Thursday, July 9, 2026
হামাস কেন গাজায় সরকার থেকে সরছে, নেপথ্যে কী? by সাইয়িদ মারকোস তেনোরিও
হামাস স্পষ্ট করেছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতে চায়। গাজার প্রশাসন পুরোপুরি নতুন কাঠামোর হাতে না যাওয়া পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ হঠাৎ তারা সব ছেড়ে দিচ্ছে না; বরং ধাপে ধাপে সরে যাচ্ছে।
এ সিদ্ধান্তের প্রথম লক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হামাস নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে। তারা শুধু একটি সরকার নয়; তারা একটি আন্দোলন। তাদের শিকড় ফিলিস্তিনি সমাজের ভেতরে অনেক গভীরে।
প্রায় ২০ বছর ধরে হামাস একসঙ্গে দুটি কঠিন কাজ করেছে। একদিকে সরকার চালিয়েছে, অন্যদিকে প্রতিরোধ চালিয়েছে। গাজা ছিল অবরুদ্ধ। বারবার যুদ্ধ হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল—জীবনের মৌলিক কাঠামো বারবার ধ্বংস হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই তাদের প্রশাসন চালাতে হয়েছে। এটি সহজ কাজ ছিল না।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আধুনিক ফিলিস্তিনি ইতিহাসে এর মতো ধ্বংস খুব কমই দেখা গেছে। তবু একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। দখলদার শক্তি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। তারা হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি।
এ অবস্থায় গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানো হামাসের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। এতে তাদের ওপর সরাসরি চাপ কমবে। প্রশাসনিক দায়ও কমবে। তারা নিজেদের সংগঠন নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারবে। শক্তি পুনর্গঠন করতে পারবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাদের মূল লক্ষ্যে, অর্থাৎ ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো জাতীয় ঐক্য। বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনি রাজনীতি ভেঙে আছে। গাজা একদিকে, পশ্চিম তীর আরেক দিকে। অভ্যন্তরীণ বিভাজনও কম নয়। এই বিভক্ত অবস্থাই দখলদার শক্তির বড় সুবিধা। এ বাস্তবতা বদলানো জরুরি।
হামাস বলছে, গাজা তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি পুরো ফিলিস্তিনি জনগণের। তাই নতুন প্রশাসন এমন হতে হবে, যা সবার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এখানে একটি সতর্কবার্তাও আছে। নতুন প্রশাসন যেন বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণে না চলে যায়। যেন এটি কোনো বিদেশি প্রভাবের হাতিয়ার না হয়।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় আছে। ফিলিস্তিনি সমাজে যেসব রাজনৈতিক শক্তির বাস্তব ভিত্তি আছে, তাদের বাদ দেওয়া যাবে না। তাদের বাদ দিলে ঐক্য গড়া সম্ভব নয়। তাই একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা অধিকৃত অঞ্চল, শরণার্থীশিবির এবং প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলতে পারে।
তৃতীয় লক্ষ্য হলো প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। শাসন আর প্রতিরোধ এক জিনিস নয়। এ দুইয়ের কাজ আলাদা। একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন অনেক ধরনের ভূমিকা নিতে পারে। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। প্রশাসন চালাতে পারে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে পারে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও মেনে নিতে পারে। আবার সময় এলে প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়াতেও পারে; যদি সেখানে থাকা তাদের বড় লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করে।
বহু বছর ধরে ইসরায়েল একটি যুক্তি দিয়েছে। তারা বলেছে, গাজায় হামাস সরকারে থাকার কারণেই অবরোধ, সামরিক হামলা এবং সমষ্টিগত শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই যুক্তি কি এখনো টিকে থাকে?
কারণ, হামাস এখন প্রশাসন হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবু দেখা যাচ্ছে, দখলদার শক্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। তারা চায় না নতুন জাতীয় কমিটি ঠিকভাবে কাজ শুরু করুক। বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে প্রশাসনিক শূন্যতা থাকবে। আর সেই শূন্যতা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।
এই জায়গাতেই বড় একটি বিরোধাভাস সামনে আসে। মনে হয়, লক্ষ্য শুধু হামাসকে সরকার থেকে সরানো ছিল না। আসল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা।
হামাস এখন মধ্যস্থতাকারী ও গ্যারান্টর রাষ্ট্রগুলোর দিকেও তাকাচ্ছে। তারা চাইছে এই দেশগুলো চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে চুক্তি বাস্তবায়ন হয়। নতুন প্রশাসন কাজ শুরু করতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে গাজায় জরুরি জনসেবা ধীরে ধীরে ফিরতে পারে। মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। যুদ্ধের ফলে তৈরি মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবিলাও শুরু করা সম্ভব হবে।
এ সিদ্ধান্ত দখলদার শক্তির কথাবার্তাকেও পরীক্ষা করছে। যদি সত্যিই যুদ্ধের কারণ হয়ে থাকে হামাসের শাসন, তাহলে তাদের সরে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতি বদলানোর কথা। দখলদার সেনা সরে যাওয়ার কথা। সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা। পুনর্গঠন শুরু হওয়ার কথা। সামরিক হামলা বন্ধ হওয়ার কথা।
কিন্তু যদি তা না হয়, যদি নতুন নতুন শর্ত চাপানো হয়, তাহলে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন আর লুকিয়ে রাখা যাবে না। সমস্যা শুধু কে গাজা শাসন করছে, তা নয়। সমস্যা হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা মাথা নত করতে রাজি নয়। যারা উচ্ছেদ হতে চায় না। যারা বিলুপ্ত হতে চায় না।
হামাস মন্ত্রণালয় ছাড়তে পারে। কমিটি ভেঙে দিতে পারে। প্রশাসনের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে। কিন্তু এই পদক্ষেপের অর্থ প্রতিরোধ ছেড়ে দেওয়া নয়। গাজা শাসন করা ছিল একটি সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামই তাদের মূল লক্ষ্য। সেটিই রয়ে গেছে সামনে।
* সাইয়িদ মারকোস তেনোরিও, একজন ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। তিনি ব্রাজিল-ফিলিস্তিন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এবং সহসভাপতি।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।
![]() |
| হামাসের সশস্ত্র মহড়া। ফাইল ছবি: এএফপি |
Tuesday, July 7, 2026
ভারতে এবার কি তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হবে
উত্তর প্রদেশের আগ্রা আদালত অতীতে তাজমহল জরিপের উদ্দেশ্যে এই সৌধের স্থিরচিত্র ও ভিডিওগ্রাফির জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগে অনুমতি দেননি। অর্থাৎ তাজমহল জরিপ করার যে আবেদন এক আইনজীবী ২০১৫ সালে করেছিলেন, সেই আবেদন অতীতে খারিজ করে দিয়েছিলেন আগ্রা আদালত।
সম্প্রতি সেই মামলার শুনানি করেই সোমবার এলাহাবাদ হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, কেন তাজমহলের নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজতে জরিপ করা যাবে না।
আবেদনকারীর পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের বক্তব্য শোনার পর এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ জানতে চান, কেন সৌধের জরিপ করা যাবে না। আবেদনকারী আইনজীবী জৈনের দাবি, বিশ্বখ্যাত এই স্মৃতিসৌধটি আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, যার নাম ‘তেজো মহালয়া’। এটি ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে উৎসর্গী করা হয়েছিল।
হিন্দু দেবতা মহাদেবকে মামলাটির মূল পক্ষ করা হয়েছে, যেমন সাধারণ মানুষকে করা হয়। মহাদেবকে মূল পক্ষ করে তাঁর ‘পরম বন্ধু’ আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন এবং আরও বেশ কয়েকজন ভক্তের মাধ্যমে এই পিটিশন করা হয়েছে।
বিতর্কিত রামমন্দির-বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বছর কয়েক আগে হিন্দুত্ববাদী হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এক সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, যেসব সৌধের নিচে হিন্দুদের কথিত পবিত্র স্থান রয়েছে, একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাঁরা। এই তালিকা দীর্ঘ।
বিষ্ণুশঙ্কর বলেছিলেন, এসব স্থান বেছে বেছে বের করে মামলা করা হবে। বর্তমানে সেই কাজই করছেন পিতা–পুত্রের এই দল। বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত।
কেন তাজমহলকে হিন্দু মন্দির বলা হচ্ছে
এলাহাবাদ হাইকোর্টের মামলায় বাদীপক্ষ (আবেদনকারী) একটি ঘোষণামূলক ডিক্রি ও নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো—এই স্মৃতিসৌধটি একটি হিন্দু মন্দির। তাই বাদীপক্ষ তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে পূজা করার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।
বাদীপক্ষের সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট সরকার ও এসআই–এর কাছে জানতে চেয়েছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য কেন জরিপ করা হবে না।
বিতর্কিত রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তিতে এই এলাহাবাদ হাইকোর্টই অন্যতম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের লখনৌ বেঞ্চ ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দিয়েছিলেন, অযোধ্যার বিবদমান ২ দশমিক ৭৭ একর জমি হিন্দু দেবতা রাম লালা, রক্ষণাবেক্ষণকারী নির্মোহী আখড়া এবং সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।
তাজমহলের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সৌধের ভেতরে ‘দর্শন’ ও ‘পূজা’ করার মৌলিক অধিকার হিন্দুদের রয়েছে। এরপর ২০১৯ সালে তাজমহলে জরিপ করতে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন করা হয়েছিল।
তবে ওই সময় আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন) ওই আবেদন খারিজ করেছিলেন। আদালত যুক্তি দিয়েছিলেন, বাদীপক্ষ তাজমহলে সুনির্দিষ্ট জায়গা (দাগ নম্বর) নিশ্চিত করার জন্য কোনো রাজস্ব নথি (যেমন খতিয়ান বা খসড়া) দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্পত্তির বর্ণিত সীমানা ও আয়তন (৭৭ বিঘা) বিবাদীপক্ষের নথির সঙ্গে মেলেনি।
এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে একটি রিভিশন পিটিশন (সংশোধনী আবেদন) রক্ষণাবেক্ষণের অযোগ্য বলে গণ্য করেন আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ। এই দুটি আদেশকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাদীপক্ষ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
আবেদনে বাদীপক্ষ মূল মামলায় করা নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যসংক্রান্ত দাবিগুলো উল্লেখ করে বলেছে, কথিত প্রাচীন তেজো মহালয় মন্দিরটি (তাজমহল), যেখানে দেবতা আগ্রেশ্বর মহাদেব বিরাজ করছেন, সেটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন।
প্রসঙ্গত, ইউনেস্কো তাজমহলকে একটি ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিষয়টি ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে।
সেই ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, এটি তৈরি করেছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান, তাঁর পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে। ওয়েবসাইটে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের ছবিও (হাতে বা কম্পিউটারে করা পেন্টিং) রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের বক্তব্য, তাজমহল বানানোর কাজ শুরু হয় ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালে বা তার আশপাশে। বছর দশেক আগে হিসাব করে দেখা যায়, এই স্মৃতিসৌধটির বাজার মূল্য ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এটি ভারতের মুখ্য পর্যটনকেন্দ্র।
হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস মানতে নারাজ
আবেদনকারী হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা অবশ্য এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতিসৌধটি রাজা মানসিংহের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় আসে এবং পরবর্তী সময়ে ১৭ শতকে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই স্থানে অর্থাৎ তাজমহলে অভিষিক্ত হন।
এরপর মোগল শাসক শাহজাহান রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে কথিত ‘তেজো মহালয়া’ প্রাসাদটি জোরপূর্বক দখল করেন এবং তাঁর মৃত রানির স্মৃতিসৌধে পরিণত করেন। এই রূপান্তরের জন্য বিতর্কিত সৌধটির কিছু অংশ পরিবর্তন করে ইসলামিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা আরও দাবি করেন, অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে, এই সম্পত্তিটি একটি হিন্দু মন্দির।
মামলার আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এএসআই ‘বেআইনিভাবে’ মুসলিমদেরকে গত শুক্রবারে তেজো মহালয়া বা তাজমহলে ‘নামাজ’ পড়ার অনুমতি দিয়েছে। এ কারণে দর্শনার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ভবন চত্বরের বেশ কয়েকটি তলা তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, হিন্দু ‘পূজা’ ও দেবতার আরাধনা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই সম্পত্তির ব্যবহার বেআইনি।
আবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বিতর্কিত সম্পত্তির পরিচয় নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। কারণ, এটি একটি সর্বজনবিদিত প্রাচীন স্মৃতিসৌধ। তা ছাড়া আবেদনকারীদের যুক্তি, সৌধটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং তালাবদ্ধ অংশগুলো ‘কেবল মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে কার্যকরভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়’।
আবেদনে দাবি করা হয়েছে, এএসআই-নিয়ন্ত্রিত এই সৌধটিতে তাদের অবাধ প্রবেশের অধিকার নেই, যার ফলে কার্যকর নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের নিযুক্ত একজন ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য।
এই পটভূমিতে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, হাইকোর্ট যেন আগ্রা আদালতের আদেশ বাতিল করেন এবং ট্রায়াল কোর্টকে (নিম্ন আদালত) গুণাগুণের ভিত্তিতে অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদনটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেয়।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন একটি স্থগিতাদেশের আবেদনে অনুরোধ করা হয়েছে, হাইকোর্ট যেন এএসআইয়ের পরিচালককে নির্দেশ দেন, আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ভবনের ভেতর ও বাইরের ছবি তোলা হয় এবং তা বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় দাখিল করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে অবগত আইনজীবীরা মনে করছেন, তাজমহল নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল এবং যা ৬ জুলাই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তা একটি নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। একইভাবে ভারতে নতুন এক বিতর্কের সূচনা হয়েছিল তিন দশক আগে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে, যা ২০১৯ সালে ভারতে রামমন্দির বলে আদালত চিহ্নিত করেছিলেন। তাজমহলের কপালে কী লেখা আছে, তা বোঝা যাবে আর কয়েক বছরের মধ্যেই।
![]() |
| তাজমহল। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি |
Monday, July 6, 2026
মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা
ভেতরে ঢুকে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন। আলো নিভে আসে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা তার শিশুকে কাঁধে নিয়ে সংগীত শুরুর অপেক্ষায়।
তবে এটি কোনো সাধারণ পপ বা ইলেকট্রনিক মিউজিক কনসার্ট নয়। স্পিকারে বেজে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিমূলক সংগীত- ‘ভজন’, যা সাধারণত মন্দির বা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় শোনা যায়।
সংগীতের তালে তালে দর্শকদের বড় একটি অংশ উঠে দাঁড়ায়। তারা একসঙ্গে হাততালি দেয়, ভজন গায় এবং নাচে। পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কিন্তু এখানে নেই মদ, মাদক কিংবা ধূমপানের কোনো আয়োজন। বরং আয়োজকদের পক্ষ থেকেই অ্যালকোহল ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর অংশগ্রহণকারীরাও সেটিই সমর্থন করছেন।
তরুণদের নতুন আকর্ষণ ‘ভজন ক্লাবিং’
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ভজন ক্লাবিং’ নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক ধারা। এটি মূলত ‘সোবার ক্লাবিং’ বা ‘কফি রেভ’-এর ভারতীয় সংস্করণ, যেখানে মাদক বা মদ ছাড়াই সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন তরুণরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্ম ধীরে ধীরে অ্যালকোহল ও মাদক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় যেমন ‘সোবার কিউরিয়াস’ সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে, তেমনি ভারতে তার ধর্মীয় সংস্করণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ভজন ক্লাবিং’।
২৫ বছর বয়সী জিল ভীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, এমন একটি কনসার্ট, যা সত্যিই মানুষকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, সাধারণ কনসার্টে ধূমপান, ভেপিং বা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে এসে মাখন-ঘোল পান করাই যেন আমার কাছে অ্যালকোহলের বিকল্প হয়ে উঠেছিল।
প্রার্থনা ও পার্টির মিশেল
ভজন ভারতের শত শত বছরের পুরোনো ভক্তিমূলক সংগীত। সাধারণত মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পরিবেশিত হয়।
তবে নতুনত্ব এসেছে এর উপস্থাপনায়। এখন বড় ভেন্যুতে টিকিট কেটে এসব অনুষ্ঠান দেখতে আসছেন মানুষ। থাকছে স্মোক মেশিন, বিশাল এলইডি স্ক্রিন, আলোকসজ্জা ও আধুনিক কনসার্টের সব আয়োজন।
২৬ বছর বয়সী ধ্বনি পারাডিয়া বলেন, ধোঁয়া, আগুনের বিশেষ প্রভাব আর সংগীতের বিট- এসবই আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
তার ছোট বোন ২৩ বছর বয়সী ফিওনি পারাডিয়ার ভাষায়, মঞ্চের সাজসজ্জা অনেকটা টেকনো কনসার্টের মতো। তাই এটি জেন-জি প্রজন্মকে সহজেই আকর্ষণ করছে।
ব্যাকস্টেজ সিবলিংসের হাত ধরে জনপ্রিয়তা
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভাই-বোনের সংগীত জুটি ‘ব্যাকস্টেজ সিবলিংস’। ছোটবেলা থেকেই তারা ভজন গেয়ে আসছেন। এখন আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহরে তরুণদের কাছে ভজনকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এই
জুটির সদস্য রাঘব আগারওয়াল বলেন, অ্যালকোহল আর ক্লাবিং এক জিনিস নয়। অ্যালকোহল মানে নেশা, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।
তার বোন প্রাচি আগারওয়াল বলেন, এখানে মানুষ দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু কিংবা সঙ্গী- যাকে খুশি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি দর্শক
ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব অনুষ্ঠানের ভিডিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কনসার্টের আলোয় হাজারো মানুষের একসঙ্গে ভজন গাওয়া, খালি পায়ে নাচ, আবেগে কান্না কিংবা অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ দেখছেন।
সমর্থকদের মতে, এটি কঠোর ধর্মীয় নিয়মের বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার একটি সহজ ও উন্মুক্ত প্রকাশ। তবে সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, এ ধরনের অনুষ্ঠান আধ্যাত্মিকতাকে বিনোদন ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করছে।
ধর্মীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালে ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী এক দশকে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
একই সময়ে ভারতে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীকও জনজীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এতে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে ‘ভজন ক্লাবিং’-এর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জেন-জি প্রজন্ম ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে নিয়েছে- এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।
কেন আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণরা?
সনাতন জার্নি’র আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্তা জানান, এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ।
তার ভাষায়, মানুষের জীবনে এখন প্রচুর উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। এখানে এসে তারা স্বস্তি অনুভব করে।
ভারতের গড় বয়স মাত্র ২৯ বছর, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশে পরিণত করেছে। দেশটির তরুণরা আগের তুলনায় আরও বেশি শিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে সীমিতসংখ্যক চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভজনের আসর তাদের মানসিক শান্তি, আনন্দ ও একাত্মতার অনুভূতি এনে দিচ্ছে।
বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়েছে।
নিকুঞ্জ গুপ্তা বলেন, মদ্যপানের পরের ক্লান্তি নয়, এখান থেকে মানুষ মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সম্ভবত এ কারণেই আরও বেশি তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ফিওনি পারাডিয়া বলেন, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে আধ্যাত্মিকতার সন্ধান পান। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত।
আর তার চাচাতো বোন হেতা সোলাঙ্কির ভাষায়, একবার আসুন, তারপর দেখবেন আপনি নিজেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্যিই দারুণ আনন্দের অভিজ্ঞতা।

Monday, June 8, 2026
ভারতে ৩০ লাখ যৌনকর্মী

Saturday, June 6, 2026
ভাসমান ‘শহর’: এক মাইল দীর্ঘ আর ৩০ তলা ভবনের সমান উঁচু জাহাজে কী কী থাকবে
ফ্রিডম শিপ নামের এই জাহাজের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১ মাইল, প্রস্থ ৮০০ ফুট ও উচ্চতা ৩০ তলা ভবনের সমান। এটি তৈরি করতে খরচ হবে ১ হাজার ২০০ কোটি পাউন্ড। এই জাহাজে একটি গবেষণামূলক হাসপাতাল থাকবে। এ ছাড়া এখানে স্কুল, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ থাকবে, যা যুক্তরাজ্যের কেন্টে অবস্থিত চ্যাথাম শহরের জনসংখ্যার সমসংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটি পারমাণবিক জ্বালানিতে চলবে। ২৩ লাখ গ্রস টনের এই বিশাল জাহাজে স্থায়ীভাবে ৫০ হাজার বাসিন্দার থাকার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি আরও ১০ হাজার ভ্রমণকারী যাত্রী ও স্বল্প সময়ের দর্শনার্থীর জন্য জায়গা থাকবে। তাঁদের সেবা দিতে ২০ হাজার কর্মী কাজ করবেন।
এতে আরও নানা ধরনের সুযোগ–সুবিধা থাকবে। এর মধ্যে আছে—বহুতল হোটেল, ১৫ হাজার আসনের একটি স্টেডিয়াম, একটি কনভেনশন সেন্টার, একটি ওয়াটার পার্ক, দুটি জাদুঘর ও একটি সিম্ফনি হল।
আগ্রহীরা একটি বিশাল অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটতে পারবেন। আর যাঁরা বিনোদন পছন্দ করেন, তাঁরা একটি বিশেষ নৈশক্লাবে রাতভর নাচ-গান উপভোগ করতে পারবেন।
যেসব বাসিন্দা নির্ধারিত খাবারের জায়গার বাইরে ব্যতিক্রমী কিছু খেতে চাইবেন, তাঁদের জন্য দুই তলাবিশিষ্ট একটি ফুড হল থাকবে।
জাহাজটিতে শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া জাহাজের চারটি ডেক বাণিজ্যিক সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও খুচরা ব্যবসার জন্য বরাদ্দ থাকবে। জাহাজের সর্বোচ্চ অংশে থাকবে আটটি হেলিপ্যাড।
অনেকটা দ্বীপের মতো এই বিশাল জাহাজ, কিন্তু স্থির থাকবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি ঘণ্টায় প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে প্রতি দুই বছরে একবার পুরো পৃথিবী ঘুরবে। আকারে অনেক বড় হওয়ায় এটি কোনো বন্দরে ভিড়তে পারবে না। তাই জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করবে এবং যাত্রীদের আনা-নেওয়ার জন্য ফেরিবহর ব্যবহার করা হবে। অন্যান্য প্রমোদতরিও এর পাশে নোঙর করতে পারবে।
দর্শনার্থীদের জাহাজের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার জন্য ট্রাম ব্যবস্থার সুবিধা থাকবে। আর যাঁরা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে চান, তাঁদের জন্য থাকবে ১৫ মাইল হাঁটার পথ এবং তিন একরের পার্ক।
৩০ বছর ধরে লালিত স্বপ্ন
ফ্রিডম শিপ এখনো সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেনি। এমনকি এর নির্মাণকাজও শুরু হয়নি। তবে এ ধরনের ভাসমান শহর তৈরির ধারণাটি তিন দশক ধরে আলোচনায় আছে।
১৯৯০-এর দশকে মার্কিন প্রকৌশলী নরম্যান নিক্সন প্রথম এই প্রকল্পের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি ২০১২ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরের বছর প্রকল্পটির নকশা আবার প্রকাশ্যে আনা হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন পর সেটি আবার স্থগিত হয়ে যায়।
তাহলে এখন কেন প্রকল্পটি আবার সামনে এসেছে?
ফ্রিডম শিপ নির্মাণের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী রজার গুচের দাবি, এ প্রকল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা যথেষ্ট বেশি।
গুচ বলেন, ‘আমরা চাইলে প্রায় তিনটি জাহাজ নির্মাণের যৌক্তিকতাও দেখাতে পারি।’
তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক অর্থ সংগ্রহ করা।
ফ্লোরিডায় নিজের কার্যালয় থেকে জুমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রজার গুচ বলেন, ‘আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারব। তবে মূল বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করা।’
নির্মাণ করলেই মানুষ আসবে
অর্থায়নের ব্যবস্থা হয়ে গেলে পরবর্তী ধাপে ইন্দোনেশিয়ায় জাহাজটির নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রথমে এর মূল কাঠামো তৈরি করা হবে। এটি বিভিন্ন অংশে নির্মাণ করে পরে সমুদ্রের বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জোড়া লাগানো হবে।
রজার গুচের মতে, পুরো জাহাজ নির্মাণ শেষ হতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। তবে নির্মাণকাজ চলাকালেই মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করতে পারবে।
ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘আমাদের জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো প্রতিদিনই পানিতে ভাসমান অবস্থায় করা হবে। এমনকি যখন এটি উপকূলের বাইরে নোঙর করা থাকবে, তখনো। জাহাজটি সব সময় পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। এর কোনো স্থায়ী বন্দর থাকবে না।’
প্রকল্পের আয়ের একটি অংশ আসবে বিভিন্ন ব্যবসা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে।
গুচ বলেন, ‘আমরা চাই উদ্যোক্তারা আমাদের কাছ থেকে জায়গা ইজারা নিন বা কিনুন, ঠিক যেমন তারা স্থলভাগে কোনো শহর বা লোকালয়ে করে থাকেন।’
গুচ আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিটি সেলুন বা প্রতিটি পিৎজা বিক্রির দোকানের মালিক হতে চাই না। কিছু ব্যবসায়িক উদ্যোগে অবশ্য হোল্ডিং কোম্পানির অংশীদারত্ব থাকবে। এর মধ্যে একটি অবশ্যই ক্যাসিনো হবে।’
প্রকল্পের আওতায় একটি অত্যাধুনিক হাসপাতালও গড়ে তোলা হবে। গুচ বলেন, ‘বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কারণ, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সরাসরি আওতার বাইরে থাকবে। ফলে গবেষণার জন্য ফ্রিডম শিপ একটি আদর্শ স্থান হতে পারে।’
পরিবেশবান্ধব ও পারমাণবিক শক্তিচালিত ভ্রমণ
গুচের দাবি, প্রকল্পটির একটি জনকল্যাণমূলক দিকও থাকবে। তাঁর মতে, জাহাজটি সমুদ্রপথে চলাচলের সময় মহাসাগরের বর্জ্য ও দূষণ পরিষ্কারে ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণও উল্লেখজনকভাবে কমানো সম্ভব হবে।
রজার গুচ বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, আমরা একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছি এবং বিশ্বসমাজের জন্য ভালো কিছু করছি।’
ফ্রিডম শিপ ছোট ছোট বন্দরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে না। কারণ, এটি উপকূলের বাইরে অবস্থান করবে। বরং মানুষ সমুদ্রে গিয়ে এর বিভিন্ন সুবিধা উপভোগ করতে পারবে।
রজার গুচ বলেন, ‘আমরা চাই এই ভাসমান শহর যে এলাকার কাছে আসবে, সেই এলাকার মানুষ যেন সেখানে গিয়ে এর সুবিধাগুলো উপভোগ করেন। কারণ, এটি আবার একই জায়গায় ফিরতে আড়াই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের প্রধান পরিকল্পনাকারী হলেন কেভিন শপফার। তিনি আর্কোলজি নিয়ে কাজ করেন, যা স্থাপত্য ও পরিবেশবিদ্যার সমন্বয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলার জন্য শপফার আগেও ভাসমান উপকূলীয় আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন। এর মধ্যে ছিল ৪০ হাজার মানুষের জন্য পরিকল্পিত নিউ অরলিন্স আর্কোলজি হ্যাবিট্যাট (এনওএএইচ) প্রকল্প।
শপফার দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম জাহাজটি যেন একটানা বিশাল ও ভারী কাঠামোর মতো না দেখায়, বরং দেখতে আরামদায়ক লাগে। তাই আমরা এর সব প্রান্তকে নরম ও মসৃণভাবে নকশা করেছি। আমরা এটাও চেয়েছি, এটিতে যেন প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যায়। তাই সেখানে হাঁটার পথ ও সবুজ খোলা জায়গা রাখার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।’
জাহাজের নকশায় একটি ফুটবল মাঠও রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শপফার। তিনি বলেন, ‘এটি খুব বড় স্টেডিয়াম নয়, তবে সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কনসার্ট আয়োজন করা যাবে। একপর্যায়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাবনায় টেইলর সুইফটের নামও উঠে এসেছিল। কিন্তু আমি বলেছিলাম, এত বড় আয়োজন সামলাতে পারব কি না, তা জানি না।’
আজকের মেগা ক্রুজ শিপের তুলনায় এটি কেমন
৮০ হাজার যাত্রী ও ক্রুর ধারণক্ষমতার ফ্রিডম শিপ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ বহন করতে পারবে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজ হলো স্টার অব দ্য সিজ। ফ্রিডম শিপ তার চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি মানুষ বহন করতে পারবে।
অনেক বছর ধরে বিভিন্ন ভাসমান আবাসনের ধারণা সামনে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত শুধু ধনীদের জন্য নির্মিত দ্য ওয়ার্ল্ড এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ভিলা ভি ওডিসি সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছে।
তবে প্রকল্পের পরিসর বিশাল হলেও এর ব্যবস্থাপক শ্রীদেব মুখার্জি তাতে বিচলিত নন। তিনি সিঙ্গাপুরের ব্লসম গ্রুপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক।
লন্ডনের সেন্ট ক্যাথারিন ডকসে টেলিগ্রাফের প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় তিনি যাত্রীবাহী ও ক্যাসিনো জাহাজ ব্যবস্থাপনায় তাঁর ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন।
