Wednesday, May 13, 2015

সীমান্তজয়ী শেখ হাসিনা by মিজানুর রহমান খান

ডটার অব দি ইস্ট নামে পাকিস্তানের প্রয়াত নেত্রী বেনজির ভুট্টোর একটি বই আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য উপযুক্ত বিশেষণ কী হতে পারে? ডটার অব বর্ডারস। কারণ, তিনি নিশ্চিতভাবেই এক অনন্যসাধারণ সীমান্তজয়ী। কারণ, তাঁর প্রথম মেয়াদে মিয়ানমারের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির পূর্ণতা পায়। ভারতের মতো বর্মি পার্লামেন্টও স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থন করেছিল।
শেখ হাসিনা এই পর্বে ক্ষমতায় এসে ভারত ও মিয়ানমার উভয়কে বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতিতে বিহ্বল করে দিয়ে জাতির জন্য অবিস্মরণীয় সমুদ্রজয় এনে দিয়েছেন। এরপর ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনটাও সম্পন্ন করলেন। তাই আজ গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ঘাটতি এক পাশে সরিয়ে রেখে কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করব। সহস৶ কণ্ঠে তাঁকে অভিবাদন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিবাদন। বিরোধী দলের নেতা সোনিয়া গান্ধীকেও অভিবাদন। অভিবাদন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও, রাষ্ট্রের এই গৌরবে অংশগ্রহণের জন্য। ভারতকে ধন্যবাদ জানাতে তিনি বিলম্ব করেননি।
অবশ্য এটাও বলতে হবে, সীমান্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সরকার যে নীতি নিয়েছিল, তা মোটামুটি সবগুলো সরকার সমর্থন করেছে। ভারতীয় বিলের প্রস্তাবনায় চুয়াত্তরের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল ছাড়াও ১৯৮২ ও ১৯৯২ সালের সীমান্ত চুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলেও স্থলসীমান্তে অগ্রগতি ঘটেছিল। তবে সমুদ্র জয়ে শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা নিরঙ্কুশ, এটা তাঁর অমলিন কীর্তি হয়ে থাকবে।
আশা করব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সফরটি একটি সর্বদলীয় আবহে সম্পন্ন হবে। যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ২০-দলীয় মোর্চার নেতারা মোদির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। জাতীয় স্বার্থে আমাদের ভারতবিরোধিতার পাকিস্তানি মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কেবল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য নয়, নরেন্দ্র মোদি বিশ্ববাসীর কাছে একটি শান্তির বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। দক্ষিণ চীন সমুদ্রকে ঘিরে চীনের সঙ্গে জাপান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের সম্পর্ক যখন খাবি খাচ্ছে, ভারত নিজেও ভূখণ্ডগত বিরোধে পীড়িত, তখন বাংলাদেশ, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ভূখণ্ডগত বিরোধমুক্ত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করল নতুন ইতিহাস।
এবং আবারও, কী আশ্চর্য সবার অলক্ষ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদনির্ভর দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হলো। কারণ, ভারত তার বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ছাড়াও নেপালের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধ মেটাতে পারেনি। ইরাক-ইরান সীমান্ত নিয়েই দশক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে। কিন্তু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে ভূখণ্ডগত বিরোধের নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হলো। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ। আসাম ভাগ নিয়ে বাড়তি জটিলতার শিকড় কিন্তু ইতিহাসেই। সিলেট ভাগ নিয়েই গণভোট করতে হয়েছিল। আজ আমরা যে সীমান্ত পেলাম, সেটা ঠিক করার কারিগর ছিলেন স্যার সিরিল রেডক্লিফের নেতৃত্বাধীন বাউন্ডারি কমিশনের পাঁচ সদস্য। পরে সুইডেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অ্যালগট ব্যাগি, মাদ্রাজ ও ঢাকা হাইকোর্টের দুই বিচারকের সমন্বয়ে করা একটি ট্রাইব্যুনালও কঠোর পরিশ্রম করেছে। আমরা কেবল লাল কালিতে দাগ টেনে সীমান্তরেখা আঁকিয়ে রেডক্লিফের কথাই জানি, অ্যালগট ব্যাগিও আমাদের সীমান্তরেখা টেনেছিলেন। এটা ব্যাগি লাইন হিসেবে পরিচিত। আমি আজ বাউন্ডারি কমিশন ও ট্রাইব্যুনালের আট সদস্য, যাঁদের বেশির ভাগই ভারত ও পাকিস্তানের বিচারপতি ছিলেন, তাঁদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আর স্মরণ করি দুই রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে (১৩ আগস্ট, ১৯৪৭) করা স্যার রেডক্লিফের একটি উক্তি: ‘আসাম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভূখণ্ডগত কিছু বিনিময় অবশ্যই ঘটাতে হবে, কিছু অমুসলিম ভূখণ্ড পূর্ববঙ্গে, কিছু মুসলিম ভূখণ্ড আসামে যাবে।’ ৬৮ বছর পরে তাই চূড়ান্তভাবে ফলল।
ঐতিহাসিকভাবে ভূখণ্ডগত বিরোধ বিশ্বশান্তির প্রতি একটি বিরাট হুমকি হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন এ ভাসকুইজ ও ম্যারি টি হ্যানেহান দেখিয়েছেন, ‘দুই শতাব্দী ধরে বাণিজ্য ও সরকারের ধরনের মতো বিষয় নিয়ে বিরোধের চেয়ে ভূখণ্ডগত বিরোধ নিয়েই পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক যুদ্ধ হয়েছে। ভূমি বিরোধেই অধিকাংশ যুদ্ধের সূচনা ঘটেছে।’ ২০০২ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল কে. হাথ ও টড এল. অ্যালি এক সমীক্ষায় দেখান, ভূখণ্ডগত বিরোধের বিস্তার অতীতের পরিত্যক্ত কোনো বিষয় নয়। ১৯৯৫ সালেও বিশ্বে ৬৭টি ভূখণ্ডগত বিরোধ সক্রিয় ছিল। ১৯৯৯ সালে আরেক গবেষক (অ্যান্ডারসন) দাবি করেছিলেন যে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ভূমি এবং দুই-তৃতীয়াংশ সমুদ্রসীমা বর্তমানে স্থিতিহীন। এসব তথ্য উল্লেখ করে কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জারোজাভ তির তাঁর রিড্রয়িং দ্য ম্যাপ টু প্রমোট পিস: টেরিটোরিয়াল ডিসপিউট ম্যানেজমেন্ট ভায়া টেরিটোরিয়াল চেঞ্জেস (লেক্সিংটন বুকস, ২০০৬) বইয়ে মন্তব্য করেন যে, ‘সুপ্ত অবস্থায় থাকা ভূখণ্ডগত বিরোধের পরিমাণ তর্ক সাপেক্ষে বরং আরও বেশি।’ আমরা কিন্তু আজ একটি নিখুঁত মানচিত্র পাব।
১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ এবং ভারতের কট্টরপন্থীরা এই সীমান্ত চুক্তি সুনজরে দেখেনি। সেই কট্টর মুসলিম লীগারদের উত্তরসূরিরা আজ ২০-দলীয় জোটে ভর করেছে। আমি নূন-নেহরুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। চুক্তিটা হয়েছিল ১৯৫৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। টাইম সাময়িকী ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ লিখেছে, ‘এই গ্রীষ্মে পূর্ব পাকিস্তানের দুর্বলভাবে চিহ্নিত থাকা সীমান্তে গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ল। এবং আবারও পাকিস্তানি মুসলিম লীগাররা (ভারতের বিরুদ্ধে) পবিত্র যুদ্ধে যেতে হাঁক দিলেন। প্রথাগতভাবে পাকিস্তানের যে রাজনীতিকই ভারতের সঙ্গে সম্প্রীতির সুরে কথা বলবেন, সেটা তাঁর জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল বলে গণ্য হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদেহী, অক্সফোর্ড শিক্ষিত অভিজাত ফিরোজ খান নূন, যিনি গত শীতে পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি মনস্থির করেছেন যে এ ধরনের দায়িত্বহীন চটকদার বাগাড়ম্বরকে বড় বেশি বাড়াবাড়ি রকমের বাড়তে দেওয়া হয়েছে, এটা আর নয়।’ আমি আজ খালেদা জিয়ার কাছেও একই দৃষ্টিভঙ্গির আরও বেশি জোরালো বহিঃপ্রকাশ আশা করি।
জামায়াতের ভারতকে অভিনন্দন জানানো ইতিবাচক। অন্য ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোরও উচিত এতে শরিক হওয়া। আমাদের উচিত হবে পাকিস্তানি ধারার ভারতবিরোধিতার বৃত্ত ভেঙে দিয়ে কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের শর্তে প্রয়োজনে ভারতের বিরোধিতা করার বন্ধুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক একটি শক্তিশালী ধারার প্রবর্তন করা। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ কেবল আওয়ামী লীগের হাতেই বেশি নিরাপদ, এই ধারণার ছেদ ঘটাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই কমবেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে ফোন করে বলেছেন, ‘আপনার পিতার হাতে যে চুক্তির সূচনা, আপনার আমলেই তার সার্থক পরিণতি।’ কথাটি নিপাট সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, যে রাজনীতি নরেন্দ্র মোদিকে আজ প্রধানমন্ত্রী করেছে, তার মূলে রয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘ভারতীয় জনসংঘ, যেটি আশির দশকে বিজেপিতে মিশে গেছে। রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে ভারতীয় জনসংঘ নূন-নেহরুর মূল চুক্তির প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিল। সংগঠনটি ওই চুক্তি বাতিলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জোর আইনি লড়াই চালিয়েছিল। চুয়াত্তরের চুক্তি আটান্নর চুক্তির কার্বন কপি। বাংলাদেশ ১০ হাজার একর বেশি জমি পেয়েছে বলে অনেকে অবাক হন। তাঁদের জানা দরকার যে, নূন-নেহরুর সীমান্ত চুক্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যখন শুনানি চলছিল, তখন ভারতের সরকার আদালতকে বলেছে, সংবিধান সংশোধন না করে ১৯৫১ সালের চুক্তির আওতায় আমরা তো ভুটানকে ৩২ বর্গমাইল জায়গা ছেড়ে দিয়েছি, যা ছিল আসাম অংশের।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পই পই করে বলে দিয়েছিলেন, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধানের সংশোধনী আনার দরকার নেই। কিন্তু ভারতের সংসদ সে কথায় কর্ণপাত করেনি, এটা আমার কাছে একটা মস্ত ধাঁধা হয়ে থাকবে। উপরন্তু এত সময় নিয়েও তারা ভুলভাবে পাস করাল। অথচ বিরোধপূর্ণ এসব ছিটমহল কখনো ভারতের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে ভারত নবম সংশোধনী আনার পরে একই বিষয়ে আবারও সংবিধান সংশোধন বিল পাস করে তার লাভটা কী হলো? প্রতিবেশী কোনো দেশ স্বাধীন হলে এবং তার সঙ্গে চুক্তি থাকলে কি আগে থেকে স্বাধীন হওয়া দেশকে তার সংবিধান শোধরাতেই হয়? যে দেশের রাজনীতি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনাকে এভাবে অগ্রাহ্য (তিনবিঘা স্মরণযোগ্য) করতে পারে, সেখানে জুডিশিয়াল রিভিউ নিয়ে এতটা অহংকার কীভাবে তৈরি হতে পারল? একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার পরে তার বাস্তবায়নে ৪১ বছরের বিলম্ব বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনীতিকদের জন্য গৌরবজনক নয়।
গঙ্গা নদী নিয়ে ভারতের সঙ্গে ট্রিটি আছে, আরও ট্রিটি লাগবে। তাই আমাদের ধরে নিতে হবে, ভারতের রাজনীতিটাই শেষ কথা। এই সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাস্তবসম্মত একটি উক্তি করেছেন: ‘ট্রিটি রাজনৈতিক, আদালতের হাতের নাগালের বিষয় এটি নয়।’ তালপট্টি নিয়ে আমরা বিরোধ করেছি। ১৯৭৪ সালেই ইন্দিরা শ্রীলঙ্কার কাছে ‘কাছাতিভু’ দ্বীপের মালিকানার দাবি ত্যাগ করেন। ২০০৮ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জয়ললিতা সংবিধান সংশোধন না করে ওই দ্বীপ হস্তান্তর অবৈধ দাবি করে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেন। মনমোহনজির সরকার আদালতে সাফ বলেছেন, ওটা সব সময় বিরোধপূর্ণ ছিল। কখনো ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না। একই যুক্তিতে ভারত আমাদের ছিটমহলগুলো অনেক আগেই দিতে পারত।
তবে কথা হলো আজ ৬৮ বছর পরে দুই পারের প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ ‘স্বাধীনতা’ পেল। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের যে বিরাট ঘাটতি চলছে, তা মানতে পারি না। কিন্তু সম্ভবত এটা মানতেই হয় যে শেখ হাসিনার জন্যই আমরা আজ ভূখণ্ডগত বিরোধমুক্ত একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছি। এই সাফল্যের চূড়ান্ত দাবিদার নিশ্চয় আমাদের জনপ্রতিনিধি ও নেতারা। কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে সবাইকে ছাপিয়ে যাবেন শেখ হাসিনা। দেশ শাসনে নানা বিপর্যয় চলছে, জনপ্রশাসন যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম, বিরোধী দলের প্রতি তাঁর ও তাঁর সরকারের অসূয়াপ্রসূত মনোভাব কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। তদুপরি সীমান্ত জয়ের এই লগ্নে জনগণের নেত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর যে সত্তা মানবিক, রাষ্ট্রনায়কোচিত, সেই সত্তার প্রতি আমাদের অভিবাদন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

যেভাবে নিখোঁজ যেভাবে পাওয়া গেল, সব সময় চোখ বেঁধে রাখা হতো সালাহউদ্দিনের

১০ই মার্চ গভীর রাত। উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে। তার পরিবারের সদস্যরা এত দিন দাবি করে আসছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তাকে ধরে নিয়ে গেছেন। ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরাও একই তথ্য জানান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।
১২ই মে সকাল। মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে একটি ফোন আসে হাসিনা আহমেদের কাছে। তাকে বলা হয়, তার স্বামী সালাহউদ্দিন আহমেদ তার সঙ্গে কথা বলবেন। দুই মাস ধরে নিখোঁজ স্বামীর কণ্ঠ শুনতে পেরে আনন্দে উদ্বেল হাসিনা আহমেদ ছুটে যান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাসায়। দলীয়প্রধানকে সালাহউদ্দিন আহমেদের খোঁজ পাওয়ার কথা জানিয়ে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন। সাংবাদিকদেরও বলেন, স্বামীকে ফিরে পাওয়ার কথা। মুহূর্তের মধ্যে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। তৈরি হয় চাঞ্চল্য। প্রশ্ন দেখা দেয়, এত দিন কোথায় ছিলেন তিনি। কিভাবেইবা গেলেন মেঘালয়ে। অমিতাভ ভট্টশালীর প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানায়, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি কিভাবে মেঘালয়ে গিয়ে পৌঁছালেন সেই বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়। ভারতের পুলিশ বলছে, মি. আহমেদকে শিলং শহরের বাসিন্দারা উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখার পর তারা বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথমে তাকে সেখানকার পোলো গ্রাউন্ড গলফ লিংক এলাকায় দেখা যায়। পরে তার মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাকে একটি সরকারি মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। শিলং শহরের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট বিবেক সিয়াম বলেন, এক ব্যক্তি উদভ্রান্তের মতো ঘুরছেন- এ খবর পেয়েই তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও তিনি গুছিয়ে দিতে পারছিলেন না। তাই তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে নেয়া হয়। পুলিশের ওই কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, তার ভারতে আসার কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। এখানে তিনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন, সেটা তাকে জেরা করার পরেই বোঝা যাবে। এখন তিনি অসুস্থ বলে জেরা করতে পারিনি।
এদিকে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন, তাদের দিল্লি প্রতিনিধি রঞ্জন বসুর বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলছে, আসলে সোমবার ভোর থেকেই এ এক অচেনা ব্যক্তি শিলংয়ের পুলিশকে যেভাবে নাজেহাল করে রেখেছেন, তেমন অভিজ্ঞতা তাদের আগে হয়নি বললেই চলে। যখন গলফ ক্লাবের সামনে অচেনা লোককে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন, তখন সেখান দিয়েই যাচ্ছিল পুলিশ পেট্রলের একটি জিপ। টহলদার বাহিনী লোকটিকে ধরে নিয়ে কাছেই শিলংয়ের প্যাসটিওর বিট হাউস থানাতে নিয়ে যাওয়ার পরেই নাটকের শুরু!
নাটক, কারণ ওই ভদ্রলোক থানায় গিয়েই বলতে শুরু করেন, ‘দেখুন আমি কিন্তু বাংলাদেশের একজন ভিআইপি। আমি সে দেশে ক্যাবিনেট মিনিস্টারও ছিলাম!’ এদিকে ভদ্রলোকের পকেটে একটা কাগজ পর্যন্ত নেই। কোন টাকা-পয়সা দূরে থাক, পকেটে একটা মানিব্যাগও নেই, ফলে যথারীতি শিলংয়ের পুলিশ প্রথমে তার কথা একেবারেই বিশ্বাস করেনি, পাগলের প্রলাপ বলেই উড়িয়ে দিয়েছিল। ‘আচ্ছা বুঝলাম আপনি বাংলাদেশে মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু বর্ডার পেরিয়ে আপনি শিলং অবধি এলেন কি করে?’ পুলিশের এ প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক আবার ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, মুখে কোন কথা জোগায় না। ওনার অবস্থা দেখে থানাতেই সিদ্ধান্ত হয় ইনি নিশ্চয় মানসিক ভারসাম্যহীন আর তার পরই পুলিশ তাকে শিলংয়ের মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল অ্যান্ড নিউরোলজিক্যাল সায়েন্সেসে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করে। মিমহ্যানস শিলংয়ে মানসিক প্রতিবন্ধীর হাসপাতাল বলেই পরিচিত। সালাহউদ্দিন আহমেদের গতি হয় সেখানেই।
‘তবে একটা কথা কি, ভদ্রলোক বাংলাদেশী কি-না কিংবা সালাহউদ্দিন আহমেদ কিনা সেটা কিন্তু আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ওনার কাছে কোন কাগজপত্র নেই। ওর কোন আত্মীয়-পরিজন এসে ওকে এখনও চিহ্নিতও করেননি। ফলে আপাতত ওনাকে একজন বিদেশী নাগরিক বলে চিহ্নিত করে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করার জন্য ফরেনার্স অ্যাক্টে আমরা রীতিমাফিক মামলা রুজু করেছি’, জানাচ্ছিলেন পুলিশপ্রধান এম খারক্রাং।
তাহলে কিভাবে জানা গেল সালাহউদ্দিন আহমেদ শিলংয়ের হাসপাতালে ভর্তি আছেন? আসলে মিমহ্যানসে ডাক্তারদের চিকিৎসায় গতকাল রাত থেকেই অল্প অল্প করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ দেখাতে শুরু করেন তিনি। তারপর গতকাল সকালে তিনি মিমহ্যানসের ডাক্তারদের জানান, ঢাকায় থাকা স্ত্রীর টেলিফোন নম্বর তার মনে পড়েছে, সেখানে তিনি ফোন করে কথা বলতে চান। এর পরই তিনি ঢাকায় স্ত্রী হাসিনা আহমেদকে ফোন করে জানান, তিনি ভাল আছেন, মেঘালয়ের একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
সোমবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ যখন শিলং গলফ ক্লাবের সামনে থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে, তখন তিনি কপর্দকশূন্য অবস্থায় থাকলেও তার শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে মিমহ্যানসের চিকিৎসকরা এদিন তাকে পরীক্ষা করে দেখেছেন তার হৃদযন্ত্রে কিছু দুর্বলতার লক্ষণ আছে। ফলে মানসিক হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়ে এদিন বিকালে তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
কিন্তু সালাহউদ্দিন আহমেদকে উদ্ধারের রহস্যটা যে এখনও ধোঁয়াশায় ঘেরা, তা হলো তিনি শিলংয়ে উদয় হলেন কিভাবে? পুলিশ সুপার আমার কাছে স্বীকার করেছেন, ব্যাপারটা তাদেরও ধন্দে রেখেছে। আসলে শিলংয়ের সবচেয়ে কাছে বাংলাদেশ সীমান্তের ডাউকী সেটাও প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশ মাইল দূরে। প্রাথমিকভাবে মেঘালয় পুলিশ অনুমান করছে, রোববার রাতে সেই ডাউকীর কাছে সীমান্ত পেরিয়েই ভারতে ঢোকেন সালাহউদ্দিন আহমেদ কিংবা তাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়! তারপর সেখান থেকে কোন বাস বা ভাড়ার টেম্পোয় চেপে তিনি সোমবার ভোরে শিলংয়ে পৌঁছান এবং কিছুক্ষণ পর পুলিশের কাছে ধরা পড়েন।
কিন্তু এ সময়টাও তিনি আদৌ স্বাভাবিক বা প্রকৃতিস্থ অবস্থায় ছিলেন না। খুব জোরালো ইলেকট্রিক শক খেলে বা অন্য কোন শক থেরাপির মানুষের যেমন সাময়িক মস্তিষ্ক বৈকল্য হয়, তার মধ্যেও সে রকমই লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। মিমহ্যানসের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না-করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ওই রোগীকে সমপ্রতি ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে বলেই তারা অনুমান করছেন। এখন সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারটি নিয়ে মেঘালয়ের পুলিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিভাবে মামলা এগোবে এবং তাকে নিয়ে কি করা হবে মেঘালয় সরকার বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথাবার্তা বলছেন। তার পরিচয় সম্বন্ধে পুরোপুরি নিশ্চিত হলেই যোগাযোগ করা হবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও। খুব সহজে যে এ মামলার জট খুলবে না তা বোঝাই যাচ্ছে।
সব সময় চোখ বেঁধে রাখা হতো সালাহউদ্দিনের
দুই মাস কোথায় ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, কিভাবেই মেঘালয়ে গেলেন তিনি। এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র। নানা আলোচনা, নানা খবর। সাংবাদিকদের সঙ্গে এ পর্যন্ত খুব বেশি কথা বলতে পারেননি ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপির এই নেতা। একটি কথা অবশ্য তিনি পরিষ্কার করেই বলেছেন, দুই মাস আগে তাকে উত্তরার একটি বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়। কারা অপহরণ করেছে তাদের পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি। তবে দৈনিক প্রথম আলো’তে শিলং থেকে মানস চৌধুরীর লেখা প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কী করে এখানে এলাম কিছুই জানি না। কিছু লোক চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে করে আমাকে এখানে ফেলে গেল। তারা কারা তা-ও জানি না।
সালাহউদ্দিন পুলিশকে বলেন, আমাকে ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। তারা আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। যারা আমাকে বন্দী করেছিল, তারা সব সময় চোখ বেঁধে রেখেছে। আমি কিছুই দেখতে পাইনি। তারা একটি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে আসে। এরপর ফেলে যায়। আমি কোথায় তার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কাছে সব অচেনা মনে হচ্ছে।

ব্লগার অনন্তকে কুপিয়ে হত্যা, লেখালেখিই ছিল অনন্তের ধ্যানজ্ঞান by উজ্জ্বল মেহেদী ও সুমনকুমার দাশ

অনন্ত বিজয় দাশ
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে লেখক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের লাশ। চলছে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি। মর্গের প্রাঙ্গণজুড়ে পরিচিতজনেরা। সবাই উদ্বিগ্ন। আসছেন, যাচ্ছেন। চলছে নীরব অশ্রুবিসর্জনও। আগন্তুকেরা একজন আরেকজনের সঙ্গে অনুচ্চস্বরে কথা বলছিলেন।
এরই মধ্যে দুজনের উচ্চস্বরের প্রশ্নোত্তরে ভাঙে মর্গের আশপাশের নীরবতা। ‘অনন্ত? কোন অনন্ত...? ওই যে শান্ত-সুমন্ত...!’ এই ‘শান্ত-সুমন্ত’ই অনন্ত বিজয় দাশ। ওই নামেই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠা এ মানুষটির ধ্যানজ্ঞানই ছিল লেখালেখি করা। আর এর মধ্য দিয়ে নিজের কাছে যেটা কুসংস্কার বলে মনে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা।
সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় গতকাল সকালে এই অনন্তকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ‘শান্ত-সুমন্ত’ সম্পর্কে পরিবার ছাড়াও প্রতিবেশীরা ছিলেন ভালোরকম অবহিত। কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে পড়াশোনা-লেখালেখিতেই সময়টা কাটাতেন তিনি। অনন্ত সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ থেকে পাস করে পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছর আগে যোগদান করেন। ব্যাংকের সুনামগঞ্জের জাউয়াবাজার শাখায় কর্মরত ছিলেন।
বন্ধুরা জানান, মুক্তমনা ও সামহোয়্যার ইন ব্লগে নিয়মিত লেখালেখি ছাড়াও অনন্ত ফেসবুকেও ছিলেন সক্রিয়। গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একাধিক লেখা লেখেন। বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ নিয়ে ব্লগে লিখতেন তিনি। অনন্তর লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পার্থিব, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব: লিসেস্কো অধ্যায়, ডারউইন: একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা।
সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকায় অনন্ত বিজয় দাশ নামে এক লেখক ও ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা l ছবি: প্রথম আলো
গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের অবিশ্বাসের দর্শন বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা লিখেছিলেন অনন্ত। তিনি যুক্তি নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
এ ছাড়া অনন্ত মুক্তমনা ব্লগের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক ছিলেন। সিলেটের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ‘সেক্যুলারিজম, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা’ বিষয়ক তৎপরতার জন্য ‘মুক্তমনা ২০০৫’ পুরস্কার পান অনন্ত।
বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত দুজন সংগঠক বলেন, অনন্ত বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে ছাত্রাবস্থা থেকেই সভা-সেমিনার আয়োজনের পাশাপাশি লেখালেখি করে আসছিলেন। কুসংস্কার, সংস্কারবদ্ধ জীবনাচারণ, অপবিশ্বাস আর চিরায়ত প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি ও মুক্তচিন্তা দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে তাঁর সংগঠন ও যুক্তি পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এসব কারণেই অনন্তকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
জীবনের শেষ স্ট্যাটাস: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্পর্কে সরকারদলীয় স্থানীয় এক সাংসদের মন্তব্য নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন অনন্ত। গতকাল সকাল আটটা ৩৮ মিনিটে তিনি এ স্ট্যাটাস দেন। এটিই ছিল তাঁর শেষ স্ট্যাটাস। তাতে লেখেন, ‘...২০০৭ সালের দিকে আমি যখন যুক্তির প্রথম সংখ্যাটা সম্পাদনা করি, সেখানে লেখক সুমন তুরহান-এর লেখা প্রকাশ করেছিলাম, যার নাম ছিল সিলেটি মৌলবাদ।’
লেখাটির শেষের কিছু অংশ, ‘সিলেট, মহাসমুদ্রের একটি ক্ষুদ্রতম চর, আর আমরা সেই চরের অধিপতিরা আর কিছু করতে না পারলেও জন্ম দিয়েছি একটি স্বতন্ত্র মৌলবাদের। সিলেটি মৌলবাদ, অত্যন্ত নীরবে, বহুদিন ধরেই ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ মহামারি আকারে, এখনই এই প্রগতিবিরোধী আঞ্চলিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দরকার। পৃথিবীটা অনেক বড়ো, তবে আমাদের সুশীল ভণ্ডরা এখনো বেশ আদিম, তাঁদের সময় এসেছে কুয়োর বাইরে বেরিয়ে এসে বিশাল বিশ্বটাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। আমরা প্রত্যেকে মানুষ, এবং আমরা প্রত্যেকেই বাঙলাদেশের বাঙালি—এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে সিলেটবাসীর আর কতকাল লাগবে?’
চোখ দান করা হলো না: অনন্ত তাঁর মরনোত্তর চক্ষুদান প্রসঙ্গে বছর খানেক আগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সন্ধানী ইউনিটের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন। এই হাসপাতালে চোখ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গতকাল মৃত্যুর পর তাঁর আর চোখ দান করা হয়নি।
অনন্তের বাবা রবীন্দ্র কুমার দাশ ও মা পীযূষ বালা দাশ অবসর জীবন যাপন করছেন।

যেভাবে বিলুপ্ত হতে পারে মানুষ

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তির পরবর্তী বিবর্তন। এর স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানিরা। গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে পুরোদোমে। সফলতা রয়েছে। একইসঙ্গে রয়েছে নানা আশঙ্কাও। শক্তিশালী আর বুদ্ধিমান কম্পিউটারের আগমন মানবতার ভবিষ্যত পাল্টে দেবে সন্দেহ নেই। তবে নিশ্চিত করতে হবে নানা বিপন্নতার আশঙ্কা থেকে এর সম্ভাবনার পাল্লা যেন ভারী হয়। সেটা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেটাই প্রশ্ন।
খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিন্স সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণাঙ্গ রূপ অর্জিত হলে তা মানব জাতির ইতি টানতে পারে। কানাডিয়ান উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা এলোন মাস্কের আশঙ্কা হলো, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন হতে পারে মানবতার জন্য সব চেয়ে বড় হুমকি। মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এ নিয়ে মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আতঙ্কের বিষয় হলো, মানুষের তৈরি যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে তাদের প্রভু বা তাদের ঘাতক। এ শঙ্কা নতুন নয়। কিন্তু যখন একজন প্রখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী, একজন সিলিকন ভ্যালি উদ্যোক্তা এবং মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতার কণ্ঠে ওই শঙ্কা ধ্বনিত হবে তখন তা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। গুগল, মাইক্রোসফটের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এআই খাতে যে বিশাল বিনিয়োগ করেছে এ শঙ্কা তার বিরোধী। তবে উদ্বেগগুলো যখন তাদের মাপের ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে তখন এমন ভীতির পাল্লাটা যে ভারী হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রত্যেকের পকেটে সুপার কম্পিউটার আর যুদ্ধক্ষেত্রে রোবোটদের বিচরণের মতো বিষয়গুলো স্রেফ সায়েন্স ফিকশন বলে উড়িয়ে দেয়াটা আত্মপ্রবঞ্চনার মতো মনে হয়। প্রশ্ন হলো বিচক্ষণতার সঙ্গে কিভাবে উদ্বেগগুলো দূর করা যায়।
এর প্রথম ধাপ হলো কম্পিউটার আজকের দিনে কি করতে সক্ষম আর ভবিষ্যতে কি কি করতে সমর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করা। তথ্য উপাত্ত প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্যের ডিজিটাল রূপের ক্রমবর্ধমান প্রাচুর্য্যরে বদৌলতে এআই তার সক্ষমতার সমৃদ্ধি উপভোগ করছে। মানব মস্তিস্কের নিউরোনের স্তরগুলো অনুকরণ করে এবং ব্যাপক পরিমান তথ্যউপাত্ত প্রক্রিয়া করার মাধ্যমে আজকের ‘ডিপ লার্নিং’ পদ্ধতি নিজেদেরকে কিছু কাজ করা শেখাতে পারে। নকশা ও গতিপ্রকৃতি শণাক্ত থেকে শুরু করে অনুবাদ পর্যন্ত। আর মানুষ যতটা দক্ষতার সঙ্গে  সেগুলো করতে পারে প্রায় তেমনভাবেই। ফলে যেযব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে একসময় ‘মন’-এর প্রয়োজন হতো সেগুলো এখন কম্পিউটার প্রোগামগুলোর আয়ত্তের মধ্যে। ছবি পাঠোদ্ধার থেকে শুরু করে ভিডিও গেম ‘ফ্রগার’ খেলা পর্যন্ত। ২০১৪ সালে ফেসবুক ‘ডিপফেস’ নামের একটি অ্যালগরিদম প্রকাশ করে যা আলাদা করে ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে মানব চেহারাকে চিনতে পারে।
সূত্র: দ্যা ইকোনমিস্ট

ধান–চাল আর গমের বাজারে অরাজকতা by ইফতেখার মাহমুদ

বাজার দর
ধান-চাল ও গমের বাজারে রীতিমতো অরাজকতা শুরু হয়েছে। ফি বছর মে মাসে বোরো ওঠা শুরুর সময়টাতে ধানের দাম বাড়ে। এবার দাম কমছে। চালের পাইকারি দরের পতন দ্রুত থেকে দ্রুততর হলেও খুচরা বাজারে দাম কমেছে সামান্যই। খুচরা ও পাইকারি দামের পার্থক্য ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে।
আবার কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিতে সরকারের সংগ্রহ অভিযান শুরুর ১২ দিন পেরিয়ে গেছে। আমদানি চালের ওপরে ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। তার পরেও হাটবাজারে ন্যায্যমূল্যের জন্য কৃষকের হাহাকার বেড়েছে।
সরকার প্রতি কেজি চাল বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ টাকা এবং গম ৮ টাকা বেশি দরে সংগ্রহ করার ঘোষণা দিয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচের চেয়ে ২০ শতাংশ মুনাফা দিয়ে নির্ধারণ করা হলেও সেই দামের সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। সরকার সংগ্রহ করছে ব্যবসায়ী ও চালকলমালিকদের কাছ থেকে। ফলে এই বাড়তি মুনাফা যাচ্ছে তাঁদের পকেটে।
চালের বাজারের এই চিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এস মুর্শিদ প্রথম আলোকে বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের এই পার্থক্য স্বাভাবিক নয়। কোথায় সমস্যা আছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
চালের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম কমার চিত্রও বাজারের স্বতঃসিদ্ধ নিয়মে হচ্ছে না। গতকাল মঙ্গলবার খাদ্য অধিদপ্তরের দৈনিক খাদ্যশস্যবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে মোটা ও মাঝারি চালের পাইকারি মূল্য কমেছে ৭ ও ৯ শতাংশ। আর খুচরা বাজারে দাম কমেছে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ শতাংশ। প্রতি কেজি মোটা চাল ২২ থেকে ৩০ টাকা আর মাঝারি মানের চাল ২৭ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহ করার জন্য গঠিত কমিটিতে স্থানীয় সাংসদকে উপদেষ্টা করা হয়েছে। ওই কমিটিগুলো এখনো বসতে না পারায় সরকারি সংগ্রহ শুরুর ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো এক কেজি চালও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। ফলে হাটবাজারে ধানের দর আর বাড়েনি। প্রতি মণ ধানের সরকারি সংগ্রহমূল্য ৮৮০ টাকা ও চাল ১ হাজার ২৮০ টাকা। আর বাজারে প্রতি মণ ধান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও চাল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অথচ সরকার দেড় লাখ টন গম সংগ্রহের ঘোষণা দেওয়ার ২৭ দিনের মাথায় অর্ধেক গম সংগ্রহ হয়ে গেছে। প্রতি কেজি আমদানি করা গমের দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা পড়ছে। আর সরকার গম সংগ্রহ করছে ২৮ টাকা কেজি দরে। বাড়তি লাভের আশায় সরকারি গুদামে গম সরবরাহকারীদের তালিকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা যোগ দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে গম সরবরাহ করা নিয়ে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারদলীয় নেতাদের হাতে মার খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা খাদ্য সংগ্রহ কমিটিগুলোর সভা শেষ না হওয়ায় এখনো গুদামে চাল আসেনি। আশা করি, চাল দ্রুত গুদামে আসা শুরু হবে।’ গম সংগ্রহ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ গণমাধ্যমে দেখতে পেয়ে তা আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তাদের তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকার নীতিগতভাবে খাদ্য সংগ্রহের কারণ হিসেবে সরকারি মজুত বাড়ানো এবং কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেওয়ার কথাই বলে থাকে। ভারত থেকে শূন্য শুল্কের সুযোগে গত বছর বেসরকারিভাবে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আর এই অর্থবছরে এ পর্যন্ত ১৪ লাখ ৮ হাজার টন চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এই চালের প্রভাবেই বাজারে ধান ও চালের দাম কমছে। ভারত থেকে আসা প্রতি কেজি মোটা চাল ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

উগ্রবাদীরা সমাজকে দুষ্টচক্রের ফাঁদে ফেলবে by আবুল মোমেন

মুসলিম বিশ্বের অস্থিরতা বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে কেবল ইরানের নেতৃত্ব পশ্চিমের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে একটি দর-কষাকষি নিষ্পত্তি করেছে। হয়তো এর চূড়ান্ত ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে জুন পর্যন্ত। তবু পারমাণবিক শক্তি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যন্ত পৌঁছানো ইরানের দিক থেকে কেবল অগ্রগতি নয়, এতে নেতৃত্বের পরিপক্বতার পরিচয়ও মিলছে।
এক-এগারোর পর বিভিন্ন ছুতানাতা ধরে মার্কিন নেতৃত্বে যেভাবে ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ ঘটল, তার পরও কেন মুসলিম বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা জাগল না, তা বিস্ময়কর। মুসলিম বিশ্বের অঘোষিত কেন্দ্র সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের ওপর মার্কিন বলয়ের অশুভ প্রভাবের ফল এটা। রাজতন্ত্রী বা স্বৈরাচারী শাসকদের স্বার্থকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলে এই আত্মঘাতী প্রভাব বহাল রইল।
বিশ্ব পুঁজিবাদ তার সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সব সময় নতুন নতুন ছক কেটেছে, চাল দিয়েছে। তাদের হাতে আছে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ তেল ব্যবসা, আফ্রিকাতেও তা-ই। উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নও তাদেরই বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ভোগ্যপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণ কবজা করার জন্য মুক্তবাজারের যূপকাষ্ঠে সবার বলি হওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হলো। বহুকাল ধরেই পুঁজিবাদ তার মূল শত্রুকে চেনে—জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। ১৯৯০-এর পর থেকে পুরো বিশ্ব তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। বিশ্বায়নের সুযোগে ভোগবাদী মায়াজাল ছড়িয়ে মানুষকে দলে দলে নিতান্ত ভোক্তার খেলো ভূমিকায় নামাতে পারলেও পুঁজিবাদের সংকট কাটেনি। কিন্তু এর খেসারত হিসেবে দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, শিক্ষা এবং অবশ্যই ধর্মও মানবের বামনায়নের এ রোগ নিরাময়ে কাজ করছে না।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম সমাজে পশ্চিমাবিরোধী তীব্র প্রতিক্রিয়া আছে। কিন্তু তা ঘটছে কেবল ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ধর্মের নামেই নানা দেশে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। কিন্তু এর কোনোটিই পুঁজিবাদের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে না। তার জন্য জাতীয় চেতনায়—সঙ্গে নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চেতনায়ও—সমৃদ্ধ জনপ্রিয় রাজনীতির প্রয়োজন। আরব ও আফ্রিকার গোত্রভিত্তিক সমাজে এ কাজটা বরাবর কঠিন রয়ে গেল। মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের কবজায় রেখে পরোক্ষ শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম জঙ্গিদের তৎপরতার সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো পশ্চিমি ভূখণ্ডের কোথাও এক-এগারোর মাপের আক্রমণের পুনরাবৃত্তি ঘটানো—যদিও পরবর্তী সব আক্রমণই হয়েছে তুলনায় ছোটখাটো। এটাই স্বাভাবিক, কারণ সব পশ্চিমা দেশ তো সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ফলে উল্টো সব মুসলমানকেই এর খেসারত দিতে হচ্ছে।
পশ্চিমি ভূখণ্ডে যুদ্ধ ছড়াতে না পেরে জঙ্গিরা মনোযোগ দিয়েছে স্থানীয় প্রতিপক্ষের দিকে, যেগুলো আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রায়ই নিজস্ব ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদ স্বভাবতই একে নিজের স্বার্থে সমর্থন ও নির্মূলের নীতিতে ব্যবহার করে চলেছে। আপাতত অপরের কাঁধে ভর দিয়ে দুটো লাভ হয় তাদের—অস্থিতিশীল ও ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশগুলোর পরবর্তী বিনির্মাণের কাজ তাদের হয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পায় এবং তারাই লাভ গুনতে পারছে। আর যুদ্ধ তাদের অর্থাগমের বড় উৎস অস্ত্র ব্যবসাকে চাঙা রাখছে। পাছে সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতি বিরাজ করে, এ নিয়ে পশ্চিমের শাসকেরা সব সময় উৎকণ্ঠিত থাকে। কারণ, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্দা কাটানোর সেরা উপায় অস্ত্র ব্যবসা।
মুসলিম জঙ্গিরা এখন স্বদেশের ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। ইসলামিক স্টেট, আল-শাবাব, বোকো হারাম, আল-কায়েদা, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী—সবাই ভ্রাতৃঘাতী তথা আত্মঘাতী সংঘাতে লিপ্ত। উত্তেজনায় এবং সম্ভবত খুনের নেশায় তারা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে দুটি বিষয়—এক. সব যুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবসা বাড়ে এবং হাত-ফেরতা হয়ে মুনাফা যায় পশ্চিমের ভান্ডারে; দুই. জজিরাতুল আরবে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি, অন্যায়-অনাচারের অবসান ঘটাতেই একদিন ঐক্য ও সাম্যের বাণী নিয়ে এসেছিল ইসলাম। ঐক্য ও সাম্য তো মানবিক সদিচ্ছার প্রকাশ, যা অর্জন করতে হয়। এর জন্য বর্জনের সংস্কৃতি থেকে গ্রহণের সংস্কৃতি তৈরি করতে হয়, ঘৃণা বিদ্বেষের স্থলে মানবতাবোধের চর্চা করতে হয়, দূরে ঠেলে শত্রুতার পরিবর্তে কাছে টানা ও মৈত্রীর সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হয়। প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা, বাস্তব বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয় নেতৃত্বকে। এসব গুণের উৎস অবশ্যই ক্রোধ হতে পারে না।
ক্রোধ অবশ্যই ঘৃণার পথে টানবে, যা প্রতিহিংসায় সান্ত্বনা খোঁজে। মনস্তাত্ত্বিক জানেন ক্রোধ এমন এক রিপু, যা মানবমনের সহজাত সমৃদ্ধ বহুত্বকে অবিশ্বাস ও খারিজ করে কেবল ক্রোধ চরিতার্থ করার একক লক্ষ্যে স্থির হতে থাকে। এটা মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক প্রবণতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ক্রোধ হলো পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ মানুষের বিকারমাত্র। কেমন চাতুর্যের সঙ্গে খনিজ-সমৃদ্ধ আর ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সব দেশে দেশে—যার অধিকাংশই মুসলিমপ্রধান—ক্রোধ ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদ।
পরিস্থিতি এমন যে শান্তি, স্থিতি, সাম্য, ঔদার্য—এসব শব্দ অস্ত্র, যুদ্ধ, খুন প্রতিশোধের কাছে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গেছে। তারা লক্ষ্যই করছে না যে উদ্দেশ্যে ইসলামের আবির্ভাব, তাকেই তারা অপাঙ্ক্তেয় করে তুলেছে। কেউ নিশ্চয় বোকো হারামের আক্রমণ কি ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধ অথবা হুতিদের সুন্নিবিরোধী আক্রমণকে বদর বা ওহুদের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করবেন না। পরিপ্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের প্রতিটি গুলিতে লাভবান হচ্ছে পুঁজিবাদ, এদের প্রতিটি যুদ্ধ জয়ী করছে নয়া উপনিবেশবাদকে।
যুদ্ধমাত্রই উত্তেজনা ছড়ায় আর উত্তেজিত তরুণদের ন্যায়ের রোমান্সে বিজয়াভিযানে প্রলুব্ধ করে। সেই অভিযানে তারা কদাচিৎ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পশ্চিমা লক্ষ্য—ব্যক্তি বা বস্তুতে হানা দেন, অধিকাংশ সময় স্বদেশের ভিন্নধর্মী কিংবা ভিন্নমতের মুসলিমদেরই হনন করছেন। ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় না জেগে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিতে লিপ্ত থাকলেই পুঁজিবাদের কার্যসিদ্ধি হয়। ওদের ফর্মুলা এ পর্যন্ত ঠিকঠাক কাজ করছে।
মুক্তবুদ্ধির তরুণ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায় বা ওয়াশিকুর রহমান খুন হলে পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের কী ক্ষতি হবে? অনেকেই ভাববেন, অভ্যন্তরীণভাবে জ্ঞানচর্চার মুক্ত পথ রুদ্ধ হবে এবং তাতে ইসলামি সমাজ কায়েম সহজ হয়ে যাবে। এভাবে জ্ঞানচর্চাকে হয় ইসলামের বিপরীতে দাঁড় করানো হচ্ছে অথবা ইসলামি সমাজে জ্ঞানচর্চাকে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। এটা নিছক ধারণা নয়, বাস্তবেই যে ঘটছে তার প্রমাণ কেনিয়া, পাকিস্তানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে শত শত ছাত্র হত্যা।
কোরআন-হাদিসে কিন্তু জ্ঞানচর্চায় সীমা টানার বিপক্ষেই বলা হয়েছে, জ্ঞানচর্চার জন্য সুদূর চীন দেশে যাও এবং দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করো—এ দুটো উপদেশ জ্ঞানের অসীমতার প্রতি ইঙ্গিত করে। আর জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র কথাটিতেও যুদ্ধ, এমনকি ধর্মযুদ্ধেরও ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে জ্ঞানচর্চাকে।
আদতে সমস্যাটা জ্ঞানচর্চাতে নয়, আর সমাধানও হত্যায় মিলবে না। কেননা জ্ঞানের কোনো ধর্মীয়, আঞ্চলিক বিভাজন সম্ভব নয়। বিভাজন বা স্বাতন্ত্র্য থাকে সংস্কৃতিতে যে কারণে ধর্মবিশ্বাসে না হলেও ধর্মচর্চার সংস্কৃতিতে দেশে দেশে ভিন্নতা দেখা যায়। তবে সেখান গ্রহণ-বর্জন ধীরে হলেও ঘটতে থাকে। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় যদি ধর্মের দোহাই দিয়ে জ্ঞানচর্চার পথ রুদ্ধ করে দিতে চায়, তাহলে একসময় সেই সম্প্রদায় পিছিয়ে পড়বে। বাগদাদ ও সর্বশেষ কর্দোভার পতনের পরে আরবের মুসলিম সভ্যতার (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরবিভাষী অঞ্চল) অবক্ষয় ঠেকানো যায়নি, জ্ঞানচর্চা রুদ্ধ হওয়া এর একটি বড় কারণ। তুর্কি-পার্সিভাষী মুসলিম সভ্যতা আরেকটু দীর্ঘায়িত হয়েছে, ভারতে মোগল শাসনের কারণে তা ইংরেজ আক্রমণ পর্যন্ত অন্তত কাব্য-শিল্পকলা-সংগীত-স্থাপত্য, প্রশাসনে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে, ইরানে জ্ঞানচর্চার ধারা ক্ষীয়মাণ হলেও সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়নি কখনো।
ভারতবর্ষে বাংলা তার নিজস্ব সংস্কৃতির গুণে—যা কাব্য, আধ্যাত্মিক সংগীত, উদারনৈতিক ও সরল জীবনদর্শনের সম্ভারে—বেশ দ্রুত প্রতিকূল প্রত্যাঘাত সামলে উঠেছিল। তার নিজস্ব মানবিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জোরে এ দেশের মানুষ পাকিস্তানের সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তা দ্রুত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান আমলের সে আন্দোলন ফলপ্রসূ হওয়ার কারণ তা ঘটনাচক্রে হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।
বাংলাদেশে বর্তমানে যে সংকট আছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মাঠে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী শক্তির অবস্থান শক্তিশালী হতে হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ যুগপৎ অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং ক্ষমতার রাজনীতির ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে গিয়ে সমাজতন্ত্রসহ নীতি-আদর্শকেই গুরুত্বহীন এবং ধর্মান্ধতা ও ভোগবাদ উভয়ের সঙ্গেই আপস করেছে।
অন্যদিকে লোভ, ক্রোধ ও ঘৃণার মতো স্থূল রিপুই সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে। তাতে জঙ্গিদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে। তাদের এ তৎপরতা অবশ্য মূল প্রতিপক্ষ পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের গায়ে আঁচড়টিও কাটতে পারছে না। বরং মুসলিম দেশগুলোর ওপর আরও সংঘবদ্ধ প্রত্যাঘাত হানার জন্য উসকানির কাজ করছে। আর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জন্য স্বৈরাচার হয়ে ওঠার পথ প্রশান্ত করে দিচ্ছে। যেকোনো মনস্তাত্ত্বিকই বলবেন, ধর্মান্ধদের আক্রমণাত্মক তৎপরতা প্রমাণ করে অন্তর্নিহিতভাবে তারা কত দুর্বল এবং ভিতু। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো পৌরুষের প্রমাণ দেয় না, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না, তা বোঝায় যে জ্ঞানচর্চায় এবং ইসলাম ধর্ম পঠন-পাঠনে, বড় রকমের গলদ থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সামনে থাকে দুটি কাজ—রাজনীতিতে নয়া উপনিবেশবাদবিরোধী উপাদান যোগ ও জোরালো করা এবং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে জ্ঞানচর্চার পরিসর মুক্ত অবাধ করে তোলা। এ কথা সব মুসলিম দেশের জন্যই প্রযোজ্য। আর সত্য হলো ধর্মবর্ণনির্বিশেষে উন্নয়নশীল বিশ্বের সব দেশকেই এ পথে চলতে হবে।
বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী কখনো ধর্ম ত্যাগ করেনি, করবে না, সংস্কৃতিও তারা ছাড়ে না, ছাড়তে পারে না এবং জ্ঞানচর্চা ছাড়া মানুষের পক্ষে মানুষ থাকা সম্ভব নয়। এগুলোই শাশ্বত ও বিকাশমানতায় সংযোগ ঘটিয়ে মানবসমাজকে সার্থক করে তোলে। বিপরীত পথে আক্রোশ বাড়ে এবং ঘৃণা-ক্রোধ-হত্যার দুষ্টচক্রের ফাঁদে আটকে যায় সেই সমাজ। এটা কারও কাম্য হতে পারে?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

নতুন মেয়রকে অভিনন্দন জানানোর হিড়িক by সুজন ঘোষ

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে ও কর্তৃপক্ষের অনুমতি
না নিয়ে নবনির্বাচিত মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তাঁকে শুভেচ্ছা
জানিয়ে চট্টগ্রাম নগর ভবনের দেয়ালে টানানো হয়েছে পোস্টার,
ব্যানার। ছবিটি গতকাল দুপুরে তোলা l প্রথম আলো
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর হিড়িক পড়েছে নগরজুড়ে। বেআইনিভাবে যেখানে-সেখানে লাগানো হচ্ছে ব্যানার-বিলবোর্ড। সাঁটানো হচ্ছে পোস্টার। এ ক্ষেত্রে বাদ পড়েনি নগর ভবনও।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত নগর ভবনের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির ব্যানার। এমনকি পাশের নির্মাণাধীন নগর ভবনের পরিচিতি ফলক ঢেকে বিশাল ব্যানার লাগিয়েছে ছাত্রলীগ। নগর ভবনের প্রাচীরে সাঁটানো হয়েছে পোস্টার।
অভিনন্দন জ্ঞাপনকারীরা এসব পোস্টার-ব্যানার লাগানোর ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অনুমতির তোয়াক্কা করেননি। এমনকি এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনও মানা হয়নি। নতুন মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগানো এসব ব্যানার-পোস্টার অপসারণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সিটি করপোরেশন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পড়েছেন বিব্রতকর অবস্থায়।
স্থানীয় সরকার আইনের (২০০৯) পঞ্চম তফসিলের ৪৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ‘করপোরেশন কর্তৃক নির্ধারিত কোনো স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে বিজ্ঞাপন, নোটিশ, প্ল্যাকার্ড বা অন্য কোনো প্রকার প্রচারপত্র সাঁটিয়া দেওয়া অপরাধ।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে নগর ভবনে এসব ব্যানার লাগানো হয়েছে। কারা, কখন লাগিয়েছে তা-ও আমরা জানি না। পুরো বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। এখন নতুন মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন নগর ভবনের পরিচিতি-সংবলিত বিলবোর্ড ঢেকে দেওয়া হয়েছে অভিনন্দনের ব্যানারে। কোতোয়ালি থানা ছাত্রলীগের সৌজন্যে লাগানো এ ব্যানারে আ জ ম নাছির উদ্দিনকে মেয়র পদে নির্বাচিত করায় নাগরিকদের অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এই ব্যানারটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা এবং আ জ ম নাছিরের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাত নেতার ছবি রয়েছে।
ব্যানারে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পরিচয়দানকারী গৌতম হাজারী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, নতুন মেয়রকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার লাগানো হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে খুলে ফেলা হবে। নগর ভবনের পরিচিত ফলক ঢেকে ব্যানার লাগানো কতটুকু শোভনীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব কী বলেন আপনি (প্রতিবেদক)? ওখানে কোথায় নগর ভবনের পরিচিত ফলক আছে?’
এ ছাড়া নতুন মেয়রকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বর্তমান নগর ভবনের দেয়ালে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারবৃন্দ’ দুটি, সিটি করপোরেশন শ্রমিক ও কর্মচারী লীগ একটি, সিটি করপোরেশন শ্রমিক সংস্থা একটি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড একটি ব্যানার টানিয়েছে। নগর ভবনে আরও তিনটি ব্যানার থাকলেও সেখানে কোনো সংগঠনের নাম নেই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা তো সিটি করপোরেশন পরিবারের সদস্য। সবাই ব্যানার লাগাতে পারলে আমরা কেন পারব না!’
নগর ভবনে লাগানো এসব ব্যানার-পোস্টার অপসারণের বিষয়ে করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুলে ফেলা হবে।’

কারও সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারছেন না ইসমত জাহান

পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন
ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ইসমত জাহান। কিন্তু পুলিশের এক
সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন l ফাইল ছবি
‘পুলিশ আমাদের ওপর গাড়ি তুলে দিচ্ছিল। সরে না এলে আমাদের ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দিত। তখন চুপ করে থাকতে পারিনি। ক্ষোভ-রাগ থেকে ঢিল দিয়েছি। তবে বলতে পারি, আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য গেছি। পুলিশকে আঘাত করার জন্য যাইনি, পিকেটিংয়ের জন্য যাইনি।’
কথাগুলো বলছিলেন পুলিশি নির্যাতনের শিকার ইসমত জাহান। বর্ষবরণের দিন যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে গত রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে পুলিশের হামলার শিকার হন তিনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে নিজের বাসায় আছেন ইসমত। জানালেন, শারীরিক অবস্থা ভালো না। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেঁতলে গেছে। ব্যথায় ঠিকমতো বসতেও পারছেন না। পিঠে বুটের লাথির ফলে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। কারও সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারছেন না। ডান চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখছেন। আপাতত বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ছাত্র ইউনিয়নের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য ইসমত জাহান ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি কলাভবন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, মধুর ক্যানটিন ঘুরে শাহবাগের দিকে যায়। পুলিশ ছিল, রাস্তায় যানজটও ছিল। মিছিলটি ঘুরে কার্জন হলের দিকে যেতে থাকে। দোয়েল চত্বরে আসতেই পুলিশের ব্যারিকেড। কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে মিছিলটি হাইকোর্টের দিকে এগোতে থাকে। সার্কিট হাউস রোডে যাওয়ার পর পুলিশ বাধা দেয়। আন্দোলনকারীরা সেখানে রাস্তার ওপর বসে স্লোগান দেন। বক্তব্য দিচ্ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান তারেক। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পুলিশ মাইকের তার কেড়ে নেয়। প্রতিবাদ জানালে পুলিশ মারতে শুরু করে। পুলিশের গাড়ি তুলে দিচ্ছিল। তখন তিনি ঢিল ছুড়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিবিএ প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ইসমত জাহান জানালেন, পুলিশ যখন গাছের আড়াল থেকে তাঁকে বের করে মারধর করছিল; তখন একইসঙ্গে চলছিল অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ।
সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। বললেন, পুলিশ যখন তাঁকে গাছের আড়াল থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করার চেষ্টা করছিলেন, তখন এক সাংবাদিক তাঁকে আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। যখন তাঁর ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতন চলছিল, তখন কয়েকজন সাংবাদিক তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দিয়ে ধাওয়া দেয়।
যে যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন, তেমন একটা কাজ পুলিশ তাঁদের সঙ্গেও করল—মন্তব্য করে ইসমত বলেন, সেই ঘটনা থেকে এটা কোনো অংশেই কম না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মারতেই যদি হয় মহিলা ফোর্স দিয়ে মার। পুরুষ হয়ে নারীর ওপর তারা হাত তুলেছে, আইনের দৃষ্টিতে এটা কোনোভাবেই ঠিক না। তিনি দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইলেন, যেন এমন আর কেউ কোনো দিন না করে।

নিরস্ত্র সাংবাদিক কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

ভোট কেন্দ্র থেকে ইসি, হামলার লক্ষ্যই যেন সাংবাদিক
এবারের তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই লেখার প্রসঙ্গ শুধুই গণমাধ্যম। অনেকে ভাবতেন, দেশের অন্য কোথাও ভোট ডাকাতি হলেও ঢাকা শহরে তা কখনো সম্ভব হবে না। কারণ, ঢাকায় রয়েছে ২৫টি টিভি চ্যানেলের অন্তত দুই শতাধিক সাংবাদিক ও ক্যামেরা। বিভিন্ন সংবাদপত্রের শত শত সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান। অ্যামেচার বা ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান তো আছেই। মোবাইল ফোন ক্যামেরাম্যানদের হিসাব এখানে ধরছি না। সেটা সারা দেশে রয়েছে। এত এত ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের চোখের সামনে ঢাকা শহরে ভোট-সন্ত্রাস করা সম্ভব হবে না বলে মনে হতো। এসব ভোট ডাকাতি বা ভোট-সন্ত্রাস উপজেলায় বা অন্য শহরে সম্ভব।
কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আমাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভোট-সন্ত্রাসীরা গণমাধ্যমকে তোয়াক্কা করেনি। ২৯ এপ্রিলের অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে: ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনেক ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অনেকের ভিডিও ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অনেকের স্টিল ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা ছবি ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে।
তবে আমাদের সৌভাগ্য, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এত সন্ত্রাস ও আক্রমণের পরও ঢাকা ও চট্টগ্রামের বহু সাংবাদিক ও রিপোর্টার সাহসিকতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অভিনন্দন জানাই। ২৮ এপ্রিল বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের লাইভ কভারেজ, সংবাদচিত্র, নির্বাচন পর্যালোচনা (টক শো) ইত্যাদির মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্বাচন প্রহসন অনেকটাই প্রতিফলিত হয়েছে। বেশির ভাগ সাংবাদিক, আলোচক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনকে তামাশা বলেই বর্ণনা করেছেন। সংযুক্ত ভিডিওচিত্র তাঁদের বক্তব্যকে আরও জোরদার করেছে। এটা হলো গণমাধ্যমের শক্তি ও ইতিবাচক দিক।
ভোট-সন্ত্রাসীরা জানত, যদি ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম তাদের শতকরা ১০০ ভাগ দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে ভোট ডাকাতির যে চিত্র মিডিয়ায় উঠে আসবে তা হবে ভয়াবহ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শত বক্তৃতা দিয়েও তা ঢাকতে পারবেন না। এই প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করা ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় থাকবে না। তাই ভোট সন্ত্রাসীরা গণমাধ্যমকে ঠিকভাবে কাজ করতে দেয়নি। সন্ত্রাসীদের পেশিশক্তির কাছে সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা পরাজিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তা করতে পারত পুলিশ, র্যাব ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা। প্রথমত, সব কেন্দ্রে পুলিশ, র্যাব ছিল না। অনেক কেন্দ্রে পাহারারত পুলিশ ও দায়িত্ব পালনরত ভোট কর্মকর্তারা সাংবাদিককে রক্ষা না করে ভোট–সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছে। এই যখন ভোটকেন্দ্রের অবস্থা তখন সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন কীভাবে? এবারের নির্বাচনে পুলিশ যেভাবে ভোট-সন্ত্রাসীদের সহযোগী হয়েছে, অতীতে তেমন দেখা যায়নি।
এবারের সিটি নির্বাচন প্রমাণ করেছে ক্যামেরা বা গণমাধ্যম নয়, আসলে বাস্তবে মাস্তান ও সন্ত্রাসীরাই শক্তিশালী। আর সন্ত্রাসীরা যদি ক্যামেরা ভেঙেই দিতে পারে, তাহলে ক্যামেরা আর সত্য চিত্র দেখাবে কী করে? আর পুলিশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তা যদি ভোট-সন্ত্রাসের সহযোগী হয়, তাহলে এই নিরস্ত্র সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানকে রক্ষা করবে কে? এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন যদি ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা পালন করে ও ভোটের দিন জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগ পড়ার সময় না পায়, তাহলে ভোট-সন্ত্রাস বন্ধ করবে কে?
দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিও কর্তৃপক্ষ সবাইকে এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ করছি। সন্ত্রাসীরা যদি মিডিয়াকে বলপূর্বক বের করে দিতে পারে, ক্যামেরা ভেঙে দিতে পারে, তাহলে মিডিয়ার ভূমিকা বলে আর কিছু থাকে কি? এ রকম আচরণ করেও সিটি নির্বাচন যদি আইনি সমর্থন পেয়ে যায় তাহলে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ভবিষ্যতে দুর্নীতিবাজ, জঙ্গি, রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ, স্থানীয় মাস্তান, চাঁদাবাজ এ রকম দুশ্চরিত্রের সবাই মিডিয়া কর্মীর ওপর বলপ্রয়োগ করার সাহস পাবে। তাঁর ক্যামেরা ভেঙে দেওয়ার সাহস পাবে। তখন নিরস্ত্র সাংবাদিক কী করবেন? এ ব্যাপারে একটা কৌশল নির্ধারণের জন্য সব পেশাজীবী সাংবাদিককে আলোচনায় বসতে হবে। সাংবাদিক ইউনিয়ন এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দেবে কি না সন্দেহ। দলনিরপেক্ষ পেশাজীবী সাংবাদিকদের এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে।
কোনো সংবাদপত্র, টিভি বা রেডিও ভোটের দিনের বিকৃত ছবি বা ভুল তথ্যসংবলিত খবর প্রকাশ করলে তাও নিন্দনীয়। গণমাধ্যম কোনো দলের বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারে না। যারা করছে তাদের পাঠক, দর্শক চেনেন। আমাদের ধারণা, বেশির ভাগ গণমাধ্যম দলনিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ। সে জন্য ভোট-সন্ত্রাসীরা ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়েছে।
আরেকটা অদ্ভুত মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাহলো: যারা ভোটের দিনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে, তাদের ‘সরকারবিরোধী’ বা ‘আওয়ামীবিদ্বেষী’ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এসব পত্রিকা বা টিভি নির্বাচনের কী কী ভুল তথ্য দিয়েছে বা কী কী বানোয়াট ছবি প্রকাশ বা প্রচার করেছে, তা কোনো সমালোচক তুলে ধরছেন না। তাঁরা ঢালাওভাবে ‘আওয়ামীবিদ্বেষী’ বলে প্রচার করে পাঠককে বিভ্রান্ত করছেন। আমরা মনে করি, কোনো পত্রিকা বা টিভির ভুল তথ্য প্রচার বা বিকৃত ছবি প্রকাশের অধিকার নেই।
অমিতাভ চৌধুরী
কলকাতার খ্যাতনামা সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী ২ মে প্রয়াত হয়েছেন। বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে যাঁরা আধুনিক রূপ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অমিতাভ চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের পর যেমন আনন্দবাজারকে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি বাংলা সাংবাদিকতার একটি টেকসই আধুনিক রূপ দিতে পেরেছিলেন। সঙ্গে আরও ছিলেন সন্তোষ কুমার ঘোষ, গৌরকিশোর ঘোষ, নিখিল সরকারসহ আরও কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক। সেই আনন্দবাজার পত্রিকা এখনো পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাংবাদিকতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অমিতাভ চৌধুরী বিশ্বভারতীর ছাত্র ও পরে শিক্ষক ছিলেন। রবীন্দ্র অন্তঃপ্রাণ। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কয়েকটি বইও লিখেছিলেন। তবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক বই সংবাদের নেপথ্যে (১৯৮১) একটি উল্লেখযোগ্য বই। বইটি সাংবাদিকেরা পড়লে উপকৃত হবেন। পেশাদারি সাংবাদিকতা পেশা সম্পর্কে বহু কিছু জানা যায় এই বই পড়ে। একজন জুনিয়র রিপোর্টার থেকে তিনি কী করে এত বড় জাঁদরেল সাংবাদিক হয়েছিলেন, সেই সংগ্রামের কথাও জানা যায় এই বই পড়ে। অমিতাভ চৌধুরীর মৃত্যুর সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাংবাদিকতার একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।
ফয়েজ আহ্মদ স্মারকগ্রন্থ
খ্যাতনামা সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সংগঠক ফয়েজ আহ্মদ স্মরণে বাংলা একাডেমি একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সম্পাদনা করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও কামাল লোহানী। আমাদের দেশের সাংবাদিকতায় ফয়েজ আহ্মদ একটি বর্ণাঢ্য নাম। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে রিপোর্টার পদে কাজ শুরু করে তিনি একাধিক সাপ্তাহিক ও জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক হয়েছিলেন। ষাটের দশকে আজাদ ও ইত্তেফাক পত্রিকার চিফ রিপোর্টার হিসেবে তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইতিহাসখ্যাত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ কভার করে তিনি বহু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। স্বাধীনতাপূর্ব কালে সাপ্তাহিক স্বরাজ ও পরে বঙ্গবার্তা সম্পাদনা তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সাহিত্যজগতেও তাঁর বড় অবদান রয়েছে। পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি একজন ছড়াকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন ও দেশের প্রথম আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্ব ও অবদান সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এই স্মারকগ্রন্থে বিভিন্ন লেখক তাঁর নানামুখী প্রতিভা ও অবদানের কথা তুলে ধরেছেন।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

মার্কিন-চীন সম্পর্কের নতুন ব্লুপ্রিন্ট by গ্যারেথ ইভান্

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কের চলমান পালাবদল যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বৈশ্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুশাসন। এই সম্পর্কের চেয়ে অন্য কোনো বিষয় এসব নির্ধারণে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে না। দীর্ঘ মেয়াদে দেখা যাবে, আজকের যে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন পশ্চিমের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি—এসব সমস্যা উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্রের রূপ নিয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক হবে প্রধান চরিত্র।
চীন-মার্কিন সম্পর্ক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার কারণ হচ্ছে, দুই দেশেরই শক্তিশালী বিভিন্ন গোষ্ঠীও সংঘাতের পথে হাঁটতে চাইছে। চীন শি জিনপিংয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে। তারা আর দেং জিয়াওপিংয়ের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছে না। দেংয়ের নীতি ছিল এ রকম: ‘নিজের শক্তি গোপন রাখো, অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষা করো আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কখনো নেতৃস্থানীয় অবস্থান নিয়ো না।’ তারা খোলামেলাভাবেই সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা দেখিয়ে আসছে, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের এই আগ্রাসী মনোভাব পরিষ্কার দেখা গেছে। এমনকি তারা সে অঞ্চলে অন্তহীন মার্কিন আধিপত্য প্রতিরোধের ইচ্ছাও খোলামেলাভাবে দেখিয়েছে। তাদের এখন ভাবছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে একঘরে করতে চায়, বশে এনে খাটো করতে চায়।
দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজের দৃষ্টান্ত দেখে চীনের এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। মার্কিন নীতি প্রণেতারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যত যা-ই বলুন না কেন, তাঁরা জনসমক্ষে যা বলছেন ও করছেন, তাতে বোঝা যায় যে তাঁরা বিশ্বের আধিপত্যকামী শক্তি হিসেবেই থাকতে চান। বিশেষ করে এশিয়ায় তাঁরা যেন অনন্তকাল ধরে বিরাজমান আধিপত্য বজায় রাখতে চান।
সম্প্রতি রবার্ট ব্ল্যাকঅয়েল ও আশলে টাইলস প্রণীত রিপোর্ট ফর দ্য কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বজায় রাখার সবচেয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মার্কিন গ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘বৈশ্বিক ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা’। সেখানে তাঁরা চীনের সঙ্গে ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখার জন্য একাধিক আগ্রাসী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁরা বলছেন, এটা কাউকে ‘সংবরণ’ করার নীতি নয়, কিন্তু আদতে এটা তার চেয়ে কম কিছু নয়।
এই সম্পর্ককে চালিয়ে নেওয়ার আর কোনো উপায় আছে কি, যেখানে এই শক্তিসমূহের বাস্তবতা ও মনোভাব প্রতিফলিত হবে, কিন্তু এই বৈধ প্রতিযোগিতা বিপজ্জনকভাবে যুদ্ধংদেহী অবস্থায় পর্যবসিত হবে না? অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে তেমনই এক কৌশল বাতলে দিয়েছেন। তিনি এর নামকরণ করেছেন ‘গঠনমূলক বাস্তবতা’। মোড়ক হিসেবে এটা খুবই নিস্তেজ, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণ ও নীতিগত পরামর্শ সত্যিই আগ্রহোদ্দীপক।
রাডের যুক্তির ‘বাস্তব’ মাত্রায় এটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে মতানৈক্যের কয়েকটি ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতেও লাগাম দেওয়া যাবে না: তাইওয়ানসহ দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে ভূমিবিরোধ, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রী ও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি। তারা সহজ সমাধানকে অগ্রাহ্য করে যাবে, ফলে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগুলোর ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
রাডের অভিসন্দর্ভের ‘গঠনমূলক’ অংশে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিজের সমকক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করবে। এর লক্ষ্য হচ্ছে, ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরের কঠিন সমস্যাগুলো যাতে সামলানো যায়। দ্বিপক্ষীয়ভাবে, এমন সহযোগিতার মধ্যে হয়তো বিনিয়োগ নীতি, সন্ত্রাসবাদবিষয়ক যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, সাইবার-নিরাপত্তা প্রটোকল, অপরিকল্পিত সামরিক ঘটনা নিয়ন্ত্রণে মতৈক্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ ও কম্প্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটিতে দুই পক্ষের অনুসমর্থন প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে।
আঞ্চলিক ক্ষেত্রে রাডের কথা হচ্ছে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র রোধে একত্রে কাজ করতে পারে, কোরিয়া উপদ্বীপের একত্রীকরণে সহায়তা করতে পারে, জাপানের ক্রমেই গভীর হতে থাকা যুদ্ধ ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারে, আঞ্চলিক বাণিজ্য মতৈক্য সমন্বয় করতে পারে; আর পূর্ব এশিয়া সামিটকে আরও পূর্ণাঙ্গ এশিয়া-প্যাসিফিক সম্প্রদায়ে রূপ দিতে পারে।
ওদিকে রাড মনে করেন, বৈশ্বিক পরিসরে দেশ দুটি যৌথ কর্মসূচি নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জি-২০-কে পুনর্জীবিত করা, চীনের মুদ্রাব্যবস্থা রেনমিনবিকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া; বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে চীনকে আরও গুরুত্ব দেওয়া আর জাতিসংঘের পরিচালনাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সংস্কার প্রভৃতি করতে পারে।
প্রবীণ চীন বিশেষজ্ঞ ডেভিড শ্যামবাঘসহ পশ্চিমের অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের সহযোগিতামূলক ছাড় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা হবে না। এ ব্যাপারে তারা মোটামুটি নিঃসন্দেহ। তার কারণ হিসেবে তাঁরা মনে করেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে চীন নিজে থেকে ধসে যাবে। রাডের যুক্তি হচ্ছে, এঁরা ভুল করছেন। শি কখনোই নিজের কর্তৃত্বপরায়ণতায় বেশি জোর দেবেন না, আবার প্রবৃদ্ধির হার কমে যাবে এমন কিছুও করবেন না। চীনের উত্থান চলতেই থাকবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সবাইকে নীতিভিত্তিক পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে তাকে এই ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে স্থান দেওয়া যায়।
রাডের সুপারিশে উচ্চাভিলাষ আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর পরিচিতির কথা বিবেচনা করে রাডের কথায় গুরুত্ব দিতে হবে। রাড একজন বিশিষ্ট চীনা ভাষাতাত্ত্বিক, সৃজনশীল নীতি চিন্তক; চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাডের জামানা খুব একটা সুখকর ছিল না, কিন্তু তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার তুলনা হয় না। সমকালে বা গত ৩০ বছরে যত নেতাকে দেখেছি, তাঁদের মধ্যে তিনিই এ ক্ষেত্রে সেরা (তিনি জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হতে চান, সে কারণে এসব বলছি না। এই পদে প্রধান শক্তিগুলো চোখ-কানহীন মানুষকেই পছন্দ করে, সৃজনশীল মানুষদের নয়)। সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই দেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলতেই স্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু আমাদের এটা আশা করা উচিত যে আগামী দিনগুলোতে আমরা ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ ‘আধিপত্য’ প্রভৃতি শুনব না, আমরা শুনব সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা। যুক্তরাষ্ট্র চীনবিষয়ক এমন নীতি নিলেই কেবল একুশ শতক আশাবাদী হতে পারে, দুনিয়াটা আগের শতকের মতো আর কান্নার উপত্যকা হবে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
গ্যারেথ ইভান্স: অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

কূটনীতির কাছে হেরে গেল রাজনীতি by ওয়াসবির হোসেন

তরুণ গগৈ: চুক্তির পক্ষে যাঁর অবস্থান
শেষমেশ কূটনীতি ও দ্বিপক্ষীয় দাবি রাজনীতি ও আবেগের ওপরে স্থান পেল। বলা যায়, রাজনীতি হেরে গেল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় মন্ত্রিসভা গত মঙ্গলবার স্থলসীমান্ত বিলে (সংবিধানের ১১৯তম সংশোধনী) অনুমোদন দিয়েছে, যার মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর হবে। পার্লামেন্টে বিলটি পাস হয়ে গেলে দুই দেশের মধ্যে ভূমি বিনিময় সম্ভব করে তুলবে।
মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস সরকার ২০১১ সালে অতিরিক্ত প্রটোকল স্বাক্ষর করলে বিজেপি তখন এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর যখন বুঝলেন, বাংলাদেশসহ ভারতের অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন করা দরকার, তখন তিনি খুব দ্রুতই নিজেকে ও দলকে শুধরে নিলেন। মোদি নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্ক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। তাঁর মন্ত্রিসভা যখন মঙ্গলবার এ বিলে অনুমোদন দিল, তখনই বোঝা গেল, তিনি আসলে কাজের মানুষ। শুধু কথার খই ফোটান না তিনি।
বৈপরীত্য হচ্ছে, কংগ্রেস নয়, বিজেপিরই একটি অংশ এই স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। আসামের রাজ্য বিজেপি এর বিরোধিতা করেছে, কারণ সেখানকার স্থানীয় পার্টি নেতারা ‘সূচ্যগ্র মেদিনীও দেব না’—এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ করে বসেছিলেন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই, কারণ আগামী বছর আসাম রাজ্যসভার নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগে বাংলাদেশকে ভূমি দিয়ে দেওয়া হলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, তারা ভূখণ্ড বেচে দিয়েছে। ফলে তারা এর বিরোধিতা করেছে। তদুপরি, আসামের জাতীয়তাবাদী দল যেমন অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএসইউ), আঞ্চলিক গণপরিষদ (এজিপি) বাংলাদেশের কাছে ভূমি হস্তান্তরের তীব্র বিরোধিতা করছে। তারা ইতিমধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির হুমকিও দিয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ থেকে আসামসহ ভারতের অন্যান্য অংশে অনুপ্রবেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রে সত্যিই বড় রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আগামী বছরের রাজ্য নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করে আসাম রাজ্য বিজেপির নেতারা আসামকে এ চুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের এই আরজি প্রায় পাসও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কংগ্রেস ও বাংলাদেশ এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোদি রাজনীতি ও আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর মন্ত্রিসভায় এই বিল পাস করান। গতকাল বুধবার রাজ্যসভায় সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হওয়ার পর আজ লোকসভায় পেশ করার কথা।
এখন সবাই এটা দেখছে যে পররাষ্ট্রনীতিতে মোদি বেশ সক্রিয়। আর আগামী জুনে বাংলাদেশ সফরের আগে তাঁর পক্ষে এই চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। সর্বোপরি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভালো হচ্ছে গত বছর থেকে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আর নয়াদিল্লি তার পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার সুযোগ হাতছাড়া করবে না। নয়াদিল্লি পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতার কারণে ঢাকার সঙ্গে তিস্তা চুক্তিতে তেমন একটা অগ্রসর হতে পারেনি। ফলে মোদি আগামী জুন মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় সেখানে খালি হাতে যেতে চান না। অন্তত বাংলাদেশকে দেওয়া যায়—এমন সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব নিয়ে তিনি সেখানে যেতে চান।
আসামের প্রবীণ মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ বলেছেন, ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সীমানা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। ফলে তখন সীমানা সিলগালা করে দেওয়া যাবে, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাবে। তিনি আরও বলেছেন, স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিতর্কের চির অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তে মোট ৯৮২ একর ভূমি নিয়ে বিতর্ক আছে। আসাম রাজ্য সরকার বলেছে, এই চুক্তির বাস্তবায়ন হলে আসাম ৭১৪ একর ভূমি পাবে, আর এর বিনিময়ে তাকে ২৬৮ একর জমি বাংলাদেশকে দিতে হবে। এই সত্যেই এখন বিজেপিকে সান্ত্বনা খুঁজতে হবে, তরুণ গগৈ ঠিক এ কথাটাই ঢাকঢোল পিটিয়ে বলছেন।
স্থানীয় রাজনীতি ও আবেগের ব্যাপারটি সত্ত্বেও কারও পক্ষে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গির বৃহৎ পরিসরকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন, ফলে তিনি নিশ্চিতভাবে অনেক কিছুই করতে পারেন। এমনকি আসামের মতো স্থানীয় পার্টি ইউনিটের ভীতিকেও তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেন, ঠিক এ ক্ষেত্রে তিনি যেমন করেছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝুলে থাকা খুঁতখুঁতে সমস্যাগুলো তিনি অবশ্যই সমাধান করতে চান। কারণ, এরপর তাঁকে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঝুলে থাকা অনেক কুটিল সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেই জটিল কাজ হাতে নেওয়ার আগে তিনি এগুলোর সুরাহা করতে চান। ফলে তাঁকে এই বিল পাস করাতেই হবে।
বিজেপি আশা করে, আজ হোক বা কাল হোক, সবাই এটা মেনে নেবে যে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা সমস্যার চির সমাধান দেবে। এরপর দেশ দুটি বাণিজ্য, সংযোগ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ কৌশল প্রণয়ন এবং পানি সমস্যার মতো বিষয়গুলোতে মতৈক্যে আসতে পারবে। হ্যাঁ, এখন সবার দৃষ্টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের দিকে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ওয়াসবির হোসেন: রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও আসামের গুয়াহাটির সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পিস স্টাডির নির্বাহী পরিচালক।

‘চোখ বাঁধা অবস্থায় কিছু লোক আমাকে ফেলে গেছে’ by মানস চৌধুরী

ভারতের মেঘালয়ের শিলং সিভিল হাসপাতালে
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ।
গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ তাঁকে এই
হাসপাতালে ভর্তি করে l ছবি: সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য
‘আমি কী করে এখানে এলাম কিছুই জানি না। কিছু লোক চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে করে আমাকে এখানে ফেলে গেল। তারা কারা তা-ও জানি না।’ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা থেকে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ এসব কথা বলেন।
সালাহ উদ্দিন পুলিশকে বলেন, ‘আমাকে ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। তারা আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। যারা আমাকে বন্দী করেছিল, তারা সব সময় চোখ বেঁধে রেখেছে। আমি কিছুই দেখতে পায়নি। তারা একটি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে আসে। এরপর ফেলে যায়। আমি কোথায় তার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কাছে সব অচেনা মনে হচ্ছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, সালাহ উদ্দিন আহমেদ সোমবার সকালে গলফ লিংক এলাকায় উদভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করছিলেন। সকাল থেকে একই স্থানে তিনি বারবার পায়চারি করছিলেন। এ রকম একজন লোককে ঘোরাফেরা করতে দেখে লোকজন পুলিশকে জানায়। এরপর পুলিশ এসে তাঁকে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের কাছে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী বলে পরিচয় দেন। তখন পুলিশের সন্দেহ হয়, তিনি ঠিক বলছেন কি না। কিন্তু তিনি এর সমর্থনে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারছিলেন না। পরনের কাপড় ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না। তিনি কাঁপছিলেন।
শিলংয়ের পূর্ব খাসি হিলস জেলার পুলিশ প্রধান মারিয়াহোম খারক্রাং জানান, তিনি ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছে, তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর হার্টে ও লিভারে সমস্যা আছে। হাসপাতালে আসার পর তিনি একজন চিকিৎসকে বলেন, ‘আপনার ফোনটা একটু দিন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তিনি কীভাবে শিলং পৌঁছালেন সে ব্যাপারে পুলিশ কিছুই জানাতে পারেনি। সালাহ উদ্দিন নিজেও ঠিকমতো কিছু বলতে পারছেন না।

পয়লা বৈশাখের ঘটনাকে ‘তিন-চারটা ছেলের দুষ্টামি’ বললেন আইজিপি

এ কে এম শহীদুল হক
পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে ‘তিন-চারটা ছেলের দুষ্টামি ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। এ ঘটনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দীর বক্তব্যও ঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। আজ মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরে বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আইজিপি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে চার-পাঁচটি ছেলে দুই-তিনটা মেয়েকে শ্লীলতাহানি করল। যাদের সামনে এই ঘটনা ঘটালো সেই পাবলিকরা তাদের কেন ধরল না। পাবলিকই তো তাদের শায়েস্তা করতে পারত। প্রত্যেক নাগরিকের আইনগত অধিকার আছে, তাদের সামনে অপরাধ ঘটলে তারাই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারবে। এতে পুলিশের গ্রেপ্তার করা লাগত না।’ ওই দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা লিটন নন্দীর কথা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন আইজিপি। তিনি বলেন, লিটন নন্দী একেক জায়গায় একেক ধরনের কথা বলেছেন। তবে লিটন নন্দীর কথা ধরে নিলেও দেখা যায়, পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। লিটন নন্দীর বক্তব্য, পুলিশ লাঠিপেটা করে দুটি মেয়েকে উদ্ধার করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাড়া করে দিয়েছে।
আইজিপি আরও বলেন, ‘তিন-চারটা ছেলে দুষ্টামি করতাছে, মেয়েদের শ্লীলতাহানি করছে, কেউ আগায়া আসল না, বাকি লোক তাকিয়ে দেখল। একটা লোকও তো বলল না, এই লোকটাকে তারা চেনেন। তারা তাদের বাড়ির পাশের।’ তিনি বলেন, গণমাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে সেদিনের ভিডিও ফুটেজ দেওয়া হয়েছিল, যাতে জনগণ তাদের সহযোগিতা করে। কিন্তু একটি লোকও তো তথ্য দিলেন না। এতে শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না।

সুন্দরবন থেকে রূপপুর: ভুল তথ্য ও অস্বচ্ছতা by আনু মুহাম্মদ

৩ মে প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র–বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশে আবারও বিষোদ্গার করেছেন। হাসিঠাট্টার ছলে তিনি যে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন, সেগুলো গুরুতর অভিযোগ। যেমন তিনি বলেছেন, আন্দোলনকারীরা মানুষের স্বার্থ বাদ দিয়ে এখন পশুপাখি রক্ষার আন্দোলন করছে। স্মরণ করি, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।’ খুবই সঠিক কথা ছিল সেটি। তাহলে প্রধানমন্ত্রী কি কয়েক দিন আগে বলা কথা নিজেই অস্বীকার করছেন? সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন অবশ্যই পশুপাখি-গাছপালা রক্ষা করতে চায়। কিন্তু সেটাই প্রথম বা শেষ কথা নয়। বহু কারণে এই সুন্দরবন রক্ষার দায় আমাদের। কারণ, এই বিশাল সম্পদ (ক) পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, (খ) এটি বিশ্ব ঐতিহ্য, (গ) এর ওপর কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে, (ঘ) এটি অসংখ্য প্রাণের সমষ্টি এক মহাপ্রাণ, (ঙ) এটি অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন, সর্বোপরি (চ) এটি প্রাকৃতিক রক্ষা বাঁধ, যা প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ মানুষ বাঁচায়।
প্রধানমন্ত্রী এবারও বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনা টেনেছেন। এই দুটো যে তুলনীয় নয়, তা আমরা আগেও বহুবার বলেছি। প্রথমত, বড়পুকুরিয়ায় কোনো সুন্দরবন নেই; দ্বিতীয়ত, বড়পুকুরিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ ভাগের ১ ভাগ; তৃতীয়ত, ছোট আকারের হলেও সেই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে এলাকায় পানির সংকট ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে ওপরের পানি দূষিত হয়ে কুৎসিত আকার ধারণ করছে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে যাওয়ায় খাবার ও কৃষিপানি দুর্লভ হয়ে উঠছে। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এর ১০ গুণ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি সুন্দরবনের মতো প্রতিবেশগতভাবে সংবেদনশীল স্থানে হয়, তাহলে তার পরিণতি কী হবে!
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে সুন্দরবন থেকে ‘নিরাপদ দূরত্বে’। সরকারি দলিলেই বলা হয়েছে, সুন্দরবন থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। বাফার জোন ধরলে মাত্র চার কিলোমিটার। ভারতে অনেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই সেখানে আইন হয়েছে এই দূরত্ব কমপক্ষে হতে হবে ২৫ কিলোমিটার। এনটিপিসির পরে বাংলাদেশের কোম্পানি ওরিয়নকে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা সুন্দরবনের আরও নিকটবর্তী। দূরত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই নিশ্চিন্ত অবস্থানের সঙ্গে সম্প্রতি ইউনেসকোর কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের পাঠানো চিঠির বক্তব্যের সম্পর্ক থাকতে পারে। এই চিঠিতে বলা হয়েছে, সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার দূরে। এই বক্তব্যের চালাকি হচ্ছে এই যে বিশ্ব ঐতিহ্য বলে ইউনেসকো সুন্দরবনের উপকূলসংলগ্ন একটি অংশকে নির্দিষ্ট করেছে, যার থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র ঠিকই ৭০ কিলোমিটার দূরে। সরকার এটা বলে ইউনেসকোকে বুঝ দিচ্ছে, কিন্তু সরকার কি তবে সুন্দরবন বলতে তার ক্ষুদ্র একটি অংশকেই বোঝাতে চায়? সরকার কি তবে সুন্দরবনের বড় অংশ খরচের খাতায় ফেলছে? মানচিত্র দেখলে যে কেউ বুঝবেন, এভাবে ওই টুকরোটিও নিরাপদ হবে না। কয়লা পরিবহন হবে সমুদ্র থেকে পুরো সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে, বিশ্ব ঐতিহ্য বলে চিহ্নিত অংশের পাশ দিয়ে। এই পরিবহনই ওই টুকরোসহ পুরো সুন্দরবনকে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। এর সঙ্গে পুরো সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটের চক্রাকার ভূমিকা তো আছেই। আর এর মধ্যে একটাও যদি দুর্ঘটনা হয়, তাহলে কী পরিণতি হবে, তা সাম্প্রতিক তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনাই তার প্রমাণ। এখনো ওই জাহাজ ওখানেই পড়ে আছে। এর মধ্যে আবারও জাহাজডুবি হয়েছে। এগুলোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির যেসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে সংবেদনশীল হলে অনেক আগেই সরকারের তৎপরতায় আমূল পরিবর্তন আসত।
সব যুক্তি-তথ্য অস্বীকার করে ‘উন্নয়ন’ হবে, কর্মসংস্থান হবে, বিদ্যুৎ আসবে, শহর হবে ইত্যাদি অসততা ও প্রতারণায় ভরা প্রচারণা চলছেই। গোপন করা হচ্ছে এই সত্য যে যত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তুলনায় কর্মসংস্থান নষ্ট হবে তার কয়েক গুণ। কাজের জন্য, মাছের জন্য, সুন্দরবন বাঁচার জন্য নদীর যে স্বাদু পানি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেই পানি বিষাক্ত হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য শত হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ বানানো হয়। আর বাংলাদেশে তার তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে সুন্দরবন। এখন বহু হাজার কোটি টাকা খরচ করে এই সুন্দরবনের সর্বনাশ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এই সর্বনাশ মানে কোটি মানুষের অসুস্থতা বৃদ্ধি, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
সুন্দরবন রক্ষার অর্থ তাই শুধু পশুপাখি-গাছপালা নয়, মানুষের অস্তিত্বের জন্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে, এর সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন একটাই, এর বিনাশ ঘটলে তা আর পুনরুৎপাদন করা যাবে না। সে জন্যই আমরা বারবার বলি, সুন্দরবন না থাকা মানে বাংলাদেশ অরক্ষিত হয়ে পড়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প উপায় আছে, কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প নেই।
সরকারের একটাই বুলি, ‘কোনো ক্ষতি হবে না।’ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ ভারত করবে না। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তঁার সরকার দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ করবে না। এসব কথায় ভরসা করতে পারতাম যদি ক্ষমতাবানদের হাতে জমি, পাহাড়, বন, নদী, সর্বজনের সম্পদ অরক্ষিত না দেখতাম। বস্তুত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে যেসব তৎপরতা চলছে, তাতে ইতিমধ্যে সুন্দরবন আক্রান্ত। সাইলো, সিমেন্ট কারখানা শুধু নয়, বন উজাড় করে ভূমিগ্রাসে এখনই লিপ্ত আছে সরকারঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠী। ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষ গরিব ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার ফলে তাদের অনেকের হাত থেকে জমি কেড়ে নেওয়া সহজ হয়েছে। আবার এখন ঘাড়ের ওপর বানানো হচ্ছে বিমানবন্দর!
এলাকায় ভূমিদখল, সুন্দরবন বিনাশ ও প্রকল্প নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরও এখন কথা বলার উপায় নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলাকা থেকে মানুষ সরানো হয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে, জোর করে। এখন সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘের বসেছে। এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীরাই সব ধরনের আলোচনা মত বা প্রতিবাদের বিরুদ্ধে নিয়োজিত। জবরদস্তির এই চেহারা আমরা মাতারবাড়ী ও রূপপুর এলাকায়ও দেখছি। গত এক বছরে অন্তত ছয়টি ঘটনা জানি, যেখানে ঈশ্বরদী এমনকি পাবনায়ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে সভা-সমাবেশ দূরের কথা, মতবিনিময় সভাও করতে দেওয়া হয়নি। সাদাপোশাক, উর্দি পরা সরকারি বাহিনী থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী—সবাইকে ব্যবহার করা হচ্ছে এই প্রকল্প নিয়ে কোনো কথাবার্তা যাতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে যদি দেশের মঙ্গল হয়, তাহলে দেশের মানুষই তার সুবিধা পাবে; যদি অমঙ্গল হয়, তাহলে ভুগবে দেশের মানুষ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। তাহলে কেন তাদের কথা শুনতে বা কথা বলতে দিতে এত ভয়? সরকার যদি নিশ্চিত থাকে এগুলো ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প, ধ্বংস বা লুণ্ঠন প্রকল্প নয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে অসুবিধা কী? জনগণের মুখোমুখি হতে অসুবিধা কী? সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগের মোকাবিলা করতেই অনিচ্ছুক। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা নিয়ে কথা ওঠায় একবার রুশ রাষ্ট্রদূত বললেন, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এতই সুরক্ষিত থাকবে যে এখানে বোমা মারলেও এর কোনো ক্ষতি হবে না। সুনামি হলেও কোনো সমস্যা হবে না। এর পর থেকে সরকারের লোকজনও একই কথা পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছেন। বিপদের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা হবে বা পারমাণবিক বর্জ্য কীভাবে সরানো হবে, তার কোনো সন্তোষজনক জবাব মেলেনি। এর মাধ্যমে কয়েক কোটি মানুষকে যে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে, তার থেকে বাঁচার নিরাপত্তাকবচ কোথায়?
সুন্দরবনে আলট্রাসুপার টেকনোলজি কিংবা রূপপুরে বোমা বা সুনামি প্রতিরোধক প্রযুক্তি কি শুধু বাংলাদেশের জন্যই পাওয়া যাচ্ছে? নইলে যে ভারতীয় কোম্পানি বা বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছে, তাদের নিজ দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে এত ভয়াবহ প্রতিবেদন কেন? কেন ভারতের গ্রিন ট্রাইব্যুনাল এই এনটিপিসির একাধিক প্রকল্প স্থগিত করেছে? কেন একই প্রযুক্তি নিয়ে রাশিয়ার ঋণে নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তামিলনাড়ুতে (কুডানকুলাম) বারবার বাধা ও অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে? কেন মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে সেখানে?
সুন্দরবন ও রূপপুরে দুই স্থানেই প্রকল্প গ্রহণ-প্রক্রিয়া অস্বচ্ছতায় পূর্ণ। রামপালে কয়লা কোথা থেকে আসবে, অর্থসংস্থান কীভাবে হবে, বিদ্যুতের দাম কত পড়বে, তা দেশের মানুষের কাছে এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ান ঋণ নেওয়া হয়েছে উচ্চ সুদে, কিন্তু তার ব্যবহার নিয়ে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এই দুই প্রকল্পে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, তা বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ২০ ভাগেরও কম। অনেক পথ আছে এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের। একটি বড় এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হলো বঙ্গোপসাগর। এখানকার গ্যাস-তেল সম্পদ যদি জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে শতভাগ নিজেদের মালিকানায় উত্তোলন করা যায়, তাহলে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জনগণকে সুলভে পরিবেশসম্মতভাবে বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া সম্ভব। এর জন্য জাতীয় মালিকানার নীতি ও জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের কর্মসূচি নিতে হবে। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে মার্কিন, ভারতীয় ও চীনা কোম্পানির সঙ্গে এমন ধরনের চুক্তির পথে যাচ্ছে, যাতে এই গ্যাস আর দেশের সম্পদ থাকবে না, বোঝায় পরিণত হবে। অন্যদিকে, স্থলভাগে নিজেদের সক্ষমতা নিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও গাজপ্রমসহ বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ স্থলভাগের অবশিষ্ট ব্লক। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি তো বাংলাদেশের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনা। উপরন্তু এর ব্যয়ও দ্রুত কমে আসছে। সেদিকেও বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির উদ্যোগ নেই।
সমাধানের যথাযথ পথ নিলে দেশ ও মানুষ টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা পাবে ঠিকই, কিন্তু তাতে দেশি-বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর কমিশন, দুর্নীতিসহ বৃহৎ লাভের সম্ভাবনা নেই। সে জন্যই কি বাংলাদেশের ঘাড়ে বিপদের প্রকল্প জমা হচ্ছে একের পর এক?
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

সালাহউদ্দিনের খোঁজ মিললো

দীর্ঘ ৬৩ দিন পর। খোঁজ মিললো বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমেদের। মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকায় রাস্তায় উদভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরার সময় গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁকে আটক করে স্থানীয় পুলিশ। বর্তমানে তিনি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিখোঁজ এ নেতার সন্ধান বার্তা পেয়েছেন তার পরিবার। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের একটি হাসপাতাল থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদের মোবাইলে একটি ফোন আসে। মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোজিক্যাল সায়েন্স (মিমহ্যান্স)-এর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে এক মহিলা ইংরেজিতে হাসিনা আহমেদকে জানান, ‘আপনার স্বামী আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’ এরপরই টেলিফোনে অসুস্থ সালাহউদ্দিন আহমেদের কন্ঠ ভেসে আসে। সালাহউদ্দিন বলেন, ‘কেমন আছো হাসিনা। আমি সালাহউদ্দিন বলছি। আমি বেঁচে আছি। তুমি সবাইকে খবরটি জানিয়ে দাও। আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে কিভাবে নিয়ে যাবে একটু দ্রুত ব্যবস্থা করো।’ পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সালাহউদ্দিনের বার্তা নিয়ে ফোনটি যখন আসে তখন মেয়েকে স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে নিয়ে গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলেন হাসিনা আহমেদ। স্বামীর কণ্ঠ শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বাসায় মেয়েকে রেখেই ছুটে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসায়। তার সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট কথা বলে হাসিনা আহমেদ বাসায় ফিরেন। এরপর তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা এবং স্বামীর সন্ধান পেয়ে দেশবাসী, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট, সকল রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে কখন ও কারা সালাহউদ্দিন আহমেদকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী। এদিকে সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে ভারতের মেঘালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে তার পরিবার। গতকাল দুপুরেই ভিসার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনে আবেদন করেছেন হাসিনা আহমেদ ও তার দুই আত্মীয়। হাসিনা আহমেদ জানিয়েছেন ভিসা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভিসা প্রসেসিংয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। এদিকে গতকাল বিকালে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেছেন, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে। তার বিষয়টি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ওদিকে মঙ্গলবার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ের দ্য নর্থইস্ট টুডে পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকার রাস্তায় ইতস্তত ঘোরাফেরার সময় গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সোমবার সালাহউদ্দিন আহমেদকে আটক করে স্থানীয় পুলিশ। প্রাথমিক কথাবার্তায় অপ্রকৃতিস্থ মনে হওয়ায় মঙ্গলবার মিমহ্যানস হাসপাতালে নেয় পুলিশ। হাসপাতালে নেয়ার পর তাঁর পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রোগী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি বিএনপির একজন নেতা। তিনি শিলংয়ে কিভাবে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি জানি না’। এ সংবাদের সঙ্গে হাসপাতালে পুলিশের সঙ্গে দাঁড়ানো অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি ছবিও প্রকাশ করেছে নর্থইস্ট টুডে। ছবিতে দেখা যায়, সাদা টি-শার্ট পরিহিত সালাহউদ্দিনের গায়ে জড়ানো রয়েছে একটি খয়েরি-সাদা চেক চাদর। তাঁর হাত ধরে রেখেছেন একজন পুলিশ সদস্য। পেছনে দেখা যায় হাসপাতালের একজন নার্সকে। এদিকে মেঘালয় পুলিশ সূত্রে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, শিলংয়ের সবচেয়ে কাছে বাংলাদেশ সীমান্তের ডাউকি সেটাও প্রায় ৪০-৪২ মাইল দূরে। প্রাথমিকভাবে মেঘালয় পুলিশ অনুমান করছে রবিবার রাতে সেই ডাউকির কাছে সীমান্ত পেরিয়েই সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতে ঢোকেন কিংবা তাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তারপর সেখান থেকে কোন বাস বা ভাড়ার টেম্পোয় চেপে তিনি হয়তো সোমবার ভোরে শিলংয়ে পৌঁছেন। এবং কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে আটক করে। সূত্রগুলোর বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এখন সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারটি নিয়ে মেঘালয়ের পুলিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কীভাবে মামলা এগোবে এবং তাকে নিয়ে কী করা হবে মেঘালয় সরকার বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথাবার্তা বলছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে। তবে মামলার জট কিছুটা জটিল হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সালাহউদ্দিনের সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় নানা আলোচনা জমে উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। তারা মনে করছেন, সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ ও আন্দোলন থেকে সরে আসার ফলাফলই হয়তো সালাহউদ্দিন উদ্ধার।
যেভাবে আটক ও হাসপাতালে : মেঘালয়ের পূর্ব খাসী পাহাড় পুলিশ সুপার এম খারক্রাং কয়েকটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সোমবার সাতসকালে ভদ্রলোক উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন শিলং গলফ ক্লাবের সামনে রাস্তায়। চোখের চাহনিও একটু অদ্ভুত। যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, এলাকায় অপরিচিত ওই ভদ্রলোকের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে স্থানীয়রাই পুলিশে খবর দেন। খারক্রাং বলেন, তখন সেখান দিয়েই যাচ্ছিল পুলিশ পেট্রোলের একটি জিপ। টহলদার বাহিনী লোকটিকে ধরে নিয়ে কাছেই শিলংয়ের প্যাসটিওর বিটহাউস থানাতে নিয়ে যায়। ভদ্রলোক (সালাহউদ্দিন) থানায় গিয়েই বলতে শুরু করেন, ‘দেখুন আমি কিন্তু বাংলাদেশের একজন ভিআইপি। আমি সে দেশে স্টেট মিনিস্টারও ছিলাম! কিন্তু ভদ্রলোকের পকেটে একটা কাগজ পর্যন্ত নেই। কোনও টাকা-পয়সা দূরে থাক, পকেটে একটা মানিব্যাগও নেই। ফলে যথারীতি শিলংয়ের পুলিশ প্রথমে তার কথা একেবারেই বিশ্বাস করেনি, পাগলের প্রলাপ বলেই উড়িয়ে দিয়েছিল। আচ্ছা বুঝলাম আপনি বাংলাদেশে মন্ত্রী ছিলেন কিন্তু বর্ডার পেরিয়ে শিলং অবধি এলেন কী করে? পুলিশের এই প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক আবার ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, মুখে কোনও কথা জোগায় না। ওনার অবস্থা দেখে থানাতেই সিদ্ধান্ত হয় ইনি নিশ্চয় মানসিক ভারসাম্যহীন। আর তারপরই পুলিশ তাকে শিলংয়ের মানসিক প্রতিবন্ধীর হাসপাতাল মিমহ্যানসে (মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল অ্যান্ড নিউরোলজিক্যাল সায়েন্স) ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করে। খারক্রাং বলেন, ভদ্রলোক বাংলাদেশী কিনা বা সালাহউদ্দিন আহমেদ কিনা সেটা কিন্তু আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ওনার কাছে কোনও কাগজপত্র নেই। কোনও আত্মীয়-পরিজন এসে ওকে এখনও চিহ্নিতও করেননি। ফলে আপাতত ওনাকে একজন বিদেশী নাগরিক বলে চিহ্নিত করে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করার জন্য ফরেনার্স অ্যাক্টে আমরা রীতিমাফিক মামলা দায়ের করেছি। আমরা তাকে আদালতে পাঠিয়ে দিতাম, কিন্তু তার শরীর অসুস্থ হওয়ার কারণে প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে দিতে হয়েছে। একই কারণে পুলিশ এখনও তাকে ভালভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। খারক্রাং বলেন, মেঘালয় পুলিশ সার্ভিসে দীর্ঘ কর্মজীবনেও এমন কেস খুব কমই পেয়েছি। এ ধরনের অভিজ্ঞতা আগে হয়নি বললেই চলে। এদিকে শিলং শহরের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট বিবেক সিয়াম বিবিসিকে বলেছেন, একজন ব্যক্তি উদভ্রান্তের মতো গল্ফ লিংক এলাকায় ঘুরছেন- এ খবর পেয়েই তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। তার দেহে কোন চোট বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না। কিন্তু তিনি নিজে হৃদরোগ আর লিভারের সমস্যা রয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও তিনি গুছিয়ে দিতে পারছিলেন না। তাই তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এখানে তিনি কী উদ্দেশ্যে এসেছেন, সেটা তাকে জেরা করার পরেই বোঝা যাবে।
ইলেকট্রিক শক বা শক থেরাপির লক্ষণ ছিল: চিকিৎসক: মিমহ্যানসের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওই রোগীকে সমপ্রতি ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে বলেই তারা অনুমান করছেন। খুব জোরালো ইলেকট্রিক শক খেলে বা অন্য কোনও শক থেরাপির মানুষের যেমন সাময়িক মস্তিষ্ক বৈকল্য হয় তার মধ্যেও সেরকমই লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। তিনি স্বাভাবিক বা প্রকৃতিস্থ অবস্থায় ছিলেন না। আসলে মিমহ্যানসে ডাক্তারদের চিকিৎসায় সোমবার রাত থেকেই অল্প অল্প করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ দেখাতে শুরু করেন তিনি। তারপর গতকাল সকালে তিনি মিমহ্যানসের চিকিৎসকদের জানান, ঢাকায় তার স্ত্রীর টেলিফোন নম্বর তার মনে পড়েছে। সেখানে তিনি ফোন করে কথা বলতে চান। তবে মিমহ্যানসে চিকিৎসকরা এদিন তাকে পরীক্ষা করে দেখেছেন তার হৃদযন্ত্রে কিছু দুর্বলতার লক্ষণ আছে। ফলে মানসিক হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়ে এদিন বিকালে তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তবে মিমহ্যানস হাসপাতালের অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট ডা. ডি সিনকন জানান, সোমবার বিকালে পুলিশ একজন ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসে। নিজেকে সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করা ওই ব্যক্তিকে মিমহ্যানসে নিয়ে আসার পর তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। আমাদের মনোচিকিৎসকরা দেখেন, ওই ব্যক্তিটি মানসিকভাবে সুস্থ আছেন। কিন্তু তিনি হৃদযন্ত্রের সমস্যার কথা জানালে তাকে আবার শিলং সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরিত সালাহউদ্দিন : এদিকে দৈনিক মানবজমিনের কলকাতা প্রতিনিধি পরিতোষ পাল জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে গতকাল বিকালে পুলিশ শিলং সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, সোমবার শিলংয়ের গল্ফ লিংক এলাকায় এক ব্যক্তিকে অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। থানায় নেয়া হলে সে তার নাম সালাহউদ্দিন আহমেদ হিসেবে জানালেও তাকে খুবই বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। তার উপর মানসিক নির্যাতন হয়েছে অনুমান করে পুলিশ তাকে রাতেই মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল। এরপরই হার্টের চিকিৎসার জন্য পুলিশ তাকে সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই তার হার্টের চিকিৎসা চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, সালাহউদ্দিনকে যখন আটক করা হয় তখন তার কাছে কোন নথিই পাওয়া যায়নি। তবে সে যে বাংলাদেশী সে কথা পুলিশকে শুরুতেই জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সালাহউদ্দিন কিভাবে সীমান্ত পেরিয়ে শিলংয়ে এসেছেন সে ব্যাপারে কোন কিছু জানাতে পারেননি। সালাহউদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও এ ব্যাপারে কোন তথ্য পুলিশ জানাতে পারেনি। তবে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। শরীর একটু ভাল হলেই তাকে ফরেনার্স আইনে বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগে আজ অথবা কাল আদালতে তোলা হবে।
‘আমি বেঁচে আছি, সবাইকে জানিয়ে দাও’ :‘আমি বেঁচে আছি, সবাইকে জানিয়ে দাও’- গতকাল মেঘালয়ের একটি হাসপাতাল থেকে ফোনে স্ত্রীকে এ কথা বলেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল দুপুর আড়াইটায় গুলশানের নিজ বাসায় গণমাধ্যমকে দেয়া এক ব্রিফিংয়ে তার স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদ এ কথা জানিয়েছেন। হাসিনা আহমেদ জানান, বেলা ১১টা থেকে ১২টার মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ তার মোবাইলে একটি ফোন আসে। ভারতের মেঘালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোজিক্যাল সায়েন্স (মিমহ্যান্স) হাসপাতালের পরিচয় দিয়ে এক মহিলা কর্মকর্তা ইংরেজিতে বলেন, ‘আপনার স্বামী আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’ হাসিনা এই সময়ে বলেন, ‘আমি উনার মিসেস বলছি।’ এরপরই ওই পাশের টেলিফোনে অসুস্থ সালাহউদ্দিন আহমেদের কণ্ঠ ভেসে আসে। সালাহউদ্দিন বলেন, ‘কেমন আছো হাসিনা। আমি সালাহউদ্দিন বলছি। আমি বেঁচে আছি। মোটামুটি ভাল আছি। তুমি সবাইকে খবরটি জানিয়ে দাও। সবাই যেন আমার জন্য দোয়া করে। দ্রুত আমার দলের লোকজন ও গণমাধ্যমকে জানাও। আমাকে এখানে ফেলে গেছে। তিনি আরও বলেছেন, ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ করো। আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে কিভাবে নিয়ে যাবে একটু দ্রুত ব্যবস্থা করো। এখানে খুব ঠাণ্ডা। আমার পর্যাপ্ত কাপড়-চোপড় নেই।’ হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে আমার স্বামী বেঁচে আছেন। মেঘালয়ের শিলংয়ের মিমহ্যান্স মেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমার স্বামীর সন্ধান পাওয়ায় আমি দেশবাসী, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট, সকল রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’ হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘আমার স্বামীর সন্ধান বার্তাটি পেয়ে আমি মানসিকভাবে শান্তি পেয়েছি। আমি আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি আমার ডাক শুনেছেন। আমার ডাক কবুল করেছেন। আমার বিশ্বাস ছিল আমার স্বামী জীবিত আছেন এবং ইনশাআল্লাহ্‌ আমাদের মাঝে একদিন ফিরে আসবেন।’ আপনি কি সালাহউদ্দিন আহমেদের কণ্ঠ নিশ্চিত হয়েছেন- সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘আমি আমার স্বামীর কণ্ঠ চিনি। ১০০ বছর পর হলেও তার কণ্ঠ আমি চিনবোই।’ কারা কখন ও কিভাবে সালাহউদ্দিন আহমেদকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন কিছু জানতে পেরেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘এসব আমি জানি না। আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি।’ সালাহউদ্দিন আহমেদকে আনতে কখন ভারত যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘আমরা তার কাছে দ্রুততম সময়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে ভিসার আবেদন করা হয়েছে। ভিসা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমি ও আমার দুই আত্মীয় যাবেন। এ ব্যাপারে আমরা সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া খবরটি শুনেই আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন। আমাকে বলেছেন, তুমি দ্রুত যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ভিসা বা অন্য কোন প্রয়োজনে যদি কোথাও কাউকে বলতে হয়, আমাকে জানাও আমি বলে দিচ্ছি।’ এ সময় বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি ও ডা. ফরহাদ শুভ উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির মিথ্যাচার প্রমাণিত- নাসিম: সালাহউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে বিএনপি এতদিন মিথ্যাচার করেছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ধানমণ্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তার স্ত্রীর কথা হয়েছে। তার এই সন্ধানের খবরই প্রমাণ করে এতদিন বিএনপি মিথ্যাচার করেছে।’ নাসিম বলেন, খালেদা জিয়া এতদিন দাবি করে আসছেন সালাহউদ্দিন র‌্যাবের কাছে আছে। সালাহউদ্দিনের স্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আছে। তাদের এসব দাবি এখন মিথ্যাচারে পরিণত হয়েছে। সালাহউদ্দিনের গুমের বিষয়ে বিএনপি দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবরের পর তা বিএনপির মিথ্যাচার প্রমাণ হয়েছে। জনগণ বিএনপির কোন মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হবে না। এদিকে দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদের কথোপকথনের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার, বিএনপির এই নেতাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করেনি। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার সন্ধান করছিল পুলিশ। বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে নাশকতার কয়েকটি মামলা আছে। মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে আদালত। তিনি কিভাবে ভারতে গেলেন তা খতিয়ে দেখা হবে।