Wednesday, January 24, 2018

ট্রাম্প কেন বিপজ্জনক

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে চিহ্নিত করেছে একটি বিকার, দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির আকস্মিক ফল, একটি রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, নিশ্চিতভাবে একটি উৎপাত, এমনকি ভীতিকর ও ভবিষ্যদ্বাণী অযোগ্য মানুষ হিসেবে। তারা এমনটি বলার কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের কেউ নন এবং তিনি ‘তাদের একজন’ হতে চানও না। বস্তুত বিশ্বায়নের ধাক্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশার গভীরতা এলিটরা বুঝতে পারেননি- এর ওপর ভিত্তি করেই ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তিনি নিজের তৈরি নীতিতে চাল চেলেছেন, নিজের রীতিতে অবিচল থেকেছেন এবং তিনি জানতেন তিনি কী করছেন, কী চাচ্ছেন এবং কীভাবে সেসব পাওয়া যায়। সফল হওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে অনেক বন্ধু তার দরকার ছিল এবং তিনি তাদের পেয়েছেনও। আমেরিকার রাজনীতির কর্তৃত্ব বড় বড় তেল কোম্পানি ও কর্পোরেশনের আওতায় চলে গেছে। এর বড় লক্ষ্য হল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছড়ি ঘোরানো, বৈশ্বিক খনিজ জ্বালানির তৃতীয় বৃহৎ আমদানিকারক হওয়া এবং নিট রফতানিকারক হওয়া, বিশেষত তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানির ক্ষেত্রে। এর অন্যতম লক্ষ্য হল বড় বড় ব্যবসায়ীকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়া। এসব লক্ষ্যমাত্রার চূড়ান্ত অর্জনে ট্রাম্প পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল ও প্রস্তুত করেছেন। এজন্য আগের প্রশাসনগুলোর রেখে যাওয়া প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে এবং অফশোর প্রতিষ্ঠানগুলোকে (বেনামি কোম্পানি) অন্তর্ভুক্ত করাসহ তাদের কাজ করার সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার (এপিএ) বর্তমানে মূল লক্ষ্য পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, বিপরীতে পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং বিষাক্ত বস্তুর হাত থেকে মানুষকে রক্ষায় নেয়া নীতি ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাজের একটি দীর্ঘ তালিকাকে বাতিল করে দিতে এটি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নেয়া বিধিনিষেধগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেপরোয়া আচরণের দরজা খুলে দেয়া হচ্ছে, যেসব আচরণের কারণে ২০০৮-০৯ সালে মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১৭ সালের শেষের দিকে কর সংস্কারের একটি পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে কংগ্রেস। এতে কর্পোরেট কর কমিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে করে বড় বড় তেল সংক্রান্ত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেয়া যায় এবং উচ্চ আয়ের পক্ষগুলোকে তুলনামূলক কম ট্যাক্স দিতে হয়। মূলত, এটি হচ্ছে রিপাবলিকানদের নীতি যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পদক্ষেপ হিসেবে ভোটারদের বোঝানো হয়েছে; কিন্তু সরকারি ঋণ এবং মধ্যম আয়ের মানুষদের জন্য এর মধ্যমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব কী হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি। এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পররাষ্ট্রনীতিও সেভাবে সাজানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় হতে যাওয়া চীনা এলএনজি মার্কেটকে অবশ্যই পরাজিত করতে ও বশে আনতে হবে। এমন নীতি ব্যাখ্যা করছে যে, পররাষ্ট্রনীতি হতে যাচ্ছে চীন ও উত্তর কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস রফতানিকারক দেশগুলোর মুখোমুখি অবস্থান নেয়ার মতো। কূটনৈতিক মহলে আলোচিত গুজব অনুযায়ী আরও বেশি আগ্রাসী একটি বাণিজ্যনীতি পাইপলাইনে আছে। এটি কেবল বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্যাঞ্চল নাফটাকেই খোজা করছে না, একইসঙ্গে সাময়িক আমদানি বিধিনিষেধের সুনির্দিষ্ট ঘটনারও জন্ম দিচ্ছে। ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নিজের সমর্থনের ঘাঁটি সুরক্ষিত রাখার জন্য ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। বিদেশিদের আমেরিকায় প্রবেশ আরও কঠিন করার জন্য একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং এটিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ থেকে আমেরিকানদের সুরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে। ঘোষণামূলক নীতির চমৎকার ব্যবহার হিসেবে এটি ভালোই শোনাচ্ছে এবং ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে বিদেশিভীতিও তৈরি করছে। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরির বিষয়টি আলোচনা থেকে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ৭শ’ মাইলের বেশি দেয়াল তৈরির জন্য কংগ্রেসের কাছে ১৮শ’ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে। ওবামাকেয়ার বা স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্যসেবানীতি বাতিল করা যায়নি; কিন্তু নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর আর্থিক প্রবাহ আটকে দেয়া হয়েছে। ফলে এটি যেমনটি হওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে নিজের ছায়া হয়ে পড়েছে। সংকট পার করে নিজের এসব নীতিকে সাহায্য করার জন্য রাষ্ট্রের তিন মূল স্তম্ভ- নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগকে কোনো না কোনো পথে নিয়ন্ত্রণ বা পাশ কাটিয়ে যেতে হয়েছে ট্রাম্পকে। এজন্য তিনি সংবিধান বা রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও শিষ্টাচার কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। নির্বাহী বিভাগ আর্থিক ও জনবলের ক্ষেত্রে তীব্রভাবে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ভেঙে দেয়ার ওপর আলোকপাত করছে।
আইন বিভাগকে বোকা বানিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রশাসন চালাতে পছন্দ করেন ট্রাম্প। এজন্য কংগ্রেসকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয় প্রায় সব সময়ই উপেক্ষা করা হয়েছে। কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের সঙ্গে ট্রাম্পের অংশীদারিত্ব মূলত হয়েছে ওবামা যুগের নীতি-নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারের জন্য। প্রেসিডেন্টের কিছু নির্বাহী আদেশ আটকে দেয়ার চেষ্টা করা বিচার বিভাগকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে ট্রাম্পের প্রশাসন। অন্য যে কোনো পূর্বসূরির তুলনায় প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদের প্রথম বছরে বহু ফেডারেল বিচারক নিয়োগ করার জন্য বিচার বিভাগের অনেক শূন্যপদ পূরণের সুযোগটি প্রায় পর্দার আড়ালেই নিয়েছেন। নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য, এমনকি প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার বৈরিতা কাজে লাগাতেও সক্ষম হয়েছেন ট্রাম্প। ক্যাবল নেটওয়ার্ক ও পত্রিকাগুলো জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করছে- এমন অভিযোগ তুলে মূলধারার মিডিয়া হাউসগুলোকে প্রত্যাখ্যানের জন্য তিনি নিজের সমর্থকদের উৎসাহিত করেছেন। তবে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণভাবে যেসব বড় নীতি তিনি বাস্তবায়ন করতে চান সেগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে নিজের অভিব্যক্তির সঙ্গে মিডিয়া আচ্ছন্নতাকে ব্যবহার করেছেন তিনি। নিয়মিতভাবে করা তার বিতর্কিত টুইটের দিকে মূলধারার মিডিয়া ও সাধারণ মানুষ মনোযোগী হওয়ার কারণে যা তিনি চেয়েছেন, তার বেশির ভাগই রাডারের নিচ দিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছে। সংক্ষেপে, তিনি যা চান তা অর্জনে নিজেকে খুবই কার্যকর প্রমাণ করেছেন ট্রাম্প। আর এগুলোই তাকে বেশ বিপজ্জনক বানিয়েছে। এক বছরজুড়ে ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বেপরোয়া ও বাজে বলে বিবেচিত সিদ্ধান্তগুলো থেকে প্রেসিডেন্টকে বিরত রাখার জন্য ভারসাম্য রক্ষার যে পদ্ধতি ছিল, তা সত্যিকারার্থেই যথাযথভাবে কাজ করে না। যতটুকু সময় তিনি নিজের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পার করেছেন, এতেই সম্ভবত মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বৈদেশিক সম্পর্কের অপূরণীয় ক্ষতি তিনি করে ফেলেছেন।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
জোয়েরজেন মোয়েলার : সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস ইউসুফ ইসহাক ইন্সটিটিউটের জ্যেষ্ঠ ভিসিটিং ফেলো

শিউরে ওঠার মতো হত্যা

গৃহকর্মী নির্যাতনের বিষয়টি ব্যাপক নিন্দিত ও সমালোচিত হলেও তাদের ওপর নির্যাতন যে কমছে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। নির্যাতনের ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে যেভাবে সবাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, সে তুলনায় নির্যাতন না কমার একটি কারণ হতে পারে অপরাধপ্রবণদের একটি বড় অংশ দেশের ঘটনাপ্রবাহের খুব একটা খোঁজখবর রাখে না। অনেক গৃহকর্মী তাদের ওপর নির্যাতনকে নিয়তি বলেই মেনে নেয়।
১২ বছর বয়সী গৃহকর্মী আল আমিনের ওপর গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী যেভাবে নির্যাতন করেছে, তা কল্পনাকেও হার মানায়। বুধবার যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গৃহকর্মী আল আমিনের কাজে সামান্য ভুল হলেই নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো তার ওপর। সামান্য ভুলের কারণে যারা শিশুটির ওপর নির্যাতন করত- সেই গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর অমানবিকতার কোনো ক্ষমা হয় না। এক পুলিশ কর্মকর্তার একটি বাক্য থেকেই বোঝা যায় কী নির্মমতার শিকার হয়েছে শিশুটি। ওই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য- তাকে দেখে মনে হয়েছে একটি কঙ্কালের ওপর চামড়া লাগিয়ে দেয়া হয়েছে! রাজধানীর আদাবরে নির্মমতার শিকার আল আমিন গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে। আল আমিনের ওপর যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তাতে মনে হয় গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর মধ্যে মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলীর অভাব প্রকট। এই বর্বরতার কঠোর শাস্তিই কাম্য। দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। পরিবারের সদস্যদের আদর-যত্নে যে শিশুর বড় হওয়ার কথা সেই শিশুটি গৃহকর্মী হওয়ায় সারাদিনের অমানুষিক পরিশ্রমের পর তার ভাগ্যে জুটত পচা খাবার। এ অখাদ্য খেয়ে বড় হওয়ার সুখও আল আমিনের কপালে সইল না।
হতভাগ্য আল আমিন গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুকে যেভাবে বরণ করেছে, তা যে কোনো মানুষের বিবেককে নাড়া না দিয়ে পারে না। মৃত্যুর আগে শিশুটি মানবিকতা শব্দটির সঙ্গে পরিচিতই হতে পারল না! আল আমিনের মতো শিশুদের যাতে গৃহকর্মী পেশায় নিযুক্ত হওয়ার প্রয়োজন না হয় এজন্য সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অসহায় শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে একসময় তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। পাশাপাশি গৃহকর্মীরা যাতে তাদের অধিকার ও মর্যাদা পায়, এ ব্যাপারে সমাজের সবারই সোচ্চার হওয়া উচিত। ক্রমাগত নির্যাতনের মাধ্যমে আল আমিনকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে- এমন পরিণতি যাতে আর কোনো শিশুকে বরণ করতে না হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

একজন অদম্য মাইশার অন্যরকম গল্প

হারমোনিকা (মাউথ অর্গান) বাজাতে ভীষণ ভালোবাসে মাইশা। রয়েছে বিশেষ পারদর্শীতা। সঙ্গে অন্যান্য বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গবেষণা রয়েছে তার। মাইশা মরিয়ম সায়েদ, শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমেই আগ্রহ এবং চর্চা করে সে। একজন ভালো বক্তা, উপস্থিত বক্তৃতায় দেশ সেরা হবার স্বর্ণপদকসহ অনেক স্বীকৃতি রয়েছে তার ঝুলিতে। এছাড়াও সে একজনআবৃত্তিকার, উপস্থাপক, সঙ্গীতশিল্পী, লেখিকা, গীতিকার, হারমোনি বিশেষজ্ঞ এবং ছড়াকার। তার কথায় কথায় ছড়া কাটতে পারার স্বভাব যোগ্যতা সবাইকে মুগ্ধ করে। সহজ কথা যায়না বলা সহজে- হ্যা, ছড়ায় ছড়ায় সহজ করে গভীর অর্থ প্রকাশের প্রবণতা তার মধ্যে রয়েছে।
অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি মানুষটি তার শারিরীক প্রতিবন্ধকতা কীভাবে জয় করেছে! মাইশা মরিয়ম সায়েদের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে এক অতিমাত্রায় মেধাবী, প্রগতিশীল এবং মুক্তমনা নারীর কথা। সাদা মনের মানুষের কথা। একজন লেখিকা এবং চিন্তাবিদের কথা। কখনোই মনে পড়েনা তার শারিরীক প্রতিবন্ধকতার কথা। হ্যা, জন্মগত শারিরীক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এই নারীর। তবে তার সব গুণ, যোগ্যতা এবং চর্চা ছাপিয়ে গেছে সবকিছু। ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী মাইশা মরিয়ম। মা একজন ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপিকা, বাবা রাজশাহী শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী । ছোট ভাই রয়েছে মাইশার, সেও সঙ্গীত চর্চা করে। সবমিলে ছোট, সুখী এবং শৈল্পিক পরিবার তার। রাজশাহীতেই বসবাস। তবে মাইশার চর্চা রাজশাহীর গন্ডী পেরিয়ে সবকূল ছাপিয়ে যায়। বন্ধুদের ভীষণ প্রিয় মাইশা। আড্ডা, শিল্প, বন্ধু এবং যত ইতিবাচক চিন্তায় দিন কাটে তার। জয় করেছে দেশের অনেক গন্যমান্য শিল্পীদের হৃদয়। সে স্বপ্ন দেখে একটি প্রগতিশীল সমাজের। আর তার লেখনি ও চিন্তারা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে দেশের স্বার্থে। মাইশা মরিয়ম সায়েদ একজন অনুপ্রেরণা, একজন শক্তি এবং একজন দৃষ্টান্ত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দোহাই দিয়ে বিষন্নতা উদযাপন করে না যে, বিষন্নতা ছড়িয়ে দেয় না যে, কেবল ছড়িয়ে দেয় স্বপ্ন। শেখায় কোন বাঁধাই বাঁধা নয়। কোন ব্যথাই বিলাসিতা নয়। বরং শক্তি। মাইশা আজ দেশের কাছে কেবলই মেধাবী মাইশা হিসেবে পরিচিত; আর কিছু নয়। আর এটিই তার অর্জন। মাইশা মরিয়ম একজন শিক্ষা। আর তার পরিবার তো বটেই। তার গুণগুলোকে সম্মানিত করেছে তারা, আর উৎসাহ দিয়ে চলেছে। তাই অনেক কিছুই শেখার রয়েছে এই পরিবারটির কাছ থেকে। ইতিবাচক চিন্তাই পারে সব বাঁধা দূর করতে।

