Monday, October 5, 2009

কানাডায় সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনাকারীর সাত বছরের কারাদণ্ড

কানাডার পার্লামেন্ট ভবন, পুলিশ সদর দপ্তর এবং আণবিক শক্তি কেন্দ্রে ব্যাপক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করার পরিকল্পনার দায়ে ‘টরন্টো-১৮’ ইসলামিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ দিরাইকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন টরন্টো ব্রামপটনের উচ্চ আদালত। বিচারপতি ব্রুস ডুরনো তাঁর রায়ে বলেন, সোমালি বংশোদ্ভূত দিরাইয়ের অপরাধ কানাডীয় জাতীয় মূল্যবোধের মর্মমূলে আঘাত করেছে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তবর্তী একটি শহরে ২০০৫ সালের আগস্টে ট্রাকভর্তি আগ্রেয়াস্ত্র এবং অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বস্তা নামানোর সময় পুলিশের হাতে কয়েকজন সঙ্গীসহ গ্রেপ্তার হন মোহাম্মদ দিরাই। তিনি আদালতে তাঁর দোষ স্বীকার করে বলেন, আফগানিস্তানে কানাডীয় সেনার উপস্থিতির প্রতিবাদে ওই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ভিডিওচিত্রে গিলাদ শালিতকে স্বাস্থ্যবান দেখা গেছে

২০০৬ সালে অপহূত ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে ভিডিওচিত্রে ক্ষণিকের জন্য হাসতে দেখা গেছে। ছবিতে তাঁকে স্বাস্থ্যবান দেখা গেছে। শুক্রবার দুই মিনিটের ওই ভিডিওচিত্রটি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গিলাদ শালিতের (২৩) হাতে আরবি ভাষার পত্রিকা প্যালেস্টাইন। পত্রিকাটি ১৪ সেপ্টেম্বরের। ২০ ফিলিস্তিনি নারীবন্দীর মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের কাছে ভিডিওচিত্রটি হস্তান্তর করে হামাস।
এতে প্লাস্টিকের একটি চেয়ারে বসে হিব্রু ভাষায় একটি বিবৃতি পড়ে শোনান গিলাদ শালিত। এ সময় তাঁর পরনে ছিল জলপাই রঙের পোশাক। তাঁকে বেশ শান্ত দেখাচ্ছিল। গিলাদ শালিতের দাড়ি ছিল কামানো এবং চুল ছিল বেশ পরিপাটি। তিনি বলেন, অপহরণকারীরা তাঁর সঙ্গে বেশ ভালো আচরণ করেছে।
ভিডিওচিত্রে শালিত বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই আমি মুক্তির আশায় দিন গুনছি। আশা করছি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ হাতছাড়া করবে না।’

রাউলিংকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিতে আপত্তি করেছিল বুশ প্রশাসন

হ্যারি পটারের লেখিকা জে কে রাউলিং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ, কয়েকজন মার্কিন রাজনীতিক বিশ্বাস করতেন, লেখিকা রাউলিং ‘ডাকিনীবিদ্যা উত্সাহিত’ করেছেন। বুশ প্রশাসনের সাবেক একজন কর্মকর্তা এ দাবি করেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাষণ লেখক ম্যাট লাটিমার বলেন, বুশ প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য বিশ্বাস করতেন যে জে কে রাউলিংয়ের বই মায়াবিদ্যাকে উত্সাহিত করছে। যার ফলে রাউলিং কখনো প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পাননি। লাটিমারের নতুন বই স্পিসলেস: টেলস অব এ হোয়াইট হাউস সারভাইভর বইয়ে এ দাবি করা হয়েছে।
বইয়ে লাটিমার লিখেছেন, ‘সংকীর্ণ ভাবনা’র কারণে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা রাউলিংকে বেসামরিক সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, বিশ্বশান্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পদক দেওয়া হয়ে থাকে। সাহিত্যিক জন স্টেইনব্যাক ও হারপার লি এ পদক পেয়েছিলেন।

আজকের অনেক শিশুই বেঁচে থাকবে আগামী শতাব্দী পর্যন্ত

আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উন্নত দেশগুলোতে বর্তমান সময়ে জন্ম নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি শিশু নিজেদের ১০০তম জন্মদিন পালন করতে পারে। গত শুক্রবার মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্কের ডেনিশ এইজিং রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক কারে ক্রিস্টিনসেন ওই গবেষণা চালান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শতাব্দীতে অধিকাংশ উন্নত দেশে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০ বছর করে।
১৯৫০ সালে উন্নত দেশগুলোতে ৮০ বছর বয়স্ক ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ নারী এবং ১২ শতাংশ পুরুষ গড়ে ৯০ বছর করে বাঁচত। ২০০২ সালে ওই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৭ ও ২৫ শতাংশ। জাপানে ৮০ থেকে ৯০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা নারীর সংখ্যা বর্তমানে ৫০ শতাংশেরও বেশি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই শতাব্দীতে উন্নত বিশ্বে মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির ওই প্রবণতা যদি একুশ শতকেও অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০০০ সাল থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপানসহ অন্যান্য উন্নত দেশে জন্ম নেওয়া অধিকাংশ শিশুই নিজেদের ১০০তম জন্মদিন পালন করলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে গবেষণায় সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, সমাজে বয়োবৃদ্ধ মানুষের অনুপাত বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জও দেখা দিতে পারে।

আয়ারল্যান্ডের গণভোটে লিসবন চুক্তি অনুমোদন পেতে যাচ্ছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) লিসবন চুক্তির ওপর আয়ারল্যান্ডে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় দফা গণভোটের ভোট গণনা শুরু হয়েছে। জনমত জরিপ ও অনানুষ্ঠানিক বুথ-ফেরত সমীক্ষায় দেখা গেছে, নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হতে চলেছে। মাত্র ১৮ মাস আগে নেওয়া গণভোটে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেছিল আয়ারল্যান্ডের জনগণ।
নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। বিবিসির এক সংবাদদাতা জানান, গত গণভোটে ‘না’ ভোট দিয়েছিলেন এ রকম ভোটারের বড় একটি অংশ এবার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল ফিইনে গায়েলের পরিচালিত এক অনানুষ্ঠানিক জরিপ দেখা গেছে, নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আয়ারল্যান্ডের মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার কারণে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ ভোটের দিকে ঝুঁকেছেন। এ ছাড়া ইইউর সদস্য দেশগুলো আয়ারল্যান্ডের জন্য যেসব সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে, সে জন্যও ভোটাররা মত পরিবর্তন করে থাকতে পারেন।
সব সদস্য দেশ চুক্তিটি অনুমোদন না করলে এটি কার্যকর হবে না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আয়ারল্যান্ডে চুক্তিটি অনুমোদিত হলে সেটা হবে বড় ধরনের অগ্রগতি। আয়ারল্যান্ড ছাড়াও পোল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিকেও চুক্তিটি অনুমোদিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিনটি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল

যুক্তরাষ্ট্রে আরও তিনটি ব্যাংক গত শুক্রবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সে দেশে এ পর্যন্ত ৯৮টি ব্যাংক বন্ধ করে দিল সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। মার্কিন ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি) জানিয়েছে, অতিরিক্ত ঋণ ও তারল্যসংকটের কারণে মিশিগানের ওয়ারেন ব্যাংক, মিনেসোটার জেনিংস স্টেট ব্যাংক এবং কলোরাডোর সাউদার্ন কলোরাডো ন্যাশনাল ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, ওয়ারেন ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছে ওহাইওর হান্টিংটন ন্যাশনাল ব্যাংক। আর জেনিংস স্টেট ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মিনেসোটার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এ ছাড়া সাউদার্ন কলোরাডো ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা এখন থেকে ওই অঙ্গরাজ্যের লিগেসি ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা পাবেন। গতকাল শনিবার থেকে ওই তিনটি ব্যাংকের শাখাগুলো নতুন মালিকানায় পরিচালিত হওয়ার কথা।
এ তিনটি ব্যাংক বন্ধ হওয়ায় এফডিআইসির বীমা তহবিল থেকে ২৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেরিয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। একই কারণে চলতি সপ্তাহে সংস্থার তহবিল ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। তবে কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের আশা, বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব ব্যাংকের বীমা থেকে ২০০৯—১৩ সালের মধ্যে এফডিআইসির তহবিলে ১০ হাজার কোটি ডলার জমা হবে। এই সংস্থার কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ২০০৯-১০ সালের মধ্যে মার্কিন ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হবে।

সংকট সমাধানে ব্যর্থ হলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্র

জেনেভা বৈঠকে ইরান তার নতুন পরমাণুকেন্দ্র পরিদর্শন করতে দিতে রাজি হওয়ার পর এবার ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বললেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি বলেছেন, ইরান ‘আন্তরিকভাবেই’ তার নতুন পরমাণুকেন্দ্র পরিদর্শন করতে দিতে রাজি। ইরান সব সময় প্রকাশ্যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। ওই কর্মসূচির ব্যাপারে তারা কখনোই গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়নি। নতুন পরমাণুকেন্দ্রের ব্যাপারেও তারা যথাযথ সময়েই আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থাকে (আইএইএ) জানিয়েছে।
ইরান তার পরমাণু সংকট ‘কূটনৈতিকভাবে’ সমাধানে ব্যর্থ হলে মার্কিন কংগ্রেস তেহরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। মার্কিন সিনেটের ব্যাংকিং কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ক্রিস্টোফার ডড বলেছেন, ‘ইরান সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে কংগ্রেস প্রস্তুত।’ তিনি বলেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানের পরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এ ব্যাপারে আগামী মঙ্গলবার সিনেটের ব্যাংকিং কমিটিতে শুনানি হবে।
জেনেভায় গত বৃহস্পতিবার ছয় বিশ্ব-পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ গতকাল শনিবার এ ব্যাপারে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম তাদের আগের নীতি থেকে সরে আসেনি। তারা অভিযোগ করেছে, ইরান গোপনে পরমাণু কর্মসূচি চালাচ্ছে। ইরান সম্পর্কে ওই প্রচারণা মানুষের মগজে না ঢোকা পর্যন্ত পশ্চিমা গণমাধ্যম বারবার ওই অভিযোগ করে যাবে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসংক্রান্ত প্রধান আলোচক সাইদ জলিলি আবারও বলেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া ইরানের বৈধ ও নৈতিক অধিকার। ইরান এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। জেনেভা বৈঠক শেষে গত শুক্রবার দেশে ফিরে তেহরান বিমানবন্দরে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ওই বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জলিলি। তিনি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ইরানের শতভাগ বৈধ কর্মকাণ্ডেরই একটি অংশ। শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইরান এ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
জেনেভা বৈঠকের পর পরমাণু সংকট নিরসনে ওয়াশিংটন ও তার মিত্র দেশগুলো ইরানের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, এ ব্যাপারে তেহরান কালক্ষেপণ করলে তাদের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে এবং বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে।
জাতিসংঘ আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রধান মোহাম্মদ এল-বারাদির গতকাল শনিবার রাতেই ইরান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের আণবিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহির সঙ্গে তিনি সাক্ষাত্ করবেন।
ইরানের কোম নগরে একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে নতুন ওই পরমাণুকেন্দ্র স্থাপনের কথা তেহরান গত ২১ সেপ্টেম্বর চিঠি দিয়ে আইএইএকে জানিয়েছিল। জেনেভা বৈঠকে ইরান তার নতুন ওই পরমাণুকেন্দ্র পরিদর্শনে জাতিসংঘকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে।

ফিলিপাইনে আঘাত হেনেছে ‘পারমা’

ফিলিপাইনের উত্তর উপকূলে আঘাত হেনেছে টাইফুন ‘পারমা’। প্রবল বাতাসের তোড়ে উড়ে গেছে বাড়ির ছাদ, উপড়ে গেছে গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। আর ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকায় গতকাল শনিবার একটি হোটেলের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আটজনকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।
ফিলিপাইনের সরকারি আবহাওয়া ব্যুরোর প্রধান নাথানিয়েল ক্রুজ বলেন, শনিবার বিকেলে কাগায়ান প্রদেশে আঘাত হানে পারমা। কর্মকর্তারা বলেন, পারমার গতিপথ বদলে যাওয়ায় আরও একটি বড় ধরনের বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে রাজধানী ম্যানিলা। শুরুতে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে আরও উত্তর দিকে সরে গেছে পারমা।
কাগায়ান প্রদেশের রাজধানী টুগুয়েগারাও শহরের মেয়র ডেলফিন টিং বলেন, পারমার তাণ্ডবে বাড়িঘরের ছাদ উড়ে গেছে। উপড়ে গেছে গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি। স্থানীয় একটি বেতারকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, শহরের নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। লোকজনকে শহরের উঁচু জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পারমার সরাসরি গতিপথের মধ্যে পড়েছে টুগুয়েগারাও শহরটি। পারমার ছোবলে কতজন হতাহত হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি মেয়র। টুগুয়েগারাও শহরে এক লাখ ৩০ হাজার মানুষের বাস।
ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা: ইন্দোনেশিয়ার পাদাংয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের তিন দিন পর একটি হোটেলের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটজনকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তা আরকামেলভি কারমানি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটজন বেঁচে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আটকে পড়া ব্যক্তিদের একজন শুক্রবার রাত তিনটার দিকে তাঁর এক আত্মীয়ের কাছে মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্ত বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েছেন। এসএমএসে ওই ব্যক্তি উদ্ধারকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা সাবধানে খোঁড়াখুঁড়ি করুন, আমাদের ওপর যাতে ধ্বংসস্তূপ না পড়ে।’
পাদাংয়ের পুলিশপ্রধান রাফরি অমর বলেন, ‘আমাদের ধারণা, হোটেলের ভেতরে এখনো লোকজন বেঁচে আছে। তারা হয়তো হোটেলের লবি, কনফারেন্স কক্ষ কিংবা সুইমিং পুল এলাকায় আটকা পড়েছে।’
হোটেলটির ভেতরে কমপক্ষে ১০০ জন আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশিও রয়েছে।
উদ্ধার তত্পরতা জোরদার করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার তত্পরতা ব্যাহত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুতদের জন্য পৌঁছতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক সহায়তা।
মৃতের সংখ্যা বেড়েছে: টাইফুন ‘কেটসানা’র ছোবলে লাওসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪। গতকাল রেডক্রস এ কথা জানায়। আর কেটসানার আঘাতে ভিয়েতনামে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭।
সামোয়ায় সুনামির তাণ্ডবে নিহত লোকজনকে গণকবর দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার দেশটির সরকার ওই পরিকল্পনার কথা জানায়। আগামী মঙ্গলবার নিহত লোকজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন ২৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্ব চলছে

বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে গত সেপ্টেম্বর মাসে আশঙ্কার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই মাসে দেশটিতে অকৃষি খাতে দুই লাখ ৬৩ হাজার মানুষ চাকরি হারান।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন বেকারত্বের হার গত ২৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগের মাস আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে টানা ২১ মাস ধরে কর্মসংস্থানের হার কমে আসছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ থেকে গত জুলাই ও আগস্ট মাসের কর্মচ্যুতি বা বেকারত্বের পরিসংখ্যান সংশোধন করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এই দুই মাসে যত লোক বেকার হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে ১৩ হাজার বেশি হয়েছে।
২০০৭ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রবল গতিতে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হওয়ার সময় থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৭৬ লাখ থেকে এক কোটি ৫১ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছেন।
নিউজার্সিভিত্তিক স্টিফেল, নিকোলাস অ্যান্ড কোম্পানির বাজার বিশ্লেষক কেভিন ক্যারোন বলেন, ‘ভোক্তা আস্থাসূচকসহ আমরা যেসব তথ্য-উপাত্ত দেখছি, তাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিকে ধীরই বলতে হবে।’
মার্কিন অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারি খাতের কর্মসংস্থান গত বছরে ভালো ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এই সেপ্টেম্বরে দেশটিতে সরকারি খাতেই ৫৩ হাজার মানুষের চাকরি চলে গেছে। এ ছাড়া নির্মাণ, উত্পাদন ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে কর্মচ্যুতি লক্ষ করা গেছে।
মিসৌরিভিত্তিক ওয়েলস ফার্গোর উপদেষ্টা গ্যারি থেয়ার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সহসাই পুনরুদ্ধারের প্রবণতা আশা করছেন। তবে তিনি বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা গেলেও কিন্তু নিয়োগদাতাদের জন্য অধিকতর আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হতে হবে, যাতে তাঁরা আবার লোক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার

অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হই। এ ব্যবস্থা থাকবে কি না তা নিয়ে বু"িজীবী বা রাজনীতিকেরা মতামত দিলেও নিরপেক্ষ, আমজনতার মতামত জরিপের কোনো উদ্যোগ দেখছি না। অথচ এ ব্যবস্থার ভিত্তিই নির্দলীয় ভাসমান ভোটার, যারা মূলত সরকার বদলায়। প্রশ্ন হলো, এই সরকারব্যবস্থা বাতিলের সময় উপস্থিত কি না? আমরা যদি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সাহেবের অস্থায়ী সরকারকে বিচেনায় নিই, তাহলে চারটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে। প্রতিটি নির্বাচনই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। শুধু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচনকালে একজন দলীয় ব্যক্তি সরকারপ্রধান থাকলে, তিনি দলের পক্ষে পক্ষপাতের আশ্রয় নিতেই পারেন, সে জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার উ"্ভব হয়েছে।
আমরা ভাসমান ভোটাররা কেন এ ব্যবস্থার পক্ষে? এই সরকারব্যবস্থা আমাদের অল্প সময়ের জন্য হলেও মুক্তভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। অন্য সরকারগুলো শুধু দলীয় ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মনে হয় আমরা জনগণই ক্ষমতায় থাকি। যেখানে দলীয় লোকের দাপট থাকে না, থাকে না চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজদের দৌরাত্ম্য। সবকিছুই থাকে শান্ত, গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ উপদেষ্টা আমাদের বিজ্ঞ শাসনই উপহার দিয়েছেন। অন্যদিকে নগণ্য ত্রুটি ব্যতীত একেকটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচণ পাই, যাতে আমাদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থা বাতিল হলে তো কোনো নির্বাচনই আর কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনিতেই বিগত প্রত্যেক নির্বাচনে পরাজিত দল কারচুপিরর অভিযোগ এনেছে, জনগণ তা আমলে নেয়নি।
নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক, নির্বাচনের আগে বিগত দিনের মতো দলীয় কমিশনার নিয়োগ পেলে জনগণের ভোটাধিকারের কী অবস্থা দাঁড়াবে ভেবে দেখুন। এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলে আগামী চার বছরের শাসন হবে দিকহারা এবং দলীয় নেতা-কর্মীরা অতি উত্সাহী হয়ে সরকারের ভরাডুবি ডেকে আনতে পারেন। তাই এই ব্যবস্থা তত দিনই কাম্য, যত দিন আমাদের রাজনীতিকদের নৈতিকতা ও উদারতা নিয়ে জনগণের মনে প্রশ্ন উদিত হবে না।
সমাজের সুশীল সমাজকে অনুরোধ করব, তাঁরা যেন এই কাজে সময় নষ্ট না করে দেশে বিদ্যমান গুরুতর সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারকে প্রভাবিত করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখতে ভ"মিকা রাখেন। এ ছাড়া মুহূর্তের জ্বলন্ত সমস্যা যেমন: জ্বালানি সংকট, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, যার আশু সমাধানে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।
নুরুল আমিন
শিল্প উদ্যোক্তা, বনানী, ঢাকা।

বিদেশি অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিকদের ভারতে কাজে উত্সাহ দেওয়া হবে না

ভারতের নতুন ভিসানীতি অনুযায়ী এ দেশের বিভিন্ন সংস্থায় আর কাজের জন্য নতুন করে বিদেশি কোনো অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিককে উত্সাহ দেওয়া হবে না। তবে এখন যেসব বিদেশি শ্রমিক ‘বিজনেস’ ভিসা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন তাঁদের আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ভিসা পরিবর্তন করে ‘এমপ্লয়মেন্ট’ ভিসা নিতে হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এই ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া ঘোষণায় দুই প্রতিবেশী চীন ও বাংলাদেশের শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, এই দুটি দেশের প্রচুরসংখ্যক অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিক রয়েছেন ভারতে। এর মধ্যে চীনা শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে চীনের ২৫ হাজার শ্রমিক ভারতে কাজ করছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুধবার দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারতে বিদেশের প্রচুর অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
তবে পি চিদাম্বরম একথাও বলেছেন যে দক্ষ শ্রমিকের বেলায় এই নীতি প্রযোজ্য হবে না। তিনি বলেন, বহু বাংলাদেশি ও চীনের অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিক বিজনেস ভিসা নিয়ে এ দেশে কাজ করছেন। তাঁদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এমপ্লয়মেন্ট ভিসা নিতে হবে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শ্রমিকেরা পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ আরও বেশকিছু রাজ্যে। তাঁরা মূলত বিভিন্ন ছোটখাটো কারখানার শ্রমিক, মজুর ও রিকশাচালক হিসেবে কাজ করছেন।

এক মাসে প্রতি মণ পাটের দাম কমেছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত by আসিফ হোসেন,

চলতি মৌসুমের শুরুতে দেশে পাটের চড়া দাম পেয়ে কৃষকেরা খুশি হলেও গত এক মাসে প্রতি মণ পাটের দাম ৩০০ টাকা কমে গেছে।
সরকার পাট ক্রয়ের জন্য ২০০ কোটি টাকা বিজেএমসিকে বরাদ্দ দেওয়ার পর তারা বেশি দামে পাট ক্রয় করে এখন কম দামের সময় আর্থিক সংকট দেখিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। বর্তমানে বিজেএমসি-নিয়ন্ত্রিত পাটকলগুলোতে দেনার পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকা।
এদিকে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে পাট ক্রয় নিয়ে বিক্রেতাদের রয়েছে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। আর্থিক অনিয়মসহ অদক্ষ পরিচালনার জন্য সরকারনিয়ন্ত্রিত পাটকলগুলোকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সরকারিভাবে সারা দেশে ১৫টি পাটকলের জন্য ১২০টি ক্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের হাফিজ জুট মিলের ক্রয়কেন্দ্রে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রতি মণ পাটের দাম এক হাজার ৬০১ টাকা দর প্রদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে পাট ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করেন।
মৌসুমের শুরুতে সারা দেশে সাদা পাট প্রতি মণ এক হাজার ২০০ টাকা এবং তোষা পাট এক হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হওয়ায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়েছিলেন। সরকার এ সময় পাট ক্রয়ের জন্য বিজেএমসিকে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে পাট ক্রয় শুরু করলে প্রথমে বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তবে এক মাসের মধ্যে পাটের বাজারদর নিম্নমুখী হয়। এ সময় সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে অনিয়মের মাধ্যমে বেশি দরে চার লাখ মণ অতিরিক্ত পাট ক্রয় করলে দেনা বেড়ে ১০০ কোটি টাকা হয়। আর বিগত বছরের দেনাসহ বর্তমানে ২৫০ কোটি টাকা দেনা হয়ে যায়।
এদিকে সরকার নতুনভাবে পাট ক্রয় খাতে কোনো টাকা বরাদ্দ না দেওয়ায় কৃষকসহ প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র পাট ব্যবসায়ী বিপাকে পড়ে গেছেন।
গত শনিবার দেশের প্রধান পাটের মোকাম নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা, খানপুর ও হাজীগঞ্জ এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি মণ সুতিপাট ৯০০, তোষা ৯৫০ থেকে এক হাজার টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছে।
সরকারি একটি মিলের একজন পাট ক্রয় কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, বাজারমূল্যের চেয়ে ১০০ টাকা বেশি দরে তিনি নরসিংদীর একটি মিলের জন্য পাট ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে বেসরকারি পাট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির মালিক জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে মিলের কর্মকর্তারা এক হাজার ৩৫০ টাকা মণ দরে অতিরিক্ত পাট ক্রয়ের বিল করে রেখেছিলেন। বর্তমানে এক হাজার ১০০ টাকা মণ দরে পাট ক্রয় করে ফরিদপুরের একটি ক্রয়কেন্দ্রের বিল তাঁকে দিয়ে যাচ্ছে। বিলের অতিরিক্ত টাকা পরিশোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দিয়ে দেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাট বিক্রেতা আরও জানান, বিজেএমসি থেকে শুরু করে মিল পর্যন্ত বিষয়টি জানাজানি হলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এ ব্যাপারে বিজেএমসির পরিচালক (পাট) আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বিজেএমসি ৩০ লাখ মণ পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে মিল-ঘাটসহ ১২০টি ক্রয়কেন্দ্রে ১৩ লাখ মণ পাট ক্রয় করা হয়েছে। ঢাকা জোনের পাঁচটি মিলে ৪৩ ভাগ, খুলনা জোনে সাতটি মিলে ৩৮ ভাগ ও চট্টগ্রাম জোনের তিনটি মিলে ৪১ ভাগ পাট ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে বিজেএমসি মিল ঘাটে সুতি এক হাজার ৫৫ টাকা এবং তোষা এক হাজার ১০৫ টাকা দরে ক্রয় করছে। পাট ক্রয়কেন্দ্রে ঘাটের দরের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম।

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে আগ্রহী ভুটান

সার্কের অন্যতম সদস্য ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভুটান।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সফররত ভুটানের অর্থমন্ত্রী লিনোপো খান্ডু ওয়াংচুক ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ কথা জানান। তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, এফটিএ করার ব্যাপারে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক। তিনি দুই দেশের জনসাধারণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে উভয় দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআইয়ের সভাপতি জাফর ওসমান। এ সময় বাংলাদেশে ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাসো ব্যাপ কেসাং, ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সভাপতি এস এম সেকিল চৌধুরী, সহসভাপতি সিরাজউদ্দিন মালিকসহ পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।
ভুটানের অর্থমন্ত্রী লিনোপো খান্ডু ওয়াংচুক বলেন, ‘ভুটান প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগনীতি (এফডিআই) সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এটা চূড়ান্ত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ছাড়াও সরকার ইচ্ছা করলে জলবিদ্যুত্সহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে।’
ওয়াংচুক জানান, আগামী ১২ বছরে ভুটান আরও ১০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ নীতিমালা চূড়ান্ত হলে এ প্রক্রিয়ায় এ দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে অংশ নিতে পারবেন।
স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআইয়ের সভাপতি জাফর ওসমান বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুত্ রপ্তানি করার বিষয়ে ভুটান বিবেচনা করে দেখতে পারে। কারণ ভুটানে জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। তিনি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে ভুটানকে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের ওষুধ ও সিরামিক পণ্য আমদানির প্রস্তাব করেন।
জাফর ওসমান আরও বলেন, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই সামান্য। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ এক কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার পণ্য আমদানির বিপরীতে ভুটানে সাড়ে ১৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) কর্তৃক সংকলিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম হলেও দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

ত্রিপুরার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আরেকটি স্থলবন্দর চালু হচ্ছে

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়াতে ফেনীর বিলোনীয়ায় আরেকটি স্থলবন্দর আজ চালু করা হচ্ছে। এই স্থলবন্দর চালু হলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে বলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা প্রকাশ করছে।
স্থলবন্দর চালু উপলক্ষে গতকাল শনিবার ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন চেম্বারের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। এ সময় চেম্বারের অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফেনী চেম্বার ও ত্রিপুরা চেম্বারের সহযোগিতায় আইবিসিসিআই আজ রোববার স্থলবন্দর চালু উপলক্ষে বাংলাদেশের বিলোনীয়ায় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে বন্দর ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার অর্থমন্ত্রী বাদল চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী জীতেন্দ্র চৌধুরী, বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ত্রিপুরার মুখ্য সচিব লতিত কুমার গুপ্ত, ত্রিপুরা চেম্বারের সভাপতি এম এল দেবনাথ উপস্থিত থাকবেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাতলুব আহমাদ বলেন, ফেনীতে নতুন স্থলবন্দর চালু হলে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফেনীর রপ্তানিকারকেরা উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারে প্রবেশের বিশেষ সুবিধা পাবেন।
মাতলুব আহমাদ আরও বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও প্রতিবছরই বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে।
প্রথম আলোর ফেনী অফিস থেকে জানানো হয়েছে, ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ১৯তম সভায় বিলোনীয়া স্থলবন্দরের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিলোনীয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন ছয় একর ভূমিতে স্থলবন্দরের প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যারহাউস, ওপেন ইয়ার্ড নির্মাণ ও ভবিষ্যতে বন্দর সম্প্রসারণের জন্য ১৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় কার্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

দেশে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গরিবদের জন্য অপ্রতুল

বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলো দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অপ্রতুল। আর তাই সবচেয়ে গরিব মানুষদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা চালু করে তাদের অবস্থার ও সামাজিক মর্যাদার উন্নতি ঘটানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চরম দরিদ্রদের খাদ্য, আবাসস্থল ও চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে গতকাল শনিবার বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিডিআই) যৌথভাবে ‘চরম দারিদ্র্য ও উত্তরণ প্রক্রিয়া’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, চরম দরিদ্রদের অর্ধেকের বেশি সরকারি নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আসতে পারছে না। অথচ এরা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৫ শতাংশ।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সব মহলকেই এগিয়ে আসতে হবে।
দিনব্যাপী এ সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিডিআইয়ের পরিচালক সৈয়দ এম হাশেমী। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মঙ্গাকবলিত এলাকায় সরকার অস্থায়ী ভিত্তিতে পরিচালিত দুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য (ভিজিএফ) কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৪০ শতাংশ বেশি বিনিয়োগ করছে। অথচ দুস্থ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচিতে মাত্র ৪৫ শতাংশ বিনিয়োগ করছে। এটা সরকারি কর্মসূচির একটি বৈষম্য।
মঙ্গাকবলিত এলাকার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর বলেন, উত্তরবঙ্গের মঙ্গা-আক্রান্ত চারটি জেলা—কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারীতে তিন লাখ ৩৪ হাজার ২৬৫টি পরিবার মৌসুমি বেকার থাকে। এ এলাকায় এক লাখ ৮৮ হাজার ১৮১টি পরিবারের খাদ্যঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া তিন লাখ ৫৭ হাজার ৭৫টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ এবং আট হাজার ৯৩ পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত। এসব পরিবারের জন্য সরকারকে উপযুক্ত পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সর্বাত্মক সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখন গুরুত্বসহকারে চিন্তা করতে হবে, যা এখন শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। সুরক্ষা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দারিদ্র্যের প্রবাহ বন্ধ করার জন্য কাজ করতে হবে।
সেমিনারের বিভিন্ন অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড হিউম, পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মেজবাহউদ্দিন আহমেদ, ব্র্যাকের উপনির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন প্রমুখ।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগের সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচনে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালার সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, চরম দরিদ্ররা এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার পরও দারিদ্র্য থেকে যেতে পারে এবং যারা গরিব না হয়, তারাও গরিব হতে পারে। আর তা পারে নাজুকতার কারণে।

টেন্ডুলকারই প্রেরণা পন্টিংয়ের

শচীন টেন্ডুলকারের রান ১৬৯০৩। আর রিকি পন্টিংয়ের ১২০৪৩। তার পরও পরশু প্রথম অস্ট্রেলীয় হিসেবে ওয়ানডেতে ১২ হাজার রানের মাইলফলক ছোঁয়ার পর পন্টিং জানালেন, টেন্ডুলকারকে লক্ষ্য করেই ছুটে চলেছেন তিনি। টেন্ডুলকারই তাঁর প্রেরণা।
‘বসে থেকে তার যতগুলো ইনিংস আমি দেখেছি, তাতেই আমার মনে হয়েছে, অবিশ্বাস্য এক খেলোয়াড় সে (টেন্ডুলকার)। তার পরিসংখ্যান আর রেকর্ড দেখুন, টানা ২০ বছর ধরে এভাবে খেলে যাওয়া অবিশ্বাস্য। আমার মতো খেলোয়াড়দের জন্য ও একটা মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেটার পেছনে আমরা ছুটছি। ওর যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। ২০ বছর ধরে খেলে যেতে হলে আমাকে তো হুইলচেয়ারে বসে ব্যাট করতে হবে’—পরশু সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক।
পরশু ব্যাট হাতে নামার আগে পন্টিংয়ের রান ছিল ১১৯৩২। প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র অস্ট্রেলীয় হিসেবে ওয়ানডেতে ১০ হাজার রান পেরোনো পন্টিং জানালেন, ম্যাচের আগে তিনি জানতেনই না, ১২ হাজার রানের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তিনি। ফিফটি পেরিয়ে যাওয়ার পর পর পানির বোতল নিয়ে মাঠে ঢোকা সতীর্থ ডেভিড হাসির কাছেই প্রথম শুনছেন, আর কটা রান করলেই সেই কীর্তিটা হয়ে যায়, “এটা দারুণ এক অর্জন। কিন্তু এই ম্যাচের আগে আমার ধারণাই ছিল না ঠিক কত রান আছে আমার। আজ (পরশু) ডেভিড উইকেটে এসে জানাল, ‘আমি তোমাকে জানাতে চাই, তুমি ১২ হাজার রানের কাছাকাছি।”
টেন্ডুলকারের চিরায়ত সেই বাণীর মতোই বললেন, ‘এটা এমন কিছু নয় যেটি আমাকে উদ্দীপিত করে। এটা স্রেফ একটা ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান। আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি হলো দলের প্রয়োজনে কাজ করা। সেটি করতে পেরেই আমি খুশি।’ বললেন, হয়তো একদিন অবসর নেওয়ার পর নিজের ব্যক্তিগত অর্জনগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর ফুরসত মিলবে। এর আগে নয়।
মুখে যা-ই বলুন, পন্টিংয়ের এই কীর্তি অবশ্যই অনেক বড় কিছু। তাঁর আগে ওয়ানডেতে এই কীর্তি গড়েছেন মাত্র দুজন। টেন্ডুলকারের পর শ্রীলঙ্কার সনাত্ জয়াসুরিয়া (১৩৩৭৭)। রানের হিসাবে জয়াসুরিয়া এখনো তাঁর অনেক সামনে থাকলেও সেঞ্চুরি সংখ্যায় পরশু এই শ্রীলঙ্কানকে ধরে ফেলেছেন পন্টিং। এই দুজনেরই সেঞ্চুরি এখন ২৮টি। এখানেও অবশ্য টেন্ডুলকার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তির সেঞ্চুরি ৪৪টি।
ওয়ানডেতে না হলেও টেস্টে কিন্তু পন্টিং ভালোমতোই পিছু তাড়া করছেন টেন্ডুলকারের। তাঁর সেঞ্চুরি ৩৮টি। আর টেন্ডুলকারের ৪২টি। টেন্ডুলকারের রান ১২৭৭৩, পন্টিংয়ের ১১৩৪৫।

কোচিং নির্দেশিকা বের করল বিসিবি

‘বাংলাদেশ ক্রিকেট কোচ’ বলতে আপনি হয়তো চেনেন জেমি সিডন্সকেই। তবে এবার একটি বইকেইও পেয়ে যাচ্ছেন এই ভূমিকায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট কোচ: এ কমপ্লিট গাইড টু কোচিং ক্রিকেট নামের একটা কোচিং নির্দেশিকা বের করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) সঙ্গে বিসিবির ক্রিকেট উন্নয়ন-সংক্রান্ত চুক্তির আওতায়ই কোচিং নির্দেশিকা বের করার ব্যাপারটি ছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট কোচ: এ কমপ্লিট গাইড টু কোচিং ক্রিকেট বের করার ব্যাপারে সিএ প্রতিশ্রুত সে সাহায্য করেছেও। কোচিং নির্দেশিকার লেখক মার্টিন গ্লেসন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কোচিং প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ায়।
কাল বিসিবি কার্যালয়ে নির্দেশিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিসিবির গেম এডুকেশন ডেপুটি ম্যানেজার এস এম আশফাকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সারা দেশের ক্রিকেট কোচদের কোচিংয়ের ভাষা ও কৌশলে সামঞ্জস্য আনতেই এই নির্দেশিকা। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিসিবির কোচদের পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে এটি। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সব কোচের হাতে এই নির্দেশিকা পৌঁছে দেবে বোর্ড। আপাতত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এটি বাজারে ছাড়া না হলেও প্রয়োজনে ভবিষ্যতে সেটা হতে পারে।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিসিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের কোচ জেমি সিডন্সও। কোচিং নির্দেশিকাটিকে কোচদের বাইবেল হিসেবে দেখছেন তিনি, ‘এ রকম নির্দেশিকা সব দেশেরই আছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও বের করেছে। কোচিংয়ের কলাকৌশল শেখার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোচিংয়ের নীতি, ব্যাটিং-বোলিং কোচিংয়ের কৌশলসহ সবই এতে পাবেন একজন কোচ। কোচদের জন্য এটা হতে পারে খুব ভালো একটা পথপ্রদর্শক, বলতে পারেন বাইবেল।’

নিউজিল্যান্ডও ভালোই লড়ছিল

এখন পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে যা দেখা গেছে, তাতে জোহানেসবার্গে টস জিতলে বোলিং নেওয়াটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। ওয়ানডেতে ৪৩৪ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটা এখানেই গড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু এই টুর্নামেন্টে ওয়ান্ডারার্সের উইকেট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে বোলারদের দিকেই। তবে কাল ছিল ব্যতিক্রম, উইকেট ছিল ব্যাটিং-সহায়ক। টস জিতলে তাই প্রথমে ব্যাট করতে চেয়েছিলেন দুই অধিনায়কই।
টস জিতে হাসলেন ইউনুস খান, তবে পাকিস্তানের ইনিংস শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেও উধাও সেই হাসি। আহামরি কিছু বোলিং করেনি নিউজিল্যান্ড, কিন্তু শুরুর দিকে একে একে আত্মহত্যা করে গেলেন পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। মাঝে উমর আকমল ও মোহাম্মদ ইউসুফ ৮০ রানের জুটি গড়ে সেটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ২৩৩ রানই তুলতে পেরেছিল পাকিস্তান।
এর পরও অবশ্য এই প্রতিবেদন লেখার সময় নিউজিল্যান্ডের স্কোর ১৬ ওভারে ২ উইকেটে ৬৯। উইকেটে ছিলেন গাপটিল (১১) ও টেলর (৭)। ঠিক বলা যাচ্ছিল না ম্যাচের ভাগ্য কোন দিকে হেলে ছিল। বলা যাচ্ছিল না শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যাবে কারা, পাকিস্তান না নিউজিল্যান্ড? যদিও ৪৩ রানের মধ্যে ২ উইকেট তুলে নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি বোলাররা।
৮৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলার পরই লড়াই শুরু হয় পাকিস্তানের দুই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান উমর আকমল ও ইউসুফের। দলকে ১৬৬ রানে রেখে মিলসের বলে বোল্ড হওয়ার আগে ৪৫ রান করেছেন ইউসুফ। এখান থেকেও হয়তো ভালো একটা স্কোর গড়তে পারত পাকিস্তান। কিন্তু ১৭ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ৫ উইকেটে ১৮১ থেকে ৯ উইকেটে ১৯৮ হয়ে যায় তারা। এই ‘সুনামি’র শুরুটা হয় ৫৫ রান করা আকমলকে দিয়েই। এর পরও যে পাকিস্তান ২৩৩ রান তুলতে পারল, তাতে অবদান মোহাম্মদ আমিরের (১৯*) ও সাঈদ আজমলের (১৪*)। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ২৩৩/৯ (নাজির ২৮, কামরান ২৪, মালিক ২, ইউনুস ১৫, উমর ৫৫, ইউসুফ ৪৫, আফ্রিদি ৪, নাভিদ ৮, গুল ৬, আমির ১৯*, আজমল ১৪*; বাটলার ৪/৪৪, ভেট্টোরি ৩/৪৩, মিলস ১/৪৬, বন্ড ১/৫৪)।

এবার ঘরের মাঠে গ্রামীণফোন কাপ

জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে গত সিরিজের টাইটেল স্পনসর ছিল বাংলাদেশের বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি গ্রামীণফোন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় আসন্ন পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের স্পনসরও তারাই। ৭৮ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ২৭ অক্টোবর থেকে শুরু গ্রামীণফোন কাপের স্পনসর হয়েছে দেশের এই বেসরকারি মুঠো ফোন কোম্পানিটি।
টাইটেল স্পনসরের জন্য বিসিবির বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম দর ছিল ৬০ হাজার ডলার। গ্রামীণফোন ৬৩ হাজার ৮০০ ডলার মূল্য হাঁকলেও আলোচনা সাপেক্ষে সেটি ৭৮ হাজার ডলারে ওঠে বলে কাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন বিসিবির বিপণন কমিটির প্রধান আজিজ আল কায়সার। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস ও গ্রামীণফোনের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা কাজী মনিরুল কবির।
সিরিজের প্রাইজমানি বাবদ ১৪ হাজার ডলারও দেবে গ্রামীণফোন। প্রতি ম্যাচের ম্যান অব দ্য ম্যাচ পাবে ১ হাজার ডলার করে, ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার ২ হাজার ডলার। বাকি ৭ হাজার ডলার জমা হবে বিসিবির তহবিলে। সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে বসেই স্পনসর গ্রামীণফোনকে আর একটা অনুরোধ করেছেন জালাল ইউনুস, ‘ইদানীং বিভিন্ন দেশে ক্রিকেটারদের পুরস্কার হিসেবে ব্ল্যাকবেরি মোবাইল ফোনসেট দেওয়া হচ্ছে। আশা করি, গ্রামীণফোনও এবার সে রকম কিছু করবে।’
ছাড়া সিরিজের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞাপন স্বত্ব পেয়েছে এক্সিওম টেকনোলজিস। প্যাকেজ-১-এর ন্যূনতম দর ছিল ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার ও প্যাকেজ-২-এর ৩৫ হাজার ডলার। এক্সিওম টেকনোলিজস দুটোই কিনে নিয়েছে ৪৫ হাজার ৬৭২ মার্কিন ডলার ও ৩৫ হাজার ৫০৭ মার্কিন ডলারে।
সাকিবকে গ্রামীণফোনের অভিনন্দন: আইসিসি বর্ষসেরা টেস্ট দলে হিসেবে জায়গা পাওয়ায় সংবাদ সম্মেলন শেষে জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে গ্রামীণফোন। সে সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে তারা। গ্রামীণফোনের অভিনন্দনের জবাবে সাকিবের প্রতিক্রিয়া, ‘খুব ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশ থেকে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আমি এই স্বীকৃতি পেলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে আমাদের অন্য ক্রিকেটাররাও আইসিসির বর্ষসেরা দলে থাকবে।’

টিপাইমুখ নিয়ে আরও কিছু কথা by এম এ কাসেম

ভারত্রকর্তৃক্রপ্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে প্রথম আলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ড. আকবর আলি খানের প্রবন্ধটি মনোযোগসহকারে পড়েছি। লেখক অত্যন্ত যত্নসহকারে তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, প্রস্তাবিত টিপাইমুখ জলবিদ্যুেকন্দ্র নিয়ে বিতর্ক যত আলো জ্বেলেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯)
আমি তাঁর সব তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার এবং উপসংহারের সঙ্গে একমত পোষণ করি না। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের বিতর্কে আলো জ্বালার চেষ্টা করেছেন।
পাঁচ সংখ্যায় প্রকাশিত সুদীর্ঘ প্রবন্ধের সব দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমার আলোচনা তথ্য-উপাত্ত, নিরপেক্ষতার প্রশ্নবিদ্ধতা, লক্ষণীয় অসংগতি এবং কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মতামতের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে।
প্রবন্ধকার বরাবরই ‘স্ট্রেট ফরওয়ার্ড’ বলে পরিচিত। তাই তিনি প্রবন্ধের উপক্রমণিকায় বলতে পেরেছেন, আল্লাহ বাংলাদেশে মাত্র দুই ধরনের মানুষ তৈরি করেছেন—ভারতবান্ধব ও ভারতবিদ্ধেষী। অবশ্য কৌতূহলী পাঠককুল প্রশ্ন করতে পারে, প্রবন্ধকার নিজে কোন ধরনের মানুষ; কারণ তিনি ভারতবান্ধব ও ভারতবিদ্ধেষীর্রবাইর্রেকোনো তৃতীয় ধরনের মানুষের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেননি। আমি ভারতবিদ্ধেষী নই। ভারত পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র; মুক্তিযুদ্ধে ও তার পরবর্তীকালে ভারতের সাহয্যের বিষয়টি বাদ দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া ধর্মীয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, নাগরিক পর্যায়্রেযাতায়াত এবং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিষয় বিবেচনা করে আমি ভারতের সঙ্গে ‘বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বের”নীতি’তে বিশ্বাসী। আমি এও্রবিশ্বাস করি, পারস্পরিক স্বার্থের প্রতি পরস্পরের শ্রদ্ধাবোধ এবং পারস্পরিক সাহায্যের মনোভাবই হলো সকল বন্ধুত্বের ভিত্তি—ব্যক্তিই হোক আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই হোক। বন্ধুত্ব রাক্ষার ক্ষেত্রে উভয়কেই যত্নশীল হতে হয়।
যেকোনো প্রবন্ধের ক্ষেত্রেই ব্যবহূত তথ্য-উপাত্তের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনায় অনেককেই অসত্য তথ্য ও বক্তব্য এবং বিভ্রান্তিকর উদ্ধৃতি দিতে, এমনকি চাতুর্যের আশ্রয়ও নিতে দেখেছি। প্রবন্ধকার কর্তৃক প্রদত্ত রেফারেন্স এবং উদ্ধৃতির ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে, যদিও উদ্ধৃতির ব্যবহার সর্বত্র সঠিক মনে হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রণীত ফ্যাপ-৬-এর রিপোর্টকে প্রবন্ধকার আমলে নেননি। ওটা ১৯৯৩ সালে প্রণয়ন্রকরা হয়েছে। তাই তিন্রিঅপ্রাসঙ্গিক মনে করেছেন। অথচ তিনি ১৯৮৯ (তারও ৪ বছর আগের) সালে প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনকে প্রাসঙ্গিক মনে করেছেন। বিষয়টি স্ববিরোধিতা হয়ে গেল না?
প্রবন্ধকারের লেখায় আরও কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি লক্ষণীয়। সীমিত পরিসরে সব সমানভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তিনি লিখেছেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ কর্তৃক সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ছাড়া অনেক ব্যাপারেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব নয়।’ তার এই বক্তব্য যথার্থ এবং আমি একমত পোষণ করি। কিন্তু সুদীর্ঘ প্রবন্ধে প্রতিটি গুরূত্বপূর্ণ বিষয়েই তিনি চূড়ান্ত মতামত দিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ‘টিপাইমুখে বৃহত্ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশেও প্রান্তজনের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।’ (৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৯)
প্রশ্ন হচ্ছে, টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়নই হয়নি, তাহলে এটা বাস্তবায়নের ফলে প্রতিবেশী দেশের প্রান্তজনের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে কীভাবে? তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘...টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বরাক নদী অববাহিকায় বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ কমবে না এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাবে।’ (৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯) ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে তার উপসংহার, ‘কাজেই এ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি, তাতে সন্দেহ নেই।’ (১০ সেপ্টেম্বর ২০০৯) এ ক্ষেত্রেও্রস্ববিরোধিতা লক্ষণীয়।
প্রবন্ধকার উপরিউল্লিখিত্রচূড়ান্ত্রএবং্রগুরুত্বপূর্ণ মতামতের ভিত্তি হিসেবে কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের রেফারেন্স দেননি। উল্লেখ্য, ফ্যাপ-৬-এর রিপোর্ট প্রবন্ধকারের বক্তব্যকে সমর্থন করে না। ফ্যাপ-৬-এর সংশ্লিষ্ট ম্যাথমেটিক্যাল মডেল সিম্যুলেশনের মাধ্যমে কৃত টিপাইমুখসংক্রান্ত পর্যালোচনা্রবাংলাদেশ সরকারের একমাত্র বিজ্ঞানভিত্তিক বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ। সংশ্লিষ্ট কোনো্রবিজ্ঞানী্রএটাকে অপ্রাসঙ্গিক বলবেন না। ফ্যাপ-৬-এর Findingsকে বিরোধিতা্রকরতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে (ক) ফ্যাপ-৬-এর বিশ্লেষণে ব্যবহূত মডেল (MIKE II) উপযুক্ত নয়, (খ) তথ্য-উপাত্ত পর্যাপ্ত ছিল না, (গ) মডেল সিম্যুলেশনের ফলাফলের ব্যাখ্যা (interpretation) সঠিক নয়, (ঘ) মডেলে ব্যবহূত তথ্য-উপাত্তের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে ইত্যাদি। অন্যথায় যেভাবে কথাগুলো বলা হচ্ছে তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বক্তব্য না হয়ে ভবিষ্যত্রদ্রষ্টার্রকথার্রমতোই শোনাবে। উল্লেখ্য, টিপাইমুখ প্রকল্পের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা বা স্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রবন্ধকার NEEPCO কর্তৃক্রপ্রণীত্রঅত্যন্ত্রগুরুত্বপূর্ণ ‘এনভায়রনমেন্ট মিটিগেশন প্ল্যান’ও (ইএমপি) আমলে নেননি।
আমার উপরিউক্ত কথাগুলো টিপাইমুখ প্রকল্পকে ছাড় দেওয়ার জন্য নয়, আলোচনা-পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণপদ্ধতি ব্যবহারের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। ইতিমধ্যেই ড্যাম এবং বাঁধসংক্রান্ত অনেক ভ্রান্ত আলোচনা হয়েছে ঢালাওভাবে, যা ভবিষ্যতে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হতে পারে।
এবার প্রবন্ধকারের কয়েকটি বক্তব্য্রসম্পর্কে দু-একটি কথা্রবলা্রপ্রয়োজন। টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকল্পের উপদ্রুত উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে, মণিপুর রাজ্যে আপত্তির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পের পক্ষেও যে জনসমর্থন রয়েছে, তা বলা হয়নি। গুগল্রসার্চ্রকরলেই্রজানা্রযাবে। আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী টিপাইমুখ এলাকার সন্নিকটস্থ্রএলাকায় বেড়াতে গিয়ে টিপাইমুখের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে কী প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখেই না পড়েছিলেন! এ ঘটনার বিবরণ আমি তাঁর সহযাত্রীর (একটি বেসরকার্রিবিশ্ববিদ্যালয়ের্রউপাচার্য) মুখে শুনেছি।
দ্বিতীয়ত,্রপ্রবন্ধকার ভূমিকম্পের আশঙ্কা এবং ভয়াবহতার কথা বলেছেন। কিন্তু বিগত দশকগুলোয় ভূমিকম্প প্রতিরোধমূলক টেকনোলজির উত্কর্ষতা ও ব্যবহার, বিশ্বের সর্বোচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানে ২২০০-এর্রঊর্ধ্বে নির্মিত্রড্যামের অভিজ্ঞতা এবং টিপাইমুখ্রেযে টেকনোলজি ও্রডিজাইন্রব্যবহার করা হবে, তার আলোকে ভূমিকম্পের সত্যিকারের সম্ভাবনা কতটুকু, এ সম্পর্কে প্রবন্ধকার কিছু বলেননি।
তৃতীয়ত, ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা বিদ্যুত্ চায় না, চায় তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। কথাটাতে আবেগ আছে, আমি শ্রদ্ধা করি। ঐতিহ্য ধরে রাখার বিষয়টি আমি জোরালোভাবে সমর্থন করি, তবে ঐতিহ্যের ভালো ও প্রগতিমুখী দিকগুলো, পশ্চাত্মুখী মানসিকতা নয়।
চতুর্থত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২০ এবং ৩৬ বছর আগে দুটি জলবিদ্যুেকন্দ্র পলি জমে অকার্যকর হয়ে গেছে। এরও বহু বছর আগে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ ড্যামে (মিসরের আসওয়ান ড্যাম) একসময় পলি জমার বিষয়টি পশ্চিমা পত্রিকাগুলোয় মহা সংকট হিসেবে ফলাও্রকর্রেপ্রচারিত হয়েছিল। সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং আসওয়ান ড্যাম আজও ভালোভাবে কার্যকর আছে। প্রবন্ধকার কর্তৃক উল্লিখিত ড্যামদ্বয়ের বিষয়ে ভারত সরকারের নিরুত্সাহ হয়ে পড়ার আর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি না জানা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, প্রকৃতিতে জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন একটি নিমোঘ সত্য ও নিয়ম। মাঝেমধ্যেই দৈনিক পত্রিকায় দেখা যায়, আমাদের দেশেও বহু প্রাণী, মাছ ও উদ্ভিদ দিনে দিনে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কেউই ওল্টাতে পারবে না। তবে মানুষের indiscriminate কার্যাবলির দ্বারা যাতে জীববৈচিত্র্য এবং প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং তার জন্য যত্নবান হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। উন্নত দেশ বা পৃথিবীর কোথাও জীববৈচিত্র্যের দোহাই দিয়ে মানবসমাজের ক্রমবিকাশ বা উন্নয়ন প্রকল্প ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে না। তারা জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। প্রবন্ধকার নিজেও তাঁর প্রবন্ধের শেষ অধ্যায়ে অনুরূপ সুপারিশ করেছেন। উল্লেখ্য, টিপাইমুখের ক্ষেত্রেও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং উন্নয়নের জন্য ইএমপি প্রণয়ন করা হয়েছে—প্রবন্ধকার সে বিষয়ট্রিউল্লেখ করেননি।্রতবে সেটা কেবল ভারতীয় অঞ্চলের জন্য, বাংলাদেশের বিষয় তাতে স্থান পায়নি। বাংলাদেশের বিষয়টি তাদের বিবেচনায় অবশ্যই আসা্রউচিত ছিল। প্রবন্ধকার একই সময়ে অতি বন্যা এবং ভূমিকম্পের্রআশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়টি বিবেচনায়্রআনা প্রয়োজন।
ষষ্ঠত,্রপ্রবন্ধকার টিপাইমুখ বাঁধ এলাকায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাজনিত্রঝুঁকির কথা্রবলেছেন্র(১০ সেপ্টেম্বর ২০০৯)। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিলেই হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে কম ঝুটঝামেলা হয়নি। কিন্তু কাপ্তাই ড্যাম কি নিরাপদ ছিল না?
প্রবন্ধকার শেষ অধ্যায়ে (১১ সেপ্টেম্বর ২০০৯) টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। সেগুলো যাচাই্রকরে দেখত্রেহ্বে। লক্ষণীয়, প্রবন্ধকার এ ক্ষেত্র্রেএকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেননি। সেটা হচ্ছে দেওয়া-নেওয়ার এবং সমঝোতার জন্য একটা সহায়ক সম্পর্ক ও পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা;্রযদিও প্রবন্ধকার বলেছেন, ভারত সরকারের সম্মতি ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো অর্থবহ ব্যবস্থা সম্ভব নয়। স্পষ্ট করে বলেননি, তবে মনে হয়, অনেকের মতো তিনিও মনে করেন, এ ধরনের সমঝোতার ব্যাপারে ভারতের কোনো আগ্রহ নেই এবং ভারতের দেওয়া ও নেওয়ার মনোবৃত্তিও নেই। এ ক্ষেত্র্রেতিন্রিকিছু পরামর্শ দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে: তাঁর্রপরামর্শ অনুযায়ী ভারতের বাঁধবিরোধী সংগ্রামী সংগঠনগুলোর সঙ্গে মোর্চাবদ্ধ্রহয়ে যৌথ আন্দোলন করে, এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ‘ক্যাম্পেইন’ করে সমঝোতা ও দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি কি নিশ্চিত হবে?
প্রবন্ধকার বলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো, বাংলাদেশ সরকারের ঘুম ভাঙাতে হবে।’ এটা বিরোধী দলের বক্তৃতার মতো শুনিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে টিপাইমুখ বিষয়ে সরকারের নীতি ও করণীয় সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন, পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল ভারতীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং টিপাইমুখ সাইট পরিদর্শন করেছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতীয় সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিষয়টি বারবার আলোচনা হচ্ছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু করা হবে না।’ অনেকেই মনে করেন, বর্তমান পর্যায়ে সরকার অনুসৃত পদ্ধতি সঠিক; আবার অনেকে অবশ্যই ভাবতে পারেন, সরকার যা করছে তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু সরকার ঘুমিয়ে আছে বলাটা কি সঠিক? পরিশেষে, ভীতি ও আতঙ্ক মানুষের সহজাত দুর্বলতা। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই দুর্বলতাকে ভিত্তি না করে, বিজ্ঞান ও কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করাই বিধেয়। পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে এটাই আমার আরজি।
ড. এম এ কাসেম: সাবেক মহাপরিচালক, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা, বাংলাদেশ।

