Friday, October 10, 2025

ট্রাম্পকে যে কৌশলে বশে আনলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান by এলফাদিল ইব্রাহিম

২৫ সেপ্টেম্বর ওভাল অফিসে যা ঘটেছিল, কয়েক বছর আগে সেটা কল্পনা করাও যেত না। সেখানে এক পাশে বসেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তাঁদের অপর পাশে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশংসা করে অতিথিদের বলেন, ‘খুব দারুণ মানুষ।’

এ বছর হোয়াইট হাউসে এটিই ছিল মুনিরের দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক। কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের কোনো সেনাপ্রধান এমন সুযোগ পাননি। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর এ সাক্ষাৎ ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। একসময়ের অবিশ্বস্ত ও সমাজচ্যুত দেশ থেকে আঞ্চলিক অংশীদার মর্যাদায় পাকিস্তানকে পুনর্বাসন।

ট্রাম্প সেই একই প্রেসিডেন্ট, যিনি তাঁর প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানকে প্রকাশ্যেই কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, দেশটি ‘মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া’ কিছু দেয়নি।

পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়াও তিনি বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু এখন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সম্পর্ক ঘুরে গেছে। বাইডেন প্রশাসনের সময় উপেক্ষার পাত্র হওয়া পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের এ মোড় পরিবর্তন নতুন কোনো মূল্যবোধ বা বড় কোনো কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে হয়নি; বরং এটি এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপের ওপর নির্মিত হয়েছে, যেটা সরাসরি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মোহাম্মদ শরিফুল্লাহর গ্রেপ্তার। তিনি ২০২১ সালে কাবুলে অ্যাবি গেট বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে অভিযুক্ত। ওই হামলায় মার্কিন ১৩ সেনা নিহত হয়েছিলেন। গত মার্চে সিআইএর তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে আটক করে।

ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল মার্কিন জনগণের সামনে পরিষ্কার বিজয় দেখানোর মতো একটি ঘটনা। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলভাবে সরে আসার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যে ব্যর্থতাবোধ তৈরি হয়েছিল, তার বিপরীতে এ গ্রেপ্তার ছিল একটা সাফল্য।

দ্বিতীয়টি ছিল ট্রাম্পের অহংবোধকে বুঝে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেটা খুশি করার কৌশল। মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ বন্ধের পর ইসলামাবাদ অতি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপকে শান্তি স্থাপনের কারণ হিসেবে স্বীকার করে।

নয়াদিল্লি যদিও ট্রাম্পের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান চতুরতার সঙ্গে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। একজন নেতা যিনি পররাষ্ট্রনীতিকে ব্যক্তিগতভাবে নেন, তাঁর জন্য তোষামোদ হলো খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতোই ব্যাপার।

তৃতীয়ত, এখানে অর্থনৈতিক মধুও আছে। পাকিস্তানের বিরল খনিজ ও তেল অনুসন্ধান থেকে শুরু করে ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রকল্প—সবকিছুর জন্য চুক্তি করা হচ্ছে।

ট্রাম্প তাঁর নিজের বক্তব্যে বলেছেন, পাকিস্তানে ‘বিশাল তেলের মজুত’ রয়েছে। কিন্তু তাঁর এ দাবি জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। ট্রাম্পের এ বক্তব্য যতটা ভূতত্ত্ব বা জ্বালানিসংক্রান্ত, তার চেয়ে বেশি নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব–সম্পর্কিত ইঙ্গিত।

যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে (১৯ শতাংশ) ভারতের (৫০ শতাংশ) সঙ্গে তুলনায় অনেক কম শুল্ক ধার্য করেছে। মনে করা হচ্ছে পাকিস্তানের সম্পদ ব্যবহারে যুক্তরাষ্টের প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের জন্য এই আমেরিকান আলিঙ্গন দেশটিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সুরক্ষা দেয়। এটি ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন বিরক্ত হবে কি না, এ ভয়ের বাইরে বেরিয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী ভূ-অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করার সুযোগ করে দেয়।

সৌদি আরবের সঙ্গে সম্প্রতি প্রতিরক্ষা চুক্তি (আগের যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যেটিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখত) করেছে পাকিস্তান। এটা সম্ভব হয়েছে পাকিস্তানের নেতৃত্ব হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ায়।

এই নতুন স্বাধীনতা পাকিস্তানকে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ দেয়। ফলে পাকিস্তান বিশ্বের এমন বিরল দেশের একটি, যারা বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে সমন্বয় করতে পারে।

সাম্প্রতিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কের ঐতিহাসিক স্বাভাবিক স্তরে ফিরে যাওয়ার মতো। এ অংশীদারত্ব সব সময় সুবিধা ও সমস্যার মিশ্রণ হিসেবে ওঠানামা করেছে।

শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত’। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার সম্পর্ককে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তখন পাকিস্তানকে সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি দুর্গ হিসেবে দেখা হতো।

৯/১১–পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ‘সামনের সারির দেশে’ পরিণত হয়। কোটি কোটি ডলারের কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের বিনিময়ে পাকিস্তানের এ সহযোগিতা কেনা হয়েছিল। তবে ড্রোন হামলা এবং ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনকে আবিষ্কারের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সেই তিক্ত সম্পর্কের যৌক্তিক সমাপ্তি দেখা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা বাতিল করেছিল। বর্তমান উষ্ণ সম্পর্কও সেই একই চক্রের ওঠানামা। যৌথ আদর্শের কারণে নয়; বরং নতুন পারস্পরিক স্বার্থের কারণেও সম্পর্ক আবার উষ্ণ হয়েছে।

পেন্টাগন ও ল্যাংলির (সিআইএর সদর দপ্তর) ঝানু কর্মকর্তারা ভালো করেই জানেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের রাস্তাটি হলো রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তর।

এমনকি যখন রাজনৈতিক সম্পর্ক চূড়ান্ত শীতল থাকে, তখনো দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক টিকে থাকে। মুনিরের বারবার যুক্তরাষ্ট্র সফর (প্রথমে জুনে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ, তারপর সেন্টকম কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সর্বশেষ ওভাল অফিস) এ বাস্তবতারও স্বীকৃতি।

ওয়াশিংটনের জন্য সরাসরি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে কাজ করা সুবিধাজনক। কারণ, দেশটির প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে এটা সরাসরি যোগাযোগ। যদিও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সমর্থকদের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

যাহোক যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের এ পরিবর্তন বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ২০ বছর ধরে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ ঐকমত্য ছিল যে চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে গণতান্ত্রিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করবে। পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক সহযোগিতা সেই নীতিকে উল্টে দিয়েছে।

রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর শুল্ক চাপানো এবং মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তানের পাশে হোয়াইট হাউসের দাঁড়ানোর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের মিত্রকে ক্ষুব্ধ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নরেন্দ্র মোদি সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার চীন সফর করেন।

যাহোক, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এখন চুপচাপ করে সম্পর্ক মেরামত এবং একটি বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

হোয়াইট হাউসের কাছে আপাতত ইসলামাবাদের নেতারা ‘খুব দারুণ মানুষ’ হতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এই রোলারকোস্টারে পরের ঢাল খুব কাছেই।

* এলফাদিল ইব্রাহিম, একজন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শেহবাজ শরিফ ও আসিম মুনির
ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শেহবাজ শরিফ ও আসিম মুনির। ছবি : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

ভারতকে বশ মানাতে গিয়ে উল্টো বিপদে ট্রাম্প by এড্রিয়ান ব্লমফিল্ড ও সামান লতিফ

ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ভেবে থাকেন যে তিনি ভারতকে বশে আনতে পারবেন, তবে ঘটনাপ্রবাহ মোটেও তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। নরেন্দ্র মোদি শুধু অনমনীয় অবস্থানই নেননি, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কার্যত নীরব আচরণও দেখাচ্ছেন।

আগস্টের শুরুর দিকে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ভারতকে কঠোর দ্বৈত শুল্কের আওতায় নেওয়ার পর থেকে তিনি চারবার মোদিকে ফোন করেছেন—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ফোন ধরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

এই সময়ে মোদি দুবার তাঁর ‘বন্ধু’ ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মস্কোয় পাঠিয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আয়োজিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনে মোদি অংশ নিচ্ছেন, যা অনুষ্ঠিত হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তিয়ানজিনে। দীর্ঘদিনের দূরত্ব সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের মধ্যে আলোচনা আয়োজন করেছে।

২০০১ সাল থেকে ওয়াশিংটন চেষ্টা করে আসছে ভারতকে তাদের প্রভাববলয়ে আনতে; উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কে আগুনে লাগিয়ে দিয়েছেন; প্রথমে ভারতীয় রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, এরপর রাশিয়ান তেল কেনার কারণে দিল্লিকে শাস্তি দিতে দ্বিগুণ চাপ প্রয়োগ করে। এটি ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনো দেশের ওপর ওয়াশিংটনের আরোপিত সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা।

এর সঙ্গে ট্রাম্প অপমানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তুলে, যে দেশ ভারতের চরম শত্রু। তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও কার্যত দেশটির প্রধান শাসক আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে পর্যন্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মোদি রয়েছেন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায়।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এত সরল ও কঠোরভাবে শক্তি প্রয়োগ করে ট্রাম্প উল্টো ফল ডেকে আনছেন—ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছেন মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে।

এ ফাটল ঘটছে এমন সময়ে, যখন সি চিন পিং সাংহাই কো–অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে ওয়াশিংটনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের আতিথ্য দিচ্ছেন; এটি মূলত মার্কিন প্রভাব প্রতিহত করতে চীন ও রাশিয়ার উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল।

এ সম্মেলনে স্বৈরশাসক নেতাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে—উত্তর কোরিয়ার কিম জং–উন তাঁর বুলেটপ্রুফ ট্রেনে আসছেন, বেলারুশের আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো এবং ইরানের মাসুদ পেজেশকিয়ানও থাকবেন আর থাকবেন পুতিন নিজেও।

তবে সবচেয়ে বড় অর্জন মোদি, যাঁর সঙ্গে সির সম্পর্ক হিমালয় সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে ভয়াবহভাবে তিক্ত হয়ে আছে। ২০২০ সালের জুনে লাঠি ও ইট দিয়ে সংঘটিত সেই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন।

ট্রাম্প ও মোদির এককালে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল; সে বাস্তবতা সত্ত্বেও এই পুনর্মিলনের চেষ্টা নিজেই এক বিস্ময়কর ঘটনা।

ভালোবাসা আর ‘ব্রোমান্স’

ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, অভিন্ন জনতুষ্টিবাদী প্রবণতা ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক একসময় এ দুই নেতাকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছিল। দুজনই অপরের দেশে বিশাল জনসমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন—২০১৯ সালে টেক্সাসে ‘হাউডি, মোদি’ সমাবেশে ৫০ হাজার মানুষের সামনে; আর পরের বছর আহমেদাবাদে ‘নমস্তে, ট্রাম্প’ উৎসবে এক লাখ মানুষের সামনে।

তারপর এল কৌশলগত সমন্বয়। চীনের উত্থান উভয় পক্ষকেই উদ্বিগ্ন করে তোলে, ফলে ভারত যোগ দেয় কোয়াডে—যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক জোট, যার উদ্দেশ্য বেইজিংয়ের প্রভাব মোকাবিলা করা।

ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে তোলে এই বন্ধনকে। ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ভারতে গভীর শিকড় গেড়ে বসে, যা ছিল তাদের অন্যতম বৃহৎ বাজার।

ভারতে কমপক্ষে দশটি ট্রাম্প-ব্র্যান্ডেড ভবন নির্মিত হয়েছে, নির্মাণাধীন বা পরিকল্পনায় আছে। কেবল নামের কারণে ট্রাম্প টাওয়ারের ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি হয়েছে বাড়তি দামে।

সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছিল ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির সঙ্গেও, যিনি মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সুবিধাভোগী এবং একই সঙ্গে গুজরাটেরই সন্তান। এ বছর ট্রাম্পের অভিষেকপূর্ব নৈশভোজে আম্বানি উপস্থিত ছিলেন। তাঁর (ট্রাম্প) বক্তৃতার সময় সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং পরে এক অন্তরঙ্গ সংবর্ধনায় যোগ দিয়েছিলেন।

আম্বানির ছেলের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্টের কন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। এটি কার্যত পারিবারিক সম্পর্ককেও মজবুত করেছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব সম্পর্কের মূল্য তেমন কিছুই হয়নি। আম্বানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও রুশ অপরিশোধিত তেলের ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক রিলায়েন্স হয়ে উঠেছে এখন ট্রাম্পের ক্রোধের প্রধান লক্ষ্য।

আগাম বিপদের ইঙ্গিত

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকেই সম্পর্কে টান পড়তে শুরু হয়, যখন তিনি বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। তিনি আশা করেছিলেন, ভারত নতি স্বীকার করবে এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য তাদের কড়া সুরক্ষিত কৃষি খাত খুলে দেবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেন। জবাবে ওয়াশিংটন আরোপ করে ২৫ শতাংশ শুল্ক।

দিল্লির বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ‘যদি ভারত কৃষি ও দুগ্ধশিল্প খোলার জন্য মার্কিন চাপ মেনে নিত, তবে তা গুরুতর রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সমস্যার সৃষ্টি করত।’

এরপর আসে প্রকৃত বিচ্ছেদ। ওয়াশিংটন শাস্তি দ্বিগুণ করে, ‘অয়েল লন্ডারিং’ বা তেল পাচারের অভিযোগ তোলে ভারতের বিরুদ্ধে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ‘ভারতের রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত জ্বালানি ধনকুবেরদের’ বিরুদ্ধে, অভিযোগ তোলেন যে তারা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ‘লাভবান’ হচ্ছে। যদিও সরাসরি মুকেশ আম্বানির নাম নেননি, তবু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল ইঙ্গিত কার দিকে।

অভিযোগটি পুরোপুরি ভিত্তিহীনও ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত রাশিয়া থেকে খুব কম তেল কিনত। কিন্তু তার পর থেকে ছাড়কৃত মূল্যে তেলের জন্য ব্যয় করেছে ১০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। হেলসিঙ্কিভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার বৈশ্বিক জ্বালানিপ্রবাহ নজরদারি করে। তাদের তথ্যমতে, শুধু রিলায়েন্স একাই এ বছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি করেছে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের অপরিশোধিত তেল।

তবু ওয়াশিংটনের ভারতের ওপর এত মনোযোগ প্রশ্ন তোলে। চীন অনেক বড় ক্রেতা। তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানও উল্লেখযোগ্য ক্রেতা। ইউরোপ এখনো রাশিয়ার সবচেয়ে বড় গ্যাস গ্রাহক। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অস্ট্রিয়া ও স্লোভাকিয়া তাদের নির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে; অস্ট্রিয়া এখন ৯৮ শতাংশ গ্যাস আমদানি করে রাশিয়া থেকে। অথচ তাদের কারও বিরুদ্ধে একই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভারতের ‘বিভ্রান্ত’ সরকার যুক্তি দিচ্ছে, তারা ওয়াশিংটনের সম্মতিতেই রাশিয়ার তেল কিনেছিল এবং তার অনেকটাই পরিশোধন করে বিক্রি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে। তারা আরও বলছে, ভারতের ওপর শুল্ক রাশিয়ার তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি, অথচ রাশিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়েছে সেই অগ্রাধিকারমূলক হার; যেটির জন্য ব্রিটেনকে হিমশিম খেয়ে আলাদা করে সমঝোতা করতে হয়েছিল।

দিল্লির অনেকের বিশ্বাস, আসল কারণ রাজনৈতিক। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, কেবল তাঁর কূটনীতিই মে মাসে ভারত–পাকিস্তানের চার দিনের সামরিক সংঘাত থামিয়েছিল, যা নিয়ে তিনি ৪০ বারের বেশি গর্ব করেছেন। পাকিস্তান তাঁকে কৃতিত্ব দিয়েছে—এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও করেছে। কিন্তু ভারত তা করেনি। এর পর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের আগের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

চলুন বাস্তবতার মুখোমুখি হই

যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে অপমানিত ও আহত মোদি এখন বিকল্প খুঁজছেন।

এ সংকট চীনের জন্য একপ্রকার উপহার। ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়েছেন তিনটি আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে—ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এর সুযোগ নিয়ে সি চিন পিং বেইজিংকে উপস্থাপন করছেন বেশি দায়িত্বশীল, কম খামখেয়ালি অংশীদার হিসেবে।

তবে মৌলিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা কম। চীন ও ভারত এশিয়ার আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের স্বার্থ অনিবার্যভাবেই সংঘর্ষে জড়াবে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারসাম্য আনতে সক্ষম।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র ভারতবিষয়ক বিশ্লেষক প্রভিন দোন্থি বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সম্পর্কে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিছুটা উন্নতি হতে পারে; কিন্তু ঐতিহাসিক ঘাটতির কারণে সম্পর্ক কখনো প্রকৃত অর্থে বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারবে না।’

তবু সুরে পরিবর্তন আসতে পারে। ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা নিয়ে শঙ্কিত ভারতীয় রাজনীতিকেরা এখন নিজেদের সঠিক বলে মনে করছেন। মোদি চাপে থাকবেন ভারতের ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতি অর্থাৎ সবার বন্ধু, কারও শত্রু নন—এটি পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য।

মোদি হয়তো প্রকাশ্যে অন্তত কোয়াড নিয়ে উৎসাহ কম দেখাবেন, রাশিয়া থেকে আরও অস্ত্র কিনবেন এবং মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করবেন। এ বছর শেষ হওয়ার আগেই পুতিনকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়ে গেছে।

তবু যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানিবাজার, বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান উৎস এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। মোদি হয়তো ওয়াশিংটনকে শান্ত করার চেষ্টা করবেন—সম্ভবত কম রুশ তেল কিনে তুলনামূলক বেশি মার্কিন গ্যাস আমদানি করে।

দোন্থির ভাষায়, ‘চীন নিয়ে উদ্বেগের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারত–মার্কিন সম্পর্ক ভারসাম্যে পৌঁছাবে। ভারত পশ্চিম ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি যেতে চাইছিল। আপাতত সে গতি কিছুটা শ্লথ হবে, তবে অগ্রগতি চলতে থাকবে।’

তাই সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কম। তবে যেকোনো পুনর্মিলন হবে কঠোর শর্তে। মোদি দেখাতে চান—ভারতের ওপর বিদেশি শক্তির সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার দিন শেষ।
মোদি ও ট্রাম্প হয়তো সম্পর্ক জোড়া লাগাবেন, কিন্তু ‘ব্রোমান্স’ সম্ভবত শেষ। বিয়ে টিকে থাকবে, কিন্তু তা হবে ভালোবাসাহীন, কেবল প্রয়োজনের তাগিদে।

* এড্রিয়ান ব্লমফিল্ড, সিনিয়র ফরেন করেসপন্ডেন্ট, দ্য টেলিগ্রাফ
* সামান লতিফ, সাংবাদিক, দ্য টেলিগ্রাফ
- দ্য টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া
- সংক্ষেপিতকরণ ও অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-31%2Fn3jsotew%2Fbrickssummit.JPG?rect=0%2C2%2C643%2C429&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাজানে ব্রিকস সম্মেলনে মোদি, পুতিন ও সি। ছবি : রয়টার্স

তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ‘স্টিল ডোম’ কি ইসরায়েলের আয়রন ডোমের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

তুরস্কের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এমন সময় তুরস্কের সামরিক বাহিনীতে ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ ঘটনাকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

তুরস্কের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কয়েক স্তরের সমন্বিত এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ২৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এ ঘটনাকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।

এমন সময় তুরস্কের সামরিক বাহিনীতে ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফিলিস্তিনের গাজা ও সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায়ই বাগ্‌যুদ্ধে জড়াচ্ছেন দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ইরানে নজিরবিহীন ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য দৃশ্যত ওলটপালট হয়ে গেছে। তেল আবিবের পরবর্তী নিশানা আঙ্কারা—তুরস্কের জনগণের মধ্যে এমন ভাবনা চেপে বসেছে। নড়েচড়ে বসেছেন দেশটির নেতারাও।

ইরানে হামলার পর এরদোয়ানের অন্যতম মিত্র তুরস্কের ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির (এমএইচপি) প্রধান দেভলেত বাহচেলি বলেন, ইরানের ওপর হামলা তুরস্ককে ঘিরে ফেলার ইসরায়েলের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য স্পষ্ট। আনাতোলিয়াকে ঘিরে ফেলা এবং নিজেদের গুরুদের হয়ে সন্ত্রাসমুক্ত ভবিষ্যৎ তুরস্কের যাত্রা নস্যাৎ করা।’

