Thursday, February 11, 2016

ক্যাপ্টেন রফিক ও মেজর জিয়া জ্বলে উঠতে পেরেছিলেন বলেই

লাঞ্চের পর আমি নিয়াজ স্টেডিয়ামে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। মেজর জিয়া এসে আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন। তখন আনুমানিক বিকাল চারটা। জিয়া আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, কোন খবর আছে কি না? জানালাম, এখনো উল্লেখযোগ্য তেমন কোন খবর নেই। দু-এক দিনের মধ্যে খবর সংগ্রহের জন্য আমাকে বা অন্য কাউকে হয়তো ঢাকায় পাঠানো হবে। তখন সঠিক খবর জানা যাবে।
মেজর জেনারেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী ‘১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন’ শীর্ষক গ্রন্থে এসব কথা লিখেছেন। প্রয়াত এ বীর মুক্তিযোদ্ধা আরও লিখেছেন, তারপর জিয়াকে আমি বললাম, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুপযোগী করলে কেমন হয়। ইদ্রিসের দেওয়া চ্যানেলের ছবিগুলো তাকে দেখালাম। বললাম, জাহাজ প্রবেশ চ্যানেলের কোনো নাজুক জায়গায় আড়াআড়িভাবে ডুবিয়ে দিয়ে বন্দরের প্রবেশপথ বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রেনের সংযোগকারী কেবলের (যার মাধ্যমে ক্রেন চলাচল করে) জংশন পয়েন্ট বিচ্ছিন্ন করা হলে বা গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দিলে বন্দরের জেটিগুলোও অকেজো হয়ে যাবে। এতে পাকিস্তানিরা আর বন্দর ব্যবহার করতে পারবে না।
জিয়া তার স্বভাবসুলভ ভারী গলায় বললেন, ‘আরে রাখো এসব প্ল্যানিং। এটা কি সামরিক অভিযান? উই নিড ইট অ্যাট দ্য রিকোয়ার্ড টাইম। বাকি সব কার্যক্রম সংবেদনশীল ডেটোনেটরের বিস্ফোরণের ফলে আপনা-আপনি ঘটতে থাকবে। আগে থেকে এসব প্ল্যানিং করতে গেলে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ষোলো আনা।’ পাকিস্তান সামরিক একাডেমির একসময়ের প্রখ্যাত একজন প্রশিক্ষক জিয়া। তার মুখে এসব কথা আমার মনঃপূত হয়নি। বরং তাৎক্ষণিভাবে জিয়ার ভাবমূর্তি আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে অবশ্য দেখা গেল, সময়মতো গর্জে উঠতে না পারলে এসব প্ল্যানিং ভেস্তে যায় বা কোন কাজে আসে না। ইবিআরসির ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। ক্যাপ্টেন রফিক ও মেজর জিয়া তাৎক্ষণিকভাবে জ্বলে উঠতে পেরেছিলেন বলেই মিলিটারি ক্র্যাক ডাউনের প্রথম প্রহরেই অবিশ্বাস্যভাবে প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। অবশ্য রফিক ক্র্যাক ডাউন শুরুর আগেই জ্বলে উঠেছিলেন।
যাহোক এরপর মেজর জিয়া চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম সম্ভব হলে তিনি যেন এম আর সিদ্দিকী ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বললেন, রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আমার মতো জুনিয়র অফিসারদের যোগাযোগ রাখাই অধিকতর যৌক্তিক। সিনিয়র কেউ আগে থেকে যোগাযোগ স্থাপনে তৎপর হলে পাকিস্তানিরা সজাগ হয়ে সবাইকে বদলি করে দিতে পারে। একথা বলে তিনি চলে গেলেন।

ভারতে অন্তঃসত্ত্বা এক পুরুষ!

ভারতের কেরালায় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন ৫২ বছর বয়সী একজন পুরুষ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। সমকামিতার সূত্র ধরে তিনি এখন সন্তান জন্ম দিতে চলেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জি নিউজ। প্রথমে তার কথায় কেউ পাত্তাই দিতে চায় নি। তিনি যখন বলেন তার পেটের ভিতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে তখন সবাই তা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতেন। যখন বমি করা শুরু করলেন তখন বলা হলো উড়ো বাতাস। কিন্তু চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে বললেন, ঠিকই ওই পুরুষ একটি সন্তানের জন্ম দিতে চলেছেন। তবে তার নাম প্রকাশ করা হয় নি। ওই ব্যক্তির বাড়ি কোজিকোড়িতে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি লক্ষ্য করেন তার পেট বড় হয়ে যাচ্ছে। নিচের দিকে ঝুলে পড়ছে। তখনই তার সন্দেহ হয় যে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারি আমার পেটের ভিতর একটি বাচ্চা নড়াচড়া করছে। এ কথা যখন তিনি স্ত্রী, সন্তানদের বললেন তখন তো তারা যেন আকাশ থেকে পড়েন। তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এর কয়েক মাস পরেই ওই ব্যক্তির বমি বমি ভাব হতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি বমি করা শুরু করেন। এ অবস্থায় তাকে রাখা হয় পূর্ণ বিশ্রামে। পরিবারের সদস্যরা মিলে তাকে নিয়ে যায় একজন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক তাকে পুরোপুরি পরীক্ষা করে দেখলেন। রাখা হলো কাউন্সেলিং সেশনে। এরপরই বেরিয়ে এলো বাস্তবতা। ওই ব্যক্তি স্বীকার করলেন আরেকজন পুরুষের সঙ্গে তিনি সমকামী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। সেই সূত্রেই তিনি এখন সন্তান জন্ম দিতে চলেছেন। তবে তাকে যে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা বলছেন, এর আগে তাদের কাছে এমন ঘটনা আর কখনো আসে নি।

বিরোধীদের ‘দমিয়ে রাখায়’ সন্ত্রাসীদের বিস্তার হতে পারে -মার্কিন গোয়েন্দা–প্রধানের শঙ্কা

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জেমস ক্ল্যাপার বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দমিয়ে রাখতে’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেষ্টা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়িয়ে দিতে পারে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে শুনানিতে এ শঙ্কার কথা বলেন ক্ল্যাপার।
এপির খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিরোধী দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এ তৎপরতা বলে মনে করা হয়। তবে সরকারি এ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জেমস ক্ল্যাপার।
সিনেটে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে ক্ল্যাপার উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিক এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ১১টি বড় ধরনের হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এ ছাড়া ২০১৩ সাল থেকে ১১ জন প্রগতিশীল লেখক এবং ব্লগার হত্যার দায় স্বীকার করেছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস)।
এপির খবরে বলা হয়, বর্তমান সরকার বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতির কথা স্বীকার করে না। বরং তারা এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য দেশীয় ইসলামি গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করে।
এইচ টি ইমামের সমালোচনা: জেমস ক্ল্যাপারের এ বক্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ‘অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত’ আখ্যায়িত করেছেন। বিবিসি বাংলাকে গতকাল সন্ধ্যায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে এইচ টি ইমাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এ ধরনের উদ্ধৃতি করাটা সৌজন্যমূলকও নয়। বিষয়টি সম্পূর্ণ বানোয়াট। এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অপজিশনকে (বিরোধীদের) কোনোভাবেই আন্ডারমাইন (দমিয়ে রাখা) করছেন না। যদি করতেন, তাহলে বিএনপি কিংবা অন্যান্য অপজিশন যাঁরা আছেন, তাঁরা প্রকাশ্যে সভা করতে পারতেন না। তাঁরা নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।’
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বাস্তবতা স্বীকার করেন কি না—বিবিসির এ প্রশ্নের জবাবে এইচ টি ইমাম বলেন, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ সবগুলো জঙ্গি দলের যদি গোড়ায় যান তাহলে দেখবেন, প্রত্যেকটার উৎপত্তিই হচ্ছে জামায়াত।’
বিশ্লেষকদের কথা: এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বিবিসিকে বলেন, বিভাজনের রাজনীতির কারণে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের তৎপরতা বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। এই গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোকে অনুসরণ করতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কিছু একটা ঘটনা ঘটলেই বিএনপির দিকে তাক করা হয়, জামায়াতের দিকে তাক করা হয়। আমি ঠিক এভাবে বিষয়টাকে দেখতে চাই না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কিছুটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জামায়াত জড়িয়ে গেছে। ফলে এটা সরাসরিভাবে না বললেও, কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক যে আছে তা তো অস্বীকার করা যাবে না। তবে বিএনপি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কতটা জড়িত, সে নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অবশ্য ক্ল্যাপারের বক্তব্য মানতে রাজি নন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ক্ল্যাপারের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা, সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদ উৎসাহিত করতে তা আড়াল করা হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাসের ভাষ্য: এদিকে মার্কিন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেমস ক্ল্যাপারের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল প্রথম আলোকে ই-মেইল বার্তায় বলেন, মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির অনুরোধে জেমস ক্ল্যাপার বৈশ্বিক হুমকির বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। ক্ল্যাপারের ওই বিবৃতিতে পরামর্শমূলক তথ্য এবং আলোচনার জন্য বিশ্লেষণের উপাদান রয়েছে। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই এটি দেওয়া হয়েছে।
বার্নিকাট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইয়ের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ (আদৌ বরদাশত না করা) নীতিকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে সমর্থন করে। যেসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও তাদের লক্ষ্যবস্তু। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, পরিমিতিবোধ এবং ধর্মের শান্তিপূর্ণ চর্চা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বড় শক্তি।

নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ড না রাখার কথা ভাবা হবে: আইনমন্ত্রী

ভবিষ্যতে নতুন আইন করার ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে অপরাধের গুরুত্ব বুঝে মৃত্যুদণ্ড না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তবে বর্তমানে যে সব আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে তার কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, যেহেতু মৃত্যুদণ্ড সাজা হিসেবে তেমন গ্রহণযোগ্য নয়, সে জন্য এর পরিবর্তন আনা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাতে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে এ কথা বলেন। এর আগে আজ সচিবালয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মন্ত্রী এই বার্তাই দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যখন আলোচনা হয়েছে তখন আমি বলেছি, যেসব অপরাধের জন্য বর্তমানে মৃত্যুদণ্ড সাজা হিসাবে রয়েছে, সেগুলোর কোনো পরিবর্তন হবে না। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই শাস্তির বিলোপ ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের দণ্ড কার্যকরের সময়ও ইইউ বিবৃতি দিয়ে তা রদ করতে বলেছে।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে যেসব ক্ষেত্রে এড়ানো সম্ভব, সেসব নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হবে না। যেমন ফরমালিনের আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড না রেখে যাবজ্জীবন রাখা ভালো। এই রকম আইন করলে আমরা সেখানে মৃত্যুদণ্ড না রাখার চেষ্টা করব। তবে অপরাধের গুরুত্ব বুঝে যদি আমরা মনে করি, মৃত্যুদণ্ড রাখাটাই অপরাধ দমনের সবচেয়ে ভালো অস্ত্র, তাহলে (নতুন আইনেও) মৃত্যুদণ্ড থাকবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়েও বৈঠকে কথা হয়েছে। তিনি ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের বলেছেন, সরকার নতুন ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ করে ৫৭ ধারার ‘বিভ্রান্তিগুলো’ দূর করার ব্যবস্থা করছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক লেখক-প্রকাশক হত্যার প্রসঙ্গও আসে। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ব্লগারদের হত্যার ঘটনা সম্পর্কে আমি বলেছি, একটা মামলার রায় হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দুটো জিনিস করার চেষ্টা করছি। এই হত্যাগুলোর বিচার ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছি। এই রকম হত্যা যাতে না হয়, সেইভাবে আচরণ করতে এবং সকল পক্ষকে সংযত হতে অনুরোধ করছি।’ তবে কারও বাক স্বাধীনতা হরণ করার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
বৈঠকে কোম্পানি আইন, বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ- সরকারের অনুমোদন নিয়ে তদন্তের নির্দেশ

মাহফুজ আনাম
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে করা আবেদন সরকারের অনুমোদন নিয়ে তদন্ত করে কোতোয়ালি থানাকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ২৮ মার্চ এই প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তী এ আদেশ দেন।
১ / ১১-এর সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য প্রকাশের অভিযোগ এনে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা নিতে আদালতে আবেদন করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর সহকারী সরকারি কৌঁসুলি মোস্তাফিজুর রহমান । তিনি দণ্ডবিধির ১২৩ (ক), ১২৪ (ক), ৫০০ ও ৫০১ ধারায় এ আবেদন করেন।
মামলার আরজিতে বলা হয়, ১ / ১১-এর সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে নেতৃত্ব-শূন্য করার হীন প্রচেষ্টায় একটি এজেন্সির প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য মাহফুজ আনাম তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য প্রকাশ করেন; যা প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আবেদনে আরও বলা হয়, আসামি এরূপ হলুদ সাংবাদিকতা করে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিকৃত তথ্য প্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থির করেছেন।
এরপর আদালত তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করে বিষয়টি আদেশের জন্য রাখেন।
পরে আদালত আদেশে বলেন, ঘটনার গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। তাই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৬ ধারা মোতাবেক সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে পরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নয় এমন কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করে আগামী ২৮ মার্চ প্রতিবেদন দিতে বলেছেন।

লতিফ-মহিউদ্দিন দ্বন্দ্ব চরমে by মহিউদ্দীন জুয়েল

চট্টগ্রামে মুখোমুখি আওয়ামী লীগের এমপি এম এ লতিফ ও সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। এম এ লতিফের শাস্তি দাবি করে সমাবেশ  ডেকেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই নিয়ে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দর নগরীর আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে সবার সামনে। একজন আরেকজনকে নিয়ে করছেন বিষোদগার। কটূক্তি। নানা ধরনের মন্তব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের শুরুতেই তোপের মুখে পড়েছেন চট্টগ্রামের ১১ আসনের এমপি এমএ লতিফ। গত ৩০শে জানুয়ারি শেখ হাসিনার সফর উপলক্ষে তিনি বেশকিছু ফেস্টুন টাঙিয়েছিলেন নগরীতে। সেখানে নিজের শরীরে বঙ্গবন্ধুর মাথার অংশ বসানোর ঘটনায় ফেঁসে যান লতিফ। এরপর তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য হাজির করেন ওই ছবির ডিজাইনার ও নকশাকারককে। তারা জানিয়েছিলেন তাড়াহুড়ো করে এই কাজটি করেছেন। এখানে এমপি’র কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী এই ঘটনায় দলীয় এমপি লতিফের বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, দলীয় হাইকমান্ডের কাছে এই বিষয়ে নালিশ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে লতিফের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে গত এক সপ্তাহের মধ্যে। এমপি লতিফ এই ঘটনায় শুরুতে বলেছেন, একটি চক্র যারা দলের ভেতর লুকিয়ে রয়েছেন তারা তার সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এমন কুৎসা রটাচ্ছেন। এসব লোকজন শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছাতে না পেরে তার পেছনে লেগেছে। ষড়যন্ত্র করছে। এসব কথায় তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ইঙ্গিত করেছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, এমপি লতিফ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর দ্বন্দ্ব দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। শোনা যাচ্ছে মহিউদ্দিনের সমর্থনে লতিফের বিরুদ্ধে আরও বেশকিছু মামলা দায়ের করা হবে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে লতিফের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমাবেশ করার ঘোষণায় এই দ্বন্দ্ব আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃতির অপরাধে এমপি লতিফের বিচারের দাবিতে আগামী শনিবার নগরের লালদীঘি মাঠে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন তিনি। সেখানে ‘নাগরিক মঞ্চ’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে এই কর্মসূচি নিয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি ছাড়াও তার সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা একেএম বেলায়েত হোসেনও থাকবেন। কর্মসূচিতে সবাইকে থাকার আহ্বান জানান মহিউদ্দিন  চৌধুরী। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি যে বিকৃত করেছে তাকে যুদ্ধাপরাধীদের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করতে হবে। সরকার ও প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের নির্মূল করতে হবে। মহিউদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, কেবল আমি নই। আমার সঙ্গে এই ঘটনার বিচার দাবিতে থাকবেন ডেপুটি অ্যাটর্নি  জেনারেল কামাল উদ্দিন, নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সুনীল সরকার, খোরশেদ আলম সুজনসহ আরও অনেকে। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো। অন্যদিকে জানতে চাইলে এমপি এমএ লতিফ বলেন, কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না। এই ঘটনা নেত্রীর সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা আমি মেনে নেবো। আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, এমপি লতিফ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর দ্বন্দ্ব নতুন নয়। নানা সময়ে নানা আলোচনায় তারা একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে মূল বিষয়টি শুরু হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। যার প্রভাব পড়ে রাজনীতিতে। বন্দরের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে দুই নেতা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন। সেই সময় এমপি লতিফ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বহদ্দারহাটের মোড় থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরী বন্দরের চার নম্বর গেটে আন্দোলন করতে এসেছেন। তিনি একজন হঠকারী আন্দোলনকারী। উনার যখন স্বার্থ তখন তিনি আন্দোলন করেন। লতিফের এমন বক্তব্যে পরবর্তীতে এক অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, দলের ভেতর কিছু কুখ্যাত ব্যক্তি ঢুকে গেছে। এদেরকে আপনারা প্রশ্রয় দেবেন না। তারা কখনও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। রাতারাতি কিভাবে যেনো এমপিও হয়ে গেছে।

আধিপত্য বাড়াতে হিজড়াদের হাতে অস্ত্র by রুদ্র মিজান

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলবদ্ধভাবে চাঁদা আদায় করে হিজড়ারা। চাঁদা আদায়ের শৃঙ্খলার জন্য রাজধানীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছে তারা। এক-একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন হিজড়াদের এক-একজন নেতা। একজনের স্থানে অন্যরা যখন চাঁদা আদায় করতে যান তখনই দুই গ্রুপের মধ্যে বিপত্তি দেখা দেয়। এ ছাড়াও আদায়কৃত চাঁদার টাকা নিয়েও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তারা। ঘটছে গুলির ঘটনাও। প্রতি মাসে রাজধানী থেকে প্রায় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকেন হিজড়ারা। হিজড়াদের নিয়ন্ত্রণকারী নেতারা বিলাসী জীবন-যাপন করেন। তারা নিজ অনুসারীদের সুযোগ-সুবিধা দেখভাল করেন। চাঁদা আদায় ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হিজড়াদের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করে। আদায়কৃত চাঁদায় ভাগ বসাতে স্থানীয় সন্ত্রাসীরাও তাদের সঙ্গে হাত মেলায়। অবৈধভাবে অস্ত্রও সংগ্রহ করে তারা। কখনও কখনও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে তাদের মধ্যে। প্রতি মাসে এক একটি গ্রুপ চাঁদাবাজিসহ বিভিন্নভাবে কোটি টাকা আয় করে থাকে বলে হিজড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০০৪ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুসারে দেশে ১৫ হাজার হিজড়া রয়েছেন। তবে হিজড়াদের দাবি সারা দেশে অন্তত ৪০ হাজার হিজড়া রয়েছেন। ঢাকাতেই রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। রাজধানী ঢাকা নিয়ন্ত্রণ করেন এমন নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ময়না, নাজমা, কচি, স্বপ্না, দিপালী, আবুল ও মেসবাহ। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপে সহস্রাধিক হিজড়া রয়েছেন। গ্রুপে রয়েছে উপগ্রুপ। হিজড়ারা কোথায়, কিভাবে কাজ করবেন তার নির্দেশনা দেন নেতারা। এজন্য সিনিয়র স্থানীয় হিজড়া নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। ওই স্থানীয় সিনিয়র হিজড়ারাই তৃণমূল হিজড়াদের পরিচালনা করে থাকেন। তৃণমূল হিজড়াদের কাছ থেকে দৈনিক টাকার হিসাব বুঝে নেন স্থানীয় হিজড়া নেতারা। খরচের টাকা ছাড়া বাকি টাকা জমা থাকে স্থানীয় ওই নেতার কাছে। স্থানীয় নেতাদের নিয়ে মাসে একাধিকবার বৈঠক হয় আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে। এ বিষয়ে বড় মগবাজারের বাসন্তি হিজড়া জানান, গুরুমায়েরা (নেতা) তাদের মা। নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। যে কারণে স্থানীয় নেতা পরে আঞ্চলিক নেতার কাছে টাকা জমা রাখা হয়।
সূত্রমতে, ভারতের দিপা এবং রেশমা নামে দুই হিজড়ার অনুসারী  রয়েছে এ দেশে। দুই ভাগে বিভক্ত এই হিজড়াদের মধ্যে রয়েছে নানা উপগ্রুপ। হিজড়াদের যোগ্যতা অনুযায়ী  তিন ভাগে ভাগ করে কাজ করানো হয়। পৃথক এই তিনটি ভাগের নাম হচ্ছে, মাছুরা, ঘুঙুর  শ্যামবাজার। দেখতে সুদর্শন মেয়ে হিজড়াদের রাখা হয় ঘুঙুর গ্রুপে। তাদের কাজ হচ্ছে নাচ, গান করে অর্থ উপার্জন করা। এই গ্রুপের একটি অংশ নানা অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে যায়। ছিনতাই ও অনৈতিক কাজ করে থাকে তাদের অনেকে। তাদের মধ্যে রয়েছে দুটি উপগ্রুপ। তুলনামূলক কম সুন্দরীদের একটি গ্রুপ দিনের বেলা বিভিন্ন বাসায় চাঁদা আদায় করতে যায়। তারা সেখানে নাচ-গান পরিবেশন করে থাকে। বিশেষ করে নতুন শিশুর জন্ম হলে ওই বাড়িতে ছুটে যায় তারা। তাদের ঢোলসহ দেশীয় কয়েক বাদ্যযন্ত্র থাকে। ঘুঙুর গ্রুপের সুন্দরী হিজড়ারা সাধারণত সন্ধ্যার পরপর বাসা থেকে বের হয়। অর্থের বিনিময়ে এক শ্রেণির পুরুষদের মনোরঞ্জন করে থাকে তারা। তাদের কেউ কেউ জোর করে পুরুষদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মহাখালী মোড়, পল্লবী, বসিলা, সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, বিএফডিসি সংলগ্ন হাতিরঝিল, রেললাইন সংলগ্ন মগবাজার, পরীবাগ, রমনা পার্ক এলাকায় তাদের বিচরণ বেশি।
এ বিষয়ে গুলশান-১ এর বাসিন্দা হিজড়া মিষ্টি জানান, তিনি নিজে প্রায়ই অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন। তবে এটাকে অনৈতিক মনে করেন না তিনি। বরং তিনি মনে করেন এটা এক ধরনের সেবা। মনোরঞ্জনের নামে ছিনতাইয়ের বিষয়ে মিষ্টি বলেন, বেগুনবাড়ি এলাকায় তিন পুরুষ তার এক সঙ্গীকে নিয়েছিলেন। ওই দিন মিষ্টি অন্যত্র ব্যস্ত ছিলেন। পরদিন তিন পুরুষের একজন ফোনে জানান, তার ১২শ’ টাকাসহ তার মানিব্যাগ চুরি করে নিয়ে গেছে ওই হিজড়া। মিষ্টি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, এতে তার খুব খারাপ লেগেছে।
শ্যামবাজার গ্রুপের হিজড়ারা বিভিন্ন হাটে-বাজারে চাঁদা তুলে থাকে। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে ওই প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে আদায় করা হয়। কাওরানবাজারের এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, প্রায়ই তাদের ব্যাংক ঘেরাও করে হিজড়ারা। মনে করে ব্যাংকে টাকা আছে, ঘেরাও করলেই তাদের দিয়ে দেয়া হবে। বুঝানোর পরও তারা বুঝতে চায় না। নিজ পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাদের বিদায় করতে হয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব বিব্রত। একই অভিযোগ করেন ফার্মগেইটের পাঞ্জাবি ডটকমের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম। তিনি জানান, হিজড়ারা প্রায়ই মার্কেটে চাঁদা আদায় করতে যায়। না দিলে যেতে চায় না। দোকানের সামনে বসে থাকে। ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়েই তবে বিদায় করতে হয় তাদের। শ্যামবাজার গ্রুপের হিজড়ারারা শুধু মার্কেটে না তারা রাস্তাঘাটেও চাঁদা আদায় করে থাকেন। মতিঝিল, গুলিস্তান, বাবুবাজার, সদরঘাট, কমলাপুর রেলস্টেশন, রামপুরা, খামারবাড়ি, মিরপুর, গাবতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থাকেন তারা। মাছুরা গ্রুপটি খালে, বিলে, নদীতে চাঁদাবাজির কথা থাকলেও তারা এখন সর্বত্রই চাঁদাবাজি করে থাকেন। বিশেষ করে ঢাকায়। এ ছাড়া এই গ্রুপটি বাসায় রান্না-বান্নার কাজও করে থাকেন। সব মিলিয়ে ঢাকায় হিজড়াদের মাসিক চাঁদার পরিমাণ কত তা নির্দিষ্টভাবে কেউ জানাতে পারেননি। তবে কোনো কোনো সূত্রমতে, পুরো রাজধানী থেকে মাসে কোটি আয় করে থাকেন হিজড়ারা। এই টাকায় ভাগ বসান স্থানীয় অনেক সন্ত্রাসী। তারা বিভিন্নভাবে হিজড়াদের সঙ্গে মিশে গেছেন। অনেক সন্ত্রাসী রয়েছেন যারা হিজড়াদের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে তাদের সঙ্গে বসবাস করেন। সূত্রে জানা গেছে, হিজড়াদের এক নেত্রীর বয়ফ্রেন্ড হিসেবে তার সঙ্গে থাকেন আরমান নামের এক যুবক। ওই যুবক এক সময়ে যাত্রাবাড়ীর এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও অনেকে ছদ্মবেশ ধারণ করে হিজড়া নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে রাজউক মার্কেটের পেছনে  হিজড়াদের দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের গ্রুপের শক্তি প্রদর্শনের জন্য হিজড়া নেতারা অস্ত্র সংগ্রহে রাখেন। এ ছাড়াও তাদের সঙ্গে সখ্যতা থাকে অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীদের। হিজড়াদের একটি গ্রুপ মাদক বিক্রয়েও সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে হিজড়া নেতা আবুল জানান, অনেকেই অনেক খারাপ কাজ করছে। টাকা উত্তোলনের নামে চাঁদাবাজি, ছিনতাই করছে। মাদকও বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তবে কারা এতে জড়িত তা জানা নেই বলে জানান তিনি।
হিজড়া নেতাদের অনেকেই  অঢেল সম্পত্তির মালিক। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে জানা গেছে। পুরান ঢাকায় মেসবাহ হিজড়ার অধীনে রয়েছে অর্ধশত হিজড়া। নানা ধরনের চাঁদাবাজি, অনৈতিক কাজই তাদের আয়ের উৎস। খিলক্ষেত এলাকায় নাজমার অধীনে রয়েছে অন্তত ৩৫ হিজড়া। তার রয়েছে বিপুল টাকা। বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে সুদে টাকা দিয়ে থাকেন নাজমা। একইভাবে আরামবাগের আবুল হিজড়ার রয়েছে কোটি কোটি টাকা মূূল্যের দুটি বাড়ি। দক্ষিণ গোড়ান সিদ্দিকবাজার এলাকার ময়না হিজড়ার রয়েছে বিলাস বহুল বাড়ি। খিলগাঁও এলাকার মাদক বিক্রেতা রেখা ও ফাতেমার সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত ময়না হিজড়ার গ্রুপটি।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, অপরাধী যেই হোক অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু হিজড়াদের অপরাধ নিয়ে কেউ তেমন কোনো  অভিযোগ করেন না বলে জানান তিনি।

তারেকের পদেও সরাসরি নির্বাচন

গতকাল বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন পদের মতো সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও সরাসরি নির্বাচন হবে। এ জন্য গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধন অনুমোদন করেছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কথা বলেন। এতে গতকাল বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হলেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান। এবারও এই দুই পদে তাঁরাই প্রার্থী হচ্ছেন বলে দলটির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ২০০৯ সালে বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলে তারেকের জন্য সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়। এর আগে তারেকের জন্য সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদও সৃষ্টি করা হয়। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান একই ক্ষমতা ভোগ করবেন। এ কারণে চেয়ারপারসনের সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য জানিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচনের সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধন করার জন্য চেয়ারপারসনকে অনুরোধ করা হয়। স্থায়ী কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে দলের চেয়ারপারসন গঠনতন্ত্রের ১৯ ‘ক’ ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী অনুমোদন করেছেন।
সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় দলের চেয়ারপারসন ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন পরিচালনায় একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দীন সরকারকে এই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। আর হারুন-আল-রশীদকে সদস্য ও মো. আমিনুল হককে সদস্যসচিব করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যথাসময়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নেবে।
স্থায়ী কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মামলা করার অনুমতি দেওয়ার নিন্দা জানানো হয়েছে। সভায় বলা হয়, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন মামলা করা একটি গভীর চক্রান্ত।’
সভায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র আবদুল মান্নান, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ সব বন্দীর মুক্তি দাবি করা হয়। সভায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ, এম এ সালামসহ আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করা হয়।
স্থায়ী কমিটির সভায় জাতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে ১৫টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

জাতীয় বীর মাখন অনাদৃত by নূরে আলম সিদ্দিকী

গভীর বেদনাপ্লুত চিত্তে অবলোকন করলাম, কী নিষ্প্রভভাবে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য, জাতীয় বীর আব্দুল কুদ্দুস মাখনের মৃত্যুবার্ষিকীটা চলে গেল! আমরা অবশ্য ঘরোয়াভাবে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম। আরেকটু বৃহৎ পরিসরে করতে পারিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে। এটাও আমাকে আত্মগ্লানিতে ভোগাচ্ছে। কিন্তু একজন জাতীয় বীরের এই মৃত্যুদিবসে সংবাদপত্র ও বৈদ্যুতিক মাধ্যমগুলো দিনটিকে যতটা গুরুত্ব প্রদানের প্রয়োজন ছিল তাও করেনি। এমনকি রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি পর্যন্ত আসেনি। যতদূর মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার(!) ভুল করেও এই বদান্যতা কখনো দেখান নি। অথচ ১৯৯৪ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি যেদিন তিনি মারা যান, বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় থাকলেও তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংসদ অধিবেশন মুলতবি করা হয়েছিল। তখনকার সংসদ সদস্য এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব শাজাহান সিরাজ সংসদে প্রত্যয়দৃঢ় বক্তৃতা করে সংসদ মুলতবি করতে সরকারকে বাধ্য করেছিলেন। তবুও সংসদ মুলতবি করাটা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে গুরুত্ব প্রদানের একটি ইতিবাচক দিক। পুরো তিন দিন তার লাশ হিমাগারে ছিল। সমগ্র ছাত্রসমাজসহ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের দাবি ছিল, সামরিক শকটে জাতীয় গোরস্তানে তাঁর দাফন হবে। এই দাবি নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। বিএনপির পক্ষে সর্বজনাব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, আমানউল্লাহ আমান ও খোকন এবং আমাদের তরফ থেকে মরহুম আবদুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শাজাহান সিরাজ ও আমি। আমাদের দাবিটির যথার্থতা স্বীকার করে স্বল্পভাষিণী খালেদা জিয়া বললেন, উনি একজন বেসামরিক ব্যক্তিত্ব, তাই সামরিক শকট দিতে হলে একটা জাতীয় ঐক্যের ওপর ভিত্তি করেই দিতে হবে। আপনারা বিরোধী দলের নেত্রীর পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রদান করান, আমার পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকবে না। তিন দিন ধরে গ্রিন রোডে বিরাট শামিয়ানা টাঙিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা খণ্ড খণ্ড বক্তৃতা চলতো এবং জাতীয় উল্লেখযোগ্য সকল স্তরের নেতৃত্বের পদচারণায় এলিফ্যান্ট রোড উজ্জীবিত হয়ে থাকত। বিরোধীদলের নেত্রী শেখ হাসিনাও প্রতিদিন অপরাহ্নে ওখানে যেতেন এবং সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন মহিলা নেতৃত্বের সঙ্গে অনেক সময় ব্যয় করতেন। তা সত্ত্বেও তার বিবৃতিটি সংবাদপত্রে আসেনি। তার যুক্তি হলো- যেখানে সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমানরা শায়িত আছে, সেখানে আমাদের কেউই শায়িত হবে না। অবশ্য তখন রমজানের সময়। অসংখ্য লোক দাবিতে এতই অনড় ছিল যে, তারা অনশন করবে এবং দাবির স্বপক্ষে অনড় থাকবে। একে তো রমজান মাস, দ্বিতীয়ত- আমার হাতে কোনো সংগঠন নেই, আমি রাজনীতির বাইরে; শাহজাহান সিরাজও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। উপরন্তু, মাখনের স্ত্রী মরহুমা হাসুসহ পরিবার থেকে চাপ আসতে লাগলো, রুহের কষ্ট হবে, দাফনের ব্যবস্থা করুন। অনেক কষ্টে সকলকে শান্ত করে আমরা জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাজার ব্যবস্থা করলাম। সেই জানাজা লক্ষ লোকে ভরপুর এবং প্রায় সমগ্র জাতীয় নেতৃত্বই সেই জানাজায় অংশ নেন। মাইকে অশ্রুসিক্ত নয়নে আবেগভরা বক্তৃতা করে উত্তেজিত জনতাকে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে লাশ দাফন করা হলো। অবশ্যই সামরিক বাহিনীর বিউগল বেজেছে, কামানও গর্জে উঠেছিল। আমি জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অশ্রুসিক্ত নয়নে সেদিন বলেছিলাম- মাখন, তোমার সামরিক শকটের প্রয়োজন নেই, লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল তোমাকে গোরস্তানে নিয়ে যাবে। আজও তার পুনরাবৃত্তি করেই বলতে চাই, আপাত দৃষ্টিতে আজকে যত অনাদৃতই হও না কেন, মুক্তিযুদ্ধে তোমার গৌরবময় স্মৃতি ইতিহাস একদিন অকপটে তুলে ধরবে।

আমি এখন অনেক সতর্ক -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

অতীতের চেয়ে এখন অনেক বেশি সতর্ক বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, এনএসটি ফেলোশিপ ও গবেষকদের বিশেষ অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশ-বিদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ এবং গবেষকদের বিশেষ অনুদান দেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে গতকাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালের ফেলোশিপ ও অনুদানের চেক স্ব স্ব ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেন।
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বিএনপির আমলে বন্ধ করে দেয়ার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার অভিজ্ঞতা আছে, এভাবে কাজ করে গেলেও সরকার পরিবর্তন হলে সেই সরকারের যদি দেশপ্রেম না থাকে, দেশের মানুষের প্রতি যদি তাদের কোনো দায়িত্ববোধ না থাকে তাহলে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু তারা বন্ধ করে দিতে পারে। তাই, আমি এখন অতীতের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গবেষণার জন্য অনেক মেধাবীকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেকের গবেষণা মাঝপথেই বাতিল করে দেয়। গবেষণা  যাতে কেউ বন্ধ করতে না পারে সেজন্য বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপকে ট্রাস্ট ফান্ডে রূপান্তর করা হবে বলে উল্লেখ করেন দেশের সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেখা গেলো গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। সে বছরই গবেষণার জন্য ১২ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দিয়েছিলাম। এখন যে সারা বছরই তরিতরকারি পাওয়া যাচ্ছে, এটি সে সময়কার বরাদ্দে কৃষি গবেষণার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, ২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সেসব প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছিল। যারা বিদেশে গবেষণা করছিলেন, তাদের গবেষণাও বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে আবার সেসব প্রকল্প চালু করতে হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধিসহ দেশের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যারা একসময় বাংলাদেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো তারা মনে করতো বাংলাদেশ ভিক্ষা চেয়ে চলবে। এখন তারা দেখছে- বাংলাদেশ তা নয়। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনকারী দেশ। আমাদেরকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। দেশ ও জাতির প্রতি ‘কর্তব্যবোধ, মমত্ববোধ ও ভালোবাসা’ থাকলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ শুরু করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট। এই পদ্মাসেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমাকে, আমার পরিবারকে দুর্নীতিবাজ বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে, দেশকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পদ্মা সেতুকে আমি যখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলাম, সেখানে দুর্নীতির কোনো কিছু তারা দেখাতে পারলো না।
বাংলাদেশের কেউ জ্বালাও-পোড়াও আর দেখতে চায়না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা, শিশু হত্যা, বোমা হামলার কারণে ছাত্রছাত্রী স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না- এই দৃশ্য আমরা আর দেখতে চাই না। বাংলাদেশের কেউ এটা চায় না। দেশের সবাই নিরাপদে চলবে, সুন্দরভাবে বাঁচবে- এটাই আমরা চাই। আজকের শিশুরা আগামী দিনের কর্ণধার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা অনেক মেধাবী, আমাদের চাইতেও বেশি মেধাবী। তারা এই যুগের ডিজিটাল বাচ্চা হিসেবে বড় হচ্ছে। শিশুরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে, উন্নত জীবনধারণ করবে- সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। আজকের যারা শিশু, তারাই আগামী দিনে কর্ণধার হবে। আর সেটা হতে হবে আরও বেশি শিক্ষিত হয়ে, জ্ঞান অর্জন করে।
শিক্ষার্থীদের সবার আগে লেখাপড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার দিকে মন দেয়ার মাধ্যমে বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ২০৪১ সালে আমাদের নতুন প্রজন্ম যাতে উন্নত জীবন পায় সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের বর্তমানকে আমরা উৎসর্গ করেছি। তাই নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি হোক, দেশ আরও এগিয়ে যাক- আমরা সেই প্রত্যাশাই করছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষানীতির আলোকেই আমরা নতুন শিক্ষানীতি করেছি। শিক্ষাকে বহুমুখীকরণের উদ্যোগও আমরা নিয়েছি। এ লক্ষ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের পাশাপাশি ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করেছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞানবিষয়ক লেখাপড়ার আগ্রহ কমে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষার্থীদের সেই আগ্রহ বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য আগে বৃত্তি দেয়া হয়নি। সেই বৃত্তি দেয়ার ব্যবস্থাও করেছি। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা স্বতন্ত্র ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি-২০১১ প্রণয়ন করেছি। দুটি নীতিতেই জাতির পিতার দেখানো পথ অনুসরণ করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. আ.ফ.ম রুহুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সিরাজুল হক খান। এ বছর ৫০ জন এমএস, ১৬০ জন পিএইচডি, ১১ জন পোস্ট ডক্টোরাল স্টুডেন্ট এবং গবেষককে দেশ-বিদেশে উচ্চ শিক্ষা-গবেষণার জন্য ফেলোশিপ প্রদান করা হয়।
নাশকতা মামলায় জামিনপ্রাপ্তরা নজরদারিতে-প্রধানমন্ত্রী
জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নাশকতার মামলায় যারা জামিন পেয়েছে, তারা যাতে আবারও অনুরূপ অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য তাদের নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া, পার্বত্য শান্তিচুক্তির সকল ধারা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই আমরা পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছিলাম। ইতিমধ্যে অনেক ধারাই বাস্তবায়ন হয়েছে। আগামীতে শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে। গতকাল সংসদে প্রশ্নোত্তর-পর্বে তিনি একথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত  ঊষাতন তালুকদার। জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যাবতীয় ব্যবস্থা আমরা করেছি। যারা চাকরি চেয়েছিল, আমরা তাদের চাকরি দিয়েছি। ভারত থেকে ৬৪ হাজার শরণার্থী ফেরত এনেছি। তাদের জীবন- জীবিকার জন্য যা যা করা দরকার তা আমরা করেছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কর্মকর্তাদের সহায়তা পেলে আরও দ্রুত করা সম্ভব হতো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হঠাৎ করেই চুক্তি করেছি, তা নয়। আমি ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর ওই অঞ্চলে যখনই কোনো ঘটনা ঘটেছে আমি তখনই ছুটে গেছি। সমস্যার বিষয়গুলো আমার জানা ছিল, সমাধানের পথ কি তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করেছি। আমরা সব সময় বলেছি, সমাধান হবে সংবিধানের ভেতরে থেকে। তিনি আরও বলেন, যখন চুক্তি হয় বিএনপি-জামায়াত তার বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। উনি তখন ফেনীর সংসদ সদস্য। উনাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ফেনী যদি ভারত হয়ে যায়, তাহলে কি উনি ভারতের সংসদে গিয়ে বসবেন। তিনি বলেন, যেদিন অস্ত্র সমর্পণ হয়, সেদিন বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় হরতাল-অবরোধ ডেকে ছিল, যাতে অস্ত্র সমর্পণ না হয়। নিরাপত্তার সকল বাধা উপেক্ষা করে এই ১০ই ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। শামসুল হক চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এয়ারপোর্ট করতে হলে, পাহাড় কেটে করতে হবে। সেটা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ভালো হবে না। আমরা রাস্তা করে দিচ্ছি, কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বেশি দূরে নয়। প্রশস্ত রাস্তা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য রাস্তা দিয়ে চলাই সুন্দর হবে। এয়ারপোর্টের দরকার নেই।
পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হয়নি
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণকাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি স্থগিত করে। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বিশ্বব্যাংকের সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন, তবে একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে আবারও ফিরে আসার ঘোষণা দিলেও নতুন নতুন শর্তারোপ করে দীর্ঘসূত্রতার পথ অবলম্বন করেছিল। এ কারণে বিশ্বব্যাংকের ঋণ না নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাহসী ও স্বাধীনচেতা নেতৃত্ব ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের ফলেই সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়। এ সেতু নির্মাণে অন্য কোনো দেশ থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে না। সংসদ নেতা আরও বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আওতায় পদ্মা সেতুতে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়ন প্রাপ্তিসাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের জন্য পায়রা বন্দরে একটি ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকার নিয়েছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীর বৃহত্তম হাইওয়ে সেতুর মধ্যে (ভায়াডাক্টসহ) পদ্মা সেতুর অবস্থান ২৫তম। তবে নদীর ওপর নির্মিত সেতুর মধ্যে এ সেতুর অবস্থান প্রথম এবং ফাউন্ডেশনের গভীরতার দিক থেকেও এ সেতুর অবস্থান প্রথম।
নাশকতা মামলায় জামিনপ্রাপ্তরা নজরদারিতে
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নাশকতার মামলায় যারা জামিন পেয়েছে, তারা যাতে আবারও অনুরূপ অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য তাদের নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি নাগরিকদের বসবাসের এলাকা ও চলাচলের রাস্তাগুলোতে গোয়েন্দা কার্যক্রম অধিকতর জোরদার করা হয়েছে। ডিপ্লোমেটিক এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ চলমান টহল আরও নিবিড় ও চেকপোস্ট ডিউটি জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, নিরাপত্তা ঝুঁকি পর্যালোচনা করে জনসাধারণের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা নিশ্চিতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পুলিশের মাধ্যমে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ জনসাধারণের সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে অভিযোগের গুরুত্বানুসারে চাকরি থেকে বরখাস্তসহ বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে বলেও তিনি সংসদকে জানান।

তৃণমূলের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোট? by রজত রায়

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমান বসু ও অধীর চৌধুরী
সুসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী একটা কথা প্রায়ই বলতেন, বিপদে পড়লে শয়তানেও মাছি ধরে খায়। গণতন্ত্রের আঙিনায় কোনো রাজনৈতিক দলকেই শয়তানের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের মুখে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস ও সিপিআইএম নেতাদের দেখে ওই উপমা মনে পড়ে যেতে বাধ্য। স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন আবর্তিত হয়েছিল কংগ্রেস ও বামপন্থীদের তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল—সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ বছর কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থেকেছে। আর ১৯৭৭ সাল থেকে সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকেছে। মাঝে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল—এই পাঁচ বছরে একাধিক জোড়াতালির সরকার স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতাসীন ছিল, কিছুটা সময় রাষ্ট্রপতির শাসনও জারি ছিল।
রাজ্য রাজনীতির এই মেরুকরণের প্রক্রিয়ায় কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। তা আরও বাড়িয়ে দেয় ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারির পরের ২২ মাসে পশ্চিমবঙ্গে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকারের আমলে বামপন্থীদের ওপরে নেমে আসা পুলিশি অত্যাচার। তা দুই শিবিরের সম্পর্ককে আরও তিক্ত ঘৃণায় পরিণত করে। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জ্যোতি বসু কংগ্রেসি অপশাসনের কথা বলার সময় প্রায়ই দাবি করতেন, শুধু জরুরি অবস্থার সময়েই ১ হাজার ১০০ বামপন্থী কর্মীকে খুন করা হয়েছিল। অন্যদিকে, কংগ্রেসও পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি থেকে উদ্বাস্তু শরণার্থীদের পুলিশ দিয়ে উচ্ছেদের জন্য গুলি চালিয়ে গণহত্যা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকজনের ওপর ধারাবাহিক সন্ত্রাস ইত্যাদি নানা অন্যায়ের অভিযোগে সোচ্চার থেকেছে।
এর বিপরীতে কেন্দ্রে বামপন্থীরা অবশ্য মাঝেমধ্যেই কংগ্রেসের হাত ধরেছে। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ইন্দিরা গান্ধীর প্রার্থী ভি ভি গিরিকে জেতাতে সাহায্য করা, ১৯৯১-৯৬ সালে পি ভি নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে সংখ্যালঘু থাকা সত্ত্বেও লোকসভায় একাধিকবার অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট না দিয়ে ওয়াকআউট করে কংগ্রেস সরকারকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করার নজির তো রয়েছেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় নজির তৈরি হয় ২০০৪ সালে। বিজেপিকে ঠেকাতে সেবার বামপন্থীরা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকারকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের এই ঘনিষ্ঠতা আগে কখনোই পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের কংগ্রেসকে কাছে টানতে উৎসাহিত করেনি।
এখন করছে। অবশ্য এখন শুধু বামপন্থীরাই নন, পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতারাও দুই পক্ষের সঙ্গে জোট বেঁধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তূণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার কথা বলছেন। ইতিমধ্যে জোট প্রস্তাব নিয়ে রাজনীতির জল অনেক দূর গড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেস প্রতিনিধিদল দিল্লিতে গিয়ে কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছে। এবার সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন রাজ্যের নেতারা। অপেক্ষায় রয়েছে বামফ্রন্টের প্রধান শরিক সিপিআইএম দলও। তাদের রাজ্য কমিটি বৈঠকে বসছে ১২-১৩ ফেব্রুয়ারি, তারপর দিল্লিতে ১৬ তারিখ পলিটব্যুরো এবং ১৭-১৮ তারিখ কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হবে। কেন্দ্রীয় কমিটিই চূড়ান্ত করবে, বামপন্থীদের সঙ্গে কংগ্রেসের নির্বাচনী জোট হবে কি না।
এত দিনের বৈরিতা সরিয়ে রেখে দুই শিবিরেরই রাজ্যস্তরের নেতারা যে এখন পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তা এক কথায় তাঁদের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার ফসল। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাম ও কংগ্রেস উভয়েরই অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অবশ্যই এ পরিস্থিতি তৈরিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় অবদান রয়েছে। তিনি ২০১১ সালে নির্বাচনে জেতার পর বলেছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল চাই’। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ঠিক উল্টোটাই ঘটল। ভোটের পরপরই পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় মমতার দলের লোকজন সিপিএমের কয়েকজনকে নৃশংসভাবে খুন করে। সেই আক্রমণ এখনো চলছে। ২০১১ সালের নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত সিপিএমের অন্তত ১৭০ জন রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়েছেন, বেশির ভাগই তূণমূল কংগ্রেসের হাতে। তূণমূলের সশস্ত্র গুন্ডা বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে গ্রামাঞ্চলের কয়েক হাজার সিপিএম কর্মী ও সমর্থক বছরের পর বছর গ্রামছাড়া। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আরও বহু মানুষ কারাবন্দী। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় সিপিএমের অসংখ্য দলীয় কার্যালয় গায়ের জোরে তূণমূল কংগ্রেসের লোকজন দখল করে নিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের ওপর তূণমূল কংগ্রেসের অত্যাচার এতটাই বেশি যে বহু সিপিএম কর্মী জান ও জীবিকা বাঁচাতে তূণমূলের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁদের ঝান্ডা হাতে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তূণমূল কংগ্রেসের এই লাগামছাড়া আক্রমণের হাত থেকে কংগ্রেসও রেহাই পায়নি। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা আবদুল মান্নান হিসাব দেন, অন্তত ২৫ জন কংগ্রেস কর্মী এই পাঁচ বছরে শাসক দলের গুন্ডাদের হাতে খুন হয়েছেন। বহু জায়গায় দলীয় কার্যালয় জোর করে দখল করা হয়েছে। কংগ্রেসের বিধায়ক, পুরসভার প্রধান ও অনেক কর্মীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তূণমূলে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে কংগ্রেস করার ‘অপরাধে’ বহু টাকা জরিমানা আদায় করছেন তূণমূল কংগ্রেসের সশস্ত্র কর্মীরা, এমনকি বামপন্থীদের কাছ থেকেও।
গত পাঁচ বছরে রাজ্যে তিন স্তরের পঞ্চায়েত, পুরসভা ও লোকসভার নির্বাচন হয়েছে। তার মধ্যে লোকসভা নির্বাচন বাদে বাকি দুটিই পরিচালনা করে থাকে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই দেখা গেল, রাজ্য পুলিশের সক্রিয় সহযোগিতা ও নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতার সুযোগে অসংখ্য জায়গায় গায়ের জোরে বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিদের নির্বাচনী বুথের বাইরে বের করে দিলেন তূণমূল কংগ্রেস কর্মীরা। বুথ দখল ও জাল ভোট তো চললই, তার সঙ্গে নতুন উপাদান হিসাবে যুক্ত হলো বিরোধী সমর্থক বেশি এমন সব গ্রামে সশস্ত্র মোটরবাইক বাহিনী পাঠিয়ে ভোটদাতাদের ভোটদানে নিরস্ত রাখা। ফলে, তূণমূলের জয়ের ধারা অব্যাহত থাকলেও তাতে কতটা জল মেশানো, তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ল।
অন্যদিকে, কলকাতায় ও বিভিন্ন জেলার স্কুল-কলেজের পরিচালন সমিতিতে দলীয় লোকজনকে বসিয়ে সেখানকার পরিবেশ এখন এতটাই কলুষিত করে তোলা হয়েছে যে আবার পরীক্ষার হলে গণটোকাটুকি ফিরে আসছে। তূণমূল কংগ্রেসের রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে সমাজজীবনেও অসহিষ্ণুতার বাড়াবাড়ি এখন এতটাই যে একটা দমবন্ধ করা অবস্থায় পড়েছে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীসমাজও। কোনো সন্দেহ নেই, এই অসহিষ্ণুতার পরিবেশ ঘনিয়ে তোলার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছেন মমতা নিজে সবচেয়ে বেশি। ব্যঙ্গচিত্র-কাণ্ডে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বরীশ মহাপাত্রকে বেআইনিভাবে জেলে পুরে রাখা, ঝাড়গ্রামে জনসভায় সারের দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া কৃষককে মাওবাদী বলে ধরিয়ে দেওয়া, টিভি টকশোতে মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার অপরাধে প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতী ছাত্রীকে মাওবাদী আখ্যা দেওয়ার মতো বহু কাজ করে দলীয় কর্মীদেরও বিরোধী দল ও বিরুদ্ধমতের পোষকদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে উৎসাহিত করেছেন তিনি। অন্যদিকে, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসার পর মমতার আমলে কোনো বড় বা মাঝারি শিল্পে নতুন বিনিয়োগ হয়নি। ফলে একদিকে রাজ্যে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে, অন্যদিকে খুন–ডাকাতি থেকে শুরু করে নানা অপরাধ সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের এপ্রিল-মে মাসে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন ঘিরে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তূণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়ে। মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে তূণমূল কংগ্রেস পায় ১৮৪টি, কংগ্রেস ৪২টি। অন্যদিকে বামফ্রন্ট মাত্র ৬২টি। মোট বৈধ ভোটের ৪৩ শতাংশ তূণমূল কংগ্রেস পায়, কংগ্রেস ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে ৫২ শতাংশ। বামপন্থীরা পায় ৩৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০১৪ সালে কংগ্রেস একা লড়ে মোট ভোটের ৯ দশমিক ৬ শতাংশ পায়, অর্থাৎ নিজেদের ভোট তারা প্রায় পুরোটাই ধরে রাখে। অন্যদিকে, মোদি হাওয়ায় বিজেপি নাটকীয়ভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে যাওয়ায় তূণমূল কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট উভয়েরই ভোট কমে। তূণমূল কংগ্রেস পায় ৩৯ দশমিক ৯০ শতাংশ, বামপন্থীরা ৩০ শতাংশ। এখন নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা জোট বেঁধে লড়লে তূণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটা জোরদার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা, এটা মাথায় রেখেই কংগ্রেস ও বামপন্থীরা কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। যদি নির্বাচন কমিশন এবার তাদের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী ঠিকমতো ভূমিকা পালন করে, তাহলে যে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে শাসক দলকে জবরদস্ত মোকাবিলার সামনে পড়তে হবে, সেটা বুঝেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কিছুটা শঙ্কিত। তাই তিনি নিজে একবার এই জোট সম্ভাবনাকে অনৈতিক কাজ বলে আক্রমণ শাণাচ্ছেন, কখনো একে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন।
রজত রায়: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক।

খায়রুল হক বিতর্কে নতুন মাত্রা

অবসরের পর রায় লেখা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায় প্রকাশের পর এ নিয়ে সর্বপ্রথম বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। স্পষ্টত অবসরের পর রায় লেখার চেয়েও সে সময় বড় প্রশ্ন ওঠে- রায়ে পরিবর্তন নিয়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আদেশের অংশ যখন প্রকাশ্য আদালতে ঘোষণা করা হয়, তখন বলা হয়েছিল, সংসদ চাইলে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখতে পারবে। কিন্তু অবসরের ১৬ মাস পর বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের লেখা রায় যখন প্রকাশিত হয় তখন দেখা যায় দুই মেয়াদের অংশটি আর নেই।
অবসরের পর কোনো বিচারপতির রায় পরিবর্তন করতে পারেন কি-না সে নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখনও চলছে। তবে এ বিতর্কে নতুনমাত্রা যোগ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী। তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নাম মুখে তোলেননি। তবে ইঙ্গিত স্পষ্ট। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এক আলোচনা সভায় বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেন, আমি মনে করি না অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি। পদ্ধতিগত কারণে আপিল বিভাগের রায়ে দেরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে সেটা যৌক্তিক সময়, যেমন এক মাসের মধ্যে হতে পারে। কিছুতেই এক-দেড় বছর হতে পারে না। আর অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদেশের অংশ  কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। সেটা করতে গেলে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন ও শুনানি হতে হবে। কিন্তু তা না করেই যদি রাতের অন্ধকারে, এক-দেড় বছর পর রায় পরিবর্তন করে ফেলেন, তাহলে সেটা  ফৌজদারি অপরাধ। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর এ বক্তব্যের পর দু’টি প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, কোন ধরনের রিভিউ বা পুনঃশুনানি ছাড়া ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ে যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে তা আইনের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ। দ্বিতীয়ত, অবসরের ১৬ মাস পর এই ধরনের পরিবর্তন আনা আইনের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধ কি-না?
বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী যা বলেছেন-
মঙ্গলবারের আলোচনায় মাহমুদুল আমিন চৌধুরী আরও নানা ইস্যুতে কথা বলেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এই বিচার বিভাগ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি ধ্বংস হয়ে যাক আমরা তা চাই না। তবে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যখন ভালো কিছু শুনি তখন মনটা ভরে যায়। তিনি বলেন, অটোক্রেটিক সরকার থাকলে তার কথামতো চলতে হয়। তার কথামতো আইন হয়। সবকিছু হয় তার সুবিধামতো। আর গণতান্ত্রিক সরকারে তা নয়। জনগণের সুবিধার জন্য আইন হয়। সবকিছু হয়। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নাগরিকত্ব আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, এমন আইনের খসড়া সংসদে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকায় যে সংবাদ দেখেছি তা খুবই বিপদজনক। এই আইন হলে যে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে সরকার। এ আইনে আছে একজন ব্যক্তি রাজাকার প্রমাণিত হলে তার সম্পদ তার সন্তানেরা পাবে না। বাবার শাস্তি কি ছেলে ভোগ করবে? এটা হয় কি করে? ফৌজদারি আইনে তো একজনের শাস্তি আরেকজন ভোগ করতে পারে না। গণতান্ত্রিক সরকারে এসব থাকার কথা নয়। জনগণের জন্য আইন হওয়ার কথা। এ বিষয়ে আমাদের দেখা উচিত আমরা কোথায় যাচ্ছি? প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকাশ্য আদালতে রায় দিতে হবে। কেউ কেউ দেন না। হয়তো তিনি রায় লিখতে পারেন না বলেই দেন না। এখন নাকি রুল দেয়া নিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র মারামারি হয়। বিতর্ক হয়। সিনিয়র এজলাস থেকে নেমে যান। এটা খুবই দুঃখজনক। লজ্জাকর। এজন্য দায়ী আইনজীবীরা। কারণ আইনজীবীদের দায়িত্ব আদালতকে সহযোগিতা করা। আইনজীবীদের দায়িত্ব নয় কারও শাস্তির ব্যবস্থা করা, কাউকে খালাস করিয়ে দেয়া। রাষ্ট্র বা আসামিপক্ষের আইনজীবীর দায়িত্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতকে সহায়তা করা। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক প্রসঙ্গে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি এখন প্রেসকনফারেন্স করেন। এ বিষয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে। সংসদেই একজন নেতা তাকে বলেছিলেন স্যাডিস্ট। তাহলে একজন স্যাডিস্টকে আপিল বিভাগে নেয়া হলো কিভাবে? এখন তো প্রমাণিত হলো আসলেই তিনি স্যাডিস্ট। বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী আরও বলেন, এখন তো শুনি একেকজনের কাছে এক দেড়শ’ মামলা রয়েছে রায় লেখার অপেক্ষায়। এটা দুঃখজনক। একেকজনের কাছে এই বিপুল পরিমাণ রায় লেখার অপেক্ষায় থাকার কারণে বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্টের সর্বনাশ হয়েছে। এ রায় লেখা পড়ে থাকার জন্য দোষ আইনজীবীদের। আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বিচার বিভাগকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু আইনজীবীরা তা করছেন না। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনারা রাজনীতি করবেন কিন্তু তা আদালতের বাইরে। আদালত অঙ্গনে আপনাদের পরিচয় আপনারা আইনজীবী। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আপনারা কাজ করবেন। জুডিশিয়ারি বাঁচাতে হলে আপনাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে। বিচার বিভাগের সংস্কারে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন দিতে আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। আপনাদের উচিত তাকে সহযোগিতা করা। বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আপনারা বিচার বিভাগকে বাঁচান। দেশ রক্ষা করুন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করুন।
একই আলোচনায় হাইকোর্টের  অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন যখন আসবে তখন আইনজীবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমি বারের সম্পাদক ছিলাম তখন বারের সদস্য ছিল আড়াই হাজার। এরপর ১৫ বছর জজিয়তি করেছি। এখন বারের সদস্য সাড়ে ৬ হাজার। এটা উৎসাহজনক। তিনি বলেন, এই সুপ্রিম কোর্টে আপনারা (আইনজীবী) আছেন, থাকবেন। আপনারাই ন্যায় বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মশাল তুলে ধরবেন। আর এর জন্য শর্ত একটাই আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিচারপতি নজরুল বলেন, ১৫ বছর যখন হাইকোর্টে বিচারক ছিলাম তখন কেউ কখনও অন্যায় অনুরোধ নিয়ে আমার সামনে আসেননি। কারণ জানেন অনুরোধ করলে উল্টো ফল হবে। বিচারক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিমগাছ থেকে ফজলি আম আশা করা বাতুলতা মাত্র। ফজলি গাছ রোপণ করেন তাহলে ফজলি আমই পাবেন। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিমালা করার জন্য আপনাদের সোচ্চার হতে হবে।

আইনি জটিলতায় সহসাই দায়িত্ব নিতে পারছেন না কারাবন্দি মেয়র গউছ

আইনি জটিলতার কারণে সহসা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছেন না কারাবন্দি হবিগঞ্জ পৌর মেয়র আলহাজ জি কে গউছ। গত ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে সাবেক অর্থমন্ত্রী  শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে থাকা আলহাজ্ব জি কে গউছ হবিগঞ্জ পৌরসভায় পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর গত ১০ই জানুয়ারি এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। গত ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জ পৌরসভার পুনঃনির্বাচিত মেয়র জি কে গউছ ও কাউন্সিলরগণ শপথগ্রহণ করেন। শপথগ্রহণের পর জি কে গউছ দায়িত্বগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। স্থানীয় সরকারের বিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পৌর পরিষদের ১ম সভা অনুষ্ঠানের কথা। এ প্রেক্ষিতে ৭ই ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় দায়িত্বভার হস্তান্তরের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সিলেট কারাগারে বন্দি মেয়র জি কে গউছকে হবিগঞ্জ পৌরসভায় আনা হয়নি। এ অবস্থায় দায়িত্বভার হস্তান্তর অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। এদিকে গত পরিষদের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি। নির্ধারিত সময়ে পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরগণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে না পারলে তাদের ভাগ্যে কি ঘটবে এ নিয়ে নবনির্বাচিতদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, সিলেটের  জেল সুপারের মাধ্যমে জি কে গউছের দায়িত্বগ্রহণের ব্যাপারে একটি আবেদন পেয়েছি। এ বিষয়টি আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবগত করলে তারা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়র জি কে গউছের দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র পিয়ারা বেগম জানান, নিয়ম অনুযায়ী আমার দায়িত্ব নির্বাচিত মেয়রের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে মেয়র জি কে গউছ না আসায় আমি দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারিনি। আমি নির্বাচিত মেয়রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চাই। এ ব্যাপারে সরকার শিগগিরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আমি আশাবাদী। উল্লেখ্য, গত পৌর নির্বাচনে কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে  মেয়র পদে তৃতীয়বারের মতো পুনঃনির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন আলহাজ্ব জি কে গউছ। পরে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে শপথগ্রহণ করেন তিনি।

কোন শক্তি বিশ্ব অর্থনীতির রাশ টেনে ধরছে? by জোসেফ ই স্টিগলিৎস ও হামিদ রশিদ

২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার পর ২০১৫ সালে এসেও বৈশ্বিক অর্থনীতি হোঁচট খেয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টাস ২০১৬-তে দেখা গেল, সংকটের পর থেকে উন্নত দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধির হার ৫৪ শতাংশেরও বেশি কমেছে। উন্নত দেশগুলোতে বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ, যেটা ২০০৭ সালের তুলনায় ১ কোটি ২০ লাখ বেশি, আর গত বছর সেখানকার মূল্যস্ফীতির হারও সংকটের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা বিস্ময়কর, কারণ উন্নত দেশ হওয়ায় তাদের ক্যাপিটাল হিসাব সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, ফলে পুঁজির অবাধ প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগের কারণে তাদের লাভবান হওয়ার কথা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সামষ্টিক অর্থনীতি অতটা অস্থিতিশীল হওয়ার কথা নয়। এ ছাড়া বেকার ভাতার মতো সামাজিক কর্মসূচির কারণে পরিবারের ভোগ চাহিদাও স্থিতিশীল থাকার কথা। কিন্তু সংকট-উত্তরকালে অধিকাংশ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ব্যয়সংকোচ ও কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের নীতি (কিউই) গ্রহণ করায় পরিবারের ভোগ, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ার তেমন সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এসব ক্ষেত্রে প্রণোদনা না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমরা দেখলাম, কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের কারণে ভোগ বা বিনিয়োগ কোনোটিই বাড়েনি, যার আংশিক কারণ হচ্ছে, দেশটিতে যে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়েছে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ হিসেবে জমা হচ্ছে। সেখানে ২০০৬ সালে যে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস রেগুলেটরি রিলিফ অ্যাক্ট হয়েছিল, তার কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ প্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত রিজার্ভের ওপর সুদ দেওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। এতে কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের লক্ষ্য বিনষ্ট হয়। সে সময় মার্কিন আর্থিক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলে যে ইমার্জেন্সি ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন অ্যাক্ট, ২০০৮ প্রণয়ন করা হয়, তার বদৌলতে রিজার্ভের সুদ প্রদান করার কার্যকর সময় তিন বছর বাড়ানো হয়, নতুন তারিখ নির্ধারিত হয় ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর। এর ফলে দেখা গেল, ফেডে সঞ্চিত রিজার্ভের পরিমাণ ব্যাপক বেড়ে গেল, ২০০০-০৮ সালে যেখানে গড় রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২০,০০০ কোটি ডলার, সেখানে ২০০৯-১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোক্তাদের ঋণ না দিয়ে ফেডে জমা রাখতে শুরু করে, ফলে গত পাঁচ বছরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত উপায়ে বছরে ৩,০০০ কোটি ডলার আয় করেছে। ফলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে ফেড আসলে আর্থিক খাতকে উদার ও মুক্তহস্তে ভর্তুকি দিল, যার চরিত্র অনেকটাই গোপন। আর গত মাসে ফেডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় এ বছর ওই ভর্তুকির পরিমাণ বাড়বে ১,৩০০ কোটি ডলার।
এ ধরনের বিকৃত প্রণোদনা দেওয়ার কারণে নিম্ন সুদের হারের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, যেটা আমরা আশা করেছিলাম। উল্লিখিত কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের কারণে প্রায় সাত বছর সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল, যার কারণে উন্নত দেশগুলোর ধার করে হলেও অবকাঠামো, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে উৎসাহিত হওয়া উচিত ছিল। সংকট-উত্তরকালে ক্রমবর্ধমান হারে যে সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তাতে সম্মিলিত চাহিদা বাড়ার এবং ভোগের ধরনও স্থিতিশীল হওয়ার কথা ছিল। আর জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তো দেখাই গেল, উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার একদম কমে গেলেও সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। ২০টি উন্নত দেশের মধ্যে ১৭টিতে দেখা যায়, সংকটের আগের সময়ের চেয়ে পরের সময়ে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে, তার মধ্যে আবার ২০১০-১৫ সালের মধ্যে পাঁচটি দেশের বিনিয়োগই কমে গেছে। বৈশ্বিক পরিসরে দেখা গেল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের যে নিরাপত্তা দিত, এই সময়ে তার পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে গেল, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করার কথা। অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে এটা থেকে বোঝা যায়, নিম্ন সুদের হারের সুযোগ নিয়ে অ-আর্থিক করপোরেশনগুলো ঋণ নিয়েছে। কিন্তু তারা এই টাকা বিনিয়োগ না করে সেটা দিয়ে নিজেদের ইকু্যইটি অথবা অন্যান্য আর্থিক সম্পদ কিনেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের কারণে লিভারেজ, মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ও আর্থিক খাতের মুনাফা বেড়েছে।
কিন্তু এগুলোর কারণে প্রকৃত অর্থনীতির তেমন একটা উন্নতি হয়নি। ফলে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখলেই বিনিয়োগ বা ঋণ নেওয়ার হার বেড়ে যাবে, এমন কথা নেই। ব্যাংকগুলোকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হলে তারা ঋণ না দিয়ে ঝুঁকিহীন মুনাফা লাভ ও আর্থিক ফাটকাবাজির পথ বেছে নেয়।
কিন্তু বৈপরীত্যমূলক ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ দেয়, তখন তারা শর্ত জুড়ে দেয়, এই টাকা দিয়ে কী করা যাবে আর কী যাবে না। কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে হলে শুধু ঋণ প্রদানের আনুষ্ঠানিক পদ্ধতির সংস্কার করলেই চলবে না, ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য দিতে হবে। ব্যাংককে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে উৎসাহিত না করে ফেডের উচিত, অতিরিক্ত রিজার্ভ রাখার জন্য ব্যাংককে শাস্তি দেওয়া।
সুদের হার একদম কমে যাওয়াটা উন্নত দেশের জন্য সুবিধাজনক হলেও উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান বাজারের জন্য তা লাভজনক নয়। উদ্দেশ্যমূলক না হলেও এ ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত নয়, সেটা হলো মুদ্রানীতি সহজীকরণের ফলে আন্তর্দেশীয় পুঁজির প্রবাহ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পুঁজি প্রবাহের হার ২০০৮ সালে যেখানে ২,০০০ কোটি ডলার ছিল, সেখানে ২০১০ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৬০,০০০ কোটি ডলার।
সে সময় অনেক উদীয়মান বাজারই এই পুঁজির প্রবাহ সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। এর খুব সামান্যই নির্ধারিত বিনিয়োগে ব্যয় হয়েছে। বস্তুত সংকট-উত্তরকালে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির হার কমে গিয়েছিল। ২০০৬ সালের পর এবারই প্রথম তারা পুঁজি রপ্তানি করতে যাচ্ছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ হবে ৬১,৫০০ কোটি ডলার।
মুদ্রানীতি বা আর্থিক খাত—কেউই তাদের যা করার সেটা করছে না। দেখা যাচ্ছে, তারল্যের জোয়ারের কারণে বেসদৃশভাবে আর্থিক সম্পদ বাড়ছে, সম্পদের বুদ্বুদ সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু সে কারণে কোনোভাবেই প্রকৃত অর্থনীতি তেজি হচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে ইকু্যইটির মূল্য ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক জিডিপির অংশ হিসেবে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের হার অনেক বেশি। ফলে আরেকটি আর্থিক সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নীতির আরও কিছু শাখা-প্রশাখা আছে, যার মাধ্যমে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শুরু করতে হবে বৃহত্তর সমতা অর্জনে বাজার অর্থনীতির নিয়ম পুনর্লিখন করে, কার্যকর বিধিবিধানের মাধ্যমে আর্থিক খাতের রাশ টেনে ধরে, সঙ্গে থাকবে প্রণোদনা দেওয়ার কার্যকর কাঠামো, চিন্তা করতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে। কিন্তু সরকারকে অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। এই টাকার অন্তত কিছুটা আসতে হবে পরিবেশ কর, যেমন: কার্বন কর এবং একচেটিয়া ব্যবসা ও ভাড়ার ওপর আরোপিত কর থেকে, যেটা বাজার অর্থনীতিতে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, আর যার কারণে অসমতা বাড়ছে, প্রবৃদ্ধির গতি কমছে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
জোসেফ ই স্টিগলিৎস: নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন অর্থনীতিবিদ।
হামিদ রশিদ: জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের গ্লোবাল ইকোনমিক মনিটরিংয়ের প্রধান।

সংবিধানের অবমাননায় কেন এমন নিয়োগ? by ইকতেদার আহমেদ

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এটি জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিতে রচিত। উচ্চাদালতের বিচারকদের সকল ধরনের প্রলোভনের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য ৭২’র সংবিধানে তাঁদের অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের কর্মে যে কোনো ধরনের নিয়োগ বারিত ছিল। পরবর্তীতে দেশ সামরিক শাসনের কবলে পড়লে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দ্বারা সংবিধানের ৯৯ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করত: উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের লাভজনক বিচারিক বা আধা-বিচারিক পদে নিয়োগের জন্য এবং হাইকোর্ট বিভাগ হতে অবসর পরবর্তী আপিল বিভাগে ওকালতি করার জন্য যোগ্য করা হয়। উক্ত সামরিক ফরমানটি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশ হিসেবে স্থায়ী রূপ পায়। অতঃপর সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদে আসীন হওয়ার জন্য যোগ্য করা হয়। উল্লেখ্য, উভয় পদই প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলে দেশের সর্বমহল হতে ৭২’র সংবিধানের প্রত্যাবর্তনের দাবি ওঠে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় ৭২’র সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের কথা বলে আসছিল। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল পরবর্তী পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তনের আবশ্যকতা দেখা দিলে দেশের সাধারণ জনমানুষের মধ্যে ৭২’র সংবিধানে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সংশোধনী পরবর্তী দেখা গেল উচ্চাদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদে নিয়োগের জন্য অযোগ্য করা হলেও সামরিক ফরমানের মাধ্যমে প্রবর্তিত বিচারিক ও আধা-বিচারিক পদে যোগদান ও হাইকোর্ট বিভাগ হতে অবসর পরবর্তী আপিল বিভাগে ওকালতির বিধান অক্ষুণ্ন রাখা হয়।
উচ্চ আদালতের বিচারকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ব্যত্যয়ে অবসর পরবর্তী বেতনের সমপরিমাণ অবসর ভাতা প্রাপ্ত হন। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী অবসর পরবর্তী চুক্তিভিত্তিতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত হলে তিনি তাঁর অবসর ভাতা হিসেবে বেতনের যে পরিমাণ অর্থগ্রহণ করেন তা বিয়োজনপূর্বক তাঁর চুক্তিভিত্তিক বেতন নির্ধারণ করা হয়। ভারত ও পাকিস্তানে এখনও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ন্যায় উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ দেয়া হলে তাঁদের বেতন হতে যে পরিমাণ অর্থ অবসর ভাতা হিসেবে নেয়া হয় তা বিয়োজন করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের দেশের চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এটি একই পদ হতে দু’বার বেতন গ্রহণের সমরূপ যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আর্থিক নিয়মের পরিপন্থি।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের পদ বিচারিক বা আধা-বিচারিক পদ নয়। এ কারণে উভয় প্রতিষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের কোন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের নিয়োগের সুযোগ নেই। এ ধরনের নিয়োগ একদিকে অসাংবিধানিক ও বেআইনি অপরদিকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নব সংযোজিত অনুচ্ছেদ নং ৭ক(১)(খ) এর বিধান অনুযায়ী সংবিধান বা এর কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করার সমরূপ। এ ধরনের কাজে সাজার বিধান কি সংবিধানে তা উল্লেখ রয়েছে। এরপরও কিভাবে এমন নিয়োগ চলছে তাতে হতবাক ও বিস্মিত না হয়ে উপায় আছে কি!
(সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক)
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

গান্ধীবাদী আবদুল্লাহ ও অগ্নিদগ্ধ চা-দোকানি by সৈয়দ আবুল মকসুদ

১৯৪৬-এর অক্টোবরে নোয়াখালীর নারকীয়তার পর মহাত্মা গান্ধী তাঁর শান্তি মিশন নিয়ে নোয়াখালী আসেন। তিনি এ কালের প্রাজ্ঞ ও জনবান্ধব রাজনীতিকদের মতো অপরাহ্ণে মিডিয়ার সামনে প্রবল উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া পছন্দ করতেন না। আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতেন। অবিচারের প্রতিবাদে যেখানে আইন অমান্য প্রয়োজন, সেখানে যথাযথ ঘোষণা দিয়েই আইন অমান্য করে সত্যাগ্রহ করতেন। নোয়াখালীতে এসে গান্ধীজি সেখানকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন থানার ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। তখন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার ছিলেন এম এ আবদুল্লাহ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএসের সদস্য। অতি সৎ, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ অফিসার। মাঝেমধ্যেই তিনি গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করতেন। তাঁর অভিযোগ শুনতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। আবদুল্লাহর কাজে গান্ধীজি খুবই প্রীত হন। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। তিনি গান্ধীর ভক্তে পরিণত হন। মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন। নিরামিষ ধরেন এবং আমৃত্যু তিনি নিরামিষাশী ছিলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যু হয়।
আবদুল্লাহ পঞ্চাশের শুরুতে ঢাকার সিটি এসপি ছিলেন, এখন যা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পদ। আমরা তখন স্কুলছাত্র। গান্ধীবাদী আবদুল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা শুনে আমরা শিহরিত হতাম। সেকালে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার হতো না। কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা খুব বেশি হলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতেন গাড়িতে। ঢাকা শহরই ছিল তখন একটুখানি। সব কটি স্কুলই ছিল দু-আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে। কোনো সরকারি জিপে কোনো স্কুলছাত্রছাত্রীকে যাতায়াত করতে দেখলে আবদুল্লাহ তাকে থামাতেন। গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাকে বলতেন, হেঁটে বাড়ি যাও, এ গাড়ি তোমার বাবার অফিসের কাজে ব্যবহারের জন্য, তোমার ব্যবহারের জন্য নয়। মেয়েদের পর্যন্ত তিনি গাড়ি থেকে নামিয়ে চার আনা পয়সা দিয়ে একটি রিকশা ভাড়া করে দিয়েছেন তাকে বাড়িতে বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এসপি আবদুল্লাহ তাঁর চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তা, এমনকি সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলেমেয়েদেরও সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সরকারি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু সেকালের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যূনতম মূল্যবোধ থাকায় তাঁকে বিপদে পড়তে হয়নি। ওএসডি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন।
আবদুল্লাহরা ছিলেন দুই ভাই—আবদুল্লাহ ও সাদুল্লাহ। কলকাতার মানুষ। আধা উর্দুভাষী। আবদুল্লাহ ছিলেন ব্যাচেলর। থাকতেন কাকরাইল সার্কিট হাউসে। তাঁর প্রিয়জনের মধ্যে ছিল গোটা আট-দশ বিড়াল। ওই বিড়াল নিয়ে আপত্তি তোলেন সার্কিট হাউসের অন্যান্য অফিসার। তিনি ডিআইজি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে বিড়াল নিয়ে গোলমাল বাধে গভর্নর মোনায়েম খানের সঙ্গে। চিঠি চালাচালি হয়। আবদুল্লাহ আগাম অবসর নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যারিস্টার হয়েছিলেনও। তিনি থাকতেন ইস্কাটনে ভাড়াটে বাড়িতে। তাঁর ভাই চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। গান্ধীভক্ত আবদুল্লাহ আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। গান্ধীজির নোয়াখালীর কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথামূলক বই লেখার ইচ্ছা তাঁর ছিল, কিন্তু সম্ভবত তা আর হয়ে ওঠেনি।
পুলিশ বিভাগের সব কর্মকর্তাই আবদুল্লাহর মতো সত্য ও ন্যায় নিয়ে থাকবেন, তা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান নেবেন, সেটাও মানা যায় না। আর কেউ যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেন, তা ঘোরতর অন্যায়। পুলিশ কর্মকর্তার কাজ অপরাধী ও দুর্বৃত্তকে ধরে আইন-আদালতের কাছে সোপর্দ করা। রাষ্ট্র তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দেবে। পুলিশের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা পর্যন্ত। অবশিষ্ট কাজ করবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
পুলিশ একটি অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী এবং আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় খুবই ক্ষমতাবান। অন্যদিকে একজন দরিদ্র চা-দোকানি অতি দুর্বল। পুলিশের সোর্স বলে একটি প্রজাতি বহুকাল থেকেই পুলিশ বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশের সোর্সের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। পুলিশ ও তার সোর্স যোগসাজশ করে যদি কোনো অপরাধ ঘটায়, সে অপরাধ কোনো সাধারণ নাগরিকের অপরাধের চেয়ে গুরুতর। এবং ক্ষমার অযোগ্য। ক্ষমা করা যায় না এ জন্য যে তাঁদের রাষ্ট্র বেতন-ভাতা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে অপরাধীদের দমন করতে, তা না করে তাঁরা নিজেরাই অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। এবং সে অপরাধও মুহূর্তের উত্তেজনাবশত নয়, সুপরিকল্পিতভাবে স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
কোনো পুলিশ অফিসার বা সোর্স স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বসেন, সেটা অপরাধ। সে অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। কিন্তু কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা তাঁর সোর্স জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করতে গিয়ে যদি কোনো চা-দোকানিকে তাঁর জ্বলন্ত চুলার মধ্যে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারেন, সে খুনের দায় ওই বাহিনীর ওপর অবশ্যই বর্তায়। তাতে প্রমাণিত হয় ওই বাহিনীর কেউ কেউ ঠিকমতো দায়িত্ব পালন তো করছেনই না বরং অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। বাহিনী হিসেবে নির্দোষ থাকতে চাইলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য তৎক্ষণাৎ দোষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তারপর যথাযথ শাস্তির জন্য তাঁকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। তা না করে অপরাধ আড়ালের চেষ্টা গর্হিত ও জঘন্য কাজ।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে এত কথা হওয়া সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি না সবাই দুর্নীতিতে লিপ্ত। সম্প্রতি কোনো এক মাসের শেষ দিকে আমি একজন সহকারী পুলিশ সুপার পর্যায়ের কর্মকর্তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। তাঁরা রাতে খেতে বসেছিলেন। ডিম আর ডাল দিয়ে তাঁরা ভাত খাচ্ছিলেন। আভাসে-ইঙ্গিতে আলাপ করে যা বুঝলাম তা হলো, মাসের শেষের দিকে ঠিকমতো বাজার করা সম্ভব হয় না। কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর পর সংসার চালানোই কঠিন। বছরে রোজার ঈদে ছাড়া নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয় না। বাস্তবতা হলো, সততা-অসততা কোনো পেশাজীবীর গায়ে লেখা থাকে না। আজও পুলিশ বাহিনীতে সৎ ও নীতিমান মানুষ আছেন। তাঁদের বাহিনীর কেউ যখন অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখন নিশ্চয়ই তাঁদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়। আমার পরিচিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সৎ এবং দক্ষ। মানুষের প্রতি রয়েছে তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ। সম্ভবত তাঁরা পুলিশ পদক পান না।
পুলিশ মানুষ, তাঁর পক্ষে অপরাধ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর এক মজাদার শাস্তি আছে। সে শাস্তির নাম ক্লোজ, যার বাংলা করেছি আমরা ‘প্রত্যাহার’। দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা। যে অপরাধ করলে কলিমুদ্দিন ও হারাধন সাহার কোমরে দড়ি পড়ে, সেই অপরাধ করে পুলিশ দিব্যি দাঁত কেলিয়ে হাসেন। বসে বসে বেতন-ভাতা পান। এমনকি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে যখন সাসপেন্ড করা হয়, তিনি শুধু মূল বেতনটা পান—অন্য কোনো ভাতা নয়। পুলিশ বেতন-ভাতাসহ দায়িত্ব থেকে ‘প্রত্যাহার’ হন। ক্ষতি শুধু থানায় থাকলে উপরি আয় হয়, ‘ক্লোজ’ থাকলে সেটা বন্ধ। ধর্ষণের মতো চরমতম অপরাধের অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, তাঁকে শুধু ‘ক্লোজ’ করলেই হলো।
বিরোধী দলের তথাকথিত আন্দোলন এবং ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পরে অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছে। গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ বিরোধী দলের তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকেরা। থানা-হাজতে নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নারীর ওপর যৌন হয়রানি, ইয়াবা থেরাপি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তাও নয়। ‘পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ছোট-বড় বিভিন্ন বিচ্যুতি-অপরাধে ৯ হাজার ৯৫৮ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৭৬ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে।...২০১৫ সালের ১২ মাসে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে।’ [সমকাল, ৭ মার্চ ’১৫]
পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা করবে কোথায়? থানা মামলা নিতে চায় না। নিলেও ফরিয়াদি গুম হওয়ার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ায়। আদালতে হাজিরা দেয় না। যা দরকার তা হলো উচ্চপর্যায়ের আশকারা বন্ধ হওয়া এবং দ্রুত বিচারের আদালতে বিচার করে রায় বাস্তবায়ন।
চুলার আগুনে পুড়িয়ে মিরপুরের চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে হত্যা করার অভিযোগে মিডিয়ার প্রবল চাপে শাহ আলী থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে। মানুষ ‘ব্যবস্থা’ দেখতে চায় না, শাস্তি দেখতে চায়। বাংলার মানুষের কপাল পোড়া, তাই স্টোভের আগুনে ফেলে তাদের পুড়িয়ে মারা হয়। বাংলার মানুষ কার আগুনে পুড়ে মরল সেটা মুখ্য নয়, পুড়ে মরছে সেটাই বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেও সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দরকার। চাঁদাবাজিতে শিল্প-কারখানার মালিক ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। পুলিশের সহায়তা তাঁদের প্রয়োজন। তা না পেয়ে যদি তাঁরা পুলিশের হাতেই নিগৃহীত হন, তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজেও থাকবে না শান্তিশৃঙ্খলা। আমরা গান্ধীবাদী আবদুল্লাহকে পাব না। কিন্তু ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে দু-এক লাখ ন্যায়পরায়ণ পুলিশ সদস্য পাব না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

গর্দভ সমাচার by আতাউর রহমান

গল্পটি বহুল প্রচারিত: পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে দেশে আদমশুমারির সঙ্গে সঙ্গে গর্দভশুমারিও চলছিল। তো তৎকালীন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক প্রাদেশিক সচিবালয়ে প্রেরিতব্য প্রতিবেদন হাতে হাতে জেলা প্রশাসকের কাছে নিয়ে এসেছেন। দেখা গেল, কুমিল্লা জেলায় মোট গাধার সংখ্যা ৩৩১টি। জেলা প্রশাসক সহাস্যে বললেন, ‘সংখ্যাটি আরও ২ বাড়িয়ে ৩৩৩ করে দিন। তাতে সংখ্যাটি সুন্দর ও সহজে স্মরণযোগ্য হবে। আর ওই দুটির একজন হলাম গিয়ে আমি ও একজন আপনি।’
আর একাত্তরে করাচিতে বসে গল্প শুনেছিলাম: গাধার কণ্ঠস্বর হচ্ছে, ‘হে-হে, ম্যায়-ম্যায়।’ তো শয়তান নাকি এসে গাধাকে উর্দুতে বলে, ‘তোমহারা মালিক মর গায়া (তোমার মালিক মারা গেছেন)।’ তখন গাধা স্বাভাবিক ঔৎসুক্যবশত বলে, ‘হে-হে (কী বললে, কী বললে)?’ অতঃপর শয়তান জিজ্ঞেস করে, ‘উনকি বেওয়া কো শাদি করেগা কৌন (ওনার বিধবাকে কে বিয়ে করবে)?’ তখন গাধা বলতে থাকে, ‘ম্যায়-ম্যায়’; অর্থাৎ ‘আমি-আমি।’
যা হোক, গল্পটির এক বাংলা সংস্করণও আছে: ধোপার গাধাকে ধোপা ঠিকমতো খেতে দেয় না, কিন্তু কাজ করিয়ে নেয় অতিরিক্ত। তবু গাধাটা তার মালিককে ছেড়ে যায় না। এ ব্যাপারে অপর এক গাধা তাকে প্রশ্ন করলে প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমি একদিন শুনলাম মালিক তার বউকে বলছেন, আজকেও তরকারিতে লবণ বেশি দিয়েছিস। আরেক দিন যদি লবণ বেশি দিস তা হলে তোকে ওই গাধাটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব। আমি আশায় আছি, খোদা চাহে তো আরেক দিন বউটা তরকারিতে লবণ বেশি দিয়ে দেবে।’
ধোপার গাধার গল্প বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল: শহরে গ্রীষ্মকালে মশার খুব উপদ্রব। তাই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ধোপার গাধাটা দোয়া করে শীতকাল আসুক। কিন্তু শীতকাল এলে আশপাশের পুকুরে পানি শুকিয়ে যায় বলে বিরাট কাপড়ের বোঝা দূরের জলাশয়ে নিয়ে যেতে-আসতে খুব কষ্ট হয়। তাই গাধা দোয়া করে গ্রীষ্মকাল আসুক। অতএব শীত-গ্রীষ্ম কোনো ঋতুতেই গাধার কপালে সুখ নেই। আর আমরা আমজনতা তথা ‘ম্যাংগো পাবলিক’ হচ্ছি গিয়ে সেই গাধা।
ভিন্নার্থেও আমরা গাধা। বাপ ছেলেকে নিয়ে গেছেন চিড়িয়াখানায়। ছেলের বয়স অল্প, তাই তার কৌতূহলের শেষ নেই। বাপকে সে প্রশ্ন করে করে অতিষ্ঠ করে তুলল। এক জায়গায় এসে একটি জন্তুকে দেখে সে বাপকে ‘ওটা কী’ জিজ্ঞেস করতেই তিনি জবাব দিলেন, ‘ওটা হচ্ছে গাধা’।
‘আর ওই যে গাধার পাশে দেখতে ঠিক গাধার মতো?’ ছেলে আবারও প্রশ্ন করল।
‘ওটা হচ্ছে গাধার বউ,’ বাপ প্রত্যুত্তরে বললেন।
‘গাধারাও কি বিয়ে করে?’ ছেলে এবারে শুধাল।
‘গাধারাই কেবল বিয়ে করে,’ বাপ একগাল হেসে জবাব দিলেন।
সে যাকগে। পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশের সূচনালগ্নেও ঢাকার তোপখানা রোডে ছিল ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের অফিস কাম লাইব্রেরি। এটাকে ইংরেজিতে সংক্ষেপে বলা হতো ‘ইউ-এস-আই-এস (USIS)’। তো ষাটের দশকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন ঠাট্টাচ্ছলে বলতাম ‘ইউএসআইএস’-এর মানে হচ্ছে ‘তুমি গাধা আমি গাধা।’ আর স্কুলে পড়াকালীন ইংরেজি Psychology শব্দের বানান যেমন মনে রাখার চেষ্টা করতাম ‘পিসি-চলো-যাই’ কথাটা স্মরণ রেখে, তেমনিভাবে Assassination শব্দের বানানের বেলায়ও স্মরণ রাখার চেষ্টা করতাম ‘গাধার পর গাধা, তারপর আমি, তারপর জাতি’ বাক্যাংশের সাহায্যে।
আর আরবি ভাষায় দুটি উল্লেখযোগ্য প্রবচন আছে এবং দুটিতেই গাধার সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়। একটি হচ্ছে, ‘আত্ তাক্রারু য়ুআল্লিমুল হিমার;’ যার মানে হচ্ছে: গাধা তো খুব নির্বোধ প্রাণী, যেটা পরিষ্কার পানিকেও ঘোলা করে খায়। কিন্তু সেই গাধাও একটা জিনিস বারবার করলে শিখে যায়। আরেকটি হচ্ছে, ‘আনা আমির, আন্তা আমির; মান্ ইয়াসুকাল হামির?’ অর্থাৎ ‘আমি প্রিন্স, আপনিও প্রিন্স; তা হলে গাধা চালাবে কেটা?’ তার মানে, সবাই প্রিন্স হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে সংসার চলে না।
এবারে গাধা–সংক্রান্ত বীরবলের গল্প: যুবরাজ সেলিমের ইচ্ছায় সম্রাট আকবর প্রাসাদের বাইরে সরোবরে গোসল করতে সেলিম বীরবলসহ রওনা দিয়েছেন। সম্রাট ও যুবরাজের সব পোশাক-পরিচ্ছদ বীরবলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো। তাঁদের পোশাক তো আর অল্প হতে পারে না। কাজেই পথে যেতে যেতে সেলিম বীরবলকে উদ্দেশ করে টিপ্পনী কাটলেন, ‘আপনাকে দেখে একটি ভারবাহী গাধা মনে হচ্ছে।’ বীরবল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘তা তো মনে হবেই, আমি যে দুটি গাধার ভার বইছি।’ সেলিম তাতে অপমানিত বোধ করলেও সম্রাট হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন।
তা হলে মোল্লা নাসিরুদ্দিনই বা বাদ যাবেন কেন? মোল্লার একমাত্র গাধাটা জনৈক প্রতিবেশী দিন কয়েকের জন্য ধার চেয়েছিলেন। মোল্লা বললেন, ‘কী করে দেব, ভাই? ওটা যে আমি আরেকজনকে ধার দিয়ে দিয়েছি।’ এমন সময় তাঁর গাধা আস্তাবল থেকে ডেকে উঠতেই প্রতিবেশী বললেন, ‘এই তো আপনার গাধার ডাক শুনছি; আর আপনি বলছেন ওটা নেই?’ মোল্লার তাৎক্ষণিক উত্তর: ‘আমার কথার চেয়ে গাধার ডাক যে লোক বেশি বিশ্বাস করে, তাকে গাধা ধার দেওয়া যায় না। আপনি এখন আসতে পারেন।’
ইশপের নীতিগল্পেও গাধা যথারীতি বিদ্যমান। বাপ ও বেটা তাদের গাধাটাকে বিক্রি করার জন্য হাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে ভিন্ন লোকজনের কথামৃত শুনতে ও রাখতে গিয়ে তাঁরা প্রথমে পালাক্রমে ও পরে উভয়ে একসঙ্গে গাধার পিঠে সওয়ার হলেন। অতঃপর প্রায়শ্চিত্ত করতে গাধার পাগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁশ ঢুকিয়ে বয়ে নিতে গিয়ে হাটসংলগ্ন সাঁকো পাড়ি দেওয়ার সময় গাধাটা দড়িসুদ্ধ পানিতে পড়ে স্রোতের মুখে ভেসে গেল। বাপ-বেটা তখন সম্যক উপলব্ধি করতে পারলেন, সংসারে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে গেলে কাউকেই সন্তুষ্ট করা যায় না। ইশপের সেই গল্পটি অতিশয় জীবনধর্মী ও জনপ্রিয়।
ভারতীয় সাংবাদিক ও সুলেখক কৃষণ চন্দরের আমি গাধা বলছি শীর্ষক বইটি আমি বহু বছর আগে পড়েছি। মানুষের জীবনের ভালোমানুষি ও বোকামির অপর নাম হচ্ছে গাধা। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গাধা তার নিজস্ব জবানিতে শুনিয়েছে এক শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি। কৃষণ চন্দর যথার্থই বুঝিয়েছেন, মানুষ যদি গাধার ভাষায় কথা বলতে পারে, তা হলে গাধা মানুষের ভাষায় কথা বলতে দোষ বা আশ্চর্যের কিছুই নেই।
প্রিয় পাঠক! পত্রিকার পাতায় বেরিয়েছে, দেশে গাধার সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে গাধা আমদানির চিন্তাভাবনা করছে। তা বেশ। তবে আমার মতে, পাকিস্তানে গাধার অভাব নেই, ওখান থেকে গাধা আমদানি করাই সর্বোত্তম।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

ভর্তির নামে অতিরিক্ত ফি- তারা কি সরকার ও আদালতের চেয়েও ক্ষমতাবান?

গত সোমবার বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি ভর্তি ফি আদায় এবং নির্ধারিত আসনের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তিসহ শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে। শিক্ষার সমস্যা সমাধানে এ ধরনের মতবিনিময় সভা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এমন সভা শুধু ঢাকায় সীমিত না রেখে শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরেই হওয়া প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষেও শিক্ষার সমস্যা অনুধাবন করা সহজ হবে।
মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী অতিরিক্ত ভর্তি ফি ফেরত না দেওয়া হলে উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এই আইনি ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা কমিটি অকার্যকর করার কথাও রয়েছে। এর আগে তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে অতিরিক্ত ভর্তি ফি ফেরত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সেই নির্দেশনা অগ্রাহ্য করল? তাহলে কি তারা নিজেদের সরকার কিংবা আদালতের চেয়েও ক্ষমতাবান ভাবে?
উল্লেখ্য, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে আছেন মন্ত্রী, সাংসদ ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারা। মন্ত্রী-সাংসদ কিংবা সরকারি দলের নেতা হয়েও যদি তাঁরা সরকারি নির্দেশনা না মানেন তাহলে সাধারণ মানুষ কেন মানবে?
যেসব বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ফি নিয়েছে, সেগুলো আর্থিকভাবে মোটেই দুর্বল নয়। এর পেছনে কাজ করেছে অতিরিক্ত মুনাফার লোভ। আরও উদ্বেগজনক হলো, কতিপয় নামকরা বিদ্যালয়ে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উৎকোচ নেওয়ারও অভিযোগ আছে।
অতিরিক্ত ফি আদায় ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি—দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করতে হবে। অন্যথায় এই বেআইনি ভর্তি-বাণিজ্য এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন।