Friday, April 10, 2020

প্রথম যৌনমিলন কোন বয়সে হওয়া উচিত?

বৃটিশদের যৌনতা বিষয়ক সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে যে, তরুণদের প্রধান আফসোসের বিষয় যথাযথ বয়সের অনেক আগেই প্রথম যৌনমিলন সম্পন্ন করা।
জরিপে অংশ নেওয়া কিশোর ও তরুণদের এক তৃতীয়াংশের বেশি নারী এবং এক চতুর্থাংশের বেশি পুরুষ মনে করেন যে তারা প্রথম যখন যৌন সঙ্গম করেন সেটি 'সঠিক সময়' ছিল না।
আইন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে যৌনমিলনের সম্মতি প্রদানের জন্য কোনো ব্যক্তিকে অন্তত ১৬ বছর বয়সী হতে হয়।
যুক্তরাজ্যের মানুষের যৌন আচরণ এবং জীবনধারা নিয়ে সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে ঐ বয়সে অনেকেই যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত থাকে না।
'ন্যাটস্যাল সার্ভে' নামে পরিচিত এই জরিপটি প্রতি দশকেই পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের গবেষকরা ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ৩ হাজার তরুণ-তরুণীর দেয়া তথ্য ব্যবহার করেছেন এই জরিপে।

জরিপের ফলাফল

অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া উত্তর থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০% নারী এবং ২৬% পুরুষ মনে করেন যে তাদের প্রথম যৌনমিলন 'সঠিক সময়ে হয় নি'।
এদের অধিকাংশই মনে করেন যে, কৌমার্য বা কুমারীত্ব পরিত্যাগ করার আগে তাদের আরো অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
তবে স্বল্পসংখ্যক উত্তরদাতা প্রথম যৌন সঙ্গম আরো আগে সংঘটনের পক্ষ নেন।
অধিকাংশই ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রথমবার যৌনমিলনের স্বাদ নিয়েছেন - যাদের প্রায় অর্ধেক নিজেদের ষোড়শ বর্ষের শেষদিকে যৌন সঙ্গম করেছেন।
এক তৃতীয়াংশের প্রথমবার ছিল তাদের বয়স ১৬ বছর হওয়ার আগেই।

ইচ্ছা ও প্রস্তুতি

জরিপে যৌনমিলনের প্রস্তুতির বিষয়টিরও ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় প্রথমবার যৌন সঙ্গম করার যৌক্তিক সিদ্ধান্তে সম্মত হতে সক্ষম কিনা - তা যাচাই করার চেষ্টা করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরুপ, সম্মতি দেয়ার সময় কোনো ধরণের মাদকের প্রভাবে না থাকা বা সঙ্গী, বন্ধুবান্ধবদের চাপে পড়ে সম্মতি না দেয়ার মতো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া হয়েছে।
জরিপে অংশ নেয়া নারীদের প্রায় অর্ধেক এবং পুরুষদের প্রায় ৪০% এই ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়।
নারীদের প্রতি পাঁচজনে একজন এবং পুরুষদের পুরুষদের প্রতি ১০ জনে ৪ জনই মনে করেন প্রথম মিলনের সময় তাদের সঙ্গী সমান আগ্রহী ছিল না। অর্থাৎ তারা মনে করেন তাদের সঙ্গীরা অনেকটা চাপে পড়েই প্রথম মিলনে সম্মতি দিয়েছিলেন।
'ন্যাটস্যাল সার্ভে'র প্রতিষ্ঠাতা কায়ে উইলিংস মনে করেন কোনো ব্যক্তি যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত কিনা তা বয়সের মানদণ্ডে যাচাই করা উচিত নয়।
"প্রত্যেক তরুণই আলাদা - কেউ ১৫ বছর বয়সেও যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত হয়, আবার অনেক ১৮ বছর বয়সীও প্রস্তুত না থাকতে পারেন", বলেন মি. উইলিংস।
সহ-গবেষক মেলিসা পামার বলেন, "আমাদের পাওয়া তর্থ বিশ্লেষণ যাচাই করে ধারণা করা যায় যে, প্রথম যৌনমিলনের সম্মতি দেয়ার ক্ষেত্রে উঠতি বয়সী তরুণদের চেয়ে তরুণীরা অপেক্ষাকৃত বেশি চাপের মধ্যে থাকে।"
তিনি বলেন তরুণ-তরুণীরা যেন প্রথম যৌনমিলনের ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ও নিরাপদ যৌন সঙ্গমের নিশ্চয়তা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে স্কুলগুলোর যৌনতা বিষয়ক পাঠ্যসূচি সাজানো প্রয়োজন।

কখন সঠিক সময়?

