Tuesday, December 16, 2014

বছরজুড়ে অবহেলা, শুধু দুই দিবসে ধোয়ামোছা by অরূপ রায়

(১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে লাগানো ফুল গাছে পানি দিচ্ছেন স্মৃতিসৌধে কর্মরত এক মালি l প্রথম আলো) বছরে দুটো দিন। ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর। এ দুই জাতীয় দিবস এলেই শুরু হয় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ধোয়ামোছা ও মেরামতের এক মহাযজ্ঞ। বছর বছর চলে একই কাজ। পাস হয় নতুন বিল, খরচ হয় ইচ্ছেমতো। জাতীয় এই স্থাপনার বাকি সময়টা কাটে নীরবতায়, অবহেলায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালির লড়াই আর শহীদদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতার নিদর্শন জাতীয় এই স্মৃতিসৌধ। রাজধানী থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভারের নবীনগর এলাকায় ১০৮ একর জমির ওপর এই সৌধের নির্মাণ শুরু ১৯৭২ সালে। শেষ হয় ১৯৮৮ সালে। এই স্মৃতিসৌধের মূল আকর্ষণ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ। স্বাধীনতা-সংগ্রামের সাতটি পর্যায়কে তাৎপর্যমণ্ডিত করে তৈরি করা হয়েছে ১৫০ ফুট উঁচু সাতটি ত্রিভুজ আকৃতির মিনার। এ ছাড়া এই স্থাপনা এলাকায় রয়েছে পায়ে চলার পথ, কৃত্রিম হ্রদ, সাঁকো, অজ্ঞাতনামা শহীদদের কবর, বাগান আর সবুজ বলয়। প্রতিবারের মতো এবারও এসে গেছে ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবস। সঙ্গে কয়েক দিন ধরে শুরুও হয়ে গেছে ধোয়ামোছা, রং-তুলির আঁচড় আর মেরামতের কাজ। এ বছর এ কাজে বরাদ্দ ২৪ লাখ টাকা। গণপূর্ত বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, স্মৃতিসৌধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছেন ৭৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিশাল এই জনবল থাকার পরও এর রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর ঠিকাদারি বিল তৈরি করতে হয়।
সরেজমিন: গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা। স্মৃতিসৌধে গিয়ে কোনো দর্শনার্থীর দেখা মেলেনি। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে ওই দিন থেকে দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া না হলেও বাইরে উৎসুক জনতার ভিড় ছিল প্রচুর। তাঁরা ভেতরে যেতে বচসায় জড়াচ্ছিলেন নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে। সংবাদকর্মীদের জন্য প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত থাকার সুবাদে ভেতরে প্রবেশ করে কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল সেনাসদস্যদের প্রস্তুতি। চলছে বিজয় দিবসে শ্রদ্ধা জানানোর অনুশীলন। স্মৃতিসৌধের নানা স্থানে বুলার লাইট স্থাপন করতে দেখা গেল। বৈদ্যুতিক সহকারী আমির আলী ও মাইজুল হক বলেন, স্মৃতিসৌধ এলাকায় তিন শতাধিক বুলার লাইট ছিল। এর মধ্যে অনেকগুলোই চুরি হয়ে গেছে। তাই বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৭টি নতুন বুলার লাইট স্থাপন করা হচ্ছে। মূল ফটক দিয়ে শহীদবেদিতে যাওয়ার পথে রং-তুলির আঁচড় দিচ্ছিলেন জামাল হোসেন। বললেন, সপ্তাহ খানেক ধরে এ কাজ করছেন তাঁরা। পথের পাশে ও নানা বাঁকে রয়েছে ছোট ছোট ফুলের বাগান। বছরের অধিকাংশ সময় বাগানগুলো প্রায় মলিন হয়ে থাকে। এখন সেগুলো ফুলে ফুলে ভরিয়ে তোলা হয়েছে। গত রোববার স্মৃতিসৌধের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্মৃতিসৌধ সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার কথা জানালেও গতকাল সোমবারও রং-তুলি, ধোয়ামোছার কাজ করতে দেখা যায়।
কোটি টাকার ধোয়ামোছা-বাতি মেরামত: গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানায়, বিজয় দিবস উপলক্ষে এবার ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। নিয়োগ করা হয়েছে ১২ জন ঠিকাদার। এই ব্যয়ের মধ্যে ভিআইপি লাউঞ্জ ও সীমানাপ্রাচীর মেরামত, স্মৃতিস্তম্ভ পরিষ্কারে ধরা হয়েছে ১২ লাখ টাকা। ধোয়ামোছা, রং-তুলি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আর হালকা মেরামতের কাজে বাকি ১২ লাখ টাকা। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসসহ বছরের অন্য সময়ে খরচে বরাদ্দ থাকে আরও প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে কেবল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণেই খরচ হয় অন্তত ২৩ লাখ টাকা। স্মৃতিসৌধের ২ নম্বর ফটকের পাশেই ভিআইপি লাউঞ্জ। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ বিদেশি অতিথিরা এলে অনেক সময় এখানেই বিশ্রাম নেন। লাউঞ্জের একটি কক্ষের দেয়ালের চারপাশে হার্ডবোর্ড স্থাপন আর রং করে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ পেয়েছে মেসার্স কিংস এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ টাকা। তবে বৃহস্পতিবার শুধু রঙের কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ চোখে পড়েনি। মিনার ধোয়ামোছার কাজ পেয়েছে হক ব্রাদার্স। এ কাজে বরাদ্দ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। পাঁচ বছর ধরেই হক ব্রাদার্স এ কাজ করে আসছে। স্মৃতিসৌধের কয়েকজন কর্মচারী বলেন, হক ব্রাদার্সের নামে কাজ দেখানো হলেও কাজ করছেন মূলত স্মৃতিসৌধের কর্মচারীরা। শুধু পানি স্প্রে করে মিনার পরিষ্কার করেন তাঁরা। আর এ কাজেই প্রতিবছর করা হয় চার-পাঁচ লাখ টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা। তবে হক ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী ফয়জুর রহমান বলেন, চুক্তি অনুযায়ী সোডা আর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে স্তম্ভ ধোয়ামোছা করা হয়। এ কাজে টাকা তছরুপের সুযোগ নেই। পায়ে চলার পথসহ অন্য স্থাপনা মেরামত ও রং-তুলির কাজও তেমন চোখে পড়েনি। কিছু শ্রমিক পায়ে চলার পথের কয়েক শ ইট আংশিক রং করার পাশাপাশি সিমেন্ট আর বালু দিয়ে কয়েকটি স্থানে সামান্য মেরামতের কাজ করেছেন। অথচ এ কাজেই ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ টাকা।
হকার-ছিনতাইকারী, পোস্টার: স্মৃতিসৌধের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বছরজুড়ে চলতে থাকে হকার ও ছিনতাইকারীদের উৎপাত। মূল ফটকের সামনে গড়ে তোলা হয় গাড়ির গ্যারেজ। ফলে স্মৃতিসৌধে বেড়াতে এসে দর্শনার্থীরা সম্মুখীন হন নানা সমস্যার। বিজয় দিবস উপলক্ষে স্মৃতিসৌধের সামনের সব দোকানপাট, গ্যারেজ সাময়িকভাবে তুলে দেওয়া হলেও মূল ফটকের দুপাশের সীমানাপ্রাচীর ছেয়ে ফেলা হয়েছে নানা রঙের পোস্টার-বিলবোর্ডে। এগুলোর প্রায় সবই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগের। যুবলীগের পক্ষ থেকে মূল ফটকের দুপাশে বিলবোর্ড দিয়েছেন রাসেল দেওয়ান। বিলবোর্ডে তাঁর ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় সাংসদ এনামুর রহমানের ছবি। এই রাসেল দেওয়ান এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। মাস খানেক আগেও চাঁদাবাজি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা: বিজয় দিবস সামনে রেখে স্মৃতিসৌধ এলাকা নেওয়া হয়েছে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায়। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হয়েছে প্রায় তিন হাজার পুলিশ সদস্য।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: স্মৃতিসৌধের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মিজানুর রহমান বলেন, স্মৃতিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণেরÿকাজ চলে সারা বছরই। তবে ১৬ ডিসেম্বর আর ২৬ মার্চ বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তা ছাড়া বছরে মাত্র এক কোটি টাকা বরাদ্দ থাকায় প্রয়োজনীয় সব সংস্কারকাজ করা সম্ভব হয় না।

তাপসকে খুনের ঘটনায় মামলা: আসামি অর্ধশত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কর্মী তাপস সরকার নিহত হওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেনসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত সোয়া দুইটায় হাটহাজারী থানায় মামলাটি করেন নিহত তাপসের সহপাঠী হাফিজুল ইসলাম। এতে অজ্ঞাত আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তাপস সরকার গত রোববার শাহ আমানত ছাত্রাবাসের সামনে গুলিবিদ্ধ হন। আহত হন পাঁচজন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাপসকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হতাহত ছাত্রদের সবাই ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক পক্ষ সিএফসি (চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার) ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ পক্ষের নেতা-কর্মী। ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক একটি পক্ষ হচ্ছে সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছাত্রলীগের সাবেক সম্পাদক নাসির হায়দার বাবুল। বগিভিত্তিক ভিএক্স (ভার্সিটি এক্সপ্রেস) পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন। মঞ্জুরুল ও এরশাদ দুজনই একই বাড়ির বাসিন্দা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উন্নয়নকাজের কমিশনের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে কার্যত সাবেক দুই নেতা নাসির হায়দার বাবুল ও এরশাদ হোসেনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। সাবেক এই দুই নেতার দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগের সাধারণ নেতা-কর্মীরা ব্যবহৃত হচ্ছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, তাপস হত্যা মামলার আসামিরা হলেন আশরাফুজ্জামান আশা, রুবেল দে, শাহরীদ শুভ, ফরহাদ হোসেন, এনামুল হাসান, সোহেল খান, রাশেদ হোছাইন, মিজানুর রহমান বিপুল, সরওয়ার পারভেজ, রেজাউল করিম, হাবিবুর রহমান, আবু আহাদ, প্রদীপ চক্রবর্তী, আরিফুল ইসলাম, জালাল আহমেদ, রূপম বিশ্বাস, এরশাদ হোসেন, জাহিদুল আউয়াল, শফিক আহমেদ, শুভগত বড়ুয়া, জায়েদ মাহমুদ, জমির উদ্দিন, কাউছার মিয়া, আসিফ ইকবাল, আবিদ রায়হান, আজমীর আরিফ, মোহাম্মদ হানিফ (স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী), সরওয়ার উদ্দিন রাসেল, শাহাদাৎ হোসেন ও মোহাম্মদ হাসান।
এদিকে গতকাল সোমবার সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের পক্ষের নেতা-কর্মীরা এই হত্যার প্রতিবাদে উপাচার্য কার্যালয় অবরুদ্ধ করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, তাঁরা আসামির তালিকায় প্রক্টরের নাম রাখায় মামলা নেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে এ ঘটনার মদতদাতা হিসেবে প্রক্টরকে দায়ী করেন তাঁরা।
তবে গতকাল রাতে করা মামলায় আসামির তালিকায় নেই প্রক্টরের নাম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের পক্ষের নেতা ও বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন মামুন বলেন, ‘আসামিদের তালিকায় প্রক্টরের নাম দেখে পুলিশ প্রশাসন জানায়, ওপরের নির্দেশ রয়েছে প্রক্টরের নামে মামলা না নেওয়ার। কয়েকবার এ বিষয়ে যোগাযোগ করলেও পুলিশ গড়িমসি করে। পরে আমরা সবাই বসে প্রক্টর যেহেতু একটি প্রতিষ্ঠান, তাই আসামির তালিকা থেকে প্রক্টরের নাম বাদ দিয়ে মামলার সিদ্ধান্ত নিই ও মামলা করি।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. শহিদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রক্টরকে আসামি করার জন্য প্রচণ্ড একটা চাপ ছিল। আমাদের চাওয়া ছিল প্রকৃত হত্যাকারীরাই যেন আসামি হয়। ঘটনার বাইরে কাউকে অাসামি করা হলে মামলাটি আদালতে প্রমাণ করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি প্রকৃত আসামিরা পার েপয়ে যাবে।’
শহিদুল্লাহ আরও বলেন, ‘আমরা নিহত তাপসের আত্মীয়র জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্ত ওই পরিবারের কেউ চট্টগ্রামে না আসায় তাপসের সহপাঠী ও বন্ধু হাফিজুল ইসলামের মামলা নিয়েছি। এতে পাঁচ-ছয়জন আসামি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। আমরা তদন্ত করে আসল হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করব।’
মামলার বাদী হাফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসামিদের সবাই দোষী। তাঁদের আমি চিনি। তাপস খুনের ঘটনায় কেউ সরাসরি জড়িত, আবার কেউ উসকানি দিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আমি আমার বন্ধু ও সহপাঠী তাপস খুনের বিচার চাই।’
এদিকে আজ মঙ্গলবার বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে ভিএক্স এবং সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ অংশ নেয়নি। উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা আজ ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীতে শিবিরের ‘বিজয়’ র‌্যালী

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে র‌্যালী করেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর বসুন্ধরা গেট থেকে পতাকা শোভিত র‌্যালিটি শুরু হয়ে কুড়িল বিশ্বরোডে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক শাহীন আহমেদ খান ও শাখা সভাপতি আনিসুর রহমান বিশ্বাস সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। এসময় তারা কারাগারে আটক সকল জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর মুক্তি দাবি করেন। র‌্যালীতে অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারী তারিক হাসান, দপ্তর সম্পাদক জামিল মাহমুদ, ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক রুহুল আমিন খাঁন, অর্থ সম্পাদক আশিকুর রহমান আসিফ, শিক্ষা সম্পাদক আব্দুল হালিম, প্রশিক্ষণ সম্পাদক আইয়ুব আলী, ফাউন্ডেশন সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম শাকিল, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক হোসাইন অপু, সমাজসেবা সম্পাদক গোলাম সারোয়ার, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক মোহাইমেনুল নঈমসহ প্রায় দেড়শতাধিক নেতকর্মী অংশ নেন ।

‘কবে দিব স্বীকৃতি?’ by মানসুরা হোসাইন

(জাতীয় প্রেসক্লাবে মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন সিরাজগঞ্জের রাজুবালাসহ (বাঁ দিক দিয়ে দ্বিতীয়) চারজন বীরাঙ্গনা। ছবি: প্রথম আলো) ‘মুক্তিযোদ্ধারা বন্দুক দিয়া যুদ্ধ করছে, দ্যাশ স্বাধীন করছে। আমরা নিজের মান দিয়া দ্যাশ স্বাধীন করছি। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরা সম্মান পায়। আমরা পাই না ক্যান? আমরা মানের স্বীকৃতি চাই।’
অভিমান নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার সিরাজগঞ্জের রাজুবালা। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন চারজন বীরাঙ্গনা। সেখানেই কথা হয় রাজুবালার সঙ্গে। বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সংগঠন ‘বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক ওই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিবরণ দিয়ে রাজুবালা জানান, যুদ্ধের পর তাঁর জীবনে আরও বিপর্যয় নেমে আসে। স্বামী মেনে নিলেও শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁর হাতের রান্না খেতেন না। স্বামী মারা গেছেন। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন তাঁর দিন কাটে মন্দিরে মন্দিরে।
বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার—এ কথা শুনে রাজুবালা বলেন, ‘শুনছি তো সরকার স্বীকৃতি দিব। কিন্তু কবে দিব? মরতে মরতে তো বীরাঙ্গনাদের সংখ্যাই কইম্যা যাইতাছে।’
সিরাজগঞ্জের আরেক বীরাঙ্গনা হাজেরা। তিনিও এসেছিলেন ওই অনুষ্ঠানে। তিনি জানান, যুদ্ধের পর তাঁকে ঘরে তোলেননি স্বামী। ছেলেমেয়েরাও মায়ের খোঁজ সেভাবে রাখেন না। পান না বয়স্কভাতা। এখন তাঁর দিন কাটে রেলওয়ে স্টেশনের পাশে।
রাজুবালা, হাজেরাদের মতো বীরাঙ্গনাদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই সরকারের কাছে। তবে সম্প্রতি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন সংজ্ঞায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতনের শিকার নারীদের (বীরাঙ্গনা) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) কার্যালয়ে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বীরাঙ্গনাদের নিয়ে যেসব সংগঠন কাজ করছে, তাদের কাছে তালিকা চেয়েছি। তারা দেবে বলেছে। তবে সবাই পাঠাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০০ জনের নাম পাওয়া গেছে। তাই গেজেট করা সম্ভব হচ্ছে না।’
মন্ত্রীর ভাষ্য, নারী মুক্তিযোদ্ধারা আগামী জানুয়ারি থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাবেন। জুলাই থেকে তাঁদের আবাসন ও চিকিত্সার ব্যবস্থা হাতে নেবে সরকার।
বীরাঙ্গনা নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে না জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন সংগঠনের পাঠানো তালিকার পাশাপাশি সরকার নারী কমিটি গঠন করবে। এ কমিটিই বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করবে।

স্কুলে তালেবানের হামলায় ৮৪ শিক্ষার্থী সহ ১২৬ জন নিহত

(ছবি:-১ পাকিস্তানের পেশোয়ারে ওয়ারসাক রোডে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে আজ মঙ্গলবার দুপুরে তালেবান জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে শিশুশিক্ষার্থীসহ পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করেছে। ছবি:-২  পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে আজ জঙ্গি হামলার পর দুই স্কুলশিশুকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন এক সেনাসদস্য। ছবি: রয়টার্স) পাকিস্তানের পেশোয়ারে ওয়ারসাক রোডে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে আজ মঙ্গলবার দুপুরে তালেবান জঙ্গিদের হামলায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮৪ শিশুসহ ১২৬ জন নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, এখনো বেশ কিছু শিশু তালেবানের জিম্মায় আছে। খবর ডন, রয়টার্স, এএফপি ও এনডিটিভি অনলাইনের। তেহেরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) হামলার দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তালেবানের ঘাঁটি জার্ব-ই-আজবে চলমান সেনা অভিযানের প্রতিশোধ নিতে এ হামলা চালানো হয়েছে। তালেবানের মুখপাত্র মোহাম্মদ খোরাসানি জানান, হামলাকারীরা সংখ্যায় ছয়জন। হামলাকারীদের স্কুলের বড় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুদের ওপর গুলি না ছোড়ার কথা বলা হয়েছে।
একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপির খবরে জানানো হয়, সামরিক পোশাক পরা পাঁচজন জঙ্গি স্কুলে ঢুকে পড়ে। জঙ্গিরা স্কুলের ভেতরে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে। স্কুলটি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খায়বার-পাখতুনখাওয়া অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে ক্ষমতায় আছে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ। ইমরান খান খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খাত্তাকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। স্কুলটি পাকিস্তানের আর্মি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। দেশজুড়ে এমন ১৪৬টি স্কুল আছে। সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের সন্তানেরা এখানে পড়াশোনা করে। এখানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বয়স ১০-১৮ বছর। স্কুলটির শিক্ষকদের বেশির ভাগ সেনাসদস্যদের স্ত্রী।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ জিম্মিদের উদ্ধার অভিযান তদারকি করতে স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া দুইটার দিকে পেশোয়ারের উদ্দেশে রওয়ানা হন। এক বিবৃতিতে তিনি জিম্মি হওয়া শিশুদের নিজের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেন। তাই তিনি তাদের উদ্ধারে চালানো অভিযান নিজেই তদারকি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালের চিকিৎসক শিরফ খান জানান, তাঁদের কাছে তিনজন শিক্ষার্থীর মরদেহ এসে পৌঁছেছে। আহত ৩৫ জনকে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ওই স্কুলের শিক্ষক। চিকিৎসাধীন দুই চিকিৎসকের বরাত দিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা ইজাজ খান বলেন, অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পেশোয়ারের হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। হাসপাতালগুলো ‘ও নেগেটিভ’ রক্ত দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিক্ষক জানিয়েছেন, হামলাকারীরা হামলার জন্য পরীক্ষার সময়কে বেছে নিয়েছে। বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে ওই শিক্ষক বলেন, হামলার আধা ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

৪০০ টাকায় মেলে ১০০০ টাকার নোট

(জাল নোটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় রাজধানীর মিরপুর থেকে দুই যুবককে আটক করেছে র‍্যাব। ছবি: প্রথম আলো) মাত্র ৪০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয় ১০০০ টাকার একটি নোট। তবে এটি আসল নয়, জাল। এভাবে বান্ডিল বান্ডিল জাল নোট কেনার পর সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, ফার্মগেট, নিউমার্কেটের মতো কর্মব্যস্ত এলাকায়। জাল নোটের এ রকম ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মো. আরিফ (৩০) ও মো. আশরাফ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাব-২-এর জ্যেষ্ঠ এএসপি মারুফ আহমেদের ভাষ্য, গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে গ্রেপ্তারের সময় আরিফ ও আশরাফের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ ও আশরাফ জানান, পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে ১০০০ টাকার ১০০টি নোট বা এক লাখ টাকার একটি বান্ডিল ৩৫-৪৫ হাজার টাকায় কিনতেন তাঁরা। পরে খুচরা বাজারে একটি বান্ডিল বিক্রি করা হতো ৬০-৭০ হাজার টাকায়। এসব টাকা নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, সদরঘাট, নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজার, গাবতলী, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হতো। স্বল্পশিক্ষিত, বৃদ্ধ, কম আয়ের লোকজনকে লক্ষ্য করে এসব জাল নোট লেনদেন করা হতো। এ ছাড়া খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ১০০০ টাকার জাল নোট ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হতো।
আরিফ আরও জানান, পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি। কিন্তু ঢাকার রায়েরবাগে থাকার সময় জাল নোটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আশরাফ জানান, পোশাক কারখানায় কাজ করলেও আরিফের সঙ্গে আগে থেকেই তাঁর পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের কারণে বেশি লাভের আশায় জাল নোটের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁরা স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শ্রদ্ধা জানান। এর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দেন। এ সময় দলের নেতা-কর্মীরা তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির নেত্রীর শ্রদ্ধা: সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় দলের নেতা-কর্মীরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

শিক্ষকদের শ্রদ্ধাঞ্জলীতে ছাত্রলীগের বাধা

বাকৃবিতে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শহীদ স্মৃতি ভাস্কর্য ‘মরণ সাগর’ এ বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের শ্রদ্ধাঞ্জলী দেওয়ার সময় বাধা দিয়েছে ছাত্রলীগ। পরে শিক্ষকরা ফুল না দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ‘মরণ সাগর’ এর পাদদেশে সকলে জড়ো হয়। এরপর শহীদদের উদ্দেশ্যে দোয়া করা হয় এবং ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল হক শ্রদ্ধাঞ্জালী দেওয়ার পর একে একে অন্যান্য সংগঠন ফুল দিতে থাকে। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষক ফোরাম’ শ্রদ্ধাঞ্জলী দেওয়ার পর শ্রদ্ধাঞ্জলী দেওয়ার জন্য সোনালী দলের নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাকৃবি শাখা ছাত্রলীগ এই সিরিয়াল না মেনে সোনালী দলের শিক্ষকদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তারা শ্রদ্ধাঞ্জলী দেয়। সোনালী দল এঘটনার প্রতিবাদ করলে তাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কটুক্তিমূলক স্লোগান দেয় ছাত্রলীগ। এসময় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে। পরে উপাচার্য ও জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটি তাদের ফুল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তারা ফুল না দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। এ ব্যাপারে সোনালী দলের সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, প্রতি বছরই ছাত্রলীগ এই রকম সমস্যা করে। তাই এবছর আমারা আগে থেকেই প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়ে রাখি। কিন্তু তবুও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। আর প্রশাসন ও ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাতামাতি করলেও হিসেব করলে দেখা যাবে তাদের থেকে সোনালী দলে মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষকদের সংখ্যাও কম নয়। বিজয় দিবস উদযাপন কমিটির অহ্বায়ক ও ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জহিরুল হক খন্দকার বলেন, ছাত্রলীগকে নিষেধ করা হলেও তারা তা শুনেনি।

পাকিস্তানের স্কুলে জঙ্গি হামলায় নিহত ১০৪

পাকিস্তানের পেশোয়ারে সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে হামলা করেছে জঙ্গিরা। মঙ্গলবার সকালে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা ওয়ারসাক রোডের ওই স্কুলে হামলা চালায়। এতে অন্তত ১০৪জন নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে। এর মধ্যে ৮৪জন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। সামরিক বাহিনী পরিচালিত এ স্কুলে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী-শিক্ষক আটকা পড়েছেন। হামলার পর স্কুলে চারপাশ বন্ধ করে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। এক বিবৃতিতে তালেবান হামলার দায় স্বীকার করেছে। সেনা বাহিনীর অভিযানের জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে এই জঙ্গি সংগঠন। ডন এর খবরে বলা হয় ৫-৬জন বন্দুকধারী সেনা বাহিনীর পোশাক পরে স্কুলে প্রবেশ করে গুলি চালায়। এদিকে তালেবানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান তদারকি করার জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পেশোয়ারের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়েছেন।

জয় নিশ্চিত না হলে নির্বাচন দেবেন না হাসিনা -ডিএনএ’র মতামত কলাম by ভারত ভূষণ

ঢাকায় বিএনপি’র এক সিনিয়র নেতার লিভিং রুমে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। তখন সে নেতা বললেন, আমি বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটি উপভোগ করবো। এরপর সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন শুরু হবে। এ বছরের জানুয়ারিতে ত্রুটিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজপথ লক্ষণীয়ভাবে শান্ত। জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী ১১ মাস ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা আরও সুসংহত করার সময়। চরম বিতর্কিত ওই নির্বাচনে আরও এক মেয়াদে তার ক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পর বিরোধী দল শুধু সংসদ থেকেই নয়, রাস্তায়ও অনুপস্থিত। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে তারা আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলো, যারা বিএনপি’কে নির্বাচন বয়কট করতে প্ররোচিত করেছিল, তারা চুপ হয়ে গেছে। কার্যত তারা ক্ষমতার এ পালাবদল নীরবে মেনে নিয়েছেন। গত সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের আগে, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র সঙ্গে একটি সংলাপ শুরু করেছিল। তখন বিএনপি নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে ছিল অটল। সেই সংলাপ ব্যর্থ হয়েছিল। কেননা, বিএনপি দাবি জানিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পথ খুলে দিতে হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। সংবিধান সংশোধন করে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নীতি বাতিল করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তবে তারা নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চলমান নির্বাচনের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা না করলে, বিএনপি’র সঙ্গে আলোচনা করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তারা দেবে। তবে আন্তর্জাতিক সমর্থনে বলীয়ান বিএনপি তখন তাতে সায় দেয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনে জিতে যায়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে এমন ১৪৭টি আসনের মধ্যে ১৩৯টি আসনেই জয়লাভ করে তারা। একই সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১২৩টি আসনও পায়। এর ফলে ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বিএনপি’র প্রত্যাশা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ব্যতিত আন্তর্জাতিক বিরোধিতা থেমে যায়। প্রায় ৪০টির মতো দেশ শেখ হাসিনাকে পুনঃনির্বাচিত হওয়ায় শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠায়। আর নতুন সংসদের উদ্বোধনী দিনে ঢাকার বেশির ভাগ কূটনীতিক অতিথিদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনসমূহ অলঙ্কৃত করেন। হাসিনা এরপর প্রাথমিক আন্তর্জাতিক সমর্থন সতর্কতার সঙ্গে সংহত করেন। বিদেশে তার প্রথম সফর ছিল জাপানে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের অস্থায়ী সদস্যপদের জন্য জাপানের পক্ষে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন তিনি। এরপরই জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফর করেন। যুক্তরাজ্যেও সফল সফর শেষ করেন হাসিনা। তবে সেটি আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না। তিনি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ক্যামেরন তখন কেবল বাংলাদেশের জন্য সমর্থনের প্রতিশ্রুতিই দেননি, বরং তিনি ঢাকা ও সিলেট সফরের আকাক্সক্ষাও ব্যক্ত করেন। এরপর এ বছরের অক্টোবরে, বাংলাদেশের সংসদের ¯িপকার শিরীন শারমিন কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একই মাসে আওয়ামী লীগের এক এমপি সারা বিশ্বের ১৬৪টি দেশের পার্লামেন্টের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি সংগঠন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই চুপ থাকে। এর কারণ হতে পারে, হাসিনার সরকারের প্রতি ভারতীয় সমর্থন। এ সমস্ত প্রাথমিক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পর, তার সরকার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার আত্মবিশ্বাস পায়। এরফলে জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করা দলগুলোকে নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তাব অর্থহীন হয়ে যায়। যে বিএনপি এর আগে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা এখন আওয়ামী লীগকে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করছে। যখন সরকার তার অবস্থান সুসংহত করেছে, বিএনপি তখন রীতিমতো বিপর্যস্ত। যদিও বিএনপি’র ভেতরে কিছু পদে বিরোধের পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তবে দলটির নেতৃত্ব নিয়ে সত্যিকারের মতবিরোধ রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান ও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক জিয়া যদিও লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন, তবুও তাকে দেখা হয় দলের মধ্যে বিভেদকারী শক্তি হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে তারেক জিয়ার উস্কানিমূলক বক্তব্যে তার কোন লাভ হয়নি। তিনি নানা বিতর্কিত কথাবার্তা বলেছেন। যেমন, মুজিবকে বঙ্গবন্ধু না বলে, পাকবন্ধু বলা উচিত এবং পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য তার মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত। এছাড়া বিএনপি ব্যাপকভাবে এর জোটের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভরশীল, যাদের ক্যাডার ও রাজপথের কর্মীরা বাংলাদেশের সব বড় শহরের রাজপথ অচল করে দিতে পারে। তবে দলটির শীর্ষ নেতারা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার দায়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায়প্রাপ্ত, নতুবা তাদের বিরুদ্ধে করা মামলায় জেল খাটছেন। তাই আগামী জানুয়ারি থেকে বিরোধী দল যদি গণ-আন্দোলন শুরু করে, তাহলে সরকার হয়তো তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। বাংলাদেশে সরকার তখনই পরিবর্তন হয় যখন সেনাবাহিনী অবস্থান পরিবর্তন করে। আর হাসিনা সেনাবাহিনীকে নিজের পাশেই রেখেছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে তাদের আরও অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি এটা করেছেন। শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সেনাবাহিনী ডলারে বেতন পায়। এছাড়া সেনাবাহিনীর চাওয়া মোতাবেক হেলিকপ্টার, সাবমেরিনসহ অন্যান্য অস্ত্র দেয়া হয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনী এখন ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও পরিচালনা করার অনুমতি পেয়েছে। বর্তমানে দেড় লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনীও খুশি। কেননা, প্রায় ৫০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন হাসিনা। বেসামরিক প্রশাসনকে সন্তুষ্ট রেখেছেন পে-কমিশন ও পদোন্নতি দিয়ে। গণমাধ্যম, বিচারব্যাবস্থা ও সুশীল সমাজকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হচ্ছে। ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমকে আয়ত্তে আনা হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ প্রণয়ন করে। অপরদিকে বিচার ব্যাবস্থাকে আনা হয়েছে সম্প্রতি পাস হওয়া একটি সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে, যেখানে একজন বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিশংসন করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংসদকে। অপরদিকে সুশীল সমাজকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এনজিওসমূহের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও অনুগত আমলাদের তা বন্ধ পর্যন্ত করে দেয়ার কর্তৃত্ব দিয়ে। হাসিনার সমর্থকরা তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগসমূহ উড়িয়ে দেন। যদি আজও নির্বাচন হয়, হয়তো বিএনপি-জামায়াত জোট সহজেই জিতে যাবে। তবে শিগগিরই নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যদি আওয়ামী লীগের সব ভাল ভালয় কেটে যায়, তাহলে আগামী নির্বাচন হবে আগামী ৫ বছর পর। শেখ হাসিনা একজন চতুর রাজনীতিক। আর তিনি নিজের জয় স¤পর্কে নিশ্চিত না হয়ে, নির্বাচনের ডাক দেবেন না।
লেখক পরিচয়: নয়াদিল্লি ভিত্তিক লেখক এবং সাংবাদিক

সিডনিতে ১৬ ঘণ্টার জিম্মিদশা

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ক্যাফের মধ্যে অস্ত্রের মুখে কর্মী ও ক্রেতাদের জিম্মি
করে রেখেছে বন্দুকধারী। সেখান থেকে কোনো রকমে বেরুতে পেরে
রুদ্ধশ্বাসে ছুটছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স ও এএফপি
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অস্ত্র নিয়ে ক্যাফের মধ্যে ঢুকে কর্মী ও সেখানে আগত লোকজনকে জিম্মি করেন এক ব্যক্তি। গতকাল সোমবার সকালের ওই ঘটনার পর মাঝরাত পর্যন্ত চলে জিম্মিনাটক। এ সময়ে ১৬ ঘণ্টার বেশি রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যে ছিল সিডনি। মধ্যরাতে নিরাপত্তা বাহিনীর আচমকা এক অভিযানের পর পুলিশ জানায়, জিম্মিদশার অবসান ঘটেছে। রাত দুইটার দিকে নিরাপত্তা বাহিনীর ওই অভিযানে অস্ত্রধারী ব্যক্তিসহ তিনজন নিহত হয়। আহত হয় আরও চারজন। এদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জানা গেছে, অস্ত্রধারী ব্যক্তির নাম হারুন মনিস (৪৯)। তিনি ইরানি নাগরিক। নিজেকে ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ হিসেবে দাবি করতেন। রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে তিনি ১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যান। ২০১২ সালে আফগানিস্তানে নিহত অস্ট্রেলীয় সেনাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে ‘হুমকিমূলক’ চিঠি লেখার ঘটনায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় শহর সিডনির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লিন্দ্‌ত ক্যাফেতে জিম্মি নাটকের শুরু স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে। ক্যাফেটির কাছেই আছে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পার্লামেন্ট ভবন, রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন কনস্যুলেট এবং কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার ভবন। একটু দূরেই বিখ্যাত সিডনি অপেরা হাউস। বন্দুকধারী ক্যাফের মধ্যে ঢুকেই অস্ত্র দেখিয়ে জিম্মি করে ফেলেন সেখানকার কর্মী ও আগত লোকজনকে। শুরুতে বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হয়, ১০ জন কর্মীসহ অন্তত ৪০ জনকে জিম্মি করা হয়েছে। ঘটনা জানার পর পুলিশ দ্রুত আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে। কিছুক্ষণের মধ্যে আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও ওই এলাকায় মোতায়েন করা হয়। কাছে-পিঠে যেসব অফিস আছে, সেখানকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর পুলিশ জিম্মিদের উদ্ধারের তৎপরতা শুরু করে। ক্যাফের কর্মী ব্রুনো ঘটনার সময় বাইরে ছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে (এবিসি) বলেন, ‘আমি বাইরে থেকে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন দেখলাম, ভেতরের সবাই হঠাৎ বসে পড়ল। মাথায় হ্যাট পরা এক ব্যক্তি শুধু পায়চারি করছেন।’ হ্যাট পরা ওই ব্যক্তিকেই জিম্মিকারী বলে উল্লেখ করেন ব্রুনো। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, জিম্মিকারীর হাতে ছিল একটি শটগান। লোকজনকে জিম্মি করার পর তাঁর পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবিদাওয়া জানানো হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়। কিন্তু পুলিশের অনুরোধে গণমাধ্যম তা প্রকাশ করেনি। একপর্যায়ে দেখা যায়, কালো কাপড়ের একটি ফ্লাগ ক্যাফের জানালায় ধরে রাখতে জিম্মি ব্যক্তিদের বাধ্য করা হয়েছে। এতে আরবিতে কিছু লেখা ছিল। এতে করে ঘটনার সঙ্গে সংঘবদ্ধ ইসলামি কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর জড়িত থাকার আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে।
জরুরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, এ ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট বলেন, এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ক্যাফেটির ঠিক উল্টো পাশে মার্টিন প্লেস নামের ভবনে ‘চ্যানেল নাইন’ টেলিভিশনের কার্যালয়। টেলিভিশনটির সাংবাদিক ক্রিস রেজন খুদে ব্লগ লেখার ওয়েবসাইট টুইটারে লেখেন, ‘আমাদের সংবাদকক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রায় দুই ঘণ্টা পর পর জিম্মিদের অবস্থান বদল করানো হচ্ছে। জিম্মির সংখ্যা ১৫ জনের মতো।’ জিম্মিদশার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর তিন ব্যক্তি ওই ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এর ঘণ্টা খানেক পর বেরিয়ে আসেন আরও দুই নারী। তবে তাঁরা পালিয়ে আসেন, নাকি জিম্মিকারী তাঁদের ছেড়ে দেয়, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় সময় রাত দুইটার পর হঠাৎ ঘটনার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ক্যাফে থেকে কয়েকজনকে বেরিয়ে আসতে দেখে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যান। তখন বাইরে থেকে গোলাগুলি ও চিৎকারের জোরালো শব্দ শোনা যায়। এর পর পরই আহত লোকজনকে বের করে আনেন নিরাপত্তাকর্মীরা। স্বাস্থ্যকর্মীরা এগিয়ে যান। আহত ব্যক্তিদের স্ট্রেচারে তুলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রায় ১৫ মিনিট এ অবস্থা চলার পর পুলিশের পক্ষ থেকে টুইটারে বলা হয়, ‘সিডনির জিম্মি নাটকের অবসান হয়েছে। বিস্তারিত শিগগির জানানো হবে।’

‘মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোন ভুমিকা নেই’ -তারেক রহমান

বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন,  আওয়ামী লীগ দাবি করে তাদের দল নাকি মুক্তিযুদ্ধের দল অথচ শেখ মুজিব নিজেই আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকালীন দল বটে, তবে মুক্তিযুদ্ধের দল নয়। এ দলের অধিকাংশ নেতাই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ নেননি। বাংলাদেশের ৪৪তম বিজয় দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য বিএনপির আটদিনের অনুষ্ঠানমালার সপ্তম দিনে সোমবার ইস্ট লন্ডনের দ্যা অট্রিয়াম অডিটরিয়ামে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদারদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসাবে বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়ক সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান একে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমান প্রশ্ন রেখে বলেন, এখন তাকে রাজাকার আখ্যা দিয়ে কি বাংলাদেশের বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়নি? সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুস। যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমদের পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেনন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক মন্ত্রী মীর নাসির এবং বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট রহুল কবীর রিজভী এবং বিএনপি‘র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমানসহ অনেকে। তারেক রহমান বলেন, শেখ মুজিব ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর হামলার আগ পর্যন্ত ইয়াহইয়া খানের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাকামী জনগণ তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ নস্যাত করে দিয়েছিলো। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শেখ মুজিবকে জোর করে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই ইতিহাস বিকৃতির শুরু।
তারেক রহমান বলেন, দেশে এখন গনতন্ত্র নেই। মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই, বাক স্বাধীনতা নেই। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। প্রতিদিনই মানুষ গুম হচ্ছে খুন হচ্ছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে এসব গুম খুনের সঙ্গে খোদ শেখ হাসিনা জড়িয়ে পড়েছেন। দূর্নীতি লুটপাট এখন সর্বগ্রাসী। জনগণের হাজার হাজার টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। র‌্যাব নামের রক্ষীবাহিনীর বন্দুকের জোরে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন রংহেডেড শেখ হাসিনা। এই দখলদার হাসিনার অবৈধ সরকারের অবৈধ মন্ত্রীদের অতিকথনে জনগণ অতিষ্ঠ। খোদ শেখ হাসিনার মুখে নোংরা ও অশ্লীল কথাবার্তা জাতি হিসেবে প্রায়শঃই জনগণকে লজ্জায় পড়তে হয়। তারেক রহমান বলেন, একটার পর একটা অপকর্ম করে শেখ হাসিনা বিপদে পড়লেই জনগণকে ধোকা দিতে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেন।
তারেক রহমান বলেন, শেখ মুজিব কখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নয় আন্দোলন করেছিলেন পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের জন্য। শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি বলেই সুযোগ পেয়েও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি। তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন, পাকিস্তান আমলের পুরো সময়টাতে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে কোথাও কোন সমাবেশে প্রকাশ্যে কখনোই তার মুখ থেকে কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা উচ্চারিত হতেও শোনেনি। শেখ মুজিব চেয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে।
তিনি বলেন, শেখ মুজিব তো নয়ই তার পরিবারও  মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম অলি আহাদের জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫ বই থেকে ডেপুটি এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী ক্রিস পারভেন এর মার্কিন সিনেট সাব কমিটির শুনানীর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেন। শুনানীতে বলা হয়, “শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকায় অবস্থানকারী পরিবারের ব্যয় বহনে বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে প্রতিমাসে ১৫ শ টাকা করিয়া মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন“। তারেক রহমান বলেন, আধাবেলা একবেলা খেয়ে না খেয়ে লাখো মানুষ যখন রণাঙ্গনে শেখ মুজিবের পরিবার তখন খুনী ইয়াহিয়া খানের পয়সায় খানসেনাদের পাহারায় নিরাপদে দিন কাটাচ্ছেন ঢাকায়।
প্রায় দেড়ঘন্টার বেশী সময় ধরে দেয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ায় শেখ মুজিবের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ৭১ এ পাকিস্তানের দোসর যারা ইয়াহিয়া টিক্কা খানের রুপী খেয়ে যারা ঢাকায় আয়েশে নয়মাস কাটিয়ে দিয়েছেন দেশ ও গণতন্ত্র এখন তাদের কাছে বন্দী। আবারো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চলমান অপশাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করে একটি গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে বেগম খালেদা জিয়ার দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান হানার তারেক রহমান।

সিআইএর নির্যাতকদের ‘বীর’ বললেন চেনি

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) নৃশংস জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল ব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের ‘বীর’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি। আবার ক্ষমতায় গেলে সিআইএকে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করতে বলবেন বলেও জানান তিনি। এনবিসি টেলিভিশনে গত রোববার দেওয়া সাক্ষাৎকারে চেনির ওই বক্তব্য সিআইএর জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো করে তুলল। খবর বিবিসি ও এএফপির।
৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত মার্কিন সিনেটের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির প্রতিবেদনে সিআইএর নৃশংস জিজ্ঞাসাবাদ কৌশলের বিষয়টি প্রকাশিত হলে নিন্দার ঝড় ওঠে। কিন্তু চেনি ও সিআইএর বর্তমান পরিচালক জন ব্রেনানসহ কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে সিআইএর পক্ষেই সাফাই গাইছেন। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে সিআইএ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার সন্দেহভাজন জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় এসব কৌশল ব্যবহার করে। ওই সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডিক চেনি। এনবিসি টেলিভিশনের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে চেনি বলেন, ‘আমি মনে করি, জিজ্ঞাসাবাদের ওই কৌশল ব্যবহারকারী সিআইএ কর্মকর্তাদের প্রশংসা করা উচিত। বিশেষ পদক দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করা উচিত।’ সিনেট কমিটির প্রতিবেদনে সিআইএর নৃশংস জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল আদৌ কাজে লেগেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু চেনি এই প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই কৌশল কাজে লেগেছে। অবশ্যই কাজে লেগেছে।’ এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে চেনি সিনেট কমিটির প্রতিবেদনকে ‘বাজে কথা’ বলেও আখ্যা দেন।

শ্রদ্ধা ভালবাসায় শহীদদের স্মরণ

বিজয়ের ৪৩তম বার্ষিকীতে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরযোদ্ধাদের। যাদের আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ভূখন্ড, নিজস্ব মানচিত্র। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শেরে বাংলা নগরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে বিজয়ের দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৬টার পর প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে সেই মুক্তিসেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় সালাম জানায়। শহীদদের স্মরণে বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। পরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসাবে দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আবারো স্মৃতিসৌধে ফুল দেন শেখ হাসিনা। এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরে স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। পতাকা আর ফুল হাতে জনতার ঢল নামে সৌধ প্রাঙ্গণে। মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। এদিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেখানে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা । সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়া স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি যান জাতীয় সংসদ সংলগ্ন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। বিজয় দিবস উদযাপনে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সশস্ত্রবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদকে সশস্ত্র সালাম ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ শুরু হয়। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে কুচকাওয়াজের উপ-অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেনের নেতৃত্বে সকল বাহিনীর সদস্যরা কুচকাওয়াজের জন্য প্রস্তুত হন। কুচকাওয়াজে অংশ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), বিজিবি, পুলিশ বাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, মহিলা পুলিশসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা। প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ ও সশস্ত্রবাহিনীর মহড়া উপভোগ করেছেন প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ, দশম জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক প্রমুখ। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ কুচকাওয়াজ ও মহড়া দেখতে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সমবেত হন। বিজয় দিবসে সাধারণ ছুটির দিনে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উড়ছে। প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো সাজানো হয়েছে জাতীয় পতাকা ও রঙ-বেরঙের পতাকায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় রাতে আলোকসজ্জায় করা হয়। এ দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। বেতার ও টেলিভিশনেও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হচ্ছে।

নারী চালাবেন, নারীই চড়বেন

একটি শি ট্যাক্সির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন চালক। গত
শুক্রবার ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় কোচি শহর থেকে তোলা ছবি। রয়টার্স
ভারতের পরিবহনব্যবস্থা নারীর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার সর্বশেষ উদাহরণ ট্যাক্সিচালকের হাতে এক নারী ধর্ষণ। নারীর জন্য নিরাপদ পরিবহনের ব্যবস্থা করে দিতে এখন পর্যন্ত দেশটি অক্ষমই বলা চলে। তবে এবার একটা সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছে  কর্তৃপক্ষ: নারীদের জন্য নারীচালিত ট্যাক্সি। খবর রয়টার্সের। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালা গত বছর চালু করে ‘শি ট্যাক্সি’। এর আওতায় ছিল গোলাপি রঙের ৪০টি ট্যাক্সি, যার সবগুলোর চালকই নারী। পাশাপাশি এসব ট্যাক্সিতে রয়েছে তারহীন গতিবিধি শনাক্তের যন্ত্র ও একটি বিশেষ বাটন, যেটি কল সেন্টারগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে ট্যাক্সিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নয়াদিল্লিতে বেসরকারি উবের ট্যাক্সি সার্ভিসের একটি ট্যাক্সিতে ৫ ডিসেম্বর চালকের হাতে এক নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর কেরালার ওই সার্ভিসকেই মডেল হিসেবে গ্রহণ করছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ওই রকম ট্যাক্সি সার্ভিস সারা দেশেই চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। ‘শি ট্যাক্সি’র প্রধান নির্বাহী পি টি এম সুনিশ এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দিল্লির ঘটনা সারা দেশেই ‘শি ট্যাক্সি’ চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিয়েছে।  শি ট্যাক্সি’ ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ট্রিপে ২৪ হাজারের মতো যাত্রী আনা-নেওয়া করেছে। আর চাহিদা অনুযায়ী ট্যাক্সি নেই। কারণ, এখন পর্যন্ত ট্যাক্সির জন্য যতজন কল করেছে, তাদের প্রায় অর্ধেকই খালি হাতে ফিরেছে। সাত মাস ধরে ‘শি ট্যাক্সি’ ব্যবহার করছেন ২৫ বছর বয়সী অশ্বথী শ্রীকুমার।
কাজ শেষে প্রতিদিনই মধ্যরাতে বাড়ি ফেরা এই প্রযুক্তিকর্মী ‘শি ট্যাক্সি’ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, ‘আমি নিরাপদ বোধ করি। পরিবারও নিশ্চিন্ত থাকে। যখন পাই না, তখন আমার উদ্বিগ্ন বাবা-মা ফোন দিতেই থাকেন।’ ভারতে ক্রমবর্ধমান যৌন অপরাধের কারণেই রাজ্যগুলো ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নারীচালকদের দিয়ে ট্যাক্সি সার্ভিস চালুর দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে শিক্ষার্থী ‘নির্ভয়া’ ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাওয়ার পর নারীচালিক ট্যাক্সি সার্ভিসের কদর বাড়ছেই। যৌন-সংশ্লিষ্ট অপরাধ রুখতে ভারত সরকার কঠোর সব আইন পাস এবং অধিকতর পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তা অকার্যকরই প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, ভারতের গণপরিবহন নারীদের জন্য বিশ্বের চতুর্থতম বিপজ্জনক গণপরিবহন। রাতের বেলা যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা প্রশ্নে তা দ্বিতীয়। ২০১০ সালে মুম্বাইয়ে প্রিয়দর্শিনী ট্যাক্সি সার্ভিস চালু করা সমাজকর্মী সুশিবেন শাহ বলেন, ‘উবের ট্যাক্সিতে নারী ধর্ষণের ঘটনা এই ধারণাই জোরালো করেছে যে, ট্যাক্সির চালক নারী হলে আপনি নিরাপদ। এ বিষয়ে লোকজন এখন আরও বেশি আগ্রহী হবেন।’ তবে সমালোচকেরা বলছেন, অধিকতর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাই সঠিক পথ। সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের পরিচালক রঞ্জনা কুমারী বলেন, ‘কেউ না বুঝেশুনে একটা পথ বলে দেয়, আর সরকার সব সময়ই তাতেই নাচে। আইনশৃঙ্খলা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কোনোমতেই এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।’

রাজধানীতে শিবিরের ‘বিজয়’ র‌্যালী

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে র‌্যালী করেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর বসুন্ধরা গেট থেকে পতাকা শোভিত র‌্যালিটি শুরু হয়ে কুড়িল বিশ্বরোডে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক শাহীন আহমেদ খান ও শাখা সভাপতি আনিসুর রহমান বিশ্বাস সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। এসময় তারা কারাগারে আটক সকল জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর মুক্তি দাবি করেন। র‌্যালীতে অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারী তারিক হাসান, দপ্তর সম্পাদক জামিল মাহমুদ, ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক রুহুল আমিন খাঁন, অর্থ সম্পাদক আশিকুর রহমান আসিফ, শিক্ষা সম্পাদক আব্দুল হালিম, প্রশিক্ষণ সম্পাদক আইয়ুব আলী, ফাউন্ডেশন সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম শাকিল, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক হোসাইন অপু, সমাজসেবা সম্পাদক গোলাম সারোয়ার, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক মোহাইমেনুল নঈমসহ প্রায় দেড়শতাধিক নেতকর্মী অংশ নেন ।

কৈলাসের আহ্বান

কৈলাস সত্যার্থী।
শিশুশ্রম বন্ধে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা একটি বিল পাস করতে ভারতের পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ভারতীয় কৈলাস সত্যার্থী। গতকাল সোমবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বছরের নোবেলজয়ী কৈলাস এ আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, এ বিল পাস না করলে পার্লামেন্ট সদস্য ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের ইতিহাস ক্ষমা করবে না। ভারতীয় শিশুদের কাছেও তাঁরা ক্ষমা পাবেন না। কৈলাস আরও বলেন, তিনি শিশুশ্রমকে ‘ইতিহাসের পাতায়’ পাঠাতে চান। এনডিটিভি

ঐতিহ্য- গয়ঘর খোজার মসজিদ by আকমল হোসেন

প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক গয়ঘর খোজার মসজিদ। ৫০০ বছরের বেশি আগে নির্মিত এ মসজিদ নিয়ে লোকমুখে ছড়িয়ে আছে নানা কাহিনি। কিন্তু অপরিকল্পিত সংস্কারকাজে এর স্থাপত্যকলা বিনষ্ট হওয়ার পথে। মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গয়ঘর গ্রামে একটি টিলার মতো স্থানে খোজার মসজিদের অবস্থান। দেয়ালের শুভ্র রঙে দূর থেকেও জ্বলজ্বল করে মসজিদটি। এর মেঝে ও গম্বুজে টাইলস লাগানো। তিনটি বড় দরজা ও ছয়টি ছোট দরজা। ভেতরে পূর্ব দিকের স্তম্ভে ‘বাঘের পায়ের ছাপ’। স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস, এ মসজিদ যখন নির্মাণ করা হচ্ছিল, তখন ঘন জঙ্গলে পূর্ণ ছিল এ এলাকা। বিচরণ ছিল বাঘের। হয়তো সে সময়ই কোনো বাঘ মসজিদের কাঁচা দেয়ালে থাবা বসিয়েছিল। কয়েক শ বছর ধরে টিকে আছে সেই চিহ্ন। দেয়ালের ওপরের দিকে আরবি লেখা; ফুল-লতার ছবি আঁকা। পশ্চিমের দেয়ালে কৃষ্ণ পাথরের বহু পুরোনো একটি শিলালিপি। চুরি ঠেকাতে লোহার খাঁচার বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে এতে। দেয়ালের ইটের গাঁথুনি অনেক পুরু। মূল মসজিদ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ২৪ হাত করে। গম্বুজ ১৮ ফুট উঁচু। ঐতিহাসিক ও সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থাপনা হওয়ায় অনেক মানুষই দেখতে আসেন মসজিদটি। অনেকে একে গায়েবি মসজিদও বলে থাকেন। স্থানীয় লোকজন জানান, মসজিদের বাইরে দুটি বড় কষ্টিপাথর ছিল। প্রচলিত আছে, এগুলো রাতের আঁধারে ঘোরাফেরা করত। তাই মানুষ পাথর দুটিকে মনে করত জীবন্ত। পাথরে হাত দিয়ে অনেকে সে হাত লাগাতেন মুখে-বুকে। ভক্তি করে পাথর ধোয়া পানিও খেতেন। পাথর নিয়ে হেলাফেলা করলে সেগুলো কেউ তুলতে পারতেন না। একটি পাথর একসময় ‘মারা গেলে’ সেটি পাশের দিঘিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। অপরটি পরে চুরি হয়ে যায়। খোজার মসজিদ নির্মাণ করা হয় সুলতান বরবক শাহের ছেলে সুলতান শামসউদ্দীন ইউছুফ শাহর আমলে। হাজি আমীরের পৌত্র ও সেই সময়ের মন্ত্রী মজলিস আলম ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন এটি। সিলেটের হজরত শাহজালালের মসজিদ ও খোজার মসজিদের শিলালিপিতে উল্লে­খ থাকা মজলিস আলম একই ব্যক্তি। মসজিদ দুটি নির্মিত হয়েছিল চার বছরের ব্যবধানে। খোজার মসজিদের নামকরণ নিয়ে পরিষ্কার তথ্য মেলে না। তবে প্রচলিত আছে, মানসিংহের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে পথে পাঠান বীর খাজা উসমান মসজিদটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই থেকে খাজা নামের অপভ্রংশ ‘খোজা’ থেকে এর নামকরণ। মসজিদ কমিটির সাবেক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, ১৯৩৮-১৯৪০ সালের মধ্যে আজম শাহ নামের একজন কামেল পীর এ মসজিদে আসেন। ১৯৪০ সালের দিকে মসজিদের গম্বুজ ভেঙে পড়ে। তখন তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টাকা সংগ্রহ করে হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে ইসমাইল মিস্ত্রি নামে পরিচিত একজনকে দিয়ে সংস্কার করান। ১৯৬০ সালে আরও একবার মসজিদটি সংস্কার করান তিনি। সংস্কারের পর আজম শাহ চলে গেলে এটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ঝোপজঙ্গলে ছেয়ে যায় স্থান। গম্বুজে বটের চারা, লতাপাতা গজিয়ে ওঠে।  জয়নাল আবেদীন আরও জানান, ১৯৮৪ সালের পর অপরিকল্পিতভাবে সংস্কার শুরু হয় এ মসজিদের। মুসল্লিদের স্থান সংকুলান হয় না বলে পূর্ব দিকে মসজিদের জায়গা বাড়ানো হয়। প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবে যথাযথ রীতি মেনে যেভাবে এর সংস্কার দরকার ছিল, তা করা হয়নি। ১৯৯৩ সালে মসজিদটি সংরক্ষণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। পরে লোকজন এসে মাপজোখ করে যান। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। এখন মসজিদের পুরোনো সৌন্দর্যের অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটি সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। উদ্যোগ না নিয়ে থাকলে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বে- নির্মাণকাজে ভাগ বসায় ছাত্রলীগ by একরামুল হক ও তাসনীম হাসান

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৫২ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে আরও ১০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষের পথে। ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক দুই সাধারণ সম্পাদকের কড়া ‘নজর’ রয়েছে এসব উন্নয়নকাজে। দরপত্র আর ঠিকাদারি কাজ থেকে প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিতেই বারবার বিরোধে জড়াচ্ছে দুই নেতার অনুসারী দুটি পক্ষ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের নেতা-কর্মী, পুলিশ ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে যে পক্ষ একচেটিয়া প্রভাব খাটাতে পারে, তারাই সব সুবিধা ভোগ করে। এ নিয়েই একের পর এক সংঘর্ষে জড়াচ্ছে দুই পক্ষ। সর্বশেষ গত রোববার গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ছাত্রলীগের কর্মী তাপস সরকারকে।
ছাত্রলীগের একটি সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক দুই সাধারণ সম্পাদকের স্বার্থের দ্বন্দ্বে সংগঠনের বিরোধ মিটছে না। তাঁরা ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন (চাঁদা) আদায় করছেন। ঠিকাদারি কাজের সাব-কন্ট্রাক্ট (ঠিকাকাজ, তবে জোর করে) ভাগিয়ে নিচ্ছেন।
আর তাঁদের হয়ে সাধারণ কর্মীরা বুঝে না-বুঝে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। একের পর এক সংঘর্ষের কারণে গত জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ বলেন, এই সরকারের আমলে শতাধিক কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। কোটি কোটি টাকার কাজ চলমান আছে। প্রাচীর নির্মাণের জন্য আগামী মাসে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। এসব কাজে অনেকের স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কারণে দ্বন্দ্ব-বিবাদ যে হচ্ছে না, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে কলা ভবন এবং ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল নির্মাণের কাজ চলছে। এর আগে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে জীববিজ্ঞান অনুষদ ভবন, ছয় কোটি টাকায় জিমনেসিয়াম (ব্যায়ামাগার) ও ১৩ কোটি টাকায় শেখ হাসিনা ছাত্রী হল নির্মাণের কাজ শেষ হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর এসব কাজ শুরু হয়ে। আগামী মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য আরও ১০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক উন্নয়নকাজ হচ্ছে। সেখানে চাঁদাবাজি বা কমিশন খাওয়ার ধান্দা যদি হয়, সেটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। আমাদের সহযোগিতা চাইলে পুলিশ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না।’
ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি পক্ষের একটি হচ্ছে সিএফসি (চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার) ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির হায়দার বাবুল। ভিএক্স (ভার্সিটি এক্সপ্রেস) নামে পরিচিত অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য মঞ্জুরুল আলম।
ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, মঞ্জুরুল-এরশাদের বাড়ি ক্যাম্পাস থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মদনহাটে। আর নাসির হায়দারের বাড়ি ক্যাম্পাস থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে ইসলামিয়া হাট এলাকায়। গত ৫ মে ক্যাম্পাসে ভিএক্স পক্ষের নেতা-কর্মীরা লাঞ্ছিত করেন নাসির হায়দারকে।
এ বিষয়ে সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ পক্ষের নেতা ও বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন মামুন বলেন, ‘আমরা দেড় বছর ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলাম। ক্যাম্পাসে কোটি কোটি টাকার কাজ কারা করেছে, কী কাজ করেছে, তা-ও জানি না। সিনিয়ররা কী করেছেন, তা-ও আমরা বলতে পারি না।’
ভিএক্স পক্ষের নেতা ও ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির দপ্তর সম্পাদক জালাল আহমেদ বলেন, ‘সিনিয়র ভাইয়েরা কী করেন, তা আমরা জানি না। এসব টেন্ডার-ফেন্ডারের সঙ্গে আমরা জড়িত না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান দুটি নির্মাণ প্রকল্পের একটির ঠিকাদার নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কাজ শুরুর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা দরপত্র থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করেন তাঁর কাছে। কমিশন না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করতে হয়। এ জন্য নাসির হায়দার বাবুলকে দায়ী করেন ওই ঠিকাদার। নাসির হায়দার বাবুল ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তবে নাসির হায়দার বাবুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা দেড় বছর ক্যাম্পাসের বাইরে ছিল। আমাদের কোনো ছেলে ঠিকাদার থেকে চাঁদা বা কমিশন দাবি করেনি। মঞ্জুরুল আলম ভাই ও এরশাদ হোসেনের ছেলেরা দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করেন। আগামী মাসে আরও ১০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। সেই কাজের কমিশনও তাঁরা পকেটে ভরতে চান। তাই আমাদের ছেলেকে খুন করে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে।’
নাসির হায়দার বলেন, তাপস সরকারের খুনিরা চাঁদবাজ-সন্ত্রাসী। তারা ক্যাম্পাসের দরপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য হত্যাকাণ্ডের মতো এই অপরাধ করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে এরশাদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তিনি মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।
মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘শহরে আমার ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। ক্যাম্পাসের ঠিকাদারদের কাছ থেকে আমি কেন চাঁদা বা কমিশন নেব?’ তিনি বলেন, ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি পক্ষই তাঁর স্নেহভাজন। সবাইকে মাস খানেক আগে তাঁর বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন। কেবল নাসির হায়দার বাবুল আসেননি।

একই সঙ্গে একটি ইতিহাস

ছদ্মনাম তারামন বিবি। একটি বীরত্বপূর্ণ নাম। একই সঙ্গে একটি ইতিহাস। জন্ম ১৯৫৭ সালে। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে। বাবা আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বেওয়া। তার এক ছেলে এক মেয়ে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন নানা ভূমিকায়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য আরও একজন বীর নারী ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পান। তিনি হলেন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম। তারামন বিবি ১১নং সেক্টরে নিজ গ্রাম কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরে ছিলেন। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। যিনি তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে ক্যাম্পে রান্নাবান্নার প্রস্তাব দেন। প্রথমে তারামনের মা কুলসুম বেওয়া এতে রাজি হননি। পরে মুহিব হাবিলদার তারামনকে ধর্মমেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপরই তারামনকে দশঘরিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে রান্নার কাজে পাঠাতে রাজি হন তার মা। তখন তারামনের বয়স ছিল ১৪ বছর। কিন্তু পরবর্তীতে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালানো শেখান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা বর্ণনা করে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বীর প্রতীক তারামন বিবি বলেন, এছাড়াও দীর্ঘ নয় মাসের অসংখ্য ঘটনার মাঝ থেকে স্মৃতি হাতড়ে জানালেন একদিনের সরাসরি যুদ্ধের ঘটনা। ঘটনা ছিল ঠিক মধ্য দুপুরের। সবাই খেতে বসেছে। তারামনকে পাকিস্তানি সেনাদের কেউ আসছে কিনা তা দেখার জন্য বলা হলো। তারামন সুপারি গাছে উঠে দূরবীন দিয়ে চারদিকে লক্ষ্য রাখছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, পাক বাহিনীর একটি গানবোট তাদের দিকে আসছে। সবার খাওয়া বন্ধ। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে অ্যাকশনের অপেক্ষা করতে লাগলেন সবাই। তারামন তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। সেদিন তারা শত্রুদের পরাস্ত করতে সক্ষম হন। এরপর তারামন অনেক যুদ্ধে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ নেন। অনেকবার তাদের ক্যাম্প পাকবাহিনী আক্রমণ করেছে, তবে ভাগ্যের জোরে তিনি প্রতিবার বেঁচে যান। শুধু সম্মুখ যুদ্ধই নয়, নানা কৌশলে শত্রুপক্ষের তৎপরতা এবং অবস্থান জানতে গুপ্তচর সেজে সোজা চলে গেছেন পাকবাহিনীর শিবিরে। কখনও সারা শরীরে কাদামাটি, চক, কালি এমনকি মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত লাগিয়ে পাগল সেজেছেন তারামন। চুল এলোমেলো করে বোবা সেজে পাকসেনাদের সামনে দীর্ঘ হাসি কিংবা কান্নার অভিনয় করেছেন। কখনও প্রতিবন্ধী কিংবা পঙ্গুর মতো করে চলাফেরা করে শত্রুসেনাদের খোঁজ নিয়ে এসেছেন নদী সাঁতরে গিয়ে। আবার কলাগাছের ভেলা নিয়ে কখনও পাড়ি দিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। জান-মানের কথা না ভেবেই এসব দুঃসাহসী কাজে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য।

নরসিংদীতে ছাত্রলীগ নেতাসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নরসিংদীতে সাংবাদিকদের মারধর ও হামলার ঘটনায় পলাশ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনির মোল্লাসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলায় আহত চ্যানেল নাইন ও মানব কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আইয়ুব খান সরকার বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় এ মামলা করেন। ‘এমপি পোটনের বাসায় আত্মগোপনে পলাশের হামলাকারীরা’ শিরোনামে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন ছিল হট অব দ্য ডিসট্রিক্ট। সরকারি কাজে বাধা প্রদান ও অবৈধ সংযোগের মূল হোতাদের এমপির বাড়িতে আশ্রয় দেয়ায় জেলাজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। বেলা ১০টার মধ্যে পত্রিকা বিক্রি শেষ হয়ে যায়। হকারদের কাছে পত্রিকা না পেয়ে পলাশ, পাচদোনা ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকার দৈনিক যুগান্তরের ফটোকপি বিক্রি হয়। সাংবাদিকদের করা মামলার অন্য আসামিরা হল- জেলা বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ উপজেলার গজারিয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে সজিব হোসেন, একই উপজেলার উত্তর টেঙ্গরপাড়া গ্রামের আবদুল লতিফের ছেলে তুহিন ও তিতাস গ্যাসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শাহজাহান এন্টারপ্রাইজের মালিক সদর উপজেলার বদরপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন খানের ছেলে শাহজাহান খানসহ অজ্ঞাত ১৫ জন।মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার বেলা ১১টায় নরসিংদী সদর উপজেলার ভাটপাড়ায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এই সংবাদ পেয়ে সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও ধারণের সময় আসামিরা লোহার পাইপ ও লাঠিসোটা নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। এতে চ্যানেল নাইন ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আইয়ুব খান সরকার, চ্যানেল ২৪-এর ক্যামেরাম্যান লক্ষ্মণ বর্মণ ও সময় টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান কাউছার হোসেন আহত হয়। একই সঙ্গে সংবাদকর্মীদের তিনটি ক্যামেরা লুট ও একটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়।এদিকে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিনিধি দল আজ সরেজমিন তদন্ত করতে ভাটপাড়ায় যাবে। প্রতিনিধি দল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাধারণ মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে।মামলার বাদী আহত সাংবাদিক চ্যানেল নাইন ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আইয়ুব খান সরকার বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যেভাবে আমাদের ওপর হামলা হল তা নরসিংদীতে নজিরবিহীন ঘটনা। একই সঙ্গে তারা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশসহ তিতাসের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীরা কেন এখনও গ্রেফতার হয়নি সেই প্রশ্নই সব শ্রেণী-পেশার মানুষের।নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কাসেম বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সাংবাদিকদের হামলার ঘটনায় তিতাস ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশের দুটি বিশেষ দল ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই অভিযুক্তদের গ্রেফতারের সংবাদ দিতে পারব।বুধবার নরসিংদী সদর উপজেলার ভাটপাড়া এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হামলা চালিয়েছে গ্রামবাসী। হামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, পুলিশ, আনসার ও তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাসহ ২০ জন আহত হয়েছে। এ সময় সংবাদকর্মীদের তিনটি ক্যামেরা লুট ও একটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়। সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে বৃহস্পতিবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করেছে সাংবাদিকরা।

গণতন্ত্রের সব স্পেস সংকুচিত হচ্ছে : ফখরুল

নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। এ উপলক্ষে শুক্রবার সকালে নেতাকর্মীদের নিয়ে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দিবসটি উপলক্ষে এদিন ভোরে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয় এবং গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সংবাদপত্রে ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে বিএনপি। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে। সকালে জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে আজ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। গণতন্ত্রের সব স্পেস সরকার সংকুচিত করে ফেলেছে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তারা ধ্বংস করে ফেলেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই পথ- খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অবৈধ সরকারকে সরিয়ে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা।’তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে, বিএনপির কাছে স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ওই সময়ে জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। দেশপ্রেমিক সৈনিক ও জনতা ৭ নভেম্বর তাকে সেনানিবাসের বাসা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সেদিন জিয়ার মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই ‘দেশের স্বাধীনতা রক্ষা পায়’ বলেও দাবি করেন তিনি।জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব কেড়ে নিতে ক্ষমতাসীনদের দাবি প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ফখরুল বলেন, এটা ক্ষমতাসীনদের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক, তিনি একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এটা চিরন্তন সত্য। তার নেতৃত্বেই ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছিল। জিয়া কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।মাজার জিয়ারতের পর বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন খালেদা জিয়া। জিয়া সাংস্কৃতিক সংস্থা (জিসাস) মাজার প্রাঙ্গণে রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, এমকে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, উপদেষ্টা শাহজাহান ওমর, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, রুহুল কবির রিজভী, ফজলুল হক মিলন, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, নাজিম উদ্দিন আলম, খায়রুল কবীর খোকন, শিরিন সুলতানা, হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।এ ছাড়া বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে দলটির নেতাকার্মীরা জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।এদিকে বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বাকশালী কবরাস্থানের ওপর বহুদলীয় গণতন্ত্রের বাগান তৈরি করেছিলেন বলেই জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ অবিরাম কটূক্তি করছে। জিয়াকে এত ভয় ও জ্বালার কারণ- আওয়ামী লীগ যা পারেনি, জিয়া তা পেরেছিলেন বলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল তাদেরই। তারা দিতে পারেনি। জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ড্যাবের উদ্যোগে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ‘শহীদ জিয়া ও গণতন্ত্র’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের নানা বক্তব্যের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নাসিম সাহেব বলেছেন, জিয়া নাকি ক্ষমতায় বসার পর সৈনিকদের হত্যা করেছেন। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। ১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর পর থেকে ৭ নভেম্বরের পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছিল- তখন আওয়ামী লীগ নেতারাই ক্ষমতায় ছিলেন। তাদেরই মন্ত্রিসভা ছিল।’সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক একেএম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ড্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, আবদুল মান্নান মিয়া প্রমুখ বক্তব্য দেন।

লোপাট লাখ লাখ টাকা নেপথ্যে দলীয় কর্মীরা

কোনো প্রকার ইজারা না দিয়ে খাস আদায়ের নামে প্রায় ৪ বছর ধরে লুটপাট চলছে বরিশাল নগরীর ৩টি সিটি টোল গেটে। গত মেয়রের সময় শুরু হওয়া এই পদ্ধতি বহাল রয়েছে এখনও। টোল গেটসংলগ্ন এলাকাগুলোর দলীয় নেতাকর্মীদের পকেট ভারি করার জন্যই যেন দুর্নীতির এই প্রকাশ্য পন্থা। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরনের আমলে এসব গেটের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্ষমতাসীন দলের দখলে। আর বর্তমান বিএনপি সমর্থিত মেয়র আহসান হাবিব কামালের আমলে নিয়ন্ত্রণ বদল হয়ে তা চলে গেছে তার দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে। এসব সিটি টোল গেট দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করা সব পণ্যবাহী যানবাহন থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় হলেও তার খুব সামান্যই জমা হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের ফান্ডে। বাকি টাকার পুরোটাই লোপাট করছে গেটের দখলে থাকা দলীয় নেতাকর্মীরা। নগর ভবনের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিখিল চন্দ্র দাস অবশ্য বলেছেন, খুব শিগগিরই এগুলো ইজারা দেয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হবে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ যে আসলে নেই তা স্বীকার করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর ভবনেরই হাটবাজার শাখার একাধিক কর্মকর্তা।
মরহুম শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকাকালে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করেই বরিশাল নগরীর ৩টি প্রবেশ পথে টোল গেট বসায় নগর ভবন। সিটি টোল নামে এই ৩টি গেট থেকে পণ্যবাহী ভারি ও হালকা যানবাহন থেকে শুরু হয় যথাক্রমে ৫০ এবং ৩০ টাকা করে আদায়। শুরু থেকেই কোনো প্রকার ইজারা দেয়া ছাড়াই এসব টাকা সরাসরি আদায় করতে থাকে সিটি কর্পোরেশন। মূলত এই আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। সিটি কর্পোরেশনের একজন করে প্রতিনিধি টোল পয়েন্টগুলোতে থাকলেও বলতে গেলে তিনি থাকেন সাক্ষীগোপাল। সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে নেতাকর্মীদের মাধ্যমে। কোন আইনি প্রক্রিয়ায় এই টোল আদায় শুরু করে নগর ভবন তা নিয়ে অবশ্য বির্তক রয়েছে। এই সংক্রান্ত কোনো বিধি-বিধান যে আজ পর্যন্ত আসেনি তা স্বীকারও করেছেন টোল আদায়সংক্রান্ত বিভাগের সুপারিনটেন্ডেন্ট। হাটবাজার শাখার দায়িত্বে থাকা নুরুল ইসলাম নামের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত সিটি টোল গেট পরিচালনাসংক্রান্ত কোনো বিধিমালা আমরা পাইনি।’ বিধিমালা না পেয়ে কি করে আপনারা টোল নিচ্ছেন জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।নগরীর ৩টি প্রবেশ দ্বার ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গড়িয়ার পাড়, বরিশাল-ঝালকাঠি সড়কের কালীজিরা এবং বরিশাল-কুয়াকাটা আন্তঃমহাসড়কের রুপাতলী এলাকায় স্থাপিত এই ৩টি সিটি টোল গেট থেকে ইজারা বাবদ আদায় হওয়া টাকা এবং এর বিপরীতে নগর ভবনের ফান্ডে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়ে শুরু থেকেই উঠে বির্তক। আদায় হওয়া অর্থের সিকিভাগও সিটি কর্পোরেশন পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠতে থাকে বারবার। কিন্তু সব জেনেও যেন চুপ হয়ে থাকেন কর্মকর্তারা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নগর ভবনের এক কর্মকর্তা বলেন, ইজারাবিহীন এই প্রক্রিয়ায় আদায় হওয়া অর্থের প্রায় পুরোটাই যেন নেতাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ দিয়ে দেন রাজনৈতিক দল সমর্থিত মেয়র। যে কারণে এই বিষয়ে আর কেউ কিছু বলার সাহস পাননি। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে হারেন শওকত হোসেন হিরন। তার এই পরাজয়ের পরপরই বদলে যায় সিটি টোলের দখলি স্বত্ব। রাতারাতি এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় নবনির্বাচিত মেয়র আহসান হাবিব কামালের দল বিএনপির নেতাকর্মীরা। নেপথ্যে তাদের সঙ্গে থাকেন সিটি কাউন্সিলররাও। মেয়র বদল হওয়ার পর সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো টেন্ডারের মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে ইজারাদার। বছরের পর বছর ধরে চলা অবৈধ প্রক্রিয়াটিকে করা হবে বৈধ। কিন্তু তেমন কোনো লক্ষ্মণ দেখা যায়নি গত দেড় বছরেও। দখলের হাতবদল ছাড়া আর সবকিছুই চলছে ঠিক আগের মতো। সেই সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে লুটপাটের ধারা।নগর ভবনের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গড়িয়ার পাড় এলাকায় থাকা টোল গেট থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ৪/সাড়ে ৪ হাজার টাকা জমা হয় সিটি কর্পোরেশনের ফান্ডে। রুপাতলী থেকে আসে ৮০০ থেকে ১৫শ’। কালীজিরা থেকে ১ হাজার টাকার বেশি জমা হয় না কখনোই। অথচ সরেজমিন এসব স্পটে গিয়ে দেখা গেছে, ৩টি টোল পয়েন্টে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ কম করে হলেও ৩৭ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩০/৩৩ হাজার টাকাই প্রতিদিন হয়ে যাচ্ছে লোপাট। ধান-চাল কিংবা তরমুজের মৌসুমে যখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ট্রাক আসে দক্ষিণে তখন যার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ হাজারে। যদিও মৌসুমের এই প্রকারভেদে কখনোই বাড়ে না নগর ভবনের ফান্ডে জমা হওয়া সিটি টোলের পরিমাণ। বাড়ে কেবল নেতাকর্মীদের পকেটে ঢোকা টাকার অংক। সিটি টোল আদায়ের ৩ পয়েন্টের ৩টিরই খুব কাছে রয়েছে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের ৩টি শাখা অফিস। সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এসব অফিসের মাধ্যমে আদায় করা হয় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা। সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী ট্রাক থেকে এই চাঁদা আদায় করে শ্রমিক নেতারা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একই ট্রাক থেকে সিটি টোলের টাকা উঠলেও দু’পক্ষের আদায়ের হিসাবে থাকে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রুপাতলীসংলগ্ন দপদপিয়া জিরো পয়েন্টে থাকা শ্রমিক ইউনিয়ন অফিসের এক নেতা বলেন, বর্তমানে ডালসিজন চলছে পরিবহন সেক্টরে। তারপরও প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুইশ’ ট্রাক পার করে এই সড়ক। সেই হিসাবে কেবল ভারি ট্রাক থেকেই সিটি টোল বাবদ আদায় হওয়ার কথা গড়ে ১০ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে ছোট পরিবহন আর স্থানীয় পর্যায়ে থাকা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী যানবাহন তো রয়েছেই। সেখানে যদি সরকারি ফান্ডে দৈনিক মাত্র হাজার/পনেরশ’ টাকা জমা হয় তাহলে সহজেই অনুমেয় যে বাকি টাকা কোথায় যায়।রুপাতলী পয়েন্টের মতোই গণহারে অর্থ লোপাটের তথ্য মেলে গড়িয়ার পাড় আর কালীজিরা পয়েন্টে। গড়িয়ার পাড় পয়েন্টে থাকা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, দৈনিক কম করে হলেও ৪ থেকে ৫শ’ পণ্যবোঝাই যানবাহন ঢোকে বরিশালে। এই মহাসড়ক ধরেই যেহেতু যেতে হয় পটুয়াখালী, ভোলা এবং বরগুনা জেলায় তাই চাপটাও বেশি। এই হিসাব ধরলে সিটি টোল বাবদ আদায় হওয়ার কথা কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা। অথচ এই পয়েন্ট থেকে কখনোই সাড়ে ৪ হাজার টাকার বেশি জমা হয় না নগর ভবনের খাতায়। বরিশাল নগরীতে থাকা প্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপ খান সন্স, অপসোনিন, অমৃত লাল দে অ্যান্ড কোং এবং লিভার ব্রাদার্সের ডিপোসহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে যানবাহন প্রতি দৈনিক ১ বার সিটি টোল দিতে হয় আমাদের। আর সবগুলো প্রতিষ্ঠানের যৌথ হিসাব করলে কম করে হলেও ১৫০ গাড়ির দৈনিক টোল দিই আমরা। কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যের এই দেড়শ’ গাড়ির টোল বাবদ আদায় হওয়া টাকাও যদি জমা হতো তাহলেও বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি টাকা পেত নগর ভবন। দৈনিক এভাবে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোপাটের সুযোগ করে দিয়ে ৪৩ মাসে নগর ভবনকে হারাতে হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। বৈধ ইজারা পদ্ধতি চালু না করায় যা বাড়ছে প্রতি দিন। অথচ বৈধ ইজারা দিলে হয়তো এভাবে লুটপাটের আর সুযোগ থাকত না। পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘খাস আদায় পদ্ধতিতে বর্তমানে সিটি টোলের টাকা আদায় হচ্ছে। সেখানে আমাদের লোকজনও আছে। তবে খুব শিগগিরই এগুলো ইজারা দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি আমরা। খাস আদায়ের নামে লুটপাট বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিযোগ এলে এবং তার প্রমাণ মিললে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নববধূকে রেখে যুদ্ধে

আজাহার কমান্ডার নববধূকে রেখে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে ২৭ বছরের তরুণ যুবক মো. আজাহার আলী খান যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তিনি বললেন, যুদ্ধের কথা মনে হলে মনটা ঘরে থাকতে চায় না। মনে হয় যুদ্ধে চলে যাই। তিনি বলেন, দিন তারিখ মনে নেই, ১৯৭১ সালে বিয়ে করেছি। তার দেড় মাস পর আমতলীর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বেসামরিক প্রশাসন প্রধান মরহুম আফাজ বিশ্বাসের প্রেরণায় ঘরে নতুন বউ রিজিয়া বেগমকে রেখে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমতলীর মুক্তিযোদ্ধা আফাজ বিশ্বাস, হাতেম সুবেদারসহ কয়েকজন আমরা আগাঠাকুরপাড়ায় আশ্রয় নিই। কিন্তু পাকহানাদার বাহিনী আমাদের আশ্রয় নেয়ার কথা শুনে অ্যাটাক করে এবং আমাদের দলের দু’জনকে খবর দিয়ে নিয়ে যায়। ওই জায়গা থেকে কোনরকমে প্রাণে বেঁচে বুকাবুনিয়া থেকে অস্ত্র এনে কলাপাড়ার কাউয়ারচর এলাকায় চলে যাই। সেখানে পাকসেনাদের অ্যাটাক করি। তখন বাধ্য হয়ে ৩৫ জন পাকসেনা প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদ ও ৪টি গানবোটসহ আত্মসমর্পণ করেন। তিনি বলেন, ‘দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পাই। ঘর দুয়ার নাই, বুড়া হইয়া গেছি, এখনও কাম কইরা খাই। আমার একটা ঘর নাই। ছাপরা দিয়া থাকি। এত বড় বন্যার পর অনেক মানুষে ঘর-দুয়ার পাইছে। আমারে কেউ কিছু দেয়নি।’ আমতলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জি এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, আজাহার কমান্ডার একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যেভাবে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তা জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আজাহার কমান্ডার হেরে গেছেন অভাবের কাছে। অভাব নিত্যদিন তাকে তাড়া করছে।

কাত্তরে গোপনে পতাকা তৈরি করতেন আবু বক্কর

একাত্তরের যুদ্ধ চলছে। চারদিকে বর্বরতা। অগ্নিঝরা সময়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে গোপনে তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের পতাকা। রাজশাহী শহরের এবং বাইরের সব পতাকাই তার হাতে তৈরি। উড়ছিল ওই সময় চারদিকে। এই সাহসী যোদ্ধার নাম আবু বক্কর। বয়সের ভারে আজ তিনি নুইয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন নগরীর গণকপাড়া এলাকায় খোলা আকাশের নিচে সেলাই মেশিন নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। ছয় ছেলে ও পাঁচ মেয়ে নিয়ে তার অভাবের সংসার। এক সময় তার নিজস্ব টেইলার্স থাকলেও মামলা সংক্রান্ত সময় তা খোয়া যায়।  সূত্রমতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারের পাশাপাশি জীবন বাজি রেখে মুক্তি সংগ্রামের প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিলেন শ্রমজীবী মানুষরা। এ সময় রাজশাহীতে বিভিন্ন এলাকা প্রতিদিন হাজার হাজার পতাকা উড়েছে। পুলিশের ধাওয়া ও গুলির মুখে পতাকা হাতে মিছিল করেছেন রাজশাহীর সংগ্রামী জনতা। তাদের সেই সংগ্রাম সফল হয়েছে। তবে এই পতাকা তৈরির পেছনের কারিগরদের খোঁজ কেউ রাখে না।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে গভীর রাতে নগরীর ভুবনমোহন পার্ক এলাকায় ইউরেকা টেইলার্সের দরজা বন্ধ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পতাকা তৈরি করতেন যুবক বয়সী কারিগর আবু বক্কর। তখন তিনি ২২ বছরের টগবগে তরুণ। টেইলার্সটির মালিক ছিলেন সিরাজ উদ্দিন। অনেক আগেই তিনি মারা গেছেন। পাননি কোন সম্মাননা। পতাকা কারিগর আবু বক্কর সিদ্দিকও এখন বয়সের ভারে ও দারিদ্র্যের ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত। পাকসেনারা পতাকা কারিগর আবু বক্করকে ধরেতে স্বাধীনতা লাভের কয়েকদিন আগে হানা দেয়। কিন্তু সেদিন আবু বক্কর ফুটবল মাঠে থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। আজ সেদিনের তরুণ আবু বক্কর বার্ধক্যের কাছে পরাজিত। ছেলে-মেয়েদের মুখে আহার তুলে দিতে দিনরাত সেলাই মেশিনে আওয়াজ তুলছেন। জীবনযুদ্ধে কোনভাবে হার মানতে নারাজ তিনি।
পতাকা কারিগর আবু বক্কর সিদ্দিক মানবজমিনকে জানান, এখন আর কেউ খোঁজ-খবর রাখেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলো ‘ইউরেকা টেইলার্সে’ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিটিং করতো। সে সময় কোন প্রত্যাশা ছিল না। দেশের প্রতি ভালবাসা থেকে রাতের আঁধারে পতাকা তৈরি করেছেন। এখন বয়স হয়েছে, শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। নিজস্ব একটি টেইলার্স দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় তাও খোয়া যায়। সে সময় অনেকেই আশার বাণী শুনিয়ে ছিলেন। সরকারের পর সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু তার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। শেষ বয়সে এসে তিনি স্বীকৃতি চান। যদি তার ছেলেদের কারও চাকরির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতেন।

‘ভিক্ষা করে খাইয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের’

মাহামুদা খাতুন। বয়সের ভারে অনেকটা নুইয়ে পড়েছেন। তার ওপর চলে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতন। সবকিছু মিলে মাজার ব্যথায় ছটফট করেন প্রায় সময়। ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। ঘরে নেই দু’বেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান। নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। নেই প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র। তাই অনেক দিন খড়কুটোর আগুন পোহায়ে পার করে দেন রাত। স্বামী বীরযোদ্ধা খোরশেদ মোল্যা মারা গেছেন মাস দু’য়েক আগে। অনেকটা বিনা চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিজের বসতভিটার এক কোণে এ যোদ্ধাকে সমাহিত করেন তার সারা জীবনের সঙ্গী গেরিলা যোদ্ধা মাহামুদা। যে দেশের জন্য খোরশেদ আর তার সহধর্মিণী মরণপণ লড়াই করেছিলেন, সে দেশে তাদের কবর দেয়ার মতো একখ- ভূমি নেই। তাই অগত্যা লাশের সৎকারে নিজের একখ- বসতভিটার এক কোণকে বেছে নেন মাহামুদা। যশোর শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার উত্তরে মধুগ্রামের অবস্থান। সদর উপজেলার এ গ্রামটি বর্তমানে লিচুর জন্য বিখ্যাত। এ গ্রামের শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। শহরতলিতে গ্রামটির অবস্থান হলেও এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা সেকেলে। গ্রামের অর্ধেকেই এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। ঝোঁপ-জঙ্গল আর বাঁশবাগানে ভরা এ গ্রামের উত্তরপাড়ায় মাহামুদা খাতুনের বাড়ি। বাড়ি বলতে যা বোঝাই তেমনটি আসলে নয়। কাঁচা রাস্তার পাশে বড় বড় বাঁশঝাড়ের আড়ালে ছোট্ট দুটি খুপড়ি ঘর। এর একটি মাহামুদা খাতুন নাতিপুতিদের নিয়ে থাকেন। আর অপরটিতে বাস করেন নয়া ছেলে শহিদুল আর তার ৪ সন্তান। বাকি ৩ ছেলে অভাব-অনটনে গ্রাম ছেড়েছেন। ছোট ছেলে রংমিস্ত্রির কাজ করে মাকে খাওয়ায়। মাহামুদা খাতুনের ৫ মেয়েই সংসারী। তবে অভাব তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। অভাবের কারণে ২ মেয়ের ৪ ছেলেমেয়েকে কাছে রেখে মানুষ করছেন বিধবা মাহামুদা। একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা মাহামুদা খাতুনের এখন আর ভিক্ষার বয়স বা সামর্থ্য নেই। একাত্তরে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধের পাশাপাশি ১০ গ্রামে ভিক্ষা করে বীরযোদ্ধাদের খাইয়েছেন মাহামুদা। নিজের ছেঁড়াছোটা শাড়ি পরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরের বাইরে নিয়ে গেছেন। অন্ধকারে টর্চ লাইট জ্বেলে মুক্তিযোদ্ধাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে গেছেন এ বীরযোদ্ধা। সরাসরি সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। শত্রুর ফেলে যাওয়া অস্ত্র কুড়িয়ে জমা রেখেছেন। পরে তা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দিয়েছেন শত্রু দমনের জন্য। মাহামুদা খাতুন এসবই করেছেন দেশের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের জন্য। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশের মাটিতে উড়ছে জাতীয় পতাকা। কিন্তু মাহামুদার পরনে কাপড় জোটেনি। পেটে জোটেনি ভাত। অর্থাভাবে সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। যুদ্ধের পর স্বামী খোরশেদ ফিরে যান নিজের পেশা ইটভাটায় শ্রম দিতে। অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে না পারা মাহামুদার ৫ ছেলে সবাই দিন মজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বড় তিন ছেলে অভাবের কারণে গ্রাম ছেড়েছেন। নয়া ছেলে রিকশা চালায় যশোর শহরে। আর ছোট ছেলে রংমিস্ত্রির কাজ করে বৃদ্ধ মা আর ৩ ভাগ্নে-ভাগ্নিকে খাওয়াচ্ছেন। গত ৫ই ডিসেম্বর সকালে খুঁজতে খুঁজতে এই প্রতিবেদক হাজির হন মাহামুদা খাতুনের বাড়িতে। একটি কুঁড়ে ঘর দেখিয়ে একজন বললেন, এই হচ্ছে মাহামুদা খাতুনের বাড়ি। সামনের অংশে কলার পাতার বেড়া। ভেতরে প্রবেশ করতেই বোঝা গেল দেশের কোটি কোটি ছিন্নমূল মানুষের মতোই মাহামুদা খাতুনের জীবন।
১৯৭১ সালে মাহামুদা খাতুন ছিলেন ৩ সন্তানের মা। স্বামী খোরশেদ ইটের ভাটায় জোন খাটে। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মাস খানেক পরে একদিন রাতে গুলি, বন্দুক নিয়ে ৭-৮ জন যুবক ছেলে মধু গ্রামের বাঁশতলায় এসে হাজির। চারদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ টর্চ লাইটের আলো মারতে মারতে তারা ঢুকে পড়ে খোরশেদের বাড়িতে। সে সময় খোরশেদ ভাটায়। প্রথমে কিছুটা ভয় পেয়ে যান মাহামুদা। পরক্ষণেই সাহস করে ঘর থেকে বের হয়ে জানতে চানা, আপনারা কারা? পাল্টা উত্তর, আমরা মুক্তিফৌজ। প্রাণে পানি ফিরে পেলো মাহামুদা। এর পরের গল্প আরও গা ছমছমে। একটু পরে আরও ৫-৬ জন বাড়িতে ঢোকে। সবার হাতে অস্ত্র। সবাই মাহামুদার কুঁড়ে ঘরের বারান্দায় অস্ত্র রেখে হাত-মুখ ধুয়ে বারান্দায় বসে থাকেন। তাদের চেহারা দেখে মাহামুদা বুঝতে পারেন তাদের খাওয়া হয়নি। কিন্তু তার ঘরে খাবার নেই। ঘরে ছোট্ট ছোট্ট তিনটি শিশুপুত্র। লজ্জায় পড়েন তিনি। কিছু বলতেও পারছেন না। অনেকটা নিরুপায় হয়ে মাহামুদা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরের বারান্দায় বসিয়ে রেখে সেই রাতে বের হয়ে যান। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে ভাত আর তরকারি চেয়ে এনে ওই রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ান। খাওয়া শেষে সেই কুঁড়ে ঘরের বারান্দা আর খড়ের গাদার মাচায় শুয়ে পড়েন ক্লান্ত যোদ্ধারা। বোঝা গেল বেশ কয়েক রাত তাদের ঘুম হয়নি। একদিকে ভয়, অন্যদিকে এক অজানা আতঙ্কে সারা রাত কাটে মাহামুদার। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কেটে যায় প্রথম রাত। পর দিন সকাল ১০টায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ চলে যায় কনেজপুরে। মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার শেখ রবিউল আলমের নেতৃত্বে রাজেক আহম্মেদ, গাজী আবদুল হাই, কামাল আহম্মেদ, আলী হোসেন মনি, ইউসুফ, ইব্রাহিম, নজরুল, বাবর, কেরামত, জহুর, খায়রুলসহ কয়েকজন থেকে যান মধু গ্রামে। তারা সারা রাত অপারেশন করতেন। ভোর রাতে ফিরে এসে মাহামুদার সেই কুঁড়ে ঘরে ঘুমাতেন। নিজের ঘরে মুক্তিসেনাদের রেখে মাহামুদা বের হতেন ভিক্ষা করতে। আশপাশের ১০ গ্রাম ঘুরে ভিক্ষা করার পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানি সেনাদের খবর এনে মুক্তিসেনাদের দিতেন। পর দিন সেভাবে তারা অভিযান চালাতেন। এভাবে দীর্ঘ ৯ মাস মাহামুদা মুক্তিযুদ্ধে গেরিলার ভূমিকা পালন করেছেন। ভিক্ষে করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়েছেন। তাদের রক্তমাখা জামাকাপড় পরিষ্কার করেছেন। অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে গেছেন। প্রথম প্রথম খোরশেদ অস্ত্র দেখে কেঁপে উঠলেও পরে স্ত্রী মাহামুদার সাহসে তিনিও সাহসী হয়ে ওঠেন। ডেপুটি কমান্ডারের কাছে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেন। নাম লেখান মুক্তিযুদ্ধে। স্ত্রী মাহামুদার সঙ্গে তিনিও যশোরসহ আশপাশের বহু যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মাহামুদা স্মৃতি হাতড়ে বলেন, পাঁচবাড়িয়া, কনেজপুর, চুড়ামনকাটি, বাহাদুরপুর, মনোহরপুরসহ কয়েকটি যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। মধুগ্রামে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্ত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। মাহামুদা বুকের শিশুদের নিয়ে ওই ক্যাম্পে যোগ দেন। স্বামী খোরশেদ প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে চলে যান। মাহামুদা থেকে যান ক্যাম্পে। রাত-দিন তিনি কাজ করেছেন। রাতের বেলা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। দিনের বেলায় শাড়ি কাপড় পরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ঘুরেছেন। তাদের অস্ত্র মাটির নিচে, পল গাদার নিচে লুকিয়ে রেখেছেন। ২০শে অক্টোবর এ ক্যাম্পের খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। তারা ক্যাম্পে হামলা চালায়। মাহামুদা আগে থেকে খবর পেয়ে ক্যাম্পের সব অস্ত্র ভৈরব নদের কচুরিপনার মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। পরে পাশের বাহাদুরপুরে পাকিস্তানি সেনারা ২৭ গ্রামবাসীকে গুলি করে মারে। প্রাণে রক্ষা পান মুক্তিযোদ্ধারা। ২৭শে অক্টোবর সালতাযুদ্ধে মান্নান আর আসাদ নামে ২ মুক্তি সেনা শহীদ হন। ওই যুদ্ধে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। পরে ৫ই ডিসেম্বর মধু গ্রামে মুক্তিসেনাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের একটি বড় লড়াই হয়। সে লড়াইয়ে মুক্তি সেনারা অস্ত্রশস্ত্রসহ ১০ জন পাকিস্তানি সেনাকে পাকড়াও করেন। পরে জনতার গণপিটুনিতে তারা মারা যায়। সেই লড়াইয়ে মাহামুদা খাতুনও ছিলেন। তিনি পুরো যুদ্ধে গেরিলা সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেন। এসব স্মৃতিচারণ করতে করতে মাহামুদা খাতুন আবেগে-আপ্লুত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাহামুদা খাতুন বলেন, মুর্খ আর গরিব বলে ২৯ বছর তিনি সামনে আসতে পারেননি। পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি পেয়েছেন। পেয়েছেন সার্টিফিকেট। তার স্বামী খোরশেদও জীবদ্দশায় মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি পেয়েছেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় ৫জন নিহত

হবিগঞ্জের সুতাং এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় ৫ সিএনজি অটোরিকশা যাত্রী নিহত হয়েছেন। আজ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১০জন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে ঘন কুয়াশার মধ্যে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের সুতাং এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশাটির পেছনে একটি চলন্ত ট্রাক ধাক্কা দেয়। পরে একটি হিউম্যান হলার ও ট্রাক্টর অটোরিকশাটিকে পুনরায় ধাক্কা দিলে সেটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতে অটোরিকশার ৫জন আরোহী মারা যান।

ঋণ পরিশোধে ২০২৬ পর্যন্ত সময় পেলো বেক্সিমকো


এবার দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ আরও বেশ কিছু ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন ওয়ান-ইলেভেনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যবসায়ীরা। এরই অংশ হিসেবে সমপ্রতি সোনালী ও জনতা ব্যাংকের এমন সুবিধা পেয়েছে দেশের অন্যতম শিল্প উদ্যোক্তা বেক্সিমকো গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানটিকে যথাক্রমে ২০২৫ ও ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সময় দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সমপ্রতি দেশের বেশ কিছু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক চিত্র তুলে ধরে ঋণ পুনঃতফসিলসহ সুদ কমানোর দাবি জানিয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। রাজনৈতিক বা  যৌক্তিক কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ কিছু সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন ব্যবসায়ীরা। জরিমানার অজুহাতে নামে-বেনামে অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সে সময়ে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের মামলার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাবে জুলুম- নির্যাতন করা হয়েছে। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক কর্তা সে সময় ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও নির্যাতন করে শ শ কোটি টাকাও হাতিয়ে নিয়েছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে রাজনৈতিক কারণে যে সব ব্যবসায়ী ও তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সহায়তা করতে ব্যাংক ও গ্রাহকের লেনদেন সম্পর্কের ভিত্তিতে সুবিধা দিতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী আর অর্থনীতিবিদরা।
এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ৫ই আগস্ট ঋণ পুনর্গঠন ও সুদের হার কমানোর এক প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে দেন  বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। তিনি  বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট বিভাগের ঋণের পাওনা ৫০০০ কোটি টাকা পরিশোধে ১২ বছর সময় ও সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।
বেক্সিমকো গ্রুপের এই প্রস্তাব  পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৯শে আগস্ট সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মতামত চায়। প্রস্তাবের সঙ্গে একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতামত ও সংশ্লিষ্ট নথি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়েছে বেক্সিমকো। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত ৩০শে জুন পর্যন্ত  বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ডিভিশনের ঋণের স্থিতি একীভূত করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিশোধের জন্য পুনঃতফসিলীকরণ,  কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আড়াই বছরের জন্য স্থগিত এবং সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের এই প্রস্তাব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সমপ্রতি এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন,  রাজনৈতিক বা যৌক্তিক  কোন কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হতেই পারে। আমাদের সবার জানা আছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ভাল ভাবে যাচাই করে ব্যাংক কোম্পানি আইনের মধ্যেই যা করার তা করবে। আইনের বাইরে কাউকে কোন ছাড় দিলে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়লে অবশ্যই ব্যাংক তাকে উদ্ধার করবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইদুজ্জামান বলেন, বেক্সিমকো গ্রুপ যদি ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা চায়, তা বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করতে হবে।
এই কোম্পানিটি দেশে কর্পোরেট ব্যবসা ও প্রশাসন পদ্ধতি সর্বপ্রথম চালু করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, একটি বড় গ্রুপ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে  বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যালেন্স সিট  দেখেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তা চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদনের আগে এই বিবেচনাটি সর্বাগ্রে রাখতে হবে। একই ভাবে অন্যান্য ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদেরকেও তাদের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের প্রস্তাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককেই।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন,  বিগত বিএনপি-জামায়াতের চার দলীয় জোট সরকার ও পরবর্তীতে ১/১১’র সরকারের নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিরই অংশ। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনীতিকে বিকশিত করতে তারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্যাতিত ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা দেয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন,  ব্যাংকিং খাতে এই উদ্যোগে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিই লাভবান হবে।
 বেক্সিমকো গ্রুপের ওই প্রস্তাব সংক্রান্ত চিঠিতে সালমান এফ রহমান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ গ্রহণে বাধা  দেয়াসহ ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল (প্রথমে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট ও পরে মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল) পর্যন্ত নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এতে প্রায়ই বেক্সিমকো গ্রুপকে চলতি মূলধন সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে। আর ২০০৯ সাল  থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন  কোম্পানির ঋণ শোধ করা হয়েছে। মূলত এটা আমরা করেছি ঋণ খেলাপি হওয়া এড়ানোর জন্য। এটা অস্থায়ী একটা সমাধান ছিল।
 বেক্সিমকো গ্রুপের মধ্যে  বেক্সিমকো (টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট) হলো দেশের  বেসরকারি খাতের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও পুরনো একটি প্রতিষ্ঠান। টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট ছাড়াও সিরামিক, ওষুধ, পাটসহ অন্যান্য খাতে এ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী কর্মরত আছেন। অপ্রত্যক্ষভাবে জড়িত আরও প্রায় দুই লাখ মানুষ।
গত ১০ বছরে বেক্সিমকো গ্রুপ  দেড় বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বলে চিঠিতে দাবি করেন সালমান এফ রহমান। এর আগে এ রকম ঋণ পরিশোধের সুযোগ  পেয়েছিল দেশের আরেকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ইসলাম গ্রুপ। চলতি মূলধন সঙ্কটে পড়া  কোম্পানিকে বিদেশেও এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। এছাড়াও মুন্নু গ্রুপকেও সোনালী ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা মওকুফ করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বেক্সিমকোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের আলোকে মতামত দিয়েছে জনতা ব্যাংক লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিও  বেক্সিমকো গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের ১৭৮৫  কোটি টাকা পরিশোধে ১১ বছর  মেয়াদি সুবিধা দিয়েছে। গত ৮ই ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বোর্ড সভায় নেয়া সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সময় পেয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ।
এর আগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সভায় গত ৩রা নভেম্বর  বেক্সিমকো গ্রুপকে তাদের ঋণ পরিশোধে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক নজিবুর রহমান বলেন,  বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের আলোকে সোন?ালী ব্যাংকের পর্ষদ বোর্ড সভায় বিষয়টি অনুমোদন করেছে। এই গ্রুপটি দীর্ঘ ৮ বছর রাজনৈতিক কারণে ভালভাবে ব্যবসা করতে পারেনি। তাই আমরা মনে করছি, বড় এ গ্রুপটিকে সুযোগ দিলে তারা টিকে থাকবে।
অর্থপ্রবাহ ঠিক রেখে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখতেই এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিলেই তা কার্যকর হবে।  অতীতে রাজনৈতিক কারণে এমন হয়রানির শিকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে আবেদন করলে,  তা-ও একই ভাবে মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো সোনালী ব্যাংকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে,   বেক্সিমকো গ্রুপের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিসাপেক্ষে এবং  কোম্পানির অর্থপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে বৃহদায়ক ঋণ বিশ্রেণীকরণ করে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার জন্য পুনঃতফসিল করা যেতে পারে। এ জন্য সুদের হার হবে ১০ শতাংশ।
গত ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  বেক্সিমকো গ্রুপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস বিভাগের ৫২৬৯ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করেছেন সালমান এফ রহমান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,   সোনালী ব্যাংকের মতো অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান  বেক্সিমকো গ্রুপের প্রস্তাবে একমত হলেই তা কার্যকর হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রুপটির সম্মিলিত সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, অর্থনীতিতে  বেক্সিমকো গ্রুপের বড় অবদান আছে। সেই অবদান বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এ বিষয়ে সব ব্যাংকের মতামত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে হবে। একই ভাবে আরও অন্য  যে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই সুবিধা চান, তাদের সক্ষমতাও  দেখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন,  গ্রাহকদের প্রতি ব্যাংকগুলোর সহনশীল ভূমিকা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে বিগত ১/১১ সরকারের আমলে যে সব ব্যবসায়ী নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের ঋণ পুনঃগঠনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সহানুভূতি থাকা উচিত।