Wednesday, July 15, 2026

শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে: নাহিদ

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে ফেরা মাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফ্‌ফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নাহিদ ইসলাম এ কথাগুলো বলেন। এই আলোচনা সভার আয়োজন করে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

আলোচনা সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার মামলার রায় যখন হয়েছে, আপিল করার সুযোগ ছিল ৩০ দিন। সেই ৩০ দিনে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কেউ আপিল করে নাই। ফলে শেখ হাসিনার মামলার রায়ে কোনো আপিলের সুযোগ নাই।’

আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার দেখেছি, যেখানে বলেছেন ডিসেম্বরে দেশে আসবেন, আত্মসমর্পণ করবেন। আমরা জানি, ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মাস; ডিসেম্বরেই সবাই আত্মসমর্পণ করে। তো শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসবেন কি না, কবে আসবেন—এটা বাংলাদেশ সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, গতকাল সরকারের জায়গা থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে, যে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের আসলে কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) আসবেন এবং তাঁকে আসা মাত্রই এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং তাঁর রায় কার্যকর করা হবে।’

এ বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলার সময় উনার স্বভাবসুলভ একটা নোক্তা রেখেছেন, একটা ফাঁক রেখেছেন। সেটা হলো আপিল করা যাবে কি না, সেটা আইন দেখবে। তিনি বলেন, আপিল করা যাবে না।

এ সময় ২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ওই দিনের হামলাকারীদের তালিকা প্রকাশ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষক ওই হামলাকে সমর্থন বা বৈধতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে সরকার’

সংস্কার প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বর্তমান সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাঁর অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গুমবিরোধী অধ্যাদেশ, পুলিশ সংস্কার, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়সহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে। নতুন সংবিধান বা সাংবিধানিক পুনর্গঠনের দাবিকেও সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে রাজনীতি হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘জুলাই নিয়ে অবশ্যই রাজনীতি করতে হবে। কারণ, নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে জুলাইয়ের রাজনীতি। আমরা আর স্বৈরতন্ত্রে ফেরত যাব না, আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাব। আমরা বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চাই; স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ চাই।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শৃঙ্খলা বিভাগের প্রধান ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আলোচনা সভা শেষে বিজয়ী শিশুদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

 ‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১৫ জুলাই ২০২৬
‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১৫ জুলাই ২০২৬ ছবি: নোমান ছিদ্দিক

মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে কী বললেন আহমাদিনেজাদ

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাঁকে ইরানের ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করেছিল এবং তিনি গৃহবন্দী অবস্থানে আছেন—একটি প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক টাইমসের এমন দাবি গতকাল মঙ্গলবার প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি বলেছেন, ‘এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

আহমাদিনেজাদের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে উল্টো অভিযোগ করে বলা হয়, জনমতকে বিভ্রান্ত করা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দেওয়ার লক্ষ্যে নিউইয়র্ক টাইমস মনগড়া এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে আহমাদিনেজাদকে গৃহবন্দী করে রাখার দাবিও অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁর কার্যালয়ের দাবি, সংবাদপত্রটি নিজেদের ‘অবাস্তব’ দাবির পক্ষে সমর্থনের জন্যই মনগড়া এ (গৃহবন্দী) অভিযোগ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে যেসব দাবি করা হয়েছে তার সবই সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং আমরা এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’

নিউইয়র্ক টাইমস গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতায় রাজি করানোর চেষ্টা এবং তাঁকে ইরানের নেতৃত্বের জন্য সম্ভাব্য একজন প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বর্তমানে গৃহবন্দী রয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার পর দেশটিতে সরকার পরিবর্তন ঘটানোর বৃহত্তর ইসরায়েলি চেষ্টার অংশ ছিল এ পরিকল্পনা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল গোপনে আহমাদিনেজাদের বাসস্থান ও ভ্রমণ খরচের জন্য অর্থ প্রদান করেছে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিদেশে বেশ কয়েকবার তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে বুদাপেস্ট সফরের সময়ের বৈঠকও রয়েছে।’

সংবাদপত্রটি আরও দাবি করেছে, এ চেষ্টার চূড়ান্ত পর্যায় ঘটে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতে। সে সময় ইরানে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহমাদিনেজাদকে তেহরান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এবং তাঁকে দেশটির নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল আহমাদিনেজাদের বাসভবনকে নিশানা করে একটি বিমান হামলা চালায়। হামলায় তাঁর দেহরক্ষীদের ভবন ও বুলেটপ্রুফ একটি গাড়ি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

ইরানের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে আরও দাবি করা হয়, হামলার পর ঘটনাস্থলে একটি কালো রঙের প্যুজো গাড়ি এসে আহমাদিনেজাদকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।

অভিযান সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মোসাদের সদস্যরা গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। তাঁরা আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরে একটি গোপন নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যান।

তবে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এ তড়িঘড়ি উদ্ধার অভিযানে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ। একই সঙ্গে তাঁকে আবার ক্ষমতায় বসানোর ইসরায়েলের পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল।

২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। গত সপ্তাহে তাঁর জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হয়। আহমাদিনেজাদ জানাজায় অংশ নিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটাই ছিল জনসমক্ষে তাঁর প্রথমবার উপস্থিত হওয়া।

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আহমাদিনেজাদ। একজন সংস্কারবাদী এবং কট্টর ইসরায়েল ও মার্কিনবিরোধী নেতা হিসেবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।

প্রসঙ্গত, মানচিত্র থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলার ঐতিহাসিক আহ্বানটি জানিয়েছিলেন ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। পরে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ একটি সম্মেলনে খোমেনির এ বক্তব্য আবার উদ্ধৃত করে নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেন। সংবাদমাধ্যমগুলোতে তাঁর এ বক্তব্যটি ইংরেজিতে ‘wipe Israel off the map’ (মানচিত্র থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলা) হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মণিপুর–নাগাল্যান্ডে নাগা-কুকি সংঘর্ষে জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি, তিন সেনাসদস্য নিহত by শুভজিৎ বাগচী

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্তত দুটি রাজ্য নাগাল্যান্ড এবং মণিপুরের পরিস্থিতি ক্রমশ নাজুক হয়ে উঠছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে কুকি-জো সম্প্রদায় ও নাগাদের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। দুপক্ষের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের পাশাপাশি আক্রমণ হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রধান নিরাপত্তা বাহিনী আসাম রাইফেলসের ওপর। গত সাত দিনে দুটি আক্রমণে আসাম রাইফেলসের অন্তত তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। দুই সম্প্রদায়ের সংঘাতের জেরেই নিরাপত্তারক্ষীদের মৃত্যু হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মী

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে। মণিপুরের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, উত্তর মণিপুরের সেনাপতি শহরে সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে বাধা দেওয়া হয়েছে। আসাম রাইফেলস যাতে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি শিবিরে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হামলা চালিয়েছে ‘মব’ বা উত্তেজিত জনতা। তারা আসাম রাইফেলসের ক্যাম্পে পাথর ছোড়ে, ভাঙচুর করে ও আগুন দেয়।

উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং অন্তত দুটি ট্রাক উল্টে দেয়। আক্রান্ত হন স্থানীয় বাসিন্দারাও। আসাম রাইফেলস, ভারতের সেনাবাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসন বিষয়টিকে ‘রাষ্ট্রের ওপর হামলা’ হিসেবে দেখছে।

সেনাপতি জেলায় ​নাগা সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠী লিয়াংমাই নাগাদের গ্রাম ওক্লং। আসামের প্রধান বিদ্রোহী সংগঠন ন্যাশনাল সোসালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-আইজাক-মুইভার (এনএসসিএন-আইএম) সংগঠন ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার রাতে এনএসসিএন-আইএমের ক্যাম্পের কাছে তাদের সশস্ত্র ক্যাডারদের উপস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আসে। আসাম রাইফেলস সেখানে তল্লাশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করে। আসাম রাইফেলসের দলটি ওক্লং গ্রামের দিকে এগোনোর সময় নারীসহ বহু মানুষ তাদের আটকায়। অবশ্য তাঁদের কেউ সশস্ত্র ছিলেন না। এ কারণে আসাম রাইফেলস গুলি চালায়নি। আসাম রাইফেলস তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও উত্তেজিত জনতা বড় ধরনের হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়।

নাগাল্যান্ডে আসাম রাইফেলসের সেনাসদস্যের মৃত্যু

এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা আগে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নাগাল্যান্ডে প্রাণ হারান আসাম রাইফেলসের এক সেনাসদস্য। গত সোমবার দুপুরের নাগাদ নাগাল্যান্ডের পশ্চিম অংশে চুমৌকেডিমা ‘এ’ জেলায় আসাম রাইফেলসের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কাছে সন্দেহভাজন এক বিস্ফোরণে আসাম রাইফেলসের অন্তত এক সদস্য নিহত হন। একজন বেসামরিক নাগরিকসহ আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পুলিশ সূত্রের খবর, আসাম রাইফেলসের কর্মীরা একটি খোলা গাড়িতে করে রাজধানী ডিমাপুরের দিকে যাওয়ার পথে বেলা দুইটা নাগাদ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিকশার ভেতরে বিস্ফোরক রাখা ছিল, যা দূর নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের। কারণ, এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের নাশকতা বলে মনে করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ সময় নাগাল্যান্ডে দেখা যায়নি। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে কেবল দুমড়ানো ধাতব অংশ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, যা বিস্ফোরণের ভয়াবহতার ইঙ্গিত।

মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও, রাজ্যপাল নন্দকিশোর যাদব এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা নাগাল্যান্ডের নাগরিক সংগঠন ‘নাগাল্যান্ড পিস সেন্টার’ এই হামলার নিন্দা করেছে।

গত সপ্তাহের হামলা

তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে আসাম রাইফেলসের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোই একমাত্র আক্রমণ নয়। সোমবার দুপুরের আক্রমণের এক সপ্তাহ আগে ৬ জুলাই মণিপুরের উখুরুল জেলায় সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীরা আসাম রাইফেলসের এক গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা চালায়। এ ঘটনায় আসাম রাইফেলসের ৪০ ব্যাটালিয়নের অন্তত দুই কর্মী নিহত হন। ঘটনাস্থলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। পরে ওই এলাকায় বড় আকারের তল্লাশি অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।

মণিপুরের এক সাংবাদিক এই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যেভাবে হামলা চালানো হয়ে, তা অবিশ্বাস্য। আসাম রাইফেলসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী পাল্টাহামলা চালায়। সবচেয়ে বড় কথা, তারা দীর্ঘক্ষণ লড়াই চালিয়েছে। তাদের কাছে অস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার ছিল, তা অভাবনীয়।

সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে

নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে পুলিশের বিবৃতি এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মণিপুরে নাগা এবং কুকি-জোদ সম্প্রদায়ের মধ্যে চার-পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন কুকি-জো সমাজের মানুষ, ১১ জন নাগা গোষ্ঠীর। বাকিরা অন্য সম্প্রদায়ের এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, কুকি-জো এবং নাগা সম্প্রদায়ই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। তাই ওই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। দুপক্ষের এই লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা বাহিনী জড়িয়ে পড়ছে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। উত্তর–পূর্ব ভারতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আসাম রাইফেলসের সদস্যদেরও মৃত্যু হচ্ছে।

এ ছাড়া দুপক্ষের লড়াইয়ের জেরে নাগাল্যান্ডের রাজধানী ডিমাপুরের সঙ্গে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের সংযোগকারী ২ নম্বর জাতীয় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ৮৭ দিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে।

নাগা-কুকি সংঘর্ষের পটভূমি

মণিপুরের উখুরুল জেলায় গত ফেব্রুয়ারিতে মদ্যপানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ঝগড়াঝাঁটি থেকে নাগা-কুকি সংঘাতের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১৩ মে কুকিরা নাগা সম্প্রদায়ের ছয়জনকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ। পরে ১১ জুন তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ওই ঘটনার প্রতিবাদে মণিপুরে নাগাদের শীর্ষ সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) গত ১৭ মে থেকে সেনাপতি জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া ২ নম্বর মহাসড়কে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ শুরু করে। ফলে কুকি–প্রধান কাংপোকপি জেলায় জরুরি পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কাংপোকপি জেলায় এক পাশে মেইতেই-প্রধান ইম্ফল পশ্চিম এবং অন্য পাশে সেনাপতি জেলা অবস্থিত। এই অবরোধ স্বাভাবিকভাবেই দুই জনগোষ্ঠীর সম্পর্ককে আরও নাজুক করে তুলেছে।

​কুকিদের শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর (কেআইএম) জানিয়েছে, কাংপোকপিতে ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে বারবার আবেদন করেও কোনো সমাধান সূত্র মেলেনি। কেআইএম জানিয়েছে, খাদ্য সরবরাহ না থাকায় বহু গ্রামবাসী বুনো ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা এবং শিকড় খেতে বাধ্য হচ্ছেন। নাগা-কুকিদের মধ্যে চলা এই নতুন ‘সংঘাত’ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার লাগোয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে চরম অস্থিরতা তৈরি করছে।

মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ও নাগাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ প্রতিবাদ শুরু করেছে। তারা নাগা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং কুকি সম্প্রদায়ের উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপজেনের পদত্যাগ দাবি করেছে।

পাশাপাশি, ২০২৩ সাল থেকে চলা মেইতেই-কুকি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য মেইতেই গোষ্ঠীগুলো ১৯৫১ সালকে ভিত্তি বছর ধরে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছে।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ভারতের মণিপুর রাজ্যে নাগা গ্রুপের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের প্রতিবাদে কুকি সম্প্রদায়ে নারী–পুরুষ ন্যাশনাল হাইওয়ে–২–এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ৯ জুলাই ২০২৬, কাংপোকপি
ভারতের মণিপুর রাজ্যে নাগা গ্রুপের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের প্রতিবাদে কুকি সম্প্রদায়ে নারী–পুরুষ ন্যাশনাল হাইওয়ে–২–এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ৯ জুলাই ২০২৬, কাংপোকপি। ছবি: এএনআই

সব দেশ ট্রাম্পের বশ্যতা মেনেছে, ব্যতিক্রম শুধু ইরান

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ১৩৬তম দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভিনব পরিকল্পনা হাজির করলেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ইরানি বাহিনীর হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি চড়া ‘টোল’ বা শুল্ক আদায় করবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা স্থায়ী হল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ১৩৭তম দিনে এসে তিনি সম্পূর্ণ নতুন আরেক সিদ্ধান্ত নিলেন—না, শেষ পর্যন্ত কোনো টোল নেওয়া হচ্ছে না!

আরব মিত্রদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে মঙ্গলবার ট্রাম্পের এই ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় হোয়াইট হাউস কতটা দিশেহারা। যে অভিযানটিকে মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের একটি ‘ক্লিন অপারেশন’ বা সহজ জয় ভাবা হয়েছিল, তা এখন ২০তম সপ্তাহের এক চরম গোলমেলে ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। স্পষ্টতই, ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক খেয়ালখুশি আর আবেগনির্ভর রণকৌশল কোনো কাজে আসছে না।

নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বমঞ্চে পেশিশক্তি প্রদর্শনকে যিনি অভ্যাসে পরিণত করেছেন, সেই ট্রাম্প এবার ইরানে এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন—যারা সহজে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া পোস্ট দিয়ে বা শুল্কের হুমকি ছুড়ে যে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ জেতা যায় না, ইরান তা প্রমাণ করে ছাড়ছে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ওয়ালি নাসর বলেন, ‘ট্রাম্প এবার এমন এক দেশের মুখোমুখি হয়েছেন যারা তার নিয়ম মেনে খেলতে রাজি নয়। ট্রাম্পের নিয়ম হলো—প্রথমে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার স্তুতি গাইতে হবে, তারপর তিনি দয়া করে যেটুকু ছাড় দেবেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেইন পলিসি বিভাগের পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক কূটনীতি কিছুটা ভাগ্য এবং প্রতিপক্ষের পিছু হটার সুযোগের ওপর ভর করে টিকে ছিল। কিন্তু গত ৪৭ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তেহরান যে এত সহজে মার্কিন ফাঁদে পা দেবে না, তা ট্রাম্পের বোঝা উচিত ছিল।’

আমেরিকান থিংক ট্যাংক ‘জিসা’-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন হ্যানাহ অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে সীমিত সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে এক ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্প মস্ত বড় ভুল করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং মার্কিন সামরিক ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেছেন।

হ্যানাহ সরাসরি বলেন, ‘পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন মার্কিন বিমান হামলা আর ট্রুথ সোশ্যালে কড়া পোস্ট দিলেই ইরানের বিপ্লবী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এর চেয়ে ক্ষতিকারক ধারণা আর হতে পারে না।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘ভুলটা আরো প্রকট হয়েছে কারণ প্রেসিডেন্টের চারপাশে এমন কোনো শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা দল ছিল না, যারা সত্য বলার সাহস রাখতেন। অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জ্ঞানকে উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্টের ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়েছে।’

সম্প্রতি ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মোটেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান ছিল না। এটি ছিল মাত্র ৬০ দিনের একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যাতে দুপক্ষ শান্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। কিন্তু একটি সাময়িক চুক্তিই যেখানে টিকল না, সেখানে স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তির আশা করা এখন সুদূরপরাহত।

পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্প এখন দ্বিধাগ্রস্ত। তিনি আবার সামরিক পন্থায় ফিরে গিয়ে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরানের একটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ একটি ‘বড়সড় ও জবরদস্ত আঘাত’ হানার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায়, যুদ্ধের শুরুতে তিনি যেভাবে বেপরোয়া বোমাবর্ষণ করেছিলেন, তেমন কিছু করার সাহস এখন আর দেখাচ্ছেন না।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প এখন একটা খাঁচায় বন্দি। তিনি এমন এক নিষ্ঠুর ও জেদি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্য উপসাগরে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তাকে জিম্মি করে ফেলেছে।’

এদিকে টোল বা শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আকস্মিক ডিগবাজি প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ চালাচ্ছেন। সোমবার যখন তিনি ঘোষণা করলেন যে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তার জন্য কার্গো জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হবে, তখন তিনি প্রকারান্তরে নিজের প্রশাসনের আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক অবস্থানকেই লঙ্ঘন করেছিলেন। এরপর মঙ্গলবার উপসাগরীয় আরব নেতাদের একটি ফোনেই তিনি সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক আব্বাস মিলানি বলেন, ‘আমি মনে করি না ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি আছে। এটাই আসল সমস্যা। তিনি পুরোপুরি সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভর করে চলছেন, যার মধ্যে দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য রয়েছে।

ট্রাম্পের সমালোচনা করে মিলানি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তিনি এই শাসনব্যবস্থার আসল চরিত্র কখনোই বুঝতে পারেননি এবং এখনো বোঝেন না। ইরান আর দশটা দেশের মতো নয়। তারা সবসময় অভাবনীয় চাল চালে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো সীমায় যেতে পারে।’

