Showing posts with label আন্দোলন. Show all posts
Showing posts with label আন্দোলন. Show all posts

Tuesday, August 25, 2026

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত

বিহারের রাজধানী পাটনায় নিয়োগ পরীক্ষা ও চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় ডাক বাংলো মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।

মঙ্গলবার বিপুলসংখ্যক বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) চাকরিপ্রার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থী পাটনার গান্ধী ময়দান থেকে পূর্বঘোষিত মিছিল শুরু করেন। পরে তারা ডাক বাংলো মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয় এবং একপর্যায়ে তারা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পুলিশ জলকামান ছুড়লে আন্দোলনকারীদের অনেকে ভিজে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই ছিল জাতীয় পতাকা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাটনার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডাক বাংলো মোড়ে অতিরিক্ত বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।

যেসব দাবিতে আন্দোলন

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে পাটনার গার্দানিবাগ এলাকায় অবস্থান ও বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এক ধাপে নেওয়া, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (বিএসএসসি) নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন এবং হিন্দি মাধ্যমের প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষাটি বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার কামাখ্যা নারায়ণ সিং বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আলোচনার ফল ইতিবাচক। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসবেন, তাদের থামানো হবে এবং সামনে যেতে দেওয়া হবে না।

সরকারের সঙ্গে সংলাপের দাবি

বিক্ষোভস্থলে কংগ্রেস নেতা সুশীল কুমার বলেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় এক ধাপের ব্যবস্থা এবং নেগেটিভ মার্কিং বাতিলসহ বিপিএসসি, বিএসএসসি ও সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে অনশন করলেও সরকার তাদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপে বসেনি। মুখ্যমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে চলমান বিপিএসসি পরীক্ষাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন বিহারের বিরোধীদলীয় নেতা তেজস্বী যাদব। তিনি আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

তেজস্বী যাদবের দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। এছাড়া রেভল্যুশনারি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, এসএসএআই ও ছাত্র যুব সংগ্রাম মোর্চাসহ ১৪টি ছাত্র ও যুব সংগঠনও বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানাতে ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’


বিক্ষোভের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ হিসেবে মাসিক ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিহার সরকার। মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রতি মাসের চতুর্থ মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব শিবির আয়োজন করা হবে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি নিজেদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।

এ ছাড়া অনলাইনে অভিযোগ নিবন্ধন এবং তার অগ্রগতি অনুসরণের সুবিধাও থাকবে। এ জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল ও ১১০০ হেল্পলাইন চালুর কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মন্তব্য ঘিরেও ক্ষোভ

এর আগে বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক রাজেশ কুমার বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘হাতি চলে বাজার, কুকুর ভোকে হাজার’—এই মন্তব্যকে আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা।

তেজস্বী যাদব ওই কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অপসারণ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, পরীক্ষায় বারবার অনিয়ম ও বাতিলের ঘটনা ঘটলেও দায় নির্ধারণ বা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

শিক্ষার্থীদের দাবি ও সরকারের অবস্থান নিয়ে অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুত সংলাপ না হলে পাটনায় আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত

Monday, August 24, 2026

জেন-জির ক্ষোভ সামলাতে জোড়া ব্যবস্থা বিজেপির by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শুধু জেন–জি নয়, নতুন প্রজন্মের মন জিততে বিজেপি এখন থেকে জেন আলফাকেও সমান গুরুত্ব দিতে চলেছে। কারণ, আজ যারা ১৬–১৭, ২০২৯ সালে লোকসভা ভোটে তারা ভোটাধিকার পেয়ে যাবে। সংগঠনের দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের হাতে সঁপে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৈরি করে দেওয়া ‘রোড ম্যাপ’ অনুযায়ী বিজেপি এখন নতুন প্রজন্মের মন জেতার ওপরই বেশি করে নজর দিতে চলেছে।

সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত ৬৫ সদস্যের জাতীয় টিমের প্রথম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ওই সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন, এত দিন দলীয় নেতারা সবাইকে কর্তব্য সম্পর্কে জানিয়ে এসেছেন। কী কী করতে হবে, সেসব ‘বাণী’ শুনিয়ে এসেছেন। এবার থেকে চলতে হবে নতুন করে। বাণী নয়, ভাষণ নয়, নেতাদের এবার থেকে নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি বসতে হবে। তাঁদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে। অভিযোগ ও চাহিদার কথা বলতে দিতে হবে। নেতাদের মন দিয়ে সেসব কথা শুনতে হবে। সেই অনুযায়ী দলকে চালনা করতে হবে। ওপর থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

অর্থাৎ বিজেপিতে নেতাদের একতরফা ভাষণবাজির দিন শেষ হতে চলেছে। প্রাধান্য পেতে চলেছে নয়া প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপ শুরুর দিন।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণও আছে। ভুঁইফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে দেশের যুবসমাজ বা জেন–জি যেভাবে দিকে দিকে প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, বিজেপির কাছে তা অশনিসংকেত। শুধু বিজেপিই নয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) নয়া প্রজন্মের এই অসন্তোষ টের পেয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সজাগ করে দিয়েছে। আরএসএস ও তার সঙ্গী সংগঠনগুলো, যাদের ‘সংঘ পরিবার’ মনে করা হয়, তাদের নেতারা সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপট্টনমে এক সমন্বয় বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। সংঘ নেতৃত্বের উপলব্ধি, তরুণদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, উপযুক্ত চাকরির আকালসহ নানা কারণে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সরকারের ওপর তাদের আস্থা ও ভরসা টলে যাচ্ছে। সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত এই উপলব্ধির কথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়ে বলেছেন, সরকারকে যেমন যথাযথ পদক্ষেপ করতে হবে, দলকে তেমন পরিচালনা করতে হবে নতুনভাবে, নতুন ভাবনায়।

একদিকে সংলাপ, অন্যদিকে প্রতিরোধ: বিজেপির সাঁড়াশি নীতি

তবে শুধু ‘ভুল শোধরানো’ নয়, তেলাপোকাদের দল সিজেপির মোকাবিলায় বিজেপি নেতৃত্ব কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নৈরাজ্য বন্ধে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিচ্ছে এবং সেটা প্রয়োগ করা হচ্ছে সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।

স্বাধীনতা দিবসের দিন, অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে সিজেপি দেশজুড়ে এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘স্কুল ঠিক করো’। দলীয় নেতা–কর্মীরা রাজ্যে রাজ্যে সরকারি স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছেন। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি না, অবকাঠামো কেমন, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, পড়ুয়ারা কতটা সন্তুষ্ট—এসব তাঁরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন, যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। সিজেপির এই কর্মসূচির কথা জানাজানি হওয়ার পর বহু জেন আলফা স্কুলপড়ুয়া নিজেরাই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছে। বিজেপি এই কর্মসূচির বিরোধিতা করছে। কোথাও সিজেপি নেতাদের মারধর করা হয়েছে। তাঁদের গাড়িবহরে হামলা করা হয়েছে। স্কুলে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কোথাওবা অনধিকার চর্চার মামলা করা হয়েছে।

যেমন রাজস্থানের এক গ্রামে সিজেপির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাংকাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কলকাতার কোথাও তাঁদের মিলনায়তন ভাড়া দেওয়া হয়নি। কোথাও প্রতিনিধিদের মারধর করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, দিপকেসহ সিজেপি নেতারা ওই স্কুলে বিনা অনুমতিতে ঢুকেছিলেন। পড়ুয়াদের সঙ্গে স্কুলের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করেছেন। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের কাজে বাধা দিয়েছেন।

বিজেপির ‘হার্ড লাইনাররা’, মানে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, সংলাপের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি সিজেপিকে হতোদ্যম করাও জরুরি। তাদের এমন কিছু করতে দেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সমাজে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। অরাজকতা দেখা যায়। এই কট্টরপন্থীদের কাছে ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী।

নৈরাজ্য–তত্ত্ব ও রাহুল গান্ধীর দাদাগিরি

শুধু তেলাপোকারাই নয়, নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও বিজেপির শীর্ষ নেতারা তুলতে শুরু করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গত ২০ জুলাই সাহিল লোচাব নামে ১৯ বছরের এক তরুণ পুলিশের ছোড়া ‘পেলেট’ বা ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি ছররার কারণে লোপ পেয়েছে। সাহিলের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি এফআইআর করতে পারছিলেন না। পুলিশ কোনো না কোনো উসিলায় তাঁর এফআইআর নিচ্ছিল না। ফিরিয়ে দিচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি রাহুল গান্ধীর শরণাপন্ন হন।

সাহিল, তাঁর মা ও সাহিলের আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল সম্প্রতি দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে ধরনায় বসেন। পুলিশের বড় কর্তাদের তিনি বলেন, দিল্লি পুলিশকে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর নিতেই হবে। কোনো অজুহাতেই তা এড়ানো যাবে না। পুলিশ টালবাহানা করলে সাহিল, তাঁর মা ও আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল থানার সামনে ধরনায় বসে যান। তাঁদের সঙ্গ দিতে একে একে চলে আসেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশ, সলমন খুরশিদ, পবন খেরাসহ বহু কংগ্রেস নেতা ও কর্মী। পার্লামেন্ট স্ট্রিটে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। কংগ্রেসিরা সরকারবিরোধী স্লোগানে তল্লাট মুখর করে তোলেন। সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরনার পর অবশেষে দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়।

রাহুলের ওই প্রতিবাদী চরিত্র, থানার সামনে ধরনায় বসে যাওয়ার সমালোচনায় মুখর হন বিজেপির শীর্ষ নেতারা। সাবেক সভাপতি জে পি নাড্ডা বলেন, রাহুল নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এইভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনেও ধরনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রবিশংকর প্রসাদ সংবাদ সম্মেলন করে রাহুলের ‘অগণতান্ত্রিক’ মনোভাবের নিন্দা করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাহুলকে তাঁরা টলাতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে থেকে কংগ্রেসিদের বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে থেকে তা করা যায়নি, যেহেতু আইনত পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। রাহুলের অনমনীয়তার দরুন এত দিন টালবাহানা করা দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়। রাহুল তারপর বলেন, এটাই প্রতিবাদের জয়। ন্যায়ের জয়। পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। অথচ তা না নিয়ে তারাই আইন লঙ্ঘন করছিল।

বিজেপির ‘নৈরাজ্য–তত্ত্ব’ এবং মামলা দায়ের তেলাপোকাদের দমাতে পারছে না। এফআইআর করা সত্ত্বেও তারা ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি থেকে সরছে না। একইভাবে রাহুল গান্ধীও বন্ধ করছেন না ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি। গত শনিবার মহারাষ্ট্রের পুনেয় রাহুলের সমাবেশে ছাত্র–ছাত্রীদের বিপুল ভিড় দেখা যায়। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ও প্রশাসনের বাধা সত্ত্বেও ওই সমাবেশে জেন–জি ও জেন আলফার ভিড় ছিল চমকে দেওয়ার মতো। রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস এই কর্মসূচির আয়োজন করছে।

রাহুলকে ঘিরে এই ভিড় বিজেপির বাড়তি চিন্তার কারণ। সরকারের প্রতি হতাশ ও ক্ষুব্ধ জেন–জি এবং জেন আলফার সমর্থন কংগ্রেসের দিকে যাতে ঢলে না পড়ে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিজেপি জোর দেওয়ার সেটাও একটা বড় কারণ।

ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ২০ জুলাই ২০২৬
ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ২০ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Wednesday, August 19, 2026

ভারতে মুসলিম যুবকের পরিবারের জন্য ৪ দফা দাবি ককরোচদের

উত্তর কলকাতার ‘ভারত সভা হল’-এ নির্ধারিত ‘মিট আপ’ শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিজেপির চাপে অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা।

মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আশুতোষ অভিযোগ করেন, ‘ভারত সভা হল’-এর পাশাপাশি কলকাতার আরো প্রায় ৬টি অডিটোরিয়াম তাদের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বুকিং দিতে রাজি হয়নি। তার দাবি, রাজনৈতিক চাপের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ওরা ভয় পেয়েছে।

তবে বাধা দিয়ে তাদের থামানো যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আশুতোষ। তিনি জানান, খুব শিগগিরই আরো বড় পরিসরে ‘মিট আপ’ আয়োজন করা হবে। যত আটকানোর চেষ্টা হবে, আমরা তত শক্তিশালী হব।

এদিন সংবাদ সম্মেলনে বাঁকুড়ার ইন্দাসের যুবক শেখ আব্দুল হাফিজের পরিবারের পাশে থাকার কথাও জানান সিজেপির মুখপাত্র। দলটির দাবি, সিজেপির ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করায় আব্দুলের বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকে হত্যা করা হয়েছে।

আব্দুলের পরিবারের জন্য চার দফা দাবি তুলে ধরেছে ককরোচ জনতা পার্টি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার, পরিবারের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা এবং আব্দুলের নামে অর্থ সংগ্রহ করে পরিবারকে সহায়তা করা।

এ জন্য শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের কাছেও আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন আশুতোষ।

তবে সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও সিজেপি অংশ নেবে না বলে জানান আশুতোষ। তিনি বলেন, আমরা প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করব। রাজনীতি করার জন্য আরো অনেকে আছে।

সূত্র: এই সময়

ভারতে মুসলিম যুবকের পরিবারের জন্য ৪ দফা দাবি ককরোচদের

অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

ভারতের স্বাধীনতা দিবস ঘিরে যখন স্বাধীনতার অর্জন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন দিল্লির তিহার কারাগারে প্রায় ৬ বছর ধরে বন্দি সাবেক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) শিক্ষার্থী নেতা উমর খালিদের মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি এখনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হননি; এমনকি মূল মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও এখনো শুরু পর্যায়ে রয়েছে।

উমর খালিদ দিল্লির ২০২০ সালের দাঙ্গাকে ঘিরে করা ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়ার মতো অভিযোগও আনা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় খালিদসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। পুলিশের দাবি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ ছিলেন খালিদ।

তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন উমর খালিদ। তার দাবি, দাঙ্গার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো ষড়যন্ত্রেও তিনি যুক্ত ছিলেন না। তার সমর্থকদের ভাষ্য, মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জামিনের পথেও দীর্ঘসূত্রতা

খালিদের মামলায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপূর্ব আটক থাকা। ইউএপিএর ৪৩ডি(৫) ধারায় জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত রয়েছে। আদালতকে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হতে হয় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই—যা সাধারণ ফৌজদারি মামলায় জামিনের প্রচলিত নীতির তুলনায় অনেক কঠিন।

২০২২ সালের অক্টোবরে দিল্লি হাইকোর্ট খালিদের জামিন আবেদন খারিজ করেন। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। সেখানে শুনানি দীর্ঘ সময় ধরে এগোয়নি। বিভিন্ন কারণে এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালতে নতুন করে জামিনের আবেদন করেন। সেখানেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।

২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট একই মামলার পাঁচ অভিযুক্ত—গুলফিশা ফাতিমা, মীরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মোহাম্মদ সেলিম খান ও শাদাব আহমদকে জামিন দেন। তবে উমর খালিদ ও আরেক কর্মী শরজিল ইমাম জামিন পাননি। আদালত তাদের অবস্থান অন্য অভিযুক্তদের তুলনায় ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন।

এরপর দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক নিয়ে নিম্ন আদালতগুলো কীভাবে আইনি নজির প্রয়োগ করছে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে। সেই সুযোগে খালিদ ও শরজিল ইমাম নতুন করে জামিনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাদের জানানো হয়, জানুয়ারির সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কারণে ট্রায়াল কোর্ট ওই সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবে না।

বর্তমানে খালিদ আবারো দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। এটি তার অষ্টম দফা জামিন আবেদন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। পুলিশের জবাব চাওয়া হয়েছে এবং আগস্টের শেষ দিকে এ বিষয়ে শুনানির কথা রয়েছে।

‘বিচারের আগে শাস্তি’ নিয়ে প্রশ্ন

খালিদের মামলাকে কেন্দ্র করে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো মূলত একটি প্রশ্ন তুলছে—একজন অভিযুক্তকে বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই কারাগারে রাখা কতটা ন্যায়সংগত?

মামলায় বিপুল পরিমাণ নথি ও প্রমাণ রয়েছে বলে আদালতে উল্লেখ করা হলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা হয়নি। এমনকি গ্রেপ্তারের কয়েক বছর পরও মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমালোচকদের মতে, দ্রুত বিচারের সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে এত দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি, কোনো ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হন কি না, তা আদালতের বিচারের বিষয়; কিন্তু বিচার শুরুর আগেই বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকা কার্যত শাস্তির মতো হয়ে যেতে পারে।

ইউএপিএর কঠোর জামিন বিধান নিয়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও দেশীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী এই আইনটি রাজনৈতিক মতবিরোধ, সাংবাদিকতা ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয়েছে এবং দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক অনেক ক্ষেত্রে কার্যত শাস্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে খালিদের মামলায় আদালতের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও নেই। আদালত বিদ্যমান আইন ও তার কঠোর জামিন কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব বিশেষ পরিস্থিতিতে জামিনের কারণ হতে পারে।

স্বাধীনতার প্রশ্নে উমর খালিদের মামলা

উমর খালিদের মামলা নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা এবং ভারতে রাজনৈতিক ভিন্নমতকে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখার প্রবণতা—এই তিনটি বিষয়কে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তার সমর্থকদের মতে, সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, তিনি গুরুতর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—যার বিচার আদালতেই নির্ধারিত হওয়ার কথা।

শেষ পর্যন্ত খালিদ দোষী না নির্দোষ, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে বিচার না হওয়াই এখন তার মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্যায়ন শুধু রাষ্ট্রের অর্জন দিয়ে নয়, রাষ্ট্র তার বিরোধীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে—তার মাধ্যমেও হয়।

উমর খালিদের মামলা তাই শুধু একজন ব্যক্তির জামিনের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্র: দ্য অবজার্ভার পোস্ট

অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

Tuesday, August 18, 2026

এবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ

‘তেলাপোকা’ আন্দোলনে নয়া কর্মসূচির লক্ষ্য সরকারি স্কুলঃ ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে আলোচিত ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এবার সরকারি স্কুলগুলোর দুরবস্থা নিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে এই কর্মসূচি শুরুর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে এক আন্দোলনকর্মীর বাবার মৃত্যুর ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের এই চাপসৃষ্টিকারী সংগঠন সম্প্রতি ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে ভূমিকা রাখার দাবি করে। ৩৭ দিনের অবস্থান কর্মসূচির পর দেশজুড়ে সরকারবিরোধী তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে গত জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

এবার সংগঠনটির নতুন কর্মসূচির নাম ‘ফিক্স দ্য স্কুলস’। এর আওতায় সমর্থকদের নিজ নিজ এলাকার সরকারি স্কুল পরিদর্শন করে সেখানকার অবস্থা যাচাই করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপদ পানীয় জল, কার্যকর শৌচাগার, বিদ্যুৎ, ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের নিরাপত্তা, মধ্যাহ্নভোজ এবং শিক্ষকদের উপস্থিতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান ২৬ বছর বয়সী আবদুল হাফিজ। ওই স্কুলেই একসময় পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, স্কুল পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় হাফিজ ও তার বাবা মোহাম্মদ মাফিক আহত হন। দুই দিন পর ৫১ বছর বয়সী মাফিক মারা যান।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব হামলাকারীদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে এবং ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পরও আবদুল হাফিজ জানিয়েছেন, উন্নত শিক্ষার দাবিতে তাদের আন্দোলন বন্ধ হবে না।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, শুধু ভালো স্কুলের দাবি জানানোর কারণে মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এদিকে রাজস্থানের আলওয়ার জেলায় স্কুলে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও পানীয় জলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন সংগঠনের এক নেতা। স্থানীয় কর্মকর্তারা পরে এসব দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানান।

তবে রাজস্থান সরকার সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ছবি বা ভিডিও ধারণের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা এটিকে তাদের কর্মসূচি ঠেকানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অনেক সরকারি স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিক্ষার নিম্নমানের মতো সমস্যা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এসব বিষয়কে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংগঠনটির কর্মীরা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা হামলা ও সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তা সত্ত্বেও সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, বাধা যতই আসুক সরকারি স্কুলগুলোর জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে।

এবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ
ভারতের নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট চলাকালে ২০২৬ সালের ১৯শে জুলাই তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে মোবাইল ফোন নাড়াচ্ছেন। রয়টার্স

চাপের মুখেও আবু সাঈদকে গুলির দৃশ্য কীভাবে টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল, উঠে এল সেই গল্প

‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেই অবস্থাতেই তাঁর বুকে গুলি করছে পুলিশ—এটি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সেই দৃশ্যের ফুটেজ প্রথম প্রচারিত হয়েছিল বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল চাপ সত্ত্বেও সেই দৃশ্য কীভাবে এনটিভিতে প্রচার করা হয়েছিল, সেই গল্প উঠে এল সাংবাদিকদের নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে এনসিপি–সংশ্লিষ্ট ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেই গল্প বলেছেন এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফকরুল আলম (কাঞ্চন)। ওই দৃশ্য ধারণ করা এনটিভির রংপুরের স্টাফ ক্যামেরাপারসন আসাদুজ্জামান আরমান এবং টেলিভিশনটির রংপুরের সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট এ কে এম মঈনুল হকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার সেই দৃশ্য এনটিভিতে প্রচারের গল্প বলতে গিয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘জুলাই বেদনার স্মৃতিতে ভরা। কারণ, যেদিন প্রথম আলোতে ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, সেদিন বিভিন্ন টেলিভিশন দুজনের মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিল। আমাদের কাছে অনেক ফুটেজ থাকলেও দেখানো সম্ভব হয়নি। আবু সাঈদকে যেদিন শহীদ করা হয়, সেদিন রানডাউনে (বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে) তিনি ছিলেন।’

সে সময় আন্দোলনে সংঘাত-সংঘর্ষের খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল উল্লেখ করে ফকরুল আলম বলেন, ‘১৬ জুলাই সংবাদ চলাকালে আমরা দুটি জায়গা থেকে লাইভ করি। প্রথমে বরিশালে সংঘর্ষের ঘটনার লাইভ প্রচারিত হয়। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে রংপুরে লাইভে চলে গেলাম। আরমান (পাশে থাকা) সেদিন স্পটে ছিলেন। তিনি সেদিনের সুপার হিরো। মঈনুলও ছিলেন। ক্যামেরা নিয়ে দুঃসাহসী কাজটি করেছিলেন আরমান।’

শুধু এনটিভিই আবু সাঈদকে গুলি করার সেই দৃশ্য লাইভে প্রচার করেছিল উল্লেখ করে এনটিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ ব্যবস্থাপক ফকরুল আলম বলেন, ‘লাইভের পর আমরা নিউজরুমে হতভম্ব হয়ে পড়ি, হাত-পা কাঁপছিল। কারণ, আমি জানতাম এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এরপর অনেক কিছু হলো—নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ, গোয়েন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ ও জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের অনেক প্রশ্ন।’

সে যাত্রায় কীভাবে জেলে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘সেদিন গোয়েন্দাদের বলেছিলাম—এ রকম একটি ঘটনা ঘটবে আমি তো জানি না, সংঘর্ষের ঘটনা দেখে লাইভে গিয়েছিলাম, আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে, পুলিশ তাঁকে গুলি করবে—তা আমরা জানতাম না। এ কথা বলে সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম।’

জুলাইয়ের স্মৃতিচারণা, ক্ষোভ–হতাশা

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা–প্রাপ্তি নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন। তাঁদের অধিকাংশ জুলাইয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেন। কেউ কেউ অভ্যুত্থানের পর চাকরিচ্যুতির ঘটনা উল্লেখ করেন। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেন।

ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ে যাঁরা যাত্রাবাড়ী-রামপুরার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফুটেজ নিয়েছেন, মোবাইলকে যাঁরা অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন, গুলির পাশে দাঁড়িয়ে জুলাইকে লিপিদ্ধ করা সেই সাংবাদিকদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বড়। আর যাঁরা জুলাইয়ের বিপক্ষে ছিলেন, ইতিহাস তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে কৌশলে কিছু মানুষের সুবিধা পাওয়া আর কিছু মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন অভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ। ঘৃণার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের অ্যাসাইমেন্ট এডিটর মাকসুদ উন নবী জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংবাদ প্রচারে বিভিন্ন সংস্থার বাধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাওয়ায় অনেক ছাত্র-জনতা সাংবাদিকদের মেরেছিল।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব অভ্যুত্থানের সময় দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করতেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুরে ধরে তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়ায় তাঁকে টার্গেট (নিশানা) করা হয়েছিল। ২৬ জুলাই তাঁর অফিসে তাঁকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অফিসে ঢুকে তাঁর ব্যবহৃত কম্পিউটার ভাঙচুর ও নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করা হয়। মালিক–সম্পাদককে চাপ দেওয়া তাঁকে র‌্যাবের হাতে তুলে দিতে। তবে সম্পাদক দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তাঁকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বর্তমানে কালের কণ্ঠে কর্মরত জাহিদুল ইসলাম অভ্যুত্থানের সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিকেরা।

বর্তমানে দৈনিক আগামীর সময়ের স্টাফ রিপোর্টার আমজাদ হোসেন (হৃদয়) অভ্যুত্থানের সময় ছিলেন দেশ রূপান্তর পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক। তিনি বলেন, আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন, ৯ দফা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুজব ডিবাঙ্ক (উন্মোচন) করতে ভূমিকা রেখেছিলেন সাংবাদিকেরা।

অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহিউদ্দিন মুজাহিদ (মাহি)। সে সময় ‘কঠিন সেন্সরশিপে’ আবদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এখন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে চাকরিচ্যুত বেলায়েত হোসেন নিজের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের কাছে প্রশ্ন রাখেন, দায়িত্বে থাকার সময় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের সঙ্গে বসার কোনো তাড়না তাঁর ছিল কি না।

স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে মালিকানা পরিবর্তন বা তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সটা শিফট হয়েছে। এটা ভবিষ্যতে পীড়া দেবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে নিউ এজের নির্বাহী সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত (কল্লোল), ডেইলি স্টারের জিনা তাসরিন, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান বাবলু, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক জুমাতুল বিদা, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদ হায়দার, এখন টিভির মাহমুদ রাকিব, যমুনা টিভির আহমেদ রেজা ও লামিয়া তিথি প্রমুখ বক্তব্য দেন।

‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিদের একাংশ। রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৭ আগস্ট ২০২৬
‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিদের একাংশ। রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৭ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এনসিপির সৌজন্যে

Monday, August 17, 2026

নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি, তরুণদের মন জয়ে ব্যর্থ বিজেপি

ভারতের তরুণদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ছাত্র আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, উপনির্বাচনে পরাজয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মন জয়ের ব্যর্থ চেষ্টা—সব মিলিয়ে বিজেপিকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলে চাপ সৃষ্টি করেছে। টানা সাত সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এর পরপরই কয়েকটি উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বেকারত্ব, চাকরির পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ থেকে তরুণদের মধ্যে এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গত মে মাসে ইনস্টাগ্রামে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। পরে সেটিই ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। আন্দোলন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ভারতের বিভিন্ন শহরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

উপনির্বাচনে ধাক্কা

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতে হেরেছে বিজেপি। এর মধ্যে বিহারের ব্যাংকিপুর আসনে দলটির পরাজয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা এই আসন হাতছাড়া হওয়াকে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু উপনির্বাচনের ফল দেখে বিজেপির শক্তি কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপি এখনো শক্তিশালী এবং নির্বাচনীভাবে অত্যন্ত সংগঠিত দল।

তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা

তরুণদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেপিও নতুনভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেছে। মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তরুণদের আকৃষ্ট করতে নতুন ধরনের প্রচারণাও চালাচ্ছে দলটি।

উত্তর প্রদেশে তরুণদের জন্য বিশেষ যোগাযোগ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজেপির এসব প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একসময় বিজেপি যেভাবে নিজের রাজনৈতিক বার্তা সহজে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারত, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সেই প্রভাব এখন আগের মতো নেই। ইনস্টাগ্রামের মতো বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির প্রচলিত প্রচারণা কৌশল কার্যকর হচ্ছে না।

পুরোনো কৌশলও কাজ করছে না

বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী, বিদেশি অর্থায়নপুষ্ট বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরার পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল এবার তেমন কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এতে বিভিন্ন ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক শ্রেণির তরুণরা অংশ নিয়েছেন। এমনকি বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত উচ্চবর্ণের হিন্দু তরুণদেরও আন্দোলনে দেখা গেছে।

ফলে আন্দোলনটিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজেপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন বিজেপির ক্ষমতা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বল করেনি, কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় প্রশ্ন তুলেছে।

বিজেপি এখনো ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব, শিক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের একাংশ বলছে, শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ তাদের লক্ষ্য নয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীবিরোধী রাজনীতিসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার পরিবর্তন চান তারা।

তবে বিজেপি তার হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয় ও হিন্দুত্বের রাজনীতিকেই আরও জোরালোভাবে সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে দলটি।

সব মিলিয়ে, ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন বিজেপির ক্ষমতার ভিত ভেঙে দিয়েছে—এ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ যে মোদি সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, তা আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। 

নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি, তরুণদের মন জয়ে ব্যর্থ বিজেপি

Sunday, August 16, 2026

মোদিদের শত্রু সেই ‘আজাদি’ স্লোগান আবার ভারতের তরুণদের মুখে

ভারতে শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘আজাদি’ স্লোগান। একসময় যে স্লোগানকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষার্থী নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়েছিল, সেই একই স্লোগান এখন জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

২৬ জুলাই সকালে নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরের কাছে দেয়ালে আঁকা আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রাফিতি মুছে ফেলতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত কর্মীদের পাঠায়। এর একদিন আগে পরীক্ষা কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। আন্দোলনের প্রবেশপথে লেখা ছিল— “#২০২৬ জেন-জি বিপ্লব!!!” এই আন্দোলনের প্রধান স্লোগান ছিল আজাদি বা স্বাধীনতা।

আন্দোলনের সময় ২০ বছরের এক তরুণ গাছে উঠে শক্তিশালী লাউডস্পিকারে ‘আজাদি’ গানটি বাজান—‘আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও! আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও! আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও!’ গানটির সঙ্গে জনতাও সুর মেলায় এবং হাত উঁচিয়ে স্বাধীনতার দাবি জানায়। বলিউডের গলি বয় সিনেমার জনপ্রিয় এই গানটি এবার শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগীত হয়ে ওঠে।

নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিটে পুলিশ সদস্যদের শিক্ষার্থীদের মারধরের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে প্রায় এক দশক পুরোনো গানটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। শুধু দিল্লি নয়, জয়পুর, লখনউ ও মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরেও ‘আজাদি’ স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে।

অথচ এক দশক আগেও দিল্লিতে ‘আজাদি’ ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত একটি শব্দ। ২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) শিক্ষার্থীদের এই স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।

গত মাসে মন্ত্রীর পদত্যাগের পর হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বাড়ি ফিরে যাওয়ায় যন্তর মন্তরের আলো নিভে গিয়েছিল। কিন্তু রাস্তা জুড়ে তখনও উজ্জ্বল হলুদ রঙের ধাতব পুলিশের ব্যারিকেডের সারি ছিল। সেগুলোর অনেকগুলোই বিক্ষোভকারীরা রং করে দিয়েছিল। যেগুলোর একটিতে লাল রঙে লেখা ছিল: ‘উমর, শারজিল, গুলফিশা তোমাদের আগে এখানে ছিল।’

এই স্লোগানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের নারীবাদী আন্দোলন ও কাশ্মীরের প্রতিরোধ থেকে, যা বর্তমানে ভারতের মূলধারার ছাত্র রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে

জেএনইউ থেকে রাজপথে

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে জেএনইউতে ভারতের মৃত্যুদণ্ড ও কাশ্মীরি নেতা আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে একটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো শিক্ষার্থীদের ‘আজাদি’ স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে ঘটনাটিকে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনাটি এভাবেই স্মরণ করেছেন উমর খালিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং অনুষ্ঠানটির অন্যতম আয়োজক বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী

মোদী সরকারের প্রতি অনুগত বলে বিবেচিত ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো এই ঘটনাটিকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে এবং তৎকালীন জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারের নেতৃত্বে ছাত্রদের ‘আজাদি’ স্লোগান দেওয়ার ফুটেজ বারবার সম্প্রচার করে।

মোদিপন্থি গণমাধ্যমগুলো ছাত্রদেরকে ‘সন্ত্রাসীদের সমর্থক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং কিছু চ্যানেল ঘটনাটি সম্পর্কে বিকৃত ক্লিপও সম্প্রচার করেছে। লাহিড়ী বলেন, বিতর্কটি ‘মাত্রাতিরিক্ত বড় আকার ধারণ করায়’ খালিদের মতো ছাত্র এবং জেএনইউ ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠে।

লাহিড়ী স্মরণ করেন, ‘তীব্র গণমাধ্যম ট্রায়াল শুরু হলো। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রচারণা: আর বার্তা ছড়ানো হচ্ছিল যে দেশবিরোধী ছাত্ররা করদাতাদের টাকায় জীবনযাপন করে ।’ কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ ও গ্রেপ্তার শুরু হয় এবং কয়েক সপ্তাহ পরে খালিদ ও অন্যরা জামিনে মুক্তি পায়।

দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ তুলে দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করার পর, সেখানকার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর দমন অভিযান চালায়।

২০১৬ সালের শুরুর দিকের এই ঘটনাগুলো একটি সরকারি অভিযানের সূচনা করেছিল, যা ধীরে ধীরে ভারতের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমত ও মত প্রকাশের পরিসরকে সংকুচিত করে দেয়। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

এরপর ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের পরিসর সংকুচিত হতে থাকে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি না দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগের অভিযোগও ওঠে।

২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় দিল্লির মুসলিম শিক্ষার্থী নেতারা জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব দাবিতে হওয়া বিক্ষোভ, যা ২০২০ সাল পর্যন্ত চলেছিল, তার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।

পুলিশি উপস্থিতি ও তদন্ত জোরদার করা হয়েছিল; শিক্ষার্থীদের অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং গবেষণা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আর এর ছয় বছর পর আজও, পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়া খালিদ এবং শারজিল ইমামের মতো ছাত্রনেতারা বিনা বিচারে কারারুদ্ধ রয়েছেন।

‘আজাদি’ থেকে গলি বয়

২০১৬ সালের জেএনইউ আন্দোলনের ‘আজাদি’ স্লোগানই সংগীত প্রযোজক ডাব শর্মাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের সঙ্গে ইলেকট্রনিক বিট যুক্ত করে গানটি তৈরি করেন।

পরবর্তী সময়ে পরিচালক জোয়া আখতার ২০১৯ সালের গলি বয় সিনেমায় গানটি ব্যবহার করেন। মুম্বাইয়ের র‍্যাপার ডিভাইন এতে অংশ নেন। সিনেমার সংস্করণে ক্ষুধা ও বৈষম্য থেকে মুক্তির বিষয়টি থাকলেও মূল আন্দোলনের জাতপাত, পুঁজিবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে থাকা অনেক বক্তব্য বাদ দেওয়া হয়।

সাত বছর আগে, পুনর্নির্মিত সংস্করণে ডিভাইন আয় বৈষম্য ও রাজনীতিবিদদের সুবিধাভোগী সন্তানদের নিয়ে র‍্যাপ করেছিলেন এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা দখলের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন — এই সবই এখন বিশ্বজুড়ে জেন জি প্রজন্মের প্রতিবাদের মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

মোদীর শাসনামলে ভারত একাধিক গণতান্ত্রিক সূচকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে। এ বছর, শর্মার নতুন করে সাজানো স্কোরটি ব্যাপকতর শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের প্রতিরোধের স্লোগানে পরিণত হয়।

‘আজাদি’ ধ্বনির সর্বপ্রথম আধুনিক রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৮০-এর দশকে জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নারীবাদী প্রতিরোধে। প্রয়াত ভারতীয় নারীবাদী কর্মী কমলা ভাসিন স্মরণ করেছেন যে, তিনি এই ধ্বনির সাবলীলতায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং এটিকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিবাদের জন্য আহ্বানগুলোকে উপযোগী করে তুলেছিলেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি প্রতিরোধও এই স্লোগানটি গ্রহণ করেছিল। নয়াদিল্লির বাম উদারপন্থী আন্দোলনও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের স্বাধীনতার আহ্বান ছিল নিজ নিজ প্রেক্ষাপট-নির্ভর।

২০২১ সালে ভাসিনের মৃত্যুর এক বছর আগে, তিনি এক সাক্ষাৎকারে আজাদি স্লোগানকে “একটি জীবন্ত, স্পন্দনশীল স্লোগান” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

এই স্লোগানটি প্রতিদিন বিকশিত হয়, প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়। এর অর্থ অপরিবর্তনীয় নয়।

জেন-জি আন্দোলনে নতুন অর্থ

ভারতের প্রধান বিচারপতি বিতর্কিতভাবে দেশের বেকার যুবকদের তেলাপোকা ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করার এক মাস পর, গত জুন মাসে সেই অপমানজনক মন্তব্যটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্নাতক অভিজিৎ দীপকে এক্স-এ একটি পোস্টে সাধারণভাবে ভেবেছিলেন: “যদি সব তেলাপোকা একজোট হয়?”। এরপর তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করেন এবং ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যান। এটি ইনস্টাগ্রামে ২২ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার অর্জন করে, যা ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ফলোয়ারের সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।

লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ছাত্রছাত্রীকে প্রভাবিত করা একাধিক পরীক্ষা কেলেঙ্কারির পর, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষা সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে একটি আন্দোলন শুরু করার অঙ্গীকার করে দীপকে ভারতে ফিরে আসেন।

এবারের আন্দোলনে ‘আজাদি’ নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে পরীক্ষার কেলেঙ্কারি ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে দিল্লির জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠনও যুক্ত হয়।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়াসহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা পালা করে আন্দোলনস্থলে অবস্থান করেন। আইনজীবী, অধ্যাপক ও কৃষকদেরও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এটি প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, মিম ও ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে আন্দোলনকারীরাই নিজেদের বক্তব্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠেন।

এআইএসএর সাবেক জাতীয় সভাপতি এন সাই বালাজির মতে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ হওয়ায় তারা নিজেদের আন্দোলনের বয়ান নিজেরাই তৈরি করতে পেরেছে। ফলে তাদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টাও আগের তুলনায় কম কার্যকর হয়েছে।

‘আজাদি’ কেন আবার জনপ্রিয়?

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রতিবাদের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় তরুণদের রাজনীতি আবার রাস্তায় ফিরে এসেছে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ববিরোধী আন্দোলন তাদের অনুপ্রাণিত করেছে বলেও অনেকে মনে করেন।

এআইএসএর নেত্রী নেহা বোরা বলেন, ২০১৯ সালের মুসলিম নেতৃত্বাধীন নাগরিকত্ববিরোধী আন্দোলন তার মধ্যে একটি ‘বিপ্লব’ তৈরি করেছিল। তার মতে, সরকার ‘আজাদি’ শব্দটিকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেও পুলিশি নির্যাতনের মুখে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে—এই স্লোগান আসলে মৌলিক অধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবি।

সাম্প্রতিক আন্দোলনে ‘আজাদি’ তাই শুধু পুরোনো একটি প্রতিবাদী গান নয়; বরং ভারতের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষা, অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মোদিদের শত্রু সেই ‘আজাদি’ স্লোগান আবার ভারতের তরুণদের মুখে
ছবি: সংগৃহীত।

Tuesday, August 11, 2026

দিল্লির চাপ সামাল দিতে ঝাড়খন্ডকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পুঁজি করছে বিজেপি

দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি অত্যাচার নিয়ে কোণঠাসা বিজেপিকে চাঙা করে দিল ঝাড়খন্ডে একই ধরনের বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিপেটা। দিল্লির ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহির দাবিতে জেরবার বিজেপি আজ মঙ্গলবার পাল্টা মুখর হলো রাঁচিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি লাঠিপেটার ঘটনায়।

বিরোধীদের যে দাবিতে টানা তিন সপ্তাহ সংসদ অচল রয়েছে, সেই দাবিই এবার হাতিয়ার হলো কেন্দ্রের শাসকশিবিরের সদস্যদের। ঝাড়খন্ডের ঘটনার জন্য আজ কংগ্রেস নেতার রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে সরব হয়েছে বিজেপি। সংসদ চত্বর গম গম করে ওঠে সরকার ও বিরোধীদের মুখোমুখি বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি স্লোগানে।

এর ফলে আজও সংসদের উভয় কক্ষে স্বাভাবিক কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও লোকসভা বা রাজ্যসভায় যাননি। টানা তিন সপ্তাহ সংসদে বিরোধীদের মুখোমুখি না হয়ে মোদি ও শাহ এক বিরল নজির সৃষ্টি করলেন।

সরকারপক্ষ জানিয়েছে, অমিত শাহ বিবৃতি দিতে রাজি। বিরোধীরা জানিয়েছেন, দায়সারা বিবৃতি নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, পেলেট গান ছোড়াসহ পুলিশকে অত্যাচারের নির্দেশ কে দিয়েছিল। আগামী বৃহস্পতিবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ দিন।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থীরা কিছুদিন ধরেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সময় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতানেত্রীরা অনশন করেছিলেন, ঝাড়খন্ডে তেমনই অনশন করছেন ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো।

নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, অপরাধীদের শাস্তিদান ও দুর্নীতির তদন্তের ভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল সোমবার শিক্ষার্থীরা বিধানসভা ভবন অভিযানে শামিল হন। তা ঠেকাতে ঝাড়খন্ড পুলিশ জলকামান ছোড়ে। লাঠি চালায়। আজ সংসদ ভবন চত্বরে তা নিয়ে সরব হন বিজেপি ও এনডিএ সদস্যরা। পুলিশি অত্যাচারের জন্য পাল্টা তাঁরা রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। কংগ্রেস ঝাড়খন্ডে ইন্ডিয়া জোট সরকারের শরিক। ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) নেতৃত্বাধীন মোর্চায় কংগ্রেস ছাড়াও রয়েছে আরজেডি ও বামপন্থীরা।

দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ, র‍্যাফ ও সিআরপিএফ লাঠি চালিয়েছিল, কাঁদানে গ্রাসের শেল ছুড়েছিল, পেরেক পোঁতা ও ইলেকট্রিক শক দেওয়া লাঠি (শক ব্যাটন) ব্যবহার করেছিল এবং পেলেট গান থেকে ছররা গুলি ছুড়েছিল।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ সিজেপি নেতারা সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীকে ওভাবে শক্তি প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছিলেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই। সে কারণে তাঁর জবাবদিহির দাবিতে বিরোধীরা আজও সংসদ অচল রেখেছে।

বিরোধীদের দাবি, অমিত শাহকে জানাতে হবে ওই নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কি না। না দিলে কে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল। বস্তুত, তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও অমিত শাহ সেই দাবি মানেননি। প্রধানমন্ত্রী মোদিও শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাননি।

ঝাড়খন্ডের ঘটনা নিয়ে আজ সকালে কোণঠাসা বিজেপি ও এনডিএ জোট সরব হয়ে ওঠেন। বিরোধীদের মতো তাঁরাও প্ল্যাকার্ড নিয়ে সংসদ ভবনে আসেন। কংগ্রেস নেতা রাহুলের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে মুখর হন, যদিও রাহুল ঝাড়খন্ড সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন।

২০ জুলাই দিল্লিতে পুলিশি অত্যাচার নিয়ে মোদি-শাহ এখনো মুখ খোলেননি। কিন্তু রাহুল গতকালই রাঁচিতে পুলিশি লাঠি চালনার নিন্দা করে বিবৃতি দেন। গতকালই ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘ঝাড়খন্ডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। একমাত্র আলোচনার মধ্য দিয়েই সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে।’

রাহুল রাজ্য সরকারকে অনুরোধ জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে দ্রুত সমস্যার সুরাহা করতে।

ইনস্টাগ্রামে রাহুল গান্ধী ‘আস্ক মি এনিথিং’ নামে এক অনুষ্ঠান করছেন। তাতে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাহুল বলেন, ‘দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করছেন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কোটা, দেরাদুন, এলাহাবাদে (প্রয়াগরাজ) আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও নিপীড়নমূলক। কেন্দ্রীয় সরকার, ঝাড়খন্ড সরকার বা কংগ্রেস সরকার, সবার উচিত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনা।’

শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে রাহুলের অবস্থান স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হলেও সংসদ ভবন চত্বরে বিজেপি সদস্যরা তাঁকেই আক্রমণের লক্ষ্য করে তোলেন। ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে মুখর হন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকেন বিরোধীরাও। তাঁরাও মুখর নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে। এক সময় ওইখান দিয়ে আসতে দেখা যায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদেরাকে। বিজেপি সদস্যরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন রাহুল কেন চুপ। জবাবে প্রিয়াঙ্কা বলেন, রাহুল পুলিশি অত্যাচারের নিন্দা করেছেন। ঝাড়খন্ডের পড়ুয়াদের সঙ্গেও দেখা করেছেন।

ঝাড়খন্ডের অনশনকারী ছাত্র নেতা দেবেন্দ্র মাহাতো গতকাল বিধানসভা অভিযানে শামিল হন অ্যাম্বুলেন্সে চেপে। পরে শরীর খারাপ হয়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেবেন্দ্র ১০ দিন ধরে অনশন করছেন। গতকাল গভীর রাতে তাঁকে ভিডিও কল করেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে।

পরে দিপকে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘দেবেন্দ্র মাহাতোর সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশের লাঠিতে আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ওকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বুকে ব্যথা অনুভব করছেন। যন্তর মন্তর হোক বা ঝাড়খন্ড, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা অমানবিক। সিজেপি দৃঢ়ভাবে দেবেন্দ্র ও তাঁর সংগ্রামের পাশে আছে। তিনি একজন প্রকৃত বীর। তাঁর সাহস ও শক্তিকে কুর্নিশ করি।’

ঝাড়খন্ড সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বারবার আলোচনা করেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, ৯৮ শতাংশ দাবি মানা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যে দুই দাবি মানতে সরকার নারাজ তার একটি হলো দুর্নীতির তদন্তের ভার সিবিআইয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অন্যটি হলো ঝাড়খন্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) ও কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (সিজিএল) পরীক্ষা দুটি বাতিল করার।

এই দুই দাবি নিয়ে টানাপোড়েন চলছে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। রাজ্যে বিজেপি বিরোধী পক্ষ। তারা ছাত্রদের সমর্থনে ও পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে আজ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

সিজেপির সমর্থকদের ওপর পুলিশের দমন–পীড়ন ও রামমন্দিরের অর্থ লোপাটের প্রতিবাদের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য অভিনেত্রী জয়া বচ্চনসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভ করেন। ১১ আগস্ট ২০২৬, নয়াদিল্লি
সিজেপির সমর্থকদের ওপর পুলিশের দমন–পীড়ন ও রামমন্দিরের অর্থ লোপাটের প্রতিবাদের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য অভিনেত্রী জয়া বচ্চনসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভ করেন। ১১ আগস্ট ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই

Sunday, August 2, 2026

তিউনিসিয়ায় জনরোষ তীব্র, দানা বাঁধছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা

পাঁচ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের ক্ষমতা দখলের পর আপাত শান্ত তিউনিসিয়ার ভেতরে জমে উঠছে জনঅসন্তোষ। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ক্রমাবনতিশীল অর্থনীতি, ভেঙে পড়া জনসেবা এবং দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও পানি সংকট দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে।

২০১১ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রায় সব অর্জনই এখন ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে জনগণের অংশগ্রহণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। একসময় টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্কের যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তার জায়গা নিয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠান।

সম্প্রতি রাজধানী তিউনিসে হাজারো মানুষ প্রেসিডেন্ট সাইদের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জীবনযাত্রার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে সাইদের সমর্থকরাও পাল্টা সমাবেশ করে বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তাদের কারাবন্দি করার দাবি জানান।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তিউনিসিয়া পরিচালক সালসাবিল শেল্লালি বলেন, সরকারবিরোধী যেকোনো সমালোচনা এখন কার্যত অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, পাঁচ বছর আগে কাইস সাইদ তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সমাপ্ত করে দেশকে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরিয়ে নিয়েছেন। আইনের শাসন দুর্বল করা, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। তার শাসনে কোনো সমালোচকই নিরাপদ নন।

তাপপ্রবাহে উন্মোচিত অব্যবস্থাপনা

তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানলে তিউনিসিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। ইতালি ও আলজেরিয়ার সহায়তা সত্ত্বেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানি এসটিইজি এ পর্যায়ক্রমিক লোডশেডিং চালু করেছে। এতে কৃষিজ ফসল নষ্ট হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেক এলাকায় টানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তিউনিসীয় বিশ্লেষক বলেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা বাড়বে এটা সবাই জানে। কিন্তু তিউনিসিয়ায় নেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, নেই বিনিয়োগ, নেই অর্থ। তিনি আরো বলেন, সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়; জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনারও চরম অভাব রয়েছে।

বিরোধীদের কারাবন্দি, গণমাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

দেশটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারবিরোধী নেতা হয় কারাগারে, নয়তো নির্বাসনে রয়েছেন। একসময়কার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এন্নাহদার অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বন্দি। দলটির ৮৫ বছর বয়সী নেতা রাশেদ ঘানুশিও কারাগারে রয়েছেন। গত মাসে অসুস্থ হয়ে কারাগারে অজ্ঞান হওয়ার পর থেকে তার অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে ‘ভুয়া খবর’ দমনের নামে প্রণীত কঠোর আইনের মাধ্যমে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ব্যঙ্গবিদ হাইথেম এল মেক্কিকে তিন বছর আগের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক হামজা মেদদেব বলেন, সবখানেই সেন্সরশিপ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অসুস্থ মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন, এমনকি বয়স্কদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

তার মতে, মানুষের ক্ষোভ কখনও রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও পানি কোম্পানির দিকে, কখনও সরকারের দিকে গেলেও, প্রকৃত ক্ষমতাকেন্দ্র প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে দায়ী করতে মানুষ ভয় পাচ্ছে।

সংস্কারের আশা ক্ষীণ

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সাইদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুর চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তিউনিসিয়া সরকারের সঙ্গে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে তারা।

প্রতিবেশী আলজেরিয়া ও লিবিয়াও সীমান্তে অস্থিতিশীলতা এড়াতে সাইদ সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুন সম্প্রতি তিউনিসিয়ার স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক রিকার্দো ফ্যাবিয়ানি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাইদ এমন একটি মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছেন, যেখানে দেশের সব সমস্যাকেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন। তার মতে, তিউনিসিয়ার প্রায় সব আন্তর্জাতিক অংশীদারই এখন দেশটির সংস্কারের আশা ছেড়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

তিউনিসিয়ায় জনরোষ তীব্র, দানা বাঁধছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা
চলতি বছরের শুরুতে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা বিক্ষোভ করেন

Friday, July 31, 2026

এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ চাইল ‘ককরোচ’

ভারতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশেই হয়েছিল বলে অভিযোগ করছেন ‘ককরোচ জনতা পার্ট সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগও দাবি করেন তিনি। দীপকে বলেন, ‘ছাত্রদের উপর যে ভাবে আক্রমণ হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের রক্ত ঝরেছে, তা অমিত শাহের নির্দেশ ছাড়া হতে পারে না।’

আগের দিন বুধবার প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী বিল নিয়ে বিতর্কের সময় ভারতের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, গত ২০ জুলাই পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে ‘ককরোচ’দের সংসদ অভিযানের সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ শাহের নির্দেশেই করা হয়েছিল। লাঠি চালানোর পাশাপাশি ছোড়া হয়েছিল কাঁদানে গ্যাস, পেলেট। এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফাও দাবি করেছিলেন রাহুল।

এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলনেতার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গেল সিজেপির প্রধানের মুখে। ২০ জুলাইয়ের পুলিশি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিজেপি কর্মীদের দিকেও অভিযোগের তোলেন তিনি।

