Sunday, September 13, 2009

মুক্তিযোদ্ধা আবুর কথা বলছি by গাজীউল হক

আজ ১২ সেপ্টেম্বর। একাত্তরের রণাঙ্গনে শহীদ হওয়া কিশোর আবুর ৩৮তম শাহাদতবার্ষিকী। পুরো নাম আবু জাহিদ। তবে ‘আবু’ নামেই ওই কিশোর সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে তিনি হয়ে ওঠেন এক আদর্শিক নাম। কুমিল্লা জিলা স্কুলের নবম শ্রেণীর ওই শিক্ষার্থী এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। উত্তরসূরিদের সংগঠন কুমিল্লা জিলা স্কুল ফোরাম ’৭৩-এর সব সহপাঠী তাঁকে আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দিনটি এলেই তাঁরা সহপাঠী হারানোর কষ্টে একত্রে মিলিত হন। আবুর নামে তাঁরা কুমিল্লা জিলা স্কুলে মিলনায়তনের নামকরণ করেন।
ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে আবু এক তেজোদীপ্ত নাম। এক অহঙ্কারের নাম। আর ওই অহঙ্কারকে অলংকার মনে করছে এখানকার সহস্রাধিক শিক্ষার্থী।
কিশোর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবু জাহিদের জন্ম ১৯৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে কুমিল্লা শহরের মগবাড়ী চৌমুহনীতে। বাবা আবুল হাসেম দুলা মিয়া ও মা ভেলুয়া বিবির পাঁচ পুত্রসন্তানের একজন আবু। ১৯৬৭ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। ব্যতিক্রমী স্বভাবের ওই কিশোর সবার কাছে অল্প সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন।
সহপাঠীরা জানান, বালকবেলা থেকেই আবু খুব ডানপিটে ছিলেন। পাখির বাসার খোঁজ করা, গ্রীষ্মের ভরদুপুরে আম পাড়া আর বাড়ির কাছের গোমতী নদী তাঁকে দারুণ মোহিত করত। খেলাধুলায়ও ছিলেন সবার আগে। সাহসী হিসেবে বন্ধুমহলে তাঁর পরিচিতি ছিল।
ঊনসত্তরে শহীদ আসাদের রক্তমাখা জামা নিয়ে মুক্তিকামী জনতার প্রতিবাদ ও সংগ্রামের কথা খবরের কাগজে পড়ে তাঁর মনে বিপ্লবী স্পৃহার জন্ম নেয়। একাত্তরের যুদ্ধ শুরু হলে মায়ের কাছে বায়না ধরেন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। অনুমতি মেলে না তাঁর। মা ভেলুয়া বিবির স্বামীসহ অন্য চার ছেলে যুদ্ধে গেছেন। এতটুকুন ছেলেকে তিনি কিছুতেই যুদ্ধে পাঠাতে রাজি নন। একদিন কিশোর আবু ফন্দি করেন। মাকে বলেন, ‘১০ টাকা দাও। সেলুনে যাব, শেভ করতে হবে।’ ওই টাকা নিয়ে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। গন্তব্য ভারতে। একাত্তরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আবু কুমিল্লা শহরের অদূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া টিলার কাছে মুক্তি শিবিরে এসে উপস্থিত হন। তখন তাঁর শরীরের সব কাপড় ছিল ভেজা। সেখানে অবস্থানরত তাঁর বড় ভাই আনোয়ার হোসেন কেনু মিয়া আবুকে দেখে বিচলিত হন। আবু তাঁকে বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তোমাদের খোঁজে বাড়িতে আসে। বাড়ি তল্লাশি করে। আমরা এ বাড়ি, সেই বাড়ি পালিয়ে বেড়াই। এভাবে বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না। যদি বাঁচতে হয়, তাহলে বীরের মতো বাঁচব। দেশকে বাঁচাতে পারলে আমরাও ভালো থাকব। তাই গোমতী নদী সাঁতরিয়ে এখানে চলে এসেছি।’ এ কথা বলার পর বড় ভাই তাঁকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু বড় ভাইয়ের অনুরোধ তাঁকে দেশমাতৃকার লড়াই থেকে একটুও টলাতে পারেনি, বরং গেরিলা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য কেঁদে একাকার। সেখানে উপস্থিত অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও তাঁকে বয়স কম বলে মুক্তিযুদ্ধে যেতে বারণ করেন। অনেক পীড়াপীড়ির পর সেক্টর ইস্টার্ন জোনের কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি তাঁকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে আবু অবস্থান করছিলেন নিমবাগ বাদাম ঘাট হেড কোয়ার্টারে। ১২ সেপ্টেম্বর বড় ভাই আনোয়ার হোসেন কেনুর জন্য একটি চিঠি লিখে যান আবু। ওই চিঠিতে দোয়া চেয়ে জানিয়েছিলেন, ‘ওই দলের দলনেতা এবং পরে প্রথিতযশা মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হাসান পাখী ভাইয়ের সঙ্গে আমি অপারেশনে যাচ্ছি।’ ওই দিন রাতে নাজমুল হাসান পাখীর নেতৃত্বে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার চারগাছ বাজারে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ঝটিকা অপারেশনে বের হন। নয়জন মুক্তিযোদ্ধার একটি বহর নৌপথে ওই অপারেশনে রওনা হয়। ওই দলে ছিলেন শিব নারায়ণ দাস, নৃপেণ পোদ্দার, মুমিনুল হক ভূঞা, মোজাম্মেল হক, সাইফুল ইসলাম, আবু জাহিদসহ আরও অনেকে। রাতের অপারেশন, তাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর এ দেশের আলবদর বাহিনীর সহায়তায় মাঝনদীতে দলটির ওপর গুলি চালায়। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে মারা যান মোজাম্মেল হক ও সাইফুল ইসলাম। কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা আবুও গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সঙ্গী এবং মুক্তিকামী জনতা নদী থেকে কিশোর আবুর মরদেহ উদ্ধার করে। অতঃপর তাঁকেসহ তিন মুক্তিযোদ্ধাকে চারগাছ উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় সমাধিস্থ করা হয়। পরে সেখানে তাঁদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ওই দলের দলনেতা এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) নাজমুল হাসান পাখী স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আবু দেশকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত। তেজোদীপ্ত ছেলে ছিল ও। তার চিন্তা গভীরভাবে রেখাপাত করেছে আমাদের। মিছিল আর সমাবেশে চেতনার রং ফুটিয়ে তুলত আন্দোলনের সামনের কাতারে থেকে।’
এ দিনটি এলে তাঁর সহপাঠীরা প্রতিবছরই কিছু করার চেষ্টা করেন। আজ শনিবার আবুর নামে নির্মিত ‘শহীদ আবু জাহিদ’ মিলনায়তনে সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হাসান পাখী, মুমিনুল হক ভূঞা ও আবদুল্লাহ-হিল-বাকী তাঁকে নিয়ে আলোচনা করবেন। তাঁর নামে স্মৃতিফলক উন্মোচন করবেন। সহযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেবেন। অনুষ্ঠানে কুমিল্লা-৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. আবদুর রউফ অতিথি থাকবেন। আবুর সহপাঠী কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনোয়ার ফারুক কুমিল্লা জিলা স্কুলের ফোরাম ’৭৩-এর সভাপতি। আবুর সহপাঠী শাহ মো. সেলিম বলেন, ‘বেঁচে থাকলে ও (আবু) আমাদের সঙ্গে ১৯৭৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নিত। তাই ওই ব্যাচের সবাই তাঁকে সব সময়ই স্মরণ করে। ওর কথা মনে এলে এখনো কাঁদি।’

বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং by মামুন রশীদ

কথা হচ্ছিল, বাংলাদেশের বাইরে আমাদের একজন সার্বভৌম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে। বাংলাদেশের সার্বভৌম ঝুঁকি রেটিং বিষয়ে কিছু কথা বলার পরই তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশ ডাজ নট ডু এ গুড পি আর’ অর্থাত্ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জনসংযোগ ভালো নয়। আমাদের অনেকের একটি সাধারণ দুঃখবোধ রয়েছে যে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সত্যিকারের ভাবমূর্তি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এখনো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যেন বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দুর্নীতিগ্রস্ততাসহ নানা ধরনের নেতিবাচক ভাবমূর্তির একটি দেশ।
আমাদের দেশের অনুসরণযোগ্য বেশ কিছু কার্যক্রমসহ অনেক ইতিবাচক দিক বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে অজ্ঞাতই থেকে গেছে। যে কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই দেশটাকে শুধু নেতিবাচক বিষয়গুলোর মাপকাঠিতেই বিচার করা হয়। আমাদের জনগণের অসাধারণ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, অমিত সাহস, অদম্য মানসিকতা, প্রত্যয়-প্রতিশ্রুতি ও অফুরন্ত উদ্ভাবনী শক্তি এবং সফল সব কর্মকাণ্ডসহ ইতিবাচক দিকগুলো আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্বের সামনে সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কয়েক দশক ধরে বেশ কিছু খাতে বাংলাদেশ যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করলেও সেসব স্বীকার করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কেন জানি ইতস্তত বোধ করে। অথচ বাংলাদেশের এসব অর্জনগাঁথা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে শুধু বেশিই নয়, বরং অনেকের জন্য অনুকরণীয়ও বটে। বাংলাদেশকে এখনো ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারাই হয়তো এর প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সচরাচর একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায় যে তারা বাংলাদেশকে বেশির ভাগ সময়ই আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে থাকে। এমনকি বাংলাদেশকে বিভিন্ন অকার্যকর দেশগুলোর কাতারেও ফেলেন কেউ কেউ। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে এহেন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দোষারোপ করলে সেটা হবে ‘ক্রন্দনরত’ শিশুর মতো আচরণ। এ ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে। কারণ আমরাও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে দেশের জনগণের সত্যিকারের চেতনা ও দেশের ভাবমূর্তি সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এই অক্ষমতার কারণেই আমাদের আর দেরি না করে বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
সামপ্রতিককালে স্থানীয় একটি সংগঠন ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’ বা বাংলাদেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে ঢাকায় একটি সেমিনারের আয়োজন করে। যদিও ওই সেমিনারে ব্র্যান্ডিং-সংক্রান্ত মৌলিক ধারণার বাইরেও কিছু অপ্রাসঙ্গিক বা বিভ্রান্তিকর আলোচনাও হয়েছিল, তবে সেমিনারটি সন্দেহাতীতভাবেই সময়োপযোগী ছিল বলে আমি আয়োজক সংগঠনটিকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন আলোচনার চেয়ে একটি কার্যকর কৌশল নেওয়াই হবে উত্তম কাজ। এ ক্ষেত্রে বিপণন-ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতিমালা মেনে তবেই মাঠে নামা উচিত হবে।
আন্তর্জাতিক ফোরামে ‘বাংলাদেশ’-এর ব্র্যান্ড ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই ‘ব্র্যান্ড’ শব্দটির সত্যিকারের মানেটা বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্র্যান্ডের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা মূলত বিপণন ব্যবস্থাপনারই একটি প্রক্রিয়াবিশেষ, যেখানে একজন বিক্রেতা গুণগত মানের ওপর জোর দিয়ে কিংবা প্রতিযোগীদের চেয়ে আলাদা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরার মাধ্যমে তাঁর পণ্য বাজারজাতকরণের চেষ্টা করেন। ‘বিপণন গুরু’খ্যাত ফিলিপ কোটলার ব্র্যান্ডকে গোটা পাঁচেক শব্দের সমষ্টিগত রূপ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, ‘একটি নাম (নেইম), শর্ত বা কার্যকাল (টার্ম), প্রতীক বা চিহ্ন (সাইন), নমুনা (সিম্বল) এবং রূপরেখা বা পরিকল্পনা (ডিজাইন) অনুযায়ী অথবা এসব শব্দের সমষ্টিগত ব্যঞ্জনায় কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র ধরনের পণ্য বা সেবা বিক্রি করলে সেটাকেই ব্র্যান্ড বলে।’ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ব্র্যান্ড হচ্ছে মূলত সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রির ব্যাপারে ক্রেতার কাছে বিক্রেতার প্রতিশ্রুতি বিশেষ। এর মধ্যে সেটিকেই সবচেয়ে ভালো ব্র্যান্ড বলা যাবে, যেটির মধ্যে সর্বোচ্চ গুণগত মানের নিশ্চয়তা থাকে।’
পণ্য বা সেবা যেটাই হোক, সেটাকে বৈশ্বিক বাজারে সুনাম ও সাফল্যের সঙ্গে তা বাজারজাত করাটাই হলো ‘ব্র্যান্ডবিষয়ক ভাবমূর্তি’র বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে সচরাচর জাতীয় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্র্যান্ডিংয়ের ধারণায় উজ্জীবিত হয়ে আজকাল স্বল্পোন্নত দেশগুলোও এদিকে ঝুঁকছে। কোনো দেশ বা জাতির নামে ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে তা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে আকৃষ্ট করে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হয়।
ব্র্যান্ডিংয়ের নমুনা হিসেবে প্রায়ই বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধরনের চিত্তাকর্ষক কিছু স্লোগানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। যেমন—‘মালয়েশিয়া: সত্যিকারের এশিয়া’ (মালয়েশিয়া, ট্রুলি এশিয়া); ‘দুবাই: মরুভূমিতে রত্নপাথর’ (দুবাই: দ্য জুয়েল ইন দ্য ডেজার্ট); ‘চীন: বিশ্বে উত্পাদনের কারখানা (চায়না: দ্য ফ্যাক্টরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড) এবং ‘শ্রীলঙ্কা: ভারত মহাসাগরের মুক্তা’ (শ্রীলঙ্কা: দ্য পার্ল অব ইন্ডিয়ান ওশান) ইত্যাদি। আমরা যখন নিউজ উইক, টাইম বা দ্য ইকনোমিস্টের মতো বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিনগুলোর পাতা উল্টাই তখন দেখতে পাই যে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশও এখন নিজেদের ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যাপারে বেশ মনোযোগী হয়েছে।
আমাদের প্রতিবেশী ভারতও ব্র্যান্ড পরিচিতি নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। দেশটি এরই মধ্যে অব্যাহত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকাশ, শিল্প খাতে নিত্যনতুন উদ্ভাবন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব সাধন এবং ‘ইন্ডিয়ান নলেজ ব্যাংক’ বা ‘ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডার’-এর বদৌলতে বিশ্বের কাঙ্ক্ষিত বাজারগুলোতে ঢুকে পড়েছে।
আমাদের দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতির জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করতে হলে আমাদের প্রথমেই কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে—আমাদের অভিজ্ঞতা, স্বাতন্ত্র্যবোধ বা অসাধারণত্ব, জনগণের আচরণ ও ঐতিহ্যগত গুণাবলি এবং বাধা-বিপত্তিসমূহ ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সবগুলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকও বিবেচনায় রাখা জরুরি। আমাদের ভালো-মন্দ যে অভিজ্ঞতাই থাকুক না কেন, সেটাকে পুঁজি করে ব্যাপকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করাই হবে দেশের ব্র্যান্ড পরিচিতির অন্যতম নিয়ামক। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অবারিত প্রতিশ্রুতি আর সাহসের সঙ্গে আমাদের জনগণ যেভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আসছে এবং দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, তা কাজে লাগানো যেতে পারে।
বিশ্বে আমরাই প্রথম নিজেদের দারিদ্র্য বিমোচনের উপায় হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি উদ্ভাবন করেছি, যা এখন আমরা বিশ্বকে শেখাতে পারি। তৈরি পোশাকশিল্প নিয়েও আমরা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছি। বদৌলতে প্রতিবছরই বিশ্ববাজারে আমাদের তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে। জাতি হিসেবেও আমরা নিপীড়িত ও বঞ্চিতদের ভাগ্য বদলের লক্ষ্যে সহনশীলতা প্রদর্শনসহ সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছি। আমাদের পূর্বসূরিদেরও অনেকেই তাঁদের জীবন উত্সর্গ করে গেছেন, যাতে উত্তরসূরিরা সব ধরনের মানবিক সুযোগ-সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারে। আমাদের অব্যাহতভাবেই নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হলেও আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগোনোর পথ থেকে বিচ্যুত্ হইনি। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সভ্যতা আমাদের জনগণকে বিনয়-ভদ্রতা, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়, স্বাভাবিক কর্মোদ্যম এবং স্বপ্ন দেখার মতো মানবীয় বিষয়গুলোসহ শত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র শিখিয়েছে।
আমাদের বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবেই একটি ‘জাতি-রাষ্ট্র’ বিশেষ। যেখানে ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও চেতনা অভিন্ন রকমের। সে জন্য বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে কোনো রকম মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার দরকার নেই, যা আমাদের নেই বা যা আমরা করতে বা দেখাতে পারব না তা নিয়ে কথার ফুলঝুরি ছড়ানোরও প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান বাধা-বিপত্তি, দুর্বলতা ও পশ্চাত্পদতা ইত্যাদি সাবলীলভাবে স্বীকার করেও আমরা নিজেদের যেসব অর্জন ও ভালো দিক আছে সেগুলো নিয়েও বাংলাদেশকে একটি ব্র্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
তবে এ কথাও ঠিক যে কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বাজারজাত করার চেয়ে বিশ্বের দরবারে দেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করে তোলার কাজটি অনেক বড় এবং বেশ কঠিনও বইকি। বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি জোরদারের যে প্রচেষ্টা চলছে তাতে জনগণের অগাধ আস্থা-বিশ্বাস ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের দেশের ব্র্যান্ড পরিচিতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিশ্বের কাছে আমাদের বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী, বেসরকারি খাত, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, কৃষক-শ্রমিক, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সবাইকে এবং বিশেষ করে গণমাধ্যমকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমস্বরে সোচ্চার হতে হবে।
বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক উত্তরণের পর্যায়ে থাকা একটি দেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের কথাও ভাবতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী এবং সমজাতীয় দেশগুলো কীভাবে ব্র্যান্ডিং করে ওপরে উঠেছে, সেটিও অনুসরণ করা যেতে পারে।
তবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড পরিচিতি অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের মূল সংগ্রামের পথ থেকে ছিটকে না পড়ি, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। আবার একটি গতিশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আমরা যেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন সান্ত্বনার জ্বরে না ভুগি, সেটাও খেয়ালে রাখতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি রোধ, দারিদ্র্য বিমোচন, ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করার ব্যাপারে জোর দিতে হবে।
আমাদের এখন আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে আমরা সত্যিকার অর্থেই ব্র্যান্ডের পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। বোঝাতে হবে, আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার বদল হয়। আর সরকার বদল হলেও মৌলিক নীতিমালায় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বিদেশি সাহায্য পাওয়ার জন্য এখানে যতটা না ‘নাই নাই’ প্রচেষ্টা অব্যাহত, তার চেয়েও বেশি দেদীপ্যমান দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টা। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জোরদার করার ব্যাপারেও নিরন্তর লড়াই করে চলেছি। বাংলাদেশকে একটি গতিশীল ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের প্রচেষ্টা হতে হবে অব্যাহত ।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ।

পলিথিন সমস্যা by জানে আলম

ঢাকা শহরে পরিবেশের বড় শত্রু পলিথিন। পলিথিন ব্যাগ দামে সস্তা, হালকা ও মজবুত বলে এটা সবাই ব্যবহার করতে উত্সাহী হয়। পলিথিন প্রতিনিয়ত আমাদের ক্ষতিসাধন করছে। পলিথিন মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, পয়োনিষ্কাশনে সমস্যার সৃষ্টি করছে। ফলে সামান্য বৃষ্টির পানিতে শহর বন্যার মতো ডুবে যায়। ১৯ জুলাইয়ের বৃষ্টিপাতে ঢাকা শহর যেভাবে তলিয়ে গিয়েছিল, তা কারও অজানা নয়। পলিথিন আমাদের ক্ষতিসাধন করে বলেই সরকার এর উত্পাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তার পরও একশ্রেণীর পেশাদার ব্যবসায়ী পলিথিন উত্পাদন, বাজারজাত করছেন।
আইনের প্রয়োগের জন্য সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা দরকার। পলিথিন ব্যাগ বন্ধের পাশাপাশি চটের ব্যাগ ব্যবহার করার জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর জন্য কীভাবে চটের ব্যাগ সস্তা মূল্যে সরবরাহ করা যায়, তার উপায় বের করতে হবে।
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ।
Alam1122@gmail.com

ত্যাগ ও সংযম সাধনায় মাহে রমজান -মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে মাহে রমজানের রোজাব্রত পালন বা সংযম সাধনা। মানুষের দেহ ও মনকে সংযমের শাসনে রেখে ইসলামি শরিয়ত বা জীবনবিধানের পরিপন্থী যাবতীয় অসামাজিক ও অমানবিক কার্যাবলি পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তাকওয়া অর্জনের কঠোর সিয়াম সাধনাই মাহে রমজানের মূলকথা।
রোজা অর্থ আত্মসংযম। মিথ্যাচারিতা, আজেবাজে, অহেতুক কথা বলা, চোখের গিবত এবং কটুবাক্য থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখা, প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত করা এবং হারাম মাল না খাওয়া সর্বক্ষেত্রেই সংযত হওয়া বাঞ্ছনীয়। রমজান মাসে রোজা প্রকৃতই রোজাদারদের হাত, পা, মুখ ও অন্তঃকরণকে সংযত করে। সত্কর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের রোজা চক্ষু, কান, জিহ্বা, হাত, পা এবং সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়। যেমন—চোখকে অবৈধ দৃষ্টিপাত থেকে ফিরিয়ে রাখা। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বাণী প্রদান করেছেন যে, ‘মন্দ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা শয়তানের একটি বিষমিশ্রিত তীর।’ যে আল্লাহর ভয়ে এটা বর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ঈমানের এমন নূর প্রদান করেন, যার আস্বাদন সে অন্তরে অনুভব করে।
দেহকে আত্মনিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দৈহিক প্রেরণাকে সংযত করতে হয়। আত্মিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করতে হয়। দৈহিক কামনা-বাসনাকে সংযত করার জন্য একদিকে ক্ষুধা, তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য ও রিপুর তাড়নাকে পরিত্যাগ করতে হয়, অপর দিকে জিহ্বা ও মনের চাহিদা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এভাবে দৈহিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রেরণাকে যত সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অন্য কোনোভাবে তা সম্ভব নয়। তাই হারাম জিনিস দেখা, নিষিদ্ধ কথা শ্রবণ করা ও হারাম কাজ সম্পাদন করা প্রভৃতি থেকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অবশ্যই বিরত রাখা উচিত। তবেই রোজার স্বাদ অনুভূত হবে এবং রোজাও প্রাণবন্ত হবে। মাহে রমজানে ত্যাগ ও সংযম সাধনার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচটি বিষয় রোজাদারের রোজা বিনষ্ট করে দেয়—মিথ্যা বলা, কুটনামি করা, পশ্চাতে পরনিন্দা করা, মিথ্যা শপথ করা এবং খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো।’
মাহে রমজান হলো সংযম সাধনারই একটি সুবর্ণ সুযোগের মাস। আর নিরলস সাধনা হলো নিজের বিরুদ্ধে, নফ্স, রিপু ও লালিত কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রকৃত মুজাহিদ তো সে-ই, যে তার নিজের নফ্স ও রিপুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।’ (মুসনাদে আহমাদ) রোজাব্রত পালন বা সিয়াম সাধনার বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যাচার, পরনিন্দা, গিবত, কটুবাক্য ব্যবহার প্রভৃতি গর্হিত কাজ থেকে জিহ্বাকে সংযম অবস্থায় রাখতে হবে। তাই নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ! তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে তখন যেন মুখ দিয়ে অশ্লীল ও খারাপ কথা না বলে, কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে—আমি রোজাদার।’ (বুখারি)
রোজাদারকে কু-কথা শ্রবণ করা থেকে নিজের কানকে বিরত রেখে সাধনা করতে হবে। কেননা যেসব কথা বলা হারাম সেগুলো শ্রবণ করাও হারাম। এ কারণেই মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারীদের পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘গিবতকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই গুনাহের অংশীদার।’ সুতরাং রমজান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকা, রুটিনমাফিক উপবাস করা, মসজিদে যাওয়া, তারাবি নামাজ পড়া, ইফতার আর সেহির খাওয়াতেই রোজাব্রত পালন সম্পন্ন হয় না, এর সঙ্গে রোজাদার ব্যক্তির দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সংযম সাধনা করা বাঞ্ছনীয়।
মাহে রমজানে রোজাদারদের চোখকে খারাপ জিনিস দেখা থেকে বিরত রাখতে হবে। পা-কে অসত্ কাজে অগ্রসর হতে বাধা দিতে হবে। হাতকে চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্নীতি, ছিনতাই, রাহাজানি, খুনখারাবি, ধর্ষণ, অপহরণ, চোরাকারবারিসহ সকল প্রকার অবৈধ কাজকর্ম থেকে বা হারাম খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে। কানকে নিষিদ্ধ কোনো কিছু শোনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মনকে কামনা-বাসনা, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসামুক্ত রেখে মৃত্যু ও পরকালীন হিসাব-নিকাশের কথা সর্বদা স্মরণে রেখে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জনে উন্মুখ হতে হবে। এভাবে মাহে রমজানের কঠোর সংযম সাধনা ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে হবে আগামী ১১টি মাস। তাহলেই সিয়াম পালন ও সংযম সাধনা পূর্ণাঙ্গ হবে।
প্রকৃতপক্ষে মাহে রমজান ত্যাগ ও সংযম সাধনার মাস। এ মাসে লাগামহীনভাবে জীবন যাপন করা যায় না। ইচ্ছা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও হালাল খাদ্য গ্রহণ এবং বৈধ ভোগ্যসামগ্রী দিনের বেলা উপভোগ করা যায় না। তাই মাহে রমজান রোজাদারদের অত্যন্ত সংযত ও মার্জিত হতে শিক্ষা দেয়।
মানুষের মধ্যে যেসব কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, তা মানুষকে অন্যায়-অত্যাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। মাহে রমজানের রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে পশু-প্রবৃত্তিকে দমন করা এবং ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়া। বছরের ১১ মাস প্রচুর খাওয়ার পর রমজানের এক মাস কিছুটা কম খেয়ে সংযম সাধনা করলে তেমন অসুবিধা হয় না। যার ইন্দ্রিয় তৃষ্ণা প্রবল তাকে রোজা রাখার জন্য উপদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ১২ মাসের মধ্যে একটি মাস ইন্দ্রিয় সংযমের জন্য রোজা পালনের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই মানুষের মঙ্গলের জন্যই সিয়াম সাধনাকে শরিয়তের বিধান হিসেবে নির্ধারিত করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সব শরিয়তেই রোজার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির কঠোর সংযম সাধনার প্রচলন ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই রোজা পালন সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।
রোজা মানুষকে সংযমী মনোভাব গড়ে তোলার অতুলনীয় শিক্ষা দেয়। সংযত ও নিষ্ঠাবান হওয়ার যে মহান শিক্ষা মাহে রমজানে রয়েছে আমরা যেন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি, যার ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত রোজাদারদের সংযম সাধনা। ইবাদত-বন্দেগি, তাসবিহ-তাহলিলের ভেতর দিয়ে সব ধরনের অন্যায়, অশোভন, অনাচার, দুরাচার, পাপাচার, অকল্যাণকর কাজকর্ম থেকে বিরত হয়ে সংযম সাধনার পথ ধরে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয় এ মাহে রমজান। রোজার মাধ্যমে সংযম সাধনার ফলে মানুষের পক্ষে পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হয়। কিন্তু আমরা যদি নিজেদের মধ্যে সংযম ও আত্মসংশোধন না আনতে পারি এবং আগের মতো অন্যায় কাজে লিপ্ত থেকে রোজা পালন করি, তাহলে এ ধরনের সিয়াম সাধনার কোনো মূল্যই আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না।
অতএব, মাহে রমজানের সংযম সাধনার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় একজন রোজা পালনকারী ঈমানদার মুসলমানকে অবশ্যই হতে হবে বাকসংযমী, লোভে সংযমী, অপকর্মে সংযমী, নিদ্রায় সংযমী, নিষিদ্ধ কর্মে সংযমী, আচরণে সংযমী। রমজান মাসের এ হেন ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মসংযম সাধনার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের সবাইকে মানব জাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করে যেতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

সেনা স্থানান্তর ও পাহাড়ে শান্তির খোঁজ by ফিরোজ জামান চৌধুরী

সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে ‘সেনা প্রত্যাহার’ বা ‘সেনা স্থানান্তর’ নিয়ে আলোচনা আর বির্তকের শেষ নেই। অনেকেরই আশঙ্কা, সেনা প্রত্যাহার হলে পার্বত্যাঞ্চলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাবে, ওখানে আর কেউ বাস করতে পারবে না। আবার অনেকে ভাবছে, সেনা ছাউনি সরিয়ে নিলেই তবে সেখানকার নাগরিকেরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে খতিয়ে দেখা যাক পার্বত্যাঞ্চলে সেনা-সংস্কৃতির ভালো-মন্দ এবং রাষ্ট্রের মনোজগতে এর অবস্থান।
সরকারি সূত্র দাবি করছে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৩০০ সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এ বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩৫টি সেনাক্যাম্পসহ একটি ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু ক্যাম্প স্থানান্তর করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সেনা প্রত্যাহার বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য লক্ষ করার মতো। ১৯ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শামীম চৌধুরী বলেছেন, ‘১৯৯৮ সালে ১০টি ক্যাম্প সরানোর মধ্য দিয়ে এটি শুরু হয় এবং ২০০৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৩টি ক্যাম্প সরানো হয়েছে। এ বছর ৩৫টি ক্যাম্প সরানো হচ্ছে।’ (প্রথম আলো ২০ আগস্ট)।
এখানে ‘২০০৪ সাল’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এ যাবত্ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যত সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৬৩টি) সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে ২০০৪ সালে—বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে। তাহলে এখন বিএনপি কেন এই ইস্যুতে ভিন্নমত পোষন করছে? বিএনপির অনেক নেতা তো এর ফলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও দেখতে পাচ্ছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে যখন সেনা প্রত্যাহার করেছিল, তখন কি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল? যদি না পড়ে থাকে, তাহলে এখন কেন সে প্রসঙ্গ আসছে?
পার্বত্যবিষয়ক যেকোনো আলোচনায় ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় দুই দশক (১৯৭৭—১৯৯৭) ধরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির (যা ‘শান্তিচুক্তি’ নামে অধিক পরিচিত) পর থেকে তিন পার্বত্য জেলাতেই স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। দেশের অন্য অঞ্চলের মতো ওখানেও কিছু বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির পর কোনো ব্যক্তি বা বিবাদমান কোনো পক্ষ, রাজনৈতিক দল বা সংস্থা একবারের জন্যও বলেনি যে পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধাবস্থা চলছে। তাহলে কেন সেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘কৃত্রিম যুদ্ধাপরিস্থিতি’ বজায় রাখা হবে?
বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাসহ সারা দেশে অসংখ্য হামলা বা জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভয়াবহ ওই সব ঘটনার পর কোথাও সেনা শাসন জারির প্রয়োজন পড়েনি। সিভিল প্রশাসনই সব পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। যশোর, খুলনা, নওগাঁসহ দেশের অনেক অঞ্চলে সর্বহারা কর্তৃক অপহরণের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কই, সেখানে তো সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ে না। পার্বত্যাঞ্চলে ছোটখাটো চাঁদাবাজি বা বিচ্ছিন্ন কোনো অপহরণের ঘটনাকেও সেভাবে দেখা উচিত। নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখলেও বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সার্বক্ষণিক সেনা উপস্থিতির প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
পার্বত্য নেতৃত্বের অনেকে বলছেন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ক্যান্টনমেন্টসহ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করতে হবে। তাঁদের এ মত কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, দেশের অন্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও পর্যাপ্ত ক্যান্টনমেন্ট থাকতে হবে। এমনকি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। বিদ্যমান ছয়টি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা অবিকৃত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে পাড়ায় পাড়ায় এবং পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সেনাক্যাম্প রেখে নাগরিকজীবনের স্বস্তি নষ্ট করার কোনো মানে থাকতে পারে না। তাই বলব, পর্যায়ক্রমে সব সেনাক্যাম্প গুটিয়ে সব সেনাসদস্যকে পার্বত্য এলাকার ছয়টি ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনা হোক। যদি কোনো স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে তবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়নে সেনা প্রেরণ করার সহজ সুযোগ তো রইলই।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৯৭-এর পার্বত্য চুক্তির আলোকেই সরকারিভাবে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের অনুমান, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামের জিওসি যেমন বলেছেন, ‘আগে পাহাড়ের অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ছিল না, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্গম। এখন ওসব এলাকায় ভালো সড়ক যোগাযোগ, এমনকি মোবাইল টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে সেসব জায়গায় অর্থহীন ক্যাম্প রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।’ (প্রথম আলো ২০ আগস্ট)। জিওসির এই বক্তব্য খুবই দূরদর্শী বলে মনে হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলতে চাই, তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলার অলিগলিতে সেনা অবস্থান করানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ‘অপারেশন উত্তরণ’ প্রত্যাহার করে নিয়ে সিভিল প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
সেনা স্থানান্তরের ফলে এতদিন সেনা নিরাপত্তায় থাকা বসতি স্থাপনকারী উদ্বাস্তু বাঙালিরা নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে সংগত কারণেই উত্কণ্ঠিত। দেশের যেকোনো এলাকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সবার নিরাপত্তার স্বার্থে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে পুলিশ-আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ বাহিনীর মতো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘পার্বত্য পুলিশ বাহিনী’ গঠন করা যেতে পারে।
২.
সেনা স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বসতি স্থাপনকারী (সেটেলার) বাঙালিদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের বিষয়টিও জড়িত। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের তিন ভাগে শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন: পাহাড়ি আদিবাসী, স্থায়ী বাঙালি এবং সেটেলার বা বসতি স্থাপনকারী বাঙালি। একটি পরিসংখ্যানে চোখ বুলানো যাক। ১৯৫১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮ হাজার ৭০ জন (মোট জনসংখ্যার ছয় শতাংশ)। আর ১৯৯১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে চার লাখ ৭৩ হাজার ৩০১ (মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ)। জ্যামিতিক হারে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে মূলত আশির দশকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বিভিন্ন জেলার ছিন্নমূল বাঙালিদের অবৈধ বসতি স্থাপনের ফলে।
স্থায়ী বাঙালিদের নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা নেতারা একবারের জন্যও প্রশ্ন তোলেননি। মূল সমস্যা সেটেলার বা বসতিস্থাপনকারী বাঙালিদের নিয়ে। কারণ এরা অবৈধ অধিবাসী। এরা কেউ কখনো ওখানে জমি কিনে বসবাস শুরু করেনি। জিয়া ও এরশাদের আমলে সরকারের দেখানো লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিল সারা দেশের অজস্র হতদরিদ্র উদ্বাস্তু বাঙালি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পাহাড়ের জায়গা-জমি দখল করে তাদের অবৈধভাবে বসবাস করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের অনেককে দেওয়া হয়েছিল খাসজমির মিথ্যা দলিল।
পার্বত্য অঞ্চলের কোনো গুচ্ছগ্রামে গিয়ে যদি কোনো সেটেলার বাঙালিকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার বাড়ি কোথায়? তিনি নির্দ্বিধায় বলবেন, কুড়িগ্রাম, মুক্তাগাছা, ফেনী, ভোলা বা অন্য কোনো এলাকার নাম। তাঁর মন পড়ে আছে নদীভাঙা কোনো গ্রামে, দেহটা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, পার্বত্যাঞ্চলের সেটেলার বাঙালিদের প্রায় ৩০ বছর ধরে সরকার রেশন দিয়ে চলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে রেশন দিয়ে তাদের পার্বত্যাঞ্চলে লালন-পালন করতে হবে? সেটেলার বাঙালিদের রেশন ও নিরাপত্তা বাবদ প্রতিবছর কত শত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে? আমাদের মতো সাধারণ জনগণের দেওয়া করের টাকা কেন এভাবে নষ্ট হবে? সরকারকে এর জবাব দিতে হবে। তবে শুধু বাঙালি নয়, পাহাড়ি উদ্বাস্তুদেরও গণহারে রেশন দেওয়া চলবে না। রেশনের নামে সরকারি টাকা তছরুপ কোনো বিবেচনায়ই সমর্থনযোগ্য নয়।
পাহাড়ের অপরিচিত আঙিনায় সেটেলার বাঙালিদের অধিকাংশই বিভিন্ন গুচ্ছগ্রাম বা নিকটবর্তী পাহাড় দখল করে বসবাস করছে। উদ্বাস্তু এসব বাঙালির মানবেতর জীবন কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাম্য হতে পারে না। কিন্তু কীভাবে অবৈধ বসবাসকারী উদ্বাস্তু এই বাঙালিদের পুনর্বাসন করা যাবে?
এ বিষয়ে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বলেছেন, ‘গুচ্ছগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিদের বেশির ভাগই দরিদ্র। যথাযথ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসিত করা যেতে পারে। যদি ভূমি কমিশন রায় দিয়ে বলে, সরকার তাদের যে দলিল দিয়েছিল তা বেআইনি, তাহলে গুচ্ছগ্রামবাসীর যথাযথ পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তাবে। ...তাদের পার্বত্যাঞ্চলে পুনর্বাসিত না করে অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা যেতে পারে। ...ইউরোপীয় কমিশন এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। (মুক্তপ্রকাশ, আর্টিক্যাল-১৯ ও এমএমসি প্রকাশনা, জুন ২০০৯)।
আমাদের সামনে পার্বত্য সমস্যা সমাধানে অনেক রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে। তার মধ্য থেকেই কোনো একটা বেছে নিতে হবে। বলপ্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেই সমাধান সূত্র খুঁজতে হবে। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সরকারের উচিত হবে, দ্রুতই সেটেলার বাঙালিদের দেশের বিভিন্ন স্থানে খাসজমি বরাদ্দ দিয়ে সম্মানজনক পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা। তাদের পুনর্বাসনের জন্য বিদেশিদের অর্থের দিকে চেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। সেটেলার বাঙালির জীবনধারণের জন্য রেশন ও নিরাপত্তা বাবদ সরকারের প্রতি মাসে যত কোটি টাকা ব্যয় হয়, তা দিয়েই খাসজমিতে তাদের জন্য বসতভিটা নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের জন্য এককালীন আর্থিক সাহায্য প্রদান করা সম্ভব। এক টুকরো জমি ও এককালীন আর্থসাহায্য পেলে উদ্বাস্তু সেটেলার বাঙালিদের অনেকেই যে সমতলে নিজের এলাকায় ফিরে আসতে আগ্রহী হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে সব কথার শেষ কথা, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা বাঙালি নেতৃবৃন্দ ‘দখলদারি মনস্তত্ত্ব’ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে পার্বত্য সমস্যার সমাধান সুদূর স্বপ্নই থেকে যাবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ যেন আগের শাসনামলের (১৯৯৬—২০০১) মতো ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে না পারে, সে জন্য পাহাড়ি নেতৃত্ব ও বাঙালি নাগরিকসমাজকে সোচ্চার থাকতে হবে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক
firoz.choudhury@yahoo.com

জাতীয় স্বার্থরক্ষার দায় এবং সরকারের করণীয় -প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ by আকবর আলি খান

টিপাইমুখ প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান দেখে রবীন্দ্রনাথের কবিতার চরণ মনে পড়ে: ‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা পাই তাহা চাই না।’ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী টিপাইমুখ প্রশ্নে দেশে গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করে বিরোধটির আন্তর্জাতিকীকরণের পক্ষে। তাদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তিগুলো নিম্নরূপ। প্রথমত, বাংলাদেশে টিপাইমুখবিরোধী দুর্বার আন্দোলন ভারতকে তাদের পূর্বসিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করবে। লংমার্চ, ঘেরাও, ধরনা ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। দ্বিতীয়ত, টিপাইমুখ বাঁধ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট বরখেলাপ। সুতরাং বিষয়টি আন্তর্জাতিকীকরণ করা হলে বাংলাদেশ ন্যায়বিচার পাবে।
দুটি যুক্তিই ত্রুটিপূর্ণ। ভারত সরকার নর্মদা, কাবেরী, তেহরি, টিপাইমুখ ইত্যাদি বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে তাদের জনগণের আপত্তি গ্রাহ্য করেনি। টিপাইমুখের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপত্তি গ্রাহ্য করবে বলে মনে হয় না। পক্ষান্তরে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট অনিশ্চয়তায় ও টানাপোড়েনে বাংলাদেশ যে লাভবান হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয়ত, টিপাইমুখ বাঁধের প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক প্রশ্নে রূপান্তর করা কঠিন হবে। ফারাক্কার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত মোটেই সফল হয়নি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন অস্পষ্ট ও এসব আইন আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বলবত্ করা সম্ভব নয়। এ ঘরানার রাজনীতিবিদেরা টিপাইমুখকে ফারাক্কার সঙ্গে তুলনা করছেন ও দাবি করছেন, টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। টিপাইমুখ বাঁধ ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এখানে পানি আটকিয়ে শুষ্ক মৌসুমে বেশি পানি ছাড়া হবে। কিন্তু ফারাক্কার মতো পানি প্রত্যাহার করা হবে না। ভারত দাবি করবে, বাংলাদেশ যদি কাপ্তাই জলবিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করতে পারে, ভারত কেন একই যুক্তিতে ভারতের অভ্যন্তরে জলবিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে না? যারা টিপাইমুখকে ফারাক্কার মতো ক্ষতিকর প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচার চালাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের উপকারের চেয়ে বেশি অপকার করছে। কেননা, এই ধরনের বক্তব্যের অসারতা ভারত অতি সহজেই প্রমাণ করতে পারবে। এতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বক্তব্য গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
যেসব রাজনৈতিক দল ভারত-বান্ধব, তারা মনে করেন যে টিপাইমুখে যদি সেচ প্রকল্প না হয়, তাহলে বাংলাদেশের ভয়ের কারণ নেই। এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। টিপাইমুখ প্রকল্পের মূল সমস্যা হলো ঝুঁকি। এ বিষয়ে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এ প্রকল্পে লাখ লাখ মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। যেকোনো দেশপ্রেমিক সরকারকে এ বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এ ধরনের আলোচনায় বাংলাদেশের বক্তব্যে নিম্নলিখিত উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:
১। ভারতীয় পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র থেকে দেখা যায়, যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে প্রকল্পটির নকশা প্রস্তুত করা হয়নি। এখানে ১০০ বছরে সর্বোচ্চ বন্যার পরিবর্তে এক হাজার বছরে সর্বোচ্চ বন্যাকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ১৬ বছরের উপাত্তের পরিবর্তে দীর্ঘ সময়ের উপাত্তের ভিত্তিতে বাঁধের নকশাটি পুনরায় পরীক্ষা করা দরকার। এ জন্য ভারত ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে সমীক্ষা পরিচালনা সম্পন্ন করার আগে প্রকল্পটি স্থগিত করা হোক।
২। ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য টিপাইমুখ বাঁধের বিকল্পের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের বিকল্প রয়েছে। একটি হলো বাঁধের উচ্চতা ও জলবিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা কমিয়ে আনা। চন্দ্রভাগা নদীতে বাগলিহার জলবিদ্যুত্ প্রকল্প সম্পর্কে পাকিস্তান দুটি বিষয়ে আপত্তি করে। একটি হলো বাঁধের উচ্চতা, অন্যটি জলাধারের ধারণক্ষমতা। বাঁধের উচ্চতা কমানো হলে ও জলাধারের ধারণক্ষমতা হ্রাস করা হলে বাঁধ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হবে। তবে অন্যদিকে এর জলবিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা কমে যাবে। বাগলিহারে ভারত বাঁধের উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট কমাতে রাজি হয়েছে (দেখুন lyer রচিত Towards Water Wisdom, পৃষ্ঠা ৭৯-৮৫)। দ্বিতীয় ধরনের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে আসামের ডিহং নদীতে প্রস্তাবিত জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের ক্ষেত্রে। এখানে একটি বড় বাঁধ না দিয়ে আশপাশের ছোট ছোট শাখানদীতে ছোট ছোট বাঁধ দিলে কম খরচে একই ধরনের বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিকল্প প্রস্তাবটি ব্রহ্মপুত্র বোর্ড পরীক্ষা করছে (দেখুন B.G. Vergese, Waters of Hope পৃষ্ঠা-১২৭)। টিপাইমুখের ওপর পার্বত্য অঞ্চলে বরাকের অনেকগুলো শাখানদী রয়েছে। সেসব নদীতে ছোট ছোট বাঁধ দিলে টিপাইমুখ বাঁধের প্রয়োজন হবে না। অন্যথায় বাঁধের বর্তমান নকশা পরিবর্তন করতে হবে, বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কোনো উপকার না পেয়েও বাংলাদেশকে একটি বিশাল ঝুঁকি নিতে হবে।
৩। শুধু টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আলোচনা করলে চলবে না। ব্রহ্মপুত্র ও বরাক নদীতে যত বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সবগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। যৌথ নদী কমিশনের বিধি-নিয়মের-৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রতি তিন মাস অন্তর যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার বিধান রয়েছে। এখন বছরের পর বছর এ সভা অনুষ্ঠিত হয় না। নিয়মিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক করে প্রতিটি প্রস্তাবিত বাঁধ পরীক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশকে দিতে হবে।
৪। যেসব ক্ষেত্রে জলবিদ্যুেকন্দ্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে মতৈক্য হবে, সেখানে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নিতে হবে:
ক) পৃথিবীতে কোনো বাঁধই নিরাপদ নয়, তাই বাঁধ ভেঙে গেলে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যবস্থা শুধু ভারতে নিলেই চলবে না, বাংলাদেশেও নিতে হবে। বাঁধ অঞ্চলে পানির প্রবাহ সম্পর্কে তথ্য তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে পাঠাতে হবে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতির ব্যয় জলবিদ্যুত্ প্রকল্প থেকে বহন করতে হবে।
খ) বাঁধের ফলে বাংলাদেশের জানমালের ও অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হলে পূর্বনির্ধারিত হারে অবিলম্বে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ভারত সরকার ইতিমধ্যে উপদ্রুত অঞ্চলের জনগণের উন্নয়নের জন্য প্রকল্পের আয়ের ২ শতাংশ বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বাইরে প্রকল্প আয়ের ১ শতাংশ দিয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তহবিল গঠন করা উচিত, যাতে অবিলম্বে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অঙ্গীকার ভারতকে করতে হবে।
গ) রাতের অন্ধকারে বাঁধ ভাঙা পানির স্রোতে যাতে মানুষ না ভেসে যায়, তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ বন্যার সীমার ঊর্ধ্বে (flood proof) আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের খরচ ভারতকে দিতে হবে।
ঘ) বাঁধের জলাধারে যখন প্রথম পানি জমানো হয়, তখন নদীর প্রবাহ একেবারে বন্ধ হওয়ার বা এক-দুই বছরের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাঁধ নির্মাণের আগে নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জলপ্রবাহ সম্পর্কে বাংলাদেশকে গ্যারান্টি দিতে হবে।
ঙ) বাঁধের ফলে মত্স্য উত্পাদন ক্ষেত্রে ক্ষতি হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশকে প্রকল্প নিতে হবে। ভারতকে এর ব্যয়ভার বহন করতে হবে।
চ) জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে খরচ ভারত সরকারকে দিতে হবে।
ছ) পলিবিহীন পানিপ্রবাহের ফলে যদি বাংলাদেশে নদীভাঙন বেড়ে যায়, তবে নগর ও গ্রাম সংরক্ষণের জন্য প্রকল্পের ব্যয় ভারতকে বহন করতে হবে।
জ) মানবসৃষ্ট বাঁধের ফলে যদি বাংলাদেশের নদীতে চর জেগে ওঠে, তবে সেক্ষেত্রে ড্রেজিংয়ের খরচ ভারতকে দিতে হবে।
ঝ) পলির প্রবাহ হ্রাস পেলে হাওর এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিরূপ প্রভাব হ্রাসের জন্য প্রকল্প নিতে হবে।
ঞ) জলবায়ু পরিবর্তন ও বাঁধ নির্মাণের ফলে এ অঞ্চলে যেসব সমস্যা দেখা দেবে, সেগুলো সম্পর্কে যৌথ গবেষণা প্রয়োজন। প্রথমত, অনুমান করা হচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নিয়মিত বৃষ্টি না হয়ে আকস্মিকভাবে মাঝেমধ্যে নজিরবিহীন অতিবৃষ্টি হবে। এ ধরনের অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা বাঁধের নকশায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাঁধে বনাঞ্চল প্লাবিত হলে গ্রিনহাউস গ্যাসের উদিগরণ বেড়ে যাবে। এ ধরনের অনভিপ্রেত প্রভাব হ্রাস করার জন্য যৌথ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় গবেষণা করতে হবে।
ট) বহুমুখী প্রকল্পে সেচ অন্তর্ভুক্ত হলে অথবা শুধু সেচ প্রকল্পের পানি বণ্টন সম্পর্কে প্রকল্প নির্মাণ হওয়ার আগে সুস্পষ্ট সমঝোতা থাকতে হবে।
টিপাইমুখ প্রশ্নে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো, ভারত খোলা মন নিয়ে এসব বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি হবে কি? বাংলাদেশে অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভারতের এ ধরনের সমঝোতায় কোনো আগ্রহ নেই এবং ভারতের দেওয়া এবং নেওয়ার মনোবৃত্তিও নেই। এ জন্য বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার দাবি উঠেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না। উপরন্তু বেশির ভাগ শক্তিশালী রাষ্ট্র নদীর উজানের দেশ (upper riparian), তাদের ভাটির দেশের (lower riparian) সমস্যায় আগ্রহ নেই। কাজেই তাদের নৈতিক সমর্থন আদায় করাও শক্ত হবে। তবু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যাটির ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে নৈতিক সমর্থন সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো (NGO’s) যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে। এ বিষয়ে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী ও উন্নয়ন এনজিওগুলোর সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে মনে রাখতে হবে, ভারত সরকারের সম্মতি ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো অর্থবহ ব্যবস্থা সম্ভব নয়। শুধু ভারত সরকারের ওপর নির্ভর না করে টিপাইমুখ বাঁধ প্রশ্নে বাংলাদেশের উচিত হবে সহানুভূতিশীল ভারতীয় জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ করে বাঁধবিরোধী সংগ্রামী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্মিলিত মোর্চা গড়ে তোলা। অন্য কোনো প্রতিকারের উপায় না থাকলে ভারতীয় আদালতে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের উদ্যোগে ক্ষতিপূরণের মামলার সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। অনেক সময় অভিযোগ করা হয়, ভারত সরকার প্রয়োজনীয় উপাত্ত দিতে অস্বীকার করায় বাংলাদেশে অনেক সমস্যার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে ভারতের তথ্য স্বাধীনতা আইন (Freedom of Information Act) ব্যবহার করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে হবে।
আপাতদৃষ্টিতে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ ভারত ও বাংলাদেশের জন্য একটি দুঃসাধ্য সমস্যা। ভারত তার স্বার্থে নতুন নতুন বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুত্ উত্পাদন করবেই। অথচ এসব বাঁধের বহিঃপ্রভাব (externalities) ও ব্যর্থতার খেসারত ঠেকানোর ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ সমুদ্রের তলায় হারিয়ে যাবে এবং মনুষ্য বসতির অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ভারতের জলবিদ্যুত্ প্রকল্পগুলোর ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লোকালয় ও নগরগুলো মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হবে। এসব প্রবণতার সংশোধন না করা গেলে বাংলাদেশের মাটিতে একুশ শতকে পৃথিবীর করুণতম ট্র্যাজেডি উন্মোচিত হবে। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, এসব সমস্যার কারিগরি সমাধান রয়েছে। ভারত ইচ্ছে করলে বড় বড় জলবিদ্যুত্ স্থাপন না করে অনেকগুলো ছোট ছোট জলবিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করতে পারে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করে মানবসৃষ্ট অবকাঠামোগুলোর ঝুঁকি কমাতে পারে। সমস্যা কারিগরি নয়, সমস্যা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার ও আর্থিক সম্পদের অভাব। রাজনৈতিক সমর্থন গড়ার জন্য বাংলাদেশকে টিপাইমুখ বাঁধের মতো প্রকল্পগুলোর সমস্যা ভারতসহ বিশ্বের সব মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশি ও বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা। সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো, বাংলাদেশ সরকারের ঘুম ভাঙাতে হবে। বাংলাদেশ সরকার যদি এসব সমস্যার ভয়াবহতা উপলব্ধি না করে, তবে কেউই এসব পরিবেশগত সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকার করবে না। শুধু নবনির্বাচিত সরকার নয়, পূর্ববর্তী সরকারও এ ব্যাপারে যথেষ্ট তত্পর ছিল না। বাংলাদেশের আত্মঘাতী রাজনীতিবিদদের কার্যকলাপ দেখে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে:
‘কিন্তু ভেবে দেখেছ কি?
দেরি হয়ে গেছে অনেক, অনেক দেরি।
লাইনে দাঁড়ানো অভ্যাস কর নি কোন দিন
একটি মাত্র লক্ষ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মারামারি করেছ পরস্পর
তোমাদের ঐক্যহীন বিশৃঙ্খলা দেখে
বন্ধ হয়ে গেছে মুক্তির দোকানের ঝাঁপ।’
(সমাপ্ত)
আকবর আলি খান: গবেষক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা; অর্থ, বন ও পরিবেশ এবং মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব। এ ছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

ওবামার ‘আদর্শ’ মহাত্মা গান্ধী

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যদি সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তিনি তাঁর ‘আদর্শ’ মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে একবেলা খাবার খেতে চাইবেন। যদিও ভারতের অহিংস আন্দোলনের এই নেতা বেশি খাবার খেতেন না। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে ওয়েকফিল্ড হাইস্কুলের নবম গ্রেডের শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ওবামাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি জীবিত অথবা মৃত কারও সঙ্গে তিনি খাবার খেতে চান, তাহলে তিনি কে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জীবিত অথবা মৃত কারও সঙ্গে খাবার? তোমরা জানো, মৃত ও জীবিত মানুষের তালিকা অনেক দীর্ঘ।’ এরপর ওবামা বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি হতে পারেন গান্ধী, তিনিই আমার আদর্শ।’ তিনি বলেন, তবে সেই খাবার হতে পারে খুবই সামান্য। কারণ গান্ধী খুবই অল্প পরিমাণে খেতেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ওবামা বলেন, তিনি গান্ধীর কাছ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তিনি বলেন, গান্ধী এমন একজন মানুষ, যিনি গত কয়েক প্রজন্ম ধরে গোটা বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মার্টিন লুথার কিংকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ভারতে যদি অহিংস আন্দোলন না হতো, তাহলে নাগরিক অধিকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো একই ধরনের অহিংস আন্দোলন হতো না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, মহাত্মা গান্ধী শুধু তাঁর নৈতিকতার শক্তিতে পৃথিবীতে পরিবর্তন এনেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় সেসব মানুষের ব্যাপারে আগ্রহী, যারা সহিংসতা কিংবা অর্থের জোরে নয়, নিজেদের ব্যক্তিত্ব, নীতি এবং নৈতিক অবস্থানের শক্তিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এ ধরনের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বসতে, কথা বলতে ও খাবার খেতে পছন্দ করব আমি।

সেনা স্থানান্তর ও পাহাড়ে শান্তির খোঁজ by ফিরোজ জামান চৌধুরী

সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে ‘সেনা প্রত্যাহার’ বা ‘সেনা স্থানান্তর’ নিয়ে আলোচনা আর বির্তকের শেষ নেই। অনেকেরই আশঙ্কা, সেনা প্রত্যাহার হলে পার্বত্যাঞ্চলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাবে, ওখানে আর কেউ বাস করতে পারবে না। আবার অনেকে ভাবছে, সেনা ছাউনি সরিয়ে নিলেই তবে সেখানকার নাগরিকেরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে খতিয়ে দেখা যাক পার্বত্যাঞ্চলে সেনা-সংস্কৃতির ভালো-মন্দ এবং রাষ্ট্রের মনোজগতে এর অবস্থান।
সরকারি সূত্র দাবি করছে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৩০০ সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এ বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩৫টি সেনাক্যাম্পসহ একটি ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু ক্যাম্প স্থানান্তর করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সেনা প্রত্যাহার বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য লক্ষ করার মতো। ১৯ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শামীম চৌধুরী বলেছেন, ‘১৯৯৮ সালে ১০টি ক্যাম্প সরানোর মধ্য দিয়ে এটি শুরু হয় এবং ২০০৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৩টি ক্যাম্প সরানো হয়েছে। এ বছর ৩৫টি ক্যাম্প সরানো হচ্ছে।’ (প্রথম আলো ২০ আগস্ট)।
এখানে ‘২০০৪ সাল’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এ যাবত্ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যত সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৬৩টি) সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে ২০০৪ সালে—বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে। তাহলে এখন বিএনপি কেন এই ইস্যুতে ভিন্নমত পোষন করছে? বিএনপির অনেক নেতা তো এর ফলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও দেখতে পাচ্ছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে যখন সেনা প্রত্যাহার করেছিল, তখন কি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল? যদি না পড়ে থাকে, তাহলে এখন কেন সে প্রসঙ্গ আসছে?
পার্বত্যবিষয়ক যেকোনো আলোচনায় ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় দুই দশক (১৯৭৭—১৯৯৭) ধরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির (যা ‘শান্তিচুক্তি’ নামে অধিক পরিচিত) পর থেকে তিন পার্বত্য জেলাতেই স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। দেশের অন্য অঞ্চলের মতো ওখানেও কিছু বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির পর কোনো ব্যক্তি বা বিবাদমান কোনো পক্ষ, রাজনৈতিক দল বা সংস্থা একবারের জন্যও বলেনি যে পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধাবস্থা চলছে। তাহলে কেন সেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘কৃত্রিম যুদ্ধাপরিস্থিতি’ বজায় রাখা হবে?
বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাসহ সারা দেশে অসংখ্য হামলা বা জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভয়াবহ ওই সব ঘটনার পর কোথাও সেনা শাসন জারির প্রয়োজন পড়েনি। সিভিল প্রশাসনই সব পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। যশোর, খুলনা, নওগাঁসহ দেশের অনেক অঞ্চলে সর্বহারা কর্তৃক অপহরণের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কই, সেখানে তো সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ে না। পার্বত্যাঞ্চলে ছোটখাটো চাঁদাবাজি বা বিচ্ছিন্ন কোনো অপহরণের ঘটনাকেও সেভাবে দেখা উচিত। নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখলেও বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সার্বক্ষণিক সেনা উপস্থিতির প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
পার্বত্য নেতৃত্বের অনেকে বলছেন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ক্যান্টনমেন্টসহ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করতে হবে। তাঁদের এ মত কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, দেশের অন্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও পর্যাপ্ত ক্যান্টনমেন্ট থাকতে হবে। এমনকি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। বিদ্যমান ছয়টি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা অবিকৃত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে পাড়ায় পাড়ায় এবং পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সেনাক্যাম্প রেখে নাগরিকজীবনের স্বস্তি নষ্ট করার কোনো মানে থাকতে পারে না। তাই বলব, পর্যায়ক্রমে সব সেনাক্যাম্প গুটিয়ে সব সেনাসদস্যকে পার্বত্য এলাকার ছয়টি ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনা হোক। যদি কোনো স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে তবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়নে সেনা প্রেরণ করার সহজ সুযোগ তো রইলই।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৯৭-এর পার্বত্য চুক্তির আলোকেই সরকারিভাবে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের অনুমান, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামের জিওসি যেমন বলেছেন, ‘আগে পাহাড়ের অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ছিল না, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্গম। এখন ওসব এলাকায় ভালো সড়ক যোগাযোগ, এমনকি মোবাইল টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে সেসব জায়গায় অর্থহীন ক্যাম্প রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।’ (প্রথম আলো ২০ আগস্ট)। জিওসির এই বক্তব্য খুবই দূরদর্শী বলে মনে হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলতে চাই, তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলার অলিগলিতে সেনা অবস্থান করানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ‘অপারেশন উত্তরণ’ প্রত্যাহার করে নিয়ে সিভিল প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
সেনা স্থানান্তরের ফলে এতদিন সেনা নিরাপত্তায় থাকা বসতি স্থাপনকারী উদ্বাস্তু বাঙালিরা নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে সংগত কারণেই উত্কণ্ঠিত। দেশের যেকোনো এলাকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সবার নিরাপত্তার স্বার্থে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে পুলিশ-আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ বাহিনীর মতো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘পার্বত্য পুলিশ বাহিনী’ গঠন করা যেতে পারে।
২.
সেনা স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বসতি স্থাপনকারী (সেটেলার) বাঙালিদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের বিষয়টিও জড়িত। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের তিন ভাগে শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন: পাহাড়ি আদিবাসী, স্থায়ী বাঙালি এবং সেটেলার বা বসতি স্থাপনকারী বাঙালি। একটি পরিসংখ্যানে চোখ বুলানো যাক। ১৯৫১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮ হাজার ৭০ জন (মোট জনসংখ্যার ছয় শতাংশ)। আর ১৯৯১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে চার লাখ ৭৩ হাজার ৩০১ (মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ)। জ্যামিতিক হারে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে মূলত আশির দশকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বিভিন্ন জেলার ছিন্নমূল বাঙালিদের অবৈধ বসতি স্থাপনের ফলে।
স্থায়ী বাঙালিদের নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা নেতারা একবারের জন্যও প্রশ্ন তোলেননি। মূল সমস্যা সেটেলার বা বসতিস্থাপনকারী বাঙালিদের নিয়ে। কারণ এরা অবৈধ অধিবাসী। এরা কেউ কখনো ওখানে জমি কিনে বসবাস শুরু করেনি। জিয়া ও এরশাদের আমলে সরকারের দেখানো লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিল সারা দেশের অজস্র হতদরিদ্র উদ্বাস্তু বাঙালি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পাহাড়ের জায়গা-জমি দখল করে তাদের অবৈধভাবে বসবাস করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের অনেককে দেওয়া হয়েছিল খাসজমির মিথ্যা দলিল।
পার্বত্য অঞ্চলের কোনো গুচ্ছগ্রামে গিয়ে যদি কোনো সেটেলার বাঙালিকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার বাড়ি কোথায়? তিনি নির্দ্বিধায় বলবেন, কুড়িগ্রাম, মুক্তাগাছা, ফেনী, ভোলা বা অন্য কোনো এলাকার নাম। তাঁর মন পড়ে আছে নদীভাঙা কোনো গ্রামে, দেহটা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, পার্বত্যাঞ্চলের সেটেলার বাঙালিদের প্রায় ৩০ বছর ধরে সরকার রেশন দিয়ে চলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে রেশন দিয়ে তাদের পার্বত্যাঞ্চলে লালন-পালন করতে হবে? সেটেলার বাঙালিদের রেশন ও নিরাপত্তা বাবদ প্রতিবছর কত শত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে? আমাদের মতো সাধারণ জনগণের দেওয়া করের টাকা কেন এভাবে নষ্ট হবে? সরকারকে এর জবাব দিতে হবে। তবে শুধু বাঙালি নয়, পাহাড়ি উদ্বাস্তুদেরও গণহারে রেশন দেওয়া চলবে না। রেশনের নামে সরকারি টাকা তছরুপ কোনো বিবেচনায়ই সমর্থনযোগ্য নয়।
পাহাড়ের অপরিচিত আঙিনায় সেটেলার বাঙালিদের অধিকাংশই বিভিন্ন গুচ্ছগ্রাম বা নিকটবর্তী পাহাড় দখল করে বসবাস করছে। উদ্বাস্তু এসব বাঙালির মানবেতর জীবন কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাম্য হতে পারে না। কিন্তু কীভাবে অবৈধ বসবাসকারী উদ্বাস্তু এই বাঙালিদের পুনর্বাসন করা যাবে?
এ বিষয়ে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বলেছেন, ‘গুচ্ছগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিদের বেশির ভাগই দরিদ্র। যথাযথ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসিত করা যেতে পারে। যদি ভূমি কমিশন রায় দিয়ে বলে, সরকার তাদের যে দলিল দিয়েছিল তা বেআইনি, তাহলে গুচ্ছগ্রামবাসীর যথাযথ পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তাবে। ...তাদের পার্বত্যাঞ্চলে পুনর্বাসিত না করে অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা যেতে পারে। ...ইউরোপীয় কমিশন এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। (মুক্তপ্রকাশ, আর্টিক্যাল-১৯ ও এমএমসি প্রকাশনা, জুন ২০০৯)।
আমাদের সামনে পার্বত্য সমস্যা সমাধানে অনেক রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে। তার মধ্য থেকেই কোনো একটা বেছে নিতে হবে। বলপ্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেই সমাধান সূত্র খুঁজতে হবে। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সরকারের উচিত হবে, দ্রুতই সেটেলার বাঙালিদের দেশের বিভিন্ন স্থানে খাসজমি বরাদ্দ দিয়ে সম্মানজনক পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা। তাদের পুনর্বাসনের জন্য বিদেশিদের অর্থের দিকে চেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। সেটেলার বাঙালির জীবনধারণের জন্য রেশন ও নিরাপত্তা বাবদ সরকারের প্রতি মাসে যত কোটি টাকা ব্যয় হয়, তা দিয়েই খাসজমিতে তাদের জন্য বসতভিটা নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের জন্য এককালীন আর্থিক সাহায্য প্রদান করা সম্ভব। এক টুকরো জমি ও এককালীন আর্থসাহায্য পেলে উদ্বাস্তু সেটেলার বাঙালিদের অনেকেই যে সমতলে নিজের এলাকায় ফিরে আসতে আগ্রহী হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে সব কথার শেষ কথা, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা বাঙালি নেতৃবৃন্দ ‘দখলদারি মনস্তত্ত্ব’ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে পার্বত্য সমস্যার সমাধান সুদূর স্বপ্নই থেকে যাবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ যেন আগের শাসনামলের (১৯৯৬—২০০১) মতো ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে না পারে, সে জন্য পাহাড়ি নেতৃত্ব ও বাঙালি নাগরিকসমাজকে সোচ্চার থাকতে হবে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক।
firoz.choudhury@yahoo.com

আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো হুমকি -টুইন টাওয়ারে হামলার অষ্টম বার্ষিকী আজ

নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার অষ্টম বার্ষিকী আজ ১১ সেপ্টেম্বর। আগের বছরগুলোর মতো এবারও দিনটির স্মরণে ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে নিউইয়র্কবাসী। ওই হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া টুইন টাওয়ারের স্থানটি গ্রাউন্ড জিরো নামে পরিচিত। এদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো হুমকি। খবর এএফপির।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা একটি বিমান ছিনতাই করে টুইন টাওয়ারে বা ওয়ার্ল্ডট্রেড সেন্টারে হামলা চালায়। হামলায় দুই হাজার ৭৫২ জন নিহত হয়। সন্ত্রাসীরা ওই দিন পেন্টাগনে বিমান ছিনতাই করে হামলা করে এবং আরেকটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানোর সময় যাত্রীরা বাধা দিলে পেনসিলভানিয়ায় তা বিধ্বস্ত হয়।
মার্কিন প্রশাসন এ হামলার জন্য আল-কায়েদা জঙ্গিগোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করে। স্মরণ অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ ও অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। এতে হামলায় নিহত প্রত্যেকের নাম পড়ে শোনানো হবে এবং তাদের স্মরণে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করা হবে। সাম্প্রতিক এক জরিপে জানা গেছে, টুইন টাওয়ারের স্থানে প্রতিশ্রুত ভবন ও স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজের ধীরগতিতে নিউইয়র্কবাসী অসন্তুষ্ট।
আল-কায়েদা এখনো হুমকি: মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টুইন টাওয়ারে হামলার আট বছর পার হওয়ার পরও ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো হুমকি হিসেবে রয়েছে। গত মাসে মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ এর চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন বলেন, আল-কায়েদা চক্র এখনো মার্কিন ভূমিতে হামলা চালাতে সক্ষম এবং তারা তাদের লক্ষ্যের ব্যাপারে খুবই পরিষ্কার।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আল-কায়েদার অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নেই। টুইন টাওয়ারে হামলার পর আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৮ সালের জুলাই পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শীর্ষ আল-কায়েদা নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ১১ জন নেতা অথবা সহযোগী নিহত হয়েছেন। ২০০৫ সালের জুলাইয়ের পর থেকে জঙ্গি সংগঠনটি পশ্চিমা দেশগুলোয় হামলা চালাতে পারেনি।
বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, আল-কায়েদার হুমকি কমে আসছে। প্যারিস ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক জ্যঁ-পিরে বলেন, প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর আল-কায়েদা এখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। সম্ভবত তাদের দম ফুরিয়ে গেছে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তারা আবার জেগে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের তৃণমূল শাখাগুলোর ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হারানোয় আল-কায়েদা এখন হয়তো চাপে রয়েছে। কিন্তু এখনো তারা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে। গোষ্ঠীর সদস্যরা পাকিস্তানের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে তাদের শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন ও দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আয়মান আল জওয়াহিরি লুকিয়ে রয়েছেন।
তবে এই সতর্কবার্তার পরও আফগানিস্তানে অভিযানের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান বলেন, ‘অনেক মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত। যুদ্ধ ব্যয় ও যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি তাদের এই বিরূপ মনোভাবের কারণ, বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দার এই সময়ে। তবে অভিযান বন্ধ করার পথ নেই।’

শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় মাহে রমজান -সিয়াম সাধনার মাস ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

মাহে রমজান হচ্ছে কর্মচারীদের থেকে কাজের বোঝা কমিয়ে দেওয়ার মাস। খেটে খাওয়া পরিশ্রমী মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের পক্ষে রোজা রেখে পরিপূর্ণভাবে কাজকর্ম সম্পাদন যে কত কঠিন, তা মালিকপক্ষের তিলে তিলে অনুভব করার সময় এ মাহে রমজান। বিভিন্ন ধরনের যেসব শ্রমিক দৈহিক পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রুজি-রোজগার বা আয়-উপার্জন করে, তাদের জন্য রোজা অবস্থায় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের বিষয়টি মালিকপক্ষকে উপলব্ধি করা দরকার। মাহে রমজানের দিনে অধীনস্থ কর্মচারী এবং চাকর-বাকরদের দায়িত্ব ও কাজকর্ম হালকা করে দেওয়া ইসলামের বিধান। অন্যথায় তারা কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে। রমজান মাসে তাদের ওপর কষ্টকর সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপানো সম্পূর্ণ অনুুচিত—এটা অমানবিক বটে। কারণ তারাও রোজাদার, রোজা রেখে তারা অধিক কষ্টসাধ্য কাজ করলে বেশি ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। তাই কঠিন ও সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপিয়ে যাতে তাদের অধিক কষ্ট দেওয়া না হয় সেদিকটি অবশ্যই মানবিক বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এ মাসে (রমজানে) যারা দাস-দাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন, অর্থাত্ তাদের কাজের বোঝা হালকা করেন আল্লাহ তাদের দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন।’
ইসলাম ধনী-গরিব, মনিব-চাকর, মালিক-শ্রমিকের কোনো পার্থক্য করে না। ইসলাম আদল-ইনসাফ ও ন্যায়নীতির ধর্ম। গৃহের মালিক নিজে যা খাবে ও পরবে, অধীনস্থ কাজের লোকদের তা-ই খাওয়াবে ও পরাবে। হাদীস শরিফে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের ভাইদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। অতএব, যার অধীনে কোনো ভাই থাকে তাকে তা-ই খাওয়াবে যা সে নিজে খায়, তাকে তা-ই পরাবে যা সে নিজে পরে এবং তাকে সাধ্যের অধিক কাজ চাপিয়ে দিবে না। অগত্যা তাকে দিয়ে যদি কোনো কষ্টের কাজ করাতে হয় তাহলে তাকে সাহায্য করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের জীবনে নবীজির এ আদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছেন এবং অন্যকেও পালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে ঘাম ঝরানো শ্রমিকের প্রতি মালিক শ্রেণীকে সামান্যতম সহানুভূতি প্রদর্শন করতে দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে যেন রমজান মাসে তাদের আরও রুদ্রমূর্তি হয়ে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। রোজাদার শ্রমিকদের কাছ থেকে অন্য সময়ের মতোই কড়ায়-গণ্ডায় শ্রম আদায় করার জন্য কঠোরতা দেখালে, রোজা রাখার কারণে তপ্ত দুপুরে প্রচণ্ড খরতাপে যখন সে হাঁপিয়ে ওঠে এবং দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয় তখন তার প্রতি চাপ প্রয়োগ ও দুর্ব্যবহার করলে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের দিনগুলোতে মালিকপক্ষের ক্ষমা নয়, বরং কঠোর শাস্তিই নিশ্চিত হবে। অপরদিকে শ্রমিক যদি রোজা রাখা সত্ত্বেও সাধ্যমতো কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হয়, তাহলে সে সাধারণ কেউ রোজা রেখে যে সওয়াব পাবে তার দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। কারণ অধীনস্থ কর্মচারী, শ্রমিক শ্রেণী ও খেটে খাওয়া লোকদের পুরস্কারের কথা নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তিন ধরনের লোকের জন্য (প্রতিটি নেক কাজের) দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি হচ্ছে ওই দাস যে আল্লাহর হক ও মনিবের হক উভয় আদায় করে।’ এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমত্কার প্রতিদান।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৬)
গৃহভৃত্য ও পরিচারিকারাও যে আল্লাহর বান্দা, রমজান মাসে যেন লোকেরা সেসব কথা ভুলে যায়। ফলে তাদের খাটুনির মাত্রা বেড়ে যায়। অথচ নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমরা মাহে রমজানে দাস-দাসীর কাজকর্ম শিথিল করে দাও। তারা যেন রমজান মাসের ইবাদত যথাযথভাবে করতে পারে।’ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। তিনি ক্রীতদাসদের কষ্ট নিজে ভাগ করে নিতেন। বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। একবার এক গোলাম গম পিষছিল আর কাঁদছিল। নবীজি তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ‘প্রতিদিন তাকে এক মণ গম পিষতে হয়। আজ শরীরটা খুব অসুস্থ তাই পিষতে পারছি না। আমার মনিব বড়ই নিষ্ঠুর লোক। গম পিষতে পারছি না দেখলে হয়তো সে আমাকে মারবে—এই ভয়ে কাঁদছি।’ রাহমাতুল্লিল আলামিন গোলামটির পাশে বসে তার গমগুলো পিষে দিলেন এবং বললেন, ‘আগামীতে যখনই তোমার কষ্ট হবে আমাকে খবর দিবে। আমি এসে তোমার কাজ সম্পন্ন করে দিব।’
কোনো ক্রীতদাসের অসুস্থতার খবর শুনলে নবীজি ছুটে যেতেন এবং তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন। একবার এক ধনী লোকের জনৈক গোলাম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাকে দেখার কেউ ছিল না। মনিব ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির। গোলামটি একটি অন্ধকার কুঠুরিতে শুয়ে কাতরাচ্ছিল। দয়াল নবীজি ওই বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় অসুস্থ গোলামটির কাতরানির আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে তার মাথায় হাত বোলাতে থাকেন। এতে সে আরাম বোধ করতে লাগল। রাতে সে নবীজিকে চিনতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, তার মনিব তাকে সেবার জন্য পাঠিয়েছেন কি না। নবীজি বললেন, ‘তিনি স্বেচ্ছায়ই এসেছেন।’ পরদিন সকালে ওই ক্রীতদাস যখন দেখল যে, নবীজি তার সেবা করছে, তখন সে বিস্ময়ে কেঁদে উঠল, ভাবতে লাগল—মানুষের জন্য মানুষের এত দয়া, এত ভালোবাসা? আমি একজন গোলাম, অথচ দোজাহানের বাদশাহ হয়েও নবীজি আমার সেবা করছেন? এই ছিল মহানবী (সা.)-এর সুমহান আদর্শ। রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত দাস-দাসীদের কথা স্মরণ রেখেছিলেন। হজরত আলী (রা.) বলেছেন যে, নবী করিম (সা.)-এর সর্বশেষ বাণী ছিল, ‘১ নামাজ-নামাজ, আর ২. যারা তোমাদের অধীনে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)
প্রকৃত রোজাদার মুমিন ব্যক্তি সদা আল্লাহর প্রতি দায়িত্বশীল এবং মানুষের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ থাকেন। মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকাই ঈমানদারের দায়িত্ব। তার ঘরে যেসব কাজের লোক রয়েছে তাদের প্রতিও তার অধিকার রয়েছে। দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে তাদের এ ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হবে। কোনো রোজাদার ব্যক্তি এ ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাতে পারেন না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকবে আল্লাহ তার ওপর রহমতের ডানা প্রসারিত করবেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ১. দুর্বলের সাথে নম্র ব্যবহার, ২. পিতা-মাতার সাথে মমতা জড়ানো কোমল ব্যবহার এবং ৩. দাস-দাসীর প্রতি সদাচরণ।’ (তিরমিযী)
সাধারণত কাজের লোকদের মানুষ খুব কমই ক্ষমা করে থাকে। নিজের ছেলেমেয়ের হাত দিয়ে মূল্যবান জিনিসটি খোয়া গেলে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না, আর ওই গৃহস্থালি শিশু শ্রমিক বা কাজের ছেলেমেয়ের হাত দিয়ে সামান্য কিছু নষ্ট হলেই অমনি শুরু হয় বেদম প্রহার বা নির্যাতন। অসুখের কারণে কাজ না করতে পারলে তাদের বকুনিও শুনতে হয়। কাজের লোক বলে তাদের কামনা-বাসনা নেই, বিশ্রামের প্রয়োজন নেই, রোগব্যাধি নেই—এমন ধারণা ইসলামসম্মত নয়। নবী করিম (সা.) এ জাতীয় দুর্ব্যবহার থেকে উম্মতকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অধীনস্থ লোকদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেই সমাজে মালিক-শ্রমিক ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে, যা সভ্য সমাজের জন্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং সর্বাবস্থায় কঠোরতা পরিহার করে রোজাদারদের আচার-ব্যবহারে ইসলামের সদাচরণ, ক্ষমা, উদারতা ও কোমলতার মহত্ গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি (ইনস্টিটিউট অব ইন্টেলেকচুয়াল স্টাডিজ), দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ -জাতীয়সংগীত by জামিল চৌধুরী

সেদিন (১৬ ভাদ্র ১৪১৬) সকালে প্রথম আলোর কলাম-১-এর প্রথম খবরটি পড়ে মন ভরে গেল। মনে হলো, আবার যেন ফিরে গিয়েছি সেই দেশে, যে দেশকে পাকিস্তানের দখলমুক্ত করতে সমগ্র বাঙালি জাতি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যে দেশের মুক্তির জন্য লাখ লাখ বাঙালি প্রাণ উত্সর্গ করেছিল। খবরের শিরোনাম ‘জাতীয় সংগীতে ১০’। খবরের বিবরণে বলা হয়েছে, ঠিক করে জাতীয় সংগীত গাইতে পারার জন্য গোয়াইনহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের তিনটি পরীক্ষার প্রতিটিতে আলাদাভাবে ১০ নম্বর করে রাখা হয়েছে। অভিনন্দন গোয়াইনহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়। অভিনন্দন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
কেবল গোয়াইনহাট প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন, বাংলাদেশের প্রতিটি বিদ্যালয়েই তো এমন হওয়া উচিত ছিল, এমনকি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতেও। প্রতিটি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরম্ভের আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। এমনও শুনেছি, রাজধানী ঢাকার কোনো কোনো স্কুলে জাতীয় সংগীতের বদলে ছাত্রছাত্রীদের অন্য গান গাইতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে জাতীয় সংগীত শেখা এবং গাওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এখানে মনে রাখা উচিত, ঠিক করে জাতীয় সংগীত গাইতে পারার অর্থ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত সুরে জাতীয় সংগীত গাইতে পারা। কিন্তু অনুমোদিত সুর কোথায় পাবে বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে জাতীয় সংগীত নির্বাসিত। অনেকে হয়তো জানেনই না যে ১৯৭৬ সালের মে মাস থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন বাণীসহ জাতীয় সংগীতের প্রচার বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ বেতার তার বেশ কিছুকাল আগে থেকেই জাতীয় সংগীতের বাণী প্রচার বন্ধ করে দেয়। কেন বা কার নির্দেশে তারাই জানে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানাই অধিবেশনের শেষে প্রতিদিন প্রতিটি সরকারি এবং বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেল থেকে বাণীসহ সরকার অনুমোদিত সুরে জাতীয় সংগীতের প্রচার বাধ্যতামূলক করতে। একই সঙ্গে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে জাতীয় সংগীত প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর বাংলাদেশের যেসব জেলায় জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের শাখা রয়েছে, সেসব জেলায় বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলন পরিষদ এই অঞ্চলের স্কুলগুলোর সহযোগিতায় বিনা পারিশ্রমিকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
এখানে জাতীয় সংগীতের অনুমোদিত সুর সম্পর্কে দু-একটি বিষয়ের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দুই দিন পর শান্তিদেব ঘোষ তাঁর নিজের গাওয়া ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের একটি ক্যাসেট আমার হাতে দিয়ে বলেন, গানটি জাতীয় সংগীতরূপে নির্বাচিত হলে যেন এই সুরে গাওয়া হয়। অনেকের মতো তিনিও ধরে নিয়েছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিই হয়তো বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হবে। তার কিছুদিন পর ওই সুরের একটি স্বরলিপি ছাপিয়ে বিশ্বভারতীর কর্মসচিব অমিয় সেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়ে দেন।
জাতীয় সংগীতরূপে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির নির্বাচন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ৬৯-এর গণ-আন্দোলনের সময় থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঠে-ময়দানে সর্বত্র এই গানটি শোনা যেত। সে সময়কার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রায়ই জাহিদুর রহিমকে ডেকে পাঠাতেন সভা আরম্ভ হওয়ার আগে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়ার জন্য। একবার একটি অনুষ্ঠানে সন্জীদা খাতুন গাইবেন জেনে বঙ্গবন্ধু একজনকে দিয়ে বলে পাঠান তিনি যেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরিবেশন করেন। ১৯৭০-৭১ সালে গানটি এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ঢাকার রাস্তায় রিকশাচালককেও ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে শুনেছি। মুক্তযুদ্ধ চলাকালে প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরে রোজ এই গানটি গাওয়া হতো। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর কলকাতার বাংলাদেশ মিশনে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। কলকাতা বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হোসেন আলী কর্তৃক সেই পতাকা উত্তোলনের দৃশ্য বিশ্বের সমগ্র টেলিভিশন-সংবাদচিত্রে দেখানো হয় এবং পরদিন তাঁর আলোকচিত্র প্রায় সব কাগজে ছাপা হয়।
বিশ্বভারতীর পাঠানো স্বরলিপি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকে গৃহীত হয়নি। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম চলাকালে যে সুরে গানটি গাওয়া হতো, সেই সুরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রেকর্ড করা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের একটি টেপ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই সভায় বাজিয়ে শোনানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেই রেকর্ডে গাওয়া গানের সুর ও বাণীকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতরূপে অনুমোদন করে। ছায়ানটের অধ্যক্ষ সন্জীদা খাতুনের নির্দেশনায় গানটি আগেই ঢাকা টেলিভিশনকেন্দ্রের ডিআইটি (বর্তমান রাজউক) স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছিল। জাতীয় সংগীতের বিষয়টি পর্যালোচনাকালে ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ গানটির কথাও আলোচনায় উঠে আসে। বিস্তৃত আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি হবে জাতীয় সংগীত (National Anthem) এবং ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ গানটি হবে জাতীয় গীতি (National song)। জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি জাতীয় গীতি হিসেবে দ্বিতীয় একটি গানের নির্বাচন কোনো অভিনব ব্যাপার নয়। অন্য অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ গানটি গাওয়া হয় National Anthem রূপে এবং ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া হয় National song হিসেবে।
১৯৭৯ সালে ‘শ্রোতার আসর’-এর উদ্যোগে একটি ব্যাপ্তবাদনের (extended play disc) প্রথম পিঠে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত সুরে ‘আমার সোনার বাংলা’ (জাতীয় সংগীত) এবং দ্বিতীয় পিঠে ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ (জাতীয় গীতি) রেকর্ড করে প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৪০০ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে আনন্দধারার উদ্যোগে সরকারের অনুমোদিত সুরে জাতীয় সংগীতের একটি সিডিও প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় চার দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও বাংলাদেশ সরকার জাতীয় সংগীত বা জাতীয় গীতির কোনো রেকর্ড বা সিডি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়নি।
জামিল চৌধুরী: জাতীয়রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ও ছায়ানটের সাবেক সভাপতি।

মেক্সিকোয় বিমান ছিনতাই নাটকের অবসান

মেক্সিকোয় গত বুধবার একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিমানটি অবতরণের পর পুলিশ সফলভাবে ছিনতাইকারী দলকে আটক করতে পেরেছে। ছিনতাই করা ওই বিমানের শতাধিক যাত্রী নিরাপদে নেমে এসেছে। বিমানটি মেক্সিকোর পর্যটননগর ক্যানকান থেকে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে যাচ্ছিল।
কর্মকর্তারা জানান, জোসে ফ্লোরস পেরেইরা নামের একজন বলিভীয় প্রটেস্ট্যান্ট পাদ্রি ছিনতাইয়ের এ ঘটনা ঘটান। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাঁকে ছাড়াও আরও ছয়জনকে আটক করেছে। তবে তাঁদের কাছে কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
এয়ারোমেক্সিকো বোয়িং৭৩৭ ফ্লাইটটি বুধবার মেক্সিকোর পর্যটনশহর ক্যানকান থেকে মেক্সিকো সিটি অভিমুখে যাচ্ছিল। এতে ১০৪ জন যাত্রী ছিল। তাদের মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের নাগরিকও। বিমানটি বেলা একটায় আকাশে ওঠার পর জোসে ফ্লোরস পেরেইরা এটি ছিনতাই হওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বিমানটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন এবং প্রেসিডেন্ট ফিলিপ ক্যালডেরনের সঙ্গে কথা বলতে চান।
ওই বিমানের ত্রুদ্ধরা বলেছেন, পেরেইরার অভিযোগ, তিনি তিন মাস ধরে প্রেসিডেন্ট ক্যালডেরনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারেননি। তাই তিনি বিমান ছিনতাই করে হুমকি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন।
পরিবহনমন্ত্রী জুয়ান মোর্লিনার বলেছেন, ‘পেরেইরা বিমান হামলার হুমকি দিলেও ওই বিমানে কোনো বোমা পাওয়া যায়নি। যাত্রীরা নিরাপদে বিমান থেকে নেমে এসেছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’
মেক্সিকোর জননিরাপত্তা-বিষয়ক সচিব জেনারো গারসিয়া লুনা বলেন, জোসে পেরেইরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তাঁর বিশ্বাস, মেক্সিকো বড় ধরনের বিপজ্জনক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মেক্সিকোয় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি এই বিপদ থেকে লোকজনকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বরের কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছেন। বিমান ছিনতাইয়ের মূল পরিকল্পনাকারী তিনিই। এ জন্য তিনি ফলের রসের একটি ক্যানে টেপ পেঁচিয়ে বিমানযাত্রীদের বোমা হামলার ভয় দেখিয়েছেন। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাঁকে আরও তিনজন সাহায্য করেছেন। তাঁরা হলেন (জোসে পেরেইরার ভাষায়) ফাদার, সান ও হলি ঘোস্ট।
পেরেইরা আরও বলেন, ‘তিনি এ ঘটনা ৯ সেপ্টেম্বর ঘটিয়েছেন, কারণ ৯/৯/৯ হলো ৬/৬/৬ তারিখের উল্টো। ৬/৬/৬ তারিখ হলো খ্রিষ্টান ধর্মবিরোধী। বড়দিন কাছাকাছি চলে আসায় তিনি ওই দিন এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।’
জেনারো গারসিয়া লুনা বলেন, জোসে পেরেইরা আগে মাদক গ্রহণ করতেন। তিনি বলিভিয়ায় একটি অস্ত্র ডাকাতির ঘটনায়ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ১৭ বছর আগে তিনি মেক্সিকোয় চলে আসেন।
পেরেইরা বলেছেন, তিনি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বলিভিয়া থেকে ক্যানকানে যান। গানও করেন তিনি। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় জোসে পেরেইরার হাতে বাইবেল ছিল।
ইউটিউবে প্রকাশিত একটি মিউজিক ভিডিওতে পেরেইরা বলেন, ‘আমি মাত্রাধিক মাদক গ্রহণ করতাম। কিন্তু ঈশ্বর বছর কয়েক আগে এর কবল থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন।’
মেক্সিকোর টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সেখানে দেখা গেছে, বিমানটি নিরাপদে মেক্সিকো সিটির বিমানবন্দরে অবতরণ করে। যাত্রীদের বিমান থেকে নেমে রানওয়ে ধরে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে। এর কয়েক মিনিট পর পুলিশ ছয়জনকে হাতকড়া পরিয়ে বের হয়ে আসে।
বোমা বিশেষজ্ঞরা দ্রুত বিমানটির ভেতরে চলে যান এবং তল্লাশি চালান। কিন্তু তাঁরা বিস্ফোরকজাতীয় কিছু পাননি।
রোসিও গারসিয়া নামের এক যাত্রী বলেছেন, ‘বিমানটি যখন অবতরণ করে, তখন ক্রুরা ঘোষণা দেন যে বিমান ছিনতাই হয়েছে। তাঁদের ঘোষণার ওই সময়টা ছিল একটা চরম ভীতিকর মুহূর্ত।

আবার হরতাল-জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী আন্দোলনের কৌশল বর্জন করুন

মহাজোট সরকারের আমলে হরতালের অভিষেক হতে যাচ্ছে ১৪ সেপ্টেম্বর। তবে প্রধান বিরোধী দল নয়, এর সূত্রপাত করল বামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। যখন ঈদের বাজারগুলো কেবল জমজমাট হতে শুরু করেছে, তখন রাজধানীতে আধা বেলা হরতাল আহ্বান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঈদের ভরা মৌসুমে হরতাল আহ্বানের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষতির আশঙ্কা বিরাজ করছে। ঈদে বাড়ি ফেরা লোকজন যে এ হরতালের কারণে দুর্ভোগের মুখে পড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, মানুষ হরতাল চায় না। আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে এখন আর হরতালের তেমন কার্যকারিতা দেখা যায় না। সাম্প্রতিককালে হরতাল করে কোনো দাবি আদায় হয়েছে—এমন উদাহরণও নেই। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, জনগণের ভোগান্তি বাড়বে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। হরতালের নেতিবাচক ফলের কথা আমরা অতীতে বারবার বলেছি, এখনো সেই কথা পুনর্ব্যক্ত করছি।
ঈদ মৌসুমে হরতালের ঘোষণা আসবে, এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ২ সেপ্টেম্বর আন্দোলনকারীদের ওপর নিন্দনীয় পুলিশি হামলার ঘটনায় সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে হরতালের ঘোষণা ছিল অনেকটাই আচমকা। পুলিশি হামলার কারণে আন্দোলনকারীদের প্রতি জনগণের যে সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল, এই হরতাল তাতেও ধস নামাতে পারে।
হরতাল আহ্বান নিয়ে এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের মধ্যেও বিভক্তি লক্ষ করা গেছে। ওয়ার্কার্স পার্টি হরতাল সমর্থন করেনি। জাতীয় কমিটির অন্য শরিকেরা বলতে পারে, হরতালের বিকল্প কী? আমরা বলব, আন্দোলন ও দাবি আদায়ের আরও পন্থা আছে। সারা দেশে তারা বিক্ষোভ মিছিলের যে কর্মসূচি দিয়েছে, আন্দোলনের ধরন হিসেবে তা সমর্থনযোগ্য। হরতালের মতো জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী আন্দোলনের কৌশল বর্জন করে বিকল্প কর্মসূচির সন্ধান করতে হবে।
যেকোনো ইস্যুতে আন্দোলন-সংগ্রাম করা মানুষের নাগরিক অধিকার। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনের লক্ষণীয় বহিঃপ্রকাশ ছাড়া শুধু জনগণকে জিম্মি করে কোনো আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা যায় না। মনে রাখতে হবে, হরতালের প্রথম আঘাত আসে শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। কেবল কথা ও গায়ের জোরে জনগণের ওপর যখন হরতাল চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন এর প্রত্যক্ষ ক্ষতির শিকার শ্রমজীবী মানুষ এ আন্দোলন থেকে দূরে সরে যেতে পারে। আন্দোলনে সাফল্য অর্জনের স্বার্থেই হরতালের মতো আত্মবিনাশী কর্মসূচি পরিহার করা উচিত। দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে, জনদুর্ভোগ কমাতে হরতালের রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে—এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।
আমরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন এই কারণেও যে, এই একটি আধাবেলার হরতাল কিনা জাতীয় রাজনীতিতে দুঃস্বপ্নের হরতালসর্বস্ব সময়ের সূচনা ঘটায়। জাতীয় কমিটির জাতীয় স্বার্থ রক্ষার যে বৈধ উদ্বেগ তাকে নিশ্চয় আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কিন্তু হরতাল নামের কৌশলটিকে নয়। তাই ঘোষিত হরতাল প্রত্যাহার করাই হবে বিচক্ষণতা। এ ক্ষেত্রে জাতীয় কমিটির নেতারা দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।

দুটি মৃত্যু, একটি গোলটেবিল -কেডেনি ও অন্যান্য by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

ইংরেজি হাইওয়ে (highway) শব্দটির কোনো জুতসই বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি হয়নি। প্রধান রাজপথ, মহাসড়ক, সংসরণ—কোনোটাই আমাদের নিত্যদিনের কথায়, লেখায় ব্যবহূত নয়; ইংরেজি হাইওয়ে যেভাবে হয়ে আসছে। যা হোক, হাইওয়ে বা মহাসড়ক একটি মূল্যবান প্রাণ হরণ করেছে। আমি সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিক সাইফুর রহমানের মৃত্যুর কথা বলছি। দুর্ঘটনার যে বিবরণ কাগজে এসেছে, তাতে মহাসড়ক কতটা দায়ী, আর সাবেক মন্ত্রীর বাহন কতটা দায়ী বা বাহনের চালক কতটা দায়ী, সেটা নির্ণীত হয়নি। একটা তদন্ত হচ্ছে বা হবে, তখন হয়তো জানা যাবে। ইতিমধ্যে সাইফুর রহমানের মৃত্যু সব মহল থেকে যে শোকবার্তা বয়ে এনেছে সেটা চোখে পড়ার মতো, মনে ধরার মতো।
দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে যে ভূমিকা পালন করেছেন সাইফুর রহমান, সেটা স্থায়িত্বের দিক দিয়ে যেমন অতুলনীয়, গুরুত্বের দিক দিয়েও সমান গুরুত্বের দাবিদার—বেশ বোঝা যায়। এই দায়িত্ব পালনে তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন যেমন, তেমনি যোগ্যতারও পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির বুনিয়াদ তিনিই তৈরি করে দিয়েছেন, এমন কথাও বলেছেন অনেকে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের সঙ্গে তিনি যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, সেটা ছিল পুরোদস্তুর দ্বান্দ্বিক। ওরা ওদের কথা বলেছে, তিনি তাঁর কথা বলেছেন; এবং শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় পৌঁছেছেন, যেখানে সাধ্যমতো তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। এই হচ্ছে সাধারণ ধারণা। দাতাপক্ষের চাপের কাছে তিনি সহজে নতি স্বীকার করেননি। যখন করেছেন, যেমন আদমজী জুট মিল বন্ধ করার বেলায়, সেখানে আর কোনো বিকল্প ছিল কি না, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শেষ কথা, অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শেষ হবে না। বিএনপির দুই মেয়াদে শাসনকালে, সরকারের একটি প্রধান স্তম্ভ ছিলেন তিনি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একটি দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন। এ জন্য দল তাঁর অভাব অনুভব করবে সামনের দিনগুলোতে। তাঁর শূন্যস্থান পূরণ করা সহজ হবে না।
নিজের জেলা মৌলভীবাজার ও বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়নে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। সে জন্য দলমতনির্বিশেষে সিলেটবাসী তাঁর প্রয়াণে শোকাভিভূত হয়েছে। জীবিতকালে তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রমে যত সমালোচনা হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর আকস্মিকতায় সব মূক হয়ে গেছে। কথায় আছে, তাঁতির হাতে রং লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতাবান রাজনীতিকের নামে যত নিন্দা, তা এই তাঁতির হাতে রং লাগার অনিবার্যতার কথা মনে করায়।
সব দোষগুণ নিয়ে সাইফুর রহমান ছিলেন একজন বর্ণাঢ্য মানুষ। তাঁর স্পষ্টবাদিতা, তাঁর নিজস্ব কৌতুক পরায়ণতা, দলের হয়েও নিজের মাথা উঁচু করে চলার ক্ষমতা তাঁকে তাঁর বিশিষ্টতা দিয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও সেটা মানতে বাধ্য হয়েছে; এবং তাঁর মৃত্যুতে সাধারণ শোকে, সাধারণ কৃতজ্ঞতা প্রকাশে, সাধারণ সম্মানদানে শরিক হয়েছে। আমাদের সমাজে এ দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্প্রতি আরও একটি মৃত্যু একটা শূন্যতা রেখে গেল। বাংলাদেশে নয়, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে। এডওয়ার্ড কেনেডি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—কীভাবে একজন রাজনীতিক একটি দলের হয়েও সবার শ্রদ্ধেয় হয়ে যান। তাঁর জ্যেষ্ঠ দুই ভাইয়ের একজন—জন এফ কেনেডি—রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে (১৯৬৩), আরেক ভাই, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার প্রাক্কালে আততায়ীর হাতে মৃত্যুবরণ করেন। কেনেডি পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা এমনই মজবুত ছিল ওই সময়ে যে এরপর এডওয়ার্ড কেনেডিরও ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকিটে প্রেসিডেন্ট হওয়া ছিল এক সাধারণ প্রত্যাশা। ব্যক্তিগত কারণে সে প্রত্যাশা পূরণের পথে তিনি যাননি। না গেলেও দেশের রাজনীতিতে, একজন সিনেটর হিসেবে তিনি এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিতদের পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের স্বার্থরক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে তাঁর ছিল মুখ্য ভূমিকা। এ কাজে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন তিনি জানতেন, আর সংলাপের মাধ্যমে ওদের বিরোধিতাকে জয় করে, ওদের সমর্থন আদায় করে তিনি তাঁর উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করেছেন। এটা তাঁর বিশেষ ক্ষমতা, বিশেষ প্রতিভার স্বাক্ষর বলে স্বীকৃতি পেয়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ গণতন্ত্রের এক মূল শর্ত। সংবিধানে সেই ব্যবস্থাই থাকে। কিন্তু অপরিণত গণতন্ত্র—এবং বাংলাদেশে যা হয়েছে, প্রকটভাবে সক্রিয় দলতন্ত্র গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ আগলে রেখেছে—এই সংলাপের সুস্থ ধারা বাধাগ্রস্ত। যেখানে জাতীয় স্বার্থ জড়িত, সেখানে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে গিয়ে, এক জায়গায় দাঁড়ানো যে কতটা জরুরি, এ দেশে আমরা এখনো সেটা বুঝিনি। এডওয়ার্ড কেনেডি দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে, দলীয় বিভাজন অস্বীকার করে কীভাবে বিপক্ষের সহায়তা নিয়ে কাজ করা সম্ভব। তাঁর মৃত্যুর পর যে শোক প্রকাশ করা হয়েছে, সেটা জাতীয়ভাবেই হয়েছে, দলীয়ভাবে নয়।
একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের চরম দুঃসময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে, তখন মহত্ প্রাণের মানুষ এডওয়ার্ড কেনেডি, রাষ্ট্রীয় নীতি উপেক্ষা করে মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। একথা কৃতজ্ঞ বাঙালি কোনো দিন ভুলবে না।
বাহাত্তরের এক শীতের সকালে এডওয়ার্ড কেনেডিকে আমরা পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাঙ্গণে। কী কারণে আমি ভুলে গেছি, আমিও উপস্থিত ছিলাম সেদিন ঘটনাস্থলে। এডওয়ার্ড কেনেডিকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছিল ছাত্ররা। আমি বরাবর ভিড়কে ভয় করেছি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কলাভবন প্রাঙ্গণের যে বটগাছটি পাকিস্তানি বাহিনী ভূমিসাত্ করেছিল, ঠিক সেই জায়গাটিতেই তিনি দাঁড়িয়ে। বোধহয় তখনই সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন, ঠিক ওই জায়গায় তিনি একটি বটের চারা রোপণ করবেন। তা-ই করেছিলেন তিনি। সেই চারাটি এত দিনে বড় হয়েছে; ও কেনেডির কথা বলছে।
কেনেডি প্রেসিডেন্ট হননি, কিন্তু মৃত্যুর পর যে সম্মান তিনি পেলেন সব পক্ষের, সব মতের মানুষের, সে প্রশংসা কয়জন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন তাঁদের মৃত্যুর পর? মহত্ত্বের কোন চূড়ায় পৌঁছালে একজন মানুষ সবার বরণীয় মানুষে পরিণত হন? বাংলাদেশ কীভাবে, কৃতজ্ঞতার চেয়েও যা বড়, সম্মান জানাতে পারে এই দুর্দিনের বন্ধুকে? চলমান সংসদীয় অধিবেশনে শোক প্রকাশের তালিকায় সাইফুর রহমান কি ছিলেন? আশা করি সংসদ ভুল করেনি। তার পরও বোধহয় কিছু করার থাকে। আশা করি সংসদ এটা বিবেচনা করবে।
শিক্ষা সংস্কার কমিটি মন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছে তাদের খসড়া প্রতিবেদন। কাজটি বেশ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে কমিটি। এ ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যতিক্রম করল এ কমিটি, কারণ অতীতে দেখা গেছে, বারবার অতিরিক্ত সময় প্রার্থনাই এ দেশে কমিটিগুলোর রীতি। এ ক্ষেত্রে কিছুটা কৃতিত্ব মন্ত্রীকেও দিতে হয়। তাঁর চাহিদার জোর ছিল, তাই কমিটিও সেভাবে সাড়া দিয়েছে। এরপর, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর, কালবিলম্ব না করে মন্ত্রী তাঁর হাতে প্রতিবেদনটি তুলে দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেদনের ব্যাপক প্রচারের ও মতামত সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রতিবেদনের মূল সুপারিশগুলোর ওপর ভিত্তি করে যে গোলটেবিল করেছে সমকাল, সেখানে উপস্থিত হয়ে একটি লাভ হয়েছে আমার—আমি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত উচ্চ পদের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ পেয়েছি। এঁরা চালু ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জুতো যার পায়ে, সে-ই জানে কোথায় খোঁচাটা বিঁধছে। মন্ত্রী মহোদয় নিজে প্রধান অতিথি ছিলেন, তিনিও নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোথায় গলদ এবং কী পরিমাণ দুর্নীতি এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।
যেটা লক্ষ করে আমি খুশি তা হলো, শিক্ষার মানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে যে কথাগুলো বলা হয়েছে। মান এমন একটা বিষয়, যার তল খুঁঁজে পাওয়া যায় না। কীভাবে মান অর্জিত হয়, কীভাবে সেটা আঙুলের ফাঁক গলে হারিয়ে যায়, কীভাবে তাকে পুনরুদ্ধার করা যায়—এ নিয়ে আজও এ দেশে কোনো গভীর পর্যালোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ জন্য প্রয়োজন একটা সত্যিকার মগজ-ঝাঁকানো—ব্রেইন স্টর্মি—বৈঠক। তেমন একটা বৈঠক যদি হয়, আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করব।
আরও একটি বিষয় রীতিমতো গুরুত্ব পেয়েছে ওই গোলটেবিলে, সেটা হলো শিক্ষার জন্য অর্থায়ন। শিক্ষায় বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি লাভজনক—কথাটা একেবারে নতুন নয়। প্রত্যাশিত মানসম্মত শিক্ষা যদি পেতে হয়, তাহলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, এমনকি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর তুলনায়ও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। একটা অত্যন্ত কঠিন কাজের সূত্রপাত হয়েছে মাত্র—শিক্ষা সংস্কার। তবে সূচনা যেভাবে হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক। আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী: শিক্ষাবিদ। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ইস্যু ম্যানেজার হলো এএএ ফাইন্যান্সিয়াল

মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের রাইট শেয়ার ও বন্ড ইস্যুর ব্যাপারে এএএ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার ও কনসালট্যান্ট লিমিটেড ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড ও এএএ-এর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী দেওয়ান মুজিবুর রহমান এবং এএএ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার ও কনসালট্যান্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী খাজা আরিফ আহমেদ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শহীদুল হক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিএফও মনীন্দ্র কুমার নাথসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গুলশানে ইবিএলের ৪৬তম এটিএম উদ্বোধন

রাজধানীর গুলশান-২-এ সম্প্রতি ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) ৪৬তম এটিএম বুথ চালু করা হয়েছে। এ নিয়ে ইবিএল এ বছর ১১টি এটিএম বুথ চালু করল।
ইবিএলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ শাহ এটিএম বুথটির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইবিএলের প্রশাসন বিভাগের প্রধান মেজর (অব.) আবদুস সালাম, হেড অব অলটারনেটিভ ডিস্ট্রিবিউশন সাইদুল আমিন ও বিপণন প্রধান নাজিম এ চৌধুরী।

ঈদের এক সপ্তাহ আগেই বেতন-বোনাস পরিশোধ করুন -ঈদ কি পোশাক-শ্রমিকদের জন্য নয়?

রোজা ও ঈদ সবার জন্য সমান নয়। অন্তত পোশাক-শ্রমিকদের জন্য তা বঞ্চনার মাস হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রতিবছরই পোশাক তৈরি কারখানার (গার্মেন্টস) মালিকেরা রমজান মাস এলেই নিজেদের দীন-দরিদ্র হিসেবে ফলাও করে প্রচার করেন এবং শ্রমিকদের পাওনা বেতন, বকেয়া বোনাস প্রভৃতি দিতে গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতনটুকুও দেওয়া হয় না। এটা অগ্রহণযোগ্য, রীতিনীতিবর্জিত ও অন্যায়।
রমজান মাস তথা আগস্ট-সেপ্টেম্বরেই মালিকদের দেখা যায় ‘টাকা নাই, তাই বেতন দেওয়া যাবে না’—এজাতীয় কথাবার্তা বলতে, আর শ্রমিকদের দেখা যায় রাজপথে বেতন-বোনাসের জন্য হাহাকার করে বেড়াতে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিল যে সরকারি সাহায্য না পেলে তারা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবে না। পরে অবশ্য এই দাবির ভাষা নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তা হলেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং রোজা ও ঈদের এই জটিল সময়ে এখনো বেতন-বোনাসের নিশ্চয়তা পাননি শ্রমিকেরা। অবশ্য অনেক কারখানায়ই শ্রমিকেরা বেতন-বোনাস নিয়মিত পেয়ে থাকেন। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি এ রকম নয়।
বাংলাদেশে পোশাকশিল্প অন্যতম প্রধান লাভজনক ব্যবসা। এমনকি খুদে কৃষকের করের ছাড় না থাকলেও পোশাকশিল্পে কর রেয়াত পর্যাপ্ত। তাদের জন্য সরকারি ঋণ ও জমি সহজলভ্য। তাদের মুনাফা আসে ডলারের হিসাবে। সম্প্রতি বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলার জন্য তাদের আবেদন অনুযায়ী ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়েছে। দেশের বিত্তশালীদের মধ্যেও তারাই শিরোমণি। তার পরও বহুবিধ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাধন্য এ শিল্পের শ্রমিকদের বেতন কেন বকেয়া থাকবে বা নির্ধারিত মজুরি দেওয়া হবে না, এটা তাই কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।
প্রায় ২৫ লাখ পোশাক-শ্রমিকের বেশির ভাগই অল্পবয়সী নারী। কাজের সন্ধানে তাঁরা গ্রামছাড়া হয়েছেন। তাঁরা দাস নন যে মজুরি না দিয়ে কিংবা ক্ষুধার্ত রেখেই কাজ করিয়ে নেওয়া চলে। এই লাখ লাখ শ্রমিককে যদি মানুষ হিসেবে স্বীকার করি, যদি তাঁরা এ দেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে সরকারের উচিত পোশাক কারখানার মালিকদের বাধ্য করা। ঈদের আগেই সব পোশাক কারখানায় নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং যথাযথ ভাতা ও বোনাসের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখা দরকার, গত বছর ঈদ উপলক্ষেই ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। পোশাক কারখানার মালিকদের গড়িমসিতে আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পোশাকশ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস দাবি -শ্রম মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি

আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ঈদ বোনাস ও চলতি মাসের অর্ধেক বেতন দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সেই সঙ্গে পরিষদ বন্ধ কারখানাগুলোর শ্রমিকদের জন্যও বেতন-ভাতা এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
ঐক্য পরিষদের সমন্বয়কারী আমিরুল হকসহ দেলোয়ার হোসেন খান ও সালাউদ্দিন স্বপনের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এ স্মারকলিপি দেয়।
পরিষদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ও পাঁচ হাজার টাকায় নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আইন সংশোধন ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সব বাধা নিরসন।
এ ছাড়া ঝুট ব্যবসা ও টিফিন সরবরাহের নামে পোশাকশিল্পে যে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি হয়, তা বন্ধে হস্তক্ষেপ করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্মারকলিপি দেওয়ার আগে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা সালাউদ্দিন স্বপন। সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী আমিরুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন খান, মঈন উদ্দিন মণ্ডল, আলমগীর রনি, কাজী মোহাম্মাদ আলী, আ. আজিজ, মো. নূরুল ইসলাম, শাহাদাত্ হোসেন, মো. সাইফুল ইসলাম, আরজুয়ারা, রানী, মালা রানী দাস, কোহিনুর আক্তার ও সুলতানা আক্তার বক্তব্য দেন।

প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কি তাহলে অকার্যকর -দেশে ব্যবসা করা কঠিন হচ্ছে

পর পর দুই দিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দুটিই বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে দেশগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করেছে; তৈরি করেছে অবস্থান সূচক। উভয় সূচকেই বাংলাদেশের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়; বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় এবার চার ধাপ পিছিয়ে গেছে। এর বিপরীতে অবশ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্ব প্রতিযোগিতা-সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান আগেরবারের তুলনায় পাঁচ ধাপ অগ্রসর হয়েছে। আপাতদৃষ্টে এই দুটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান পরস্পরবিরোধী বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এর পেছনে অবশ্য জরিপ পরিচালনার সময়গত ব্যবধানকে দায়ী করা যেতে পারে।
তা ছাড়া একটু নিবিড় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, উভয় প্রতিবেদনেই বাংলাদেশে ব্যবসার উপযোগী পরিবেশের প্রধান অন্তরায় হিসেবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সুশাসনের অভাবের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিশ্ব প্রতিযোগিতা-সক্ষমতার প্রতিবেদন অনুসারে, যেখানে ২০০৭ সালে দুর্নীতিকে ব্যবসার এক নম্বর অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে ২০০৮ সালে অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততা উঠে এসেছে এই স্থানে। আর এটি বাস্তবতার সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দেশে বিনিয়োগ এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। উদ্যোক্তারা শিল্প-কারখানা চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। রেল, সড়ক ও নৌযোগাযোগের দুরবস্থা বাড়াচ্ছে ব্যবসার খরচ। আর তাই দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবসা শুরু করতে গড়ে যেখানে ২৮ দিন ব্যয় হয়, সেখানে বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৪৪ দিন—বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই তথ্য অবিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই। একইভাবে কর প্রদান-প্রক্রিয়া ও করবিধির জটিলতা ব্যবসার অগ্রগতির বাধা হচ্ছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেই বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার তালিকায় ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২০তম স্থানে রয়েছে।
এসব বিবেচনায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্যের দিকটি বাংলাদেশের একেবারেই দুর্বল নয়; বরং প্রয়োজনীয় ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো থেকে ইতিবাচক সহায়তা ও সমর্থন পেলে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কার্যকর ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। বছরের পর বছর এ বিষয়গুলো উপেক্ষিত হওয়ায় সমস্যা এখন জটিলতর রূপ ধারণ করেছে। দুর্নীতির কালো থাবায় জ্বালানি ও যোগাযোগ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার মূল্য গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষকে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধুই হয়রানি বাড়াচ্ছে।
এই প্রতিবেদনগুলোয় যা বলা হয়েছে, সেগুলো আসলে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতারই সুসংহত রূপ, কোনো বায়বীয় আবিষ্কার নয়। তাই সরকারের উচিত হবে প্রতিবেদন দুটির সার বক্তব্য গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা এবং এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এ জন্য ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং যেসব দেশ এগিয়ে আছে, তাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা অপসারণের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান -যুক্তরাষ্ট্রে এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে সেমিনার

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী নেতাসহ এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আউট সোর্সিং করিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমআই থ্রি কোম্পানির সহযোগিতায় ‘আউট সোর্স টু বাংলাদেশ’ বিষয়ক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান প্রধান অতিথি ছিলেন। সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সরকারে গৃহীত ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন। আরও বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হক। গতকাল বৃহস্পতিবার এফবিসিসিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার দক্ষ আইটি প্রকৌশলী রয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিবছর ৯০টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭০০ কলেজ থেকে প্রায় ছয় হাজার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এ খাতে প্রবেশ করছেন। এ শিল্পকে সরকার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ খাতের উন্নয়নে সমমূলধন তহবিল প্রদান ছাড়াও আয়করমুক্ত ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হক বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় বিভিন্ন আইটি মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য উপস্থিত প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানান। বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোর আইটি নির্বাহীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সেমিনার বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সজীব ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সরকার ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি, সাবমেরিন কেবলের বিস্তৃতি, আইটি পার্ক স্থাপন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ বিশদ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতির তুলনায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। এ জন্য বাংলাদেশ সফটওয়্যার নির্মাণ, সাপোর্ট কল সেন্টার এবং অন্যান্য আইটি এনাবলিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠার আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) নির্বাহীদের সর্ববৃহত্ সিআইও (চিফ ইনফরমেশন অফিসার) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ফরচুন-৫০০ভুক্ত ৭০টিরও বেশি কোম্পানিসহ প্রায় ১৫০টি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান সম্মেলনে অংশ নেয়। এ সম্মেলন উপলক্ষে এফবিসিসিআই এ সেমিনার আয়োজন করে।
সেমিনারে বিশ্বখ্যাত মাইক্রোসফট, ইউনিসিল, কোকাকোলা, সিসকো, ব্যাংক অব আমেরিকা, অস্টিন এনার্জি, রেডিও শ্যাক, হিউলেট প্যাকার্ড (এইচপি), ওয়েলফার্গো, মিলিনিয়াম নেট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদ গঠন -পর্যটনশিল্পের বিকাশে নবোদ্যম

দেশের পর্যটনশিল্পকে গতিশীল এবং এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার পর্যটনশিল্পের জন্য রূপকল্প তৈরি করছে। গঠন করা হয়েছে জাতীয় পর্যটন পরিষদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পরিষদের সভাপতি।
পরিষদের সদস্য হিসেবে আরও আছেন অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনসচিব। গত ৩১ আগস্ট এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে।
পরিষদের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পর্যটন উন্নয়নসংক্রান্ত জাতীয় ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাগুলোর নীতিগত অনুমোদন করবে পরিষদ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার ও বিপণনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানে যাতায়াতের জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদান, বেসরকারি খাতে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পর্যটন উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশগুলোর পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অনুমোদন দেবে জাতীয় পর্যটন পরিষদ। ছয় মাস পর পর জাতীয় পর্যটন পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পর্যটনশিল্পের বিকাশে প্রধানমন্ত্রী নিজে এই পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এর বাইরেও আরও দুটি কমিটি কাজ করবে। একটি হলো মন্ত্রিপরিষদ কমিটি, যার সভাপতি অর্থমন্ত্রী। অপরটি হলো পর্যটন উপদেষ্টা কমিটি। এ কমিটিতে সরকার ছাড়া বেসরকারি খাতের লোকজন অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের পর্যটনশিল্পকে একটি পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একটি খসড়া পর্যটন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। অচিরেই এটি চূড়ান্ত করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে প্রায় ২৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের এই নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)। তবে তারা মনে করে, নানা সম্ভাবনা সত্ত্বেও দেশের পর্যটনশিল্প কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড তো বটেই, এমনকি গত এক দশকে কম্বোডিয়াও পর্যটনশিল্পে ব্যাপক উন্নতি করেছে।
এক হিসাব থেকে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে কম্বোডিয়া মাত্র ৯৬ হাজার বিদেশি পর্যটক গ্রহণ করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশে এসেছিল এক লাখ ৫৬ হাজার। ২০০৬ সালে কম্বোডিয়ায় ২০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছে। আর বাংলাদেশে এসেছে মাত্র দুই লাখ। অথচ কম্বোডিয়ায় বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো আছে শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
সুন্দরবন, কক্সবাজারের মতো আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তেমন কোনো পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারছে না। ২০০৬ সালে কম্বোডিয়া পর্যটন থেকে ১০০ কোটি ডলার আয় করেছে। আর বাংলাদেশের আয় বেসরকারি হিসাবে সর্বোচ্চ নয় কোটি ডলার হতে পারে।
টোয়াবের সভাপতি তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবেই আমরা পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছি না।

বিসিবির নতুন সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতির পদে পরিবর্তন আসছে। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, বিসিবির নতুন সভাপতি হচ্ছেন কুমিল্লা-১০ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও আবাহনীর ক্রিকেট কমিটির প্রধান আ হ ম মোস্তফা কামাল। যিনি লোটাস কামাল নামেই বেশি পরিচিত।
বোর্ড সভাপতি হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছিল আরেক সংসদ সদস্য এবং বিসিবি পরিচালক গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীকেরও। তবে সূত্র জানিয়েছে, আ হ ম মোস্তফা কামালকে বোর্ড সভাপতি করার সিদ্ধান্তটি মোটামুটি চূড়ান্ত। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে তাঁর নাম। কাল রাতে এ ব্যাপারে আ হ ম মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছেন, ‘আমি এ রকম কোনো খবর এখনো জানি না। তবে আমাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলে আমি সবাইকে নিয়ে তা ঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করব।’
২০০৭ সালের ২৯ জুলাই ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনার জন্য সিনা ইবনে জামালীর সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের অস্থায়ী কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেছিল তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। গত বছরের নভেম্বর মাসে নির্বাচনের মাধ্যমে বিসিবিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ এলেও সভাপতি থেকে যান জামালী।

বেঁচে রইল ফ্রান্স-পর্তুগালের আশা

এক দল ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী; দুবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন। অন্য দল এখনো সেই সাফল্যের জন্য ব্যাকুল হয়ে প্রহর গুনছে। সাফল্য বিবেচনায় যতই ব্যবধান থাক, ফ্রান্স আর পর্তুগালকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। দুদলের বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলা না-খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা যে পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান।
গত পরশু দুদলই সেই আশাটাকে একটু উজ্জ্বল করে তুলেছে। হাঙ্গেরিতে গিয়ে ১-০ গোলে জিতেছে পর্তুগাল। আর সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুর দিকেই ১০ জনের দলে পরিণত ফ্রান্স পিছিয়ে পড়ার পরও ড্র করেছে ১-১ গোলে।
ড্র করেই খুশি ফরাসি কোচ রেমন্ড ডমেনেখ। হওয়ারই কথা। ম্যাচটা ছিল ফ্রান্সের বাঁচা-মরার লড়াই, অথচ সেটির শুরুটা এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারত না। নিকোলা জিগিচকে ফাউল করায় ম্যাচের ১৩ মিনিটেই লাল কার্ড দেখে মাঠে ছাড়তে হয় ফরাসি গোলরক্ষক হুগো লরিসকে। পেনাল্টি থেকে গোল করে সার্বিয়া এগিয়েও যায়। ১০ জন নিয়ে খেলেও ফ্রান্স যে ড্র করতে পেরেছে, সেই কৃতিত্বটা থিয়েরি অঁরির। ৩১ মিনিটে অঁরি তাঁর ৫০তম আন্তর্জাতিক গোল করে কক্ষচ্যুত হতে দেননি ফ্রান্সকে। দুই ম্যাচ বাকি থাকতে গ্রুপের শীর্ষে থাকা সার্বিয়ার সঙ্গে এখন চার পয়েন্টের ব্যবধান ফ্রান্সের।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে হারলে পর্তুগালের আশা শেষই হয়ে যেত। ৯ মিনিটে পেপের গোলে জয় হাওয়া লাগিয়েছে পর্তুগালের আশার পালে। ১৩ পয়েন্ট নিয়ে অবশ্য তৃতীয় স্থানেই আছে তারা। মাল্টাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে সুইডেন (১৫)। গ্রুপের শীর্ষে থাকা ডেনমার্ক (১৮ পয়েন্ট) এ দিন আলবেনিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করায় সুইডেন ও পর্তুগালের সঙ্গে কমে এসেছে পয়েন্টের ব্যবধান।
ওদিকে বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি এক পা দিয়ে রেখেছে চূড়ান্ত পর্বে। আট নম্বর গ্রুপে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আয়ারল্যান্ডের চেয়ে ৪ পয়েন্টে এগিয়ে আজ্জুরিরা। আজারবাইজানকে ৪-০ গোলে হারিয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারছে না জার্মানি। ৪ নম্বর গ্রুপে তাদের চেয়ে মাত্র এক পয়েন্ট কম দুইয়ে থাকা রাশিয়ার (২১ পয়েন্ট)।
ওদিকে এশিয়া অঞ্চলে প্লে-অফে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে পরশু মুখোমুখি হয়েছিল বাহরাইন আর সৌদি আরব। স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনার ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হলেও অ্যাওয়ে গোলের হিসাবে প্লে-অফে জায়গা করে নিয়েছে বাহরাইন। প্রথম বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নপূরণ করতে চাইলে বাহরাইনকে জিততে হবে ওশেনিয়া অঞ্চলের নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।
কনক্যাকাফ অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপের আশা শেষ হয়ে গেছে গতবার চূড়ান্ত পর্বে খেলা ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর। শীর্ষ দুটি স্থানে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। হন্ডুরাস নেমে গেছে তিনে। চারে আছে কোস্টারিকা। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে আর্জেন্টিনা ৫ নম্বরে থেকে শেষ করলে এই কনক্যাকাফের চার নম্বর দলের সঙ্গে প্লে-অফ খেলতে হবে তাদের।

নেদারল্যান্ডের সঙ্গী ইংল্যান্ড-স্পেন

সেই ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। সেই দুই দল ইংল্যান্ড আর ক্রোয়েশিয়া। পার্থক্য কেবল, ২০০৮ ইউরোর বাছাইপর্বে নিজেদের মাঠে হেরে মাথানত করে মাঠ ছেড়েছিল ইংল্যান্ড। হারিয়েছিল ইউরোর চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ। আর পরশু গৌরবোদ্ধত অহংকারে উচ্ছল ওয়েইন রুনিরা। এত দিন ধরে পুষে রাখা সেই জ্বালা জুড়াল ইংল্যান্ড। ক্রোয়েশিয়াকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিত করল ২০১০ বিশ্বকাপ। দুটি করে গোল করেছেন ল্যাম্পার্ড ও জেরার্ড, অন্য গোলটি রুনির।
ইউরোপ থেকে সবার আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছিল নেদারল্যান্ড। ইংল্যান্ড ছাড়াও দুই ম্যাচ হাতে রেখেই ডাচদের সঙ্গী হয়েছে স্পেন। সেস ফ্যাব্রিগাস, কাজোরলা আর মাতার গোলে এস্তোনিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে।
প্রতিশোধের মিশন নিয়েই মাঠে নেমেছিল ইংল্যান্ড। মাত্র সাত মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেন ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। ১১ মিনিট পর ব্যবধানটি দ্বিগুণ করেন স্টিভেন জেরার্ড। এই ছিল প্রথমার্ধের ফল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ক্রোয়েশিয়া একটা পাল্টা আঘাত হানার নিষ্ফল চেষ্টা চালায়। কিন্তু ৫৯ মিনিটে ল্যাম্পার্ড তাঁর দ্বিতীয় আর দলের তৃতীয় গোল করে ম্যাচের ভাগ্যটাও যেন বেঁধে দেন। ৭ মিনিট পর নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন জেরার্ড। ৪-০ তে পিছিয়ে পড়া হতোদ্যম ক্রোয়েশিয়াকে ৭৩ মিনিটে সান্ত্বনাসূচক গোল এনে দেন এদুয়ার্দো। কিন্তু ৭৮ মিনিটে ওয়েইন রুনি কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিলে বড় পরাজয়ের লজ্জা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় ক্রোটদের।
ক্রোয়েশিয়া অবশ্য এখনো প্লে-অফের আশা জিইয়ে রেখেছে। কিন্তু এসব ঝামেলায় না গিয়ে ‘আমরা আসছি’ বলে সগর্ব ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ড। বাছাইপর্বের ৮ ম্যাচেই জিতেছে ফ্যাবিও ক্যাপেলোর দল, ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ৩১টি গোলও করেছে তারা। আর বাছাইপর্বের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এখনই ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্নে বিভোর করে তুলছে ইংলিশদের।
যে ক্যাপেলো সহজে তুষ্ট হন না, প্রায়ই ‘এখনো অনেক পথ বাকি’ বলে শিষ্যদের গা ঝাড়ার তাগিদ দেন, সেই ইতালীয় কোচও বলছেন, ২০১০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতেই পারে, ‘অবশ্যই, কেন নয়? এই দলের সবাই দুর্দান্ত।’
৮ ম্যাচের সব কটিতে জয় পেয়েছে স্পেনও। ২১ গোলের বিপরীতে গোল খেয়েছে মাত্র দুটো। তার পরও ক্যাপেলোর মতো তৃপ্তি নেই স্পেনের কোচ ভিনসেন্ত দেল বস্কের কণ্ঠে, ‘আজ (পরশু) রাতে আমরা আমাদের সেরাটা খেলতে পারিনি। অবশ্য আমরা বিশ্বকাপে উঠে গেছি, এটাই আসল কথা। তার পরও এখনই আমি বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবতে রাজি নই।’ এএফপি।

চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত যাদের
ইউরোপ
নেদারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, স্পেন
এশিয়া
জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া
আফ্রিকা
দক্ষিণ আফ্রিকা (স্বাগতিক), ঘানা
দ. আমেরিকা
ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে

কলকাতা ওপেন দাবা

কলকাতা ওপেন দাবায় মোট দাবাড়ু ছিলেন ১১৬ জন, পরশু দশম রাউন্ডে জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করা বাংলাদেশের গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান হয়েছেন ১১তম। জিয়ার পয়েন্ট সাড়ে ছয়। গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার ৩৪তম (৬ পয়েন্ট), গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন ৫৪তম (৫ পয়েন্ট)। ফিদে মাস্টার আবু সুফিয়ান শাকিল ৮১তম (সাড়ে চার পয়েন্ট), ফিদে মাস্টার মিনহাজউদ্দিন ৮৭তম (৪ পয়েন্ট), দেবরাজ চ্যাটার্জি ১০১ (৩.৫ পয়েন্ট)। আট পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন ভিয়েতনামের গ্র্যান্ডমাস্টার লি কুয়াং লিম।