Monday, April 6, 2015

ঝড়ে লন্ডভন্ড জনপদ- মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৬

বগুড়ার পালপাড়ায় শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর আঘাতে
লন্ডভন্ড হয়ে গেছে থাকার ঘর। সেই ঘরের ধ্বংসস্তূপের ভেতর
থেকে বইপত্র সরিয়ে নিচ্ছে এক শিক্ষার্থী l ছবি: ফোকাস বাংলা
দেশের বিভিন্ন স্থানে গত শনিবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা প্রচণ্ড ঝড়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে গতকাল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৬ জনে দাঁড়িয়েছে। কেবল বগুড়াতে মারা গেছেন ২০ জন। অন্যদের মধ্যে ঢাকায় দুজন, রাজশাহীতে পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুজন এবং পাবনা, জামালপুর, নওগাঁ, মানিকগঞ্জ, গাইবান্ধা, নরসিংদী ও কুষ্টিয়ায় একজন করে মারা যান। এ ছাড়া ঝড়ে আহত হয়েছেন দুই শতাধিক ব্যক্তি। নৌকাডুবির একাধিক ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত পাঁচজন। মূলত দেয়ালধসে, ঘর ও গাছচাপা পড়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, বজ্রপাতে ও নৌকাডুবিতে হতাহেতর ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি ছাড়াও প্রায় ৩৬ হাজার কাঁচা ও আধা পাকা বাড়ি, স্কুল, দোকান সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও অসংখ্য গাছপালা। কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
ঝড়ের এক দিন পরও গতকাল বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল অনেক এলাকা। বসতবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে প্রচণ্ড কষ্টে দিন কাটাচ্ছে বহু মানুষ। তবে দুর্গত লোকজনের সহায়তায় সরকারিভাবে এগিয়ে আসার তেমন লক্ষণ দেখা যায়নি।
বগুড়ায় নিহত ২০: ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা। রাতের আঁধারে ধ্বংসযজ্ঞের ভয়বহতা তেমন বোঝা না গেলেও গতকাল সকাল হতেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিস্মিত, হতবাক হয়ে যান শহরবাসী। শহরজুড়ে কেবল ধ্বংসের চিহ্ন।
এদিকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে। ঝড়ে আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। আহত ব্যক্তিদের অধিকাংশকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়া মৃত ব্যক্তিরা হলেন বগুড়া শহরের বউবাজার এসপি সেতুসংলগ্ন বস্তি এলাকার আজিরন বিবি, একই বস্তির আড়াই মাসের শিশু নীলা খাতুন, শহরদীঘি এলাকার রজব আলী, মধ্য পালশা এলাকার পলাশ, সদর উপজেলার চানপুর গ্রামের গোলাপী বেগম, পালশা গ্রামের মোস্তাফিজার রহমান, গোকুল গ্রামের আকালু, শাজাহানপুরের ক্ষুদ্র ফুলকোর্ট গ্রামের আবদুল মান্নান, ঘাসিরা গ্রামের বৃদ্ধা রাবেয়া বেগম, খোয়ারপাড়া গ্রামের পায়েল, সারিয়াকান্দির বিলপাড়ান গ্রামের শান্তা বেগম, ফুলবাড়ী পূর্বপাড়া গ্রামের সুজন মিয়া, ধারাবর্ষা চরের নৌকাযাত্রী মোজাম হোসেন ও ফুলবাড়ী মালোপাড়ার সুবল চন্দ্র, কাহালুর হারলতা গ্রামের আজিজুল ইসলাম ও ইসমাইল হোসেন, ধুনটের জোড়শিমুল গ্রামের আফজাল হোসেন, সোনাতলার লোহাগড়া গ্রামের ফিরোজা বেগম, গাবতলীর তেলিহাটা ফকিরপাড়া গ্রামের সামিরা বেগম এবং নন্দীগ্রামের বৈলগ্রামের আবদুস সাত্তার। আবদুস সাত্তার নন্দীগ্রাম উপজেলা জাকের পার্টির সভাপতি।
শনিবার ঝড়ের পর থেকেই বিপর্যস্ত শহরের বিদ্যুৎব্যবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকায় শহরজুড়ে পানিরও হাহাকার। বন্ধ রয়েছে পৌরসভার পানি সরবরাহ। অচল হয়ে পড়েছে টেলিফোন যোগাযোগ। চার্জ দিতে না পারায় অনেকের মুঠোফোনও বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রশিদ বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত দিন সময় লাগবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. খোরশেদ আলম জানান, ঝড়ে ৯২ হাজার পরিবারের ৪ লাখ ১৭ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২৮ হাজার ৬৬৭টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও ৭০ হাজার বাড়িঘর আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ২৬টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। ১৪৭টি গোবাদিপশুও মারা গেছে।
অন্যান্য স্থানের চিত্র: নওগাঁর মান্দা উপজেলায় শাহানাজ বেগম নামের এক গৃহবধূ দেয়ালচাপায় মারা গেছেন। আহত হয়েছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ প্রায় অর্ধশত লোক। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জনকে মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি, কয়েক হাজার গাছপালা। ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে ব্যাপক। জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
নরসিংদীর সদর উপজেলার চাকশাল এলাকায় আলাল উদ্দিন নামের এক তরুণ শনিবার রাতে মারা গেছেন। বাড়ির পাশে মাছ ধরতে গিয়ে গায়ের ওপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সিরাজগঞ্জে নৌকাডুবি ও বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন কাজীপুরের পীরগাছা গ্রামের মোজাম্মেল হক ও উল্লাপাড়ার দুর্গাপুর গ্রামের ফজলার রহমান। মোজাম্মেল মারা যান নৌকাডুবিতে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন একই গ্রামের আবদুল খালেক।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বনগ্রাম গ্রামে ঘরচাপায় সন্ধ্যা বেগম নামের এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জেলা সদর ও শিবালয়ের কয়েকটি স্থানে গাছ পড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। জেলায় বেশ কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কয়েক শ বিঘা জমির ভুট্টা, গম ও বোরো ধানের।
পাবনা শহরের চাঁদমারী এলাকায় শনিবার রাতে দোকানের ওপর গাছ উপড়ে মারা গেছেন জামের উদ্দিন (৮০) নামের এক চা-বিক্রেতা। তাঁর বাড়ি পৌর সদরের চক গোবিন্দা মহল্লায়। ঝড়ে সুজানগর উপজেলায় পেঁয়াজখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনা নদীর কুলকান্দি হার্ট পয়েন্টে শনিবার রাতে নৌকাডুবিতে জহুরা বেগম নামের এক নারী মারা গেছেন। তিনি বরুল গ্রামের মৃত ছাত্তার মুন্সির স্ত্রী। একই ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন কুলকান্দি এলাকার ব্যাপারী পাড়ার মঙ্গল আলী, মৌল্লা ব্যাপারী ও রশিদুল।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাঁধবাজার এলাকায় বজ্রপাতে আতাউল ইসলাম নামের এক পল্লি চিকিৎসক মারা গেছেন। তিনি সান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ঝড়ে পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ফসলের। বিধ্বস্ত হয়েছে শত শত গাছ। কুষ্টিয়া-হরিপুর বাঁশসেতু আংশিক ভেঙে গিয়ে গড়াই নদ পারাপারে সমস্যা হচ্ছে।
গাইবান্ধায় ঝড়ে যমুনা নদীতে নৌকাডুবিতে সাঘাটা উপজেলার নলছিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের স্ত্রী সাহেরা খাতুন মারা গেছেন। এ ছাড়া পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত এবং বহু গাছপালা উপড়ে গেছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ২৩ ঘণ্টা জেলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এদিকে গতকাল দুপুরে ঝড়ের সময় বজ্রপাতে বিভিন্ন স্থানে ছয়জন ইটভাটাশ্রমিক আহত হয়েছেন।
জামালপুরে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি ও ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৩০ জন। উপড়ে গেছে শত শত গাছ। ২০ ঘণ্টা পর জামালপুর শহরে বিদ্যুৎ এলেও জেলার অন্যত্র তা বন্ধ রয়েছে।
ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, ইউনিয়নের শতকরা ৯০ ভাগ বাড়িঘর লন্ডভন্ড হয়েছে। শত শত পরিবার খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। তাদের দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুমুর রহমান বলেন, ঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ উপজেলা।
রাজশাহীর বাঘার পীরগাছা গ্রামে রাস্তার ওপর উপড়ে পড়া একটি বটগাছ গতকালও সরানো সম্ভব হয়নি। রাজশাহীজুড়েই শনিবারের ঝড়ে এভাবে পুরোনো গাছপালা ভেঙে পড়েছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গতকাল ফুলমনি নামের এক আদিবাসী নারী মারা গেছেন। তাঁর বাড়ি পুঠিয়ার ভরতমাড়িয়া গ্রামে। তাঁকে নিয়ে জেলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচজন।
জেলা প্রশাসনের হিসাবমতে, ঝড়ে ২৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২ হাজার ২৩৩টি। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৯৬৭টি বসতবাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭৬টি।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সহস্রাধিক কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখায় দুই ঘাটের মহাসড়কে আটকা পড়ে কয়েক শ যানবাহন।
শেরপুরে ঝড়ে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ঘরবাড়ি ও বিপুলসংখ্যক গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। উঠতি বোরো ফসল ও সবজি আবাদেরও ক্ষতি হয়েছে। শেরপুর-জামালপুর ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে গাছ উপড়ে পড়ে পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল ভোররাতে জেলা সদরে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার পাঁচটি গ্রাম ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে। দুটি মন্দিরসহ দুই শতাধিক বাড়িঘর হয়েছে বিধ্বস্ত। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়া ছাড়াও সুপারিবাগান, রবিশস্য ও বোরো খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শতাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কড়িকান্দি ঘাটের পন্টুন ঝড়ে ভেসে গিয়ে গতকাল বিকেল চারটা পর্যন্ত ২০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। এতে বাঞ্ছারামপুর-আড়াইহাজার রুটে কয়েক শ গাড়ি আটকা পড়লে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
নাটোরে অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার হেক্টর জমির উঠতি বোরো, গম, ভুট্টা, খেসারি এবং লিচু, আম, কলাবাগান ও সবজি খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মৌলভীবাজার শহর গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল। এতে বাসাবাড়িতে পানি-সংকট দেখা দেয়। এ ছাড়া জেলার ২৫০ শয্যার হাসপাতালে অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অনেকটা সময় বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এ ছাড়া ঝড়ে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। গাছ উপড়ে পড়ে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বলিঘর হুজুরী শাহ উচ্চবিদ্যালয় টিনের ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা}

বিচলিত নন কামারুজ্জামান -সাক্ষাতের পর ছেলে

ফাঁসির রায় বহাল থাকায় বিচলিত নন জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান। কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্য কামারুজ্জামানকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছেন। তিনি তাদের সৎ পথে থাকার এবং সৎ উপার্জনের পরামর্শ দিয়েছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কামারুজ্জামানের স্ত্রী নুরুন্নাহার, মেয়ে আছিয়া নূর, দুই ছেলে হাসান ইকবাল ইয়ামি ও হাসান ইমাম ওয়াফি, ভাগ্নি রুকসানা জেরিনসহ ১২ জন কারাফটকের সামনে যান। সন্ধ্যায় ৬টা ৪৫ মিনিটে একজন বাদে বাকিরা কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এক ঘণ্টা পর রাত পৌনে ৮টায় তারা কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। সাক্ষাৎ শেষে ওয়ামি বলেন, যে রায় সরকার দিয়েছে তা ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। তার (কামারুজ্জামান) ওপর জুলুম করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এই রায়ে যারা জড়িত, আল্লাহ তাদের বিচার করবেন। কারাগার থেকে বেরোনোর সময় কামারুজ্জামানের মেয়ে আছিয়া নূর সবার উদ্দেশ্যে ‘ভি’ চিহ্ন দেখান। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসান ইকবাল বলেন, এ ঘটনায় আমরা বিচলিত নই। হাসিমুখে আমরা তাকে বিদায় জানাতে এসেছি এবং হাসিমুখে চলে যাচ্ছি।
হাসান জানান, ফ্যামিলির উদ্দেশ্যে তার বাবা বলেছেন, ‘সৎ পথে থেকো, সৎ উপার্জন করো। তিনি বলেন, আব্বা কোনও অপরাধ করেননি। সোহাগপুরের যে ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। আব্বা সুস্থ ও মানসিকভাবে শক্ত রয়েছেন। এটা শেষ দেখা কিনা সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে হাসান ইকবাল বলেন, এটা শেষ দেখা না। শেষ দেখা হলে একান্তভাবে কথা বলার সুযোগ দেয়া হতো। তা দেয়া হয়নি। এটা শেষ দেখা না বলেই আমরা মনে করি। ক্ষমাপ্রার্থনা প্রসঙ্গে হাসান ইকবাল বলেন, কেন ক্ষমা চাইবেন? তিনি কি অপরাধ করেছেন? হাসান বলেন, তরুণ প্রজন্ম প্রহসনের এই রায়ের সমুচিত জবাব দেবে। কারাগার থেকে কামারুজ্জামানের ছেলে বেরিয়ে আসার আগেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়ার জেলসুপার ফরমান আলী সাংবাদিকদের বলেন, আমি এখ পর্যন্ত আদালতের রায়ের কপি পাইনি। রায়ের কপি না পেয়ে রায় সংক্রান্ত কোনও কার্যক্রম করা যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনজীবিদের সঙ্গে তার (কামারুজ্জামান) দেখা করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা রায়ের পর দেখা করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। সেজন্য তারা দেখা করেছেন। তিনি বলেন, জেলকোড অনুযায়ী যে সুবিধা দেয়ার কথা তাই তাকে (কামারুজ্জামান) দেয়া হচ্ছে। বিধি-বিধান মেনেই আমরা আমাদের কাজ করছি।

‘ট্যানারি সরলেই জীবনটা বাঁচে’ by মোছাব্বের হোসেন

রাস্তার ওপর কোথাও ট্যানারির বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও চামড়ার উচ্ছিষ্ট। সুয়ারেজ উপচে রাস্তায় এসে জমছে রাসায়নিক মেশানো পানি। খানাখন্দে ভরা এসব জলাবদ্ধ রাস্তা মাড়িয়ে চলছে মানুষ। আর চামড়ার উটকো দুর্গন্ধ তো আছেই।
এমন দৃশ্য চামড়াশিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত হাজারীবাগের ট্যানারি এলাকার। গতকাল রোববার সকালে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই এলাকার প্রধান সমস্যা ট্যানারির বর্জ্য আর জলাবদ্ধতা। তাঁদের অভিযোগ, সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এলাকাটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের। এই ওয়ার্ডের অন্য এলাকা হচ্ছে জিগাতলা, বিবরণ কাছড়া, গজমহল, শিকারিটোলা, সোনাতনগড়, চরকঘাটা, মনেশ্বর, তল্লাবাগ, বাংলা সড়ক, সুলতানগঞ্জ ও মধুবাজারের কিছু অংশ। ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা ৭৫ হাজার ১৭৫। পুরুষ ভোটার ৪১ হাজার ২৬৪ ও নারী ভোটার ৩৩ হাজার ৯১১। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল হাইকে এলাকার সমস্যার কথা জিজ্ঞাসা করতেই ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘ড্রেনের ওপরে ওই ময়লার স্তূপ দেখতাছেন না? গত পাঁচ মাস ধইরা ওইখানেই পইড়া রইছে। সিটি করপোরেশন থাইক্যা কেউ আহে নাই। ড্রেনও পরিষ্কার করে না কেউ। আমার তো মাঝে মইদ্যে মনে কয়, এই এলাকা সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকা।’
আবদুল হাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই আরেক বাসিন্দা কামাল হোসেন বললেন, ‘বৃষ্টি হইলেই কোমরপানি ওঠে। নোংরা পানি পাড়াইলেই গা চুলকায়। মাসের শ্যাষ দিকে আইলে দেখবেন, খালি বাসা বদলের লাইগা ভ্যান দিয়া রাস্তা ভরা।’ এলাকাবাসী জানালেন, দুপুরে সব ট্যানারি একসঙ্গে বর্জ্য ছাড়ে, সুয়ারেজগুলো দিয়ে ওই নোংরা পানি ঠিকমতো যেতে পারে না। ফলে ওই সময় প্রতিদিন রাস্তায় নোংরা পানি উঠে আসে।
ট্যানারি মোড় ও হাজারীবাগ থানার মাঝামাঝি শেরেবাংলা রোডের ওপর চারটি ডাস্টবিন। রাস্তার একপাশে খোলা ডাস্টবিনের ময়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে সুয়ারেজের পানিতে সয়লাব। হাঁটার রাস্তা বলতে তেমন কোনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। আর পুরো রাস্তার পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট টং দোকান। রয়েছে রাস্তায় খানাখন্দ। পুরো ট্যানারি মোড় ও আশপাশের এলাকার চিত্র মোটামুটি একই রকম। এলাকার বাসিন্দা মুদি দোকানি নাসিম মিয়া বললেন, ‘সইন্ধা হইলেই দাঁড়ান যায় না মশার জ্বালায়। কয়েলও কাম করে না।’
ট্যানারি এলাকায় বিভিন্ন ভবনের নিচেই গড়ে উঠেছে রাসায়নিক পণ্যের দোকান। আগুন প্রতিরোধক প্রস্তুতি দেখা গেল না সেখানে। গজমহল এলাকায় এস কে লেদারের সামনে রাস্তায় পানি, কাদা আর ময়লার স্তূপ থাকায় মানুষ অন্য দিক দিয়ে চলছে। তবে এলাকাবাসীর কথায় ঘুরেফিরে এল ট্যানারি স্থানান্তরের কথা। ব্যবসায়ী কাজি মো. নুরুল আলম প্রশ্ন করেন, ‘আপনে কি কইতে পারবেন কবে ট্যানারি সরব? খালি শুনি যে সরব আর সরে না। ট্যানারি সরলেই আমাগো জীবনটা বাঁচে।’
জিগাতলা থেকে মনেশ্বর রোডের দিকে যেতে দেখা গেল, সেখানে পুরোনো কাঁচাবাজার এলাকায় রাস্তার দুই পাশে ফুটপাতের ওপর দোকান। বাজার বসানো হয়েছে রাস্তার ওপরে। ঝিগাতলা ও আশপাশের এলাকায় অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছে। তাই বাসাভাড়াও বেশি।
এলাকার নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (৩ নম্বর জোন) নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন অপ্রতুল জনবলের কথা জানালেন। তিনি বলেন, এই এলাকাটি জনবহুল হওয়ায় সামলানো কঠিন। তবে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় বহাল, কারাগারে পরিবারের সদস্যরা, রাজধানীর বিভিন্নস্থানে জামায়াতের বিক্ষোভ

জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার প্রতিবাদে আজ রাজধানীর মিরপুর, মগবাজার, দৈনিক বাংলারমোড়, জুরাইন, গেন্ডারিয়া, ধানমন্ডি এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে দলের নেতাকর্মী সমর্থকরা। এসব সমাবেশে বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া একজন তরুণকে মিথ্যা ও বায়বীয় অভিযোগে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে অবৈধ সরকার । তারা বলেন, কামারুজ্জামান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সরকার নেতৃত্বশূন্য করে জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার যে ষড়যন্ত্র করছে তার ধারাবাহিকতায় কামরুজ্জামানের  মৃত্যুদন্ড। সময়ের ব্যবধানে প্রতি ফোটা রক্তের জবাব কড়ায় গন্ডায় আদায় করা হবে। এদিকে মৃত্যুদন্ড বহালের প্রতিবাদে সকাল ১১ টায় রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে বিক্ষোভ করেছে জামায়াত। মিছিল মিরপুর-১১ নম্বর থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। দলের ঢাকা মহানগরীর সহকার সেক্রেটারী মোবারক হোসাইনের নেতৃত্বে মিছিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য লস্কর মোঃ তসলিম ও মাহফুজুর রহমান, মহানগরী মজলিশে শুরা সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল করিম, নূরুল ইসলাম আকন্দ, রুপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আমীর মোঃ নাসির উদ্দিন, জামায়াত নেতা জামাল উদ্দিন,শিবির ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সভাপতি তামিম হোসাইন, বখতিয়ারউদ্দিন মোঃ তুহিন প্রমূখ। রমনা থানা আমীর ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় মগবাজার চৌরাস্তায় বিক্ষোভ করে রমনা অঞ্চলের কর্মীরা। বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন- শেরেবাংলা নগর থানা আমীর আ.জ.ম কামাল উদ্দিন, রমনা থানা নায়েবে আমীর ড. আহসান হাবিব, জামায়াত নেতা এম জে রহমান, সাইফুল আলম, আতাউর রহমান সরকার,ছাত্রনেতা শরীফুল ইসলাম, জামিল মাহমুদ ও মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। মিছিলটি রেলগেট থেকে শুরু হয়ে চৌরাস্তায় গিয়ে শেষ হয়। সকাল ১১ টায় রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড় ও ফকিরাপুল পানির ট্যাংকি এলাকায় বিক্ষোভ করেছে জামায়াত। মহানগর মজলিশে শুরা সদস্য মোঃ কামাল হোসাইনের নেতৃত্বে মিছিলে উপস্থিত ছিলেন মতিঝিল থানা সেক্রেটারী মোতাসিম বিল্লাহ, শিবির নেতা সোহেল রানা মিঠু, আঃ সাত্তার সুমন প্রমূখ। দুপুর পৌনে ২ টায় রাজধানীর জুরাইন ও গেন্ডারিয়া এলাকায় বিক্ষোভ করেছে জামায়াত। মিছিলটি জুরাইন রেলগেট থেকে শুরু হয়ে গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনের কাছে গিয়ে শেষ হয়। মহানগরী মজলিশে শুরা সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান ও গাজী আবুল কাসেমের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জামায়াত নেতা অধ্যাপক এন আহমদ, অধ্যাপক মিজানুল হক, আব্দুর রহীম, মহিউদ্দিন, আঃ জব্বার, আলমগীর হোসাইন, ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরী দক্ষিনের সেক্রেটারী গিয়াসউদ্দিন, শিবির নেতা রিয়াজ উদ্দিন, তোফাজ্জল হোসাইন, ফরিদউদ্দিন, মুসান্না প্রমূখ। বেলা ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডি-২৭ নম্বরে বিক্ষোভ করেছে জামায়াত । দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মিছিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগরী মজলিশে শুরা সদস্য জিয়াউল হাসান, হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত আমী আঃ বারি আকন্দ, ধানমন্ডি থানা সেক্রেটারী মোহাম্মদ আলী, শিবির নেতা সোহেল মাহমুদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সাকিবুল হাসান, মশিউর রহমান প্রমূখ।
নোয়াখালীতে মিছিলে পুলিশের গুলি, শিবির কর্মী নিহত
নোয়াখালীর মাইজদীতে জামায়াত-শিবিরের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে এক শিবির কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- বহালের প্রতিবাদে দলটির নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে গুলি চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ছাত্রশিবিরের এক কর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল সোয়া ১১টার দিকে মাইজদীর মফিজ প্লাজার সামনের প্রধান সড়কে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করে। এ সময় মিছিলটি সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ তাতে গুলি চালায়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনাস্থলেই মারা যান একজন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের নাম পরিচয় জানা যায়নি। সুধারাম থানার ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ মিছিলে বাধা দিলে শিবির কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা করে। এসময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ সর্টগানের গুলি ছোড়ে। এসময় দৌঁড়ে পালাতে গিয়ে নর্দমায় পড়ে এক শিবির কর্মীর মৃত্যু হয়।
কামারুজ্জামানের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না আইনজীবীরা
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাচ্ছেন না তার আইনজীবীরা। সোমবার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে তার আইনজীবী এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির বলেন, আমরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ দেখা করতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার আছে তার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার। বিকালে কামারুজ্জামানের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে যাচ্ছেন। আমরা তাদের মাধ্যমে কামারুজ্জামানের সিদ্ধান্ত জানার চেষ্টা করবো। এর আগে, বেলা সোয়া ১১টায় কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু বিকাল পৌনে ৩টার দিকে তাদের দেখা করতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
কারাগারে কামারুজ্জামানের পরিবার
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তারা কারাগারে প্রবেশ করেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কামারুজ্জামানের স্ত্রী নুরুন্নাহার, দুই ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামি ও হাসান ইমাম ওয়াফি, মেয়ে আতিয়া নূর ও ভাগ্নি রোকসানা জেরিনসহ ১২ জন। এর আগে দুপুরে কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার নির্দেশনা দিয়ে পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। আজ সকাল ৯ টায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ কামারুজ্জামানের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করেন। ফলে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় বহাল থাকে। নিয়ম অনুযায়ী তিনি  প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইতে পারবেন। এ বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে সরকার দ- কার্যকর করবে। গত বছর ৩রা নভেম্বর আপিল বিভাগের এই বেঞ্চই কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখে। ২০১৩ সালের ৯ই মে আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনালের রায়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছিল।

আপাতত নমনীয় দুই পক্ষ by শরিফুজ্জামান

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় খোলা, খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া, জামিনলাভ ও আদালত থেকে নিজ বাসায় ফেরা-২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই চারটি ঘটনা রাজনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। জনমনে অনেকটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এমন পরিস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সরকার ও বিরোধী দলের একাধিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, দেশে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির জন্য দেশি-বিদেশি কয়েকজন ব্যক্তি ও কূটনীতিক বিচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা করে আসছিলেন। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন ও ভোটারদের জন্য একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা মনে করেছি, এর মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফের শুরু হবে।’
সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, টানা তিন মাসের সহিংস পরিস্থিতি ও নাশকতায় মানুষের মৃত্যু, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ার কারণে দেশ স্থায়ী সংকটের দিকে এগোচ্ছিল। এরই মধ্যে উভয় পক্ষ নিজেদের সম্মানজনক প্রস্থানের উপায় খুঁজতে শুরু করে।
গতকাল রোববারের রাজনৈতিক অগ্রগতির পর খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হবেন বা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে পুলিশ ফের তালা লাগিয়ে দেবে, এমন জল্পনা-কল্পনার আপাতত অবসান হয়েছে। হরতাল কর্মসূচি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট নমনীয়। নাশকতাও বন্ধ হয়েছে। অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না করা হলেও এর কার্যকারিতা আর নেই।
খালেদা জিয়াকে তাঁর কার্যালয় থেকে জোর করে বের করা বা গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও সরকারকে তা করতে হয়নি। গতকাল তিনি স্বেচ্ছায় বের হয়ে জামিন নিয়ে নিজ বাসায় ফিরে গেছেন। এর নেপথ্যে সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান গতকাল রাতে বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) ইচ্ছা করে সেখানে থাকেননি। সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
সেলিমা রহমান মনে করেন, সিটি নির্বাচন সামনে রেখে সরকার হয়তো কিছুটা ছাড় দিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপির দাবি ছিল, নির্বাচনে গেলে কিছু কথা মানতে হবে। যেমন, কার্যালয় খুলে দেওয়া, কর্মীদের হয়রানি না করা। তাঁর মতে, পল্টন কার্যালয় খোলার পর মনে হচ্ছে, দু-একটি কথা সরকার শুনছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন গত ৩ জানুয়ারি থেকে তিন মাস দলীয় কার্যালয়েই অবস্থান করছিলেন। ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিনে রাজধানী ঢাকায় সমাবেশ কর্মসূচিকে ঘিরে ওই রাত থেকে তাঁকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এরপর ১৯ জানুয়ারি তালা খুলে দেওয়া হলেও তিনি আর কার্যালয় থেকে বের হননি।
এমনকি ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানেও যোগ দেননি খালেদা জিয়া। গুলশানের দলীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, গত তিন মাসে তিনি তিন দিন দোতলা থেকে নিচে নেমেছেন। একদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে, আরেকদিন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে এবং অন্যদিন ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর লাশ দেখতে নিচে নেমেছিলেন তিনি।
জানতে চাইলে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক এই অগ্রগতি স্বস্তিদায়ক। তবে বিএনপির এই বিলম্বিত বোধোদয় সাময়িক নাকি কৌশল, তা অচিরেই তাদের কর্মকাণ্ডে পরিস্কার হবে।
কোকোর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানাতে গেলে খালেদা জিয়ার দেখা না করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, এ ধরনের ঘটনায় পারস্পারিক তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে, মানসিক দূরত্ব বেড়েছে। তাঁর মতে, আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় নাশকতা ছেড়ে সুষ্ঠু রাজনীতিতে আসার বিকল্প আর ছিল না।
অবশ্য বিএনপি নেতাদের একটি অংশও মনে করে, দলটির আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির বিপুল জনসমর্থন থাকলেও আন্দোলন করার মতো শক্তি নেই। এখন নতুন করে শুরু করতে হবে দলটিকে। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ইস্যু সিটি করপোরেশন নির্বাচন।
এ প্রসঙ্গে সরকারের একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সিটি নির্বাচন সরকারের জন্য উভয়সংকটও হতে পারে। কারণ, নির্বাচনে জিতলে বিরোধীরা বলবে, জয় ছিনিয়ে নিয়েছে সরকারি দল। আর পরাজিত হলে বলবে, সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া, সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া এবং কর্মসূচি শিথিল করার পেছনে কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়াও বিএনপি-সমর্থক কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, এমাজউদ্দীন আহমদ, আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহবুবউল্লাহ, মাহফুজউল্লাহসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক খালেদা জিয়ার সঙ্গে সিটি নির্বাচন নিয়ে কয়েক দফা কথা বলেন।
বিএনপি-সমর্থক এসব বিশিষ্ট নাগরিকদের সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়া সিটি নির্বাচনের বিষয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। কারণ, দলের নেতাদের একটি অংশ নির্বাচনের পরিবর্তে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সরব ছিল।
জানতে চাইলে আ ফ ম ইউসুফ হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি এই নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করে, সরকারের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে আসে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে রাজনীতির এই ইতিবাচক ধারা আরও অগ্রসর হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর ৪০ দিনেও খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার না করে শুধু আওয়াজ তুলে সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়ে। সরকার একদিকে গ্রেপ্তারের কথা বলছিল, অন্যদিকে চাইছিল, তিনি যেন হাজিরা দিয়ে সরকারের মুখ রক্ষা করেন।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আদালতে হাজির না হলে ৫ মার্চ খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হবেন, পুলিশ ও প্রশাসনের এমন প্রস্তুতি এবং সরকারের ইঙ্গিত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
গতকাল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া হাজির হওয়ার পর আদালত তাঁকে জামিন দেন। কিন্তু সেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি নিয়ে ধুম্রজাল রয়েই গেল। এই পরোয়ানা ৪০ দিনেও আদালত থেকে থানায় পৌঁছাল না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত ৪ মার্চ কূটনীতিকদের প্রকাশ্য দৌড়ঝাঁপের পর দুই পক্ষের মধ্যে দৃশ্যত নমনীয় মনোভাবের সূত্রপাত হয়। ওই দিন কূটনীতিকেরা গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। এর আগে ১ মার্চ কূটনীতিকেরা দেখা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে। এরপর সরকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করা থেকে বিরত থাকে।
রাজনীতির এই ইতিবাচক ধারা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা ওয়েলকাম অ্যাপ্রোচ। রাজনীতির এই ইতিবাচক ধারা যাতে ধীরে ধীরে স্থায়ী হয়, সেটাই নাগরিকদের প্রত্যাশা।’

নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদযাত্রা, নগরে অসহনীয় যানজট

খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল বিকেলে রাজধানীতে
শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের
গণপদযাত্রা। ওই কর্মসূচির কারণে সড়কের এক পাশে যান
চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে প্রচণ্ড যানজটে
পড়তে হয় নগরবাসীকে। পরীবাগ সংলগ্ন কাজী নজরুল
ইসলাম অ্যাভিনিউ থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা আলফাজউদ্দিন মতিঝিলে যাওয়ার জন্য মিনিবাসে উঠেছিলেন বেলা সাড়ে তিনটার দিকে। বিকেল চারটার দিকে মিনিবাসটি বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ক্রসিংয়ে পৌঁছার পর আটকে দেয় পুলিশ। এক ঘণ্টায়ও মিনিবাসটি যাওয়ার সংকেত পায়নি। ভাপসা গরমে আলফাজ ও অন্য যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। আলফাজ একপর্যায়ে বিকল্প যান খুঁজতে বাস থেকে নেমে দেখেন, বিজয় সরণি জুড়েই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সব স্থবির। একই অবস্থা ছিল আশপাশের সব সড়কেই। এসব সড়কে যানবাহনের স্থবিরতার প্রভাব পড়ে অন্যান্য সড়কেও। ফলে গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে নগরজুড়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য অসহনীয় যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয় মানুষকে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত গণপদযাত্রা কর্মসূচির কারণে এ অবস্থা হয়।
পদযাত্রায় অংশ নিতে দুপুর থেকে বাস, মিনিবাসে করে লোকজন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যাওয়ার কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছিল, পদযাত্রা শুরুর পর সড়কে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়। পদযাত্রা শুরুর আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশ হয়। ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, প্রটেকশন ও প্রটোকল) মিলি বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদযাত্রা কর্মসূচির কারণে রাস্তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। অবরোধ-হরতালের নামে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, জ্বালাও-পোড়াও এবং পেট্রলবোমায় মানুষ হত্যার দায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বিকেলে শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশ ও সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন পর্যন্ত পদযাত্রা কর্মসূচি দেয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নৌমন্ত্রী। বক্তব্য দেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংসদ শিরীন আক্তার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হেলাল মোর্শেদ খান প্রমুখ। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে বক্তব্য দেন তাঁরা।
সমাবেশের কারণে পুলিশ বিকেল চারটার দিকে বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ক্রসিং, বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়ক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ মোড় ও ফার্মগেট মোড়ের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। সমাবেশ শেষে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে শুরু হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অভিমুখে পদযাত্রা। পদযাত্রা শুরুর পর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ মোড়ের রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু রাস্তায় মিছিল থাকার কারণে যান থেমে থাকে। পদযাত্রার সময় কারওয়ান বাজার ক্রসিং, বাংলামোটর, রূপসী বাংলা ক্রসিং ও শাহবাগ মোড়ের যান চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়।

ঘোলা পানির এঁদো ডোবা!

সকাল ১০টা থেকে দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেট নগরের বেশ কিছু স্থান
জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সংস্কারের নামে স্থানে স্থানে রাস্তা খুঁড়ে ফেলে
রাখায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে নগরবাসীর অভিযোগ।
ছবিটি শেখঘাটপয়েন্ট থেকে দুপুর ১২টার দিকে তোলা l প্রথম আলো
সিলেট নগরের কোথাও কোথাও ঘোলা পানির এঁদো ডোবা। আবার কোথাও জলকাদায় একাকার। রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখায় গতকাল রোববারের ভারী বৃষ্টিতে নগরের অধিকাংশ সড়কে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় পথচারী থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজন পড়েছে চরম দুর্ভোগে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের বন্দরবাজার, সিটি পয়েন্ট ও মহাজনপট্টি এলাকায় ১০ দিন আগে পানির পাইপ বসানোর জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। সড়কের অনেকটা অংশ খোঁড়ায় গত তিন দিনের থেমে থেমে চলা বৃষ্টিতে সেসব স্থান জলকাদায় একাকার হয়ে গেছে। নিরুপায় নাগরিকদের এর মধ্য দিয়েই পথ চলতে হচ্ছে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে টানা দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে কাদায় সয়লাব হয়ে পড়ে এসব এলাকা।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা জানিয়েছে, ‘ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে কয়েক মাস ধরেই সিটি করপোরেশন পানির পাইপ বসানোর কাজ করে আসছে। তবে নগরের মির্জাজাঙ্গাল, রামেরদিঘিরপার ও তালতলা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এসব এলাকার মূল সড়কে প্রায় দুই মাস আগে পাইপ বসানোর কাজ শেষ হলেও সড়কটি পুনরায় সংস্কার না করায় বৃষ্টিতে এখন সড়কটি কাদায় একাকার হয়ে পড়েছে।
মহাজনপট্টি এলাকার ব্যবসায়ী আলমগীর রহমান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘বৃষ্টি-বাদলের মৌসুম আসার আগ মুহূর্তেই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর উন্নয়নমূলক কাজের কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনে পড়ে। অথচ সারা বছর তাদের কোনো পাত্তাই থাকে না। এর দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষদের।’ একই এলাকার আরও চার ব্যবসায়ী জানান, সড়কের এক পাশে স্তূপ করা কাদা থাকায় যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে যানজট হচ্ছে। এ ছাড়া পথচারীদের কাপড়চোপড়ও নষ্ট হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, হুট করে বৃষ্টি হওয়ায় খোঁড়াখুঁড়ির স্থানগুলোতে জলকাদায় একাকার হয়ে গেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে এলে দ্রুতগতিতে পাইপ বসানোর কাজ শেষ করে সড়কগুলো সংস্কার করা হবে।
শেখঘাট এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন আহমদের অভিযোগ, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমল থেকেই থেমে থেমে চলছে কাজিরবাজার এলাকায় সুরমা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাজ। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেতুটির যাবতীয় কাজ শেষ হয়ে এলেও সেতু থেকে শেখঘাট জিতু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনকারী সড়কটির কিছু অংশ নির্মিত না হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে সেখানে ঘোলা পানির এঁদো ডোবায় পরিণত হয়েছে।
কাজিরবাজার ব্রিজ ও অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ-প্রক্রিয়ার তদারককারী প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জুন মাসের মধ্যে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা শেষ হবে। তখন আর কোনো ধরনের ভোগান্তি থাকবে না। তবে পয়েন্ট-লাগোয়া কিছু অংশ বাদে সংযোগ সড়কটির কাজই প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

মাহীর পাল্লাই ভারি by কাফি কামাল

তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দুইটিতেই মেয়র পদে সমর্থন চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে নির্বাচনী বিধির কারণে প্রকাশ্যে এ সমর্থন ঘোষণা দেয়নি দলটি। জাতীয়তাবাদী মনোভাবের বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ ব্যানারেই চূড়ান্ত করা হচ্ছে এ সমর্থন। ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ এর সমর্থন পেয়েছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। শনিবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু ঢাকা উত্তর নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত এক জটিলতা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বিএনপি ও ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ কমিটি। উত্তরে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী মূল প্রার্থী ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজ হয়ে যাওয়ায় এ সিটিতে বিকল্প প্রার্থীর কথা ভাবছে বিএনপি। মিন্টু ছাড়া এ সিটিতে মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক এমপি মাহী বি চৌধুরীও এ সিটিতে নির্বাচনে রয়েছেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ঐক্য না করলেও আন্দোলন ইস্যুতে ঐকমত্য পোষণ করেছে দলটি।
বিএনপি ও ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ কমিটির কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্টেও মিন্টুর মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে না পাওয়ায় বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মাহী বি চৌধুরীর পাল্লাই ভারি। তারা জানান, নানামুখী বিচার বিশ্লেষণ চলছে। তবে একাধিক কারণে মাহীর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিথ প্রার্থী আনিসুল হক একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থী হলে লড়াই হতো জমজমাট। কিন্তু তার ছেলে তাবিথ আউয়াল রাজনীতিতে অপরিচিত মুখ। দলে তার পদ-পদবী বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও নেই। তাবিথকে সমর্থন দিলে তার নাম পরিচয় করাতে হবে। বর্তমানে মামলায় জেরবার অবস্থা বিএনপি নেতাকর্মীদের। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে ভোটারদের কাছে একজন নতুন প্রার্থীকে পরিচয় করানো কঠিন। অন্যদিকে মাহী বি চৌধুরী সাবেক প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরীর ছেলে এবং নিজেও একবার এমপি ছিলেন। রাজনীতি এবং ভোটের মাঠে তিনি তুলনামূলকভাবে পরিচিত মুখ। বিশেষ করে টকশোতে মুখর তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। সূত্র আরও জানায়, আবদুল আউয়াল মিন্টু একজন ব্যবসায়ী নেতা হলেও বিএনপি রাজনীতির সদর-অন্দর এবং নানা গ্রুপের সঙ্গে ইতিমধ্যে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তিনি প্রার্থী হচ্ছেন দেখেই তাই ঢাকা উত্তরে বিএনপির কোন নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি। কিন্তু তার ছেলের বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। ইতিমধ্যে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দিক থেকে প্রশ্ন উঠেছেÑ তাবিথকে সমর্থন দেয়া হলে সেটা দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে মাহী বি চৌধুরী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিন নিজেকে জাতীয়তাবাদী পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে। এখন তার দল জোটের বাইরে থাকলেও আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করছে। সূত্র জানায়, মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন দেয়া হলে জাতীয়তাবাদী ঘরনার ছোট ছোট দলগুলো বিএনপির ওপর আস্থা তৈরি হবে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের বিএনপির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অবস্থানে আসতে সহায়ক হবে। এ ছাড়া বিএনপি একাধিক নেতা ও শুভাকাক্সক্ষী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদী রাজনীতিক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এগোনো উচিত। সে জন্যই শুভাকাক্সক্ষী ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য মজবুতের বিকল্প নেই।

সাংবাদিকেরাই যখন বিপন্ন মানুষের বড় ভরসা by মহিউদ্দিন আহমদ

বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধিদের এমন ছড়াছড়ি; সর্বনিম্ন পর্যায়ে ওয়ার্ডের সদস্য থেকে ওপরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের দুই ভাইস চেয়ারম্যান, তারপর চেয়ারম্যান এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে জাতীয় সংসদের সদস্য। এই পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য। প্রত্যেক নাগরিকের সংবিধান এবং আইন ও বিধিবিধানে প্রদত্ত অধিকার, সুযোগ-সুবিধা কেউ ক্ষুণ্ন বা লঙ্ঘন করলে এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের পক্ষ নিয়ে সরকার বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করবেন, দরকার হলে লড়বেন—এটাই প্রত্যাশিত প্রকৃত গণতন্ত্রে। পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখেছি, সংক্ষুব্ধ নাগরিক ‘রিলিফ’ বা প্রতিকার পেতে তাঁর এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকেন।
স্পষ্ট মনে আছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর ব্রিটিশ আইনজীবী টম উইলিয়ামস কিউসি সেই ’৭২-এর প্রথম দিকে মরহুম তসদ্দক আহমেদের গঙ্গা রেস্টুরেন্টে এক লাঞ্চে আমাকে তাঁর নির্বাচনী এলাকার এক মধ্যবয়সী ব্রিটিশ নারীকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন। ওই নারীর সিলেটি স্বামী তাঁদের একমাত্র শিশুসন্তানকে নিয়ে চলে এসেছেন সিলেটে, স্ত্রীকে না জানিয়ে। টম উইলিয়ামস কিউসি, এমপি আমাকে জানালেন, তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস হিউমকেও লিখেছেন, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনকে অপহৃত শিশুটিকে উদ্ধারকাজে সক্রিয় হতে। তিনি আরও বললেন, ঢাকায় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের কাছেও তিনি আইনগত পরামর্শের জন্য চিঠি লিখেছেন। উল্লেখ্য, আগরতলা মামলায় টম উইলিয়ামসকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যাপারে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, জাকারিয়া খান চৌধুরীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
কিন্তু বাংলাদেশে বিহিত চাইতে সাংসদদের কাছে সাহায্য চাওয়ার সংস্কৃতি একেবারে নেই বললেই চলে। তার বিপরীতে, আমাদের দেশের বিপদগ্রস্ত মানুষ সাহায্য চাইতে একজন সাংবাদিককেই খোঁজে, তারা পত্রিকা বা টিভি অফিসেই ধরনা দেয়।
১৫ বছর আগের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি উদাহরণ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন, পাকিস্তান পোস্টাল ক্যাডারের এক কর্মকর্তা রফিকুল আলম জাহাঙ্গীরকে পোস্টিং দেওয়া হলো বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে, কিন্তু তাঁকে নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে দিচ্ছিলেন না এই মন্ত্রণালয়ের ‘গদিনশিন’ সচিব। জাহাঙ্গীর বিষয়টি আমাকে জানাল। আমি তখন সদ্য অবসরে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করায় সাংবাদিক মহলে কিছুটা পরিচিত। আমি টেলিফোন করলাম তখন ইত্তেফাক-এর এক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদককে। পরদিন ইত্তেফাক-এর প্রথম পৃষ্ঠায় রফিকুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের বিপন্ন অবস্থার কথা প্রকাশিত হলো। আর সেদিনই তাঁর নতুন বদলির আদেশ জারি হলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে। এ রকম হাজার হাজার উদাহরণ আছে।
তো কথাটি আবার বলি, বাংলাদেশের বিপন্ন বিপদগ্রস্ত মানুষজন বিপদ থেকে প্রতিকার চাইতে একজন সাংবাদিককেই খোঁজে। গ্রাম, শহর, বন্দরের যেকোনো বয়সের মানুষ গণমাধ্যমকেই তাদের ভরসা হিসেবে দেখে। বস্তুত, দেশের মানুষজনের নাগরিক অধিকার রক্ষায় প্রায় ‘অকার্যকর’ জাতীয় সংসদের চাইতে অনেক বেশি কার্যকর আমাদের গণমাধ্যম। একজন মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধ বয়সেও রিকশা চালিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন—এই খবর তো আমি পত্রিকায়, টিভিতেই দেখি। সাত-আট বছর আগে দৈনিক জনকণ্ঠ-এ প্রবীণ রিকশাচালক মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ারের একটি সচিত্র খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আমি মেডোনা গ্রুপের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামানকে অনুরোধ করলে মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ারের জন্য তিনি আমাকে এক লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। ওই টাকাটা তখন রিকশাচালক সরোয়ারকে পাঠিয়ে দিই, যেন তিনি তাঁর প্রত্যাশামতো যশোরের একটি গ্রামে একটি ছোট বাড়ি বানাতে পারেন। এখানেও সরোয়ারের পাঁচ–পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন। তাঁরা তো কেউ কিছু করলেন না।
‘হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার’ হিসেবে দুনিয়ার প্রতিটি দেশেই সাংবাদিকদের একটি আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও কালো মানুষগুলোর অধিকার রক্ষায় বেশি সোচ্চার-সক্রিয় সাংবাদিকেরা।
গত আগস্ট মাসে মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের ফার্গুসনে ১৮ বছরের কালো নিরপরাধ মাইকেল ব্রাউন নামের একজনকে গুলি করে মেরে ফেলার প্রতিবাদে যেসব বিক্ষোভ, মিছিল-মিটিং-সমাবেশ হয় মার্কিন মুলুকে, তা সম্ভব হয়েছিল সে দেশেরই টিভি ও প্রিন্ট সাংবাদিকদের প্রবল ইতিবাচক ভূমিকার কারণে। জনমতের চাপে সেই অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ড্যারেন উইলসন কয়েক দিন আগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
---দুই
এই পটভূমিতেই প্রথম আলোর বাউফল প্রতিনিধি মিজানুর রহমানের ওপর পুলিশি হেফাজতে অত্যাচার-নির্যাতনের খবরে সাংঘাতিকভাবে বিচলিত বোধ করছি। এই পর্যায়ে আমাকে বলতেই হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপর আওয়ামী লীগের কিছু সংসদ সদস্যের মারধরের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমি যে পরিমাণ লেখালেখি করেছি, তেমনটি বোধ হয় আর কেউ করেননি।
মিরপুরের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্ প্রকাশ্যে দিনের বেলায় মারলেন এক পুলিশ সার্জেন্টকে। কারণ, ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া এমপি সাহেবকে পুলিশ সার্জেন্ট দ্রুত বের করে আনলেন না কেন। পুলিশ সার্জেন্ট যখন এমপির বিরুদ্ধে মামলা করলেন, তখন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এই বলে, ‘পুলিশ সার্জেন্ট মামলা করতে গেল কেন? আমাদের বললেই তো আমরাই মিটমাট করে দিতাম।’ পুলিশকে থানা থেকে ডেকে এনে তাঁর অফিসে মারধর করেছেন যশোরের শেখ আফিলউদ্দিন এমপি। আর কক্সবাজারের এমপি আবদুর রহমান বদি যে কত সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর করেছেন, তার তালিকা দেওয়া এখানে সম্ভব নয়। আমাদের পুলিশ-র্যা ব বাহিনীর টু-স্টার, থ্রি-স্টার বিশিষ্ট কোনো কর্মকর্তা এঁদের কারও বিরুদ্ধে সামান্যতম ব্যবস্থা নিতে সাহস করেননি।
এই সাংসদদের এমন গর্হিত আচরণের প্রতিবাদে লেখা আমার কলামের প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন তখনকার আইজিপি নূর মোহাম্মদ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের মারধরের প্রতিবাদ করতে আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি কয়েকবার। বিধি মোতাবেক রাষ্ট্রের বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালোমন্দ দেখভাল করাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অধিকার রক্ষায় আমি যেমন সোচ্চার, তেমনি সোচ্চার পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও।
বাউফলের মিজানুর রহমানের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার প্রথম আলোর প্রথম পাতায় তাঁর যে ছবি ছাপা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে তিনি দাঁড়াতে পারছেন না। পুলিশের এমন অত্যাচার-নির্যাতনের সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ; আশঙ্কা হয় এটি সর্বশেষ উদাহরণ নয়।
পুলিশি নির্যাতনের বর্ণনা প্রথম শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম দিকে, প্রায় চুয়ান্ন বছর আগে। কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে এবং পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানায়। তার বর্ণনা আছে মালেকা বেগমের লেখা ইলা মিত্র বইটিতে। এখনো আমি ওখানে গেলে থানাটির সামনে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চরম নির্যাতন চালানো হয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ওপর: তার বর্ণনা আছে তাঁর নোটস ফ্রম প্রিজন এবং জেলের কথা মানুষের কথা বই দুটিতে। নির্যাতন চালানো হয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ওপর। নির্যাতন চালানো হয় এরশাদের স্ত্রী বিদিশার ওপর। নারী বলে তাঁকে এতটুকু ছাড় দেওয়া হয়নি। তখন খালেদা জিয়ার বিএনপি-জামায়াত জমানা।
সাংবাদিকদের মধ্যে হালজামানায় অনেক ধান্ধাবাজ আছে। তাদের বিরুদ্ধেও আমার লড়াই। নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ঠিকানা, বাংলাদেশের ইনকিলাব ও দিনকাল আমার ওপর লম্বা লম্বা প্রতিবেদন ছাপলেও একটিবারও আমার সঙ্গে কথা বলেনি। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংবাদিকতার অবশ্যপালনীয় নিয়ম হলো, খবর তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের ভাষ্যও রিপোর্টে রাখতে হবে। আমাদের অনেক পত্রিকায় গায়েবি-আসমানি সোর্সের বরাতে রচনা থাকে বেশি। প্রকৃত খবর থাকে কম। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ইত্তেফাক-এর মতো পত্রিকাগুলোতে ধান্ধাবাজদের স্থান থাকার কথা নয়। কারণ, সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় এবং অবশ্যপালনীয় নিয়মনীতি, নৈতিকতা পত্রিকা তিনটি প্রয়োগ করে থাকে বলে জানি।
আমার আশঙ্কা, দেশের সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার পাঠকপ্রিয় প্রথম আলোর একজন সাংবাদিককে যদি এমন নিষ্ঠুরভাবে দমন করার অপচেষ্টা চলে, তাহলে অন্য সব পত্রপত্রিকা, টিভি, রেডিওর সাংবাদিকেরা তো নিজেদের গুটিয়ে নেবেন। দেশে যখন সন্ত্রাস, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, দখল, টেন্ডার ছিনতাই ব্যাপক ও বেপরোয়াভাবেই চলছে, তার প্রতিকার চাইতে দেশের সংক্ষুব্ধ মানুষজন তাহলে কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে?
ঢাকা জেলা পরিষদ প্রশাসক হাসিনাদৌলাহর লুণ্ঠনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে চ্যানেল ৭১ গত ৮ ডিসেম্বর। এই আওয়ামী লীগ নেতা ধামরাইয়ের বোয়াইন গ্রামের একটি বটগাছকে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেন। কারণ, ওই গাছের নিচে পূজা হয়। তো এমন লুণ্ঠন দমনে দুর্নীতি দমন কমিশনেরই বা ভূমিকা কী? এটি তো এখন দুর্নীতি অব্যাহতি কমিশন হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই লুণ্ঠনের খবর তো আমরা পাচ্ছি একটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের কারণে। আল-জাজিরা টিভিতে এখন একটি স্লোগান প্রায়ই দেখি—জার্নালিজম ইজ নট অ্যা ক্রাইম।
বিচারব্যবস্থা যেভাবে চলছে, তাতে এর প্রতিও মানুষের আস্থা কমে আসছে। পুলিশ-র্যা বের ব্যর্থতার তালিকাও দীর্ঘ। লিমনের কথা আমাদের মনে আছে। পুলিশ-র্যা ব সাগর-রুনি দম্পতির হত্যারহস্য তিন বছরেও উদ্ঘাটন করতে পারেনি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা তদন্তের অগ্রগতি কোথায়? ত্বকী হত্যার চার্জশিট দুই বছরেও দেওয়া হয়নি। অভিজিৎ হত্যার তদন্তে ব্যর্থতায় প্রতিবাদী, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন তাঁর বাবা ৮০ বছর বয়সী সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক অজয় রায়। রানা প্লাজায় ১১৩৯ নিরপরাধ মানুষকে হত্যার দুই বছরে তদন্তের অগ্রগতি কতটুকু?
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন থেকে সেদিন একটি সভায় প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের পুলিশ-র্যা বের সমালোচনামূলক কিছু কথার প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদে। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে, পুলিশকে এখানে-ওখানে যে এমন আক্রমণ করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও থানা ঘেরাও করে, কোথাও কোথাও থানায় ঢুকেই তার বিরুদ্ধে কখন, কোথায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের কে কী করছেন, কয়টা প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন?
তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথাগুলোও গণমাধ্যমেই তুলে ধরতে হবে। আমরা জানি পুলিশ বাহিনীও কখনো কখনো বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সেসব খবর গণমাধ্যমে এলে তারাও তখন রিলিফ পাবে।
মহিউদ্দিন আহমদ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, কলাম লেখক।

বিয়ে করতে না পেরে ১০ জনকে খুন

প্রিয়তমাকে না পেয়ে উন্মত্ত খুনি হয়ে উঠেছে এক পাকিস্তানি যুবক। নিজের ভালোবাসার সফলতা না পেয়ে মদের বোতল নয়, রক্তপেয়ালার পথ বেছে নিয়েছে সে। ব্যর্থ প্রেমের প্রতিশোধ নিতে এক-দু’জন নয়, ১০ জনকে খুন করেছে ওই যুবক। তার জিঘাংসায় বাদ পড়েনি ভালোবাসার মেয়েটিও। রোববার পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের টাঙ্গাই তেহসিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চাচাতো বোনকে বিয়ের জের ধরে পরিবারের ১০ সদস্যকে খুন করে ওই যুবক।
স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা শহীদ খান জানান, হত্যাকারী গুল আহমেদ তার চাচা জামালের মেয়েকে পরিবারের নিষেধ সত্ত্বেও বিয়ে করতে চেয়েছিল। এর জের ধরে গুল আহমেদ গত বছরের ২৮ নভেম্বর তার বাবা-মা’সহ ভাইয়ের পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যা করে। এরপর সে পালিয়ে যায়। রোববার সে তারা চাচা-চাচি ও আট চাচাতো ভাইবোনকে গুলি করে হত্যা করে। এদের মধ্যে গুল আহমেদ যে মেয়েটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল সেও রয়েছে। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর গুল আহমেদ পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। নিউইয়র্ক টাইমস।

রিয়াল ৯ রোনাল্ডো ৫

শিরোনাম দেখে চমকে উঠবেন না, যা ঘটেছে তা কোনো মায়াবী বিভ্রম নয়। বাস্তব। রিয়াল মাদ্রিদের নয় গোলের মধ্যে পাঁচটিই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর। রোববার গ্রানাডার ওপর দিয়ে বেশ ভালো ধরনের ঝড় বয়ে গেল। ঝড়ের নাম আপনি ইচ্ছে করলে রিয়াল মাদ্রিদও রাখতে পারেন। আবার রোনাল্ডোও। পর্তুগিজ তারকার পাঁচ গোলে গ্রানাডা লণ্ডভণ্ড। রিয়াল জিতেছে ৯-১ গোলে। একটি গোল গ্যারেথ বেলের। দুটি করিম বেনজেমার। লা লীগার চূড়ায় বার্সেলোনা। তাদের চেয়ে ব্যবধান এক পয়েন্টে কমিয়ে আনে রিয়াল। রোববার রাতে সেল্টা ভিগোকে হারালে বার্সা ফের চার পয়েন্টের লিড নেবে। নিজেদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এদিন একটি শো’ই মঞ্চস্থ হয়েছে- রোনাল্ডো শো। পাঁচ গোল করার পথে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছেন তিনি। ৩০ থেকে ৩৮- আট মিনিটেই হ্যাটট্রিক। রিয়ালের জার্সিতে, যা দ্রুততম।
ডিসেম্বরের পর প্রথম হ্যাটট্রিক এটি রোনাল্ডোর। দিয়েগো মাইঞ্জ গ্রানাডার দুঃস্বপ্ন আরও বাড়িয়ে দেন নিজেদের জালে বল পাঠিয়ে। ২৫ মিনিটে রিয়ালের গোল উৎসবের সূচনা করেন ওয়েলস তারকা গ্যারেথ বেল। ৮৩ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে গ্রানাডার শোচনীয় হার নিশ্চিত হয়। মাঝে ৫২ ও ৫৬ মিনিটে ফরাসি ফরোয়ার্ড বেনজেমার লক্ষ্যভেদ বাদ দিলে পুরোটা সময় ছড়ি ঘুরিয়েছেন রোনাল্ডো। ৩০, ৩৬, ৩৮, ৫৪ ও ৮৯ মিনিটে গোল করেন তিনি। গ্রানাডার পক্ষে একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোল করেন রবার্ট ইবানেজ। পায়ের ইনজুরি থেকে সেরে উঠে দু’মাস পর প্রথম মাঠে নামেন কলম্বিয়ান বিশ্বকাপ তারকা জেমস রদ্রিগেজ। তার বাঁ-পায়ের চমৎকার পাসেই রোনাল্ডো নিজের প্রথম গোল করেন। রোনাল্ডো পাঁচ গোলের সুবাদে লা লীগার টপ স্কোরার এখন। ছাড়িয়ে গেছেন মেসিকে। ২৬ ম্যাচে রোনাল্ডোর গোল ৩৬। মেসি ৩২ গোল করেছেন ২৮ ম্যাচে। অবশ্য রোববার রাতেই নিজের গোলসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। ওয়েবসাইট।

কাজী রকিবউদ্দীনকে ইতিহাস যে কারণে মনে রাখবে by সাজেদুল হক

একবার তার অনুশোচনার খবর চাউর হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন করার কারণে তিনি অনুতপ্ত। পদত্যাগও নাকি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন এটা বিশুদ্ধ পানির মতোই পরিষ্কার যে, ওইসবই ছিল গুজব। বরং তিনি ফিরেছেন প্রবল পরাক্রমশালী রূপে। কাউকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। বিএনপি অথবা শত নাগরিকদেরই শুধু নয়, এমনকি তিনি আমলে নিচ্ছেন না নির্বাচন কমিশনারদেরও। একটি মীমাংসিত ইস্যুও সামনে নিয়ে এলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বহু আগেই সুপ্রিম কোর্টে এটা ফয়সালা হয়ে গেছে, নির্বাচন কমিশন বলতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের বুঝায়। সোজা মানে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনাররা সমন্বিতভাবেই নেবেন। তাহলেই কেবল তা কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এসব কোন কিছুরই ধার ধারছেন না। খেয়াল করলে দেখবেন প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলটি যখন দেখা করতে যায় কাজী রকিবউদ্দীন তাদের সঙ্গে একাই বৈঠক করেন। আর প্রতিনিধি দলের বক্তব্যও নাকচ করেন একাই। কমিশনারদের সঙ্গে পরামর্শ করাও অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন তিনি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও আসম হান্নান শাহের নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতিনিধি দলের বেলাতেও তাই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কথা বলেছেন একাই এবং নাকচও করেছেন একাই।
এরইমধ্যে খবর বেরিয়েছে শুধু বৈঠকই নয় নির্বাচন কমিশনের প্রায় সব সিদ্ধান্তই এককভাবে নিচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক একটি সহযোগী দৈনিককে বলেছেন ‘কমিশনের অনেক গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়ে সিইসি একাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। নিবন্ধন বিভাগে হাজার কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। এসব কাজ কে করছে, কীভাবে করছে তার কিছুই আমরা জানি না। এ-সংক্রান্ত কোন নথি আজ পর্যন্ত কমিশনারদের দৃষ্টিগোচরে আনা হয়নি।’
এটা শতভাগ নিশ্চিত করেই বলা যায়, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের এভাবে একক সিদ্ধান্ত নেয়া সংবিধান অনুমোদন করে না। এটা সুপ্রিম কোর্টেরও একাধিক রায়ের লঙ্ঘন। তিনি অবশ্য সৌভাগ্যবান। এমন এক সময়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন যখন প্রশ্ন তোলাটাই অন্যায়। একটি ‘ঐতিহাসিক’ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নাম অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে। যদিও কলঙ্কিত নির্বাচন বাংলাদেশে একেবারে অভিনব নয়। তবে যা একেবারেই অভিনব তা হচ্ছে, ভোটের আগেই কোন পক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়া। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নেয়নি। এর ভুল-শুদ্ধের দায় ওই জোটকেই নিতে হবে। কিন্তু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে রকিব কমিশন কতটুকু চেষ্টা করেছে সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বর্তমান কমিশন অবশ্য দাবি করতে পারে, অতীতে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তারা সফলতা দেখিয়েছে। কিন্তু কমিশন সেখানেই সফলতা দেখাতে পেরেছে যেখানে সরকারি দল হস্তক্ষেপ করেনি। আর যেখানে সরকারি দল হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানে কমিশন কোন বাধাই তৈরি করতে পারেনি।
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অবশ্য কমিশন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের যারপরনাই হতাশ করছে। অনেকেই বলেন, পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ীই নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ ঘোষণা করেছে। আর এ কয়দিনে কমিশন যেভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি অস্বীকার করেছে তা ভোটের ইতিহাসে একেবারেই অভিনব। এমনকি আফ্রিকার কোন দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে কি-না তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে এটা সবাই নিশ্চিত করেই বলতে পারছেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে অবশ্যই ইতিহাস মনে রাখবে।
সাজেদুল হক
৪ঠা এপ্রিল, ২০১৫, ঢাকা।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন থেকেই গেল by তারেক শামসুর রেহমান

তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হবে ২৮ এপ্রিল। ১ ও ২ এপ্রিল প্রার্থিতা বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। ৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর বোঝা যাবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারা কারা থাকছেন। চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী মোটামুটি নিশ্চিত। ২০ দল ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুজন প্রার্থী আছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদ্বয় নিশ্চিত থাকলেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এখনও নিশ্চিত হয়নি। একাধিক প্রার্থী রয়েছেন মাঠে। কোনো কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীর শেষ মুহূর্তে প্রার্থীপদ 'নানা কারণে' বাতিল হয়েছে। উপরন্তু বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বয়কটও করতে পারে! নির্বাচন নিয়ে এখন নানা 'অঙ্ক কষা' শুরু হয়েছে। সরকারের ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা, বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি- নানা প্রশ্ন এখন এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আবর্তিত হচ্ছে। তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন প্রয়োজন ছিল। আট বছর নির্বাচন হয়নি এখানে। সর্বশেষ মেয়র ছিলেন বিএনপির। তার মেয়াদ শেষের পরও নির্বাচন হয়নি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনসেবা নিশ্চিত করা যায়। আমলা দিয়ে জনসেবা নিশ্চিত করা যায় না। ঢাকা শহরের মানুষ এ জনসেবা পাচ্ছে না বেশকিছু দিন ধরে। মশক নিধন কর্মসূচিসহ অনেক জনসেবামূলক কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এ মশক নিধন কর্মসূচিতে। তাহলে এ টাকা কোথায় যাচ্ছে? কে এ থেকে সুবিধা নিচ্ছে? জনপ্রতিনিধিরা থাকলে, তাদের দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু আমলারা থাকলে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। সে জন্যই আসন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি প্রশংসার যোগ্য। নিঃসন্দেহে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা চাচ্ছেন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়ে 'সব রাজনৈতিক দল'কে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করার একটি সুযোগ দেয়া। কিন্তু যে প্রশ্ন এখনও অনেকেই করেন, তা হচ্ছে বিএনপি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবে তো! ঢাকা উত্তরের বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থী পদ বাতিল হয়েছে। এখানে বিএনপির 'শক্ত' কোনো প্রার্থী নেই। আউয়াল মিন্টু শক্ত প্রার্থী ছিলেন। মুক্ত ঢাকার মেয়র তিনি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি খোদ বিএনপির হাইকমান্ডের সমর্থনের অভাবে। এখন তার ছেলে তাবিদ আউয়াল প্রার্থী। কিন্তু তাবিদ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। যে যুক্তিতে তার প্রার্থী পদ বাতিল হয়েছে, আইনগতভাবে তা সঠিক। তাহলে প্রশ্ন এসে যায়, তিনি জেনেশুনে এই 'ভুল' করেছেন, নাকি সরকারের কোনো কোনো মহলকে খুশি করার জন্যই তিনি এ 'ভুল'টি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এ প্রশ্নও অনেকে করেছেন। তাহলে উত্তরে বিএনপির অবস্থান কী হবে? বিএনপি কী তাহলে তাবিদ আউয়ালকে সমর্থন করবে, নাকি মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন করবে? যদিও মাহী চৌধুরীর বিকল্পধারা ২০ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ঢাকার দক্ষিণে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি। মির্জা আব্বাস, সালাম ও আসাদুজ্জামান রিপনের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। অথচ আব্বাসের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে একাধিক। অনেক মামলায় জামিন না নেয়ায় তিনি আইনের দৃষ্টিতে 'ফেরারি'। প্রশ্নটা এখানেই। বিএনপি আবারও হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার। বিএনপি একদিকে আন্দোলনেও থাকবে, অন্যদিকে নির্বাচনেও অংশ নেবে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি তার জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার পরীক্ষা করে ফেলতে চায়।
তবে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি সুযোগ এসেছে। নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং সন্ত্রাসমুক্ত হবে- এটা ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে। এমনিতেই ইসি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক হারিয়েছে। এখন সুযোগ এসেছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর। এটা তো সত্য, সরকার যদি ইসিকে সহযোগিতা না করে তাহলে ইসির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব নয়। সরকার সমর্থকরা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। ইসি এক্ষেত্রে কতটুকু শক্তিশালী হতে পারবে, এ প্রশ্ন থাকলই। নির্বাচনী এলাকায় কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসি এ ব্যাপারে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এখন সরকার ইসির পরামর্শ কতটুকু গ্রহণ করে, সেটি দেখার বিষয়। একটি জটিলতা আছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) ওয়ার্ড সংখ্যা নিয়ে। উত্তরের লোকসংখ্যা ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩, আর ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩৬। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লোকসংখ্যা কম; কিন্তু ওয়ার্ড সংখ্যা বেশি। লোকসংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৩, আর ওয়ার্ড ৫৭টি। ফলে এখানে এক ধরনের বৈষম্য রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ বৈষম্য দূর করা সম্ভবও হবে না। ফলে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। নির্বাচনের জন্য যে বিষয়টি বেশ জরুরি, তা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি 'লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড' তৈরি করা। ইসি কি এটা পারবে? বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা, সাবেক কাউন্সিলর হয় পলাতক, নতুবা মামলার আসামি। কেউবা আবার গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন। এদের কেউ যদি প্রার্থী হনও তারা তো ভয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তাহলে কী নির্বাচনটা একপক্ষীয় হয়ে যাবে না? তাদের জন্য নূ্যনতম যে সুযোগ, সেটি নিশ্চিত হবে কীভাবে? সরকারি দলের ঘোষিত প্রার্থীরা এরই মধ্যে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। একজন ব্যবসায়ী, একজন সংসদ সদস্য, একজন সাবেক মেয়রপুত্র- এদের বিলবোর্ডে নির্বাচনের আগেই ঢাকা শহরে ছেয়ে গিয়েছিল। তারা এটা পারেন না। নির্বাচনে 'জয়ী' হওয়ার আগেই যদি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়, তাতে ইসির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি! শুধু তাই নয়, প্রার্থীরা আদৌ ঋণখেলাপি কিনা, এটাও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর কাছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পাওনা ছিল ১১৮ কোটি টাকা। তিনি বাড়ি বিক্রি করে টাকার কিছুটা পরিশোধ করেছেন, এমন তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মাঠে আছেন। কিন্তু ব্যবসায়ী প্রার্থীর খবর কী? তিনি আদৌ ঋণখেলাপি কিনা, ঋণ রিশিডিউল করেছেন কিনা, আমরা জানি না। এমন ধনী ব্যক্তিরা, ব্যবসায়ীরা যখন প্রার্থী হন এবং তাদের কাছে ব্যাংকের পাওনা থাকে ১০০ কোটি টাকার উপরে, তারা যখন 'নগরপিতা' হতে চান, তখন আমাদের দুঃখ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সিটি করপোরেশনের মতো জায়গাতে, ব্যবসায়ীদের প্রার্থী না করাই মঙ্গল। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসায়িক 'স্বার্থ' থাকে। হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের কাজ হয় সিটি করপোরেশনগুলোতে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ থাকাটাই স্বাভাবিক।
এ তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, আমরা জানি না। বিএনপির প্রার্থীরা অংশ নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আর না নিলে সরকারি দলের প্রার্থীরা 'খালি মাঠে' গোল দেবে! এখন এখানেই বিএনপি এ সুযোগটি দেবে কিনা? বিএনপির ব্যাপক সমর্থক রয়েছে। আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেন, একটা নৈতিক সমর্থন তো বিএনপির জন্য আছে। ফলে বিএনপি কি এ সুযোগটি কাজে লাগাবে না? বিএনপি আন্দোলনের বিকল্প হিসেবেও এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেটা প্রত্যক্ষ হোক কিংবা পরোক্ষ হোক। দীর্ঘদিন ধরে দেশে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকার ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো আস্থার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। খালেদা জিয়া সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করলেও কোনো একটি দাবিও সরকার মানেনি। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা একরকম 'ভেস্তে' গেছে! তাই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। যদিও জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের মতো সিনিয়র নেতারা বলেছেন, বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবে। ২০ দলীয় জোটে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এমন কথাও আমাদের জানিয়েছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। তাই ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে বিএনপি মাঠে আছে কী নেই।
তবে চূড়ান্ত মুহূর্তে বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে, আমি অবাক হব না(?) নির্বাচন বয়কটের জন্য যথেষ্ট যুক্তি বিএনপির আছে। প্রথমত, বিএনপি সমর্থিত শত নাগরিক কমিটি মনোনয়নপত্র তথা নির্বাচনের তারিখ পেছানোর দাবি করলেও নির্বাচন কমিশন তাতে রাজি হয়নি। নির্বাচন কমিশন খুব দ্রুত নির্বাচনটি করতে চায়। দ্বিতীয়ত, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মাঠে যেতে পারছেন না। প্রচারণা চালাতে পারছেন না- এমন খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি তাদের অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী (যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ রয়েছে) গ্রেফতার হতে পারেন, এমন কথা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। ফলে বিএনপি একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। তৃতীয়ত, খালেদা জিয়া স্থায়ী পরিষদ কিংবা ২০ দলীয় জোট কারও সঙ্গেই কোনো মিটিং করছেন না বা মিটিং করতে পারছেন না। ফলে দল কোনো সুস্পষ্ট নীতিও গ্রহণ করতে পারছে না। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ মূলত পরিচালিত হচ্ছে শত নাগরিক কমিটির মাধ্যমে, যেখানে স্থায়ী পরিষদের সদস্যরা থাকছেন উপেক্ষিত। চতুর্থত, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন তার দলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন, তখন এটা বুঝতে কারও বাকি থাকে না, সরকারপ্রধান কত সিরিয়াস। এটা দল তথা সরকারের জন্য একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। নির্বাচনে 'বিজয়ী' হয়ে সরকার দেখাতে চাইবে বিএনপির কোনো জনপ্রিয়তা নেই! এজন্যই বিএনপির নির্বাচনে মাঠে থাকা উচিত। ডজন ডজন মিডিয়াকর্মী ও ক্যামেরার উপস্থিতিতে নির্বাচনে জালিয়াতি ও কারচুপির সুযোগ থাকবে কম।
তাই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল। কিছু 'কিন্তু' কিছু 'যদি'র মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলো যাবে। বিএনপি আবারও হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছিল। শুধু নির্বাচনের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামকে হরতালমুক্ত রাখা হয়েছিল। এর অর্থ পরিষ্কার, বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে চায়। নতুন করে আবারও হরতালের ডাক দেয়ার অর্থ হচ্ছে আগামীতেও এ হরতাল আসতে পারে! যদিও বলতে দ্বিধা নেই, হরতালের তেমন একটা 'প্রভাব' এখন আর নেই। হরতালের 'ধার' কমে গেছে। তাই অনেক জল্পনাকল্পনার মধ্য দিয়ে তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সারা জাতির দৃষ্টি এখন এদিকে। ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে নির্বাচনটি আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, নাকি একতরফাভাবে হবে! এ নির্বাচন পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে যেমনি বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি এ নির্বাচন সঙ্কটকে আরও গভীরতর করতে পারে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahmanbd@yahoo.com

ছাত্রলীগের হেলিকপ্টার বিলাস by মশিউল আলম

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈরিতায় বাংলাদেশ যখন পর্যুদস্ত, যখন সরকারের আইন প্রয়োগের কেরামতিতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দিশাহারা হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান এক উল্টা ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। গত ২৯ মার্চ রোববার তিনি ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে খাওয়াদাওয়া করতে গিয়েছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার এক বিএনপি নেতার বাড়িতে। অবশ্য তাঁর এই হেলিকপ্টার ভ্রমণের মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল খাওয়াদাওয়া—এমন কথা বললে ঠিক বলা হয় না। তিনি আসলে গিয়েছিলেন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। জাকারিয়া শিক্ষানিকেতন নামের ওই বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন। মাহমুদ সাহেবের রাজনৈতিক পরিচয় কুয়াশাচ্ছন্ন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির ভাষ্য হলো, মাহমুদ সাহেব একসময় ছাত্রলীগ করতেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক। কিন্তু কয়রা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জি এম মহসীন রেজা প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় রাজনীতি করছেন, কিন্তু আবদুল্লাহ আল মাহমুদ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন বা করেন, এমন কথা তিনি কখনো শোনেননি। কয়রা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মতিউর রহমানও আবদুল্লাহ আল মাহমুদের রাজনৈতিক পরিচয় জানেন না।
রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামানকে অত্যন্ত সমাদর করেন এবং সভাপতি সাহেবও যে তাঁর প্রীতিধন্য, তার একটা প্রমাণ হলো, ঢাকা থেকে বদিউজ্জামানকে কয়রা নিয়ে যাওয়া এবং অনুষ্ঠান শেষে আবার ঢাকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য মাহমুদ ভাড়া করেছিলেন একটি হেলিকপ্টার। কয়রাবাসী হেলিকপ্টার দেখে পুলকিত হয়েছেন, বিস্মিতও কম হননি। কারণ, হেলিকপ্টার অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি আকাশযান। গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিকে আনার জন্য কেন লাখ টাকা খরচ করে হেলিকপ্টার ভাড়া করা হয়েছে—এটা একটা স্বাভাবিক কৌতূহলের বিষয়। অবশ্য মাহমুদ সাহেবকে এই প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞাসা করেছেন কি না, তা জানা যায়নি। তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির কাছে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক যখন এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তখন তিনি কৈফিয়ত দিয়েছেন এই কথা বলে: ‘আমাকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে গেছে বলেই হেলিকপ্টারে গিয়েছি। গাড়িতে নিয়ে গেলে গাড়িতেই যেতাম।’
আমাদের স্মরণ করা উচিত যে প্রায় তিন মাস হতে চলল, বিএনপি-জামায়াতের ২০-দলীয় জোটের ডাকে দেশজুড়ে অবরোধ চলছে। শহরের মধ্যেই চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ, এক শহর থেকে আরেক শহর কিংবা গ্রামে যাওয়ার পথ আরও বিপৎসংকুল। পেট্রলবোমা ওত পেতে আছে সবখানে। ইতিমধ্যে শতাধিক মানুষ পেট্রলবোমা, ককটেল, আগুনে পুড়ে মারা গেছে। প্রচুর পোড়া মানুষ বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এহেন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিকে ঢাকা থেকে কয়রা নিয়ে যাওয়া এবং অনুষ্ঠান ও খাওয়াদাওয়া শেষে ফেরত পাঠানোর কাজে মাত্র লাখ খানেক টাকা খরচ করে হেলিকপ্টার ভাড়া করা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অসংবেদনশীলতার পরিচায়ক বইকি। হেলিকপ্টার যেহেতু পেট্রলবোমা থেকে নিরাপদ উচ্চতায় ওড়াউড়ি করে, অতএব ছাত্রলীগের সভাপতির জন্য হেলিকপ্টারই ছিল যথার্থ বাহন!
কিন্তু কয়রাবাসীর মনে হেলিকপ্টার দর্শনের চেয়ে কম বিস্ময়ের উদ্রেক হয়নি, যখন তাঁরা দেখতে পেলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি অনুষ্ঠান শেষে খাওয়াদাওয়া করতে গেলেন আবদুল্লাহ আল মাহমুদের সহোদর মনিরুজ্জামানের বাড়িতে। কারণ, মনিরুজ্জামান কয়রা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসমাজকল্যাণ সম্পাদক। তাঁর আরেক ভাই মোফাজ্জেল হোসেন জামায়াতে ইসলামীর একজন বড় হিতৈষী ও গোপন নেতা হিসেবে পরিচিত।
কয়রার লোকজন বিষয়টি ভালো চোখে দেখেননি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জি এম মহসীন রেজা তো সংবাদমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করেছেন এই বলে যে বিএনপি নেতার বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ঠিক কাজ করেননি। আর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মতিউর রহমান হতাশ হয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী কারও বাড়িতে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সভাপতি অংশ নিচ্ছেন, এটা আমরা ভাবতে পারি না।’
কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে যখন কার্যত দলীয় নেতা–কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে, যখন তাঁকে খাবার পাঠানোর পথেও বাধা সৃষ্টির অভিযোগ শোনা যায়, তখন বিএনপির এক উপজেলা নেতার বাড়িতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির সাদর আপ্যায়ন বিরাট দৃষ্টি উন্মোচনকারী ঘটনা বলে বিবেচিত হতে পারত। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা চক্ষু মেলে দেখতে পারতেন, বিএনপির একদম উপজেলা পর্যায়েও কত উদার ও মেহমানদার নেতা আছেন! তাঁরা তাঁদের মনে এই শুভবুদ্ধি জাগ্রত করতে পারতেন যে শত্রুতা ভালো নয়, বন্ধুত্বেই উভয় পক্ষের মঙ্গল! কিন্তু তা হওয়ার নয়। বরং কয়রাবাসী ভেবে পাচ্ছেন না, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির এই হেলিকপ্টার ভ্রমণ ও খাওয়াদাওয়ার মাজেজা কী।
মশিউল আলম: লেখক ও সাংবাদিক৷
mashiul.alam@gmail.com

গণতন্ত্রের সংকট by ড. আবদুর রহমান সিদ্দিকী

জাতি হিসেবে আমাদের স্বপ্ন ছিলো উদার গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরির। সেটি করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা কাম্য ছিলো না। গণতন্ত্রের জন্য তো নয়ই, এমনকি স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্যও এ পরিস্থিতি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ২-৩ বছর ধরে। তবে ‘ট্রিগারিং ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করেছে বিরোধী জোটের পল্টনের সেই জনসভা। জনসভাটি করতে দেয়া হলে হয়তো এ পরিস্থিতি উদ্ভব হতো না। সংকট উত্তরণে একরোখা মনোভাব, হার-জিতের প্রশ্নে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতো। রাজনৈতিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান জরুরি।
৫ই জানুয়ারি পল্টনে ২০ দলীয় জোটকে সমাবেশ করতে দিলে সরকারের তেমন কোন ক্ষতি হতো না। অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্মও হতো না। কর্মসূচি পালন করতে না পেরে বিরোধী দল ধৈর্য হারিয়েছে এবং কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য হলো সম্পর্কের যতই অবনতি ঘটুক না কেন, আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্র সংকটে পড়বে। মূলত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোনভাবেই বৈধতা পায়নি। লেজিটিমেসি হলো একটি সরকারের রক্ষাকবজ। সে সময় নিয়মরক্ষার নির্বাচনের কথা বলেও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। এতে বিরোধী জোট মনে করছে সরকার এক বছর ধরে ওয়াদা খেলাপ করেছে। সভা-সমাবেশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সরকারের কঠোরতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। এই সংকট উত্তরণে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে প্রথমে। কেননা জনগণের স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ দেখার গুরুদায়িত্ব সরকারের উপরই বর্তায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের উচিত ছিলো অনির্দিষ্ট বা দীর্ঘমেয়াদি কোন কর্মসূচি না দিয়ে ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দুই বা তিন দফায় ৭২/৯৬ ঘণ্টার কার্যকর অবরোধ-হরতাল দিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া। অনির্দিষ্টকালের অবরোধ সরকারকেই বরং সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। অপরপক্ষে যারা ‘গণতন্ত্র রক্ষার জন্য’ আন্দোলনে নেমেছেন তারাই পড়েছেন বিপাকে। সংকট উত্তরণের জন্য সরকারের উচিত অতিসত্বর বিরোধী জোটের সাথে আলাপ-আলোচনা করে উত্তরণের পথ বের করা। নতুবা অগণতান্ত্রিক শক্তির আবির্ভাব ঘটতে পারে। যা কোন পক্ষের জন্য সুখকর হবে না। সেই পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসারও কোন পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সিটি নির্বাচন বড় বা জাতীয় নির্বাচনকে আড়াল করার কৌশল হিসেবে নিয়েছে সরকার। তারা হয়তো বলবে এটা গণতন্ত্র এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ। অনেকটা রূপকথার নাকের বদলে নরুন দান।
ড. আবদুর রহমান সিদ্দিকী : অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন:
আসলাম-উদ-দৌল্লা

তামাশা by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, বিএনপির কাণ্ডটা দেখ। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিএনপি বলছে, এটা নাকি তামাশার নির্বাচন। তাই যদি হবে তাহলে তোমরা নির্বাচনে এলে কেনো?
আমি জানালাম, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা ক্ষমতার বদল চায়। এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন তামাশার কিনা জানি না। তবে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই তামাশার ব্যাপার।
চাচা রক্তচক্ষু তুলে তাকালেন আমার দিকে, তুমি কি বিএনপিতে নাম লিখিয়েছ?
চাচা! এই এক অদ্ভুত সমস্যা আমাদের। আমরা আমাদের চিন্তার বিপরীত বক্তব্যকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। এটা মোটেই গণতান্ত্রিক মানসিকতা নয়।
হু! এই বয়সে এসে তোমার কাছ থেকে গণতন্ত্রের সবক নিতে হচ্ছে। ঠিক আছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া তামাশা কেন, সেটা ব্যাখ্যা কর।
আমি বললাম, প্রথমত, সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বলা হচ্ছে নির্দলীয় নির্বাচন। এটা ডাহা মিথ্যা কথা। নির্দলীয় যদি হবে তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপিকে অংশগ্রহণের জন্য এত তোষামোদ করছেন কেন?
তারপর?
একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের সদস্যপদ ত্যাগ করে এই নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। হতে পারে তিনি একটি দলের সদস্য। কিন্তু তিনি ঐ দলের সংসদ সদস্য নন। সুতরাং তিনি সংসদ সদস্য থাকবেন কি থাকবেন না, এটা দলীয় প্রধানের বিষয় হতে পারে না। তাছাড়া একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদত্যাগ করতে চাইলে তাকে বাধা দেয়া হবে কেন? সংসদ সদস্য পদে পদত্যাগ করে মেয়র পদে নির্বাচন করায় বিধি-বিধান ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা নেই। তাই হাজী সেলিমকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়া আমার কাছে তামাশা মনে হয়।
তারপর?
গতবার ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়। অতঃপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার দীর্ঘ ছুটিতে আমেরিকা পাড়ি জমান। এবারও ভয় হচ্ছে, নির্বাচনকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয় বিদেশে চলে যাবেন কিনা! সেদিন টিভিতে দেখলাম, শত নাগরিক কমিটির ৬ জন প্রতিনিধি সিইসি’র সঙ্গে দেখা করার পর তিনি বলেছেন, যারা আত্মগোপনে আছে তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমার নয়। খুবই সত্য কথা। কিন্তু আত্মগোপনকারীদের খুঁজে বের করার দাবি তার কাছে কে করতে গেছেন? তাকে বলা হয়েছিল, বিরোধী দলের প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারেন ও ভোট দিতে পারেন, সে ব্যবস্থা করার জন্য। মূল বিষয়ের পাশ কাটিয়ে যাওয়া কি একরকম তামাশা নয়?
তারপর?
এখন পর্যন্ত যা আলামত দেখা যাচ্ছে তাতে নির্বাচন কমিশন সংবিধানে প্রদত্ত এবং তাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। স্পষ্টত: ক্ষমতাসীন দলের বিষয়ে তারা পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে বললে অত্যুক্তি বলা হবে না। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এক সভায় তাদের কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন, যেখানে মেয়র প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। এটা নির্বাচন বিধির বরখেলাপ বলা হলেও নির্বাচন কমিশন কোন ব্যবস্থা না নিয়ে চুপ করে আছে। মনে হয় এটা ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী তামাশা।
চাচা এতক্ষণ ধৈর্য সহকারে শুনছিলেন। মনে মনে তার ধৈর্যের প্রশংসা করলাম আমি। চাচা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি আর কিছু বলার আছে?
আছে। আরও অনেক কথা বলার আছে।
আজ তোমার কথা এ পর্যন্তই থাক। এবার আমি বলি।
বলুন।
তুমি কি চাও দেশটা জঙ্গি ও খুনিদের হাতে চলে যাক?
না। অবশ্যই না।
তাহলে এত অভিযোগ করছো কেন? কি চাও তুমি?
চাচা! আমি চাই আমাদের এই সুন্দর দেশটায় কেউ যেন কৌশলে ক্ষমতায় না যায় কিংবা জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে না থাকে। সবার অংশগ্রহণে এখানে সুন্দর ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন হতে হবে। ভয়-ভীতিহীন নির্বাচনে সবাই যেন ভোট দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল আমার কাম্য, আজ্ঞাবহ বিরোধী দল নয়।
এসবই সম্ভব যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে। কিন্তু তুমি আসল কথাটাই বললে না।
কী আসল কথা?
জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি! আমাদের এখন দরকার জনগণের আর্থিক সচ্ছলতা, জিডিপি’র হার বাড়ানো। এসব চাও না?
নিশ্চয়ই চাই।
তাহলে তোমার আর কিছু বলার নেই। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেশটা চালাতে দাও। দেখতে পাবে বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? তারপর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ ৫টি উন্নত দেশের তালিকায় উঠে যাবে।
মানে?
৫টি দেশ হলো আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ। আমরা তখন বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হয়ে যাব।
চাচা! আমরা তো তা দেখে যেতে পারব না।
কেন পারব না?
আমরা কি ততদিন বেঁচে থাকব?
অবশ্যই বেঁচে থাকব। আওয়ামী লীগের আমলে মানুষের গড় আয়ু কত বেড়ে গেছে জানো? আগামীতে আমাদের দেশের মানুষ একশ’ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। সুতরাং আমরা সবই দেখে যেতে পারব। আওয়ামী লীগ তো ২০৪১ পর্যন্ত তাদের সব পরিকল্পনা সাজিয়ে নিয়েছে। এতে জনগণের কিছু স্যাক্রিফাইস দরকার।
কী স্যাক্রিফাইস?
জনগণের উচিত নির্বাচন নিয়ে তর্কবিতর্ক না করে আওয়ামী লীগের হাতকে শক্তিশালী করা। আমাদের এখন একদফা। ‘আওয়ামী লীগের হাত শক্তিশালী কর, সোনার বাংলাকে উঁচিয়ে ধর।’
তাহলে গণতন্ত্র? বিব্রতকণ্ঠে আমি প্রশ্ন করলাম।
গণতন্ত্রের অর্থ কি? তুমি যদি পশ্চিমা ধরনের গণতন্ত্রের কথা বলো, তাহলে বলবো, ওটা আমাদের দেশে অচল। পশ্চিমের দিকে না তাকিয়ে আমাদের এখন পূর্বদিকে তাকাতে হবে।
পূর্ব দিক মানে?
মানে প্রতিবেশী মিয়ানমার, চীন, সিঙ্গাপুর-এদের দিকে। এদের দেশে কি গণতন্ত্র নেই? অবশ্যই আছে। আমরা গণতন্ত্রের বস্তাপচা পশ্চিমা ধারণাকে পালটে দিতে চাই। গণতন্ত্রের নতুন ধারণা বা কনসেপ্ট হচ্ছে, আগে উন্নয়ন ও পরে গণতন্ত্র।
চাচা! আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এখন তাহলে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কি হবে?
সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন? নির্বাচন হবে নির্বাচনের মতোই। ওটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দাও। সত্যি বলতে কি, আমাদের দেশের পুলিশ কর্মকর্তারা মূলত দার্শনিক।
পুলিশ কর্মকর্তারা দার্শনিক?
কথাটা শুনে তুমি আঁতকে উঠলে যে! আসলে আমি বলতে চাচ্ছি তারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। ভবিষ্যৎ নির্বাচনের কথা চিন্তা করে তারা নাশকতার মামলাগুলো সাজিয়ে রেখেছিলেন। বিরোধী দলের প্রার্থীরা তাতে নামে-বেনামে আসামি।
নামে না হয় বুঝলাম। বেনামে মানে?
মানে, বেনামীরা সবাই পুলিশের ‘অজ্ঞাতনামা’ তালিকায় আছে। নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে চাইলে তাদের কোন অনুমতি লাগবে না। অবশ্য পুলিশও ঠিকমতো আসামি প্রার্থীদের ভয় দেখাতে গ্রেপ্তার করার হুমকি দিয়ে চলেছে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা যাতে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে বা রাস্তায় না আসতে পারে সে জন্য পুলিশ তৎপর। যারা নাশকতা করে তাদের ভোট চাওয়ার ও ভোট দেয়ার কোন অধিকার নেই।
চাচা! পত্রিকায় দেখলাম, মাননীয় মন্ত্রীরা নির্বাচনের আচরণবিধি মোটেই মানছেন না। তারা রীতিমত ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
তোমার কথা মোটেই সত্য নয়। মন্ত্রীরা ঘরের ভেতর বসে সভা করছেন এবং তারা জনগণকে প্রকাশ্যে ভোট দেয়ার আহ্বান জানাননি।
কিন্তু চাচা! চট্টগ্রামে একজন পূর্ণমন্ত্রী বলেছেন, ‘যে করেই হোক আমাদের জিততে হবে। জিততে হবে এ জন্য যে, ১৫০ জন পেট্রোলবোমায় নিহত হয়েছেন। যদি পরাজিত হই তাহলে পেট্রোলবোমার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।’
এতে তুমি দোষের কি দেখলে, তা বুঝতে পারলাম না।
‘যে কোন প্রকারে হোক জিততে হবে’-মন্ত্রী মহোদয়ের একথায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।
কে বললো তোমাকে? চাচা মৃদু হেসে বললেন, প্রবাদ আছে ‘যুদ্ধ আর প্রেমে কোন নীতি-নৈতিকতার স্থান নেই।’ ভোটযুদ্ধ তো আসলে যুদ্ধই।
আমি বললাম এসব করে আওয়ামী লীগ জিততে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন হারবে। নির্বাচন কমিশনের ওপর এমনিতে মানুষের তেমন আস্থা নেই।
মানুষের আস্থা কি কমিশন ধুয়ে খাবে? ওদের ওপর সরকারের আস্থা থাকলেই হলো। নির্বাচনের পর সরকার দেশ-বিদেশে প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনের বৈধতা আনিয়ে দিলেই হলো।
চাচা! আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন এটা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। এতে দেশ-বিদেশের বৈধতা যোগাড়ের প্রশ্ন নেই।
তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল। এসব নিয়ে আসলে আমাদের চুপ করে থাকাই ভালো। সিটি করপোরেশনের মেয়র কে হলো না হলো, তাতে তোমার আর আমার কি আসে যায়? আমাদের কেবল দেখতে হবে দেশটা যেন স্বাধীনতা বিরোধীদের দখলে চলে না যায়।
স্বাভাবিক নির্বাচন হলে দেশ তো বিরোধীদের হাতে যেতেই পারে।
অ্যাবসার্ড। স্বাভাবিক নির্বাচনে যদি নাশকতাকারীদের জয় হয়, তাহলে সে নির্বাচন কেউ সাপোর্ট করতে পারে না।
এতে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই কিন্তু তামাশায় পর্যবসিত হয়ে যাবে।
তামাশার কথা বলে আজ তুমি আমাকে অনেক কিছু শুনিয়েছো। তামাশা শব্দটা কি খারাপ? মোটেই খারাপ নয়। হাসিমুখে চাচা বললেন, আমাদের দেশের জনগণ তামাশা খুব পছন্দ করে। তারা সারাক্ষণ তামাশার মধ্যে থাকতে চায়। টেলিভিশনের টক শোতে ও পত্র-পত্রিকার কলামে তামাশা দেখতে ও পড়তে চায়। রাজনীতিবিদদের কাছে তারা তামাশা ছাড়া আর কিছু আশা করে না। রাজনীতিবিদরাও তাদের সঙ্গে তামাশা করতে ভালোবাসেন।

বিএনপি কার্যালয়ে অন্যরকম দৃশ্য

শনিবার রাত পৌনে আটটার দিকে কার্যালয়ের তালা কেটে
ভেতরে ঢোকেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা
দীর্ঘ তিন মাস পর ফের সরগরম হয়ে উঠেছে নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ৯২ দিন বন্ধ থাকার পর গত শনিবার সন্ধ্যায় প্রধান ফটকের তালা কেটে কার্যালয় খোলেন দলের নেতাকর্মীরা। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কার্যালয়ে ধোয়া-মোছা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। তবে সকাল থেকেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন সারির নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে আসতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে পেয়ে একে অপরে কোলাকুলি করেন। কেউ কেউ একে অপরের সঙ্গে ছবি তুলেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালতের হাজিরা শেষে পল্টন কার্যালয়ে আসবেন- এমন সংবাদের ভিত্তিতে পল্টন এলাকা ও এর আশপাশেও নেতাকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে হাজিরা শেষে বাসায় ফিরে যান খালেদা জিয়া। শিগগিরই কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজকর্ম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এদিকে কার্যালয়ের সামনে ফের মোতায়েন করা হয়েছে এপিসি, জলকামান, পুলিশ ভ্যান। রয়েছে সাদা পোশাকের পুলিশসহ অর্ধশতাধিক পোশাকধারী পুলিশও। বেলা ১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে থেকে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি সরদার নুরুজ্জামানকে আটক করে ডিবি পুলিশ। গতকাল দুপুরে নয়াপল্টন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের ধোয়া-মোছার কাজ করছেন কর্মচারীরা। দীর্ঘ তিন মাসের জমানো ধুলার আস্তরণ পানি দিয়ে পরিষ্কার করেন। কার্যালয়ের আসবাবপত্র, চেয়ার, টেবিল, দরজা, জানালাও পরিপাটি করা হয়। তবে গতকাল পাঁচতলা ওই ভবনের শুধু নিচতলা ও তিনতলা আর সিঁড়িগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের কক্ষটিও পরিপাটি করে রাখা হয়েছে। চারতলা ও পাঁচতলায় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক, জাসাস ও মহিলা দল, শ্রমিক দলের দপ্তর খোলা হয়নি। এ ছাড়া দোতলার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কক্ষটিও খোলা হয়নি। এদিকে ৩রা জানুয়ারির পর থেকে মিডিয়া কর্মীরাও নয়াপল্টনমুখী হননি। গতকাল থেকে বিএনপির কার্যালয় ঘিরে মিডিয়া কর্মীদেরও আনাগোনাও বেড়েছে। টিভি ক্যামেরা আর ফটো সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাংবাদিকরা নয়াপল্টনে যান। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন জানান, গত শনিবার সন্ধ্যায় কার্যালয়টি খোলার পর রাত ১০টার দিকে বন্ধ করা হয়। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ধোয়া-মোছার কাজ চলে। দলের নেতাকর্মীরা আসছেন। শিগগিরই দাপ্তরিক কাজকর্মও শুরু হবে। নেতাকর্মীদের বাধা দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার্যালয়ের সামনে পুলিশ মোতায়েন করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। দুপুরে পুলিশ দলের একজন ছাত্রদল নেতাকে আটক করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মহিলা দলের নেত্রী বিলকিস নার্গিস জানান, অফিস এতদিন বন্ধ থাকায় এখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হচ্ছে। ধীরে ধীরে দলের বিভিন্ন সংগঠনের দপ্তরগুলোর তালা খুলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। আবারও নেতাকর্মীরা আসবেন। দলের কার্যালয় এভাবে চাঞ্চল্য ফিরে পাবে। সকাল থেকে কার্যালয়ে আসেন বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী আসাদ, সাবেক এমপি আবেদ রেজা, বিলকিস ইসলাম, শিরিন জাহান, ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, কৃষক দলের যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান সম্রাট, আমিনুল ইসলাম, সাযযাদ জামান, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মাহতাব হোসেন, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, ছাত্রদল সহ-সভাপতি নাজমুল হাসান, সহ-সভাপতি আলমগীর হাসান সোহান, অর্থ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, ছাত্রনেতা রজিবুল ইসলাম, যুবদল নেতা দিন মোহাম্মদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোজাম্মেল হোসেন মৃধা, যুবদল নেতা শহীদুল্লাহ তালুকদার, বিএনপি নেতা খলিলুর রহমানসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী কার্যালয়ে আসেন। তারা কিছুসময় কার্যালয়ে অবস্থান করে ফের ফিরে যান।
গত ৩রা জানুয়ারি রাতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে অসুস্থ অবস্থায় নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে আটক করে এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাই ডিবি পুলিশ। এরপর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কার্যালয়ের সামনে মোতায়েন করা হয় এসিপি, জলকামান, রায়ট কার ও পুলিশ ভ্যান। এক প্লাটুন পোশাকধারী পুলিশ কার্যালয়ের সামনে সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল। বিরোধী জোটের আন্দোলন চলাকালীন দলটির কোন নেতাকর্মীকে নয়াপল্টনমুখী হতে দেখা যায়নি। এদিকে ২রা মার্চ দুপুরে হঠাৎ করেই কার্যালয়ের সামনে থেকে পোশাকধারী পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়। কার্যালয়ের সামনে জলকামান ও পুলিশ ভ্যানও সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর শনিবার  সন্ধ্যা ৭টার দিকে কার্যালয় খুলতে যান আসাদুল করিম শাহীনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনে জড়িত মন্ত্রীর জামাতাকে রক্ষার জন্যই তদন্তে বিলম্ব

মন্ত্রীর জামাতাকে রক্ষা করতেই নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার অভিযোগপত্র জমা দিতে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বহুল আলোচিত এ মামলার বেশির ভাগ আসামি ধরা পড়েছেন, তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তদন্তকারী এ-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ হাতে পেলেও অভিযোগপত্র দিতে পারেননি। এ মাসের ২৭ তারিখ এ ঘটনার এক বছর পূর্ণ হবে।
মন্ত্রীর জামাতা হলেন র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ। সাত খুনে জড়িত থাকার কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। তাঁকে রক্ষার জন্য অভিযোগপত্র দিতে দেরি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ করে ফেলা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। তদন্তে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি।’
এদিকে মামলার অন্যতম আসামি নূর হোসেনকে ভারতের কারাগার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের ভেতরে কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে। তাঁকে ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ, সেটা কেবল দুই দেশের চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, নূর হোসেনকে প্রক্রিয়া মেনেই দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, এই মামলায় অনেক আসামি ধরা হয়েছে। শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছ থেকে পৌর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করেন র্যাব-১১-এর সদস্যরা। এরপর সাতজনেরই মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া যায়। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে দুটি মামলা করা হয়। অভিযোগ আছে, নূর হোসেনের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে তাঁর প্রতিপক্ষকে খুন করেছে র্যাব। নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এ মামলাটি তদন্ত করছে। জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মামুনুর রশিদ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, উপ-অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার এম এম রানাসহ র্যাবের ১৯ জন সদস্য রয়েছেন। বাকি ১১ জন মামলার প্রধান সন্দেহভাজন আসামি নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ বা বেতনভুক্ত কর্মচারী। নূর হোসেন বর্তমানে কলকাতার একটি কারাগারে বন্দী।
র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ বর্তমান সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর জামাতা। তারেক সাঈদ গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি খুনের ঘটনার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, শুরু থেকেই একটি প্রভাবশালী মহল এ ঘটনার সব দায় অন্য একজন কর্মকর্তার কাঁধে চাপাতে তৎপর হয়ে ওঠেন। মূলত এ কারণেই অভিযোগপত্র দেওয়ার ব্যাপার ‘ধীরে চলো নীতি’ গ্রহণ করে পুলিশ। এতে প্রায় এক বছর পেরিয়ে যায়। এখন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা তদন্ত গুছিয়ে ফেলেছে।
অবশ্য পুলিশের তদন্ত শেষ না হলেও র্যাব সদর দপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের বিভাগীয় তদন্ত শেষে প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে র্যাব-১১-এর ২১ জনকে দায়ী করা হয়েছে। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লাকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। শাহজাহান এখন সরকারি কর্মকমিশনের সচিব। কিন্তু সেই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ১৯ র্যাব সদস্যই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে তিন কর্মকর্তা ছাড়া বাকি ১৬ জন ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে জানান, তাঁরা শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মেনেছেন। হত্যা বা লাশ গুম করার চেষ্টার পেছনে ব্যক্তিগত লাভ বা অন্য কোনো কারণ ছিল না। তদন্ত দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এক ভাগে অপহরণ ও হত্যা। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন র্যাবের ১১ জন সদস্য। আর দ্বিতীয় ভাগে ছিল লাশ গুমের চেষ্টা। এখানে র্যাবের আটজন জড়িত ছিলেন। এর বাইরে ১৭ জন মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে র্যাবের ১২ জন। বাকি পাঁচজন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ নাগরিক। তিন কর্মকর্তার মধ্যে এম এম রানা শুধু অপহরণের সময় ছিলেন বলে স্বীকারোক্তিতে বলেছেন। বাকি দুজন পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলেন বলে স্বীকারোক্তিতে বলেছেন।
জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি স্পর্শকাতর ও বড় মামলা। সে জন্য সময় লাগছে। তবে তাঁরা মামলাটি আদালতের প্রমাণের জন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন এবং করছেন। নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন।
নূর হোসেনকে ফেরাতে চিঠি চালাচালি: নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলালয় ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠায়। গত বছরের নভেম্বরে ভারত এই চিঠির জবাব দেয়। জবাবে এ বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রক্রিয়া মেনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। এর পর থেকে উদ্যোগটি থেমে আছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নূর হোসেনকে ফিরিয়ে দিতে ভারত সরকারের কাছে আরও একটি চিঠি দিয়েছে। তবে এই চিঠির কোনো জবাব মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলাণয়ের একজন উপসচিব বলেছেন, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ভারতের আদালতে ২২ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য রয়েছে। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, নূর হোসেনকে দেশে ফেরানোর কাজটি খুব বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না।

ইয়েমেন থেকে আরেক দুঃসংবাদ by মিজানুর রহমান

ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা বন্ধে জাতিসংঘের আহবান
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে বাংলাদেশের কোন দূতাবাস না থাকায় যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল সেখানে নিযুক্ত অনারারি কনসাল। বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশীদের সম্মানীয় ওই দূত ও তার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছিল সরকার। বয়োজ্যেষ্ঠ কনসাল জেনারেল এবং তার ছেলের ফোন ও ই-মেইল সংযুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হেল্পলাইন’ চালুর ঘোষণা এসেছিল। ৩১শে মার্চের ওই সরকারি ঘোষণার পর থেকেই ফোন দুটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আটকা পড়া বাংলাদেশের কাছ থেকে ফোন বন্ধ পাওয়া সংক্রান্ত অব্যাহত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজ নিয়ে সরকার জানতে পারে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল জেনারেল সালেহ আল ঘালেবি মারা গেছেন। ১লা এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করলেও বাংলাদেশ গতকালই দুঃখজনক ওই খবরটি পায়। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বয়সজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন ইয়েমেনের ওই সম্মানীয় নাগরিক। দেশটির রাজধানী সানায় তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বাবার মৃত্যু-পরবর্তী বিভিন্ন কাজে স্বভাবতই কনসাল জেনারেলের শোকাহত ছেলে মোহাম্মদ আল ঘালেবি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হেল্পলাইনে থাকা তার ফোন নম্বরগুলোও ব্যস্ত হয়ে যায় জানিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিয়োগান্তক ওই ঘটনাটি জানার পর থেকে সরকার ভিন্ন ফর্মে বাংলাদেশীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টায় রয়েছে। তা ছাড়া হেল্পলাইনের অন্য নম্বরগুলো ২৪ ঘণ্টাই খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইয়েমেনের বাংলাদেশীদের উদ্ধারের বিষয়টি মনিটর করতে অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করছে জানিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে বলেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে কর্মীদের উদ্ধার পরিকল্পনায় বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। কুয়েত মিশনের একজন কর্মকর্তা ইয়েমেনের এডেন বন্দরের কাছে জেবুতিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশীদের নৌপথে জেবুতি নিয়ে আসার একটি পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা স্থগিত রেখে সানায় সৌদি কর্তৃপক্ষের অনুমিত নিয়ে একটি বিশেষ বিমান পাঠানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। এই কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় উদ্ধার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। অবশ্য অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের এখনও বের করে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশও সেটি পারবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কূটনীতিক।
ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতির আহ্বান রেডক্রসের
ওদিকে ইয়েমেনের ‘ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি’ মোকাবিলার সুযোগ করে দিতে ২৪ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে রেডক্রস। সহায়তা সংগঠনটির মধ্যপ্রাচ্য কর্মকাণ্ডের প্রধান রবার্ট মার্দিনি বলেন, অবিলম্বে লড়াই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন যাতে করে সব থেকে আক্রান্ত এলাকার পরিবারগুলো খাবার পানি বা স্বাস্থ্যসেবা নিতে বের হতে পারে। তিনি আরও বলেন, যেসব হাসপাতাল আহতদের সেবা দিচ্ছে তাদের ওষুধের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। আর অ্যাডেনের রাস্তাগুলো মৃতদেহে ঢেকে গেছে। মার্দিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের সহায়তা দ্রব্যাদি আর শৈল্যচিকিৎসকদের অবশ্যই দেশটিতে ঢুকতে দিতে হবে আর নিরাপদে সর্বাধিক আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে সহায়তা দেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। আর তা না হলে আরও মানুষ প্রাণ হারাবে। আহতদের বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে যদি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছায়, কয়েক দিন পর নয়। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস আরও জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি ও খাবার পানিরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, লড়াইয়ে আহত ২০০০ থেকে ৩০০০ ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছে তারা। ৪৮ টন মেডিক্যাল দ্রব্যাদি আর শৈল্য চিকিৎসার সরঞ্জাম পৌঁছানোর জন্য অবিলম্বে স্থল, নৌ ও আকাশপথ খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।