Tuesday, November 3, 2015

ব্র্যাকেটবন্দী বিএনপি, ব্র্যাকেটমুক্ত বিএনপি by সোহরাব হাসান

ভয়মুক্ত নন ক্ষমতাসীনেরা: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপি এখন সংসদের বাইরে। তারপরও জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৪ সালজুড়ে গণসংযোগ ও মহাসমাবেশ করে আসছিলেন। কিন্তু লন্ডন থেকে অদৃশ্য সুতার টানে কোথা থেকে কী হয়ে গেল। সেখান থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিহাস নিয়ে একেকটি অ্যাটম বোমা ছুড়তে থাকেন আর বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঘটতে থাকে। অবশ্য এই অ্যাটম বোমার পেছনে কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার ‘জিয়ার আইএসআই সংযোগতত্ত্ব’ও কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
চলতি বছরের শুরুতে বিএনপির তিন মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার পর দলটির প্রকাশ্য কার্যক্রম এখন দলীয় অফিসে রুটিন প্রেস ব্রিফিং, আদালতে মামলা মোকাবিলা এবং ঘরোয়া আলোচনা সভা বা সেমিনারের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে। তারপরও বিএনপি নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দারুণ উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যায় মন্ত্রী-নেতাদের বিরতিহীন বক্তৃতা-বিবৃতিতে। অনেকের মতে, নিষ্ক্রিয় বিএনপিকে এখন আওয়ামী লীগের নেতারাই ‘সক্রিয়’ রেখেছেন। চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের কাছ থেকে ধার করে, তেমনি বাংলাদেশে বিরোধী দলের জনসমর্থনের জন্যও নিজেদের কিছু করতে হয় না। ক্ষমতাসীনদের বাড়াবাড়ির কারণেই ‘মধ্যবর্তী’ ভোটাররা বিরোধী দলের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক যত সমৃদ্ধই হোক না কেন, তাতে ‘মধ্যবর্তী’ ভোট ছাড়া নৌকা কিংবা ধানের শীষ কারও জিতে আসা সম্ভব নয়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচন সেটাই প্রমাণ করে। এই ‘মধ্যবর্তী’ ভোটাররা যে দলকে ভোট দিয়েছেন, সে দলই জিতেছে।
তাই, ক্ষমতাসীনেরা মুখে যতই বিএনপিকে জনগণ থেকে ধিক্কৃত ও নিন্দিত বলে বুলন্দ আওয়াজ তুলুক না কেন, ভেতরে-ভেতরে ভয় রয়েই গেছে। নাবিক বুদ্ধিমান হলে উজানে নৌকা না চালিয়ে অনুকূল স্রোত তৈরি করেন। অন্য দলের দোষ খোঁজার চেয়ে নিজ দলের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে তুলতে সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতাসীনেরা সে রকম শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে হয় না। এমনকি তারা যে জনগণের নামে রাজনীতি করেন, সেই জনগণের রায়ের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল সব সময় থাকেন না। ফলে নির্বাচনে হেরে গেলেই তারা ভোট কারচুপির অভিযোগ আনেন এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তী পাঁচ বছর তারা সরকারকে রাজপথে ফেলে দেওয়ার আন্দোলনে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনেরা দায়িত্ব গ্রহণের পয়লা দিন থেকেই সবকিছু বিজয়ীর দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা পরস্পরের কাছ থেকে যে শিক্ষা নেন, তা হলো আমার জন্য যা অবশ্যকর্তব্য, তোমার জন্য তা হারাম। তোমার জন্য যা অবশ্যপালনীয়, আমার জন্য তা পরিত্যাজ্য। আমাদের দেশে সরকার ও বিরোধী দল এভাবেই ‘গণতান্ত্রিক কর্মসম্পর্ক’ গড়ে তুলেছে। তবে ৫ জানুয়ারির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিএনপি যদি এতই গণধিক্কৃত ও নিন্দিত দল হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিয়ে প্রতিদিন মন্ত্রী ও নেতাদের গলা ফাটানোর প্রয়োজন পড়ে না। তাদের কৃত অপরাধ ও দুষ্কর্মগুলো সবারই জানা। কিন্তু সেসবের পরও কেন মানুষ ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিরূপ, সেটি একবার চিন্তা করা উচিত। আওয়ামী লীগের বক্তৃতাবাজ নেতাদের বলব, বিএনপি নিয়ে ঘুম হারাম না করে একটু জনগণের সমস্যার দিকে নজর দিন। উন্নয়নের ঢক্কানিনাদের মধ্যেও ঢাকা শহর প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শহরের রাস্তাঘাটের দুরবস্থা অবর্ণনীয়। ভিভিআইপি সড়ক ছাড়া সর্বত্রই খানাখন্দে ভরা। এ ব্যাপারে কি গণবান্ধব সরকারের কিংবা সরকারের বিশ্বস্ত দুই মেয়রের কিছুই করণীয় নেই?
খালেদা জিয়ার ফেরা না-ফেরা: গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর ফেরা না-ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে বিচার–প্রক্রিয়া এড়াতেই তিনি লন্ডন গিয়েছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরছেন না। কিন্তু বিএনপির নেতাদের দাবি, তিনি চিকিৎসা ও ছেলেকে দেখতে লন্ডন গিয়েছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরে আসবেন। তবে বিএনপির কোনো কোনো নেতা এ কথাও বলছেন যে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলেও সেখানে দল ও রাজনীতি নিয়ে কথা হবে। যেহেতু তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান, সেহেতু সাংগঠনিক বিষয় এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতেই পারে। বিএনপি দীর্ঘদিন চলেছে স্থায়ী মহাসচিব ছাড়া। আগামী ডিসেম্বরে দলের সম্মেলন হলে অস্থায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেও কেউ কেউ আভাস দিচ্ছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন লন্ডন থাকতেই দেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। এই সময়েই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এতে আপিল বিভাগ কর্তৃক তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ প্রশস্ত হলো। তাঁরা দুজনই রিভিউয়ের জন্য যে আবেদন করেছেন এবং তাও অবিলম্বে নিষ্পত্তি হবে আশা করা যায়। এরই মধ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা ঢাকায় ও ৩ অক্টোবর জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি রংপুরে আততায়ীর হাতে নিহত হন। ক্ষমতাসীনদের দাবি, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তাঁরা বিএনপির প্রতিই সন্দেহের তির ছুড়ছেন। কুনিও হোশি হত্যার ঘটনায় যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীও আছেন। তবে তদন্তকারী সংস্থা এখনো হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বিএনপি নেত্রীর নাম ধরে অভিযোগ করছেন। এ অবস্থায় তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা চলছে। কেউ বলছেন, তিনি শিগগিরই ফিরে আসবেন। আবার কারও মতে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
এদিকে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করার সিদ্ধান্তকে বিএনপি দুরভিসন্ধিমূলক বললেও শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারপারসনই। ডিসেম্বরে দুই শতাধিক পৌরসভায় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন, চ্যালেঞ্জ হিসেবে হলেও নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া উচিত। নির্বাচনী প্রচারের সুযোগে দলের প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ পাবেন। বিএনপি নির্বাচনে গেলে ভালো ফল করবে বলেও আশাবাদী তাঁরা। নির্বাচনে না গেলে সরকার এ কথা বলার সুযোগ পাবে যে জামায়াতে ইসলামীর কারণেই বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী জামায়াত দলীয়ভাবে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
ব্র্যাকেটবন্দী-ব্র্যাকেটমুক্ত: সম্প্রতি দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের নেতারা সেটিকে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কাজ বলে অভিযোগ করেছিলেন। এ বিষয়ে ডেইলি স্টার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেছেন, ‘সব ব্যাপারে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী করা উচিত নয়। বিএনপি জামায়াতের রাজনীতি করে না। বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি আছে। সে অনুযায়ী বিএনপি চলে। গণতন্ত্র উদ্ধারে বিএনপি যে ২০-দলীয় জোট করেছে, জামায়াত তার একটি শরিক মাত্র। এর আগে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তাই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকে ব্র্যাকেটবন্দী করা ঠিক নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির জোট নিয়ে দলের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে নানা প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। দলের উদারপন্থীরা মনে করেন, মৌলবাদী এই দলটির সঙ্গে জোট বেঁধে বিএনপি লাভবান হয়নি। তাঁরা মনে করেন, বিএনপির উচিত সময় ও সুযোগমতো জামায়াতকে ত্যাগ করা। বিএনপি যে সরকারবিরোধী সব শক্তিকে এক করতে চাইছে, তারও অন্তরায় জামায়াত। তাদের ধারণা, বিএনপি জামায়াতকে ছাড়লেই সরকারবিরোধী বৃহত্তর মোর্চা হতে পারে। আর সেটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নয়, জামায়াত যে রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি পোষণ করে, তা কখনোই গণতন্ত্রের সহায়ক নয়।
পত্রিকায় খবর দেখলাম, বিএনপি নেত্রী নাকি জামায়াতকে সংস্কারের জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়েই দল করার কথা বলেছেন। তাঁর সেই যুক্তি মেনে নিলে বিএনপির ভেতরের সংস্কারটি আরও বেশি জরুরি। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরও তাঁকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ না দেওয়া সংস্কারের লক্ষণ নয়।
বিএনপি নেতারা স্বীকার করুন আর না-ই করুন, পাঁচ বছরের জোট সরকারের শাসন এবং নয় বছরের জোটীয় রাজনীতি বিএনপি নিজেকে জামায়াতের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী করে ফেলেছে। এই ব্র্যাকেট মুক্ত করতে হলে কেবল মুখে বিএনপির রাজনীতি আলাদা বললে হবে না, কাজেও তার প্রমাণ দিতে হবে। সেটি কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, বিএনপিকে প্রকাশ্যে বলতে হবে, তারাও যুদ্ধাপরাধের বিচার সমর্থন করে। দ্বিতীয়ত, দলে যেসব যুদ্ধাপরাধী আছেন, তাঁরা দণ্ডিত হোন বা অভিযুক্ত, তাঁদের দল থেকে বের করে দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় থাকাকালে দলের যেসব নেতা-কর্মী জঙ্গিবাদীদের মদদ দিয়েছেন, নানাভাবে সহায়তা করেছেন, যাঁরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার জোগানদার হয়ে কাজ করেছেন, যাঁরা জজ মিয়া কাহিনি বানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।
কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বের পক্ষে সেটি করা সম্ভব হবে না, যদি না তাঁরা লন্ডনের গ্রিন সিগন্যাল পান। তত তিন হয়তো বিএনপিকে ব্র্যাকেটবন্দী হয়েই থাকতে হবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: সংরক্ষিত এলাকা অরক্ষিত