ইরানে হামলার পর এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক মাঝারি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করছে। শত্রুকে হামলা থেকে নিবৃত্ত রাখতে নিজেদের সক্ষমতা জোরদার করছে, যাতে কেউ তুরস্কে হামলার সাহস না পায়। তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতকে পুরোপুরি স্বনির্ভর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

এরদোয়ান বলেন, ‘যদি তুমি স্বাধীনতা চাও, যদি তুমি মুক্তি চাও; যদি তুমি এই ভূখণ্ডে নিজের সম্মান, মর্যাদা ও সততার সঙ্গে বাঁচতে চাও; যদি তুমি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চাও, যদি তুমি প্রাচুর্য, সম্পদ ও সম্প্রীতি চাও; যদি তুমি শান্তি চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে সব সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কী

সাধারণত রাডার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ফায়ারিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট হয়ে থাকে। তবে ‘স্টিল ডোম’ একক কোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নয়। এটি তুরস্কের স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার কয়েক স্তরের আকাশ ও রাডার ব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপ। ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে তুরস্কের অন্যতম প্রতিরক্ষা কোম্পানি আসেলসান। প্রথম ধাপে ২৭ আগস্ট এ সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ৪৭টি যান সরবরাহ করেছে কোম্পানিটি।

সরবরাহ করা সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ‘হিসার–ও প্লাস’ ও ‘সিপের’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, আল্প ৩০০-জি এবং ১০০-জি রাডার ব্যবস্থা, পুহু ও রেডেট ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং কোরকুৎ স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা যান।

গত বছরের আগস্টে ‘স্টিল ডোম’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এটিকে ‘সিস্টেম অব সিস্টেমস’ অভিহিত করেন। এটি দেশীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি, রাডার, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, যোগাযোগ মডিউল এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল কেন্দ্রগুলোর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা।

স্টিল ডোমকে তুরস্কেরর আকাশ ‘নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এটি তুরস্কের কোম্পানিগুলোর তৈরি বিভিন্ন জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার হুমকিগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত সুরক্ষা দেবে।

এর মধ্যে একটি হলো আসেলসানের বিমানবিধ্বংসী অ্যান্টি–এয়ারক্রাফট গান কোরকুৎ। এটি স্বল্পপাল্লার হুমকির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর, ভ্রাম্যমাণ ও দ্রুততর ব্যবস্থা হিসেবে তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষার চাহিদা পূরণ করবে।

আসেলসান ও রকেটসানের তৈরি ‘হিসার-এ প্লাস’ ও ‘হিসার-ও প্লাস’ স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা উড়োজাহাজ, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দেবে।

আসেলসান, রকেটসান ও টার্কি সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের যৌথভাবে তৈরি ‘সিপের’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি দূরপাল্লার হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর। এটি যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য আকাশযান থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সামরিক ইউনিট ও শহরগুলোকে রক্ষা করতে সক্ষম। ‘সিপের ব্লক-১’ ইতিমধ্যে তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আরও উন্নত সংস্করণ ‘সিপের ব্লক-২’–এর কাজ চলছে।

স্টিল ডোম কীভাবে কাজ করে

‘স্টিল ডোম’ দেশি প্রযুক্তিতে তৈরি ভূমি ও সমুদ্রভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম ও সেন্সরগুলোর মাধ্যমে স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। এটি তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে এসেছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট হালুক গোরকুন বলেন, ‘স্টিল ডোম বহু স্তরের একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সমন্বিত রূপ। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সেন্সর থেকে শুরু করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সবই একটি নেটওয়ার্কের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা বলয় হিসেবে ‘রিয়েল-টাইম’ এবং সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।’

আসেলসান ও রকেটসান কোম্পানির লেজারভিত্তিক ‘গোকবার্ক’ ও ‘আলকা’ ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এগুলো তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্পের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং এগুলো একটি সমন্বিত ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।

আসেলসানের ‘গুরজ’ হাইব্রিড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান এবং লেজার প্রযুক্তিকে একীভূত করে। আর ‘গোকের’, ‘গোকদেনিজ’, ‘গোকসুর’ এবং রকেটসানের ‘লেভেন্ত’-এর মতো অন্যান্য ব্যবস্থাও একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এগুলোকে কাজে লাগানো যায়।

