Showing posts with label ঐতিহাসিক. Show all posts
Showing posts with label ঐতিহাসিক. Show all posts

Wednesday, December 3, 2025

ভাঙতে ভাঙতে রাজবাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এল সুড়ঙ্গ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

বাড়িটি বানিয়েছিলেন দিঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়। বাড়ির দুই পাশে দুটি একতলা ভবন। সামনে একটি নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ। পেছনে একটি দোতলা ভবন। সরকারি কাগজে এটি এখন অর্পিত সম্পত্তি। স্থাপনাটি জরাজীর্ণ হওয়ায় নিলামে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয় প্রশাসন। সেই বাড়ি ভাঙতে গিয়ে নিচতলা থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি সুড়ঙ্গ। সেখান থেকে বের হচ্ছে পানি।

‘ঐতিহাসিক’ এই বাড়িটির অবস্থান রাজশাহী নগরের দরগাপাড়া মৌজায়। ভবনটির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ছিল কি না, যাচাই না করেই ভাঙার জন্য নিলামে তুলে বিক্রি করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় ইতিহাসবিদেরা। তাঁরা বলছেন, এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল।

বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দরগাপাড়া মৌজায় ৫২৪ খতিয়ানের এই জমির দাগ নম্বর ৪৭। শ্রেণি হিসেবে লেখা আছে, ‘সিভিল ডিভিশন অফিস’। মালিকের ঠিকানায় ‘দিঘাপতিয়া স্টেট, বলিহার, থানা– নাটোর’ লেখা আছে। ১৯৮১ সালে বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়। যদিও সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের পর কোনো সম্পত্তিকে অর্পিত ঘোষণা করা যাবে না। এরপর কীভাবে ১৯৮১ সালে বাড়িটিকে অর্পিত ঘোষণা করা হয়েছে, তা রহস্যজনক।

কবি ও গবেষক তসিকুল ইসলাম জানান, রাজপরিবার চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পড়ে ছিল। স্বাধীনতার পর ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমানকে বাড়িটি ইজারা দেয় সরকার। তিনি বাড়িতে ‘মহিলা কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি সংগঠন চালাতেন। ২০০৯ সালে মনোয়ারা রহমান মারা যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, মহারানি হেমন্তকুমারী (১৮৬৯-১৯৪২) পুঠিয়া থেকে রাজশাহী শহরে এলে এই বাড়িতে থাকতেন। রাজশাহীর একটি কলেজের শিক্ষক আখতার বানু ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে যাতায়াত করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়িতে ঢুকতেই সামনে পড়ে একটি নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ। সেটি এখনো আছে। ডান ও বাঁ পাশে দুটি একতলা ভবন। তার ঠিক উত্তর পাশে দোতলা ভবন। একটি থেকে আরেকটিতে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কাঠের সিঁড়ি ছিল। আর পূর্ব পাশ দিয়ে চুন–সুরকির সরু একটি সিঁড়ি ছিল। এ ছাড়া দোতলা ভবনের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গপথে একতলা ভবনে যাওয়ার রাস্তা ছিল। ওই একতলা ভবন ভাঙতে গিয়েই সুড়ঙ্গটা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় বলছে, মাসখানেক আগে স্থাপনাটি নিলামে বিক্রি করে দেয় জেলা প্রশাসন। নগরের দরগাপাড়া এলাকার এক ব্যক্তি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকায় সেটি কিনে নেন। ১০–১৫ দিন ধরে তিনি সেটা ভাঙতে শুরু করেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, পাঁচজন শ্রমিক বাড়িটি ভাঙার কাজ করছেন। ক্রেতার ব্যবস্থাপক অপু বলেন, বাড়িটি ভাঙার পর সুড়ঙ্গ বেরিয়ে আসে। ভাঙার পর সেখান থেকে পানি বের হচ্ছে। এক সুড়ঙ্গের সঙ্গে আরেকটির সংযোগ আছে। সুড়ঙ্গের পানি শুকাতে সেচযন্ত্র বসানো হয়েছে। এক দিক থেকে পানি বের হচ্ছে, আরেক দিক থেকে সেচযন্ত্রের মাধ্যমে টেনে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে আস্তে আস্তে শুকনা জায়গা বের করে তারা ভাঙার কাজ করছেন।

হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা মাহাবুব সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, এমন স্থাপনা ভাঙার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহীর পরতে পরতে দিঘাপতিয়ার জমিদারদের অবদান আছে। বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজকুমার শরৎ কুমার রায়। রাজশাহী কলেজ ও পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন তাঁর ভাই প্রমদানাথ রায়। আরেক ভাই বসন্ত কুমার রাজশাহী হাসপাতালের জন্য ৮০ বিঘা জমি দান করেছিলেন। নগরের মিয়াপাড়ায় ডিজিএফআইয়ের বর্তমান কার্যালয়টি হেমেন্দ্র কুমার রায়ের বাড়ি। মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, বাড়ি ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাঁরা রাজশাহীতে ইতিহাস চর্চা করেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহিনুল ইসলাম বলেন, স্থাপনাটি খসে পড়ে যাচ্ছিল। এ জন্য ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জায়গাটি নিয়ে তাঁদের একটা পরিকল্পনা আছে। সুড়ঙ্গ বের হওয়ার কথা শুনে বলেন, তিনি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সেখানে পাঠাচ্ছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেলে সেটা রক্ষা করা হবে।

রাজশাহীতে একটি রাজবাড়ি ভাঙার সময় মেঝের নিচে পাওয়া গেল সুড়ঙ্গ। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের দরগাপাড়া মহল্লায়
রাজশাহীতে একটি রাজবাড়ি ভাঙার সময় মেঝের নিচে পাওয়া গেল সুড়ঙ্গ। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের দরগাপাড়া মহল্লায়। ছবি : প্রথম আলো

Tuesday, August 26, 2025

শত বছরের পুরোনো বিশাল আস্ত গির্জা চলে যাচ্ছে অন্য শহরে

মাটিধসে ঝুঁকিতে পড়া ১১৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক একটি গির্জাকে না ভেঙে পুরোপুরি স্থানান্তর করা হচ্ছে। সুইডেনের উত্তরাঞ্চলের একটি সড়ক ধরে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে গির্জাটিকে।

সুইডেনের কিরুনায় ১৯১২ সালে নির্মিত লাল কাঠের বিশাল এই গির্জাকে বড় একটি ট্রেলারের ওপর তোলা হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে নতুন শহরের পথে যাত্রা করছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০০ মিটার গতিতে চলা এই যাত্রা শেষ হতে দুই দিন লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লৌহ আকরিক খনির খননকাজের কারণে সৃষ্ট ভূমিধস ও ফাটলের ঝুঁকিতে আছে পুরোনো শহরের কেন্দ্রস্থল। কিরুনার ভবনগুলোর স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে গির্জার স্থানান্তর সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা। শহরটি আর্কটিক সার্কেলের ১৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।

গির্জার ভিকার লেনা জার্নবার্গ ও লুলেয়ো ডায়োসিসের বিশপ আশা নাইস্ট্রোমের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গির্জা স্থানান্তরের যাত্রা শুরু হয়। সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে ট্রেলারের ইঞ্জিন চালু হয়ে বিশাল কাঠের গির্জাটিকে নিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে শুরু করে। প্রথম ঘণ্টায় এটি মাত্র ৩০ মিটার অগ্রসর হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই ব্যতিক্রমী ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন।

সুইডেনের সাংস্কৃতিক কৌশলবিদ সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, ‘এটা বিশাল জনসমাগম। শুধু কিরুনা বা সুইডেনের বিভিন্ন জায়গা থেকেই নয়, নানা ভাষার মানুষ এখানে এসেছেন। মনে হচ্ছে, যেন চোখের সামনে ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।’

স্থানান্তরের কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টেফান হোমব্লাড জোহানসন বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিশাল ও জটিল কাজ এবং এখানে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। তবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।’

২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কিরুনার অন্যান্য ভবন নিরাপদ এলাকায় সরানো শুরু হয়। বেশির ভাগ ভবন ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, তবে কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা হুবহু অক্ষত সরানো হয়েছে।

এর মধ্যে আছে ইয়ালমার লুন্ডবোমসগার্ডেনের হলুদ সারির তিনটি পুরোনো কাঠের বাড়ি ও খনির ব্যবস্থাপক ইয়ালমার লুন্ডবোমের বাসা। এগুলো তিন ভাগে কেটে সরানো হয়েছিল। পুরোনো সিটি হলের ছাদের ক্লক টাওয়ারটিও সরিয়ে নতুন সিটি হলের পাশে বসানো হয়েছে।

সুইডিশ আইনে কোনো ভবনের নিচে খননকাজ করার অনুমতি নেই। কিরুনার একটি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবার্ট ইলিতালো বলেন, ‘মানুষ হঠাৎ ফাটলের মধ্যে পড়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। সময়ের সঙ্গে ফাটলগুলো পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অবকাঠামো ধসে পড়ার আগে মানুষকে সরিয়ে আনতে হবে।’

লৌহ আকরিক খনির অপারেটর ও কিরুনার সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা এলকেএবি পুরো শহর স্থানান্তরের খরচ বহন করছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার কোটি সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ৭৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড)।

কিরুনা গির্জার উচ্চতা ৩৫ মিটার (১১৫ ফুট), প্রস্থ ৪০ মিটার ও ওজন ৬৭২ টন। এটি একসময় সুইডেনে ১৯৫০ সালের আগের সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।

এত বড় ভবন স্থানান্তর একটি জটিল বিষয়। তবে ভবনটিকে না ভেঙে প্রকৌশলীরা পুরো ভবনটি একসঙ্গে অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নিচ্ছেন। এটি সরানো হচ্ছে ইস্পাত বিমের ওপর ভর করে স্বচালিত মডুলার ট্রান্সপোর্টারের মাধ্যমে।

জোহানসন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাস্তা প্রস্তুত করা, যাতে এত বড় ভবন পার হতে পারে। আমরা রাস্তা ২৪ মিটার (৭৯ ফুট) প্রশস্ত করেছি। রাস্তা থেকে ল্যাম্পপোস্ট, ট্রাফিক লাইট সরানো হয়েছে, এমনকি একটি সেতু ভেঙে ফেলা হয়েছে।’

গির্জা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া দেখতে গোথেনবার্গ থেকে গাড়ি চালিয়ে সেখানে গেছেন লেনা এডকভিস্ট ও তাঁর স্বামী। লেনা বলেন, ‘আমি বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া গির্জায় যাই না। তবে এটি আমার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। ওরা না ভেঙে গির্জাটি পুরোপুরি সরাচ্ছে, এটা আমাদের জন্য গৌরবের।’

ভেইডেক্কে নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক কিয়েল ওলভসন বলেন, ‘বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর অবশেষে আমরা এগোতে শুরু করেছি। আমি আনন্দিত এবং মুহূর্তটা উপভোগ করছি। আবহাওয়া ভালো, আর আমি নিশ্চিত সবকিছু নির্বিঘ্নে চলবে।’

অক্ষত অবস্থায় গির্জা স্থানান্তরে সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজগুলোর একটি হলো, গির্জার ভেতরের ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা করা, বিশেষ করে সুইডিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স ইউজেনের আঁকা বিশাল বেদিচিত্র।

স্থানান্তরের কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জোহানসন বলেন, ‘এটা এমন কিছু নয়, যেটা হুক থেকে নামিয়ে নেওয়া যায়। এটা সরাসরি ইটের দেয়ালে আটকানো, তাই ক্ষতি ছাড়া সরানো যেত না। এ জন্য স্থানান্তরের সময় ছবিটি গির্জার ভেতরেই ঢাকা থাকবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই স্থানান্তর বিস্ময়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, ছোটবেলায় তিনি দাদির হাত ধরে প্রথমবারের মতো গির্জায় গিয়েছিলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গির্জাটি ছিল আত্মিক কেন্দ্র ও মিলনস্থল।

মাত্তা আরও বলেন, ‘এই স্থানান্তর আমাদের আনন্দ ও বেদনার স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে এনেছে। আর আমরা সেই স্মৃতিগুলো সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি অন্য শহরে।’

স্থানান্তরের কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জোহানসন একজন প্রকৌশলী। তিনি গির্জার গসপেল সংগীত দলেরও সদস্য। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি একেবারেই বিশেষ কাজ। ১০০ বছর আগে গির্জাটি এলকেএবি পৌরসভার জন্য তৈরি করেছিল। এখন আমরা এটিকে নতুন শহরে সরিয়ে নিচ্ছি। আর কোনো বিকল্প ছিল না।’

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে গতকাল বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে গির্জাটি নতুন শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার কথা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Fi2n2qw8r%2FKiruna-Church-3.jpg?rect=0%2C0%2C5460%2C3640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
৬৭২ টন ওজনের বিশাল এই গির্জাকে বড় একটি ট্রেলারের ওপর তোলা হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে নতুন শহরের পথে যাত্রা করছে। ১৯ আগস্ট। ছবি: এএফপি

Saturday, May 22, 2010

একটি ঐতিহাসিক জীবাণু by শাহাদুজ্জামান

একটি ঐতিহাসিক জীবাণুর গল্প হোক এবার। ১৮৩২ সালে ইউরোপের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে এক ব্যাপক কলেরা মহামারি দেখা দিয়েছিল। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, সেই মহামারির জীবাণুটি তার যাত্রা শুরু করেছিল আমাদের এই বাংলাদেশ থেকে। এখান থেকে রওনা দিয়ে নৌ ও স্থল বাণিজ্যের পথ ধরে এই কলেরার জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, রাশিয়াসহ ইউরোপের বিশাল অঞ্চলে। ইতিহাসে এটি ‘বেঙ্গল কলেরা প্যান্ডেমিক’ হিসেবেই পরিচিত। ইউরোপের সামাজিক, আত্মিক, স্থাপত্যিক, রাজনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে এই কলেরা এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, রোগ একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলেও মহামারির অভিজ্ঞতাটি সামাজিক। ফলে মহামারির একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। ইতিহাসে রোগ ও মহামারির ভূমিকা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য কাজটি করেছেন উইলিয়াম ম্যাকনিল (১৯৭৭) তাঁর প্লেগ অ্যান্ড দ্য পিপল বইটিতে। তিনি মূলত অনুসন্ধান করেছেন উপনিবেশ বিস্তারে জীবাণুর ভূমিকা নিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন, কলম্বাসের আমেরিকা জয়ে যেমন বন্দুকের ভূমিকা ছিল তেমনি ভূমিকা ছিল জীবাণুরও। কলম্বাস তাঁর জাহাজে করে পুরোনো পৃথিবী থেকে যেসব রোগ নতুন পৃথিবীতে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার কোনোটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা ছিল না আদিবাসী আমেরিকানদের। ব্যাপক মহামারিতে অতি অল্প সময়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে লাখ লাখ আদিবাসী। তাতে কলম্বাসের জয়ের পথ সুগম হয়েছে।
বেঙ্গল কলেরার গল্পটি অবশ্য খানিকটা ভিন্ন। পিটার স্ট্রিফল্যান্ড (১৯৯৭), আর জে ইভান্স (১৯৮৮) প্রমুখ ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের মহামারির ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ স্থাপন করে ইউরোপ যখন জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থনীতিতে শনৈঃশনৈঃ উন্নতি করে দারুণ আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে, ঠিক তখন দূরপ্রাচ্যের ‘বর্বর’ এক দেশ থেকে কলেরা নামের বর্বর এই রোগটি আঘাত করে তাদের। ইউরোপের শহরে শহরে তখন কেবল লাশের মিছিল। চিকিৎসকেরা বিমূঢ়। তাঁদের হাতে কলেরার কোনো সমাধান নেই। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি নিয়ে তখন তাঁদের সীমাহীন গর্ব। হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় মৃত্যুকে যখন তাঁরা নান্দনিক করে তোলার চেষ্টা করছেন তখন কিনা তাঁদের হতবিহ্বল করে তোলে দাস্তবমির বিদঘুটে উপসর্গের কলেরা নামের এই রোগ। কলেরার কারণ নিয়ে তর্কবিতর্কে উদভ্রান্ত হয়ে ওঠেন ইউরোপের চিকিৎসকেরা। কুল নামের এক ডাচ্ চিকিৎসক কলেরা সারানোর জন্য রীতিমতো একটি মেশিন তৈরি করে বসেন, যার ভেতর তিনি তাঁর রোগীদের ঢুকিয়ে রাখতেন। বলাবাহুল্য, সে মেশিনে কোনো কাজ হয় না। কলেরাকে পর্যুদস্ত করতে না পেরে হতাশ সেই চিকিৎসক শেষে কবি হয়ে ওঠেন এবং কলেরা নিয়ে ‘এনিমি উইদাউট আ ফেইস’ নামে এক দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলেন। কলেরা যখন এক এক করে ইউরোপের শহরগুলোতে আঘাত করছে, তখন প্যারিসের নগরপ্রধান ঘোষণা করেন, ফরাসিরা ইউরোপের সবচেয়ে সভ্য জাতি। ফলে তাদের কলেরার মতো এমন একটি অসভ্য রোগ আক্রান্ত করতে পারে না। এই ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই ফ্রান্সের রাজপরিবারের একজন সদস্য কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বলা যায়, সামগ্রিকভাবে ইউরোপের রেনেসাঁ-উত্তর আভিজাত্যবোধকে একেবারে চুরমার করে দেয় এই কলেরা।
পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের চিকিৎসক স্নো কলেরার সঙ্গে দূষিত পানির সম্পর্কটি আবিষ্কার করেন। এই কলেরার সূত্র ধরেই পরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পাবলিক হেলথ’ নামে একটি নতুন জ্ঞানকাণ্ডের সূচনা ঘটে। বস্তুত, ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই কলেরার প্রেক্ষাপটেই ইউরোপ তাঁর শহরগুলোর পানি এবং পয়ঃপ্রণালি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। লন্ডন, প্যারিসের মতো বহু শহরে তখন ঘরে ঘরে খাটা পায়খানার ব্যবস্থা ছিল। ভোরবেলা নগরের পরিচ্ছন্নকর্মী এসে মলের বালতি পরিষ্কার করে যেত। কলেরা মহামারি তাদের বাধ্য করে পয়োনিষ্কাশন নিয়ে নতুন করে ভাবতে। ইউরোপের শহরে শহরে শুরু হয় স্যানিটেশন নিয়ে উপর্যুপরি কনফারেন্স। নগরপরিকল্পনাবিদেরা পুরো শহরের পানিবিতরণ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। রাস্তা, দালানকোঠা নির্মাণে তৈরি হয় নতুন নীতিমালা।
বলাবাহুল্য, ইউরোপীয় সেই কলেরা মহামারির প্রধান শিকার হয় শহরের দরিদ্র মানুষ। কর্তৃপক্ষ কলেরা ছড়ানোর জন্য দরিদ্র মানুষকে অভিযুক্ত করতে থাকে। তাদের শহরের কেন্দ্র থেকে ঝেঁটিয়ে বের করে দেওয়া হয় বাইরে। শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে গরিবদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবে কলেরাকে কেন্দ্র করে ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে সামাজিক ও ভৌগোলিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এমন গুজবও ছড়ায় যে ধনবানেরা ষড়যন্ত্র করে কলেরার মাধ্যমে গরিবদের মেরে ফেলার ব্যবস্থা করছে। ইউরোপের সেই ঐতিহাসিক কলেরা মহামারির সময় একাধিক বিক্ষোভ, সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কলেরাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন অভিজাত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনাও ঘটে। কলেরাজাত ওই আন্দোলনের কারণে সরকারকে অনেক দরিদ্রবান্ধব আইন পাস করতে হয়।
এভাবেই কলেরা নানাভাবে বদলে দেয় ইউরোপকে। সেই সূত্রে বলা যায়, আধুনিক ইউরোপ গড়ার এবং তার নয়নাভিরাম শহরগুলো তৈরির পেছনে এক অর্থে বাংলার ঐতিহাসিক সেই কলেরা জীবাণুরও একটি ভূমিকা আছে। সেই সঙ্গে এও প্রতিষ্ঠিত যে বিধ্বংসী এই কলেরার সমাধান যে রয়েছে সামান্য এক প্যাকেট স্যালাইনে, সে সত্যটি আবিষ্কৃত হয়েছে এই বাংলাদেশেরই কলেরা হাসপাতালের গবেষণাগারে। তবে আপসোস এই, কলেরাকে ইউরোপ ইতিহাসের পাতায় পাঠিয়ে দিলেও আমাদের সেই পর্যটক জীবাণু এখনো আস্তানা গেড়ে আছে এই মাটিতে। আমাদের জীবাণু ওদের বদলে ফেললেও আমরা বদলাই না।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com