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সব দেশ ট্রাম্পের বশ্যতা মেনেছে, ব্যতিক্রম শুধু ইরান

মালয়েশিয়ায় কোনো ইসরাইলিকে পাওয়া গেলেই বহিষ্কার -প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিম

মালয়েশিয়ায় কোনো ইসরাইলি নাগরিককে পাওয়া গেলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে বহিষ্কার করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জোহর রাজ্যে ফরেস্ট সিটিতে একটি বেসরকারি আবাসিক কমিউনিটির কার্যক্রমে একজন ইসরায়েলি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সরকার কোনো ছাড় দেবে না।

তিনি বলেন, ‘যদি আমরা কোনো ইসরাইলিকে খুঁজে পাই, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে দেশ থেকে বের করে দেব। কারণ আমরা ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেই না।’

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলো তদন্ত করছে এবং এগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সরকার কোনো আপোস করবে না।

ইসরাইলের পাসপোর্টধারীদের জন্য সাধারণত বিশেষ সরকারি অনুমোদন ছাড়া মালয়েশিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ, কারণ দেশটি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না।

জোহরভিত্তিক একটি স্টার্টআপ কমিউনিটি ‘নেটওয়ার্ক স্কুল’ সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত শুরু করেছে।

পাশাপাশি অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে যে ফরেস্ট সিটির একটি আন্তর্জাতিক কমিউনিটিতে পরিদর্শন করা ২৬৬ জন বিদেশির সকলেরই বৈধ অভিবাসন নথি ছিল।

ফরেস্ট সিটি হলো সিঙ্গাপুর সীমান্তের কাছে জোহরে কৃত্রিম দ্বীপের ওপর নির্মিত একটি বড় আকারের মিশ্র-ব্যবহারের উন্নয়ন প্রকল্প।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

মালয়েশিয়ায় কোনো ইসরাইলিকে পাওয়া গেলেই বহিষ্কার
আনোয়ার ইবরাহিম। ছবি: সংগৃহীত

আল-আকসা মসজিদের ফটক বন্ধ করে দিলো ইসরাইল

সামরিক মহড়ার অজুহাতে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের একটি ফটক মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সাময়িকভাবে বন্ধ দেয় ইসরাইলি বাহিনী। এ ঘটনায় মুসল্লিদের প্রবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেট এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরাইলি বাহিনী আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রায় ৩০ মিনিটব্যাপী সামরিক মহড়া চালায়।

যদিও শুধু কিং ফয়সাল গেট বন্ধ রাখা হয়েছিল, তবে মসজিদের অন্যান্য প্রবেশপথেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এর ফলে মুসল্লিদের স্বাভাবিকভাবে মসজিদে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

আল-আকসায় বাড়ছে ইসরাইলি বিধিনিষেধ
সাম্প্রতিক সময়ে আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিধিনিষেধ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে নিরাপত্তার অজুহাতে ইসরাইল নজিরবিহীনভাবে ৪০ দিনের জন্য আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয়।
সে সময় ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের জুমার নামাজ, রমজানের রাতের তারাবির নামাজ এবং ঈদুল ফিতরের নামাজে অংশ নেয়ার জন্য মসজিদে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ওই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এটি নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন নয়; বরং আল-আকসা মসজিদের ইসলামী পরিচয় ক্ষুণ্ন করে সেখানে “ইহুদিকরণ” এগিয়ে নেয়ার একটি প্রচেষ্টা।
ফিলিস্তিনের আওকাফ ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, জুন মাসে ইসরাইলি বাহিনী ২৬ বার আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে অভিযান চালায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে ৪ হাজার ২১২ জন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আল-আকসা মসজিদ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত “স্ট্যাটাস কো” ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই ব্যবস্থায় পুরো ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গমিটার এলাকা জর্ডানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইসলামিক ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের অধীনে। এর মধ্যে রয়েছে ডোম অব দ্য রক, কিবলি মসজিদ, আশপাশের প্রাঙ্গণ, ফটক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো।

এই ব্যবস্থায় নির্ধারিত সময়ে অমুসলিমরা স্থানটি পরিদর্শন করতে পারলেও সেখানে নামাজ আদায়ের অধিকার শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। পাশাপাশি স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসন ও ধর্মীয় বিষয়গুলোও ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে।
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ইসরাইল ধীরে ধীরে ‘স্ট্যাটাস কো’ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে আসছে।

তাদের দাবি, মুসল্লিদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলি উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াকফের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সীমিত করা, কর্মীদের অনুমতিপত্র বাতিল এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেখানে ইহুদিদের প্রার্থনার সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আরও খর্ব করা হয়েছে।

গত মে মাসে মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে দাবি করে, আল-আকসা মসজিদের ওপর জর্ডানের ঐতিহাসিক অভিভাবকত্ব (কাস্টডিয়ানশিপ) বাতিলের লক্ষ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে ওয়াশিংটন এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।

আল-আকসা মসজিদের ফটক বন্ধ করে দিলো ইসরাইল

ইসরায়েলের হাজার দিনের যুদ্ধ ও হামাসের কৌশল by মালিহা লোধি

গাজায় ইসরায়েলের যে গণবিধ্বংসী যুদ্ধ চলছে, তা ইতিমধ্যেই হাজার দিনের সীমা ছাড়িয়েছে। গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়েছে। থামেনি হামলা, থামেনি মৃত্যু। ধ্বংস আর হত্যালীলা যেন এক অন্তহীন অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

এই দীর্ঘ সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। তাঁদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। পুরো গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। শুধু সাধারণ মানুষই নন, লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন সাংবাদিকেরাও। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ গেছে দুই শতাধিক সাংবাদিকের। আন্তর্জাতিক মহলের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গাজার আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, এ পরিস্থিতি ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।

মানবিক বিপর্যয় এখনো ভয়াবহ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা লঙ্ঘন করে চলছে হামলা। অথচ বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরে গেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং তাদের সম্ভাব্য সমঝোতা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও গাজা প্রসঙ্গ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। ফলে গাজা কার্যত আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শান্তি পরিকল্পনাও তাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।

এ প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি বদলাতে চায় হামাস। আন্তর্জাতিক মহলের নজর ফেরাতে তারা নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সপ্তাহে তারা ঘোষণা করেছে, গাজায় তাদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্ষমতা তারা একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে তুলে দেবে। প্রায় দুই দশক ধরে গাজায় কার্যত শাসনক্ষমতায় ছিল হামাস। এখন তারা সেই দায়িত্ব ছাড়তে চাইছে।

এই নতুন সংস্থার নাম ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা, সংক্ষেপে এনসিএজি। এটি মূলত ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি গঠিত হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কমিটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে এবং বোর্ড অব পিস নামে একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।

ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ছিল ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা। প্রথম ধাপে ছিল ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটাই কার্যকর হয়নি।

এনসিএজিকে কোনো সম্পদ বা সহায়তা দেওয়া হয়নি। তারা এখনো কায়রোয় আটকে আছে। ইসরায়েল তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীও এখনো মোতায়েন হয়নি। বোর্ড অব পিস কার্যত নিষ্ক্রিয়। আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় তারা জড়িয়ে আছে। এমনকি তাদের জন্য গঠিত তহবিলেও কোনো অর্থ নেই।

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন বোর্ড অব পিস ঘোষণা করে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনরার গাজায় আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এ সিদ্ধান্তকে শরণার্থী সমস্যাকে মুছে ফেলার চেষ্টা বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি দক্ষিণ গাজায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত মানবিক অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনাও করছে বোর্ডটি। সেখানে যাচাই করা কিছু ফিলিস্তিনিকে রাখা হবে। এ পরিকল্পনাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন। অনেকের মতে, এটি জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তরের শামিল।

হামাস বলেছে, তারা শাসনক্ষমতা ছাড়ছে, যাতে ইসরায়েল তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হারায়। এ ঘোষণা দিয়ে তারা তাদের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। এর লক্ষ্য, ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করা এবং শান্তিপ্রক্রিয়াকে আবার সচল করা।

তবে ইসরায়েল এ ঘোষণাকে গুরুত্ব দেয়নি। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘চালাকি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, নিরস্ত্রীকরণ এড়াতেই এ কৌশল নিয়েছে হামাস।

বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, তারা কথার চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেবে। তাদের মতে, গাজায় সব অস্ত্র এনসিএজির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কিন্তু হামাস নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কিছু বলেনি। শুরু থেকেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার—ইসরায়েল যদি গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যায় এবং দখলদারি শেষ করে, তবেই তারা অস্ত্র ছাড়ার কথা ভাববে।

হামাস আরও বলছে, আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। কারণ, কোনো কার্যকর প্রশাসন না থাকলে তারা অস্ত্র কার হাতে তুলে দেবে?

বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন গাজার ৭০ শতাংশ দখলে নিতে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গাজার ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’গুলোয় অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা থাকবে। সেনা প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নেই।

হামাসের পদক্ষেপ অনেকের কাছে প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। যদি ১৩ সদস্যের এই টেকনোক্র্যাট কমিটিকে (যার নেতৃত্বে রয়েছেন আলি শাথ) গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে পারবে। কিন্তু সে পথও আটকে রেখেছে ইসরায়েল।

কায়রোয় বিভিন্ন বৈঠক হয়েছে। সেখানে হামাস, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, বোর্ড অব পিসের প্রতিনিধিরা, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা অংশ নিয়েছেন। তবু অচলাবস্থা কাটেনি। শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।

এখন কী হবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ট্রাম্প প্রশাসন গাজা পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে কতটা আগ্রহী, সেটাই মূল প্রশ্ন। আপাতত তাদের সমস্ত মনোযোগ ইরান সংকটের দিকে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানি তেল বিক্রির অনুমতিও বাতিল করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ। তবে আলোচনার দরজা খোলা আছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ট্রাম্পের অস্থিরতা, খামেনির অন্ত্যেষ্টির পর ইরানের কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে গাজার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর ফেরার সম্ভাবনা কমছে।

আরেকটি প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে—ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ প্রয়োগ করবে। এখন পর্যন্ত তারা কার্যত চোখ বন্ধ করে রয়েছে। গাজায় হামলা, ত্রাণে বাধা, নতুন এলাকা দখল—এসব নিয়ে ওয়াশিংটনের বক্তব্য নীরব।

বরং তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবি। কিন্তু ইসরায়েলের দৈনন্দিন হামলা বা পশ্চিম তীরে কার্যত দখলদারি, অভিযান, বেদুইন ও পশুপালক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন—এসব বিষয়ে তারা কিছু বলছে না।

এর মধ্যে নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনের মুখে। তাঁর জনসমর্থন কমছে। ফলে শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে তিনি আরও অনিচ্ছুক হয়ে উঠেছেন।

সব মিলিয়ে গাজার শান্তি পরিকল্পনার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। আবারও ফিলিস্তিনিদের সামনে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা পেয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস আর অন্তহীন যন্ত্রণা।

* মালিহা লোধি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
- ডন থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলের হামলা।
দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলের হামলা। ফাইল ছবি: এএফপি

আইন ভাঙার খেলায় ট্রাম্প: হরমুজে ২০% টোলের পেছনে আসল রহস্য কী

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনঃ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজ থেকে তাঁর দেশ ২০ শতাংশ ফি বা টোল আদায় করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মতেই এ ধরনের ফি আদায় করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই গত সোমবার ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

এ জলপথকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে দুই দেশ একে অপরের ওপর কয়েকবার হামলা, পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এ কারণে তাদের মধ্যকার মাসখানেক ধরে চলা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সূত্রপাত। এর পর থেকে ইরান এ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে আসছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি পথ ব্যবহারে বাধ্য করতেই ইরান এ কৌশল নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নিজেদের পক্ষ থেকে টোল আদায়ের পথ তৈরি করতেই এমনটা করছে তারা।

ট্রাম্প ঠিক কী বলেছেন

টোল আদায়ের এ পরিকল্পনা ঘোষণার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তার খরচ উশুল করতেই এ ফি নেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালি মুক্ত আছে এবং ইরানের সহযোগিতা ছাড়াই এটি মুক্ত থাকবে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যেকোনো এবং সব ধরনের প্রয়োজনীয় খরচ’ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র এ ২০ শতাংশ ফি আদায় করবে। এটিকে ন্যায়সংগত হিসেবেও আখ্যায়িত করেন তিনি। সেই সঙ্গে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করা শুরু করবে।

টোল আদায়ের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবারই প্রথম এমন হুমকি দিলেন না। গত মাসে ইরানের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সইয়ের পরও তিনি এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। যদিও ওই চুক্তির একটি ধারার এমন ব্যাখ্যা তেহরান দিয়েছিল যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে।

স্মারকে আরও বলা হয়েছিল, চুক্তি–পরবর্তী ৬০ দিন কোনো দেশই কোনো ধরনের টোল আদায় করতে পারবে না। তবে এর পরের সময়ের জন্য এই ফি আরোপের পথ খোলা রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এ টোল কীভাবে কাজ করবে

এ বিষয় এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ ২০ শতাংশ ফি কীভাবে হিসাব করা হবে বা কীভাবে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি। তা ছাড়া তাঁর এ অবস্থান কেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে ব্যাখ্যাও ট্রাম্প বা তাঁর উপদেষ্টারা দেননি।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আরোপ করা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশেরই টোল বা ফি আদায়ের অনুমতি নেই। এটাই বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন।’

একদিকে টোল আদায়ের ঘোষণা এবং অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলো আবার অবরোধের নির্দেশ—সব মিলিয়ে এ যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে বিকল্প যে ক্রমেই কমে আসছে, তাঁর এ পদক্ষেপগুলোয় সেটিই ফুটে উঠেছে।

জাহাজ চলাচল ও বাজারে এ টোলের সম্ভাব্য প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের মালামালের মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করা হলে এ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী একটি বড় ট্যাংকারের ক্ষেত্রে এ ফি বাবদ ৩ কোটি ডলারের বেশি বাড়তি খরচ যোগ হতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি দামের মুখে পড়তে হবে।

অতিরিক্ত খরচের কারণে অবশ্য কিছু বিশ্লেষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এ ফি আদৌ কার্যকর হবে কি না।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে এ মুহূর্তে ফির আশঙ্কার চেয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিই বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্য কোথাও কি এমন টোল চালু আছে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিকে এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, যা আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে এ জলপথ পরিচালনা করে।

এ জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলো শুধু তখনই ফি দেয়, যখন তাদের নির্দিষ্ট কোনো সেবার প্রয়োজন হয়। যেমন কোনো জাহাজ টেনে নেওয়ার জন্য সাহায্য বা প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশগুলো পার হওয়ার জন্য দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হলে তারা ফি দেয়। কিন্তু শুধু এ জলপথ দিয়ে যাতায়াত বা পারাপারে জাহাজগুলোকে কোনো অর্থ দিতে হয় না।

তা ছাড়া মালাক্কা প্রণালির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। জলপথটি পরিচালনাকারী তিনটি দেশের মধ্যে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই এবং তারা প্রায় ছয় দশক ধরে নিজেদের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে পেরেছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কী

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর একহাত নিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যখন নিজেই ইরানের টোল আদায়ের ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছিল, তখন ট্রাম্পের নিজের মুখে টোলের ঘোষণা দেওয়াটা বেশ হাস্যকর।

আব্বাস আরাগচি অবশ্য ট্রাম্পের একটি কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ট্রাম্প ‘একেবারে ঠিক’ বলেছেন যে যারা এই প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত। তবে এ কথা বলার পর আরাগচি দাবি করেন, ইরানই আসলে এ জলপথের নিরাপত্তা দিচ্ছে।

এরপর আরাগচি স্পষ্ট উপহাসের সুরে বলেন, ‘অবশ্য ২০ শতাংশ ফি অনেক বেশি। আমরা ন্যায্য ফি রাখব।’

চলতি যুদ্ধের শুরুর দিকে তেহরান যখন এ জলপথ কার্যকরভাবে বন্ধ করে ফেলেছিল, তখন থেকেই ইরানি কর্মকর্তারা বারবার এ প্রণালি থেকে অর্থ উপার্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন।

জানা গেছে, ইরান এবং এ প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত দেশ ওমান যৌথভাবে এ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ফি আদায়ের উপায় খুঁজছে। ওমানের এ প্রস্তাব মূলত মালাক্কা প্রণালির আদলে তৈরি করা হয়েছে। তবে এ ফি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছামূলক হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের নিয়মকেই অস্ত্র বানিয়ে তাঁকে নিয়ে কীভাবে খেলছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। ইরান তা ভালোভাবে বুঝে গেছে। এখন ট্রাম্পের নিয়মই তাঁর সঙ্গে খেলায় মেতেছে তেহরান। গত সোমবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, চুক্তি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানের ওপর ভরসা করা যায় না। যুদ্ধ সাময়িকভাবে থামানো সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘এটি একটি চূড়ান্ত চুক্তি ছিল, কিন্তু তারা তা ভেঙেছে। তারা সব সময়ই চুক্তি ভঙ্গ করে।’

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নিজে বেরিয়ে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে ট্রাম্পের। কিন্তু তিনিই এখন চুক্তি ভঙ্গের জন্য ইরানের সমালোচনা করছেন। তবে কিছু সমালোচক যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংকটের জন্য ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সেই সিদ্ধান্তকেই দায়ী করবেন, যার মাধ্যমে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার ওবামা আমলের চুক্তিটি বাতিল করেছিলেন।

ক্ষুব্ধ ট্রাম্প আবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর ওপর নিজস্ব মাশুল আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের সে ঘোষণাকে ব্যঙ্গ করেছিল তেহরান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প একেবারে সঠিক। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে যাতায়াতের জন্য মাশুল নেওয়ার বিষয়ে তেহরানের অবস্থানকে ট্রাম্প নিজেই বৈধতা দিয়েছেন।’ তিনি ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘ট্রাম্প যে ২০ শতাংশ মাশুল নিতে চায়, তা একটু বেশিই হয়ে যায়। আমরা ন্যায্য আচরণ করব।’

ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন, ইরান সহজে ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। সমঝোতা স্মারকে কী ছিল, তা নিয়ে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। আর যে যুদ্ধ তিনি বারবার ‘ইতিমধ্যেই জিতে গেছেন’ বলে দাবি করেছিলেন, তা কেন তিনি আবার উসকে দিলেন, সে বিষয়ে মার্কিন জনগণের কাছে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

ধূমধাম করে স্বাক্ষর করা একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ট্রাম্প চিরতরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছেন। তিন হাজার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এনেছেন বলে ঘোষণা করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ট্রাম্পের সুর বদলে গেছে। গত সোমবার হিউ হিউইটের রেডিও শোতে ট্রাম্প বলেন, ওই চুক্তিটি ছিল একটি পরীক্ষা, যাতে ইরান ব্যর্থ হয়েছে এবং এর তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্প এখন এক অচলাবস্থার মধ্যে বন্দী।

যুদ্ধের বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারছেন না ট্রাম্প

সমঝোতা স্মারকটি ভেঙে পড়ার কারণ হলো ইরান এই যুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন-হরমুজের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে মাঠে নেমেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এক কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের সব হুমকি এবং সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তেহরানই এখনো এ লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে।

ইচ্ছাশক্তির এই নতুন পরীক্ষা আংশিকভাবে তৈরি হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের তাড়াহুড়া করে একটি অস্পষ্ট ভাষার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কারণে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে ট্রাম্পের আবাসন ব্যবসায়ী আলোচকদের দলটি সম্ভবত সেই বিষয়টি ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইতিহাস ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞ সমালোচকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। ইরান এটিকে নতুন সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।

উদাহরণস্বরূপ, চুক্তিতে তেহরানকে ৬০ দিনের জন্য প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক পরিষেবাগুলো নির্ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ওপর ওপর দেখলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া পূরণ করে, তা হলো প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা। কিন্তু ইরান সম্ভবত এটিকে একটি স্থায়ী চুক্তির পর নৌপথটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে। তাই, তারা যে নতুন স্থিতাবস্থা নিজেদের মতো করে সাজাতে লড়াই করবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এই ভুলটি আগের আরেকটি ভুলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, তা হলো ইরান যে প্রথমেই প্রণালিটি বন্ধ করে দিতে পারে, তা বুঝতে না পারা। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের এক মাস পরও এটি এখনো একটি সমস্যা হিসেবে থেকে যাওয়াটা বলে দিচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য ৬০ দিনের যে সময়সীমা ধরা হয়েছিল, তা ছিল চরম অবাস্তব।

ইরানের আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের এই ধুঁকতে থাকা অবস্থা ট্রাম্পের আবার যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং ট্রাম্পের আবার নৌ-অবরোধ আরোপ কি নতুন ইরানি নেতাদের হিসাব-নিকাশ পরিবর্তনে আগের চেয়ে বেশি সফল হবে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ আছে?

সর্বোপরি, হরমুজ আবার বন্ধ করতে ইরানের মাত্র কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রয়োজন হয়েছিল।

তা ছাড়া, দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি কি প্রেসিডেন্টকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এড়াতে আবার চোখ রাঙানির মুখে পিছু হটতে বাধ্য করবে, যে মূল্য দিতে তিনি রাজি নন বলে গত মাসে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন?

সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হতে পারে

আশার একটি কারণ হলো, নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের মানে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয়ই ভবিষ্যৎ কূটনীতির মাঠ প্রস্তুত করতে সমঝোতা স্মারকের নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে ইরানের তেল উৎপাদনকেন্দ্র খারগ দ্বীপে আক্রমণ করার মতো বড় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য বিপুল হতাহতের ঝুঁকি নিতে ট্রাম্প কোনো আগ্রহ দেখাননি।

ইতিমধ্যে, যুদ্ধক্ষেত্রের রণকৌশল বর্তমানে এমন একটি সংঘাতের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, যা ফুটন্ত নয়, বরং ধিকিধিকি জ্বলছে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ‘ইরান অ্যান্ড দ্য শিয়া অ্যাক্সিস’ প্রোগ্রামের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে কানেক্ট দ্য ওয়ার্ল্ড অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত হামলা এবং ইরানের প্রতিশোধ সত্ত্বেও কূটনীতির সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিদিন পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন নিশ্চিতভাবেই খেলার নিয়ম বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’

আর এই নতুন সংঘাত যদি ফুটন্ত অবস্থার ঠিক নিচেই বজায় থাকে, তবু ট্রাম্পকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে, যা নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ মাস ধরে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই যুদ্ধ থেকে কীভাবে বের হবেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি। ছবি: কোলাজ

যৌন নিপীড়ন মামলায় ৫৬ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দিলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌন নিপীড়ন ও মানহানির মামলায় লেখিকা ই. জিন ক্যারলকে ৫৬ লাখ ২০ হাজার ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করেছেন। ক্যারলের আইনজীবীরা মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। খবর বিবিসির।

ক্যারলের আইনজীবী রবার্টা ক্যাপলান জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেছেন। এতে ৫০ লাখ ডলারের মূল ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আপিল চলাকালে জমা হওয়া সুদের অর্থও রয়েছে।

ক্যারল অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বার্গডর্ফ গুডম্যান ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে ট্রাম্প তাকে যৌন নিপীড়ন করেন।

পরে ২০২২ সালে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। ক্যারলের দাবি ছিল, ওই পোস্টের মাধ্যমে তার মানহানি করা হয়েছে।

২০২৩ সালে নিউইয়র্কের একটি জুরি ট্রাম্পকে যৌন নিপীড়ন ও মানহানির দায়ে ক্যারলকে ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ট্রাম্প রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও গত বছর ফেডারেল আপিল আদালত সেই রায় বহাল রাখে। এরপর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও মামলাটি পুনর্বিবেচনায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এর পর বিচারকের নির্দেশে ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেন।

অন্যদিকে ট্রাম্প বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন। তার আইনজীবীরা মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

এদিকে ২০২৪ সালে আরেকটি মানহানি মামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের যে রায় হয়েছিল, সেটির বিরুদ্ধেও তিনি এখনো আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। 

লেখিকা ই. জিন ক্যারল। ছবি: সংগৃহীত
লেখিকা ই. জিন ক্যারল। ছবি: সংগৃহীত

একের পর এক হরমুজ পাড়ি দিল ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ

মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার আগে মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে। শিপ-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন প্রণালি অতিক্রম করা অধিকাংশ জাহাজই ইরানের বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। খবর রয়টার্সের।

তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ১১টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার মধ্যে ৯টি ইরানি রুট ব্যবহার করেছে।

এসবের মধ্যে একটি আফ্রাম্যাক্স আকারের তেলবাহী জাহাজ এবং দুটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার খালি অবস্থায় প্রণালিতে প্রবেশ করে। অন্যদিকে প্রণালি ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনকারী একটি জাহাজ, পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী একটি মাঝারি আকারের ট্যাংকার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বহনকারী দুটি ট্যাংকার, একটি মিথানলবাহী জাহাজ এবং লৌহ আকরিক বহনকারী একটি বাল্ক ক্যারিয়ার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য কোনো তেল বা গ্যাসবাহী ট্যাংকারের প্রবেশ বা প্রস্থানের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সব বন্দরকে লক্ষ্য করে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরান আলোচনায় না ফিরলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানো হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, গত এক সপ্তাহে ইরান সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন বলে ওয়াশিংটনের দাবি। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপারট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের স্পট মার্কেটে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। নতুন করে বাড়ছে অন্যান্য খনিজ জ্বালানির দামও। 

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা বিল আটকে দিলেন ডেমোক্র্যাটরা

মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা বিল নিয়ে বিতর্ক শুরুর প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভোটে বিলটি নিয়ে বিতর্ক শুরু করার প্রস্তাব ৫০-৪৬ ভোটে আটকে যায়। ১০০ সদস্যের সিনেটে বিতর্ক শুরু করতে প্রয়োজন ছিল ৬০ ভোট। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত প্রায় ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটের বড় অংশ অনুমোদনের পথ আপাতত আটকে গেছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটররা শুধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধেরই বিরোধিতা করেনি বরং এমন বিধানগুলোরও বিরোধিতা করেন-যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করবে।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করছে। একই সঙ্গে বিলটিতে এমন কিছু ধারা রাখা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও গভীর করবে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত পেন্টাগনের বাজেটের আকার নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তারা।

সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক স্কামার ভোটের আগে বলেন, এই বিল পাস হলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসের তদারকি ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ‘অনুমতিপত্র’ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র: আল জাজিরা

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা বিল আটকে দিলেন ডেমোক্র্যাটরা

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী -সোনারগাঁয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি

এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আমরা এমন একজন শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছি যিনি স্ট্যান্ডবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ওস্তাদ। শিক্ষামন্ত্রী সব জায়গায় গিয়ে বলেন, নকল আর হবে না। ২০২৬ সালের শির্ক্ষাথীরা কিন্তু আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছে এ স্ট্যান্ডবাজি এদেশে আর চলবে না। হাটুঁ সমান পানিতে, বুক সমান পানিতে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের আপনি ডুবিয়ে ডুবিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছেন।

একটি পরীক্ষায় আপনি দুইটা সৃজনশীল ভুল দিয়ে রেখেছেন। পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নে উত্তর মেলাতে চেষ্টা করে সে যখন উত্তর মেলাতে পারে না, তখন তাদের কী ধরনের মানসিক অবস্থা হয়, বুঝতে পারেন?

এ ঘটনায় আপনি একবারও দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজন মনে করলেন না। বরং এ শিক্ষার্থীদের আপনি বললেন মাদকাসক্ত। শিক্ষামন্ত্রী আপনি আজ যাদের ফার্মের মুরগী বলছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী হতে পেরেছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই শিলং থেকে এসে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন।

এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আজ লন্ডন থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সোনারগাঁ উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ পথযাত্রা নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপি আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে বলব শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়। তাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করুন। কিছুদিন পর পর আপনাদের ইচ্ছা হয় আর সেটাই শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেন। আপনাদের সন্তানরা দেশে পড়াশুনা করে না। তাদের বিদেশে রেখে পড়াশুনা করান।

পরের সন্তানকে রাস্তায় নিয়ে রাজনীতি করবেন, এক্সপিরিমেন্ট করবেন- এ বাংলায় আর এসব হতে দেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করার অনুরোধ করছি, তা না হলে তারা রাস্তায় নামলে আপনাদের অস্থিত্ব থাকবে না। আপনাদের পাটাতন যে কত দুর্বল তা শিক্ষার্থীদের অর্ধবেলার আন্দোলনেই বুঝা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এখানে বাপ হচ্ছে এমপি আর তার ছেলে করে চাঁদাবাজি। থানায় গিয়ে দিতে হয় মুচলেকা। আমরা সারা দেশে দেখি গ্যাসের হাহাকার আর সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অবৈধ সংযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

চুনা কারখানাগুলো কোটি টাকার অবৈধ গ্যাস পোড়াচ্ছে। সোনারগাঁয়ের নদী ও খালগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দখল করে ফেলেছে। চব্বিশ পরবর্তী এ বাংলাদেশ আমরা চাইনি। ব্যবসায়ীরা, হকাররা ও রিকশাচালকরা হাহাকারের মধ্যে রয়েছে। দুইশত টাকা ইনকাম করলে পঞ্চাশ টাকা ছাত্রদল যুবদলকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। স্থানীয় এমপিদেরকেও চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদাবাজি বাংলাদেশ আর চলবে না।

আপনারা এভাবে চাঁদাবাজি করে বেশি দিন আর খেতে পারবেন না। আবার যদি জুলাই হয় পালানোর জায়গা পাবেন না। হাসিনার জন্য ইন্ডিয়া ছিল। আপনারা বলেন আপনারা বাংলাদেশপন্থি। আপনাদের কিন্তু ভারতে জায়গা হবে না। পাকিস্তানেও জায়গা হবে না। আমাদেরকে এদেশেই থাকতে হবে, সুতরাং মানুষের আকাঙ্খার বাইরে গেলে জনগণ রাস্তায় বিচার করবে।

তিনি বলেন, আমরা হাসিনা ব্যবস্থার পরির্বতন চেয়েছি কেবল হাসিনার পরিবর্তন চাইনি। বর্তমান সরকার জন আকাঙ্খার বিপক্ষে গিয়ে, গণভোটের বিপক্ষে গিয়ে এমন অবস্থান নিয়েছেন যা সরাসরি আমাদের আকাঙ্খার পরিপন্থি।

তিনি চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রতিমন্ত্রী হজ্ব করতে চলে গেছেন। একই সময় দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বন্যায় কষ্ট পাচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফর করছেন।

চট্টগ্রাম থেকে এ বছর নব্বই হাজার কোটি টাকার বেশি জাতীয় রাজস্ব জমা দেওয়া হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এ সংকটকালে বন্যার জন্য চট্টগ্রামে জনপ্রতি ত্রিশটারও কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি নাকি সংবিধানে নাই। যদি এটি সংবিধানে না থেকে থাকে তাহলে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনও কোনো সংবিধানে নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। আপনার থাকার কথা ছিল শিলংয়ে, প্রধানমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল লন্ডনে, আপনার নেতাকর্মীর থাকার কথা ছিল ধানক্ষেতে, আপনার নেতাকর্মীর ঢাকা শহরে চালানোর কথা ছিল রিকশা।

এ সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ছাত্রজনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আপনাদের পায়ের তলায় কিন্তু মাটি নেই।

পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদকে আসন্ন সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন ও জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলামসহ উপজেলা এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী
ছবি: আমার দেশ

৫০ কোটি পারিশ্রমিক! কার্তিকই কি এখন বলিউডের শীর্ষে

প্রকাশ ২২ নভেম্বর ২০২৫ঃ মুম্বাইয়ে এক ছাত্রাবাসে থাকতেন ক্ষীণকায়, লাজুক এক তরুণ। বাড়িতে জানানো ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য মুম্বাইয়ে এসেছেন। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে যাওয়া তরুণের আসল গন্তব্য ছিল শহরের নানা প্রান্তের অডিশন ভেন্যু। সেই তরুণের হন্যে হয়ে দৌড়ানোই আজ বলিউডের অন্যতম পরিচিত সাফল্যের গল্প। সেই ছেলেই আজকের জনপ্রিয় নায়ক কার্তিক আরিয়ান। ২২ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে
কার্তিক আরিয়ানের আসল নাম কার্তিক তিওয়ারি। মুম্বাইয়ে এসে তিনি ভর্তি হন নাভি মুম্বাইয়ের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে; কিন্তু সেটি ছিল মূলত পরিবারের চোখে ধুলা দেওয়া। আসলে তিনি মন দিয়ে পড়তেন অভিনয়ের খাতা। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতেন অডিশনের লাইনে। সম্পূর্ণ অচেনা পরিচালক–প্রযোজকদের কাছে বারবার কড়া নেড়েও সহজে দরজা খুলছিল না। ফিল্ম পরিবার থেকে না আসায় সুযোগ পাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।

তবু হাল ছাড়েননি আরিয়ান। কখনো রাত জেগে লাইন দিয়েছেন, কখনো স্টুডিওর বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। সেই অধ্যবসায়ই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দেয় প্রথম কাজ—লাভ রঞ্জনের নির্দেশনায় ‘পেয়ার কা পঞ্চনামা’ (২০১১)।

যে মনোলগে রাতারাতি পরিচিত
‘পেয়ার কা পঞ্চনামা’–তে পাঁচ মিনিটের একটি দীর্ঘ মনোলগ দিয়ে কার্তিক আলোচনায় আসেন। সম্পর্কের নানা ঝামেলা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
প্রথম ছবিই দর্শকের মনে দাগ কাটলেও বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো তখনো তাঁর দিকে তেমন নজর দেয়নি। পরপর দুটি ছবি—‘আকাশবাণী’, ‘কাঞ্চি’ বক্স অফিসে খুব সাড়া ফেলতে না পারায় তাঁর পথ আবার কঠিন হয়ে ওঠে। তবে তিনি থেমে যাননি। অভিনয়ের চর্চা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।

দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু
২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সনু কে টিটু কি সুইটি’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় বাঁক এনে দেয়। ছবিটি সুপারহিট হওয়ার পর কার্তিককে আর উপেক্ষা করা যায়নি। এটিও ছিল লাভ রঞ্জনের সিনেমা। এরপর একে একে তাঁর হাতে আসে মূলধারার ছবির প্রস্তাব। ‘লুকা চুপি’, ‘পতি পত্নী অউর ওহ’, ‘সত্যপ্রেম কি কথা’—সব কটিই বাণিজ্যিকভাবে ভালো চলে। ২০১৮ সাল থেকে তাঁর অভিনীত মুক্তি পাওয়া আটটি ছবির পাঁচটি হিট হয়—এমন ধারাবাহিকতা এখন বলিউডে বিরল।

হিন্দি সিনেমা যখন ধুঁকছিল
কোভিড–পরবর্তী সময়ে হিন্দি সিনেমা ছিল সবচেয়ে বড় সংকটে। পরপর বড় বাজেটের ছবিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছিল, দর্শক ওটিটিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার ওপর দক্ষিণ ভারতীয় ছবির সাফল্যে বলিউড হারাচ্ছিল নিজস্ব ছন্দ। বক্স অফিসে এমন সময় যাচ্ছিল, যখন ‘সুপারহিট’ তো দূরের কথা, ‘হিট’ শব্দটাই যেন ভুলে গিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রি। হলমালিকদের মধ্যে আতঙ্ক, প্রযোজকদের মুখে উদ্বেগ, আর সবার একই কথা—‘হিন্দি সিনেমাকে বাঁচাবে কে?’

ঠিক সেই সময়েই মুক্তি পায় ‘ভুল ভুলাইয়া ২’। প্রথমদিকে অনেকেই ছবিটির সাফল্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ, মূল ‘ভুল ভুলাইয়া’ ছিল অক্ষয় কুমারের জনপ্রিয় এক ক্ল্যাসিক; সেটিকে ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়। তা ছাড়া সে সময় দর্শকের অভ্যাস বদলে গেছে—এমনটিই মনে করতেন সমালোচকেরা। হরর–কমেডির ধারাটিও বেশি দিন হিট দিচ্ছিল না। আরও বড় কারণ, কার্তিককে তখনো বড় বাজেটের ‘ব্যাংকেবল’ নায়ক হিসেবে পরীক্ষা করা হয়নি!
কিন্তু মুক্তির পর সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ‘ভুল ভুলাইয়া ২’ শুধু হলে মানুষ টানেনি; বরং দীর্ঘদিন পর হিন্দি সিনেমার জন্য এনে দেয় উৎসবমুখর পরিবেশ। টিকিটের জন্য লম্বা লাইন, প্রেক্ষাগৃহে ভিড়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাউসফুল—এই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন কার্তিক আরিয়ান। সিনেমাটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই পায়নি; বরং সংকটে থাকা অসংখ্য প্রযোজকের কাছে নতুন আশার আলো হয়ে ওঠে।

অনেকে সেই সময়ে তাঁকে ডাকতে শুরু করেন ‘বক্স অফিস ত্রাতা’। সাফল্যের এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন তিনি ‘ভুল ভুলাইয়া ৩’ সিনেমায়ও। সিকুয়েলের সাফল্য সাধারণত কঠিন। কারণ, দর্শকের প্রত্যাশা বেশি থাকে। কিন্তু কার্তিক দ্বিতীয় কিস্তির জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখে নতুন কিস্তিকেও বাণিজ্যিক সাফল্যে পরিণত করেন। ‘ভুল ভুলাইয়া ৩’-এর ব্যবসা প্রমাণ করে কার্তিক এখন আর শুধু রোমান্টিক নায়ক নন; বরং তিনি আজ বলিউডের অন্যতম নিরাপদ, লাভজনক ও দর্শকনির্ভর তারকা। হিন্দি সিনেমার কঠিন সময়ে যেভাবে তিনি বক্স অফিসকে চাঙা করেছেন, তাই তাঁকে আজকের শিল্পে ‘বিশ্বাসযোগ্য নায়ক’–এর মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে।

রোমান্টিক ইমেজ ভাঙার লড়াই
রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া অনেক অভিনেতাই নিরাপদ পথেই হাঁটেন। কিন্তু কার্তিক আরিয়ান এ পরিচয়ের ভেতর আটকে থাকতে চাননি। ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়েই তিনি বুঝে যান, শুধু ‘চকলেট বয়’ ইমেজ ধরে রাখলে বলিউডে দীর্ঘ দৌড় সম্ভব নয়। তাই ঝুঁকি নিয়েছেন, চরিত্র বেছে নিয়েছেন নিজের আরামের জায়গা ভেঙে।
তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ‘ফ্রেডি’। এ ছবিতে কার্তিকের চরিত্র একজন অন্তর্মুখী, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ডেন্টিস্ট—যাঁর ব্যক্তিজীবনে লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর অন্ধকার। এ ধরনের সাইকোলজিক্যাল চরিত্র বলিউডে খুব কমই করা হয়, আর কার্তিকের মতো মূলধারার নায়কদের জন্য তো আরও কম। ‘ফ্রেডি’তে তাঁর অভিনয় ছিল অসহায়ত্ব, ক্ষোভ ও নীরব নিষ্ঠুরতার মিশ্রণ, যা দর্শককে চমকে দেয়।

এরপর আসে ‘ধামাকা’—এক বসায় শুট করা থ্রিলার। টানা শুটিং, ক্লোজআপনির্ভর ক্যামেরা এবং পুরো ছবিতে এক চরিত্রের মানসিক চাপ ধরে রাখা—এসবই ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ সিনেমায় তিনি দেখান, আবেগের ওঠানামা, ভয় ও বিভ্রান্তিকে কীভাবে সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায়।
সবশেষে আসে ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’, যেখানে তিনি অভিনয় করেন ভারতীয় অ্যাথলেট মুরলিকান্ত পান্ডের চরিত্রে। বায়োপিক মানেই তীব্র শারীরিক শ্রম—ওজন কমানো–বাড়ানো, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ, সময়নিষ্ঠ অভ্যাস। কার্তিক এ ছবির জন্য দীর্ঘদিন কুস্তি, দৌড়, ডায়েট, এমনকি পেশাদার ক্রীড়াবিদদের মতো কোচিং নিয়েছেন। পরিচালক কবির খান তাঁর ওপর ভরসা করেই ছবিটি বানান। এটিও ছিল তাঁর জন্য বড় স্বীকৃতি।
সমালোচকদের ভাষ্যে, ‘কার্তিক হয়তো ক্ল্যাসিক অর্থে অসাধারণ অভিনেতা নন, কিন্তু তাঁর নিবেদন, প্রস্তুতি আর কঠোর পরিশ্রম তাঁকে আলাদা করে।’ তাঁরা মনে করেন, কার্তিককে ‘ফাঁকিবাজ’ মনে হয় না; বরং প্রতিটি চরিত্রে নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দেওয়া একজন সিরিয়াস অভিনেতাকে দেখা যায়।

এভাবেই রোমান্টিক ইমেজ ভেঙে নিজের অভিনয়জগৎকে প্রসারিত করেছেন তিনি। এ কারণেই কার্তিক আজ বহুমুখী, প্রাসঙ্গিক এবং বয়সে তরুণ হলেও বলিউডে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাময় নায়ক হিসেবে বিবেচিত।

সংযত ব্যক্তিজীবন, ক্লিন ইমেজ
বলিউডে তারকাদের নিয়ে গুঞ্জন, সম্পর্ক, বিতর্ক—এসব যেন শিল্পের নিয়মের অংশ। কিন্তু কার্তিক আরিয়ান এ নিয়মের বাইরে হাঁটেন। তাঁকে ঘিরে খুব কমই বিতর্ক শোনা যায়। সারা আলী খানের সঙ্গে তাঁর প্রেমের গুঞ্জন একসময় শিরোনাম হয়েছিল ঠিকই, তবে সেটি ছিল ক্ষণস্থায়ী। সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিজীবন নিয়ে বাড়তি হইচই করেন না তিনি। খুব বেশি সাক্ষাৎকারে মুখ দেখান না, মিডিয়ার সামনে নিজেকে যতটা সম্ভব সংযত রাখেন। এ সংযম নিজেকে ‘ওভার এক্সপোজ’ না করার অভ্যাস, আর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সতর্কতা—এসব মিলেই তাঁকে দিয়েছে এক বিশেষ ‘ক্লিন ইমেজ’। আর বলিউডে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এমন অভাবের সময়ে এ ইমেজই তাঁর জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি।

এই জনপ্রিয়তা সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে ব্র্যান্ড জগতেও। বর্তমানে যেসব বলিউড তারকাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু সবচেয়ে বেশি, কার্তিক তাঁদেরই একজন। সুপারড্রি, ক্যাডবেরি সিল্ক, ম্যাকডোনাল্ডস, বোয়াট, আরমানি এক্সচেঞ্জসহ দেশ–বিদেশের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো তাঁর মুখ বেছে নিয়েছে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা—বলিউডের তরুণ অভিনেতাদের জন্য যা বিরল এক উচ্চতা।

শুধু ব্র্যান্ড নয়, রিয়েল এস্টেটেও তিনি দেখিয়েছেন বিচক্ষণতা। ২০২৩ সালে জুহুর মর্যাদাপূর্ণ এলাকায় তিনি কিনেছেন সাড়ে ১৭ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। সম্প্রতি সেটি তিনি মাসে সাড়ে চার লাখ টাকায় লিজ দিয়েছেন, যা তাঁর আয়ের আরেকটি স্থায়ী উৎস। বক্স অফিসেও তাঁর বাজারদর বাড়ছে দ্রুত। ‘ভুল ভুলাইয়া ২’-এ যেখানে পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ১৫ কোটি টাকা, সেখানে ‘ভুল ভুলাইয়া ৩’-এ গিয়ে সেই পারিশ্রমিক বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকায়।
সব মিলিয়ে আজ তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি রুপি। পরিশ্রম, হিসেবি সিদ্ধান্ত এবং নির্লিপ্ত ব্যক্তিজীবনের সংমিশ্রণে তিনি হয়ে উঠেছেন বলিউডের সবচেয়ে ব্যাংকেবল তরুণ তারকাদের একজন। বাড়িতে মিথ্যা বলে অভিনয়ের জন্য মুম্বাইয়ে ফেরা সেই ছেলে আজ বলিউডে আত্মবিশ্বাস, স্থিরতা ও বাণিজ্যিক সাফল্যের অন্যতম প্রতীক—এটিই তাঁর গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী অংশ।
কার্তিক আরিয়ান। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে
কার্তিক আরিয়ান। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

রুনা লায়লাকে নিয়ে আফজাল হোসেনের আবেগঘন পোস্ট

প্রকাশ ২২ নভেম্বর ২০২৫ঃ কোক স্টুডিও বাংলার তৃতীয় মৌসুমে জনপ্রিয় সুফিগান ‘মাস্ত কালান্দার’গেয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। ১৭ নভেম্বর ২০২৫ রুনা লায়লার জন্মদিননে গানটি প্রকাশ পেয়েছে। এটি দিয়ে তৃতীয় মৌসুম শেষ হয়েছে। গানপ্রেমীদের পাশাপাশি বিনোদন অঙ্গনের মানুষদেরও মন কেড়েছে এই গান। অভিনয়শিল্পী, চিত্রকর ও নির্মাতা আফজাল হোসেন নতুন সংগীতায়োজনে ‘মাস্ত কালান্দার’ শুনে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। নিজের ফেসবুকে এ নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, কোক স্টুডিও বাংলাতে “মাস্ত কালান্দার”শুনে সকালটা সুন্দর হয়ে গেল।

‘মাস্ত কালান্দার’ গানটি নিয়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘এটি সব সময় আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি গান। নতুনভাবে, তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে আবার গানটি গাইতে পেরে আমি আনন্দিত। প্রজন্ম-পরম্পরায় গানটির নতুনভাবে ফিরে আসা আমাকে আনন্দ দিয়েছে।’

রুনা লায়লার গাওয়া ‘মাস্ত কালান্দার’ শুনে এক আবেগঘন লেখায় শিল্প-সংস্কৃতি, সমাজে সৌন্দর্যবোধের সংকট ও সৃজনশীল মানুষের মূল্যায়ন নিয়েও নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন আফজাল হোসেন। পোস্টের শুরুতেই আফজাল হোসেন উল্লেখ করেন, নিয়মিত জীবনযাপনে আমরা কত অনর্থক, অসুন্দর ও অপ্রয়োজনীয় চিন্তায় দিন কাটাই। মানুষের জীবনে অর্থবোধ, প্রেরণা ও সঠিক দিশা খুঁজে পেতে কত কম সময় আমরা ব্যয় করি—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের বিখ্যাত সংলাপ—‘বেঁচে থাকাটা বড় কথা নয়, কীভাবে বেঁচে আছি সেটাই বড়’—উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন তিনি।

এরপর আফজাল হোসেন লিখেছেন সৃজনশীল মানুষের বাস্তবতা, সমাজের উপেক্ষা ও একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার শক্তি নিয়ে। তাঁর ভাষায়, চিত্রকর জানেন দেশে ছবি আঁকা কতটা গুরুত্ব পায়; তবু তিনি দুঃখিত হন না; কারণ, শিল্পী আঁকতে পারার মধ্যেই নিজের সৌভাগ্য খুঁজে পান। লেখক জানেন, সাহিত্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ কম; তবু নিজের অনুভব, ভাবনা ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটিয়ে লেখেন। লেখক যদি না লিখতে পারেন, তিনি বেঁচে থেকেও মৃত।

দেশে সৃজনশীল মানুষের অবদান ও ভূমিকার প্রতি সমাজের অনীহা নিয়ে আফজাল হোসেন তাঁর লেখায় আক্ষেপ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘তবু শিল্পীরা নিবিষ্ট মনে কাজ করে যান—কণ্ঠশিল্পী গানেই খুঁজে পান সুখ, লেখক অর্থবিত্তের আশা না করে লিখে যান মনের আনন্দে। এই নিবেদন তিনি দেখেন সমাজকে বাঁচিয়ে রাখা একটি নীরব শক্তি হিসেবে।’

রুনা লায়লাকে নিয়ে লেখায় আফজাল হোসেনের আবেগ ফুটে ওঠে। তিনি লিখেছেন, ‘রুনা লায়লা অসাধারণ একজন শিল্পী, অল্প কথায় এটাই তাঁর পুরো পরিচয়। সে পরিচয় এতটা বড়, শিল্পী পরিচয়ের আলোতে আলোকিত হতে পারে একটা পুরো দেশ। দেশের একমাত্র শিল্পী, যিনি পাকিস্তান এবং ভারতের শ্রোতাদের কাছেও তুমুল জনপ্রিয়, সম্মানীয়। এমন শিল্পীর বিষয়ে আমরা কতটুকু মনোযোগী?’

রুনা লায়লার জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের বিশেষ আয়োজন তাঁকে আশাবাদী করেছে। বিশেষ করে মাছরাঙা টিভির অনুষ্ঠানে পাকিস্তান ও ভারতের শিল্পীদের আন্তরিক মন্তব্যে তিনি বিস্ময় ও আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মাছরাঙা টেলিভিশন চ‍্যানেলের একটা অনুষ্ঠানে অন‍্য দেশের শিল্পী কলাকুশলীরা আমাদের রুনা লায়লাকে নিয়ে যেসব হৃদয়খোলা মন্তব‍্য করেছেন, সাধ‍্য অনুযায়ী যেভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন—কোনো শিল্পী, সৃজনশীল মানুষের প্রতি অত উদারভাবে শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানানোর অভ্যাস আমরা কি গড়ে তুলতে পেরেছি?’

সমাজের সামগ্রিক অসংলগ্নতা ও বিভেদ প্রসঙ্গেও লিখেছেন আফজাল হোসেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা বলি দেশ ভালোবাসি, কিন্তু দেশের জন‍্য ক্ষতিকর ভাবনায় শামিল হয়ে যাই। যারা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, ঘৃণা ছড়িয়ে বেড়ায়, সভ‍্যতার ক্ষতি করে তাদের অনুসারী হয়ে, তাদেরকে মান‍্য করে অনেক অনেক গর্ববোধ করি। জেগে থাকার অধিকাংশ সময়ই আমরা কাটিয়ে দিই অদরকারি কথা, কুতর্ক ও মানুষকে অসম্মান অমর্যাদা করার চেষ্টায়। গুরুত্ব পাওয়ার মতো বহু বিষয়ের প্রতি অমনোযোগী হওয়ার কারণে অসংখ্য প্রদীপ তেলহীন, নিভু নিভু। নিজ নিজ ঘরে আলো থাকলেই আমরা জীবন মুখর আছে ভাবি। এমন অসচতেনতায় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্যবোধ।’

এসব অন্ধকারের মধ্যেও কোক স্টুডিও বাংলার ‘মাস্ত কালান্দার’ তাঁর মনে আলো জ্বেলেছে। তিনি লিখেছেন, ‘কোক স্টুডিওতে যেভাবে রুনা লায়লাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা শুধু তাঁর গান শোনা ও দেখার অভিজ্ঞতা নয়, মনে হয়েছে সমগ্র আয়োজন যেন এ অসাধারণ শিল্পীর প্রতি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা। ভালোবাসা, শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও চমৎকার যত্নের জন‍্য কোক স্টুডিও বাংলাকে ধন‍্যবাদ। শিল্পী ও দর্শক শ্রোতার প্রতি সম্মান প্রদানের এমন আন্তরিক চেষ্টা আনন্দিত করে, আশা জাগায়। মাঝে মাঝে অনুভব করা দরকার, আলো নিভতে না দেওয়া মানুষ দেশে আছে, আছে বলেই মাঝে মাঝে আচমকা বিস্ময়, আনন্দ ও প্রাণের উষ্ণতা এসে এভাবে জীবনকে বুঝিয়ে দেবে, বেঁচে থাকা আসলেই সুন্দর। নতুন করে প্রাণ পাওয়া রুনা লায়লা ও “মাস্ত কালান্দার”জীবনে যোগ করেছে নতুন বিস্ময়, আলাদা রঙের আনন্দ। আমাদের প্রেমে, শ্রদ্ধায় আপনি দীর্ঘায়ু হোন রুনা লায়লা।’

রুনা লায়লা ও আফজাল হোসেন
রুনা লায়লা ও আফজাল হোসেন। কোলাজ

সৌদিতে হুতিদের হামলা, চার বছরের যুদ্ধবিরতির কি অবসান ঘটল

ইয়েমেনে তাঁদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ এনে দেশটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন হুতি বিদ্রোহীরা। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার চার বছরের যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটল। হুতিরা ইরান-সমর্থিত।

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের এক মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে হুতি গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি আরব।

হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাঁরা সৌদি আরবের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিশানা করে হামলা চালিয়েছেন। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ওই অঞ্চলটিতে অনেক সৌদি নাগরিক ঘুরতে যান।

২০২২ সালের মার্চে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে হুতিদের হামলার পর একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এরপর এই প্রথম সৌদির বিরুদ্ধে কোনো হামলার দায় স্বীকার করল গোষ্ঠীটি।

গত এপ্রিল মাসে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর সৌদির পূর্বাঞ্চল ও রিয়াদে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে এসেছিল। তবে সোমবারের এই সহিংসতার জেরে সৌদির দক্ষিণ সীমান্তে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলো।

উপসাগরীয় অন্য ছোট দেশগুলোর তুলনায় সৌদি আরব আয়তনে বড় হওয়ায় যুদ্ধের ধকল তারা ভালোভাবেই সামলেছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পূর্ব থেকে লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলের পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি সচল রেখেছে দেশটি। তবে অতীতে লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা চালানো হুতিদের সঙ্গে বড় কোনো সংঘাত তৈরি হলে, তা এই তেল রপ্তানির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

সৌদি যুবরাজকে ট্রাম্পের সবুজ সংকেত

মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরব হুতিদের নিয়ে উদ্বেগের কথা যুক্তরাষ্ট্রকে জানায় এবং সম্ভাব্য হামলার জন্য সমর্থনের অনুরোধ করে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরদিন রুবিও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে কথা বলেন।

মার্কিন এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, এর পরপরই গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ওই আলাপে মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চান এবং ট্রাম্প তা মঞ্জুর করেন।

ইরানি বিমান

এর আগে সোমবার ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সৌদি আরব ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে হুতিদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর অধ্যায় শেষ হলো।

একই সঙ্গে সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে ‘অবরোধ’ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদির আকাশসীমা এড়িয়ে চলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয় হুতিরা।

সানা বিমানবন্দরে চালানো হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। রিয়াদের ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট এই সরকারের অনেক সদস্যই রিয়াদে বসবাস করেন।

ইয়েমেনি সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করা থেকে বিরত রাখতে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালানো হয়েছিল। তারা জানায়, ইয়েমেনের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী যেকোনো বৈরী বিমানকে সরকারি বাহিনী ‘সব উপায়ে’ প্রতিহত করবে। এ জন্য ইরানকে দায়ী করেছে তারা।

পরবর্তী সময়ে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, উড়োজাহাজটি হুতি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। সানা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত হোদেইদাহে বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধ আবার চাঙা

ইয়েমেনের আরেক মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, হুতিরা সানা বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) আরেকটি বিমানকে আটকে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আইসিআরসির মুখপাত্র হাশেম ওসেইরান বলেন, রেডক্রসের সব কর্মী ও বিমানের ক্রুরা নিরাপদে আছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতি এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে আইসিআরসির মধ্যস্থতায় বন্দিবিনিময় চুক্তি ভেস্তে যায়। দুপক্ষই এ জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে, যা ক্রমবর্ধমান উত্তেজনারই ইঙ্গিত দেয়।

হুতিরা রাজধানী দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার পর থেকে ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি শক্তির প্রক্সি যুদ্ধ চলছে।

২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করে, যা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়।

গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দক্ষিণের অঞ্চলগুলো দখল করে নিলে সংঘাত আবার নতুন করে চাঙা হয়। এতে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে ফাটল ধরে। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ইরান যুদ্ধ চলাকালে লোহিত সাগরের বহু জাহাজে হুতিদের হামলা সত্ত্বেও ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিটি অনেকটাই বজায় ছিল।

ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৩ জুলাই ২০২৬, সানা
ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৩ জুলাই ২০২৬, সানা। ছবি: এএফপি