পাকা দেয়ালের একাংশ দরজার মতো করে ভাঙা। সেখান দিয়ে যাওয়া-আসা করছিলেন মাঝবয়সী এক লোক। বাড়ি তাঁর দেয়ালের ওপাশেই। সংরক্ষিত এলাকার ভেতর দিয়ে এভাবে অবাধে যাতায়াত প্রসঙ্গে তাঁর নির্লিপ্ত জবাব, ‘ইটা অইল ফাঁড়ির একটা পথ। তারাই (বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ) করি দিছইন!’
এই ‘ফাঁড়ি’ পথ হচ্ছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমানাপ্রাচীর ডিঙিয়ে চলাচল ব্যবস্থা। বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার পরও সীমানাপ্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক কোনোভাবেই ‘ফাঁড়ি’ পথমুক্ত করা যাচ্ছে না। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ এখান দিয়ে যাতায়াত ছাড়াও গো-চারণের কাজও করছেন সীমানাপ্রাচীরের ভেতর সংরক্ষিত এলাকায়। এ অবস্থায় রানওয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বিমানবন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তৎপরতা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নগরের উত্তরে বড়শালা এলাকায় ৬৭৪ একর জায়গা নিয়ে এ বিমানবন্দর। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৪০ মিটার আয়তনের রানওয়ের নিরাপত্তায় পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রয়েছে কাঁটাতারের প্রাচীর। রানওয়ের এক পাশ দিয়ে প্রবহমান একটি ছোট খালের কারণে উত্তর-পূর্ব দিকের ২৪০ ফুট প্রাচীর ধসে পড়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রয়েছে বাইশটিলা এলাকার কয়েকটি গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষ সহজে যাতায়াত করতে ফাঁড়ির পথ ব্যবহার করেন।
বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে ‘সুপরিসর জাহাজ চলাচল উপযোগীকরণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকাও বর্ধিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনায় ১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ চলে। ২০০৭ সালের ৯ নভেম্বর লন্ডন থেকে দুবাই হয়ে ওসমানীতে অবতরণ করার মধ্য দিয়ে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক রূপ পায়।
আন্তর্জাতিক রূপান্তর পরিকল্পনায় তখন সালুটিকর এলাকার একাংশ অধিগ্রহণ করায় পাকা রাস্তাটিও সংরক্ষিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়। সীমানা বর্ধিত করে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের কিছুটা প্রাচীরমুক্ত ছিল। ২০০১ সালে সংরক্ষিত এলাকা প্রাচীরবেষ্টিত করার পর ফাঁড়ির (সহজে যাতায়াত ব্যবস্থার স্থানীয় নাম) প্রচলন শুরুহয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পূর্ব দিকের প্রাচীরের ধস ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য খালে পাকা বক্স ড্রেন করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটা অনেকটা অরক্ষিত। সেখানে প্রাচীর ভেদ করে ফাঁড়ির পথ তৈরি করা হয়েছে, যা রানওয়ের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের প্রাচীরের প্রথম দিকে ফাঁড়ির পথটি মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানার সামনের মোড় থেকে। দেয়ালের নিচের মাটি সরিয়ে আসা-যাওয়ার এ পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে রানওয়ে দেখা যায়। এ পথ দিয়ে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় প্রাচীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি মুদি দোকানও।
দ্বিতীয় পথটি ব্যবহার হচ্ছে জেলা পরিষদের উদ্যান এলাকা ও বাইশটিলা গ্রামের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালের নিচের মাটি সরিয়ে পথ করে গরু-ছাগল সংরক্ষিত এলাকায় নেওয়া হয়। কয়েকজন রাখাল বলেন, পশ্চিমে টিলার মতো একাংশ পেরিয়ে গরু প্রায়ই রানওয়ের কাছাকাছি চলে যায়। তখন নিরাপত্তাকর্মীরা গরু বের করে দেন।
বেশ বড় আকারের তৃতীয় পথটি বিমানবন্দরের পেছনে সালুটিকর সড়কের এক পাশে। প্রাচীর ভেঙে পড়ায় এ পথ ছোটখাটো রাস্তার মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। সালুটিকরসহ আশপাশের বাসিন্দারা বলেন, বিমানবন্দরের সীমানা বর্ধিত করায় এলাকাবাসীর যাতায়াতের পুরোনো সড়কপথ সংরক্ষিত এলাকায় পড়ে যায়। এতে সালুটিকরের পশ্চিম দিকের অন্তত ছয়টি গ্রামের মানুষ যাতায়াত বিড়ম্বনায় পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে তারা এ পথ ব্যবহার করছে।
এই পথ সংরক্ষিত এলাকার জন্য হুমকির হলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. হাফিজ আহমদ দাবি করেন, এ রকম কোনো পথ নেই। পরে তাঁকে সুনির্দিষ্ট করে জানালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পথ থাকলেও থাকতে পারে। এগুলো দেখলে তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া প্রসঙ্গে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক বলেন, প্রতিদিনই রুটিন করে অপারেশন (নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ) চলে। সংরক্ষিত এলাকায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ থাকলে অপারেশনে চিহ্নিত হয়।
সীমানাপ্রাচীরের নিচের মাটি সরিয়ে তৈরি করা হয়েছে যাওয়া-আসার পথ। আবার কোথাও (ডানে) প্রাচীরের একাংশ দরজার মতো ভেঙে চলছে অবাধে যাতায়াত। এভাবে সংরক্ষিত এলাকার ভেতর দিয়ে মানুষ চলাচল করায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সম্প্রতি তোলা ছবি l আনিস মাহমুদ

একদিকে জমছে, অন্যদিকে গলছে

অ্যান্টার্কটিকায় বরফ ক্রমশ বাড়ছে। এমনটাই জানিয়েছে নাসা। তার মানে এই নয় যে, যেসব বিজ্ঞানীরা এতো দিন অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলছে বলে জানিয়েছে তারা মিথ্যা বলেছেন।
আসলে ঘটনা হলো, অ্যান্টার্কটিকায় একদিকে যেমন বরফ গলছে, অন্যদিকে বরফ জমছেও।
সম্প্রতি নাসার একটি গবেষণা থেকে এমন তথ্যটি উঠে এসেছে। সাধারণত গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কারণেই বরফ গলে যাচ্ছে বলে অনুমান সংস্থাটির।
২০১৩ সালে একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কয়েক বছর পর অ্যান্টার্কটিকার সব বরফই গলে যাবে।
নতুন গবেষণার প্রধান জে জোয়ালি জানান, অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা এবং পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকাতে বরফ গলে যাওয়ার পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু পূর্ব অ্যান্টার্কটিকায় বরফ জমছে-এটাও সত্যি।
নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০১ পর্যন্ত নতুন করে বরফ জমেছে ১১২ বিলিয়ন টন। এরপর ২০০৮ পর্যন্ত ৮২ বিলিয়ন টন বরফ কমেছে। অর্থাৎ কমে যাচ্ছে না বরফের পরিমাণ। এই আশ্বাসবাণীই দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
১৯৯২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ইআরএস স্যাটেলাইট এবং আইসিইএস স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সালের মাধ্যমে এই সব গবেষণা চালানো হয়।

তুরস্কে পার্লামেন্ট নির্বাচনে একে পার্টির জয়: স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
তুরস্কে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতা ধরে রাখলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। গত রোববার অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাঁর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এরদোয়ান তাঁর দলের বিজয়কে ‘ঐক্য ও সততার’ জয় বলে অভিহিত করেছেন। খবর বিবিসি ও আল-জাজিরার।
একে পার্টি গত জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় রোববারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচন দেওয়াকে অনেকেই এরদোয়ানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় এখন এরদোয়ানের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে তুরস্কের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
একে পার্টির জয়লাভের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে এরদোয়ান বলেন, নির্বাচনের ফলাফল কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতি ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা’। ওই বার্তা হলো, ‘নিষ্ঠুরতা ও রক্তপাত’ আর গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না।
রোববারের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের কুর্দিবিরোধী অভিযান আর রাজধানী আঙ্কারায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১০২ জন নিহত হওয়ার পর নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় ছিল। নিরাপত্তা নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জে পাস করেছে এরদোয়ান সরকার।
২০০২-০৩ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে একে পার্টি জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হন এরদোয়ান। ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে ওই আগস্টেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
একে পার্টি ক্ষমতায় আসার আগে কয়েক দশকের মধ্যে তুর্কি সেনাবাহিনী চারবার দেশটির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। আর এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালে একে পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের দায়ে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের ১৭ জন কর্মকর্তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। ২০১১ সালে ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ নামের এমন আর একটি ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ২০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। ওই ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের সময় এর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন দেশটির সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানেরা। সেটাও ছিল ওই সময়ে এরদোয়ান সরকারের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
এরদোয়ানের আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল ২০১৩ সালের জুনে ইস্তাম্বুলে গেজি পার্ককে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়া। ওই বিক্ষোভে ধর্মনিরপেক্ষ অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, একে পার্টি ইসলামি লাইনে চলে যাচ্ছে। সেই বিক্ষোভকারীরা পরে বিভিন্ন শহরেও ছড়িয়ে পড়েন।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরেই এরদোয়ান সরকার বেশ বড় একটা ধাক্কা খায় দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ঘটনায়। তিনজন মন্ত্রীর ছেলেসহ বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ওই ঘটনায়।
সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, এরদোয়ান তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশ্চুপ রাখতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেন। বিরোধীদের বিরুদ্ধে অনেক বানোয়াট অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে সমর্থকদের কাছে নায়কের মর্যাদা পান এরদোয়ান।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় একে পার্টির প্রধান কার্যালয়ের বাইরে গতকাল পতাকা উড়িয়ে জয়োল্লাস করেন নারী সমর্থকেরা। রোববার অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ​একে পার্টি l ছবি: রয়টার্স

নাসার কিশোর গবেষক

মোশে কাই কাভালিনের দুটি কলেজ ডিগ্রি রয়েছে। কিন্তু, তাতে কী, ভোট দেয়ার বয়স কিন্তু এখনো তার হয়নি। বিমান নিয়ে সে আকাশে উড়তে পারে। কিন্তু সত্যটা হলো, একা গাড়ি চালানোর আইনি ছাড়পত্র এখনো পায়নি। কারণ বয়স যে এখনো ১৮ হয়নি।
বলতেই পারেন জীবন তার বৈপরীত্যে পূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান গ্যাব্রিয়েলের এই ১৭ বছরের তরুণ এর মধ্যেই কিন্তু নিজের মতো অনেক কীর্তি স্থাপন করে ফেলেছে। মাত্র এগারোতেই কমিউনিটি কলেজ থেকে স্নাতক। তার ঠিক চার বছরের মাথায় ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আবারো স্নাতক, এবার অঙ্কে।
এখন অনলাইনে ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরের পাঠ নিচ্ছে কাভালিন, বিষয় সাইবার সিকিওরিটি। এর মধ্যেই ডাক পায় নাসার। বিমান ও ড্রোনের নজরদারি প্রযুক্তির উদ্ভাবনে, নাসাকে সাহায্য করার জন্যই ডাক পড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এই তরুণের। সানন্দে এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করে, আপাতত মাস্টার্সে ইতি টেনেছে সে।
এসব তো রয়েছেই। এর মধ্যেই তার লেখা দুটি বইও প্রকাশ পেয়েছে। মার্শাল আর্ট? তাতেও সে তুখোড়। ঘরে প্রচুর পুরস্কার নিয়ে এসেছে। কাভালিন জানায়, এ বছরের শেষেই সে বিমানচালকের লাইসেন্স হাতে পেয়ে যাবে।
এতো গুণের অধিকারী হলেও, আর পাঁচজন সাধারণের মতোই নিজেকে মনে করে এই তরুণ। নাসার ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারে গবেষণারত এই তরুণের কথায়, 'আমি বিশেষ কিছুই করিনি। যা করেছি, যেটুকু করেছি, সেই কৃতিত্বও মা-বাবার। প্রেরণা, অনুপ্রেরণা- সবটাই তাদের কাছ থেকে পাওয়া। আমি শুধু চেষ্টা করেছি, সব সময় আমার সেরাটা দিতে।'
মা জন্মসূত্রে তাইওয়ানের নাগরিক, বাবা ব্রাজিলিয়ান। ছেলের মতো তারাও মনে করেন, সন্তান জিনিয়াস কিছু নয়। সবটাই তার মধ্যে এসেছে স্বাভাবিকভাবে।
তার একসময়কার অঙ্কের শিক্ষক ড্যানিয়েল জজের কথায়, ও খুব পরিশ্রম করতে পারে। কাউকে ওর মতো পরিশ্রম করতে দেখিনি। এই ড্যানিয়েলের কাছে দুই বছর অঙ্কের পাঠ নিয়েছে কাভালিন।
তার লক্ষ্য, ভবিষ্যতে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হওয়া। সেই লক্ষ্যের দিকেই দ্রুত এগোচ্ছে সে।

হোসেনি দালানে আহতদের অবস্থা ভালোর দিকে

ছয় বছরের হাসানকে দেখা গেল সিরিঞ্জ নিয়ে খেলছে। ওটা দিয়ে কী করবে, জিজ্ঞাসা করতেই বলল, ‘ওটা দিয়ে দুষ্ট লোকদের শাস্তি দিব।’ তার স্প্লিন্টারবিদ্ধ হওয়া বাঁ হাতে এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে। তার ক্ষতগুলো শুকিয়ে এসেছে। অন্য আহতরা প্রায় সুস্থ হয়ে উঠলেও এখন পর্যন্ত হোসেনি দালানে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
গত ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশু হাসান ও তার মা রীনা বেগম (৩৮)। মাকে ছাড়া হাসান থাকতে পারে না বলে দুই বিছানা জোড়া দিয়ে ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে পাশাপাশি বিছানায় মা-ছেলের চিকিৎসা চলছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ১৩ জনের অবস্থা উন্নতির দিকে। আহত দুটি শিশু সোহান ও কয়েসের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। এদের মধ্যে পেটে স্প্লিন্টারবিদ্ধ সোহানের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। গুরুতর আহত আরেকজন রকিবের (২৫) অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। তাঁরা এখন আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তবে এখনই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন না।
এদিকে এখন পর্যন্ত গ্রেনেড হামলায় সরাসরি জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গাবতলীতে এএসআই হত্যাকারীরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন।
গত ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি জমায়েতে হাতে তৈরি গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় দেড় শ লোক আহত হয়। আহতদের মধ্যে এক কিশোর ঘটনার রাতেই, আরেকজন ছয় দিন পরে মারা যায়। ওই হামলার আগের দিন ২২ অক্টোবর রাতে রাজধানীর গাবতলীতে এক ব্যক্তির ব্যাগ তল্লাশির সময় তার সঙ্গীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন দারুস সালাম থানার এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা। ঘটনাস্থল থেকেই মাসুদ রানা নামে একজনকে ধরে ফেলে পুলিশ।
পরে মাসুদের দেওয়া তথ্যমতে ২৩ অক্টোবর ভোরে কামরাঙ্গীরচর থেকে পাঁচটি হাতে তৈরি গ্রেনেডসহ তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, একই রকম গ্রেনেড হোসেনি দালানে হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রেনেডের মিল থাকার কারণে শুরু থেকেই পুলিশ ধারণা করছে যে একই চক্র এএসআই হত্যা ও হোসেনি দালানে হামলায় জড়িত। তবে সেই গ্রেনেডগুলো কোথায় তৈরি, কারা এটা তৈরি করেছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেনি পুলিশ।
কর্মকর্তারা জানান, এএসআই হত্যায় ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার মাসুদ একজন শিবির কর্মী। এএসআই ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাতকারী এনামুল ওরফে কামাল বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। ওই ঘটনায় ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তাদের কাছ থেকে হোসেনি দালানে হামলার বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি।
হোসেনি দালানে হামলা ঘটনার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল বলেন, হোসেনি দালানে হামলার ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে পারেনি। তবে এএসআই হত্যার সঙ্গে জড়িতরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হোসেনি দালানের ৩২টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দুজনকে গ্রেনেড ছুড়তেও দেখা গেছে। তবে তাদের চেহারা স্পষ্ট নয়। ওই হামলার সঙ্গে সরাসরি জামায়াত-শিবির জড়িত বা তাদের অর্থায়নে অন্য কোনো গোষ্ঠী হামলাটি চালিয়েছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে হামলায় আহত শিশু হাসান এখন কিছুটা সুস্থ। ছবিটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গতকাল দুপুরে তোলা l আশরাফুল আলম

যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় খালেদা জিয়া গুপ্তহত্যায় নেমেছেন: প্রধানমন্ত্রী

সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিদেশে বসে দেশে গুপ্তহত্যায় নেমেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই অভিযোগ করেন।
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে এরপর তিনি গেছেন বিদেশে। বিদেশে গিয়ে ষড়যন্ত্রটা কী? বিদেশিদের হত্যা করতে হবে। তাহলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এখন তিনি গুপ্তহত্যায় নেমেছেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, এমনকি লেখক-প্রকাশক, বিদেশি, সবার ওপর গুপ্তহত্যা। যখনই হত্যায় জড়িতরা ধরা পড়ছে; দেখা যাচ্ছে তারা ছাত্রজীবনে হয় শিবির, নাহয় বিএনপি করত।’
শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় যখন কার্যকর হচ্ছে, তখন খুনিদের রক্ষা করার জন্যই এই গুপ্তহত্যা। কারণ, লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। খুনিদের মন্ত্রিসভায় বসিয়েছিলেন, পুরস্কৃত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান একবার করেছিলেন। এরপর করেছেন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া।
গুপ্তহত্যাকারীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশের মানুষ স্বাধীনচেতা। এই স্বাধীনচেতা মানুষ ষড়যন্ত্র-হত্যাকাণ্ডে মাথা নত করে না। গুপ্তহত্যা, খুন, যাই করুক না কেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না। হত্যাকারীদের সাবধান করে দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের পথে কেউ যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমা করবে না। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য তাদের শাস্তি পেতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে হত্যা, গুম, খুন ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তাহলে দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। খেলতে দেওয়া হবে না।
হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গুপ্তহত্যা যারা করছে, তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। আরও হবে। তাদের লিংক কোথায়, বড় ভাই কোথায়, মুরব্বি কে, তা বের করে এই বাংলার মাটিতে শাস্তি দেওয়া হবে। খুনিদের শাস্তি দেবই দেব। আমি শুধু বাংলাদেশের মানুষের সহযোগিতা চাই।’
খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করার মতো বীভৎস ঘটনা সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘটিয়েছে। এরপর ঘটালেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর এ মানুষ খুন করার রাজনীতি প্রতিহত করেছে। ২৮২ দিন অবরোধ চলেছে। এখনো খালেদা জিয়া তাঁর ঘোষিত অবরোধ প্রত্যাহার করেননি। দেশের মানুষের সাড়া না পেয়ে নিজেই নাকে খত দিয়ে বের হন। মামলায় হাজিরা দিয়ে নিজের ঘরে ফেরেন। দেশবাসী ও নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ দেশের মানুষকে নিয়ে বারবার ষড়যন্ত্রের খেলা হয়েছে। কোনো কোনো মহল চেষ্টা চালাচ্ছে, এ দেশে আইএস আছে, এ দেশে সন্ত্রাসী আছে। এ দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছে। কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে তাকে রেহাই দেওয়া হয় না। তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে, সে যে দলেরই হোক না কেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলছি, এ দেশে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। সন্ত্রাসীদের স্থান এ দেশে হবে না। জয় জনগণেরই হবে। খুনি-ষড়যন্ত্রকারীদের জয় হতে দেওয়া হবে না। আমরা যা বলি, তা করি।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাবলি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মোশতাক আহমদের পর জিয়াউর রহমান খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিলেন। খুনিদের বিচার করা হয়নি, বরং বিভিন্নভাবে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ বন্ধ করা হয়েছিল।’
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সমালোচনা করে বলেন, ‘কারা এই অ্যামনেস্টি? যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে সিভিল ওয়ার বলেছিল? আমি বলে দিতে চাই, তাদের কথায় বাংলাদেশ উঠবে না, বসবেও না।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় ক্ষমতায় থাকলে আমরা অলস হয়ে পড়ি। আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে, আমরা যাতে সচেষ্ট থাকি। সব সময় যেন চোখ এবং কান খোলা রাখি। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শেখ হাসিনার হাতে অনেক কাজ এখনো রয়েছে। শেখ হাসিনাকে আরও বেশি শক্তি প্রদান করতে হবে।’
শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, তারাই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে। তারা পাকিস্তানের কনফেডারেশন বানাতে চেয়েছিল। তারা এখনো তৎপর। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না।
খালেদা জিয়ার উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘বাংলার মানুষ আপনার আসল চেহারা চিনে ফেলেছে। আপনি একজন খুনি।’
সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।
সমাবেশ শুরুর সময় ছিল বেলা আড়াইটা। কিন্তু দুপুরের আগে থেকেই রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে বাস-ট্রাকে করে নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে থাকেন। তাঁদের হাতে ছিল নানা স্লোগান-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন বলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সমাবেশস্থলের প্রবেশমুখগুলো অপরিসর হওয়ার কারণে মিছিলসহ আসা নেতা-কর্মীদের ঢুকতে বেগ পেতে হয়। বেলা তিনটার দিকে যখন প্রধানমন্ত্রী সমাবেশের মঞ্চে ওঠেন, তখন সমাবেশস্থল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। পরে আগতদের অনেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাইরে অবস্থান নিয়ে বক্তৃতা শোনেন।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বহনকারী যানবাহনগুলো আশপাশের সড়কে রাখা হয়। এ ছাড়া মিছিলের কারণে শাহবাগ, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলামোটরসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সমাবেশ শেষেও যান চলাচল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক ঘণ্টা লাগে।

পঁচাত্তরের নভেম্বর: অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান by এইচ এম এ গাফফার

সেনাপ্রধান নিয়োগের পর মেজর জেনারেলের
ব্যাজ পরানো হয় খালেদ মোশাররফকে
পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিল যখন বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রকে উৎখাত করার উদ্যোগ নেন, তখন ২২তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল হালদার মোহাম্মদ আবদুল গাফফার। সে সময়ের ঘটনাবলি ও তাঁর নিজের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গটি তুলে ধরেছেন এই লেখায়।
৩ নভেম্বরের আগেই ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিল বঙ্গভবন থেকে পথভ্রষ্ট খুনি চক্রকে উৎখাত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের এই সিদ্ধান্তের কথা কর্নেল তাহের কিংবা অন্য কাউকে বলেননি। ৩ নভেম্বর ভোরেই ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের ব্যাটালিয়নগুলো থেকে সেনাদল পাঠিয়ে বঙ্গভবন অবরোধ করা হলো। সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর গৃহে অন্তরীণ করা হলো এবং তাঁর টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো। এ ছাড়া বাইরে থেকে অন্তরীণকারী হাউস গার্ড ছাড়া কাউকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ করা হলো। কারণ, আমরা প্রথম থেকেই তাঁকে খুনি চক্রের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সন্দেহ করতাম। প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো। নতুন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের আদেশবলে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে সেনাপ্রধান এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা হলো।
কিন্তু ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষক’ হিসেবে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। তাই জিয়াকে অন্তরীণ রাখাকে সৈনিকেরা পছন্দ করেনি। খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বরের পর বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কোনো চেষ্টা করেননি, কিংবা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও সব অফিসার ও জওয়ানদের উদ্দেশে কোনো দরবার কিংবা কনফারেন্সের ব্যবস্থা করেননি। ফলে তাঁর অনুগত ব্যাটালিয়নগুলো ছাড়া সারা সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তিনি অচেনা-অজানাই রয়ে গেলেন। অপর দিকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি রেডিও এবং টেলিভিশনে কোনো বক্তব্য দিলেন না। ফলে দেশবাসীও তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্ধকারে রয়ে গেল।
ইতিমধ্যে কর্নেল তাহের এবং জাসদের নেতারা প্রচারণা চালালেন যে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল সাফায়াত জামিল ‘ভারতের দালাল’। এই প্রচারণা সব ব্যারাকে দ্রুত লিফলেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিল ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র সদস্যরা। ফলে সৈনিক ও জাতীয়তাবাদী জনতার মধ্যে খালেদের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেল। এই সময়ে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিল। খালেদের ছোট ভাই রাশেদ মোশাররফ (আওয়ামী লীগের দলীয় সাংসদ) ও তাঁর মা ধানমন্ডিতে একটি মিছিল বের করেন, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর বিষয়ে অনেক স্লোগান দেওয়া হয়। প্রায় সব পত্রিকা এই মিছিলের খবর প্রচার করেছিল। এই মিছিলের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ধারণা হলো যে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি মূলত ভারতপন্থী ও আওয়ামী লীগের অভ্যুত্থান। প্রকৃতপক্ষে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ কখনোই ভারতপন্থী
ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী। যুদ্ধের সময়ও আমি লক্ষ করেছিলাম যে ভারতীয় জেনারেলরা খালেদকে কখনোই বিশ্বাস করতেন না। অথচ কর্নেল তাহের তাঁর দলীয় সর্বশক্তি নিয়োগ করে দ্রুত এই দেশপ্রেমিক বীরকে একজন বিশ্বাসঘাতক বিদেশি দালাল বলে ব্র্যান্ডিং করে দিতে সমর্থ হলেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল, যেন যেকোনো মুহূর্তে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে দিয়ে বেতার ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ প্রচারের ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাঁর ওই ভাষণ জাতির কাছে তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা পেল না।
৬ নভেম্বর দিনের বেলা কর্নেল শাফায়াত জামিল আমাকে ও আমার ইউনিটকে (২২তম ইস্ট বেঙ্গল) নির্দেশ দিলেন যে একটি পদাতিক কোম্পানিকে মহাখালী চৌরাস্তায় এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করাতে, যাতে গুলশান-বনানীর দিক থেকে কোনো বিদেশি শহরে আসতে না পারেন এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারেন। আমার আরেকটা কোম্পানিকে বঙ্গভবনে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত করলাম। এই কোম্পানিকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের একটি দায়িত্বরত কোম্পানির কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিতে আদেশ করা হলো। আমার তৃতীয় কোম্পানিটি, যেটি আগেই মানিকগঞ্জে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল, সেটিকে সেখানেই থাকতে বলা হলো। আমার চতুর্থ কোম্পানিটিকে রিজার্ভ হিসেবে ব্যাটালিয়ন সদরে রাখার আদেশ করা হলো। আমি তখন কমান্ডারকে অনুরোধ করলাম যে আমার জন্য নির্ধারিত নির্দেশাবলি যেন আমাকে লিখিত আকারে দেওয়া হয়। ফলে কমান্ডার আমাকে লিখিতভাবে আদেশগুলো প্রদান করলেন। লিখিত আদেশ পাওয়ার পরই আমি আমার তিনটি কোম্পানিকে আদেশানুযায়ী নিয়োজিত করলাম। উল্লেখ্য, এই লিখিত আদেশটির কপি আমাকে পরবর্তীকালে সামরিক আদালতে আমার সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
আমাদের অভ্যুত্থানবিরোধী জাসদের প্রচারণা যখন তুঙ্গে, তখন ৬ নভেম্বর রাত আনুমানিক ১০টায় ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল আমাকে টেলিফোনে আদেশ দিলেন, যেন আমি তাড়াতাড়ি আমার ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে গিয়ে ব্যাটালিয়নের নিয়ন্ত্রণ করি। ব্যাটালিয়নে পৌঁছে আমি সরাসরি আমার অফিসের দিকে এগোচ্ছিলাম। এ সময় আমি ইঞ্জিনিয়ার্স ও অর্ডন্যান্স কোরের কিছু সৈনিককে আমার ইউনিটের গেটের সামনে জটলা করতে দেখলাম। তারা উত্তেজিতভাবে কিছু একটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিল। আমি আমার সুবেদার মেজর চান মিয়াকে ডাকলাম এবং কী ব্যাপার তা জানতে চাইলাম। চান মিয়া আমাকে জানাল যে ‘স্যার, ওরা কী যেন একটা লিফলেট পেয়েছে, তাই নিয়ে আলোচনা করছে এবং তারা অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত।’ আমি তাদের আমার কাছে ডাকতে বললাম। প্রথমে তো তারা আসতেই চায়নি, একটু পরে গড়িমসি করে কাছে এলে তাদের আমার খুবই অস্বাভাবিক মনে হলো। কথাবার্তা শুনেও মনে হলো তারা অপ্রকৃতিস্থ। আমি তাদের শান্ত হতে বললাম এবং স্বাভাবিক আচরণ করতে বললাম। আমি তাদের আমার ইউনিটের সামনে জটলা ও হইচই করতে নিষেধ করে চলে যেতে বললাম।
জাসদের প্রতি অনুগত ওই উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের বিদায় করে আমি আমার অফিসে ঢুকে আমার চেয়ারে বসলাম। ঘটনাচক্রে আমার চেয়ারটি ঠিক যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখান থেকে একটু সরিয়ে একপাশে বসে ছিলাম। এমন সময় আমার সামনের খোলা দরজা দিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের একঝাঁক গুলি আমার চেয়ারের স্বাভাবিক অবস্থান বরাবর পেছনের দেয়ালে এসে বিঁধল। আমার সুবেদার মেজর চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, ‘স্যার! সর্বনাশ হয়েছে। শিগগির আমার সঙ্গে আসেন।’ আমরা দ্রুত ঘরের পেছনের জানালা টপকে বাইরে চলে এলাম। ইতিমধ্যে আমার ব্যাটালিয়নের ২৫-৩০ জন সৈনিক একত্র হয়ে আমার কাছে চলে এল এবং আমাকে ঘিরে দাঁড়াল।
যা-ই হোক, বুঝতে পারছিলাম যে একটা পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার্সের যেদিক থেকে গুলি আসছিল, তা এড়িয়ে আমরা রেললাইনের দিকে হেঁটে গেলাম। আমরা রেললাইন আর ময়মনসিংহ সড়কটি পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করলাম। ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে একত্র হওয়া সৈন্যদের সংখ্যা ৫০ পেরিয়ে গেছে। আমরা সবাই সশস্ত্র এবং যেকোনো অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। সেখান থেকে আমরা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে স্টাফ রোডের অফিসার্স কোয়ার্টারগুলোর একটিতে লে. কর্নেল ডা. জামানের বাসার গেটে নক করলাম। কর্নেল জামান নিজেই গেট খুলে দিলে আমি তাঁকে বললাম যে আমার ৫০ জন সৈন্যসহ আমি অবস্থানের জন্য একটা নিরিবিলি স্থান চাই। উনি আমাকে তাঁর পাঁচিলঘেরা বাসার সামনের লনটা দেখিয়ে বললেন, আপনি এখানেই অবস্থান করতে পারেন। লনে বেশ কিছু গাছ আর ঝোপঝাড়সহ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ ছিল।
কিছু পরে আমি আর আমার সুবেদার মেজর সৈনিকদের দুই ভাগে ভাগ করে রেললাইন ধরে দক্ষিণ দিকে হেঁটে অগ্রসর হতে লাগলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখলাম বিপ্লবী সৈনিকদের আর একটি দল স্লোগান দিতে দিতে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে, অর্থাৎ আমাদের দিকে আসছে। আমরাও তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় অফিসারদের মুণ্ডুপাত করে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চললাম। আমাদের পাশ কাটানোর সময় তারা স্লোগান দিল, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। কিছু দূর এগিয়ে আমরা কুর্মিটোলা গলফ মাঠে পৌঁছালাম। তখন মাঠের পশ্চিম দিকে অবস্থিত সেনা ভবনে গিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার সৌভাগ্য যে সেনা ভবনে তখন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকেরা ডিউটি করছিল। তখন ৭ নভেম্বরের ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমরা সেনা ভবনের পেছনে থাকা একটি ছোট গেট দিয়ে ভবনে প্রবেশ করলাম।
আমি সেনা ভবনের দরজার কাছেই দেখলাম মে. জে. (অব) সফিউল্লাহ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে বারান্দায় বসে উচ্চ স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করছেন। আমি সংক্ষেপে সেই রাতের অভিজ্ঞতা তাঁকে জানালাম এবং এই অবস্থায় আমার করণীয় কী তা জানতে চাইলাম। তিনি হাস্যকরভাবে তাঁর হাতের দুটি তালু উল্টে দিয়ে বললেন, ‘গাফফার! আমার বাড়ি হলো জাতিসংঘ। আমার কারও জন্য কোনো আদেশ নাই। তোমার যা ভালো লাগে তা করতে পারো।’ তাঁর কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে পড়লাম।
আমি আবার সেনা ভবনের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল লাইনসের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের লাইনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকদের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। সেখানে সুবেদার মেজর ইদ্রিস মিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা প্রতিরক্ষার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?’ তিনি আমাকে জানালেন যে ব্যাটালিয়নের চারদিকে রিকয়েললেস রাইফেল, রকেট লঞ্চার আর ভারী মেশিনগান বসানো হয়েছে। তিনি আরও প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন যে বিপ্লবীরা ট্যাংক নিয়ে এলেও ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। সুবেদার মেজর এরপর আমাদের জন্য গরম চায়ের ব্যবস্থা করলেন।
লে. কর্নেল (অব.) হালদার মোহাম্মদ আবদুল গাফফার (বীর উত্তম): অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধকালে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক। পরবর্তী সময়ে ২২তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী।

‘মোশতাক আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না’ by জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির নেতা এবং প্রথম বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য আবু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে শুধু নামেই চিনতাম স্বাধীনতার বেশ কয়েক মাস পর পর্যন্ত। স্বাধীনতার পরপরই আমি সরকারি চাকরিতে পুনরায় যোগদানের পর আমাকে নিয়োগ করা হয় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে, তত্কালীন সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল কুদ্দুসের সহকারী হিসেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো দেশে ফেরেননি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমি তাঁর ছবি দেখেছি পত্রপত্রিকায়, টিভিতে, সামনাসামনি নয়।
বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর যখন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন, মন্ত্রিপরিষদের অনেক পরিবর্তন হলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তাজউদ্দীনের অর্থমন্ত্রী হওয়া আর কামরুজ্জামানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরে এসে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া। এই পরিবর্তনের পর আমি আরও কয়েক মাস প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে কাজ করি। হঠাৎ মে মাসে রুহুল কুদ্দুস আমাকে ডেকে বলেন যে ত্রাণমন্ত্রী কামরুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁর সচিবালয় থেকে কাউকে যেন নিয়োগ করা হয় তাঁর একান্ত সচিব হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর আদেশে রুহুল কুদ্দুস জানালেন যে আমি যেন কামরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করি। তাঁর পছন্দ হলে আমাকে সে পদে নিয়োগ করা হবে।
আমি পড়লাম মহা বিপদে। আমি কোনো দিন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ধারেকাছেও যাইনি। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে কাজ করা আর একজন মন্ত্রীর সরাসরি সহকারী হিসেবে কাজ করা অনেক তফাত। এদিকে সরকারি চাকরিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে নেওয়া উচিত। আমার ইতস্তত ভাব দেখে রুহুল কুদ্দুস বললেন, ‘কামরুজ্জামান আমার খুব পরিচিত, অত্যন্ত সজ্জন লোক, তুমি তার সঙ্গে কাজ করে খুশি হবে।’
রুহুল কুদ্দুসের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিল। আমি কামরুজ্জামানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করি তিন বছরের ওপরে, পরপর তিন মন্ত্রণালয়ে। শেষবার তিনি যখন শিল্পমন্ত্রী, ১৯৭৫ সালে, তাঁর একান্ত সহকারী হিসেবে কাজ ছিল প্রায় উদয়াস্ত তাঁর সঙ্গে থাকা। নথিপত্রের কাজের সঙ্গে তাঁর সব সরকারি সভা-সমিতির দিনক্ষণ নির্ধারণ করা, তাঁর পত্রবিনিময় মুসাবিদা করা, সফরের বন্দোবস্ত করা, সফরে তাঁর সঙ্গে যাওয়া—সব দায়িত্বই ছিল। তিন বছরে যতই কামরুজ্জামানকে দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি তাঁর ব্যবহারে, বুদ্ধিমত্তায়, রাজনৈতিক পরিপক্বতায় এবং সর্বোপরি তাঁর সাধুতা ও সত্যতায়। তিনি কেবল একজন দেশনেতাই ছিলেন না, ছিলেন একজন নির্ভীক ও ন্যায়পরায়ণ রাজনীতিবিদ।
৩ নভেম্বর রাতে কামরুজ্জামান ও অন্য তিন নেতাকে ঢাকা জেলে হত্যা হয়তো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তৎকালীন দখলদার সরকার কার্যকর করে, কিন্তু তাঁদের হত্যা করা যে আগস্ট অভ্যুত্থানকারীদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, তা কামরুজ্জামান আমাকে বলেছিলেন ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরপরই।
১৫ আগস্টের আকস্মিকতা সবাইকে যেমন করে বিহ্বল, তার নিষ্ঠুরতা মানুষকে করে বিমূঢ়। আসলে সেদিনের পুরো ঘটনা আর নৃশংসতার কথা লোকের জানতে বেশ দেরি হয়। সকালে মেজর ডালিমের রেডিওতে অভ্যুত্থানের ঘোষণার অনেক আগেই আমার ঘুম ভাঙে ভোরে গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দে। আমি ছিলাম ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটি বাসায়, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ির খুব কাছে। গোলাগুলির শব্দে ঘরের সবাই ভীতসন্ত্রস্ত, বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। শুধু এটা বুঝতে পারছিলাম যে আওয়াজ লেকের উল্টো দিক থেকে আসছে। তখনো চিন্তায় আসেনি যে গোলাগুলি ৩২ নম্বর বাড়িতেই হচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর গোলাগুলি থামলে এক আত্মীয়র ফোন পেলাম, তিনি বললেন রেডিও শুনতে। তখনই মেজর ডালিমের কণ্ঠে শুনতে পেলাম খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের কথা।
মেজর ডালিমের এ ঘোষণা আমাকে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে মন্ত্রী কামরুজ্জামানের কথা ভেবে। সশস্ত্র অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হলে তাঁর সহকর্মীরাও বিপদে পড়বেন এই আশঙ্কায়। আর কামরুজ্জামান ছিলেন তাঁর অন্যতম নিকট সহযোগী, যিনি কয়েক মাস আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এর আগের দিন আমি শিল্প ভবনে মন্ত্রীর দপ্তরে রাত আটটা অবধি ছিলাম। মন্ত্রী আমার অফিস ছাড়ার সময় তাঁর দপ্তরেই ছিলেন।
ঢাকা থেকে দূরে এক জেলা শহরে বসে যখন এ হত্যার কথা শুনি, আমার কানে বাজতে থাকে আমার মন্ত্রীর কথা, ‘মোশতাককে চিনি বলেই বলছি তোমাকে, মোশতাক আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না, আমাদের সবাইকে খুন করবে’ আমি রেডিও শোনা বন্ধ করে তড়িঘড়ি তাঁকে ফোন করলাম আর পেয়েও গেলাম। চলমান ঘটনা সম্পর্কে কোনো কথা না বলে কামরুজ্জামান আমাকে বললেন তাড়াতাড়ি তাঁর বাসায় যেতে, তিনি ধানমন্ডিতেই থাকতেন। আমি তাঁকে জানালাম যে আমার গাড়ি সরকারি পুল থেকে ডেকে এনে তারপর আসছি। মন্ত্রী একটু অসহিষ্ণুভাবে বললেন, আমি যেন যেভাবে পারি তাড়াতাড়ি যাই। জানালাম, আমি আসছি।
বাড়িতে একটি গাড়ি ছিল, কিন্তু ড্রাইভার ছিল না। আমি নিজেই গাড়িতে করে আমার এক আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। মন্ত্রীর বাড়ি পৌঁছে গিয়ে দেখি, বাড়িতে কেউ নেই। বাড়িতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনরত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জানালেন, মন্ত্রী সাহেব কিছুক্ষণ আগে সপরিবারে একটি গাড়িতে করে চলে গেছেন; কোথায় গেছেন, তা তাঁরা জানেন না। কার সঙ্গে গিয়েছেন, সেটাও তাঁরা জানেন না। আমি পড়লাম মহা চিন্তায়, তাঁকে অভ্যুত্থানকারীরা নিয়ে গেছে কি না।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পরে একটি টেলিফোন পেলাম এক ব্যক্তির কাছ থেকে। তিনি জানালেন, তাঁর বাড়িতে মন্ত্রী আছেন সপরিবারে এবং তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। ব্যক্তিটি ছিলেন কামরুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বগুড়ার এক সাংসদের জামাতা। তিনিও ধানমন্ডিতে থাকতেন, তাঁর বাড়ি আমি চিনতাম।
ধানমন্ডির সেই বাড়িতে যখন পৌঁছাই, সময় প্রায় দশটা। বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রচারিত হয়ে গেছে। আমি কামরুজ্জামানের দেখা পাই সেই বাড়ির অন্দরে শোয়ারঘরে। বিছানায় বসে তিনি, পাশে তাঁর স্ত্রী আর তিন মেয়ে (তাঁর দুই ছেলে তখন ভারতে স্কুলে)। অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত চেহারা নিয়ে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন বঙ্গবন্ধুর কথা। তখনো তিনি জানেন না যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে।
খোন্দকার মোশতাককে তো আপনি ভালো করে চেনেন, আমি বললাম।
মুখ ঘুরিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে কামরুজ্জামান গভীর স্বরে বললেন, ‘মোশতাককে চিনি বলেই বলছি তোমাকে, মোশতাক আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না, আমাদের সবাইকে খুন করবে।’ কামরুজ্জামানের এ কথা আজও আমার কানে বাজে।
কামরুজ্জামান সেই বন্ধুর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আরও দিন কয়েক থাকেন। তিনি ঢাকার বাইরে অন্য কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করেননি, যাওয়ার কোনো আগ্রহও ছিল না। সেই বাড়িতে থাকার সময় আমি প্রায় প্রতিদিন দেখা করতে যেতাম। কয়েক দিন পর তিনি তাঁর সরকারি বাসভবনে ফিরে যান সরকারের নিরাপত্তার মিথ্যা আশ্বাসে, কারণ ফিরে যাওয়ার পর তাঁকে বাইরের কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না। আমিও পারিনি, কারণ সরকারিভাবে আমি আর তাঁর সহকারী ছিলাম না।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, আবু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
কিছুদিন পর কামরুজ্জামান আর তাঁর তিন সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলীকে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে বন্দী করে মোশতাক সরকার। এর দুই মাস পর এই চার জাতীয় নেতা জেলখানায় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হত্যার শিকার হন। ঢাকা থেকে দূরে এক জেলা শহরে বসে যখন এ হত্যার কথা শুনি, আমার কানে বাজতে থাকে আমার মন্ত্রীর কথা, ‘মোশতাককে চিনি বলেই বলছি তোমাকে, মোশতাক আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না, আমাদের সবাইকে খুন করবে।’
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা।

চীনে তৈরি প্রথম যাত্রীবাহী বিমান

চীন সরকার সোমবার সাংহাইয়ে তাদের প্রথম যাত্রীবাহী বৃহৎ বিমান উন্মুক্ত করেছে। দেশটির পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৪ হাজার কর্মকর্তা ও অতিথির উপস্থিতিতে ‘দ্য কমার্শিয়াল এয়ার ক্রাফট অব চায়না (সিওএমএসি)’ দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট সি-৯১৯ নামের যাত্রীবাহী বিমানটি উন্মুক্ত করে। খবর এপি ও রয়টার্স। চীনে বিমানের ক্রমবর্ধমান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ও এয়ারবাস কোম্পানি। এজন্য চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি বিদেশী কোম্পানির অবস্থান শিথিল করতে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির বেসামরিক বিমান সংস্থার প্রধান লি জিয়াচিং সরকারি ও শিল্প কর্মকর্তাদের এক সভায় বলেন, চীনের বিমান পরিবহনশিল্প শুধু আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং বৃহৎ দেশ হিসেবে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। প্রথমবারে মতো উন্মুক্ত হওয়া এ যাত্রীবাহী বিমানটি ৩৯ মিটার লম্বা,
যা সবুজ রঙা লেজসহ সাদা রঙের ক্যানভাসে মোড়ানো। বিমানটির নির্মাতা কোম্পানি সিওএমএসি’র চেয়ারম্যান জিন ঝুয়াংলং বলেন, ‘২০১৬ সালেই বিমানটি তার প্রথম যাত্রা শুরু করবে।’ ৭ মাসের কঠোর প্রচেষ্টায় যাত্রীবাহী এ বিমানটির ব্যয়ে ৭.৯ বিলিয়ন ডলার অর্থ সরবরাহ করেছে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না। এরই মধ্যে ২১ জন ক্রেতার কাছ থেকে আরও ৫১৭টি সি৯১৯ মডেলের বিমান তৈরির অর্ডার পেয়েছে। অধিকাংশ অর্ডারগুলো দেশীয় বায়ারদের কাছ থেকে হলেও থাইল্যান্ড সিটি এয়ারওয়েজ ১০টি বিমানের অর্ডার দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোম্পানিটি বলছে, ২০১৯ সালের মধ্যে ওই অর্ডারগুলো সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ৭৩৭ এবং এয়ারবাস এ-৩২০ বিমানের রেকর্ড ভেঙে নতুন আরও ৬ হাজার ৩৩০টি যাত্রীবাহী সি-৯১৯ বিমান তৈরি করবে চীন।

এরদোগান : লেবু বিক্রেতা থেকে প্রতাপশালী সুলতান!

তুরস্কের রাস্তায় লেবু বিক্রি করতেন তিনি। বাবা ছিলেন তুর্কি কোস্টগার্ডের সদস্য। এখন তিনি তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তিনি রিসেপ তায়েপ এরদোগান। ৬১ বছর বয়সী এই মানুষটি এবার তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্তে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) নির্বাচনে আবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় ১৩ বছরের শাসনকে প্রলম্বিত করার সুযোগ পেলেন। বলা হচ্ছে, তুমুল জনপ্রিয়তার এ সুযোগ নিয়ে তুর্কিদের ওপর প্রতাপশালী নয়া সুলতান হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন এরদোগান। এবার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মার্কিন স্টাইলের সর্বক্ষমতাসম্পন্ন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন তিনি। এভাবে গণতান্ত্রিক উপায়েই ‘এক ব্যক্তির শাসন’ প্রতিষ্ঠায় উচ্চাভিলাষী এরদোগান। ১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে। ১৩ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে আসেন। সেখানে রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু, তিল ও ঝুটি। পরবর্তী সময়য পড়ালেখা করেছেন ব্যবসায় প্রশাসনে। জড়িয়ে পড়েন ইসলামী আন্দোলনে। ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। দেড় কোটি মানুষের শহর ইস্তাম্বুলে তখন তিনি যানজট ও বায়ুদূষণ রোধ করে নগরের চেহারা পাল্টে দেন। তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তিনি বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন।
সেখানে একটি ধর্মীয় কবিতা আবৃত্তির কারণে চার বছরের জেল হয় তার। কবিতাটি ছিল- ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়নেট এবং বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক।’ এরদোগানের দীর্ঘদিনের মিত্র আবদুল্লাহ গুল ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ২০০১ সালে একেপি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০২ সাল থেকে এ দলটি প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে। জেল খাটার অতীত থাকায় প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি তিনি। পার্লামেন্টে নতুন আইন পাসের মাধ্যমে ২০০৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। গত বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। লম্বা স্লিম মধ্যবয়স্ক এরদোগান রাজনীতিতে এক ভিন্নধর্মী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিন বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন কোনো মুসলিম দেশে প্রেসিডেনসিয়াল সফরে গেলেন, তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম পাঁচ মিত্র দেশের অন্যতম বলে উল্লেখ করলেন। এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।’ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন। কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্ম পালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐতিহ্য ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন। এরদোগান সেই ক্ষত সারিয়ে বলেছেন, ধর্ম পালনে কাউকে বাধ্য যেমন করবেন না, তেমনি ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা না দিতে পারে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, অনেক আগেই তিনি গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে এসেছেন। ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে ১১৫০ রুমবিশিষ্ট বিলাসবহুল প্রেসিডেন্ট প্যালেস বানানো তার কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতালিপ্সার দৃষ্টান্ত। ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক আসলি আইদিনতাসবাস বলেন, ‘নির্বাচনে একেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা এটাই নির্দেশ করে যে, জনগণ এরদোগানের কর্তৃত্ববাদী শাসন অনুমোদন করেছেন। এখন তিনি পুতিন স্টাইলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করবেন।’ তুর্কিদের একাংশ এরদোগানকে ‘বুয়ুক উস্তা’ বা ‘বড় মাস্টার’ বলে থাকেন। তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন সুলতান হিসেবে। কেউ কেউ বলে থাকেন, ‘এরদোগান দ্য লাস্ট ডিক্টেটর’।

পাট রফতানি বন্ধ

আজ থেকে আগামী এক মাস সব ধরনের কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সোমবার মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি ঠেকানো এবং পলিথিনির পরিবর্তে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়,
আইন অনুসারে পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ৩ নভেম্বর থেকে এক মাস পর্যন্ত সব ধরনের কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ রাখা হল। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হল। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর গড়ে ৭৮ লাখ বেল পাট উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে ১৭ লাখ বেল রফতানি হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় করে বাংলাদেশ। তবে মধ্যস্বত্বভোগীরা কাঁচাপাট মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়।

যাও খেলে এসো : শিশিরই পাঠিয়ে দিলেন সাকিবকে

সবকিছু ঠিক থাকলে ২২ নভেম্বর কন্যাসন্তানের বাবা হতে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান। সন্তানসম্ভবা স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরকে যুক্তরাষ্ট্রে রেখেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে চলে এসেছেন সাকিব। চেয়েছিলেন থেকে যেতে। শিশির সাকিবকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাল অনুশীলন শেষে মিরপুর স্টেডিয়ামে সাকিব বলেন, ‘স্ত্রীর সাহায্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ও (শিশির) আমাকে বলেছে, খুব বেশি প্রয়োজন হলে আবার আসতে পারবা।’
জিম্বাবুয়ে সিরিজ না খেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেই নাকি সাকিবের মনটা বেশি খারাপ হতো। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে না খেললে কি হতো না? সাকিব বলেন, ‘না এলেও হতো। কিন্তু ও (শিশির) বলেছে, এখানে বসে খেলা দেখলে তোমার যে চেহারার অবস্থা হবে, সেটা আমার দেখার দরকার নেই। এর চেয়ে ভালো তুমি যাও খেলে এসো। এমনিতে সব সময় কথা হচ্ছে। ওরা সুস্থ আছে। ভালোভাবে সিরিজটি খেলে যেতে পারলে ভালো।’ এই বাঁ-হাতি অলরাউন্ডার প্রথমবার বাবা হওয়া নিয়ে যেমন উত্তেজিত, তেমনি জিম্বাবুয়ে সিরিজ নিয়েও ভাবনা রয়েছে তার। প্রয়োজন হলে দু’একটা ম্যাচ বাদ দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে পারেন সাকিব। তিনি বলেন, ‘সিরিজ নিয়ে এমনিতেই উত্তেজিত, ওই বিষয়টা (বাবা হওয়া) নিয়েও উত্তেজিত। উত্তেজনার মাত্রা হয়তো বেশি! প্রয়োজনে হয়তো দু’একটা ম্যাচ বাদ দিতে হতে পারে। সেটা নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।’ অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তার অজুহাতে সফর স্থগিত করেছে। জিম্বাবুয়ে আসায় বাংলাদেশের জন্য ভালো হয়েছে বলে মনে করেন সাকিব। তিনি বলেন, ‘এই সিরিজ হওয়াটা ভালো। জিম্বাবুয়ে এ সময়ে এসে আমাদের দারুণ সাহায্য করল। একটা দেশ সিরিজ স্থগিত করেছে। তারপর অন্য কোনো দলের আসাটা বড় ব্যাপার। ক্রিকেট নিয়ে আমাদের এখানে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। ক্রিকেট নিয়ে আমাদের এখানে কোনো সমস্যাও হবে না।’ পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় তিনটি দলের বিপক্ষে হোম সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। র‌্যাংকিংয়ে ১০ নম্বরে থাকা জিম্বাবুয়ের সঙ্গেও খেলাটা ভালো হবে বলে আশা করছেন সাকিব। তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ওদের সঙ্গে আমরা ভালো খেলেছি। এখনও আমাদের ভালো খেলার চিন্তা।
লক্ষ্য থাকবে যাতে ওদের চাপে ফেলে খেলতে পারি। চ্যালেঞ্জটা দিন দিন পরিবর্তন হতে থাকে। ওদের সঙ্গে যেহেতু আমরা নিয়মিত ভালো খেলি, এ কারণে এবার প্রভাব বিস্তার করে খেলতে চাই। যেভাবে বড় দল কোনো ছোট দলের সঙ্গে খেলে।’ সাকিব বলেন, ‘এ বছরের পুরোটা সময় আমরা ভালো খেলেছি, শেষটাও ভালো করতে চাই। আত্মবিশ্বাস আছে। ওদের সঙ্গে ভালো করতে পারলে আমাদের সবচেয়ে সফলতার বছর হবে। সবাই সিরিজের জন্য মুখিয়ে আছে।’ এদিকে বিপিএলের দল নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার রংপুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকছে। ওরা আমাকেই প্রথম ডেকেছে। এখনও ওদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি। ফোনে কথা হয়েছে। আপাতত লক্ষ্য জিম্বাবুয়ে সিরিজটা ভালোভাবে শেষ করা।’ সোমবার জিম্বাবুয়ে দল ঢাকায় পৌঁছেছে। শনিবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে খেলতে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।

হাছন রাজায় তুষ্ট তুষ্টি

গত এক বছর ধরেই অপেক্ষা করছিলেন অভিনেত্রী শামীমা তুষ্টি। শুটিং, ডাবিং, এডিটিং সবই শেষ হয়েছে। এখন দর্শকের সামনে আসার পালা। বলা হচ্ছে, তুষ্টি অভিনীত নতুন ছবি ‘হাছন রাজা’র কথা। রুহুল আমিনের পরিচালনায় ছবিটি এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। সব কাজ এরই মধ্যে শেষ। আগামী জানুয়ারিতেই বড় পর্দার দর্শকের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন তুষ্টি। কলকাতার কিংবদন্তি অভিনেতার বিপরীতে এ ছবির দুই নারী চরিত্রের মধ্যে একজন হলেন তুষ্টি। অন্যজন কলকাতারই জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা সেন।
এ ছবি প্রসঙ্গে তুষ্টি বলেন, ‘ছবির শুটিং সময় থেকে বলে আসছি এটি নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। আমার ক্যারিয়ারে কয়েকটি ভালো কাজের মধ্যে হাছন রাজা একটি। এখানে অভিনয় করতে গিয়ে একজন গুণী অভিনেতার কাছাকাছি যেতে পেরেছি। পাশাপাশি হয়েছে নতুন সব অভিজ্ঞতাও। আর এ মুহূর্তে এটা জেনে আনন্দিত, ছবিটি খুব শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছে। আশা করছি ভালো একটি ছবি দর্শক দেখতে পাবেন।’ এদিকে বর্তমানে একাধিক ধারাবাহিকে অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত আছেন এ অভিনেত্রী। এর মধ্যে রয়েছে ‘অলসপুর’, ‘উত্তর পুরুষ’, ‘খড়কুটা’, ‘আলাল দুলাল’, ‘নন স্টপ’, ‘লেক ড্রাইভ লেন’ ও ‘মায়ার খেলা’।

আমরা শূন্যের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজছি -সাক্ষাৎ​কার : আবুল কাসেম ফজলুল হক by শরিফুজ্জামান

দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজনের সন্তান লেখক, অপরজনের সন্তান ওই লেখকের বইয়ের প্রকাশক। দুজনের সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুষ্কৃতকারীরা। সন্তানহারা এই দুই পিতার সাক্ষাৎ​কার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো: আপনি ছেলে হত্যার বিচার চান না কেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিচার চেয়ে আর কী হবে? এ দেশে রাজনৈতিক সমাধান যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ আইনগত কোনো সমাধান সম্ভব না। আমরা শূন্যের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজছি। এটা পাওয়া সম্ভব না। আমার কাছে মনে হয়, আগে এটা আদর্শগত ও রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।
প্রথম আলো: আপনি কি আবেগ বা ক্ষোভ থেকে বিচার প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেমনটি একের পর এক সাংবাদিক খুন হওয়ার পর খুলনার সাংবাদিকেরা বিচার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?
ফজলুল হক: শোনো, এটা মোটেও আবেগ বা ক্ষোভের বিষয় নয়। আমি এটা ভেবে ও নিজের যৌক্তিক বিবেচনাবোধ থেকে বলেছি। কেন বলছি—সেই জবাব এখন তোমাকে দেব না। দীপনের জানাজা ও দাফন হয়ে যাক। এরপর কোনো এক সময় বলব। এখন এটুকু বলতে পারি, বিচার দিয়ে বা আইন-আদালত দিয়ে আমরা একজনকে শাস্তি বা জেল-ফাঁসি দিতে পারি। কিন্তু যদি দেশের সার্বিক উন্নতি না হয়, সবার বিচার তো আর হবে না।
প্রথম আলো: ছেলে হত্যার ঘটনায় মামলা করবেন কি না?
ফজলুল হক: নিয়ম অনুযায়ী মামলা করব। আমি আইন মেনে চলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, একটা দরখাস্ত লিখে দিতে। আমি আজ না পারলে আগামীকাল লিখে দেব। তবে তার মানে এই নয় যে, আমি এটার ওপর নির্ভর করি। আমি শুভ বুদ্ধির জাগরণ চাই। সেই জাগরণ হতে হবে সমাজে, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।
প্রথম আলো: একের পর এক ব্লগার খুন হওয়ার এখনকার এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
ফজলুল হক: এর জবাব দেওয়ার আগে তুমি আমাকে বলো, কেউ কি এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায়? কেবল আইনের বিচারে একের পর এক হামলা বা হত্যার সমাধান হবে না, এ সংকট থেকে বাঁচতে আদর্শগত রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা বামপন্থী—কেউই কি এখনকার পরিস্থিতি থেকে বের হতে চায়? আমরা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম, তা পেয়েছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম, সেটিও পেয়েছি। কিন্তু এরশাদবিরোধী আন্দোলন করে যে গণতন্ত্র আমরা চেয়েছি, সেটি পাইনি। কারণ ওই চাওয়ার মধ্যে ভুল ও বিভ্রান্তি ছিল। সেই ভুলের খেসারত আজও আমরা দিচ্ছি। আমরা তখন গণতন্ত্রের কথা বলেছি, সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু করেছি আবার মুছে ফেলেছি। কিন্তু কোনো চাওয়াই পূর্ণতা পায়নি।
প্রথম আলো: তাহলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কি ঠিক ছিল না?
ফজলুল হক: স্বৈরাচারের পতন দরকার ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন হয়েছিল নানা শক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে, সামনে ছিল সুশীল সমাজের কিছু লোকজন। ফলে ত্রুটিপূর্ণ ওই আন্দোলনের চরিত্র অনুযায়ী এখন দেশ চলছে। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকের নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এর চেয়েও খারাপ অবস্থা তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলো: এখান থেকে ফেরার উপায় কী?
ফজলুল হক: আমাদের মুক্তি ও উন্নতির জন্য ২৮ দফা কর্মসূচি নিয়ে স্বদেশ চিন্তা সংঘ অনেক দিন ধরে কাজ করছে। আমরা বলছি, নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্র থেকে বের হতে হবে। তা না হলে সব মানুষের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত হবে না। এমন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে, যারা শুধু ঐক্যের কথা বলবে না, কাজেও এর প্রমাণ দেবে। অনেকেই কথায় কথায় আজকাল বলেন, ঐক্য দরকার। কিন্তু আমার প্রশ্ন—তাঁরা কি আসলেই এটা চান। চাইলে এত দিনেও তা হয় না কেন? আমাদের এখন একটি সংকল্প ও কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, ওই ঐক্য যেন লুটপাট ও ভাগাভাগির জন্য না হয়।
প্রথম আলো: রাজনীতির কথা বললেন, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে মানুষের করণীয় কী?
ফজলুল হক: রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি—যে যেখানে আছি সবক্ষেত্রেই আত্মনির্ভরতা ও আত্মশক্তির চর্চা করা দরকার। আমরা এখনো পরিচালিত হচ্ছি বাইরের শক্তি দিয়ে। এর অবসান ঘটাতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। আমার মনে হয়, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের জন্য ভালো করছেন না। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া দরকার।
প্রথম আলো: ছেলের সম্পর্কে কিছু বলবেন?
ফজলুল হক: ও কারও সঙ্গে কোনো দিন খারাপ ব্যবহার করেছে, এটা শুনিনি। জ্ঞানত কারও ক্ষতি করেনি। ওর টাকাপয়সার প্রতি মোহ ছিল না। যতটুকু দরকার ততটুকু পেলেই সন্তুষ্ট থাকত। ধর্ম নিয়ে কখনোই বাড়াবাড়ি করেনি। শুধু অভিজিতের বই প্রকাশ করায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ফয়সল আরেফিনকে দাফনের সময় দাঁড়িয়ে শোকবিহ্বল বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (সামনে ডান থেকে তৃতীয়) l প্রথম আলো

চুপচাপ থাকলে চলবে না, মাঠে নামতে হবে -সাক্ষাৎ​কারে : অজয় রায় (অভিজিৎ​ রায়ের বাবা) by শরিফুজ্জামান

দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজনের সন্তান লেখক, অপরজনের সন্তান ওই লেখকের বইয়ের প্রকাশক। দুজনের সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুষ্কৃতকারীরা। সন্তানহারা এই দুই পিতার সাক্ষাৎ​কার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো: স্যার, কেমন আছেন? অবসর কীভাবে কাটছে?
অজয় রায়: কেমন আছি বুঝতে পারছি না। গতকাল শেরপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন স্থানীয় প্রবীণ ফটোসাংবাদিকের হাতে বিভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করা কিছু অর্থ দিয়ে এলাম। আসার পথে কয়েকজন ফোনে জানাল, দীপনকে মেরে ফেলা হয়েছে। ইশ্‌! একের পর এক ওদের মেরে ফেলা হচ্ছে। আমরা ওদের রক্ষা করতে পারছি না।
প্রথম আলো: আজ কী করবেন?
অজয় রায়: সকাল থেকে বারবার বাইরে যেতে মন চাইছে। কিন্তু পরিবার থেকে আমাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, বাইরে যাওয়াটা আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করছি গতকাল থেকে। কিন্তু পাচ্ছি না। কী বা আর বলব? সেও আমার মতো এক হতভাগ্য বাবা। অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য দীপনকে মরতে হলো। অভিজিতের বইয়ের আরেক প্রকাশক টুটুলও অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ওকেও দেখতে যাওয়া দরকার।
প্রথম আলো: এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করব?
অজয় রায়: দেশটা তো রসাতলে চলে গেল। এখন আর চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। উনসত্তরের কথা মনে করতে হবে। ওই রকম গণ-অভ্যুত্থান দরকার। কিন্তু মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মোজাফ্ফর (ন্যাপ) সাহেবের মতো নেতা দরকার। সেই নেতৃত্বের শূন্যতা এখন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। আন্দোলন শুরু হলে নেতা তৈরি হবে।
প্রথম আলো: তত দিন কি সবাই চুপ করেই থাকবে?
অজয় রায়: এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো এগিয়ে আসত। ছাত্র সংগঠনগুলো নেমে পড়ত। ছাত্র সংগঠনগুলোর এখনকার অবস্থা আর নাইবা বললাম। কিন্তু শিক্ষক সমিতিগুলোও শিক্ষকদের রাজনৈতিক বিভক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে। এখন তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ফেসবুকে থাকলে হবে না, প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামতে হবে। শিক্ষকদেরও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মাঠে নামতে হবে। যে পরিস্থিতির দিকে দেশ যাচ্ছে, তাতে কেউই এখন আর নিরাপদ নয়।
প্রথম আলো: অভিজিৎ হত্যার বিচার কত দূর?
অজয় রায়: এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে ১৫-২০ দিন আগে গোয়েন্দা বিভাগে গিয়েছিলাম। সেখানে ঢোকাও কঠিন কাজ। তারপরও গেলাম মামলার অগ্রগতি জানতে। গোয়েন্দারা বললেন, পাঁচজনকে নাকি শনাক্ত করেছে। এদের দুজন হত্যাকারী, একজন অভিজিতের চলাফেরা অনুসরণ করত। বাকি দুজন নিলয় হত্যার সঙ্গে জড়িত।
প্রথম আলো: একের পর এক ব্লগার হত্যাকারীদের সঙ্গে কারা জড়িত বলে মনে করেন?
অজয় রায়: এদের একটি চক্র আছে। ওই চক্রের কিলার সেলে ১৫-২০ জন করে সদস্য আছে বলে মনে হয়। তারা দলনেতার নির্দেশ মেনে চলে। ওদের কী দুঃসাহস ভাবতে পারেন? আগে পথেঘাটে মারত। এখন বাসায় ঢুকে মারে, অফিসে ঢুকে মারার পর দরজা বন্ধ করে রেখে যায়।
প্রথম আলো: সরকারের ভূমিকা কেমন দেখছেন?
অজয় রায়: সরকার তো সবকিছু স্বাভাবিক আছে—এমনটি দেখাতে চায়। আর রাষ্ট্র একটি নিষ্ক্রিয়তার ভাব ধরে আছে। ব্লগারদের বিরুদ্ধে যেভাবে অপপ্রচার হচ্ছে, তাতে অনেকের ধারণা যে, তারা নাস্তিক এবং ধর্মের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে যারা ব্লগে ও ওয়েবে নিজের মত প্রকাশ করে, তারাই ব্লগার। তারা দেশ বা ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বললে বা লিখলে তো প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্লগার হোক, নন ব্লগার হোক—তাদের প্রাণ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু আমার প্রশ্ন, সরকার কি প্রাণ রক্ষার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে দেওয়া পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, টার্গেটেড কিল হলে তাকে রক্ষা করা যায় না। আমার প্রশ্ন, একজন আইজিপি কি প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে পারেন? এতে খুনিরাই তো উৎসাহিত হবে। টুটুল তো টার্গেট ছিল। সেও জানত, পুলিশও জানত। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে। কিন্তু পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
প্রথম আলো: কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হতে পারে?
অজয় রায়: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা। বিচার না হওয়ায় একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে খুনের এই ধারাবাহিকতা থামবে না। তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। কত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। যদি তদন্তে টুকটাক ভুলও হয়, তা আদালতে শোধরানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু অভিযোগ তো গঠন করতে হবে, বিচার তো শুরু করতে হবে। নইলে জঙ্গিরা আশকারা পেতে থাকবে।
প্রথম আলো: সরকার তো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করার কথা বলেছে। বেশ কিছু গ্রেপ্তার হয়েছে, বিচারও চলছে।
অজয় রায়: সরকার কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যে মোটেও কার্যকর হচ্ছে না, তার প্রমাণ একের পর নৃশংস গুপ্তহত্যা। আসলে আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সবার আগে ভোটের চিন্তা করে। এমনকি আওয়ামী লীগও মনে করে, যদি জামায়াত বা ইসলামি দলের কিছু ভোট পাওয়া যায়। যদিও তাদের একটি ভোটও আওয়ামী লীগ কোনো দিন পাবে না।
প্রথম আলো: আপনার ছেলের বউ কেমন আছেন?
অজয় রায়: রাফিদা শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দেশে আসতে চায়। আমিই না করেছি। কারণ সেও তো তিন নম্বর টার্গেট। সম্প্রতি চাকরি ছেড়ে গবেষণা শুরু করেছে। ওই গবেষণার জন্য দেশে আসার দরকার ছিল। আমি না করায় বলল, তাহলে আমাকেই ওর গবেষণাকাজে সহায়তা করতে হবে। আমি ওকে বললাম, এই মানসিক অবস্থার মধ্যে তুমি গবেষণা করতে পারবে? রাফিদার জবাব, কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে। ওর মেয়েকেও ওকে দেখাশোনা করতে হয়। বুঝলে, একটি মৃত্যু কতজনের জীবনকে কতভাবে প্রভাবিত করে!

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলার বাদী নিহত by এম এ মজিদ

ওয়েষ্টমন্ট পাওয়ার গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করে বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচিত ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম ফারুক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে হবিগঞ্জের গ্রামের বাড়ি থেকে পাজেরো গাড়িতে করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ওঠার সময় একটি মালবাহী ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে তাজুল ইসলাম ফারুককে বহনকারী গাড়িটি ধুমড়ে মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পথে ভৈরবের কাছে তিনি মারা যান।
এ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বড়বড় গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে সড়ক অবরোধ করেন তারা। এসময় প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
২০০৪ সালে বন্যার্তদের মাঝে লাখ লাখ টাকা বিতরণের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন তাজুল ইসলাম ফারুক। ২০০৮ সালের শুরুতে তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে মামলা দায়ের করে তিনি বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচনায় আসেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি খারিজ করে দেয়া হয়।
২০০১ সালের নির্বাচনে হবিগঞ্জ সদর আসনের প্রার্থী সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম শাহ এএমএস কিবরিয়ার নির্বাচনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন তাজুল ইসলাম ফারুক।
এবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাজুল ইসলাম ফারুক দৃশ্যত আত্মগোপনে চলে যান। বেশির ভাগ সময় তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। এলাকার মসজিদ মন্দিরে দান-খয়রাত, গরীব অসহায়দের পাশে দাড়ানো, এলাকার শত শত যুবক-যুবতীকে চাকরি দেয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয়পাত্র ছিলেন তাজুল ইসলাম ফারুক।
শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি এজাজ আহমেদ শিল্পপতি তাজুল ইসলাম ফারুক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

৪৮ ঘণ্টা পর মামলা, ভরসা সিসিসির ফুটেজ

‘দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, আস্থা আছে, তবে চলমান বিচারের প্রতি ভরসা নেই।’ ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর গতকাল সোমবার দুপুরে ছেলের হত্যার এজাহার লিখতে লিখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয়ে বসে এ কথা বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিনের (দীপন‍) বাবা তিনি। গত শনিবার আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতির কার্যালয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ফয়সলকে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, তাই মামলা করছেন জানিয়ে অধ্যাপক ফজলুল হক বলেন, ‘দেখেন, গত পাঁচ বছরে কোনো মামলার রায় হয়েছে কি না। আর দু-একটি রায় হলেও সেগুলো কার্যকর হয়েছে কতটুকু।’
মামলা লেখা শেষে শাহবাগ থানায় গিয়ে তা জমা দেওয়া হয়। মামলার বাদী হয়েছেন ফয়সলের স্ত্রী রাজিয়া রহমান। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। একই দিনে লালমাটিয়ায় হামলার ঘটনায় গতকাল মোহাম্মদপুর থানায় আরেকটি মামলা করেছেন প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী (টুটুল)। আহমেদুরসহ তিনজনকে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। তিনজন এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, হাসপাতাল থেকে আহমেদুরের স্বাক্ষর নিয়ে মামলাটি করা হয়েছে। এই মামলায়ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। হামলার দুই দিন পরে এ দুটি মামলা করা হলো।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ফয়সল আরেফিনকে হত্যার অভিযোগে তাঁর স্ত্রী রাজিয়া রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করেগতকাল দুপুরে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ৩। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, লালমাটিয়ায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আহমেদুর বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেছেন। তবে এ দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছে দুই থানা পুলিশ।
ঘটনার শুরু থেকেই মামলার ছায়া তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা আজিজ সুপার মার্কেটের কয়েকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছেন। তবে এখন পর্যন্ত সেসব ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজন কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি। লালমাটিয়ায় যে বাড়িটিতে শুদ্ধস্বরের কার্যালয়, তার আশপাশের কয়েকটি বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা থেকেও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল লালমাটিয়া সি-ব্লকের ওই বাড়িটিতে গিয়ে দেখা গেছে, তিনটি পরিবার ছাড়া বাড়িটির আর সব ফ্ল্যাটে তালা মারা। বাড়িটিতে কোনো নিরাপত্তারক্ষী বা পুলিশ নেই। মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বিনা বাধায় ওপরে ওঠা যায়। ওপরে ওঠার সিঁড়িতে রক্তমাখা জুতার ছাপ কিছুটা ঝাপসা হয়ে এসেছে।
বাড়িটির ছাদে দুটি পরিবার থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাসিন্দা বলেন, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তির শব্দ শুনেছেন। পরে ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার শুনেছেন। কিন্তু শহরে কে আর কার বিপদে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়? তাই তিনি ও তাঁর পরিবারের কেউ সাহস করে নিচে নামতে পারেননি। রক্তাক্ত একজনকে পুলিশ যখন হাসপাতালে নিয়ে যায়, তখন ছাদ থেকেই সে দৃশ্য দেখেছেন। বড়দের মুখে বিভিন্ন কথা শুনতে শুনতে তাঁর মেয়েটি (ছয় বছর) অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তবে চাইলেই তো আর বাসা পাল্টানো সম্ভব নয়। ছাদ থেকে নামার পথে ছাদে বসবাসকারী আরেকজনের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। জানালেন, ঘটনার দিন তিনি বাড়ি ছিলেন না। তবে দিনদুপুরে এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর থেকেই ‘গা ছমছম’ করছে।
এদিকে ফয়সল হত্যার পর থেকে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার থেকে তিন দিন দোকান বন্ধ করে শোক ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন মার্কেটটির ব্যবসায়ীরা। এর অংশ হিসেবে গতকালও মার্কেটের ৫৭০টি দোকান ও কার্যালয় বন্ধ ছিল। প্রতিবাদের কালো কাপড়ে ছেয়ে আছে ভবনটি। গতকাল মার্কেটের এক, দুই আর তিনতলায় দোকানগুলোর নামফলকও কালো কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে। মার্কেটের প্রবেশপথগুলো সব বন্ধ। সেখানে বসে আছেন সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা। পূর্ব প্রান্তের প্রবেশপথ দিয়ে কেবল মার্কেট-সংশ্লিষ্ট লোকজনদের ঢুকতে দিচ্ছেন চারজন পুলিশ সদস্য। তাঁদের সঙ্গে আছেন মার্কেটের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরাও। আর যেখানে ফয়সলকে হত্যা করা হয়েছে, সেই জাগৃতির কার্যালয়ের সামনে হলুদ নিরাপত্তা ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। দুজন পুলিশ সদস্য সেই জায়গাটিও পাহারা দিচ্ছেন। শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর জানান, এক প্লাটুন পুলিশ আজিজ সুপার মার্কেটের পাহারায় রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থা আরও কয়েক দিন থাকবে।