Tuesday, December 31, 2024

বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ নয়, হবে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ -বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ নয়, মঙ্গলবার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি পালন করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সোমবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছে তারা।

মঙ্গলবারের কর্মসূচি তুলে ধরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেছেন, ‘আজ ৩১শে ডিসেম্বর, মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে “মার্চ ফর ইউনিটি” কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, আপনারা যে উদ্দীপনায় সংগঠিত হয়েছেন, তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবেন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গত রোববার সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তাঁরা মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেবেন। সংগঠনের নেতারা ঘোষণাপত্রে দুটি মৌলিক বিষয়ের উল্লেখ করেন। তাতে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর ‘কবর’ রচনা করা এবং ‘নাৎসিবাদী আওয়ামী লীগকে’ বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করার কথা থাকবে।

এই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এ বিষয়ে দলগুলোর কারও কারও মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তারা মনে করছে, ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তা না করে হঠাৎ কোনো ঘোষণা বিভাজন তৈরি করবে। তবে কোনো কোনো দল ছাত্রদের ওই উদ্যোগকে নৈতিকভাবে সমর্থন জানায়।

এ নিয়ে দিনভর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনার মধ্যে রাত পৌনে নয়টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে জরুরি প্রেস ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমতে৵র ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জনগণের ঐক্য, ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংহত রাখার জন্য এ ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হবে।

সরকারের এ ঘোষণার পর মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে রাজধানীর বাংলামোটরে বৈঠকে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা।

বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রথমে কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় শহীদ মিনারে ঘোষণাপত্রটি আসার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তার জায়গা থেকে পুরো বাংলাদেশকে একটি ঐক্যবদ্ধ জায়গায় এনে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সকলকে সম্পৃক্ত করে ঘোষণাপত্রটি দেওয়া উচিত বলে অনুভব করেছে।

সারজিস বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে আমাদের যে জিনিসটি মনে হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের চেয়ে রাষ্ট্র যখন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্বটি নিয়ে নেয়, আমরা আমাদের জায়গা থেকে এ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাই।’

পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সদস্যসচিব আরিফ সোহেল মঙ্গলবারের কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত জন-আকাঙ্ক্ষা তথা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েমের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে আবির্ভূত হয়েছে। হাজারো শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও জন-আকাঙ্ক্ষার দলিলস্বরূপ জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র অত্যাবশ্যক ছিল। এই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের ঐতিহাসিক দায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর বর্তায়।’

আরিফ সোহেল বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার পক্ষে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রের প্রণয়ন ও ঘোষণার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। আমাদের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত ও ইতিবাচক সাড়া সঞ্চারিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ছাত্র-জনতার আহ্বানে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছাত্র-জনতা এই সময়পোযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছে।’

এর আগে রাত পৌনে একটার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক দলিল যাতে আমরা উপস্থাপন না করতে পারি, সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সরকার এটির ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। এটা আমাদের প্রাথমিক বিজয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘোষণাপত্র নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রে পেরেক মেরে দিয়েছে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার। তারা বলেছে, সরকারের জায়গা থেকে ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে।’

জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘আমরা পূর্ববর্তী যে কর্মসূচি দিয়েছি, আমরা বিপ্লবীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একত্রিত হব। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণাপত্র আসবে, কিন্তু তাই বলে আমাদের একত্রিত হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে না। আগামীকাল শহীদ মিনারে আহত থেকে শুরু করে শহীদ পরিবার এবং ঢাকা শহরের মা ও বোনেরা যেভাবে ৫ আগস্ট রাজপথে নেমে এসেছিল, সেভাবে প্রোক্লেমেশনের পক্ষে রাজপথে নেমে আসবে।’

সোমবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে
সোমবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে। ছবি: প্রথম আলো

বছর শেষে কেমন আছেন গাজাবাসী

বছর শেষে ১৬তম মাসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে গাজা যুদ্ধ। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান সত্ত্বেও এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের কাছে আশার আলো দেখা দেয়নি। ১১ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রেজ্যুলেশন অনুমোদন করে। তাতে অবিলম্বে, নিঃশর্ত এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আহ্বান করা হয় গাজায়। পাশাপাশি অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে হামাসের হাতে আটক সব জিম্মির মুক্তি দাবি করা হয়। পরিষদ থেকে নিয়ার ইস্টে ফিলিস্তিনের শরণার্থী বিষয়ক ত্রাণ ও ওয়ার্ক বিষয়ক এজেন্সিকে (ইউএনআরডব্লিউএ) তাদের ম্যান্ডেটের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ধারণা করা হয় এটা হলো কয়েক লাখ মানুষের লাইফলাইন। এ ছাড়া এই এজেন্সির ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট একটি প্রস্তাব পাস করে। জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে নিন্দা জানায়। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাস আকস্মিক ইসরাইলের দক্ষিণে দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়। তাতে নিহত হয় প্রায় ১২০০ মানুষ। হামাস জিম্মি করে প্রায় ২৪০ জনকে। এরপর থেকেই গাজার ওপর সীমাহীন ও বাধাহীন বোমা হামলা শুরু করে ইসরাইল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এসব হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার ফিলিস্তিনি। ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পয়ঃনিষ্কাশন সেবা, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। বহু বাড়িঘরে একাধিকবার বোমা হামলা হয়েছে। গাজায় শতকরা কমপক্ষে ৮৩ ভাগ মানবিক ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেয় ইসরাইল। গাজাবাসীর জন্য যথেষ্ট নয় এমন ত্রাণ বহনকারী গাড়িবহরে লুটপাট হয়। এর ফলে গাজায় অকল্পনীয় খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। খাদ্য সংকট এবং অন্যান্য সংকটের ফলে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ অনাহারে বা অন্যান্য দুর্বিপাকে ভুগছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে যে, গাজার খাদ্য ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সেখানে প্রতিটি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের উচ্চ ঝুঁকি আছে। গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রায় তিন মাস কোনো সহায়তা, ত্রাণ পৌঁছেনি। সেখানে ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি দুর্ভিক্ষের অত্যাসন্ন হুমকিতে। নভেম্বরে নিরপেক্ষ ফেমিন রিভিউ কমিটি সতর্ক করে বলেছে, গাজার এই অংশে দুর্ভিক্ষাবস্থা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে অথবা নিকট ভবিষ্যতে তা অতিক্রম করবে। ১লা এপ্রিল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিপোর্ট করেছে যে, উত্তরাঞ্চলে অপুষ্টিতে এবং পানিশূন্যতায় ভুগে হাসপাতালে মারা গেছে ২৮ শিশুসহ ৩২ জন। কামাল আদোয়ান এবং আল আওদা হাসপাতালে শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে- এমন ঘটনা মার্টে প্রামাণ্য আকারে তুলে ধরেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ এজেন্সিগুলো রিপোর্ট করেছে যে, শতকরা ৫ ভাগ শিশু, যাদের বয়স দুই বছরের নিচে, তারা মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এসব কারণে এবং গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি)। রায়ে বলা হয়েছে, যদি তারা এই আদালতের সদস্য ১২৪টি দেশের কোনোটিতে সফর করেন, তাহলে তাকে বা তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। নভেম্বরের শেষের দিকে নেতানিয়াহু, ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাসের কমান্ডার মোহাম্মদ দিয়েফের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে ইসরাইলের দাবি জুলাইয়ে তারা মোহাম্মদ দিয়েফকে হত্যা করেছে। তবে তাকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি জীবিত আছেন- এ বিষয়ে আইসিসি কোনো মন্তব্য করেনি। আইসিসি তার রায়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে মানুষকে অনাহারে রাখার কৌশল ব্যবহার করেছে। এর মধ্যদিয়ে তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে। হত্যা, নিষ্পেষণ ও অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। এই ফৌজদারি অপরাধের দায় নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের। আইসিসি’র যৌক্তিক কারণ রয়েছে যে, মোহাম্মদ দিয়েফও হত্যা, নির্যাতন, অন্যান্য যৌন নির্যাতন, জিম্মি আটকসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ করেছে।
কিছু সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন আরও একটু অগ্রসর হয়েছে। সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক রিপোর্টে বলেছে, দখলিকৃত গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে ইসরাইল এবং তা অব্যাহত আছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য ইসরাইলকে প্রথম দায়ী করে যেসব দেশ তার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। এমনকি তারা জানুয়ারিতে আইসিসিতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মামলা করে। দাবি করা হয়, ইসরাইল জোনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এই মামলায় যোগ দেয় বা স্বাক্ষর করে বিশ্বের কমপক্ষে ১৪টি দেশ। এরমধ্যে আছে স্পেন, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মিশর এবং চিলি।
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে যে হামলা হয় ইসরাইলে তাতে ইউএনআরডব্লিউএ’র বেশ কিছু কর্মী জড়িত বলে জানুয়ারিতে অভিযোগ করে ইসরাইল। এমন অভিযোগে ওই এজেন্সি তদন্ত শুরু করে। এ সময়ে ত্রাণ সহায়তা বন্ধ করে রাখে অনেক পশ্চিমা দাতা। তদন্ত শেষে ৯জন কর্মীকে দায়ী দেখিয়ে তাদের বরখাস্ত করে ইউএনআরডব্লিউএ। যুক্তরাষ্ট্র বাদে সব দাতা তাদের অর্থ আবার দেয়া শুরু করে। রিপোর্টে দেখা যায়, গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্কুলগুলোর মধ্যে শতকরা কমপক্ষে ৭০ ভাগ স্কুল ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলের বোমা হামলায়। এসব স্কুলের শতকরা ৯৫ ভাগই ব্যবহার করা হতো ইসরাইলের হামলায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল হিসেবে। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন গাজার দক্ষিণে আল মাওয়াসি ক্যাম্পে। এটাকে মানবিক নিরাপদ জোন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল ইসরাইল। কিন্তু ৪ঠা ডিসেম্বর সেখানেও হামলা চালায় তারা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আল মাওয়াসি ক্যাম্প কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। গাজায় এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ইসরাইল হামলা চালায়নি, আর সেখানে রক্তপাত হয়নি। 

mzamin

হাসিনারে ফেলায় দেয়ার আন্দোলন বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান না কি জনঅভ্যুত্থান? by আর রাজী

বাংলাভাষাটা ভিন্ন রকমের। সাধারণত এ ভাষার শব্দেই ঢুকানো থাকে শব্দের অর্থ। সুতরাং শব্দ খুলতে জানলেই চলে, কারও দেয়া সংজ্ঞা মুখস্থ করে শব্দের অর্থ বুঝতে হয় না। সুতরাং আপনি যদি বাংলা জানেন, তাহলেই চলবে; আপনি সহজেই বুঝবেন হাসিনারে ফেলে দেয়ার আন্দোলনকে কী নামে ডাকা উচিত।

‘প্লাবন’ শব্দটা আমাদের বেশ চেনা। ‘প্লব’-ও চেনা কিন্তু যখন তার আগে ‘বি’ থাকে তখন আরও ভালোভাবে চিনতে পারি তাকে (বি-+প্লব= বিপ্লব)। সরল শব্দার্থ কোষ বলছে: ‘প্লব’ হচ্ছে প্ল-তে বাহিত হয় যে। ‘প্ল’ হচ্ছে- ধারা, জলধারা। তাতে যে বা যা বাহিত হয় সে বা তা ‘প্লব’। যেমন হাঁস। আর ‘বিশেষ প্রকারের প্লব যাহাতে তাহাই বিপ্লব’। সমাজ-রাষ্ট্রেও ধারা থাকে- কর্মধারা যেমন। সেখানে   যে ধারায় জন বা আমলারা ভেসে বেড়াচ্ছে তা বদলে গেলে, তখন তাকে বলা হয় ‘বিপ্লব’। ‘বিপ্লব’ এমন কিছু যা ধারাটা বদলে দেয় বা জলধারায় যা কিছু ভেসে বেড়াচ্ছিল তাদের ভেসে বেড়ানোটা বিশেষভাবে বদলে দেয়। এটা দৃশ্যমান কিছু। আপনি দেখতে পাবেন যে সমাজে ভেসে বেড়ানোর ধরন বদলে গেছে। ভালো বা খারাপ  সেটা আলোচ্য না, বদলে চলা দৃশ্যমান হলে তা ‘বিপ্লব’। এটা ফল  দেখে শনাক্ত করার বিষয়। খুঁজে বলতে হয় না  যে সমাজ বা রাষ্ট্রে ‘বিপ্লব’ হয়েছে কি না?

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মধারা-রীতি-পদ্ধতি কিছুই বদলে যায়নি, কিছু লোকের বদল হওয়া ছাড়া। গত দশ বছর আগে যেমন ছিল এখনো তেমনি সবাই ভাসছেন। সমাজ-রাষ্ট্রের যে স্রোতধারা তা যেমন বদলে যায়নি, তাতে ভেসে বেড়ানো মানুষদের ভেসে বেড়েনোর প্রক্রিয়া-পদ্ধতিও বদলে যায়নি। সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ধারা বদল মানে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক বদল। তেমন বদল কি হয়েছে? কেবল কিছু মানুষের বদলে নতুন অন্য কিছু মানুষ এসেছেন। সমাজে ক্ষমতালব্ধ ও ক্ষমতা-প্রলুব্ধ অংশের মধ্যে যে লড়াই সর্বক্ষণ চলে তাতে এক পক্ষকে সরিয়ে আর এক পক্ষ ক্ষমতা নিয়েছেন। আর নতুন যারা ক্ষমতা পেয়েছেন তারা একইভাবে ভেসে বেড়াচ্ছেন। এ বিবেচনায় ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রে বিপ্লব হয়েছে সে কথা মান্যতা পায় না। অনেকেই একে ‘অভ্যুত্থান’ বলছেন। একে কি ‘অভ্যুত্থান’ বলা যায়? ‘অভ্যুত্থান’ কাকে বলে? মানে, আমাদের বাংলাভাষায় ‘অভ্যুত্থান’ বলতে কী বুঝায়?
‘অভ্যুত্থান’ হচ্ছে- ‘অভির কারণে উত্থান যাহাতে’। ‘অভি’ বুঝায় উপরে স্থিত থাকা। অভিভাবক শব্দটা তো আমরা জানি। উপরে থেকে যিনি ‘ভাবক’ হিসেবে থাকেন- আমার উপরে স্থিত থেকে যিনি আমার ভাবনাকে প্রভাবিত করেন বা করতে পারেন তিনিই আমার অভিভাবক। একইভাবে উপরিস্থিত কারণে যে উত্থান তাকে বলে ‘অভি+উত্থান= অভ্যুত্থান’। ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ এই রাষ্ট্রে যা ঘটছে তা আমরা দেখেছি। উপরে, মানে রাষ্ট্রের মাথায় যারা ছিলেন তাদের কারণে সৃষ্ট বিরক্তিতে বা যন্ত্রণায় বা অন্য কোনো কারণে জনতার উত্থান ঘটেছে। রাষ্ট্রজন রায়ে যেখানে ছিলেন সেখান থেকে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, উত্থিত হয়েছেন এবং যারা ক্ষমতার আসনে বসে ছিলেন তাদের আসন থেকে উঠিয়ে দিয়েছেন। একটা দ্রোহ ছিল মানুষের মনে, বিশেষ সেই দ্রোহ অর্থাৎ বিদ্রোহের কারণে তাদের ‘উত্থান’ ঘটেছে। ফলত অন্যদের ‘পতন’ ঘটেছে। তার মানে ঘটনা যা ঘটেছে তাকে আমরা ‘অভ্যুত্থান’ বলতে পারি। কিন্তু তা কি ‘গণঅভ্যুত্থান’? না কি তাকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে, আরও যথাযথভাবে নামাঙ্কিত/বিশেষায়িত করার সুযোগ রয়েছে? কী নামে সেই অভ্যুত্থানকে অভিহিত করা অধিকতর সঙ্গত হবে? আর ৫ই আগস্টের ব্যাপারটাকে  কেন একটা যথাসঙ্গত নামে অভিহিত করা অত্যাবশ্যক সে প্রশ্নেও  তা ওঠার কথা, তাই খুবই স্বল্প কথায়ে লেখার   শেষে আছে তার উত্তর।   
২.
অভূতপূর্ব, সিনেমেটিক এক অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে আগস্টের ৫ তারিখে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে গেলেন। এরপর থেকে আমাদের শিক্ষিত-বাঙালি গোষ্ঠী ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান’- হিসেবে ওই ঘটনাকে উল্লেখ করতে শুরু করলো। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার প্রথম ভাষণে একে ‘ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করলেও পরের ভাষণে একে ‘ছাত্র-শ্রমিক-গণঅভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ ‘ছাত্র-জনতা-সৈনিকদের ঐক্যকে’ অভ্যুত্থানের শক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন। এইভাবে সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন বর্গকে স্বীকৃতি   দেয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে আগামীতে এই অভ্যুত্থানকে ছাত্র-শ্রামিক-কৃষক-মজুর-সৈনিক ইত্যাদি ইত্যাদি বর্গযুক্ত ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলার পরেও কোনো না কোনো বর্গ বাইরে থেকে যেতে পারে আর তারা নিজেদের ‘নীরবতার শিকার’ হিসেবে হীনতায় ভুগতে এবং দুঃখ পেতে পারেন। আবার এক বর্গ অন্য আর এক বর্গকে উহ্য রেখে প্রতিশোধও নিতে পারে। অবশ্য এখন পর্যন্ত   মোটাদাগে ‘ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবেই একে নির্দেশ করা হচ্ছে। দু’-একজন পণ্ডিত ‘ছাত্র’-এর বদলে ‘শিক্ষার্থী’ শব্দ যুক্ত করছেন ছাত্রের সাথে ছাত্রীদেরও অংশভাগ নিশ্চিত করার লৈঙ্গিক সমতা বজায় রাখার তাগাদা থেকে (যদিও ব্যাকরণ বলে- ছাত্রের স্ত্রী হচ্ছেন ছাত্রী)।
৩.
ইংরেজি ‘গ্যাং’ শব্দটা মাথায় রাখলে বাংলা ‘গণ’ প্রত্যয়টা বুঝা সহজ হতে পারে। ‘গণ’ এমন এক এক দল মানুষকে বুঝায় যারা দলপতির অধীনে একসঙ্গে জীবিকা অর্জনের কর্ম করেন। মানে একই ধরনের কাজ করে এমন দলবদ্ধ মানুষ হচ্ছে ‘গণ’। বঙ্গীয় শব্দকোষে হরিচরণ ‘গণ’-এর অর্থ দিয়েছেন সমূহ, নিচয়, সমুদয়।  যেমন- পিতৃগণ, সখীগণ, নারীগণ ইত্যাদি। আর তিনি ‘গণ’ শব্দের যে বিবরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে- ‘যাহারা মিলিতভাবে এক কার্য্যদ্বারা জীবিকা‘র্জ্জন করে (মেধাতিথি), সমবায়, সংঘ।’ খেয়াল করে  দেখেলে  তা, এই যে ‘আন্দোলন’ হলো- এখানে একই ধরনের কাজ করেন এমন মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন কি না? গার্মেন্টসের লোকজন বা পরিবহন শ্রমিক বা কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক বা রিকশাওয়ালারা কি একসঙ্গে দলবেঁধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, কারও   নেতৃত্বে বা দলপতির অধীনে? শিক্ষকরা নেমেছিলেন, কাউকে  নেতা   মেনে? নামেন নাই। কিন্তু এই আন্দোলনে গার্মেন্টসের অনেক শ্রমিক ছিলেন, পরিবহন শ্রমিক ছিলেন, রিকশাওয়ালা ছিলেন। (কৃষক যদিও আমার নজরে পড়ে নাই!) এরা যে ছিলেন তারা দল, গ্যাং বা গণ হিসাবে ছিলেন না, ‘রহিমুদ্দীন গং নামছিল’- বলার উপায় নাই। তারা হাজির ছিলেন এক একজন বিচ্ছিন্ন ও একক পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে। আমার দেখা-জানা বলছে- ছাত্রদের সবচেয়ে বড় যে অংশ হাজির ছিলেন তারাও দল বা গ্যাং হিসেবে না- যার যার অন্তর ও/বা বিবেকের তাড়নায় রাজপথে নামছিলেন। এমনও দেখছি, কুরিয়ারের ডেলিভারিম্যান, পানির ফিটিংমিস্ত্রী তার কাজ রেখে আন্দোলনে সক্রিয় আছেন, অনেক   ক্ষেত্রে গলায় যে কোনো একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ঝুলিয়ে নিয়ে, ছাত্র সেজে আন্দোলনে ছিলেন তারা। রাজনৈতিক দলগুলার কর্মীদের বিপুল অংশগ্রহণ দেখেছি কিন্তু সে   ক্ষেত্রেও তারা দল না, ব্যক্তি হিসেবে হাজির ছিলেন। শেষদিকে এই হাজিরা তালিকায় অনেক অনেক ছাত্রলীগ-কর্মীও দেখেছি, সদ্য দলত্যাগীকে   দেখেছি হাসিনার পতন নিশ্চিত করতে জীবন দিতেও প্রস্তুত- ১৬/১৭ই জুলাইয়ের পর তারা ভাইয়ের রক্তের বদলা নিতে চাইছিলেন এবং নিয়েই ঘরে ফিরেছেন।
এই যে, বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি তিনিই ‘জন’। বঙ্গীয় শব্দকোষে বলা হয়েছে- ‘জন’ ধাতুটির অর্থ জনন, উৎপত্তি, হওয়া থেকে শুরু করে জন্মী, জীব ইত্যাদি অর্থ বহন করে। বাংলায় ‘জন’ ‘পুরুষ’ (নর না) অর্থেও ব্যবহৃত হয়- ‘জানেন যে জন (অন্তর্যামী যিনি)।’ কিন্তু মৈথিলি ভাষায় ‘জন’ শব্দের অর্থ শ্রমজীবী, মজুর। হরিচরণ আলালের ঘরে দুলাল থেকে ‘জন’ শব্দের ব্যবহারের যে উদাহরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে- ‘জনখাটা ভরসা’। বাংলা ভাষাতেও এমন অসংখ্য ব্যবহার রয়েছে যেখানে ‘জন’ হচ্ছে একক মানুষ, ব্যক্তি মানুষ। আমরা যেমন বলি- কতজন এলো  গেল/ জনে জনে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে/সে আমার আপনজন ইত্যাদি। এ সবের প্রতিটি   ক্ষেত্রেই ‘জন' একক ব্যক্তিকে, বিচ্ছিন্ন মানবসত্তাকে নির্দেশ করে।
৪.
ছাত্ররা আন্দোলনে ছিলেন, তবে সব   লোক-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার পর ঢাকার ‘রাজনীতিমুক্ত’ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, যারা রাজনৈতিক দলভুক্ত বলে কখনো   কেউ  মানেননি, তারা বিপুলভাবে রাজপথে হাজির হয়েছিলেন। লীগ নিয়োজিত মাস্তানবাহিনীর যাচ্ছেতাই আচরণ, পথে পথে মোবাইলে  চক/ কেড়ে নেয়া, সন্দেহ হলেই চড়থাপ্পড় ইত্যাদি তাদের সম্ভবত ত্যাক্তবিরক্ত করে তুলছিল। পুলিশের মাতব্বরি,   শেখ হাসিনাসহ সরকারি লোকদের আহাম্মকের মতো ব্যাটাগিরি এই ছাত্রদের পথে নামতে ‘তাগাদা’ দিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমার চোখে- ছাত্রদের এই হাজিরা এমন মাত্রায় ছিল না যে তাতে সরকার পড়ে যেতে পারে। দেখেছি- আইডি ঝুলানো কিছু তরুণ, যারা আসলে একে-অপরকে  চেনেনও না, তারা রাস্তায় দাঁড়ালেই আশপাশেরে  লাকজন বিপুলভাবে তাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে গেছেন। এই পরস্পর বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো যেন যুগযুগান্তরের ক্ষোভকে আগুন করে ছড়িয়ে দিতে চাইছিলেন। ‘হাসিনাগংকে ফেলে দেওয়ার যুদ্ধে’ তারা শহীদ হওয়ার জন্য যেন পাগল হয়ে গিয়েছিলেন!
এই মানুষগুলো যখন পথে নেমে এসেছেন, আন্দোলনের সামনে চলে   গেছেন তখন ছাত্রদের ভূমিকা আর মুখ্য থাকেনি। তবে ছাত্রদের যদি  কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে   চেয়েছে মানুষ তাকে বাধা দেয়নি, আহ্লাদও দেখায়নি। এই নেতৃত্ব   দেয়া ছাত্ররাও একক সিদ্ধান্তে, একা সাহস করে, দল ছাড়াই ওই ঝুঁকি গ্রহণে ব্রতী হয়েছিলেন বলেই আমার পর্যবেক্ষণ।
৫.
আন্দোলনে একটা ছোট ফিচার ধরা পড়েছে আমার চোখে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল আন্দোলন থমকে যেতে পারে। পরে   খেয়াল করলাম- আন্দোলন যারা করছে, সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউজ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাই নাই। এমন কি ইন্টারনেট থাকাকালেও   সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা কে কী বলে চলেছেন তা শোনার ‘টাইম নাই’ তাদের। তারা যেন বুঝে গিয়েছিলেন- তারাই নিউজ-মেকার। তারা নিউজের এলিমেন্ট নন। আর যারা প্রতিদিন আন্দোলনে নেমেছেন, তারা তো স্মার্টফোনে ছেড়ে বাটন   ফোন ধরেছিলেন! নাগরিকদের একটা অংশ জীবনের সবরকম মায়া ছেড়েই ‘হাসিনারে ফেলে দিতে’ পথে ছিলেন। কিন্তু তাই বলে সামাজিক মিডিয়ার ভাষ্যকার, বিশ্লেষকদের বিপুল অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন পরিণতি পেত বলে মনে করার কারণ নাই। অথচ ইনারা কেউ গ্যাং ধরে এসব কিছু করছেন, সমিতি বানিয়ে তা করছেন অর্থাৎ ‘গণ’ হিসেবে আন্দোলনে হাজির ছিলেন বলে সাদা   চোখে ধরা পড়েনি।
৬.
মাঝেমাঝে ভাবি, যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া-রামপুরা-আব্দুল্লাহপুর যদি রুখে না দাঁড়াতো তাহলে কী হতো? যাত্রাবাড়ীর মতো অনেক অনেক জায়গায় পরস্পর অপরিচিত ব্যক্তি বিপুল সংখ্যায় এবং নেতা/নেতৃত্ব ছাড়াই একান্ত ব্যক্তিগত দায়ে বাধ   থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘হাসিনা গংরে ফেলে দিতে’ রাস্তায়   নেমেছিলেন। এই আন্দোলনে মাদ্রাসার ছাত্রদের ভূমিকা বিশাল- কিন্তু তারা ‘তালিব’ হয়ে আন্দোলনে আসেন নাই, এসেছেন রাষ্ট্রের এক একজন নাগরিক বা রাষ্ট্রজন হয়ে।
৭.
ওপরের ভাষ্য যদি সত্য হয়- তাহলে ছাত্রদের কেন ‘গণ’-এর বাইরে রাখা হচ্ছে? তারা তো গণের অংশ হিসেবেই ক্রিয়াশীল ছিলেন। একই কথা প্রযোজ্য শ্রমিক বা অন্য যে কোনো বর্গের   ক্ষেত্রে। তারা কেউই দল বা গ্যাং বা গণ হিসেবে হাজির ছিলেন না। তাহলে তারা কী পরিচয়ে হাজির ছিলেন? আমার প্রস্তাব হচ্ছে, তারা হাজির ছিলেন ‘জন’ হিসেবে। যে ‘জন’ হচ্ছে ‘একক ব্যক্তিসত্তা’। মানে দল বা গণ/গ্যাং না, নিজের স্বাধীন ইচ্ছায়, নিজের অংশ উপ-অর্জন করেছেন একেক ‘জন’। একজন, দুইজন, বহুজন- যারা পৃথক কর্তা-সত্তা নিয়া সমাজে/রাষ্ট্রে ক্রিয়া করেন, সেই জনে জনে একতা গড়ে তুলে জনতায় উত্থিত হয়েছিলেন।  
৮.
জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল তাকে সবচেয়ে কম কথায় যদি নির্দেশিত করতে চাই, তাহলে তা হচ্ছে- এইটা ছিল বাংলাদেশের শহুরে ব্যক্তি-মানুষের একেবারে ব্যক্তি হিসেবে ঝুঁকি নিয়ে ‘হাসিনারে  ফেলে   দেওয়ার’ আন্দোলন। যাকে ‘জন’ আন্দোলন বলে নির্দেশ করা সম্ভবত সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বলে বিবেচিত হতে পারে। এই ‘জন’ আন্দোলনই ক্রমে পরিণতি পেয়েছে একটা সফল ‘জনঅভ্যুত্থান’ হিসেবে।
৯.
এই সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তা এই কথাটি বলার জন্য যে, যেহেতু এটি ‘গণ’ নয় ‘জন’ অভ্যুত্থান ছিল ফলত এই জনঅভ্যুত্থানের দূরপ্রসারী  কোনো স্বপ্ন/চিন্তা/ভাবনা ছিল না অথবা বলা যায় সামষ্টিক একটা স্বপ্ন/কল্প ‘প্রকল্প’ আকারে গড়ে ওঠার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন ছিল তা ওই আন্দোলন পায়ইনি। ‘হাসিনারে   ফেলে দেওয়া’র লক্ষ্য পর্যন্ত জনে জনে একতা গড়ে তুলে জনতায় পরিণত হয়েছিল কিন্তু তারপরে কী হবে- সে বিষয়ে জন-তার ভাবনা-চিন্তা ছিল বলে   কোথাও কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। তাদের যদি কিছু বাসনা থেকেও থাকে, তার রূপায়ণ বা আকার ৫ই আগস্টের আগে দলগতভাবে সেই জনতার মাঝে উপস্থাপিত ও চর্চিত হওয়ার উদহারণ দুর্লক্ষণীয়।
১০.
আন্দোলন যখন দ্রুত রঙ বদলাচ্ছিল এবং ক্রমশ আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠছিল- তখনও ‘হাসিনারে ফেলে   দেয়ার পর’ কী তরিকায় সরকার গঠন হবে, কী তরিকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তা আমাদের শিক্ষিত-বাঙালি সমাজ জনপরিসরে হাজির করতে পারে নাই। অথচ এখন কত কথা হচ্ছে! ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা/অভিপ্রায়’ হিসেবে অনেকে যেন আকাশ  ভেঙে   ফেলার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন! ‘জন’   কে ‘গণ’-এ পরিণত করা, তাকে গঠিত ও পরিগঠিত করা হয় তো সম্ভব কিন্তু ৫ই আগস্ট পর্যন্ত যে আন্দোলন চলেছে এবং ৫ই আগস্ট যে অভ্যুত্থান হয়েছে তাতে ‘গণ’-এর উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল না। যা ছিল তা জন-এর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ওটি আদতে ছিল জন-অভ্যুত্থান। গণপরিসরে কথাবার্তা শুরু হলেও আজতক জনপরিসরে রাষ্ট্র-প্রকল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরুই হয়নি।
বিচ্ছিন্ন একক মানুষের সাময়িক সমূহ হয়ে ওঠার পরিণতি যে জন-অভ্যুত্থান তা স্বল্প দূরত্বের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকর হয়েছে মানে এই না যে তা সুদূর লক্ষ্য পর্যন্ত তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে। যদি জুলাই জনঅভ্যুত্থানকে ছেদবিন্দু ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গঠন করতে হয়, রাষ্ট্রসংস্কার করতে হয়, যদি তার নতুন গঠনতন্ত্র নির্মাণ করতে হয়, তবে অবশ্যই প্রতিটি বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তিসত্তা বা জনকে মোকাবিলা করার মাধ্যমেই তা করতে হবে।
আধুনিক রাষ্ট্রগঠন মানে প্রতিটি ব্যক্তির   সেই রাষ্ট্রের সংস্কারে ও/বা গঠনতন্ত্র নির্মাণেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অর্থাৎ প্রতিজনের মতামত প্রতিফলিত করে এমন একটি গঠনতন্ত্র ওরফে সংবিধান এবং সংস্কার-প্রস্তাব তৈরি করা। সংস্কার-প্রস্তাব ও গঠনতন্ত্রে কেবল   সেটুকুই থাকতে পারে বা গঠনতন্ত্রের   কেবল সেটুকুই সংস্কার হতে পারে যতটুকুতে প্রতিটি মানুষের সম্মতি রয়েছে বা থাকবে। বাংলাদেশে যদি ‘গণঅভ্যুত্থান’ সংঘটিত হতো, অর্থাৎ   কোনো একক নেতার নেতৃত্বধীন গণের (দলের) বা গণসমূহের (দলসমূহের) ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বে উত্থান হতো ‘গণ’-এর তাহলে সম্ভবত ‘জন’-এর  মোকাবিলা না করেও নতুন একটা গঠনতন্ত্র ও সংস্কার-প্রস্তাব পেতে পারতো বাংলাদেশ। এভাবে সংস্কার ও গঠনতন্ত্র পেয়ে যাওয়া ভালো হতো না হয়ে তা কিন্তু কাজটা সহজ হতো। এখন আর তা সম্ভব না। যেহেতু ‘গণঅভ্যুত্থান’ না হয়ে হয়েছে ‘জনঅভ্যুত্থান’, সুতরাং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠনে (প্রতি)জনকে মোকাবিলার দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করা এখন রাষ্ট্রজনদের জন্য আবশ্যিক শর্তে পরিণত হয়ে গেছে। এই পথে   ছেঁটে ফেলে সহজে কার্যসিদ্ধি করার কথা যদি রাজনীতিকরা ভাবেন তাহলে নিশ্চিত জানবেন- জনমানুষ তা অন্তর   থেকে গ্রহণ করবে না এবং ফলত সে গঠনতন্ত্র বা রাষ্ট্রসংস্কার স্থায়িত্বও পাবে না। কাঙ্ক্ষিত সংস্কার, কাঙ্ক্ষিত সংবিধান, ও কাঙ্ক্ষিত সমাজ-রাষ্ট্র পাওয়ার কোনো সহজ-সংক্ষিপ্ত পথ নাই। জনঅভ্যুত্থান তা তৈরি করে  দেয় না। দীর্ঘ ও যত্নশীল চেষ্টা ও সাধনাতই  তো কেবল হাসিল হতে পারে। জুলাই জনঅভ্যুত্থান সেই পথযাত্রার দুয়ার উন্মুক্ত করেছে মাত্র।
লেখক: শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

mzamin

কমলাপুর স্টেশন: মানুষ বেচা কেনার হাট by শাহীন কাওসার ও ফাহিমা আক্তার সুমি

কমলাপুর রেলস্টেশন। রেলপথের পুরো দেশের কেন্দ্রস্থল। ট্রেনের হুইসেল আর লাখো যাত্রীর পদভারে রাতদিন একাকার হয়ে যায় এখানে। দিনে কতো মানুষ আসে, কতো মানুষ যায় এই স্টেশন হয়ে। এই যাত্রীদের ঘিরে জীবন-জীবিকার সংস্থান হয় অনেক মানুষের। তাদের কারও কারও আবার ঘরবাড়ি মানে এই স্টেশন। এদের কেউ ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করে আবার কেউ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িত। এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা মানুষ বিক্রির মতো জঘন্য কাজ করে এই স্টেশনে বসেই। অবুঝ শিশু, কিশোরী এমনকি নারীদেরও বিক্রি করে দেয় এই চক্র। সরজমিন কয়েক দিন কমলাপুর স্টেশনে অবস্থান করে মানবজমিন মানুুষ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত এই চক্রের বিষয়ে বিস্তর তথ্য পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে অসহায় অবস্থায় কমলাপুর এসে অনেকে আশ্রয় নেয়। এই অসহায় মানুষদেরই টার্গেট করে গড়ে উঠেছে এই চক্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিশু চুরির সঙ্গেও যোগসাজশ আছে তাদের। এই চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চুরি করে আনা শিশু তুলে দেয় কোনো পরিবারের হাতে। আবার এই শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তির কাজে ব্যবহারেরও অভিযোগ আছে। এ ছাড়া কিশোরী বা নারীদেরও নানা পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয় তারা। এই কিশোরী বা নারীরাও নানাভাবে পরবর্তীতে পাচার বা সহিংসতার শিকার হন।

কমলাপুরে মানুষ কেনাবেচার এই চক্রটিতে ১০ থেকে ১২ জন। সোমবার কমলাপুর রেলস্টেশনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় চক্রটির মূলহোতা রুবেলের সঙ্গে। এক ব্যক্তিকে ক্রেতা সাজিয়ে তার কাছে একটি শিশুর চাহিদার কথা জানানো হয়। শুরুতে সে এড়িয়ে যেতে চাইলেও তার এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনে। একপর্যায়ে চাহিদামতো শিশু এনে দিতে পারবে বলে জানায়, দাবি করে  মোটা অঙ্কের অর্থ। শুধু শিশু নয় কিশোরী ও তরুণীদেরও বিক্রি করে দেয়ার তথ্য দেয়। তরুণীদের গর্ভে অবৈধভাবে ধারণ করা সন্তান বিক্রিরও প্রস্তাব দেয়। একটি পাঁচ মাসের ছেলে সন্তান বিক্রির জন্য দরদামও হাঁকায়।

শিশু-কিশোরীদের পাচারের কথা জানিয়ে রুবেল বলে, ছোট-বড় যে বয়সী শিশু দরকার সেটি দিতে পারবো। শিশু সংগ্রহের কৌশলের বিষয়ে সে বলে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নির্ধারিত লোক শিশু চুরি করে নিয়ে আসে। এই শিশুদের পরে বিক্রি করে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এই চক্রের সদস্যদের ধরা পড়ার তথ্যও জানায় এই যুবক।  

চক্রের ৬ সদস্য শিশু চুরির কাজ করে জানিয়ে রুবেল বলে, এখান থেকে খরচ দিয়ে আমি তিনটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিবো। তারা যাবে ময়মনসিংহ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া এবং জয়দেবপুর এবং অন্য কয়েকটি জেলায় যাবে বাকিরা। মোট আমাদের ছয়টি মেয়ে যাবে, তারা সঙ্গে করে দুইটা বাচ্চা নিয়ে আসবে। তারা নিয়ে এসে আমাকে খবর পাঠাবে আমরা আবার সেখান থেকে নিয়ে আসবো।

ক্রেতা সেজে একজন শিশুর চাহিদা জানালে রুবেল টাকা দাবি করে বলে, রাতে তার চক্রের ৬ সদস্যকে ঢাকার বাইরে পাঠানোর জন্য গাড়ি ভাড়ার খরচ বাবদ দুই হাজার টাকা দিতে হবে।
ঘণ্টাখানেক পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল করে শিশুটিকে হাতে পাওয়ার পর ১ লাখ টাকা দাবি করে রুবেল। সে বলে, কমলাপুরে এসে বাচ্চাটিকে নিতে হবে।
অন্য একজন একটি কিশোরীর চাহিদা জানালে রুবেল বলে, মারিয়া নামের একটি মেয়ে আছে। তার জন্য আমাকে ২০ হাজার টাকা দিলে হবে। মেয়েটিকে কোনো টাকা দেয়া লাগবে না। তাকে একেবারে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।

রুবেল কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে একটি পানির পাম্পে কাজ করার কথা দাবি করেন।
এসময় তিনি নিজের বাড়ি নোয়াখালী দাবি করেন। ওদিকে স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চক্রের কিছু কাজের আলামতও মিলে। শুধু শিশু না, ভবঘুরে ছিন্নমূল কিশোরী, তরুণীদেরও নানা কাজে ব্যবহার করে রুবেলসহ একাধিক চক্র। তাদের ভয় ও লোভ দেখিয়ে নানা অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এমন একজন কিশোরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, রুবেল ভাই আমাকে যেতে বলেছে। আর বলেছে আমি যেন গিয়ে ঠিকমতো কথা শুনি, যদি কথা না শুনি তাহলে কমলাপুরে দেখলে খারাপ হবে। এরচেয়ে আর বেশি কিছু বলেনি। কিশোরীটি বলে, আমার সৎমা ধরে আমাকে মারতো। নিজের মা আরেক জনকে বিয়ে করেছে। কিছু চাইলে ঠিকমতো দিতে চাইতো না। স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারতাম না। বই-খাতা কিনতে চাইলে কিনে দিতো না। এরপর অল্প বয়সে বাড়ি থেকে ট্রেনে করে চলে আসি কমলাপুরে। এখানে এসে থাকা শুরু করি। নিজের বলতে এখানে কেউ নেই। যখন আমার ৭ থেকে ৮ বছর বয়স তখন আসি। আমার বাড়ি রংপুর। সাত বছর ধরে থাকি। বাড়ি থেকেও কখনো কেউ খোঁজ নেয়নি। কিশোরীটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা ও সুঁচের চিহ্ন দেখা যায়। এসব কী জানতে চাইলে সে বলে এখানে থাকা প্রায় সবাই মাদক গ্রহণ করে, নেশা করে।

আরেক কিশোরী বলে, একেবারে ছোটবেলায় চলে আসি। রাজশাহী আমাদের গ্রামের বাড়ি। এই জগতটা আর ভালো লাগে না। অনেক ঘটনা ঘটে এই কমলাপুরে। নতুন বা পুরাতন যেই আসুক মানুষের মোবাইল ছিনতাই হয়। যাত্রীদের ব্যাগ ছিনতাই হয়। অনেকে অনেকভাবে খারাপ কথা বলে। ব্লেড দিয়ে হাত-পা কাটি। শরীরে ড্রাগ নেই, এতে নেশা হয় সব ভুলে থাকি। কখনো কখনো কষ্টে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাই। এখানে আসার পর মানুষ আর ভালো থাকতে দেয়নি। এই কিশোরীও রুবেলের কথামতো কাজ করে বলে জানায়।

২৩ বছরের আরেক তরুণ বলেন, আমার জন্মই কমলাপুর। বাবা-মা গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসে। এখন তাদের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ তেমন নেই।
আমার কোনো বাড়িঘর নেই এই কমলাপুরই সব। আমি বাইরে কোথাও ভিক্ষা করতে গেলেও কমলাপুরের কথা আমার চোখে ভাসে। এই রেলস্টেশন আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। আমার অনেক কষ্ট আছে সেজন্য আমি এলাকায় যাই না। আমি আমার মা-বাবা ছাড়া কাউকে চিনি না। করোনার সময় মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে আর হয়নি। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়লে এক জায়গায় বসে কান্নাকাটি করে নিজের দুঃখ নিজের কাছে বলি। এই কমলাপুরই আমার ভালোবাসা। এখানে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়াও বিভিন্ন কাজ করি, তাতে প্রায় ৭-৮ শত টাকা আয় হয়।

স্টেশনে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায়ই অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসে। শুধু তাই নয় ছোট ছোট শিশুরাও আসে। আবার বিভিন্ন ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে পড়ে মেয়েরা এখানে আসে। পরে মেয়েটাকে ফেলে রেখে চলে যায়। এসব মেয়েরা আর ফিরে যায় না পরিবারের কাছে। অনেক ছেলে-মেয়ে আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করে আসে। কেউ সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে আসে। এখানে অনেকে অভাবের কারণে নিজের বাচ্চা বিক্রি করে দিতে শুনেছি। যাদের বাচ্চার প্রয়োজন হয় তারা মোবাইল নাম্বার দিয়ে যায়।
বারবার নাম জানতে চাইলেও নিজের নামটি বলতে চাননি এ তরুণ। তিনি বলেন, এখানে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই। আমার মতো যারা থাকে তাদের কেউ ভালো, কেউ খারাপ। তবে কমলাপুর সবারই ঠিকানা।

mzamin