Wednesday, September 30, 2026

আল-আকসা মসজিদে শত শত ইসরাইলি, চললো নাচ-গান

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে শত শত ইসরাইলি প্রবেশ করেছে। ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব সুক্কোট উপলক্ষে তারা সেখানে যায় বলে জানিয়েছেন জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াকফের এক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আনাদোলুকে বলেন, ইসরাইলি পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শত শত ইসরাইলি আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে।
তিনি বলেন, এ সময় সেখানে তালমুদিক ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা, নাচ ও গান করা হয়েছে। মসজিদ প্রাঙ্গণের প্রচলিত ‘স্ট্যাটাস কুও’ বা ঐতিহাসিক ব্যবস্থার সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের বিরোধ রয়েছে।

১৯৬৭ সালে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম দখলের আগের ঐতিহাসিক ব্যবস্থায় আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের ব্যবস্থাপনার একক দায়িত্ব জেরুজালেম ইসলামিক ওয়াকফের। এটি জর্ডানের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন। ১৪৪ দুনাম বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ একর আয়তনের এই প্রাঙ্গণ মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত একটি ইবাদতের স্থান।

সুক্কোট উপলক্ষে আল-আকসায় বড় ধরনের প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছিল ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী। গত শনিবার শুরু হওয়া সুক্কোট আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চলবে।

জেরুজালেম ইসলামিক ওয়াকফ জানিয়েছে, রোববার ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি ইসরাইলি আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। সোমবার এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭০০-এর বেশি এবং মঙ্গলবার প্রবেশ করে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি।

ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব শুরু হওয়ার পর থেকে আল-আকসায় ইসরাইলিদের প্রবেশের ঘটনা বেড়েছে। এসব ঘটনায় ইসরাইলি বাহিনীর ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামরিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।

ইহুদিদের উৎসব শুরু হয় ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ইহুদি নববর্ষের মধ্য দিয়ে। এরপর ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ইয়োম কিপুর। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে সুক্কোট। এরপর ৩ অক্টোবর পালিত হবে সিমখাত তোরাহ।
২০০৩ সাল থেকে ইসরাইলি পুলিশ একতরফাভাবে ইসরাইলিদের পশ্চিম দেয়ালের মুগরাবি গেট দিয়ে আল-আকসায় প্রবেশের অনুমতি দিয়ে আসছে। এ সময় তাদের সঙ্গে ইসরাইলি পুলিশ সদস্যরাও থাকে।

আল-আকসায় এসব প্রবেশ বন্ধের জন্য জেরুজালেম ইসলামিক ওয়াকফ বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এসব আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করে আসছেন, কয়েক দশক ধরে ইসরাইল দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম, বিশেষ করে আল-আকসা মসজিদের ‘ইহুদিকরণ’ এবং এর আরব ও ইসলামি পরিচয় মুছে ফেলার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ জোরদার করেছে।

আল-আকসা মসজিদে শত শত ইসরাইলি, চললো নাচ-গান

ভারতে মুসলিমদের নিশানা করে গাড়ি-জমির ধর্মভিত্তিক তথ্য চাইছে কমিশন: ওয়াইসি

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত ডেমোগ্রাফি কমিশন থেকে গাড়ি নিবন্ধন ও সম্পত্তি কেনাবেচা সংক্রান্ত ধর্ম-ভিত্তিক তথ্য চেয়ে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করছে বলে অভিযোগ করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।

ওয়াইসি বলেন, আমরা যখন মোদী সরকারের কাছে মুসলিমদের শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহের দাবি জানিয়েছিলাম, তখন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অথচ অমিত শাহের ‘ডেমোগ্রাফি কমিশন’ এখন রাজ্যগুলোর কাছে জানতে চাইছে কোন ধর্মের মানুষ কতগুলো গাড়ি কিনেছে, কার কত জমি আছে—ইত্যাদি।

তার দাবি, তথ্যের ভিত্তিতে উন্নত নীতি প্রণয়ন করা এই কমিশনের উদ্দেশ্য নয়। বরং তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন ও বিকৃত করা হতে পারে, যাতে মুসলিমদের টার্গেট করা যায় এবং তাদের অবশিষ্ট অধিকারও কেড়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটি (এইচএলসিডিসি) গত ১৫ বছরের ধর্মভিত্তিক জন্মনিবন্ধন, গাড়ি নিবন্ধন, স্কুলে ভর্তি ও সম্পত্তি লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। পাশাপাশি জেলা অনুযায়ী ধর্মীয় স্থাপনার সংখ্যা এবং আধার, ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড নিবন্ধনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তফসিলি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মান্তর নিয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদন এবং কার্যকর আটককেন্দ্রগুলোর তথ্যও কমিটি চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২৬ মে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবৈধ অভিবাসনসহ অন্যান্য অস্বাভাবিক কারণে সৃষ্ট জনসংখ্যাগত পরিবর্তন পর্যালোচনা এবং তা মোকাবিলায় করণীয় সুপারিশের জন্য এইচএলসিডিসি গঠন করে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকরকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।

এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে ওয়াইসি অভিযোগ করেন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটেছে এমন এলাকায় এই কমিটি যাবে। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) শেষ হওয়া এলাকাগুলোতে গিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করা হবে এবং অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।

ওয়াইসি আরো বলেন, অমিত শাহ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। তার আশঙ্কা, এসআইআরের মাধ্যমে প্রস্তুত করা ভোটার তালিকার ভিত্তিতেও এনআরসি করা হতে পারে।

সূত্র: মুসলিম মিরর

ভারতে মুসলিমদের নিশানা করে গাড়ি-জমির ধর্মভিত্তিক তথ্য চাইছে কমিশন: ওয়াইসি
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি

ইরানে হামলার আধা ঘণ্টা আগে সতর্কবার্তা পান কাতারের প্রধানমন্ত্রী

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরুর মাত্র আধা ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউস থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কতা পেয়েও যুদ্ধ ঠেকাতে কিছু করার সুযোগ প্রায় ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।

সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটি ঠেকাতে কিছু করা সম্ভব কি না।’ তবে ততক্ষণে হামলা কার্যত শুরু হয়ে গিয়েছিল।

পিয়ার্স মরগান জানতে চান, আরও আগে সতর্ক করা হলে কাতার আরও কিছু করতে পারত কি না। জবাবে আল-থানি বলেন, আগে জানানো হলে যুদ্ধ ঠেকাতে তারা সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন। কারণ কাতার সবসময় কূটনীতিকেই সামনে এগোনোর একমাত্র পথ এবং যে কোনো সংঘাতের সমাধান হিসেবে দেখে।

তবে এবারের পরিস্থিতি তাদের জন্য ‘বিস্ময়কর’ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। হামলা শুরুর ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই কাতারও ইরানের হামলার শিকার হয় বলে জানান কাতারের প্রধানমন্ত্রী।

আল-থানি বলেন, তিনি দোহায় নিজের বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সেখানেই হোয়াইট হাউস থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। হামলা শুরু হওয়ার এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কাতারেও হামলা হয়।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী এ স্বল্প সময়ের সতর্কবার্তায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠেকাতে কাতারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দোহায় ইরানের হামলার নিন্দা জানান তিনি।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধকে ‘ভূমিকম্প’ হিসেবে বর্ণনা করেন আল-থানি। তার মতে, এই সংঘাত যুদ্ধের ধরন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে।

তবে সরাসরি সংঘাতের পরও কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইরান সবসময় কাতারের প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে। দুই দেশের মধ্যে সিরিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেন তিনি। সিরিয়া ইস্যুতে ইরান বাশার আল-আসাদকে সমর্থন করলেও কাতার তার বিরোধিতা করেছিল।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তার বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সরাসরি যোগাযোগ নেই বলেও জানান আল-থানি। মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে যোগাযোগ কার্যকরভাবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠান তেহরানের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে।

যুদ্ধের কারণে কাতারের অর্থনীতিতে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান আল-থানি। তার দেওয়া হিসাবে, দেশটির অর্থনীতি ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, পর্যটন কমেছে ৮০ শতাংশ এবং হোটেলগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। এতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে কাতার।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে কিছু ক্রেতা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব নিতে রাজি হওয়ায় সীমিত পরিসরে রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক অথবা আইনি সমাধানের আহ্বান জানান কাতারের প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালেও কাতার প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিল। তখন সরকারি কর্মীদের বেতন দিতে দেশটিকে সম্পদ বিক্রি করতে ও ঋণ নিতে হয়েছিল।

তবে গত কয়েক দশকে গড়ে তোলা সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কারণে বর্তমান সংকটও কাতার সামলে উঠতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আল-থানি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।

সূত্র : পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড ও ওয়াইনেট

সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ছবি: ইউটিউব
সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ছবি: ইউটিউব

মধ্যপ্রাচ্যকে বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করল ইরান

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে ইসরাইলি সরকারের উপস্থিতির ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিণতি’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং এই অঞ্চলে দখলদার ইসরাইলি সরকারের উপস্থিতির অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করছে।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ইসরাইলের ইরানে সামরিক আগ্রাসন এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও লেবাননে দখলদারত্ব ও সংঘাত আরো বাড়ার কারণে পশ্চিম এশিয়া বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক ও স্পর্শকাতর সময়গুলোর একটি পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘শত শত হাজার নিরপরাধ মানুষের রক্তে হাত রঞ্জিত এবং আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারের মুখোমুখি’ একজন ব্যক্তির এই অঞ্চলে উপস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক।

ইরান বলেছে, ইসরাইলের সঙ্গে ইরান ও অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বারবার দেওয়া হুমকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের সফরের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে অঞ্চলটির সব দেশের সচেতন থাকা উচিত। এ ধরনের উপস্থিতি পুরো অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা একটি সম্মিলিত ও অবিচ্ছেদ্য বিষয়। এমন কোনো পদক্ষেপ, যা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তিকে অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়, শেষ পর্যন্ত সব আঞ্চলিক দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ায় বিভাজন, অনিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে।

এ কারণে অঞ্চলটির সরকারগুলোর প্রতি নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ‘ইসরাইলি সরকারের ধ্বংসাত্মক উপস্থিতির’ জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার এবং কোনো আঞ্চলিক দেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্মে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।

মধ্যপ্রাচ্যকে বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করল ইরান

ইসরাইলে আরো উগ্র নতুন প্রজন্মের উত্থান

অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি ফিলিস্তিনি গ্রামে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ব্যাপক হামলার ঘটনা ওই অঞ্চলে আদর্শগতভাবে উগ্র একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

কঠোরপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি শিথিলভাবে সংগঠিত আন্দোলন ফিলিস্তিনিদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে। ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্যই তরুণ। তাদের মধ্যে পশ্চিম তীরের বাইরের এলাকার কিছু স্কুলছুট তরুণও রয়েছে।

ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত এই আন্দোলনের লক্ষ্য ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ করা। এ জন্য তারা প্রতিষ্ঠিত ইসরাইলি বসতিগুলোর বাইরে পাহাড়ের চূড়ায় অনুমোদনহীন নতুন বসতি বা ‘আউটপোস্ট’ গড়ে তোলে। এসব স্থাপনা সাধারণত অস্থায়ী তাঁবু দিয়ে তৈরি করা হয়।

১৯৯০-এর দশক থেকেই পশ্চিম তীরে মূলধারার বাইরে বসবাসকারী ইসরাইলিদের বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের এই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলের স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের সমর্থনকারী ইহুদি কর্মীদের সংগঠন ‘চিলড্রেন অব আব্রাহাম’-এর ডভির ওয়ারশাভস্কি।

মঙ্গলবার ভোরে ১০০-এর বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী ফিলিস্তিনি গ্রাম জালুদে হামলা চালায়। এতে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর তিন সদস্য আহত হন।

ঘটনার সময় ইসরাইলি সেনারা একটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে সহায়তা করছিল। বসতি স্থাপনকারীদের হামলার কারণে পরিবারটি আগে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মসজিদ ও গির্জায় হামলার ঘটনাও বেড়েছে। এর জেরে ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এতে ইসরাইল ক্ষুব্ধ হয়েছে।

সম্প্রতি ‘হিলটপ ইয়ুথ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে প্রকাশিত পোস্টে দাবি করা হয়, গত ১২ মাসে এই গোষ্ঠী ১৫৮টি ফিলিস্তিনি গ্রামে ৬৩৫টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ৪০৯ জন ফিলিস্তিনি আহত এবং ৪৩৬টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও পোস্টে দাবি করা হয়। তবে এএফপি এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

এ ধরনের সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের খুব কম ক্ষেত্রেই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বসতি স্থাপনকারীদের হামলাকে ‘প্রায় ১৫০ জন কিশোর অপরাধীর’ কাজ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের অন্যান্য দেশ ফিলিস্তিনিদের সহিংসতা উপেক্ষা করছে বলেও অভিযোগ করেন।

ইসরাইল ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর দখলে রেখেছে। এই ভূখণ্ডে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে।

ইসরাইলি সরকার প্রায় ১৪০টি বসতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এসব বসতি অবৈধ। ইসরাইলি পর্যবেক্ষক সংগঠন পিস নাও-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি আইনেও অবৈধ এমন খামার ও ছোট বসতির সংখ্যা এখন প্রায় ৪০০।

বহু বছর ধরে ‘হিলটপ ইয়ুথ’-এর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা ইসরাইলি মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৫ সালে ইসরাইল গাজা উপত্যকার ২১টি এবং পশ্চিম তীরের চারটি বসতি ভেঙে দেওয়ার পর এই আন্দোলন নতুন গতি পায়।

একতরফাভাবে ওই বসতিগুলো থেকে ইসরাইলিদের সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে বসতি আন্দোলনের পুরোনো নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়। হাজার হাজার ইসরাইলিকে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ক্ষোভ আন্দোলনে নতুন একটি পর্যায়ের সূচনা করে।

এরপর আরো বেশি আদর্শনির্ভর বসতি স্থাপনকারী সামনে আসে। তারা বসতি আন্দোলনের পুরোনো কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করে। পুরোনো কৌশলের মূলনীতি ছিল—আরও বেশি মানুষ নিয়ে আরও বেশি বসতি গড়ে তোলা।

এর বিপরীতে নতুন প্রজন্ম ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ছোট ছোট অবৈধ বসতি ও কৃষি প্রকল্প গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়। এই কৌশলকে বলা হয় ‘সর্বোচ্চ জমিতে সর্বনিম্ন মানুষ’।

ভেড়া ও ছাগলের পাল চরানোর মাধ্যমে ‘হিলটপ ইয়ুথ’ ইসরাইলি সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রামীণ এলাকাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের মতো আদর্শনির্ভর বসতি স্থাপনকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনীতিকদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্প্রদায় ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এসব অর্থের কিছু অংশ অবৈধ খামার ও বসতিতে ব্যয় করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

‘পিস নাও’-এর হাগিত অফরান বলেন, অবৈধ হওয়ার কারণে সরকার সরাসরি এসব স্থাপনায় অর্থ দিতে পারে না। তবে ‘বাকি সবকিছুর জন্য তারা অর্থ দেয়’—অর্থাৎ সড়ক, টহল গাড়ি, নিরাপত্তা ক্যামেরা, সৌর প্যানেল ও ড্রোনের মতো অবকাঠামোতে অর্থ ব্যয় করা হয়। এসব বসতিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তাও দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত অনুদান ও অনলাইন গণ-অর্থসংগ্রহের মাধ্যমেও কিছু অর্থ আসে।

সেনাবাহিনীর সুরক্ষার অভিযোগ

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের কয়েকজন নেতা ‘হিলটপ ইয়ুথ’ থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। গত বছরের শেষ দিকে পশ্চিম তীরের তিনটি ইসরাইলি স্থানীয় পরিষদের প্রধান যৌথ বিবৃতি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘হিলটপ ইয়ুথ’-এর বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, এই গোষ্ঠী বৃহত্তর বসতি স্থাপনকারী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলা এবং এরপর গাজা ও অন্যান্য ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরাইলি নিয়মিত সেনাদের একটি অংশ পশ্চিম তীর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বর্তমানে ইসরাইলি বসতিগুলোর আশপাশে টহল দেওয়া সেনাদের মধ্যে অনেকেই রিজার্ভ সেনা, যারা নিজেরাও বসতি স্থাপনকারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সেনাদের তুলনায় এসব রিজার্ভ সেনা অবৈধ বসতি উচ্ছেদ বা ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কম আগ্রহী।

‘পিস নাও’-এর হাগিত অফরান বলেন, ‘সেনাবাহিনী আসলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। তারা তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে চায় না।’

ইসরাইলে আরো উগ্র নতুন প্রজন্মের উত্থান

নির্বাচনের আগে ফের হামলার শঙ্কা প্রকাশ নেতানিয়াহুর, মতলব কী?

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের ‘শত্রুরা’ হামলার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ না করায় বিরোধী নেতারা তাকে নিরাপত্তা হুমকিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। খবর দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) তেল নফ বিমানঘাঁটি পরিদর্শনের সময় ধারণ করা এক ভিডিওতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে নির্বাচনের আগে আমাদের শত্রুরা আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাই এখান থেকে, বিমানবাহিনীর ঘাঁটি থেকে, ইসরায়েলের দীর্ঘ হাতের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের একটি বার্তা দিচ্ছি; আমাদের সঙ্গে খেলবেন না, এখন নয়, কখনো নয়। আমাদের দীর্ঘ হাত যে কোনো জায়গায়, যেকোনো সময় আপনাদের কাছে পৌঁছাবে।’

তবে সম্ভাব্য হামলার ধরন বা তার কাছে থাকা ‘ইঙ্গিত’ সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত জানাননি নেতানিয়াহু।

তার বক্তব্যের পর প্রধান নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের দল ইয়াশার এক বিবৃতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে অবহিত করার দাবি জানায়। দলটি বলেছে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য সঠিক হলে লাপিদকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি, নাকি নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার রাজনৈতিক কৌশল; তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

লাপিদও নেতানিয়াহুর কাছে জরুরি নিরাপত্তা ব্রিফিং দাবি করেন। এক্সে তিনি লেখেন, হুমকিগুলো বাস্তব কি না এবং নির্বাচন যাতে কোনো বাধা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন; তা জানতে চান তিনি।

ডেমোক্র্যাটস পার্টির চেয়ারম্যান ইয়ার গোলানও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তার মতে, নিরাপত্তা হুমকি থাকলে তা বিরোধীদলীয় নেতাকে জানানো এবং জনগণের কাছে এর ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।

এদিকে কান, হারেৎজ ও আর্মি রেডিওর উদ্ধৃত নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের কোনো শত্রুপক্ষ হামলার পরিকল্পনা করছে; এমন নির্দিষ্ট কোনো হুমকি সেনাবাহিনীর কাছে নেই। এ কারণে সেনাবাহিনী সতর্কতার মাত্রা বাড়ায়নি বা কোনো এলাকায় অতিরিক্ত সেনাও মোতায়েন করেনি বলে জানানো হয়েছে।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর তার দপ্তর জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব লাপিদকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করবেন। দপ্তরটি আরও জানায়, নেতানিয়াহু নিয়মিত বিরোধীদলীয় নেতা লাপিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠক করেন এবং সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর।

তবে এতে সন্তুষ্ট না হয়ে লাপিদ চার পক্ষের বৈঠকের দাবি জানান। সেখানে নেতানিয়াহু ও তিনি ছাড়াও শিন বেতের প্রধান এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যানকে রাখার দাবি করেন তিনি।

পরে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় নেতানিয়াহু ও লাপিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সম্ভাব্য হামলার হুমকি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল গাই মার্কিজেনো এবং সামরিক সচিবালয়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিং শেষে লাপিদ বলেন, ‘জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো কারণ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা হুমকির বিষয়গুলো পেশাদার ও দায়িত্বশীলভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আইডিএফের ঘাঁটিগুলো নির্বাচনি ভিডিও তৈরির জায়গা নয়।’

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করে লাপিদ বলেন, আইডিএফের প্রধান এয়াল জামির যুদ্ধের সেনাসংকট ও সেনাবাহিনীর দুর্বলতা নিয়ে ১০টি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। নিরাপত্তা নিয়ে নেতানিয়াহু যদি এতটাই উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আইডিএফের প্রয়োজনীয় ১৫ হাজার অতি-অর্থডক্স ইহুদি তরুণকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লাপিদ বলেন, ‘যে কোনো পরিস্থিতিতেই নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে এবং কেউ তা বাধাগ্রস্ত করার অজুহাত দেখাতে পারবে না।’

তবে নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, বৈঠকে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দিক থেকে সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর বেশি কিছু জানানো হয়নি।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি অবশ্য লাপিদের সমালোচনা করে বলেছে, তিনি রাত ১১টা ৩৯ মিনিটে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান এবং মাত্র দুই মিনিট পর প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্যসংবলিত দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেন। দলটির দাবি, হয় লাপিদ ‘আলোর গতিতে’ লিখেছেন, নয়তো ব্রিফিংয়ের আগেই বিবৃতিটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তার সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বি’ইয়াখাদ পার্টির নেতা নাফতালি বেনেটও। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু একই সঙ্গে ব্যাপক সেনাসেবা এড়ানোর সুযোগ এবং আইডিএফের দুর্বলতার দিকে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন।

তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে বেনেট বলেন, নেতানিয়াহু নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করছেন, অথচ তার নিজের সরকারই ‘সবচেয়ে বড় ঝুঁকি’ তৈরি করছে। তার অভিযোগ, অতি-অর্থডক্স ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দিতে বর্তমান সরকার আইন করার চেষ্টা করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে যারা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন, তাদের ব্যর্থতার জন্য পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন বেনেট।

এদিকে মুক্ত জিম্মি মাতান জাঙ্গাউকারের মা এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাকে দায়মুক্ত করার উদ্দেশ্যে জঘন্য প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ করেন। তার দাবি, হামলার আগে বিশ্বজুড়ে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করা হলেও তিনি তা উপেক্ষা করেছিলেন।

হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার হুমকি নিয়ে শীর্ষ মন্ত্রী ও সহযোগীদের অবহিত করতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকও ডাকার পরিকল্পনা করেছিলেন নেতানিয়াহু। তবে বৈঠকটি অস্বাভাবিক একটি স্থানে আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে নেতানিয়াহু-সমর্থক ও বিরোধী দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে সমতা দেখা যাচ্ছে। টাইমস অব ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, এখন নির্বাচন হলে দুই জোটই ৫৩টি করে আসন পেতে পারে। বাকি আসনগুলোর ক্ষেত্রে দুটি আরব দলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র : দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : আইডিএফ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : আইডিএফ

৬৩–তে এসেও তরুণ! জাভেদ জাফরির বয়স–ভাঙা ফিট থাকার রহস্য

প্রকাশ ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ৬০ পেরোলে শরীর–স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত যত্ন প্রয়োজন—এ কথা অনেকে বলেন। পেশির জন্য প্রোটিন, হাড়ের জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্য ওমেগা থ্রি আর হজম ও কোষ–স্বাস্থ্যের জন্য ফাইবার, ভিটামিন বি–১২ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট—সবই জরুরি। কিন্তু এই হিসাবের বাইরে গিয়ে যাঁর নামে আজও ‘অবিশ্বাস্যভাবে ফিট’ অভিধা জুড়ে যায়, তিনি বলিউড অভিনেতা–নৃত্যশিল্পী–কমেডিয়ান জাভেদ জাফরি। ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর ৬৩তম জন্মদিন। উপলক্ষটা তাই একেবারেই আলাদা।

বয়স নয়, অভ্যাসই আসল
কার্লি টেলসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাভেদ জাফরি খোলাখুলি বলেছেন—নিয়মিত ব্যায়াম, ঘরোয়া খাবার আর স্বল্প–প্রক্রিয়াজাত খাদ্যই তাঁর ‘এজ–রিভার্সিং’ রুটিনের মূলে। দিন শুরু করেন এক লিটার গরম পানি দিয়ে। এরপর ফল—পেঁপে, আপেল, অ্যাভোকাডো, কলা। প্রাতঃরাশে থাকে চারটি ডিম, সঙ্গে বাদাম–আখরোট, ব্লুবেরি, কখনো রাগির রুটি। দুপুরে সালাদ, রাতে সাধারণ ঘরোয়া খাবার। ধূমপান–মদ একেবারেই নয়। আর নাচ—যেটা তাঁর জীবনেরই অংশ।

পুষ্টিবিদের চোখে এই ডায়েট
পুষ্টিবিদ সঞ্জনা মালহোত্রা ও এডউইনা রাজের বিশ্লেষণে জানা যায়, প্রতিদিন চারটি ডিমের সঙ্গে বাদাম–আখরোট মিলিয়ে জাভেদ পাচ্ছেন পর্যাপ্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ভিটামিন বি–১২, যা বয়সের সঙ্গে পেশিশক্তি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফল দিচ্ছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি, যা ত্বক, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও কোষ মেরামতে সহায়ক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমের সংখ্যার চেয়ে বড় বিষয় পুরো জীবনযাপন—যেহেতু জাভেদ নিয়মিত শরীরচর্চা করেন এবং ধূমপান–মদ্যপান নেই, তাই এই ডায়েট তাঁর ক্ষেত্রে সমস্যার নয়।

বাবার ছায়া নয়, নিজস্ব আলো
বিখ্যাত অভিনেতা জগদীপের পুত্র হওয়া সত্ত্বেও বাবার নাম ভাঙিয়ে চলেননি জাভেদ। মা ছিলেন বেগম জাফরি, ভাই নাভেদ জাফরি—যাঁর সঙ্গে ‘বুগি উগি’ শো–তে বিচারকের ভূমিকায় জাভেদ টেলিভিশনের ইতিহাসে আলাদা ছাপ রেখেছেন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা মধুর ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই দূরত্বে সেতু তৈরি হয়েছে, গড়ে উঠেছে সুসম্পর্ক।

কমেডি, অভিনয় আর নাচ—এক শরীরে বহু প্রতিভা
তুখোড় কমিক টাইমিং, কিন্তু অভিনয়েও সমান দক্ষ। প্রধান চরিত্র খুব একটা না পেলেও ছোট ছোট চরিত্রে নিজের আলাদা জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন জাভেদ। টেলিভিশন, সিনেমা, ওয়েব সিরিজ—সব ফরম্যাটেই সাবলীল। নৃত্যশিল্পী হিসেবেও তিনি অনন্য। ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে চেনে ‘মাল্টি–ট্যালেন্টেড’ তারকা হিসেবেই।
১৯৮৫ সালে অনিল কাপুর অভিনীত ‘মেরি জং’ ছবির মধ্য দিয়ে বলিউডে তাঁর যাত্রা। সেখানেই নাচে তাঁর পারদর্শিতা চোখে পড়ে। এরপর ‘জ জন্তরম ম মন্তরম’, ‘ম্যায় প্রেম কি দিয়ানি হুঁ’, ‘সলাম নামস্তে’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘ধমাল’—একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে তিনি নিজের মতো করে দাগ কেটেছেন।

১৯৯৬ সালে ভাই নাভেদ ও রবি বহেলের সঙ্গে শুরু করেন নাচের রিয়েলিটি শো ‘বুগি উগি’—যা সে সময় টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে। অভিনয়ের বাইরে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তাঁর সুনাম আছে—হিন্দি ডাবিংয়ে ‘মিকি মাউস’ থেকে শুরু করে ‘ডন কারনেজ’, এমনকি ‘সপনে’ ছবিতে প্রভু দেবার কণ্ঠও ছিলেন জাভেদ।

কাজই জীবন
৩৫০টির বেশি ছবিতে কাজ করেছেন জাভেদ। রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছিলেন—২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির প্রার্থী হিসেবে। তবে প্রচারের আলো থেকে পরিবারকে দূরেই রাখতে চান। স্ত্রী হবিবা, তিন সন্তান—ছেলে মিজান বলিউডে পা রেখেছেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে না বললেও সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গেও যুক্ত জাভেদ। অবসরে বিশ্বাস নেই তাঁর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যেতে চান।

৬৩–তে দাঁড়িয়েও যিনি প্রমাণ করছেন—বয়স কেবল সংখ্যা, আসল পরিচয়টা গড়ে ওঠে অভ্যাসে, শৃঙ্খলায় আর কাজের প্রতি ভালোবাসায়—তাঁর ৬৩তম জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-04%2Fcqdkr9d4%2FWhatsApp-Image-2025-12-05-at-00.10.21a6221d68.jpg?rect=31%2C0%2C482%2C321&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অভিনেতা–নৃত্যশিল্পী–জাভেদ জাফরি। ফেসবুক থেকে

হাসিনের সুর ও সংগীতে কনার ‘নীরবে’

প্রকাশ পেয়েছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনার নতুন গান ‘নীরবে’। এটি নতুন প্রজন্মের সংগীত পরিচালক হৃদয় হাসিনের পরিকল্পনায় শুরু হওয়া বিশেষ সংগীত প্রজেক্ট ‘হৃদয় হাসিন ফিচারিং ভ্যারিয়াস আর্টিস্টস’-এর প্রথম গান। গানের কথা লিখেছেন সৈয়দা হেমা এবং সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন হৃদয় হাসিন।

গানটি নিয়ে কনা বলেন, ‘গানটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। অনেকটা নব্বই দশকের ব্যান্ড সংগীতের আমেজ পাওয়া যায় এতে, যা আমার বিশেষভাবে পছন্দের। কথাগুলোও সুন্দরভাবে লেখা হয়েছে। আর হাসিনের কাজ আমার বরাবরই ভালো লাগে। সবমিলিয়ে আমি আশাবাদী গানটি শ্রোতাদের ভালো লাগবে।’

অন্যদিকে হৃদয় হাসিন জানান, কনাকে মাথায় রেখেই এই গানটি তৈরি করেছেন তিনি। গানটি নিয়ে হাসিন বলেন, ‘কনা আপু আমার প্রিয় একজন শিল্পী ও মানুষ। রেট্রো ক্লাসিক ধাঁচের এই গানটা ওনাকে ভেবেই করা হয়েছে। আশা করছি শ্রোতারা আমাদের এই প্রচেষ্টা ভালোভাবে গ্রহণ করবেন।’

হৃদয় হাসিন আরও জানান, হৃদয় হাসিন ফিচারিং ভ্যারিয়াস আর্টিস্টস’ তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের প্রজেক্ট। বহু পরিকল্পনার পর অবশেষে প্রথম সিজন শুরু হলো। প্রথম সিজনে কনার পাশাপাশি আরও গান গেয়েছেন সংগীতশিল্পী লিজা ও নদী। প্রতিটি গানেই ভিন্নতা আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে শ্রোতারা নতুন ধরনের স্বাদ পান।

কনার গাওয়া ‘নীরবে’ গানটি ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে হৃদয় হাসিনের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে। পর্যায়ক্রমে প্রথম সিজনের অন্যান্য গানও একই চ্যানেল থেকে প্রকাশ করা হবে। 

হৃদয় হাসিন ও দিলশাদ নাহার কনা। ছবি : সংগৃহীত
হৃদয় হাসিন ও দিলশাদ নাহার কনা। ছবি : সংগৃহীত

Tuesday, September 29, 2026

ভারত-ইসরাইলের তৈরি অস্ত্রে নৃশংসতার শিকার গাজা-কাশ্মীর

২০২৬ সালের জুলাইয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব উইপনস অ্যান্ড অ্যামুনিশনস টু ইসরাইল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান চলাকালে ভারত কয়েক লাখ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের উপাদান ইসরাইলে পাঠিয়েছে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে, এসব রপ্তানি ইসরাইলের চলমান ‘গণহত্যায়’ অবদান রাখার ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরি করছে।

তবে প্রাণঘাতী প্রযুক্তি ও অস্ত্র কীভাবে রপ্তানি বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, বিপদ শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আরো বড় আশঙ্কা তৈরি হয় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে, তা থেকে।

এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ ভারতের দিল্লিতে দেখা গেছে। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংসদ অভিমুখে মিছিল করলে তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করে। এতে অন্তত ১০ জন বেসামরিক মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে এক তরুণের স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

কাশ্মীর থেকে নয়াদিল্লিতে জনতা নিয়ন্ত্রণে পেলেট গানের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো যুদ্ধক্ষেত্রই একসময় অস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। কোনো একটি জায়গায় যে অস্ত্রের ব্যবহার বৈধতা পায়, তা সেখানেই আটকে থাকে না।

ভারত ২০১০ সালে কাশ্মীরে জনতা নিয়ন্ত্রণে পেলেট গান ব্যবহার শুরু করে। তখন এটিকে ‘প্রাণঘাতী নয়’ বা ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এতে ২৪ জন নিহত হন। ২০১৬ সালে সশস্ত্র সংগঠনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানির নিহত হওয়ার পর ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তা দমনে পেলেট গানের ব্যাপক ব্যবহার হয়। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনাও ওই সময়ের পর ঘটে।

২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধাতব পেলেটের আঘাতে ১৮ জন নিহত, ১৩৯ জন অন্ধ এবং ২ হাজার ৯৪২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ১ হাজার ৪৫৯ জনের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে।

পেলেট গান সাধারণত দশমিক ১২-বোরের পাম্প-অ্যাকশন শটগান, যা মূলত পাখি শিকারে ব্যবহৃত হয়। এতে এমন কার্তুজ ব্যবহার করা হয়, যার ভেতরে কয়েক শ ধাতব পেলেট থাকতে পারে। গুলি ছোড়ার পর এসব পেলেট একটি নির্দিষ্ট লক্ষে একক প্রজেক্টাইলের মতো না গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিটি কার্তুজে কয়েক শ ছোট পেলেট থাকতে পারে। গুলি ছোড়ার পর এগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিটার গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জনতার মধ্যে একটি গুলিতেই একাধিক মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন।

অর্থাৎ, এই অস্ত্র লক্ষ্য বাছাই করে আঘাত করে না। নির্দিষ্ট পাল্লার মধ্যে থাকা যে কেউ এর শিকার হতে পারেন। কাশ্মীরে পেলেটের আঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা এবং আক্রান্তদের পরিচয়—জানালার পাশে বসে থাকা এক কিশোরী কিংবা মায়ের কোলে থাকা একটি শিশুও এর শিকার হয়েছে। এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, কথিত সহিংস বিক্ষোভকারী আর ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অস্ত্র কোনো পার্থক্য করে না।

পুরোনো ক্ষত আবারো খুলছে

পেলেট গানের ভয়াবহতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়, যদি এর শিকার হওয়া মানুষের জীবন কীভাবে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বিবেচনায় না নেওয়া হয়।

‘কম প্রাণঘাতী’ হিসেবে পরিচিত হলেও পেলেটগুলো এতটাই ধারালো যে তা চামড়া ভেদ করে শরীরে আটকে থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর কারণে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হয়। অনেক সময় এসব পেলেট স্থায়ী অন্ধত্বের কারণও হয়েছে। এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। কিছু ক্ষেত্রে আঘাতের কারণে মৃত্যুও ঘটেছে।

তারপরও কাশ্মীরে পেলেট গানের ব্যবহারকে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক একটি কৃত্রিম জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

শত শত মানুষের অন্ধত্ব, বহু মানুষের মৃত্যু এবং অনেকে স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র এই অস্ত্রকে ‘প্রাণঘাতী নয়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এতে দেশজুড়ে বড় ধরনের প্রতিবাদ বা ক্ষোভ দেখা যায়নি। কাশ্মীরকে ‘ব্যতিক্রমী অঞ্চল’ হিসেবে দেখার দীর্ঘদিনের প্রবণতা ভুক্তভোগীদের নিয়ে উপহাসের পরিবেশও তৈরি করেছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে আসন্ন বলিউড চলচ্চিত্র ‘চৌহান’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র মতো যুক্তি দেখিয়ে পেলেট গানের ব্যবহারকে সমর্থন করা হয়েছে। অথচ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ নেই; বরং এটি ব্যবহার করা হয়েছে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরাপত্তা কৌশল থেকে নেওয়া এবং বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে একটি অঞ্চলের জন্য তৈরি করা এই নিরাপত্তা-নীতি এখন অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ছে।

সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস

দিল্লিতে ব্যবহারের আগে ভারতের কৃষক আন্দোলন এবং মণিপুরেও পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এর ব্যবহার দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। তখন বলা হয়, ‘তারা শিক্ষার্থী, সন্ত্রাসী নয়।’

কিন্তু যে জনগোষ্ঠীকে জাতীয় কল্পনায় ইতোমধ্যেই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একাকার করে দেখা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই যুক্তি কখনো একইভাবে প্রয়োগ করা হয় না। কাশ্মীর, মণিপুর কিংবা পাঞ্জাবের কৃষকদের ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য দেখা যায়। অর্থাৎ, নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতি সবার জন্য সমান নয়; পরিচয়ের ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হয়।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, পেলেটের আঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এখনো পুরোনো কৌশলের ওপর নির্ভর করছে। সরাসরি অস্বীকারের বদলে প্রশ্ন ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু জবাবদিহির ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো—যে দলটি ২০১০ সালে ভারতে পেলেট গান চালু করেছিল—কে এই অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল এবং কেন দিয়েছিল, তা জানতে চাইছে। কিন্তু ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে জবাব দেননি।

জবাবদিহির অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই পেলেট গান কিংবা ‘প্রাণঘাতী নয়’ হিসেবে পরিচিত অন্য অস্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত থাকার পথ তৈরি করে। কাশ্মীরে ২০১০ সালে কাঁদানে গ্যাসের শেল সরাসরি শরীরের ওপরের অংশে নিক্ষেপের ঘটনায় তরুণদের নিহত হওয়ার নথিভুক্ত ঘটনাও রয়েছে।

এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্টও পেলেট গান ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। বরং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও নির্ধারিত মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতির মধ্যে কোথায় ফারাক রয়েছে, তা পরীক্ষা করার দিকে বিষয়টি ঘুরিয়ে দিয়েছে।

তবে জনতা নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে কি না—এই প্রশ্ন শুধু সেই সীমার মধ্যে রাখলে বিতর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘প্রাণঘাতী নয়’ বা ‘কম প্রাণঘাতী’ হিসেবে পরিচিত হলেও যেসব অস্ত্র মানুষকে হত্যা করতে পারে, সেগুলোর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, একটি অঞ্চলে তৈরি হওয়া সহিংসতার দৃষ্টান্ত কীভাবে অন্য অঞ্চল এবং শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে

পেলেট গান ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘দ্য ট্রাবলস’ নামে পরিচিত প্রায় ৩০ বছরের সহিংস সংঘাতে রাবার ও প্লাস্টিকের পেলেট ছোড়ার শটগান ব্যবহার করা বিশ্বের প্রথম পরিচিত উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশও জনতা নিয়ন্ত্রণে এর অনুরূপ অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে।

পেলেট গানসহ অন্যান্য কথিত ‘প্রাণঘাতী নয়’ অস্ত্র ফিলিস্তিনেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভারত ইসরাইলের কাছ থেকে এই দমন-পদ্ধতি গ্রহণ করেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা দেশের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

২০১৯ সালে চিলিতে পেলেটের আঘাতে ২৩০ জন দৃষ্টিশক্তি হারান। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে এর ব্যবহারে ২২ জন শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারী নিহত এবং ৪০০ জন অন্ধ হয়ে যান। সাম্প্রতিক ইরানের বিক্ষোভেও পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পেলেটের আঘাতের অন্তত ৭৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এক ব্যক্তির ডান বুকের ভেতরে ঘনভাবে আটকে থাকা ১৭৪টি পেলেটের আঘাতে তার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পেলেট গান আরো একবার দেখিয়ে দেয়, প্রথমবার কোনো ভুল যুক্তি বা অজুহাতকে চ্যালেঞ্জ না করা হলে রাষ্ট্রগুলো কত দ্রুত শিখে যায় যে বেসামরিক মানুষকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

পারমাণবিক হামলা হয়তো বিরল ব্যতিক্রম। কিন্তু সাদা ফসফরাস ও ড্রোন হামলার মতো অস্ত্র ব্যবহারের বহু উদাহরণ রয়েছে, যা একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে—এক জায়গায় যে অস্ত্র বা কৌশল ব্যবহার করা হয়, তা সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী কোনো কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দায়মুক্তির আড়াল চাইলে সেটি অন্য জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

ভারত-ইসরাইলের তৈরি অস্ত্রে নৃশংসতার শিকার গাজা-কাশ্মীর
পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

দুই দশক ও ৪৫০০ সেনা হারানোর পর অবশেষে ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী

দুই দশকেরও বেশি সময়ের যুদ্ধ ও প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার প্রাণহানির পর অবশেষে ইরাক ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। বুধবারের মধ্যে ইরাকে থাকা মার্কিন বাহিনীর শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিদায়কে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে ইরান ও দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, যারা এরই মধ্যে ইরাকে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।

ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা রয়টার্সকে বলছেন, ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে নেওয়া প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বাস্তবায়ন করছে। এমনকি একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে গেলে ইরান ও তার শক্তিশালী মিত্ররা ইরাকে আরও অবাধে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেটসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিপক্ষও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।

ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গবেষণা করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়ে কৌশলগতভাবে লাভবান হবে ইরান। কারণ, বহু বছর ধরে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি।

তার মতে, ইরানপন্থি মিলিশিয়াগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।

ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন প্রত্যাহারকে ‘ইরাকি ইসলামিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সম্মানিত ইরাকিদের ঐতিহাসিক বিজয়’ এবং ‘আমেরিকান প্রকল্পের চরম পরাজয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘৩০ সেপ্টেম্বর আমরা ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান এবং আমাদের দেশের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার দখলদারিত্বের ব্যর্থতা উদযাপন করব।’

‘ইরাক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়’

ইরাকিদের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত প্রত্যাহারের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও ইরানে সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি নিয়ে উদ্বিগ্নদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই মুহূর্তে প্রত্যাহারটি আগাম হয়ে যাচ্ছে।

এক সময় মার্কিনবিরোধী প্রতিরোধের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে ইরাক নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি নেওয়ার জন্য এখনো প্রস্তুত নয়।’

রয়টার্সকে তিনি বলেন, সব ইরাকি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চান এবং এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এভাবে চলে গিয়ে যে শূন্যতা তৈরি করছে, সেটিই ইরাকিদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

২০০৩ সালে সুন্নি মুসলিম স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে দেশটি দখলে নিয়ে শিয়াপন্থি নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্রোহ দমনে লড়াই চালায়। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন বাহিনী ইরাক সেনা থেকে প্রত্যাহার করে।

তবে এর তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করতে আবারও দেশটিতে ফিরে আসে মার্কিন সেনারা। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চলা বড় ধরনের সামরিক অভিযানে ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এ নিহত মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা আফগানিস্তানে একই সময়ে চলা যুদ্ধে নিহতের প্রায় দ্বিগুণ। আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে আকস্মিকভাবে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক এমন একমাত্র দেশ হিসেবে টিকে ছিল, যার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান; উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। কখনো কখনো ইরাকি ভূখণ্ডই দুই পক্ষের পরোক্ষ সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। এর পর ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বারবার ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

চলতি বছরের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে অবস্থানরত ছিলেন। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন।

ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয়

পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়াই নিজেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে দাবি করে আসছে ইরান। দেশটি ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকে আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গঠিত নিজেদের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে দেখছে।

সোমবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম বলেন, আমেরিকান সেনারা ইরাক ও অঞ্চলটি ছেড়ে গেলে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, ‘ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান স্বাগত জানায় এবং নিঃসন্দেহে এটিকে সমর্থন করবে। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার মধ্যে কখনো কখনো মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা ও তাদের সঙ্গে সংঘর্ষও রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়াগুলো তেহরানের নির্দেশনায় বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ভূমিকা রাখছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। চলতি মাসে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে। তবে বাগদাদ সরকার বলছে, তারা এসব গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।

মার্কিন বাহিনী সরে গেলে কী ফিরবে আইএস?

ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলছেন, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ায় ইসলামিক স্টেটও নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

প্রায় এক দশক আগে নিজেদের ঘোষিত ‘খিলাফত’ পরাজিত হলেও গোষ্ঠীটির এখনো ঘুমন্ত সেল বা গোপন নেটওয়ার্ক রয়েছে। একসময় তারা ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেছিল এবং হাজারো মানুষকে হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে এমন কয়েক শ মানুষও ছিলেন, যাদের হত্যার ভিডিও নিজেরাই ধারণ করেছিল গোষ্ঠীটি।

কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ সহায়তা ও ড্রোনের সহযোগিতা না থাকায় ইসলামিক স্টেট নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জোটের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশের পর গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়ে ইসলামিক স্টেটের ঘুমন্ত সেলগুলোর তৎপরতা তারা লক্ষ্য করেছেন। তার মতে, এতে ওই যোদ্ধাদের মনোবল বেড়েছে।

ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইসলামিক স্টেটের একটি সন্দেহভাজন সেল। চারজন ইরাকি নিরাপত্তা ও সেনা কর্মকর্তা বলেন, এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে; বছরের পর বছর সামরিক পরাজয়ের পরও নিরাপত্তার দুর্বলতা কাজে লাগানোর সক্ষমতা গোষ্ঠীটির রয়েছে।

কৌশলগত তেলনগরী কিরকুকের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, ‘ইসলামিক স্টেট বোঝাতে চাইছে, তারা এখনো শক্তিশালী এবং রক্তক্ষয়ী হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’

সূত : রয়টার্স

ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল হেলিকপ্টারে চড়ছেন। ছবি: ইউএস আর্মি
ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল হেলিকপ্টারে চড়ছেন। ছবি: ইউএস আর্মি

মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের স্পিকারের

ইরান তেল বিক্রি করতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই তেল বিক্রি করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফ। মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন।

গালিবাফ বলেন, ‘যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারব না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না।’ ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ওই অঞ্চলের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। ইরান হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে দাবি করছে।

এর আগে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছিল, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শূন্যে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের সহায়তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, অবরোধের কারণে ইরান নিজে তেল রপ্তানি করতে পারেনি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান আরও কঠোর করে গালিবাফ বলেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো ও সম্পদও পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য সাত দিনের মধ্যে খুলে দেওয়ার ইরানি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানের দেওয়া শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ইরানের প্রস্তাবে হিমায়িত সম্পদ ছাড়, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বন্ধের দাবি করা হয়েছে। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পাশাপাশি চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়েছে।

তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা হরমুজ পুনরায় খুলতে তেহরানের শর্ত পূরণের বিষয়ে নতুন কিছু প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরবে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। তাই এটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফ। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফ। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

বিশ্বজুড়ে ৮০০ মার্কিন ঘাঁটির কোনো প্রয়োজন নেই: আইআরজিসি

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি। একই সঙ্গে মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। খবর আলজাজিরার।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মোহেবি বলেন, ‘আমেরিকানরা আমাদের অঞ্চল সম্পর্কে জানেন না। আমাদের তাদের সঙ্গে কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন। আমরা মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্রস্তুত এবং তারাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ৮০০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কোনো কারণ নেই।’

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বার্ষিক বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ বলেও দাবি করেন আইআরজিসির এই মুখপাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের শাসকেরা নিজেদের জনগণের কথা ভাবেন না; এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, দেশটির ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো চেষ্টা করছে না বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি। মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মোহেবি বলেন, ‘ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করেনি এবং এ অবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

একই সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি তাদের সরকারকে প্রশ্ন করার আহ্বান জানান তিনি; কেন আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে ইরান ও অঞ্চলটিতে ‘লুটপাট’ ঠেকানোর ভূমিকা দায়ী বলে দাবি করেন মোহেবি।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘অপরাধের’ অভিযোগও তোলেন তিনি। তার দাবি, স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গির্জায় হামলার মতো কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মার্কিন নাগরিকরা অবগত নন।

মার্কিন নেতৃত্বের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে কি না; এমন প্রশ্নও তোলেন আইআরজিসির মুখপাত্র। তিনি বলেন, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলায় যে অর্থ ব্যয় করে তার মাত্র ১০ শতাংশ খরচ করলেও দেশটি জনপ্রিয় একটি দেশে পরিণত হতো।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি।

মোহেবি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জনগণকে লুট করতে এবং আমাদের মাতৃভূমিকে বিভক্ত করতে চায়। মার্কিন জনগণের উদ্দেশে আমাদের বার্তার লক্ষ্য সত্য তুলে ধরা, আমেরিকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করা নয়।’

ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানে হামলার পেছনে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। মোহেবি বলেন, ‘তাদের বিষয় হলো ইরানি জনগণ ও ইরানের সম্পদ লুট করা। তাদের লক্ষ্য ইরানকে খণ্ডিত করা। তাদের নিয়ন্ত্রণে ইরানকে আবার একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই তাদের উদ্দেশ্য। তারা নিজেরাও জানে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘বড় মিথ্যাবাদী’ আখ্যা দিয়েছেন আইআরজিসির এই মুখপাত্র। মার্কিন জনগণকে সত্য জানানো প্রয়োজন উল্লেখ করে মোহেবি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাওয়া উচিত।

সূত্র : আলজাজিরা

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি। ছবি: আইআরআইবি
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি। ছবি: আইআরআইবি

মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন ট্রাম্প

আল জাজিরাকে বিশ্লেষকঃ ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উদ্বিগ্ন এবং রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতি কমানোর পথ খুঁজছেন বলে মন্তব্য করেছেন এক বিশ্লেষক।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সরকারি প্রশাসনের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প ভাবছেন না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার মতে, নির্বাচনে যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে ট্রাম্প স্পষ্টতই আগ্রহী এবং রিপাবলিকান পার্টির ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমানোর চেষ্টা করছেন।

মঙ্গলবার আল জাজিরা মাসগ্রেভের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। তাতে তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। এ জন্য তিনি পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন বলেও মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।

মাসগ্রেভের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে ইরানেরও ‘বেশ পরিণত ধারণা’ রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইরানকে ঘিরে নানা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে তেহরান।

তিনি ১৯৮০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তার মতে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের পুনর্নির্বাচন প্রচারে ইরানের সঙ্গে জিম্মি সংকট ও উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব পড়েছিল।

মাসগ্রেভ বলেন, ইরান হয়তো মনে করছে, ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ধরনের নির্বাচনী পরাজয় এড়াতে ট্রাম্পের আগ্রহ তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই কারণে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও ভালো কোনো সমঝোতা আদায় করা সম্ভব বলে মনে করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে এগুলো বিশ্লেষকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদনে স্বাধীন কোনো প্রমাণ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি

২ মেয়াদে ট্রাম্পের ৮৫০০টির বেশি মিথ্যা দাবি নথিভুক্ত করেছেন সিএনএনের সাংবাদিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ফ্যাক্টচেক করতে গিয়ে গত ১০ বছরে ৮ হাজার ৫০০টির বেশি মিথ্যা দাবি নথিভুক্ত করেছেন সিএনএনের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল। দীর্ঘ এক দশকের অভিজ্ঞতায় ট্রাম্পের মিথ্যাচারের ধরন, এর রাজনৈতিক প্রভাব এবং গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ১৫টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন তিনি।

১০ বছর আগে টরন্টো স্টারের ওয়াশিংটন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সময় ট্রাম্পকে ফ্যাক্টচেক করার কাজ শুরু করেন ডেল। তখন ট্রাম্প ছিলেন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা প্রার্থী। তার বক্তব্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় অসত্য তথ্য থাকলেও সেগুলোর খুব কমই যাচাই করে প্রকাশ্যে সংশোধন করা হচ্ছিল।

ডেল ভেবেছিলেন, ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে যাবেন এবং তার এই ছোটখাটো প্রকল্পও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হন এবং পরবর্তী এক দশকেও বিভিন্ন বিষয়ে বারবার অসত্য দাবি করতে থাকেন।

ডেল বলেন, ট্রাম্পের ধারাবাহিক অসত্য বক্তব্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ভোটার, কংগ্রেস সদস্য, মিত্র, প্রতিপক্ষ, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী; সবাইকে এমন একজন রাজনীতিকের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করতে হচ্ছে, যার কথার বড় একটি অংশ প্রায়ই সত্যের সঙ্গে মেলে না।

২০২০ সালের নির্বাচনের দুই মাস আগে প্রতিটি ট্রাম্প বক্তব্য ফ্যাক্টচেক করার চার বছরের প্রকল্পটি বন্ধ করতে বাধ্য হন ডেল। কারণ, ট্রাম্প এত বেশি মিথ্যা দাবি করছিলেন যে সবগুলো যাচাই করতে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনও সম্ভব হচ্ছিল না। ততদিনে সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে তিনি ট্রাম্পের ৮ হাজার ৫০০টির বেশি মিথ্যা দাবি নথিভুক্ত করেছিলেন।

২০২১ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর কিছু সময়ের জন্য তাকে ফ্যাক্টচেক করা থেকে বিরতি নেন ডেল। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসেন। ২০২২ সালে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া ভাষণেই ডেল ২০টির বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি শনাক্ত করেন।

২০১৯ সালে সিএনএনে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে তথ্য ও মিথ্যার পার্থক্য তুলে ধরাই তার প্রতিবেদনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে শত শত ঘণ্টা কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যে ১৫টি বিষয় পেয়েছেন, তা তুলে ধরা হলো।

ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের মতো মিথ্যাবাদী আর নেই

ডেলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জো বাইডেন, জেডি ভ্যান্স, কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্য কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্যরাও কখনো কখনো মিথ্যা বলেন। কিন্তু ট্রাম্পের মতো ধারাবাহিকভাবে, প্রকাশ্যভাবে এবং এত বিপুলসংখ্যক বিষয়ে মিথ্যা বলা ওয়াশিংটনের অন্য কোনো রাজনীতিকের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

সংকট যত বড়, মিথ্যাও তত বেশি

রাজনৈতিক সংকটে পড়লেই ট্রাম্পের মিথ্যা বলার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে মনে করেন ডেল। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ২০১৯ সালের ইউক্রেন কেলেঙ্কারি, ২০২০ সালের করোনা মহামারি এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন; প্রতিটি বড় রাজনৈতিক সংকটের সময় ট্রাম্পের মিথ্যা বক্তব্যের প্রবাহ আরও বেড়েছিল।

ছোট মিথ্যাগুলোই ট্রাম্পকে আলাদা করে

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা বলা রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ট্রাম্প এমন বিষয়েও মিথ্যা বলেছেন, যেগুলোর কোনো রাজনৈতিক গুরুত্বই নেই। যেমন, বয় স্কাউটসের কাছ থেকে একটি ফোন পাওয়ার দাবি, মিশিগানের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পাওয়ার দাবি কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে খালি আসন ছিল কি না; এসব বিষয় নিয়েও তিনি অসত্য গল্প বলেছেন।

অনেক মিথ্যাই বারবার ফিরে আসে

ট্রাম্পের একই মিথ্যা বারবার পুনরাবৃত্তি করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে প্রথমবার কোনো বক্তব্য যাচাই করতে সময় লাগলেও দশম বা শততমবার সেটি যাচাই করা অনেক সহজ হয়ে যায়। ডেলের মতে, কিছু মিথ্যার ক্ষেত্রে সত্যিই শততমবারও একই দাবি করতে দেখা গেছে ট্রাম্পকে।

মিথ্যা বলার কিছু ‘সংকেত’ রয়েছে

ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন কিছু পুনরাবৃত্ত ধরন রয়েছে, যা ডেলের মতে অসত্য গল্পের ইঙ্গিত দিতে পারে। যেমন, কোনো নাম না জানা ব্যক্তি তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছেন; এ ধরনের গল্প। একইভাবে শ্রমজীবী শক্তসমর্থ পুরুষেরা তার সামনে কেঁদেছেন কিংবা তার কোনো সমালোচক পরে তার কাছে এসে সাহায্য চেয়েছেন; এ ধরনের গল্পও তিনি প্রায়ই বলেন। এসব গল্পে ট্রাম্পকে এমন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সামনে অন্যরা নত হয়।

ট্রাম্পের দেওয়া সংখ্যাগুলো নিয়ে সন্দেহ থাকে

জরিপ, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানির দাম, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা জনসমাগম; বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রায়ই ভুল সংখ্যা ব্যবহার করেন বলে ডেল উল্লেখ করেছেন। এমনকি সঠিক পরিসংখ্যান তার জন্য ইতিবাচক হলেও তিনি এমন সংখ্যা বেছে নেন, যা তাকে আরও ভালো অবস্থানে দেখায়।

শুধু মিথ্যা ছড়ান না, নিজেও মিথ্যা তথ্য বিশ্বাস করেন

ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বহু মিথ্যা তৈরি করেছেন। তবে ডেলের মতে, অন্যদের তৈরি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও তিনি প্রায়ই গ্রহণ করেন এবং সেগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেন বলে মনে হয়। ফলে তিনি শুধু ভুল তথ্যের উৎস নন, অন্যদের ছড়ানো ভুল তথ্যের ভুক্তভোগীও হতে পারেন।

ফ্যাক্টচেক সম্পর্কে জানেন, কিন্তু গুরুত্ব দেন না

ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে তার বক্তব্যকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সংশোধনের পরও তিনি একই দাবি আবার করেছেন। ডেল উদাহরণ হিসেবে ট্রাম্পের সেই দাবির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন জো বাইডেনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। বিষয়টি ভুল বলে জানানো হলেও ট্রাম্প পরে একই দাবি পুনরায় করেন।

এখন মিথ্যা বলায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা লোকজনই তাকে ঘিরে আছেন

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা তার মিথ্যা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে তার চারপাশে এমন অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা প্রকাশ্যে তার ভুল দাবিকেও সঠিক বলে সমর্থন করেন; এমনটাই ডেলের পর্যবেক্ষণ।

গণমাধ্যমও ট্রাম্পের মিথ্যাচার যথেষ্ট ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি

ট্রাম্পপন্থি গণমাধ্যমগুলো তার মিথ্যা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। তবে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ গণমাধ্যমও অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে। ডেলের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে মিথ্যা থাকলেও সংবাদ প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয় না, কিংবা তার বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃত করা হলেও কেন তা ভুল; সেটি ব্যাখ্যা করা হয় না।

এর পেছনে পুরোনো সাংবাদিকতার অভ্যাস, ট্রাম্পের তৈরি করা বিপুলসংখ্যক তাৎক্ষণিক সংবাদ এবং সংবাদকর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ট্রাম্প হলেন কম্পিউটার হ্যাকারদের ডিনায়াল-অফ-সার্ভিস অ্যাটাকের মানব সংস্করণ, যা সিস্টেমগুলোকে তাদের ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি ভুল তথ্যে প্লাবিত করে।

আর একজন রাজনীতিক বছরে একবার বড় মিথ্যা বললে সেটি বড় খবর হয়। কিন্তু একই ব্যক্তি বছরের পর বছর প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য মিথ্যা বললে সেগুলো ধীরে ধীরে সংবাদ না হয়ে ‘পটভূমির শব্দে’ পরিণত হয়।

অনেক মানুষ ট্রাম্পের মিথ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন

ট্রাম্পের মিথ্যাচার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ডেল জানান, শ্রোতাদের কাছ থেকে তিনি প্রায়ই শুনেছেন, ‘কেউ কি আসলেই এসব নিয়ে চিন্তা করে?’ তার মতে, এই ধারণাও সঠিক নয়। লাখো মার্কিন নাগরিক মূলধারার গণমাধ্যমের ফ্যাক্টচেক বিশ্বাস না করলেও আরও লাখো মানুষ প্রেসিডেন্ট কখন এবং কীভাবে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন, তা জানতে আগ্রহী।

আবার অনেকে মিথ্যা বলাকে খারাপও মনে করেন না

২০১৭ সালে ট্রাম্পের সমর্থক অধ্যুষিত ওহাইওর দুটি এলাকায় প্রতিবেদন করতে গিয়ে ডেল এমন মানুষের দেখা পেয়েছিলেন, যারা শুধু ট্রাম্পের মিথ্যাচারে বিরক্ত নন; বরং তা পছন্দও করেন। কারণ, তাদের ধারণা ছিল ট্রাম্প প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন। ডেলের মতে, ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি অংশ হয়তো তার মিথ্যাচার সম্পর্কে জানেন না বা তার নীতিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তবে এমন একটি অংশও রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হলে অসত্য বক্তব্যকেও সমর্থন করে।

ফিল্টারহীন বক্তব্যকে অনেক সময় সততার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়

ডেলের মতে, কোনো রাজনীতিক যদি এমনভাবে কথা বলেন যেন তিনি নিজের মনের কথা সরাসরি প্রকাশ করছেন, তাহলে তার বক্তব্যের বড় অংশ অসত্য হলেও অনেক মানুষ তাকে সৎ মনে করতে পারেন। ট্রাম্পের টেলিপ্রম্পটারবিরোধী, আক্রমণাত্মক ও সরাসরি বক্তব্যের ধরনও তার একটি অংশকে তাকে অত্যন্ত সত্যবাদী হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন তিনি।

দামের বিষয়ে মিথ্যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে

সামরিক চুক্তি, কানাডার কৃষিনীতি বা কোনো ডেমোক্র্যাট নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে ট্রাম্পের ভুল তথ্য সাধারণ ভোটারের কাছে সহজে ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু যখন তিনি বলেন, তার ক্ষমতায় আসার পর সব পণ্যের দাম কমেছে বা প্রায় সব দাম দ্রুত কমছে, তখন মানুষ নিজের চোখেই বাস্তবতা দেখতে পারে। ডেলের ধারণা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের বর্তমান জনসমর্থনের দুর্বলতার সঙ্গে মূল্যস্ফীতিকে অস্বীকার করার প্রবণতারও সম্পর্ক থাকতে পারে।

মিথ্যার বাস্তব ক্ষতি রয়েছে

ডেল বলেন, ট্রাম্পের কিছু মিথ্যা এতটাই অদ্ভুত বা তুচ্ছ যে তা হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এসব মিথ্যার ক্ষতি গভীর। ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল নিয়ে তার মিথ্যা বক্তব্যের পর ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা ঘটে এবং মানুষ মারা যায়। করোনা মহামারির ভয়াবহতা নিয়ে তার বক্তব্যও মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।

ডেলের মতে, সাংবাদিক, বিচারক ও নির্বাচনকর্মীদের মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা তার বক্তব্যের কারণে হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় নিয়েও তার মিথ্যা বক্তব্য জনপরিসরের বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মিথ্যাচারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সূত্র : সিএনএন

সিএনএনের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
সিএনএনের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

সিনেমা ছাড়ার কষ্টের গল্প, কেন দেশ ছেড়েছিলেন কাজী মারুফ

প্রকাশ ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ঢালিউডে ‘ইতিহাস’ সিনেমা দিয়ে ভক্তদের কাছে জায়গা করে নেন কাজী মারুফ। একটি সিনেমা দিয়েই তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। পরে নিয়মিত কাজ করলেও এখন সিনেমা থেকে দূরে এই নায়ক। শুধু তা–ই নয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন দেশটিতে স্থায়ী হচ্ছেন। অভিমানে ঢালিউড ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয় এই নায়ক।

এক রাতে মন খারাপ করে এই নায়কের বাবা জানিয়েছিলেন, তাঁকে নায়ক হতে হবে। এমনকি তাঁর পরের ছবিতেই। হাতে খুব বেশি সময়ও ছিল না। সেদিন বাবাকে ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখে রাজি হয়ে যান মারুফ। এভাবেই বাবা কাজী হায়াতের সিনেমা দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। এই পথটা শুরুতে মসৃণ হলেও পরে তাঁকে সংগ্রাম করে ঢালিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়। পরিচালক–প্রযোজকদের কাছে সফল নাম হলেও বাবা পরিচালক হওয়ায় শুনতে হয়েছে নানা কথা।

‘পরিচালক বাবার কারণেই আপনি নায়ক হতে পেরেছেন’—এই প্রশ্ন শোনা একসময় সাধারণ বিষয় হয়ে যায়। শুরুতে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে না চাইলেও পরে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এই নিয়ে তিনি এক বছর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘অনেকেই বলেন আমার বাবা না থাকলে আমি নায়ক হতে পারতাম না। এটা তাঁরা ঠিকই বলেন। কারণ, আমি তো দেখতে নায়কদের মতো ছিলাম না। বাবা এসে বললেন সিনেমা করতে হবে, নায়ক হতে হবে। বাবার কথা ভেবে সিনেমায় নাম লেখাই। বাবার কারণেই নায়ক হয়ে যাই।’

কাজী মারুফ সিনেমায় বাবাকে ‘আব্বা সম্বোধন করেন। যা ভক্তদের কাছে পরিচিত শব্দ। এই নায়কের ভক্তদের কাছে সিনেমার ‘আব্বা’ সংলাপ যেন মারুফের ট্রেডমার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, দূর থেকেও সংলাপটি মনে করিয়ে দেয় কাজী মারুফের কথা। তাঁর ফেসবুক লাইভ বা কোনো পোস্টে ভক্তরা মন্তব্য করেন ‘আব্বা’খ্যাত অভিনেতা হিসেবে। এই নায়ক এই নিয়ে চ্যানেল আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি বাস্তবে এমনই। আব্বা আব্বাই বলি। এতে কে কী বলল মেটার করে না। আমি বাবার কাছে গৃহপালিত ছেলের মতো। আমি এভাবেই বাবার কাছে থাকতে আজীবন চাই। আমার আব্বা আছে, যাকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে আব্বা বলতে পারি।’

মান্না, শাকিব খানদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সিনেমায় সফল হন। এই নায়কের মতে, সিনেমায় যখন অশ্লীলতা চরমে, সেই সময়ে তিনি নাম লেখান। চাইলে হারিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা না হয়ে ভক্তদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন পরিচিত মুখ। ‘অশ্লীল সিনেমা তখন চরম এগিয়ে। মান্না আংকেলও পারছিলেন না সেসব সিনেমাকে ডাউন করতে। চলচ্চিত্রের বড় বড় তারকার জন্য সময়টা ছিল হতাশার, লজ্জার। কেউ কেউ ভেঙেও পড়েছিলেন’ বলেন মারুফ।

২০১২ সাল–পরবর্তী বাংলাদেশের সিনেমা ও সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। তখন ভালো সিনেমাও সেই অর্থে হচ্ছিল না বলে মনে করেন মারুফ। অন্যদিকে দেশে সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সিনেমা মুক্তি দিতে পারছিলেন না তাঁর বাবা। এসব ঘটনায় তাঁকে একসময় দেশ ছাড়তে হয়।

এই নায়ক এক লাইভে বলেন, ‘আমাদের “ছিন্নমূল” সিনেমা ১৪ ফেব্রুয়ারি (২০১৯) মুক্তির কথা ছিল। সেভাবেই টার্গেট করেছিলাম। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তি দিতে দেয়নি একটি বড় প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান। পরিচালক ছিলেন আমার আব্বা (কাজী হায়াৎ)। তাঁরা আমার আব্বাকে বলেছিলেন, আমরা রিলিজ করতে না দিলে কীভাবে রিলিজ করবেন। আমার আব্বার মতো মানুষকে এই কথা শুনতে হয়েছিল। সেদিন আব্বা বাসায় এসে বললেন, ‘‘আমি এই বয়সে যুদ্ধ করব? আমি চাই না তুমিও যুদ্ধ করো এদের সঙ্গে। চলে যাও আমেরিকা। এসব কারণেই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেছি।’

বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করছেন মারুফ। সিনেমা থেকেও তিনি দূরে। সর্বশেষ তাঁকে দেখা যায় ‘গ্রিন কার্ড’ সিনেমায়। এটি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছে। এই নায়ক ক্যারিয়ারের শুরুতে টানা পাঁচ বছর বাবা কাজী হায়াতের সিনেমায় অভিনয় করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে আরও রয়েছে অন্ধকার, অন্য মানুষ, আমার মা আমার অহংকার। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ১৯৮২ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2022-03%2Fbbed1356-f4c7-48c1-84d0-7306118762a9%2F254539455_2315266801949487_6758532090112034678_n.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাজী মারুফ এখন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া-ইরানের গোয়েন্দা সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছিল হুতিরা, এবার সেই ব্যবস্থাই হামলার মুখে

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুতিদের অগ্রযাত্রা শুধু তাদের সংখ্যাগত শক্তির কারণে হয়নি; বরং রাশিয়া ও ইরানের সমন্বিত গোয়েন্দা ও কমান্ড কাঠামো এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই কাঠামোয় রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্য ও সংকেত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরান-নেতৃত্বাধীন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর সঙ্গে তারিক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) ভেতরে মানব গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত হয়ে হুতিদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছিল বলে আলজাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী মতামতে বলা হয়েছে।

‘প্রজেক্ট অরোরাহ’ নামে একটি ভূ-স্থানিক ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য একীভূতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের ওপর রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা নজরদারির ধরণ শনাক্ত করা হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় একটি বিশেষভাবে সীমিত প্রবেশাধিকারযুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে রাশিয়ার কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতাকে একটি সমন্বিত বহুসেন্সর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আগে রুশ গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তৎপরতার ধারাবাহিকতাও এতে শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় রুশ সামরিক ভূ-স্থানিক স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়ে সিএনএনের একটি বড় অনুসন্ধানেও তা উঠে আসে।

ইরান যুদ্ধের সময়ই এর মূল কৌশলটি স্পষ্ট হয়। সেখানে কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা, নজরদারি ও অনুসন্ধান ব্যবস্থা শুধু সামরিক অভিযানকে সহায়তা করেনি; বরং হামলার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

রাশিয়ার ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বিভিন্ন বাহিনীর অবস্থান, চলাচলের পথ, সদর দপ্তর ও রসদ ব্যবস্থার পরিবর্তন শনাক্ত করে। একই সঙ্গে সংকেত গোয়েন্দা ব্যবস্থা ইলেকট্রনিক সংকেতের উৎস, যোগাযোগের ধরন এবং কমান্ড কাঠামোর সম্পর্ক চিহ্নিত করে থাকে।

স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত ব্যবহার

এই ব্যবস্থার মূল সুবিধা কোনো একটি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তথ্য সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিভিন্ন রিকনেসান্স স্যাটেলাইটের পরিপূরক ভৌগোলিক ও তড়িৎচৌম্বকীয় কাভারেজের মাধ্যমে বাহিনীগুলোর চলাচল ও কার্যক্রমের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

ইরান যুদ্ধের সময় এই সমন্বিত স্যাটেলাইট গোয়েন্দা ব্যবস্থাই দেখিয়েছিল, রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে ইরানের সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানকে আরও কার্যকর করতে পারে।

ইয়েমেনে এই গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর সমন্বয় করেছিল ইরান। রাশিয়া থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য এবং গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত করে তারিক সালেহর কমান্ড কাঠামোর বিস্তারিত চিত্র তৈরি করা হয়েছিল।

এর মাধ্যমে কোন সদর দপ্তর কার্যকর ছিল, কোথায় অবগত অবস্থান বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে মিলছিল না, কোন ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল ছিল এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের মধ্যে কোথায় কমান্ড, তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে; এসব শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পশ্চিম উপকূলে কীভাবে ভেঙে পড়ে প্রতিরোধ

এই পরিস্থিতিতেই ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সদর দপ্তরের সঙ্গে এনআরএফের কিছু ইউনিটের একটি কমান্ড চ্যানেল ছিল। অন্য একটি চ্যানেলের মাধ্যমে এসব বাহিনী নিজেদের মধ্যে এবং নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করত। দুটি ব্যবস্থাই যখন অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে, তখন ভুল তথ্য ওপরের দিকে যেতে থাকে এবং বিভ্রান্তিকর বা নিয়ন্ত্রিত নির্দেশ নিচের দিকে পৌঁছাতে থাকে।

এর প্রভাব ছিল সরাসরি। এনআরএফের এক কমান্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেও পরে সেখান থেকে সরে যান। আরেকজন জানান, এনআরএফের বাইরের একটি ইয়েমেনি বাহিনী সামরিক বিমানঘাঁটি ছেড়ে গেছে, যদিও সেখানে তখনো ওই বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। ফলে মিত্র বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে কমান্ডারদের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছায় এবং বিমান হামলার পর হতাহতের ঘটনা ঘটে।

মোখায় অবস্থানরত সৌদি বিশেষ বাহিনীর একটি টাস্কফোর্সই প্রথম বুঝতে পারে যে মাঠপর্যায়ে বাহিনীগুলোর যে অবস্থান জানানো হচ্ছে, বাস্তবে তার সঙ্গে তা মিলছে না।

সৌদি বাহিনীর বিমান হামলার প্রস্তুতি থাকলেও মিত্র বাহিনীর অবস্থান নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা না গেলে বিমানশক্তি অবাধে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর সঙ্গে আরও সমস্যা তৈরি হয় যখন এনআরএফের কয়েকটি ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় দেখতে পায়, নিবন্ধিত সদস্যদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দায়িত্বে যোগ দেননি।

জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড কয়েক মাস ধরে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বেতন পুনর্বহাল ও বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব সদস্যকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি জাবাল আল-নারকে ঘিরে সমন্বয় ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনআরএফের বিভিন্ন ইউনিট মূল হুতি বাহিনী পৌঁছানোর আগেই অবস্থান ছেড়ে যেতে শুরু করে।

মোখার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা

এই ব্যর্থতাকে এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যৌথ সৌদি-ইয়েমেনি এবং সৌদি-পাকিস্তানি জয়েন্ট টার্মিনাল অ্যাটাক কন্ট্রোলার বা জেটিএসি দলগুলোকে এখন গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় বাহিনীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

এর লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা বাহিনী এবং জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের হামলা ব্যবস্থার মধ্যে একটি যাচাইকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি সৌদি অপারেশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড লিয়াজোঁ টিমগুলো জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ইয়েমেনি বাহিনীর জনবল, অবস্থান ও প্রস্তুতির স্বাধীন যাচাই করছে।

একই সঙ্গে নির্দেশের পরিচয় যাচাই, সীমিত পরিসরে তথ্য আদান-প্রদান এবং বিকল্প এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মোখায় প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।

সৌদি আরব এর আগেও ভিন্ন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স দক্ষিণ ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) অভিযানকে সহায়তা করা আবুধাবির কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শনাক্ত ও দুর্বল করে দিয়েছিল।

তখনও মাঠপর্যায়ের অভিযান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত রাখতে যোগাযোগ ও লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। বাইরের ওই সহায়তা কাঠামো দুর্বল হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের টাস্কফোর্স ও তাদের মিত্র বাহিনীগুলো দ্রুত কার্যকর স্বাধীনতা হারিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের চাপে পিছু হটে।

হুতিদের কমান্ড কাঠামোতে আঘাত

তবে বর্তমানে হুতিদের সহায়তা করা ব্যবস্থা আরও জটিল। রাশিয়া স্যাটেলাইট ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে এবং ইরান সেই তথ্য হুতিদের কমান্ড ও সামরিক অভিযানের সঙ্গে একীভূত করছে।

কিন্তু এই জটিলতাই ব্যবস্থাটিকে কিছু দুর্বলতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। নিরাপদ যোগাযোগ, বিশেষজ্ঞ জনবল, গোয়েন্দা তথ্য একীভূত করার কেন্দ্র, কারিগরি পরামর্শক এবং সানা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সদর দপ্তরগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ; সবই এই ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন এসব দুর্বলতাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সানায় ইরান-নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী। হুতিদের নিহত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত দুই মেজর জেনারেল, সাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ৩২ কর্নেল রয়েছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সহকারী, স্টাফ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সদস্যরাও নিহত হন।

মেজর জেনারেলের চেয়েও উচ্চপদমর্যাদার কিছু কর্মকর্তা হুতিদের সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামোয় নিহত হয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন। তবে এসব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

তবে নিহতের সংখ্যা নয়, এর প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামনের সারির কমান্ড কাঠামো যখন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে, একই সময়ে সানার উচ্চপর্যায়ের কমান্ড কেন্দ্রগুলো সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার মুখে পড়ছে। এতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলা পরিচালনা; পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সদর দপ্তরগুলো বাধ্য হয়ে স্থান পরিবর্তন করলে, বেঁচে থাকা কমান্ডাররা অধীনস্থ ইউনিটগুলোর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে এবং অবশিষ্ট জুনিয়র ইরানি পরামর্শকরা বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরির চেষ্টা করলে নতুন নতুন সংকেত তৈরি হয়। এসব সংকেত শনাক্ত, সমন্বয় ও অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব ।

এ কারণেই পশ্চিম উপকূলে হুতিরা যে গতিতে অগ্রসর হয়েছিল, এখন সেই গতি ধরে রাখতে পারছে না বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। হুতিরা যে কমান্ড যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সুবিধা পেয়েছিল, তা এখন শক্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের নিজস্ব বাহ্যিক সহায়তাপ্রাপ্ত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে অন্ধ ও উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।

ফলে পশ্চিম উপকূলের ব্যর্থতা এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য স্থায়ী দুর্বলতা নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছে।

বদলে যাচ্ছে সামরিক সমীকরণ

২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের কমান্ড, যোগাযোগ, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবস্থা সিক্সসিআইএসআর ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা এবং সেন্সর থেকে দ্রুত অস্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা হুতি উত্তেজনা সৌদি নীতির ওপর থাকা সংযমও অনেকটা ক্ষয় করেছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন বড় ধরনের যে সামরিক অভিযান এখন গড়ে উঠছে, তা এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুরু হতে পারে যার বাহ্যিক কমান্ড সহায়তা ইতোমধ্যে ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে রয়েছে।

এটাই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া রাশিয়া-ইরান সমর্থিত ব্যবস্থা বড় ধরনের সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দুর্বল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোখায় প্রকাশ পাওয়া কৌশলগত ও কমান্ডগত ব্যর্থতাগুলোও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের ভেতরে সংশোধন করা হচ্ছে।

অর্থাৎ হুতিরা একবার একটি দুর্বল কমান্ড ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিয়েছিল। এখন তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে লড়তে হচ্ছে, যেখানে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া বাহ্যিক কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাটিকেই পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র : আলজাজিরা

রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি
রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি

১২ বিলিয়ন বছর আগের ‘মিল্কিওয়ে-সদৃশ’ গ্যালাক্সি শনাক্ত করলেন বিজ্ঞানীরা

বিগ ব্যাংয়ের মাত্র দেড় বিলিয়ন বছর পর সৃষ্টি হওয়া এক বিশাল, সুগঠিত সর্পিল গ্যালাক্সি শনাক্ত করেছেন ভারতের একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যা বর্তমান গ্যালাক্সি গঠনের ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

বিজ্ঞানীরা জানান, মহাবিশ্বের বয়স এখন ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ সদ্য আবিষ্কৃত এই গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে সময় লেগেছে প্রায় ১২ বিলিয়ন বছর। সেই সময়ে মহাবিশ্ব ছিল বর্তমানের এক-দশমাংশ বয়সী এবং তখনকার বেশিরভাগ গ্যালাক্সি ছিল অনিয়মিত ও বিশৃঙ্খল।

কিন্তু জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) ব্যবহার করে গবেষক রাশি জৈন ও যোগেশ ওয়াদাদেকার যে গ্যালাক্সিটি শনাক্ত করেছেন- তা একটি পূর্ণাঙ্গ সর্পিল গ্যালাক্সি। দেখতে অনেকটা সুগঠিত, মহাজাগতিক পিনহুইলের মতো। গবেষণাটি নভেম্বর মাসে ইউরোপের শীর্ষ জার্নাল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এ প্রকাশিত হয়।
গ্যালাক্সিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘অলাকনন্দা’। এটি হিমালয়ের একটি নদীর নামে। এটি শনাক্ত করেন পুনে-ভিত্তিক টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের (এনসিআরএ-টিআইএফআর) পিএইচডি গবেষক রাশি জৈন। তিনি জানান, ৭০ হাজার বস্তুর তথ্য বিশ্লেষণের সময় মাত্র একটি বস্তু ছিল নিখুঁত। যার ব্যাস প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ। গ্যালাক্সিটিতে দুটি সমান্তরাল বাহু কেন্দ্রীয় উজ্জ্বল অংশকে ঘিরে পাক খেয়ে রয়েছে। যেন আধুনিক সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর মতোই ‘বিডস-অন-এ-স্ট্রিং’ বা মালার দানার মতো তারার গুচ্ছ।

ওয়াদাদেকার বলেন, বিগ ব্যাংয়ের মাত্র কয়েকশত মিলিয়ন বছর পরই এত বড় সর্পিল গ্যালাক্সির অস্তিত্ব আবিষ্কার এক বিস্ময়। এত অল্প সময়ে এটি ১০ বিলিয়ন সূর্য-ভরের তারকা তৈরি করেছে এবং বিশাল ডিস্ক গঠন করেছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ‘কসমিক ডন’ সময়কালের গ্যালাক্সিগুলো ছিল ছোট ও বিশৃঙ্খল। কিন্তু অলাকনন্দা সে ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। এটি আকারে মিল্কিওয়ের এক-তৃতীয়াংশ এবং বর্তমান মিল্কিওয়ের তুলনায় ২০-৩০ গুণ দ্রুত তারকা সৃষ্টি করছে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে বহু অগঠিত, লালচে দূরবর্তী গ্যালাক্সির ছবি পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক আবিষ্কারে দেখা যাচ্ছে আরও পরিণত, সুগঠিত গ্যালাক্সি। অলাকনন্দার আবিষ্কার সেই ধারাবাহিকতারই নতুন প্রমাণ।

https://mzamin.com/uploads/news/main/192547_Kaium-4.webp

Monday, September 28, 2026

ইমরান খানের মুক্তি কোন পথে, আন্দোলন স্থগিতের পর কী করছে পিটিআই

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কারাগারে থাকা ইমরানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়েছে। এর আগে ইমরানের তিন বোন—আলিমা খান, উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকে আটক করা হয়। একই সময়ে ইসলামাবাদে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা, সড়ক অবরোধ এবং পিটিআই নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।

ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন এবং বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আদিয়ালা কারাগারে আটক আছেন। তার দল ও পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তার মুক্তি, উন্নত চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দাবি করে আসছে। সরকার অবশ্য ইমরানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, একাকী বন্দিত্ব বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আগস্টে জানিয়েছিল, ইমরান একজন দণ্ডিত বন্দি হিসেবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং তার সঙ্গে পরিবার, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে।

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে বিরোধের সর্বশেষ বড় ঘটনা ঘটে আগস্টে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ জানানো হলে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ১৮ আগস্ট তাকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া, ব্যক্তিগত চিকিৎসককে চিকিৎসায় যুক্ত করা, নিয়মিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত একটি বহুবিষয়ক চিকিৎসক বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা করার কথাও বলে।

তবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হয়। পাকিস্তান সরকার ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে না নিয়ে ইসলামাবাদের সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) রাতে চিকিৎসা পরীক্ষা করিয়ে পরদিন ভোরে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফেরত পাঠায়। সরকারের বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে সরকারি কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসকেরা তাকে পরীক্ষা করে কারাগারে ফেরত পাঠানোর উপযোগী বলে মত দিয়েছেন।

এরই মধ্যে ইমরানের পরিবার ও পিটিআই অভিযোগ করে আসছিল, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সুযোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট আদিয়ালা কারা কর্তৃপক্ষকে ইমরান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে একাকী বন্দিত্বে না রাখার নির্দেশ দেয়। আদালত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ইমরানের ছেলেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের ব্যবস্থাও করতে বলে।

আগস্টে অবশ্য দীর্ঘ বিরতির পর ইমরান তার বোন নোরিন এবং স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার তার বোনদের সাক্ষাৎ আটকে দেওয়া হয় বলে পরিবার ও পিটিআই অভিযোগ করে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইমরানের বোনেরা আবারও তাকে দেখতে পারেননি।

ইমরানকে ঘিরে সর্বশেষ বড় উত্তেজনা তৈরি হয় পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লংমার্চকে কেন্দ্র করে। দলটি ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে বড় ধরনের সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল। মূল দাবি ছিল ইমরান খানের মুক্তি। এর আগে সরকার রাজধানীর প্রবেশপথে কনটেইনার বসানো, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং বিভিন্ন সড়কে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। ইসলামাবাদে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শত শত পিটিআই কর্মীকে আটক করা হয়।

ইসলামাবাদ হাইকোর্টও পিটিআইয়ের প্রস্তাবিত দীর্ঘমার্চ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দল, নেতা বা প্রাদেশিক সরকার এমনভাবে রাজধানীর সড়ক, মহাসড়ক বা প্রবেশপথ দখল করতে পারে না, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল, চিকিৎসা বা শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানের তিন বোনকে আটক করা হয়। প্রথমে আলিমা খানকে লাহোরে আটক করা হয়। এরপর উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকেও আটক করে কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার’ আইনের অধীনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দেওয়া হয়। পিটিআই ও তাদের আইনজীবীরা আটককে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে আবেদন করেন। লাহোর হাইকোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে আটকাদেশ স্থগিত না করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছে।

ইমরানের বোনদের গ্রেপ্তারকে পিটিআই তাদের নেতার ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, ইসলামাবাদে বড় ধরনের বিক্ষোভের কারণে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। পিটিআই ২৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করে, ইসলামাবাদমুখী দীর্ঘমার্চ ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহাইল আফ্রিদি জানান, নতুন নির্ধারিত তারিখে পেশোয়ার থেকে দীর্ঘমার্চ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীমুখী দীর্ঘমার্চের বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে।

মার্চ পিছিয়ে দেওয়ার আগে পিটিআই ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে পর্দার আড়ালে একাধিক যোগাযোগের খবরও এসেছে। গত চার-পাঁচ সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে অর্ধডজনের বেশি ব্যাকচ্যানেল বৈঠক হয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয় হিসেবে পিটিআইয়ের কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। এসব তথ্য অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে আলোচনায় ইমরানের চিকিৎসা ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির অবস্থান নিয়েও সম্ভাব্য ছাড়ের কথা উঠেছিল। তবে পিটিআই ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে আছে।

ইমরানের ছেলে কাসিম খানও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির আগে তিনি সমর্থকদের আদিয়ালা কারাগারের কাছে না যাওয়ার আহ্বান জানান। তার আশঙ্কা ছিল, কারাগারের কাছে বড় জমায়েত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে এবং তার বাবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমরান খান নিজে কারাগারে থাকলেও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত থামেনি। বরং তার স্বাস্থ্য, কারাগারে সুযোগ-সুবিধা, পরিবারের সাক্ষাৎ, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং পিটিআইয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।

এখন পিটিআইয়ের সামনে নতুন তারিখ ৪ অক্টোবর। ওই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কীভাবে পরিচালিত হবে, সরকার রাজধানীতে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে এবং ইমরানের পরিবার ও দলের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি হয় কি না—এসবই আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমরান খান এখনো আদিয়ালা কারাগারেই আছেন এবং তার মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, জিও নিউজ, ডন, দ্য নিউজ পাকিস্তান, আরব নিউজ, এপি নিউজ, দ্য ইকোনমিক টাইমস, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান

ইমরান খানের মুক্তি কোন পথে, আন্দোলন স্থগিতের পর কী করছে পিটিআই

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরান বা ইসরাইলের বিরোধী নয়: এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কোনো নির্দিষ্ট দেশ—ইরান, ইসরাইল কিংবা অন্য কারও বিরুদ্ধে গঠিত জোট নয়। বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরোধ সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

এরদোয়ান বলেন, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। চুক্তির মূল বিধান অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে আক্রান্ত দেশের প্রয়োজন ও অনুরোধের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ধারণ করা হবে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সহায়তার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা কিংবা গোলাবারুদ সরবরাহ থাকতে পারে। হুমকির মাত্রা অনুযায়ী আরো ব্যাপক সামরিক সহায়তার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। তবে কোনো হামলা ঘটলেই তুরস্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা চুক্তিতে নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

এরদোয়ান আরো বলেন, ইরাক, ইয়েমেন বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো স্থানে সম্ভাব্য প্রতিটি ঘটনার জন্য আগেই স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার ছক তৈরি করা ঠিক হবে না। রাজনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইসরাইল–তুরস্ক সম্পর্ক

সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তার অভিযোগ, ইসরাইলে সম্প্রতি তুরস্ককে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রচারণা তৈরি হয়েছে। তিনি এর সঙ্গে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

একই সঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পর্যন্ত বিভিন্ন সংকটে শান্তির উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা তুরস্কের রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিরিয়া ও ইরান প্রসঙ্গ

সিরিয়ার স্থিতিশীলতাকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এরদোয়ান। তার মতে, সিরিয়ার সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আনা দেশটির সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সামাজিক ঐক্য শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন। কুর্দিরাও যেন সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারেন, তুরস্ক এমন একটি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে বলে তিনি জানান।

ইরানের পরিস্থিতি নিয়েও তুরস্ক সতর্কভাবে নজর রাখছে বলে জানান এরদোয়ান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ইরানের জনগণের নিজেদেরই সমাধান করা উচিত এবং কোনো ধরনের বাইরের হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি ইরানে পিকেকে/পিজেএকে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন।

সব মিলিয়ে এরদোয়ানের বক্তব্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কোনো নতুন ইরান বা ইসরাইলবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে উপস্থাপন না করে তিন দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ সক্ষমতার কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে তুরস্ক আঞ্চলিক সংঘাতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের নীতি বজায় রাখবে—এমন বার্তাও তিনি দিয়েছেন।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও নিউজউইক

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরান বা ইসরাইলের বিরোধী নয়: এরদোয়ান

নরক হয়ে উঠেছে ওলেশকি, ঘাস-আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা

ইউক্রেনের রুশ-অধিকৃত ওলেশকি শহরে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবা প্রায় বন্ধ। খাদ্য সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় শহরের বাসিন্দাদের কেউ কেউ এখন বাগানের ঘাস ও আগাছা রান্না করে খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। নিরাপদে বের হওয়ার পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

যুদ্ধের আগে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস ছিল দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের এই শহরে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০টি শিশু রয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

এক নারী জানান, শহরে খাবার শেষ হয়ে গেছে। তিনি একসময় ১১০ কেজি ওজনের ছিলেন, এখন তার ওজন ৬৭ কেজিতে নেমে এসেছে। তিনি জানান, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার না পেলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে তার নিজের বাড়ি ও যেখানে গত শীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই বাড়িটিও ধ্বংস হয়েছে।

ওলেশকি খেরসন শহরের বিপরীতে ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে। বর্তমানে এটি ইউক্রেনীয় ও রুশ বাহিনীর মধ্যবর্তী একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।

বন্ধ খাবার সরবরাহ

ওলেশকির ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, শহরে শেষ খাদ্য সরবরাহ মে মাসে পৌঁছেছিল। এরপর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাসিন্দাদের হাতে থাকা খাদ্যও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

খাবারের অভাবে অনেকে বাগানে জন্মানো আগাছা সংগ্রহ করে রান্না করছেন। স্থানীয় যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপগুলোতে কোন আগাছা খাওয়ার উপযোগী এবং কীভাবে সেগুলো রান্না করতে হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

শহরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কেন্দ্রীয় পানির সরবরাহও নেই। কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের পর ২০২৩ সালে ভয়াবহ বন্যায় ওলেশকির বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর থেকে শহরের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরতে পারেনি।

খাবার আনতেও মৃত্যুর ঝুঁকি

খাবারের সন্ধানে পাশের এলাকায় যাওয়াও এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এক স্থানীয় নারী জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর এক দম্পতি ওলেশকি থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরের রাদেনস্ক এলাকায় খাবার আনতে গিয়েছিলেন। কারফিউয়ের আগে তারা শহরে ফিরতে পারেননি। পরে ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন।

এ ধরনের ঘটনার কারণে স্থানীয়রা খাবারের জন্য শহরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। রাস্তার বিভিন্ন এলাকায় মাইন থাকার পাশাপাশি আকাশে ড্রোনের উপস্থিতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

লাশ পড়ে থাকার অভিযোগ

শহরের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে মৃতদের দাফন নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকদের অভিযোগ, বিভিন্ন হামলা বা বিস্ফোরণে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ যথাযথভাবে দাফন করা সম্ভব হচ্ছে না।

তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে একাধিক ছবি পেয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দাবি, কিছু মরদেহ দীর্ঘদিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কিছু লাশ রাস্তায় পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের হিসাবে, চলতি বছর ওলেশকি ও কাছাকাছি হোলা প্রিস্তান এলাকায় অন্তত ২৯ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত এবং ৫৪ জন আহত হওয়ার খবর নথিভুক্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের হিসাব আরো বেশি।

‘প্রায় কিছুই খাওয়ার নেই’

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ২৫ সেপ্টেম্বর ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, শহরে প্রায় কোনো খাবার অবশিষ্ট নেই। কিছু বেসামরিক মানুষ ঘাস ও আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবা ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিশুদেরও একই পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

সিবিহা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দ্রুত ও বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। যারা শহর থেকে বের হতে চান, তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থারও দাবি করেন তিনি।

ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই সংকটের জন্য রাশিয়ার দখলকে দায়ী করা হয়েছে। তবে রুশ পক্ষ পাল্টা অভিযোগ করেছে, ইউক্রেনীয় হামলার কারণে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ২১ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতিকে ‘সংকটজনক’ বলে স্বীকার করলেও এর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেন এবং বলেন, রুশ সেনারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।

ড্রোনে খাবার পাঠাল ইউক্রেন

এর মধ্যেই ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য ইউক্রেনীয় বাহিনী ড্রোনের মাধ্যমে খাবার পাঠিয়েছে। খেরসন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর প্রায় চার টন খাদ্য ১০০টি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

খেরসন কর্তৃপক্ষ বড় ড্রোন ব্যবহার করে ওলেশকি ও আশপাশের এলাকায় জরুরি খাবার, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছে। প্রায় চার টন খাবার ১০০টি স্থানে ফেলা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এর কতটা রুশ বাহিনী আটক করেছে বা সব মানুষের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

পালানোর পথও বন্ধ

ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য শহর থেকে বের হয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ডিনিপ্রো নদী একদিকে এবং রুশ বাহিনীর অবস্থান অন্যদিকে থাকায় নিরাপদ স্থলপথ সীমিত। মাইন ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কারণে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে এই মানুষগুলোকে বাঁচানো যাবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বাস্তবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নিরাপদে বেসামরিক মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও'ফ্লাহার্টিও ২৫ সেপ্টেম্বর ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, খাবার, ওষুধ, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুতের অভাবে বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি মানবিক সহায়তার সুযোগ এবং বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

একসময় ২৪ হাজার মানুষের প্রাণচঞ্চল শহর ওলেশকি এখন যুদ্ধ, দখল, ধ্বংস ও খাদ্যসংকটে প্রায় জনশূন্য। যারা এখনও সেখানে রয়ে গেছেন, তাদের সামনে একদিকে খাবার ও চিকিৎসার সংকট, অন্যদিকে পালানোর পথে মাইন ও ড্রোন হামলার ভয়। ফলে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের এই শহরটি এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি

নরক হয়ে উঠেছে ওলেশকি, ঘাস-আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা

৬৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ ভাঙলে একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে ২৮ মসজিদ

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নে ছয় শতাধিক বছরের পুরোনো শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙার উদ্যোগের প্রতিবাদে মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রাত কাটিয়েছেন শত শত মুসলিম। মসজিদ রক্ষার দাবিতে অবস্থানকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছেন।

ইন্দোরের আলেম মুফতি জুনাইদ অবশ্য বিষয়টিকে আরো বিস্তৃত আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার দাবি, শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙা হলে উজ্জয়নের আরো ২৮টি মসজিদ একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে শহরের পুনর্বিন্যাসের নামে পুরোনো মসজিদগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দাবি, শাহী মসজিদটি ১৩৯০ সালের স্থাপনা এবং এর বয়স প্রায় ৬৩৬ বছর। মসজিদ পরিচালনাকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর ঐতিহাসিক অস্তিত্বের পক্ষে পুরোনো সরকারি নথিও রয়েছে।

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই আন্দোলনকে ‘গান্ধীবাদী’ বা অহিংস প্রতিবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় স্থাপনা এভাবে ভেঙে ফেলা উচিত নয়।

রোববার রাতেও মসজিদের বাইরে বুলডোজার অবস্থান করছিল। সম্ভাব্য উচ্ছেদ ও ভাঙার কার্যক্রম ঠেকাতে স্থানীয় মুসলিমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন। রোববার রাতে মসজিদ এলাকায় মানুষের উপস্থিতি আরো বাড়ে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও অন্যান্য নিরাপত্তা সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়। তবে মসজিদের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান নেওয়ায় ওই রাতে মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙার কার্যক্রম এগোয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।

মসজিদে অবস্থানকারী স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এটি তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবাদ নয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা পালাক্রমে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাদের বক্তব্য, মসজিদটি রক্ষার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে অবস্থান করছেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে।

মসজিদটি উজ্জয়নের মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রায় বিপরীতে এবং ক্ষিপ্রা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত। ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে ওই এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করার পরিকল্পনা করেছে উজ্জয়েন পৌর করপোরেশন। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি ১৫ মিটার প্রশস্ত করা হবে। এই প্রকল্পের নির্ধারিত অংশে শাহী মসজিদের কিছু স্থাপনা পড়েছে।

প্রস্তাবিত অপসারণের মধ্যে রয়েছে মসজিদের নামাজের হলের একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার এবং মাজহার চৌক শাহী নামে পরিচিত অংশ। মসজিদ পরিচালনাকারীরা এর বৈধতা নিয়ে আদালতে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, সড়ক সম্প্রসারণের বিকল্প ব্যবস্থা করা সম্ভব এবং ধর্মীয় স্থাপনা বাদ দিয়েও রাস্তা প্রশস্ত করা যেতে পারে।

অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান হলো, ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভে বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর আগমনকে সামনে রেখে যান চলাচল ও জনসুবিধার জন্য সড়ক সম্প্রসারণ প্রয়োজন। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও মামলার রায়ে সড়ক সম্প্রসারণ, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।

মসজিদ ভাঙার বিষয়ে এর আগে করা দুটি আবেদন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চের রায়ে বলা হয়, পৌর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান অনুসরণ করে এবং মসজিদ পরিচালনাকারীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েই পদক্ষেপ নিয়েছে। আদালত সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগও গ্রহণ করেনি।

তবে বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। মসজিদ কর্তৃপক্ষ নতুন করে উচ্চতর বেঞ্চে আবেদন করেছে। ওই আবেদনের শুনানি সোমবার হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মসজিদ ভাঙার কার্যক্রমের পরবর্তী গতি আদালতের নতুন শুনানির ওপরও নির্ভর করছে।

মুসলিম পক্ষের আরো দাবি, এর আগে উজ্জয়নের তাখিয়া মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই শাহী মসজিদের ক্ষেত্রে তারা এবার সরাসরি মসজিদের ভেতরে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মসজিদের চারপাশে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ৬০০-এর বেশি পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও বিশেষ বাহিনীর সদস্য এলাকায় উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে মুসলিমদের অবস্থান অব্যাহত আছে এবং একই সঙ্গে আইনি লড়াইও চলছে। ফলে উজ্জয়নের এই বিরোধ এখন শুধু একটি সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার ঐতিহাসিক মর্যাদা, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা, ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।

সোমবারের আদালতের শুনানি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই এখন নির্ধারণ করবে শাহী মসজিদের বিতর্কিত অংশ শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হবে কি না। এর মধ্যে মসজিদের ভেতরে মুসলিমদের অবস্থান অব্যাহত থাকায় উজ্জয়নে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফ্রী প্রেস জার্নাল, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য ডেইলি ওয়াদা

৬৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ ভাঙলে একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে ২৮ মসজিদ