Saturday, September 27, 2025

১০৮ বছর পর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলো বৃটেন, বালফোর ঘোষণা পরবর্তী ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত by মাযিয়ার মোটামেদি ও ফেদেরিকা মারসি

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বালফোর ঘোষণা দিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতির জন্য ‘একটি জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানানোর ১০৮ বছর পর এবং বৃটিশ ম্যান্ডেটাধীন ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির ৭৭ বছর পরে এমন স্বীকৃতি দিলো বৃটেন। স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় রবিবার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা এমন এক পদক্ষেপ নিচ্ছি যা শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে জীবিত রাখবে।

যুক্তরাজ্যের অবস্থান পরিবর্তন: জুলাই মাসে বৃটিশ সরকার জানায়, তারা বহুদিনের নীতি থেকে সরে আসছে। সেই নীতিতে বলা হয়েছিল ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী মুহূর্তে’ স্বীকৃতি দেয়া হবে। কিন্তু শর্ত ছিল- ইসরাইলকে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং অবরুদ্ধ উপত্যকায় আরও বেশি ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। এরপরও গাজায় পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়কর আকার ধারণ করে। ইসরাইলি সেনারা গাজা নগরী ধ্বংস করে দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুধার্ত ও বাস্তুচ্যুত জনগণকে অনাহারে রাখছে। পশ্চিম তীরেও প্রতিদিন ইসরাইলি সেনা অভিযান এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা চলছে। একইসাথে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল ও পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি যুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ‘দাফন’ করতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঢেউ: এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮০তম অধিবেশন শুরু হওয়ার দু’দিন আগে এ ঘোষণা আসে, যেখানে ইসরাইলের দশকব্যাপী দখল ও বর্ণবৈষম্যের পর ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব বড় আলোচ্য বিষয় হবে।

বৃটিশ নেতাদের বক্তব্য:
স্টারমার জানিয়েছেন, হামাস নেতৃত্বের সিনিয়র ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, হামাসের কোনো ভূমিকা ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনে থাকবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেন, এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আমাদের অবিচল দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছেদ্য অধিকারকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি সতর্ক করে বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ এই নয় যে রাতারাতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা এই পদক্ষেপ নিচ্ছি কারণ আমরা চাই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা টিকে থাকুক।

ফিলিস্তিনের প্রতিক্রিয়া: ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য আশা- একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের আশা। এটি একইসাথে প্রমাণ করে যে ইসরাইলের আমাদের ভূমিতে কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। তিনি আরও বলেন, ইসরাইল মানবতার অস্তিত্বের ওপর পরিকল্পিত আঘাত চালাচ্ছে, যাতে ফিলিস্তিনি জনগণ, তাদের সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ মুছে ফেলা যায়। বৃটেনের সংসদে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি লায়লা মোরান বলেন, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এক অবিচারের সংশোধন হলো রোববার। তবে তিনি এটিকে যাত্রার শুরু মাত্র বলে উল্লেখ করেন এবং যোগ করেন, আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে একটি গণহত্যা ঘটতে হয়েছে, যা হওয়া উচিত ছিল না।

ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই স্বীকৃতিকে হামাসের জন্য একটি ‘পুরস্কার’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি ঘটবে না। (অর্থাৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে না)। জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। উগ্রপন্থি মন্ত্রীরা নেতানিয়াহুকে পশ্চিম তীর দখলের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, তিনি অবিলম্বে ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের প্রস্তাব দেবেন। অন্যদিকে ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের মন্ত্রী ইসহাক ভাসারলাউফ দাবি করেন, ইসরাইলের ভূমি একচেটিয়াভাবে ইহুদি জাতির। ফিলিস্তিনি জনগণ বলে কিছু নেই, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও নেই।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই স্বীকৃতির বিরোধিতা করেন এবং জানান এটি তাদের কয়েকটি মতভেদযুক্ত বিষয়ের একটি। আজ সোমবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ফ্রান্স ও সৌদি আরব যৌথভাবে একদিনের সম্মেলন আয়োজন করছে। সেখানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান অগ্রসর করার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার এ উদ্যোগ ইসরাইলি উগ্রবাদীদের পশ্চিম তীর দখলের পথে আরও উস্কে দিতে পারে, যদিও আন্তর্জাতিক চাপ ও নিন্দা ক্রমেই বাড়ছে।
(অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)

https://mzamin.com/uploads/news/main/181235_bls.webp

ইসরায়েল-তুরস্কের বিরোধে সিরিয়া কি ভাগ হয়ে যাবে by মার্কো কার্নোলোস

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে নজর দিলে মনে হতে পারে, ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। একই কথা বলা যায় তুরস্কের ক্ষেত্রেও। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পরিস্থিতি কি স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে, নাকি সামনে আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরান—বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেও ইসরায়েল এ মুহূর্তে এগিয়ে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষকে’ বিশৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে এখন সিরিয়া শাসন করছেন আল-কায়েদার সাবেক নেতা। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাঁর ভাবমূর্তি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ‘পরিষ্কার’ করে নিয়েছে। আইএস ও হায়াত তাহরির আল-শামের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েক দশকের অবস্থান কয়েক দিনের মধ্যে আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলা হয়, যেটা পশ্চিমাদের দ্বিচারিতাকে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।

তুরস্কে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়া থেকে বাশার আল-আসাদকে সরাতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়েছে। তাঁর জায়গায় এসেছেন আহমেদ আল-শারা। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ভাবমূর্তি আরও মজবুত করেছে আঙ্কারা।

ইসরায়েলের পাশাপাশি তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ আঞ্চলিক ক্রীড়নক। ফলে অত্যন্ত অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে গেলে অনিবার্যভাবেই তুরস্ক ও ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর দুটি দেশই মার্কিন চাপ উপেক্ষা করতে প্রস্তুত, যেটা অধিকাংশ মিত্রদেশের কল্পনারও বাইরে। তুরস্কে অবশ্য ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। আঙ্কারার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা ইসরায়েলকেই অগ্রাধিকার দেবে।

এ সমীকরণে সিরিয়া বড় একটা পরীক্ষার ময়দান হতে পারে। গত মাসে দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজ ও বেদুইন সম্প্রদায়ের সংঘর্ষের মধ্যে ইসরায়েল সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর অবস্থানে বিমান হামলা চালায়। যদিও ইসরায়েল বলেছে, এর লক্ষ্য দ্রুজদের রক্ষা করা। আসল উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চলকে নিরস্ত্র করে নিজেদের ‘নিরপেক্ষ অঞ্চল’ বাড়ানো।

এর বাইরে আসাদের পতনের পরপরই ইসরায়েল কোনো উসকানি ছাড়াই একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো সে সময় স্বাভাবিকভাবেই নীরবতা বজায় রেখেছিল।

সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ সিরিয়ার ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সতর্ক করেছেন, দ্রুজরা (যাদের আঙ্কারা ইসরায়েলের সহযোগী মনে করে) যদি সিরিয়াকে বিভক্ত বা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তবে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এমন জল্পনাও রয়েছে যে ইসরায়েল ১৯৭৪ সালে সিরিয়ার সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল করে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করতে চায়। এর মাধ্যমে ইসরায়েল গোলান মালভূমিতে অন্তর্বর্তীকালীন পাঁচ বছরের জন্য অবস্থান করতে চায়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ইসরায়েল সহজেই এসব ‘অস্থায়ী’ ব্যবস্থাকে স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করে। সেটা যেমন দামেস্কের জন্য উদ্বেগজনক, আবার আঙ্কারার জন্যও।

এদিকে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক দ্রুজ দমন অভিযান কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গোষ্ঠীটি আশঙ্কা করছে, পরের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তারা। যদিও এখন পর্যন্ত মার্কিন সুরক্ষা গোষ্ঠীটি তাদের পাশে রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে তুরস্ক শারার পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে মনে হয় না। আবার ইসরায়েলের সঙ্গে প্রভাবক্ষেত্র ভাগাভাগি নিয়ে আপস করতেও তারা রাজি হবে কি না, সেটাও অনিশ্চিত।

এ বাস্তবতায় আমরা একটা কাল্পনিক ভাগাভাগির কথা চিন্তা করতে পারি। দামেস্কের উপকণ্ঠ পর্যন্ত সিরিয়ার দক্ষিণাংশ ইসরায়েলের প্রভাবে চলে যেতে পারে। আর ইউফ্রেতিসের পূর্ব দিকে এসডিএফের প্রধান ঘাঁটি এলাকা ছাড়া বাকি অংশ তুরস্কের প্রভাবে চলে যাবে। এ অবস্থায় এসডিএফ মার্কিন সমর্থনের ওপর ভরসা রাখবে, যা তুর্কি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের ঢাল হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা কীভাবে কার্যকর হবে, সেটাই প্রশ্ন।

এ অঞ্চলে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির বড় পরীক্ষা আসতে পারে। ওয়াশিংটন সম্ভবত একটি সমন্বিত কৌশলের দিকে এগোচ্ছে।

ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে তুরস্কের সংশয় অবশ্যই আগের মতোই গভীর। আঙ্কারার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা ইসরায়েলকেই অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র কি পারবে মধ্যপ্রাচ্যে তার দুই আঞ্চলিক মিত্রকে গভীরভাবে বিভক্ত সিরিয়ায় নিজ নিজ প্রভাববলয় তৈরির প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে? কেননা যেকোনো সময়ই এ বিভাজন আরেকটি বড় সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দিতে পারে।

● মার্কো কার্নোলোস, ইতালির সাবেক কূটনীতিক। তিনি সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-12-19%2Fxq2pjx9p%2Ferdoganneta.jpg?rect=73%2C0%2C720%2C480&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি : এএফপি

চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড: ট্রাম্প কি দাঙ্গা–ফ্যাসাদকেই নীতি হিসেবে নিয়েছেন by জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার

যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দিন আগে কট্টর ডানপন্থী নেতা চার্লি কার্ককে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দেশের দুই রাজনৈতিক শিবির (ডানপন্থী ও বামপন্থী) শান্তভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালেও এটি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভারসাম্য নেই। কারণ, ডানপন্থী অনেক নেতা, এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও খুনির পরিচয় বা উদ্দেশ্য না জেনেই সরাসরি বামপন্থীদের দোষারোপ করেছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ডাক দিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রায় এক দশক ধরে ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন, তাঁর সমর্থকদের রাজনৈতিক সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় এবং কখনো কখনো এমন সহিংসতা পুরস্কৃতও হতে পারে। এর অনেক উদাহরণ আছে।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত বহু সহিংস অপরাধীকে ট্রাম্প ক্ষমা করে দিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা এসব কর্মকাণ্ডকে সহিংসতা না বলে এগুলোকে বৈধ, এমনকি দেশপ্রেমিকদের আত্মরক্ষার কাজ হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের এমনভাবে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরে আসছেন, ঠিক যেমন অন্য ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদীরাও নিজেদের সব সময় ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন।

চার্লি কার্ক হত্যার পর কিছু বামপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশোভন মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বিদ্রূপ করে বলেছেন, কার্ক নিজেই বলেছিলেন, বন্দুক হামলায় মৃত্যু মানা যেতে পারে। কারণ, এটি অস্ত্র রাখার অধিকার নিশ্চিত করার মূল্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে, উদারপন্থী লেখক ও সমালোচকেরা শুধু সহিংসতাকে নিন্দা করেননি; বরং কার্ককে একজন সৎ বিতর্ককারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিপরীতে ডানপন্থী অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দমননীতির ডাক দিয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি ‘যুদ্ধের’ কথাও বলেছেন। এমনকি এফবিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা জে এডগার হুভারের বেআইনি কৌশল অনুসরণ করতে হবে, এমন বক্তব্যও দিয়েছেন।

আরও উদ্বেগজনক হলো ট্রাম্প নিজেই এ হত্যাকাণ্ডকে নিজের অপছন্দের সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর ওপর আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য আগেই ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করেন না। তাই বিরোধীদের বিচারের হুমকি শুধুই ডেমোক্র্যাটদের জন্য নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সবার জন্যই ভয়ংকর সংকেত।

ট্রাম্প শুধু আইন অমান্য করেননি, বারবার রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকিয়েছেন। ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে কাউকে গুলি করার কল্পনা করা, সমর্থকদের বিরোধীদের মারধর করানোর আহ্বান, ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে সহিংস শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের ‘ভালো মানুষ’ বলা, এমনকি ৬ জানুয়ারি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি দেখেও আপত্তি না করা—সবই এর প্রমাণ। এসব উসকানি দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাঁর লক্ষ্য ছিল।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল নিষ্ঠুরতার বড় প্রদর্শনী। এবার তাঁর প্রশাসন সরাসরি সহিংসতার বন্দনা করছে। ভেনেজুয়েলার উপকূলে ১১ জনকে কোনো আইনি কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে এবং সে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দের সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়মিতভাবে এমন ছবি ছড়াচ্ছে, যেখানে প্রিয়জনদের জোর করে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের পরিবারের মানুষদের কষ্ট দেখানো হচ্ছে। এক পোস্টে দেখা গেছে, আইসিইয়ের কর্মীরা নাৎসি হেলমেট পরে ছবি তুলছেন। ট্রাম্প হয়তো এবার তাঁর অনুসারীদের জন্য সব বাঁধন খুলে দিচ্ছেন। কারণ, তিনি নিজেই আইন ও নিয়মকে অগ্রাহ্য করে চলেছেন।

দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প নিজেকে অপরাধী না বলে ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাচ্ছেন। তাঁর পেছনে পুরো এক ‘অভিযোগ ইন্ডাস্ট্রি’ কাজ করছে। ফক্স নিউজ থেকে শুরু করে টক-রেডিও—সব জায়গায় প্রচারকেরা বলছেন, ট্রাম্পপন্থীদের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। এই ভুক্তভোগিতাকেই এখন সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। কিছু লোক হয়তো তা চাইছে বা তার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু জরিপ দেখাচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার বিপক্ষে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্পের ওপর হামলার পরও সহিংসতার প্রতি সমর্থন কমেছে।

অনেকে আশা করেন, ট্রাম্প একদিন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ঐক্যের পথ ধরবেন। কিন্তু কার্ক হত্যার রাতের ঘটনা দেখাচ্ছে, ট্রাম্পের বিভাজনমূলক কৌশল চলতে থাকবে। দুর্ভাগ্য হলো, এখন তাঁর প্রশাসন ‘মতবিরোধের স্বাদ’ নয়; বরং ‘নিষ্ঠুরতার স্বাদ’ প্রচলিত করছে। আর কিছু মানুষ সেটিকেই গ্রহণ করছে।

● জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

২০২৪ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চার্লি কার্ক
২০২৪ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চার্লি কার্ক। ছবি: এএফপি

তুরস্ক যে কারণে নিজেদের ইসরায়েলের চূড়ান্ত টার্গেট মনে করছে by বাসিল আল মুহাম্মেদ

মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে ইসরায়েল সম্প্রতি সিরিয়ার দামেস্ক ও সুওয়াইদার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে যে সুওয়াইদায় দ্রুজ মিলিশিয়া ও সুন্নি বেদুইন উপজাতিদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুজদের রক্ষা করতে এই হামলাগুলো চালানো জরুরি ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার ফলে নতুন করে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তুরস্ককে একটি নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। আঙ্কারা এখন সিরিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর তাদের কৌশলগত অবস্থান পুনরায় মূল্যায়ন করছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সিরিয়ার রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে তুর্কি রাজনীতিবিদেরা নজিরবিহীন চাপের মধ্যে রয়েছেন।

দ্য নিউ আরবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুর্কি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এরসান এরগুর ব্যাখ্যা করেছেন যে সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এখন তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভিত্তিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আঙ্কারা এখন আর সিরিয়ার ইস্যুকে কেবল একটি বৈদেশিক নীতির বিষয় হিসেবে দেখে না, বরং এটিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার বিষয় হিসেবে দেখে।’ তিনি আঞ্চলিক বিভাজন থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া এবং আবার তুরস্কে শরণার্থীর ঢল নামতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন।

এরগুর বলেন, তুরস্কের কৌশলটি তার ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তুরস্কের এ প্রকল্পটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে। তুরস্কের ভূরাজনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্কগুলো সঙ্গে গভীর যুক্ততার কারণে আঙ্কারা সিরিয়াকে স্থিতিশীল করতে চায়। এটি শুধু তার সীমান্ত রক্ষা করার জন্য নয়, বরং তার আশপাশে ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর উত্থান রোধ করার জন্যও।

এরগুর আরও বলেন, তুর্কি নীতিনির্ধারকেরা সিরিয়ায় ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকে বিপজ্জনক উসকানি হিসেবে দেখছেন। এ হামলার লক্ষ্য হলো, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত উত্তেজনা পুনরায় উসকে দেওয়া। এমন পরিস্থিতি আরও একটি গৃহযুদ্ধ শুরু করতে পারে এবং তুরস্কে বর্তমানে আশ্রয় নেওয়া ৩৫ লাখ সিরীয় শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সিরিয়ার ওপর ইসরায়েলি হামলার দ্রুত নিন্দা জানিয়েছে আঙ্কারা। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তেল আবিবের বিরুদ্ধে দ্রুজ–সংকটকে ব্যবহার করে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়া এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলার অভিযোগ করেছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও একই সুরে কথা বলেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে যে চলমান উত্তেজনা বৃদ্ধি শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে এবং আরও বড় আঞ্চলিক সংকট তৈরি করতে পারে। আঙ্কারা সিরিয়ার পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলে তার প্রতিরক্ষা সহায়তার জন্য প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে সিরিয়ার স্থিতিশীলতা সব প্রতিবেশী দেশের জন্য অপরিহার্য।

তুরস্ক ইসরায়েলের সম্প্রসারণ ঠেকিয়ে দিচ্ছে

তুর্কি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এরগুর যুক্তি দিয়েছেন যে তুরস্কের সিরিয়া নীতি আত্মরক্ষার বাইরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। যেটি আঙ্কারাকে ইসরায়েলি আধিপত্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবিলার জন্য একটি মূল আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল স্থানীয় মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে এবং দামেস্কের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে ভেঙে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এখানে ইসরায়েলের জন্য তুরস্ক হচ্ছে শেষ অবশিষ্ট বাধাগুলোর মধ্যে একটি।’

তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা কাহিত তুজ এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করে দ্য নিউ আরবকে বলেছেন যে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার সম্প্রসারণের জন্য তুরস্ককে একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বাধা হিসেবে দেখে। তুজ সতর্ক করে বলেন, ‘গাজা ছিল কেবল শুরু। এরপর এসেছে লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়া। কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো স্বয়ং তুরস্ক।’ তিনি আরও বলেন যে আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিশেষ করে তার ড্রোনশিল্প, ইসরায়েলকে চিন্তিত করে তুলেছে।

এই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি ইসরায়েলের নাগেল কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়, যেখানে সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাবকে ইরানের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আঙ্কারা-সমর্থিত সিরিয়ার সরকার ইসরায়েলি স্বার্থের জন্য সরাসরি হুমকি হতে পারে।

এরগুরের মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকে কেবল একটি কৌশলগত অভিযান হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বোঝা উচিত। তেল আবিব সিরিয়াকে বিভক্ত করার জুয়া খেলছে। আর আঙ্কারা তাকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ওপর বাজি ধরছে—দুটি উদ্দেশ্যেই, আঞ্চলিক প্রভাব তৈরি করা ও তার দোরগোড়ায় ইসরায়েলি দুঃসাহসিকতার নেতিবাচক প্রভাব এড়ানো।

ইসরায়েলের ‘ডেভিড করিডর’ পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক তাহা ওউদা ওগ্লু বলেছেন যে সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে একটি নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

তাহা ওউদা ওগ্লু সতর্ক করে বলেন যে ইসরায়েল সম্ভবত এমন একটি পরিকল্পনা নিয়েছে, যাকে কিছু আঞ্চলিক বিশ্লেষক ‘ডেভিড করিডর’ বলছেন। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সুওয়াইদার মাধ্যমে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সংযোগ স্থাপন করা। সিরিয়ার মূল ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সম্প্রসারণকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য তেল আবিব এখানে ধর্মীয় বয়ান ব্যবহার করছে। ওউদা বলেন যে আঙ্কারায় এ প্রকল্পটিকে একটি প্রকৃত কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

কথিত আছে, সুওয়াইদার সংঘর্ষ চলাকালীন দ্রুজ আধ্যাত্মিক নেতা হিকমত আল-হিজরি কুর্দি ফোর্সের (এসডিএফ) পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছেও সহায়তা চেয়েছিলেন। ওউদা এই সংযোগকে তুর্কি কর্মকর্তাদের দ্বারা দামেস্ককে দুর্বল করতে এবং আঙ্কারাকে পাশ কাটিয়ে একটি কার্যত বাফার জোন তৈরির জন্য ইসরায়েলি-কুর্দি প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সুওয়াইদার অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ সিরিয়ায় নিজেদের অবস্থান সম্প্রসারণের জন্য এসডিএফকে সতর্ক করেছেন। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার জাতীয় নিরাপত্তাকে অন্যদের সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে রাখার এবং ভূরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেন।

ওউদার মতে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই বার্তাকে আরও দৃঢ় করেছেন এই বলে, তুরস্ক তার দক্ষিণ সীমান্তে কোনো ‘সন্ত্রাসী করিডর’ সহ্য করবে না—যা তথাকথিত ডেভিড করিডরের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

দামেস্কের প্রতি পূর্ণ সমর্থন

দামেস্কের প্রতি তুরস্কের নীতি স্পষ্ট ও দৃঢ়। আঙ্কারা আহমেদ আল-শারার অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে, তাকে এমন একজন স্থিতিশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখছে, যিনি সিরিয়ার পুনরায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে পতন রোধ করতে সক্ষম।

২২ জুলাই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সুওয়াইদা সংকটে পদক্ষেপের জন্য শারার প্রশংসা করেন, বিশেষ করে দ্রুজ নেতাদের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর জন্য একটি বোঝাপড়া তৈরির সাফল্যকে সাধুবাদ জানান। এরদোয়ান বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শারা কোনো ছাড় দেননি এবং একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইসরায়েল এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায় না এবং আমাদের এই প্রকল্পের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

ওউদা ওগ্লুর মতে, এটি আঞ্চলিক খেলোয়াড় ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি এরদোয়ানের একটি স্পষ্ট বার্তা, ‘শারার সরকার অস্থিতিশীল হলে তুরস্ক চুপ থাকবে না।’ তিনি যুক্তি দেন যে আঙ্কারা শারাকে সিরিয়ার ঐক্য পুনর্গঠনের জন্য একজন বৈধ অংশীদার হিসেবে দেখছে এবং তাকে দুর্বল করার যেকোনো ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য সরাসরি হুমকি মনে করছে।

সাবেক উপদেষ্টা কাহিত তুজও এই কথার প্রতিধ্বনি করে বলেন যে সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে আঙ্কারা দ্রুত কূটনৈতিক সংযম ত্যাগ করতে পারে। এখন পর্যন্ত তুরস্ক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু যদি এই আগ্রাসন চলতে থাকে, তবে এটি তুর্কি স্বার্থ এবং অঞ্চলের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

* বাসিল আল মুহাম্মেদ, তুরস্কভিত্তিক সিরীয় সাংবাদিক।
- দ্য নিউ আরব থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।

রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স