সেন্ট ক্যাথারিন বলেন, ‘অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্প মানুষকে জীবনে কিছু অর্জন করতে সাহায্য করে। আমি বিশ্বাস করি, রজারের প্রচেষ্টা, ধৈর্য এবং এই প্রকল্প সফল করার ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে এটি সফল হবে। এর কোনো সীমা নেই।’
ক্যাথারিন আরও বলেন, এটি একটি অসাধারণ ধারণা এবং এটি বাস্তবায়নে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। -দ্য টেলিগ্রাফ
![]() |
| ঘণ্টায় প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে প্রতি দুই বছর একবার পুরো পৃথিবী ঘুরবে। ছবি: ফিড্রম শিপের ওয়েবসাইট |
যে প্রাণীর রক্ত সবচেয়ে দামি by কবীর হোসাইন
কেন এর রক্তের দাম এত বেশি? প্রশ্নের জবাবে যাওয়ার আগে প্রাণীটির বিবর্তনগত প্রেক্ষাপট বুঝে নেওয়া দরকার। নিরীহ এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে এক অপার বিস্ময়। এর পর্যাপ্ত কারণও আছে।
প্রধান কারণ, পৃথিবীতে এর টিকে থাকার সুদীর্ঘ ইতিহাস। ‘সুদীর্ঘ’ বলতে ঠিক কতটা? হ্যাঁ, বিস্ময়ের শুরুটা এখানেই। কমপক্ষে ৩৬০ মিলিয়ন বছর, অর্থাৎ ৩৬ কোটি বছর ধরে এরা পৃথিবীতে একই রূপে টিকে আছে। কোথাও ৪৫ কোটি বছর, আবার কোথাও ৫৫ কোটি বছরের কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ডাইনোসর যুগেরও মোটামুটি ১০-১৫ কোটি বছর আগে এরা পৃথিবীতে এসেছে।
কীভাবে এত দিন টিকে আছে
আদিম এই আর্থ্রোপোড বা সন্ধিপদী প্রাণীটি পৃথিবীর অন্যতম জীবন্ত জীবাশ্ম। কী করে এত দিন অবিকৃত অবস্থায় টিকে আছে এরা! বিবর্তনের নানাবিধ ভয়ংকর বিপর্যয় এবং প্রাণঘাতী রোগ থেকে কীভাবে নিজেদের অস্তিত্বকে সুসংহত রাখতে পেরেছে?
এর মূল কারণ এদের দেহের বিশেষ ‘নীল রক্ত’। সেই যে ‘ব্লু ব্লাড’ বলে একটি কথা আছে ইংরেজিতে, ঠিক যেন তা-ই। রাজকাঁকড়ার নীল রক্তের ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। সেই অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এরা যেকোনো ব্যাকটেরিয়া, বিষাক্ত পদার্থ বা প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেদের রক্ষা করে থাকে।
সাধারণত মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্তের হিমোগ্লোবিনে লৌহ থাকে। এই লৌহের সহায়তায় অক্সিজেন পরিবাহিত হয়। অন্য দিকে রাজকাঁকড়ার দেহে অক্সিজেন পরিবাহিত হয় এদের রক্তে থাকা হিমোসায়ানিনের সাহায্যে। এই হিমোসায়ানিনে লৌহ নয়, রয়েছে কপার বা তামার উপস্থিতি। ফলে রক্তের রং হয় নীল।
এদের রক্তে অ্যামিবোসাইট নামক একধরনের বিশেষ কোষ রয়েছে। এর দরুন সামান্য পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া এন্ডোটক্সিন বা ক্ষতিকর জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই রক্ত জমাট বেঁধে যায় বা জেলির মতো আকার ধারণ করে। এমনকি মাত্র এক লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ ব্যাকটিরিয়ার উপস্থিতিতেই রক্ত জমাট বাঁধে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার জন্য সময় লাগে ৪৮ ঘণ্টা। এই অতি সংবেদনশীল রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্যই মূলত এরা আজও টিকে আছে।
এই প্রাণীর রক্ত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে কেন
এবার আসা যাক রক্তের বহুমূল্য প্রসঙ্গে। আগেই বলা হয়েছে, যৎসামান্য ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই এদের রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এই ধর্মকে কাজ লাগিয়ে ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেডরিক ব্যাং ও জ্যাক লেভিন নামের দুজন গবেষক ‘লিমুলাস অ্যামিবোসাইট লাইসেট’ নামক একটি পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
১৯৭০-এর দশক থেকে এই টেস্ট বা পরীক্ষাপদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পদ্ধতিটি চিকিৎসাজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মূলত মানবদেহে প্রবেশ করানো হয়, এমন প্রতিটি চিকিৎসা-সরঞ্জাম, যেমন ইনজেকশন, ভ্যাকসিন, শিরায় দেওয়া ওষুধ, অপারেশন থিয়েটারের সরঞ্জাম, কৃত্রিম হিপ জয়েন্ট বা হৃদ্যন্ত্রের যন্ত্রাংশ—সবকিছুতে জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য এই টেস্ট ব্যবহার করা হয়।
সহজ কথায়, মানবদেহের প্রতিটি অস্ত্রোপচার এবং ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার জন্য এই প্রাণীর রক্ত অপরিহার্য। এর মাধ্যমে রোগীকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো যায় এবং নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যায় অসংখ্য মানুষের জীবন। ফলে এই প্রাণীকে বলা যেতে পারে ‘জীবনদায়ী প্রাণী’।
বর্তমানে এর রক্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরঞ্জামের বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্যও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং এই রক্তের দাম এমন অকল্পনীয় হবে এটাই স্বাভাবিক।
অস্তিত্বের হুমকি
তবে এত বছর ধরে টিকে থাকতে পারলেও প্রাণীটি এখন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। আটলান্টিক স্টেটস মেরিন ফিশারিজ কমিশনের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রকাশনা অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ অশ্বখুরাকৃতি কাঁকড়া ধরে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় এদের চরম চাহিদা থাকায় এমনটি হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার এটিকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। শিগগিরই এর বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করা না গেলে এদের অস্তিত্ব তো হুমকির মুখে পড়বেই, চিকিৎসাবিজ্ঞানও পড়ে যাবে গভীর সংকটে। চূড়ান্ত বিবেচনায় মানবজাতিও পড়বে মহাবিপদে।
সূত্র: থটকো ডটকম, এএসএমএফসি
![]() |
| এভাবেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়। ছবি: আরিয়েন মুলার |
Sunday, March 29, 2026
নামের আগে ‘ডক্টর’ লাগাতে মরিয়া কেন তাঁরা by ইমদাদুল হক তালুকদার
এমন চর্চা দেখা যায় অনেকের ক্ষেত্রে নামের আগে ডক্টরেট লাগানো নিয়ে। একটু অর্থবিত্তের মালিক আর একটা অনার্স-মাস্টার্স থাকলেই জনগণের কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য নানা উপায়ে এই ‘ডক্টর’ শব্দটির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন কিছু ব্যক্তি। এ তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ নানা পদধারী লোকজন। তাদের মধ্যেও অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন নিশ্চয়ই, তাঁদের বাদ দিয়ে বাকিদের ক্ষেত্রে এ আলোচনা।
বিখ্যাত মনোবিদ আব্রাহাম মাসলোর তত্ত্বমতে, মানুষের যখন মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়ে যায়, তখন সে খোঁজে নিরাপত্তা, এরপর সঙ্গ ও ভালোবাসা এবং এরপর খ্যাতি। পিএইচডি জিনিসটার সঙ্গে খ্যাতির কোনো সম্পর্ক নেই; অন্তত একাডেমিক দিক থেকে। এর সঙ্গে আসলে মাসলোর থিওরির আরও উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক। যেটিকে বলা হয় ‘সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন’। এ শব্দের অনুবাদ প্রায় অসম্ভব। তবে কাছাকাছি বললে এর অর্থ কিছুটা দাঁড়ায়, আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নিজেকে এমন স্তরে পৌঁছানো, যার মাধ্যমে ব্যক্তি এমন এক ফিলোসফিক্যাল বা দার্শনিক স্তরে পৌঁছান, যে জায়গায় তিনি চিন্তাগত দিক থেকে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে অর্থবহভাবে প্রকাশ ও চর্চা করেন; খ্যাতি যেখানে গৌণ। মুখ্য হলো আত্মসাধনা, আত্মোপলব্ধি।
পিএইচডির পুরো অর্থ হলো ‘ডক্টর অব ফিলোসফি’। কোনো ব্যক্তি যে বিষয়েই পিএইচডি অর্জন করুক না কেন, ডিগ্রির নাম ডক্টর অব ফিলোসফি! ডক্টর অব ফিজিকস বা ডক্টর অব ইকোনমিকস নয়। এর কারণ পিএইচডি কেবল ডিগ্রি নয়; এটি জ্ঞানের এমন স্তর, যেটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে তিনি তাঁর বিশেষজ্ঞ এলাকায় নতুন জ্ঞান উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। উন্নত দেশে কেবল যাঁরা একাডেমিয়াতে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের জগতে অবদান রাখতে চান, তারাই কেবল পিএইচডির মতো জটিল, সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য পথে হেঁটে থাকেন। বাকিরা যাঁর যাঁর ফিল্ডে অনার্স বা বড়জোর মাস্টার্স করে চাকরির জগতে প্রবেশ করে নিজেকে অল্প বয়সে প্রতিষ্ঠিত করে নেন।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালে উন্নত দেশের জনগণের ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারীর শতকরা সংখ্যার তথ্য প্রকাশ করেছে। হিসাবে দেখা যায়, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ ও স্লোভেনিয়া সর্বোচ্চ পিএইচডিধারী জনসংখ্যায় এগিয়ে, যা ৩ শতাংশ। এ সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ২ শতাংশ এবং ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়ামসহ অন্যান্য দেশে এ হার ১ শতাংশ। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এ সংখ্যা যথাক্রমে সর্বমোট ১৬ হাজার ও ১৩ হাজার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো জনবহুল বিশাল দেশে এ সংখ্যা মাত্র ২৪ হাজারের মতো। বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৫১ হাজার ৭০৪ (বিবিএস, ২০২২)।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির ভয়াবহ চিত্র। সরকারি হিসাবে যে সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই যেখানে মৌলিকত্বের প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে এই পুচ্ছশোভিত ভুয়া পিএইচডির ভার জাতিকে সইতে হচ্ছে করুণভাবে। এই ভুয়া পিএইচডি-পুচ্ছধারীদের ক্রমাগত বাহাদুরি প্রদর্শন, গণমানুষকে ধোঁকা দেওয়া, নানা ধরনের সামাজিক সুবিধা নেওয়া থেকে শুরু করে নানাভাবে ঠকিয়ে চলেছেন জাতিকে।
এই পুচ্ছধারীদের অনেকে প্রায়ই এই ডিগ্রি ব্যবহার করে কোনো আর্থিক বা পদের সুবিধা নিচ্ছেন না বলে জায়েজ করে থাকেন। আপাতদৃষ্টে দেশের প্রচলিত আইনেও এর প্রতিকার নেই বলেই ব্যাপক মতামত প্রচলিত রয়েছে। এর বিপক্ষে দুটি কথা বলা জরুরি।
যদি আমরা আইনের দার্শনিকতার (জুরিসপ্রুডেন্স) দিক থেকে এটিকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে আইনের দর্শনের দুটি দিক থেকে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথমত, প্রতিশোধমূলক বা ন্যায়বিচারমূলক যুক্তির (রিট্রিবিউটিভিজম) দিক থেকে এটি নৈতিকতা ভঙ্গ করা, যা একাডেমিক মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি করা একটি নৈতিক অপরাধ, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যাঁরা পিএইচডি অর্জন করেন, তাঁদের অর্জিত মর্যাদার অপব্যবহার ও অবমাননা এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পবিত্রতা নষ্ট করা, যা আইনের দার্শিনকতার দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যদিকে ফলবাদী বা উপযোগবাদী যুক্তির (ইউটিলিটারিয়ানিজম ) আলোকে এ ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত হলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা ঠেকানো (ডিটারেন্স), অন্য অপরাধীদের ভীতি তৈরি করা (জেনারেল ডিটারেন্স) এবং সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এ ধরনের কাজ করা থেকে বিরত রাখা (স্পেসেফিক ডিটারেন্স), জনসাধারণের বিশ্বাস রক্ষা, মিথ্যা বিশেষজ্ঞদের থেকে সুরক্ষিত রাখা, যাতে যোগ্য ব্যক্তিদের ওপর মানুষের বিশ্বাস বজায় থাকে ইত্যাদি একাডেমিক নৈতিকতাকে সুরক্ষিত করবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতারণা বন্ধ করা বিচারব্যবস্থার একধরনের সহজাত কর্তব্যও বটে।
ভুয়া পিএইচডি রোধকল্পে বারবার হাইকোর্ট বিভাগ নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে যাচ্ছে এ বিষয়ে আইন ও বিধি প্রণয়নে। যুগান্তকারী এই কর্মযজ্ঞে যেন আইনের উল্লিখিত দার্শনিক দিক বিবেচনায় ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে ধরনের সুবিধাই নিক না কেন, তার যথাযথ শাস্তি যাতে নিশ্চিত করা হয়, এটিই পরম প্রত্যাশা। অন্যথায় ভুয়া পিএইচডি ব্যবহার করে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীদের ফেরানো গেলেও পুচ্ছধারীরা পতপত করে জাতির সামনে উড়িয়ে চলবেন পিএইচডির চকচকে নকল পুচ্ছ; বিভ্রান্ত করবেন জাতিকে, হেয় করবেন শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দর্শন।
* ইমদাদুল হক তালুকদার, মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Monday, March 9, 2026
তেল স্থাপনায় হামলা: তেহরানে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার শুরুতে নিশানা ছিল মূলত তেহরানের সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা। যদিও তারা বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে। গতকাল তাদের হামলার নিশানা করা হয় ইরানের তেল তথা জ্বালানি স্থাপনাকে।
গতকালের ওই হামলার জবাবে সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডে ‘ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানলে এক বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় নিহত হন।
কুয়েতে বিমানবন্দর, জ্বালানি ডিপো, নিরাপত্তা ভবনে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত। গতকাল ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফাসহ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে ইসরায়েলে তিনজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার সময় টুকরা অংশ পড়ে আহত হয়েছেন তিনজন। ইরাকের এরবিলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে।
ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে দুই সেনা নিহত হয়েছেন। আর লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহত বেড়ে ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, একটা সময় আসবে যখন ইরানে ‘আত্মসমর্পণ করছি’ বলার মতো কোনো লোক থাকবে না। তবে তাঁর এ হুঁশিয়ারির মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের বিশেষজ্ঞ পর্ষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট)। যদিও গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নাম ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ইরান। এসব হামলার কঠোর জবাব দেবে তাঁর দেশ।
২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পর থেকে দফায় দফায় দেশটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে ইরান।
চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান ছাড়া এসব দেশে ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। ইরানে নিহতের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্য দুই দিন ধরে জানানো হচ্ছে না। গত শুক্রবার দেশটির রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছিল, দেশটিতে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। দেশটিতে গতকালের হামলায় নিহত ৪১ জন হিসাবে আনলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৭৩।
‘মনে হচ্ছিল যেন শেষ সময়’
তেহরান ও এর পশ্চিমে আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরে কয়েকটি তেল স্থাপনায় গতকাল হামলা হয়েছে বলে জানায় ইরানের তেল মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পরমুহূর্তেই কুণ্ডলী পাকানো ভয়াবহ আগুনে দিনের মতো আলোর সৃষ্টি হয়।
তেহরানের শাহরান তেলের ডিপোতে হামলার পরের দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বিধ্বস্ত ডিপোর তেল নালা দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করলে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদীর’ মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে কিয়ামতের সঙ্গে তুলনা করেন তেহরানের এক বাসিন্দা। গতকাল সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমি বিস্ফোরণ দেখেছি, যা আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে কিংবা আমি দোজখকে ঠিক যেভাবে কল্পনা করি, এটি ছিল অনেকটা তেমনই।’
এদিকে তেলের স্থাপনায় হামলার ফলে বিষাক্ত বৃষ্টি ঝরার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট। এটি ত্বক ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ধরনের বৃষ্টির সময় লোকজনকে বাসাবাড়িতে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তেল স্থাপনায় হামলার পর নাগরিকদের তেল নেওয়ার সীমা কমিয়ে দিয়েছে তেহরানের প্রশাসন। শহরের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান বলেছেন, একজন ব্যক্তি দিনে ২০ লিটার তেল নিতে পারবেন। আগে দিনে ৩০ লিটার নেওয়া যেত। তবে জনগণকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর বলেন, শিগগিরই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি আল-জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলা এ যুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তেহরানসহ ইরানের শহরগুলো এই প্রথম এ ধরনের হামলা দেখেছে। তিনি আরও বলেন, ‘এখন স্থানীয় সময় প্রায় দুপুর, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে মনে হচ্ছে যেন রাত নেমে এসেছে। আমরা সূর্য দেখতে পাচ্ছি না।’
এদিকে গতকাল ইরানের ইসফাহানে একটি বিমানবন্দর, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও একটি ক্লাবে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে। তেহরান ও কারাজে তেলের ডিপোতে হামলায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। নাজাফাবাদ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২০ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। সেখানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উদ্ধারকাজ চলাকালে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইরানের পানি শোধনাগারেও হামলা হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গতকাল সিএনএনকে বলেন, তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পে হামলা চালানো কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
এদিকে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, তেহরানে ইরানের মহাকাশ সংস্থা এবং দেশটির ৫০টি গোলাবারুদ গুদামে হামলা চালানো হয়েছে। হামলা হয়েছে কোম শহরেও।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এফি ডেফরিন গতকাল বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির ১৫০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকেজো করে দিয়েছে।
এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ১০৪ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন। ইরানের সেনাবাহিনী এ কথা জানিয়েছে।
ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ২৭তম দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। টেলিভিশন দেওয়া বক্তব্যে আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়েনি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়েছে, তার ৬০ শতাংশ এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং তাদের ‘কৌশলগত স্বার্থ’ নিশানা করে। বাকি ৪০ শতাংশে নিশানা ছিল ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু।
আইআরজিসির মুখপাত্র আরও বলেন, ‘আমরা এ যুদ্ধে আমেরিকানদের প্রধান শত্রু মনে করি এবং এ কারণেই তাদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আমেরিকানরা ৭০ বছর ধরে এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে।’ আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত চারটি রাডার ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। এই বাহিনীর মুখপাত্র বলেন, ‘তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার দেখতে চাইলে এই খেলা খেলতে পারো।’
ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ১ হাজার ৯২৯ জন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৫৭ জন চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরব দেশগুলোর মধ্যে তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ইরান থেকে ছোড়া ২৩০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১ হাজার ৪০০টির বেশি ড্রোন শনাক্ত করেছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে আমিরাতের একটি টাগবোট ডুবে তিন ইন্দোনেশীয় নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জাকার্তা জানিয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, কুয়েতের আল-আদিরি বিমানঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টার মেরামতের একটি স্থাপনা, জ্বালানি মজুত ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কূটনৈতিক এলাকাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন সেনাকে আটক করা হয়েছে বলে শনিবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছে যে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাকে বন্দী করা হয়েছে।’ তবে লারিজানির দাবি নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
ইরানে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩২ হাজারের বেশি নাগরিককে সরিয়ে নিয়েছে। গতকাল মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য দিয়েছে। ইতালিও গতকাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের ২০ হাজার নাগরিককে সরিয়ে নিয়েছে।
লেবাননে হামলা চলছে
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় সির আল-গারবিয়েহ গ্রামে একটি তিনতলা ভবনে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শিশুসহ ১৯ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ এ কথা জানিয়েছে। রাজধানী বৈরুতের একটি হোটেলেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে চারজন নিহত হন। ‘আইআরজিসির কমান্ড সেন্টার’ লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ৮৩ শিশুসহ ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৩০ জন।
জবাবে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। হাইফা ও কিরয়াত শমোনো শহরে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হাইফার একটি নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। ইসরায়েলের ‘মিসগাভ’ সামরিক সরঞ্জাম কেন্দ্রকেও নিশানা করা হয়েছে।
এ হামলার প্রয়োজন ছিল না: চীন
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালানো উচিত হয়নি। বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অবিলম্বে এ যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানান। ওয়াং ই বলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমান সংকটের কখনো সমাধান হবে না। তিনি আরও বলেন, ‘শক্তির অধিকারী হওয়া মানেই শক্তিশালী যুক্তি নয়। বিশ্ব আবার জোর যার মুল্লুক তার যুগে ফিরে যেতে পারে না।’ এ সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনে (রেজিম চেঞ্জ) কোনো জনসমর্থন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
| ইরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলছে। শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানী তেহরানে। ছবি: এএফপি |
Wednesday, February 11, 2026
বিশ্বজুড়ে রাঘববোয়ালদের ফাঁসানো এপস্টেইন কি ইসরায়েলি চর ছিলেন by মো. আবু হুরাইরাহ্
জেফরি এপস্টেইনের পরিচয় শুধু একজন ভয়ংকর যৌন অপরাধী হিসেবেই নয়; তিনি এ কালের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি এ অন্ধকারকে আরও গভীর করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ছাড়াও অনেক বিলিয়নিয়ার ও রাজপরিবারের সদস্যের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্কের বিষয়টি আগেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে নতুন নথিপত্র (গত শুক্রবার প্রকাশিত) ইসরায়েলের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড আর এর আড়ালে থাকা সম্পর্কের প্রশ্ন এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি তুলে ধরেছে রাষ্ট্রীয়, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং কয়েক দশক ধরে চলা সুরক্ষিত দায়মুক্তির রহস্যও।
যৌন নিপীড়নের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান। যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে নারীদের পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলায় বিচারকাজ চলা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনার এক দশকের বেশি আগে এপস্টেইন অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে যৌন নিপীড়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এমন মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।
এপস্টেইনের নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে সস্ত্রীক এহুদ বারাক
২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এহুদ বারাক ও তাঁর স্ত্রী নিলি প্রিয়েল একাধিকবার নিউইয়র্কে এপস্টেইনের অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন। এপস্টেইন ফাইলসে উল্লেখ করা ই-মেইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইনের সহকারী লেসলি গ্রফ ঘর পরিষ্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ভ্রমণ পরিকল্পনার মতো প্রাত্যহিক বিষয় সমন্বয় করতেন।
এহুদ বারাক ২০০৩ সাল থেকে এপস্টেইনকে চেনেন বলে স্বীকার করেছেন। এমনকি ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। তবে এহুদ বারাক কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা দেখার কথা বারবার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এপস্টেইন একজন নিবন্ধিত যৌন অপরাধী হওয়ার কয়েক বছর পরও তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ জনমনে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এফবিআইয়ের স্মারক ও মোসাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
২০২০ সালের একটি এফবিআই স্মারকে বিস্ফোরক সব তথ্য পাওয়া গেছে। মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে তদন্তের সময় তৈরি করা ওই স্মারকে এক গোপন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন এবং ধারণা করা হয় মোসাদের একজন নিয়োগকৃত এজেন্টও ছিলেন।
স্মারকে আরও বলা হয়, এপস্টেইন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বারাক ক্ষমতায় থাকাকালে এপস্টেইন তাঁর অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের অংশ হিসেবে শুক্রবার এ স্মারকও প্রকাশ করা হয়।
যদিও এ স্মারক কোনো বিচারিক রায় নয় এবং গোপন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল; তবে এটি এফবিআইয়ের দাপ্তরিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয় প্রমাণ করে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।
এপস্টেইন ও বারাকের মধ্যে ই-মেইল চালাচালিতেও মোসাদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের এক বার্তায় এপস্টেইন বারাককে প্রকাশ্যে এটি স্পষ্ট করতে বলেছিলেন যে তিনি (এপস্টেইন) ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেন না।
এফবিআইয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, সাবেক ফেডারেল কৌঁসুলি অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টাকে নাকি বলা হয়েছিল, এপস্টেইন গোয়েন্দা সংস্থার (ইসরায়েলি) লোক। অ্যাকোস্টা প্রকাশ্যে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত না করলেও এটি বছরের পর বছর ধরে চর্চিত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে কৌঁসুলিরা এপস্টেইনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন। ফলে তিনি ফেডারেল মামলার হাত থেকে রেহাই পান। ওই মামলায় তাঁর আজীবন কারাদণ্ড হতে পারত। তবে তা না করে তাঁকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ সময় এপস্টেইনকে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন অফিসে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৩ মাস পর তাঁকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।
মায়ামি হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাকোস্টা এমন একটি চুক্তি করেছিলেন, যেন এপস্টেইনের অপরাধের প্রকৃত মাত্রা চাপা পড়ে এবং আরও ভুক্তভোগী বা প্রভাবশালী জড়িত ব্যক্তিদের খোঁজে এফবিআইয়ের তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি একে ‘শতাব্দীর চুক্তি’ বলে উল্লেখ করে।
এ কেলেঙ্কারির জেরে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন, এই চুক্তি হওয়ার কারণে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও এপস্টেইনের কারাদণ্ড হয়েছিল।
ট্রাম্প, কুশনার ও ইসরায়েলের প্রভাব
নতুন প্রকাশিত নথিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অন্তত ১ হাজার ৮০০ বার এসেছে। ট্রাম্প কোনো ধরনের অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এপস্টেইন–কাণ্ডে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।
তবে এফবিআইয়ের স্মারকে অভিযোগ করা হয়েছে, ট্রাম্প ‘ইসরায়েলের মাধ্যমে এ বিষয়ে আপস করেছিলেন’ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে নিযুক্ত করেন। স্মারকে কট্টর অর্থোডক্স ‘চাবাদ-লুবাভিচ’ আন্দোলনের ভূমিকার কথাও বলা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মতাদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এদের। কুশনারকে এ গোষ্ঠীর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েল
ই-মেইলগুলো থেকে আভাস পাওয়া যায়, এপস্টেইন ইসরায়েলকে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও দেখতেন। একটি বার্তায় এপস্টেইন দাবি করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইসরায়েল সফরের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তবে ভারত সরকার এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যান্য নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন ইসরায়েলি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পশ্চিমা ক্ষমতাধরদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করতেন। নথিতে তাঁকে এমন এক অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; যিনি প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে কাজ করতেন।
কেন এপস্টেইন–কাণ্ডে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ
এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অন্য সব প্রভাবশালীর তুলনায় আলাদা। কারণ, এটি ছিল কয়েক দশকের ধারাবাহিক সম্পর্ক। অফিশিয়াল নথিতে বারবার মোসাদের নাম আসা ও এপস্টেইনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার বিষয়টি একটি বিশেষ প্যাটার্ন তৈরি করেছে। কোনো আদালত এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে এপস্টেইন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছেন। তবে নথিপত্র, ই–মেইল ও স্মারকের স্তূপ একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে—এপস্টেইন একা ছিলেন না; বরং গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সুরক্ষিত বলয়ের ভেতরে ছিলেন। তাই লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি এখন জনগণের সামনে আসার পর মূল প্রশ্নটি আর এটি নেই যে এপস্টেইনের শক্তিশালী বন্ধু ছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতাই কি তাঁর অপরাধগুলো এতকাল আড়াল করে রেখেছিল?
[তথ্যসূত্র: দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল, বিবিসি, সিএনএন ও দ্য মিডল ইস্ট আই]
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া |
Sunday, October 19, 2025
গোপন মর্গে থাকা মরদেহ কি ৫০ বছরের পুরোনো রহস্যের সমাধান করতে পারবে by মইন শারিফ
ইরানের ধর্মীয় নেতা মুসা আল-সাদর নিখোঁজ হয়েছেন ৫০ বছর আগে। কেউ বলছেন, তাঁকে লিবিয়ায় হত্যা করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন মইন শারিফ। গতকাল মঙ্গলবার বিবিসির অনলাইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কম্পিউটারবিজ্ঞানী একটি মরদেহের ছবি নিয়ে গবেষণা করছেন। চেষ্টা করছেন এমন এক রহস্য উন্মোচন করতে, যা প্রায় ৫০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
‘(বেঁচে থাকলে) বর্তমানে তাঁর চেহারা কি দেখতে এমন হতো?’ দ্বিধার সুরে প্রশ্ন করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান উগাইল।
বহু পুরোনো পচন ধরা একজনের মরদেহের চেহারার ছবিটিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিবিসি অনুসন্ধানী দলের জন্য এটিকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হবে।
মূল ছবিটি তুলেছিলেন এক সাংবাদিক। তিনি ২০১১ সালে লিবিয়ার রাজধানীতে একটি গোপন মর্গে মরদেহটি দেখেছিলেন। তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, হতে পারে এটি প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মুসা আল-সদরের মরদেহ। ১৯৭৮ সালে লিবিয়ায় গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।
মুসা আল-সদরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে। কেউ কেউ মনে করেন, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। আবার অনেকের দাবি, তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং লিবিয়ার কোথাও বন্দী আছেন।
মুসা আল-সদরের ভক্তদের কাছে তাঁর নিখোঁজের ঘটনা ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের মতোই রহস্যজনক। মুসাকে নিয়ে আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান এতটাই সংবেদনশীল ছিল যে আমি ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি দল কয়েক দিন লিবিয়ায় আটক ছিলাম।
ভক্তদের কাছে মুসা ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। লেবাননের অবহেলিত শিয়া মুসলিমদের জন্য কাজ করায় রাজনৈতিকভাবে তাঁর সুনাম ছিল। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা। তাই তাঁকে নিয়ে ভক্তদের আবেগ-অনুভূতিও বেশি।
মুসার অনুসারীরা তাঁকে ‘ইমাম’ উপাধি দিয়েছেন। জীবিত অবস্থায় কোনো শিয়া ধর্মগুরুর জন্য এমন সম্মান বিরল। শিয়া সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ খেতাব দেওয়া হয়।
শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শাখা ইসনা আশারিয়া। এই শাখার অনুসারীরা ১২ ইমামে বিশ্বাসী। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের দ্বাদশ ইমাম মারা যাননি। তিনি নবম শতাব্দীতে নিখোঁজ হন। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগে তিনি আবার ফিরে আসবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর সঙ্গে মুসা আল-সদরের নিয়তি অনেকটাই মিলে যায়। তাই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ায় অনুসারীদের কাছে তাঁর প্রভাব আরও বেড়েছে।
এ ছাড়া মুসার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিশ্বের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যও সম্ভবত বদলে দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইরানি-লেবানিজ এই ধর্মগুরু তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে এবং এর মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও মধ্যপন্থী মতাদর্শের দিকে পরিচালনা করতে চাচ্ছিলেন। তবে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ঠিক আগে তিনি নিখোঁজ হন।
তাই মুসা আল-সদরের পরিচয় শনাক্তে ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচেষ্টার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছিল।
যে সাংবাদিক ওই মরদেহের ছবিটি তুলেছেন, তিনি আমাদের বলেন, মরদেহটি অস্বাভাবিক লম্বা ছিল। মুসা আল-সদরও ছিলেন বেশ লম্বা। তাঁর উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি। তবে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার মতো কোনো বৈশিষ্ট্যই সেটির চেহারায় অবশিষ্ট ছিল না।
আমরা কি শেষমেশ এই রহস্যের সমাধান করতে পারব
১৯৭৪ সালে লেবাননে ‘আমাল মুভমেন্ট’ নামের একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন চালু করেন মুসা। এটি ‘দ্য মুভমেন্ট অব দ্য ডিপ্রাইভড’ বা বঞ্চিতদের আন্দোলন নামেও পরিচিত ছিল। এই সংগঠন শিয়াদের সমান প্রতিনিধিত্ব এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দরিদ্রদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি এতটাই দৃঢ় ছিলেন যে গির্জায় ধর্মীয় বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির সঙ্গে দেখা করতে তাঁরই আমন্ত্রণে ১৯৭৮ সালের ২৫ আগস্টে মুসা আল-সদর লিবিয়ায় যান।
এর তিন বছর আগে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সেই সংঘাতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারাও জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের অনেকেই সে সময় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থান নেন। সেখানে মুসা আল-সদরের বেশির ভাগ অনুসারী বাস করতেন।
সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের গোলাগুলি শুরু হয়। মুসা চেয়েছিলেন গাদ্দাফি এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে লেবাননের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুন।
গাদ্দাফির সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছয় দিন লিবিয়ায় থাকার পর ১৯৭৮ সালের ৩১ আগস্ট মুসাকে ত্রিপোলির একটি হোটেল থেকে বেরিয়ে লিবিয়ার একটি সরকারি গাড়িতে উঠতে দেখা গিয়েছিল। এরপর আর কখনো তাঁকে দেখা যায়নি।
গাদ্দাফির নিরাপত্তা বাহিনী পরে দাবি করেছিল, মুসা রোমে চলে গেছেন। তবে পরবর্তী সময়ে এক তদন্তে এ দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
গাদ্দাফিশাসিত লিবিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ছিল কার্যত অসম্ভব। কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় লিবিয়ার মানুষ যখন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন সত্য উন্মোচনের দরজা খুলে যায়।
লেবানিজ-সুইডিশ সাংবাদিক কাসেম হামাদি সে সময় ত্রিপোলিতে একটি গোপন মর্গের খবর পান। একটি সূত্র তাঁকে জানিয়েছিল, সেখানে হয়তো মুসা আল-সদরের মরদেহ থাকতে পারে।
কাসেম ওই মর্গে গিয়ে দেখলেন, সেখানে একটি হিমায়িত কক্ষে ১৭টি মরদেহ রাখা। এর মধ্যে একটি মরদেহ ছিল শিশুর, বাকিগুলো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের।
কাসেমকে জানানো হলো, তাঁদের প্রায় সবাই আনুমানিক তিন দশক আগে মারা গেছেন, যা মুসার নিখোঁজ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। এর মধ্যে একটি মরদেহের সঙ্গে মুসার মিল পাওয়া গেছে।
কাসেম আমাকে বলেন, (মর্গের এক কর্মী) একটি ড্রয়ার খুললেন। ড্রয়ারে মরদেহ দেখার সঙ্গে সঙ্গে দুটি বিষয় আমার চোখে পড়ে। একটি হলো মরদেহটির মুখাবয়ব, ত্বকের রং এবং চুলের গঠন—এত বছর পরও সবকিছু মুসার মতোই মনে হচ্ছিল।
অন্যটি হলো এই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। অন্তত মাথার খুলি দেখে কাসেমের তা–ই মনে হয়েছিল। কপালে প্রচণ্ড আঘাত কিংবা বাঁ চোখের ওপর গুলি লাগার মতো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু আসলেই কি এটা মুসার দেহ? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব?
বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাসেমের তোলা ওই মরদেহের ছবিটি আমরা ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দলের কাছে নিয়ে গেলাম। ২০ বছর ধরে এই দল একটি বিশেষ অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যার নাম ‘ডিপ ফেস রিকগনিশন’। এটি দুই বা ততোধিক ছবির মধ্যে জটিল মিলগুলো খুঁজে বের করতে পারে। এই পদ্ধতি বিভিন্ন পরীক্ষায় অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে, এমনকি অসম্পূর্ণ ও ঝাপসা ছবির ক্ষেত্রেও।
এই দলের প্রধান অধ্যাপক হাসান উগাইল। তিনি মর্গের ওই ছবি মুসা আল-সদরের জীবদ্দশায় বিভিন্ন সময় তোলা চারটি ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে রাজি হলেন।
‘ডিপ ফেস রিকগনিশন’ সফটওয়্যারে ছবির মিল নির্ধারণে সর্বোচ্চ ১০০ নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। যে ছবি যত বেশি নম্বর পাবে, সে ছবি একই ব্যক্তি বা একই পরিবারের সদস্যের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
মুসার চারটি ছবির সঙ্গে মর্গের মরদেহটির ছবি মেলানোর পর দেখা গেল, সেটি ৬০ নম্বর পেয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে অধ্যাপক হাসান উগাইল আমাদের বললেন, মরদেহটি মুসা আল-সদরের হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
আরও বিশদভাবে যাচাইয়ের জন্য অধ্যাপক উগাইল একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ছবিটির সঙ্গে মুসার পরিবারের ছয় সদস্যের ছবি মেলালেন। এরপর তিনি মরদেহের ছবির সঙ্গে দৈবচয়নের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের ১০০ জন পুরুষের ছবি মেলালেন, যাঁদের চেহারার সঙ্গে মুসার চেহারার কিছুটা মিল আছে।
পরীক্ষা শেষে দেখা গেল, মুসার পরিবারের সদস্যদের ছবি বেশি নম্বর পেয়েছে। তবে মরদেহের চেহারার সঙ্গে মুসার জীবদ্দশায়ের ছবি সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, মরদেহটি মুসা আল-সদরের হওয়ার বেশ ভালো সম্ভাবনা আছে। আর মাথার ভাঙা খুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাঁকে হয়তো হত্যা করা হয়েছে।
কাসেমের তোলা ওই ছবি দেখার চার বছর পর ২০২৩ সালের মার্চে আমরা সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলতে এবং নিজ চোখে মরদেহটি দেখার জন্য লিবিয়ায় যাই। আমরা জানতাম, বিষয়টি সংবেদনশীল। এরপরও লিবিয়ার প্রতিক্রিয়া আমাদের অবাক করেছিল।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরদিন ত্রিপোলিতে আমরা গোপন মর্গটি খুঁজতে বের হই। বিবিসির দলটির সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক কাসেম। তিনি ওই মর্গে গিয়েছিলেন ২০১১ সালে। কিন্তু তিনি এটির অবস্থান মনে করতে পারছিলেন না। শুধু মনে আছে, মর্গটির কাছেই একটি হাসপাতাল ছিল।
পরে আমরা জানতে পারলাম, হাঁটাদূরত্বের মধ্যেই একটি হাসপাতাল আছে। সেদিকেই রওনা দিলাম। হঠাৎ কাসেম বলে উঠলেন, ‘এই তো! আমি নিশ্চিত, এটাই সেই ভবন, যেখানে মর্গ ছিল।’
আমরা শুধু ভবনটির বাইরের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে পেরেছিলাম। কারণ, ভেতরে ঢুকে ছবি তোলা বা ভিডিও করার অনুমতি চাইলেও আমাদের তা দেওয়া হয়নি। পরদিন অজ্ঞাতপরিচয় একদল লোক এসে ব্যাখ্যা ছাড়াই আমাদের আটক করে। পরে জানতে পারি, তারা লিবিয়ার গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা।
আমাদের লিবিয়ার গোয়েন্দা বিভাগের একটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আলাদা আলাদা কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়। অভিযোগ আনা হয় গুপ্তচরবৃত্তির। আমাদের চোখে মুখোশ পরানো হয়, বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং বলা হয়, কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। গোয়েন্দারা বলেছিল, ওই কারাগারে দশকের পর দশক আমাদের বন্দী করে রাখা হবে।
আমরা সেখানে যন্ত্রণাদায়ক ছয়টি দিন কাটালাম। শেষ পর্যন্ত বিবিসি ও যুক্তরাজ্য সরকারের চাপের মুখে আমাদের মুক্তি দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
কারাগারের কর্মীরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, গাদ্দাফির অনুগতরাই লিবিয়ার গোয়েন্দা বিভাগ চালান। তাঁরা চাননি, বিবিসি মুসা আল-সদরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্ত করুক।
কেউ কেউ বহুদিন ধরে বিশ্বাস করেন, মুসা আল-সদরকে হত্যা করা হয়েছে।
সাবেক লেবানিজ গবেষক ড. হোসেইন কেনান একসময় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালের যে সপ্তাহে মুসা আল-সদর নিখোঁজ হন, ওই সপ্তাহে তিনি ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তরে গিয়েছিলেন। তাঁকে জানানো হয়েছিল, মুসাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা একটি প্রতিবেদন পেয়েছে।
এই তথ্য প্রমাণিত হয় লিবিয়ার সাবেক বিচারমন্ত্রী মুস্তাফা আবদেল জালিলের মাধ্যমে। ২০১১ সালে তিনি কাসেমকে বলেছেন, ‘নিখোঁজের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন তারা মুসার কাগজপত্র নকল করে দেখান, তিনি ইতালি যাচ্ছেন। আর তারপর তাঁকে লিবিয়ার কারাগারে হত্যা করা হয়।’
মুস্তাফা আবদেল আরও বলেন, গাদ্দাফির সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
গাদ্দাফি যদি সত্যিই মুসাকে হত্যার আদেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে কেন তিনি এমনটি করলেন?
ইরান–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কুপারের মতে, গাদ্দাফির ওপর ইরানের কট্টরপন্থীদের প্রভাব ছিল। তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন, মুসা ইরানে বিপ্লবের পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে চলেছেন।
তবে লেবাননের আমাল পার্টি বিশ্বাস করে, মুসা আল-সদর এখনো বেঁচে আছেন। প্রায় প্রতিটি বছর তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বার্ষিকীতে দলটি তাঁর মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করে। বিবিসি
![]() |
| ইসনা আশারিয়া শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু মুসা আল-সাদর। ফাইল ছবি: এএফপি |
Saturday, October 11, 2025
গ্রামের কিশোর থেকে আন্তর্জাতিক গ্যাং লিডার—জেলে বসেও নিয়ন্ত্রণ করেন অন্ধকার জগৎ
বিষ্ণোইয়ের ‘রাজদণ্ড’ হলো একটি মুঠোফোন ও রাজসিংহাসন হলো কংক্রিটের বাক্স। এই স্মার্টফোনও তাঁর হাতে গেছে গোপনে পাচার হয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, এখান থেকেই ৩২ বছর বয়সী এই গ্যাং লিডার এক বলিউড সুপারস্টারকে হুমকি দিয়েছেন, এক পপ তারকাকে হত্যা করিয়েছেন এবং বিশ্বের অন্য প্রান্তে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।
উজ্জ্বল ত্বক, ঘন গোঁফ ও শান্ত দৃষ্টির বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে ভারতের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) বহু বছর ধরে অভিযোগ করছে যে তিনি কারাগারের ভেতর থেকে সাত শতাধিক সদস্যের এক ভয়ংকর গ্যাং (সন্ত্রাসী চক্র) নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো অনেক অভিযোগ রয়েছে।
গত মাসে বিষ্ণোই কানাডায় একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংস্থার মুখচ্ছবি হয়ে ওঠেন। এর আগে দেশটির সরকার অভিযোগ করে, ভারত বিষ্ণোই গ্যাংকে ব্যবহার করে কানাডার মাটিতে শিখ ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করছে।
কানাডার এ সিদ্ধান্ত বিষ্ণোইকে ভারতের এক সুপরিচিত মাফিয়াপ্রধান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তাড়া করে ফেরা একজন শীর্ষ গ্যাং নেতায় পরিণত করেছে।
কানাডার জননিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারি গত সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বিষ্ণোই গ্যাং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয় দেখানোর লক্ষ্য করেছে। এ অপরাধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি তাদের অপরাধ মোকাবিলা করা ও থামানোর ক্ষেত্রে আমাদের আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার এনে দেবে।’
বিষ্ণোই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগই অস্বীকার করেন এবং তাঁর আইনজীবী সিএনএনকে বলেছেন যে কানাডার সর্বশেষ অভিযোগগুলো তাঁদের তদন্ত করতে হবে।
সিএনএন পশ্চিম ভারতের গুজরাটে সবরমতী কারাগারে যোগাযোগ করেছে। বিষ্ণোই এখানেই বন্দী, তবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
কয়েক বছরের তিক্ত সম্পর্কের পর দুই দেশ যখন সম্পর্ক ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে, তখন কানাডার মন্ত্রী ওই বিবৃতি দিলেন। নয়াদিল্লি কানডার এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
গ্রামের ছেলে থেকে গ্যাং লিডার
বিষ্ণোইয়ের গল্প গোপন অন্ধকার জগতের বস্তিতে শুরু হয়নি। এটি শুরু হয় ভারতের ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে পরিচিত পাঞ্জাব রাজ্যের উর্বর মাঠ থেকে, যেখানে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও স্থানীয় নানা গর্বের অনুভূতি আছে। তবে রাজ্যটি তরুণদের বেকারত্ব ও ব্যাপক গ্যাং সহিংসতায়ও আক্রান্ত।
এ রাজ্যের ছোট একটি গ্রামের প্রাক্তন এই ছাত্র আন্দোলনকারী নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের কথিত পরিকল্পনাকারীর ভূমিকায় রূপান্তর করেন।
বিশ্ব তাঁকে লরেন্স বিষ্ণোই নামে চেনার আগে, তিনি ছিলেস বালকরন ব্রার। তাঁর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল দুতারাওয়ালির ধুলামাখা ছোট গ্রামীণ পথে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এ গ্রামে মাত্র তিন হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
ভারতের রাজধানী থেকে প্রায় সাত ঘণ্টা দূরত্বে এবং পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে, এটি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষের জীবন ঘোরে ফসলের চারপাশে। সেখানে বিষ্ণোইকে মধ্যবিত্ত জীবনের জন্য উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছিল। হরিয়ানা পুলিশের একজন কনস্টেবলের ছেলে হিসেবে সাদামাটা এক স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তাঁকে নিয়ে ছিল মায়ের বড় স্বপ্ন।
বিষ্ণোই শিক্ষিত ও ‘খুব ভালো পরিবারের’ সদস্য—বলেছেন সাংবাদিক ও ‘হু কিল্ড মুসেওয়ালা?’ বইয়ের লেখক জুপিন্দারজিৎ সিং। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগের একটি—পাঞ্জাবি র্যাপার সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বইটি লেখা হয়েছে।
লরেন্স বিষ্ণোই নামটি একজন হিন্দু ছেলের জন্য ‘অসাধারণ’, উল্লেখ করেছেন জুপিন্দারজিৎ সিং। তিনি বলেন, এটি তাঁর মায়ের দেওয়া নাম। স্যার হেনরি লরেন্সকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ছেলের ওই নাম দিয়েছিলেন তিনি। হেনরি লরেন্স পাঞ্জাবের প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক ছিলেন। বিষ্ণোইও খুব ফর্সা ত্বক নিয়ে জন্মেছিলেন।
তাঁর নিজ গ্রামেই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, শিশুকালের বিষ্ণোই আর গ্যাং লিডার বিষ্ণোই যেন একেবারে দুই ভিন্ন মানুষ। গ্রামের মানুষ এখনো এ দুই রূপকে মেলাতে পারেন না।
‘সে খুব ভালো ছেলে ছিল এবং স্বভাবও ছিল ভালো’, গত বছর দুতারাওয়ালির এক বাসিন্দা সিএনএন নিউজ ১৮–কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন। ‘গ্রামের কারও কাছে গেলে, কেউ তাঁর সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবে না…আমি বিশ্বাস করি না যে সে গ্যাংস্টার।’
অন্য একজন সিএনএন নিউজ ১৮-কে বললেন, ‘বিষ্ণোই গ্রামে কখনো কাউকে খারাপ কথা বলেনি। সে সবাইকে সম্মান দেখাত।’
কিন্তু গ্রামের সেই ধুলাবালুর পথ বিষ্ণোইয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। সমবয়সীদের সঙ্গে সেখানকার মাঠে ভলিবল আর ক্রিকেট খেলে দিন কাটানো বিষ্ণোইয়ের ভেতর তখন আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা জন্মে।
২০১০ সালের দিকে বিষ্ণোই গ্রাম ছেড়ে চলে যান চণ্ডীগড়ে—পাঞ্জাব ও হরিয়ানার আধুনিক রাজধানী শহরে। শোনা যায়, আইন পড়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় ছোট গ্রামের ছেলে থেকে তাঁর ভয়ংকর গ্যাং লিডারে রূপান্তর। ২০২৩ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তৈরি দীর্ঘ চার্জশিটে এ তথ্য উল্লেখ আছে। এটি সিএনএন হাতে পেয়েছে।
বিষ্ণোই ভর্তি হন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহু বছর ধরে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে রাজনীতিবিদ ও কখনো কখনো ‘কুখ্যাত অপরাধীও’ জন্ম নিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির সহিংস পরিবেশ তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রভাব, আধিপত্য ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও রাজস্থানে অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিশাল অপরাধ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।’
সাংবাদিক জুপিন্দারজিৎ সিং বলেন, বিষ্ণোই নিজেকে ঈশ্বরভক্ত ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ হিসেবে দেখাতে চান। বিষ্ণোই দাবি করেন, তিনি নেশা থেকে দূরে থাকেন ও প্রার্থনায় মনোযোগী।
এই ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বিষ্ণোই নিজেকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবেও তুলে ধরেন। ২০২৩ সালে কারাগার থেকে এবিপি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষ্ণোই বলেছিলেন, পাকিস্তান ও খালিস্তান আন্দোলনের বিরোধী তিনি। খালিস্তান আন্দোলন হলো ভারতের অংশবিশেষ নিয়ে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন।
আইনের সঙ্গে সংঘাত
বিষ্ণোই প্রথমবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ২০১০ সালে, এক হামলা মামলায়। দুই বছরের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়। প্রতিবারের গ্রেপ্তার ও জেলজীবন তাঁকে আরও শক্ত ও সংগঠিত করে তোলে—বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
২০১৪ সালে রাজস্থানে পুলিশের এক তল্লাশিচলাকালে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন আবারও গ্রেপ্তার হন বিষ্ণোই। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, এক আত্মীয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে কয়েক মাস পর নাটকীয়ভাবে তিনি পালিয়ে যান।
২০১৫ সালের মার্চে বিষ্ণোই আবার ধরা পড়েন পাঞ্জাবে। এবার আর পালানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু পুলিশ বুঝতে পারে—তাঁকে বন্দী করে রাখলেই তাঁর অপরাধ থেমে থাকবে না।
অভিযোগপত্রে লেখা হয়, ‘লরেন্স বিষ্ণোই জেল থেকেই পুরো গ্যাং পরিচালনা করেন। তিনি জেলের ভেতর থেকে এত দক্ষভাবে কাজ চালান যে বাইরে থেকেও তাঁকে থামানো যায় না।’
বিষ্ণোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করতেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিষ্ণোই গ্যাং গোপন পরিচয়ে কাজ করে। গ্যাংয়ের প্রত্যেক সদস্য শুধু তাঁর ওপরের জনকে চেনেন। একই অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরাও একে অপরকে চেনেন না, যাতে একজন ধরা পড়লেও অন্যদের নিরাপদে রাখা যায়।
বলিউডের তারকা ও পপ গায়ক হত্যার অভিযোগ
বিষ্ণোইয়ের গ্রেপ্তারের পরও তাঁর গ্যাং আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে তিনি আলোচনায় আসেন বলিউড তারকা সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে। কারণ ছিল, ১৯৯৮ সালে খানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এক মামলার অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, সালমান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেছিলেন, যেগুলো বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র।
বিষ্ণোই সম্প্রদায় উত্তর ভারতের এক হিন্দু গোষ্ঠী। তাদের ‘প্রকৃতির রক্ষক’ বলা হয়। তাদের গুরু জাম্ভেশ্বর দেবের দেওয়া ২৯টি উপদেশের একটি হলো, সব প্রাণীর সুরক্ষা দেওয়া।
জুপিন্দারজিৎ সিংয়ের ভাষায়, ‘তাঁর (বিষ্ণোই) প্রথম উদ্দেশ্য ছিল (২০১৮ সালে), সালমান খানকে ভয় দেখানো এবং কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।’
এর চার বছর পর, ২০২২ সালে, পুলিশের অভিযোগ—বিষ্ণোইয়ের নির্দেশেই খুন হন পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা। তিনি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।
বিষ্ণোই এ হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে জেল থেকে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আবার সালমান খানকে হুমকি দেন। বলেন, ‘ওকে শাস্তি দেওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য।’
বিষ্ণোইয়ের আন্তর্জাতিক সংযোগ
প্রায় এক দশক কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও বিষ্ণোইয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানার বাইরে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাঁর গ্যাং এখন যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও কানাডা পর্যন্ত সক্রিয়।
গত বছর কানাডার কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, বিষ্ণোই কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর হামলার পেছনে যুক্ত। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় গুলিতে নিহত হন শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর। তাঁর হত্যার সূত্রেও বিষ্ণোইয়ের নাম আসে।
নিজ্জরকে ভারত সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ভারতের অভিযোগ ছিল, তিনি একটি নিষিদ্ধ সংগঠন চালাতেন। সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়কে খালিস্তানের পক্ষে উসকে দিত।
খালিস্তান আন্দোলনকে ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে এবং বহুদিন ধরে কানাডাকে দেশটিতে শিখ ‘উগ্রপন্থীদের’ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করে আসছে।
অন্যদিকে কানাডার অভিযোগ, তার মাটিতে শিখ রাজনীতিকদের ওপর সহিংসতা ছড়াচ্ছে ভারত।
গত বছরের অক্টোবরে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টারি কমিটিতে বলেন, ভারত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের মতো অপরাধী সংগঠনকে ব্যবহার করছে, যাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত সরকারের সমালোচক এমন কানাডীয়দের ওপর হামলা চালানো যায়।
তবে ভারত নিজ্জর হত্যায় নিজেদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা বারবারই অস্বীকার করেছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ চলতি মাসে সিবিসি নিউজকে বলেছেন, ভারতীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তদন্তে সহযোগিতা করছে।
সিএনএন এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
কানাডায় বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা
কানাডা সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে। অভিযোগ, তারা প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছে।
কানাডার জননিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, বিষ্ণোই গ্যাং খুন, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত। তারা ভয় দেখিয়ে ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
কানাডার ‘বিশ্ব শিখ সংস্থা’ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিষ্ণোই গ্যাং কানাডায় শিখদের বিরুদ্ধে ভারতের দমন অভিযানের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে নিজ্জর হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।
এ ঘোষণার ফলে কানাডা সরকার এখন বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পদ ও তহবিল জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার করার ক্ষমতা পেয়েছে।
কারাগারে থেকেও আত্মবিশ্বাসী বিষ্ণোই
এত সব অভিযোগ ও কয়েক ডজন মামলাও বিষ্ণোইকে বিচলিত করতে পারেনি। গত বছর এবিপি নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্যাংস্টার বলা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা সেই পরিচয়, যা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন।’
বিষ্ণোই আরও বলেন, ‘৯ বছর জেলে কাটিয়ে আমি এখন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আমি যেমন আছি, তাতেই ভালো আছি।’
![]() |
| নয়াদিল্লির একটি আদালতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত লরেন্স বিষ্ণোই। ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ছবি: রয়টার্স |
Sunday, October 5, 2025
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো কি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট
আল-কায়েসি কিংবা তার আগে এই মাসের শুরুর দিকে একই সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীকে আক্রমণকারী মাহির আল-জাজি—কেউ-ই ফিলিস্তিনি নন। তাঁরা দুজনই পূর্ব তীরের জর্ডানিয়ান। আল-কায়েসির বার্তা ছিল, ‘বিশ্বের সম্মানিত স্বাধীন মানুষদের উদ্দেশে এবং বিশেষভাবে শামের আরব গোত্রভাই জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের মানুষদের উদ্দেশে।’
আল-কায়েসির বার্তা স্পষ্ট, ‘গাজায় যা ঘটছে, তা অন্য আরব দেশগুলোতেও পুনরাবৃত্তি হবে। আমাদের নীরবতা মানেই সহায়তা। কিছু না করলে “গ্রেটার ইসরায়েল” আমাদের ঘরে এসে দাঁড়াবে। যদি এই বার্তা কেবল আম্মানের প্রান্তে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর এক মনোভাবকে প্রতিফলিত করে, তবে ইসরায়েল ইতিহাসের ভয়াবহ ভুল করছে।’
ইসরায়েল: অস্তিত্বগত হুমকি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বারবার বলছেন, জর্ডান নদীর পশ্চিমে কেবল একটি রাষ্ট্রই থাকবে, আর সেটি হবে ইসরায়েল। এই বার্তা শুধু ফিলিস্তিন নয়, সীমান্তের বাইরেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ইসরায়েল যে হুমকি তৈরি করছে, তা জোট, রাজনীতি, গোত্রীয় পরিচয় বা ধর্মনির্বিশেষে পুরো অঞ্চলকে ঘিরে ফেলছে।
প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে লেবাননের অংশবিশেষ ও গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, দক্ষিণ সিরিয়া দখল হয়েছে আর ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ গালেব নাসের আল-রাহাওয়িকে হত্যা করেছে এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করেছে। এখন ইসরায়েল শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
আপনি যদি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, তবে তার যুদ্ধবিমান আপনার আলোচক দলকেই টার্গেট করবে। ওমানের আলোচনার আগেই ইরানকে আক্রমণ এবং দোহায় হামাসের আলোচক দলকে বোমা হামলায় টার্গেট করার ঘটনাই তার প্রমাণ। ক্ষমতার নেশায় বা তা আঁকড়ে ধরার মরিয়া চেষ্টায় নেতানিয়াহু মনে করছেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলের নতুন সীমানা চাপিয়ে দিতে পারবেন।
ইসরায়েল আর কখনো এমন সুবিধাজনক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাবে না, যেমন এখন পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তিনি ইতিমধ্যে দখলকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তি স্বীকার করেছেন, জেরুজালেমকে ‘ইহুদি রাষ্ট্রের’ অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এখন গাজা নগরীকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন। মার্কিন প্রশাসন কখনোই এতটা খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।
দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনি বাড়ির নিচে খনন করা এক টানেলে দাঁড়িয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ঘোষণা করেন, জেরুজালেম হলো ইহুদিদের ‘চিরন্তন, অবিভাজ্য, অবিসংবাদিত রাজধানী’। তিনি বলেন, ‘চার হাজার বছর আগে এখানেই, মরিয়াহ পর্বতে, ঈশ্বর তাঁর জাতিকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি কেবল একটি জাতিকেই বেছে নেননি, একটি স্থানও বেছে নিয়েছিলেন এবং এই জাতির জন্য একটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছিলেন। জাতি ছিল ইহুদিরা, স্থান ছিল ইসরায়েল, আর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর আলোকবর্তিকা হওয়া।’ হাকাবির কাছে এই সংঘাতে কোনো ধূসর এলাকা নেই। এটি শুভ বনাম অশুভর লড়াই।
ধর্মীয় যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত
উন্মত্ততাটা শুধু কোনো ধর্মানুরাগী মৌলবীদের উৎসে ফেরা নয়, এটি ধর্মীয় যুদ্ধে পরিণত হওয়ার শুরুর বাঁশিও হতে পারে। মুসলিম অঞ্চলের ওপর সম্পূর্ণ বিজয়ের লক্ষ্যে যাঁরা আছেন, নেতানিয়াহু তাঁদের পথেই ভুল করছেন; ইতিহাসে আগের অনেক নেতাই তেমন করেছেন, বিশেষ করে নেপোলিয়ন ও হিটলার, যাঁরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ করে পরাজিত হয়েছিলেন।
নেতানিয়াহু মনে করেন যে ৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ইহুদি নাগরিকের ইসরায়েল ৪৭৩ মিলিয়ন আরব (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা), ৯২ মিলিয়ন ইরানি বা বিশ্বব্যাপী ২ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে।
এটা নেতানিয়াহুর ‘সুপার স্পার্টা’ ভাবনা। ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চালিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে সরে এসে ক্রমে সব আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, যেমন ইরান ও তুরস্ককে টার্গেট করেছে। নেতানিয়াহুর সুপার স্পার্টা ধারণা সব আরব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ইসরায়েল যে হুমকি সৃষ্টি করছে, তা জোট, রাজনীতি, গোত্র বা ধর্মনির্বিশেষে পুরো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কথাই ধরা যাক। ক্ষমতার রাস্তা কোথায়, তা প্রথম শনাক্তকারী নেতাদের একজন ছিলেন ইউএইর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বিন জায়েদ (এমবিএজেড)। তিনি সৌদি যুবরাজকে গোপনে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতের পথ দেখিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক দায়বোধ
আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ ছিল ইউএই। তাই এটিই হতে পারে শেষ দেশ, যা তা বাতিল করবে। তবে আবুধাবির মেজাজ এখন ইসরায়েলের প্রতি খচখচ করছে। ইউএইর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ টুইট করেছেন, ‘প্রথমবারের মতো (ইউএইতে) গুরুতর আলোচনা চলছে যে এখন সময় এসেছে আব্রাহাম চুক্তিগুলো স্থগিত করার। চুক্তি এখন কৌশলগত সম্পদ না হয়ে রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।’
একজন আমিরাতি শিল্পপতির প্রতিষ্ঠিত থিঙ্কট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা দোহা আঘাতের পর ইসরায়েলের অর্থনীতিকে কীভাবে আঘাত করা যায়, সে বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, যদি আরব রাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে আকাশপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইসরায়েলের ২৮ বিলিয়ন থেকে ৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দোহায় হামাসের বিরুদ্ধে আঘাতের এক সপ্তাহ পর জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ইসরায়েলকে ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর শাসনকালে (২০১৪ থেকে) এমনটা বলার প্রথম ঘটনা এটা। ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ সীমান্ত এবং ফিলাডেলফি করিডর দখল করে মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে।
নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা গাজা থেকে এক মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনিকে সিনাইভিত্তিক এলাকায় ঠেলে দেওয়া। এটি মিসরের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজার জনসংখ্যার অর্ধেক খালি করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা মিসরের সহযোগিতা ছাড়া সফল হতে পারে না। যতক্ষণ আরও ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণে ঠেলে দেওয়া হবে, সিনাই ততই ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
জর্ডানকে হুমকি
ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করা দ্বিতীয় আরব দেশ জর্ডানে এখন ওয়াদি আরাবা চুক্তির বর্তমান মূল্য নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক চলছে। জর্ডানের ভাষ্যকার মাহের আবু তাইয়ার লিখেছেন, ‘অসলো চুক্তি প্রমাণ করেছে, এটি কেবল ইসরায়েলের বৈধতা আদায়ের ফাঁদ, সারা বিশ্ব থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের জড়ো করে তাদের দখলদারের নজরদারির নিচে আনার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।’
মাহের আবু তাইয়ার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তাহলে ওয়াদি আরাবা চুক্তির পরিণতি কী? এটি কি জর্ডানের কৌশলগত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা? আর নিশ্চয়তাদাতা কারা? যখন আমরা দেখেছি অসলো চুক্তির নিশ্চয়তাদাতারা চোখের সামনে সেটি ভেঙে যেতে দেখেছে এবং তারাই সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছে।’
আবু তাইয়ার বলেন, জর্ডান দুইভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারে। প্রথমত, আল-আকসা মসজিদের তত্ত্বাবধানের কারণে, যেখানে অভূতপূর্ব মাত্রায় ইসরায়েলি বসতকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম তীর ইস্যুতে। ইসরায়েল সীমান্তে নিরাপত্তা অজুহাত তৈরি করে দক্ষিণ জর্ডান পুনর্দখলের চেষ্টা করতে পারে।
প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের স্বীকৃতির সর্বশেষ প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইসরায়েল কখনোই জর্ডান নদীর পশ্চিমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি দেবে না, অর্থাৎ পূর্ব দিকে (জর্ডান ভূখণ্ডে) সে সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।
নতুন জোট
আরব নেতারা নিষ্ক্রিয় বসে নেই। প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে এখন গুরুত্বসহকারে ভাবা হচ্ছে, যা গত ১০ বছরে অকল্পনীয় ছিল। ২০১৬ সালে সৌদি গণমাধ্যমকে রাতের শিফটে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে হত্যা করার ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রকাশের জন্য। এরদোয়ান বেঁচে গিয়েছিলেন, তবে অভ্যুত্থান প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিল।
দুই বছর পর সৌদি সাংবাদিক ও মিডল ইস্ট আইয়ের লেখক জামাল খাসোগিকে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যাকে কেন্দ্র করে দুই আঞ্চলিক শক্তি আবার মুখোমুখি হয়। তুরস্ক বরাবরই দাবি করেছে যে হত্যার নির্দেশ এসেছিল সৌদি যুবরাজের কাছ থেকে। টানা তিন বছর ধরে এই ইস্যুতে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে ওই যুবরাজ কার্যত অচ্ছুত হয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু এর পর থেকে সম্পর্কের যে উষ্ণতা তৈরি হয়েছে, তা লক্ষণীয়। দুই বছর আগে সৌদি তুর্কি ড্রোন নির্মাতা বায়কারের সঙ্গে আকিনজি যুদ্ধ ড্রোন কেনার চুক্তি করে, যা ছিল তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি। এখন রিয়াদ আগ্রহ দেখাচ্ছে আলতাই যুদ্ধ ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও কান স্টেলথ ফাইটার জেট প্রকল্পে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারেও।
আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের কানের প্রতি আগ্রহের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানের জন্য দীর্ঘদিনের ব্যর্থ চেষ্টা। ইসরায়েল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে ইরানে হামলার জন্য এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধা দিয়েছে যেন তারা এ অঞ্চলের আর কারও কাছে এফ-৩৫ বিক্রি না করে।
একইভাবে তুরস্ক ও মিসর, যারা দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, কেবল রাজনৈতিক ইসলাম ও মুসলিম ব্রাদারহুডের অবস্থান নিয়েই নয়; বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রেও সম্প্রতি একধরনের উষ্ণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মিসরও কান যুদ্ধবিমান নির্মাণে সহ–উৎপাদক হিসেবে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তা ছাড়া দুই দেশ ১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ মহড়া আয়োজন করতে যাচ্ছে।
সৌদি আরবও পূর্বমুখী হচ্ছে প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রেও। চলমান পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে তার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অবহেলা করা যাবে না। এই চুক্তি কিছুদিন ধরেই আলোচনায় ছিল, এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ক্ষমতায় আসার আগেও।
তবে দোহায় ইসরায়েলি হামলার মাত্র কয়েক দিন পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একমাত্র পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে এই চুক্তির ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। পাকিস্তানের পেছনে আছে চীন, এ বিষয়ও ওয়াশিংটনের চোখ এড়িয়ে যায়নি। তারপর আছে তুরস্ক।
প্রকৃতিগতভাবেই সতর্ক আঙ্কারা ইসরায়েলের সঙ্গে মুখোমুখি হচ্ছে—দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের দখল, বিশেষ করে বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে। কেবল তা–ই নয়, ইসরায়েল দক্ষিণে দ্রুজ এবং উত্তরে কুর্দিদের অভিভাবকত্ব নিজের হাতে নিয়েছে, যা কোনো এক পর্যায়ে পিকেকের সঙ্গে আঙ্কারার শান্তিপ্রক্রিয়ার সরাসরি বিরোধিতা তৈরি করতে পারে। এখন আবার তারা সাইপ্রাসেও প্রবেশ করছে।
ইসরায়েল ইতিমধ্যে সাইপ্রাসে বারাক এমএক্স আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করেছে, যা রাশিয়ার এস-৩০০-এর চেয়েও কার্যকর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি আকাশ ও স্থলবাহিনীকে ট্র্যাক করতে সক্ষম। ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) সাবেক বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সহসভাপতি শাই গাল গত জুলাইয়ে যুক্তি দেন, ইসরায়েলের উচিত সাইপ্রাসের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করা এবং দ্বীপের উত্তরাংশকে তুর্কি বাহিনী থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করা।
এ রকম পটভূমিতে আরব অঞ্চল ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটবে না, আবার একরকমভাবে ঘটবেও না। আরবদের বিভক্তি হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্প দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থা চিরস্থায়ী হবে—এমনটা ভাবা বোকামি, যখন ছোট্ট ‘স্পার্টা’ ক্রমেই বড় হতে থাকে।
ইসরায়েল স্পষ্টতই বল প্রয়োগ করে সীমান্ত সম্প্রসারণ করার কাজে নেমেছে। একে থামাতে পারে কেবল পুরো অঞ্চলের সম্মিলিত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি।
* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ: মনজুরুল ইসলাম
![]() |
| ইসরায়েলি বর্বরতায় একরকম মাটিতে মিশে যাওয়া গাজা উপত্যকা। ছবি: হারেৎজের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া |
Sunday, September 21, 2025
কেনিয়ার জঙ্গলে গাছের ওপরে ঘরে ওঠার সময় ছিলেন রাজকন্যা, নেমে এলেন রানি হয়ে by ফাহমিদা আক্তার
১৯৫২ সালে বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় এলিজাবেথ উত্তরাধিকারী হিসেবে ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেন। তিনি টানা সাত দশক ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন ছিলেন। ২০২২ সালের জুনে তিনি তাঁর সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেন। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ওই বছরেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। গত ৮ সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের আয়োজন।
১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ব্রিটিশ রাজকন্যা দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর। তাঁর বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। বাবা অসুস্থ থাকায় তাঁর হয়ে স্বামী ফিলিপকে নিয়ে কমনওয়েলথ সফরে বের হয়েছিলেন এলিজাবেথ। সেই সফরের প্রথম গন্তব্যই ছিল কেনিয়া। তখন কেনিয়া ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ।
সফরকালে এলিজাবেথ ও ফিলিপ কেনিয়ার গভীর বনে একটি ট্রি হাউসে ছিলেন। গাছের ওপর বসে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে হঠাৎ করে খবর আসে, কয়েক হাজার মাইল দূরে যুক্তরাজ্যে বাবা রাজা জর্জ মারা গেছেন। আর সেই মুহূর্ত থেকেই ব্রিটিশ রাজকন্যা এলিজাবেথ হয়ে যান ব্রিটিশ রানি। এরপর ৭০ বছর ছিলেন রাজ সিংহাসনে।
প্রকৃতিবিদ ও শিকারি জিম করবেট রাজদম্পতিকে ওই ট্রি হাউসে সঙ্গ দিয়েছিলেন। ওই ট্রি–টপস হোটেলের পরিদর্শক বইয়ে তিনি লিখেছিলেন: ‘বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমবার এক তরুণী একদিন রাজকন্যা হিসেবে গাছে উঠলেন, একে তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করলেন এবং পরদিন গাছ থেকে নেমে এলেন এক রানি হয়ে।’
সিংহাসনে বসাটাও ছিল অপ্রত্যাশিত
১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন মা–বাবার প্রথম সন্তান। তাঁর বাবা প্রিন্স আলবার্ট তখন ডিউক অব ইয়র্ক ছিলেন। পরে তিনি রাজা ষষ্ঠ জর্জ হিসেবে রাজকার্য চালিয়েছেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথের মায়ের নাম ছিল এলিজাবেথ বোয়েস লিয়ন।
পরিবারের সদস্যরা দ্বিতীয় এলিজাবেথকে আদর করে লিলিবেট বলে ডাকতেন। তাঁর জন্মের ৪ বছর পর ১৯৩০ সালে বোন মার্গারেটের জন্ম হয়।
দ্বিতীয় এলিজাবেথের যখন জন্ম হয়, তখন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের তৃতীয় উত্তরসূরি। রাজা পঞ্চম জর্জ ছিলেন তাঁর দাদা। তাঁর বাবা ছিলেন দাদার দ্বিতীয় সন্তান এবং সিংহাসনের দ্বিতীয় উত্তরসূরি। আর প্রথম উত্তরসূরি ছিলেন চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড। সেদিক থেকে দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ সিংহাসনে বসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে।
দাদা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর ১৯৩৬ সালে তাঁর চাচা এডওয়ার্ড রাজ সিংহাসনে বসেন। তবে তিনি বেশিদিন ক্ষমতায় থাকেননি। বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া এক মার্কিন নারীকে বিয়ে করতে তিনি রাজপদবি ছাড়েন। রাজা হিসেবে অষ্টম এডওয়ার্ডের পদত্যাগের পর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ। আর এলিজাবেথ তখন হয়ে যান সিংহাসনের প্রথম উত্তরসূরি।
রাজদপ্তরের লেখক এবং ইতিহাসবিদ সারাহ গ্রিস্টউডের মতে, ষষ্ঠ জর্জ আগে থেকে ধরেই নিয়েছিলেন, বড় ভাই এডওয়ার্ডই রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাই হঠাৎ রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার মতো প্রস্তুতি তাঁর ছিল না। রাজা হওয়ার পর তিনি দৃঢ়সংকল্প করেন যে মেয়ে এলিজাবেথকে অন্তত ভালোভাবে প্রস্তুত করে তুলবেন।
এলিজাবেথকে ব্যক্তিগতভাবে পড়াতেন ইটনের প্রভোস্ট। তিনি তাঁকে ব্রিটিশ ও মার্কিন সংবিধান শেখাতেন। পাশাপাশি এক ফরাসি শিক্ষক তাঁকে সাবলীল ফরাসি ভাষাও শিখিয়েছিলেন—যা পরে কানাডার ফরাসিভাষী জনগণের রানি হিসেবে তাঁর জন্য বিশেষ কাজে আসে।
বোনের সঙ্গে সম্পর্ক
দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং বোন মার্গারেটের মধ্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে দুই বোনের কেউ–ই স্কুলে যাননি। বাড়িতেই টিউটর এসে তাঁদের পড়াতেন। বাবা ষষ্ঠ জর্জ রাজা হওয়ার পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও এলিজাবেথ ও মার্গারেট তাঁদের মা–বাবার সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসে চলে যান। এলিজাবেথ তখন আর নির্ভার রাজকন্যা হয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি ভবিষ্যৎ দায়িত্বের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
এলিজাবেথ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার পর তিনি বোনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কম পেতেন। রাজদপ্তরের ইতিহাসবিদ ক্যারোলিন হ্যারিসের ভাষায়, ‘মার্গারেট চাইতেন যেখানে এলিজাবেথ থাকবেন, তাকেও সেখানে থাকতে দেওয়া হোক। আর তাই এলিজাবেথ যখন ইটনে পড়াশোনার জন্য যেতেন, মার্গারেটের কাছে তা কষ্টকর ছিল। কারণ, তারা সবকিছু একসঙ্গেই করতেন।’
গ্রিস্টউড বলেন, দায়িত্বটা কঠিন হলেও এলিজাবেথ ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিলেন সামনে কী আসছে এবং তা মেনে নিয়েছিলেন। তরুণী রাজকন্যা প্রহরীদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেন, যাতে তারা অস্ত্র তোলে। তখন থেকেই তাঁর মনে হতো, তাঁর জীবনের যেন নির্দিষ্ট পথে গড়ে দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ডে আক্রমণ করলে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন পরিবারটি বালমোরালে ছুটিতে ছিল। কোথায় থাকা নিরাপদ হবে বুঝতে না পেরে রাজা জর্জ ষষ্ঠ ও রানি লন্ডনে ফিরে যান। এলিজাবেথ ও মার্গারেটকে রেখে যান ধাত্রীদের কাছে। কিছুদিন স্যান্ড্রিংহ্যামে থাকার পর দুই রাজকন্যাকে উইন্ডসরে নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধকালে প্রায় পুরো সময়ই তারা সেখানেই ছিলেন।
যুদ্ধের বছরগুলোতেই শুরু হয় এলিজাবেথের প্রকাশ্য জীবন। ১৯৪০ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার বিবিসির চিলড্রেনস আওয়ার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি শিশুদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার বোন মার্গারেট রোজ আর আমি তোমাদের কষ্ট বুঝতে পারি। কারণ আমরাও জানি, সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে কেমন লাগে।’
এলিজাবেথের এই বক্তব্য শুধু ব্রিটিশ শিশুদের মনোবলই বৃদ্ধি করেনি, বরং জার্মানির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের লড়াইয়ে শামিল হতে যুক্তরাষ্ট্রকেও উদ্বুদ্ধ করেছিল। গ্রিস্টউডের মতে, অল্প বয়সে এলিজাবেথ যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেটা কার্যত ‘সফট ডিপ্লোমেসি’।
১৯৪৩ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথকে গ্রেনেডিয়ার গার্ডসের কর্নেল-ইন-চিফ ঘোষণা করেন। সেই বছরই তিনি প্রথমবারের মতো সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই বছর পর, যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি তাঁকে উইমেনস টেরিটোরিয়াল অক্সিলিয়ারি সার্ভিসে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতে বাবাকে রাজি করান। সেখানে তিনি একজন চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
গ্রিস্টউডের মতে, এই সিদ্ধান্ত ছিল এলিজাবেথের সম্পূর্ণ নিজের। তিনি বলেছিলেন—‘যদি আমার বয়সী অন্য সব মেয়ের যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে আমাকেও দেওয়া উচিত।’
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে হাজারো মানুষ লন্ডনের রাস্তায় নেমে বিজয় উদ্যাপন করেন। সেই রাতে এলিজাবেথ আর মার্গারেটকে সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার বিরল সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
রানি পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন—সেটি ছিল তাঁর জীবনের সেরা রাতগুলোর একটি।
প্রেম–বিয়ে–সংসার
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাজপরিবার ডার্টমাউথ নেভাল কলেজ পরিদর্শনে গিয়েছিল। সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন গ্রিসের তরুণ প্রিন্স ফিলিপ।
ইতিহাসবিদ গ্রিস্টউডের ভাষায়, ‘সেই প্রথম দেখা থেকেই এলিজাবেথ বুঝে গিয়েছিলেন—কাকে তিনি চান।’
ফিলিপ দায়িত্ব থেকে ছুটি পেলেই এলিজাবেথকে দেখতে যেতেন। আর যুদ্ধ চলাকালে দুজন নিয়মিত একে অপরকে চিঠি লিখতেন।
গ্রিস্টউড বলেন, এলিজাবেথ তখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও ফিলিপের মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন।
তখন থেকেই ধারণা ছিল—একদিন ফিলিপ আর এলিজাবেথের বিয়ে হবেই।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই বছর পর ফিলিপ ও এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক বাগদান হয়। ওই বছরেরই শেষ দিকে বিয়ে। আর তারপর থেকে ২০২১ সালে ফিলিপের মৃত্যু পর্যন্ত টানা ৭৩ বছর একসঙ্গে ছিলেন তাঁরা। তাঁদের চার সন্তান–চার্লস (বর্তমান রাজা), প্রিন্সেস অ্যান, প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ড।
রাজতন্ত্রের উত্থান–পতনের সাক্ষী
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবা রাজা জর্জ মারা গেলে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন এবং কমনওয়েলথের প্রধান হন। তাঁর রাজ্যাভিষেক বিশ্বজুড়ে টিভি রেকর্ড গড়ে। এ ছাড়া রাজতন্ত্র ও ব্রিটিশ কমনওয়েলথের জন্য নতুন এক যুগের সূচনা করেন তিনি।
১৯৫০–এর দশকে রাজপরিবার ও রানির প্রতি মানুষের ব্যাপক শ্রদ্ধা ছিল। তবে, পরবর্তী কয়েক দশকে সম্প্রচারমাধ্যমের প্রসারের কারণে রাজপরিবারের অনেক গোপন ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসতে থাকে। রানির সন্তানদের বৈবাহিক সমস্যা এবং এ–সম্পর্কিত কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো গণমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নেয়। তবে এরপরও মানুষ রানির কারণে রাজপরিবারের প্রতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।
রানি কমনওয়েলথকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাঁর কাজের ওপর খুব জোর দিয়েছিলেন। কারণ, যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে কঠিন কাজ। অনেক দেশ ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। তবে কমনওয়েলথকে সত্যিকারের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন।
নব্বইয়ের দশকে কিছু সমস্যায় পড়লেও ২০০০ সালের পরে এসে রানির জনপ্রিয়তা আবার বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর শাসনকালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকেন। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনে খ্রিষ্টান হিসেবেই তাঁর বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন রানি।
তবে চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান হিসেবে ভূমিকায় থাকলেও রানি এলিজাবেথ সব ধর্মের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান রানি হলেও যুক্তরাজ্যের সরকারব্যবস্থার প্রধান প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৭০ বছরের শাসনামলে যুক্তরাজ্য ১৬ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।
বিশ্ববাসীর কাছে রানি ছিলেন বিপুল সম্মানের পাত্র। যে দেশে তিনি সফরে গেছেন, সেখানেই পেয়েছেন রাজকীয় সম্ভাষণ। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর লন্ডন থেকে অনেক দূরে স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ারের বালমোরাল প্যালেসে মৃত্যুবরণ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।
মৃত্যুর পরদিন থেকে টানা ১০ দিনের জাতীয় শোক পালন শেষে তাঁকে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে ও রাজকীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
৭০ বছর আগে যে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর অভিষেক, সেখানেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানির কফিন রাখা হয়েছিল তাঁর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
তথ্যসূত্র: স্কাই নিউজ, এএফপি, বিবিসি
![]() |
| রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...








