Tuesday, July 17, 2018

জটিল সমীকরণে প্রত্যাবাসন রোহিঙ্গা: ২,১৫৪ জনে অনাপত্তি মিয়ানমারের তবে... by মিজানুর রহমান

শর্তের  বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। রোহিঙ্গারা এবার নতুন শর্ত যুক্ত করেছে! এতদিন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের কথা বললেও এখন তারা বিচারের দাবিটি পূর্ব শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছে। সেগুনবাগিচা বলছে- এমনিতেই প্রত্যাবাসন তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে সাড়ে ৪ মাস সময় খেয়ে ফেলেছে (কিল) মিয়ানমার। সেই তালিকার ৮ হাজার ৩২ জনের মধ্যে চার দফায় মোট ২ হাজার একশ’ ৫৪ জনের বিষয়ে অনাপত্তি মিলেছে। বাকিটা আজও ঝুলে আছে। এখন ভেরিফাইড রোহিঙ্গারা শর্ত বাড়াতে শুরু করেছে। আগে নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকারসহ ৫টি শর্ত ছিল তাদের। এখন নির্যাতনের বিচারের বিষয়টি তারা সামনে নিয়ে এসেছে।
এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি মতে রাখাইন কতটা প্রস্তুত তা দেখতে যেতে চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা। তারা সরজমিন দেখতে চান ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে। চীনসহ রোহিঙ্গা সংকটের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় উৎসাহদাতা বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো দ্রুত ভেরিফাইড রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রতিনিয়ত ঢাকাকে তাগিদ দিচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমারও দাবি করছে তারা তাদের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা যাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে তাদের যেকোনো সময় গ্রহণে তারা প্রস্তুত।
এ অবস্থায় মন্ত্রীসহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা দ্রুতই রাখাইন যেতে চান। তারা দেখতে চায় আদৌ রাখাইন কতটা প্রস্তুত? যেটি মিয়ানমার তথা অং সান সুচি সরকারের প্রতিনিধিরা চীনসহ তাদের বন্ধুদের বলে বেড়াচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরের বিষয়ে গত সপ্তাহে নোট পাঠানো হলেও গতকাল পর্যন্ত মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। ফলে চলতি মাসে সফরটি  হচ্ছে না বলে ধারণা দিয়েছেন কর্মকর্তারা। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ মিটিং এবং প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি সইয়ের পর গত ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৬৭৩টি পরিবারের ৮ হাজার  ৩২ জনের প্রথম প্রত্যাবাসন তালিকা হস্তান্তর করেছিলেন বাংলাদেশ। সেই সময়ে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিউ সোয়ে ঢাকায় এলে তার হাতেই তালিকা তুলে দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
বলা হয়েছিল- দ্রুততম সময়ের মধ্যে তালিকা যাচাই-বাছাই করে তাদের গ্রহণে আপত্তি বা অনাপত্তি জানাবে মিয়ানমার। কিন্তু সাড়ে ৪ মাসেও সেই ‘দ্রুততম সময়’ শেষ হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন- যাচাই-বাছাইয়ে কমপক্ষে দু’মাস সময় নেয়ার কথা রয়েছে চুক্তিতে। কিন্তু সর্বোচ্চ কতদিন সময় পাবে মিয়ানমার তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে মিয়ানমার সেই সুযোগটিই নিচ্ছে। অন্যদিকে তারা এ পর্যন্ত যে ২,১৫৪ বাস্তুচ্যুতকে (রোহিঙ্গা) গ্রহণে অনাপত্তি দিয়েছে তারাও এখন ফিরতে গররাজি। ফেরার শর্ত হিসেবে এতদিন নিরাপত্তা, পুরনো বসত এলাকায় পুনর্বাসন, বাধাহীন চলাফেরা, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, মক্তব, মাদরাসায় যেতে দেয়াসহ কাজকর্মে যোগদানের সুযোগ এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা চেয়েছিল তারা।
কিন্তু প্রত্যাবাসনের পূর্ব শর্ত হিসেবে নির্যাতনের বিচারের দাবিটি যুক্ত করে দিয়েছে ভেরিফাইড বা যাচাই-বাছাইকৃত রোহিঙ্গারা। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন একদিকে যাচাই-বাছাইয়ে মিয়ানমারের ধীরগতি অন্যদিকে ভেরিফাইড রোহিঙ্গাদের নতুন শর্ত আরোপে জটিল সমীকরণের দিকেই যাচ্ছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। যদিও চীনসহ রোহিঙ্গা সংকটের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় উৎসাহদাতা বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো চাইছে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে! তারা প্রতিনিয়ত এ নিয়ে বাংলাদেশকে তাগিদ দিচ্ছে। ওদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় গত আগস্ট থেকে অবস্থান করছে প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গা। তারা শূন্য রেখাতেই রয়েছে, বাংলাদেশে ঢুকেনি বা ঢুকতে পারেনি। এদের যাচাই-বাছাই ছাড়াই  ফেরত নেয়ার বিষয়ে গত ২০শে ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে দুই দেশের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু ৫ মাসেও তাদের ফেরানোর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই! উল্লেখ্য, গত ২৩শে জানুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার নির্ধারিত ডেডলাইন ছিল।

অনলাইনে প্রেম-প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ by রুদ্র মিজান

কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তরুণী। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। থানায় দায়ের করা একটি সাধারণ ডায়েরি নিয়ে ওই তরুণী এসেছেন সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটে। হেল্পডেস্কের সামনে বসে নির্ধারিত ফরমে নিজের অভিযোগ লিখে সাধারণ ডায়েরিটি সংযুক্ত করে দেন। সঙ্গে ফেসবুকে, মেসেঞ্জারের কিছু স্ক্রিনশট। তরুণী একজন ইন্টার্নি ডাক্তার। মাথা নিচু করে বলছিলেন, প্রতারণার এক ভয়ঙ্কর গল্প। অজানা শঙ্কায় তার কণ্ঠ কাঁপছিলো। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা তাকে সাহস দিচ্ছেন। আশ্বাস দিচ্ছেন যে কোনোভাবেই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে। তরুণী বারবার অনুরোধ করছেন কোনোভাবেই যেন বিষয়টি বাইরের কেউ না জানেন। চিকিৎসক তরুণীর মা পুরো বিষয়টি জানলেও বাবাকে জানানো হয়নি। এমনকি পরিবারের আর কাউকেই তা জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সাহস দেন। ভয় নেই, কাউকে জানানো হবে না।
তরুণী জানান, তখন তিনি মেডিকেলে ভর্তির জন্য কোচিং করছেন ঢাকায়। গুলশানে এক আত্মীয়ের বাসায় থেকে কোচিং করেন। এরমধ্যেই ফেসবুকে পরিচয় এক তরুণের সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধুতা। তারপর প্রেম। চুটিয়ে প্রেম করেছেন কয়েক মাস। সুযোগ পেলেই লং ড্রাইভে চলে যেতেন দু’জন। একসঙ্গে সময় কাটাতেন। ছবি তুলতেন। এমনকি মহাখালীর একটি বাসায় প্রায়ই মিলিত হতেন তারা। এরমধ্যেই ঢাকার বাইরে একটি মেডিকেলে ভর্তি হন ওই ছাত্রী। আগের চেয়ে খুব কম দেখা হয় দু’জনের।
কিন্তু ফোনে, ইমোতে, মেসেঞ্জারে কথা। দেখাদেখি হয় ভিডিও কলে। কখনও কখনও তরুণী নিজেই ছুটে আসেন ঢাকায়। সেদিন দু’জনে আগের মতো ঘুরে বেড়ান। এরমধ্যেই ঘটে ঘটনা। সারাদিনে ফোনে একবারও পাচ্ছিলেন না প্রেমিক ছেলেটিকে। বাধ্য হয়েই রাতে কল দেন। তখন গভীর রাত। কলটা রিসিভ হয়। কিন্তু চিকিৎসক তরুণীকে চমকে দিয়ে ওই প্রান্ত থেকে ভেসে আসে একটি নারী কণ্ঠ। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি তার স্ত্রী বলছি। আপনি কে, এতো রাতে কেন কল দিয়েছেন। তারপর আর সহ্য করা সম্ভব হয়নি। লাইন কেটে দেন চিকিৎসক তরুণী। যদিও তখনও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যেই ছিলেন তিনি। বিষয়টি আরও যাচাই করতে পরদিন ওই তরুণের এক বন্ধুকে কল দেন। যার সঙ্গে এরআগে প্রেমিকের মাধ্যমেই পরিচয়। এমনকি একাধিকবার সাক্ষাতও হয়েছে। ফোন নম্বর ছিলো না। তবে ফেসবুকের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করেন। রাতের ঘটনার সত্যতা পান তরুণী। তার প্রেমিক বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। মিথ্যা পরিচয়েই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তাদের।
চিকিৎসক তরুণী বেশ কয়েকদিন ফোন বন্ধ করে বাসায় বন্দি জীবন কাটান। ফোনটি খোলার পর প্রেমিকের ফোন। তিনি সম্পর্ক রাখতে চান। বিয়ের দরকার নেই। তরুণী জানিয়ে দেন, কোনোভাবেই তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না।
তারপর থেকেই হুমকি-ধমকি দিতে থাকে ছেলেটি। ফোনে, মেসেঞ্জারে একই হুমকি। সম্পর্ক না রাখলে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি, ভিডিওগুলো ফেসবুকে, ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এ বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, এই মামলাটি প্রক্রিয়াধীন। আসামি গ্রেপ্তারের আগে তার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে চাই না। তবে প্রাথমিক তদন্তে আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়েছি।
একইভাবে ইডেন মহিলা কলেজের এক ছাত্রীকে বারবার হুমকি-ধমকি দেয়া হয়। তারপর সমঝোতার নামে ডেকে নিয়ে একটি বাসায় ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে।
গত মাসে সিটিটিসি’র অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে দিদার মুন্সী নামক এক প্রতারক। মিথ্যা পরিচয়, প্রলোভন দিয়ে এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে দিদার। তারপর শারীরিক সম্পর্ক। মুখোশ উন্মোচন হলে মেয়েটি তার থেকে দূরে সরে যেতে চাইলেই দেয়া হয় হুমকি-ধমকি। একপর্যায়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয় তাদের অন্তরঙ্গ ছবি। এমনকি গোপনে ধারণ করা ভিডিও চিত্রও ছড়িয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন জনের কাছে। দিদার মুন্সীকে গ্রেপ্তারের পর প্রাণ ফিরে পায় মেয়েটি।
প্রতিদিনই এ রকম অভিযোগ আসছে সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কাছে। সামাজিকতার কারণে নির্যাতিতা তার পরিচয় গোপন রাখতে চান। এমনকি বিষয়টি বাইরের কেউ জানুক তা চান না। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা মামলা ছাড়াও অনেককে সহযোগিতা করি। অভিযোগকারীদের মধ্যে মামলা করতে চান খুবই কম। তাদের হার ৩০ ভাগের বেশি না।

মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা by কাজী সোহাগ

জীবনে বাংলাদেশকে দেখেনি ওরা। কিন্তু তাদের মুখে বাংলা ভাষা। মনে আছে রাজধানী ঢাকা, বরিশাল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, খুলনাসহ আরো অনেক জেলার চিত্র। জানে ইলিশের খবরও। কিন্তু কখনও খেয়ে দেখা হয়নি। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছর।
বাংলাদেশি দেখলেই ছুটে আসে। কথা বলার চেষ্টা করে। এমনই ক’জন খালেদ, মাহমুদ, ওসমান, সানি, আলী ও সিরাত। মধ্য আফ্রিকার বোয়ার এলাকার বাসিন্দা। এদের কেউ স্কুলে যায় আবার কেউ যায় না। ছন্নছাড়া জীবন। এ বয়সেই জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে প্রতিক্ষণ। হতহরিদ্র এসব শিশু-কিশোরদের কাছে শোনা যায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা বখতিয়ার, জহিরুলসহ আরো অনেকের নাম। তারা মানবজমিনকে বাংলায় বলেন, আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি। তাই বাংলা ভাষা শিখেছি। স্যাররা  (সেনাকর্মকর্তারা) আমাদের খুব ভালোবাসেন। আমরা এরকম ভালোবাসা পাই না। তাই যেদিন থেকে স্যারদের সঙ্গে মিশেছি সেদিন থেকে ক্যাম্পের আশেপাশে নিয়মিত আসি। স্যাররা কিছু বললে মন দিয়ে শুনি। কিভাবে বাংলা ভাষা শেখা হলো? তারা বলেন, মুখে মুখে শিখেছি। বলতে বলতে অভ্যাস হয়ে গেছে। আমাদের বন্ধুরা এ ভাষা শুনে খুব মজা পায়। তারা বুঝতে পারে না তবে হাততালি দেয়। মধ্য আফ্রিকার বোয়ারে কাজ করছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কন্টিনজেন্ট বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন। তারা ব্যানব্যাট নামে স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এখানে প্রবেশের মূল গেটে রয়েছে একটি লেমিনেটিং করা মাঝারি আকারের নোটিশ। সেখানে সাত শিশুর ছবিসহ পরিচিতি দেয়া আছে। উপরে লেখা রয়েছে স্থানীয় বাংলা ভাষা জানা ব্যক্তিবর্গের তালিকা। শুধু বাংলায় কথা বলা নয় এরই মধ্যে তারা বাংলা ভাষায় গানও শিখেছে। বাংলাদেশি দেখলেই গান শোনায় তারা। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে পারস্পরিক হানাহানি বেড়ে যাওয়ায় জাতিসংঘ ২০১৪ সালে মধ্য আফ্রিকার শান্তিপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জীবনবাজি রেখে কাজ করছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। স্বাধীনতার পর এই দেশে ফ্রান্স সমর্থিত সরকারের সঙ্গে জনগণের সমস্যা হতে থাকায় নানা নামে বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপ তৈরি হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্যু,পাল্টা ক্যু, ক্ষমতা দখল লাগাতার চলেই আসছিল। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত একটা সরকার দাঁড় করালেও বড় দুইটি আলাদা বিদ্রোহী দল তৈরি হয়। মুসলিম সমর্থিত এক্স সেলেকা এবং খ্রিষ্টান সমর্থিত এন্টি বালাকা। এই দুই দলের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সহিংসতা চলছে প্রতিদিন। খুন হয়েছেন অনেকে। এখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বিশ্বের ২১টি দেশের ২৭টি কন্টিনজেন্ট কাজ করছে। এর মধ্যে সবেচেয় বেশি আস্থা অর্জন করেছে ৩টি কন্টিনজেন্ট নিয়ে শান্তি রক্ষায় কাজ করা বাংলাদেশিরা। শান্তিরক্ষার পাশাপাশি এখানে নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। বোয়ারে প্রতি শনিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্থানীয়দের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। সঙ্গে ওষুধসহ খাবার স্যালাইন সরবরাহ করা হয়। একইভাবে অপর দুই কন্টিনজেন্ট থেকেও নানা ধরনের সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন (ব্যানব্যাট) এর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ ভুঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, শান্তিরক্ষার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড করার জন্য আমাদের প্রতি এদের খুব আস্থা। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চেয়ার, টেবিল দিয়ে সহযোগিতা করি। এ ছাড়া মাঝে মাঝে বিস্কুট, স্কুলের বই, খাতা ও খেলার সামগ্রী সরবরাহ করি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের বন্ধু বলে মনে করেন মধ্য আফ্রিকার স্থানীয়রা। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিরপেক্ষ ভূমিকা। এখানে জাতিগত বিরোধ থাকলেও বাংলাদেশের ভূমিকা একেবারে নিরপেক্ষ। গত ২রা জুলাই বাংলাদেশ থেকে আসা সেনাবাহিনীর গুডউইল টিমের সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মধ্য আফ্রিকার সংসদের স্পিকার জ মাপেঞ্জির সঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান মেজর জেনারেল শামিম-উজ-জামান বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা নিরপেক্ষ। এখানে আমাদের কাছে কোনো ধর্ম নেই, বর্ণ নেই। আমরা এসেছি কেবল জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষার কাজে। এ সময় তিনি স্পিকারের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আপনারা যারা এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন তাদের প্রত্যেকের সহযোগিতা চাই। জবাবে স্পিকার জানান, শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত বাংলদেশি শান্তিরক্ষীদের এখানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাদের প্রতি আমরা আস্থাশীল। এ সময় তিনি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ, কর্নেল নুরুল হুদা, মেজর মইদুল হায়দার ও ক্যাপ্টেন খোরশেদ হাসান। উঁচুনিচু পাহাড়, সমতল ভূমি আর সবুজ ছায়া ঘেরা এই দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। মাটি খুবই উর্বর। দেশটির আয়তন ২ লাখ ৪০ হাজার বর্গমাইল। রাজধানীর নাম বাংগুই। শিক্ষার হার ৫০ শতাংশ। মুদ্রার নাম সেফা। সাঙ্গো এবং ফরাসি এই দুইটি ভাষা প্রচলিত। দেশটির জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। প্রতিবছরই প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। গাছে আম ধরে থাকে বার মাস। দারিদ্র্য আর দূষণ হাত ধরে চলে। লোকজনের পরিষ্কার পরিছন্নতার বালাই নেই। গোসল করে অনেক দিন পর পর। অবশ্য পানির সংকটও প্রকট। বিলাসিতার ধারে কাছেও নেই দেশটির মানুষজন। সম্পূর্ণ জাতি প্রায় ৮০টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। দেশটিতে প্রচুর পরিমাণে হিরা, ইউরেনিয়াম, তেল এবং সোনার খনি রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশি মিশন শুরু হওয়ার পর অনেকটাই বদলে গেছে এখানকার চিত্র। অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীরা থাকলেও স্থানীয়রা তাদের সঙ্গে খুব একটা মেশেন না। কন্টিনজেন্ট ও ক্যাম্পের আশেপাশে থাকা মানুষদের অনেক কিছু শেখাচ্ছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। এভাবেই ৮ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশে বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ।

কারা কিনছে সঞ্চয়পত্র? by গোলাম মওলা

সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছেন তার কোনও পরিসংখ্যান নেই সঞ্চয় অধিদফতরের কাছে। তবে অন্য কয়েকটি সূত্র বলছে, স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের কাছে বিক্রি করার কথা থাকলেও বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কিনছেন বিত্তবানরাই। এই তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এমনকি, বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছে। ব্যাংকের চেয়ে সুদের হার বেশি ও নিরাপদ হওয়ায় বিনিয়োগের বিকল্প জায়গা হিসেবে তারা সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রও এখন ধনীদের দখলে। সাধারণ বা স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের কথা বলা হলেও বাস্তবে ৯০ শতাংশ সঞ্চয়পত্র কিনছেন বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনীতিবিদ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘৮৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র মাত্র ১২ শতাংশ লোকের কাছে বিক্রি হচ্ছে। আর মাত্র ১৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে বাকি ৮৮ শতাংশ লোকের কাছে।’
মূলত সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকার নিম্ন-মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পগুলো চালু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সুদের হার বেশি হওয়ায় সঞ্চয়পত্রে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে।
এদিকে, সমাজের কোন কোন শ্রেণির ব্যক্তিরা সঞ্চয়পত্র কিনছেন –এ ব্যাপারে সঞ্চয় অধিদফতরের কাছে কোনও তথ্য নেই। এমনকি, বছরের পর বছর ধরে সঞ্চয়পত্র কারা কিনছে, সে ব্যাপারে তথ্যভাণ্ডার তৈরির চেষ্টাও নেই এই অধিদফতরের।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের মহাপরিচালক শামসুন্নাহার বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোন শ্রেণির ব্যক্তিরা সঞ্চয়পত্র কিনছেন, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সঞ্চয় অধিদফতর কোনও রিসার্চ করেনি। ফলে সমাজের কোন শ্রেণির ব্যক্তিরা সঞ্চয়পত্র বেশি কিনছেন, তারও হিসাব নেই।’ তিনি উল্লেখ করেন, ১৮ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশের যে কোনও সুস্থ নাগরিক সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।
জানা গেছে, মূলত দু’টি কারণে সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। প্রথমত, গ্রাহকদের কাছে অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যেকোনও আমানতের সুদের হারের চেয়ে অনেক বেশি। তবে সঞ্চয় অধিদফতরের মহাপরিচালক শামসুন্নাহার বেগম মনে করেন, ‘সঞ্চয়পত্র যারা কেনেন, তারা সুদের হার ছাড়াও এখানে টাকা রাখাকে নিরাপদ ভাবেন।’
এদিকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো গত ১ জুলাই থেকে তিন মাস মেয়াদী আমানতের সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করার পর সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২ কোটি।
এদিকে, প্রতিবছর সঞ্চয়পত্রের পেছনে বিপুল পরিমাণ সুদ গুণতে হচ্ছে সরকারকে, যা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করছে। আবার সরকারের বিপুল পরিমাণ সুদ গুণতে গিয়ে ঋণ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঝুঁকি। এ ছাড়া, হিসেবি ও নির্ঝঞ্জাট মানুষেরা ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার কারণে একদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির রেকর্ড হচ্ছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তহবিলেও টান পড়ছে।
এদিকে, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদের কারণে সার্বিকভাবে আর্থিক খাত ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার অর্থবাজারে বিদ্যমান সুদহারের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারের দায় বেড়ে যাচ্ছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। দুই মাস আগে অর্থাৎ মে মাসে ১০ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। সব মিলে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের চালু করা চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এগুলো হলো– পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এবং তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এগুলোর গড় সুদের হার ১১ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র দেশের যে কোনও নাগরিক কিনতে পারেন। এই দুই ধরনের সঞ্চয়পত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনার সুযোগ আছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনা যায়। তবে সবাই এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। কেবল ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী যে কোনও বয়সী নারী-পুরুষ এবং ৬৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নারী ও পুরুষ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনা যায়। এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন কেবল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা অফিস, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের অধীনস্থ সারাদেশে ৭১টি সঞ্চয় ব্যুরো অফিস এবং পোস্ট অফিস থেকে এসব সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়ন করা যায়।   সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ ছাড়া, ডাকঘর সঞ্চয়পত্র নামে আরও একটি সঞ্চয়পত্র স্কিম রয়েছে, যা শুধু ডাকঘর থেকে লেনদেন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের যে কেউ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

ঘাতক পিন্টুর কথিত ‘বড় ভাই’ ও পরকীয়া প্রেমিকা গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে অনেকটা ‘কেঁচো-খুঁড়তে অজগর’ বেরিয়ে আসার মতো। প্রবীর ঘোষ হচ্ছে পিন্টু দেবনাথের শেষ শিকার। এরআগে স্বপন দাস নামে তাদের আরেক বন্ধু গুম হয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে স্বপন দাস গুমের পেছনে পিন্টু দেবনাথের হাত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে নতুন করে স্বপন অপহরণের মামলা হয়েছে। অথচ প্রবীর ঘোষের মতো স্বপন দাসও ঘাতক পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।
এদিকে  প্রবীর হত্যাকাণ্ডের সেই তৃতীয় পক্ষ ও ঘাতক পিন্টুর শেল্টারদাতা কথিত ‘বড় ভাই’ মৃত মহসিন মোল্লার পুত্র মামুন মোল্লা (৫০) এবং পিন্টুর পরকীয়া প্রেমিকা রত্না চক্রবর্তীকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। গতকাল বিকালে নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে শুনানি শেষে তাদের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরআগে রোববার গভীর রাতে শহরের আমলাপাড়ার মোল্লা বাড়ি থেকে মামুন মোল্লা ও গতকাল সকালে রত্না চক্রবর্তীকে আটক করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি মোবাইল ফোন।
প্রবীর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুল ইসলাম পিপিএম জানান, পিন্টু দেবনাথ আদালতে স্বীকারোক্তিতে ‘বড় ভাই’ মানে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে মামুন মোল্লার নাম বলেছে। তার তথ্যের ভিত্তিতেই রোববার রাত ২টায় মামুন মোল্লাকে আটক করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অপহৃত স্বপন দাসের বাড়ি শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায়। সেও শহরের কালীরবাজারে ব্যবসা করতো। স্বপন দাস ছিল প্রবীর ও পিন্টুর ঘনিষ্ঠজনদের একজন। গত প্রায় এক বছর ধরে সে নিখোঁজ রয়েছে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু জানিয়েছে স্বপন ভারতে চলে গেছে। কিন্তু ডিবির ধারণা, এক বছর ধরে নিখোঁজ স্বপনের ভাগ্যেও হয়তো নির্মম কোনো পরিণতি ঘটে থাকতে পারে।
নিখোঁজ স্বপন দাস পাসপোর্টের ব্রোকারি করতেন। ধর্মে হিন্দু হলেও তিনি ফতুল্লার কাশীপুর এলাকার একটি মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। স্বপনের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।
১৪ই জুলাই বিকালে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালতে পিন্টুর ১৬৪ ধারায় দীর্ঘ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরআগে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদেও বেরিয়ে আসে অনেক তথ্য।
পিন্টু জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে তার এক বড় ভাই মামুন মোল্লা তাকে ডেকে নিয়ে প্রবীরের ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল, প্রবীর তোর বন্ধু না শত্রু? পিন্টু নির্দ্বিধায় প্রবীরকে বন্ধু বলে স্বীকার করলে মামুন মোল্লা পিন্টুকে চড় মারে ও গালি দিয়ে বলে প্রবীর তোর বন্ধু না। এরপর মামুন মোল্লা প্রবীরকে ফোন করে মোবাইলে লাউড স্পিকারে পিন্টুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেই প্রবীর বলেছিল, ‘ওরে মাইরালান লোক দিয়া... কইরা র‌্যাব দিয়া ধরাইয়া দেন দাদা। ওর টাকা পয়সা বাইরা গেছে, অর্ডারও বাইরা গেছে। ওর দোকানডা আমার লাগব।’
প্রিয় বন্ধুর মুখে এমন কথা শোনার পরই ক্ষোভ জন্মে পিন্টুর মধ্যে। শুধু প্রবীরই নয়, তাদের বন্ধু স্বপন, উত্তমসহ কয়েকজনের সঙ্গে মামুন মোল্লা কথা বললে তারাও পিন্টু সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে।
মামুন মোল্লা প্রবীরের হাত থেকে তার ব্যবসা বাঁচিয়ে দেবে বলে পিন্টুর কাছ থেকে কয়েক দফায় ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। আবারো টাকা চাওয়ার কারণে পিন্টু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় প্রবীরকে হত্যার।
যদিও অর্থ, বন্ধকী স্বর্ণালংকার ও দোকান আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই নারায়ণগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন পিন্টু দেবনাথ। ১৪ই জুলাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বর্ণনা করেন প্রবীরের ওপর পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করে তার ফ্ল্যাট বাসায় প্রবীরকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ৭ টুকরো করেছে। চেষ্টা করেছিল লাশ গুম করতে ও পুরো বিষয়টি ভিন্ন দিকে ধাবিত করতে।
উল্লেখ্য, ১৮ই জুলাই রাতে কালিরবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে মোবাইল ফোনে নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে খুন করে পিন্টু দেবনাথ। এরপর লাশ ৭ টুকরো করে সেপটিক ট্যাংকি ও ড্রেনে ফেলে দেয়। ঘটনার ২১ দিন পর ৯ই জুলাই রাতে ও ১০ জুলাই রাতে পিন্টুর দেয়া তথ্য মতে, শহরের আমলাপাড়া কেসিনাগ রোডের রাসেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির নিচতলার সেপটিক ট্যাংকি থেকে প্রবীরের ৫ টুকরো লাশ এবং বাড়ির অদূরে একটি ড্রেন থেকে দুই পা উদ্ধার করে ডিবি। ঠান্ডু মিয়ার বাড়িতে ২২ বছর ধরে ভাড়া থাকে পিন্টু দেবনাথ।

ধিক্কার! ভেবে অনুতপ্ত হই কেন শিক্ষকতায় এলাম!

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে নাজেহালের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজীম উদ্দিন খান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, মনুষ্যত্ব হারিয়ে যাওয়া শিক্ষকেরা প্রশাসনিক নেতৃত্বে আছে বলেই আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কেউ নিরাপদ নই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু আমাদের নাজেহাল আর শারীরিক আক্রমনই করেনি, ছাত্রলীগের তিনজন মাস্তান ভয় দেখানোর জন্য আমার বাসা পর্যন্ত মটর সাইকেলে চেপে আর দুজন পদব্রজে অনুসরণ করতে করতে এসেছে! এদের একজন আবার মোবাইল ফোন দিয়ে ক্রমাগত ছবি তুলছিলো! আর ‘মহামান্য’ প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বললেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে যা খুশি তা করতে পারি না! প্রক্টরিয়াল বডিকে না জানিয়ে কেন শহীদ মিনারে গেলাম? ধিক্কার! ভেবে অনুতপ্ত হই কেন শিক্ষকতায় এলাম! আমাদের কেউ বা আমাদের পরিবারের কেউ কোন রকম শারীরিক বা মানসিক আক্রমনের শিকার হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি দায়ী থাকবে।

মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করিনি -ঐতিহাসিক বৈঠক শেষে পুতিন

রাশিয়া কখনই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার তথাকথিত হস্তক্ষেপের বিষয়টি  তুলেছেন। এ বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। রাশিয়া কখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। গতকাল ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ সব কথা বলেন পুটিন। এতে ট্রাম্প উভয় দেশের মধ্যে আরো জোরদার সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনলাইন সিএনএন’র খবরে বলা হয়েছে, অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল দুপুরের কিছু পরে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে দুই নেতার মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। সেখানকার প্রেসিডেন্ট ভবনে হাসিমুখে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করেন তারা। পরে বৈঠকের বিষয়ে অল্প সময়ের জন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প ও পুতিন।
এরপরই তাদের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। এসময় ওই কক্ষে দোভাষী ছাড়া আর কাউকে রাখেন নি তারা। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তারা পরস্পরের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে সরাসরি লাঞ্চের জন্য নির্ধারিত টেবিলে বসেন দুই নেতা। ট্রাম্প ও পুতিন একেবারেই মুখোমুখি হয়ে বসেন। এসময় দু’দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
খাবারের টেবিলে বসার আগে একজন সংবাদকর্মী চিৎকার করে ট্রাম্পের কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চান। এতে সাড়া দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবার জন্য এটা খুবই ভালো সূচনা’। এরপরই তিনি লাঞ্চের টেবিলে বসেন। এসময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তার সঙ্গে ছিলেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র খবরে বলা হয়েছে, বৈঠক শুরুর পূর্বে ট্রাম্প ও পুতিন অল্প সময়ের জন্য হাজির হন সাংবাদিকদের সামনে। এসময় সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করায় পুতিনকে অভিনন্দন জানান ট্রাম্প। বৈঠকের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়েই তাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। তার ভাষায়- ‘পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, গত কয়েক বছর ধরে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই পারমাণবিক শক্তি। আমি মনে করি, বিশ্ব আমাদেরকে একসঙ্গে দেখতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই আমি এখানে আসি না। তা প্রায় ২ বছরের কাছাকাছি। কিন্তু আশা করি, আমাদের মধ্যে অসাধারণ সম্পর্ক তৈরি হবে।’ জবাবে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান পুতিন। সাংবাদিকদের পুতিন বলেন, আমাদের সম্পর্ক ও গোটা বিশ্বের সমস্যা নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা করার সময় এসেছে।
এছাড়া, বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে ওয়াশিংটনের রুশ দূতাবাস বলেছে, দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, ইউক্রেন, সিরিয়া, কোরিয়া উপদ্বীপে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে বৈঠক-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প তার বক্তৃতায় এসব বিষয় উল্লেখ করেন নি। তিনি বলেন, বাণিজ্য, চীন, পারমাণবিক বিস্তার রোধ ও সামরিক বিষয়ে পুতিনের সঙ্গে তার আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার পথে নিজের পূর্বসূরিদের নিয়ে বিষোদগার করেছেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার সঙ্গে বর্তমান তিক্ত সম্পর্কের জন্য তার পূর্বসূরিরা দায়ী। তার মতে, পূর্বসূরিদের বোকামির কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ডেমোক্রেট নেতা ও ওবামা প্রশাসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল। তার মতে, দু’নেতার মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কোনো পরিষ্কার কৌশলগত উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেন, একজন নেতার স্বার্থের চেয়ে একটি জাতির স্বার্থ অনেক বড়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা করতে চান, তা আমেরিকার স্বার্থ না। এটা ব্যবসায়িক চুক্তির মতো কোনো বিনিময়ের বিষয় না।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের দায়ে কয়েকদিন আগে ১২ রুশ গোয়েন্দাকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রেক্ষিতে পুতিনের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে যোগ না দিতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ডেমোক্রেটরা। কিন্তু ট্রাম্প তাতে কোনো কর্ণপাত না করে একরকম জোর করেই পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন।

সরজমিন আদালতপাড়া: কমলার অপেক্ষার প্রহর ১৬ বছরেও শেষ হয়নি by উৎপল রায়

বুধবার ১১ই জুলাই। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার বারান্দার মেঝের এক কোনায় বসে আছেন বৃদ্ধা কমলা খাতুন। সকাল থেকে অপেক্ষা। তার আইনজীবী আসবেন। মামলা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তুলবেন। এরই মধ্যে দুপুরও গড়িয়ে যায়। কিন্তুআইনজীবী আর আসেন না। তিনি জানান, মাদক মামলার আসামি তিনি। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিনিয়ত আদালতে আসছেন। হাজিরা দেন। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা কমলা খাতুন জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে তার নামে মাদকের মামলা হয়। তার দাবি জায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে প্রতিপক্ষ তার ঘরে হেরোইন রেখে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। কিছুদিন কারাগারেও ছিলেন। এরপর নিয়মিতই আদালতে আসা যাওয়া। তার মামলা বর্তমানে কি পর্যায়ে আছে তা জানেন না স্বল্প শিক্ষিত কমলা খাতুন। শুধু বলেন, সাক্ষী আসে না, উকিল সব জানে। কিন্তু সকাল থেকে অপেক্ষা করেও আইনজীবীর দেখা পাননি। সঙ্গে মোবাইল ফোন এমনকি কোনো স্বজনও নেই। তার অপেক্ষার প্রহর যেন আর ফুরোয় না। তিনি বলেন, সাক্ষী আহে না, বাদীও আহে না। কিন্তু আমি নিয়মিত আহি। তিনি জানান, তার স্বামী নেই। মেয়ের স্বামীদের সহায়তায় কোনোমতে দিন চলে তার। এই দীর্ঘ সময়ে মামলা চালাতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই বয়সে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে শরীর স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কমলা খাতুনের বিচারকাজ আর শেষ হয় না। কবে শেষ হবে তাও তিনি জানেন না। বলেন, ‘আমার যদি কোনো দোষ থাইক্যা থাকে বিচার হোক। সাজা হোক। কিন্তু এই যন্ত্রণা আর সহ্য  হইতেছে না। ১৬ বছর ধইরা আদালতে আসতে আসতে আমার সব শেষ। এহন শান্তিতে মরবার চাই।’
একই ভবনের পঞ্চম তলার বারান্দার মেঝের এক কোনায় জবুথবু হয়ে বসে আছেন আব্দুল ওয়াদুদ (৬৪)। পাশেই তার স্ত্রী ছামুদা বেগম (৫৫)। ওয়াদুদের শরীর ভেঙে পড়েছে। ঘোলাটে চোখ। বগুড়ার সোনাতলা পাঁচপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তিনি গ্যাস চালিত অটোরিকশা চালাতেন। প্রায় একযুগ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। প্রায় ছয় মাস ছিলেন কারাগারে। এরপর এই দীর্ঘ সময়ে মামলা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে বদলি হয়েছে। কিন্তু মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। আবদুল ওয়াদুদ জানান, মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়ে যাচ্ছে তার। প্রায় সারাক্ষণ বসে থাকতে হয়। তার স্ত্রী ছামুদা বেগম চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট দেখিয়ে বলেন, আব্দুল ওয়াদুদ এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। তিনি অন্যের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। এক ছেলে রিকশা চালায়। কোনোমতে সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মামলার কারণে আব্দুল ওয়াদুদের জীবন একপ্রকার থমকে আছে। দীর্ঘ সময়েও মামলা শেষ না হওয়ায় এই অসুস্থ শরীরেও প্রতিটি ধার্য তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। 
ঢাকা জেলা জজ আদালত ভবনের (পুরাতন) তৃতীয় তলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর সামনে জটলা। বিচারপ্রার্থী, আসামি ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা। আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের বাদানুবাদ। তর্ক-বিতর্ক। হকারদের অবাধ আনাগোনা। একই চিত্র যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের সামনেও। ভেতরে বিচারকাজ চলছে। কিন্তু বাইরে কোলাহল, চিৎকার চেঁচামেচি। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশও নির্বিকার। আইনজীবী পলাশ কান্তি দাস বলেন, যেহেতু এগুলো বিচারিক আদালত তাই এখানে বাদী, আসামি, সাক্ষী সবাই আসে। সেজন্য কোলাহল একটু বেশি। তবে, আমরা চাই কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। আদালতের পরিবেশ যেন আদালতের মতোই থাকে। আইনজীবী অনিরুদ্ধ বলেন, মামলার অনুপাতে বিচারক খুবই অপ্রতুল। একেকটি আদালতে অসংখ্য মামলা। বাদী, আসামিদের দিনের পর দিন আদালতে আসতে হয়। সকাল থেকে দিনভর তাদের অপেক্ষায়  থাকতে হয়। যে কারণে আদালতের পরিবেশও থাকে কোলাহলপূর্ণ। বিচারপ্রার্থী মানুষের দুর্দশা দেখে আমাদেরও কষ্ট হয়। কিন্তু সিষ্টেম এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে দিনের পর দিন এভাবেই চলছে। বিচারের আশায় থাকা মানুষের দুর্দশা কিভাবে কমবে সে বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। 
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রিতা আক্তার (৪২) হন্যে হয়ে ঘুরছেন ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবন এলাকায়। যাচ্ছেন এর ওর কাছে। কখনো আইনজীবী কখনো গণমাধ্যমকর্মী। বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার রাকিবরে মাইরা ফালাইছে, আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাই।’ রিতা আক্তার জানান, গত ৪ঠা এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার ছেলে দুটি সিনেমায় অভিনয় করা শিশুশিল্পী রাকিব হাওলাদার (১৫) বাসা থেকে বের হয়ে কাপ্তান বাজার পোলট্রি মোড় যায়। সেখান থেকে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করে ওয়ারী থানায় নিয়ে যাওয়া হয় রাকিবকে। তিনি খবর পেয়ে থানায় গিয়ে ছেলের চিৎকার শুনতে পান। দেখতে পান তার ছেলেকে মধ্যযুগীয় কায়দার পেটানো হচ্ছে। এভাবে দুদিন পার হওয়ার পর ৬ই এপ্রিল তাদের জানানো হয় রাকিব ক্রসফায়ারে মারা গেছে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ছেলের লাশ দেখতে পান। তিনি জানান, রাকিবকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) মো. সেলিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত ১১ই এপ্রিল মামলা করেন রিতা আক্তার। তিনি জানান, মামলা করার পর থেকেই নানা হুমকির মধ্যে ছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে তাকে জোর করে  মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেয়া হয়েছে। অভিযোগ থেকেও তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত প্রাঙ্গণে আলাপকালে তিনি জানান, ঘটনার পর তার কাছ থেকে অন্তত ১০টি কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে পুলিশ ও সাদা পোশাকের লোকজন। তাকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেও নিষেধ করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিতা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেরে যারা মারছে তাদের বিচার আল্লায় করবো।’
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ভবনের পাশে হাজতখানার সামনে বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষের ভিড়। একেকটি পুলিশ ভ্যান আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। খুঁজছেন স্বজনদের। কারো হাতে কলা, পাউরুটি। এই আদালতের কয়েকজন আইনজীবী ও তাদের সহকারীরা জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের পর প্রথমে এখানেই নিয়ে আসা হয়। এরপর তাদের সংশ্লিষ্ট আদালতে তোলা হয়। শুনানির পর আদালতের আদেশ অনুযায়ী যাদের কারাগারে পাঠানো হয় তাদের আবারো ওই হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শ্যামপুর থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জুলেখা বেগম জানান মঙ্গলবার শ্যামপুর এলাকায় দুই গ্রুপের মারামারির একটি মামলায় তার ভাইয়ের ছেলে জালালকে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। বুধবার আদালতে তাকে তোলা হবে। তাকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকে অপেক্ষায় আছেন তিনি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি বিটিআরসির by কাজী সোহাগ

রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া আদায় নিয়ে বিপাকে দেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ বিটিসিএলের কাছে পাওনা রয়েছে দুই হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে টেলিটকের কাছে রয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিটিআরসি।
এজন্য প্রতিষ্ঠানটি সরকারের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে দেয়া এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বিকল্প কাউন্সিল অফিসার ও উপ-সচিব মো. আমিনুল হক স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বিটিসিএল প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিটিসিএল’র কাছে সরকারের/কমিশনের পাওনা টাকা আদায়ের জন্য বারবার ডিমান্ড নোট পাঠানো হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা পরিশোধ করেনি। মন্ত্রিপরিষদ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অপর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। তাই আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই চেষ্টায় আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ায় সচিব ও প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে কয়েকবার ডিও লেটার পাঠানো হয়। তাদের হস্তক্ষেপের পরও কোনো ফল না পাওয়ায় বিটিআরসি থেকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অপারেশনাল ব্যবস্থা বন্ধের প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে অপারেশনাল ক্যাপাসিটি কমিয়ে দেয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, সরকার থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বকেয়া টাকা আদায় করতে না পেরে বিটিআরসি চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে বিটিসিএলের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কলের সক্ষমতা ৩০ শতাংশ কমিয়েছে। ২৯শে মার্চ বিটিআরসির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে ১৪ই মার্চ বিটিসিএলকে একটি নোটিশ দেয়া হয়। ওই নোটিশে ১০ দিনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করতে বলা হলে প্রতিষ্ঠানটি ১০০ কোটি টাকা দেয়। তবে, বকেয়ার পুরো টাকা পরিশোধে বারবার ব্যর্থ হয়েছে বিটিসিএল।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের আয় দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে একজন টেলিফোন গ্রাহক এক হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল পরিশোধ করতো। ভোগান্তির কারণে এখন অনেকেই টেলিফোন থাকলেও তা ব্যবহার করছেন না। ফলে প্রতিদিনই রাজস্ব কমছে। তারা জানান, বিটিসিএলের লাইনে নানা সমস্যা, ক্যাবল চুরি, ক্যাবল কাটা পড়া, ভূগর্ভস্থ ক্যাবল কেটে যাওয়াসহ নানা কারণে প্রায় সময় ল্যান্ডফোনে ত্রুটি দেখা দেয়। এই ত্রুটি সারাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।
এ কারণে ল্যান্ডফোনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। এদিকে সাধারণ মানুষ মনে করে, বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ গ্রাহকসেবার মান বাড়িয়ে আস্থা অর্জন করতে পারলে আবারো মানুষ এই ফোন ব্যবহার  করবে। তা না হলে সরকারি অফিস-আদালত ছাড়া আর কেউ ল্যান্ডফোন ব্যবহার করবে না। যদিও সময়মতো বিল পরিশোধ না করায় প্রতিমাসে অনেক ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এদিকে প্রতিবেদনে টেলিটকের কাছে পাওনা প্রসঙ্গে একই পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, টেলিটকের অপারেশনাল সক্ষমতা কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়, টেলিটকের বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারের কাছে অর্থ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ওই চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিচারাধীন রয়েছে। তাই টেলিটকের বিরুদ্ধে অপারেশনাল ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য (মালামাল আমদানির অনুমোদন না দেয়ার কল ক্যাপাসিটি কমিয়ে না দেয়া) অনুরোধ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ অপারেশনাল অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, লাইসেন্সধারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বকেয়া অর্থ আদায়ে বিভিন্ন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিসিএল ও টেলিটকের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নমনীয় অবস্থান দেখিয়ে এসেছে। এতে সংশ্লিষ্ট সেক্টরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর আগে সিটিসেলের কাছে পাওনা আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলাসহ কোম্পানি আইনে পক্ষভুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বকেয়া ৩৭২ কোটি ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৬৭ টাকা থেকে আদায় করা হয়েছে ২৪৪ কোটি ৬৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৪ টাকা। অবশিষ্ট ১২৮ কোটি ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৩ টাকা আদালতের রায় পাওয়ার পর আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা নজিরবিহীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষাবিদরা বলছেন, মুক্তচিন্তা চর্চার কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা আগে আর ঘটেনি। তারা বলছেন, নিরাপত্তার নামে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কাউকে যেমন বিচ্ছিন্ন করা যাবে না তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলছেন, একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষকরাও লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যথাযথ ভূমিকা নিতে পারছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বাক-স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের জায়গা। শিক্ষকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশ করবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ প্রতিবাদটুকু করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। যেটা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও হয়নি। রাজনৈতিক দলের পেটোয়া বাহিনী যেভাবে হামলা করছে তা খুবই নিন্দনীয়। তিনি বলেন, কোর্ট থেকেই রায় দিয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ তো সেই উদ্যোগ নেয়নি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন করলে তো কোনো সমস্যা থাকে না। এটা হলে মত প্রকাশের একটা জায়গা থাকে। আর সে জায়গা যদি না থাকে তাহলে ছাত্ররা যাবে কোথায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর আবুল কাশেম ফজলুল হক মানবজমিনকে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন আর আনুষঙ্গিক অন্যান্য আন্দোলন সরকার ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে বলে সরকারের লোকজন হয়তো মনে করছে। যারা প্রতিবাদ করছে তাদের মারা হচ্ছে। এখানে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকা অভিন্ন। তারা প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে কাজ করছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি, সরকারের যা চাওয়া তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বাস্তবায়ন করছে। এটা যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা নয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, মধ্যযুগে রাজা বাদশাদের মনে করা হতো ‘দণ্ডে মণ্ডের কর্তা’। এখন বাংলাদেশের অবস্থাও তাই মনে হচ্ছে। সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কারণ তাদের তো নিরাপত্তার অভাব নাই। আর সরকারের চিন্তার সঙ্গে যারা ভিন্নমত প্রকাশ করে তাদের নিরাপত্তার অভাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। পাকিস্তান ও বৃটিশ আমলে শিক্ষকরা যেভাবে আন্দোলন করেছে এখন সেভাবে করতে পারছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা খুবই জরুরি। এটা প্রশাসনের নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা যেমন জরুরি, আবার নিরাপত্তার কথা বলে মুক্তচর্চা বা বাইরে কাউকে বিচ্ছিন্ন করাও যাবে না। বিচ্ছিন্ন করে কোনো নিরাপত্তা হয় না। কিন্তু সবাই যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তখন বলতে দ্বিধা নেই প্রশাসন যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ সম্পদকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

ন্যাটোর অস্তিত্ব থাকার কোনো কারণ নেই: মার্কিন বিশ্লেষক

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটো সামরিক জোটের অস্তিত্ব থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ইরানের প্রেসটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন, খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মার্কিন লেখক জন স্টেপলিং।
তিনি আরো বলেন, ন্যাটোকে আমেরিকা বিদেশী সেনাজোট হিসেবে ব্যবহার করছে। যখন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একান্ত বৈঠক করতে যাচ্ছেন তার আগে জন স্টেপলিং একথা বললেন। ন্যাটোর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ করে আসছে মস্কো।
হেলসিংকিতে ট্রাম্প বলেছেন, “আলোচনার মতো আমাদের সামনে অনেক বিষয় রয়েছে।” প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে তিনি একান্ত বৈঠকে ‘বাণিজ্য থেকে সামরিক’ এবং ‘ক্ষেপণাস্ত্র থেকে চীন’ সব বিষয় নিয়েই কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় পুতিনও বলেন, সময় এসেছে মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার করার।