Sunday, February 28, 2016

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াই নিয়ে নানা জল্পনা by ইব্রাহীম চৌধুরী

ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটন ও
বার্নি স্যান্ডার্স এবং রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কো রুবিও ও টেড ক্রুজ।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে দেশটির রাজনীতির মাঠ এখন রীতিমতো গরম। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দল থেকে কোন দুই প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন, তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা।
রিপাবলিকান দলের আলোচিত মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক দলের বার্নি স্যান্ডার্সকে ঘিরে চলছে যত আলোচনা।
রিপাবলিকান দলের মূলধারার নেতৃত্বের মনোবাসনার বাইরের প্রার্থী হিসেবে উঠে আসছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক দলের মূল নেতৃত্ব না চাইলেও স্যান্ডার্সকে নিয়ে দলের তরুণদের মধ্যে একধরনের জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।
আমেরিকার রক্ষণশীলদের প্ল্যাটফর্ম রিপাবলিকান দলের মূল স্রোতোধারার বাইরের লোক ট্রাম্প। তিনি টানা তিনটি অঙ্গরাজ্যের বাছাইপর্বে জয়ী হয়ে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক রিপাবলিকানদের প্রার্থী জেব বুশ ও ক্রিস ক্রিস্টির প্রস্থান আগেই ঘটেছে। বাছাইপর্বে এখনো ঝুলে আছেন প্রাতিষ্ঠানিক রিপাবলিকানদের প্রতিনিধি মার্কো রুবিও ও টেড ক্রুজ। ট্রাম্পের জাগরণের কাছে তাঁদের টিকে থাকা নিয়ে খোদ রিপাবলিকান দলের মধ্যেই সংশয় আছে।
পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠেছে যে, ট্রাম্পকে রিপাবলিকান দলের চূড়ান্ত প্রার্থী ধরে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অথচ কিছুদিন আগেও অনেকেই মনে করতেন, বেপরোয়া কথা বলে মাঠ গরম করা ধনকুবের ট্রাম্পের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
রিপাবলিকান দলের মূল রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরে নানা সব কথা বলে মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন ট্রাম্প। অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য দিয়েও ট্রাম্প অভিবাসীবহুল নেভাদায় জয়ী হয়েছেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল দেওয়ার কথা বলার পরও এই অঙ্গরাজ্যে হিস্পানিক ভোট পেয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প বিতর্কের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ধারাবাহিকভাবে এমন সব কথা বলছেন, যা রাজনৈতিকভাবে বলা ঠিক নয়। তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মিথ্যাবাদী, নির্লজ্জ থেকে শুরু করে নানা গাল দিচ্ছেন। অপমানজনক উক্তি করছেন। সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করছেন। রিপাবলিকান দলের তহবিল জোগানদাতাদেরও কষে সমালোচনা করছেন তিনি। এত কিছুর পরও ট্রাম্পের সমর্থনে কোনো ভাটা পড়ছে না।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত বেশিসংখ্যক ডেলিগেট ট্রাম্পের সংগ্রহে। আগামী ১ মার্চ অনেকগুলো অঙ্গরাজ্যে বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হবে। ওই সব অঙ্গরাজ্যের অধিকাংশতে ট্রাম্প জনমতে হয় এগিয়ে আছেন, নয়তো কাছাকাছি অবস্থান করছেন। দলের ট্রাম্পবিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে ক্রুজ ও রুবিওর মধ্যে। এই দুজনের মধ্যে কেউই এখনই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন না। ফলে বাছাইপর্বে ট্রাম্পকে ঠেকানো যাবে—এমন ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে উঠছে।
বাছাইপর্বে ট্রাম্পের উত্থান নিয়ে রিপাবলিকান নেতৃত্ব উৎকণ্ঠিত। মূল রিপাবলিকান ঘরানার মতে, যে নীতি-আদর্শের জন্য দলের ক্রমাগত লড়াই, ট্রাম্প সেসবের ধারেকাছেও নেই। তাই ট্রাম্পকে নিয়ে যত ভয়। তবে রিপাবলিকান দলের জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাছাইপর্বে মনোনীত প্রার্থীর পাশে থাকবে তারা।
ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যেও নানা গুঞ্জন রয়েছে। পুঁজিবাদের তীর্থস্থানে দাঁড়িয়ে দলের প্রবীণ সিনেটর স্যান্ডার্স নিজেকে সামাজিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রচার শুরু করেন। শুরুতে ধরে নেওয়া হয়েছিল, হিলারিই ডেমোক্রেটিক দলের অবধারিত প্রার্থী। কিন্তু বিষয়টি এখন আর সেই পর্যায়ে নেই।
ডেলিগেট সংগ্রহে এখন পর্যন্ত হিলারি এগিয়ে আছেন। তবে ১ মার্চ অনেকগুলো অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠেয় বাছাইপর্বে বিস্তর ব্যবধান সৃষ্টি করা না পর্যন্ত হিলারির সমর্থকদের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটছে না।
যুব ও তরুণ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে স্যান্ডার্সকে নিয়ে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তা হিলারিকে নিয়ে নেই। হিলারিকে সবাই ওয়াশিংটনের চেনা মুখ হিসেবে জানে। দলের নেতারাও বাছাইপর্বে মনেপ্রাণে হিলারির পক্ষে। তবে তাঁকে নিয়ে সন্দেহ, সংশয়ের শেষ নেই। ওবামা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করায় অনেক ব্যর্থতার দায় তাঁকেও নিতে হচ্ছে। ই-মেইল কেলেঙ্কারিসহ নানা প্রশ্ন হিলারিকে তাড়া করছে।
ডেমোক্রেটিক দল থেকে হিলারি এবং রিপাবলিকান দল থেকে ট্রাম্প যদি মনোনয়ন পান, সে ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যকার লড়াই কেমন হবে—তা নিয়ে আগাম আলোচনা হচ্ছে। ট্রাম্পকে হিলারি কতটা মোকাবিলা করতে পারবেন, সেই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
ইতিমধ্যে স্যান্ডার্স বলে দিয়েছেন, হিলারিকে দিয়ে ট্রাম্পকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্পকে মোকাবিলা করার জন্য নিজের প্রচারণা তহবিলে অনুদান চেয়ে সমর্থকদের বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি।
হিলারি-ট্রাম্প কিংবা ট্রাম্প-স্যান্ডার্সের মধ্যকার সম্ভাব্য লড়াই নিয়ে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত লড়াই কোন দুজন প্রার্থীর মধ্যে হবে, তা জানতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

৫০০ নারীর শয্যাসঙ্গী

টনি ব্লাকবার্ন স্বীকার করেছেন তিনি ৫ শতাধিক নারীর সঙ্গ ভোগ করেছেন। তবে তিনি নিজেকে যৌন নিপীড়ক হিসেবে স্বীকার করেন না। তার মতে, এসব সম্পর্ক তিনি গড়েছিলেন পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে। জিমি সেভিলে কেলেংকারির তদন্তে যখন তার বিরুদ্ধে অসংখ্য নারীর দেহ ভোগ করার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তখন তাকে বরখাস্ত করেছে বিবিসি। তিনি বিবিসির সাবেক ডিজে। এ ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর তিনি বলছেন, সম্ভবত আমি ৫০০ নারীর সঙ্গে শয্যাভোগ করেছি। এতে আমি গর্বিত বোধ করছি না। কিন্তু এসব নারীর সঙ্গে আমার যে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা ছিল পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে। কারো সঙ্গেই অযৌক্তিক কোন সম্পর্ক গড়ি নি। কারো গা স্পর্শ করি নি তার সম্মতির বাইরে। যখন এসব ঘটনা ঘটেছে তখন আমি ছিলাম একা। এটা আমার কাছে তখন খুব মজার ছিল। তবে আমি অন্যায় কিছু করি নি। অভিযোগ আছে ১৯৭১ সালে তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন টিনেজ ড্যান্সার ক্লেয়ার ম্যাকআলপিন। এ নিয়ে তাকে কেউ কখনো জিজ্ঞাসাবাদ করে নি। গোপন মেমোতে দেখা গেছে, বিবিসির সাবেক এই ডিজে ওই টিনেজ মেয়ের সঙ্গে দু’বার গোপনে আলাপ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত দাবি করেন তিনি।

ডিবিএইচ মিউচুয়াল ফান্ড আইপিও আসছে ১৩ ডিসেম্বর থেকে

১২০ কোটি টাকার ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের আইপিও তথা প্রাথমিক শেয়ারের জন্য আবেদনপ্রক্রিয়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। নিবাসী বাংলাদেশিরা ২০ ডিসেম্বর এবং অনাবাসী বাংলাদেশিরা (এনআরবি) ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই মিউচুয়াল ফান্ডের আইপিওর জন্য আবেদন করতে পারবেন।
ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডটিতে নিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ৩২ কোটি টাকা, অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য চার কোটি টাকা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য চার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ডিবিএইচের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, মিউচুয়াল ফান্ডটির স্পন্সর ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেড (ডিবিএইচ) একটি ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিংপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এটি বেসরকারি খাতের একটি গৃহঋণ প্রদানকারী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ডিবিএইচ দুই হাজার ৫৬০ কোটি টাকার অধিক মূল্যের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছে।
ডিবিএইচ নিত্যনতুন আর্থিক পণ্যসেবা চালু করা এবং এর বিকাশে সর্বদা সক্রিয় ও অঙ্গীকারবদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অবদান রাখতে এই মিউচুয়াল ফান্ডটির স্পন্সর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিবিএইচ।
রকফেলার অ্যান্ড কোম্পানির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ এএমসি এই ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক নিযুক্ত হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে ডিবিএইচ মিউচুয়াল ফান্ডের কাস্টডিয়ান এবং বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে (বিজিআইসি) ‘ট্রাস্টি’ নিযুক্ত করা হয়েছে।
আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা ওয়েবসাইট থেকে ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড-সংক্রান্ত প্রসপেক্টাস ও আবেদনপত্র ডাউনলোড করতে পারবেন। ওয়েবসাইটটির ঠিকানা হচ্ছে: www.lrglobalbd.com।

রূপালী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন আহমেদ আল কবির। তিন বছরের জন্য তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চারজন নতুন সদস্যও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তাঁরা হলেন মো. মঈন উদ্দিন, কাজী মোর্শেদ হোসেন কামাল, এস এম মাহফুজুর রহমান ও আবদুস সালাম।
গতকাল রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়।
আহমেদ আল কবির বর্তমানে রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (আরটিএম) নামের একটি বেসরকারি সংস্থার চেয়ারম্যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল এবং স্টপ টিবি পার্টনারশিপ নামের দুটি সংস্থারও সদস্য তিনি।
আহমেদ আল কবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং পরে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

দেশকে যা বিপন্ন করে, তা উন্নয়ন নয় by আনু মুহাম্মদ

অবশেষে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র এই সত্যটি স্বীকার করলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে ঠিকই।’ একই সঙ্গে এই কথাও বললেন, ‘কিন্তু এই স্থান পরিবর্তন করা যাবে না।’ তাই এই মাসেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতীয় হেভি ইলেকট্রিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আয়োজন চলছে।
বাংলাদেশের এই অতুলনীয় সম্পদ ও আশ্রয় ধ্বংস হবে জেনেও সরকারকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে? কেন? কোথায় তাদের হাত-পা বাঁধা? অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, যঁাদের হাত-পা বাঁধা নেই, তঁাদের এই সর্বনাশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই দায়িত্ব। সে জন্যই সুন্দরবন-বিনাশী এই প্রকল্প বাতিলসহ সাত দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ২৪ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সুন্দরবন লংমার্চ সংগঠিত করেছিল তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। দাবি পূরণ না হওয়ায় এই কমিটি থেকে আবারও আগামী ১০ থেকে ১৫ মার্চ জনযাত্রা বা বৃহত্তর লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও সংগঠন বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য, যুক্তিসহ সরকারের কাছে সুন্দরবনের জন্য বিপজ্জনক এসব প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। প্রবল জনমত তৈরি হয়েছে এর বিরুদ্ধে।
কারণ, মহাপ্রাণ সুন্দরবনের আঙিনায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রকল্পটি অস্বচ্ছ ও অসম। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে যে সুন্দরবন বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করে, অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আঁধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে, সেই সুন্দরবনকে এই প্রকল্প ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। সুন্দরবন আছে বলে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচে। সুন্দরবন বিনষ্ট হওয়া মানে বহু মানুষের জীবিকা হারানো, উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষকে মৃত্যু ও ধ্বংসের হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন, এক অতুলনীয় ইকোসিস্টেম, পরিবেশ শোধনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই।
সুন্দরবনের গুরুত্ব যেমন এ দেশের মানুষ জানে, তেমনি জানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাই সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিপদ নিশ্চিত জেনে রামসার ও ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। সরকার যদি তারপরও এই কাজ অব্যাহত রাখে, তাহলে তারা বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে সুন্দরবনের নাম বাদ দেবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের জন্য বিপজ্জনক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি থেকে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থসংস্থানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার সংস্থা সরেজমিনে তদন্ত শেষে এই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। প্রথমদিকে খোদ সরকারের বিভিন্ন বিভাগও লিখিতভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল! অথচ একদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করে এই নবায়নযোগ্য বিশাল আশ্রয় সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন চলছে, অন্যদিকে এই প্রকল্প সামনে রেখে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিপইয়ার্ড, সাইলো, সিমেন্ট কারখানাসহ নানা বাণিজ্যিক ও দখলদারি তৎপরতা বাড়ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট নিরসনের যুক্তি তুলেই সরকার এসব কাজ করছে। এই সংকট নিরসন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বোঝা যায়, সংকট সমাধানের চেয়ে দেশি-বিদেশি কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই যেন তাদের প্রধান লক্ষ্য। সুন্দরবন-কৃষিজমি-শহরধ্বংসী প্রকল্প ছাড়াও ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা, বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে অনেক বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি শতকরা ২০ ভাগে নেমে এলেও দেশে দাম বাড়িয়ে রাখা, কক্সবাজারের সম্পদ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে অস্বচ্ছ, অনির্ভরযোগ্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, নিরাপত্তা পারমাণবিক বর্জ্যসহ ভয়াবহ ঝুঁকির নিষ্পত্তি না করে রূপপুরে বিপুল ঋণ ও বিদেশি কোম্পানি-নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি এর দৃষ্টান্ত।
যেখানে বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস সম্পদই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধান অবলম্বন, সেখানে এই সম্পদ নিয়ে সতর্ক সুচিন্তিত দায়িত্বশীল পরিকল্পনা হওয়াই বাঞ্ছিত। না হলে দেশ এক বিশাল সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে। অথচ উল্টো এই বিষয়ে যেসব তৎপরতা চলছে, তা জেনে যে কেউ স্তম্ভিত হবেন। সরকার বিনা টেন্ডারে ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া’র ভিত্তিতে সমুদ্রের তেল-গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কাজে ২০১০ সালে প্রণীত ‘দায়মুক্তি আইন’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায় না। তাড়াহুড়ার কথা বলেই এর যৌক্তিকতা দেখানো হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টার কারণেই সমুদ্র সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানে বিলম্ব হচ্ছে। আমরা কনোকো–ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করেছিলাম। সে সময় সরকার এই তাড়াহুড়ার অজুহাত দিয়েই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছিল। কনোকো–ফিলিপস চুক্তি করে ঠিকই সাবকন্ট্রাক্ট দিয়েছে, তাদের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে লাভবান হয়েছে, কোনো কাজের কাজ করেনি। বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে, সময় নষ্ট হয়েছে।
আমরা বলেছিলাম যেহেতু সমুদ্রের গ্যাস সম্পদের সম্ভাব্য বিশাল মজুত দেশের ভবিষ্যতের বড় অবলম্বন, সেহেতু জাতীয় সংস্থার মালিকানায়, প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সাবকন্ট্রাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ করা হোক। এভাবে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মসূচি নিলে দেশের শতভাগ সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত নির্মাণ সম্ভব হতো, উল্লিখিত বিভিন্ন মানবধ্বংসী প্রকল্প নিতে হতো না। সরকার সে পথে যাওয়ার কোনো চেষ্টা না করে নানা রকম ভুল নীতি ও দুর্নীতির পথে গেছে। পিএসসি মডেল বারবার সংশোধন করে এখন যেভাবে দাঁড় করানো হয়েছে, তা দুর্নীতি ছাড়া আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রস্তাব অনুযায়ী, যে দামে গ্যাস কেনা হবে, তা আমদানি করা গ্যাসের দামের সমান কিংবা তার চেয়ে বেশি হবে। উপরন্তু, পাইপলাইনের ব্যয়, কোম্পানির কর সবই বহন করবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রতিবছর গ্যাসের দাম শতকরা ৫ ভাগ হারে বৃদ্ধির ব্যবস্থা, ব্যয় পরিশোধ পর্বে বিদেশি কোম্পানির অংশীদারত্ব শতকরা ৫৫ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে শতকরা ৭০ ভাগ করা হয়েছে। এই রকম মডেলে চুক্তি সম্পাদন করলে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে না। তার ওপর এ ধরনের চুক্তির কারণে বাংলাদেশের আর্থিক বোঝাও বাড়বে।
শুধু জ্বালানি খাতে দায়মুক্তি নয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তা-পরিচালকদের সম্ভাব্য সব ক্ষতি ও ব্যয়ের জন্যও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিল ২০১৫’ পাস করা হয়েছে। ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ’ শিরোনামে ২৮তম ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই অধ্যাদেশ জারির পূর্বে বা পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়ে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কাজকর্মের জন্য সরকার, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, অন্য কোনো পরিচালক, পরামর্শক, উপদেষ্টা, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোেনা আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ ক্ষতি হলে তার কোনো দায়দায়িত্ব কেউ নেবে না। শুধু বিপদ টানবে বাংলাদেশের মানুষ।
কিন্তু দেশের সর্বজনের সম্পদ নিয়ে যথেচ্ছাচার ও ‘হাত–পা বাঁধা’ ভূমিকার অধিকার কোনো সরকারের থাকতে পারে না। বিদ্যুৎ-সংকট সমাধানে যথাযথ পথ অবশ্যই আছে। সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট মেরামত ও নবায়ন, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব প্রদান ইত্যাদি যথাযথ পথ। এই পথই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, সুলভ, নিরাপদ ও জনবান্ধব উন্নয়ন ধারা তৈরি করতে সক্ষম।
সরকার যাচ্ছে উল্টো পথে: ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী ও ঋণনির্ভর। এতে কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে। এগুলোকে যতই উন্নয়ন বলে ঢোল পেটানো হোক, এগুলো মানববিধ্বংসী অস্ত্রের মতোই মানুষ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী প্রকল্প। মানুষ ও দেশকে বিপন্ন করার এসব আয়োজন আমরা মানতে পারি না।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anujuniv@gmail.com

