Showing posts with label ইরাক. Show all posts
Showing posts with label ইরাক. Show all posts

Sunday, July 12, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হাত মিলাচ্ছে’ ইরাক-সিরিয়াঃ ইরানকে ঠেকাতে নতুন চাল

ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সিনিয়র ইরাকি এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই’কে (এমইই) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্রগুলো এমইই’কে বলেছে, উত্তর ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন পুনরুজ্জীবনের চুক্তি আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। এ সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, তুরস্কে নিযুক্ত ট্রাম্প প্রশাসনের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন। সফরকালে আল-জায়েদি জ্বালানি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন অঙ্গরাজ্য টেক্সাসও যেতে পারেন।

ঊর্ধ্বতন এক ইরাকি কর্মকর্তা এমইই’কে বলেছেন, টম ব্যারাকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আল-জায়েদির ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ব্যারাক এই পাইপলাইন প্রকল্পকে লেভান্ট অঞ্চলে এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য সমানভাবে লাভজনক হবে।
পাইপলাইনটি ১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মাণ করে। এটির দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা ছিল।

তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া তেহরানের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ১৯৮০-এর দশকে বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের সময় পাইপলাইনটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এরপর থেকে এটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
আঞ্চলিক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমইই’কে জানান, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করতে নতুন সংরক্ষণাগার, পাম্প, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
তার মতে, বাস্তবে পুরো পাইপলাইন নতুন করে নির্মাণ করতে হতে পারে, যা শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই পুনর্র্নিমাণে ইতোমধ্যে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।

হরমুজ সংকটের পর গুরুত্ব বেড়েছে
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়া ও ইরাক পাইপলাইনটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ তখন সফল হয়নি।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরালো হওয়ায় পাইপলাইনটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক সীমিত পরিসরে সিরিয়ার মাধ্যমে ট্রাকে করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সারহাং হামাসাঈদ বলেন, ইরাক এখন সিরিয়াকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে। আগে তাদের মধ্যে সন্দেহ ছিল, কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরাকের সিরিয়াকে প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।
যদিও ইরাকের বর্তমান সরকারে ইরান ঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের প্রভাব রয়েছে, তবু তারা এখন সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থন পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে সিরিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে এবং আল-শারার সাবেক সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
গত সপ্তাহে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প আল-শারাকে “অসাধারণ” এবং “অত্যন্ত সম্মানিত” নেতা বলে প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ১৯৭৯ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় থাকা সিরিয়ার নামও সরিয়ে নেয়া হবে।

মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ
চলতি মাসের শুরুতে ইরাক সরকার ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিরকুক ও হাদিথা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের একটি প্রাথমিক চুক্তি অনুমোদন করেছে।
ইরাক তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে করে থাকে। ফলে প্রণালিটি বন্ধ বা অচল হয়ে গেলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি গত বছরের গড়ের মাত্র ৮ শতাংশে নেমে আসে।
উল্লেখ্য, ইরাকের রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প রপ্তানি পথ চালু করা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হাত মিলাচ্ছে’ ইরাক-সিরিয়া

Friday, February 27, 2026

ইরানেও কি ইরাকের মতো ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সিএনএনঃ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানকে একের পর এক হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। চলতি শতকের শুরুর দিকে ইরাকে হামলার আগে অস্ত্র নিয়ে একই ধরনের কথা বলেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। যদিও পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইরাক অভিযান–পরবর্তী সময়টাও হিসাব–নিকাশ অনুযায়ী চলেনি। এখন ট্রাম্পও ইরান ঘিরে একই ধরনের ফাঁদের দিকে এগোচ্ছেন কি না, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সিএনএনের প্রতিবেদক স্টিফেন কলিনসন। প্রথম আলো পাঠকদের জন্য লেখাটি কিছুটা সংক্ষেপিত আকারে বাংলা করে প্রকাশ করা হলো।

ইরাক যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল দেশটির প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা। এমনটি না হলে হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না।

বিষয়টি এখন একটি পরিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিহাস বলা হচ্ছে, কারণ ট্রাম্প এখন এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন এবং এমন কিছু কৌশলগত ভুল করতে পারেন, যে ধরনের ভুল ২০০৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে কি না, তার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেননি ট্রাম্প। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বিপুল সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন অভিযানের পর এটিই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।

বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেখানে তেহরানকে কিছুটা পিছু হটতে চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে এই সেনা সমাবেশ। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কূটনৈতিকভাবে বড় কোনো সাফল্য না আসে, আর গুলি চালানো বাদেই এই সেনা সমাবেশ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিতে হয়, তাহলে তা হবে ট্রাম্পের জন্য সম্মানহানিকর।

ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের ভিত্তি হলো ‘মাগা’ বা ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলুন’ শীর্ষক আন্দোলন। এ আন্দোলন বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন মার্কিন বাহিনী হয়তো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে দেশের মানুষ এর জন্য প্রস্তুত নন।

ইরাকে হামলা শুরুর আগে বুশ কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তবে সেগুলো ছিল ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে। ইরানে হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পও অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর যুক্তি দেখাচ্ছেন। যদিও মঙ্গলবার রাতে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে নিজের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করেছেন তিনি। তবে এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে আরও কোণঠাসা করে ফেলতে পারেন।

যেমন আগের মতোই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে ইরানকে কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে দেওয়া হবে না। তাঁর এ বক্তব্য কিছু প্রশ্ন সামনে আনে। একটি হলো, তিনি আগেই দাবি করেছেন যে গত বছর হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে শত শত মার্কিন সেনার মৃত্যুর জন্য ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দায়ী বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।

ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বাড়িয়ে বলা

ইরাক হামলার দিনগুলোর প্রতিধ্বনি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে, যখন ট্রাম্প ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলাপ শুরু করেন। তিনি বলেন, তারা এরই মধ্যে এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে, যেগুলো ইউরোপকে এবং বিদেশে থাকা আমাদের ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আর তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কাজ করছে, যেগুলো শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যাবে।

ট্রাম্প হয়তো ইরানের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে বলছেন। তবে হুমকিটা যখন তিনি নিজের দেশের ওপর টেনে আনছেন, তখন তিনি সেই বিতর্কিত পথই বেছে নিচ্ছেন, যা ইরাক যুদ্ধের বৈধতা দেওয়ার জন্য বুশের প্রশাসন এবং যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকার ব্যবহার করেছিল।

বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একই ধরনের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, নিজেদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াচ্ছে তারা। আর তারা যে পথের দিকে এগোচ্ছে, তাতে স্পষ্টতই এক দিন এমন অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যাবে। তাদের কাছে এখন এমন অস্ত্র আছে, যেগুলো ইউরোপের বেশির ভাগ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।’

কথাগুলো পরিচিত। ২০০২ সালে বুশ বলেছিলেন, সৌদি আরব, ইসরায়েল, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে মার্কিন নাগরিকেরা ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ–ও দাবি করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় খুঁজছে বাগদাদ। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে ইরাক।

বুশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি ছিল ইরাকের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি পরিকল্পনায় অবহেলা। ফলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। ইরাকের চেয়ে ইরান শক্তিশালী দেশ। কিন্তু মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কারণে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কী হতে পারে, তা নিয়ে ট্রাম্প এখনো মার্কিনদের খোলাখুলি কিছু বলেননি।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানে শাসন পরিবর্তনের ফলে কী হবে, তার আভাস দিতে পারছেন না যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। আর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ক্ষমতার এ শূন্যতা পূরণে সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তি হতে পারে বিপ্লবী গার্ড কোর। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি শক্তির জায়গায় একই ধরনের আরেকটি শক্তি আসতে পারে।

ভিন দেশে শাসক পরিবর্তন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। এ বছরেই তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মাদুরোর পতনের পর দেশটিতে ক্ষমতায় বসা দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ উদ্ধারে নেমে পড়েছেন। তবে ইরানে সরকার পতন হলে দেলসির মতো যুক্তরাষ্ট্র কাউকে খুঁজে পাবে—এমন সম্ভাবনা অনেক কম বলেই মনে হচ্ছে।

প্রতিপক্ষ কীভাবে আচরণ করবে, তা নিয়ে ভুল ধারণার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরনের ভুল–বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও গত বছরে সৌদি আরবে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের সময় যাঁরা হামলা চালিয়েছিলেন তাঁরা এমন জটিল সব সমাজের ওপর সেটা করেছিলেন, যে সমাজকে তাঁরা নিজেরাই বুঝতেন না।

চলতি মাসে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পারছেন না কেন ইরান তাঁর চাপে নতি স্বীকার করছে না। এই বক্তব্যের পেছনে একটি কারণ থাকতে পারে। সেটি হলো ইরান দেখেছে, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো যেসব স্বৈরশাসকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না, তাঁদের কীভাবে পতন হয়েছে। তাই শাসন টিকিয়ে রাখতে তেহরান অস্ত্র রাখতে চাইবে।

তবে ২০০৩ সালের মতোই এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঝুঁকি হলো অহংকার। ইরাকের ক্ষেত্রে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কম সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। দেশটিতে মার্কিন সেনাদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানানো হবে। ২০ বছরের বেশি সময় পর ট্রাম্পও মনে করছেন, ইরানে সহজ জয় পাবে মার্কিন বাহিনী। এ ক্ষেত্রে পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে রাখা দরকার।

কী ধরনের চুক্তি ট্রাম্প মেনে নিতে পারেন

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য কূটনীতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আজকেও (বৃহস্পতিবার) জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তবে এই আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে ট্রাম্পকে ইরান কোনো ছাড় দিতে রাজি হয় কি না, তার ওপর। এই ছাড়কে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এরই মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান; কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে সমঝোতা কঠিন হতে পারে। ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি এমন কোনো চুক্তি মেনে নিতে পারবেন না, যা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলের পারমাণবিক চুক্তির মতো দেখায়। ওই চুক্তি তিনি নিজেই বাতিল করেছিলেন।

এ কারণে ইরানে সামরিক পদক্ষেপ ট্রাম্পের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। যদিও এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। আর ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনই সঠিক সময় হতে পারে। কারণ, ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানের ভেতরেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে, তাহলে দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন ট্রাম্প। চীনের প্রভাববলয় থেকে একটি দেশকে বের করেও আনতে পারবেন। তাই চলতি শতকের শুরুর দিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক বিপর্যয়ের মতো সতর্কবার্তা থাকলেও ট্রাম্প হয়তো সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইবেন।

আদালতে বিচার চলাকালে ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন
আদালতে বিচার চলাকালে ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, January 28, 2026

নুরি আল-মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলে ইরাককে সহায়তা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

ইরাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকিকে ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হলে দেশটিকে দেওয়া সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, নুরি আল-মালিকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

ইরাকের পার্লামেন্টে শিয়াদের বৃহত্তম অংশ ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁদের প্রার্থী হিসেবে নুরি আল-মালিকির নাম জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরাক ‘খুবই বাজে একটি পছন্দ’ বেছে নিয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘মালিকির সর্বশেষ আমলে দেশটি দারিদ্র্য আর সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলায় ডুবে গিয়েছিল। এটি আর ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘তাঁর (নুরি আল-মালিকি) পাগলাটে নীতি ও আদর্শের কারণে, নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরাককে সহায়তা করবে না।’

