Wednesday, August 25, 2021

শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকরী উপায় -চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীর মতে

খাদ্যাভ্যাস
মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকতে পারে এবং কোন উপায়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, সেটি নিয়ে নানামুখী গবেষণা হয়েছে বিশ্বজুড়ে।
চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী না হলে অল্প অসুস্থতাতেও মানুষ খুব সহজে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগের আক্রমণও জোরালো হয়।
এক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন-যাপনের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা।
মানুষ সচরাচর যে ধরণের খাবার খায়, সেগুলো হচ্ছে - শর্করা, প্রোটিন এবং ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার।
এ ধরণের খাবার শরীরের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ভর করে ভিটামিন এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-এর উপর।

দুগ্ধজাত খাবার

দুগ্ধজাত খাবারগুলো বিজ্ঞানের ভাষায় প্রোবায়েটিকস হিসেবে পরিচিত। যেমন- দই, ঘোল, ছানা ইত্যাদি।
মানুষের পাকস্থলিতে যে আবরণ আছে, সেটার ভেতরে বেশ কিছু উপকারী জীবাণু কার্যকরী হয়।
বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক হাসান শাহরিয়ার কল্লোল বলেন, পাকস্থলীতে যদি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যায় তখন সেখানে ক্যান্সার বাসা বাঁধতে পারে।
দুগ্ধজাত খাবারগুলোর পাকস্থলীতে উপকারী জীবাণুকে বাঁচিয়ে রাখে। ভিটামিন ডি এর জন্য দিনের কিছুটা সময় শরীরে রোদ লাগাতে হবে। এটা খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনাচরণের সাথে সম্পৃক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, যার শরীরের গঠন ভালো এবং সেখানে কোন ঘাটতি থাকবে না, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হবে।
তিনি বলেন, যেমন শিশু জন্মের পর থেকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

ভিটামিন 'বি' এবং 'সি' জাতীয় খাবার

এই ভিটামিনগুলো পানির সাথে মিশে যায়। এগুলো শরীরে জমা হয়না। চিকিৎসক কল্লোলের মতে, প্রতিদিনই কিছু পরিমাণে ভিটামিন বি এবং সি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
এই ভিটামিনগুলো পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়।
শরীরের নার্ভ-এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই দুই ধরণের ভিটামিন কাজ করে।
শরীরের ভেতরে বিক্রিয়ার কারণে যেসব সেল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলো সারিয়ে তুলতে কাজ করে ভিটামিন সি।
দুধ এবং কলিজার মধ্যে ভিটামিন বি আছে। টক জাতীয় যে কোন ধরণের ফল- লেবু, আমলকী, কমলা, বাতাবিলেবু এবং পেয়ারাতে ভিটামিন সি আছে।

চা-কফি কতটা খাবেন?

অতিমাত্রায় চা-কফি পান করা শরীরের জন্য ভালো নয় বলে সতর্ক করে দিচ্ছেন চিকিৎসক মি: কল্লোল।
"ধরুন একজন ব্যক্তি যদি দিনে সাত কাপ চা খায়, এবং প্রতি কাপে এক চামচ চিনি থাকে তাহলে তিনি কিন্তু প্রতিদিন সাত চামচ চিনি খাচ্ছেন। এই সাত চামচ চিনি শরীরের জন্য ভয়াবহ।" বলছিলেন মি: কল্লোল।
চা-কফিতে এমন অনেক উপাদান থাকে যার কোনটি শরীরের জন্য ভালো এবং কোনটি শরীরের জন্য খারাপ।

ভাত বেশি খাবেন না

একজন মানুষ প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার খাবেন, তার ৬০ শতাংশ হওয়া উচিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা।
এর পর ৩০ শতাংশ হতে হবে প্রোটিন এবং ৫ শতাংশের মতো থাকবে চর্বিজাতীয় খাবার।
মি: কল্লোল বলেন, "আমাদের দেশে দেখা যায়, শর্করা প্রচুর খাওয়া হচ্ছে কিন্তু সে পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করা হয়না।"
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভাত বা শর্করা জাতীয় খাবার খেলে সেটি শরীরের ভেতরে ঢোকার পর ফ্যাট বা চর্বিতে রূপান্তর ঘটে।
অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরণের খাবার সুষমভাবে খেতে হবে।
"আপনি হয়তো মনে করছেন যে আপনি প্রচুর পরিমাণে তেল, চর্বি, ঘি বা মাখন জাতীয় খাবার খাচ্ছি না। তাহলে আমার শরীরে এতো চর্বি জমা হয় কীভাবে?"

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম

শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে শারীরিক পরিশ্রমের সম্পর্ক আছে। একজন মানুষ যখন শারীরিক পরিশ্রম করে তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করে।
শরীরের মাংসপেশি এবং হৃদযন্ত্র অনেক কার্যকরী হয়। একই সাথে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
ফলে শরীরের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছবে। তখন শরীরের কোষগুলোতে শক্তি উৎপাদন শুরু হবে।
সুতরাং প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রমের সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। মি: কল্লোল বলেন, এমন ধরণের পরিশ্রম করতে হবে যাতে শরীর থেকে ঘাম ঝরে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে ডেঙ্গু জ্বর থেকে রেহাই মিলবে?

চিকিৎসক মি: কল্লোল বলেন, এর সাথে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া কিংবা না হওয়ার সম্পর্ক আছে কিনা সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। একজনের শরীরে কতটুকু জীবাণু ঢুকছে এবং সে জীবাণুটির আক্রান্ত করার ক্ষমতা কতটা সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
"ডেঙ্গু একটি ভাইরাস। সে ভাইরাস যখন আমার শরীরে ঢুকছে, তখন আমার শরীরের রোগ প্রতিরোধ সিস্টেম অ্যাকটিভেট (কার্যকরী) হচ্ছে সাথে-সাথে। তখন আমার শরীর সাথে-সাথে সেটির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সুতরাং যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, এবং যে মশাটি কামড়াচ্ছে সেটির ভেতরে যদি জীবাণুর পরিমাণ কম হয়, সেক্ষেত্রে আমার শরীর ভালো রিঅ্যাক্ট (সাড়া) করবে।"
নিয়মিত ব্যায়াম অথবা অন্য যে কোন ধরণের শারীরিক পরিশ্রম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

Tuesday, August 24, 2021

আফগানিস্তানে দখলদারিত্বের অবসান!

ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আফগানিস্তান সম্পর্কে অনেক আজেবাজে কথা লেখা হচ্ছে। এই আজেবাজে কথাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সত্য গোপন করা হচ্ছে ।প্রথমত, তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে। দ্বিতীয়ত, তালেবানরা জিতেছে কারণ তাদের জনসমর্থন বেশি। তৃতীয়ত, এর কারণ এই নয় যে, অধিকাংশ আফগান তালেবানকে ভালোবাসে। কারণ আমেরিকার কর্তৃত্ব তাদের কাছে  অসহনীয়। চতুর্থত, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবেও পরাজিত হয়েছে। বেশিরভাগ আমেরিকান এখন আফগানিস্তান ত্যাগের পক্ষে এবং যে কোনো বিদেশী যুদ্ধের বিপক্ষে। পঞ্চম, এটি বিশ্ব ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি একটি ছোট, দরিদ্র দেশের মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছে। এটি সারা বিশ্বে আমেরিকান সাম্রাজ্যের শক্তিকে দুর্বল করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট । ষষ্ঠত, নিজেদের জীবনকে বাঁচাতে কট্টর নারীবাদে বিশ্বাসী অনেক মহিলা তালেবানদের বিপক্ষে যেতে পারেননি , যা নারীবাদের প্রতি এক প্রবল ধাক্কার সমান।  ন্যান্সি লিন্ডিসফার্ন এবং জোনাথন নিল জানাচ্ছেন এগুলি শুধু কয়েকটি কারণ তারা বর্ণনা করেছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আফগানিস্তানের নৃতত্ত্ববিদ হিসাবে ফিল্ডওয়ার্ক করার সময় তাঁরা লিঙ্গ বৈষম্য , রাজনীতি এবং যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছেন।

একটি সামরিক জয়
এটি তালেবানদের জন্য একটি সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয়।  কমপক্ষে দুই বছর ধরে আফগান বাহিনী - দেশের সেনাবাহিনী এবং পুলিশে কর্মরত  অনেককে হত্যা এবং মারাত্মকভাবে জখম করেছে যাতে তারা মাথা  তুলে দাঁড়াতে না পারে।  গত দশ বছর ধরে তালেবানরা অধিক সংখ্যক গ্রাম এবং কিছু শহরের ওপর নিজেদের  নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে । ধীরে ধীরে একটির পর একটি শহর-গ্রাম  দখল করতে করতে শেষে তারা রাজধানী কাবুলে থাবা বসায়।  গুরুত্বপূর্ণভাবে, উত্তর জুড়ে তালেবানরা ক্রমাগত তাজিক, উজবেক এবং আরবদের নিয়োগ করছিল। এটি তালেবানের জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয়ও বটে । পৃথিবীতে কোন গেরিলা বিদ্রোহ জনপ্রিয় সমর্থন ছাড়া এই ধরনের বিজয় অর্জন করতে পারে না। এককথায়  বলা যেতে পারে , আফগান জনগণ আমেরিকান দখলদারদের চেয়ে তালেবানদের পাশে দাঁড়ানো শ্রেয় বলে মেনে নিয়েছে । আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারের চেয়ে অনেক আফগানরাই  তালেবানদের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেছে।  শেবার্গানে দোসতাম এবং হেরাটে  ইসমাইল খানের পরাজয় তার জ্বলন্ত  প্রমাণ। ২০০১ সালের তালেবানরা অপ্রতিরোধ্যভাবে পুশতুন সম্প্রদায়ের ছিল এবং তারা উগ্র জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিল। ২০২১ সালে বহু জাতিগোষ্ঠীর তালেবান যোদ্ধারা উজবেক এবং তাজিক অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষমতা দখল করেছে।গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হলো মধ্য পার্বত্য অঞ্চলে হাজারা অধ্যুষিত এলাকা। সব আফগানই অবশ্য তালেবানদের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাদের প্রতিবাদ আসলে বিদেশী হানাদারদের বিরুদ্ধে , যাকে গৃহযুদ্ধও বলা যেতে পারে । বেঁচে থাকার জন্য অনেক আফগানই  আমেরিকান, সরকার বা যুদ্ধবাজদের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। অনেকে উভয় পক্ষের সাথে সমঝোতা করেছেন এবং বাকিদের অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন না যে কোন পক্ষ নেবেন, তারা সময়ের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন।আমেরিকার বাইডেন সরকারের ওপর পুরো দোষ চাপিয়ে লাভ নেই , যদি আমেরিকান সৈন্যরা আফগানিস্তানে থেকে যেত, তাহলে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হতো অথবা মরতে হতো। এটি বর্তমান পরাজয়ের চেয়ে আমেরিকান শক্তির জন্য আরও বড় অপমান হতো । বাইডেনের মতো এক্ষেত্রে ট্রাম্প -ও অসহায় ছিলেন।  