স্টিল ডোম কী আয়রন ডোমের প্রতিদ্বন্দ্বী

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবরে এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের বিখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমের সঙ্গে স্টিল ডোমের তুলনা করে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। দেশে তৈরি হেলিকপ্টার ‘গোকবে’ আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ তুলনা টানেন।

এরদোয়ান বলেন, ‘এখন আরও ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, আমাদের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আমাদের নিরাপত্তার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাদের (ইসরায়েল) ‘আয়রন ডোম’ থাকে, আমাদের থাকবে “স্টিল ডোম”। আমরা তাদের দিকে তাকিয়ে আফসোস করে বলব না, “কেন আমাদের এটা নেই”।’

ইসরায়েলের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি তাদের ভূখণ্ডে ছোড়া রকেট ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়। এটি ২০১১ সালে চালু হয়। রাডার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ফায়ারিং ব্যবস্থা—এ তিনের সমন্বয়ে তৈরি এ ব্যবস্থা রকেট, মর্টার এবং ড্রোনের মতো স্বল্পপাল্লার হুমকিগুলোকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে দেয়। এ ছাড়া ২০১৭ সালে আয়রন ডোমের একটি নৌ-সংস্করণও মোতায়েন করা হয়।

এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি নির্ণয় করতে পারে একটি রকেট কোনো জনবহুল এলাকায় আঘাত হানতে যাচ্ছে কি না। যদি জনবহুল এলাকায় আঘাতের সম্ভাবনা না থাকে, তবে রকেটটিকে ধ্বংস না করে নিরাপদে ভূমিতে পড়তে দেওয়া হয়। মূলত ব্যয়বহুল এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আর্থিক খরচ এড়াতে এটি করা হয়।

আয়রন ডোমের সাফল্য ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা আয়রন ডোমের মাধ্যমে হামাসের ছোড়া রকেটের ৯০ শতাংশই মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে। আয়রন ডোমের সাফল্যে মুগ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দেশে ‘গোল্ডেন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ‘স্টিল ডোম’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আয়রন ডোমের প্রসঙ্গ টানলেও দুটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক নয়। আয়রন ডোম একক একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আর স্টিল ডোম তুরস্কের বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপ।

স্টিল ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এখনো কোনো ধরনের হামলা মোকাবিলার মতো পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। তবে ন্যাটো মানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুনাম রয়েছে তুরস্কের সমরাস্ত্র কোম্পানিগুলোর। এ ছাড়া ‘হিসার-এ প্লাস; ও ‘হিসার-ও প্লাস’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ স্টিল ডোমের অনেক সরঞ্জামই নিজ দেশে ব্যবহারের পাশাপাশি রপ্তানি করছে তুরস্ক।

গত বছরের আগস্টে ইস্তাম্বুলভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজের (ইডিএএম) পরিচালক ও কার্নেগি ইউরোপের ভিজিটিং ফেলো সিনান উলগেন আরব নিউজকে বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখেছি, আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে আকাশপথের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো ইসরায়েলের ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র ড্রোন হামলা। এ ঘটনা আঞ্চলিক যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরনকে তুলে ধরেছে।’

সিনান আরও বলেন, ‘মূলত এই প্রেক্ষাপটেই তুরস্কের সরকার দেশের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ছিল।’

ইরানে হামলার পর তুরস্ক ইসরায়েলের পরবর্তী নিশানা হতে যাচ্ছে, এমন শঙ্কা পেয়ে বসেছে আঙ্কারাকে। এমন প্রেক্ষাপটে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোয় নজর দিয়েছে এরদোয়ান সরকার। স্টিল ডোম সক্ষমতার দিক থেকে আয়রন ডোম বা পশ্চিমা অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমমানের না-ও হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা তুরস্কের সামরিক সামর্থ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তথ্য সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-01%2Fkiqxubsp%2Fsteeldome1.jpg?rect=27%2C0%2C1995%2C1330&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সামরিক বাহিনীর কাছে ‘স্টিল ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। আঙ্কারা, ২৭ আগস্ট। ছবি: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের সৌজন্যে