Wednesday, June 10, 2020
ইংরেজি ভাষার ক্রিকেট উপন্যাস by শারমিন সুলতানা

ইংরেজি ভাষা ও ক্রিকেট—ভারতবর্ষ থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ান ভূখণ্ড—সবখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যের পরবর্তীকালে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার পরিচায়ক হয়ে বিকশিত হয়েছে। খোদ ব্রিটিশ ইংরেজি সাহিত্যে ক্রিকেটের সংক্রমণ ভীষণ রকম। চার্লস ডিকেন্সের পিক উইক পেপার (১৮৩৬)-এ কাল্পনিক ক্রিকেট দল সর্ব-মাগলটনের বিপক্ষে ডিংলি ডেল দলের ক্রিকেট ম্যাচের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা সম্ভবত উপন্যাসে সবচেয়ে প্রাচীন ক্রিকেটীয় উপাদান। তারপর টমাস হিউজের টম ব্রাউন’স স্কুল ডেইজ–এ (১৮৫৭) ক্রিকেট উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে। টমাস হিউজের এই উপন্যাসের একটি বখাটে চরিত্র হ্যারি ফ্লাশম্যান শতবর্ষ পরে জর্জ ম্যাকডোনাল্ড ফ্লেজারের ‘ফ্ল্যাশম্যান’ সিরিজে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমর্স ও ড. ওয়াটসন ‘দ্য ফিল্ড বাজার’ গল্পে ক্রিকেটবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সিগফ্রিড সাসুনের মেমোয়ারস অব ফক্স হান্টিং ম্যান (১৯২৮); ডরোথি সেয়ার্স, এজি ম্যাকডোনাল্ড প্রমুখের লেখায় ক্রিকেট নানা পরিসরে, বর্ণনাশৈলীতে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এঁদের কোনো উপন্যাসই পুরোপুরি ক্রিকেট উপন্যাস নয়, এখানে ক্রিকেট এসেছে কেবল অনুষঙ্গ হয়ে। কিন্তু ক্রিকেট উপন্যাসে মূলত ক্রিকেট গল্পের মূল চরিত্রের মতো গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ে ডরোথি সেয়ার্সের ‘লর্ড পিটার উইমসি’ সিরিজেও ক্রিকেটের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
ইংরেজি সাহিত্যের প্রাথমিক ক্রিকেট উপন্যাস হিসেবে বলা যায় দুটি বইকে—পি জি উডহাইসের মাইক (১৯০৯) ও স্মিথ ইন দ্য সিটি (১৯১০)। মাইক উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মাইক জ্যাকসন, এক ক্রিকেটপাগল পরিবারের ছোট ছেলে। মাইকের ক্রিকেটের প্রতি আসক্তি এবং ক্রিকেটার হয়ে ওঠাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। এই উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় স্মিথ ইন দ্য সিটিতে মাইক জ্যাকসন এবং তার ফ্যাশনসচেতন বন্ধু স্মিথের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম এবং ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা—এই দুইয়ের সংকটকে চিত্রায়িত হতে দেখা যায়।
হিউ দে সেলিনকোর্ট গ্রামীণ ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন দুটি উপন্যাস—দ্য ক্রিকেট ম্যাচ (১৯২৪) ও দ্য গেম অব দ্য সিজন (১৯৩৫)। ব্রুস হ্যামিলটনের প্রো: অ্যান ইংলিশ ট্র্যাজেডি (১৯৪৬), হ্যারল্ড হবসনের দ্য ডেভিল ইন দ্য উডফোর্ড ওয়েলস–এ–ও মিশে আছে ক্রিকেট। উইলিয়াম গডফ্রে, জে এল কর ও ডগলাস অ্যাডামসও ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস। অ্যডামসের ‘হিচ হাইকার’ সিরিজের উপন্যাস লাইফ, দ্য ইউনিভার্স অ্যান্ড এভরিথিং–এ (১৯৮২) কল্পবিজ্ঞানের সম্মিলন ঘটেছে, ‘অ্যাশেজ’ নিয়ে বিকল্প বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে। আবার আইরিশ লেখক জোসেফ ও’ নিলের নেদারল্যান্ডস ও পল হুইলারের বডি লাইন—এই দুই উপন্যাসের গল্পও আবর্তিত হয়েছে ক্রিকেট নিয়ে। এ তো গেল ইংরেজ রচিত ইংরেজি ক্রিকেট-সাহিত্য। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের সাম্রাজ্য যত দূর ছিল, সবখানে নিজের অস্তিত্ব ভালোভাবেই পোক্ত করেছে ক্রিকেট, সাবেক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া ইংরেজি ভাষা ও ক্রিকেট—এই দুটো ব্যাপার আত্তীকৃত করে উপনেবিশিত দেশগুলোয় লেখা হয়েছে এন্তার সাহিত্য।