আপনি যদি মনে করেন যে আপনার যৌন সঙ্গমের সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে আগে নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন।
  • আমি কি সঠিক কাজ করতে যাচ্ছি?
  • আমি কি আমার সঙ্গীকে ভালোবাসি?
  • আমার সঙ্গীও আমাকে সমান পরিমাণ ভালোবাসে?
  • যৌন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমি কি সঙ্গীর সাথে সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা করেছি? আলোচনা কি যথাযথ ছিল?
  • যৌন মিলনের ক্ষেত্রে হঠাত মত পরিবর্তন হলে যে কোনো সময় কি আমি 'না' বলতে পারবো? সেই সিদ্ধান্তে আমি ও আমার সঙ্গী দুজনেই কি সন্তুষ্ট থাকবো?
এই সব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে হয়তো আপনি যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নিচের কোনো প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি প্রস্তুত নাও হতে পারেন:
  • আমি কি আমার সঙ্গী বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে কোনো ধরণের চাপ অনুভব করছি?
  • যৌনমিলনের পরে কী আমার মধ্যে কোনো ধরণের আক্ষেপ জন্ম নিতে পারে?
  • আমি কি আমার বন্ধুদের সাথে তাল মিলাতে যৌন সঙ্গম করার কথা চিন্তা করছি?
  • আমি কি আমার সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যৌনমিলনে আগ্রহী হচ্ছি? 
যুক্তরাজ্যের মানুষের যৌন আচরণ এবং জীবনধারা নিয়ে সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী তরুণ-তরুণীদের অনেকেই মনে করেন তাদের প্রথম যৌনমিলন 'সঠিক সময়ে হয়নি'।

গল্প- হাসপাতালের গান by মাসুম বিল্লাহ

জুনের এক বিষণ্ণ দিন। চারিদিকে গুমোট বাতাস। অস্বস্তি বাড়ছে। আভার মন চাইছে আকাশ মুখ ভার করুক, কালো মেঘে ছেয়ে যাক পৃথিবী, ভেঙে-চুরে বৃষ্টি নামুক মাটির বুকে। ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়ে যাক পৃথিবীর অবাঞ্ছিত ধুলো-বালি, বাদামের খোসা, সিগারেটের শেষ অংশ, জন্মবিরতীকরণ পিলের প্যাকেট, থুতুসহ যাবতীয় জঞ্জাল! গাছের পাতা আবার সবুজ হয়ে উঠুক, শেষ কবে বর্ষার জলে স্নান করেছিল প্রিয় জারুল ভুলে গেছে, গতকাল নয়, গত পরশুও নয়, মনে পড়ে না। আভার মন বলে বৃষ্টি তুমি সব ধুয়ে নিতে পারো না, মানুষের বুকের ভেতরটা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে পারো না, পারো না হাসপাতালের দুঃখ মুছে দিতে, কান্না মুছে দিতে পারো না, তুমি কিচ্ছু পারো না!
বৃষ্টির ছাট তার মুখে এসে লাগতেই চোখ মেলে আভা, ঝুমবৃষ্টি নেমেছে হাসপাতালের উত্তর দিকের জানালায়। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয় সে। তার ভালো লাগছে। হাসপাতাল তার সবচেয়ে অপ্রিয় একটা জায়গা। এখানে প্রথম যে বার রোগী দেখতে এসে বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছিল, তার বুক কেঁপে উঠেছিল। সর্বত্র মানুষের করুণ হাহাকারের ছবি, অসহায়-উৎকণ্ঠায়, অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর মুখ দেখে বুক ভার লাগে তার, হাসপাতালের অদ্ভুত গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল প্রায়; ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল সেদিন। মনে প্রার্থনা ছিল, সৃষ্টিকর্তা যেন হাসপাতালে তাকে আর না আনেন। নিয়তি তার কথা রাখেনি, আভাকে আবার হাসপাতালে এনেছে এবং এখানে দিন-রাতের পুরোটা সময় হাসপাতালেই কাটাতে হচ্ছে। আভার বাবা খুব অসুস্থ, বাড়িতে আর কেউ নেই বলে শেষমেশ বাবাকে নিয়ে তাকেই ছুটতে হলো। জীবনের এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। রোগী ভর্তি। ট্রলি। ট্রলির মালিক হাসপাতাল নয় অন্য কেউ। হাসপাতালের বারান্দা অথবা বেড। তারপর বেডের দালাল। টাকা। ডিউটি নার্সদের রুম।…
একটু হাফ ছাড়ার ফুসরত পায় আভা। তবু চারপাশের বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ মানুষের বেদনাভরা মুখ, রোগীকে ঘিরে থাকা পরিবার-পরিজনদের গোপন অশ্রু দেখতে হচ্ছে তাকে। সে মনে মনে বলল কেউ যদি জীবনকে চিনতে ও বুঝতে চায় সে যেন কমপক্ষে এক দিন-এক রাত সুস্থ শরীরে হাসপাতালে কাটায়। এই একদিনে আভা অনেক বড় হয়ে গেছে। বড়দের মত চিন্তা করছে, দায়িত্ব পালন করছে, সে নিজেও অবাক; পরিবেশ-পরিস্থিতি মানুষকে কত পাল্টে দেয়।
তার ভাবনার দুয়ারে টোকা পড়ল। তার বাবা আসাদ সাহেব ক্ষণিকের ঘুম থেকে জাগলেন। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। একদিনেই তার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় তিনি কুঁকড়ে উঠছেন ক্ষণে ক্ষণে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, আভা রে, মা রে, আমার জান তো বের হয়ে গেল…
জানালার পাশ থেকে সরে এল আভা। বাবার কপালে হাত রেখে ভারি গলায় বলল, আব্বু, সব ঠিক হয়ে যাবে, আপনি একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেন…
ঘুমাতে পারি না রে, মা!
আভা কিছু বলল না। উঠে দাঁড়াতেই আসাদ সাহেব ক্ষীণস্বরে বলেন, কোথায় যাচ্ছিস একা একা? বেশি দূরে যাস না।
ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আসছি।মিথ্যে বলল আভা। যাতে বাবা একটু স্বস্তি পান।
ক্লান্ত পায়ে সামনে এগিয়ে গেল। সযত্নে চোখ নিচে নামিয়ে রেখেছে, যাতে অসুস্থ মানুষের চোখে চোখ না পড়ে। সে সইতে পারে না। হঠাৎ কি হলো তা সে নিজেও জানে না, ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সামনের একটি বেডের কাছে। তার বাবার বয়সী একজন শুয়ে আছেন। প্রচন্ড মমতায় মানুষটির হাত ছুঁয়ে বলল, এখন কেমন আছেন, চাচা?
মানুষটির ঠোঁটের কোণে স্ফীত হাসির রেখা ফুটে উঠল। তবে মলিন মুখের আবহে কোনো পরিবর্তন হলো না। আভা আবার বলল, একদম চিন্তা করবেন না, সুস্থ হয়ে যাবেন। সে আর ওখানে দাঁড়ায় না। পাশের বেডে উঁকি দেয়। জানতে চায়, কী হয়েছে?
রোগীর স্ত্রী চড়া গলায় বলে, স্টুক (স্ট্রোক) করছেন উনি। এখনো হুঁশ ফিরে নাই, কবে ফিরবো ডাক্তারও কইতে পারে নাই।
আভা বলে, চিন্তা করবেন না, ভালো হয়ে যাবে। তারপর ঘুরে পাশের বেডের দিকে এক পলক চেয়ে সামনে এগিয়ে যায়। এ সময় পেছন থেকে এসে সামনে দাঁড়ায় একজন বাবা, তারপর কাতরকণ্ঠে বলে, আপনি কি ডাক্তার? আমার ছেলেরে একটু দেখবেন?
মুহূর্তে আভা লজ্জায় পড়ল। সে কঁাঁপাকণ্ঠে ‘না না’ করে ওঠে। আমার আব্বুকে নিয়ে এসেছি, ওই যে ৮ নম্বর বেড। তারপর দ্রুত পায়ে ফিরে আসে। তার বাবা ঘুমে। ঘুম ভাঙাতে চাইল না সে। পাশের বেড এখনো ফাঁকা। নতুন রোগী আসেনি। সাদা চাদর এখন হলদে রং ধারণ করেছে, গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। তবুও পা ঝুলিয়ে বসল আভা।

শরীর যেন ভেঙে আসছে। জেগে থাকা ছাড়া অন্য সুযোগ নেই। এখন কয়টা বাজে ঘড়ি না দেখে বোঝার উপায় নেই। হাসপাতালের দিন-রাত সমান। সন্ধে সাড়ে সাতটা। এখনো পুরো রাত পড়ে আছে। অসহ্য। প্রচন্ড অসহ্য লাগছে এ পরিবেশ, আবার বাবার জন্যেও খারাপ লাগছে। সে স্থির হয়ে থাকার চেষ্টা করল। প্রতিদিন মানুষের এক রকম যায় না। আজকের রাতটা অন্যরকম। যদিও বেদনাভরা, দুশ্চিন্তা ভরা। এছাড়া ফেলে আসা রাত তো সে কোনো রকম ঝুটঝামেলা ছাড়াই পার করে এসেছে। এই যেমন বাইরের হাসি-আনন্দ, আলো ঝলমলে পৃথিবীর সঙ্গে হাসপাতালের পরিবেশ পুরো বিপরীত। নিশ্চয়ই হাসপাতালের কথা ভেবে বাইরের মানুষ তাদের হাসি-আনন্দ থামিয়ে দেয় না, উচিতও নয়। হাসি-কান্না নিয়ে তো মানুষের জীবন। হাসপাতালে না এলে এমন করে হয়ত কখনো ভাবা হতো না।
সামনের বেডে একটি ছেলেকে নিঃশব্দে বাবার পাশে বসে কাঁদতে দেখছে আভা। ছেলেটি একটু পর পর বিড়বিড় করছে আর উপরে মুখ তুলছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না ছেলেটি তার বাবার জন্য প্রার্থনা করছে ঈশ্বরের নিকট। আভারও চোখ ভিজে উঠল। তার বাবাও অসুস্থ। ডাক্তারও বলেছেন রিপোর্টগুলো তো খারাপ আসছে। সেও সারাদিন ঈশ্বরকে বলেছে, আমার বাবাকে ভালো করে দিন…
হঠাৎ এক বৃদ্ধ আভার সামনে এসে দাঁড়াল। বাম হাতে ভেজা চোখ মুছে নেয় আভা। বৃদ্ধ বলল, এখানে একটু বসব মা?
আভা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, হ্যাঁ।
তুমি না বসলে তো আমিও বসতে পারি না। বোসো তোমার বাবার জন্য মন খারাপ, ওই ছেলেটিরও তার বাবার জন্য মন খারাপ…
আপনার কে অসুস্থ? আভা জানতে চাইল।
হাসপাতালে আমার কেউ নেই, আমি একা এবং নিঃসঙ্গ। যন্ত্রণাময় জীবন।
বাড়ি যান না?
আমার নিজের বাড়ি নেই, তবে সবার বাড়ি যাই, সবখানে ঘুরে বেড়াই… মানুষের কান্না দেখি, বিলাপ দেখি, আহাজারি দেখি…আবার হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরা মানুষের হাসি মুখ দেখি দেখে ভালো লাগে। অথচ প্রতিদিন রাতে-দিনে এখানে একজন-দুইজন করে মানুষ মরে যায়, আজ রাতেও এখানে থেকে দুইজন মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাবে…ওই ছেলেটির বাবা আর একজন তোমার পাশ থেকে…
কী বলছেন আপনি! কে আপনি? চিৎকার করে ওঠে আভা। বুক কাঁপছে তার। তখন আসাদ সাহেব ক্ষীণস্বরে আভাকে ডাক দিলেন আভা-আভা…
কী হয়েছে আব্বু?
আসাদ সাহেবের শরীরে তাপ নেই, নিশ্চুপ হয়ে আছেন, আভা ডিউটি ডক্টরের রুমের দিকে ছুটে গেল। ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারল না, ডাক্তার বলল, যান, আসছি। আভাকে অসহায় দেখাল। ফিরে আসার পথে লোকজনের জটলার সামনে তাকে থামতে হলো এক ভদ্রলোক ‘অজ্ঞান পার্টির’ কবলে পড়ে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আভা দ্রুত এখান থেকে তার বাবার কাছে ফিরে এল। এসে দেখে পাশের বেডে নতুন রোগী উঠেছে। বয়স্ক একজন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, শরীর বরফ…
এ সময় ডাক্তার এলেন, জুনিয়র, তবে আন্তরিক। প্রেশার মেপে বললেন, প্রেশার তো খুবই কম। ওষুধ লিখে দিচ্ছি…
ডাক্তার চলে যেতে আভা বাবার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। পাশের রোগীর অবস্থা সুবিধের নয়, আভা নিজেকে স্বাভাবিক করল, চারপাশে ভিড় জমে গেছে। বেডে এক পাশে সরে বসতেই পাশের বয়স্ক লোকটা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলÑআভা একটি বরফের হাত ধরল যেন, লোকটি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আভা, মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ভালো হয়ে যাবেন…
লোকটির স্ত্রী, দুই ছেলে, বড় ছেলের বন্ধু ছুটোছুটি করছেন; ডাক্তার আসছে, ওষুধ দিচ্ছেন, নার্স আসছে, যাচ্ছে…

রাত বারোটার ঘরে। এ সময় লম্বা রুমটা কেঁপে উঠল কারোর চিৎকারে। তারপর কান্নার রোল উঠল। ভারি হয়ে উঠল হাসপাতালের বাতাস। আশপাশের মহিলাদের ছুটোছুটি লেগে গেল। ওই ছেলেটির বাবা মারা গেছেন!
আভার বুক হালকা হয়ে গেল। বৃদ্ধের কথা মনে পড়ল সত্যি হলো! চারপাশে খুঁজল, বৃদ্ধকে কোথাও দেখতে পেল না। বাবার পাশে সেটে রইল সে। বাবার মুখের দিকে তাকাতেও তার ভয় লাগছে। তখন আসাদ সাহেব মেয়ের কাছে জানতে চাইলেন, কাঁদছে কে? কী হয়েছে?
স্বামীর অসুখ বেশি তো তাই স্ত্রী কাঁদছেন! -মিথ্যে বলল আভা।

রাত বাড়ে। কান্না বাড়ে। রাত দুটোর মিনিট তিনেক পর পাশের বেডের লোকটিকে নিয়ে ফিসফিস শুরু হলো। আভা ফিরল সেদিকে। তার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে, সে লোকটির দিকে চেয়ে আছে, শেষ যন্ত্রণা ভোগ করার দৃশ্যটি দেখতে পেল একা সে। লোকটি একবার চোখ ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজলেন…তারপর… চিরদিনের জন্য থেমে গেলেন! আভার চোখ উপচে পড়ছে অশ্রুজলে, ঈশ্বর কেন তাকে এ শাস্তি দিলেন চোখের সামনে মানুষের মৃত্যুদৃশ্য দেখতে হল!

আভার আবার বৃদ্ধের কথা মনে পড়ল। বলেছিল পাশে একজন মারা যাবে। সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। মিনিট দুই পর কেউ একজন তার মাথায় হাত রাখল। মাথা তুলে তাকাতেই সেই বৃদ্ধকে দেখতে পেল। আভা কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ বললেন, পৃথিবীতে প্রাণীর জন্মই হয় মৃত্যুর জন্যে; কেউ আজ, কেউ কাল।
বৃদ্ধ আর দাঁড়ায় না। আভা তাকে দরজা থেকে বের হয়ে যেতে দেখল। তার ইচ্ছে করছে ছুটে যেতে।