Wednesday, September 10, 2014

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন by আলী ইমাম মজুমদার

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া নতুনভাবে শুরু করতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে। খবরে জানা যায়, দুই মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ের তালিকায় রয়েছে দুই হাজার ৪১৫ জনের নাম।
প্রায় এক দশক পর পুনরায় শুরু হতে যাওয়া এই প্রক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। ২০০৫ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। উল্লেখ করা যায়, শিবিরে এখন রয়েছে ৩২ হাজার রোহিঙ্গা। শিবিরের বাইরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কোনো কোনো স্থানে অনিবন্ধিত আরও তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হয়। উল্লিখিত তিনটি জেলার, বিশেষ করে কক্সবাজারের শ্রমঘন কাজ মূলত এদেরই আওতায় রয়েছে। দেশি শ্রমিকদের চেয়ে তুলনামূলক কম বেতনে তারা কাজ করে। শিবিরে বসবাসকারী অবশিষ্ট শরণার্থীদের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে—এমনটাই বলেছে মিয়ানমার। শিবিরের বাইরে অবস্থানকারী অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে রয়েছে নীরব।

শিবিরে বসবাসকারী শরণার্থীরা জাতিগত দাঙ্গার শিকার হয়ে ১৯৯১-৯২ সালে এ দেশে চলে আসা প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থীর অবশিষ্টাংশ। অন্যরা ২০০৫ সালের আগে নিজ দেশে ফেরত গেছে। এর আগে ১৯৭৮ সালে চলে এসেছিল প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা। ১৯৭৯ সালের শেষাবধি তাদের সবার প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। আবার ২০১২ সালের জাতিগত দাঙ্গার সময় এ দেশে আসার নিষ্ফল চেষ্টা চালিয়েছিল বহু রোহিঙ্গা। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যায় ভারাক্রান্ত জনবহুল এ দেশে আমরা তাদের আশ্রয় দিইনি। আবার শিবিরের বাইরে থাকা শরণার্থীরা বিভিন্ন সময়ে নীরবে ঠাঁই নিয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু কেন ছেড়ে চলে আসে তারা মিয়ানমারের আরাকানের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উর্বর ভূমির দেশ? সহজ জবাব, প্রাণ ও পেট উভয়ের দায়ে।
জাতিসংঘের বিশ্লেষণ অনুসারে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। ১৯৫০ সাল থেকে মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলেই স্বীকার করে না। তাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত। প্রায়ই দিতে হয় বাধ্যকর শ্রম। তাও অনেক কম, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিনা মজুরিতে। ন্যায়নীতি-বহির্ভূত কর দিতে হয় তাদের। এমনকি বিয়ের জন্যও কর আছে। কারণে-অকারণে জমিজমা বাজেয়াপ্ত করা হয়। উচ্ছেদ করা হয় ভিটেবাড়ি থেকে। এগুলো কোনো লুকোছাপা বিষয় নয়। সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে বারবার আলোচিত হয়েছে এসব বিষয়। শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। মূলত তাদের আর্থিক সহায়তায়ই শিবিরের শরণার্থীরা জীবন ধারণ করে।

রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা আরব বংশোদ্ভূত। অষ্টম শতাব্দী থেকে আরাকানে তাদের বাস। মিয়ানমার সরকার ১৯৫০ সালের নাগরিকত্ব আইনে সেই দাবি নাকচ করে দেয়। তাদের মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে তারা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। তাও তো আজ শতাব্দীর ব্যাপার। আর একেবারেই পাশাপাশি অবস্থান এবং বেশ কিছু বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক নৈকট্য সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এখন মিয়ানমারে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে। ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এদিক-সেদিক চলে গেছে অনেকে। হাজারো বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বেশ কিছু ঢুকে পড়েছে বলে জানা যায়। কিছু গেছে থাইল্যান্ডের দিকে। এক লাখ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হয়ে আছে দেশের শিবিরগুলোতে। নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার দুঃসাহসিক চেষ্টার কথা আমরা প্রায়ই খবরের কাগজে দেখি। মানুষ কখন এতটা মরিয়া হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়। বাংলাদেশে আসা কিছু রোহিঙ্গা এ দেশের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবেও পাড়ি দিয়েছে। এ দেশে রোহিঙ্গা সমস্যাটি লাভ করেছে বহুমাত্রিকতা। শিক্ষাদীক্ষা-বঞ্চিত ও অবহেলিত ব্যক্তিদের একটি অংশ বড় অপরাধীদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর তা-ই হচ্ছে। জঙ্গিবাদ, চোরাচালানসহ অপরাধের পৃষ্ঠপোষকেরা রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে সহজেই ব্যবহার করতে পারছে। ফলে, নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর। সমস্যাটির একটি যৌক্তিক এবং ন্যায়সংগত সমাধান না হলে মিয়ানমারের নিকট-প্রতিবেশী বাংলাদেশ সদা ভারাক্রান্ত থাকবে।
রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্বসমাজ বারবার অনুরোধ জানাচ্ছে মিয়ানমারকে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট সে দেশ সফরকালেও একই অনুরোধ করেছেন। এতে কার্যকর কোনো ফলোদয় হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। অতি সম্প্রতি সে দেশে জনগণনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই গণনার ফলাফল অনুসারে, ১৯৮৩ সালের চেয়ে তাদের জনসংখ্যা কমেছে ৯০ লাখ। কোথাও কিছু ভুল থাকতে পারে। তবে সেই জনগণনায় রোহিঙ্গারা অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। তথ্য নিবন্ধন ফরমে জাতিসত্তার তালিকায় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই ছিল না। তা ছাড়া বিদ্রোহী–অধ্যুষিত কাচিন প্রদেশ গণনার বাইরেই রয়ে গেছে। এ জনগণনা থেকে বাদ পড়ে রোহিঙ্গারা একটি নেতিবাচক বার্তা পেল।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শরণার্থী সমস্যা বিভিন্নভাবে সমাধান করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে এতে আবশ্যক হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। উনিশ শতকের শেষ দিকে ভুটানের দক্ষিণাঞ্চলে নেপালি ভাষাভাষী বেশ কিছু লোক বসতি স্থাপন করে। ১৯৮৫ সালে ভুটানে নাগরিকত্ব আইন নতুনভাবে প্রণীত হয়। জনগণনা করা হয় ১৯৮৮ সালে। নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দাঙ্গা হয় ১৯৯০ সাল থেকে কয়েক বছর। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নেপালি ভাষাভাষীরা আশ্রয় নেয় নেপালে। ইউএনএইচসিআর শিবির স্থাপন করে ত্রাণ কার্যক্রম চালায় সেখানে। সেসব শিবিরে জনসংখ্যা একপর্যায়ে দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ সাত হাজার। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ এদের পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসে। ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৮৮ হাজার ৭৭০ জন পুনর্বাসিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ হাজার যুক্তরাষ্ট্রে আর ১৩ হাজার ৭৭০ জন অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এমন ব্যবস্থা তো নেওয়া যেত ২৩ বছর শিবির জীবনযাপনকারী কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্যও। পাশ্চাত্যের পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশ এদের ধারণ করতে সক্ষম নয়। এটা সবারই জানা। জাতিসংঘ উদ্যোগ নিলে ভুটানি শরণার্থীদের প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের একটি অংশ এভাবে পুনর্বাসিত হতে পারে।
মিয়ানমারের সঙ্গে কর্মকর্তা পর্যায়ে সাম্প্রতিক বৈঠকের ফলাফল আমাদের মধ্যে নতুন আশাবাদের সঞ্চার করেছে। তবে এ বিষয়ে তাদের অতীত ভূমিকায় আমরা কিছুটা সন্ধিহানও থাকছি। দীর্ঘকাল সামরিক বাহিনী দেশটি শাসন করেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও বিচ্ছিন্ন ছিল সারা বিশ্বের চিন্তাচেতনা থেকে। সম্প্রতি কিছুটা গণতন্ত্রায়ণ হয়েছে। তবে চেতনার জগতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। রোহিঙ্গারা ২০১২ সালের দাঙ্গায় বিপন্ন হলে তাদের পক্ষে কোনো বক্তব্য নিয়ে অবস্থান নেননি শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি। অথচ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জীবনের মূল্যবান সময় বন্দিদশাতেই কাটিয়েছিলেন। মনে করা হচ্ছে, এখানে ভোটের রাজনীতির ঊর্ধ্বে তিনিও উঠতে সক্ষম হননি।

মিয়ানমার আমাদের নিকট-প্রতিবেশী একটি দেশ। তাদের সঙ্গে সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশই ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হতে পারে। অতীতে যা-ই ঘটুক, এখন তাকানো দরকার সামনের দিকে। শিবিরে থাকা শরণার্থীদের এক ক্ষুদ্র অংশকে সে দেশের প্রত্যাবর্তনে সম্মত হওয়া তাদের সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবেই আমরা ধরে নেব। পাশাপাশি প্রয়োজন, যারা সেখানে আছে, তাদের শান্তি, নিরাপত্তা আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের অধিকার। মিয়ানমার আজ গণতন্ত্রের পথযাত্রী। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সমার্থক।
মানবাধিকারের ন্যূনতম বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে এ সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান হয়ে যাবে। তবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারকে সংশয় কাটাতে হবে। সমস্যাটি শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিকও বটে। যে সদিচ্ছার সূচনা কর্মকর্তা পর্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে হলো, তা ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হোক—এ প্রত্যাশা সবার।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

অভিবাসীর মৃত্যু -মৃত্যুর আগে দেশকে কী বলেছিল রুবেল? by ফারুক ওয়াসিফ

ব্রিটেনে ‘আউটসাইডার’ বাংলাদেশি তরুণ রুবেল নিজের মতো জীবন চেয়ে পেলেন করুণ মৃত্যু। আলব্যের কামুর আউটসাইডার উপন্যাসের নায়ক চেয়েছিল মৃত্যুর সময় তার চারপাশে থাকুক অনেক মানুষের কলরোল। ব্রিটেনের হাজতে ২৬ বছর বয়সী রুবেলের মৃত্যুর পরিবেশ জনবিরল ছিল না। কিন্তু পাশে থাকার সুযোগ হয়নি কারোরই। ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের হাজতখানায় সবাই-ই তো তাঁরা বন্দী। রুবেলের সাহায্যের জন্য চিৎকার শোনা ছাড়া তাঁদের কিছুই করার ছিল না। মৃত্যুমুখে মানুষ শেষবারের মতো স্বজনের দেখা চায়। কেন চায়? একা একা মরে যেতে চায় না কেউই। কেন চায় না? হয়তো দরদি চোখের শেষ দেখাদেখিই মানুষের অন্তিম ও চিরন্তন ইচ্ছা। হয়তো একাকী মৃত্যুর বিভীষিকা বহুগুণ বেশি। আমাদের রুবেলও এভাবে একা একা মরে যায়। বুকে ব্যথার কথা জানা গেছে, নির্যাতন হয়েছিল কি না জানা যায়নি। ঘণ্টারও বেশি সময় গরাদের শিক ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে সাহায্য ভিক্ষা করে গেছে। কেউ আসেনি। সিলেটের বিয়ানীবাজারে মা তখন অপেক্ষায়, এই তো ছেলে ফিরল বলে।

বিলাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, রুবেল আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু রুবেলের সহবন্দীরা তা বিশ্বাস করেননি। ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় তাঁরাই বলেছেন, রাত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত রুবেলের কণ্ঠস্বর তাঁরা শুনেছেন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স এসেছে রাত সাড়ে ১১টায়। তখন সব শেষ। শেষের পরে শুরু হলো অন্য কাহিনি।
রুবেলের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরটাও জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি মর্টন হল নামের ওই ডিটেনশন সেন্টারের কর্তারা। খবরটা রুবেলের উকিলের কাছে দেন সেখানকারই আরেক বন্দী। ঘটনা গত শুক্রবার রাতের। শনিবার সকালে কারাকক্ষগুলোর দরজা খোলার পর বিদ্রোহ করে বসেন অন্য বন্দীরা। তাঁরা রুবেলের মৃত্যুর প্রতিবাদ করেন, নিজেদের অমানবিক অবস্থার জন্য কারা প্রশাসনকে অভিযুক্ত করেন। রক্ষীরা তাঁদের সামলাতে ব্যর্থ হলে দাঙ্গা পুলিশ আসে। এর মধ্যে খবরটা ব্রিটিশ গণমাধ্যমে চাউর হয়। এত কিছু ঘটে যায়, অথচ লন্ডনের বাংলা পত্রিকা ইউকেবেঙ্গলি জানাচ্ছে, সেখানকার বাংলাদেশি দূতাবাস সম্পূর্ণ বেখবর!
পছন্দমতো জীবনের আশায় রুবেল আহমেদ পাঁচ বছর আগে লন্ডনে পাড়ি জমান। জীবনের অধিকারের মতোই মৌলিক পছন্দসই জীবনের অধিকার। কিন্তু সেটাই তঁার কাল হলো। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো এর থোড়াই পরোয়া করে। যা হোক, ব্রিটেনে বসবাসের অনুমতি চেয়ে আবেদনও করেন রুবেল। সেই আবেদন এখনো ঝুলন্ত আছে। এই অবস্থায় গত রোজার সময় রেস্টুরেন্টে কর্মরত অবস্থায় ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে আটক করে। রুবেলের অপরাধ, তিনি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত হয়েছিলেন।
লর্ড ক্লাইভের বঙ্গদেশে ব্যবসা করতে আসার জন্য নবাবের দরবার থেকে ভিসা নিতে হয়নি। যে পাঁচ লাখ ব্রিটিশ শেষ দিন পর্যন্ত ভারতবর্ষে ছিল, তাদের কারোরই ভিসা ছিল না। ভিসা-পাসপোর্টের বাধ্যবাধকতা মানলে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করতেই পারতেন না। সেটা এমন এক সময়, যখন পা-ই ছিল মানুষের আসল পাসপোর্ট, যার মেয়াদ কখনো ফুরোত না। আর এটা এমন এক সময়, যখন কালো বা সাদা সব টাকাই বিনা বাধায় যাওয়া-আসা করে, দখলদার সেনারা সীমান্ত পেরোয় অতর্কিতে, পুঁজি ও মুনাফা মুহূর্তে দেশ ছাড়ে, কিন্তু মানুষ তা পারে না।
এসব কথার দাম নেই আজকের দুনিয়ায়। যাঁর কথার দাম আছে, তাঁর কথা শুনি বরং। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নবনিযুক্ত হাইকমিশনার জাইদ রা’য়াদ আল হুসেইন ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ২৭তম অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তৃতা শেষ করেছেন অভিবাসীদের মানবাধিকারের দাবি তুলে। তিনি বলেছেন, ‘মানবাধিকার কেবল নাগরিকদের জন্য বা ভিসাধারীদের জন্য সংরক্ষিত নয়। প্রতিটি নাগরিক, তা তিনি যেখানকার অধিবাসী বা যে ধরনের (বৈধ বা অবৈধ) অভিবাসীই হোন; এটা তাঁর অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আইন প্রয়োগের নামে ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধিক অভিবাসীদের অমানবীয় অবস্থায় ফেলার প্রবণতা বাড়ছে। তাতে করে অভিবাসীরা হিংস্র পরিবেশে পতিত হচ্ছেন, আইনের পূর্ণ সুরক্ষাও বেশি করে হারাচ্ছেন।’
ব্রিটেনে বা কাতারে এই হিংস্র অমানবিক দশারই শিকার আমাদের রুবেল আহমেদরা। এ বছরেই ব্রিটেনে নিরাপত্তা হেফাজতে দুজন আফ্রিকানের মৃত্যু হয়েছে। গত ২০ বছরে অভিবাসী হতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে জীবন দিয়েছেন ২০ হাজার মানুষ। ভারত সীমান্তে, বঙ্গোপসাগরে অথবা মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর থেকে আরব অবধি হাজার হাজার অভিবাসী বাংলাদেশির হত্যা-মৃত্যু তো দৈনন্দিন ঘটনা।
ইউরোপে অভিবাসীবিরোধী বর্ণবাদ যতই শক্তিশালী হচ্ছে, সরকারগুলোর অভিবাসন আইনও ততই কঠোর হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার সম্প্রতি অভিবাসীবিরোধী হুমকিজনক বিজ্ঞাপন দিয়ে সাজানো ট্রাক লন্ডন শহর ঘোরানোর ব্যবস্থা করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে অমানবিক বর্ণনা করে হইচই করলে ট্রাকগুলো গ্যারেজস্থ হয়। কিন্তু আইন তো আর বাতিল হয়নি। এই আইন এমনই আইন, যেখানে অভিবাসীরা যেন অপরাধী। অপরাধীদের মতোই তাঁদের হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। বিনা বিচারে বছরের বছর আটকে রাখার নজিরও বিস্তর। এ রকম অবস্থায় অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, বছরে এই সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। আটকদের ৮৫ ভাগই হয় মানসিক রোগের শিকার। গেল বছর কেবল যুক্তরাজ্যেই আটক অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার!
অভিবাসনের মূল কারণ বৈশ্বিক বৈষম্য। একসময়কার সমৃদ্ধ দেশগুলো যখন ইউরোপীয়দের উপনিবেশ হয়ে পড়ল, তখন থেকেই উপনিবেশিত দেশের সম্পদ যে পথে পাচার হয়েছে, সেই সব দেশের সম্পদবঞ্চিত মানুষও সে পথেই অভিবাসী হয়েছেন। অভিবাসনকে তাই বলা যায় উপনিবেশবাদের উল্টানো রূপ। যেমন উপনিবেশিত এশিয়া-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকার সম্পদ ছাড়া ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো চলতে পারত না, এখন তেমনি অভিবাসীদের শ্রম ছাড়া এসব দেশের অর্থনীতি অচল। এদের সঙ্গে জুটেছে মধ্যপ্রাচ্যের তৈলশাহীগুলো। সম্প্রতি ইতালির এক মন্ত্রী এর সত্যতা স্বীকারও করেছেন। নিম্নমানের কম মজুরির কাজগুলো কে করবে? তৃতীয় দুনিয়ার যুবক-যুবতীরা কম মজুরিতে তাদের কাজগুলো করে না দিলে যুব-জনসংখ্যা কমতে থাকা ইউরোপের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। তার পরও, বর্ণবাদী মনোভাব থেকে অভিবাসীদের ঠেকানোর তোড়জোড় চলে। আইনের ভয় দেখিয়ে মজুরি কমানো হয়, অধিকার কাটা পড়ে।
মাল্টার প্রেসিডেন্ট এই অবস্থার প্রতিবাদে যা বলেছেন তা আমাদের কথা: কত মানুষের মৃত্যু হলে এই অবস্থার বদল ঘটবে? আইন বদলাতে হবে। কঠিনই করুন বা সহজই করুন, বিদ্যমান আইনে ফাটল আছে; সেটা সারান। নইলে সীমান্তগুলো কবরস্থানে ভরে যাবে।
রুবেলের লাশ দেশে আসছে। যেভাবে পাঁচ বছরে এসেছিল প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের লাশ। নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এর আরেকজন রুবেল কি এতে নিরাপদ হবে? সমস্যার গোড়া তো রয়েছে অভিবাসনবিরোধী ব্যবস্থার মধ্যে। সেটা সারানোয় বাংলাদেশের মতো অভিবাসনের উৎস দেশগুলোকে অভিবাসনের গন্তব্যের দেশগুলোর সঙ্গে জোরদার সংলাপে দর–কষাকষিতে নামতে হবে। আমাদের মানুষ আর তোমাদের কাজ; লাভ তো দুই পক্ষেরই। তাহলে কেন ভাই হাঁকডাক? ভিসাবঞ্চিত অভিবাসীদের অপরাধী হিসেবে দেখার চোখটা তাই ধুয়ে নিতেই হবে।
বাংলাদেশের সরকার, পৃথিবীর সব বাংলাদেশি নাগরিকের সরকার। নিজের নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে যে সরকার নির্বিকার থাকে, সে কি ভালো সরকার? রুবেলের জন্য যারা কেঁদেছিল, যারা প্রতিবাদ করেছিল তারা বাংলাদেশি ছিল না। ভিনদেশিরা যদি পারে, স্বদেশিরা পারে না কেন? মৃত্যুর আগে মানুষের মনে প্রিয় মুখ ভাসে। বিদেশ–বিভুঁইয়ে বিপদে পড়লে এমনকি মরে যাবার সময় মুখে দেশের কথাও কি মনে আসে? গরাদের শিক ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হয়তো রুবেল ভেবেছিল, আমার দেশ কি আমাকে বাঁচাবে না? এক রুবেল গেছে, অন্য রুবেলরা কিন্তু দেশকে চাইছে। প্রবাসেই দেশকে বেশি দরকার হয় প্রবাসীর।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

আত্মহত্যা রোধ দিবস -দায়িত্বটা সরকারেরই by পুনম ক্ষেত্রপাল সিং

প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছেন। স্বজনদের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কেবল ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেছেন আট লাখ মানুষ। ডব্লিউএইচওর সব কটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। আত্মহত্যা একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা—অনেক দেশে নিষিদ্ধও। সে কারণে আত্মহত্যার ঘটনা অনেক সময় লিপিবদ্ধ হয় না।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর আত্মহত্যার ধরন নির্ভর করে। কোন বয়সে মানুষ বেশি আত্মহত্যা করছেন? দেখা গেছে, ধনী দেশগুলোয় বেশি বয়সে মানুষ আত্মহত্যা করেন, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত দেশগুলোয় অল্প বয়সে আত্মঘাতী হন বেশি। বিশ্বে আত্মহত্যার যত ঘটনা ঘটছে, তার ৭৫ শতাংশের বেশি ঘটছে নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলোয়। সেসব দেশের মধ্যে আবার এগিয়ে আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশ। গোটা বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ লোকের বাস এই অঞ্চলে।
সাধারণভাবে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থাভেদে এ চিত্রেরও ভিন্নরূপ দেখা যায়। ধনী দেশগুলোয় নারীদের তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার তিন গুণ পর্যন্ত বেশি। কিন্তু নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশে এই হার ১ দশমিক ৫ জন পুরুষ: ১ জন নারী। বেশির ভাগ দেশে সত্তরোর্ধ্ব মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলোয় আত্মহত্যায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কীটনাশক বিষ। অন্যদিকে ধনী দেশগুলোয় মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে বা গুলিতে আত্মহত্যা করেন বেশি। আত্মহত্যার প্রবণতা, ধরন ও পদ্ধতি বদলায় সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী ও সময়ের সঙ্গে। কাজেই আত্মহত্যা রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হলে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যা চেষ্টার সাম্প্রতিক তথ্য সরকারের হাতে থাকা দরকার। এই তথ্য সংগ্রহের কাজ বেশ জটিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যা কলঙ্কজনক ইস্যু, আইনত নিষিদ্ধ। সে কারণে সত্যিকারের পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ কষ্টকর। যত দিন পর্যন্ত দেশ বা সম্প্রদায়গুলো আত্মহত্যাকে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা বলে চিহ্নিত না করছে এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এমন মানুষের পাশে এসে না দাঁড়াচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত আত্মহত্যা প্রতিরোধের যুদ্ধ সফল হবে না।
আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সরকারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে জাতীয় পর্যায়ে একটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অঙ্গীকার করতে হবে। বিশ্বের মাত্র ২৮টি দেশে এ ধরনের কৌশলপত্র আছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ দরকার।
আত্মহত্যায় মানুষ যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে থাকে, সেগুলোর সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় কীটনাশকের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করে সুফল পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণও কাজে এসেছে। যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, দ্রুত তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছাতে হবে। সমাজের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বৈরী পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোয় সাহায্য করতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে, সবাই তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। তাঁদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে দিতে হবে। আর এ উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। আত্মহত্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে তথ্য দিতে হবে, আত্মহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে হবে, প্রয়োজনে সাহায্য কোথায় পাওয়া যাবে, তা-ও জানাতে হবে। কিন্তু আত্মহত্যাকে গৌরবান্বিত করার কোনো চেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সংবাদমাধ্যমগুলো যেন এগিয়ে আসে, সে বিষয়ে সরকার সহযোগিতা করতে পারে। মানসিক রোগে কেউ ভুগছে কি না, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ঝুঁকি কী—এসব বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতিকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। সরকারকে সে জন্য যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দও করতে হবে।
গোটা বিশ্বে মৃত্যুর প্রথম ২০টি কারণের একটি আত্মহত্যা। মানসিক রোগ, বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি, নির্যাতন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট মানুষকে আত্মহত্যায় আগ্রহী করে তুলতে পারে। কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আত্মহত্যার প্রধান মাধ্যম কীটনাশক বিষ। কীটনাশক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, এ দায়িত্ব সবার। একযোগে শিক্ষা, শ্রম, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, ধর্ম, আইন, রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমকে কাজ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনার প্রধানতম অঙ্গ আত্মহত্যা প্রতিরোধ। এই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে আত্মহত্যার হার কমাতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন প্রতিবেদন ‘সুইসাইড প্রিভেনশন: এ গ্লোবাল পাবলিক ইমপারেটিভ’-এ জনস্বাস্থ্য নীতিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একযোগে কাজ শুরুর গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ড. পুনম ক্ষেত্রপাল সিং: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক।