কেন এত আফগান তালেবানকে বেছে নিল?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, তালেবানই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন যা আমেরিকান দখলদারীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং অধিকাংশ আফগানরা আমেরিকার দখলদারিকে  ঘৃণা করতে শুরু করেছে । ৯/১১ হামলার একমাস পর আমেরিকা প্রথম আফগানিস্তানে বোমারু বিমান এবং সৈন্য পাঠায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তরের জোটের বাহিনী সমর্থন করেছিল, দেশের উত্তরে অ-পুশতুন যুদ্ধবাজদের একটি জোট ছিল । কিন্তু জোটের সৈন্য এবং নেতারা আসলে আমেরিকানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। অন্যদিকে, তালেবান সরকারকে তখন ক্ষমতায় আসা থেকে প্রতিহত করতে  প্রায় কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মার্কিন, ব্রিটিশ এবং তাদের বিদেশী মিত্ররা বোমা হামলা শুরু করে। পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আলোচনার মাধ্যমে চলতে থাকা অচলাবস্থার অবসান ঘটায়। সমঝোতায় ঠিক হয় , যুক্তরাষ্ট্রকে কাবুলে ক্ষমতা গ্রহণ এবং তাদের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসানোর অনুমতি দেওয়া হবে। বিনিময়ে, তালেবান নেতাদের তাদের গ্রামে ফিরে যাবার অনুমতি দেওয়া হবে। 'এই সমঝোতার বিষয়টি  সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে সুস্পষ্ট কারণে প্রচারিত হয়নি, কিন্তু আমরা আফগানিস্তানে তখন ছিলাম বলে সবটাই বুঝতে পেরেছিলাম ।' জানাচ্ছেন ন্যান্সি লিন্ডিসফার্ন এবং জোনাথন নিল। এই ঘটনার পর দুই বছর ধরে আমেরিকান দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ ছিল না সেদেশে । হাজার হাজার সাবেক তালেবান তাদের  গ্রামে রয়ে  গিয়েছিল। ২০০৩ সালে  ইরাকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে  দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকে ব্যাপক প্রতিরোধ সংঘটিত হয়েছিল। অথবা ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে রাশিয়ার আক্রমণের সময়েও দেশের মানুষের ক্ষোভ দেখেছে বিশ্ববাসী।  কারণটি কেবল এই নয় যে, তালেবানরা যুদ্ধ করতে পারে  না। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তালেবানরাও ভেবেছিলো , আমেরিকান কর্তৃত্ব  আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং ভয়াবহ দারিদ্র্যের অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে । সবথেকে বড় কথা- দেশের প্রত্যেকেই , এমনকি তালেবানরাও তখন শান্তি চাইছিলো।  কারণ একের পর এক যুদ্ধে তারাও ক্লান্ত , বিধস্ত ছিল।  ২০০১ সাল থেকে টানা ২৩ বছর  কখনো কমিউনিস্টদের সঙ্গে  ইসলামপন্থীদের  গৃহযুদ্ধ, কখনো  ইসলামপন্থী এবং সোভিয়েত আক্রমণকারীদের মধ্যে যুদ্ধ, কখনো  দেশের উত্তরে  ইসলামপন্থী যুদ্ধবাজ এবং তালেবানদের মধ্যে যুদ্ধ তাদের ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিলো ভেতর থেকে । তেইশ বছরের যুদ্ধ মানে মৃত্যু,  নির্বাসন , শরণার্থী শিবির, দারিদ্র্য, সেই সঙ্গে অবিরাম ভয় এবং উদ্বেগ। এই সম্পর্কে সেরা বই হল ক্লাইটস এবং গুলমানাডোভা ক্লাইটস এর  লাভ অ্যান্ড ওয়ার ইন আফগানিস্তান (২০০৫)।  মানুষ শান্তির জন্য মরিয়া ছিল। ২০০১ সালের মধ্যেও তালেবান সমর্থকরা মনে করেছিল একটি ভাল যুদ্ধের চেয়ে খারাপ শান্তি ভালো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফুরান অর্থভাণ্ডার দেখে আফগানরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল  যে আমেরিকার দখলদারিত্ব তাদের দেশকে  উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে যা তাদের দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করবে।

আফগানরা অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু  যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ দিয়েছে- শান্তি নয়
আমেরিকা  ও যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী ঘাঁটি দখল করে নিয়েছিল তালিবানদের একের পর গ্রাম , ছোট শহর, দক্ষিণ ও পূর্বের পুশতুন এলাকা। তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকার গোপন সমঝোতার কথা মার্কিন সেনা বাহিনী জানতো না  , যদি জানতো তাহলে তা বুশ সরকারের কাছে খুব সম্মানজনক হত না।  উল্টো সেনাদের বলা হয়েছিল, আফগানিস্তান থেকে যারা খারাপ লোক আছে তাদের সবাইকে নির্মূল করতে হবে।  তার ফলস্বরূপ দিনের পর দিন রাতে  অভিযান চালিয়ে  দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে , পরিবারকে অপমান করে -ভয় দেখিয়ে  পুরুষদের ওপর চলতো অকথ্য নির্যাতন।  আমেরিকান সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দারা নির্যাতনের নতুন সংজ্ঞা তুলে ধরেছিল বিশ্বের সামনে।  যার উল্লেখ রয়েছে ,  আবু  গ্রাইব- এর লেখা বই ' 'আমেরিকান প্রিসন ইন ইরাক'- এ। ধীরে ধীরে আমেরিকানদের প্রতি আফগানবাসি এবং তালেবানদের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিলো।  অনেকে রাতের অন্ধকারে মার্কিন সেনাদের ওপর ছোটোখাটো হামলাও করতো । বদলা নিতে  আমেরিকানরা পরিবারের পর পরিবারকে হত্যা করেছিল বোমারু বিমানে হামলা চালিয়ে।  আফগানিস্তানের  দক্ষিণ ও পূর্ব জুড়ে যুদ্ধ আবারো ফিরতে শুরু করে।
 
বৈষম্য ও দুর্নীতি চরমে ওঠে
আফগানরা এমন উন্নয়নের প্রত্যাশা করেছিল যা ধনী এবং দরিদ্র উভয়কেই উন্নয়নের পথে  নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তারা  আমেরিকার বিদেশ নীতি বুঝতে পারেনি। আমেরিকানরা আফগানিস্তানে টাকা ঢেলে দিয়েছিলো।  যা আফগানদের কাছে পৌঁছেছিল ঠিক , কিন্তু শুধু তাদের কাছে যারা আমেরিকানদের পক্ষে যেতে রাজি হয়েছিল।  টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল যুদ্ধবাজদের কাছে , সিআইএ এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দ্বারা সমর্থিত হেরোইন ব্যবসায়ীদের কাছে।  কাবুলে বিলাসবহুল, সুরক্ষিত বাড়িগুলির মালিকদের কাছে,  এবং বিদেশী অর্থে চলা  এনজিও-গুলির কাছে।  আফগানরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিতে অভ্যস্ত ছিল। তবে দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের মানুষের চোখে অর্থের এই নয়ছয় দুর্নীতি বলে মনে হয়েছিল।গত এক দশক ধরে তালেবানরা  দেশজুড়ে শুধু দুটি জিনিসের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমটি হল যে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, এবং তারাই  দেশের একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি। তালেবানরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রামাঞ্চলে একটি নিজস্ব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।  তাদের প্রভাব  এতটাই বেশি ছিল যে, শহরে দেওয়ানি মামলার সাথে জড়িত অনেকেই সম্মত হয়েছেন তারা তালেবান বিচারকদের কাছে যাওয়া পছন্দ করতেন  । এটি তাদের ঘুষ ছাড়া দ্রুত, এবং ন্যায্য বিচারের রাস্তা বাতলে দেবে বলে মনে হয়েছিল   । তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ন্যায্য বিচারের পাশাপাশি ছিল  বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা। সাধারণ মানুষের মনে হয়েছিল ধনীরা যখন বিচারকদের ঘুষ দিতে পারে, তাহলে তারা দরিদ্রদের সঙ্গে যা খুশি করতে পারে। ন্যায় বিচার দেবার নাম করে  ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি, যুদ্ধবাজ এবং সরকারী কর্মকর্তারা ক্ষুদ্র কৃষকদের জমির ওপর দখল নিতে শুরু করেছিল , কিন্তু তালিবান ন্যায়ালয়ে এই বৈষম্য ছিল না। ২০ বছর ধরে।

২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর আফগান রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।  বিশ বছরের যুদ্ধ ও সংকট রাজনৈতিক গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে।  তালেবানরাও নিজেদের অনেক পরিবর্তন করছে ,তাছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।   অনেক আফগান এবং অনেক বিদেশী বিশেষজ্ঞ এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। গিউস্ততোজি একটি জনপ্রিয় বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন নব্য -তালেবান। এই নতুন তালেবানরা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছিল , পুশতুন নিয়ে তাদের অন্ধ জাতীয়তাবাদী মনোভাব আসলে তাদের দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছিলো। এরপর থেকে একটা বিষয়েই জোর দিতে লাগলো তালেবানরা , তা হলো- তারা মুসলিম এবং মুসলিম ভাই -বোনেদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টায় নামলো ।  কিন্তু তালেবান বাহিনীর মধ্যে বিভাজন ছিল । সংখ্যালঘু তালেবান যোদ্ধা এবং সমর্থকরা নিজেদের ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পার্থক্য হল ইসলামিক স্টেট শিয়া, শিখ এবং খ্রিস্টানদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। পাকিস্তানের তালেবানরাও একই কাজ করে। কিন্তু তালেবানের একটা বিরাট অংশ আবার এই ধরনের সব হামলার নিন্দা করে । নতুন তালেবানরা নারীদের অধিকারের  ওপর জোর দিয়েছে। তারা বলেছে  যে, তারা সঙ্গীত এবং মিউজিক ভিডিওগুলির বিপক্ষে নয়।    তারা আগের শাসনকালের সেই কঠিন দিকগুলি পেছনে ফেলে এসেছে। তালেবানরা এখন জোর দিয়ে একটা কথাই বার বার বলছে যে- তারা শান্তি চায় , যুদ্ধ নয়।  

আফগান মহিলাদের উদ্ধারের বিষয়ে কি হবে ?
আমাদের ১৯৭০- এর দশকে ফিরে গিয়ে শুরু করতে হবে। বিশ্বজুড়ে, লিঙ্গ বৈষম্য, শ্রেণী বৈষম্য ভীষণভাবে প্রচলিত ছিল । আফগানিস্তানও তার থেকে আলাদা ছিল না। ন্যান্সি ১৯৭০- এর দশকের গোড়ার দিকে দেশের উত্তরে পুশতুন নারী ও পুরুষদের সাথে নৃতাত্ত্বিক ক্ষেত্রের কাজ করেছিলেন। তারা কৃষিকাজ ও পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করত। ন্যান্সির পরবর্তী বই, 'বার্টার্ড ব্রাইডস: পলিটিক্স অ্যান্ড ম্যারেজ ইন আ ট্রাইবাল সোসাইটি,' -তে সেই সময় শ্রেণী, লিঙ্গ এবং জাতিগত বিভাজনের ব্যাখ্যা মেলে । সাদা কথায় বলতে গেলে , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যৌনতা এবং শ্রেণীর বৈষম্য থেকে  আফগানিস্তান খুব একটা আলাদা ছিল না।  ১৯৭৮ সালে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।  কমিউনিস্ট সরকার এবং ইসলামী মুজাহিদিন-দের মধ্যে বেঁধে যায় গৃহযুদ্ধ। ইসলামপন্থীরা জয়লাভ করছিল, তাই কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯- এর শেষের দিকে আফগানিস্তানে আক্রমণ করে। এরপর সোভিয়েত ও মুজাহিদিনদের মধ্যে সাত বছরের নৃশংস যুদ্ধ চলে।  ১৯৮৭ সালে সোভিয়েত সৈন্যরা চলে যায়, পরাজিত হয়ে । ১৯৭০- এর দশকের গোড়ার দিকে, কমিউনিস্টরা অন্যরকম ছিল।  তারা দেশের উন্নয়ন করতে চেয়েছিল। তারা বড় জমির মালিকদের থেকে ক্ষমতা নিয়ে  জমি ভাগ করে দিতে চেয়েছিল এবং তারা নারীদের জন্য সমানাধিকার চেয়েছিল। ১৯৭৮ সালে  সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছিল। তারা   সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামবাসীর রাজনৈতিক সমর্থন জিততে পারেনি। ফলাফল এই ছিল যে, বিরোধীদের প্রতিহত  করতে একমাত্র উপায় ছিল গ্রেফতার, নির্যাতন এবং বোমা হামলা। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্টদের সমর্থন করার জন্য আক্রমণ করে। তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল বায়ু থেকে বোমা ফেলা, এবং দেশের বড় অংশগুলি ফ্রি ফায়ার জোন করে দেওয়া হয়েছিল । কয়েক লক্ষ আফগান নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল, কয়েক লক্ষ মানুষ আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে  গিয়েছিলো। ইরান ও পাকিস্তানে ছয় থেকে আট লক্ষ মানুষ পালিয়ে গিয়েছিলো এবং বাকিরা দেশের ভেতরেই থেকে গিয়েছিলো উদ্বাস্তু হয়ে। কমিউনিস্টরা সর্বপ্রথম যা করার চেষ্টা করেছিল তা হলো ভূমি সংস্কার এবং নারীর অধিকারের জন্য আইন। যখন রাশিয়ানরা আক্রমণ করে, তখন অধিকাংশ কমিউনিস্ট তাদের পাশে ছিল। সেই কমিউনিস্টদের অনেকেই ছিলেন নারী। এর ফলাফল ছিল নারীবাদের নামকে নির্যাতন ও গণহত্যার নাম দিয়ে কলঙ্কিত করা। তাই যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত হয় তখন আফগানিস্তান স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলেছিলো।  

