Tuesday, July 14, 2015

অসময়ের হানিমুন! by আসিফ নজরুল

হানিমুনের বাংলা প্রতিশব্দ মধুচন্দ্রিমা। একান্তে সময় কাটানোর জন্য নবদম্পতির কাছে হানিমুন পরম প্রত্যাশিত কিছু। হানিমুনের ধারণা এসেছে পশ্চিমা সভ্যতা থেকে। এ দেশে উচ্চবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের মধ্যেও হানিমুনের প্রসার বাড়ছে এখন। বেড়েছে বিভিন্ন পরিস্থিতি বোঝাতে হানিমুন শব্দের ব্যবহারও। যেমন: কোনো নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম কয়েক মাসকে অভিহিত করা হয় হানিমুন পিরিয়ড হিসেবে। এ সময় সরকারকে সমালোচনার তির থেকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়, কিছুটা সময় দেওয়া হয় সব গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকে সবাই, এমনকি নির্বাচনে পরাজিত বিরোধী দলও।
হানিমুন পিরিয়ড ভোগ করার সুযোগ তাই বলে সব সরকারের হয় না। বিশেষ করে অতিবিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ী দলের তো নয়ই। ১৯৯৬ সালে এমন একটি নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পরদিন থেকে দেশ অচল করে দেওয়ার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। ১৯৮৮ সালে একতরফা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির বিজয়ের কিছুদিন পর একই অবস্থার সৃষ্টি করে অন্য তিনটি বড় রাজনৈতিক দল। সেদিক থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ ছিল অনেক ভাগ্যবান। এই নির্বাচন আরও একতরফা এবং আরও বেশি বিতর্কিত হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে ছয় মাস হানিমুন পিরিয়ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বসে বিএনপি।
রাজনৈতিকভাবে হানিমুন পিরিয়ডের মানে হতে পারে জবাবদিহিহীন থাকা। সেই অর্থে ২০১৫ সালের মধ্যভাগে এসে আওয়ামী লীগ সরকার আবারও এক হানিমুন পিরিয়ড ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। তবে এবারের হানিমুন একটু ভিন্ন। এই হানিমুন এসেছে অসময়ে, এটি হাসিমুখে বা সন্তুষ্টচিত্তে সরকারকে দেওয়া হয়নি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক মহলগুলোকে শক্তিমত্তা দেখিয়ে দমন করে, ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে এমন মহলগুলোকে নানান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বশীভূত করে এবং আমজনতাকে বিভিন্ন প্রচারণা-অপপ্রচারণা চালিয়ে হতোদ্যম করে সরকার এই হানিমুন পিরিয়ড সৃষ্টি করে নিয়েছে।
এমনই নিরুপদ্রব এই হানিমুন যে আওয়ামী লীগকে এখন তো বটেই, অদূর ভবিষ্যতে কোনো জবাবদিহির যন্ত্রণায় আর পড়তে হবে বলে মনে হচ্ছে না। এমন যন্ত্রণায় ফেলতে পারার মতো কোনো প্রকৃত বিরোধী দল এখন আর সংসদে নেই। যারা আছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল দেশি-বিদেশি শক্তির ধমক খেয়ে। তারা এখন সরকারকে যতটা ধমক দিতে পারে, তারচেয়ে বেশি ধমক দেয় সরকারের প্রতিপক্ষদের, কখনো নিজেরা নিজেদের।
আসল ‘বিরোধী দল’ যারা, তাদের বিশ্বাস ছিল, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা জিতবে তাতে। নির্বাচন না ঠেকাতে পেরে, নির্বাচনে না অংশ নিয়ে আম-ছালা দুটোই আপাতত হারিয়ে তারা আজ সংসদ থেকেই নির্বাসিত। রাজপথে আন্দোলন করার অনুমতি নেই তাদের, পেট্রলবোমার কালিমা গায়ে লাগার পর সরকারকে এই অনুমতি দিতে বাধ্য করার মতো তেমন শক্তিও নেই তাদের। তাদের নেতা-সংগঠক-কর্মী-মিত্রদের একাংশ জর্জরিত মৃত্যুদণ্ড বা কারাদণ্ডের আশঙ্কায়, আরেক অংশ সন্ত্রস্ত ক্রসফায়ার বা গুমের ভয়ে। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে যারা স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে মেয়র বা কাউন্সিলর হয়েছিলেন, আইনি মারপ্যাঁচে তাঁদের অনেকের পদ কেড়ে নিয়ে নিক্ষেপ করা হয়েছে কারাগারে। তাঁদের কর্মী বা ছোট নেতাদের বিরাট একটি অংশও কারাগারে বা আত্মগোপনে বা অগণিত মামলার বেড়াজালে। আগামী শীতে তো দূরের কথা, আগামী আরও অনেক শীতে রাজপথ গরম করার যথেষ্ট সামর্থ্য তাদের আছে কি না সন্দেহ!
বাকি থাকে জবাবদিহির জন্য জনগণের অর্থে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সাংবিধানিক ও আইনসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। সরকার বাড়াবাড়ি করলে, নাগরিক অধিকার হরণ করলে, গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের টুঁটি চেপে ধরলে সরকারকে লাগামের মধ্যে রাখার দায়িত্ব সংসদীয় কমিটি, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু রাষ্ট্রের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখন বরং নিবেদিত সরকারের শক্তিমত্তা রক্ষা ও বৃদ্ধিতে কিংবা বিরোধী দলগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করার কাজে। রাষ্ট্রের পুলিশ-র্যা ব ব্যস্ত সরকারের ক্যাডারের ভূমিকা নিয়ে জনগণকে চোখ রাঙানোর কাজে। যে বিজিবির কাজ সীমান্তের সম্মান আর মর্যাদা রক্ষা করা, সেখানে নতকণ্ঠ থেকে তারা বরং গর্জে ওঠে রাজধানী আর দেশের ভেতরের বড় শহরের আন্দোলনের বিরুদ্ধে।
সুষ্ঠু নির্বাচন আর সুশাসন দিতে ব্যর্থ হলে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নাগরিক সমাজেরও। এদের একাংশ ব্যস্ত সরকারের সব কর্মকাণ্ডের গুণকীর্তনে, সরকারের অনুগ্রহ ও সুবিধা লাভের আশায় বা তা ভোগের আনন্দে। এদের কেউ কেউ ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে সহনীয় করার লক্ষ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন, প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব এবং নিরন্তর জবাবদিহি ছাড়াই উন্নয়ন, এমনকি গণতন্ত্র পর্যন্ত সম্ভব—এমন মহা আবিষ্কার দেশের মানুষকে শোনাতে মগ্ন। কেউ কেউ কম গণতন্ত্রই দেশের জন্য মঙ্গলজনক—এমন বাণী প্রচারে নিবেদিত। নাগরিক সমাজের আরেক অংশ ব্যস্ত বিরোধী দলের টিমটিমে বাতি বহনে। এই বাতি যত টিমটিমে হচ্ছে, ততই তারা দলছুট বা মৃদুকণ্ঠ হচ্ছে, হচ্ছে দলকানা তর্কে অপাঙ্ক্তেয়। সরকারের কাছে কোনো কিছুর জবাব চাওয়ার নৈতিক সাহস ও জোরালো কণ্ঠস্বর—দুটোই তারা হারাচ্ছে দিনকে দিন।
নাগরিক সমাজের অবশিষ্ট অংশ হতবুদ্ধ নানান ভোগান্তি ও হয়রানির আশঙ্কায়। এঁদের কেউ কেউ এক-এগারো সরকারের গন্ধ গায়ে মেখে ম্রিয়মাণ, কেউ কেউ সরকার পরিবর্তন হলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনায় সন্দিহান, কেউ কেউ সরকারের কড়া চাবুকের ভয়ে কম্পমান। আমেরিকা আর ইউরোপকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-সহযোগীদের প্রিয়পাত্র হিসেবে পরিচিত এই ‘নাগরিক সমাজের’ দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন-সহযোগীদের ভূমিকাও এখন মৃদু, অনুল্লেখ্য এবং অকার্যকর। এই ‘সহযোগীরা’ নামকাওয়াস্তে কিছু বিবৃতি-বক্তব্য প্রদান করে সরকারকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার-বিষয়ক কিছু দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আবার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য বিরোধী দলের ততোধিক সমালোচনা করে সরকারকে নিঃশঙ্ক রাখছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একচেটিয়া অভিভাবকত্বও এঁরা সম্ভবত মেনে নিয়েছেন।
সরকারের তাই জয়জয়কার সর্বত্র। কোথাও কেউ নেই জবাব চাওয়ার, প্রশ্নবিদ্ধ করার, জনরায়ের সামনে ফেলার। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আদৌ বৈধতা আছে কি না, এই সরকার আদৌ জনগণের সম্মতির সরকার কি না, সেই প্রশ্ন তোলার মতো কোনো জোরালো শক্তি আর নেই দেশে। দলীয়করণ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হলে প্রতিকার পাওয়ার শক্তিশালী কোনো সম্ভাবনা নেই কোথাও। ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বহু কিছু উজাড় করে দেওয়ার অভিযোগ থাকলে এর জবাব চাওয়ার জায়গা নেই কোথাও। কিছুটা সমালোচনা করার অধিকার হয়তো আছে এখনো কোথাও কোথাও। কিন্তু সমালোচনা একটু এদিক-সেদিক হলে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বা রাষ্ট্রদ্রোহী বা মান হননকারী বা অবমাননাকারী হিসেবে হেনস্তা হওয়ার ভয়। আছে সরকারের রোষানলে জীবন-জীবিকা বা সুখ-শান্তি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা।
এমন হানিমুন পিরিয়ড বহু বছর অভাবনীয় ছিল নব্বই-পরবর্তী সময়ে। এখন এটাই বাস্তবতা। এই হানিমুন সরকারের লোকদের জন্য অপার আনন্দ আর উপভোগের কারণ হতে পারে। কিন্তু জবাবদিহিহীন এবং চ্যালেঞ্জহীন একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগের বর্তমান সময় দীর্ঘায়িত হলে সর্বনাশ হতে পারে সাধারণ মানুষের আর দেশের।
সরকার যখন এমন জবাবদিহিহীন থাকে, তখন প্রহসনমূলক নির্বাচন আবারও অনুষ্ঠানের দম্ভ দেখানো যায়, খুন-খারাবি-দুর্নীতি করেও ক্ষমতার দাপট দেখানো যায়, ইয়াবা-মাদক-মানব পাচারকারী হয়েও আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো যায়, শেয়ারবাজার আর ব্যাংকের সাধারণ মানুষের টাকা লুট করে তাদের ভাগ্যবিধাতা হওয়া যায়, সরকারি চাকরি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ থেকে মেধাবী তরুণদের হটিয়ে দিয়ে দলের ক্যাডারদের অভিষিক্ত করা যায়, ক্ষমতায় নিরাপদে থাকার জন্য দেশের বন-জলাভূমি আর সম্পদ দেশি-বিদেশি লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়। সরকার এমন জবাবদিহিহীন থাকলে তরুণদের স্বপ্ন চুরি হয়, সাধারণ মানুষের দুঃস্বপ্ন দীর্ঘায়িত হয়, দেশে অরাজকতা, অশান্তি আর অস্বস্তি বৃদ্ধি পায়, উন্নয়নের ফসল অল্প কিছু মানুষের করায়ত্ত হয়।
জনগণের প্রকৃত সম্মতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হলে সরকারের জবাবদিহি থাকে না। জবাবদিহি না থাকলে বা সুশাসনে ব্যর্থ হলে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় না থাকলে, সরকার গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, ন্যায়বিচার আর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হয় না।
আমরা রক্তস্নাত একটি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এসব লক্ষ্য অর্জন করার জন্যই। আরব, লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার কোনো দেশের মতো বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মহিমান্বিত রজনী শবে কদর by মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

গুটিয়া মসজিদ, বরিশাল
পবিত্র রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো শবে কদর। মহানবী (সা.) বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে; তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি: ৩৪)। রমজানুল মোবারকের রাতসমূহের মধ্যে একটি রাতকে শবে কদর বলা হয়, যা খুবই বরকত ও মঙ্গলের রাত। কোরআন পাকে একে হাজার মাস হতে উত্তম বলা হয়েছে। হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। ভাগ্যবান ওই ব্যক্তি, যার এই রাতের ইবাদত নছিব হয়।
বছরে একটি রাত শবে কদর; রমজান মাস সেরা মাস, তাই শবে কদর রমজান মাসে হবে এটাই স্বাভাবিক; শেষ দশকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল; বিজোড় রাতগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ। শবে কদর পাওয়ার জন্য প্রিয় নবী (সা.) ইতিকাফ করতেন এবং করতে বলেছেন। প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করবে; তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি: ৩৬)।
কোরআনুল কারিমে আরও এসেছে: শপথ সুস্পস্ট কিতাবের। আমি তো নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; আমি তো সতর্ককারী। যাতে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এ নির্দেশ আমার তরফ থেকে, নিশ্চয় আমিই রাসুল পাঠিয়ে থাকি। এ হলো আপনার প্রভুর দয়া, নিশ্চয় তিনি সব শোনেন এবং সব জানেন। তিনি নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডল এবং এ উভয়ের মাঝে যা আছে সেসবের রব। যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস কর; তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনিই তোমাদের পরওয়ারদেগার আর তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও। তবু তারা সংশয়ে রঙ্গ করে। তবে অপেক্ষা করো সেই দিনের, যেদিন আকাশ সুস্পষ্টভাবে ধূম্রাচ্ছন্ন হবে। (সূরা দুখান, আয়াত: ২-১০)।
শবে কদর নামের তাত্পর্য:
আরবিতে লাইলাতুল কদরের অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রাত, ভাগ্য রজনী মহিমান্বিত রজনী। ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্যসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এটি শবে কদর নামেই সমধিক পরিচিত।
এ রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সূরা কদর নামে স্বতন্ত্র একটি সূরাও আছে। সুরাটির সারসংক্ষেপ হলো: ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কি জানো? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ হজরত আনাছ (রা.) হতে বর্ণিত হুজুর (সা.) ইরশাদ করেন: শবে কদর একমাত্র আমার উম্মতকে দেওয়া হয়েছে, অন্য কোনো উম্মতকে নয়। (মুসলিম, দুররে মানছূরে)
যেভাবে এল শবে কদর:
পূর্ববর্তী উম্মতগণ দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণে বেশি বেশি ইবাদত করতে পারতেন। আখেরি নবীর উম্মত স্বল্পায়ু হওয়ার কারণে বেশি ইবাদত হতে বঞ্চিত ছিল। তাই আল্লাহ পাক দয়া করে এই রাতটি উম্মাতে মুহাম্মদিকে উপহার দিলেন। অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, মহানবী (সা.) একদিন বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তির হাজার মাস জিহাদে কাটানোর কথা সাহাবাদের নিকট উল্লেখ করেন, এতে সাহাবায়ে কেরামের ঈর্ষা হয়। তখন আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা কদর নাজিলের মাধ্যমে শবে কদর দান করে তাঁদের সান্ত্বনা দেন। সূরা কদরের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: শবে কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যার অর্থ হলো, এ রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের সমতুল্য। রাসুল (সা.) বলেন: তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় তারিখে শবে কদর খোঁজ করো। (বুখারি)।
যদি কোনো ভাগ্যবানের একটি রাতও নছিব হয়ে যায়, আর এ রাতটি ইবাদতে কাটায়, তবে যেন ৮৩ বছর ৪ মাসের অধিক কাল ইবাদতের ছওয়াব পাবে।
হুজুর পাক (সা.) বনী ইসরাঈলের চার নবী আইয়ূব (আ.), যাকারিয়া (আ.), হিযকিল (আ.), ইউশা (আ.)-এর আলোচনা করলেন। তাঁরা একেকজন ৮০ বছর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন এবং এক পলকের জন্যও আল্লাহর নাফরমানি করেননি। সাহাবাগণ আশ্চর্য হলে তখন হজরত জিবরাইল (আ.) উপস্থিত হন এবং সূরা কদর শোনান। উম্মাতে মুহাম্মদির জন্য এটি আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিয়ামত। এ রাত আল্লাহরই দান, আর এতে আমল করাও তাঁরই তাওফিকে লাভ হয়ে থাকে।
শবে কদরের তারিখ নির্ধারণ:
এই রাত নির্ধারণের ব্যাপারে হাদিস শরিফে এসেছে: একদা নবী করিম (সা.) ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে আসছিলেন, পথে দেখলেন দুজন লোক ঝগড়া করছে; তিনি বিমর্ষ হলেন। মসজিদে এসে সাহাবিদের বললেন, আমাকে শবে কদরের তারিখ জানানো হয়েছিল। আমি আসছিলাম তোমাদের তা জানাতে; কিন্তু দুই ব্যক্তির ঝগড়ার কারণে আমি তা ভুলে গেছি। তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয়, অর্থাত্ বিশ তারিখ দিবাগত (একুশ তারিখের রাত), বাইশ তারিখ দিবাগত (তেইশ তারিখের রাত), চব্বিশ তারিখ দিবাগত (পঁচিশ তারিখের রাত), ছাব্বিশ তারিখ দিবাগত (সাতাশ তারিখের রাত), আটাশ তারিখ দিবাগত (উনত্রিশ তারিখের রাত) শবে কদর সন্ধান করো। (মুসলিম)। বুজুর্গানদের অনেকেই ছাব্বিশ তারিখ দিবাগত (সাতাশ তারিখের) রাতকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে শবে কদর প্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিরাপদ পন্থা হলো ইতিকাফ করা।
শবে কদরে করণীয় আমলসমূহ:
এ রাতে ইবাদত করলে আল্লাহ পাক বান্দার ইবাদতে বরকত দান করেন, রহমত ও বরকত নাজিল করেন এবং বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। এ রাতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের উদ্দেশে বলেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কোনো রিজিক অন্বেষণকারী? আমি তাকে রিজিক দান করব। আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দেব। আছে কি কেউ রোগাক্রান্ত? আমি তাকে সুস্থ করে দেব। কার কী অভাব? আমি দূর করে দেব; কার কী প্রয়োজন? আমি তা পূর্ণ করে দেব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। (ইবনে মাজাহ: খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা: ৩৭৮)।
বরকতপূর্ণ এই রজনীতে অধিক পরিমাণে তওবা-ইস্তিগফার, দোয়া ও জিকির-আসকার করা, নফল নামাজ ও তাসবিহ-তাহলিল পড়া দরকার। আল্লাহর কাছে পার্থিব ও পরকালীন সুখ-শান্তি চাওয়া এবং সার্বিক সফলতার জন্য কান্নাকাটির মাধ্যমে রাত কাটানো শ্রেয়। এ ছাড়া আছে নফল নামাজ (আউওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, ছলাতুত তাছবিহ, তওবার নামাজ ও অন্যান্য নফল নামাজ) পড়া; কিরাআত ও রুকু-সিজদা দীর্ঘ করা; কোরআন শরিফ (সূরা কদর, সূরা দুখান ও অন্যান্য ফজিলতের সূরাসমূহ) তিলাওয়াত করা; দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়া; তওবা-ইস্তিগফার বেশি করা; দোয়া-কালাম, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আসকার ইত্যাদি করা; কবর জিয়ারত করা; নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মুমিন-মুসলমানের জন্য দোয়া করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা।
নবী করিম (সা.) বলেন: আল্লাহ তাআলা এ রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস-৫৬৬৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস-১৩৯০)। আল্লাহ তাআলা এ রাতে বিদ্বেষ পোষণকারী ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকারী ছাড়া বাকি সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৭৬)। আল্লাহ তাআলা মুশরিক ও ব্যভিচারিণী ছাড়া সবার চাওয়া পূরণ করে থাকেন। (শুআবুল ইমান, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩৮৩)। যখন এ রাত আসে, তখন আল্লাহ তাআলা মাখলুকাতের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান; মুমিনদের ক্ষমা করে দেন, কাফিরদের ফিরে আসার সুযোগ দেন এবং হিংসুকদের হিংসা পরিত্যাগ ছাড়া ক্ষমা করেন না। (কিতাবুস সন্নাহ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩৮২)। তওবার মাধ্যমে সব পাপ মাফ পাওয়া যায়।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি।

লাইলাতুল কদরের তাত্পর্য by সাইয়্যিদ জুলফিকার জহুর

সময়ের নাম হায়াত, সময়েরই নাম ইতিহাস। সময়েরই নাম যুগ এবং যুগ সন্ধিক্ষণ। এমনই এক খণ্ড সময়ের নাম বছর এবং বছরেরই একাংশের নাম মাস এবং এমনই একটি মাসের নাম রমজান। রমজান তো সেই মাস, যার শেষাংশে রয়েছে কদরের রাত এবং কদরের রাতের মধ্যে রয়েছে এক সুপ্ত সফলতা, যার মধ্যে লুকায়িত হাজার মাস—৮৩ বছরের ইবাদতময় সফলতা। এখন তো সেই সময়, সেই এক হাজার মাস কোলে করে ঘুমিয়ে থাকা ঘুমন্ত মর্যাদাময় রাতের প্রতীক্ষাপর্ব। যে রাত ঘুমানোর জন্য বেছে নেয় আলসে ও অজ্ঞ হতভাগা মানুষেরা। অথচ জেগে থাকেন সব ফেরেশতা এবং ফেরেশতাদের আমির জিবরাইল (আ.)-এর নেতৃত্বে শান্তির বার্তা নিয়ে ঘোরে শান্তিময় ভবিষ্যত্ ও শান্তি আলয় দারুস সালামের প্রবেশাধিকারপ্রাপ্তির প্রত্যাশা বিতরণ করে চলে সারা রাত এবং ফজর পর্যন্ত। এমনই দিনে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ক্ষমার আভাসে বলে উঠতেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন কারিম; তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।’ আপনিই সেই সত্তা, যে ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতঃপর ক্ষমা করেন, হে মহান ক্ষমাশীল। (জামেউত তিরমিজি: ৩৫-১৩)।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) জেগে থাকতেন রাতের প্রতিটি প্রহরে, প্রতি বেজোড় রাতের গভীরতা ও পবিত্রতা মাপতেন লাইলাতুল কদরের পরম নিক্তিতে। কেনই-বা তিনি তা করবেন না! কুদরতি কৌতূহলে তাঁকেই তো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘আপনি কি জানেন, কদরের রাত্রি কি?
হয়তো আল্লাহর রাসুল তাঁর বিনীত উত্তরে বলেছিলেন, আল্লাহই ভালো জানেন। অতঃপর আল্লাহ বলেছিলেন, এই সেই রাত, যে রাতের গর্ভে লুকিয়ে থাকে ৮৩ বছর ৪ মাস। রমজানে কেউ যদি এ রাতে জেগে রয়, কেউ যদি কেঁদে ফেলে, কেউ যদি ক্ষমা চায়, কেউ যদি তাকওয়া-তাড়িত হয়ে সিজদায় পড়ে রয়; সে এক রাতে এবাদতে পূর্ণ ৮৩ বছরের হায়াতসমৃদ্ধ হবে। জীবনের পবিত্র প্রবৃদ্ধি এর থেকে বেশি আর কীই-বা হতে পারে?
কদরের পার্থক্য ও পরিচিতি:
কদরের রাত যদিও তার আঁধার, অবয়ব, প্রহরের প্রেক্ষাপট সন্ধ্যা ও সুবহে সাদিক একই রকম; তবু এর ভাবগাম্ভীর্য আলাদা, আলাদা এর অভ্যন্তর ভাগের দীপ্তি ও মহত্ত্ব। তেমনি ব্যতিক্রম হতে পারে এর আবহাওয়া এবং সুবহে সাদিক তো মালাইকা কুলের ফিরতি প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে। উলম্বিত উচ্চতা ও অভিনব মর্যাদা লাভ করতে পারে। কুরআনিক মর্যাদার কারণে যেমন কদর মহিমাপূর্ণ, তেমনি কদরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোরআনও মহিমাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুদরতি রহস্যে ঘেরা এ রাত যেমন উম্মতে মুহাম্মদির হায়াতে তৈয়্যবা বৃদ্ধি ঘটিয়েছে, তেমনি গাফেলরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরাসরি।
এ রাত প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিতও বটে:
এর প্রকাশিত প্রেক্ষাপট যেমন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে আকর্ষণ ও আবেগ সৃষ্টি করে, তেমনি এ রাতের টানেই রাত জেগে রয়—রাতের পাহারায় কাটে ১০ দিন ১০ রাত্রি। আবেগ ভুলে যায় তার সাময়িক সংসার, ঈদের শপিং ও বাস্তবিক ব্যবসায়িক ব্যস্ততা। এ কারণেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ রাতের আবেগে ঘর ছেড়ে মসজিদমুখী হতেন। এ রাতের পাহারায় জেগে থাকতেন সম্ভাব্য রাতগুলো। ইতিকাফে খুব যত্ন করে মগ্ন থাকতেন জিকির ও সালাতে। রাতের আঁধারে এসে এ রাত যেন আঁধারেই হারিয়ে না যায়। এ রাত প্রাপ্তির আভাস পেয়েই হজরত মুহাম্মদ (সা.) অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন বেজোড় রাতগুলোয় পূর্ণ জাগরণের।
বরাদ্দ ও বিধানের প্রেক্ষাপটে কদরের রাত্রি
‘ফিহা ইয়ুফরকু কুল্ল আমরিন হাকিম। আমরাম মিন ইনদিনা ইন্না কুন্না মুরসিলিন।’ (দুখান: ২-৩)। এই সেই রাত, যার অভ্যন্তরে রয়েছে বিধান বিতরণের প্রেক্ষাপট। আমারই কাছ থেকে বিধানাবলি আমিই প্রেরণ করে থাকি। তাই এ রাত কেবলি প্রতীকী মর্যাদায় মহিমান্বিত নয় বরং আল্লাহর দাপ্তরিক কর্মসূচি ও বরাদ্দের কারণেও অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই প্রান্তিক পবিত্রতা ও প্রক্রিয়ায় মালাইকা কুলের ব্যস্ততা যে ব্যাপ্তি ধারণ করে ও জ্যোতি ছড়ায়, তা সর্বাবস্থায়ই তুলনাহীন। এ রাত ধারণ ও বরণের একমাত্র পথ। রাতের পাহারায় রাত জাগরণ, সিজদা বহরের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া; আর এর শিক্ষা ধারণ করাটাই সারা জীবনের জন্যই পরম পাথেয়।
মওলানা সাইয়্যিদ জুলফিকার জহুর: খতিব, মসজিদুত তাকওয়া, ধানমন্ডি, ঢাকা এবং স্থপতি।

এনডিবি যেন নতুন বিশ্বব্যাংক না হয় by মুহাম্মদ ইউনূস

গত সপ্তাহে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের বার্ষিক সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম আগামী বছর শুরু হবে। ব্যাংকটির প্রাথমিক পুঁজির পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার, ব্রিকসের সদস্যদেশসহ অন্যান্য দেশের অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন খাতে ব্যাংকটি বিনিয়োগ করবে।
স্পষ্টতই আমাদের কথা হচ্ছে, ব্রিকস যেন নতুন বিশ্বব্যাংক না হয়। বিশ্বব্যাংকও এসব দেশগুলোতে একই রকম প্রকল্পে বিনিয়োগ করে থাকে, তাদের হাতিয়ার আর মনোভাবও একই রকম। এই নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক যেন উদীয়মান দেশগুলোর আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক না হয়ে ওঠে, এটি প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য যেন থাকে।
সম্পূর্ণ নতুন উদ্দেশ্যে এনডিবি গঠন করা উচিত, নতুন কৌশলের মাধ্যমে যেন তা বাস্তবায়ন করা হয়। বিশ্বব্যাংক ও তার কাজ একই রকম, ফলে সে সহজেই একই কাতারে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই এনডিবিকে সেটা রোধ করতে হবে।
আমি এনডিবির জন্য তিনটি মুখ্য উদ্দেশ্য প্রস্তাব করছি, এগুলোকে আমি বৈশ্বিক পরিসরে প্রাসঙ্গিক মনে করি। এনডিবির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, ২০৫০ সালের মধ্যে তিনটি ক্ষেত্রে শূন্য অর্জন করা: দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বনশূন্য বিশ্ব নিশ্চিত করা। প্রতিবছর ব্রিকস এসব ক্ষেত্রে কী অগ্রগতি অর্জন করল, এনডিবি তা নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে।
চার কৌশল
এই লক্ষ্য অর্জন করতে এনডিবি চারটি মৌলিক কৌশল ব্যবহার করতে পারে। প্রথম কৌশল হতে পারে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও অঙ্গীকারের দিগন্ত অবারিত করা। ব্রিকস যদি তরুণদের শক্তিকে একত্র করতে পারে, তাহলে লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে।
দ্বিতীয় কৌশল হতে পারে এ রকম: মানবীয় সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন রীতি প্রবর্তন। বর্তমানে প্রযুক্তি টাকাওয়ালা ও যুদ্ধবাজদের দখলে রয়েছে। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকা উচিত, যারা সামাজিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। আজকে তারা অদৃশ্য, তারুণ্যের শক্তির সঙ্গে প্রযুক্তির যোগ হলে এক অটল শক্তির সৃষ্টি হবে, যাকে কেউ নাড়াতে পারবে না।
এর মধ্য দিয়ে আমরা তৃতীয় কৌশলের দ্বারপ্রান্তে চলে আসি: দীর্ঘমেয়াদি জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যা নিরসনে তরুণদের সৃজনশীলতার শক্তিকে একত্র করা, যার মাধ্যম হবে সামাজিক ব্যবসা।
সামাজিক ব্যবসা এক নতুন ধরনের উদ্যোগ, মুনাফা সৃষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। এই ব্যবসা একটি লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে লভ্যাংশবিহীন কোম্পানিগুলো শুধু মানবীয় সমস্যা নিরসনে নিয়োজিত থাকে। কোম্পানি মুনাফা করার পর বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বিনিয়োগ তুলে নেয়, কিন্তু তারপর সেখান থেকে তারা মুনাফা নেয় না। যে অতিরিক্ত মুনাফা সৃষ্টি হয়, তা ব্যবসার সম্প্রসারণ ও উন্নতিতে ব্যয় করা হয়।
প্রথাগত ব্যবসা সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অন্যান্য অংশীজন যেমন রাষ্ট্র ও বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান টেকসই হয় না, সেগুলোর দক্ষতার ঘাটতি থাকে। সামাজিক ব্যবসা টেকসই, দক্ষ, অনুসরণযোগ্য, এই ব্যবসা হস্তান্তরযোগ্য। ফলে সেটা অনেক কার্যকর হতে পারে।
সারা বিশ্বেই এই ধরনের ব্যবসার যে সৃষ্টি ও প্রচার হয়েছে, তার ফলাফলও এসেছে দারুণ। আমি বিশ্বাস করি, এনডিবির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতি প্যাকেজের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত এই সামাজিক ব্যবসা। এটা এমন এক মডেল, যা খুব সহজেই বিভিন্ন স্থানে অনুসরণ করা যায়।
সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। বেকারত্ব হলো মানবজাতি সম্পর্কে ভুল ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ফসল। মানুষের ধর্ম চাকরি খোঁজা নয়, সে জন্মগতভাবে উদ্যোক্তা। উদ্যোগের ব্যাপারটা মানুষের ডিএনএতেই আছে। মানুষ স্বভাবগতভাবে খুবই আগ্রাসী উদ্যোক্তা, সমস্যার সমাধানকারী। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে বেকার মানুষেরা উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারে, বাংলাদেশে আমরা সে কাজটি করছি। এনডিবি সেটাকে তাদের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এনডিবি অর্থায়ন ও সামাজিক ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলে যে তরুণ, বৃদ্ধ, পুরুষ-নারী, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ব্যবসার চিন্তা আছে, তারা সবাই এর প্রতি আকৃষ্ট হবে। এর ফলে যারা প্রথাগত ব্যবসা করছে, তারাও মূল ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসা করতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।
এনডিবি স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দেশীয় পর্যায়ে সামাজিক ব্যবসার তহবিল তৈরি করতে পারে। এটা প্রাদেশিক পর্যায়ে সামাজিক ব্যবসার তহবিল তৈরি করতে পারে, যেখানে তার ইকুইটি হবে কম, আর স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের ইকুইটি হবে বেশি।
আর সামাজিক ব্যবসার মধ্য দিয়ে দরিদ্রদের জন্য আর্থিক ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।
সামাজিক ব্যবসার মালিকানা
এনডিবি অবকাঠামোগত অনেক প্রকল্প হাতে নেবে, এর সঙ্গে তাকে সেগুলোর মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারেও ঐকান্তিক মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে আমরা দেখছি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর মালিকানা রয়েছে টাকাওয়ালাদের হাতে। আগে এগুলো একচেটিয়াভাবে সরকারের মালিকানায় ছিল। সরকারি ও বাণিজ্যিক মালিকানার বাইরে সামাজিক ব্যবসার মালিকানাও আছে। ব্যবহারকারীদের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মালিকানা সামাজিক ব্যবসার অধীনে থাকলে তা অন্য দুটোর চেয়ে অনেক তৃপ্তিকর হবে।
শেষ কথা হলো, এনডিবির কার্যক্রমের মূল কথা হওয়া উচিত মানবাধিকার ও সুশাসন। কার্যক্রমের শুরুতে এনডিবির হাতে সুযোগ আছে, তারা সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। আর সেটার বাস্তবায়নে তারা যথাযথ কৌশলও প্রণয়ন করতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; ভারতীয় পত্রিকা দ্য হিন্দু থেকে নেওয়া
ড. মুহাম্মদ ইউনূস: শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা।

শিনজো আবে এশিয়ার দিকে ঝুঁকছেন by বিল এমোট

বিল এমোট
এক বছর ধরে পূর্ব এশিয়ার তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির দেশ অর্থাৎ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক ধীরে ও অবিরামভাবে ভালো হচ্ছে। ব্যাপারটা এ কারণে উল্লেখযোগ্য যে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অতীতে কখনোই ভালো ছিল না। ২০ শতকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ কথা বলাই যায়। দেশগুলোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিপ্রেক্ষিতেও তা সত্য।
আগামী আগস্টে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৭০ বছর পূর্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। সেই ভাষণের মাধ্যমে তিনি এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে পারেন, আবার সেটা থামিয়েও দিতে পারেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীরা বরাবরই ডানপন্থী, আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস-বিষয়ক আবের অবস্থান সংশোধনবাদী। ফলে তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের কূটনীতি নতুন করে উত্তাল হতে পারে।
আবের এটা মনে রাখা উচিত, নিজের ক্ষমতার বলে তিনি ভিন্ন ফলাফল বয়ে আনতে পারেন। যদিও ভাষণ না দেওয়াটাও বিজ্ঞ কাজ হতে পারে, তবু তিনি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাপান যে এশিয়ার ইতিবাচক শক্তি, সেই ভাবমূর্তি মানুষের মনে আরও দৃঢ় করতে পারেন। জাপান একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎমুখী দেশ, পশ্চাৎমুখী নয়, যারা বিশ্বের ও বিশেষ করে এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়—মানুষের কাছে জাপানকে এভাবে উপস্থাপন করার জন্য তাঁকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের অর্থনীতি ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ঘুরে দাঁড়ায়। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তার ইতিহাস মোকাবিলা করতে চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। আবের উচিত হবে, এই চেতনা ও কাজের উদারতাকে কেন্দ্র করেই আগস্টের বক্তৃতাটি সাজানো।
উদারতার শক্তি আছে, এর বলে নিরস্ত্রীকরণও ঘটতে পারে। ২০০৭ সালে আমি চীনের ‘মিউজিয়াম অব দ্য ওয়ার অব চায়নিজ পিপলস রেসিসট্যান্স অ্যাগেইনস্ট জাপানিজ অ্যাগ্রেশন’ নামের জাদুঘর পরিদর্শন করি। এ জাদুঘরের নাম দেখেই বোঝা যায়, সেখানে রক্ষিত অধিকাংশ নিদর্শনে কোন অনুভূতির প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে জাদুঘরের শেষ প্রদর্শিত নিদর্শনটিতে যখন দেখলাম, বিগত কয়েক দশকে চীনকে প্রদত্ত জাপানের সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ নানা বস্তু রাখা হয়েছে, তখন সেটা আমার কাছে সুখকর চমক হিসেবেই মনে হয়েছে।
গত মাসে আবে এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ফলে মনে হয়েছে, তিনি সম্পর্কোন্নয়নের কথা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যা হয়েছে সময়ের কারণে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান উভয়েই চীনা নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এ যোগ না দিয়ে ভুল করেছে। এমনকি তারা যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ যে ৫০টি দেশ এতে যোগ দিয়েছে, তাদের সমালোচনাও করেছে। এতে দুটি দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তাদের এই যোগ না দেওয়া অনেকটা অভদ্রোচিতও মনে হয়েছে। আর জাপানের বেলায় মনে হয়েছে, তারা এই বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে এআইআইবির ইটের জবাবে পাটকেল মেরেছে। বিনিয়োগের অঙ্কটা দেখেও তা-ই মনে হয়েছে। এআইআইবি যেখানে প্রাথমিকভাবে ১০০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সেখানে জাপান ১১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আবে যদি তাঁর বক্তৃতায় ডানপন্থীদের প্রশমিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে এই অঞ্চলের জাপান-বিষয়ক ধারণা আরও খারাপ হবে। তিনি যদি বক্তৃতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ না করেন বা সে সময় জাপানের ভূমিকার সমালোচনাকে প্রশ্ন করেন, তাহলে চীন ও কোরিয়া খেপে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর দ্বারা কোরীয় নারীদের যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহার করা, যাদের তারা বলত ‘কমফোর্ট উইমেন’।
এর বদলে গত এপ্রিলে আবে মার্কিন কংগ্রেসে যে বক্তৃতা করেছেন, সেখান থেকে কয়েক পাতা তিনি ধার নিতে পারেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের সময় তিনি হৃদয়ে ‘গভীর অনুশোচনা বোধ করেছেন’। তাঁদের জন্য তিনি ‘চিরন্তন শোক’ প্রকাশ করেছেন।
এশিয়ায় জাপানের ভূমিকা প্রসঙ্গে আবে অঙ্গীকার করেছেন, তিনি ‘জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন’, তাঁদের দুঃখ প্রকাশের ব্যাপারটি ছাড়া। আগস্টের বক্তৃতায় আবেকে তাঁর পূর্বসূরিদের কথা পুনর্ব্যক্ত তো করতেই হবে, এমনকি সে ক্ষেত্রে তাঁদের ছাড়িয়েও যেতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মার্কিনদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, আগস্টের বক্তব্যে সেই শব্দ ব্যবহার করলে বোঝা যাবে, জাপান ইতিহাস পুনর্লিখন করতে চায় না। আর আবে শুধু নিহত মার্কিন সেনাদের জন্যই অনুশোচনা বোধ করেন না, তাঁর এশীয় প্রতিবেশীদের প্রতিও তিনি একই রকম সহানুভূতি বোধ করেন।
সেটা হলে আবে ঘোষণা করতে পারবেন, জাপান উদার ও গঠনমূলক হতে চায়। আর সেই সুযোগে তিনি বলতে পারেন, জাপান অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে যেতে চায়। তিনি এশিয়াকে যে রূপে গড়তে চান, সে বিষয়ে কথা বলতে পারেন। আর সে ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানগুলো দরকার হবে, সেগুলো সম্পর্কেও কথা বলতে পারেন।
এই সুযোগ নেওয়ার একটা নাটকীয় পন্থা হতে পারে এ রকম: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে জাপান যে শান্তি স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, সেটার ওপর ভর করেই এশিয়ার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে জাপান প্রস্তাব দিতে পারে। এই পরিকল্পনার মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া থাকতে পারে। আর শুধু দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গেও তথ্য বিনিময়ের আয়োজন করতে পারে জাপান।
এমন প্রস্তাব একটু বেশিই সাহসী, ফলে সেটা বাস্তবায়ন করা কঠিন। সর্বোপরি এশিয়ায় তো বাস্তবে বিভাজন আছেই, এই প্রস্তাব তার বিরুদ্ধেই যাবে। কিন্তু এটা করলে জাপানের লাভ হবে। মানুষ মনে করবে, জাপান সবার জন্য শান্তি ও উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায়। ফলে জাপানের নৈতিক জায়গাটা আরও উঁচু হবে। আর সেটাই তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
বিল এমোট: দ্য ইকোনমিস্ট-এর সাবেক সম্পাদক।

ইউরোপের রঙ্গমঞ্চে ঋণ-নাটক by মনজুরুল হক

রোববারের গণভোটে গ্রিসের জনগণ পরিষ্কার যে রায় দিয়েছেন তা হলো, দেউলিয়া হয়ে পড়ার অবস্থা থেকে গ্রিসকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ লাভ করতে হলে যেসব পূর্বশর্তের উল্লেখ দাতারা করেছে, গ্রিসের কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে খেলাপি হওয়ার পথে আরও একধাপ দেশটি এখন এগিয়ে গেল। গ্রিস ইতিমধ্যে নির্ধারিত সময়সীমায় ঋণের দেড় শ কোটি ডলারের একটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে এবং দেশটির ভান্ডারে অর্থের ঘাটতি থেকে যাওয়ায় নতুন ঋণ না পেলে আগের কিস্তি পরিশোধ করা আবারও অসম্ভব হয়ে দেখা দেবে।
আমরা যারা ব্যাংকিং খাতের জটিল নানা রকম হিসাবপত্র নিয়ে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নই, তাদের কাছে গ্রিসের দাবিকে সহজেই অযৌক্তিক মনে হতে পারে। ঋণ যখন গ্রিস নিয়েছে, তখন সেই ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও দেশটির। গ্রিসও কিন্তু ঠিক সে কথাই বলছে। গ্রিসের সরকার বলছে না যে ঋণ এথেন্স পরিশোধ করবে না। তবে গ্রিসের দাবি হলো, ঋণের পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা দরকার এবং এ রকম একটি ঋণ পরিশোধব্যবস্থা ঠিক করে নেওয়া উচিত, যেটা কিনা ঋণ পরিশোধের নামে নাগরিক জীবনকে আরও বেশি অসহনীয় করে তুলবে না।
গ্রিসের কাছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জমা হওয়া ঋণের মোট পরিমাণ হচ্ছে ২৪ হাজার কোটি ইউরো। ২০০৮ সালে গ্রিস প্রথমবারের মতো আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর সংকট উত্তরণে দুই দফায় গ্রিসকে দেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণ জমা হয়ে এমন এক ঋণের ফাঁদ এখন গ্রিসের জন্য সেটা তৈরি করে দিয়েছে, যা থেকে বের হয়ে আসার কোনো পথ দেশটির সামনে খোলা রাখা হয়নি। আগের দুই দফার ঋণ অবশ্যই শর্তহীন ছিল না। ঋণ পাওয়ার জন্য দেশটিকে যেসব শর্ত হজম করে নিতে হয়, তার মধ্যে ঋণদাতাদের অত্যন্ত পছন্দনীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় সংকোচন এবং বৃদ্ধদের পেনশন ভাতা হ্রাস অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঋণদাতারা এসব শর্ত ঋণ গ্রহণকারী দেশের উপকারের কথা বিবেচনা করে নয়, বরং নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করেই আরোপ করে থাকে। যুক্তি এখানে হচ্ছে এ রকম যে সরকারের খরচ কমিয়ে আনা হলে বাড়তি যে আয় সরকারের হাতে আসবে, সেটা দিয়ে ঋণের কিস্তি সরকার পরিশোধ করতে পারবে।
অন্যদিকে আবার বিশাল অঙ্কের নতুন যে ঋণ শর্ত মেনে নেওয়া সাপেক্ষে দেওয়া হয়, তারও সিংহভাগ চলে যায় ঋণদাতাদের ব্যাংকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ বাবদ। অর্থাৎ, নতুন ঋণের বড় অংশ ঋণ গ্রহণকারী দেশ চোখে দেখারও সুযোগ পায় না, দাতাদের কাছ থেকেই সেই অর্থ বরং চলে যায় দাতাদের দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে। আগের দুই কিস্তির ঋণের ৭০ শতাংশেরও বেশি এভাবেই চলে গিয়েছিল দাতা দেশগুলোর ব্যাংকে।
সরকারের ব্যয় হ্রাসের অন্য যে প্রেসক্রিপশন দাতারা দিয়ে থাকে তা হলো, সরকারের আকার ছোট করে নেওয়া। যার অর্থ অন্য কথায় সরকারি চাকরির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা। ফলে আমরা যা দেখতে পাই তা হলো, ঋণদাতাদের আরোপিত শর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যারা হচ্ছে, তারা হলো ঋণ গ্রহণকারী দেশের প্রান্তিক জনগণ—পেনশন ভাতা কমে যাওয়া বৃদ্ধ, চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসায় বেকারত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়া তরুণ সমাজ এবং সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা থেকে বঞ্চিত সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষজন।
এসব হিসাব সামনে রেখেই জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থী নেতা অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের রাজনৈতিক দল সিরিজা জনগণের সমর্থন পেলে ঋণের শর্তাবলি পুনর্নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে দিয়েছিল। ফলে দাতারা আবারও নতুন ঋণ প্রদানের বিনিময়ে আগের একই রকমের সব শর্ত গ্রিসের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইলে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনগণের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন ঋণ প্রশ্নে জনতার রায় শোনার জন্য। ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ বলেছেন দাতাদের শর্ত মেনে নিতে তারা রাজি নন।
গ্রিস যে হচ্ছে আকণ্ঠ ঋণে জর্জরিত একটি দেশ, সেই প্রশ্নে কোনো রকম সন্দেহ একেবারেই নেই। গত দুই দশকে বছরের পর বছর ধরে ঋণের পর ঋণ গ্রিস নিয়ে গেছে এবং সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশটি যে সংকটময় পথের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, ঋণদাতাদের চোখে সেটা পড়েনি, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে তারপরও গ্রিসকে ঋণ দিতে কোনো রকম কুণ্ঠাবোধ তারা করেনি। কেন করেনি, সেই প্রশ্নও এক গোলকধাঁধার মধ্যে আমাদের ফেলে দেয়। তবে পুঁজির থলের ভেতরের খেলার দিকে নজর দিলে প্রশ্নের উত্তরও আমরা হয়তো সহজেই পেয়ে যেতে পারি।
ইউরো মুদ্রার দেশগুলোর মুদ্রা-সংকটসংক্রান্ত বিষয়াবলি সাধারণভাবে ট্রয়কা নামে পরিচিত যে তিনটি খুবই প্রভাবশালী সংগঠন দেখাশোনা করে থাকে, তারা হচ্ছে ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। কোনো একটি দেশে ঋণ কিংবা মুদ্রাসংকট দেখা দিলে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই সংকট উত্তরণের পথের সন্ধানও এরাই দেখিয়ে দেয়। প্রয়োজনে বিশাল অঙ্কের নতুন ঋণও এদের কাছ থেকে কিংবা এদের অনুমোদন সাপেক্ষে অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকে আসে। গ্রিসের সংকট যেহেতু হঠাৎ করে দেখা দেওয়া সমস্যা নয়, ফলে গ্রিসকে সংকট থেকে বের হয়ে আসার পথের দিশাও আগে থেকে এরা দেখিয়ে আসছে। তবে কথা হচ্ছে, সংকট উত্তরণে এদের সহায়তার হাত যতটা না হচ্ছে, সংকটকবলিত দেশটিকে সাহায্য করার জন্য, তার চেয়ে বেশি সেটা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে। গ্রিসকে দেওয়া আগের ঋণের হিসাব-নিকাশ সেই সত্যতার প্রমাণ সহজেই আমাদের কাছে রাখতে সক্ষম।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর গ্রিসের জন্য দুই দফায় মোট ২৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়। তবে নিঃশর্ত ঋণ তা কোনো অবস্থাতেই ছিল না। বরং শর্তের শৃঙ্খল ছিল খুবই কঠোর। ফলে বিশাল সেই পরিমাণের আর্থিক সহায়তার সিংহভাগ চলে গিয়েছিল পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংকের জমায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের আকারে। আর এটাই হচ্ছে ঋণে জর্জরিত কোনো একটি দেশকে আবারও ঋণ দেওয়ার পেছনের খেলা। ঋণের মধ্যে দিয়ে দেশটিকে সহজেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেওয়া সম্ভব বলে ঋণের অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি সেখানে থাকে কম।
গ্রিসের আগের উদ্ধার ঋণের বেলায় কিস্তি পরিশোধ ও অন্য শর্তাবলির জন্য অর্থ খরচ করার পর মোট থোকের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ সরকারের ভান্ডারে এসে জমা হয়, যেটা দিয়ে গ্রিসকে তখন আবার অসাধ্য সাধন করতে বলা হয়েছিল। সরকারের আর্থিক ভিত পোক্ত করে নিয়ে ভবিষ্যতে সংকট এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের নামে যেসব শর্ত গ্রিসের ওপর তখন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পেনশন ভাতা হ্রাস ও সরকারের নির্ধারিত সর্বনিম্ন বেতন কমানো। আগের সেই উদ্ধার পরিকল্পনার নেট ফলাফল হিসেবে গ্রিস যা পেয়েছে তা হলো, অর্থনীতি ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়ে আসা এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬০ শতাংশে বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে আগের সেসব শর্ত গ্রিসের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী আবারও নতুন আলোচনায় বসার আহ্বান ঋণদাতাদের প্রতি জানিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, আলোচনার পথ সুগম করে দিতে অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস পদত্যাগ করেছেন। দাবার পরবর্তী চাল তাই এখন দাতাদের দেওয়ার কথা।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

বাংলাদেশের রাজনীতি- হাফিংটন পোস্টের মূল্যায়ন

বাংলাদেশে ‘দুই নেত্রী’ ও তাদের দলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তা দৃশ্যত শেষ হওয়ার নয়। ২০০৮ সালে তারা গণতন্ত্রের বার্তা নিয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন, যে সরকার তাদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। গণতন্ত্রের সেই বার্তা আবারও হয়তো একবার সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত অনলাইন হাফিংটন পোস্টে এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ডমিনিক মোসবার্গেন। ‘উই নিড টু টক এবাউট বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এতে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে পড়েছে দুই শিবিরে বিভক্ত। এক শিবির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন। আরেক শিবির বিরোধীদলীয় নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন। ১৯৯১ সাল থেকে তারা দুজনেই পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দুজনেরই আছে কিছু সফলতা। দুজনের বিরুদ্ধেই আছে নির্বাচনে জালিয়াতি, দুর্নীতি ও সরকার চালাতে অক্ষমতার অভিযোগ। দুই নারীই যখন বিরোধী দলে থেকেছেন তখনই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হরতাল-অবরোধসহ সহিংস কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়েছেন। এর ফলে দেশ বারবার আপাদমস্তক বিশৃঙ্খলায় ডুবছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়স ৬৭ বছর। খালেদা জিয়ার ৬৯ বছর। তারা দলীয় কর্তৃত্বপরায়ণতা চালিয়েছেন। এতে দেশ যুদ্ধমুখী দুটি শিবিরে বিভক্ত। বাংলাদেশের অলাভজনক সংস্থা সুজনের সম্মাদক বদিউল আলম মজুমদার এ বছরের শুরুতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে হেয় করা হয়েছে এবং সুশীলসমাজ বিভক্ত হয়ে গেছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আরও গভীর হচ্ছে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, শেখ হাসিনার পিতা, আওয়ামী লীগ নেতা ও বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তার সঙ্গে যোগসূত্র ছিল খালেদা জিয়ার স্বামী ও বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। কয়েক বছর পরে জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে আরও দ্বন্দ্ব তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের জাতীয় পরিচয় নিয়ে। শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষ। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে ইসলামপন্থি ও এর সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন দলের। দুই পক্ষের মধ্যে সম্প্রতি যে সংঘাত হয়ে গেছে তা ভয়াবহ। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে এ বছরের ৫ই জানুয়ারি ওই ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্ররা বর্জন করায় ওই নির্বাচনে বিজয়ী হন শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ। কিন্তু তখন ওই নির্বাচনকে খালেদা জিয়া কলঙ্কিত, প্রহসনের নির্বাচন আখ্যা দেন। এ বছর জানুয়ারিতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার সমর্থকদের অনির্দিষ্টকালের হরতাল ও সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট পালনের নির্দেশ দেন। খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচন দেয়ার জন্য বাধ্য করার জন্য ওই হরতাল ও অবরোধ ছিল। তবে তিনি সফল হন নি। সে সময় থেকে টানা তিন মাস চলতে থাকে রাজপথের সহিংসতা। রাস্তায় বোমা হামলা করা হয়। গুলি চালানো হয়। ভয়াবহ সেই সহিংসতায় কমপক্ষে ১০০ মানুষ নিহত হন। মারাত্মক আহত হন অনেকে। আটক করা হয় বিরোধী দলের ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে। রাজনৈতিক এ অস্থিরতায় কমপক্ষে ২২০ কোটি ডলারের অর্থনীতির ক্ষতি হয় বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে যা জাতীয় প্রবৃদ্ধির শতকরা প্রায় এক ভাগ। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে হরতাল ও অবরোধ। সামপ্রতিক সময়ে তা গণতান্ত্রিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের স্থান দখল করেছে তা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সহিংসতা হয়। এতে কমপক্ষে ৫০০ মানুষ নিহত হন। রাজনৈতিক এ সহিংসতা বাংলাদেশে এতটাই প্রভাব বিস্তার করে আছে, অনেককে বলেছেন, তারা রাজনীতি থেকে দূরে সরে এসেছেন। বেছে নিয়েছেন যতটা সম্ভব সাধারণ জীবন। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ছিলেন কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘লেফট অব দ্য ডট’-এর প্রতিষ্ঠাতা জন লিওটিয়ের। তখন বাংলাদেশে দীর্ঘায়িত হরতাল চলছে। তিনি বলেছেন, তখন মনে হয়েছে সাধারণ মানুষ রাজনীতি থেকে অবসরে গেছেন। তারা হরতালে বিরক্ত। প্রতিদিন তাদের জীবনে এর যে প্রভাব পড়ছে তাতে তারা আর এটা মেনে নিতে পারছেন না। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে এই যে রাজনৈতিক লড়ই তা এ অঞ্চলের অনেক মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হালের সাউথ এশিয়া প্রজেক্টের পরিচালক প্রফেসর ভূমিকা চাকমা বলেন, দুই উত্তরাধিকার সূত্রের রাজনীতিতে যে সংঘাত তাতে এরই মধ্যে বাংলাদেশকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এতে গণতন্ত্রায়ণের ধারা পাল্টে গেছে। বাংলাদেশে ব্যক্তি রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে সহিংসতা। অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক যে অস্থিতিশীলতা তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে। এর সুবাদে কট্টরপন্থি ও অপরাধীদের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পাবে- এ নিয়ে জোরালো উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে ইসলামপন্থি উগ্র জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ বছরের শুরুর দিকে ইসলামপন্থি জঙ্গিদের হাতে নিহত হয়েছে তিন ব্লগার। বঙ্গোপসাগর দিয়ে নতুন করে অভিবাসী সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ভাগ্যবিড়ম্বিত বহু হাজার মানুষকে পাচার করে নৌপথে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা ধরা পড়েছে। এতে দেশ ও সমাজের ভঙ্গুর অবস্থার আরেকটি চিত্র ফুটে উঠেছে। তা হলো দলে দলে মানুষের দেশত্যাগ। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। বিশ্বের মধ্যে এটি সবচেয়ে ঘনবসতির অন্যতম দেশ। যদিও এর অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তথাপি এ দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি মানুষের বসবাস গ্রামে। এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বেশি রয়েছেন দারিদ্র্যে। এখানে জমি বিরল। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গিন করে তুলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিকদের ভীতিকর পরিস্থিতি, নারী, সংখ্যালঘু ও সমাজে বিপর্যয়ের মুখ থাকা মানুষগুলোর বিরুদ্ধে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সহিংসতা, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমানো মানুষের হার সব সময়ই উচ্চ। বছরে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বৈধভাবে ভাল বেতন ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় দেশ ছাড়েন। বাংলাদেশ থেকে যেসব মানুষ বিদেশে যান কাজের জন্য তার বেশির ভাগই কম দক্ষ ও মোটামুটি দক্ষ। বিশেষ করে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে যান অস্থায়ী চুক্তিতে। বিশ্বের মধ্যে অষ্টম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পায় বাংলাদেশ। সরকারি হিসাবে যে পরিমাণ মানুষের কথা বলা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ আছে দেশের বাইরে। অবৈধভাবে তারা আছে বিভিন্ন দেশে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অবশ্যই তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে এমন অবস্থা তখনই সৃষ্টি হবে যখন এখানে শান্তি ফিরবে। বাংলাদেশের দুই নেত্রী ও তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যকার বিরোধ কোন দিন মিটবে বলে মনে হয় না। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রফেসর ডেভিড লুইসের মতে, দলের ভেতর যদি গণতন্ত্র কায়েম না হয় তাহলে এর কোন পরিসমাপ্তি ঘটবে না। তা সত্ত্বেও দুপক্ষকেই হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হবে, তারা একে অন্যের সহযোগিতায় দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে সহায়তা করেছে। ২০০৮ সালে দুই নেত্রী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে একত্রিত হয়েছিলেন, যে সরকার তাদের দুজনকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আবারও হয়তো সেই পরিস্থিতি আসতে পারে।

রাজনের গায়ে ৬৪ আঘাত: মুহিত রিমান্ডে, সৌদিতে আটক কামরুল by ওয়েছ খছরু

সিলেটে নির্মম নির্যাতনে খুন হওয়া শিশু রাজনের শরীরে রয়েছে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন। আঙুল, কবজি, কনুই, হাঁটুতে আঘাতের পর আঘাত। এমনকি মাথায়ও আঘাত করা হয়। এ কারণে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা গেছে শিশু সামিউল ইসলাম রাজন। রাজনের মৃত্যুর পর ময়না তদন্তের রিপোর্টে ডাক্তাররা জানিয়েছেন এসব তথ্য। গতকাল সিলেটের জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ডাক্তারি রিপোর্টে উঠে এসেছে শিশু রাজনকে নির্যাতনের ভয়াবহতা। রাজনের শরীরের সবখানেই ছিল আঘাতের চিহ্ন। আর গোটা শরীর থেকে রক্ত ঝড়ে পড়ে। তিনি বলেন, রাজনের উপর নির্যাতন সকল বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টেও উঠে আসে নির্যাতনের ভয়াবহতা। এদিকে, রাজনের ঘটনায় ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। রোববার রাতভর পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। ভোরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে মামলার প্রধান আসামি মুহিতের তালতো ভাই ইসমাইলকে। বিশ্বনাথের লামাকাজি এলাকা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কয়েকটি টিম এক যোগে অভিযান চালাচ্ছে। অমানুষিক নির্যাতন করে শিশু রাজনকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত শেখপাড়া গ্রামের আবদুল মানিকের ছেলে মুহিত আলমের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম ২য় আদালতের বিচারক ফারহানা ইয়াসমিন এ রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। ৮ই জুলাই বুধবার সকালে বাদেআলী গ্রামের মো. আজিজুর রহমান আলমের ছেলে সামিউল আলম রাজন বাড়ি থেকে সবজি নিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে টুকের বাজারে যায়। সকাল ৮টায় তেমুখি বাইপাস সেতুর ওপর পৌঁছলে অজ্ঞাত কারণে মুহিত আলম, আলী, কামরুল, ময়না মিয়া চৌকিদারসহ ৫-৬ জন মিলে রাজনকে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করে। রাজনের মৃতদেহ গুম করার লক্ষ্যে সাদা রঙের মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৪-০৫১৬) যোগে কুমারগাঁও আবাসিক এলাকার হায়দর মিয়ার বাসার পশ্চিমে গাড়ি হতে লাশ ফেলার চেষ্টাকালে স্থানীয় লোকজন মুহিত আলমকে হাতেনাতে আটক করেন। এসময় অন্য আসামি পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে জালালাবাদ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মুহিত আলমকে গ্রেপ্তার করে এবং মৃতদেহটি থানায় নিয়ে এসে ময়না তদন্তের জন্য সিওমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেন। ওদিকে ঘটনার দুদিন পর মুহিতের ভাই কামরুল সৌদি আরব চলে যায়। গতকাল কামরুলকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীরা। ওদিকে এ ঘটনায় পুলিশের এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে মুহিত ও ময়নাকে আসামি করে মামলা করেন। পরে রাত ১১টায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও ৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে এজাহার দায়ের করেন। এদিকে, নিহতের পিতা আজিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে তার ছেলে রাজন হত্যাকারীদের রক্ষা করার জন্য একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে এবং পুলিশের সঙ্গেও সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। রাজনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ওয়াহিদুর রহমান জানান, রাজনকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পিতা আজিজুর রহমানের আইনজীবী আতিকুর রহমান তাপাদার জানান, এমন নৃশংস ঘটনা তিনি পূর্বে আর কখনও দেখেননি। ইতিপূর্বে একজন ঘাতককে আটক করা হয়েছে এবং তার ৫ দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছেন আদালত। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও  দ্রুত আটক করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। চাঞ্চল্যকর ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজনকে নির্যাতনের সময় ঘাতকরা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় তাকে বলে তোকে কিভাবে মারব বল, আমাদের সব পদ্ধতি জানা আছে। এই বলে তারা রোল দিয়ে তার পায়ে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। শিশুটির স্পর্শকাতর অঙ্গে বারবার খোঁচানো হয়েছে। রোলার দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। বন্ধ মার্কেটের একটি পিলারের সঙ্গে তাকে পিছমোড়া বেঁধে রাখা হয়। বাঁধন খুলে মাটিতে ফেলেও তাকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। টানা ২৮ মিনিটের ভিডিওটিতে দেখা গেছে নির্যাতন সইতে না পেরে শিশুটির আর্তচিৎকার। এ সময় সিনেমার দৃশ্যের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ঘাতকরা। শিশুটি পানি খাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করে। তারপরও নির্যাতনকারীদের এতটুকু দয়া হয়নি। তারা তাকে শরীরের ঘাম খেতে বলে। এর পর রাজনকে হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটতে দেয়া হয়। ঘাতকরা ভেবেছিল রাজন বুঝি হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু ভয়ে ভয়ে হাঁটতে থাকা শিশুটিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলে হাড়গোড় দেখি এখনও ঠিক আছে। আরও মারো এরপর রাজনের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আরেক দফা পেটানো হয়। এভাবে দফায় দফায় শিশুটির নখে, মাথা, পেট ও উরুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রোল দিয়ে আঘাত করা হয়। এক সময় বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়। এদিকে, রাজনের মৃত্যুর ঘটনায় রোববার তার বাইয়ারপাড়ে তার বাড়িতেই রোববার হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয়ার এ ঘটনার জন্য খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। রাজনের চাচারা জানিয়েছে, খুনিদের গ্রেপ্তার দাবিতে দুদিনের আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। তবে, একটি পক্ষ এই আন্দোলন বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।

ওদিকে রাজন হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিশ্ব মিডিয়াও সোচ্চার। লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট লিখেছে, ১৩ বছর বয়সী সামিউল আলম রাজনকে যখন একটি রিকশা চুরির অভিযোগে প্রহার করা হচ্ছিল তখন হামলাকারীরাই হাসিতে ফেটে পড়ছিল। তাকে হত্যা করে ফেসবুকে সে দৃশ্যের ভিডিও-ও প্রকাশ করে দিয়েছে তারা। এখন ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজছে পুলিশ। এরই মধ্যে একজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়েছে বুধবার। আটক করা হয়েছে আরও একজনকে। শিশুটিকে হত্যার ফুটেজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে। তাতে দেখা যায়, সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্টেশনে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে একদল মানুষ ওই শিশুটিকে প্রহার করছে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট তার নোটে লিখেছে, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পূর্ণাঙ্গ ভিডিওটি প্রচার করছে না। কারণ, তা দেখে অনেক মানুষই বিমর্ষ হয়ে পড়তে পারেন। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজনকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার হাত পেছনে নিয়ে বাঁধা। এ অবস্থায় তাকে ধাতব দণ্ড দিয়ে প্রহার করা হচ্ছে। তার চুল ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক হামলাকারী। কিন্তু ব্যথায় গড়িয়ে পড়ে রাজন। এ হত্যায় অভিযুক্ত করা হয়েছে কামরুল ইসলাম (২৪), আলী হায়দার (৩৪), ময়না মিয়া (৪৫)কে। ভারতের অনলাইন রেডিফ লিখেছে, নৃশংসভাবে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বাংলাদেশে এক শিশুকে প্রহার করা হয়েছে ৩০ মিনিট। এতে সে মারা গেছে। এই নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করে পোস্ট করা হয়েছে ফেসবুকে। তাতে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ফলে অভিযুক্তদের ধরার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। সিলেটে নারী, শিশু সহ হাজার হাজার মানুষ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন। তারা রাজনের পোস্টার উঁচু করে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে মূল দু’জন। একজন হলো ২২ বছর বয়সী মুহিত আলম। তাকে এলাকাবাসী ধরে পুলিশে দিয়েছে। সে এখন হাজতে। অনলাইন গ্লোবাল ভয়েস লিখেছে, বাংলাদেশীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকের একটি কভার। তাতে লেখা ‘আমরা ১৩ বছর বয়সী রাজন হত্যার বিচার চাই’।

আমি আবহাওয়া অফিসে চাকরি করি না -রাজনীতিতে ঝড়ের পূর্বাভাস প্রশ্নে মতিয়া

দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর যে শান্তভাব বিরাজ করছে তাতে খানিকটা স্বস্তিবোধ করছেন উদ্বিগ্ন কূটনীতিকরা। তবে এ অবস্থা কতদিন ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে চিন্তিত তারা। দীর্ঘ মেয়াদে এটি ধরে রাখার জন্য সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কি ব্যবস্থা নিচ্ছে, আদৌ কোন উদ্যোগ আছে কি-না তা জানতে চান বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা। গতকাল সরকারের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল ঢাকায় কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নেয়া জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্সের। সরকারি দলের প্রভাবশালী ওই নেত্রীর সঙ্গে এই প্রথম বৈঠক করেন জাতিসংঘ দূত। দুপুরের পর সচিবালয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কথা হয়েছে তাদের মধ্যে। সেখানে অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা হয়। জাতিসংঘ দূত সিটি নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক  পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে এ পরিস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের কোন ঝড়ের পূর্বাভাস কি-না সেটি জানতে চান তিনি। পোড় খাওয়া রাজনীতিক মতিয়া চৌধুরী অবশ্য প্রসঙ্গটি বেশিদূর এগুতে দেননি। ইউএনডিপি দূতের জিজ্ঞাসার জবাবে মন্ত্রী বলেন, তিনি আবহাওয়া অফিসে চাকরি করেন না বিধায় এটি ঝড়ের কোন পূর্বাভাস কি-না সে সম্পর্কে বলতে পারছেন না। বৈঠক শেষে মতিয়া চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ‘তিনি জানতে চেয়েছেন বর্তমান শান্ত পরিস্থিতি রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝড়ের কোন পূর্বাভাস কিনা। আমি তাকে বলেছি আমি আবহাওয়া অফিসে চাকরি করি না।’ তার সঙ্গে কি কি বিষয়ে কথা হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমি তাকে বলেছি আপনারা যদি বিএনপির বন্ধু হয়ে থাকেন, তা হলে বিএনপি নেত্রীকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে বলুন। সেখানে মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে কথা হয়েছে। মতিয়া চৌধুরী বলেন, দুনিয়ার কোন দেশে কত বয়সে বিয়ে হয়, তার তথ্য-উপাত্ত আমি তাকে সরবরাহ করেছি। বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ১৬ বছরে মেয়ে বিয়ে দেয়ার যে বিধান রয়েছে সেটি তুলে ধরেছি। উল্লেখ্য, গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদুনও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত ভাব নিয়ে কথা বলেছেন। এই অবস্থাকে ভঙ্গুর বলে মন্তব্য করে তিনি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান প্রত্যাশা করেছেন।

সরকারি অর্থের নয়ছয় by রোকনুজ্জামান পিয়াস

সরঞ্জাম আছে, কিন্তু প্রয়োজন নেই। আবার কিছু কিছুর প্রয়োজন থাকলেও ব্যবহার করার মতো দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর। কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব সরঞ্জাম এখন অনেকটাই অকেজো। কোনটি কেনার পর থেকেই অব্যবহৃত, কোনটি একবার ব্যবহারের পরই অকেজো। আবার কোনটি ক্রয়ের পর থেকেই নিয়মিত মেরামত করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ, এসব সরঞ্জাম কিনে শুধু তালিকা-ই দীর্ঘ করা হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। এমনকি ওয়ার্ডগুলোতে লাগানো এসিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। সিলিং ফ্যানগুলো ঠিকমতো বাতাস দিচ্ছে না। ফলে সেবা নিতে আসা রোগীদের অনেকেই টেবিল ফ্যান কিনে তাপদাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। আর যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা হাপিত্যেশ করছেন। এ চিত্র রাজধানীর হৃদরোগ হাসপাতালের (জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল)। হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এবং হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কোটি টাকার এসব চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনা হয়েছে। তবে সেবা না বাড়লেও পকেট ভারি হয়েছে তাদের। অনেকেই মনে করেন হাসপাতালটি যেন সরকারি অর্থ তছরুপের এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মামলা হলেও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা রেহাই পেয়েছেন বারবার। সংসদীয় কমিটির তদন্তে একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে। অব্যবহৃত এ মেশিনগুলো সবই সাবেক পরিচালকদের সময়ের উল্লেখ করে বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. এসটিএম আবু আজম বলেন, এগুলো অনেক পুরাতন। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এগুলো চালু করা হবে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি, আশা করি আমি সফল হবো। ওই সব যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানির কাছ থেকে ভাল সার্ভিস না পেলে তাদের বিল দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সালের প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ২টি অটোক্লেভ মেশিন নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। মেশিন দুটি দেয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিএমএসডি। কিন্তু এগুলো চালু করার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ওই সময় কোন কেবল (তার) দেয়নি। এ ব্যাপারে ঠিকাদারকে বলার পরও কোন লাভ হয়নি। কারণ, সরঞ্জাম নেয়ার সময় ইঞ্জিনিয়ার সবকিছু বুঝে পেয়েছেন মর্মে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার ফলে এগুলো এখন নষ্টের পথে। হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক এগুলো সচলের জন্য অনেক চেষ্টা করছেন। তবে ঠিকাদার কেবল না দেয়ায় সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ মেশিনটি জীবাণুমুক্ত করার কাজে লাগে। অপারেশনের পর ব্যবহার করা যন্ত্রপাতিগুলো জীবাণুমুক্ত করা হয় এ মেশিনের সাহায্যে। অটোক্লেভ মেশিন দুই ধরনের হয়। এক ধরনের হলো- স্টিম বা তাপ সৃষ্টি করে জীবাণুমুক্ত করে। অন্যটি জীবাণুমুক্ত করে গ্যাসের মাধ্যমে। হাসপাতালে সম্পূর্ণ অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা মূল্যের গ্যাস প্লাজমা স্টাইলাইজিং মেশিন। বেঙ্গল নামে একটি কোম্পানির কাছ থেকে এটি কেনা হয়। ২০১৩ সালে ১ কোটি টাকার আরও একটি মেশিন ক্রয় করা হয়। এটি আনা হয় হাসান এন্টারপ্রাইজ থেকে। কিন্তু এ মেশিনের বাক্সটি খালি ছিল। ভেতরে কিছুই ছিল না। পরে প্রফেসর ডা. আমানউল্লাহর সভাপতিত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে প্রমাণিত হয় বাক্সে কিছুই ছিল না। এ নিয়ে একটি মামলাও হয়। কিন্তু এ মেশিন ক্রয়ের সঙ্গে হাসপাতালের যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদেরকে মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়। আসামি করা হয় শুধু ঠিকাদারকে। নিয়ম অনুযায়ী মোট টাকার ১০ ভাগ হাসপাতালে জামানত রাখতে হয়। কিন্তু তারা ওই টাকাও জমা রাখেনি। সে হিসেবে তৎকালীন হাসপাতালের পরিচালক ও একাউন্টস অফিসার এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এ দুজনকে অদৃশ্য কারণে মামলার আসামি করা হয়নি। ১৯৮০ সালে জাইকার অনুদান দেয়া মেশিনটি দিয়ে জীবাণুমুক্তকরণের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।
ইসিপি-এক্সটারনাল কাউন্টার পালমেশন। যাদের হার্টে কম ব্লক থাকে তাদের ক্ষেত্রে এই মেশিন ব্যবহার করে এক ধরনের থেরাপি দেয়া হয়। ওই থেরাপির মাধ্যমে ব্লক ছুটানো হয়। ১ কোটি টাকা করে মোট দুই কোটি টাকা দিয়ে এ মেশিন দুটির একটি ক্রয় করা হয় ২০০৯ সালে এবং অপরটি ২০১১ সালে। কিন্তু আজ পর্যন্ত মেশিন দুটি চালু হয়নি। ইউএসএ-এর তৈরি মেশিন দুটি সরবরাহ করে বায়োজিন ফার্মা। আওয়ামী লীগের এক নেতা কোম্পানিটির মালিক। ২০০৯ সালে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করা হয় দুটি রেনাল গার্ড। এ মেশিন দুটিরও কোন ব্যবহার নেই। সে সময় হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে কর্মরত অধ্যাপক একেএম মহিবুল্লাহ’র মাধ্যমে মেশিনটি কেনা হয়। তিনিই শুধু ১৩ জন রোগীর ক্ষেত্রে এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পেরেছেন। এরপর ওই যন্ত্রটির আর ব্যবহার হয়নি। কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এটি ক্রয়ের উদ্দেশ্য ছিল টাকা আত্মসাৎ বলে অনেকেই মনে করেন। এটিও বায়োজিন ফার্মা সরবরাহ করেছিল। অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহারের জন্য ২০০৮ সালে একই কোম্পানি থেকে কেনা হয় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকায় টিএমএলআর নামে আরেকটি মেশিন। যাদের মেডিক্যাল  থেরাপি, এনজিও প্লাস্টি, স্টেনটিং (রিং) অথবা বাইপাস অপারেশন করা সম্ভব নয়, সেসব রোগীর ক্ষেত্রে এই মেশিন ব্যবহার করে চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেটিও চালু হয়নি। স্টিম সেল থেরাপি মেশিন। বায়োজিন ফার্মার কাছ থেকে ২০১০ সালে এটি কেনা হয়েছিল ৪ কোটি টাকা দিয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত মেশিনটি বাক্সবন্দি। মেশিনটি তাপ দিয়ে ব্লক ছুটানোর কাজে ব্যবহার হওয়ার কথা। সিটি এনজিওগ্রাম- এক ধরনের স্ক্যানিং মেশিন। এটি উন্নত ধরনের ইসিজি রিপোর্ট দেয়। ২০০৯ সালে মেশিনটি প্রায় ৭ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল। দীর্ঘদিন মেশিনটি অকেজো ছিল। শর্ত অনুযায়ী ২জন ডাক্তার এবং ২জন টেকনিশিয়ানকে সরবরাহ কোম্পানির প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথমদিকে তারা সে শর্ত পূরণ করেনি। পরবর্তী সময়ে  শুধুমাত্র দুজন ডাক্তারকে প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ না দেয়ার কারণে মেশিনটি চালু করতে গিয়ে ভুল হয়। ফলে বারবার নষ্ট হয়ে যায়। ২০১২ সালে একবার নষ্ট হওয়ার পর ৯২ লাখ টাকা লাগে। পুনরায় নষ্ট হয়ে গেলে চলতি বছরের জুনে মেরামত করতে আরও ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়। তা ছাড়া এটি রোগীর তেমন উপকারও করে না। কারণ, এরপরও এনজিওগ্রাম করতে হয়। সিমেন্স কোম্পানি মেশিনটি সরবরাহ করে। এ ছাড়া ক্যাথল্যাব টু মেরামতের নামে সিমেন্স কোম্পানি ২ বারে মোট ৯২ লাখ টাকা নিলেও আজ পর্যন্ত তা করেনি। লন্ড্রি  প্লান মেশিনটি সরবরাহ করে সিএমএসডি। এটি চালু করার নামে সাড়ে ৭ লাখ টাকা খরচ করা হলেও তা করা হয়নি। ফলে এখন টেন্ডার দিয়ে কাপড় ধোলাই করে আনা হয়। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি আজ দেড় বছর ধরে বিকল রয়েছে। ফলে রোগীকে বেশি মূল্যে বাইরে থেকে এ পরীক্ষা করাতে হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অপ্রয়োজনীয় এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সঙ্গে হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা পর্যন্ত জড়িত। অনেক প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার চেয়ে তাদের বসার কক্ষটি বেশ পরিপাটি। এতে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা ক্ষুব্ধও বটে।

দুরন্ত রাজনের স্বপ্ন ছিল বড় হবে

সুরমা তীরের গ্রাম বাইয়ারপাড়। এ গ্রামেরই দরিদ্র পরিবারের সন্তান রাজন। দরিদ্র হলে কি হবে শিশু রাজনেরও ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন। লেখাপড়া করার স্বপ্ন। কিন্তু দরিদ্র্যতাই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার লেখাপড়ায়। আর জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাশ গ্রামের কিছু পাষণ্ড। যাদের নির্মম অত্যাচার তার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। অথচ ওই দিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও কি রাজন জানতো পাশ গ্রামে তার জন্য অপেক্ষা করছে যমদূত। প্রতিদিন ভোরে রাজনতো এ পথ ধরেই যেতো সবজী বেচতে। শিশু রাজন জীবন কি বুঝার আগেই চলে যেতে হলো পৃথিবী ছেড়ে। অথচ সুন্দর এ প্রথিবীতে রাজন খেলায় মেতে থাকতো সুরমার তীরে। খেলার সঙ্গী ছিলো ছোটভাই সাজনসহ পাড়ার ছেলেরাও। মায়ের বকুনিও খেলা থেকে বিরত রাখা যেত না তাকে। বন্ধুদের নিয়ে সুরমায় সাঁতার কাটা, মাছ ধরা ছিলো তার নেশা। এখন এ সবই স্মৃতি। রাজন চলে গেছে না ফেরার দেশে। আর এই রাজনের শেষ ঠাঁই হয়েছে সুরমার তীরেই। বাইয়ারপাড় গ্রামের নিজ বাড়ির আঙ্গিনার কাছাকাছি সুরমা নদীর তীরেই চির নিদ্রায় শায়িত রাজন। মায়ের চোখের সামনেই রাজনের কবর। দরোজা খুললেই রাজনের কবর চোখে পড়ে মা লুবনা বেগমের। রাজনের পুরো নাম সামিউল ইসলাম রাজন। বয়স ১২ কিংবা ১৩ বছর। বাইয়ারপাড়ের আজিজুর রহমানের প্রথম সন্তান। পিতা মাইক্রোবাস চালক। নিতান্তই গরিব ঘরের সন্তান সে। মা লুবনা বেগম গৃহিণী। বড় ছেলে হিসেবে সে ছিলো সবার আদরের। পরিবারের স্নেহ ও ভালোবাসায় বড় হয়েছে সে। বড়ই চঞ্চল ছিলো সে। চঞ্চলতার কারণে মায়ের বকুনি ছিলো তার নিত্য সঙ্গী। রাজনের ছোটো ভাইয়ের নাম সাজন। সাজনের বয়স ৭ বছর। সেও স্কুলে পড়ালেখা করে। দুই ভাই এক সঙ্গে মাতিয়ে রাখতো গোটা ঘর। তাদের অবিরাম দুষ্টুমি মাতিয়ে রাখতো আজিজ-লুবনার সংসার। ছয় বছর বয়স যখন তখন গ্রামের পার্শ্ববর্তী অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় রাজনকে। ওই স্কুলেই কেটেছে তার চারটি বছর। এই চার বছরের মধ্যে সে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। স্কুলেও বেশ দুরন্ত ছিলো রাজন। বন্ধুদের নিয়ে দুষ্টুমির অন্ত ছিলো। গতকাল তার স্কুলের সহপাঠীরা মানবজমিনের কাছে জানিয়েছে, সে ছিলো সবার প্রিয়। পড়ালেখায় তেমন ভালো না হলেও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করবেন এমনটি মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন মা লুবনা বেগম। কিন্তু পারিবারিক দুর্দিনের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে শিশু রাজনের জীবন। এ বছরের শুরু থেকে আর বিদ্যালয়ে পা মাড়ায়নি সে। অভাব-অনটনের সংসারে সে হাল ধরার চেষ্টায় মেতে উঠে। কিছু দিন ধরে সবজি ব্যবসায় পা বাড়ায় সাজন। সেই ভোর হলেই সবজি ব্যবসার জন্য বের হয়। দুপুরের পরপরই সে ফিরতো বাড়িতে। এরপর বন্ধুদের নিয়ে চষে বেড়াতো গোটা গ্রাম। রাজনের সহপাঠীরা জানিয়েছে, রাজন টুকেরবাজার, মদিনা মার্কেট সহ সিলেট শহরের বিভিন্ন স্থানে সবজি ব্যবসা করতো। যা উপার্জন হতো তা তুলে দিতো মা লুবনা বেগমের হাতে। পিতা আজিজুর রহমান প্রায় সময় যেতো না কাজে। এ জন্য পরিবারে অভাব লেগেই থাকতো। অভাবের তাগিদে সে সবজি ব্যবসায় পা বাড়ায়। রাজনের পিতা জানিয়েছেন, রাজনের মৃত্যু সবার মনে দাগ কেটেছে। গোটা দেশের মানুষ এ ঘটনায় ধিক্কার দিয়েছে। তিনি বলেন, রাজনের মৃত্যুর পর ঘাতকদের ছেড়ে দেয়া ভিডিও দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তারা। তিনি জানান, রাজনের কবর হয়েছে তাদের বাড়ির পাশেই। তার কবর দেখতে আসছেন দূর দূরান্ত থেকে মানুষ। সুরমার তীর ঘেঁষা বাইয়ারপাড়ের এই রাজনকে যেভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে সেই ভিডিও যারা দেখছেন তারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না। গতকাল রাজনের মা লুবনা বেগমকে সিলেটের আদালতে আনা হয়েছিলো। সেখানে সাংবাদিকদের দেখেই অঝোরে কেঁদে উঠেন তিনি। আমার বাছাধন কই গেলো... বলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর গাড়িতে তুলে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। একই অবস্থা বাবা আজিজুর রহমানেরও। চোখের জল ছেড়ে বললেন, আমার অবুঝ শিশুটি মৃত্যুর আগে পানির জন্য হাহাকার করেছে। একটু পানি দেয়নি ওরা। অথচ পানিতে দেশ ভেসে যাচ্ছে। আমার ছেলে একটু পানি পেলো না...। কত নির্মমভাবে ওরা রাজনকে মেরেছে। ওদের কী একটু দয়া-মায়া হলো না।

গ্রিসের যুদ্ধ ও ট্রয়কা by আনু মুহাম্মদ

গ্রিসের মানুষ এখন যুদ্ধের অনুভূতি নিয়ে রাস্তায়। মিছিল হচ্ছে, লেখা হচ্ছে, গান হচ্ছে, নাটক-কার্টুন, তাত্ত্বিক বোঝাপড়া। রাস্তায় রাস্তায় স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন গ্রুপ দিন-রাত কাজ করছে। লঙ্গরখানা চলছে দিন-রাত। আইএমএফ বা করপোরেট নেতারা বলেন, গ্রিকরা অলস, সে জন্য আজ এই সংকট। এখনকার গ্রিস দেখে কেউ এটা বিশ্বাস করবে না। কর্মসংস্থান নেই, উপার্জনের রাস্তা নেই, তবু বেকার তরুণদের অনেকেই দিন-রাত ব্যস্ত। ভীষণ বিপদের আশঙ্কা, আর তার বিরুদ্ধে সর্বজনের সংগঠন আর সক্রিয়তা ঘরে ঘরে, পথে পথে। তর্কবিতর্ক বিস্তর, সিপ্রাস কি আপস করছে? এই সরকার কি জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে? কেন সিপ্রাস সরকার আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে না আন্তর্জাতিক দস্যুদের বিরুদ্ধে?
গ্রিস এখন মোকাবিলা করছে ট্রয়কা বা ত্রয়ী মহাশক্তি: ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং আইএমএফ। এরা কেউ নির্বাচিত সংস্থা নয়, কিন্তু এদের কাছেই মূল ক্ষমতা। এই তিন মহাশক্তির চাওয়া-পাওয়া, বিশ্বপুঁজির সঙ্গে বাঁধা, একঘেয়ে সুরে অভিন্ন: সর্বজনের সব সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানা বা করপোরেট গোষ্ঠীর মুনাফামুখী তৎপরতার জন্য খুলে দিতে হবে, মজুরি ও পেনশন বাড়ানোর বদলে কমাতে হবে, শিক্ষা-চিকিৎসায় সরকারের দায়িত্ব কমাতে হবে। দক্ষতা, কর্মসংস্থান বাড়ানোর যুক্তিতেই এসব কর্মসূচি আনা হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, তাদের কর্মসূচির কারণে যদি কর্মসংস্থান কমে, দক্ষ ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদি দারিদ্র্যবৈষম্য বাড়ে, তখন তারা অন্যদিকে মুখ করে থাকবে অথবা আবারও একই পথে চলতে চাপ দেবে।
আইএমএফের বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশে ঋণ, দুর্নীতি আর সম্পদ পাচারের যে রেকর্ড, তাতে অনেক আগেই আরও অনেক খারাপ অবস্থা হতো। অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে প্রবাসী–আয়। এর কারণেই একসময় আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সব যুক্তি ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আইএমএফের বড়শি থেকে বেরিয়ে গেলে শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বের ক্ষমতাধর এমনকি দেশের বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অসুবিধা। সুতরাং ২০০৭ সালে নতুন একটি চুক্তির জন্য জোরজবরদস্তি, তদবির শুরু হলো। ঋণ দরকার নেই, তাতে কী? আইএমএফ পরামর্শদান অব্যাহত রাখতে চায় এবং তার জন্য একটি চুক্তি করতে হবে। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। প্রবল আপত্তি ও প্রতিরোধের মুখে সরকার এটা সই করতে পারেনি। কিন্তু পরে নির্বাচিত সরকার তদবিরে, অর্থমন্ত্রীসহ উপদেষ্টাদের উৎসাহে বড়শি গেলে, এক বিলিয়ন ডলার ঋণে আটকায় বাংলাদেশ।
গ্রিসের প্রবাসী–আয় দুর্বল, রপ্তানি খাতও শক্তিশালী নয়, রপ্তানি আয়ের শতকরা প্রায় ৩৫ ভাগ বিদেশি ঋণের কিস্তি শোধ করতেই যায়। ‘বাজারই সবকিছুর সমাধান করবে’ এই দর্শন প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে ব্যাংক-বিমাসহ একচেটিয়া বৃহৎ ব্যবসায়ী ও আমলা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়। গ্রিসে ঋণের সিদ্ধান্ত হয়েছে সে রকমই। বাংলাদেশে যেমন সরকারের ঋণের সিদ্ধান্ত জনগণের নামে নেওয়া হলেও তা প্রকৃতপক্ষে দেশি-বিদেশি ঋণদাতা গোষ্ঠী এবং বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থই রক্ষা করে, গ্রিসেও তার অন্যথা হয়নি। সেখানে একেকবার ঋণ নেওয়া হয়েছে আর গ্রিসের ওপর চাপ বেড়েছে। সেই ঋণ শোধ করতে সর্বজনের সম্পদে হাত দিতে হয়েছে, জনগণের জীবনযাত্রার মান আরও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। গ্রিসেও আইএমএফ বা ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের সব টাকা ফেরত পেতে আগ্রহী নয়, তারা আরও ঋণ দিতে আগ্রহী, তবে কিছু কাজ করতে হবে সেটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ঋণ এখানে ক্ষমতাধরদের অস্ত্র। সংকট নিরসনে তাদের রেডিমেড সমাধান প্যাকেজ সবার জন্য একই: ‘কৃচ্ছ্রসাধন’। এই কর্মসূচি সামরিক খাতে ব্যয় কমায় না, শাসকদের বিলাস অপচয় কমায় না, মুনাফা উন্মাদনা বাড়ায়, কমায় জনগণের অধিকার, তার আয় কমায়, ব্যয় বাড়ায়, বাড়ায় বৈষম্য।
গ্রিসের গত কয়েক বছরের ঘটনাবলি সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। ২০০৯ থেকেই গ্রিসের বর্তমান সংকট দৃশ্যমান ও ঘনীভূত হতে থাকে। সে বছর বাজেট ঘাটতি দেখা যায় জিডিপির শতকরা প্রায় ১৩ ভাগ। এই বছর বিশ্বের প্রধান প্রধান ঋণক্ষমতা পর্যালোচনা সূচকে (ক্রেডিট রেটিং) গ্রিসের অবস্থার অবনতি দেখায় মুডি ও স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী সংস্থা। এই অবস্থায় চাপ আসে ‘কৃচ্ছ্রসাধনের’ কর্মসূচি গ্রহণের। ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি গ্রিক পার্লামেন্টে গৃহীত হয় প্রথম ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ কর্মসূচি, এই কর্মসূচি অনুযায়ী সব সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা, বোনাস শতকরা ১০ ভাগ কমানো, শ্রমিকদের ওভারটাইম কমানো হয়। এর দুই মাসের মধ্যে ৩ মার্চ দ্বিতীয় কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি পাস হয় গ্রিক পার্লামেন্টে। এতে ছিল পেনশন আর বৃদ্ধি না করা, ভ্যাট শতকরা ১৯ থেকে বাড়িয়ে ২১ ভাগ করা, তেলসহ কয়েকটি পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় খাতে বেতন হ্রাস। এরপরও ঋণ গ্রহণ ক্ষমতা সূচকে অবনতি ঘটতে থাকে।
২৩ এপ্রিল ২০১০ সালে গ্রিস আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক উদ্ধারের (বেইলআউটের) আবেদন জানালে এই কাজে উৎসাহের সঙ্গে যুক্ত হয় ত্রয়ী সংস্থা। কিন্তু ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি থামেনি। ২ মে, ১১০ বিলিয়ন ইউরো বা ১৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রথম বেইলআউট প্যাকেজ ঘোষণা করে ত্রয়ী। বিনিময়ে গ্রিক সরকার তৃতীয় কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৬ মে পার্লামেন্টে এই কর্মসূচি যখন পাস হয়, তখন সারা দেশে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ এতই তীব্র হয় যে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় তিনজন, অসংখ্য আহত হয়। এই বছর কর্মসংস্থান, মজুরি ও পেনশনের ওপর আরও আক্রমণ আসে।
২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর গ্রিক সরকার আস্থা ভোটে বিজয় অর্জন করলেও পরিস্থিতির অবনতিতে দুই মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পাপান্দ্রু পদত্যাগ করেন। ১২ ফেব্রুয়ারি এথেন্সসহ বিভিন্ন শহরে আগুন, ভাঙচুর ও বিক্ষোভের মধ্যে গ্রিক পার্লামেন্ট পঞ্চম কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ২৪৬ বিলিয়ন ইউরোর দ্বিতীয় ‘পুনরুদ্ধার’ (বেইলআউট) কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। এই বছরেই ৪ এপ্রিল ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট গ্রিক পার্লামেন্টের সামনে আত্মহত্যা করেন। সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
বছরের শেষদিকে ষষ্ঠ কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি গ্রহণ করে গ্রিক পার্লামেন্ট। ঋণের কিস্তি পেতে এটা করতে বাধ্য ছিল সরকার। এই কর্মসূচির মধ্যে ছিল আরও মজুরি কমানো, অবসর বয়স আরও বাড়ানো, মজুরি শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ কমানো এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই। প্রাপ্ত ঋণের বড় অংশ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ঋণদাতা ব্যাংকের পাওনা ও সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়। শতকরা ১০ ভাগেরও কম অর্থ জনগণের প্রয়োজনে ব্যয় করার জন্য সরকারের হাতে থাকে। শেষ হিসাব অনুযায়ী গ্রিক সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ৩২০ বিলিয়ন ইউরো, যার শতকরা ৭৮ ভাগই ট্রয়কার কাছে। ইউরোপীয় অর্থকরী খাতের জন্যই সব বেইলআউট, আর তার বিনিময়ে যা কিছু কর্মসূচি, তা কিছু গোষ্ঠীর হাতে সর্বজনের (পাবলিক) সম্পদ তুলে দিতে নিবেদিত, যা জনগণের জীবন আরও কঠিন ও অনিশ্চিত করে তুলছে।
২০১৩ সালে সরকারের মধ্যে অনেক পরিবর্তনের পর বছরের শেষে এসে তার পতন হয়। ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘কোয়ালিশন অব র্যা ডিক্যাল লেফট’ বিজয় অর্জন করে। সিপ্রাস তাদের প্রতিনিধি হিসেবে এখন প্রধানমন্ত্রী।
এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বহু দেশ গ্রিসের চেয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতা পার করেছে কয়েক দশক আগেই। ৬০ দশক থেকে পরের কয়েক দশকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ গোষ্ঠীর এসব কর্মসূচিতে তাদের ব্যাংক, কৃষি, খনি, তেলক্ষেত্র—সব বহুজাতিক পুঁজির দখলে গেছে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। দেশে দেশে সামরিক শাসন, নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা, দুর্নীতিবাজদের শাসন তৈরি হয়েছে। ৯০ দশকের শেষ থেকে ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এই জাল থেকে বের হওয়ার রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে। এই চেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রোষানলে পড়ে এই দেশগুলো। এখন গ্রিস, পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডে একই ধরনের কর্মসূচির কারণে দারিদ্র্য, বৈষম্য বাড়ছে। অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। গ্রিসের তরুণদের এখন শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ বেকার। শতকরা ৩৩ ভাগ জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার বাইরে। শতকরা ৩২ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে। জিডিপি ২৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ছয় বছরে কমে হয়েছে ২০০ বিলিয়ন ডলার।
৩০ জুন গ্রিস দেউলিয়া অবস্থায় পতিত হলো। আইএমএফের ঋণকিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শেষ। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধের সময় এই জুলাইয়ে শেষ হবে। এখন তাদের শর্ত মেনে আরও ঋণ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আগামী ৫ জুলাই গণভোট করার উদ্যোগ নিয়েছে গ্রিক-সিপ্রাস সরকার। এই গণভোট মানে সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছেই ফেরত যাওয়া। এভাবে গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে প্রবল বিরোধী ছিল ট্রয়কা, যেমন তারা বিরোধী ছিল গ্রিসের সামরিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রস্তাবে। গ্রিস সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে অর্থ সাশ্রয় করতে চায় বহুদিন ধরেই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি ন্যাটোর মাধ্যমে প্রবল বাধা দিয়েছে। গ্রিস তার সামরিক খাতে ব্যয় দিয়ে জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র আমদানি করে। সেই বাজার তারা হারাতে চায় না।
এত ঋণ শুধু জালই তৈরি করেছে। ত্রয়ীর পেছনে যে বিশাল করপোরেট ও রাজনৈতিক আধিপত্য আছে, তাদের প্রয়োজন শুধু মুনাফার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ নয়, গ্রিক জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিকে শায়েস্তা করাও। যাতে পুঁজিমুখী সংস্কারের (নয়া উদারনৈতিক বলে যা পরিচিত) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ পরাজিত হয়, এ রকম জনপন্থী শক্তি নাস্তানাবুদ হয়। কেননা, পুরো ইউরোপে যে কল্যাণমূলক ব্যবস্থাগুলো আছে, তা বাতিল করা তাদের এখন অন্যতম এজেন্ডা।
এই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রিস যদি পুঁজির স্বার্থকে আঘাত করে জনস্বার্থের পথে যেতে পারে, তা অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে। সে জন্যই ট্রয়কার জোট অচলায়তন তৈরি করেছে। জাল অনেক জটিল। তবে গ্রিস একা নয়, ব্রিটেনসহ ইউরোপের বহু দেশে প্রায়ই বিক্ষোভ প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে পুঁজিমুখী সংস্কারের বিরুদ্ধে। ইউরোপের এই প্রতিবাদী আবহাওয়ায় সিপ্রাসদের পিছিয়ে আসা সম্ভব হবে না।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

শিশু সামিউলের শরীরে ছিল ৬৪ আঘাত

মো. সামিউল আলম
সিলেটে নির্যাতন করে হত্যা করা শিশু শেখ মো. সামিউল আলম ওরফে রাজনের (১৩) শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আর একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
সোমবার সিলেট মহানগর হাকিম আদালতে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিশু সামিউলের বুকে, মাথায়, দুই হাতে, পায়ে, হাঁটুতে ও গোড়ালিতে ফোলা জখম ছিল। মৃত্যুর কারণ হিসেবে উপর্যুপরি নির্যাতন ও মস্তিষ্কে রক্তরক্ষণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগরের জালালাবাদ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন।
এদিকে পুলিশ হত্যা মামলার আসামি মুহিত আলমের নিকট আত্মীয় ইসমাইল হোসেন ওরফে আবলুসকে সদরের রামাকাজী এলাকা থেকে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আটক করে। তাঁর বাড়ি জালালাবাদের মীরের চর এলাকায়।
এর আগে সিলেট মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক ফারহানা ইয়াসমিন আসামি মুহিত আলমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মুহিতকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন। চুরির অভিযোগে গত বুধবার সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডে সবজিবিক্রেতা সামিউলকে একটি দোকানঘরের খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে মারা যায় সামিউল। পরে তার লাশ গুম করার চেষ্টা করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নগরের কুমারগাঁওয়ের শেখপাড়ার বাসিন্দা মুহিতকে আটক করে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে। জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন বলেন, মামলায় মুহিতসহ তাঁর ভাই কামরুল ইসলাম (২৪), তাঁদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী (৩৪) ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে।
সামিউলের খুনিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছেন তার স্বজন ও এলাকাবাসী।
ভিডিওচিত্রের সূত্র ধরে গতকাল রোববার প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় ‘নির্মম, পৈশাচিক!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হলে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়।
এলাকাবাসী জানান, ২৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের ভিডিওচিত্র থেকে নির্যাতনকারীদের চিহ্নিত এবং তাদের মুখচ্ছবিকে বড় করে তাঁরা পোস্টার তৈরি করেছেন।
গতকাল সকালে ওইসব পোস্টার নগরের কুমারগাঁও বাসস্টেশন থেকে শুরু করে সামিউলের গ্রামের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদে আলী গ্রাম পর্যন্ত সাঁটানো হয়। বেলা একটার দিকে বাদে আলী গ্রামে পোস্টার হাতে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। সামিউলের বাড়ির সামনে মানববন্ধনে একটি পোস্টার হাতে একাত্ম হন তাঁর মা লুবনা আক্তার ও প্রতিবেশীরা। একপর্যায়ে লুবনা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
সামিউলকে নির্যাতন করার ভিডিওচিত্রটি এলাকাবাসীর মাধ্যমে গত শুক্রবার রাতে প্রথম আলোর সিলেট কার্যালয়ে পৌঁছে। এতে দেখা যায়, কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের একটি দোকানঘরের বারান্দার খুঁটিতে সামিউলকে বেঁধে রাখা হয়েছে। খুঁটির সঙ্গে তার দুই হাত পেছন দিক করে বাঁধা। রোলার দিয়ে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত থেমে থেমে চলছিল আঘাত। বাঁধা অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করছিল সামিউল, ‘আমি মরি যাইয়ার! কেউ আমারে বাঁচাও রে বা! ’ এতেও বন্ধ হয়নি নির্যাতন। শেষে আকুতি, ‘আমারে পানি খাওয়াও! ’ তখন তাঁর চোখ-মুখ বেয়ে অঝোরে ঘাম ঝরছিল। তাঁকে বলা হলো ‘পানির বদলা ঘাম খা!’
সামিউলকে পেটানোর সময় নির্যাতনকারীরাই ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। ভিডিওচিত্রে তিন-চারজনের কণ্ঠস্বর শোনা গেলেও ভিডিওধারণকারী আরও দুজনের কথাবার্তা ও আগন্তুক একজনের উপস্থিতি ছিল।
শুরুতে ‘এই ক (বল) তুই চোর, তোর নাম ক...কারা আছিল...’ বলতে বলতে চুলের মুঠি ধরে সামিউলকে মারধর করা হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে কয়েক মিনিটের জন্য তার হাতের বাঁধন খুলে হাঁটতে দেওয়া হয়। ‘হাড়গোড় তো দেখি সব ঠিক আছে, আরও মারো...’ বলে সামিউলের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে আরেক দফা পেটানো হয়।
মারধর করার সময় একদিকে সামিউলের আর্তচিৎকার, আর অন্যদিকে নির্যাতনকারীদের মুখে অট্টহাসিসহ নানা কটূক্তি শোনা যায়।
যে ভিডিও ধারণ করার কাজটি করছিল, তাকে নির্দেশ করে নির্যাতনকারীরা জানতে চায় ঠিকমতো ভিডিও ধারণ হচ্ছে কি না। একজনকে তখন বলতে শোনা যায়, ‘ফেসবুকে ছাড়ি দে, এ তো খাঁটি চোর! সারা দুনিয়ার মানুষ দেখব...’। শেষ দিকে সলাপরামর্শও চলে। নির্যাতনকারী একজন সঙ্গীদের কাছে জানতে চায়, ‘কিতা করতাম?’ অপর একজনকে তখন বলতে শোনা যায়, ‘মামায় যে কইছন, ওই কাম করি ছাড়ি দে! ’
সামিউলের বাবা শেখ আজিজুর রহমান মাইক্রোবাসচালক। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে সামিউল বড়। আজিজুর জানান, তিনি যেদিন ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালাতে পারেন না, সেদিন সংসার খরচ চালাতে সবজি বিক্রি করতে বের হয় সামিউল।
মা লুবনা আক্তার জানান, ঘটনার দিন (বুধবার) সামিউলের বাবা গাড়িতে ছিলেন (ভাড়ায়) বলে বাড়ি ফেরেননি। ভোরে টুকেরবাজার থেকে সবজি নিয়ে বিক্রির জন্য সামিউল বের হয়েছিল। সারা দিন ছেলের খোঁজ পাননি তাঁরা। রাতে থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার সময় এক কিশোরের লাশ পাওয়ার সূত্র ধরে সামিউলকে শনাক্ত করা হয়।

৬৫ ভাগ মানুষ নিরাপদ পানি পাচ্ছে না by পার্থ শঙ্কর সাহা

দেশের ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ পানি পান করে। এই পানিতে আর্সেনিক এবং ই. কোলাই (মলের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া) সংক্রমণ আছে। নিরাপদ পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সিলেট বিভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিপুল পরিমাণ মানুষের অনিরাপদ পানি পানের এই চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পানি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, সরকারের আগের সব নথিপত্রে ৯৭ শতাংশ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহের যে দাবি করা হচ্ছে, নতুন এই তথ্য তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাঁদের কথা, সরকারের উচিত ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে এসে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকৃত অর্থে নিরাপদ পানির সংস্থানে সচেষ্ট হওয়া।
বিবিএসের এই বহু নির্দেশক গুচ্ছ জরিপ (মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-মিকস) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় ৫ জুলাই। জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বিবিএস এই জরিপ করে। জরিপে ৫১ হাজার ৮৯৫টি পরিবারের ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৯৬ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
এই জরিপ প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে পানি ও স্যানিটেশনের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেক বলেন, ‘আমি এই তথ্য অসত্য বলছি না। তবে এটা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আমি তা মেনে নিচ্ছি না।’
বিবিএসের জরিপে পানির উৎস এবং গৃহস্থালিতে মানুষের খাওয়ার পানির মান পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ খাওয়ার পানির উৎস নিরাপদ নয়। উৎসেই আর্সেনিক এবং ই. কোলাইয়ের সংক্রমণ থাকায় এই পানিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ই. কোলাই জীবাণূর কারণে কলেরা, ডায়রিয়াসহ নানারকম পেটের অসুখ হয় এবং তা মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্সেনিক এবং ই. কোলাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়, সে অনুযায়ী দেশের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের খাবার পানির উৎস নিরাপদ আছে। তবে ঘরে মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারে। কারণ উৎস অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হলেও সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি, পানি পরিবহন, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের পর্যায়ে তা অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি লিটার পানিতে ১০ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন) আর্সেনিকের উপস্থিতি থাকলেই তা খাওয়ার অনুপযোগী বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের মানদণ্ড অনুযায়ী তা ৫০ পিপিবি।
জরিপে ৫০ পিপিবিকে মান ধরে দেখা যায়, দেশের প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ মানুষ আর্সেনিক সংক্রমিত উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে। তবে সিলেট বিভাগে এ হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। আর বরিশাল বিভাগে এই হার সবচেয়ে কম, মাত্র ১ শতাংশ। শহরের চেয়ে আর্সেনিকে দূষিত পানির উৎস গ্রামে দ্বিগুণ।
মিকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪১ শতাংশ পরিবারের খাবার পানির উৎসে ক্ষতিকর মাত্রায় ই. কোলাই রয়েছে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১ কলোনি ফর্মিং ইউনিটের (সিএফইউ) বেশি ই. কোলাই থাকলে তা অনিরাপদ পানি হিসেবে বিবেচিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অণুজীব ও রোগ প্রতিরোধ বিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন মিয়া বলেন, ‘অনেকগুলো ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ই. কোলাই একটি। পানিতে শুধু এর উপস্থিতিই যে ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগ সৃষ্টি করে তা বলা যায় না। তবে ১ সিএফইউয়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ ই. কোলাই সংক্রমিত পানি নিঃসন্দেহে পেটের পীড়ার জন্য দায়ী।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহস্থালিতে ব্যবহারের পানিতে ই. কোলাইয়ের সংক্রমণের হার ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ উৎসের চেয়ে ব্যবহারকালে পানিতে আরও ই. কোলাই সংক্রমিত হয়। সরবরাহ লাইনের ত্রুটি এবং পরিচ্ছন্নতার অভাবই এর মূল কারণ বলে মনে করেন অধ্যাপক রুহুল আমিন মিয়া।
আর্সেনিক সংক্রমণের হার গ্রামে বেশি হলেও গ্রামের চেয়ে শহরের পানি বেশি মাত্রায় ই. কোলাই সংক্রমিত। শহরাঞ্চলে ৫৫ শতাংশ পানির উৎস এবং গ্রামাঞ্চলে ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পানির উৎস ই. কোলাই সংক্রমিত। বিভাগের হিসাবে সিলেটে সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ পানি ই. কোলাই সংক্রমিত। সিলেটের ২১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এরপরেই ঢাকা বিভাগের ২০ দশমিক ৭ শতাংশ খাওয়ার পানিতে অতি উচ্চমাত্রায় ই. কোলাই সংক্রমিত আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা মহানগরে ওয়াসার পানি সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এ অঞ্চলে ই. কোলাই সংক্রমণের হার বেশি। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) এক গবেষণায় ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা ৬৩ শতাংশ পানিতেই ই. কোলাই জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
সরকারের দাবি, ২০১৫ সালের মধ্যে ৮৫ শতাংশ মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জিত হয়েছে। এমডিজিতে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। উৎসে কোনো ধরনের সংক্রমণের দিকটি এখানে স্থান পায়নি। তবে গত ৩০ জুন প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘স্যানিটেশন ও সুপেয় পানি খাতে অগ্রগতি: এমডিজি মূল্যায়ন ২০১৫’ শীর্ষক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৩ শতাংশ মানুষ এখনো অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করে। আর্সেনিক সংক্রমিত পানিকেই এখানে অনিরাপদ পানি বলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডের বাংলাদেশীয় প্রধান খায়রুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশে স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি খাতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবে অর্জনের সংজ্ঞায় যেসব ফাঁকফোকর আছে, তাকে পুঁজি করে অর্জনের পরিসংখ্যান কৃত্রিমভাবে দেখানো হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার খায়রুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিসংখ্যানগত সততার বিষয়ে আমাদের আন্তরিক হওয়া উচিত। ঊর্ধ্বতন মহলের যা শুনলে ভালো লাগে, সে রকম তথ্য সাজিয়ে দেওয়া মিত্রের কাজ নয়। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে দেশের অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায় না। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া দরকার।’
তবে পানি ও স্যানিটেশন খাতে পরিসংখ্যান বাড়িয়ে বলে কৃতিত্ব নেওয়ার কোনো অভিপ্রায় নেই, এমন মন্তব্য করে স্থানীয় সরকারসচিব আব্দুল মালেক বলেন, ‘যাঁরা সরকারের বাইরে আছেন, তাঁরা অনেক কিছুই বলতে পারেন। বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।’
বেসরকারি সংগঠন এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের নির্বাহী পরিচালক এস এম এ রশিদ বলেন, নিরাপদ পানির ক্ষেত্রে সরকারকে এখন তার দাবি থেকে সরে আসতে হবে। কারণ ৯৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায় আর ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায় না—দুটিই এখন সরকারি তথ্য। তাই এখন সরকারকে এ বিষয়ে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিভক্তির কবলে বিশ্বাস by উৎপল রায় ও সিরাজুস সালেকিন

বিভক্ত বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি। রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দেনা-পাওনার ভিত্তিতেই এ বিভাজন। সুশীল সমাজের বিভক্তিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মীজানুর রহমান শেলী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভক্তি জিনিসটা জীবনের প্রত্যক্ষ অংশ হিসাবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যান্য অংশে যেমন রাজনীতি জড়িত; তেমনি এখানেও রাজনীতি তার প্রচণ্ড স্বাক্ষর রেখেছে। রাজনৈতিক বিভক্তি এখন পেশাজীবী সমাজকে, বিভিন্ন অংশকে যেমন চাকরিজীবী যারা জনপ্রশাসনে সম্পৃক্ত আমলাদের বিভক্ত করেছে। এ অবস্থায় উচিত পেশাজীবীদের একমত থাকা। যদি সুশীল সমাজ, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সবাই যদি নিরপেক্ষভাবে কোন বিশেষ মত বা দলের সমর্থক না হয়ে কাজ করতে পারেন যেমন আগে করেছেন তবে তা মঙ্গলজনক। আগে অনেক জাতীয় প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্তি ছিল না, আমাদের ভাষা আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, সুশীল সমাজের নেতৃস্থানীয়রা একভাবে চিন্তা করেছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের ব্যাপারে সেই চিন্তাটা সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যাচ্ছে না। এখানে গণতন্ত্র কতখানি গণতন্ত্র, গণতন্ত্র না উন্নয়ন এই সমস্ত ব্যাপারে তর্কবিতর্ক চালাতে গিয়ে তারা বিভক্ত হয়েছেন এবং দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে। সুশীল সমাজের বিভক্তি রোধে মূল্যবোধ চর্চার প্রতি গুরুত্ব দেন এ সমাজবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বোধের উন্মেষ উপলব্ধি, চেতনা জাগ্রত করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে এরকম করে বিশেষ দলের মুখপাত্র হয়ে তারা শুধু নিজেদের অসম্মান করছেন না নিজেদের ক্ষতি করছেন। একজন বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের লোক তিনি তো সরকারি চাকরি করেন না। তার কোন সরকারের পক্ষ থেকে বিপক্ষে থেকে তার এমন কি লাভ ক্ষতি হয়। তবে বলা যেতে পারে সরকারের রোষানলে পড়লে ব্যবসা বাণিজ্য করাও অসম্ভব হয়ে দাড়ায়। এভাবে তো গণতন্ত্র চলতে পারে না।
ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ তেমনভাবে গড়ে উঠেনি। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের মধ্যে যদি বিভাজন, মতপার্থক্য ও বিভক্তি থাকে তাহলে তাকে সুশীল সমাজ বলা যায় না। একে ‘বিশেষ গোষ্ঠী’ বলা যায়। যারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে। আশা করবো বাংলাদেশের সুশীল সমাজ মতপার্থক্য ও বিভক্তি দূর করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করবে। 
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, সিভিল সোসাইটি বলতে বুঝায় যারা কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নয়, যারা নীতিগতভাবে স্বাধীন। তারা কোন দলের নয়। ক্ষমতায় যাবে বা যাওয়ার চেষ্টা করবে তারা এরকমও নয়। তাদের পরিসরটা এমন যে, তারা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ কিংবা বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায় যা-ই বলিনা যেভাবে গড়ে ওঠার কথা ছিল সেভাবে গড়ে উঠেনি। এটা অত্যন্ত দুখঃজনক। তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখন রাজনৈতিক সোসাইটি গড়ে উঠেছে। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশের সুশীল সমাজ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল আওয়ামী লীগ, আরেক দল বিএনপি। কিন্তু সিভিল সোসাইটিতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে ভাগাভাগি হতে পারে না। আফসান চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রের দুটি অংশ আছে। একটি সরকার ও আরেকটি সমাজ। সুশীল সমাজ সরকারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে চায়। সমাজের সঙ্গে নয়। কেননা সরকারের তরফে তার স্বার্থসিদ্ধির বিষয় জড়িত থাকে। এ কারণে সুশীল সমাজ বা বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায় সমাজ থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা সবাই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাই। সমাজের সঙ্গে নয়। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এমনটাই মনে হয়। আর আমাদের সুশীল সমাজের মূল সংকটটা এখানেই। আফসান চৌধুরী আরও বলেন, বিভাজন যেটা হয়েছে সেটা স্বার্থের বিভাজন। প্রাপ্তির প্রতি সুশীল সমাজের একাংশের এত বেশি আগ্রহ বেড়েছে যে, তারা মনে করে সরকারের মন্ত্রী না হলেও বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। এখানে সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অনেকেই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের সিভিল সোসাইটিরতো খাওয়া, পরার কোন অভাব দেখি না। গরিব কোন সুশীল সমাজও দেখি না। কিন্তু তারা কেন এ সংকটের পথে যাবে? সংকট তৈরি করবে? তবে, অনেকেই এখনও নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। কিন্তু এ সংখ্যা খুবই নগণ্য।   
সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল বাবু বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের বড় বড় অর্জনে সিভিল সোসাইটির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য সিভিল সোসাইটি অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করেছে। এত কিছু করার পরেও তারা কেউ ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়নি। তাদের কোন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। কিন্তু এখন যাদের সিভিল সোসাইটি বলা হয় তাদের অনেকেই বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে এক এগারোর মতো পরিস্থিতি কায়েম করতে চায়। অরাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায়। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা আওয়ামী লীগের দাসে পরিণত হয়েছে। আবার কেউ আছেন যারা বিএনপির দাসত্ব করছে। এরা দলদাসে পরিণত হয়েছে। দেশে আরও এক ধরনের সিভিল সোসাইটি আছে, যারা বিভিন্ন অ্যাম্বেসির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। সুশীল সমাজের নামে এরা আসলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা বিভিন্ন অ্যাম্বেসির দাসে পরিণত হয়েছে। দলীয় দাসত্ব থেকে না বেরুলে সিভিল সোসাইটি দেশ ও জনগণের স্বার্থে তাদের কাজ করতে পারবে না।
সুশীল সমাজের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে রাজনীতির জন্যই ক্ষতিকর বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এটা সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজের জন্য যেমন ক্ষতিকর একইভাবে আমি মনে করি রাজনীতির জন্যও ক্ষতিকর। নাগরিক সমাজকে দলনিরপেক্ষ থাকতে হবে। বলছি না যে রাজনীতি নিরপেক্ষ। কারণ আমরা যে কথাগুলো বলি, কাজগুলো করি সুশাসনের জন্য কাজ করি, দুর্নীতিবিরোধী  কাজ করি এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক ইস্যু। এগুলো নাগরিক সমাজের কাজের মধ্যে থাকবে কিন্তু দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। এগুলো হচ্ছে মৌলিক জিনিস। এ থেকে বিচ্যুত হওয়াটা রাজনীতির জন্য ক্ষতিকারক এবং নাগরিক সমাজের জন্য ক্ষতিকারক। সুশীল সমাজের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তারা তো এটা থেকে বিভিন্নভাবে মুনাফা বা সুবিধা অর্জনের উপায় হিসাবে দেখেন। অন্যদিক থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে চাহিদা এবং সরবরাহ দুটোই কাজ করে। তাদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল বা সরকার নাগরিক সমাজকে ব্যবহার করে। নাগরিক সমাজের একাংশ সুবিধা পায় এবং রাজনৈতিক দলগুলো সুবিধা পায়। এক ধরনের টানাপড়েন কাজ করে। মূল দায়িত্ব নাগরিক সমাজকে নিতে হবে। যদি তারা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চান তবে সরাসরি যোগ দিতে পারেন। দলীয় আদর্শের মধ্যে আংশিক বিলিয়ে দিয়ে নিজেকে নাগরিক সমাজ দাবি করা ঠিক না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সুশীল সমাজের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, নাগরিক সমাজকে একটা প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধরে নিতে চাই। আমরা যখন রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলি, গণতন্ত্রের চর্চা বৃদ্ধির কথা বলি। একইভাবে নাগরিক সমাজকে বলবো এই মূল্যবোধকে ধারণ করা। আমাদের কার্যক্রম আন্দোলন, বক্তব্য, অবস্থান দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে এই ধারণাটাকে আত্তীকরণকরণ এবং এটাকে চর্চা করার চেষ্টা করা। এটা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার জন্য ভারসাম্য রক্ষা করে চলা সেগুলো নিশ্চিত করা দরকার।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সত্যিকারের সুশীল সমাজকে অরাজনৈতিক বলবো না, তবে নির্দলীয় হওয়া উচিত। কোন দলভিত্তিক হলে তারা সুশীল সমাজের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ার কথা না। সুশীল সমাজের সংজ্ঞা হচ্ছে নন-গভর্নমেন্ট, নন-পার্টি, নন-মিলিটারি। কিন্তু আমরা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতাটা লক্ষ্য করছি বেশ কয়েকবছর ধরে। তিনি আরও বলেন, আমি যদি কোথাও কোন জায়গায় অবস্থান নেই সুশীল সমাজের নামে সেই অবস্থান যদি কোন দলের পক্ষে যায় তখনই তাকে চিহ্নিত করে ফেলা হয় যে ওই দলের ওই। এই অন্যায়টাও করা হয়। আমরা তো দেখি একজন মানবাধিকার কর্মী একজন অবস্থান নিলেন যেটা ন্যায্য। যখন দেখা গেল রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে যাচ্ছে, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপক্ষে যাচ্ছে। তারা তাকে দলীয় কালার দেয়ার চেষ্টা করছে। দুদিকেই সমস্যা। একটা হচ্ছে দলীয় আনুগত্যের বিষয় থাকতে পারে। তার চেয়েও বেশি হচ্ছে যখনই কোন জায়গায় সুশীল সমাজ অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে তখনই তাকে দলীয় রাজনীতির পরিচয় দিয়ে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন সংগঠন যারা আছেন পেশাজীবীদের মধ্যে সর্বত্র দলীয়ভাবে বিভাজনটা প্রকট। তারা কিন্তু সুশীল সমাজের অংশ।