Showing posts with label ভুটান. Show all posts
Showing posts with label ভুটান. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু: ভুটান কি যুব-ভূমিকম্প টের পাচ্ছে? by নামগে জাম

কুয়েন্সেলের নিবন্ধঃ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বিশাল মঞ্চে টেকটোনিক পরিবর্তন ঘটছে। ঢাকা শহরের বর্ষামাখা রাস্তাগুলো থেকে শুরু করে কাঠমান্ডুর উঁচু উপত্যকা পর্যন্ত এক প্রজন্ম-নির্ধারণ করে দেয়া কম্পন অনুভূত হচ্ছে। এটি এক ‘যুব-ভূমিকম্প’ (ইয়ুথ আর্থকোয়েক)। এটা যুব প্রজন্মের ডিজিটালপ্রজন্ম নাগরিকদের চালিত এক ভূমিকম্পের মতো ঢেউ। এই যুব সমাজ আর স্থিতাবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন নাটকীয় গণআন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দেয়। নেপালে চলমান সংস্কার আন্দোলনও কোনো বিচ্ছিন্ন ঝড় নয়। বরং এগুলো গভীর আঞ্চলিক রূপান্তরের ইঙ্গিত, যা হিমালয়ের ওপার থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি দেশের জন্য শিক্ষার বার্তা নিয়ে, আমাদের স্নেহের ড্রাগন কিংডম ভুটানসহ।

ভুটানের জন্য, যা তার স্থিতিশীলতা ও অনন্য উন্নয়ন দর্শনের জন্য পরিচিত, এসব ঘটনা আতঙ্কের কারণ নয়। বরং এগুলো আমাদের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিগুলো মেনে এসেছে- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব, তার শক্তিশালী স্বীকৃতি। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা এসব অস্থিরতা থেকে মুক্ত কিনা তা নয়; বরং আমরা কি আমাদের প্রতিবেশী রাজধানীগুলোর রাস্তায় লেখা শিক্ষাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছি?

ঢাকার প্লাবন: ভেঙে যাওয়া আস্থার কেস স্টাডি
আঞ্চলিক পরিবর্তনের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে প্রথমে তাকাতে হবে বাংলাদেশের দিকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো দশক ধরে অধ্যয়ন করা হবে। যা শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ছাত্র প্রতিবাদ দিয়ে, তা অবিশ্বাস্য গতিতে রূপ নেয় দেশব্যাপী আন্দোলনে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় সরকারের পতনের আন্দোলনে। কোটার ইস্যু ছিল কেবল স্ফুলিঙ্গ; মূলত এটি ছিল এক প্রজন্মের ক্ষোভের বিস্ফোরণ- একটি ব্যবস্থা, যা তাদের কাছে অস্বচ্ছ, জবাবদিহিতাহীন ও অন্যায্য মনে হয়েছিল।

বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দায়মুক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তরুণদের আকাঙ্ক্ষার ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ জমে উঠছিল। ছাত্ররা কেবল চাকরি চাইছিল না; তারা চাইছিল সমান সুযোগ, যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার সম্ভব হয়েছিল ডিজিটাল টুলসের কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের স্নায়ুতন্ত্র, যা বাস্তব সময়ে সংগঠন ও গতিশীলতা তৈরি করেছিল। এ ঘটনা নতুন বাস্তবতা তুলে ধরল: আজকের দিনে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- ডিজিটালি সংযুক্ত তরুণদের আস্থা হারিয়ে ফেলা। ঢাকার শিক্ষা স্পষ্ট: সুশাসনের ভিত্তি যখন ভেঙে পড়ার মতো মনে হয়, তখন রাজনৈতিক ভূমিকম্প দ্রুত ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

কাঠমান্ডুর ঐকমত্য: স্থায়ী সংস্কারের আহ্বান
বাংলাদেশের ঘটনাগুলো ছিল আকস্মিক প্লাবন; আর কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হলো পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী স্রোত। ‘জেনারেশন জেড আন্দোলন’ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি হলো এক বিপ্লবী আহ্বান। দশকের পর দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ তরুণ নেপালিরা এবার রাস্তায় নেমেছে স্পষ্ট বার্তা নিয়ে: তারা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির মৌলিক পুনর্গঠন চায়।
তাদের ক্ষোভ কোনো একক নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তারা দায়মুক্তির অবসান, স্বজনপ্রীতির বদলে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাপূর্ণ সরকার দাবি করছে। এই আন্দোলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- গণতন্ত্র কেবল ভোট দেয়া নয়; বরং এটি প্রতিদিনের সুশাসনের চর্চা। তরুণরা গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করছে না; তারা চাইছে এর একটি উন্নত সংস্করণ- যেখানে জনসেবা দায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থলাভের সুযোগ নয়।

ভুটানের আয়না: আতঙ্ক নয়, আত্মপ্রত্যয়
ভুটানের জন্য সবচেয়ে সহজ, কিন্তু মারাত্মক ভ্রান্তি হবে আঞ্চলিক ঘটনাগুলোকে দূর থেকে উদাসীনভাবে দেখা। আমাদের রাজতন্ত্রের প্রজ্ঞায় পরিচালিত স্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের ঈর্ষার বিষয়। আমাদের মোট জাতীয় সুখ দর্শন আমাদের জাতীয় সত্তায় সুশাসন, ন্যায় ও সাম্যের নীতিকে প্রোথিত করেছে।
তাই ঢাকার প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি আমাদের কাছে ধ্বংসের সতর্কবার্তা নয়; বরং এগুলো আমাদের বেছে নেওয়া পথের বহিঃস্বীকৃতি। এগুলো আয়নার মতো আমাদের অর্জনের মূল্য এবং এগুলো রক্ষা করার অপরিসীম গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিরতা বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে- যখন ভুটানের লালিত নীতিগুলো ক্ষয়ে যায়, তখন কী ঘটে।

আত্মতুষ্টি কোনো বিকল্প নয়
আমাদের প্রজ্ঞা স্বীকার করা কেবল প্রথম ধাপ। আঞ্চলিক যুব-ভূমিকম্প থেকে প্রকৃত শিক্ষা হলো- সুশাসন কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই বর্তমান সরকারসহ ভবিষ্যতের প্রতিটি সরকারকে সক্রিয়ভাবে শুনতে হবে।
প্রথমত, আমাদের নিজেদের তরুণদের কথা শুনতে হবে। চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক একসময় বলেছিলেন: ‘দেশের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের হাতে।’ এই কথাটি আজও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিশারী। ভুটানের তরুণরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, বৈশ্বিকভাবে সচেতন এবং ডিজিটালি সংযুক্ত। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা-বিচার বিভাগ, সিভিল সার্ভিস, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া- ভুটানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংলাপ হচ্ছে।

আমাদের প্রশ্ন করতে হবে:
সংলাপের চ্যানেলগুলো কি খোলা ও কার্যকর? তরুণরা কি মনে করে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে?
দ্বিতীয়ত, আমাদের মূল নীতিগুলো রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংস্থার প্রতি অক্লান্ত সমর্থন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জবাবদিহিতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি দৃশ্যমান হতে হবে। যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তখন এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে আইনের শাসন পরম। যখন সরকারের সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ হয়, তখন এটি হতাশার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা তৈরি করে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল যুগে স্বচ্ছতা আর ঐচ্ছিক নয়। তথ্য অবাধে প্রবাহিত হয়, নাগরিকদের কাছে নেতাদের খতিয়ে দেখার আরও বেশি উপায় আছে। অস্বচ্ছভাবে কাজ করার যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারকে অবশ্যই নতুন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করতে হবে- নীতিমালা ব্যাখ্যা করে জানানো, সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোলামেলা থাকা, চ্যালেঞ্জ স্বীকার করা। যে সরকার তার জনগণের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়, সেই সরকারই আস্থা অর্জন করে।

উপসংহার
ঢাকা থেকে প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হুমকি নয়, বরং এক গর্জন তোলা শিক্ষা। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে জাতীয় স্থিতিশীলতার অপরিহার্য উপাদান। মনোযোগ দিয়ে শুনে, এই মূল্যবোধগুলোতে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করে এবং জনগণের- বিশেষ করে তরুণদের- আস্থা ক্রমাগত অর্জন করে ভুটান নিশ্চিত করতে পারে যে ‘যুব-ভূমিকম্প’ আমাদের কাছে গবেষণার বিষয় থাকবে, অভিজ্ঞতার নয়। আমাদের স্থায়ী শান্তি এর ওপরই নির্ভর করছে।

(লেখক: নামগে জাম (এলএলএম), ইউনেস্কো মাদঞ্জীত সিং সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ (ইউএমএসএআইএলএস), এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ) 

mzamin

Monday, February 17, 2025

সেভেন সিস্টার্স নিয়ে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা

নেপাল বারবার বলছে, আমাদের নিয়ে যাও, আমরা এক পায়ে খাড়া নেয়ার জন্য। কিন্তু মাঝখানে ওইটুকু পথ অতিক্রমের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। নেপালের যে অবস্থা, ভুটানের যে অবস্থা, ভারতের সেভেন সিস্টার্সেরও একই অবস্থা বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনের নৈশভোজে অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন,  দুই পাশে দুই মহাশক্তি আমাদের। ভারত আর চীন। তারা দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। আমরা যেহেতু মাঝখানে আছি, আমাদের ফেলে যেতে পারবে না। তাদের বাতাসে আমরাও উড়তে থাকব। সেই থেকে আমার বদ্ধমূল ধারণা, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অতি চমৎকার তার অবস্থানের কারণে।

তিনি বলেন, ‘তখন দুই মহাশক্তির কথা বলেছিলাম, এখন আর দুই মহাশক্তির কথা বলি না। এখন চার মহাশক্তি। আমাদের অপূর্ব সুযোগ। আমাদের সামনে বিস্তীর্ণ মহাসাগর। আমাদের উপকূলভূমি সাগরের সঙ্গেই লাগোয়া উপকূল। এটি একটি মস্তবড় সুযোগ। পৃথিবীর দরজা আমাদের সামনে খোলা। আমরা এতদিন এটি ব্যবহার করতে জানিনি। এখন যেই মুহূর্তে এর ব্যবহার শুরু করব, আমাদের অর্থনীতিকে লোহার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলেও, বেঁধে রাখতে পারবে না।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের উত্তরে সেই বিখ্যাত হিমালয় পর্বতমালা, যেখানে জমে আছে যাবতীয় শক্তি—হাইড্রো পাওয়ার। আমাদের কত শক্তি দরকার, সব ওখানে জমা আছে, হারিয়ে যাচ্ছে না। শুধু নেয়ার অপেক্ষায়, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির অপেক্ষায়, যাতে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে যে দূরত্বটুকু আছে, তা অতিক্রম করা যায়।

ড. ইউনূস বলেন, ‘নেপাল বারবার বলছে, ‘আমাদের নিয়ে যাও, আমরা প্রস্তুত’। কিন্তু মাঝখানে ওইটুকু পথ অতিক্রম করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আশা করি, তাদেরই অর্থনৈতিক কারণে তারা আমাদের সেই সুযোগ দেবে। এটা সবার মঙ্গলের জন্য। আমরা মহাসৌভাগ্যবান এক জাতি আমাদের অবস্থানের কারণে। তাহলে এই জাতির দুঃখ কেন থাকবে? এটা কি আমাদের কপালের দোষ, চরিত্রের দোষ, নাকি চিন্তার দোষ? যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো থেকে মুক্ত হতে হবে। আমরা তড়িৎ গতি এগিয়ে যেতে চাই। এটি মহা শক্তিধর অর্থনীতি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ‘আজ কুমিরা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত যে উপকূলভূমি রয়েছে, সেখানে যদি কাতারে কাতারে সব নৌবন্দর স্থাপন হয়, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যদি বিশ্বের সব জাহাজকে আশ্রয় দেওয়া যায়, তাহলে আমাদের আটকাবে কে?

“আমাদের উত্তরে নেপাল। তাদের সৌভাগ্য, তারা হিমালয় পর্বতের পাদদেশে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো তারা সমুদ্রের দেখা পায় না। তাদের সমুদ্র দেখতে হলে আমাদের মাধ্যমে দেখতে হবে।”

তিনি বলেন ‘‘ভুটানের অবস্থাও একই। তাদেরও সমুদ্র দর্শনের সুযোগ নেই। তাদের সমুদ্র দেখতে হলে আমাদের মাধ্যমে আসতে হবে। তেমনিভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চল—সেভেন সিস্টার্স—তাদের অবস্থাও একই। তাদের সমুদ্র দর্শন হয় না।

‘‘আমরা একসঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পারি। আমাদের সমুদ্রবন্দর দিয়ে তাদের মালামাল আনা-নেয়া হবে, আমাদের মালামালও চলবে। এতে আমাদের অর্থনীতি এবং তাদের অর্থনীতি একসঙ্গে সমৃদ্ধ হবে।”

mzamin

Thursday, November 14, 2024

জলবিদ্যুৎ ভাগ করার জন্য দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরির আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

নেপাল ও ভুটানের উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ ভাগ করে নেয়ার জন্য একটি দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার বাকুতে জলবায়ু সম্মেলনের সাইডলাইনে সোশ্যাল বিজনেস গ্রুপের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো এক বার্তায় বিষয়টি জানানো হয়েছে।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে সংযোগকারী বিদ্যুতের গ্রিডের অভাবে হিমালয় দেশগুলোর বেশিরভাগ জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নেপালের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, দেশটির ৪০,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারত ও বাংলাদেশের মতো বড় দেশগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সহজেই নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনতে পারে, কারণ এটি বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে। নেপালের জলবিদ্যুৎও সস্তা হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানকে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রিড তৈরি করার কথা ভাবতে হবে।

জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বন্যারোধে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে, পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পানি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, পানি আমাদের প্রধান পরিবেশগত সমস্যা। আমাদের এমনভাবে পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে যাতে এটি প্রকৃতিকে সমর্থন করে।

অন্তর্বর্তী সরকার যুব উন্নয়ন ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সরকার জানুয়ারিতে তরুণদের জন্য একটি উৎসবের আয়োজন করবে। যখন দেশের ক্রিকেট বোর্ড তার বার্ষিক টি-টোয়েন্টি বিপিএল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করবে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং আইওসি প্রেসিডেন্ট টোমাস বাখ উৎসবে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নারী ফুটবলের জন্য একটি টুর্নামেন্টেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেশের সব জায়গায় উৎসব করার চেষ্টা করছি।

অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কেও কথা বলেন, যা শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ বর্বর স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। তিনি কপ২৯-এর মূল বিষয় এবং কার্বন ক্রেডিট নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আলোচনার বিষয়েও কথা বলেছেন।

mzamin

Saturday, September 7, 2024

ভুটানে দ্বিতীয় ম্যাচেও জয় চায় কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া বাংলাদেশ

প্রথম প্রীতি ম্যাচে জয় পেলেও শিষ্যদের পারফরমেন্সে মন ভরেনি কোচ হাভিয়ের কাবরেরার। তবে ভুটানের প্রতিকূল কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জয় পাওয়ার আত্মবিশ্বাস জন্মেছে ফুটবলারদের মনে। একইসঙ্গে কাটানো গেছে ২০১৬ সালের সেই হারের ভয়ও। তপু বর্মণের কথায় তারই প্রতিধ্বনি। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেও জয় চাইছেন ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। থিম্পুর চ্যাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে আগামীকাল ভুটানের বিপক্ষে দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে শেখ মোরসালিনের একমাত্র গোলে জয় পায় হাভিয়ের কাবরেরার দল।

প্রথম ম্যাচের পরই রাকিব হোসেনের চোট কাটিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে খেলা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন কাবরেরা। গতকাল অনুশীলনে রিকভারির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানালেও রাকিবকে নিয়ে পরিষ্কার করে কোনো কথা বলেননি ম্যানেজার আমের খান। গতকাল এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ১০-১২টা পর্যন্ত রিকভারি সেশন ছিল। ফান, গেমস, যেগুলো করলে মানসিকভাবে ছেলেরা ভালো বোধ করে, সেগুলো করা হয়েছে।

রাকিব গতকাল চোট পেয়েছে, তার চিকিৎসা চলছে।’ ২০১৬ সালে চ্যাংলিমিথাংয়ের টার্ফেই এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে ৩-১ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। ওই হারে প্রায় দুই বছর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দূরে ছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। আমের খান বলেন, ‘সবার মধ্যে একটা টেনশন কাজ করছিল, প্রথম ম্যাচ, অনেক দিন পর খেলা, ভুটানের এ মাঠে আগের একটা অভিজ্ঞতা ছিল, যেটায় আমরা ভালো ফল করতে পারিনি। সেখান থেকে সব দুঃশ্চিন্তা দুর করে একটা গোল দিয়ে যে ধরে রাখতে পেরেছি, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ পঞ্চম মিনিটে করা মোরসালিনের গোলটি আগলে রেখে প্রথম প্রীতি ম্যাচে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। এই জয়ে খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তির সঙ্গে আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে জানিয়ে ওই ম্যাচের অধিনায়ক ডিফেন্ডার তপু বর্মণ বলেন, ‘আমাদের যে লক্ষ্য ছিল, কোচের যে দর্শন ছিল, আমার মনে হয় আমাদের টিম ওয়ার্ক ভালো ছিল এবং সেটা আমরা প্রয়োগ করতে পেরেছি (প্রথম প্রীতি ম্যাচে)। দেখুন, আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি।’ আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাত দিন আগে ভুটান পৌঁছায় বাংলাদেশ দল। সেটা দারুণ কাজে এসেছে জানিয়ে তপু বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি উপকার পেয়েছি এখানে সাত দিন আগে আসায়। আবহাওয়ার সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পেরেছি। পরিকল্পনা মোতাবেক খেলতে পেরেছি। আমাদের কালকের ম্যাচটা যদি দেখেন, আমরা কোনো তাড়াহুড়ো করিনি। আমার মনে হয়, কাল আমাদের জয়ের জন্য এটা বড় ভূমিকা রেখেছিল।’ দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচেও জয়ের ধারায় থাকতে চান তপু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ভুটানের উচ্চতা, ঠান্ডা- এসব প্রতিকূল কন্ডিশন দলের লক্ষ্য পূরণের পথে অন্তরায় হতে পারবে না, দৃঢ় কণ্ঠে অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমাদের এখন জয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এরই মধ্যে এখানে আমরা মানিয়ে নিয়েছি। প্রথম ম্যাচ কঠিন ছিল, এরই মধ্যে সেটা জিতেছি। মানসিকভাবে আমরা এখন চাঙ্গা। প্রতিটি খেলোয়াড় আত্মবিশ্বাসী। এটা পরের ম্যাচের জন্য জরুরি। আমার মনে হয়, আমরা যদি একই কাজ (করতে পারি), একই নিবেদন নিয়ে মাঠে নামি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা জিতবো।’

Friday, September 27, 2019

যানজটের দুর্ভোগে পড়েছে ‘সবুজ ও সুখী’ ভুটান by নিদুপ গায়েলশেন

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপরে গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসকে স্থান দেয়ার কারণে বিখ্যাত ভুটান টেকসই উন্নয়নের একটা আদর্শ উদাহরণ।

কিন্তু কার্বন নেগেটিভ দেশ হিসেবে ভুটানের যে অবস্থান রয়েছে, গাড়ি বিক্রি বাড়তে থাকায় সেটা হুমকির মুখে পড়েছে। সেই সাথে রাস্তায় গাড়ির জ্যাম বাড়তে থাকায় ভুটানের নাগরিকদের মানসিকতাও একটা পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেছে।

গত দুই দশকে ভুটানে প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকের সংখ্যা পাঁচগুণের বেশি বেড়েছে। পরিবহন কর্তৃপক্ষের ডিরেক্টর জেনারেল পেমবা ওয়াংচুক এ তথ্য জানিয়ে আরও বলেন, যানবাহনের এই বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে রাজধানী থিম্পু।

মিডিয়া কনসালটেন্ট ফুন্তশো ওয়াংদি বলেছেন, এই যানজট ও পার্কিংয়ের সমস্যার কারণে ক্ষুদে এই হিমালয় রাজ্যে গাড়ি চালানোটা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যেখানে কোন ট্রাফিক সিগন্যাল নেই।

তিনি আরও বলেন, “আরও কম গাড়ি হলে ভালো হতো, আগে এ রকম ছিল না”। দেশের অর্ধের গাড়িই চলাচল করছে এই রাজধানীতে।

বিশ্ব ব্যাংকের মতে, গত দশকে দেশের অর্থনীতি প্রতি বছর ৭.৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। কর্মকর্তারা দেখেছেন, প্রতি সাতজন ভুটানিজের জন্য এখন একটি করে গাড়ি রয়েছে, যেখানে পুরো দেশের জনসংখ্যা হলো সাড়ে সাত লাখ।

কিন্তু দেশের সংকীর্ণ গ্রামিণ সড়ক এবং শহরের মেয়াদোত্তীর্ণ রাস্তাঘাটগুলো আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না। অবকাঠামোর অভাবের পাশাপাশি দুর্বল ড্রাইভিং নিয়ম নীতির  কারণে সমস্যা বহুগুণে বেড়ে গেছে। অনেকে এমনকি সড়কের প্রায় মাঝখানে গাড়ি পার্ক করে রাখেন।

ট্যাক্সি ড্রাইভার লেন্দুপ এএফপিকে বলেন, “প্রতি বছর গাড়ির সংখ্যা আর মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু রাস্তাঘাট আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। এখন এটা একটা সমস্যা হয়ে গেছে”।

সকালের ব্যস্ত সময়ে যে দূরত্ব এক সময় পাঁচ মিনিটে যাওয়া যেতো, এখন সেখানে আধা ঘন্টার বেশি সময় লাগে।

ভুটান আর সুরিনামের ব্যাপক বনাঞ্চল রয়েছে এবং পৃথিবীর এই দুটি দেশই কেবল নিজেদের কার্বন নেগেটিভ দাবি করতে পারে। যতটুকু কার্বন তারা তৈরি করছে, তার থেকে বেশি শুষে নিচ্ছে।

গরুর মিথেন, শস্য পোড়ানো এবং অন্যান্য খামারভিত্তিক কর্মকাণ্ড ছিল মূলত ভুটানের গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রধান উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্প ও গাড়ির বিকাশের কারণে সেই চিত্র বদলে গেছে।

ভুটানের সংবিধানে বলা হয়েছে যে, দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ বনাঞ্চল থাকতে হবে। বর্তমানে এই বনাঞ্চল রয়েছে ৭০ শতাংশের উপরে।

কিন্তু ভুটান বর্তমানে ভারতের কাছে যতটুকু জলবিদ্যুৎ রফতানি করে, তার চেয়ে বেশি ফসিল জ্বালানি তারা আমদানি করছে।

সরকারী পরিবহন ব্যবস্থা এখনও দুর্বল, বিশেষ করে থিম্পুতে। প্রায় এক লাখ মানুষ বাস করছে থিম্পুতে কিন্তু সেখানে বাস রয়েছে মাত্র ৪০টি।

রাজধানীর মেয়র কিনলে দর্জি পরিকল্পনা নিয়েছেন নগরীতে শুধুমাত্র বাসের জন্য লেন চালু করা হবে এবং আরও বাস কিনবেন তিনি।

তিনি বলেন, “বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে এখন”।

তিনি আরও বলেন, “সরকারী পরিবহনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে আমাদের এবং গাড়ি কেনাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে”। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, থিম্পুতে যদি এই সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে অচল শহরে পরিণত হবে এটা।

এই জট সহজ করতে শহর কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো দুটো বহুতল কার পার্ক নির্মাণ করতে যাচ্ছে, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে ৬০০টি গাড়ি রাখা যাবে।

ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট কমিশন জোর দিয়ে বলছে যে, ভুটান এখনও কার্বন নেগেটিভ রয়েছে যদিও ট্রাফিক জ্যাম ও যানবাহন বেড়েছে। তবে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়া ঠেকাতে চান তারা।

কমিশন সেক্রেটারি দাশো সোনাম পি ওয়াংদি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে: “আমরা জনগণকে গাড়ি কেনা থেকে বিরত রাখতে পারি না, কিন্তু আমরা বিকল্প চালু করতে পারি, কম দূষণীয় গাড়ি যেমন হাইব্রিড বা ইলেকট্রিক কার, যাতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা যায়”।

Sunday, September 22, 2019

ভুটানের সুখের মন্ত্র ও মূল্যবোধ-ভিত্তিক শিক্ষা by জুলফিকলি আব্দুল রাজাক

একটি রোড সাইনে লেখা “৫০ কিমি/ঘ. গতিসীমা মেনে চলুন”। আরেকটিতে লেখা “তাড়াহুড়া করলে উদ্বেগে পড়তে হবে।” পৃথিবীর বুকে শেষ সাং-গ্রিলা – ভুটানে স্বাগতম। বিশ্বের একমাত্র কার্বন নেগেটিভ দেশটি বলে দিচ্ছে তারা দেশের পরিবেশকে ধরে রাখতে আর “সুখী” থাকতে কতটা ব্যাকুল।

এই ধারণার ইতিহাস ঘাটতে হলে ১৬২৯ সালে ফিরে যেতে হবে, যখন এই “সুখ” ভাবনার উদ্ভব। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাবদ্রুং নাগাওয়াং নামগিয়াল নামে এক লোক বলেছিলেন: সরকার যদি প্রজাদের সুখ দিতে না পারে তাহলে সেই সরকার থাকার কোন মানে হয় না।

কি সত্যি কথাই না তিনি বলেছিলেন! আজকের প্রেক্ষাপটে এর প্রতিটি অক্ষর সত্যি।

এই ক্ষুদ্র ও লোক চক্ষুর আড়ালে থাকা রাষ্ট্র ভুটান ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে এক সাহসী ঘোষণা দেয়: “গ্রোস ন্যাশনাল প্রডাক্ট (জিএনপি) থেকে গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” এটা অনেককে অবাক করেছে। ওই গভীর নীতিমালাটি অনেকে বিস্মৃত হলেও বাকি বিশ্ব পরবর্তীতে সেখানেই ফিরে গেছে।

সন্দেহ পোষণ না করলেও জিএনএইচ ধারণাকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেন অনেকে। কেউ কেউ বলেন হাস্যকর। কিন্তু ভুটান তার কথায় অটল ও দৃঢ় থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৮ সালের সংবিধানে ৯ নং ধারায় গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করা হয়: ন্যাশনাল গ্রোস হ্যাপিনেসের অভিষ্ঠ লক্ষ্য হাসিল করতে পারবে এমন পরিবেশ জোরদারের চেষ্টা করবে রাষ্ট্র।

২০০৮ সালেই ভুটানে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার গঠিত হয় এবং তারা জিএনএইচ রক্ষার অঙ্গীকার করে। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য ধ্বংসকারী বিশ্বায়নের কুফলগুলো থেকে দেশকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়।

দেশের রাজপরিবার থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সবকিছুতে এর প্রমাণ মেলে। কাউকে হিমালয় পর্বতমালার কোন চূড়ায় উঠতে দেয়া হয় না। এগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়।

অনেকটা তরুণ ৩৯ বছর বয়সী রাজা জিগমে খেসার নামগিয়ার ওয়াংচুকের মতে: জিএনএইচ সার্বিকভাবে একটি দেশের মান পরিমাপ করে। এটা বিশ্বাস করে যে কোন দেশের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন পাশাপাশি ঘটলেই মানব সমাজের জন্য সেটা হবে উপকারী উন্নয়ন। এই উন্নয়ন হবে পরস্পরের জন্য সম্পূরক ও শক্তিবর্ধক।

অন্য কথায় এটা হলো মধ্যমপন্থা যা প্রতীচ্যের বিজয়ী দর্শন এবং জীবন ব্যবস্থা।

দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে জিএনএইচ মানে হলো – উন্নয়নের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বিক ধারণা। তার সেই বিবৃতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এ ব্যাপারে রাজা বলেন, জাতীয় সচেতনতা আমাদেরকে (ভুটানিদের) একটি উন্নততর ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে চালিত করে।

আর সে কারণেই রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভুটানের পারো কলেজ অব এডুকেশনের গবেষণা হচ্ছে জিএনএইচ-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। এর লক্ষ্য হলো দয়া, সাম্য, সহানুভুতি ও মানবতার মতো নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বস্তুগত উন্নয়নের সেতুবন্ধন রচনা।

মানুষের সত্যিকারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের মানুষ তৈরি এর লক্ষ্য। কোন মানব পুঁজি তৈরি এর লক্ষ্য নয়।

দেশটির জাতীয় শিক্ষা দর্শনে এই আকাঙ্ক্ষাগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে, যাতে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসঙ্গত মানব লালনের কথা বলা হয়েছে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, জিএনএইচ এমন মানুষ তৈরি করবে যারা বিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে চিন্তাশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মনন সম্পন্ন হবে, লোভ ও অত্যধিক কামনা থেকে মুক্ত হবে।

আসলে মনযোগ অনুশীলন করাই দেশটির মন্ত্র যা ভুটানকে জাগ্রত ও শালীন করে রেখেছে। তাই দেশটি এই গ্লোবালাইজড বিশ্বের কাছে অনুকরণীয়।

>>>লেখক ইউনিভার্সিটি সাইন্স মালয়েশিয়ার সেন্টার ফর পলিসি রিসার্স এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফেলো।

Sunday, September 8, 2019

ভুটানের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ by লুই জুড সেলভাদোরে

ভুটানের সরকার সম্প্রতি যে নীতি ঘোষণা করেছে তা বাস্তবায়িত হলে দেশটির শিক্ষক, চিকিৎসক ও অন্যান্য চিকিৎসা স্টাফ বেসামরিক কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি উপার্জন করবেন। নতুন বেতন স্কেল প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষক ও চিকিৎসকের জন্য কল্যাণকর হবে। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। অন্য কোনো দেশ সম্মানি ও প্রতীকীভাবে তাদের সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের এমন গর্বের স্থানে রাখেনি। উল্লেখ্য, প্রস্তাবটির উত্থাপনকারী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং নিজে একজন পাস করা চিকিৎসক। ফলে পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই নীতির প্রস্তাব করা হয়েছে, বলা যায়।
উদ্দীপনা না উদ্ভট?
আসুন আমরা নীতিটির শিক্ষাগত দৃশ্যপট থেকে পরীক্ষা করি যে প্রস্তাবটি একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশবিশেষ নাকি উদ্দীপ্ত এই প্রস্তাবটির আসলে কার্যকারিতা তেমন থাকবে না?
প্রস্তাবটির রেশ পাওয়া যাবে ভুটানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস কমিশনের দ্বাদশ পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৮-২৩)। ‘শিক্ষাকে একটি পছন্দ করে নেয়ার বিষয়’ হিসেবে মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশটির মানব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিক্ষকের ঘাটতি থেকে, বিশেষ করে সর্বোত্তম শিক্ষক না পাওয়ার কারণ থেকে। স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ভয়াবহ রক্তক্ষরণ বন্ধ করার প্রতিষেধক হিসেবে ভুটান সরকার এ নীতি গ্রহণ করতে চাচ্ছে।
সহজাতভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ভুটান সরকার একটি পেশায় সেরা প্রতিভাদের আকৃষ্ট করতে যাচ্ছে। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষক পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি কি শিক্ষার ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারবে?
অর্গ্যানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ) একটি বিশ্বব্যাপী সমীক্ষা যা পঠন, গণিত, বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ছাত্রদের সক্ষমতা তুলনা করে। এর আলোকে সংস্থাটি দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার র‌্যাংক করে থাকে। অর্থনীতিবিদ পিটার ডোলটনের পরিচালিত একটি স্বাধীন সমীক্ষায় দেখা গেছে, পিআইএসএর নম্বর অনুযায়ী, ছাত্রদের ফলাফলের সাথে শিক্ষকদের মর্যাদার একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। গ্লোবাল টিচার স্টাটাস ইনডেক্স ২০১৮-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে ৩৫টি দেশের সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে উচ্চ বেতনের সম্পর্ক রয়েছে।
সরকার যে ক্ষেত্রে সাফল্য চায়, সেখানে নজর দিয়ে নীতি প্রণয়ন সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। ভুটানের নীতিটি বাস্তবায়িত হলে তাতে কী ফলাফল হয়, তা জানার জন্য কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে এ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা হতে হবে।
রাজস্ব সংশ্লিষ্টতা
ভুটান এখন তার জিডিপির ৭.৫ ভাগ ব্যয় করছে শিক্ষা খাতে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব কতটা হবে তা এখনো অস্পষ্ট। সাধারণভাবে শিক্ষকেরা সরকারি কর্মীতে একটি বড় অংশজুড়ে থাকে। ফলে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর আগে আর্থিকভাবে তা কতটা যৌক্তিক হবে, তা ভেবে দেখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষা খাতে ভারতের তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকা তামিল নাড়ুতে পেনশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটরত শিক্ষকদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ভারতীয় রাজ্যটির শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, রাজ্যের মোট ব্যয়ের ৭১ ভাগ ব্যয় হয় বেতন, পেনশন, প্রশাসনিক ব্যয় ও সুদ পরিশোধে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বাকি থাকে অতি সামান্যই।
ভারত কি একই ধরনের নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে?
ভারত বর্তমানে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৩ ভাগ ব্যয় করে থাকে। এটি কেন্দ্র ও রাজ্যের বাজেটের ব্যয়ের ১০ ভাগ। এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় বেতনে। গত বছরের নীতি আয়োগের এক প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, ভারত ২০২২ সাল নাগাদ জিডিপির ৬ ভাগে উন্নীত করা হবে। শিক্ষক ও চিকিৎসকদের বেতন ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে কঠিন কাজ। তবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো শিক্ষকদের নিয়োগ ও বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে তহবিল বরাদ্দ যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আর এই ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার সৃষ্টি করা হলে বিপুল সাশ্রয় হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে ভারতে অনুপস্থিতি প্রায় ২৪ ভাগ। এর ফলে দেশে প্রতি বছর ব্যয় হয় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। অনুপস্থিতির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আয় বাড়ানোর শিক্ষকদের আরেকটি চাকরি গ্রহণ বা কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকা, গৃহকর্মী বা সাহায্যকারী রাখতে না পারায় শিশুর পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত থাকা। কিংবা অনেকে যথার্থ উৎসাহ না পেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা প্রদান করতে পারেন না। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা হলে অনেক অপচয় বা দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, জাতীয় লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।
দিল্লি বা ছোট ছোট রাজ্যে এ ধরনের কার্যক্রম পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। দিল্লি সরকারের অন্যতম গুরুত্ব দেয়া ক্ষেত্র হলো শিক্ষা। দিল্লির রাজ্য সরকার তাদের বার্ষিক বাজেটের ২৬ ভাগ ব্যয় করে এই খঅতে। এটি জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। এই রাজ্যে শিক্ষা প্রশাসনও উন্নত করার প্রয়াস চলছে। রাজ্যটি মোটামুটিভাবে নগরকেন্দ্রিক হওয়ায় এখানে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক সহজ হয়।
পরিশেষে বলা যায়, একটি শিক্ষিত, স্বাস্থ্যকর, দায়িত্বশীল ও সুখী সমাজ সৃষ্টি করে এমন কোনো বিনিয়োগই কোনো সমাজেই খুব বেশি বিবেচিত হতে পারে না। ওইসিডির প্রতিবেদনে যথার্থ ভাবেই বলা হয়েছে, মানসম্পন্ন শিক্ষা হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচক। শিক্ষা খাতে অর্জনে ঘাটতির মূল্য হতে পারে চরম। সরকারকে এই ক্ষতি পূরণের উপায় বের এবং সবার জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করতেই হবে। সরকার যদি মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়, তবে তাকে নীতিপ্রণয়ন পর্যায়ে অবশ্যই বেতন বৃদ্ধির কাজটি করতেই হবে। সবচেয়ে মেধাবীদের এই খাতে আকৃষ্ট করার জন্য তাদেরকে সবচেয়ে বেশি বেতন দিয়ে তাদের মর্যাদা বাড়াতেই হবে। আর ভুটান বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে এই দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
>>>লেখক: কমিউনিকেশন্স কনসাল্টেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ

Saturday, September 7, 2019

প্রধানমন্ত্রী হয়েও চিকিৎসাসেবা দেন তিনি

নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহের শনিবার হাসপাতালে সেবা দেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। ছবি: এএফপি
সপ্তাহের শেষ দিন, শনিবার। ভুটানের জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে মূত্রথলির সফল অস্ত্রোপচার শেষ করে বেরিয়ে আসছেন একজন চিকিৎসক। আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ একটি দৃশ্য মনে হলেও, আদতে তা নয়। এই চিকিৎসক স্রেফ চিকিৎসক নন, দেশের প্রধানমন্ত্রীও। তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।
সপ্তাহের প্রতিটা দিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পালন করেন লোটে শেরিং। কিন্তু শনিবারের দিনটায় বাড়তি হিসেবে তিনি ফিরে যান নিজের প্রকৃত পেশায়। বনে যান পুরোদস্তুর একজন চিকিৎসক। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এ কাজ করেন তিনি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে লোটে শেরিং বলেন, ‘কাজের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমি সপ্তাহে এক দিন করে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা করি। এর জন্য কেউ গলফ খেলেন, কেউ আর্চারি খেলেন। আর আমি অস্ত্রোপচার করি। সপ্তাহের শেষ দিনটা আমি হাসপাতালে কাটাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি।’
চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন লোটে শেরিং। ঢাকা ও থিম্পুর মধ্যে আরও যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ওই সরকারি সফর করেন তিনি। লোটে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র।
প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজের মূল পেশাকে ছাড়তে পারেননি লোটে শেরিং। প্রতি শনিবার রোগীদের চিকিৎসা তো করেনই, বৃহস্পতিবার সকালে প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের পরামর্শও দেন দেশটির অন্যতম সেরা শল্যবিদ হিসেবে পরিচিত শেরিং। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দকৃত তাঁর অফিসের চেয়ারের পেছনেও তাঁর ল্যাব কোট ঝুলে থাকে সপ্তাহজুড়ে।
রাজধানী থিম্পুর ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন লোটে শেরিং। ছবি: এএফপি
কিন্তু কেন তিনি প্রতি সপ্তাহেই হাসপাতালে যান? এমন প্রশ্নের উত্তরে এএফপিকে শেরিং বলেছেন, নির্বাচনের আগে সাধারণ জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সেগুলো পূরণ করার তাগিদই তাঁকে প্রতি সপ্তাহে হাসপাতালে টেনে নিয়ে যায়।
স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে ভুটানের। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, শিশুমৃত্যুর হার কমে এসেছে অনেকটাই। অনেক ছোঁয়াচে রোগও দূর হয়েছে। কিন্তু তার পরও শেরিং বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে এখনো অনেক কিছু করার আছে তাঁর সরকারের। বিশেষ করে মদ্যপান ও ডায়াবেটিসের হার কমিয়ে আনাকে প্রাধান্য দিতে চান শেরিং।
লোটে শেরিংয়ের অস্ত্রোপচার করার দৃশ্য এখন হাসপাতালের বাকিদের কাছেও বেশ পরিচিত। বাংলাদেশ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নেওয়া শেরিং হাসপাতালের রোগীদের কাছেও এক আস্থার নাম। ৪০ বছর বয়সী এক রোগী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজে আমার অস্ত্রোপচার করেছেন। দেশের অন্যতম সেরা চিকিৎসক বলে তাঁর সুনাম আছে। তিনি আমার অস্ত্রোপচার করেছেন, এখন আমি নিশ্চিন্ত।’
লোটে শেরিং মনে করেন, রাজনীতি ও চিকিৎসা—দুটো পেশাতেই বেশ মিল আছে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আমি রোগীদের পরীক্ষা করি, চিকিৎসা করি। রাজনীতিতেও আমাকে সরকারি নীতিগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোর চিকিৎসা করতে হয়, যাতে সেগুলো আরও উন্নত হয়ে ওঠে।’
৫০ বছর বয়সী লোটে শেরিং ২০১৩ সালে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন। কিন্তু সেই বছর নির্বাচনে জিততে পারেননি তিনি। পরে গত তিনি বছর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের দেশ ভুটানে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসান হয়। এরপর অনুষ্ঠিত তৃতীয় নির্বাচনে জিতে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন লোটে শেরিং।
হাসপাতালের রাউন্ডে এসে রোগীদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন লোটে শেরিং। ছবি: এএফপি

Saturday, August 31, 2019

শুধু ভুটানেই সম্ভব: ইনিই প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং যিনি তার হাত ময়লা করছেন

আমরা প্রায়ই দেখি বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে রাজনীতিকরা আসেন। আর পরিচ্ছন্নতা কাজে অংশ নেয়ার নামে লোকদেখানো ভাবভঙ্গী করেন। কিন্তু ছবির মতো সাজানো হিমালয়ান রাজ্য ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সততার এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা সবার অনুসরণ করা উচিত।

সামাজিক গণমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো কিছু হৃদয় জয় করা ছবিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং তার হাত ময়লা করছেন, আক্ষরিকভাবেই, নিজের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনি কাজটি করছেন। ছবিগুলো মনকাড়া, এবং অবশ্যই তা হওয়া উচিত।

এমন একটি ছবিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী ডোবা থেকে গাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন। আরেক ছবিতে দেখা যায় তিনি পাহাড়ের পাদদেশে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া গাছ ও ডালপালা সরাচ্ছেন।

এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে আরো অনেকের সঙ্গে লোটে শেরিং যোগ দিয়েছেন। মাটিতে নেমে এসে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন কাজ তিনি এবারই প্রথম করেননি।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে তাকে স্টেডিয়ামের সাধারণ দর্শকের সারিতে বসে ভুটানি দলের ফুটবল খেলা দেখে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। সাধারণ বেশে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি তার দলকে বিপুলভাবে অনুপ্রাণীত করে। এই ছবি নেটিজেনদের বিপুল প্রশংসা কুড়ায়।

সাধারণ কাজ করার জন্য প্রায়ই খবরের শিরোনাম হন লোটে শেরিং। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর সপ্তাহান্তের দিনটি তিনি বরাদ্দ রেখেছেন নিজের মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য। প্রতি শনিবারে তাকে ডাক্তারের সাদা এপ্রোন পরে হাসপাতালে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিতে দেখা যায়।

হিমালয়ান রাজ্যের এই প্রধানমন্ত্রী সত্যিকার অর্থেই সরলতা ও নম্রতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

Tuesday, August 27, 2019

অপারেশন করতে হাসপাতালে ছুরি-কাঁচি হাতে প্রধানমন্ত্রী

সপ্তাহের পাঁচদিন ব্যস্ত থাকেন দেশ পরিচালনায়। ডাক্তারি পেশার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার টানে সপ্তাহের একটি দিন চলে যান হাসপাতালে৷হ্যাঁ, প্রতি শনিবার হাসপাতালে গিয়ে ছুরি-কাঁচি হাতে তুলে নেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।
সপ্তাহের একটি দিন স্বাস্থ্যসেবায়
প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজ হাতে রোগীদের সেবা দিয়ে যাওয়ার ব্রত ত্যাগ করতে পারেননি লোটে শেরিং। আর তাই ভাগ করে নিয়েছেন সপ্তাহের দিনগুলো। পাঁচ দিন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সামলে প্রতি শনিবার সশরীরে হাসপাতালে উপস্থিত থেকে রোগী দেখেন, নিজ হাতে করেন অস্ত্রোপচার। সপ্তাহের অবশিষ্ট দিন, অর্থাৎ রবিবার সারা দিন কাটান পরিবারের সাথে।
এখনো উপভোগ করেন ডাক্তারি
‘‘এমনিতে কেউ ফুটবল খেলে কাটান সপ্তাহান্তের অবসর, কেউবা খেলেন গল্ফ। পুরো সপ্তাহের কর্মদিবস শেষে আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আর তাই প্রতি শনিবার রোগীদের নিজ হাতে সেবা দেই। এতে আমি আনন্দ পাই, আমার শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাই,’’ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন তিনি।
দেশ পরিচালনা আর ডাক্তারি একই রকম’
ডাক্তারি এবং প্রধানমন্ত্রীত্ব দুটোকেই এক চোখে দেখেন শেরিং। এক মনে করার একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। হাসপাতালে একজন ডাক্তার রোগীকে সারাতে ঔষধ দেন কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখেন। প্রধানমন্ত্রীর কাজও একই, কারণ, তাকে সরকারের বিভিন্ন পলিসি পরীক্ষা করে দেখতে হয়, সার্বিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করতে হয়।
বাংলাদেশে পড়াশোনা
১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়েছেন লোটে শেরিং। এমবিবিএস কোর্স শেষ করার পর একটি প্রশিক্ষণও নেন ময়মনসিংহে। তারপর জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চশিক্ষা নেন শেরিং। শুরু হয় পথ চলা। প্রায় এক দশক মাঠপর্যায়ে ডাক্তারি পেশায় ব্যাস্ত ছিলেন তিনি।
রাজনীতির শুরু
২০১৩ সালে অনেকটা আকস্মিকভাবেই দেশটির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তবে নির্বাচনের হার মেনে নিয়ে আবার মনোনিবেশ করেন ডাক্তারি পেশায়। এসময় গ্রামে-গঞ্জে চিকিৎসা দিয়ে বেড়িয়েছেন মানুষকে। তারপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
মনোযোগ দেন স্বাস্থ্যখাতে
প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন তিনি, নেন নানামুখী পদক্ষেপ। নাগরিকদের সুন্দর স্বাস্থ্য আর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেন লোটে শেরিং।
আশ্বস্ত রোগীরাও
প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা পেয়ে রোগীরাও খুশি। মূত্রাশয়ের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন বুমথাপ। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে তার অস্ত্রোপচার করেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রধানমন্ত্রীর এমন সেবা পেয়ে ভীষণ আনন্দিত এবং আস্বস্ত বুমথাপ।
যদি হাসপাতালে যেতে পারতাম
প্রতিদিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যান লোটে শেরিং। পথিমধ্যে পড়ে হাসপাতাল। কিন্তু সপ্তাহের পাঁচদিন তো তাকে সামলাতে হয় দপ্তর। আর তাই সামলে নেন নিজের আবেগ। বললেন, ‘‘হাসপাতাল দেখে আমার মনে হয় গাড়িটি ঘুড়িয়ে যদি হাসপাতালে চলে যেতে পারতাম!’’
>>ডয়েচে ভেলে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং

Friday, August 23, 2019

বিশেষ কিছু: নরেন্দ্র মোদির ভুটার সফর

ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে দুই দিনের যে সফরে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সেটা ভারত ও ভুটানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের একটা অংশ, যেখানে দুই দেশের নেতারাই তাদের মেয়াদের শুরুর দিকে একে অন্যের দেশ সফরকে অন্যতম অগ্রাধিকার জ্ঞান করে থাকেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছিলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং; তার পাল্টা সফরে গেলেন মোদি। আসলে ৭২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাংদেচ্ছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি উদ্বোধনের বিষয়টি চিন্তা করে সফরের সময় পেছানো হয়েছিল। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, যেটা আজকের পৃথিবীতে বিরল। সীমান্ত উন্মুক্ত, পররাষ্ট্রনীতিতে দুই দেশ পরস্পরের কাছাকাছি এবং আলোচনার ভিত্তিতে পরিচালিত, এবং সকল কৌশলগত ইস্যুতে নিয়মিত খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রয়েছে, যেটা এই সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং যেটা বিগত বহু দশক ধরে বজায় রয়েছে। কৌশলগত ইস্যুতে ভারতকে সর্বোতভাবে সহায়তা করায় সেটা আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও জাতিসংঘে ভারতের জন্য বিরাট অর্জনের কারণ হয়েছে। একইভাবে, ভারতের জন্য যেগুলো হুমকি, সেগুলোর বিরোধিতা করার ব্যাপারে ভুটানের নেতৃবৃন্দ কখনও পিছু হটেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৩ সালে সাবেক রাজা উলফা বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন; আবার সম্প্রতি দোকলাম উপত্যকায় চীনা সেনাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছে ভুটান। ভুটানের পরিকল্পিত অর্থনীতির জন্য ভারতের সহায়তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উচ্চ রাজস্ব আয়ের জন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে দিয়ে এরপর সেই বিদ্যুৎ আবার কিনে নেয়ার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একটা পারস্পরিক উপকারের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যেটা দুই দেশের নেতারাই লালন করে এসেছেন এবং এটাকে মি মোদি ‘উদাহরণ সৃষ্টিকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে, ভুটানের সাথে এই সম্পর্কটাকে নিজেদের প্রাপ্য হিসেবে নিলে ভুল করবে নয়াদিল্লী। বিগত কয়েক বছরে, ভারত তাদের বিদ্যুৎ ক্রয় নীতিতে হঠাৎ করে পরিবর্তন আনায়, এবং তাদের অনমনীয় মূল্য এবং ভুটানকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে না দেয়ায়, এবং বাংলাদেশের মতো তৃতীয় দেশের সাথে বাণিজ্য করতে না দেয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। এই ইস্যুগুলোকে এখন বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আরেকটি উদ্বেগ যেটি মতপার্থক্য তৈরি করতে পারে, সেটা হলো – ভারতের সাথে অতি বেশি বাণিজ্য, পরিবহন এবং পর্যটনের কারণে ভুটানের পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল গ্রুপের অধীনে ভুটানে মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট (এমভিএ) বাস্তবায়নের যে পরিকল্পনা ভারতের রয়েছে, সেটা ভুটান স্থগিত রেখেছে। একই সাথে ভারতীয় পর্যটকদের ভুটানে প্রবেশের জন্য যে শুল্কের প্রস্তাব ভুটান দিয়েছে, সেটাও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য বাড়াতে পারে। ভুটানের শিক্ষার্থীদের আগের প্রজন্ম ভারতের বাইরে কোথায় তাকায়নি, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ ভুটানিজরা শিক্ষার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ কারণে সম্পর্কে মেরামতের অনেক কিছু রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো নয়াদিল্লীকে কৌশলগত অন্যান্য শক্তি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে যারা ভুটানকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সফরের মাধ্যমে যেটা ফুটে উঠেছে। বিশ্বে যেখানে অসংখ্য উপায় প্রতিনিয়ত খুলে যাচ্ছে, সেখানে ভারত ও ভুটানের জন্য ভালো হবে যদি তারা একে অন্যের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলে।

Thursday, August 22, 2019

জেন্ডার সমতা আনতে ভুটান উইমেন পার্লামেন্টারি ককাস গঠিত

জেন্ডার সমতা আনতে ১৪ আগস্ট ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ন্যাশনাল কমিশন ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (এনসিডাব্লিউসি) এবং ভুটান নেটওয়ার্ক ফর এমপাওয়ারিং উইমেন (বিএনইডাব্লিউ)।

এই পদক্ষেপের নাম দেয়া হয়েছে ভুটান উইমেন পার্লামেন্টারি ককাস (বিডাব্লিউপিসি)। নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারী রোল মডেলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে তারা। নারী নেতৃত্বরা যাতে তাদের যোগ্যতা বাড়িয়ে সমাজের আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে, সেজন্য সহযোগিতা দেবে এই ককাস।

এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নারী নেতৃত্বকে তুলে ধরা হবে। এটা নারীদের কণ্ঠ তুলে ধরবে এবং নারীদের দৃশ্যমান করে তুলবে যাতে সমাজের নেতৃত্বের অবস্থানে যাওয়ার ব্যাপারে তারা আস্থা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে। এবং এর মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

একই সাথে এই প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করবে যাতে নারীদের অধিকার, জেন্ডার সমতা, শিশুদের অধিকার এবং সামাজিক এজেন্ডাগোলো পার্লামেন্টে যথাযথ মনোযোগ পায়।

ফুন্তশোক শোডেন বলেন, “এই ককাসের মাধ্যমে পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে নারীদের ঐক্যবদ্ধ করা হবে”।

এটা একই সাথে নির্বাচিত, অনির্বাচিত ও সম্ভাব্য নারী নেতাদের দক্ষতা বাড়াবে। “এটা শুধু নারী বা পার্লামেন্টের জন্য নয়, বরং সবার জন্য”।

Tuesday, August 20, 2019

মোদীর ভুটান সফরের আগে বাংলার সঙ্গে আলোচনা হলো না কেন, প্রশ্ন মমতার

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুদিনের সফরে শনিবার (১৭ আগস্ট), ভুটান পৌঁছেছেন। ডোকলাম কান্ডের পর এটাই তাঁর প্রথম ভুটান সফর। এ সফরে ভুটানের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ নিয়ে একটি বিশেষ চুক্তি হওয়ার কথা। ভুটানের সঙ্কোশ নদীর জল থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় এবং ভুটানের ভারতের কাছে একমাত্র এক্সপোর্ট প্রোডাক্ট হল এই জলবিদ্যুৎ।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই ভুটান সফর নিয়ে মোদী সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কোনোরকম আগাম আলোচনা করেনি, যে ঘটনায় ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা সরকার মনে করে, মোদী সরকারের উচিত ছিল ভুটানে যাওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ, সঙ্কোশ থেকে জল ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সমস্যায় আছে রাজ্য সরকার। বিশেষত এর ফলে উত্তরবঙ্গে বর্ষার সময় প্লাবন হয়ে যায়। যে বিপদ থেকে বাঁচাটা রাজ্যের জন্য বিশেষ জরুরী।

মমতা নিজে এর আগে ভুটান সফরে যান। সেদেশের রাজার সঙ্গেও তাঁর এ ব্যাপারে কথা হয়। অতএব এবার প্রধানমন্ত্রী ভুটান যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় বা বিদেশ মন্ত্রকের উচিত ছিল মমতার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলা, এমনটাই মনে করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি অনুসারে এমনটাই করা উচিত।

দিল্লির যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। বিদেশমন্ত্রকের এক সূত্রের কথায়, “যদি এ সফরে সঙ্কোশ নদীর জল নিয়ে আলোচনা হতো, তবে আমরা পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতাম। যেমন তিস্তা নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে যাওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন।”

এবার আসলে ভুটান যাওয়ার কারণ আলাদা। ২০১৪ সালে মোদী ভুটান দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন। তখনই তিনি ভুটানকে কথা দেন, ২০১৯-এও আবার ক্ষমতায় এলে উনি ভুটান দিয়েই যাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু এবার তা করতে পারেন নি কারণ তাঁকে জাপান যেতে হয়েছিল বহুপাক্ষিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। তাঁর জন্য তিনি ভুটানের ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ভুটান যাত্রা করছেন।

চিনের জন্যও এ সফর জরুরী, বিশেষ করে পাকিস্তান যখন দুনিয়ার জনমত পেতে মরিয়া। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিন সক্রিয় পাকিস্তানের পক্ষে, সে সময় বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চিন গেছেন, মোদী যাচ্ছেন ভুটান। এটা বিদেশনীতিরই অঙ্গ। এর সঙ্গে রাজ্য সরকারের সম্পর্ক নেই।

কিন্তু মমতার সরকার মনে করে, ভুটান তো প্রধানমন্ত্রী বারবার যাচ্ছেন না, কাজেই যখন যাচ্ছেন, তখন চাইলেই রাজ্যের সমস্যার বিষয়টিও আলোচ্য সূচীতে যোগ করতে পারত কেন্দ্র সরকার। শেষমেশ কেন্দ্র-রাজ্য বিতর্ক জারি ভুটান সফর নিয়েও।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিমুক্ত দেশের সূচকে ২৫তম স্থানে ভুটান

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ সফলতা অর্জন করেছে হিমালয়ান রাষ্ট্র ভুটান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা (সিপিআই) সূচকে ২০১৭ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে যেখানে ভুটানের অবস্থান ছিলো ২৬তম সেখানে ২০১৮ সালে আরো এক ধাপ এগিয়ে হয়েছে ২৫তম।

দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রচেষ্টায় গত ১৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ২০১৯-২৩ মেয়াদের জন্য জাতীয় সততা ও দুর্নীতি দমন কৌশল (এনআইএসিএস) উদ্বোধন করেন।

২০০৯ সালের পর থেকে দুর্নীতি দমনের জন্য এটা তৃতীয় কৌশল। আগের দুটি কৌশলের উপর ভিত্তি করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই কমিটিতে সরকারি সংস্থা, বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক দফতর, সিভিল সার্ভিস সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি রয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারপার্সন কিনলে ইয়াংজুম বলেন যে, ২০০৫ সালে এই কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য দিকনিদের্শক হিসেবে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কৌশল।

প্রথম দুটি কৌশল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে দুর্নীতি দমনর আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা ও ইনটিগ্রিটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির আলোচনা, ১০ এমওইউ সই

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসার পর প্রতিবেশী ভুটানে প্রথম সফরে গিয়ে শনিবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় মোদি তার প্রতিপক্ষকে থিম্ফুর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ভুটানের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা মোদির দ্বিতীয়বার ভুটান সফর। তিনি সেখানে ৭৪০ মেগাওয়াট মাংদেচ্ছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্বোধন এবং ভুটান-ভারত জলবিদ্যুৎ সহযোগিতার পাঁচ দশক পুর্তি উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন।

ভুটানের সঙ্গে শিক্ষা এবং অন্যান্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা শেষে ১০টি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে ভারত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এনআইটি শিলচরের সাথে ইউনিভার্সিটি অব ভুটানের এমওইউ। ফলে আসামের শিলচর প্রতিবেশী দেশের সাথে একত্রিতভাবে শিক্ষার পরিবেশ, মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বিরল সম্মান লাভ করেছে।

স্বাক্ষরিত মোট ১০টি এমওইউ’র মধ্যে ৪টি হল স্ট্যাম (সাইন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথামেটিক্স) নিয়ে।

রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ভুটানের সাথে এমওইউ সই হয় আইআইটি দিল্লি, আইআইটি মুম্বাই, কানপুর ও উত্তর পূর্বের একমাত্র শিলচর এনআইটি’র সঙ্গে।

Friday, August 16, 2019

ভুটান সফরে শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক, ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান

ভুটান সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন জে সুলিভান ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আইন-ভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

সুলিভান ১২-১৩ আগস্ট ভুটানের রাজধানী থিম্ফু সফর করেন। নবীন হিমালয়ান গণতান্ত্রিক দেশটিতে এটা গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মাপের মার্কিন কূটনীতিকের সফর।

দুই দিনের সফরকালে সুলিভান ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক, প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তানদি দর্জি ও অর্থমন্ত্রী লোকনাথ শর্মার সঙ্গে সাক্ষাত করেন।

চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভুটান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৭ সালের ১৬ জুন ভুটান, ভারত ও চীনের ত্রিসংযোগ দোকলামে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা ৭৩ দিন বজায় ছিলো। ভুটানের দাবি করা একটি ভূখণ্ডে চীনের সেনারা সড়ক নির্মাণ শুরু করলে ভারতীয় সেনারা সেখানে গিয়ে বাধা দেয়। চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশের জন্য ভারতীয় সেনাদের অভিযুক্ত করে বেইজিং। তবে ভুটানের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সেনারা সেখানে গিয়েছে বলে ভারত দাবি করে। যদিও ভারতের দাবির পক্ষে ভুটানের তরফ থেকে স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

২৮ আগস্ট উভয় পক্ষের সেনারা পিছিয়ে গেলে অচলাবস্থার নিরসন হয়। ভূখণ্ডটি নিয়ে চীনের সঙ্গে ভুটানের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

ভুটানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সুলিভান নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বলে পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মরগান ওর্তাগাস জানিয়েছেন। এসব বিষয়ের মধ্যে ‘ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আইন-ভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জোরদারের গুরুত্ব’ও রয়েছে।

মুখপাত্র বলেন, তিনি আমাদের দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং মানবপাচার মোকাবেলায় যৌথ প্রচেষ্টা জোরদারের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এদিকে, এক টুইটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেন, আমার ডেপুটি সুলিভান চলতি সপ্তাহে ভুটান সফর করায় আমি পুলকিত, যা গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরকারি সফর, যা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আইন-ভিত্তিক শৃঙ্খলা এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখা ভুটানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনকে তুলে ধরেছে।

লোডেন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে এক বৈঠকে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের জন্য ভুটানের প্রচেষ্টাগুলো সম্পর্কে অবগত হন সুলিভান।

ওর্তাগাস বলেন, মার্কিন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুটানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের সুবিধার জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ভুটানে আগ্রাসী চমক সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত মোদি by গোপিলাল আচার্য

ভারতের সাম্প্রতিক পুনর্নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৭ আগস্ট থিম্পুতে আসছেন। হিমালয় অঞ্চলের দেশটিতে এটা তার দ্বিতীয় সফর।

ভুটানে প্রধানমন্ত্রী মোদি রাজা জিগমে সিঙ্গে খেসার নামগেল ওয়াংচুক এবং চতুর্থ রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকের সাথে সাক্ষাত করবেন। সেই সাথে এই সফরে বেশ কিছু প্রকল্প উদ্বোধন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সফর একটা মাইলফলক সফর হতে যাচ্ছে।

প্রধান এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৭২০ মেগাওয়াট মাংদেচ্ছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সংশোধিত শুল্ক, যেটা ভুটানের ১২তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লী সফরের সময় রফতানি শুল্ক সংশোধন করে প্রতি ইউনিট ৪.১২ গুলট্রাম (ভুটানের মুদ্রা) করা হয়। ভারত একই সাথে ভুটানের ১২তম পরিকল্পনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন গুলট্রাম-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বাণিজ্য সহায়তা ও ভারতে ভুটানের রফতানি বৃদ্ধির জন্য আরও অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন গুলট্রাম-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

মোদি একইসাথে রু পে কার্ডেরও উদ্বোধন করবেন। ভারতে কেনাবেচার জন্য অনেকটা ভিসা বা মাস্টারকার্ডের মতোই এটা ব্যবহার করা যায় এবং এটিএম মেশিনে এই কার্ড ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুরের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে রু পে কার্ড ব্যবহার করতে যাচ্ছে ভুটান।

সাউথ এশিয়ান স্যাটেলাইটের জন্য একটি গ্রাউন্ড স্টেশানও উদ্বোধন করা হবে। দুই দেশের মধ্যে যে নয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে, তার মধ্যে ভুটানের নতুন মহাকাশ প্রযুক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশানের সহযোগিতার বিষয়টিও রয়েছে।

যুবকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির এজেন্ডা

একটা উল্লেখযোগ্য ভারতীয় এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে ভারত-ভুটান সম্পর্কের ব্যাপারে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

দিল্লীতে গত সপ্তাহে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ভুটানের সাথে সম্পর্ককে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সীমানা ছাড়িয়ে আরও সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে বলেছেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটন খাতের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভুটানের রয়েল ইউনিভার্সিটিতে ভুটানের তরুণ প্রজন্মের সাথে সরাসরি কথা বলবেন।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলবেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো ভুটানের তরুণদের আরও কাছাকাছি যাওয়া এবং তাদেরকে এটা বোঝানো যে আমরা ভুটানের সাথে আরও ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়তে চাই”।

যদিও স্কলারশিপ নিয়ে বা নিজ খরচে উচ্চশিক্ষার জন্য ভুটানিজ শিক্ষার্থীদের ভারত গমন অব্যাহত রয়েছে, এর পরও দুই দেশের তরুণদের মধ্যে বিনিময়ের মাত্রা যথেষ্ট কম। তাছাড়া ভারতের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভুটানিজ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভারত সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

সচিব বিজয় গোখলে বলেছেন, এ কারণেই যে সব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, সেখানে অনেকগুলো স্বাক্ষরিত হবে দুই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলী, এবং গণিতের ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তিনি বলেন, স্কলারশিপ এবং অন্যান্য উপায়ে ভারত সরকার ভুটানিজ শিক্ষার্থীদের ভারতে নেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

২০১৮ সালে ভারত-ভুটান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের সময় চিত্রকলা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ভুটানিজদের সাথে বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দেয়া হয়।

ভুটানের তরুণ জণগোষ্ঠির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপারে একটা অস্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। অনেকে ভারতকে বন্ধুপ্রতীম সহায়ক প্রতিবেশী মনে করেন। অন্যেরা মনে করেন, এই সম্পর্কের ভেতরে ভারসাম্যহীন উপায়ে বিনিময় হচ্ছে, সেটা ভুটানের জন্য ইতিবাচক নয়।

তরুণ কলেজ গ্র্যাজুয়েট দর্জি ফুন্তশো বলেন, “আমাদের রাজারা সবসময় ভারতের সাথে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং আমাদেরকেও অবশ্যই সেই একই কাজ করতে হবে”।

অন্যেরা শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিনিময় বৃদ্ধির কথা বলেছেন। ভুটানিজ এবং ভারতীয়রা একত্র হয়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করছে, এবং বার্ষিক ‘মাউন্টেন ইকোজ’ অনুষ্ঠানে দুই দেশের লেখক, একাডেমিক, চিত্রশিল্পী, এবং অন্যান্য পেশাদারদের সমাগম ক্রমেই বাড়ছে। ভারতের টিভি সোপ অনুষ্ঠানগুলো ভুটানিজ নারীদের মধ্যে জনপ্রিয়, এবং সব বয়সের ভুটানিজরা ব্যবসায় ও তীর্থভ্রমণে ভারত সফর করে থাকেন।

অন্যদিকে, ভারত-বিদ্বেষী একটা মনোভাবও মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে, বিশেষ করে যখন ভুটান-চীন সম্পর্কের বিষয় এসেছে এবং ভুটান যেখানে চীনের সাথে ইস্যুগুলোকে সরাসরি সমাধান করতে চেয়েছে। ভুটানিজরা ভারতের ভুটান নীতিকে বল-প্রয়োগমূলক এবং বড় ভাইসুলভ হিসেবে দেখে থাকে।

২০১৭ সালের দোকলাম অচলাবস্থার মতো ঘটনা – যেখানে ভুটান দুই বড় প্রতিবেশীর মধ্যে আটকা পড়েছিল। এই ঘটনা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কবল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ভুটানিজদের আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এক তরুণ ভুটানিজ ব্লগার লিখেছেন, “ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বৃহৎ সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের ভৌগলিক অবস্থানটি সবচেয়ে বড় অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ভারতের বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন সহায়তা প্রয়োজন, আর সেটার জন্য আমাদের মূল্য দিতে হচ্ছে”।

এরপরও, নরেন্দ্র মোদি ভুটানের জনগণকে চমৎকৃত করতে চান এবং হিমালয় অঞ্চলের ক্ষুদে এ দেশটির সাথে ঐতিহ্যগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চান, কারণ এই রাষ্ট্রটি তার বৃহৎ প্রতিবেশীকে স্বাচ্ছন্দ্যে রেখেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলে ভারতীয় মিডিয়াকে বলেছেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভুটান সফরের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। সেখানকার মহামান্য রাজা ও মহামান্য চতুর্থ রাজাসহ প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিংয়ের সাথে তার শক্তিশালী ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে”।

তিনি আরও বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই সফরের মধ্য দিয়ে ভুটানের সাথে আমাদের অনন্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে”।

প্রতিবেশী প্রথম

মোদি সরকারের প্রতিবেশী প্রথম নীতির অংশ হিসেবে নতুন নির্বাচিত ও উদ্দীপ্ত নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে তার প্রথম বিদেশ সফরে ভুটানে এসেছিলেন। তিনি সে সময় নেপালও সফর করেছিলেন এবং ভারতের সীমান্তকে মুক্ত বাণিজ্য ও ব্যবসায়ের দুয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তবে, তার উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ শিগগিরই উধাও হয়ে যায় যখন মাধেসি জনগোষ্ঠির আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি বাস্তবায়নের জন্য নেপালের সংবিধানে পরিবর্তন আনতে নেপালি এমপিদের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে ভারত। এই সূত্রে দুই দেশের মধ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং নেপালের জ্বালানি সরবরাহ আটকে দেয় ভারত। নেপালের জনগণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে এবং সোশাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ জানায়। ভারত সরকারের পদক্ষেপকে তারা দেশকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে এবং সামাজিক যাতনা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যে অনানুষ্ঠানিক অবরোধ আরোপ করা হয়, সে সময় থেকে ভারতকে এইভাবে বিবেচনা করেছে নেপাল। জ্বালানির ব্যাপক সঙ্কটের কারণে সে সময় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মেরামত চেষ্টার অংশ হিসেবে মোদি জুনে মালদ্বীপ ও শ্রীলংকা সফর করেছেন। এই দুই দ্বীপরাষ্ট্র তার সফরকে সফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে চীনা প্রভাবের মোকাবেলার তার সফরকে সফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোদি দুই দেশেই উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সাময়িক বাধা বাদ দিলে, প্রতিবেশী প্রথম নীতিতে ফল মিলছে, যদিও সেটা ধীরগতিতে। ভারত ভুটানের সাথে দৃঢ় বন্ধুত্ব ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একইভাবে, বিগত পাঁচ বছরে ভারত ও বাংলাদেশও আরও কাছাকাছি হয়েছে। শেখ হাসিনার অধীনে, ঢাকা দিল্লির সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক বিনিময় বাড়িয়েছে।

আসলে ভারত যদি তার প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করার আশা করে থাকে, তাহলে এর জন্য এই মুহূর্তের চেয়ে উত্তম সময় আর হতে পারে না। বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) উপ-আঞ্চলিক ব্লক আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করতে পারে। বৃহৎ পরিসরে, ভারত যদি বিমসটেকের মধ্যেও একই ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে সেটাও সংযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

তবে, ভারতীয় নেতৃবৃন্দকে তাদের ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। ভারতকে সচেতন থাকতে হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের সমতাকে গ্রহণ করে নিতে হবে, তা তাদের আকার যত ছোটই হোক না কেন। তা না হলে এ অঞ্চলের উন্নয়নে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে ভারত যে ভূমিকা রাখতে চায়, সেটা ভেস্তে যাবে এবং এ জন্য তাদেরকে উচ্চমূল্য দিতে হবে।

এমনকি ভারত তাদের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীর যেভাবে উত্তপ্ত হওয়া অব্যাহত রেছে, সেখানে ভারতের ক্ষুদে প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটির প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নজর রাখবে। এই মুহূর্তে এটা একটা সচেতন অপেক্ষার খেলা যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে বলেছেন যে, ভুটান কাশ্মীর ইস্যুকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই জানে।

Wednesday, August 7, 2019

চীনকে দূরে রাখতে প্রতিবেশীদের দিকে নজর মোদির by বার্টিল লিন্টনার

আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের মধ্যে অবস্থানকারী হিমালয় রাজতান্ত্রিক দেশ ভুটান শিগগিরই সম্প্রতি নবনির্বাচিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচ্চ পর্যায়ের সফলকে স্বাগত জানাবে।

এটি হবে ভারতীয় নেতার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির সর্বশেষ মিশন। নয়া দিল্লির প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচিত এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিরোধের লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে এই পদক্ষেপ।

এই একই নীতি অনুসরণ করে মোদি গত জুনে গিয়েছিলেন মালদ্বীপে। সেটা ছিল মে মাসে পুননির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফর। মালদ্বীপে নতুন ভারতপন্থী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে চীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত আবদুল্লাহ ইয়ামিনের কাছ থেকে। শ্রীলঙ্কায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা ২০১৫ সালে নির্বাচনে চীনাপন্থী প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসাকে হারানোর পর থেকে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

তবে ভুটানে প্রভাব বাড়ানো নিয়ে চীন ও ভারত দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। আর এটিই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি ও কৌশলগত সম্পর্ককে গড়ে দিচ্ছে।

ভুটান হলো ভারতের দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ছোট্ট তবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশটির সাথে কার্যকর সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা শুরু করেছে। আবার এই দেশটির সাথেই চীনের এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য সম্ভবত অনেক ধরনের পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বিকশিত করা। মোদি নিজেই এমনটা ঘোষণা করেছে।

কিন্তু এখন কোনো সন্দেহ নেই যে, আসলে এর লক্ষ্য হলো ভারতের আঙিনায় চীনা প্রভাব হ্রাস করা। আর সেই লক্ষ্যে ভারত নতুন মিত্র পেয়েছে, সে হলো চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান।

মে মাসে ভারত ও জাপান শ্রীলংকায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে দ্বীপ দেশটির রাজধানী কলম্বোর প্রধান বন্দরটির সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই সমঝোতাটি আসে শ্রীলংকা তাদের হামবানতোতা বন্দরটি ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় চীনকে দিয়ে দেয়ার প্রেক্ষাপটে।

হামবানতোতা ঘটনা চীনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উস্কে দেয় যে দেশটি ঋণ ফাঁদ ফেলে বিআরআই বাস্তবায়ন করার কৌশল গ্রহণ করেছে, তারপর তারা বিশাল এলাকাজুড়ে কৌশলগত অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।

ভারত ও চীনের মধ্যে থাকা ভুটান ছোট দেশ হলেও বেইজিং সেখানেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। অবশ্য এখানে তার কৌশল বিআরআই ঋণ বা মঞ্জুরি নয়, বরং ‘সফট কূটনীতি’।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা সার্কাস শিল্পী, অ্যাক্রোব্যাট, ফুটবলাররা স্থানীয় লোকদের আনন্দ দিতে সারা ভুটান ঘুরে ফিরছে। আবার বিপুলসংখ্যক ভুটানি ছাত্র স্কলারশিপ নিয়ে চীন যাচ্ছে। চীনা পর্যটনও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

চীন ও ভুটান একে অপরের দেশে দূতাবাস প্রতিষ্ঠা না করলেও তারা তাদের মধ্যকার অভিন্ন ও বিরোধপূর্ণ সীমান্ত নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা করেছে।

দুই দেশের মধ্যে ১৯৮৪ সাল থেকে ২৪ দফা আলোচনা হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের কূটনীতিকরা পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে।

ভারত বেশ উদ্বেগের সাথে এসব ঘটনা লক্ষ্য করে ২০১৪ সাল থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। মোদির আসন্ন সফর এমনই একটি।

ওই বছরের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি প্রথম বিদেশ সফর করেছিলেন ভুটানে। ভারতীয় নেতার এজেন্ডায় চীনের দূতাবাস বা অন্য কোনো ধরনের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

চীন ও ভারতের মধ্যে থাকা ভুটানের গুরুত্ব প্রবলভাবে ফুটে ওঠে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। এ সময় দোকলাম দিয়ে রাস্তা বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে চীন। এই স্থানটি ভুটান ও চীন উভয় দেশই দাবি করে থাকে। ভারত সেখানে সৈন্য পাঠিয়ে চীনা উদ্যোগ ভণ্ডুল করার চেষ্টা চালায়। এ নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু দিন উত্তেজনা থাকে। ভুটান যে কঠিন অবস্থানে আছে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আবার ভুটানের কাছেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে তারা দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর মধ্যকার সঙ্ঘাতে প্রক্সি হতে চায় না।

ভুটানের স্থানীয় একটি ওয়েবসাইট ২০১৭ সালের ৫ আগস্ট জানায়, ভুটান চায় না যে ভারত ও চীন যুদ্ধে মাতুক। ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠো পরিস্থিতি আর উত্তপ্ত হতে দিতে চায় না ভুটান।

এখনো ভুটানে ভারতের যে প্রভাব আছে, তা নস্যাৎ করার মতো অবস্থানে নেই চীন। সেই ১৮৬৫ সাণ থেকে ভুটানের সাথে ভারতের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ওই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল ভুটানের শাসক ও ব্রিটিশ ভারতের উপনিবেশিক প্রভুদের মাধ্যমে।

ভুটান ও ব্রিটিশ ভারত ১৯১০ সালে একটি চুক্তিতে সই করে। এতে ব্রিটিশ রাজ ভুটানের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়, আর এর পররাষ্ট্র সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ভুটান ও স্বাধীন ভারত ১৯৪৯ সালে একই ধরনের চুক্তিতে সই করে।

ভুটানের একচ্ছত্র রক্ষক হিসেবে ভারতের আবির্ভাব ঘটে ১৯৬৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী। এই চুক্তিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে ভুটান উপনিবেশ-পূর্ব ভারতের রাজন্যশাসিত রাজ্য নয়, বরং স্বাধীন রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

ভারতের সমর্থন নিয়ে ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের সদস্য হয় ভুটান। তবে ১৯৪৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ভারতই দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকে।

এরপর ২০০৭ সালে সই হওয়া চুক্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক স্বার্থে দুই পক্ষ ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করবে। দুই দেশের কেউই অপরের স্বার্থের হানি হয়, এমন কোনো ক্ষতিকর কাজ করবে না।

এই স্বার্থ পরিভাষাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিয়ে আসলে চীনকে প্রতিরোধের কথাই বোঝানো হয়েছে। আর এ কারণেই ভুটানবিষয়ক কূটনৈতিক গুরুত্ব এত বেশি আরোপ করেছেন মোদি।

প্রতিবেশী প্রথম কৌশলের মাধ্যমে ভারত নতুন নতুন অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে ভুটানকে আরো কাছে টানার পরিকল্পনা করছে। ভারত এখন স্থল ও নদী রুট দিয়ে এই অঞ্চলের নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চাচ্ছে।

এ ধরনের একটি উদ্যোগ হিসেবে সম্প্রতি ১০০০ টন ভুটানি পাথর ট্রাকে করে ভুটান থেকে ধুবরিতে পাঠানো হয়। এই পাথর এরপর জাহাজে করে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে বাংলাদেশে রফতানি করা হয়।

এই উদ্যোগটি চীনের বিআরআইয়ের মতো তত সমৃদ্ধ ও জাঁকালো না হলেও এর তাৎপর্যও কম নয়। স্থল-নদী রুটটি ব্যবহারের ফলে ভুটান থেকে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতে ৮-১০ দিন সময় কমবে, পরিবহন ব্যয়ও হ্রাস পাবে ৩০ ভাগ।

ভুটানে সাহায্যের হাত সম্প্রসারণ করছে জাপানও। এর মধ্যে রয়েছে ভূমিধস ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দুর্যোগ ত্রাণ।

আরো প্রতীকী ব্যবস্থা হিসেবে জাপানের সম্রাটের ছোট ভাই সম্রাট নারুহিতো আগস্টে তার পরিবার নিয়ে ভুটান যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি রাজপরিবার প্রায়ই ভুটান সফর করে। ১৯৯৭ সালে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নারুহিতো সফর করেছিলেন ভুটান।

ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকেন্দ্রিক মোদির প্রতিবেশী প্রথম নীতিটি জাপানের স্বার্থের সাথেও প্রাসঙ্গিক।

একইসাথে এই নীতি একে অপরের প্রতি এশিয়ার দুই জায়ন্ট যে পারস্পরিক সন্দেহ পোষণ করে, তা আরো গভীর করতে পারে।

অন্যদিকে ভুটান ও মালদ্বীপের মতো প্রত্যন্ত দেশগুলো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে।

একদিকে ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধিকারী চীন ও অপরদিকে ভারত ও জাপানসহ শিথিলভাবে জোটবদ্ধ জোটের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সৃষ্ট একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মতো অবস্থা বিরাজ করা বিশ্বের এই অংশের জন্য শুভ ইঙ্গিত হবে না।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়ালের সঙ্গে ভারতের প্রদানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (ডানে), ছবি: ফেসবুক

Tuesday, August 6, 2019

চীনের প্রভাব রুখতে ভুটান যাচ্ছেন মোদি by নয়ানিমা বসু

সম্পর্ক চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ১৭ আগস্ট দুই দিনের সফরে ভুটান যাচ্ছেন। চীনের সঙ্গে দোকলাল অচলাবস্থার আগে ভুটানের প্রতি এতটা মনযোগী ছিলো না ভারত।

তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মোদির সফরের তারিখ ঘোষণা করেনি।

২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর মোদি প্রথম বিদেশ সফরে ভুটান গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় মেয়াদে ভুটান ছিলো মোদির নুতন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের প্রথম বৈদেশিক গন্তব্য। গত জুনে হিমালয়ান দেশটি সফর করেন তিনি।

দুর্বল হয়ে পড়া সম্পর্ক

গত বছর কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পুর্তি উদযাপন করে ভারত ও ভুটান। কিন্তু এর পরও ভুটানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি তেমন কিছু করতে পারেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র এই পত্রিকাকে এ কথা জানিয়েছে।

দোকলাম উপত্যকায় চীন ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক অচলাবস্থা দেখা দেয়ার পর ভুটানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিম্নমুখি হতে শুরু করে। ভারত-ভুটান-চীন ত্রিসংযোগস্থলের কাছে ২০১৭ সালে এই ঘটনা ঘটে। চীন একটি সড়ক নির্মাণ শুরু করলে সীমান্ত লঙ্ঘন করে ভারতীয় সেনারা সেখানে গিয়ে বাধা দেয়। ভারত দাবি করে যে ভুটানের অনুরোধে সেনারা সেখানে গিয়েছিলো। তবে ভুটান এমন অনুরোধ করেছিলো বলে স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।

দোকলাম অচলাবস্থা ৭২ দিন বিরাজ করে। ভুটান এসময় চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। ভুটান যেন চীনের সঙ্গে সংলাপে না বসতে না পারে সে জন্য ভারতের ‘আগ্রাসী আচরণে’ থিম্ফু ক্ষুব্ধ বলে বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করে।

রাজনীতিতে পরিবর্তন

গত বছর অক্টোবরে ভুটানের নির্বাচনে ড. লোটে শেরিংয়ের নেতৃত্বাধিন দল দ্রুক নিয়েমরুপ শোগপা (ডিএনটি) ক্ষমতায় আসে। এই দলটি ভারতের কাছে তেমন পরিচিত ছিলো না। ফলে তারা বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে মোদি সরকারে উদ্বেগ দেখা দেয়।

তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে প্রথম সফরে ভুটান যান জয়শঙ্কর। আরো বড় কারণ হলো ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি সফল করতে হলে এই দেশটি গুরুত্বপূর্ণ।

মন্ত্রী তার সফরে রাজা জিগমে খেসার নামগিয়াল ওয়াংচুক ও প্রধানমন্ত্রী শেরিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন।

ভুটানে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত! বাড়ছে চীনের প্রভাব by কাশিশ কুমার

ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যখন প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে ভুটানে যান, তখন বিষয়টা খুব একটা অবাক হওয়ার মতো ছিল না। এর মাধ্যমে আবারও বোঝা গেলো যে ভারত তার প্রতিবেশী দেশটির সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগের আমলেও প্রথম দেশ হিসেবে ভুটান সফর করেছিলেন তিনি। এর অর্থ কি এ-ই যে ভারত-ভুটান সম্পর্ক ‘প্রতিবেশীকে ভালোবাসো’ নীতির একটা উজ্জ্বল উদাহরণ? না কি ভারত সরকার ভুটানকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্য অর্জনের পথে একটা প্যাকেজ চুক্তি হিসেবে দেখছে?
২০১৮ সালে ভারত ও ভুটান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করে, যেখানে জনগণকে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়া হয়। বাস্তবেও ভুটানের মতো দেশগুলোর জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ভুটান, নেপাল ও সিকিমে বেইজিংয়ের আঞ্চলিক দাবি-দাওয়া এবং তিব্বতে চীনের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভুটান প্রথমে বৃটিশ ভারতের এবং পরে স্বাধীন ভারতের অংশীদারিত্ব ও সহায়তার উপর সবসময় ভরসা করেছে। ১৯৪৯ সালে অনেকটা মরিয়া হয়েই ভারতের সাথে ট্রিটি অব পারপিচুয়াল পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ স্বাক্ষর করে ভুটান। এই চুক্তির অধীনে ভুটানের পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা উপদেষ্টার ভূমিকা পায় ভারত। পাশাপাশি চীনের মোকাবেলায় ভারতের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পাবে ভুটান। ভুটান সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তাকে স্বাগত জানালেও এটা খুবই স্পষ্ট যে ভারত চমৎকার এই দেশটির উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে।
তাহলে কি ঘটছে আসলে? দুই দেশের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বিকশিত হচ্ছে এবং সেখানে জলবিদ্যুৎ আবির্ভূত হয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে। ২০০৭ সালে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে, যেটা ১৯৪৯ সালের চুক্তিকে ছাপিয়ে যায়।
ভারত ভুটানের জন্য অন্যতম বৃহত্তম বাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুতের তিন-চতুর্থাংশ রফতানি করা হয় ভারতে। ২০২০ সালের মধ্যে এই রফতানির পরিমাণ ৫০০০ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১০০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও ভুটানের আগের প্রজন্ম ভারতকে কৃতজ্ঞতার চোখে দেখে এসেছে, কিন্তু নতুন প্রজন্ম পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারছে। তারা জলবিদ্যুৎ খাতে ভারতের অন্তর্ভুক্তিকে উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে দেখছে এবং অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের কর্তৃত্বের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে? বেইজিং ভুটানের সাথে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। কোমল শক্তির কূটনীতি ও উন্নত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা এটা করছে। ভারত সেখানে হেরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ভুটানের জিডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান পর্যটন খাতের এবং চীন এই খাতটাকে কাজে লাগিয়ে ভুটানের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করছে। গত এক দশকে ভুটানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ১৯৯৬ সালে ভুটানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২০ জন। ২০১৬ সালে সেটা ৯২২০ জনে দাঁড়ায়। পরে দোকলামের ঘটনার পর চীনা পর্যটকের সংখ্যা আবার কমে যায়। ভুটানের জন্য এটা এসেছে সতর্কবার্তা হিসেবে। তাছাড়া, বর্তমান ভুটান সরকার যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, এর মধ্যে রয়েছে বেকারত্বের হার এবং ভারতের কাছে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি।
চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে ভুটানে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি এখন জনমানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রাইভেট সেক্টরের দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে সরকার। ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে উপকৃত হতে চায় কিন্তু ভারতের দিক থেকে চাপ তাদেরকে এগুতে দিচ্ছে না এবং এই বন্ধুত্বের সম্পর্কের সাথে সাথে দেশটির সার্বভৌমত্বও যেন হারিয়ে গেছে।