তালিবানদের ফিরে দেখা
১৯৯৪ সালের শরতে, তালেবানরা কান্দাহারে এসেছিল, বেশিরভাগ তখন পশতুন শহর এবং দক্ষিণ আফগানিস্তানের মধ্যে যা বৃহত্তম। আফগান ইতিহাসে তালেবানরা আগে কিছুই ছিল না।তারা আফগানিস্তান শাসনকারী অভিজাতদের থেকে একটি ভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কমিউনিস্টরা এই সময়ে শহরে জমিজায়গা নিয়ে বসবাস করতো , তারা বড় জমিদারদের থেকে ক্ষমতা নিয়ে  দেশকে আধুনিক করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের ইসলামপন্থী যারা তারা কমিউনিস্টদের সাথে লড়াই করতেন।  তারাও দেশকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন , কিন্তু ভিন্নভাবে। তারা মুসলিম ব্রাদারহুড এবং কায়রোর আল-আলজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার দিকে তাকিয়েছিলেন । তালেবান শব্দের অর্থ একটি ইসলামিক স্কুলের ছাত্র, রাষ্ট্রীয় স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তালেবানের যোদ্ধারা যারা ১৯৯৪ সালে কান্দাহারে প্রবেশ করেছিল তারা ছিল যুবক ,যারা পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে বিনামূল্যে ইসলামিক  স্কুলে পড়াশোনা করেছিল। তালেবানের নেতারা আফগানিস্তানের গ্রামের মোল্লা ছিলেন। শহরের মসজিদের অনেক ইমামের মতো অভিজাত সংযোগ তাদের ছিল না। তবে গ্রামের মোল্লারা পড়তে পারতেন, এবং অন্যান্য গ্রামবাসীরা তাদের  শ্রদ্ধার  চোখে দেখতেন । তবে তাদের সামাজিক মর্যাদা খুব একটা  ছিল না। অনেক আফগান শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এবং কিছুটা নিরাপত্তার জন্য এদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন,কিন্তু তালেবানরা দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম ছিল ।১৯৯৬ সালে আমেরিকানরা সমর্থন তুলে নেবার পর , তালেবানদের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়া নামে এক নতুন এবং মারাত্মক পরিস্থিতির উদ্রেক হয়েছিল।  প্রায় রাতারাতি, আফগান মহিলাদের অসহায় এবং নিপীড়িতদের দলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আফগান পুরুষদের - ওরফে তালেবানদের ওপর অত্যাচার সব সীমা লঙ্ঘন করে দিয়েছিলো।  ৯/১১ এর আগে ৪ বছর তালেবানরা আমেরিকানদের লক্ষ্যবস্তু ছিল, দেশের  নারীবাদীরা এবং অন্য আফগান নারীরা  সুরক্ষার দাবী করেছিল। আমেরিকান বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার সময়, সবাই বুঝতে পেরেছিল যে, আফগান মহিলাদের সাহায্যের প্রয়োজন।

৯/১১ এবং আমেরিকান যুদ্ধ
বোমা হামলা শুরু হয় ৭ অক্টোবর। কয়েকদিনের মধ্যেই তালেবানদের আত্মগোপনে বাধ্য করা হয়েছিল - অথবা আক্ষরিক অর্থেই তাদের ওপর বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ডেইলি মেইলের প্রথম পাতায় একটি ছবি প্রকাশিত হয় , যাতে পরতে পরতে ছিল হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ।   দেখে চমকে উঠেছিল বিশ্বের মানুষ।  তবুও  আমেরিকা থামার পাত্র ছিল না।  যেভাবে নির্বিচারে বোমা মেরে আফগান নারী , তাদের স্বামী, সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। নারীবাদী ইসলামোফোবিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক অভিব্যক্তি যুদ্ধের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে  সামনে এসেছিল। প্রতিশোধের নামে  একটি বিশাল অসম যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্ব।  বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দিতে প্রেসিডেন্ট বুশের স্ত্রী লরা বুশ আফগান মহিলাদের দুর্দশার জন্য শোক প্রকাশ করেছিলেন।  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী চেরি ব্লেয়ার -ও তাঁর শোকবার্তা জানান।  'সেভিং আফগান উইমেন'  নাম নিয়ে এই ধনী যুদ্ধবাজদের স্ত্রীরা আফগানদের ওপর হামলাকে মিডিয়ার সামনে ক্রমাগত ঢাকার চেষ্টা করে। ২০০৮ সালে বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।  আমেরিকান যুদ্ধবিরোধী জোট কার্যকরভাবে ওবামার প্রচারে সহায়তা করার জন্য নিজেকে বিলুপ্ত করে দেয়।