এই ভূখণ্ডে জঙ্গিবাদের বিপদ কতটা বাস্তব? by মশিউল আলম

আল-কায়েদার কোনো অডিও বা ভিডিওবার্তা প্রচারিত হলে এত দিন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সরকার ও সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু এবার একটা বড় ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেল। আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির একটি ভিডিওবার্তা ইন্টারনেটে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠল ভারতের সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তাঁর মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসলেন; দেশটির গোয়েন্দাপ্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হলো, যত দ্রুত সম্ভব আল-কায়েদার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে এবং ভারতের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
ভারত সরকারের এত বিচলিত হওয়ার কারণ কী? কেন এত চাঞ্চল্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে? দৃশ্যমান কারণ, আল-কায়েদা ভারত উপমহাদেশে এই প্রথম শাখা বিস্তারের ঘোষণা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আল-কায়েদার তৎপরতা এতকাল সীমাবদ্ধ ছিল আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে। এবার তার নজর পড়েছে ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতি। ভিডিওবার্তায় বলা হয়েছে, এই অঞ্চলজুড়ে সীমান্তবিহীন একটা ইসলামি খেলাফত গড়ে তোলার লক্ষ্যে আল-কায়েদার ভারত উপমহাদেশীয় শাখা খোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
জাওয়াহিরির বক্তব্য অনুযায়ী আল-কায়েদার শ্যেন দৃষ্টির আওতায় বাংলাদেশও আছে, যে দেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলমান এবং যেখানে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা অনেক ছোট ছোট জঙ্গিগোষ্ঠী আছে, যাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদিন ও পরবর্তীকালে তালেবানের সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। আফগানিস্তানে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে জিহাদের কাজে আত্মনিয়োগ করেছে এমন কিছু জঙ্গির কথা জানা যায়; তাদের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছে, এমন খবরও অতীতে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) পক্ষ থেকে জাওয়াহিরির ওই ভিডিওবার্তার সত্যতা নিয়ে প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। অর্থাৎ এ বিষয়টি আমাদের সরকারের কাছে প্রথমে ততটা গুরুত্ব পায়নি, যতটা পেয়েছে ভারত সরকারের কাছে। পরে অবশ্য র্যাবের জঙ্গিবিরোধী সেলগুলোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার মামলার আসামি এক জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সুবাদে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও নজরদারি শুরু হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। অর্থাৎ জাওয়াহিরির ভিডিওবার্তা বাংলাদেশের সরকারের হাতে ধর্মভিত্তিক বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও কোণঠাসা করার সুযোগ এনে দিল। ভারতেও বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সুযোগ হবে, আরও জোশ বাড়বে ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীদের, এবং মুসলমান মৌলবাদীদেরও কম সুবিধা হবে না—এ রকম কথাও বলাবলি হচ্ছে। লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় রুচির জোশি লিখেছেন, জাওয়াহিরির ঘোষণার পর ভারতে হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদীরা একসঙ্গে ট্যাঙ্গো নাচ নাচতে শুরু করেছে, কারণ ধর্মীয় ঘৃণা ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটায় এবার উভয় পক্ষেরই বিরাট সুবিধা হবে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আল-কায়েদার পক্ষ থেকে জাওয়াহিরির এই ভিডিওবার্তা প্রচারের তাৎপর্য কী? ঠিক এই মুহূর্তে কেন এটা প্রচার করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তরে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভিডিওবার্তাটি ভুয়া হতে পারে, মতলববাজ কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরিও হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের দাবির সমর্থনে সাক্ষ্য–প্রমাণের খবর পাওয়া যায়নি। খুব সম্ভবত এটা আয়মান আল জাওয়াহিরির কণ্ঠে উচ্চারিত আল-কায়েদারই বক্তব্য এবং এই বক্তব্য একটি প্রতিক্রিয়া। ইরাক ও সিরিয়ার বিরাট অঞ্চলজুড়ে ‘ইসলামি খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করে প্রবল দাপটের সঙ্গে ইরাকি ও সিরীয় সরকারি বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) নামের যে সুন্নি জঙ্গি সংগঠন, সারা মুসলিম বিশ্বে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ক্রমেই বেড়ে ওঠার দৃশ্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আল-কায়েদার পক্ষ থেকে জাওয়াহিরির এই ভিডিওবার্তা প্রচার করা হয়েছে।
আমেরিকানদের হাতে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার বেশ আগে থেকেই আল-কায়েদার তৎপরতা হ্রাস পেতে শুরু করে। বিশেষত, আফগানিস্তানে ও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আমেরিকানরা ড্রোন হামলা শুরু করার পর থেকে আল-কায়েদার যোদ্ধাদের পক্ষে সক্রিয় থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের বড় নেতাদের অনেকেই ড্রোন হামলায় মারা যান এবং অন্য যোদ্ধাদের চলাফেরা সংকুচিত হতে থাকে। এমনকি তাঁদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও আর আগের মতো থাকে না। বিশেষত, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত কম্পিউটার ব্যবহার তাঁদের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আমেরিকান ড্রোন হামলায় নিহত তালেবান যোদ্ধাদের অধিকাংশই মারা গেছেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করার কারণে। যন্ত্র ব্যবহারের এই বিপদ তাঁদের বাধ্য করে চিঠি-চিরকুট লেখা ও মানুষের হাতে হাতে সেগুলো আদান-প্রদানের যুগে ফিরে যেতে। ওসামা বিন লাদেনও মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপেন বাধ্য হন। আল-কায়েদার অল্প কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ যেটুকু ছিল, তার মাধ্যম ছিলেন তাঁর অতি বিশ্বস্ত দুই সহোদর বার্তাবাহক, যাঁরা তাঁর সঙ্গে সপরিবারে বাস করতেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরের একটি বাড়িতে, যেখানে আমেরিকান বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে লাদেন ও তাঁর ওই দুই বার্তাবাহককে হত্যা করে।
চলাফেরায় বাধা, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগহীনতা ইত্যাদির পাশাপাশি ড্রোন হামলার সার্বক্ষণিক হুমকি—এসবের মারাত্মক প্রভাব পড়ে আল-কায়েদার অর্থায়নেও। গোষ্ঠীটি দরিদ্র হতে থাকে এবং নতুন কর্মী সংগ্রহ প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। আর বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর তালেবান যোদ্ধাদের মনোবল ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে এবং অবশেষে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন জঙ্গিবাদ পর্যবেক্ষকেরা বলতে শুরু করেন যে আল-কায়েদা এখন যতটা না একটা সংগঠন, তার চেয়ে বেশি একটা ভাবাদর্শের আকারে টিকে আছে। আয়মান আল জাওয়াহিরিও আমেরিকান ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার ভয়ে পালিয়ে থাকা এক গুহাবাসী নেতা, আল-কায়েদাকে সংগঠিত রাখা যাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
আল-কায়েদার এই দুর্দশার বিপরীতে ইরাক-সিরিয়ায় দাপটের সঙ্গে যুদ্ধরত আইএস (বা আইসিস) সারা বিশ্বের জঙ্গি মনোভাবাপন্ন মুসলমান তরুণ-যুবকের কাছে ভীষণ এক প্রলুব্ধকর সংগঠনের নাম। আইএসের নেতা আবু বকর আল বাগদাদি তাদের কাছে ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও আকর্ষণীয় এক নেতা, নৃশংসতায় যার জুড়ি মেলা ভার। সে কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৮১টি দেশ থেকে মুসলমান তরুণ-যুবকেরা ছুটে গেছেন ইরাক ও সিরিয়ায়, যোগ দিয়েছে খলিফা আবু বকর আল বাগদাদির নিশানতলে। দেশগুলোর তালিকায় আমেরিকা ও ব্রিটেনও আছে। এই দুটি দেশ, বিশেষত আমেরিকায় মানুষ আইএসকে নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এ কারণে যে, তাদের অনেক যুবক নাগরিক ইসলামি খিলাফত কায়েম করতে ইরাক-সিরিয়া গিয়ে আইএসের যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। তারা যখন স্বদেশে ফিরবে, মনের মধ্যে জঙ্গিবাদ নিয়েই ফিরবে এবং ওই ভাবাদর্শ আমেরিকা ও ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যাবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুদ্ধ ঢুকে পড়বে খোদ আমেরিকান বা ব্রিটিশ ভূখণ্ডে।
ভারত উপমহাদেশে আল-কায়েদার বিস্তারের বিপদ যদি এখন আর বাস্তবসম্মত নাও হয়, তবু ভারত সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। কারণটা আইএসকে ঘিরে। ভারতীয় গোয়েন্দারা খবর পেয়েছেন, ভারত থেকেও কিছু মুসলমান যুবক সিরিয়া-ইরাকে গিয়ে আইএসের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। আর আল-কায়েদার এই নতুন ঘোষণার আগেই আইএস দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের পেশোয়ারসহ সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় ও আফগানিস্তানে আইএসের প্রচারপত্র বিলি করা শুরু হয়েছে; তাদের লিফলেট পাওয়া গেছে ভারতীয় কাশ্মীরেও। আর পাকিস্তানি তালেবানের একটা খুব সক্রিয় গ্রুপ জামাআতুল আহরার আইএসের যোদ্ধাদের ‘ভাই’ বলে ঘোষণা করেছে এবং তারা আইএসের নেতা আবু বকর আল বাগদাদির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। যদিও পাকিস্তানি তালেবান আল-কায়েদার সঙ্গেও সংহতি প্রকাশ করে, তবু আল-কায়েদার তুলনায় আইএসের আকর্ষণ এখন অনেক গুণ বেশি। আইএস সিরিয়া-ইরাকের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে নিজেদের রাষ্ট্র বা খিলাফত কায়েম করেছে এবং ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তা পরিচালনা করছে। আইএস বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে ধনী জঙ্গি সংগঠন, যার নগদ সম্পদের পরিমাণ ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। তারা যেসব তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা থেকে তাদের দৈনিক আয় ৩০ লাখ ডলার। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের ধনাঢ্য সুন্নিরা তাদের নিয়মিত বিরাট অঙ্কের চাঁদা দেয়। সব মিলিয়ে আইএসের যে রমরমা অবস্থা, তার ফলে বিশ্বের জঙ্গিবাদী মহলে এই সংগঠনটি আল-কায়েদার সেরা বিকল্পরূপে হাজির হয়েছে।
সুতরাং আল-কায়েদা না হোক, আইএসের মাধ্যমে ইসলামি জঙ্গিবাদ ভারত উপমহাদেশে, এমনকি বাংলাদেশেও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে বাংলাদেশে তারা হয়তো সুবিধা করতে পারবে না, কারণ এ দেশে ধর্মের নামে সহিংস তৎপরতার পক্ষে সামাজিক সমর্থন নেই, যা আছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন দুষ্কৃতকারীদের মতো আচরণ করেও তারা যে সমাজের শান্তি যথেষ্ট মাত্রায় বিঘ্নিত করতে পারে, তার কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি ও বাংলা ভাইয়ের জাগ্রত মুসলিম জনতার দৌরাত্ম্যের সময়।
মশিউল আলম: সাংবাদিক৷

সুযোগকে সতর্কতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে by মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ প্রস্তাব এককথায় সোনায় সোহাগা। উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এখানে এক বিন্দুতে মেলানোর সুযোগ পেয়েছে। বেশ কয়েকটা দিক থেকে এটা গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের নতুন অর্থনৈতিক কৌশল হলো, চীনের ওপরে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। এ জন্যই তারা এখন বঙ্গোপসাগর ঘিরে তাদের বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র সন্ধান করছে। বে অব বেঙ্গলে তাদের এই অর্থনৈতিক আগ্রহকে তারা বলছে ‘বিগ বি’।
বাংলাদেশও যাকে বলে ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র-অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগর ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে তেমন একটি গ্রোথ জোন সৃষ্টি করার চিন্তা করছে। অবকাঠামোকে নতুন স্তরে উন্নীত করার মাধ্যমে আরও বেশি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে এই চাহিদা। উভয় পক্ষের আগ্রহের মধ্যে সমন্বয়ের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবেই তাই দেখা যায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে।
বাংলাদেশে আমাদের নিজস্ব ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারি না অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে গেলে অবকাঠামোতেই বিনিয়োগ দরকার। এর জন্য আগামী ১০ বছরে আমাদের ১০০ বিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগ লাগবে। সেদিক থেকে জাপান যেসব প্রকল্পের কথা বলছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ও আগ্রহের সঙ্গে মিল আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও বিকশিত করা এবং মাতারবাড়িতে বন্দর করে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার প্রস্তাব তাই চমৎকার উদ্যোগ।
জাপান বিভিন্ন কারণে চীনের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে চায়। তারা প্রতিবছর ৮৫০ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট আমদানির ২১ ভাগ করে চীন থেকে। প্রতিবছর সেখানে তাদের সাত-আট বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হচ্ছে। সেই নির্ভরশীলতা কমানোয় জাপানের যে আগ্রহ তা মেটাতে পারে আমাদের বে অব বেঙ্গল। জাপান যেহেতু বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য খুঁজছে, সেহেতু চীনে বিনিয়োগের একটা হিস্যা নিয়ে আসা আমাদেরও পরিকল্পনাতেও থাকা উচিত। এতে কর্মসংস্থান হবে, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়বে এবং শিল্পায়ন ঘটবে।
জাপান রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জিরো সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছে। তাই এখান থেকে জাপানে পণ্য পাঠানো সহজ। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৫০টি কোম্পানির প্রতিনিধি ছিলেন। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যে শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশ পায়, সেই সুবিধা ব্যবহার করেই এখান থেকে জাপানের বাজারের জন্য তৈরি পণ্য জাপানে পাঠাতে জাপানি কোম্পানিদের কোনো অসুবিধাই হবে না। এখান থেকে তারা ভারতেও পণ্য পাঠাতে পারবে।
বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। জাপানি ব্যবসায়ীরা বিজনেস ফোরামে যে কথা বলেছেন তাতে মনে হয়, বাংলাদেশের বর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারকেও তারা মাথায় রেখেছে। এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলায় জাপান ও বাংলাদেশের স্বার্থ মিলে যায়। সুতরাং, জাপানের বিনিয়োগ প্রস্তাবের লক্ষ্যের মধ্যে থাকছে জাপানি বাজার, ভারতের বাজার এবং বাংলাদেশের বাজার।
আমরা যে বিসিআইএম (Bangladesh-China-India-Myanmar Forum for Regional Cooperation) ইকোনমিক করিডরের কথা বলছি, সেটার সুবিধাও জাপান পাবে। চীন ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারেরও হিস্যা রয়েছে। এটা সম্ভব হবে আমাদের অবকাঠামো সুবিধা বাড়লে। তখন দক্ষিণমুখী অর্থনীতিও প্রসারিত হবে। চীন ও ভারতেরও আগ্রহ আছে বিসিআইএমে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের অনন্যতার সুবাদে আমরা ভারত, চীন ও জাপানের ত্রিভুজকে কাজে লাগাতে পারি।
জাপানের এই আগ্রহ বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নয়ন–সহযোগীদের থেকে চরিত্রগতভাবে অনেক উদার। অতীতের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশকে দেওয়া জাপানের ঋণগুলো হয় সফট লোন। এ ক্ষেত্রে তারা কঠিন শর্তাবলি আরোপ করে না। এর একটা উদাহরণ হলো তাদের দেওয়া ডেট ক্যানসেলেশন ফান্ড। তাদের কাছে অপরিশোধিত ঋণ আছে, তা অনুদান হিসাবে করে দেওয়ায় এবং জাপানকে ঋণের সুদ বাবদ দেয় অর্থ আবার ফিরে পাওয়ার এই ব্যবস্থা উদারতার একটা নজির।
২০০৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই তহবিল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১৬০ মিলিয়ন ডলার করে পাবে। ১৪ বছরে এর মোট পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এর শর্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অর্থ ব্যবহার করা। ২০১৪-১৫ সালের চলমান এডিপিতে ৩১টি প্রকল্প আছে, যা ওই তহবিল দিয়ে বাস্তবায়ন করব। সুতরাং, বাংলাদেশে উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে জাপানের ভূমিকাও পরীক্ষিত। এ দিকটাও বিবেচনা করি, তাহলে জাপানের উদ্দেশ্যের মধ্যে স্বচ্ছতা আছে। সব মিলিয়ে তাই এটা একটা বড় সুযোগ।
বছরে তিন হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে জাপান। এর ৮০ শতাংশই আসে চীন থেকে। এ ক্ষেত্রে সদ্যবিদায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৫৭ কোটি ডলার, অর্থাৎ দেড় শতাংশের মতো। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৪৭ কোটি ডলার। পণ্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সম্ভাবনার পুরোটাই কাজে লাগানো সম্ভব।
জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকেও শূন্য শুল্ক সুবিধা আছে। এখন চীন থেকে তারা নিচ্ছে অথচ এ ক্ষেত্রেও আমাদের শক্তিমত্তা আছে। গত পাঁচ বছরে জাপানে পোশাক রপ্তানি ১০ গুণ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রেও চীনের পরিপূরক বা বিকল্প হিসেবে আমরা তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়াতে পারি। যেহেতু জাপানিরা খুবই মানসম্পন্ন পণ্য চায়, সে ক্ষেত্রে চীন থেকে সরে এসে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব করে জাপানিদের চাহিদামতো পোশাক তৈরি করে পাঠানোর সুযোগ আছে। তাহলে আমরা আরও বড় আকারে তাদের বাজারে প্রবেশ করতে পারব। এই বাজারে ঢোকার জন্যও আমাদের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) দরকার।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আস্থার সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখাই এখন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ। এখন তো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলো, পরে উভয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দ্বিপক্ষীয় কথাবার্তা হবে। সেসব আলোচনা, যা আসলে সহযোগিতা বাস্তবায়নের প্রায়োগিক দিকগুলো মেলে ধরবে, তাতে যদি আমরা দক্ষতা দেখাতে না পারি, যদি আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি না থাকে, তাহলে জাপানের আগ্রহ কমতে পারে। জাপানের সামনে চীনের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের পাশাপাশি কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামও আছে। তাই আমরা যদি হেলাফেলা করি, তাহলে সুযোগটা হাতছাড়া হতে পারে। তারা বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত দেখতে আগ্রহী। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা, নীতি-ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাদের বিনিয়োগকারীরা যাতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস পান, তাহলে আস্থার সম্পর্কটা তৈরি হবে।
অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক বড় বড় বিনিয়োগে সমস্যা হয়েছে; বিনিয়োগ ফিরে গেছে। জাপানিরা এসবের ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর। সুশাসন ও দুর্নীতির প্রশ্নে তারা অত্যন্ত কঠোর। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির কারণে, অর্থনীতির দৃষ্টিকোণের বাইরের বিবেচনা থেকে প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনা করে কিছু করতে গেলে জাপানিরা নিরুৎসাহ হবে। এ বিষয়ে সতর্ক থেকে যৌথতাকে সমন্বিত গতিশক্তিতে পরিণত করার মধ্যেই রয়েছে সাফল্যের চাবি।
বাংলাদেশকে এখন বহু দিকেই হাত বাড়াতে হবে। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালাম মানে কিন্তু ভারত ও চীন থেকে দূরে আসা নয়। সবকিছুকেই মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করে দেখতে হবে। তাহলেই যেখানে যা সম্ভব তা বাস্তব সুযোগ হিসেবে সামনে আসবে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান: অর্থনীতিবিদ, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সারমেয় মেয়র by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার একটি ছোট পৌরসভা করমোর্যান্ট। তার সদ্যনির্বাচিত মেয়র ডিউকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়ে গেল ১৬ আগস্ট। ভোটাররা সব মানুষ হলেও যে নির্বাচিত হয়েছে, সে একটি কুকুর। ডিউকের বয়স সাত বছর।
পৌর এলাকায় নির্বাচিত মেয়র একজন আছেন। ডিউক অবৈতনিক বা সাম্মানিক মেয়র। গণতন্ত্র এখন এমন এক জিনিস, যা মানুষ থেকে কুকুর পর্যন্ত নেমে এসেছে।
করমোর্যান্ট-এর নাগরিক মিজ ট্রিসিয়া ম্যালোনি সংবাদমাধ্যম WDAY6-কে জানিয়েছেন: ডিউক বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আজ তার এই খ্যাতি ও সম্মান অবশ্য উপভোগ করার ক্ষমতা তার নেই। তার বিজয় আমরা উদ্যাপন করছি।
বিজয়ের পরে শহরের নাগরিকরা ডিউকের গলায় বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করেন। মালাগলায় তার ছবি সারা পৃথিবীতে প্রচারিত হয়েছে।
অবশ্য ডিউক শুধু ফুলের মালাই পেয়েছে। সোনার তৈরি তার নির্বাচনী প্রতীক তাকে উপহার দেওয়া হয়নি। তাকে সংবর্ধনা দিতে শহরের বিদ্যালয়গুলোর ছেলেমেয়েদের রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়েও রাখা হয়নি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পাঁচ সপ্তাহব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণার জন্য চাঁদাও তোলা হয়েছে অতি সামান্য। জনপ্রতি এক ডলার।
কেন ডিউককে ‘বাই আ ল্যান্ডস্লাইড’ বা ভূমিধস ভোটে নির্বাচিত করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা নগরবাসী সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছেন। তারা বলেন, ডিউক আমাদের শহরকে পাহারা দেয় এবং ডিউক মেক্স দ্য কমিউনিটি সেফার—আমাদের নাগরিক সমাজকে নিরাপদে রাখে। তারা আরও বলেছেন, এমনকি সে এটা পর্যন্ত লক্ষ রাখে যে, কেউ যেন তার গাড়ির গতিসীমা লঙ্ঘন না করে—এনসিওরিং কারস ডু নট ব্রেক দ্য স্পিড লিমিট।
সারমেয় মেয়রের এই খবর পড়ে আমার মনে হয়েছে, অনেক দেশের মানুষ–মেয়ররাও তো এই দায়িত্বগুলো পালন করেন না। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও নন।
কোনো জনপ্রতিনিধি বা শহরের মেয়র নিজে লাঠিসোঁটা নিয়ে তার শহর বা এলাকা পাহারা দেবেন—তা আশা করে না কেউ। কিন্তু ডিউকের শহরের লোকেরা আর যে কথাটি বলেছেন, তার তাৎপর্য বিরাট। তাঁরা বলেন, ডিউক আমাদের জনপদকে নিরাপদে রাখে। বহু দেশের অনেক মানুষ-মেয়র ও জনপ্রতিনিধিরা তাদের ভোটারদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরের কথা তারা তাদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভীষিকা।
কোনো দেশের অনেক মেয়রের ছেলে একের পর এক মানুষ খুন করতে পারেন। তার বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম। হলেই-বা কী? আদৌ যদি ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়—কুচ পরোয়া নেই। রাষ্ট্রপতি আছেন। তিনি ক্ষমা করবেন বা সাজা কমাবেন। জেলে বসেই ঘটা করে মেয়রের পুত্র তার চোখে-পড়া সুন্দরী মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারেন। জেল কর্মকর্তাদের পোয়াবারো। শুধু মিষ্টিমুখ নয়, তারা সেদিন বিরিয়ানিমুখ করেন। শুধু তাই নয়, বিয়ের পরে অন্য জেলার জেলখানা থেকে নববিবাহের স্বার্থে নিজের জেলার কারাগারে জামাই–আদরে নিয়ে আসা হয়। কয়েদি মেয়রপুত্র হলে আগের জেলখানার প্রভুভক্ত জেলার বলবেন, কোনো নির্দেশনা না থাকায় তাকে আর এখানে আনার সম্ভাবনা নেই। নবদম্পতির মেলামেশায় আর কোনো বাধা নেই।
দুনিয়াতে এমন দেশও আছে যার রাজধানী নগরীরই কোনো মেয়র নেই। নির্বাচন দিলে সরকারি দলের প্রার্থীর ভরাডুবি হবে, সে জন্য দয়াময় নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকেই শিকেয় তুলে রাখে। দুই মিনিটে মহানগরকে কেটে দুই টুকরা করা হয়। তারপর সিটি ফাদার নির্বাচন তো দূরের কথা, সিটিরই বাপ-মা নেই। একেবারে এতিম। মেয়রহীন। পৃথিবীতে এমন পৌর এলাকাও আছে যেখানে অভিযোগ রয়েছে, স্বনির্বাচিত অথবা নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচিত ঘোষিত জনপ্রতিনিধির লোকজন পুলিশের উপস্থিতিতে এক পরিবারের নয়জনকে ঘরে তালা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারে। নগর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ একজন অপরাধীর একটি লোম পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে না। পরিবারের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, দৈবক্রমে তার ওপরে উঠে যায় একটি বাস। তিনি চলে যান এমন জায়গায়, যেখানে মামলা- মোকদ্দমা, সাক্ষী-সাবুদ, আসামি-হাকিম কিছুই নেই।
যেসব দেশে মানুষের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে একটি কর্তব্যপরায়ণ কুকুরকে ‘মেয়র’ নির্বাচিত করা হয় প্রতীকী কারণে। কুকুরটি কোনো অপরাধীকে তার শহরে ঢুকতে দেয় না। তাড়া করে। শহরের সড়কে কাউকে বেপরোয়া গাড়ি চালাতে দেয় না। ঘেউ ঘেউ করে তার পেছনে ছোটে। শহরবাসীকে নিরাপদে রাখে এবং শান্তিতে ঘুমাতে দেয়।
কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে একটি কুকুরও পায় মেয়রের মর্যাদা। অন্যদিকে অসততা, দণ্ডনীয় অপরাধ, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনার কারণে মানুষ নেমে যায় পশুর পর্যায়ে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আত্মহত্যা নয়, রুখে দাঁড়াও by মালেকা বেগম

বাংলাদেশের নারীবৈষম্যের ও কিশোরী নির্যাতনের যে চিত্র বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ এবং ইউনিসেফ সম্প্রতি প্রচার করেছে, তা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ও নারী আন্দোলনের জন্য অবশ্যই চিন্তা-উদ্বেগের একটি সতর্কীকরণ বিষয়।
দাতাগোষ্ঠীর সাহায্যে দাতাগোষ্ঠীর অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় যেসব এনজিও-নারী সংগঠনগুলো পরিচালিত হচ্ছে, সেসব সংগঠনের এবং দাতাগোষ্ঠীর জন্যও জাতিসংঘের সর্বশেষ নারীবৈষম্য, নারী হত্যা, কিশোরী আত্মহত্যার প্রতিবেদনগুলো দুঃসংবাদ ও তাদের সাহায্যে পরিচালিত সংগঠনগুলোর কাজের পুনর্মূল্যায়নের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে নিশ্চয়ই।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী-কিশোরীকে নিহত হতে হচ্ছে, নির্যাতিত হতে হচ্ছে এবং আত্মহত্যা করতে হচ্ছে। যদিও নারী শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরে, শহরে-বন্দরে; তবু দেখি নারী বড় অসহায় হয়ে আজও নির্যাতন রুখে দাঁড়ানোর মতো শক্তি ও সহায়তা পাচ্ছে না। আমাদের চারপাশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বহু সুখবর নারীর ক্ষমতায়িত সুস্থ বিকশিত দৃঢ় অবস্থানের আনন্দ বয়ে আনছে। কিন্তু পরিবারের ভেতরই নারী নির্যাতনের ভয়াবহ নৃশংসতার বৈশ্বিক-তথ্যাদি আমাদের পরিবার, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির অন্ধকার-গহ্বরের খবরটিও যখন দিচ্ছে, তখন শুধু নারী আন্দোলনের ব্যর্থতাই প্রকট হচ্ছে না, সেই সঙ্গে সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির আলোকিত আন্দোলনের ব্যর্থতাও প্রকট হয়ে উঠছে। নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ সনদের ২ নম্বর ও ১৬ নম্বর ধারায় | এবারও বাংলাদেশ সরকার অস্বীকৃতি জানাল। অর্থাৎ নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার সনদে স্বীকৃতি দেওয়া বিষয়গুলোতে সরকার সব ক্ষেত্রে এখনই আইনি সংশোধন আনতে অপারগতা জানাল। হিন্দু আইনের বিষয়ে অস্বীকৃতি সংখ্যালঘু নারীর প্রতি নির্যাতন বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে সন্তানের অভিভাবকত্বের অধিকার থেকে মা বঞ্চিত থাকছেন।
ঘরের বাইরের ভালো মানুষটি, (নারী ও পুরুষ উভয়েই) ঘরের ভেতরের পুরুষ-নারী-শিশুকে কীভাবে গড়ে তুলছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন অবস্থানের, কাজের, আচরণের বিষয়ে মতবিনিময় হচ্ছে কি না, ঘরের ভেতরের ও ঘরের বাইরের নারী-পুরুষ উভয়ে উভয়কে সম্মানজনক, সমমর্যাদায় বিবেচনা করছেন কি না, গার্হস্থ্যকাজে পুরুষ সদস্য সমান তালে অংশ নিচ্ছেন কি না—এসবই নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনের জন্য সমাজের প্রাথমিক ইউনিট পরিবারের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বহু পুরোনো এই তত্ত্বগত বিষয়টি অতি আবশ্যিক প্রায়োগিক বলে কাজ শুরু করতেই হবে। আর দেরি করার সময় নেই।
পরিবারের চেহারাটা বাংলাদেশে ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। ছোট পরিবার, বড় পরিবার, চাকরিজীবী নারী-পুরুষের পরিবার, শ্রমজীবী-গৃহকর্মী-নারী-পুরুষের মেসভিত্তিক জীবনযাপনে পরিবার বিচ্যুত অথচ সংযুক্ত মানুষগুলো আর্থিক-পারিবারিক দায়দায়িত্ব পালনে বিব্রত বিধ্বস্ত। নিজ দেশে শ্রমজীবী বেকার নারী-পুরুষের জন্য কলকারখানা-কাজের ব্যবস্থা না করে যেসব নারী-পুরুষকে সরকার বিদেশে পাঠানোর তৎপরতায় সফল হচ্ছে, সেসব পরিবারের বন্ধন ও ভাঙন এবং নারীর ওপর শোষণ-নির্যাতনের তথ্যচিত্র কম ভয়াবহ নয়। এইডসের ভয়াবহতার খবরও চিন্তার বিষয়।
নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক এবং তার নীতিগত-ধর্মীয়-আইনগত বিধিমালা সমাজ-সংস্কৃতি-পরিবার-রাজনীতি-আইন প্রশাসন-থানা-পুলিশ—সবার নিজ নিজ ধ্যানধারণার সীমাবদ্ধতায় পরিচালিত হয়। সে ক্ষেত্রে পুরুষের যথেচ্ছ যৌন আচরণ এবং ধর্ষণ, যৌন উত্ত্যক্ত করা সমাজ বিচারে সাধারণত ধিক্কৃত নয়। সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই নির্যাতনের শিকার নারীই সমাজ-নিন্দিত, পরিবার-নিন্দিত হয়ে আসছে।
লজ্জা, শরম, ভয় শিশুকাল থেকেই মেয়েটির মন আচ্ছন্ন করে রাখে। পরিবারের নানাজনের শাসন চলে মেয়েটির ওপরই। ছেলেটিকে শেখানোই হয় না যে মেয়ে, সে বোন, মা, খালা, দাদি, নারী, সহপাঠী, বন্ধু যেই হোক না কেন, তাকে সম্মান করতে হবে; হেনস্তা করা যাবে না। বাড়ির শিশুটি মায়ের কাছেই বেশি সময় কাটায়। বাবা বা অন্য পুরুষ সদস্যরা শিশুসন্তানের খোঁজখবর আলগা-আলগা দায়সারাভাবে রাখেন। অনেকে তাও রাখেন না। কিন্তু পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক (বাবা-মা ও অন্য সদস্যদের) আচরণের স্নিগ্ধতা-মাধুর্য অথবা তিক্ততা-নিষ্ঠুরতা শিশুদের মনে সেই আচরণের প্রভাব ফেলে। ফলে ভালো আচরণ সম্পর্কের প্রভাবে ভালো আচরণের শিশু গড়ে ওঠে। মন্দ আচরণের প্রভাবে মন্দ শিশুর মন-মানসিকতা মন্দ হয়।
মনস্তত্ত্ববিদদের প্রয়োজনীয়তা সুস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। কিন্তু মনস্তত্ত্ববিদের কাজ শুরু হয় অঘটন ঘটার পরে। সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির অঘটন কোন মনস্তত্ত্ববিদ সারিয়ে তুলবেন? সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সুস্থ আন্দোলন-সংগঠনই হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে অঘটন না ঘটানোর মূল চালিকাশক্তি। এসব ক্ষেত্রে সুস্থচর্চার বড়ই অভাব।
নারীর অসহায়ত্ব-নির্যাতন, হত্যা, আত্মহত্যার ঘটনাগুলো রুখে দাঁড়ানোর জন্য নারী আন্দোলন-সংগঠনগুলোর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে নতুন যুগের, নতুন সময়ের প্রয়োজনে নতুন কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে। পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়, গ্রামে-শহরে নারী-পুরুষের মিলিত চর্চায় মেয়েদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার কাজ করতে হবে সব সংগঠনকে সম্মিলিতভাবে। এও এক মুক্তিযুদ্ধ। নারীর মুক্তিযুদ্ধ আজ সমাজের, সংস্কৃতির, রাজনীতির মুক্তিযুদ্ধ। আত্মহত্যা করবে কেন নির্যাতনের শিকার মেয়েটি? সে রুখে দাঁড়াবে। তখনই সে এই কাজটি করতে পারবে যখন সে নিশ্চিতভাবে জানবে যে সে অপরাধী নয় এবং তাকে সমাজ, পরিবার, প্রশাসন, আইন, বন্ধু—সবাই সমর্থন করছে, সহায়তা দিচ্ছে।
মিডিয়ার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, তাই ইতিবাচক হতেই হবে। টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, ফেসবুক, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগের সব মাধ্যম, বিজ্ঞাপন অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে এটাও সত্য এসব মাধ্যম বাণিজ্যিক-পুঁজিবাদের নেতিবাচক বাজার লাভের হিসাব-নিকাশে নারীকে পণ্য করে তুলতে চরম উৎসাহী। এসবের বিরুদ্ধেও সামাজিক-সাংস্কৃতিক-নারী আন্দোলনের সম্মিলিত মঞ্চ গড়ে তুলে কাজ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। নারী নির্যাতন বন্ধে মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়ে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে এবং নারীকে সর্ব পর্যায়ে সাহসী করে তোলার জন্য মিডিয়াকে সর্বাত্মক সহযোগিতার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
মালেকা বেগম: নারীনেত্রী। অধ্যাপক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

বাংলাদেশ থেকে ভালোবাসা নিয়ে by আবদুল মান্নান

২২ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফর শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেন গত রোববার। ১৪ বছরের মধ্যে এটি কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। শেষবার ২০০০ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিরো মরি বাংলাদেশ সফর করেন। তখনো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, ২০১৪ সালেও তিনি স্বপদে বহাল আছেন।
জাপান বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন-সহযোগী দেশ। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশকে জাপান আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের পর যে কয়েকটি দেশ সাহায্য নিয়ে প্রথমে এগিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে জাপান অন্যতম। ১৯৭৩ সালের ১৭ অক্টোবর এক সপ্তাহের সফরে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাপান সফর করেন। সেই সফরে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সম্মতিপত্র স্বাক্ষর হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল যমুনা নদীর ওপর বহুমুখী সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই। সেই সফরের সময় বঙ্গবন্ধু টোকিওর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁদের অতিথি বইয়ে।
গত ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে তাঁকে তাঁর বাবার সেই ‘জয় বাংলা’ লেখাসংবলিত স্বাক্ষরটি দেখালে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই আনন্দঘন মুহূর্তে আমার সুযোগ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকার। ২৮ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে এক জাপানি সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ২০১৬-১৭ মেয়াদে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত অস্থায়ী আসনটি বাংলাদেশ জাপানের সমর্থনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে কি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে বলেন, সেটি তিনি দেশে গিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলে সেখানে তাঁকে হয়তো একটা সারপ্রাইজ দেবেন।
বাংলাদেশ এর আগে ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৯৯-২০০০ সালে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং শেষের বার নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাপান। তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্ষমতা সম্পর্কে জাপান পুরোমাত্রায় ওয়াকিবহাল এবং এবারও দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে ফলাফল ভিন্ন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। বাংলাদেশ বিশ্বাস করেছে, জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদের আলংকারিক সদস্য হওয়ার চেয়ে জাপানের মতো বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তির সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধনটাকে আরও মজবুত করা দেশের জন্য অনেক বেশি লাভজনক।
সেদিন যেতে যেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ কি জাপানের পক্ষে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে? তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে একটু মুচকি হেসেছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যদের খুব বেশি একটা ক্ষমতা থাকে না৷ কারণ, কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটাভুটি হলে তা পাঁচটি বৃহৎ শক্তির যেকোনো একটি ভেটো দিয়ে বাতিল করে দিতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যের সংখ্যা ১০।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার এক অনুজ প্রতিম সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছে, বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে জাইকা পদ্মা সেতু থেকে সরে গিয়েছিল আর শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বেগম জিয়া কূটনৈতিক চালে শেখ হাসিনার সঙ্গে পারবেন কেন?
তাঁর মন্তব্যের গুরুত্ব আছে। অবশ্য বিএনপি বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারকে সমর্থন করেনি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, আমাদের এককালের পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেছেন, এটি একান্ত দলীয় সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এটি একটি নজিরবিহীন মন্তব্য, কারণ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই দেশে একটি সরকার থাকে। বর্তমান সরকারকে বিএনপি স্বীকার না করতে পারে, সেটি তাদের বিষয়। তবে একজন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব যদি ‘উইন উইন’ পরিস্থিতি না বোঝেন, তাহলে তা দুঃখের বিষয়।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তি হলে রাতের এক টিভি টক শোয় চারদলীয় জোট সরকারের আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান মন্তব্য করেছিলেন, যে বিষয় নিয়ে মিয়ানমারও সন্তুষ্ট, সেটিতে বাংলাদেশের বিজয় কীভাবে হলো, বোঝা গেল না। উইন উইন পরিস্থিতি শুধু শমসের মবিন বোঝেন না তা নয়, অনেকেই বোঝেন না।
শিনজো আবের এই ঝটিকা সফর থেকে কী পেল বাংলাদেশ? শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক জাপান সফরের সময় শিনজো আবে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী চার-পাঁচ বছরে জাপান বাংলাদেশকে ছয় বিলিয়ন অথবা ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা দেবে। শিনজো আবে জাপান সরকারের এই অঙ্গীকারের কথা বাংলাদেশে এসে পুনরুল্লেখ করেছেন। এরই মধ্যে ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবের সঙ্গে জাপানের ২২টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন প্রতিনিধি এসেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বাংলাদেশের ৫০ জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিজ খরচে জাপান সফর করেছেন। উভয় সফরেরই অন্যতম উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা। দুদেশের মধ্যে আন্তদেশীয় বাণিজ্য সব সময় জাপানের অনুকূলে থেকেছে। গত অর্থবছর জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৮৬২ মিলিয়ন ডলার আর যার বিপরীতে বাংলাদেশ জাপান থেকে আমদানি করেছে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশের আগ্রহ সব সময় রপ্তানি বৃদ্ধির চেয়ে বাংলাদেশে জাপানি পঁুজি আকৃষ্ট করা, কারণ জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত কমছে আর তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালে জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পণ্য উৎপাদনকারী দেশ ছিল।
বর্তমানে জাপানে এই পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আছে ঠিক, তবে তাদের বেশির ভাগ পণ্যই অন্য দেশে উৎপাদিত হয়৷ কারণ, জাপানের উৎপাদন খরচ দিয়ে সে দেশের পণ্য অন্য দেশে রপ্তানি করা প্রায় অসম্ভব। এখন জাপানের টয়োটা গাড়ি থেকে শুরু করে মিতসুবিসির পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি বা সংযোজন হয় চীন, ভারত, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে কারণ এসব দেশে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম।
তবে চীন প্রতিযোগিতার একাধিক অস্ত্র হারাতে বসেছে৷ কারণ, চীনেও এখন শ্রমিকদের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বাড়তির দিকে৷ ফলে চীন এখন ধীরে ধীরে কম মূল্যের পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য প্রস্তুত বন্ধ করে দিচ্ছে। চীন তাদের দেশের নাগরিকদের জন্য পোশাক বাংলাদেশ থেকেও আমদানি করছে।
জাপানের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তাদের উৎপাদনব্যবস্থা বা ম্যানুফ্যাকচারিং, যা আর নিজ দেশে সম্ভব হচ্ছে না। একটি সময় আসবে, যখন চীন থেকেও তারা তাদের কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলবে এবং পুঁজি নিয়ে অন্য কোনো গন্তব্যস্থল খঁুজবে। বিশ্বায়নের যুগে পঁুজির কোনো দেশ বা জাতীয়তা নেই। এই যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে আমরা এত গর্ব করি দেখা যাবে, আগামী দুই দশক পর এই খাতের আর বৃদ্ধি হচ্ছে না কারণ এই শিল্পে যারা পঁুজি বিনিয়োগ করে, তারা তাদের কলকারখানা বন্ধ করে অন্যত্র, হতে পারে তা মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ায় হিজরত করেছে।
এমনটি ঘটেছিল মঙ্গোলিয়ায়। ২০০৪ সালে যখন বস্ত্র খাত থেকে কোটাপদ্ধতি উঠে গেল, তখন মঙ্গোলিয়ার ২০টি তৈরি পোশাক কারখানা রাতারাতি বন্ধ করে দিয়ে পঁুজি বিনিয়োগকারীরা চীনে চলে গিয়েছেন। বেকার হয়েছিলেন ২০ হাজার শ্রমিক। ধরে নিতে হবে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রমরমা অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। আমাদের নিজেদের পঁুজি খুবই সীমিত। সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে পঁুজি বিনিয়োগ, যা এখন খুবই নগণ্য৷ কারণ, এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করলে তা তুলে আনতে সেবা খাতের চেয়ে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে যেটুকু বিদেশি পুঁজি আসছে, তার সিংহভাগই সেবা খাতে। এই খাত কর্মসংস্থান করে যৎসামান্য। যেমন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ টেলিকম কোম্পানি মাত্র চার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। কিন্তু একটি গাড়ি সংযোজন কারখানা, বস্ত্রকল, পেট্রোকেমিক্যাল, জাহাজ নির্মাণ কারখানা, ওষুধ প্রস্তুতকারী কারখানা অথবা ইস্পাত কারখানা অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করে, যা ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে প্রয়োজন এবং যা জাপানের পক্ষে এই দেশে করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি৷ কারণ, আমাদের সক্ষমতার অভাব।
কথায় কথায় আমরা বলি, আমাদের সস্তা শ্রম আছে। কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের উৎপাদনশীলতা এই অঞ্চলে সর্বনিম্ন। বলি আমাদের আছে বন্দর। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নিয়মিত যে ভানুমতীর খেল হয়, তা দেখে কেন ভিনদেশের কেউ এ দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে আসবে? গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক কলকারখানা চালুর অপেক্ষায় আছে। চট্টগ্রামে গেলে মনে হয়, এই শহরে বাংলাদেশ সরকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শহরে সরকারের ভেতর সরকার, তার ভেতরে আরও অনেক সরকার। কে যে আসল সরকার, তা বোঝা মুশকিল।
শুধু জাপান নয়, বাংলাদেশে আরও অনেক দেশীয় পুঁজি আসবে৷ তবে তার জন্য চাই সক্ষমতা বৃদ্ধি। শুধু সস্তা শ্রম আর বন্দরের কথা বললে হবে না। প্রয়োজন সুশাসন, দুর্নীতি বন্ধ করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ২০১৩ সালে দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনটি হলে জাপান নয়, ভুটানও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে বুঝেছি, কেন অনেকে বলেন, তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা দুরূহ। এমন কথা যদি তাঁর সরকারের অারও ১০-২০ জন সম্পর্কে বলা যেত, তাহলে বাংলাদেশ যেতে পারত অনেক দূর। শুধু জাপান নয়, সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক।
আবদুল মান্নান: গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাক্ষরসমাজের স্বপ্ন ও বানু বিবির প্রশ্ন by রাশেদা কে চৌধূরী

নাম তাঁর বানু বিবি। বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে, নেত্রকোনার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায় দুই দশক আগে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসেছিলেন। সেই থেকে আমার গৃহে তিনি আমার সহকর্মী। প্রথাগতভাবে ‘গৃহকর্মী’ হিসেবে পরিচিত হলেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমার অফিসের সহকর্মীরা যেমন আমাকে সহায়তা করেন, ঠিক তেমনি গৃহস্থালির কাজে বানু বিবির সহায়তা আমাকে আশ্বস্ত করে।
বানু বিবিকে স্বামী-পরিত্যক্তা বলা যাবে না। পর পর তিন-তিনটি মেয়েসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে (!) স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় বানু বিবি সন্তানদের নানার বাড়ি রেখে নিজেই স্বামীকে পরিত্যাগ করে জীবিকার খোঁজে রাজধানীমুখী হয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু তাঁর সংগ্রাম। নিজে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার জন্য দীর্ঘদিন নিজের রোজগারের পুরোটাই ব্যয় করেছেন। একটি মেয়ে অল্প বয়সে মারা গেলেও বাকি দুজন এসএসসি পাস করেছেন। একজন আজ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, আরেকজন একটি পোশাকশিল্পে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। শিক্ষার আলো তাঁদের জীবিকার সন্ধান দিয়েছে, কর্মজীবনকে দিয়েছে মর্যাদা। বানু বিবির ভাষায়, ‘আমি একলা একজন মানুষ যদি আমার মাইয়াদের ভবিষ্যৎ ভালো করার জন্য আমার সবকিছু দিয়া লেখাপড়া শিখাইতে পারি, তয় সরকার কেন সারা দেশের হগল মানুষেরে এই সুযোগ কইরা দিতে পারে না? তেনারা তো আমাগোর ভালোর কথা বইলাই আমাগো ভোট নিয়া সরকারে যায়!’
বানু বিবির প্রশ্ন চিরন্তন, শাশ্বত। নাগরিকের সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রের যথাযথ ভূমিকা প্রত্যেক মানুষের কাম্য। কিন্তু সাক্ষরতা তো শুধু একটি প্রত্যাশা নয়, প্রত্যেক মানবসন্তানের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের আহ্বানে প্রতিবছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বর্ষ পরিক্রমায় ফিরে আসা ৮ সেপ্টেম্বরের এই দিনে ইউনেসকো তার তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মানবসমাজকে স্মরণ করিয়ে দেয় সাক্ষরতার নিরিখে কত কোটি মানবসন্তান এখনো জ্ঞানের রাজ্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারেনি, রাষ্ট্রনেতৃত্বের দেওয়া অসংখ্য প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিশ্বে প্রায় ৭৮১ মিলিয়ন মানুষ এখনো ন্যূনতম সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত।
কী বিচিত্র এই পৃথিবী! একদিকে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থ প্রাচুর্য আর বিত্ত-বৈভবের নগ্ন প্রকাশ, অন্যদিকে খেটে খাওয়া বিত্তহীন অগণিত মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। এখনো নানা দেশে গণতন্ত্রের নামে চলে সাধারণ জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের প্রয়াস, ধর্মরক্ষার অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে প্রাণ হারায় অগণিত নারী, শিশু, অসহায় মানুষ। সমরাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের লাগামহীন প্রয়াস মানবসমাজের অগ্রগতিকে করে প্রশ্নবিদ্ধ।
কিন্তু গত শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে হিসাব কষলে মানব উন্নয়নে অর্জনও নেহাত কম নয়। বিশ্বব্যাপী চরম দারিদ্র্যের হার কমছে, সাক্ষরতার হারও বাড়ছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অসাক্ষর মানুষের সংখ্যা ছিল ৯৬০ মিলিয়ন। সহস্রাব্দের শুরুতে তা হ্রাস পেয়ে হয় ৮৮০ মিলিয়ন। কিন্তু এখনো প্রায় ৭৮১ মিলিয়ন মানবসন্তান ন্যূনতম সাক্ষরতার আলো থেকে বঞ্চিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার সব স্তরে, বিশেষ করে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য—নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, শহর-গ্রামের এ বৈষম্য মানব উন্নয়নের সব সূচককে পশ্চাদমুখী করে তুলছে। ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী ঊ-৯ বলে পরিচিত নয়টি জনবহুল দেশ, যেখানে সাক্ষরতার হারও কম৷ তার মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। এতদঞ্চলে বিশ্বের অসাক্ষর জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস, যার দুই-তৃতীয়াংশই নারী!
এমন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আজ বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার প্রয়াসে বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। দেশ-বিদেশের বহু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও নীতিনির্ধারকেরা একত্র হবেন; শিক্ষা ও সাক্ষরতা নিরিখে কোথায় অবস্থান করছে বিশ্বসমাজ, নারী ও কন্যাশিশুর সাক্ষরতার অন্তরায়গুলো কী কী, সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে ইত্যাদি নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে, সুপারিশ প্রণীত হবে, হয়তো একটি ‘ঢাকা ঘোষণা’ও স্বাক্ষরিত হবে।
কন্যাশিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বস্বীকৃত, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় শতভাগ ভর্তির সরকারি দাবিও অনেক ক্ষেত্রে সত্য। স্বাধীনতা-উত্তরকালে, বিশেষ করে গত দুই দশকে সাক্ষরতার হারও বেড়েছে—নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে। ১৯৯০ সালে বয়স্ক শিক্ষার হার ছিল ৩৭ শতাংশ, এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন স্তরে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। নৈর্ব্যক্তিক আত্মসমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আলোকিত, সাক্ষরসমাজ বিনির্মাণে আরও অনেক দূর পথ চলতে হবে আমাদের। সেই পথে কি এগোচ্ছি আমরা?
ইউনেসকোর সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেকোনো ভাষায় পড়তে, বুঝতে ও লিখতে পারা এবং সাধারণ অঙ্কের জ্ঞান থাকলে যেকোনো মানুষকে সাক্ষর হিসেবে গণ্য করা যায়। তাদের হিসাবে, সাক্ষরতার হারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা অঞ্চলের দেশগুলো। এই অঞ্চলের জনসংখ্যা যেমন বিশাল, তেমনি তাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, বহুমুখী সাংস্কৃতিক কাঠামো, সীমাহীন পরিবেশগত বৈচিত্র্য—সবকিছুই নানামুখী চ্যালেঞ্জের পরিচায়ক। কিন্তু এতদঞ্চলের শিক্ষা ও সাক্ষরতার ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে অসংখ্য প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও যথাযথ বিনিয়োগ একটি দেশের আপামর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার আলোয় নিষিক্ত করতে পারে। আমাদের কাছের দেশ শ্রীলঙ্কা এর উজ্জ্বল উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নানাবিধ টানাপোড়েন—কোনো কিছুই শ্রীলঙ্কার সাক্ষরতার অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখতে পারেনি।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি থাকলেও এডুকেশন ওয়াচের বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে গত চার দশকে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোর সময়ে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রাথমিক শিক্ষার বৈপ্লবিক অগ্রগতি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তকারী জনগোষ্ঠীর অনেকে হয়তো জীবিকার তাগিদে পরবর্তী সময়ে ঝরে পড়েছে, কিন্তু তার স্কুলে পড়ার সামান্য সুযোগটুকু তাকে করে তুলেছে সাক্ষরসমাজ বিনির্মাণের প্রথম ধাপের যাত্রী। কিন্তু যারা ঝরে গেল, অসচ্ছলতা ও বয়সের কারণে যারা আর কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেল না, তাদের জন্য কী করেছি, কতটুকু করেছি আমরা? সরকারের কিছু উপানুষ্ঠানিক ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, হাতে গোনা কিছু এনজিওর সমন্বিত কর্মসূচি ইত্যাদি এতই অপ্রতুল ও প্রকল্পভিত্তিক যে এগুলো এখনো বয়স্ক সাক্ষরতার ক্ষেত্রে তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারেনি।
নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধে তৎকালীন সরকার পরিচালিত ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন’ বা কর্মসূচি কিছু চমক তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই কোনো ফল নিয়ে আসেনি। চমকপ্রদ সব নাম দিয়ে চালু হয়েছিল টিএলএম—এর যাত্রা আলোকিত মাগুরা, উজ্জীবিত নওগাঁ ইত্যাদি। কিন্তু নানাবিধ প্রতিকূলতায় হারিয়ে গেছে সেগুলো, তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে প্রায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। দলীয় সরকারে নির্বাচন-পরবর্তী নেতৃত্বের পালাবদলে এ কর্মসূচি পরিচালনায় নতুন নীতিনির্ধারকদের অনীহার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কর্মসূচির অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অপবাদ।
শুধু কি তা-ই? আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় এ ধরনের আন্দোলনমুখী একটি কার্যক্রম যে কাঙ্ক্ষিত ধারায় চলতে পারে না, স্থানীয় সরকার ও সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া এমন কর্মসূচির ফসল যে ঘরে তোলা যাবে না, সেটি ভেবে দেখা হয়নি। যথাযথ কৌশল ও জন-অংশগ্রহণের অভাবে একটি মহতী লক্ষ্য এভাবেই অপূর্ণ থেকে যায়, ব্যর্থ হয় জাতীয় বিনিয়োগ।
সার্বিক সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে যদি যথাযথ পরিকল্পনা, যথার্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যুক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে মানবসক্ষমতা উন্নয়নের যেকোনো লক্ষ্য অর্জন করা দুরূহ নয়। দৌলতদিয়া ঘাটে ডিম বিক্রেতা কিশোর নুরু মিয়া যেমন অবলীলায় বলেছিল, ‘পরিবারের খরচ চালানোর জন্য স্কুলে পড়া হয়নি। এখন বয়স চলে গেছে, কোনো স্কুল তো আমাকে নেবে না। কিন্তু যেদিন দেখলাম আমাদের গ্রামে একটা এনজিও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছে, আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের জন্য, সেদিন আর সুযোগ ছাড়িনি। এখানের পড়া শেষ হলে কী করব জানি না। সরকার কি আমাদের জন্য ব্যবস্থা করতে পারে না?’
নুরুকে বলতে চেয়েছিলাম, ‘নিশ্চয়ই পারে’, কিন্তু বলতে পারিনি। আমরা যারা শিক্ষার আলো পেয়েছি, তারা কি কখনো ভাবি এ ধরনের শত-সহস্র নুরু মিয়ার কথা? শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে যাদের সংখ্যা অনেক দেশের মোট জনসংখ্যারও বেশি, ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী ১২৬ মিলিয়ন! প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর আমরা নানা আয়োজনে পালন করব আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। কিন্তু সেই দিবসটি কবে আসবে, যেদিন আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারব যে এই দিবসের আর প্রয়োজন নেই অথবা দিবসটি অন্য আঙ্গিকে, অন্য লক্ষ্য নিয়ে পালন করব—দিনটি আর কত দূরে?
রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

বিদ্যুৎ-ভাইয়া, আপনার আবার কি হইলো? by সাহস রতন

বছরখানেক তো ভালই কাটছিল। তবে বাঙালির কপালে সুখ বেশি দিন সয় না। হঠাৎ আবার কি যেন হয়ে গেল? গত কয়েক দিন ধরে আমার অফিস এলাকায় দিনে ৩-৪ বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবারে ঘণ্টাখানেকের বিরতি। অন্য অনেক এলাকায়ও প্রায় একই অবস্থা। ঘটনা কি? পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনে কেউ কিছু বলছেও না। রাজধানীতেই যদি হয় এই হাল, তাহলে গ্রামের অবস্থা যে কতটা শোচনীয় তা সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। ১০ হাজার মেগাওয়াটের আলোক উৎসবের পরও এখনও বেশির ভাগ গ্রামকে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন কাটাতে হচ্ছে। অন্য গ্রামের কথা বলতে পারবো না, কিন্তু আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনও দুঃসহ যন্ত্রণার পর্যায়েই আছে। সাধুবাদ বর্তমান সরকারকে। তাদের আমলে প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। আরও নতুন নতুন বিশাল আকারের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুতের হাহাকার বন্ধ হবে। উন্নয়ন বিবেচনায় একটি রাষ্ট্রের অগ্রধিকার বিষয়ে থাকে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলো না। আজকের জামানায় এটা অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটা বাস্তবেই ঘটছে। কারণ এটা বাংলাদেশ। সৌরজগতের কোথাও যা ঘটে না, সে সব ঘটনা কিন্তু বাংলাদেশে ঘটে অহরহ। সে সবের ফিরিস্তি সবাই জানেন। এখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জনগণকে অন্ধকারে রেখে বড় বড় দুর্নীতিবাজদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এ দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করে না। এবং এর জন্য জবাবদিহিও করতে হয় না। কারণ এটা আমার সোনার বাংলা। এখানে সব কিছুতে গণতন্ত্র বিদ্যমান। বিদ্যুৎ বিল না দেয়াও গণতান্ত্রিক অধিকার, যদি ব্যবহারকারী হন ‘জাম পাবলিক’।
বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে দেশব্যাপী যে হারে নানা ধরনের প্রকল্প শুরু হচ্ছে তাতে ২০২৫ সাল নাগাদ বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা হবে আনুমানিক ৫০ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার হিসাব যখন করা হয় তখন ইজিবাইক কিংবা আইপিএস-এর ব্যাটারি চার্জের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ থেকে যায় হিসাবের বাইরে। এখনই আমাদের চাহিদা যদিও ২০ হাজার মেগাওয়াট কিন্তু বাস্তবিক এটা দাঁড়াবে আরও বেশি। ভবিষ্যতে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটাই মাথায় রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। মোটামুটি ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হওয়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া মুশকিল হবে। শুধু বড় শহরগুলো নয় বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কথা বলছি আমি। গ্রামভিত্তিক বাংলাদেশে গ্রামকেন্দ্রিক বড় কোন পরিকল্পনা নেই। সেটা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। শ’ শ’ কিলোমিটার দূরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে তা সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। এইডা কিছু হইলো? প্রতিটি উপজেলায় একটা করে ছোট আকারের জেনারেটার বসিয়ে তা দিয়ে শুধু সেই এলাকাটিকে বিদ্যুতের জ্বালা থেকে মুক্তি দেয়া যায় না? পুরো প্রক্রিয়াটি হবে সাময়িক। বড় বড় প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত এগুলো দিয়ে ঠেকা কাজ চলবে। বিদ্যমান সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করেই এটা করা যায়। প্রয়োজন শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগ। আমি যদ্দূর জেনেছি, কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ (চান্দিনা)-এর বর্তমান চাহিদা মাত্র ৫ মেগাওয়াট। মাঝারি সাইজের একটা গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে এর চেয়ে বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন পড়ে। বেশির ভাগ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি লোডশেডিংয়ের সময় এই জেনারেটর দিয়ে কাজ চালায়। আমার নিজ উপজেলা বরুড়ায় অন্তত ১০ জন বড় মাপের শিল্পমালিক আছেন যাদের বাৎসরিক টার্নওভার হাজার কোটি টাকার বেশি। বড় বড় শিল্প মালিকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে যাতে তারা নিজ এলাকায় বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করেন। নানা ধরনের ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করেও এটা করা যেতে পারে। যেমন, কোন শিল্পমালিক নিজ এলাকায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করলে তার অন্য কোন প্রকল্পে ২০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে। এরকম অনেক কিছুই হতে পারে। ১৯৯৭ সাল থেকে আয়কর দিচ্ছি। আমার মতো লাখ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত আয়কর ও ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বাৎসরিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত একটি। আমাদের অর্থে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দুর্নীতিবাজগুলো সার্বক্ষণিকভাবে ব্যবহার করে আয়েশি জীবন কাটাবে- আর আমরা অন্ধকারে বসে ঘেমে একাকার হবো। এটা আর কত যুগ সহ্য করতে হবে?

সংবাদমাধ্যম বনাম শাসক, শাসক বনাম সৌজন্য by জয়ন্ত ঘোষাল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। সবে চীনের যুদ্ধের ঝড় মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে। এই রকম একটা সময়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে দিল্লি এসেছিলেন সরাসরি বেজিং থেকে। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তার বৈঠক হয়। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের বার্তা নিয়ে একই সময়ে দিল্লি এসে নেহরুর সঙ্গে বৈঠক করেন চীনে কর্মরত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৬৩ সালের কথা। বন্দরনায়েকের এই সফর নিয়ে লোকসভায় বিতর্কের ঝড় ওঠে। সেই বিতর্কে কলকাতার কিছু সংবাদপত্রের প্রকাশিত রিপোর্টে বেদম চটে যান নেহরু। ১৯৬৩-র ২রা ফেব্রুয়ারি প্রফুল্ল সেনকে একটি চিঠি দিয়ে তিনি লেখেন যে, “হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড’ (আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর সেই সময়কার কাগজ) এবং ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র কিছু লেখা দেখে আমি বিস্মিত ও ব্যথিত হয়েছি। মতপার্থক্য নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। কিন্তু আমার সঙ্গে বন্দরনায়েকের সম্পর্ক নিয়ে যে ভাষায় লেখা হয়েছে সেটি অনুচিত বলে আমার মনে হচ্ছে। লেখায় বুদ্ধির থেকে রাগ এবং অসন্তোষ বেশি বলে মনে হচ্ছে। আমরা একটা পরিণত জাতি। এই রকম আচরণ অকাম্য। আমি এটা বলছি না যে তোমাকে এখনই কিছু ব্যবস্থা নিতে, আমি বলছি, যদি না সেটা তুমি প্রয়োজনীয় বলে মনে করো। কিন্তু আমি আমার মতামত তোমাকে জানালাম।’ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই মতামতটুকুই যথেষ্ট। এই চিঠি পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী ‘হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড’-এর সম্পাদক অশোক সরকারের কাছে চিঠি পাঠালেন। সেই চিঠিটির মধ্যে কোন রূঢ়তা ছিল না। কিন্তু ভুল সংশোধন করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। তার পর ১২ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ এবং ‘হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড’-এ বেশ কিছু প্রবন্ধ নিয়ে আমি অশোক সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। জানিয়েছি যে আমি এই প্রবন্ধগুলিকে ‘অনুমোদন’ দিতে পারছি না। তবে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ এবং ‘যুগান্তর’ আমাদের নীতিকে সম্পূর্ণ সমর্থন করছে। সমস্যা হচ্ছে যে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র কাছ থেকে ওই রকম ভাবে কোন মুচলেকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রফুল্লচন্দ্র সেন শুধু নয়, বিধান রায় থেকে সিদ্ধার্থ রায় পর্যন্ত প্রত্যেক মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন যে সাংবাদিক, সেই শরৎ চক্রবর্তীর দু’টি খন্ডে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে শীর্ষক গ্রন্থে এই চিঠি দু’টি-সহ অতীতের ঘটনাটি জানা যাচ্ছে।

এটা ১৯৬৩ সালের কথা। বলা যায় যে ২০১৪ সালেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম, তার মালিক ও সাংবাদিকদের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক গবেষণার বিষয়। সাপ্তাহিক বেঙ্গল গেজেট পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৮০-র ২৯শে জানুয়ারি জেমস অগাস্টাস হিকি-র সম্পাদনায়। এটা ছিল ভারতের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা। প্রথম প্রতিবাদী পত্রিকাও বলা যায় একে। সেই সময় থেকে স্বাধীন ভারতবর্ষের কয়েক যুগ কেটে গিয়েছে। সংবাদমাধ্যমেরও এক বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। উর্দু সংবাদপত্র পয়গম-ই-আজাদির সম্পাদক দেদার বক্তকে প্রাণদ- দেয়া হয়েছিল মহাবিদ্রোহ সমর্থন করার জন্য। সম্ভবত ইনি ভারতের প্রথম সাংবাদিক শহিদ। জরুরি অবস্থার সময় গণশক্তি-র বার্তা সম্পাদক কল্পতরু সেনগুপ্তকে বিধানসভা সদস্যের অধিকার ভঙ্গের জন্য বিধানসভার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল, জয়প্রকাশ নারায়ণের সভাভঙ্গকারীদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন যে সব বিধায়ক, তাদের অবস্থানের প্রতিবাদ করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। সত্যি কথা বলতে, সংবাদপত্রও এক বিপুল অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে।
যেভাবে একজন পুলিশ কিংবা এক জন চিকিৎসক অথবা একজন শিক্ষক দুর্নীতিগ্রস্ত হন, ঠিক সে ভাবে এক জন সাংবাদিকও হতে পারেন। আবার ভালো পুলিশ, ভালো চিকিৎসক, ভালো শিক্ষক যেমন এ সমাজে রয়েছেন, তেমন ভালো সাংবাদিকও রয়েছেন। তা ছাড়া খবরের কাগজ বের করাটা এখন আর ঠিক ‘নষ্টনীড়’-এর ভূপতির ছাপাখানা নয়। বিশেষত বৈদ্যুতিন চ্যানেলগুলি আসার পর, সোস্যাল মিডিয়ার আবির্ভাবের পর পুরো দৃশ্যপটটাই বদলে গিয়েছে। গ্রাহকমূল্যে সংবাদমাধ্যম যত চলে, তার থেকে অনেক বেশি প্রয়োজন বিজ্ঞাপন রাজস্ব। আবার রাজনেতাদের বিরোধী শিবিরে থাকা আর শাসক হয়ে ওঠার মধ্যেও মনন্তত্বের ফারাক হয়ে যায়। শাসক দলের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যখন সংবাদমাধ্যম সোচ্চার হয়, তখন সেটা বিরোধী পরিসরের পছন্দ হয়। ফলে বিরোধী নেতানেত্রীরা সংবাদমাধ্যমের ‘ডার্লিং’ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই শাসকদল যখন রাজনেতা হয়ে ওঠেন, তখন তার সমালোচনা সহ্য করার সহিষ্ণুতা তথা পরমত সহিষ্ণুতা খুব কমে যায়। ফলে বিরোধী দলে থাকার সময় অর্ডিন্যান্সের বিরোধিতা করে। শাসক প্রভু হয়ে অর্ডিন্যান্সের ক্ষমতা ব্যবহার করে।
সেটা যে আজকে নরেন্দ্র মোদী প্রথম করছেন তা নয়। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাও এই অসহিষ্ণুতারই প্রকাশ। ইন্দিরা গান্ধীর সময় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে কাজ করেছেন এমন এক জন বিশিষ্ট প্রশাসক বি এন ট্যান্ডন তার ‘পিএমও ডায়েরি’ গ্রন্থে  লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তার কাছে এসে হন্তদন্ত হয়ে বললেন যে রাজ্য সরকার শরৎ রচনাবলী প্রকাশ করতে চান। কিন্তু শরৎবাবুর পরিবারের সদস্যরা রাজি হচ্ছেন না। তাই তিনি অর্ডিন্যান্স করে অবিলম্বে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে শরৎ রচনাবলী প্রকাশ করে দিতে চান। তখন এই অফিসার বলেছিলেন, এত তুচ্ছ কারণে এ হেন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করাটা কি সমীচীন হবে? এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৫-এর ১ ফেব্রুয়ারি। পশ্চিমবঙ্গে শরৎচন্দ্রের অনেক ভক্ত আছেন। এই কারণে মুখ্যমন্ত্রী শরৎবাবুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রচনাবলী প্রকাশের এবং তার গল্প থেকে দু’টি চলচ্চিত্র বানানোর কথা ভেবেছিলেন। বি এন ট্যান্ডন লিখেছেন, এটা ভয়াবহ প্রস্তাব বলে তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। অর্ডিন্যান্স করে কপিরাইট কেড়ে নেয়া ভুল হবে। অন্য রাজ্য সরকারগুলিও এই পথ নিতে পারে।
রাজীব গান্ধীও প্রেস বিল করে বিপদে পড়েছিলেন। তার পর তিনি নিজেই সংসদে এসে সেই বিল প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। হিটলারের মনস্তত্ব নিয়ে লেখা একটি বইতে এক মার্কিন মনস্তাত্বিক লেখেন, হিটলারের প্রধান সমস্যা তার মধ্যে হাস্যরস ছিল না। চার্লি চ্যাপলিনের গোঁফ দেখেও তিনি রেগে গিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিল, চার্লি তাকে ব্যঙ্গ করার জন্য এটি করেছেন। ‘গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিটি তিনি নিজের দেশে নিষিদ্ধ করেছিলেন। যদিও চার্লি ও হিটলার ছিলেন সমসাময়িক। ব্যঙ্গচিত্র আঁকার দায়ে এই প্রথম শাস্তি পশ্চিমবঙ্গেই হচ্ছে তা নয়। দার্শনিক প্লেটো-ও অবশ্য ব্যঙ্গচিত্র সহ্য করতে পারতেন না। তিনি ব্যঙ্গচিত্রকে ব্ল্যাক ম্যাজিক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। বৃটিশ আমলে বসন্তক বলে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রিকায় হগ সাহেবের বাজারের লিজ পাওয়া নিয়ে দুর্নীতির ব্যঙ্গচিত্র ছাপা হয়েছিল। বৃটিশ শাসক দল তাদের রক্তচক্ষু দেখানোয় পত্রিকাটি বেশ কয়েক বার উঠে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। রাজনেতার অহংবোধও সুপ্রাচীন। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি যখন রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে ১৫৩৪ সালে পাল্টা চার্চ অফ ইংল্যান্ড তৈরি করলেন, তখনই এস্টাব্লিশমেন্টের ধারণাটিও এল। এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা থেকে সরে যাওয়া আজ সংবাদমাধ্যমের পক্ষে অসম্ভব। শুধু নীতির জন্য নয়। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জোগান রক্ষা করার জন্যও। সমস্যা হচ্ছে, রাজনৈতিক নেতারা চান নিঃশর্ত আনুগত্য। যদি তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে সমর্থন করো, তা হলে আমার মতাবলম্বী হতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের এক অসাধারণ প্রবন্ধ রয়েছে যার নাম ‘ভালোবাসার অত্যাচার’। সেখানে তিনি বলেছেন যে, লোকের বিশ্বাস যারা শত্রু তারাই শুধু আমাদের উপর অত্যাচার করে। আসলে তা নয়। ভালোবাসার অত্যাচারও ভয়াবহ। ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো। অতএব আমার অনুরোধ রাখিতে হইবে। তোমার ইষ্ট হউক, অনিষ্ট হউক, আমার মতাবলম্বী হইতে হইবে।’
তবে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কিন্তু অনেকটা। গণহিস্টিরিয়া তৈরি করার একটা প্রবণতা যে এই প্রতিযোগিতামূলক সাংবাদিকতায় নেই সেটাও সত্য নয়। আবার সেটাও নতুন নয়। বার্টান্ড রাসেলের একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। ‘টু ফেস ডেঞ্জার উইথআউট হিস্টিরিয়া’ গ্রন্থে এক জায়গায় রাসেল লিখেছেন, ‘হাতি খুব শান্ত ও বিচক্ষণ প্রাণী। কিন্তু মধ্য আফ্রিকায় কিছু হাতির পাল যখন সর্বপ্রথম আকাশে এরোপ্লেন উড়তে দেখে, তখন তাদের ভিতর ভীষণ চাঞ্চল্য দেখা দেয়। ওদের চোদ্দো পুরুষে কেউ কখনও এমন আজব শব্দ করা একটা পাখিকে উড়তে দেখেনি। দলের সব হাতি ভয় পেয়ে এ দিক-ও দিক ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। কিন্তু এরোপ্লেনটি দিগন্তে মিলিয়ে যেতে সবাই আবার শান্ত হয়ে লাইন করে হাঁটতে শুরু করল।’ কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। কোনো ষড়যন্ত্রের উপাখ্যান রচনা হয়নি। কোনো সিবিআই তদন্তেরও দাবি ওঠেনি।
কারণ, রাসেল লিখেছেন, সেই হাতির পালে কোন সাংবাদিক ছিলেন না!
সৌজন্য: আনন্দ বাজার পত্রিকা

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা -২০১৪ অতিথিদেরা

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান -২০১৪ এর অতিথিদেরা ফটো এ্যালবাম...










মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা -২০১৪

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা -২০১৪ এ জাতীয় সংগীত পরিবেশন

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান -২০১৪ এ জাতীয় সংগীত পরিবেশন এর ফটো এ্যালবাম...






বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কাশ্মীর

ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে নামছে
জম্মু-কাশ্মীর থেকে উদ্ধার করে আনা
বন্যাদুর্গত ব্যক্তিরা। ছবি: এএফপি
ভারত ও পাকিস্তানে বন্যায় মৃতের সংখ্যা গতকাল সোমবার বেড়ে ৩২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী এ বন্যায় অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ জন। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণজনিত বন্যায় দুই দেশের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল। খবর এএফপি ও বিবিসির। ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মুতে সামান্য উন্নতি হলেও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের বেশির ভাগ এলাকাসহ কাশ্মীর উপত্যকায় বন্যা-পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। সেনানিবাসসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দোতলা ভবন পর্যন্ত পানি উঠেছে। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। ত্রাণের আশায় দিন গুনছে তারা। যাপন করছে মানবেতর জীবন।
সেনা হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিও দৃশ্যে দেখা গেছে, শ্রীনগরের সব কটি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত রোববার আকাশপথে বন্যা-পরিস্থিতি সরেজমিনে ঘুরে দেখার পর একে জাতীয় বিপর্যয় বলে আখ্যায়িত করেছেন।শ্রীনগরের বেশির ভাগ এলাকাই এখন পানিবন্দী। বিদ্যুৎ ও টেলি যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ কোনোক্রমে নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে পারলেও অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে তিন বা চারতলার বারান্দায় কিংবা বহুতল ভবনের ছাদে। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার কখন তাদের উদ্ধার করবে সেই প্রতীক্ষা করছে তারা। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক হাজার সেনা, বিমানবাহিনীর সদস্য, পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণকর্মী নৌকা ও হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর, বেলুচিস্তান ও পাঞ্জাবে গত কয়েক দিনে বন্যায় অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ রোববার পাঞ্জাবের রাজধানী শিয়ালকোটে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত আছে।

৩ বছরে আইএসকে নির্মূল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ইরাক ও সিরিয়ায় ভয়ংকর হয়ে ওঠা জঙ্গিসংগঠন ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র কী কৌশল বা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা জানা যাবে কাল বুধবার দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষণে। তবে তাঁর প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন বছরের মধ্যে আইএসকে নির্মূল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে মার্কিন বাহিনী। অভিযান চলবে তিন ধাপে, এর প্রথম ধাপ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের। প্রেসিডেন্ট ওবামা গত রোববার একটি টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকারে বলেন, আইএসকে মোকাবিলায় তাঁর সরকার কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বুধবার দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তা তুলে ধরবেন তিনি। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, আইএসকে রুখতে প্রথম ধাপের অভিযানের অংশ হিসেবে ইরাকে জঙ্গি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। গত মাসে ইরাকে আইএসের অবস্থানে অন্তত ১৪৫ বার বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং মার্কিন কূটনীতিক, গোয়েন্দা, সামরিক সদস্য ও স্থাপনা রক্ষায় ওই হামলা চালানো হয়। এটা বেশ কাজেও দিয়েছে। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে অনেকটাই পিছু হটেছে আইএস। মার্কিন প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আইএসবিরোধী দ্বিতীয় ধাপের অভিযান শুরু হবে ইরাকে সরকার গঠনের পর পরই। চলতি সপ্তাহেই দেশটিতে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকার গঠিত হলে ইরাকি বাহিনী, কুর্দি যোদ্ধা ও উপজাতি কিছু গোষ্ঠীর প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা বাড়ানো হবে। সেই সহায়তা হবে পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, আইএসবিরোধী তৃতীয় ও সর্বশেষ ধাপের অভিযান হবে সবচেয়ে কঠিন। এই অভিযান রাজনৈতিকভাবেও বিতর্কিত হবে। এই ধাপে সিরিয়ার অভ্যন্তরে আইএসের অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামার মেয়াদ শেষে নতুন প্রশাসন না আসা পর্যন্ত আইএসবিরোধী অভিযান পুরোপুরি শেষ করা হয়তো সম্ভব হবে না। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, আইএসবিরোধী তিন ধাপের অভিযান কমপক্ষে তিন বছর চলবে। এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা জানান, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সাময়িকভাবে জঙ্গিদের দুর্বল করতে সেখানে যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা পদ্ধতিগতভাবে জঙ্গিদের সামর্থ্য কমিয়ে আনতে যাচ্ছি। জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড কমিয়ে আনা সর্বোপরি তাদের পরাজিত করতেই যাচ্ছি আমরা।’ ওবামা সামরিক অভিযানের ধরন কী হবে, তা স্পষ্ট করেননি। তবে মার্কিন সেনারা যে আইএসের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেবে না, সেটা একরকম নিশ্চিত।
তবে এটাও নিশ্চিত যে লিবিয়ায় কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফিবিরোধী অভিযানের মতো পেছন থেকে নয়, আইএসকে নিশ্চিহ্ন করতে সামনে থেকে মূল ভূমিকা পালন করবে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, আইএস নির্মূলে ইরাকে হামলা চালানোর পক্ষে অনেক দেশই মত দিয়েছে। সিরিয়ায় হামলা চালানোর পক্ষেও মত আছে। তবে সিরিয়ার হামলা চালানোর ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটিতে যুদ্ধ চলায় আইএসের অবস্থান শনাক্ত করে হামলা চালানোটা হবে বেশ কঠিন। ইরাক ও সিরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে তুরস্কের। বিদেশি যোদ্ধারা তুরস্ক দিয়ে ওই দুই দেশে প্রবেশ করে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আইএসবিরোধী অভিযান চালাতে সেই তুরস্ককেই ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তুরস্কের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তুরস্ক সেই সাড়া দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, কূটনীতিকসহ তুরস্কের ৪৯ জন নাগরিক আইএসের হাতে জিম্মি হয়ে আছেন। গত জুনে ইরাকের মসুল শহরে তুর্কি কনস্যুলেট থেকে তাদের অপহরণ করে আইএসের জঙ্গিরা।

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা -২০১৪

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান -২০১৪ এর ফটো এ্যালবাম...
















































মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান -২০১৪ এর ফটো এ্যালবাম...