‘আমরা যদি সহায়তার জন্য না থাকি, তাহলে ইরাকের সাফল্য, সমৃদ্ধি বা স্বাধীনতার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য। ইরাককে আবার গৌরবের পথে ফেরান!’ বলেন ট্রাম্প।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরাক নিজেদের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পথে হাঁটছে। তবে ট্রাম্প ইরাকের শাসনকাঠামো থেকে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীলদের সরাতে চান। তাঁর সর্বশেষ মন্তব্যকে এ কৌশল বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে কড়া অবস্থান বলা যেতে পারে।

একটি চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা বলেছেন, নিজেদের প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার বিষয়টি বাগদাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে ‘মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে’ ইরাকের পরবর্তী সরকার সম্পর্কে ওয়াশিংটন অবশ্যই নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেবে।

ইরানের মদদপুষ্ট ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে’ পরবর্তী সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলেও ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দিচ্ছে—এমনটা জানিয়েছেন ইরাকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক। তাঁদের ভাষ্য, ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে এটা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত সপ্তাহে এ তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদন করেছে।

নুরি আল-মালিকির বয়স ৭৫ বছর। তিনি ইরাকি শিয়া ইসলামপন্থীদের দাওয়া পার্টির জ্যেষ্ঠ একজন রাজনীতিক। ২০০৬ সালে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নুরি আল-মালিকি। ক্ষমতায় ছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। ওই সময় সুন্নি ও কুর্দিদের সঙ্গে ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে।

২০১৪ সালে আইএস যখন ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়, তখন নুরি আল-মালিকি সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে ইরাকের রাজনীতিতে বরাবরই তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখেছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Fiq0i8pjo%2FUntitled-1.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নুরি আল-মালিকি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, January 2, 2026

একটি অখ্যাত কবর ও ইরাকের আশ্চর্য অতীতের গল্প by তানিয়া গুডসুজিয়ান ও ইব্রাহিম আল মারাশি

বাগদাদের বাব আল শারকি এলাকার পুরোনো অ্যাংলিকান কবরস্থানে এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে সমাহিত বিদেশিদের দেহ শুয়ে আছে। রোদে পুড়ে যাওয়া পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শুকনা ঝোপঝাড় গজিয়েছে। অনেক সমাধিফলকের লেখাই এখন ক্ষয়ে যাওয়ায় তা পড়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

এখানে আসা বেশির ভাগ মানুষ খুঁজে ফেরেন গার্ট্রুড বেলের কবর। তিনি ‘কুইন অব দ্য ডেজার্ট’ নামে পরিচিত। হলিউডে তিনি অমর হয়ে আছেন। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আধুনিক ইরাক গঠনে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে কেউ প্রশংসা করেন, কেউ আবার সমালোচনা করেন।

কিন্তু বেলের কবর থেকে একটু দূরেই রয়েছে আরেকটি পুরোনো সমাধিফলক, যা কৌতূহলী চোখ আকর্ষণ করবেই। সেটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রিজার্ভ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার চার্লস হেনরি কাউলির কবর। ১৮৭২ সালে বাগদাদে জন্ম নেওয়া কাউলি ১৯১৬ সালে কুটের কাছে এক যুদ্ধে নিহত হন। ওই যুদ্ধে তাঁকে ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রদান করা হয়েছিল।

গার্ট্রুড বেলের মতো পরিচিত নাম না হলেও কাউলির জীবনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, একসময় ইরাক কীভাবে নদীনির্ভর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র ছিল। এই নেটওয়ার্ক শুধু বাণিজ্য নয়; বরং গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই ইতিহাস নতুন করে গুরুত্ব পায় গত সেপ্টেম্বরের একটি বিতর্কিত এবং তথ্যগতভাবে ভুল মন্তব্যের পটভূমিতে।

মন্তব্যটি করেছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী থেকে তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হওয়া টম ব্যারাক। ব্যারাক বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য বলে কিছু নেই। এখানে আছে শুধু গোত্র আর গ্রাম। তার যুক্তি ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আসলে ঔপনিবেশিক শক্তির তৈরি করা কৃত্রিম কাঠামো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের বন্দোবস্ত নিয়ে কেউ কেউ বলেন, সাইকস পিকো চুক্তি কৃত্রিম রাষ্ট্র গঠন চাপিয়ে দিয়েছিল, যা পরে অস্থিরতার জন্ম দেয়। কিন্তু সেই সমাজগুলোকে আদিম বা অসভ্য বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভুল একটি দাবি। এই দৃষ্টিভঙ্গি যে বিষয়টি উপেক্ষা করে, তা হলো সাইকস পিকো চুক্তির সীমান্তগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আঁকা হলেও সেগুলো মরুভূমি থেকে নতুন কোনো সভ্যতা তৈরি করেনি।

ইউরোপীয় মানচিত্রবিদেরা আসার বহু আগেই ইরাকের দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছিল। সেই ইতিহাস ছিল বহুভাষিক, বাণিজ্যনির্ভর, শিক্ষিত ও ভবিষ্যৎ–মুখী। এই ইতিহাসই এমন সব সংশোধনবাদী ব্যাখ্যার সরাসরি প্রতিবাদ করে। টম ব্যারাকের এ ধরনের ধারণা পশ্চিমে বহু আগেই এডওয়ার্ড সাঈদ ও ওরিয়েন্টালিজম (প্রাচ্যবাদ) বিষয়ে পুরো একাডেমিক ধারার মাধ্যমে খণ্ডিত হয়েছে।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া বা গার্ট্রুড বেলের মতো পরিচিত নাম না হলেও কাউলির জীবন গভীরভাবে দেখলে এমন এক সময়ের জানালা খুলে যায়, যখন দাজলা ও ফোরাত নদী ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান যোগাযোগপথ। এই নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বাজার, কূটনীতি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ।

ইউফ্রেটিস অ্যান্ড টাইগ্রিস স্টিমশিপ নেভিগেশন কোম্পানির একজন জ্যেষ্ঠ ক্যাপ্টেনের ছেলে এবং আর্মেনীয় পারস্য বংশোদ্ভূত এক নারীর সন্তান হিসেবে কাউলি টাইগ্রিস নদীর তীরে বড় হন। স্টিমশিপের ক্যাপ্টেন, নদীর নাবিক, ব্যবসায়ী ও দোভাষীদের মধ্যে বেড়ে উঠে তিনি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন যে এই নদীগুলোই ইরাকের অর্থনীতির প্রাণ।

আরবি ভাষা ও আরও কয়েকটি ভাষায় দক্ষ কাউলি সহজেই এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে বিচরণ করতেন। তিনি সীমান্তের চেয়ে বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন মেসোপটেমিয়া বহুসাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

ইরাকের সাংস্কৃতিক জীবনও ইউরোপীয় আলোর অপেক্ষায় ছিল না। রাজা ফয়সাল প্রথম পশ্চিমা ধাঁচের যে টুপি পরতেন এবং যাকে তিনি অগ্রগতির প্রতীক বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেই আল সিদারা আসার এক হাজার বছর আগেই আল মুতানাব্বি শাসকদের উত্থান-পতন ও ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে মুল্লা আব্বুদ আল কারখি এমন কিছু তীক্ষ্ণ কবিতা লেখেন, যেখানে অটোমান শাসনের ভাঙন ও ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝখানে আটকে পড়া একটি সমাজের উদ্বেগ ফুটে ওঠে। তাঁর কবিতায় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব ও আধুনিকতা নিয়ে প্রাথমিক চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়।

বাস্তবতা হলো, ইরাকিরা ইতিহাসের নীরব ভুক্তভোগী ছিলেন না। তাঁরা নিজেদের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সক্রিয়ভাবে বুঝেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন।

আজ অবশ্য একসময়কার সেই শক্তিশালী নদীগুলো আর আগের মতো প্রবাহিত হয় না। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানি সরিয়ে নেওয়া এবং খরার কারণে নদীগুলোর প্রাণশক্তি কমে গেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এখন এসব নদীর গুরুত্বও খুব সামান্য। কারণ, বাণিজ্য অনেক আগেই স্থলপথে সরে গেছে।

তবে যে বিষয়টি একেবারেই কমে যায়নি, তা হলো ইরাকের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। কিউনিফর্ম লিপি, গণিত ও আইনের সূচনাকাল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের আগেও মধ্যপ্রাচ্যে সুসংগঠিত সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিচয় বিদ্যমান ছিল।

কাউলির কবর এবং তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা হারিয়ে যাওয়া সেই জগৎ আজ আবার একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ইরাকের ঐক্য ও বৃহত্তর অঞ্চলের সংহতি সব সময়ই স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠেছে। তা তেল, যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের কারণে নয়; বরং মানুষ, ভাবনা ও অর্থনীতিকে যুক্ত করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ইরাকের নদীগুলোর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের অভিযোজনের ক্ষমতাই বরাবর তার সবচেয়ে বড় শক্তি ও পরিচয়।

তানিয়া গুডসুজিয়ান, কানাডীয় সাংবাদিক ও আল–জাজিরা ইংলিশ অনলাইনের সাবেক মতামত সম্পাদক
ইব্রাহিম আল মারাশি, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি সান মারকোসে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-22%2Fvgy4d6q2%2Firaqkk.JPG?rect=75%2C0%2C890%2C593&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বাগদাদের একটি সেতু পার হচ্ছেন ইরাকের অধিবাসীরা। ১৯৩২ সালের ইরাক। ছবি : এএফপি

Wednesday, November 5, 2025

মারা গেছেন ইরাকে হামলার নেপথ্য কারিগর সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি

ইরাকে হামলার নেপথ্য কারিগর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টন ডিক চেনি মারা গেছেন। মঙ্গলবার ৮৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চেনি নিউমোনিয়া ও হৃদরোগজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই রাজনীতিবিদ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, চেনি মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার নেতৃত্বে ভাইস প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রশাসনের ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

চেনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের সরকার বিপুল পরিমাণে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ মজুত রেখেছে এবং আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। পরবর্তীতে ৯/১১ কমিশন এই দাবি ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি।

তবুও চেনি বারবার বলেন, সেই সময়কার গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরাক আক্রমণ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। ইরাক আক্রমণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, মার্কিন সৈন্যদের স্বাধীনতাকামী হিসেবে স্বাগত জানানো হবে এবং যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। যদিও সেটি শেষ হতে এক দশক লেগে যায়।

১৯৪১ সালের ৩০ জানুয়ারি নেব্রাস্কার লিংকনে জন্মগ্রহণ করেন রিচার্ড ব্রুস চেনি। কৈশোরে পরিবার নিয়ে ওয়াইওমিংয়ে চলে যান। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়া শেষ করতে পারেননি। পরে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে তার সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে। নিক্সন প্রশাসনের ইন্টার্ন হিসেবে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সরকারের চিফ অব স্টাফ হন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ-এর প্রশাসনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

চেনি বুশ প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখেন। ৯/১১ হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় তিনি তথাকথিত ‘এনহান্সড ইন্টাররোগেশন টেকনিক’ বা বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদের পক্ষে ছিলেন। যেখানে ওয়াটারবোর্ডিং ও ঘুম বঞ্চনার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ এসব পদ্ধতিকে নির্যাতন বলে আখ্যা দেয়। চেনিকে তার কঠোর নীতির জন্য প্রায়ই ‘স্টার ওয়ার্স’ চলচ্চিত্রের খলনায়ক ডার্থ ভেডার-এর সঙ্গে তুলনা করা হতো। একবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, এই তুলনাটা খারাপ নয়। এমনকি তিনি একবার ডার্থ ভেডারের পোশাক পরে অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন।

ডিক চেনির স্ত্রী লিন চেনি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাদের দুই মেয়ে- লিজ চেনি ও মেরি চেনি। বড় মেয়ে লিজ চেনি মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সদস্য ছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেওয়ার পর নিজের আসন হারান। ডিক চেনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি ডেমোক্রেট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দেবেন। কারণ আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের জন্য ডনাল্ড ট্রাম্পকে বড় হুমকি মনে করেন তিনি।

২০০৬ সালে টেক্সাসে এক শিকার অভিযানে ভুলবশত তিনি নিজের বন্ধুকে গুলিবিদ্ধ করেন। যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ২০১৮ সালে তার জীবনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ভাইস-এ অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেল তাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন। বেল গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার গ্রহণকালে মজা করে বলেন, এই চরিত্রে অনুপ্রেরণার জন্য শয়তানকে ধন্যবাদ। ডিক চেনি তার মৃত্যু পর্যন্ত মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতির এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী লিন, কন্যা লিজ ও মেরি।

mzamin

Thursday, July 17, 2025

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য পোক্ত করার জন্য কতটা দায়ী সাদ্দাম by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

ফিলিস্তিন ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিয়ে আরবসহ গোটা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তাঁর অবস্থান ছিল দৃশ্যত মার্কিনবিরোধী। আদতে কি তাই? ১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই সাদ্দাম ইরাকের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। জেনে নেওয়া যাক সেই সময়ের ইরাকের নেপথ্যের রাজনীতি।

মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ইতিহাসে বড় জায়গা করে নিয়েছেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। তাঁর শাসনামলে অস্থির সময় পার করেছে গোটা অঞ্চল। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তাঁর অবস্থান ছিল দৃশ্যত মার্কিনবিরোধী। আদতে কি তাই? নাকি নিজের একরোখা মনোভাব আর আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আরব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পোক্ত করার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন সাদ্দাম। ইরান ও কুয়েতে হামলা করার মাধ্যমে তিনি কার্যত আরব বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে ঠেলে দিয়েছিলেন।

১৬ জুলাই। ১৯৭৯ সালের এই দিনে সাদ্দাম হোসেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর টানা প্রায় ২৫ বছর তিনি ইরাক শাসন করেন। এ সময়ে তিনি প্রতিবেশী দুটি দেশে আগ্রাসন চালান। সংঘাতে জড়ান ইসরায়েলের সঙ্গেও। তাঁর বিরুদ্ধে নিজ দেশের জনগণের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

কৃষক পরিবার থেকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে

ইরাকের উত্তরাঞ্চলে তিকরিত শহরের পাশে ১৯৩৭ সালের ২৮ এপ্রিল এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে সাদ্দামের জন্ম। জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা যান। বাগদাদে চাচার কাছে থেকে বড় হয়েছেন তিনি। ২০ বছর বয়সে ইরাকের বাথ পার্টিতে যোগ দেন। বছর দুয়েকের মাথায় ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন সাদ্দাম ও তাঁর দলীয় সহযোগীরা। আহত অবস্থায় পালিয়ে যান সিরিয়ায়, এরপর মিসরে।

সাদ্দাম মিসরের কায়রো ল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে ১৯৬৩ সালে ইরাকে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে। দেশে ফেরেন সাদ্দাম। ভর্তি হন বাগদাদ ল কলেজে। ওই বছরই ক্ষমতা ছাড়তে হয় বাথ পার্টির সরকারকে। সাদ্দামকে কারাগারে যেতে হয়। কয়েক বছর বন্দী ছিলেন তিনি।

একপর্যায়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান সাদ্দাম। দলের নেতা হন তিনি। ১৯৬৮ সালে বাথ পার্টি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় আসে। এতে নেতৃত্ব দেন সাদ্দাম। তবে ওই সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আহমাদ হাসান আল-বকর। ১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই তাঁকে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেন সাদ্দাম।

ক্ষমতা দখলে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতা

নিউইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল পলিসি ফোরামের (জিপিএফ) আর্কাইভে থাকা একটি নিবন্ধে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ১৯৬৩ সালে সাদ্দামের বাথ পার্টিকে প্রথমবারের মতো ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিল। তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায়, সাদ্দাম ১৯৫৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) আর্থিক সুবিধাভোগীদের তালিকায় ছিলেন, যখন তিনি ইরাকের প্রভাবশালী নেতা আবদ আল-করিম কাসেমকে হত্যার একটি ব্যর্থ চেষ্টায় অংশ নেন।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, বিশেষ করে ইরাকের রাজনীতি নিয়ে বিস্তর জানাশোনা আছে লেখক হান্না বাতাতুর। তাঁর গবেষণা থেকে জানা যায়, কীভাবে ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাথ পার্টি ক্ষমতা দখল করে নেয়। মার্কিন গোয়েন্দাদের সরবরাহ করা তালিকা নিয়েও কথা বলেন তিনি। ওই তালিকা ধরে বিরোধীদের, বিশেষ করে কমিউনিস্টদের খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করেছিল বাথ পার্টি।

‘হিউম্যান রাইটস ইন আমেরিকান ফরেন পলিসি: ফ্রম দ্য নাইনটিন সিক্সটি’জ টু দ্য সোভিয়েত কলাপস’ বইয়ের লেখক জো রেনোয়ার্ড। ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ফোরামের (আইএএফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি লিখেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল নিছকই বাস্তববাদী রাজনীতিনির্ভর। ওয়াশিংটন তেলের সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখতে, সোভিয়েত ও ইরানি প্রভাব সীমিত করতে, আরব জাতীয়তাবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ইসলামপন্থার বিস্তার রোধ করতে চেয়েছিল।

জো রেনোয়ার্ড লেখেন, সাদ্দাম হোসেনের বাথপন্থী ইরাক কেবল ধর্মনিরপেক্ষ ও কমিউনিস্টবিরোধীই ছিল না, এটি মস্কো ও তেহরান উভয়ের বিরুদ্ধেই একটি সম্ভাব্য ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি ছিল। দেশটির বিশাল তেলের মজুত পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারত। ইতিহাসবিদ জোসেফ সাসুন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এই পারস্পরিক স্বার্থ সাদ্দাম ও যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সহজাত মিত্রে’ পরিণত করেছিল।

অপ্রস্তুত ইরানে হামলা কার স্বার্থে

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী কাউন্টার পাঞ্চের অনলাইন সংস্করণে ২০০৪ সালের ১৭ জুন ‘সাদ্দামকে যেভাবে রাসায়নিক অস্ত্রে সজ্জিত করেছেন রিগ্যান (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান)’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন নর্ম ডিক্সন। এতে তিনি বলেন, ইরাকগেটের (ইরাককে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা) প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে ইরানের গণ-অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে মার্কিনপন্থী শাহ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ইরানের এই বিপ্লব কৌশলগত তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ইসরায়েল ছাড়াও ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র ছিল।

ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে ইরানি বিপ্লবকে দুর্বল বা উৎখাত করার অথবা শাহর পতনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজতে শুরু করে। সাদ্দাম হোসেনের সরকার এতে এগিয়ে আসে। ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরানে আক্রমণ করে বসে ইরাক। আট বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন ইরাককে সমর্থন করেছিল।

মার্ক ফিথিয়ানের ১৯৯৭ সাল প্রকাশিত বই ‘আর্মিং ইরাক: হাউ দ্য ইউএস অ্যান্ড ব্রিটেন সিক্রেটলি বিল্ট সাদ্দামস ওয়ার মেশিন’ বইয়ে বলা হয়, ১৯৮৩ সালে রিগ্যান ইতালির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলিও আন্দ্রেওত্তিকে ইরাকে অস্ত্র সরবরাহের অনুরোধ করেছিলেন।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়। তবে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তৎপর হয় ওয়াশিংটন। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে বাগদাদে সাদ্দামের সঙ্গে উষ্ণ সাক্ষাৎ হয় মার্কিন বিশেষ দূত ডোনাল্ড রামসফেল্ডের। এই সাক্ষাতে রামসফেল্ড বলেন, ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও উন্নত করতে ‘প্রস্তুত’, যা পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার শুরু করার পথ প্রশস্ত করে।

ওয়াশিংটন ইরাককে তাদের সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং ইরানকে সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এ ছাড়া ইরাককে খাদ্যশস্য কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইরাকের ঋণমান বাড়ানোর জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয় এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহের সুবিধা দেওয়া শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরাকের পতন রোধ করতে’ সচেষ্ট ছিল। এ জন্য ইরাককে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলো থেকে আরও সহায়তা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৮৪ সালের ২৪ মার্চ রামসফেল্ড আবারও বাগদাদে যান। একই দিনে জাতিসংঘ থেকে মার্কিন বার্তা সংস্থা ইউপিআই এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘ইরানি সেনাদের ওপর নার্ভ এজেন্ট-মিশ্রিত মাস্টার্ড গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।’ আর ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত রামসফেল্ড বাগদাদে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরানসোর্স ব্লগের সম্পাদক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হলি ড্যাগরেস ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট একটি ব্লগে লেখেন, শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সাদ্দামের অতর্কিত আক্রমণে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতায় জর্জরিত দুর্বল দেশ হিসেবে ইরান শাহ আমলের সামরিক ব্যক্তিত্বদের হয় নির্বাসন অথবা মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী থেকে সরিয়ে দেয়। সামরিক বাজেট এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেয়। এতে সাদ্দাম ধারণা করেছিলেন, নতুন আঞ্চলিক শক্তিধর হিসেবে তাঁর জয় নিশ্চিত এবং সহজেই তিনি জয়লাভ করবেন।

কিন্তু সাদ্দামের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। বরং ইরান-ইরাক যুদ্ধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করে। এটি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সরকারকে ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং বিপ্লবের বিরুদ্ধে থাকা অন্য গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে সাহায্য করে।

অনেক ইরানি জাতীয়তাবাদকে আলিঙ্গন করেন এবং ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের দেশকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। এই যুদ্ধকে ইরানিরা ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ কিংবা ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সুযোগে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মতন্ত্রের প্রতি জনসাধারণের সমালোচনাও কমে যায়।

জো রেনোয়ার্ড তাঁর নিবন্ধে লেখেন, যদিও ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল, তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হয়েছিল। কারণ, উভয়েই ইরানের বিজয়ের আশঙ্কা করেছিল। যেহেতু ইরানের বিপ্লবের প্রসারের বিরুদ্ধে ইরাক একটি রক্ষাকবচ ছিল, তাই সিআইএর ১৯৮৩ সালের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ‘ইরাকের সম্পূর্ণ পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ফল বয়ে আনবে।’

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটি পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল, ‘বর্তমান (ইরাকি) সরকার যেকোনো নতুন সরকারের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরও অনুকূল নীতি অনুসরণ করবে এবং সাদ্দামের অপসারণ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার সূচনা করতে পারে।’

যুদ্ধে ইরাককে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ১৯৯২ সালের ২৬ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়, ইরান-ইরাক যুদ্ধের শুরুর দিকে বাগদাদকে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তটি এসেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সতর্কবাণীর পর। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, ইরানের দাপটে প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়ছে ইরাকি বাহিনী। এর এক বছর আগে ইরানের সেনাবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রের গোপন চালান পাঠিয়ে শক্তিশালী করা হয়েছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে রিগ্যান প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ইসরায়েলকে কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন অস্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ ইরানে পাঠানোর অনুমতি দিতে গোপনে সিদ্ধান্ত নেয়। লেবাননে আটক মার্কিন জিম্মিদের মুক্ত করতে এবং ইরান সরকারের কিছু অংশে নিজেদের প্রভাব তৈরি করতে রিগ্যান প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিআইএর অবমুক্ত করা গোপন নথিতে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

কিন্তু যুদ্ধে শুরুর ধাক্কা সামলে ইরান ঘুরে দাঁড়ালে নড়েচড়ে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্ররা। ইরাকের পরাজয় ঠেকাতে এগিয়ে আসতে রিগ্যান প্রশাসনকে প্রভাবিত করে সৌদি আরব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ১৯৮৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআইএ গোপনে ইরাককে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্পর্শকাতর স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে প্রাপ্ত তথ্যও ছিল। এসব তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল স্থাপনা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলায় ইরাককে সহায়তা করা। ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা মেনে আল-ফাও উপদ্বীপ দখল করে নেয় ইরাকি সেনাবাহিনী। এটি এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনকারী ছিল।

১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে। এর দুই মাস আগে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেনেস ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভূপাতিত করে। এতে ওই উড়োজাহাজের ২৯০ জন আরোহী নিহত হন। এ ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। এমনকি এই যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেনকে একটি পদকও দিয়েছিল।

কুয়েতে হামলা

ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। তবে আশির দশকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় দুই দেশ কাছাকাছি আসে। আট বছর ধরে চলা এ যুদ্ধের সময় বাগদাদকে অস্ত্রশস্ত্র কিনতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার দিয়েছিল কুয়েত। স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের পর ধারের ওই অর্থ শোধ করার কথা ছিল ইরাকের। কিন্তু সেই সহায়তাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কুয়েতের জন্য।

১৯৯০ সালের ২০ জুলাই থেকে কুয়েত ঘিরে সেনা মোতায়েন শুরু করে ইরাক। পারস্য উপসাগর ঘিরে তখন তুমুল উত্তেজনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এসেছিল প্রতিবেশী মিসর ও সৌদি আরব। তবে কিছুতেই কাজ হয়নি।

২ আগস্ট বেলা দুইটার দিকে বিপুল পরিমাণ সেনা নিয়ে কুয়েতে হামলা শুরু করে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী। ১৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি তারা দখল করে নেয়। কিন্তু এই দখলদারত্ব সাদ্দাম ও ইরাকের করুণ পরিণতির সূচনা করেছিল।

কুয়েতে ইরাকের হামলার পর এর তীব্র নিন্দা জানায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরাক একপ্রকার একঘরে হয়ে পড়ে। হামলার চার দিন পর ৬ আগস্ট কুয়েত থেকে অবিলম্বে ও বিনা শর্তে ইরাকি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে। একই সঙ্গে বাগদাদের ওপর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

জাতিসংঘের এ আহ্বান আমলে নেয়নি ইরাক। তখন ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সেনা না সরালে ‘যেকোনো উপায়ে’ বাগদাদকে বাধ্য করার জন্য একটি প্রস্তাব পাস হয় নিরাপত্তা পরিষদে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সহায়তা পাওয়া সাদ্দাম মনে করেছিলেন, কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসন এড়িয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, ওই যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাঁর প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।

জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা না মানলে ইরাককে শায়েস্তা করার জন্য তৎপরতা শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। সৌদি আরবে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সেনা পাঠান তিনি। সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোটও গড়ে তোলেন।

তবে সাদ্দাম হোসেন একগুঁয়েমি করে ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারিতেও কুয়েতে সেনা মোতায়েন করে রাখেন। এর এক দিন পরই ১৭ জানুয়ারি ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ নামে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী। কুয়েত ও ইরাকের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হয়। ৪৩ দিন ধরে চলে এই অভিযান। শেষ ১০০ ঘণ্টা ধরে চালানো হয় স্থল হামলা। শেষ পর্যন্ত ২৭ ফেব্রুয়ারি কুয়েত থেকে পিছু হটে ইরাকি বাহিনী।

প্রায় ২৫ বছরের শাসনামলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব ছিলেন সাদ্দাম। এ জন্য আরব বিশ্বের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয়তা পান তিনি। ১৯৯১ সালের ১৮ জানুয়ারি ইসরায়েলে কয়েকটি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরাক। তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবে গিয়ে পড়ে।

জেরুজালেমের বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী মানাল মুস্তাফা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘কোনো আরব নেতা যা করতে পারেননি, সাদ্দাম হোসেন সেটা করে দেখিয়েছেন। এ জন্য আমি তাঁকে সব সময় মনে রাখব।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পোক্ত হয়

ইরাক কুয়েতে হামলার পর সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের আহ্বানে যুদ্ধের ময়দানে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ অঞ্চল ঘিরে ওয়াশিংটনেরও নিজস্ব কিছু স্বার্থ ছিল। প্রেসিডেন্ট বুশ চাচ্ছিলেন, এই সুযোগে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি গেড়ে পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করতে।

কুয়েত থেকে ইরাক পিছু হটার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ব্যবসাও রমরমা হয়েছিল। যুদ্ধের পর উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসি দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনা শুরু করে।

এ ছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইনসহ আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে মার্কিন বাহিনী। সর্বোপরি, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তপোক্ত আস্তানা গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে—এমন অজুহাত তুলে ২০০৩ সালে সাদ্দাম সরকারের বিরুদ্ধেই ইরাকে আবার হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশটি তছনছ হয়ে যায়। ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম। আত্মগোপনে চলে যান তিনি। ২০০৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর জন্মশহর তিকরিতের পাশে একটি সুড়ঙ্গ থেকে মার্কিন সেনারা সাদ্দামকে পাকড়াও করেন।

সাদ্দামকে আটক করা সেনারা জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে ছোট্ট একটি কক্ষে ছিলেন তিনি। ওই কক্ষে পাশাপাশি দুটি বিছানা পাতা ছিল। ছোট্ট একটি ফ্রিজ ছিল। তাতে ছিল কয়েক ক্যান লেমনেড, একটি হটডগের প্যাকেট আর চকলেটের একটি খোলা প্যাকেট। কক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল নতুন কেনা কয়েক পাটি জুতা।

২০০৫ সালের অক্টোবরে সাদ্দামের বিচার শুরু হয়। চলে টানা ৯ মাস। তাঁকে ১৯৮২ সালে ইরাকের দুজাইল গ্রামে শিয়া সম্প্রদায়ের ১৪৮ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়।

২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর পবিত্র ঈদুল আজহার দিন রাজধানী বাগদাদে সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সাদ্দামের মরদেহ বাগদাদের সুরক্ষিত ‘গ্রিন জোন’ এলাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসার কাছে সড়কে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে পরে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল-খাদিমি। একসময়কার প্রতাপশালী এই প্রেসিডেন্টের এমন নির্মম পরিণতির সাক্ষী হয় বিশ্ব।

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, কাউন্টার পাঞ্চ, রয়টার্স, আল-জাজিরা

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। ফাইল ছবি: এএফপি

Tuesday, July 8, 2025

ইরান এবার বড় যুদ্ধের জন্য যেভাবে প্রস্তুত হবে by মোহাম্মদ ইসলামি ও ইব্রাহিম আল-মারাশি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তাতে ১২ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার অবসান ঘটেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংঘাতে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করেছেন। একুশ শতকের স্বল্প স্থায়ী একটি যুদ্ধ হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ইরানও এই যুদ্ধে বিজয় দাবি করেছে। ১৯৮০-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষে যেমন করে ইরান বিজয় দাবি করেছিল, এবারের ঘটনাটি অনেকটাই তার সঙ্গে মিলে যায়। সেই যুদ্ধ ছিল বিশ শতকের অন্যতম দীর্ঘ প্রথাগত যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও বিজয় দাবি করেছিলেন।

দুটি ক্ষেত্রেই ইরান আক্রান্ত হয়েছে। ইরানের শাসকেরা দুটি সংঘাতকেই ‘আরোপিত যুদ্ধ’ বলে চিত্রিত করেছেন এবং দাবি করেছেন এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবুজ সংকেত’ ছিল।

দুটি ক্ষেত্রেই ইরান তাদের বিজয় ঘোষণার ক্ষেত্রে কৌশলগত ধৈর্য (সব্র-ই রাহবর্দি) প্রদর্শনের নীতি নিয়েছে। অর্থাৎ সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্যকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে ইরান।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর, ইরান অপেক্ষা করে ছিল। সময় ও পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রই ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করেছিল। এরপর ২০০৩ সালে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে আজকেও তারা সেই একই কৌশলগত ধৈর্যের নীতি প্রয়োগ করছে।

বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। কিন্তু দেশটির শাসকেরা বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামরিক মহল এটিকে একটি কৌশলগত যুদ্ধবিরতি হিসেবে দেখছেন। তাঁরা এটাকে টেকসই শান্তি হিসেবে দেখছেন না।

ইরানের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতি একটি স্পষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য বহন করছে।

ইরানের এই কৌশলগত ধৈর্যের নীতিতে সময়কে একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরান এখন সময়কে পারমাণবিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের, আঞ্চলিক জোট সম্প্রসারণের এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দৃঢ়তার সীমা পরীক্ষার উপায় হিসেবে গ্রহণ করবে।

এই সময়ে ইরানের নীতিনির্ধারকেরা তাঁদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে আবার পর্যালোচনা করবেন। বিশেষ করে নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং সাইবার অপারেশনের সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো তাঁরা আবারও মূল্যায়ন করবেন। আর এসব কিছুর লক্ষ্য হচ্ছে, একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা।

সময়, তেহরানের সামনে তিনটি জায়গায় নতুন করে চিন্তাভাবনা করার গুরুত্বপূর্ণ ফুরসত এনে দিয়েছে। প্রথমত, নেতৃত্ব পুনর্গঠন; দ্বিতীয়ত, অস্ত্রভান্ডার পূর্ণ করা এবং তৃতীয়ত, একটি আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক আক্রমণ শানানোর পরিকল্পনা।

১৯৮১ সালের জুন মাসে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির কার্যালয়ে বোমা হামলা করা হয়। এতে দলটির মহাসচিব মোহাম্মদ বেহেশতিসহ ৭৪ জন উচ্চপদস্থ কর্তা নিহত হন। ওই একই মাসে, ইরান ইরাক সীমান্তে এক লড়াইয়ে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার মোস্তাফা চামরান নিহত হন।

১৯৮১ সালের আগস্ট মাসে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ-জাভাদ বাহোনার তেহরানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বোমা হামলায় নিহত হন।

এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল মুজাহিদিন-ই-খালক নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিরোধী এই গোষ্ঠী ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলেছিল।

বোমাটি স্থাপন করেছিল মাসউদ কেশমিরি। তিনি ছিলেন মুজাহিদিন-ই-খালকের সদস্য। নিরাপত্তা কর্মকর্তার ছদ্মবেশে তিনি সরকারে অনুপ্রবেশ করেছিল। বিস্ফোরণে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় পুলিশের প্রধান, জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসহ আটজন পদস্থ কর্তা নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধের শুরুর বছরে এটি ছিল ভয়ানক একটি নাশকতা।

এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরেও ইরান পাল্টা আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানের ভূখণ্ড থেকে ইরাকের সমস্ত সেনাকে বিতাড়িত করেছিল।

গত ১৩ জুন ভোররাতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান শুরু করে।

এই হামলা শুধু পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল ইসরায়েল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার হোসেইন সালামি, এবং অ্যারোস্পেস প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ। বেশ কয়েকজন পারমাণুবিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাকেও হত্যা করেছিল ইসরায়েল।

এরপরও ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করতে সক্ষম হয়। ইসরায়েলের বহুল প্রশংসিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চরম চাপের মুখে ফেলে দেয়। এই যুদ্ধে ইরানের স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শান্তির এই নতুন পর্যায়ে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পূর্ণ করা এবং আধুনিকায়নে অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ফাত্তাহ ও খাইবার শেকানের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো আকস্মিক হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে ইরান এখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও জোরদার করবে।

সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধ থেকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে, একটি আধুনিক যুদ্ধে একটি সক্ষম ও উন্নত বিমানবাহিনী ছাড়া বিজয় অর্জন সম্ভব নয়।

যদিও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা কিছুটা কৌশলগত শক্তি দেখিয়েছে। কিন্তু এর বড় ধরনের দুর্বলতাও উন্মোচিত হয়েছে। আধুনিক বিমান ও বৈদ্যুতিন যুদ্ধের সক্ষমতা আছে, এমন শক্তির বিরুদ্ধে শুধু এই ব্যবস্থা সেভাবে কাজ করে না।

এই কৌশলগত ঘাটতি পূরণে, ইরান এখন জরুরি ভিত্তিতে রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সু-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান নেওয়ার বিষয়টিকেও ইরান এখন বিবেচনা করবে। কেননা, সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় চীনের যুদ্ধবিমান সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

এ ছাড়া ইরানের সামরিকবিদেরা আরেকটি বড় ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছেন। সেটা হলো, এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা আকাশপথে কোনো আক্রমণ হলে আগেভাগেই সতর্ক করার প্রযুক্তি না থাকা।

সবচেয়ে উন্নত ভূমিভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম ছাড়া। এ কারণে তেহরান এখন চীন বা রাশিয়া থেকে এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম সংগ্রহে অগ্রাধিকার দেবে।

এর বাইরেও ইরান এখন কূটনৈতিক ও আইনি পাল্টা আক্রমণ শাসানোর ভূমি প্রস্তুত করবে।

- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

* মোহাম্মদ ইসলামি, পর্তুগালের মিনহো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
* ইব্রাহিম আল-মারাশি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি সান মারকোসের মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক।

ইরানের  রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছে। ২০১৮ সালে রয়টার্সের তোলা ছবি
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছে। ২০১৮ সালে রয়টার্সের তোলা ছবি

Thursday, June 19, 2025

ইরাকের সেই সাজানো গল্প এবার ইরানেও by উমর সোলায়মান

বিশ্ব এই সাজানো চিত্রনাট্য আগেও দেখেছে। এখানে অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি হচ্ছে—এ রকম একটা বয়ান তৈরি করা হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো সম্মিলিতভাবে এটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। রাজনীতিবিদেরা রণবাদ্য বাজায়, নিরাপত্তার কথা বলে আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়।

আগেরবার ছিল ইরাক। আর এবারে ইরান।

কিন্তু দৃশ্যপটে স্পষ্ট করে ভেসে থাকা একটা জ্বাজল্যমান সত্য সবাই দেখেও দেখছে না। ইসরায়েলের কাছে পারমানবিক অস্ত্র আছে, অথচ কেউ তাদের জবাবদিহি করছে না।

এবার আসুন বাস্তবতাগুলো স্পষ্ট করে বলা যাক—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্যরাষ্ট্র। তারা আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) অনুমতি দিয়েছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সব সময় নজরদারির মধ্যে থাকে। শুধু সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতার অভিযোগেই ইরানের ওপর বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি। ইসরায়েল কখনো আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়্যারহেড রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রে শক্তিধর দেশ ইসরায়েল। দীঘদিন ধরেই তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রাণঘাতী কৌশল অবলম্বন করে আসছে। তারা ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে আসছে।

বিস্ময়কর ভণ্ডামি

এই মুহূর্তে ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্ত চলছে। এটা কোনো তত্ত্ব কিংবা জল্পনা নয়, এখনো সেটা চলমান।

গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। শিশুদের দেহ খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে। গোটা পরিবার ধরে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। গোটা পাড়া পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর এসব ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে রাষ্ট্র দায়ী, পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত সেই রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রকে নজরদারির মধ্যে আনার দাবি জানাচ্ছে।

এ ঘটনা আমাদের সেই তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ সম্পর্কে কী ধারণা দেয়?

এটি আমাদের বলে, নিয়মকানুন শুধু দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য। এটি আমাদের বলে, কিছুর রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে যেকোনো কিছু করতে পারে। এ কাজে সেই রাষ্ট্রগুলো ভূরাজনৈতিক জোটের প্রশ্রয় পায়, তাদের মদদদাতারা নীরব থাকে।

এটি আরও বলে, যেসব সংবাদমাধ্যমে ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একসময় দাবি করেছিল, ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে (যা পরে চরমভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল), সেসব সংবাদমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠান এখনো সবচেয়ে অনিবার্য প্রশ্নগুলো তুলতে ব্যর্থতা দেখাচ্ছে।

ইরানের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, সেটা কেন ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না?

একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন। কেন সেই দেশ জরুরি বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু নয়?

ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আছে, সেটা আতঙ্কের বিষয় নয়, অথচ ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে—এমনটা কল্পনা করে আমরা কেন আতঙ্কিত হচ্ছি?

এই দ্বিচারিতা বিস্ময়কর। বাকি বিশ্বের মানুষেরা এটা ভালো করেই বুঝে ফেলেছে।

ইরাকের চিত্রনাট্য

বৈশ্বিক দক্ষিণ এই ভণ্ডামি দেখছে। মুসলিমরাও এটা দেখছে। আর ফিলিস্তিনের জনগণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি প্রতিদিন ভোগ করছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকেরা তাদের নেতাদের এই দ্বিচারিতা সম্পর্কে ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের নৈতিক কর্তৃত্ব ক্রমে ধ্বংস হচ্ছে।

এটি ইরানের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ধারাবাহিক ও বিপজ্জনক অবক্ষয়ের বিষয়।

যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সত্যিই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সব পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্রের কোনো স্বচ্ছতা নেই, যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা উসকে দেয়।

ইসরায়েল যদি এভাবে তাদের সহিংসতা ও পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের জন্য প্রশ্নহীন সমর্থন পেতেই থাকে, তাহলে এনপিটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। আইএইএ নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর ভবিষ্যতে তারা যে ‘রেড লাইন’ বা বিপদের সীমারেখা টেনে দেবে, সেটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই হবে না।

বিশ্বের যেকোনো নৈতিকতাবোধসম্পন মানুষ স্পষ্টভাবে বলতেই পারে, ইসরায়েলকে শুধু গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য নয়, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের জন্যও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

মিথ্যা অজুহাত কারও ক্ষেত্রে নিয়মের দোহাই, আর কারও ক্ষেত্রে দায়মুক্তি—এই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান থেকে বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া আমরা সহ্য করতে পারি না।

ইরাকে ব্যবহার করা সেই পুরোনো চিত্রনাট্য বহু আগেই বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি যদি আবার ফিরিয়ে আনা হয়, তবে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।

এই দ্বিচারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনো চরমপন্থা নয়; বরং এটি উপেক্ষা করাটাই সাধারণ নিয়মে পরিণত করা ঠিক নয়।

* উমর সোলায়মান, ইয়াকিন ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের কফিন নিয়ে তেহরানে শোকমিছিল।
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের কফিন নিয়ে তেহরানে শোক মিছিল। ছবি: এএফপি

Friday, January 31, 2025

মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো যুবককে গুলি করে হত্যা সুইডেনে

সুইডেনে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো যুবক সালওয়ান মোমিকা’কে (৩৮) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থে আগুন দিয়ে সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভে উস্কানি দিয়েছিল সে। তার কর্মকাণ্ডে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ইরাকের সঙ্গে সুইডেনের কূটনৈতিক সম্পর্কে দেখা দেয় উত্তেজনা। এক পর্যায়ে বাগদাদ থেকে বহিষ্কার করা হয় সুইডেনের রাষ্ট্রদূতকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যায় স্টকহোমের সোদারটালজে’তে একটি এপার্টমেন্টে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৩ সালে স্কটহোম সেন্ট্রাল মসজিদের বাইরে মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থে অগ্নিসংযোগ করে মোমিকা। এর ফলে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা।

পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, তাকে হত্যার পর বুধবার রাতভর অভিযান চালিয়ে সন্দেহজনকভাবে ৫ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। উল্লেখ্য, সালওয়ান মোমিকা একজন ইরাকি। সে বসবাস করে সুইডেনে। তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে চারটি ঘটনায় একটি জাতিগত গ্রুপের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেয়। এ কারণে অন্য একজনের সঙ্গে অভিযুক্ত হয় সে। এই ঘটনার রায় দেয়ার কথা আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু স্টকহোম ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট বলেছে, দুই আসামীর মধ্যে একজন নিহত হওয়ার ফলে রায় ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে। বিবিসি লিখেছে, সালওয়ান মোমিকা ইসলামবিরোধী ধারাবাহিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। এতে বহু মুসলিমের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিক্ষোভ। বাগদাদে সুইডিশ দূতাবাসে দু’বার প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরাকের সঙ্গে সুইডেনের কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ফলে বাগদাদ থেকে বহিষ্কার করা হয় সুইডিশ রাষ্ট্রদূতকে।

এখানে উল্লেখ্য, যে প্রতিবাদ বিক্ষোভে সালওয়ান মোমিকা মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থে অগ্নিসংযোগ করেছে, তার অনুমতি দিয়েছিল সুইডিশ সরকার। তাদের দাবি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক আইন অনুযায়ী এই অনুমতি দেয়া হয়েছিল। পরে তারা কোনো ধর্মীয় পুস্তক পোড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিবাদবিক্ষোভের বিষয়ে আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

mzamin

Saturday, December 7, 2024

সিরিয়া সীমান্তে সেনা জড়ো করল ইরাক, অনুমতি পেলেই হামলা

প্রতিবেশী দেশে বিদ্রোহীদের হানায় ইরাকি কর্মকর্তাদের মনেও শঙ্কা জেগেছে। হায়াত তাহরির আল শামের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীদের আটকাতে পারছে না সিরিয়ার সামরিক বাহিনী। একের পর এক শহরের দখলে নিচ্ছে তারা। রাশিয়া এবং সিরিয়ান বিমানবাহিনীর যৌথ প্রতিরোধও টিকেনি বিদ্রোহীদের গতি এবং সংকল্পের সামনে।

সিরীয় সেনারা প্রতিরোধ তো দূরের কথা, অনেকটা প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে বলা যায়। সিরিয়ায় অবস্থানরত রুশ সেনারাও তেমন কিছু করতে পারছে না। এরই মধ্যে আলোপ্পো ও হামা শহর দখল নিয়ে এবার ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হোমস শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিদ্রোহীরা ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, যে কোনো সময় পতন ঘটতে পারে হোমস শহরেরও। এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত তা বুঝতে পাচ্ছে না রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক বা ইরাক। তবে প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ইরাকি কর্মকর্তারা বেশি ভয়ে আছেন। বিশেষ করে, বিদ্রোহীদের নজর সিরিয়ার পর, ইরাকের দিকেও পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরাক।

ধারণা করা হচ্ছে, সিরিয়ায় সেনা পাঠিয়ে অভিযান চালাতে পারে ইরাক। অবশ্য এ নিয়ে ইরাকি কর্মকর্তাদের মধ্যে দোটানা শুরু হয়েছে। সুন্নি বিদ্রোহীদের এই জোটের সঙ্গে আল কায়েদার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শিয়া-অধ্যুষিত ইরাক ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।

বিশেষ করে ২০০৩ সালে সিরিয়াভিত্তিক সুন্নি যোদ্ধারা ইরাক ঢুকে রীতিমতো তাণ্ডব চালায়। তখন মার্কিন অভিযানে সাদ্দাম সরকারের পতন হলে ইরাক পুরোপুরি অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। আর এই অরাজকতার পেছনে রয়েছে সুন্নি যোদ্ধারা। মার্কিন হামলার ১০ বছর পর ২০১৩ সালে দায়েশের সঙ্গে মিলে সুন্নি যোদ্ধারা ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। এবারও তেমন কিছু ঘটতে পারে এমন বিশ্বাস ইরাকের শাসকগোষ্ঠীর। যদিও সিরিয়ার বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের।

তবে বিদ্রোহীদের এমন আশ্বাসে বিশ্বাস নেই ইরাকি কর্মকর্তাদের। তাই সিরিয়া সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে তারা। পাশাপাশি পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের হাজার হাজার যোদ্ধাদের জড়ো করেছে তারা। এই গ্রুপটি এর আগে সিরিয়ার যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।

ইরাকের আপাতত লক্ষ্য নিজেদের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমানার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সমীকরণ যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে। যদি হোমস শহর বা আসাদের পতন ঘটে এমনকি শিয়াদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তাহলে সিরিয়ায় ঢুকে পড়বে ইরাকি বাহিনী।

ইরাক সরকার বলছে, তারা সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ইরাক হচ্ছে বাগদাদের জন্য লাল রেখা। এরই মধ্যে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শত শত ইরাকি যোদ্ধা সিরিয়া ঢুকে পড়েছে। তারা ইরাকি ও দেশটিতে থাকা লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে আসাদ বাহিনীর হয়ে লড়বে।

কিন্তু ইরাক থেকে এখনও গণহারে যোদ্ধাদের প্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানিও আঞ্চলিক এই সংঘাতের চক্রে পড়তে চাইছেন না বলে মনে করা হচ্ছে।

সীমান্ত এলাকায় ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা। ছবি : সংগৃহীত
সীমান্ত এলাকায় ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা। ছবি : সংগৃহীত



Wednesday, November 13, 2024

আবু ঘ্রাইব কারাগারে নির্যাতন: ৩ ইরাকিকে ৪৪ মিলিয়ন ডলার দেয়ার রায় মার্কিন ফেডারেল জুরির

ইরাকের কুখ্যাত আবু ঘ্রাইব কারাগারে নির্যাতিত তিন ইরাকি বিচারে জয় পেয়েছেন। মার্কিন ফেডারেল জুরি তাদেরকে চার কোটি  ২০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিষয়ক এক কন্ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে এই রায় দিয়েছে জুরি। অনলাইন আল জাজিরা এ খবর দিয়ে বলেছে, ১৫ বছর ধরে চলা এই মামলার শেষ হলো অবশেষে মঙ্গলবার। এদিন ভার্জিনিয়াভিত্তিক কন্ট্রাক্টর সিএআিই’র বিরুদ্ধে ওই রায় হয়। ওই কারাগারে এই সংস্থার বেসামরিক নাগরিকরা কাজ করার দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে সাধারণ ইরাকিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তাদেরকে নগ্ন করে উল্লাস করা হয়। যৌন নির্যাতন করা হয়। প্রহার করা হয়। সবাইকে নগ্ন করে একজনের ওপর আরেকজন, তার ওপর আরেকজন- এভাবে স্তূপ করা হয়। এ ছবি প্রকাশ পেলে সারাবিশ্বে তোলপাড় হয়। এ ঘটনাই আবু ঘ্রাইব কারাগারকে কুখ্যাত করে তোলে। জুরি যাদের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওই অর্থ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে তারা হলেন সুহেইল আল শিমারি, সালাহ আল ইজাইলি এবং আসাদ আল জুবেই। প্রতিজনকে ৩০ লাখ ডলার করে ক্ষতিপূরণ এবং তাদের ক্ষতি করার শাস্তি হিসেবে প্রতিজনকে এক কোটি দশ লাখ ডলার করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে জুরি। মে মাসে আলাদাভাবে ফেডারেল এক বিচার শেষ হয় জুরিদের ঝুলন্ত সিদ্ধান্তে।

উল্লেখ্য, নির্যাতিত আল শিমারি ইরাকের মাধ্যমিক একটি স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। আল ইজাইলি একজন সাংবাদিক এবং আল জুবেই একজন ফল বিক্রেতা। তাদের ওপর যেসব নির্যাতন চালানো হয়েছে এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।  তারা বলেছেন, সিএসিআই-এর জিজ্ঞাসাবাদকারীরা নিজেরা নির্যাতন চালায়নি। তবে তারা জড়িত। কারণ, তারা যাদেরকে দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করিয়েছে তারা তাদেরই লোক। যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত দু’জন জেনারেলের কাছ থেকে পাওয়া রিপোর্টকে এক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তারা ওই নির্যাতনের দৃশ্য প্রামাণ্য আকারে ধারণ করেছিলেন। তাতে দেখা যায়, ওইসব নির্যাতনে জড়িত সিএসিআই-এর অনেক জিজ্ঞাসাবাদকারী। বেশির ভাগ নির্যাতন সংঘটিত হয় ২০০৩ সালে। ওই সময় জেলখানার ভিতরে কাজ করছিলেন সিএসিআই-এর কর্মচারীরা।

mzamin


ইরাকে বিবাহ আইন সংশোধন: মেয়েদের বিয়ের বৈধ বয়স কমিয়ে ৯ বছর করার পরিকল্পনা

ইরাক একটি নতুন আইন পাস করার দ্বারপ্রান্তে। যার মাধ্যমে পুরুষরা ৯ বছর বয়সী মেয়েদেরও এবার থেকে বিয়ে করতে পারবে। শিয়া রক্ষণশীল অধ্যুষিত ইরাকের পার্লামেন্টে একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেছে ‘ব্যক্তিগত মর্যাদা  আইন’ বা ‘personal status law’ । যা তালেবানের  নীতির মতো নারীর অধিকারে একটি বড় ধাক্কার কারণ হতে পারে। সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই আইনটি নারীদের সমস্ত সিদ্ধান্ত থেকে বঞ্চিত করবে। রায়া ফাইক, যিনি ইরাকি প্রতিনিধিদের সাথে বিলটিকে চ্যালেঞ্জ করছেন, বলেছেন যে এই আইন অল্পবয়সী মেয়েদের সময়ের আগেই বিয়ে করার অনুমতি দেবে এবং প্রায় সমস্ত পারিবারিক সিদ্ধান্ত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের  হাতে হস্তান্তর করার ক্ষমতা দেবে। দ্য গার্ডিয়ানকে রায়া বলেন, ‘এই আইন দেশের মেয়েদের কাছে একটি বিপর্যয়। কয়েক দশকের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ফলে শিয়া মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা আধিপত্য একটি সরকার হয়েছে, যা আগে দুবার ব্যক্তিগত মর্যাদা আইন সংশোধন করার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে পার্লামেন্টে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, ফাইক এবং ২৫ জন নারী প্রতিনিধিরা এই বিলটি রোখার চেষ্টা করছেন।একজন ইরাকি প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দুর্ভাগ্যবশত, পুরুষ এমপিরা এই আইনকে সমর্থন করেছেন।  তারা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন নাবালিকাকে বিয়ে করলে সমস্যা কী?' তাদের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত  সংকীর্ণ।

একবার আইনটি পাস হলে, নারীদের বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের হেফাজত এবং উত্তরাধিকারের অধিকার সংক্রান্ত আইনেও বদল আসবে বলে মনে করেন তিনি। শিয়া কোয়ালিশন ক্রমাগত যুক্তি দিয়েছে যে আইনটির লক্ষ্য মেয়েদের  ‘অনৈতিক সম্পর্ক’ থেকে রক্ষা করা। আইনের বিরোধীরা এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি দেশে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা হিসাবে বিলটির  নিন্দা করেছে। তারা  যুক্তি দিয়েছেন যে, এই বিলটি অল্পবয়সী মেয়েদের যৌন ও শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করবে। যদিও ১৯৫০-এর দশক থেকে  বাল্যবিবাহ দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ছিল, ২০২৩ সালের জাতিসংঘের জরিপে দেখা গেছে যে ইরাকে প্রায় ২৮ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর হওয়ার আগেই।

সূত্র :  টাইমস অফ ইন্ডিয়া

mzamin

Tuesday, September 10, 2024

আরেক দেশ ছাড়ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী

আরও এক দেশ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশটির মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গেও চূড়ান্ত আলোচনা শেষ করেছে ওয়াশিংটন।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দখলদার বাহিনী হিসেবে আরও একটি দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশক পর এবার ইরাক ছাড়তে হচ্ছে মার্কিন বাহিনীকে। এই দীর্ঘ সময় একটুও শান্তিতে থাকতে পারেনি তারা। ইরানের প্রক্সিদের একের পর এক হামলায় তটস্থ ছিল মার্কিন বাহিনী। অস্থির ইরাকও তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল মরণফাঁদ। তাই ইরাক ছাড়ার সব কিছু চূড়ান্ত করে ফেলেছে মার্কিন বাহিনী।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, আলোচনা চূড়ান্ত হলেও ওয়াশিংটন ও বাগদাদের নেতাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, কখন সেই ঘোষণা দেওয়া হবে, এখন সেটাই প্রশ্ন। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ইরাক ছাড়বে কয়েক শ’ মার্কিন সেনা। বাকিরা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইরাকের মাটি ছেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে অনেক সমালোচক খুশি হয়েছে।

তবে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের কপালে। তাদের উদ্বেগ, এতে করে ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বাড়বে। ইরাকে থাকা প্রায় আড়াই হাজার সেনার ভাগ্য নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। তবে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের কারণে চলমান উত্তেজনায় এই আলোচনার গতি কিছুটা ধীর ছিল। গেল ৭ অক্টোবর থেকে ইরাকে মার্কিন বাহিনী অন্তত ৭০ বার হামলার শিকার হয়েছে।

ইরাকে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাগদাদের অস্বস্তি ছিল। দেশটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি সাম্প্রতিক মাসগুলো বেশ সরব হয়েছেন। ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী চলে গেলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ইরান। দীর্ঘদিন ধরেই ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী উৎখাতে নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছিল তেহরান। এবার সফল হতে যাচ্ছে দেশটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে এই অঞ্চল ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। শক্তিশালী দেশগুলো নিজের স্বার্থে ইরাকে হামলা চালাতে পারে। যার সাম্প্রতিক নজির, গেল সোমবার ইরাকে তুরস্কের হামলা। এ ছাড়া ইরান আরও বেশি শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি অধ্যুষিত ইরাকে প্রভাব বাড়বে ইরানের। 

মার্কিন সেনাবাহিনী। ছবি : সংগৃহীত

Wednesday, September 22, 2021

ইরাক-ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের ৮ বছরের নৃশংস যে লড়াইতে কেউ জেতেনি

ইরাক-ইরান যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৮০ সালে। সেপ্টেম্বরের একদিনে সাদ্দাম হোসেন ইরানে সৈন্য পাঠালেন। তারপর সেই লড়াই বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটিতে রূপ নেয়।
যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে বড় ধরণের সাফল্য পেয়ে যায় ইরাক। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর খোররামশা দখল করে নেয় ইরাক।
"প্রথম ক'সপ্তাহে ইরাকিরা কোনো প্রতিরোধের মুখেই পড়েনি। তারা ইরানের অনেক জায়গা দখল করে নেয়। ইরাকের সবাই তখন ভেবেছিল সাদ্দাম হোসেন যুদ্ধে জিতে গেছেন। সাদ্দাম হোসেন টিভিতে একদিন বললেন, ছয় দিনে তিনি যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন।"
যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিবিসিকে বলছিলেন, ইরাকি চিকিৎসক ও কবি আহমেদ আল-মুশতাত যাকে যুদ্ধের শেষ দিকে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল। দক্ষিণে বসরা এবং পরে উত্তর আল-হাফজার রণাঙ্গনে পাঠানো হয়েছিল তাকে।
ইরানের সৈন্যরা বসরার কাছে একটি যুদ্ধে বিজয় উদযাপন করছে (২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৭)
১৯৮০ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয় আহমেদ আল-মুশতাতের বয়স ছিল ১৮। বাগদাদে তিনি তখন একজন মেডিকেল ছাত্র ছিলেন।
আট বছর পর যখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ যখন শেষ হয়েছিল তিনি তখন ২৬ বছরের যুবক।
"আমি মেডিকেল স্কুল শেষ করলাম । এক বছর হাসপাতালে কাজ করলাম। তারপর চলে গেলাম যুদ্ধে।"
তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, একটা সময় যুদ্ধে না গিয়ে উপায় থাকবে না।
"ঐ সময় শুধু আমি নই - প্রতিটি ইরাকির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যুদ্ধ দ্বারা প্রভাবিত হতো। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর। হঠাৎ একদিন শুনলেন আপনার প্রতিবেশীর ছেলে রণাঙ্গনে মারা গেছে। আমি আমার অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। পরিবারের অনেক সদস্য হারিয়েছি। জঘন্য সময় ছিল সেটা।"
'"আমি লেখালেখি করতাম। কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিছু লেখা সম্ভবই ছিলনা। নিরাপত্তা গোয়েন্দারা সর্বক্ষণ সবার ওপর কড়া নজর রাখতো।"

জবরদস্তি করে রণাঙ্গনে

যুদ্ধ শুরুর সাত বছর পর আহমেদ চিঠি পেলেন তাকে সেনাবাহিনীর মেডিকেল ইউনিটে যোগ দিতে হবে।
"এরকম একটি চিঠি একদিন আসবে আমি ধরেই নিয়েছিলাম, কিন্তু আমি চাইনি তা আসুক। কারণ ঐ সময় রণাঙ্গনে গিয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল ৯০ ভাগ। কিন্তু নিয়তি অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না, কারণ আপনি ঐ নির্দেশ অবজ্ঞা করতে পারতেন না। পালানোর কোনো উপায় ছিলনা। পালালেই আপনাকে ধরা পড়তে হবে, আপনাকে না পেলেও আপনার পরিবারকে তারা রেহাই দেবেনা।
দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে ইরানের সৈন্যদের কাছ থেকে একটি জায়গা পুনর্দখলের পর ইরাকি সৈন্যদের বিজয় উদযাপন, ২০ এপ্রিল, ১৯৮৮
খুঁজে না পেলে কি হতে পারতো?
"সোজা মেরে ফেলতো। আত্মরক্ষার, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই ছিলনা।"
১৯৮৭ সাল নাগাদ যুদ্ধে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। কোনো পক্ষই বলতে পারছিল না তারাই সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ তার মধ্যে মারা গেছে। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেহারা

এত সৈন্য মারা গিয়েছিল যে এক পর্যায়ে দুটি দেশই জোর করে তরুণ যুবকদের ধরে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিচ্ছিল।
যুদ্ধের চেহারা নিয়েছিল অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো - কাঁটাতার, মাইন আর ট্রেঞ্চে ভরা রণাঙ্গন। সব সময় মাস্টার্ড গ্যাস হামলার ভয়।

বসরার মরুতে ৫০ হাজার মৃতদেহ

ইরাকের তেল সমৃদ্ধ বসরার দখল নিয়ে লড়াইতে ১০ হাজার ইরাকির মৃত্যু হয়। অন্যদিকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার মরুতে ৫০ হাজার ইরানির মৃতদেহ পচছিল।
খোমেনির ছবিতে লাথি মারছে ইরাকি সৈন্যরা
ইরাকিদের শক্ত অবস্থানের ওপর ইরানি তরুণ স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা ঢেউয়ের মতো একের পর এক হামলা চালিয়েছিল।
আয়াতোল্লাহ খোমেনির ডাকে শহীদ হওয়ার উন্মাদনা নিয়ে ইরাকি মেশিনগান উপেক্ষা করে মাইন-ভর্তি এলাকা পেরিয়ে দলে দলে তারা ইরাকি অবস্থানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।
আহমেদ তখন বসরার কাছেই একটি ইরাকি ব্রিগেডের সাথে ছিলেন।
"আমাকে বসরার কাছে আমরা নামে একটি জায়গায় একটি ব্রিগেডের সাথে যুক্ত করা হলো। সে বছর যুদ্ধে তখন তুঙ্গে। আমি যখন প্রথমবার আমার ইউনিটের কাছে যাচ্ছিলাম, গোলার শব্দ ততই জোরালো হচ্ছিল। সেইসাথে আমার হৃৎপিণ্ডের গতিও বাড়ছিল।"
ইউনিটে মোট আটজন পুরুষ নার্স ছিল, ইরাকের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা। উত্তরের কুর্দি এলাকা থেকে কুর্দি, সুন্নি, শিয়া।
"সবই আমার খেয়াল রাখছিল, কারণ আমার কোনো সামরিক অভিজ্ঞতাই ছিলনা। সুতরাং তারা আমাকে শেখাতো কীভাবে মাইনফিল্ড এড়িয়ে চলতে হবে, কিভাবে বোমা থেকে বাঁচতে হবে। রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা কিভাবে বুঝতে হবে, কী করতে হবে। খুব ভালো ছিল তারা।"
"ঐ দিনগুলোর কথা আমি সবসময় মনে পড়ে। অনেক সময় স্বপ্নেও দেখি।"
১৯৮৮ সাল নাগাদ দুই দেশই ক্লান্ত হয়ে পড়লো। শেষের দিকে যুদ্ধ ইরাকের উত্তরের সীমান্তে জোরদার হলো। আহমেদের ব্যাটালিয়ানকে সেখানে পাঠানো হলো। যদিও ইরান তখন জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজী হয়েছিল, তারপরও উত্তর সীমান্তে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিলো।
আহবাজ বন্দী শিবিরে ইরাকি যুদ্ধবন্দীদের ওপর নজর রাখছে ইরানের একজন সৈন্য, ২২ জানুয়ারি, ১৯৮৭
"তিন দিনে আমরা প্রায় দেড় হাজার সৈন্য হারাই। রক্তে ভেজা আহত সৈন্যরা যন্ত্রণায় চিৎকার করতো। ভয়ানক দৃশ্য সব। আমরা যতটুকু পারতাম করতাম। এখনও সেই বারুদ মেশানো ধোঁয়ার গন্ধ পাই আমি।"

প্রাণে বাঁচতে সৈন্যদের আকুতি

যুদ্ধ হচ্ছিল হালাপজা শহরের কাছে ছোটো একটি পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ইরানী বাহিনীর হামলার মুখে তিনদিন পর ইরাকি বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছিল।
এরপর ব্রিগেড কমান্ডার আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, তিনি সৈন্যদের লড়াই থেকে পালাতে সাহায্য করেছেন - কারণ অল্প জখম সৈন্যদের তিনি ফিল্ড হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
"তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্যই আমরা এই লড়াইতে হেরে গেলাম। আমি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম তিনি কারো ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছিলেন।"
আহমেদ ভয় পেয়েছিলেন, তাকে হয়ত কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্ত অন্য ক'জন অফিসারের হস্তক্ষেপে তিনি রক্ষা পান।
কিন্তু কমান্ডারের অভিযোগ কি সত্যি ছিল? তিনি কি সত্যিই রণাঙ্গন থেকে সরতে সৈন্যদের সাহায্য করেছিলেন?
এই প্রশ্নে একটু মৃদু হেসে আহমেদ বলেন, "আমি সবাইকে রক্ষা করতে চাইছিলাম। তারা আমার চোখের দিকে এমনভাবে তাকাতো যেন বলতো 'প্লিজ আমাকে আর যুদ্ধ করতে পাঠিও না।' আমি এখনও অনেক সৈন্যের নাম মনে করতে পারি। আমি মনে করতে পারি তারা আমার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ ছিল। তাদের জীবন বেঁচেছিল।
রামাদির কাছে এক ইরাকি বন্দী শিবিরে ইরানী যুদ্ধবন্দী, এপ্রিল, ১৯৮৫
কম-বেশি ১০ লাখ ইরাকির মৃত্যু হয়েছিল আট বছর ধরে চলা ঐ যুদ্ধে।
যদিও এই যুদ্ধ নিয়ে বাইরের বিশ্বে তত বেশি কথা হয়নি, কিন্তু আহমেদের মতো ঐ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, যারা যুদ্ধ করেছে এবং বেঁচে গেছে, তারা কখনো ভোলেননা।
"এখনো বহু সৈন্যর মুখ আমার মনে আছে। লড়াইতে যাওয়ার আগে তারা বিদায় জানিয়ে যেত। তারাও বুঝতো, আমিও জানতাম তারা হয়তো ফিরবে না। আমি সব মুখগুলো মনে করতে পারি।
১৯৮৮ সালের ২০ অগাস্ট ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হয়। দু'বছর পর ইরাক আরেকটি যুদ্ধ শুরু করে, কুয়েতে সৈন্য পাঠিয়ে।
আহমেদ অবশ্য সেই যুদ্ধে যাননি। ১৯৯৪ সালে তিনি ইরাক ছেড়ে যান। এখনও তিনি ডাক্তার। একইসাথে তিনি একজন কবি। কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

Sunday, August 2, 2020

ইতিহাসের সাক্ষী: ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যখন কুয়েত দখল করে নিয়েছিল

১৯৯০ সালের ২ আগস্ট। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশি কুয়েতে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে দেশটি দখল করে নিলেন।
কুয়েতের মানুষ হতভম্ব। চারিদিকে বিভ্রান্তি। কুয়েতের সরকারি রেডিও তখনও চালু। সেখান থেকে বাইরের দুনিয়ার সাহায্য চেয়ে আবেদন জানানো হলো।
সামি আল-আলাউইর বয়স তখন মাত্র বিশ বছর। তার বাবা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন।
"আমার বাবা আমাকে যা বললেন, তা শুনে আমি অবাক। তিনি আমাকে বললেন, সামি, ওঠো, তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হও। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দাও। সেনা সদর দফতরে যাও, দেখো কীভাবে সাহায্য করতে পারো।"
সামি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে তার গাড়িতে উঠলেন। কিন্তু কুয়েত সিটির যে অংশে তিনি থাকেন, সেটা ততক্ষণে ইরাকি বাহিনীর দখলে চলে গেছে।
"পুরোপুরি যুদ্ধসাজে সজ্জিত সৈন্যরা ততক্ষণে রাস্তা দখল করে নিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম এরা হয়তো কুয়েতি সেনা। একজন সৈন্য আমার দিকে বন্দুক তাক করলো। তখন আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। সৈন্যটি আমার গালে একটা চড় মারলো।"
যুদ্ধ শেষে কুয়েত সিটির বাইরে পরাজিত ইরাকি বাহিনীর বিধ্বস্ত ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যান।
"আমাকে সে বলছিল, তুমি কি আমাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছো? আমি বললাম, ভাই, আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। কী হচ্ছে দেশে?"
"আসলে ও ছিল একজন ইরাকি সৈন্য। সে বুঝতে পারলো, আমি আসলে নার্ভাস। আমাকে সে বললো, তোমার গাড়িতে উঠে এক্ষুনি এখান থেকে ভাগো। নইলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।"
ইরাক এবং কুয়েতের মধ্যে বহু বছর ধরে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ চলছিল। দুটি দেশই তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল। ইরাকের অভিযোগ ছিল, কুয়েত অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ধস নামাচ্ছে।
দুদেশের সম্পর্কে আরও সমস্যা তৈরি করে ১৪০০ কোটি ডলারের এক ঋণ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইরাক এই অর্থ ধার করেছিল কুয়েতের কাছ থেকে।
কিন্তু বহু বছরের যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইরাক এই ঋণ শোধ করতে পারছিল না। সাদ্দাম হোসেন চাইছিলেন, কুয়েত এই ঋণ মওকুফ করুক। কিন্তু কুয়েত তাতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর পরিস্থিতি মারাত্মক দিকে মোড় নিল।
এক রাতের মধ্যেই ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতে অভিযান চালিয়ে সরকারকে উৎখাত করলো। ইরাকি সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য ট্যাংক নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে রাজধানী কুয়েত সিটিতে পৌঁছে গেল।
আত্মসমর্পনের পর মরুভূমিতে ইরাকী সৈন্যদের পাহারা দিচ্ছে জোট বাহিনীর সৈন্যরা।
তখন কুয়েতের মোট জনসংখ্যা মাত্র ২১ লাখ। বেশিরভাগ বিদেশি সাথে সাথেই কুয়েত ছেড়ে চলে গেলেন। আর কুয়েতের নাগরিকদেরও দুই-তৃতীয়াংশ হয় দেশ ছেড়ে পালালেন, বা বিদেশে আটকে পড়লেন।
যারা কুয়েতে রয়ে গেলেন, তারা নানাভাবে ইরাকি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন।
সামি এবং তার বাবা বেসামরিক মানুষ থেকে রাতারাতি হয়ে গেলেন প্রতিরোধ যোদ্ধা। তারা অস্ত্র এবং গোলাবারুদ সংগ্রহ শুরু করলেন, যোগ দিলেন প্রতিরোধ বাহিনীতে।
"আগষ্ট মাসে আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরী ছিল নিজেদের জন্য একটা জায়গা খুঁজে বের করা - যেখান থেকে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারি, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতে পারি। ইরাকিরা তখনো আমাদের দেশ ঠিকমত জানে না, চেনে না। অন্তত আমাদের মতো অত ভালোভাবে নয়। কাজেই আমরা যত পারি অস্ত্র সংগ্রহ করলাম, তারপর আত্মগোপনে চলে গেলাম।"
ইরাকিরা কুয়েতে তাদের নিয়ন্ত্রণ যত কঠোর করে আনতে থাকলো, প্রতিরোধ যুদ্ধ তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলো।
অক্টোবর মাসে সামি এবং তার চাচা ধরা পড়লেন। তাদেরকে ইরাকের বসরা নগরীর এক জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। পথে তাদের এক জায়গায় থামানো হলো।
"আমাদের পিঠমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো। তারপর বাস থেকে নামিয়ে লাইন বেঁধে দাঁড় করানো হলো। সৈন্যরা তাদের বন্দুকে গুলি ভরছিল, আমরা তার শব্দ পাচ্ছিলাম। এরপর গুলি চালানোর শব্দ পেলাম। তখন আমার মনে হলো, আমার সামনের জনকে বোধহয় গুলি করা হয়েছে, এরপর হয়তো আমার পালা।"
কুয়েত মুক্ত হওয়ার পর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের উল্লাস
"আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন একটা বুলেট এসে আমাকে আঘাত করবে, তারপর আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়বো। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই শুনলাম ইরাকিরা হাসাহাসি করছে। ওরা আসলে ভান করছিল যে আমাদের ওরা গুলি করে মারছে। কিন্তু এরপর ওরা আমাদের আবার বাসে তুললো।"
১৯৯০ সালে ডিসেম্বরের শেষে সামিকে মুক্তি দেয়া হলো। কিন্তু ছাড়া পেয়েই আবার কুয়েতে ফিরে প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দিলেন তিনি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইরাক বিরোধী এক সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ইরাকের দখল থেকে কুয়েতকে মুক্ত করা।
১৭ জানুয়ারি, ১৯৯১। শুরু হলো 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম।'
আন্তর্জাতিক জোট বাহিনী কুয়েতে ঢুকলো ২৪শে ফেব্রুয়ারি। তখন ভোর পাঁচটা, চারিদিকে গোলাগুলি, বিস্ফোরণের শব্দ।
সামির মনে হলো কুয়েত এবার মুক্ত হতে চলেছে, নিজের দেশ এবার তারা ফিরে পাবেন।
"এক একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলাম খুশিতে। আমাদের লক্ষ্য সফল হতে চলেছে।"
কিন্তু না, এরমধ্যেই ঘটে গেল অন্যরকম এক ঘটনা, যা হিসেবের মধ্যে ছিল না।
সামির বাবা হাদি আল-আলাউই একটি প্রতিরোধ সেলের নেতৃত্বে ছিলেন। এর নাম ছিল 'মাসিলা সেল।'
কুয়েত সিটির দক্ষিণে এক বাড়িতে ছিল এই সেলটির ঘাঁটি। আন্তর্জাতিক জোট বাহিনী তখনো কুয়েত সিটিতে পৌঁছেনি। ইরাকি বাহিনী তখন এ্ই জায়গায় এসে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করলো।
বাড়ির ভেতরে তখন সামি এবং তার বাবা। তাদের সঙ্গে ছিল আরও ১৭ জন তরুণ। ইরাকি সৈন্যরা যখন দরোজায়, তখন তাদের বাধা দিতে এক তরুণ গুলি ছুঁড়লো। ইরাকি সৈন্যরা পাল্টা গুলি ছুঁড়লো।
কিন্তু দুপক্ষের এই গোলাগুলি ব্যাপক লড়াইয়ে রূপ নিল। ইরাকীরা আরও সৈন্য নিয়ে আসলো। ট্যাংক নিয়ে এলো।
"খুবই ভীতিকর অবস্থা। অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে ওরা সুবিধেজনক অবস্থায় ছিল। যখন ওরা ট্যাংক নিয়ে আসলো, পরিস্থিতি বদলে গেল। তখন তখন আমার মনে হলো, এর মোকাবেলা করা আমাদের কাজ নয়।"
সময় যত গড়াতে লাগলো, কুয়েতি প্রতিরোধ বাহিনীর বিপরীতে ইরাকি সেনাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। সামির বাবা, যিনি প্রতিরোধ বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি বুঝতে পারলেন, তাদের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের সবাই হয়তো ধরা পড়বেন, তাদেরকে হত্যা করা হবে। সামির জন্য একটি ছিল এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
"আমার বাবা আমার খুব প্রিয় ছিলেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। কাজেই তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে এটাই শেষ, তখন তিনি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।"
সাদ্দাম হোসেন: কুয়েতকে ইরাকের প্রদেশ বলে ঘোষণা করেছিলেন
"আমার বাবা যেন বলছেন, এখানে আমিই সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী। কাজেই আমিই আগে মরবো।"
"তিনি বাড়ির ছাদে উঠলেন। একটা গোলা এসে আঘাত করলো। আমি বাবাকে ডাকলাম। বাবা উত্তর দিলেন, আমি ঠিক আছি। এবার দ্বিতীয় একটি গোলা এসে পড়লো। আমি আবার বাবাকে ডাকলাম। কিন্তু এবার তিনি কোন উত্তর দিলেন না। উপরে গিয়ে দেখার সাহসও আমার ছিল না। পুরো বাড়ি তখন অরক্ষিত। আমার মনে হলো বাবা আর নেই।"
"ঠিক ঐ মূহুর্তে আমার অনুভূতি, আমার সাহসিকতা, আমার সবকিছু যেন উবে গেল। আমি তখন একটা জিনিসই চাইছিলাম। আমি ঘর থেকে বেরুতে চাইছিলাম।"
"আমি জীবিত অবস্থায় এখান থেকে বেরুতে চাই। আমি জামাল আর তালালকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। আমরা পাশের বাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম।"
ইরাকী বাহিনী এই বাড়িতেও ঢুকবে, এটা জেনে সামি এবং তার এক বন্ধু একটা ছোট কুঠুরিতে গিয়ে লুকিয়ে থাকলেন।
"সেখানে আমরা কিছু কম্বল এবং শাল পেলাম। বেশ ঠান্ডা ছিল তখন। আমরা সেগুলো গায়ে জড়ালাম। আমি এবং জামাল সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। এরপর আমরা শুনলাম ইরাকীরা সেখানে আসছে। একজন ইরাকী সেনা বললো, আমি এখানে একটা ঘর দেখতে পাচ্ছি। এটা দেখা দরকার"
"এই সৈন্যটি এসে তার লাইটার জ্বালালো। আমাদের সেলটা ছিল দুই মিটার বাই দুই মিটার। ভেতরে কি আছে, সেটা তার না দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আমার মনে হলো, সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পাচ্ছে। আমি কোরানের একটা আয়াত পড়তে শুরু করলাম মনে মনে।"
আত্মসমর্পনের জন্য সাদা পতাকা হাতে এগিয়ে যাচ্ছে ইরাকি সৈন্যরা
ইরাকি সেনাটি কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তার সাথের অফিসারকে বললো, "মনে হয় এখানে কিছু নেই!"
"আমার মনে হচ্ছিল, লোকটা হয়তো ভালো লোক ছিল। আমাদের অনুকম্পা করছে।"
"কিন্তু একটু পরেই এই সৈন্য তার তার অফিসারকে বললো, এই বাড়িটাকে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুমুক্ত করা দরকার। কিন্তু ঠিক তখন বাইরে থেকে একটা অফিসারের ডাক শোনা গেল। তখন ভেতরের অফিসারটা বললো, বাদ দাও, বাদ দাও।"
২৪ শে ফেব্রুয়ারি কুয়েত সিটির উপকন্ঠে সেই লড়াই চলেছিল দশ ঘন্টা ধরে।
সামির বাবা এবং ঐ প্রতিরোধ সেলের আরও দুজন লড়াইয়ে নিহত হয়। যে নয়জন ইরাকি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে, তাদের মৃতদেহ কাছাকাছি ফেলে রাখা হয়।
সামি এবং অপর সাতজন বেঁচে যান।
"মঙ্গলবার সকালে আমাদের দেশ মুক্ত এবং স্বাধীন হলো। মানুষ খুশিতে উল্লাস করছিল। কুয়েত তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে।"
"কিন্তু যে মূহুর্তের জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি, যখন সেই মূহুর্ত এলো, আমি সেটা উদযাপন করতে পারলাম না। আমি হাসপাতালগুলোর মর্গে মর্গে ঘুরছিলাম। আমার বন্ধুদের খুঁজছিলাম।"
"এখনো আমার নাকে ট্যাংকের, বারুদের গন্ধ পাই। আমি সেই ঘরটার গন্ধ পাই। যখন আমি একা থাকি, এই পুরো ঘটনার স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। এটা যেন একটা উল্কির মতো আঁকা হয়ে আছে আমার মনে।"
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইরাক পরাস্ত হয়েছিল। কুয়েত মুক্ত হয়েছিল ইরাকী দখলদারিত্ব থেকে।
তবে কুয়েত যতদিন ইরাকের দখলে ছিল, তখন এক হাজারের মতো কুয়েতি নাগরিক লড়াইয়ে নিহত হয়। ৬০০ জনের মতো গুম হয়। ইরাকেরও হাজার হাজার সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হয়।
কুয়েতের তৎকালীন আমীর শেখ জাবের আল আহমেদ আল সাবাহ