Saturday, October 12, 2013

ঈদের পর ‘অপারেশন ধরপাকড়’ by মাকসুদুল আলম

১৬ই অক্টোবর দেশব্যাপী উদযাপিত হবে ঈদুল আজহা। সর্বোচ্চ ত্যাগের উৎসব। জাপানে তা আগের দিন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজাও কাছাকাছি সময়ে। দু’টি বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব থাকলেও খুশির আমেজ নেই জনমনে।

সংঘাতের আশঙ্কা সমঝোতার পরামর্শ

নির্বাচন নিয়ে ধূম্রজাল। মুখোমুখি দুই রাজনৈতিক শিবির। সমঝোতার কোন আলামত নেই। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা দেশ। শুরু হয়েছে উৎকণ্ঠার ক্ষণ গণনা। ডেডলাইন ২৪শে অক্টোবর।

২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে আঘাত হানবে পাইলিন

ভারতীয় উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে ঘূর্ণিঝড় পাইলিন। উড়িষ্যার উপকূলীয় শহর গোপালপুর থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসারের অবস্থান করছে ঝড়টি।

হানিফকে পদত্যাগ করে জনপ্রিয়তা যাচাই করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বিশেষ সহকারী মাহবুব উল আলম হানিফকে পদত্যাগ করে জনপ্রিয়তা যাচাই করতে বলেছেন। কুষ্টিয়ার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তর্কে জড়ানোর এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা হানিফকে এ কথা বলেন।

যে কারণে গ্রেফতার হলেন রুমি by কামরুজ্জামান মিলু

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আরফিন রুমি শনিবার সকালে গ্রেপ্তার হয়েছেন। রুমির প্রথম স্ত্রী লামিয়া ইমলাম অনন্যা তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করার পর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিং এর নিজ বাসা থেকে

প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ ১০০, কাঁচামরিচ ১২০ by মফিজুল সাদিক

রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে হঠাৎ করেই বেড়েছে পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচের দাম। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ ১০০,  ভারতীয় নাসিক মোটা পেঁয়াজ ৯০, পাকিস্তানি ৯০ ও চায়না পেঁয়াজ ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিমানে ৭০০ কোটি টাকার দুর্নীতি, ফাঁসছেন কর্তারা by আদিত্য আরাফাত

কেনাবেচা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে  বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে প্রায় সাতশো কোটি টাকা দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সমীক্ষা: দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি সংকোচনের আশঙ্কা

স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় সতর্ক করেছে যে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী হওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে এ খাতের অবদান কমছে।

কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ

নির্ধারণ করা হলো কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্ক্রিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও

ইতিহাস গড়া হলো না মালালার

বিশ্ববাসীর ধারণা ও সংবাদ মাধ্যমগুলোর গুঞ্জনকে ফের উড়িয়ে দিয়ে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থাকেই (ওপিসিডব্লিউ) চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করলো নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।

রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী by মাহমুদুল বাসার

গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক গণবক্তৃতা সম্মিলনে বক্তারা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা হল গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ধর্মনিরপেক্ষতাই একমাত্র পথ। এর কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার ফল কখনও সুখকর হয়নি। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করেই দেখতে হবে। এ সম্মিলনে বাংলাদেশ থেকে উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রুখতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলছে। এ নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও নতুন কিছু নয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ প্রবণতা মাহামারী আকার ধারণ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও এর বাইরে নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিকরা এ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন বলে উদ্যোক্তারা বক্তৃতায় বলেছেন। সম্মিলনে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। সম্মিলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে ভারত উপমহাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায়। এ সম্মিলনের জ্ঞানী বক্তাদের বক্তব্য থেকে আরও ভালো করে তা জানা গেল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যারা পালাক্রমে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা কেউ সরাসরি ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিয়ে জঙ্গিবাদ প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কেউ নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে মোলায়েম কৌশলে ধর্মকে রাষ্ট্রের নীতিমালার সঙ্গে মিশিয়ে জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য খাড়া রাখার স্বার্থে প্রায় সব পক্ষ কোনো না কোনো কৌশলে ধর্মকে ব্যবহার করছেন। এতে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরে নানা অশান্তি, রক্তপাত চলছে। রাষ্ট্রগুলো এক একটি স্ববিরোধী প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে ধর্মকে ব্যবহার করতে গিয়ে। এই সম্মিলনের প্রত্যেক বক্তাই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। প্রত্যেক বক্তার বক্তৃতার সারমর্ম অভিন্ন, তা হল রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনা হলে বিপদ বাড়বে ছাড়া কমবে না। পৃথিবীর তাবৎ মনীষী বলেছেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হয় না, রাষ্ট্র পুরোপুরি অর্থনীতি ও সংস্কৃতিভিত্তিক। এ সম্মিলনের প্রধান বক্তা ভারতের জামিয়া মিল্লাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মশিরুল হাসান বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাই একমাত্র পথ। এর কোনো বিকল্প নেই। তবে মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের বিরোধিতা নয়। তিনি বলেন, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনীতিকরা অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন করার লক্ষ্যে তেমন কোনো কাজ করেননি। যদি তারা সেভাবে কাজ করতেন, তাহলে অসাম্প্রদায়িক সামাজ গঠন সম্ভব হতো। তিনি বলেন, মুসলিম সমাজে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মুসলিম সমাজে নারীরা পিছিয়ে আছেন। মুসলিম নারীদের রাষ্ট্রগঠনে যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে যে ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা ফুটে উঠেছে তা আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ভেবে দেখা দরকার। পাকিস্তানের লাহোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক রহমান বলেন, অসাম্প্রদায়িক ইস্যুতে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একত্র হয়েছি। নানা মত, ভাবনা আর পরামর্শে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা দরকার বলে আমরা মনে করি। তারিক রহমান পাকিস্তানে নির্বিচারে ধর্মের অপব্যবহারের চিত্র তুলে ধরেন তার বক্তৃতায়। ব্যাপক ইসলামীকরণের প্রভাবে পাকিস্তানের খ্রিস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ও প্রভাবিত হচ্ছেন। এতে নিঃসন্দেহে নাগরিক মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞান, ইতিহাস ও যুক্তিমনস্কতা অবরুদ্ধ হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে এখনই সজাগ হতে হবে। যারা ডেমোক্র্যাট, লিবারেল, তারা ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থানকে ধর্ম দিয়ে প্রতিরোধ করতে চায় কখনও কখনও। কিন্তু সেটা একপর্যায়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সে কারণে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
কথাটা বোধ করি অতি ব্যবহারে একটু মলিন হয়ে গেছে। রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে পৃথক করার অর্থ আরও স্পষ্ট করা দরকার। না হলে নাস্তিক খেতাব কপালে জুটবে। বলা দরকার, রাজনীতির মঞ্চে ধর্মচর্চা আর ধর্মের মঞ্চে রাজনীতিচর্চা চলবে না। এসব ফেরেববাজি চললে রাষ্ট্রে ধর্মের ফেরকা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। রাজনৈতিক পক্ষকে রাজনৈতিক ইস্যু দিয়েই ঘায়েল করা বাঞ্ছনীয়, যখনই ধর্মীয় ইস্যু দিয়ে ঘায়েল করা হয় তখনই বিপত্তি ঘটে, জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ সম্মিলনে মূল্যবান কথা বলেছেন মননশীল লেখক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এটি গণভাবে ব্যবহার করা বিধি নয়। ধর্মকে ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন তারা একটি নীতি দিয়েছিল, ভাগ কর, শাসন কর। এ নীতি নেয়ার ফলে তাদের শাসন করতে সুবিধা হয়। পাশাপাশি তখন মুসলিম লীগও ধর্ম ব্যবহার করতে শুরু করে। পরিণতিতে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ভাগ হয়। ড. চৌধুরী আরেকটি চমৎকার কথা বলেছেন- দেশে এখন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ সমাজের ধনীরা এলাকায় গিয়ে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। কোনো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে না। আর মাদ্রাসায় পড়ছে গরিব শিক্ষার্থীরা। সেখানে কোনো ধনীর সন্তানেরা পড়ে না। আসলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একটা ষড়যন্ত্রের শিকার। ধর্ম ও রাষ্ট্র সম্পর্কে এর চেয়ে সহজ ব্যাখ্যা আর হতে পারে না। শ্রীলংকার অধ্যাপক রোহান গুনারত্নে বাংলাদেশ থেকে উগ্রধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রুখতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। অধ্যাপক রোহানের মতে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ পাশাপাশি অবস্থান করে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এর উৎস। তাই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করা দরকার। তিনি বলেন, যারা ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন করে শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া বুদ্ধিভিত্তিক ও আদর্শগত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সন্ত্রাস সম্পর্কে অধ্যাপক রোহান কাটা কাটা সত্য কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। তবে এখনও তা অপ্রতিরোধ্য অবস্থায় পৌঁছেনি। এখনই ব্যবস্থা নিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী। এটা মৌলবাদিতা রুখতে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, ২০০২, ০৩, ও ০৬ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আল কায়দার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু সে সময়ের সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে ব্যবস্থা না নিয়ে এড়িয়ে গেছে। অথচ সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ মোকাবেলা করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
ড. আবুল বারাকাত বরাবারের মতো ধর্মীয় মৌলবাদীদের অর্থনীতির উৎস পরিসংখ্যান আকারে তুলে ধরেন এ সম্মিলনে। তিনি বলেন, জামায়াত সুসংগঠিত জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা দখল করতে চায়। এ জন্য তারা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড দেশেকে হাজার বছর পিছিয়ে দেবে। কারণ তারা যুক্তির ধার ধারে না। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত। দেশে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হল মাদ্রাসা শিক্ষা।
অতন্ত ভয়ংকর একটি মুহূর্তে বাংলাদেশে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস সম্মিলন হল। সামনে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষমতা পরিবর্তন যদি দেশের সংখ্যালঘু বিতাড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বিকৃত হয়, সাম্প্রদায়িক উগ্রতা হালে পানি পেয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে অন্ধকার নেমে আসবে।
মাহমুদুল বাসার : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

