Wednesday, June 5, 2024

জেনারেল আজিজের তেলেসমাতি by শরিফ রুবেল

 আজিজ আহমেদ। ডাক নাম ফারুক। এক সময়ের মহাপরাক্রমশালী জেনারেল। কাজ করতেন খেয়াল-খুশিমতো। তিনি একজন আদর্শ ভাইও বটে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ভাইদের বাঁচাতে আজিজ আহমেদের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। সন্ত্রাসী ভাইদের নানা সুবিধা, ফাঁসি থেকে বাঁচানো, ব্যবসায়িক সহায়তা, অনৈতিক সুবিধা, সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গায়েব, নাম পরিবর্তন, ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা, ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি, হোটেল-রিসোর্ট এমনকি বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনে ভাইদের সহায়তা করেছেন এই দাপুটে জেনারেল। আলোচিত ছিলেন নিজের কর্মগুণেও। শুধু ভাইদের জন্য নয়। নিজেও রিসোর্ট, বাংলোবাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, শত বিঘা জমি কিনে তেলেসমাতি দেখিয়েছেন।
অনিয়ম ও পদ ব্যবহার করে দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন আজিজ। দেশ জুড়ে তাকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা- সমালোচনা।

নামে-বেনামে যত সম্পদ: মানবজমিনের অনুসন্ধানে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। রাজধানীর তুরাগ নদ ঘেঁষা আমিনবাজার বড় বরদেশী মৌজায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ে আরএস ১৩০৩ নং দাগে ৭৫ কাঠা, ১৩১১ নং দাগে ৩০.৬ কাঠা, ১৭৬১ দাগে ৮০ কাঠা জমি রয়েছে আজিজ আহমেদের। ওই জমিতে তার একটি বাংলো বাড়ি রয়েছে। উঁচু দেয়ালে ঘেরা বাড়িতে হরেক রকম গাছ ও পশুপাখি লালনপালন করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আনসার সদস্যরা। সময় পেলেই এই বাড়িতে ছুটে যান আজিজ আহমেদ। মাঝেমধ্যেই স্কুল- কলেজের বন্ধুদের নিয়ে এই বাড়িতে আড্ডা দেন। এমন কয়েকটি ছবিও মানবজমিনের হাতে রয়েছে। সিলিকন সিটি হাউজিংয়ে আজিজ আহমেদের বড় ছেলে ইরফান আহমেদ সাদিব পরিচালক পদে রয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট সিলিকন সিটির সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া সিলিকন সিটিতে আজিজ আহমেদের ছোটভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামে প্রায় ২০০ কাঠা জমি আছে। অভিযোগ রয়েছে, জেনারেল আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ের এমডি সরোয়ার খালেদকে জমি দখলে সহায়তা করায় আজিজ ও তার পরিবারকে এই সম্পত্তি উপহার দেয়া হয়।

সিলিকনের ম্যাপেও আজিজ পরিবারের সম্পত্তির নির্দেশিকা দেখা গেছে। এ ছাড়া আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের মনোসন্তোষপুর মৌজায় পূর্ণিমারচালা এলাকায় আরএস ১৭১ ও ১৭২ নং দাগে আজিজ আহমেদের প্রায় ২১ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের স্থানীয় ঈমান আলী, আব্বাস উদ্দিন, খোরশেদ আলম ও ফারুকের মাধ্যমে এই জমি কেনেন আজিজ আহমেদ। ১৭১ দাগের জমিতে উঁচু প্রাচীরঘেরা একটি বাংলোবাড়ি আছে। পাশের ১৭২ দাগে ইটের রাস্তার পাশে প্রায় ৫ বিঘা জমি বাউন্ডারি করে রাখা আছে। ভেতরে ছোট্ট একটি ঘরে আজিজ আহমেদের বাসার কাজের লোক সাবেক সৈনিক মাইন উদ্দিন সুমন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তিনি প্রায় ২ বছর ধরে এই সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। সরজমিন গিয়ে আজিজ আহমেদের জমির নিরাপত্তারক্ষী মাইন উদ্দিন সুমনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার বাড়ি বছিলা ঘাটারচর। আমি আজিজ স্যারের বাসায় কাজ করতাম। অবসরে যাওয়ার পরে আমারও চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। পরে আমি এখানে চলে আসছি। এই জমির মালিক কে জানি না। তারা (আজিজ) আমাকে এখানে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দায়িত্ব পালন করছি। আমার কাজ শুধু দেখাশোনা করা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, আজিজ আহমেদ প্রায়ই এই জমি দেখতে আসেন। আশুলিয়া জিরাবোর ফারুক হোসেন তাকে এই জমি কিনে দিয়েছেন। ২০১৮ সালে  সেনাবাহিনীর গাড়ি নিয়েই তিনি এখানে আসতেন। এখন কম আসেন। তার ভাই জোসেফ ২  থেকে ৩ মাস পর পর আসেন। কয়েকটি গাড়ি নিয়ে আসেন। জমি দেখে আবার চলে যান। শুনেছি আজিজ আহমেদ জমিগুলো ফারুক হোসেন ব্যাপারীর নামে কিনেছেন। পরে তার কাছ থেকে পাওয়ার নিয়ে রেখেছেন।

তার মনোসন্তোষপুর মৌজায় ৫০ বিঘার উপরে জমি আছে। ফারুকের যত জমি সবগুলোই আজিজ আহমেদের। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর রামচন্দ্রপুর মৌজায় জাকের ডেইরি ফার্মের অপর পাশে আরএস ৫৮২ নং দাগে আজিজ আহমেদের ৪ কাঠার দুটি প্লট আছে। প্লট দুটির দাম আনুমানিক ৬ কোটি টাকা। ওই প্লটে আজিজ আহমেদের নামে সাইনবোর্ড ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরদিন ওই সাইনবোর্ড সরিয়ে নেয়া হয়। একই মৌজায় মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড ৪ নং রোডে কুবা মসজিদের গলিতে ৯৯ নং বাসায় আজিজ আহমেদ ও তার ভাইদের নামে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাড়িটি নির্মাণ করা ইউনিক হোল্ডিংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৫ সালে বাড়িটি নির্মাণের সময় আজিজ আহমেদের ভাইয়েরা নির্মাণে বাধা দেন। প্রায় ৫ মাস নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। পরে তাদের ফ্ল্যাট দেয়ার শর্তে নির্মাণকাজ শেষ করা হয়। ওই বিল্ডিংয়ে তাদের নামে কয়েকটি ‘দানের’ ফ্ল্যাট রয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের ওই ফ্ল্যাট দিতে হয়েছে। তাই দানের ফ্ল্যাট বললাম। এ ছাড়া ভাকুর্তা ইউনিয়নের বাহেরচর এলাকায় শ্যামলাপুর মৌজায় আজিজ আহমেদের নামে বেশ কিছু প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শ্যামলাসি কলাতিয়া পাড়ার পেছনে জমজম হাউজিংয়ের রাস্তার ডান পাশে ৮০ শতাংশের প্লট, এর একটু দূরেই ৫০ শতাংশের আরেকটি প্লট আছে আজিজ আহমেদের। এ ছাড়া শ্যামলাসি দুদু মার্কেট এলাকায় অ্যাকটিভ প্রিক্যাডেট স্কুলের পাশে ১৭ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে তার। ওই জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। ভাকুর্তা ইউনিয়নের শ্যামলাপুর মৌজার বাহেরচর ও লুটেরচর এলাকায় আজিজ আহমেদের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বড় ভাই আনিস আহমেদের ছেলে আসিফ আহমেদের বিরুদ্ধে। সিএস ৩৪৩ ও ৩৪৪, আরএস ২৫০২ দাগে ৭৮ শতাংশ। জমিটি আগে সেজান জুসের মালিকানায় ছিল।

 এ ছাড়া শ্যামলাপুর মৌজায় আরএস ২৬৬৪ দাগে ৯৮ শতাংশ জমি আছে। জমিটি আগে ছিল লুটেরচর বড় মসজিদ ও বছিলা মসজিদের। এই জমিতে ৩৮টি প্লট তৈরি করে চারদিকে প্রাচীর দিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের প্লটেই এসএ ৮২৫, আরএস ২৫০০ ও ২৫০১ দাগে আজিজ আহমেদের বোন জামাই নুরুল ইসলামের ৩৯ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমির মালিক ছিলেন খোরশেদ আলম। পুরো জায়গাটি ইটের প্রাচীর তৈরি করে জিনি পাওয়ার টেকনোলজি লিমিটেডের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া চরওয়াশপুরে আসিফের নামে ৫২ শতাংশ জমি আছে। এই জমির একটি সাইনবোর্ড প্রতিবেদকের কাছে আছে। শ্যামলাসি স্কুলের পাশে রাস্তা থেকে নেমে আরএস ২৮৮৬ দাগে ৫ কাঠা জমিতে আজিজ আহমেদের একটি একতলা বাড়ি আছে। ওই বাড়িটি তিনি তার বোনকে লিখে দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আজিজ পরিবারের যত বাড়ি: মিরপুর ১২ নম্বরের সিরামিক ৪ নং গেইটের পাশে বঙ্গবন্ধু কলেজ রোডে ৫ কাঠার প্লটে আজিজ আহমেদের একটি ১০তলা বাড়ি রয়েছে। বাউনিয়া মৌজায় বাড়ি নং ১৩/১৪ ব্লক ডি, এভিনিউ-২, মিরপুর-১২, পল্লবী। ওই বিল্ডিংয়ে ২১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ২০১৮ সালে বাড়ি নির্মাণের পরে হাউজিং কোম্পানির কাছ থেকে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেন আজিজ আহমেদ। গত ২৫শে মে বাড়িটির নামফলক মুছে ফেলা হয়। ভবনের অধিকাংশ ফ্ল্যাট ফাঁকা আছে।

এলাকাবাসী জানান- আজিজ আহমেদের ম্যানেজার বাড়িটি বিক্রির জন্য স্থানীয় জমি কেনাবেচাকারীদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন। অনেকে বাড়ি দেখেও গেছেন। তবে বিক্রি হয়েছে কিনা তা কেউ বলতে পারছে না। মিরপুর সিরামিক ৪নং গেইটের ঠিক উল্টোপাশে বাউনিয়া মৌজায় ৩ কাঠা প্লটে আজিজ আহমেদের টিনশেডের আরেকটি বাড়ি রয়েছে। বাড়ির সম্মুখভাগে ৪ থেকে ৫টি দোকান রয়েছে। যা ভাড়া দেয়া আছে। সিরামিক রোডের ১০তলা ভবনের বিষয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা হলে তারা মানবজমিনকে বলেন, আজিজ আহমেদের এখানে বাড়ি আছে, এটা জানে না, এই এলাকার এমন কোনো মানুষ নেই। ২০১৮ সালে বাড়িটি নির্মাণের সময় তিনি নিজে এসে দেখভাল করতেন। প্রায় প্রতিদিন আসতেন। পাশের চা দোকানি আলামিন মিয়া মানবজমিনকে বলেন, এই রোডে ১০ তলা একমাত্র বিল্ডিংই আজিজ আহমেদের। সেনাপ্রধানের লাল বিল্ডিং বললেই যে কেউ দেখিয়ে দিবে। রিকশাওয়ালাকে বলতেই নিয়ে আসবে। এই রোডে তার আরও একটি প্লট আছে। সামনে গিয়ে দেখেন তার নাম লেখা সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে। ওই সাইনবোর্ডে আরেকজন অফিসারের নামও আছে। মনে হয় শেয়ারে জমি কিনেছেন। মিরপুর ডিওএইচএসে আজিজ আহমেদের ১টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। রোড নং ১৩, প্লট নং ১৩২০, এভিনিউ-২, মিরপুর ঢাকা। ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল আজিজ আহমেদের একটি বিশাল বাংলোবাড়ি রয়েছে। হাউজ নং-০৩ (পথিকৃৎ) ঢাকা সেনানিবাস। এই বাড়িতে তিনি দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি পালন করেন। এ ছাড়া কুর্মিটোলা গল্‌ফ ক্লাবের পাশে নিকুঞ্জ-১ এর ৬ নম্বর রোডের মাথায় আজিজ আহমেদের একটি আলিশান বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নং- RCF9+F5P, বাড়ির নাম আজিজ রেসিডেন্স। মিরপুর সিরামিক গেইটে আজিজ আহমেদের টিনশেড বাড়ির পাশের ৩০ নং প্লটের মালিকানা নিয়েও স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ চলছে। মো. হোসেন ফারুক লিটন নামের এক ব্যক্তি বর্তমানে ওই জমির ভোগদখলে আছে। স্থানীয় এক ফার্মেসি দোকানি মানবজমিনকে বলেন, এই জমি যার দখলে আছে সেই লিটন সাবেক সেনাপ্রধানের লোক। তার বলেই তিনি এই জমিতে আছেন। আজিজ আহমেদ মাঝেমধ্যে এখানে এসে জমির সামনে দাঁড়িয়ে লিটনের সঙ্গে কথা বলেন। তখন এলাকার কেউই এখানে আসার সাহস পান না।

পরিবারের সদস্যদের বাড়ি দখল: আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর রোডের মাথায় জমি দখল করে বিলাসবহুল একটি ১০ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন আজিজ আহমেদের ভাই জোসেফ আহমেদ। বাড়ি নং ৫৪/১৯ এ, ব্লক#ক# ১২। বাড়ির নাম মায়ের আঁচল। এ ছাড়া পাশেই আজিজের ভাতিজা আসিফ আহমেদেরও একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নং ৫৪/১৯ বি, ব্লক # ক # ১২। বাড়ির নাম ডায়মন্ড রিজেন্সি। বাড়িটি নির্মাণে প্রায় ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ ছাড়া আদাবর নবোদয় হাউজিংয়ের ৫ নং রোডের এ ব্লকে ৭ নং বাড়িটিও আজিজ আহমেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে দখল করে নেন জোসেফ। পরে ওই বাড়িটি জোসেফের বোন জামাই নুরুল ইসলামকে দেয়া হয়। মাস চারেক আগে  মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের ফিলবার্ড ক্যাবল অফিসের উল্টো পাশে একটি টিনশেড বাড়ি দখলে নেন জোসেফ।

হারিছের হাউজিং দখল: বাড্ডার সাতারকুলে মগারদিয়ার পূর্ব হাররদিয়া মৌজায় প্রায় ২৩৫ বিঘা জমি দখলে রয়েছে আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ আহমেদ ও স্থানীয় এমপি’র ছেলে হেদায়েতউল্লাহ রন’র। আজিজ আহমেদ, শাহজাহান (যিনি আগে ওই জমির মালিক ছিলেন বলে অনেকের দাবি), হেদায়েতউল্লাহ রন ও হারিছ আহমেদের বৈঠকের একটি ছবিও প্রকাশ পায়। সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাড্ডা মডেল টাউনের ২৩৫ বিঘা জমির বড় বড় খণ্ডগুলোতে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কালো রংয়ের সাইনবোর্ডে সাদা কালিতে লেখা রয়েছে এই সম্পত্তির মালিক হাসান হারিছ আহমেদ ও হেদায়েত উল্লাহ রন। পুরো প্রকল্প জুড়ে প্রায় ১৭টি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। তবে সাইনবোর্ডে জমির পরিমাণ ও দাগ খতিয়ান কিছুই লেখা নেই। কিছু কিছু সাইনবোর্ডে আবার হারিছ আহমেদের সঙ্গে এপেক্স প্রপ্রার্টিস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের নাম রয়েছে। স্থানীয় হালিম শেখ নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, একজনের দখল করা জমি, আবার আরেকজন দখল করছে। এতে আমাদের কোনো লাভ-ক্ষতি হয়নি। প্রথমে শাহজাহান এক পাকি কিনে ১০ পাকি ভরাট করছে। তখন এলাকাবাসী বাধা দিয়েও কিছু করতে পারেনি। এখন তার দল ক্ষমতায় নেই তার জমিই অন্যরা দখল করে নিচ্ছে। এ ছাড়া হাজারীবাগ মডেল টাউনেও আজিজ আহমেদের ভাই হাসান হারিছ আহমেদ ও হেদায়েতউল্লাহ রন’র নামে ১১টি প্লট রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ’২১ সাল পর্যন্ত তারা এই প্লটগুলো দখলে নেন। এ ছাড়া হেমায়েতপুর আলিপুর ব্রিজের পাশে মাকান রিভারভিউ হাউজিংয়ে হাসান হারিছ আহমেদ ও জোসেফের নামে ২১টি প্লট আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

হ্যারিটেজ রিসোর্টে শেয়ার: আজিজ আহমেদের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র মানবজমিনকে জানিয়েছেন নরসিংদীর মাধবদী রাইনাদী দিঘিরপাড় আজিজ আহমেদের আংশিক শেয়ারে একটি রিসোর্ট রয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই রিসোর্টের নাম হ্যারিটেজ রিসোর্ট। এর মালিকানায় আছেন মিনহাজুর রহমান রাজু ভুঁইয়া। তিনি জেনারেল আজিজ আহমেদের ছোট ভাই জোসেফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ২০২০ সালে জেনারেল আজিজ আহমেদ ওই রিসোর্ট পরিদর্শনে যান। এমন বেশ কয়েকটি ছবিও মানবজমিনের হাতে রয়েছে। আজিজ তখন ঘুরে ঘুরে রিসোর্টের নির্মাণকাজের খুঁটিনাটি দেখেন। রিসোর্টের আশপাশের লোকজন বলেন, অনেকটা জোরজবরদস্তি করে পুলিশের ভয় দেখিয়ে রিসোর্টের জমি কিনে নেয়া হয়। এক বিঘা কিনে ৩ বিঘা ভরাট করা হয়। প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে এই রিসোর্ট। নির্মাণের সময় প্রায় প্রতিদিনই সেখানে পুলিশ পাহারা চলতো। মাঝেমধ্যে একটি বিশেষ বাহিনীর লোকজনকেও সেখানে যাতায়াত করতে দেখেছে এলাকাবাসী। তবে ওই রিসোর্টে আজিজ আহমেদের মালিকানার  বিষয়ে দালিলিক কোন তথ্য মিলেনি।
প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে দফায় দফায় কল দেয়া হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ইথিওপিয়ায় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যার প্রমাণের দাবি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের

টাইগ্রে যুদ্ধের সময় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যা এবং ব্যাপক লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য নিউ লাইনস ইন্সটিটিউট। মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটিকে উদ্বৃত করে এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী এবং টাইগ্রে বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধ টানা দুই বছর চলে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরে ওই গৃহযুদ্ধটিকে টাইগ্রে যুদ্ধ নামে উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ওই গৃহযুদ্ধে বেসামরিকদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা এবং লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন ওই প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ১২০ পাতা সম্বলিত ওই প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ায় ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বেসামরিকদের ওপর যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অভিযোগের প্রমাণ হাজির করা হয়েছে।

দ্য নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স, ইরিত্রিয়ার ডিফেন্স ফোর্স এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলে। পরে সমঝোতার মাধ্যমে ভয়ঙ্কর ওই সংঘাতের ইতি টানে তারা। কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ এক প্রতিবেদনে সেখানে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তোলে। তার ভিত্তিতে প্রমাণাদি সংগ্রহ করা শুরু করে দ্য নিউ লাইনস ইন্সটিটিউট।
ইথিওপিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যা, নারীদের ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য প্রমাণাদি হাজির করার দাবি করেছে মার্কিন ওই প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হাজির করার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।



যেখানে তাজউদ্দীনের কাছে শেখার আছে অনেক by গওহার নঈম ওয়ারা

আগামী বছর তাজউদ্দীন আহমদের জন্মশতবার্ষিকী। নিশ্চয় দেশবাসী যথাযথ মর্যাদায় তাঁকে স্মরণ করবে। স্মরণ করবে রাষ্ট্র, তাঁর পরিবার, সংবাদমাধ্যম।

সম্প্রতি এসব নিয়ে আলাপ হচ্ছিল জুলিয়ান ফ্রান্সিসের সঙ্গে। জুলিয়ান এখন বাংলাদেশের নাগরিক। এ বছর তিনি আশিতে পৌঁছালেন। ২৯ এপ্রিল ছিল তাঁর জন্মদিন। একানব্বইয়ের মহাপ্লাবন এসেছিল ২৯ এপ্রিল। সে কারণেই জুলিয়ানের জন্মদিনটা মনে থাকে সব সময়।

কানাডাভিত্তিক এক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার তখন তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি। উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়ে সে বছর নিহত হয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জন মানুষ। কয়েক লাখ পরিবার হয়েছিল বাস্তুচ্যুত। নতুন সরকারের নতুন গণতন্ত্র নিয়ে সেই সংকট সামলানো বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু একাত্তরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে থাকা জুলিয়ান ঢাকায় বসেই বলে দিচ্ছিলেন কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে। উন্নয়ন সংগঠনগুলোর সভায় অনেকেই অপেক্ষা করতেন জুলিয়ানের বক্তব্যের জন্য।

একাত্তরে জুলিয়ান ছিলেন অক্সফামের কলকাতা কার্যালয়ের প্রধান সমন্বয়ক। বিহারের দুর্ভিক্ষের (১৯৬৬-৬৭) পর ১৯৬৮ সালে ত্রাণকর্মী হিসেবে কাজ করতে এসে আর দেশে ফেরা হয়নি জুলিয়ানের। একাত্তরের এপ্রিলে ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল পূর্ব ভারতের অফিস রাঁচিতে বসে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ লাখ লাখ শরণার্থী সামলানো সম্ভব হবে না। অফিস ঠিক করে কলকাতায় নতুন দপ্তর খোলা হলো।

বিহার থেকে জিপগাড়ি চালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন জুলিয়ান। রাসেল স্ট্রিটের এক হোটেলে খোলা হয় অস্থায়ী দপ্তর। কাছেই থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। সেখানে জুলিয়ান গেছেন ত্রাণকাজে বুদ্ধি–পরামর্শের জন্য। দেখা হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। জুলিয়ানের চেয়ে কমপক্ষে ১৯ বছরের বড় প্রবল ব্যস্ত যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে তাঁর সব সময় বন্ধু বলেই মনে হতো। ত্রাণের অনেক খুঁটিনাটি তরুণ জুলিয়ান শিখেছিলেন তাজউদ্দীনের কাছে।

একবার অক্সফাম কানাডা একটা বড় খাদ্যসামগ্রীর চালান পাঠায় জুলিয়ানদের কাছে। শর্ত ছিল বিতরণ করতে হবে বাংলাদেশের মুক্ত অঞ্চলে। কলকাতার অক্সফাম অফিস তখন কাজ করছে শরণার্থী ক্যাম্পে। ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, কোচবিহারসহ পশ্চিম বাংলার প্রায় ৫০টি ক্যাম্পে ছয় লাখ শরণার্থীর সেবা দিতে তখন অক্সফামের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এর মধ্যে মুক্তাঞ্চলে বিতরণের অনুরোধ!

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা না বলে এগোনো সম্ভব নয়। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের দিনক্ষণ ঠিক করে কাগজপত্র নিয়ে সময়মতো থিয়েটার রোডে গিয়েও প্রথম দিন তাজউদ্দীনকে পাননি জুলিয়ান। অনির্ধারিত বিশেষ জরুরি এক মিটিংয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে জুলিয়ানের মন খারাপ হয়ে যায়। নানা ভিটামিন, খনিজ আর গুঁড়া দুধ মেশানো ৫০ টন আলুর পাউডার নিয়ে তখন মহাবিপাকে অক্সফাম। পরদিন সকালে জুলিয়ানের কাছে হাতে লেখা এক চিঠি আসে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন।

জুলিয়ান দেরি করেননি। তিনি অন্য এক তাজউদ্দীনকে সেদিন আবিষ্কার করেন তাঁর রান্নাঘরে। আমরা জানি, তাজউদ্দীন দীর্ঘ ৯ মাস রান্নাবান্না, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে সব কাজ নিজে করতেন। তিনি বললেন, এটা খাবার, তার ওপর প্রধানত শিশুদের খাবার, আমাকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এসব খাবার আগে আমি রান্না করে দেখব, টেস্ট করব, তারপর বিতরণের ব্যবস্থা হবে। রাতে সবজি রান্নার সময় এটা মেশাব আর কাল ডালে দিয়ে দেখব খেতে কেমন হয়। তাজউদ্দীন শুধু পরীক্ষা করেননি, রাত জেগে সেই আলু পাউডার কীভাবে শিশুদের জন্য খাবারে পরিণত করতে হবে, তার নির্দেশিকা তৈরি করেছিলেন সহজ বাংলায়।

এখানেই অন্যদের থেকে তাজউদ্দীনের তফাত। এই গল্প প্রথম শুনি ১৯৯১ সালে ত্রাণ তৎপরতা চালানোর সময় যখন অনেক কোম্পানি বাজার দখলের জন্য নানা ব্র্যান্ডের ‘শিশুখাদ্য’ নিয়ে ছোটাছুটি করছিল আর অনেকেই তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ফটোসেশনে সময় পার করছিল।

আমরা ভাবি, দুর্গত মানুষের খাবারদাবার, মশারি, বালিশ–কম্বল, থালাবাসন দিলেই চলবে। তরুণ ত্রাণকর্মী জুলিয়ান শুনলেন অন্য কথা তাজউদ্দীনের কাছে। তিনি বলেছিলেন, ‘শরণার্থীশিবিরে খাবার দিচ্ছেন ঠিক আছে। কিন্তু তাদের সব সময় মনমরা অবস্থায় দেখেন না! তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আমার মনে হয় শিবিরগুলোতে কিছু নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। আপনারা কি কিছু বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারেন?’

ত্রাণের তালিকায় চাল, ডাল, নুন, মশারি, ওষুধ থাকলেও তবলা, হারমোনিয়াম নেই। অক্সফামের মতো একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা গাছ থেকে পড়ল এসব শুনে।

তাজউদ্দীন জানিয়েছিলেন, ‘আমি বলছি বলে নই, আপনারা ত্রাণশিবিরে কর্মরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁরা সব বয়সের মানুষের মধ্যে ট্রমা লক্ষ করছেন। ট্রমায় থাকলে তারা দিন দিন আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। কোনো ওষুধ কাজে আসবে না।’ তাজউদ্দীনের মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল। কোনো বাজেট লাইন না থাকলেও জুলিয়ান রাজি হয়ে যান। কেনা হয় নানা বাদ্যযন্ত্র। বিতরণ করা হয় শিবিরে শিবিরে। গড়ে ওঠে শিল্পীদল।

কিন্তু হিসাব নিরীক্ষকদের কে মানাবে? তবলা, ঢোল, গিটার, হারমোনিয়াম কেনা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে। ওষুধ না কিনে গানবাজনার যন্ত্রপাতি কেনা ছিল তাদের কাছে গর্হিত অপরাধ। এবার শিবিরের চিকিৎসকেরা এগিয়ে আসেন। তাঁরা লিখিতভাবে জানান, এসব সামগ্রী ব্যবহারের পর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, কত গভীর চিন্তার চর্চা থাকলে একজন আগাপাছতলা রাজনীতিবিদ এমনভাবে ভাবতে পারেন। শেখাতে পারেন পেশাদার ত্রাণকর্মীদের।

দেশ শত্রুমুক্ত হলে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে জুলিয়ান ঢাকায় এসে তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করেন। তাজউদ্দীনের দপ্তরে তখন ত্রাণের দায়িত্বে থাকা কামারুজ্জামানের সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়। তাঁরা তাঁকে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কাছে। জুলিয়ানের কাছে সেটাও এক স্মরণীয় মুহূর্ত। সেটা অন্য গল্প। অন্য একদিন সে ঝাঁপি খোলা যাবে। তাজউদ্দীন জন্মশতবর্ষ যথাযথ মর্যাদায় উদ্‌যাপিত হোক।

গওহার নঈম ওয়ারা গবেষক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন গ্রন্থের প্রণেতা।
nayeem5508@gmail.com

যেখানে তাজউদ্দীনের কাছে শেখার আছে অনেক