ভারতবর্ষে ক্রিকেট-উন্মাদনা তো অবিশ্বাস্য রকমের। জনপ্রিয় সাহিত্যে, বিশেষত ইংরেজি ভাষায় রচিত উপন্যাসে ক্রিকেট উপস্থাপিত হয়েছে নিবিড়ভাবে, রচিত হয়েছে বেশ কিছু ক্রিকেট উপন্যাস। এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হলেন মালগুড়ি ডেজখ্যাত লেখক আর কে নারায়ণ। তাঁর স্বামী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস সচেতনভাবে ক্রিকেট উপন্যাস না হলেও ঘটনাপ্রবাহ এবং চরিত্রগুলোও ক্রিকেটের ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারে না। দক্ষিণ ভারতে কল্পিত ছোট শহর মালগুড়িতে বালক স্বামীনাথ ও তার বন্ধুরা ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে তোলে একটি ক্রিকেট ক্লাব। স্বামীনাথ তার বোলিং কৌশলে দক্ষতার জন্য উপন্যাসে পরিচিতি পায় বিখ্যাত ইংরেজ ক্রিকেটার মরিস টেটের নামে। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে চরিত্রগুলো ক্রিকেট নিয়ে সব সময় নিয়োজিত থাকলেও এবং এখানে অনেক খ্যাতিমান ক্রিকেটারের নাম নেওয়া হলেও এ উপন্যাসে কোনো ক্রিকেট ম্যাচের বিবরণ পাওয়া যায় না।
বর্তমানকালে ভারতের জনপ্রিয় ধারার ইংরেজি ভাষার লেখক চেতন ভগতের থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ একটি ক্রিকেট উপন্যাস। এ উপন্যাস থেকে ক্রিকেটপ্রধান চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে বলিউডে—কাই পো চে নামে। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ঈশান ক্রিকেটপাগল তরুণ। তার বন্ধু গোবিন্দ, ক্রিকেট সরঞ্জামের দোকান চালায়। ঈশান আবিষ্কার করে আলী নামের মুসলিম বালককে, যে একজন অসাধারণ ব্যাটসম্যান। বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রেম ও সংস্কারের পরতে পরতে থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ-এ মিশে আছে ক্রিকেট।
দ্য হোয়াইট টাইগারখ্যাত বুকারজয়ী লেখক অরবিন্দ আদিগার সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ক্রিকেট উপন্যাস সিলেকশন ডে (২০১৬)। ২০১৮ সালে এই উপন্যাস থেকে নির্মিত একই নামের একটি সিরিজ প্রকাশিত হয় নেটফ্লিক্সে। উপন্যাসে দুই ভাই মোহন, কুমার ও তার বাবার ক্রিকেট-জ্বরের গল্প উঠে এসেছে। স্থানীয় আচারবিক্রেতা বাবার ইচ্ছা, তার ছেলেরা শচীন টেন্ডুলকারের মতো ক্রিকেটার হোক, আর এ জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। ক্রিকেটে পুঁজিবাদের আগ্রাসন, ভারতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বিপুল তারকাখ্যাতি এবং এই পপ কালচারে বিভ্রান্ত নিম্নবিত্ত বাবার স্বপ্ন ও তার ছেলেদের স্বতন্ত্রতা—এসব সংঘাতে এগিয়ে চলে গল্প। পুরো উপন্যাসে রয়েছে উত্তেজনাময় ক্রিকেট ম্যাচের স্নায়ু অবশ করা নিখাদ বর্ণনা।
অরবিন্দ আদিগার ক্রিকেট উপন্যাস নিয়ে লিখতেই মনে এল অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট সাহিত্যের কথা। কারণ, অরবিন্দ আদিগা একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় লেখক, তাঁর সিলেকশন ডে উপন্যাসের পটভূমি ভারত হলেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট কথাসাহিত্যের নাম খুঁজলে চলে আসবে ‘টবি জোনস’ সিরিজের নাম। মিশেল প্যানক্রিজ ও অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতিমান পেসার ব্রেট লির লেখা মোট পাঁচটি ক্রিকেট উপন্যাস নিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে এই সিরিজ। এখানে দেখা যায়, টবি জোনস নামের এক তরুণ ক্রিকেটারকে, সাফল্য ও ব্যর্থতার একপর্যায়ে যে আবিষ্কার করে সময় পরিভ্রমণ করতে পারে সে। উইজডেন ক্রিকেট আলম্যানাকের যেকোনো স্কোরকার্ডের দিকে তাকিয়েই অতীতের সেই ম্যাচে চলে যেতে পারে সে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলীয় লেখক ম্যালকম নক্স লিখেছেন অভিনব ক্রিকেট–রহস্য উপন্যাস আ প্রাইভেট ম্যান (২০০৪)। সিডনিতে অনুষ্ঠিত পাঁচ দিনব্যাপী টেস্ট ম্যাচের অন্তরালে দুর্ধর্ষ খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করেন লেখক, পাশাপাশি গল্পের অনেকখানি ব্যাপ্তিজুড়ে থাকে ক্রিসের ক্রিকেট ক্যারিয়ার বাঁচানোর লড়াই।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব কিছু ক্রিকেট উপন্যাস আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মিশেল ও’ লরির আউট অব ইট (১৯৮৭)। এখানে মধ্য আশির দশকের একটি এক দিনের ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ কাহিনি উপস্থাপন করেছেন তিনি, যেখানে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট দলের বিপক্ষে তৎকালীন বিখ্যাত গায়ক ও তারকাদের একাদশকে খেলতে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে জিমি হেনডিক্স ও জ্যানিস জ্যাপলিনও আছেন। নিউজিল্যান্ডের মতো আরেক দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কারও রয়েছে গর্ব করার মতো কিছু ক্রিকেট সাহিত্য। লঙ্কান ঔপন্যাসিক শিহান করুনাতিলাকা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস চায়নাম্যান: দ্য লিজেন্ড অব প্রদীপ ম্যাথিউ-এ ক্রিকেটকে আশ্রয় করে শ্রীলঙ্কার সমাজবাস্তবতার গল্পই বলেছেন।
ক্রিকেট ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের জল-হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেলেও এখানে তেমন কোনো ক্রিকেট উপন্যাস মেলে না। তবে ভি এস নাইপলের গল্পসমগ্র মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯)-এ পোর্ট অব স্পেনের শহরতলিতে নিম্নবিত্ত জীবনে ক্রিকেটকে মিশে থাকতে দেখা যায়। আর আর্ল লাভলেসের ইজ জাস্ট আ মুভি উপন্যাসের (২০১২) ‘ফ্র্যাঙ্কলিন ব্যাটিং’ নামের অধ্যায়টি ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটকেই চিত্রায়িত করে।
আর শেষে লিখতে হবে এ কথা যে ক্রিকেটটা ভালো খেললেও ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাসে ক্রিকেট এখনো অনুপস্থিতই থেকে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশ।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শহীদ কাদরীর কবিতায় জল ও ডাঙার দ্বৈরথ by বেগম আকতার কামাল
অগ্রজ কবি শামসুর রাহমান যেমন পিতৃত্বের কাঠামো-ছায়ায় কখনো আশ্রয়ী হন, কখনো আশ্বাস খুঁজে পান, কখনো-বা পিতার বয়স্ক অবসন্ন দেহমূর্তি দেখে বিষণ্ণ হন, সেরকমটি শহীদ কাদরীর মধ্যে লক্ষণীয় নয়। সদ্য-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের রাজধানী ঢাকা নগরীর ঘটমান সময়কালটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির চেতনাছন্দ ও গড়নেরও পটভূমি ছিল। আর তাতে জড়িয়ে ছিল শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে অবাঙালি ধনিক বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের প্রচ্ছন্ন বিরোধ। অবাঙালি উর্দুভাষী উচ্চপদস্থ পিতার পুত্র শহীদ কাদরীর মধ্যে এই সূত্রে দেখি একটি আত্মসংকট, আরেক দিকে বাঙালি মায়ের সাহিত্যপাঠপ্রীতি তাঁকে করেছিল শিল্পতায় আবিষ্ট। নিজের পরিবারের মূল্যবোধ তাঁকে এই বীক্ষা দেয় যে, সংস্কৃতিবান সম্পাদক থেকে তাঁর পিতা হয়ে গেলেন জাঁদরেল অফিসার, দীর্ঘকায় বিশাল ব্যক্তিত্ববান আহমাদ কাদরীর স্বপ্নের ভেতর ছিল শুধু টাকা নিয়ে লোফালুফি খেলার বাসনা, ছিল স্টুডিও বেকারে ঘরে ফেরার দাপটত্ব ইত্যাদি। এসব নিয়েই লিখেছেন ‘একটি উত্থান-পতনের গল্প’ কবিতাটি (কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই কাব্য)। কবি তাঁর পিতার কাঠামোতে দেখেন এক মিশ্র সংস্কৃতি – ব্রিটিশের পরিত্যক্ত ঔপনিবেশিকতার পাকিসত্মানি প্রতিচ্ছায়া, আবার ‘দামেস্কে তৈরি কারুকাজ করা একটি বিশাল ভারী তরবারি’র মতো পিতার এই প্রতিমূর্তির পাশে তাঁর নিজের নাম ও শরীরী কাঠামো হ্রস্ব – ‘ঝোড়ো নদীতে/ কাগজের নৌকার মতোই পলকা/ কাগজের নৌকার মতো পলকা।’ (‘একটি উত্থান-পতনের গল্প’) কেন নিজেকে পলকা বলেন বা কবিতাটির নামই বা কেন উত্থান-পতনের গল্প হয়? তবে কি শহীদ কাদরীর চেতনায় কোনো রক্তীয় গৌরব-অগৌরবের সংকট ছিল? মনে হয় এটি তাঁর ব্যক্তিচেহারা বা কাঠামো হলেও মূলত শহীদ কাদরী কাগজের নৌকার মতোই নির্ভার হতে চেয়েছেন, ভেসে বেড়াতে চেয়েছেন শহরের দারুণ বৃষ্টির মধ্যে অলিগলি জুড়ে। এই যে বৃষ্টি (‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতা) তা নিছক নগরানুষঙ্গ নয়, এই বৃষ্টি বিধ্বস্ত শক্তি যা নগরের সভ্যতাও তার ধারক-শাসকদের ধ্বংস করে আর সেই ধ্বংসপটে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করে ভিখারি ও প্রলেতারিয়েতরা। চিত্রকল্পাত্মক বৃষ্টি প্রতীকটি তাঁর মতাদর্শেরই ভাবকল্প।
উত্তরাধিকার কাব্যের ‘উত্তরাধিকার’ কবিতায় কবির যে-শিল্পসত্তা (পার্সোনা) মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই সন্ত্রস্ত শহরে বস্ন্যাকআউটের রাতের আঁধার দেখতে পাচ্ছে তা অতঃপর আক্রমণ করে বি-জীবনায়নের রাষ্ট্রকাঠামোকে। এ-কথাটি সুবিদিত যে, শহীদ কাদরী আপাদমস্তক নাগরিক কবি, তাঁর দীপ্র ভাষা, দৃঢ় চিত্রকল্প – যাতে মনন আবেগকে শাসনে রেখেছে – সবকিছুই মার্জিত, স্মার্ট। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের নাগরিকমনস্ক যে-আভিধানিক শব্দকৃতি তার পাশে শহীদ কাদরীর নগরভাষ্যচিত্র অনেক বেশি প্রাত্যহিক, অনেক বেশি কোলাজধর্মী, অনেক বেশি দৃশ্যমান এবং জীবন ও সময়-সংকট আচ্ছন্ন। এই সংকট নিজেকেই কুরে-কুরে খায়, উদ্বাস্ত্তর মতো শুধু শহরে নয়, মহাব্রহ্মা– নিজের একাকিতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। বিচ্ছিন্নতাবাদের যেসব সূত্র কার্ল মার্কস উৎপাদন-কাঠামোজাত রূপে দেখেছিলেন, আমরা শহীদ কাদরীর কবিসত্তায় সেই বিচ্ছিন্নতার সবগুলো সূত্র যেমন দেখি, তেমনি দেখি এই বিচ্ছিন্নতা শুধুই নাগরিক বিচ্ছিন্নতা নয়, মানুষ হিসেবে এই বিশ্বে নিঃসঙ্গ প্রাণী হওয়ার বিচ্ছিন্নতা, যার ঈশ্বর নেই, অসিত্মবাদী হওয়ার মতো কোনো মহাশক্তির প্রতি নতজানু বিনীত সমর্পণ নেই, নেই সমাজ-সংসারের কাঠামো – তা সে প্রেম, রক্তীয় বন্ধন কিংবা উৎপাদনব্যবস্থা যা-ই হোক না কেন। তৎকালীন কবিরা যেখানে প্রথম কাব্যের পরে দ্বিতীয়-তৃতীয় কাব্যে এসে হয়ে যান স্বজাতি-স্বদেশ লগ্ন, আশাবাদে-সংগ্রামে-উত্তেজনায় যোগমুক্ত, সেখানে যেন শহীদ কাদরী এক নির্বাসিত আত্মার মতো একলা ঘুরে বেড়ান শহরেই, যে-শহরে তুমুল বৃষ্টিও হয়, যেখানে ‘তীক্ষনধার জনতা এবং তার একচক্ষু আশার চিৎকার।’ শোনা যায়, কিন্তু তারা কেমন? তারা ‘পূর্ণিমা-প্রেতার্ত তারা নির্বীজ চাঁদের নিচে, গোলাপ বাগানে/ ফাল্গুনের বালখিল্য চপল আঙুলে, রুগ্নঊরু প্রেমিকার/ নিঃস্বপ্ন চোখের ’পরে নিজের ধোঁয়াটে চোখ রাখে না ভুলেও;/ কম্পমান অবিবেকী হাতে গুঁজে দেয় মস্নান ফুল/ পীতাভকুমত্মলে তার, প্রথামতো সেরে নেয়ে কবির ভূমিকা’ – এই যে ‘নপুংসক সমেত্মর উক্তি’র মধ্যে প্রথাগত কাব্যিক কাঠামোর চাঁদ ফুল ইত্যাদির রংরূপ হরণ করেন কবি তা তো কাঠামো ভাঙারই অমত্মর্বেদনা – কারণ নপুংসক, অন্ধ হলেও কবি কিন্তু ‘সত্যসন্ধ দুরমত্ম সমত্মান।’ নিজেকে বধ্যভূমে বলির পশুরূপে প্রত্যক্ষ করে কেবল দেখে যান উজ্জ্বল আতশবাজিতে বিচিত্র আলোকসাজে সজ্জিত রাত্রির নকটার্ন, আর ‘ভেল্কি কাড়া নাকাড়ায় সাড়া তুলে/ যূথচারী মানুষদের;’ একই সূত্রে দেখেন ‘আমার শরীরের শব্জীক্ষেতে/ অসীম উৎসাহ ভরে একটি কবর খুঁড়ে রাখে’, এখানে ‘শরীরের শব্জীক্ষে’ রূপকার্থে নিজেরই কৃষিসংস্কৃতির স্বদেশ, অথচ স্বদেশসংলগ্ন থেকেও তিনি ‘নিঃসঙ্গ উদ্বাস্ত্ত/ জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্ত্তত, অনাত্মীয় একা।’ নিজেকে আঁধার টানেলে ভূতলবাসীর মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন আর জনতার সঙ্গে অনাত্মীয়তা আরো মনে করিয়ে দেয় সুধীন্দ্রনাথের যূথবদ্ধতার প্রতি ঘৃণা প্রকাশের কাব্যপঙ্ক্তি – ‘সহে না সহে না জনতার জঘন্য মিতালি।’
শহীদ কাদরীর কবিস্বভাবের এই একাকিতার ধরনটিই কি টেনে নিয়ে গেছে প্রবাসে – স্বদেশ থেকে নির্বাসনে? বলতেই হয়, এই একাকিত্বের জন্ম হয়েছে বিজ্ঞানের সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে। পরিবার-কাঠামো পরিহার করলেও শহরের জীবনে রাষ্ট্রীয় প্রতাপ-ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে তো অমত্মরীণ থাকতেই হয়। এরই প্রকল্প রূপে তিনি লিখলেন তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা কাব্য। প্রতীচ্য কবিতার আদল বা কবির প্রভাব থাকলেও এই কাব্যটি শহীদ কাদরীর অসমর্থ কবিতাস্ত্রকে (‘কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার’ দ্রষ্টব্য) তৎকালীন পাকিসত্মানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বা বলা চলে সকল আধুনিক বা আধা-সামরিক আধা-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্ররূপকে বদলে দিতে চেয়েছে, নিজের বাসনার পরিমাপে গড়তে চেয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত উক্ত কাব্যটি ‘স্বাধীনতার শহর’ গড়তে চেয়েছে যেখানে কবি ‘দেয়ালের পোস্টারগুলো সকালের হিরণ্ময় রৌদ্রে/ নিবিষ্ট মনে পড়তে পড়তে চ’লে যাবো -/ স্বাধীনতা তুমি কাউকে দিয়েছো সারাদিন টো টো কোম্পানির উদ্দাম ম্যানেজারি করার সুবিধা’ ইত্যাদি দৃশ্যকল্প এটাই জানায় যে, কবির স্বাধীনতা আসলে ‘মধ্যরাত পেরুনো মেঘলোকে ডোবা সকল রেসেত্মারাঁ/ স্বাধীনতা, তোমার জরায়ু থেকে/ জন্ম নিলো নিঃসঙ্গ পার্কের বেঞ্চি/ দুপুরের জনকলেস্নাল/ আর যখন-তখন এক চক্কর ঘুরে আসার/ ব্যক্তিগত, ব্যথিত শহর, স্বাধীনতা।’ অর্থাৎ কবিসত্তাটি নিঃসঙ্গ পার্কের বেঞ্চি আর ভবঘুরের মতো জীবনযাপনের মধ্যেই স্বাধীনতাকে খুঁজে পাচ্ছে। আর রাষ্ট্রের একটা নান্দনিকায়ন ঘটাতে চাচ্ছে। যে-কবির চুল হচ্ছে বেপরোয়া উদ্দামতার প্রতীক (চুল যৌনতারও প্রতীক) আর ‘নিজস্ব সম্পত্তি ভেবে অপরের নীলিমাকে/ ছেঁড়েখোঁড়ে আর হৃদয়হীনের মতো/ অনবরত, অনবরত,/ ব্যবহার করে।’ সেই কবি আরো বলেন, ‘মূক ও বধির চুল মাস না যেতেই/ আহত অশ্বের মতো আবার লাফিয়ে উঠছে অবিরাম’ – এসব কাব্যপঙ্ক্তি কবিস্বভাবের অস্থিরতার যেমন দ্যোতক তেমনি রাষ্ট্রকাঠামোর ‘লেফট রাইট’-এর সাঁজোয়া বাহিনীকে প্রত্যক্ষ করে এবং আরো-আরো ক্ষমতাকাঠামোর জেলখানা, ১৪৪ ধারা, ছাত্র-আন্দোলন ইত্যাদি দেখে-দেখে তিনি নিজস্ব এক রাষ্ট্রব্যবস্থাপত্র কাব্যায়িত করেন। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ কবিতাটি তারই স্মারক যা পাঠককে খুবই আহ্লাদিত ও চমৎকৃত করে। স্বাধীন দেশটির জন্যে কবি কী-কী ব্যবস্থা করবেন, তার বিসত্মৃত বর্ণনায় জড়িয়ে আছে কবির সকল বাসনা-আকাঙক্ষা-স্বপ্ন এবং একই সঙ্গে স্বদেশকে প্রিয়তমা নারীর রূপকল্পে বর্ণনায়িত করার নতুন ধরন। স্বদেশকে মাতৃমূর্তিতেই কবিতায়িত করার রেওয়াজ, কিন্তু কবির কাছে তা প্রিয়তমা। মাতৃরূপ আর প্রিয়ারূপ এখানে একীভূত, একটি আরেকটিতে বিগলিত।
শহীদ কাদরীর দেশচেতনা আপাত প্রিয়তমার রূপ পেলেও তাঁর জীবন-বাসনা, বাল্যকৈশোর, প্রেমপ্রত্যাশা সবই যেন জতুগৃহের মতো। বিপস্নব বা প্রেম, গৃহাঙ্গন বা পার্কের বেঞ্চি কোনো কিছুই তাঁকে বাসনাতৃপ্তি দান করেনি। কারণ এই শহরে বাগানঅলা হলুদ নতুন বাড়ি কিনবেন বলে প্রস্ত্ততি নিলেও তাঁর নির্বিকার বিবেকীমন সব বাসনাকে উড়িয়েই দিতে চেয়েছে। কোনো নির্বেদের প্রত্যাশায় কী? কোন ব্যথাহত অভিমানে এই কবিসত্তা কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই কাব্যগ্রন্থখানি লিখলেন অথবা প্রবাস থেকে পাঠালেন আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও? তাঁর নির্বেদ প্রাপ্তি কি ঘটেছিল নাকি ভাঙার অন্বেষা কখনোই থেমে যায়নি? তাঁর কি পায়ের তলে ছিল না কোনো ভূমি? এই উদ্বাস্ত্ত সত্তা শুধু নগর-জীবনের ফলাফল নয় – এ-কথা আমরা আগেই বলেছি যে, তিনি নৈঃসঙ্গ্যে নিমজ্জিত এক সত্তা, একে ঠিক আত্মবিচ্ছিন্নতা বলা যাবে না। বরং অনেক বেশি আকাঙক্ষালিপ্ত – তাঁর তো সাধ ছিল ‘এখন তোমার সঙ্গে ক্ষেত খামার দেখে বেড়াবো’, এবং ‘আমি করাতকলের শব্দ শুনে মানুষ/ আমি জুতোর ভেতর, মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ/ আমি এবার গাঁও-গেরামে গিয়ে/ যদি ট্রেনভর্তি শিউলি নিয়ে ফিরি/ হে লোহা, তামা, পিতল এবং পাথর/ তোমরা আমায় চিনতে পারবে তো হে।’ (‘এখন আমি’) এই যে প্রাকৃতায়নের মধ্যে হাঁটার বাসনা তা নিছক মধ্যবয়সের রোমান্টিসিজম নয়। বিবর্ণ, রং হীন, শহুরে জীবনকায়ার মধ্যে ‘একটা দিন’ ডাঙায়-ডাঙায় ঘুরতে চেয়েছেন, মাছের সঙ্গে কাটাতে চেয়েছেন, ‘ঊরু আর নাভি অনেক খুঁড়লে/ প্রেমের সঙ্গে একটা দিন’ – কাটাতে চেয়েছেন। যে-দিকটি শেষের দিকে প্রবলতা পেয়েছে তা হচ্ছে সভ্যতার ধীমান মেধাবী মানুষগুলোর চতুরতা, প্রজ্ঞা বা বৌদ্ধিক মনন কাঠামো এড়িয়ে যাবার তাড়না, সহজিয়া হয়ে ওঠা, এই কাঠামো যদি বাষ্পের মতো উবে যায় ‘তবেই গোপাল, টিয়ে/ এবং তাদের আত্মীয়স্বজন বেশি উপকার পাবে।’ (‘এক চমৎকার রাত্রে’ কবিতা)। তিনি আবিশ্বের মানুষজনকেও এবং প্রত্যহ যারা আসে দুধ খবরের কাগজ নিয়ে তাদেরকেও আপন করে নিতে চাইছেন, পাশাপাশি বিপ্রতীপ চিত্ররূপে দেখেন মার্কিন ও ফরাসি রণতরী আর বোমারু বিমানের আওয়াজ। এই যে সরলতার দিকে টান, সহজ জীবনের কাছে যাওয়ার আকাঙক্ষা তা অত্যমত্ম আমত্মরিক, নির্ভেজাল। তিনি যেমন বহুজনের সংস্কৃতির দিকেই অভিগমন করছিলেন, তেমনি মাছ, পাখি, গোলাপ, শিউলি ইত্যাকার কাব্যপ্রতিমাকেও নতুনভাবে প্রয়োগ করছিলেন তাঁর জীবনবীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে, তাঁর নিঃসঙ্গ হৃদয়ের বেদনা মাখিয়ে দিয়ে। তাঁর বীক্ষায় সরল বালক, জীবন ও মাছ, গোলাপ ও প্রকৃতির উপাদান এলেও বিপ্রতীপভাবে তাতে ছায়া ফেলে পারমাণবিক বোমাতঙ্ক। বালকের বিশ্বাসের মতো কবিরও বিশ্বাস যে, মহাবিস্ফোরণের পরেও ‘লাল নীল সবুজ মার্বেলগুলো/ পরীদের চোখের মতো অখ- অটুট থেকে যাবে।’ (‘বালকেরা জানে শুধু’ কবিতা)। এবং থেকে যাবে ‘আমাদের ভালোবাসার প্রাক্তন প্রহরগুলো আমার কামরার জলে/ লাল, নীল, সোনালি মাছের মতো লেজ তুলে ঘুরছে, প্রিয়তমা।’ সোনালি, লাল-নীল মাছ তো অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে সাঁতার কাটে তথা বন্দি বনসাই জীবন তাদের। কবির এই যে জীবনবোধ তা আত্মজৈবনিকতা থেকেই উৎসারিত। কবিতায় তিনি diversified autobiography-কেই রূপান্বিত করে কবিতার পার্সোনা তৈরি করেছেন।
১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর যে সামুদ্রিক ঝড় আমাদের উপকূলকে ও মানুষজনকে বিধ্বস্ত করেছিল সেই সূত্র ধরে শহীদ কাদরী তাঁর ‘একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল’ কবিতাটি রচনা করেন। এখানে ‘জীবিতের মুখ যেন/ মিশে গেছে মৃতের আদলে, শবযাত্রার মতো গম্ভীর মিছিলে/ ছেয়ে গেলো আমার শহর, ভরে গেলো বঙ্গোপসাগরের গর্জনে’, অথচ নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল যথাস্থানে শহরের রেসেত্মারাঁগুলি। বিবেকি কবির মধ্যে যে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক জাগে তা দেখে যে নিজের ‘ওয়ার্ডরোব থেকে অনর্গল বেরিয়ে আসছে/ আমারই কাপড় চোপড় ফুলে যাওয়া লাশের মতো/ যেখানেই হাত রাখি সবকিছু মৃতের দেহের মতো/ শীতল, ঠান্ডা, হিম…।’ কবি আর রেসেত্মারাঁর নীল আলোর মধ্যেও আত্মগোপন করতে পারেন না। পরাবাস্তব জগতের মতো তাঁর প্রিয়তম ‘রেসেত্মারাঁটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে/ পড়ে আছে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে।’ অর্থাৎ কবিকে ছুঁয়ে যায়, পরিবর্তন ঘটায় ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এহবাহ্য, কবির আসল বিবর্তনটা ঘটে প্রাকৃতায়ন আর নগরায়ণের বৈপরীত্য উপলব্ধিতে – যা তিনি উত্তরাধিকার কাব্যে উপলব্ধি করেননি। যে-সূত্রে তাঁকে শুধুই বলা হয়ে থাকে নাগরিক কবি।
‘দাঁড়াও আমি আসছি’ কবিতাটি (কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই কাব্য) তাঁর বাসনাকে আরো প্রাকৃতায়নের অভিমুখী করে। পুরো কবিতাটি দার্শনিকতায় রূপকান্বিত আবার একই সঙ্গে বাহ্যিক অর্থের ব্যাপ্তিতেও শক্তিশালী, ছিপ হাতে অপেক্ষমাণ একজন তুমি-কে উদ্দেশ করে কবিতাটির অমত্মর্বয়ন ঘটেছে। জলের প্রতীকতায় মুক্ত জীবনকে ধারণ করা হয়েছে, আর মাছ হচ্ছে যৌনতা-প্রজননের রূপক। জল আর ডাঙার বৈপরীত্যে কবিতাটিতে দ্বিমুখী টান তৈরি হয়েছে – ‘আমি কোনদিন যাবো – দুই দিকেই প্রবল টান/ আমার, হ্যাঁ এই, চিরকাল/ এমনটাই হলো/ এমনি করেই ডাঙার ধার ঘেঁষে-ঘেঁষে আমার বসবাস/ কোনোদিনও হলো না’, কোন টানে কবি ডাঙা ছেড়ে ভেসে গেছেন ‘মাঝনদীতে একাকী খেলাচ্ছলে/ চোরা ঘূর্ণির ভেতরে/ এখন আমি কোনোদিকেই আর যেতে পারছি না’। এই জলে ভাসা কবিতার মধ্যে থাকা যেখানে ডুব সাঁতার-চিৎ সাঁতার-উবু সাঁতার সবই করেছেন কবি। ‘জলের ওপর আমার কৈশোর, আমার যৌবন/ কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে কি দারুণ সবুজ।’ এবং কবির ‘তুমি’কে হঠাৎ দেখেন সেও জলে সাঁতার দিচ্ছে। এই ‘তুমি’ কি কোনো দয়িতা, না-কি স্বয়ং কবিতা? নাকি কবির জীবনটাই এই তুমি – যে ছিপ হাতে তীরে বসেছিল, এখন জলে নেমে কবির সঙ্গে সাঁতার দিচ্ছে? মৃত্যুর আবছায়াও আছে। কাব্যপঙ্ক্তিতে – ‘একটু পরেই রাত, তার পর জল তার ঠান্ডা করাত দিয়ে ফালি-ফালি/ কাটবে দুজনকে – ।’ বহুমাত্রিক দ্যোতনায় কবিতাটি ভরপুর, কেবল আত্মজৈবনিকতাই নয়, কবিতার সত্তাকেও এখানে দ্যোতিত করা হয়েছে – ‘দাঁড়াও আমি আসছি/ তোমাকে চাই ভাসতে-ভাসতে/ ডুবতে-ডুবতে/ ডুবে যেতে-যেতে আমার/ তোমাকে চাই…।’ কবিতা ও দয়িতা এখানে একাকার হয়ে গেল যা সকল জাতকবির মধ্যেই প্রত্যক্ষ করা যায়।
রবীন্দ্রনাথ যেমন শেষ লেখায় তাঁর ঈশ্বরীসত্তাকে সৃষ্টির বিচিত্র ছলনাজালে আকীর্ণরূপে দেখেছিলেন, অত বড় মাত্রিকতায় না হলেও শহীদ কাদরীর জীবনদর্শন শেষে এসে ভাসমান সত্তার মধ্যে তুমিকে পেয়েছে। এই ভাসমানতা প্রবাসজীবনসঞ্জাত হলেও তার উৎসারণে আছে স্বদেশেও উন্মূল হয়ে থাকার অমত্মর্বেদনা। তাই তিনি চতুর্থ কাব্যে তাঁর চুম্বনগুলিকে – তাঁর যাবতীয় আবেগ স্পর্শেন্দ্রিয়কে স্বদেশের ডাঙার দিকে প্রেরণ করতে চেয়েছেন। এই যে তাঁর জীবন-ভূমির প্রতি টান তবে তা কোনো তত্ত্বীয় কাঠামো বা রাষ্ট্রীয়-পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নয়, তা মুক্তই থাকতে চেয়েছে – নদীর জলধারার মতো, অনমত্ম প্রবহমান স্রোতেই চেয়েছে ভেসে যেতে। যাকে বলতে পারি মহাকাল, তাই তিনি গিয়েছেন মৃত্যুর হাত ধরে দেহহীন ভাসমানতায় লীন হয়ে গিয়ে। জল এখানে কাঠামোহীন বহমান জীবন আর ডাঙা হচ্ছে তাঁর শ্রেণিসত্তা, স্বদেশ ও নগর এবং পঠন-পাঠনঋদ্ধ মেধাবী সৃষ্টিশীলতা। দুইয়ের দ্বন্দ্বময়তায় তাঁর কবিতা দীপ্র ও সংহত, মিথকথনে ছন্দ আর শব্দের চিত্রকাল্পিক বিন্যাস নিয়ে একামত্মই আধুনিক – যদিও কবিতার সংখ্যা স্বল্প, যেরকমটি লক্ষ করা যায় কবি সমর সেনের মধ্যেও। যে-বৃষ্টিমুখর নগর ও চিত্র এঁকে শহীদ কাদরীর কাব্যজীবন শুরু হয়েছিল শেষ কবিতায় (‘দাঁড়াও আমি আসছি’) সেই জল আর ডাঙার দ্বৈরথেই তা সমাপ্ত হয়েছে, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও কাব্যের কথা স্মরণে রেখেই আমরা এ-কথা বলছি। জল হচ্ছে কবির জীবনকাল আর ডাঙা তাঁর অন্বিষ্ট স্পেস যা তিনি মনে হয় পাননি বা পেলেও সেখানে স্থিত হতে পারেননি। এই কাল আর স্পেস বা ভূমির সন্ধিৎসা ‘তুমি’র দিকেই ধাবমান ছিল। এই ‘তুমি’কে বলা যাবে না প্রেমিকা-সত্তা, বরং তা অনির্ণেয় হলেও বহুমাত্রিক এক দিশার প্রতীকতা।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঘামাচি দূরে ঘরোয়া টোটকা

- ১) আলুর রসে দূর হয় ঘামাচি। আলু পাতলা করে কেটে ঘামাচির স্থানে ঘসে নিন। অথবা ব্লেন্ড করে রস বের করে নিন। আলুর রস দিনে দুবার ঘামাচি আক্রান্ত স্থানে দিলেই আরাম মিলবে।
- ২) ঘামাচি বা র্যাশে লাগাতে পারেন অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারীর রস লাগাতে পারেন নিয়মিত। সব জ্বালা যন্ত্রণা নিমিষেই দূর হয়ে যাবে।
- ৩) ব্যবহার করতে পারেন বেসন ও গোলাপজলের প্যাক। চার চামচ বেসনের সঙ্গে সামান্য পানি ও গোলাপজল মিশিয়ে ঘামাচি আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে নিন। ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।
- ৪) মুলতানি মাটি লাগাতে পারেন গোলাপজল দিয়ে।
- ৫)বরফ কাজ করে দারুণভাবে। বরফের টুকরো পাতলা কাপড়ে জড়িয়ে ঘামাচি আক্রান্ত স্থানে ঘসে নিন।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1421)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ▼ 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
