Thursday, November 15, 2018

বানানো নগ্ন ছবি ফেসবুকে, ক্ষোভে বিদায় নিলেন অভিনেত্রী

ফেসবুক ব্যবহার করতেন নিয়মিত। হঠাত্ই দেখলেন প্রোফাইলে ‘নিজের’ নগ্ন ছবি! বানানো ওই ছবি দেখে রাগে, ক্ষোভে ফেসবুক থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অভিনেত্রী। তিনি কবিতা কৌশিক।
ফেসবুক ছাড়ার আগে দীর্ঘ বার্তায় নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন কবিতা। তিনি লিখেছেন, ‘ফেসবুক এমন একটা মাধ্যম যেখানে বহু অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও কথা হয়। সেখানেই যদি নিজের বানানো নগ্ন ছবি কেউ দেখেন… আমার কাছে এটা অপমানজনক, রুচিবিরুদ্ধ। আমার সত্যিই মনে হচ্ছে, এখানে আমি বেমানান। বিদায় বন্ধুরা…।’
‘কুটুম্ব’, ‘কহানি ঘর ঘর কি’, ‘তুমহারি দিশা, ‘রিমিক্স’, ‘ইয়ে মেরি লাইফ হ্যায়’, ‘সিআইডি’, ‘কুমকুম’-এর মতো অসংখ্য টেলিভিশন ধারাবাহিক বা শো-এ কবিতাকে দেখেছেন দর্শক। ‘এক হাসিনা থি’, ‘মুম্বই কাটিং’-এর মতো কয়েকটি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন।
তাঁর এ হেন পদক্ষেপে অবাক অনুরাগীরা।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ হেন ঘটনা এই প্রথম নয়। আর আগেও বিকৃত ছবি শেয়ার করার ঘটনা ঘটেছে। গোটা ঘটনাটি নিয়ে সাইবার ক্রাইমে অভিযোগ জানাবেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন কবিতা।
সুত্র- আনন্দবাজার

আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

আসন্ন বিশ্ব ইজতেমার স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ও তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আজ দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষকে নিয়ে বসা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে ধর্ম সচিব মো. আনিছুর রহমান সাংবাদিকরে বলেন, নির্বাচনী বছর ও তাবলিগ জামাতের মধ্যে বিদ্যমান দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এছাড়াও চলতি বছর নির্বাচনী বছর হওয়ায় সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ। এসব বিবেচনায় তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষই জানুয়ারিতে আলাদা আলাদা তারিখে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা করার ঘোষণা দিয়েছে। এ দ্বন্দ্ব নিরসন করতে তাবলিগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল ভারত যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ধর্ম সচিব বলেন, নির্বাচন শেষ হলে দুই পক্ষ বসেই তারিখ নির্ধারণ করবে।
সেক্ষেত্রে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মাওলানার ফরীদ উদ্দীন মাসঊদসহ তাবলিগের মুরব্বিরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, ভারতের তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভি অনুসারীরা গত বিশ্ব ইজতেমার পর ২০১৯ সালের বিশ্ব ইজতেমার জন্য ১১, ১২, ও ১৩ জানুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেন। অন্যদিকে ভারতে মাওলানা সাদবিরোধীরা ও হেফাজতপন্থী কওমি আলেমদের নিয়ে সম্প্রতি ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে জানুয়ারির ১৮, ১৯ ও ২০ ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করেছিল। একইসঙ্গে দুই পক্ষই পৃথক তারিখে জেলা ভিত্তিক জমায়েতের তারিখ নির্ধারণ করেছিল। আর এই জমায়েতকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে তাবলিগ জামাতের মুরব্বিদের মধ্যে শুরা সদস্য মাওলানা যুবায়ের আহমদ ও সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
আলেমদের মধ্যে শোলাকিয়া ঈদগাহর খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ও গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল হাসানও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন, পুলিশের আইজি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ধর্মসচিব, সেতু বিভাগের সচিব, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ আবদুলল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কথা বিবেচনা করে ইজতেমার তারিখ আপাতত চূড়ান্ত না করার অনুরোধ করেন। নির্বাচনের পর যথাসময়ে ইজতেমা হবে এমন আশ্বাস দেন।

ইসরায়েলে ‘ইহুদি-নাৎসি প্রবণতা’র উত্থান ঘটছে: চমস্কি

ইসরায়েলে ‘ইহুদি-নাৎসি’ প্রবণতার উত্থান হচ্ছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিখ্যাত ইহুদি বুদ্ধিজীবী নম চমস্কি। গত সপ্তাহে আই টোয়েন্টিফোর নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক সমালোচক, ভাষাবিদ ও পণ্ডিত চমস্কি আরেক ইহুদি পণ্ডিত ইয়েশায়াহু লেইবোবিৎজ’র সতর্ক বাণীর পুনরাবৃত্তি করেন। চমস্কি নির্যাতিত ও অত্যাচারীর ভিত্তিতে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের নিষ্ঠুর দখলদারিত্বের অমানবিক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
লেইবোবিৎজকে এই বছর ইসরায়েল প্রাইজের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। তার বিষয়ে বলতে গিয়ে চমস্কি বলেন, ‘‘লেইবোবিৎজ সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ‘যদি দখলদারিত্ব চলতে থাকে তাহলে ইসরায়েলিরা ‘ইহুদি-নাৎসি’তে রুপান্তরিত হবে’।’’ চমস্কি তার ‘ইহুদি-নাৎসি’ শব্দটিকে একটি ‘শক্তিশালী পরিভাষা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, এইভাবে ইসরায়েলকে বর্ণনা করা হলে বেশিরভাগ মানুষই তা থেকে নিস্তার পাবে না। চমস্কি ব্যাখ্যা করেন, লেইবোবিৎজের এই অবস্থানের কারণেই তিনি রাগান্বিত না হয়েই ইসরায়েল সম্পর্কে কথা বলতে সমর্থ ছিলেন।
লেইবোবিৎজ ইসরায়েলের একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, প্রাণরসায়নবিদ ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালে জেরুজালেমে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ইহুদি মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও জায়নবাদই বেশি পূজনীয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া ফিলিস্তিনি এলাকায় ইসরায়েলের চালানো দখলদারিত্বকে তিনি প্রকৃতগতভাবে ‘ইহুদি-নাৎসি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
১৯৫৩ সালে কিবয়া গ্রামে ভয়ঙ্কর ইসরায়েলি কমান্ডো ইউনিট ১০১ হামলা চালিয়ে ৬০ জনকে হত্যা করে। নিষ্ঠুরতার জন্য ওই ঘটনায় পরিচিত। ওই সময় লেইবোবিৎজ বলেন, ‘আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে, আমাদের এই তরুণরা কোথা থেকে এসেছে, যাদের মধ্যে এই নৃসংশতা চালানোর বিষয়ে কোনও মানসিক সংশয় নেই? এই ধরনের কাজ করার জন্য ভেতরকার কোন প্রেরণা তাদের মধ্যে কাজ করেছে? এই তরুণরা কোনও উচ্ছৃংখল জনতা নয়, তারা জায়নবাদী সামাজিক শিক্ষার ফল।’
লেইবোবিৎজ’র কথা সঙ্গে সুর মিলিয়ে চমস্কি বলেন, ‘যদি আপনি কারও গলায় পা দিয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে অবশ্যই তার বৈধতা দেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে’। লেইবোবিৎজ’র সতর্কতার পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের দোষারোপ করা চলমান দখলদারিত্ব, মানুষকে অপমান করা ও ইসরায়েলি সরকারের সন্ত্রাসী হামলারই প্রতিফলন’।
ভাষাতত্ত্ববিদ নম চমস্কি বলেন, এখন ইসরায়েলি দখলদারির সমালোচনা করলেই তাকে দেশদ্রোহী অ্যাখ্যা দেওয়া হয়। এই ব্যাপারটির কারণে রাজনৈতিক বৈচিত্র্যতা থেকে বিকল্পপন্থীরা দৃশ্যত হারিয়ে গেছে। গাজা উপত্যকার পরিস্থিতির বিরোধিতার ঘটনায় বিরোধিদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নকরণকে একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আর গাজা উপত্যকাকে তিনি একটি ‘বন্দি শিবির’ হিসেবে মনে করেন।
চমস্কি বলেন, ‘গাজার কথাই ধরুন। যদি আপনি ২০ লাখ মানুষকে একটি বন্দি শিবিরে আটকে রাখেন আর যদি সহিংস অবরোধ আরোপ করেন তাহলে তার কী প্রভাব পড়বে? আপনার নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে- আমি কি এই কাজকে বৈধতা দিচ্ছি? যেসব মানুষ এর বিরোধিতা করেন তাদের দেশদ্রোহী, আরবপ্রেমীসহ আরও নানা কিছু বলা হয়। আমি আপনাদের উদাহরণ দেবো না, আপনারা ইউরোপীয় ইতিহাসেও এই ব্যাপারটি লক্ষ্য করতে পারবেন।’
ইসরায়েলি সমাজে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে, নিরাপত্তার কারণে পশ্চিম তীরে সামরিক উপস্থিতির দরকার রয়েছে। চমস্কি এই ধারণা বাতিল করে দিয়ে বলেন, এর উল্টোটাই সত্য। পশ্চিম তীরে সামরিক দখলদারিত্ব ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে শুধু বিপদেই ফেলবে। তিনি বলেন, ‘যেকোনও ইসরায়েলি কৌশল বিশ্লেষককে জিজ্ঞেস করে দেখুন। তারা সবাই বোঝেন যে, পশ্চিম তীরে দখলদারিত্ব ইসরায়েলি নিরাপত্তার জন্য হুমকি’।
চমস্কি বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে পশ্চিম তীর থেকে সরে আসার বিনিময়ে আরব নেতারা শান্তির প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তা হুমকিকে বেছে নিচ্ছে।

পোস্টার দেখলেই তো বোঝা যায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা কোথায়? -সাক্ষাৎকারে এম সাখাওয়াত হোসেন by মরিয়ম চম্পা

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এমন নির্বাচন হোক যেখানে হয়রানি-ভয়ভীতি থাকবে না। ২০০৮-এর মতো মানুষ ভোট দিতে পারবে। কারণ এর পরে আর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (এসআইপিজি)-এর অনারারি ফেলো অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। দেশের রাজনীতি, সংলাপ, সামাজিক সংকটসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। 
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এত বছরের একটি রাজনৈতিক সংকট দুটি সেটিং বা সংলাপে সমাধান হবে- এটা আশা করা যায় না। এটা আশা করা অনেক বেশি হয়ে যাবে। তবুও বলা যায় যে, দেরিতে হলেও সরকারের তরফ থেকে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং পাশাপাশি যারা অংশ নিয়েছে উভয়কেই স্বাগত জানানো উচিত।
কিন্তু তারপরও বেসিক কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনটা কতটুকু ফেয়ার হবে এবং ভোটাররা কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারবে। প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে এই কারণে যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে সংসদ রেখে এবং ৩৫০ জন এমপি স্বপদে থেকে নির্বাচন করবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমপিরা তৃণমূলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন। গত দশ বছরে পালাক্রমে একধরনের প্রভাব বলয় তারা সৃষ্টি করেছে। সেখানে এমপিরা অকার্যকর থাকবেন এটা ঠিক কথা নয়। সর্বোপরি আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত তাদের প্রভাবটা থেকে যাবে।
সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হয় এবং একইসঙ্গে ভোটারদের কাছে এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কাছে যদি গ্রহণযোগ্য হয় ও জেনারেল পারসেপশন যদি ভালো হয় তাহলেই এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচন ভালো হয় নি বলে পরবর্তী কোনো নির্বাচনই ভালো হয় নি। সব নির্বাচনে একই ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। কেন্দ্র দখল, জালভোট সব ঘটনাই ঘটেছে। যেখানে নির্বাচন কমিশনকে অতটা কার্যকর দেখা যায় নি। কাজেই আসন্ন নির্বাচনটা ভালো হলে বাকি নির্বাচনও ভালো হবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বাংলাদেশে প্রত্যেকটি নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকটে থেকে কাজ করেছে। কিছু কিছু নির্বাচন কমিশন সে আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেও অনেক কমিশনই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে নি। যারা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তারা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পেরেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ভালো হয় নি বলে ওটার কনটিনিউটি বজায় রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের দেশের যে সব প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক ধারা ও জবাবদিহিতা অব্যাহত রাখার কথা সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এখান থেকে যদি আমরা বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে সমস্যা রয়েই যাবে।
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমত যেকোনো নির্বাচনে নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সিকিউরিটি অব ম্যান অ্যান্ড ম্যাটারিয়ালস। যেহেতু ১ দিনে ৩শ’ আসনে নির্বাচনটা করা হয় এবং প্রতিবছর ভোটার এবং ভোটিং সেন্টার সব মিলিয়ে ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে পাহারা দেয়ার জন্য যে পরিমাণ ফোর্স দরকার সেই ফোর্স কিন্তু কখনোই পাওয়া যায় না। তখন ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার হিসেবে সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়। সরকারের আওতায় যেহেতু আর কোনো রিজার্ভ ফোর্স নেই তাই এই সীমিত পরিসরে সেনাবাহিনীকে দিয়ে একদিনের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয় কারণ পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকার কথা থাকলেও প্রতিনিয়ত তারা বিশ্বাস যোগ্যতা হারাচ্ছে। কাজেই সেখানে সামরিক বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। তাদের কেউ খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না। একইভাবে ম্যাজিস্ট্রেসি অর্ডারের বাইরে তাদের কোনো কার্যকারিতাও থাকে না।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, এর জন্য দায়ী আমাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম ও কালচার। পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ে তোলার জন্য যে পদ্ধতি এখন পুরো দুনিয়াতে আছে সেগুলোতে আমরা এখনো যাই নি। আমরা সঠিক লোক নির্বাচন করে সঠিক জায়গায় দেই নি। এর কারণ হচ্ছে আমি যাকে দেবো তাকে বা সেই প্রতিষ্ঠানকে আমার মতো চলতে হবে। অন্যথায় তাকে বিতাড়ন, বা চরিত্র হনন করা হবে। এটা যদি হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠান মানে এই নয় দালানকোঠা ও বাড়ি-গাড়ি বানালাম, পতাকা দিলাম। এগুলো হচ্ছে অবকাঠামো। আমি অবকাঠামো বানালাম কিন্তু গায়ে রক্ত দিলাম না। ভাবার জন্য ব্রেইন দিলাম না। শোনার জন্য, দেখার জন্য, কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় সব যদি না থাকে তাহলে সুন্দর অবকাঠামো দিয়ে কি হবে? আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুন্দর অফিস আছে কিন্তু গায়ে রক্ত নেই, চিন্তা করার ব্রেইন নেই।
বিরোধী রাজনৈতিক জোট ঐক্যফ্রন্টের আবির্ভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট ছোট দলগুলো বড় দলের সঙ্গে ভিড়ে যায়। সে হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে বলা যায় যে, এক্ষেত্রে উভয় দিকেই লাভবান হয়েছে। বিএনপির এই মুহূর্তে নেতৃত্ব নেই। সেখানে ড. কামাল হোসেনের মতো ইন্টারন্যাশনাল ফিগারের নেতৃত্ব পাওয়া অনেক বড় একটি বিষয়। তিনিও বহু আগে থেকেই রাজনীতি করতেন। এদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে তিনি জড়িত। সবচেয়ে বড় কথা তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। তাকে নেতা হিসেবে সামনে রাখা এবং তার সঙ্গে একাত্মতা স্বীকার করা, সেদিক থেকে মনে করি ঐক্যফ্রন্টের একটি প্লাস পয়েন্ট আছে। সম্প্রতি তাদের সংলাপের কারণে রাজনীতিতে যে একটি গুমোট হাওয়া ছিল সেখানে নাড়া পড়েছে। আমরা আশাবাদী যে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে তার অন্যান্য অবদানের মধ্যে এই সংলাপটি যদি সফল করতে পারেন সেটা হবে খুবই ভালো একটি উদ্যোগ।
সিভিল সোসাইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, সিভিল সোসাইটি বলতে আমরা স্বল্প পরিসরে বুঝি ১০ জন লোক টকশোতে কথা বললো তারাই সিভিল সোসাইটি। এমনটা নয়। এটা আইনজীবী থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই যাদের কথাবার্তা ও চিন্তাধারা সমাজকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে। সমাজের মানুষের ভালোর জন্য, গণতন্ত্রের ভালোর জন্য সরকার বা তার প্রতিষ্ঠানকে চাপ প্রয়োগ করবে- সেটাই সিভিল সোসাইটি। বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠেনি কখনো। এটা শুনতে যদিও খারাপ শোনা যাবে। বাংলাদেশে যেটা গড়ে উঠেছে সেটা হচ্ছে মোরাললেস চাটুকার সোসাইটি। এবং তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। আজকে কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা নানা ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কাজেই হয়রানির মধ্যে থেকে সিভিল সোসাইটির মুভমেন্ট হয় না। বাকিরা তো চাটুকার টাইপের। তাদের ভাব অনেকটা এমন যে, আপনি সরদার আর আমি ঝাড়ুদার। ঝাড়ু দিয়ে সব পরিষ্কার করে  দেবো। তারা খুব অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। এজন্য দোষারোপ করা যেতে পারে ১৯৭২ থেকে ’৯১-এর পরিস্থিতিকে। বঙ্গবন্ধুর সময়েও সিভিল সোসাইটির বিষয় ততোটা গুরুত্ব পায় নি। সিভিল সোসাইটি বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কারণ হালুয়া-রুটি তাদের সামনে চলে এসেছে। সহজভাবে যদি বলি বাংলাদেশে কোনো সিভিল সোসাইটি দেখি না। অথচ পৃথিবীর বহু দেশে ঐতিহাসিকভাবে সিভিল সোসাইটির কারণে অনেক বিপ্লব এসেছে।
অবাধ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমত হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তারপর হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই লক্ষ্যে কাজ করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব কিন্তু সরকার এবং সরকারের ইনস্টিটিউশন ও সিভিল সোসাইটির। সেটা যদি না হয় তাহলে গত ৫ বছরের মারামারি-হানাহানি, গুম-খুন ৪০ দিনে ঠিক করা যাবে না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলা হচ্ছে অথচ সেটা আগেই তো ছিল না। এই ৪০ দিনে কি করে হবে? পোস্টার দেখলেই তো বোঝা যায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা কোথায়? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এখন যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, টাকার মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। যার টাকা আছে সেই নির্বাচন করে। অথচ দেখা যাবে রাজনীতি বিষয়টা কি সেটাই অনেকে জানে না।

যৌন আসক্তি ও একজন নীলার স্বীকারোক্তি- প্রথম পর্ব by সঙ্গীতা মিসকা

মধ্য এশিয়ায় ১৫ বছর কাটিয়ে যুক্তরাজ্যে নীলার প্রথম চাকরি ছিল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং ফ্লোরে। তার ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠানে পুরুষদের আধিপত্য বেশি, যারা কিনা বোনাসই কামান মিলিয়ন পাউন্ডের অঙ্কে। পুরো দলে মাত্র দু’ জন নারী ছিলেন। একজন নীলা। তাদের পুরুষ সহকর্মীরা প্রায়ই সভাকক্ষের বড় পর্দায় পর্নোগ্রাফি চালিয়ে তাদেরকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করতেন। অথচ, এই বড় পর্দার কাজ হলো বাজারদরের তথ্য প্রদর্শন করা।
