Monday, October 25, 2010

শিশুরা কেমন মানুষ হচ্ছে? by সরকার আবদুল মান্নান

একজন শিশু কেন স্কুলে যাবে, কেন সে পড়াশোনা করবে—এসব প্রসঙ্গ বেশ পুরোনো, বহুল বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু এর গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি, মীমাংসা হয়ে যায়নি; বরং বিষয়টি এখন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সংকটাপন্ন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কেন? এই প্রশ্নে শিক্ষা-বৈজ্ঞানিক (Pedagogical) বিতর্ক রয়েছে। সেই বিতর্কে না গিয়ে খোলা চোখে যেটুকু দেখা যায়, সেটুকু বিবেচনা করা যেতে পারে।
কোনো শিশুকেই রাষ্ট্র স্কুলে নিয়ে আসে না। শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসে তার মা-বাবা, অভিভাবক। সেই মা-বাবা বা অভিভাবককে যদি জিজ্ঞাসা করেন, কেন আপনি আপনার শিশুকে স্কুলে পাঠান? তিনি বলবেন, মানুষ করার জন্য। কিন্তু মানুষ করার মানে কী, নীতি কী, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের নয়। স্বাধীনতা লাভের পর চার দশক অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ এ সময়ে শিশুদের মানুষ করে তোলার জন্য রাষ্ট্র কি সত্যিকার অর্থে সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য কোনো নীতি তৈরি করেছে? যদি তৈরি করে থাকে তাহলে সেই নীতিগুলো কোথায়? কোন শিক্ষক সেই নীতিগুলোর আলোকে শিক্ষার্থীকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছেন, মানুষ করে তুলছেন? এর কিছুই আমরা জানি না।
আমরা জানি, পরীক্ষায় ভালো ফল করাই মানুষ হওয়ার একমাত্র মানদণ্ড। শিক্ষার্থীর কাছে, মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের কাছে, শিক্ষকের কাছে, এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও ভালো ছাত্রছাত্রীর মানেই হলো কাগজ-কলমে পরীক্ষায় ভালো ফল করা। খুব শৈশব থেকে অর্থাৎ তথাকথিত ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া থেকেই শুরু হয় মানুষ হওয়ার এই প্রক্রিয়া। শিশুটিকে ভর্তিযুদ্ধে জয়ী করানোর জন্য মা-বাবা এবং কোচিং সেন্টারগুলো যে পরিমাণ অত্যাচার তার ওপর করে, এর কোনো তুলনা চলে না। অস্বাভাবিক তথ্য মুখস্থ করতে বাধ্য করা হয়। অবোধ শিশুটির কিছুই করার থাকে না।
শিশুটি যখন স্কুলে ভর্তি হয়, তখন মা-বাবা ও শিক্ষকের প্রত্যাশা অনুযায়ী, ভালো ফল করার জন্য মুখস্থ, মুখস্থ আর মুখস্থ করার মধ্যেই তার মানুষ হওয়ার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে যায় এবং শিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই নিয়তিকে কখনোই আর সে অতিক্রম করতে পারে না। ফলে ফি-বছর শিক্ষার হার বাড়ে, সার্টিফিকেট লাভ হয়, ডিগ্রি লাভ হয়; কিন্তু সুনাগরিক বাড়ে না, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক বাড়ে না, দেশপ্রেমিক নাগরিক বাড়ে না, অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধে বিশ্বাসী মানুষ গড়ে ওঠে না; জাতি, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সব মানুষকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করার মতো উদার মনোভঙ্গির মানুষ তৈরি হয় না। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠার জন্যই যেন তার শিক্ষা। নীতি-নৈতিকতার বিষয় নেই, সত্যাসত্যের বিষয় নেই, মূল্যবোধের বিষয় নেই, ন্যায়-অন্যায়ের বিষয় নেই, যুক্তি-অযুক্তির বিষয় নেই, কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় নেই—তার সামনে থাকে শুধুই প্রতিষ্ঠা লাভের দানবীয় আকাঙ্ক্ষা। যখন শিশুর মস্তিষ্কের গড়ন নির্ধারিত হবে; জীবনকে দেখার, বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে তখন থেকে তার মধ্যে পুরে দেওয়া হয় স্বার্থপরতার এই বীভৎস একচোখা দৈত্যের পাঠ।
আমরা জাতিগতভাবেই ভুলে গিয়েছি যে ভালো ছাত্র হওয়ার প্রতিভা নিয়ে সব শিশু জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু বিচিত্র পথে যোগ্য মানুষ হওয়ার প্রতিভা সব শিশুর মধ্যেই আছে। যথাযথ পরিচর্যা পেলে তার অসাধারণ সম্ভাবনাগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। আর সেই বিকাশের পথে প্রথম পাঠ হলো শিশুকে ভালোবাসতে শেখানো। পাঠ্যপুস্তকনির্ভর খাতা-কলমের পরীক্ষা দিয়ে শিশুকে ভালোবাসতে শেখানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন তার প্রতিদিনের আচরণকে পরিমার্জিত করা। শিশুটি যেন তার পোশাক-পরিচ্ছদকে ভালোবাসতে শেখে; তার বই-পুস্তক, খাতা-কলমকে ভালোবাসতে শেখে; তার আসবাবকে ভালোবাসতে শেখে; তার মা-বাবা, ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসতে শেখে; শিক্ষক থেকে শুরু করে সহপাঠী সবাইকে এবং পিয়ন-দারোয়ানকে ভালোবাসতে শেখে—শিশুর মধ্যে এই পাঠদান করা সর্বাগ্রে জরুরি। প্রকৃতিকে সে যেন গভীর মমত্ব ও ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে সেই দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব মা-বাবা ও শিক্ষকের। জাতি, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র সব মানুষকে সে যেন শ্রদ্ধা ও সম্মান করার সামর্থ্য লাভ করতে পারে সে দায়িত্বও মা-বাবা ও শিক্ষকের। কিছু তথ্য মুখস্থ রাখার বাইরে সব ক্ষেত্রে শিশুরা যেন তাদের নিজ নিজ চিন্তা ও কল্পনা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে, শিক্ষককে তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যের লেখা নোট শিশুকে দিয়ে মুখস্থ করানো শুধু অনৈতিকই নয়, অপরাধও বটে। শিক্ষক ও অভিভাবককে এই অনৈতিক ও অপরাধের পথ থেকে সরে আসতে হবে। কোনো শিশুকে দিয়েই অন্যকে অতিক্রম করানোর চেষ্টা করা যাবে না। শিশুটি যেন প্রতিনিয়ত নিজেকে অতিক্রম করতে পারে, সেই শক্তি ও সম্ভাবনা তার মধ্যে তৈরি করতে হবে।
শিশুকে মা মায়ের মতো, বাবা বাবার মতো কিংবা শিক্ষক শিক্ষকের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন না। বরং শিশুকে তার নিজের মতো করে গড়ে ওঠার পথ করে দেবেন। ভালো ছাত্র, মন্দ ছাত্র; ধনী ছাত্র, দরিদ্র ছাত্র; সুবোধ ছাত্র, দুষ্ট ছাত্র; হিন্দু ছাত্র, মুসলমান ছাত্র—এমন কোনো পরিচয় কোনো অবস্থাতেই বিবেচনায় আনা যাবে না। বরং শিখন-শিক্ষণ (Teaching-Learning) প্রক্রিয়ায় সব শিক্ষার্থীর জন্য আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন বঞ্চিতবোধ না করে, বঞ্চিত না হয় সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। সব শিক্ষার্থী যেন শিক্ষকের ভালোবাসা পায়, তার স্নেহের পরশ লাভ করে, সচেতনভাবেই তা নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তি দিয়ে, গালাগাল দিয়ে, চিৎকার-চেঁচামেচি করে কখনোই শিশুদের আচরণিক পরিবর্তন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন নিঃশর্ত ভালোবাসা ও অফুরন্ত স্নেহ। অধিকাংশ শিশু যেমন সহজাতভাবেই মা-বাবাকে অনিঃশেষ আশ্রয়স্থল মনে করে, তেমনি বিদ্যালয়েও যদি শিক্ষকেরা নিজেদের শিশুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তবে শিশুরা নিঃসংকোচে নিজেদের মেলে ধরার স্বতঃস্ফূর্ততা লাভ করবে।
প্রকৃতিগতভাবেই শিশুরা কমবেশি দুরন্ত। এই দুরন্তপনাকে যেসব শিক্ষক অস্বাভাবিক ও অসহ্য মনে করেন, শিশুশিক্ষায় তাঁদের না যাওয়াই ভালো। কেননা, তাঁদের দিয়ে শিশুদের শিক্ষা হয় না—অশিক্ষা হয়, ক্ষতি হয়। শিশুদের শাসন ততক্ষণ পর্যন্ত করা যাবে না, যতক্ষণ না শিশু বুঝতে পারে যে আপনি তাকে ভালোবাসেন। শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। এই প্রবাদ কোনো কথার কথা নয়।
শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য; মানব-প্রেমিক, দেশপ্রেমিক ও প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ করে সর্বান্তঃকরণে এগিয়ে আসে, তাহলে পাশে দাঁড়ানোর মতো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের অভাব হবে না। শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্যে মানদণ্ডগুলোকে দৃঢ়ভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার, সে দায়িত্ব তো সরকারেরই। একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এই যে মূলগত ভিত্তি—এ নিয়ে কোনো সরকার কখনো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছে? তবে সময় ফুরিয়ে যায়নি। ইতিমধ্যে অনেক অহেতুক বিষয়নিয়ে অনেক সময় পার করে দিয়েছি, যার সত্যিকার অর্থে কোনো অর্থ নেই, তাৎপর্য নেই। কেননা একটি স্বার্থান্ধ মনোগড়ন নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুটিকে পরিণত বয়সে এসে পরিবর্তন করা কখনোই সম্ভব নয়। ফলে আমাদের পরিবার-সংগঠন থেকে শুরু করে সমাজ-সংগঠন ও রাষ্ট্র-সংগঠনের সর্বত্রই বিরাজ করছে স্বার্থপরতাসংশ্লিষ্ট বিচিত্র সংকট। এই সংকট উত্তরণের জন্য দরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিশুশিক্ষার খোলনলচে পালটে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিঃসন্দেহেই মুখ্য। কিন্তু শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং অন্যান্য অংশীজনদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবাই মিলে আমরা যদি আমাদের শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার গ্রহণ করি, তাহলেই একটি আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হবে; তিরিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা যথার্থ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে।
সরকার আবদুল মান্নান: গবেষক, প্রাবন্ধিক।

ক্ষুদ্রঋণের সুদ ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে হিসাবের প্রস্তাব

দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে সুরাহা হতে যাচ্ছে বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত এনজিও খাতের, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতিরও।
অর্থাৎ নির্দিষ্ট সুদহারে (ফ্লাট রেট) ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর বদলে ঋণ দানে আসছে ক্রমহ্রাসমান সুদের হার পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বর্তমানে ঋণ দিয়ে থাকে।
আর সুদের হার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হতে পারবে বলেও প্রস্তাব করেছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)।
শুধু সুদের হার নয়, এনজিও খাতের সার্বিক কর্মকাণ্ডেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এমআরএ সূত্র। এমআরএ সূত্র আরও জানায়, সবকিছুই করা হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের স্বার্থের দিক বিবেচনা করে।
এ ছাড়া ঋণের কিস্তির সময়কাল, সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদ, গ্রেস পিরিয়ড এবং ঋণ প্রক্রিয়াকরণ মাশুলের বিষয়েও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নিবন্ধিত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যা বাধ্যতামূলকভাবে পরিপালন করতে হবে।
এসব বিষয়ে শিগগির এমআরএ একটি নির্দেশনা জারি করবে বলে জানা গেছে।
এমআরএ সূত্র জানায়, দেশের জনগণকে নানা বিষয়ে সচেতন করা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বল্প পরিমাণে ঋণ বিতরণ করা এনজিও দেশের বড় একটি খাত। তবে খাতটিতে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণের ওপর।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এমআরএর চেয়ারম্যান আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নির্ধারণসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, এনজিও ব্যুরোর প্রতিনিধি, ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক বাকী খলীলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, এই বৈঠকেও নির্ধারিত সুদহারে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। বৈঠক শেষে আতিউর রহমান সিডিএফের নির্বাহী পরিচালককে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘সুদ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এবার এর একটা সমাধান করুন। আর কত আলোচনা করবেন।’
জানা গেছে, ঋণ বিতরণের আগেই এনজিওগুলো সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কিছু সঞ্চয় নিয়ে নেয়। বর্তমানে এ হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। এমআরএ বলছে, এটি অন্যায়। ঋণ বিতরণের আগেই আর সঞ্চয়ের জন্য অর্থ জমা নেওয়া যাবে না। গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি বাধ্যতামূলক বা ঐচ্ছিক আকারে রাখতে পারে এনজিওগুলো, তবে অবশ্যই তা বিতরণের পর।
আবার নির্ধারিত হারে উচ্চ সুদ নিলেও ঋণগ্রহীতাদের সঞ্চয়ের বিপরীতে এরা সুদ দেয় সামান্যই। এই হার ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। এমআরএর মতে, এটি ৫ থেকে ৭ শতাংশ করা হবে।
অন্যদিকে, ঋণ বিতরণের পর গ্রহণকারীকে বর্তমানে কোনো গ্রেস পিরিয়ড বা ছাড় দেওয়া হয় না। অর্থাৎ বিতরণের পরের সপ্তাহ থেকেই কিস্তি উত্তোলন শুরু হয়। অন্যদিকে বছর ধরা হয় ৪৫ থেকে ৪৬ সপ্তাহে। নতুন নির্দেশনায় সাপ্তাহিক কিস্তি হবে ৫০টি। আর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে দুই সপ্তাহ। অর্থাৎ এক বছরের পূর্ণ সময়ের মধ্যেই সব কিস্তি নিতে হবে।
সূত্র জানায়, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠেয় একটি বৈঠকে বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে। তারপর আগামী ২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এমআরএর পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে সেগুলো।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বেসরকারি সংস্থা আশার প্রেসিডেন্ট সফিকুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে সুদের হার নির্ধারিত থাকাটাই ভালো। কারণ চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার ঋণের ওপর ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে সুদ আরোপ করলে জটিলতা বাড়বে।
আশার প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, বিশ্বের সব দেশের তুলনায় কম খরচে ঋণ বিতরণ করা হয় বাংলাদেশে, মাননীয় গভর্নরও তা জানেন। তারপরও বিষয়টি সরকারের কাউকে বিশ্বাস করানো যায় না এবং দুঃখজনক যে সরকার তা যাচাই করেও দেখে না।
তবে এ ব্যাপারে বাকী খলীলী প্রথম আলোকে বলেন, সুদের হার ক্রমহ্রাসমান হওয়াটা খুব জরুরি। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ পদ্ধতিতে সুদ হিসাব করতে পারলে এনজিওগুলোর না পারার কোনো কারণ নেই। দেশের ৬০ শতাংশ এনজিওর অদক্ষতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশে ভারতের বিদ্যুৎ ২০১২ সাল নাগাদ

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা জানিয়েছেন, ভারত ২০১২ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। তিনি গতকাল শনিবার বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খানের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এ কথা বলেন।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত জুলাই মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি চুক্তি হয়। ২০১২ সালের মধ্যেই ভারত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে।

সোমালিয়ার আকাশ ও নৌপথেঅবরোধের আহ্বান

সোমালিয়ার ওপর আকাশ ও নৌপথে অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন।
আফ্রিকান ইউনিয়নের কমিশনার রামতানে লামারা গত শুক্রবার জানান, অবরোধের ফলে সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্রের সরবরাহ কমে আসবে। এতে জলদস্যুতাও বন্ধ হবে।
এ ছাড়া তিনি সেখানে আন্তর্জাতিক সেনাসংখ্যা আট হাজার থেকে ২০ হাজারে উন্নীত করার আহ্বান জানান।

চীনে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় মেগি

ঘূর্ণিঝড় মেগি গতকাল শনিবার চীনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এর প্রভাবে সেখানে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝড়ে বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় অন্তত ১৪০ কিলোমিটার। চীনের উপকূলে আঘাত হানার আগে এ ঝড়ে ইতিমধ্যে ফিলিপাইন ও তাইওয়ানে ৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ২৪ জন।
চীনের সরকারি টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, প্রবল ঝোড়ো হাওয়ায় দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের বেশ কিছু বিলবোর্ড ও গাছপালা উপড়ে পড়েছে। উপকূলে বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ঝাংঝু শহরের পথঘাট ডুবে গেছে।
জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে কর্তৃপক্ষ আগেই দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। স্থানীয় বন্যানিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, জরুরি ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে আরও অনেক লোককে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এলাকায় ফেরি ও বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফুজিয়ানের শিয়ামিন শহরের বিমানবন্দরের অন্তত ৮০টি নিয়মিত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
এর আগে মেগির আঘাতে ফিলিপাইনে ৩৬ জন ও তাইওয়ানে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাহরাইনে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে গতকাল শনিবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল ক্ষমতাসীন সুন্নিদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতা চলার পর এই ভোট নেওয়া হলো। দেশের শাসনব্যবস্থায় সংস্কার শুরু হওয়ার পর এটি সে দেশে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন।
বাহরাইনে শিয়া সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা বিরোধী দলে থাকায় তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ৪০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ক্ষমতাও সীমিত। কাজেই নির্বাচনে খুব ভালো ফল না করতে পারলে তাদের অবস্থানের হেরফের হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাহরাইন। মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর রয়েছে সে দেশে। গত আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিশিষ্ট শিয়া নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ সময় আড়াই শতাধিক শিয়া নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর জের ধরে রাস্তায় রাস্তায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে।
এ সময় বাহরাইনের সরকার আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়। বিশিষ্ট কয়েকজন শিয়া নেতাসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের দাবি, কোণঠাসা পরিস্থিতি থেকে তাঁরা উদ্ধার পেতে চান। চান আরও বেশি অধিকার।

হাইতিতে কলেরা ছড়িয়েপড়া ঠেকানোর চেষ্টা

হাইতির মধ্যাঞ্চলে কলেরায় গতকাল শনিবার পর্যন্ত কমপক্ষে ১৯৬ জন মারা গেছে। তা ছাড়া এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আর্টিবোনিট ও মধ্য প্লেটিউ শহরে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য অঞ্চলে যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।
কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, কলেরা যদি মধ্যাঞ্চল থেকে হাইতির ভূমিকম্প-দুর্গত শরণার্থীশিবিরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে মৃতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।
গত জানুয়ারি মাসে হাইতিতে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়। এই ভূমিকম্পে শুধু রাজধানী পোর্ট অ প্রিন্সেই ১৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
হাইতির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, আর্টিবোনিট নদীর দূষিত পানি পান করেই এ অঞ্চলে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
হাইতির কলেরা-আক্রান্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণেরও জায়গা নেই। হাসপাতালগুলোয় কলেরা-আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই শহরের বিভিন্ন ক্লিনিকে ছুটছে।
স্থানীয় চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ কম হওয়ায় তাঁরা সব রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে পারছেন না। এ ছাড়া রোগীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় সবাইকে হাসপাতালে জায়গাও দেওয়া যাচ্ছে না।

ফ্রান্সের সিনেটে পেনশন সংস্কার বিল পাস

ফ্রান্সে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে গত শুক্রবার বিতর্কিত পেনশন সংস্কার বিল পাস হয়েছে। বিলটির পক্ষে ১৭৭ ভোট এবং বিপক্ষে ১৫৩ ভোট পড়ে।
এই বিলকে কেন্দ্র করে ১০ দিন ধরে ফ্রান্সজুড়ে অবরোধ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিলটির বিরোধিতা করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। বিক্ষোভকারীদের অবরোধে ফ্রান্সে জ্বালানি-সংকটসহ নানা খাতে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।
সিনেটে প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির পেনশন সংস্কার বিল অনুমোদন পাওয়ার ফলে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এটি আইনে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেনশন সংস্কার বিলে সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬২ এবং পূর্ণ অবসরকালীন ভাতা পাওয়ার বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতে এই পদক্ষেপ অপরিহার্য বলে সারকোজি মন্তব্য করেছেন।
পেনশন সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারকোজির সরকারের এই পদক্ষেপ শুরু থেকেই কঠোর সমালোচনার মুখে রয়েছে। কর্মচারীদের অবসরকালীন বয়স বাড়ালে সরকারি অর্থব্যয়ের শ্রাদ্ধ হবে বলে অনেকে মনে করছেন। অনেকের মতে, সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফরাসি নাগরিক হিসেবে তাঁদের জন্মগত অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। এ নিয়ে বিতর্ক ও ক্ষোভের জের ধরে ১২ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তেলের ডিপো ও শোধনাগারে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেন ধর্মঘটি কর্মচারীরা। এতে প্যারিসের দুটি প্রধান বিমানবন্দরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেখা দেয় তেল-সংকট।
চলমান আন্দোলনের জের ধরে ফ্রান্সের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও যোগ দিয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় চলে সংঘর্ষ। একপর্যায়ে সারকোজি তেলের ডিপো ও শোধনাগার থেকে সরবরাহ পুনরায় চালু করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সিনেটে ভোটাভুটির কয়েক ঘণ্টা আগে পুলিশ দেশের একটি কৌশলগত তেল শোধনাগার কেন্দ্র আবার চালু করতে সক্ষম হয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকারের পেনশন সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নাগরিকদের আন্দোলন জোরদার হবে। তবে সারকোজি তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। গতকাল একটি কারখানা পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ‘ইতিহাস মনে রাখবে, কার কথা সত্য। একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কী আশা করেন আপনারা? তিনি সত্য কথা বলছেন এবং যা করা দরকার, তা-ই করছেন।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের কার্যালয়ে আত্মঘাতী হামলা

আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হেরাতে জাতিসংঘের কার্যালয়ে গতকাল শনিবার আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে। এতে হামলাকারী চারজন নিহত হয়েছে। তবে জাতিসংঘের কোনো কর্মী হতাহত হয়নি। তালেবান এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে।
হেরাত প্রদেশের পুলিশ বিভাগের উপপ্রধান দেলোয়ার শাহ দেলোয়ার জানান, ‘চার ব্যক্তি পুলিশের পোশাক পরে এই হামলায় অংশ নেয়। হামলাকারীদের একজন বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে জাতিসংঘ কার্যালয়ের ফটকের সামনে এনে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে গাড়িটি বিধ্বস্ত হয় ও হামলাকারীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তবে এই বিস্ফোরণে জাতিসংঘ কার্যালয়ের কোনো কর্মী হতাহত হয়নি। তিনি জানান, দ্বিতীয় হামলাকারীকে জাতিসংঘ কার্যালয় চত্বরের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়। অন্য দুজন চত্বরের ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়। এ ঘটনায় অন্য কেউ হতাহত হয়নি।
রাজধানী কাবুল ও হেরাত শহরে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হামলায় জাতিসংঘের কোনো কর্মী হতাহত হয়নি বলে তাঁরা জানান। হামলার সময় জাতিসংঘের কর্মীদের নিরাপদ বাংকারে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থল থেকে এএফপির একজন সাংবাদিক জানান, স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতিসংঘ কার্যালয় চত্বর থেকে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি কার্যালয়ের ফটকের সামনে বিধ্বস্ত গাড়ি ও একজন জঙ্গির ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেমারাই বাশারি হামলার ঘটনা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে।
তালেবান মুখপাত্র ইউসুফ আহমাদি অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোন করে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, হেরাতে জাতিসংঘ কার্যালয়ে তাঁরাই হামলা চালিয়েছেন। হামলায় জাতিসংঘের কর্মী ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১২ জন নিহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পাকিস্তানে জঙ্গিদের গোপন আস্তানায় হামলা, নিহত ১২

পাকিস্তানের আফগান-অধ্যুষিত ওরাকজাই এলাকায় হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে চালানো হামলায় সন্দেভাজন ১২ জঙ্গি নিহত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এ কথা জানান। গতকাল শনিবার ওই এলাকায় জঙ্গিদের দুটি গোপন আস্তানায় এ হামলা চালানো হয়।
স্থানীয় সরকার প্রশাসনের কর্মকর্তা আওরঙ্গজেব জানান, গতকালের ওই হামলায় ছয় জঙ্গি আহত হয়েছে। ওই এলাকায় সাংবাদিকদের যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ থাকায় এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। গত শুক্রবার ওই এলাকায় রাস্তার পাশে একটি বোমা বিস্ফোরণে ছয় সৈন্য নিহত হন।

ভারতে হাতিকে ঐতিহ্যবাহী প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি

ভারত সরকার গত শুক্রবার হাতিকে সে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
ভারতে এখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার হাতি রয়েছে। বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় রয়েছে সাড়ে তিন হাজার হাতি।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ১১ হাজার ৩০০, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ১৭ হাজার এবং মধ্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে দুই হাজারের বেশি হাতি।

পশ্চিমাদের ওপর হামলার আহ্বান আল-কায়েদার মার্কিন মুখপাত্রের

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার মার্কিন মুখপাত্র অ্যাডাম গাদান মুসলমানদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসআইটিই গতকাল শনিবার এ কথা জানিয়েছে।
এসআইটিই অ্যাডাম গাদানের দেওয়া একটি ভিডিওবার্তা জব্দ করেছে। ৪৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডের এই বার্তায় বলা হয়েছে, ‘ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দেশে বসবাসকারী মুসলমান ভাইদের এটা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে জিহাদই হচ্ছে তাদের কর্তব্য।’
এসআইটিই বলেছে, ফ্রান্সের প্যারিস, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটে প্রতিকূল পরিবেশে কোণঠাসা হয়ে বসবাসকারী মুসলামানদের উদ্দেশে জিহাদের এ আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পড়াশোনা অথবা চাকরির উদ্দেশে আসা মুসলমানদের প্রতিও হামলা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসআইটিই জানায়, মুসলমানদের উদ্দেশে গাদান ভিডিওবার্তায় বলেছেন, ‘নাস্তিকদের ওপর হামলা ও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে আপনাদের। নাস্তিকদের সঙ্গে কোনো চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত তাদের ওপর হামলা চালানো আপনাদের দায়িত্ব।’
যুক্তরাষ্ট্রে আজম নামে পরিচিত আল-কায়েদার এই নেতার জন্ম ১৯৭৮ সালে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়ে উঠেছেন তিনি। ২০০৪ সাল থেকে বেশ কয়েকবার তিনি আল-কায়েদার হয়ে ভিডিওবার্তা প্রকাশ করেছেন।

আগ্রাসনের ভয়াবহতা বুঝতে নথির প্রয়োজন হয় না তাঁর

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ভয়াবহতা বুঝতে উইকিলিকসের গোপন নথি প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না বাগদাদের স্কুলশিক্ষিকা ফাতিমা রাজাকের। প্রতিদিন সকালে আয়নায় মুখ রাখলেই তাঁর মনে ভেসে ওঠে এক দুঃসহ স্মৃতি।
২০০৭ সালের ঘটনা। একটি কাজে বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বের হন ফাতিমা। পথে মার্কিন বাহিনীর এক চেকপয়েন্টে অনেক গাড়ি থেমে থাকতে দেখে নিজের গাড়িও থামান তিনি। জানতে পারেন, এই গাড়িগুলোর মধ্যে কোনো একটিতে আত্মঘাতী হামলাকারী ওত পেতে আছে। তাই প্রতিটি গাড়িতে কঠোরভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। উদ্বিগ্ন হয়ে গাড়ির ভেতরে বসেই অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি।
ফাতিমা জানান, অপেক্ষার একপর্যায়ে হঠাৎ করে একজন মার্কিন সেনা তাঁর বন্দুক গাড়িগুলোর দিকে তাক করলেন। যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই ওই সেনা গুলি ছোড়া শুরু করলেন। ফাতিমা তাঁর মুখ থেকে কান পর্যন্ত লম্বা ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘ওই বন্দুকের একটি বুলেট আমার মুখের পাশে লেগে কানের পাশ দিয়ে চলে যায়।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে গেলেই আমি শিউরে ওঠি। আমি একজন মা, একজন স্ত্রী।’
৪২ বছর বয়সী ফাতিমা জানান, এ পর্যন্ত তাঁকে ছয়বার প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়েছে। সপ্তমবারের মতো সার্জারি করতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি।
গত শুক্রবার উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন বাহিনীর ইরাক যুদ্ধের গোপন নথিতে দেখা যায়, ইরাকে বিভিন্ন চেকপয়েন্টে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বেসামরিক জনগণকে হত্যা করা হয়। এই সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮১ জন।

‘ইরাকি বন্দীদের ওপর নির্যাতন উপেক্ষা করেছেন মার্কিন সেনারা’

সরকারের জন্য বিব্রতকর তথ্য ফাঁসের জন্য আলোচিত ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকস’ এবার ইরাকে মার্কিন দখলদারির বেশ কিছু গোপন নথি প্রকাশ করেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন বাহিনীর প্রায় চার লাখ নথিতে ওয়েবসাইটটি সাধারণ মানুষের ওপর ইরাকি কর্তৃপক্ষের ব্যাপক নির্যাতন ও মার্কিন সেনা চৌকিতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরাকি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় বলেছে, প্রকাশিত তথ্যে ‘বিস্মিত হওয়ার মতো’ নতুন কিছু নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব তথ্য তত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করার পাশাপাশি তা ফাঁস করে দেওয়ার নিন্দা করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে একসঙ্গে এত বেশি গোপন নথি ফাঁসের ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে গত জুলাইয়ে উইকিলিকস আফগান যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন বাহিনীর ৯২ হাজারেরও বেশি গোপন নথি প্রকাশ করে আলোড়ন তোলে।
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, ইরাকের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানোর বিষয়টি দখলদার মার্কিন সেনা কর্তৃপক্ষ জানত। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা এসব নির্যাতন চালালেও তা তদন্ত করতে ব্যর্থ হয় মার্কিন বাহিনী। এ ছাড়া ইরাকের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনকে প্রতিবেশী ইরানের সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়েও জানতেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, এসব নথি থেকে পাওয়া তথ্যে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ মেলে।
নথি ফাঁস করায় উইকিলিকসের নিন্দা জানিয়ে পেন্টাগন বলেছে, এর ফলে মার্কিন বাহিনী ও তাদের সহযোগী অন্তত ৩০০ ইরাকি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
উইকিলিকসে প্রকাশিত নথিতে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের শুরু (২০০৩) থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। আগে অস্বীকার করলেও দেখা যাচ্ছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষ বেসামরিক হতাহতের রেকর্ড সংরক্ষণ করেছে। নথির তথ্য অনুযায়ী ইরাক যুদ্ধের প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে দুই লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। মোট নিহত হয়েছে এক লাখ নয় হাজার ব্যক্তি। এর মধ্যে ৬৬ হাজার ৮১ জনই বেসামরিক ইরাকি। কিন্তু ‘যুদ্ধের কারণে’ তাদের মৃত্যু হয়নি বলে দাবি করা হয়।
উইকিলিকসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরাকের বিভিন্ন নিরাপত্তা চৌকিতে নির্বিচারে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে...। বিভিন্ন কারাগারে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন। জঙ্গি আশ্রয় নিয়েছে, এমন সন্দেহ থেকে মার্কিন সেনারা বহু বেসামরিক ভবন উড়িয়ে দিয়েছেন।’ উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বেসরকারি নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক ওয়াটারের বিরুদ্ধেও ইরাকে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার তথ্য রয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি।
প্রচারমাধ্যমে উইকিলিকসের প্রকাশিত নথির সূত্র ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ বলা হয়েছে, সেনাদের অন্যায়ের বিষয়ে মার্কিন বাহিনীর কাছে অভিযোগ গেলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। সেনারা এ বিষয়ে তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালেও বিষয়টি শুধু ইরাকিদের তদন্ত করতে বলা হতো।
গার্ডিয়ান-এ বলা হয়, ইরাকের এক কারাগারে একজন বন্দীর পায়ে গুলি করে ইরাকি পুলিশ। তাঁর কাছে লোহার রড আছে, শুধু এই সন্দেহে ওই বন্দীকে গুলি করা হয়। ওই ঘটনার কোনো তদন্ত হয়নি। এ ছাড়া ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, নির্যাতনসহ অনেক অভিযোগেরও তদন্ত করতে ব্যর্থ হয় মার্কিন বাহিনী। উল্লেখ্য, মার্কিন অভিযানে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর কয়েক বছর ইরাকের প্রশাসন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রই চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পরিচালক ম্যালকম স্মার্ট বলেন, উইকিলিকসের নথি থেকে বোঝা যায়, ইরাকে বছরের পর বছর ধরে চলা এসব নির্যাতনের বিষয়ে জানত মার্কিন বাহিনী।
ইরাকের মানবাধিকারবিষয়ক মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার এ ব্যাপারে প্রথমবারের মতো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কামিল আল আমিন বলেন, ‘এসব নথিতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কোনো তথ্য নেই। কারণ আবু গারিবসহ বিভিন্ন কারাগারের ঘটনা সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। অনেক ঘটনার সঙ্গে মার্কিন সেনারাও জড়িত।’
ইরাকি মুখপাত্র আরও বলেন, উইকিলিকসে মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা এক লাখ নয় হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংখ্যা ইরাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবের কাছাকাছি।
কয়েকজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা দাবি করেন, এসব তথ্য ট্যাকটিক্যাল ইউনিটগুলোর সংগ্রহ করা ‘প্রাথমিক তথ্য’ মাত্র। তাঁরা বলেন, যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে লক্ষ্যেই প্রচলিত নিয়মমতো এসব ব্যাপারে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছিল তাঁদের।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এসব তথ্য ফাঁসের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সরে দাঁড়াল রাশিয়া

২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের লড়াই থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে রাশিয়া। এ ছাড়া আর উপায়ও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোয় নিশ্চিত হয়ে গেছে ২০১৮ বিশ্বকাপ হচ্ছে ইউরোপেই। ফিফার নীতি অনুযায়ী টানা দুটো বিশ্বকাপ একই মহাদেশে হয় না। রাশিয়ান ফুটবল ইউনিয়নের মহাব্যবস্থাপক আলেক্সেই সরোকিন গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। ২০১৮ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ার জন্যই এবার কোমর বেঁধে নামবে তারা। রাশিয়ার সঙ্গে স্বাগতিক হওয়ার লড়াইয়ে আছে ইংল্যান্ড, যৌথভাবে স্পেন-পর্তুগাল ও হল্যান্ড-বেলজিয়াম। রাশিয়া সরে দাঁড়ানোয় ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার লড়াইটা এখন এশিয়া ও আমেরিকার।

অস্ট্রেলিয়াকে আবার শীর্ষে নিতে চান চ্যাপেল

দুই টেস্টের সিরিজের দুই ম্যাচেই হার। র‌্যাঙ্কিং চালুর পর টেস্টে এক নম্বর আসনটি যারা প্রায় পৈতৃক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিল, সেই অস্ট্রেলিয়া এখন পঞ্চম স্থানে! ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার এমন খারাপ সময় কমই গেছে। তবে দলের এই ক্রমাবনমনকালেও আশার গান শোনাচ্ছেন গ্রেগ চ্যাপেল।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নতুন নির্বাচক বলছেন, তাঁদের লক্ষ্যই দল হিসেবে সুসংগঠিত হওয়া, যাতে আবার তাঁরা বিশ্বক্রিকেটের শীর্ষ দলের আসনটা ফিরে পেতে পারে। দলের এই লক্ষ্যের সঙ্গে অ্যাশেজকে জুড়ে দিয়ে গ্রেগ বললেন, ‘অ্যাশেজ বড় সিরিজ, ঠিক আছে, কিন্তু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত লক্ষ্য হলো, তিন ঘরানার ক্রিকেটেরই শীর্ষে ওঠা।’
টেস্ট সিরিজ জিতে ভারত এক নম্বরে তাদের অবস্থান সংহত করেছে আরও। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়া নেমে গেছে পাঁচে। ওয়ানডে ক্রিকেটে যদিও তারা এক নম্বরেই। তবে টি-টোয়েন্টিতে তাদের যে অবস্থা, তাতে র‌্যাঙ্কিং চালু থাকলে এখানেও তাদের অবস্থানটা হতো নিচের দিকেই। অস্ট্রেলিয়ার কেন এই দশা?
কারণ হিসেবে অনেকেই টেনে আনছেন ‘বুড়ো’দের নিয়ে গড়া দলটির ব্যাটিং লাইনআপকে। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়া দলে ৩৫ পেরোনো ব্যাটসম্যান ছিলেন তিনজন—পন্টিং, ক্যাটিচ ও মাইক হাসি। দলটিতে অপেক্ষাকৃত তরুণ যে তিন সদস্য, সেই মার্কাস নর্থের বয়স ৩১ বছর, মাইকেল ক্লার্ক, শেন ওয়াটসনের ২৯!
চ্যাপেলও ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে পারছেন এবং এখানেই একটা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন।

গিলক্রিস্টের ১৪৯-ই সেরা

ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাস ৩৫ বছরের। এই ৩৫ বছরে ৯টি বিশ্বকাপে কত অনবদ্য ইনিংসই তো খেলেছেন কত ব্যাটসম্যান। ২০০৭ বিশ্বকাপের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ১৪৯ রানের ইনিংস, ’৮৩-তে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কপিল দেবের অপরাজিত ১৭৫ অথবা প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডের ১০২ রান—স্মৃতির সরণিতে জ্বলজ্বল করে এই ইনিংসগুলো।
যদি বলা হয় সেরার সেরা বাছতে? একটু কঠিনই হয়ে পড়ে কাজটা। কোনটা ছেড়ে কোনটাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাবেন আপনি! কঠিন এই কাজটাই করেছে ক্যাস্ট্রল ইনডেক্স রেটিং। বিশেষজ্ঞদের ভোটে এই রেটিংয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে গিলক্রিস্টের ১০৪ বলে খেলা ১৪৯ রানের ইনিংসটি। আর দ্বিতীয় সেরা নির্বাচিত হয়েছে টানব্রিজ ওয়েলসে করা কপিল দেবের ১৭৫।
তবে রেটিং করতে গিয়ে একেকজন বিশেষজ্ঞ ভোট দিয়েছেন একেকটি ইনিংসকে। ক্যাস্ট্রল সেই মতামতও প্রকাশ করেছে। ভারতের সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার এবং বর্তমানে ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রীর ভোটটি যেমন পেয়েছে ১৯৯৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অরবিন্দ ডি সিলভার ১০৭ রানের ইনিংসটিতে। শাস্ত্রীর সঙ্গে আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাতেরও বিশ্বকাপের সেরা ইনিংস মনে হয়েছে এটিকেই।
শাস্ত্রীর কাছে ডি সিলভার এই ইনিংসটিকে সেরা মনে হওয়ার যুক্তিও আছে, ‘এই ইনিংসটি দিয়ে ডি সিলভা বুঝিয়েছে ও বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। শ্রীলঙ্কা রান তাড়া করছিল। দল খুব দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। অরবিন্দই তখন ছিল শ্রীলঙ্কার একমাত্র ভরসা। আর এর আগে ওর দলও কোনো বড় টুর্নামেন্ট জেতেনি। আর গিলক্রিস্ট এর আগেও বিশ্বকাপ জিতেছে, পাশাপাশি সে এও জানত তারপর দলে আরও ভালো ভালো ব্যাটসম্যান আছে।’
লরগাতের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে শাস্ত্রীর কথা, ‘শ্রীলঙ্কা তখনো নতুন একটি দল। আর অরবিন্দর ওই ইনিংসটাই সব বাজিকে মিথ্যা করে শ্রীলঙ্কাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছে।’
ধারাভাষ্যকার হার্সা ভোগলে বিশ্বকাপের সেরা ইনিংস নির্বাচন করতে গিয়ে চলে গেছেন ৩৫ বছর পেছনে। ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্লাইভ লয়েডের ইনিংসটিই চির-উজ্জ্বল তাঁর স্মৃতিতে।

চিগুম্বুরার চোখ বাংলাদেশে

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে একেবারেই নাস্তানাবুদ জিম্বাবুয়ে। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ৮ রানের পরাজয়টা বাদ দিলে দুই টি-টোয়েন্টি ও তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বিন্দুমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি জিম্বাবুয়ে। অথচ এমন একটা সিরিজ থেকেও নাকি বেশ কিছু ইতিবাচক দিক খুঁজে পেয়েছেন এলটন চিগুম্বুরা। এগুলো জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক কাজে লাগাতে চান বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের জবাব দেওয়ার জন্য নাকি কোমর বেঁধেই আসবে তারা!
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের হাতে রামধোলাই খেয়েছে জিম্বাবুয়ের বোলিং। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে জিম্বাবুয়ের ১৬৮ রান দক্ষিণ আফ্রিকা টপকে যায় ২৫ বল হাতে রেখে, পরের টি-টোয়েন্টিতে প্রথমে ব্যাট করে তোলে ১৯৪ রান। ওয়ানডে সিরিজে দুটি ম্যাচে আগে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলেছে ৩৫১ ও ৩৯৯ রান, এক ম্যাচে জিম্বাবুয়ের করা ২৬৭ রান টপকেছে ১১ ওভার ৮ উইকেট হাতে রেখে। ওয়ানডে সিরিজের তিন ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে আছে জোড়া সেঞ্চুরি।
দলের ব্যাটিংয়ে সন্তুষ্ট চিগুম্বুরা বোলিংয়ের দুরবস্থার দায় দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার নিষ্প্রাণ উইকেটকে। তবে এমন উইকেটে বোলিং করে আখেরে নাকি লাভই হয়েছে তাদের। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান বাংলাদেশ সিরিজে, ‘পুরো সিরিজটাকে আমি ইতিবাচকই বলব। কারণ আমরা বুঝতে পারছি, আমরা ঠিক কোথায় আছি। দক্ষিণ আফ্রিকার নিষ্প্রাণ উইকেটে ভুলের সুযোগ থাকে খুব সামান্যই। এখানেই স্কিলের ব্যাপারটা চলে আসে। আর এমন নিষ্প্রাণ উইকেটে ভালো বোলিং স্কিল এখনো আমাদের হয়নি। তবে একটা দিক থেকে এমন উইকেটে দারুণ সব ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বোলিং করাটা আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে। আশা করি, আমরা যখন বাংলাদেশে যাব তখন এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে বোলিং করতে হয়।’
রে প্রাইসকে না পাওয়ার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে চিগুম্বুরার কথায়। বাবার অসুস্থতার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে ছিলেন না বাঁহাতি স্পিনার। অভিজ্ঞ এই স্পিনারকে পেলে বাংলাদেশে বোলিং আক্রমণের চেহারাটা আরেকটু ভালো হবে, আশা চিগুম্বুরার। শুধু নিজেদের স্পিনার নিয়েই নয়, জিম্বাবুয়ে অধিনায়কের মাথায় আছে প্রতিপক্ষের স্পিন আক্রমণও। স্পিনই যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হবে, ভালোই জানা আছে এই অলরাউন্ডারের। তাই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েই বাংলাদেশের বিমানে উঠবেন তাঁরা, ‘নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজটার খোঁজখবর আমি রেখেছি। ওরা খুবই ভালো খেলছে। তবে আমাদের ব্যাটসম্যানরাও খুব ভালো ফর্মে আছে। জানাই আছে, বাংলাদেশে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, এক গাদা স্পিনারের মুখোমুখি হতে হবে। দেশে ফিরে আমরা তাই আমাদের বোলিংয়ের পাশাপাশি স্পিন খেলা নিয়েও কাজ করব।’
পাঁচ ওয়ানডের সিরিজ খেলতে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে আসছে জিম্বাবুয়ে। সিরিজের সূচি অবশ্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

কেন থেকে গেলেন রুনি?

আজ জন্মদিনটা ভালোই কাটার কথা তাঁর। কলিনের সঙ্গে শ্যাম্পেনের গ্লাস ঠুকবেন যখন, সুস্বাস্থ্য কামনার পাশাপাশি স্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ অভিনন্দনও হয়তো পাবেন। যুদ্ধ জয়ের অভিনন্দন। যুদ্ধই তো। অ্যালেক্স ফার্গুসনের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে জেতার বিরল নজিরই তো স্থাপন করেছেন ওয়েইন রুনি!
কিন্তু কী সেই মন্ত্র যার বলে ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল দৃশ্যপট? এক দিন আগেও যাঁর বিদায় ছিল অনিবার্য, সেই তিনিই কি না ম্যানইউতে এক-দুই নয়, আরও পাঁচ বছরের জন্য থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করলেন। আগের দিন যাঁর কণ্ঠে ছিল বিরহের সুর, ‘আজ দুজনার দুটি পথ...’, পরদিনই তিনি কিনা গাইছেন, ‘তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমারও প্রাণ...।’
ইংলিশ মিডিয়া ধন্দে আছে। রহস্য উদ্ধার হচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে, রুনির সাপ্তাহিক বেতন আগের চেয়ে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে। আসল অঙ্কটাও ধোঁয়াশার জালে। ইংলিশ পত্রিকাগুলো রুনির নতুন সাপ্তাহিক বেতন দেড় থেকে ২ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত লেখা হচ্ছে। আসল অঙ্ক যেটাই হোক, রুনি যে ম্যানইউর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের নতুন রেকর্ড গড়েছেন, এটা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই।
সবচেয়ে বড় বিস্ময়টা হলো, রুনি এমন একসময় ম্যানইউকে দর-কষাকষিতে কোণঠাসা করেছেন, যখন উল্টো চাপের মুখে থাকার কথা ছিল তাঁরই। মাঠে পারফরম্যান্স ভালো নয়, মাঠের বাইরেও পতিতা-কেলেঙ্কারি নিয়ে জীবন অতিষ্ঠ। বড় স্পনসররা ফিরিয়ে নিচ্ছে মুখ। সেই সময় ক্লাবের সঙ্গে দর-কষাকষির লড়াইয়ে রুনিকে জিতেয়ে আনার পুরো কৃতিত্ব পাচ্ছেন রুনির এজেন্ট পল স্ট্রেটফোর্ড।
ট্যাবলয়েডগুলো অবশ্য তাদের নিজস্ব তত্ত্ব খাটিয়ে রুনির ম্যানইউতে থেকে যাওয়ার আরও কিছু কারণ বের করছে। কিছু পত্রিকা লিখেছে, রুনি আসলে যেতে চেয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানে হোসে মরিনহোর সঙ্গে কাজ করার লোভ তো আছেই, উপরি হিসেবে আছে বন্ধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে আবারও জুটি বাঁধা। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত রুনি পাল্টাতে বাধ্য হন তাঁর শাশুড়ি কলেট্টে ম্যাকলাফলিনের প্রভাবে।
দলবদলের সব নাটকের পেছন থেকে নাকি কলকাঠি নেড়েছেন কলিনের মা। কলিনও স্বামীকে চাপ দিয়েছেন। বিশেষ করে হুলিগানদের (ফুটবলের দাঙ্গাবাজ সমর্থক) হুমকি-ধমকিতে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন কলিন।
আসল কারণ যা-ই হোক না কেন রুনি ম্যানইউতে থাকছেন এটা আসলে ক্লাবটির জন্য সুখবরই। এই সুখবর নিয়ে আজ স্টোক সিটির বিপক্ষে মাঠে নামছে লিগে ৮ ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট পাওয়া ম্যানইউ। অ্যাঙ্কেলে চোট পাওয়া রুনি অবশ্য এ ম্যাচে থাকবেন না।
এদিকে রুনির থেকে যাওয়া নিয়ে মিডিয়া যতই বিস্মিত হোক, ইংলিশ লিগের কোচরা কিন্তু বলছেন, এমনটা যে হবে, সেটি তাঁরা আগেই অনুমান করে রেখেছিলেন। আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার তো দাবি করলেন, রুনি-সংক্রান্ত কোনো খবরই তিনি পড়েননি। এরই মধ্যে টটেনহাম কোচ হ্যারি রেডন্যাপ একটা যুক্তিসংগত প্রশ্ন তুলেছেন। ভবিষ্যতে কি তারকা খেলোয়াড়দের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কাছে মাথা নুয়ে থাকতে হবে ক্লাবকেই?
এই প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে আনুগত্যের ব্যাপারটিও। কোথায় গেল ম্যানইউর প্রতি রুনির অগাধ ভালোবাসা! সামনের দিনগুলোয় রুনিকে ওই ভালোবাসা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ নিয়েই নামতে হবে মাঠে। ব্যর্থ হলে জুটবে ধিক্কার। সফল হলে সমর্থকেরা ভুলেই যাবে, এই রুনিই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন ওল্ড ট্রাফোর্ড।

বিদায় চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান!

ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। বড় নির্মম।
সত্যটা কাল উপলব্ধি করতে বাধ্য হলো ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান। সর্বাধিকবার ফেডারেশন কাপ শিরোপার স্বাদ নেওয়া মোহামেডান এই প্রথম মৌসুম সূচক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠতেই ব্যর্থ!
ফেডারেশন কাপ শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। গত ২১ আসরে দুবার যুগ্ম চ্যাম্পিয়নসহ সর্বোচ্চ ১০ বারের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান। চারবার রানার্সআপ। ১৪ বার খেলেছে ফাইনালে। টানা শিরোপা জিতেছে গত দুবার। হ্যাটট্রিক শিরোপা মিশনে তাদেরই কিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়!
কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে এই দৃশ্য কী করে হজম করেন মোহামেডানের বিখ্যাত সাবেকেরা! ছাইদ হাসানের (কানন) আক্ষেপ, ‘মোহামেডানের ফুটবল ইতিহাসে অনেক বিপর্যয়ই এসেছে। কিন্তু এমন কখনো হয়নি। খুব লজ্জা লাগছে।’ ইমতিয়াজ সুলতান (জনি) বললেন, ‘মোহামেডানের যে দল এবার, তাতে ভালো কিছু আশা করা যায় না। মোহামেডানের ইতিহাসে এবারই জাতীয় দলের কোনো খেলোয়াড় নেই। ভালো ফল আশা করি কীভাবে?’
ঘটনাক্রমে কাল শেষ ম্যাচে মোহামেডান মাঠে নামার আগেই তাদের সব আশা শেষ। দিনের প্রথম ম্যাচে ব্রাদার্সকে মুক্তিযোদ্ধা হারিয়েছে ৩-০ গোলে। ব্রাদার্স অন্তত ড্র করলে পরের ম্যাচে বড় ব্যবধানে জিতে সেমিতে যাওয়ার সুযোগ থাকত মোহামেডানের সামনে। কিন্তু আগের দুই ম্যাচই জিতে সেমিফাইনালে চলে যাওয়া ব্রাদার্স এদিন প্রথম একাদশে ৭টি পরিবর্তন এনে দুলকি চালে খেলেছে মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে।
এরই ফল—মুক্তিযোদ্ধা ৩ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। ব্রাদার্স গ্রুপ রানার্সআপ হতে চেয়েছে, হয়েছেও তাই। সেমিফাইনালে শেখ জামালের পরিবর্তে তাদের পছন্দ যে আবাহনী।
আগের ম্যাচগুলোয় নজর কাড়া ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার এভারটন, ঘানার এনক বেনটিলদের সাইডবেঞ্চেই বসিয়ে রাখল ব্রাদার্স। মুক্তিযোদ্ধা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে পুরোপুরি। গত ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা সুদানের স্ট্রাইকার জেমস মগা দুটি (একটি পেনাল্টি থেকে), মিঠুন চৌধুরী অন্য গোলটি করে ব্রাদার্সকে দিয়েছেন পরাজয়ের স্বাদ।
ফেনী সকারের বিপক্ষে জিতলে তবু জয় দিয়ে শেষ করতে পারত মোহামেডান। কিন্তু ফেনী সকার আর মোহামেডানে পার্থক্য কী! দুই দলই লড়ল সমানে সমান। ৩৭ মিনিটে বুলবুলের গোলে এগিয়ে যায় সকার। ৪৮ মিনিটে পেনাল্টি পেয়েছে মোহামেডান। কিন্তু ‘আনফিট’ নাইজেরিয়ার স্ট্রাইকার এমেকার দুর্বল শট ঠেকিয়ে দিয়েছেন সকারের গোলরক্ষক। শেষ পর্যন্ত ৮৫ মিনিটে জাতীয় যুবদলের সদস্য ক্যানারি ওয়ার্ফের আবাসিক ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা তরুণ সোহেল কোনাকুনি শটে ১-১ করেন।
মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে গোলশূন্য, ব্রাদার্সের কাছে ০-২ হার। ফেনী সকারের সঙ্গে ড্র—তিন ম্যাচে ২ পয়েন্ট পেয়েছে মোহামেডান। ‘বি’ গ্রুপে তৃতীয় হলো সাদা-কালোরা।
মোহামেডান গ্রুপে তৃতীয়! অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার হাসান আল মামুন মোটেও বিস্মিত নন, ‘আমাদের সময় লাগবে। এই বিদায়টা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নয়। তৃতীয় হওয়াও অস্বাভাবিক ফল বলব না।’
দলে পাঁচজন বিদেশি খেলোয়াড়। একজন গত ম্যাচে লাল কার্ড দেখায় এদিন মাঠের বাইরে। গোলরক্ষক মোহাম্মদ হাসান এবং স্ট্রাইকার এমেকা খেলেছেন। ছাড়পত্র না আসায় দুজন ছিলেন দর্শক। এই দুজনকে পেলে হয়তো ফলাফল আরেকটু ভালো হতে পারত বলে মনে করে মোহামেডান শিবির। অখ্যাত তরুণদের পক্ষে এর চেয়ে আর কী করা সম্ভব—সান্ত্বনা খোঁজা হয়েছে এই কথা বলেও।
এদিন সাদা-কালো জার্সি ছেড়ে সবুজ পরে খেলাটাই ভালো হয়েছে মোহামেডানের। এই তরুণ দল সাদা-কালোর ভার নেওয়ার উপযুক্ত তো নয়। অচেনা এই দলের কান্ডারি কোচ শফিকুল ইসলামকে (মানিক) ম্যাচের পর সান্ত্বনা দিচ্ছিল সমর্থকেরা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বিদায়ের কথাই প্রত্যেকের মুখে। মোহামেডান ঘুরে দাঁড়াবে—এই প্রত্যয়ও রইল মোহামেডান সমর্থকদের কণ্ঠে।
শফিকুল ইসলামের মনে ঝড় বইলেও কণ্ঠটা ছিল স্বাভাবিক, ‘এই ফলাফল হতেই পারে। এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে নিচ্ছি। আমি হতাশ নই।’
তবে ঘটনা হলো, ইতিহাসের উল্টো পিঠ দেখা মোহামেডানের জন্য এটি সত্যিই হতাশার দিন!

বিজ্ঞান আলোচনা- 'হারিয়ে যাবে দানব গ্রহ!' by সাকিব রায়হান

ডব্লিউএএসপি-১২ বি আবিষ্কার হয় ২০০৮ সালে।
গত ১৫ বছরে আমাদের সৌরজগতের বাইরে যে চার শতাধিক গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে তার মধ্যে একটি অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী গ্রহ হচ্ছে এটি।

গল্প- 'ট্রেনের হুইসেল' by হামিদুল ইসলাম

আপাতত: আমাদের মূল আকর্ষণ ট্রেন। একটু পরই চলে আসবে ওটা। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতের মাঝখান চিরে চলে গেছে রেললাইন। একদম সোজা।
তীক্ষ হুইসেল বাজিয়ে ছুটে যাবে ট্রেন। একটু নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে বিশাল বাতাসের ধাক্কায় আমরা একটু বিচলিত হবো। হঠাৎই সেই ধাবমান ট্রেনের কামরার জানালায় ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠবে কটি কচিকাচা মুখ।

আলোচনা- 'জীবজগতে বেঁচে থাকার কৌশল' by আরিফ হাসান

যেমন রঙিন প্রবাল প্রাচীর তেমন রঙিন মাছ। মনে হয় এই মাত্র উভয়ের গায়ে কেউ একজন রঙের তুলি দিয়ে ছোপ ছোপ দাগ কেটে দিয়ে গেছে।
রঙিন মাছগুলো লালচে গোলাপি রঙের প্রবাল প্রাচীরের চার পাশে ঘুরছে আর লুকোচুরি খেলছে।

আলোচনা- 'মিনার : মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন' by শেখ মারূফ সৈকত

আমাদের জীবনধারায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নিদর্শন মূর্ত হয়ে ওঠে। এগুলো সম্পর্কে সম্যক জেনে রাখা খুবই প্রয়োজন।
কেননা, এগুলো একটা জাতির চিন্তা-চেতনা, জীবনাচার, জাতির উদ্ভব প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে।

আলোচনা- 'ভাষা নিয়ে যত কথা' by আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মনে পড়ে ভাষা আন্দোলনের কথা।
ফাগুন এলেই পলাশের ডালে, কৃষ্ণচূড়ার শাখায় ফোটে লাল-লাল ফুল। আর আমরা যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি আমাদের চোখে ভাসে- রক্তাক্ত রাজপথ, শহীদ সালাম, বরকত আর জব্বারের নাম।
মনের অজান্তে আমরা গেয়ে উঠি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি?”

গল্প- 'বোকা জ্যাকের কাণ্ড' অনুবাদঃ জাফর তালুকদার

জ্যাক শুধু বোকা নয়, ওরা ছিল ভারি গরিব। গায়ে গতরে তাগড়া হলেও মায়ের কোনো উপকারেই আসত না সে।
দুটো খাবারের জন্য মা রাতদিন খেটে মরলেও জ্যাক ঘুরে বেড়াত গায়ে ফুঁ দিয়ে।

স্মৃতি ও গল্প- 'চানমিয়ার হাতি দেখা' by ড. কাজী দীন মুহম্মদ

দিন যায়, কথা থাকে। দুঃখের রজনী পোহাতে চায় না। সুখের রজনী মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।
 
আক্ষেপ থেকে যায়, কেন এত তাড়াতাড়ি রাত পোহাল, কাকেরা কোলাহল শুরু করল।

ভ্রমণ- 'সাগরকন্যার তীরে' by এস এম ওমর ফারুক

দিনটির তুলনা হয় না অন্য আর কোনো দিনের সাথে।
 
কারণ ঐদিন আমরা কয়েকজন ভাই এক চমৎকার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম। সিদ্ধান্ত ছিল এ জার্নি টু কুয়াকাটা।

ইতিহাস- সংবাদপত্রে যেভাবে সংবাদ এলো by জে হুসাইন

১৯৬৯ সালের আগে মুদ্রণযন্ত্রে প্রকাশিত খবর ছিল কোনো কোনো দেশের মানুষের কাছে হাস্যকর ব্যাপারমাত্র।
১৯৬৯ সালে মরক্কোতে চাঁদে মানুষ পৌঁছানোর খবরটি সে দেশের ৫৬ ভাগ মানুষই প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি।

ভ্রমণ- 'আমার দেখা নরওয়ে' by অধ্যাপিকা চেমন আরা

আমার মেয়ে-জামাই মধ্য সুইডেনের সটিনাস নামক স্থানে বসবাস করে। সটিনাস সুইডেনের এয়ার বেস এলাকা। জামাই আবহাওয়াবিদ এখানকার। নতুন নাতি হয়েছে আমার। তাকে দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি। তাই ছুটে গেলাম সটিনাসে নাতিকে দেখতে। কয়দিন আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে কেটে গেল আমার। কিন্তু জনমানবহীন নির্জনতা আস্তে আস্তে আমাকে বিষণœ করে তোলে। আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। জামাই-মেয়ে টের পেল আমার বিষণœতার কারণ। তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আমার মেয়ে বের হয় প্যারামবুলেটারে বেবিকে নিয়ে আমাকে সঙ্গ দিতে এয়ারবেসের ভেতরে হেঁটে বেড়াতে। একদিন গথেনবর্গ থেকে ওর এক সুইডিশ বান্ধবী এলো স্বামীসহ ওর বাচ্চাকে দেখতে। সঙ্গে অনেক উপহার। তারা দুইদিন থাকলো- বাড়ির লনে তাঁবু গেড়ে। আমি তাজ্জব বনে গেলাম। এটা নাকি নিয়ম। ওরা কারো ঘরের শৃঙ্খলা নষ্ট করে না। খাওয়া-দাওয়া অবশ্য ঘরেই খায়।
ওদের কাছে রুবা আমার মনের অস্থিরতার কথা বলে হাসতে হাসতে বললোÑ তুমি একবার আমার মাকে পার্শ্ববর্তী নরওয়ে দেশটা দেখিয়ে আন। নরওয়ে তো তোমার মায়ের দেশ। বলা মাত্র ওর বন্ধু রাজি হয়ে গেল। খাওয়ার সময় বলে গেল দুই-একদিনের মধ্যে সে ও তার মা নরওয়ে যাবে। আমি যেন তৈরি থাকি।
২১ জুলাই ১৯৮৭ সাল। খুব ভোরে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। উলফ এসে ফোন ধরলো। ফোন করেছেন পিয়ার মা। পথেনবর্গ থাকতে পিয়ার মা আমাকে কথা দিয়েছিলেন- সময় ও সুযোগ মতো আমাকে নরওয়ে বেড়িয়ে আনবেন। তিনি তার সেই প্রতিশ্রুতি ভুলেননি। এখন তার সেই সময় ও সুযোগ এসেছে। তিন দিনের জন্য তার ব্যবসাসংক্রান্ত কাজকর্ম তদারকির দায়িত্ব নিয়েছেন তার বাবা। পিয়া ও পিয়ার মা আমাকে নরওরয়ে নিয়ে যাবেন। আগামীকাল সকালে ওরা আমাকে নিতে আসবেন। খবরটা পেয়ে আমার খুব সুবিধা হলো। নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারলাম। রুবাও খুশি। পরদিন ঠিক সময় ওরা গাড়ি নিয়ে হাজির।
ভিনদেশী অত্যাধুনিক দুই সুইডিশ মহিলার সঙ্গে আমি বেড়াতে যচ্ছি। তাও আবার যেখানে সেখানে নয়, বাংলাদেশের মানুষের কল্পনার দেশ, স্বপ্নের দেশ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের শেষ প্রান্তের চির তুষারের দেশ নরওয়েতে। কিছুটা ভয়ও হচ্ছে আমার। ভয় হবারই কথা, কী জানি কোথায় যাচ্ছি। এমনিতেই অজানা জিনিসের শঙ্কায় আমি নার্ভাস হয়ে পড়ি। এবার নার্ভাসের মাত্রাটা একটু বেশি এই যা।
পিয়াকে রুবা বারবার সাবধান করে দিয়ে বলে- আমার মা বাংলাদেশের মেয়ে। তোমাদের সাথে একাকী বেড়াতে যাচ্ছেন। তার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রেখ।
পিয়া হাসিমুখে রুবার কাছ থেকে সব দায়িত্ব বুঝে নেয়। রুবা দু’দিনের আন্দাজ খাবার-দাবার ছোট একটা থার্মোফাক্স জাতীয় বাক্সে ভরে দেয়। অল্প-স্বল্প কাপড়-চোপড় ছোট একটা ব্যাগে করে দিয়ে দেয় ওখানে ব্যবহারের জন্য। মা যেমন ছেলে-মেয়েকে পরম যতনে প্রবাসে পাঠান, তেমনি আমার মেয়ে আজ আমাকে নরওয়েতে বেড়াতে পাঠাচ্ছে।
আজ ২২ জুলাই সকাল ১০টা। চারদিকে রোদ হাসছে। পিয়া গাড়ি চালাচ্ছে। পিয়ার মা তার পাশে বসে আছেন। আমি পেছনের সিটে একা। সটিনাস থেকে পাঁচ মাইল দূরে গ্রাস নামে ছোট একটা শহরে এসে একটা পেট্রল পাম্পের কাছে গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নামলো পেট্রল নেয়ার জন্য। পেট্রল পাম্পে কোন কর্মচারী চোখে পড়লো না। প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য পয়সা ফেলার ব্যবস্থা আছে। পয়সা অনুযায়ী তেল ভরে নিতে হয়। কেউ চুরি করে তেল বেশি নেয় না। পয়সা ফাঁকি দেয়ার বদ মতলব এদের জানা নেই। সটিনাস থেকে নরওয়ের দূরত্ব প্রায় পাঁচ শ’ কিলোমিটার। ট্রেনে এই দূরত্ব পার হতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা। আর গাড়িতে লাগে ৮ ঘণ্টা। পেট্রল ভরা শেষ। এবার গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল হাতে নিলেন পিয়ার মা। গাড়ি চলছে অপার্থিব এক জগতের দিকে। রাস্তার দু’ধারে গহিন ঘন ওক, পাইন, বিচ গাছের দিগন্ত জোড়া বর্ণ আমাকে বারবার বিমুগ্ধ করে ফেলছে। পিয়ার মা মাঝে মাঝে সুইডেনের ম্যাপ দেখে নিচ্ছেন। আমাকেও বুঝাতে চেষ্টা করছেন- আমরা কোন দিক দিয়ে নরওয়ে যাচ্ছি। আমি যে খুব বুঝতে পারছি তা নয়, তবুও কিছুটা আন্দাজ করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান ঘরের মেয়ে আমি। অত্যন্ত সাদামাটা জীবন আমাদের। সুইডেন, নরওয়ে এসব দেশে আমার আসার বিষয়টি স্বপ্নে ছিলো এই সেদিনও। আল্লাহর অপার মহিমায় আমি এই দেশে এসেছি, আবার নরওয়েতেও যাচ্ছি। এটা অবিশ্বাস্য ঠেকছে আমার নিজের কাছেই। কিন্তু স্বপ্ন এখন বাস্তব হয়ে আমার জীবনে ধরা দিয়েছে। এই সত্যকে অস্বীকার করি কেমন করে? পরম করুণাময়ের কাছে লাখ শোকরিয়া এমন সুন্দর দেশটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে বলে।
ঘণ্টা দু’য়েক বিরতিহীন গাড়ি চালিয়ে পিয়ার মা ঝড়ঃধপধহধষ নামে একটি জায়গায় এসে গাড়ি থামিয়ে বললেন- এখানে একটু নামেন। সুইডেনের খুব সুন্দর জায়গা এটা। টুরিস্টরা সব সময় এখানে ভিড় করে থাকে। পিয়ার মায়ের কথায় আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এতক্ষণ আমি আরেক জগতে বিচরণ করছিলাম। গাড়ি থেকে নেমে এসে আমরা একটা পুলের ওপর দাঁড়ালাম। এই পুলের একটু নিচ দিয়ে দেখলাম ট্রেন লাইন চলে গেছে। আরও নিচ দিয়ে খাল প্রবাহিত হচ্ছে। খালের মূল মুখে পানির স্বাভাবিক স্রোতের গতি রুদ্ধ করে অন্য দিক দিয়ে প্রবাহিত করানো হয়েছে। যেদিকে খালের পানি যাবার কথা, সেখানে সৃষ্টি করা হয়েছে মনোহর জনপদ। মানুষের চিন্তা, কর্ম, সততা ও পরিশ্রমের সঠিক প্রয়োগে দেশকে যে কী অসামান্য উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে পারেÑ এসব দেশে না এলে তা বোঝানো সম্ভব নয়। আমরা হালকা কিছু খাবার খেয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
গাড়ি চলছে নরওয়ে সীমানা লক্ষ্য করে। রাস্তার দু’ধারে কখনো বা চোখে পড়ছে শিলাময় নাতিউচ্চ পাহাড়শ্রেণী, কখনো বা নীল পানির লেক, মাঝে মাঝে ছবির মতো সাজানো জনপদ। সর্বোপরি বড় বড় গাছের সুবিশাল অরণ্য। সব দেখতে দেখতে এক সময় নরওয়ে সীমানায় এসে পৌঁছলাম। চালকের সিট থেকে পিয়া সরে বসলো। এবার পিয়ার মা গাড়ির হুইল ধরে বসলেন। চেক পোস্ট বরাবার এসে পিয়ার মা গাড়ির গতি একটু কমিয়ে দিলেন। কিন্তু না কেউ গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলো না। যদিও দু’জন পুলিশ নির্বিকারভাবে চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গাড়ি এখন নরওয়ে সীমানায় ঢুকে পড়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এখনো নরওয়েকে আমি সুইডেন থেকে আলাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি না। কারণ আমি যাচ্ছি সুইডেনের এক গ্রামীণ এলাকা থেকে। শহর থেকে দূরে এসব গ্রাম ও এলাকার প্রকৃতি সর্বত্র আমার কাছে একরকম মনে হয়। গাড়ি নরওয়ের দিকে একটু এগিয়ে যেতে ভূগোলে পড়া তুন্দ্রা অঞ্চলের দেখা মিললো। নরওয়েকে সুইডেন থেকে আলাদা করার সুযোগ পেলাম। এখন আমার চোখ দূরে ছোট ছোট গাছের দিকে। রাস্তার দু’ধারে দেখা যাচ্ছে একই রকমের দৃশ্য। স্কুলে ভূগোলে ম্যাপ আঁকতে গিয়ে আমরা পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের শেষ মাথায় তুন্দ্রা অঞ্চলকে সবুজ রঙে ছোট ছোট গাছ এঁকে দেখাতাম, দেখাতাম পানির নিশানা। এই সেই তুন্দ্রা অঞ্চল, যাকে আল্লাহ আমাকে চোখে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ পানিতে ভরে আসে।
আমরা রওনা দিয়েছিলাম সেই সকাল ১০টায়। এখন বেলা তিনটা। আমরা প্রায় এসে পড়েছি নরওয়ের রাজধানী অসলোর কাছাকাছি। অসলোতে ঢুকতে ঢুকতে চারটা বেজে গেল। অসলোর সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের সামনে গাড়ি থামালেন পিয়ার মা। এখানে টুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার রয়েছে। হোটেল, রেল, বাস এবং সকল দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমে আমাদের একটি মাঝারি রেটের হোটেল প্রয়োজন, পরে অন্য কিছুর ব্যবস্থা। স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেলে সিট পাওয়া গেল। কিন্তু গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া গেল না। ঠিক হলো স্টেশনে গাড়ি পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমরা হেঁটে হোটেলে আসা-যাওয়া করবো। মুশকিল হলো হোটেলে ঢুকে। আমরা সিট পেয়েছি আট তলায়। অথচ ওঠার এলিভেটর অচল। সঙ্গিনী পিয়ার মা কিছুতেই এই হোটেলে থাকতে রাজি হলেন না। প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা তদবির করে আর একটা হোটেল পাওয়া গেলো। শহর থেকে বেশ দূরে। তবে দামে একটু সস্তা। হোটেলের নাম হলতি শিলেন সামার হোটেল (ঐড়ষঃবশরষবহ ংঁসসবৎ যড়ঃবষ). এই হোটেলটির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে সতের বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী ছেলেদের বিভিন্ন বিষয়ে ৩৩ সপ্তাহের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু আছে। এই কোর্স প্রায় সারা বছর চালু থাকে। কেবল ১ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য হোটেল করে দেয়া হয়। নরওয়েতে এ ধরনের আশিটি হোটেল আছে। সব ক’টি ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত হয়।
আমরা দোতলায় ৩০৫ নং কক্ষে জায়গা পেলাম। তিন বেডের একটি রুম। আমাদের দেশের হোস্টেলের ঢঙে করা। দু’দিকে অনেক রুম, মাঝখানে বারান্দা।
হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় রাত আটটা বেজে গেল। আমরা তিন জনই শ্রান্ত-কান্ত। পৃথিবীর আরেক প্রান্তের দুই বিদেশিনীর সঙ্গে আমি একা এক বাংলাদেশী প্রৌঢ়া মহিলা। কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ করছি। ওরা কিন্তু খুব সহজভাবে আমার সাথে আলাপ-সালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। রুমে ঢুকেই পিয়ার মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- কোন সিট আপনার পছন্দ। আমি জানালার পাশের সিট দেখিয়ে দিলাম। ভদ্র মহিলা সঙ্গে সঙ্গে অষষ ৎরমযঃ বলে আমার মাল-সামানগুলো আমার বেডের সঙ্গে লাগোয়া কাবাডে ঢুকিয়ে রাখলেন। পিয়া মাঝখানের বেডে জুতাসহ ধুম করে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর উঠে মা-মেয়ে বের হয়ে গেলেন বাথরুমের দিকে।
কিছুক্ষণ পর তারা রুমে ফিরলেন। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে রহস্যময়ী অসলো নগরীর রাতের রূপ দেখছি। গোটা নগরীটাকে মনে হচ্ছে পাহাড়ের ওপর। পাহাড়গুলো সব বড় বড় পাথুরের চাঁইয়ে ঠাসা। এরপর তিনজনে সঙ্গে আনা খাবার খেলাম। পিয়ার মাও অনেক খাবার সঙ্গে এনেছেন। আমার বিছানার পাশে টেবিলে টিফিন ক্যারিয়ার  থেকে তিনি নামালেন- স্ট্রবেরি, আপেল, কেক, কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল। সবাই খেয়ে শুয়ে পড়লাম যে যার বিছানায়। পরদিন সকালে রুবার দেয়া নাস্তা করলাম রুমে বসে। পিয়া ও তার মা চলে গেলেন নিচের ক্যাফেটেরিয়াতে নাস্তা করতে। ওরা ফিরে এলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অসলো নগরী দেখার জন্য।
অসলো নগরী আগাগোড়া পাহাড়ে ঠাসা। মাঝে মাঝে পাহাড় কেটে রাস্তা চলে গেছে এদিক-ওদিক। সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কোনটার কমতি নেই। রাস্তাঘাটে মেরামতকাজ চলছে। মানুষজনের চলাচল খুব কম। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের মতো পর্বতশ্রেণী। পিয়ার মা প্রথমে নিয়ে গেলেন অসলোর গেট হারবারে। অসংখ্য বোট গেট হারবারে পড়ে রয়েছে। তার পরে নিয়ে গেলেন ১৩০০ শতাব্দীতে তৈরি একটি দুর্গ দেখাতে। এই দুর্গ সতের শ’ শতাব্দীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ইদানীং এই দুর্গ সরকারি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা অসলো টাউন হলে গেলাম।
বিখ্যাত এই টাউন হলের সামনে রয়েছে অসলো হ্রদ। একদিকে হারবার অন্যদিকে ব্যস্ত নগরী। লাল ইটের দু’টি স্তম্ভ নগরীর শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক।
অসলো টাউন হলের স্থাপত্য শিল্পের অসাধারণ কারুকার্য মেয়র হিরোনিমাস হায়ার ডেল (ঐরবৎড় ঘরসড়ঁং ঐবুবৎ উধযষ)-এর অবিনশ্বর কীর্তি। ১৯১৭ সালে নগরের সিটি ফাদার টাউন হলের জন্য একটা নকশা অনুমোদন করেন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৯২০ সালে শিল্পী আর্নস্টেইন (অৎহংঃবরহ অৎহবনবৎম) আর্নবার্গ ও গধমযঁং চড়ঁষংংড়হ টাউন হলের ভেতরের নকশা আঁকার অনুমতি লাভ করেন। নানা কারণে টাউন হলের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত অসলোর প্রতিভাধর শিল্পীদের রাত দিন পরিশ্রমের ফলশ্রুতিস্বরূপ সম্পূর্ণ নরওয়েজিয়ান শৈল্পিক মাধ্যমে টাউন হলের গায়ে ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ সম্পূর্ণ কাজ করা হয়। এখন এই টাউন হল সমস্তÍ নরওয়েনবাসীর জন্য একটা গর্বের বস্তু এবং নরওয়েজিয়ান সংস্কৃতিকে দেখার একটা জায়গা। এই হলে একটা মিউজিয়াম রয়েছে। বিদেশী রাজ অতিথিদের দেয়া সামগ্রী এখানে থরে থরে সাজানো। বাংলাদেশ ছাড়া প্রায় সব দেশেরই কিছু না কিছু দেশীয় উপহার সামগ্রী এখানে দেখতে পেলাম। শ্বেত পাথরের একটা ছোট তাজমহলও দেখলাম।
টাউন হলে গেলাম নরওয়েজিয়ানদের তৈরি প্রাচীনতম নৌকা দেখতে। এই নৌকা প্যাপিরাস পাতার তৈরি। নৌকাটি পাঁচ হাজার মাইল সাগর পাড়ি দিয়েছিলো বলে গাইড বুকে লেখা রয়েছে। অসলো নদীর বাঁকে একটি মিউজিয়াম বানিয়ে এই নৌকাটিকে জনসাধারণকে দেখানোর জন্য রাখা হয়েছে। প্রতিদিন চার-পাঁচশত দর্শক স্পিড বোটে চেপে এই ঐতিহাসিক নৌকাখানা দেখতে যান। মিউজিয়ামের নাম ঞযব কড়হ-ঞরশর গঁংবঁস. দ্বীপের মধ্যে এই মিউজিয়ামের অবস্থান। এখানে এলে বেড়ানো ও ঐতিহাসিক জিনিস দুটোরই স্বাদ পাওয়া যায়।
মিউজিয়াম দেখতে দেখতে প্রায় তিনটা বাজে। পিয়ার মা বললেন, মিসেস চেমন আরা, চলেন এবার ফেরা যাক। সন্ধ্যার পর আবার বেরুনো যাবে। তথাস্তু বলে আমিও সম্মতি জানালাম। সন্ধ্যার কিছু সময় আগে আমরা বের হলাম গাসটভ ভিজি ল্যান্ডের তৈরি ভাস্কর্যে সজ্জিত ভিজিল্যান্ড কালচার পার্ক দেখার জন্য। আশি একর জমির ওপর ভাস্কর্য শিল্পের চরম নিদর্শন নিয়ে এই পার্কটি অবস্থিত। এই ভাস্কর্যগুলোর মধ্য দিয়ে ভিজিল্যান্ড স্তরে স্তরে মানবজীবনের ক্রমপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরেছে। পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক, বড়দের সাথে ছোটদের সম্পর্ক এবং বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে হৃদয়ের সংঘাতÑ এসবও তার ভাস্কর্যের মাঝে ঠাঁই নিয়েছে।
এই পার্কে পৌঁছে এই সব অবিশ্বাস্য পাথর-শিল্পের নৈপুণ্য দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। সন্ধ্যা হলেও রোদ এখনো চারিদিক ঝলমল করছে। পিয়ার মা বললেন- আর একটা জায়গা আপনাকে দেখানো যায়। আমি বললাম- চলেন। শুধু শুধু হোটেলে গিয়ে বসে থেকে তো লাভ নেই। এবার আমাকে নিয়ে গেলেন পৃথিবীর বিখ্যাত স্কি প্রতিযোগিতার জায়গায়। এই জায়গায় নাম- হলমেন কোলেন (ঐড়ষষসবহ কড়ষবহ), এখানে একটা মিউজিয়ামও রয়েছে। এই মিউজিয়ামে আড়াই হাজার বছরের পুরনো স্কি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ক্রীড়ামোদীরা এখানে শীতকালে আসতেন। এখানকার গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে সঙ্গিনী পিয়ার মা আনন্দে গৌরবে উল্লসিত হয়ে ওঠেন। গাড়ি থেকে নেমে এই জায়গার খবর শুনতে শুনতে আমার স্কি প্রতিযোগিতা যেই পাহাড়ের ওপর থেকে শুরু হয় সেখানে এসে পড়লাম। এই পাহাড়টি আবার এখান থেকে আরও ১৬৫ ফিট ওপরে। মূল জায়গায় ওঠার জন্য কিছু সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। পিয়ার মা বললেন, ওপরে উঠলে সমগ্র অসলো শহরের দৃশ্য দেখা যায়। আপনি কি উঠতে পারবেন? পিয়ার মার কথার মধ্যে আমার শক্তিমত্তার ওপর কেমন একটা সংশয় লক্ষ করলাম। ফলে আমার জেদ চেপে গেল। বললাম- অবশ্যই পারবো। পিয়া গিয়ে ওপরে ওঠার টিকিট কিনে নিয়ে এলো। আমরা লিফ্টের ঘরে গিয়ে লাইন করে দাঁড়ালাম। সত্তর বছরের বুড়োরাও দেখলাম ওপরে যাওয়ার জন্য লাইন ধরেছেন। সাহসে বুক বেঁধে আল্লাহর নাম নিয়ে সত্যি সত্যি আমি লিফ্ট পাড়ি দিয়ে আরো আড়াই শ’ সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলাম স্কি প্রতিযোগিতার মূল জায়গায়। এখান থেকে প্রতিযোগীরা খেলা শুরু করে। নেমে যায় প্রায় আড়াই শ’ মিটার নিচে গভীর খাদে। নিচের দিকে তাকাতেই আমাদের মত মানুষ ভয় পায়। ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারদিকে অসলো নগরীর শোভা দেখলাম। বিজ্ঞান প্রযুক্তি, বুদ্ধি, আধুনিকতা ও প্রকৃতিÑ হাত ধরাধরি করে এখানে অবস্থান করছে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নদী প্রতিযোগিতার স্থান দেখে সে দিনের মতো ফিরে এলাম হোটেলে একরাশ আনন্দ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে।
পরদিন সুইডেনে ফিরে আসার পালা। উত্তর গোলার্ধের শেষ দেশ নরওয়ে। আর নরওয়ের রাজধানী হচ্ছে অসলো। দ্বীপ, নদী, পাহাড়, সবুজ, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মিশে সুন্দর মনোহর অসলো নগরী।
শহরের কোন কোন স্থান থেকে অসলো নগরীকে মনে হয় অনেক নিচে, কোন সময় মনে হয় যেন অনেক ওপরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে- ভূগোলে পড়া তুন্দ্রা অঞ্চলের ম্যাপ। সেই ম্যাপ আমার সামনে মেলে ধরেছে অসংখ্য রূপরেখা। মেহেরবান আল্লাহকে হাজার শোকরিয়া।
২৪ জুলাই সকাল ১০টার দিকে আমি রওনা দিলাম সটিনাসের পথে, রুবার বাড়ির দিকে। পথে নরওয়ে ছাড়ার আগে পিয়ার মা আমাকে নিয়ে গেলেন ভাইকিং জাহাজ দেখতে। হাজার বছর আগে নিমজ্জিত তিনটি কাঠের জাহাজকে ধরে রাখা হয়েছে ঠিক তার নিজস্ব অবয়বে।
এই তিন জাহাজকে রাখা হয়েছে ভাইকিং শিপ মিউজিয়ামে দর্শকদের দেখার জন্য। ভেতরে তাদের ব্যবহারের দ্রব্যসামগ্রীও দেখলাম। ওদের খাবার জিনিসের মধ্যে একটা মিষ্টি কুমড়া দেখলাম।
এবার অসলো থেকে আমাদের বিদায়ের পালা। অসলো শহরের মধ্যে যতক্ষণ গাড়ি ছিল ততক্ষণ ড্রাইভ করলেন পিয়ার মা। শহর ছাড়লে পিয়ার মা হুইল ছেড়ে দিলেন। পিয়া গিয়ে বসলো মার জায়গায়। দু’ধারে সীমাহীন দিগন্ত জুড়ে তুন্দ্রা অঞ্চল। সামনে বিসর্পিল- সুন্দর রাস্তা আমরা তার অভিযাত্রী। পাহাড়, হ্রদ, নদী, অরণ্য রাস্তার দু’ধারে ফেলে ফেলে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনে আরও সামনে। মনে হচ্ছে অনন্তের পথে বুঝি আমাদের অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রার শেষ নেই, বিরাম নেই।
এক সময় যাত্রার বিরতি ঘটলো। সটিনাসে ফিরে এলাম। পিয়া ও পিয়ার মা আমাকে উলফের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে পথেনবর্গের পথে রওনা দিলেন।
এখানে দু’দিন বিশ্রাম শেষে এবার আমার দেশে ফিরে যাবার পালা। পুরনো রাস্তা ধরে গহিন বনের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে উলফ আমাকে নিয়ে এলো। ট্রেনের স্টেশন ফলশপিং। রুবা, নাভিদও আমার সঙ্গে আছে। মনটা সবার ভারাক্রান্ত। মাস দেড়েক রুবার সঙ্গে ছিলাম। এখানে-ওখানে বেড়াতে গেলেও মনে হতো রুবা আমার সঙ্গে আছে। ওর কাছে আবার আমি ফিরে আসব। এবারের যাওয়া সে রকম নয়। দেশের উদ্দেশে রওনা দেবার জন্য স্টকহলম যাওয়া।
রুবা, উলফ, আমি সবাই চুপচাপ। কারো মুখে কথা নেই। সবাই যেন কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেছি। রুবাকে ও ওর ছোট ছেলে নাভিদকে ফেলে আসতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। অতি কষ্টে চোখের পানি গোপন করে ওদের বিদায় জানিয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। কিভাবে রাস্তা পাড়ি দিলাম জানি না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে জড়িয়ে আছে রুবা, নাভিদ ও উলফকে ছেড়ে আসার বেদনাবোধ। স্টকহলম স্টেশনে ট্রেন এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম- ছাত্রী মমতাজের স্বামী এসে দাঁড়িয়েছে ট্রেনের কামরার দোরগোড়ায়। ওকে দেখে আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
ও হেসে বলল, আপা ভয় পেয়েছিলেন পথে? মুখটা এত শুকনো শুকনো কেন? আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে আমাকে নামতে বলে, আমার মাল-সামান সমেত নেমে এলো ট্রেন থেকে। এবার স্কেলেটারে চেপে ভূতলের ট্রেনে উঠতে যাবে। আমি কিছুতেই স্কেলেটারে যেতে রাজি হলাম না। ফলে বেচারার খুব কষ্ট হলো। লট-বহরসহ সিঁড়ি বেয় নিচে নামতে সময়ও গেল অনেক। বাঙালিদের লটবহর সে তো আর কাঁধের ছোট ব্যাগ নয়। বড় আকারের স্যুটকেস, মাঝারি গোছের দুটো ব্যাগ, ফাক্স, টিফিন ক্যারিয়ার। ভদ্রলোক একাই সব সামলালেন। আমাকে ধরতেও দিলেন না। একেবারে অদেখা অচেনা একটা লোক। ছাত্রীর স্বামী সম্পর্কের সূত্র ধরে আমার জন্য এত কিছু করবে, ভাবাও যায় না। আমি লজ্জিত। নিচে এসে মেট্রো ট্রেনে উঠলাম। এবার আমরা একেবারে চলে এলাম মমতাজের বাড়ির দোরগোড়ায়। ওখান থেকে লিফটে চড়ে চার তলায় মমতাজের ঘরের সামনে এসে কলিং বেল টিপতেই মমতাজ আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো। স্বামী-স্ত্রীর আন্তরিকতায়, অতিথিপরায়ণতায় আমি মুগ্ধ, কৃতজ্ঞ। আমি জানি না ছাত্রীরা আমাকে কেন এত ভালোবাসে। ছাত্রীদের জন্য আমি যা করেছি তা নিছক কর্তব্যবোধে করেছি। কিন্তু ছাত্রীদের কাছ থেকে আমি পেয়েছি অনেক বেশি। ওদের প্রেম-প্রীতি, অঢেল ভালোবাসার ফুলডোরে আমি বাঁধা পড়ে আছি।
সারাদিন হইচই, হট্টগোল, আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে ফিরে আসার সময় ছেলেদের বৌরা ধরে বসলো ওদের সমিতির পত্রিকার জন্য একটা কবিতা দিতে হবে। ওখানে বাঙালি মেয়েদের একটা সমিতি আছে। এই সমিতির মেয়েরা একটা পত্রিকাও বের করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। জানতে পেরে অনেক খুশি হলাম।
মুরাদের সাথে মমতাজের বাসায় ফিরে এসে সে রাতেই একটি কবিতা লিখলাম। কারণ পরদিন অর্থাৎ- আগস্টের ২ তারিখেই বাংলাদেশে ফিরে আসার ফাইট।
কবিতাটি উল্লেখ করেই আমার ভ্রমণ কাহিনীর ইতি টানবো :
সুইডেনের প্রতি ভালোবাসা
রক্ত গোলাপের মতো ফুটে আছে
বুকের অতলে আমার।
দামি আতরের সুবাস সুইডেনের স্মৃতিতে।
সুইডেন এক আনন্দ-সুন্দর ফুল বাগান।
কর্মনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ সৎ মানুষের দেশ সুইডেন।
বিপন্ন মানবতার সেবায় নিবেদিত সুন্দর
একটি দেশের নাম সুইডেন।
বিজ্ঞান মানবতার সেবায় নিবেদিত সুন্দর
একটি দেশের নাম সুইডেন।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-শিক্ষা সভ্যতার শীর্ষে
এই দেশের অবস্থান।
পূর্ব দেশের ললনা আমি।
উত্তর প্রবাসে এসে নিয়ে গেলাম
দেশের মনোহর সুন্দরকে দু’চোখ ভরে
কর্মের প্রেরণা পেলাম হৃদয় জুড়ে।
আল্লাহর সৃষ্ট রাজ্যে অনুপম সুন্দর
একটি দেশের নামÑ
সুইডেন! সুইডেন!!
============================
কিশোরকন্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ অধ্যাপিকা চেমন আরা