পরিবারের ১৪ জনকে হত্যার পর ‘আত্মহত্যা’

ভারতের মহারাষ্ট্রে এক ব্যক্তি তাঁর পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে ওই ব্যক্তিকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় পাওয়া যায়। আজ রোববার ভোররাতে রাজ্যের থানে জেলা কাসরওয়াদাভালি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সন্দেহভাজন হত্যাকারীর নাম হাসান আনোয়ার ওয়াড়েকর (৩৫)। হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৪ জনই তাঁর নিকট আত্মীয়। এর মধ্যে সাতজন শিশু, ছয়জন নারী ও একজন পুরুষ। নারীদের মধ্যে হাসানের স্ত্রীও রয়েছে।
পুলিশ বলছে, সবাইকে অচেতন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর হাতে একটি ছুরি ছিল।
হত্যাকাণ্ডের ওই ঘটনায় গুরুতর জখম অবস্থায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন এক নারী সদস্য। স্থানীয় একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
থানে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নিজ পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হত্যার পর হত্যাকারী ফাঁসিতে ঝুলেছেন। হত্যার কারণ এখনো জানা যায়নি।

ডেইলি স্টার-প্রথম আলো : সঙ্কট এবং প্রেক্ষাপট by গোলাম মাওলা রনি

মামলাগুলো একের পর এক ঘটে যাচ্ছে ঠিক যেন সিনেমার মতো। প্রধানমন্ত্রীতনয় সজীব ওয়াজেদ জয় সর্বপ্রথম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে। তিনি কুখ্যাত ১/১১-র মাস্টারমাইন্ড হিসেবে মাহফুজ আনামকে দায়ী করে ওই আমলে সংঘটিত নানা অবিচার-অনাচারের জন্য তার বিচার দাবি করলেন। এর কয়েক দিন পর হঠাৎ করেই মাহফুজ আনাম একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে হাজির হয়ে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে বলে বসলেন, ১/১১-র সময় তৎকালীন ডিজিএফআই থেকে সরবরাহকৃত খবরগুলো তিনি কোনোরূপ যাচাই-বাছাই না করেই ছেপেছেন, যা ছিল তার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। এই ঘটনার পরের রাতে আরো একটি অযাচিত অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত হলেন এবং মাহফুজ আনাম তাকে মঞ্চে নিয়ে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ করে দিলেন। অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা ড. ইউনূসের আকস্মিক উপস্থিতিতে বিব্রতবোধ করলেন এবং সভাস্থল ত্যাগ করে চলে গেলেন। এ ঘটনার দু-তিন দিনের মাথায় সারা দেশে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে একের পর এক মানহানি এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের হতে থাকে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০।
আওয়ামী লীগের সাথে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পত্রিকার দ্বন্দ্ব মূলত মনস্তাত্ত্বিক। নবম সংসদ গঠিত হওয়ার পর সরকারি দল আওয়ামী লীগ একাধিকবার সংসদ এবং সংসদের বাইরে প্রথম আলো এবং এর সম্পাদক মতিউর রহমানকে উদ্দেশ করে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এমনটাও কেউ কেউ প্রচার করেছেন- ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার নায়ক সাজাপ্রাপ্ত আসামি মুফতি হান্নান নাকি প্রথম আলো অফিসে বসে শেখ হাসিনাকে নিঃশেষ করার পরিকল্পনার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি প্রদান করেছেন। তিনি নাকি এ কথাও বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার অর্থের জোগান এসেছে পত্রিকাটির কাছ থেকে। সরকার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে থাকে বলে জানা যায়। তার পুত্রসন্তান ও কন্যাসন্তানের কাছ থেকে নানা স্বীকারোক্তি সংগ্রহ করা হয় কৌশলে। প্রথম আলো থেকে চাকরিচ্যুত সাংবাদিকেরাও তথ্য-উপাত্ত এবং প্রমাণাদি দিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোকে সাহায্য করেছেন বলে শোনা যায়। ২০১২ সালের মাঝামাঝি এসে সরকার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ‘তথ্য-প্রমাণ’ হাজির করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায় মূলত অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে।
রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট সবার ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম আলো সম্পাদককে এক চুলও ছাড় দেবে না। এ ক্ষেত্রে প্রথম আলোর সাথে যুগপৎভাবে ডেইলি স্টার ও সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শাসক দলে আলোচনা হতো। অনেকে আবার পত্রিকা দু’টির মালিক লতিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উত্থাপন করতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান এবং উলফা নেতা পরেশ বড়–য়ার সাথে লতিফুর রহমানের আত্মীয়তার সূত্র ধরে বাংলাদেশকে স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগে তাদের দায়ী করে নানা দেশী-বিদেশী সংস্থার একাধিক প্রতিবেদন সরকারের হস্তগত হওয়ার দাবি করার পর সরকার উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
সরকারের নানামুখী তৎপরতার খবর পত্রিকা দু’টি ঠিকই জানত। অনেকের মতে, সতর্কতা হিসেবে তারা তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথমত, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাথে একান্ত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, পত্রিকা দু’টিতে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে যারা আওয়ামী মনোভাবাপন্ন তাদের মাধ্যমে বঙ্গভবন ও গণভবনের একটি সেতুবন্ধ গড়ে তোলা। তিনটি পদক্ষেপই দারুণভাবে কাজ দেয়। কিন্তু তৃতীয় পদক্ষেপটি পত্রিকা দুটোর জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ বঙ্গভবন ও গণভবনের পিঠে-পুলি-পায়েস পার্বণে অংশ নিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সাথে একত্রে ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তির জানান দিতে থাকেন। এই সুযোগে শাসক দলের কর্তাব্যক্তিরা নতুন মাইনাস টু প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোতে থাকেন। অর্থাৎ তারা চান, ডেইলি স্টার-প্রথম আলো চলবে কিন্তু মাহফুজ-মতিউর থাকবেন না। এখন প্রশ্ন হলো ১/১১’র সময়ে জাতীয় রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দেয়ার ফর্মুলার আদলে নতুন মাইনাস টু প্রকল্প বা মাইনাস টু জুনিয়র-এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে পত্রিকা দুটো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন সম্মানিত পাঠকদের জানানো আবশ্যক।
আমার মতে, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান হলেন গত পনেরো বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের অন্যতম। মানসম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি, গ্রহণযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিচারে গত পনেরো বছরে এ দেশের কেউ তাদের সমপর্যায়ে যেতে পেরেছেন কি না জানা নেই। কিন্তু তারা একবারও ভাবেননি যে, তাদের পূর্বসূরি দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক এবং অবজারভার ভবনের আয়তন ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো ভবনের চেয়ে অনেক বড় ছিল। অন্য দিকে ওই সব ভবনের স্বর্ণালি দিনগুলোতে যেসব সিংহপুরুষ তারকা সাংবাদিক সেখানে কাজ করতেন তাদের সমপর্যায় তো দূরের কথা, তাদের কাছে বসার মতো একজন সাংবাদিকও প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টার ভবনে নেই। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবদুস সালাম এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা বর্তমান জমানায় কল্পনাও করা যায় না। অথচ তারা যেসব দুঃসাহসিক কর্ম করেননি, তার চেয়েও বেশি মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ কর্মে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলেছেন মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান। এটা বর্তমান পরিণতি ডেকে এনেছে বলে অনেকের অভিমত।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের কিংবদন্তি পূর্বসূরিরা অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজেদের সুসময়কে কাজে লাগিয়েছিলেন। তারা নিজেদের পেশা, স্বার্থ ও বলয়ের বাইরে গিয়ে বহু মানুষের সাথে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সাংবাদিক সমাজের সাথে তাদের সম্পর্ক এতটাই চমৎকার ছিল যে, সারা দেশের সাংবাদিকেরা তাদেরকে আদর্শ মানব বলে সম্মান-সমীহ করতেন। তারা অহঙ্কার করতেন না, সবাইকে সম্মান করতেন এবং কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে হেয় করতেন না। তারা নিজেরা ছিলেন অতি উঁচুমানের পণ্ডিত, লেখক এবং সমাজসংস্কারক। রাজনীতিবিদদের সাথে তাদের ছিল আত্মার সম্পর্ক। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মাওলানা আকরম খাঁকে সমীহ করতেন না- এমন কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। অন্য দিকে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং অবজারভার মালিক হামিদুল হক চৌধুরী পাকিস্তান জমানায় পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মধ্যমণি ছিলেন। এসব প্রবাদপুরুষ দেশীয় ঐতিহ্যকে লালন করতেন এবং সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতেন।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানকে যেমন তাদের উল্লিখিত পূর্বসূরিদের সাথে তুলনা করা যাবে না; তেমনি তাদের পত্রিকার গুণগত মান, গ্রহণযোগ্যতাকে সোনালি দিনের আজাদ, ইত্তেফাক কিংবা অবজারভারের সাথে মেলানো যাবে না। তবে অতি অল্প দিনে অধিকসংখ্যক পাঠক সংগ্রহ এবং তার চেয়েও কম সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জনের কথা বিবেচনা করলে তারা অবশ্যই প্রথম হবেন।
এই সফলতাকে হয়তো আলোচিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির সফলতার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কিন্তু আজাদ, ইত্তেফাক ও অবজারভারের সার্থকতার সাথে মেলানো যাবে না। অল্প সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ফুলে-ফেঁপে উঠলে সাধারণত যেসব ‘রোগবালাই’ দ্বারা তারা আক্রান্ত হয়, সেগুলো হয়তো আজ ডেইলি স্টার-প্রথম আলোকে চেপে ধরেছে। অনেকের মতে, অহংবোধ, অতি উচ্চাকাক্সক্ষা, নিজেদেরকে অতিপণ্ডিত হিসেবে জাহির এবং পেশার অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার পরিণামে আজ তারা মহা বিপদে পড়েছেন। এ সুযোগকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাচ্ছে বর্তমানের শাসক দল।
আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগের সাথে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর দ্বন্দ্বটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক। আওয়ামী লীগ মনে করে, পত্রিকা দু’টির সম্পাদক তাদের সাংবাদিকতার পেশা এবং গণমাধ্যমের মঞ্চ ব্যবহার করে ১৫-১৬ বছর ধরে ক্রমাগতভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রাজনীতিবিদদের ইমেজ নস্যাৎ করার জন্য। আওয়ামী লীগ মনে করে তারা গত পনেরো-বিশ বছরে রাজনীতির একটি ভালো সংবাদও পরিবেশন করেনি। বরং দু-একটি দুর্ঘটনা, অপকর্ম কিংবা অনিয়মকে পুঁজি করে তামাম সম্প্রদায়ের ওপর কালিমালেপনের অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, দুই সম্পাদকের প্ররোচনায় ১/১১ প্রলম্বিত হয়েছে। তাদের কারণেই জাতীয় দুই নেত্রীকে জেলে যেতে হয়েছিল। কাজেই যেভাবে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে, একইভাবে অভিযুক্ত দুই সম্পাদককেও বিচার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই পুরো দৃশ্যপট রাতারাতি পাল্টে যেতে থাকে। সরকারসমর্থক নেতাকর্মী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাহফুজ-মতিউরের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারযজ্ঞে নেমে পড়েছেন। টেলিভিশনগুলোতে শুরু হয়ে গেছে ডেইলি স্টার-প্রথম আলো নিধনযজ্ঞ। সবারই এক কথা- যত দোষ তা কেবল মাহফুজ-মতিউরের কপালেই তিলক আকারে লেপ্টে দিতে হবে। শত শত কণ্ঠ বাংলার টেকনাফ থেকে তেঁতুরিয়া পর্যন্ত একসাথে আওয়াজ তুলছে- দুই সম্পাদকের অবশ্যই বিচার হতে হবে এবং দুই সম্পাদকের উচিত অবিলম্বে পদত্যাগ করা।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলটি যেভাবে দেশের শীর্ষ দু’টি পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি এবং রাষ্ট্রশক্তির মেশিনারিগুলো ব্যবহার করে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থা যে, একুশে টিভির আবদুস সালাম এবং আমার দেশের মাহমুদুর রহমানের মতো হবে না এ কথা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সম্পাদকদ্বয়ের সবচেয়ে ভালো সাহায্যকারী হতে পারতেন আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এবং দেশের সাংবাদিক সমাজ। কিন্তু ডেইলি স্টার-প্রথম আলো প্রথম থেকেই তাদের বন্ধু তালিকা থেকে রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় মহল এবং সাংবাদিক সংগঠনকে বাদ দিয়ে একটি দেশী-বিদেশী বন্ধুমহল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ২০-২৫ জন বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও বয়সের লোকজনকে বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ধ্রুব সত্য হলো, এ দেশে ১/১১ সংঘটিত হয়েছিল। এ সময়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছিল শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এই লক্ষ্যে দুই নেত্রীকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পরে ব্যর্থ হয়ে তাদের জেলে ঢোকানো হলো। ১/১১’র রাজনীতির ছলচাতুরী ও কলাকৌশলের সাথে তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকজন যেমন জড়িত ছিলেন, তেমনি আওয়ামী লীগ-বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে জড়িত ছিলেন। কিংস পার্টি খ্যাত কয়েকটি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ভুইফোঁড় রাজনৈতিক দল এবং দুইটি পত্রিকা যে মাইনাস টু ফর্মুলার অংশীদার ছিলেন তা দেশের মানুষ বিশ্বাস করে। এ অবস্থায় কেবল সম্পাদকদ্বয় একক প্রচেষ্টায় এবং একক কণ্ঠে প্রতিবাদ করে ইতিহাসের সেই দায় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবেন না।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ হয়তো ভারতীয় রাজনীতির একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আগাম সতর্কতা হিসেবে সম্পাদকদ্বয়কে টার্গেট করেছে। অনেকে মনে করে, ভারতের নামীদামি কয়েকজন সম্পাদক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের সিন্ডিকেট একটি বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়ে প্রথম দফায় ইন্দিরা সরকারের পতন ঘটায়। সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন ইন্ডিয়ার এক প্রেসের মালিক রামনাথ গোয়েঙ্কা, সাংবাদিক খুশবন্ত সিং, সাগরময় ঘোষ, কলামিস্ট নিরোদচন্দ্র চৌধুরী, শিল্পপতি ধীরুভাই আম্বানি, অমলেশ ত্রিপাঠি, আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ রাম জেঠমালানি প্রমুখ। সিন্ডিকেটটির তৎপরতার কারণে ১৯৭৫-৭৭ সালে পুরো ভারত উত্তাল হয়ে ওঠে এবং ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়। পরে ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা আবার ক্ষমতায় আসার কিছুকাল পর তাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়।
আওয়ামী লীগ যদি উপরিউক্ত ঘটনা বিশ্বাস করে দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে থাকে তবে একই ঘটনার মধ্যে সম্পাদকদ্বয়ের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে জেনে নিতে পারবেন, কেন ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার মধ্যেও ইন্দিরা গান্ধী ‘সিন্ডিকেট’ সদস্যদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেননি। অথবা ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসীন হয়ে কেন ইন্দিরা গান্ধী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন? তার মৃত্যুর পর রাজিব গান্ধী শত চেষ্টা করেও কেন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে উল্টো তাদের সাথে সমঝোতায় বাধ্য হয়েছিলেন?