হাসপাতালে বাচ্চা বদল

ঘটনাটি বলিউডের সিনেমার কাহিনির মতো। প্রথমত, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটো শিশুর জন্ম হয় এবং হাসপাতালে থাকতেই এই দুটো শিশু দুর্ঘটনাবশত বদলাবদলি হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত: একেবারেই ভিন্ন রকমের দুটো পরিবারে তাদের জন্ম। একটি শিশু উপজাতি এক হিন্দু পরিবারে আর অন্যটি মুসলিম। কিন্তু তারপর কি হলো? কর্তৃপক্ষের সাথে দীর্ঘ সংগ্রামের পর তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করে যে পরিবারে তাদের জন্ম তাদেরকে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত ওই দুটো শিশু যে পরিবারে বড় হয়েছে তাদেরকে ছেড়ে নিজের জন্মদাতা পিতামাতার কাছে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। পরে ওই দুটো দম্পতি আদালতের শরণাপন্ন হয় এবং নিশ্চিত করেন যে তারা একে অপরের সন্তানকে লালন পালন করবেন। এই ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে। শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান তিনি তার স্ত্রী সালমা পারভীনকে মঙ্গলদাই হাসপাতালে নিয়ে যান ২০১৫ সালের ১১ই মার্চ সকাল ৬টার সময় এবং তার এক ঘণ্টা পরেই তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরের দিনই তার স্ত্রীকে ছেড়ে দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। `এক সপ্তাহ পর আমার স্ত্রী বললো এই বাচ্চা আমাদের না। আমি বললাম, কি বলছো তুমি? একটি নিষ্পাপ শিশুর ব্যাপারে তোমার এভাবে কথা বলা ঠিক না। আমার স্ত্রী বললো প্রসূতি কক্ষে নাকি একজন বোড়ো মহিলা ছিলো এবং তার মনে হচ্ছে ওই মহিলার বাচ্চার সাথে আমাদের বাচ্চা বদল হয়ে গেছে।
আমি তার কথা বিশ্বাস করি নি। কিন্তু দিনের পর দিন সে এই কথাটা আমাকে বলতেই থাকলো।' তাদের সন্তানের নাম রাখা হয় জুনায়েত। সালমা পারভীন জানান, শুরু থেকেই তার সন্দেহ হয়েছিলো যে এই বাচ্চা তাদের নয়। `যখন আমি তার মুখ দেখলাম আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হলো। আমার তখন প্রসূতি কক্ষের ওই মহিলার কথা মনে পড়লো। বাচ্চাটার চেহারার সাথে ওই মহিলার চেহারার মিল আছে। বাচ্চাটার ছোট ছোট দুটো চোখ দেখেই আমি সেটা বুঝতে পারি। আমাদের পরিবারের কারোর চোখই ওরকম নয়,' বলেন তিনি। আহমেদ তখন হাসপাতালে ছুটে যান এবং সেখানকার এক কর্মকর্তাকে তার স্ত্রীর সন্দেহের কথা জানান। তখন ওই কর্মকর্তা তাকে বলেন যে তার স্ত্রী মানসিকভাবে সুস্থ নন। তার মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। আহমেদ তখন তথ্য জানার অধিকার সংক্রান্ত একটি পিটিশন দায়ের করেন। সেদিন সকাল সাতটা থেকে যতো শিশুর জন্ম হয়েছিলো তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চান তিনি। তার এক মাস পর তিনি সাতজন নারীর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন। কাগজপত্র দেখার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন একটি উপজাতি মহিলার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ খবর নেওয়ার। কারণ ওই মহিলার সন্তান জন্মদানের সাথে তাদের সন্তানের জন্ম হওয়ার সময় ও ঘটনার মধ্যে তিনি অনেক মিল দেখতে পেয়েছেন। এই দুটো মহিলাই পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। দুটো শিশুরই ওজন তিন কেজি এবং তাদের জন্ম মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে। এরপর ওই মহিলার খোঁজে তিনি দু'বার তার গ্রামে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বাড়িতে যাওয়ার সাহস পান নি। `তখন আমি তাদেরকে একটি চিঠি লিখি। আমি বলি যে আমার স্ত্রী সন্দেহ করছে তাদের বাচ্চার সাথে আমাদের বাচ্চা বদল হয়ে গেছে এবং এবিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ আছে কীনা। চিঠির নিচে আমি আমার ফোন নম্বর দিয়ে দেই।' 
আহমেদের বাড়ি থেকে প্রায় ১৯ মাইল দূরে এই বোড়ো পরিবারের গ্রাম- বার্লি। সেখানে অনিল ও শেওয়ালি বোড়ো দম্পতির সন্তান রইয়ান চন্দ্রা। আহমেদের চিঠি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই বোড়ো দম্পতির সন্দেহ হয় নি যে তাদের সন্তান অন্য কোনো শিশুর সাথে বদল হয়ে গেছে। এরকম কিছু হতে পারে বলে তারা কেউই সেটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কিন্তু পুরো ঘটনাটিই বদলে যায় যখন এই দুটো পরিবার একসাথে মিলিত হয়। `যখন আমি অন্য শিশুটিকে প্রথম দেখলাম তখনই মনে হলো যে আমার স্বামীর সাথে তার চেহারার প্রচুর মিল। আমার তখন এতো খারাপ লাগছিলো যে আমি কতোক্ষণ কাঁদলাম। আমরা বোড়োরা দেখতে অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমাদের নাক চোখ দেখতে মুসলমানদের মতো নয়,' বলেন শেওয়ালি বোড়ো। সালমা পারভীন বলেন, প্রথমবার দেখার সাথে সাথেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রইয়ানই তাদের বাচ্চা। সেই মুহূর্তেই তিনি বাচ্চা দুটোকে আবার বদলে নিতে চেয়েছিলেন। তবে বোড়ো নারী তাতে রাজি হননি। পরে আহমেদের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে তদন্ত করতে শুরু করে। হাসপাতালের প্রসূতি কক্ষে সেদিন যেসব নার্স ছিলেন তাদের সাথেও কথাবার্তা বলা হয়। তাদের কাজে কোনো ধরনের ভুল ভ্রান্তি হওয়ার কথা তারা অস্বীকার করেন। এতেও ক্ষান্ত হননি আহমেদ। তিনি তখন তার স্ত্রী ও শিশুর রক্তের নমুনা পাঠান ডিএনএ টেস্টের জন্যে। পরীক্ষার ফলাফল যখন তার হাতে আসে তিনি তার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যান। সেখানে দেখা যায় শিশু জুনায়েতের সাথে সালমা পারভীনের জিনগত কোন মিল পাওয়া যায় নি। হাসপাতাল থেকে তখন আহমেদের পরিবারকে জানানো হয় যে আইনের কাছে এই রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য নয়। তখন তিনি পরের বছরের ডিসেম্বর মাসে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এই মামলাটি যিনি তদন্ত করেছেন সেই সাব-ইন্সপেক্টর হেমন্ত বড়ুয়া বিবিসিকে বলেছেন, হাসপাতাল থেকে তিনি শিশুদের জন্মসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন এবং সবকিছু মিলিয়ে দেখতে তিনি ওই দুটো পরিবারের সাথেও কথা বলেছেন। পরে তিনি ওই দুটো দম্পতি ও দুটো শিশুর রক্তের নমুনা নিয়ে কলকাতায় যান পরীক্ষার জন্যে। তবে ফর্মে কিছু ত্রুটি থাকায় ফরেনসিক ল্যাবরেটরি এই পরীক্ষা করাতে রাজি হননি। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘তখন আমরা দ্বিতীয়বারের মতো নমুনা সংগ্রহ করি। রাজধানী গৌহাটিতে ফরেনসিক ল্যাবে এই টেস্ট সম্পন্ন করা হয়। ওই পরীক্ষায় প্রমাণ হয় যে আসলেই বাচ্চা দুটো জন্মের সময় বদলা বদলি হয়ে গেছে।’ বড়ুয়া তখন আহমেদকে পরামর্শ দেন বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়ার জন্যে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিনি আবেদন করেন দুটো বাচ্চাকে আবার বদল করার জন্যে। তখন সিদ্ধান্ত হয় যে বাচ্চা দুটোকে যার যার আসল পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। এজন্যে দুটো পরিবার আদালতেও হাজির হয়। কিন্তু বাদ সাধে দুটো শিশু।
যে পরিবারে তারা বেড়ে উঠেছে সেই পরিবার ছেড়ে যেতে তারা আর রাজি হয়নি। সালমা পারভীন বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের বলেন, চাইলে আমরা আমাদের বাচ্চা দুটো বদলাবদলি করে নিতে পারি। কিন্তু আমরা তখন বলি যে না, আমরা সেটা করবো না। কারণ গত তিন বছর ধরে আমরা তাদেরকে বড় করেছি। হঠাৎ করেই আমরা তো আর তাদেরকে অন্যের কাছে দিয়ে দিতে পারি না।’ ‘এছাড়াও জুনায়েত কাঁদছিলো। সে ছিলো আমার দেবরের কোলে। সে তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। দু'হাত দিয়ে তার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে তখন কাঁদতে লাগলো। আমাদের ছেড়ে সে যেতে চাইছিলো না।’ একই আচরণ করতে থাকে বোড়ো পরিবারে বড়ো হওয়া শিশু রইয়ানও। অনিল বোড়ো বলেন, এখন যদি তাদেরকে বদল করা হয় তাহলে তারা মানসিকভাবে কষ্ট পেতে পারে। তারা এতো ছোট্ট যে কি ঘটছে তার কিছুই তারা বুঝতে পারছে না। তারপর থেকে ওই দুটো শিশু আগের মতোই ভিন্ন পরিবারে আদর যত্ন আর ভালোবাসায় বেড়ে উঠছে। কিন্তু বিবিসির প্রতিবেদক দুটো পরিবারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন শিশুদের ধর্মীয় পরিচয় ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হতে পারে কীনা। ‘বাচ্চা তো বাচ্চাই। সে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার উপহার। সে হিন্দুও নয়, মুসলিমও নয়। সবার উৎস একই। পৃথিবীতে আসার পরেই তারা হিন্দু বা মুসলিম হয়ে যায়,’ বলেন আহমেদ। তিনি বলেন, এখন যদি বাচ্চা দুটোকে বদল করা হয় তাহলে নতুন পরিবারে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে না। কারণ দুটো পরিবারের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, অভ্যাস এসব একেবারেই আলাদা। একজন মা যে শিশুটিকে বড় করেন তার সাথে তার একটি বন্ধন তৈরি হয় ঠিকই কিন্তু যে শিশুটিকে তিনি গর্ভে ধারণ করেন তার জন্যেও ওই নারী একটা টান অনুভব করেন। এই আকুলতা দুই মায়ের মধ্যেও আছে। তবে তারা বলছেন, বাচ্চা দুটো বড়ো হওয়ার পর তারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে তারা আসলে কোন পরিবারের সাথে থাকতে আগ্রহী। এখন এই দুটো পরিবার যেটা চেষ্টা করছে তা হলো- তাদের মধ্যে যাতে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ হয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং শিশু দুটোর সাথে যাতে তাদের আসল পরিবারের একটা সম্পর্ক বজায় থাকে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

মৃত সেজে হাতি থেকে প্রাণরক্ষা

হাতির লাথিতে কোমর ভেঙেছে। প্রবল যন্ত্রণার মধ্যেও মড়ার ভান করেছিলেন তারা সরকার। তার ভয় করছিল, নড়াচড়া করলে হাতি যদি বুঝতে পারে, তিনি পড়ে আছেন! তা হলে শুঁড়ে তুলে আছাড় মারতে পারে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের দমনপুর রেঞ্জ সংলগ্ন উত্তর জিৎপুর গ্রামের ঘটনা। সময়, মঙ্গলবার ভোর ৪টা। পরে আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তারা দেবী বলছিলেন সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। জানালেন, ভোরে বিছানার পাশে দরমার বেড়া ভাঙার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। বুঝতে পারেন, হাতি এসেছে। পাশে থাকা স্বামীকে ডাকতে থাকেন তিনি। ততক্ষণে হাতিটি দরমার বেড়া ভেঙে তাকে খাট থেকে টেনে নামিয়ে আনে বাইরের মাটিতে। ভয়ে দরজা খুলে স্বামী বাইরে পালান। শাশুড়ি পাশের ঘরে লুকিয়ে ছিলেন।
তারাদেবী বলেন, “হাতিটি প্রথমে মাটিতে ফেলে কোমরে লাথি মারে। পা দিয়ে আমাকে ঠেলতে থাকে। তার পর শুঁড় দিয়ে পেঁচানোর চেষ্টা করে। পরনে সোয়েটার ছিল বলে ওর ধরতে অসুবিধা হচ্ছিল। সেই ফাঁকে গড়াতে গড়াতে উঠোনের দিকে চলে যাই।’’ উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। সেই অবস্থায় উঠোনের এক কোণে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতে থাকতে বুঝতে পারেন, হাতিটা সেখানেও উঠে এসেছে। তারা দেবী বলেন, ‘‘মড়ার মতো পড়েছিলাম।’’ এই ভাবে কতক্ষণ ছিলেন খেয়াল নেই। হাতি চলে গেছে বুঝে ডাকেন শাশুড়িকে। পরে জানা যায়, তারা দেবীর কোমরের হাড় ভেঙেছে। বন দফতর সূত্রে জানানো হয়, তার চিকিৎসার সব খরচ দফতরই দেবে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই এলাকায় মাঝেমধ্যেই হাতি হামলা চালাচ্ছে। বন বিভাগকে বহুবার বলা সত্ত্বেও বুনো হাতি আটকাতে সঠিক পদক্ষেপ করা হচ্ছে না।

পাঠদানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে সাপ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের সময় শ্রেণীকক্ষে সাপ বেরিয়ে আসায় আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার মীর মশাররফ হোসেন অ্যাকাডেমিক ভবনের ২০৪ নং কক্ষে ক্লাস চলাকালে একটি বিষধর সাপ পাওয়া যায়। বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ভবনের ২০৪ নং কক্ষে লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস চলছিল। ক্লাস নিচ্ছিলেন প্রফেসর ড. আসাদুজ্জামান।
ক্লাস চলাকালে একটি বিষধর সাপ রুমের জানালা বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। সাপ দেখে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে লাফিয়ে ওঠে। পরে সাপটিকে চেয়ার দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলা হয়। শিক্ষার্থীরা জানায়, সাপটি দেখে মনে হয়েছে বাচ্চা সাপ। এই সাপের মা সাপ এবং একই সাথে বেড়ে ওঠা আরো বাচ্চা আশপাশে থাকতে পারে। সাপ প্রবেশের সময় ক্লাসের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক প্রফেসর ড. আসাদ বলেন, ‘আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম। এতাবস্থায় একটি সাপ জানালার পর্দা বেয়ে যাচ্ছিল। পরে শিক্ষার্থীরা সাপটি মেরেছে। ভবনের আসপাশে ভালোভাবে খুঁজে দেখা দরকার। আরো সাপ থাকতে পারে।’ লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি। কেউ আমাকে জানায়নি। এখনি বিভাগে খোঁজ নিচ্ছি।’ সাপ-আতঙ্কে ভোগেন যারা, পড়বেন না তারা

ভিয়েনায় যেভাবে বিদেশিনীর প্রেমে পড়েছিলেন সুভাষ বসু

১৯৩৪ সালের কথা। নেতাজি হিসেবে পরিচিত সুভাষ চন্দ্র বসু সেসময় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে ছিলেন। তার শরীর বেশ কিছুদিন ধরেই খারাপ হচ্ছিল। ১৯৩২-এর ফেব্রুয়ারী থেকে অসহযোগ আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার সময় থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসার জন্য সুভাষ বসুকে শেষমেশ ইউরোপে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার, তবে শর্ত চিকিৎসার খরচ তার পরিবারকেই দিতে হবে। ভিয়েনায় চিকিৎসা করানোর সময়ই সুভাষচন্দ্র ঠিক করলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বপক্ষে ইউরোপে বসবাসরত ভারতীয় ছাত্রদের সংঘবদ্ধ করা দরকার। এক ইউরোপীয় প্রকাশক ওই সময় তাকে 'দা ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল' নামে একটা বই লেখার কাজ দেন। বইটি লেখার জন্য একজন সহকারীর প্রয়োজন হল, যিনি ইংরেজী আর টাইপিং - দুটিই ভালোমতো জানবেন। সুভাষ চন্দ্রের বন্ধু ড. মাথুর দুজনের নাম সুপারিশ করে পাঠালেন। তার মধ্যে যাকে বেশি উপযুক্ত মনে হলো - তাকে সাক্ষাতকারের জন্য ডেকে পাঠালেন সুভাষ। কিন্তু কথাবার্তা বলে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
তখনই দ্বিতীয়জনের ডাক পড়ল। ২৩ বছর বয়সী এমিলি শেঙ্কল এসেছিলেন ইন্টারভিউ দিতে। সুন্দরী অস্ট্রিয়ান ওই তরুণীকেই সহকারী হিসাবে কাজে নিয়োগ করলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। ১৯৩৪ সালের জুন মাস। সুভাষ চন্দ্রে বয়স তখন ৩৭ বছর। তার ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল কী করে ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতকে স্বাধীন করা যায় তার ওপর। শেঙ্কলের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ধারণাও করতে পারেননি যে ওই অস্ট্রিয় তরুণী তার জীবনে একটা নতুন ঝড় তুলে দিতে পারেন। সুভাষ চন্দ্র বসুর বড়ভাই শরৎ বসুর নাতি ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুগত বসু নিজের বই 'হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট - সুভাষ চন্দ্র বসু এন্ড ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল এগেইনস্ট এম্পায়ার'-এ লিখেছেন, এমিলির সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই সুভাষের জীবনে একটা নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল। সুগত বসুর মতে তার আগে পর্যন্ত সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনে প্রেম বা বিয়ের বেশ কিছু প্রস্তাব এসেছিল। সেসবে তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু এমিলির সৌন্দর্য সুভাষের ওপরে যেন কী একটা জাদু করে দিল। এমিলিকে উদ্ধৃত করে সুগত বসু তার বইতে লিখেছেন, "প্রেমের আভাসটা সুভাষ চন্দ্র বসুর দিক থেকেই এসেছিল। ধীরে ধীরে সেটা একটা রোমান্টিক সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। ১৯৩৪-এর মাঝামাঝি সময় থেকে পরের বছর দুয়েক অস্ট্রিয়া আর চেকোস্লাভাকিয়াতে থাকার সময়ে সম্পর্কটা আরও মধুর হয়ে উঠেছিল।" ১৯১০ সালের ২৬ জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার এক ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম হয়েছিল এমিলির। তার বাবা প্রথমে মেয়েকে এক ভারতীয়র অধীনে কাজ করতে দিতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে দেখা করার পরে তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে মাথা নোয়াতেই হয়েছিল এমিলির বাবাকে।
প্রেমপত্র বিনিময় পর্ব
ইতিহাসলেখক রুদ্রাংশু মুখার্জী সুভাষ চন্দ্র আর জওহরলাল নেহরুর জীবন নিয়ে একটি তুলনামূলক আলোচনা করেছেন তার বই 'নেহরু এন্ড বোস - প্যারালাল লাইভস'-এ। ওই বইতে একটু অনুচ্ছেদ রয়েছে 'টু উইমেন এন্ড টু বুক্স' নামে। সেখানে নেহরু আর সুভাষ চন্দ্রের জীবনে তাঁদের দুজনের পত্নীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন রুদ্রাংশু মুখার্জী। মুখার্জী লিখেছেন, "সুভাষ এবং এমিলি দুজনেই একেবারে গোড়ার দিকেই মেনে নিয়েছিলেন যে তাদের সম্পর্কটা আর পাঁচটি সম্পর্কের মতো হবে না। সেখানে নানা অসুবিধা আসবে। একে অন্যকে যেসব চিঠি লিখেছিলেন, সেগুলোতে সংবোধন করার ধরণ দেখেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এমিলি সম্বোধন করতেন 'মিস্টার বোস' বলে, আর সুভাষ চন্দ্র লিখতেন মিস শেঙ্কল বা পার্ল শেঙ্কল।" পরিচয় গোপন করার বাধ্যবাধকতা আর যুদ্ধের সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য সাহায্য পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপের মধ্যে সুভাষচন্দ্র নিজের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতেন। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও সুভাষচন্দ্র এমিলির জন্য কতটা চিন্তা করতেন, তার প্রমাণ একটা চিঠিতে পাওয়া যায়, যেটাকে সুভাষ চন্দ্রের প্রেমপত্রও বলা যেতে পারে। এই চিঠি অবশ্য প্রথমে এমিলিকে লেখা সুভাষ চন্দ্রের চিঠিগুলির সংগ্রহে ছিল না। কিন্তু এমিলি নিজেই এই চিঠিটা তুলে দিয়েছিলেন শরৎ চন্দ্র বসুর ছেলে, ডা. শিশির বসুর স্ত্রী কৃষ্ণা বসুর হাতে।
৫ মার্চ, ১৯৩৬ সালে লেখা চিঠিটা শুরু হয়েছিল এইভাবে :
"মাই ডার্লিং, কখনও সখনও হিমবাহও গলে যায়। আমার মনে এখন অনেকটা সেরকমই অবস্থা। আমি যে তোমায় কতটা ভালবাসি সেটা জানাতে এই চিঠিটা লেখা থেকে নিজেকে সম্বরণ করতে পারলাম না। 'মাই ডার্লিং', আমাদের নিজেদের মতো করে কী বলতে পারি, যে তুমি আমার হৃদয়ের রাণী?" সুভাষ চন্দ্র ওই চিঠিতেই লিখছেন, "আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। হতে পারে, পুরো জীবনটাই হয়তো জেলে কাটাতে হবে, অথবা আমাকে গুলি করে দেয়া হতে পারে, কিংবা ফাঁসিও হতে পারে। এও সম্ভব যে তুমি হয়তো আমাকে কখনও আর দেখতেই পাবে না, অথবা আমি হয়তো কখনও তোমাকে চিঠিও লিখতে পারব না। কিন্তু ভরসা রেখ, তুমি চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকবে, আমার মনে, আমার স্বপ্নে থাকবে। যদি এই জীবনে সম্ভব না হয়, তাহলে পরের জীবনে তোমার সঙ্গেই থাকব আমি।" "আমি তোমার অন্তরে থাকা নারীত্বকে ভালবাসি, তোমার আত্মার সঙ্গে আমার প্রেম। তুমিই আমার জীবনে প্রথম প্রেম," এমিলি শেঙ্কলকে লিখেছিলেন সুভাষ চন্দ্র। একেবারে শেষে ওই চিঠিটা নষ্ট করে ফেলতে বলেছিলেন সুভাষ। কিন্তু এমিলি সেটাকে সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন।
গোপন বিবাহ
বোঝাই যাচ্ছে যে সুভাষ চন্দ্র বসু এমিলি শেঙ্কলের প্রেমে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন। এই বিষয়ে সুভাষ চন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং রাজনৈতিক সহযোগী এ সি এন নাম্বিয়ার সুগত বসুকে জানিয়েছিলেন, "সুভাষ একজন প্রকৃত আদর্শবাদী ব্যক্তি ছিল। তার ধ্যানজ্ঞান ছিল দেশের স্বাধীনতা। কিন্তু যদি কোনও বিচ্যতির কথা বলতে হয়, তাহলে সেটা হয়েছিল তিনি যখন এমিলির প্রেমে পড়লেন, সেই সময়ে। খুবই ভালবাসতেন এমিলিকে। একেবারে প্রেমে ডুবে যাওয়া যাকে বলে, সেইরকম।" সেই সময়ে সুভাষচন্দ্রের মনের অবস্থা কীরকম ছিল, সেটা বোঝা যায় আরেকটি চিঠিতে। ১৯৩৭ এর এপ্রিল বা মার্চ মাসে এমিলিকে লেখা ওই চিঠির পুরোটাই ইংরেজী ক্যাপিটাল অক্ষরে লেখা। "গত কিছুদিন যাবত তোমাকে চিঠি লেখার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আশা করি তুমি বুঝতে পারবে যে তোমাকে নিয়ে আমার মনের মধ্যে কী চলছে, সেটা লিখে বোঝানো কঠিন। তোমাকে শুধু এটাই বলতে চাই, আমি আগেও যেরকম ছিলাম এখনও সেরকমই আছি।" এই চিঠি দেয়া নেয়ার পালার পরে প্রথম যেবার এমিলি আর সুভাষ চন্দ্রের দেখা হয়েছিল, তখনই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ড. কৃষ্ণা বসুকে এমিলি বলেছিলেন, ১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়েছিল অস্ট্রিয়ার বাদগাস্তিনে। দুজনেরই পছন্দের রিসর্ট ছিল ওটা। তবে দুজনেই নিজেদের বিয়ের ব্যাপারটা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কৃষ্ণা বসু বলছেন, নিজের বিয়ের তারিখটা ছাড়া আর কোনো কিছুই বলতে চাননি এমিলি। তবে সুভাষ চন্দ্র আর এমিলির মেয়ে অনিতা বসু তার মায়ের কাছ থেকে যা শুনেছেন, তার ভিত্তিতেই বলেছিলেন ভারতীয় নববধূর মতো বিয়ের সময়ে তার মাথায় সিঁদুর পরানো হয়েছিল।
বিয়েটা এতটাই গোপণীয় রাখা হয়েছিল যে সুভাষচন্দ্রের ভাইপো অমিয় বসু বিয়ের সময়েই বাদগাস্তিনে গিয়েছিলেন, তবুও এমিলিকে দেখে তার সেই সময়েও নিজের কাকার সহকারী ছাড়া অন্য কিছু মনে হয়নি। নিজের বিয়ে নিয়ে এত গোপণীয়তার সম্ভাব্য কারণ হিসাবে রুদ্রাংশু মুখার্জী লিখেছেন, সম্ভবত সুভাষ চন্দ্র নিজের রাজনৈতিক জীবনে এই বিয়ের কোনো প্রভাব পড়ুক, সেটা চাননি। একজন বিদেশীনিকে বিয়ে করার ঘটনায় মানুষের মনে তার যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তার ওপরে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই তিনি হয়তো মনে করেছিলেন। সুভাষ চন্দ্র আর এমিলি শেঙ্কলের প্রেমপর্বের ওপরেই একটা বই লিখেছেন তিনবার ভারতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ড. কৃষ্ণা বসু । 'আ ট্রু লাভ স্টোরি - এমিলি এন্ড সুভাষ' নামের ওই বইটিতে দুজনের প্রেমপর্বের অনেক জানা- অজানা তথ্য রয়েছে। এমিলিকে সুভাষ ভালোবেসে 'বাঘিনী' বলে ডাকতেন। আবার এরকম ঘটনারও উদাহরণ আছে, এমিলির বুদ্ধিমত্তা যে সুভাষের ধারে কাছেও ছিল না, এবং সেটা সুভাষ কখনও কখনও প্রকাশও করে দিতেন। কৃষ্ণা বসুর লিখেছেন, সুভাষচন্দ্র চেয়েছিলেন যে এমিলি কয়েকটি ভারতীয় পত্রপত্রিকার জন্য ভিয়েনা থেকে রিপোর্ট লিখতে শুরু করুন। এমিলি সেই অনুযায়ী 'দা হিন্দু' এবং 'মর্ডান রিভিউ' পত্রিকার জন্য বেশ কিছু লেখাও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংবাদের বিশ্লেষণ ঠিকমতো করতে না পারায় এমিলির বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়নি। সুভাষ তাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, "তোমার লেখা ঠিক হয়নি, তাই ছাপা হলো না।" একবার ভারতের ওপরে বেশ কিছু বই আনতে বলেছিলেন এমিলি। ১৯৩৭-এর ১২ অগাস্ট লেখা এক চিঠিতে সুভাষচন্দ্র এমিলিকে লিখেছিলেন, "তুমি ভারতের ওপরে কিছু বই আনতে দিয়েছ। তবে আমার মনে হয় না ওইসব বইগুলো তোমাকে পড়তে দিয়ে খুব একটা লাভ হবে।
তোমার কাছে যেসব বইগুলো আছে, তুমি তো সেগুলোই পড়ে ওঠনি।" "তুমি যতদিন না সিরিয়াস হবে, ততদিন পড়ার ব্যাপারে তোমার মন লাগবে না। ভিয়েনাতে তোমার কাছে এখনই কত বই রয়েছে। আমার তো মনে হয় না সেগুলো তুমি উল্টেপাল্টেও দেখেছ কখনও," স্ত্রীকে লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র। এরকম কিছু কড়া শব্দ কখনও সখনও ব্যবহার করলেও এমিলি আর সুভাষ একে অপরকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ - এই প্রায় ১২ বছর সময়কালে দুজনে বছর তিনেকেরও কম সময় একসঙ্গে কাটাতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার মধ্যেই দুজনের প্রেমের চিহ্ন হিসেবে ১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর জন্ম নেয় তাদের কন্যা অনিতা। মেয়েকে দেখার জন্য ১৯৪২-এর ডিসেম্বরে ভিয়েনায় পৌঁছান সুভাষ চন্দ্র। তারপরে বড়ভাই শরৎ চন্দ্রকে বাংলায় লেখা একটি চিঠিতে সুভাষ চন্দ্র স্ত্রী আর কন্যার ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। তারপরেই সুভাষ চন্দ্র বসু সেই মিশনে রওনা হন, যেখান থেকে এমিলি বা অনিতার কাছে আর কোনওদিনই ফিরে আসেন নি। এমিলি অবশ্য সুভাষের স্মৃতি নিয়েই ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। একটা ছোট টেলিগ্রাফ অফিসে চাকরী করে সুভাষ চন্দ্রের শেষ স্মৃতি - নিজের মেয়ে অনিতাকে বড় করেছেন - জার্মানীর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বানিয়েছেন। তবে সুভাষ চন্দ্রের পরিবার থেকে কোনো রকম সাহায্য নিতে অস্বীকার করে গেছেন এমিলি। শুধু তাই নয়, সুভাষ চন্দ্র নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে যে গোপণীয়তা রক্ষা করতে চাইতেন, যেভাবে সেটা গোটা দুনিয়ার কাছ থেকে আড়াল করতে চাইতেন, এমিলিও সম্পূর্ণভাবে তার মর্যাদা রেখে গেছেন চির জীবন।

নেতৃত্ব-ইটন-ফৌজদারহাট by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

গত ২০ বছরে অনেক পত্রিকায় লিখেছি বা লিখে আসছি যেমন- ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ, মানবজমিন, ইত্তেফাক, সমকাল, কালের কণ্ঠ, প্রভৃতি। বর্তমানে বেশি লিখি নয়া দিগন্ত ও যুগান্তরে। প্রত্যেক সপ্তাহে, বুধবারের দুই-তিন দিন আগে লেখার সময় এলেই, নয়া দিগন্তের কলামের বিষয়বস্তু কী হবে সেটা নিয়ে যৎকিঞ্চিত চিন্তা করি। হার্ডকপি বা মুদ্রিত কপির সার্কুলেশন হিসেবে, পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা দুই-তিন লাখের মধ্যে হলেও, অনলাইনে এই পত্রিকার পাঠক সংখ্যা পঞ্চান্ন লাখের উপরে বলে জানা যায়। অতএব এত বিশাল সংখ্যক গ্রাহকের সমীপে বক্তব্য উপস্থাপন করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা স্বাভাবিক। জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ভালো। নিজে কলাম পড়ি ১৯৭২ সাল থেকে; লিখি ১৯৯৭ সাল থেকে; অর্থাৎ পাঠক হিসেবে যেমন অভিজ্ঞতা আছে, লেখক হিসেবেও অভিজ্ঞতা আছে। সেই সুবাদে মনের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত কামনা এরূপ : মানুষ ও দেশ যেন আমার লেখনীর মাধ্যমে উপকৃত হয়। ছোটকালে স্কুল-কলেজে আমরা যেমন বিতর্কে অংশ নিয়েছি, তেমনি এখনো ছাত্রছাত্রীরা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বিতর্কের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও আলাপপ্রিয় বিষয় অতীতে যেমন ছিল এখনো আছে: ‘অসি বড়, না মসি বড়’। অসি মানে তরবারি তবা বন্দুক তথা যুদ্ধের অস্ত্র তথা যুদ্ধ মানে বল প্রয়োগ বা শক্তি। মসি মানে কলম তথা লেখনী, উদ্দীপনা সৃষ্টি তথা সচেতনতা সৃষ্টি অথবা শান্তিময় পরিবেশে ভাব বিনিময় কিংবা বিনয়ী ভাষায় আহ্বান তথা ভদ্র ভাষায় প্রতিবাদ জ্ঞাপন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একজন সৈনিক ছিলাম, অর্থাৎ অসি আমার হাতে ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে অন্যতম উদাহরণ, যেখানে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা আনতে হয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল বিনা অস্ত্রে, সাহিত্যে-ভাষণে-বচনে-চিন্তায়। আমার অবসর জীবনে অসির সাথে সম্পৃক্ত নই বা সেটার ওপর নির্ভরশীল নই; আমার প্রাধান্য মসিতে। তাই আজ লিখব একটি পরিচিত বিষয় নিয়ে; নেতৃত্ব সৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে। উদাহরণ হচ্ছে, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ (সংক্ষেপে এফসিসি)।
মিশ্র কথন
বুধবার ১৭ জানুয়ারি নয়া দিগন্তে আমার কলামের শেষ অনুচ্ছেদটি ছিল ফৌজদারহাট নিয়ে। ফৌজদারহাট মানে এফসিসি। আমার লেখা একাদশতম বইয়ের নাম ‘মিশ্র কথন’। সেই বইটি প্রখ্যাত দোকানগুলোতে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি অনলাইন বিক্রেতাদের কাছেও এবং ই-বুক হিসেবেও পাওয়া যায়। সেই বইয়ে তৃতীয় অধ্যায়ের নাম : ‘জীবনের ভিত্তি ক্যাডেট কলেজ অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়’। আমার বইয়ের ৩৭ থেকে ৮২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ক্যাডেট কলেজ শিক্ষার ওপরই তথা এফসিসির শিক্ষার ওপরে আলোচনা আছে। এর এক জায়গায় ইংল্যান্ডের ইটন নামক স্থানে অবস্থিত পাবলিক স্কুল এবং বাংলাদেশের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অতি সংক্ষিপ্ত পরিপূরক আলোচনা করেছি।
ইটন ও ডিউক অব ওয়েলিংটন
ইটন স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত; তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ১৮ জুন ১৮১৫ সালে সংঘটিত ওয়াটারলু যুদ্ধে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ানের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনীকে পরাস্তকারী, ব্রিটিশ সেনাপতি যার নাম ছিল আর্থার ওয়েলেসলি। যুদ্ধ জয়ের পর, পুরস্কার ও সম্মানের অংশ হিসেবে, ব্রিটিশ রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে, তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাট ওয়েলেসলিকে ‘ডিউক অব ওয়েলিংটন’ হিসেবে মনোনীত করেন। বলে রাখা ভালো, ওয়েলিংটন তৎকালীন ইংল্যান্ডেরই একটি জায়গার নাম। আভিজাত্য ও গুরুত্বের ক্রমবিন্যাসে সম্রাটের পরেই হলেন প্রিন্স এবং প্রিন্সের পরে হলেন ডিউকেরা। বর্তমান ব্রিটিশ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী ফিলিপ হলেন ডিউক অব এডিনবরা’। স্কটল্যান্ডের রাজধানী নগরীর নাম এডিনবরা। যুদ্ধজয়ী সেনাপতি আর্থার ওয়েলেসলি হলেন প্রথম ডিউক অব ওয়েলিংটন এবং পরে তিনি হয়েছিলেন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ তথা স্টেটসম্যান। ওয়াটারলুর যুদ্ধজয়ী সেনাপতির মূল নাম সবাই ভুলে গেছে; ‘ডিউক অব ওয়েলিংটন’ নামটি ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত। ওয়াটারলুর যুদ্ধের পরে, সেই ডিউক অব ওয়েলিংটন বলেছিলেন : ‘দি ব্যাটল অব ওয়াটারলু ওয়াজ ওয়ান অন দি প্লেইং ফিল্ডস অব ইটন।’ অর্থাৎ ওয়াটারলুর যুদ্ধ জয় হয়েছিল ইটনের খেলার মাঠেই। বাক্যটিকে প্রতীকী বা রূপক অর্থে গ্রহণ করতে হবে। ব্যাখ্যাটা এরূপ : ইটনে অবস্থিত স্কুলে লেখাপড়া করার সময় আর্থার ওয়েলেসলি যে গুণাবলি অর্জন করেছিলেন, ইটনের শিক্ষার মাধ্যমে যেসব বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে স্থান পেয়েছিল, সেগুলোর সুবাদেই তিনি প্রখ্যাত সেনাপতি নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছিলেন।
ফৌজদারহাট ও ইবরাহিম
ইটন ও ডিউক অব ওয়েলিংটনের আলোচনার পর ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ তথা এফসিসির আলোচনা করব। আমি নিতান্তই একজন নগণ্য ব্যক্তি, সাবেক সৈনিক, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী, একজন সাধারণ সাংসারিক ব্যক্তি। ওয়াটারলুর যুদ্ধের মতো কোনো যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করিনি। কিন্তু জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে যে কয়টি স্থানে জয়ী হতে পেরেছি, এর পেছনে অবদান আছে এফসিসির শিক্ষার; এ ওই আমলের শিক্ষকদের। আমি নবম ব্যাচের ছাত্র। ছাত্রদের মধ্যে যাদের পিতা মাসিক উপার্জনে দরিদ্র ছিলেন, তাদের মধ্যে আমার পিতা অন্যতম। তৎকালীন সরকার প্রত্যেক ক্যাডেটের পেছনে মাথাপিছু ব্যয় করত ৪০০ টাকা মাসিক। তার মধ্যে ক্যাডেটদের কাছ থেকে আদায় করা হত সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। আমার পিতা দিতেন মাত্র ২৫ টাকা, বাকিটা স্কলারশিপ। বহু ছাত্র বা বন্ধুই একদম বিনামূল্যেও পড়েছেন, অর্থাৎ পূর্ণ স্কলারশিপ। ১৯৬২ সালে ঢুকেছিলাম, ১৯৬৮ সালে বের হয়েছি। ওই বছর ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত, যদি ক্যাডেট কলেজের ছাত্র না হতাম অর্থাৎ যদি চট্টগ্রাম বন্দর হাইস্কুলেই থেকে যেতাম, তাহলে প্রথম স্থান অধিকার করতাম না। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুল থেকে ২৪তম ওয়ার কোর্সের সেরা বা প্রথম স্থান অধিকারকারী বা সর্বোত্তম ক্যাডেট হিসেবে কমিশন পেয়েছিলাম। পুরস্কার হিসেবে ঐতিহ্যবাহী কমান্ডার ইন চিফস কেইন আমার হাতে তুলে দেয়া হয়। ওই আমলের মিলিটারি একাডেমিতে, দুই বছর মেয়াদি বা লং কোর্সে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হতো সোর্ড অব অনার; ৯ মাসব্যাপী ওয়ার কোর্সে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হচ্ছে কমান্ডার ইন চিফস কেইন। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে মাত্র একজন বাঙালি সোর্ড অব অনার পেয়েছিলেন এবং তিন জন বাঙালি কমান্ডার ইন চিফ’স কেইন পেয়েছিলেন; অর্থাৎ মোট চারজন বাঙালি নিজ নিজ আমলে, সর্বোত্তম ক্যাডেট বিবেচিত হয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার, ১১৫ পাউন্ড ওজনের শ্যামলা বর্ণের বাঙালি ছেলে ইবরাহিম ওই সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিল ফৌজদারহাটের শিক্ষার জনই। ১৯৭১ সালের ৯ মাসব্যাপী মহান মুক্তিযুদ্ধে যতথাসাধ্য সম্ভব ততটুকু অবদান রেখেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে ২৭ বছরের চাকরি জীবনে যতটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন সম্ভব ততটুকু করেছি এবং সাফল্যের সাথেই করেছি। সময়ের আগেই বাধ্যতামূলক অবসর পেয়েছি সত্য, কিন্তু অবসর জীবনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি পূর্ণোদ্যমে। ‘কাজে লাগানো’ বলতে, নিজের জন্য যত না, তার থেকে শতগুণ বেশি দেশের জন্য ও মানুষের জন্য। প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশে টিকে আছি; টেলিভিশনে বক্তব্য রাখি, পত্রিকায় কলাম লিখি, রাজপথে হাঁটি- এ সবকিছুর পেছনেই ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার অবদান আছে। এই কলামের পাঠক আমার শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে কেউ যেন ভুল না বোঝেন; মহান আল্লাহর দয়ায় তথা মহান আল্লাহর রহমতেই সবকিছু হয়েছে এবং হচ্ছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু জাগতিক উসিলা বা জাগতিক কাঠামো বা মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালাই এই উসিলা, এই কাঠামো, এই মাধ্যম এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেন।
এই প্রেক্ষাপটেই আমার বক্তব্য : ডিউক অব ওয়েলিংটনের জন্য ইটন যেমন, ইবরাহিমের জন্য ফৌজদারহাট তেমন।
ক্যাডেট কলেজ সমাচার
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের হাসান আবদাল নামক শহরে প্রথম ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ, জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের আগ্রহে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও একটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ২৮ এপ্রিল ১৯৫৮ সালে সে সময়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ১০ মাইল উত্তরে, ফৌজদারহাট নামক স্থানে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রাংক রোডের পূর্ব পাশে, অনুচ্চ পাহাড় সারির পাদদেশে এই কলেজ চালু হয়; নাম ছিল দি ইস্ট পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজ। আইয়ুব খানের উদ্যোগেই প্রথম প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ফেলো অব দি রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি, লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম মরিস ব্রাউন, জন্মসূত্রে নিউজিল্যান্ডবাসী এবং চাকরিসূত্রে বিলাতি। কর্নেল ব্রাউনের অবদান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ এবং তার আমলের সব ছাত্রের ইতিহাসে ও মানসপটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ছয় বছর পর ১৯৬৪ সালে, রাজশাহীর সারদাতে, বর্তমান টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এবং তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহে আরো তিনটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়। ফলে প্রথমটির নাম বদলিয়ে রাখতে হয় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষা চালুর পেছনে যে ধারণাটি কাজ করেছিল, সেটি ছিল : দেশের ও জাতীয় জীবনের সর্ব আঙ্গিকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি সৃষ্টি করা। এই কলামে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়; কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, দেশে এবং বিদেশে বহু পেশায় ও কর্মকান্ডে উল্লেখযোগ্য ও দর্শনীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্ররা তথা ক্যাডেট কলেজগুলোর ছাত্ররা। আমার পরিবারে, আমার থেকে বারো বছর ছোট ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ মইনুদ্দিন, এফসিসির ২১তম ব্যাচের ক্যাডেট। মইনুদ্দিন জাপান থেকে পিএইচডি করেছেন নিউরো সার্জারিতে, আমেরিকার আরকানসাস থেকে তিন বছর অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণ নিয়েছেন; এখন নিউরো সার্জারির প্রফেসর। আমার ছেলে সৈয়দ ফজলুল করিম মুজাহিদ কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের ১২তম ব্যাচের ছাত্র। আমার তৃতীয় ছোটভাই প্রথিতযশা শিল্প উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে রায়াত বিন নাসির, বর্তমানে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। পুরনো অনেক সাবেক ক্যাডেটের ছেলেও ‘সাবেক ক্যাডেট’ হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। এমনকি, অনেক সাবেক ক্যাডেটের নাতিরাও ক্যাডেট কলেজগুলোতে পড়ছে। তবে অবশ্যই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে রাখি যে, বাংলাদেশী সমাজের যেকোনো স্তরের যে কোনো ইনকাম গ্রুপের, যেকোনো স্বচ্ছ পেশার, যেকোনো ধর্মের ও ভাষার যেকোনো পরিবারের সন্তানদের জন্য ক্যাডেট কলেজে প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত। ঢোকার পরীক্ষা বা পরীক্ষার ধাপগুলো অতি কঠিন, অতি স্বচ্ছ এবং পাস করার জন্য প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।
ক্যাডেট কলেজের মৃত্যুদণ্ড ও রক্ষা
১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তির আগ্রহে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সব ক্যাডেট কলেজে ওই পদ্ধতির শিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ওই কলেজগুলোর ক্যাম্পাসকে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হবে। তখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের কিছু সাবেক ক্যাডেট (যাদের ‘ওল্ড ফৌজিয়ান’ বলা হয়) সংগঠিত হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন ক্যাডেট কলেজ রক্ষার জন্য (‘সেইভ ক্যাডেট কলেজ’ মুভমেন্ট)। আমার লেখা বই মিশ্রকথনের যথাস্থানে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে। ওই আন্দোলনকারী ওল্ড ফৌজিয়ানরা, তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাহায্য কামনা করেন এবং সেই সাহায্য পেয়েছেন। জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে, তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি ও পরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর সাহায্য কামনা করেন এবং সাহায্য পান। জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল ওসমানী ছাত্রদের ধৈর্যসহকারে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। মূলত জেনারেল ওসমানীর কারণেই বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দেন যে, ক্যাডেট কলেজগুলো বহাল থাকবে।
রি-ইউনিয়ন বা পুনর্মিলনী
বলছিলাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের। ২৮ এপ্রিল ১৯৫৮ থেকে ২৮ এপ্রিল ২০১৮ সময়কাল হচ্ছে ৬০ বছর। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ব্যবস্থার কারণে ক্যাডেট কলেজগুলোতে পুনর্মিলনী বা রি-ইউনিয়ন অনুষ্ঠিত হয় প্রতি চার বছর অন্তর। ঘটনাক্রমে ২০১৮তে কলেজের হীরকজয়ন্তীর (ডায়মন্ড জুবলি) সঙ্গে রি-ইউনিয়নের বছর মিলে যায়। ফলে ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০১৮ তিন দিনব্যাপী রি-ইউনিয়ন হলো। প্রায় দুই হাজার সাবেক ছাত্র ও তাদের স্ত্রী পরিবার অংশ নেয়। অতীতের মতো এবারো রি-ইউনিয়ন খরচের ৯০ ভাগই বহন করেছে সাবেক ক্যাডেটরা তথা ওল্ড ফৌজিয়ানরা এবং তারা এটা সংগ্রহ করেন বিভিন্ন দানশীল বা শিক্ষা-অনুরাগী বা ক্যাডেটকলেজ-বান্ধব ব্যক্তি এবং করপোরেট সংগঠনগুলো থেকে। উদাহরণস্বরূপ শুধুমাত্র বলছি, মোট ছয়টি ব্রেকফার্স্ট, লাঞ্চ ও ডিনার এর প্রত্যেকটি স্পন্সর করা হয়েছে। সোলস এবং এলআরবি গিয়েছিল, সেটাও স্পন্সর করা হয়েছে এবং স্পন্সরদের সাথে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওল্ড ফৌজিয়ানরা জড়িত; অথবা ধনী ও উদার ওল্ড ফৌজিয়ানরা নিজেরাই স্পন্সর করেছেন। প্রত্যেকবার রি-ইউনিয়নের সময় যে ফান্ড সংগ্রহ করা হয়, সেখান থেকে একটি বড় অংশ কলেজকে অনুদান হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়। তিন-চার বছর আগে এরূপ অনুদান দিয়ে, সব ক্যাডেটের শোয়ার খাট বদলানো হয়েছিল। আরো কিছু টাকা তহবিলে জমা রাখা হয়েছিল। সরকার অনুমতি দিয়েছে, সাবেক ক্যাডেটরা ইচ্ছা করলে, ক্যাডেট কলেজের ভৌতকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে বা সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নে অনুদান দিতে পারেন। কিন্তু এটা কারো ব্যক্তিগত নামে হবে না, এটা ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের নামে হবে বা কোনো ফাউন্ডেশনের অথবা কোনো ফান্ডের নামে হবে। এটা সব ক্যাডেট কলেজের জন্য প্রযোজ্য। অতীতের বছরগুলোতে কলেজের নতুন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট সেন্টার নবায়ন করা, লাইব্রেরি নবায়ন করা, কম্পিউটার সেন্টার সমৃদ্ধ করা এবং এবারে জিমনেসিয়াম নবায়ন করা হয়েছে। ওল্ড ফৌজিয়ান আর্কিটেক্ট কর্তৃক শুভেচ্ছার বিনিময়ে নকশা বানানো হয়েছে এবং নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারক স্তম্ভ এবং কলেজের প্রবেশমুখে হীরকজয়ন্তী গেট; এগুলোর সম্পূর্ণ খরচ ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বহন করেছে। বৃহদাকারের একটি রেস্ট হাউজ তথা গেস্ট হাউজ নির্মিত হবে; সেখানেও অর্ধেক খরচ অনুদান হিসেবে দেবে ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। ক্যাডেট কলেজের অতীত ও বর্তমান শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ওয়েলফেয়ার ফান্ড সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আরো করা হবে। কলেজের বাইরে, শীতকালে বা বর্ষাকালে এবং সাইক্লোনের সময় দুস্থদের পাশে সবসময়ই সব ক্যাডেট কলেজের ওল্ড ক্যাডেটরা দাঁড়ান। রোহিঙ্গাদের পাশে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে; সরকারি মাধ্যমে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ন্যাশনাল সলিডারিটি ফর দি রোহিঙ্গা নামে আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো আহবান করে যাচ্ছি। এবারের রি-ইউনিয়নটি ছিল আনন্দদায়ক এবং সাফল্যমণ্ডিত। ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয়, ঢাকা চ্যাপ্টার, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার নেতাদেরকে, বিশেষ আহ্বায়ক কমিটিকে এবং স্পন্সরদেরকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্যান্য প্রথিতযশা স্কুল ও কলেজের সাবেক ছাত্ররাও এভাবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অবদানের বৃত্ত গড়ে তুলেছেন অথবা ভবিষ্যতে গড়ে তুলবেন।
সাবেকদের পদচারণা
দেশের সব ছাত্র ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুযোগ পাবে না; এটাই বাস্তবতা। ক্যাডেট কলেজে পড়লেই মাত্র দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর এসএসসি বা এইচএসসির মেধা তালিকায় স্থান পাবে- এমনও কোনোমতেই নয়। শুধু ক্যাডেট কলেজে পড়লেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন পাওয়ার সময় মেধা তালিকায় উপরের দিকে থাকবে, এমনও নয়। ক্যাডেট কলেজে পড়েননি এমন ছাত্র বা ব্যক্তিদের সংখ্যা, কলেজে পড়ুয়াদের তুলনায় হাজার গুণ বেশি। সামরিক বাহিনীতে জেনারেল বা অ্যাডমিরাল বা এয়ার মার্শাল, সরকারে সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর, ব্যাংকগুলোতে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, পুলিশে এসপি, বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজের ক্যাপ্টেন বা ইঞ্জিনিয়ার, তাবলিগ জামাতে মুরুব্বি, বড় বড় হাসপাতালের বড় বড় ডাক্তার, শিল্প উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশে পার্লামেন্ট সদস্য যতজন হবেন বা হচ্ছেন, তার মধ্যে ক্ষুদ্র অংশ মাত্র সাবেক ক্যাডেটরা; সব ক্যাডেট কলেজের। কিন্তু আচরণে, দক্ষতায়, বৈশিষ্ট্যে এই ক্ষুদ্র অংশ তথা মাইনরিটি, উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয়। একটি কথা না বললেই নয়; নভোমণ্ডলে তারকা বা গ্রহ যেমন কক্ষচ্যুত হয়, ট্রেন লাইনের ট্রেন যেমন লাইনচ্যুত হয়, তেমনি শুধু ফৌজদারহাট বলে নয়, সব ক্যাডেট কলেজেরই সাবেকদের মধ্যে কোনো না কোনো সাবেক ক্যাডেট কক্ষচ্যুত, পথচ্যুত, লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারেন; সামাজিক প্রক্রিয়ায় এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিতে হবে। তাই আমরা সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যাকে আলোচনা আর না। আমরা আলোচনার বিষয় করাচি তাদেরকেই, যারা ইতিবাচক অবদান রেখেছেন বা রেখেই যাচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ফৌজিয়ানরা
এফসিসির সাবেক ছাত্রদের (১৯৫৮-১৯৭১) মধ্যে ৪৭ জন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন; তাদের মধ্যে আটজন শহীদ। এই ৪৭ জনের মধ্যে একজন বীর উত্তম (প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের) লেফটেন্যান্ট আনোয়ার যাঁর নামে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্কুল আছে, একজন বীর বিক্রম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র এবং সুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকার ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ সদস্য) বদিউল আলম। ওই ৪৭ জনের মধ্যে জীবিত খেতাবপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলেন- সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান (অব:) এ এস এম লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাসিম বীর বিক্রম, সাবেক রাষ্ট্রদূত (অব:) মেজর জেনারেল সাইদ আহমেদ বীর প্রতীক, বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বীর বিক্রম এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও টিভি ব্যক্তিত্ব অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক।
একটি বক্তৃতা
এফসিসির সদ্য সমাপ্ত রি-ইউনিয়নে উদ্বোধনী সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এবং সকালের উদ্বোধনী প্যারেডে সালাম গ্রহণের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান। উভয়েই উদ্দীপনাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। প্রধান দিবসে সন্ধ্যাবেলা রি-ইউনিয়ন স্পিকার ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী (বাংলাদেশে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করেন) প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী-গবেষক প্রফেসর মুহাম্মদ আতাউল করিম। বৃহত্তর সিলেটের বড়লেখার সন্তান আতাউল করিম ফৌজদারহাটের ১২তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। তিনি এসএসসির পর কলেজ থেকে চলে গিয়েছিলেন। ৩৫ মিনিট দীর্ঘ বক্তব্যে, তিনি তরুণদের জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উদাহরণ উপস্থাপনা এবং প্রণোদনা প্রদান করেন। তার দীর্ঘ বক্তব্য থেকে যদি আমাকে কিছু কথা বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি বলবো, এক. জীবনে লক্ষ্য স্থির করতে হয়, কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। দুই. ধীরেসুস্থে বিবেচনার পর লক্ষ্য স্থির হয়ে গেলে সেটা অর্জনের জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হতে হয়।
তিন. লক্ষ্য অর্জন এক-দুই বছরের ব্যাপার নয়, দীর্ঘ মেয়াদি ব্যাপার। যদি বলা হয় যে, কোনো একজনের জীবনের লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া, সেটা হবে আংশিক বক্তব্য। বর্ধিত বক্তব্য হবে একজন ভালো ডাক্তার হওয়া। আরো বর্ধিত বক্তব্য হবে (অর্থাৎ উপার্জনের বাইরে), ডাক্তার হিসেবে সমাজে অবদান রাখা। তাই প্রত্যেক লক্ষ্য অর্জনের পথে ধাপে ধাপে নিজের কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়ন ও পুনর্মূলায়ন করতে হবে। চার. লক্ষ্য অর্জনের পথে বিভিন্ন সুযোগ আসে। চলার পথে যদি উন্নতির বা উন্নয়নের জন্য বা উপকারের জন্য কোনো সুযোগ আসে তাহলে সেই সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। পাঁচ. সুযোগ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি দরকার। প্রস্তুতির গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদের এবং সার্বক্ষণিক। প্রত্যেকেই তার জীবনে সুযোগ গ্রহণের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। সাত. হঠাৎ হঠাৎ মানুষের জীবনে সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়। সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় কোনো সময় প্রতিযোগিতা থাকে, কোনো সময় প্রতিযোগিতা থাকে না। যাই হোক, প্রবেশের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা লাগে। সে যোগ্যতা হঠাৎ করে অর্জন করা যায় না। এ জন্য সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

নেতৃত্ব-ইটন-ফৌজদারহাট by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

গত ২০ বছরে অনেক পত্রিকায় লিখেছি বা লিখে আসছি যেমন- ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ, মানবজমিন, ইত্তেফাক, সমকাল, কালের কণ্ঠ, প্রভৃতি। বর্তমানে বেশি লিখি নয়া দিগন্ত ও যুগান্তরে। প্রত্যেক সপ্তাহে, বুধবারের দুই-তিন দিন আগে লেখার সময় এলেই, নয়া দিগন্তের কলামের বিষয়বস্তু কী হবে সেটা নিয়ে যৎকিঞ্চিত চিন্তা করি। হার্ডকপি বা মুদ্রিত কপির সার্কুলেশন হিসেবে, পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা দুই-তিন লাখের মধ্যে হলেও, অনলাইনে এই পত্রিকার পাঠক সংখ্যা পঞ্চান্ন লাখের উপরে বলে জানা যায়। অতএব এত বিশাল সংখ্যক গ্রাহকের সমীপে বক্তব্য উপস্থাপন করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা স্বাভাবিক। জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ভালো। নিজে কলাম পড়ি ১৯৭২ সাল থেকে; লিখি ১৯৯৭ সাল থেকে; অর্থাৎ পাঠক হিসেবে যেমন অভিজ্ঞতা আছে, লেখক হিসেবেও অভিজ্ঞতা আছে। সেই সুবাদে মনের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত কামনা এরূপ : মানুষ ও দেশ যেন আমার লেখনীর মাধ্যমে উপকৃত হয়। ছোটকালে স্কুল-কলেজে আমরা যেমন বিতর্কে অংশ নিয়েছি, তেমনি এখনো ছাত্রছাত্রীরা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বিতর্কের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও আলাপপ্রিয় বিষয় অতীতে যেমন ছিল এখনো আছে: ‘অসি বড়, না মসি বড়’। অসি মানে তরবারি তবা বন্দুক তথা যুদ্ধের অস্ত্র তথা যুদ্ধ মানে বল প্রয়োগ বা শক্তি। মসি মানে কলম তথা লেখনী, উদ্দীপনা সৃষ্টি তথা সচেতনতা সৃষ্টি অথবা শান্তিময় পরিবেশে ভাব বিনিময় কিংবা বিনয়ী ভাষায় আহ্বান তথা ভদ্র ভাষায় প্রতিবাদ জ্ঞাপন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একজন সৈনিক ছিলাম, অর্থাৎ অসি আমার হাতে ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে অন্যতম উদাহরণ, যেখানে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা আনতে হয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল বিনা অস্ত্রে, সাহিত্যে-ভাষণে-বচনে-চিন্তায়। আমার অবসর জীবনে অসির সাথে সম্পৃক্ত নই বা সেটার ওপর নির্ভরশীল নই; আমার প্রাধান্য মসিতে। তাই আজ লিখব একটি পরিচিত বিষয় নিয়ে; নেতৃত্ব সৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে। উদাহরণ হচ্ছে, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ (সংক্ষেপে এফসিসি)।
মিশ্র কথন
বুধবার ১৭ জানুয়ারি নয়া দিগন্তে আমার কলামের শেষ অনুচ্ছেদটি ছিল ফৌজদারহাট নিয়ে। ফৌজদারহাট মানে এফসিসি। আমার লেখা একাদশতম বইয়ের নাম ‘মিশ্র কথন’। সেই বইটি প্রখ্যাত দোকানগুলোতে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি অনলাইন বিক্রেতাদের কাছেও এবং ই-বুক হিসেবেও পাওয়া যায়। সেই বইয়ে তৃতীয় অধ্যায়ের নাম : ‘জীবনের ভিত্তি ক্যাডেট কলেজ অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়’। আমার বইয়ের ৩৭ থেকে ৮২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ক্যাডেট কলেজ শিক্ষার ওপরই তথা এফসিসির শিক্ষার ওপরে আলোচনা আছে। এর এক জায়গায় ইংল্যান্ডের ইটন নামক স্থানে অবস্থিত পাবলিক স্কুল এবং বাংলাদেশের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অতি সংক্ষিপ্ত পরিপূরক আলোচনা করেছি।
ইটন ও ডিউক অব ওয়েলিংটন
ইটন স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত; তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ১৮ জুন ১৮১৫ সালে সংঘটিত ওয়াটারলু যুদ্ধে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ানের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনীকে পরাস্তকারী, ব্রিটিশ সেনাপতি যার নাম ছিল আর্থার ওয়েলেসলি। যুদ্ধ জয়ের পর, পুরস্কার ও সম্মানের অংশ হিসেবে, ব্রিটিশ রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে, তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাট ওয়েলেসলিকে ‘ডিউক অব ওয়েলিংটন’ হিসেবে মনোনীত করেন। বলে রাখা ভালো, ওয়েলিংটন তৎকালীন ইংল্যান্ডেরই একটি জায়গার নাম। আভিজাত্য ও গুরুত্বের ক্রমবিন্যাসে সম্রাটের পরেই হলেন প্রিন্স এবং প্রিন্সের পরে হলেন ডিউকেরা। বর্তমান ব্রিটিশ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী ফিলিপ হলেন ডিউক অব এডিনবরা’। স্কটল্যান্ডের রাজধানী নগরীর নাম এডিনবরা। যুদ্ধজয়ী সেনাপতি আর্থার ওয়েলেসলি হলেন প্রথম ডিউক অব ওয়েলিংটন এবং পরে তিনি হয়েছিলেন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ তথা স্টেটসম্যান। ওয়াটারলুর যুদ্ধজয়ী সেনাপতির মূল নাম সবাই ভুলে গেছে; ‘ডিউক অব ওয়েলিংটন’ নামটি ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত। ওয়াটারলুর যুদ্ধের পরে, সেই ডিউক অব ওয়েলিংটন বলেছিলেন : ‘দি ব্যাটল অব ওয়াটারলু ওয়াজ ওয়ান অন দি প্লেইং ফিল্ডস অব ইটন।’ অর্থাৎ ওয়াটারলুর যুদ্ধ জয় হয়েছিল ইটনের খেলার মাঠেই। বাক্যটিকে প্রতীকী বা রূপক অর্থে গ্রহণ করতে হবে। ব্যাখ্যাটা এরূপ : ইটনে অবস্থিত স্কুলে লেখাপড়া করার সময় আর্থার ওয়েলেসলি যে গুণাবলি অর্জন করেছিলেন, ইটনের শিক্ষার মাধ্যমে যেসব বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে স্থান পেয়েছিল, সেগুলোর সুবাদেই তিনি প্রখ্যাত সেনাপতি নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছিলেন।
ফৌজদারহাট ও ইবরাহিম
ইটন ও ডিউক অব ওয়েলিংটনের আলোচনার পর ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ তথা এফসিসির আলোচনা করব। আমি নিতান্তই একজন নগণ্য ব্যক্তি, সাবেক সৈনিক, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী, একজন সাধারণ সাংসারিক ব্যক্তি। ওয়াটারলুর যুদ্ধের মতো কোনো যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করিনি। কিন্তু জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে যে কয়টি স্থানে জয়ী হতে পেরেছি, এর পেছনে অবদান আছে এফসিসির শিক্ষার; এ ওই আমলের শিক্ষকদের। আমি নবম ব্যাচের ছাত্র। ছাত্রদের মধ্যে যাদের পিতা মাসিক উপার্জনে দরিদ্র ছিলেন, তাদের মধ্যে আমার পিতা অন্যতম। তৎকালীন সরকার প্রত্যেক ক্যাডেটের পেছনে মাথাপিছু ব্যয় করত ৪০০ টাকা মাসিক। তার মধ্যে ক্যাডেটদের কাছ থেকে আদায় করা হত সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। আমার পিতা দিতেন মাত্র ২৫ টাকা, বাকিটা স্কলারশিপ। বহু ছাত্র বা বন্ধুই একদম বিনামূল্যেও পড়েছেন, অর্থাৎ পূর্ণ স্কলারশিপ। ১৯৬২ সালে ঢুকেছিলাম, ১৯৬৮ সালে বের হয়েছি। ওই বছর ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত, যদি ক্যাডেট কলেজের ছাত্র না হতাম অর্থাৎ যদি চট্টগ্রাম বন্দর হাইস্কুলেই থেকে যেতাম, তাহলে প্রথম স্থান অধিকার করতাম না। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুল থেকে ২৪তম ওয়ার কোর্সের সেরা বা প্রথম স্থান অধিকারকারী বা সর্বোত্তম ক্যাডেট হিসেবে কমিশন পেয়েছিলাম। পুরস্কার হিসেবে ঐতিহ্যবাহী কমান্ডার ইন চিফস কেইন আমার হাতে তুলে দেয়া হয়। ওই আমলের মিলিটারি একাডেমিতে, দুই বছর মেয়াদি বা লং কোর্সে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হতো সোর্ড অব অনার; ৯ মাসব্যাপী ওয়ার কোর্সে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হচ্ছে কমান্ডার ইন চিফস কেইন। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে মাত্র একজন বাঙালি সোর্ড অব অনার পেয়েছিলেন এবং তিন জন বাঙালি কমান্ডার ইন চিফ’স কেইন পেয়েছিলেন; অর্থাৎ মোট চারজন বাঙালি নিজ নিজ আমলে, সর্বোত্তম ক্যাডেট বিবেচিত হয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার, ১১৫ পাউন্ড ওজনের শ্যামলা বর্ণের বাঙালি ছেলে ইবরাহিম ওই সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিল ফৌজদারহাটের শিক্ষার জনই। ১৯৭১ সালের ৯ মাসব্যাপী মহান মুক্তিযুদ্ধে যতথাসাধ্য সম্ভব ততটুকু অবদান রেখেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে ২৭ বছরের চাকরি জীবনে যতটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন সম্ভব ততটুকু করেছি এবং সাফল্যের সাথেই করেছি। সময়ের আগেই বাধ্যতামূলক অবসর পেয়েছি সত্য, কিন্তু অবসর জীবনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি পূর্ণোদ্যমে। ‘কাজে লাগানো’ বলতে, নিজের জন্য যত না, তার থেকে শতগুণ বেশি দেশের জন্য ও মানুষের জন্য। প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশে টিকে আছি; টেলিভিশনে বক্তব্য রাখি, পত্রিকায় কলাম লিখি, রাজপথে হাঁটি- এ সবকিছুর পেছনেই ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার অবদান আছে। এই কলামের পাঠক আমার শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে কেউ যেন ভুল না বোঝেন; মহান আল্লাহর দয়ায় তথা মহান আল্লাহর রহমতেই সবকিছু হয়েছে এবং হচ্ছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু জাগতিক উসিলা বা জাগতিক কাঠামো বা মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালাই এই উসিলা, এই কাঠামো, এই মাধ্যম এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেন।
এই প্রেক্ষাপটেই আমার বক্তব্য : ডিউক অব ওয়েলিংটনের জন্য ইটন যেমন, ইবরাহিমের জন্য ফৌজদারহাট তেমন।
ক্যাডেট কলেজ সমাচার
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের হাসান আবদাল নামক শহরে প্রথম ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ, জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের আগ্রহে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও একটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ২৮ এপ্রিল ১৯৫৮ সালে সে সময়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ১০ মাইল উত্তরে, ফৌজদারহাট নামক স্থানে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রাংক রোডের পূর্ব পাশে, অনুচ্চ পাহাড় সারির পাদদেশে এই কলেজ চালু হয়; নাম ছিল দি ইস্ট পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজ। আইয়ুব খানের উদ্যোগেই প্রথম প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ফেলো অব দি রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি, লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম মরিস ব্রাউন, জন্মসূত্রে নিউজিল্যান্ডবাসী এবং চাকরিসূত্রে বিলাতি। কর্নেল ব্রাউনের অবদান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ এবং তার আমলের সব ছাত্রের ইতিহাসে ও মানসপটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ছয় বছর পর ১৯৬৪ সালে, রাজশাহীর সারদাতে, বর্তমান টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এবং তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহে আরো তিনটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়। ফলে প্রথমটির নাম বদলিয়ে রাখতে হয় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষা চালুর পেছনে যে ধারণাটি কাজ করেছিল, সেটি ছিল : দেশের ও জাতীয় জীবনের সর্ব আঙ্গিকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি সৃষ্টি করা। এই কলামে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়; কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, দেশে এবং বিদেশে বহু পেশায় ও কর্মকান্ডে উল্লেখযোগ্য ও দর্শনীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্ররা তথা ক্যাডেট কলেজগুলোর ছাত্ররা। আমার পরিবারে, আমার থেকে বারো বছর ছোট ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ মইনুদ্দিন, এফসিসির ২১তম ব্যাচের ক্যাডেট। মইনুদ্দিন জাপান থেকে পিএইচডি করেছেন নিউরো সার্জারিতে, আমেরিকার আরকানসাস থেকে তিন বছর অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণ নিয়েছেন; এখন নিউরো সার্জারির প্রফেসর। আমার ছেলে সৈয়দ ফজলুল করিম মুজাহিদ কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের ১২তম ব্যাচের ছাত্র। আমার তৃতীয় ছোটভাই প্রথিতযশা শিল্প উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে রায়াত বিন নাসির, বর্তমানে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। পুরনো অনেক সাবেক ক্যাডেটের ছেলেও ‘সাবেক ক্যাডেট’ হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। এমনকি, অনেক সাবেক ক্যাডেটের নাতিরাও ক্যাডেট কলেজগুলোতে পড়ছে। তবে অবশ্যই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে রাখি যে, বাংলাদেশী সমাজের যেকোনো স্তরের যে কোনো ইনকাম গ্রুপের, যেকোনো স্বচ্ছ পেশার, যেকোনো ধর্মের ও ভাষার যেকোনো পরিবারের সন্তানদের জন্য ক্যাডেট কলেজে প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত। ঢোকার পরীক্ষা বা পরীক্ষার ধাপগুলো অতি কঠিন, অতি স্বচ্ছ এবং পাস করার জন্য প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।
ক্যাডেট কলেজের মৃত্যুদণ্ড ও রক্ষা
১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তির আগ্রহে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সব ক্যাডেট কলেজে ওই পদ্ধতির শিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ওই কলেজগুলোর ক্যাম্পাসকে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হবে। তখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের কিছু সাবেক ক্যাডেট (যাদের ‘ওল্ড ফৌজিয়ান’ বলা হয়) সংগঠিত হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন ক্যাডেট কলেজ রক্ষার জন্য (‘সেইভ ক্যাডেট কলেজ’ মুভমেন্ট)। আমার লেখা বই মিশ্রকথনের যথাস্থানে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে। ওই আন্দোলনকারী ওল্ড ফৌজিয়ানরা, তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাহায্য কামনা করেন এবং সেই সাহায্য পেয়েছেন। জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে, তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি ও পরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর সাহায্য কামনা করেন এবং সাহায্য পান। জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল ওসমানী ছাত্রদের ধৈর্যসহকারে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। মূলত জেনারেল ওসমানীর কারণেই বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দেন যে, ক্যাডেট কলেজগুলো বহাল থাকবে।
রি-ইউনিয়ন বা পুনর্মিলনী
বলছিলাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের। ২৮ এপ্রিল ১৯৫৮ থেকে ২৮ এপ্রিল ২০১৮ সময়কাল হচ্ছে ৬০ বছর। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ব্যবস্থার কারণে ক্যাডেট কলেজগুলোতে পুনর্মিলনী বা রি-ইউনিয়ন অনুষ্ঠিত হয় প্রতি চার বছর অন্তর। ঘটনাক্রমে ২০১৮তে কলেজের হীরকজয়ন্তীর (ডায়মন্ড জুবলি) সঙ্গে রি-ইউনিয়নের বছর মিলে যায়। ফলে ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০১৮ তিন দিনব্যাপী রি-ইউনিয়ন হলো। প্রায় দুই হাজার সাবেক ছাত্র ও তাদের স্ত্রী পরিবার অংশ নেয়। অতীতের মতো এবারো রি-ইউনিয়ন খরচের ৯০ ভাগই বহন করেছে সাবেক ক্যাডেটরা তথা ওল্ড ফৌজিয়ানরা এবং তারা এটা সংগ্রহ করেন বিভিন্ন দানশীল বা শিক্ষা-অনুরাগী বা ক্যাডেটকলেজ-বান্ধব ব্যক্তি এবং করপোরেট সংগঠনগুলো থেকে। উদাহরণস্বরূপ শুধুমাত্র বলছি, মোট ছয়টি ব্রেকফার্স্ট, লাঞ্চ ও ডিনার এর প্রত্যেকটি স্পন্সর করা হয়েছে। সোলস এবং এলআরবি গিয়েছিল, সেটাও স্পন্সর করা হয়েছে এবং স্পন্সরদের সাথে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওল্ড ফৌজিয়ানরা জড়িত; অথবা ধনী ও উদার ওল্ড ফৌজিয়ানরা নিজেরাই স্পন্সর করেছেন। প্রত্যেকবার রি-ইউনিয়নের সময় যে ফান্ড সংগ্রহ করা হয়, সেখান থেকে একটি বড় অংশ কলেজকে অনুদান হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়। তিন-চার বছর আগে এরূপ অনুদান দিয়ে, সব ক্যাডেটের শোয়ার খাট বদলানো হয়েছিল। আরো কিছু টাকা তহবিলে জমা রাখা হয়েছিল। সরকার অনুমতি দিয়েছে, সাবেক ক্যাডেটরা ইচ্ছা করলে, ক্যাডেট কলেজের ভৌতকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে বা সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নে অনুদান দিতে পারেন। কিন্তু এটা কারো ব্যক্তিগত নামে হবে না, এটা ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের নামে হবে বা কোনো ফাউন্ডেশনের অথবা কোনো ফান্ডের নামে হবে। এটা সব ক্যাডেট কলেজের জন্য প্রযোজ্য। অতীতের বছরগুলোতে কলেজের নতুন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট সেন্টার নবায়ন করা, লাইব্রেরি নবায়ন করা, কম্পিউটার সেন্টার সমৃদ্ধ করা এবং এবারে জিমনেসিয়াম নবায়ন করা হয়েছে। ওল্ড ফৌজিয়ান আর্কিটেক্ট কর্তৃক শুভেচ্ছার বিনিময়ে নকশা বানানো হয়েছে এবং নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারক স্তম্ভ এবং কলেজের প্রবেশমুখে হীরকজয়ন্তী গেট; এগুলোর সম্পূর্ণ খরচ ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বহন করেছে। বৃহদাকারের একটি রেস্ট হাউজ তথা গেস্ট হাউজ নির্মিত হবে; সেখানেও অর্ধেক খরচ অনুদান হিসেবে দেবে ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। ক্যাডেট কলেজের অতীত ও বর্তমান শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ওয়েলফেয়ার ফান্ড সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আরো করা হবে। কলেজের বাইরে, শীতকালে বা বর্ষাকালে এবং সাইক্লোনের সময় দুস্থদের পাশে সবসময়ই সব ক্যাডেট কলেজের ওল্ড ক্যাডেটরা দাঁড়ান। রোহিঙ্গাদের পাশে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে; সরকারি মাধ্যমে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ন্যাশনাল সলিডারিটি ফর দি রোহিঙ্গা নামে আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো আহবান করে যাচ্ছি। এবারের রি-ইউনিয়নটি ছিল আনন্দদায়ক এবং সাফল্যমণ্ডিত। ওল্ড ফৌজিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয়, ঢাকা চ্যাপ্টার, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার নেতাদেরকে, বিশেষ আহ্বায়ক কমিটিকে এবং স্পন্সরদেরকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্যান্য প্রথিতযশা স্কুল ও কলেজের সাবেক ছাত্ররাও এভাবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অবদানের বৃত্ত গড়ে তুলেছেন অথবা ভবিষ্যতে গড়ে তুলবেন।
সাবেকদের পদচারণা
দেশের সব ছাত্র ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুযোগ পাবে না; এটাই বাস্তবতা। ক্যাডেট কলেজে পড়লেই মাত্র দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর এসএসসি বা এইচএসসির মেধা তালিকায় স্থান পাবে- এমনও কোনোমতেই নয়। শুধু ক্যাডেট কলেজে পড়লেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন পাওয়ার সময় মেধা তালিকায় উপরের দিকে থাকবে, এমনও নয়। ক্যাডেট কলেজে পড়েননি এমন ছাত্র বা ব্যক্তিদের সংখ্যা, কলেজে পড়ুয়াদের তুলনায় হাজার গুণ বেশি। সামরিক বাহিনীতে জেনারেল বা অ্যাডমিরাল বা এয়ার মার্শাল, সরকারে সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর, ব্যাংকগুলোতে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, পুলিশে এসপি, বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজের ক্যাপ্টেন বা ইঞ্জিনিয়ার, তাবলিগ জামাতে মুরুব্বি, বড় বড় হাসপাতালের বড় বড় ডাক্তার, শিল্প উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশে পার্লামেন্ট সদস্য যতজন হবেন বা হচ্ছেন, তার মধ্যে ক্ষুদ্র অংশ মাত্র সাবেক ক্যাডেটরা; সব ক্যাডেট কলেজের। কিন্তু আচরণে, দক্ষতায়, বৈশিষ্ট্যে এই ক্ষুদ্র অংশ তথা মাইনরিটি, উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয়। একটি কথা না বললেই নয়; নভোমণ্ডলে তারকা বা গ্রহ যেমন কক্ষচ্যুত হয়, ট্রেন লাইনের ট্রেন যেমন লাইনচ্যুত হয়, তেমনি শুধু ফৌজদারহাট বলে নয়, সব ক্যাডেট কলেজেরই সাবেকদের মধ্যে কোনো না কোনো সাবেক ক্যাডেট কক্ষচ্যুত, পথচ্যুত, লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারেন; সামাজিক প্রক্রিয়ায় এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিতে হবে। তাই আমরা সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যাকে আলোচনা আর না। আমরা আলোচনার বিষয় করাচি তাদেরকেই, যারা ইতিবাচক অবদান রেখেছেন বা রেখেই যাচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ফৌজিয়ানরা
এফসিসির সাবেক ছাত্রদের (১৯৫৮-১৯৭১) মধ্যে ৪৭ জন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন; তাদের মধ্যে আটজন শহীদ। এই ৪৭ জনের মধ্যে একজন বীর উত্তম (প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের) লেফটেন্যান্ট আনোয়ার যাঁর নামে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্কুল আছে, একজন বীর বিক্রম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র এবং সুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকার ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ সদস্য) বদিউল আলম। ওই ৪৭ জনের মধ্যে জীবিত খেতাবপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলেন- সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান (অব:) এ এস এম লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাসিম বীর বিক্রম, সাবেক রাষ্ট্রদূত (অব:) মেজর জেনারেল সাইদ আহমেদ বীর প্রতীক, বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বীর বিক্রম এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও টিভি ব্যক্তিত্ব অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক।
একটি বক্তৃতা
এফসিসির সদ্য সমাপ্ত রি-ইউনিয়নে উদ্বোধনী সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এবং সকালের উদ্বোধনী প্যারেডে সালাম গ্রহণের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান। উভয়েই উদ্দীপনাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। প্রধান দিবসে সন্ধ্যাবেলা রি-ইউনিয়ন স্পিকার ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী (বাংলাদেশে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করেন) প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী-গবেষক প্রফেসর মুহাম্মদ আতাউল করিম। বৃহত্তর সিলেটের বড়লেখার সন্তান আতাউল করিম ফৌজদারহাটের ১২তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। তিনি এসএসসির পর কলেজ থেকে চলে গিয়েছিলেন। ৩৫ মিনিট দীর্ঘ বক্তব্যে, তিনি তরুণদের জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উদাহরণ উপস্থাপনা এবং প্রণোদনা প্রদান করেন। তার দীর্ঘ বক্তব্য থেকে যদি আমাকে কিছু কথা বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি বলবো, এক. জীবনে লক্ষ্য স্থির করতে হয়, কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। দুই. ধীরেসুস্থে বিবেচনার পর লক্ষ্য স্থির হয়ে গেলে সেটা অর্জনের জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হতে হয়।
তিন. লক্ষ্য অর্জন এক-দুই বছরের ব্যাপার নয়, দীর্ঘ মেয়াদি ব্যাপার। যদি বলা হয় যে, কোনো একজনের জীবনের লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া, সেটা হবে আংশিক বক্তব্য। বর্ধিত বক্তব্য হবে একজন ভালো ডাক্তার হওয়া। আরো বর্ধিত বক্তব্য হবে (অর্থাৎ উপার্জনের বাইরে), ডাক্তার হিসেবে সমাজে অবদান রাখা। তাই প্রত্যেক লক্ষ্য অর্জনের পথে ধাপে ধাপে নিজের কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়ন ও পুনর্মূলায়ন করতে হবে। চার. লক্ষ্য অর্জনের পথে বিভিন্ন সুযোগ আসে। চলার পথে যদি উন্নতির বা উন্নয়নের জন্য বা উপকারের জন্য কোনো সুযোগ আসে তাহলে সেই সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। পাঁচ. সুযোগ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি দরকার। প্রস্তুতির গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদের এবং সার্বক্ষণিক। প্রত্যেকেই তার জীবনে সুযোগ গ্রহণের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। সাত. হঠাৎ হঠাৎ মানুষের জীবনে সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়। সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় কোনো সময় প্রতিযোগিতা থাকে, কোনো সময় প্রতিযোগিতা থাকে না। যাই হোক, প্রবেশের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা লাগে। সে যোগ্যতা হঠাৎ করে অর্জন করা যায় না। এ জন্য সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

ইতালিতে হিজাব পরা আইনজীবীকে আদালত থেকে বহিষ্কার

হিজাব খুলতে অস্বীকৃতির জন্য ইতালির একটি আঞ্চলিক আদালতের কক্ষ থেকে মুসলিম এক আইনজীবীকে বের করে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নিজের হতাশা ব্যক্ত করেছেন মরক্কোর বংশোদ্ভূত শিক্ষানবিস আইনজীবী আসমে বেলফাকির।
বোলোগ্নার একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক আদালতে শুনানি চলাকালে বিচারক জিয়ানকার্লো মোজজারেলি মুসলিম আইনজীবী আসমে বেলফাকিরকে তার মাথার হিজাব খুলতে বলেন। অন্যথায় তাকে আদালতের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে আসমে বেলফাকির বলেন, ‘ওই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য সব আইনজীবীর সঙ্গে আমিও আদালতের কক্ষে প্রবেশ করি। হঠাৎ বিচারক বলতে শুরু করলেন : ‘আপনি কি খুলতে পারেন?’ তিনি হিজাবের কথা উল্লেখ করেননি এবং আমার দিকে তাকানওনি। আমি ভেবেছিলাম তিনি কাউকে তার বা তাদের কোট খোলার জন্য বলছেন। আমি কল্পনাও করতে পারছিলাম না যে তিনি আমাকে বলছিলেন। তারপর আমি তার দিকে তাকালাম এবং বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলাম।
আমি অবাক হয়ে গেলাম এবং তার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, আমার হিজাবের কথা বলছেন?’ তিনি বলেন, ‘আমার কথা শেষ হওয়ার পরক্ষণই তিনি বললেন : ‘হ্যাঁ, আপনি যদি এই আদালতে থাকতে চান, তবে আপনাকে বাধ্যতামূলকভাবে এটি অপসারণ করতে হবে।’ আসমে বেলফাকির বলেন, ‘আমি জবাবে তাকে বলেছিলাম, ‘আমি এটা খুলতে যাচ্ছি না। আমি বাইরে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, বের হওয়ার জন্য যেই মাত্র তিনি দরজা খুলেছিলেন, সেই মুহূর্তে বিচারক উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এটি করা হয়েছে।’

প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ট্রাম্পকন্যার by মাইকেল উলফ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন মুল্লুকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইটির প্রকাশনা ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তাতে কাজ হয়নি। বরং নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে বইটি। প্রকাশের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যায় সব কপি। অগ্রিম অর্ডার দেয়া হয় ১০ লাখ কপির। বইটির চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন আহমেদ বায়েজীদ
[পর্ব-৮]

অভিবাসন আইন পাস হওয়ার একদিন পর রোববার এমএসএনবিসির প্রভাতী অনুষ্ঠান, মর্নিং শোয়ের উপস্থাপক জো স্কারবরো ও সহউপস্থাপক মিকা ব্রেজিজিনস্কি ট্রাম্পের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিতে আসেন। দিনটি ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের নবম দিন। স্কারবরো ফ্লোরিডার পেনসাকোলা এলাকার সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য। আর ব্রেজিজিনস্কির বাবা ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা ও জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মর্নিং শো একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক টক শো। এই দুই উপস্থাপকের কারণে টিভি চ্যানেলটাও অনেকটা ট্রাম্পপন্থী অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্প খুব আগ্রহ নিয়ে এই জুটিকে পুরো হোয়াইট হাউজ ঘুরিয়ে দেখালেন। একপর্যায়ে বেশ উৎফুল্ল মেজাজে তাদের কাছে জানতে চান, প্রেসিডেন্সির প্রথম সপ্তাহটি কেমন কাটলো বলে মনে হয় আপনাদের? সারা দেশে যখন (নতুন অভিবাসন আইনের বিরুদ্ধে) বিক্ষোভ চলছে, সে সময় ট্রাম্পের এমন প্রশ্ন শুনে যেন বোকা হয়ে গেলেন স্কারবরো। কিছুটা সঙ্কোচ নিয়ে বললেন, ‘ভালো, ইউএস স্টিল বিষয়ে আপনার পদক্ষেপ এবং হোয়াইট হাউজে ইউনিয়ন নেতাদের আগমনের বিষয় আমার ভীষণ ভালো লেগেছে’ (অপ্রিয় সত্য কথাটি বলতে চাইলেন না তিনি)। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পাইপলাইনগুলোতে দেশে তৈরি স্টিল ব্যবহারের অঙ্গীকার করেছেন এবং ইমারত ও স্টিল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হোয়াইট হাউজে ডেকে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্পের মতে, এ কাজ ওবামা কখনোই করেননি। কিন্তু ট্রাম্প আবারো প্রশ্নটি করলেন। স্কারবরো বুঝলেন, প্রথম সপ্তাহটি যে ট্রাম্পের জন্য কতটা খারাপ গেছে, সে ব্যাপারে তাকে কেউ কিছুই বলেনি। তিনি ভাবলেন, স্টিভ ব্যানন ও রেইন্স প্রিবাস শুধু অফিসে আসা যাওয়াই করেছেন, আর ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন তিনি সফল একটি সপ্তাহ পার করেছেন।’ এরপর অভিবাসী ইস্যুটি আরো কতটা ভালোভাবে মোকাবেলা করা যেত, সে বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন জো স্কারবরো। ট্রাম্প এতে অবাক হয়ে বলেন,‘ জো মনে করছে না যে, সপ্তাহটি আমাদের ভালো কেটেছে’।
দুপুরের খাবারে তাদের সাথে যোগ দেন জ্যারেড কুশনার ও ইভাঙ্কা ট্রাম্প। বারবারই তার প্রথম সপ্তাহ সম্পর্কে তোষামোদ শুনতে চান; কিন্তু স্কারবরো সব কিছু বাদ দিয়ে ইউনিয়ন নেতাদের সাথে সফল বৈঠকের প্রশংসা করলেন। এ সময় জ্যারেড কুশনার বলেন, এই কাজটি ব্যাননের অবদান এবং করা হয়েছে তার নির্দেশিত পন্থায়। ট্রাম্পের গলা চড়ে যায় জামাতার ওপর, ‘কিসের ব্যানন? সেটি ব্যাননের পরিকল্পনা ছিল না। ছিলো আমার পরিকল্পনা। ট্রাম্পের কর্মপন্থা, ব্যাননের নয়’। কুশনার নতি শিকার করে আলোচনা অন্য দিকে নিতে চেষ্টা করেন। ট্রাম্পও তাতে যোগ দেন। স্কারবরো ও ব্রেজিজিনস্কির সম্পর্কের কথা ইঙ্গিত করেন বলেন, ‘আপনাদের কী খবর বলুন। কেমন চলছে?’ স্কারবরো জানান, পুরোটাই এখনো গোপনে চলছে, বাইরের কেউ জানে না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের বিয়ে করা উচিত’। কুশনার বলেন, ‘আমি আপনাদের বিয়ে পড়াতে পারি! আমি একজন ইন্টারনেট ইউনিটারিয়ান মিনিস্টার (খ্রিষ্টানদের একটি ধর্মীয় সংগঠনের সদস্য)। অথচ তিনি গোঁড়া ইহুদি। ট্রাম্প আবারো চটে গেলেন, ‘কি বললে? কেন তারা তোমার কাছে এসে বিয়ে করবে যখন আমিই তাদের বিয়ে পড়াতে পারি? স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কাছেই তারা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে’। প্রায় সবাই কুশনারকে নিষেধ করেছে হোয়াইট হাউজের কোনো পদ দখল না করতে। প্রেসিডেন্টের পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি অনায়াসেই পর্দার আড়াল থেকে অনেক প্রভাব খাটাতে পারতেন এবং সে ব্যাপারে কেউ চ্যালেঞ্জও জানাতে পারত না। কিন্তু একজন কর্মকর্তা হিসেবে শুধু তার অনভিজ্ঞতা নয়, পরিবারের সদস্য হয়ে রাষ্ট্রীয় পদে বসা নিয়ে প্রতিপক্ষ ও মিডিয়া ব্যাপক সমালোচনা করতে পারে। এমনকি জ্যারেডের ভাই, জোশও তাকে নিষেধ করেছেন। ইভাঙ্কার কাছেও এসেছে এই পরামর্শ। তবে সেগুলো তারা কানে তোলেননি।
ট্রাম্প বরাবরই তার মেয়ে ও জামাতাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের নতুন মিশনে। আবার কখনো এটাও বলেছেন, তিনি ওদের থামাতে পারছেন না। জ্যারেড ও ইভাঙ্কা শুধু নয়, নতুন প্রশাসনের সবার ক্ষেত্রে-এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টেরও নতুন দায়িত্ব নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে আর থামানো যায়নি। প্রশাসনে দায়িত্ব নেয়া ছিল ওই দম্পতির যৌথ সিদ্ধান্ত, এমনকি ‘যৌথ চাকরি’ও বলা যায়। জ্যারেড ও ইভাঙ্কার মধ্যে এই চুক্তি হলো যে, ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ আসে, তাহলে ইভাঙ্কা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন। ইভাঙ্কা স্বপ্ন দেখতে লাগলেন- হিলারি ক্লিনটন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হবেন ইভাঙ্কা ট্রাম্প! জ্যারেড ও ইভাঙ্কার নামের প্রথম অংশ নিয়ে এক সাথে তাদেরকে ‘জারভাঙ্কা’ ডাকতেন ব্যানন। এই দম্পতির অলিখিত চুক্তির বিষয়টি শোনার পর ব্যাননের চেহারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। বললেন, ‘থামুন, তারা এমন কোনো কথা বলেনি। আসলেই তারা এমন কিছু বলেনি। আমাকে এসব বলবে না। ঈশ্বর রক্ষা করো!’ বাস্তবতা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ইভাঙ্কাই ছিলেন হোয়াইট হাউজের সব স্টাফের চেয়ে অভিজ্ঞ। এই দম্পতি কিংবা শুধু ইভাঙ্কা ছিলেন কার্যত চিফ অব স্টাফ অথবা চিফ অব স্টাফ প্রিবাস বা ব্যাননের মতো ক্ষমতাবান, যারা প্রত্যেকেই সরাসরি যেকোনো বিষয় প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট করার ক্ষমতা রাখেন। এমনকি অফিশিয়াল বিষয়েও হোয়াইট হাউজের ওয়েস্ট উইংয়ে (নির্বাহী ভবন যেখানে প্রেসিডেন্টের অফিস) এই দম্পতির একটি স্বাধীন অবস্থান ছিল। এরই মধ্যে ট্রাম্প তার জামাতার হাতে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দায়িত্ব তুলে দিলেন, যা তাকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকের আসনে বসিয়ে দেয়। প্রথম কয়েক সপ্তাহে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইস্যু সম্পর্কেও তাকে অবহিত করা হলো। যদিও জ্যারেড কুশনারের অতীত বলছে, তিনি এই কাজের জন্য মোটেও প্রস্তুত নন। মূলত বিশাল ধনসম্পদের মালিক ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করা লোকদের যে আত্মগরিমামূলক স্বভাব থাকে, ট্রাম্পও সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কেউ ছিলেন না। সামাজিক শৃঙ্খলার কোনো শিক্ষাই তার ছিল না। এমনকি প্রয়োজনের সময় অন্যেরটা দেখেও করতে পারতেন না। মানুষের সাথে সাধারণ আলাপ বা কথার দক্ষতাটুকুও তার মধ্যে নেই। তাকে কে কী বলল তা ভাবার সময় নেই; সেই কথার উত্তরে কী বলা উচিত তা নিয়েও ভাবনা ছিল না। ন্যূনতম ভদ্রতা দেখিয়ে একজনকে স্বাগত জানাতে পারেন না। নিজে কিছু চাইলে তা নিয়ে খুবই সিরিয়াস থাকেন; কিন্তু তার কাছে কেউ চাইলে বিরক্ত হন, কোনো আগ্রহই দেখান না সে ব্যাপারে। ট্রাম্পের সাথে তার জামাতার অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও তারা একই তালে কাজ করার লোক নন। কুশনার সব সময়ই চেষ্টা করতেন শ্বশুরের আচরণ যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
ব্যানন যখন হোয়াইট হাউজে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা স্বাক্ষর করিয়ে নিতে মরিয়া, কুশনার তখন ব্যস্ত তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক নিয়ে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় হুমকি দিয়ে ও অপমান করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই কাজে নামার আগে কুশনার ফোন করেন ৯৩ বছর বয়সী কিসিঞ্জারকে। মূলত পরামর্শ নেয়ার জন্যই তাকে ফোন করেছিলেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে কোন কারণ ছাড়াই বিবাদ বাধিয়েছেন ট্রাম্প। কুশনার চাইলেন, তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে কৃতিত্ব নেবেন। সে লক্ষ্যে আলোচনা চলল। কুশনারের ইচ্ছা ছিল সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টিকে একটি দ্বিপক্ষীয় অভিবাসন চুক্তিতে রূপ দেয়ার। সে লক্ষ্যে মেক্সিকোর উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল হোয়াইট হাউজে এসে কুশনার ও প্রিবাসের সাথে বৈঠক করে। বৈঠকের পর কুশনার তার শ্বশুরকে জানালেন, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে আসবেন, বৈঠকের পরিকল্পনা করা শুরু হয়েছে। পরদিনই ট্রাম্প টুইট করলেন, ‘মেক্সিকোর সাথে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষতি হচ্ছে। মেক্সিকো যদি সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অর্থ দিতে রাজি না হয়, তাহলে বৈঠক বাতিল করাই সঠিক হবে’। এর জবাবে, উল্টো মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টই বৈঠক বাতিল করে দিলেন। কুশনারের প্রচেষ্টা মাঠে মারা গেল।

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন মেরুকরণ

উপমহাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এ অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের শত্রু-মিত্রের হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছেন- সন্ত্রাসবাদ নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলপত্র প্রকাশকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। ম্যাটিস বলেন, চীন ও রাশিয়ার মতো সংশোধনবাদী শক্তিগুলো থেকে আমরা এখন ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখোমুখি হচ্ছি।
এসব দেশ তাদের কর্তৃত্ববাদী ছাঁচের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বিশ্ব গড়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের প্রভাব এ অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর ওপর পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক যতটা তিক্ত রূপ নিচ্ছে, ততটাই নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্পষ্টতই পাকিস্তান এবং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। অপর দিকে, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নেতৃস্থানীয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ভারতের সাথে শুধু পাকিস্তান নয়, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কের ওপরেও এর প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের এক সময়ের অতি ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রধান অস্ত্রসরবরাহকারী দেশ ছিল রাশিয়া। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। অপর দিকে, ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর বাইরে, দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর পরই দেশটির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মস্কোর ওপর নজরদারির জন্য ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ার বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি পায় যুক্তরাষ্ট্র। লাহোরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা অফিস স্থাপনের অনুমতিও দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোল্ড ওয়ারের পুরো সময়ে পাকিস্তান সামরিক ও বেসামরিক বিপুল সাহায্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আফগান যুদ্ধের পর, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আবার পাকিস্তানের সামরিক গুরুত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মার্কিন ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে সে দেশে মার্কিনবিরোধী জনমত তীব্র হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে তালেবানরা নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে। আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হওয়ার অনিশ্চয়তা যতটা বাড়ছে, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের ততই অবনতি ঘটছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর দুই দেশের মিত্রতার সম্পর্ক দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই কুজুগোতোভিচ শোয়গু পাকিস্তান সফর করেন। ৪৫ বছরের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম কোনো রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ইসলামাবাদ সফর।
এ সময় দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ সফরের ফলাফল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ২০১৫ সালের আগস্টে পাকিস্তান ২০টি রাশিয়ার এমআই-৩৫ হেলিকপ্টার কেনার ঘোষণা দেয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৬ সালে পাকিস্তানে দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালে আরব সাগরে হয়েছে যৌথ নৌ-মহড়া। সামরিক সম্পর্কের বাইরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক জ্বালানি সহযোগিতা ও পাইপলাইন নির্মাণের চুক্তিও হয়। রাশিয়ার একজন কূটনীতিক সম্প্রতি ইসলামাবাদে ইঙ্গিত দিয়েছেন, নিউক্লিয়ার্স সাপ্লায়ার্স গ্রুপে (এনএসজি) পাকিস্তানের সদস্য পদের জন্য রাশিয়া সমর্থন দিতে পারে। ভারত দীর্ঘ দিন ধরে এনএসজির সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টা করছে। চীন প্রবলভাবে এর বিরোধিতা করছে। ভারতের সদস্যপদের ব্যাপারে রাশিয়ার সমর্থন আছে বলে মনে করা হলেও পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে। রাশিয়ার সাথে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার নেপথ্যে চীনের বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ, চীনের সাথে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একাধিক চুক্তি রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ পরিকল্পনার অন্যতম সহযোগী দেশ পাকিস্তান। চীন ও রাশিয়ার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, দেশটির ওপর মার্কিন চাপ ততই বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার নতুন বছরের শুরুর দিন পাকিস্তান নিয়ে এক টুইট বার্তা প্রকাশ করেছেন। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক বেশ উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প তার টুইট বার্তায় বলেনÑ ‘যুক্তরাষ্ট্র বোকার মতোই পাকিস্তানকে গত ১৫ বছরে ৩৩ বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা দিয়েছে। এর বিপরীতে তারা আমাদের মিথ্যা ও শঠতা ছাড়া কিছুই দেয়নি। তারা আমাদের নেতাদের বোকা ভাবছে।’ ট্রাম্পের অভিযোগÑ ‘আমরা আফগানিস্তানে যেসব সন্ত্রাসীকে তাড়া করছি, তাদের নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে পাকিস্তান। আমাদের কোনো সহযোগিতা করছে না। আর না।’ ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর পাকিস্তান কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘আমরা এমন একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যখন আফগান বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পাকিস্তানের মাটিতেই যুদ্ধ শুরু হবে।’ তার দাবি, সেটাই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া। তবে ইসলামাবাদ কখনো দেশের মাটিকে আফগান যুদ্ধের ময়দান হতে দেবে না।’ পাকিস্তান সংক্রান্ত নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তন বা কঠোর অবস্থানের পেছনে আফগানিস্তানকে ঘিরে এ অঞ্চলে প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও অন্যতম কারণ। যেখানে চীন ও পাকিস্তানের সাথে রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আফগানিস্তানের বিভিন্ন ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি তালেবানদের সাথে বিভিন্ন ধরনের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা। ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে মতবিরোধ দূর করতে চীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। আফগানিস্তানে চীনা প্রভাব নিয়ে পেন্টাগনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বেইজিং সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বাড়িয়ে তুলছে। এর মধ্যে গত ২৬ ডিসেম্বর বেইজিংয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে ৫৭ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, আফগানিস্তান, ইরান, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সাথে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে তার দেশ খুবই আগ্রহী। আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন রব্বানী বলেছেন, আফগানিস্তানের চিরদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু চীন। দেশটির বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে সংযুক্ত হওয়ার জন্য আফগানিস্তান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যদি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর খাইবার পাস হয়ে আমুদরিয়ার তীর পর্যন্ত যদি সম্প্রসারিত হয়, তাহলে বাস্তবিক অর্থে নতুন সিল্ক রুটের পুনরুজ্জীবন ঘটবে। তখন মধ্য এশিয়া হয়ে এর সাথে খুব সহজেই রাশিয়া সংযুক্ত হতে পারবে। ইতোমধ্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গত ডিসেম্বরে একসাথে নয়াদিল্লি সফর করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে ভারতকে সংযুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক বিরোধে এ ধরনের অর্থনৈতিক প্রকল্প সম্পৃক্ত না করার কথাও বলেন। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে রাশিয়া নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চাইছে মূলত কৌশলগত কারণে। বালুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আরব সাগরের উষ্ণ পানিতে পা ভেজাতে পারবে রাশিয়া। আফগানিস্তান এবং সিপিইসিকে ঘিরে চীন ও রাশিয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের নেপথ্য কারণ খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে চীন। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইট বার্তার পর চীনের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বলেন, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের পূর্ণ স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দেয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে করছে বলে আমরা খুশি। আসলে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলতে। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমিয়ে আনতে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল যে পাকিস্তানের জন্য আত্মঘাতী হবে, তা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। তিনি এ কারণে বলছেন, ইসলামাবাদ কখনো দেশের মাটিকে আফগান যুদ্ধের ময়দান হতে দেবে না। পরিহাস হচ্ছে, এক সময় আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের জন্য পাকিস্তান থেকে যে সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে, একই ধরনের সুবিধা চীন ও রাশিয়াও পেতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগের মার্কিন নীতি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এর ফলে পাকিস্তান আরো বেশি চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে। ইতোমধ্যেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে তিক্ততার কারণে পাকিস্তান যদি আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি আফগানিস্তানে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এ দিকটি সম্ভবত জেমস ম্যাটিস উপলব্ধি করতে পারছেন এবং পাকিস্তানের সাথে ‘সামরিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে’ বলে জানিয়েছেন। পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব আরো খর্ব করতে পারে। একমাত্র ভারত ছাড়া এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেই। জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলপত্র প্রকাশের অনুষ্ঠানে জেমস ম্যাটিস বলেছেন, আমাদের সামরিক বাহিনী এখনো শক্তিশালী; কিন্তু আকাশ, স্থল, সাগর, মহাশূন্য ও সাইবার স্পেস- যুদ্ধের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধাজনক অবস্থান হ্রাস পেয়েছে এবং ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। রাশিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি আমাদের চ্যালেঞ্জ করো, তাহলে তা হবে তোমাদের জন্য দীর্ঘতম খারাপ দিন।’ দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল- সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, আফগানিস্তানে বিদ্রোহ দমনে অভিযান, ইরাক ও সিরিয়া। কিন্তু এখন জোরালোভাবে তা আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে মোড় নিচ্ছে; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনের দিকে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। চীন স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে। নেপালের রাজনীতিতে ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীন এখন সামনের সারিতে চলে এসেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে চীন ও রাশিয়া সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের নীতির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে মিয়ানমারকে সমর্থন দেয়ার পরও ভারতের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন সত্ত্বেও ভারত বেশ চাপ অনুভব করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠাতে রাজি হয়নি ভারত। চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তাতে আগামী দিনে এ অঞ্চলে ভারতকে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
alfazanambd@yahoo.com