Sunday, May 3, 2015

তুমি আবার এসো বুদ্ধ by প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

বুদ্ধের জীবদ্দশায় কালজয়ী যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, তার বেশির ভাগ পূর্ণিমাকেন্দ্রিক। বাংলা বারো মাসে বারোটি পূর্ণিমা দেখা যায়। চৈত্র পূর্ণিমা, বৈশাখী পূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, শ্রাবণী পূর্ণিমা, ভাদ্র পূর্ণিমা, আশ্বিনী পূর্ণিমা, কার্তিকী পূর্ণিমা, পৌষ পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, ফাল্গুনী পূর্ণিমা, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা, অগ্রহায়ণ পূর্ণিমা। এক এক পূর্ণিমার সঙ্গে এক এক স্মৃতি বিজড়িত আছে। তবে বৈশাখী পূর্ণিমা অন্য সব পূর্ণিমার চেয়ে বেশি ঘটনা, বেশি স্মৃতি ধারণ করে আছে। তাই বৈশাখী পূর্ণিমা বৌদ্ধ বিশ্বে সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। কেননা রাজপুত্র সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তি এই তিনটি অনন্য ঘটনা ঘটে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে। এ জন্য বৈশাখী পূর্ণিমার অপর নাম ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’।
অনেকে মনে করেন বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তি যেমন একই পূর্ণিমা তিথিতে ঘটেছিল, তেমনি এই তিনটি ঘটনা একই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল। আমি এ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করি। কেননা, সিদ্ধার্থ পরবর্তী সময়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। সিদ্ধার্থ হলেন গৌতম বুদ্ধের আগের অবস্থা আর গৌতম বুদ্ধ হলেন সিদ্ধার্থের পরবর্তী অবস্থা। যাঁরা এটুকু পার্থক্য বোঝেন না, তাঁরা বলেন বুদ্ধের সংসার, স্ত্রী, পুত্র ছিল। এটা সঠিক ধারণা নয়। সিদ্ধার্থের মধ্যে মোহ, কাম, তৃষ্ণা ছিল। কিন্তু বুদ্ধগণ এসব বিকার মুক্ত হন।
বুদ্ধের নয়টি গুণের মধ্যে দুটি হলো তিনি অরহৎ এবং ভগবান। সকল প্রকার অরি বা রিপুকে হত্যা করেছেন, ধ্বংস করেছেন বলে তিনি অরহৎ। তাঁর মধ্যে লোভ, দ্বেষ, মোহ, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি বিকার উৎপন্ন হওয়ার কারণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অপর দিকে তৃষ্ণা বা চাহিদার শৃঙ্খল তিনি ভগ্ন করেছেন। মোহবন্ধন চিরতরে ছিন্ন করেছেন, ভেঙে ফেলেছেন। এই অর্থে তিনি ভগবান। সিদ্ধার্থ কিন্তু অরহৎ কিংবা ভগবান নন। আমরা রাজকুমার সিদ্ধার্থের মহানতাকে ভক্তি করি কিন্তু পূজা করি বুদ্ধজ্ঞানকে, মুক্তির পথপ্রদর্শক মানি বুদ্ধকে। সিদ্ধার্থ নামটি অন্য কোনো নামও হতে পারত। কিন্তু বুদ্ধ শব্দটি কোনো নামবাচক শব্দ নয়, এটা গুণবাচক শব্দ।
রাজা শুদ্ধোধনের দীর্ঘ সাংসারিক জীবনে তখনো কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ না করায় রাজা মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ফুটফুটে একটি শিশু জন্ম নিল। এবার রাজার দীর্ঘদিনের কামনা, প্রার্থনা সিদ্ধিলাভ করল। তাই রাজা পুত্রের নাম রাখলেন ‘সিদ্ধার্থ’।
সিদ্ধার্থের জন্মের এক সপ্তাহ পর মাতা মহামায়া স্বর্গবাসী হন। পরে রাজা শুদ্ধোধন মহামায়ার ছোট বোন মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে বিবাহ করেন। গৌতমী সিদ্ধার্থের বিমাতা হন। কিন্তু তিনি আজকের বিমাতার মতো আচরণ করেননি। গৌতমীর এক পুত্র ছিলেন। তাঁর নাম ছিল নন্দ। সিদ্ধার্থের পরিচর্যা এবং লালন-পালনে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে ভেবে তিনি নিজের গর্ভজাত সন্তান নন্দকে লালন-পালনের ভার অন্যের হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থকে মহাপ্রজাপতি গৌতমী লালন-পালন করেছিলেন বলে তাঁকে গৌতম বুদ্ধ বলা হয়। শাক্যরাজ বংশীয় বলে বুদ্ধকে শাক্যসিংহও বলা হয়।
২৯ বছর বয়সী রাজনন্দন সিদ্ধার্থ নগর ভ্রমণে সে সময় যে চার নিমিত্ত বা দৃশ্য দেখেছিলেন তা তাঁর মধ্যে গভীর রেখাপাত করল। জরাগ্রস্ত ব্যক্তি, ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি, মৃত ব্যক্তি এবং সন্ন্যাসী এই চারটি ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য তাঁকে গৃহবাস ত্যাগে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করেছিল। রোগ, জরা, মৃত্যু, শোক ইত্যাদি দুঃখ থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণ করার জন্যই তিনি সংসার ত্যাগ করেছিলেন। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব তাঁর Buddha, The Humanist গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বুদ্ধ এ জগতে যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে পরিবেশের বিরুদ্ধেই তিনি এক দ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই দ্রোহ বা বিপ্লব ছিল জীবনের দুঃখ, জরার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে দেওয়ার প্রয়াস।’
দীর্ঘ ছয় বছর সাধনার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধজ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি উদ্ঘাটন করলেন যে জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর কারণ হলো জন্ম। জন্মের মূল কারণ হলো তৃষ্ণা। আর তৃষ্ণার মূল কারণ হলো অবিদ্যা। তৃষ্ণা নিবৃত্ত হলেই মানুষ দুঃখ মুক্তি লাভ করতে পারে, যার প্রমাণ বুদ্ধ নিজেই। আর এই দুঃখ মুক্তির জন্য যে পথে হাঁটতে হবে তা হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। আর এই মার্গে বিচরণ করতে হলে প্রয়োজন প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি, পরিবর্তনবাদ, কর্মবাদ এবং অনাতবাদ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান।
৩৫ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভের পর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধর্মপ্রচার করে অবশেষে তিনি ৮০ বছর বয়সে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের ২৫৫৯ বছর পূর্ণ হলো। বিশ্ব বৌদ্ধরা বৈশাখী পূর্ণিমা উদ্যাপনের মাধ্যমে নতুন বুদ্ধবর্ষকেও বরণ করে নেবেন।
বৈশাখী পূর্ণিমা দিনে যদিও বা বুদ্ধ জন্মোৎসব পালিত হয়, প্রকৃতপক্ষে এটা বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ দিবসও বটে। বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপনে আনন্দটা মুখ্য নয়। ভাবগম্ভীর পরিবেশে সম্পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদায় দিনটি পালন করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
কবিগুরু তাঁর বুদ্ধদেব গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি যাঁকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি, আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি। এ কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের অলংকার নয়, একান্তে নিভৃতে যা তাঁকে বারবার সমর্পণ করেছি সেই অর্ঘ্যই আজ এখানে উৎসর্গ করি।’ [বৈশাখী পূর্ণিমা, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪২]
যিনি ভারতবর্ষ থেকে অমিয় প্রেমের মন্ত্র, বিশ্বমৈত্রীর বাণী বিশ্বে ছড়িয়েছেন, আজ তাঁর শূন্যতা বিশ্বময় উপলব্ধি হচ্ছে। কবিগুরু লিখেছেন, ‘একদিন বুদ্ধগয়াতে গিয়েছিলাম মন্দির দর্শনে, সেই দিন এই কথা আমার মনে জেগেছিল—যাঁর চরণ স্পর্শে বসুন্ধরা একদিন পবিত্র হয়েছিল, তিনি যেদিন সশরীরে এই গয়াতে ভ্রমণ করেছিলেন, সেদিন কেন আমি জন্মাই নি, সমস্ত শরীর মন দিয়ে প্রত্যক্ষ তাঁর পুণ্য প্রভাব অনুভব করি নি ?’
কবিগুরুর ভাষায়—
‘‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব
ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ।
নূতন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী,
কর’ ত্রাণ মহাপ্রাণ, আন’ অমৃতবাণী,
বিকশিত কর’, প্রেমপদ চিরমধুনিষ্যন্দ।
শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য,
করুণাঘন, ধরণীতল কর’ কলঙ্কশূন্য।’’
‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।’
বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু: সহকারী পরিচালিক, সীমা বৌদ্ধ বিহার, রামু।

ওরা ইন্টারনেটে যা দেখে -ডয়চে ভেলে

জার্মানির মাইনৎস মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোদৈহিক বিভাগের একটি জরিপের ফলাফলে জানা গেছে, আজকের কিশোর-কিশোরীরা অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। কী দেখে তারা? সম্প্রতি ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি ২,৪০০ কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে একটি জরিপ করা হয়েছিলো। যারা দিনের ৬ ঘণ্টাই কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল বা ট্যাবলেটের সামনে বসে সময় কাটায়, তাদের সমবয়সি বা বন্ধুবান্ধবদের সাথে মেশার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। কারণ সামনে থাকা যন্ত্রটিই তাদের বড় বন্ধু ৷ যখন মানুষের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সবচেয়ে ভালো সময় ঠিক সেসময়ই যদি তারা দিনের এতটা সময় কম্পিউটার গেম বা যৌন বিষয়ক ওয়েবসাইট নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায় তাহলে কারো সাথে বন্ধুত্ব হওয়া খুব কঠিন। এ কথা বলেন গবেষক টিমের প্রধান ডা.মানফ্রেড বয়টেল। যাদের নিয়ে গবেষণা করা হয়, তাদের মধ্যে শতকরা ৩দশমিক ৪ শতাংশই ইন্টারনেটে নেশাগ্রস্ত। অর্থাৎ তারা দিনে ৬ ঘণ্টার বেশি অনলাইনে থাকে, অন্য কিছুর প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। ১৩দশমিক ৮ শতাংশ কিশোর-কিশোরীদের নেশা না হলেও তারাও ইন্টারনেটের প্রতি খুবই আগ্রহী। সময়ের দিক থেকে ছেলেমেয়ে সমানভাবেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে। সময়ের দিক থেকে পার্থক্য না থাকলেও ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে। যেমন মেয়েরা বেশি সময় কাটায় সামাজিক যোগাযোগ এবং অনলাইন শপিং-এ, আরা ছেলেরা বেশি সময় খরচ করে কম্পিউটার গেম এ, এবং যৌনআনন্দে। যেসব টিন-এজ বা কিশোর-কিশোরীরা সমাজে ভালোভাবে মেলামেশা করতে পারেনা, তারা এমন অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকে যেগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ কম হয়। এ তথ্য জানান ড.বয়টেল তাদের ক্লিনিকের আউটডোর পেশেন্ট হিসেবে আসা কম্পিউটারে ‘নেশা’ টিন-এজারদের সম্পর্কে। এরকম ছেলে-মেয়েদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের প্রতি ডা.মানফ্রেড বয়টেলের পরামর্শ, টিন-এজারদের প্রযুক্তির উন্নয়ন ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিকভাবে মেলামেশার বিষয়টির দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া এবং লক্ষ্য রাখা উচিত।

থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবর!

দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সাদাও এলাকার জঙ্গলে গণকবর থেকে
দেহাবশেষ উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মী ও ফরেনসিক কর্মকর্তারা
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গভীর জঙ্গলে অভিবাসীদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আটটি কঙ্কাল। এগুলো বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকাটি থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের একজন বাংলাদেশি অথবা মিয়ানমারের নাগরিক। খবর এএফপির।
মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী শংখলা প্রদেশের সাদাও এলাকার জঙ্গলে ওই গণকবর থেকে গতকাল শনিবার উদ্ধার করা হয় তিনটি কঙ্কাল। এর আগের দিন আরও পাঁচজনের দেহাবশেষ উদ্ধার করেন ফরেনসিক বিভাগের কর্মীরা।
এ বিষয়ে থাই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে, প্রত্যন্ত ওই এলাকায় পাচারকারীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। কয়েক দিন আগে হয়তো পাচারকারীরা এলাকাটি ছেড়ে চলে যায়। নৌকায় করে আসা মিয়ানমার ও বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘এই জঙ্গলের কারাগারে’ আটকে রাখা হতো। পরে তাঁদের স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। মুক্তিপণ দিতে না পারা অনেকে বিন্দদশায় অনাহারে ও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
থাইল্যান্ডের পুলিশপ্রধান সোমাইয়ুত পুমপানমাউং বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তি জঙ্গল থেকে মাশরুম সংগ্রহ করতে গিয়ে কবরগুলোর সন্ধান পান। পরে তিনি পুলিশকে খবর দিলে শুক্রবার থেকে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। স্থানটি প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। একই এলাকায় কবরের মতো দেখতে অন্তত ৩২টি জায়গা রয়েছে। সেখানে একজন নাকি একসঙ্গে বহু মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে, তা এসব স্থান খুঁড়ে দেখতে হবে। সেই চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া এই এলাকায় আরও অন্তত ২০টি কবর থাকতে পারে। সেগুলোর অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা দুজনের পুরো পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালটির এক চিকিৎসক বলেছেন, একজনের বয়স ২৫ ও অন্যজনের ৩৫ বছর। দুজনেই ওই ঘাঁটিতে কয়েক মাস বন্দী ছিলেন। এ সময় জ্বরে ভুগেছেন। তাঁদের প্রায় দিনই না খেয়ে থাকতে হতো। ৩৫ বছরের ব্যক্তিটিকে উদ্ধারের আগে দুই দিন কোনো কিছুই খাননি। তিনি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে হাঁটতে পারতেন না।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিকটতম সড়ক থেকে মাত্র ৪০ মিনিট হাঁটলেই পাচারকারীদের ওই ঘাঁটি ছিল। সেখানে পাচারকারীদের গোপন আরও অনেক আস্তানা থাকতে পারে। পাচারকারীদের হাতে আটক বন্দীরা অনাহারে ও রোগে মারা যায় বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, গণকবরের সন্ধান পাওয়ার এ ঘটনায় জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতায় স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসী প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সাগর পাড়ি দেন। এই দলে অনেক বাংলাদেশিও থাকেন।

স্বামীকে খুন করে গোয়ালঘরে পুঁতে রাখে স্ত্রী!

স্বামী হত্যার দায়ে আটক ফাতেমা বেগম
নিখোঁজের ৩৮ দিন পর গোয়ালঘর থেকে এক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে চিনিকলের স্টাফ কোয়ার্টাররের একটি গোয়ালঘর থেকে তার গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ । এ ঘটনায় নিহত মোবারকগঞ্জ চিনিকলের মেকানিক রফিউদ্দিন (৫০)-এর স্ত্রীসহ দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
কালীগঞ্জ থানার ওসি মো: আনোয়ার হোসেন জানান, শনিবার বিকালে স্ত্রী ফাতেমাকে ( ৪৫) আটকের পর তার দেয়া তথ্যমতে রোববার চিনিকলের স্টাফকোয়ার্টারের একটি গোয়াল ঘরের মেঝেতে পুতে রাখা রফিউদ্দিনের গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি আরো জানান রফিউদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পরে দুই পা কেটে একটি পলি ব্যাগে ভরে নিজ কোয়ার্টারের সামনের গোয়াল ঘরের মেঝেতে গর্ত খুঁড়ে পুতে রাখা হয়। এরপর গর্তের ওপরের অংশে সিমেন্ট বালু দিয়ে প্লাস্টার করে দেয়া হয় । জিজ্ঞাসাবাদের জন্য  আনিচ ভুইয়া নামে চিনিকলের আরো এক শ্রমিককে আটক করা হয়েছে ।
চিনিকলের উপ ব্যবস্থাপক পরিবহণ বিভাগ মো: কামরুল ইসলাম জানান গত ২৬ মার্চ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরে নিখোঁজ হন ম্যাকানিক মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামের মৃত তাইজুদ্দিন শেখের ছেলে ৩ সন্তানের পিতা মো: রফিউদ্দিন শেখ । এরপর চিনিকল কর্তৃপক্ষ থানায় একটি ডায়রি করেন । নিখোঁজ সংবাদ প্রকাশ করা হয় স্থানীয় একটি পত্রিকায় । একপর্যায়ে গতকাল শনিবার রফিউদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমাকে আটক করে পুলিশ । এরপর তার লাশ পাওয়া যায় । ফাতেমা নিহতের নিজ গ্রামের মৃত হাবিবর রহমানের মেয়ে । তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ১৮ বছর আগে।  দুই ছেলে এক মেয়ের জনক জননী তারা । এক মাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে ।
সংশ্লিষ্ট প্রাথমিকভাবে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানান তিনি ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার দিন (২৬ মার্চ) ঘটনার দিন রাতে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে শাবল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয় । এতেই মারা যায় সে । এরপর পেশাদার কিলার দিয়ে রফিউদ্দিনের দুই পা কেটে বডি ছোট করা হয় । লাশ একটি বড় পলি ব্যাগে ভরে বাড়ির সামনের গোয়াল ঘরের মেঝেতে বিশাল একটি গর্ত খুঁড়ে পুতে রাখা হয় । আগে থেকেই আনা হয় বালি ও সিমেন্ট । পরিকল্না মোতাবেক গর্তের উপরিভাগ প্লাষ্টার করে দেয়া হয় । ঘাতক স্ত্রী সহ পরিবারের সদস্যরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে থাকে । শনিবার নিহতের ছোট ভাই বাবর আলী ঘটনা জানতে পারেন এবং সে পুলিশকে খবর দেয় । এরপর পুলিশ প্রথমে স্ত্রী ফাতেমা ও তার সহযোগি নবাবগঞ্জ উপজেলার চৌকিখাটা গ্রামের মৃত দাগন ভুইয়ার ছেলে চিনি কলের শ্রমিক আনিচ ভুইয়াকে আটক করে । এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে । দুপুরে নিহতের  লাশ ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রুনা লায়লাকে নিয়ে পালাতেন নচিকেতা! by আহমেদ মুনির

সংগীতজগতের তারকা হলেও নচিকেতা এখনো
নিজেকে কলকাতার দত্তবাগানের পাড়ার
ছেলে বলেই ভাবেন l সৌরভ দাশ
ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী নচিকেতার জন্ম কলকাতায় হলেও বাপ–দাদার ভিটা বরিশালে। তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর বিশেষ অনুভূতি থাকারই কথা। তবে কেবল বরিশাল নয়, এ দেশের প্রতি গভীর অনুরাগের পেছনের আরেকটা বড় কারণ রুনা লায়লাও। নচিকেতা সেই ছেলেবেলায় গান শুনে প্রেমে পড়েছিলেন তাঁর। রুনা লায়লার বয়স কম হলে নাকি তাঁকে নিয়ে পালিয়েও যেতেন।
নীল রঙের খোলা শার্টের নিচে উঁকি দিচ্ছে লাল গেঞ্জি। এলোমেলো চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হতে জ্বলছে পাতার বিড়ি। কবির সুমনের পর ‘জীবনমুখী’ ধারার শিল্পী হিসেবে পরিচিতি জুটেছিল নব্বইয়ের দশকেই। সেই নচিকেতা চক্রবর্তী নিজেকে সাধারণ মানুষ ভাবতেই পছন্দ করেন। এখনো কলকাতার দত্তবাগানের ছেলেই রয়ে গেছেন। পাড়ার রকে হরদম আড্ডাও দেন।
গত ৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিনিয়রস ক্লাবে এ বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া গায়ক চন্দন সিনহার সংবর্ধনা উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গান গাইলেন নচিকেতা। তার আগে সকালে ঘণ্টা দেড়েকের জমজমাট আড্ডা হলো। গান, লেখালেখি, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, রাজনীতি—সব প্রসঙ্গই উঠে এল।
কিন্তু সব ছাপিয়ে এল নীলাঞ্জনার প্রসঙ্গ। তিন–তিনটে সিক্যুয়েল গেয়েছেন নীলাঞ্জনাকে নিয়ে। ‘হাজার কবিতা’ লিখতে হয়েছে যাকে নিয়ে, কে সেই মানুষটি?
প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে সপ্রতিভ নচিকেতার জবাব, ‘বলা যাবে না, বলব না।’ একটু থেমে বললেন, ‘একটা উর্দু শের আছে, যার অর্থ হলো সুন্দর জিনিস থেকে দূরে থাকাই ভালো। সুতরাং, এই নীলাঞ্জনা থেকে দূরেই থাকুন। হা হা হা...’
‘নীলাঞ্জনা’ গানটি অবলম্বনে যে এ দেশের টিভি চ্যানেলে ছয় পর্বের ধারাবাহিক নাটক হয়েছে, এই তথ্যও অজানা তাঁর। শুনে অবাক হলেন। বললেন, ‘ভালো তো!’
প্রসঙ্গ এড়িয়ে দত্তবাগানের কথায় ফিরে যান। বললেন, ‘আমার বাড়িতে সংগীতচর্চার জন্য আলাদা কোনো রুম নেই। পাড়ার রকে বসেই অনেক গান রচিত হয়েছে। পাড়ায় পালা করে আমরা নাইট ডিউটি দিতাম। বিখ্যাত হওয়ার পর এখনো তেমনই আছি।’
নীলাঞ্জনাও কী দত্তবাগানেরই বাসিন্দা?
এবার আর এড়াতে পারলেন না। বললেন, ‘শুধু এটুকুই বলব কিন্তু। হ্যাঁ, নীলাঞ্জনা দত্তবাগানেরই মেয়ে।’
১৯৯৩ সালে এই বেশ ভালো আছি অ্যালবাম বের হওয়ার পরপরই নচিকেতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত বছর পর্যন্ত ১৮টি একক অ্যালবাম বেরিয়েছে। মিশ্র অ্যালবাম আছে ১১টির মতো। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক তো আছেই। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হঠাৎ বৃষ্টি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। সেই চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘একদিন স্বপ্নের দিন’ শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে একঝলক নতুন হাওয়াও এনে দিয়েছে। কণ্ঠ দিয়েছেন বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত বলিউডের ওমকারাসহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে। এর পরও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো ভাবনা নেই তাঁর। বললেন, ‘প্লেব্যাক একদম ভালো লাগে না। আসলে ফরমায়েশি গান পছন্দ নয়। তা ছাড়া এসব মিষ্টি ভালোবাসার চটুল গান থেকে দূরেই থাকতে চাই।’
এই বেশ ভালো আছি অ্যালবামের আগের নচিকেতা আর আজকের নচিকেতার মধ্যে কোনো তফাত আছে? ‘আছেই তো। তখন বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। প্রতিবাদ করার সাহস ছিল। আর এখন সাহসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিজ্ঞতা আর পরিপক্বতা।’
কেমন মানুষ নচিকেতা? প্রশ্ন করতেই ভ্রু কোঁচকালেন, ‘এই প্রশ্ন অনেকেই করে। আসলে আমি বেশ অহংকারী।’ বলেই একচোট হাসলেন।
কবির সুমন, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা—এই তিন শিল্পীর গান একই সময়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে। নচিকেতা কেন বিশিষ্ট, সে ব্যাখা দিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কবির সুমন বা অঞ্জন দত্ত গুণী শিল্পী। তবে তাঁরা আমার মতো নন। আমি জনপ্রিয় ধারার গায়ক। হিন্দি গানের দাপটের সময় বাংলা গানকে জনপ্রিয় করেছি। আমি এই ধারার গান প্রতিষ্ঠিত করেছি। এখন যাঁরা গাইছেন অনুপম রায় বা অরিজিৎ সিং, তাঁরাও আমার গান শুনেছেন। আমার শো দেখে বড় হয়েছেন।’
নচিকেতার অনেক গানের মধ্যে গল্প খঁুজে পাওয়া যায়। বেশ কিছু গল্প লিখেছেনও। বেরিয়েছে ক্যকটাস ও জন্মদিনের রাত নামের দুটো উপন্যাস। লেখালিখির প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘আসলে আমি খুব অলস। যে সব গল্প মাথায় ঘোরে সেসব আর লেখার ফুসরত হয় না। আমি সেসব গানে ঢুকিয়ে দিই।’
জ্যাক লন্ডন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং হুমায়ুন আহমেদ তাঁর ভীষণ প্রিয়। হুমায়ুন বেঁচে থাকতে কেন দেখা করনেনি এ নিয়ে আফসোস হয় খুব। তাঁর ধারণা হুমায়ুনের ‘মিসির আলী’ চরিত্রটি অমর হয়ে থাকবে।
সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের পাশাপাশি বব ডিলান ও মাইকেল জ্যাকসনের গান তাঁর খুব ভালো লাগে। তবে এদের বাইরে তিনি যাঁর বড় ভক্ত তাঁর নাম রুনা লায়লা। উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘রুনাজি সুফি, গজল, রোমান্টিক সব ধারার গানই করেন। কী অপূর্ব তাঁর গলা। আরেকটু আগে জন্মালে নিশ্চিত তাঁকে নিয়ে আমি পালিয়ে যেতাম।’
কেবল রুনা লায়লা নন, হুট করে যে কোনো মেয়েরই প্রেমে পড়ে যান নচিকেতা। ঘন ঘন প্রেমে পড়া তাঁর স্বাভাব। তবে হৃদয়ের সবচেয়ে বড় লেনদেনটা হয় স্ত্রী রুমকির সঙ্গেই।
একজন শিল্পীর সব চেয়ে বড় সম্পদ কী? এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে একটু ভাবলেন। এরপর বললেন, ‘বিশ্বাস। শিল্পী নিজে যা করছেন তার প্রতি বিশ্বাস থাকাটা খুব জরুরি। এটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।’

ব্যাংক ডাকাতেরা আনসারুল্লাহর সদস্য

আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সবাই জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য বলে দাবি করছে পুলিশ।
রিমান্ডে চার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানান, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কারাবন্দী নেতাদের জামিনে মুক্ত করতেই অর্থ সংগ্রহের জন্য সংগঠনের সদস্যরা ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করেন। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখায় তাঁরা ডাকাতি করতে যান।
গত ২১ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কর্মাস ব্যাংকে ডাকাতি হয়। ব্যাংকের ব্যবস্থাপক, নিরাপত্তা কর্মী ও এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করে টাকা নিয়ে পালানোর সময় ডাকাতেরা জনতার বাধার মুখে পড়েন। এ সময় তাঁরা গুলি করে ও বোমা ছুড়ে পালাতে থাকে। এতে মারা যান আরও পাঁচ জন। জনতা ধাওয়া করে তিন ডাকাতকে ধরে গণপিটুনি দিলে তাঁদের একজন মারা যান। বাকি দুজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে জনতা। এঁরা হলেন আল-আমিন ও বোরহান উদ্দিন। তাঁরা এখন পুলিশের হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
পুলিশ জানায়, এই দুজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন মিন্টু প্রধান, বাবুল সরদার, হারুন-আর-রশীদ ও সোহেল রানা। এঁদের মধ্যে সোহেল রানা ওই ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী। এঁদের মধ্যে প্রথম দুজনের সাত দিনের রিমান্ড গতকাল শেষ হয়েছে। তাঁদের আজ রোববার আদালতে হাজির করা হবে। বাকি দুজন হারুন ও সোহেলের প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। গতকাল ঢাকা মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত তাঁদের আরও দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তাঁরা অনেক দিন ধরেই সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় বড় ধরনের কিছু ঘটানোর জন্য পরিকল্পনা আঁটছিলেন। এই দলে আরও কিছু সদস্য রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গিদের এ দলটি কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখায় ডাকাতির পরিকল্পনা করে কয়েক মাস আগে। এ জন্য দলটির সদস্যরা প্রথমে ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী সোহেলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাঁর কাছ থেকেই তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ঘটনার দিন তাঁদের একটি দল ছদ্মবেশে ব্যাংকের আশপাশে অবস্থান নিয়ে জনসাধারণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। আরেকটি দল মোটরসাইকেল ও একটি গাড়ি নিয়ে কাঠগড়া বাজারসংলগ্ন বিশমাইল-জিরাবর সড়কে অবস্থান নেয়। যাতে তাঁরা ঘটনার পর দ্রুত পালাতে পারেন। ছয়জনের একটি দল ব্যাংকে ঢুকে ডাকাতি ও হত্যায় অংশ নেন।
ছয় আসামির পরিচয়:
গ্রেপ্তার থাকা আসামিরা শুরুতে নিজের ভুল ঠিকানা দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ তাঁদের প্রকৃত ঠিকানা বের করে ফেলে।
পুলিশ জানায়, এর মধ্যে আল-আমিন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের ধুকুরিয়া গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে। তিনি একসময় তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। বছর দেড়েক আগে চাকরি ছেড়ে যোগ দেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেন। ব্যাংক ডাকাতির আগে তিনি রিকশাচালকের ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
মজনু প্রধান মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ব্রাহ্মণকুল গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। তিনিও রিকশা চালানোর পাশাপাশি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের হয়ে কাজ করতেন।
বাবুল সরদার মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দাসকান্দি গ্রামের ইসকান্দার সরদারের ছেলে। তিনি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।
বোরহান উদ্দিন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের আবুল কালামের ছেলে। আশুলিয়ায় তাঁর পরিবহনের ব্যবসা ছিল।
ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী সোহেল রানা নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার ফোকন্দা গ্রামের শাজাহান আলীর ছেলে।
আরেক আসামি হারুন-অর-রশীদ জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাচুইল গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে। রাজধানীতে তাঁর একটি কম্পিউটারের দোকান ছিল। পুলিশের দাবি তিনি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ।

থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবর!

দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সাদাও এলাকার জঙ্গলে গণকবর
থেকে গতকাল দেহাবশেষ উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মী
ও ফরেনসিক কর্মকর্তারা l ছবি: এএফপি
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গভীর জঙ্গলে অভিবাসীদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আটটি কঙ্কাল। এগুলো বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকাটি থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের একজন বাংলাদেশি অথবা মিয়ানমারের নাগরিক। খবর এএফপির।
মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী শংখলা প্রদেশের সাদাও এলাকার জঙ্গলে ওই গণকবর থেকে গতকাল শনিবার উদ্ধার করা হয় তিনটি কঙ্কাল। এর আগের দিন আরও পাঁচজনের দেহাবশেষ উদ্ধার করেন ফরেনসিক বিভাগের কর্মীরা।
এ বিষয়ে থাই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে, প্রত্যন্ত ওই এলাকায় পাচারকারীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। কয়েক দিন আগে হয়তো পাচারকারীরা এলাকাটি ছেড়ে চলে যায়। নৌকায় করে আসা মিয়ানমার ও বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘এই জঙ্গলের কারাগারে’ আটকে রাখা হতো। পরে তাঁদের স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। মুক্তিপণ দিতে না পারা অনেকে বিন্দদশায় অনাহারে ও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
থাইল্যান্ডের পুলিশপ্রধান সোমাইয়ুত পুমপানমাউং বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তি জঙ্গল থেকে মাশরুম সংগ্রহ করতে গিয়ে কবরগুলোর সন্ধান পান। পরে তিনি পুলিশকে খবর দিলে শুক্রবার থেকে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। স্থানটি প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। একই এলাকায় কবরের মতো দেখতে অন্তত ৩২টি জায়গা রয়েছে। সেখানে একজন নাকি একসঙ্গে বহু মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে, তা এসব স্থান খুঁড়ে দেখতে হবে। সেই চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া এই এলাকায় আরও অন্তত ২০টি কবর থাকতে পারে। সেগুলোর অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা দুজনের পুরো পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালটির এক চিকিৎসক বলেছেন, একজনের বয়স ২৫ ও অন্যজনের ৩৫ বছর। দুজনেই ওই ঘাঁটিতে কয়েক মাস বন্দী ছিলেন। এ সময় জ্বরে ভুগেছেন। তাঁদের প্রায় দিনই না খেয়ে থাকতে হতো। ৩৫ বছরের ব্যক্তিটিকে উদ্ধারের আগে দুই দিন কোনো কিছুই খাননি। তিনি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে হাঁটতে পারতেন না।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিকটতম সড়ক থেকে মাত্র ৪০ মিনিট হাঁটলেই পাচারকারীদের ওই ঘাঁটি ছিল। সেখানে পাচারকারীদের গোপন আরও অনেক আস্তানা থাকতে পারে। পাচারকারীদের হাতে আটক বন্দীরা অনাহারে ও রোগে মারা যায় বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, গণকবরের সন্ধান পাওয়ার এ ঘটনায় জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতায় স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসী প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সাগর পাড়ি দেন। এই দলে অনেক বাংলাদেশিও থাকেন।

এরশাদ বললেন, হয়তো বিএনপি জিততেও পারত

বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বয়কট না করলে জিততেও পারত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। আজ রোববার রংপুরে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর বিএনপির বয়কট প্রসঙ্গে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে এইচ এম এরশাদ বলেন, ‘হঠাৎ করে তাদের নির্বাচন বয়কট করা ঠিক হয়নি। বয়কট না করলে ভোটের ব্যবধান আরও অনেক কম হতো। হয়তো তারা জিততেও পারত। নির্বাচন থেকে কেন তারা সরে দাঁড়াল আমি তা বলতে পারব না।’
সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ আরও বলেন, তারা (বিএনপি) হয়তো আশঙ্কা করেছিল জিততে পারবে না। এ কারণে তারা বয়কট করেছে। কিন্তু ভোট গণনার পর দেখা যায় তারা তিন লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে তা না ঘটলে আরও ভালো হতো।
তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। জাতীয় পার্টির ‘বেহাল দশা’ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এরশাদ বলেন, ‘এ বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু বলতে চাই না। দেশের চলমান রাজনীতি বলে দেবে কী করতে হবে।’
এরশাদ ঢাকা থেকে বিমানযোগে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করে সড়কপথে রংপুর সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছান। এ সময় সেখানে তাঁকে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
রংপুরে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জি এম কাদের, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আসিফ শাহরিয়ার, মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান, সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরসহ জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বন বাঁচাবে মিলি আপার চুলা by এস এম হানিফ

পরিবেশবান্ধব চুলা বানিয়ে বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করছেন
আফরোজা বুলবুল। সাধারণ চুলার তুলনায় জ্বালানি কাঠ কম
লাগে বলে বন বঁাচাতে ভূমিকা রাখছে এই চুলা l প্রথম আলো
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের খন্দকারপাড়া গ্রামের পাশেই ফাঁসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। বন থেকেই আসে গ্রামের মানুষের জ্বালানি কাঠের জোগান। তবে গত কয়েক বছরে জ্বালানি কাঠের চাহিদা কমায় গাছ নিধনও কমেছে। আর এসবের পেছনে ভূমিকা রাখছে ‘মিলি আপা’র পরিবেশবান্ধব চুলা। পুরো নাম আফরোজা বুলবুল, ডাকনাম মিলি। খন্দকারপাড়া গ্রামেরই মেয়ে তিনি। সবার কাছে তিনি মিলি আপা নামেই পরিচিত। তাঁর তৈরি চুলায় জ্বালানি কাঠ লাগে সাধারণ চুলার অর্ধেক। ধোঁয়া হয় না বলে পরিবেশদূষণও ঘটায় না, সাশ্রয়ী তো বটেই, সবচেয়ে বড় কথা, বন বাঁচাতে ভূমিকা রাখছে এই চুলা। খন্দকারপাড়া গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ আফরোজা বুলবুল ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ মেটাতে শুরু করেছিলেন এমন চুলা বানানো। ছয় বছর আগে চুলা বানানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে এই কাজে লেগে যান তিনি। বন বাঁচাতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নিজের সংসারেও এনেছেন সচ্ছলতা। ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ফাঁসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন ৩০টি গ্রামের এক হাজার পরিবার এখন তাঁর তৈরি চুলা ব্যবহার করছে।
কেমন কাজ করে এই চুলা? খন্দকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সোলাইমান দেখাতে নিয়ে যান তাঁর রান্নাঘরে। বেশ ঝকঝকে রান্নাঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুই মুখের সিমেন্টের পাকা চুলা। চুলার মাঝ থেকে একটি চিমনি উঠে গেছে ছাদের ওপরে। চুলা জ্বললেও নেই দম বন্ধ করা ধোঁয়া।
সোলাইমান জানান, খন্দকারপাড়ার ২০০ পরিবারের মধ্যে এক শরও বেশি পরিবার এখন মিলি আপার তৈরি চুলা ব্যবহার করছে। এই গ্রামের লোকজনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার করছে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের খোন্দকারপাড়া, মাস্টার আলীপাড়া, নয়াপাড়া, মুসলিমনগর, সিকদারপাড়া, ছড়ারকুল, ঘোনাপাড়া, হাঁসেরদীঘি, ছায়েরাখালী, নতুন মসজিদ, ছগির শাহ কাটা, মিঠাছড়ি ডুমখালী চা বাগানসহ ৩০টি গ্রামের মানুষজন।
গত ৩১ মার্চ সকালে আফরোজা বুলবুলের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর আগের কথা। স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চলত না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটানো কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে খবর পেলাম ইন্ডিকেটেড প্রোটেক্টেড এরিয়ার কো-ম্যানেজম্যান্ট (আইপেক) প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আমি সপ্তাহব্যাপী চুলা বানানোর প্রশিক্ষণ নিলাম। চুলা তৈরির শুরুটা এভাবেই।’
আফরোজা বলেন, প্রথমে চুলার উপকারিতা সম্পর্কে গ্রামের লোকদের বোঝাতে কষ্ট হয়। পরে মাঠ পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করতে উঠান বৈঠক ও সভা করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং ইউএসএইড কর্তৃপক্ষ। এই দুই সংস্থা ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) নামের একটি প্রকল্পের আওতায় পরিবেশবান্ধব চুলা জনপ্রিয় করতে উৎসাহ দিচ্ছেন গ্রামবাসীকে।
বালি, কংক্রিট, সিমেন্ট, জিআই তার, প্লাস্টিকের পাইপ, লোহার ছাকনি এসব উপাদান দিয়ে তৈরি হয় পরিবেশবান্ধব চুলা। এক সঙ্গে সাত সেট চুলা তৈরি করেন আফরোজা। তৈরি থেকে বসানো পর্যন্ত সময় লাগে তিন দিন। একটি চুলা তৈরি করতে খরচ হয় ৫৮০ টাকা। আর এ চুলা তিনি বিক্রি করেন ১২০০ টাকায়। এ কাজে তিনি কোনো শ্রমিক ব্যবহার করেন না। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও চুলা তৈরি করেছেন আফরোজা।
আফরোজার সংসারে এখন অভাব নেই। স্বামী রুহুল কাদেরকে গ্রামের মধ্যে একটি ফার্মেসি করে দিয়েছেন। ৯০ হাজার টাকা খরচ করে সেমিপাকা ঘর করেছেন। প্রতি মাসে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বাবদ খরচ করেন সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। মেয়ে রুমানা জান্নাত পড়ে চকরিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে। আর ছেলে আশরাফুল মোহাম্মদ নিহাদ খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। গত বছর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে পুরো বিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে আশরাফুল। এতে মায়ের আনন্দের শেষ নেই। আফরোজার স্বপ্ন মেয়েকে চিকিৎসক ও ছেলেকে প্রকৌশলী বানাবেন।
ক্রেল প্রকল্পের চকরিয়া উপজেলার সমন্বয়কারী মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতেই পরিবেশবান্ধব চুলা উদ্ভাবন করা হয়। আফরোজাকে উৎসাহিত করতে প্রতি চুলায় তাঁকে ক্রেলের পক্ষ থেকে ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, একটা সময় আসবে একজন লোকও বনের ক্ষতি করবে না।

বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে গেছে by সেলিম জাহিদ

নেতা-কর্মীদের আত্মগোপন ও নিষ্ক্রিয়তায় তছনছ হয়ে পড়েছে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো। এ অবস্থায় দলটির আন্দোলন, নির্বাচন—সব ধরনের কর্মসূচিই অনেকটা ‘ঘোষণানির্ভর’ হয়ে পড়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী এবং আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তাঁরা বলছেন, নিকট অতীতে এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকেনি বিএনপি। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে কারাবরণ, নেতা-কর্মীদের গুম-খুন ও নির্যাতনের ভীতি দলের সকল পর্যায়ে। এ কারণে শীর্ষ পর্যায় থেকে নানা চেষ্টা, আহ্বান, তাগিদ সত্ত্বেও দলের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামানো যাচ্ছে না।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, সর্বশেষ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের সংকট প্রকাশ পেয়েছে। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভোটে ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটাতে সংবাদ সম্মেলন করে নেতা-কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে পাহারা বসাতে বলেছিলেন। এমনকি গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করারও নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। নির্বাচনের দিন ৯০ ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টই যাননি। গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয়ে নেতা-কর্মীরা যার যার জায়গায় চুপচাপ ছিলেন।
বিএনপির নেতারা বলছেন, রাজধানী ঢাকায় সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই ৬ জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাসের আন্দোলনে সফল হতে পারেনি বিএনপি। সিটি নির্বাচনে সেই দুর্বলতা আরও খোলাসা হয়েছে। দেখা গেছে, আন্দোলনের মতো সিটি নির্বাচনেও দলের নীতিনির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ নেতা সক্রিয় হননি বা আত্মগোপন অবস্থান থেকে বের হননি। আন্দোলনের পর নির্বাচনেও দলীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও চরমে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন ও আন্দোলনে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার একটি দিক যে প্রকাশ পেয়েছে, তা অস্বীকার করব না। তবে এ জন্য বেশি দায়ী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।’
দলের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে গত চার মাসে প্রায় ১০ হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে ৬ জানুয়ারি অবরোধ কর্মসূচি শুরুর আগেই গ্রেপ্তার করা হয় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। এরপর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের আন্দোলন, এরপর এপ্রিলে তিন সিটি নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ১৯ সদস্যের মধ্যে খালেদা জিয়াসহ মাত্র তিন-চারজন নেতাকে সক্রিয় হতে দেখা যায়।
বিএনপির সূত্র জানায়, অনেক দিন পর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও আ স ম হান্নান শাহ সিটি নির্বাচনে সক্রিয় হন। আন্দোলনের সময় এ দুই নেতাসহ স্থায়ী কমিটির সদস্য আর এ গণি, জমির উদ্দিন সরকার, এম কে আনোয়ার, সারোয়ারি রহমান, রফিকুল ইসলাম মিয়া নীরব ছিলেন। তরিকুল ইসলাম ও মির্জা আব্বাস আত্মগোপনে আর নজরুল ইসলাম খান চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে ছিলেন। আন্দোলনে এই তিনজনের সম্পৃক্ততা ছিল। আবদুল মঈন খান কখনো সক্রিয়, কখনো নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এমনও অভিযোগ আছে, ওই সময় একজন বিদেশি কূটনীতিক বিশেষ প্রয়োজনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যকে নিজ দূতাবাসে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি যাননি। ভয়ে তিনি বাসা থেকে বের হতে রাজি হননি।
এর বাইরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন দুনীতির মামলায়, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ফৌজদারি মামলায় কারাগারে আছেন। তারেক রহমান লন্ডনে, এম শামসুল ইসলাম অসুস্থ। আর খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেছেন।
বিএনপির ও বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র জানায়, আন্দোলন চলাকালে নেতারা এতটাই ভীতিতে ছিলেন যে মাহবুবুর রহমান ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সব সদস্য গণমাধ্যমকেও এড়িয়ে চলেছেন। সিটি নির্বাচনের পর সেই আগের অবস্থা ফিরে এসেছে। গত কয়েক দিন তৎপর ছিলেন, এমন তিনজন স্থায়ী কমিটির সদস্যকে গতকাল ফোন করলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাতজন যুগ্ম মহাসচিব আছেন। মহাসচিবের পাশাপাশি তাঁরাও সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মির্জা ফখরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করার পর যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দায়িত্ব পান। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর দায়িত্ব দেওয়া হয় সালাহ উদ্দিন আহমেদ। ৫৩ দিন ধরে তাঁর খোঁজ নেই। এরপর দায়িত্ব পান আত্মগোপনে থাকা বরকত উল্লাহ। এখন দলের মুখপাত্রের দায়িত্বে আছেন আসাদুজ্জামান রিপন। যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান আগেই গ্রেপ্তার হন। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আরেক যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু আত্মগোপনে। আর আমান উল্লাহ আমান শুরু থেকেই নিষ্ক্রিয়। মাহবুব উদ্দিন খোকন ব্যস্ত আইন পেশায়।
বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা পররাষ্ট্রবিষয়ক বিভাগটিও ভেঙে পড়েছে। গত জানুয়ারিতে আন্দোলনের শুরুর দিকেই দলের পররাষ্ট্র বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানকে গুলি করে আহত করা হয়। তার আগে গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মুবিন চৌধুরীকে। ওই সময় গুলশানের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলে পররাষ্ট্র বিভাগের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আহমেদের গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এরপর তিনি দীর্ঘদিন আর বাসা থেকে বের হননি।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন গত ১১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে গেলে ওই দিন সাবিহ উদ্দিন আহমেদও যান।
দলীয় সূত্র জানায়, বিগত আন্দোলন ও নির্বাচনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের ৩২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র সাত-আটজন সক্রিয় বা তৎপর ছিলেন। এর মধ্যে এম ওসমান ফারুক, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আহমদ আযম খান, মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম, শওকত মাহমুদ ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন আন্দোলন ও সিটি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গ্রেপ্তার আছেন উপদেষ্টা পরিষদের দুই সদস্য এম এ মান্নান (গাজীপুর সিটি মেয়র), শামসুজ্জামান দুদু। তিনজন উপদেষ্টা মারা গেছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে আন্দোলন ও নির্বাচনে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের কিছু তৎপরতা দেখা গেছে। যুবদল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, ওলামা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল ও জাসাসের উল্লেখ করার মতো তৎপরতা ছিল না। ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো দেওয়া হয়নি। সংগঠনের মহানগর কমিটিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি নেই। স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে সিদ্ধান্তহীনতা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৯ সালের পর দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয় না। আন্দোলন-কর্মসূচি সবকিছু একাই ঠিক করছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এতে দুই-চারজন ছাড়া দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেকে কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে হলে পদ কেনা-বেচা বন্ধ করতে হবে। যোগ্যদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। কারও পছন্দের লোক দিয়ে দল চালানো যাবে না।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, সিটি নির্বাচনের পর এখন দল ও ২০-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা আবার গ্রেপ্তার-আতঙ্কে আছেন। পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে আগের মতো গুম-খুন এবং অপহরণের ভীতিও রয়েছে। ১০ মার্চ রাতে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ উত্তরার একটি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর বিএনপির সব মহলে ছড়িয়ে পড়া এই ভীতি এখনো কাটেনি। সালাহ উদ্দিন ছাড়াও বর্তমানে ছাত্রদলের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা আনিসুর রহমান তালুকদার ও মেহেদী নিখোঁজ আছেন। এ অবস্থায় নির্বাচন উপলক্ষে যে কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আবারও আত্মগোপনে চলে গেছেন। বিশেষ করে মির্জা আব্বাসের জামিনের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় নেতাদের মধ্যে গ্রেপ্তারের ভীতি বেড়ে গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান গ্রেপ্তার, গুম ও অপহরণের ভীতির কথা স্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের সাংঘাতিক কঠোর মনোভাব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমভাবে ক্ষমতা ব্যবহার নেতা-কর্মীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষ করে সালাহ উদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে নেপালের ভূমিকম্প- ৬০০০ বর্গকিমি ভূমির উচ্চতা বেড়ে গেছে

কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) তোলা ছবিতে নেপালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ভূগর্ভের অবস্থা ধরা পড়েছে। ‘সেন্টিনেল-ওয়ান এ’ নামের ওই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী কাঠমান্ডুর আশপাশের ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০ কিলোমিটার (৬০০০ বর্গকিলোমিটার) প্রস্থের ভূখণ্ডের উচ্চতা বেড়ে গেছে। এই উচ্চতা বৃদ্ধি কোনো কোনো স্থানে এক মিটার (তিন ফুট) পর্যন্ত হয়েছে।
‘সেন্টিনেল-ওয়ান এ’ এ যুক্ত থাকা রাডার ভূপৃষ্ঠের নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। এটি কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর যেসব ছবি তুলেছে, সেগুলো পর্যালোচনা করেছেন নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডের একদল গবেষক। তাঁরা নেপালের গত শনিবারের ভূমিকম্পের আগের ও পরের ছবিগুলো তুলনা করেছেন। এসব ছবির সমন্বয়ে তৈরি একটি রঙিন নকশার মাধ্যমে তাঁরা ভূপৃষ্ঠের নির্দিষ্ট স্থানচ্যুতি তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাজ্যের নার্ক সেন্টার ফর দি অবজারভেশন অ্যান্ড মডেলিং অব আর্থকোয়েকস, ভলক্যানোজ অ্যান্ড টেকটোনিকসের (সিওএমইটি) অধ্যাপক টিম রাইট বলেন, কাঠমান্ডুর ঠিক উত্তর-পূর্বে একটি আকস্মিক স্থানচ্যুতির ফলে ভূখণ্ডটি অন্তত এক মিটার ওপরে উঠে গেছে।
কাঠমান্ডুর উত্তরে ভূত্বক কিছুটা বসে গেছে বলেও দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। আইএনএসএআরএপি নামে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) একটি গবেষণার অংশ হিসেবে ওই ডায়াগ্রাম তৈরি করা হয়েছে। শনিবারের ভূমিকম্পে ভূগর্ভের ওই স্থানে সঞ্চিত সব চাপ মুক্ত হয়নি বলেও ধারণা পাওয়া গেছে। এর ফলে সেখানে আবার ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়ে গেছে। সূত্র: বিবিসি

নেপালে মৃতের সংখ্যা ছাড়াল সাত হাজার

নেপালের তীব্র ভূমিকম্পের পর ১ সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। মৃতের সংখ্যা ৭,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এদিকে নেপালে আটকে পড়া পর্যটক, বাসিন্দাদের আত্মীয়স্বজনরা এখনও আশা রাখলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে আর কোনও জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা মোটামুটিভাবে আর সম্ভব নয় বলেই মনে করছে নেপাল সরকার। একইসঙ্গে মনে করা হচ্ছে এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই ছড়াতে পারে সংক্রমণ।
২দিন আগে পর্যন্ত ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে এক মহিলাকে উদ্ধার করা হয়েছে যিনি ১২৮ ঘণ্টা আটকে ছিলেন ধ্বংসস্তুপ থেকে। এক যুবককে ৮০ ঘন্টার পর উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এমন চমৎকার আর সম্ভব নয় বলেই জানিয়ে দিয়েছে নেপাল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র লক্ষ্মীপ্রসাদ ধাকাল জানিয়েছেন, "দুর্ঘটনার পরে ১ সপ্তাহের উপর কেটে গিয়েছে। আমরা উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে আমার মনে হয় না ধ্বংসস্তুপের মধ্যে কোনও জীবিত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে।"
যদিও হাল ছাড়তে রাজি নন আত্মীয় পরিজনেরা। এখনও অনেকেরই বিশ্বাস তাঁদের আপনজন ইট-মাটি-পাথরের স্তূপে কোথায় আটকে রয়েছেন। তাদের অবশ্যই জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যাবে। ভূমিকম্পের জেরে যে নির্দিষ্ট কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনও পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। এখনও এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছতেই পারেনি। এখনও অনেক জায়গা পৌছনো বাকি রয়েছে। তবু আশার আলো বুকে নিয়েই আপনজনের জীবিত ফেরার আশায় আত্মীয় পরিজনেরা।

পিন্টুর চিকিৎসা করতে দেয়নি কারাকর্তৃপক্ষ : চিকিৎসক

পিন্টুর মৃত্যুতে কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তার চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. রইস উদ্দিন। জেল সুপার কারাগারে পিন্টুকে চিকিৎসা করতে দেয়নি বলে জানান তিনি। ডা. রউসউদ্দিন আহমেদ বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই নাছিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু মারা গেছেন। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ডা. রইস উদ্দিন অভিযোগ করেন, শনিবার কারাগার থেকে রামেক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সে অনুযায়ী তিনি শনিবার কারাগারে পিন্টুর চিকিৎসার জন্য গেলেও সিনিয়র জেল সুপার তাকে পিন্টুর চিকিৎসা করতে দেননি। তবে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান জানান, নাছিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু নানাবিধ অসুখে ভুগছিলেন। হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিকস, ব্লাডপ্রেশারসহ চোখ ও বুকের সমস্যা ছিল তারা। রোববার বেলা ১২টার দিকে তিনি কারাগারের মধ্যে বুকের ব্যথা অনুভব করেন ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে কারাগার থেকে রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে পিন্টু মারা যান। কারা চিকিৎসক এসএম সায়েম জানান, বেলা ১১টার দিকে নাছিরউদ্দিন পিন্টু অসুস্থ বোধ করেন। তার বুকের ব্যথা তীব্র হলে দুপুর ১২টার দিকে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অপরদিকে রামেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. রইস উদ্দিন জানান, কারাবন্দি নাছিরউদ্দিন পিন্টু হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিকস, ব্লাডপ্রেসারসহ চোখ ও বুকের সমস্যায় ভুগছিলেন। কারাগার থেকেই শনিবার রামেক পরিচালকের কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। সেই অনুযায়ি শনিবার কারাগারে তিনি পিন্টুর চিকিৎসার জন্য যান। কিন্তু সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান তাকে পিন্টুর চিকিৎসা করতে দেননি। তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা ভাল ছিল না বলেই পরের দিনই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান জানান, ২৫ এপ্রিল তার ফলোআপ চিকিৎসার ডেট ছিল। ওই দিন তাকে রামেক হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শনিবার চিঠি দেয়ার পরেও কেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে নাছিরউদ্দিন পিন্টুর চিকিৎসা করা হয়নি এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম খান কোন কথা না বলেই রামেক হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
‘হত্যার জন্যই পিন্টুকে রাজশাহী নেয়া হয়েছিলো’
নিহত বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমদ পিন্টুর স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, হত্যার জন্যই নাসির উদ্দিন পিন্টুকে রাজশাহী নেয়া হয়েছিলো। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পিত হত্যার জন্যই আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তাকে সেখানে নেয়া হয়।
পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা বলেন, আমার স্বামী মারা যাননি, সরকার পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসায় অবহেলা করে তাকে হত্যা করেছে।
তিনি বলেন,পিন্টুকে মারার জন্য ঢাকা থেকে রাজশাহী নেয়া হয়েছে। তিনি জনপ্রিয় নেতা। তার জনপ্রিয়তা দেখে সরকার সিটি নির্বাচনের আগে রাজশাহী নিয়ে হত্যা করেছে। তিনি মারা যাননি।
রবিবার দুপুরে পিন্টুর লালবাগের বাসায় সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেন নাসিমা আক্তার কল্পনা।
পিন্টুর স্ত্রীর দাবি, হাইকোর্টের একটি আদেশ ছিল তাকে (পিন্টু) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেলে রেখে চিকিৎসা করানোর। আমরা আইজি প্রিজনকে এই আদেশ দিলেও তা রাখেননি। অনুরোধ সত্বেও পিন্টুকে ঢাকা থেকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে পিন্টুর স্ত্রী যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মতিউর রহমান মন্টু কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চিকিৎসার অবহেলার অভিযোগ এনে বলেন, শনিবার নাছিরউদ্দিন পিন্টুর সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন। এ সময় পিন্টু তাকে জানান যে, কারা কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো তাকে ওষুধ দিচ্ছে না। ওদিকে নাছিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোটভাই রিন্টু সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, অসুস্থ থাকার কারণে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিলÑ পিন্টুকে ঢাকার বাইরের কারাগারে স্থানান্তর না করার। তারপরও তাকে কারাকর্তৃপক্ষ তাকে রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর করে। চিকিৎসার অবহেলার জন্যই আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে পিন্টুর মৃত্যুর খবর শুনে তার সহকর্মী, সমর্থকরা পিন্টুর লালবাগের বাসায় ছুটে যান।
দুপুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, দলের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদারসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা তার লালবাগের বাসায় যান। তারা পিন্টুর স্ত্রী সন্তানদের সমবেদনা জানান।

সাংবাদিক নির্যাতনে এগিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র-ক্ষমতাসীন দল -আর্টিকেল ১৯-এর প্রতিবেদন

বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সাংবাদিক নির্যাতনে এগিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আর্টিকেল ১৯ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করেছে।
আজ রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা নিয়ে আর্টিকেল ১৯ ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৪’ নামের এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের মাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে নির্যাতনের মধ্যে ২৩ ভাগই হয়েছে পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দ্বারা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ১১ শতাংশ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ৬৬ দশমিক ৩১ ভাগ। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের হাতে ৩৩ দশমিক ৬৯ ভাগ ঘটনা ঘটেছে।
তাহমিনা রহমান বলেন, এমন নির্যাতন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য হুমকি। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। এ হয়রানির মধ্যে রয়েছে মানহানি, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা। এ ছাড়া ২০১৪ সালে মোট ২১৩ জন সাংবাদিক ও আটজন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। গুরুতর জখম হয়েছেন ৪০ জন। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন সাংবাদিক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ ১৩ জন মিডিয়াব্যক্তিত্বকে আদালত অবমাননার অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান, ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান প্রমুখ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের অযাচিত আক্রমণ, সহিংস ঘটনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি গণমাধ্যমের কর্মীদের জন্য চরম বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালা করার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া ওই প্রতিবেদনে তথ্যপ্রযুক্তি আইন, মানহানি ও আদালত অবমাননা-সংক্রান্ত আইনকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা।

‘জাতীয় পার্টি সরকারের সকল অপকর্মের দোসর’ -গোলাম কাদের

জাতীয় পার্টির কঠোর সমালোচনা করেছেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই ও প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মুহম্মদ কাদের। শুক্রবার দুপুরে ফেসবুকের এক স্টাটাসে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি বর্তমানে সরকারের অংশ (বিকল্প নয়)। আর সরকারের দোসর হিসাবে চিহ্নিত।
সম্পূর্ণ ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হল-
যে কোন রাজনৈতিক দলের শক্তি ও সৌন্দর্য হল জনসমর্থন। বর্তমানে জাতীয়পার্টির জনসমর্থন প্রায় তলানির কোটায়।
কারণ হিসেবে বলা যায় এ মুহুর্তে জাতীয়পার্টির কোন নিজস্ব রাজনীতি নেই। জাতীয়পার্টিকে বিরোধী দল বলা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলের রাজনীতিতো নয়ই সরকারী দলের বাইরে আলাদা কোন রাজনৈতিক সত্তা বা বৈশিষ্ট্য জাতীয় পার্টির আছে বলে মনে হয় না।
বিরোধী দল সরকারের বিকল্প শক্তি বা বিকল্প সরকার, যে কোন সরকারী অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। বর্তমানে জাতীয়পার্টি সরকারের অংশ (বিকল্প নয়)। আর সরকারের সকল অপকর্মের দোসর হিসেবে চিহ্নিত।
তবে, সুখের বিষয়, হাতে গোনা কয়েকজন বাদে বাকী জাতীয়পার্টির নেতাকর্মীরা এ সকল কর্মকান্ডের জন্য দায়ী নয়। দুঃখের বিষয় এ গুটি কয়েক ব্যক্তির কর্মকান্ডের দায়ভার গোটা জাতীয়পার্টিকে বহন করতে হচ্ছে ও হবে। জাতীয় রাজনীতিতে প্রকৃত অপকর্মকারীরা হয়ত উদ্ধার পেয়ে যেতে পারে তবে তাদের দোসর হিসেবে জাতীয়পার্টিকে ভবিষ্যতে এ জন্য চড়া মাসুল দিতে হতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস সে শিক্ষাই দেয়। জনগনের আস্থা অর্জনে প্রয়োজন রাহুমুক্ত জাতীয়পার্টি।
রাজনীতি জনকল্যাণের নীতি। সঠিক রাজনীতির পথ কুসুমাস্তীর্ন নয় বরং প্রায়শঃ বিপদসঙ্কুল। সহজ পথে রাজনীতির যে সাফল্য অর্জিত হয় তা অধিকাংশ সময় সম্মানজনক হয় না। সে পথে বিচরন কাপুরুষতা। ফলে ন্যায় ও জনকল্যানের রাজনীতি, কষ্টকর হলেও সে পথেই আছে মর্যাদা, সে পথের সাফল্য সম্মানজনক। সে পথ অনুসরনই জাতীয়পার্টির জন্য কল্যাণকর।

সতর্ক বিএনপি by হাবিবুর রহমান খান ও নজরুল ইসলাম

পোড় খাওয়া বিএনপি এখন বড়ই সতর্ক। সব কিছুতেই আরও কৌশলী হতে চায়। তাই আন্দোলন কর্মসূচির বিষয়ে হুট করে কোনো সিদ্ধান্তও নেবে না। যে কারণে সিটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির মহোৎসবের অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ সাধারণ মানুষের অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, ভোট কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নির্ঘাত হরতালের মতো কর্মসূচি দেবে। কিন্তু বাস্তবে এবার সে শংকার কথা প্রতিফলিত হয়নি। এর কারণ খুঁজতে দলটির কয়েকজন নীতিনির্ধারকের কাছে যুগান্তরের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে কর্মসূচি ঘোষণা না দেয়ার পেছনে তারা কৌশলী হওয়ার নানা যুক্তি ও বাস্তব অবস্থার কথা তুলে ধরেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হঠকারী কোনো সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিএনপি তার সাম্প্রতিক বিরাট অর্জনকে ভণ্ডুল করতে চায় না। তাই এখনই যারা কর্মসূচি চাচ্ছেন তাদের সময়মতো ও সুপরিকল্পিত কার্যকর কর্মসূচির জন্য কিছুদিন তো অপেক্ষা করতেই হবে।
স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেন, সরকারের শত উসকানি সত্ত্বেও তাদের ফাঁদে পা দেবে না তারা। তিনি বলেন, আমরা জনগণের কাছে প্রমাণ করব যে বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল। তাই সিটি নির্বাচনে ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপির যে রাজনৈতিক অর্জন হয়েছে তা ধরে রাখতে ২০ দলীয় জোট ভুল করবে কেন?
এদিকে এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সিনিয়র সদস্য যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি কারও পাতা ফাঁদে পা দেবে না। ভেবেচিন্তে সময়মতো কার্যকর কর্মসূচি দেবে। বেশিরভাগ জনগণ যখন যেভাবে কর্মসূচি প্রত্যাশা করবে সেভাবেই কর্মসূচি আসবে। তাছাড়া বাস্তবিক অর্থে সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো আন্দোলন কর্মসূচি দেয়ার প্রয়োজনও নেই। কেননা, ভোট কারচুপির রেকর্ড গড়ে সরকার এমনিতেই বেকায়দায় পড়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল নিয়ে সিটি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। সরকার ভেবেছিল, তিন সিটিতে নির্বাচন দিলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। আর এলেও জয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে না। কিন্তু এ সিটি নির্বাচন এখন সরকারের জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশাসন যন্ত্রকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতির উৎসবে মেতে ওঠে সরকারি দল আওয়ামী লীগ- যা নানাভাবে প্রত্যক্ষ করে দেশে-বিদেশে সবাই এখন বিস্মিত। আর এর মধ্য দিয়ে সরকারের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। প্রমাণিত হয়েছে, এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন কখনও সম্ভব নয়। এর ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা নিয়ে বিএনপির অন্যতম দাবির যৌক্তিকতা এখন আরও স্পষ্ট। এসব বিবেচনায় বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল মনে করেন, সরকারের ব্যর্থতার এ বড় রেকর্ডের চেয়ে এ মুহূর্তে বিএনপির কাছে আর কোনো সাফল্য নেই। তাই অহেতুক হরতাল ডেকে সরকারের হাতে ‘ক্যাচ’ ধরার মতো কোনো বল তুলে দিতে চায় না বিএনপি।
একই সঙ্গে দলটির নীতিনির্ধারক মহল আরও মনে করেন, আসলে সরকার এখন নিজের নেতিবাচক অবস্থান দূর করতে বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হতে চাচ্ছে। এজন্য তারা মনেপ্রাণে চাইছে, ২০ দলীয় জোট দ্রুত হরতালের মতো কর্মসূচি দিক। যাতে করে হরতাল নিয়ে সমালোচনার উত্তাপ যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের ভোট কারচুপির আলোচনাও থিতু হয়ে আসবে। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিএনপি এখন অনেকটা পোক্ত। তাই সরকারের এ রকম ফাঁদে পা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বরং তারা মনে করেন, সিটি নির্বাচনের ভয়াবহ ভোট কারচুপির আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ক্রমেই বেরিয়ে আসবে। এতে করে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জনসম্মুখে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাদের মতে, কোনো আন্দোলন কর্মসূচি ছাড়াই তা হবে বিএনপির জন্য ঘরে বসে বোনাস পাওয়ার মতো অবস্থা। তাই এদিকে মনোনিবেশ না করে বিএনপি বরং এখন দল গোছানোর দিকে বেশি নজর ও সময় দেবে। কেননা, দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তা হবে বড় সহায়ক। তাই চলতি মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি চলছে। এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীরা যাতে নতুন করে উজ্জীবিত হতে পারে তেমন পরিকল্পনাই নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার নানা দিক চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে আরও বলেন, এ সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এটা এখন জনগণের কাছে স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে যে দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি তার যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়েছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের অনেক বড় অর্জন। তিনি বলেন, সরকারের এসব ব্যর্থতার দিক তুলে ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণকে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করার দিকেই জোর দেয়া হবে। নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের আগে বিগত আন্দোলনের ব্যর্থতা, সফলতা, অর্জন-বিসর্জন নিয়েও অনেক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেন, খুব শিগগির দল ও জোটের বৈঠক ডেকে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রহসনের সিটি নির্বাচনে ভোট কারচুপির চিত্র গণমাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে, যা বিশ্ববাসী দেখেছে। এর মাধ্যমে সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ এ নির্বাচনের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, তিন সিটি নির্বাচনে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুঠে ওঠেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাজাহান যুগান্তরকে বলেন, দলে সাংগঠনিক দুর্বলতা তো আছেই। এটা অস্বীকার করার কিছুই নেই। তবে সামনের দিনগুলোতে তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনার টেবিলে বসাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। মার্কিন কংগ্রেসের এশিয়া ও প্যাসিফিক সাব-কমিটির বৈদেশিক কমিটিতে ‘অস্থিভঙ্গ বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রতা’ শীর্ষক আলোচনায় একথা বলা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার বিরোধ মেটানোর উপযুক্ত উপায় খুঁজে বের করতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শুনানিতে অংশগ্রহণকারী ৫ জন বিশেষজ্ঞ আলোচক বাংলাদেশের সংকট নিরসনে নির্দিষ্টভাবে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার পক্ষে সুপারিশ ব্যক্ত করেছেন। তারা সংকট মেটাতে অবিলম্বে নতুন সাধারণ নির্বাচন চেয়েছেন। তাদের কথায় আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখলে ভারতের স্বার্থ  বেশি রক্ষা পাবে মর্মে দিল্লি বর্তমান ধারণায় অদূরদর্শিতার ছাপ রয়েছে।  তাদের আলোচনায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে বাংলাদেশ ও মার্কিন সরকারের দ্বারা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার সুপারিশও এসেছে। তারা বলেছে, মিডিয়ার উপর ক্রাকডাউন চলছে।
তারা সতর্ক  করেছেন যে, অচলাবস্থা দীর্ঘ হতে পারে আবার সহিংসতা তীব্রতর হলে ২০০৭ সালের মতো আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। এর মধ্যে বাস্তবে যেটিই ঘটুক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া, সহিংসতার কোন কিনারা না হলে বাংলাদেশ উগ্র ধর্মীয় সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের শিকার হতে পারে।
৩০শে এপ্রিলের এ শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন সাব-কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান ম্যাট স্যালমন। এতে অংশ নেন লিসা কার্টিজ, প্রফেসর আলী রিয়াজ, জেই কানসারা,   স্টিভেন ডি. ফ্লেশলি ও আলিসা অ্যারিস। এই শুনানির একটি সংক্ষিপ্তসার নিচে তুলে ধরা হলো।
লিসা কার্টিজ
সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, এশিয়া স্টাডিজ সেন্টার, দি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, ওয়াশিংটন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলকে রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসন ও সংলাপের টেবিলে বসতে উৎসাহিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ...আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা যাতে না ঘটে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কারণ এর ফলে সহিংস রাজনৈতিক গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে পারে। ...‘প্রলম্বিত রাজনৈতিক অচলাবস্থা কিংবা রাজপথের সহিংসতা তীব্রতর  হলে ২০০৭ সালের মতো আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। এবং এই দুটোর যে কোনটি ঘটলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে দুর্ভোগ পোহাবে।
আর এসব এড়াতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে যা করতে হবে।
প্রথমত, সমমনা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার টেবিলে বসানোর উদ্যোগ নেয়। একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবনে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে একটি খাঁটি সংলাপ শুরু করতে  শেখ হাসিনাকে রাজি করানোর লক্ষ্যে অন্য দেশগুলো যেমন: যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে  সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নিতে, যদিও নয়া দিল্লি এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতায় বসতে প্রভাব খাটানোর ইচ্ছা থেকে দূরে রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারতের নেতারা দৃশ্যত তাদের স্বার্থের হিসাব কষছেন যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই তাদের লাভ বেশি হবে। আর সে কারণেই বিএনপির জন্য একটি জায়গা করে দিতে শেখ হাসিনাকে চাপ দেয়ার ব্যাপারে দিল্লি শিথিল মনোভাব দেখিয়ে চলছে। তবে দিল্লির এ অবস্থান অদূরদর্শী হতে পারে। যদি শেখ হাসিনা তার ক্রমবর্ধমান একনায়কোচিত শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোন বাধার মুখোমুখি না হন বা সামান্যই বাধা আসে, তাহলে বাংলাদেশী রাজনীতির সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এতে ইসলামপন্থি কট্টর গ্রুপগুলোর দ্বারা নতুন নিয়োগ সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, বিরোধী দল যে সহিংস কৌশল নিয়েছে এবং বিরোধী দলকে জায়গা করে দিতে সরকারের যে ব্যর্থতা- এ দুই বিষয়েই আরও উচ্চকণ্ঠে সমালোচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমশ চাপ দিতে হবে যে, হয় তারা বিরোধী দলের শত শত নেতাকর্মীকে জেল থেকে ছেড়ে দেবে অন্যথায় আইনের যথা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে। যারা নিরীহ পথচারী  বিশেষ করে পেট্রলবোমা মেরে যারা হত্যা করেছে, তাদের অবিলম্বে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই নিখোঁজ থাকা সালাউদ্দিনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে, যাতে তিনি তার পরিবারের মাঝে অবিলম্বে ফিরে আসতে পারেন।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য সুশীল সমাজের মধ্যে সংলাপকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে জড়িত থাকবে উঠতি প্রজন্ম। এর লক্ষ্য হবে স্থানীয় গ্রুপগুলোকে অহিংস রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহান্বিত করে তোলা। এ সংলাপে জামায়াতের তরুণ কর্মীদের আকৃষ্ট করতে হবে যারা দলের সহিংস কর্মসূচিকে দৃঢ়তার সঙ্গে বিরোধীতা করে দল সংস্কারে ব্রতী হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশে মার্কিন ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে হবে। যার ফলে রাজনৈতিক স্থিতির ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে রাজি করাতে প্রণোদনা দেয়া যায়। 
...মিডিয়া রিপোর্ট মতে ৭ হাজার বিরোধীদলীয় কর্মীকে অন্তরীণ ও প্রায় ২০ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্মুখীন হয়েছেন।
...২০০৭ সালে সামরিক কবাহিনী যেভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল, সেভাবে এখনও পর্যন্ত তারা হস্তক্ষেপ করে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু যদি লক্ষণীয়ভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে তাহলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে। শেখ হাসিনা কথিত মতে সামরিক বাহিনীকে অর্থনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা রাখতে গিয়ে রাজনীতিতে তাদের জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আরেকটি কারণ হলো ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তারা ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় দেখা যায় ৭৭ ভাগ মানুষ কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়।
...গত ফেব্রুয়ারিতে ৩৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার সম্মুখীন হয়। এর বেশির ভাগ ঘটেছে পুলিশ হেফাজতে। আরেকটি সংগঠনের বরাতে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারি থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৩২ জন নিহত হয়, এর মধ্যে ২২ জন মারা যান ক্রসফায়ারে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পক্ষ অবলম্বনের কারণে তাদের নেতাদের অনেকের ফাঁসি হয়েছে, কেউ মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। ...আগের সরকারগুলো যুদ্ধাপরাধের বিচার এড়িয়ে গেছে কারণ তারা এর অনুমান অযোগ্য প্রতিক্রিয়া হওয়ার ভয়ে ছিলেন। ...আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ  বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যে, শেখ হাসিনা একে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন কিনা। শহুরে তরুণ মধ্যবিত্তসহ দেশের একটি বড় অংশ এ বিচারকে সমর্থন করছে। ২০১৩ সালের আগস্টে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ ঘোষণা দেন, জামায়াত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক মানকবাধিকার সংগঠনগুলো কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড রদ চেয়েছিল এই যুক্তিতে যে যেভাবে বিচার হয়েছে তা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারেনি।
...গ্রাম এলাকায় জামায়াতের ছোট সমর্থন ভিত্তি আছে। ৪ থেকে ৫ ভাগ ভোট পায় তারা ২০০৮ সালের নির্বাচনে। ছাত্র শিবিরের জঙ্গিত্বের বদনাম আছে, তারা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সহিংস বিরোধে লিপ্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর হামলার সঙ্গেও তারা জড়িত।
...রাজনৈতিক ডামাডোল ও চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে ইসলামী জঙ্গিত্বের হুমকির মুখে রয়েছে। এমনটাও অনুমেয়, উগ্রপন্থিরা রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে পারে। ব্লগার অভিজিৎ ও ওয়াশিকুরের হত্যাকাণ্ড ইঙ্গিতবহ। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের উত্থান ইংগিত দিচ্ছে, আল কায়েদা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতির সুযোগ নিতে শুরু করেছে কিনা। শেখ হাসিনা সাফল্যের সঙ্গে জেএমবিকে ভোঁতা করেছে। আইন প্রয়োগকারী ও গোায়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয়তার সঙ্গে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার ও তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
...জামায়াতের সহিংস অতীত বিবেচনায় তাকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য। কিন্তু তাদের বিবেচনায় নেয়া উচিত যে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সুযোগ সীমিত করে দেয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুনরায় সহিংস কাজে জড়িত হতে তারা নিজদের ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তখন সমস্যা আরও নিকৃষ্ট হতে পারে।
...দেশটির রাপ্তানির ৭৫ ভাগের হিস্যা পোশাক খাতে এবং সেটি আঘাত পেতে শুরু করেছে। অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে গার্মেন্টস ক্রেতারা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে তাদের ফরমায়েশ আদেশ স্থানান্তর করছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, অবরোধকালীন অস্থিরতা ২.২ বিলিয়ন ডলার খেয়ে ফেলছে যা জিডিপির ১ ভাগ। তবে বাংলাদেশ আগামী দশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে আছে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশটি খাদ্যে স্বয়ম্ভর হবে। দেশটির সাফল্য যখন প্রশংসনীয় তখন এটাও দেখার বিষয়, জনসংখ্যার ৩০ ভাগ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা পালনকারী গার্মেন্ট কর্মীরাও রয়েছে। 
আলী রীয়াজ
প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি
...এরশাদকে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। বিএনপি তার সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জামায়াত নির্ভরতার কারণে ওই নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। ...সংসদ কার্যত একটি একদলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ...গত বছর ৫ ধাপে উপজেলা নির্বাচন হয়। এর প্রথম দুধাপে সরকার বড় হস্তক্ষেপ করেনি। ২১২টি উপজেলার মধ্যে বিএনপি ৯৩, আওয়ামী লীগ ৭৮ ও জামায়াত সমর্থকরা ২১টিতে জয়লাভ করে। এরপরে ব্যাপক কারচুপি ঘটলে ২৪৫ আসনের মধ্যে বিএনপি ৬৫, আওয়ামী লীগ ১৪৫ ও জামায়াত সমর্থকরা ১৫টিতে জয় পায়।
...পেট্রলবোমা হামলার জন্য সরকার ও বিএনপি পরস্পরকে দায়ী করেছে। তবে কয়েকটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা জড়িত থাকার অভিযোগ স্বীকৃত হয়। কিন্তু বেশির ভাগই এটা বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা করেছে। বিএনপির অবরোধের কৌশল জনগণের কাছে আবেদন হারিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অন্তত ১৫ হাজার ব্যক্তি যাদের বেশির ভাগই বিরোধীদলীয় কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত তিন বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নাগরিক নিরাপত্তায় বিরাট হুমকি সৃষ্টি করেছে। ২০১০ থেকে নাটকীয়ভাবে গুম বেড়েছে। আসকের মতে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ২৫ জন গুম হয়েছেন। এ বিষয়ে ভাল দালিলিক প্রমাণ থাকলেও সরকার অব্যাহতভাবে এর দায় অস্বীকার করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ উচ্চপদস্থরা দেখামাত্র গুলির নির্দেশকে দায়মুক্তি দেয়ার ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য প্রকাশ্য করেছেন।
...বাংলাদেশে সহিংসতা সব সময় ছিল। কিন্তু গত দেড় বছরে তা নতুন করে একটি নিকৃষ্ট মাত্রা পেয়েছে। কোন রাজনৈতিক সংস্রব নেই এমন ব্যক্তিও হামলার স্বীকার হয়েছেন। সংখ্যালঘুদের রক্ষায় রাষ্ট্র দুঃখজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গত এক বছরে একনায়কসুলভ শাসনের সঙ্গে তুলনীয় একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়ে গেছে, যেখানে বাকস্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিএনপি তার দাবি আদায়ে নিজেই সহিংসতায় অংশ নিচ্ছে বা উৎসাহিত করছে।
সরকার সমর্থকরা মালয়েশিয়ার মতো শাসনের পক্ষে আস্থা ব্যক্ত করছেন, যে দেশটিতে বহু বছর একনায়কসুলভ শাসন চলেছে, বিরোধী দলের জন্য কোন জায়গা ছিল না, কিন্তু প্রবৃদ্ধি অর্জন ঘটেছে।
সিটি নির্বাচন একটা আশাবাদ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু মিডিয়া ও পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট মতে তা প্রহসনে পরিণত হয়।
৫টি সুপারিশ
১. শাসনের জন্য একটি ন্যায্য ম্যান্ডেন্ট লাভ করা।
২. মৌলিক অধিকারের ক্ষয় বন্ধ করতে হবে। গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক দলগুলোর জন্য গণতান্ত্রিক জায়গা তৈরি করতে হবে।
৩. অজবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো রাষ্ট্রীয় কঠোরতা বন্ধ করতে হবে।
৪. বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিরোধী দলকে রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে সহিংসতার আশ্রয় নেয়ার বিষয়ে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় নিন্দা জানাতে হবে।
৫. ভোটাধিকারসহ যত ধরনের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আছে তাদের শক্তিশালী করতে হবে।
সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত থাকা সুযোগ যদিও আরও সীমিত হয়ে পড়েছে, তবুও একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সব দল ও সিভিল সোসাইটি নিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে।
বর্তমানে বিরোধী দলের পিছুহটা এবং ক্ষমতাসীন দলের ‘সাফল্য’ যা প্রকারন্তরে একটি ডি ফ্যাক্টো একদলীয় রাষ্ট্র গড়ে তুলছে। সামনে আবারও সহিংসতা নতুন করে শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
জে কানাসারা
পরিচালক, গভর্নমেন্ট রিলেশনস, হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন
আওয়ামী লীগ সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে খাটো করার মধ্য দিয়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বিএনপি ও তার সহযোগী জামায়াত প্রাথমিকভাবে সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য দায়ী।
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের পক্ষে আমি এ বছরের গোড়ায় বাংলাদেশে আমি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনে গিয়েছিলাম। আমার ঢাকা ত্যাগের তিন সপ্তাহ পরে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড ঘটে। অনেক বাংলাদেশীর মতো এটা আমার আশা যে,
১. বাংলাদেশ ও মার্কিন সরকারের উচিত হবে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে ফরেন সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে ঘোষণা দেয়া। কারণ তাদের তৎপরতা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ও বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থের প্রতি হুমকিস্বরূপ।
২. মার্কিন আইনে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে সে হিসেবে বাংলাদেশে তা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট জামায়াত সদস্যদের মার্কিন ভিসা না দেয়া।
৩. মার্কিন সরকারের উচিত হবে সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানানো।
৪. ভবিষ্যতে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অবস্থা, যার উন্নতি হয়েছে মর্মে দেয়া মার্কিন কংগ্রেসের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে এবং তার সঙ্গে সাহায্যকে শর্তযুক্ত করতে হবে। 
স্টিভেন ডি. ফ্লেশলি
কে-ফাউন্ডার অ্যান্ড প্রেসিডেন্ট
ইউএস-বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড রিলেশনস অ্যাসোসিয়েশন (ইউবিটিআরএ)
আমি ২০০৭ সালে প্রথম বাংলাদেশ সফর করি। দেশটির পোশাক খাতে ৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে এমন একটি কাজের সঙ্গে নিজেকে তখন যুক্ত করেছিলাম। ...২০১৭ সাল পর্যন্ত জিএসপি সুবিধা চালু রাখার পক্ষে আমরা অভিমত রেখেছি। কিন্তু ওবামা প্রশাসন ঘোষিত অ্যাকশন প্ল্যান, ২০১৩ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা নবায়ন না করার জন্য সুপারিশ করেছি। ...২০১৪ ও ২০১৫ সালজুড়ে শ্রম খাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছেই। ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ ও ভীতি সামান্যই দূর করেছে। বরং তা মার্কিন-বাংলা বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্কের ক্ষতি করেছে। ...র‌্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো রিপোর্ট দিচ্ছে। অথচ র‌্যাব সদস্যের অনেকেই বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে নিয়োজিত রয়েছে।...
কয়েক বছর আগে আমি একটি মার্কিন ডিসকাউন্ট স্টোরের দলের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলাম। একটি কারখানায় যাওয়ার পথে আমরা লক্ষ্য করি যে, র‌্যাব অফিসার দৃশ্যত এক নিরীহ ব্যক্তিকে প্রহার করছে। এ সহিংসতা আমার ক্লায়েন্টকে বিরক্ত করেছিল। এ ঘটনার কয়েক মাস পরে এই ডিসকাউন্ট চেইন স্টোর বাংলাদেশের কোন কারখানা আর পরিদর্শনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর তারা তাদের ক্রয় ফরমায়েশ আদেশে পরিবর্তন আনে। তাদের পোশাক বাংলাদেশে নয় এখন তা তৈরি হচ্ছে চীনের কারখানায়।
রাজনৈতিক সহিংসতার নানামুখী ও ব্যাপকভিত্তিক নেতিবাচক প্রভাব এবং বাণিজ্য পরিবেশের ওপর তার অস্থিতিশীল দিক বিবেচনায় নিয়ে ইউবিটিআরএ বাংলাদেশে একটি নতুন নির্বাচনের আহ্বানকে সমর্থন দিচ্ছে।
আলিসা অ্যারিস
সিনিয়র ফেলো ফর ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড সাউথ এশিয়া
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স
...সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ থেকে ভয়ঙ্কর সব খবর আসছে। ...এমন এক সময়ে বাংলাদেশে সহিংস ইসলামের উত্থান ঘটছে, যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম মেরূকরণ ঘটেছে এবং শাসনগত শূন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।...
...বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা সুফল দেয়নি। আওয়ামী লীগ উল্লেখযোগ্যভাবে বিরোধী দল ও মিডিয়ার ওপর ক্রাকডাউন চালাচ্ছে। ...কিন্তু এসবের কোন কিছুই সহিংস প্রতিবাদকে সমর্থন দেয় না। ...তবে কথা হলো দুই বছর আগেও যেটা ছিল না অথচ এখন দেখা যাচ্ছে সেটা হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিভিন্নভাবে অর্থনীতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশ রাজনীতি বিষাক্ত থেকেছে কিন্তু তা সত্ত্বেও তার পক্ষে সামনের দিকে এগিয়ে চলা সম্ভব হয়েছে। দুই দশক ধরে মোটামুটিভাবে কমবেশি ৫ থেকে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।... কিন্তু চলমান অস্থিতিশীলতার কারণে আইএমএফ প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে পূর্বাভাস করেছে, যা কিনা সরকারের ৭ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। দেশটির অর্থমন্ত্রী নিজেই ৭.৩ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ...
সুপারিশ
১. বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও শাসনগত বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদানকারী কর্মসূচিসমূহকে সহায়তাদান অব্যাহত রাখা, এমনকি সেখানে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করা।
২. যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমন ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারিত করা। র‌্যাব যদিও মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের দায়ে অভিযুক্ত, তবুও এ সংগঠনটির সংস্কারে সহযোগিতা দিয়েই চলতে হবে। ...নিরাপত্তা সহায়তা বাংলাদেশকে এখন যা দেয়া হচ্ছে তা দ্বিগুণ করা হলেও তা পাকিস্তানকে দেয়া আর্থিক সহায়তার চেয়ে অনেক কম থাকবে।
৩. বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তাগত আলোচনা আরও গভীর করতে হবে।
৪. দেশটির দুই বিবাদমান রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটা আপস-রফার জন্য অব্যাহতভাবে উৎসাহ ও প্রণোদনা জুগিয়ে চলতে হবে। ব্যক্তিগত বিরোধই এ সংকটকে গভীরতর করছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা কোন কাজ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে বাংলাদেশে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনে সংকল্পবদ্ধ হওয়া। এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ একটি বিরাট সম্ভানাময় দেশ।

সিটি নির্বাচনের অনিয়ম স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করতে হবে -ওয়েন্ডি শারম্যান

সদ্য সমাপ্ত ৩ সিটি নির্বাচনের যাবতীয় অনিয়ম-কারচুপি তদন্তের জোর তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা সফর করে যাওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতি বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যান। বাংলাদেশের সঙ্গে চতুর্থ পার্টনারশিপ সংলাপের সমাপনীতে শুক্রবার পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তাগিদ দেন। বলেন, অবশ্যই এসব অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। আগামীর যে কোন নির্বাচন তথা গণতন্ত্রের জন্য উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত করা ‘গুরুত্বপূর্ণ’। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক জোরদারে বাৎসরিক আলোচনা পার্টনারশিপ ডায়ালগ-এর এবারের দু’দিনের আয়োজন ছিল রাজধানীর রমনাস্থ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায়। মহাপরিচালক বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া ওই আয়োজনে সমাপনী দিনে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ও মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। তারা নিজ নিজ দলের নেতৃত্বে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্টনারশিপ আরও জোরদার করার কর্ম-কৌশল নির্ধারণী ওই আলোচনা শেষে প্রতিনিধি দলের নেতাদ্বয় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। সেখানে মূল আয়োজনের আউটকাম জানানো ছাড়াও সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারা।
২৮শে এপ্রিলের বহুল আলোচিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন আন্ডার  সেক্রেটারি বলেন, আজ সকালে (শুক্রবার) ও গতকাল (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় আমরা নির্বাচনের ব্যাপারে আলোচনা করেছি। ভোটে অনিয়মের ব্যাপারে স্পষ্টত সবাই ভীষণ উদ্বিগ্ন, এটা আমাকে অবশ্যই বলতে হবে। তিনি বলেন, ভোট চলাকালে বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। আমি মনে করি, নির্বাচনে অনিয়মগুলোর ব্যাপারে কিভাবে স্বচ্ছ তদন্ত করা যায়, এ ব্যাপারে সবার লক্ষ্য করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রের জন্য ওই অনিয়ম তদন্তগুলোর তদন্ত করা খুব জরুরি। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দেয়া সূচনা বক্তব্যেও সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলেন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি। বলেন, নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি ও ভোটের মাঝখানে বিএনপির নির্বাচন বর্জনে আমরা হতাশ হয়েছি। এখন সব দলের সমঝোতায় এটির দীর্ঘ মেয়াদি সমাধানের দিকে আমরা নজর রাখছি, যাতে বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। ডায়ালগে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান জানান, আলোচনায় দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গও এসেছিল। এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। যে ইস্যুতে ডায়ালগ সেই ঢাকা-ওয়াশিংটন পার্টনারশিপ বা অংশীদারিত্বের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে শারম্যান বলেন, এটি এখন যথেষ্ট বিস্তৃত ও গভীর। এটি কেবল দুই দেশ নয়, বিশ্ব সমপ্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তিনি বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আনেন। বলেন, আমাদের বিশ্বাস, দক্ষিণ অঞ্চলকে বদলে দেয়ার ‘প্রায় অসীম সম্ভাবনা’ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশের সেই লক্ষ্যে  পৌঁছানোর পথে যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার হতে পেরে আনন্দিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করে না যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মনে করে চলমান দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসন এবং শান্তি ফেরাতে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জরুরি। নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ওই মনোভাবের কারণে বাংলাদেশের সম্পর্কে কিছুটা ‘ভাটা’ পড়েছে। এর মধ্যে সদ্য সমাপ্ত ২৮শে এপ্রিল সিটি নির্বাচন নিয়েও সরকারের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারিও ভবিষ্যতের জন্য সিটি নির্বাচনের অনিয়মগুলোর অভিযোগের তাগিদ দিলেন। রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতভিন্নতার প্রসঙ্গ আসে সংবাদ সম্মেলনে। জবাবে শারম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। তবে কিসে আমাদের ঐক্যবদ্ধ  রেখেছে তা মনে রাখতে হবে। এ সময় তিনি শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষায় প্রতিশ্রুতি, নারী ও মেয়ে শিশুদের জন্য সুযোগ সমপ্রসারণে অনুরাগ, ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য ও সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিখুঁত করার অন্তহীন প্রক্রিয়ার প্রতি যৌথ দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন  শারম্যান। তবে দু’দেশের মধ্যেকার ভিন্নতাগুলোর বিষয়ে মুখ খুলেননি মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি। ঢাকায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “উন্নয়ন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংহতিতে সাধারণ লক্ষ্যসমূহ এগিয়ে নিতে দুটি উদার, বহুত্ববাদী দেশের একসঙ্গে কাজ করার উপায়গুলো খুঁজতে আলোচনার জন্য আমি এখানে এসেছি। আমরা ওই সব লক্ষ্যে অনেক অগ্রগতি করেছি। বিশেষ করে উন্নয়নে, যেখানে বাংলাদেশের  জোর পদচারণা রয়েছে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্ধনশীল অর্থনীতিকে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে আয় ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে আমরা আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। “আমরা আমাদের নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রও বৃদ্ধি করছি। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় যুদ্ধ জাহাজ কোস্টগার্ড কার্টার আগামী ৬ই মে ক্যালিফোর্নিয়ায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধানের হাতে তা তুলে দেবেন। নারী ও শিশুর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রীকে ‘অপ্রতিরোধ্য সৈনিক’ আখ্যা দেন ওয়েন্ডি শারম্যান। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপালে ত্রাণ ও চিকিৎসা দল পাঠানোর জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপ ছিল খুবই গঠনমূলক। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল এবং ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক
ওদিকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় সফররত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) ওয়েন্ডি শারম্যান। শুক্রবার বিকালে খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজায়’ এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিটি নির্বাচনে কারচুপিসহ দেশের চলমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণগুলো ওয়েন্ডি শারম্যানের কাছে তুলে ধরেছেন। বৈঠকের পর বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস অন্তর সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসেন। তাদের এ সফরের অংশ হিসেবে ওয়েন্ডি শারম্যান খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মঈন খান সাংবাদিকদের বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারির আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি কোন কিছুই বাদ যায়নি। ড. মঈন খান বলেন, ওয়েন্ডি শারম্যান এমন এক সময়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন, যেই সময়টি বাংলাদেশের রাজনীতি গতিধারার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনটি সিটি নির্বাচন হয়ে গেছে। গণমাধ্যম সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে। ওই নির্বাচনের রহস্য কারও অজানা নয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে শারম্যানের বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বৈঠকে ওই নির্বাচন নিয়ে কী বলা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা (ওয়েন্ডি শারম্যান) কি বলেছেন, তা তারা বলবেন। যা দূতাবাস থেকে বিবৃতি আকারে দিয়ে থাকে। আমরা এ বিষয়ে কিছু বলছি না। এ বিষয়ে আমার কোন কিছু বলা নীতিগতভাবে ঠিক হবে না। সিটি নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্বেগ বিবৃতিতে জানিয়েছে। বিএনপি নেতারা জানান, বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের দমননীতি, স্থানীয় সরকারের সদ্য শেষ হওয়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে সরকার-নির্বাচন কমিশন-শাসকদলের যৌথ উদ্যোগে ভোট কারচুপি, বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের ওপর সরকারের নিপীড়ন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বরখাস্ত করার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়াবলীর ওপর তথ্য প্রমাণাদিও মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারির কাছে উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ  রহমান ও সাবিহ উদ্দিন আহমেদ এবং ওয়েন্ডি শারম্যানের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট অংশ নেন। তবে সফররত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বৈঠকে ছিলেন না। এর আগে বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে গুলশানের ৭৯ নং সড়কে বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসা ‘ফিরোজা’য় যান ওয়েন্ডি শারম্যান ও মার্শিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট। দীর্ঘ ৪০ মিনিট পর ৫টা ৭ মিনিটে তারা খালেদা জিয়ার বাসভবন ত্যাগ করেন।
জিএসপি ফেরাতে শারম্যানকে রওশনের অনুরোধ: এদিকে ঢাকা সফরকালে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যান। শুক্রবার বিকালে সংসদ নেতার গুলশানস্থ বাসভবনে যান তিনি। সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করতে শারম্যানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানান রওশন এরশাদ। এ সময় উন্নয়ন ও সুশাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তাসহ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেন বিরোধী নেতা। বলেন, গার্মেন্টস সেক্টর আমাদের  দেশে অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ার। তাই এ  সেক্টরকে বেগবান রাখার জন্য জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করা খুবই জরুরি। জবাবে ওয়েন্ডি শারম্যান জিএসপি সুবিধা বিবেচনা করা হবে বলে বিরোধীদলীয়  নেতাকে আশ্বাস দেন বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস খবর প্রকাশ করেছে। ওই খবরে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নির্ভর করছে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। জনগণই ঠিক করবে তাদের কি করা উচিত। এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। বিরোধী নেতার সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতার বৈঠকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি, নূর-ই-হাসনা লিলি  চৌধুরী এমপি, সেলিম উদ্দিন এমপি, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট, মার্কিন দূতাবাসে নিযুক্ত রাজনৈতিক কর্মকর্তা ক্যাথলিন গিবিলিসকো উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রীর বৈঠকে ‘আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তি’ প্রসঙ্গ: এদিকে পার্টনারশিপ ডায়ালগ শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন ওয়েন্ডি শারম্যান। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়- বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্ডার  সেক্রেটারিকে অনুরোধ করেন মন্ত্রী। জবাবে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে কাজ চলছে বলে জানান শারম্যান। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠককালে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়- সহিংস উগ্রপন্থা দমন নিয়ে গত  ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে বৈঠক করার জন্য মাহমুদ আলীকে ধন্যবাদ জানান শারম্যান। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করে আগামীতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জন  কেরির সঙ্গে তার বৈঠকের পর ‘দুই  দেশের সম্পর্কে আস্থা বাড়ার লক্ষণ  দেখা গেছে’। ওয়াশিংটনে  বৈঠককালে জন কেরির বাংলাদেশ সফরের আগ্রহের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘দুই পক্ষের সুবিধামতো সময়ে’ কেরিকে ঢাকায় অভ্যর্থনা জানাতে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাহমুদ আলী। এ প্রসঙ্গে শারম্যান বলেন, নয়া দিল্লি থেকে সরাসরি ঢাকায় এসে তিনি বাংলাদেশ-ভারত উষ্ণ সম্পর্কের ‘ধারণা’ পেয়েছেন। মিয়ানমারের শরণার্থী এবং বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের অবৈধভাবে বসবাসের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে এলেও এ বিষয়টিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি আসছে না বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদানের কথা শারম্যান স্বীকার করেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।