Showing posts with label কামাল আহমেদ. Show all posts
Showing posts with label কামাল আহমেদ. Show all posts

Saturday, May 9, 2026

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনীতির এ এক অদ্ভুত প্রকৃতি। যাদের সহায়তা গতকাল অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছে, আজ তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে অবিশ্বাস্য সব ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পেছনে ছোটা।

দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনায় যাদের সমর্থনের আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতে দেখা যেত কিংবা যাদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এখন সেই জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (ওএইচসিএইচআর) উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

বাম ও ডানপন্থী, ধর্মবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ—বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলগুলো যেন একই মোহনায় মিলিত হচ্ছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ছাত্র ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতারাও এ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।

হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলার পেছনে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পেয়েছেন।

ডয়চে ভেলে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘তারা এখানে অফিস করলে সমকামিতা উৎসাহিত হবে। তাহলে তো সভ্যতা থাকবে না। তারা কাদিয়ানি (আহমদিয়া), সংখ্যালঘু, পাহাড়ি, নানা ইস্যু তৈরি করবে। খ্রিষ্টানদের প্রভাব বেড়ে যাবে। আর নারী স্বাধীনতার নামে তারা নারীদের ইসলামের বিধিবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে কাজ করবে।’

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স একই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তো এমন কোনো দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়ে নাই যে তাদের অফিস লাগবে।’ তিনি বরং অভিযোগ করেছেন, ‘জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তারা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদীর স্বার্থ রক্ষা করছে।’

এনসিপি দলীয়ভাবে কিছু না বললেও দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সমঝোতা স্মারক নিয়ে ফেসবুকে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি ওএইচসিএইচআরের ভূমিকাকে পক্ষপাতমূলক ও সাম্রাজ্যবাদ-সমর্থক অভিহিত করে ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যক্রমের কিছু বাংলাদেশে হোক, এটা না চাওয়ার কারণ হিসেবে যা পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর সম–অধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার কারণ বলে মনে হচ্ছে। বিরোধিতার আরেকটি বিষয় হচ্ছে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি, যা প্রধানত উঠেছে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে। বাম-ডান সবার ভাষ্যে কথিত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের কথাও আছে।

সব সরকারের আমলে সুবিধাভোগী একজন অধ্যাপক এক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন, বিশ্বের ১৮ দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় রয়েছে, বাংলাদেশ যদি সেই তালিকায় চলে যায়, তাহলে এটা আমাদের জন্য বিরাট ইমেজ সংকট হবে। বিনিয়োগকারীরা তখন বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে অন্য দেশে চলে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে তাদের কার্যালয় প্রতিষ্ঠায় কোনো বিনিয়োগকারী দেশ দুটি ছেড়ে গেছেন কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য তাঁকে কেউ করেনি।

মানবাধিকারের প্রশ্নে বহির্বিশ্বের কারও নজরদারি ও জবাবদিহি যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর কেউ সমর্থন করেন না, সেটা মোটেও অজানা কিছু নয়। তাঁদের উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, জনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁদের শক্তি প্রয়োগ সব সময় নিয়মনীতি মেনে চলে না এবং সে কারণে এ ধরনের নিবিড় নজরদারিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে জাতিসংঘে কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সবচেয়ে বড় শরিক হিসেবে এ আশঙ্কার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষায় আমাদের সৈনিক ও পুলিশ সদস্য যখন যান, তখন তাঁদের কর্মস্থল যত ঝঞ্ঝাপূর্ণ ও বিপজ্জনক হোক না কেন, তাঁরা তখন ঠিকই মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলেন। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে দ্রুততার সঙ্গে তার তদন্ত এবং সামরিক আদালতে বিচারের কথাও আমরা জানি।

বিদেশের মাটিতে যে সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা মানবাধিকারের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে চলেন, তাঁরা স্বদেশে তা অনুসরণ করতে পারবেন না, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এখানে অবশ্য স্মরণ করা দরকার, স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর গণ-অভ্যুত্থানে এসব বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এমন সব প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, যা শান্তি মিশনে তাঁরা ব্যবহার করতে পারতেন না। স্বাভাবিকভাবেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার উপস্থিতিও নিরোধক হিসেবে কাজ করত।

সব জনগোষ্ঠীর সম–অধিকারের প্রশ্নে যে উদ্বেগ, তা আগেও ছিল এবং দেশের বাইরে থেকেই এর সমালোচনা হয়ে এসেছে। এই সমালোচনা তত দিন চলবে, যত দিন বাস্তবে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠা না পাবে। পশ্চিমা বিশ্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ না থাকা এবং যৌন হয়রানির বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতই হতাশাজনক প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ও বিতর্ক হয়।

আমাদের দেশে সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ধর্মীয় বিধিবিধানের কথা বলে সম্পদের অধিকারসহ নানাভাবে নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়। নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ সত্ত্বেও উপার্জনের জন্য নারীকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর কোনো আপত্তির কথা কখনো শোনা যায় না, কিন্তু সম্পদের উত্তরাধিকারের দাবি উঠলেই ‘গেল, গেল’ রব তোলা হয়।

দেশে নারী-পুরুষ, ধর্ম-জাতি-গোত্রনির্বিশেষে কারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না—এমন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা ও তা প্রতিপালন করা হলে জাতিসংঘ বা বিদেশি কোনো সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। সমস্যা কেবল তখনই হতে পারে, যদি আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রশ্রয় দিই এবং তা আড়াল করতে চাই।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কাজ সম্পর্কে আমরা পর্যাপ্ত তথ্য না জেনেই বিতর্ক ও বিরোধিতায় নেমে পড়ি। গাজা ও পুরো ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যে গণহত্যা ও দখলদারি, সেটা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের বিষয়, যার সমাধান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ শক্তিগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার কাজ শুধুই সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ এবং তা বৃহৎ পরিসরে তুলে ধরা, যেটা তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে নিয়মিত পেশ করে।

বাংলাদেশে তাদের দপ্তর খোলার বিরোধিতায় বলা হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনে গণহত্যা রোধ করতে পারেনি। তাঁরা জানেনও না যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে জাতিসংঘের র‍্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ গণহত্যা নিয়ে অব্যাহত সমালোচনা করতে থাকায় ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকদের চক্ষুশূল হয়েছেন।

সম্প্রতি কোন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের জন্য সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করছে, তার তালিকা সমপ্রমাণে প্রকাশ করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলা হলে তারা দেশে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন ডান ও বামপন্থী—উভয় ধারার রাজনীতিকেরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও এমন বক্তব্যের ভিত্তি কী? প্রথমবারও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন মানবাধিকার সংস্থার কথিত ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাতের অভিযোগে। এবার ক্ষমতা গ্রহণের দিনই তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছেন।

২২ জুলাই ট্রাম্প জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংস্থাটি বিভাজন সৃষ্টি করে, এমন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর প্রসার ঘটাচ্ছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে সংস্থার সদস্যপদ দেওয়াও আরেকটি কারণ। বলা দরকার যে যৌনশিক্ষার বিষয়টি ইউনেসকোর কার্যক্রমের অংশ। নারী অধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রক্ষণশীল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কি আমাদের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর খুব একটা পার্থক্য করা যায়?

ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিপরীতে আমাদের বরং এই সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ জরুরি, কেননা গুমের মতো নিষ্ঠুর বর্বরতার বিরুদ্ধে এক দশক ধরে সবচেয়ে বেশি তৎপর ও সোচ্চার ছিল এই সংস্থা। হেফাজতের শাপলা চত্বরের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অধিকারের প্রতিবেদনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যাহত অপবাদ সত্ত্বেও সংস্থাটি অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।

গত বছর ছাত্রহত্যার নিন্দা ও তদন্ত দাবি করে সবার আগে সবচেয়ে জোরালো বিবৃতিটি এসেছিল কোত্থেকে? ১৯ জুলাই মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক প্রথম বিবৃতি দিয়ে ছাত্র হত্যা বন্ধ ও সব ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার তদন্ত নিয়েও আপত্তি তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাদের তদন্তের কারণেই ১ হাজার ৪০০ প্রাণহানি এবং শেখ হাসিনার সরকারের নিষ্ঠুরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। না হলে আওয়ামী লীগের বিদেশি বন্ধুদের অপপ্রচার মোকাবিলা দুঃসাধ্য হতো। তিন বছরের জন্য সংস্থাটির দপ্তর খোলার পেছনে তাই ষড়যন্ত্র না খুঁজে তাদের সহায়তায় মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ও অতীত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করায় মনোযোগী হওয়াই জরুরি। তাহলে তিন বছর পর আর তাদের প্রয়োজন হবে না।

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন

Saturday, October 11, 2025

বছর পেরিয়ে জুলাই: অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, মানবাধিকার হরণ ও ন্যায়বিচার by কামাল আহমেদ

কোনো রাজনীতিবিদ যেমন হঠাৎ করেই স্বৈরশাসক হয়ে যান না, তেমনি কোনো দলও রাতারাতি ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হয় না। একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে এই রূপান্তর ঘটে। বাংলাদেশে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগও বেশ কিছুটা সময় ধরে ফ্যাসিস্ট হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। স্টিভেন লেভিৎস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলেট যদি তাঁদের বই হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই–এর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন, তাহলে সম্ভবত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত হওয়া, তারপর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা একে একে ধ্বংস করে কুক্ষিগত করা, দল ও সরকারে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো তাজা উদাহরণ হিসেবে খুব কাজে লাগবে। জাতীয় সংসদ, আদালত, নিরাপত্তা বাহিনী, গণমাধ্যম—কোনো কিছুরই তাঁর অঙ্গুলিহেলনের বাইরে চলার সামর্থ্য অবশিষ্ট ছিল না।

পাশাপাশি ভূরাজনীতির কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁকে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের অগাধ আস্থা ও সমর্থন যেমন তাঁর জন্য আশীর্বাদ হয়ে থেকেছে, তেমনি প্রভাবশালী দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক শিল্প ও ব্যবসায়িক নানা ধরনের লেনদেনে ভর করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বৈধতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ায় তেমন একটা সমস্যা হয়নি। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফায় ক্ষমতারোহণও দিয়েছে বাড়তি সুবিধা, কেননা তখন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে নাক না গলানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় সবাই তখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেও শেখ হাসিনা তাঁর রক্ষণশীল মুসলিমপ্রধান দেশে ধর্মবাদী জঙ্গিবাদের হুমকির বিষয়টিকে নিজের ক্ষমতা সংহত করার কাজে যথাসম্ভব ব্যবহার করেন।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিনা বিচারে আটক, গণহারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন–নিপীড়নের সবকিছুই তিনি নিষ্ঠুরভাবে প্রয়োগ করতে থাকেন। নির্যাতিত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। রাজপথে আন্দোলনের চেষ্টা—তা সে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক যা–ই হোক না কেন, তার পরিণতি হয়েছে নিষ্ঠুর দমন। ২০১৮ সালে ছাত্র–কিশোরদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ আন্দোলনও ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী দিয়ে কীভাবে দমন করা হয়েছে, তা এখনো বহু অভিভাবকের দুঃস্বপ্ন।

এই বিচারহীনতার সময়ে দেশের বাইরে প্রবাসীদের অনেকেই বিকল্প খুঁজতে থাকেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে অনেকে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। নিপীড়ন–নির্যাতনে জড়িতদের আন্তর্জাতিক পরিসরে বিচার বা কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা যায় কি না, তা নিয়ে খোঁজখবর ও চিন্তা শুরু হয়।

পাশাপাশি যাত্রা শুরু হয় এক্সাইল মিডিয়া বলে পরিচিতি পাওয়া নির্বাসিতদের গণমাধ্যমের। এক্সাইল মিডিয়ার যাত্রা প্রধানত শুরু হয় সুইডেনে, এক–এগারোর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার তাসনিম খলিল এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান প্রতিষ্ঠিত নেত্র নিউজের মাধ্যমে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যাত্রার শুরুতেই নেত্র নিউজ আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে। কেননা, শুরুতেই তারা আওয়ামী লীগের দুর্নীতির একটা খণ্ডচিত্র তুলে ধরার অংশ হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের ঘড়িবিলাসের সচিত্র প্রতিবেদন করে, যে বিলাসিতা অতিধনী ছাড়া আর কারও পক্ষেই সৎ উপার্জনে সম্ভব নয়।

২০১৮ সালের যে নির্বাচন নিশিভোটের জন্য পরিচিত, সেই নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে ক্রসফায়ারে হত্যার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। অধিকাংশ বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) বিরুদ্ধে, যে কারণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাহিনীটিকে ‘ডেথ স্কোয়াড’ নামে অভিহিত করে। তখন ওই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাতি পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালে তাঁকে যখন পুলিশের মহাপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়, তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল যে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে র‍্যাবের বিরুদ্ধে যত ক্রসফায়ারের (১,১৫৮ জন) অভিযোগ, তার এক–তৃতীয়াংশই ঘটেছে বেনজীরের নেতৃত্বের পাঁচ বছরে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কালে। মারণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর প্রকাশ্য কিছু ঘোষণা বা নির্দেশনাও ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠুর। ২১ আগস্ট ২০২০ তারিখে বাংলাদেশের পুলিশপ্রধানের পরিচিতির একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয় নেত্র নিউজে। তাতে বলা হয়, যাঁর অধীনে (কমান্ডে) সংঘটিত অগণিত হত্যার জন্য তাঁর বিচার করার কথা, তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছে পুলিশপ্রধান।

এর বছরখানেক পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী হিসেবে পুরো র‍্যাব, বেনজীর এবং র‍্যাবের অপর পাঁচজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ ছাড়া বেনজীরের বিরুদ্ধে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আলাদা করে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য যে সুখকর হয়নি, তার প্রমাণ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে। ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টায় শেখ হাসিনা নিজে এবং তাঁর সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এতে করে ওই বাহিনীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। ক্রসফায়ার পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

২০২৪ সালে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের নিস্পৃহতায় সরকারবিরোধী এবং ভিন্নমতের সবার ওপর হতাশার ছায়া চেপে বসে। শেখ হাসিনার ‘কার্যত রাজতন্ত্র’ আমৃত্যু টিকে থাকবে বলেই ধরে নেওয়া হয়। বিতর্কিত নির্বাচনের মাস তিনেক আগে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে বিমান বিক্রির আশায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এক সরকারি সফরে ঢাকায় হাজির হলে স্বৈরশাসক আরও আস্থা ফিরে পায়।

