Tuesday, July 30, 2013

প্রয়োজন একটি সামাজিক উল্লম্ফন by ড. শেখ জিনাত আলী

প্রাচ্যের সমাজব্যবস্থায় বাঙালি সমাজ সেই কোন কালে গড়ে উঠেছে, তার হিসাব-নিকাশ কেউ করছে কি-না তা আমার জানা নেই। তবে এটা জানি, হাজার বছরে গড়ে ওঠা এ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে বংশপরম্পরায় যে কৌলিক উপাদান বাঙালির জীবন কাঠামোতে প্রবহমান, তা-ই বাঙালিত্বের শারীরিক-মানসিক সৌষ্ঠব এনে দিয়েছে। এ সমাজ ইতিমধ্যে তিনটি যুগ অতিক্রম করে এসে চতুর্থ যুগে পদার্পণ করেছে। সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগে, যাকে আমরা আদিম সাম্য, ভূমিদাসত্ব ও পুঁজিতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। আর কলি যুগ আধুনিক সমাজবাদী বা সমাজতন্ত্রের তুল্য হতে পারে। বাংলাদেশে শতাধিক বছর কিংবা তার অল্পকাল পর কলির যুগ শুরু হয়েছে, যদিও চতুর্দশ শতাব্দীতে কলকারখানার উপাদান থেকে ইউরোপে পূর্বোক্ত যুগের অবসান হয়। প্রতিটি যুগ কিছু নিয়ামক দ্বারা সূচিত হয়েছে। আবার নিয়ামকগুলোর পরিসমাপ্তিতে মানুষ পরবর্তী যুগে প্রবেশের মধ্য দিয়ে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। মানুষ অগ্রসর হচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে, আবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে। গভীর বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, অদম্য মানুষ কোনো সমাজে বা দেশে অগ্রসর হতে চায় এবং কোথাও হচ্ছে। তবে অল্পসংখ্যক তাতে বাধা সৃষ্টি করছে। অগ্রসর হতে হলে অল্প সংখ্যকের এ বাধা অতিক্রম করতেই হয়। নইলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।
কলির যুগে আমরা ভারত উপমহাদেশের মানুষরা ব্রিটিশ বেনিয়াদের শাসন কবলে আটকা থেকেছি। ব্রিটিশ উপনিবেশে পলাশীর লব্ধ নিয়মনীতিতে আমরা শাসিত হয়েছি। ব্রিটিশরা তাদের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ অটুট রাখার জন্য যা দরকার তার সবই করেছে। এই যা যা করার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ইচ্ছানুযায়ী ভারতীয়দের মধ্য থেকে একটি শাসক শ্রেণী সৃষ্টি করা হয় এবং ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তার হতে থাকে। কিছু দেশপ্রেমিক শিক্ষিত লোকজনও এর মাধ্যমে তৈরি হয়। রাজনৈতিক দলও প্রতিষ্ঠিত হয় এসব শিক্ষিতজনের মধ্য থেকে এবং ভারতের সব জাতির জাতিসত্তার মধ্যেই তা কমবেশি বিস্তার লাভ করে। শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম। এতে নেতৃত্ব আসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫ থেকে), কমিউনিস্ট পার্টি (১৯২১ থেকে) ও কিছু আঞ্চলিক চরমপন্থী দল থেকে। মানুষকে ভালোবাসার, মানুষের জন্য কিছু মঙ্গলকর কর্ম সম্পাদনের এভাবেই শুরু হয়। অনুপ্রেরণা আসে ফরাসি বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব এবং বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহ-শ্রমিক আন্দোলন থেকে। আমরা মে দিবসের কথা জানি। ইউরোপ, এশিয়ার বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষক-প্রজাদের আন্দোলন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। উল্লেখ্য, সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লীগ ১৯০৬ সালে ঢাকায় গঠিত হলেও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে তার অবদান নেই বললেই চলে। বরং বলা চলে, তারা ব্রিটিশের ‘ভাগ কর, শাসন কর’ নীতির একনিষ্ঠ সমর্থক ছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পৃথিবীতে উপনিবেশবাদ বিরোধী নবজাগরণ সৃষ্টি হলেও ভারতবর্ষ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের শিকার হয় এবং ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট গভীর রাতে পাকিস্তান নামের একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র মুসলমানদের উপহার দেয় ব্রিটিশ শাসকরা। প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত লতিফ ভাইয়ের কথায় একে ‘জল্লাদের কাছে সোপর্দ’ বলা যায়। এটা হল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্র। এ রকম রাষ্ট্র পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এ রাষ্ট্রে ছিল একটি ভৌতিক কাণ্ড এবং ১৯৪৭-এর পর রাষ্ট্রটিতে অনুসৃত নীতিই ছিল বাঙালি জাতিসত্তার ওপর প্রথম আঘাত এবং এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা অঞ্চলের বাঙালিকে জাতি হিসেবে বিকশিত হতে না দেয়া। তাই জাতিগত নিপীড়ন ও পূর্ববাংলার সম্পদ (পাট, চা, চামড়া ও মানুষ) লুট করে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন ছিল চোখে পড়ার মতো ঘটনা।
এভাবে নানা বৈষম্যের শিকার পূর্ব বাংলার মানুষকে পশ্চিমা শাসকদের বিরুদ্ধে প্রথম দাঁড়াতে হয়েছিল ১৯৫২-তে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যেসব রাজনৈতিক দল সক্রিয় ছিল, তার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি, মুসলিম লীগের মোহভঙ্গ অংশ আওয়ামী মুসলিম লীগ ও ছাত্র-যুব গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। এভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে, তারাই পরবর্তীকালে ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, ১৯৬৬-এর আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও ১৯৬৯-এর ছাত্র সংগ্রামের ১১ দফা প্রণয়ন করে জনগণকে সংগঠিত করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা নেয় এবং জেল-জুলুম, হত্যা, নির্যাতন ভোগ করে। এর ফলে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয় আসে। কমরেড মণি সিংহকে কমপক্ষে ৪০ বছর আÍগোপনে থেকে এবং জেল থেকে সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে হয়। অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাপ গঠন করে প্রগতির পথে হাঁটতে থাকেন এবং শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যদের সঙ্গে বন্দি হন। ১৯৬৮-তে সেনাবাহিনীতে কমিশনড র‌্যাংকে চাকরির জন্য ঢাকা সেনানিবাসে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি তা হল, আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমি ৬ দফা সমর্থন করি কি-না। আমার উত্তর ছিল হ্যাঁ সূচক। সে সময় আমরা যারা ওই সাক্ষাৎকার দিতে যাই, তাদের কারও চাকরি হয়নি। নতুন প্রজšে§র কাছে আমি কিছু কথা এখানে লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছি, যাতে তারা পাকিস্তানি ২৩ বছরের ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করে। কারণ এটা না বুঝলে বর্তমান দেশের সংকট-সমস্যা সম্পর্কে তারা অন্ধের হাতি দেখার মতো অবস্থায় থেকে যাবে। থেকে যাচ্ছে।
যে শিরোনামে লেখাটি শুরু করেছি, দেশের বর্তমান অবস্থা সঠিকভাবে বোঝার জন্য ওই প্রেক্ষাপট সবার কাছে খুবই গুরুত্ববহ হবে, আমি যা আগেই উল্লেখ করেছি। আজকের এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লাখো প্রাণের বিনিময়ে এক নদী রক্ত ঝরাতে হয় বাঙালিকে। পশ্চিমা শাসকদের সীমাহীন শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাতে লাখো প্রাণের রক্তের ঋণ শোধ হতে পারে শুধু শোষণহীন সোনার বাংলা (বঙ্গবন্ধুর ভাষায়) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর তা করতে হলে আমরা যে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে যুদ্ধ করেছি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও মাওবাদী চীনের পাকিস্তান প্রীতি উপেক্ষা করে, তার বাস্তবায়ন ছাড়া এখানে সেখানে কিছু চুনকাম করে কিছুই করা যাবে না। আমাদের ১৯৭২-এর সংবিধান সে জন্য সর্বাগ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। এটা করতে যত কালক্ষেপণ হবে, তত দেশে বিশৃংখলা বাড়বে।
আজকের প্রজš§ ভীষণভাবে হতাশ দেশের বর্তমান সৃষ্ট সংকট-সমস্যায়। সময় এসেছে ২০০৮-এর নির্বাচনে মহাজোট সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর দিকে যথাসম্ভব দৃষ্টি দেয়ার, যেমন (ক) ১৯৭২-এর সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ পুনরুজ্জীবন, (খ) যুদ্বাপরাধীদের বিচারের যে রায় ইতিমধ্যে হয়েছে, তা দ্রুত কার্যকর করা, (গ) নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা, (ঘ) বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, (ঙ) দুর্নীতি নির্মূলসহ আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং (চ) গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার তথা সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাজের পরিধি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সংসদ সদস্যদের কর্মক্ষেত্র আলাদা করে সমন্বয় সাধন করা এবং সংসদ সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে øাতক ডিগ্রি করা।
এ কাজগুলো করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দক্ষ কর্মশক্তি ও ব্যক্তি সৃষ্টি করার বিকল্প নেই এবং এরূপ লোকজনকে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করতে হবে, যাতে দেশে একটি আর্থ-সামাজিক উল্লম্ফন ঘটানো যায়। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারলে সমাজে ও প্রশাসনে ঘুষ-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। কৃষি-শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রাম সমবায় ও শ্রমিকের অংশীদারিত্বমূলক শিল্পায়ন গড়ে তুলতে হবে। এতে মানুষের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে হলে মানুষের সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে দেশে কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না, থাকতে দেয়া যায় না। কথাটি মনে রাখার জন্য গণমাধ্যমের আলোচনায় অংশ নেয়া বক্তাদের বিনীত অনুরোধ করছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাহক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া সামাজিক উল্লম্ফন ঘটানো যাবে না এবং সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন হবে না।
ড. শেখ জিনাত আলী : অধ্যাপক

জনগণের মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা by মোশাররফ হোসেন মুসা

লেখাটির শুরুতে একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। ঘটনাটি একটি প্রত্যন্ত গ্রামের। ওই গ্রামের একটি প্রভাবশালী পরিবারের দুই সন্তান হলেন একজন এমপি ও আরেকজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তারা প্রতি বছর তাদের পিতার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বেশ ঘটা করে দোয়া-খয়রাতের আয়োজন করেন। সেই অনুষ্ঠানে খোলা আকাশের নিচে চাটাই বিছিয়ে প্রায় ১০ হাজার গ্রামবাসীর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। ওই দোয়া-খয়রাতে প্রথম প্রথম গ্রামের লোকজনই অংশগ্রহণ করত। এক সময় শহরের লোকজনও অংশগ্রহণ করা শুরু করে। একবার এমপি তার ছোট ভাইয়ের পরামর্শে দুই রকম প্যান্ডেলের আয়োজন করেন। একটি প্যান্ডেলে চেয়ার-টেবিল পেতে শহরের লোকজন ও সরকারি চাকরিজীবীদের এবং অন্যটিতে চাটাই বিছিয়ে গ্রামের সাধারণ লোকদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। একই অনুষ্ঠানে দুই রকম ব্যবস্থা দেখে গ্রামের লোকজন সমালোচনা শুরু করে। তাদের মতে, চাটাইতে বসতে দিয়ে তাদের অমর্যাদা করা হয়েছে। আমলা ভাইটি গ্রামবাসীকে গালাগাল শুরু করলে এমপি সেদিকে না গিয়ে গ্রামবাসীর পক্ষ নেন। তার বক্তব্য, জনগণকে নিয়েই তাকে চলতে হবে, সে জন্য জনগণের অমর্যাদা হয় এমন নিয়ম তিনি রাখবেন না। পরবর্তী বছর থেকে সবার জন্যই চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। এদেশের জনগণের মর্যাদার প্রতি নজর না থাকার পেছনে রয়েছে দীর্ঘকাল পরাধীন থাকার ইতিহাস। বিদেশী শাসকরা তাদের অর্থনৈতিক শোষণের স্বার্থে স্থানীয়দের ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত ও উঁচু-নীচু শ্রেণীতে বিভক্ত করে রাখত। দেশ স্বাধীন হলেও উপযুক্ত শাসন ব্যবস্থার অভাবে এখনও তাদের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসেনি। ফলে অনেক সময় তারা অর্থনৈতিক বৈষম্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক বৈষম্যতে ক্ষুব্ধ হয় বেশি। একই কারণে কখনও কখনও চরম দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিও মিষ্ট আচরণে জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অতিকথন ও উদ্ধত আচরণের কারণে সরকারের বহু অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রধানমন্ত্রীও জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে বিবেচনায় না নিয়ে মাঝে-মধ্যে বিরূপ মন্তব্য করে থাকেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া দেখে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন- ‘সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অহংকার, দম্ভ আর খামখেয়ালিপনার জবাব দিয়েছে জনগণ।’ আবার কেউ বলেছেন- ‘এগুলো নেতিবাচক ভোট। এ ভোট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হলেও বিএনপির পক্ষে নয়।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যারা সৎ, ক্লিন ইমেজের এবং উন্নতি করেছেন তারা ভোট পাননি। যারা দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি আর খুনের সঙ্গে জড়িত, তারাই জিতে এলেন। ... তাহলে আমরা এই উন্নয়ন কেন করছি? কার জন্য করছি? যদি দুর্নীতিবাজরাই জিতে আসে! এই জেতার রহস্যটা কী? ... শুনলাম জাতীয় ইস্যুর জন্য হেরে গেছি। জাতীয় ইস্যু কী? আমরা খাদ্য নিরাপত্তা দিতে পারছি কি না! ... জাতীয় ইস্যুর জন্যই যদি হারব, তাহলে আমার প্রশ্ন, জাতীয় ইস্যু হয়ে গেল দুর্নীতি। আমাদের সরকার নাকি দুর্নীতি করেছে, তবে দুর্নীতি করে তো এত উন্নয়ন সম্ভব নয়’ (ইত্তেফাক, ১৪ জুলাই ২০১৩)। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু বুদ্ধিজীবীও বিভিন্ন লেখায় অনুরূপ ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন (যদিও প্রধানমন্ত্রী গত ২১ জুলাই পাঁচ মেয়রকে শপথবাক্য পাঠ করানোর সময় দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে তাদেরকে জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে অনুরোধ করেছেন)। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ইস্যু ও স্থানীয় ইস্যু বোঝেন না, এটি ভাবা চরম বোকামো হবে। তিনি মাঝে-মধ্যেই সরকারি সফরে উন্নত বিশ্বে যান (ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রায় দশ মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন)। সেখানকার হোটেল, পরিবহনসহ বহু কিছুই স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। ইংল্যান্ডে শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানটিও পরিচালিত হয়েছে স্থানীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে। বলা হয়, এদেশেও স্থানীয় কাজগুলো স্থানীয় সরকারের জন্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় সরকারের কোনো স্বাধীনতা নেই। একই কারণে ‘স্থানীয় সরকার’ নামে আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ একটি ড্রেনকে পরিষ্কার রাখলেন, তিনি কালা মিয়া না ধলা মিয়া, সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। যিনি পরিষ্কার রেখেছেন তাকেই ভোট দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয়রা জাতীয় রাজনীতিতে অতিমাত্রায় আক্রান্ত হয়ে পড়ায় স্থানীয় কাজের বিবেচনায় ভোট প্রদান করছেন না। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় নেতারাসহ সরকারি দলের শতাধিক এমপিকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনটি আর স্থানীয়দের থাকেনি, জাতীয় রাজনীতির মহড়ায় পরিণত হয়। এই নিবন্ধের লেখক গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহকে বলেছিলেন, তিনি যেন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলেন- ‘এটি স্থানীয় নির্বাচন। স্থানীয় কাজ আর জাতীয় কাজ এক নয়।’ কিন্তু তিনিও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে করে ভোট প্রার্থনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জয়ী প্রার্থীদের দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ভোটারদেরই অবমূল্যায়ন করেছেন। জনগণ শতভাগ বিশুদ্ধ হয় না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারও বিশুদ্ধ হয় না। সে জন্য গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ হল জনগণকে শুদ্ধ হওয়ার জন্য সচেতন করে তোলা। টঙ্গী এলাকার জনৈক ভোটার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকার যদি উন্নতি করে থাকে তাহলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় করেছে, নিজেদের পকেটের টাকায় নয়। কেউ যদি দুর্নীতি করে থাকে তাহলে সেটাও জনগণের টাকাই।’ আরেকজন ভোটার বলেন, ‘জনগণ ভাত-কাপড় চায়, মর্যাদাও চায়।’ আমার বিশ্বাস, তাদের দু’জনের সরল উক্তি যেন সাধারণ জনগণের বিশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি। জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণের পেছনে রয়েছে মানুষের মর্যাদা দেয়ার চিন্তা। উন্নত বিশ্বে মানুষকে মর্যাদা দেয়ার জন্য পৃথক আইন রয়েছে। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার পেছনেও রয়েছে জনগণকে মর্যাদা দেওয়ার চেতনা। ২৮ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ কিন্তু মহান জাতীয় সংসদে এর বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যায়। মানুষের জন্মস্থান, বংশপরিচয় ইত্যাদি প্রসঙ্গ তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করা হয়। অথচ তাদের ছেলেমেয়ের সঙ্গে ভিন্ন দেশের ভিন্ন ধর্মের ছেলে-মেয়েদের বিয়েশাদি সম্পন্ন হচ্ছে। তারা ভুলে যান যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, বাচনভঙ্গি ইত্যাদিতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল বলেই সমগ্র জাতি আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছিল। সরকারপ্রধানের স্ববিরোধী ও ক্ষুব্ধ আচরণ প্রসঙ্গে সরকারদলীয় জনৈক এমপি বলেন, ‘নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মাঝে-মধ্যে ভুল আচরণ করে থাকেন।’ মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তার কথাটি অনেকটাই সত্য। তাই বলে প্রধান নির্বাহী পদে বসে ব্যক্তিগত রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে ক্ষুব্ধ আচরণ করে শপথ ভঙ্গ করতে পারেন না।
বর্তমানে বহু বুদ্ধিজীবী বলা শুরু করেছেন- সময়োপযোগী শাসন ব্যবস্থার অভাবে আমরা অসহনীয় পরিবার ও ব্যক্তিতন্ত্রের কবলে পড়ে আছি। সেজন্য একাধিক সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাবও নানাভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। বিরোধী দলের কেউ কেউ বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে নতুন ধারার সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবেন। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হল- এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা বহাল রেখেও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণসহ জনগণের ক্ষমতায়ন সম্ভব। যেমন- প্রতিটি জেলাকে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিয়ে ও স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট করে সব স্থানীয় কাজ এই ইউনিটের ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। এই প্রস্তাবে ইউনিয়ন হবে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের সর্বনিু ইউনিট এবং পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন উভয় হবে নগরীয় স্থানীয় সরকারের সর্বনিু ইউনিট। ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হওয়ায় ও পরিচিত হয়ে পড়ায় প্রতিটি ইউনিটের সঙ্গে ‘সরকার’ শব্দটি সংযুক্ত করে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। যেমন- ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার ইত্যাদি। এ ব্যবস্থায় জেলার প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষও করা সম্ভব। পরিশেষে বলা প্রয়োজন, একটি মাত্র সরকার দিয়ে, তথা উনবিংশ শতাব্দীর সরকারব্যবস্থা দিয়ে সর্বস্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, এটি এখন দিবালোকের মতো সত্য।
মোশাররফ হোসেন মুসা : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক ও সদস্য, সিডিএলজি

না-লেখার মাঝেও আনন্দ আছে by বদিউর রহমান

৩ জুলাই যুগান্তরে ‘আনারসের হলে জয়, মজাটা কেমন হয়?’ শীর্ষক আমার লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকদিন লেখা হয়নি। এর আগে ১৫ জুন প্রকাশিত ‘চার সিটির নির্বাচন কি কোনো পূর্বাভাস দেবে?’ বেশ আলোচিত হয়েছিল। দু’-একজন পাঠক টেলিফোনে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন আমি ‘বাজাদ-মনা’ হয়ে যাচ্ছি কি-না। আলী-মনা আর বাজাদ-মনা নিয়ে চাকরিতে থাকতে বেশ সরব কথাবার্তা সোনা যেত। সরকারি চাকরির জোটীয় আর মহাজোটীয় দলীয়করণে কারা আওয়ামী লীগ (আলী) আর কারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাজাদ) ঘরানার তা নিয়ে দস্তুর মতো তর্কবিতর্ক এমন পর্যায়ে যেত যে, কোনো কোনো কর্মকর্তার জন্মের ইতিহাস, পরবর্তী বিবর্তন, সুবিধাবাদী মোড় ফেরা- সবই ‘উলঙ্গভাবে’ আলোচিত হতো। অন্তত আমাদের ’৭৯ ব্যাচের এবং পরবর্তী ’৮১ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনেকে আলী-মনা আর বাজাদ-মনায় এমনভাবে চিহ্নিত হয়েছেন যে, পদোন্নতিতে তা প্রকাশ্যভাবে ধরা পড়ে গেল। এখন এমনও ধারণা করা হচ্ছে, ওই বিভাজনের সুফল ওই দুই গোষ্ঠী চাকরিতে থাকতে যেমন পেয়েছে, চাকরি-পরবর্তী পর্যায়েও পাবে। অনেকে এখনও পাচ্ছে। বাজাদ ক্ষমতায় এলে নাকি ’৭৯ ব্যাচের অনেক সাবেকের কপালে আবার শিকে ঝুলবে।
জোট-মহাজোটের নগ্ন দলীয়করণ সিভিল প্রশাসনকে যে রসাতলে নিয়ে গেল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। খালেদা জিয়ার গত মেয়াদে আমাকেও আলী-মনা হিসেবে আমার ব্যাচমেটরাই প্রচার করেছে এবং আমার ব্যাচমেট কুশীলবরাই চার-চারবার আমাকে সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত করেছে, যার কিছুটা আমার ‘সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতি : পদোন্নতি, বঞ্চনা’ বইয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। নিজের ঢোল নিজে বাজানো নাকি উত্তম, অন্য কেউ বাজাতে গেলে তা আবার ফাটিয়ে ফেলতে পারে। আমি সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতি নিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত ৬টি বইয়ে যা লিখেছি, তাতে কোনো মনাগিরির স্থান আছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। এমনকি ‘তত্ত্বাবধায়ক আমল : কিছু রাজনীতি কিছু বাজনীতি’ বইটিতে তত্ত্বাবধায়ক আমলের রাজনীতি-বাজনীতি নিয়ে, হাসিনা-খালেদার রাজনীতি নিয়ে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখাগুলোতেও আমি কোনো মনাগিরিতে ছিলাম না, যেমন আজও নেই। আমার কাছে যা যথাযথ মনে হয়েছে, যা সুবিবেচ্য ভেবেছি, যা জনগণের ধ্যান-ধারণা থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছি- তা-ই লিখেছি। আমি আগেও নয়, এখনও নয়, কোনো লাভের আসায় ‘পুঁজি-খাটানো’ অভ্যাসে কিছু লিখিনি, লিখি না। অতএব ১৫ জুনের চার সিটির নির্বাচন নিয়ে পূর্বাভাস সংক্রান্ত মতামতে বাজাদ-মনা হওয়ার যেমন কিছু নেই, তেমনি আমাকে আলী-মনা ভাবারও কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো লেখাকে বিশ্লেষণ করার অধিকার অবশ্যই পাঠকের রয়েছে। কিন্তু তেমন বিশ্লেষণ অবশ্যই নৈর্ব্যক্তিক হওয়া কাম্য। আর চার সিটির নির্বাচনের পূর্বাভাস নিয়ে আমি তো ফলাফলের আগে লিখেছি, পরে নয়; যেমনটি গাসিক নির্বাচনে ‘আনারসের হলে জয়, মজাটা কেমন হয়?’ লিখেছিলাম। ভোটের পরের বিশ্লেষণ তো গোটা দেশ করে চলেছে। সেই যে সিসিসি নির্বাচনে মহিউদ্দিনকে কুপোকাত করে যাত্রা শুরু হল, নারায়ণগঞ্জ আর কুমিল্লা হয়ে তা রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেটে বিস্তৃত হল এবং আপাতত সর্বশেষ গাজীপুরে এসে সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রেখে কী যেন একটা ‘জানান’ দিয়ে গেল, তা কি আর ধামাচাপা দেয়ার মধ্যে সীমিত থাকল? আলী-বাজাদ যার যার মতো নিজেদের পক্ষে গলাবাজি তো করেই যাচ্ছে, যাবেও, যেতেই হবে। এটা কখনও রাজনীতি, আবার কখনও বাজনীতি। তাই গাজীপুরের পর আমার কেন জানি আর লিখতে ইচ্ছা হয়নি। জাহাঙ্গীরকে নাটক করে দলীয় চাপে বসিয়ে না দিলে গাজীপুর হয়তো আরেক ‘নারায়ণগঞ্জ’ হতে পারত, যেমনটি বাজাদের জন্য ‘কুমিল্লা’ হয়েছে। প্রার্থী মনোনয়ন ও সমর্থনে আমরা যে ক্যারিকেচার দেখলাম, তাতে গণতন্ত্র তার উৎকট রূপই প্রকাশ করেছে। অতএব না লিখেই যেন আনন্দ পেলাম।
তার পর আরেক মজা হল, বিদেশ থেকে ফিরে এসে ‘তিনি’ নাকি কাদের ‘হারু পাট্টি’ বললেন! এরপর তো আরও ক্ষেপে গেলেন- উন্নয়ন করেও যদি ভোট না পাওয়া যায়, তাহলে আর উন্নয়ন করার দরকার কী? দিলে বড় কষ্ট পেয়েছেন তিনি- বোঝাই যায়। কিন্তু আমি বলব, উন্নয়ন করেছেন আগে ভোট পেয়েছেন বলে, উন্নয়ন করেছেন সরকার গঠন করতে পেরেছেন বলে, উন্নয়ন করেছেন মানুষের জন্য আপনার একটা ভালো দরদী মন আছে বলে। উন্নয়নের আগে তো আবার ভোট দিতে হবে তা বলেননি? রোজার পরে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে বিদ্যুৎ না থাকার কষ্ট বুঝিয়ে দেবেন বলেও ভয় দেখিয়েছেন তিনি। ক্ষমতায় যখন আছেন, তখন সবই পারবেন। নিষেধ করে কে? ফালতু কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাত্রদের ফুটেজ দেখে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন/বাদ দিয়ে দেবেন- কী প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ! এটা মানায় তাকে?
এই যে বারবার হেরে গিয়ে তার এত কষ্ট, তা আমাদেরও কষ্ট। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির এমনতরো সিরিজ-পরাজয় আমাদেরও বড় কষ্ট দেয়, দিয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো আরও দেবে। কিন্তু বাস্তবতা তো আর উড়িয়ে দেয়া যায় না। আচ্ছা, তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন, শেয়ার কেলেংকারিতে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী কেমন কষ্ট পেয়েছেন? ডেসটিনি, হলমার্ক, যুবক নিয়ে ভুক্তভোগীরা কেমন কষ্ট পেয়েছেন? ড. ইউনূস ইস্যুতে অনেকে কেমন কষ্ট হজম করেছেন? ছাত্রলীগ-যুবলীগের টেন্ডারবাজি-খুনাখুনিতে, পদোন্নতির দলবাজিতে অন্যেরা কেমন কষ্ট পেয়েছেন? গাসিক নির্বাচনের আগ মুহূর্তে চট্টগ্রামের টেন্ডারবাজিতে খুন কি কাউকে কষ্ট দেয়নি? আমি কার খালুরে, মধ্যরাতের সিঁদেল চোর, মোটাতাজা ব্যক্তি কিংবা নির্বাচন করতে ব্যর্থ- এসব বলায় কি অন্যরা কষ্ট পাননি? কষ্ট মূলত যার যার তার তার, কে কাকে কখন কীভাবে কষ্ট দেয়, আর কে কখন কিসে কীভাবে কষ্ট পায় তা বুঝতে পারা বড় গুণ। এ গুণ না থাকলে অহমিকা থাকতে পারে, ঝাঁকুনিতে রানা প্লাজা ধসে যেতে পারে, টকশোতে কারও চোখ তুলে ফেলা যেতে পারে এবং আরও কত কী। কিন্তু মনের কষ্ট থামানো যায় না। ফলে ‘শত মণ দুগ্ধ নষ্ট বিন্দু গোচনায়’ হয়ে যায়, হয়ে যেতে পারে। তখন সে কষ্ট নিয়ে হা-পিত্যেশ না করে শোধরানোর চেষ্টাই উত্তম নয় কি? পাঁচ বছরে একবার, একটা সিল, কী ভয়ানক গণতন্ত্র! কেমনে যে এ দেশের মানুষ প্রতিবার পুরো পাঁচ বছরের হিসাব মনে রাখে এবং কোনটা যে তাদের মনকে স্থির করে দেয়, তা বারবারই আমাদের চমকিত করে। অতএব না লিখে চুপ থাকাই ভালো মনে হল, লিখতে আর ইচ্ছা হল না। তাই কষ্ট বুকে নিয়ে না লিখেই আনন্দ পেতে চাইলাম। ভাবলাম, ইটস বেটার নট টু হ্যাভ বর্ন দ্যান টু হ্যাভ বর্ন অ্যান্ড সাফার- জন্ম কষ্ট পাওয়ার চেয়ে না জন্মানোটাই উত্তম; অতএব এত উন্নয়নের পরও ‘শত মণ দুগ্ধ নষ্ট বিন্দু গোচনায়’ অবস্থায় গিয়ে কষ্ট করে, কষ্ট পুষে, কষ্ট ভরে লেখার চেয়ে না লেখাই বরং আনন্দের।
আরও কষ্ট যখন দেখি সাজেদা-হালিম সমর্থকদের সে কী লড়াই, হালিমের সে কী রক্তাক্ত ছবি, তারপর আবার হালিম-সমর্থকদের বাড়িঘর ভাংচুর! আহা, আবার দেখি আমাদের ‘ভাইছা’ ‘নতুনরূপে’ তোপখানা রোডে! সাংবাদিকরা হল হাত-পা মজবুত করার প্রশিক্ষণের এক বড় ‘বালির বস্তা’। পুলিশ সুযোগ পেলে থাপ্পড় মারবে, রাজনীতিকরাও ছাড়বে না। ব্যাটা সাংবাদিক, বোঝ না মনু, মুই কী! অ্যাডা কি মোগল সাম্রাজ্যের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম পেয়েছ নাকি? অ্যাডা হল গিয়ে দেশ কাঁপানো সাংবাদিক-লাত্থি মারা! আমি বিস্ময়ে হতবাক হই, তিনি না টকশোতে কত সুন্দর করে কথা বলেন! হবেই তো, সব গুণ থাকতে হয়, আইনের ছাত্রের ‘আÍরক্ষার’ কৌশল প্রয়োগ কি আর বেআইনি হতে পারে? সাংবাদিকরা বললেন, তাকে বয়কট করবেন। কিন্তু করলেন কই? এদিকে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড নিয়ে শোরগোল তুলে দিয়ে এক সাংবাদিক নেতা আবার কপালে রাজটিকা লাগালেন। তিনিও কী এক উপদেষ্টা হয়ে গেলেন, সংসদ নির্বাচনে হারলেও এবার তিনি আর হারলেন না। এই-ই যদি হয় অবস্থা, তাহলে না লেখাই কি উত্তম নয়? না লেখার মাঝেও যে আনন্দ আছে।
বড় কষ্ট লাগে যখন শুনি নব্বই ঊর্ধ্ব গো আযমের নব্বই বছরের জেল। কিন্তু বিচার যে, কিছু বলা যাবে না।
অপরাধ প্রমাণের পর তার আবার বয়স কিসের? অপকর্মের হোতা কি কারও বয়স বিবেচনা করেছিলেন? রহস্যটা কোথায়? তাকে জেলেও ঢুকতে হল না, অনুতপ্ত হতেও হল না, নিজের নীতিতে অটলই থাকলেন। অথচ ট্রাইব্যুনাল হলেন দয়ার সাগর। একবার মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে গেলে পরে দেখা যাবে কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের গাড়ির বেঞ্চের তলায় কম্বল পেঁচিয়ে জেলে গিয়ে রক্ষা পেয়ে শাহ আজিজ যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তবে গো আযম নিরাশ হবেন কেন? হাসিনা-শফিক-হানিফের প্রতিক্রিয়া দেখে তো ‘নির্বুদ্ধিতায় ভরা’ আমজনতার মনে হতেই পারে, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না’। আরও কত সন্দেহ- ‘সৌদি দয়া’, ‘নির্বাচনী-কূটচাল’, ‘বিচারটাই তো এখন হাতের পাঁচ’ ইত্যাদি ইত্যাদি!
সর্বশেষ আবার মনে পড়ল- ‘আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব’। ভাতের অভাব এখন নেই, কিন্তু ওয়াসার পানির আহা সে কী কষ্ট! এসি চালিয়ে তবে অজু করলাম একদিন। একটু ব্যবস্থা যাও হল, বস্তির নেতারা মধ্যরাতের সিঁদেল চোর না হয়েও আমাদের রাস্তায় পানি আসার চাবি বন্ধ করে দিল! বেচারা নির্বাহী প্রকৌশলী কত অসহায়। বস্তিতে যে অনেক ভোট, হোক না বিনে পয়সার পানি তাদের। লিখে বিপদে পড়ার চেয়ে, লিখে আলী-মনা আর বাজাদ-মনার অভিযোগে অহেতুক অভিযুক্ত হওয়ার চেয়ে না লেখার মাঝেও যে আনন্দ আছে, তা ভোগ করাই কি উত্তম নয়?
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

ডিজিটাল কলগার্ল!

পতিতালয় আর পতিতা নিয়ে পূর্বে দুটি গল্প লিখেছি। এবার একটু ভিন্ন দিকে নজর দেয়া যাক। শহরের আধুনিক ফ্লাট আর উচু দালানের রঙ্গীন কাঁচের দেয়ালের ভিতরে চলে আসা ডিজিটাল যৌন ব্যবসার কিছু অজানা কথা।

উপকূলীয় সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসুন by ড. একেএম নওশাদ আলম

বিগত কয়েক বছরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, নানা রকম সচেতনতামূলক ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালনের ফলে অভ্যন্তরীণ মাছের উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ব্যাপক প্রভাব জনজীবনে লক্ষ্য করা যায়। কয়েক বছর আগে যেখানে বাজারে মাছই পাওয়া যেত না, এখন চাষের মাছ হলেও এবং মাছের বাজারে গুটিকয় প্রজাতির প্রাধান্য থাকলেও বাঙালি মাছ তো খেতে পারছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনের এ সাফল্যের নিরিখে বলা যায়, এ ধরনের কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে এবার দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ আমাদের দেশে এখনও একটি অবহেলিত উপখাত। অথচ এটা সবার জানা যে, জাতীয় রফতানিতে এ উপখাত থেকেই মৎস্যখাতের সবচেয়ে বেশি অবদান আসছে।
কোনো কালে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে সম্পদের কাণ্ডজ্ঞানহীন ও মাত্রাতিরিক্ত আহরণের ফলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উপকূল নিঃশেষ হয়েছে বহু আগেই। যাওবা ধুক ধুক করে অবশিষ্ট ছিল পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবনে, ঘূর্ণিঝড় সিডরে তার যে পরিমাণ সম্পদহানি হয়েছে, তা আজও পূরণ হয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লাগামহীন ও অনৈতিকভাবে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় শামিল সরকারি-বেসরকারি উভয়পক্ষ। উপকূলীয় এলাকায় নানা রকম সনাতন ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে একদিকে যেমন পোনা মাছসহ প্রায় সব মাছ ছেঁকে তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে ধারণক্ষমতার অধিক যান্ত্রিক ট্রলার ব্যবহার করে সমুদ্র প্রায় মাছশূন্য করে ফেলা হচ্ছে। এরপরও প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক নতুন নতুন ট্রলারের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে।
উপকূলীয় প্যারাবন কেটে সাফ করে দেয়া হয়েছেÑ যার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য অপরিসীম। এর ফলে মাছসহ অন্য ছোট-বড় সব জলজ প্রাণীর আবাস, খাদ্য ও প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। মাত্রাতিরিক্ত আহরণের ফলে অগভীর জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং প্রাণীর খাদ্য জোগান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন প্রতিবছর একটু একটু করে বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন না বাড়লেও, পরিমাণগত উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানো হলেও ধরা মাছের গুণগতমান বেশ নাজুক। অর্থাৎ ধরা মাছের প্রায় পুরোটাই স্বল্পদামের কিশোর বা ছোট মাছ, যা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বড় হয়ে ডিম পেড়ে আরও অনেক কিশোর মাছ উৎপাদন করতে পারত। একই সঙ্গে বেশি বেশি দেশীয় সনাতন ক্ষতিকর জাল যেমনÑ মোহনা-বেহুন্দি বা সাগর-বেহুন্দি এবং উপকূলের কাছাকাছি যান্ত্রিক ট্রলার বা ধারণক্ষমতার বেশি যান্ত্রিক ট্রলার ব্যবহারের ফলে কিশোর মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ছোট মাছ বেশি ধরাতে মাছের মোট পরিমাণ কখনও কখনও সামান্য হয়তো বাড়ছে, তবে দাম কম পাওয়ায় ছোট থেকে বড় সব মৎস্যজীবীর লাভের অংকে ভাটা পড়েছে। গরিব সনাতন মৎস্যজীবীদের তাতে সংসার চালানোর মতো আয়ের সংস্থান হচ্ছে না, যান্ত্রিক নৌকা বা জালের মালিক-মহাজনদের লগ্নিকৃত পুঁজি উঠে আসছে না, ট্রলারওয়ালাদের ট্রিপ প্রতি লোকসানের পরিমাণ বাড়ছেই। আয় বাড়াতে বা ক্ষতি পোষাতে সব স্তরের মৎস্যজীবীই আরও বেশি মাছ আহরণে নিয়োজিত হচ্ছে। এতে প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়ছে উপকূলীয় জলাশয়।
বঙ্গোপসাগরে আমাদের অংশের তলদেশ, বিশেষ করে সুন্দরবনের লাগোয়া উপকূল থেকে মহীসোপান পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই বালি ও কাদাময়, খুব সামান্য অংশই কঠিন শীলা বা পাথর দ্বারা আবৃত। এখানে অসংখ্য ধারায় মিঠাপানি প্রবাহের ফলে তীর থেকে বহুদূরে গেলে স্বাভাবিক লবণাক্ততাসম্পন্ন সমুদ্রের পানি পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নদীতে মিঠাপানি প্রবাহের পরিমাণ বেশি বলে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা হ্রাস পাওয়ার ব্যাপ্তি সাগরের উপরিভাগের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়। শীতকালে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় সঠিক লবণাক্ততা উপকূলের খুব কাছেই পাওয়া যায়। পোনা ও কিশোর মাছ উপকূলের কাছাকাছি কম লোনা পানিতে থাকে। মাছ যতই বড় বা পরিণত হতে থাকে, ততই অধিক লবণাক্ত গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যেতে থাকে। তলদেশে বসবাসকারী প্রজাতি তলদেশ ধরে চলাচল করে। অন্যদিকে, দ্রুত সঞ্চরণশীল ভাসমান প্রজাতি পানির উপরিতল ঘেঁষে বা তার সামান্য নিচ দিয়ে চলাচল করে।
আকার, স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচল পথের ওপর ভিত্তি করে মাছ সমুদ্রের তলদেশে, অপেক্ষাকৃত গভীর পানিতে অথবা উপরিতলের সামান্য নিচে ডিম পাড়ে। মাছ যেখানেই ডিম পাড়–ক না কেন, নিষিক্ত হয়েই তা পানির ওপরে ভেসে ওঠে। পানির উপরিতলে মাছের ডিম ফুটে প্রথমে রেণুপোনা উৎপন্ন হয়। রেণুপোনা পানির স্রোতে ভেসে ভেসে উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। এখানে তারা বিশ্রাম নেয় ও আকৃতি পাল্টায়, দ্রুত খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে এবং বড় হয়ে আবার গভীর সমুদ্রে নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরে যায়। এভাবে মাছের জীবনচক্র চলতে থাকে। উপকূল থেকে বা গভীর সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় তাদের ধরে ফেললে বড় হয়ে আবার ডিম দেয়ার মতো মা-মাছ আর থাকল কই? তাই উপকূলে বছরের পর বছর ধরে একই পরিমাণ মাছ আহরণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এক্ষেত্রে করণীয় কী? এর জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, সমুদ্রের গুণগতমান বজায় রাখা এবং সঙ্গে সঙ্গে মৎস্য সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ থেকে বিরত থাকা, বিশেষ করে দিনদিন কমতে থাকা মাছ বা জলজ প্রাণী আহরণে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই আহরণে জীববৈচিত্র্যকে অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ মারাÍকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মৎস্য বিভাগ ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি উপকূলীয় মৎস্যজীবী, বৃহদায়তন মৎস্য আহরণকারী বা ট্রলার মালিক, ব্যবসায়ী, পুঁজি লগ্নিকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, সম্প্রসারণ কর্মী, গবেষক, উন্নয়ন কর্মীসহ সব সুফলভোগী ও অংশীদার মিলে উপকূলীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এ কাজটি শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়। এখন থেকেই আমরা প্রতিবছর ‘জাতীয় উপকূল সপ্তাহ’ পালন করে সুফলভোগীদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে পারলে এক সময় আবার উপকূলকে মাছে মাছে ভরিয়ে দিতে পারি। আমরা এর জন্য কিছু করণীয় নির্ধারণ করতে পারি। যেমন- উপকূলে মোহনা-বেহুন্দি নিষিদ্ধ করে মোহনা-বেহুন্দির জেলেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে সাগর-বেহুন্দিতে স্থানান্তরিত বা প্রতিস্থাপিত করতে পারি। সাগর-বেহুন্দির জেলেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে গভীর সমুদ্রে বা একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় লং-লাইনিংয়ের মাধ্যমে টুনা বা অন্যান্য ভাসমান প্রজাতির মাছ আহরণে নিয়োজিত করতে পারি। চল্লিশ মিটার গভীরতার বাইরে যান্ত্রিক ট্রলারের মাছ ধরার আইনের বিধানটি কড়াকড়িভাবে পালন করতে পারি। সরকারি পর্যায়ে আর একটিও বটম বা মিড-ওয়াটার ট্রলার বর্তমান ট্রলার বহরে সংযোজিত না করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞ থেকে সবাই আইনের বিধানের প্রতি একনিষ্ঠ হতে পারি। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ চাষে আকাশ পরিমাণ সাফল্য পেলে উপকূলীয় জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কেন বাড়াতে পারব না? দেশপ্রেমিক মন নিয়ে সবাই মিলে সচেষ্ট হলে অবশ্যই পারব।
ড. একেএম নওশাদ আলম : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

৭ টি গোপন কথা যা আপনার স্ত্রী কখনও মুখে বলবেন না

বেশীরভাগ পুরুষেরই নারীদেরকে বুঝে উঠা প্রায়শই খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এমনকি সেই নারীকেও যার সাথে সে বহু বছর বিবাহিত জীবন পার করেছে। এক মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, পর মুহূর্তেই হয়ত শিশুর মত কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন।

নারীর কাম উত্তেজনা ওতৃপ্তি


নারীর কাম উত্তেজনা
নারীর কাম উত্তেজনা দ্রুত কি ভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়েও কামশাস্ত্রে আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নলিখিত উপায়গুলি অবলম্বন করলে দ্রু নারীর কাম উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

পুরুষত্বে সমস্যা–ঘরোয়া সমাধান

বর্তমান যুগে বেশীর ভাগ পুরুষের মধ্যে একটা সমস্যা বেশ প্রকট হয়ে উঠছে৷ দিন যত যাচ্ছে পুরুষের মধ্যে নপুংসকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের যৌণ ইচ্ছা ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে৷

প্রেমের আড়ালে অবৈধ সেক্সে কুমারীত্ব হারাচ্ছে মেয়েরা

প্রেমের আড়ালে অবৈধ সেক্সে কুমারীত্ব হারাচ্ছে মেয়েরা। যুবকদের প্রশ্ন আমি কি করে বুঝবো বিয়ের আগে আমার স্ত্রী অন্য কারো সাথে সেক্স করেছে কি না? এই বিষয়টি নিয়ে লিখে ছিলাম। কিন্তু দূঃখের বিষয়ে আমাকে আবারও লিখতে হচ্ছে। কারন আমি আবারও নতুন শত শত বাংলাদেশী সেক্স ভিডিও পেয়েছি। গণমাধ্যম কে তথ্য জানিয়ে ও কোনো প্রতিকার পেলাম না। বাধ্য হয়ে আমাকেই বার বার লেখতে হচ্ছে। নোংরামী করতেছে কয়েক জন? তা দেখতে আছে দেশের সর্বজন । প্রেমিক প্রেমিকাদের এই সব নোংরা ভিডিও দেখে যুবকরা আমার কাছে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। একটি প্রশ্ন শত শত যুবকরা করেছে। প্রশ্ন টি হলঃ আমি কিকরে বুঝবো বিয়ের আগে আমার স্ত্রী অন্য কারো সাথে সেক্স করেছে কিনা?। এই রকম প্রশ্ন করবেই না কেনো? কোনো স্বভ সমাজের স্বামীয়ই এই রকম ঘৃণাত্বক বিষয়টি মানতে পারবেনা। এমন কি কোনো স্ত্রীও অন্য মেয়ের সাথে স্বামীর নোংরামী আচরণ মানতে পারবে না। এই রকম কয়েক টি ঘটনা আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমি অবাক হয়েছি কয়েক টি ভিডিওর কথকপন শুনে। এর ভিতর ২টি ভিডিওর কথকপন আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতেছি। ১।মামা তার ভাগ্নী কে বাসার গেটের সামনে দাড় করিয়ে বলতেছে তোর কামিজ উপরে তুল ছবি তুলবো। অথচ মামা তার ভাগ্নি কে ভিডিও করতেছে। ভাগ্নি তার মামার কথা শুনে কামিজ উপরে তুলে পেট ও এক জোড়া স্তন বের করে রাখলো। এর পর মামা তার ভাগ্নি কে বললো সেলোয়ার খুলতে। এ কথা শুনে ভাগ্নি তার মামাকে জিঞ্জাসা করলো মামা তুমি কি আবারো ভিডিও করতেছো? মামা বললো না ছবি তুলতেছি। তারপর ভাগ্নি মামার কথায় সেলো্যার খুললো। এরপর মামা তার ভাগ্নিকে বললো পাও ২টা একটু ফাক করতে। ভাগ্নি মামার কথা শু্নে পাও ২ ফাক করলো। এবার মামা তার ক্যামেরা দিয়ে ভাগ্নির যৌনির ভিডিও করতে লাগলো। ভিডিও করে মামা তার ভাগ্নিকে বললো যে সুন্দর হয়েছে। ভাগ্নি মহা খুশি হয়ে বলতে লাগলো দেখতে হবেনা কার ভাগ্নি আমি। কই দেখি? এখন চিন্তা করে করে দেখুন দেশ কত বড় ডিজিটাল হয়েছে। এর চেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় আছে কি আমার জানা নাই। আরও অবাক এই বারো তেরো বছরের মেয়েটির বুক দেখে। অথচ সতের আঠারো বছরের আপুরা আমার কাছে জানতে চায় কি ভাবে তার ছোট বুক বড় করবে? ২। প্রেমিক প্রেমিকাকে জড়িয়ে চুম্মা দিতে লাগলো। হঠাৎ মেয়েটি কড়াভাষায় ছেলেটিকে বলতে লাগলো আমার কাপড় খুলতে কি তোমার কি কষ্ট হয়? তারপর নিজের কাপড় নিজেই সব খুলে লেংটা হইয়ে গেলো। ছেলেটি মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করতেছে সে মেয়েটিও জানে। এখন চিন্তা করে দেখুন মেয়েরা নোংরামীতে ছেলেদের চায়তে কতটুকু এগিয়ে? আমি এরকম ভিডিও দেখেছি যে প্রেমিক সহ প্রেমিকের বন্ধুরা ও একটি মেয়ের সাথে সেক্স করেছে । এবং তার বন্ধু ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করতেছে তা মেয়ে টি দেখতেছে। এখন চিন্তা করে দেখুন এই অতি আধুনিক ছেলে মেয়েরা কত নিচে নেমে গেছে। এখন আমার প্রশ্ন হলঃ এরা কি মানব সমাজের না কি কত্তার সমাজের? এতো ক্ষন তো ভিডিও কথার বললাম। কিন্তু যেসব ঘটনা ভিডিও হইনা? সেই সব তো আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে যাই। এই সব নোংরামী দুনিয়ার কারো চোখে না পড়লে ও এক জনের চোখে ঠিকি পড়তেছে। সেদিন যার যার কৃত কর্মের হিসাব দিতে হবে।এবং তোমার হাত পাও দিয়ে আজ যা কিছুকি করতেছো সবই বলে দিবে কোনো কিছুই গোপন থাকবেনা। হে পুরুষ আজকে তুমি যে মেয়েকে প্রেমের ফাদে ফেলে তার দেহকে লুটে পুটে খাচ্ছ? তার নগ্ন ভিডিও ধারন করে বাজারে প্রকাশ করতেছো? এই মেয়েটি হইতো কারো বোন না হয় কারো মেয়ে হবে। তো্মারো তো বোন আছে। বিয়ে করলে মেয়েও হবে। অন্য কেউ যদি তোমার অথবা মেয়েকে নিয়ে এই সমস্ত নোংরামী কাজ করে ? তখন তোমার কেমন লাগবে। তোমার সন্তান যখন দেখবে তুমি বিয়ের আগে অন্য মেয়ের সাথে এই নোংরামী করেছো? তখন সে তোমাকে কি ভাববে? একটু কি ভেবে দেখেছো? তুমি কেনো তোমার বোনের সম্মান নষ্ট করতেছো? তোমার কাছে তোমার বোনের অথবা মেয়ের ইজ্জত আছে? অন্য ভায়ের বা বাবার কাছেও আছে। তুমি যদি স্বভ মানুষের ঘরে জন্ম নিয়ে থাক? তাহলে এই নোংরামীর পথ পরিহার করো। কারন তুমিও এক মায়ের পেট হতে বের হয়ে এসেছো। আবার আরেক জনের মা কে ধর্ষণ করতেছো? তোমার বিবেক গেলো কোথাই? হে নারী আজ তুমি প্রেমের আড়ালে নিজের দেহকে গোপনে অন্য কে ভোগ করতে দিচ্ছো? তুমি কি ভেবেছো সে তো্মাকে বিয়ে করবে? সে যদি তোমাকেই বিয়েই করবে? তা হলে সে তো্মার সাথে বিয়ের আগে পথে ঘাটে সেক্স করবে কেনো? কারন সে তো বিয়ের পরেই তো্মার সাথে এই সব করতে পারবে। 
ঠিক আছে আমি মেনে নিলাম সে তো্মাকে বিয়েই করবে। তা হলে সে গোপনে তো্মার নগ্ন ভিডিও ধারন করবে কেনো? এর জবাব দাও। অথবা তো্মার মা বাবা অন্য কোনো ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দিল? বাসর রাতে তো্মার স্বামী যখন জানতে পারবে বিয়ের আগে তুমি অন্য কারো সাথে সেক্স করোছো? অথবা তো্মার গোপন নগ্ন ভিডিও ক্লিপটি তোমার স্বমীর হাতে আসবে? তখন তো্মার কি হবে একটু ভেবে দেখেছো? যত ঝাটার জুতার বারি আছে? এক টিও মাটিতে পড়বেনা সব তোমার কপালে এসে পড়বে। নিজের খাইয়া নিজের পড়ে তোমাদের কে আর কত বুঝাবো। তা ছাড়া এই দেহের মালিক তুমি না তো্মার স্বামীর। তোমার দেহ ভোগ করার সম্পূর্ণ অধিকার তোমার স্বামীর। অন্য কারোর নাই। স্বামীর অধিকার লঙ্গন করার দ্বায়ে তো্মাকে জাহান্নামে যেতে হবে। তোমাদের চেয়ে এ দেশের মাগী ছাগীরাও অনেক ভালো । যদিও তার দেহকে টাকার বিনিময়ে সামান্য সময়ের জন্য অন্যর হাতে তুলে দেয়। তুবুও তো্মাদের মতো বিনা মূললে নিজের দেহকে অন্যকে ভোগ করতে দেয় না। এক টির মাগির দেহর দাম আছে কিন্তু তো্মার দেহর কোনো দাম নাই। আজ যদি বাংলাদেশের নারীদের কুমাড়ীত্ব পরিক্ষা করা হয়? তা হলে শতকরা ৩০% নারীদের কুমাড়ীত্ব পাওয়া যাবে কি আমার সন্দেহ হয়। যে সমাজের নারীদের কুমাড়ীত্ব থাকেনা? সে সমাজকে মানব সমাজ বলে না পুশুর সমাজ বলে। আজ আমাকে বলতে হচ্ছে [ যিনা ব্যভিচার ভরে যাচ্ছে দেশ, কুমাড়ীত্বহীন নারী দিয়ে গড়তে যাচ্ছি ডিজিটাল বাংলাদেশ।] আমরা বাংলাদেশ কে আমেরিকার পুশু সমাজের মতো দেখতে চাই না। বরং আমরা বাংলাদেশ কে স্বভ জাতি হিসাবে দেখাতে চাই। আমেরিকার মতো হায়া লজ্জাহীন ভাবে বিশ্ববাসী কে দেখাতে চাইনা।

প্রতিবাদের অপর নাম শাহেদ কায়েস by সাজেদা হক

ভালো আছেন কবি শাহেদ কায়েস। হাতের কবজিতে ও ঘাড়ে দায়ের কোপ আর কিছু কিল-ঘুষির ব্যথা নিয়ে সোনারগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন তিনি। চিকিৎসকরা বলছেন, আঘাত মারাত্মক, তবে আশঙ্কামুক্ত কবি।

কি কথা তাহার সাথে, তার সাথে? by অজয় দাশগুপ্ত

সকাল সকাল এয়ারপোর্ট যেতে হয়েছিল আজ। পরমাত্মীয়া যাচ্ছে বস-কান্ট্রি আমেরিকা সফরে। তাকে ছাড়তে সকালে টোস্ট চিবুতে চিবুতে চায়ের মগ হাতে দে-ছুট।

প্রভা হ্যাকিং করেন !

প্রভা হ্যাকিং করেন। এবং তিনি একটি হ্যাকার্স দলের হয়ে কাজ করেন। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? বিশ্বাস করতে হয়। অভিনয়শিল্পীদের কত কিছুই করতে হয়। একটি হ্যাকার্স দলের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটক `হ্যাকার্স`।

Monday, July 29, 2013

অস্ট্রেলিয়ার মেধাবী বাঙালিরা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিদ্যাশিক্ষা উপলক্ষে সেই ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। তারপর নানা দেশে ভ্রমণের সুযোগ এলেও এই দ্বীপ মহাদেশে আসার সুযোগ হয়নি, যতক্ষণ না আমাদের সুযোগ্য ছাত্র সহকর্মী এবং সে সময় মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিপসল্যান্ড ক্যাম্পাসের কম্পিউটার বিভাগের প্রধান ড. মঞ্জুর মুর্শেদ সুযোগ সৃষ্টি করল। যা হোক, এবার আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে অনুষ্ঠিত হবে বিধায় আবার সুযোগ হল। কুয়ালালামপুর থেকে উঠেছি ঘণ্টা সাতেকের পথ। সাধারণত খাবার যা দেয়া হয়, তা খেতে না পারলেও ফেলে দিই না।
ব্রিসবেন পৌঁছার পর কাস্টম ডিক্লারেশনের যে ফরম দেয়া হয়, তাতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর বুঝে না বুঝে লিখতে হয়। আমিও তাই করলাম। তারপর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর যেহেতু মালামাল সবই আমার সঙ্গে নেয়া ৬ কিলোগ্রাম ওজনের ব্যাগে, সেহেতু কাস্টমসে দৈব চয়নে আমাকে যে পরীক্ষা করা হবে, তা ধরেই নিয়েছিলাম। যেহেতু কোনো ফটকেই আমার ভাগ্য নেই। অতি সম্প্রতি আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য নামকরা একটি হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। কত মানুষ প্রবেশ করছে, কিন্তু আমার আর প্রবেশ করা হয় না। পরিশেষে দীর্ঘক্ষণ আমার এতিম অবস্থা দেখে আমাকে একজন পাহারাদার দয়াপরবশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। যা হোক, এত বড় বড় মালামাল রেখে শিকারি ক্ষুদ্র কুকুরটি যখন আমার ব্যাগের কাছে বসে পড়ল, আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে, শক্ত কাগজের মোড়কের ভেতরে বিমানবালা আমাকে যে খাবারটি দিয়েছিল, তার মধ্যে এক খণ্ড মাংসও ছিল। যা হোক, ওই মাংসের টুকরা রেখে তার পরিবর্তে আমাকে একটি রিসিপ্ট ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের সময় কোনো রকম প্রাণিজাত কিংবা উদ্ভিদজাত খাবার নেয়া যাবে না- এরকম একটি লিফলেট দিয়ে আমাকে বিদায় করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ছাত্র ও সহকর্মী ড. নিউটন এসে গেল। নাম দেখে তাকে বিদেশী ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তান। নিউটনের বিচক্ষণ পিতা তার ছেলেমেয়েদের নাম রেখেছে নিউটন, মিল্টন ও লিঙ্কন। সন্তানেরা কিছুটা হলেও নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে। নামের জন্য কোনো না কোনো সময়ে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়নি তা বলা যাবে না, তবে সুস্থির যুক্তিবাদী নিউটন যে যথেষ্ট সফলতার সঙ্গেই তার মোকাবেলা করেছে, এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বগুড়ার ছেলে নিউটন কোনোদিন ক্ষুদ্র চিন্তা করেনি। পিএইচডি করে ফিরে যখন বিভাগে যোগদান করল, তখন আমরা বিভাগে কোনো একটি বাইরের কাজ করছিলাম। যেখানে ছোটখাটো নানা কাজ আমরা বড় বড় অধ্যাপক ঠাণ্ডা মাথায় বসে করছিলাম, নিউটন তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এই বলে যে, যথেষ্ট বুদ্ধির কাজ না হলে সে করবে না।
নিউটনের ছাত্রজীবনে নানা সময়ে আমি গবেষণা প্রবন্ধ এবং তার সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতাম, যা নিউটন কখনও পাত্তা দেয়নি। এবার দেশে এসে খুঁজে দেখলাম অত্যন্ত হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নাল বিএমসি বায়োইনফরমেটিক্সের ভলিউম ১৪তে এ বছর তার দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য, নিউটনের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ Wizard ও Kangaroo ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানী মহলের নজর কেড়েছে। নিউটনের পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুপারভাইজার অধ্যাপক সাত্তার নিউটনের কাজ, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। ৬০ বছর বয়সী যশস্বী অধ্যাপক যখন অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী গবেষকের সঙ্গে আলাপে অনেক কিছু শেখা যায় বলে মন্তব্য করেন, তখন উভয়েই যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষক হিসেবে নিউটনের নজর কাড়তে না পারলেও তার অর্জন আমাকে রীতিমতো গর্বিত করে তুলল। অধ্যাপক সাত্তার আমাদের একাধিক ছাত্রের মেন্টর হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশে আয়োজিত সবচেয়ে নিয়মিত কনফারেন্স আইসিসিআইটিতে মূলবক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করে আমাদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় আমার উভয় ভ্রমণে আতিথ্যকর্তা হিসেবে অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার দেয়ার পর একটি তুর্কি রেস্টুরেন্টে অধ্যাপক সাত্তারের দেয়া সান্ধ্যভোজ ও আলাপচারিতা অত্যন্ত সুখকর ছিল। এরপর অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্কুলের তরুণ পরিচালক বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করার সম্ভাবনা এবং তাতে তার সহায়তার কথা আন্তরিকভাবে জানালেন। আমাদের স্নাতক এবং সেখানে ফ্যাকাল্টি ড. শাহাদাত উদ্দিন একটি সেমিনারের আয়োজন করল এবং তার বাসার আতিথেয়তাও উপভোগ করলাম। আমার সহপাঠী- এক সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামাল ভাই- সারাদিন সিডনির একাংশ পরিভ্রমণ করে দেখালেন। পরিশেষে অস্ট্রেলিয়ার আরেক রাজ্যের রাজধানী পার্থের উদ্দেশে রওনা হলাম। ৫ ঘণ্টার বিমানপথ। ৭ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ঘোষণা শুনে জেগে উঠলাম। বিরূপ আবহাওয়ার জন্য পার্থে নামা সম্ভব হয়নি বলে মেলবোর্নে অবতরণ করতে হয়েছে। যা হোক, পরিশেষে আরেকটি বিমানযোগে পার্থ পৌঁছানো সম্ভব হল।
বিমানবন্দরের বাইরে এসে ব্যাগটি নামিয়ে দু’একটি ছবি তুলছি। এরই মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী এসে আমার ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাগটি যে আমারই তা বুঝতে পেরে তার সুপারভাইজারকে ওয়াকিটকি ব্যবহার করে আসতে বলল। কোনো মালামাল অরক্ষিত রাখা যাবে না। যা হোক, সুপারভাইজার এসে আমাকে গোবেচারা ভেবে ব্যাগটি দিয়ে দিল। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক ড. ফেরদৌস সোহেলের আতিথেয়তায় আমাদের স্নাতক ও অন্যান্য বাংলাদেশীর প্রশংসনীয় আন্তরিকতায় সিক্ত হয়ে আরেকখানি সেমিনারে বক্তব্য রেখে দেশের পথে পা বাড়ালাম।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদের পর মাঠের রাজনীতি কতটা তপ্ত হবে? by বিভুরঞ্জন সরকার

ঈদের পর রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপি ঈদের পর মাঠে নামার ঘোষণা রোজার আগেই দিয়ে রেখেছে। এখন প্রতিদিনের ইফতার পার্টিতে এ ঘোষণার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম ঈদের পর মাঠে নামবে বলে জানিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিও ঈদের পর মহাজোটে থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত ঈদের পর জানাবে বলে এরশাদ সাহেব তার একাধিক বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। জোট-মহাজোটের পরিধি বাড়ানোর রাজনৈতিক উদ্যোগ-প্রচেষ্টাও ঈদের পর বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ঈদের পর মাঠে নামবে জনমত নিজেদের অনুকূলে এনে হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে ‘উপযুক্ত’ জবাব দেয়ার প্রস্তুতি সরকারি দল নিচ্ছে বলে শোনা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এখন দেশে আছেন। তিনি নির্বাচন পর্যন্ত দেশে থেকেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় সাহায্য-সহযোগিতা করবেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি যুবলীগের এক ইফতার পার্টিতে জয় বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসবে। তার কাছে এ সংক্রান্ত কী তথ্য আসলে আছে, সেটা তিনি বিস্তারিত বলেননি। তবে তার এই আশাবাদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমন চাঞ্চল্য দেখা যায়নি।
অন্যদিকে বিএনপির মাঠে নামার লক্ষ্য হচ্ছে, আন্দোলন জোরদার করে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা। বিএনপি ১৮ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়েই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। তবে এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ১৮ দলভুক্ত অন্য দলগুলোর পক্ষে আন্দোলনে বাড়তি শক্তি জোগানোর ক্ষমতা নেই। তারা কেবল জোটের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখছে। তবে বিএনপি নতুন মিত্র হিসেবে সঙ্গে পাবে হেফাজতে ইসলামকে। হেফাজতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারাও ঈদের পর আবার মাঠে নামবে এবং ১৩ দফা দাবি মানতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ৫ মে শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর হেফাজত আবার সংগঠিত হয়ে তাদের শক্তি দেখাতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।
মাঠে নামার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গী-সাথী আছে বলে মনে হচ্ছে না। ১৪ দলকে সক্রিয় করা এবং তাদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৪ দলভুক্ত একটি ছোট দলের একজন নেতা জানিয়েছেন, ১৪ দলের ঐক্য সুসংহত ও তা সারাদেশে সম্প্রসারণের ব্যাপারে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ যখন মনে করে, কেবল তখনই ১৪ দলের বৈঠক আহ্বান করা হয়। তবে ১৪ দলীয় জোটকে সম্প্রসারিত করার জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। গত ২৪ জুলাই ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপির নেতৃত্বে তাদের একটি প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করে জোট সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। ১৪ দলের বাইরে থাকা বাম বলয়ের দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য-আলোচনা শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ফলাফল কী দাঁড়াবে সেটা এখনই বলা যায় না। আবার জাতীয় পার্টি এখন মহাজোটে আছে নামেমাত্র। এ দলের কাছ থেকে আওয়ামী লীগের আর সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বেশ কিছুদিন ধরেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে মহাজোট ছাড়ার কথা বলে আসছেন। ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ের পর এরশাদ মহাজোট ছাড়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করেছেন বলেই মনে হয়। ঈদের পর এবং এ সরকারের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগেই এরশাদ মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি এটাও বলেছেন, জাতীয় পার্টি ১৮ দলীয় জোটে যোগ দেবে না। আগামী সংসদ নির্বাচনে এককভাবেই অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। অবশ্য মহাজোটে থাকা না থাকা নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যেও মতভিন্নতা আছে। দলের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই মহাজোট ছাড়ার পক্ষে হলেও মহাজোটের সঙ্গে থাকার পক্ষেও প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা আছেন। মহাজোটে থাকা না থাকার ইস্যুতে জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন দেখা দিতে পারে বলেও কোনো কোনো পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই খবরের সূত্র ধরে এরশাদ বলেছেন, কারও যদি ‘রাজনৈতিক এতিম’ হওয়ার বাসনা থাকে তাহলে জাতীয় পার্টি ত্যাগ করতে পারেন। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, ঈদের পর মাঠে নামলে আওয়ামী লীগ যে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে পাবে না এটা প্রায় নিশ্চিত। তাহলে এটা বলা যায়, ঈদের পর বিরোধী দলের যে আন্দোলন পরিকল্পনা তা মোকাবেলা করতে হবে আওয়ামী লীগকে একাই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ঈদের পর সত্যি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কি-না? দেশের মানুষ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত আছে কি-না? এখন আন্দোলনের নামে যে ধরনের সহিংসতা চলে, মানুষ তা পছন্দ করে না। গত কমপক্ষে দুটি ঈদের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঈদের পর সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ঈদের পর ‘সর্বশক্তি’ নিয়ে মাঠে নামার কথা গত দুই ঈদের আগেও বিএনপি বলেছিল। সরকারকে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে না দেয়ার ঘোষণাও বিএনপি দিয়েছিল। কিন্তু ঈদের পর বিএনপি আন্দোলনের এমন কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি যার জন্য সরকার চাপের মুখে পড়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই এটা মনে করছেন যে, এবারও ঈদের পর সরকারবিরোধী আন্দোলন জমাতে পারবে না বিএনপি। সরকারের মেয়াদ শেষে এসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আগ্রহী হয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত কারণ দেখা যায় না।
এসব কিছু বিবেচনায় রেখেই ‘নির্দলীয়’ সরকারের দাবি অব্যাহত রেখে বিএনপি বর্তমান সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল নিলেও তারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতিও পুরোপুরিভাবেই রাখছে। আন্দোলন করে যদি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করা যায় তো ভালো, আর যদি তা শেষ পর্যন্ত না-ই হয়, তাহলেও তারা নির্বাচনের মাঠ আওয়ামী লীগকে ফাঁকা ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ তথা সরকার বিএনপির দাবি মেনে নির্দলীয় কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করবে না- আওয়ামী লীগের বক্তৃতা-বিবৃতি পর্যালোচনা করলে সেটাই মনে হয়। বিএনপি যদিও বলছে, তাদের দাবি না মানলে তারা নির্বাচনে যাবে না, তবে তাদের কথার মধ্যে এখন যথেষ্ট ফাঁক থাকছে বলে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন। গত ২২ জুলাই এক ইফতার পার্টিতে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার অধীনে নয়।’ স্পষ্টতই বোঝা যায়, বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। এখন তারা নির্দলীয় সরকার নিয়েই দরকষাকষি চালাবে। এই নির্দলীয় সরকার বলতে বিএনপি প্রকৃতপক্ষে কী বোঝাচ্ছে, কিভাবে এই সরকার গঠিত হবে, নির্দলীয় ব্যক্তিদের কোন মাপকাঠিতে এবং কিভাবে চিহ্নিত করা হবে- এসব কিছু পরিষ্কারভাবে জাতির কাছে বিএনপিকেই তুলে ধরতে হবে।
আওয়ামী লীগ যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছে, স্বাভাবিকভাবেই সে সরকারের প্রধান থাকবেন শেখ হাসিনা। কিন্তু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে বিএনপির প্রবল আপত্তি। তাহলে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আর কোনো উপায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হতে পারে কি-না, সেটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর তাগিদ বিভিন্ন মহল থেকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আগে বিএনপিকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তাদের ঝেড়ে কাশতে হবে। কারণ কেউ কেউ এমনও মনে করছেন যে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা যাই হোক না কেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিশেষ করে ৫ সিটি নির্বাচনে জয়ের পর নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে যে দোদুল্যমানতা ছিল, এখন তা অনেকটাই দূর হয়েছে। তাদের এখন আস্থা ফিরে এসেছে। বিএনপি গত ৪ বছর সরকারবিরোধী আন্দোলন করে বস্তুত কিছুই অর্জন করতে পারেনি। অথচ ৫ সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং জয়লাভ করে তারা যে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করেছে, তা এককথায় তুলনাহীন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখন এটা মনে করছেন যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক গত ২২ জুলাই এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নিজেদের সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে হারবে। এটা যদি তার কথার কথা না হয়, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারবে জেনে বিএনপি সে নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে কেন? আর বিএনপি যদি দূরেই থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ হারবে কার কাছে?
নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজপথে থাকার কৌশল বিএনপি সম্ভবত এই কারণেই নিচ্ছে যে, যদি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে আসে, তাহলে সরকার হয়তো দাবি মানতে বাধ্য হলেও হতে পারে। সরকার আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নিলে বিএনপি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক খেলায় জিতে যাবে। আর মানুষ যদি বিএনপির আন্দোলনের ডাকে সেভাবে সাড়া না দেয়, তাহলেও বিএনপির কোনো ক্ষতি নেই। আন্দোলনের নামে একের পর এক হরতালের কর্মসূচি দিয়ে তারা জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। এতে মানুষ সরকারের ওপরই ক্ষিপ্ত হবে। সরকার জনপ্রিয়তা হারাবে। ঈদের পর বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন কতটুকু জোরালো করে তুলতে পারবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, আন্দোলন-সংগ্রামে দেশের মানুষের আগ্রহ কম। তাছাড়া আন্দোলনের কোনো অটোসিস্টেম নেই। সুইচ টিপে দিলেই আন্দোলন হয় না। দেশের মানুষের মধ্যে যে আন্দোলনের মনোভাব তীব্র হয়ে উঠেছে, কোনো কিছু থেকেই তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আন্দোলন মানেই এখন ধ্বংস, মৃত্যু, রক্তপাত, সংঘাত, হানাহানি। মানুষ এসব চায় না। মানুষ শান্তি চায়। আর সে জন্যই ভোট দিয়ে তারা সরকার পরিবর্তন করতে চায়। সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থা থাকলেও বিরোধী দলের প্রতি আস্থা আছে- বিষয়টি তেমনও নয়। তারপরও মানুষ নিরুপায় হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলকে ভোট দিয়ে থাকেন। এটা বিরোধী দলের সাফল্য নয়, সরকারের ব্যর্থতা। তবে এবার ঈদের পর আন্দোলনে নামলে বিএনপির জন্য কিছু বোনাস পরিস্থিতি থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক দিনে একাধিকবার বলেছেন, এ সরকারের মেয়াদকালেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কয়েকটি রায় কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে বর্তমান সরকার যাতে কোনো রায় কার্যকর করতে না পারে সে জন্য তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করবে জামায়াত-শিবির। জামায়াত-শিবিরের প্রতিরোধ কতটা হিংস্র ও ভয়াবহ হয়, সেটা গত কয়েক মাসে দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। জামায়াত-শিবিরের প্রস্তুতির পাশাপাশি ঈদের পর মাঠে নামার কথা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতের আমীর মাওলানা শাহ আহমদ শফী বলেছেন, ‘দেশের আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার যে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, যে রক্ত ঝরানো হয়েছে, ঈদের পর এর জবাব দেয়া হবে।’ তাদের এই জবাবদান প্রক্রিয়া ৫ মে’র সহিংসতাকে ছাড়িয়ে যাবে কি-না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে আসছে।
দেশের পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে সরকার কী করবে, কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেটা নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের মেয়াদ শেষে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রক্তপাত ঘটালে সেটাও সরকারের জন্য সুখকর হবে না। তবে আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল। অনেক চড়াই-উতরাই, পতন-অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এই দলে এখনও অসংখ্য পোড় খাওয়া নেতাকর্মী আছেন, যারা বিপদ-আপদে দলের জন্য বুক পেতে দেবেন, কিন্তু পিঠ দেখাবেন না। সিটি নির্বাচনের পরাজয়ের গ্লানিতে ধুঁকছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে আন্দোলনের মুখে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হলে ভোটের আগেই তাদের আরেকটি পরাজয় ঘটবে। সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ ও সরকার ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে কী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে, দেশের মানুষ এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায়।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক

আলোচনা-সমালোচনায় তারেক রহমান by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

মানুষের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কোনো মানুষ নেই। যে যত বড় মানুষ, তার তত বেশি সমালোচনা। সমালোচনা মানুষকে আরও বিখ্যাত করে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে, বর্তমানে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অতীতেও হয়েছে, বর্তমানেও থেমে নেই। চারদলীয় জোট সরকারের একেবারে শেষের দিকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা হয়েছে। এ সমালোচনায় সত্য-মিথ্যার কোনো বালাই ছিল না, যে যেভাবে পারে সেভাবেই তার সমালোচনা করেছে। একটি সমালোচনার ধরন আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই, ‘চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে তারেক রহমান নাকি শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই ২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন। অথচ বাস্তবতা হল, বিদ্যুৎ খাতে জোট সরকারের পাঁচ বছরে সর্বমোট বরাদ্দই ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা।’
বিদ্যুতের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে এ সমালোচনাটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় তার প্রতিপক্ষ এবং মানুষ তা বিশ্বাসও করে। কেননা এ সমালোচনার বিপরীতে কোনো প্রতিবাদ তখন ছিল না। কার্যত এ সমালোচনাটির মাধ্যমেই তারেক রহমান জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এ অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করে মইন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকার। তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় প্রায় ১৫টি দুর্নীতি মামলা, যার একটিরও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি। গ্রেফতার করে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন; এমনকি নির্যাতন চালিয়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় পর্যন্ত ভেঙে দেয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি লন্ডনে যান চিকিৎসা নিতে। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন।
তার বিরুদ্ধে সমালোচনা থেমে নেই; চলছে সমান তালে, বিশেষ করে ওই সময়ের ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করছে তার প্রতিপক্ষ। দীর্ঘ সাত বছরেও যার বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা প্রমাণ তো দূরের কথা অভিযোগ পর্যন্ত গঠন করা সম্ভব হয়নি, তার বিরুদ্ধে নতুন করে সমালোচার কী যুক্তি থাকতে পারে, তা বোধগম্য নয়। এমন সমালোচনা করে কোনো লাভ নেই, যা হিতে বিপরীত হয়। সুতরাং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন করে সমালোচনা তাকে আরও অধিকতর বিখ্যাতই করবে।
যে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির কল্পকাহিনী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল- মানুষ দেখছে সে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চিত্র। লোভশেডিং তো বন্ধ হয়ইনি, তা আরও বেড়েছে। গ্রাহকদের ওই সময়ের চেয়ে আরও চার-পাঁচগুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। এ বর্ধিত বিল দিতে গিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষ অবলীলায় বলছে, আমরা ওই আমলেই ভালো ছিলাম।
তারেক রহমান একজন আপাদমস্তক রাজনীতিক। তিনি একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় সংগঠক। এটি তিনি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তৃণমূলের মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। তিনি তাদের অতি কাছে গিয়েছেন। তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, যা একজন রাজনীতিবিদের জন্য অপরিহার্য। তিনি যে দল করেন, সে দলের রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। বাংলাদেশে এ দলটি পাঁচবার সরকার পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো কাজ এ দলটির মাধ্যমেই হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করা, মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা, এনজিও’র কর্মকাণ্ড তৃণমূলে বিস্তৃত করা, নারীর ক্ষমতায়ন ও হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ও টু-স্ট্রোকচালিত যানবাহন বন্ধ করা ইত্যাদি। এসব যুগান্তকারী কাজের মাধ্যমে তৃণমূলে বিএনপির রয়েছে শক্তিশালী ভিত্তি, যা তারেক রহমানের রাজনীতির জন্য তৈরি করেছে অবারিত সুযোগ। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তার এ সম্ভাবনা ধূলিসাৎ করারও আশংকা রয়েছে। সার্বক্ষণিক নেতৃত্বে আসার আগে তাকে এসব অপরিহার্য দিক বিচার-বিশ্লেষণ অবশ্যই করতে হবে। কেননা নেতৃত্ব একটি অত্যন্ত কঠিন জিনিস। নেতৃত্বের সম্ভাবনা যার মধ্যে বিদ্যমান, তার সঙ্গে স্রষ্টার নৈকট্য আছে। ভুল-ত্র“টি এক সময় মানুষের হয়, এ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই মানুষ পরিশুদ্ধ হয়। নিজের ভেতরে থাকা নেতিবাচক দিকগুলো যিনি চিহ্নিত করতে পারেন- বিখ্যাত মানুষ হতে তার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না।
ন্যায় ও সত্যের পথ অনুসরণ করতে জনগণকে উৎসাহ প্রদান এবং পরিবর্তন আনয়নে অনুঘটক হওয়ার ক্ষমতাই হচ্ছে সত্যিকারের নেতৃত্ব। কাজেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃতি হতে হবে উদারনৈতিক, সংকীর্ণমনা নয়। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিত্ব হতে হবে সৃজনমুখী; হতে হবে সংবেদনশীল, কঠোরমনা নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জনগণের আমানত হিসেবে গণ্য করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের প্রভাব, বৈভব বা প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না।
নেতৃত্বের বিভাজন প্রত্যেক দেশেই আছে, আছে আদর্শগত বিরোধও। তাই বলে কি অহেতুক সমালোচনা করে একে অপরকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠতে হবে? নেতৃত্বকে কলুষিত করা মানে রাষ্ট্রকে বিপন্ন করা। কেননা নেতৃত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ওতপ্রোত। অহেতুক সমালোচনার প্রভাবে গোটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় । কাজেই অহেতুক সমালোচনার আÍঘাতী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনীতিকে তার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিতে হবে।
যারা বাংলাদেশ শাসন করার ইচ্ছা রাখেন তাদের একটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে; ‘স্ট্র্যাটেজিক’ কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন অপরিসীম। কেননা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ২৫০ কোটি মানুষের বসবাস। আগামী দিনের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ঘিরে। আর বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ রয়েছে। তাই শিল্পোন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ; এখানে একটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নিরন্তন প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে পক্ষে রাখতে না পারলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে যে পিছিয়ে পড়তে হবে, এটি উন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অনুধাবন করতে পেরেছে। তাই বাংলাদেশে তাদের ব্যাপক তৎপরতার দিকটি প্রতীয়মান হচ্ছে। সমালোচনার মাধ্যমে নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে তৎপর। কাজেই অহেতুক সমালোচনা করে প্রতিহিংসার জন্ম দেয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমীচীন নয়। তাতে অবধারিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও জনগণ। কাজেই এখন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা রাজনীতিকদের জন্য অপরিহার্য।
আমরা প্রায়ই শুনি, ক্ষমতা দূষিত করে। একথা সত্য নয়, ক্ষমতা তাদেরই দূষিত করতে পারে, যারা দূষণযোগ্য। সৎ লোকের হাতে ক্ষমতা আশীর্বাদস্বরূপ, আর অধার্মিকের হাতে তা অভিশাপ। বিশ্বাসঘাতক, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ এবং প্রতারক লোকেরাই দুর্নীতি ডেকে আনে। সুতরাং নেতৃত্বের সংস্পর্শে যাতে এসব দোষী মানুষ ঘোরাঘুরি করতে না পারে সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য। কিছু খারাপ মানুষের জন্য তারেক রহমান ও বিএনপিকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারলেই এই চড়া মূল্য দেয়ার সার্থকতা থাকবে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

টিকফা প্রসঙ্গে কিছু কথা by তারেক শামসুর রেহমান

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মজিনা বলেছেন, আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে টিকফা স্বাক্ষরিত হবে। টিকফা বা Trade and Investment Co-operation Frame work Agreement (TICFA) নিয়ে বাংলাদেশে নানা মত আছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে যেমনি একটি মত আছে, ঠিক তেমনি একটি বিপক্ষ মতও আছে। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা এরই মধ্যে চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। তবে মজার কথা, টিকফার বিষয়বস্তু এখন অব্দি উপস্থাপন করা হয়নি, এমনকি সংসদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদেরও টিকফার ব্যাপারে আশাবাদী। সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশাও ব্যক্ত করা হয়েছে, টিকফা স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে। বলা ভালো যুক্তরাষ্ট্র অতিসম্প্রতি কিছু পণ্যের যে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) বাংলাদেশকে দিত, তা স্থগিত করেছে। স্থগিত হওয়ার পেছনে মূল কারণটি ছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমমান নিশ্চিত করার ব্যর্থতা। এমনকি আশুলিয়ায় শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, তৈরি পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা না করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট ছিল। ফলে একপর্যায়ে কংগ্রেস সদস্যদের চাপের মুখে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশ সরকারের একটা উদ্দেশ্য হতে পারে, টিকফা স্বাক্ষর করলে হয়তো বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবে। প্রকৃতপক্ষে এর সঙ্গে টিকফার কোনো যোগসূত্র নেই।
দ্বিতীয় আরেকটি যে বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি বাড়বে না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা চেয়ে আসছিল। কিন্তু তৈরি পোশাকে আমাদের কোনো জিএসপি সুবিধা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার হচ্ছে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মাঝে মাত্র ০.৫ ভাগ পণ্য এ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। এর পরিমাণ মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার কর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনও তার পণ্য নিয়ে টিকে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় যেসব বাংলাদেশী পণ্যে, তার মাঝে রয়েছে- তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, খেলনা ইত্যাদি। এর খুব কম পণ্যই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে। গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাকে বাংলাদেশী রফতানিকারকরা শতকরা ১৫ ভাগ হারে শুল্ক পরিশোধ করে বাজার ধরে রেখেছে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তি অনুযায়ী একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে তার পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা দিচ্ছে না। এ সুবিধা উন্নত রাষ্ট্রগুলো পায়। তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দোহা চুক্তি লংঘন করেছে। সুতরাং তৈরি পোশাকে আমরা যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা না পাই, তাহলে এ জিএসপি সুবিধা রফতানির ক্ষেত্রে কোনো বড় অবদান রাখতে পারবে না। আজ যদি জিএসপি সুবিধার আশ্বাসে আমরা টিকফা স্বাক্ষর করি, তাতে আমাদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। টিকফার সঙ্গে তাই জিএসপি সুবিধাকে মেলানো যাবে না। জিএসপি সুবিধা একটি ভিন্ন বিষয়।
এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে টিকফা করে আমরা কতটুকু উপকৃত হব। টিকফা স্বাক্ষরিত হলে দেশে মার্কিনি বিনিয়োগ বাড়বে, এটা সত্য কথা। এতে করে আমাদের বাজার, সেবা খাত উন্মুক্ত হয়ে যাবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য। ব্যাপক প্রাইভেটাইজেশন ঘটবে, তাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যক্তিগত খাত। টিকফার (প্রস্তাবিত) ৫ ও ১৯ ধারা মতে উভয় দেশ (বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র) বাণিজ্যে বেশ নমনীয় নীতি গ্রহণ বাড়াবে এবং ব্যাপক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে। ৮নং ধারায় ব্যাপক ব্যক্তিগত খাত প্রসারের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কমিশন গঠন করার কথাও আছে। এদের কাজ হবে ব্যক্তিগত খাত কীভাবে আরও বিকশিত করা যায়, সে ব্যাপারে উভয় সরকারকে উপদেশ দেয়া। ৯নং ধারায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। কিন্তু উৎপাদন খাতে জড়াবে না। অর্থাৎ কোনো পণ্য উৎপাদন করবে না। এখানে সমস্যা হবে অনেক। এক. যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে (বিশেষ করে সেবা খাতে) এবং এসব কোম্পানিকে ট্যাক্স সুবিধা দিতে হবে। আইনে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশকে সেই আইন সংশোধন করতে হবে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা মার খাবে। তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। দুই. চুক্তির ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য থাকবে। জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর ব্যবহার, টেলিকমিউনিকেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিল্প খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে, শিক্ষা খাত পণ্যে পরিণত হবে। বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এতে করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। যারা ধনী, তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে, আর যারা গরিব তারা শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
একই কথা প্রযোজ্য স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্য খাতে খরচ বেড়ে যাবে। এসব সেবামূলক খাত থেকে সাধারণ মানুষ যে ‘সেবা’ পেত, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে। সেবার জন্য সাধারণ মানুষকে তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ গ্রাহককে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস কিনতে হবে। সরকারি ভর্তুকির কোনো সুযোগ থাকবে না। তিন. সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকবে কৃষি ও আইটি সেক্টর। কৃষিতে যে সরকার ভর্তুকি দেয়, তা আর দিতে পারবে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তিতে বলা হয়েছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলো কৃষিতে ৫ ভাগের বেশি ভর্তুকি দিতে পারবে না। টিকফার ১৮নং ধারায় বলা হয়েছে, কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে হবে। মজার ব্যাপার যুক্তরাষ্ট্র নিজে কৃষিতে ভর্তুকি দেয় ৯ ভাগ। এখন বাংলাদেশে কৃষি সেক্টরে ভর্তুকি কমানো হলে কৃষিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। ফলে কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে চাল উৎপাদন হ্রাস পাবে। বাংলাদেশকে এসব চাল আমদানি করতে হয় না। কিন্তু উৎপাদন হ্রাস পেলে মার্কিন কৃষি পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা গম ও চাল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। চার. বলা হচ্ছে টিকফা হলে বাংলাদেশের রফতানি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা অত্যন্ত উচ্চ কর দিয়ে (১৫ দশমিক ৩ ভাগ) বাংলাদেশ তার রফতানি বাজার সম্প্রসারিত করেছে। অথচ চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের চেয়ে কম কর দেয়, মাত্র শতকরা ৩ ভাগ। অথচ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো টিকফা নেই। পাঁচ. বাংলাদেশ বড় সমস্যায় পড়বে মেধাস্বত্ব আইন নিয়ে। টিকফা চুক্তি কার্যকর হলে এ মেধাস্বত্ব আইনের শক্ত প্রয়োগে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর, ওষুধ শিল্প ও কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা। কৃষক আর বীজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বীজ কিনতে বাধ্য করা হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এক সময় জিম্মি করে ফেলবে আমাদের কৃষি সেক্টরকে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প উন্নয়নশীল দেশে নাম করলেও টিকফার পর এ শিল্প এক ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে। কেননা ওষুধ কোম্পানিগুলো প্যাটোট কিনে কাঁচামাল আমদানি করে সস্তায় ওষুধ তৈরি করে। বিশ্বের ৬০টি দেশে এ ওষুধ রফতানি হয়। এখন এ টিকফার ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্যাটোট ক্রয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য এ সুযোগটি রয়েছে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে মার্কিন কোম্পানির লাইসেন্স কিনতে হবে। এ লাইসেন্স দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে হবে। ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ওষুধ ক্রয় করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের কম্পিউটার সফটওয়্যার শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কেননা এখন স্বল্পমূল্যে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে কম্পিউটার এ দেশেই সংযোজিত হয়। ফলে কম্পিউটারের দাম একটা ক্রয় সীমার মধ্যে আছে। কিন্তু টিকফার বাধ্যবাধকতার কারণে এ ‘ক্লোন কম্পিউটার’ আমদানি বা সংযোজন বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশকে তখন ব্র্যান্ড কম্পিউটার আমদানি করতে হবে, যার মূল্য গিয়ে দাঁড়াবে অনেক। সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে তা চলে যাবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল যুগের’ কথা বলছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে তখন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে টিকফা করে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলো এলে তাতে বাংলাদেশে ‘সেবার’ মান বাড়বে। সেবা সেক্টরে নিয়ম শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় তাতে সেবার মান বাড়বে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু এ ‘সেবার’ জন্য অনেক অর্থ ব্যয় হবে। শিক্ষা খাতে মার্কিনি পুঁজি বিনিয়োগ হলে শিক্ষার মান উন্নত হবে। যারা সার্টিফিকেট বিক্রি করে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারব। ক্ষতি হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এখানে সরকারের বিনিয়োগ কমবে। এ ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়িয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য হয়তো হবে না। কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের জন্য তা সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। তাদের বৃত্তির সংখ্যা বাড়বে। মেধার মূল্য হবে। এখন যেভাবে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হয়, তখন তা আর থাকবে না।
টিকফা স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র গত এক যুগ আগেই বাংলাদেশকে এ চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এটা সত্য যে বাংলাদেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র টিকফা করছে না, পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টিকফা রয়েছে। ভারত, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার মতো উঠতি অর্থনৈতিক শক্তির দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পেরেছে আমরা তা জানি না। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাংলাদেশ ‘নেগোসিয়েশনস’-এ কখনও সাফল্য দেখাতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে টিকফা নিয়ে আলোচনায় বিভিন্ন প্রশ্নে বাংলাদেশ তার স্বার্থ কতটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে, আমরা তা জানি না। আগামী দিনগুলোই এর প্রমাণ করবে। তবে একটা জিনিস নিশ্চিত করেই বলা যায় আর তা হচ্ছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ যদি এ চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে করে সম্পর্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে দেখে। এজন্য জিএসপি সুবিধা প্রাপ্তি কিংবা গার্মেন্ট শিল্পের পরিস্থিতির সঙ্গে টিকফাকে মেলানো যাবে না। এটা একটি ভিন্ন ইস্যু।
টিকফার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, বিনিয়োগের গ্যারান্টি ও নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ, শ্রমমান বাড়ানোর প্রশ্ন। এ চুক্তিতে জিএসপি সুবিধার প্রশ্নটি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্লাটা এতে ভারি। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এতে কম। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গেই এ ধরনের চুক্তি করেছে। এখন বাংলাদেশের সঙ্গেও করল।
নিউইয়র্ক, ২৪ জুলাই, ২০১৩
ড. তারেক শামসুর রেহমান :
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Sunday, July 28, 2013

অপরিকল্পিত নগরে ফুটপাতও দখলে! by ড.হারুন রশীদ

বাংলাদেশ একটি রাজনীতি প্রভাবিত দেশ। রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে অনেক জনহিতকর ইস্যুও চাপা পড়ে যায়। ফলে যুগের পর যুগ সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। মাঝেমধ্যে সমস্যা নিয়ে আলোচনার টেবিল গরম হলেও সে উত্তাপ ফুরিয়ে যায় সমস্যা সমাধানের আগেই। যানজট, গণপরিবহন সংকটের মতো সমস্যা নিয়ে দিন দিন হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীবাসী। কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে ছিল, রয়ে গেছে সেখানেই।
আসলে সমস্যা রয়েছে পরতে পরতে। ঢাকা দেশের রাজধানী, সবচেয়ে বড় নগরী এবং দেড় কোটির বেশি মানুষের বাস এখানে। এখানে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় ছাড়াও রয়েছে নানা অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল। এখানে অনেক বিদেশীও নানা কর্মসূত্রে আসছেন, অনেকে বসবাসও করছেন। সব মিলিয়ে মহাকর্মব্যস্ত এক নগরী ঢাকা। দুঃখজনক হলেও সত্যি ৪শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ঢাকা নগরী বেড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে। ফলে নাগরিক সুবিধার অনেকটাই এখানে অনুপস্থিত। আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি। পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু হলে প্রত্যেক নগরেই মানুষ শৃংখলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু নগর পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না। অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠার কারণে রাজধানীর মোট ২ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার রাস্তার একটি বড় অংশ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের দখলে। বিশেষ করে ঢাকার ফুটপাতগুলো দখলে থাকায় যারপরনাই ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। আসন্ন ঈদ মৌসুমে ফুটপাতগুলো পরিণত হয়েছে হকার মার্কেটে। যানজটের নিগড়ে পিষ্ট মানুষের কাছে এ যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া। সাধারণত হকাররাই ফুটপাত দখল করে রাখে। ফুটপাতে হকারদের বসা, না বসা নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলছেন, ছিন্নমূল এসব মানুষজনকে যদি ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা হয়, সেটা হবে তাদের রুটি-রুজির ওপর হস্তক্ষেপ। তাই স্থায়ী পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ হবে সম্পূর্ণ অমানবিক। বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার সমিতির তথ্যানুসারে বর্তমানে ঢাকা শহরে ১ লাখ ৩০ হাজার হকার রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার স্থায়ী ও ৬০ হাজার অস্থায়ী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহায় সম্বলহীন এসব মানুষ ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে এসে হকার পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। সামান্য পুঁজিতেই ফুটপাতে বসে যে কোনো ধরনের ছোটখাটো ব্যবসা করা যায়। আর সরকারি দলের পাতি মাস্তান, পুলিশ, অন্যান্য চাঁদাবাজ গোষ্ঠীকে বখরা দিয়ে বাকি যে আয় থাকে, তাও নিছক কম নয়। ওই দিয়েই এক একজনের আয়ে ৩-৪ জনের একটি সংসার চলে।
প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাসের এই নগরী আসলে এক বিশাল বাজার। এ বাজারের অন্তত ২৫ শতাংশ অর্থনীতি পরিচালিত হয় বা নিয়ন্ত্রিত হয় এই হকারদের মাধ্যমেই। হকারদের কাছ থেকে সস্তায় জিনিসপত্র কেনা যায়। কারণ তাদের দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয় না বলে পণ্যের মূল্যের ওপর তার প্রভাব পড়ে না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিু-মধ্যবিত্তের লোকজন কেনাকাটার জন্য হকারদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে হকার উচ্ছেদের ব্যাপারটি একপাক্ষিক নয়। তাদের উচ্ছেদ করলে কোথায় গিয়ে তারা দাঁড়াবে, এ বিষয়টিও অবশ্যই ভাবতে হবে। যানজট সৃষ্টির জন্য হকারদের দায়ী করা হলেও তারা আসলে এজন্য কতটা দায়ী সেটিও ভেবে দেখতে হবে। ঢাকার যানজটের প্রধান কারণ রাস্তা সংকট। ঢাকায় যে পরিমাণ জমি রয়েছে তার জন্য ২৫ ভাগ রাস্তা দরকার। সেখানে অলিগলিসহ আছে মাত্র ৭ ভাগ। মেইন রোড আছে ৩ ভাগ। এই ৩ ভাগের ৩০ ভাগ দখল করে অবৈধ দখলদাররা। যার মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে হকার। রাজধানীর ৭০ শতাংশ ফুটপাত প্রাইভেট গাড়ি দখল করে রেখেছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যে পুলিশ হকার উচ্ছেদ করে সেই পুলিশই রাজধানীর ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারে দেড় শতাধিক পুলিশবক্স স্থাপন করেছে। যার সবই অবৈধ। সিটি কর্পোরেশন থেকে কোনো অনুমতি না নিয়েই তা করা হয়েছে। ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারের ওপর এসব বক্সের কারণে লোকজনের চলাচলে মারাÍক অসুবিধা সৃষ্টি হলেও কারও কিছ– করার নেই। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন পুলিশের চাপের মুখে এসব অবৈধ বক্স উচ্ছেদ করতে পারছে না। আইন প্রয়োগকারীরাই যদি আইন না মানেন, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
রাজধানীর ভাসমান হকারদের পুনর্বাসনে গত ২৫ বছরে অন্তত দুই ডজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৯ সালেও বাস্তবায়ন করা হয় দুটি প্রকল্প। ডিসিসির খাতাপত্রে এসব প্রকল্পের আওতায় সর্বমোট ১৮ হাজার হকারকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। রাজধানীর হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তৎকালীন ঢাকা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নগরীর সদরঘাট এলাকায় প্রথম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ১৯৫২ সালে। সদরঘাট হকার্স মার্কেট নামের ওই প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হয় সর্বমোট ৮১২ হকারকে। এরপর ১৯৭৯ সালে সদরঘাট এলাকাতেই হকার পুনর্বাসনের ২য় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। লেডিস পার্ক হকার্স মার্কেট নামের ওই প্রকল্পে ৬৪৫ হকার পুনর্বাসিত হয়। তারপর আশির দশকের শেষার্ধে হকার পুনর্বাসনের ব্যাপকভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এভাবেই গত ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৮ হাজার হকারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু এত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও নগরজুড়ে হকারের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, হকার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার আদৌ কি কোনো শেষ আছে?
আসলে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কথাই বলি আর হকার পুনর্বাসনের কথাই বলি- এ দুটি কাজ করতে হলে উভয়পক্ষ থেকেই দায়িত্বশীল কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। স্রোতের মতো হকাররা আসতে থাকবে আর তারা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করবে, তারপর পুনর্বাসনের দাবি তুলবে- এটি কখনও বাস্তবসম্মত নয়। এজন্য সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। একটি সুসমন্বিত পন্থায় এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রসঙ্গত আমরা কলকাতা শহরের হকারদের পুনর্বাসনের নীতিটি পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। এই নীতিতে হকার পুনর্বাসনের ব্যাপারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয় পুরসভা। হকার নীতি নামে পরিচিত এই নতুন নীতিতে বলা হয়েছে- ১. পুরসভা হকারদের চিহ্নিত করে পরিচয়পত্র দেয়ার ব্যবস্থা করবে। ২. নতুন কোনো হকার ফুটপাত দখল করে বসে পড়ছে কি-না তা মাঝেমধ্যেই সমীক্ষা করে দেখা হবে। ৩. পুরসভা হকারদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় বীমা যোজনা ইত্যাদিতে অন্তর্ভুক্ত করবে। ৪. অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা শিশু হকারদের পুনর্বাসন দিয়ে বিভিন্ন কর্মশিক্ষা, শিশু শিক্ষা প্রকল্প, জাতীয় শিশুশ্রম প্রকল্পে যুক্ত করা হবে। ৫. হকার সন্তানরা অবৈতনিক শিক্ষা এবং মিডডে মিল পাবে। ৬. ঋণ দেয়ার পাশাপাশি বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। ৭. খাবার ও আতশবাজি বিক্রি করে যারা, তাদের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিতে হবে। ৮. ন্যূনতম ১৫ বর্গফুট ও সর্বাধিক ৪০ বর্গফুট জায়গা একজন হকারের জন্য নির্দিষ্ট হবে। যেখানে সম্ভব ও প্রয়োজন, সেখানে নির্দিষ্ট অনুপাতে শহরের তফসিলি জাতি, উপজাতি, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী হকারদের জন্য বিক্রির জায়গা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। ৯. হকারদের বেঁধেছেদে রেখে যাওয়া দোকানের মালপত্র রাতে যাতে চুরি না যায় সেজন্য জিনিসপত্র সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হবে। ১০. কোথায় কে বসবে তা পরিচয়পত্র দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করে কাঠামোভিত্তিক ফি নির্ধারণ করা হবে। ১১. এছাড়া হকার নিয়ন্ত্রিত ফুটপাথে কঠিন বর্জ্য অপসারণ, শৌচাগার নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোজন ও পানীয় জল, বিক্রেতাদের জন্য ছাউনি এবং কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ফুটপাতেই প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে পুরসভা। ১২. হকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য পুরসভার নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। পথচারীদের জন্য হকারদের কিছু নির্দেশিকাও মানতে হবে। পথচারী চলাচলের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ফুটপাত খালি রাখতে হবে। এছাড়া বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরসভা কর্তৃপক্ষ যে কোনো জায়গায় হকারদের বসা, বিক্রি নিয়ন্ত্রণ ও নিষিদ্ধ রাখতে পারবে।
এটি যে একটি চমৎকার ও বাস্তবানু নীতি, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এর অনেক নীতিই সামঞ্জস্যপূর্ণ। হকারদের যদি পরিচয়পত্র দেয়া যায়, তাহলে তারা একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। তাছাড়া যে কোনো সিদ্ধান্ত যেমন পুনর্বাসন বা অন্যান্য সেবা দেয়ার ক্ষেত্রেও হকারদের একটি সঠিক পরিসংখ্যান জানা থাকলে তা সহজ হবে। এছাড়া সার্বিকভাবে একটি শৃংখলাও প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক হবে নিঃসন্দেহে। এজন্য একটি হকার নীতিমালা করা গেলে বিষফোঁড়ার মতো এ সমস্যা থেকে বাঁচা যাবে।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক

সরকারি কর্মকমিশন কতটা স্বাধীন? by ইকতেদার আহমেদ

নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিমকোর্টের অনুরূপ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক পদধারীদের মতো পিএসসির সাংবিধানিক পদধারীরা শপথের অধীন। শপথ পাঠ ছাড়া উপরোক্ত কোনো পদধারীর নিয়োগ কার্যকর হয় না। প্রধান বিচারপতি ছাড়া উপরোক্ত সব সাংবিধানিক পদধারীর শপথ পাঠ অনুষ্ঠান প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হয়। প্রধান বিচারপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পরিচালিত হয়।
পিএসসির সাংবিধানিক পদধারী বলতে কমিশনের সভাপতি (চেয়ারম্যান) ও সদস্যদের (মেম্বার) বোঝায়। অনুরূপ সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক পদধারী বলতে প্রধান বিচারপতি এবং আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের বোঝায়। একইভাবে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক পদধারীদের বলতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের বোঝায়।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যরা শপথ গ্রহণের সময় সুপ্রিমকোর্টের বিচারক এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের মতো অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্ত করেন যে, তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের সম্পর্কে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, এ সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনে স্বাধীন থাকবেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে এবং কেবল এ সংবিধান ও আইনের অধীন হবে। যদিও পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংবিধানে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ও নির্বাচন কমিশনের অনুরূপ সুস্পষ্টভাবে কিছুই ব্যক্ত করা হয়নি, কিন্তু তাদের স্বপঠিত শপথ দৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ কতজন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত হবে এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী কিছু বলা ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক ৪ জন কমিশনারকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। পিএসসির গঠন বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৭৭-এ বলা হয়েছে, একটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন নামে অভিহিত হবে। চেয়ারম্যানসহ সর্বনিু ৬ অথবা সর্বোচ্চ ১৫ জন সদস্য সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। সংবিধানে এক বা একাধিক কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ (অধ্যাদেশ নম্বর ঠওওও, ১৯৭৭)-এর মাধ্যমে দুটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালের খঠওও নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে আগের অধ্যাদেশটি বাতিল করে একটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান প্রণয়ন করে সদস্য সংখ্যা সর্বনিু ও সর্বোচ্চের ক্ষেত্রে সীমিত করে দেয়া হয়।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের মেয়াদ বিষয়ে সংবিধানে বলা আছে, দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর বা বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া- এ দুটির মধ্যে যা অগ্রে ঘটে সেকাল পর্যন্ত সভাপতি বা একজন সদস্য স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। তাদের অপসারণ বিষয়ে সংবিধানে বলা আছে, সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত সরকারি কর্মকমিশনের সভাপতি বা কোনো সদস্যকে অপসারণ করা যাবে না।
উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারক গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী কর্মে প্রবীণ দুজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্তপূর্বক যে প্রতিবেদন দাখিল করে, রাষ্ট্রপতি তার ভিত্তিতে অপসারণের আদেশ প্রদান করেন।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের অপসারণ পদ্ধতি সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অনুরূপ হওয়ায় প্রতীয়মান হয়, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের রক্ষাকবচ।
পিএসসিকে সাংবিধানিকভাবে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা হল- (ক) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপয্ক্তু ব্যক্তিদের মনোনয়নের উদ্দেশে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা; (খ) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হলে কিংবা কমিশনের দায়িত্ব সংক্রান্ত কোনো বিষয় কমিশনের কাছে প্রেরণ করা হলে সে সমন্ধে রাষ্ট্রপতিকে উপদেশ দান এবং (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন।
আইন ও বিধিবিধানের অধীনে কমিশনকে সরকারের বিভিন্ন ক্যাডার পদে এবং অধস্তন বিচার বিভাগ ছাড়া অপরাপর বেসামরিক বিভাগ ও কতিপয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের পরীক্ষা পরিচালনা ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কমিশন প্রার্থী বাছাইপূর্বক সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে থাকে। কমিশনের সুপারিশ প্রদান পরবর্তী পুলিশের গোয়েন্দা শাখা কর্তৃক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিরূপ কোনো কিছু না থাকলে রাষ্ট্রপতি বা ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ আদেশ প্রদান করে থাকেন। এ পর্যন্ত এভাবেই নিয়োগ আদেশ দেয়া হয়ে আসছিল। কমিশন কর্তৃক নিয়োগ সংক্রান্ত সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর রাষ্ট্রপতি বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ প্রদান করে থাকলে এ নিয়োগ বিষয়ে কোনো মহল থেকে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ সীমিত। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কোনো ব্যক্তি যদি এমন কিছু বলেন, যা কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এ কথাটি বলার অবকাশ আছে কি?
সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার অবসান বা পুনর্বিন্যাসের দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলনে নেমে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে সরকারের শীর্ষ নির্বাহী তার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক সভায় বলেন, আন্দোলনের নামে যারা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ চাকরি পাবে না। ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে, অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।
সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর মুখ থেকে এ কথাটি উচ্চারিত হওয়ার পর দেশের সচেতন মানুষের মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য ও অকৃতকার্য বিষয়ে পিএসসি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে নাকি কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে করে থাকে? সরকারি কর্মকমিশনের সাবেক একাধিক সাংবিধানিক পদধারীর সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কমিশন সুপারিশ প্রদান-পরবর্তী কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থীর বিষয়ে পুলিশের গোপন শাখা থেকে নেতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সে প্রার্থীর নিয়োগ কার্যকর করা হয় না এবং এ পর্বটি সব সময় কমিশন কর্তৃক মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্নের পর বাছাই সংক্রান্ত প্রতিবেদন সরকারের বরাবরে পেশ করার পর ঘটে থাকে। তাদের অভিমত, সরকারের শীর্ষ নির্বাহী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, আন্দোলনকারীদের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার সময় পিএসসি যদি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেবে, সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর দল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার দলের ছাত্র সংগঠনের যেসব নেতাকর্মী অগ্নিকাণ্ড, ভাংচুর, লুটতরাজ, হত্যা প্রভৃতিতে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে? এ বিষয়ে কিছু না বলা প্রচ্ছন্নভাবে নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের এ ধরনের ঘটনা সংগঠনে উৎসাহিত করার নামান্তর নয় কি?
দেশবাসী অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে, ১৯৯০-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে পিএসসির সভাপতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কতিপয় সদস্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগের মাধ্যমে কমিশনের ভাবমূর্তির ওপর কুঠারাঘাত করেছেন। যদিও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সভাপতি ও সদস্যরা নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে কমিশনের হƒত গৌরব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু তাদের বিদায়ের পর অতীতের ধারাবাহিকতার পদধ্বনিই শোনা যায়।
ইতিমধ্যে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্যের জবাবে সরকারের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী ঘোষণা করেছেন, কথিতভাবে যাদের মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য করানো হবে, তার দল ক্ষমতায় গেলে তাদের সবার চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের সাবেক শীর্ষ নির্বাহীর এ ঘোষণা আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করেছে এবং অনুমিত হয় বিপুল জনগোষ্ঠীর এ আন্দোলন আগামী নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারকের বিচারিক দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন বাইরের কোনো মহলের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই, ঠিক তেমন প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন ক্যাডার পদে এবং বিচার বিভাগ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের পরীক্ষা পরিচালনা ও প্রার্থী বাছাই সাংবিধানিকভাবে পিএসসির একক এখতিয়ারের বিষয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীসহ পদস্থ কেউ যদি কোনো ধরনের বক্তব্য প্রদান করেন, তা হবে কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের শামিল। আর এ ধরনের হস্তক্ষেপ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও ভাবমূর্তির ভিত্তিমূলে আঘাত হানে। তাই সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর পক্ষ থেকে বক্তব্যটি দেয়ার পর দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল, কমিশন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি প্রদান করে তার অবস্থান বিষয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করবে। কিন্তু এ বিষয়ে কমিশনের নীরবতা জনমানুষের মধ্যে এমন বিশ্বাসের জš§ দিয়েছে যে, কমিশন সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করছে। আর এভাবে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে কমিশনকে স্বাধীন না বলে অধীন বলাই বোধ করি সমীচীন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জেলা জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিমকোর্ট

ইহকালের শান্তি ও পরকালের সুখ- দুইটাই বিনষ্ট হয়... by মোকাম্মেল হোসেন

আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলে আন্ধাগোন্ধা দৌড় বলে একটা কথা আছে। এর অর্থ হল, বেদিশা হয়ে দৌড়ানো। ইফতারের সময় হয়ে যাওয়ায় বাস থেকে নেমেই একটা হোটেল লক্ষ্য করে আন্ধাগোন্ধা দৌড় দিলাম। হোটেলের লোকজন প্লেটে ইফতার সাজিয়েই রেখেছিল। অজু করে চেয়ারে বসতেই তা পরিবেশন করা হল। খাবারগুলোর দিকে একবার নজর বুলিয়ে সময় দেখার জন্য পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম, আর ঠিক তখনই এটি নেচে-গেয়ে উঠল। কল রিসিভ করে বললাম-
: আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। জনাব, আপনে কি আজও রাস্তায় ইফতার করবাইন!
: করমু কী- অলরেডি ইফতার সামনে লইয়া বইসা গেছি...
- মানে?
হোটেলে ইফতার করার কথা শুনে লবণ বেগম ক্ষেপে গেল। বলল,
: তোমার কি বৌ-পোলাপান নাই?
- আছে। একাধিক।
: কী!
- ঘাবড়াইও না। একাধিক বৌয়ের কথা বলি নাই; পোলাপানের কথা বলছি।
: তাসিনের আব্বা!
- জ্বে।
: সারাদিন রোজা রাইখ্যা মাথা কিন্তু হট হইয়া রইছে!
- এই তো আর মাত্র চার-পাঁচ মিনিট। তারপরেই আজান দিবে...
: কথা সেইটা না।
- কী কথা!
: ছেলেরা তোমার অপেক্ষায় পথ চাইয়া রইছে!
- তুমি চাইয়া রইছ না?
: আমার অত ঠেকা পড়ে নাই...
এটা হচ্ছে অভিমানের কথা। আমি জানি, লবণ বেগম অধীর আগ্রহে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু উপায় কী? রাস্তার লালবাতি-সবুজবাতি নিয়ন্ত্রণের ভার যাদের হাতে ন্যস্ত, তাদের কাছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি মূল্যহীন। ফলে কোনোদিন বাসায়, কোনোদিন রাস্তায় ইফতার করার মধ্য দিয়েই রমজান অতিবাহিত হচ্ছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পানির গ্লাসের দিকে তাকাতেই মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো। ইফতার শেষ করে হোটেল থেকে বের হওয়ার পর ওয়াক্কেস সাহেবের সঙ্গে দেখা। তার হাতে একটা পোটলা দেখে জিজ্ঞেস করলাম,
: ঈদের কেনাকাটা শুরু কইরা দিছেন নাকি?
- আরে না!
: তাইলে পোটলার মধ্যে কী?
- লুঙ্গি।
: আপনের তো দেখতেছি বেজায় সাহস! শাড়ি না কিইন্যা আগে লুঙ্গি কিনছেন- ভাবি আপনেরে ছেঁচা দিব না?
- এইটার ইতিহাস ভিন্ন।
: কী রকম?
- আর বলবেন না! বাসের জন্য ফুটপাতে দাঁড়াইয়া রইছি- এক লোক আইসা বলল, স্যার, ঈদ উপলক্ষে আমার আব্বার জন্য দুইটা লুঙ্গি কিনছিলাম। হঠাৎ নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় এইগুলা বিক্রি করতে হইতেছে। আপনে যদি নেন, তাইলে অর্ধেক দামে দিয়া দিব।
লোকটার কথা শুনে জিজ্ঞেস করলাম-
: কত নিবা?
লোকটা তখন বলল-
: স্যার, লুঙ্গি দুইটার দাম হইল সাড়ে ছয়শ’ টাকা। আপনে আমারে তিনশ’ টাকা দেন।
কথাবার্তার মাঝখানে সেখানে আরও কয়েকজন লোক আইসা দাঁড়াইতেই সুযোগ হাতছাড়া হইতে পারে ভাইব্যা আমি আর বিলম্ব করলাম না। লোকটার হাতে তিনশ’ টাকা দিয়া দিলাম। এই হইল পোটলার ইতিহাস...
বর্তমান বাজারে তিনশ’ টাকায় এক জোড়া লুঙ্গি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি লুঙ্গিগুলো দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে বললাম-
: দেখি, কোন কোম্পানির লুঙ্গি!
পোটলা থেকে লুঙ্গি দুটো বের করে ভাঁজ খুলতেই আমাদের দু’জনের চোখ কপালে উঠে গেল। হায় আল্লাহ! ছেঁড়াফাটা পুরনো লুঙ্গি মাড় দিয়ে কড়কড়া করার পর ইস্ত্রি করে কী সুন্দর করে প্যাকেট করা হয়েছে! প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে ওয়াক্কেস সাহেব হায়-হায় করে উঠলেন।
ওয়াক্কাস সাহেবকে প্রতারিত হতে দেখে আমার ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। এটা অনেকটা গল্পের মতো। আমাদের পাশের গ্রামের নজু বেপারি রাতে একা হাট থেকে বাড়ি ফিরছিল। গোরস্তানের সামনে আসার পর সেখানে চট পরিহিত এক লোককে দেখে দাঁড়িয়ে পড়তেই লোকটা তাকে বলল-
: ডরাইস না। কাছে আয়।
নজু বেপারি কাছে যেতেই লোকটা জিজ্ঞেস করল-
: তর নাম কী?
- নজু বেপারি।
: বাড়ি কই?
- সেনেরচর।
নজু বেপারি সাহস অর্জন করে জিজ্ঞেস করল-
: হুজুর, আপনে গোরস্তানে কী করেন!
- আর বলিস না! এই গোরস্তানে আগমন করার পর নেকির অভাবে যেসব মুর্দা কবরে আজাবের সম্মুখীন হয়- আমি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি কইরা তাদের নেকি ডাবল কইরা দেই। এর ফলে তাদের আর কবরের আজাব সহ্য করতে হয় না...
ডাবল হুজুরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নজু বেপারির সাহস বেড়ে গেল। একইসঙ্গে তার মনের কোণে লোভও উঁকি দিল। এক পর্যায়ে ডাবল হুজুরকে নজু বেপারি বলল-
: হুজুর, শুধু নেকিই ডাবল করেন? আর কিছু ডাবল করতে পারেন না!
- পারি। বউ ডাবল করতে পারি। তর কি ডাবল বৌ দরকার?
: না-না! একটা লইয়াই বেকায়দা অবস্থায় আছি। বৌ ডাবল দরকার নাই। তবে...
- তবে কী?
: ধনদৌলত ডাবল করতে পারলে মন্দ হইত না!
- ধনদৌলত ডাবল করার কাম আগে করতাম। এখন আর করি না। এই কাম করতে গিয়া দেখছি- মানুষ যত ধনসম্পদ পায়- তত তার লোভ বাইড়া যায়। লোভের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। টাকা-পয়সা, সোনাদানা একবার ডাবল কইরা দেওয়ার পর আবার ডাবল কইরা দিতে বলে। দ্বিতীয়বার ডাবল কইরা দেওয়ার পর আবার ডাবল কইরা দিতে বলে। তারপর আবার। আমারে একেবারে বেহুঁশ বানাইয়া ফেলে। সেইজন্য অই জায়গা থেইক্যা সইরা আসছি।
: আমার লোভ অত পাতলা না!
- পাতলা, না ঘন- ফিল্ডে না নামলে বোঝার উপায় নাই।
: তাইলে মেহেরবানী কইরা একবার ফিল্ডে নাইম্যা দেখেন।
- দুনিয়াদারি কারবার- অনেক ঝামেলার! সেইজন্যই মরা মানুষ লইয়া পইড়া থাকি। আইচ্ছা, তুই যখন বলতেছস, দেখি...
: দেখি না, কখন আমার বাড়িতে যাবাইন- কইন!
- শুধু গেলেই তো হইব না পাগল! তর ঘরে নগদ টাকা-পয়সা, সোনাদানা কেমন আছে?
: সোনাদানা সামান্য পরিমাণ আছে। তবে নগদ টাকা-পয়সা তো নাই।
- আমার কেরামতির ফল পাইতে হইলে প্রচুর নগদ টাকা-পয়সা আর সোনাদানা লাগব। পারবি জোগাড় করতে?
: পারমু।
- ঠিক আছে। টাকা-পয়সা যোগাড় করার আগে তুই শহর থেইক্যা বড় দেইখ্যা দুইটা পিতলের কলসি কিইন্যা আনবি। কলসি দুইটা তর শোয়ার ঘরে গলা পর্যন্ত পুইত্যা রাখবি। এরপর একটা কলসির মধ্যে যতটা সম্ভব নগদ টাকা-পয়সা ও সোনাদানা জমাবি। আমি আগামী অমাবস্যার রাতে তর ঘরে যাইয়া ওই কলসিতে যে পরিমাণ টাকা-পয়সা ও সোনাদানা থাকবে- তা দ্বিগুণ বানাইয়া অপর কলসিতে ঢুকাইয়া দিব।
ডাবল হুজুরের কথামতো নজু বেপারি পরদিন শহর থেকে বড় আকারের দুটি পিতলের কলসি কিনে আনল। তারপর টাকা-পয়সা জোগাড়ের দিকে মন দিতেই তার স্ত্রী জবেদন নেছা ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল-
: আপনে এইসব কী শুরু করছুইন?
- কী শুরু করছি?
: গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি সব বেইচ্যা অহন জমি বেচা শুরু করছুইন!
- বেচনের দেখছস কী? আমার তো ইচ্ছা করতাছে বাড়ি ভিটা বেইচ্যা দিয়া সেই টাকাগুলাও কলসিতে রাখি...
অমাবস্যার রাতে নজু বেপারির বাড়িতে ডাবল হুজুর তশরিফ রাখলেন। তার সামনে গলা পর্যন্ত পুঁতে রাখা পাশাপাশি দুটি পিতলের কলসি। এর একটার মধ্যে টাকা-পয়সা ও অলংকার। অন্যটি খালি। লাল সালু কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা কলসি দুটি সামনে রেখে ডাবল হুজুর জিকির শুরু করলেন। জিকির করার ফাঁকে হুজুর একবার টাকা-পয়সা ও অলংকার রাখা কলসিতে ফুঁ দেন, আবার খালি কলসিতে ফুঁ দেন। নজু বেপারি একটু দূরে বসে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছিল। রাত গভীর হওয়ার পর ইশারায় নজু বেপারিকে কাছে ডাকলেন ডাবল হুজুর। হুজুরের কাছে যাওয়ার পর নাকের কাছে একটা রুমাল ধরতেই নজু বেপারি ত্যানার মতো নেতিয়ে পড়ল। পরদিন জ্ঞান ফেরার পর নজু বেপারি দেখল, ডাবল হুজুর নেই; টাকা-পয়সা ও অলংকারের কলসিও নেই।
ওয়াক্কেস সাহেবকে সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশে বললাম-
: ভাই, এই দেশে প্রতারকের অভাব নাই। প্রতারকরা কেউ লুঙ্গি-গামছা লইয়া, কেউ খাবার ও ওষুধ লইয়া, কেউ বাড়ি-গাড়ি-জমি লইয়া, কেউ চাকরি-ব্যবসা ও বিবাহ লইয়া, আবার কেউ সমবায় সমিতি-ব্যংক-বীমা ও শেয়ারবাজার লইয়া মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেছে। যারা এদের প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন থাকে, তারা কোনো ভেজালে পড়ে না। কিন্তু সচেতন না থাকলেই বিপদ। ইহকালের শান্তি ও পরকালের সুখ- দুইটাই বিনষ্ট হয়...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের অধীনতামূলক সম্পর্ক by বদরুদ্দীন উমর

ভারতের পক্ষ থেকে যত না, তার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের কথা বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অহরহ ভারতকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে পারস্পরিক বন্ধুত্বের গৌরব প্রচার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই প্রচার সত্ত্বেও দু’দেশের এই বন্ধুত্ব কতখানি বাস্তব ও কার্যকর তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, ভারত এমন কোনো কাজ করবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মর্মার্থ, ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদের আছে কিন্তু মহানুভবতার কারণে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি তারা করবে না! টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে যখনই বাংলাদেশের সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে আপত্তি জানানো হয়, তখন তারা বিশেষ করে এসব কথা বলে থাকেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়েও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে সে কথাই বলেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে অন্য মন্ত্রীর দল এবং সব ধরনের আমলা-ফায়লা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রায়ই বিদেশ সফর করে থাকেন, যার অধিকাংশই নিষ্প্রয়োজন এবং আনন্দ ভ্রমণ ছাড়া আর কিছু নয়। মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের বোনঝির বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য ৪২ জন সরকারি লোক ও আÍীয়স্বজন নিয়ে সরকারি খরচে লন্ডন গিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে থেকে দেশের জনগণের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসেছেন। এটাকে তারা চরম দুর্নীতি মনে করেন না। আসলে বাংলাদেশে চুরি, ঘুষখোরি, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, এসবই পরিণত হয়েছে স্বাভাবিক ব্যাপারে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য যে মন্ত্রীরা কারণে-অকারণে বিদেশ সফর করেন, তাদের মধ্যে বিদেশমন্ত্রী শীর্ষস্থানীয়। বিদেশ সফরের বিষয়ে তার কোনো নীতিজ্ঞান, কাণ্ডজ্ঞান অথবা প্রয়োজনের বোধ আছে বলে মনে হয় না। কাজেই যে কোনো ছুঁতো ধরে বা ছুঁতো তৈরি করে বিদেশ সফরের তাড়নায় তিনি অস্থির থাকেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে যে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, সেই লুটপাটের ঐতিহ্য এ ধরনের সফরের মাধ্যমেও রক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী এখন ভারতে গেছেন সেখানকার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় ভূমি সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে আলোচনার জন্য। অবধারিতভাবে বিদেশমন্ত্রীর এই সফর ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এদের কাছে সফর ব্যর্থ বা সফল হওয়া আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার হল সফর করা। যে বিষয়ে মন্ত্রী ভারত সফরে গেছেন তা নিয়ে অসংখ্যবার আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ভারত তার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে। কাজেই এ মুহূর্তে ওই সফর বাংলাদেশের জন্য নিষ্প্রয়োজন। তিস্তা চুক্তি সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফররত বাংলাদেশী বিদেশমন্ত্রীকে যা বলেছেন, তার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। নতুনত্ব যে থাকার কথা নয় এটাও জানা কথা। ভারত-বাংলাদেশ ভূমি সীমান্ত চুক্তি কার্যকর শুধু সরকারি প্রভাব ও সিদ্ধান্তের ব্যাপার নয়। তার জন্য প্রয়োজন ভারতের সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। যেহেতু বিজেপি এবং অন্য কয়েকটি দল এর বিরোধী, সে কারণে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজেই এই চুক্তি বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত একটি বাংলাদেশ ঠকানো ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজেপি এই চুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছে, এই চুক্তি হলে ভারতের অধিকৃত ভূমির পরিমাণ কম হবে। এটা ঠিক। কারণ ভারত ইতিপূর্বেই বাংলাদেশের ভূমির অনেকটা অংশ দখল করে রেখেছে। চুক্তির মাধ্যমে সেই দখল ছাড়ার বিষয়টি তাদের কাছে ‘ভারতের ভূমি হারানোর’ ব্যাপার! এই পরিস্থিতিতে কোনো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ভারত-বাংলাদেশ ভূমি সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সে সম্ভাবনা একেবারেই না থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে বিদেশ সফরে বিদেশমন্ত্রীর উৎসাহের কোনো অভাব নেই!!
ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বিষয় নিয়ে প্রথমে কথা শুরু করেছিলাম। এ দুই দেশের বন্ধুত্ব বলতে কী বোঝায় সেটা প্রচার মাধ্যমের ক্ষেত্রে যা ঘটছে তার দিকে তাকালে যত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এমন আর কোনোভাবে বোঝা যায় না। এদিক দিয়ে টেলিভিশনের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ভারতের অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের দরজা বাংলাদেশের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। এদিক দিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদারতার শেষ নেই। ভারতের সরকারি চ্যানেল ডিডি বাংলা থেকে নিয়ে অসংখ্য ভারতীয় টিভি চ্যানেল এখন বাংলাদেশে অবাধে তাদের প্রোগ্রাম প্রচারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার ভারতে নেই! এই হল বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পরম বন্ধুত্বের নিদর্শন!! এটা যে কোনো তথাকথিত দুই ‘বন্ধু দেশ’ ছাড়াও কোনো দুই দেশের সাধারণ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভব, এটা চিন্তা করাই যায় না। সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের অসম সম্পর্ক দেখা যায় না। বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্যমন্ত্রী অনেক লম্বা-চওড়া গালভরা কথা বলে থাকেন, কিন্তু ভারতের সঙ্গে প্রচার মাধ্যমের এই অসম ও হীন সম্পর্কের বিষয়ে তাদের মুখ থেকে কোনো কথা শোনা যায় না। তারা এ নিয়ে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি তো দূরের কথা, কোনো কথাবার্তা বলেন- এমন কিছু শোনাও যায় না। দু’দেশের এই সম্পর্ক যে বন্ধুত্বের সম্পর্কের পরিবর্তে দাস ও প্রভুর সম্পর্ক- এ কথা বললে কি সত্যের অপলাপ হয়? অনেক সময় দেখা যায় এখানকার কোনো কোনো সংবাদপত্র সম্পাদক বা কলাম লেখককে ভারতের কোনো কোনো টিভি চ্যানেলের প্রোগ্রাম সম্পর্কে গদগদ ভাষায় লিখতে। কিন্তু ভারতের জনগণ যে বাংলাদেশের কোনো টিভির কিছুই দেখতে-শুনতে পান না, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই! ভারতের জনগণের মধ্যেও বাংলাদেশের টিভি প্রোগ্রাম না দেখা নিয়ে অসন্তোষ আছে। তারা এখানকার প্রোগ্রাম শুনতে চান, কিন্তু ভারত সরকার তাদের ইচ্ছাকে পাত্তা দেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের জনগণ কিছু জানুক, এটা তাদের অভিপ্রেত নয়! এসব দেখে মনে হয় যে, প্রকৃতপক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, শত্র“তামূলক। ভারত নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি গুরুতর বিষয়ে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে শত্র“তামূলক আচরণ করে থাকে। শুধু কেন্দ্রীয় সরকারই নয়, পশ্চিমবঙ্গের সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী যে বাংলাদেশের কোনো ধরনের বন্ধু নয়, এটা তিস্তা চুক্তির বিরোধিতার ক্ষেত্রে তারা যে অবস্থানে আছে, তার থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? বাংলাদেশ সরকারের এই ভারতনীতি পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই যতদিন বর্তমান শাসক শ্রেণী এবং তার যে কোনো রাজনৈতিক দল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে বন্ধুত্বপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন উভয় দেশেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা। এই গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের জোরে গঠিত সরকার নয়। এর অর্থ এমন সরকার, যারা ধাপ্পাবাজির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট অর্জনের থেকে জনগণের মৌলিক সমস্যার প্রতি বেশি যতœবান হবে এবং সেই হিসেবে শুধু নিজেদের দেশের জনগণের জন্যই নয়, অন্য দেশের জনগণের স্বার্থও কোনোভাবে যাতে ক্ষুণœ না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল