Tuesday, March 22, 2011

প্রার্থিতা নিয়ে সহিংসতা

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এগিয়ে আসছে আর প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ ও সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে শুরু করেছে। শনিবার এ ধরনের এক ঘটনায় খুলনায় খুন হয়েছেন ছাত্রলীগের এক নেতা। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের সহিংসতা নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাই বাড়তি মনোযোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন তাত্ত্বিকভাবে অরাজনৈতিক; কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোই এই নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ে মূল ভূমিকা পালন করে। প্রার্থীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দল থেকে একধরনের ‘মনোনয়ন’ পেয়ে থাকেন। দলের সমর্থন তাই প্রার্থীদের জন্য খুবই জরুরি একটি বিষয়। খুলনার তেরখাদা উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত দুই প্রার্থীর মধ্যে। আগ্নেয়াস্ত্রসহ নানা কিছুই ব্যবহূত হয়েছে এই সংঘর্ষে। উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান ফকির নিহত হয়েছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। সরকারি দলের লোকজন যদি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি বাড়তি উদ্বেগের সৃষ্টি করে। কারণ, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষে অধিকাংশ সময় যথাযথ ভূমিকা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আওয়ামী লীগ-সমর্থিত যে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাঁদের দুজনের পেছনে রয়েছে দলটির বড় দুই নেতার সমর্থন। খুলনা-৪ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ মোল্লা জালাল উদ্দিনের সমর্থন রয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান ও তেরখাদা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলামের প্রতি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কর্মী এফ এম ওয়াহিদুজ্জামানকে সমর্থন করছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজা। শনিবার যে সংঘর্ষ এবং ছাত্রলীগের নেতার প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, তার দায় আওয়ামী লীগের এই বড় নেতারা এড়াতে পারেন না। নিজ দলের দুই প্রার্থীর প্রতি যেহেতু তাঁদের সমর্থন রয়েছে, তাই তাঁদের উচিত ছিল কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। কিন্তু তাঁরা এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি।
স্থানীয় পর্যায়ের এই নির্বাচনে দলগুলোর আঞ্চলিক নেতারা কী ভূমিকা পালন করবেন, সে ব্যাপারে কেন্দ্রের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। আওয়ামী লীগের দুই নেতার দুই প্রার্থীকে সমর্থন এবং এই নিয়ে সংঘর্ষ ও পরিণতিতে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু—এর কী ব্যাখ্যা দেবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব?
দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের সহিংস সংঘাতের ঘটনাকে গুরুতর আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে যাঁরাই এর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সরকারি দলের কোনো নেতা যাতে এ ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব খাটাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করব, প্রশাসন এ ব্যাপারে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।

উইকিলিকস ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের জবাবদিহি by মিজানুর রহমান খান

উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া মার্কিন দূতাবাসের সর্বশেষ দলিলটি অন্তত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। ড. গওহর রিজভী যদিও দাবি করেছেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির সঙ্গে ওই তারিখে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। তাহলে ধরে নিতে হবে, মরিয়ার্টি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে একটি বার্তা ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ড. রিজভীর দাবি সত্য হলে সেটি হয়তো হবে মার্কিন কূটনৈতিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত বিপর্যয়। অবশ্য মরিয়ার্টি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বিষয়টি ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আলোকে যাচাইযোগ্য। ওই বার্তাটি বানোয়াট প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব। তত দিন এ নিয়ে আলাপ করতে পারি। আমরা হয়তো এ পর্যন্ত একটি মুখ রক্ষার বিবৃতি পেয়েছি। ড. রিজভীর ব্যাখ্যায় মনে হয়েছে, তিনি ‘ব্যক্তিগতভাবে’ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সত্যিই দেখা করেননি!
সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেন। সে দেশে বিশেষ উপদেষ্টা রয়েছে। সহজেই বোঝা যায়, কে মন্ত্রী আর কে উপদেষ্টা। কোন কাজ মন্ত্রী করেন, কোন কাজ উপদেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে তা ঠাহর করা যায় না। দেশে উপদেষ্টার আকস্মিক প্রাদুর্ভাব ঘটল। ৪৪ জন মন্ত্রীর দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত উপদেষ্টা সাত। কোনো আইন হলো না।
এক-এগারোতে ভাগ্যবিড়ম্বিত আব্দুল জলিল ২০০৯ সালে সংসদে কথাটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভার বৈঠকে বসতে পারেন না। কারণ সেখানে অনেক গোপনীয় বিষয় আলোচিত হয়। মন্ত্রীরা গোপনীয়তার শপথ নেন। উপদেষ্টাদের নিতে হয় না।’ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ ক্ষুব্ধ হন। বলেন, ‘তিনি মন্ত্রিসভায় বসতে পারেননি। তাঁর ক্ষোভ তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারেন। সংসদে বলাটা দৃষ্টিকটু।’ ড. আলাউদ্দিন স্পষ্টতই ভ্রান্ত। আমরা ভুলিনি, চরম দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির ধাক্কা সামাল দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গত বছর তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি বিষয়ে একটি নন্দিত তালিকা করেন। সচেতন মহলে তা প্রশংসিত হয়। কিন্তু অবাঞ্ছিত দলীয় ও কোটারি চাপ আসে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটান। তিনি উপদেষ্টা আলাউদ্দিনকে সেই তালিকা সংশোধন করতে বলেন। তবে এ ধরনের কাজে উপদেষ্টাদের সম্পৃক্ত করা প্রমাণ দেয়, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় উপদেষ্টা কী কাজে লাগে, সে ব্যাপারে শাসকদের ধারণা নেই। চাকরি দিতে হবে। কারও ঠাটবাট, ওজন আরও বাড়াতে হবে। তাই পদ সৃষ্টি করা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর উপদেষ্টার কথা শুনেছিলাম। ইদানীং জানছি, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ এই নামেও অঘোষিত পদ আছে। কোনো বিষয় নির্দিষ্ট ছাড়া ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ পদ অন্য কোথাও আছে কি না, সন্দেহ।
সরকারের কাজ আর সরকারি দলের কাজ সব সময় এক হতে পারে না। ব্রিটেনের চেয়ে এ সমস্যা আমাদের বেশি। ব্রিটেনের আচরণবিধি মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজের ফারাক স্পষ্ট করেছে। তাদের বিধি বলেছে, সরকার ও সরকারি দলের কাজে কখনো ‘ওভারল্যাপ’ বা দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। তখন স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা তাতে জড়াবে না। তখন মন্ত্রীদের সহায়তা দেবেন বিশেষ উপদেষ্টারা। প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনকে নির্দলীয় রাখাও বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের অন্যতম দায়িত্ব। আর আমরা দেখি উল্টো। নির্দলীয় বিষয়ে দলীয় বিষ ঢালেন উপদেষ্টা।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাত উপদেষ্টা। মন্ত্রীদের কারও নেই। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা কিন্তু অনধিক দুজন বিশেষ উপদেষ্টা নিতে পারেন। তবে তাঁদের নিয়োগপত্রে বিষয় ও কী ধরনের কাগজপত্র দেখবেন, তা নির্দিষ্ট থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এই উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভা বৈঠকেও অংশ নিতে পারেন।
এ বিষয়ে দু-একটি উদাহরণ দিই। লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচার। প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুতে উপদেষ্টা নিয়োগে নিরাসক্ত ছিলেন। রাজনীতি বিষয়ে মন্ত্রী, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মন্ত্রণালয়। এ-ই ছিল তাঁর মন্ত্র। পরে মত পাল্টান। অ্যান্থনি স্টিফেন কিং লিখেছেন, ১৯৮০ সালে থ্যাচার ভাবলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ঠিকভাবে চলছে কি না, তার নজরদারি দরকার। মুদ্রানিয়ন্ত্রণবাদী মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যালান ওয়াল্টারকে নিয়োগ দেন। তাঁর জ্যেষ্ঠতা ও স্বাধীন মর্যাদা বজায় রাখতে হবে। তাই তাঁর পদমর্যাদা ছিল অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিরাশির জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তবে খণ্ডকালীন উপদেষ্টা হন। মাসে একটা সপ্তাহ লন্ডনে কাটাতেন।
মার্কিন অধ্যাপক ওয়াল্টারকে দিয়ে থ্যাচার কী কাজ করিয়েছেন, তা দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ জানে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অকপটে বলতে পারবেন। কিন্তু স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রিজভী কী করছেন, তা কি আমরা জানতে পারছি, নাকি পারব? আমাদের পেশাদার কূটনীতিকদের কাছে কি স্পষ্ট যে দেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কী কাজ করেন? ড. রিজভী রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান। আমাদের ছাত্রদের কি পড়ানো হবে যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজ কী। আমাদের মন্ত্রীদের অনেকেই উপদেষ্টাদের প্রতি বিরক্ত। কারণ অহেতুক তাঁরা তাঁদের মাথার ওপর ছায়া ফেলেছেন। তাঁদের পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা অপরিহার্য কেন? মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজনকে অবৈতনিক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করেছেন। মন্ত্রীর মর্যাদা দরকার হয়নি। বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরও তখন মন্ত্রীর পদমর্যাদা দরকার পড়েনি। আমাদের উপদেষ্টারা পদমর্যাদায় পূর্ণ মন্ত্রী।
বিধিবিধানের বাঁধন সত্ত্বেও উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ব্রিটেনেও আছে। জেমস কালাহান সরকারের বিশেষ উপদেষ্টা লর্ড ম্যাক নেলি সম্প্রতি বলেন, ‘বিশেষ উপদেষ্টা ও সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে ভারসাম্য আরও নিকৃষ্ট রূপ নিচ্ছে। কোনো ব্যক্তি এখন সহজেই রাজনৈতিক নিয়োগ থেকে সিভিল সার্ভেন্ট কিংবা সিভিল সার্ভেন্ট থেকে রাজনৈতিক নিয়োগ পেতে পারেন।’
আমরা উদ্বিগ্ন হতে পারি এই ভেবে যে আমাদের আমলাতন্ত্র এবং আগ্রহীরা ক্রমশ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে ‘বিশেষ বিনিয়োগে’ আগ্রহী হতে পারে। আব্দুল জলিলকে খণ্ডাতে গিয়ে ড. আলাউদ্দিনের ঔদ্ধত্য মন্তব্য বড়ই উদ্বেগজনক। তাঁর কথায়, ‘কতজন উপদেষ্টা থাকবেন সেটা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপার। তিনি চাইলে ১০০ জনও থাকতে পারেন।’ তবে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের ‘কার্যপরিধি’ আছে। থাকলে সেটা প্রকাশ করা হোক। আমরা জানতে চাই।
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড সংকটের পর থ্যাচার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন স্যার অ্যান্থনি পার্সনসেক। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় তিনি জাতিসংঘে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিরাশির ডিসেম্বরে তাঁর দরকার ফুরায়। স্যার পার্সি ক্রাডকক আসেন। কারণ কী। তিনি চীনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিরাশিতে হংকং প্রশ্নে ব্রিটেনের ভূমিকা কী হবে, সেটা নির্ধারণ জরুরি ছিল। তাই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়। এসব আমরা অনলাইনেই জানতে পারি। কিন্তু আমাদের উপদেষ্টাদের কাকে কী কারণে বেছে নেওয়া হলো, সেটা আমরা জানি না। অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ড. রিজভীকে বিশ্ব চেনে। বাংলাদেশ চেনে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কখন কেমন ছিল, তা আমাদের জানা নেই।
মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘রিজভী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অত্যন্ত গোপন ও ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। শুধু গত সপ্তাহে এতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।’ এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত বাদ দিয়েই ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ‘ছোট তরী’ এতই ছোট যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তাতে ঠাঁই নেই। যার বিয়ে তার খবর নেই। নীতিনির্ধারণী পেশাদার কূটনীতিকদের অন্ধকারে রাখা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা আমাদের ইতিহাসে বিরল নয়। সামরিক শাসনামলে এর যথেচ্ছাচার ঘটেছে। ড. আলাউদ্দিনও বলেছেন, উপদেষ্টা নিয়োগ নতুন নয়। জিয়ার আমল থেকে চলছে। বাহ্। কী চমৎকার যুক্তি! সাধে কি বলি, সামরিক শাসন যায়, সামরিক সংস্কৃতি যায় না।
আমরা বহুকাল জেনেছি, ভারতের আমলাতন্ত্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে অন্যতম বড় বাধা। এই সে দিনও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্রীনিবাসনদ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে এ বিষয়ে আক্ষেপ করেছেন। মুচকুন্দ দুবের কাছ থেকেও তেমনটাই শুনেছি। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার থাকাকালে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক-সুবিধা দিতে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। এর বহু পরে ঢাকায় তিনি আমাকে বলেন, ভারতের আমলাতন্ত্রই বাধা। আর এবারে মরিয়ার্টিকে ড. রিজভী ধারণা দিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও ট্রানজিটের মতো সুবিধা ভারতকে প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রই বাধা। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত ধাপে এসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও মসিউর রহমানকে; আমলাতন্ত্রের মধ্যে আটকে পড়া চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের সম্পর্কে রিজভী বলেন, ‘তাঁদের সৃজনশীলতা ও দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে।’
তবে ড. রিজভী তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করলেও মরিয়ার্টি করেননি। তাঁর কাছ থেকে আমাদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম পাঠ নিতে পারে। কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তল্পিবাহকেরা অনেক সময় সেসব বিষয়ে বড় বড় শিরোনাম ছাপেন, যেগুলো ভারতের জাতীয় স্বার্থের বা অগ্রাধিকারের অনুকূল হয়। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নতুন ও তুলনামূলকভাবে গৌণ চুক্তিগুলোর (প্রত্যর্পণ, বন্দিবিনিময়, বিদ্যুৎ বিনিময় ইত্যাদি) ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এবং এই সফরকালে সেগুলো স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সত্যিই আমরা সম্মিলিতভাবে মুজিব-ইন্দিরার ঐতিহাসিক চুক্তির অনুসমর্থন, পানি ভাগাভাগি ও সমুদ্রসীমা ইত্যাদি প্রশ্নে আওয়াজ তুলতে পারিনি। মরিয়ার্টিকে ধন্যবাদ। তিনি যথার্থই বাংলাদেশের প্রেসের দৈন্য চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
মরিয়ার্টি রিজভীর বরাতে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিতর্কটি একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক সালিস কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করে তখন ভারতীয়রা হতাশ হয়।’ রিজভী সম্ভবত এখানেও অসতর্ক ছিলেন। তিনি যদি মরিয়ার্টিকে এই ধারণা দিয়ে থাকেন যে সমুদ্রসীমা বিতর্কটি বাংলাদেশ একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে গেছে, তাহলে তাতে সত্যের অপলাপ ঘটে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারই এ বিষয়ে সংলাপের সূচনা ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছিল, ভারতীয় আমলাতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আলোচনার টেবিলে এই বিতর্কের মীমাংসা নেই। অথচ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পিঠ অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে। তখন উপায়ান্তর না দেখে ভারতের প্রতি বন্ধুপরায়ণ আওয়ামী লীগ কিংবা সমগ্র জাতি ইন্দিরা গান্ধীর দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সরকারকে সালিসিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে ভারতের হতাশা নয়, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। আমরা যখন ভারতকে করিডোর দিই, তখন আমাদের রিজভী সাহেবকে তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে ‘সামান্য আশাবাদী’ মনে হয়। তার মানে অবশিষ্ট নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে এখনো আশাবাদী হওয়ার প্রশ্ন আসে না।
ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা উইকিলিকসের এই খবরটি পরিবেশন করতে গিয়ে তার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে শেখ হাসিনার কলকাতা সফর ভণ্ডুল করে দেওয়ার বিষয়টি। তুলনা চলে না, তবে এক অর্থে দিল্লির চেয়ে বরাবর কলকাতা আমাদের বান্ধব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামে আমরা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলাম। জ্যোতি বসু চলে গেছেন। গঙ্গার মতো সহজে তিস্তা হবে কি না, সন্দেহ। প্রণব মুখার্জির যুগের অবসান ঘটলে আমরা দিল্লির সঙ্গে কাদের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলব, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা দিল্লির সঙ্গে বড় গলায় কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কোনো সাড়াশব্দ কিংবা কোনো প্রাণের স্পন্দন পাই না। ড. রিজভী প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টতই অপরিণামদর্শী পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ দিল্লির সঙ্গে দর-কষাকষিতে কিংবা ছাড় পাওয়া না-পাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি রাজনীতিকেরাই কার্যকর ভূমিকা রাখেন এবং রাখবেন। পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ কিংবা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ মানুষগুলোকে কাছে না টেনে দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়ে আসার পরামর্শ সঠিক ছিল না। কারণ, বাংলাদেশের বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির মতো দলকে ভারত প্রশ্নে অহেতুক ভয় করার কোনো কারণ নেই। কারণ তার রাজনৈতিক বিকাশ যথেষ্ট বৈধতা পেয়েছে ভারত-বিরোধিতার বাতাবরণে। তাকে সামলাতে কলকাতাকে চটানো কোনো যুক্তির কথা নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিরোধী দলের অপপ্রচার কিংবা পাবলিক খেপানো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের অবাক করবে না।
সুতরাং ড. গওহর রিজভী বা অন্য কারও পরামর্শে প্রধানমন্ত্রীর কলকাতাকে পাশ কাটানো ভুল হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘রূপান্তরে’ কলকাতাকে লাগবেই। তবে উপদেষ্টাদের জবাবদিহির বিষয়টিই আমরা বড় করে দেখি। তাঁদের কার কী কাজ থাকবে, মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে একটি আইন করতে হবে। ব্রিটিশরা উইকস কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বলেছে, ‘সরকার বিশ্বাস করে না যে বিশেষ উপদেষ্টার বিষয় সংখ্যা দিয়ে বিবেচ্য হতে পারে। ইস্যু হচ্ছে জবাবদিহি, ভূমিকা, দায়িত্বশীলতা ও তাদের সংখ্যার বিষয়ে স্বচ্ছতা।’ আমরাও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজের স্বচ্ছতা আশা করি। মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী চাওয়া হয়েছে। উপদেষ্টারাও দেবেন। তবে বড় দরকার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য পৃথক আচরণবিধি।
ড. রিজভীর একটি মনোভঙ্গি উল্লেখ না করলেই নয়। মরিয়ার্টির সঙ্গে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও সামাজিক’ সম্পর্ক আছে বলেই তিনি আমাদের অবহিত করেছেন। সেটা তিনি যথারীতি বজায় রাখবেন। কিন্তু মরিয়ার্টির কথিত বার্তার সত্যতা যাচাই করবেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা। সত্যিই তাঁর এই পরিহাস স্বচ্ছ।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

একটি পদের জন্য ভুট্টোর ব্যাকুলতা by আইয়ুব খান



একাত্তরের মার্চে যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত সমগ্র দেশ, ‘যার যা আছে তা-ই নিয়ে’ পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি বাঙালি, তখন এক হাজার ২০০ মাইল দূরে বসে সাবেক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান কীভাবে সেসব ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে দেখেছেন মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক কিংবা ভুট্টোর আস্ফাালন—সেসব বিবৃত হয়েছে তাঁর রোজনামচায়। মাত্র দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে পদচ্যুত, প্রচণ্ড বাঙালিবিদ্বেষী এই শাসক ‘পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছেদকে অবশ্যম্ভাবী’ বলে মনে করেছিলেন। ক্রেইগ ব্যাক্সটার সম্পাদিত আইয়ুব খানের রোজনামচা ১৯৬৬-১৯৭২ বইয়ের নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করেছেন এম এ মোমেন

২১ মার্চ ১৯৭১, রোববার
দেখলাম, ভুট্টো ও তাঁর পার্টির লোকজন ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাঁর জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হয়েছে, কারণ বাঙালিদের চোখে পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার এবং মুজিবুর রহমানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হওয়ার দায় তাঁরও।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এয়ারপোর্টে ভুট্টোপন্থী স্লোগান দেওয়া হয়েছে এবং দেশকে বিভক্ত না করার জন্য তিনি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই অবাঙালি হবেন, তবে হোটেলে বিরুদ্ধপক্ষীয় বিক্ষোভও হয়েছে—স্পষ্টতই তা মুজিবুর রহমানেরই আয়োজন। করাচির উড়োজাহাজ ধরার জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঙ্গে ভুট্টো এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেন, প্রদেশের অবস্থা একান্তে বুঝতে চেষ্টা করেন। তাঁরা ভুট্টোকে একটি ফুলেল বর্ণনা দিতে সক্ষম হননি, এই উৎপাতের সময় অবাঙালিদের সঙ্গে নির্মম আচরণ করা হয়েছে। তাঁরা অবশ্যই প্রাণভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। আমার মনে হয়, প্রয়োজন হলে এই বিষয়টি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির রসদই জোগাচ্ছেন তিনি।
ভুট্টোকে ক্যান্টনমেন্টেই রাখার কথা, কিন্তু তাঁর পীড়াপীড়ির কারণে হোটেলে রাখতে হয়েছে। বিষয়টির ওপর তিনি জোরও দিয়েছেন। অন্যটি ছিল, যত সংক্ষিপ্তই হয় হোক মুজিবুর রহমান যেন তাঁর সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট দুটো ব্যাপারেই তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। তার পরই ভুট্টো বলেছেন, তিনি পরিতৃপ্ত বোধ করছেন এবং ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
এটা খোঁড়া ও শিশুসুলভ অজুহাতের মতো শোনায়। তিনি আসলে যা চেয়েছেন তা হচ্ছে—সাময়িক কোনো সরকার গঠিত হতে হলে তাতে একটি পদ পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং পরবর্তী সময় কেন্দ্রীয় সরকার গঠনকালে তাঁর দল যেন মুজিবুর রহমানের কাছে গুরুত্ব পায় তার নিশ্চয়তা। আর তাঁর বাকি সব হুংকার ও লম্ফঝম্প সবই ফাঁপা—পশ্চিম পাকিস্তানিদের এই বলে বোকা বানানো যে তিনি জাতীয় স্বার্থে ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থে একজন চ্যাম্পিয়ন লড়াকু। কেউ একজন আমাকে জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থা ভুট্টোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। তাঁরা ভুট্টোকে স্বার্থপর সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি বলে মনে করেন, তবে সাধারণ মানুষ তাঁর প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করে। ভুট্টো কয়েক বছর শাসন করার সুযোগ পেলে তাদের মোহ কাটবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে দেশের আর থাকলটা কী? আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরা—আমি বলি, তাঁরা কেবল শয়তানি করার ক্ষমতা রাখেন, তাঁদের দিয়ে ভালো কিছু করানোর প্রত্যাশা কেবল স্বপ্নচারিতা।

ঘুচে যাক সব বৈষম্য by জোবাইদা নাসরীন

বছর চারেক আগে ঢাকায় একটি সেমিনারে সৈয়দপুরের সুইপার তুঁতিয়া বাঁশফোঁড় বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে যুদ্ধে পাকিস্তানিরা আমার বাবারে অত্যাচার কইরছে, আমার বোনরে দংশন [ধর্ষণ] কইরছে। পাকিস্তান সময়েও আমরা স্কুলে পড়তে পারিনি, আইজও আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাতে পারি না। আমরা স্বাধীনতা ওসব বুঝি না। দেশ স্বাধীন হইল, আমাগো কী হইল? আমরা তো একই রকম আছি।’
আজ ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য বিলোপ দিবস। ১৯৬০ সালের এই দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার সারপেবিলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টির জারী করা বর্ণভিত্তিক আলাদা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে শান্তিপূর্ণ মিছিল হয়, সেখানে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে এবং ৬৯ জন প্রাণ হারায়। সব ধরনের বর্ণবৈষম্য বিলোপের প্রচেষ্টা জোরদার করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ ১৯৬৬ সালে এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য বিলোপ দিবস হিসেবে পালনের সূচনা দেয়।
সেই ঘটনার অর্ধশতাব্দী পরও এখনো বিশ্বজুড়ে ভীষণভাবে রয়েছে বর্ণবৈষম্য। বাংলাদেশে ধর্ম, বিশ্বাস, অস্পৃশ্যতা, আঞ্চলিকতা, জাতিগত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রকটভাবেই রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ এ ছাড়া ২৮(১) ধারায় বলা আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’
তবু এই ধারাকে লঙ্ঘন করে শুধু জন্ম ও পেশাগত অস্পৃশ্যতার কারণে বৈষম্য, নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৫৫ লাখ দলিত জনগোষ্ঠীকে। এই দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৫ শতাংশেরও নিচে। শিক্ষার হার এত কমের কারণ, তাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়। পত্রিকান্তরে জানা যায়, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সুইপার কলোনির শিশু হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ওই শিশুদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছিল (সূত্র: ২৪ অক্টোবর, ২০০৯, দৈনিক যুগান্তর)। একই অবস্থা বেদে, সিলেটের শব্দকর, যশোর, কুষ্টিয়া, নীলফামারীর কাওড়া, হরিজনসহ অন্যান্য সমপ্রদায়ও। তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাওয়ার অধিকারও কখনো কখনো স্বীকার করা হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেকটাই বঞ্চিত বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ১৫ হাজার হিজড়া। পুরুষ ও নারীর বাইরে আর কোনো লিঙ্গের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র কিংবা সমাজ গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাদের প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীর মধ্যে অনেকেই শুধু আদিবাসী হওয়ার কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। উত্তরবঙ্গে একজন বাঙালি দিনমজুরি পান ১২০-১৫০ টাকা (খাবারসহ), সেখানে আদিবাসী মজুরি পান ১০০-১২০ টাকা (খাবারসহ)। আর সেখানে একজন আদিবাসী নারী পান ৭০-৮০ টাকা (খাবারসহ)। যদিও এলাকাভেদে এই দর ওঠানামা করে, তবে তা বৈষম্য জিইয়ে রেখেই। সেখানেই শেষ হয় না সবকিছু। গবেষণায় জানা গেছে, এই টাকা পেতে অনেক আদিবাসী নারী ও পুরুষকে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন।
বাংলাদেশে শ্রম শোষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো চা-বাগান। যে শ্রমিকের শ্রমের ওপর ভর দিয়ে এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশরা তাদের শোষণ শুরু করেছিল, আজও সেই শ্রমিকেরা শ্রমভিত্তিক বৈষম্যের শিকার, যা তাঁদের এখনকার মজুরি বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের মজুরি ছিল ৩২ দশমিক ৫০ টাকা। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, তরাই ও ডুয়ার্সের চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫৩ দশমিক ৫০ ভারতীয় রুপি। এই চা-শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার হার খুব কম। সেখানে শিক্ষার ক্ষেত্রে খুব বেশি উৎসাহিত করা হয় না শ্রমিকদের।
এদের বাইরে দরিদ্র নারী, প্রবীণ নারী, প্রতিবন্ধী নারী, দলিত নারী, যৌনকর্মী, বেদে নারীসহ সমাজের বিভিন্ন অস্পৃশ্যতার শিকার নারীদের প্রতি বৈষ্যম্যের চিত্র আরও করুণ। খোদ ঢাকা শহরের সিটি করপোরেশনেই দলিত ঝাড়ুদার নারীরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ মার্চ ২০১০)। মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থাকা অবস্থায়ও (এখন হয়েছে ছয় মাস) দলিত নারীরা এই ছুটি ভোগ করতে পারতেন মাত্র দুই মাস। ছুটির দুই মাসের মধ্যে চাকরিতে যোগদান না করলে তাঁদের চাকরি হারাতে হয়। অস্পৃশ্যতার কারণে বহু হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ঢুকে খেতে দেওয়া হয় না দলিত মানুষদের। আবার সৈয়দপুরের কয়েকজন সুইপার নারী জানিয়েছেন, হোটেলে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া না হলেও হোটেলের কর্মচারীরা তাঁদের পানি মারে, নানা ছুতোয় তাঁদের হাত ধরার চেষ্টা করে, তাঁদের প্রতি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলে (নাসরীন ২০০৬)।
পুরুষের জন্য তৈরি হওয়া এবং তাদের জন্য টিকে থাকা ‘পতিতালয়ের’ যৌনকর্মীরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ পেশাদারি হলেও সমাজের কাছে আদৃত না হওয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পদে পদে। তবে রাষ্ট্র এবং বেসরকারি উন্নয়ন ভাবনায় তাদের একমাত্র উপস্থিতি পাওয়া যায় এইডস এবং এইচআইভির অনিবার্য ‘এজেন্ট’ হিসেবে। সামাজিকভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার না থাকায় তাঁরা হয়ে পড়ছেন অধিকারহীন। তাঁদের ছেলেমেয়েরাও বন্দী থাকছে ‘পতিতালয়ের’ গণ্ডিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাচ্ছে না।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংবিধানের অবস্থান হলেও বাংলাদেশে বিরাজমান বৈষম্যের বিপক্ষে সরকারের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার মধ্য দিয়ে এই বৈষম্য বৈধ হয়ে ওঠে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক সমতা আনয়নই নিশ্চিত করতে পারে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। প্রতিটি মানুষের সমমর্যাদা ও সমসুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেই আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা যেন সবার হয়ে ওঠে।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

মোশাররফকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারিতে সময় দিলেন আদালত

পাকিস্তানের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে আইনজীবীদের এক সপ্তাহ সময় দিয়েছেন। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যা মামলায় এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রস্তুতি চলছে।
বেনজির হত্যার মামলার যৌথ তদন্তকারী দল বিচারকের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সময় চেয়েছিল।

রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার করলেন বাহরাইনের যুবরাজ

বাহরাইনের যুবরাজ শেখ সালমান বিন হামাদ আল-খলিফা রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। গত শনিবার দেশটির সংবাদ সংস্থা বিএনএ এ কথা জানায়। এদিকে বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করার জন্য যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির শিয়া সম্প্রদায় রাজনৈতিক সংস্কার ও অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে।
যুবরাজ এক বিবৃতিতে জানান, রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে তিনি কোনো দ্বিধাবিভক্তি মেনে নেবেন না। তিনি জানান, দেশের সব নাগরিকের তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলতে সরকারের দরজা সব সময় খোলা।
এদিকে রাজধানী মানামার দক্ষিণে শিয়া-অধ্যুষিত গ্রাম সিতরায় গত মঙ্গলবার সংঘর্ষের পর নিখোঁজ হওয়া আবদালি রাধি নামের এক ব্যক্তির লাশ গত শনিবার পাওয়া গেছে। মানামার সালমানিয়া হাসপাতালের মর্গে লাশটি খুঁজে পাওয়া যায়। আবদালির ভাই জলিল এ কথা জানান। তিনি আরও জানান, চিকিৎসা প্রতিবেদনের তথ্যে বলা হয়েছে, আবদালি গুলিতে নিহত হয়েছেন।

লিবিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে চিন্তিত যুক্তরাষ্ট্র

লিবিয়ায় বিমান হামলা চালালেও সে দেশের নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির হাতে থাকা রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে চিন্তায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য তারা লিবিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত রাসায়নিকের একটি সম্ভাব্য গুদামের ওপর উপগ্রহের মাধ্যমে নজর রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল-এর খবর অনুযায়ী, লিবিয়ার সিরতে শহরের একটি গুদামে ১০ টনের মতো বিষাক্ত মাসটার্ড গ্যাস আছে। এ ছাড়া গাদ্দাফির হাতে অন্যান্য রাসায়নিক অস্ত্র, বহুসংখ্যক স্কুড-বি ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজার মেট্রিক টন ইউরেনিয়াম ইয়োলোকেক আছে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্র। গাদ্দাফি যেকোনো সময় এসব রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে পশ্চিমারা।
মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘গাদ্দাফির মতো একজন খ্যাপাটে ব্যক্তির কাছে এ ধরনের অস্ত্র থাকলে সেটা সব সময়ই উদ্বেগের বিষয়। তবে আমরা এখনো পর্যন্ত তাঁকে মাসটার্ড গ্যাস বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখিনি।’
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ২০০৩ সালে লিবিয়া তাদের পরমাণু কর্মসূচি বাদ দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়ায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে গাদ্দাফি রাসায়নিক অস্ত্র বা কাঁচামালের মজুদ নষ্ট করেননি।

হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ

লিবিয়ায় সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে মার্কিনরা। ইরাক ও আফগান যুদ্ধে বিরক্ত হয়ে ওঠা মার্কিন জনগণ নতুন করে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে।
গত শনিবার যুুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগরে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরাক যুদ্ধের অষ্টম বার্ষিকী উপলক্ষে যুদ্ধবিরোধী মার্কিন নাগরিকেরা মূলত এসব সমাবেশের আয়োজন করে। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে লিবিয়ায় মার্কিন বিমান হামলার নিন্দা জানানো হয়। হোয়াইট হাউসসংলগ্ন এলাকা থেকে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে অংশ নেওয়া ১০০ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন কংগ্রেসম্যান চার্লস রেঙ্গেল। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রবীণ এই আইনপ্রণেতা বলেন, ‘লিবিয়ায় বোমা হামলার আগে বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে কোনো আলোচনা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ওবামা মনে করেছেন, লিবিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আমরা জাতিসংঘে যাব এবং তাদের কথামতো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব।’ যুদ্ধে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ওবামার নেওয়া উচিত হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আফ্রিকান ইউনিয়নের বিরোধিতা রাশিয়া, চীন ও ভারতের উদ্বেগ

লিবিয়ায় বহুজাতিক বাহিনীর বিমান হামলায় চীন, রাশিয়া ও ভারত উদ্বেগ ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচ সদস্য দেশের একটি প্যানেল এ হামলার সরাসরি বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ তারা মেনে নিতে পারছে না।
আলাদাভাবে দেওয়া বিবৃতিতে চীন, ভারত ও রাশিয়া বলেছে, এ ঘটনা দুঃখজনক। তারা এতে উদ্বিগ্ন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেইজিং লিবিয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নৈতিকভাবে এ হামলার বিরোধিতা করছে। চীন ওই বিবৃতিতে কোনো অস্ত্রবিরতির কথা উল্লেখ করেনি। তবে তারা বলেছে, তারা উত্তর আফ্রিকার ওই দেশটির ‘সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্য ও ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্যকে’ শ্রদ্ধা করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা আশা করছি, বেসামরিক লোকজনের সংঘর্ষজনিত প্রাণহানির ঘটনা এড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব লিবিয়া তার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, লিবিয়ায় যে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে তাতে ভারত দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন। এমনিতেই লিবিয়ার মানবিক পরিস্থিতি সংকটের মুখে পড়েছে। এ হামলা সে সংকটকে যাতে আরও বাড়িয়ে না দেয়, সে ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলেকজান্ডার লুকাশেভিচ বিবৃতিতে বলেছেন, তাঁরা চান লিবিয়ায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রক্তপাত বন্ধ করা হোক। তাঁরা চান লিবিয়াবাসী অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে সক্ষম হোক।
এদিকে এইউ প্যানেলভুক্ত দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ডেনিস সাসৌ নোগেসো, মালির প্রেসিডেন্ট আমাদৌ তৌমানি তৌরি, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োভেরি মুসেভেনি ও মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট ওউল আবদেল আজিজ লিবিয়া পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দেন।
মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বলেছেন, তাঁরা লিবিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক স্বাধীনতাকে সম্মান করেন। এ কারণে তাঁরা লিবিয়ায় বিদেশি বাহিনীর হামলাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁরা চান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বহুজাতিক হামলা বন্ধ করা হোক।
জাপানের সমর্থন: এ দিকে লিবিয়ায় আন্তর্জাতিক হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে জাপান। পাশাপাশি দেশটি গাদ্দাফিকে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও আহবান জানিয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকিয়াকি মাতসুমোতো গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৯৭৩ সালের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলো যে পদক্ষেপ নিয়েছে তার প্রতি জাপান সরকার সমর্থন ব্যক্ত করছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত রাখায় আমরা লিবীয় কর্তৃপক্ষের তীব্র নিন্দা এবং যত দ্রুত সম্ভব একটি যথাযথ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে তাদেরকে জোরালো আহবান জানাচ্ছি।’

‘আমাদের ছেলে, প্রিয় ওবামার প্রতি’

বিদ্রোহীদের ওপর হামলার পক্ষে সাফাই গেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চিঠি লিখেছেন লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। চিঠিতে তিনি ‘প্রিয় ওবামা, আমাদের ছেলে’ বলে ওবামাকে সম্বোধন করেছেন।
এ ছাড়া ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনকেও চিঠি লিখেছেন গাদ্দাফি। চিঠিতে তিনি লিবিয়ায় হামলার অনুমতি দিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবকে অসিদ্ধ এবং জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে লিবিয়ায় হামলার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে গাদ্দাফি বলেছেন, এ জন্য তাঁদের অনুতাপ করতে হবে।
গাদ্দাফি লিখেছেন, ‘লিবিয়া আপনাদের নয়, লিবিয়ার মানুষের।’ গতকাল ত্রিপোলিতে এক সংবাদ সম্মেলনে গাদ্দাফির এক মুখপাত্র চিঠির বিস্তারিত তুলে ধরেন। ওবামাকে লেখা চিঠিতে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের ছেলে, প্রিয় বারাক ওবামা। আমি আপনাকে আগেও বলেছি, লিবিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধে জড়িয়েও পড়ে আল্লাহ তা না করুন, তারপরও আপনি আমাদের ছেলেই থাকবেন।’

বিজেপির বিভক্তির সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস!

২০০৮ সালের আস্থা ভোটের সময় অর্থ দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ সম্পর্কিত উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল কংগ্রেস। তবে পার্লামেন্টে সামান্য হই-হট্টগোল ছাড়া এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারছে না প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিজেপি নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
বিজেপি ভালোভাবেই জানে, পার্লামেন্টে নতুন করে আস্থা ভোট হলে তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে। পাশাপাশি দলের নেতৃত্বও এ মুহূর্তে কোনো বিষয়ে একমত হতে পারবে না।
বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চায় (এনডিএ) একসময় শরিক দল ছিল ২৪টি। কিন্তু এখন এনডিএ মানে-বিজেপি, জনতা দল-ইউনাইটেড (জেডি-ইউ) এবং আকালি দল। এর মধ্যে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে আবার জেডি-ইউর সঙ্গে বিজেপির মতবিরোধ আছে। অটল বিহারি বাজপেয়ি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর বিজেপি আগের মতো শরিক দলে টানতে পারছে না।
লোকসভায় বিজেপির নেতা সুষমা স্বরাজ এবং দলের রাজ্যসভার নেতা অরুণ জেটলির মতবিরোধের মধ্য দিয়েই মূলত বিজেপিতে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। বিতর্কিত আমলা পি জে টমাসকে সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিজেপি কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে একমত হতে পারেননি এই দুই নেতা। থমাসের ওই নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।
সুষমা স্বরাজ বিষয়টিকে ততটা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে চাননি। কিন্তু জেটলির অবস্থান ছিল বিপরীত। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। জেটলিকে দলের সভাপতি নিতিন গাদকারি সমর্থন দিলে অনেকটা একা হয়ে পড়েন সুষমা।
এর আগে কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর পরিবারের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তোলায় তাঁর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা এল কে আদভানি। একই সঙ্গে আদভানি জানান, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা বিজেপির গ্রহণযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এ ছাড়া বিজেপি নেতা কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়াদিরাপ্পার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। বিষয়টিকে অনৈতিক মনে করলেও বেআইনি নয় বলে মনে করেন গাদকারি। গাদকারির এই অবস্থানের কারণে কংগ্রেসের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণা অনেকটা ঢিলে হয়ে যায়। বিজেপির মধ্যে এই বিভক্তির কারণে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামাল দেওয়া কংগ্রেসের জন্য সহজ হয়ে যায়।
তার পরও কংগ্রেস যে খুব স্বস্তিতে আছে, তা নয়। ডিএমকের সঙ্গে মিত্রতা হুমকির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনও তারা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোটগতভাবে করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
দিল্লির ক্ষমতায় থাকার জন্য কংগ্রেস যেমন আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তেমনি আঞ্চলিক দলগুলোর জন্যও এটা সত্য যে কংগ্রেস ছাড়া তারা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভাগ পাবে না। তবে কংগ্রেসকে এটা মনে রাখতে হবে, শরিকদের দুর্নীতির কারণে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতা এখনো প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু একের পর এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি তাদের সেই নৈতিক অবস্থানকে ধ্বংস করে দেবে।

এ বছরই সঞ্চালন লাইন নির্মিত হবে

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এ বছরই শেষ হবে।
গতকাল রোববার এডিবির পরামর্শকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের এ কথা জানান। ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের বেসরকারি খাতকে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। ভারতের কাছ থেকে ঋণ না পাওয়ায় এডিবির ঋণে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ২৫ হাজার ডলার।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, ২০৫০ সাল নাগাদ এশিয়ার সম্ভাবনাময় অর্থনীতির আটটি দেশের মধ্যে অন্যতম হবে বাংলাদেশ। এই সময়ে এশিয়া নতুন রূপে গঠিত হবে। বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন ধরনের মূল্যায়ন করেছে এডিবি।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের আয়বৈষম্য, সুশাসন, দুর্নীতি, অবকাঠামো দুর্বলতা, আঞ্চলিক যোগাযোগসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিসহ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী।
এডিবি মনে করছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আগামী বছরগুলো শুধু এশীয় দেশগুলোর। এ জন্য আরও বিনিয়োগ দরকার।
এডিবির উদ্ধৃতি দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্ব মন্দার ধাক্কায় এশীয় দেশগুলোয় খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। এসব দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুসংহত হওয়ার কারণেই মন্দার ধাক্কা লাগেনি।
বৈঠকে অর্থসচিব মোহাম্মদ তারেক, এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর থেবাকুমার কান্দিয়াহ প্রমুখ অংশ নেন

স্বল্প মূলধনের কোম্পানির প্রতি ঝোঁক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে দেশের শেয়ারবাজার। গত কয়েক দিনের লেনদেন বিশ্লেষণ করে এ রকমই অভিমত দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
তবে স্বল্প মূলধনের অপেক্ষাকৃত দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম আবারও যেভাবে বাড়ছে, তাতে কিছুটা উদ্বিগ্ন তাঁরা। তাঁদের মতে, এসব শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে খুব একটা শিক্ষা নেয়নি।
যোগাযোগ করা হলে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতার হোসেন সান্নামাত প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে সামগ্রিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি নির্ভর করবে বাজারের পুনর্গঠন কীভাবে হচ্ছে, তার ওপর। অর্থাৎ পুঁজিবাজারের আইন-কানুনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিকে কতটা শক্তিশালী করা হচ্ছে, বাজারের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কতটুকু বাজারবান্ধব করা হবে, তার ওপর।
স্বল্প মূলধনের কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রসঙ্গে সান্নামাত বলেন, এটা তো সব সময়ই হয়ে আসছে। কারণ, এসব শেয়ারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। তা ছাড়া শেয়ারের অভিহিত মূল্য দুই রকম থেকে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক কারণেও ১০ টাকার শেয়ারের দিকে ঝুঁকছে। এ ক্ষেত্রে তারা কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের দিকে খুব একটা মনোযোগী নয়। এ অবস্থায় বাজারের সব শেয়ারের অভিহিত মূল্যে সমতা আনার পক্ষে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে এ কাজটি করে ফেলা উচিত, যেন কেউ কারসাজির সুযোগ নিতে না পারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম দিন দাম বাড়ার তালিকায় থাকা ২০টি কোম্পানির প্রায় সবই ছিল তুলনামূলক কম মূলধনের। এর মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কিছু দিন আগেও লভ্যাংশ না দিতে পারার কারণে ‘জেড’ শ্রেণীতে ছিল। আবার এর মধ্যে ১০টি কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই ৪০-এর বেশি। এসইসির নির্দেশ অনুসারে, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় পিই ৪০-এর বেশি, এমন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনাবেচায় ঋণসুবিধা পাওয়া যায় না।
বাজার পরিস্থিতি: গতকাল দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়েছে। এদিন ব্যাংকিং খাত ছাড়া জ্বালানি, প্রকৌশল, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা, খাদ্য, ওষুধ, বস্ত্র ও বিবিধ খাত ছিল বেশ চাঙা। তবে মিউচুয়াল ফান্ড খাত ছিল কিছুটা মিশ্র।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল দিনের লেনদেন শেষে সাধারণ মূল্যসূচক ৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ছয় হাজার ৪৭০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১২৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৮ হাজার ১২০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এদিন স্টক এক্সচেঞ্জটিতে মোট ১৯৮টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩৫টির, কমেছে ৫৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ছয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে গতকাল ১৫৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৫২৪ কোটি টাকার। প্রায় তিন মাস পর স্টক এক্সচেঞ্জটির লেনদেন আবার দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়াল। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৮৮টির, কমেছে ৫৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১০টির।
এসইসিতে ডিএসইর নবনির্বাচিত কমিটি: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নবনির্বাচিত জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের এক প্রতিনিধিদল গতকাল এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় এসইসির সদস্য মো. আনিসুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদ, এ টি এম তারিকুজ্জামান ও রোকসানা চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ডিএসইর নবনির্বাচিত সহসভাপতি মো. শাহজাহান এবং দুজন নবনির্বাচিত পরিচালক আজিজুর রহমান ও মিজানুর রহমান খান।

পদ্মা অয়েল, পিপলস লিজিং ও আরএন স্পিনিংয়ের লভ্যাংশ ঘোষণা

পদ্মা অয়েল কোম্পানি ৫০ শতাংশ নগদ ও ৫০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড ৭৫ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ এবং আরএন স্পিনিং মিলস লিমিটেড ৩০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
পদ্মা অয়েল কোম্পানি: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ৩০ এপ্রিল বেলা ১১টায় চট্টগ্রামে পতেঙ্গার গুপ্ত খালের মেইন ইনস্টলেশনে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ৪ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ২১.৬৯ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৮০.২২ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ১৮২.৪৮ টাকা।
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। পর্ষদ বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম), বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) শেয়ারহোল্ডারেদর এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি সাপেক্ষে প্রতি দুটি শেয়ারের জন্য একটি রাইট শেয়ার দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির এজিএম আগামী ২ মে বেলা ১১টায় ঢাকায় এয়ারপোর্ট রোডের আর্মি গলফ ক্লাবের গলফ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ৩ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ৯.৪৭ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৩০.৯৫ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৬.৮০ টাকা।
আরএন স্পিনিং মিলস লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। পর্ষদ মূলধন বাড়ানোর জন্য বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) শেয়ারহোল্ডারেদর এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিটি শেয়ারের জন্য একটি রাইট শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ও ইজিএম আগামী ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। ইজিএম বেলা ১১টায় এবং এজিএম বেলা সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা ইজিজেডে কারখানা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। ইজিএম ও এজিএমের রেকর্ড ডেট ৩০ মার্চ। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ৫.০৪ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ১৬.১০ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৩.৮৮ টাকা।

ডিইপিজেডে শ্রমিক অসন্তোষ

মামলা প্রত্যাহার ও অতিরিক্ত কাজের বকেয়া পারিশ্রমিকের দাবিতে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ডিইপিজেড) ‘আমরা অ্যাপারেলস লিমিটেডের’ শ্রমিকেরা আজ সোমবার কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন। পরে কোনো সমাধান ছাড়াই শ্রমিকেরা বিকেলে বিক্ষোভ বন্ধ করে বাড়ি চলে যান।
আশুলিয়া থানা পুলিশ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানাটির এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক কয়েক দিন ধরেই তাঁদের অতিরিক্ত কাজের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
গতকাল রোববার দুপুরে কারখানার উত্পাদন ব্যবস্থাপক শহীদুল ইসলাম এ নিয়ে কথা বলতে গেলে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মান্নান তাকে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় শ্রমিকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে জিএমকে মারধর করেন এবং বেলা একটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ করেন। ওই ঘটনায় জিএম আবদুল মান্নান বাদী হয়ে গতকাল রাতে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২২ শ্রমিককে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাত শ্রমিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
আজ সকালে শ্রমিকেরা কর্মস্থলে গিয়ে মামলা করার বিষয়টি জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এর পর তাঁরা সকাল সাড়ে আটটা থেকে কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিকেল পাঁচটায় কারখানা ছুটি হলে কোনো সমঝোতা ছাড়াই শ্রমিকেরা বাড়ি চলে যান।
কারখানার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, কারখানার জিএমকে মারধরের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ওই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে শ্রমিকেরা আজ কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন।

বুকবিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে এসইসির প্রস্তাবনা পেশ

বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধনী নিয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) একটি প্রস্তাবনা পেশ করেছে। আজ সোমবার এসইসির সভাকক্ষে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এ প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।
এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, প্রস্তাবনা পেশের পর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডাররা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রস্তাবনাটি নিয়ে আলোচনা করবেন। তাঁদের মত-অভিমত থাকলে তা এসইসিতে জমা দেবেন। এরপর শিগগিরই আবার বৈঠকের মাধ্যমে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে।
সাইফুর রহমান আরও বলেন, খসড়া প্রস্তাবনায় বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির নির্দেশক মূল্য কী হবে, রোড শোতে কারা অংশ নিতে পারবে—এ ধরনের বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এ পদ্ধতি যাতে যথাযথ এবং যুগোপযোগীভাবে কার্যকর হয় সে ব্যাপারে চেষ্টা করা হবে।
ডিএসইর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিটি বন্ধ রয়েছে। পদ্ধতিটি যাতে আবার চালু করা যায় সে ব্যাপারে চেষ্টা করা হচ্ছে। আজ এ ব্যাপারে এসইসি কিছু প্রস্তাবনা এনেছে। বড় পরিসরে আলোচনার জন্য ডিএসইর বোর্ড ও লিস্টিং সুপারিশ নেব। মার্চেন্ট ব্যাংক ও অন্য সংস্থাগুলো আলাদাভাবে আলোচনা করে আমরা সবাই একসঙ্গে বসব।’ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী সোমবার আবার এসইসির সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে বলে তিনি জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে আহসানুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কোনো দোষ দেখি না। তবে কিছু কিছু ধারার অপব্যবহার করে অনেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা চেষ্টা করব যাতে এ পদ্ধতিটির যথাযথ প্রতিফলন হয়।’
সভায় অন্যদের মধ্যে এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার, বাংলাদেশ পাবলিক লিস্টেট কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালমান এফ রহমান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আল মারুফ খান, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মুর্তজা আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রিয়াল-বার্সার জয়

লিগে এটি ছিল তাঁর শততম ম্যাচ। স্প্যানিশ লিগে এক শ ম্যাচ খেলা তৃতীয় কনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ডও গড়েছেন। পরশু রাতটাকে বোজান কিরকিচ আরও স্মরণীয় করে রাখলেন গোল করে। তাঁর আর দানি আলভেজের গোলে গেটাফেকে ২-১ ব্যবধানে হারাল বার্সেলোনা। জয় পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদও। ডার্বি ম্যাচে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে হারিয়েছে ২-১ গোলে। রিয়ালের গোল দুটি করেছেন করিম বেনজেমা ও মেসুত ওজিল। অ্যাটলেটিকোর গোলটি সার্জিও আগুয়েরোর।
এই মৌসুমে রিয়ালের কাছে অ্যাটলেটিকোর এটা চতুর্থ হার। এর আগে কিংস কাপে দুবার ও লিগে একবার হেরেছিল তারা। দুই শিরোপা প্রতিদ্বন্দ্বীই এদিন পুরো ৩ পয়েন্ট করে তুলে নেওয়ায় ব্যবধান আগে যা ছিল, তাই থাকল। ২৯ ম্যাচে ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বার্সেলোনা, ৭৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রিয়াল।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে পরশু বোল্টনকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। খেলা শেষের ২ মিনিট আগে করা দিমিত্রি বারবেতভের গোল ৩ পয়েন্ট এনে দিয়েছে ম্যানইউকে। অন্য ম্যাচে ওয়েস্ট ব্রমউইচের সঙ্গে হারতে হারতে শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র করেছে আর্সেনাল।

কোয়ার্টার ফাইনালে ফিরতে চান ভেট্টোরি

ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের আগ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালের সূচিটা চূড়ান্ত করা যাচ্ছিল না। তবে এটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আগেই—দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হচ্ছে নিউজিল্যান্ড। একটা অনিশ্চয়তা অবশ্য এ ম্যাচ নিয়েও আছে। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি খেলতে পারবেন তো? পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পাওয়া ভেট্টোরি গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচে খেলতে পারেননি। তবে তাঁর আশা, শেষ আটের লড়াইয়ে ঠিকই ফিরবেন দলে।
এই ম্যাচটি খেলার জন্য মুখিয়ে আছেন বলেই জানালেন ভেট্টোরি। জানালেন, ‘ব্যাটিং-বোলিংয়ে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে দৌড়ানোর সময় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।’ হাঁটুতে এখনো সামান্য ব্যথা আছে। তবে এই ৩২ বছর বয়সী মনে করছেন, কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটির আগে ফিট হয়ে উঠবেন। অনুশীলনে বল করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তা ছাড়া ভেট্টোরি আরও সময়ও পাচ্ছেন।
এদিকে চোটের কারণে বিশ্বকাপই শেষ হয়ে গেছে পেসার হামিশ বেনেটের। বেনেটের জায়গায় দলে ঢুকেছেন ড্যারিল টাফি।

কোয়ার্টার ফাইনালেই ভারত-অস্ট্রেলিয়া

কোয়ার্টার ফাইনালের আট দল চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল গত পরশু। কাল চূড়ান্ত হলো কার সঙ্গে কার খেলা। ২০০৩ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্টের এবার দেখা হয়ে যাচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালেই। আগামী ২৪ মার্চ আহমেদাবাদে মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত।
কোয়ার্টার ফাইনাল পর্ব শুরু হয়ে যাবে এর আগের দিনই, আগামী পরশু বুধবার ঢাকায় পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দিয়ে। ২৫ মার্চ ঢাকায় অন্য কোয়ার্টার ফাইনালের দুই দল দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড। পরদিন কলম্বোতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে শ্রীলঙ্কা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে আবার আসছে ঢাকায়। বাংলাদেশের আক্ষেপ আরও বাড়াতেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পয়েন্ট তো বাংলাদেশেরই সমান (৬)। কিন্তু ৫৮ আর ৭৮-এর অভিশাপে নেট রানরেটের দুর্দশায় বাংলাদেশ দর্শক হয়ে থাকবে কোয়ার্টার ফাইনালে।

কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট মিলবে আজ

আগামী ২৩ ও ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়া যাবে আজ। মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেওয়া হবে টিকিট। ব্যাংক থেকে পাওয়া রসিদ দেখিয়ে এখান থেকে টিকিট নিতে হবে বলে জানিয়েছে বিশ্বকাপের স্থানীয় আয়োজক কমিটি।

টেন্ডুলকার নয়, যুবরাজের ম্যাচ

তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের স্যুভেনিয়রে প্রথম লেখাটা এখানকার ৮০ বছরের ক্রিকেট-ঐতিহ্য নিয়ে। সেই ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হতো শচীন টেন্ডুলকার তাঁর সেঞ্চুরির সেঞ্চুরিটা পেলে। মাত্র ২ রানেই টেন্ডুলকারের আউট হয়ে যাওয়ায় চেন্নাইয়ের এই রাতটা আলোকোজ্জ্বল হলো না। বরং আবারও মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের ব্যাটিং-ধসের পর একটা সময় পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের কড়া চ্যালেঞ্জ বড় এক স্নায়ুর পরীক্ষা নিল মাঠভর্তি দর্শকের।
শেষ পর্যন্ত ভারতের সহজ জয়ে চিত্রনাট্যের সমাপ্তি। নিজেরা ২৬৮ করে ৮০ রানের জয়। এই মাঠে ইংল্যান্ডের ২৪৩ তাড়া করতে নেমে শেষ দিকে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ১৮ রানে হেরে বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন পরীক্ষার সামনে। সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশ পাস নম্বরের ধারেকাছেও নেই। আশ্চর্য ব্যাপার, কালও একই অবস্থা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের তৃতীয় উইকেট পড়ল ১৫৪ রানে। দেখতে দেখতে ৪৩ ওভারে ১৮৮ রানে অলআউট!
এতে অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালেই অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ভারতকে। ২৪ মার্চ আহমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া মহারণ, ২০০৩ ফাইনালে প্রতিশোধ নেওয়ার একটা সুযোগ ভারতীয় দলের সামনে। কিন্তু কাল রাতে হোটেলে ফিরে প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবার চেয়ে নিজেদের সমস্যাগুলোই মাথায় কিলবিল করার কথা ধোনির।
সমস্যার নাম হঠাৎ ভেঙে পড়া। দুরন্ত বেগে ছুটতে ছুটতে খাদে বাস পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এই বিশ্বকাপে ভারতের ব্যাটিংয়ের বিজ্ঞাপনই হয়ে গেছে এটা। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ—দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৯ রানে ৯ উইকেট নেই! অত বড় বিপর্যয় কাল হয়নি ঠিকই, তবে এ দিন ২৮ রানে শেষ ৫ উইকেট হারানোও তো কম নয়। কে বলবে এটি ক্রিকেট-দুনিয়ায় সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যাটিং লাইনআপের ছবি!
পাওয়ার প্লেতে রান কই? বোলিং পাওয়ার প্লেতে ২৮, ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতেও চার-চারটি উইকেট হারিয়ে ২৮! ২৮ ওভারে ২ উইকেটে ১৫০, ৪০ ওভারে ৩ উইকেটে ২১২। বিকল গাড়ির মতো ঠেলে-ধাক্কিয়ে শেষ পর্যন্ত ৫ বল আগে ভারত অলআউট ২৬৮ রানে।
হাঁটুর হালকা চোট এ দিন বিশ্রামে রেখেছে বীরেন্দর শেবাগকে। টেন্ডুলকার নিজের চতুর্থ বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরার পর শুরুতেই বড় ধাক্কা। আম্পায়ার আউট না দিলেও নিজেই ফিরে গেলেন প্যাভিলিয়নে। টেন্ডুলকার নিজেও যে একজন বড় মাপের মানুষ সেটি বোঝালেন আরেকবার। যে দুজনের ব্যাটিং দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ বসে থাকতে রাজি, তাঁদের একজনও উইকেটে না থাকা মানে আকর্ষণ অর্ধেক কমে যাওয়া। টেন্ডুলকার যখন আউট, গোটা স্টেডিয়াম যেন ঢেকে গেল শোকের চাদরে। থেমে গেছে বাঁশি ফুঁকানো, পতাকা ওড়ানো। কারও যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না টেন্ডুলকার আউট!
যুবরাজ সিং মঞ্চে এলেন। টেন্ডুলকারের ম্যাচ হলো না, এটি হলো আসলে যুবরাজেরই ম্যাচ। এই বিশ্বকাপেই এর আগে দুটি করে ম্যাচ জেতানো ফিফটি, একটায় ৫ উইকেটও। সেঞ্চুরি পেলেন এই প্রথম। এবারের বিশ্বকাপটা যেন যুবরাজময় হয়ে উঠছে!
ক্ষমতাসীন করুণানিধি না জয়ললিতা জিতবেন আগামী মাসের তমিলনাড়ুর রাজ্য নির্বাচনে, এটা নিয়ে এখানকার মানুষের বেশ আগ্রহ। এসবই কাল ভুলিয়ে রাখলেন যুবরাজ। কোহলির সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ২৩.৫ ওভারে তুললেন ১২০ রান। এটিই ভারতীয় ইনিংসে সবচেয়ে স্বস্তির অংশ। ১১২ বলে সেঞ্চুরি পাওয়া যুবরাজ আউট হলেন ১১৩ রানে, ১০ চার, দুই ছক্কা। বল হাতে দুই উইকেট। ব্যাট-বলে উজ্জ্বল (এই বিশ্বকাপে যুবরাজের ব্যাটিং গড় ৯৪ আর স্ট্রাইক রেট ৮৬) যুবরাজ ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছেন নিজেকে এবং হয়ে উঠছেন দলের কান্ডারি।
ভারতীয় ব্যাটিংয়ের বড় পরীক্ষা হবে কেমার রোচের গতির সামনে—ম্যাচের আগে অনেকেই বলছিলেন। কিন্তু রোচ ছিলেন না ম্যাচে। রবি রামপল হয়ে উঠলেন উইকেট শিকারি। ৫১ রানে ৫ উইকেট—রান একটু বেশি দিলেও ভারতীয়দের প্রাণঘাতীর নাম তো রামপলই। ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর এই তরুণ ক্যারিবিয়ান আঞ্চলিক যুব টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে পেয়েছিলেন ৪৫ উইকেট! তাঁর জ্বলে ওঠার বার্তা আগেই পাওয়া গিয়েছিল।
অথচ দেখুন, ম্যাচ-পূর্ব আলোচনা ছিল স্পিনারদের নিয়েই। অফ স্পিনার আর অশ্বিনকে না খেলানো নিয়ে অনেক জল ঘোলার পর এ দিন আশিস নেহরার বদলি হিসেবে তিনি একাদশে। এর আগে চিদাম্বরমের উইকেটে ইংলিশ স্পিনার সোয়ান ও ট্রেডওয়েল বোলারদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন, সেটা দেখেই কিনা এ দিন ধোনি বোলিং শুরুই করলেন অশ্বিনকে দিয়ে। শুভসূচনা—অশ্বিন প্রথম ওভারে দিলেন এক রান।
তবে গেইলবিহীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটিংয়ে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি ভারতীয় স্পিনাররা। ইনজুরির কারণে একাদশের বাইরে গেইল। মিডল-অর্ডারে ফেরানো হয়নি অভিজ্ঞ চন্দরপলকে। তবু ধুঁকল ভারতীয় বোলিং। উইকেটে জমে যাওয়া স্মিথকে (৮১) ৩১তম ওভারে ফেরালেন দ্বিতীয় স্পেলে আসা জহির খান। এই স্পেলে ২ ওভারে মাত্র ৪ রানে ১ উইকেট নিলেন জহির। ৩৩তম ওভারে মারকুটে পোলার্ডকে ইউসুফ পাঠানের হাতে ক্যাচ বানালেন হরভজন। এর পর তো পরাজয়ের দিকেই এগিয়ে চলা।

আশার ফুল দেখছেন ফ্লাওয়ার

গত কিছুদিন ধরে নিজের রক্তচাপ হয়তো নিয়মিতই মেপেছেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। রক্তচাপ কমাতে ওষুধ-টষুধও খেয়ে থাকতে পারেন। হূৎপিণ্ডের ওপর দিয়ে কম ঝড় তো আর যায়নি। অনেক দিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন। আর এ জন্য ইংল্যান্ডের কোচ কৃতজ্ঞ থাকবেন বাংলাদেশের কাছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারতে হারতে বেঁচে যাওয়া ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত জয় নিয়ে টিকে ছিল বিশ্বকাপে। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত ছিল না। বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিলে আবারও হিসাবের মারপ্যাঁচে পড়ে যেত ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ অনায়াসে সেই লড়াইয়ে আত্মসমর্পণ করায়ই স্বস্তি ফ্লাওয়ারের, ‘দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পেরে ভালো লাগছে। এটা আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল। যদিও সেই লক্ষ্য পূরণ হলো অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে।’
ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলের সঙ্গে রোমাঞ্চকর শব্দটা কখনোই সেভাবে যায়নি। কিন্তু এই বিশ্বকাপে তারা যেন প্রতিজ্ঞা করেই নেমেছিল নিজেদের নতুন পরিচয়ে পরিচিত করাতে। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের ছয়টি ম্যাচের দিকে ফিরে তাকান। যেটিতে নাটক সেভাবে জমেনি, সেই ম্যাচও শেষ হয়েছে ৮ বল বাকি থাকতে!
কোচ ফ্লাওয়ারও বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের বিশ্বকাপ হয়েছে উদ্বেগপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর। ম্যাচগুলো খুবই ক্লোজ হয়েছে। ড্রেসিংরুমের সবাই অনেকবারই আবেগে ভেসে গেছে। তবে আমি মনে করি, চাপের মধ্যে আমাদের খেলোয়াড়েরা খুবই ভালো করেছে। সবচেয়ে ভালো করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত ম্যাচটায়। আমরা বাদ পড়ার মুখে দাঁড়িয়েও লড়াই করেছি। হ্যাঁ, কেউ হয়তো বলতে পারেন, আমাদের হয়তো আরও দাপট দেখিয়েই জেতা উচিত ছিল। যা-ই হোক, এখন আমরা সামনে তাকিয়ে আছি।’
এই বিশ্বকাপে দুটো বড় অঘটনেরই শিকার ইংল্যান্ড। আয়ারল্যান্ডের পর হেরেছে বাংলাদেশের কাছেও। এই দুটি যদি বিস্মরণযোগ্য ম্যাচ হয়, দুটি মনে রাখার মতো ম্যাচও খুঁজে পাচ্ছেন ফ্লাওয়ার, ‘বিশ্বকাপের অন্যতম দুই ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকা আর ভারতের বিপক্ষে আমরা দারুণ খেলেছি। যদিও আমরা ধারাবাহিক ছিলাম না। আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। না হলে আর এগোতে পারব না।’
কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ঠিক ছিল না। তবে রণকৌশল এরই মধ্যে ঠিক করতে শুরু করেছেন অ্যাশেজজয়ী এই কোচ, ‘আমাদের সম্ভবত ম্যাচটা কলম্বোয় গিয়ে খেলতে হবে। এ ভেন্যুর অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান ম্যাচটি দেখছিলাম। উইকেটটা তো খুবই ভালো মনে হলো। সেখানে আমরা আগেও খেলেছি। অবশ্য ভেন্যু নিয়ে আমাদের কোনো বাতিক নেই। যে কোনো জায়গায়ই খেলতে আমরা প্রস্তুত। শুধু প্রতিপক্ষ আর ভেন্যুটা চূড়ান্ত হয়ে গেলে পুরোদমে প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।’
ইংল্যান্ড দলেই চোটের কারণে সবচেয়ে বেশি ওলটপালট হয়েছে। এউইন মরগানের জায়গায় রবি বোপারা, কেভিন পিটারসেনের জায়গায় মরগান, স্টুয়ার্ট ব্রডের জায়গায় ক্রিস ট্রেমলেট...সর্বশেষ আজমল শেহজাদের জায়গায় জেড ডার্নবাখ। ডার্নবাখকে নিয়ে ইংল্যান্ড দলে যোগ হলো আরেক দক্ষিণ আফ্রিকান। আগামী মাসে ২৫ পূর্ণ করতে চলা এই পেসারের ব্যাপারে ফ্লাওয়ারকে উচ্ছ্বসিতই মনে হচ্ছে।
কিন্তু একইভাবে জেমস অ্যান্ডারসনের ফর্মহীনতাও কি তাঁকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করছে না? তবে ফ্লাওয়ার সমস্যাটা ধরতে পেরেছেন, তা নিরাময়ের উপায়ও, ‘গত শীতে (অস্ট্রেলিয়া সফরে) ওর ওপর দিয়ে অনেক চাপ গেছে। ওর ওপর থেকে আমাদের চাপ সরাতে হবে।’

‘আনলাকি’ নাজমুল

ধারণাটা তাঁর আগে থেকেই ছিল। এবার সেটা হয়ে গেল বদ্ধমূল। নাজমুল হোসেন এখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, তিনি আসলেই ‘আনলাকি’। কপাল যদি না-ই খারাপ হবে, এক মাস দলের সঙ্গে থেকেও কেউ ছয়-ছয়টা ম্যাচে শুধু দর্শক হয়ে বসে থাকে?
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ১৫ ক্রিকেটারের ১৪ ক্রিকেটারই খেলার সুযোগ পেয়েছেন, পাননি শুধু নাজমুল। সান্ত্বনা হিসেবে দলের অনেকেই ‘ব্যাডলাক’ বলেছেন। নাজমুল হাসেন। কথাটা যে নতুন শুনছেন না!
নাজমুলের ক্যারিয়ারজুড়েই আসলে ‘ব্যাডলাক’ ছেয়ে আছে। তাঁর দলে থাকাটা বেশির ভাগ সময় নির্ভর করে কারও ইনজুরির ওপর। দলে থাকলেও খেলার নিশ্চয়তা পাননি কখনোই। এমনও হয়েছে, খেলার আগের রাতে জানতেন পরদিন খেলবেন, সকালে মাঠে গিয়ে শোনেন দলে তাঁর জায়গা হয়নি।
এই অভিজ্ঞতা এবারের বিশ্বকাপেও হয়েছে। অনুশীলনে চোট পেয়েছিলেন শফিউল ইসলাম। আয়ারল্যান্ড ম্যাচের আগের রাতে আর সবার মতো নাজমুলও জানতেন পরদিন খেলছেন। কিন্তু সকালে মাঠে গিয়ে ওয়ার্মআপ করার সময় শুনলেন, বাদ পড়ার আগে শফিউলের ফিটনেস টেস্ট হবে। অতীত অভিজ্ঞতা নিকট ভবিষ্যৎটা ভেসে ওঠে নাজমুলের চোখের সামনে। তাহলে আরও একবার ঘটতে যাচ্ছে ঘটনাটা! ‘দল ঘোষণার ৫-৭ মিনিট আগে শুনলাম শফিউলের ফিটনেস টেস্ট হবে। তখনই বুঝে গেছি আমার আর খেলা হচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা তো আর নতুন নয়’—কালই হবিগঞ্জ চলে যাওয়া নাজমুল টেলিফোনে কথাগুলো বলার সময় হাসলেন। দুঃখের হাসি।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের উত্থান-পতন মাঠের বাইরে বসেই দেখেছেন। ইংল্যান্ডের সঙ্গে জেতার পর ড্রেসিংরুমে অন্য সবার সঙ্গে উল্লাসে মেতেছেন, আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর দক্ষিণ আফ্রিকা বিপর্যয়ের পর হয়েছেন শোকবিহ্বল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ রানে অলআউট হওয়াটা নাজমুলের চোখে একটা দুর্ঘটনা। তবে মেনে নিতে পারছেন না দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানেই গুঁড়িয়ে যাওয়াটাকে, ‘৫৮ রানের ঘটনাটা আসলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হয়ে গেছে। এক ম্যাচে ও রকম হতেই পারে। কিন্তু কাল (পরশু) ৭৮ রানে অলআউট হওয়ার পর আমরা উপলব্ধি করলাম, আসলে আমাদের ব্যাটিংই খারাপ হচ্ছে। বড় জুটি হচ্ছে না, কেউ দায়িত্ব নিতে পারছে না।’ কেন এই বিপর্যয়? পানি টেনে বিশ্বকাপ কাটিয়ে দেওয়া নাজমুলও একমত কোচ-অধিনায়কের সঙ্গে, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতেই হবে—এই চাপ থেকেই সম্ভবত এটা হয়েছে। জিততেই হবে চাপটাই বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল।’
একটা ম্যাচও যেহেতু খেলেননি, নাজমুল চাইলে ব্যর্থতার দায় না-ই নিতে পারেন। বলে দিতে পারেন, ‘আমার আর কী দোষ! আমাকে তো খেলালোই না!’ শত হতাশার পরও সে পথে যাচ্ছেন না এই পেসার, ‘অন্যদের আমার চেয়ে ভালো মনে হয়েছে বলেই খেলানো হয়েছে। আমি খেললেও ফলাফল এ রকমই হতে পারত।’
তাই বলে ভাববেন না দেশের মাটির বিশ্বকাপে একটি ম্যাচও খেলতে না পারায় নাজমুলের হতাশা নেই। বরং কাল এই প্রতিবেদকের ফোনটা পেয়েই বলেছেন, ‘জানি, কেন ফোন করেছেন...আমার ক্ষেত্রে এ রকমই হয়। আমি আনলাকি। ভালো খেলতাম, না খারাপ খেলতাম সেটা পরে, দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ হলো আর আমি কিনা একটা ম্যাচও খেলতে পারলাম না, সেটাই দুঃখ।’ দল জিতলে তবু জয়ের আনন্দে ঢেকে রাখতে পেরেছেন হতাশা, তবে হারের পর দুঃখটা আরও বেড়েছে।
সামনে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ। বিশ্বকাপ খেলতে না পারার হতাশা ভুলতে সেদিকেই তাকিয়ে আছেন নাজমুল। তবে আবারও তাঁকে ‘আনলাকি’ হয়েই থাকতে হবে না, সেই নিশ্চয়তা কী!

বিষাদে বিদায় টিকোলোর

কটক থেকে কলকাতা, বারাবতি থেকে ইডেন। আকাশপথে মাত্র ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু স্টিভ টিকোলোর কাছে ১৫ বছরের দূরত্ব। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ থেকে ২০ মার্চ ২০১১—মাঝখানে দীর্ঘ ১৫ বছর, ১৩৪টি ওয়ানডে। ২৪ বছরের তরুণ কটকে সেদিন নিজের অভিষেক ম্যাচে করেছিলেন ৬৫ রান। আরেকটি বিশ্বকাপ দিয়েই শেষ হলো যাত্রা। শেষটা অবশ্য মাত্র ১০ রান দিয়ে।
শেষটা ভালো হলো না স্টিভ টিকোলোর, নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে যোগ হয়েছে দলীয় ব্যর্থতা। কেনিয়ার ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাটিকে একটা বড় বিদায়ী উপহার দিতে চেয়েছিল দল। এই ম্যাচের নেতৃত্বও সঁপে দেওয়া হয়েছিল তাঁর কাঁধে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘নির্দয়’ জিম্বাবুয়ে টিকোলোকে উপহার দিল ১৬১ রানের পরাজয়।
বিশ্বকাপ থেকে শূন্য হাতে বিদায় নিল ২০০৩-এর সেমিফাইনালিস্টরা। এবারের আসরে চরমভাবে বিপর্যস্ত কেনিয়া হেরেছিল কানাডার সঙ্গেও। কাল শেষ ম্যাচটা ছিল তাদের শেষ আশা। কিন্তু সেই আশা শেষ হয়ে গেছে জিম্বাবুয়ে ৩০৮ রান করাতেই। ক্রেগ আরভিন আর ভুসি সিবান্দার দুটি ষাটের ইনিংসের সঙ্গে টাটেন্ডা টাইবুর ফিফটি—সব মিলে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে ৩০০ পেরোনো স্কোর এনে দিয়েছিল জিম্বাবুয়েকে। টিকোলোর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় কেনিয়ার আশা। স্কোর যে তখন ২৭/৩।
কাল ইডেনে জিম্বাবুয়ের স্পিনারদের হাতে নাকাল হয়ে কেনিয়া শেষ পর্যন্ত ১৪৭ রানে অলআউট। জিম্বাবুয়ের চার স্পিনার মিলে নিয়েছেন ৭ উইকেট। পাঁচজন ব্যাটসম্যান এলবিডব্লুর শিকার, বিশ্বকাপ সপ্তমবার দেখল এ ঘটনা। নেহেমিয়া ওদিয়াম্বোই যা একটু প্রতিরোধ গড়েন তাঁর অপরাজিত ৪৪ রানের ইনিংসে।
ম্যাচ শেষে টিকোলোর কণ্ঠে থাকল হতাশাই, ‘ভালো খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে রকম কোনো জুটিই হলো না আমাদের। এই ম্যাচ থেকে তরুণেরা ইতিবাচক দিকগুলো নিতে পারলে সেটাই হবে আমাদের বড় পাওয়া।’ বললেন নিজের কথাও, ‘ক্যারিয়ারের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছি। অনেক উত্থান-পতন ছিল। কিন্তু নিজের দেশের হয়ে অনেক গর্ব নিয়েই খেলেছি।’

হতাশার নাম সাকিব-তামিম

রেসিংরুম থেকেই বিদায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্বকাপকে। হাসি-আনন্দ, হতাশা-গ্লানি সবকিছুকেই। পরশু ম্যাচ শেষে কোচ জেমি সিডন্স দীর্ঘ বক্তব্যে কঠিন কঠিন কথা যেমন বলেছেন, সব ভুলে সামনের দিকে তাকানোর পরামর্শও দিয়েছেন। রাতেই হোটেল ছেড়ে বিশ্বকাপ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন কোচ, সহ-অধিনায়কসহ অনেক ক্রিকেটার। অধিনায়ক সাকিব আল হাসানসহ বাকিরা হোটেল ছেড়েছেন কাল সকালে।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের আরও দুটি ম্যাচ বাকি থাকলেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শেষ। কাল সারা দিন ক্রিকেটাঙ্গনে, সাধারণ্যে সেই উপসংহার নিয়েই ব্যথাতুর আলোচনা হলো। হারবে তো হারবে, ৭৮ রানে অলআউট হয়ে! আরেকটু ভালো কি করা যেত না? অতি বিশ্লেষণী কেউ কেউ সব দোষ চাপাচ্ছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপর। বাংলাদেশকে ৫৮ রানে অলআউট করে দেওয়া ওই ওয়েস্ট ইন্ডিজই তো নষ্টের গোড়া। এরপর যদি তারা ইংল্যান্ডকে হারাতে পারত, তা-ও হতো। ড্যারেন সামির দল বাংলাদেশের জন্য সেটাও করল না!
৫৮ ও ৭৮ রানের হতাশায় একটা ব্যাপার চাপাই পড়ে যাচ্ছে—বাংলাদেশ তো বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ জিতেছেও! এর মধ্যে আছে ইংল্যান্ডকে হারানোর গর্ব। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ডের সঙ্গে আর অন্তত একটা বড় দলের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল সাকিবের দল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই স্বপ্ন পূরণের পরও এত হতাশা! বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারেনি বলেই হয়তো।
কারণ আসলে সেটাও নয়। ৫৮ আর ৭৮-এর লজ্জাই বিশ্বকাপের সব প্রাপ্তিকে মুছে দিচ্ছে। এই দুটি ম্যাচে আরেকটু লড়াই করতে পারলেই এত কষ্ট পেতে হতো না। এত সমালোচনাও হতো না। তিন ম্যাচে জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে দুই ম্যাচে এক শর নিচে অলআউট হওয়াটাই এখন ২০১১ বিশ্বকাপের স্মৃতি হয়ে থাকবে। সঙ্গে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের উপহার দেওয়া হতাশা তো আছেই। বিশ্বকাপের আগের এক বছরের পারফরম্যান্স এই দুই ক্রিকেটারকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য উচ্চতায়। ক্রিকেট-বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মুখ হয়ে উঠেছিলেন সাকিব-তামিম। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-স্বপ্নও আবর্তিত হচ্ছিল তাঁদের ঘিরেই। প্রত্যাশাকে একটু একটু করে বাড়িয়ে তাঁরাই উঠিয়ে দিয়েছিলেন আকাশে। সেখান থেকে পড়ে গেলে ধপাস শব্দ তো হবেই! সমালোচনাটা সেভাবেই নেওয়া উচিত অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের।
সাকিব বিশ্বসেরা ওয়ানডে অলরাউন্ডার। ৬ ম্যাচে ১৪২ রান আর ৮ উইকেটে কি সেটির প্রতিফলন ঘটে? গত বিশ্বকাপের আবিষ্কার তামিম এই বিশ্বকাপের আগেও ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের প্রাণভোমরা। তামিম একটা ভালো শুরু এনে দেওয়া মানেই বাংলাদেশের ভালো কিছুর সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়া। যেটি পূর্ণতা পাবে ব্যাটে-বলে সাকিবের ধারাবাহিকতায়! দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশের মাটির বিশ্বকাপে সে হিসাব মিলল না। তিন জয় পেয়েও যে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার প্রতিশব্দ হয়ে যাচ্ছে, সেটির কারণও সাকিব-তামিমের নিষ্প্রভ হয়ে থাকা।
বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে তামিম রান করেছেন মাত্র ১৫৭, ফিফটি একটাই। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ৭০ রানের সেই ইনিংসটিও কি তামিমসুলভ ছিল? তামিমকে তাঁর মতো মনে হয়েছে কেবল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৮ রানের ইনিংসটিতেই। সেই ইনিংস আরও বড় না হওয়ায় বাঁহাতি এই ওপেনার নিজেই নিজের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘৪০ রানকে এখন ব্যর্থতা মনে হয়।’ তবে শেষ ম্যাচে সাকিবের ৩০ রানকেও অনেক মনে হলো। ৭৮ থেকে এই ৩০ বিয়োগ দিলে যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫৮-এর চেয়েও ১০ রান কম হয়ে যায় বাংলাদেশের! বিশ্বকাপে সাকিবেরও একটিই ফিফটি এবং সেটিও ভারতের বিপক্ষে। এরপর ১৬, ৮, ৩২, ১ এবং ওই ৩০। সাকিব নিজেই নিজের জন্য যে উঁচু মানদণ্ড ঠিক করে রেখেছেন, তাতে এই পারফরম্যান্স তাঁকে যন্ত্রণায় পোড়ানোরই কথা।
পোড়াক। বিশ্বকাপ-হতাশার জ্বলুনি সবারই আছে, সাকিবের না হয় একটু বেশিই থাকল। অধিনায়ক সাফল্যের হাততালি যেমন নেবেন, ব্যর্থতার গ্লানিও তো তাঁকেই বেশি বইতে হবে! সমস্যা একটাই—‘মার ঘুরিয়ে’র বিশ্বকাপটা বাংলাদেশের জন্য হয়ে থাকল ‘মার পুড়িয়ে’র বিশ্বকাপ।

অপেক্ষা বাড়ল টেন্ডুলকারের

‘প্লিজ, গিভ আস আ হিস্টোরিক সেঞ্চুরি’—ব্যানারটা ধরে আছে একদল উল্লসিত তরুণ-তরুণী। সামনে টিভি ক্যামেরা। পুলিশ অফিসার এসে সরিয়ে দিতে চাইলে অ্যাংকরের অনুরোধ, ‘স্যার, দো মিনিট...দেনা চাউঙ্গে।’
এটি একটা খণ্ড চিত্র। চিদাম্বরম স্টেডিয়ামের গেট খেলার আগেই বাইরের চত্বরটা জানাতে থাকল এমন আকুতি। ভারত টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পর আকুতিটা পরিণত হলো অপেক্ষায়। টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ৯৯ সেঞ্চুরির মালিকের দিকে সবার চোখ।
কিন্তু পিপাসু সেই চোখ টেন্ডুলকারের বদলে দ্বিতীয় ওভারেই দেখছে বিরাট কোহলিকে! প্রথম বলেই ২ রান নিয়ে শুরু করা টেন্ডুলকার তিন বল পর প্যাভিলিয়নে। গোটা স্টেডিয়াম স্তব্ধ। সাংবাদিকদের আবেগের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়, কিন্তু প্রেসবক্সও যেন শোকে পাথর!
স্টেডিয়ামে আসার পথে টেন্ডুলকার নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন, তাঁর ‘ঐতিহাসিক’ সেঞ্চুরি দেখার জন্য চেন্নাই কেমন উৎসবমুখর ছিল! সেই উৎসব থেমে যাওয়ার হতাশা রেকর্ডের বরপুত্রকে না পুড়িয়ে পারেই না!
টেন্ডুলকারের আউট দেখে সাবেক ভারতীয় উইকেটকিপার দীপ দাশগুপ্তার অনুভূতি কী ছিল কে জানে, তবে ম্যাচের আগে একটা চ্যানেলে ‘লাইভ’ অনুষ্ঠানে টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি নিয়েই প্রত্যাশার জাল বুনছিলেন। সঙ্গে এও ছিল, ‘গ্যারি কারস্টেন ছেলেদের ওপর চাপের বোঝা চাপিয়ে দেয়নি। কাল (পরশু) অনুশীলনে ভারতীয় ক্রিকেটাররা ছিল নির্ভার, হাসি-ঠাট্টা, মজা করেছে অনেক...’ বলে যাচ্ছিলেন দীপ।
কিন্তু ভালো করে শোনা গেলে তো! চারপাশে এমন হইহুল্লোড় যে মিরপুরে বাংলাদেশের ম্যাচ নিয়ে তৈরি হওয়া উচ্ছ্বাসের প্রতিচ্ছবি এখানেও। ভারত ‘ক্রিকেটের দেশ’ বলে এখানকার উচ্ছ্বাস নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। তবে কাল ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ ঘিরে চিদাম্বরম স্টেডিয়াম নতুন করে জানাল, ক্রিকেট আসলেই ভারতীয়দের শয়নে-স্বপনে।
প্রবাসজীবন ছেড়ে আপাতত ভারত ঘুরে ঘুরে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখা দীনেশের বড় বিজ্ঞাপন। গায়ে ভারতীয় পতাকা জড়িয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তুমুল আনন্দে মেতে থাকা মাঝবয়সীর হাতে একটা ব্যানার। টিভি ক্যামেরায় দেখানোর আশায় লন্ডনে থাকা স্ত্রীর উদ্দেশে মজা করে লিখেছেন, ‘তাড়াতাড়ি টাকা-পয়সা পাঠাও। আমি আর এখানে চলতে পারছি না!’
৫০০ রুপির টিকিট ৫ হাজার রুপি দিয়ে কিনে নাকি ভারতীয় ম্যাচগুলো দেখতে হয়েছে তাঁকে! ভদ্রলোক বাংলাদেশে একটা কোয়ার্টার ফাইনাল দেখার আকাঙ্ক্ষায় এই প্রতিবেদকের কাছে চেয়ে বসলেন একটা টিকিট! হাসি-ঠাট্টার মধ্যে হঠাৎই এমন সিরিয়াস অনুরোধ।
এই ভিড়ে দেদার চলেছে মুখে রং, ভারতীয় পতাকা আঁকার মহাযজ্ঞ। একে সকাল থেকেই চলেছে রাস্তায় রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী রং খেলা, তার ওপর ভারতীয় ক্রিকেটে ‘বিশেষ’ দিন। স্টেডিয়াম চত্বরে রঙের কৌটা নিয়ে ঘুরছে একদল ‘ব্যবসায়ী’, সমর্থকেরাও এসে কেউ মুখ কেউ হাত এগিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটি মুখ তো দেখা গেল একদমই বদলে গেছে। দিনের বেলা বলে ভূতের মতো লাগছিল লেখা যাচ্ছে না! নইলে তো ‘ভূত’ই!
ম্যারি সি কিজুসিকে দেখলে সেই ‘ভয়’ নেই। মুখে কিছু আঁকেননি। জাপানি ভদ্রমহিলা জীবনে এই প্রথম মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে এলেন! ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে ক্রিকেট দেখতে টোকিও থেকে তাঁর ছুটে আসা। ক্রিকেটের ওপর একটা বই লেখার প্রাক-অভিজ্ঞতা নেওয়াও একটা উদ্দেশ্য।
পেশায় শিক্ষক কিজুসি বলছিলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-মানসিকতা বোঝার জন্য ক্রিকেট দেখা চাই। আশির দশকে ছাত্রী হিসেবে এ দেশে এসে তখন দেখেছিলাম একটা পরিবারের সবাই সারা দিন টিভির সামনে বসে ক্রিকেট দেখে। তখন থেকেই এর প্রতি আমার আগ্রহ। টেন্ডুলকারের শততম সেঞ্চুরি দেখতে পেলে সেটি আমার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।’ টেন্ু্ভ্রলকার আউট হয়ে যাওয়ার পর ফোনে ধরা গেলে কিজুসির কণ্ঠে ঝরল হতাশা, ‘আই অ্যাম ভেরি ডিজহার্টেড।’
তবে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি না দেখুন, জীবন্ত কিংবদন্তিকে মাঠে বসে দেখাও তো কম নয় এক জাপানিজের জন্য। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কিজুসি বলতে ভুললেন না, ‘এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কোনো দিন ভোলার নয়!’

অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতার খোঁজে যুবরাজ

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বটা যথার্থ ফেবারিটের মতো খেলেই কোয়ার্টার ফাইনালে পা দিয়েছে স্বাগতিক ভারত। ‘বি’ গ্রুপ থেকে শীর্ষস্থানটা দখল করতে না পারলেও ধোনি বাহিনীর পারফরমেন্স সমীহ জাগিয়েছে সবার মধ্যেই। দুই ভারতীয় ওপেনার বীরেন্দর শেবাগ ও শচীন টেন্ডুলকার আছেন ভালো ফর্মে। ইতিমধ্যেই দুটি সেঞ্চুরি করে শেষ বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন লিটল মাস্টার। তবে ভারতীয় শিবিরে সবচেয়ে বেশি আশার আলো জাগিয়েছেন যুবরাজ সিং। অনেক দিন ধরেই রান খরার জন্য সমালোচনার মুখে ছিলেন এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। দলে জায়গা পাওয়াটাও পরে গিয়েছিল অনিশ্চয়তার মুখে। কিন্তু গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রায় দেড় বছর পর স্বস্তির এক শতক হাঁকিয়ে নিজের প্রত্যাবর্তনের কথা বেশ ভালোভাবেই জানান দিয়েছেন যুবরাজ। বল হাতেও নিয়েছেন দুটি উইকেট।
শীর্ষস্থানটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে কোয়ার্টার ফাইনালেই টানা তিনবারের শিরোপা জয়ী অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ভারতকে। এই ম্যাচটাকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচ হিসেবে অনুমান করছেন অনেকেই। গতকাল শেষ আটের ফিক্সচার চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর পরই এই ম্যাচটা নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন যুবরাজ সিং। গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের পর এই ভারতীয় অলরাউন্ডার বলেছেন, ‘গ্রুপ পর্বে তারাও চারটা ম্যাচ জিতেছে, আমরাও চারটা জিতেছি। দুই দলই সমান শক্তিধর। এখন ওই ম্যাচে মাঠে ভালো খেলতে পারাটাই মূল ব্যাপার।’
আগের বিশ্বকাপগুলোর অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে এবারের অস্ট্রেলিয়া অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করছেন যুবরাজ। আর সেই দুর্বলতার পুরো সুযোগ নিয়েই অসিদের টানা বিশ্বকাপ সাফল্যের অবসান ঘটাতে চান তিনি, ‘অস্ট্রেলিয়া খুবই ভালো দল। তারা টানা তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে। কিন্তু এখন তাদের শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা ম্যাথু হেইডেন নেই। মিডল অর্ডারে রিকি পন্টিংয়ের ফর্মও খুব বেশি ভালো যাচ্ছে না। তাদের এ রকম দুর্বল জায়গাগুলো যদি আমরা শনাক্ত করতে পারি, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে জিততে পারব।’

ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিশ্বাস

বীরেন্দর শেবাগকে তাড়াতাড়ি সাজঘরে ফেরাতে পারাটা যেকোনো বোলারেরই চরম প্রার্থিত। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ বোলারদের খুব বেশি আনন্দে ভাসতে দেননি ভারতের এই বিধ্বংসী ওপেনার। গ্রুপ পর্বের পাঁচ ম্যাচ খেলেই ৬৫.৪০ গড়ে করে ফেলেছেন ৩২৭ রান। যতক্ষণ ব্যাট হাতে উইকেটে থেকেছেন, রীতিমতো তটস্থ থাকতে হয়েছে সব বোলারকেই। এই বিধ্বংসী চেহারার জন্য তাঁরা দোষারোপ করতে পারেন শেবাগের জার্সিটাকে। এই জার্সির কারণেই নাকি এত ভালো ফর্মে ফিরতে পেরেছেন শেবাগ। অনেকেই হয়তো লক্ষ্য করেছেন, অন্য সব খেলোয়াড়ের জার্সিতে একটা নির্দিষ্ট নম্বর থাকলেও শেবাগের জার্সিটা নম্বরবিহীন। আর এটাই নাকি তাঁর সৌভাগ্যের প্রতীক।
এর আগে শেবাগের জার্সিতে ৪৪ নম্বরটা থাকত। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর আগ দিয়ে এক জ্যোতিষীর পরামর্শক্রমে নম্বরবিহীন জার্সি পরে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন ভারতের এই ড্যাশিং ওপেনার। এ ধরনের কুসংস্কারে শুধু শেবাগই নন, বিশ্বাস করেন ভারতের অন্য অনেক ক্রিকেটাররাও। ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির জার্সি নম্বর ৭, কারণ তাঁর জন্মদিন ৭ জুলাই। যুবরাজ সিংও তাঁর জন্মদিন (১২ ডিসেম্বর) মিলিয়েই পছন্দ করেছেন তাঁর জার্সি নম্বরটা (১২)। এ ছাড়া ভারতীয় এই অলরাউন্ডার, তাঁর মায়ের পরামর্শে হাতে একটা কালো সুতা বেঁধে মাঠে নামেন এবং বিশ্বাস করেন যে এটা তাঁকে যেকোনো অপশক্তির হাত থেকে দূরে রাখবে।
ভারতের ব্যাটিং লাইনের আরেক স্তম্ভ বিরাট কোহলিও স্বীকার করেছেন তাঁর কুসংস্কারের কথা। কলকাতা টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘আগে, আমি যে গ্লাভস পরে বেশি রান করতে পারতাম, সব সময় সেটা পরেই মাঠে নামতাম। কিন্তু এখন আমি স্বাচ্ছন্দ্যটাকেই বেশি প্রাধান্য দিই। তবে এখনো আমি একটা কালো সুতা পরে মাঠে নামি।’ পেসার জহির খানও অকপটে জানিয়েছেন তাঁর বিশ্বাসের কথা। প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে একটা হলুদ রুমাল সঙ্গে রাখেন ভারতের এই বাঁ-হাতি পেসার।
এই কুসংস্কারের তালিকায় আছে সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের নামও। ব্যাট হাতে মাঠে নামার আগে তিনি সব সময় প্রথমে বাঁ পায়ে প্যাড পরেন। আর ব্যাট নিয়ে তাঁর খুঁতখুঁতে স্বভাবের কথা তো অনেকেরই জানা। শুধু লিটল মাস্টার নিজে নন। তাঁকে ঘিরে অনেক কুসংস্কার আছে তাঁর পরিবারের—এমনকি সমর্থক-ভক্তদেরও। টেন্ডুলকার যখন ব্যাটিং করেন, তখন নাকি তাঁর পরিবারের কেউ টিভিতে খেলা দেখেন না। এই ভয়ে যে এতে তিনি দ্রুত আউট হয়ে যেতে পারেন। সমর্থকদের অনেকে ভারতের খেলা দেখার আগে ক্রিকেটারদের সুস্বাস্থ্য কামনা করে দুধ পান করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এ জাতীয় নির্দেশনা রেডিওর মাধ্যমেও দেওয়া হয়। দিল্লির একটি গবেষণা সংস্থার কর্মী প্রিতম সিনহা বলেছেন, ‘ভারতের খেলা দেখার সময় আমি শুধু আমিষজাতীয় খাবার খাই—মাছ, মুরগি বা খাসির মাংস। এটা ভারতের পক্ষে সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং সব অপশক্তিকে দূরে রাখে বলেই আমার বিশ্বাস।’

অবসরের সিদ্ধান্তে অটল স্মিথ

২০০২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়কের দায়িত্ব নিয়েছিলেন গ্রায়েম স্মিথ। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী অধিনায়ক। এরপর থেকে ১৪৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পরিণত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা অধিনায়কে। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে অনেক ম্যাচেই দলকে যথার্থ অর্থেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গড়ে দিয়েছেন অনেক জয়ের ভিত্তি। এবারের বিশ্বকাপেও তাঁর নেতৃত্বেই ‘বি’ গ্রুপ থেকে শীর্ষস্থান দখল করে শেষ আটে পা দিয়েছে প্রোটিয়ারা। কিন্তু আর খুব বেশি দিন এ ভূমিকায় দেখা যাবে না স্মিথকে। বিশ্বকাপের পরপরই এক দিনের ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন ৩০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। এত কম বয়সে তাঁর এ সিদ্ধান্ত অবাক করেছে অনেককেই। কিন্তু অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্তেই অটল আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সফল এ অধিনায়ক।
গতকাল ঢাকায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্মিথ বলেছেন, ‘আমি অনেক দিন আগেই এ সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছি। আমার মনে হয় অবসরে যাওয়ার এটাই সঠিক সময়।’ এমনকি প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ নিতে পারলেও নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবেন না বলে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ইয়ান বোথার হাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন অনেক দিন আগেই। এবার এক দিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারটাকে দীর্ঘায়িত করতে চান স্মিথ। দীর্ঘ নয় বছরের অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ক্যারিয়ারে আমি অনেক উত্তেজনাপূর্ণ সময় কাটিয়েছি। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। এত অল্প বয়সে এ রকম বড় একটা দায়িত্ব নেওয়াটা আসলে রোলার কোস্টারে চড়ার মতো ব্যাপার। প্রথম দিকে আমার এতে কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিন্তু শেষ চার বছর থেকে আমি চালকের আসনে বসতে পেরেছি।

ব্যাখ্যা নেই সিডন্সের কাছেও

এক দল ২৮৪ রান করে ফেলার পর আরেক দল ৭৮ রানে অলআউট হলে পিচ কিউরেটরের রক্তচাপ বাড়ার কথা নয়। ফলাফলে যে উইকেটের ‘অবদান’ শূন্য, সেটা তো ২০৬ রানের ব্যবধানই বলে দেয়! কাল ম্যাচ শেষে তবু শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের কিউরেটর বদিউল আলমকে মেডিকেল রুমে ঢুকতে দেখা গেল। রক্তচাপ মাপতেই কি?
একপেশে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচটাই খেলার আগে-পরে অনেকেরই রক্তচাপ বাড়াল। খেলার আগে দর্শকেরা টেনশনে থাকল—কোয়ার্টার ফাইনালে যাবে তো বাংলাদেশ? ম্যাচ শেষে সেই টেনশন স্থানান্তরিত নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে। দুই দলের দুটি বাসকে মাঠ থেকে নিরাপদে হোটেলে পৌঁছে দিতে হবে। ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা যদি আবারও ক্ষোভের ঢিল ছুড়ে মারে? স্টেডিয়াম থেকে টিম হোটেল পর্যন্ত থাকল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। ক্ষুব্ধ সমর্থকদের ধোঁকা দিতে টিম বাসের সঙ্গে থাকল দুটি ডামি বাসও। স্টেডিয়ামের মূল ফটক এড়িয়ে গাড়ির বহর বের হলো দক্ষিণ দিকের ফটক দিয়ে। মাঠ থেকে হোটেল পর্যন্ত রাস্তার আশপাশের এলাকা করে দেওয়া হলো জনশূন্য। টিম বাস আর নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়ি ছাড়া দুই পাশের রাস্তায় থাকল না আর কোনো যানবাহনও। সংযোগ সড়কগুলোতে যানজটে আটকে পড়া মানুষ যতই বিরক্ত হোক, একেবারেই ফাঁকা রাস্তায় সম্ভবত কালই সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে মাঠ থেকে হোটেলে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা হলো ক্রিকেটারদের।
এর আগে ড্রেসিংরুমের টিম মিটিংয়ে জেমি সিডন্স একটা বক্তৃতা দিলেন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেন দুবার এমন লজ্জাজনক ব্যাটিং হলো জানতে চেয়েছেন কোচ। জবাব পাননি। তবে হোটেলে ফেরার আগে এই প্রতিবেদককে নিজেই দিয়ে গেলেন ব্যর্থতার ব্যাখ্যা, ‘নিজেদের ওপর বিশ্বাস নেই কারও। ম্যাচটা ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার উপলক্ষ, সেটাই যেন চাপে ফেলে দিয়েছে সবাইকে। একটার পর একটা উইকেট পড়ছিল আর চাপ চেপে বসেছিল সবার ওপর। ভালো খেলার সামর্থ্য ওদের সবারই আছে, অথচ উইকেটে গিয়ে সব গুলিয়ে ফেলল!’ এত দিন ক্রিকেট খেলার পরও কেন চাপে ভেঙে পড়া? সিডন্স নিরুত্তর, ‘আমি জানি না...।’ শাহরিয়ার নাফীস কোচের সঙ্গে একমত, বড় আসরে বড় চ্যালেঞ্জের চাপটাই নিতে পারেননি তাঁরা, ‘অকেশনটাই চাপ হয়ে গেছে। চারদিকে সবার প্রত্যাশা, জিততেই হবে—আমরা এটি নিতে পারিনি।’
বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে সিডন্সের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে। রসিকতার ছলে সেটা মনে করিয়ে দেওয়া হলো, ‘ছুটিতে যাচ্ছেন...?’ ৭৮ রানে অলআউট হওয়ার যন্ত্রণা সত্ত্বেও কোচের পাল্টা রসিকতা, ‘...হয়তো লম্বা ছুটিতেই।’ সিডন্সের রসিকতাই সত্যি হয়ে যেতে পারে।্রআগামী জুনে চুক্তি শেষ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান এই কোচকে ‘গুডবাই’ বলার জন্য তৈরি বিসিবি। কাল বোর্ডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও জানালেন, কোচ সিডন্স ও ফিজিও মাইকেল হেনরির চুক্তি অন্তত বাড়ার সম্ভাবনা নেই। বোলিং কোচ ইয়ান পন্ট, ফিল্ডিং কোচ জুলিয়েন ফাউন্টেন ও ট্রেনার গ্রান্ট লুডেনের পারফরম্যান্সে বোর্ড মোটামুটি সন্তুষ্ট হলেও পন্টের ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার গুঞ্জনটা বেশ জোরালো। সিডন্স ছাড়া দলের সঙ্গে থাকা বাকি বিদেশিদের চুক্তি শেষ হওয়ার কথা বিশ্বকাপের পরপর। তবে সাময়িক মেয়াদ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ পর্যন্ত তাঁদেরও রেখে দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ কালই শেষ। খেলোয়াড়দের হোটেল ছাড়াও শুরু হয়ে গেছে রাত থেকেই। অপেক্ষা এখন ৯ এপ্রিল থেকে শুরু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ওয়ানডের হোম সিরিজের জন্য। ২৮ মার্চ পর্যন্ত ছুটি কাটিয়ে পরদিন থেকে শুরু হবে প্রস্তুতি। তিন ম্যাচে জিতলেও ৫৮ আর ৭৮-এর হতাশা কি ভোলা সম্ভব তার আগে?

টিকোলোর ম্যাচে কেনিয়ার চাই ৩০৯ রান

বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু, বিশ্বকাপেই শেষ! ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল স্টিভ টিকোলোর। পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কেনিয়ার ৩৯ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান কলকাতায় খেলছেন নিজের বিদায়ী ম্যাচ।
এবারের বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে হার পাঁচটিতেই। টিকোলোর বিদায়ী ম্যাচে উপহার হিসেবে কেনিয়া একটা জয় প্রত্যাশা করলেও তা কঠিন করে দিয়েছেন জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরা। প্রথম ব্যাট করে ৬ উইকেটে ৩০৮ রানের বড় স্কোর দাঁড় করিয়েছে জিম্বাবুয়ে। তবে আসুক আর না আসুক, টিকোলোকে এই ম্যাচে অধিনায়ক করে একটা ‘উপহার’ দিয়ে রেখেছে কেনিয়া।
চাকাভার কথা বাদ দিলে রান পেয়েছেন জিম্বাবুয়ে ব্যাটসম্যানদের সবাই। হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছেন তিনজন—টাটেন্ডা টাইবু (৫৩), সিবান্দা (৬১) ও ক্রেইগ আরভিন (৬৬)। অধিনায়ক চিগুম্বুরা ৩৮ ও উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান টেইলর করেন ২৬ রান। মাত্র ৬ বলে ১৯ রান করে জিম্বাবুয়ের স্কোর তিনশো অতিক্রম করান প্রসপার উতসেয়া

আমাদের ব্যাটিং খুব বাজে ছিল: পন্টিং

সর্বশেষ হারটা ছিল ১৯৯৯ সালে, পাকিস্তানের বিপক্ষে হেডিংলিতে। এরপর বিশ্বকাপের ৩৪ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার অপরাজেয় যাত্রা। অস্ট্রেলিয়ার যাত্রাটা গতকাল থামল প্রেমাদাসায়। প্রায় এক যুগ পর থামাল সেই পাকিস্তানই! এই ম্যাচে নিজেদের পারফরম্যান্স কীভাবে দেখছেন অসি অধিনায়ক?
‘আমাদের ব্যাটিং খুবই বাজে ছিল। যেভাবে আমরা ব্যাট করেছি, এটি দিয়ে বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ জয়ের কাছাকাছিও যাওয়া সম্ভব নয়।’ রিকি পন্টিংয়ের সরল স্বীকারোক্তি।
গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচ খেলে শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট ৯। তবে নেট রান রেটে এগিয়ে থাকায় শ্রীলঙ্কার অবস্থান দ্বিতীয়, আর অস্ট্রেলিয়া তৃতীয়। আজ চেন্নাইয়ে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার লড়াইয়ে যে দল জয় পাবে, ওই দলের বিপক্ষেই কোয়ার্টার ফাইনালে লড়তে হবে অস্ট্রেলিয়াকে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের স্মৃতিচারণা করে পন্টিং বলেছেন, ‘আমরা যদি আহমেদাবাদে ভারতের বিপক্ষে (ভারত যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারায়) একই রকম খেলি, তাহলে আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, আরেকবার একই পরিণতি হবে আমাদের।