এসময় দীপকে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জন্য সিজেপি বিদেশি অর্থ-সাহায্য পেয়েছে বলে অভিযোগও খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই আমরা বিদেশি অর্থ পেয়ে থাকি, আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলালয়ের দায়িত্বে থেকেও অমিত শাহ তা আটকাতে না পারেন, তবে সেটাও তারই ব্যর্থতা। তা হলে নিজেকে কি তিনি ‘চাণক্য’ বলবেন? সে ক্ষেত্রেও তো তার পদত্যাগ করা উচিত।’

সেই সঙ্গে দীপকে অভিযোগ করেন, ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অজুহাত তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, ‘২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরের একটি ট্রাকে করে পাথর এবং একটি ভাঙাচোরা গাড়ি আনা হয়েছিল, যাতে পুলিশি অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা যায়। তিনি আরো বলেন, পাথর নিক্ষেপের পুরো ঘটনাই দিল্লি পুলিশ পরিকল্পিত ভাবে ঘটিয়েছে। বিজেপির লোকজন এসে পাথর ছোড়ে, অথচ দোষ চাপানো হয় ছাত্রদের উপর।’

প্রসঙ্গত, প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের জেরে গত ২৫ জুলাই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। আন্দোলনের সাফল্যের পর বুধবার নিজের মহারাষ্ট্রের বাড়িতে ফিরে দফায় দফায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন দীপকে।

তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্ব সামলানোর বদলে নরেন্দ্র মোদী সমাজমাধ্যমে নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে করেন। দীপকের কথায়, “আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে যাওয়া উচিত। ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি ভাল কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়ে অন্য কোনও নেতাকে দেশের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া উচিত।”

সেই সঙ্গে ‘ককরোচ’ প্রধানের অভিযোগ, বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরেও কেন্দ্র এবং বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারীদের খুঁজে বার করে হয়রানি করছে।

তিনি বলেন, ‘সিজেপি আন্দোলন তুলে নেওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করে হয়রানি করছে। সরকার অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ করুক। না হলে আগামী নির্বাচনে আন্দোলনকারীরাই এর জবাব দেবে।’

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কমেনি জানিয়ে দীপকে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে যে ভাবে পদত্যাগ করানো হয়েছে, তেমনই প্রয়োজনে সরকারও বদলে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বড় পরিসরে হবে।’

সূত্র: আনন্দবাজার

এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ চাইল ‘ককরোচ’
ছবি: সংগৃহীত।

মোদি সরকারকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতার হুঁশিয়ারি, ‘কথা না শুনলে সরকারই বদলে দেব’

‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তিনি দাবি করেছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আরো বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে উঠবে।

দিল্লিতে মাসব্যাপী আন্দোলন শেষে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দিপকে এসব কথা বলেন। তার অভিযোগ, ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘সংসদ অভিযান’ কর্মসূচিতে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ছররা গুলি ব্যবহার করে এবং এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

ওই প্রবল গণআন্দোলনের জেরে ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা ও কর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে পুলিশ। দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তারির কড়া হুমকি। পরিবারের সদস্যদেরও অহেতুক হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের এ দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা। আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানোর উদ্দেশে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

পুলিশি হেনস্তা অবিলম্বে বন্ধ না হলে দেশের যুবসমাজ আগামী দিনে সরকারকেই বদলে দেবে দাবি করে তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ না করে সরকারের উচিত সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়েছে, এমনটা ভাবলে মস্ত বড় ভুল হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বলপ্রয়োগের নির্দেশ যেই দিয়ে থাকুন না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নামও উল্লেখ করেন।

তিনি মনে করিয়ে দেন, ছাত্ররোষের কারণেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। ঠিক একইভাবে সরকার যদি নিজেদের শুধরে না নেয়, তবে আগামীকাল তারা এ সরকারকেই বদলে দেবেন।

এদিকে আন্দোলন ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক ও আইনি মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশটির সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে কড়া নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া কোনোভাবেই ছররা গুলি ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও কেন্দ্রীয় সরকার তা অস্বীকার করেছে। শাসক দল বিজেপি পুলিশের পদক্ষেপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ বলে দাবি করে। আর সিজেপি জানিয়েছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে এফআইআর প্রত্যাহার না হলে তারা দেশব্যাপী আরো বৃহত্তর ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথে হাঁটবে।

‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত এক মাস ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের এ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল করবে সরকার। অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে ভারতের শাসক দলকে হয়তো দীর্ঘমেয়াদে এর বড় রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হবে।

মোদি সরকারকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতার হুঁশিয়ারি, ‘কথা না শুনলে সরকারই বদলে দেব’
ছবি: সংগৃহীত

Tuesday, July 21, 2026

যন্তর মন্তরে ‘তেলাপোকাদের’ আন্দোলন চলবে, সরকারের কাছে তাদের তিন দাবি কী

সংসদ ভবন অভিযান চলাকালে গতকাল সোমবার বিকেলে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ধরনামঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল। আজ মঙ্গলবার ভোরে সেখানেই ফিরে এসেছেন আন্দোলনকারী নেতারা। সিজেপির নেতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, যন্তর মন্তরেই তাঁরা ধরনা চালাবেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকবেন। তবে নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানে শামিল যাচ্ছেন না।

আজ সকালে ধরনামঞ্চে ফিরে এসে অভিজিৎ দিপকে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানের ডাক তাঁরা দিচ্ছেন না। কারণ, তাতে পুলিশের উদ্দেশ্য সফল হবে। পুলিশ আবার শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করবে। তাঁদের বদনাম করবে। সে সুযোগ পুলিশকে তাঁরা দেবেন না।

অভিজিৎ বলেন, সরকারের মুখ পুড়েছে। তারা চাইলে এমন ঘটনা ঘটত না। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করলে এই আন্দোলনের প্রয়োজনই হতো না। কিন্তু সরকার নির্লজ্জ। বিজেপির নেতারা উদ্ধত।

সিজেপির আন্দোলনে সাড়া দিয়ে সংসদ ভবন অভিযানে শামিল হওয়া আহত শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অভিজিৎ আজ সকালেই এক বার্তা দেন। এক্সে সেই বার্তায় তিনি লেখেন, ‘পুলিশি বর্বরতায় আপনারা আহত হয়েছেন। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। অমানবিক দিল্লি পুলিশের নৃশংসতা থেকে আপনাদের রক্ষা করতে পারিনি।’

অভিজিৎ লিখেছেন, একজন ধর্মেন্দ্র প্রধান, যিনি ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে সরকার নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের রক্তাক্ত করল। আহত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের প্রত্যেকের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আপনাদের সবার স্বার্থে এই লড়াই জারি থাকবে।’

গতকালের ঘটনার জন্য দিল্লি পুলিশ যেমন আন্দোলনকারীদের দায়ী করছে, আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজ ও বিরোধীরা তেমন দায়ী করছেন পুলিশ ও সরকারকে। সিজেপি ও বিরোধীরা বলছেন, পুলিশ লাঠি না চালালে, কাঁদানে গ্যাস না ছুড়লে এমন হতো না। তারা ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে চাইল বলেই হিংসা ছড়াল। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ছাত্ররা তাদের আক্রমণ করেছে।

গতকালের ঘটনায় পুলিশ ৫টি এফআইআর দাখিল করেছে। ৭০ জনের বেশি ছাত্রছাত্রীকে আটক করেছে। পুলিশ দেখতে চাইছে, এই আন্দোলনের পেছনে বৃহত্তর কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না। শান্তি–শৃঙ্খলা নষ্ট করার মধ্য দিয়ে অন্য কোনো ধরনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না।

পুলিশের দাবি, তাদের ১১৮ জন কর্মী জখম হয়েছেন। সিজেপির দাবি, শতাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কয়েকজনের আঘাত গুরুতর।

সংসদমুখী যাত্রা যে এমন মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, সেই অনুমান দিল্লি পুলিশ করতে পারেনি। সরকারও নয়। সরকারি এক সূত্র স্বীকার করে, আন্দোলনকারীরা এত বিপুল সংখ্যায় জড়ো হবেন, চারদিক থেকে সংসদের দিকে এগিয়ে যাবে, পুলিশি প্রতিরোধে ভয় পাবে না—এ ধারণা সরকার ও পুলিশের ছিল না। নিঃসন্দেহে এটা গোয়েন্দা ব্যর্থতাও।

ওই সূত্রের মতে, পুলিশ ভেবেছিল, হয়তো কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী জড়ো হবেন। ব্যারিকেড ভেঙে তাঁরা এগোবেন না। কিন্তু হাজারে হাজারে তরুণ–তরুণী এভাবে চলে আসবেন, কল্পনা করা যায়নি। পুলিশি হিসাবে গতকাল কম করেও ৫০ হাজার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশ স্বীকার করছে, গত ৪০ বছরে কোনো আন্দোলন এভাবে সংসদ ভবনের এত কাছে চলে আসতে পারেনি। পুলিশের গাড়ি দখল করতে পারেনি। পুলিশের গাড়ি ওল্টায়নি।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র আজ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রসমর্থন দেখা যাচ্ছে। তাঁরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন।

কর্ণাটকের বিজেপি নেতা কে সুধাকর গণমাধ্যমে বলেছেন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যেমন ঘটেছে, এখানেও তেমনই একটা ঘটানোর চক্রান্ত চলছে। এই আন্দোলন তারই অংশ। তবে সেটা হবে না। কারা ঠিক পথে রয়েছে, কারা ভুল পথে, তা দেশের মানুষ জানে।

ছাত্র আন্দোলন ও সংসদ অভিযানে পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব প্রতিটি বিরোধী দল। গতকালের মতো আজও সংসদ অচল থাকে। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে এ নিয়ে আলোচনার দাবি জানান। সংসদ ভবন চত্বরে গণমাধ্যমকে রাহুল বলেন, অবাক কাণ্ড, স্পিকার বলছেন আলোচনার জন্য সরকারের অনুমতি চাইবেন!

রাহুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া। এত দিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, এক দিনও তিনি কথা বলেননি। কোনো মন্তব্য করেননি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উইয়ে খাওয়া কাঠের মতো ফোঁপড়া হয়ে গেছে। গোটা দেশ তা জানে। আন্দোলন তার বিরুদ্ধেই। অথচ প্রধানমন্ত্রী নীরব। গতকাল যা ঘটল, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া উচিত।

আজ সকালে রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে গিয়ে আহত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন অভিজিৎ দিপকে ও সিজেপির অন্য নেতারা। হাসপাতালে যান আম আদমি পার্টির (এএপি) অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আতিশি, সৌরভ ভরদ্বাজ, সঞ্জয় সিংসহ অন্য নেতারা।

সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা ভদ্রও আরএমএল হাসপাতালে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেন। চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেন। আহত ব্যক্তিদের সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাও।

নাড্ডার সঙ্গে গতকাল দেখা করেছিলেন সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকা। সরকারের কাছে তাঁরা তিনটি দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেন। দাবিগুলো হলো শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হোক, সোনম ওয়াংচুককে নিঃশর্তে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হোক এবং যে ২০ জন ছাত্রছাত্রী আত্মঘাতী হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে দেওয়া হোক।

গণমাধ্যমকে সিজেপি নেতারা বলেন, সরকার এখনো কিছুই জানায়নি। মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পাঁচ ঘণ্টা সময় শুধু নষ্ট হয়েছে। তাঁরা বলেন, নাড্ডা বলেছেন, নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন। কিন্তু কিছুই জানানো হয়নি।

আজ এনডিএ সংসদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠক শেষে সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু গণমাধ্যমকে বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি হবে। ত্রুটিমুক্ত পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়। সেটাই সরকারের লক্ষ্য।

রিজিজু বলেন, ‘ছাত্রদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভুল পথে যাওয়া খুব সহজ। সঠিক পথে থাকা কঠিন। ছাত্রদের ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাই আমাদের কর্তব্য।’

ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যন্তর মন্তরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। ২১ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি
ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যন্তর মন্তরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। ২১ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই

ফিলিস্তিনি চিকিৎসকের মুক্তির দাবিতে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ

ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়াকে মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন একদল ইসরায়েলি অধিকারকর্মী। সোমবার জেরুজালেমে একটি মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার সামনে তারা বিক্ষোভ করেন।

দখলবিরোধী ইসরায়েলি সংগঠন ফ্রি জেরুজালেম আয়োজিত এ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি নির্যাতন বন্ধেরও দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের প্রতি সামরিক সহায়তা বন্ধ করার আহ্বান জানান।

বিক্ষোভকারীরা ডা. আবু সাফিয়ার মুক্তির দাবিতে ব্যানার বহন করেন, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে স্লোগান দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বানসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া লুইস ফ্র্যাঙ্কেনথাল আনাদোলুকে বলেন, ডা. আবু সাফিয়ার আটক অবৈধ। তার অভিযোগ, আটক অবস্থায় ওই চিকিৎসক নির্যাতন, অনাহার এবং জীবনঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের বার্তা হলো নির্যাতন বন্ধ করুন, গণহত্যা বন্ধ করুন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করুন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার পর হাসপাতালটি ধ্বংস করা হয় এবং পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়াকে আটক করা হয়। 

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজনীতিতে নতুন ঝড় by উদয় চন্দ্র

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঠিক দুই মাস পর এর অনুসারীরা এখন এক চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি। দিল্লির যন্তর মন্তর মানমন্দিরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচি থেকে শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। অনির্দিষ্টকালের অনশনের ২১তম দিনে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও অনশন শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর এ মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপরই জন্ম নেয় সিজেপি। ভারতের তরুণদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁরা একের পর এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলেন।

গত শনিবারের এ সংঘাতের আগে সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা কঠোর দমন–পীড়নও করেনি, আবার আন্দোলন মেনেও নেয়নি। সরকারের নীতি ছিল বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা। আন্দোলনকে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা এবং জোট ভেঙে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সিজেপির এই উত্থান শাসকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সিজেপিকে এখন আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক ভাইরাল ঝড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন কোনো ব্যঙ্গাত্মক তরুণ সংগঠন নয়, যা রাস্তায় অল্প কিছুদিন দৃশ্যমান থেকে মিলিয়ে যাবে। এই ‘তেলাপোকা’ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কারণ, এটি সমাজের এক গভীর ক্ষোভের নাম দিয়েছে।

কাউকে তেলাপোকা বলার অর্থ হলো তাকে নোংরা, অপ্রয়োজনীয় ও চোখের আড়ালে রাখার যোগ্য মনে করা। তেলাপোকাকে সবাই ঘৃণা করে, কিন্তু এটি সহজে মরে না। এটি সমাজের অন্ধকার কোণে টিকে থাকে। বিষ, অন্ধকার আর ঘৃণা সহ্য করেও এটি বেঁচে থাকে। ঘরের মালিকেরা ঘর যতই পরিষ্কার দাবি করুক না কেন, ময়লা থাকলেই তেলাপোকা বেরিয়ে আসে।

ভারতের বহু তরুণ এখন বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মুখোমুখি। এই অপমানজনক শব্দটি তাঁদের ভেতরের কষ্টকেই যেন ফুটিয়ে তুলেছে। সিজেপি তরুণদের এই অপমানকে দৃশ্যমান করেছে। তাঁরা বলতে চাইছেন, ক্ষমতা যদি আমাদের এই চোখেই দেখে, তবে এ নামেই আমরা আমাদের কথা বলব। ফলে একটি গালি এখন তাঁদের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি কোনো বিপ্লবী রাজনীতি নয়। এই তেলাপোকা আসলে সেই ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে লাখো তরুণের ওপরমুখী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

এমন এক সময়ে এই ‘তেলাপোকা রাজনীতি’র উদয় হলো, যখন নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক অপরাজেয় নির্বাচনী যন্ত্র চালাচ্ছে। তাদের রয়েছে বিপুল অর্থবল, আদর্শিক শৃঙ্খলা ও কল্যাণমুখী প্রকল্প। তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও বিরোধীদের বিভাজনকে ভোটে রূপান্তর করতে পারদর্শী।

তবু ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি জাতীয়ভাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। অর্থাৎ ভোট দেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে সমর্থন করেননি। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা কোনো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি টিকে আছে আঞ্চলিক ও জাতিগত জোট, বিরোধী দলের ভাঙন এবং দুই প্রধান দলের বাইরে তৃতীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে।

বর্তমানে ওপর থেকে নির্বাচনী রাজনীতি গোছানো মনে হলেও নিচ থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে। তরুণেরা চাকরিহীনতা ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে ক্ষুব্ধ। তাঁরা এমন এক সময়ে রাজনীতিতে আসছেন, যখন ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক মাধ্যমগুলো—যেমন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন, গণমাধ্যম ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান—দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পর ভারতের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। বর্তমানে ৮০ কোটির বেশি ভারতীয় সরকারের দেওয়া ফ্রি রেশনের ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই খাদ্যসহায়তা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে তারা কোনোমতে বেঁচে আছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এই খাদ্যসহায়তা সমাজের আসল উন্নয়নকে বোঝায় না; বরং এটি মহামারি–যুগের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

অন্যদিকে দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে গেছে। ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী এখন দেশের মোট আয়ের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটাই বর্তমানের রাজনৈতিক অর্থনীতি—নিচে খয়রাতি সাহায্য, ওপরে একচেটিয়া ব্যবসা আর মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। এই মধ্যবিত্ত এখন চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি আর অবরুদ্ধ আকাঙ্ক্ষার শিকার।

ভারত স্কুল ও উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছে, কিন্তু তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। শিক্ষিত তরুণেরাই এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় শিকার। তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, ডিগ্রি থাকলেই জীবনে উন্নতি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি তাঁদের কেবল হতাশাই দিচ্ছে।

এ কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষা বাতিল তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে একটি পরীক্ষা মানে কেবলই একটি পরীক্ষা নয়। এটি জীবন পরিবর্তনের এক জুয়া খেলা। সন্তান যাতে একটি সম্মানজনক চাকরি পায়, সে জন্য মা-বাবা সঞ্চয় করেন, ঋণ নেন, এমনকি জমিও বিক্রি করে দেন। কোচিং সেন্টারে দেন চড়া ফি।

যখন একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তখন সেই পরিবারের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। রাষ্ট্র কেবল পরীক্ষা নিতেই ব্যর্থ হয় না, বরং লাখ লাখ পরিবারের ত্যাগকে উপহাস করে।

তেলাপোকা প্রতীকটি তাই আজ অনেক ভারী অর্থ বহন করছে। এটি এমন এক নাগরিকের কথা বলে, যে কোনো সম্মান ছাড়াই বেঁচে থাকে। মোদি–আমল ভোট জিততে পারলেও সামাজিক অসন্তোষ দূর করতে পারেনি। ভারতের লাখ লাখ তরুণ আজ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—যাঁদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ বা বৈশ্বিক যোগাযোগ নেই, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী?

সিজেপি নিজেও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। এই দল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল। এর অসংলগ্নতাই এর আসল সত্য। এটি নতুন কোনো দলের আগমনবার্তা নয়, বরং পুরোনো রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতীক।

কোনো ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এত দূর এলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য তার পুরোপুরি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণ ভাষায় কথা বলা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ ব্যঙ্গের আশ্রয় নেয়। সংগঠিত রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তখন মানুষ মিমের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাটাই হলো সাহসের শেষ রূপ।

তেলাপোকা কোনো বিপ্লবী নায়ক নয়। এটি এক সাধারণ জীব, যা ঘরের মালিকদের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।

* উদয় চন্দ্র, অশোকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি অনূদিত।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন। ছবি : রয়টার্স

Sunday, July 19, 2026

তেলাপোকাকে কতটা পাত্তা দিচ্ছেন সাফল্য উদ্‌যাপনে বুঁদ মোদি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

টানা ৪ হাজার ৩৯৯ দিন ধরে তাবড় কেষ্ট-বিষ্টুরা যা পারেনি, তেলাপোকারা সেই অসাধ্যসাধন করবে, আন্দোলনে আন্দোলনে জেরবার করে তুলবে সরকারকে, এমন অলক্ষুনে চিন্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর অন্ধ ভক্তরা মনে স্থান দিতে রাজি নন। জওহরলাল নেহরুকে ‘ছাপিয়ে যাওয়ার’ সাফল্য উদ্‌যাপনে তাঁরা এখন ব্যস্ত। দেশজুড়ে মোদি-বন্দনা চলছে। মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনা চলছে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনায়। গণমাধ্যমগুলো সয়লাব সরকারি বিজ্ঞাপনে।

জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ৬ হাজার ১২৯ দিন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৬৪ সালের ২৭ মে মৃত্যু পর্যন্ত। টানা ১৬ বছর। মোদি সেখানে ১২ বছর পূর্ণ করলেন। কিন্তু তাতে কী! বিজেপি বলছে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত নেহরু ছিলেন অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি তাঁকে টপকেছেন! এটাই অনন্য সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনায় দিল্লির জগন্নাথ মন্দিরে পূজা দিয়েছেন ওডিশার বিজেপি নেতা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তেলাপোকাদের তিরের লক্ষ্য আপাতত তিনিই। তাঁর পদত্যাগ চেয়ে তেলাপোকারা জানিয়েছে, দাবি মানা না হলে আরও বড় আন্দোলন শুরু হবে।

ধর্মেন্দ্রর ঈশ্বরের শরণাগত হওয়ার সেটাও আরেক কারণ। প্রধানমন্ত্রীর জন্য যতটা, তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য। ধর্মেন্দ্র জানেন, তেলাপোকাদের দাবি সমর্থন করেছেন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট নেতারাও। নিট পেপার লিক ও সিবিএসইর দুর্নীতি নিয়ে তাদের আন্দোলন ‘ইন্ডিয়া’ যথার্থ মনে করেছে। খাঁড়াটা ঝুলছে তাঁর ঘাড়ের ওপরেই।

নরেন্দ্র মোদি বিরোধীদের চাপে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত আজ পর্যন্ত নেননি। বিরোধীরা দাবি জানাচ্ছে বলে কখনো কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলেননি। অশ্বিনী বৈষ্ণব ২০২১ সালের জুলাই মাস থেকে রেলমন্ত্রী। তাঁর আমলে অনেক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। দায় ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়েছে বারবার। মোদি মানেননি। অশ্বিনী আজও রেলমন্ত্রী। এপস্টিন ফাইল কেলেঙ্কারির আঁচ পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ পুরীর গায়ে লাগতে দেননি। কিন্তু তাই বলে কি ব্যবস্থা নেন না? অবশ্যই নেন। নেন নিজের শর্তে। নিজের সুবিধামতো।

২০২১ সালে মন্ত্রিসভার রদবদলে এক ধাক্কায় বাদ দিয়েছিলেন ১২ জনকে। কোভিড তখন চরমে, অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধনকে ছেঁটে ফেললেন! টুইটারের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমেছিলেন আইনমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ। তাঁকে ছাঁটাই করলেন। সরালেন শিক্ষানীতির রূপকার শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিওয়াল, পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর, সারমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়, শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ারকে।

তাঁদের কেউ আর মন্ত্রী হতে পারেননি। কাজেই তেলাপোকারা চাইছে বলেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মোদি সরিয়ে দেবেন মনে হয় না। তা ছাড়া ধর্মেন্দ্রর প্রতি তিনি আস্থাশীল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী দায়িত্ব তাঁকেই দিয়েছিলেন। কাজটা তিনি ভালোভাবেই উতরেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় ও সংসদীয় দলে ভাঙন ধরানোর প্রধান কারিগরও তিনি। ধর্মেন্দ্র হয়তো তাই নিজেকে খুব একটা বিপদগ্রস্ত মনে করছেন না।

তেলাপোকাদের নিয়ে বিজেপির চিন্তাভাবনারও বদল ঘটেছে। একশ্রেণির বেকার যুবকদের উদ্দেশে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর আলটপকা ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক যে আন্দোলন শুরু, যার মধ্য দিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) জন্ম। শুরুতে এর পেছনে বিজেপি ‘পাকিস্তান ও মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস’-এর হাত দেখতে পেয়েছিল।

বলা হচ্ছিল, তেলাপোকা আন্দোলন ওদেরই চক্রান্ত। উদ্দেশ্য মোদির ভারতকে দুর্বল করা। কয়েক দিনের মধ্যে সিজেপির অনুগামী সংখ্যা বিজেপিকে ছাপিয়ে গেলে সরকার তাদের ‘এক্স’ হ্যান্ডল ব্লক করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন তেলাপোকাদের নিয়ে তোলপাড়, আমেরিকা থেকে অভিজিৎ দিপকে যখন জানালেন, ময়দানে নেমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে তিনি ভারতে আসবেন, তখন তাঁকে গ্রেপ্তার করার ভাবনাও সরকারি মহলে মাথাচাড়া দিয়েছিল।

মনে রাখতে হবে, সেই সময় আমেরিকায় অভিজিৎ ও ভারতে তাঁর পরিবারের লোকজনদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অভিজিৎ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছিলেন, ‘কে জানে, হয়তো দেশে ফিরলে আমার ঠিকানা হবে তিহার জেল।’ যেদিন রওনা হলেন, সেদিনও লেখেন, ‘ভারতে যাচ্ছি। দেশের সংবিধানের হাতে ভাগ্যকে সঁপে দিয়েছি।’

সুখের কথা, তেমন কিছু ঘটেনি। সমাবেশ রুখতে অতি উৎসাহীরা মামলা করেছিল। দিল্লি হাইকোর্টে আমল পায়নি। রাজধানীর যন্তর মন্তরে সমাবেশ করার অনুমতিও পুলিশ দেয়। সেখানে সিজেপি আলটিমেটাম দিয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা না দিলে ফের আন্দোলন।

অভিজিৎদের ধরপাকড় না করা ও সমাবেশের অনুমতিদানের নেপথ্য কারণ একাধিক। প্রথম কারণ, তেলাপোকা আন্দোলনের আন্তর্জাতিকতা। ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় অনেক প্রশ্ন আছে। সেসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে। অভিজিৎদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। সরকারকে সমালোচিত হতে হতো। দ্বিতীয় কারণ, শশী থারুরের মতো সরকারের শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শ, যাঁরা মনে করেন গণতন্ত্রে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ থাকা দরকার। তৃতীয় কারণ, তড়িঘড়ি ব্যবস্থা না নেওয়ার পরামর্শ, যেহেতু তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

মনমোহন সিং সরকারকে ওই কারণে ভুগতে হয়েছিল নির্ভয়া–কাণ্ড ও আন্না হাজারের আন্দোলনের সময়। সরকারও দেখেছে, নিট পেপার লিক ও সিবিএসই রেজাল্ট কেলেঙ্কারি নিয়ে বিরোধীরা জোরালো কোনো আন্দোলনে নামেনি। তা ছাড়া সিজেপি নিয়ে বিরোধীরাও সন্দিহান। কাজেই শ্রেষ্ঠ পন্থা ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’।

সরকার সাফল্যের ঢাক পেটালেও সত্য হলো, বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি ভারতে বেকারত্বের জ্বালা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে ঘটে চলেছে নিটসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে অনাচার বাড়ছে অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না। বিরোধীরাও নখদন্তহীন। যে আন্দোলন বিরোধীদের করার কথা, তা করতে সাহসী হলেন কোনো এক অজ্ঞাতকুলশীল অভিজিৎ দিপকে! মুহূর্তের মধ্যে আন্দোলিত হলো যুবসমাজ। যন্তর মন্তরে তেলাপোকা সমাবেশ ও বিক্ষোভ শুধু বিরোধী-ব্যর্থতার উদাহরণ নয়, সেটা ছিল শাসক ও বিরোধীদের প্রতি যুবসমাজের অনাস্থারও প্রকাশ।

সাফল্যে বুঁদ থাকা সরকার স্বীকার না করলেও সত্য হলো ভারতের কর্মসংস্থানের ক্যানভাস বড় বর্ণহীন। বড়ই অনুজ্জ্বল। চাকরি–বাকরির হাল কেমন, আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’র সর্বশেষ রিপোর্ট তা দেখিয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষিত ও স্নাতকদের ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২০ শতাংশই বেকার। দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীর সংখ্যা ৩৭ কোটি ৭০ লাখ। তাঁরা কর্মক্ষম জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। স্কুল-কলেজে লিঙ্গবৈষম্য কমেছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমবাজারে শিক্ষিতদের প্রবেশ বেড়ে চলেছে। ফি বছর গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে ৫০ লাখ। অথচ চাকরি হচ্ছে মাত্র ২৮ লাখের!

সিজেপির হাতিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো মারাত্মক দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শঙ্কিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের মন তাই এত আলোড়িত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বেরিয়ে সবে ময়দানে নেমেছে তেলাপোকারা। সামাজিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক করে তোলা সহজ নয়।

বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় যা সফল, ভারতের মতো বিশাল, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও নানা ভাষাভাষীর দেশ, যেখানে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি দিন দিন মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেখানে তা কতটা সম্ভবপর, প্রশ্ন সেটাই।

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সিজেপির হাতিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব
সিজেপির হাতিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। ছবি: এএফপি

Wednesday, July 8, 2026

গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: বিরোধীদলীয় নেতা

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করতে দেব না। জনগণের এই রায় বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। সংসদে সবাই মিলে চিৎকার দেব, রাজপথের আন্দোলনও আরও বেগবান হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ দেশকে আমরা ভালোবাসি, কোনো অশুভ শক্তিকে মাঝখান থেকে খেলতে দেব না। নাক-কান সজাগ রেখেই আমাদের সব কাজ চলবে এবং সময়মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষাও পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা নতুন বা পুরানো কোনো ফ্যাসিবাদ মেনে নেব না।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেন। ‘অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং সব গণহত্যার বিচারের দাবিতে’ এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

এ সময় জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে-অভিযোগ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা সংযত হোন, নইলে জনগণের উত্তাল ঢেউ আর জোয়ারে সব খড়কুটা ভেসে যাবে। তিনি বলেন, আইন আমরা হাতে তুলে নেয়ার পক্ষে নই, তবে কেউ শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে জুলাইকে অপমান করার দু:সাহস আর দেখাবেন না। দু:সাহস দেখালে এই যুব সমাজ ও জনতা এখনো ঘুমিয়ে যায়নি। যারা সশস্ত্র বাহিনীর সামনে খোলা হাতে দেশপ্রেম নিয়ে দাঁড়াতে পারে, আজও তারা দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ঘুমাইনি, আমরা ঘুমাবো না।

গণভোট নিয়ে প্রতারণার বিষয়ে জাতীয় সংসদে আত্মস্বীকৃত সাক্ষী পাওয়া গেছে জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, হায়া শরম থাকলে এটা হওয়ার কথা ছিল না। তবে, ভালো হয়েছে, জাতি চিনে ফেলছে, এখন আর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সংসদে যা বলা হয় কার্যপ্রণালিতে তা লেখা হয়ে যায়, ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। যেহেতু এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হয় নাই, কাজেই এই আত্মস্বীকৃতিও রেকর্ড হয়ে থাকল।

তিনি বলেন, তারা (সরকারি দল) এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- জুলাই সনদ একটা অন্তহীন প্রতারণার দলিল, আর এই সংসদেই দাঁড়িয়ে তারা আবার প্রমাণ করলেন তারাই জাতির সঙ্গে অন্তহীন প্রতারণা করেছে। তাদের কাছে তাদের আপন সঙ্গীদেরও রক্তের কোনো মূল্য নেই। যদি সে মূল্য থাকতো তাহলে আগে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতো। নির্বাচন কার জন্যে, সরকার কার জন্যে? জনগণের জন্যে। সেই জনগণ প্রমাটাইজ, আহত, দারুণ কষ্টে আছে। তাদের কষ্টে পাশে না দাঁড়িয়ে আমাদেরকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে যে, আমরা নির্বাচন চাই না। নির্বাচন না চাইলে পরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলাম কিভাবে?

জামায়াত আমির বলেন, আমরা নির্বাচন চেয়েছি, তবে আমরা নির্বাচনের নামে ষড়যন্ত্র চাই নাই। ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, আমরা নিন্দা জানাই। দল-নিরপেক্ষ পরিচয়ের অন্তর্বর্তী সরকারও এই ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল। নিজেরাই তারা স্বীকার করেছে, ষড়যন্ত্র করে ১১ দলকে হারানো হয়েছে।

তারপরও এই রায় মেনে নেয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাড়ে ১৭ বছর পরে এই নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে যদি আমরা সেদিন রিভোর্ট করতাম, এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতাম, তাহলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো কেউ জানে না। ১১ দল দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে ১১ দল এটাও বলেছে, নির্বাচনের এই ষড়যন্ত্রের ফল মেনে নিলেও আমরা গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করতে দেব না।

সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনে এ পর্যন্ত ১০-১১ বার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসেছে জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংশোধনের জন্য কমিটি লাগে না। আর সংশোধনী কমিশনের জন্য গণভোট হয়নি। গণভোট হয়েছে দেশের পচা রাজনীতির আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য। ফ্যাসিবাদের মূল কেটে দেওয়ার জন্য। আমরা সেই সংস্কার চাই।

তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা থেকে সরে গিয়েছে। আমরা বেঈমানি করতে পারব না। আমরা জাতিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই জায়গায় আমরা আছি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমরা গভীর আস্থাশীল। জনগণের এই রায় বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। সংসদে সকলে মিলে চিৎকার দেব। রাজপথের আন্দোলন চলছে, এটা আরো বেগবান হবে।

তিনি বলেন, লোহা গরম হয়ে লাল হতে সময় লাগে। কিন্তু লাল যখন হবে, তখন জনগণ মুগুর নিয়ে ঠিকমতোই পিটাবে ইনশাআল্লাহ।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে মজলুম ছিলাম, একসঙ্গে জেল খেটেছি, একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, জেল-জুলুম সহ্য করেছি। সরকার গঠনও করেছি। কিন্তু এখন কোন কোন বন্ধুর বক্তব্য ভাষায় মনে হয়, তারা জীবনেও আমাদেরকে দেখেননি। ভুলে গেছেন এততাড়াতাড়ি? স্মরণ হতে সময় লাগবে না। একটা ঝাঁকুনিই যথেষ্ট।

মান-অভিমান ভুলে গিয়ে জনগণের এই রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলে জনগণের কাছে সম্মানিত হবেন। সম্মান না করলে যেখানে স্পিকারের অনুমতি লাগে না, ওখানে বক্তব্য হবে।

জেল-জুলুমের ভয় না দেখানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে একজন পরিণতির কথা বলেছেন, আমরা বলেছি, ৫৫ বছর পরিণতি দেখে দেখেই বাংলাদেশ এই জায়গায় এসেছে। সর্বোচ্চ পরিণতি ফাঁসির তক্তা অথবা একটা গুলি। আমরা দেশ-জাতির ও আল্লাহর জন্য প্রস্তুত আছি। আমাদের লড়াই চলবে, ইনশাআল্লাহ জনগণের বিজয় হবে।

তিনি বলেন, আমাদের আলোচনা চলবে, সরকারের ন্যায্য কাজে সহযোগিতা করবো। কিন্তু জনগণের অধিকারের বিষয়ে একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের রায়ের অপমান আমরা সহ্য করবো না। জনগণকে নিয়ে বাংলাদেশ নিয়েই বিজয় হবো ইনশাআল্লাহ। আমাদের কোনো মামু বাড়ি নেই, এই বাংলাদেশ নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই।

সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটাকরি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার প্রমুখ।

গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: বিরোধীদলীয় নেতা
কাকরাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে বিরোধীদলীয় নেতা। ছবি: সংগৃহীত

Monday, July 6, 2026

মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা

সিএনএনের রিপোর্টঃ রাত নামতেই মুম্বাইয়ের একটি বিশাল বিমান হ্যাঙ্গারের মতো কনসার্ট ভেন্যুর বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজারো তরুণ-তরুণী। প্রবেশপথে ইভেন্ট কর্মীরা কিউআর কোড স্ক্যান করছেন, হাতে পরিয়ে দিচ্ছেন রিস্টব্যান্ড। বন্ধুরা সেলফি তুলছেন, অপেক্ষা করছেন দরজা খোলার।

ভেতরে ঢুকে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন। আলো নিভে আসে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা তার শিশুকে কাঁধে নিয়ে সংগীত শুরুর অপেক্ষায়।
তবে এটি কোনো সাধারণ পপ বা ইলেকট্রনিক মিউজিক কনসার্ট নয়। স্পিকারে বেজে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিমূলক সংগীত- ‘ভজন’, যা সাধারণত মন্দির বা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় শোনা যায়।
সংগীতের তালে তালে দর্শকদের বড় একটি অংশ উঠে দাঁড়ায়। তারা একসঙ্গে হাততালি দেয়, ভজন গায় এবং নাচে। পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কিন্তু এখানে নেই মদ, মাদক কিংবা ধূমপানের কোনো আয়োজন। বরং আয়োজকদের পক্ষ থেকেই অ্যালকোহল ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর অংশগ্রহণকারীরাও সেটিই সমর্থন করছেন।

তরুণদের নতুন আকর্ষণ ‘ভজন ক্লাবিং’
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ভজন ক্লাবিং’ নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক ধারা। এটি মূলত ‘সোবার ক্লাবিং’ বা ‘কফি রেভ’-এর ভারতীয় সংস্করণ, যেখানে মাদক বা মদ ছাড়াই সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন তরুণরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্ম ধীরে ধীরে অ্যালকোহল ও মাদক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় যেমন ‘সোবার কিউরিয়াস’ সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে, তেমনি ভারতে তার ধর্মীয় সংস্করণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ভজন ক্লাবিং’।
২৫ বছর বয়সী জিল ভীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, এমন একটি কনসার্ট, যা সত্যিই মানুষকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, সাধারণ কনসার্টে ধূমপান, ভেপিং বা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে এসে মাখন-ঘোল পান করাই যেন আমার কাছে অ্যালকোহলের বিকল্প হয়ে উঠেছিল।

প্রার্থনা ও পার্টির মিশেল
ভজন ভারতের শত শত বছরের পুরোনো ভক্তিমূলক সংগীত। সাধারণত মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পরিবেশিত হয়।
তবে নতুনত্ব এসেছে এর উপস্থাপনায়। এখন বড় ভেন্যুতে টিকিট কেটে এসব অনুষ্ঠান দেখতে আসছেন মানুষ। থাকছে স্মোক মেশিন, বিশাল এলইডি স্ক্রিন, আলোকসজ্জা ও আধুনিক কনসার্টের সব আয়োজন।
২৬ বছর বয়সী ধ্বনি পারাডিয়া বলেন, ধোঁয়া, আগুনের বিশেষ প্রভাব আর সংগীতের বিট- এসবই আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
তার ছোট বোন ২৩ বছর বয়সী ফিওনি পারাডিয়ার ভাষায়, মঞ্চের সাজসজ্জা অনেকটা টেকনো কনসার্টের মতো। তাই এটি জেন-জি প্রজন্মকে সহজেই আকর্ষণ করছে।

ব্যাকস্টেজ সিবলিংসের হাত ধরে জনপ্রিয়তা
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভাই-বোনের সংগীত জুটি ‘ব্যাকস্টেজ সিবলিংস’। ছোটবেলা থেকেই তারা ভজন গেয়ে আসছেন। এখন আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহরে তরুণদের কাছে ভজনকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এই
জুটির সদস্য রাঘব আগারওয়াল বলেন, অ্যালকোহল আর ক্লাবিং এক জিনিস নয়। অ্যালকোহল মানে নেশা, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।
তার বোন প্রাচি আগারওয়াল বলেন, এখানে মানুষ দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু কিংবা সঙ্গী- যাকে খুশি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি দর্শক
ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব অনুষ্ঠানের ভিডিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কনসার্টের আলোয় হাজারো মানুষের একসঙ্গে ভজন গাওয়া, খালি পায়ে নাচ, আবেগে কান্না কিংবা অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ দেখছেন।
সমর্থকদের মতে, এটি কঠোর ধর্মীয় নিয়মের বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার একটি সহজ ও উন্মুক্ত প্রকাশ। তবে সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, এ ধরনের অনুষ্ঠান আধ্যাত্মিকতাকে বিনোদন ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করছে।

ধর্মীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালে ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী এক দশকে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
একই সময়ে ভারতে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীকও জনজীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এতে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে ‘ভজন ক্লাবিং’-এর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জেন-জি প্রজন্ম ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে নিয়েছে- এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।

কেন আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণরা?
সনাতন জার্নি’র আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্তা জানান, এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ।
তার ভাষায়, মানুষের জীবনে এখন প্রচুর উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। এখানে এসে তারা স্বস্তি অনুভব করে।
ভারতের গড় বয়স মাত্র ২৯ বছর, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশে পরিণত করেছে। দেশটির তরুণরা আগের তুলনায় আরও বেশি শিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে সীমিতসংখ্যক চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভজনের আসর তাদের মানসিক শান্তি, আনন্দ ও একাত্মতার অনুভূতি এনে দিচ্ছে।
বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়েছে।

নিকুঞ্জ গুপ্তা বলেন, মদ্যপানের পরের ক্লান্তি নয়, এখান থেকে মানুষ মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সম্ভবত এ কারণেই আরও বেশি তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ফিওনি পারাডিয়া বলেন, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে আধ্যাত্মিকতার সন্ধান পান। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত।
আর তার চাচাতো বোন হেতা সোলাঙ্কির ভাষায়, একবার আসুন, তারপর দেখবেন আপনি নিজেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্যিই দারুণ আনন্দের অভিজ্ঞতা।

মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা

Thursday, July 2, 2026

বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ন্যায্যতা থাকবে না by মাহমুদুর রহমান

আজ পহেলা জুলাই। ঠিক দুবছর আগে এই দিনে আমাদের লড়াকু ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল; যার পরিণতিতে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শাসককে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে তার প্রভুর চরণে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

আমি তখন ইস্তান্বুলে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ভেবেছিলাম আগের কোটা আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি এবারও ঘটবে না। কিন্তু অতিদ্রুত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংকীর্ণ বয়ান বৃহত্তর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ধাবিত হলে আশান্বিত হয়ে উঠলাম।

আন্দোলনকারীদের এক অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রথমে অবৈধ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের এক দফা দাবির পরামর্শ দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম, কাজেই মাঠের প্রকৃত উত্তাল চিত্র আমার জানা ছিল না।

এ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার মাত্রাও দূরে থেকে উপলব্ধি করতে পারিনি। আন্দোলনের গতি আমার ধারণাকে ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদের অবিস্মরণীয় শাহাদতের দৃশ্যে আমার মনে হয়েছিল এবার আর সম্ভবত শেখ হাসিনার শেষরক্ষা হবে না।

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তুরস্কের প্রখ্যাত মিডিয়া ‘ইয়েনি শাফাক’-এর স্টুডিওতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে আমার একটি একক বক্তৃতা ছিল। সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, শুধু ভারতের সমর্থনের জোরে জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনার সরকার আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সবারই জানা।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তরুণ বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ স্নেহ আর অপরিসীম শ্রদ্ধার যুগপৎ অনুভূতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে অন্যসব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে পাব। আমি রাজনীতিবিদ নই বলেই হয়তো বোকার মতো একেবারেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশে ফিরে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলাম, ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।

ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে ব্যস্ত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার জরুরি দাবিটিও আমাকে উত্থাপন করতে হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় সমাপ্তি পর্যন্ত দুই দফার বন্দিজীবনে যাদের দিনের পর দিন জেলখানায় এক পাতে খেতে দেখেছিলাম, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েই তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদ্গার করছেন। ১৫ বছর যারা একই ধরনের মজলুম ছিলেন, তারা একে অন্যকে যথাক্রমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী এবং রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন।

প্রসঙ্গক্রমে পুরোনো কথা বলছি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনরত আমি এবং তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিলে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই উদ্যোগে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নিজে চীন মৈত্রী হলে মেলার উদ্বোধন করেছিলেন।

সেই সূত্র ধরেই বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের অফিসেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের অনেক ঘটনাই আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার মনে পড়ছে না তিনি ‘রাজাকার মন্ত্রীর’ অধীনে প্রতিমন্ত্রিত্ব নিয়ে কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলমান সংসদেও তিনি নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু যখন সেই আলমগীর ভাইকে বাংলাদেশে মৌলবাদের কথিত উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে একেবারে আওয়ামী বয়ানে বক্তব্য দিতে শুনি, তখন বড়ই আশ্চর্য হই। মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনিও আছে।

আমার প্রায় পাঁচ বছরের জেল জীবনের অধিকাংশ সময় কাশিমপুর দুই নম্বর জেলে কেটেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুস সালাম পিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী একই জেলে বন্দি ছিলাম। জামায়াত নেতাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী তিনতলায় আমার পাশের সেলে প্রায় দুবছর ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই একই সেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার থেকেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানও ওই সেলে বন্দি ছিলেন। জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রায় এক বছর একই বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলে থাকতেন।

তিনি আমাকে বুড়ো বয়সে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক প্রান্তের সেলে থাকতেন। মামুনের সেলেই আমরা জামাতে নামাজ পড়তাম। মীর কাসেম আলী নামাজে ইমামতি করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

মামুনের সেলের সামনের বারান্দায় আমাদের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সপ্তাহে এক দিন আমরা বাসা থেকে খাওয়া পেতাম। এছাড়া জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন কারারক্ষী আমাদের টাকায় বাজার করে আনতেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এসব কিছু দেখাশোনা করতেন। জেলে রান্না করা এবং সবার বাসা থেকে আনা সাপ্তাহিক খাবার আমরা ভাগ করে খেতাম। তখন কিন্তু কোনো জামায়াত নেতাকে বলতে শুনিনি যে, আমরা কোনো চাঁদাবাজের বাসা থেকে আনা অথবা তার টাকায় কেনা খাবার গ্রহণ করব না। রাজাকার ও চাঁদাবাজরা যে একে অন্যের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্যÑসেটি আজকের ক্ষমতাবান নেতাদের বোধ হয় ফ্যাসিস্ট আমলে কারাগারে স্মরণে ছিল না।

রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একে অন্যকে গালাগাল করবেন; আবার বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই গালাগালি ছেড়ে গলাগলি করবেনÑএতে আমাদের মতো আমজনতার কিছু যায়-আসে না। বরং এদের কাজকারবারে আমরা বেশ আমোদ অনুভব করি। কিন্তু তারা এত তাড়াতাড়ি যেভাবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নির্মাণ করছেন, সেটি বিপজ্জনক। ভাই, ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভালো কথা।

কিন্তু আপনাদের কর্মকাণ্ডে যদি কোনোভাবে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বৈধতার সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনারা তো বিপদে পড়বেনই, সেই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারও আবার হুমকির মুখে পড়বে। ৩৬ জুলাই না ঘটলে আজকের সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনোটাই সৃষ্টি হতো না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনাদের বিভাজনের সুযোগে এদেশের চিহ্নিত ভারতপন্থিরা আবার ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে? দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার হুমকি দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে!

এদিকে সুশীলরা ফতোয়া দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সন্ত্রাসের হোতা আওয়ামী লীগকে আর ‘সন্ত্রাসী’ বলা যাবে না। অথচ ব্যক্তিসন্ত্রাস থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জনগণের ওপর যাবতীয় নির্যাতনের পন্থা আওয়ামী কারখানা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল যেমন আওয়ামী ‘প্রডাক্ট’ ছিল, একইভাবে এ শতাব্দীতে আওয়ামী ঘরানা থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী দিয়ে যে গুমের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকেই শেখ হাসিনা ডিজিএফআই এবং র‍্যাবকে ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ও নির্মমভাবে প্রয়োগ করেছেন।

‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামী বয়ান তৈরির জন্য দুর্নীতির কথিত সূচককে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সব আমলেই দুর্নীতি হয়েছে। ড. ইউনূসের আমলও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানায় দুর্নীতি যে মাত্রায় উঠেছিল, তার সঙ্গে এ যাবৎ অন্য কোনো আমলের তুলনা হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ সে সময় ভয়ানক সব দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করেছে।

একের পর এক ব্যাংক দখল হয়েছে এবং আমানতকারীদের লাখো-কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে; অথচ সুশীলরা নীরব থেকেছেন। তারা নাকি যুক্তি দিতেন, শেখ হাসিনা খারাপ হতে পারেন; তবে দেশের অন্য যেকোনো নেতার তুলনায় তিনি মন্দের ভালো। ফ্যাসিস্ট আমলে তারেক রহমান সম্পর্কে তারা কী বলতেন, সেটি লিখে বোধ হয় আজ আর কোনো লাভ নেই। ক্ষমতা প্রাপ্তির আনন্দে বিএনপি নেতারা সেগুলো শুনতে আগ্রহী নন। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আপনাদের নতুন বন্ধুরাই ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের ললাটে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেওয়ার অনুঘটক ছিলেন। দুদিন আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান দুদক দিয়ে করানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন।

অথচ আজ পর্যন্ত বিএনপির কোনো মন্ত্রীর মুখে আওয়ামী আমলের দুর্নীতির অনুসন্ধানের কথা শুনিনি। বরং শেখ পরিবার, অলিগার্ক ও আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস আমলের সব অনুসন্ধান এখন দুদকে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, সুশীলদের মতো বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা অন্যদের, এমনকি তাদের চেয়েও ভালো ছিলেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেই বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মহানুভবতার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম জাতিকে ভুলে যেতে বলেছেন।

সব মজলুম তার মতো এতটা মহৎ নাও হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেখেও মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ‘মন্দের ভালো’ এবং ‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামীপন্থি সুশীল সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অধিকতর আগ্রহী। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী কোন রাজনীতিচর্চা করবেন কিংবা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, সেসব একান্তই তার বিবেচনা। আমাদের মতো আদার ব্যাপারীর সেই জাহাজের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকার কারণে হয়তো আজকের বিশেষ দিনে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা বলার অধিকার দাবি করতে পারি।

৩৬ জুলাইকে আমি প্রথমাবধি বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায় ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছি। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম নালিশ ছিল যে, তিনি বিপ্লবী সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সুশীল সমর্থকরা জুলাইকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ভারতপন্থি বাম তাত্ত্বিকরাও জুলাইকে ভয়ানক অপছন্দ করেন। কারণ, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এটি একটি ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ছিল।

মব সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামপন্থা জুড়ে দিয়ে এরা হাসিনার পতনের বিপক্ষে দেশ-বিদেশে বয়ান উৎপাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। যে চিহ্নিত গোষ্ঠী একসময় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করত, তারাই ড. ইউনূসের আমলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উত্থান খুঁজে পেয়েছিল। এখন আবার নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। জুলাইকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি দল বিএনপি বেশ সমস্যায় পড়ে যায়। কারণ, তারা বিপ্লবের প্রধান উপকারভোগী। হাসিনার পতনের পর দলে ‘গুপ্ত জামায়াতের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গুপ্ত আওয়ামীদের’ জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। এ কারণেই গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের বয়ানের মধ্যে উপরোক্ত বাম ও আওয়ামীকরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারাও নাকি বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান দেখছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপির আবেগাপ্লুত প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারা গত দুবছরে অনেকটাই সরে এসেছেন। নিজেদের সেসব বক্তব্য আবার শুনলে পার্থক্যটা তারা নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপত্তিকে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একেবারে অযৌক্তিক মনে করি না।

কাজেই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের ভয়ে খোদ জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার মনোভাব সরকারি দলের নেতাদের আপন স্বার্থেই পরিত্যাগ করা উচিত। বিএনপির জুলাই নিয়ে বয়ান আওয়ামী প্রোপাগান্ডা ও ভারতপন্থি বাম ঘরানার তাত্ত্বিক বয়ানের সঙ্গে মিলে গেলে শেখ হাসিনার পতনের প্রক্রিয়াই যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়— সেটি আশা করি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেননি— এ বিতর্ক যারা তোলেন, তাদের উদ্দেশ্য সরকার বুঝতে না পারলে আখেরে তারাই পস্তাবেন। এক-এগারো থেকে কোনো শিক্ষা বিএনপি নিয়েছে কি না—সেটিও আমার জানা নেই।

মোট কথা, ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির যে সুযোগ আমাদের তরুণরা সৃষ্টি করেছে, তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কেউ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে আর কেউ যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে জুলাইয়ের মর্যাদাহানি করে উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ও জনগণের জন্য বিপদ তৈরি করছে। ইতিহাস আপনাদের এই সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করবে না।

বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ন্যায্যতা থাকবে না
মাহমুদুর রহমান