দুর্গতিনাশিনী দুর্গা by বিচারপতি গৌর গোপাল সাহা

বাঙালি হিন্দুর সর্বপ্রধান এবং সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দময়ী দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আগমন বার্তায় গোটা বিশ্ব আজ আনন্দমুখর। মা দুর্গা ব্রহ্ম শক্তি স্বরূপিনী, তিনি বিভাসিতা মাতৃশক্তি, তিনি জগজ্জননীরূপে সর্বভূতে বিরাজমান। তিনি সব প্রাণীতে চেতনারূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, শ্রদ্ধারূপে, দয়ারূপে ইত্যাদি নানারূপে বিরাজিতা, সব ধরনের অকল্যাণের হাত থেকে তিনি তার সন্তানদের রক্ষা করে থাকেন। দেবতা ও অসুরদের সংগ্রামে শরণাগত শুভবুদ্ধি ও কল্যাণকামী দেবতাদের তিনি সব সময় বরাভয় দান করেছেন। বিভিন্ন পুরাণে মায়ের অপার মহিমা বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। আদ্যাশক্তি এ মহামায়াই ব্রহ্মজ্ঞানদাত্রীরূপে সন্তানদের পরমানন্দ দান করে চলেছেন। এ সর্বভূতময়ী চৈতন্য সত্তাই মহিষাসুরমর্দিনী জ্যোতির্ময়ী শ্রীদুর্গা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সারা অবিভক্ত ভারতে শক্তি পূজার প্রচলন আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা সুরথ রাজ্যহারা হয়ে এবং বৈশ্য সমাধি বিষয় বৈভব থেকে বঞ্চিত হয়ে মনের দুঃখে বনে-জঙ্গলে শান্তির অন্বেষায় ঘুরে বেড়িয়ে হারানো সৌভাগ্য ফেরত পাওয়ার আশায় বিভোর। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তারা দৈবক্রমে ঋষি মেধসের আশ্রমে এসে হাজির হলেন। তারা ঋষি মেধসের কাছে তাদের দুর্গতির অবসানে হৃত বৈভব ফেরত প্রাপ্তির প্রার্থনা জানালে ঋষিবর তাদের সর্বদুঃখবিনাশিনী কল্যাণময়ী মা দুর্গার পূজা করে বর প্রার্থনার পরামর্শ দেন। দয়াপরবশ হয়ে মুনিবর তাদের শ্রীমায়ের রূপকল্পনা ও পূজাবিধির কথাও বলেন। ঋষি মেধসের পরামর্শমতো রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি দুর্গাপূজার আয়োজন করেন এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা দ্বারা তারা মা দুর্গাকে সন্তুষ্ট করে শ্রীমার আশীর্বাদে তাদের স্ব স্ব হৃতগৌরব ও বিষয়-বৈভব পুনঃপ্রাপ্ত হন। এভাবেই এ দেশে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়।
দুর্গাপূজায় বহুবিধ দুর্লভ ও মূল্যবান উপাচার প্রয়োজন। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ পূজার অনুষ্ঠান করা খুবই দুঃসাধ্যের ব্যাপার। তাই প্রাচীনকালে রাজা-জমিদার আর ধণাঢ্য বণিক সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই এ পূজার প্রচলন লক্ষণীয়। এ যুগের সাধারণত আর্থিকভাবে সচ্ছল ও ধনী ব্যক্তিরাই পারিবারিকভাবে বংশপরম্পরায় দুর্গাপূজা করে আসছেন। তবে হালে সার্বজনীন দুর্গাপূজার আধিক্য, দৃষ্টিনন্দন জৌলুস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব সার্বজনীন পূজাতে সমাজের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণে এক আনন্দমুখর আলোকিত পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং দুর্গাপূজাকে উজ্জ্বল মহিমায় অভিসিঞ্চিত করে।
অনেকদিন আগের কথা। সে সময় দেবতাদের রাজা যেমন ছিলেন ইন্দ্র, তেমনই অসুরদের রাজা ছিলেন মহিষাসুর। দেববরে বলীয়ান বলদর্পী মহিষাসুর একসময় স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে। ফলে এক ভয়ানক যুদ্ধ বেধে যায়, যা চলে একশ’ বছর ধরে। দেবতারা প্রাণপণে যুদ্ধ করলেও মহিষাসুরের প্রবল আসুরিক শক্তির কাছে পরাজিত হন। স্বর্গরাজ্য থেকে বেদতারা বিতাড়িত হলেন, অসুররাজ মহিষাসুর হলেন স্বর্গের অধিপতি। দেবতারা তাদের দুঃখের অবসানে স্বর্গরাজ্য উদ্ধারের জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা তাদের ভগবান বিষ্ণু ও শিবের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেন।
দেবতাদের দুঃখের কথা শুনে ভগবান শিব ও বিষ্ণু অতিশয় ক্রুদ্ধ হলেন। ক্রুদ্ধ বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও শিবের বদন থেকে মহাতেজ নির্গত হল। ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতার শরীর থেকেও সুবিপুল তেজরাশি নির্গত হল। দেবতাদের এ সম্মিলিত তেজরাশি থেকে সৃষ্টি হল অপরূপা এক নারীমূর্তি। দেবতাদের দেহ নিঃসৃত তেজে সেই নারীমূর্তির অঙ্গগুলো সৃষ্টি হল। ভগবান বিষ্ণুর তেজে উৎপন্ন হল তার বাহুসমূহ- দশভুজ। তিনিই হলেন দশভুজা মহিষমর্দিনী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা।
দেবগণ নিজ নিজ দেহ নিঃসৃত তেজ দ্বারা যেমন দেবীর অঙ্গসকল সৃষ্টি করে তাকে পূর্ণরূপ দিয়েছিলেন, তেমনই তারা নিজ নিজ শ্রেষ্ঠ অস্ত্রও তার হাতে তুলে দিয়ে তাকে করেছিলেন রণসাজে সজ্জিতা। দেবতারা দেবী দুর্গার হাতে যেসব অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন, সেগুলো হল দেবাদিদেব মহাদেবের ত্রিশূল, কালদেবতার খক্ষ, ভগবান বিষ্ণুর চক্র, পবন দেবতার তীক্ষœ বান, জলদেবতা বরুণের পাশ, পবনদেবের বার্ণপূর্ণ দুটি তূণীর, অগ্নি দেবতার শক্তি, দেবরাজ ইন্দ্রের বজ , মৃত্যুদেবতা যমের কালদণ্ড, বিশ্বকর্মার উজ্জ্বল কুঠার। অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গা এসব অস্ত্রই ব্যবহার করেছিলেন। এ যুদ্ধের ক্রান্তিলগ্নে মহিষাসুরের পতন ঘটে। এভাবেই মা দুর্গার প্রসাদে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নিশ্চিত হয়।
হিংসায় উন্মত্ত আজকের এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও মৈত্রীর, ঐক্য ও সংহতির। আমরা বিশ্বাস করি, সব ধর্মের মর্মবাণী এক ও অভিন্ন- ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বত্র বিরাজমান এবং পরম করুণাময়। ধর্ম-দর্শনের এ মৌলিক প্রশ্নে এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের কোনোই প্রভেদ নেই, তফাৎ যেটুকু তা নেহায়তই ভাষাগত, প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণের। হিন্দুর প্রত্যয়ে আছে সর্বভূতে সমদর্শন, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য ও সংহতি এবং সব ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, মনুষ্যত্বই মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার- এ হোক আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি।
আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বের সব ধর্মই ঈশ্বর প্রেরিত এবং শাশ্বত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, কালজয়ী। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই পৃথিবীতে এতসব বৈচিত্র্যের সমাহার। সাদা-কালো, দীর্ঘকায়-খর্বাকায়, তীক্ষ্ণ-নাশা ও চেপ্টা নাক আরও কত বৈচিত্র্যে ভরা বিশ্বসংসার। কিন্তু এ সবেরই নিয়ন্তা এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। আমরা তাকে যে নামে যেভাবেই ডাকি না কেন, তিনি ভক্তের ডাকে সেভাবেই সাড়া দেন। তিনিই সব পথের শেষ ঠিকানা। তাই আমাদের উচিত নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাসে নিষ্ঠাবান ও অবিচল থেকে ধর্মাচরণ করা, কোনোভাবেই যেন আমরা অন্যের মত ও পথকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করি। এভাবেই আমরা আন্তঃধর্মীয় সংঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করে সব মানুষের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি। আর এভাবে এ পৃথিবীতেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ধর্মবোধে উদারনৈকি চেতনার উন্মেষ ও যথার্থ মানবিক মূল্যবোধের বিকাশই এক অখণ্ড শান্তিময় বিশ্ব বিনির্মাণের মৌলিক উপাদান। ‘বসুধৈব টুকুম্বকম’- গোটা বিশ্বই আমার আত্মীয়- এ হোক আমাদের আলোকিত প্রত্যয়। সত্য সুন্দরের আলোকে, শান্তি ও কল্যাণের সুবাতাসে অভিসিঞ্চিত হোক এ আর্ত বসুন্ধরা।
দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আশীর্বাদের করুণাধারা সবার ওপর বর্ষিত হোক- দেশ ও জাতি সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির আলোকছটায় উদ্ভাসিত হোক!
বিচারপতি গৌর গোপাল সাহা : সভাপতি, রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা

ভূমধ্যসাগরে জাহাজ ডুবে ৫৫ অভিবাসীর মৃত্যু

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসী জাহাজ ডুবিতে কমপক্ষে ৫৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মাল্টা ও ইতালির ল্যাম্পেদুসার মধ্যবর্তী স্থানে এবং মিশরের আলেজান্দ্রিয়া বন্দরের কাছে দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় এ প্রাণহানি হয়।

কোরবানির পশুর হাটের অর্থনীতি by ড. আর এম দেবনাথ

সামনে ঈদ ও পূজা। ঈদ দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। পূজা, মানে দুর্গাপূজা সংখ্যালঘু হিন্দুদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। দুটি একসঙ্গে পড়েছে এবার। প্রথমে পূজা, তারপর কোরবানির ঈদ। বাসে, ট্রেনে, বিমানে, লঞ্চে কোথাও টিকিট নেই। দেশের ভেতরের জন্যও নেই, বিদেশে ভ্রমণের জন্যও নেই। দেশের ভেতরে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছাও একটা স্বপ্ন। গত বুধবার ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা আসার তিস্তা ট্রেনটি চার ঘণ্টা বিলম্ব করেও ময়মনসিংহ স্টেশন ছাড়েনি। অজানা আশংকায় যাত্রীরা ছিল অসহায়। ঢাকা থেকে বেরোনোর কোনো ব্যবস্থা নেই। টঙ্গী দিয়ে বেরোনো, যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ দিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা একটা দুঃস্বপ্ন মাত্র। ঢাকায় বন্দি থাকাই ভালো। এমনিতেই তো বন্দি জীবন! ঢাকায় এখন স্বাভাবিক অবস্থাতেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে এক-দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
এরই মধ্যে কোরবানির হাট বসছে অনেক জায়গায়। এটা ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। কিছু বলার নেই। এ পশুর হাটের ব্যবস্থা প্রতি বছরই হয়। ব্যবসায়ীরা কখনও লাভ করেন, কখনও লোকসান দেন। যারা কোরবানির জন্য পশু কেনেন তারা কখনও জেতেন, কখনও লোকসান নয়- ঠকেন। প্রতি বছরের ঘটনা এটা। এবারও তাই শুরু হয়েছে। ঈদের পর হিসাব মেলালে বোঝা যাবে কার হার, কার জিত হল- ক্রেতার না বিক্রেতার। এ হিসাবের আগে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশাল ঈদের বাজার জমে উঠেছে। দেশের সর্বত্র। এ ঈদে কাপড়ের ব্যবসা, জামা-কাপড়ের ব্যবসা বেশি হয় না। তবে এবার কিছুটা হতে পারে। কারণ দেশের হিন্দুভাইরা পূজা করবেন। তাদের কেনাকাটা আছে। এ কারণে জামা-কাপড়, শাড়ির ব্যবসাও এবার কম জমজমাট নয়। সেদিন গিয়েছিলাম মুদি দোকানে। প্রচণ্ড ভিড়। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিকন চাল, সেমাই ইত্যাদির রমরমা বাণিজ্য। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিশেষভাবে জমজমাট হবে মশলার বাজার। জিরা, মরিচ, হলুদ, বিরিয়ানির উপকরণ ইত্যাদির বাজার জমবে। জমবে পশুখাদ্যের বাজারও। দা-খন্তা-কুড়ালের বাণিজ্যও হবে। কোরবানিতে সাহায্য নিতে হবে মৌলভী সাহেবদের। তাদের কদর বাড়বে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা তৎপর, যথারীতি তাদের ব্যবসার রেকর্ড ভালো নয়। গৃহনির্মাণ, পরিবহন, কোল্ডস্টোরেজ, পাট, চামড়া ও চা ব্যবসায়ীদের ব্যাংক রেকর্ড ভালো নয়। তবু এবার আগের বছরের মতোই চামড়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার জন্য সরকার তৎপর। এদের ঋণ দিতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকওয়ালারা কত সুনামের দাবিদার, কিন্তু পাট-চামড়ায় পয়সা তারা দেয় না। সব বদনামের ভাগিদার সরকারি ব্যাংক এসবে ঋণ দিতে বাধ্য হয়। এবারও তাই। তারা সরকারি ব্যাংক থেকে বস্তুত বিনা প্রশ্নে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গেছে। এই যে চামড়ার ব্যবসা, এর অনেকগুলো দিক আছে। চামড়ার ব্যবসা গরুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চামড়ার ব্যবসায় কেমিক্যাল লাগবে, লবণ লাগবে। এসবের বাণিজ্যও হবে প্রচুর। তা হোক, আমরা দেখতে চাই এ ব্যবসার অন্যান্য দিক। গরু ও চামড়ার ব্যবসার রাজনৈতিক দিক আছে। এর অর্থনৈতিক দিক আছে, প্রশাসনিক দিক আছে। অর্থনৈতিক দিকে আছে সরকারের রাজস্বের দিক, হুন্ডির দিক ইত্যাদি।
প্রথমেই রাজনৈতিক দিকটার ওপর একটু আলোকপাত করতে চাই। এ কথা সবাই আমরা জানি, শুধু কোরবানির ঈদ নয়, সাধারণভাবেও সারা বছর যে গোমাংস দেশে ভোগ হয়, তার একটা বড় অংশের জোগানদার প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও মিয়ানমার। সবচেয়ে বড় জোগানদার অবশ্য ভারত। ভারতের মানুষ গরুর মাংস খায় না ধর্মীয় কারণে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে গরুর মাংস একটা সস্তা পুষ্টিকর খাদ্য। অধিকন্তু এতে রয়েছে ধর্মীয় অনুভূতি। এক দেশে নেতিবাচক, আরেক দেশে তা ইতিবাচক। এটা গরু বাণিজ্যের ভিত্তি, এটাই গরু চোরাচালানের ভিত্তি। হাজার চেষ্টা করেও এটা রোধ করা সম্ভব নয়। নিতান্ত অর্থনৈতিক কারণেই এ চোরাচালান বাণিজ্য সংঘটিত হয়। এর সুবিধাভোগী উভয় দেশের মানুষ। ভারতীয়দের গরুর দরকার নেই মাংসের জন্য, বাংলাদেশীদের গরুর দরকার মাংসের জন্য। এই প্রয়োজনকে ভিত্তি করেই এই বাণিজ্য হচ্ছে। অথচ এটা অবৈধ। কারণ বৈধভাবে ভারত গরু রফতানি করে না। বৈধভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র (এলসি) খুলে বাংলাদেশ তা আমদানি করে না। দৃশ্যত এই অবৈধ বাণিজ্যে জড়িত উভয় দেশের হাজার হাজার বা লাখ লাখ লোক- এটা অবৈধ বাণিজ্য জেনেও। ফলে সীমান্তে এ নিয়ে গোলাগুলি হয়। মানুষ মারা যায়। এতে উভয় দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং এটা ঘটে প্রায়ই। এ সমস্যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সৃষ্টি করে। তা করে সারা বছরই। ফলে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। নানারকমের গুজব রটে। অথচ অনেকেই বলছেন সীমান্তে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, গুলির ঘটনা ঘটে, তা চোরাচালানের জন্য। এতে গরুর বাণিজ্যও আছে।
দৃশ্যত অবৈধ এই গরুর বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক হুন্ডির, যা আবার অবৈধ-বেআইনি, দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের বিচার হয় ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইনে’। হুন্ডি কেন? গরুর ব্যবসা বা আমদানি বৈধ নয়। ভারত, নেপাল, ভুটান বা মিয়ানমার থেকে যে গরু আসে, তার সংখ্যা কত তা কেউ আমরা জানি না। এ ব্যাপারে কোনো গবেষণামূলক তথ্যও নেই। সরকারি তথ্যও নেই। অতএব এর সঙ্গে কত টাকার বাণিজ্য জড়িত, তা বলা মুশকিল। তবে সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়, এ খাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রশ্ন, যে আমদানি বৈধ নয়, সেই আমদানি কীভাবে হয়? ভারতীয় চোরাচালানিরা তাদের গরু বাংলাদেশে ‘পুশ’ করে। এপারে আসার পর এগুলো হয় ‘দাবিদারহীন’ গরু। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের চোরাচালানিরা জানে কার ‘চালান’ কোনটা। গরু ‘কাস্টমসে’ নিলামে ওঠে নামমাত্র। বাংলাদেশী চোরাচালানিদের মধ্যে যে ‘প্রকৃত’ দাবিদার, অর্থাৎ যার ‘চালান’ সেই নিলাম ডাকে অংশ নেয় এবং নামমাত্র একটা কর পরিশোধ করে দেয়। ‘চোরাচালানিরা’ একটা রসিদ হাতে পায়। গরুর শরীরে একটা সিল মারা হয়। ‘অবৈধ’ গরু ‘বৈধ’ হয়ে যায়। তা পরে সারাদেশের বিভিন্ন বাজারে সারা বছর বিক্রি হয়। এটা একটা অভিনব পন্থা, যার মাধ্যমে আমরা বাণিজ্যটা বৈধ করে নিয়েছি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বড় একটা। ভারতীয় চোরাচালানিরা কি বিনা পয়সায় গরুর চালান পাঠায় বাংলাদেশী চোরাচালানিদের কাছে? দু’জনের মধ্যে কি ‘ভাই ভাই’ সম্পর্ক? বিনা পয়সায় এই ব্যবসা হচ্ছে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। রীতিমতো উচিত মূল্যে এসব গরু বাংলাদেশে ‘আমদানি’ হয়। তাহলে এর ‘পেমেন্ট’ কীভাবে হয়? এটা তো ব্যাংকের মাধ্যমে ‘এলসি’ (ঋণপত্র) খুলে আমদানি করা পণ্য নয় যে তা ডলারে পরিশোধিত হবে। তাহলে কোন পন্থায় এর ‘পেমেন্ট’ হয়? অবশ্যই তা হুন্ডির মাধ্যমে। অথচ হুন্ডি অবৈধ। কিন্তু তা হচ্ছে, হবে, অতীতেও হয়েছে। এর পরিমাণ বাড়ছে। নিতান্ত অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তা হচ্ছে। কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ই এ ব্যবসা রোধ করা যায়নি, আগামী দিনে তা পারা যাবে- এ কথা আমি বিশ্বাস করি না অভিজ্ঞতার আলোকেই। অবৈধ বাণিজ্য থাকলে হুন্ডি থাকবে। হুন্ডি থাকলে অবৈধ বাণিজ্য থাকবে। একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ সমস্যার আরেকটা দিক আছে। এটা রাজস্ব সম্পর্কিত। অবৈধভাবে যেসব পণ্য ভারত, মিয়ানমার, ভুটান ও নেপাল থেকে আসে, বিপরীতে যেসব পণ্য সেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে যায়, তার ওপর সরকার কোনো কর (ট্যাক্স) পায় না। লাভবান হয় অবৈধ ব্যবসায়ীরা। যদি অবৈধ বাণিজ্য না হয় তাহলে সরকার রাজস্ব পেত, সব সরকারই পেত। বাণিজ্যটা সরকারি হিসাবে আসত। এই বাণিজ্য অল্প টাকার নয়। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চোরাচালান ব্যবসা প্রচুর টাকার। অনেকে বলেন, এর পরিমাণ হবে সরকারি বাণিজ্যের সমান।
বছর দুই-তিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণাপত্রে এই বাণিজ্যকে সরকারি করার দাবি করা হয়, হুন্ডিকে অনুমোদন দেয়ার কথা বলা হয়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফও তা চায় বলে জানি। যে সমস্যা প্রশাসনিক পদক্ষেপে সমাধান হচ্ছে না, তার সমাধান অর্থনৈতিক হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। এটা অনেকেই বলেন যে, প্রশাসনিক ব্যবসা দ্বারা এই চোরাচালান বন্ধের কথা যারা বলেন তারা আসলে চোরাচালান ব্যবসা জিইয়ে রেখে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। চোরাচালানিরা সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী। তাদের প্রোপাগান্ডাই লোকে বিশ্বাস করে। অথচ এই সমস্যার সমাধান হতে হবে অর্থনৈতিক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যে উদার বাণিজ্যের পথ ধরেছে, তা ধীরে ধীরে চোরাচালান বন্ধে সহায়তা করবে। সেটা সময় লাগতে পারে। ইত্যবসরে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বসে এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে বাধা কোথায়?
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম

থেমে গেছে দাঙ্গা থামেনি ধর্ষিতার কান্না

একে কি জীবন বলে? কথায় কথায় দাঙ্গা, দাঙ্গা থেকে দাহ। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই। ভিটে-মাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ জীবন-যাপন। তারপর রাজনীতির টানাটানি এবং ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া। কিন্তু ভুলে যেতে না যেতেই আবারও ফিরে আসে সেই দাঙ্গা, একই চেহারায়; একই উনুনের আগুন হয়ে-
ভারতের মোজাফফরনগরের দাঙ্গা থেমেছে প্রায় এক মাস আগে। কিন্তু আজও থামেনি ধর্ষিতার বোবা কান্না। লোকলজ্জার ভয়ে তারা তা বলতেও পারেনি, না পুলিশকে না সমাজকে। অন্তর দহন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাদের। ঘরে ফেরার অবস্থাও নেই। ফিরলেই মৃত্যু অথবা নির্মম নির্যাতনÑ এমন আতংক তাড়া করে ফেরে। তাই আশ্রয় শিবিরে মুখ লুকিয়ে, গা বাঁচিয়ে কোনো মতে বেঁচে থাকা। ধর্ষিত এসব নারীর অপলক চোখে এখন একটাই প্রশ্ন একে কি জীবন বলে? কথায় কথায় দাঙ্গা, দাঙ্গা থেকে দাহ। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই। ভিটে-মাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ জীবন-যাপন। তারপর রাজনীতির টানাটানি এবং ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া। কিন্তু ভুলে যেতে না যেতেই আবারও ফিরে আসে সেই দাঙ্গা, একই চেহারায়; একই উনুনের আগুন হয়ে। ভারতবর্ষে দাঙ্গা কোনো নতুন ঘটনা নয়। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ আজও একই কারণে দাঙ্গার দঙ্গলে পুড়ে ছাই হয়। পার্থক্য শুধু কম আর বেশি। তবে দিনের পর দিন ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা জš§ দিয়েছে ক্ষোভ। আর এ ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জমে ওঠে রাজনীতির মাঠ, ক্ষমতার মসনদ দখলের লড়াই।
শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ হয় শিকারির নগ্ন থাবার শিকার। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩। ভারতের উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরনগর এলাকায় শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। ছড়িয়ে পড়ে সামলি ও পানিপথ জেলাতেও। লিশার, লাংক, বাহাবাদি, হাসানপুর, মোহাম্মদপুর, ভাগপথ এরকম আরও কয়েকটি গ্রামে জ্বালিয়ে দেয়া হয় মুসলমানদের শত শত ঘরবাড়ি। নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ সম্পদ-সম্পত্তি। ঘর ছাড়া হয় প্রায় ৫০ হাজার সাধারণ মুসলমান। এখনও তারা ঘরে ফিরতে পারেনি। এরই মধ্যে বেদখল হয়েছে অনেকের গৃহস্থালী। আর সবচেয়ে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় যেটা ঘটেছে তা হল- ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো বর্বর ও পৈশাচিক ঘটনা। সেই সব ধর্ষিত নারী আজ বাস্তুহারা, আÍগ্লানির ভারে মুষড়ে গেছে তাদের জীবনস্বপ্ন। সরেজমিনে ঘুরে তাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এএফপি, দৈনিক ভাস্কর। আশ্রয় শিবিরে থাকা ওই সব নারীর জীবনের বীভৎস গল্প নিয়ে বার্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হল। দৈনিক ভাস্করের প্রতিবেদকরা কাইরানা ও কানধালা শহরের আশপাশে ঘুরে দেখেছেন সেখানে কতটা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে দাঙ্গাকবলিত মোজাফফরনগরের নারীরা। এখনও অনেক নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাদের শেষ অবস্থা জানা নেই কারও। চোখের সামনে নিজের মেয়েকে ধর্ষণের দৃশ্য দেখতে হওয়ায় অনেক মা আÍহত্যা করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। চার সন্তানের এমনি এক মা যিনি লজ্জায় নিজের নামও উচ্চারণ করার শক্তি হারিয়েছেন, তিনি বলেছেন, আমার পরিবারের আমি ও আমার তিন মেয়েকে (বয়স যথাক্রমে ১৭, ১৮, ২১ বছর) আটকে রাখে ১০ থেকে ১৩ জন দাঙ্গাকারী। তারা আমার চোখের সামনে আমার মেয়েদের ধর্ষণ করে।
আমাকে বাধ্য করে ওই দৃশ্য দেখার জন্য। আমার দুই মেয়েকে উদ্ধার করা গেলেও বাকি দুই মেয়েকে এখনও খুঁজে পাইনি। জানি না তারা কোথায় আছে। ওই দুর্বৃত্তদের তিনি চেনেন বলে দাবি করেন। তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ‘জাত হিন্দু’ সম্প্রদায়ের। তারাই তাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে এবং গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। এরকম আরও কত মেয়ে রয়েছে যারা মোজাফফরনগর দাঙ্গার সময় যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছে। হতভাগ্য এসব মানুষ যখন পুলিশের আশ্রয় চেয়েছে তাও তারা পাইনি। ভাস্করের প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যখন থানায় ছুটে গেছে অসহায় মানুষ তাদের বলা হয়েছে, ‘পুলিস থানে ওয়ালে নে কাতা কি হুম তো আপনে সহায়তা করেংগে, তুম মুসলমানো কি নাহি’। এর বাংলা দাঁড়ায় এরকমÑ আমরা শুধু আমাদের জনগণকে (জাত, হিন্দু) রক্ষা করব, তোমাদের নয় মুসলিম। এরকম মর্মান্তিক ঘটনার জš§ হয়েছিল মোজাফফরনগরে। এ নিয়ে ভারত সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। দায়ী করা হয়েছে উত্তরপ্রদেশের স্থানীয় রাজনীতিকে। কিন্তু আজও দাঙ্গাপীড়িত ওই সব মুসলিমরা ঘরে ফিরতে পারেনিÑ কবে পারবে তাও বলেনি সরকার। এমন ঘটনা আর ফিরে না আসুকÑ সভ্য মানুষের এটিই প্রত্যাশা।