অপরাধ দমনে পুলিশ কী ভূমিকা রাখছে? by আলী ইমাম মজুমদার

পুলিশ রাষ্ট্রের অপরিহার্য একটি অঙ্গ। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান তাদের দায়িত্বে। তাই প্রত্যাশা সংগত যে তারা দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনকে মূলনীতি হিসেবে অনুসরণ করবে। দেখার থাকে আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দায়িত্ব পালনে কতটা কার্যকর ভূমিকায় আছে। শুরুতেই বলতে হবে ১৬ কোটি লোকের ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশটির শাসনকাজ দুরূহ। এখানে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু অপরাধ ঘটতেই পারে। আর তা ঘটছেও। অনেকে বলে থাকেন, কোনো কোনো উন্নত দেশে সংগঠিত অপরাধের চেয়ে আমাদের এখানে অপরাধের হার কম। তবে পার্থক্য হলো সেসব দেশে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়। তদন্ত হয় যথার্থ। বিচার হয়। এর অন্যথা হওয়ার সুযোগ খুব কম। আর আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া অপরাধে তদন্ত প্রক্রিয়া শ্লথ। ক্ষেত্রবিশেষে ত্রুটিপূর্ণ। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ পায় অভিযুক্ত ব্যক্তি। আদালতের সাক্ষ্য–প্রমাণ হাজির করা খুব কঠিন কাজ। আর অপরাধ যথার্থভাবে প্রমাণ করতে না পারায় আসামি পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে উৎসাহিত হয় অন্য অপরাধীরা।
সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া কিছু অপরাধ আমাদের বিচলিত করছে। তার মাঝে আছে বিদেশি, ভিন্ন ধর্ম বা মতাবলম্বী ব্যক্তিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা। আছে নিষ্পাপ শিশু-কিশোরকে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে নৃশংস হত্যার ঘটনাও। সাগর-রুনি নামের এক সাংবাদিক দম্পতি নিহত হওয়ার ঘটনাটিও অনুদ্ঘাটিতই থাকল। এটা খুবই অস্বাভাবিক। হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশু হত্যার তদন্ত স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। এর মাঝে প্রধান আসামির ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনাটি আইনের শাসনের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। সিলেটে রাজন হত্যার আসামিদের বিচারের আওতায় আনতে মূল ভূমিকায় ছিলেন স্থানীয় জনগণ। তাঁদের ন্যায্য আবেগের ফলে তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়। দুঃখজনকভাবে এ ঘটনায় পুলিশের কিছু সদস্য অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। ঢাকার মতিঝিলে ঘরোয়া হোটেলের মালিক গুলি করে তাঁর হতদরিদ্র কিশোর কর্মচারীকে মেরে ফেলেন। আসামি গ্রেপ্তার বা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায় না। কেউ যদি মামলাটির অপমৃত্যুর আশঙ্কা করেন, তাহলে তা অমূলক বলা যাবে না। দেশের উত্তরাঞ্চলে একজন হিন্দু ধর্মগুরু নিহত হয়েছেন। সেখানে একটি মঠ ধ্বংসের খবরও আমাদের ব্যথিত করেছে। এগুলোর দ্রুত তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় না আনলে পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে। কয়েকজন বিদেশিকে হত্যার বিষয়টি অভাবনীয়। আর তা-ও নিতান্ত নিরীহ ব্যক্তিদের। ভিন্নমতাবলম্বী ব্লগাররা কারও অনুভূতিতে আঘাত দিলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। কিন্তু তা না করে তাঁদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য সচেষ্ট একটি গোষ্ঠী। তারা সচেষ্ট দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতেও। ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা শিয়া, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও তারাই সক্রিয়। এমনকি এ ধরনের হামলায় নিহত হয়েছেন দুজন পীর। তাঁদের মত কেউ সমর্থন না করলেও হত্যা করা যায় না। এগুলোকে আমরা যথাসময়ে দৃশ্যমানভাবে আইনের আওতায় আনতে পারিনি। তা দ্রুত করা গেলে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা লাল সংকেত পাবে।
জনগণের বড় সংশয় পুলিশের কিছু সদস্য ক্রমবর্ধমান হারে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সংবাদে। প্রায় সব সংস্থাতেই অসৎ লোক আছে। তবে পুলিশ একটি অস্ত্রধারী সুশৃঙ্খল বাহিনী। জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে মোকাবিলায় পুলিশই অগ্রভাগে। কারও জানমাল বিপন্ন হলে ছুটে যেতে হয় তাদের কাছে। সে পুলিশকে সবাই বন্ধু আর সজ্জন হিসেবে চায়। তাদের অনেকেই তা আছে। কিন্তু সবাই নয়। এসব ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর জনপ্রশাসনে দলীয়করণের মৃদু হাওয়া আসতে থাকে। তবে পালে জোর বাতাস পায় ২০০১ সালের পর থেকে। আর তীব্রতা বেড়েই চলছে। ফলে সব সরকারি চাকরিতেই সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতাসীন দলে যাঁরা থাকেন, তাঁদের কারও না কারও আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি। প্রবণতাটি প্রধানত ভর করেছে প্রশাসন ও পুলিশে। তারা বেপরোয়া। চেইন অব কমান্ড অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
অপরাধ জগৎকে উসকে দেওয়ার পেছনে আরেকটি বিষয় ব্যাপক প্রভাব রাখছে বলে অনেকেই মনে করেন। তা হলো ‘রাজনৈতিক কারণে’ মামলা প্রত্যাহার আর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে দণ্ডিত এমনকি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত আসামিকে মুক্তি দেওয়া। ২০০১ আর ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের পর হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক কারণ বলা হলেও এভাবে মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম ছিল বিতর্কিত। অভিযোগ রয়েছে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কবিহীন বহু অভিযুক্ত গুরুতর অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যায় এ প্রক্রিয়ায়। তা ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে গিয়ে ব্যবসা করত। চারদলীয় জোট সরকারের সময় তাকে সমঝোতার মাধ্যমে ডেকে এনে কয়েক দিন জেলে রেখে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগে মুক্তি দেওয়া হয়। তেমনি ঘটেছে বর্তমান সরকারের সময়কালেও। রাষ্ট্রপতির এ সাংবিধানিক ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকুক, তা আমরা চাই। তবে সেটার প্রয়োগ হোক নিরঙ্কুশ জনস্বার্থে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়। এ ধরনের কার্যক্রম অপরাধ জগৎকে সবুজ সংকেতই দিয়েছে।
পুলিশের দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতা আছে অনেক। তেমনি সীমাবদ্ধতা আছে সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও। আর সেগুলো পুলিশ থেকে ভালো চলছে এমনও বলা যাবে না। পুলিশের সীমাবদ্ধতা লোকবল, যানবাহন, আবাসনসহ অনেক বিষয়েই। সরকার এ বিষয়গুলো দূর করতে সক্রিয়, এমনটাই দেখা যায়। হয়তো সুফল পাওয়া সময়সাপেক্ষ।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, এ সংস্থাটির জনবল আর পদ-পদবি বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়ে চেলছে অপরাধীদের দাপট। একে মোকাবিলা করতে হলে পুলিশ বাহিনী সম্প্রসারণের পাশাপাশি তাদের উন্নততর প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। এসব তদন্তে প্রয়োজন উঁচু মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ কর্মকর্তা। এখন পুলিশ বাহিনীতে মেধাবী কর্মকর্তা যথেষ্ট রয়েছেন। তাঁদের দেশ-বিদেশে উন্নততর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা দরকার। আজকাল সিঁধ কেটে চুরি হয় না। টাকা চুরি হয় এটিএম বুথ থেকে, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে। সুতরাং তদন্তের ধরন ও তদন্ত কর্মকর্তার মানও একই পর্যায়ে নিতে হবে। আরেকটি বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান আইনি কাঠামোতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। নতুন একটি আইনের খসড়াও রচিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এ ধরনের আইন হলেই পুলিশ বাহিনী অনেক নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে। থাকতে পারে প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজন হতে পারে নতুন আইন প্রণয়নের। তবে আইন করে অফুরন্ত ক্ষমতা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে তো আমাদের সামনে দুর্নীতি দমন কমিশনই রয়েছে। সংবিধান ও বিভিন্ন আইনে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রভূত ক্ষমতা দেওয়া হলেও এটি সময় সময় মুখ থুবড়ে পড়েছে। নচেৎ এ দেশের বেশ কটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল না। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য বেশ কয়েকবারই নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়েছে। সুতরাং বলা চলে কার্যকর আইনের প্রয়োজন আছে। তবে তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সে আইনটি যাঁরা প্রয়োগ করবেন, তাঁদের মানসিকতা। পাশাপাশি সরকারের সদিচ্ছা।
আমরা আইনের শাসন চাই। আইনের দ্বারা গঠিত পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে, এটাই চাই। সে গণ্ডির বাইরে তারাও যেতে পারে না। হবিগঞ্জে চার শিশু হত্যা মামলার এক আসামি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এর আগে কেরানীগঞ্জে সম্প্রতি একটি হত্যা মামলার কুখ্যাত এক আসামি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধৃত হওয়ার পর ‘ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। ‘ন্যায়বিচার হয়েছে এবং এলাকায় শান্তি ফিরে এসেছে’ এই দাবিতে সেখানে মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
এ ধরনের ঘটনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনটা আমরা চাই না। আমরা চাই শক্তিশালী, দক্ষ ও নিরপেক্ষ আর আইনের প্রতি অনুগত একটি পুলিশ বাহিনী। এর জন্য যা প্রয়োজন, সরকারের তাই করা দরকার ।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

অছাত্রদের দখলে ছাত্র নেতৃত্ব! by সোহরাব হাসান

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেমন ছাত্রলীগকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির উত্তম ক্ষেত্র মনে করে, তেমনি ক্ষমতাহারা বিএনপিও ভাবে ছাত্রদলই তাদের শেষ ভরসা। নতুন নেতৃত্ব পুরোনোদের ব্যর্থতা ঘুচিয়ে দেশকে নতুন পথ দেখাবে। সেই বিবেচনায় এই দুটি ছাত্রসংগঠনের সম্মেলন কিংবা কমিটি গঠনের প্রতি অনেকের আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দুটি সংগঠনেই যেভাবে কমিটি গঠিত হয় এবং সেই কমিটিতে যাঁদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন।
গত অক্টোবরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রদলের পাঁচজনের কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে রাজিব আহসান ও আকরামুল হাসান। এরপর আসে ১৫৪ জনের নাম। এবং ৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩৬ জনকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। ছাত্রদল ও বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে, যাঁরা বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন, তাঁদের সবাইকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশাল কমিটি করার আসল কারণ হলো অভ্যন্তরীণ কোন্দল। যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই হয় না, সেহেতু সবাই নিজেকে যোগ্যতর মনে করেন। ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে চেয়ারপারসনের গুলশানের অফিসে দফায় দফায় দেনদরবার এবং নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে বিক্ষোভ, মিছিল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অবাক কাণ্ড হলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রদল একটি চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র তৈরি করতে পারেনি। খসড়া গঠনতন্ত্রে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ১৫১ সদস্যের হওয়ার কথা আছে। এর আগে ছাত্রদলের কমিটি ২৫১ জনকে নিয়ে করা হয়েছিল। এবারে ৭৩৬ জন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন ৩৮৬ জন। একেই বলে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়।
জিয়ার আদর্শধারী ছাত্রদলের কমিটিতে কারা এসেছেন? ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘ছাত্রত্ব নেই এমন বয়স্ক নেতাদের কমিটিতে স্থান দিতে গিয়েই ছাত্রদলের কমিটির আকার বাড়ানো হয়েছে। কমিটির প্রায় সবারই বয়স ২৯ বছরের বেশি। সভাপতির বয়স ৩৭ বছরের বেশি। পদ পাওয়াদের কেউই এখন আর নিয়মিত ছাত্র নন। কেউ কেউ আইন বা অন্য কোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়ে কিংবা এমফিল করার নামে “ছাত্রত্ব” টিকিয়ে রেখেছেন।’ অর্থাৎ নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখা। ছাত্রত্বের কারণে ছাত্রদলের নেতা নন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়াদের মধ্যে তিন শতাধিক হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা। এঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, কেউই নিয়মিত ছাত্র নন। চট্টগ্রামের ১৯ জনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে নয়জন মহানগর কমিটির। এঁদের কারও এখন আর ছাত্রত্ব নেই। কমিটিতে স্থান পাওয়াদের বড় অংশের বিরুদ্ধেই কোনো না কোনো মামলা আছে। মামলার বিষয়টি না হয় বোঝা গেল। সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন ঠেকাতে নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে পাইকারি মামলা করছে। কিন্তু অছাত্রদের কমিটিতে আনতে সরকারের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না।
ছাত্রদলের আগের কমিটিগুলো খুব ভালো ছিল বলা যাবে না। ছাত্রদলের একসময়ের নেতা গোলাম ফারুক অভি নব্বইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। পরে তিনি এরশাদের দলে যোগ দিয়ে সাংসদ হন।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালের প্রথম আলোয় শিরোনাম হয়েছিল: ‘ছাত্রদলের কমিটি যেন আসামিদের আশ্রয়স্থল’। ছাত্রদলের কমিটিতে অছাত্র আর বুড়োদের অগ্রাধিকারের ধারা অব্যাহত আছে। আছে গুম হওয়া মানুষের নামও। তবে আরও ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে শিক্ষিকা ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিও আছেন ছাত্রদলের নেতার তালিকায়। খোদ বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ই ওই নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা হয়। তিনি হয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। এজাহারে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলায় সাজ্জাদ হোসেন রুবেলের নাম আছে প্রথমেই। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি হত্যা মামলার আসামিও ছাত্রদলের নেতৃত্ব পেয়েছিলেন।
পিছিয়ে নেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের দাবিদার ছাত্রলীগও। স্বাধীনতার পর এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শফিউল আলম প্রধান, যিনি মুহসীন হলের সাত খুনের মামলার একজন দণ্ডিত আসামি। এই ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন হেমায়েত হোসেন আওরঙ্গ; পরে আওয়ামী লীগ থেকে বিতাড়িত হয়ে যিনি বিএনপিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের এবারের কমিটি কেমন হলো?
২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অধিকাংশই অছাত্র কিংবা নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষে নামমাত্র বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হয়ে আছেন। এঁদের অর্ধশত নেতা চাঁদাবাজি, শিক্ষক লাঞ্ছনা, প্রতিপক্ষকে মারধরসহ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘোষিত কমিটির সহসভাপতি ও সম্পাদক পর্যায়ের ১১৬ নেতার মধ্যে ৮৪ জনই অছাত্র। এর বাইরে অধিকাংশই নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষে বিভিন্ন শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হয়ে আছেন। চাঁদা ও আধিপত্যের জেরে ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফারুক মারা যান। এ ঘটনায় জড়িতসহ অন্য নানা অভিযোগে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাকিব হাসানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করে তাঁকে নতুন কমিটির সহসভাপতি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহসম্পাদক পদ পাওয়া দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪ ধারায় চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে’র অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি রয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের কমিটিতে এমন ব্যক্তিও ঠাঁই পেয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ রয়েছে। এঁরা কীভাবে কর্মীদের নৈতিকতা শিক্ষা দেবেন? অছাত্ররা যাতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে না পারেন, সে জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসার বয়সসীমা ২৭ বছর বেঁধে দিয়েছিলেন। এবার কমিটি গঠনের সময় সেই বিধানও মানা হয়নি। ফলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল দুই সংগঠনেই আদুভাইদের রাজত্ব কায়েম হবে। হয়তো দেখা যাবে, বাবা–ছাত্র ছেলে–ছাত্রকে সাংগঠনিক বিষয়ে তালিম দিচ্ছেন।
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ২৩-এর (ক) ধারায় পদপ্রাপ্তির ব্যাপারে অবিবাহিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটিও লঙ্ঘন করা হয়েছে। কমিটিতে অন্তত পাঁচজন বিবাহিত ছাত্রনেতা বা নেত্রী রয়েছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের যে পরিচয় পাওয়া গেল, তা সংগঠনের জন্য না হলেও ছাত্ররাজনীতির জন্য হতাশাজনক। নেতৃত্ব বাছাইয়ের সর্বজনীন যে রীতি, সংগঠনের কাউন্সিল হবে, কাউন্সিলরদের ভোটে নেতা নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই রীতি রাজনৈতিক দলগুলো যেমন মানে না, তেমনি ছাত্রসংগঠনগুলো অগ্রাহ্য করে চলেছে।
এখানে দল বা ছাত্রসংগঠনের কাউন্সিল হলো লোক দেখানো। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কমিটিতে কে কে থাকবেন, নতুন কে আসবেন, সেসব আগেই ঠিক করে রাখা হয়। নেতৃত্ব নির্বাচনে কাউন্সিলরদের কোনো ভূমিকা নেই। কাউন্সিলের আগে লবি তদবিরে যাঁরা এগিয়ে থাকেন, তারাই শীর্ষ পদ পান। কোনো কোনো সংগঠন কাউন্সিল করার কষ্টটুকু স্বীকার করতে চায় না। যেমন, ছাত্রদলের কাউন্সিল হয়নি। বিএনপিপ্রধান তাঁর অফিস থেকে তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন। আবার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার পর কয়েক মাস এমনকি বছর পার হয়ে যায়, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় না।
ছাত্ররাজনীতি হবে ছাত্রদের জন্য, ছাত্রদের দ্বারা এবং ছাত্রদের কল্যাণে নিবেদিত। কিন্তু আমাদের ছাত্ররাজনীতি হলো দলের জন্য, দলের প্রধানের দ্বারা এবং দলের কল্যাণে নিয়োজিত। দলীয় প্রধানকে খুশি রাখতে পারলে নেতৃত্বের সামনে আসা যাবে, না পারলে পেছনেই থাকতে হয়। ছাত্রসংগঠনকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার কাজটি প্রথম করেছিলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। রাজনৈতিক দলবিধি অনুযায়ী প্রতিটি দলকে সহযোগী ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক প্রভৃতি সংগঠনের নামও দিতে হতো। দলবিধি না থাকলেও লেজুড়বৃত্তি ঠিকই আছে। এখন ছাত্রসংগঠনগুলো পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক দলের ‘শিক্ষাঙ্গন শাখায়’। এভাবে কোনো দেশে ছাত্ররাজনীতি বিকশিত কিংবা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বও গড়ে তুলতে পারে না।
আজকের ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব যতটা নেতামুখী, ততটাই গণতন্ত্রবিমুখ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়েছে। ছাত্রনেতারা দিনের বেশির ভাগ সময় নেতা-নেত্রীদের বাড়িতে কাটান এবং আখের গোছান। লেজুড়বৃত্তির এই ছাত্ররাজনীতি ছাত্রসমাজের কোনো উপকারে আসে না।
শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র নেতৃত্ব গড়ার যেমন উদ্যোগ নেই, তেমনি ছাত্রসংগঠনগুলোর কমিটি গঠনেও সাধারণ কর্মীদের কোনো ভূমিকা নেই। আড়াই দশক ধরে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। অথচ সামরিক শাসনামলে ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হতো। নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবিদাওয়া তুলে ধরতেন। এখন তাঁদের যাওয়ার জায়গা নেই বলেই হলের ‘গেস্টরুম’ নামের টর্চার সেলে আশ্রয় নিতে হয়।
কে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঐক্য নেই? ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে কোনো মিল নেই। ঐক্য আছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না করার। মিল আছে অছাত্র, বয়স্ক ও বিতর্কিতদের কমিটিতে নেওয়ার। ক্ষমতায় থাকলে হল ও ছাত্রসংগঠন দুটোই অছাত্রদের দখলে চলে যায়। আর বিরোধী দলে থাকলে শুধু সংগঠনটি অছাত্রদের দ্বারা পূরণ করা হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

বাবা অকুতোভয় হতে শিখিয়েছেন

ঠিক একবছর আগে ঢাকার বইমেলা থেকে বেরিয়ে আসার পথে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার অভিজিৎ রায়কে। তাকে নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এ লিখেছেন তারই সৎ মেয়ে তৃষা আহমেদ। তৃষা বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। নিজের লেখায় বাবাকে নিয়ে তিনি অনেক কিছু লিখেছেন। লিখেছেন সেই হামলাটির কথা, যেটি তিনি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তৃষা লিখেছেন, কিছুসময়ের জন্য, তাকে ‘বাবা’ বলতে আমার অদ্ভুত লাগতো। কারণ, তিনি ছিলেন মজার একজন মানুষ। বুদ্ধির ঝিল্লি আর আভা সবসময় লেগেই থাকতো। আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। পরীক্ষা শেষে গ্রীষ্মে আমরা নতুন ঘরে ওঠি। বাড়ির পেছনটা থেকে দুটো লম্বা লাঠি নিয়ে তিনি একটি দিলেন আমাকে। ‘তলোয়ার লড়াই’, চ্যালেঞ্জের সুরে বললেন তিনি। ‘তোমাকে পেটাতে আমার অনেক ভালো লাগবে,’ আমিও মেকি বিদ্রূপের সুরে পালটা জবাব দিলাম। সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত আমরা এই কাঠের তলোয়ার দিয়ে লড়াই চালিয়ে গেলাম। প্রতিবার হেরে গেলেই আমি মানতে চাইতাম না, ফিরতি খেলা দাবি করতাম। এবং আমি প্রতিটা বারই হেরেছি। আমি একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তুমি আমাকে কখনই জিততে দাও না? তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি চাও না আমি তোমাকে আমার সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করি?’
দিনের বেলায় আমার বাবা কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু বাসায় ফিরে তিনি হয়ে যেতেন একজন লেখক। তার বইগুলো ছিল সমকামিতার নেপথ্যের বিজ্ঞান নিয়ে, ধর্মীয় উগ্রপন্থার ‘ভাইরাস’ সম্পর্কে। বাংলাদেশের মূলধারায় ধর্মনিরপেক্ষ আলোচনাকে আরও ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করার ফলে ক্রমেই পরিচিত একজন অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে উঠছিলেন তিনি।
আমি তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। জাতীয় এপি এক্সামের এক মাস আগে, আমার ক্যালকুলাস শিক্ষক চলে গেলেন। এর জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশও করলেন। সঙ্গে এও জানালেন, তবে তাকে যেতেই হবে। কারণ, হাইস্কুল শিক্ষক হিসেবে তার যথেষ্ট উপার্জন হচ্ছিল না। বাবা ও আমি তখন একটি চুক্তি করলাম। চুক্তিটি ছিল এমন- তিনি আমাকে ক্যালকুলাস ও পদার্থবিদ্যায় সাহায্য করবেন, যদি আমি তার লেখাগুলো ইংরেজি অনুবাদ করে দিই। আমি প্রায়ই বলতাম, ‘বাবা, এ বাক্যগুলো বিদঘুটে! তুমি কীভাবে এ ধরনের গ্রামার দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছ?’ তিনি বলতেন, ‘তৃষা, প্লিজ শুধু সম্পাদনা করে যাও। বিষয়বস্তু ভালো।’ সত্যিই, সবসময়ই এ বিষয়বস্তু দারুণ ছিল। আমরা একটি ভালো কাজ করছিলাম।
প্রতি ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় একটি জাতীয় বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বাংলাদেশে আমার পিতামাতার নিজ শহর। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে তারা আমাকে বাল্টিমোরের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার দেখতে এলেন। এখানে আমি এখনও শিক্ষার্থী। তারা আমার জন্য চকলেট, কাপড়, নোটবুক, কলমে ভরা এক বাক্স উপহার নিয়ে এলেন।
তাদের কিছু দিতে না পেরে আমি অপরাধবোধে ভুগছিলাম। আমি দ্রুত আমার ব্যাকপ্যাক থেকে দুটো স্কার্ফ নিয়ে তাদের উপহার দিলাম। পুরোটা রাত আমার বাবা ওই স্কার্ফ পরে ছিলেন। আমার মা কৌতুক করে আমাকে বললেন, তুমি তাকে যখনই নতুন কোনো জিনিস দাও, সে এটা ভীষণ গর্ব নিয়ে পরে!
২৬শে ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে দশটা। থিওরিটিক্যাল নিউরোসাইন্সের লেকচার ক্লাসের একেবারে শেষের দিকে বসলাম আমি। দুপুরের দিকে ফোন চেক করলাম। দেখি বাংলাদেশ থেকে আমার কাজিনরা তিনটি বার্তা পাঠিয়েছে, এখনও খুলে দেখা হয়নি।
দেখেই আমার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু পড়তে লাগল। আমার শরীর কেঁপে উঠলো। আমার রুমমেটকে ফোন দিলাম। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে, তুমি ঠিক আছো? আমি জবাব দিলাম, ‘আমার বাবা মারা গেছে। মা বাংলাদেশে আইসিইউ’তে।’
২৬শে ফেব্রুয়ারি বিকাল। স্ফীত লাল চোখ নিয়ে আমি ফেসবুকে লিখলাম:  ‘আমার বাবা ছিলেন একজন বিখ্যাত বাংলা লেখক। বিজ্ঞান ও নাস্তিক্যবাদিতা নিয়ে লেখার জন্যই তিনি বেশি পরিচিত। তার বইয়ের প্রচারের জন্য গত সপ্তাহে তিনি ও আমার মা বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ১৫ ঘণ্টা আগে, মৌলবাদীরা আমার বাবাকে কুপিয়ে খুন করেছে। আমার মা মারাত্মকভাবে আহত। তিনি এখনও হাসপাতালে। বাবার মৃত্যু বাংলাদেশে এখন প্রধান শিরোনাম।’
‘বাবা ছিলেন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কট্টর বিশ্বাসী। আমার বয়স ছয় বছর যখন, তখনই বাবা ও মা প্রেম করতেন। পরের ১২ বছরে তিনি আমার বন্ধু, নায়ক, সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী, নাচের সহযোগী (যদিও আমরা দুজনই খুবই বাজে নাচতাম) ও আমার পিতাতে পরিণত হয়েছেন। তিনি আমাকে কখনই শান্ত হতে বা আরও ভদ্র হতে বলেননি। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন শিক্ষিত, সাহসী ও অকুতোভয় হতে।’
‘আমি ক্ষুব্ধ বা আমার মন ভেঙে গেছে বললে কম বলা হবে। কিন্তু এই পৃথিবী যত খারাপই হোক না কেন, একে আরেকটু ভালো বানানোর লড়াই বন্ধ রাখার কোনো কারণ নেই। তিনি আমাকে যা শিখিয়েছেন, যে ভালোবাসাটা দিয়েছেন, আমি চিরকাল এটি বয়ে বেড়াব। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা। প্রতিটি জিনিসের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। #শব্দকে হত্যা করা যায় না।’
এ কথাগুলোই মানুষ দেখেছিল সেদিন। কিন্তু তারা যা দেখেনি তা হলো- প্রতিটি রাতে আমাকে ঘুমের বড়ি খেতে হয়েছে, যাতে করে বাবাকে নিজের রক্তের ওপর পড়ে থাকার দুঃস্বপ্ন দেখতে না হয়। মাকে আর কখনই দেখব না বলে বা তাকে আগের মতো পাব না বলে আমার যে দুশ্চিন্তা, তা কেউ দেখেনি। আমি ওই দিনটির পুরো ঘণ্টা বাংলাদেশি খবরের চ্যানেল দেখে কাটিয়েছি, এটা কেউ জানে না। দেখেছি, হাজারো মানুষ আমার বাবার মুখ ব্যানারে এঁকে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। তার হত্যার বিচার চেয়েছে। মানুষ যা দেখেনি তা হলো, এক মেয়ে ছিল, সে বাকশক্তিহীন হয়ে গেছে।

‘বন্দুকযুদ্ধে’ নতুন মাত্রা, গুরুত্বপূর্ণ মামলার প্রধান আসামিরাই মারা যাচ্ছেন!

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে বিলোপ হওয়ার পক্ষে মানবাধিকারকর্মীরা যখন সোচ্চার রয়েছেন, তখন সেখানে আরেকটি উদ্বেগজনক নতুন প্রবণতা চোখে পড়ছে। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের চার শিশু হত্যা মামলার অন্যতম মুখ্য সন্দেহভাজন ঘাতক বাচ্চু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এর আগে কেরানীগঞ্জে শিশুহত্যার সন্দেহভাজন আসামি একইভাবে নিহত হন। সাম্প্রতিক কালে এ রকম আরও ফৌজদারি মামলার শীর্ষস্থানীয় সন্দেহভাজন আসামিরা তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে বা অন্যবিধ উপায়ে মারা পড়ছেন।
অনেক সময় যেখানে রাজনৈতিক কার্যকারণ জড়িত থাকে, সেখানে মানুষ ওপর মহলের চাপের মতো একটি বিষয়কে কল্পনা করতে পারে। আগে বন্দুকযুদ্ধে ‘দুর্ধর্ষ’ ব্যক্তিটি প্রাণ হারানোর পরেই তার অতীত সম্পর্কে গণমাধ্যমের কাছে দ্রুত একটি বিবরণ পৌঁছে যেত। সেই ভাষ্য পড়ে কেউ কেউ ভুল করে হলেও যুক্তি খাড়া করতেন যে ‘বন্দুকযুদ্ধ’টি সমাজকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ, দেখা যেত নিহত লোকটি বহু খুনের মামলার আসামি, পুলিশ তাঁকে ধরে, কিন্তু পরে জামিনে ছাড়া পান এবং পুনরায় অপরাধ করেন, এভাবে তিনি প্রচলিত বিচারব্যবস্থা থেকে নিজেকে আড়াল করে চলছিলেন। আমরা স্মরণ করতে পারি, ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টারকে প্রধানত এ রকম বিবরণ পাঠ করিয়েই একটা গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্দেহভাজন নিহত, বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
কিন্তু সেই অবস্থা থেকেও আজকের পরিস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে অনেক দূরে সরে গেছে। বাহুবলের চার হত্যাকাণ্ডের মূলে যে বিরোধ, সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিটি হলেন পঞ্চায়েতপ্রধান। কিন্তু তিনি অরক্ষিত থাকলেন আর কথিতমতে তাঁর পক্ষে খুনের ঘটনা ঘটাতে গিয়ে মারা পড়লেন গরিব সিএনজি অটোরিকশাচালক বাচ্চু। এখন আইনজীবীরা ভয় পাচ্ছেন যে এতে বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, যদিও আরেক দল আইনজীবী বলছেন, তেমনটা হবে না। তাঁদের কথাই সত্য হোক।
আমরা এই রহস্যজনক বন্দুকযুদ্ধের সত্যতার বিষয়ে এলাকাবাসীর মতোই সন্দেহ প্রকাশ করি, তাই র্যা ব কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এ বিষয়ে একটি তদন্ত করা এবং তার ফলাফল অবিলম্বে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা।