অভিমতঃ হ্যাপি মিলার নামে কোনো ইংরেজি গল্প ছিল না by একেএম আশরাফুল হক

‘আমার দেশ’ পত্রিকার ১৬ নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় সুলেখক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদের ‘হারানো ঘুমের সন্ধানে’ শিরোনামে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় কলামের দীর্ঘ প্রতিবেদনটি পড়ে একটু হোঁচট খেতে হলো। লেখক তার নিবন্ধের অবতারণা করেছেন ‘হ্যাপি মিলার’ নামক তথাকথিত একটি ইংরেজি গল্পের সূত্র ধরে। গল্পটি তার স্কুলের ইংরেজি পাঠ্য পুস্তকে ছিল, নাকি দ্রুতপঠনের বইতে ছিল তা লেখক স্মরণ করতে পারছেন না—এই স্বীকারোক্তি দিয়ে দুই কলাম জুড়ে গল্পটির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন নিবন্ধকার।
আসলেই ‘হ্যাপি মিলার’ নামক কোনো ইংরেজি গল্প আজ থেকে ৬০-৬২ বছর আগে স্কুলের পাঠ্য তালিকায় ছিল কিনা তা আমার জানা নেই। আমি যখন স্কুলে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র (১৯৪৫ সালে) তখন বিখ্যাত ইংরেজ কবি আলফ্রেড টেনিসনের ‘দ্য মিলার অব দি ভি’ নামক কবিতাটি আমাদের পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কবিতাটি আমার এতই প্রিয় ছিল যে, ৬৫ বছর সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও কবিতাটির প্রতিটি চরণ আমার মনে আছে। কবিতাটি উদ্ধৃত করলাম।
‘There dwelt a miller hale and bold, beside the river Dee
He worked and song from morn to night, no lark more blithe than he.
And this the burden of his song for ever used to be,
I envy no body no, not I, no body envies me.
‘Thou art wrong my friend’, said old king Hal,
‘Thou art wrong as wrong can be
For, could my heart be light as thine,
I’d gladly change with thee.
Thy milly cap is worth my crown,
Thy mill my kingdoms fee
Thou men are England’s boast
Oh, miller of the Dee’.
কবিতাটি বাংলায় তরজমা করলে অনেকটা এ রকম দাঁড়াবে?
ইংল্যান্ডের ‘ডি’ নদীর তীরে বাস করতেন সুঠামদেহী স্বাস্থ্যবান এক যাঁতাকল মালিক (মিলার)। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কঠিন পরিশ্রম করে মনের আনন্দে গান গেয়ে দিন গুজরান করতেন তিনি। কোনো ‘ভরতপক্ষী’ও (গানের পাখি) তার মতো প্রাণবন্ত হাসিখুশিতে দিন কাটাত না। আর তার গানের কলিগুলো ছিল, ‘আমি কোনো দিন কাউকে হিংসা করি না এবং আমার প্রতিও কেউ কখনও হিংসা পোষণ করেন না।’
ইংল্যান্ডেশ্বর রাজা হাল (টিউডর রাজ সপ্তম হেনরিকে আদর করে লোকে ‘হাল’ বলতেন) প্রতিবাদের সুরে মিলারকে বললেন, ‘তুমি ভুল বলছ বন্ধু—এর চাইতে বড় ভুল আর কিছু হতে পারে না। কারণ আমার অন্তঃকরণ যদি তোমার প্রাণোচ্ছ্বাসের মতো হালকা হতো, তাহলে আমি অত্যন্ত আনন্দে তোমার সঙ্গে স্থান বিনিময় করে নিতাম। তোমার ওই আটা-ময়দা মাখানো মলিন টুপিটা আমার রাজমুকুটের সমমানের, আর তোমার যাঁতাকলটি আমার রাজত্বের মতোই মহামূল্যবান। ওহে ‘ডি’ তীরের মিলার, তোমার মতো লোকেরাই ইংল্যান্ডের গর্ব।’ মনে হয় কবিতাটি নিবন্ধকারের স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে গেলেও এর অন্তর্নিহিত মর্মবাণীর রেশটুকু ম্লান হয়ে যায়নি। কল্পনার দিগন্তকে চারদিকে প্রসারিত করে লেখক যে গল্পটির অবতারণা করেছেন তার সবটুকুই কবিতাটির মূল বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। দেশে ঘুম-তাড়ানিয়া পরিবেশ সৃষ্টির সঙ্গে মিলারের গল্পের যে যোগসূত্র, তা নিবন্ধকারের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, যার ওপর আমার কোনো মন্তব্য নেই।
কবি টেনিসন তার কালজয়ী এই কবিতায় যে ‘মিলার’কে চিত্রিত করেছেন তিনি সত্, শ্রমজীবী, উত্পাদনশীল মানুষের প্রতীক। রাজা সপ্তম হেনরি, সূক্ষ্ম বোধশক্তিসম্পন্ন শাসক, যিনি জানেন ইংল্যান্ড কাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। আমাদের দুর্ভাগা দেশ বাংলাদেশের যে কৃষককুল চল্লিশের দশকের শেষ দিকে পাঁচ কোটি লোকের অন্ন সংস্থান করত, তারা আজ পনেরো কোটি লোকের আহার জোগাচ্ছে। নিরলস পরিশ্রম করে যে কৃষিবিজ্ঞানী প্রতি বছর উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজ উদ্ভাবন করে কৃষকের হাতে তুলে দিচ্ছেন, তাদের আমরা চিনি না। পর্দার অন্তরালের নেপথ্য নায়কদের নিয়ে গর্ব করার বোধশক্তি আমাদের শাসকদের নেই।