Tuesday, January 30, 2018

চার বছরের সংসদের চার বৈশিষ্ট্য

একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একতরফা সংসদ চার বছর পার করল। এর চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে। প্রথমত, কোরাম সংকট নিয়ে সংসদ চলছে। এটা নিশ্চিত করে যে সাংসদেরা সংসদবহির্ভূত অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। যদিও ওই সময়ে তাঁরা সংসদ চত্বরে বা ঢাকায় থাকেন, কিন্তু সংসদের কাজে সময় দিতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কার্যপ্রণালির ৬৮ ও ১৪৭ বিধি অনুযায়ী জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদে প্রস্তাব পাস করতে পারে, কিন্তু এর আওতায় ধন্যবাদ বা প্রশংসাসূচক প্রস্তাব পাসের প্রবণতা। এমনকি এসব ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চার ঘণ্টা গড়িয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। তৃতীয়ত, বিল পাসে কম সময় লাগা। গড়ে ৩০ মিনিটে বিল পাস হয়েছে। চতুর্থত, সরকারের বিল বা কোনো নীতির প্রশ্নে পক্ষে-বিপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দেখা যাবে। এ ছাড়া আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে কারণে-অকারণে সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফর এবং মন্ত্রীদের সংসদ অধিবেশনে কম হাজির থাকা। সুতরাং এই সংসদের কাছে বাকি এক বছরে আর তেমন কিছু আশাব্যঞ্জক চাওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে না। ওই ধারাই চলবে ধরে নেওয়া যায়। অবশ্য আমরা মনোবল হারাতে চাই না। কারণ গণতন্ত্র হলো চর্চার বিষয়। ব্রিটেনের কয়েক শ বছর লেগেছে, আর আমাদের এখনো অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হয়নি। কারও মতে, আমরা শৈশবকাল পার করছি। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক ফার্স্ট লেডি রওশন এরশাদ বলেছেন, তাঁরা একটি নবযুগের সূচনা করেছেন। প্রতিবাদ হবে ওয়াকআউটে, তাই বলে সংসদ বর্জন? নৈব নৈব চ। গত চার বছরে সাংসদেরা সরকারি বিল পাসে নবম সংসদের চেয়ে কম সময় দিয়েছেন।
এবার তাঁরা গড়ে ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেছেন। অনেক বিল ১৫ মিনিটেও পাস হয়েছে। ২০০৮ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতেও ৪০ ভাগ বিল এক ঘণ্টার মধ্যে পাস হয়। কিন্তু সেখানকার সংসদীয় কমিটিতে আইন তৈরির প্রক্রিয়া যতটা দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সেটা এখানে হয় কি? পঞ্চম সংসদে সংসদীয় কমিটিকে সংসদ থেকে আলাদা করা যেত। কারণ, কমিটিতে বিরোধী দলের একটা সংখ্যাগত প্রাধান্য ছিল। আর বর্তমান সংসদে জাতীয় পার্টির ৮ মহিলা সংসদ নিয়ে ৩৯। সংসদীয় কমিটির সংখ্যাই ৩৯। সুতরাং সংসদ যাঁরা গঠন করেছেন, তাঁরা সংসদীয় কমিটিকে কার্যকর করার চিন্তা করছেন বলে মনে হয় না। তাঁরা হয়তো ভাবেননি, দেশ চালাতে কিছু কাজ তো করাতে হবে। আর সে জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে নজরদারি করতে প্রতি কমিটিতে বিরোধী দলের অন্তত দুজন সাংসদ আনতে চাইলেও প্রায় ৮০ জন সাংসদ লাগার কথা। ৩৯টি কমিটিতে তাই বিরোধী দলের দুজন করেও রাখা যায়নি। অবশ্য বিরোধী দলের রাখলেই বা কী হতো? কারণ, সরকারের প্রশংসায় সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের দলটি কখনো সরকারি দলকেও লজ্জা দিচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের স্বল্পতা কোন পর্যায়ের সংকট তৈরি করতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই সংসদ। সংসদে শক্তিমান বিরোধী দল না থাকলে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কোনোভাবেই তেমন কার্যকর করা যায় না। সংসদকে আইনের গুণগত মান দিয়ে চেনা উচিত। যেহেতু সংসদীয় কমিটিগুলোই আইন তৈরির চূড়ান্ত কাজটা করছে। তাই খোঁজ নিলাম, এর প্রক্রিয়া কীভাবে চলে। জানলাম, সাকল্যে ১০ জনের টিম থাকলেও দীর্ঘদিন পাঁচটি পদ শূন্য। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের একটি লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং উইং আছে। কিন্তু এর দক্ষতা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে, এর সপক্ষে আমরা কোনো প্রমাণ পাই না। এই ঘাটতি পূরণে সংসদের লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং উইং শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে খোলা হয়েছিল। রোববার একটি নতুন তথ্য জেনে সন্দিগ্ধ হলাম। এটি সত্যি হলে বলব, এটা ক্ষমতার পৃথক্করণের নীতি সমর্থন করে না। দক্ষতার ঘাটতি পড়লে সেটা এভাবে পূরণ করা সমীচীন হতে পারে না। জানলাম, সংসদে যেসব বিল প্রথমে উঠছে, তাতে অনেক ভুলত্রুটি দেখা যায়। মন্ত্রিসভা বিভাগ যত্নশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে আইনের খসড়া তদারককারী মন্ত্রিসভা বিভাগের একটি সাব-কমিটিতে সংসদের একজন প্রতিনিধিকেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। জানা গেছে, গত বছরই এটা প্রথম চালু করা হয়েছে। আইন শুদ্ধ করার উপলব্ধি ভালো। কিন্তু তা করার উপায় ঠিক নয়। অবশ্য রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য হলো, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গের সঙ্গে সংসদের যে চিরাচরিত দূরত্ব বা বিরোধ, তা যে ঘুচে গিয়েছে, সেটা এই ঘটনাতেও স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। সরকার সংসদে বিল পাসের কোনো প্রস্তাব করার আগে সংসদীয় সচিবালয় এ রকম প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে না। সরকার ও সংসদের স্বাধীন পরিচয় অটুট রাখতে হবে। এটা লক্ষণীয় যে গত চার বছরে এই সংসদ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মতো অল্প কিছু মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে। সুশাসন ও আইনের শাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত কোনো আইন, যেমন ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধির মতো কোনো কিছুতে তারা হাত দেয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমের মতো বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের ওপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা কোনো বিল আনেনি। সংসদের ফ্লোরে নির্বাহী বিভাগের কোনো দুর্নীতির বিষয়ে ‘প্রাণবন্ত’ কোনো বিতর্ক হয়নি, তবে উন্নয়নের গুণকীর্তনেই সংসদকক্ষ মুখর ছিল। সংসদের মতো একটি আপাদমস্তক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতার প্রশ্নে কোনো একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপকল্প হতে পারে না। আইনিভাবে বৈধ হলেও তা রাজনৈতিকভাবে অবৈধ হতে পারে। আবার কোনো সংসদ আইনি ও রাজনৈতিক উভয় অর্থে অবৈধ হতে পারে।
সামরিক বা আধা সামরিক শাসনামলের সংসদগুলোর বৈধতার প্রশ্ন তার উদাহরণ। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদকে আমরা রাবার স্ট্যাম্প বলি। কিন্তু ভোটারযুক্ত নির্বাচনও রাবার স্ট্যাম্প হতে পারে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন হওয়ার পর চলতি সংসদের বৈধতার প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। সাংবিধানিকভাবে দেখলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সরকারি দলের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় যে যেহেতু একটি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হতে পারে, তাই সরকার গঠনের জন্য যে ১৫১টি আসন দরকার, তার থেকেও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারে, আর তা সাংবিধানিকভাবে শুদ্ধ। বর্তমান সংসদ সংবিধানের ৬৫ (২) অনুচ্ছেদে বলেছে, যাঁরা ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন বা ডাইরেক্ট ইলেকশনের’ মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন, তাঁরাই সংসদ সদস্য বলে অভিহিত হবেন। ১৫৪ জন প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত হননি। আমরা বলেছিলাম, এ রকম কাগুজে বৈধতা ভূতাপেক্ষভাবেও মীমাংসা করা চলে। তাই বর্তমান সংসদের বৈধতার বিষয়টি আসলে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। এই লেখার শুরুতে গত চার বছরের যে চারটি বৈশিষ্ট্য আমরা চিহ্নিত করলাম, সেটাই আমাদের বিবেচনায় আইনগত, রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগেও ওই সমস্যা ছিল, নিরঙ্কুশ শাসন তা আরও নিরঙ্কুশ করেছে। এর থেকে বেরোতে চাইলে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই সব থেকে বেশি ভরসা দিতে পারে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জাতিরাষ্ট্র ও জাতীয় ভাষা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

জাতিরাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো তার জাতীয়তাবাদী চেতনা। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের ফসলই হলো জাতিরাষ্ট্র। মধ্যযুগে খ্রিষ্টীয় ইউরোপে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তা-ই বলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকায় যেসব জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব জাতি আগে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে, সেগুলোর অধিকাংশই স্বাধীনতার পরে ধারণ করেছে জাতীয় বৈশিষ্ট্য। পরাধীন আমলে প্রবর্তিত বহু রীতিনীতি বর্জন করেছে। জাতীয়তাবাদী চেতনা ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে তার সংস্কৃতিতে: ভাষায়, পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভ্যাসে, সম্ভাষণরীতি প্রভৃতি জীবনাচরণে।
যেসব ভূখণ্ডে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানকার সরকারব্যবস্থা স্বাধীনতার আগে যেমনটি ছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে তেমনটি থাকে না। তাতে আসে আমূল অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন। ঔপনিবেশিক আমলের বিজাতীয় সাংস্কৃতিক বিষয় পরিত্যাজ্য হয়। তার জায়গায় যুক্ত হয় জাতীয় ঐতিহ্যগত বিষয়। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে সেই লড়াই বহুমাত্রিকতা পায়। পাকিস্তানের ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষার জন্য লড়াই করার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এই কথার অর্থ হলো এই যে রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে বাংলা ভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। স্বাধীনতার আগেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছিল পাকিস্তানের ১৯৬২-এর সংবিধানে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা এবং উর্দু, তবে এই অনুচ্ছেদটির অর্থ এই নয় যে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারে বাধা থাকবে, এবং বিশেষভাবে ইংরেজি ভাষা সরকারি ও অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে যে পর্যন্ত না এর পরিবর্তনের জন্য উপযোগীকরণ ব্যবস্থা করা হবে।’ বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা ভাষার সঙ্গে এমন কোনো শর্ত নেই বিকল্প হিসেবে ইংরেজি ব্যবহারের। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নানা দাপ্তরিক কাজকর্মে বাংলার সঙ্গে ইংরেজিকে বাদ দেওয়া যায়নি। ১৯৭৪-এর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বিশ্বসভায় বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা স্বীকৃত হয়। এক সপ্তাহ পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তিনি তাঁর ভাষণ দেন বাংলায়। জাতির জীবনে তা ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের একটি শুভসূচনা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দ্বিতীয়বার জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁর হয়নি। বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিচ্ছিলেন বাংলায়, তার ইংরেজি অনুবাদ ওই কক্ষ থেকেই একই সঙ্গে পাঠ করছিলেন কূটনীতিবিদ ফারুক চৌধুরী। সেই ইংরেজি থেকে পাঁচ ভাষায় তরজমা হচ্ছিল। আমাদের জন্য তা ছিল রোমাঞ্চকর ব্যাপার। তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। সেটা সেকেলে টেলিপ্রিন্টারের যুগ। জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণ ঢাকায় আমরা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং এক্সটার্নাল পাবলিসিটি শাখা থেকে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করছিলাম।
বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর বিশ্ববাসী বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী নেতার মুখ থেকে শুনেছিল। পরের বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন বর্তমানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। বিচারপতি চৌধুরী ভাষণ ইংরেজিতে দেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অথবা তাঁদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইংরেজিতেই ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুর সূচিত বাংলায় ভাষণ দেওয়ার প্রথা অনেক বছর অনুসৃত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর পরে জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ১৯৯৩ তে। তাঁর বাংলা ভাষণের ট্রান্সলেশন বুথ থেকে ইংরেজি তরজমা পাঠ করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ শাখার মহাপরিচালক ইফতেখার আহমদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর তিন মেয়াদে সব সময় বাংলাতেই জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা। এই ভাষার কবি এক শতাব্দীরও বেশি আগে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। সেটাও ভাষার বিশ্বস্বীকৃতি। এখন বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। তারা শুধু বাংলাদেশ ও ভারতে নয়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাস করছে। সেসব বিবেচনায় ও ভাবাবেগবশত দাবি উঠছে অথবা আমরা আশা করছি, জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করা হোক বাংলাকে। বর্তমানে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, আরবি ও চৈনিক মান্দারিন জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা। বাংলা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হতে বাধা কোথায়, তা নিয়ে কথা বলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদের সঙ্গে। তিনি অনেক দিন জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে এবং জেনেভায় জাতিসংঘের ইউরোপীয় সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর মতে, অন্যান্য বাধার সঙ্গে বড় বাধা ব্যয়। ছয়টির সঙ্গে আর একটি নতুন ভাষা যুক্ত হলে বছরে জাতিসংঘের খরচ বাড়বে অন্তত সাত-আট কোটি ডলার। জাতিসংঘ এবং সদস্যদেশগুলো সেই বোঝা বহনের দায় নেবে কেন? সমৃদ্ধ ভাষা জার্মান ও জাপানিও দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি পায়নি। জার্মান ও জাপানের টাকার অভাব নেই। ভাষা নিয়ে সারা বছর বাক্য ব্যয় আমাদের মতো কোনো জাতি করে না। আর এক দিন পরই আসছে ফেব্রুয়ারি মাস, যাকে আমরা নাম দিয়েছি ‘ভাষার মাস’।
আমাদেরই আছে শুধু ‘ভাষার মাস’, পৃথিবীর আর কোনো জাতির নেই। তাদের সব মাসই ভাষার মাস, সব দিনই ভাষার দিন। ভারতের ভাষার মাস নেই; থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়া, ফরাসি দেশ, জার্মানি, স্পেন, সুইডেনের ভাষার মাস নেই। কিন্তু নিজেদের ভাষা তাদের এতই প্রিয় যে প্রতিটি দেশই তাদের জাতীয় ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করে না। সরকারের বাইরে সাধারণ নাগরিকেরাও নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলতে চায় না। জার্মানি বা ফরাসি দেশের কোথাও সে দেশের কোনো নাগরিকের ওপর বোমা মারলেও তাদের মুখ দিয়ে ইংরেজি বাক্য বেরোবে না। অথচ উচ্চশিক্ষিত জার্মান ও ফরাসিরা খুব ভালো ইংরেজি জানেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিখ্যাত ফরাসি লেখক ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আঁদ্রে মালরোঁ বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন। ইংরেজি জানা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফরাসিতেই কথা বলেছেন। তার ইংরেজিতে ও বাংলায় তরজমা করেছেন দোভাষী। স্বাজাত্যবোধ এক বিরাট ব্যাপার। মুখ দিয়ে ফটর ফটর করলেই জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটে না। তাতে ভাষার ও জাতির লেশমাত্র উপকার হয় না। ভারতের অহিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর সব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড হিন্দি বা ইংরেজিতে দেখিনি, সবই সেখানকার আঞ্চলিক ভাষায়। ঢাকার রাস্তায় চোখ বুলিয়ে দেখুন! আমরা যদি সত্যি সত্যি ভাষাপ্রেমিক হয়ে থাকি এবং যথার্থই বাংলা ভাষার উন্নতি চাই তাহলে জাতিসংঘ পর্যন্ত না গিয়ে দেশের ভৌগোলিক চৌহদ্দির মধ্যেই জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। যখন বড় বড় প্রাসাদোপম বাড়িগুলোর ফটকে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে বাড়ির নাম ও বাড়ির মালিকের নাম লেখা দেখি তখন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের কথা মনে পড়ে। স্বাধীনতার পর ব্যাংক, বিমা প্রভৃতির নাম বাংলায় করা হয়েছিল-সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, উত্তরা, জনতা প্রভৃতি। আজ বাংলার কৃষককেও আমরা ফারমার্স বলে ডাকতে ভালোবাসি।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগে ইংরেজি আমাদের ব্যবহার করতে হবে। ইংরেজি জানা এক কথা আর তা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা এবং জাতীয় ভাষাকে অবহেলা করা আরেক কথা। কিছু কিছু জিনিস একেবারে ওপর থেকে শুরু হলেই ভালো। তখন নিচের দিক বাধ্য হয় তার অনুশীলনে। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এসেছিলেন বাংলাদেশে সংক্ষিপ্ত সফরে। তিনি ইংরেজি জানেন না তা মনে করার কারণ নেই। চীন সরকারের কর্মকর্তারা তো জানেনই। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে চীনা ভাষাতেই কথা বলেছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দিলেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত অভিপ্রায়কে মর্যাদা দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডের নেতারা যদি থাই ভাষা, তুরস্কের নেতারা যদি তুর্কি ভাষা, ইরানের নেতারা যদি ফারসি ভাষা দিয়ে দেশ-বিদেশে যাবতীয় কাজ চালাতে পারেন, সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা আমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে না কেন? বিজাতীয় ভাষা মিশিয়ে মধুর ভাষা বাংলাকে যেভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিকৃত করা হচ্ছে, তা ফৌজদারি অপরাধ না দেওয়ানি অপরাধ, আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে তা যে অপরাধ একজন বাঙালি হিসেবে তাতে আমার সন্দেহ নেই। সব ব্যাপারে ফান্ডামেন্টাল রাইটের দোহাই চলে না। জাতিরাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব জাতীয় ভাষার সঙ্গে কম উন্নত আঞ্চলিক ভাষাগুলোর প্রতিও যত্নবান হওয়া। জাতীয় ভাষাকে যদি শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলেই অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সার্থক হবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

খুব বেশি মানুষ ফিরবে না by বিল রিচার্ডসন

গত দুই মাস রাখাইন রাজ্যের দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে গঠিত এক আন্তর্জাতিক প্যানেলে আমি কাজ করেছি, যার লক্ষ্য ছিল মিয়ানমার সরকারকে এ বিষয়ে এক যুক্তিসংগত ও ন্যায্য নীতি প্রণয়নে সাহায্য করা। কিন্তু এ সপ্তাহে আমি পদত্যাগ করেছি। কারণটা হলো এই অঞ্চল ও দেশের গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই প্যানেলের সামর্থ্য কতটুকু, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। অং সান সু চিই মূলত মিয়ানমারের নেতা, কিন্তু তিনি একদিকে যেমন বিচ্ছিন্ন, তেমনি অন্যদিকে গঠনমূলক সমালোচনা তিনি নিতে চান না। তাঁর সরকার তাড়াহুড়ো করে সবকিছু করতে চায়। সঠিকভাবে কিছু করার চেয়ে তারা তাড়াহুড়ো করতেই বেশি আগ্রহী। মিয়ানমার সরকার যদি সংকট আরও ঘনীভূত হতে দিতে না চায় বা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে নাটকীয় কিছু ঘটাতে হবে। মিয়ানমারের বর্তমান মনোভঙ্গি বজায় থাকলে সহিংসতার চক্র আরও দীর্ঘায়ত হবে এবং শান্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশা ধূলিসাৎ হবে। একই সঙ্গে বৃহত্তর অর্থে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আশাও দূরীভূত হবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এক নতুন মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী মিয়ানমারের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর সমন্বিত হামলা চালালে দেশটির সেনাবাহিনী এক দীর্ঘ ও নৃশংস অভিযান শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় গত ১৫ মাসে আট লাখ মানুষকে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। রাখাইন প্রদেশে মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাসের সম্পর্ক, তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। তেমনি সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও অনাস্থা বেড়েছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে বৈষম্যের নীতি এখনো জারি আছে।
বড় বড় মাদক ও মানব পাচারকারী গোষ্ঠী এখনো এই অঞ্চলটা ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। আর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে অনেক দিন ধরেই যে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ হচ্ছে তাতে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে। আবার এসব সমস্যা মোকাবিলায় মিয়ানমার যেসব প্রচেষ্টা নিয়েছে, তা যথোপযুক্ত না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই সমস্যা মোকাবিলার রূপরেখা দেওয়া হলেও দেশটির সরকার এখন পর্যন্ত রাখাইনের জন্য সুস্পষ্ট কৌশল প্রণয়ন করতে পারেনি। সরকার শুধু ফল চায়, তার প্রভাব কেমন হবে, সেটা নিয়ে তারা ভাবিত নয়। তারা দ্রুততার সঙ্গে সবকিছু করে পৃথিবীকে দেখাতে চায়; তারা এমন কোনো প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে চায় না, যার মাধ্যমে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অং সান সু চির নৈতিক নেতৃত্ব না থাকায় ব্যাপারটা আরও সমস্যাজনক হয়ে উঠছে, যে রাজনীতি ক্রমে জাতীয়তাবাদী, মুসলিমবিরোধী ও পরিবর্তনবিমুখ হয়ে উঠছে। আবার তারা যে নতুন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করছে, তাতেও পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সম্প্রতি তারা রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে। পরিবর্তন বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ওপর ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে, ব্যাপারটা ঠিকই আছে। কিন্তু তাতে সরকারের সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখার মানসিকতা জায়েজ হয় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ না করার মানসিকতা প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চায়, মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করুক। তারা সেখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করুক। পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে দেশটির সরকারের অনতিবিলম্বে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমত, রাখাইন প্রদেশের প্রসঙ্গে অং সান সু চিকে নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুই বছর আগে নির্বাচিত হওয়ার সময় তাঁর দলের যে জনপ্রিয়তা ছিল, এখন সেটা কমে গেলেও তিনি এখনো দেশটিতে শ্রদ্ধার পাত্র, বিশেষ করে সংখ্যাগুরু বর্মি নাগরিকদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়। নিজের অবস্থান কাজে লাগিয়ে তাঁর উচিত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘৃণা ছড়ানোর সমালোচনা করা। তেমনি বক্তৃতায় তাঁর এমন কিছু বলা উচিত নয়, যাতে মানুষের কাছে মনে হয় যে তিনি বৈষম্য সৃষ্টি করছেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম রাখাইনের মুসলমানদের মানব-মাছি আখ্যা দিয়েছে, এখন সু চি যদি এটা নিশ্চিত করেন যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সংঘাতের আশঙ্কা উসকে দেবে না, তাহলে সেটা কাজের কিছু হবে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের উচিত সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। দায়মুক্তির সংস্কৃতি থাকলে সু চি যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বারবার বলেছেন, তা হুমকির মুখে পড়বে। রাখাইনে গণকবরের সন্ধানে মিয়ানমার সরকার যে দৃশ্যত স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠনের কথা বলেছে, তাতে আমি উৎসাহিত হয়েছি। আশা করি, এই সূত্র ধরে তারা আরও অগ্রসর হবে।
শেষমেশ রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশমালায় গুরুত্ব দিয়ে রাখাইন প্রদেশের ব্যাপারে কী করা যায়, মিয়ানমারকে সে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। সরকার যে অবকাঠামো ও উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন সমাধানের জন্য উপযুক্ত নয়। চলাচলের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব ও বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। ধাপে ধাপে এই বিষয়গুলোর সমাধানে পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো গুরুত্ব না দিয়ে ফেলে রাখা হলে এগুলো মিয়ানমার, এই অঞ্চল ও পৃথিবীর জন্য আরও বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। স্বল্প মেয়াদের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মিয়ানমার যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, তা বড়জোর প্রতীকী ব্যাপার হবে। তাদের প্রত্যাবাসন যদি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়, তাহলে খুব কম শরণাগত মানুষই নিজ দেশে ফিরে যাবে, যেখানে তাদের ওপর সহিংসতা চালানো হয়েছিল। যে দেশে তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, যেখানে তাদের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই-সেখানে কজনই বা স্বেচ্ছায় ফিরবে। ফলে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে থেকে যাবে, যাদের আবার চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। নিজের ও আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য মিয়ানমারকে এই মুহূর্তে অবশ্যই সঠিক পথ অবলম্বন করতে হবে। আর তাকে স্বীকার করতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাকে এই কাজে সহায়তা করতে চায়।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া।
বিল রিচার্ডসন: রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অং সান সু চর গঠিত আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্যানেল থেকে ২৫ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

আমাদের সাহিত্যের কালপুরুষ by জাকির তালুকদার

লেখকের মুখের ওপর সব সময় আলোকসম্পাত তাঁর ধ্যানে বিঘ্ন ঘটায়। সব স্রষ্টার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। ধ্যানস্থ হতে না পারলে মৌলিক ও গভীরতাসম্পন্ন সৃষ্টি অসম্ভব। তাই মিডিয়া বা অনুষ্ঠানের ফোকাসে বেশি সময় থাকাটা সত্যিকারের লেখকের জন্য স্বস্তিকর নয়। কাম্যও নয়। আগেকার যুগের সাধক-মুনিঋষিরা লোকালয় ছেড়ে দূরে থাকতেন মাঝে মাঝে। মুনিঋষি মানেই কেবল ধর্মচিন্তক ঈশ্বরসন্ধানী নন।
তাঁরা অনেকেই ছিলেন দার্শনিক, কবি, গণিতবিদও। আজকের যুগের লেখক-কবিদের লোকালয় ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের বাস করতে হয় পারিবারিক গণ্ডির মধ্যেই। জীবিকার জন্য জমা দিতে হয় আট-দশ কর্মঘণ্টা। পড়তে হয় ট্র্যাফিক জ্যাম ও অবরোধের কবলে। পরিবারের ব্যয়ভার সামলাতে হয়, বাজেট করতে হয় আয়-ব্যয়ের। এই সবকিছু সামাল দেওয়ার পর কেবল জোটে ধ্যানস্থ হওয়ার বা লেখালেখির অবকাশ। সেটুকুও অন্য খাতে ব্যয় করে ফেললে লেখকের জন্য সময় থাকে কোথায়! শওকত আলীর মতো বড় লেখক এ কথা জানতেন ভালোভাবেই। মানতেন আরও বেশি ভালোভাবে। লেখক পাঠকের সামনে উপস্থিত হবেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। তাঁর হয়ে কথা বলবে রচনাকর্ম। অন্য অনেক সেলিব্রেটি লেখক-কবির সঙ্গে শওকত আলীর একটা পার্থক্য এই জায়গায়। তিনি নিজের ছায়ায় আড়াল করে ফেলেননি তাঁর সাহিত্যকর্মগুলোকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষা ও অবয়ব নির্মাণ করেছেন যে কজন কবি-সাহিত্যিক, তাঁদের মধ্যে শওকত আলী একজন। বাংলাদেশের সাহিত্য মানে ১৯৪৭ সালের ভারতভাগ ও বাংলাভাগের পরবর্তী সময়ের সাহিত্য। সত্য বটে, ১৯৪৭-এর আগেও ঢাকাকেন্দ্রিক একটি সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার ক্ষীণ ধারা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। সোমেন চন্দ, রণেশ দাশগুপ্ত, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত আর মুসলিম সাহিত্যসমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর নাম বলা যায়। কিন্তু সেগুলো ছিল নিতান্তই অবস্থানগত কারণে। তাঁদেরও মূল দৃষ্টি ছিল কলকাতার দিকেই। ১৯৪৭-এর অনেক ওলোট-পালোটের পরে এই সত্য সবাইকে মেনে নিতে হলো যে অন্য সবকিছুর মতো ঢাকাকেই গড়ে-পিটে নিতে হবে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যের কেন্দ্র হিসেবে। এই কাজটি যাঁরা করেছেন, শওকত আলী তাঁদের একজন। কাজটি সহজ ছিল না। প্রকাশনার ও বিপণনের অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না আমাদের এই ভূখণ্ডে। তার চাইতেও বড় বিপদ ছিল অন্যখানে। তা হচ্ছে একটি বড় লেখকগোষ্ঠীর পাকিস্তানি জজবা। পাকিস্তান তাদের কাছে ছিল পঞ্চম খোলাফায়ে রাশেদিনের স্বপ্ন। অবিভক্ত বাংলায় কলকাতাকেন্দ্রিক লেখকদের প্রতাপ ও প্রতিভার কাছে নতমুখ থাকতে হয়েছে তাদের। মীর মশাররফ ও নজরুলের আবির্ভাবের পরেও বাংলা সাহিত্য মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু লেখক-কবির একাধিপত্য মেনে চলেছে একটানা। পাকিস্তান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিরাট লেখকগোষ্ঠী এ দেশের সাহিত্যকে কলকাতার সাহিত্য থেকে আলাদা করার উপায় হিসেবে খুঁজে পেল আরবি-ফারসি শব্দ আর আরবজাহানের মিথগুলোকে। সংগত কারণেই তারা সহযোগিতা পাচ্ছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর। সেই বিহ্বল বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষা ও অবয়ব নির্মাণের মতো দুরূহ কাজটি করতে হয়েছে কয়েকজন প্রতিভাবান লেখক-কবিকেই। কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং কবিতায় আহসান হাবীব সাহিত্যবলয়ের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন কলকাতাতেই। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর সওগাত পত্রিকা স্থানান্তর করলেন কলকাতা থেকে ঢাকায়।
পূর্বাপর যে লেখক-কবি-প্রাবন্ধিকেরা এলেন ঢাকার সাহিত্যজগতে, তাঁদের মধ্যে একজন শওকত আলীও। বাংলাদেশের সাহিত্যের মূলধারার নির্মাতা তাঁরা। চলতি স্রোতে গা না ভাসানোর আরও দুটি পরীক্ষায় শওকত আলী পাস করলেন ষাটের দশকে। প্রথমটি ছিল কলাকৈবল্যবাদের ফাঁদ। সেই সময় ঢাকায় এল সৌন্দর্যবাদী সাহিত্যের প্রবণতা। প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকাগুলো এবং তৎকালীন তরুণদের লিটল ম্যাগাজিনগুলো এই ধারাকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে দিয়েছিল। সেই সময় এমন একটি অবস্থা হয়েছিল যে এসব পত্রিকার লিখিত-অলিখিত নির্দেশনা মোতাবেক না লিখলে সাহিত্যজগতের বাইরে ছিটকে পড়তে হবে। এখন শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও ছিলেন এই নিরীক্ষাসর্বস্ব কলাকৈবল্যবাদী ধারার প্রবল অনুসারী ও প্রচারকদের একজন। ইলিয়াসের নতুন জন্ম ঘটিয়েছিল উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। শওকত আলীর মতো লেখককে তখন ‘সেকেলে লেখক’-এর তকমা না দিলেও সৌন্দর্যবাদীদের চোখে তিনি ‘যথেষ্ট আধুনিক নন’ বলেই বিবেচিত হতেন। শওকত আলী সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। নিজের মতো করে লিখে গেছেন। এই ‘নিজের মতো করে লেখা’ই হচ্ছে লেখকের শক্তিমানতার পরিচয়। দ্বিতীয় বিপত্তিটি ছিল বামপন্থী সাহিত্যের যান্ত্রিক ধারা। পাশাপাশি ষাট ও সত্তরের দশকে এ দেশে বাম চিন্তা অনেকটাই পরিব্যাপ্ত হয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে। শওকত আলী বরাবরই বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। ইতিহাস বলে, বামপন্থী সাহিত্যের নামেও অসংখ্য জঞ্জাল সৃষ্টি হয়েছে। শওকত আলী বামপন্থী হয়েও সেই যান্ত্রিকতার জঞ্জাল থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছিলেন আত্মস্থ সাহিত্যবোধের মাধ্যমে। বড় লেখকেরা কেউ কোনো নির্দিষ্ট ধারার সাহিত্য সৃষ্টি করার জন্য লিখতে বসেন না। শওকত আলীও কখনোই বাম সাহিত্য বা মার্কসবাদী সাহিত্য লিখতে বসেননি। তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। কোনো সাহিত্যই সাহিত্য পদবাচ্য হয় না, যদি তা শিল্পের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়। লেখকের সাহিত্যিক সততা, প্রতিভা ও শিল্পবোধই সাহিত্যকে সাহিত্য করে তোলে। সৎসাহিত্যই শওকত আলীর চোখে ছিল মার্কসবাদী সাহিত্য।
২. সংগঠনও কি লেখকের ধ্যানবিঘ্ন সৃষ্টির কারণ? কখনো কখনো তো বটেই। তবু শওকত আলী সংগঠন করেছেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অনেকগুলো বছর। সংগঠন কখনো কাউকে লেখক বানাতে পারে না। তবে লেখকেরা সংগঠনে যুক্ত হন কিছু সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা পালনের জন্য। সেই দায়িত্বটা তাঁরা পালন করেন রাজনীতির মধ্য দিয়ে নয়, সাহিত্যের মধ্য দিয়েই। সে কারণেই তাঁরা নিজেদের স্লোগান নির্ধারণ করেন শিল্প-সাহিত্য ও বিপ্লবকে সমান্তরালে রেখে-‘শিল্প-সাহিত্য বিপ্লবকে দিক ভাষা, আর বিপ্লব মানুষকে দিক মুক্তি’। সংগঠন মানে তো কিছু কর্মসূচিও। সেগুলোর মধ্যে আছে নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা, বিতর্ক, প্রকাশনা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের বক্তব্য-বিবৃতি তুলে ধরা, এমনকি কখনো রাজপথেও নেমে পড়া। শওকত আলীও এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন সাধ্যমতো। কিন্তু সংগঠনের কাজ আর নিজের সাহিত্য সৃষ্টির কাজকে গুলিয়ে ফেলেননি। আমাদের দেশে কখনো এমন সরকার আসেনি, যাকে শওকত আলীর মতো লেখক সত্যিকারের জনগণের সরকার বলতে পারেন। সে কারণে কোনো সরকারের সঙ্গেই তাঁর কোনো দহরম-মহরম ছিল না। বরং সরকারি সমর্থনপুষ্ট লেখক ও তাঁদের কর্মসূচির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেন তিনি। বিদেশে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা তাঁর ছিল অন্য প্রায় সবার চাইতে বেশি। কিন্তু কখনো তা করা হয়নি তাঁর। কারণ সরকারি প্রতিনিধিদলে নাম লেখানোর জন্য যা যা করতে হয়, সেগুলো তাঁর রুচির সঙ্গে মেলেনি কোনো দিন। অন্য ভাষায় নিজের লেখা অনূদিত হোক, এমন স্বপ্ন প্রায় সব লেখক-কবিরই থাকে। কেননা, অনুবাদের মাধ্যমেই বিশ্বের অন্য ভাষার পাঠকদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু শওকত আলী কোনো দিন এসব কথা ভেবেছেন, এমন লক্ষণ দেখা যায়নি। নিজেকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা বা সুযোগ পেলেই নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার সুযোগ আমরা সহজে হাতছাড়া করতে চাই না। শওকত আলীর অসাধারণ মানসিক শক্তি ও সাহিত্যিক রুচি অবলীলায় অতিক্রম করে গেছে এই দুর্বলতাকে। বাংলাদেশ লেখক শিবির বেশ কয়েক বছর বড় সেমিনার ও আলোচনা সভার মাধ্যমে পালন করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন। তারিখটি ১২ ফেব্রুয়ারি। অনেকগুলো বছর লেখক শিবিরের সভাপতি হিসেবে ওই অনুষ্ঠানেও সভাপতিত্ব করতে হয়েছে শওকত আলীকে। কিন্তু কোনো দিন কাউকে জানতে দেননি যে ওই দিনটি তাঁরও জন্মদিন। নিজেকে এইভাবে আড়ালে রাখতে পেরেছেন বলেই সাহিত্যই আজ শওকত আলীর মূল পরিচয় হয়ে উঠতে পেরেছে।
জাকির তালুকদার: কথাসাহিত্যিক।

মার্কিন গ্রাহকদের আরো স্থানীয় সংবাদ সরবরাহ করবে ফেসবুক

ফেসবুক সোমবার জানিয়েছে, তারা মার্কিন গ্রাহকদের কাছে আরো স্থানীয় সংবাদ সরবরাহ করবে। অনেক প্রভাবশালী এ সামাজিক নেটওয়ার্কের তথ্য প্রবাহ আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি তাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। এ মাসের গোড়ার দিকে ফেসবুকের পক্ষ থেকে দেয়া ঘোষণায় ভুল তথ্যের বিস্তার ঠেকানো প্রচেষ্টার পাশাপাশি সংবাদ সূত্রের ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার মাত্রা বৃদ্ধি করে এ নেটওয়ার্কের গ্রাহক সংখ্যা ২শ’ কোটিতে উন্নীত করা কথা বলা হয়। এ অনলাইন জায়ান্ট মিথ্যা সংবাদের বিস্তার রোধে (বিশেষকরে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকালীন সময়ের) ব্যর্থ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার পর তা মোকাবেলায় এ পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়া হলো। এ সামাজিক নেটওয়ার্কে দেয়া এক পোস্টে ফেসবুক কো-ফাউন্ডার ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকার্সবার্গ বলেন, ‘স্থানীয় সংবাদ অন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে কমিউনিটি গড়ে তোলার জন্য সহায়ক হচ্ছে। ‘ফেসবুকে আমাদের সময় কাটানোর ক্ষেত্রে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’ জুকার্সবার্গ গত বছর সারা যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ফেসবুক গ্রাহকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ‘এ সময় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকে আমাকে বলেছেন যে অধিক বিতর্কিত বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে তার স্থলে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নজর দেয়া যেতে পারে।’ তিনি ফেসবুক গ্রাহকদের সাথে কথা বলে আরো জানতে পেরেছেন যে স্থানীয় সংবাদ দেয়া হলে এটা কমিউনিটির জন্য ইতিবাচক হবে।

রক্তপানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর!

প্রায় ৭৬ বছর আগে এক অদ্ভুত অনুষ্ঠানে নিজেদের রক্ত পান করেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় প্রমাণ হয় তারা এখনো সেই ঐতিহ্য থেকে বের হতে পারেনি। ১৯৪১ সালে ঘটে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সূত্রপাত। ৩০ জন সদস্য নিয়ে সেনাবাহিনীর আদলে থার্টি কমরেডস গঠিত হয়।
ওই বছরই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভয়ানক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তারা। অনুষ্ঠানে বাহিনীর সব সদস্যের শরীর থেকে একটিমাত্র সিরিঞ্জ দিয়ে অল্প অল্প করে রক্ত বের করে একটি রুপার পাত্রে রাখা হয়। পরে তা একত্রে মিশ্রিত করে সবাই ওই রক্ত পান করে। পরস্পরের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে এটি করা হয়। সে বাহিনীর নেতা হিসেবে অং সানকে নির্বাচিত করা হয়। তিনি বর্তমান স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির বাবা। মিয়ানমারের এ বাহিনী ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে অবশ্য অং সান হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সে সময় তার কন্যা অং সান সু চির বয়স ছিল দুই বছর। এরপর মিয়ানমার স্বাধীন হলে বেসামরিক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় সেনাবাহিনী। এরপরের কাহিনী মোটেই মানবিক নয়। মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, বর্বরতম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে এটাই শুধু নির্যাতনের কাহিনীর পুরোটা নয়। প্রায়ই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরো বহু জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায় তাদের।

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে রাশিয়া : সিআইএ প্রধান

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক মাইক পম্পিও সোমবার প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, রাশিয়ার নির্বাচনী হস্তক্ষেপ থেমে যায়নি। বরং দেশটি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। খবর এএফপি’র। রুশদের ব্যাপারে পম্পিও বিবিসি’কে বলেন, ‘নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিষয়ে তাদের কর্ম তৎপরতা তেমনভাবে কমে যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছি যে তারা এ কাজ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবে। তবে আমি জোরদিয়ে বলতে পারি আমেরিকা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম হবে। ২০১৬ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তাদের এই প্রচেষ্টায় ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ক্ষতি করার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবমূর্তি বড় করার প্রচারণা চালানো হয়। আর এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বার্তা হ্যাক করে তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

মাটির টানেও ফিরতে ভয় পাচ্ছে রোহিঙ্গা যুবকেরা

রোহিঙ্গা যুবকেরা পিতৃপুরুষের ভিটেমাটির মায়া কাটাতে পারেনি। মাটির টানে তারা ফিরতে চায় নিজ বসতভিটায়। তবে কোনো শরণার্থী শিবিরে বন্দী থাকতে নয়। প্রত্যাবাসন শুরু হলে মিয়ানমারে ফিরে যাবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মনজুর আহমদ জানান, মিয়ানমারে ফিরলে নানান অজুহাতে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু হবে। আমাদের গ্রেফতার করে আজীবন কারারুদ্ধ করে রাখা হবে।
নয়তো বা গুপ্ত হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হবে। উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত কয়েকজন যুবক শ্রেণীর রোহিঙ্গার সাথে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তারা এ কথা বলেন। তারা আরো বলেন, তাদের পরিবার-পরিজন আত্মীয়-স্বজন স্বদেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। তবে স্বদেশে ফেরার ক্ষেত্রে যাতে বাধা না আসে, সেখানে ফিরে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারবে তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা যুবকেরা অনেকেই বেকার দিন কাটাচ্ছে। এদের মধ্যে মোহাম্মদ আলম (২৫), মন্জুর আহমদ (২২), জামাল উদ্দিন (৩০), আবদুল্লাহ (২০) ও রাকিব উল্লাহ (২৭) ঘাসের ওপর বসে তাস খেলছিল। সাংবাদিক দেখেই তারা তাসগুলো লুকিয়ে ফেলে। কিছু জানার আগেই তারা বলতে শুরু করল, বোঝাতে চাইল এখানে কোনো কাজকাম নেই। তাই চার-পাঁচ বন্ধু বসে গল্প-গুজব করছিলাম। তাদের হাতে দেখা গেল দামি মোবাইল সেট। জানতে চাইলাম প্রত্যাবাসন শুরু হলে মিয়ানমারে ফিরে যাবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মনজুর আহমদ জানান, তাদের বাড়ি রাশিডং কাওয়ারবিল গ্রামে। তাদের সহায়সম্পদ, জমিজমা, গরু-মহিষ সব আছে তবে নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা বা কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। অদূরে দেখা গেল বেশ কয়েকটি মুদির দোকান, দোকানের মালিক সবাই মিয়ানমারের নাগরিক সালামাতুল্লাহ (৫৫) নামে এক দোকানি জানান, তারা মিয়ানমারে নিজ গ্রামে ছোটখাটো ব্যবসায় বাণিজ্য করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল।
তার কাছে জানতে চাওয়া হয় প্রত্যাবাসন শুরু হলে মিয়ানমারে চলে যাবেন কি না? জবাবে জানান নিজ দেশে ফিরতে কে না চায়? তবে কথা হচ্ছে ২০১২ সালে জাতিগত দাঙ্গায় রোহিঙ্গারা এ দেশে পালিয়ে রেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে আশ্রয় নেয়। তাদেরকে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। পরে জেলা প্রশাসক ওই সব রোহিঙ্গাকে কোনো ত্রাণসামগ্রী না দেয়ার জন্য এনজিওদের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন, এই অবস্থায় সরকার যদি তাদের জানমালের নিরাপত্তাসহ নাগরিক অধিকার আদায় করে দিতে পারে তাহলে যুবক ছেলেরা না গেলেও তারা সপরিবারে স্বদেশে ফিরে যাবেন।বুচিডং মুরুনে তমবাজার এলাকার রোহিঙ্গা মৌলভী জাফর উল্লাহ (৩৮) বলেন, রাখাইনে এখনো  চার দিকে তাক করে আছে বন্দুকের নল। চলছে নির্বিচারে গুলি। এখনো পোড়ানো হচ্ছে ঘরবাড়ি। এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে স্বদেশ ফিরবেন প্রশ্ন করেন তিনি।

অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষিত

গতকাল দশম জাতীয় সংসদের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। এ চার বছরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে, তার প্রায় ৯০ ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গত চার বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ১ হাজার ৬৫৬টি সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২২১টি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। জানা গেছে, এ সরকারের আমলে ৩৮টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সম্পর্কিত আরও ১০টিসহ মোট ৪৮টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের নামে অর্থ পাচারকারীদের তালিকা, বেসিক ব্যাংক লুটপাটের মূল হোতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও ঋণখেলাপিদের তালিকা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সুপারিশ করা হলেও অধিকাংশ সুপারিশ এখন পর্যন্ত ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়ে গেছে। সংসদীয় কমিটিগুলোর বৈঠক খাতে প্রতি বছর ব্যয় হয় ৫ কোটি টাকারও বেশি। প্রশ্ন হল, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলো যদি আমলেই নেয়া না হয়, তাহলে এ ধরনের নামসর্বস্ব কমিটি গঠন করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে কেন? অভিযোগ রয়েছে, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে খোদ সরকারেরই কোনো আগ্রহ নেই। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আইন-২০১১ নামে এ সংক্রান্ত একটি বিলের খসড়া তৈরি করে রেখেছে, যা নবম জাতীয় সংসদেই পাস হওয়ার কথা ছিল। অথচ এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে দশম সংসদের মেয়াদকালে এ বিল আদৌ পাস হবে কিনা, তা একরকম অনিশ্চিত। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিলটি পাস হলে কমিটি যাকে তলব করবে, বৈঠকে তার হাজির থাকা বাধ্যতামূলক। হাজির না হলে সংসদ অবমাননাসহ তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি এবং শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে সংসদীয় কমিটি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিলটি পাসের মধ্য দিয়ে সংসদীয় কমিটিগুলো শক্তিশালী হলে দুর্নীতি কমবে এবং মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব, জনস্বার্থে এ বিল পাস হওয়া উচিত। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ‘ছায়া মন্ত্রণালয়’ হিসেবে পরিচিত। অথচ কমিটির সুপারিশগুলো কেবল কার্যপ্রণালীবিধির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, সংসদীয় কমিটিগুলো সার্বভৌম সংসদেরই অংশ। কোনো বিষয়ে কমিটির সুপারিশ মানে একধরনের নির্দেশ। এ নির্দেশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। মন্ত্রণালয়গুলো সংসদীয় কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষা করে বা আমলে না নিয়ে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রবণতা থেকে বের হওয়া জরুরি বলে মনে করি আমরা। বস্তুত কাগজে-কলমে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল থাকলেও বাস্তবে তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সংসদ চলছে শক্তিশালী বিরোধী দলবিহীন অবস্থায়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বলীয়ান সরকার তার নিজস্ব স্টাইলে চলছে বললে অত্যুক্তি হবে না। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে এর অবসান জরুরি। এজন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ইন্টারনেট সেবা

প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। দেশের নানা ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। সরকারের নানা সেবা এখন ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়ণের প্রথম শর্ত সর্বত্র ইন্টারনেট সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর খরচ জনসাধারণের হাতের নাগালে রাখা। শতভাগ মানুষকে না পারলেও প্রতিটি পরিবারকে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসতেই হবে। নয়তো ডিজিটাল বাংলাদেশ কাগজ-কলমেই আটকে থাকবে। ১৮ কোটি মানুষকে প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে, অন্তত সঠিক ও ফেইক ওয়েবসাইট শনাক্তকরণ, ভাইরাস বা স্পাইওয়্যার সম্পর্কে ধারণা প্রদানসহ ইন্টারনেট দুনিয়ার নিরাপত্তা এবং এর ব্যবহার শেখাতেই হবে যথাসময়ে। এত বড় একটা জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার প্রশিক্ষণ যদি মানসম্মত না হয় তাহলে এর ভোগান্তি হবে ভয়াবহ। নাগরিকদের একটা বড় অংশ প্রযুক্তির সঙ্গে এখনও পরিচিত নয়। ডিজিটাল দুনিয়া মানে গ্লোবালাইজেশন। এখানে যেমন সহজে তথ্য পাওয়া যাবে তেমনি প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সরকার ঘোষণা করেছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ। আইসিটি খাতকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এখনও সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়নি। তাই মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সমস্যার একটা বড় নাম এই মোবাইল ইন্টারনেট। ২ জিবি ডেটা কিনতে গড়ে ৪০০ টাকা খরচ হয়, যার মেয়াদ থাকে ৩০ দিন।
একজন গ্রাহক কোনো কারণে যদি তার ডেটা ব্যবহার না করে রেখে দেয়, তাহলে ৩০ দিনের মেয়াদ শেষে তা আর ব্যবহার করতে পারে না। এভাবে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার অব্যবহৃত ডেটা এক্সপায়ার্ড হয়ে যাচ্ছে, যা গরিবের পকেট কাটার মতোই ব্যাপার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ডেটার মেয়াদ হবে অসীম, পাশাপাশি দাম কমাতে হবে ডেটা প্যাকের। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডেটার পরিমাণ অসীম করতে হবে, অর্থাৎ প্রতি মাসে নির্দিষ্ট টাকায় অসীম ডেটা দিতে হবে, যা হবে প্রতি মাসে নবায়নযোগ্য। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিন্ম রেটে যেন এদেশের মানুষ ইন্টারনেট প্যাক নিতে পারে তার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। সুদূরপ্রসারী সাফল্য পেতে ওয়াইফাই জোন ও নেটওয়ার্কের কাভারেজ এরিয়া বাড়াতে হবে, যেন প্রত্যেক নাগরিক যে কোনো স্থান থেকে এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা পেতে পারে। অনেক এরিয়া রয়েছে যেখানে এখনও থ্রিজি নেটওয়ার্ক নেই, আবার অনেক জায়গায় ইন্টারনেট পেইজ ওপেনই হয় না। এ জায়গাগুলোকে অতি দ্রুত চিহ্নিত করে নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। একটা বিশেষ কল সেন্টার হতে পারে যেখানে মানুষ ফোন করে তাদের এলাকার নেটওয়ার্ক সমস্যা জানাবে এবং সরকারি তদন্ত টিম তা পর্যবেক্ষণ করে সমাধানের ব্যবস্থা নেবে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি সমস্যা প্রায় সব এলাকাতেই বিদ্যমান। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে যেমন ছড়িয়ে দিতে হবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ, তেমনি এর গতির দিকটিও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ীরা ক্যাপাসিটির বেশি সংযোগ দেয়ায় নেট স্পিড শেয়ার হয়ে কমে যায়। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকার তার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সেবাসমূহ ইন্টারনেটে প্রদান করছে। আর আমরা নাগরিকরা যদি স্লো নেট স্পিডের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করি, তাহলে ডিজিটাল হওয়ার সুফল পাওয়া কি আদৌ সম্ভব হবে?
সাব্বির হোসেন : প্রকৌশলী, শ্রীপুর, গাজীপুর
kashbdltd@gmail.com

এডেনে অস্ত্রবিরতির আহ্বান সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের

সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট মঙ্গলবার ইয়েমেনের অন্তঃবর্তীকালীন রাজধানী এডেনে অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। সেখানে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সরকারি সৈন্যদের প্রচণ্ড লড়াই চলছে। সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ জোটের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ‘জোট বাহিনী বিবদমান সকল পক্ষকে অবিলম্বে অস্ত্রবিরতি ও সব ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে।’
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘জোট বাহিনী এডেনের নিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অঙ্গীকার করেছে।’ জোট বাহিনী জানায়, তারা এর আগেও বিবদমান পক্ষগুলোকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু তাদের সেই আহ্বানে কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি ফর রেডক্রস (আইসিআরসি) সোমবার রাতে জানিয়েছে, এডেনে দুই দিনের লড়াইয়ে অন্তত ৩৬ জন নিহত ও অপর ১৮৫ জন আহত হয়েছে। সোমবার লড়াইরত দুই পক্ষই ট্যাংক ও গোলা ব্যবহার করা শুরু করেছে। এর ফলে বন্দরনগরীটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

ইসরাইলকে বোকামি না করতে হুঁশিয়ারী হিজবুল্লাহর

ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা নির্মাণের দাবি নাকচ করেছে লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ। সম্প্রতি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রোনান মেনলিস দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহ ও ইরান যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা নির্মাণের চেষ্টা করছে এবং ওই সব কারখানায় লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে। হিজবুল্লাহর সংসদীয় দলের নেতা মোহাম্মাদ রা’দ বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের এ বক্তব্য একেবারেই অতিরঞ্জন। তারা এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে কোনঠাসা অবস্থা থেকে নিজেদেরকে বের করে আনার চেষ্টা করছে এবং নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার চেষ্টা করছে। হিজবুল্লাহর ওই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন এমন সব যুদ্ধ সরঞ্জাম রয়েছে যা দিয়ে ইসরাইলের সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া সম্ভব।’ এ অবস্থায় লেবাননে হামলার মতো বোকামি না করতে ইসরাইলকে পরামর্শ দেন মোহাম্মাদ রা’দ। ২০০৬ সালে ৩৩ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কাছে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই ইহুদিবাদী ইসরাইল নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে আসছে।
পরবর্তী যুদ্ধে হিজবুল্লাহ মহাসচিবকে হত্যা করা হবে: ইসরাইল
ইহুদিবাদী ইসরাইলের সামরিক বাহিনী বলেছে, ভবিষ্যত যুদ্ধে লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করা হবে। গত ২৭ নভেম্বর ইসরাইলের এইলাত শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রোনেন ম্যানেলিস একথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যত যুদ্ধে বিজয়ের কোনো পরিষ্কার চিত্র নেই। তবে হিজবুল্লাহ মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার টার্গেট হবে মূল বিষয়।’ ইহুদিবাদী এ সেনা মুখপাত্র তার ভাষায় বলেন, ‘হাসান নাসরুল্লাহর মৃত্যু হিজবুল্লাহর সামরিক অভিযানের ওপর প্রভাব ফেলবে।’ ২০০০ ও ২০০৬ সালে ইসরাইলের সঙ্গে হিজবুল্লাহর দুটি যুদ্ধ হয়েছে এবং দুটি যুদ্ধেই হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া, সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তার সাম্প্রতিক প্রতিটি ভাষণে বলেছেন, যদি ভবিষ্যতে লেবাননের ওপর আর কোনো সামরিক আগ্রাসন চালানোর মতো বোকামি করে ইসরাইল তাহলে তার দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। গত মাসে তিনি এক ভাষণে বলেন, ইসরাইল জানে না ভবিষ্যত যুদ্ধে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

ইরানে হালাল ইন্টারনেট

ইরানের নাগরিকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকার মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য তৈরি করেছে একটি বিশেষ ইন্টারনেট ব্যবস্থা যেটিকে বলা হচ্ছে ‘হালাল’ বা বৈধ ইন্টারনেট। সে কারণে ইরানি জনগণের জন্য মুক্ত তথ্যপ্রবাহের সুবিধা ভোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধ বিচরণ করা সম্ভব হচ্ছে না অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে ইরানের সরকার নাগরিকদের ইন্টারনেট সংযোগসহ মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে উদার হলেও বিষয়টি সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এ বছরের শুরুতে যে আন্দোলন হয়েছে দেশটিতে তার পেছনেও বড় অবদান ছিল স্মার্ট ফোনের। আন্দোলন ঠেকাতে সরকার একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপ্রিয় একটি মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। মূলত এ ধরনের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করেই চালু করা হয়েছে তথাকথিত ‘হালাল’ ইন্টারনেট। ২০০৯ সালে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের আগেই ইউটিউব নিষিদ্ধ ছিল। ২৬ বছর বয়সী তরুণ নেদা আঘা সুলতানের গুলিতে নিহত হওয়ার ভিডিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে সরকার আরো কঠোর হয়ে ওঠে। ওই বিক্ষোভের পর ফেসবুক, টুইটারসহ অনেক সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে অনেক ইরানি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএনের মাধ্যমে সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তবে ২০০৯ সালের সাথে এখনকার সময়ের পার্থক্য হলো এখন স্মার্ট ফোনের যুগ। এখন কমপক্ষে চার কোটি ৮০ লাখ ইরানি নাগরিকের হাতে স্মার্ট ফোন রয়েছে।
স্মার্ট ফোন ব্যাবহারে এই বিপ্লবের পেছনে ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও অপেক্ষাকৃত উদার নেতা হাসান রুহানির প্রশাসনের একটি ভূমিকা ছিল। তার সময়ই দেশটিতে থ্রি-জি ও ফোর জি ইন্টারনেট সার্ভিস চালু হয়েছে। বাসাবাড়িতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিও বেড়েছে অনেক। এর ফলে দেশটিতে টেলিগ্রাম নামে একটি বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপস ব্যাপকহারে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। চার কোটির বেশি লোক এটি ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় বিক্ষোভকারীরা এই অ্যাপসটি ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেছে। এর ফরে সরকার অস্থায়ীভাবে টেলিগ্রাম ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তবে টেলিগ্রাম ব্যবহারের ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা এটি ব্যবহার করে তাদের পণ্যে প্রচারের কাজে। তবে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় একটি জিনিস ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে যুক্তিযুক্ত মনে করেন না। রুহানি বলেন, ব্লক করে নয় বরং ইন্টারনেটকে সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় করে তুলতে হবে। ২০১১ সালে ইরান নাগরিকদের জন্য হালাল বা অনুমোদন যোগ্য ইন্টারনেট নামক একটি ধারণা নিয়ে আসে জনগণের সামনে। ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক নামে একটি সেবার আওতায় সরকার অনুমোদিত ৫০০ ওয়েবসাইট রয়েছে সেখানে যেগুলো বিদেশী ওয়েবসাইটের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগতি সম্পন্ন। ইচ্ছে করেই বিদেশী ওয়েবসাইটগুলোর গতি কমিয়ে দিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

শীতে শিশু সুস্থ থাকুক

এবারের শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় অনেক শিশুকেই নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। এ সময়ে শিশুকে সুস্থ রাখার জন্য একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। শিশুবিশেষজ্ঞ ও শিশু নিউরোলজিস্ট ডা: কর্নেল আনজুমান আরা বিউটি বলেন, এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে খাপ খাওয়াতে শিশুর কিছুটা সময় লাগে। শীতে শিশুরা কিছুটা রোগব্যাধিতে ভুগতে পারে। একটু সচেতন হলে এগুলো সহজে এড়ানো যায়।
• শিশুরা সারা দিন খেলাধুলায় মেতে থাকতে পছন্দ করে। এটাই স্বাভাবিক। শিশুকে খেলতে বাধা না দিয়ে বরং উদ্বুদ্ধ করা উচিত। এতে শিশুর মনটাও ভালো থাকবে আর শীতের সময়টায় শিশুর শরীরের জন্যও ভালো হবে। এ ছাড়া শীতের সময়টা শিশুর যত্ন খানিকটা বাড়াতে হবে।
• শিশু যখন বাইরে খেলতে যায় তখন খুব বেশি গরম ও ভারী কাপড় পরানোর প্রয়োজন নেই। এ সময় শিশুর জন্য বেছে নিন সুতির নরম ও মসৃণ কাপড়। যেমন- সুতির ফুলহাতা পোশাক। তবে তা যেন ঢিলেঢালা হয়। আঁটসাঁট কাপড়ে শরীরের ঘাম আটকে থেকে শিশুর ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে।
• শিশুর ত্বক খুব সংবেদনশীল যা খুব সহজেই অ্যালার্জি বা চর্মরোগ আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে শিশুকে পরিষ্কার ও কুসুম পানিতে গোসল করাতে হবে। শিশু গোসল করতে না চাইলে ভেজা কাপড় দিয়ে ভালো করে শরীর মুছিয়ে দিন। এতে করে শিশুর শরীরে ছত্রাক সংক্রমণের ভয় কমে যাবে। গোসল শেষে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে শিশুদের ত্বক উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
• এই সময়টা প্রচুর ধুলাবালু থাকে বাইরে। শিশু বাইরে খেলতে গিয়ে চুলেও প্রচুর ধুলা নিয়ে ঘরে ফেরে। তাই নিয়মিত চুল পরিষ্কার রাখতে হবে।
• শিশুকে ময়লা হাতে মুখমণ্ডল স্পর্শ না করতে শিখিয়ে দিন। শিশুর হাতের নখ সব সময় কেটে ছোট রাখতে হবে।
• শিশুর পোশাকগুলো ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন।
• শিশুর ঘরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা রাখুন। দিনের বেলা জানালা খুলে রোদ ও বাতাস ঢুকতে দিন। স্যাঁতসেঁতে ঘরে রোগজীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি।
• শিশুর খাবারের দিকেও নজর দিতে হবে। শীতকালীন শাক, সবজি ও ফলমূল নিয়মিত খাওয়াতে হবে শিশুকে। এগুলো শিশুর পুষ্টি পূরণের সাথে তার শরীরে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

এফবিআই উপপ্রধানের পদত্যাগ

পদত্যাগ করেছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) উপপ্রধান অ্যান্ড্রু ম্যাককেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার শিকার হয়ে সোমবার পদত্যাগ করেন সংস্থাটির এই উপপরিচালক। বিবিসির খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এফবিআইয়ের এই কর্মকর্তাকে ‘রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে সমালোচনা করার পর তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মার্চে এফবিআইয়ের উপপ্রধান হিসেবে ম্যাককেবের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় রাশিয়ার সহায়তার অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে এফবিআইয়ের তদন্তে যুক্ত ছিলেন ম্যাককেবে।
ওই তদন্ত এখনো চলছে। বেশ কিছুদিন ধরেই ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের সমালোচনার লক্ষ্য ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এফবিআইয়ের উপপ্রধানের পদে ম্যাককেবেকে আর চাইছেন না-এমন কথা প্রকাশ হওয়ার পর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ওই পদ ছেড়ে দিলেন তিনি। গত মে মাসে এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কোমিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরখাস্ত করলে কিছুদিন সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ম্যাককেবে। এরপর গত আগস্টে এফবিআইয়ের প্রধান করা হয় ক্রিস্টোফার রে-কে। সোমবার ম্যাককেবের সম্পর্কের সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান ট্রাম্প। কিন্তু কিছুদিন আগে ম্যাককেবের সমালোচনা করে টুইটও করেন তিনি। ম্যাককেবের স্ত্রী জিল ম্যাককেবে ভার্জিনিয়ার সিনেট আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ওই প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কীভাবে ম্যাককেবের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব? যদিও সোমবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স বলেছেন, ম্যাককেবের পদত্যাগের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এফবিআইয়ের উপপ্রধানের এই সিদ্ধান্তে হোয়াইট হাউসের সম্পৃক্ততা নেই।

চুল কেটে তাঁদের ‘পুরুষ’ বানানোর চেষ্টা

ইন্দোনেশিয়া পুলিশ তৃতীয় লিঙ্গের ১২ জনকে আটক করেছে। তাঁদের লম্বা চুল কেটে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, পুরুষের মতো আচরণ করার জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আচেহ প্রদেশে বেশ কয়েকটি বিউটি সেলুনে গত সপ্তাহে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। সেখানে কর্মরত তৃতীয় লিঙ্গের লোকদের স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়।
তৃতীয় লিঙ্গের ওই কয়েকজনকে জোর করে পুরুষের পোশাক পরানো হয়। তাঁদের তিন দিন থানায় রাখা হবে। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে কঠোর ইসলামিক আইন মেনে চলা হয়। তৃতীয় লিঙ্গের লোকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। দ্য ইন্দোনেশীয় ন্যাশনাল কমিশন অব হিউম্যান রাইটস এই অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে। কমিশন বলছে, পুলিশ আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। পুলিশের এ ধরনের আচরণ অমানবিক। ইন্দোনেশিয়ায় ট্রান্সজেন্ডাররা স্থানীয়ভাবে ওয়ারিয়া নামে পরিচিত। ইন্দোনেশীয় নারী ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ওয়ারিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় পুলিশপ্রধান আহমদ উনজুং সুরিয়ানাতা বিবিসিকে বলেন, ‘কাউন্সেলিং ও প্রশিক্ষণের জন্য আমরা তাঁদের তিন দিন রাখব।’ তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষ ভালো করছেন এবং অনেকটা পুরুষের মতো আচরণ করছেন বলেও জানান তিনি। ফোনে কথা বলার সময় আহমদ উনজুং সুরিয়ানাতা তৃতীয় লিঙ্গের একজনকে ডেকে বলেন, ‘তুমি কি এখনো ওয়ারিয়া?’ এ সময় তিনি উত্তর দেন, ‘না।’ কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরে কোনো স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল না বলে বিবিসির খবরে বলা হয়। এক দশক আগে আচেহ প্রদেশ নিজস্ব ইসলামিক আইন প্রচলন করার বিশেষ অনুমতি পেয়েছে। সম্প্রতি কয়েক বছরে দেশটি অনেক বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে।

ভারতে যেতে চান মালালা

ভারতীয়দের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থনে অভিভূত পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাই। তাই দেশটি সফরে যেতে ও সেখানকার কিশোরীদের জন্য করার কাজ আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি। নারী শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলি খেয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন ২০ বছর বয়সী মালালা।
বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তিদূত হিসেবে কাজ করছেন মালালা। মালালা বলেন, এরই মধ্যে তিনি ভারত সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছেন। তিনি ভারতীয় সিনেমা ও নাটকেরও একজন বড় ভক্ত। চান দেশটির সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে আরও জানতে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে গিয়ে পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মালালা এসব কথা বলেন। মালালা বলেন, ভারতে তিনি তাঁর গুলমাকাই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পেরে খুবই আনন্দিত। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তিনি কাজ করতে চান, কেননা তাঁরা স্থানীয় বিষয়-আশয় ভালো বোঝেন এবং সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দিতে পারবেন। মালালা বলেন, তিনি পাকিস্তানের কিশোরীদের নিয়ে যেমন চিন্তিত, তেমনি চিন্তিত ভারতের কোটি কোটি কিশোরীদের নিয়ে।

বাড়ছে নদীর পানি, ডুবছে প্যারিস

সেন নদীর পানির বাড়ার ফলে ডুবছে প্যারিসের বিভিন্ন অংশ। ব্যাহত হচ্ছে ফ্রান্সের রাজধানীর জীবনযাত্রা। গতকাল সোমবার প্যারিসজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গতকাল নদীর পানির ৫ দশমিক ৮৪ মিটার (১৯ ফুট) বেড়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় চার মিটার বেশি।
এই কারণে নদীর কাছাকাছি বসবাসরত নাগরিকদের বন্যার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। নদীর আশপাশের এলাকা থেকে দেড় হাজার বাসিন্দাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফ্রান্সে যাওয়া পর্যটকেরা প্যারিস নগরের বাটিউক্স মৌচিসে নৌভ্রমণ ও সৌন্দর্য অবলোকন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আজ মঙ্গলবারের আগে পানি কমতে শুরু করার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীর তীরবর্তী বেশির ভাগ এলাকাই প্লাবিত। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ল্যুভর জাদুঘরের একটি অংশ। প্লাবিত হয়েছে আইফেল টাওয়ারের নিচের অংশ। ২০১৬ সালে সেন নদীর পানি ৬ দশমিক ১ মিটার বেড়েছিল। তখন ল্যুভর জাদুঘরের অনেক শিল্পকর্ম অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছিল। এবার নদীর পানি ওই পরিমাণ বাড়বে না বলে ধারণা। তবে প্রস্তুত রয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়া হবে বিভিন্ন শিল্পকর্ম। ১৯১০ সালের বন্যায় সেন নদীতে থাকা ভাস্কর্যের গলা পর্যন্ত পানি পৌঁছেছিল। তখন প্যারিস শহর পুরো দুই মাস পানির নিচে ছিল।

রেলিং ভেঙে বাস নদীতে, ৩৬ লাশ উদ্ধার

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে কুয়াশার কারণে যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেতুর রেলিং ভেঙে ভৈরব নদীতে পড়ে যায়। এতে এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জেলার দৌলতবাদ থানা এলাকার বালিঘাট সেতুতে ওঠার সময় একটি ট্রাককে পাশ দিতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ৭টা ১০ মিনিট। বাসটি করিমপুর থেকে মালদহ যাচ্ছিল। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেছে, বাসটিতে ৫৬ জন যাত্রী ছিল। বাসটি সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে যায়।
স্থানীয় লোকজন দ্রুত ছুটে এসে উদ্ধারকাজে নামে। বাসটি পানি থেকে তোলার জন্য কলকাতা থেকে ডুবুরি এবং হাউড্রোলিক ক্রেন আনা হয়েছে। উদ্ধার কাজে নেমেছে দমকল এবং পুলিশ। এসেছে বিপর্যয় মোকাবিলা কমিটির সদস্যরাও। এদিকে সকালে উদ্ধারকাজ বিলম্ব হওয়ায় স্থানীয় লোকজন ক্ষোভে পুলিশের দুটি গাড়িসহ কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই দুর্ঘটনার খবর শুনে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিহতদের পরিবার পিছু ৫ লাখ, গুরুতর আহত যাত্রীদের ১ লাখ এবং কম আহত যাত্রীদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভারতে আদালত অবমাননার দায়ে তিন রাজ্যকে নোটিশ

গোরক্ষার নামে হিংসা দমন করতে আদালতের নির্দেশে কড়া পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিন রাজ্যকে নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ তিন রাজ্যের প্রশাসনকে আদালত অবমাননার অভিযোগে নোটিশ দেন। রাজ্য তিনটি হলো রাজস্থান, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ।
আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে ওই তিন রাজ্যের প্রশাসনকে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও মহাত্মা গান্ধী ফাউন্ডেশনের ম্যানেজিং ট্রাস্টি তুষার গান্ধীর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ২৬টি রাজ্যকে গোরক্ষার নামে হিংসা বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। নির্দেশে বলা হয়, এসব রাজ্যে নোডাল অফিসার নিয়োগ এবং জাতীয় সড়কে নজরদারি বাড়াতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর সুপ্রিম কোর্টকে অগ্রগতি জানানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরও ওই তিনটি রাজ্যে গোরক্ষার নামে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এর পরেই তুষার গান্ধী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে আদালত অবমাননার দায়ে তিন রাজ্যকে নোটিশ প্রদান করেন শীর্ষ আদালত।

দুই বছরের কমিটি থাকছে সাড়ে তিন বছর

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এর আগে প্রথম দফায় এই কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়েছিল। ফলে দুই বছরের জন্য গঠিত কমিটির মেয়াদ এখন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন বছরে। গতকাল সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন করে মেয়াদ বাড়িয়েছে। এর ফলে সংগঠনটির সমঝোতার নির্বাচনের উদ্যোগও আপাতত কাজে লাগছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত ২১ সেপ্টেম্বর। তবে উত্তরায় নতুন ভবন নির্মাণকে পুঁজি করে আগেই ছয় মাস মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছিলেন বিজিএমইএর সভাপতি। সেই বাড়তি সময়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ২১ মার্চ। তাই গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা হয়েছিল। ৭ মার্চ ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা। তবে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গত রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংগঠনটির বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর আবেদন করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ গতকালই কমিটির সেই আবেদন অনুমোদন করে মন্ত্রণালয়। এদিকে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পরই সিদ্দিকুর রহমান বিজিএমইএর নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলামিনকে চিঠি দেন। এতে ২০১৮-২০ মেয়াদের নির্বাচনের সব কার্যক্রম বাতিল করার অনুরোধ জানান তিনি। কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করে গতকাল সন্ধ্যায় বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরায় নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন মজুরি বোর্ড গঠন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে আগামী এক বছর পোশাক খাতের জন্য কঠিন সময়। বিষয়টি অনুধাবন করে পোশাকশিল্পের বড় ব্যবসায়ীরা সরকারকে অনুরোধ করেছেন বর্তমান কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর।
সংগঠনের সাবেক সভাপতিরাও বিষয়টি নিয়ে একমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, সংগঠনের বর্তমান কমিটিকে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনে অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এদিকে নেতৃত্ব নির্বাচনে বিজিএমইএতে সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম নামে দুটি পক্ষ আছে। গত বছরের শেষের দিকে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতিরা সমঝোতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে একমত হন। তাতে সভাপতির পদটি পাওয়ার কথা ফোরামের। একই সঙ্গে সাতটি সহসভাপতি ও ২৭টি পরিচালক পদ উভয় পক্ষের মধ্যে ভাগাভাগি হবে। সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরামের নেতারা যাঁদের সবুজ সংকেত দেবেন, কেবল তাঁরাই মনোনয়নপত্র কিনবেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তবে সমঝোতার বিষয়টি ২০১৫ সালেই চূড়ান্ত হয়েছিল। সে বছর সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরামের জ্যেষ্ঠ নেতারা দুই মেয়াদের জন্য বিজিএমইএর নেতৃত্ব ভাগাভাগির বিষয়ে চুক্তি করেন। এ জন্য প্রথম মেয়াদে সম্মিলিত পরিষদ সভাপতি ও চারটি সহসভাপতির পদ পায়। সেই কমিটিই বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছে। ফোরামের পক্ষ থেকে সভাপতি পদে রুপা সোয়েটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল ইসলামের নাম দেওয়া হয়। তিনি দুই মেয়াদে বিজিএমইএর সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পরিষদের নেতারা। শেষ পর্যন্ত শহীদুল ইসলামের নামই চূড়ান্ত হয়। অন্যদিকে হঠাৎ করেই ১১ জানুয়ারি স্বাধীনতা পরিষদ নামে নতুন একটি পক্ষ আত্মপ্রকাশ করে। এই পক্ষের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। তবে আপাতত সমঝোতা কিংবা ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন কোনোটাই হচ্ছে না। সংগঠনের একাধিক সাবেক ও বর্তমান নেতা জানান, কয়েক দিন ধরেই কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কয়েকজন নেতা সরকারের উচ্চমহলে দেন-দরবার করে সবুজ সংকেত আদায় করেন। সে জন্য নেতৃত্ব নির্বাচনে সমঝোতার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সাবেক সভাপতিরাও চুপসে যান। যদিও তাঁরা গত বছরের শেষ দিকে  চুক্তি অনুযায়ী সমঝোতার কমিটি করতে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক একজন সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে চাইলে অবশ্যই আমরা বিষয়টি মেনে নেব। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ বাড়ানোয় সাবেক সভাপতিরা বিচলিত।

তুরস্কের হামলার ফল ভালো হবে না by গ্যারেথ স্ট্যান্সফিল্ড

যে রাষ্ট্রেই থাকুক না কেন, কুর্দিদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপন করতে হয়। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দিরা ইসলামিক রিপাবলিকের সেনাদের হাতে ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের কুর্দিরা সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের মুখে পড়েছে। তারা আবার এক কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্মুখীনও হয়েছে। এতে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দ্বন্দ্বমুখর রাজনীতিতে কুর্দিদের আকাঙ্ক্ষার কারণে ইরাক, ইরান ও তুরস্ক একজোট হতে পারে। স্বাধীনতার লক্ষ্যে তারা যে গণভোটের আয়োজন করল, তারপর এটা বাস্তব হয়ে উঠেছে। আরও লক্ষণীয় ব্যাপার হলো পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের ইরাকি কুর্দি মিত্রদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। অথচ আইএসবিরোধী যুদ্ধে এরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পশ্চিমা সরকারের চিন্তায় যুক্তি ছিল, তাতে ছিল শীতল বস্তুনিষ্ঠা। কারণ, তারা ইরাকের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু কুর্দিদের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে বলতে হয়, তাদের প্রয়োজন অনুসারে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সিরিয়ার দূর উত্তরের আফরিনেও এমনটি ঘটেছে, যে অঞ্চলটি ইয়েকিনেয়েন পারাস্তিনা জেল (ওয়াইপিজি) ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগী ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি (পিওয়াইডি) কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। তুরস্ক মনে করে, এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তুরস্ক ও পশ্চিমে নিষিদ্ধঘোষিত পিকেকের পার্থক্য নেই। এর বিপরীতে এই গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, তারা পুরোপুরি সিরীয় রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত এবং ফেডারেল সিরিয়ার অধীনে তারা স্বায়ত্তশাসিত থাকতে চায়। আইএসবিরোধী যুদ্ধে তারা পশ্চিমাদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মিত্র। এই যুক্তিগুলোর সমস্যা হলো এসবের মধ্যে সত্যের উপাদান আছে। পিওয়াইডির নেতারা যত জোর দিয়েই বলুন না কেন তাঁরা পিকেকের অংশীদার নন, পারিপার্শ্বিক প্রমাণে হয়তো অন্য কিছু মনে হবে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। পিকেকে এর আগে সিরিয়াভিত্তিক ছিল। আর সিরিয়ার সরকার বহু বছর ধরে কুর্দিদের পিকেকেতে যোগ দিতে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছিল। একদিন এই যোদ্ধাদের ঘরে ফিরতে হতো।
এর মানে যেহেতু এটা নয় যে ওয়াইপিজি মানেই পিকেকে, সেহেতু আঙ্কারা কেন এই দাবি করবে, তা বোধগম্য। তবে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল প্রমাণ করেছে। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা নিজেদের অধিকৃত অঞ্চল পরিচালনা করেছে। আর সামরিক দিক থেকে ওয়াইপিজি মধ্যপ্রাচ্যে স্পার্টানদের সমতুল্য। সীমিত অস্ত্রে দারুণ শৃঙ্খলা ও অমিত বিশ্বাস নিয়ে লড়াই করে তারা কোবান রক্ষা করেছে। ইতিহাস বলবে, তখন থেকেই হাওয়া আইএসের বিরুদ্ধে ঘুরে যেতে শুরু করে, যার আগ পর্যন্ত তাদের অদম্য মনে হচ্ছিল। এরপর সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের মূল সেনা হিসেবে তারা আইএসকে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে হটিয়ে দিয়েছে। শুধু সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই নয়, ইরাকের সীমান্তে দিয়ের-এজর প্রদেশ পর্যন্ত তারা আইএসকে হটিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে কুর্দিরা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে। এতে তাদের আরও বলবৃদ্ধি ঘটবে। সংক্ষেপে বললে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে ন্যাটোর মিত্র তুরস্কের যুক্তি আছে। একইভাবে কুর্দিদের আইএসবিরোধী জোটেরও সেই যুক্তি আছে। যখন তাদের প্রায় অসম্ভব বিকল্প বেছে নিতে হয়, তখন সম্ভবত একদম ন্যূনতমটাই করা সহজ। কিন্তু আফরিনে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, তা পশ্চিমা সরকারগুলো ইরাকে কুর্দিদের গণভোটের মতো সহজে উপেক্ষা করতে পারবে না। তাৎক্ষণিক কৌশলগত পর্যায়ে যুদ্ধ অভ্যস্ত কুর্দিরা ইতিমধ্যে তুরস্কের প্রক্সি সেনাদের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছে। তুরস্কের সেনারা কি আরও সফলতা অর্জন করবে? এটার সম্ভাবনা কম, তবে যদি তারা সফল হয়ও, তাহলে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তা পেতে হবে। তুরস্কের সেনাবাহিনী এখনো ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। এখন তুর্কি সেনা বা তাদের প্রক্সিরা যদি আফরিনে রক্তাক্ত যুদ্ধে পরাজিত হয়, তাহলে এরদোয়ানের বিচার-বুদ্ধি সেই জনগোষ্ঠীর প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, যারা তাঁর কারণেই আরও জাতীয়তাবাদী ও কুর্দিবিরোধী হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া কুর্দিরা আরও জঙ্গি হয়ে উঠলে তুরস্কের কুর্দিরা তা থেকে সুবিধা নিতে পারে এবং আন্দোলনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ইরাক ও ইরানেও কুর্দিদের এই তর্জন-গর্জন দেখা যেতে পারে। আফরিনের প্রতিরক্ষায় কুর্দিরা সফল হোক বা না হোক, স্বাগতিক রাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তাদের বৃহত্তর বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ আছে। এই সম্ভাব্য কুর্দি বিদ্রোহ যেমন অনেক কিছু বদলে দিতে পারে, তেমনি তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীও করা সম্ভব নয়। এমনকি তারা মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রের সীমানা নিয়েও খেলতে পারে। অন্যদিকে ন্যাটোর সংহতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। রাশিয়া সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করায় তার পক্ষে ন্যাটোর অখণ্ডতা খাটো করার সুযোগ এসেছে। অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপ, বাল্টিকসহ সম্ভবত তার বাইরেও রাশিয়ার স্বার্থের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ এসেছে। রাশিয়া দৃশ্যত আফরিনে তুর্কি অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে। তারা সিরিয়াকে বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে ওয়াইপিজিকে রসদ দেওয়ার নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছে রাশিয়া। মস্কো অন্তত আংশিকভাবে সুন্দর একটি পরিকল্পনা করেছে। এতে ন্যাটোর দুই সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক অত্যন্ত রক্তাক্ত ও দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে আফরিনে যা ঘটছে, তা কেবল সিরিয়ার উত্তরে কুর্দিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, এর মাজেজা আরও বড়। এতে এই অঞ্চল বদলে যেতে পারে, বিশেষ করে তুরস্ক, ইরান ও ইরাক। অন্যদিকে পশ্চিমের জন্যও তা গভীর প্রভাব বয়ে আনতে পারে। কারণ, তখন তাকে অধিকতর শক্তিশালী, গতিশীল ও সক্ষম রাশিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। সময় এসেছে পশ্চিমকে এখন শেষমেশ এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সেটা হলো মধ্যপ্রাচ্যে তারা কী অর্জন করতে চায়। শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার মতো শুধু ভাসা–ভাসা বিবৃতি দিলেই চলবে না। এটা খুবই কঠিন এক প্রশ্ন তা ঠিক, কিন্তু এর উত্তর দিতে হবে। উত্তর না থাকলে আফরিনে যা ঘটছে এবং আগামী দিনে যা ঘটতে পারে, তাতে কেবল অন্যদের স্বার্থই সংরক্ষিত হতে পারে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।
গ্যারেথ স্ট্যান্সফিল্ড: ইনস্টিটিউট অব আরব অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিসের অধ্যাপক, এক্সেটার।

২ কোটি মানুষের ভরসা রংপুর মেডিকেল by তুহিন ওয়াদুদ

রংপুর বিভাগের আট জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। জেলা-উপজেলাভিত্তিক হাসপাতাল থাকলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের এখানেই আসতে হয়। প্রতিবছর গড়ে চার লক্ষাধিক মানুষ এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। প্রতিদিন গড়ে একটি বিভাগে রোগী ভর্তি থাকে প্রায় ১ হাজার ৮০০। দিনে তিন শতাধিক রোগী জরুরি সেবা গ্রহণ করে। ১৯৬৮ সালে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এখানে সেবা প্রদানের পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবার মানও বাড়ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় এই অঞ্চলের বাস-ট্রাক-ট্রেনে আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পেয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যে আইসিইউ সেবাকেন্দ্র রয়েছে, তা বাংলাদেশের যেকোনো উন্নত সেবাকেন্দ্রের সমতুল্য। ২৫ জানুয়ারি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কনফারেন্স রুমে টিআইবির সহযোগিতায় সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। উদ্দেশ্য Ñছিল সেবার মান বৃদ্ধিকল্পে সেবাগ্রহীতার পরামর্শ গ্রহণ। সেখানে উপস্থিত ছিলাম বলে অনেক কিছু জানার সুযোগ হলো। শুরুতেই পরিচালক অজয় রায় সেবাগ্রহীতাদের কাছে সেবার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, ‘আমরা সেবার মান বাড়াতে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে চাই।’ দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি রংপুর জেলা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। তিনি এমআরআই করিয়েছেন কিছুদিন আগে। তিন-চার দিন ঘোরার পর তিনি এমআরআই করার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু মেশিনে শরীর ঢোকানোর পর কয়েকবার মেশিন বন্ধ হয়। তাঁর প্রশ্ন হচ্ছে যাঁরা পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম থেকে আসবেন, তাঁদের এমআরআই হবে কী করে? তবে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। লাশ পরিবহনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে ছিল। যেখানে সরকারি ভাড়া মাত্র ২ হাজার টাকা, সেখানে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় যেতে বাধ্য করতেন এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অন্য গাড়িতে তাঁরা লাশ তুলতে দিতেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স চালু করার পর সেই ভাড়া নেমে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকায়। দৌরাত্ম্যও কমেছে। মেডিকেলের ভেতরে অনেক কিছুই এখনো অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে। সহকারী পরিচালক রফিকুজ্জামান বলছিলেন, ‘পুলিশ-আর্মি দিয়ে এখান থেকে দালাল বন্ধ করা যাবে না। মেডিকেলের পূর্ব গেট ও পশ্চিম গেট-সংলগ্ন স্থানীয় ব্যক্তিদের কেউ কেউ দালালি করে থাকেন। তাঁদের হাত থেকে হাসপাতাল রক্ষা করতে হবে।’ চিকিৎসা নিতে আসা একজন অন্ধ মুক্তিযোদ্ধা চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলেছিল একজন চাঁদাবাজ; এ ঘটনাও তিনি উল্লেখ করলেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেখভাল করার দায়িত্ব হাসপাতাল পরিচালকের। কিন্তু সহকারী অধ্যাপক থেকে শুরু করে অধ্যাপক পর্যন্ত চিকিৎসকেরা অধ্যক্ষের কাছে দায়বদ্ধ।
ফলে হাসপাতাল অংশে চিকিৎসকদের সঙ্গে পরিচালকের সমন্বয় করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। হাসপাতালের কিছু কিছু কাজ গণপূর্ত বিভাগের ওপর ন্যস্ত। লিফটের অবস্থা ভালো নয়। কয়েক দিন আগে একজন রোগী লিফটের নিচে পড়ে মারা গেছে। এই লিফটের তদারক করে গণপূর্ত বিভাগ। হাসপাতালের লিফট, অথচ কর্তৃত্ব গণপূর্ত বিভাগের। লাশ রাখার হিমঘরের অবস্থাও ভালো নয়। চারটি ফ্রিজে মোট ২৪টি লাশ রাখা যায়। কয়েক দিন আগে এর মধ্যে দুটি ফ্রিজই নষ্ট ছিল। একটি লাশ আছে ২০১৩ সাল থেকে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাশ সরানোর উপায় নেই। এই ফ্রিজ তাৎক্ষণিক মেরামতের উপায় নেই। যে কোম্পানির ফ্রিজ, সেই কোম্পানির টেকনিশিয়ান দিয়েই ঠিক করতে হয়। এই জটিলতা না থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত ফ্রিজ ভালো করার ব্যবস্থা করতে পারত। অপারেশন থিয়েটার ও চিকিৎসকের স্বল্পতার আরেকটি চিত্র পরিচালক অজয় রায় তুলে ধরেন, ‘নিউরোসার্জারি বিভাগে সব সময় ৮০-৯০ জন অপারেশনের রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু অপারেশন থিয়েটার আছে মাত্র একটি। একটি অপারেশন করতে সময়ের প্রয়োজন হয় দুই থেকে ছয় ঘণ্টা। তাহলে কীভাবে এতগুলো রোগীর অপারেশন প্রতিদিন করা সম্ভব?’ তবে তিনি নিরাশ নন, পরিস্থিতির উত্তরণ হবে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি আছে। এই কমিটি আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে পারলে সেবার মান বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হতে পারে। সেই সঙ্গে তদারকির ধরনও পাল্টানো প্রয়োজন। একজন পরিচালকের পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা কঠিন। চিকিৎসকেরা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় অবিচারেরও শিকার। তা সত্ত্বেও তাঁরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যান। কখনো কখনো বিনা অপরাধেও হেনস্তা হন। নিজের দেখা একটি ঘটনা বলি: এক চিকিৎসক উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে পাঁচ দিন পাঁচ রাত একটানা ডিউটি করেছেন। দুপুরে একটু খেতে গিয়েছিলেন কোয়ার্টারে। এটুকু সময় চিকিৎসক না থাকার কারণে রোগীর লোকজন মারমুখী হয়েছিলেন। চিকিৎসকের এই ত্যাগ স্বীকারের মূল্য না আছে জনগণের কাছে, না আছে রাষ্ট্রের কাছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে সেবাগ্রহীতার মতবিনিময় সভায় লেখক ও চিকিৎসক মফিজুল ইসলাম শুধু চিকিৎসকদের দোষারোপ না করে নিজেদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘একবার একজন ডাক্তার মেডিকেলে আসতে বিলম্ব করেছিলেন। রোগীর লোকজন তাঁকে অকথ্য গালিগালাজ করতে থাকলে হাসপাতালের বয় এসে রোগীর লোকজনকে বলেন, আপনারা এসব কী বলছেন? স্যার নিজের ছেলের জানাজা পড়েই আপনাদের চিকিৎসা করার জন্য এসেছেন।’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক আশার কথা শোনাল। প্যাথলজির সব মেশিন এখন ভালো আছে। কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কত টাকা প্রয়োজন, তা রোগীদের জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রতি অনেকগুলো বিভাগে অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, কিডনি ওয়ার্ড চালু হয়েছে। আর ডিজিটাল অভিযোগ বক্স চালু আছে। যেকোনো ধরনের অভিযোগ সরাসরি মন্ত্রণালয়ে জানানোর সুযোগ আছে। মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। চিকিৎসাপদ্ধতির দুর্বলতাজনিত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর সমস্ত দায় চিকিৎসকদের নয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই হাসপাতালকে রংপুর বিভাগের সব মানুষের চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা তৈরি করতে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার প্রতি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা জরুরি।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আসিয়ান সদস্যভুক্ত ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করার বিষয়টিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে চাই। যেসব বন্ধুপ্রতিম দেশকে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ তার পাশে পেয়েছে, ইন্দোনেশিয়া তার একটি। অন্যতম বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে তাদের জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবে বিরাট সহমর্মিতা রয়েছে।গত সেপ্টেম্বরে দেশটির বিদেশমন্ত্রী রেত্নো মারসুদি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি ও শীর্ষ জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা শেষে ঢাকা সফর করেছিলেন। মিয়ানমারে যাওয়ার আগে তিনি দেশটির শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকে বসেছিলেন। যদিও সফরটি দ্বিপক্ষীয় নিয়মিত বৈঠকের অংশ, কিন্তু তাঁর সফর র োহিঙ্গা সংকটের ওপর বিশেষভাবে আলো ফেলেছে। রোহিঙ্গা সংকট একটি আন্তর্জাতিক মানব বিপর্যয়। এটা লক্ষণীয় যে গণহত্যার শিকার হওয়া একটি জনগোষ্ঠীর ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেও সরেজমিনে এ পর্যন্ত বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ছুটে আসা বিরল থেকে গেছে। সেদিক থেকেও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরেজমিনে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন খুবই ইতিবাচক ঘটনা।জাকার্তার সরকার নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা বলেছে, ইন্দোনেশীয় নেতা ঢাকায় ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে’ দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গুরুত্বারোপ করেছেন। এ কথা তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উল্লেখ করেছেন বলে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হকও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। আমরা  অবশ্যই জাকার্তার এই দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিকতা খুঁজে পাই এবং বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই ইতিমধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছে।
কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়ন ও তার ফলাফলের দিকে ইন্দোনেশিয়ার মতো অকৃত্রিম ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের নজর থাকবে সেটা আমাদের প্রত্যাশিত। এতে সন্দেহ সামান্য যে শুধু দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ‘দ্রুত’ কিংবা কোনো ‘চিরস্থায়ী’ সমাধানের আশা সুদূরপরাহত। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত নভেম্বরে এক বিবৃতিতে বলেছিল, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইন্দোনেশিয়ার ‘ক্ষমতা’ রয়েছে। তারা তাদের ‘কৌশলগত ভূমিকা’ পালন করতেও আহ্বান জানিয়েছিল। আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে চাই। এ প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টির ইন্দোনেশীয় পরিচালক হামিদ উসমানের বক্তব্যকেও আমরা স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেছিলেন, জাকার্তার উচিত হবে এই সমস্যা মোকাবিলায় আসিয়ানের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া। আমরা মনে করি, এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করেছেন যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে তাঁর সরকার এই সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে।তাঁর সফরকালে পাঁচটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়া ইঙ্গিত করে যে ঢাকা-জাকার্তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উত্তরোত্তর এগিয়ে নিতে দুই দেশের মধ্যে চমৎকার রাজনৈতিক বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোকে আমরা অভিবাদন জানাই।

শহরে শব্দসন্ত্রাস

১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শহরকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে শব্দের মাত্রা বেঁধে দেওয়া হলেও সেটি কেউ মানছেন বল ে মনে হয় না। শহরে শব্দের মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে আবাসিক এলাকায় ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল, শিল্প এলাকায় ৭৫ ডেসিবেল, নীরব এলাকায় ৪৫ ডেসিবেল, আবাসিক কাম বাণিজ্যিক এলাকায় ৬০ ডেসিবেল এবং রাতেরজন্য সর্বত্র ১০ ডেসিবেল। কিন্তু রাজনৈত িক মঞ্চ থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান—সর্বত্র উচ্চস্বরে মাইক বাজানো হচ্ছে।পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে শব্দদূষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সম্প্রতি একজন হৃদ্‌রোগীকে জীবন দিতে হয়েছে। এ রকম জীবনঘাতী ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে সরকার তথা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে।গত শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনসহ কয়েকটি সংস্থা আয়োজিত আলোচনা সভায় যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো শব্দদূষণ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বঁাধবে কে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘৬০ ডেসিবেল শব্দে মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে আর ১০০ ডেসিবেল শব্দে মানুষ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।
অথচ ঢাকায় শব্দদূষণের মাত্রা তার চেয়ে কয়েক  গুণ বেশি। আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার–নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নীরব এলাকা চিহ্নিত করা হলেও তা মানা হচ্ছে না। এর পাশাপাশি হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহারও বাড়ছে, যা আইনত নিষিদ্ধ।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ যেকোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশু ও নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ, রিকশা বা গাড়িচালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানীতে বসবাসরত মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি লাঘবে নীরব ঘাতক শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আর যাঁরা আইন মানবেন না, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

শরণার্থীশিবিরের মায়েরা by গওহার নঈম ওয়ারা

রোহিঙ্গাদের না-বলা কথা ৩
নতুন মাঝি আকরামের স্ত্রী সুফিয়া এখন হাফ মাঝি—একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার মাঠকর্মী। দশটা মাঠদলের দেখাশোনা করেন। মাসিক বেতন আট হাজার টাকা। মায়েদের দলে (দশ-বারোজন মাকে নিয়ে একেকটা দল) সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তথ্য আদান-প্রদান করেন। সংস্থার ক্যাম্প অফিসে সকালে একবার, বিকেল আরেকবার যেতে হয়। মাঝেমধ্যে ঢাকা-কক্সবাজারের কর্মকর্তারা এসে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর বড় মেয়ে আমিনার বয়স নয় বছর। সে তার আর তিন ভাইবোনের দেখাশোনা করে। সুফিয়ার দ্বিতীয় সন্তান ছেলে—আট বছরের হবে। সে চাকরি করে তিন-চার ঘণ্টা, একটা সংস্থায়। প্রতিদিন পলিথিনে করে ভাত-তরকারি বিতরণ করে। সুফিয়ার ছেলে হালিম গরম ভাত পলিথিনের ঠোঙায় ঢোকায়। সকাল ১০টা থেকে তার এই কাজ। চার ব্যাগ খাবার পায় পরিশ্রমের মূল্য হিসেবে। নগদ টাকা কি কিছু পায়? সুফিয়ার কাছে সে প্রশ্নের কোনো জবাব আমরা পাই না। সুফিয়া নারীদলের নাম দিয়েছে দলের নেতার নামে। দলের নেতার ছাউনিতেই গুটিসুটি হয়ে বসে অন্যরা। তারপর সুফিয়া কাকাতুয়ার মতো বলেন চলে শেখানো বুলি: সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, নিয়মিত গোসল করবে, মশা-মাছি থেকে দূরে থাকবে। মাসিকের সময় এগুলো ব্যবহার করবে, শিশুদের সর্দিকাশি, গলা ফোলা হলে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাবে, কার্ড সঙ্গে রাখবে, ঝগড়া মারামারি করবে না, পানি ঢেকে রাখবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সুফিয়ার কাছে জানতে চাই, এর মধ্যে নতুন কথা কোনটা? যেটা এখানে আসার আগে মায়েরা জানতেন না। মায়েরা একসঙ্গে হেসে ওঠেন।
আমি সমস্যার কথা জানতে চাই। অসুবিধা কী? কেমন চলে তাঁদের দিন। সন্ধ্যায় কী হয় শিবিরে। দীর্ঘ রাত কাটে কীভাবে। বাড়ি যাবে কবে? অসুখ-বিসুখের খবর কী? টেকনাফের মাথিনের কূপই বলে দেয় এই অঞ্চলের জলসংকটের কথা। পাতকুয়ায় সারা রাতের চুঁইয়ে আসা জল জমা হয় সকালের ব্যবহারের জন্য। একটা বড় কুয়ায় বড়জোর ১০ থেকে ১২ লিটার পানি পাওয়া যায়। তারপর আবার চার-পাঁচ ঘণ্টার বিরতি দিলে বিকেল নাগাদ আরও সাত-আট লিটার পানি মেলে। এই যেখানে মাটির নিচের পানির ব্যবস্থা, যেখানে লক্ষÿমানুষের তৃষ্ণা মেটানো যে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, তা কারও অজানা নয়। পানিপ্রকৌশলীদের কাছে এটা একটা বড় মাথাব্যথার বিষয়। দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে ছড়ার পানি ধরে সেটা পানযোগ্য করে বিতরণ করা। এর জন্য দরকার ছড়াগুলোর প্রবাহ ঠিক রাখা এবং এগুলো ইটখামারিদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা। ছড়ার পানির সঠিক আর সুসম ব্যবস্থা করলে পুরো টেকনাফ আর উখিয়া জলকষ্ট থেকে রক্ষা পাবে। এখন অনেক সংস্থা তাদের নতুন যৌথ পরিকল্পনা বা জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যানিংয়ে টেকনাফ আর উখিয়ার অধিবাসী স্থানীয় মানুষের জন্য উন্নয়ন আর আয়-রোজগারের জন্য নানা প্রকল্পের নকশা আঁকছে। এসব পরিকল্পনা টেকনাফ-উখিয়ার ছড়ার পানি ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য পানিবণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি আর টেকসই উন্নয়নের দরজা খুলে দিতে পারে। টেকনাফ উখিয়ায় কোটি টাকা খরচ করে জাতিসংঘের এক সংস্থা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে মাটির নিচে পানি অনুসন্ধানের যে ব্যায়াম সম্প্রতি শেষ করেছেন, তা সর্বনাশের সূচনামাত্র। টেকনাফ আর দক্ষিণ উখিয়ার মাটির নিচে যেটুকু পানি আছে, তা কোনোভাবেই ওঠানো ঠিক হবে না। এসব স্তরে রিচার্জ বা পুনরায় পানি জমা হওয়ার প্রক্রিয়া এত ধীরলয়ে চলে যে তা হিসাবের মধ্যে ধরা যায় না। ছড়া ব্যবস্থাপনা মাটির ওপরে হলেও এখানেও হাল, নকশা, গবেষণা, মাপজোক খুবই সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। সামান্য ভুলচুকে কাড়ি কাড়ি টাকা অপচয়ের হাটে গড়াগড়ি খেতে পারে। সদ্য সমাপ্ত জলকপাটের (স্লুইস গেট) অবস্থা দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আমরা ফিরে আসি মায়েদের আলোচনায়—ডিফথেরিয়া এখনো বিদায় হয়নি ক্যাম্প থেকে; নারীদলের আট-নয়জনের মধ্যে ছয়জনের কোলেই দুধের শিশু, তিনজনের গলা ফোলা। আমি একটু চেপে বসি, মুখের সস্তা মাস্কটায় মনের অজান্তে হাত চলে যায়, নাকের কাছে আরেকটু শক্ত করে ধরি। বলি, টিকা দেন নাই? মায়েরা যেন একটু অপ্রস্তুত হয়। আমার গলার আওয়াজে বোধ হয় বিরক্তির আলামত ছিল। সবচেয়ে কম বয়সী মা মরিয়ম বিবি প্রতিবাদী কণ্ঠে জবাব দেন, ‘টিকা মারগিতো গলা ফুলে।’ টিকা দেওয়ার পরেও গলাফুলা রোগ ডিফথেরিয়া হচ্ছে। এটাতো রীতিমতো আতঙ্কজনক কথা। এটা লেখা কি ঠিক হবে? কিন্তু মায়েরা যে বলছেন মরিয়মের সঙ্গে সব মা একমত। হতে পারে টিকার গুণগত মান ঠিক ছিল না, কিংবা ঠান্ডায় রাখার কৌশলে কোনো গিঁট পড়েছিল। চিকিৎসক বন্ধু জানালেন, হতেই পারে, ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই। তা ছাড়া টিকা নেওয়ার আগেই যদি অসুখের বীজ শরীরে ঢুকে ডালপালা মেলতে শুরু করে, তাহলে টিকা দিয়ে তাকে সব সময় ঠেকানো সম্ভব হয় না। এসব কথা মায়েদের বৈঠকে আলাপ করা উচিত; না হলে টিকার প্রতি তার কার্যকারিতার প্রতি মায়েদের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। যেকোনো টিকাকে বা প্রতিষেধককে তাঁরা আর গুরুত্ব দেবেন না। শিশুদের চিকিৎসা, ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা কী? চিকিৎসাকেন্দ্রে গেলে ওষুধ দেয়, কিন্তু বড় অসুখ হলে হাসপাতালে যেতে বলে। হাসপাতালে যাওয়াটা সহজ নয়; সব সময় যাওয়া হয় না। বাসে-টেম্পোতে চেপে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে পারে। রাস্তার খরচ হাতে না থাকলে যাওয়া যায় না। আনসার-বিজিবির তল্লাশিতে তখন চিকিৎসার কাগজপত্র দেখাতে হয়। কোনো কোনো সংস্থা গাড়ি ভাড়া দেয়, কিন্তু গাড়িভাড়া ছাড়াও খরচ আছে। সেই খরচ, নগদ টাকা কোথা থেকে আসে। টাকা ধার দেওয়ার লোক আছে। যারা বিভিন্ন সংস্থায় চাকরিবাকরি করে, তাদের কেউ স্থানীয় মানুষ আর দোকানদার। রেশন পেলে রেশনের মাল দিয়ে সেসব ধারদেনা শোধ করে। আবারও মরিয়ম অন্য কথা বলেন, ‘মলোয় ওকল আইরো টিয়া দিতো।’ অর্থাৎ মোল্লা ধরনের লোকজন নগদ টাকা দিয়ে যেত। ঢাকার নানা মসজিদে চাঁদা উঠিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে যেত মসজিদের লোকজন।
মায়েরা জানান, সেসব এখন কমে এসেছে; প্রায় বন্ধ। কিন্তু তাঁদের এখন নগদ টাকা দরকার। সংসারের নানা টুকিটাকি কেনা, মাছ-তরকারির ব্যবস্থা নগদ টাকা ছাড়া সম্ভব নয়। শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত নানা সংস্থা নগদ সাহায্যের পথ খুঁজছে। কেউ কেউ নানাভাবে শুরু করেছে ছোটখাটো কাজ দিয়ে। কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে আরও ভাবার কথা ভাবছে। নগদ দিলে কী বিপদ হবে, আর না দিলে এখন যেসব আপদবিপদ হচ্ছে, সেটা নিয়ে খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা হওয়া উচিত। নগদ না দেওয়ার পক্ষে এক এনজিও কর্মকর্তা নানা যুক্তি দেখালেন। আমি তাঁকে একটা প্রস্তাব দিই: ধরেন, আপনি এখন যত বেতন পান, তার দ্বিগুণ বেতন আপনাকে সামনের মাস থেকে দেওয়া হবে। তবে নগদে নয়, চাল, ডাল, তেল, নুন, সাবান, গুড়, পাউডার, চিনি দিয়ে। আপনি নেবেন? তাঁর মুখে আর রা নেই। শেষে মায়েদের সঙ্গে আবার ঘরে ফেরার কথায় ফিরে যাই। নারীরা ‘হোম মেকার’। তাঁরা আবার ঘর বানাতে চান, ফিরতে চান নিজ নিজ গ্রামে—কোনো বন্দীখানায় নয়। আসলে এসব বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কোনো শর্তে তাঁরা ফিরবেন, কবে ফিরবেন, কেমন করে ফিরবেন, তাঁদের প‌ক্ষে কারা কোন কাগজে সই করছে, তাঁরা তা জানেন না। জানে না বলেই নানা গুজব ডানা মেলছে ছাউনিতে ছাউনিতে; গুজবের গজব বন্ধ করতে হলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, জানাতে হবে আসল তথ্য। একজন মা বললেন, তিনি শুনেছেন, শুধু নারীদের নেওয়া হবে। বলেন, ‘বার্মায় নিয়ে আমাদের মেরে আমাদের হাড়গোড় দিয়ে বেড়া দেবে।’ সত্য না জানালে গুজবের জয় হয়। আমাদের সত্য বলতে হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষক।

সমাজের কথা ভাবছে কি? by সজল চৌধুরী

দিনের বেলায় অতি উচ্চমাত্রার গাড়ির হর্ন আর রাতের বেলায় ভেসে আসা মাইকের আওয়াজ—এই হচ্ছে আমাদের নাগরিক জীবন! আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, কয়েক দিন আগে ঢাকার গোপীবাগের আর কে মিশন রোডের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক মারা গেলেন রাতের বেলায় অনুষ্ঠানে অতি উচ্চ স্বরে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলমান গান থামাতে বলায়। কারণ, কিছুদিন আগেই তঁার হার্টের অপারেশন হয়েছিল। আর সেটি ছিল একটি গায়েহলুদের অনুষ্ঠান। আমাদের অনেকেরই জানা নেই, সাধারণ কথাবার্তা হয় ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেলের (শব্দের একক) মধ্যে।
আর শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেলের ওপরে হলে সেটি হয় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আর সে ক্ষেত্রে জোরে গান বাজালে কিংবা কনসার্টে সেই শব্দের মাত্রা যদি হয় ১২০ ডেসিবেলের ওপরে, তবে সেটি হবে যে কারও জন্য মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ। হয়তো এ ক্ষেত্রে মো. নাজমুল হক শব্দের তীব্রতায় মারা যাননি, তবু আমাদের কাছে এই মুহূর্তে দেশীয় এমন পরিসংখ্যান নেই যে প্রতিদিন শব্দের দূষণজনিত কারণে শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে কত দুর্ঘটনা ঘটছে কিংবা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে এ কারণে দিনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে কতজন নাগরিক মৃত্যুবরণ করছেন? কিছুদিন আগে চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের একদল ছাত্রছাত্রীর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল চট্টগ্রাম শহরের শব্দের দূষণ সাধারণ মাত্রার থেকে বিশেষ বিশেষ এলাকায় প্রায় ১০-১২ গুণ বেশি, যার আশপাশে স্কুল-কলেজ বিদ্যমান। আরেকটি দুর্ঘটনার কথা এখানে না বললেই নয়। চট্টগ্রামের রিমি কমিউনিটি সেন্টারে কিছুদিন আগেই পদদলিত হয়ে মারা গেলেন ১০ জন। ধারণক্ষমতার বাইরে জনসমাগম, অপ্রশস্ত প্রবেশদ্বার ও ঢালু রাস্তা এর প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পাশাপাশি দুটো ঘটনাকে একসঙ্গে রাখলে একটি যোগসূত্র দেখা যায়। সাধারণত সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অধিক লোকসমাগম এবং অতি উচ্চমাত্রার শব্দের উৎপত্তি (বিশেষ করে মিউজিক) হয়। এ লেখাটি যখন লিখছি, তখন রাত প্রায় ১১টা ৪০ মিনিট। নিকটবর্তী কোনো কমিউনিটি সেন্টার থেকে ক্রমাগত উচ্চ স্বরে হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসছে। না চাইলেও যেন আমরা শুনতে বাধ্য। আর এভাবেই দিনের পর দিন শহরের আনাচকানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সামাজিক কেন্দ্রগুলো (কমিউনিটি সেন্টার) রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের মাধ্যমে একজনের পারিবারিক অনুষ্ঠান পৌঁছে দিচ্ছে আশপাশের সবার কাছে, বিনা অনুমতিতে, বিনা নিমন্ত্রণে। একদিকে যেমন শহরের রাস্তাঘাট কিংবা নাগরিক সুবিধার কথা চিন্তা না করে যেখানে-সেখানে স্কুল-কলেজ-হাসপাতালগড়ে উঠছে, তেমনি নিয়ম না মেনেই গড়ে উঠছে কমিউনিটি সেন্টারগুলো শহরের গলির এদিক-সেদিক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একতলা, দোতলা কিংবা তিনতলা একটি স্থাপনার চারপাশে থাকছে সাধারণ মানের ইটের দেয়াল-জানালা অথবা কাচ দিয়ে ঘেরা পার্টিশন। ছাদে দেখা যায় টিন-জাতীয় ছাউনির ব্যবহার, যা সাধারণভাবে ঢালাইকৃত। নেই কোনো শব্দনিরোধক উপকরণের ব্যবহার কিংবা ইনসুলেশন। এভাবেই গড়ে উঠছে কেন্দ্রগুলো। একটি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে যে পরিমাণ জায়গা অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য প্রয়োজন,
তা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে না। এতে করে যেকোনো অনুষ্ঠানের সময় অতিথিদের গাড়ি রাস্তায় পার্কিং করা হচ্ছে আর সাধারণ নাগরিকদের চরম দুর্ভোগে রাস্তায় চলাফেরা করতে হচ্ছে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় জায়গা না থাকার দরুন অতি জনসমাগমে আবারও যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা। অথচ নিয়ম থাকলেও দেখার তেমন কেউ নেই! শহরগুলোতে এমনও দেখা গেছে, এসব সেন্টারে রাতের বেলায় হাজার রকম আলোকসজ্জা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অবিরাম চলতে থাকে। স্থানীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটু এদিকে নজর দিলে কিংবা আইনের সঠিক প্রয়োগ করলে বেশ কিছু সুফল পাওয়া সম্ভব। ব্যবসা লাভজনক বলে যেকোনো জায়গায় গড়ে উঠছে এই সেন্টারগুলো। অথচ এ ধরনের সেন্টার তৈরিতে দেশীয় নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী আছে অনেক ধরনের নীতিমালা। থাকতে হবে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থাপনা—সামনে প্রশস্ত রাস্তা এবং ভেতরে উৎপন্ন শব্দ যেন বাইরে আসতে না পারে, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা এবং বহির্গমন রাস্তা অতিগুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের স্থাপনায় জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য সিঁড়ির ন্যূনতম প্রশস্ত দুই মিটার হওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও হরহামেশাই এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। অন্যদিকে অনেক সুউচ্চ আবাসিক ভবনে নিচের তলার দিকে সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করার জন্য বিধি মোতাবেক নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হলেও শব্দনিয়ন্ত্রণের বিষয় বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। যেহেতু এ ধরনের স্থাপনায় অতি উচ্চমাত্রার শব্দ তৈরি হয়, সেহেতু এ ধরনের স্থাপনার কক্ষের উচ্চতার ক্ষেত্রেও বিশেষ বিবেচনা প্রয়োজন বৈকি! এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট জায়গায় অনুষ্ঠান হলেও রাতের বেলায় শব্দদূষণের কারণে আশপাশের সবাইকে অসীম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মাণ বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যেকোনো ধরনের বিবাহ কিংবা পার্টি সেন্টারের জন্য প্রতি এক শ বর্গমিটার গ্রস এরিয়ার জন্য একটি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাপনা থাকা বাধ্যতামূলক। বিধিমালায় এ–ও উল্লেখ আছে—তিন হাজার বর্গমিটারের অধিক ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট আবাসিক ভবনে বসবাসকারীদের ব্যবহারের জন্য ন্যূনতম চার শতাংশ জায়গা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। এমনকি নগরের বিশেষ কোনো জায়গায় এ ধরনের সেন্টার তৈরি করা যাবে, তারও নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে। আর এসব বিধিনিষেধ মেনে না চললে অচিরেই এসব সামাজিক কেন্দ্র আশপাশের নাগরিক জীবন বিপন্ন করে তুলবে। আর তখন হয়তো প্রতিবাদের ভাষাও কারও থাকবে না। কারণ, তত দিনে আমাদের শ্রবণশক্তি নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়!
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
sajal_c@yahoo.com

আওয়ামী লীগ-বিএনপি কি এক পাল্লায়? by মহিউদ্দিন আহমদ

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ৩০ জানুয়ারি সিলেটে যাবেন, জনসভা করবেন এবং হজরত শাহজালাল (র.)–এর মাজার জিয়ারত করে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে সামনের ডিসেম্বরের কোনো একদিন মাহেন্দ্রক্ষণটি আসবে। নির্বাচনের প্রচার নানান কৌশলে চলছে অনেক দিন ধরেই। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে টানা নয় বছর।
এই কয় বছরে দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। প্রবৃদ্ধির পারদ ওপরে উঠেছে, মানুষের আয়রোজগারও বেড়েছে। এসব দেখিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা সব সময়ই বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়ন হয়। এ দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো বিএনপি। দলটি ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়েছে ১১ বছর আগে। চার বছর ধরে তারা সংসদে নেই। তার আগের মেয়াদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার দৃশ্যমান উন্নয়ন তেমন করতে পারেনি বলে বিরোধীদের অভিযোগ আছে। যদিও বা কিছু করে থাকে, তা এখন অতীত। মানুষ তো সুদূর অতীত মনে রাখে না, নিকট অতীতই স্মৃতিতে তাজা থাকে। তাই বলা যায়, বিএনপি বেশ অসুবিধায় আছে। তারা মানুষকে দেখাতে ও বোঝাতে পারছে না, ক্ষমতায় থাকলে তারাও উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে পারত। গণমাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব লক্ষণীয়। ফলে প্রচারণায় আওয়ামী লীগ অনেক এগিয়ে। বিএনপির নেতারা তো আদালতে হাজিরা দিতে দিতেই মাস-বছর পার করে দিচ্ছেন। প্রচারের সময় কই? তারপরও তাঁরা প্রচার পাচ্ছেন। এ কাজটা স্বেচ্ছাসেবকের মতো করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতারা কোথাও বক্তৃতা দিলে ৯০ শতাংশ সময় বিএনপিকে নিয়েই কথা বলেন। বিএনপি সম্পর্কে ভালো কথা তাঁরা বলেন না। গালাগাল এবং শ্লেষই থাকে বেশি। তো এটা একটা সাধারণ ধারণা যে আপনার প্রতিপক্ষ যদি আপনার সমালোচনা করে, তাহলে বুঝতে হবে আপনি ঠিক পথে আছেন। বলা যায়, আওয়ামী লীগের কল্যাণে বিএনপির ঢাক ঠিকই বাজছে। গণমাধ্যমে তারা শিরোনাম হচ্ছে নিয়মিত এবং নিখরচায়।
বছরখানেক আগে একটি টিভি চ্যানেলের টক শোতে আওয়ামী লীগের এক নেতা আমার মন্তব্যের সূত্র ধরে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ আর বিএনপিকে এক পাল্লায় মাপা উচিত নয়। দুই দলের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করলে আওয়ামী লীগের অনেকেই এ ধরনের মন্তব্য করেন। তাঁদের দাবি হলো আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঝান্ডা তাদের হাতে। অন্যদিকে বিএনপি হলো জামায়াতের সুহৃদ, রাজাকারদের দল, স্বাধীনতাবিরোধীদের আখড়া। সুতরাং এ দুটি দলকে এক পাল্লায় মাপলে তাতে আওয়ামী লীগকে অপমান করা হয়। আর আওয়ামী লীগের অপমান মানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। বিএনপি নেতাদের মুখে এর জবাব আছে। তাঁরা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট আদর্শিক নয়, কৌশলগত। এটা নির্বাচনী জোট। বরং আওয়ামী লীগই একসময় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। সুতরাং তাদের মুখে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করা শোভা পায় না। এই তর্ক চলতেই থাকবে। শিগগির এর মীমাংসা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক পাল্লায় উঠেছিল অনেক আগেই, ১৯৯১ সালে। কয়েক দিন আগে-পরে দুই দলের দুই নেত্রী সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন। হজরত শাহজালাল (রহ.) একজন সুফি সাধক। মধ্যযুগের শুরুর দিকে তিনি ৩৬০ জন সহচর নিয়ে এই মুলুকে এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। এই অঞ্চলে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া থেকে অনেক সুফি সাধক ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এসে এখানেই থিতু হয়েছিলেন। তাঁদের জীবন ছিল সাদামাটা।
তাঁরা সব সময় রাজদরবার থেকে দূরে থেকেছেন। রাজা, রাজ্য আর রাজনীতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো অনুরাগ-বিরাগ ছিল না। তাঁদের জীবন ও কাজ নিয়ে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তাঁদের তালিকার সামনের সারিতে আছেন হজরত শাহজালাল (রহ.)। তো রাজনৈতিক দলগুলো মাজার থেকে রাজনৈতিক প্রচার শুরু করে কেন? আমরা জানি, এ দেশের সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ, সরল। অদৃষ্টবাদী মানুষ বিপদে-আপদে এমনকি আনন্দের সময়ও পীর-আউলিয়াদের স্মরণ করে। পেশাদার রাজনীতিবিদেরা আমজনতার এই সেন্টিমেন্টটা ভালোই বোঝেন। এ দেশের ভোটারদের ৯০ শতাংশই মুসলমান। এদের এক বিরাট অংশ পীর-ফকিরের মাজারে আসা-যাওয়া করে, তাঁদের ভক্তি করে। সুতরাং মাজারকেন্দ্রিক প্রচারণার একটা বাজারমূল্য আছে বলে অনেকেই মনে করেন। পীর-ফকিরদের উপেক্ষা বা অবহেলা করে পার পাওয়া এ দেশে খুবই কঠিন, প্রায় অসম্ভব। আর রাজনীতিবিদেরা তো খুবই বাস্তববাদী এবং চালাকও বটে। সংগত কারণেই আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নতুন নামকরণ করেছিল ‘এম এ হান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার ওই নাম পাল্টে দেয়। নতুন নাম দেয় শাহ আমানত বিমানবন্দর। চট্টগ্রাম এলাকায় শাহ আমানত (রহ.) একজন সম্মানীয় সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে, তারা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে শাহ আমানত (রহ.)–কে সরানোর সাহস পায়নি। তবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জিয়াকে সরিয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.)–কে সেখানে বসিয়ে দিল। বিএনপি যদি আবার কখনো ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, শাহজালাল (রহ.)–কে তারা সরাতে পারবে না। তবে তাদের কয়েকজন কনিষ্ঠ নেতা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁরা ঢাকাকে ‘জিয়া সিটি’ বানাবেন। হজরত শাজহজালাল (রহ.) কি কখনো কল্পনা করেছেন, তিনি রাজনীতির পণ্য হবেন? কিন্তু হয়ে গেছেন। সরল ও ধর্মপ্রাণ মানুষের সেন্টিমেন্টের সুযোগ নিয়ে রাজনীতি এ দেশে নতুন নয়। তবে এর প্রকোপ বাড়ছে দিনে দিনে। রাজনীতিবিদদের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে বাড়িতে মাদ্রাসা বানালে, বারবার হজ পালন করলে, মাথায় হিজাব-টুপি পরে চলাফেরা করলে এবং মাজারে মাজারে ঘুরলে মুসলমান ভোটারের মন জয় করা সহজতর হবে। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির এই রূপ দিনে দিনে উৎকটভাবে ধরা দিচ্ছে। এখানে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি একাকার। তারা নিজেরাই এক পাল্লায় উঠে গেছে। ভোটের এমনই জাদু! রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দেওয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই। এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বলে পারছি না।
২৩ জানুয়ারি ঢাকায় প্রথমা প্রকাশনের উদ্যোগে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের আত্মজীবনীমূলক অ্যান অডিসি: জার্নি অব মাই লাইফ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অন্যতম আমন্ত্রিত বক্তা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর আলাপের সূত্র ধরে বলেন, ৩০ বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস করেন। ওখানে বসে প্রতিনিয়ত দেশের খোঁজ রাখেন। তাহলে দেশে কেন আসছেন না এমন প্রশ্ন আমি ওনাকে করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকেরা যখন চাইবেন, তখনই উপদেশ দেবেন। স্ব-উদ্যোগে দিতে যাবেন না। গত ৩০ বছরে কেউ ওনার কাছে উপদেশ চাননি। যখন যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারকের একজনের সঙ্গেও সরাসরি আলোচনায় বসার সুযোগ পাননি। একবার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দু-তিন পৃষ্ঠার একটি লিখিত পরামর্শ দিয়েছেন। পরে তিনি জেনেছেন, সেটা কেউ পড়েও দেখেননি’ (প্রথম আলো, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮)। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘকাল এই দলের কান্ডারি ছিলেন। আওয়ামী লীগের এখনকার কান্ডারি তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি সিলেট সফরে যাচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত করবেন। কিন্তু আমি খুশি হব যদি তিনি মুজিবনগর থেকে তাঁর নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এর একটি প্রতীকী মূল্য আছে। কারণ এখানেই একাত্তরের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার বাইরে থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার সুযোগ পাবেন কি না, তার সম্ভাবনা এখন পেন্ডুলামের মতো দুলছে আদালতের রায়ের ওপর। তারপরও তিনি যদি সুযোগ পান, অন্যান্যবারের মতো তিনিও হয়তো ছুটবেন সিলেটে, হজরত শাহজালাল (রহ.)–এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়েই শুরু করবেন নির্বাচনী প্রচারণা। বিএনপি দাবি করে, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক। এবং বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল বলে দলের অনেক তরুণ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। আমি চাইব মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল হিসেবে বিএনপি নিজের পরিচিতি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরুক। খালেদা জিয়াও সিলেট যান এবং হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত করুন, কিন্তু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা তারা শুরু করুক চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে, যেখান থেকে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ শেষ বিকেলে জিয়াউর রহমান নিজ হাতে লেখা স্বাধীনতার একটি ঘোষণা রেডিওতে পাঠ করেছিলেন।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com