শিক্ষানীতির যিকঞ্চিত্ by দ্বিজেন শর্মা

শিক্ষকতার যেটুকু অভিজ্ঞতা আমার আছে, তাতে বক্ষ্যমাণ আলোচনার একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা লেখা সম্ভব। কিন্তু তার কোনো প্রয়োজন দেখি না। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯’ পাঠই এ জন্য যথেষ্ট।
স্বাধীনতার পর দেশের বৈষয়িক উন্নতি কম হয়নি। কিন্তু উন্নতি তো শুধু বস্তুগত বিষয় নয়, আত্মিকও বটে এবং তা মিলিতভাবেই পরিমাপ্য। বলা বাহুল্য, শেষোক্ত ক্ষেত্রে আমাদের বড় ঘাটতি আছে। আমাদের মনোজগত্ আজও ঔপনিবেশিকতার জের ও সামন্ত সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন। আমাদের নির্বাচন আছে, সংসদ আছে, কিন্তু সমাজে ও জীবনে গণতন্ত্রের বড়ই আকাল। মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ, বিভেদ ও বৈষম্য বিলয়ের আলামত কোথাও নেই। শিক্ষাব্যবস্থা এ প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সর্বাধিক; তা আজ রুগ্ণ ও ধ্বস্ত। শিক্ষার যেটুকু উন্নতি দৃশ্যমান, তা-ও ভৌতকাঠামোগত, চৈতন্যগত নয়। শিক্ষাঙ্গনের প্রাণপুরুষ শিক্ষক, দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকায় তাঁরাও এখন হতাশ ও অনেকে অপসংস্কৃতিতে আক্রান্ত। বর্তমান শিক্ষানীতিতে আছে তা থেকে উদ্ধারলাভের দিকনির্দেশনা; আর এ জন্যই এটি একটি মহত্ জাতীয় দলিল। যেহেতু শিক্ষাবিদ নই, তাই কয়েকটি মাত্র বিষয়েই আমার মতামত সীমিত থাকবে।
১. মাধ্যমিকের সাধারণ ধারায় বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায়—এ শ্রেণীবিভাজন যৌক্তিক নয়। প্রবণতা ও সম্ভাব্য পেশা নির্বাচনের জন্য অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের বয়স খুবই কম। তারা অভিভাবক ও বন্ধুদের দিয়ে প্রভাবিত হয়ে যে কোর্স পড়ে, তা আরোপিত ও আখেরে ক্ষতিকর। দশম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষাই বাঞ্ছনীয়, অন্যথা পূর্ণ মানুষের বদলে খণ্ডিত মানুষ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল, বিরোধী পক্ষে শেষ পর্যন্ত আমি ছিলাম একা এবং ‘বিজ্ঞানের যুগ’ এ অকাট্য যুক্তিতে বিভাজন প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু এখন কী দেখছি? উন্নত দেশ ও আমাদের দেশ—উভয় জগতেই বিজ্ঞান পাঠে ইচ্ছুক ছাত্রের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। সিপি স্নোর ‘টু কালচার’ প্রসঙ্গটির মর্মকথা, কমিশনের উচ্চশিক্ষা অধ্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষায় এর প্রয়োগ নেই আর সেটাই আশ্চর্যের।
২. মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ-দশম শ্রেণী) ইতিহাস ও ভূগোলের পরিবর্তে সমাজবিদ্যাকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইডিয়াটি সাম্প্রতিক কালের এবং মার্কিন দেশ থেকে আহূত। ভারতে দুই বছর পরই এটি বাতিল এবং পুনরায় ইতিহাস ও ভূগোল পঠন চালু হয়। কিন্তু পাকিস্তান সেটা অটুট রাখে, বাংলাদেশেও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এবং কমিশনও তা রেখেছে। কিন্তু কেন? আমরা পৃথিবী নামের একটি গ্রহের বাসিন্দা এবং সব মানুষ একটিমাত্র প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের অস্তিত্ব ও অগ্রগতি এ দুটি অভগ্ন বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত আর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও ভূগোল পাঠ ছাড়া এ বোধ কিশোরমনে প্রোথিত হওয়ার নয়। তাই মাধ্যমিকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশ, বিশ্বের ইতিহাস ও ভূগোল রাখা জরুরি মনে করি। ইতিহাস তো এখন আর রাজরাজড়ার কাহিনী নয়। সামাজিক ইতিবৃত্ত, তাতে আছে সব যুগের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজবিদ্যা ও সংস্কৃতি এবং ভূগোলে রয়েছে ভূচিত্রের সঙ্গে ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জলবায়ু, পরিবেশ, জীবজগত্ সবই। বিষয়গুলো সমাজবিদ্যা ও পরিবেশবিদ্যার চেয়ে অনেক বেশি সর্বস্পর্শী। বাংলাদেশ স্টাডিজসহ শেষোক্ত দুটি বিষয়ও ইতিহাস ও ভূগোলে সহজেই আত্তীকৃত হতে পারে। বিদেশের সব দৃষ্টান্ত অনুকরণীয় নয়।
৩. উচ্চমাধ্যমিক কলেজে নবম ও দশম শ্রেণীভুক্তি এবং চার বছরের ডিগ্রিকে সাধারণ শিক্ষার শেষ ডিগ্রি ঘোষণা বহুকাল আগেই করণীয় ছিল। এ ধরনের শিক্ষাক্রম উন্নত দেশে চালু রয়েছে। কিন্তু তাদের আছে পর্যাপ্ত সহায়-সম্পদ ও শ্রেণীকক্ষে সীমিত ছাত্রসংখ্যা। আমাদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি চালু থাকলে সেখানে ছাত্রের চাপ কমবে এবং গবেষণার সুযোগ বাড়বে। কিন্তু চাকরি ক্ষেত্রে শিক্ষানীতিতে উল্লিখিত নীতি বাস্তবায়নের জন্য স্নাতকদের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিতে স্নাতকোত্তরদের অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন হবে। এ পরিস্থিতিতে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার মতো কলেজগুলোর উন্নয়নেও বিপুল অর্থ ব্যয় আবশ্যক। অন্যথা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মতো চার বছরের শিক্ষাকোর্সও পরিহাসে পরিণত হবে। কলেজগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইংরেজি ভাষাভাষী উন্নত দেশ থেকে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের কথা ভাবা যেতে পারে। বিপ্লবোত্তর রাশিয়া ও জাপান এভাবেই সফলতা অর্জন করেছিল। শুনেছি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরম্ভকালে এমন কিছু ভাবা হয়েছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিরোধিতায় তা আর সম্ভব হয়নি।
৪. উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি দুটি মাধ্যমই কমিশন বজায় রেখেছে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমে কি উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব? পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক গ্রন্থ অনুবাদের কথা প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হতাশাজনক। ৪০ বছরের অর্জন বারিবিন্দুবত্। আগামী ৪০ বছরেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সম্ভাবনা কম। দক্ষ অনুবাদকের প্রকট অভাব এবং জ্ঞানের ক্রমবর্ধমান পরিধি এভাবে মোকাবিলা দুরূহ কাজ। শিক্ষার মাধ্যম ও মাতৃভাষা আমাদের জন্য একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়, অথচ সমস্যাটির যৌক্তিক একটি সমাধান জরুরি।
৫. অন্যান্য
ক. উচ্চশিক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম দুটি থাকার দরুন উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি মাধ্যমের টেকনিক্যাল শব্দের বাংলা এবং বাংলা মাধ্যমের জন্য ইংরেজি পরিভাষা শেখা বাধ্যতামূলক হওয়া আবশ্যক। এ জন্য ৫০ নম্বর রাখা যেতে পারে। স্বাধীনতার পর উচ্চমাধ্যমিক জীববিদ্যায় এ নিয়ম চালু হয়েছিল এবং ১০ নম্বর বরাদ্দ ছিল। কিন্তু পরে তা পরিত্যক্ত হয়।
খ. দক্ষ শিক্ষক ও গবেষক কোথাও কোনোকালে সহজলভ্য নয়। তাই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পর্যায়ে অবসর নেওয়ার পরও তাদের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন আবশ্যক। আরেকটি বিষয়ও দীর্ঘকাল অবহেলিত হয়ে আছে। সব দেশেই ডিগ্রিহীন কিছু পণ্ডিত থাকেন, যাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সদ্ব্যবহূত হতে পারে এবং হয়েও থাকে। প্রসঙ্গত, ভারতের পাখিবিশারদ সালিম আলী এবং পশ্চিমবঙ্গের কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণীয়। আমাদের দেশেও এমন পণ্ডিত ছিলেন ও আছেন। আমলাতান্ত্রিকতা ও রক্ষণশীলতা এ পথের প্রধান অন্তরায়। আশা করি, কমিশন বৃহত্ স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনা করবে।
গ. উচ্চমাধ্যমিকের জীববিদ্যার পাঠ্যসূচিতে দীর্ঘকাল বিবর্তনবাদ গুরুত্বসহকারে পড়ানো হয়ে আসছিল। কয়েক বছর আগে থেকে বিবর্তনবাদের পরিবর্তে জীবপ্রযুক্তি পড়ানো হচ্ছে। কেন এ পরিবর্তন, কেন তত্ত্ব থেকে প্রয়োগের এ পৃথক্করণ? জীবপ্রযুক্তি আসলে বিবর্তনবাদেরই একটি ফলিত রূপ। প্রয়োগের সঙ্গে তত্ত্বও প্রয়োজন, তাই দুটি বিষয় এক সঙ্গে পড়ানোর নিয়মটি আশা করি কমিশনের অনুমোদন পাবে।
স্বল্পতম সময়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য কমিশনের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সব কর্মীকে ধন্যবাদ।
বরিশাল, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
দ্বিজেন শর্মা: সাবেক শিক্ষক, লেখক ও নিসর্গী।

চালের দাম

২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে জানলাম, ঈদ যেতে না যেতেই চালের দাম বাড়ছে। সরকার যদি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না নেয়, তবে তা আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কা করছে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। দাম বাড়ার ফলে মধ্যবিত্তসহ নিম্নবিত্তের লোকজনও নানা রকম বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছে। ঢাকা শহরে চাল আসে কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন মোকাম থেকে। তাই সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে সেসব জায়গা থেকে।
মোটা চাল ও মিনিকেটের দাম যেন না বাড়ে সে জন্য সরকারের তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
জানে আলম, শিক্ষার্থী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

দুর্নীতি দমন কমিশন

আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন নামে একটি স্বাধীন (কাগজে-কলমে) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাই হোক, গত বৃহস্পতিবারের খবর অনুযায়ী সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার খবর শুনে আমাদের মনে হয়েছে, কমিশনটি এখনো বেঁচে আছে।
দুদকের কর্মকাণ্ড যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক না হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে দুদকের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
নূর ইকবাল তালুকদার
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জাতিসংঘে বাংলা ভাষা

২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দিয়ে নজির স্থাপন করেছেন। তিনি বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তাঁর এই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার জন্য।
বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১০ কোটি এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও এক কোটি বাঙালি রয়েছে। সব মিলিয়ে পৃথিবীতে বাঙালির সংখ্যা ২৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আফ্রিকার একটি দেশ সিয়েরালিওন বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে ব্যবহূত হয় ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। এর মধ্যে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে বিশ্বের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, আরবিতে কথা বলে বিশ্বের প্রায় ২২ কোটি মানুষ। কিন্তু বাংলায় কথা বলে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ। বিশ্বে ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ। ফলে রুশ ও আরবি যদি জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে তাহলে বাংলা কেন পারবে না?
কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমে বাংলাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষার স্বীকৃতি আদায় করতে হবে।
সাজ্জাদ হোসেন, ঝিনাইদহ।
sazzaddx@yahoo.com

দিল্লির চিঠি -জঙ্গি তত্পরতা ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক by কুলদীপ নায়ার

স্বাধীনতার প্রায় ৩৮ বছর হয়ে গেল, কিন্তু অপ্রতুল সম্পদ আর অধিক জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ এখনো ‘সোনার বাংলা’ হয়ে উঠতে পারেনি। ধারাবাহিকভাবে দেশটির মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ভর করেছে।
প্রথম আঘাতটি আসে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন স্বাপ্নিক এই মানুষটির প্রতি জনগণের আস্থা ছিল। তাঁর কথায় জনগণ যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত ছিল। দ্বিতীয় আঘাতটি আসে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। এর ফলে মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সামরিক শাসনের ফলে উদারপন্থীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং মুক্তচিন্তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সে জায়গায় বলপ্রয়োগ, ধর্মান্ধতা ও সংঘাতের সংস্কৃতি এসে জুড়ে বসে।
বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছে একাধিক সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনামলের। এর পর ঘুরেফিরে দুই নারীর শাসনকালই চলছে—হয় আওয়ামী লাগের শেখ হাসিনা অথবা বিএনপির খালেদা জিয়া। জনগণ আবার শিকড়ে ফিরে গেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন ঐক্য। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদ বর্জন অব্যাহত রাখায় রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো সুবাতাস পাওয়া যাচ্ছে না।
চলমান কিছু ঘটনা দেশটির জন্য হুমকিস্বরূপ। ইসলামি মৌলবাদ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এরা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং বিপ্লবের ডাক দিয়ে যাচ্ছে। জিহাদিরা সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। বাংলা ভাই এবং তাঁর আট মৌলবাদী সহযোগীকে ফাঁসি দেওয়ার পর কোনো বিক্ষোভ হয়নি, যা একটি ভালো লক্ষণ। বাংলা ভাই ধর্মীয় নেতার বদলে একজন সন্ত্রাসী-খুনি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। দেশের আলেম সম্প্রদায়ও এঁদের ফাঁসি হওয়ায় স্বস্তি বোধ করেছিল।
বিএনপির সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদীরা যেভাবে হাত মিলিয়েছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে তারা ধর্ম ও রাজনীতিকে একাকার করে দেখতে আগ্রহী। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ যদিও উদারপন্থী, কিন্তু আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বাংলাদেশে আরেকটি নেতিবাচক প্রবণতা হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে গিয়ে তাদের কাছে সীমান্ত এলাকা মোটেও গুরুত্ব পায়নি। ফলে ভারত, শ্রীলঙ্কা এমনকি মিয়ানমারের বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশটি। এরা বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম চালায় এবং এটাকেই নিরাপদ আস্তানা মনে করে। এদের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা), দ্য লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)—এমন আরও অনেক চরমপন্থী দল।
সম্প্রতি দিল্লিতে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণার কাছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। দীপু মনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সন্ত্রাসীকে জায়গা দেব না, তা সে যে ধর্ম-বর্ণেরই হোক না কেন। আমরা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও মূলোত্পাটনের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমনের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
ওই বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া এবং পাওয়ার গ্রিড সংযোগ স্থাপনে সহায়তাসহ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। (উল্লেখ্য, বাংলাদেশে চরম বিদ্যুত্সংকট বিদ্যমান।)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটা যৌথ পরিকল্পনা বোর্ড কার্যকর ছিল। কীভাবে উভয় দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে, তার একটা খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে এগুলো খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এটা সত্য যে ভারতের নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। কিন্তু তার পরও ভারতের রয়েছে বৃহত্ অর্থনৈতিক ভিত্তি। ভারত যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি কিছু করার সামর্থ্য রয়েছে দেশটির। ভারত বেসরকারি কিছু বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উত্সাহী করতে পারে অথবা যৌথ মালিকানার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থাপনেরও উদ্যোগ নিতে পারে। টাটার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি এবং তারা ভারতবিরোধিতার জিগির তুলতে ব্যস্ত ছিল। এখনো ওই প্রবণতা চলমান।
শেখ হাসিনা তাঁর আগের শাসনামলে ঠিকই বুঝেছিলেন যে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা খুব সহজ নয়, যখন উভয় দেশেই এদের পৃষ্ঠপোষক রয়েছে। জঙ্গিদের মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে তাদের আয় হয় প্রায় শত কোটি টাকা। দাগি আসামি, চোরাচালানি ও গোঁড়া ধর্মান্ধদের নেটওয়ার্ক ভাঙা খুব সহজ নয়, যখন অনেকেই রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের ব্যবহার করে থাকে।
জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অল্পবিস্তর যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তার ফলে বিদ্যমান ভারতবিদ্বেষী মনোভাব চাঙা হতে পারে। পাকিস্তানবিদ্বেষী মনোভাব ভারতবিদ্বেষী মনোভাবে পরিণত হয়েছে—আজও বাংলাদেশকে এ অবস্থা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশ থেকে জঙ্গি তত্পরতা নির্মূল করতে ব্যর্থ হলে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে— বাংলাদেশ নিশ্চয় এ বিষয়ে সজাগ।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানই আসলে মূল উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশের সামর্থ্যের চেয়েও ভারত বেশি প্রত্যাশা করে। ভারত তার উত্তর-পশ্চিমাংশের রাজ্যে সহজে পৌঁছার জন্য ট্রানজিটসুবিধা পেতে এবং রপ্তানিসুবিধা বাড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতের আগ্রাসন হিসেবে দেখে থাকে। এসব বিষয়ে আলোচনা অতীতে অনেক তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। ভারতের কর্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করা যে তারা কী চাইছে এবং এতে বাংলাদেশের কী ধরনের লাভ হবে।
মণিপুর রাজ্যের বরাক উপত্যকায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে বাংলাদেশে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও ভারত বলছে যে সেখানে পানির গতিপথ পরিবর্তন করা হবে না। এই শঙ্কা নিরসনের জন্য দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অকুস্থল পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না কেন? ফারাক্কা বাঁধ বিতর্ক থামানোর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বাঁধ নিয়ে আর কোনো ঝামেলায় জড়ানো উচিত হবে না।
ভারতকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে, কেন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই, ভারতের বিশাল আয়তন একটা ভয়ের কারণ। এর চেয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর আশঙ্কা হলো, ভারত বিশ্বের আরেকটা পরাশক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সত্যিকারের ভূমিকা নিয়ে শঙ্কার জন্ম হয়েছে।
ভারতের অবশ্যই আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কারণ তা না হলে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে তার খারাপ সম্পর্ক তৈরি হবে। সবার সন্দেহের চোখ তার দিকে। সুতরাং প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো ভারতকে অবশ্যই দূর করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফিরোজ জামান চৌধুরী
কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

গণতন্ত্রিক শাসন -নিয়মতান্ত্রিকতা ও দায়বদ্ধতা by বদিউল আলম মজুমদার

গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন, আর এটি একটি নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসনকার্য পরিচালনার কতগুলো নিয়ম বা পদ্ধতি থাকে। একই সঙ্গে পদ্ধতি থাকে শাসকদের দায়বদ্ধ করার। বস্তুত গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে নিয়মতান্ত্রিকতা অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক শাসনে সুস্পষ্ট ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। আর এ সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রথম নিয়ম বা ধাপ। বস্তুত নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয়।
তবে নির্বাচন হলেই গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয় না। নির্বাচন হতে হয় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলে সব যোগ্য ভোটার সব ধরনের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিনা দ্বিধায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। নির্বাচন আরও হতে হয় নিরপেক্ষ, যাতে দলমতনির্বিশেষে সব প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে এবং নির্বাচনে কর্তৃপক্ষের কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব না থাকে। এ ছাড়া নির্বাচন হতে হয় অর্থবহ। অর্থবহ নির্বাচনের মাধ্যমেই সত্, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হলেও গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় না, যদি নির্বাচনের মাধ্যমে সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, স্বার্থান্বেষী ও অযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে আসে। অর্থাত্ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানের ওপর গণতান্ত্রিক শাসন বহুলাংশে নির্ভরশীল।
কিন্তু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়, যদিও অনেকে এ দুটিকে এক ও অভিন্ন বলে ধরে নেন। এমন দৃষ্টিভঙ্গির ফলে বস্তুত ‘এক দিনের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এক দিনের গণতন্ত্রে নির্বাচনের দিনই মূলত গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচনের পর ভোটারদের আর কোনো কদর ও ভূমিকা থাকে না। থাকে না স্বচ্ছতা-জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা, যার ফলে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ধরনের ব্যবস্থায় গণতন্ত্র হয়ে পড়ে সাধারণত ‘উইনার-টেক-অল (winner-take-all) জিরো-সাম-গেম (zero-sum-game)’ বা ‘বিজয়ীদের সবকিছু এবং অন্যরা বঞ্চিত’ ধরনের খেলায়। তাই নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র নিয়ামক নয়। বস্তুত নির্বাচন হলো শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ‘প্রসিডিউর’ বা পদ্ধতি মাত্র। নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রকে পদ্ধতিগত গণতন্ত্র বা ‘প্রসিডিউরাল ডেমোক্রেসি’ বলা যায়।
সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো কি না-হলো, তা নির্ভর করে দুই নির্বাচনের মাঝখানে কি ঘটে না-ঘটে মূলত তার ওপর। তাই ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতির বাইরেও গণতন্ত্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ, শাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের সব স্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, সমাজের বঞ্চিতদের অন্তর্ভুক্তিকরণ, সামজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা ইত্যাদি হলো গণতন্ত্রের অন্যান্য ‘সাবসটেনটিভ’ বা গুরুত্বপূর্ণ দিক। আর এগুলোই হলো গণতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার আবশ্যকীয় নিয়মাবলি।
উপরিউক্ত পদ্ধতিগত ও ‘সাবসটেনটিভ’ নিয়ম মেনে চললে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়, যদিও তা নিশ্চিত হয় না। এগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘নেসেসারি’ বা প্রয়োজনীয়, কিন্তু ‘সাফিসিয়েন্ট’ বা যথেষ্ট নয়। সত্যিকারার্থে গণতন্ত্র কায়েম করতে হলে আরও প্রয়োজন শাসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার অনেকগুলো নিয়ম বা ধাপ রয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হলো জাতীয় সংসদের কাছে মন্ত্রিপরিষদের জবাবদিহি। আমাদের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।’ এটি আনুষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রথম পর্ব এবং এর ফলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সংসদীয় কমিটিগুলোর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
জবাবদিহির এমন কাঠামোর ফলে সংসদে পাস করা সব আইন সততা, নিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় কৃচ্ছ্রসাধন বাস্তবায়িত হয়েছে কি না তা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংসদকে অবগত করানো মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের দায়িত্বের অংশ। তাঁদের আরও দায়িত্ব মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তর, অধিদপ্তর ও বিভাগের সব কার্যক্রম সততা ও জনস্বার্থে পরিচালিত হয়েছে কি না তা চাহিদামতো কমিটিগুলোকে জানানো। তাই মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সব কার্যক্রম সম্পর্কে সংসদীয় কমিটিগুলোর প্রশ্ন তোলার ও জবাব চাওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। এটাই জবাবদিহির সর্বজনস্বীকৃত নিয়ম বা পদ্ধতি।
সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রমে বিরোধী দলের সদস্যরাই সাধারণত বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাঁরাই সরকারের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করতে বেশি আগ্রহী—এটাই বিরোধী দলের দায়িত্ব। তবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জনস্বার্থে সরকারি দলের সদস্যদেরও নির্বাহী বিভাগের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা কর্তব্য।
উল্লেখ্য, আমাদের সংসদীয় কমিটিগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কে শক্ত প্রশ্ন উত্থাপনের এবং জবাবদিহি দাবি করার ফলে কিছু পর্যবেক্ষক বর্তমানে দলীয় অন্তর্কলহের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার স্বার্থে এ ধরনের দলীয় অন্তর্কলহ বা সেইম সাইডের আশঙ্কা উত্থাপন করার কোনো অবকাশ নেই। আরও অবকাশ নেই প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্য কারোর ‘বিরোধ’ নিরসনের লক্ষ্যে হস্তক্ষেপের। কারণ জবাবদিহির এই আনুষ্ঠানিক কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়বে যদি সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনমূলক প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করতে না পারে। তবে এ কাঠামোয় যথাযথভাবে কাজ করতে হলে কমিটির সদস্যদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও তদবির করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে কয়েক সপ্তাহ আগে দুই জেলা জজকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের পুনর্বহালের বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির তদন্ত সম্পর্কে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে এ ধরনের তদন্ত সম্পূর্ণ সংগত এবং কমিটির সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়দের জবাবদিহির মুখোমুখি না করে কেন তাদের অধঃস্তন সচিবকে কমিটির সামনে ডাকা হলো? এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবশ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী অংশ নিয়েছিলেন। তাই এ ক্ষেত্রে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ (conflict of interest) বা স্বার্থের দ্বন্দ্বের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এমনি ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে মন্ত্রীদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আজ প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
এ ছাড়া সংসদীয় বিশেষ অধিকার (Parliamentary privileges) প্রয়োগ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকেও ডাকার সম্ভাবনার কথা কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ‘এক্সিকিউটিভ প্রিভিলেজ’ (Executive Privileges) বা প্রধান নির্বাহীর গোপনীয়তার সঙ্গে উপদেষ্টাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার অধিকারের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। অর্থাত্ সংসদীয় কমিটির যেমন সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও অধিকার রয়েছে দ্বিধাহীনভাবে পরামর্শ গ্রহণের, যা সংসদীয় কমিটির নজরদারিত্বের (scrutiny) আওতার মধ্যে পড়বে না। তাহলেই নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যকার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সেসের সম্পর্ক কার্যকর হবে। কারণ এর মাধ্যমে শুধু চেকই নয়, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে ব্যালেন্সেস বা ভারসাম্যও প্রতিষ্ঠিত হবে।
জবাবদিহির একটি অনানুষ্ঠানিক কাঠামো হলো স্বয়ং মন্ত্রিপরিষদ। সত্যিকারের সংসদীয় পদ্ধতিতে মন্ত্রিপরিষদ একটি যৌথ সত্তা। এর সব সদস্য সমান, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রথম। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের ভিত্তিতে গৃহীত হয়। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিপরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে তাঁর সহকর্মীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যার মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এ ধরনের সম্পর্কের ফলে নিঃসন্দেহে সিদ্ধান্তের মান বৃদ্ধি পায়। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর মতামত চাপিয়ে দিতে চাইলে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ওপর সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার অর্পণ করলে এ পদ্ধতি বিফল হতে বাধ্য।
গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্সস্থল হলো রাজনৈতিক দল— বিশেষত সরকারি দল। কোনো বিশেষ আদর্শ বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে দল তার কর্মসূচি ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করে। আর এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং প্রার্থী মনোনয়ন দেয়, ফায়দা প্রাপ্তির জন্য নয়। প্রসঙ্গত, ফায়দা প্রদান বা প্রাপ্তির জন্য দল গঠিত বা দলের সঙ্গে যুক্ত হলে, দল সিন্ডিকেটের রূপ নেয়। তাই দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে যাঁরা সরকার গঠন করেন, দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাঁদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা দলের দায়িত্ব। এ কারণে দলীয় কাউন্সিলে সাধারণত সরকারের কার্যক্রম নিয়ে তির্যক প্রশ্ন তোলা হয়, বিতর্ক হয় এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। তবে একই ব্যক্তি সরকার ও দলীয় প্রধান হলে জবাবদিহির এ কাঠামো ভেঙে পড়ে, যার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে। দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা না হলে এবং দ্বিধাহীনভাবে কথা বলার অধিকার না থাকলেও এ কাঠামো অকার্যকর হতে বাধ্য।
দলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে যদি দল সরকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। বর্তমানে তাই ঘটেছে বলে অনেকের আশঙ্কা। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার ভাষায়, সরকার কর্তৃক গলাধঃকরণের কারণে আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষ্ক্রিয় হওয়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগই শুধু দল হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, আমাদের গণতান্ত্রিকব্যবস্থার যথাযথ চর্চাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে গণতন্ত্র একটি নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচন প্রয়োজন। এর জন্য আরও প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমাজে বঞ্চিতদের অন্তর্ভুক্ত করা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বিকেন্দ্রীকরণ, একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ, প্রশাসনের সব পর্যায়ে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণে নিবেদিত রাজনৈতিক দল, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রয়োজন শাসনকার্যে নিয়োজিতদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। সংসদীয় পদ্ধতিতে সংসদীয় কমিটি ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তার উপরই গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা মূলত নির্ভর করে। এ ধরনের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চা করলেই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণের সব ন্যায্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ উন্মোচিত হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক: সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

ইউপি নির্বাচনে আট তথ্য -সংসদীয় কমিটির সুপারিশ আত্মঘাতী

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা দেওয়ার বিধান বাতিল এবং বিলখেলাপিদের নির্বাচনে যোগ্য ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন) পরিষদ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে দেওয়া সংসদীয় কমিটির সুপারিশ পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। এটি গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দিনবদলের অঙ্গীকারের প্রতি একটি ছুরিকাঘাত। কারণ বর্তমান যুগটা শাসনব্যবস্থার সর্বত্র, বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার তৃণমূলের মৌলিক স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক একাংশ। এই প্রশাসনিক একাংশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হলেন চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। তাঁদের প্রত্যেকের জীবন ও কার্যাবলি সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ এবং প্রত্যক্ষভাবে ভোটারদের প্রভাবিত করে থাকে। সে কারণে নীতি-নৈতিকতা, সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয় এই স্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে এর ব্যাপকভিত্তিক সুফল জাতি আশা করতে পারে।
তৃণমূলের মানুষ মন্ত্রী দূরে থাক, সংসদ সদস্যদেরই চোখে দেখার সুযোগ কালেভদ্রে পেয়ে থাকেন। তাঁরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সুখে-দুঃখে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদেরই পেয়ে থাকেন। আর এটা অনস্বীকার্য যে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজের সবচেয়ে ভালো ও নিরীহ মানুষদের সামাজিক নেতা হওয়ার দিন অনেকটাই বাসি হয়ে গেছে। এখন যে নিতান্ত সত্ ও নিরীহ লোকের প্রায় বিনা খরচে, কেবল জনগণের ভালোবাসায় চেয়ারম্যান ও মেম্বার হওয়ার দিন একেবারেই বাসি হয়ে গেছে তা নয়; তবে এটা অনস্বীকার্য যে তাঁদের সংখ্যা কমছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব ব্যাধি, বিশেষ করে কালো টাকা ও পেশিশক্তি, তা কিন্তু এই নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়ও ঢুকে পড়েছে। অশুভ প্রতিযোগিতা, টাকার খেলা, ক্ষমতার দাপট, সর্বোপরি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি স্থানীয় শাসনকেও কলুষিত করেছে। সুতরাং এখন সময় যেখানে অধিকতর স্বচ্ছতার, সেখানে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া একটি দুর্ভাগ্যজনক পশ্চাত্মুখী যাত্রা।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর বলেছেন, চলতি অধিবেশনেই ওই সুপারিশ আইন আকারে পাস হবে। আট তথ্য না দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে তিনি নির্লজ্জ। তাঁর হাস্যকর যুক্তি: ‘সংসদের মতো এত জটিল আইন ইউনিয়ন পরিষদে থাকা কাম্য নয়।’ কথিত পরিবর্তনে সংকল্পবদ্ধ মন্ত্রিসভার সদস্যের মানসিক গঠন চাপা থাকেনি। সংসদ নির্বাচনে স্বচ্ছতাসংক্রান্ত নিয়মকানুনগুলো তাঁর কাছে সরল নয়, জটিল। বিগত সাধারণ নির্বাচনে আট তথ্য নিয়ে এত কাঠখড় পোড়ানোর পরও অনেক প্রভাবশালী আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। এবং তাঁদের পক্ষে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তথ্যসংক্রান্ত হলফনামার বিধান প্রবর্তন বিরাট ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সংসদনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করে এলেন। আমরা যতদূর জানি, শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পরিবর্তনবিষয়ক স্লোগানের একজন সমর্থক। ওবামা পাবলিক অফিসে কাজ করতে আগ্রহীদের ৬৩ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য (ট্রাফিক নিয়ম ভেঙে ৫০ ডলারের বেশি জরিমানাদানের মতো তথ্যসহ) প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেন। পরিবর্তন আনার কথা বলে বড় বিজয় অর্জনকারী আমাদের সংসদনেত্রী প্রস্তাবিত ওই আত্মঘাতী আইন প্রণয়নের আগে ওবামার এই নীতি বিবেচনায় নিতে পারেন।