সুতরাং নিপীড়ন–নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের একমাত্র খোলা পথ থাকে বিদেশে বিচার পাওয়ার আশা ও চেষ্টা। সর্বজনীন এখতিয়ার বা ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশনের আওতায় অন্য কোনো দেশে, বিশেষত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় স্বৈরাচারী সরকারের যেকোনো সদস্যকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টায় মনোযোগী হওয়াই ছিল তখন একমাত্র পথ। আমাদের উপমহাদেশের আদালতগুলো যথেষ্ট স্বাধীন হলে এবং ভারতে মানবাধিকার সংগঠকেরা উদ্যোগী হলে সে দেশে আশ্রয় নেওয়া রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারও তত্ত্বগতভাবে সম্ভব।

শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর আন্তর্জাতিক এখতিয়ারে বিচারের লক্ষ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে, এ রকম একটি সংগঠন হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি)। এই সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী এবং জাতিসংঘের হয়ে বেশ কয়েকটি দেশের মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন সুকা ও বিবিসির সাবেক ঢাকা ও কলম্বো প্রতিনিধি ফ্রান্সিস হ্যারিসন। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশে কাজ করা আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান এবং আমিও যুক্ত হই। মে মাসে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে বাংলাদেশে গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর মধ্যে যেগুলো সম্ভব, সেগুলোর সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করা হবে। জুন মাসে আমরা কাজ শুরু করি।

জুলাই আমাদের কাজের মুখ ঘুরিয়ে দেয়। ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে কোটা বিলোপের আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ ইঙ্গিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, তার পরদিন থেকেই আমরা একধরনের অস্থিরতায় ভুগতে থাকি। ছাত্রলীগকে দিয়ে আন্দোলনকারীদের শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা যে গুরুতর রূপ নিতে যাচ্ছে, তা অচিরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের হত্যা আন্দোলনকে যে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে, তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার খবর এবং তার মধ্যেও ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের অবিশ্বাস্য নৃশংসতার ছবি সাইবারমাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে আসতে থাকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এ আন্দোলন দমনের সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণেই আমরা মনোযোগী হব। ডেভিড ঢাকায় কয়েকজন সাংবাদিককেও এ কাজে যুক্ত করেন।

৩৬ জুলাই পর্যন্ত আমরা শত শত ভিডিও, ছবি ও রিপোর্ট দেখি, পড়ি ও সংরক্ষণ করি। ১৮ ও ১৯ জুলাই জাতিসংঘের লোগো–সংবলিত সামরিক যান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের ছবি দেখে এবং তার সত্যতা যাচাই করে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। হাসিনা সরকার কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, তার বিবরণ স্মরণ করলেও গা শিউরে ওঠে। একটির চেয়ে আরেকটি ঘটনা নৃশংস থেকে নৃশংসতর হতে থাকে। নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশ এমন নৃশংসতা আর কখনো দেখেনি। আমরাও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এবং ইউরোপীয় কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলি। কিছু কিছু তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আইটিজেপি বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ, স্থির চিত্র, বিবরণী সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাঁদের ভাষ্য গ্রহণ, অস্ত্রবিশেষজ্ঞ, অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক এক্সপার্ট এবং প্রয়োজনে স্যাটেলাইটের সাহায্যে সঠিক স্থান নির্ধারণের মতো খুঁটিনাটি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে মিলে দুটি ঘটনার ফরেনসিক বিশ্লেষণ সংকলনের মাধ্যমে তথ্যচিত্র তৈরি করে। সেগুলোর একটি যাত্রাবাড়ীর হত্যাযজ্ঞ, অপরটি গাজীপুরে কিশোর হৃদয় আলী হত্যার ঘটনা। দুটোই শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বলে রাখা ভালো, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের জন্য ডাক পড়ায় অক্টোবর থেকে তাদের সঙ্গে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।

স্বৈরশাসনের পতন ঘটানোয় যাঁরা গুলির মুখে বুক পেতে দিয়ে অসমসাহসের সঙ্গে অত্যাচারীর দর্পচূর্ণ করে দিয়েছেন, তাঁদের বীরত্বের কোনো তুলনা চলে না। তবে সেখানেই শেষ নয়। এখন প্রয়োজন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা–বাবা, মেহেদি হাসানের স্ত্রী কিংবা শহীদ মুগ্ধর ভাই স্নিগ্ধর পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি তাঁদের চোখেমুখে বিচার পাওয়ার আকুতি। বিচারহীনতার অন্যতম একটি কারণ যেহেতু বৈষম্য—ক্ষমতাধরের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের ফারাক, সে কারণে বৈষম্যমুক্তির জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগ, সব অপরাধের বিচার তাই এখন অগ্রাধিকারে থাকা চাই। আর যাঁরা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন, তাঁরা যে দেশেই থাকুন, সর্বজনীন এখতিয়ারের আওতায় তাঁদেরও সে দেশেই বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ সচল ও জোরদার করা দরকার। অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয় যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যায়।

জুলাই আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ
জুলাই আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ। ফাইল ছবি

Monday, August 4, 2025

কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি: হাসিনার বিচার বিভাগ ধ্বংসের পরিণতি by কামাল আহমেদ

একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির দুই হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো এবং তাঁকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন দৃশ্য যেকোনো বিবেকবান মানুষের জন্যই অস্বস্তিকর। তবে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আরেকজন প্রধান বিচারপতির পালিয়ে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া কিংবা সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীদের দ্বারা আরেকজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাকে সর্বশেষ এ ঘটনার চেয়ে মোটেও কম ভয়ংকর বলা যাবে না।

উদ্বেগের কথা হলো, গত আট বছরে এর সব ঘটনাই বাংলাদেশে ঘটেছে। এটি এমন এক করুণ ঘটনাক্রম, যেখানে দেখা যায়, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর শাসক হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা কীভাবে ঠান্ডা মাথায় ধাপে ধাপে দেশের বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

এই ধ্বংসের অন্যতম মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা ছিল সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে শেখ হাসিনা টানা তিনটি একতরফা নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছেন এবং ক্ষমতায় নিজের অবস্থান শক্ত সংহত করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের এই সংশোধনী নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার ছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তিনি উন্মুক্ত আদালতে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত আদেশ পরে পাল্টে দেন এবং অবসর নেওয়ার ১৬ মাস পরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু বিচারিক অসদাচরণ নয় বরং এটি ছিল প্রতারণা বা জালিয়াতির মতো কিছু।

এ ধরনের আচরণ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও সততার যেই মান থাকা উচিত, তার বড় বিচ্যুতি। এতে বিচার বিভাগের প্রতি জনসাধারণের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। অনেকে সন্দেহ করেন, পূর্ণাঙ্গ রায় দিতে ইচ্ছা করে দেরি করা হয়েছিল, যাতে শেখ হাসিনা ওই সংক্ষিপ্ত আদেশ এড়িয়ে আইন পাস করতে পারেন। কারণ, সংক্ষিপ্ত আদেশে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে হতো। এ সুযোগটাই হাসিনা কাজে লাগান। সংসদের একটি কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে দুই মেয়াদে বহাল রাখার সুপারিশ করলেও তিনি তা উপেক্ষা করে সেটি পুরোপুরি বাতিল করে দেন।

তার চেয়েও চিন্তার বিষয় হলো তৎকালীন বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছিল যে যখন তাঁর বেঞ্চে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু মামলা চলছিল, সে সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিল থেকে তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন। এমন কাজ বিচারিক নৈতিকতার দিক থেকে একটি বড় আপস বা দুর্বলতাকেই সামনে আনে।

সমালোচকেরা আরও বলেন, খায়রুল হক অবসরের পরও অনেক বছর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে গেছেন। এই পদে তাঁর নিয়োগ বারবার বাড়ানো হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতন পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় তিনি নিজে রায় দিয়েছিলেন—বিচারপতিরা অবসর নেওয়ার পর লাভজনক কোনো রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজেই ঠিক সেই কাজ করেছেন। তিনি এমন একটি সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন, যে সরকার তাঁর বিচারিক রায়েই সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছিল।

তবে খায়রুল হক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারক হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। শেখ হাসিনার সরকার ২০১৫ ও ২০২০ সালে তাঁকে দুবার প্রার্থী করেছিল। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রবল আপত্তি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমর্থনের অভাবে শেষ পর্যন্ত উভয়বারই তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

সম্প্রতি খায়রুল হকের গ্রেপ্তার নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই অস্বস্তি বোধ করছেন, কারণ যেসব অভিযোগ বা বিচারিক অসদাচরণের কথা আগেই বলা হচ্ছিল, সেসবের কোনোটিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং তাঁকে আটক করা হয়েছে হত্যার অভিযোগে করা মামলায়, যা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

দুঃখের বিষয় হলো, যাদের সরকার জেলে পাঠাতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে এখনো মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, একনায়কতন্ত্র শেষ হলে এসবও শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি। দেখা যাচ্ছে, এখনো এটি একটি জনপ্রিয় কৌশল হিসেবে টিকে আছে।

অনেকেই অনেক দিন ধরে বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাঁর কারণেই শেখ হাসিনা বিচার বিভাগকে রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে পেরেছিলেন। তাঁরা এখন তাঁর গ্রেপ্তারে একধরনের স্বস্তি বা প্রতিশোধের অনুভূতি পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, খায়রুল হক এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, যা বিরোধী দলের বহু মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে, এমনকি অনেক সময় তাদের ওপর সরকারি নির্যাতনেও ভূমিকা রেখেছে। তাই তাঁরা মনে করেন, খায়রুল হকের বিচারও সেই অনুযায়ী হওয়া উচিত।

তবে এখানেই যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে, সেটি হলো: তাহলে কেন খায়রুল হককে তাঁর ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো না?

মামলা দুটির একটিতে অভিযোগ ছিল, তিনি সংক্ষিপ্ত আদেশ থেকে রায় পাল্টে দিয়ে জালিয়াতি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা নারায়ণগঞ্জে দায়ের হয়েছিল রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। (হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের দুদিন পর তাঁকে রায় জালিয়াতির মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।)

কিছু আইনবিশেষজ্ঞ মনে করেন, জুডিশিয়াল ইমিউনিটি বা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য তাঁদের যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়, সেটি ওই দুই মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখানোর কারণ হতে পারে। কিন্তু অন্য আইনজ্ঞরা বলছেন, ১৮৫০ সালের জুডিশিয়াল অফিসার্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী বিচারকদের যে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা আছে, তা বিচারক অবসরে যাওয়ার পর, বিশেষ করে সাধারণ নাগরিক অবস্থায় কোনো ভুল বা অপরাধ করলে তা আর তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।

অন্যদিকে বিচারপতি এস কে সিনহা, যিনি ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন (যে সংশোধনীটি বহাল থাকলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হতো), তিনি নিজেই লিখে জানিয়েছেন, কীভাবে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তারা তাঁকে আদালতের ভেতরে হেনস্তা করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।

এস কে সিনহার এই অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে বিচার বিভাগকে দমন করার ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। বলা যায়, এস কে সিনহাই ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র প্রধান বিচারপতি, যিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সরকারের দ্বারা প্রকাশ্যে নিগৃহীত হন।

এখন বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। এখন বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি এমন বিচারব্যবস্থা, যা নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকবে এবং যেখানে কাজ চলবে স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। সে ধরনের ব্যবস্থাই এমন অবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, যেখানে কোনো বিচারপতিকে আর অপমানজনক মামলায় ফাঁসানো হবে না কিংবা দেশ ছেড়ে পালাতে হবে না।

[ইংরেজি থেকে অনূদিত। লেখাটি গত ৩০ জুলাই ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল]

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছে। ছবি : প্রথম আলো

Monday, February 15, 2016

শহীদদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা by কামাল আহমেদ

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কেমন ছিল, তা আজকের তরুণদের জানার কথা নয়। যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে পা রেখেছেন, কিংবা গত কয়েক বছরে সেখানকার লেখাপড়ার পাট চুকিয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই সেই ইতিহাস জানার প্রয়োজন পড়েনি। প্রয়োজন পড়বেই বা কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের শেষ যেবার নির্বাচন হয়েছিল, সে বছরে যাঁদের জন্ম হয়েছে, তাঁদেরও এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে পেশাজীবন শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। এই সময়ের প্রজন্ম যে ছাত্ররাজনীতি দেখেছে, তা হলো হল দখলের, টেন্ডারবাজি-লাইসেন্সবাজি বা তদবিরবাজি করে লাখ–কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার রাজনীতি। ওই রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন অবান্তর।
ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে সাবেক সামরিক শাসক আর গণতন্ত্রের সৈনিকদের মাখামাখি দেখতে দেখতে একধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে গেছে। এখন আর তাই ৮৩-র আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের অনেককে পতিত স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি দেখে কেউ ছি ছি করে না। এই আড়াই যুগের ছাত্রনেতাদের দু-একজন তো নিজেরাই অনুমোদন বাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছেন। একালের ছাত্রনেতাদের তাই সমৃদ্ধিবাদী বললে খুব একটা ভুল হবে বলে মনে হয় না। এঁরা নিজেদের সমৃদ্ধিতেই দেশের সমৃদ্ধির সুখ উপভোগ করেন। এঁদের কাছে সর্বজনীন শিক্ষার অধিকার প্রশ্নে সংগ্রামের এখন আর তেমন গুরুত্ব নেই।
৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতার পরিণতি ঘটে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে। সেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল কার্যকর গণতন্ত্রে ফিরে আসা। অথচ গণতন্ত্রচর্চার এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ভোটের অধিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও কোনো না কোনোভাবে হরণ করা হয়েছে বা লঙ্ঘিত হচ্ছে। ওই আন্দোলনের চেতনায় ছিল স্বৈরতন্ত্রের অবসান। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটলেও আমাদের রাজনীতিতে স্বৈরতান্ত্রিক ধ্যানধারণা বহাল আছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আর যে বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল, সেই শিক্ষাব্যবস্থায় এখন বৈষম্য আরও বেড়েছে। আর যে স্বৈরাচারী সেনাপতি ‘বিশ্ব বেহায়া’র খেতাব পেয়েছিলেন, তিনি এখনো ক্ষমতার ভাগীদার হিসাবে সুখ ভোগ করে চলেছেন।
ক্ষমতালিপ্সু সেনাপতি বলতে এই ভূখণ্ডে যদি কেউ জন্মে থাকেন, তিনি হলেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতার দর-কষাকষিতে এখন যাঁরা তাঁকে সকালে এক কথা বলে বিকেলে তার উল্টোটা বলতে শুনে বিস্মিত হন, তাঁরা সম্ভবত ভুলে যান যে এই ব্যক্তিই একটি নির্বাচনের ছয় মাসের মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর এক অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছিলেন ১৯৮২-র মার্চ মাসে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি তাঁর স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে গেছেন ৯০-এর ডিসেম্বর অবধি। তবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি কখনোই অবদমিত থাকেনি। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের পরদিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে স্বৈরাচার অবসানের আওয়াজ। জেনারেল এরশাদ তখন যে শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন তা নয়, তিনি একই সঙ্গে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বৈষম্যমূলক এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে আর্থিক সামর্থ্যই ছিল কে কী ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাবে, তার নির্ধারক। মজিদ খানের সেই গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্রসংগঠনগুলো তখন এক হয়ে গড়ে তোলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
৮২-র ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে তখন গড়ে ওঠে ওই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারপর ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। সেদিনের সেই কর্মসূচিতে ঢাকা শহরের ছাত্রছাত্রীদের যে বিপুল অংশগ্রহণ ছিল, তাতে মিছিলের প্রথম ভাগ যখন হাইকোর্টের মাজার গেটে, তখনো কলাভবনের বটতলায় তার পেছনের অংশ। কিন্তু স্বৈরাচারী শাসকেরা যেমন নিষ্ঠুর হন, ঠিক তেমনই ছিলেন জেনারেল এরশাদ। হঠাৎ করেই মিছিলের ওপর চালানো হয় গুলি। গুলির পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস, লাঠিপেটা ও ধরপাকড়। শহীদ হন জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালি সাহাসহ অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে শহীদদের লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে রাতভর হলে হলে চালানো হয় অভিযান। ছাত্র আন্দোলন দমনের অভিযান কতটা কঠোর হতে পারে, তার এক নজির স্থাপিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। শহরের আরেক প্রান্তে অসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা পরিস্থিতি আলোচনার জন্য মিলিত হন প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের বাসায়। সেখান থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ হাসিনাকে নেওয়া হয়েছিল মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত ভবনটিতে, যেটি আগেই রূপান্তরিত হয়েছিল একটি সেনাক্যাম্পে। কাউকে কাউকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত জায়গায়। কিন্তু ওই সব হত্যা, গ্রেপ্তার, নিপীড়ন কোনো কিছুই গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে দমাতে পারেনি। বছর না ঘুরতেই আবার সংগঠিত হতে থাকে আন্দোলন। পরের বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস।
এখন ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা ঘটা করে পালন করি ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসা দিবস ইউরোপে চালু ছিল অনেক আগে থেকেই। খ্রিষ্টান যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে এই দিবস খ্রিষ্টধর্মপ্রধান দেশগুলোয় বহুদিন ধরে পালিত হয়ে আসছে। আর ভ্যালেন্টাইনকে প্রেমিকের প্রতীক ধরে নিয়ে ভালোবাসা দিবস পালনের চল প্রথম চালু হয় ইংল্যান্ডে। তাও কোনো কোনো বর্ণনামতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৮৩-র স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণ-আন্দোলনের দিন অবধি আমাদের দেশে এর কোনো চল ছিল না। কাগজে-কলমে আমাদের দেশে এই দিনটি পালনের কথা প্রথম লেখা হয় আরও কয়েক বছর পর। দিনটিকে ঘিরে পাশ্চাত্যে বাণিজ্যেরও অনেক প্রসার ঘটেছে (বিশেষ করে চকলেট, কার্ড, ফুল, অলংকার ও পর্যটন বাণিজ্য)। বিশ্বায়নের কালে ভালোবাসা-বিষয়ক বাণিজ্যের স্রোত হয়তো স্বাভাবিকভাবেই কোনো একদিন আমাদের এই বদ্বীপে এসে ঠেকত। সে কারণে আমি বাংলাদেশে এই দিনটি আমদানির জন্য সাংবাদিক শফিক রেহমান বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেকালের সাপ্তাহিক যায়যায়দিনকে দোষ দেওয়ার পক্ষপাতী নই। দোষ যদি কিছু থেকে থাকে সেটা আমাদের। আমাদের রাজনৈতিক বিবেচনাবোধের।
সর্বসম্প্রতি এতে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নয়, ঢাকাকে ভালোবাসানোর এক অভিনব উদ্যোগ। ঢাকাকে ভালোবাসতে শহরকে আবর্জনামুক্ত করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব পালন করুক আর না করুক—নাগরিকেরা যেন তাঁদের দায়িত্বটুকু পালন করেন, সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে নতুন মেয়রদের একজনের এই উদ্যোগ। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের দুর্ভাগ্য যে তিনি চমক দেখাতে মুম্বাই থেকে বলিউডের নায়িকাদের উড়িয়ে আনতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভগ্নহৃদয়ে দেশীয় তারকাদের নিয়েই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। বলিউডের নায়িকা-গায়িকাদের প্রতি কেউ মোহাবিষ্ট থাকলে থাকতেই পারেন। কিন্তু প্রচারকৌশলে চমক যুক্ত করতে তাঁদের শরণাপন্ন হওয়ায় নিজেদের যে অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ হয়ে পড়ল, তার কী হবে? ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই ভাষার মাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে বলে অনেকে এই মাসে হিন্দি ছবির নায়িকাদের নিয়ে মাতামাতির সমালোচনা করেছেন। আবার ছাত্র-তরুণদের অনেকে এই পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতার জন্য স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসকে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আমি এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীর যুক্তিগুলোকেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি। ১৪ ফেব্রুয়ারি যদি কোনো জঞ্জাল পরিষ্কার দূর করার প্রশ্ন ওঠে, সেটা হচ্ছে গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টিকারী নানা আপদ অপসারণের শপথ নেওয়ার প্রশ্ন। দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যে হুমকি, যাকে অনেকে ভয়ের সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেন, তার অবসান ঘটানো। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়রের কাছ থেকে অবশ্য সেটা আশা করার কোনো কারণ নেই। আপাতত আমরা যা পারি, তা হলো আমাদের অক্ষমতার জন্য শহীদদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।
ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নবজাগরণ ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশটির বহুল বিতর্কিত নেতা নরেন্দ্র মোদি স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় ঝাড়ু নিয়ে নেমেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর এই উদ্যোগে তাঁর ভক্তকুল ছাড়াও নামীদামি তারকারাও যোগ দিয়েছিলেন। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ অনেক শহরেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল। ধারণা করি, সৃজনশীলতার অভাব এবং অনুকরণপ্রিয়তার স্বভাব থেকে আমরাও ঢাকায় একই ধরনের কর্মসূচির কথা ভেবেছি। দিল্লির মতো এখন নাকি ঢাকাতেও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণে সপ্তাহের এক দিন জোড় সংখ্যার রেজিস্ট্রেশন এবং পরের দিন বেজোড় সংখ্যার নম্বরওয়ালা গাড়ি চলতে দেওয়ার নিয়ম চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। ভালো জিনিস, ভালো নিয়ম, ভালো সংস্কৃতির অনুকরণে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমরা আবার শুধু ভালোটুকু গ্রহণেই থেমে থাকি না। খারাপটাও নিই। সাধারণত খারাপটা বেশিই নিই। তাই আশঙ্কা হয় যে এ ক্ষেত্রেও তেমনটি না হয়। যাঁরা দিল্লির খবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন যে দিল্লিতে এ মাসের শুরুর দিকে দিন দশেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কর্মবিরতি করায় রাস্তায় রাস্তায় জঞ্জালের স্তূপ জমে গিয়েছিল। এর পেছনের কারণ কিন্তু রাজনীতি। মোদিজির ভারত জয়ের গৌরবকে কয়েক মাসের মধ্যেই ম্লান করে দিয়েছিলেন যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, দিল্লির সেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধের জেরেই দিল্লিবাসীর ওই ভোগান্তি। ভারতে এখন ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার চর্চা যে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, সে কথাও এখন সবার জানা।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Saturday, February 6, 2016

আশাবাদী বাংলাদেশিদের নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষা by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রগুলো অনেক দিন ধরেই জাতীয় পর্যায়ে কোনো জনমত জরিপ পরিচালনা করে না। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এ ধরনের জরিপের গুরুত্বই আলাদা। অনেকে অবশ্য সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন জরিপের কথা বলতে পারেন। কিন্তু ওই জরিপগুলো মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয় এবং তাতে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের সংগঠিত চেষ্টার কথাও শোনা যায়। সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিরূপ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এড়াতে এ ধরনের জরিপ পরিচালনা থেকে বিরত থাকলেও জরিপ কিন্তু বন্ধ নেই। সে জন্যই তো গত পৌর নির্বাচনের আগে পুলিশের একটি গোপন জরিপের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল ও জোটের তরফে নির্বাচনী মনোনয়নেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার এ ধরনের জরিপের ভূমিকার কথাও আমরা বারবার শুনে আসছি। এ রকম একটি পটভূমিতে সপ্তাহ খানেক আগে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হলো, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অধিকাংশ বাংলাদেশির মধ্যে আশাবাদ বাড়ছে। জরিপটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বেছে নিচ্ছে। জরিপটি পরিচালনা করেছে ‘বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত’ (প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত লক্ষ্য) যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)।
আইআরআইয়ের এই জরিপটিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ও তার অনুসারীরা খুশি হয়েছেন সন্দেহ নেই। অন্তত জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় সে রকমটিই দেখা গেছে। তবে অন্য অনেক জরিপের মতোই এই জরিপটিও অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। জরিপটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে সারা দেশের ২ হাজার ৫৫০ জন এতে মতামত দিয়েছেন। সাতটি বিভাগে ২৫০টি নমুনা সংগ্রহকারী ইউনিট এসব মতামত সংগ্রহ করেছে। যার মানে দাঁড়ায়, একেকটি ইউনিট গড়ে ১০ জনের মতামত নিয়েছে। আবার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় যে ৪০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতার পারিবারিক আয় মাসিক ১০ হাজার টাকার নিচে। এই সামান্য আয়ের পরিবারগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সন্তুষ্টি জানানোতে বলতেই হয়, বাঙালি যে অল্পেই সন্তুষ্ট, জরিপটি তার প্রমাণ!
আইআরআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বেছে নিচ্ছে বলা হলেও দেখা যাচ্ছে যে ৫১ শতাংশ মানুষ কিন্তু গণতন্ত্রকেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন। গণতন্ত্রের আগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বাণী দুবছর ধরে প্রচারের পরও জরিপের মূল বার্তাটি বলছে গণতন্ত্রের প্রতি দেশবাসীর আস্থা এখনো অবিচল।
আইআরআইয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায় যে তাদের আগের দুটি জরিপও একইসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর ওপর একই পদ্ধতিতে চালানো হয়েছিল। গত তিনটি জনমত জরিপের মধ্যে মিল যে শুধু এটুকু তা নয়; জরিপের ফলগুলোতেও অনেক মিল দেখা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশি ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের আশাবাদ প্রকাশ করে এসেছেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই আশাবাদীদের পরিমাণ ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০১৫-এর জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ শতাংশে। এবারও যথারীতি তা বেড়েছে। গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নেও জনসমর্থনের পাল্লা ভারী অবস্থান অব্যাহত আছে। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অব্যাহত আস্থার মতো ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি জরিপের যে ফলটি সবার জন্য দুর্ভাবনার বিষয়, তা হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে। কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়া যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ ঘটানো হয়েছে, দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এখনো সেই ব্যবস্থাকেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য মনে করে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।
এই জরিপের আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এতে কথিত সংসদীয় বিরোধী দল সম্পর্কে কোনো কথা নেই। কোন দলের নেতৃত্ব দৃঢ় বা শক্তিশালী, কোন দল শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছে, কোন দল নারীদের সমর্থন করে—এসব প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। আবার কোন দল ধর্মের প্রতি বেশি বিশ্বাসী—এমন প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে বিএনপি এগিয়ে। জাতীয় পার্টির কোনো নামগন্ধই এতে নেই। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এখনো যেভাবে বিএনপিকেই সারাক্ষণ তুলাধোনা করে চলেছেন, তাতে এমন পরিণতিই তো স্বাভাবিক!
২.
গেল ৩০ জানুয়ারি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের ২৬তম শীর্ষ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, নেতাদের কখনোই অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং আইনগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা উচিত নয়। তাঁরা যখন এমনটি করেন, তখন তার যে করুণ পরিণতি হয়, আমরা সবাই তা দেখেছি। নেতাদের উচিত নিজেদের সুরক্ষার বদলে জনগণের সুরক্ষা দেওয়া। যেসব নেতা সাংবিধানিক মেয়াদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরে দাঁড়ান, আমি সেই নেতাদের প্রশংসা করি। তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণের জন্য আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাই। জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বছরে আফ্রিকার বাঘা বাঘা জাতীয়তাবাদী নেতার উপস্থিতিতে আরও বলেন যে ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ১৬টি দেশ নির্বাচনে যাবে এবং এ কারণে যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের এই বক্তৃতার বিবরণটি পড়ার সময় চোখ যায় আফ্রিকার ওই সব জাতীয়তাবাদী নেতার দিকে, যাঁরা সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার আন্দোলনে সফল হলেও গণতন্ত্র, আইনের শাসন কিংবা অর্থনৈতিক মুক্তি—এগুলোর সবকিছুই রয়ে গেছে অধরা। আফ্রিকার ওই শীর্ষ সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে, যিনি স্বৈরাচার হিসেবে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তরিত করায় তাঁর রেকর্ডটি শিগগির কেউ ভাঙতে পারবে কি না, তা বলা মুশকিল। ৪৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্টের আসনে আসীন এই স্বৈরশাসককে পাশে রেখে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কুফল বর্ণনার সময় মহাসচিব বানের কোনো মর্মপীড়া হয়েছিল কি না, হয়তো ভবিষ্যতে তাঁর জীবনীগ্রন্থে তা জানা যাবে। তবে কূটনীতিকদের জন্য এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি একেবারে অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। ২০০৩ সালের কথা। তখন মহাসচিব ছিলেন কফি আনান। সে বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ধূমপান নিষিদ্ধ করলেন মি. আনান। রাশিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ তখন জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি। মি. লাভরভ অভ্যাসবশত তাঁর সিগারেটে আগুন জ্বালাতে গেলে জাতিসংঘের কর্মীরা তাঁকে নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গেলে ক্ষুব্ধ লাভরভ তাঁদের বলেন যে মহাসচিবের ওই সিদ্ধান্তের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু এটুকু বলেই তিনি থামলেন না। তিনি আরও বললেন, ‘জাতিসংঘ ভবনের মালিক হচ্ছে সদস্যরাষ্ট্রগুলো, আর মহাসচিব হলেন একজন ভাড়াটে ব্যবস্থাপক।’ (এনভয় ফিউমস এট ইউএন সিগারেট ব্যান, বিবিসি, ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৩)।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনের অবশ্য কপাল ভালো যে তিনি যখন সংবিধান সংশোধন করে অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতার সমালোচনা করেছেন, তখন তাঁকে সে রকম কোনো রূঢ় কথা শুনতে হয়নি। এর অন্যতম কারণ সম্ভবত এই যে আফ্রিকার কোনো দেশই রাশিয়ার মতো ভেটো ক্ষমতার অধিকারী নয়। তা ছাড়া আফ্রিকান ইউনিয়নের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে সদস্যদেশ বুরুন্ডিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টার পরিণতিতে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ। দুবারের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বাধা দূর করতে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু হওয়া সংঘাত থেকে বাঁচতে বুরুন্ডির কয়েক লাখ নাগরিক ইতিমধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোয় উদ্বাস্তু হয়েছেন। আফ্রিকান ইউনিয়ন সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ায় দেশটির বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট পিয়ের এনক্রুনজেজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।
৩.
বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় জাতিসংঘের উদ্যোগ বা ভূমিকার কথা আমরা হয়তো অনেকেই ভুলতে বসেছি। ২০০৬–এ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে—এমন এক আশঙ্কার কথা শুনিয়ে এক–এগারোর পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালেও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধ মেটাতে আসেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ। তবে সংকট মেটেনি। যে কারণে ২০১৪ সালে আবারও মহাসচিব বান তাঁর বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজকে পাঠাতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁর আর আসা হয়নি। তবে আশাবাদী বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনায় এখনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা যে প্রবল, তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর নৈরাজ্য সম্ভবত সে কারণেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে ভোটারদের স্মৃতিকাতর করে তুলছে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Friday, January 8, 2016

গণতন্ত্রে ভিন্নমত সহ্য করাই গুরুত্বপূর্ণ -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : টমাস প্রিনজ by কামাল আহমেদ

হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী টমাস প্রিনজ গত বছরের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি টোকিও, ক্যানবেরা, সাংহাই, জাকার্তাসহ বিভিন্ন স্থানে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৩০ নভেম্বর তিনি প্রথম আলোর কার্যালয়ে আসেন, যেটি ছিল তাঁর এ দেশে প্রথম কোনো পত্রিকা অফিস পরিদর্শন। সে সময়ে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছাড়াও গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদের উত্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়
প্রথম আলো : বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছেন? কী ধারণা হলো আপনার?
টমাস প্রিনজ : আমি ৩২ বছর ধরে এই দেশকে জানি; বলতে গেলে এক প্রজন্ম সময়। আমি প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম, তার তুলনায় রীতিমতো মুগ্ধ। এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তবে সবকিছু যে আধুনিকায়নের সঙ্গে সংগতি রেখে হয়েছে তা নয়। এ ছাড়া নতুন সমস্যা হিসেবে যুক্ত হয়েছে যানজট।
প্রথম আলো : রাজনৈতিক অধিকারের জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, মানবাধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকারের মতো ক্ষেত্রগুলোয় বাংলাদেশে আপনার আগের অভিজ্ঞতার আলোকে বড় কোনো পরিবর্তন কি দেখতে পান?
প্রিনজ : হ্যাঁ, আমি ১৯৮৩ সালে এখানে এসেছিলাম। তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ছিলেন। সেটি ছিল সামরিক শাসনকাল। এখন এখানে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
প্রথম আলো : এরপরও আমরা নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রায়ই শুনতে পাই কেন?
প্রিনজ : কেবল আমিই নয়, আমার বেশির ভাগ সহকর্মীই উদ্বিগ্ন। আমরা একটি পরিবর্তিত পরিবেশে বাস করছি। নিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলো সবাইকেই উদ্বিগ্ন করে। অবশ্যই আমাদের মাঠের বাস্তবতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। যদিও উন্নয়নের বিষয়গুলোই আমাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
প্রথম আলো : বাক্‌স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থা নিয়ে সময়ে-সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। কেন এই উদ্বেগ এবং এই পরিস্থিতির উন্নয়নে আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
প্রিনজ : সর্বপ্রথম আমি বলব, এ দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের বিষয়ে দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। আমরা কেবল তাতে অবদান রাখতে পারি। আমরা যেটা করি তা হলো মুক্তমনা ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়া, যারা উদার এবং নিজেদের মত প্রকাশের অধিকারের জন্য সোচ্চার। এমনকি যারা কিছু ব্লগার ও প্রকাশক, যাদের মতের সঙ্গে ভিন্নমত থাকতে পারে, তাদের প্রতিও। এটা খুবই মৌলিক বিষয়। এটাই একটি গণতন্ত্রের ভিত্তি। আপনি যা চান, তা প্রকাশ করা ও বলতে পারার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : সরকার বলে থাকে, দেশে বেসরকারি খাতে ডজন ডজন টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। শত শত সংবাদপত্র প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং, গণমাধ্যমের বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় ঘাটতি কোথায়?
প্রিনজ : গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই একটি বা একাধিক কণ্ঠস্বর, যা আপনি শুনতে চান না। একটি গণতন্ত্রে সেই ভিন্নমতের ও সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে সহ্য করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রশংসাকারী অথবা ধরুন যা আপনি শুনতে চান, তাই-ই বলছে এমন শত শত মানুষের সঙ্গে আপনি কেমন আচরণ করেন, সেটি ধর্তব্যের বিষয় নয় বা তা গণতন্ত্রকে গতিশীল বা শক্তিশালী করে না।
প্রথম আলো : সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত বিতর্ক এবং পাস হওয়া এক প্রস্তাবে এ দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশকে সেই পথ অনুসরণ করাতে আপনার সরকার কী ভূমিকা রাখতে পারে?
প্রিনজ : সরকার হিসেবে জার্মানি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে সমর্থন ও সহায়তা দেয়। আমরা গণমাধ্যম পুরস্কার দিই এবং লোকজনকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাই।
প্রথম আলো : ইউরোপ থেকে প্রায়ই বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলা হয়। গত এক বছর বা তার কাছাকাছি সময়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন আপনাদের মূল্যায়ন কী? পরিস্থিতির কী উন্নতি হয়েছে?
প্রিনজ : এটাকে এগিয়ে যেতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এ ক্ষেত্রে অসাধারণ ভালো করতে পারি।
প্রথম আলো : এসব সংস্কারের জন্য আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলো উল্লেখ করার মতো। কিন্তু আমাদের পোশাকের জন্য ক্রেতারা যে দর প্রস্তাব করে থাকে, তা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। যেহেতু বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জন্য জার্মানি একটি বড় বাজার, সেহেতু আপনাদের ক্রেতাদের দাম বাড়াতে উৎসাহিত করতে আপনার সরকার কী করতে পারে?
প্রিনজ : আমরা বিষয়টি স্বীকার করি। কিন্তু একটি মুক্তবাজারে আমরা দরদাম ঠিক করে দিতে পারি না। অবশ্য আমাদের কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ক্রেডিট লাইন তৈরির জন্য আমরা ফরাসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা যাতে পরিস্থিতির উন্নয়নে বিনিয়োগ করে এবং বেশি বেশি কিনতে এবং ন্যায্য দাম দিতে উৎসাহিত হয়, তার জন্যই এই পদক্ষেপ।
প্রথম আলো : জঙ্গিবাদ এবং ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সৃষ্ট হুমকির বিষয়টি নিয়ে যদি কথা বলি, তাহলে মনে হয় যে এই জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুগুলো তো বৃহত্তরভাবে ইউরোপ। তাহলে আমাদের মতো দেশে তাদের বিস্তার নিয়ে পাশ্চাত্য এতটা উদ্বিগ্ন কেন?
প্রিনজ : মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের অন্য সব দেশের জন্যই একটা হুমকি।
ধর্মীয় চরমপন্থা বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ইসলামিক স্টেটসহ অন্য চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো কেবল আরব বিশ্বেই নয়, অন্য সব মুসলিম দেশেও তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিষয়টিই সবাইকে উদ্বিগ্ন করছে।
প্রথম আলো : ১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বদলে গেছে। নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়টি বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশের কাছেই অগ্রাধিকার পেয়েছে। অন্তত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সেটা সত্য। বাংলাদেশেও আমরা এ ধরনের সহযোগিতা দেখেছি। কিন্তু দুজন বিদেশি নাগরিকের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর আমরা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনেছি, তাদের গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয়নি। এর অর্থ কি এই যে সেই সহযোগিতায় ছেদ ঘটেছে?
প্রিনজ : আমি তেমনটি মনে করি না। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ইস্যুগুলোয় সহযোগিতার বিষয়গুলো একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। আমরা একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থানের বিরুদ্ধে আসন্ন হুমকির বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করতে পারি। এরপর সে বিষয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ফলোআপ দরকার হয়। আমাদের কাছে যেটা নেই, সেটা হলো কখন, কোথায় একটি হামলা সংঘটিত হতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য।
প্রথম আলো : ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বিদেশিদের ওপর এসব সাম্প্রতিক হামলাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, এগুলো বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাজ। বিএনপির কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
প্রিনজ : কাউকে দোষারোপ করা খুবই সহজ। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই এমন দোষারোপের ঘটনা প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার কাজটা আরও কঠিন করে তোলে।
প্রথম আলো : চলমান শরণার্থী সংকট নিয়ে আপনার সরকার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তারা অর্থনৈতিক অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই অর্থনৈতিক অভিবাসীদেরও কেউ কেউ যুদ্ধের শিকার। তারা আরব দেশগুলো থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
প্রিনজ : জার্মানি যুদ্ধবিগ্রহ ও নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে, জানাবে। কিন্তু দেশটি অবৈধ অভিবাসীদের গ্রহণ করবে না। অর্থনৈতিক অভিবাসীদের জন্য একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া রয়েছে। আপনার দক্ষতার শর্তগুলো পূরণকারী জার্মান ব্লু-কার্ড থাকলেই আপনি জার্মানিতে যেতে পারবেন। তাঁরা তখন অভিবাসনের জন্য বৈধভাবে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু যারা এই পদ্ধতি এবং যুদ্ধবিগ্রহ ও নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের স্বাগত জানানোর নীতির অপব্যবহার করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রিনজ : ধন্যবাদ।

Friday, January 1, 2016

রাজনীতি ২০১৬: গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধি দুটোই চাই! by কামাল আহমেদ

নতুন বছরে অর্থনীতি নিয়ে আছে অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু রাজনীতিতে আছে নানা শঙ্কা। সবাই মানেন যে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলে আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তাই নতুন বছরের আকাঙ্ক্ষা—রাজনীতির গুমোট ভাব কাটবে, অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। বাড়ুক গণতন্ত্রের চর্চা, কেটে যাক জঙ্গিবাদের হুমকি। সুস্থ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমৃদ্ধি বাড়ুক বাংলাদেশের।
নতুন বছর ঘিরে সবার মনেই স্বপ্ন থাকে, আশা জাগে। ব্যক্তিগত সেই চাওয়াগুলোর গুরুত্ব অনেক। কারও আশা পরীক্ষায় ভালো ফল, কারও নতুন চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক সাফল্য, বিদেশ যাত্রা, পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া, ঘর বাঁধা, নতুন বাড়ি, নতুন কিছু। সোজা কথায়, নতুন এবং আরও ভালো সমৃদ্ধ জীবন। ২০১৬-তে সবার আশা পূর্ণ হোক, সেই শুভকামনা সবার জন্যই।
২০১৬ সাল আমাদের স্বাধীনতার ৪৫তম বছর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালের বেশির ভাগ সময় আমাদের ভালো কাটেনি। একধরনের অস্থিরতা ও গুমোট রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতনের কারণ হয়েছে।
ফেলে আসা বছরের শুরুটা ছিল অবিশ্বাস্য রকম নৃশংস ও নিষ্ঠুরতায় ভরা। রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির দায়িত্বহীনতা এবং হঠকারিতার খেসারত হিেসবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিরোধী দল প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু সেই আপাতশূন্যতার জায়গায় কখনো জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা, আবার কখনো ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্কলহ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, শঙ্কা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। যেমনটি কখনো শোনা যায়নি, তেমন সব নতুন নতুন নজির তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় এবং জেলা শহরের গ্রামের রাস্তায় খুন হন বিদেশি নাগরিক। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয় মায়ের গর্ভে থাকা শিশু। তবে, অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনের জয়রথ টিকে যায়। সেই শিশু সুরাইয়ার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠাই হচ্ছে ক্ষমতার লড়াইয়ের নিষ্ঠুর আঘাতের শিকার দেশ এবং মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির প্রতীক।
বছরের শুরুতে একদিকে ছিল আন্দোলনের নামে নৃশংস আগুনে বোমায় মানুষ পোড়ানো, অন্যদিকে নৈরাজ্য ঠেকানোর নামে গুলি ও বিরোধী কর্মীদের গুম বা হাওয়া করে দেওয়া। জানুয়ারির ২ তারিখে রাজপথের বিরোধিতা বন্ধে সরকারি ইশারায় যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে দেশে অঘোষিত যে অচলাবস্থা শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয় তাঁর অফিসে। একই সময়ে শুরু হয় দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অবরোধের পালা চলে তিন মাসের বেশি। ভীতিকর পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিএনপির সেই অবরোধ ভেঙে পড়ে। অবশেষে বিদেশি কূটনীতিকদের নেপথ্য দূতিয়ালিতে নজিরবিহীন এই অস্থিরতার অবসান ঘটে। তবে, রাজনীতিতে কোনো সমঝোতার আভাস মেলে না। পরপর দ্বিতীয় বছরের মতো বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়। যার ফল হিসেবে দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রায় লোপ পাওয়ার উপক্রম ঘটে।
যে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ হয়ে গেছে বলে বিএনপি ও তার সহযোগীরা, তারাই মাস খানেকের ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে রাজনীতির মাঠে ফেরার উপায় মেনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয়। তবে, কমিশনের কথিত পক্ষপাত ও অযোগ্যতার দোষে দুষ্ট নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা তা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়ায়। সেটি ছিল এপ্রিলের কথা আর নির্বাচনটিও দলীয় প্রতীকের লড়াই ছিল না। এর ঠিক সাত মাস পর সরকার সিদ্ধান্ত নিল নৌকা ও ধানের শীষের লড়াই আয়োজনের। পৌর আইন সংশোধন করে ঘোষিত হলো দলভিত্তিক মেয়র নির্বাচনের তফসিল। পুরো বছরটিতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করার সুযোগ তেমন একটা না পেলেও বছর শেষে ডিসেম্বরজুড়ে বিএনপি আবারও তাদের রাজনীতির ধারাকে সংগঠিত করা ও জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেল। এবারে ভোটের লড়াইয়ে তারা শেষ পর্যন্ত থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করল এবং থাকার চেষ্টাও করল। যদিও নির্বাচনী সাফল্য তেমন একটা না জোটায় তারা ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তা প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দেশে-বিদেশে ওই নির্বাচন নিয়ে ক্লান্তিকর বিতর্ক সময়ের ব্যবধানে এখন অবশ্য কিছুটা থিতিয়েও এসেছে। কিন্তু সরকারের নানা পর্যায়ে একটা অস্বস্তি রয়েই গেছে। অস্বস্তিটা তাদের ক্ষমতায়নের পালায় গণতান্ত্রিক বোধের ঘাটতির কারণে। ইংরেজিতে যাকে বলে ডেফিশিয়েন্সি ইন ডেমোক্র্যাটিক ম্যান্ডেট। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এই দুটি নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, একটা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা ঢাকার সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, পৌর নির্বাচনকে দলীয় ভিত্তিতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত। এই দুই সিদ্ধান্তেই চরম সংকটে পড়া রাজনৈতিক দল বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। এখন পৌর নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যানের কথা বললেও তারা এমন কোনো কর্মসূচি দেয়নি, যা আবারও সহিংসতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাহলে কি আমরা আশা করতে পারি নতুন বছরে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাতেই আবার সংগঠিত হবে? রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তিও আর ঘটবে না? এমনটিই তো আমরা চাই।
সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে গত মাসে। কিন্তু গণতন্ত্রের অভিযাত্রা বজায় রাখতে তখন যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অধিকাংশই ঝাপসা হয়ে গেছে। নব্বইয়ে ক্ষমতা হারানো স্বৈরাচার এখন ক্ষমতারও অংশীদার, আবার একইসাথে সংসদীয় বিরোধী দলের আসনে আসীন। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনীতির বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা যে সফল হয়নি, তার প্রমাণ গত কয়েকটি নির্বাচন। উপজেলা, সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভা—কোনো কাঠামোতেই জাতীয় পার্টি জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। স্বৈরতান্ত্রিক ও সুবিধাবাদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের এই ধারা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।
এ কথা সত্যি যে সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপি আর চাপ প্রয়োগ করে দাবি আদায়ের মতো অবস্থায় নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই এখন নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ। তিনি চাইলে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক বিতর্ককে উৎসাহিত করার পরিবেশ সৃষ্টিতে কিছুটা ছাড় দিলেও দিতে পারেন। কোনো ধরনের সমঝোতা (নেপথ্যে হয়ে থাকলে আলাদা কথা) অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব, এমনটা আশা কেউ করেন বলে মনে হয় না। কিন্তু পরিস্থিতির গুমোট ভাব কাটাতে প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হবেন, সে আশা অনেকেই করেন। গত বছরের দুটি নির্বাচন থেকেই সেই আশাবাদের জন্ম। আগামী বছরে আরও বড় আকারের নির্বাচন—ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের আয়োজনও হতে পারে একটি বড় মহড়া, যার সাফল্যে ভর করে আগাম জাতীয় নির্বাচন কি সত্যিই অসম্ভব? অনেকে ভাবেন বা বলেন, ২০১৬ সালে এটিই হবে একটি বড় প্রশ্ন।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি নির্বাচনগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু পৌর নির্বাচনে তারা একেবারে নীরব দর্শকের ভূমিকা থেকে সামান্য হলেও রিঅ্যাকটিভ (প্রতিক্রিয়ামূলক ভূমিকা) হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই সামান্য পদক্ষেপকেও অনেকে ইতিবাচক চোখে দেখেছেন। আশা করা যায়, এ থেকে কমিশন কিছুটা আস্থা ফিরে পাবে এবং ভবিষ্যতে উদ্যোগী বা প্রোঅ্যাকটিভ হবে। ২০১৭ সালে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এ বছর কমিশন কি তাহলে মেরুদণ্ড কিছুটা সোজা করে দাঁড়াবে?
কোনো গণতন্ত্রই বিরোধী দলহীন অবস্থায় চলতে পারে না। দীর্ঘ সময় তো নয়ই। বিজ্ঞান বলে, শূন্যস্থান বলে কিছু নেই। নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী রাজনীতির জায়গাটি যে শূন্য থাকতে পারে না, সেটা বেশ ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কায় তাই সবাই উদ্বিগ্ন। দুজন বিদেশি নাগরিক হত্যার পর একাধিক বিদেশি কূটনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছেন যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করাটা খুব সহজ কাজ, কিন্তু তাতে করে আসল জঙ্গিরাই পার পেয়ে যাবে। তেমনটি যাতে না হয়, সে জন্য জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐকমত্যের কথাও ভাবা প্রয়োজন। তবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অস্বাভাবিক গুমোট পরিস্থিতি কোনোভাবেই তার সহায়ক হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমকে চাপমুক্ত রাখা এবং নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটির ভূমিকা সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিকে বিকশিত করে ওই অস্বস্তির অবসান ঘটাতে পারে। সুতরাং, বিরোধীদের বিনাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি পরিত্যাগ করে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলনকে উৎসাহিত করাই হোক ২০১৬ সালের অন্যতম অগ্রাধিকার। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা রাজনীতিকদের তাই এ কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে গণতন্ত্র ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা তার সমৃদ্ধি পূর্ণতা পায় না।

Sunday, December 27, 2015

নেপালের শিক্ষা! by কামাল আহমেদ

অবরোধ প্রতাহারে নেপালকে শেষ পর্যন্ত
ভারতের দাবি মেনে নিতে হয়েছে
ভারতে নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভূমিধস বিজয়ের পর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কথিত ‘প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার’ দেওয়ার পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করেছিলেন। দেশের ভেতরে ‘সবকা সাথ সমৃদ্ধি’র যে আওয়াজ তুলে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সমৃদ্ধির ধারায় প্রতিবেশীদেরও সম্পৃক্ত করার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। তবে বছর না ঘুরতেই তাঁর সেই আশ্বাস অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। নেপাল তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রায় চার মাস এক অঘোষিত অবরোধের শিকার নেপাল শেষ পর্যন্ত ২০ ডিসেম্বর রাতে ভারতের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় সাত বছর ধরে দর-কষাকষি ও রাজনৈতিক লেনদেনের নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে গৃহীত সংবিধান বৃহৎ প্রতিবেশীর চাপে আবারও সংশোধনে সম্মত হয়েছে নেপাল সরকার।
নেপালের তেরাই সমতল অঞ্চলের মধেশিদের দাবি অনুযায়ী সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রাদেশিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয় বিবেচনায় রাজি হয়েছে মন্ত্রিসভা। তেরাই অঞ্চলের এই মধেশিরা মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং ভারতের বিহার রাজ্যের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার বন্ধন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নেপালের নতুন সংবিধানের যেসব বিষয়কে ঘিরে দেশটিতে বিরোধ ও অস্থিরতা দেখা দেয়, তার মধ্যে সাতটি প্রদেশ সৃষ্টি এবং তার সীমানা চিহ্নিত করা অন্যতম। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র পরিচয় পুনরুজ্জীবনের দাবিও উঠেছিল।
গত আগস্ট মাসে দেশটিতে নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর দেশের ভেতরে মধেশিরা প্রতিবাদ জানানো শুরু করলে ভারতও প্রকাশ্যে নেপালের সমালোচনা শুরু করে। এমনকি ভারত ওই সংবিধান সংশোধনের কথাও বলে। প্রায় একই সময়ে মধেশিদের আন্দোলনের কারণে নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে ভারতের সীমান্তচৌকিগুলোতে সব ধরনের পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, যাকে অঘোষিত অবরোধ হিসেবেই সবাই অভিহিত করতে থাকেন। ভারতে সরকারিভাবে অবরোধের কথা অস্বীকার করা হলেও দেশটির বিরোধী রাজনীতিক এবং সংবাদমাধ্যমেও একে অবরোধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
গত রোববার রাতে (২০ ডিসেম্বর) মধেশি আন্দোলনকারীদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, যে কমিশন এই বিরোধ নিষ্পত্তি ও সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে সুপারিশ পেশ করবে। সমঝোতার পর নেপালের শিল্পমন্ত্রী সোম প্রসাদ পান্ডে সাংবাদিকদের বলেন যে কমিশন গঠিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তার সুপারিশমালা পেশ করবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সেদিন এক বিবৃতিতে চলমান অচলাবস্থা নিরসনের ভিত্তি তৈরি করতে এই সমঝোতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করে।
নেপালের ওপর ভারতের এই অঘোষিত অবরোধের অবসান যে সবার জন্য সুসংবাদ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আমরা সবাই এখন আপাতত স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়তে পারি। কেননা, এই অবরোধের সময় প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে নানা সময়ের সংঘাতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫০ জনের। অবরোধজনিত খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে কোনো মৃত্যু ঘটেছে কি না, তার কোনো হিসাব অবশ্য কেউ প্রকাশ করেনি। তবে ৩০ নভেম্বর ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক এক বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে অচিরেই এই অবরোধের অবসান না হলে শীত মৌসুমে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তার আগে ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষের প্রতি এই অবরোধ অবসানের আহ্বান জানিয়েছিলেন (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১১ নভেম্বর, ২০১৫)। মি. মুন তাঁর বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে অবরোধের কারণে ভয়াবহ ভূমিকম্প–পীড়িত দেশটির প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি মানবিক সাহায্যসামগ্রীর সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব তাঁর বিবৃতিতে অবরোধের জন্য দায়ী কে, তা উল্লেখ না করলেও বলেছিলেন যে একটি ভূমিবেষ্টিত (ল্যান্ডলক্ড) দেশ হিসেবে নেপালের ট্রানজিট পাওয়ার অধিকার আছে। উপরন্তু মানবিক সহায়তা পাওয়ার প্রশ্ন তো রয়েছেই। তারও দুই মাস আগে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের র্শীষ বৈঠকের সময় নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে ভারতের এই অবরোধের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল। তবে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা যে কতটা প্রকট, সে প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা না করলেও চলে। অবশ্য তাদের এসব উদ্বেগের প্রসঙ্গ উত্থাপন এ কারণে জরুরি যে সংকটটি একটি প্রাণঘাতী রূপ নিলেও নিতে পারত। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেল। সম্ভবত বাংলাদেশও একই ধরনের বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা পেল। কেননা, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে বাংলাদেশের কাছেও নেপাল সহায়তা চেয়েছিল। ভারতের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে উত্তরোত্তর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সেটা কতটা সম্ভব হতো, তা বলা মুশকিল।
এই অর্থনৈতিক অবরোধটির কারণে নেপাল এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দুর্যোগের কবলে পড়ে। প্রথমটি ঘটেছিল ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে। ওই ভূমিকম্পে দেশটিতে জাতিসংঘের হিসাবে কমপক্ষে ৯ হাজার লোকের মৃত্যু হয় এবং ২৩ হাজারের বেশি লোক আহত হয়। হাজার হাজার লোক আশ্রয়হারা হয় এবং অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানা ধরনের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এলেও দেশটিতে পুনর্গঠনের কাজ এখনো পুরোদমে শুরু হতে পারেনি।
নেপালের সঙ্গে ভারতের এই বিরোধ বা সংকটের অন্য আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসেরই এক প্রবীণ নেতা মনি শংকর আয়ার। ৭ ডিসেম্বর তিনি এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে কিছু চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন, যাতে দেখা যাচ্ছে নেপালের এই দুর্ভোগের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও অনেকাংশে দায়ী। ‘এ মোদি-মেড ডিজাস্টার হিটস নেপাল হার্ড’ শিরোনামের নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হতে না দেওয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি আরও লিখেছেন, ২০১৫ সালে বিহারে যে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল, সেই ভোট সামনে রেখে এক বছর আগে নেপালের জানকিপুরে মি. মোদি একটি জনসভা করতে চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি মধেশি মেয়েদের মধ্যে ১০ হাজার বাইসাইকেল বিতরণ করতে চেয়েছিলেন। ওই সব সাইকেল পেলে মধেশি বালিকারা বিহারে বসবাসরত তাঁদের আত্মীয়স্বজনকে বিজেপির পক্ষে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করবেন বলে তাঁর আশা ছিল। নেপাল সরকার তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
মনি শংকর আয়ার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তাঁর লেখায়। নেপালের যে সংসদে নতুন সংবিধানটি অনুমোদিত হয়েছে, সেই সংসদে তরাই অঞ্চল থেকে জনপ্রতিনিধি আছেন ১১৬ জন এবং তাঁদের মধ্যে ১০৫ জনই সংবিধানটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। মাত্র ১১ জন সাংসদের বিরোধিতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভারত যে নেপালি সংবিধান আবারও সংশোধনের চাপ দিয়েছে, তিনি তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি তাঁর পাঠকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন যে ভারতের সংবিধানসভা যে সংবিধানটি অনুমোদন করেছিল, নেপাল যদি তা সংশোধনের দাবি জানাত, তাহলে ভারতে তার প্রতিক্রিয়া কী হতো? এই অঘোষিত অবরোধের পরিণতিতে নেপালে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরদার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে কংগ্রেসের এই নেতা আশাবাদ প্রকাশ করে লিখেছেন যে নেপালিরা হয়তো বুঝতে পারবেন, নেপালের ওপর যে অবরোধজনিত দুর্যোগ নেমে এসেছে, তার দায় পুরো ভারতের নয়, শুধু বর্তমান সরকারের। মি. আয়ারের এই লেখা হয়তো রাজনৈতিক কারণেই এতটা কঠোর। কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যমও বিষয়টিতে কম সোচ্চার নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত মাসেই এক সম্পাদকীয়তে মি. মোদির প্রতিবেশী নীতির কড়া সমালোচনা করে লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেননি (আনইজি নেবারস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩ নভেম্বর, ২০১৫)।
বিশ্বায়নের কালে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণায় রূপান্তর ঘটছে—এ কথা আমরা সবাই জানি। ইউরোপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থার কারণে এক দেশের বাজেটের বিষয়ে অন্য দেশের মতামতের আলাদা গুরুত্ব ইতিমধ্যে স্বীকৃত। এমনকি বৃহত্তর ইউনিয়নকে সন্তুষ্ট করতে গ্রিসকে একাধিকবার নির্বাচনও করতে হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশেই আর সবকিছুই ওই দেশের একার নয়, এতে প্রতিবেশী এবং তার বাইরে পুরো বিশ্ববাসীর স্বার্থ অথবা ভাগ্যের অনেক কিছুই জড়িত আছে। কিন্তু অন্যের নাক গলানোরও তো একটা সীমা আছে। নাকি তা শুধু ছোট দেশগুলোর জন্য সত্য—বড় বাজার অথবা উদীয়মান বিশ্বশক্তির জন্য নয়?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Thursday, December 17, 2015

খুলনায় ৭৫ বছরের স্কুল: সেন্ট জোসেফস by কামাল আহমেদ

যত দূর মনে পড়ে, সেবার যশোর শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে কোনো একটি সংখ্যায়। তখন বরিশালে আলাদা শিক্ষা বোর্ড হয়নি। সুতরাং, যেসব স্কুল যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছিল, তার ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ছিল দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল কঠিন। ফলে পাসের হার ঢাকা, কুমিল্লা ও রাজশাহীর তুলনায় অনেক কম ছিল—সম্ভবত ২১ শতাংশের মতো। যশোর বোর্ডে সেবার প্রথম শ্রেণি পেল মাত্র পাঁচ শর কিছু বেশি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে একটি স্কুলের পরীক্ষার্থীর ৯৫ শতাংশই পেল প্রথম শ্রেণি। সালটা ১৯৭৬। স্কুলটির বয়স তখন ৩৬ বছর। আজ তার ৭৫। খুলনার সেন্ট জোসেফস হাই স্কুলের অনেক অর্জনের মধ্যে ১৯৭৬ মাত্র একটি। এ রকম অনন্য রেকর্ড নিশ্চয় আরও আছে, যেগুলোর খোঁজ আমি আর করিনি। কিন্তু আজ স্কুলটির প্লাটিনাম জুবিলিতে শুধু একটাই প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে যেন এমন আরও অনেক ভালো রেকর্ডের জন্ম দেয় আমার প্রিয় সেন্ট জোসেফস। অবশ্য, যাঁরা ঢাকার সেন্ট যোসেফের কথা জানেন কিন্তু দেশের প্রায় একটি প্রান্তে সুন্দরবনের কোলে অবস্থিত খুলনার সেন্ট জোসেফস স্কুলের কথা জানেন না, তাঁদের জানিয়ে রাখি, ঢাকারও ১৪ বছর আগে ১৯৪০ সালে সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায় ১৯৪৩ সালে।
একাত্তরে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর সদ্য স্বাধীন দেশটির প্রথম কয়েক বছরে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। প্রথম বছর—১৯৭২ সালে হলো অটো পাস, অর্থাৎ পরীক্ষা না দিয়েই সেবার ছাত্রছাত্রীরা পরের ধাপে উঠতে পেরেছিল। ’৭৩-৭৪-এ নকলের ছড়াছড়ি। কিন্তু তারপরই হঠাৎ করে পাবলিক পরীক্ষা বা জাতীয় পরিসরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে কড়াকড়ি। ’৭৬-এ আমরা সেই কড়াকড়ির মধ্যে পড়ে যাই। কিন্তু পুরো শিক্ষা বোর্ডে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ছাড়া আর হাতে গোনা যে কয়েকটি স্কুল লেখাপড়ার মানে উন্নতি ঘটাতে পেরেছিল, তার মধ্যে সেন্ট জোসেফস বা কথ্যভাষায় যোসেফ স্কুল বলা চলে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। তখন আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত অমিয় গ্যাব্রিয়েল মল্লিক। কিন্তু স্কুলে তাঁর আগের কয়েক বছরে মাঝেমধ্যেই পদচারণ ঘটত স্কুলের আরেক পৃষ্ঠপোষক ও সাবেক প্রধান শিক্ষক ফাদার এজি ব্রুনোর।
বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে আমাকে কম করে হলেও পাঁচবার স্কুল বদলাতে হয়েছে। এগুলোর মধ্যে তখনকার অজপাড়াগাঁয়ের স্কুলও ছিল। প্রায় তিন মাইল মেঠো পথ হেঁটে, কখনো ধানখেতের আইল ধরে স্কুলে যেতাম। তবে, অষ্টম শ্রেণি থেকে আমার জায়গা হয় জোসেফস স্কুলে। আমার স্কুলজীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিও ওই স্কুলকে ঘিরে। আমার ইংরেজির ভিত্তিটা ধরিয়ে দিয়েছেন আজহার স্যার, অঙ্ক ও পদার্থবিজ্ঞান নিত্যলাল গোলদার, বাংলা ব্যাকরণ হাবিব স্যার। কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন হিমাংশু স্যার। স্কাউটিংয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন মরহুম সাখাওয়াত স্যার। খুলনায় যতগুলো স্কুল আছে, তার মধ্যে আমাদের সময়ে একমাত্র বাস্কেটবল খেলার ব্যবস্থা ছিল আমাদের সেন্ট জোসেফসেই। তবে, আমার বন্ধুরা যারা ভালো খেলত, তাদের অনেককে দেখে আমার ঈর্ষাই হতো। কেননা, খেলাধুলাটা আমার ঠিক হয়ে ওঠেনি। সেসব বন্ধুর অনেকেই এখন প্রবাসে। সংস্কৃতিচর্চা কিংবা লেখালেখি যতটুকু করেছি বা করি, তার সবটার জন্যই আমি ঋণী আমার এই স্কুলের কাছে।
যশোর বোর্ডে সেবার প্রথম শ্রেণি পেল মাত্র পাঁচ শর কিছু বেশি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে একটি স্কুলের পরীক্ষার্থীর ৯৫ শতাংশই পেল প্রথম শ্রেণি। সালটা ১৯৭৬। স্কুলটির বয়স তখন ৩৬ বছর। আজ তার ৭৫। খুলনার সেন্ট জোসেফস হাই স্কুলের অনেক অর্জনের মধ্যে ১৯৭৬ মাত্র একটি ইংল্যান্ডে দীর্ঘ দেড় যুগ জীবনযাপনের কারণে সেখানকার স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর শিক্ষকদের একটা সর্বব্যাপী প্রভাব দেখা যায়। ভালোকে ভালো বলতে পারা, নৈতিকতার মূল্য বুঝতে শেখা, মানুষকে তার অর্থ-বিত্ত বা পেশার মানদণ্ডে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখা, এমনকি জীবজন্তুর প্রাণের মূল্য বুঝতে পারা—এসব কিছুর মৌলিক শিক্ষাটা ছাত্রছাত্রীরা সেখানে পরিবারের কাছ থেকে যতটা না পায়, তার চেয়ে অনেক গুণে বেশি পায় শিক্ষকদের কাছ থেকে। মা-বাবার পর সেখানকার বাচ্চারা যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারে, সেই ব্যক্তিটি হন তার শিক্ষক। আমাদের সময়েও আমরা শিক্ষকদের ওপর অনেক আস্থাবান ছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে এখন শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের এই আস্থায় অনেকটাই চিড় ধরেছে। তার কারণ হয়তো অনেক—কিছু আর্থসামাজিক বাস্তবতা আর কিছুটা রাজনৈতিক পরিবেশ। এখন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্কটা অনেকটা ভোক্তা ও বিক্রেতার সম্পর্ক—শিক্ষক নোট দেবেন, তা মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়া যাবে। যত ভালো নোট, তা তত দামি। এর পাশাপাশি আছে শিক্ষক রাজনীতি বা রাজনীতিতে শিক্ষকদের সরাসরি জড়িত হওয়ার প্রভাব।
সৌভাগ্যক্রমে, আমাদের সময়ে এ দুটির কোনোটিই আমাদের নজরে পড়েনি। আমার পরের প্রজন্মের যারা সেন্ট জোসেফসে পড়াশোনা করেছে, তাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছিল বলে শুনিনি। তবে, যেহেতু কোনো স্কুলই সমাজবিচ্ছিন্ন নয়, সেহেতু এসব সংকীর্ণ দলাদলি ও রাজনীতির প্রভাব থেকে দীর্ঘ সময় মুক্ত থাকতে পারার চ্যালেঞ্জটা জোসেফস স্কুলের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমার বিশ্বাস, এত দিনের ঐতিহ্য নিশ্চয়ই কেউ হারাতে চাইবেন না এবং শতবর্ষপূর্তিতেও তা সগৌরবে সমুন্নত থাকবে।
আমার স্কুলের বার্ষিক প্রকাশনা ‘জ্যোতি’র গোড়ার দিকের একটি সংস্করণের কপি বছর কয়েক আগে ইন্টারনেটে আমার নজরে আসে। সেটি পড়ে চল্লিশের দশকের গোড়ায় খুলনার যে বিবরণ পাই, তার সঙ্গে আজকের খুলনার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভৌগোলিক অনুষঙ্গগুলোর কিছু মিল হয়তো এখনো আছে, যেমন ভৈরব আর রূপসা নদী। কিন্তু জনপদ বদলে গেছে। গত সাড়ে সাত দশকে প্রতিষ্ঠা হয়েছে নানা ধরনের শিল্প এবং তার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সে সময়ে যোগাযোগের ঘনিষ্ঠতা ছিল কলকাতার সঙ্গে। আর এখন ঢাকা এবং তারপর যদি বিদেশের কোথাও ভাবি, সেটা হতে পারে নিউইয়র্ক অথবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো শহর। আবার এদের অনেকেই জোসেফস স্কুলের ছাত্র। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জোসেফিয়ানরা (প্রাক্তন ছাত্ররা যে নামে পরিচিত) নিজ নিজ পেশায় সমুজ্জ্বল। সেন্ট জোসেফসের প্লাটিনাম জয়ন্তীতে তাঁরা নিশ্চয়ই নিজেদের এই গৌরবের অংশীদার ভাবছেন।
সারা বিশ্বেই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের (অ্যালামনাস) নিয়ে অ্যালামনি সংগঠিত করে থাকে। সেটির কোনো সাংগঠনিক রূপ থাকুক আর না থাকুক। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান অন্বেষণের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ। এ জন্য প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা দিতে উৎসাহিতও করা হয়। নতুন নতুন শিক্ষা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেন্ট জোসেফসও তার অ্যালামনিদের নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে শামিল করতে পারে। ৭৫ বছর পূর্ণ করা জোসেফস স্কুলের এখনো অনেক কাজ বাকি। তার জন্য তাই শুভকামনা।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Sunday, December 6, 2015

স্বৈরাচারের ছায়া: গণ-অভ্যুত্থানের ২৫ বছর by কামাল আহমেদ

একটি নির্বাচনের মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়, এমন নজির দুনিয়ায় বিরল। কিন্তু বাংলাদেশে সেই দুষ্কর্মের নজির স্থাপিত হয় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এবং তার হোতা ছিলেন ক্ষমতালোভী জেনারেল হু মু এরশাদ। ক্ষমতা গ্রহণের আগেই, মূলত তাঁর পূর্বসূরি আরেক সেনাশাসক জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি হুংকার দিতে শুরু করেন যে ‘দেশ শাসনে সেনাবাহিনীর অংশীদারত্ব থাকতে হবে’। বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বলতম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে তাই নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় তিনি পদত্যাগ করিয়ে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। ’৭৫ থেকে ’৭৮ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে যে রক্তপাতময় অস্থিরতা চলেছিল, তার পটভূমিতে ’৮১ সালের মে মাসে জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ক্ষীণ আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে দেশের রাজনীতি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে পারবে।
সম্ভবত সে কারণেই জেনারেল এরশাদের সেনা অভ্যুত্থানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লেগে যায় ‘সামরিক শাসন মানি না, সামরিক আইন তুলে নাও’। ২৫ মার্চ রাতে এসব পোস্টার লাগানোর সময় গ্রেপ্তার হন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর তিন নেতা শিবলী কাইয়ুম, আবদুল আলী ও হাবিবুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ওঠা সেই স্লোগান আর থামেনি। ’৮৩-র ১১ জানুয়ারি, ’৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, ’৮৪-র ২৮ ফেব্রুয়ারি, তারপর ’৮৬, ’৮৭, ’৮৮ এবং ’৯০-এর অনেকগুলো দিন আন্দোলনকারীরা সামরিক স্বৈরশাসন অবসানের দাবিতে রক্ত ঝরান। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অনেকের নাম স্বজনেরা ছাড়া আর কেউ মনে রাখেন না। রক্তঝরা সেই তারিখগুলোও এখন আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু এসব মৃত্যু, এসব আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা কত দূর এগোলাম? নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বরকে প্রথম দিকে আমরা স্বৈরাচার পতনের দিন কিংবা গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করতাম। এখন আর তা বলতে পারি না। এখন অনেক কষ্ট নিয়ে শুধু গণ-অভু্যত্থান দিবস বলি। কেননা, না হয়েছে গণতন্ত্রের বিজয়, না হয়েছে ব্যক্তিতান্ত্রিক শাসনের অবসান। এরশাদ যে সামরিক শাসনের পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ প্রথম সোচ্চার হলেও রাজনৈতিক দলগুলো ছিল অনেকটাই নিস্তেজ। বিএনপি ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত ও বিপর্যস্ত। আর আওয়ামী লীগ বিএনপির নাকাল দশায় আত্মতৃপ্ত। ’৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলন দমনে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগে অনেকের প্রাণহানির পর আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ন্যাপ, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠকে বসলে সেনাবাহিনী তাঁদের অনেককেই চোখ বেঁধে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সামরিক জান্তার সেই ধরপাকড়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে রাজনীতিকদের সময় লাগে বছর খানেক।
তবে জেনারেল এরশাদ বেশি দিন স্বস্তিতে থাকতে পারেননি। ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিকেরাও তাঁদের দাবি–দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণকে ঘিরে গড়ে ওঠে আইনজীবীদের আন্দোলন। সামরিক ফরমানে সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ায় সাংবাদিকেরাও রাস্তায় নামেন। ছাত্র-শ্রমিক ও পেশাজীবীদের আন্দোলনের পাশাপাশি উপজেলা গঠন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের উদ্যোগ রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার করে। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের জোট ১৫ দল এবং বিএনপি ও কয়েকটি ডানপন্থী দলের জোট ৭ দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অভূতপূর্ব সমঝোতায় পৌঁছায়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বৈঠক করে অভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন পরিচালনার পথে অগ্রসর হন। জামায়াতে ইসলামীর কোনো জোটে জায়গা না হলেও উভয় জোটের সঙ্গেই তাদের একধরনের অলিখিত সমঝোতার রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং সব আন্দোলনে তাদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে দুই নেত্রী ’৮৬-র সংসদ নির্বাচনে দেড় শটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিলে ভরাডুবি নিশ্চিত জেনে সংবিধান সংশোধন করে কোনো ব্যক্তির একসঙ্গে পাঁচটির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সেই সমঝোতা টেকেনি এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয় আর বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট তা বর্জন করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় ১৫ দল এবং বামপন্থী ৫টি দল জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে নির্বাচন বর্জনে শামিল হয়। কিছুটা সময়ের জন্য এরশাদ থিতু হয়ে বসলেও ’৮৭-তে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়।
’৯০-এ এরশাদবিরোধী আন্দোলন যে গণ-অভু্যত্থানে রূপ নেয়, তা আরও আগে সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কেননা, ছাত্র-তরুণেরা আট বছরে বারবার রাজপথে নেমে মার খেয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, জেল খেটেছেন। অথচ রাজনীতির অঙ্গনে সামরিক শাসন অবসানে সুদৃঢ় সমঝোতা ’৯০-র আগ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। অনেকের মতে, ওই দীর্ঘসূত্রতার কারণ দুটো বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রধানের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। এরশাদের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ১৫, ৭ ও ৫-দলীয় জোট ওই বছরের ২১ নভেম্বর একটি যুক্ত ঘোষণা ও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আচরণবিধিতে সম্মত হয় ও তা প্রকাশ করে। ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা ও জীবনপদ্ধতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র কথা ছিল। ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার’ করে ‘তিন জোটের নিকট গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা’ এবং ‘একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদের জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল।
ওই ঘোষণায় (অনুচ্ছেদ ৪ক) তিনটি জোট অঙ্গীকার করেছিল, দেশে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত রাখা হবে এবং অসাংবিধানিক যেকোনো পন্থায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে। নির্বাচন ব্যতীত অসাংবিধানিক বা সংবিধান-বহির্ভূত কোনো পন্থায়, কোনো অজুহাতেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে (অনুচ্ছেদ ৪খ)। মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সব আইন বাতিল করা হবে (অনুচ্ছেদ ৪গ)।
ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ছলে-বলে-কৌশলে’ এরশাদ সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টার বিবরণে ‘ভোট চুরি, ভোট জালিয়াতি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, নির্লজ্জ ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলে আসছে’ বলে বলা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই আন্দোলনের ফসল ’৯১-তে যে সংসদ গঠিত হয়েছিল, সেই সংসদেরই উপনির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতির দৌরাত্ম্য ফিরে এল। ফলে ওই সংসদেই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি উঠল এবং সেই দাবি পূরণের আগে অনুষ্ঠিত হলো একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন। তারপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো নির্বাচনই এসব দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত ছিল না। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে যে নির্বাচনই হয়েছে তা সে স্থানীয় সরকার সংস্থারই হোক—সব ক্ষেত্রেই প্রহসনের পুনর্মঞ্চায়ন দেখা গেছে। আর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মোড়কে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে ১৫৪ জনের ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষা পেয়েছে, সে প্রশ্ন এখন অনেকটা তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়। তাতে দৈনন্দিন বাস্তবতায় হেরফের ঘটার কারণ নেই।
মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী আইনগুলো বাতিলের অঙ্গীকার সব রাজনৈতিক দলই ভুলে গেছে। কেননা, ক্ষমতায় থাকার এবং ক্ষমতার স্বাদ শান্তিতে ভোগ করার জন্য বিরোধীদের নিপীড়নের হাতিয়ারগুলো সবারই প্রয়োজন হয়। ক্ষমতায় থাকলে তাই তাঁরা ৫৪ ধারার যথেচ্ছ প্রয়োগ করেন। কোন আইনে গ্রেপ্তার বা জেলে পাঠানো হবে সেটা তখন বড় প্রশ্ন নয়, বড় কথা হলো, আগে ধরো এবং তারপর সুবিধামতো আইনে মামলা দাও। ৫ ডিসেম্বরের সংবাদপত্রগুলোতে ১৯টি পরিবারের আকুতি ফলাও করে ছাপা হয়েছে, যাতে তারা তাদের দুই বছর ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান চেয়েছে। বাংলাদেশে যে গুমের কথা সামরিক শাসনের সময়েও শোনা যায়নি সেই অপচর্চা কোন ধরনের আইনের শাসন, সে কথা আজ আর রাজনীতিকেরা কেউই তোলেন না। সব ধরনের কালাকানুন বাতিলের যে অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছিল, তাতে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিক দলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন (ঘোষণা ও নিবন্ধন) ১৯৭৩ এর একটি ধারা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও নতুন রূপে একের পর এক আইন ও বিধিমালা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বহাল আছে। এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, তৈরি হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা আইন। সর্বোপরি আছে কথিত মানহানির অভিযোগে ফৌজদারি মামলার অপপ্রয়োগ।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই তিন জোটের রূপরেখায় সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু সেই আদালত শুরু থেকেই রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে এবং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের টানাপোড়েনের অবসান ঘটেনি।
যুক্ত ঘোষণার সঙ্গে তিনটি জোটের নেতারা যে আচরণবিধিতে সম্মত হয়েছিলেন, সেটিকেও ধীরে ধীরে তাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে স্বৈরাচারের দোসরদের চক্রান্ত অব্যাহত থাকার কথা জানিয়ে তাঁরা বলেছিলেন যে ‘এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের সহযোগীদের আমাদের কোনো দলে স্থান না দেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ ’৯১-এর সংসদে সব দলের দাবির মুখে পতিত স্বৈরাচার এরশাদকে কারাগারে পাঠানো হলেও পরের সংসদেই তাঁর সমর্থন পেতে শুরু হয়ে যায় দুই দলের প্রতিযোগিতা। আর বামপন্থীদের মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ ক্ষমতা দখলের মামলাও করেছিলেন, তাঁরা এখন তাঁকেই ‘গণতন্ত্রের সুহৃদ’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
পারস্পরিক মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতার সাধারণ গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসরণের পাশাপাশি তাঁরা ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকার আশ্বাসবাণী দিয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদেরও তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ, কুৎসা প্রচারে এখন কর্মী-সমর্থকদের চেয়ে নেতা-নেত্রীরাই সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের ২৫ বছর পর আমাদের রাজনীতিকেরা কি একটু আয়নায় নিজেদের চেহারাটা দেখে নেবেন? তাঁদের চেহারায় এবং রাজনীতি ও আদর্শে স্বৈরাচারের ছায়া কতটা বড় হয়ে তাঁদের আড়াল করে ফেলেছে, সেটা বুঝতে যতই দেরি হবে ততই আমাদের গণতান্ত্রিক বোধ লোপ পাবে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Thursday, November 12, 2015

সংসদ নজরদারির বাইরে নয় by কামাল আহমেদ

যত দূর মনে পড়ে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পার্লামেন্ট ওয়াচ কার্যক্রম যখন শুরু হয়েছিল, সেটি ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শাসনামল। অষ্টম সংসদের সময় থেকে সংসদের কার্যক্রম নিয়ে এই সমীক্ষা তারা নিয়মিতই প্রকাশ করে আসছে। ফলে আমরাও জানতে পেরেছি কোন সাংসদ কয় দিন অধিবেশনে উপস্থিত থেকেছেন, আর কয় দিন হাজির না হলেও বেতন-ভাতা পেয়েছেন। নবম সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার সংসদে অনুপস্থিতির বিষয়ে টিআইবির হিসাবই সম্ভবত এরপর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সাবেক মহাজোটের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বারবার উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁরা কেউ সংসদ সচিবালয়ের হাজিরা খাতা যাচাই করেছেন—এমনটি কখনো শুনিনি। সেই একই সংস্থা, টিআইবি তার সাম্প্রতিক রিপোর্টে ‘বর্তমান জাতীয় সংসদকে নিয়মরক্ষার সংসদ এবং ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র ভুবনে পরিণত হওয়ার’ কথা বলে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
কিন্তু এবারের রিপোর্টে ক্ষুব্ধ হয়ে বর্তমান সাংসদেরা টিআইবির মূল্যায়নকে সংবিধান পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। সোমবার এক অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদের সমালোচনা করার এখতিয়ার কোনো এনজিওর আছে কি না, এই প্রশ্ন তুলে তাঁরা টিআইবিকে সংসদে তলব করে শাস্তি দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। অনেক প্রবীণ সাংসদ তাঁদের বক্তব্যে টিআইবিকে সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপির পকেট সংগঠন বলেও অভিহিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, শাস্তি এড়াতে হলে টিআইবিকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে হবে।
অবশ্য পুরো পর্যবেক্ষণই প্রত্যাহার করতে হবে কি না অথবা ক্ষমা চাওয়ার জন্য কোনো সময়সীমা আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কেননা, সংসদের আলোচনায় সাংসদদের অনেকেই নানা ধরনের হুমকির সুর তুললেও কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানা যায় না। এরপর মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়–বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবারও টিআইবিকে একহাত নিয়েছেন। এনজিওগুলোতে বিদেশি অর্থায়নের বিষয়ে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়ায় সংসদ, সংবিধান ও রাষ্ট্র নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে টিআইবি সংসদের বর্তমান অবস্থা বর্ণনায় ‘পুতুলনাচের নাট্যশালা’র যে রূপক ব্যবহার করেছে, সেটিকেই সাংসদরা বড় করে দেখাচ্ছেন। কিন্তু কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে দেশবাসী যে তাঁদের ভূত-ভবিষ্যৎ নির্ধারণ প্রশ্নে সংসদে গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও জবাবদিহি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সাংসদেরা সেই সমালোচনার কোনো জবাব দিতে আগ্রহী নন।
সাংসদদের এই প্রতিক্রিয়ার জবাবে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘টিআইবি কিছু অসত্য বলে থাকলে ওনারা বলুক, আমরা দুঃখ প্রকাশ করব, সংশোধনী দেব, প্রত্যাহার করব। কিন্তু জাতীয় সংসদ সম্পর্কে কথা বলার অধিকার নেই, এটা মানছি না। সংসদ নিয়ে কথা বলতে না পারাটা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ।’
সুলতানা কামাল যথার্থই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বিএনপি আমলে তাঁদের সংস্থাকে আওয়ামী লীগের পকেট সংগঠন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল এবং তখনো টিআইবির বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, ইফতেখারুজ্জামান অবশ্য একটু বিনয়ী জবাব দিয়ে বলেছেন যে সংসদের আলোচনাকে তাঁরা তাঁদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
সংসদের অবমাননা হয়েছে এমনটি মনে হলে সংসদে বিতর্ক অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্যক্তিগতভাবে সাংসদদের কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সে বিষয়েও সংসদে আলোচনা হতে পারে এবং তিনি সংসদের অভিভাবক স্পিকারের কাছে তার প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সংসদের মর্যাদা সবার ওপরে—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিেকরা একক বা গোষ্ঠীগতভাবে সংসদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও তার সমালোচনা করার অধিকার রাখেন না, এটি মনে করার কোনো সুযোগ আধুনিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না।
নাগরিকদের কাছে সংসদেরও যে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে, সেটি পার্লামেন্টের নবাগত কেউ নাও জানতে পারেন। কিন্তু অভিজ্ঞ, প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান ও পেশাদার রাজনীতিকেরা তা অস্বীকার করলে সেটাকে আর নিরীহ অজ্ঞতা বলা চলে না, বরং তাতে ভোটারদের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্তত পার্লামেন্টারিয়ানদের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ঘোষিত নানা নীতিমালায় সে রকম কথাই বলা আছে।
নাগরিকেরা যাতে সংসদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, সে জন্য অনেক দেশেই সংসদ ভবন এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যে ভবনটির বাইরে থেকেও অধিবেশনকক্ষের ভেতরে নজরদারি করা যায়। বার্লিনে জার্মান সংসদ ভবন তার একটি দৃষ্টান্ত। আবার আমাদের জাতীয় সংসদের মতো যেসব ভবনে বাইরে থেকে অধিবেশনকক্ষে চোখ রাখার সুযোগ নেই, সেসব জায়গায় প্রেস গ্যালারি ও দর্শক গ্যালারি থেকে সাংসদদের ওপর নজরদারির ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আছে। সম্প্রতি ভারত ও ব্রিটেনে অধিবেশনকক্ষে বসে ট্যাবলেট বা আইপ্যাডে নীল ছবি (পর্নোগ্রাফি) দেখার চিত্র অন্যের ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর সভা থেকে তাঁদের সাময়িক বহিষ্কারের খবর এটিই প্রমাণ করে যে কার্যকর গণতন্ত্রে সাংসদদের ওপর নাগরিক নজরদারির আলাদা গুরুত্ব আছে।
এ তো গেল সংসদ বা পার্লামেন্টের স্থাপনা বা অবকাঠামোতে নাগরিকদের নজরদারির সুবিধা রাখার প্রশ্ন। কিন্তু পার্লামেন্টে নজরদারির আইনগত ব্যবস্থাও একাধিক দেশে আছে। আমাদের পরে গণতন্ত্রায়ণ ঘটেছে—এমন দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন করে নাগরিকদের সংসদের অধিবেশনে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে (সূত্র: পার্লামেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি: আ গাইড টু গুড প্র্যাকটিস, প্রকাশক: ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, আইপিইউ, ২০০৬)।
গণতন্ত্রের তীর্থকেন্দ্র বা মাদার অব অল পার্লামেন্ট খ্যাত ব্রিটিশ সংসদ, ওয়েস্টমিনস্টারে সাংসদদের নৈতিকতার বিষয়টিতে নজরদারি করার জন্য আছে স্বাধীন সংস্থা, ইনডিপেনডেন্ট পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি, আইপিএসএ। টেলিগ্রাফ পত্রিকা দেশটির এমপিদের নানা অজুহাতে খরচ হিসেবে অন্যায়ভাবে নানা ধরনের ভাতা নেওয়ার যে হিসাব তুলে ধরেছিল, তার কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে থাকবে। এমপিদের ওই কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ ঠেকানোর জন্য সেখানেও কিছু এমপি-মন্ত্রী হুংকার দিয়েছিলেন যে সংসদের অবমাননা গ্রহণযোগ্য নয়। সে সময়ে এমপিদের নীতিনৈতিকতার বিষয়টি ছিল পার্লামেন্টের নিজস্ব এখতিয়ার। সেই স্বশাসন (সেলফ রেগুলেশন) কাজে না আসায় শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে আইন করে প্রতিষ্ঠিত হয় আইপিএসএ (সূত্র: আইপিএসএ ওয়েবসাইট)। বাইরের লোক, বিশেষ করে হিসাব বিশেষজ্ঞদের নজরদারিতে ওয়েস্টমিনস্টারের অবশ্য কোনো মানহানি হয়নি।
আমরা গর্ব করি যে সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী বিশ্বের ১৬৬টি দেশের সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন আইপিইউর সভাপতি এবং স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ারপারসন। সোমবার জাতীয় সংসদের বিতর্কে এই দুটি মহান সংগঠনের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সাংসদদের কেউ আইপিইউর প্রকাশনাটি পড়ে দেখেছেন কি না সন্দেহ।
পার্লামেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি: আ গাইড টু গুড প্র্যাকটিস-এর মুখবন্ধে সাবের হোসেন চৌধুরীর একজন পূর্বসূরি পিয়ের ফার্দিনান্দো ক্যাসিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সময়ের গোলকধাঁধা (প্যারাডক্স) হচ্ছে আমরা যখন গণতন্ত্রের বিজয়কে স্বাগত জানাই, তখন অনেক দেশেই গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পার্লামেন্ট বৈধতার সংকটে ভুগছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের প্রাধান্য এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাতে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অভাব ঘটছে এবং মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে যে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও পার্লামেন্ট তাদের বৈচিত্র্যময় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম কি না।’ কোনো সংসদ গণতান্ত্রিক কি না, তা যাচাইয়ের জন্য তিনি পাঁচটি শর্ত পূরণের কথা বলেছেন। এগুলো হলো প্রতিনিধিত্ব, স্বচ্ছতা, সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা।
নাগরিকদের কাছে জবাবদিহির জন্য সাংসদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তাঁকে অপসারণের ব্যবস্থাও চালু আছে উগান্ডার মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে। এতটা গণতান্ত্রিক সংস্কার আমাদের দেশে সহসা যে সম্ভব নয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু পার্লামেন্ট ওয়াচের মতো সীমিত নজরদারির অধিকারটুকুও যদি নাগরিকদের না থাকে, তাহলে কি এ কথা বলা যাবে যে আমরা একুশ শতকের গণতন্ত্রে আছি?
গণতন্ত্র শুধু সংসদ আর রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নয়, গণতন্ত্রে এখন নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই নাগরিক সংগঠন বা এনজিওগুলোকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি দেখানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। গণতন্ত্রায়ণে গত দুই দশকে এনজিও বা সুশীল সমাজের কাছ থেকে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য-সমর্থন নিতে হয়েছে, সেগুলোর কথা ক্ষমতাসীনেরা এত দ্রুত বিস্মৃত হন কীভাবে তা সত্যিই একটা বিস্ময়। ব্রিটেনে প্রকৃত বিরোধী দলকে আলংকারিক ভাষায় বলা হয় ‘হার রয়াল অপজিশন’ কেননা, দেশটি রাজতান্ত্রিক ও রাজ্যের সিংহাসনে আসীন আছেন রানি এলিজাবেথ। কিন্তু আমাদের দেশে? এখানে যদি অপজিশন হয় ‘হার (প্রধানমন্ত্রীর) লয়াল (অনুগত) অপজিশন’, তাহলে কোনো নাগরিক গোষ্ঠী সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে কীভাবে ‘অসত্য’ অভিহিত করা যায়?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক।

Tuesday, November 3, 2015

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজন আরও বিতর্ক by কামাল আহমেদ

স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানের জন্য আইন সংশোধনের কথা অনেক আগেই জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি যখন এই পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তখন তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এলেও পরিকল্পনায় যে হেরফের ঘটেনি, তা এখন স্পষ্ট। বরং আগে যেখানে ধারণা ছিল যে আইনের সংশোধনীটি সংসদে পাস করার পরই এই পরিবর্তন আসবে, সেখানে এখন এটি করা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে। কেননা, সংসদে আলোচনা, কমিটিতে বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদি করার মতো যথেষ্ট সময় সরকারের হাতে নেই।
সৈয়দ আশরাফের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ব্রিটেনে এবং ব্রিটিশ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ধরন-ধারণ ও পদ্ধতিটি তাঁকে কিছুটা প্রভাবিত করলেও করে থাকতে পারে। আর আমরা যেহেতু ওয়েস্টমিনস্টার গণতন্ত্রকে অনুসরণের কথা অহরহই বলে থাকি, সেহেতু স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় তাদের মডেলটি কেন নয়? তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে চলমান বিতর্কে এই ধারণার পক্ষে-বিপক্ষে যেসব কথা উঠেছে, সেগুলো একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।
এই ব্যবস্থার পক্ষে একটা বড় যুক্তি হচ্ছে, এখন যেভাবে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা বা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়, সেগুলোর সবই শুধু নাম ছাড়া বাস্তবে দলভিত্তিক প্রতিযোগিতা। দলই মনোনয়ন ঠিক করে, দলই সাংগঠনিকভাবে দলীয় মনোনয়নধারীর পক্ষে প্রচারকাজে নামে, ভোটারদেরও একটি বড় অংশ দলীয় আনুগত্য অনুসারে ভোট দেন এবং নির্বাচিত ব্যক্তিরা দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থে তাঁদের কাজ পরিচালনা করে থাকেন। যে কারণে আগে দেখা যেত, প্রার্থীর পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি। এখন সেটি বন্ধ হলেও তাঁদের সভা-সমাবেশ-মিছিলে দলীয় স্লোগান যেমন বন্ধ হয়নি, তেমনি দলের নেতারা প্রার্থীর পক্ষে সভা করা ও লিফলেট বিতরণের মতো কাজে অংশ নিয়ে চলেছেন। বরং নির্বাচনী আচরণবিধিতে একজন প্রার্থীর জন্য অফিস বা প্রচার ক্যাম্পের সীমা নির্ধারিত থাকায় দলীয় কার্যালয়গুলো তাঁদের বাড়তি সাহায্য জোগায়। কখনো কখনো সেগুলোই হয়ে ওঠে ক্যাম্পেইন হেডকোয়ার্টার বা প্রার্থীর প্রধান দপ্তর।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পক্ষে আরেকটা বড় যুক্তি এই যে দলের তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলায় এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই ধারায় ইউনিয়ন পরিষদের স্তর থেকে সংসদে উঠে এসেছেন, এমন নজিরও আছে। সংসদ নির্বাচনে যাঁরা মনোনয়ন পাননি তাঁরা জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। দলের ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচি অনুযায়ী এলাকার উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারেন এবং তা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেন। একই সঙ্গে এলাকাবাসী সাংসদকে কাছে না পেলেও সমস্যা নেই, তাঁরা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হতে পারবেন।
সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নে নির্বাচনব্যবস্থার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে দলের একাধিক নেতার স্বাধীনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা হলেও কমবে। কেননা, দল থেকে একাধিক নেতা প্রার্থী হলে তা সাধারণত বিরোধী রাজনৈতিক প্রার্থীর জন্য বাড়তি সুবিধা করে দেয়। ফলে কোনো এলাকায় দল শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও শুধু দলীয় শৃঙ্খলা প্রয়োগের সুযোগ না থাকায় সেখানে বিরোধী পক্ষ নির্বাচিত হয়ে যায়। এতে করে সেখানে বিরোধী রাজনীতি শক্তিশালী ও সংহত হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী কেউ অরাজনৈতিক বা নির্দলীয় খোলসে নির্বাচিত হয়ে পরে প্রতিপক্ষকে সাহায্য করতে পারবেন না।
আবার যাঁরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানের বিরোধী, তাঁদের যুক্তিগুলোও ফেলনা নয়। তাঁদের প্রধান আশঙ্কা, দলীয় সরকারের অধীনে দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কার্যত বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার রেকর্ড বিরল। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য যে ধরনের নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন, সে রকম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা যেটুকু তৈরি হয়েছিল, তা-ও হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বরং এখন নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের একটি অধিদপ্তরের কাজের ধরনের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য করা যায় না।
দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধিতা করেছে যেসব রাজনৈতিক দল, তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। তারা বলেছে যে সরকারের দলীয়করণ নীতির অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং স্থানীয় সরকারে ভিন্নমতের প্রতিনিধিত্ব যাতে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই হচ্ছে এর উদ্দেশ্য। তাদের এই প্রতিক্রিয়া মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। কেননা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা যেসব ক্ষেত্রে সফল হয়েছিল, সেসব জায়গায় তার সুফল তারা ঘরে তুলতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের মেয়রদের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও যেখানে তাঁরা বহালতবিয়তে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, সেখানে বিএনপির মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের অধিকাংশেরই পরিণতি হয়েছে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে পদচ্যুতি বা অপসারণ (জনপ্রতিনিধি অপসারণে সরকারের দ্বৈতনীতি, প্রথম আলো, ২৭ মার্চ, ২০১৫)। প্রবণতাটি এ রকম—প্রথমে মামলা, যেগুলোকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা বলে সন্দেহ করেন এবং তারপর পদ থেকে অপসারণে মন্ত্রণালয়ের নোটিশ। অতীতে মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিরা উচ্চ আদালত থেকে সুরক্ষা পেলেও সাম্প্রতিককালে তেমনটি আর দেখা যায় না।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলে নতুন সংশোধনী আনা হলেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়র, চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর-সদস্যদের প্রতি বৈষম্যমূলক বিধান স্পষ্ট। বলা হচ্ছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো কারণে নির্বাচন সম্ভব না হলে সরকার প্রশাসক নিয়োগ করে কাজ চালাবে। উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকার সুযোগ আর থাকবে না। কিন্তু আইনপ্রণেতাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি হয়েছে এমন যে তাঁদের নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে বর্তমান সাংসদেরাই কাজ চালিয়ে যাবেন। অনির্বাচিত কেউ সরকার পরিচালনায় থাকতে পারেন না, এই যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থারও বিলোপ ঘটানো হয়েছে। অথচ অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
নতুন সংস্কারের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ইংল্যান্ড ও ভারতের যে দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়, সেটি আসলে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থায় যতটা সংস্কার হয়েছে, আমরা কি তার ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পেরেছি? মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি পৌর নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটকেন্দ্রে দখলবাজির বিরুদ্ধে সেখানকার নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপগুলোর কথা আমরা কি আমাদের দেশে ভাবতে পারি? কিছু ভোটকেন্দ্রে দখল ও ভোটদানে বাধা সৃষ্টির কারণে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কয়েকজন সাংসদ রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের অফিসে গিয়ে তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করায় তিনি পদত্যাগ করেন (আনন্দবাজার, ৭ অক্টোবর, ২০১৫)। আমাদের দেশে এ রকম কোনো নজির কি কেউ দেখাতে পারবেন?
আর ইংল্যান্ডের গণতন্ত্রচর্চার যে দীর্ঘ ইতিহাস, তাতে উপর্যুপরি অনুশীলনের মাধ্যমে তারা এমন একটা উন্নত মান ঠিক করে ফেলেছে, যা রাতারাতি আয়ত্ত করা প্রায় অসম্ভব। সেখানে দলের নিয়মিত চাঁদা প্রদানকারী সদস্যদের ভোটে প্রার্থী ঠিক হয়, প্রার্থীরা প্রচলিত রীতিনীতি মেনে প্রচারকাজ চালান, খরচের সীমা লঙ্ঘনের সুযোগ নেই বললেই চলে, দলের ভূমিকা দখলদারি মানসিকতায় পরিচালিত হয় না এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত। প্রতিটি পৌর কর্তৃপক্ষের (কাউন্সিল বা লোকাল অথোরিটি) প্রধান নির্বাহী নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরিবিধি (পাবলিক সার্ভিস কোড) অনুযায়ী কাউন্সিলের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো দলের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। এমনকি ভোটের দিনে তাঁদের কেউ লেবার পার্টির লাল, কনজারভেটিভদের নীল কিংবা লিবারেলদের হলুদ রংওয়ালা কোনো কাপড় (টাই, স্কার্ফ বা হ্যাট) পরে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন না। বিপরীতে আমাদের দেশে সরকারি কর্মচারীদের পেশাজীবী সংগঠনের খোলসে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির কথা নিশ্চয়ই কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ইংল্যান্ডে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মেয়রের খেয়ালখুশিতে চলে না। অনেকটা মন্ত্রিসভার আদলে তাঁরা কাজ করেন। নিয়মিত জবাবদিহির ব্যবস্থাটিও বেশ পাকাপোক্ত। লন্ডনের মেয়রের যে দপ্তর, সেই ভবনে প্রতি মাসে তিনি নির্বাচিত অন্য জনপ্রতিনিধিদের (কাউন্সিলরের সমতুল্য) মুখোমুখি হয়ে জেরার মুখোমুখি হন। সেই সভাও হয় সাধারণ নাগরিকদের উপস্থিতিতে। সামাজিক স্বার্থ জড়িত আছে, এমন বিষয়ে নীতিমালা তৈরি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকদের মতামত গ্রহণ সেখানে বাধ্যতামূলক।
ইংল্যান্ডে কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা তাদের পরিচালিত নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো (স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মন্দির, হাসপাতাল ইত্যাদি) পরিচালনায় সাংসদদের কোনো ক্ষমতা বা ভূমিকা নেই। অথচ আমরা আইন করে উপজেলা পরিষদে সাংসদকে যেমন উপদেষ্টা বানিয়ে ক্ষমতায়িত করেছি, তেমনি নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সব কটিতেই তাঁদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিয়েছি।
বাংলাদেশে এখন অনেক জেলা আছে, যেখানে সেই এলাকার সাংসদ সেখানকার সব প্রতিষ্ঠানে তাঁর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভাই-ভাতিজা এমনকি স্ত্রী হচ্ছেন পৌরসভা বা উপজেলার চেয়ারম্যান, বৃহত্তর পরিবারের (আত্মীয়কুল ধরে) অন্য কোনো সদস্য ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতায়, জেলা চেম্বারের মূল পদে, স্কুল-কলেজের পরিচালনা বোর্ডে, মূল দল এবং অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্বে। অর্থাৎ সাংসদের পরিবারই জেলার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মনোনয়ন-প্রক্রিয়ায় এসব সাংসদের পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পেলে দেশে বারো ভূঁইয়াদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে বেশি দিন লাগবে না বলেই মনে হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, সেহেতু স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় তাদের একটা আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকারই কথা। কিন্তু সেটা চালু করার জন্য আমরা যে প্রস্তুত নই, সে কথাটিও সত্য। তাড়াহুড়ো করে এটি চালু করলে তার ফল ভালো না হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার এবং নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রায়ণ না হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে যেমন সুশাসন অধরাই রয়ে গেছে, তেমনি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাতেও তা দলীয় শাসন বা অপশাসনের জন্ম দিতে পারে। ওয়েস্টমিনস্টার মডেল অনুসরণের নামে আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নজিরবিহীন দুর্দশা ঘটিয়েছি, সেই একই ভাগ্য কি অপেক্ষা করছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক।