Saturday, May 2, 2026
সিএনএন ‘নির্বোধ’, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক’—চটে গিয়ে বললেন ট্রাম্প
ট্রাম্প সিএনএনকে ‘নির্বোধ’ ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয় সুবিধা বৃদ্ধির এক নির্বাহী আদেশে সই করতে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে নিজের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বজায় রেখে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানকে সামরিকভাবে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন পড়ি, তারা (ইরান) সামরিকভাবে কত ভালো করছে। আসলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, তারা শেষ। অথচ আমি নিউইয়র্ক টাইমসে এসব পড়ি আর নির্বোধ সিএনএনে দেখি। আমি সিএনএন দেখি কারণ, শত্রুর গতিবিধি বুঝতে কিছুটা দেখতে হয়।’
ট্রাম্পের অভিযোগ, সংবাদমাধ্যম দুটি এমনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে যাতে মনে হয় ইরান এ যুদ্ধে ‘জিতছে’। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ক টাইমস যা করছে তা আমার মতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। আপনারা কলামিস্টদের লেখা পড়লে দেখবেন, এসব ওপরমহল থেকেই শুরু হয়। এটা খুবই ভয়ংকর বিষয়।’
ইরানের সামরিক অবস্থা তুলে ধরে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি এসবে পরোয়া করি না, কারণ সবাই সত্য জানে। আমরা দেশটিকে (ইরান) ধ্বংস করে দিচ্ছি।’
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছিল যে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘শক্তি’ হারাচ্ছে। সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়, ছোটখাটো কিছু সাফল্য বড় কোনো জয়ে রূপ নিতে পারছে না, বরং এটি ওয়াশিংটনের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
![]() |
| সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের লোগো ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ছবি: কোলাজ |
Saturday, February 7, 2026
ওয়াশিংটন পোস্টের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই, চাকরি হারালেন শশী থারুরের ছেলেও
মারে বলেন, ‘তিনি চান, ওয়াশিংটন পোস্ট আরও বড়, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক।’
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির বেশির ভাগ সাংবাদিক এ ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, খরচ কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় করা যায় না।
I have been laid off today from the @washingtonpost, along with most of the International staff and so many other wonderful colleagues. Iâm heartbroken for our newsroom and especially for the peerless journalists who served the Post internationally â editors and correspondentsâ¦
— Ishaan Tharoor (@ishaantharoor) February 4, 2026
এ সম্পর্কে জানা আছে—এমন একজন বলেন, বুধবার প্রতিষ্ঠানটির প্রায় প্রতি তিনজন কর্মীর একজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে নিউজরুম বা সংবাদক্ষের কর্মীর সংখ্যাই ৩০০–এর বেশি।
এত ব্যাপক আকারে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে জেফ বেজোসের সমালোচনা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের অনেক সাংবাদিক উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইছেন, তিনি কি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেবেন? কেউ কেউ অবশ্য আশায় আছেন, তিনি যেন এটাই করেন।
এ নিয়ে এক বিবৃতিতে দ্য পোস্ট গিল্ড বলেছে, ‘যদি জেফ বেজোস আর সেই লক্ষ্যে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক না হন, তবে পত্রিকাটির জন্য নতুন একজন অভিভাবকের প্রয়োজন। কারণ, বহু প্রজন্ম ধরে ওয়াশিংটন পোস্ট সাংবাদিকতার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে সেবা দিয়ে গেছে। সেসব মানুষ এখনো এই পত্রিকার সেবার ওপর নির্ভরশীল।’
বেজোস এখনো ওয়াশিংটন পোস্ট নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা বিভাগকে বার্ষিক লোকসান কমিয়ে সেটিকে আবারও লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি টেকসই পথ খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বেজোসের সঙ্গে তাঁর কবে ও কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি মারে। তিনি টেলিফোনে সিএনএনকে এ সাক্ষাৎকার দেন।
শেষবার বেজোসের সঙ্গে তাঁর কবে কথা হয়েছে, তিনি তা জানাতেও অস্বীকার করেন। তবে তিনি বুধবারকে একটি ‘নতুন দিনের সূচনা’ এবং বেজোসের সমর্থনের ‘পুনর্নবায়ন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
মারে বলেন, ‘আমি আমার পক্ষ থেকে শুধু এটুকু বলতে পারি, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির সবকিছু সঠিকভাবে চলতে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে যতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, বেজোস সেটাই করছেন।’
ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাহী সম্পাদক আরও বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে, একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি নিখুঁত—একজন মালিক হিসেবে তিনি সংবাদ প্রকাশের কাজে হস্তক্ষেপ করেন না, আমরা কী করব তার নির্দেশনা দেন না, কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখান না, কীভাবে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হবে (কভারেজ) তার নির্দেশ দেন না এবং আমাদের সাংবাদিকতার লক্ষ্য ও প্রয়োজনগুলো বোঝেন। এমন মালিকই আমি পছন্দ করি।’
২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে ওয়াশিংটন পোস্টের মালিকানা কিনে নিয়েছিলেন অনলাইন প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জেফরি পি বেজোস।
শশী থারুরের ছেলেও চাকরি হারিয়েছেন
বুধবার ওয়াশিংটন পোস্টের যে কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে, এর মধ্যে ঈশান থারুরের নামও রয়েছে। তিনি পত্রিকাটিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কলাম লেখক হিসেবে কাজ করতেন। ঈশান ভারতের লোকসভার সদস্য কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের ছেলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ঈশান থারুর নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন।
![]() |
| বুধবার ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যে নিউজরুমের কর্মীর সংখ্যাই ৩০০–এর বেশি। ছবি: এএফপি |
Thursday, January 1, 2026
লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা by মহিউদ্দিন আহমদ
তারপরও আমরা অভিজ্ঞতা আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের কথা বলি। কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যা-ই আসুক না কেন, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যেখানে আমি একা নই, আমার চারপাশে আছে হাজারো মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, সেখানে আমার ব্যক্তিগত অনুমাননির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি কোনো কাজে আসে না, যদি না সেটি সম্মিলিত প্রয়াস হয়। এ রকম ঘটনা ঘটে প্রায়ই।
যা চাই না, যা প্রত্যাশিত নয়, তাকে আমরা বলি অঘটন। এ রকম কিছু ঘটে গেলে আমরা অবাক হই। আমাদের মন ভাঙে। হতাশা জেঁকে বসে।
সম্প্রতি কিছু ঘটে গেছে, যা আমাদের অনেকের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু ঘটনা তো আপনা–আপনি ঘটে না। এটি ঘটানো হয়। তার পেছনে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত প্রয়াস। এর জন্য থাকে পরিকল্পনা। অনুঘটকেরা তো আটঘাট বেঁধেই নামেন। তিনিই ভালো পরিকল্পনাকারী, যিনি অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে পদক্ষেপ নেন। সামরিক পরিভাষায় এটাকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের একটা উদ্দেশ্য থাকে—হুঁশিয়ার হয়ে যাও; আমরা আসছি বিপুল বিক্রমে।
আপাতত দেখছি, দুটি জনপ্রিয় দৈনিক আর দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা হয়েছে। এটা কি হুট করে হলো? মোটেই না। অনেক দিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার হচ্ছিল। ফেসবুক ও ইউটিউব ঘাঁটলেই জানা যাবে, কে কখন কীভাবে উসকানি দিয়েছে। জানাই ছিল, অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠান চালু থাকার ঘোর বিরোধী। কিন্তু এভাবে আক্রমণ, লুটপাট এবং আগুন দেওয়া হবে, তা আন্দাজ করা যায়নি।
এ দেশে একদল লোক যখন-তখন যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে শত্রু বানায়, নিমেষেই তার বিচার করে ফেলে এবং বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। এটাকে ‘মব জাস্টিস’ বলে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা হয়। আদতে এটা জাস্টিস, নাকি ভায়োলেন্স। এ ধরনের সংঘবদ্ধ আচরণের পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকে। সেখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে বদমতলব থেকে ভিন্নমত ও পথের লোককে শায়েস্তা করার ফন্দি।
একটা সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না, কাঠামোগত যে ব্যবস্থা আছে, সেটি খুব সময় নেয় এবং অনেক খরচ হয়। ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। আদালত আর উকিলের খরচ জোগাতে তাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়। সে জন্য অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। আইনের শাসন নিয়ে আমরা যতই আহাজারি করি না কেন, সহজে, কম খরচে এবং অতি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এ রকম মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স বন্ধ করা যাবে না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থানে যেতে আর কত শতাব্দী লাগবে, কেউ বলতে পারে না।
এ তো গেল বিচার না পাওয়ার কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও কিছু আছে। আমাদের সমাজটা এখনো পশ্চাৎপদ। পশ্চিমের শিল্পোন্নত সমাজের ভাষায় বলা যেতে পারে, আমরা মধ্যযুগীয় ‘ট্রাইবাল’ কালচারে আছি। এখানে নানান মতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে গোত্র বা গোষ্ঠী।
প্রতিটি গোত্র বা গোষ্ঠী মনে করে, সে-ই সঠিক। বাকি সবাই ভ্রান্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তার চোখে যে খারাপ, তাকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব বর্তেছে গোত্রপতির ঘাড়ে। এখানে তিনি নিছক নেতা নন, একজন ‘ত্রাতা’। তাঁর কাজ হলো বাকি সবাইকে নির্দশ দেওয়া। তিনি স্লোগান দেন—জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো। অমনি তাঁর অনুসারীরা আগুন হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো আছে মধ্যযুগে, যেখানে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, জানের বদলে জান—এই হচ্ছে ন্যায়বিচার। আমাদের স্লোগানগুলোও তেমন—একটা-দুইটা ‘অমুক’ ধর, ধরে ধরে জবাই কর। চাষাভুষা, জেলে-তাঁতি, মুটে-মজুরেরা এসব স্লোগান দেয় না। এসব স্লোগান আমরা শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা রাজনৈতিক দলের মিছিলে-সমাবেশে।
প্রবল পরাক্রান্ত মোগল বাদশাহ জালালুদ্দিন আকবর ‘অপরাধীর’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। একটা হাতিকে মদ খাইয়ে মত্ত করা হতো। তারপর দণ্ডিতকে হাত-পা বেঁধে ওই হাতির পায়ের নিচে ছুড়ে ফেলা হতো। বাদশাহ তাঁর সভাসদদের নিয়ে এটা দেখতেন, আমোদ পেতেন। তাঁর ছেলে নুরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও কম যান না। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় গাধার সদ্য ছাড়ানো চামড়ায় মুড়ে সেলাই করিয়ে দিতেন। চামড়া যতই শুকায়, সেটি আঁটসাঁট হয়ে ভেতরের মানুষটির ওপর চেপে বসে। তার হাড়গোড় ভেঙে যায়। একসময় সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মারা।
প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের স্লোগানগুলো অনেকটা সে রকম। আমরা রাস্তায় নেমে যে কারও বিরুদ্ধে ফাঁসি দাবি করি। আমরা অনেকেই বলি, অমুককে প্রকাশ্যে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া হোক, যাতে আশপাশের লোকেরা এটা দেখে বিনোদন পায়। আমাদের স্লোগানে, বক্তৃতায়, বিবৃতিতে আমরা কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে এমন সব কথা উচ্চারণ করি, যা হাজার বছর আগের সমাজ-সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।
আজকাল বক্তৃতায় উত্তেজক কথাবার্তা এবং স্ল্যাং যে যত বেশি ব্যবহার করে, তার জনপ্রিয়তার পারদ ততই ওপরে উঠতে থাকে। হেরে মাইরা ফালামু, তোরে ছিঁড়া ফালামু, ওইডা ভাইঙা ফালামু—এ রকম হুংকার দিলে হাততালি পাওয়া যায়। একশ্রেণির মানুষ তাদের পেছনে ছোটে পঙ্গপালের মতো।
আমি গানবাজনা করি। এতে আমি আনন্দ পাই। আপনার ভালো লাগে না। আপনি গাইবেন না। তাই বলে আপনি আমার ওপর চড়াও হবেন? আপনি রায় দিয়ে দিলেন, এটা ইসলামবিরোধী এবং এর বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য। আপনি গিয়ে আমার বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে হামলা করলেন, আগুন দিলেন, বাদ্যযন্ত্র লুট করলেন।
এ দেশে পত্রিকার পাঠক হচ্ছে মধ্যবিত্ত। তাদের একটা ভগ্নাংশ পত্রিকা পড়ে। আমার ধারণা, দেশের সব ছাপা পত্রিকার মোট সার্কুলেশন হবে বড়জোর ১০ লাখ। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি মানুষ নগদ টাকা দিয়ে কেনে। বাকিগুলোর তেমন বাজার নেই। আপনি বলছেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাটি জনগণের দুশমন, অমুকের দালাল, গাদ্দার। তো জনগণ আপনার পছন্দের পত্রিকা পড়ে না কেন—এটা কখনো ভেবে দেখেছেন? আপনি কোন জনগণের কথা বলছেন?
পাঠকের রায়ে তো আপনার অপছন্দের পত্রিকাটিই বেশি জনপ্রিয়। আর আপনি যাদের মধ্যে জনপ্রিয়, তারা তো পত্রিকাই পড়ে না। অথচ আপনি বা আপনারা দলবল উসকে দিয়ে আপনার অপছন্দের পত্রিকার ওপর হামলা চালালেন। সঙ্গে কাকে পেলেন? সমাজের যত চোর-ছেঁচড়-লুটেরা। তারা কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল, টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে গেল। তারপর আগুন দিল।
একশ্রেণির লোক সব সময় তক্কে তক্কে থাকে, কখন কোথায় লুটপাট করতে পারবে। সুযোগ পেলেই তারা অন্যের ওপর চড়াও হয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখন তো লুটের মচ্ছব চলছে। তার মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন পণ্ডিতকে বলতে শুনি, এদের মব বলা যাবে না। এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ। যারা মব বলে, তারা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর। লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা!
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Thursday, December 25, 2025
এটাই কি মুহাম্মদ ইউনূসের সভ্যতার নমুনা, প্রশ্ন আনু মুহাম্মদের
আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘মাসের পর মাস ধরে আমরা যে নৃশংসতা দেখছি, বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর দেখলাম, এটাই কি মুহাম্মদ ইউনূসের সভ্যতার নমুনা? এই প্রশ্নটা আজকে আমাদের সবাইকে করতে হবে।’
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা এবং সব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ বুধবার ঢাকায় শাহবাগে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন বাম সংগঠনের যৌথ সমাবেশে এ কথা বলেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ। তিনি এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন।
গত ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমরা এক বর্বর জগতে ছিলাম। যেখানে আইনকানুন ছিল না। মানুষের ইচ্ছায় যা ইচ্ছা তা করতে পারত। এখন আমরা সভ্যতায় আসলাম।’
অধ্যাপক ইউনূসের সেই বক্তব্যের পর ‘সভ্যতা’র সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে তখনই শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী আক্রমণের পর আবার তা সামনে আনলেন তিনি। তিনি মনে করেন, এই হামলাগুলো উদ্দেশ্যহীন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, বরং একটা মতাদর্শিক অবস্থান থেকে পরিকল্পিত সন্ত্রাস।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথমে প্রথম আলো কার্যালয়ে সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়। ভাঙচুর, লুটপাটের পর প্রথম আলো ভবনে আগুন দেওয়া হয়। এরপর কারওয়ান বাজারে ডেইলি স্টার এবং ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনেও একই কায়দায় হামলা হয়। পরদিন তোপখানা সড়কে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন ভবন ও প্রতিষ্ঠানে যে ভয়ংকর আক্রমণ, হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে, সেগুলো অবিশ্বাস্য ঘটনা। গত দেড় দশক ধরে স্বৈরাচারী হাসিনা আমলের অন্যায়, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানোসহ সবকিছুর বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থেকেছেন, সেই নূরুল কবীরকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে তাঁর ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। ছায়ানট, উদীচী, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আক্রমণগুলো দেখলে বোঝা যায়, এটা উদ্দেশ্যহীন কতিপয় যুবকের হঠাৎ করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, এটা খুবই পরিকল্পিত একটা সন্ত্রাস-আক্রমণ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এটা আরও অবিশ্বাস্য এই কারণে যে প্রত্যেকটা ঘটনার সময় তাদের (আক্রমণকারী) সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা যখন ধ্বংসযজ্ঞ করছে, মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেই সময় সামনে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দাঁড়ানো ছিল নিষ্ক্রিয়ভাবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থা কী কারণে নিষ্ক্রিয় থাকল, কেন নীরব থাকল? কী কারণে, কীভাবে তারা এমন ভূমিকা পালন করল, যাতে মনে হলো যারা এই ধ্বংসযজ্ঞ বা পরিকল্পিত আক্রমণ চালাচ্ছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সহযোগিতার ভূমিকায় রাষ্ট্র নেমেছে, সরকার নেমেছে? এই ভূমিকার কারণ কী?’
সরকারের মধ্যে ‘দুই ফ্যাসিবাদ’
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার আগে উসকানি থাকলেও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আনু মুহাম্মদ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, গত কয়েক মাসে ফেসবুকে যে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, তার মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আক্রমণ করার উসকানি দেওয়া হয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার এগুলো অজানা থাকার কথা নয়। গোয়েন্দা সংস্থা জানে যে দেশ থেকে এবং বিদেশ থেকে কিছু উসকানিদাতা উসকানি দিচ্ছে মানুষকে আক্রমণ করার জন্য, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির এই সদস্য বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করার জন্য উসকানি দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাঁরা শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন; আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শুধু শেখ হাসিনার আমল নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন সময় শোষণ, নিপীড়ন, আধিপত্য, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের একটা স্পষ্ট অবস্থান আছে এবং সেই সঙ্গে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির ওপর আক্রমণ কারা কেন করতে পারে?
পরিকল্পিত একটা মতাদর্শিক অবস্থান থেকে এই আক্রমণগুলো করেছে দাবি করে আনু মুহাম্মদ সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকার অবশ্য সব জায়গায় নিষ্ক্রিয় নয়, কোনো কোনো জায়গায় তারা খুবই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের দেওয়াসহ বিভিন্ন গোপন ও অস্বচ্ছ চুক্তি করার ক্ষেত্রে সরকারের তাড়াহুড়া দেখা গেছে। তাদের দৃঢ়তা ও সক্রিয়তার অভাব শুধু জনগণের স্বার্থ যেখানে আছে, সেখানে। এই সরকারের মধ্যে দুটি ফ্যাসিবাদী ধারার একটা সম্মেলন ঘটেছে—ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও করপোরেট ফ্যাসিবাদ।
সাত দাবি
সমাবেশ থেকে সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের নির্বাহী সদস্য মফিজুর রহমান। এসব দাবির মধ্যে আছে শরিফ ওসমান বিন হাদি, দীপু চন্দ্র দাস, আয়েশা আক্তারের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার; উদীচী, ছায়ানট, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ দেশজুড়ে সংঘটিত প্রতিটি মব ও সন্ত্রাসী হামলার তদন্ত ও বিচার এবং সব সহিংসতায় উসকানিদাতাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা।
অন্য দাবিগুলো হলো মতপ্রকাশের অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া; চরমভাবে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অপসারণ এবং তফসিলে ঘোষিত নির্ধারিত সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের শিল্পীদের প্রতিবাদী গানে শুরু হয় এই সমাবেশ। বাউলগান পরিবেশন করেন শিল্পী দেলোয়ার হোসেন। সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিনিধিরা। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য, মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, কাঁটাবন ও শাহবাগ মোড় ঘুরে উদীচী কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
![]() |
| অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ বুধবার ঢাকার শাহবাগে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন বাম সংগঠনের যৌথ সমাবেশে। ছবি: প্রথম আলো |
নাজনীন মুন্নীর টকশো বন্ধ হলো যে কারণে
এ বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দৈনিক মানবজমিনকে নাজনীন মুন্নি বলেন, ‘আমাকে সরাসরি কিছু বলেনি তারা। তবে অফিসে এসে হুমকি দিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি একটা শো করি। এর আগে তারা ফোন দিয়ে আমার শো বন্ধ করে দেয়। সম্ভবত চেয়ারম্যান স্যারকে তারা ফোন দেয়। বিভিন্ন অখ্যাত পত্রিকায় নানা ধরনের গুজব লিখে ওই লিংক তাকে পাঠায়। যা খুশি তাই লিখে পাঠায়। বেশ কয়েকদিন যাবত এগুলো করছিলো। তারপর আমার শো করা অ্যাজইউজুয়াল বন্ধ হয়ে যায়।’
নাজনীন মুন্নী বলেন, ‘গত ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যাই। সেখান থেকে ১৭ ডিসেম্বর ফিরি। ফিরে আসার পর আমার শো করার কথা। কিন্তু আমাকে আর শো করতে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেও এক সপ্তাহ শো করতে পেরেছি। তার আগে আবার বন্ধ ছিলো। মানে দুই মাস করেছি, আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আবার এক সপ্তাহ করেছি, তারপর আমেরিকা গিয়েছি। সেখান থেকে ফেরার পর শো বন্ধ।’
শো বন্ধ করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে উদ্ভট ধরনের গল্প বানিয়ে এগুলো চেয়ারম্যানকে পাঠায়। প্রথমে সহজভাবে বলেছেন বাদ দেয়ার জন্য। আমি বলেছি—কেন আমি বাদ দেবো। প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে তাকে ফোন দেয়। তবে চেয়ারম্যান স্যার কখনো আমাকে বলেননি। শুধু আমাকে বলেছেন দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। আপনি কয়েকদিন শো কইরেন না। শো করলে তো সবার নজরে পড়ে আরও বেশি। এটা নিয়ে আমি আমার মতো করে বলেছি—কেন করবো না। এটা তো লুকানোর কিছু নেই। আমি একটা টেলিভিশনে কাজ করি। জার্নালিস্ট ও অ্যাংকর, আমাকে তো দেখবেই মানুষ। অ্যাংকরিংয়ে যদি কোনো ক্রাইসিস থেকে থাকে তাহলে আপনারা আমাকে বলবেন যে, এই সমস্যা হচ্ছে। শব্দগত বা কারও সাপোর্টে কথা বলেছি কিনা—তখন আপনি বন্ধ করতে পারেন। কে কী দিচ্ছে এর জন্য আমার শো বন্ধ—এটা কেমন কথা! তখন তিনি বললেন, এখন তো কোনো যুক্তির কথা খাটছে না।’
নাজনীন মুন্নী বলেন, ‘প্রথমে আমাকে বললেন তফসিল ঘোষণা করুক। তখন অবস্থা ঠান্ডা হয়ে যাবে এবং এটা নিয়ে কোনো কেওয়াজ করবে না। তখন আমি বললাম—ঠিক আছে, তবে তফসিল ঘোষণার করার পরও শো করতে দেয়া হয় না। তখন আমি বিষয়টা জানতে চাইলাম। তখন বলা হলো—ঝামেলা হচ্ছে। সবাই যখন নমিনেশান পেপার জমা দেবে তখন থেকে করবেন। এরমধ্যে শো-এর জন্য একজন হোস্ট হিসেবে ঠিক করে ফেললেন। তখনই আমি বুঝেছি আমাকে আর শো করতে দেয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেয়া হয়। বিষয়টা নিয়ে আমাদের সবার মন খারাপ ছিলো। এরপর ২১ ডিসেম্বর ৭-৮ জন আমার অফিসে আসেন। তবে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তখন হয়ত আমি অফিসে ছিলাম না বা বাইরে বের হয়েছি। তখন বিষয়টা আমাকে জানানো হয়নি। পরদিন আমি নরমালি অফিস করেছি। এরপর সন্ধ্যার দিকে আমাকে বিষয়টি জানানো হয়। আমাকে বলা হয়, অনেকগুলো ছেলে আসছিলো, তারা হুমকি দিয়ে গেছে। অফিস পুড়িয়ে দেবে।’
নাজনীন মুন্নী বলেন, ‘২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রিপোর্টারদের সঙ্গে বৈঠকের পর আমি চলে যাই। এরপর এমডি স্যারের কাছে ফোন আসে। কয়েকটা ছেলে বলছে তারা এমডি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি তাদের আসতে বলেন। তারপর তারা ৭-৮ জন আসেন। এমডির রুমে প্রবেশ করেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটি হিসেবে তারা পরিচয় দেন। আসার কারণ জানতে চাইলে তারা জানান, আমাদের শরিফ ওসমান হাদি ভাইয়ের জন্য মন খারাপ। আপনাদের গ্লোবাল টিভিতে হাদি ভাইয়ের কাভারেজ ভালো হয়নি। এটা আওয়ামী লীগের এমপির চ্যানেল আমরা জানি, কিন্তু আমরা কিছু বলি না। আপনারা নাজনীন মুন্নীকে কেন রাখছেন। উনি তো আওয়ামী লীগের দোসর। তখন এমডি বলেছেন, উনি আওয়ামী লীগের দোসর কীভাবে হন। আমরা তো উনাকে বুঝেশুনেই নিয়েছি। তখন তারা বলে, উনি আওয়ামী লীগের দোসর। উনাকে আপনারা বাদ দেবেন।’
তিনি বলেন, ‘অফিস আমার বিষয়ে আন্তরিক। চেয়ারম্যান ও এমডিকে বাইরে থেকে প্রতিনিয়ত আমার বিষয়ে হুমকি দেয়া হয়। তবুও তারা আমার পক্ষেই থেকেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর নিতে পারেননি। কারণ দুইদিন আগে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পুড়িয়ে দেয়া হয়।’
এক দল তরুণের হুমকি দেয়া প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার দুপুর ২ টার ৩৮ মিনিটে ফেসবুকে পোস্ট দেন নাজনীন মুন্নী। ওই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটির নাম করে ৭-৮ জন আমার অফিসে এসে হুমকি দিয়ে গেছে চাকরি না ছাড়লে অফিস প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো আগুন ধরিয়ে দেবে।’
বর্তমানে গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন নাজনীন মুন্নী। গত জুলাই মাসে এই চ্যানেলে তিনি যোগ দেন তিনি। এর আগে ডিবিসি নিউজ চ্যানেলে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ছিলেন নাজনীন মুন্নী।

Wednesday, December 24, 2025
‘নাজনীন মুন্নীকে বাদ দিন, না হলে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো আগুন লাগিয়ে দেব’ by নাজনীন আখতার
ওই তরুণেরা ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত চ্যানেলটির কার্যালয়ে গিয়ে হুমকি দেন, নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত না করলে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো ওই অফিসেও তাঁরা আগুন লাগিয়ে দেবেন। ১৮ ডিসেম্বর রাতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয় ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
নাজনীন মুন্নী এখন গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত। এই চ্যানেলে তিনি যোগ দেন গত জুলাই মাসে। এর আগে তিনি ডিবিসি নিউজ চ্যানেলে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ছিলেন। এক দল তরুণের হুমকি দেওয়া প্রসঙ্গে আজ ফেসবুকে একটি পোস্টে নাজনীন মুন্নী লিখেছেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটির নাম করে ৭-৮ জন আমার অফিসে এসে হুমকি দিয়ে গেছে—চাকরি না ছাড়লে অফিসে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো আগুন ধরিয়ে দেবে।’
এ বিষয়ে সাংবাদিক নাজনীন মুন্নীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দিতে এই হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে হওয়া অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পরে এই প্ল্যাটফর্ম ও জাতীয় নাগরিক কমিটির যৌথ উদ্যোগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর কয়েক মাস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যমান কার্যক্রম সেভাবে ছিল না। তবে প্ল্যাটফর্মটির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার খবর আসছিল। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৫ জুন ভোটের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কমিটি গঠিত হয়।
হুমকি প্রসঙ্গে জানতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রশিদুল ইসলামের (রিফাত রশীদ) সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহানগর কমিটির পৃথু নামের এক সদস্য কেন্দ্রের কোনো নির্দেশনা ছাড়া কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে গ্লোবাল টিভিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি স্মারকলিপি দেন, যেটিতে সাংবাদিক নাজনীন মুন্নীকে ফ্যাসিবাদের দোসর উল্লেখ করে অপসারণের দাবি করা হয়। স্মারকলিপিটি আমরা সংগ্রহ করেছি। সেখানে আগুন লাগানোর কোনো কথা লেখা নেই।’ সংগঠনের ওই সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমের ওপর কোনো আঘাতের পক্ষে নেই। নাজনীন মুন্নী বা গ্লোবাল টিভি আমাদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে আমরা তাঁকে বহিষ্কার করব।’
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে নাজনীন মুন্নী প্রথম আলোকে বলেন, হুমকির ঘটনাটি ২১ ডিসেম্বর রোববারের হলেও তিনি পরদিন অফিসে এসে জানতে পারেন।
ঘটনা সম্পর্কে নাজনীন মুন্নী বলেন, ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তিনি রিপোর্টারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাত আটটার দিকে এক বন্ধু দেখা করতে এলে তাঁকে নিয়ে তিনি গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় যান। এরপর রাত সাড়ে আটটার দিকে সাত-আটজন তরুণের একটি দল তাঁর অফিসে আসে। এর আগে তাঁরা চ্যানেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদ হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আসেন। নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটির বলে পরিচয় দেন। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে আসবেন, সেটা এমডিকে ফোনে জানাননি।
নাজনীন মুন্নী বলেন, ‘এমডির সঙ্গে দেখা করে ওই তরুণেরা প্রথমে বলেন, গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর কাভারেজ ভালো হয়নি। এরপর তাঁরা আমার (নাজনীন মুন্নী) প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তরুণেরা এমডিকে বলেন, নাজনীন মুন্নীকে কেন রেখেছেন? উনি আওয়ামী লীগের লোক। ওনাকে চাকরিতে রাখা যাবে না। ওনাকে বাদ দিন।’
নাজনীন মুন্নী জানান, তরুণদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমডি আহমেদ হোসেন বলেছিলেন, তাঁরা নাজনীন মুন্নীকে দেখেশুনেই চাকরিতে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
‘আপনারা একেকবার একেকটা বলবেন, সেটা তো হবে না। ওই সময় তরুণেরা বলেন, আমরা বলেছি, এ জন্য বাদ দেবেন। আমাদের কথা শুনতে হবে। নাজনীন মুন্নীকে বাদ না দিলে আপনাদের অফিসেও প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো আগুন লাগিয়ে দেব,’ এমডি আহমেদ হোসেনকে উদ্ধৃত করে বলেন নাজনীন মুন্নী।
নাজনীন মুন্নী জানান, এরপর ওই তরুণেরা একটা কাগজ এমডির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তাতে সই করতে বলেন। ওই কাগজে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত করার প্রতিশ্রুতির কথা লেখা ছিল। এমডি তাতে সই করতে রাজি হননি। ওই সময় ক্ষুব্ধ হয়ে তরুণেরা বলেন, ‘আমরা যেটা চাই, সেটাই হবে। প্রথম আলো-ডেইলি স্টারই কিছু করতে পারেনি। আর আপনারা তো কিছুই না।’
এমডি কাগজে সই করেননি, তাঁর বদলে তাঁর সঙ্গে থাকা সহকর্মী সই করেন বলে জানান নাজনীন মুন্নী। তিনি বলেন, ‘এই হুমকি প্রসঙ্গে অফিস আমাকে চুপচাপ থাকতে বলেছিল। কয়েক দিন অফিসে আসতে মানা করেছিল। কিন্তু আমি স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়েছি। অফিস কর্তৃপক্ষ মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আমি চুপ থাকব না। দুই দিন পরপর থ্রেট (হুমকি) দিয়ে যায়, এটা মানার মতো না। যমুনা টিভির নিকোলকে (অ্যাসাইনমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং এডিটর রোকসানা আনজুমান নিকোল) হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এর আগে রাজনৈতিক চাপে এ বছরের জুন মাসে আমাকে ডিবিসি চ্যানেল ছাড়তে হয়েছে। আমি বারবার বলেছি, আপনারা প্রমাণ করুন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না। কোনো একটি সম্পৃক্ততাও তারা পায়নি।’
সংবাদমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের ধারাবাহিকতা থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন নাজনীন মুন্নী। তিনি বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী চাইছে ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে ভয়-ভীতি দেখাতে। আমরা যাঁরা মানুষকে প্রভাবিত করতে পারি, তাঁদের গণমাধ্যমে রাখতে চায় না ওই গোষ্ঠী।’
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। নাজনীন মুন্নীকে চাকরি থেকে বাদ না দিলে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো তাঁর কার্যালয়ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি ‘কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই’ বলে জানান।
![]() |
| সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী। ছবি: সংগৃহীত |
Tuesday, December 23, 2025
আমি প্রমিজ করছি- রিপোর্ট অসত্য হলে ক্ষমা চাইব: মাহফুজ আনাম
রবিবার রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে তারেক রহমানের স্বদেশপ্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দেশের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশের ৫৩ বছরে কোনো মিডিয়া অফিস অগুন দিয়ে জ¦ালানো হয় নাই। প্রথমবারের মতো প্রথম আলো ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন দেয়া হয়েছে। আমরা কী অপরাধ করলাম। সত্যিকার অর্থে আপনারা এই প্রশ্ন করবেন। তবে ভবিষ্যতের দিকে আমি তাকাতে চাই। মিডিয়ার সঙ্গে সুন্দর একটি সম্পর্ক তৈরি করতে চাই। আমার অনুরোধ থাকবে- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে স্টেপ ওয়ান। রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হবে- ক্রিটিক্যাল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু আপনাকে ক্রিটিক্যাল সমালোচনা করার স্বাধীনতা দিতে হবে। এখন সালাহউদ্দিন আহমেদ মিডিয়া ফ্রেন্ডলি, কারণ তিনি এখন ক্ষমতায় নেই। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে আপনি কেমন হবেন সেটা আমরা যখন দেখবো- আপনি একই রকম উদার, একই রকম সমালোচনা গ্রহণ করছেন কিনা।
তিনি আরও বলেন, ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- আমাদের কোনো সরকার ক্রিটিক্যাল সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেনি। আমি আশা করবো- নতুন বাংলাদেশে ক্রিটিক্যাল সমালোচনা আপনারা গ্রহণ করবেন। তিনি বলেন, ক্রিটিক্যাল সমালোচনা শুধু সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নয়, এটা ভালো সরকারের সম্ভাবনা। স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আপনি নার্সার করবেন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, আমরা যে ভুল করি না তা নয়, আমরা ভুল করতে পানি। তখন আপনি কী করবেন। আপনি কী আমাকে নিন্দা করবেন। আমার অনুরোধ থাকবে- মাহফুজ আনাম আপনাদের এই রিপোর্টটা ফ্যাক্টবেইজ না, এটা তথ্য বিকৃত করেছে। আমি আপনাকে প্রমিজ করছি- আমরা রিপোর্ট অসত্য হলে আমি ক্ষমা চাইব। ডেইলি স্টার ভুল করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষমা চায়। আমি আপনার সমালোচনা করবো আপনার ভালোর জন্য। আমি কেন মিথ্য তথ্য দিয়ে সমালোচনা করবো। সমালোচনা করবো যেন সত্যিকার অর্থে নির্বাচিত সরকার গণতন্ত্রের দিকে যায়, মানুষের চাহিদার দিকে যায়। কারণ মিডিয়া একমাত্র সত্যি বলবে।
তিনি বলেন, অনেক সম্পাদক মালিকের পিআরও হয়ে যান। আপনাদের দলের পক্ষ থেকে একটা সার্ভে করেন- কারা নৈতিক সাংবাদিকতা করে। আপনার যেমন গুড গভর্নেন্স দরকার, আমার ইতিক্যাল সাংবাদিকতা দরকার।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল করি রিজভী ও মিডিয়া সেলের সদস্য মওদুদ আলা পাভেল। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বেগম সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেনসহ বিএনপির নেতৃবৃন্দ। এছাড়া দেশের জাতীয় দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন ও রেডিওতে কর্মরত সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
Sunday, December 21, 2025
জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতা ছাড়া এত বিভেদ-সংকটে দেশ চলতে পারে না: মতিউর রহমান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন মতিউর রহমান। আজ রোববার দুপুরে র্যাডিসন ব্লু হোটেলে দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, রেডিও-টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এই সভার আয়োজন করে ‘তারেক রহমান-স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
সভায় মতিউর রহমান বলেন, দেশে একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা বিপজ্জনক। এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের আরও আগে দেশে ফেরা সম্ভব হলে বিএনপি ও দেশের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমানের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলো সম্পাদক।
মতিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে এবং নির্বাচনে তারা বড় ব্যবধানে বিজয়ী হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যে দল ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, তাদের নেতৃত্ব, আচরণ ও বিনয় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’ তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী তালিকা নিয়েও মানুষের মধ্যে খুব বেশি উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। কিছু জায়গায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে কি না, তা ভেবে দেখা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
আগামী দিনে সরকার গঠনকারী দলের জন্য সময়টা হবে বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময় বলে মনে করেন মতিউর রহমান। বিএনপির কাছ থেকে আরও বেশি সহ্যশক্তি, আরও বেশি সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা দেখতে পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, বিএনপির শাসনামলে সংবাদপত্র খুব স্বস্তিতে ছিল—এমন দাবি তিনি করছেন না। তবে তুলনামূলকভাবে সে সময়টি ছিল কিছুটা বেশি সহনশীল। অন্যদিকে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ১৫-১৬ বছরে সংবাদপত্র শিল্প সবচেয়ে বেশি ভীতি ও চাপের মধ্য দিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মতিউর রহমান বলেন, ‘এই সময়টাতে শুধু প্রথম আলো নয়, পুরো গণমাধ্যমকেই ভয়াবহ চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে তা ছিল ভয়ংকর।’ এ সময় ডিজিএফআইসহ (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপ, মালিকানা বদল, সম্পাদক পরিবর্তন ও শেয়ার হস্তান্তরের চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মতিউর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না; সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে একটি জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা। এত বিভক্ত সমাজ নিয়ে কোনো দেশ এগোতে পারে না।
সরকার যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পথে এগোতে চায়, তাহলে সংবাদপত্রের সমালোচনা শুনতে হবে উল্লেখ করে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘শুনবেন, জানবেন—মানবেন কি না, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু না শুনলে ভুলের পুনরাবৃত্তি হবেই।’
সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
![]() |
| বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, December 7, 2025
ডা. জুবাইদার আগমন: ভিউয়ের প্রতিযোগিতা ও সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট by ইয়াসির সিলমী
নিউজের চেয়েও ভিউজের দিকে মনোযোগ বাড়াতে গিয়ে সাংবাদিকতাকে হাসির খোরাক বানিয়েছে কিছু অত্যুৎসাহী সংবাদমাধ্যম। অবাক করা বিষয় হলো এই তালিকায় শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমও রয়েছে।
যার সর্বশেষ উদাহরণ পাওয়া গেল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বাংলাদেশে আগমনে। তাঁর লন্ডন থেকে ঢাকায় আগমন এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে কিছু সংবাদমাধ্যম যে অতি উৎসাহ ও অপরিণামদর্শী আচরণ প্রদর্শন করেছে, তা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার সংজ্ঞাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কৌতূহল মেটানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা
ডা. জুবাইদা রহমান তাঁর অসুস্থ শাশুড়ি, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে গত শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) দেশে ফিরেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই মুহুর্তের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ফলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর দেশে ফেরা সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে; কিন্তু সমস্যাটা সংবাদ প্রকাশে নয়, সংবাদ পরিবেশনের ধরন ও বাড়াবাড়ি নিয়ে। কিছু সংবাদমাধ্যম এটি করেছে, যা নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজেও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ডা. জুবাইদার লন্ডনে বিমানে ওঠা থেকে শুরু করে ঢাকার বিমানবন্দরে অবতরণ, ইমিগ্রেশন পার হওয়া, ভিআইপি গেট দিয়ে বের হওয়া, কোন গাড়িতে উঠলেন, কোন পথ দিয়ে হাসপাতালে গেলেন, কোন ফ্লাইওভার ব্যবহার করলেন, কখন এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছালেন—প্রতিটি মুহূর্তের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কি আসলেই জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ? নাকি এটি নিছকই কৌতূহল মেটানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা?
একটি গাড়ি কোন ফ্লাইওভার দিয়ে যাচ্ছে, তা জানা জাতির জন্য কতটা জরুরি, তা গবেষণার বিষয়। এই ধরনের লাইভ ট্র্যাকিং বা ‘ধাওয়া করা সাংবাদিকতা’ কেবল হাস্যকরই নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকতা যখন ‘গোয়েন্দাগিরি বা ‘পাপারাজ্জি’ সংস্কৃতির স্তরে নেমে আসে, তখন তথ্যের চেয়ে সস্তা বিনোদনই মুখ্য হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ
ঘটনার এখানেই শেষ নয়, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রার সম্ভাব্য সফরসঙ্গীদের তালিকা প্রকাশের নামে কিছু সংবাদমাধ্যম নজিরবিহীন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গীদের নাম, পাসপোর্টের নম্বর এবং মুঠোফোনের নম্বরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এর জন্য বিএনপির দায়িত্বশীল মহল দায় এড়াতে পারে না। এ তথ্যগুলো ব্যবহার করে যে কেউ সাইবার অপরাধ বা জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু খবরের জৌলুশ বাড়াতে গিয়ে এমন সংবদেনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেছে কিছু সংবাদমাধ্যম।
সাংবাদিকতার নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট না হলে কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। কারও পাসপোর্ট নম্বর বা ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর প্রকাশ করা কি জনস্বার্থের অন্তর্ভুক্ত? এটি সরাসরি ডেটা প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা সব খবর বা তথ্যই কি প্রকাশ করা পেশাদারির মধ্যে পড়ে?
হাসপাতালের পরিবেশ বিঘ্ন
ডা. জুবাইদা রহমান যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান, তখন সেখানকার দৃশ্য ছিল আরও করুণ। শত শত ক্যামেরা, ইউটিউবার ও মূলধারার মিডিয়াকর্মীদের ভিড় হাসপাতালের প্রবেশপথকে কার্যত এক জনসভায় পরিণত করেছিল। হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গা, যেখানে নীরবতা ও শৃঙ্খলা কাম্য, সেখানে সংবাদমাধ্যমের এই হুলুস্থুল আচরণ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ, অন্যান্য রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়েছে।
হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের পথ আটকে, অন্যান্য রোগীর স্বজনদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে ডা. জুবাইদার গাড়ির পেছনে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, এটি কোনো সংবাদ সংগ্রহ নয় বরং কোনো অ্যাকশন সিনেমার শুটিং চলছে। যেসব সাংবাদিক এমনটা করছেন তাঁরা কি ভুলে গেছেন, হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীরা থাকেন? তাঁদের এই হট্টগোল মুমূর্ষু রোগী ও হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজকর্মে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? ‘ব্রেকিং নিউজ’ দেওয়ার নেশায় মানবিক বোধটুকু বিসর্জন দেওয়া কোন ধরণের সাংবাদিকতা!
ডা. জুবাইদার ঘটনাই একমাত্র উদাহরণ নয়, ভিউয়ের নেশায় মত্ত হয়ে আমাদের অনেক সংবাদমাধ্যম এমন অত্যুৎসাহী লাইভ, ব্রেকিং ও এক্সক্লুসিভ দেওয়াকে রুটিনে পরিণত করেছে।
কেন এমন আচরণ
প্রশ্ন হলো, অনেক সাংবাদিক কেন এমন আচরণ করছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘রিচ বাড়ানো’ বা ভিউ–বাণিজ্যের মধ্যে। এখন খবরের মান যাচাই করা হয় সত্যতা বা গভীরতা দিয়ে নয়; বরং কত দ্রুত সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হলো এবং কত বেশি ভিউ পেল, তার ওপর ভিত্তি করে।
অনলাইন পোর্টাল এবং কিছু টেলিভিশন চ্যানেল টিআরপি ও ভিউ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। মানুষের আবেগ, কৌতূহল এবং ব্যক্তিগত বিষয়কে পুঁজি করে তারা চটকদার শিরোনাম তৈরি করছে। জুবাইদা রহমানের গাড়ির পেছনে দৌড়ানোর ভিডিও হয়তো ইউটিউবে লাখ লাখ ভিউ এনে দিচ্ছে, বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়াচ্ছে; কিন্তু এতে সাংবাদিকতার মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যখন সাংবাদিকতা বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন পেশার নীতি–নৈতিকতার বালাই থাকে না। সাংবাদিকেরা তখন আর ‘ওয়াচডগ’ থাকেন না, হয়ে ওঠেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
দেশে কি সংবাদের সত্যিই অভাব? উত্তর হলো ‘না’। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, পরীক্ষা বন্ধ রেখে শিক্ষকদের আন্দোলন, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো অসংখ্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে, তখন মিডিয়ার একটি বড় অংশ ব্যস্ত একজন ব্যক্তির গাড়ির রুটম্যাপ তৈরিতে। এটি কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর কৌশল? নাকি এটি কেবলই মেধা ও মননশীলতার সংকট?
মিডিয়া যখন জনগণের কথা না বলে চটকদার বিষয় নিয়ে মেতে থাকে, তখন তারা জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ডা. জুবাইদা রহমানের আগমন অবশ্যই একটি ঘটনা; কিন্তু সেটিই একমাত্র বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হতে পারে না। তাই এখনই সময় এই অপসাংবাদিকতার লাগাম টেনে ধরার। ‘জাতির বিবেক’খ্যাত সাংবাদিকদের আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা প্রয়োজন। মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা হাতে নিলেই যা খুশি তা করা যায় না, এই বোধোদয় জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের কিছু করণীয় রয়েছে।
প্রথমত, সাংবাদিকদেরই বুঝতে হবে পাপারাজ্জি আর সাংবাদিকতা এক নয়। সাংবাদিকতা মানে দায়িত্বশীলতা। সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের কর্মীদের নিয়মিত নীতিনৈতিকতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্পাদক ও বার্তাকক্ষের নীতিনির্ধারকদের আরও কঠোর হতে হবে। ভিউ বাড়ানোর জন্য যেকোনো সংবাদ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার আগে সম্পাদকীয় নীতি অনুসারে যাচাইপ্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।
এ ছাড়া সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, প্রয়োজনে ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। তবে এ আইন যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি হাসপাতাল বা স্পর্শকাতর এলাকায় মিডিয়ার আচরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমকর্মী ও সরকারের পাশাপাশি পাঠকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। চটকদার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী সংবাদ বর্জন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভিউ না পেলে তখন মিডিয়াও তাদের পলিসি বদলাতে বাধ্য হবে।
ডা. জুবাইদা রহমানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আমাদের কিছু সংবাদমাধ্যমের যে আচরণ দেখা গেল, তা আমাদের সাংবাদিকতার রুগ্ণ দশাটিই প্রকট করে তুলেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি এখনই নিজেদের সংশোধন না করে, তবে তারা কেবল হাসির খোরাকই হবে না; বরং সমাজের চোখে অবিশ্বাস আর বিরক্তির প্রতীক হয়ে উঠবে। আমরা চাই আমাদের সাংবাদিকেরা এভাবে গাড়ির পেছনে নয়, সত্যের পেছনে দৌড়াক। তাঁরা যেন তথ্যের ফেরিওয়ালা হন, গুজবের নয়। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই পারে এই পেশার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে।
* ইয়াসির সিলমী, সভাপতি, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। ই-মেইল: silmybd@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখে ফিরছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ |
Thursday, October 30, 2025
গাজা যুদ্ধের সংবাদে ‘পক্ষপাতিত্বের’ অভিযোগে ১৫০ লেখক নিউইয়র্ক টাইমস বর্জন করছেন
ওই অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষরকারীরা লিখেছেন, নিউইয়র্ক টাইমস যদি তাদের পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের জন্য দায় স্বীকার না করে এবং গাজায় চালানো ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সত্যিকারের ও নৈতিক প্রতিবেদন না দেয়, তাহলে কোনো ব্যক্তির লেখা নিবন্ধ সংবাদকক্ষ বা সম্পাদক পর্ষদের জন্য কোনো ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে কাজ করবে না। বরং তাদের এই অসদাচরণ চালিয়ে যাওয়ারই অনুমতি দেবে।
লেখকেরা আরও যোগ করেছেন, ‘আমরা কেবল আমাদের শ্রম প্রত্যাহারের মাধ্যমেই সেই প্রভাবশালী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি, যা টাইমস দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিথ্যাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য ব্যবহার করে আসছে।’
চিঠিতে রিমা হাসান, চেলসি ম্যানিং, রাশিদা তালিব, স্যালি রুনি, ইলিয়া সুলেইমান, গ্রেটা থুনবার্গ, ভিয়েট থান এনগুয়েন এবং ডেভ জিরিন-এর মতো কয়েক ডজন সুপরিচিত কর্মী, শিল্পী ও মার্কিন রাজনীতিবিদ স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে লেখকেরা আরও লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও লেখকদের প্রতি আমাদের কর্তব্য হলো, নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা থেকে বিরত থাকা এবং তাদের ভুলগুলো স্বীকার করতে বাধ্য করা। যাতে গণহত্যা, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতিকে তারা কখনো বৈধতা দিতে না পারে।’
নিউইয়র্ক টাইমস বর্জনে যোগ দেওয়া অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন ক্রিস হেজেস, মার্ক ল্যামন্ট হিল, নুরা ইরাকাত, বিজয় প্রশাদ, মারিয়াম কাবা, রবিন ডি জি কেলি, মোহাম্মদ আল-কুরদ, সুসান স্ট্রাইকার, জিয়া টোলেন্টিনো, ইভ এল ইউইং, ডিন স্পেড, নাইল ফোর্ট, সুসান আবুলহাওয়া এবং রশিদ খালিদি।
তিন দাবি
স্বাক্ষরকারীরা নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছেন—
১. পত্রিকাটি যেন ‘ফিলিস্তিনবিরোধী পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে পর্যালোচনা করে’ এবং ফিলিস্তিন কভারেজের জন্য নতুন সম্পাদকীয় মান তৈরি করে। স্বাক্ষরকারীরা নতুন সোর্সিং (উৎস যাচাই) ও রেফারেন্স পদ্ধতি, সেই সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বর্ণনা দিতে পত্রিকার ব্যবহৃত শব্দভান্ডারের জন্য একটি নতুন স্টাইল গাইড চেয়েছেন। চিঠিতে এমন সাংবাদিকদের নিষিদ্ধ করারও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাঁরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন।
২. লেখকেরা নিউইয়র্ক টাইমসকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ‘Screams Without Words’ (স্ক্রিমস উইদাউট ওয়ার্ডস) শিরোনামের একটি প্রবন্ধ প্রত্যাহার করতে বলেছেন। ওই প্রবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল, হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নেওয়া ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন করেছে।
লেখকেরা লিখেছেন, ওই প্রবন্ধটি মূলত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের একজন প্যারামেডিকের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে লেখা হয়েছিল। অথচ প্রবন্ধটিতে যে কিবুৎসে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়, পরে সেখানকার একজন মুখপাত্র নিউইয়র্ক টাইমসের অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
তাঁরা আরও লিখেছেন, ওই প্রতিবেদনের লেখকদের মধ্যে একজন আনাত শোয়ার্টজকে পরে পত্রিকাটি তদন্তের আওতায় আনে। কারণ জানা যায়, তিনি গাজাকে ‘কসাইখানায়’ পরিণত করার আহ্বান জানানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে লাইক দিয়েছিলেন।
প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার আগে হামলায় নিহত কথিত যৌন নিপীড়নের শিকার মেয়েদের পরিবারের সদস্যরা বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, যা গল্পের দাবিগুলোর সঙ্গে মেলেনি। তবে সেই সাক্ষাৎকারগুলোর কোনোটিই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়নি।
৩. চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ডকে ইসরায়েলের ওপর মার্কিন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানানোর দাবি করেছেন।
স্বাক্ষরকারীরা বলেছেন, তাঁদের দাবিগুলো ‘অসম্ভব বা অযৌক্তিক’ নয়। লেখকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, পত্রিকাটি ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে এইডস সংকটের সময় তার স্টাইল গাইড হালনাগাদ করেছিল এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে হামলার পর ভুল সংবাদের জন্য ক্ষমাও চেয়েছিল।
লেখকেরা চিঠিতে আরও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক টাইমসের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী কোনো সংবাদপত্র নেই। পশ্চিমা বিশ্বের সংবাদকক্ষগুলোতে সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা এই পত্রিকার কভারেজ অনুসরণ করেন। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “কাগজের দলিল” হিসেবে গণ্য করা হয়।’
স্বাক্ষরকারীরা আরও যোগ করেছেন, ‘ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নিধনে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিউইয়র্ক টাইমস দখলদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করেছে, ন্যায্যতা দিয়েছে এবং সরাসরি অস্বীকার করেছে। এভাবে তারা ইসরায়েলি সরকার ও সামরিক বাহিনীর জন্য মাইক হিসেবে কাজ করার দশকব্যাপী অভ্যাস বজায় রেখেছে।’
![]() |
| নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে নিউইয়র্ক টাইমসের ভবন। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, October 7, 2025
বিভুরঞ্জন সরকার যে প্রশ্নগুলো রেখে গেলেন by নাদিম মাহমুদ
সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার পাঁচ দশক ধরে দুহাত ভরে লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর সর্বশেষ লেখাটি এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন, তা আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে, আশঙ্কার পথ তৈরি করছে।
বিভুরঞ্জন সরকার গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। যেদিন তিনি নিখোঁজ হন, সেদিন (২১ আগস্ট) ভোর পাঁচটায় সিদ্ধেশ্বরী থেকে ‘খোলা চিঠি’ আকারে তাঁর সর্বশেষ লেখাটি লিখেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। তাঁর সেই লেখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলেও তাঁর বিদায়ে আমাদের ‘ভঙ্গুর সাংবাদিকতা’ একখণ্ড প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করে গেছে, যা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি বলে মনে করছি।
বিভুরঞ্জন মৃত্যুর আগপর্যন্ত ছিলেন আজকের পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে পরিচিত পাওয়া এই সাংবাদিকের শেষ জীবনে যে ধকল গেছে, তা বুঝতে হলে তাঁর খোলা চিঠিকে আমাদের পড়তেই হবে। সেই চিঠিতে তিনি এমন কিছু বিষয়ের আলোকপাত করে গেছেন, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনায় হয়তো আমাদের আগামীর বিভুরঞ্জন সরকারদের বাঁচাতে সাহায্য করবে।
বিভুরঞ্জন সরকারকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন; কিংবা তাঁর পেশাদারি সম্পর্কে জানেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন একজন সজ্জন ও ন্যায়নিষ্ঠ সাংবাদিক, যিনি কিনা তাঁর চোখে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির বিষয়ে ক্রমাগত লিখেছেন; কিন্তু দিন শেষে, তিনি নিজেই নানা অসংগতির সঙ্গে বসবাস করে গেছেন, নিজের নীতির সঙ্গে আপসের সাহস না দেখালেও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে নানা সময় বিচলিত করে রেখেছিল, যা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের প্রাত্যহিক জীবন কী ধরনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা তাঁর পাঁচ দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন বর্ষীয়ান এই কলামিস্ট।
বিভুরঞ্জন সরকার তাঁর সেই আলোচিত খোলা চিঠিতে লিখছেন, ‘আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে; কিন্তু আজ যখন নিজের জীবনকে দেখি, অনুভব করি সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়। আমার পেশা আমাকে শিখিয়েছে, সত্য প্রকাশ করা মানে সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নেওয়ার নাম।’
আর এই ঝুঁকি নিয়ে আমাদের দেশের হাজারো সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন। কেউ পারছেন, আবার কেউ ঘুণে ধরা সিস্টেমের সঙ্গে আপস করে নিয়েছেন। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সৎ সাংবাদিকতা করা কেবল দুরূহ নয়, জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও বটে।
গণমাধ্যমগুলো মালিকপক্ষের বুকপকেট থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে তাঁবেদারি কিংবা তুষ্ট করার সাংবাদিকতায় বেশি চর্চিত হচ্ছে। শাসকদের বিরুদ্ধে গেলে শাসকেরা লাল চোখ দেখান পত্রিকার মালিকদের বা সম্পাদকদের। এই চর্চা কয়েক বছর ধরে চলে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ‘নিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকতা’ কিংবা সীমাবদ্ধ প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমগুলো কাভার করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা এই ‘বনসাই জার্নালিজম’ করতে পারেন না, তাঁদের বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।
ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোই চাচ্ছে না আমাদের সাংবাদিকেরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করুক। এর মূল কারণ হচ্ছে, সরকার কিংবা ক্ষমতাশালী অংশের বিরুদ্ধে গিয়ে সাংবাদিকতা করতে গেলে যে চাপ আসবে, তা সহ্য করার সক্ষমতা সব গণমাধ্যমের থাকে না। বিজ্ঞাপন হারানোর ভয় থেকে শুরু করে করপোরেট হাউসগুলোর মালিকপক্ষের ব্যবসার কথা বিবেচনা করে একধরনের আপসের সম্পাদকীয় নীতিমালা করতে হচ্ছে। ফলে পাঠকেরা অনেক সময় ডিপ জার্নালিজম দেখার সুযোগ পান না।
অভিযোগ আছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতো, তাতে ভয়ের সংস্কৃতি চর্চা হয়েছে; কিন্তু গণ-অভুত্থানের পর আমরা এই অভিযোগ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোকে দূরে রাখতে পারিনি। তাঁর প্রমাণ মেলে প্রয়াত সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের লেখায়। তিনি বলছেন, গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও কাহিল হয়েছে। মন খুলে সমালোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন; কিন্তু তাঁর প্রেস বিভাগ তো মনখোলা নয়। মিডিয়ার যাঁরা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরা সবাই আতঙ্কে থাকেন সব সময়। কখন না কোনো খবর বা লেখার জন্য ফোন আসে। তুলে নিতে হয় লেখা বা খবর!
এমন অভিযোগ আমরা ঢাকার অনেক সাংবাদিকের মুখে শুনছি। সর্বশেষ বিভুরঞ্জন সরকার যে অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চিত্র অঙ্কন করে গেছেন, তা সত্যিই বেদনাদায়ক। সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা না থাকলে দেশে কখনোই গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরবে না, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমকে শক্তিশালী করার চেষ্টা না থাকলে কোনো ঐকমত্য কিংবা সংস্কার বিফলে যাবে।
সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় এই পেশায় এসে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে এমন প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। অনেক তারকা সাংবাদিক এসে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাটুকু করার যখন চেষ্টা করে দিন শেষে আর্থিক দৈন্যের শিকার হন, তখন স্বভাবত এই পেশাকে তাঁরা ‘গুডবাই’ জানিয়ে তুলনামূলক বেশি বেতনের চাকরি লুফে নিচ্ছেন। ফলে সাংবাদিকতায় মেধাবীদের যে বিচরণ, তা কমতে শুরু করেছে। বিভুরঞ্জন সরকার তাঁর সেই খোলা চিঠিতে এমনই এক অভিযোগ করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, আজকের সময়ে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ অন্য রূপ। অনেকেই সুবিধা, স্বার্থ, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক স্বার্থের জন্য সত্যকে আড়াল করে লেখেন।
আর এসব করতে গিয়ে ক্ষতির শিকার তিনি কিংবা তাঁর পরিবার। বাবার লেখালেখির প্রভাব গিয়ে পড়ে সন্তানদের শিক্ষালয়ে বা পেশায়। বিভুরঞ্জনের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করে গেছেন, যা আমাদের অবাক করেছে। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সততা। এই সততাকে আড়াল করলে সাংবাদিকের যে অবয়ব আসে বড়ই বেমানান। এই পেশার মানুষগুলোকে আমরা মুখে মুখে ‘মহান পেশা’ দাবি করে পিঠ চাপড়ালেও দিন শেষে একজন সৎ সাংবাদিকের আর্থিক সচ্ছলতা অনেকটাই বিভুরঞ্জনের মতো।
৫০ বছর সাংবাদিকতা করার পর ঢাকার বুকে যদি কোন মাথা গোঁজার নিজের জায়গা না থাকে, মাস শেষে যদি অন্যের কাছে ধার-দেনা করতে হয়, তাহলে এই পেশা আদৌ কোনো ‘হেলদি’ পেশা হতে পারে না।
এই শহরে হাজারো সাংবাদিক আছেন। পেটের দায়ে তাঁরা সীমাহীন পরিশ্রম করে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন; কিন্তু একসময় এসে তাঁদের অনেকের উপলব্ধি হয়, মাস শেষে তিনি যে বেতন পাচ্ছেন এই শহরের রিকশাচালকেরা তার চেয়ে বেশি আয় করেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানদের ঠিকমতো খাবার জোগাড় করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। এসব যাতনা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ‘সুবিধাবাদী’র খাতায় নাম লেখান। সরকারকে খুশি করার জন্য সাংবাদিকতার পকেটে ঢোকে অ্যাক্টিভিজম। আর এসব করে অনেকেই আর্থিক সচ্ছলতা গড়েন, গাড়ি-বাড়ি করেন।
এই সংখ্যা কেবলই মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কপালে জুটলেও বিভুরঞ্জনদের ক্যাটাগরি অনেকটাই প্রশস্ত। চাকরি করে আর্থিক নিরাপত্তা না পাওয়া সাংবাদিকেরা ‘অনিয়ম ও নানা ধরনের তদবিরে’ জড়িয়ে পড়ে সাংবাদিকতার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছেন। প্লট, বিদেশভ্রমণ থেকে শুরু করে নানান সুবিধাপ্রাপ্ত এসব সাংবাদিকের কাছে সততার বড়াই করে এগিয়ে চলা বিভুরঞ্জনরা পরাজিত হন।
এসব জীবন্ত অভিজ্ঞতা দেখার পর কোন ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে আর্থিক টানাপোড়েনের পেশাকে গ্রহণ করতে চাইবে? এই যে এত এত গণমাধ্যম আমাদের, কই এসব সংবাদমাধ্যম কি সাহস দিয়ে বলতে পারছে, আসুন আমরা একটি শক্তিশালী নীতিমালা করি, যেখানে থাকবে সাংবাদিকদের আর্থিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা?
হ্যাঁ, সাংবাদিকদের বেতনকাঠামোর জন্য ওয়েজ বোর্ড আছে; কিন্তু দীর্ঘদিন নবায়ন না হওয়া কিংবা সেই ওয়েজ বোর্ড অনুসরণ না করা সংবাদপত্রগুলো দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাচ্ছে, মালিকপক্ষ বেতন নিয়ে তাইরেনাইরে করছে, তার হিসাব কয়জন কষে? পেশাদারি বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার অভিপ্রায় যে নেই, তা নয়; কিছু সংবাদমাধ্যম সেই নীতিমালা অনুসরণ করে। তবে সেটি হাতে গোনা।
আমাদের শত শত গণমাধ্যমের প্রয়োজন নেই। এক ডজন গণমাধ্যম যদি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাটুকু করে, সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন দেয়, অন্যান্য পেশার মতো তাঁদের সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে আমরা এভাবে বিভুরঞ্জনদের হারাতাম না।
সাংবাদিকতায় বিভুরঞ্জনদের না রাখতে পারার দায় অবশ্যই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর রয়েছে। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে না পারা বিভুরঞ্জনরা এই পৃথিবীকে বিদায় জানালেও আগামীর বিভুরঞ্জনদের এই পেশায় ধরে রাখতে হলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে সংস্কার করতেই হবে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে যদি সরকার গুরুত্ব দিত, তাহলে অন্তত গণ-অভ্যুত্থানে মুক্ত গণমাধ্যমের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলে পূরণ হতো। বিভুরঞ্জন আমাদের দেখিয়ে দিলেন, তোমরা যদি ন্যায়ের পথে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে চাও, তাহলে এই পেশায় সুস্থতা নিয়ে চিন্তা করো। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কোনো বিভুরঞ্জন সরকার এ রকম খোলা চিঠি না লেখেন।
* ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nadim. ru@gmail. com
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)
| বিভুরঞ্জন সরকার। ছবি : সংগৃহীত |
Saturday, June 21, 2025
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রকৃত খবর কি গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে দিচ্ছে ইসরায়েলি সরকার
গত বুধবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সেন্সরশিপ বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কোবি ম্যান্ডেলব্লিট এক বিজ্ঞপ্তিতে কিছু নিয়মনীতি ঘোষণা করেন। ইরানি হামলার প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা কী প্রকাশ করতে পারবেন এবং কী পারবেন না, তা এসব নিয়মনীতিতে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের (সেন্সরশিপ) আইনি ভিত্তি দেশটির জন্মের চেয়েও অনেক পুরোনো।
ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৫ সালে প্রথম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই বিধিনিষেধগুলোই ইসরায়েলি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে ইসরায়েলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি কেবল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সংবাদ প্রকাশে নিষিদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের (আইএফজে) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় অন্তত ১৬৪ সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরায়েল।
এর বাইরে লেবানন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ও বর্তমানে ইরানেও অনেক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের মে থেকে ইসরায়েলি সরকার আল–জাজিরাকে সে দেশে নিষিদ্ধ করেছে। নভেম্বরে ইসরায়েলের উদারপন্থী দৈনিক হারেৎজ পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কারণ, তাদের কিছু প্রতিবেদনে সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনা করা হয়েছিল।
সাংবাদিকদের ওপর নতুন কী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন। জেনে নেওয়া যাক এ–সংক্রান্ত খুঁটিনাটি।
নতুন বিধিনিষেধে কী রয়েছে
চলমান ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করেই মূলত সংবাদমাধ্যমের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েল সরকার।
ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব নিয়ে সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা কীভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে পারবেন, তার ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
‘অপারেশন রাইজিং লায়ন—ইসরায়েলি ফ্রন্টে হামলার সংবাদ সংগ্রহ বিষয়ে আইডিএফ সেন্সরের নির্দেশনা’ শিরোনামে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়। এতে সম্পাদকদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংবাদ প্রকাশের সময় ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক সেন্সরের দপ্তর।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সেন্সরশিপ বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, সাংবাদিকেরা এমন কিছু লিখতে বা দেখাতে পারবেন না, যা থেকে বোঝা যায় কোথা থেকে হামলা হয়েছে, কীভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা কাজ করছে বা হামলায় কতটা ক্ষতি হয়েছে। কারণ, এসব তথ্য শত্রুর কাজে লাগতে পারে এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বিশেষ করে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নিচের কাজগুলো করতে নিষেধ করা হয়েছে।
হামলার জায়গা থেকে ছবি তোলা বা ভিডিও সম্প্রচার করা, বিশেষ করে সামরিক স্থাপনার আশপাশে। ড্রোন বা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা ব্যবহার করে হামলায় বিধ্বস্ত এলাকা দেখানো। সেনা স্থাপনার কাছাকাছি ক্ষতিগ্রস্ত জায়গার নির্দিষ্ট অবস্থান জানানো। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের দৃশ্য সম্প্রচার করা।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সেন্সরশিপ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভিডিও প্রকাশ করা যাবে না। এসব ভিডিও ‘শত্রুপক্ষের তৈরি ভুয়া খবর’ হতে পারে।
নতুন বিধিনিষেধগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরনগরে সম্ভাব্য হামলার ছবি তুলতে ক্যামেরা বসানোর সময় কয়েকজন আলোকচিত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল
যেকোনো সংবাদে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে কোনো তথ্য থাকলে, তা ছাপার আগে সাংবাদিক ও সম্পাদকেদের সেন্সরশিপ বিভাগের অনুমতি নিতে হয়।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর হতে পারে, এমন যেকোনো সংবাদ প্রকাশ রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সেন্সরশিপ বিভাগ।
তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বা দেশের রাজনীতিবিদদের খ্যাতি নষ্ট করবে, এমন কোনো প্রতিবেদন প্রকাশে হয়তো বাধা দিতে পারবে না সেন্সর।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের মাধ্যমে ২০২৩ সালে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরও তীব্র করা হয়। এতে বলা হয়, যাঁরা ‘সুশৃঙ্খলভাবে ও ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদী প্রকাশনা পড়েন’ বা ‘সন্ত্রাসী কাজের সরাসরি আহ্বান প্রচার করেন’, তাঁরা শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হবেন।
‘ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ’-এর মতো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে নতুন বিধিনিষেধ আসার আগেই সেন্সরশিপ বিভাগের ‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়বস্তুর’ সংজ্ঞা ছিল খুব বিস্তৃত। এর মধ্যে সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, অস্ত্র চুক্তি, প্রশাসনিক বন্দী, ইসরায়েলের বৈদেশিক নীতিসহ অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কোনো সাংবাদিক, প্রকাশনা বা সংবাদমাধ্যম সেন্সরশিপ বিভাগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারে। আদালত চাইলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন।
সেন্সরশিপ বিভাগ কত ঘন ঘন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে
প্রায়ই হস্তক্ষেপ করে। গত মে মাসে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সাময়িকী +৯৭২ জানিয়েছিল, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংবাদমাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাময়িকীটির মতে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সামরিক সেন্সরশিপ বিভাগ সম্পূর্ণভাবে ১ হাজার ৬৩৫টি সংবাদ প্রকাশে বাধা দিয়েছে এবং আরও ৬ হাজার ২৬৫টি সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় গড়ে ২১টি প্রতিবেদনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনের কোনো অংশের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করাও নিষেধ। ফলে কোন তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে এবং কোনটি রাখা হয়েছে, তা পাঠকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
‘পশ্চিমা ধাঁচের’ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় ইসরায়েলের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন?
যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলি নেতারা নিজেদের তুলনা করেন, সেসব দেশে ইসরায়েলের মতো কোনো সামরিক সেন্সরশিপ বিভাগ নেই।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ইসরায়েলের অবস্থান ১১২তম। দেশটি হাইতি, গিনি-বিসাউ, দক্ষিণ সুদান ও চাদের চেয়েও পিছিয়ে আছে।
আরএসএফের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েল নৃশংস হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বহুমাত্রিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্রমাগত কমছে।
আরএসএফ আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কেবল সরকারপন্থী চ্যানেলকে সাধারণত শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
![]() |
| ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েইজমান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স ক্যাম্পাসে সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন অধ্যাপক রোয়ে ওজেরি। রোহেবোট, ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স |
Saturday, October 19, 2024
রাজনীতির লড়াই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় by মনির হোসেন
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক লড়াইসহ আগামী দিনের সব জনমত সৃষ্টিতে অনলাইন প্রচারণা বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় যারা এদিকে নজর কম দেবে তারা পিছিয়ে পড়বে। এ দেশে বড় কয়েকটি আন্দোলনই সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন এবং ২০২৪ এর কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের আন্দোলনে সোশ্যাল সাইটের ভূমিকা ছিল বেশ।
শুধু বাংলাদেশ নয়, মি টু, মিটু এর মতো বড় আন্দোলনও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমাগত ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে ফিলিপাইনেও ক্ষমতার মসনদে বসেছেন সাবেক স্বৈরশাসকের ছেলে। কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের আরজি করের ধর্ষণ কাণ্ডও সোশ্যাল সাইটের কারণে অনেক বেশি ছড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেও আন্দোলন যখন তীব্র তখন ইন্টারনেট বন্ধ করতে বাধ্য হয় সরকার। সেখানেও দাবি করা হয় সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা সরকারকে সরাতে চাচ্ছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলন দমাতে সোশ্যাল সাইট বন্ধ করার ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সরকারের চালানো নানা হত্যাযজ্ঞের ভিডিও ও স্থির চিত্র যখন সোশ্যাল সাইট খুলে দেয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে তখন আর আটকানো যায়নি আন্দোলন। পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারও বিগত কয়েক বছর ধরে লক্ষাধিক কর্মী নিয়োগ করে সাইবার লড়াইয়ে। সিআরআইয়ের মতো শক্তিশালী গবেষণা প্ল্যাটফর্মও দাঁড় করিয়েছে দলটি। শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে অনলাইন ক্যাম্পিংয়ে। নির্বাচন ও সরকারের বিশেষ প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে এসব ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য দলও ক্রামাগত সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে আসছে পৃথকভাবে। যদিও তাদের দলীয় কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য না।
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে সতর্ক। সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি রংপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পরাজিত পতিত ফ্যাসিবাদ রাজপথ থেকে পরাজিত হয়ে এখন অনলাইনে শক্তি প্রদর্শন করছে। ফেসবুকে প্রচুর গুজব রটানো হচ্ছে, ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। আমরা যেন মিথ্যা তথ্য ও গুজবে বিশ্বাস না করি। জানতে চাইলে সিআরআই-এ কাজ করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা বলেন, সিআরআই মূলত সজীব ওয়াজেদ জয় ও রেদওয়ান মুজিব ববির তত্ত্বাবধানে চলতো। এটার মূল কাজ ছিল তৎকালীন সরকারের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অনলাইন ক্যাম্পিং করা। এক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়ন, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক দোষত্রুটি তুলে ধরা হতো। কখনো কখনো রাজনৈতিক পলিসির অংশ হিসেবে কিছু প্রোপাগান্ডাও প্রচার হয়েছে এটা সত্য। প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার অংশ হিসেবেই এটি হতো। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। তিনি বলেন, অনলাইন ক্যাম্পিং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো যায়।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে সবচেয়ে সাড়া জাগানো অনলাইন ক্যাম্পিংয়ের মধ্যে ছিল প্রোফাইল লাল ও কালো করা। ছাত্র-জনতা যখন প্রোফাইল হিসেবে বিপ্লবের রং লাল বেছে নিয়েছে তখন আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারীরা আগস্টের কালো রংকে বেছে নেয়। যার মাধ্যমে দেশে দুই ধারা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যায়। সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষই লালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ওই আন্দোলনে যুক্ত রবিউল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের ওই ক্যাম্পিং আন্দোলনের পক্ষে বিশাল একটি মত তৈরি করেছিল। যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ যে সমর্থনের দিক দিয়ে সংখ্যালঘু সেটি প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল।
সম্প্রতি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে দ্য ডিপ্লোম্যাটের পলিটিক্যাল এনালিস্ট মোবাশ্বর হাসান বলেন, আগামী দিনে বাংলাদেশের সব সরকারের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটিপতি ছেলের কৌশলগত ভ্রান্ত তথ্য প্রচার মোকাবিলা করা। ফিলিপাইনেও শেখ হাসিনার মতো পালিয়ে যাওয়া সাবেক স্বৈরশাসক মার্কোসের ছেলে বং বং মার্কোস ক্রমাগত ভ্রান্ত তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হয়েছে। তিনি বলেন, সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে না থাকলেও ক্রমাগত অপতথ্য ছাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সমাজে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে দলটি। যেটি আওয়ামী লীগের জন্য বিজয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে সোশ্যাল সাইটে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে হবে। স্ট্যাটাসে তিনি মিয়ানমারে গণহত্যা, ইউরোপীয় ইউননিয়ন ভেঙে যাওয়া ও মার্কিন ক্যাপিটাল হিলে হামলার পেছনে কৌশলগত অপতথ্য ছড়ানোর উদাহরণ টানেন। তার মতে সংস্কারসহ অন্যান্য কিছুর থেকে সরকারের কাছে বর্তমানে ছড়ানো অপতথ্য প্রতিরোধে একটি জাতীয় কৌশল থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিতে হয়। সিআরআই ছাড়াও আশরাফুল আলম খোকন, মো. এ আরাফাত এসব কাজ করতেন। আমাদের সংগঠন প্রোপাগান্ডার বিপরীতে মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করতে চায়। আমরা সুস্থ ও সঠিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ক্ষমতা হারানোর পর তারা তো রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে তাই তারা এখন অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তারা তাদের ভেরিফাইড পেইজগুলোতে শতভাগ প্রোপাগান্ডা প্রচার করছে। সিআরআই রিসার্চ করে এসব দেয়া হচ্ছে। আমরা সতর্ক আছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সতর্ক করবো। যেন শিক্ষার্থীরা পথভ্রষ্ট ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পড়ে। একই সঙ্গে আমাদের পেইজগুলোতেও এ নিয়মিত সঠিক তথ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বুম বাংলাদেশের সম্পাদক আমির শাকির বলেন, ৫ই আগস্টের আগে উভয় পক্ষ অনলাইনে জনমত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তখন কিছু মিস ইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা ও গুজব ছিল। ৫ই আগস্টের আগেও ছিল পরেও আছে। এখন এক পক্ষ মাঠে নেই, অনলাইনে আছে। তারা বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। যেগুলোর কিছু গুজব, কিছু প্রোপাগান্ডা। আওয়ামী লীগ মাঠে ফেরার আগে এভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ থেকে কর্মীদের চাঙা রেখে ইস্যুভিত্তিক মাঠের রাজনীতিতে আসতে চায়। তিনি বলেন, অনলাইনে রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা শুধু বাংলাদেশ না সারা পৃথিবীতেই গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে প্রোপাগান্ডা প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করে একদিন তারা মাঠে ফিরবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় এদের বিশাল একটা অনলাইনকর্মী বাহিনী রয়েছে। সিআরআইয়ের মতো প্ল্যাটফর্ম আছে। এভাবে মাঠে একটি রাজনৈতিক বয়ান হাজির করতে চায়। তারা যদি এর মাধ্যমে এমন কোনো বয়ান হাজির করতে পারে যেটি জনমতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তখন তারা মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে পারে। এক ফ্যাক্ট চেকার বলেন, বিএনপি-জামায়াতের কালেক্টিভ কোনো ক্যাম্পিং দেখি না, যেটি আওয়ামী লীগের বেলায় দেখি। তারা একটা ইস্যুতে দুই একদিন থাকে এরপর নতুন ক্যাম্পেইন নিয়ে আসে। বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা পৃথকভাবে করছে। তার মতে অনলাইন অ্যাক্টিভিজম ও মাঠের রাজনীতি দুটোই অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আবার অনলাইনের অ্যাক্টিভিজম আর বাস্তবের রাজনীতি এক না। কিছুদিন আগেও অনলাইনে মনে হতো জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসছে। বাস্তবিক অর্থতো ভিন্ন। আমির শাকির বলেন, যেকোনো ইস্যুতে বিভিন্ন গোষ্ঠী আগে সামাজিকমাধ্যমে বয়ান তৈরি করে, এরপর মাঠে আসে। গত এক মাসে মাঠে বড় কোনো গণ্ডগোল হয়নি। তেমন কোনো গোষ্ঠী মাঠে নেই। কিন্তু একটা বয়ান তৈরি হচ্ছে সরকার হিজবুত, ইসলামপন্থি। এ বয়ান ক্রিয়েট করে আন্দোলনবিরোধীরা আস্তে আস্তে মাঠে আসবে বলে মনে হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ পলাশ মাহমুদ বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু পজেটিভ দিক আছে। প্রথমত এখানে ব্যয় নেই ডাটা কেনা ছাড়া। কিন্তু যে কোনো কর্মসূচি সশরীরে গিয়ে বাস্তবায়ন করতে গেলে খরচের বিষয় আছে। এ ছাড়া সময় বাঁচা ও প্রাইভেসিও রক্ষা হয়। সিক্রেট গ্রুপ খুলে কাজ করা যায়। একইসঙ্গে যোগাযোগটাও দ্রুত হয়। এসব সুবিধার কারণে মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি ঝুঁকছে। এর ইম্প্যাক্টও আছে। তিনি বলেন, এক লক্ষ মানুষকে সশরীরে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছাতে অনেক সময় ও খরচের ব্যাপার। সেক্ষেত্রে অনলাইন ক্যাম্পিং অনেক বেশি কার্যকর। আওয়ামী লীগসহ সব দলই এটাকে ব্যবহার করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটা সময় আন্দোলন-সংগ্রাম ও দাবি-দাওয়া আদায়ের মূলে ছিল রাজপথে নেমে আসা। সমাবেশ, মানববন্ধন করা। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে এ উপায়গুলো পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের জীবনে প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। মানুষ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থার কারণে মানুষ তার লাইফ স্টাইল সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার প্রতি নির্ভরশীল হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানুষকে কোনো বিষয়ে অবগত করা, সচেতনতা করা সহজ। একইভাবে মানুষ কী ভাবছে, সেটিও জানা সম্ভব। মানুষ লাইক-কমেন্টে কখন কী বলছে, কীভাবে বলছে সেটা ফুটে ওঠে। তখন আন্দোলনটা যাদের কেন্দ্রিক তারা বুঝতে পারে তার করণীয় কী হবে। তার সম্পর্কে মানুষের ভাবনা কী। ড. তৌহিদুল হক বলেন, কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ার উপকরণ ব্যবহার করে গুজব, প্রোপাগান্ডা ছড়াতে চায় তারও সুযোগ আছে। কারণ অনেক ব্যবহারকারী এগুলো যাচাই-বাছাই না করে বিশ্বাস করে। সোশ্যাল মিডিয়ার পজেটিভ দিকের সঙ্গে এর নেতিবাচক দিকও ঘেটে দেখা প্রয়োজন। তাই ব্যবহারকারীরা অন্যের কোনো উদ্দেশ্যের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে কিনা সেটাও মাথায় রাখতে হবে। এখানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই আছে। তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা রিউমার ছড়ায় তাদের আইনের আওতায় আনা এবং মানুষকে সঠিক তথ্যের দিকে আকৃষ্ট করার ব্যাপারটা আমাদের এখানে নেই। যা পায় তা মানুষ বিশ্বাস করে। এ বিশ্বাসের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের একটা ব্যাপার আছে। বিভাজনের প্রেক্ষাপটেও মানুষ এগুলো করে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব অনেক যেটি ছাত্র আন্দোলনে প্রমাণিত হয়েছে। তাই সবাই এ প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করতে চায় নিজেদের মতো করে। শোনা যায় আওয়ামী লীগ নাকি সম্প্রতি ২০০ কোটি টাকা ইনভেস্ট করেছে এ খাতে। তাই তারা এর কিছু ফল পাচ্ছে এটা ঠিক। যতটুকু জানি যে শেখ হাসিনাকে তার মেয়ে ও বোনের সঙ্গেও দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। উনিতো বাস্তবিক অর্থেই প্রকাশ্যে আসতে পারবেন না। তাই দলটির অনলাইনে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে কিছু মানুষ ইনফ্লুয়েন্স হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। এটির অনেক ইম্প্যাক্ট আছে। এটা সত্য কথা। সরকারকেও সোশ্যাল মিডিয়ার এসব বিষয় মোকাবিলা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ রাজপথ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি থাকে। ছাত্র আন্দোলনের সময়ও এর বিশাল ভূমিকা ছিল। আওয়ামী লীগ এ সুযোগটা নিতে চায়। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ এ গণআন্দোলনকে মোকাবিলা করতে পারবে বলে মনে হয় না। যতই অনলাইনে সক্রিয় থাকুক। কিছু মানুষ হয়তো খুশি বা কিছু মানুষ আতঙ্কিত হবে- তবে অধিকাংশ মানুষ বোঝে এতে কোনো কাজ হবে না। তিনি বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে হবে। এখন যুগটাই এমন। সবাই এখানে অ্যাক্টিভ। কোনো দল যদি এতে গুরুত্ব কম দেয়, তাদের মেনুফেস্টোতে এটি গুরুত্ব না পায় তাহলে তাদের চিন্তিত হতে হবে ভবিষ্যতে। যত বেশি এতে গুরুত্ব দেবে তত বেশি সফল হবে।

Thursday, July 15, 2021
৬৩ বছর পর বাংলা রেডিও সার্ভিস বন্ধ করছে ভয়েস অব আমেরিকা
একই সঙ্গে, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের টেলিভিশন এবং সোশ্যাল
মিডিয়া কন্টেন্টের পরিধি যথেষ্ট বাড়ানো হবে। কারণ এই প্ল্যাটফরমগুলো ভিওএ বাংলার (এক কোটি ষাট লাখ) সাপ্তাহিক শ্রোতাদের দ্বারা বেশি ব্যবহৃত হয়।
ভিওএ প্রোগ্রামিংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জন লিপম্যান বলেন, “ভিওএ বাংলা ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে যখন চালু হয়েছিল, বাংলাদেশ তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং অঞ্চলটি সামরিক আইনের অধীনে ছিল যেখানে কোনো টেলিভিশন বা বেসরকারি রেডিও ছিল না।”
তিনি বলেন, ‘তখন সীমান্তের বাইরে থেকে ভিওএ-র শর্টওয়েভ রেডিওতে সম্প্রচারিত স্বাধীন সংবাদ এবং তথ্যের ওপর নির্ভর করতো বাংলাভাষী জনগণ।’
যদিও শর্টওয়েভ রেডিও শ্রোতা এখন এক শতাংশেরও কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিওএ বাংলার শ্রোতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। টুইটার অ্যাকাউন্টে সম্পৃক্ততা আগের বছরের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ইনস্টাগ্রামে ভিডিও দেখা ২৭৪ শতাংশ বেড়েছে।
লিপম্যান উল্লেখ করেন, ‘কয়েক ডজন দেশীয় টেলিভিশন এবং রেডিও স্টেশন বাংলাভাষী শ্রোতা ধরতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, এর পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সংবাদের জন্য বাংলাদেশে টিভি এবং অনলাইন অ্যাক্সেসের চাহিদা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভিওএ বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠান সেসব প্ল্যাটফরমে পরিবেশন করা দরকার যেখানে তার শ্রোতারা ইতিমধ্যেই সক্রিয়।
ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শতরূপা বড়ুয়া এ মাসেই বলেছিলেন, ‘রেডিও যখন প্রাথমিক সংবাদমাধ্যম ছিল সে সময় থেকেই ভিওএ বাংলা তার শ্রোতাদের কাছে বিশ্ব সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এটি ছিল আমাদের গড়ে তোলার মাধ্যমে, সবার মুখে মুখে ছিল এর নাম। শর্টওয়েভ এবং মিডিয়ামওয়েভ রেডিওর চেয়ে এখন যেসব মিডিয়ায় আমাদের উপস্থিতি আরও বেশি জনপ্রিয় সেসব জায়গায় আমাদের সেই খ্যাতিকে ভিত্তি করে এগিয়ে যাবো।’
শতরূপা বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের এমন ইতিহাসের কারণে, ভিওএ-তে কাজ করা আমাদের অনেকের জন্য ‘ড্রিম জব’।
আসন্ন পরিবর্তনগুলোর পরও তা অব্যাহত থাকবে।”
সম্প্রচারের শেষ দিনগুলোতে ভিওএ বাংলা রেডিও সার্ভিস তাদের সূচনালগ্ন অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের পর থেকে এ দেশে ঘটে যাওয়া নানা পরিবর্তন সম্প্রচার করবে।
Monday, August 3, 2020
বর্ষপূর্তি বিশেষ: উইকিলিকস-এর আলোচিত ফাঁসগুলো by মিছবাহ পাটওয়ারী

২০১০ সালের ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন বাহিনীর হেলিকপ্টার হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, ওই হামলায় কীভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এক ব্যক্তি সবাইকে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ করে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা একটি গাড়িতেও গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় নিজ সহকারীসহ নিহত হন রয়টার্সের একজন ফটোগ্রাফার। ওই হামলায় মোট ১৮ জনকে হত্যা করে মার্কিন বাহিনী। এই ভিডিও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের একটি প্রামাণ্য দলিল।
আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের ৭৫ হাজার নথি
২০১০ সালের জুলাইয়ে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের ৭৫ হাজার গোপন নথি ফাঁস করে হইচই ফেলে দেয় উইকিলিকস। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে শত শত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করার নথি ফাঁস করে দেওয়া হয়। এছাড়া তালেবানের ক্রমবর্ধমান হামলা ও দেশটির অস্থিরতার নেপথ্যে পাকিস্তান ও ইরানের যোগসাজশের কথাও উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ লাখ কূটনৈতিক নথি ফাঁস
২০১০ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৩৮টি কূটনৈতিক নথি ফাঁস করে দেয় উইকিলিকস। প্রতিষ্ঠানটি এর নাম দেয় ক্যাবলগেট। দুনিয়া কাঁপানো ওইসব তথ্য ছিল মূলত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের। আকারের দিক থেকে এটি ছিল ১ দশমিক ৭৩ গিগাবাইট। এর আগের সবচেয়ে বড় ফাঁসের চেয়ে এর ডাটার পরিমাণ ছিল প্রায় শতগুণ বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২৭৪টি দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে এসব সংগ্রহ করা হয়।
গুয়ানতানামো বে কারাগার
২০১১ সালের এপ্রিলে উইকিলিকসের ফাঁস করা গোয়েন্দা নথিতে উঠে আসে কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগারে মার্কিন বাহিনীর হাতে জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের বিষয়টি। সেখানে ১৪ থেকে ৮৯ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের ৮০০ বন্দির ওপর মার্কিন নিপীড়নের নথি ফাঁস করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
সৌদি-যুক্তরাজ্য যোগসাজশ
২০১৫ সালের জুনে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদ পেতে গোপন ভোটবাণিজ্যে মেতেছিল সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাঁস হওয়া নথি থেকে ওই তথ্য পায় উইকিলিকস।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ই-মেইল
২০১৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ১৯ হাজার ২৫২টি ই-মেইল এবং আট হাজার ৩৪টি অ্যাটাচমেন্ট ফাঁস করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটনের প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্স সম্পর্কে কটূক্তি করেছিলেন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ওই ঘটনার জেরে এর সঙ্গে যুক্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতা পদত্যাগ করেন।
দুনিয়াজুড়ে সিআইএ’র নজরদারি
২০১৭ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিআইএ’র হ্যাকিং কৌশল নিয়ে ‘ভল্ট সেভেন’ নামে বেশ কিছু নথি প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, দুনিয়াজুড়ে লোকজনের গাড়ি, স্মার্টফোন, স্মার্ট টেলিভিশন, ওয়েব ব্রাউজার ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে নজরদারি চালায় সিআইএ। আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড, মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ, স্যামসাং টেলিভিশন কিছুই এ নজরদারি তালিকার বাইরে নয়। এর মধ্য দিয়ে সিআইএ এসব ডিভাইস হ্যাক করে তথ্য হাতিয়ে নেয়। গোয়েন্দা সংস্থাটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় আকারের নথি ফাঁসের ঘটনা।
সূত্র: উইকিলিকস-এর ওয়েবসাইট।
Wednesday, February 19, 2020
বর্ষপূর্তি বিশেষ: গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট কিংবা সাংবাদিকতার নতুন যুগ by বাধন অধিকারী

ইরাক যুদ্ধের কালে আমরা দেখতে বাধ্য হয়েছি ‘এমবেডেড জার্নালিজম’র নামে কী করে সাংবাদিকতা ক্ষমতাশালী মার্কিন রাষ্ট্র ও মিলিটারি করপোরেশনের ‘রক্ষিতা’য় রূপান্তরিত হয়েছিল। অবজারভার পত্রিকা ২০০৩ সালে হিসাব কষে দেখিয়েছিল ইরাক যুদ্ধের কাভারেজ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার মুনাফার পরিকল্পনা করেছে রয়টার্স। লন্ডনভিত্তিক নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে সাংবাদিক জন পিলজার পরিসংখ্যান হাজির করেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের সময় বিবিসি’র যুদ্ধবিরোধী কাভারেজের হার ছিল ২ শতাংশ। গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্যানুসারে, ১৯৯১ সালে বিবিসি তার সংবাদকর্মীদের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ছবি দেখানোর ব্যাপারে ‘সতর্ক’ থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিছুদিন পরেই ১৯৯১ সালের ক্রিসমাসের আগে লন্ডনের মেডিক্যাল এডুকেশন ট্রাস্ট জানায়, ‘নিখুঁঁত আঘাত’ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দুই লাখেরও বেশি ইরাকি নারী-পুরুষ-শিশু মারা গেছে। এই চরম সত্য সংক্রান্ত একটি সংবাদও বিবিসি প্রচার করেনি। কমবেশি সেই এমবেডেড বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের মূলধারার সাংবাদিকতা ঘুরপাক খাচ্ছে এখনও।
ইরাক যুদ্ধ নিয়ে উইকিলিকস-এর ভূমিকা ছিল অনন্য। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস করা গোপন নথির মধ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধ সম্পর্কিত ৭৬ হাজার এবং ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত আরও ৪০ হাজার নথি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। অ্যাসাঞ্জ নথি ফাঁসের পর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের আগে থেকেই যে সত্য আড়ালের প্রচেষ্টা চলছে, দলিল ফাঁস করে দিয়ে সেই সত্যটিকেই মানুষের সামনে আনা হয়েছে। উইকিলিকস-এ মার্কিন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ছিল একটি ভিডিও, যেখানে দেখা গেছে, ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিকদের মরতে হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’। উইকিলিকস-এর উন্মোচন ছাড়া এসব কি আমরা জানতে পারতাম, ‘রক্ষিতা সাংবাদিকতা’র মধ্য দিয়ে?
করপোরেট সংবাদমাধ্যম সংবাদ নির্মাণে তার নিজস্ব মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গি আর সামগ্রিক নব্য উদারবাদী বাজার ব্যবস্থার পক্ষে যে নিত্য প্রচারণা জারি রেখেছে একটি ক্রম-কর্তৃত্বতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে, অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস তার বিপরীতে জনগণের মিডিয়া আকারে হাজির হওয়া এক অনন্য সংবাদপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবাদসূত্র হতে পারেন বিশ্বের যে কেউ। আর নয়া যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধাকে সঙ্গে নিয়ে বৃহৎ পুঁজির কারবার না হওয়ার কারণে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে করপোরেট মিডিয়ার মতো মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থাকার কারণে উইকিলিকস-এর কোনও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। সে কারণে করপোরেট মিডিয়া যেখানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের নামে রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে, উইকিলিকস সেখানে আবির্ভূত হয়েছে ‘গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট হিসেবে’।
গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কথিত জাতীয় স্বার্থের বিরোধাত্মক সম্পর্কের প্রশ্ন। রাষ্ট্রপরিচালনাকারী ক্ষমতাশালীদের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থ আর জনস্বার্থকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। জাতীয় স্বার্থের অজুহাতেই জনগণের কাছ থেকে গোপন করা হয় জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তবে রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে তাদের কাছে থেকে তথ্য গোপন করার নাম জাতীয় স্বার্থ হতে পারে কি? এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর সাংবাদিকতার সূচনা। এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর স্লোগান ‘উই ওপেন গভর্নমেন্ট। কথিত জনস্বার্থের বিপরীতে জনগণের স্বার্থকে সামনে এনে উইকিলিকস আমাদের সামনে নতুন দিনের সাংবাদিকতার নিশানা হয়ে হাজির হয়। জাতীয় স্বার্থের নামে সংঘটিত ইরাক আগ্রাসন, যুদ্ধবাজ অর্থনীতি, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’র পেছনের রাজনীতিকে উন্মোচন করে অভাবনীয় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে।
অগ্রসর প্রযুক্তির যুগে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উইকিলিকস-এর কারিগরেরা এমন একটি যোগাযোগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে কোনও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী প্রযুক্তি দক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না। কে উইকিলিকসকে তথ্য দিলো, তা আজও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বের করা যায়নি। উইকিলিকস তার সংবাদসূত্রের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করে কোনও ধরনের সেন্সরশিপ ও তথ্যগত সম্পাদনা ছাড়া জনসম্মুখে হাজির করে। ইতিহাসকে তারা ‘অতীত’ থেকে টেনে বের করে বর্তমানে স্থাপিত করেছে। সত্যিকারের সাংবাদিকতার অপরাধেই যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক-ইকুয়েডরের বিচারিক সন্ত্রাসের বলি হচ্ছেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের মধ্য দিয়ে হ্যাকিং ও গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে বিচারিক হত্যাকান্ডের মুখোমুখি করতে তৎপর ক্ষমতাশালীরা। তার সুরক্ষার প্রশ্ন আজ সাংবাদিকতার সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে।
Friday, November 22, 2019
ফিকহ অব সোশ্যাল মিডিয়া: শায়খ সুলাইমান আর-রুহাইলি

এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : শায়খ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আপনার নসিহত কী? কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে অনেকে নিজের সন্তানদের সময় দেওয়া এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন।
উত্তর : প্রিয় ভাই, প্রথমে একটা মূলনীতি জেনে নিন। তা হলো, যে বিষয় মানুষকে ওয়াজিব তথা অত্যাবশ্যকীয় কাজ থেকে বিরত রাখে, তাতে লিপ্ত হওয়া হারাম। আর যে বিষয় মানুষকে ফজিলতপূর্ণ কোনো কাজ থেকে বিরত রাখে, তাতে লিপ্ত হওয়া মাকরুহ।
সুতরাং যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কারও ওয়াজিব দায়িত্ব বা কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়; তবে এটি ব্যবহার করা তার জন্য হারাম হবে। যেমনÑ কেউ এটি ব্যবহার করার ফলে নিজের সন্তানের পরিচর্যা করে না, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে না; বরং এখন তো এমন অবস্থা হয়েছে যে, যারা চাকরিজীবী তারাও নিজের অফিসে এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়েই পড়ে থাকে, নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। দেখা যায়, কয়েকজন সেবাপ্রার্থী অফিসে এসে দাঁড়িয়ে আছে আর ওই ব্যক্তি তার ফোন নিয়ে ব্যস্ত। কোনো কোনো সময় এমনও হয়, কেউ একজন এসে পাঁচ-দশ মিনিট দাঁড়িয়ে আছে আর ওই কর্মকর্তা তার মোবাইলে গেম খেলেই যাচ্ছে।
এক ব্যক্তি আমাকে নিজের ঘটনা বলেছিল, একবার আমি এক অফিসের কর্মকর্তার কাছে গেলাম। সে তার মোবাইল ফোনে কিছু একটা টাইপ করছিল। সে আমাকে বলল, ‘ভাই একটু অপেক্ষা করুন।’ আমি তাকে বললাম, ‘আপনার কাছে আমার একটু প্রয়োজন আছে। একটা কাজ সারার জন্য আপনার কাছে এলাম।’ সে আমাকে প্রত্যুত্তর করল, ‘তুমি দেখছ না আমি ব্যস্ত!’
তো দেখুন, এই লোকটি কিন্তু তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না। সে কাজের সময়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে। হয়তো একজনকে মেসেজ পাঠাচ্ছে কিংবা অন্যজনের পাঠানো মেসেজ পড়ছে। এ রকম বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে।
সুতরাং এ ধরনের কাজকর্ম, যা অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাতে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। আর যদি এমন হয়, ওই কাজটি ফজিলতপূর্ণ কোনো বিষয় থেকে তাকে বিরত রাখে, তাহলে সেটা করা মাকরুহ হবে।
যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি আজ কী পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াত করেছেন?’ তিনি উত্তরে বলবেন, ‘না, আমি আজ তেলাওয়াত করিনি।’ যদি তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি সর্বশেষ কবে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন?’ তিনি বলবেন, ‘সর্বশেষ গত শুক্রবার তেলাওয়াত করেছি।’ যদি এর কারণ জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কেন তেলাওয়াত করেননি?’ জবাবে তিনি বলবেন, ‘আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। তাই তেলাওয়াত করার সময় পাইনি।’ যদি আমরা হিসাব করি তাহলে দেখব, তিনি যে পরিমাণ সময় এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় নষ্ট করেছেন, যদি অর্ধেক সময়ও এসব থেকে বিরত থাকতেন, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৫ পারা কোরআন তেলাওয়াত করতে সক্ষম হতেন।
আর যদি এসব সোশ্যাল মিডিয়া হারাম কাজে জড়ানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এটা অনেক বড় জুলুমের পথ খুলে দেয়। যখন মানুষ বিভিন্ন হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ে, কোনো সন্দেহ নেই এটি নিজের প্রতি অনেক বড় জুলুম হিসেবে গণ্য হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ যেসব হারামে জড়িয়ে পড়ে তার মধ্যে রয়েছে অশ্লীল দৃশ্য দেখা, অশ্লীল কিছু পড়া অথবা এসব যোগাযোগ মাধ্যমে গাইরে মাহরাম মহিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা তাদের হয়রানি করা।
এ কারণে আমি বলি, প্রিয় ভাই আমার, এসব যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার অনেক ভালো দিক রয়েছে, এতে বেশ কিছু ফায়দা রয়েছে। এটি দূরে অবস্থানকারীকে সহজেই কাছে নিয়ে আসছে। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষ অনেক বইপত্র পড়তে পারছে, সংবাদ জানতে পারছে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছে। তবে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। এর ভেতরে হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ার যেসব আশঙ্কা আছে, সেগুলো থেকে আমাদের দূরে থাকার জন্য সচেতন হতে হবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেখছেন। এসব যোগাযোগ মাধ্যমে জড়িয়ে আমরা যেন আমাদের অত্যাবশ্যকীয় কাজে অবহেলা না করি, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আরও লক্ষ রাখতে হবে, এগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যেন আমরা অতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে আক্রান্ত না হই।
আমি জানতে পেরেছি, এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা একই বাড়িতে অবস্থান করা সত্ত্বেও একের সঙ্গে অপরের কোনো যোগাযোগ নেই। দেখা যায়, সন্তানরা পরস্পরে যোগাযোগ করছে হোয়াটসাপ বা এ জাতীয় বিভিন্ন সোশ্যাল অ্যাপসের মাধ্যমে। যেন একজন এক রুমে, অন্যজন আরেক রুমে। অথচ তারা দুজনে একই ঘরে অবস্থান করছে। কিন্তু কারও সঙ্গে কারও সাক্ষাৎ হচ্ছে না। যদি এক ভাইকে অপর ভাইয়ের কিছু বলার দরকার পড়ে, তখন সে তাকে নিজের রুমে বসে একটি মেসেজ পাঠিয়ে দেয়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনে একই সঙ্গে অবস্থান করছে। স্বামী মুখে মুখে বলছে, আমি আজ বাসায় সময় দেব। আজ আর বের হব না। অথচ সে তার পুরো সময়টা নিজের ফোনের মধ্যেই কাটিয়ে দিচ্ছে। ফোন নিয়েই সে ব্যস্ত হয়ে থাকছে। অপরদিকে স্ত্রীও নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এসব যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে দুজন শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে এবং অন্তরের দিক থেকে তারা একে অপর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে থাকে।
যাই হোক, নানা দিক বিবেচনায় আমি বলব, এসব যোগাযোগ মাধ্যমকে হারাম বলার কোনো দরকার নেই। বরং এগুলো ব্যবহার করা যাবে। কারণ এর মধ্যে অনেক উপকার রয়েছে। তবে আমাদের উচিত একে সঠিকভাবে ব্যবহার করা।
এক বৃদ্ধা মহিলার কাহিনি আমার খুব ভালো লেগেছিল। তার কয়েকজন ছেলে ছিল। তার সঙ্গে তারা প্রায়ই দেখা করতে আসত। যখন তিনি দেখলেন তার ছেলেরা একত্র হওয়ার সময়টাতেও যে যার ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে; হয়তো একজন তার মেসেজ চেক করছে, আরেকজন কিছু টুইট করছে, তখন সেই বৃদ্ধা দরজার সামনে একটি বাক্স রাখলেন এবং বললেন, যে-ই ঘরে ঢুকবে সে যেন তার মোবাইল বাক্সে রেখে তারপর ঘরে ঢোকে। যেহেতু তোমরা আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘরের ভেতরে এসেছে সুতরাং আমার সঙ্গে তোমাদের বসতে হবে, আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং যখন এখান থেকে চলে যাবে, তখন বাক্স থেকে যার যার নিজের ফোন নিয়ে যাবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে যিনি প্রশ্ন করেছেন আল্লাহ তাকে জাজায়ে খাইর দান করুক। আমিন।
>>>মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপকের মসজিদে নববির দরসে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর থেকে ভাষান্তর : আবদুল্লাহ আল মাসউদ
Sunday, November 3, 2019
‘সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপ সাংঘাতিক বেড়ে গেছে’ :-মাহফুজ আনাম

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি সাক্ষাতকারে বর্তমান সাংবাদিকতার অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, চ্যালেঞ্জ উত্তরণে করনীয়- এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
তিনি বলেন, মানহানির মামলা আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এত ব্যাপকভাবে এটার প্রয়োগ হতো না।
মানহানির মামলা দুই রকমের হয়- একটা ফৌজদারি মানহানি, অন্যটা দেওয়ানি আদালতে মানহানির মামলা। সাধারণ নাগরিক কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মানহানি মামলা করতে গেলে আদালত হয়তো মামলা গ্রহণ করবেন না; কিন্তু কোনো প্রভাবশালী বা টাকাওয়ালা লোক মামলা করতে যান, তাহলে তার মামলা নেয়া হবে এবং সেটা নেয়া হবে ফৌজদারি আইনে; সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। তাছাড়া, আইনে স্পষ্ট লেখা আছে, মামলা করতে পারবেন শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, অন্য কেউ নয়। যার মানহানির অভিযোগ উঠল, শুধু তিনিই মামলা করতে পারবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, সমর্থক, অনুসারীরা মামলা করে এবং সেসব মামলা গ্রহণ করা হয়। তিনি বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা কিন্তু এসব মামলা না নিলেও পারেন, আইনে তাদের সেই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এসব মামলা গ্রহণ করেন। এতে একই অভিযোগে ১০-১৫-২০টা মামলা হয়। নিজের ওপর দায়ের করা মামলার কথা উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে হয়েছে ৮৪টা মামলা।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি বলেন, আইনে আরও বলা হয়েছে যে, একটা মানহানির ঘটনায় একের বেশি মামলা হতে পারবে না। সেখানে একাধিক মামলা হয় কীভাবে? কিন্তু আমাদের দেশে সেটাও হয়ে আসছে।
সাংবাদিকতা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলেও মন্তব্য করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক। স্বাধীনতা চর্চার দিক থেকে সাংবাদিকতা এখন সারা বিশ্বে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমেরিকার উদাহরণ টেনে মাহফুজ আনাম বলেন, সে দেশে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মতো একটা অনন্য বিধান আছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেই দেশেই এখন প্রেসিডেন্ট কথায় কথায় সাংবাদিকদের বকাঝকা করেন। সংবাদমাধ্যমে যা কিছু তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়, তাকেই তিনি ফেক নিউজ বলেন। তিনি প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের নিকৃষ্টতম জীবদের অন্যতম বলছেন। এভাবে সাংবাদিকদের ও সাংবাদিকতা পেশাকে হেয় করা হচ্ছে। শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিমা দেশগুলো ছিলো স্বাধীন সাংবাদিকতার তীর্থস্থান; তাদের সাংবাদিকতার মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার চর্চা থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের সাংবাদিকেরা অনুপ্রাণিত হতাম। সেটা এখন সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলেও সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার ফলে একজন পাঠকের সামনে সংবাদের অনেক পথ উন্মোচিত হয়েছে। সে এখন আর খবরের কাগজ, টেলিভিশন ও রেডিওর ওপর নির্ভরশীল নয়। যেকোনো খবর সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎক্ষণাৎ জেনে ফেলছে। শুধু জেনে ফেলছে না, সে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের অভিমত দেয়ারও সুযোগ পাচ্ছে। সর্বসাধারণের মতপ্রকাশের এত ব্যাপক স্বাধীনতা পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো ছিল না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে ব্যাপক স্বাধীনতা ও বিস্তৃতি, সেই তুলনায় এর দায়িত্বশীলতার ঘাটতি বিরাট। সাংবাদিকতায় যেটাকে বলা হয় এডিটোরিয়াল কন্ট্রোল বা সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটা নেই। ফলে এই মাধ্যমে খবর আদান-প্রদানের অভিজ্ঞতায় লোকজন আস্থার সংকটে ভোগে। ভাবে, আমি যে খবরটা পেলাম, এটা ঠিক না বেঠিক; এটা গুজব বা ফেক নিউজ কি না।
মাহফুজ আনাম বলেন, তবে পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য এটা বিরাট সুযোগ। আমরা যদি পাঠক-দর্শকদের আস্থা আরও দৃঢ় করতে সঠিক সাংবাদিকতা করতে থাকি, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যতই ব্যাপক হোক না কেন, তারা আমাদের কাছেই ফিরে আসবে।
সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে তৃতীয় আরেকটি বৈশ্বিক প্রবণতার কথা তুলে ধরেন তিনি। সেটা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বহীন তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ নিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ভোলা ও রামুর মতো ঘটনা যখন ঘটতে পারছে, যা বিদেশেও ঘটছে, তখন তো একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। এটার একটা যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু এটার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার অত্যন্ত কঠোর আইনকানুন তৈরি করছে, কিছু কিছু দেশে প্রয়োগও করছে। তার ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাহ্ফুজ আনাম বলেন, যে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলো, বাংলাদেশে আমরা এই তিনটারই শিকার। তবে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বা রাষ্ট্রনেতারা এখনো আমাদের ট্রাম্পের ভাষায় আখ্যায়িত করেননি। কিন্তু আমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এ দেশে ডিজিটাল ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেসব আইন করা হয়েছে, সেগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভীষণ প্রতিকূল। সবচেয়ে কঠোর আইনটি হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এবং সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে এর প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছি। এ আইনের প্রতিটি ধারা আমরা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছি, এটা কী সাংঘাতিক আইন। সরকার যদি এ আইন প্রয়োগ নাও করে, এ আইনের অস্তিত্বই সাংবাদিকদের সব উদ্যম নষ্ট করে দিতে পারে। এ আইনে ১৯ ধরনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ আছে, সেগুলোর মধ্যে ১৪টাই জামিনের অযোগ্য। তাহলে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি মামলা হয়, যেহেতু তিনি জামিন পাবেন না, বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর আগেই তাকে ছয় মাস, এক বছর কারাগারে কাটাতে হবে। একজন সাংবাদিকের মাথায় যদি এই দুশ্চিন্তা থাকে, তাহলে তার পক্ষে কীভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতা করা সম্ভব। তাছাড়া, এ আইনে পুলিশকে খুব বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোনো অপরাধ সংঘটনের প্রয়োজন নেই, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার যদি মনে হয় যে কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সে রকম কিছু করার সম্ভাবনা আছে, তাহলেই তিনি সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করে নিয়ে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা এখন বেশি করে ঝুঁকছে ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যমের দিকে। সারা বিশ্বেই এটা ঘটছে। এতে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের বিজনেস মডেল সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশে নামকরা অনেক সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেছে, তারা শুধু অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। টেলিভিশনের দর্শকও ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ব্যবসায়িক- তিন দিক থেকেই একটা ক্রান্তিকাল।
মাহ্ফুজ আনাম বলেন, সাংবাদিকতার সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, এর মধ্যেই বিরাট সুযোগ লুকিয়ে আছে। এখন আমাদের নৈতিক সাংবাদিকতা সুদৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি মানুষ যে অনাস্থা বোধ করছে, সেই অনাস্থা যদি পেশাদার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। তাই আমাদের আস্থা অটুট রাখা, বরং তা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা হলাম সঠিক সংবাদদাতা- এই অবস্থানে সম্পূর্ণভাবে অটল থাকতে হবে। এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জনগণ সত্য সংবাদের জন্য, সঠিক তথ্যের জন্য আমাদের কাছেই ফিরে আসবে; পেশাদার সাংবাদিকতাই বিকল্পহীন বলে প্রমাণিত হবে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...








