Showing posts with label শাহদীন মালিক. Show all posts
Showing posts with label শাহদীন মালিক. Show all posts

Sunday, October 6, 2019

আমরা আইনহীন সমাজের দিকে যাচ্ছি: -ড. শাহদীন মালিক

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, আমরা ক্রমে একটি আইনহীন সমাজের দিকে এগোচ্ছি। যেখানে কোনো আইন নেই, আমাদের নিরাপত্তাবোধ থাকবে না, অন্যায়-অপরাধ হলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে না। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘জোরপূর্বক গুম বিষয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও জাতিসংঘের সুপারিশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শাহদীন মালিক বলেন, ক্যাসিনো ব্যবসা পুলিশের নাকের ডগায় হচ্ছে অথচ পুলিশ বলছে তারা জানে না! চারদিকে দুর্নীতি হচ্ছে।

এসব পচন শুরু হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম দিয়ে। এক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হচ্ছে এর আগে যেসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম হয়েছে তাদের থেকে আমরাও আমাদের ভবিষ্যতের চিত্র দেখতে পাই। সে সমাজ আমাদের কারো কাম্য নয়। তিনি বলেন, সমাজে অবশ্যই অপরাধ আছে, অনিয়ম আছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। তবে কোনো সমাজই আইনের বাইরে গিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।
অনেক দেশই মূর্খের মতো এটা ভেবেছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমাদের দেশেও একটা ভাবনা এসেছে যে, দু’চারশ মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেই মাদক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা মোটেও সম্ভব নয়। কারণ এর আগে কোনো দেশ এ পথে অপরাধ দমন করতে পারেনি। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আমরা টোটালি ল’ লেস সোসাইটির দিকে এগোচ্ছি। প্রতিফলন কি সেটা যারা সরকার চালাচ্ছে তারা দেখে কি-না জানি না, তবে আমি তো দেখি। যারা সরকার চালান তারা কি সব চোখ বুজে থাকেন এমন প্রশ্ন রেখে শাহদীন মালিক বলেন, যেসব দেশে আশির দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হয়েছিল সেসব দেশে কী হয়েছিলে সেগুলো তারা দেখেন না কেন? ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে জনগণ আমেরিকায় চলে আসা।

হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়ে এসব দেশ থেকে হাজার হাজার, লাখ লাখ লোক আমেরিকায় আসতে চাইছে, আর ট্রাম্প তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করছে। আশির দশকে এসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল এরই ফল হচ্ছে এগুলো। তিনি বলেন, এ লোকগুলো আমেরিকায় আসছে কেন? তাদের সবারই এক কথা অনেকটা আমাদের রোহিঙ্গাদের মতো। তাদের দেশে তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই, তারা সম্পূর্ণ অসহায়, সাংঘাতিক ধরণের অপরাধ হচ্ছে, তারপরও সরকার তাদের কোনো সাহায্য করে না। জানে বাঁচতে তারা আমেরিকায় যাচ্ছে। এ সমস্যাটা সত্তর দশকে চিলিতে দেখা দিয়েছিল। কোনো দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হয় এর পরিণতি যে কি হয়, তার বড় উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলো। তিনি বলেন, আশির দশকে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলোর লোকজনও বলেছিল, সেসব দেশের বিচারব্যবস্থা কিছু হয় না, কিছু ত্বরিত বিচার হলে তথা অপরাধীকে সরিয়ে দিলে অপরাধ দূর হয়ে যাবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে কোনো সমাজ এ পথে গিয়ে অপরাধ দূর করতে পারেনি। বরং সেক্ষেত্রে পুরো সমাজটাই অপরাধপ্রবণ হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, গুমের অপরাধের দায় সরকারের। বেশির ভাগ গুম যদি সরকার না করে থাকে তাহলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা র?্যাব-পুলিশের নাম বলে কেন? কেন গুমের ঘটনায় মামলা নেয়া হয় না? মামলা নিলেও গড়িমসি কেন, অগ্রগতি হয় না কেন? যাঁরা ফিরে আসেন তারা মুখে তালা দেন কেন? তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ভোটাধিকার, গণতন্ত্র অনেক কিছুই গুম হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত আলোচনা সব অরণ্যে রোদন। যাদের এসব ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা সেই সরকার কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারীপক্ষের আহ্বায়ক শিরিন হক।

Sunday, August 4, 2019

দেশে ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা নেই

দেশে ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি  বলেছেন, একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য যা যা দরকার তার সবই হচ্ছে। আমরা সবাই সোচ্চার না হলে এটাকে অকার্যকর রাষ্ট্র থেকে ফিরাতে পারব না। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির উদ্যোগে ‘নির্যাতন বিরোধী জাতিসংঘ সনদের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা: আমাদের বক্তব্য’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শাহদীন মালিক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও জবাবদিহি না থাকাই অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বড় লক্ষণ। একটি দেশ একদিনে তো অকার্যকর হয় না। এটার স্টেপ লাগে। বিচারহীনতা এর একটি।
দেশে জবাবদিহিতা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে নির্যাতন করছে। দীর্ঘ সময় আটক করে রাখছে এটা কোন ধরনের আইনের মধ্যে পড়ে আমাদের জানা নেই।
তিনি বলেন, দেশে গুম হচ্ছে, খুন হচ্ছে, এসব বিচারের পরিপন্থী। এগুলো ন্যূনতম আইনি পর্যায়ে পড়ে না। যারা এসব করে মনে করে নির্যাতন করে, খুন করে আটকে রেখে দেশের জন্য ভালো করছি, তারা মোটেও ভালো চিন্তা করছে না। তারা দেশের জন্য ভালো কোনো চিন্তা করছে না। দেশটা আরো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় দেশের অবস্থা নিঃসন্দেহে ভয়ানক।
জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটিতে দেয়া সরকারের প্রতিবদেনকে তিনি একটি অবাস্তব প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলেন, আইনমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, আমাদের দেশে আইনে সব লেখা আছে তবে আমরা সুরক্ষা পাচ্ছি না। দেশে কিছু হচ্ছে না, বিদেশে যদি কিছু হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, নির্যাতন বন্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই, প্রতিকারেরও কোনো উপায় নেই। তাই পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। আইনে না থাকলেও বাস্তবে গুম হচ্ছে। আবার নির্যাতন বন্ধে অনেক আইন আছে কিন্তু বাস্তবায়ন শূন্য। আলোকচিত্রি ড. শহীদুল আলমের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার উপর যে নির্যাতন হয়েছিল আদালতে তিনি নিজেই তা বলেছেন। আইনের আমরা কোনো সুরক্ষা পাচ্ছি না।
অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিবেদনে অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে শুধু আইনের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা যে বাস্তবায়ন হচ্ছে না তা বিশ্লেষণ করা হয়নি। তিনি বলেন, নির্যাতন বিরোধী কমিটির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের হেফাজতের নির্যাতন ও হত্যা, গুম, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, রিমান্ডে নির্যাতন, অঘোষিত আটক, বিচারকদের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা, নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়ে শতাধিক প্রশ্ন উপাস্থপন করলেও এসব প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান আইন, বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সংবিধান, ফৌজদারি আইন ও প্রতিকারের বিধান এসব তুলে ধরেন। আর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠির ওপর যে নির্যাতন হয় সে সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির ওপর কোনো ধরনের বৈষম্য করা হয় না এবং এই জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার বিষয়ে সরকার অপরাধীদের বিচার করছে।
সারা হোসেন বলেন, সরকারি প্রতিনিধিদল কমিটির বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সংবিধান ও বিদ্যমান আইনের আলোকে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং অমর্যাদাকর আচরণ প্রতিরোধে বিষয়ে উল্লেখ করলেও নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য সংগঠিত অপরাধের ব্যাপারে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ না নেয়ার এবং দু’একটা ঘটনা ছাড়া অপরাধীদের বিচারে সোপর্দ না করার বাস্তবতাকে আড়াল করতে সচেষ্ট ছিল। সুরক্ষা কমিটি মনে করছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরাট অংশ, ক্ষমতাসীনদের বহুলাংশ এবং স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহল আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে। অনেক প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না পাওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সমাপনী পর্যবেক্ষণেও উল্লেখ করা হয়েছে। জেনেভায় অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশে প্রতিনিধি দলে এত বেশি সদস্য কেনো গেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সারাহ হোসেন বলেন, জেনেভায় সরকারি প্রতিনিধি দলের ২৮ জন প্রতিনিধি ছিল। এরমধ্যে মন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনএসআই, ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা অংশগ্রহণ করছেন। তবে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণাল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো সদস্য ছিল না। কি কারণে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এত লম্বা ছিল তা আমরা জানি না। মানবাধিকার কর্মী শিরিন হকের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সমন্বয়কারী সাজ্জাদ হোসেন, মানবাধিকার কর্মী আইনজীবি রেজাউল করিম সিদ্দিকী, নুর খান লিটন প্রমুখ।

Thursday, May 2, 2019

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যারা ভালো চেয়েছিল তারাই ভোগান্তিতে : শাহদীন মালিক

গত জুলাই মাসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়, প্রথম আলো বলছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ৬০টি মামলা হয়। কিছু মামলা ভয়ংকর—মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা করা, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর আক্রমণ, পুলিশের সরকারি যানবাহনে ভাঙচুর, বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা ইত্যদি।
গুরুতর সব অপরাধের অভিযোগ। আন্দোলনকারী ২২ ছাত্রকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা জামিন পেয়ে যান। এখন মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্ত করার কাজটা পুলিশের। কোন ছাত্র মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছিল, কে থানায় আগুন লাগাবার চেষ্টা করেছিল, এবং একইভাবে অন্য অপরাধগুলোর সঙ্গে কে বা কারা কীভাবে জড়িত ছিল, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব পুলিশের। এখন প্রতি মাসে মামলাগুলো তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির জন্য আদালতে আসে; পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় যে তদন্ত এখনো চলছে এবং পরবর্তী মাসে আরেকটা ‘তারিখ’ পড়ে। অভিযুক্ত ছাত্রদের প্রতি তারিখে আদালতে হাজির হতে হয়; অন্যথায় জামিন বাতিলের আশঙ্কা থাকে। পুলিশ বলছে, ছাত্রদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ তারা খুঁজে পাচ্ছে না কিন্তু তদন্ত চলছে। যত দিন তদন্ত চলবে, মাসে মাসে মামলার তারিখ পড়বে, তত দিন ছাত্রদের আদালতে হাজির থাকতে হবে। তাঁদের জীবন থমকে গেছে এবং আরও কত মাস বা বছর যে থমকে থাকে, তা বলা অসম্ভব।
২. বহুদিন ধরেই বলছি, আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভিন্নমত দমনে ও সমালোচকদের টুঁটি চেপে ধরার প্রধান অস্ত্র এখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা। প্রায় সব সময় সব দেশেই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাটা রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক অস্ত্র। এই অস্ত্রটা রাষ্ট্র প্রায়শই ভালো কাজে ব্যবহার করে। অর্থাৎ, অপরাধীদের নিবৃত্ত রাখতে, কেউ অপরাধ করলে তাকে খুঁজে বের করতে, এবং তদন্ত করে অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে হাজির করে শাস্তি নির্ধারণে সহায়তা করতে অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। মাঝে ২-৪ বার এই ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ হয়ে যায়। নিরপরাধ ব্যক্তিও আটক হয়। সরকারের সমালোচকেরাই নিগ্রহের শিকার হয় কিন্তু এইসব থেকে যায় ব্যতিক্রম হিসেবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে এই ব্যতিক্রমটাই প্রধান রীতি হয়ে গেছে বহু বছর ধরে, যার শুরুর সময়টা, অধমের হিসাবে অক্টোবর ২০০২ থেকে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীরা অন্যের অনিষ্ট করতে চায়নি। তারা চেয়েছিল সমাজের অন্তত একটা দিন যাতে ভালো হয় সেই চেষ্টা করতে। সড়কে যাতে বেঘোরে প্রাণনাশ না হয়, সড়ক যাতে নিরাপদ থাকে, সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে অক্ষত অবস্থায় সন্ধ্যায় বা রাতে ঘরে ফেরা যায়, সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের এই দাবিদাওয়া ও আন্দোলনে কেউ কোনো অপরাধ খুঁজে পায়নি। কিন্তু যা কিছু ভালো, সেটাকে নষ্ট করাই আজকাল আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাজ। তাই যারা সমাজের ভালো চেয়েছিল, এখন তদন্তের নামে তাদের ভোগান্তি চরমে।
৩. রাষ্ট্রের ন্যূনতম কিছু ভালো গুণ থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা—বলা বাহুল্য, সাক্ষ্য প্রমাণ সাপেক্ষে—এই উপসংহারে উপনীত হতেন যে যাঁদের অভিযুক্ত করে মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল, ৮-১০ মাস খোঁজাখুঁজি করে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, এই ২২ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি। অতএব, তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করতে পারেন, যাতে এই ২২ জন ছাত্রকে মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু সে আশাটি হবে আকাশকুসুম। কারণ, সভ্য রাষ্ট্রে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, ন্যায়বিচারের রাষ্ট্রে নাগরিকদের হেনস্তা করা, ভোগান্তি নিশ্চিত করা, হয়রানি করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য ও কাজ না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এখন আর সভ্য, গণতান্ত্রিক, বিচার আর ন্যায়বিচারের দেশ না। অতএব, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের এই ২২ জন অভিযুক্ত তরুণ ছাত্র আরও বহুদিন রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকবেন। কারণ, অত্যাচার করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

Thursday, November 22, 2018

আমাদের নির্বাচনের দিনটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে -সাক্ষাৎকারে ড. শাহদীন মালিক by মরিয়ম চম্পা

এখন থেকে এক-দেড় মাস আগেও যদি আমার কাছে জানতে চাওয়া হতো নির্বাচন কেমন হবে? তখন সবার মতো আমিও উত্তর দিতাম খুব সম্ভবত একতরফা নির্বাচন হবে। এখন ওই জায়গা থেকে আমরা একটু এগিয়েছি। শেষ মুহূর্তে যদি কোনো অঘটন না ঘটে তাহলে একতরফা নির্বাচন হবে- এটা বলা যাবে না। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এক-দেড় মাস আগে যা মনে হতো তার তুলনায় নির্বাচন অনেক ভালো হবে।
মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। ধানমন্ডির চেম্বারে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনীতি, সামাজিক সংকটসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচনের দিনটি হচ্ছে ঈদের মতো। ঈদের দিনে আমরা চুরি করতে বের হই না। আনন্দ করতে বের হই। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে, ভালো খাওয়া খেতে বের হই।
কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় বহু বছর ধরে আমাদের নির্বাচনের দিনটি একটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন আমাদের লোকজন এটাকে ঈদের দিন না ভেবে কারচুপি বা কারসাজি করে জেতার মতো একটি খেলা মনে করে। এটা যতোদিন দেশের লোকজন ভাবতে থাকবে ততোদিন দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত আমাদের ভাবতে হবে নির্বাচনটা কারচুপি বা কারসাজির ব্যাপার না। এবং আমাদের নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্ত হতে হবে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন কতটুকু শক্ত হতে পারবে সে সম্পর্কে আমার এই মুহূর্তে প্রচুর সন্দেহ আছে। এ পর্যন্ত তাদের যে কাজকর্ম তা থেকে তাদের প্রতি খুব বেশি আস্থার জায়গা তৈরি হয় নি। অতএব এখন আমাদের উচিত সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া ‘নির্বাচনের দিনটি আমাদের ঈদের মতো পবিত্র ও আনন্দের দিন, এটা কারচুপি বা কারসাজি করার দিন না’। তারপরেও যেকোনো দেশে যেকোনো নির্বাচনে শতকরা ২ থেকে ৫ ভাগ লোক বেআইনি কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ওই জায়গায় পক্ষপাতিত্ব না করে শক্ত হতে হবে। তরুণ ভোটারদের বলবো, কি হবে না হবে কিংবা ভালো-মন্দ না ভেবে আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিন।
পল্টনের ঘটনায় ইসির ভূমিকা বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো গণতন্ত্রের নির্বাচন বলতে যা বোঝায় সেটা থেকে আমরা অনেক পেছনে রয়েছি। আমাদের নির্বাচনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এখন জাতিগতভাবে আমরা যদি মনে করি নির্বাচনে জিততে হলে বা ভালো করতে হলে আমাদের ২ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। অথবা যারা কর্মী আছে তারাও বলে থাকেন আমাদের নেতার কত প্রভাব, কত ভালো ও কত বড় কাজ করবে- সেটা দেখাতে হলে ২ থেকে ৩ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে নামতে হবে। নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কিছু অদ্ভুত ধারণা আছে।
এই অদ্ভুত ধারণাগুলো যতোদিন থাকবে ততোদিন আমি বলবো যে বেচারা নির্বাচন কমিশন কিন্তু ব্যাক সিটেই থাকবে। এখন খুব পাক্কা জগতে নির্বাচন কমিশনও নেই। ইউরোপ- আমেরিকার মতো দেশগুলোতে এরকম শক্তির মহড়া, ভোট জালিয়াতি, ব্যালট চুরি এগুলো ওদের নির্বাচনের অংশ হিসেবে বহু দশক ধরেই চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নির্বাচন কমিশনের জন্য কাজটা সবসময়ই কঠিন। কঠিন এই কাজটি আরো ভালো করা যেতো যদি তারা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ব্যাপারে বৈষম্য না দেখাতো বা না দেখালেই ভালো হতো। সবাই সুযোগ পেলেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। যেকোনো ভাবে। এটা মাইক ব্যবহারে হোক, রঙিন পোস্টার, ভয়ভীতি দেখানোসহ বিভিন্নভাবে। সারা দেশের সবাই যদি এটাতে মেতে যায় তাহলে নির্বাচন কমিশন কী করবে? তবে হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশনকে সব জায়গায় খুঁটিনাটি না দেখে কিছু দৃশ্যমান দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সেটা হলেই হয়তো অনেক জিনিসের সমাধান চলে আসবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ডাণ্ডাপেটা করে নির্বাচন করতে পারবে না। এটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়। তার কথা লোকে শুনবে, তার প্রতি আস্থাশীল থাকবে, তার কথা মেনে নেবে- এরজন্য নৈতিক উচ্চাবস্থানে তাদের থাকার কথা ছিল। গত ১৮ থেকে ২০ মাসে অনেকগুলো নির্বাচন হয়েছে। এইসব নির্বাচনের ফলে তাদের (ইসি) প্রতি খুব বেশি আস্থা তৈরি হয় নি। আস্থার অনেক ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বাড়ে। কিন্তু শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের কথা লোকে বিশ্বাস না করলে ডাণ্ডা পেটা করে বিশ্বাস করাবো- এমন ভাবলে সে নির্বাচন করা যাবে না। তাদের প্রতি যে আস্থার ঘাটতি হয়েছে এই মুহূর্তে আমি মনে করি তাদের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা একটি বড় অন্তরায়।
তফসিল ঘোষণার পর কি পরিবর্তন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রখ্যাত এই আইনজীবী বলেন, পরিবর্তন তো হয়েছে। সব দলই বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্টসহ সবাই বলছে এখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বেশ কয়েকটি জোটের ছোট ছোট শরিক দলগুলো বলেছে জোটগতভাবে তারা ধানের শীষ বা প্রধান দলের মার্কা দিয়ে নির্বাচন করবে। এগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক দিক।
পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এখানে আমার মনে হয় দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত বিএনপির একটু দোদুল্যমানতা ছিল। কিছুটা সাংগঠনিক দুর্বলতাও ছিল। এবং তারা এককভাবে তাদের ২০দলীয় জোট নিয়ে ভালো নির্বাচন করতে পারবে কি-না এটা নিয়ে আমার মনে হয় বিএনপির মধ্যে কিছু আশঙ্কা ছিল। এখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট হওয়াতে এখানে আ.স.ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের নিয়ে একটি জোট গঠন হয়েছে। তারা একসঙ্গে আসাতে একটি বিরোধী বড় মোর্চা হিসেবে শক্তি তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালো নির্বাচন পাওয়ার প্রত্যাশাটা বেড়েছে। ড. কামাল হোসেন গত ৫০ বছর ধরেই সামনে আছেন। এবং রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টে আসার পরে তার বিরুদ্ধে বেশকিছু অহেতুক কুৎসা রটনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি মনে করি আমাদের রাজনীতিতে একজন নীতিবান লোক হিসেবে তার অবস্থান সবার উপরে। যেকোনো মানুষের দুর্বলতা থাকে, গাফিলতি থাকে। কারণ আমরা মানুষ, আমাদের কেউ ফেরেশতা না।
এই হিসেবে ড. কামালের নিশ্চয়ই কিছু দুর্বলতা আছে। নিশ্চয়ই তাকে সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু সবকিছু আমলে নিয়ে এটা বলা যাবে যে, নীতি- নৈতিকতার বিচারে তার স্থান এখন অনেক উপরে। এখানে লক্ষণীয় দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে সবাই মিলে জোট গঠন, অন্যটি ড. কামাল হোসেনের ওপর সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা- এই দুটি মিলিয়ে আমার মনে হয় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। আগে যেটা একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছিল। এখন ঐক্যফ্রন্ট আসাতে ড. কামালসহ অন্যরা আসাতে একতরফা নির্বাচনের আশঙ্কাটা অনেক কমে গেছে।
সংসদ ভাঙতে সংবিধান বাধা তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, সংবিধানে কোনো বাধা নেই। এখন সংবিধান যদি কেউ না পড়ে বা না বোঝার চেষ্টা করে সেটা অন্য কথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে ধরেই নেয়া হয় যে, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া হবে। সংবিধানে আমাদের দুটি পন্থাই বলে দেয়া হয়েছে। সংসদ ভেঙে না দিয়ে আমাদের দেশে বা সারা দুনিয়ার প্রথা বা চর্চার দৃষ্টিতে সেটা একটি ব্যতিক্রম। কখনো এটা দরকার হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যদি দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিরাট বন্যা, সাইক্লোন দেখা দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে তখন হয়তো সংসদ রেখে নির্বাচন করতে হবে। অন্যদিকে কেউ নিশ্চয় দ্বিমত করবে না যে, সংসদ রেখে নির্বাচন করলে যে দলের সংসদ সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আছেন তারা তো নিঃসন্দেহে সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনেক আচরণবিধির কথা বলা হয়। কিন্তু আপনাকে ২ হাত বেঁধে আর আমার ২ হাত খোলা রেখে যদি পুকুরে নামিয়ে দেয়া হয় সাঁতার প্রতিযোগিতায়। তখন তো আপনি ডুবে যাবেন। তখন যদি বলা হয় আপনারা তো একই পুকুরে সাঁতরাচ্ছেন। আপনি হাত বাঁধা অবস্থায় সাঁতরাতে পারছেন না কেন? এটা তো অবাস্তব কথা। সংসদ বহাল রেখে তাদের আচরণবিধি স্তিমিত করা মনে হয় অবাস্তব।
গত ৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, দুনিয়ার বহু দেশ আমাদের মতো এই অসুস্থ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গেছে। কোনো দেশে নির্বাচন একদিনেই সুষ্ঠু হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের সময়টা খুব বেশি লেগে যাচ্ছে। এখন মনে হয় আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত তারা যদি মনে করেন যে নির্বাচনটা হলো টাকার খেলা, শক্তি প্রদর্শন বা মহড়া প্রদর্শন, প্রভাব খাটানোর খেলা ততোদিন কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে আমরা যেতে পারবো না। তবে ১টি বিষয় করা যেতে পারে। আনুপাতিক হারে নির্বাচন। যেটা শ্রীলঙ্কা ও নেপালে আছে। সারা দেশের সব লোক ভোট দেবেন। তারপরে প্রাপ্য ভোটের হার অনুযায়ী তখন আসন বণ্টন হবে। যে যতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে সে ততো বেশি আসন পাবে। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ কম হবে সে ততো কম আসন পাবে। তখন এই আসনভিত্তিক নির্বাচনটা চলে যাবে। নির্বাচনে অনিয়মগুলোও কমবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তখন একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু ২০০৮ বা তার আগের নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছে। আমি আশা করবো আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা যে দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন এই চিন্তাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এখনো আসেনি। তাদের চিন্তা হলো দেশ গড়া বা দেশের উন্নয়ন করা। মানে ভালো রাস্তা গড়া, ভালো ব্রিজ করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎ এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক  পেছনে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এগুলোই হলো তাদের অগ্রাধিকার। একটি দেশ তখনই উন্নত হয় যখন তারা বুঝতে পারে যে এগুলোর (ফিজিক্যাল উন্নয়ন) সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা এটা কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ না বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নেতারা যখন বুঝতে শুরু করবে যে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী করা অন্তত সমান গুরুত্বপূর্ণ। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে।
সিভিল সোসাইটির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি মনে করি সিভিল সোসাইটির ভূমিকা গৌণ হচ্ছে না। সিভিল সোসাইটির কাজ দেশ চালানো বা রাজনীতি করা না। দেশে যে কাজগুলো হচ্ছে তার দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দেয়া বা তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাদের ভূমিকা কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ একটি বুদ্ধিভিত্তিক অবস্থান। তাদের ভূমিকা আপ’স অ্যান্ড ডাউন হতে পারে কিন্তু খুব বেশি কমে গেছে বলে আমি মনে করি না। আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল।

Monday, February 12, 2018

আখেরে খালেদা লাভবান হবেন

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। গতকাল ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই রায়ের কারণে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়তে পারে। মামলাকে ঘিরে রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের আইনগত দিক সম্পর্কে ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইনগত দিক এটা যেভাবেই হোক বিচারিক আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। এখন তার বিরুদ্ধে আপিল হবে এবং আপিল দায়ের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেটা ধারণা করছি বেগম খালেদা জিয়া জামিনে মুক্ত হতে পারবেন। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে আরো বেশ কয়েকটা মামলা চলমান আছে। ওইসব মামলায়ও তার বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
রাজনৈতিকভাবে একটা সাধারণ কথা প্রচলিত আছে ঐতিহাসিকভাবে যখন আমাদের নেতারা জেলে গেছেন তখন জনগণের তার প্রতি সমবেদনা বাড়ে এবং যে মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছেন এখন সেই মামলার ব্যাপারে আমার ধারণা জনগণের সন্দেহ আছে বিচারপ্রক্রিয়া কতটা সঠিক হয়েছে অথবা সঠিক হলেও জনমনে মনে হচ্ছে এটা রাজনৈতিক চাপে। এসব কারণে দণ্ডিত নেতাদের প্রতি আমাদের সমবেদনা বাড়ার ইতিহাস আছে। আমার ধারণা যতদূর মনে হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে বেগম খালেদা জিয়াই এ মামলা থেকে লাভবান হবেন- এই অর্থে যে, তার প্রতি সমর্থন হয়তো বা বাড়বে। এই রায়ের কারণে উনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কিনা-এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, এটা আমার মনে হয় নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তে আদালতের রায়ে এটা সিদ্ধান্ত হতে হবে। সাজাপ্রাপ্ত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি পারবেন না- এ ব্যাপারে আমাদের বিপরীতধর্মী সিদ্ধান্ত আছে। এটাও ধরে নিচ্ছি যে, উনি মনোনয়নপত্র দাখিল করলে নির্বাচন কমিশন সেটা প্রত্যাখ্যান করবে এবং তার বিরুদ্ধে উনি আদালতে যাবেন এবং আদালতের সিদ্ধান্তেই এটা দেখা যাবে উনি নির্বাচন করতে পারবেন কি পারবেন না। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর দুই/তিন সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন হয়ে উচ্চ আদালতেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।

Monday, February 29, 2016

ফোর ইন ওয়ান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ by শাহদীন মালিক

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকের ঘটনা। খোঁজাখুঁজি করলে প্রথম আলোসহ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সঠিক দিন, হেডলাইনের ভাষা ইত্যাদি পাওয়া যাবে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বৃত্তান্ত এখানে ততটা গুরুত্বপূর্ণ না, মূল কথাটাই মুখ্য।
কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহ নামের এক শিশু অপহৃত হয়েছিল। অপহরণকারীরা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। লাখ দুয়েক টাকা (যত দূর মনে পড়ে) মুক্তিপণ দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ ফিরে আসেনি। দিন পাঁচেক পর তার গলিতপ্রায় লাশ পাওয়া গিয়েছিল। মুক্তিপণ আদায় ও ঘটনাবলির অন্যান্য পরম্পরার সূত্র ধরে দুই আসামি গ্রেপ্তার হলো। মূল আসামি হিসেবে শনাক্ত হলো জনৈক মোতাহার। র্যা ব গ্রেপ্তার করল মোতাহারকে। ‘ক্রসফায়ারে দিল’। মোতাহার নিহত হলো।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে নিহত আবদুল্লাহর বাবা-মায়ের বক্তব্য শুনলাম। তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁদের ছেলের হত্যার সঠিক বিচার হয়েছে। খুনির শাস্তি (ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া) হয়েছে। টেলিভিশন আরও দেখাল—এলাকাবাসীও ভীষণ সন্তুষ্ট। এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে।
র্যা ব তার সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। দু-চারজনের মনে না-ও থাকতে পারে, তাই পুরোনো খবরের পুনরাবৃত্তি করছি। ২০০৪ সালের দিকে, যত দূর মনে পড়ে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। আজকাল কালেভদ্রে পত্রপত্রিকায় তাঁর ছবি দেখা যায় (হাতকড়া পরানো, প্রিজন ভ্যান থেকে হয় নামছেন বা উঠছেন) আর সম্ভবত তারেক রহমানের ছবি দেখা বা কথা শোনা যায় না, কারণ হাইকোর্ট পলাতক আসামির খবর প্রকাশ/প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। অনেকটা তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় সৃষ্ট র্যা ব তখন যা করত, আজও প্রায় তা-ই করছে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ চলছেই। ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে মোতাহারের পর শিশু হত্যাসংক্রান্ত ২৬ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার খবরের শিরোনাম: ‘বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন নিহত...’। অবশ্য শিরোনামে আরও ছিল ‘...বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা’।
হবিগঞ্জের বাহুবলের চার শিশু হত্যার মূল সন্দেহভাজন আসামি বাচ্চু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২৫ তারিখে, অর্থাৎ আগের দিন। সেই খবর। বিচার তো হয়েই গেল, আবার শঙ্কা-টঙ্কা কী?

দশক চারেক আগে, কিছু কমও হতে পারে, ‘টু ইন ওয়ান’ প্রথম বাজারে এসেছিল। টেপ বা ক্যাসেট প্লেয়ার, আর সঙ্গে রেডিও। তাই টু ইন ওয়ান। তারপর থ্রি ইন ওয়ান। অর্থাৎ ক্যাসেট আর সিডি প্লেয়ার, আর সেই সঙ্গে রেডিও। এখন যুগ ‘ফোর ইন ওয়ান’-এর।

বিচার-আচার দেশ থেকে উঠে গেছে—এটা তো বলা যাবে না। তবে ‘রূপ’ নিশ্চয়ই পাল্টেছে। আমরা সবাই একেবারে গোড়ার কথায় গিয়ে ঠেকেছি। এবং সেটা খোদ প্রধান বিচারপতির কথার জের ধরে। বিচারপতিরা রায় কখন লিখবেন, মামলার শুনানির পর? নিয়ম মেনে সময়মতো রায় যে লেখা হয় না, তা তো না। রায় লেখা হতো, হচ্ছে। প্রশ্নটা এখন সময় নিয়ে। তবে অন্য কিছু প্রশ্নও উঠে এসেছে কারণ, খোদ প্রধান বিচারপতিই তো কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ কে খান আইন অনুষদ ভবন’ উদ্বোধন করার বক্তৃতায় বলেছিলেন যে টেলিফোনে নির্দেশনা পেয়ে রায় আর লেখা হয় না।
শুনানি শেষের পরে যদি রায় লেখা হয় তবে, প্রশ্ন হলো কত পরে? এক বছর, দুই বছর, তিন বছর? অবসর হয়ে যাওয়ার পর কত বছর তক? রায় লেখা অবশ্য অতি দুরূহ ব্যাপার। বিশেষ করে উচ্চ আদালতের। এখানে সিদ্ধান্ত বা ‘ডিসিশন’-এর সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যার প্রশ্নও জড়িত।
আগে হাইকোর্টের নিয়ম ছিল পুরো রায়টা—অর্থাৎ এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে বাদীর আইনজীবী তাঁর পক্ষে এই এই তথ্য ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। পক্ষান্তরে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী বাদীর বক্তব্য এই এইভাবে খণ্ডন করেন। নিজের পক্ষে এই সেই তথ্য, যুক্তি প্রদান করেছেন। রায়ে এসব কথা বলে রায় প্রদানকারী বিচারপতি উভয় পক্ষের তথ্য ও আইনি যুক্তির মূল্যায়ন করে আস্তে আস্তে কোন পক্ষের আইনগত অবস্থা সঠিক, সেদিকে এগিয়ে যেতেন। দুই-তিন-চার ঘণ্টা ধরে বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মৌখিক বক্তব্যের পর একেবারে শেষে গিয়ে বলেন, মামলাভেদে—রুল ইজ মেড অ্যাবসলিউট। অর্থাৎ বাদী জিতেছে। অথবা বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ‘রুল ইজ ডিসচার্জড’।
মাননীয় বিচারপতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনে আমরা বুঝতে পারতাম, রায়টা কেন আমার মক্কেলের পক্ষে/বিপক্ষে গেল। মাননীয় বিচারপতির ডিকটেশনটা বেঞ্চ অফিসার শর্টহ্যান্ডে লিপিবদ্ধ করেন। পরে টাইপ করে বিচারপতিদের দেন। তাঁরা পড়ে, কারেকশন করে চূড়ান্ত করেন এবং অবশেষে তিন/চার মাস পর আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাই। গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলো বিভিন্ন ল রিপোর্টে ছাপা হয়।
তবে আজকাল কোনো কোনো বিচারপতি কিছু কিছু মামলায় এক লাইনে শেষের কথা—অর্থাৎ ‘আপিল অ্যালাউড’ (আপিলকারী জিতেছে) বা ‘রুল ডিসচার্জড’ বলে শেষ করে দেন। ফলে পুরো রায়টা দু-তিন বছরেও পাওয়া যায় না। বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তির অন্ত থাকে না।
‘স্যার, রায় কখন পাব’ প্রশ্নের জ্বালায় মক্কেলের ফোন ধরি না।
তাই হয়তো প্রধান বিচারপতি রায় কত দিনে লিখবেন, প্রশ্নটা সামনে নিয়ে এসেছেন। তবে কোনো সুরাহা আজতক হয়েছে বলে শুনিনি। আমরা সমস্যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে পারদর্শী। কিন্তু সমাধান খুঁজে পাই না।
কোনো কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য যে আয়োজন-সরঞ্জাম-কর্মকর্তা ইত্যাদি প্রয়োজন, তার প্রায় কিছুই আমাদের আদালত ব্যবস্থায় নেই। এসবের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে না। ফলে অবস্থার পরিবর্তনের আশা খুবই অল্প। কিন্তু আদালতে যন্ত্রপাতি (কম্পিউটার ইত্যাদি) সাজ-সরঞ্জাম, দক্ষ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যাবশ্যক। সংস্কার যত দেরিতে হবে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি তত বাড়বে আর বিচারব্যবস্থার ওপর কমবে আস্থা।

সমস্যা আরও আছে, আজকাল আইন-মামলা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ধারণাগুলো হয়ে উঠছে অত্যন্ত গোলমেলে।
পুরোনো এবং অনেকেরই জানা চুটকি। মক্কেল গেছে ভালো উকিলের কাছে। উকিল সাহেব মক্কেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, কাগজপত্র দেখে বলে দিলেন যে তার মামলা চলবে না।
মক্কেল উত্তেজিত—আপনি না বড় উকিল, মামলা চালাতে পারবেন না, এটা কী কথা? ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কেল চলে গেল, পরদিন অন্য উকিল তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে মামলা দায়ের করে দিল। মামলা চলল বছর পাঁচেক। মক্কেলের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ গেল উকিলের পেছনে, উকিলের সেরেস্তায়। শেষ পর্যন্ত মামলা খারিজ। এ জন্যই প্রথম উকিল মামলা ফেরত দিয়েছিল। কিন্তু মামলা ঠিকই চলেছিল পাঁচ বছর।
মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা চলা শুরু হয়েছে। মামলা সংখ্যা ৭৮–এ পৌঁছেছে বলে জেনেছি। অনেককে বলতে শুনেছি, এগুলো তো দেওয়ানি মামলা। ক্ষতিপূরণ চেয়েছে সে, যে মামলা করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ।
জানলাম প্রথম যে ফৌজদারি কোর্টে আজকাল দেওয়ানি মামলা চলছে ডজন ডজন, সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে। দেওয়ানি মামলায় অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট হচ্ছে। আর এতকাল জানতাম, আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করতে হলে ‘কোর্ট’ ফি দিতে হয়। কোটি টাকা বা তার বেশি ক্ষতিপূরণ চাইতে হলে আদালতে ‘ফি’ দিতে হয় হাজার পঞ্চাশেক টাকা।
পুলকিত হয়ে দেখছি ‘কোর্ট’ ফি ছাড়াই মামলা চলছে।
যে ‘ডিফেমড’ অর্থাৎ যার মানহানি হয়েছে, মানহানির মামলা করবে সে স্বয়ং, আইনে এর তিনটি ব্যতিক্রম দেওয়া আছে। যার মানহানি করা হয়েছে সেই ব্যক্তি যদি মৃত হয়, অথবা উন্মাদ হয় অথবা ‘পর্দানশিন’ মহিলা হয়, তা হলে তার পক্ষে অন্য ব্যক্তি মানহানির ফৌজদারি মামলা করতে পারবে। অন্যথায় মামলা চলবে না। অথচ মামলা চলছে। সেই দ্বিতীয় উকিলের মতো—মামলা চলবে না মানে! চালালেই চলবে।
আরেক নীতিনির্ধারক বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে বিধান করা হয়েছে। সেহেতু এক-এগারোর ক্ষমতা দখলকারীদের বিরুদ্ধে পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী অবৈধ/অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের মামলা করা হবে। ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭-এ। পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছিল ২০১১-তে। ঘটনার পর আইন পরিবর্তন করে নতুন আইনের অধীনে পুরোনো ঘটনার বিচার করা যায় না। এ ব্যাপারে ২০০৯-এর বিডিআর বিদ্রোহের পর খোদ রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আপিল বিভাগ উত্তর দিয়েছিলেন, না, ঘটনার পর আইন পরিবর্তন করে আগের ঘটনার বিচার করা যাবে না। সংবিধানের ৩৫ (১) অনুচ্ছেদেও এ কথাই বলা আছে।
তাতে কী। এ দেশে এখন মামলা চালাতে চাইলেই চলে।

এখন ফোর ইন ওয়ানের যুগ। অভিযোগ গ্রহণ করে র্যা ব। তদন্ত করে র্যা ব। দোষ-নির্দোষ সিদ্ধান্ত নেয় র্যা ব। শাস্তি কার্যকর করে র্যা ব। ফোর ইন ওয়ান। যেসব ব্যাপার বা ঘটনায় র্যা বের কোনো ইন্টারেস্ট নেই, সেসব ঘটনায় আমরা আদালতে মামলা চালাই।
এই অধম নিশ্চিত, ২০৪১ সাল পর্যন্ত এ দেশের জনগণকে অপেক্ষা করতে হবে না। তার অনেক আগেই আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে যোগ দেব। তবে আইনের শাসন বাদ দিয়ে। চলবে র্যা বের শাসন, পুলিশের শাসন, রিমান্ডের শাসন এবং আরও নতুন নতুন শাসন। জাদুঘরে ঢুকবে আইনের শাসন।
ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

Saturday, December 19, 2015

আমি প্রেসিডেন্ট ওবামা বলছি... by শাহদীন মালিক

প্রিয় দেশবাসী, আপনাদের সামনে আমি আজ দাঁড়িয়েছি ভগ্নহৃদয়ে, তবে একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চিত্তে।
আপনারা সবাই জেনেছেন, দেখেছেন, শুনেছেন কীভাবে সান বার্নাডিনোতে দুজন আততায়ী নির্বিচারে গুলি করে ১৪ জন নিরীহ নাগরিককে হত্যা করেছে, আহত করেছে আরও ৩০ জনকে। এসব হতাহতের ঘটনায় আমি আপনাদের মতোই ব্যথিত, ভগ্নহৃদয়। নিহত-আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রতি রইল আমার আর আমাদের সমবেদনা ও প্রার্থনা।
এই পাশবিকতা, এই নির্মমতা, এই বর্বরতাকে রুখতে হবে। আপনাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশবাসীর কাছে এটাই আমার প্রতিজ্ঞা। এসব আক্রমণের মুখে প্রিয় দেশবাসীর জান ও মালের নিরাপত্তার জন্য আমার সরকার কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা আপনাদের অবগত করার আগে অন্য কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই, যাতে আপনারা আমাদের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর যথার্থতা সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
প্রিয় দেশবাসী, আপনারা জানেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এখনকার ব্রিটিশ সরকার অনেক ইস্যুতে আমাদের পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে এই ব্রিটিশদেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যোদ্ধার বীর রক্তে বোস্টন, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটনসহ বহু শহরের মাটি লালে লাল হয়েছিল।
আমাদের ভুললে চলবে না যে আমাদের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে চার-চারটি বছর যুদ্ধ করতে হয়েছিল কনফেডারেশনের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন। কিন্তু তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল আততায়ীর গুলিতে। আমার মতো যে অশ্বেতাঙ্গদের তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, সেই অশ্বেতাঙ্গদের উত্তরসূরি হিসেবে আমি এবং আমরা মহান আব্রাহাম লিংকনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার, নিপীড়ন আজও বন্ধ হয়নি। আমেরিকার বহু শহরে এখনো শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অশ্বেতাঙ্গ নিরপরাধ যুবকদের গুলি করে মারে। আব্রাহাম লিংকনের অবদান আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে, যাতে স্বার্থান্বেষী মহল তরুণ প্রজন্মকে ভুল না বোঝায়, খারাপ পথে প্ররোচিত না করতে পারে।
প্রিয় দেশবাসী! আপনারা জানেন, গণতন্ত্র ও ধনতন্ত্র রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর থেকে আমেরিকান সৈন্য ও সেনাপতিরা বিশ্বের বহু দেশে সংগ্রামে-যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। ফিদেল কাস্ত্রোকে না পারলেও ইরানের মোসাদ্দেক, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির আইয়েন্দে, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণসহ বহু শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রনায়ককে অকালে ইহধাম ত্যাগ করতে আমাদের সিআইএ সাহায্য করেছে। গত শতাব্দীর ভিয়েতনাম ইত্যাদির কথা বলে আমার বক্তৃতা দীর্ঘায়িত করব না, তবে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আফগানিস্তান, ইরাক আর এখন সিরিয়ায় আমাদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের শত্রু অনেক। আমরা শুধু এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বলতে গেলে সারা দুনিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র আর উন্নয়নের জন্য কাজ করি, সাহায্য-সহযোগিতা করি, প্রয়োজনে যুদ্ধও করি। কিন্তু সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের শত্রুরা আমাদের সাফল্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রিয় দেশবাসী! আমাদের চতুর্দিকে ইতিহাস বিকৃতি ঘটছে। আমাদের, বিশেষত আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। আমরা সঠিক ইতিহাসের দিকে নজর দিইনি বলেই আজ সান বার্নাডিনোর মতো ঘটনা এ দেশে ঘটছে।
আমাকে দুঃখের সঙ্গে এ পর্যায়ে দুটি কথা বলতে হবে। প্রথমত, এই ২০১৫ সালে এ পর্যন্ত আমেরিকায় নির্বিচার গুলিবর্ষণে ৪৫০ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান পলিটিশিয়ানরা সান বার্নাডিনোর ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘পলিটিকস’ শুরু করে দিয়েছেন। রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর অন্তত তিনজন এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন আর আমার সমালোচনা করেছেন এটাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্বীকার বা স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে চাই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কখনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠী ছিল না, বর্তমানেও নেই এবং আমি যত দিন আপনাদের প্রেসিডেন্ট আছি, তত দিন এ দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের কোনো ঠিকানা হবে না।
রিপাবলিকানরা আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির কথা জেনেই আজ জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মহা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আমাদের সরকারের তথা ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়েই তারা এই খেলায় নেমেছে। বিশ্বদরবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তারা ক্ষুণ্ন করতে চাইছে। সারা বিশ্ব জানে, আমরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছি, এমন প্রেক্ষাপটে খোদ আমাদের দেশেই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী আক্রমণের কথা বলে রিপাবলিকানরা আমাদের, তথা সব আমেরিকানের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। আমার ধারণা, এই ষড়যন্ত্রে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কিছু অন্ধভক্ত ইন্ধন জোগাচ্ছে। রাজতন্ত্রের এই ভক্তদের আমরা দেখেছি প্রিন্স উইলিয়াম আর কেট এবং নবজাতক শিশুদের নিয়ে মাতামাতি করতে। লিফলেট বিলি করতে। সম্ভবত তাদের ইন্ধন জোগাচ্ছে আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী কানাডিয়ানরা। কারণ, রানি এলিজাবেথ তো কানাডারও রানি।
এ দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে কী থেকে কী হয় তা বোঝা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত, আমাদের ভাবমূর্তি যাবে, নেতৃত্বও যাবে। সান বার্নাডিনোসহ সব বন্দুকধারী দেশকে অশান্ত করতে চাইছে। দেশবাসী, আপনারা সবাই জানেন যে আমাদের দেশের আয়তন বিশাল। আর আমরা ৩০ কোটি। তা সত্ত্বেও এসব হত্যাকাণ্ড এই বিশাল দেশটাকে অস্থিতিশীল করার এক ষড়যন্ত্র। কিন্তু এ দেশকে আমরা অস্থিতিশীল করতে দিতে পারি না। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হোক, এটাও কেউ বরদাস্ত করবে না। কিন্তু নিরীহ, নিরপরাধ নাগরিকদের হতাহত হওয়া রোধ করা আমার ও আমার সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
চরমপন্থী, বন্দুকধারীরা আজকাল অনেক বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আধুনিক ও মারাত্মক। তারা লেটেস্ট টেকনোলজিতে পারদর্শী। তাদের সমর্থক ও সহায়ক গোষ্ঠী শুধু রিপাবলিকান পার্টিতেই সীমাবদ্ধ না। শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী দল, উগ্র ইহুদিবাদের অন্ধ সমর্থক, লিংকন-কেনেডির হত্যাকারীদের উত্তরসূরিসহ বহু দল, গোষ্ঠী ও গ্রুপ এ দেশে ভীষণভাবে সক্রিয়।
দেশের এই সন্ধিক্ষণে তাই আমি আপনাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিম্নে বর্ণিত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি:
আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কাউকে বন্দুক হাতে দেখলে বা শরীরে অথবা পকেটে বন্দুক লুকায়িত আছে সন্দেহ করলে তাৎক্ষণিকভাবে সে ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করতে পারবে। নিহত ব্যক্তি ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে’ বলে আখ্যায়িত হবে।
রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীরা যেহেতু স্পষ্টতই দেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে, ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে, দেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে এই ২০১৫ সালে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের যত ঘটনা ঘটছে, তাতে তারা উসকানি দিয়েছে। নির্বিচারে গুলিতে হতাহতের মামলাগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছি। বলা বাহুল্য, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী মামলা দায়ের করবে। বিচার বিভাগও যাতে আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী রায় প্রদান করে আমরা তার জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করব।
প্রিয় দেশবাসী! নাইন-ইলেভেনের পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সে সময়ে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিইনি। তারই ফলে বছরের পর বছর শত-সহস্র আমেরিকান বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে, সান বার্নাডিনোসহ বিভিন্ন জায়গায়।
আমার ভাষণের শুরুতেই বলেছিলাম, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রিয় দেশবাসী! আমেরিকানদের প্রাণ বাঁচাতে:
প্রথমত, আমি ইন্টারনেট অবৈধ ঘোষণা করছি, নিষিদ্ধ করছি। ডাক বিভাগ আগামী এক মাস বন্ধ থাকবে। আন্তনগর বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে বাস আর ট্রেন চালু থাকবে।
সঠিক ঘটনা, ইতিহাস ও তথ্য প্রচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারি টিভি চালু হবে। বেসরকারি টিভি আজ থেকে সংবাদ প্রচার করবে না। টক শো অবিলম্বে নিষিদ্ধ এবং রিপাবলিকান পার্টির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না।
ড. শাহদীন মালিক: অাইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশনের সাবেক আইনজীবী।

Wednesday, October 14, 2015

নিখোঁজ সাংসদ, এলোপাতাড়ি মন্ত্রিকুল by শাহদীন মালিক

প্রায়ই মাননীয় মন্ত্রিকুলের বক্তব্যে আমরা যেকোনো ইস্যুর ভিন্ন ভিন্ন দিকের ব্যাপারে আলোকিত হয়ে হরহামেশা পুলকিত হই। নিকট অতীেত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল টক শোগুলোতে কোনো একটা বিষয়ে বা ইস্যুতে আলোচনা করার জন্য টক শো ভেদে দু-তিন-চারজনকে ডাকত। অংশগ্রহণকারীরা কেউ সাংবাদিক, কেউ বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এনজিও কর্মকর্তা ইত্যাদি। এই হরেক গোছের অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত তুলে ধরতেন। আইনজীবীরাও সুযোগ পেতেন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও মাঝেমধ্যে সামরিক কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—সবাই থাকতেন ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলের বিভিন্ন টক শোতে। মতবিরোধ হতো, বাহাস হতো, দু-চারবার গালমন্দও যে হয়নি তা-ও নয়। সব হয়েছে। ধারণা হয়, টক শোগুলো বেশ ‘পপুলার’ হয়ে উঠেছিল।
টক শোতে অংশগ্রহণকারীর ভিন্ন ভিন্ন মতামতের প্রভাব—ধারণা হয়—মন্ত্রিকুলের ওপর আছর করেছে। টক শোর অংশগ্রহণকারীরা যেহেতু একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিতেন, তর্ক-বিতর্ক-বাহাস করতেন এবং মতানৈক্যের কারণেই তাঁদের পপুলারিটি—এই চিন্তা থেকেই পপুলার হওয়ার জন্যই বোধ হয় মন্ত্রিকুল একই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত বিশ্লেষণ জাতিকে উপহার দিচ্ছেন।
অধমের এই মূল্যায়নের ভিত্তি হলো ইদানীং দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে মাননীয় মন্ত্রিকুলের মতামত ও বিশ্লেষণ। টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি। কারও মতে গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, কারও মতে দেশীয় চক্রান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, সাবেক এক প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে দেশকে অস্থিতিশীল ইত্যাদি করার জন্য—ইত্যাদি।
বলা বাহুল্য, আগের টক শো আর নেই। মন্ত্রীরাই তো তার্কিকের জায়গা নিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলেই আপনি যেকোনো ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ পাবেন, তাই আজকাল টক শো দেখা কমে গেছে। চ্যানেলওয়ালারাও সেটা টের পেয়েছে। তাই টক শোগুলোতে আজকাল মতৈক্যই বেশি। কেউ হয়তো সরকারি দলের কট্টর সমর্থক, কারও সমর্থন কিছুটা প্রচ্ছন্ন। অতটা প্রকট না। এই সুযোগে মাননীয় মন্ত্রিকুলকে গায়ে পড়ে একটু সাবধান করে দিই। টক শোগুলোতে আজকাল যে নির্জলা-নির্ভেজাল তোষামোদি হয়, তাতে একটু খেয়াল রাখবেন ওই টক শোওয়ালারা আপনাদের না আবার গদিশূন্য করতে লেগে পড়ে।
প্রশ্ন জাগে, আপনারা কেমনে জানলেন, কারা এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখে রা নেই। ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে কুল্লে চার দিন পরেই নিস্তার। ১০ দিন রিমান্ড শেষে আরও রিমান্ড চাওয়াই যেখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বিদেশি হত্যায় চার দিনেই রিমান্ড শেষ।
সচরাচরের মতো এবং অন্য সরকারগুলোর সময়ের মতো যেসব মন্ত্রী বেশি সবজান্তা, তদন্তের ভার তাঁদেরই নেওয়া উচিত। বিদেশিরা নিঃসন্দেহে শঙ্কিত। বিভিন্ন রঙের অ্যালার্ট তাঁরা জারি করে বসে আছেন। বায়াররা বিদেশে মিটিং ডাকছে। অধম ধানমন্ডিতে মিটিং ডাকলাম, গুলশান থেকেই আসতে চায় না। বলে, এখন বারণ আছে। সেটা ছিল বিজিবি নামার আগে। ধারণা করছি, জানালার পর্দা সরিয়ে টহল যান একেবারে তাঁদের গুলশান-বারিধারার অ্যাপার্টমেন্টের জানালার নিচে দেখে তারা ধানমন্ডি তো নয়ই, হয়তো হজরত শাহজালালমুখী হবেন। খোদ রাজধানীতে দিনদুপুরে সান্ত্রিবাহী বিরাট বিরাট গাড়ি দেখে তাঁরা যদি ভাবেন যে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ দেশে থাকা নিরাপদ নয়, তাহলে অন্তত অধম তাঁদের দোষারোপ করব না। আর বিদেশি গণমাধ্যমে রাজধানীর গুলশান-বারিধারায় যদি সামরিক পোশাকে বিজিবির টহল দেওয়ার ‘ফুটেজ’ প্রচারিত হয়? পরিণতি পাঠকেরাই সহজে অনুমান করতে পারবেন।
২.
টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি সরকারদলীয় সাংসদ, স্পষ্টতই অপরাধে অভিযুক্ত—তাঁকেই পুলিশ খুঁজে পায় না বেশ কিছুদিন ধরে। গোলাগুলি করা তাঁর নাকি বেশ কিছুকালের অভ্যাস (‘সামান্য ঘটনায় গুলি করা তাঁর স্বভাব’ শিরোনামে ১১ অক্টোবর, ২০১৫-এর প্রথম আলোর তৃতীয় পৃষ্ঠার খবর দ্রষ্টব্য)। যেহেতু মাননীয় সাংসদ, সেহেতু পুলিশের কাছে তাঁর নাম-ঠিকানা, ছবি, ফোন নম্বর—সবই থাকার কথা। তা-ও তারা পাচ্ছে না। অবশ্য ইতিমধ্যে অনেক সংবাদকর্মীই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেকেই জানেন। জানে পুলিশ।
গ্রেপ্তার না করার সম্ভাব্য কারণ তিনটি। প্রথমত, অদক্ষতা। খুঁজেই পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, পেয়েও গ্রেপ্তার করছে না—আর্থিক বা অন্য কোনো তদ্রূপ কারণে। তৃতীয়ত, ‘রাজনৈতিক নির্দেশ’ নেই। কারণ, এক বা একাধিক যেটাই হোক, জনমনের নিরাপত্তার জন্য কোনো কারণই আস্থার সৃষ্টি করে না। অদক্ষ পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না। অথবা দক্ষতা থাকলেও তারা যদি আর্থিক অথবা রাজনৈতিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে অর্থ বা রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা জনগণের জন্য পুলিশ সহায়ক নয়।
আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন তো আছেই। বিদেশি হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা হবে বলে অধম আশাবাদী নয়। বলা বাহুল্য, এ হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা আমরা সবাই চাই। বিদেশিরাও আশ্বস্ত হবে, ভরসা পাবে, বিদেশিদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বহাল থাকবে। কিন্তু এত কিছু পাব কি এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে? তবে আশায় থাকতে দোষ কী।
৩.
বিভিন্ন জাতির হরেক গোছের আর্কাইভ থাকে। বর্তমানকাল ভিডিওর যুগ। সবার মুঠোফোনে আজকাল ভিডিওর সুব্যবস্থা আছে। তাই অধমের প্রস্তাব—আমরা একটি ঘুষের ভিডিও আর্কাইভ চালু করি। প্রথম আলো (৯ অক্টোবর, প্রথম পাতার খবর) বলছে, ‘গুনে গুনে ঘুষ খান তিনি’-এর ছয় মিনিটের ভিডিওটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে, বিশেষত যাঁরা ঘুষ দেবেন, তাঁরা যদি তাঁদের ঘুষ প্রদানের ভিডিও চিত্র গ্রহণ করেন এবং আপাতত সেটা কখন কীভাবে দেখা যাবে, সে খবর প্রচার করেন, তাহলে ‘বক্স অফিস হিট’ না হলেও উৎসাহী দর্শকের কমতি হওয়ার কথা নয়।
বলা বাহুল্য, এরূপ ভিডিও সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে আদালতে পাত্তা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যল্প। মাঝপথে আছে দুদক নামক প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ ঘুষ নেওয়া-দেওয়ার ভিডিওটা নেহাত আর্কাইভে সংরক্ষণের জন্য।
তবে হ্যাঁ, যদি এ দেশে কখনো আইন, বিচার ইত্যাদি ফেরত আসে, ঘুষ-দুর্নীতি আবার খারাপ বলে বিবেচিত হয়; দুদক সাফাই সার্টিফিকেট দেওয়ার পরিবর্তে ঘুষখোরদের সন্ধান করে, নির্বাচন কমিশন আসলেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৫-১৬ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিবর্তে ভোটার তালাশ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি যদি হয়, তখন নাহয় ভিডিও দেখে ঘুষখোর খোঁজা হবে।
আইনের শাসন আর গণতন্ত্র ছাড়া পৃথিবীর দু-তিনটি দেশে উন্নতি হয়েছে। আর তাই দেখে গত ৫০ বছরে শ খানেক দেশ আইন আর গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নতি করার পথ ধরেছিল। হয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, কঙ্গো, রুয়ান্ডা, নাইজেরিয়া, সুদান—অগায়রা, অগায়রা। প্রায় কেউই পারেনি। আমরা কি পারব উন্নতি করতে? আইন অমান্যকারী সাংসদেরা কি ধরা পড়বেন?
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

Monday, October 5, 2015

হার্ট অ্যাটাক, আইন, বিচার এবং অস্ট্রেলিয়া by শাহদীন মালিক

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তা ওমর সিরাজ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল আসছে না। এক ইতালীয় নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হওয়ার চার দিনের মাথায় একই কায়দায় খুন হয়েছেন এক জাপানি নাগরিক। সারা দেশে তোলপাড়, বিদেশি গণমাধ্যমও উচ্চকিত। অভিযোগ উঠেছে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এক সাংসদ কাকডাকা সকালে এক কিশোরকে গুলি করেছেন। পিস্তলের নিশ্চয়ই লাইসেন্স আছে তাঁর।
হার্ট অ্যাটাক হতেই পারে। ক্রিকেট দলের সফরও বাতিল হতে পারে। বিচ্ছিন্ন দুএকটি খুন–খারাবিও হতে পারে। পরিস্থিতি হয়তো এখনো এমন হয়ে যায়নি যে ‘গেল গেল’ করতে হবে। কিন্তু সব মিলিয়ে ভালো ঠেকছে না।
এক.
গত শতাব্দীর সত্তরের দশক কাটিয়েছি ব্রেজনেভ-কসিগিনের সোভিয়েত ইউনিয়নে। আশির দশক রোনাল্ড রিগ্যানের যুক্তরাষ্ট্রে। তারপর ম্যাগি (মার্গারেট) থ্যাচারের আর জন মেজরের যুক্তরাজ্যে। বারাক ভাইয়ের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা হয়নি। এখন আর বিদেশ যাই না। যথেষ্ট হয়েছে।
রানি যখন ঢাকায় আসেন, তখন ছোটই ছিলাম। বেইলি রোডে থাকতাম। বেইলি রোডেই রানির জন্য তড়িঘড়ি করে প্রাসাদ করা হয়। সেই রানি এখনো আছেন। সপ্তাহ দুয়েক আগে ব্রিটেনের ইতিহাসের সবার থেকে বেশি সময় সিংহাসনে থাকার রেকর্ড হয়েছে—এখন প্রায় ৬৪ বছর ধরে রানি। রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি অস্ট্রেলিয়ারও রাষ্ট্রপ্রধান। কানাডা ও আরও কিছু দেশেরও।
বিলেতে থাকাকালে ম্যাগি থ্যাচারের বা জন মেজরের জন্মদিনের খবর দেখিনি বা শুনিনি। অথবা ব্রেজনেভ-কসিগিন বা রোনাল্ড রিগ্যানের। আমেরিকায় বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে বেঁচে আছেন জিমি কার্টার আর বড় বা বাবা বুশ। তাঁদেরও জন্মদিনের মিটিং-মিছিলের খবর দেখিনি বা পড়িনি। নেতাদের জন্মদিন দলীয়ভাবে বা ঘটা করে উদ্যাপন কোনো কোনো দেশের সংস্কৃতি। স্পষ্টত পশ্চিমা দেশে এসব গত ৪০ বছরে হয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যক্তির জন্মদিন এখন সরকারি ছুটির দিন। বছর বিশেক যাবৎ এটা চালু হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীকে অনুসরণ করে ভদ্দরলোক বছর পঞ্চাশেক আগে বলেছিলেন, অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তিনি আমেরিকার রাজা-উজির কিছুই হননি। মারা যাওয়ার কয়েক দশক পর তাঁর জন্মদিনে সরকারি ছুটি। ভদ্দরলোকের নাম মার্টিন লুথার কিং।
দুই.
২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৫৭ জন ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন। তঁাদের প্রায় সবার হৃদ্রোগে আক্রান্তের ঘটনা ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘হেফাজতে’ থাকার সময়।
যেমন ঘটল আবার ১ অক্টোবর। ২০০২-০৩ সালের হার্ট অ্যাটাকে যেসব মৃত্যু, হেফাজতে জখম, অঙ্গহানি, সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছিল, তার জন্য কোনো আইনি প্রতিকার, আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে না এবং অন্য সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ করে দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল আমাদের মহান সংসদ, ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
ওই আইনটা বাতিল চেয়ে মামলায় মহামান্য আদালতকে অন্যান্য দেশে কী কী হয়েছে, তা দেখাতে গিয়ে তুলে ধরেছিলাম বিভিন্ন দেশের আইন, যেখানে হেফাজতে মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্র দায়িত্ব স্বীকার করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আইন পাস করেছে। শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধে যারা মারা গেছে, সে রকম হাজার হাজার পরিবারকে সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। আমাদের বাংলাদেশের
মেয়ে হানুফা পশ্চিমবঙ্গের রেল কর্মচারী দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার জন্য কলকাতার হাইকোর্ট রেল কর্তৃপক্ষকে আদেশ দিয়েছেন ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে।
এমনকি ইরাক-আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের গুলিতে নিরপরাধ নাগরিক নিহত হলে মার্কিন সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। কে ক্ষতিপূরণ পাবে, কীভাবে চাইতে হবে, কে দেবে ইত্যাদি ব্যাপারে বিস্তারিত আইন আছে। হেফাজতে মৃত্যুর ব্যাপারে আইন আছে আর্জেন্টিনা থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত। আর আমাদের সংসদ আইন পাস করে দায়মুক্তি দিয়েছিল। পরবর্তী কোনো সংসদ সে আইন বাতিল করেনি। মহামান্য আদালত গত ১৩ সেপ্টেম্বর রায়ের মাধ্যমে যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। আদালত এটাও বলেছেন যে রাষ্ট্রের কারণে কোনো নাগরিকের যদি প্রাণনাশ হয়, অঙ্গহানি বা অন্যান্য ক্ষতি হয়, তাহলে মহামান্য হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণের জন্য আদেশ দিতে পারবেন।
তিন.
১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক লাঞ্ছনাকর ব্যবহার এবং দণ্ডবিরোধী সনদ গ্রহণ করে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সনদটিতে অনুস্বাক্ষর করে। ২০১৩ সালে এরই ধারাবাহিকতায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন সংসদ পাস করে। আইনের মোদ্দা কথা হলো, আদালতে গিয়ে যেকোনো ব্যক্তি যদি অভিযোগ করে যে তাকে হেফাজতে নির্যাতন করেছে অথবা কারও মৃত্যু হয়েছে, তাহলে আদালত সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে নির্যাতনের ধরন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন) পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে আদেশ দেবেন এবং পুলিশ সুপারকে অভিযোগ তদন্ত করতে বলবেন। এই আইনটি অন্য সব আইনের ওপরে প্রাধান্য পাবে। তবে আদালতে গিয়ে মামলা করতে হবে। ওমর সিরাজের ঘটনার প্রতিকার পেতে হলে তাঁর আত্মীয়স্বজনকে আদালতে গিয়ে এই নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনেই মামলা করতে হবে।
ইদানীং বহুল প্রচলিত ‘হুকুমের আসামি’ এই আইনে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক বক্তব্যই আজকাল লোকজন বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। বেআইনি ও অন্যায় কাজ করে যদি জনগণের আস্থাভাজন হওয়া যেত, তাহলে সারা দুনিয়ায় স্বৈরাচারেরাই থাকত; গণতন্ত্র, নির্বাচন, নৈতিকতা বা নৈতিক ভিত্তি ইত্যাদি কোনো শাসকের দরকার হতো না।
১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক লাঞ্ছনাকর ব্যবহার এবং দণ্ডবিরোধী সনদ গ্রহণ করে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সনদটিতে অনুস্বাক্ষর করে। ২০১৩ সালে এরই ধারাবাহিকতায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন সংসদ পাস করে
এক দশক ধরে এ দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে। ঘুষ-দুর্নীতিও চলছে। মেডিকেল কলেজ ৩০টা না ৩০০টা, তাতে নেতাদের কিছু আসে যায় না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠছে হরদম। ফলে মেধা না প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভিত্তিতে ভর্তি হচ্ছেন, পাস করছেন, চিকিৎসক হচ্ছেন; সেটা ঊর্ধ্বতনদের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে না। নেতারা, বড়রা চিকিৎসা নিতে বহুদিন ধরেই বিদেশ যান। দেশে কে চিকিৎসক হলেন, কে রোগী হলো, তাতে কার কী আসে যায়। অধমও পয়সা জমাচ্ছি, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাব।
চার
দেশে বোমা ফোটেনি। তাও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল আপাতত আসছে না।
তারা দেখতে পায়। সারা বিশ্ব দেখছে। তারা দেখে ঘটা করে জন্মদিন উদ্যাপিত হয়। সৌদি রাজার জন্মদিন উদ্যাপিত হয় না। কারণ, সৌদিরা জন্মদিনে বিশ্বাস করে না। কিন্তু লিবিয়ায় গাদ্দাফির ও ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের জন্মদিন উদ্যাপিত হতো ঘটা করে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের জন্ম ১১ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার দিন। বিএনপির জন্য খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ আগস্ট। সারবত্তা—গণতান্ত্রিক দেশে সরকারপ্রধান বা বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের ঘটা করে জন্মদিন করা সম্পূর্ণ বেমানান, অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশেষ উপলক্ষে বা নানা উপলক্ষ তৈরি করে এ ধরনের অনুষ্ঠান করার মধ্যে সম্পূর্ণ সামন্তবাদী–জমিদারি মানসিকতার পরিচয় মেলে।
গণতান্ত্রিক বিশ্ব এসব দেখে। দেখে আইনের শাসন নেই। লোকে আজকাল আর বিচার চায় না, ফাঁসি চায়। বিচারকেরা—সবাই সব ক্ষেত্রে নন—গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পুলিশকে সাহায্য করার জন্য ‘রিমান্ড’ দেন। রিমান্ডই এ দেশে এখন তদন্ত, বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর মামলায়। যে পুলিশ বা র্যা ব রিমান্ড আর বন্দুকযুদ্ধ করে, তাদের তদন্তের ক্ষমতা-দক্ষতা থাকে না। চাইলেও তারা পারবে না। যা শুরু হয়েছে, যেভাবে চলছে—তাতে বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে।
ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

Sunday, July 12, 2015

পদদলিত, খানাখন্দ, উচ্চমূল্য এবং ঈদ by শাহদীন মালিক

যানজট সারা শহরে, বিশেষ করে গত কুড়ি বছরের প্রতিটি বছরের এই সময়ে শান্তিনগর, মগবাজার, মালিবাগে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। ফিরিস্তিতে অবশ্যই যোগ হবে ট্রেন আর দূরপাল্লার বাসের টিকিটের জন্য সংগ্রাম, টিকিট না পাওয়ার আহাজারি অথবা কালোবাজারির দৌরাত্ম্য। ভেজাল খাবার নিয়ে প্রতিনিয়তই প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রিপোর্ট। আর এবার ঈদের বাজারে বাড়তি পাওনা মন্ত্রীর পদ হারানোর প্রথমে গুঞ্জন, পরে সত্যতা আর তারপর অদ্ভুত সব ‘কারণ দর্শানো’।
মন্ত্রী-মিনিস্টার দিয়েই শুরু করি। সব ঈদে এই পর্বটি তো থাকে না, তাই এবার বাড়তি পাওনা। ‘স্যার, শুনেছেন। আজ রাতে আসতেই হবে।’ শেষে বিকেলে এক টিভি চ্যানেল থেকে ফোন। না, কোনো কিছু তো শুনিনি। ‘সৈয়দ আশরাফ সাহেবের মন্ত্রিত্ব গেছে’। টক শোটা জমবে, তাই পীড়াপীড়িতে রাজি হলাম। একটু পরে অবশ্য সহকর্মীর মাধ্যমে অনলাইন বার্তা সংস্থার বরাতে জানলাম, খবর পাক্কা না, রাতে টক শো হলো ‘গমের মায়া আর মায়ার গম’ গোছের শিরোনামে। ১০ জুলাইয়ের প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘গুঞ্জনই সত্য হলো’। পত্রিকা বলছে, আরও কিছু বিতর্কিত মন্ত্রী পদ হারাতে পারেন। দেখা যাক।
ময়মনসিংহ জেলা শহরের একটি ফ্যাক্টরি থেকে জাকাতের
কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্ত্রণালয় হারানোর পর দলের শীর্ষ নেতাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলেছে, এতে তিনি নাকি দলকে আরও সময় দিতে পারবেন। মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের কাজে নাকি তিনি যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি।
এটা বুঝতে পাঁচ বছর লাগল! পাঁচ বছর এ জন্য যে তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোথায়, কোন কােজ কী সময় দিতে পারবেন তা বুঝতে বুঝতে এক বা দেড় বছর পেরিয়ে যেতে পারে। তারপরও আরও পাঁচ বছর?
অবশ্য বিষয়টা যখন ‘পদ’, তখন ছোটখাটো সাধারণ বিষয় বুঝতে অনেক কসরত লাগে। সারা দেশের পর ঢাকা মহানগর নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগরের দলীয় নেতা অর্থাৎ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ারও মন্ত্রিত্বের কারণে তাঁর দলীয় দায়িত্ব পালনে অসুবিধা বা সময়ের টানাপোড়েনে পড়ার কথা। ‘আশরাফ লজিক’ কি এখানে প্রযোজ্য হবে? উদাহরণ যখন টানছি, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী? প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়াও তাঁকে সামাল দিতে হয় অন্তত আধা ডজন মন্ত্রণালয়। এত কিছু করে দলীয় সভাপতির দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করা কষ্টসাধ্য। অবশ্য সামান্য মন্ত্রীর ব্যাপারে যেটা প্রযোজ্য, সেটা খোদ প্রধানমন্ত্রীর বেলায় প্রযোজ্য না হওয়াই স্বাভাবিক। মোদ্দা কথা ‘আশরাফ লজিক’ বা দলের জন্য মন্ত্রিত্ব ছাড়া খুব জুতসই ঠেকছে না, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। রাখঢাক করলে দলের জন্য ভালো হয় না।
ময়মনসিংহের নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরিতে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে
পদদলিত হয়ে শিশু ও নারীসহ অন্তত ২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
আপিল বিভাগের রায়ের পর মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নিঃসন্দেহে সাংসদ থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। সংবিধানের কোনো কিছু লঙ্ঘন করলে কী শাস্তি বা পরিণতি হবে সেটা কোথাও বলা নেই, দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া। প্রথম ব্যতিক্রম, যেটা ১৯৭২-এর সংবিধানে ছিল এবং এখনো আছে, তা হলো কেউ সংসদ সদস্য না হয়েও সংসদ অধিবেশনে যোগদান করেন তাহলে ওইরূপ বেআইনিভাবে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রতিদিন জরিমানা হবে এক হাজার টাকা। মায়া সাহেব বিচারিক আদালতের রায়ে বর্তমানে একজন দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৩ বছরের কারাবাসের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী। সত্য, রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপিল বিচারাধীন। আপিল বিচারাধীন থাকলে যদি সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকে তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলার ব্যাপারে কোনো বিএনপি নেতা-কর্মীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাঁদের যদি সাজাও হয় তাঁরা সবাই আপিল দায়ের করে আপিল বিচারাধীন আছে এই যুক্তিতে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। তখন সেটা হবে ‘মায়া লজিক’।
যে যেই পদের যোগ্য, সে সহজেই বিতর্ক এড়াতে বা বৃহত্তর স্বার্থে (যেমন: দলের ভাবমূর্তি, সহকর্মীদের মান-সম্মান, দেশ-গণতন্ত্র ইত্যাদি) পদত্যাগ করতে পারে। অধমের ধারণা, যারা পদ পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা কোনোমতে একবার পদ পেলে যেকোনো মূল্যে তা ধরে রাখতে চেষ্টা করে। সরকার, দল, দেশ, গণতন্ত্র—সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হোক, আমার পদে থাকা চাই-ই চাই। আরও একটা সমস্যা আছে। বিদেশে যে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন তাঁদের পুরোনো পেশায় বা কাজে বা ব্যবসায় যোগ দিতে অসুবিধা হয় না অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায়। আমাদের বেশির ভাগ মন্ত্রীর এই ‘অপশন’টা নেই, তাই পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না!
---২---
কয়েক দিন ধরে ‘নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ’ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ চিল্লাচিল্লিতে কান ঝালাপালা। সংবিৎ ফিরে পেলাম বিবিসি টেলিভিশনের ‘স্ক্রলে’ বাংলাদেশে পদদলিত হয়ে ২৭ জন মারা যাওয়ার শিরোনামে। সাততাড়াতাড়ি দেশি চ্যানেল ধরলাম।
আজকের (১১ জুলাই) পত্রিকায় খবর দেখলাম, পুলিশ বলছে জাকাতের শাড়ি, লুঙ্গি দিতে হলে আগেভাগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া উত্তম।
চাকরির জন্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত নিরীহ চাকরিপ্রার্থীর সলিলসমাধি হয়েছে। অধমের আদি নিবাস সিলেট অঞ্চল থেকে গত শতাব্দীর প্রথম ভাগে অর্থাৎ প্রায় এক শ বছর আগে থেকে কলকাতা হয়ে জাহাজে চড়ে বহু লোক বিলাতে গিয়েছিল চাকরির খোঁজে। এ ধরনের পরিণতি কারও হয়েছে বলে শুনিনি।
১৯৭১-এর পর গণকবরে শায়িত হলো বাঙালি, চাকরির খোঁজে যাওয়ার পরিণতি হিসেবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) নীতির পরিণামে গত তিন বছরে বৈধপথে মালয়েশিয়া যেতে পেরেছে মাত্র হাজার ১১, যেখানে যেতে পারত হয়তো লাখ তিনেক। তিন বছর ধরে গোঁ ধরে ছিলেন সরকার ম্যান পাওয়ারের ব্যবসা করবে। পরিণাম আমরা সবাই দেখলাম। দায়ী মন্ত্রীর উন্নতি হলো।
যেভাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কারণেই হয়তো—সঠিক কারণ জানা নেই—আজকাল ঢাকার সবচেয়ে দামি হোটেলগুলোর সবচেয়ে দামি রেস্তোরাঁয় ইফতার-ডিনার খেতে লাগে জনপ্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অত্যন্ত অভিজাত সালোয়ার-কামিজের দোকানে সর্বনিম্ন মূল্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আর ঈদ উপলক্ষে পাঁচ-সাত দিনের ঈদ টুরে গৃহকর্মী, আয়াকে নিয়ে যাচ্ছেন বিমানে নানা রকমের আয়েশের টিকিট কেটে। সুইস ব্যাংকে ডলার, কানাডা-মালয়েশিয়ায় বাড়ি তো আছেই।
জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করার আগে পাঠক অবশ্যই পুলিশকে খবর দেবেন। জেলা প্রশাসনকেও বলতে ভুলবেন না।
বলা তো যায় না দেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। রাজনীতিবিদ, তাঁদের চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ দোসর, আমলা-সরকারি কর্মকর্তা (আজকাল কর্মচারীরাও পিছিয়ে পড়তে নারাজ) আর ভেজালি ব্যবসায়ীদের জন্য এটা মারহাবা-মারহাবা করার দেশ।
পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। তিন বেলা খেতে পায় না অন্তত দেড় কোটি মানুষ।
আর আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের উল্লাস করছি সামান্য একটা শাড়ির জন্য পদদলিত হয়ে পিষ্ট লাশের ওপর দাঁড়িয়ে।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

Wednesday, June 3, 2015

শিক্ষা, পরীক্ষা ও বার—পুনর্মূল্যায়ন by শাহদীন মালিক

মাননীয় প্রধান বিচারপতি ১৬ মে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে আইনের শাসন এবং বার-বেঞ্চের সম্পর্কসংক্রান্ত এক আলোচনায় যথার্থই মন্তব্য করেন যে শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় আইনজীবীদের অদক্ষতা ও গাফিলতির জন্য মক্কেল সুবিচার থেকে বঞ্চিত হন।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি কমবেশি ২৫ বছর ওকালতি করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছেন ১৯৯৯ সালে। অর্থাৎ, ১৫ বছর আগে। সব মিলিয়ে ৪০ বছরের বিশাল অভিজ্ঞতা। আইনজীবী মহলের বাইরে অনেকেই হয়তো জানেন না যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সবিতা রঞ্জন পালের জুনিয়র ছিলেন। প্রচারবিমুখ প্রয়াত সবিতা রঞ্জন পাল (এস আর পাল) আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যে অন্যতম। যত দূর শুনেছি, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর যখন হাজার হাজার হিন্দু পরিবার পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে গিয়েছিল বা যেতে বাধ্য হয়েছিল, তখন এস আর পালও কলকাতা চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ অনুরোধে উনি ঢাকায় ফিরে আসেন; নতুন দেশের নতুন সরকারকে বিভিন্ন আইনি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেছেন যে আজকাল নবীন আইনজীবীরা অভিজ্ঞ কোনো আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টাও করেন না। সনদ পেয়েই বিচারক/বিচারপতির সামনে দাঁড়িয়ে যান।
সমস্যার মূলে এখনো আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং এসব দুর্বলতার কারণেই অদক্ষতা। কোনো তরুণ আইনজীবী বা আইন শিক্ষার্থীর পক্ষে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে ভালো আইনজীবী হওয়া প্রায় অসাধ্য। এটা মাথায় রেখেই এই লেখার সম্পূর্ণ শিরোনাম: ‘আইন শিক্ষা, আইনজীবী সনদ পরীক্ষা এবং বার কাউন্সিলের ভূমিকা—পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’।
এখন আইন শিক্ষা দেয় গোটা বিশেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ইদানীং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন বিভাগ খোলার হিড়িক পড়ে গেছে। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি আইনের ছাত্রছাত্রীই আছেন হাজার তিন-চার। প্রতি সেমিস্টারে ছাত্রছাত্রীপ্রতি ১০ হাজার টাকা ফি নিলে বছরে হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। আর ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পরীক্ষাটা দিয়ে ফেললেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের মাস্টার হওয়া নাকি খুব সহজ। প্রত্যেক লেকচারারকে পড়াতে হয় চার, পাঁচ এমনকি ছয়টা বিষয়।
দুনিয়ার সত্যিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষককে দুটির বেশি ‘সাবজেক্ট’ পড়াতে হয় না। অনেকেই কোনো কোনো বছর কেবল একটা সাবজেক্ট পড়ান। দুনিয়ার প্রায় সব দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু শিক্ষকের ক্লাস ওয়ান বা টু বা থ্রিতে চার-পাঁচটা বিষয় পড়াতে হয়। আমাদের সমস্যা হলো যাঁরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক, তাঁরা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে যে পার্থক্য বা ফারাক, সেটা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেন না। ফলে সম্ভবত তাঁদের ধারণা, বেতন দিচ্ছি, পড়াবেন না কেন?
যত কম শিক্ষক দিয়ে যত বেশি বিষয় পড়ানো যায়, লাভ তত বেশি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে চাপ আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব জমি, ইমারত লাগবে। ঢাকা শহরে পাঁচ বিঘা জমি আর ইমারত তো ৫০ কোটি টাকার কম নয়।
বছর দশেক আগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ পড়ার হিড়িক ছিল; ছিল হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এখন ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ বিভাগগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ‘আইন বিভাগ’ তার জায়গা দখল করেছে।
মঙ্গোলিয়া বা মাদাগাস্কার অথবা ফ্রান্স কিংবা জার্মানি—যেখানেই আইন পড়েন না কেন, সে দেশের আইন বাংলাদেশের আদালতে অচল। বাংলাদেশের আদালতে চলে বাংলাদেশের আইন। বিলেত-আমেরিকা, চীন-জাপানের বহু আইন আপনি জানতে পারেন, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের তো পড়াতে হবে বাংলাদেশের আইন। অনেক জায়গায় নাকি বিদেশি আইন জানা গন্ডায় গন্ডায় শিক্ষক আছেন। তাঁরা দেশি আইনের ধার ধারেন না।
তারপর আছে ‘বার–অ্যাট–ল ডিগ্রি লাভের’ বিজ্ঞাপন। ‘বার–অ্যাট–ল’টা ডিগ্রি না। কিন্তু সেটা ‘ডিগ্রি লাভ হয়েছে’ বলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। প্রতারণাটা শুরু হয় প্রথম দিন থেকেই।
আইনের ডিগ্রি লাভের পর বার কাউন্সিলের ‘সনদ’-এর পরীক্ষা। মাস খানেক আগে এবারের প্রাথমিক পর্যায়ের এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন) পরীক্ষা হয়। প্রায় ২০ হাজার আইন ডিগ্রিধারী এই পরীক্ষা দেন। পাস করেছেন হাজার পাঁচেক। এখন এঁরা ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দেবেন।
খুব অল্প সিলেবাসের তিন ঘণ্টার ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হওয়া যায়। অবশ্য এরপর একটা নামমাত্র মৌখিক পরীক্ষা। জানামতে, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’—যেখানে ১০০ নম্বরের একটা পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর আইনজীবীদের পরীক্ষা হয় আগস্ট মাসের ৩০ আর ৩১ তারিখে। প্রতিদিনই সকাল আটটা থেকে দুপুর ১২টা, তারপর আবার বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। দুই দিনে মোট ১৬ ঘণ্টার পরীক্ষা।
সহজলভ্য এলএলবি ডিগ্রি নিয়ে নামকাওয়াস্তে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে যদি অ্যাডভোকেট হওয়া যায়, তাহলে তো দক্ষতার সংকট থাকতেই পারে।
যাঁরা সহকারী বিচারক হওয়ার জন্য বার কাউন্সিলের পরিবর্তে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরিবর্তে) পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁদের আইনের মোট ৬০০ আর আইনের বাইরে বাংলা, ইংরেজিসহ ‘সাধারণ’ বিষয়ে আরও ৪০০, অর্থাৎ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়। সর্বশেষ গত মাসে ২৪টা সহকারী বিচারকের খালি পদের জন্য এই লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন পাঁচ শতাধিক ছাত্রছাত্রী। তার আগে এমসিকিউতে বাদ পড়েছেন হাজারেরও বেশি।
এ বছর মার্চ মাসে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে সনদ পেয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ নবীন আইনজীবী। এই নতুন ১ হাজার ৩০০ নবীন আইনজীবীকে কে শেখাবেন। তাঁদের সঙ্গে গতবারের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের আরও হাজার তিনেক নতুন আইনজীবীকে যোগ করলে চার সহস্রাধিক আইনজীবীর অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন। নতুন চার হাজার আইনজীবীকে অভিজ্ঞতা প্রদানের ব্যবস্থা আমাদের নেই। যেমন নেই দক্ষ শিক্ষক।
এক অর্থে আইনের ছাত্রছাত্রীরা প্রতারিত হচ্ছেন। আর বার কাউন্সিল নামকাওয়াস্তে পরীক্ষায় পাসের ব্যবস্থা করে আইনজীবী হিসেবে সনদ দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। নিয়োগ-বাণিজ্য হয়। হয় অকাতরে তদবির-বাণিজ্য। তদবিরকে আমরা পারতপক্ষে অন্যায় মনে করি না।
২...
সবচেয়ে বড় কথা হলো, আদালতগুলোয় নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়ছে না। তার পরও প্রায় ৩০ লাখ মামলা ঝুলে আছে শুনলে কোনো বিচারপ্রার্থীই আদালত পানে সহজে যাবেন না।
গত পাঁচ বছরে হাইকোর্টে দায়ের হওয়া নতুন মামলার সংখ্যা বাড়েনি বললেই চলে। অথচ নতুন উকিল বেড়েছে অন্তত হাজার তিনেক।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে উকিলের চাহিদা, মামলার সংখ্যা, দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ—সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে দেশগুলোর বার কাউন্সিল তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করে।
আমাদের বার কাউন্সিল ওসবের ধার ধারে না বললেই চলে। ২৭ মে অনুষ্ঠেয় বার কাউন্সিলের নির্বাচনের জন্য নেতারা দেশের এ-মাথা থেকে ও-মাথার প্রায় সব জেলা বারে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিচ্ছেন। প্রায় সব নেতাই অন্তত ৪০টা জেলায় গেছেন। দেশের চলমান রাজনীতির কোনো বিষয় নির্ঘাত তাঁদের বক্তব্য থেকে বাদ পড়েনি।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আইন শিক্ষার মান? আইন শিক্ষার মান নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হলো বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। নতুন-নবীন আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ? গত ৪০ বছরের গড় হিসাব করলে বছরে চার দিনও বোধ হয় কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেনি।
আমাদের বারের, অর্থাৎ আইনজীবীদের নেতারা—তাঁদের নেত্রীর মামলা নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বা অন্য দল সরকারের গুণগানে—তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, প্রভাব, কোনো কিছুরই বিন্দুমাত্র অভাব বা কমতি নেই। কমতি একটাই—নবীন ও নতুন আইনজীবীদের এবং তারও আগে যখন তাঁরা আইনের ছাত্রছাত্রী থাকেন, সে সময় তাঁদের শিক্ষার মান, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে নজর দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সারা দুনিয়ায় আইনজীবীদের উৎকর্ষের মান নিয়ন্ত্রণ করা হলো বার কাউন্সিলের প্রধান কাজ। এ কাজে নজর নেই বললেই চলে। মাননীয় প্রধান বিচারপতির কথা আমলে নিতে আইনজীবীদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও শিক্ষা বাড়াতে হবে।
একটা নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়ে শেষ করব। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক একসঙ্গে তিনটির বেশি বিষয় পড়াতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমতুল্য নয়।
অন্তত আইন পড়ানোর ব্যাপারে এই নির্দেশ জারির ক্ষমতা বার কাউন্সিলের আছে। আর ১০০ নম্বরের পরিবর্তে প্রথমে ৫০০ এবং দুই বছরের মধ্যে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস করতে হবে আইনজীবী হতে হলে।
ন্যায়বিচার নির্ভর করে প্রথম আইনজীবীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, May 16, 2015

ছোট্ট একটু দুষ্টামি by শাহদীন মালিক

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ও ছবি এসেছে। একজন ছাত্রী গাছের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। এক পুলিশ সদস্য তাঁর চুল ধরে টেনে এনে দিলেন বেদম উত্তমমধ্যম। বীরদর্পে, সদলবলে। মোটেও বোঝা যাচ্ছে না, তবে এত সংক্ষুব্ধ হওয়ার কী আছে। ১৩ মের প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার খবর অনুযায়ী, একটি নয়, দুটি নয়, ষাটের বেশি বিভিন্ন গোছের সংগঠন—মানবাধিকার, আইন সহায়তা, নারী অধিকারসহ হরেক কিসিমের সব সংগঠন—প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে পুলিশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে। এই সংগঠনগুলো মোটেই বুঝল না যে পুলিশ ছোট্ট একটু দুষ্টামি করছিল। পুলিশ সদস্যরা ভেবেছিলেন যে মেয়েটি কানামাছি বা চোর-চোর খেলার জন্য গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। ছোটবেলার কানামাছি খেলায় যেমন গা ছুঁয়ে দিতাম, পুলিশ তেমনি একটু গা ছুঁয়ে দিতে গিয়েছিল। তবে হাজার হলেও পুলিশ তো, গা ছোঁয়াটা একটু ভীষণ জোরেশোরে হয়ে গেছে—চুল টানা, লাঠিপেটা, চড়-থাপ্পড়। দুষ্টামিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। তাই বলে এত তোলপাড়?
যেমন আইজিপি সাহেব বলেছেন, পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুটি কয়েক ছেলে কিছু মেয়ের সঙ্গে দুষ্টামি করছিল। এতে এত বেশি হুলুস্থুল-চেঁচামেচির কী আছে? আর ব্যাপারটা যদি গুরুতরই হতো, তাহলে আশপাশের লোকজন ছেলেগুলোকে ধরে শায়েস্তা করল না কেন। অথবা দোষী ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে নিয়ে এল না কেন?
আইজিপি সাহেবের অকাট্য যুক্তি। ১৩ মের প্রথম আলোর খবর থেকে জানলাম, উনি সবাইকে আইনের তালিমও দিয়েছেন—কোনো অপরাধ হতে দেখলে অপরাধীদের যেকোনো নাগরিক তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করতে পারবে। পয়লা বৈশাখের ঘটনায় যেখানে উপস্থিত লোকজন যেহেতু কাউকে গ্রেপ্তার করেনি, সেহেতু গুটি কয়েক ছেলে একটু দুষ্টামিই করছিল, এর বেশি কিছু নয়। এ রকম মারাত্মক বিশ্লেষণ-চিন্তা ও যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা আছে বলেই তো তিনি আইজিপি!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
২...
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতীয়মান হয়েছে যে সালাহ উদ্দিন এত দিন আত্মগোপনে ছিলেন। তাজ্জব কি বাত! আমাদের গ্রাম পুলিশ আছে, আনসার আছে, আছে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি এবং সবার ওপরে র্যা ব। আরও আছে বিজিবি। হাইকোর্টের আদেশ-নির্দেশ, মিডিয়া-সিভিল সোসাইটির তোলপাড়, অনেক মহলের প্রচণ্ড (অহেতুক) সমালোচনা—এত কিছুর মধ্যেও সালাহ উদ্দিন সাহেব পুরো দুই মাস সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে পারলেন? শুধু তা-ই নয়, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতের হাসপাতালে হাজির!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচণ্ড আত্মমূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সালাহ উদ্দিন সাহেব সরকারি কর্মকর্তা, সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ নিত্যনৈমিত্তিক কোনো ছিঁচকে চোর বা ভীষণ সন্ত্রাসী-অপরাধী নন। তাঁর মতো একজন লোক যদি দু-দুমাস এভাবে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন, তাহলে কোনো সত্যিকার ভীষণ অপরাধী সহজেই ভাবতে পারে যে বাংলাদেশ লুকিয়ে থাকার জন্য অত্যন্ত উচ্চমানের আশ্রয়স্থল। অথবা সালাহ উদ্দিন সাহেবকে ওস্তাদ মেনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে কীভাবে দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকতে হয়, তার তালিম নিতে পারে।
ভুল স্বীকার দোষ অল্প। সালাহ উদ্দিন ‘আত্মগোপনে’ যাওয়ার সাত দিনের মাথায় ভেবেছিলাম, এই ‘আত্মগোপন’টা চিরস্থায়ী। এই ভুলের জন্য দুঃখ নেই। তিনি জীবিত ফিরে এসেছেন। সব ভালো যার শেষ ভালো।।
৩...
অনন্ত বিজয় দাশ খুন হয়েছেন। আগে খবরে শুনতাম, পত্রিকায় পড়তাম যে দুনিয়ায় অনেক দেশ আছে, যেখানে লেখালেখির কারণে, মত প্রকাশ করার কারণে জেল-জুলুম-নির্যাতন হয়, হত্যা হয়। গত কয়েক বছরে জেল-জুলুম-নির্যাতন বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অতীতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিহতও হয়েছিলেন।
অনন্ত বিজয় দাশের হত্যার খবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিক্রিয়া, অর্থাৎ ‘হেডলাইন নিউজ’ আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের যে উদ্বেগ, তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা মনে করছে, বাংলাদেশে মত প্রকাশের জন্য হত্যা এখন রুটিন ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়তে থাকলে যা হয়, আমাদেরও তা-ই হচ্ছে। পুলিশ এখন ‘দুষ্টামি-দুষ্টামি খেলছে, অন্যকে দুষছে আর হত্যাকারীরা দল বেঁধে দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে খুঁজে বের করে প্রমাণ সাপেক্ষে আদালতে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা—এটা বোধ হয় আমাদের পুলিশ আর পারবে না। পুলিশ এখন পারে মেয়েকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করতে, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য করতে আর...। থাক, আর বললাম না।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, May 12, 2015

ফার্স্ট ক্লাস নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভীষণ বিজয় by শাহদীন মালিক

বাংলাবাজার গার্লস স্কুল কেন্দ্রে সরকারি দলের প্রার্থীর
পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে ধরা পড়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইদানীংকালের বক্তব্য-ভাষণের কিছু কথাবার্তার ব্যাপারে মনে মনে সমালোচনামূলক চিন্তাগুলো নিয়ে কাগজে–কলম ঠেকাব ঠেকাব করছিলাম। ভাগ্যিস তা করিনি, লিখলে বা তা প্রকাশিত হলে হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেত। অধম যে নিতান্তই অর্বাচীন, একেবারে গোমূর্খ তা প্রথম আলোর পাঠকমাত্রই অতি সহজেই বুঝতে পারতেন। অবশ্য এমন নয় যে পাঠককুল সেটা অনুধাবন করেন না, তবে একটা সান্ত্বনা আছে, যেহেতু অকাঠ মূর্খের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইদানীংকালের নির্বাচনসংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে কিছু লিখিনি, সেহেতু বোকামিটা কিছুটা আড়াল করা গেছে!
একেবারে সাচ্চা রিপোর্টারের মতো অন্য কারও বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করার ক্ষমতা বা দক্ষতা নেই। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রচণ্ডভাবে অনুভূতিতাড়িত বক্তব্যগুলোর কথা বলতে গিয়ে কিছুটা এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে। তবে আসল কথা তুলে ধরতে চেষ্টার কমতি হবে না। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার যে কথাগুলো বলছিলেন তার সারবত্তা ছিল অনেকটা এ রকম—বিএনপি ও তার দোসররা জঙ্গিবাদী। খোদ বিএনপি সরাসরি জঙ্গিবাদী দল না হলেও (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক এভাবে বলেননি, অধম তাঁর মূল কথা ঠিক রেখে নিজের মতো করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলছি) নিঃসন্দেহে জঙ্গিবাদের ইন্ধনদাতা, সাহায্যদাতা, মদদদাতা ইত্যাদি। লোকজন, টাকাপয়সা, অর্থ, বুদ্ধি, সমর্থন, আশ্বাস—সবকিছু দিয়ে বিএনপি জঙ্গিবাদের অহরহ সাহায্য করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল বিএনপির তথাকথিত আন্দোলনের নামে নির্মমতা আর নৃশংসতা নিয়ে। অর্থাৎ পেট্রলবোমায় লোক মারা নিয়ে। বিএনপি আন্দোলনের নামে প্রায় তিন মাস ধরে আগুনে পুড়িয়ে লোক মেরেছে। বীভৎসভাবে, নির্মমভাবে শিশু, নারী, নিরীহ বাসচালক, চালকের সহকারী, যাত্রী—সবাইকে মেরেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রী, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারী—কেউ রেহাই পায়নি। মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তাদের অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মার্চ-এপ্রিল মাস বা তারও আগে থেকে বক্তব্যের তৃতীয় অংশ ছিল বিএনপির তথাকথিত অবরোধ-হরতাল-আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত বাজারে পাঠাতে না পারার কারণে কৃষিজাত পণ্য, উৎপাদনকারী কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী বলেননি, কিন্তু অবরোধের কারণে মক্কেল আসতে না পারার কারণে অধম গোছের আইনজীবীদেরও দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। অবশ্য সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা, অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে গিয়েছিল। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। যা হোক জঙ্গিবাদ, পুড়িয়ে মানুষ মারা, অর্থনীতিকে ধ্বংস করা—এসবের জন্য যারা দায়ী, তাদের তো আর এ দেশের মানুষ—ভোটাররা ভোট দিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বুঝেছিলেন, জেনেছিলেন যে ওদের এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়া, অসাম্প্রদায়িক, অর্থাৎ আপামর ভালো নাগরিক ভোট দেবে না, ভোট দিতে পারে না। পাকিস্তানপন্থী বা পাকিস্তানিদের দালালরা কোনো ভোটারকে প্ররোচিত করতে পারবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের রাজনীতিতে পাকিস্তানপন্থীদের গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে মাঝে মাঝে অঙ্গুলি নির্দেশনা দেন। পুরোপুরি পশ্চিমা না হলেও স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী তো পার হতে চলল। এ দেশে এখনো কারা পাকিস্তানপন্থী? এই যে এক মাস ধরে আমরা ক্রিকেটে পাকিস্তানিদের যে পেদানি দিচ্ছি, তাতে উল্লসিত না হয়ে খেলা শেষে ঘরের দরজা বন্ধ করে পরাজয়ের দুঃখে হু হু করে কেউ কেঁদেছেন বলে তো শুনিনি। অবশ্য পাকিস্তানের পরাজয়ে যাঁরা কান্নাকাটি করেছেন, তাঁরাই বোধ হয় পাকিস্তানপন্থী। পুলিশ, ডিবি, এনএসআই, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআইসহ আরও বহু সংস্থার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় তাঁদের ব্যাপারে খোঁজখবর পান। এই ধরেন মাহমুদুর রহমান মান্না আর সাদেক হোসেন খোকার কথোপকথন, টেলিফোনে ঢাকা থেকে সেই নিউইয়র্ক। এতে বোঝা যায় ষড়যন্ত্র কত গভীর, একেবারে বিশ্বব্যাপী।।
২....
আর তাই ঠিকই জেনেছিলেন, বুঝেছিলেন যে ঢাকা আর চট্টগ্রামের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেবে না। জঙ্গিবাদ, মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাহত করার জন্য হরতাল দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা— এত সব বদকাজ যাদের স্বভাবজাত, সেই বিএনপিকে তো আর বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ভোট দিতে পারে না। ২৮ এপ্রিলের তিন সিটি নির্বাচনে তা-ই হয়েছে।
যেহেতু ভোটাররা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে আসলেই ভোট দিতেন না, তাই তাঁদের পক্ষ হয়ে আওয়ামী-সমর্থকেরা তাঁদের সেই কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছেন। সবাই তো আর দেশপ্রেমিক না, কিছু লোক এত কিছুর পরও হয়তো বিএনপি মার্কায় সিল মারতেন। তাই তাঁদের মার্কায়ও কিছু সিল মারা হয়েছে। ধারণা করছি, সব কর্মীর সাক্ষরতা জ্ঞান সমান না, তাই হয়তো না বুঝে বিএনপির মার্কায় সিল কিছু বেশিই মেরে দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে সিল মারার ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে একটু সতর্ক হতে হবে। অবশ্য নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল (দাঁড়িপাল্লা থাকবে না, কারণ জামায়াত নির্বাচন করতে পারবে না) ইত্যাদি পুরোনো মার্কা। ভুল হবে না।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভোট পড়েছিল খুবই অল্প, ৫ জানুয়ারি ২০১৪-তে ভোট পড়বে না জেনে নির্বাচনেই আসেনি; আর গত দুই-তিন বছরের অপকর্মের কারণে সিটি নির্বাচনে যে ভোট বিএনপির বাক্সে পড়বে না, সেটা সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। হয়েছেও তা-ই।
৩....
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্লেষণ যদি আমরা বিবেচনায় নিই, যা তিন সিটি নির্বাচনের ফলাফলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—তাহলে এটা এখন দাবি করার সময় এসেছে যে যদি আমাদের রাজনীতিতে অচিরেই কোনো গুণগত পরিবর্তন না আসে, অর্থাৎ বিএনপির জায়গায় শক্তিশালী কোনো বিরোধী দলের আবির্ভাব না হয়, তত দিন নির্বাচন-টির্বাচনের দরকার নেই। বিদেশিরা আমাদের বাস্তবতা অনুধাবন না করে চেঁচামেচি করবে। হয়তো তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য নির্বাচনের তারিখ-টারিখ দিতে হবে। তবে ফলাফল তো জানা আছে, তাই কর্মীদের দিয়ে নৌকা মার্কাতে সিল দেওয়ার জন্য কেন্দ্র, বুথ ইত্যাদি করতে হবে, প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ ইত্যাদি নিয়োজিত করতে হবে। একটা নির্বাচন কমিশনও লাগবে। সবচেয়ে ভালো হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকেই আরও বছর দশেকের জন্য রেখে দিলে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আর ২৮ এপ্রিলের সুষ্ঠু, সঠিক এবং বিউটিফুল নির্বাচন করার পুরস্কার হিসেবে তারা আরও ১০ বছর থাকতেই পারেন, থাকা উচিত।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল হয়েছে। কাগজ-কলমে এখনো নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী আছি। কমিশন যেহেতু সুষ্ঠু, সঠিক, ভালো কাজ করছে, সেহেতু তাদের পক্ষে আর ওকালতি করা সাজে না। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে, কমিশনও ইদানীং অধমের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেনি। তাদের আর দরকারও নেই। তাই ইস্তফাপত্রটা পাঠিয়ে দেব।
যেটা বলছিলাম, শুধু স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন নয়, অন্যান্য নির্বাচনেও ভোটাররা তো পাকিস্তানপন্থী, জঙ্গিবাদী, মানুষ পুড়িয়ে মারা, অর্থনীতি ধ্বংস করা, দুর্নীতিপরায়ণ ক্ষমতালোভী জোচ্চরদের ভোট দিতে পারেন না। এই সুবাদে প্রথম আলোর পাঠককুলকে জানিয়ে রাখি, আমাদের বার কাউন্সিলের নির্বাচন ২০ মে। ওই নির্বাচনে সারা দেশের হাজার পঞ্চাশেক আইনজীবী ভোট দিয়ে তিন বছরের জন্য বার কাউন্সিলের ১৪ জন সদস্য নির্বাচিত করবেন। একটা খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখের সমন্বয়ে বিএনপি প্যানেল। অন্যটি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মতিন খসরু, জেড আই খান পান্না, শ ম রেজা প্রমুখের সমন্বয়ে আওয়ামী প্যানেল।
বিজ্ঞ আইনজীবী ভোটাররা যেহেতু শুধু আইন মান্যকারী নন, নৈতিকতা মান্যকারীও বটে, তাই তাঁরা জঙ্গিবাদী, মানুষ পোড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি প্যানেলে তাঁদের ভোট দেওয়ার কথা নয়। তাই প্রত্যাশিত ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে—ডিসি, এসপি, স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে। বার কাউন্সিলের নির্বাচন একই দিনে প্রতিটি জেলা বারে হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন। আর প্রয়োজন তরুণ আওয়ামী আইনজীবীদের মধ্যে কিছু ‘সিল মারা বিশারদ’
তৈরি করা। হাতে সময় আছে প্রায় আরও তিন সপ্তাহ।
৪....
কী দাঁড়াল? দাঁড়াল, প্রথমত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের মানুষ কেন কাকে ভোট দেবে, সেটা সবার আগে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে অন্যরাও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই অধমের বুদ্ধিশুদ্ধি খুবই সীমিত। তাই অনেক দেরিতে হলেও ২৮ এপ্রিলের সিটি নির্বাচনের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের যথার্থতা এই অধম বুঝতে পেরেছে।
যেহেতু বিএনপিকে আর কেউ ভোট দেবেন না, সেহেতু ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘ম্যানেজড ইলেকশন’ পন্থাটাই বজায় রাখতে হবে। সিটি নির্বাচনের পর এই ‘ম্যানেজড’ পন্থাটা বার কাউন্সিল দিয়ে শুরু করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের বেলায়ও ক্রমান্বয়ে প্রয়োগ করা যায়। দরকার হলে ২০৪১ সাল পর্যন্ত যাতে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনায় কেউ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।
সবশেষে তিন সিটির তিন নবনির্বাচিত মেয়রকে অভিনন্দন। হয়তো অনেকে আপনাদের বলতে পারেন বা সমালোচনা করতে পারেন এই বলে যে আপনাদের বিজয়ের আইনি, নীতি, নৈতিকতার ভিত্তি নেই। প্লিজ ওতে দমে যাবেন না বা দুঃখ পাবেন না। কারণ, এ দেশ থেকে আমরা নীতি, নৈতিকতা আর আইনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছি। সব ইলেকশনই ম্যানেজড। সবাইকে অভিনন্দন।
ড. শাহদীন মালিক: অাইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Saturday, February 28, 2015

খালেদা গ্রেপ্তার হলে রাজনীতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে -ড. শাহদীন মালিক

দেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? এক কথায় এর কোন উত্তর নেই। কারণ, আমরা দেখছি যে পরিস্থিতি প্রায়শই বদলাচ্ছে। মাসখানেক আগে অবরোধ-সন্ত্রাসের যে তীব্রতা ছিল সেটা কমে গেছে। কিন্তু বিভিন্নভাবে প্রাণহানি কমছে না। বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হলে রাজনীতি অন্যদিকে মোড় নেয়ার সম্ভাবনা আছে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্য, গ্রেপ্তার, রিমান্ড এসব বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। তবে সরকারের চেষ্টা সত্ত্বেও সঙ্কট দ্রুত নিরসনের আশা কম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, বিরোধী দলের টানা হরতাল-অবরোধে অর্থনীতিতে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জাতিসংঘ, পশ্চিমা বিশ্ব, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ব্যাপারে উদ্বেগ এবং আলাপ-আলোচনার তাগিদ অব্যাহত রয়েছে। এসব তাগিদে কোন কাজ হয় কি না তা-ই এখন দেখার বিষয়।
নোট: ড. শাহদীন মালিক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও আইনের শিক্ষক।

Thursday, February 5, 2015

আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি by শাহদীন মালিক

৩ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ১১টা, বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের সংবাদ সম্মেলন। চিকিৎসাধীন দগ্ধ রোগীদের অবস্থার বিবরণী। বার্ন কারও ২০ শতাংশ, কারও ৪০ শতাংশ। নাম, বয়স, কোথা থেকে এসেছেন—এসব তথ্য। মোট চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১১১ জন। হাসপাতালে এখন আছেন ৬১ জন। ৩ তারিখ ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন সাতজন। সেখান থেকে আরও ছয়জন আগুনে পোড়া রোগী সকালে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন। চিকিৎসক বিভিন্ন হিসাব দিচ্ছেন। আমাদের বীভৎসতার হিসাব। আমাদের নির্মমতার হিসাব। আর সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার করা হচ্ছিল এসব খতিয়ান। অধমের মতো নিশ্চিত হাজার হাজার টিভি দর্শক এ হিসাব দেখছিলেন, শুনছিলেন।
আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। নির্মম, নির্দয়, অসুস্থ জাতি। কয়েক দিন আগে নরসিংদীর এক গ্রামের বাসিন্দারা সাতজন ডাকাতকে পিটিয়ে মেরেছে। একজন বেঁচে গেছে। পুলিশ, র্যাব, ডিবি প্রায় প্রতিদিন গুলি করে মানুষ মারছে। বিজিবিপ্রধানের আস্ফালনের পর সহসা বিজিবি যদি গুলি করে মানুষ না মারে, তাহলে তো তাদের বীরত্ব নিয়ে গুঞ্জন শুরু হবে। সবাই মানুষ মারে। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমরা ক্ষমতায় থাকব, থাকবই। আমরা ওদের হটিয়ে ক্ষমতায় যাবই! এটাই এখন আমাদের ‘রাজনীতি’।
এমন যদি হতো, এক পক্ষ হঠাৎ বলে বসল, ‘আসুন, কথা বলি’। অন্য পক্ষ নির্ঘাত আঁতকে উঠত, ‘শর্ত কী?’ ‘না, কোনো শর্ত নেই। আসুন, কথা বলি।’ আমাদের রাজনীতিতে এটা হওয়ার নয়। সভ্য লোকেরা কথা বলে, আলাপ-আলোচনা করে, কথা রাখে, ছাড় দেয়। কিন্তু আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। অসুস্থ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, থাকার কথাও না। বরং প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কত হিংস্র কথা বলতে পারে, তা নিয়ে।
‘গুগল’-এর এক সুবিধা—সহজেই অনেক কিছু জানা যায় সেখান থেকে। সবকিছুই যেন আঙুলের ডগায়। খুবই প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধারণা, ‘রোম যখন পুড়ছিল তখন সম্রাট নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।’ খারাপ অর্থে নিরো এক দয়া-মায়াহীন হিংস্র শাসকের প্রতীক। গল্পে আছে, সম্রাট নিরো নিজেই আগুন লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন ব্যালকনি-বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। ঘটনা ঘটেছিল ৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮-১৯ জুলাই তারিখে। অবশ্য অনেকে বলেন, আগুন জ্বলেছিল চার-পাঁচ দিন ধরে। উল্টো কেচ্ছাও আছে। বলা হয়, যখন আগুন লেগেছিল তখন বা সেই দিন সম্রাট নিরো রোমেই ছিলেন না। দুদিন পর রোমে ফিরে এসে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা তদারকি করেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মাঝে সাহায্য বিতরণ করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ ইতিহাসের একটা আওয়ামী লীগ ভাষ্য, আরেকটা বিএনপি ভাষ্য। অধমের ভাষ্য আরেকটা, বাংলায় নিরোর বাঁশি বাজানোর কথা কোথা থেকে কেমনে চালু হলো? অধম ল্যাটিন ভাষা জানে না। সভ্যতার উৎপত্তি ল্যাটিন ভাষায়। তাই এখন বুঝি ছাত্রাবস্থায় এই ভাষাটি রপ্ত করা দরকার ছিল। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে—ভাষা শেখার বয়স পেরিয়ে গেছে।
ইংরেজিতে বলা হয়, নিরো ফিডল বাজাচ্ছিলেন। পরে দেখা গেল ‘ফিডল’ অর্থাৎ বেহালা গোছের সরু তারের বাদ্যযন্ত্র, যেটা মোটামুটিভাবে দশম বা একাদশ শতাব্দীর আগে আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিরো আর যা বাজান না কেন, ‘ফিডল’ বাজাচ্ছিলেন না। ধারণা করছি, একটা যন্ত্রতে একদিকে ফুঁ দেবেন আর অন্য দিকে সুরেলা আওয়াজ বের হবে এমন যন্ত্র। অর্থাৎ বাঁশি। দুই হাজার বছর আগে আবিষ্কৃত, যা ব্যবহৃত হতো না। আগুনে সম্রাট নিরোর একটা প্রধান প্রাসাদ পুড়ে গিয়েছিল। যাহোক, যতটা রটে, তত না, নিশ্চয় না; আবার একদমও যা, তা–ও না।
লেখার মাঝখানে এক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা কিছু কাগজ নিয়ে এল। দেখে, সই করার জন্য। ‘স্যার, প্রতিদিন সকালে বাসে অথবা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসি। জানি না আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে পারব, নাকি আত্মীয়স্বজনদের আমার পোড়া শরীর দেখতে ঢাকা মেডিকেলে আসতে হবে। চাকরি তো করতে হবে, সকাল-বিকেল তাই ঝুঁকি নিতে হবে?’
তরুণ কর্মকর্তাটি দুই নেত্রী সম্পর্কে তারপর যা মন্তব্য করল, সেটা লিখে সবাই মিলে জেলে যাওয়ার খায়েশ নেই। সে কথাগুলো বলে ফেলেছিল বেফাঁস। নিজেই মাফ চাইল তার অতি কড়া মন্তব্যের জন্য। বুঝলাম, যুক্তিতাড়িত নয়, অনুভূতিতাড়িত মন্তব্য। এটাও অসুস্থতার লক্ষণ। সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি।
মানুষ যখন ভেঙে পড়ছে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়তে বাধ্য। হচ্ছেও তা-ই। অধমের ধারণা, পুলিশের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা আমাদের দেশের চল্লিশোর্ধ্ব বছরের মধ্যে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা যত কমে, তার কর্তাব্যক্তিদের হাঁকডাক, লম্ফঝম্ফ তত বাড়ে। তা-ই হচ্ছে। আর মনে হচ্ছে, পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, গড়ে ৫০টির কম মামলা নিশ্চয় কোনো বড় মাপের বিএনপির নেতার বিরুদ্ধে নেই। কম থাকলেও অচিরেই পুলিশ সেটা নিশ্চয় পূরণ করবে। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা জনপ্রতি ৫০ পার করে দেবে।
আর আদালত নির্বিচারে সব মামলা গ্রহণ করছেন, রিমান্ড দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশে এ গোছের রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরাট বিরাট অংশকে বিলুপ্ত করতে হয়েছে। এই গত সপ্তাহেই আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিনা কির্চনার তাঁর দেশের এসআইউই নামে পরিচিত গোয়েন্দা সংস্থার বিলুপ্তি ও নতুন আইন করে নতুন গোয়েন্দা সংস্থা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।
অসুখ অল্প-বিস্তর হলে চিকিৎসা দিয়ে সেরে ওঠা যায়। অনেক দিন চিকিৎসা না করলে বা অবহেলা করলে সাধারণ রোগবালাই দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে বা হয়েই যায়। অবস্থা এভাবে চললে আমরা সবাই ভীষণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ব।
সরকারকে বুঝতে হবে যে ২০১৪-এর নির্বাচনের ওপর ভর করে পাঁচ বছর সরকার চালানো যাবে না। চালাতে গেলে আমও যাবে, ছালাও যাবে। ২০ দলকেও বুঝতে হবে যে পেট্রলবোমা, তা আপনারা মারেন বা না মারেন, (নিরোর মতো) তা দিয়ে আপনাদের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না, আর এর মাধ্যমে সরকার উৎখাত করা অসম্ভব। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকেই তাঁর সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনই এখন একমাত্র পথ। অন্য পথও হয়তো আছে। অধম এই মুহূর্তে তার হদিস পাচ্ছে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালনাকারী সরকারের কলেবর অবশ্যই ছোট হতে হবে, তাতে দু-চারজন মন্ত্রী থাকবেন বিএনপির পছন্দ অনুযায়ী। বিএনপি হয়তো চাইবে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন। দেনদরবার হতে পারে। দেনদরবার হতে হবে নির্বাচন কমিশন নিয়ে। নির্বাচন কমিশনকে ভালো গ্রহণযোগ্য অংশীদারত্বমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য কী কী করতে হবে, কাকে দিয়ে করতে হবে, সে অভিজ্ঞতা জাতির আছে। তাই কাজটা কঠিন হবে না।
উভয় পক্ষের রাজনীতিবিদেরা ভাবছেন, তাঁরা ঠিক করছেন। তাঁরা ভুল ভাবছেন। তবে যিনি সরকার চালান, দায়িত্বটা তাঁর বেশি। দেশ এমনভাবে চালাবেন না, যাতে পুরো জাতি দীর্ঘস্থায়ী রোগবালাইেয় আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত আমরা সবাই হয়ে গেছি। তবে ওষুধ পেলে তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারব।
অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারবেন না। শক্তি প্রয়োগ না করে বিকল্প ব্যবস্থায় দেশের সমস্যা সমাধান করতে পারেন কেবল সত্যিকারের নেতারা। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে এখন সত্যিকার নেতার বড়ই অভাব। আছে বিস্তর ক্ষমতাধর এবং ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তাঁদের খপ্পরে পড়ে আমরা ক্রমান্বয়ে একটা অসুস্থ জাতিতে পরিণতি হচ্ছি, অচিরে যাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিরাপত্তা থাকবে না।
সুস্থতার আশা তো আর ছাড়া যায় না। মধ্যবর্তী নির্বাচনই এখন একমাত্র ট্রিটমেন্ট। হয়তোবা।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।