Tuesday, December 30, 2025

ইয়েমেনে আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ওপর সৌদি আরবের বোমা হামলা

ইয়েমেনের বন্দরনগরী মুকাল্লায় আজ মঙ্গলবার বোমা হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর জন্য অস্ত্রের একটি চালান পাঠানো হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এই হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’–এর (এসটিসি) সৌদি আরবের উত্তেজনা নতুন করে বাড়িয়ে দিল। একই সঙ্গে এটি রিয়াদ ও আবুধাবির সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করল।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এক দশক ধরে চলা যুদ্ধে এই দুই দেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় (এসপিএ) প্রকাশিত এক সামরিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলো মুকাল্লায় পৌঁছানোর পর এই বিমান হামলা চালানো হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাহাজগুলোতে ট্র্যাকিং ডিভাইস (অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র) বন্ধ রাখা হয়েছিল। তারা এসটিসির বাহিনীর জন্য প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র ও সামরিক যান খালাস করছিল। এসব অস্ত্র স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেওয়ায় সৌদি জোটের বিমান বাহিনী আজ মঙ্গলবার সকালে অস্ত্র ও যানবাহনগুলো লক্ষ্য করে একটি সীমিত বিমান হামলা চালিয়েছে।’

হামলায় কেউ হতাহত হয়েছে কি না বা সৌদি আরব ছাড়া অন্য কোনো দেশ এতে অংশ নিয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে সৌদি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কোনো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে তারা রাতের আঁধারে এই হামলা চালিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই হামলার বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের টেলিভিশন চ্যানেল (এআইসি) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘গ্রিনল্যান্ড’ নামের একটি জাহাজ লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ২২ ডিসেম্বর আমিরাতের ফুজাইরাহতে ছিল এবং গত রোববার মুকাল্লায় পৌঁছায়। দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইয়েমেনের বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাশা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও উদ্ধৃত করে জানান, জাহাজ আসার পর মুকাল্লায় নতুন সাঁজোয়া যান চলাচলের দৃশ্য দেখা গেছে। এ ঘটনার পর দুপক্ষই সতর্কভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। আরব আমিরাত থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সরবরাহ এখন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, সৌদি আরব ইয়েমেনের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ড্রোন ফুটেজে দেখা গেছে, মুকাল্লা শহরে বেশ কিছু সাঁজোয়া যান একটি নির্দিষ্ট এলাকার দিকে যাচ্ছে।

মুকাল্লা শহরটি ইয়েমেনের হাদরামাউত প্রদেশে অবস্থিত, যা সম্প্রতি বিচ্ছিন্নতাবাদী কাউন্সিল দখলে নিয়েছে। ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে এডেন শহরটি হুতিবিরোধী শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

এর আগে গত শুক্রবারও সৌদি আরব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সতর্ক করতে বিমান হামলা চালিয়েছিল। সৌদি আরব চায়, তারা যেন হাদরামাউত ও মাহরা প্রদেশ থেকে পিছু হটে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বর্তমানে দক্ষিণ ইয়েমেনের পতাকা ব্যবহার করছে এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন যেমন আলাদা দুটি দেশ ছিল, তারা আবারও তেমন আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুলছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দুই দেশ ওপেকের সদস্য এবং ব্যবসায়িক ও আঞ্চলিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-30%2F7ndtblj9%2Fyemen-attack.JPG?rect=0%2C0%2C2736%2C1824&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রান্সজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) সশস্ত্র গোষ্ঠী। ২০ ডিসেম্বর ২০২০, অ্যাডেন। ছবি: রয়টার্স

সাত দশক ধরে সামরিক শাসনের আবর্তে মিয়ানমার

স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে বেশির ভাগ সময় মিয়ানমার শাসন করেছে সামরিক বাহিনী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নানা আদর্শ ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত এই দেশকে পতনের হাত থেকে বাঁচাতে একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে বরাবরই নিজেদের তুলে ধরেছেন সামরিক শাসকেরা। সবশেষ এক যুগ আগে গণতন্ত্রের পথে আবার মিয়ানমার যাত্রা শুরু করলেও তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।

পাঁচ বছর ধরে সামরিক জান্তার শাসনের মুখে মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। এরই মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছে সরকার। এই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হবে বা তাতে জনগণের মতের কতটা প্রতিফলন হবে, তা নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বহু বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই একে দেখছেন জান্তার ক্ষমতা পোক্ত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে।

মিয়ানমারে সামরিক শাসন সম্পর্কে শুরু থেকে জানতে হলে ফিরতে হবে বেশ খানিকটা পেছনে। মিয়ানমার তখন পরিচিত বার্মা নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পায় মিয়ানমার। মিয়ানমারের এই স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অং সান। তিনি দেশটির কারাবন্দী নেত্রী নোবেলজয়ী অং সান সু চির বাবা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের উৎখাত করতে জাপানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন অং সান। তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে মিত্রপক্ষের দিকে গেলে তিনি আবার দল বদলান। স্বাধীনতার জন্য লন্ডনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর মিয়ানমারে বেশ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ের মুখে পড়ে বেসামরিক সরকার।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনীকে দুই বছরের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন হয়েছিল। তবে ১৯৬২ সালে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয় সামরিক বাহিনী। অং সানের একসময়ের সহযোদ্ধা নে উইন দেশ রক্ষার কথা বলে এই পদক্ষেপ নেন। অং সান হত্যার পর এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়েছিলেন।

নে উইন বলেছিলেন, সময়মতো তিনি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন; তবে কথা রাখেননি। ২৬ বছর মিয়ানমার শাসন করেন তিনি। কায়েম করেন নামমাত্র সমাজতান্ত্রিক একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা। এতে বিশ্বে মিয়ানমার একঘরে হয়ে পড়ে। এর ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। অর্থনীতি ধসে পড়ে। ক্ষমতা ধরে রাখতে ভিন্নমত দমনের পথে হাঁটে জান্তা।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মুখে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করেন নে উইন। তখন সামরিক বাহিনীর নতুন নেতৃত্ব আবার অভ্যুত্থান করে। আন্দোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করা হয়। হত্যার শিকার হন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। কারাগারে স্থান হয় অনেকের। এরপর ১৯৯২ সালে সামরিক সরকারের দায়িত্ব নেন জেনারেল থান শোয়ে।

২০১১ সালে থান শোয়ে অবসর নেন। ক্ষমতা তুলে দেন বেসামরিক সরকারের হাতে। মিয়ানমারের নতুন নেতা হন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। তিনি সু চিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। ২০১৫ সালে নির্বাচনে বিশাল জয় পায় সু চির দল। ২০২০ সালেও জয় পান তিনি। তবে এই নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী।

জান্তা সরকারের প্রধান হন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। আবার কারাবন্দী করা হয় সু চিকে। বিভক্ত হয়ে পড়ে দেশ। শুরু হয় জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহীরা চান না ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন হোক। কারণ, এর মাধ্যমে সামরিক শাসন আরও পোক্ত হওয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখছেন না তাঁরা। এমনই পরিস্থিতিতে শুরু হতে যাচ্ছে ভোট গ্রহণ। তা শেষ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হতে পারে ফল প্রকাশ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ধর্ষিতার প্রতি বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামীর হুমকি

ভারতের মধ্যপ্রদেশের সতনা জেলায় এক বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামী ছুরি দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি ধর্ষিতাকে হুমকি দিয়েছেন। দম্ভ করে বলেছেন, ‘আমার কিছুই হবে না’। শুধু ধর্ষণই নয় এর ভিডিও-ও ধারণ করেছেন তিনি। পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তাকে বারবার যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করেন। পরে যখন ওই নারী তাকে ক্যামেরার সামনে মুখোমুখি করে বলেন যে, তিনি তাদের কথোপকথনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করবেন, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্লজ্জভাবে বলেন, তার কিছুই হবে না। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম অশোক সিং। তিনি রামপুর বাঘেলান নগর পরিষদের এক বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামী। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অশোক সিংকে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করতে ও ভুক্তভোগীকে হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিও জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

ভাইরাল ভিডিওতে অভিযুক্তকে এমন বলতে শোনা যায়, ‘আমার কী হবে? কিছুই হবে না। যেখানে খুশি অভিযোগ কর- আমার কিছুই হবে না।’ এসময় পেছনে কাঁদতে থাকা নারীর কণ্ঠ শোনা যায়। তিনি অভিযোগ দায়েরের কথা বলছিলেন। ভুক্তভোগী সোমবার সতনার পুলিশ সুপার (এসপি) হাঁসরাজ সিং-এর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তিনি জানান, ঘটনাটি ঘটে প্রায় ছয় মাস আগে। কিন্তু নিজের ও পরিবারের প্রাণনাশের হুমকির কারণে তিনি এতদিন চুপ ছিলেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর এসপি তদন্তভার সহকারী পুলিশ সুপার (ডিএসপি) মনোজ ত্রিবেদীর কাছে হস্তান্তর করেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, কারহি এলাকার বাসিন্দা অশোক সিং তার বাড়িতে ঢুকে ছুরি ঠেকিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করেন এবং কাউকে জানালে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেন।

ওই নারীর অভিযোগ, ২০ ডিসেম্বর তিনি আবার তার কাছে গিয়ে তাকে যৌন হেনস্থা করেন ও পূর্বের ভিডিও প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। তিনি আরও জানান, অশোক সিংয়ের অপরাধমূলক অতীত রয়েছে এবং তাকে পূর্বে জেলাসীমানা থেকে নির্বাসিতও করা হয়েছিল। এই প্রভাবেই তিনি দাপটের সঙ্গে তাকে হুমকি দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগীর দাবি, অশোক সিং নিয়মিত তার দোকানে এসে তাকে গালিগালাজ করেন, ভয় দেখান এবং মানসিক আতঙ্ক তৈরি করেন। ওই নারীর অভিযোগ, তিনি পাঁচ দিন আগে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি তার বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তার দায় পুলিশেরই থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করছে এবং সব ধরনের প্রমাণ পরীক্ষা করছে। এ পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

mzamin

শেখ হাসিনার আক্রোশে খালেদা জিয়া: বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, বালুর ট্রাকের বেষ্টনী, কারাবন্দী

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার আচরণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে অনেকটাই ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নিয়েছিল, যার জেরে সেনানিবাসের বাড়িছাড়া হতে হয় খালেদা জিয়াকে, বালুর ট্রাকে অবরুদ্ধ থাকতে হয় বাড়িতে, শেষে কারাগারেও যেতে হয়।
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

অক্টোবরের পর ৪১৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলেও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে বলে মনে করেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ‘খুব দ্রুত’ পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

গতকাল সোমবার ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এ কথা বলেন। তবে অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল বারবার লঙ্ঘন করলেও তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন তিনি। তাঁর দাবি, ইসরায়েল ‘যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে’।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে।

গতকাল বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ‘পরিকল্পনাটি শতভাগ মেনে চলেছে’। যদিও গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে হামাস ও ইসরায়েলের কত দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত—এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব। তবে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই হতে হবে।’

হামাস সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (হামাস) যদি তাদের প্রতিশ্রুতিমতো অস্ত্র সমর্পণ না করে, তাহলে তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, গাজায় পুনর্গঠন কার্যক্রম ‘খুব শিগগির শুরু হতে পারে’।

গাজা শান্তি পরিকল্পনাটি গত অক্টোবরে কার্যকর হয়। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে বিধ্বস্ত এ ভূখণ্ডে একটি টেকনোক্রেটিক সরকার গঠন করা, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। এরপর গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে।

তবে সমালোচকদের মতে, নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারেন এবং ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের আগে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ দিতে পারেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগও করা রয়েছে, তিনি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে আগ্রহী নন।

হামাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হওয়া উচিত।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরায়েল যথেষ্ট দ্রুতভাবে কাজ না করায় তিনি উদ্বিগ্ন কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ‘পরিকল্পনার শর্ত মেনেই চলেছে’।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইসরায়েল যা করছে, তা নিয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। অন্যরা কী করছে বা কী করছে না—সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৪১৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কেবল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই গুলি চালিয়েছে। একই সময়ে তিনজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার জন্য তারা হামাসকে দায়ী করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ভিন্ন কোনো স্থাপনা ব্যবহার করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরও হামলা চালাবে।

গত জুন মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি তারা আবার তা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে না। কারণ, যদি তারা সেটা করে, তাহলে সেই কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় থাকবে না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ফ্লোরিডায় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ফ্লোরিডায় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

সিডনির হত্যাযজ্ঞ গাজার কোনো গণহত্যাকে ঢাকতে পারবে না by গিডিয়ন লেভি

দুই খুনি যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডি সমুদ্রসৈকতে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছিল, তখন গাজার খান ইউনিস সৈকতে এক নারী একটা ঝাড়ু নিয়ে সয়লাব হয়ে যাওয়া তাঁর তাঁবু থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এই তাঁবুটাকেই তিনি তাঁর ঘর বলে মেনে নিয়েছেন। এ সময় তিনি চিৎকার করে তাঁর বাচ্চাদের করুণ দশা দেখাচ্ছিলেন। ছিন্ন ও ভেজা পোশাকে বাচ্চাগুলো ঠান্ডায় বারবার শিউরে উঠছিল। কিন্তু না। কেউই তাঁর কথা শোনেনি। সারা দুনিয়ার নজর তখন সিডনি হত্যাযজ্ঞের দিকে।

পরের দিনগুলোয় সারা দুনিয়া ১৫ জন ইহুদিকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য শোক প্রকাশ করতে থাকল। যা ঘটেছে তা সবাইকেই ভয়ার্ত করে তোলে। বন্ডি হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বৈশ্বিক শোক প্রাপ্য। কিন্তু এই যে শোক, তা তো একাধারে দ্বিচারিতা, প্রতারণামূলক ব্যবহার ও দ্বৈত নীতি দিয়ে ভরা। সবার প্রথমেই বলতে হয় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা, যিনি তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করলেন।

নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে দায় নেওয়ার একটা বা দুটো বিষয় জানেন। আর তাই চট করে তিনি অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করলেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। তার মানে তিনি বোঝাতে চাইলেন যে এই হত্যাকাণ্ড ও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে!

আসলে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলা থেকেই রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ও প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগই ইসরায়েল কখনো হাতছাড়া করে না। এ রকম হামলা হতে পারে বলে মোসাদ যে একটা পূর্বাভাস দিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়া তা উপেক্ষা করেছে—তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্যটাও ছড়িয়ে দেওয়া হলো। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এ রকম যে অস্ট্রেলীয়রা তো সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে জানে না, এমনকি তারা তা করতে চায়ও না! অথচ আমাদের [ইসরায়েলিদের] দিকে তাকালে তারা দেখত যে এখানে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি!

একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী তো সিডনিতে উড়ে গেলেন নিহত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান করতে। জেরুজালেম থেকে সিডনির দূরত্ব যত দ্রুত অতিক্রম করা গেল, তার চেয়ে শতগুণ কম দূর হওয়ার পরও জেরুজালেম থেকে নির ওজে কোনো সরকারি প্রতিনিধির দেখা মেলেনি গাজা যুদ্ধে নিহত নিজ দেশের নাগরিকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে। [২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় গাজা–সংলগ্ন নির ওজে সবচেয়ে বেশি ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল।] অথচ তাঁরাই আবার ‘কীভাবে অস্ট্রেলীয় সরকার ইহুদিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় একজন প্রতিনিধি না পাঠিয়ে থাকতে পারল?’ বলে উষ্মা প্রকাশ করছে। এহেন অতি স্পর্ধা তো সব সীমা অতিক্রম করে গেছে।

অবশ্য একটা কৌতুককর স্বস্তি নেমে আসে যখন জানা গেল যে একজন অস্ট্রেলীয়-সিরীয় কয়েকজন ইহুদির প্রাণ বাঁচিয়েছে। নেতানিয়াহু তো ইহুদিদের বীরগাথা বর্ণনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আহমদ আল আহমদ নামের ব্যক্তিটি সাহসিকতার সঙ্গে এক হত্যাকারীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাকে নিরস্ত্র করে ফেলে—এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলিদের জন্য ‘বিব্রতকর’ হয়ে যায়। সব মুসলমান ও আরব সহজাতভাবেই খুনের জন্য অপরাধী—এহেন প্রচারণাও থেমে যায়।

এটা কি সম্ভব যে একজন আরব এ রকম সাহস ও মানবিকতা দেখিয়েছেন? কয়েক মুহূর্তের জন্য আরেকটা তাসের ঘর ধসে পড়ল। অবশ্য তার জায়গায় স্থান করে নিল ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) নিয়ে বিতর্ক যদিও এটা খুব পরিষ্কার যে হত্যাকারীরা আইএসআইএসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আইএসআইএসের লড়াই শুধু ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা পশ্চিমের বিরুদ্ধে।

এমনকি ইরানকে দায়ী করার চিরাচরিত প্রয়াসও তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে উঠল। ইরান ও আইএসআইএস পরস্পরের শত্রু। সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হলো হামলাকারীরা কেউই ফিলিস্তিনি নয়! সেটা হলেই তো কাজ সেরে যেত, জোর প্রচারণা ও ফায়দা লোটার মাত্রা অনেক বাড়ত।

তবে যাই হোক না কেন, এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ইসরায়েলি প্রচারণাকে সহায়তা করে, ইসরায়েলি ও ইহুদিদের বিপর্যয়ের একই পাত্রে ধারণ করে। সারা দুনিয়া যখন আমাদের বিরুদ্ধে তখন এভাবে একত্র হওয়াটা তো খুব ভালো বিষয়, নয় কি?

সর্বোপরি রয়েছে দ্বৈত মানে কালো মেঘ: সিডনির এক সৈকতে ১৫ জন মানুষের হত্যাকাণ্ড গাজার ভয়াবহ সব বড় বড় গণহত্যাগুলোকে ঝাপসা করে দিল। অথচ বন্ডি সৈকতে ছিল মাত্র দুজন হত্যাকারী। আর গাজায়? গোটা একটি দেশ ও তার সশস্ত্র বাহিনী এসব গণহত্যা চালিয়েছে, চালাচ্ছে। এইতো সেদিন, ১৮ জন শিশুসহ ৩৬ জন মানুষ মারা গেল গাজার বেইত হানাউনের এক স্কুলে ইসরায়েলি হামলায়। এ রকম আরও অনেক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, এমনকি কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শত শত নিরীহ গাজাবাসী এখনো মারা পড়ছে।

না, বন্ডি সৈকতের হত্যাযজ্ঞ গাজা উপত্যকার সব গণহত্যাকে ঢেকে দিতে পারবে না। তবে ফিলিস্তিনিরা অশ্রুসজল চোখে কেবল দেখবে যে তাঁদের ধসে পড়া তাঁবুগুলো তাঁদের শীতার্ত বাতাসের চাবুক থেকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং সারা দুনিয়া বন্ডি শোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁদের কত দ্রুত ভুলে গেছে!

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলের সাংবাদিক। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন।
- হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ আসজাদুল কিবরিয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-08%2Fjustnmop%2FCapture.PNG?rect=0%2C0%2C945%2C630&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ছবি: এএফপি

পশ্চিম তীরে নামাজরত ফিলিস্তিনিকে গাড়ি দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিলেন ইসরায়েলি সেনা

ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে সড়কের পাশে নামাজ আদায় করছিলেন এক ফিলিস্তিনি। সে সময় এক ইসরায়েলি ওই ফিলিস্তিনিকে গাড়ি দিয়ে সজোরে ধাক্কা দেন। এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

প্যালেস্টিনিয়ান টিভিতে সম্প্রচারিত ভিডিওটি যাচাইয়ের পর এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ভিডিওতে দেখা যায়, বেসামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তি কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে একটি ‘অফ-রোড’ যান চালিয়ে রাস্তার পাশে প্রার্থনারত এক ব্যক্তির দিকে ছুটে গিয়ে তাঁকে সজোরে ধাক্কা দেন।


পরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবারের। সেদিন ইসরায়েলি একজন রিজার্ভিস্ট সেনা অধিকৃত পশ্চিম তীরে রাস্তার পাশে প্রার্থনারত এক ফিলিস্তিনি পুরুষকে তাঁর গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়েছেন। তার আগে ওই এলাকায় সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছিল।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ভিডিওতে সশস্ত্র এক ব্যক্তির একজন ফিলিস্তিনিকে গাড়ি চাপা দেওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে। ওই ব্যক্তি একজন রিজার্ভিস্ট সেনা। এরই মধ্যে তাঁকে সামরিক পরিষেবা থেকে অপসারণ করা হয়েছে।’

ওই রিজার্ভিস্ট সেনা ‘নিজের ক্ষমতার গুরুতর লঙ্ঘন করেছেন’ স্বীকার করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাঁর অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই রিজার্ভিস্ট সেনাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইসরায়েলি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

যে ফিলিস্তিনিকে গাড়ি চাপা দেওয়া হয়েছিল, তিনি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আঘাত গুরুতর না হওয়ায় তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা এ বছর ফিলিস্তিনিদের ওপর রেকর্ডসংখ্যক হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘ ২০২৫ সালকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে সহিংস বছরগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে। এ বছর অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ৭৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ফিলিস্তিনিদের বেশির ভাগই হয় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর অভিযানে অথবা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

এক ফিলিস্তিনি বসে নামাজ পড়ছেন। তাঁর দিকে গাড়ি ছুটিয়ে আসছেন এক ইসরায়েলি
এক ফিলিস্তিনি বসে নামাজ পড়ছেন। তাঁর দিকে গাড়ি ছুটিয়ে আসছেন এক ইসরায়েলি। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

শতাধিক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রেখেছে চীন, সন্দেহ পেন্টাগনের

চীনের সামরিক বাহিনী দেশটির সর্বশেষ নির্মিত তিনটি সংরক্ষণকেন্দ্রে ১০০-এর বেশি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) মজুত রেখেছে বলে সন্দেহ করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। এক খসড়া প্রতিবেদনে এমনটা উল্লেখ করেছে তারা। পেন্টাগন মনে করে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই চীনের নেই।

বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর আলোকপাত করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর।

শিকাগোভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস বলেছে, চীন অন্য যেকোনো পরমাণু শক্তিধর দেশের তুলনায় সবচেয়ে দ্রুত তার অস্ত্রভান্ডারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করছে।

তবে বেইজিংয়ের দাবি, চীনের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এসব প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।

গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা নিয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

তবে রয়টার্স পেন্টাগনের যে খসড়া প্রতিবেদনটি দেখেছে, সেখানে বলা হয়েছে, বেইজিং এ ধরনের পদক্ষেপ বা বড় পরিসরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

পেন্টাগনের খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সম্ভবত মঙ্গোলিয়া সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণকেন্দ্রগুলোতে ১০০টির বেশি সলিড-ফুয়েল ডিএফ-৩১ আইসিবিএম স্থাপন করেছে। আগেই পেন্টাগন এসব কেন্দ্রের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করেছিল। তবে পেন্টাগনের প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত চীনা দূতাবাস বলেছে, চীন প্রতিরক্ষামূলকভাবে পারমাণবিক কৌশল বজায় রেখেছে, তারা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ন্যূনতম যে পারমাণবিক শক্তি দরকার, তা বজায় রাখছে এবং পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি মেনে চলছে।

খসড়া প্রতিবেদনে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, কংগ্রেসে পাঠানোর আগে প্রতিবেদনে পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা ৬০০-এর নিচে ছিল। এতে বোঝা গিয়েছিল, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উৎপাদনের গতি ধীর ছিল। তবে চীনের পারমাণবিক বিস্তার চলমান আছে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।

চীনের দাবি, তারা আত্মরক্ষার কৌশল অনুসরণ করে এবং কাউকে আগে আঘাত না করার নীতি মেনে চলে।

পেন্টাগনের প্রতিবেদনে চীনের সামরিক প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, চীন আশা করছে, তারা ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং জিততে সক্ষম হবে।

চীনের একটি সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ডিএফ-৪১ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সামরিক যান
চীনের একটি সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ডিএফ-৪১ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সামরিক যান। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়নে সম্মতি দিল ওয়াশিংটন

পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের একটি সামরিক আপগ্রেড প্যাকেজ আইনানুগ কংগ্রেসীয় নোটিফিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুমোদন পেয়েছে। এফ-১৬ যুদ্ধবিমান নির্মাতা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনকে প্রস্তাবিত এই বিক্রির প্রধান ঠিকাদার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের জন্য এফ-১৬ বিমানের নকশা, আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির দায়িত্ব পালন করে আসছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।

এতে বলা হয়, এই বিক্রয় প্রক্রিয়া আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট এবং বার্ষিক বরাদ্দ আইন অনুযায়ী বিদ্যমান আইনি ক্ষমতার আওতায় সম্পন্ন হয়েছে। এসব বিধানের ফলে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার পর এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি না উঠলে নির্বাহী বিভাগ অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় করতে পারে। ডিফেন্স সিকিউরিটি কোঅপারেশন এজেন্সি (ডিএসসিএ) পাকিস্তানের এফ-১৬ বিমানের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করে ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের ফরেন মিলিটারি সেল অনুরোধ অনুমোদন করেছে এবং এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসকে জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এই অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে কংগ্রেসের তদারকি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ডিএসসিএ নোটিফিকেশন জারি করার পর কংগ্রেসের জন্য বাধ্যতামূলক ৩০ দিনের পর্যালোচনা সময় থাকে, এ সময় আইনপ্রণেতারা চাইলে আপত্তি তুলতে বা লেনদেন বন্ধের প্রস্তাব আনতে পারেন। এ সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি না উঠলে বিক্রয়টি কংগ্রেসের অনুমোদন পেয়েছে বলে বিবেচিত হয়। কেবল কংগ্রেস হস্তক্ষেপ করতে চাইলে আলাদা ভোটের প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়াটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রপ্তানি সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর অংশ। ডিএসসিএ ফরেন মিলিটারি সেলস ও ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিংয়ের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালনার ক্ষমতা রাখে। সাধারণত এসব কর্মসূচিতে ক্রেতা দেশের নিজস্ব অর্থ অথবা প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পূর্বে অনুমোদিত মার্কিন ঋণ বা অনুদান ব্যবহৃত হয়- পাকিস্তানের এফ-১৬ প্যাকেজের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

গত সপ্তাহে কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিফিকেশন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বিক্রয়ের উদ্দেশ্য হলো পাকিস্তানের ব্লক-৫২ ও মিডলাইফ আপগ্রেডকৃত এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের কার্যকাল ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর সঙ্গে পারস্পরিক সামরিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা। মোট মূল্য থেকে ৩৭ মিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য, আর বাকি ৬৪৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও আধুনিকায়ন সেবায়। এই প্যাকেজে রয়েছে ৯২টি লিংক-১৬ ট্যাকটিক্যাল ডেটা-লিংক সিস্টেম, সংযোজন ও পরীক্ষার জন্য ছয়টি নিষ্ক্রিয় এমকে-৮২ (৫০০ পাউন্ড) বোমা বডি। এছাড়াও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অ্যাভিওনিক্স আপগ্রেড, নিরাপদ যোগাযোগ ও নেভিগেশন সরঞ্জাম, ক্রিপ্টোগ্রাফিক ডিভাইস, মিশন পরিকল্পনা সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সংশোধন। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, গোলাবারুদ পরীক্ষা ও পুনঃপ্রোগ্রামিং সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট খুচরা যন্ত্রাংশও এই প্যাকেজের অংশ। সংবেদনশীল উপাদানের মধ্যে রয়েছে মোড-৫ আইডেন্টিফিকেশন ফ্রেন্ড-অর-ফো  সিস্টেম, হাতে বহনযোগ্য কী লোডার এবং গোলাবারুদের বিল্ট-ইন টেস্ট ফাংশনের জন্য পুনঃপ্রোগ্রামিং সরঞ্জাম। এসবের কিছু অংশ ‘গোপন’ শ্রেণিভুক্ত।

পাকিস্তান প্রথম ২০২১-২২ সালে এফ-১৬ আপগ্রেডের জন্য অনুরোধ জানায়। ডিএসসিএ প্রস্তাবটিকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করলেও বাইডেন প্রশাসন তখন তা কার্যকর করেনি, যদিও নোটিফিকেশন প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি নোটিফিকেশন জারি হলেও এরপর আর অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে কংগ্রেসে নোটিফিকেশন পাঠানো হয়। নির্ধারিত আইনি সময়সীমার মধ্যে কোনো আপত্তি না ওঠায়, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী প্রস্তাবিত বিক্রয় অনুমোদিত হয়।

https://mzamin.com/uploads/news/main/195434_Abul-14.webp

বিদায় খালেদা জিয়া: সব চেষ্টা ব্যর্থ, চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী

প্রথম আলোঃ বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আজ মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে প্রথম আলোকে জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে জানিয়েছেন,  ‘আম্মা আর নেই।’

এর আগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন প্রথম আলোকে জানান, খালেদা জিয়া সকাল সাড়ে ৬টার সময় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর পাশে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন।  

খালেদা জিয়ার জানাজা আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া  ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন । চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের এমন নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী–সন্তান হারানোর গভীর শোকসন্তাপ, আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।

রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া।

শৈশব

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুরে ( তবে এই তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য রয়েছে)। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীতে। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘খালেদা খানম’। অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকেরা তাঁকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে (উচ্চমাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন।

ইস্কান্দার মজুমদার ধার্মিক ও উদার মানসিকতাসম্পন্ন ছিলেন। তাঁর বাড়িতে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশও ছিল। বড় মেয়ে খুরশিদ জাহান হক গান এবং খালেদা খানম নৃত্যের চর্চা করতেন। বাড়িতে আরবি শিক্ষকের পাশাপাশি সংগীত-নৃত্যের শিক্ষকও ছিলেন। শৈশবে দিনাজপুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এমনকি দিনাজপুরের বাইরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নৃত্য পরিবেশন করে সমাদৃত হয়েছেন। মা তৈয়বা বেগমের রান্নার হাত ছিল চমৎকার। মেয়েদের তিনি রান্না শিখিয়েছেন। মায়ের কাছ থেকে খালেদা খানমই তিন বোনের মধ্যে রান্নার গুণ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন।

খালেদা খানমের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি নিবিড় অনুরাগ ছিল তাঁর। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি ফুলের প্রতি এই অনুরাগ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।

বিবাহ

সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে খালেদা খানমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের প্রসঙ্গে তাঁর এক জীবনীকার লিখেছেন (প্রাগুক্ত) ঘটক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন,  ‘“আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। পাত্রী এত রূপসী যে তাঁর রূপের ছটায় সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।” জিয়া হাসলেন ও বিয়ে করতে সম্মত হলেন।’ বিয়ের পর থেকে তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে। জ্যেষ্ঠ তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। কনিষ্ঠ আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০মার্চ এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বৎসর বয়সে খালেদা জিয়া অকালবৈধব্য বরণ করেন।

পরিমিত আহার করতেন বেগম খালেদা জিয়া। ফল খেতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে নিয়মিত পেঁপের রস পান করতেন। প্রিয় খাবার ছিল সাদা ভাত, সবজি, মসুর ডাল ও মাছ। মাংস খেতেন, তবে তেমন পছন্দের ছিল না। শ্রোতা হিসেবে তিনি বেশ ভালো ছিলেন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। জীবনীকারেরা বলেছেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে বিচক্ষণ হয়ে ওঠেন’ (বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম, মাহফুজ উল্লাহ)।

রাজনৈতিক জীবন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু। জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই তিনি দলের শীর্ষপদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছর দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এল সাফল্য

স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭–দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’  হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চড়াই-উতরাইয়ের পথ পেরিয়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে অনেকেরই পূর্বানুমান ছিল তাঁর বিরোধী পক্ষই বিজয়ী হবে; কিন্তু সেসব অনুমান মিথ্যায় পর্যবসিত করে দীর্ঘ আট বছরের অবিরাম, নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর বিএনপির বিজয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নহীন করে তোলে। দেশের প্রথম ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি। তাঁর এক জীবনীকার বলেছেন, ‘দেশের সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।’(প্রাগুক্ত : মাহফুজ উল্লাহ)

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে অনেক সাফল্য থাকলেও কিছু সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষত দুর্নীতি দমনে তিনি সফল হননি বলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল অভিযোগ তোলা হয়েছে বিরোধী পক্ষ থেকে। কথিত ‘হাওয়া ভবন’ ও দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুসারে (২০০১-২০০৫) টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তাঁর প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।

কারাবাস

খালেদা জিয়া জীবনের নানা পর্যায়ে বেশ অনেকটা সময় বন্দিত্বের নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ জুলাই থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সেনানিবাসে বন্দী ছিলেন। জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সেনানিবাসের বাড়িতে তাঁকে কিছুদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে আলোচিত কালপর্বে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল সড়কের বাড়িতে গৃহবন্দী করা হয়। পরে সেখান থেকে সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে সাবজেল ঘোষণা করে এক বছর সাত দিন তাঁকে বন্দী রাখা হয়।

 পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কারাগারে বন্দিত্বের কঠিন সময় কেটেছে খালেদা জিয়ার জীবনে। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ‘ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা’ করা হয়। গ্রেপ্তার করে এই নির্জন স্থাপনাটিতে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে তাঁকে বন্দী রাখা হয়। এ মামলায় তাঁকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে স্লো পয়জনিংয়ের অভিযোগ ওঠে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন করেও অনুমতি পাননি। মানবিক কারণে ২০২০ সালে তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকার শর্তে কারাগার থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়।

চিকিৎসা

মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছর ৭ জানুয়ারি লন্ডনে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বাস্থ্যের অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। তবে নানা রোগে জটিলতা ও শরীর–মনে ধকল সহ্য করে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হাসপাতালে ভর্তি করানো হতো। গত ২৩ নভেম্বর এমনই পর্যায়ে তাঁকে শেষবারের মতো রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। এবার তিনি আর চিকিৎসায় সাড়া দিতে পারলেন না। ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

মনোনয়নপত্র দাখিল করে রুমিন ফারহানা বললেন, ‘এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা।

আজ সোমবার দুপুরের পর রুমিন ফারহানা নিজে উপস্থিত হয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

মনোনয়নপত্র দাখিলের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার বাইরে। আল্লাহর এই পরিকল্পনায় আমার বাবা ৭৩ সালে আওয়ামী লীগের জোয়ারের বিপক্ষে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। রাব্বুল আলামিনের কী অদ্ভুত পরিকল্পনা! ২০২৬ সালে এসে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে। আল্লাহর পরিকল্পনা ও তাঁর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া মানুষের বোঝার বাইরে।’

এরপর সমর্থদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনারা যে মার্কা চান, সেই মার্কাই আমার, আপনারা কী মার্কা চান?’ উত্তরে অনুসারীরা বলে ওঠেন, ‘হাঁস’, ‘হাঁস’।

সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলাকে বাংলাদেশের অবহেলিত দুটি উপজেলা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তোলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সরাইল-আশুগঞ্জের অবস্থা বেহাল কেন? কেন কোনো সংসদ সদস্য এই বেহাল অবস্থার পরিবর্তন আনল না? সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ কেন তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাইল না?’

বিএনপিকে ইঙ্গিত করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এবার সময় আসছে পরিবর্তনের। এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ভোট হবে জুলুমের বিপক্ষে। এই ভোট হবে ১৭ বছর যেই মহিলা মাঠে ছিল, তার পক্ষে। এই ভোট হবে যখন আপনারা মামলা–হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন যে মানুষ আপনাদের পক্ষে সংসদে এবং সংসদের বাইরে কথা বলেছে, এই ভোট হবে তার পক্ষে।’

এর আগে গত বুধবার রুমিন ফারহানার পক্ষে সরাইলের ইউএনওর কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন। আজ মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় রুমিন ফারহার সঙ্গে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁ ও উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেনসহ কয়েক শ অনুসারী।

রুমিন ফারহানার মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারী হয়েছেন শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোশাররফ হোসেন আর সমর্থনকারী হয়েছেন প্রচার সম্পাদক জোনায়েদ খান।

আজ বেলা দুইটার দিকে রুমিন ফারহানা উপজেলা সদরে উপস্থিত হন। এ সময় তাঁর শত শত অনুসারী, নেতা–কর্মী মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে সরাইল উপজেলা সদরে উপস্থিত হন।

ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি বিএনপির সমঝোতার মাধ্যমে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বর্তমানে সরাইল, আশুগঞ্জ এবং বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। রুমিন ফারহানার পৈত্রিক বাড়ি বুধন্তী ইউনিয়নে। বর্তমানে তিনি সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-29%2Fu9e2furt%2FBBariaDH12562025122920251229142651.jpg?rect=451%2C0%2C3444%2C2296&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন রুমিন ফারহানা। সোবার দুপুর আড়াই দিকে তোলা ছবি। ছবি: প্রথম আলো

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক: ফ্লোরিডায় এবার ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মধ্যে কী কথা হবে

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। সেখানে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যখন চরম উত্তাপের দিকে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই এই বৈঠক হতে যাচ্ছে।

আজ সোমবার ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন নেতানিয়াহু। গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ সম্পন্ন করতে ওয়াশিংটন যখন চাপ জোরালো করছে, তখনই এই আলোচনা হতে যাচ্ছে।

প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের ২০-দফার তথাকথিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীর, লেবানন এবং সিরিয়ায় হামলা আরও জোরদার করছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেমন হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে আল-জাজিরা।

নেতানিয়াহু বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে কী বিষয়ে আলোচনা করবেন? যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের অবস্থাই কী—এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে আল–জাজিরা।

কবে বৈঠক হবে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী রোববার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাছেন। তবে এই বৈঠক হোয়াইট হাউসে হবে না। পরিবর্তে, নেতানিয়াহু ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছুটি কাটাচ্ছেন।
দুই নেতার বৈঠক আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

ট্রাম্পের সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর কততম সাক্ষাৎ

এই সফর নেতানিয়াহুর গত ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চম সফর। অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার চেয়ে নেতানিয়াহুকে সবচেয়ে বেশি বার যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে নেতানিয়াহু প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন। এরপর তিনি এপ্রিল এবং জুলাই মাসেও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সবশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের পর ট্রাম্পের সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসিতে সাক্ষাৎ করেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠকটি হোয়াইট হাউসে হবে না। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে নেতানিয়াহু ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে যাবেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবকাশ যাপন করছেন।

আজ সোমবার দুই নেতার মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা আছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প আরও বেশি করে ইসরায়েলের রক্ষণশীল সরকারের পক্ষে মার্কিন নীতিকে এগিয়ে নেন। তিনি জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করেন, সিরিয়ার অধিকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন এবং জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাকে (ইউএনআরডব্লিউএ) অর্থায়ন বন্ধ করে দেন।

চলতি বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বিমত প্রকাশ করার প্রবণতা দেখিয়েছেন। তবু তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছে। যেমন মার্চে গাজা উপত্যকায় সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল আবারও হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে সমর্থন জানিয়েছিল।
গত জুনে ট্রাম্প ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলায় যুক্ত হন, যা তার কিছু সমর্থককে হতাশ করেছিল।

আবার একই সঙ্গে ট্রাম্প গাজায় বর্তমান যুদ্ধবিরতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছেন। গত সেপ্টেম্বরে দোহায় ইসরায়েলি হামলার বিরোধিতা করেন ট্রাম্প। ইসরায়েলের সংশয়ের পরও তিনি দ্রুত সিরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়ের পর পরই নেতানিয়াহু তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর তাতে ট্রাম্প বিরক্ত হন। কারণ, তিনি তখন মিথ্যা দাবি তুলেছিলেন, নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে।

২০২১ সালে সংবাদমাধ্যম এক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি তখন থেকে তাঁর (নেতানিয়াহু) সঙ্গে কথা বলিনি।’

২০২৪ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর দুই নেতার মধ্যে আবারও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীদের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।

নিজ দেশে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করে দিতে গত নভেম্বরে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে অনুরোধ জানান।

তবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে যে পুরোপুরিভাবে মতের মিল রয়েছে, তা নয়। গাজা ও সিরিয়া পরিস্থিতি এবং তুরস্ক ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্বের মতো বিষয়গুলোতে তাদের অবস্থানে ফাটল রয়েছে।

এবার যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নেতানিয়াহু সম্ভবত ট্রাম্পের প্রশংসা করবেন এবং তাঁর সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে দেখাতে চাইবেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর এজেন্ডাকে এগিয়ে নেবেন এবং ইসরায়েলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দেখাতে চাইবেন যে, তাঁর ওপর এখনো ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে।

২০২৩ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়। এর জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল।

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবাধ কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা চান।

ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন। গাজায় হামলা শুরু হওয়ার ১১ দিন পর তিনি ইসরায়েলে সফর করেন এবং ঘোষণা দেন যে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

বাইডেন তেল আবিব বিমানবন্দরে নেতানিয়াহুকে যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তাতে বোঝা যাচ্ছিল ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। অথচ ওই সময় গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল ইসরায়েল। গত দুই বছরে ইসরায়েলকে ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলিবিরোধী প্রস্তাবে একাধিক ভেটো দিয়েছে তারা।

নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাইছেন, ইসরায়েল নিজের পাশাপাশি মার্কিন স্বার্থ হাসিলেও কাজ করছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল গাজা ও লেবাননের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে পরোক্ষভাবে লড়ছে।
নেতানিয়াহু মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘আমরা শুধু নিজেদের রক্ষা করছি না, আমরা আপনাদেরও সুরক্ষা দিচ্ছি।’

যুদ্ধ চলাকালে অসংখ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইডেন ও ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও রাজনৈতিক সহায়তা অব্যাহত থেকেছে। নেতানিয়াহু সব সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এমনকি উত্তেজনা চললেও এর নড়চড় হয় না।

গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ অগ্রাধিকারের জায়গা হলো গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ সম্পূর্ণ করা এবং শুধু লড়াই বন্ধ করার পর্যায় থেকে দীর্ঘমেয়াদি শাসন, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠন পর্যায়ে যাওয়া।
ইসরায়েল নিয়মিতভাবে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। সম্প্রতি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

তিন হাজার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের চেয়ে ব্যাপকভাবে যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, চুক্তির আওতায় হামাসকে অস্ত্রশূন্য করার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা থাকতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিটি যোদ্ধার কাছ থেকে অস্ত্র সরানোর চেয়ে এই গোষ্ঠী যেন ইসরায়েলের জন্য হুমকি তৈরি না করতে পারে—তার ওপরই মূলত জোর দেওয়া হবে।

তবে ইসরায়েলের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রটি ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গত মঙ্গলবার বলেছেন, দেশটি গাজায় নতুন করে অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছে। পরে তিনি এই মন্তব্য প্রত্যাহার করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েল ওই এলাকায় স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে, যা ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধী।
এমন পরিস্থিতিতে আশা করা হচ্ছে, গাজা নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।

সিরিয়ার সঙ্গে কোনো চুক্তি হতে পারে কি

গত বছর ট্রাম্প আক্ষরিকভাবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে গ্রহণ করেছেন। তিনি দেশটির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন এবং তাঁর সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা শুরু করেন। তবে ইসরায়েল সিরিয়ায় তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল গোলান মালভূমির বাইরে সিরিয়ায় তার দখলদারির সম্প্রসারণ শুরু করে।
যদিও নতুন সিরীয় কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই বলে দিয়েছিল, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত চায় না। তবু ইসরায়েলি সেনারা সিরিয়ার রাষ্ট্র ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিমান হামলা চালায়।

ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়াতেও অভিযান চালাচ্ছে এবং স্থানীয়দের অপহরণ ও নিখোঁজ করার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

গত মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৩ জন সিরীয় নাগরিক নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প ইসরায়েলের সমালোচনা করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে দৃঢ় ও প্রকৃত সংলাপ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এমন কিছু করা উচিত নয়, যা সিরিয়াকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে বাধা তৈরি করবে।’

সিরিয়া ও ইসরায়েল চলতি বছরের শুরুতে নিরাপত্তা চুক্তি করার জন্য আলোচনায় বসেছিল। তবে ইসরায়েলি নেতারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর দখলকৃত ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেওয়ার জোর দাবি জানালে আলোচনা ভেস্তে যায়।

নেতানিয়াহুর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরে ট্রাম্প সিরিয়া-ইসরায়েল চুক্তি নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন ইরান আবার শিরোনামে

নেতানিয়াহুর সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সতর্কবার্তা বেড়ে গেছে। গত জুনে দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গত সপ্তাহে এনবিসি নিউজের খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের ওপর আরও হামলার পরিকল্পনা বিষয়ে অবহিত করবেন।

ট্রাম্প শিবিরের ইসরায়েলপন্থী অংশ ইতিমধ্যেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠছে।

চলতি মাসে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইসরায়েল সফর করেন এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রকে ইসরায়েলের জন্য ‘বাস্তব হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম বলেন, ‘এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েলের জন্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি তুলে ধরা।’

জুনে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত চলাকালে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন।

ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করছে বলে কোনো প্রমাণ না থাকার পরেও সম্ভাব্য ইরানি পারমাণবিক বোমার ভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে জড়ানোর মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা টুসি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোটা নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য সংঘাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
টুসির মতে, ইরানের ওপর আরও হামলার চাপ নেতানিয়াহুর জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

তবে টুসি এটাও বলেছেন, ট্রাম্প কী করবেন, তা নিয়ে আগে থেকে কিছু বলা যায় না। কারণ, তাঁর আশপাশে রুবিওর মতো ইসরায়েলপন্থীরা আছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা কী

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাম ও ডান—দুই দিক থেকেই বিরোধিতা বাড়লেও ইসরায়েলের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন এখনো অটল।

চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস একটি সামরিক ব্যয় বিল পাস করেছে। সেখানে ইসরায়েলের জন্য ৬০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা আছে।

ট্রাম্প প্রশাসন গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বা পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণসহ ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে মৌখিক সমালোচনাও এড়িয়ে চলছে।

১৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে ইহুদিদের উৎসব হানুক্কা উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সে সময় ট্রাম্প কংগ্রেসে ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের বিষয়ে বাড়তে থাকা সংশয় নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি এই মনোভাবকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে তুলনা করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি যদি ১০, ১২ বা ১৫ বছর আগে ফিরে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন ওয়াশিংটনে সবচেয়ে শক্তিশালী লবি ছিল ইহুদি লবি। আর তা হলো ইসরায়েল। এখন আর তা নেই।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আপনাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে কংগ্রেসে এমন একটা মনোভাব তৈরি হচ্ছে, যা ইহুদিবিদ্বেষী।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা টুসির মতে, ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে, তখন ইসরায়েল অঞ্চলজুড়ে ‘পূর্ণ আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররাও রয়েছে।

টুসি আরও বলেন, ইসরায়েল যে আপসহীন অবস্থান ও কৌশলগত লক্ষ্য অনুসরণ করছে, তা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মূল স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের ভবিষ্যৎ কী

ওয়াশিংটন ডিসির ইনডিপেনডেন্স অ্যাভিনিউ ধরে গাড়ি চালালে কংগ্রেস সদস্যদের দপ্তরের জানালায় অনেক সময় মার্কিন পতাকার চেয়ে বেশি ইসরায়েলি পতাকা চোখে পড়বে।

জনমত বদলাতে শুরু করলেও কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এখনো বিপুল। রিপাবলিকান শিবিরে ইসরায়েল নিয়ে সমালোচনা বাড়লেও যাঁরা ইসরায়েলের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের কোণঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে। মার্জোরি টেইলর গ্রিন কংগ্রেস ছাড়ছেন। বিশ্লেষক টাকার কার্লসন নিয়মিত হামলা ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের মুখে পড়ছেন। আর কংগ্রেস সদস্য টম ম্যাসি ট্রাম্প-সমর্থিত এক প্রতিদ্বন্দ্বীর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল কট্টর ইসরায়েলপন্থীদের দিয়ে ভরা। যাঁদের মধ্যে আছেন—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ধনকুবের দাতা মিরিয়াম অ্যাডেলসন এবং রেডিও উপস্থাপক মার্ক লেভিন।

তবে জনসমর্থন কমে যাওয়ায়, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে জনসমর্থন কমে যাওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলকে হয়তো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের মধ্যে যাঁরা ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক, তাঁদের কেউ কেউ এখন প্রাইমারি নির্বাচনে ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষ সোচ্চার থাকা প্রগতিশীল প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) ডেমোক্র্যাটদের কাছে ক্রমেই একটি ‘বিষাক্ত’ ব্র্যান্ডে পরিণত হচ্ছে।

ডানপন্থী শিবিরেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের ঐকমত্যে ফাটল আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকা মানুষদের দমন করতে জায়নবাদের বিরোধিতাকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে আইনি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ বিষয়ে তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন।

সম্প্রতি আনহার্ড ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাক্ষাকারে ভ্যান্স বলেন, ‘আসলে যা ঘটছে, তা হলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি দীর্ঘদিনের ঐকমত্যের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিক্রিয়া। আমি মনে করি, আমাদের এই নিয়ে আলোচনা করা উচিত, সেটিকে চেপে রাখার চেষ্টা করা নয়। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইহুদিবিদ্বেষী নন। তাঁরা কখনোই হবেন না। আমাদের উচিত আসল বিতর্কে মনোযোগ দেওয়া।’

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রবণতা বদলাচ্ছে। তবে আপাতত ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার দৃঢ়ই রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

কাশ্মীর ফাইলস থেকে আরআরআর: ভারতীয় সিনেমা ‘সাবালক’ হবে কবে by ভামসি জুলুরি

প্রকাশ ২৭ ডিসেম্বর ২০২২ঃ কোনো সিনেমা ভারতে (এবং প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে) ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার মানে এই নয় যে ছবিগুলো বিদেশি দর্শকেরা, বিশেষ করে একটি নিরবচ্ছিন্ন বৈশ্বিক প্রতিকূল প্রচারণায় ইতিমধ্যেই ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নেওয়া বিদেশিরা একইভাবে দেখবেন বা অনুভব করবেন।

সম্প্রতি ভারতীয় সিনেমা আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে আলোড়ন তৈরি করেছে। সুখের বিষয়, তেলেগু ব্লকবাস্টার আরআরআর দুটি গোল্ডেন গ্লোবের জন্য মনোনয়ন জিতেছে। অন্যদিকে কম আনন্দের বিষয় হলো, দ্য কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে ১৯৯০-এর দশকের কাশ্মীরি হিন্দু পণ্ডিতদের জাতিগত নির্মূল করা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা গভীর আবেগ নিয়ে স্বাগত জানালেও সেটিকে একজন ইসরায়েলি নির্মাতা ‘অশ্লীল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, এমনকি বিতর্ক কূটনৈতিক স্তরে পৌঁছে গেছে। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি কাশ্মীর ফাইলস–এর স্ক্রিপ্ট রাইটারের উদাসীনতায় ইসরায়েলি নির্মাতা নাদাভ লাপিদসহ অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য আমার কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা বন্ধুসহ অনেকেই আবার স্ক্রিপ্ট রাইটারের অবস্থানকে মহৎ বলে মনে করছেন।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই পরিচালকের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়েছে। লাপিদ ছবিতে চিত্রায়িত ঘটনাগুলো আদতেই ঘটেছিল কি না, তা বলতে তঁার অক্ষমতা প্রকাশ করেছিলেন এবং ওই হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা ছবিটি দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন।

লাপিদ বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রচার হিসেবে বানানো ছবিও শৈল্পিক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিখ্যাত রুশ নির্মাতা সেরগেই নিকোলোভিচ আইজেনস্তাইন ও জার্মান নির্মাতা লেনি রেইফেনস্টাহলের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই দুজনই প্রোপাগান্ডাভিত্তিক ছবি বানাতেন। কিন্তু এখন কেউই তাঁদের সেই ছবিগুলোকে আর প্রচারমূলক ছবি বলে না। কাশ্মীর ফাইলস সে রকমই কিছু নয় বলে তিনি জোর দিয়েছেন।

ছবিটির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী বারবার উল্লেখ করেছেন, কেউ যখন বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে মত দেয়, তখনই তারা ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কাশ্মীর ফাইলস সিনেমায় চিত্রায়িত ভয়ংকর ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই এবং তিনি তঁার ছবির গল্পের জন্য ৭০০ ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

তবে বিতর্কটি এখন কিছুটা কমে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত উভয় শিবিরেরই ইসলামবিদ্বেষ কিংবা হিন্দুবিদ্বেষ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া এর কারণ হতে পারে। কাশ্মীর ফাইলস থেকে আলোচনা এখন আরআরআর-এর দিকে সরে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আমি বহু বছর ধরে ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে অর্জিত অভিজ্ঞতা অ-ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচকদের যে মৌলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় ছবির দৃশ্য একজন ভারতীয় দর্শকের মনের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তা বিদেশিদের ক্ষেত্রে কাজ করে না।

আমরা ভারতের সিনেমা হলে গিয়ে হাম আপকে হ্যায় কৌন কিংবা মিস্টার ইন্ডিয়া ছবি দেখে যেভাবে উদ্বেলিত হয়েছি, বিদেশের ছাত্র বা দর্শকদের কাছে তা খুব কমই চিত্তাকর্ষক ছিল।

১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী বেশ খানিকটা সময় জুড়ে ‘বলিউড’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ টান ছিল, যা শাহরুখ খান থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয় নির্মাতা মিরা নায়ার ও গুরিন্দর চাড্ডার মতো নির্মাতাদের বিশেষত্ব দিয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলো ভারতীয়দের বয়ান বা ন্যারেটিভকে ভারতের বাইরে এগিয়ে নিতে পেরেছে।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে, আমরা দর্শকদের রুচি, বিষয়বস্তু এবং ফর্ম সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের দিকে যেতে পারি।

আমাদের এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যে কেন আরআরআর–এর (এবং তার আগে বাহুবলী) মতো একটি সিনেমা ভারতীয় এবং অ–ভারতীয় উভয় শ্রেণির দর্শকদের মন কাড়তে পেরেছিল।

একই সঙ্গে এটিও একটি বড় প্রশ্ন যে কেন দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর মতো একটি সিনেমায় ১৯৯০-এর জাতিগত নির্মূলকরণের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের করুণ অবস্থা দেখে ভারতীয় দর্শকদের অনেকে অশ্রুপাত করলেও তা সব অভিনয়শিল্পীর সহানুভূতি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে?

ইস্যুটি কি শুধুই কট্টর পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির, যেখানে বৈশ্বিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে হিন্দুদের মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে গণনা করা হয় না? নাকি আমাদের সীমানার বাইরের দর্শকদের মনে জায়গা করার মতো গল্প বলার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের সক্ষমতার সেই সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার দরকার আছে।

কার্ল ভন ক্লজউইটজ লিখেছিলেন, যুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানোর সময় তিন শ্রেণির দর্শক–শ্রোতার কথা মাথায় রাখতে হয়—সমর্থক, শত্রু এবং নিরপেক্ষ গোষ্ঠী। কিন্তু আমরা কয়েক বছর ধরে ভারতের প্রোপাগান্ডার যে গল্পগুলো দেখে আসছি, তা প্রায় একচেটিয়াভাবে প্রথমোক্ত গোষ্ঠীর প্রতি আলোকপাত করে বানানো।

ভারতীয় সিনেমাকে যদি বিশ্বমানের হতে হয়, ভারতের গল্পকে যদি সত্যিই বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হয়, তাহলে আমাদের কাউকে শত্রু বা বিরোধী হিসেবে ধরে না নিয়ে ভবিষ্যতে তিন শ্রেণির দর্শকের সঙ্গেই কথা বলতে শিখতে হবে।

যখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দর্শকেরা গল্পের আখ্যানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, তখনই ভারতীয় সিনেমার বয়ান বিশ্বমানের বলে প্রতিষ্ঠা পাবে। যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিন তা ‘আমাদের প্রচার, তাদের প্রচার’ মার্কা সিনেমা হবে; সেই সিনেমা ‘আমাদের’ এবং ‘তাদের’—এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধ গড়তে পারবে না।

* ভামসি জুলুরি, সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে
কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে ফাটল, দায়ী ভারতের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব

ডনের সম্পাদকীয়ঃ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম তরুণ ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। হাদির সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের একটি অংশের দাবি, ভারতের ইন্ধনেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের সম্পাদকীয় বলছে, দিল্লির বড় ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবই সমস্যার প্রধান কারণ; দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি চাইলে সবাইকে একে অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা চালায় একটি হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠী। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য শহরেও বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ভারতের উগ্রবাদী সংগঠন ভিএইচপি (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) ময়মনসিংহে এক বাংলাদেশি হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে কূটনৈতিক মিশনে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। জবাবে দিল্লিতেও বাংলাদেশি প্রতিনিধি একই ধরনের তলবের মুখে পড়েন। যা কার্যত কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। অন্যদিকে, ভারত সরকার এসব ঘটনাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে, বিশেষ করে উগ্রবাদী জনতার মাধ্যমে বাংলাদেশি মিশনে হামলার বিষয়টি।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের শাসনামলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত। তবে গত বছর তার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন খুনি ভারতে পালিয়ে গেছে। এমন খবর বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের বড়ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব। হাদির হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে দিল্লির উচিত ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রই নিজেকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে অন্যদের ওপর প্রভাব খাটাতে বা ভয় দেখাতে পারে না। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই স্থিতিশীল ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।

mzamin