নীলা বলেন, ‘আমার এটা পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমার ক্যারিয়ার সবে শুরু হয়েছে। শহরে মাত্র নিজের জায়গা করে নিচ্ছি।
বেতনও পেতাম ভালো। চাকরিটাও আকর্ষণীয়। আমি এই চাকরি হারাতে চাই নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতাম অফিসের পুরুষরা আমার কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া আশা করতেন। তারা আমাকে বিস্মিত করে দিতে চাইতো। পর্নো দেখে যাতে হতভম্ব না হই, সেজন্য আমি বাসায় ফিরে নিজেই পর্নো ভিডিও দেখতে শুরু করলাম। যাতে করে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। অফিসের প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারি।’
কিন্তু খুব দ্রুতই নীলা পটে গেলেন। সামাজিকভাবে রক্ষণশীল আবহে তার বড় হয়ে উঠা। তার পরিবারে যৌনতা নিয়ে কখনই আলোচনা হয় নি। ফলে ওই পরিস্থিতিতে ‘অসহায়’ হয়ে পড়েন তিনি।
প্রতিদিনই তিনি ভাবতে থাকেন বাসায় কত দ্রুত যাবেন। গিয়ে পর্নো ভিডিও দেখবেন আর সেক্স টয় নিয়ে স্বমেহন করবেন।
তার ভাষায় প্রক্রিয়াটা এমন: ‘প্রথমে বেশ ধীরে শুরু হয়। আপনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন। এরপর আপনি দেখতে থাকবেন। পাশাপাশি নিজের সরঞ্জাম নেওয়া শুরু করবেন। এমন উত্তেজনাকর কিছু দেখে আপনার সকল অনুভূতি বেশ তীব্র হয়ে উঠবে। আপনার মন চলে গেল হাতের দিকে। ওই যন্ত্রের বাটন না চাপলে শান্তি হবে না। আপনি জানেন যে, আপনিই এটার নিয়ন্ত্রণে আছেন। আপনার সুখানুভূতির নিয়ন্ত্রণে। আর এটার মাধ্যমে যে ধরণের অরগাজম হবে, তা অন্য কোনো মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বমেহন শুরু ও শেষ হতে বড়জোর ৫ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু আপনি এরপর লেগে থাকবেন এতে। কারণ, এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে আপনি বেরোতে চান না। এটা যেন নেশার মতো।’
এই পদ্ধতিতে তিনি সপ্তাহের প্রতিটি দিন গড়ে ২-৩ ঘণ্টা করে পর্নো দেখতেন। তার ব্যবহার ক্রমেই পীড়নকর হয়ে উঠলো। তিনি যদি পর্নো দেখতে না পারতেন, তাহলে মন আকুল হয়ে উঠতো। পুরো বিষয়টি তার জন্য যতই ক্ষতিকর হচ্ছিল, ততই তিনি বিষয়টির পক্ষে নিজের মনকে বোঝাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতেন। তিনি নিজেকে নিজে বলতেন, ‘পুরো বিষয়টি নিরাপদ। পর্নো দেখে আপনার যৌন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আপনার এত কষ্ট করে মেইক আপ করতে হবে না। আপনার শর্তানুযায়ীই সব হবে, কিন্তু ফলাফল একেবারে শতভাগ নিশ্চিত।’
কিন্তু এই শতভাগ নিশ্চিত ফল পেতে তার পর্নো দেখার অভ্যাস ক্রমেই বাজে হয়ে উঠলো। তিনি ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর পর্নো দেখতে লাগলেন। তার ভাষ্য, ‘প্রথম প্রথম আপনি হয়তো সাধারণ পর্নো দেখবেন। কিন্তু কয়েকদিন পর এটাতে আর কাজ হবে না। আপনি এ ধরণের পর্নোতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। এটা যেন মাদক সেবনের মতো। ডোজ বাড়াতে হবে আপনাকে। ফলে আপনি আরও কড়া ধাঁচের পর্নো দেখতে থাকবেন।’
নীলার কাছে এক পর্যায়ে বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠলো। তিনি নিজেই চিন্তিত হয়ে উঠলেন, তিনি কি তাহলে বিকৃত মস্তিষ্কের কেউ!
যারাই নিজেকে যৌন আসক্ত মনে করেন তাদের এই মনোভাবের পেছনে এই লজ্জা একটি বড় কারণ। এই লজ্জাবোধের কারণে নিজেদেরকে যেমন আড়াল করে ফেলতে ইচ্ছা করে, তেমনি ওই তাড়নাও আরও জাগ্রত হয়ে উঠে। নীলার ভাষায়, ‘এ যেন উত্তেজিত হওয়া ও লজ্জার সংমিশ্রণ।’
পর্নো দেখার ফলে পুরুষের প্রতিও নীলার আচরণ পরিবর্তিত হয়ে উঠলো। অর্থাৎ, তিনি যখন সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজতেন, তখন তাদের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো। তিনি বলেন, ‘আমি যেন লোকটার শার্টের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম তার শরীরটা সিক্স-প্যাক কিনা। যুক্তরাজ্যের পুরুষদের গোপনাঙ্গের যে গড় আকার, তা আমার জন্য যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু এটা তো জীবনসঙ্গী বাছার ভালো কোনো উপায় নয়।’ এ কারণে বেশ কয়েকটি ব্যর্থ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে।
একসময় নীলা আবিষ্কার করলেন, আগের কোনো ধরণেরই পর্নো ফিল্ম তাকে আকৃষ্ট করে না। তিনি এখন উত্তেজিত হওয়ার জন্য সেসব ছবি দেখতে বাধ্য হচ্ছেন যেখানে নারীদের প্রতি সহিংস আচরণ করা হয়। এই বিষয়টি ভেবে তিনি আতঙ্কিত হয়ে উঠেন।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম, এরপর আমি আর কত নিচে নামবো? আমি কি এরপর মানুষ খুনের ভিডিও দেখবো আমার আসক্তি কাটানোর জন্য?’
নীলা এরপর লন্ডন ছেড়ে যান। তিনি নিজেকে একজন মানসিক পরামর্শদাতা হিসেবে প্রশিক্ষিত করে তোলেন। বর্তমানে তার বয়স চল্লিশের কোটায়।
যেসব রোগী নিজেকে যৌন আসক্ত বলে মনে করেন তাদের চিকিৎসায় তিনি অভিজ্ঞ। মধ্য লন্ডনের লরেল সেন্টারে তিনি কাজ করেন। যুক্তরাজ্যে অল্প যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ ধরণের বিশেষ চিকিৎসা সেবা দেয় তার মধ্যে এটি একটি।
কিন্তু এই চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে মোটা অঙ্কের অর্থ গুনতে হবে। কারণ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা কর্তৃপক্ষ যৌন আসক্তিকে রোগ হিসেবে এখনও স্বীকৃতি দেয় না। তবে অনুমান করা হয় যে, যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার না হলেও শ’ শ’ রোগী এই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের বড় অংশই পুরুষ।
(এই নিবন্ধটি বিবিসি থেকে নেওয়া হয়েছে। আগামী পর্বে সমাপ্য।)

রাখাইন নিয়ে ভারত-চীন লড়াই

মিয়ানমারের রাখাইনে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারত। মিয়ানমারকে চীন দান করেছে ১০০০ গৃহনির্মাণ সামগ্রি, যার অর্থমূল্য এক কোটি ডলারের বেশি। এসব গৃহনির্মাণ সামগ্রি এমন যে, তা শুধু জোড়া দিলেই বাড়ি তৈরি হয়ে যাবে। এসব দিয়ে যে বাড়িগুলো বানানো হয়েছে সেখানে রাখা হবে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের। অন্যদিকে রাখাইনে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে গত ডিসেম্বরে আগামী ৫ বছরে আড়াই কোটি ডলার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। বর্তমানে তারা সেখানে ১৫০০ গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু রাখাইনে এই যে অবকাঠামো প্রকল্প তা ভারত ও চীনের নিজেদের আভ্যন্তরীণ স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমনই এক অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিতর্কিত প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া।
অনলাইন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। মেগান তোবিনের লেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে বন্দর পরিচালনার একটি চুক্তিতে গত মাসে স্বাক্ষর করেছে ভারত। এর মধ্য দিয়ে উত্তর দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই বন্দর প্রকল্পের মাত্র ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের কাজ করছে। এটি বঙ্গোপসাগর থেকে কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্লেষকরা একে চীন ও ভারতের মধ্যে এক আঞ্চলিক লড়াই হিসেবে দেখছেন।
গত শুক্রবার চীন ও মিয়ানমার কাউকপু বন্দর প্রকল্প নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ প্রকল্পটি হলো রাখাইনের গভীর সমুদ্র বন্দর সম্পর্কিত। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিদ্যমান ৭৭০ কিলোমিটার তেল ও গ্যাস পাইপলাইন। এ প্রকল্প নিয়ে আছে বিতর্ক। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কিভাবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারকে চীনের কাছে ঋণী করে তোলা হচ্ছে তা নিয়ে। এই প্রকল্পটি প্রস্তাবিত চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর এবং চীনের আরো বিস্তৃত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, আগে থেকেই বানিয়ে রাখা গৃহসামগ্রী পৌঁছে মিয়ানমারে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সঙ্গে একটি রেল সংযোগ নিয়ে চুক্তি করে দেশ দুটি। এটা হলো চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের সঙ্গে রাখাইনের কাউকপু বন্দরের সংযোগ স্থাপনের একটি নেটওয়ার্কের অংশ। এ ছাড়া চীনের কম ভাড়ার বিমান সংস্থা ‘৯ এ’ এরই মধ্যে গুয়াংঝু-মান্দালয় রুট চালু করেছে।
অন্যদিকে সিতওয়ে বন্দর ছাড়াও ভারত গত মাসে কালাদান মাল্টি-মডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট সই করেছে। এই প্রকল্প ভারতকে তার ‘চিকেন নেক’ বলে পরিচিত অঞ্চলে চেকপোস্ট বসাতে সহায়তা করবে। এই চিকেন নেক হলো ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী অংশ। এর পরিবর্তে বঙ্গোপসাগর হয়ে রাখাইনের ওপর দিয়ে উত্তর পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ পাবে ভারত।

খেলাপি ঋণ হ্রাসে সুশাসন by এমএ মাসুম

খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের জন্য দুর্বিষহ বোঝা হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। বড় ঋণগুলো আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাত ভেঙে পড়লে পুরো অর্থনীতি চরম দুরবস্থায় পতিত হবে। দেশের ঋণ গ্রহীতারা কেন খেলাপি হন, তার কারণ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই এক বৈঠকে উল্লেখ করেন। তার মতে, খেলাপি হওয়াটা লজ্জাজনক হলেও ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে সেটা নেই। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, কষ্ট করে টাকা পেয়েছে, এ টাকা আর ফেরত দিতে হয় না। ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, যা পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে। জাতীয় সংসদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে ঋণ খেলাপির সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন। তাদের কাছে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের ৭৩ শতাংশের সমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-১০১৭’-তে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ডিসেম্বরে ৭৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের দখলে রয়েছে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা। আবার এ খেলাপি ঋণের অর্ধেকই ৫ ব্যাংকের দখলে রয়েছে অর্থাৎ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকাই রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচ ব্যাংকের। বাকি ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে অন্য ৫৩ ব্যাংকের। খেলাপি ঋণে শীর্ষে থাকা ১০ ব্যাংকের মধ্যে তিনটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, একটি বিশেষায়িত ব্যাংক ও একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৪ (৮৩.৯) শতাংশই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এ ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। বাকি ১৬ শতাংশ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮ শতাংশ সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকৃত, বাকি ৮.১ শতাংশ নিম্নমানে শ্রেণিকৃত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের ঋণের বেশিরভাগই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কিছু শিল্প গ্রুপের হাতে। ব্যংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশই মাত্র কয়েকটি শিল্প গ্রুপের হাতে আটকা পড়ে রয়েছে। ফলে কোনো কারণে একটি গ্রুপ সমস্যায় পড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো ব্যাংকিং খাতে। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে বৃহৎ শিল্প গ্রুপ খেলাপি হয়ে যাওয়া। কোনো একটি গ্রুপের বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হলেই ব্যাংকিং খাতে খোলাপি ঋণ বেড়ে যায় হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলোÑ অনেক বৃহৎ ঋণ বিতরণ করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়, অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও প্রকল্প মূল্যায়ন বিবেচনা করা হয় না। এসব কারণে ব্যংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধির প্রবণতাও রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট যেন কিছুতেই কাটছে না। বস্তুত, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুন ’১৮ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সাত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ২৭০ কোটি টাকায়। প্রতি বছরই জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগাতে হয়। এ পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য মোটেই ভালো নয়। এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার লক্ষণ। জানা যায়, ব্যাংকগুলোর আয় দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়া। বেশিরভাগ ব্যাংকেরই মন্দ ঋণ বেড়ে গেছে। আর মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় এসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে। অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের নিট আয় কমে যাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছরই বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে। এ প্রবণতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। এক দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দেশ অনেক এগিয়ে গেলেও সুশাসন, জবাবদিহিতার সূচকে পেছনে হাঁটছে। আবার সহজ ব্যবসা করার সূচকেও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। দারিদ্র্য নিরসন হলেও আয় বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে। সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত এক কর্মশালায় বলা হয়, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার বেশি। ২০১৭ সালে বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ খেলাপি, মার্চ ২০১৮-তে ছিল ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা ছিল ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে খেলাপি ঋণের এটাই সর্বোচ্চ হার। এ থেকে ব্যাংকিং খাতে ঋণ খেলাপির ভয়াবহতা বোঝা যায়। এটি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, কয়েক বছর ঋণ খেলাপির হার বাড়লেও যথাযথ পদক্ষেপের অনুপস্থিতি।
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের তথ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার লাগামহীনভাবে বাড়লেও অন্যান্য দেশে এ হার কমছে। এর মধ্যে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ, ফিলিপাইনে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ২ শতাংশ, ভারতে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। প্রশ্ন উঠছে ঋণ খেলাপির এত টাকা কোথায় যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, খেলাপি ঋণের একটা বড় অংশ বিদেশে পাচার হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে আসছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেপ্রিটি (জিএফআই)। জিএফআইর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য রফতানি পণ্যের সম্মিলিত যে আকার তার চেয়ে বেশি অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থ পাচারে বাংলাদেশ বিশ্বে চার নম্বরে অবস্থান করছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউএনডিপি) তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির আকারের প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নতুন ব্যাংকগুলো। বর্তমান সরকারের সময়ে লাইসেন্স পাওয়া নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অব্যবস্থাপনায় ডুবতে বসেছে। এরই মধ্যে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রতি প্রান্তিকেই তা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শুধু তাই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা থাকায় এবং প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে কিছু ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এসব ব্যাংক কার্যক্রমে আসার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কবলে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া ঠিক হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় আপত্তি জানিয়েছিল, কিন্তু চাপের মুখে তারা লাইসেন্স দিতে বাধ্য হয়। কয়েকটি ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম এবং সব ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণই প্রমাণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সময়ের বিরোধিতা সঠিক ছিল। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দেড় হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি এক পর্যায়ে অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। এমনকি গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছিল না। অবশেষে ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচাতে ৭১৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়।
দেশের ব্যাংক খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে বলে সম্প্রতি মত প্রকাশ করেন খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, আর্থিক খাতের চাহিদার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, ৩০ জুলাই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং ১ নভেম্বর পুলিশের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে তফসিলি ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বর্তমানে দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯টি। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৪টি। তাই এ খাত সংকোচনের দরকার হতে পারে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও ৩টি ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। এগুলো হলোÑ বেঙ্গল ব্যাংক, পিপল ব্যাংক এবং সিটিজেন ব্যাংক। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ সময় নতুন ব্যাংক দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবে শিগগিরই কিছু ব্যাংককে একীভূত করার কথা জানান এবং এজন্য আইন প্রণয়ন করা হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি হওয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। এসব কারণে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমিয়ে আনা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য অনবরত তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্বলতা কাটছে না, বরং বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মকা- পরিচালনাকারী সংস্থা ফিচ রেটিংসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। ফিচ রেটিংসে ‘ট্রিপল এ’ থেকে ‘ডি’ পর্যন্ত ১১টি ধাপ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত রয়েছে পঞ্চম ধাপে, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বোঝায়। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন-২০১৮’ এ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণে জোর দেওয়া হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো কোনো দেশে পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, যাতে তারা অন্য দেশে পালিয়ে যেতে না পারে। এশিয়ার মধ্যেই এমন দেশের উদাহরণ পাওয়া যায়। চীনের সর্বোচ্চ আদালত সে দেশের ৬১ লাখ ৫০ হাজার ঋণ খেলাপি ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২২ লাখ ২০ হাজার ঋণ খেলাপিকে উচ্চগতি সম্পন্ন ট্রেনের টিকিট দেওয়া হয়নি, কারণ সেগুলো অনেক ব্যয়বহুল। প্রায় ৭১ হাজার ঋণ খেলাপিকে তাদের করপোরেট চাকরি বা নির্বাহী পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। চীনের একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া ৫ লাখ ৫০ হাজার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছে। দেশটির আদালত আমলা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক উপদেষ্টাম-লীর সদস্য এবং কংগ্রেস প্রতিনিধিদেরও কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে কেউ কেউ দল থেকে বহিষ্কার বা দলীয় পদ থেকে ছিটকে পড়েছে। ঋণ খেলাপিদের আইডি কার্ড নম্বরের ভিত্তিতে তাদের বড় বড় হোটেলে থাকা বা বিমান বা ট্রেনের টিকিট কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পুরো নাম ও আইডি কার্ড নম্বর তুলে দেওয়া হয়েছে দেশটির সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে, যাতে কেউ ওইসব খেলাপি সম্পর্কে জানতে পারে। সম্মেলনে এক গবেষণাপত্র উপস্থাপনে বলা হয়, মালয়েশিয়ার সরকার এশিয়ার আর্থিক সংকট-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করতে একটি ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কোম্পানিটি বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সব অ-নগদ সম্পদকে নগদ সম্পদে পরিণত করে এবং ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করে। মালয়েশিয়ার মতো থাইল্যান্ডও একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল ২০০১ সালে। এমনিভাবে শ্রীলঙ্কাও তাদের খোলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। নেপালে ঋণ খেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয় সে কারণে তাদের দেশে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণের কারণে দেশে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমান সরকার ঋণে ৯ এবং আমানতে ৬ শতাংশ সুদ হার প্রথমে ১ জুলাই পরে ৯ আগস্ট থেকে কার্যকর করার কথা ঘোষণা দেয়। জানা যায়, ঘোষিত এ হার অধিকাংশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত কার্যকর করতে পারেনি। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণেই অধিকাংশ ব্যাংক এখনও ঋণের সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। ঋণ খেলাপিরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রভাবশালী থাকায় অনেক সময় ব্যাংকাররা কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারে না। এক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং এদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। ঋণ নিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত দেয় না তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে ঘৃণা করতে হবে। ঋণ খেলাপিদের কালো তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে তারা নতুন করে ঋণ গ্রহণ, জমি ক্রয়, সম্পদ অধিগ্রহণ করে সমাজে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে এবং প্রমোদ ভ্রমণ বা ভোগ-বিলাস করে বেড়াতে না পারে। খেলাপি ঋণ হ্রাস করতে অনিয়ম ও দুর্র্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন নয় বরং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনা করা উচিত। তাছাড়া, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
এমএ মাসুম, অর্থনীতিবিষয়ক লেখক