স্টেরিওটাইপ এবং বিভ্রান্তি
আফগানিস্তানের বাইরে, গত পঁচিশ বছর ধরে তালেবানদের স্টেরিওটাইপ চরিত্র সম্পর্কে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। কিন্তু  দেখুন,  আপনি  শুনেছেন যে তারা সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবে বিশ্বাসী , নৃশংস এবং আদিম প্রবৃত্তির । এরাই আবার  ল্যাপটপ নিয়ে  গত চৌদ্দ বছর ধরে কাতারে আমেরিকানদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তালেবানরা মধ্যযুগের ফসল নয়। তারা  বিংশ শতাব্দীর শেষ এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কিছু খারাপ সময়ের ফল। বোমা হামলা, শরণার্থী শিবির, কমিউনিজম,  যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনীতি , নব্য উদারপন্থার সর্পিল বৈষম্যের অধীনে ধীরে ধীরে জীবনকে তৈরি করেছে তালেবানরা । রিচার্ড টেপার যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, উপজাতিরা আতঙ্কবাদী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। দরিদ্র কৃষকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ফসল মাত্র।  আফগানিস্তানে ক্রমাগত একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনের জেরে তৈরী হয়েছে তালেবান। তালেবানরা দরিদ্র কৃষকদের একটি আন্দোলন মাত্র , সাম্রাজ্যবাদী দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মাত্র।  কখনও কখনও তা  সাম্প্রদায়িক, কখনো তা নয়।  ইতিহাসের পাতায় নানা যুক্তি তর্কের একটি মিশেল এই তালেবান।  বিভ্রান্তির আরেকটি উৎস হলো,  তালেবানের শ্রেণী রাজনীতি। তারা একদিকে  যেমন দরিদ্রদের পাশে আছে , অন্যদিকে তারা সমাজতন্ত্রের এতটা বিরোধী।

আমেরিকায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন
কাবুলের পতন বিশ্বব্যাপী আমেরিকান শক্তির জন্য একটি চূড়ান্ত পরাজয়। যার প্রমাণ হচ্ছে,  ২০০১ সালে, ৯/১১ হামলার  ঠিক পরে, ৮৫% থেকে ৯০% আমেরিকানরা আফগানিস্তান আক্রমণের অনুমোদন দিয়েছিল। পরে তা ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে। আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বাইডেনের সিদ্ধান্তকে গত মাসে সমর্থন করেছিলেন ৬২ % মানুষ , ২৯ % এর এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছিলেন।  বাইডেন এবং ট্রাম্প দু'জনেই যুদ্ধের বিপক্ষে।  কারণ অনেক সামরিক বাহিনী আসে আমেরিকার গ্রামাঞ্চল থেকে যেখানে আবার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  জন্য ব্যাপক সমর্থন ছিল ।  তাই সেই সমর্থন যাতে হাত থেকে বেরিয়ে না যায় তাই ট্রাম্প  যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন না ।  মার্কিন সৈন্যরাও মনে করেন এখন আমেরিকার বিশ্বের সব বিষয়ে নাক গোলানো উচিত নয়। ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের বিপক্ষে।  তবে ডেমোক্র্যাট  বারাক ওবামা ,  রিপাবলিকান রোমনি -র মতো ওয়াশিংটনের অভিজাত শ্রেণীর প্রায় সবাই সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমেরিকান জনগণ এবং বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ মেনে নেওয়ার পক্ষপাতী নয়।  সাইগনের পতনের পর, আমেরিকান সরকার পরবর্তী ১৫ বছর ধরে বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করতে পারেনি। কাবুলের পতনের পর এটি আরও দীর্ঘ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিণতি
১০৩ বছর ধরে প্রচলিত আছে,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি আছে - যেমন  জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এখন চীন । কিন্তু আমেরিকা তাদের থেকেও বেশি প্রভাবশালী সেই ধারণা এখন অতীত।  দীর্ঘমেয়াদী কারণ হলো, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক পতন। কিন্তু কোভিড মহামারী এবং আফগান পরাজয় গত দুই বছরে বিস্তর পরিবর্তন এনেছে । কোভিড মহামারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসক শ্রেণি এবং সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা প্রকাশ করেছে। সরকার জনগণকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বিশৃঙ্খল এবং লজ্জাজনক ব্যর্থতা বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে সুস্পষ্ট। এরপর আছে আফগানিস্তান। যেখানে দরিদ্র মানুষগুলির ধৈর্য এবং সাহসের কাছে পরাজিত হয়েছে  মার্কিন সামরিক বাহিনী।  তালেবানদের বিজয় সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান এবং মালির বিভিন্ন ধরণের ইসলামপন্থীদের হৃদয় জিতে নিয়েছে ।  এখন তাই  কোনো সরকার বিশ্বাস করবে  না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদেশী হানাদার থেকে রক্ষা করতে পারবে।  এটাই  আমেরিকার শেষের শুরু।

এখন কি  ঘটছে?
আগামী কয়েক বছরে আফগানিস্তানে কী হবে তা কেউ জানে না। প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ছে তা হলো, আফগানদের হৃদয়ে শান্তির গভীর আকাঙ্ক্ষা। তারা গত  ৪৩ বছর যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। কাবুল, কান্দাহার এবং মাজার, তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরের পতন হয়েছে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই । তালেবানরা বার বার  বলে আসছে, তারা শান্তিতে একটি দেশ গঠন করতে চায়, এবং তারা কোনো প্রতিশোধ নিতে চায় না। তালেবান নেতারা বিলক্ষণ জানেন, সচেতন যে তাদের অবশ্যই দেশবাসীকে শান্তি প্রদান করতে হবে। এটাও অপরিহার্য যে, তালেবানদের প্রকৃত  ন্যায়বিচারের পথে হাঁটতে হবে , কোনো দেশ বা বিদেশী শক্তির কাছে মাথা নত করলে চলবে না।   আফগানিস্তান একটি দরিদ্র এবং শুষ্ক দেশ, যেখানে ৫% এরও কম জমিতে চাষ করা যায়। দেশের অর্থনীতি অনেকটাই দাঁড়িয়ে আফিম চাষ এবং তার রফতানির ওপর। এর পাশাপাশি  বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া, দেশের অর্থনৈতিক পতন ত্বরান্বিত হতে পারে   ।কারণ তালেবানরা এটা জানে, তারা স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে আসছে। আমেরিকানরা সাহায্য দেবে, এবং বিনিময়ে তালেবানরা সন্ত্রাসীদের সমর্থন করবে না  যারা ৯/১১ এর মতো হামলা চালাতে পারে। ট্রাম্প এবং বাইডেন প্রশাসন উভয়ই এই চুক্তি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এটা মোটেও স্পষ্ট নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কিনা । কারণ পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসন ইরাক, ইরান, কিউবা এবং ভিয়েতনামকে দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে গেছে।  মানবাধিকারের নামে আফগান শিশুদের অনাহারে রাখার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। এখানেই শেষ নয় ,  আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা জাতিগত শক্তিকে সমর্থনকারী  আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের হুমকিও  রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান, চীন, রাশিয়া এবং উজবেকিস্তান সবাই  প্রলুব্ধ হবে নিজেদের মতো হুকুম চালাতে । এটি আগেও ঘটেছে এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে এটি  যুদ্ধকে উস্কে দিতে পারে। আপাতত, যদিও ইরান, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা আফগানিস্তানে শান্তি চায়। তালেবানরা নিষ্ঠুরতার সাথে শাসনভার  না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে মুখে বলার সঙ্গে কাজে করার অনেক ফারাক আছে।
 
এখন কী করার আছে ?
পাশ্চাত্যের অনেকেই এখন প্রশ্ন করছেন, "আফগান মহিলাদের ,কট্টর নারীবাদীদের সাহায্য করার জন্য আমরা কি করতে পারি? উত্তর হলো- তাদের বিমানের টিকিট কেনার এবং তাদের ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় আশ্রয় দেওয়ার জন্য সংগঠিত করা। কিন্তু শুধু নারীবাদীদেরই আশ্রয় দিলে চলবে না। পেশার জন্য কাজ করা হাজার হাজার মানুষ তাদের পরিবারের সাথে আশ্রয়ের জন্য মরিয়া। এর কারণ ২০ বছর ধরে ন্যাটো বাহিনীর অত্যাচারে তারা বিপর্যস্ত।  অনেকেই কাছের লোককে হারিয়েছেন , তাই যাদের কারণে আফগানদের এই পরিণতি দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমেরিকার কর্তব্য।  অভিবাসনের নামে  বর্ণবৈষম্য জনসন এবং বাইডেন সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে ।  অবিলম্বে এই ইসলামবিরোধী মনোভাব দূর না করলে নিজের ভাবমূর্তি বদলানো সম্ভব নয়।  প্রত্যেক রাজনীতিবিদ, যিনি আফগান নারীদের সমর্থনে কথা বলেন, তাকে বারবার সব আফগানদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার অনুরোধ করা উচিত সরকারের কাছে।  আমরা  যারা ঘরে বসে রোজ টিভি , খবরের কাগজে আফগানিস্তানের খবর পড়ছি , তাদের উচিত সেই দেশের মানুষগুলির জন্য শান্তি প্রার্থনা করা।  যাতে এতো বছরের অশান্তি শেষে তারা যেন একটু মুক্ত আকাশ শ্বাস নিতে পারেন।  


সূত্র : annebonnypirate.org
ন্যান্সি লিন্ডিসফার্ন(স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের গবেষক) এবং জোনাথন নিলে( বৃটিশ ব্যবসায়ী এবং ম্যাকলরেন গ্রুপের প্রধান অপারেটিং কর্মকর্তা)'র কলমে :
অনুবাদ : সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

Saturday, August 21, 2021

একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা: যেভাবে ঘটনার শুরু থেকে শেষ

আপডেট- ৯ অক্টোবর ২০১৮: ২০০৪ সালের একুশে অগাস্টে ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো ২৪ জন - যে ঘটনা একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা হিসেবে পরিচিত।
ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর পর মতিঝিল থানায় দায়ের করার হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা দু মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ১০ই অক্টোবর দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল।

ডেটলাইন ২১শে অগাস্ট ২০০৪

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশ হচ্ছিলো আওয়ামী লীগের উদ্যোগে। সমাবেশের প্রায় শেষ পর্যায়ে তাতে বক্তব্য রাখছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
একটি ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে তিনি বক্তব্য দেবার সময় তাকে ঘিরে ছিলেন দলীয় নেতারা। আর সামনের দিক থেকে তার ছবি তুলছিলো অনেক ফটো সাংবাদিক।
২০০৪সালের ২১শে অগাস্ট, আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার পর সেখানে হতাহতরা পড়ে আছেন।
বক্তব্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হয়। ঘটনাস্থলে ছবি তুলছিলেন ফটো সাংবাদিক জিয়াউল ইসলাম।
"এমন নৃশংসতা কখনো হতে পারে আমার কল্পনাতেও ছিলোনা। আমি মঞ্চেই ছিলাম। চেয়ারে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি আর ধাক্কায় চেয়ার থেকে নীচে পড়ে যাই। আমার ওপরে পড়ে অনেকে। হঠাৎ ট্রাকের পাটাতনের ফাঁকে চোখে পড়লো আস্ত গ্রেনেড। সেটি বিস্ফোরিত হলে কি হতো ভাবতেও শিউরে উঠি এখনো। শেখ হাসিনা কয়েক হাত দুরে। তাকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেছেন তার দলের নেতারা। গ্রেনেডের শব্দ শেষে শুরু হলো গুলির শব্দ। এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়াই এবং গুলি থামলে ট্রাক থেকে নেমে আসি। নামার পর যা দেখি সেটি আরেক বিভীষিকা। চারদিকে আর্তনাদ, গোঙ্গানি। রক্তাক্ত পড়ে আছে বহু নারী পুরুষ। কে জীবিত কে মৃত বোঝা মুশকিল। নিজে বেঁচে আছি বুঝতে পেরে আবার ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করতে আরম্ভ করি"।
সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ জন আহত হন।

ঘটনার পর মামলা

গ্রেনেড হামলার ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলাটির প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ।
পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়িত্ব পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। অবশ্য এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী আরও দুটি মামলা করেছিলেন।
পরে এসব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।

২০০৪ সালের ২২শে অগাস্ট: বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন

২০০৪ সালের ২২ অগাস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার। মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় ওই বছরের ২ অক্টোবর কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল।
গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঠিক আগ মূহুর্তে তোলা এই ছবি: ভাষণ দিচ্ছিলেন শেখ হাসিনা
অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছিল ভাড়া করা দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে। এসব লোক প্রধানত একটি সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডারদের মধ্য থেকে নেওয়া হয়, যাদের সমাবেশে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার মতো ভালো জ্ঞান ছিল।
যদিও ওই প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তি বলতে কোনো দেশের নাম বলা হয়নি।

২০০৫ সালের ৯ই জুন আটক হলেন জজ মিয়া

একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের এক আলোচিত অধ্যায় জজ মিয়া। ২০০৫ সালের ৯ই জুন গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের একটি চায়ের দোকান থেকে তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় সেনবাগ থানায়।
ঢাকা থেকে সিআইডির অনুরোধ পেয়ে সেনবাগ থানা পুলিশ জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য সোর্স নিয়োগ করে।
পরে ৯ই জুন বেলা ১টার দিকে জজ মিয়াকে আটক করে থানায় খবর দেয়। এরপর পুলিশ তাকে সেখান থেকে থানায় নিয়ে আসে। পনের দিন সিআইডি পুলিশের হেফাজতে থাকার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর গ্রেনেড হামলার মামলায় তিনি 'স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি' দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।
পরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় যখন গণমাধ্যমে ফাঁস হয় যে জজ মিয়ার বিষয়টি পুলিশের সাজানো।
আসামী করার বদৌলতে তার পরিবারকে টাকা দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর ২০০৮ সালে তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি।
পরে আদালত এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া।

প্রথম অভিযোগপত্র ২০০৮ এর জুনে

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ই জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির।
এভাবেই নেতাকর্মীরা ঘিরে রেখেছিলেন শেখ হাসিনাকে
২০০৯ সালের ৩রা অগাস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। এরপর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আখন্দ।
তিনি ২০১১ সালের ৩রা জুলাই বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।

৩রা জুলাই ২০১১ : সম্পূরক চার্জশীটে তারেক-বাবর

গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০১১ সালের ৩রা জুলাই সম্পূরক চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। সেদিন বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা-সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ স্বাক্ষরিত চার্জশীটটি দাখিল করেন এস আই গোলাম মাওলা।
দুটি পৃথক ট্রাঙ্কে ভর্তি করে আনা চার্জশীটে নতুন করে ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এর আগের চার্জশীটে ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। নতুনভাবে অভিযুক্তদের মধ্যে স্থান পান বিএনপি নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ উল্লেখযোগ্য।
বিস্ফোরণের পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ
এতে জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও জেএমবি সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় ইতোমধ্যেই কার্যকর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।
ফলে এ মামলায় এখন আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন ২৩ জন এবং জামিনে ছিলেন ৮ জন। জামিনে থাকা আট জনের জামিন বাতিল করে আদালত।

'তারেক-বাবর ও পাকিস্তানী জঙ্গি'

মামলা চলাকালে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা বারবার বলেছেন যে তারা মনে করেন ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা৷
তারা আদালতকে জানান,ওই হামলার আগে ঢাকায় ১০টি বৈঠক হয় এবং এসব বৈঠকে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন৷ টাকা এবং গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে৷
পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর আব্দুল মজিদ বাট এই কাজে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল৷ বাংলাদেশে হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হরকতুল জিহাদ-এর সদস্যরা৷
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু হলে অনেক নতুন তথ্য প্রকাশ পায়৷
এর ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আরো অনেকের নাম আসে৷
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতে এসব আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে।
যদিও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন মামলার তদন্তই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।

সাত বছরে ৬ তদন্ত কর্মকর্তা

গ্রেনেড হামলার পর মামলা হয়েছিলো পৃথক তিনটি। এর মধ্যে প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি।
সম্পূরক চার্জশীটে নাম এসেছে তারেক রহমানের, তিনি এখন লন্ডনে
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ই জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
ওই অভিযোগ পত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের শনাক্ত করা হয়নি। বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্র পক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন।
১৩ দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার তদন্ত শেষ হয়।

২০১২ সালের ২৮ মার্চ: মামলার বিচার শুরু

একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায়, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮শে মার্চ বুধবার৷
বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় ওই বছর ৯ই এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়৷ এর আগে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শুরু হয়েছিলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিশেষ ট্রাইবুনালে৷
এই মামলায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানসহ ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচারকার্য শুরু হয়েছিল৷ আদালত ৬১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন৷
আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ গ্রহণ করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণ কী?

মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে পরস্পরকে দায়ী করেছেন রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা। রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বিবিসিকে বলেছেন, " আসামী পক্ষের আইনজীবীরা মামলা দুটি পাঁচ বার উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়ায় আদালতের ২৯২ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে"।
গ্রেনেড হামলার ঘটনাস্থলেই ২২ জনসহ মোট নিহত হয়েছিলেন আইভি রহমান সহ ২৪ জন
এছাড়া তারা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে কালক্ষেপণ করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন বিএনপির সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদিন মেজবাহ।
তিনি বলেন, "এই মামলায় শুরুতে ৬১ জনের সাক্ষী নেয়ার পর অধিকতর তদন্তের আবেদন করা হয়। দ্বিতীয় রিপোর্ট আসা পর্যন্ত কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। এছাড়া প্রত্যেকটা আসামীর পক্ষে আলাদা আলাদা আইনজীবী জেরা করছেন। রাষ্ট্রপক্ষ ২২৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে। এটা অবশ্যই সময়সাপেক্ষ। সবই হয়েছে আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। কোন কিছু সংক্ষিপ্ত করার কোন সুযোগ নেই।"

১৮ই সেপ্টেম্বর শেষ হলো বিচারপ্রক্রিয়া: রায় দশ অক্টোবর

গত ১৮ই সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ১০ই অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন।
এ নিয়ে ১১৯তম কার্যদিবসে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হল। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৩০ ও আসামিপক্ষ ৮৯ কার্যদিবস ব্যয় করেছে।
ঘটনার ১৪ বছর এক মাস ২০ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পরের দিন শেখ হাসিনা যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখনও তিনি হত-বিহ্বল

Thursday, August 19, 2021

টেম্পোরাল লোব by নাসিমা আনিস

আকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে তখন। আমায় আনা হলো একটা আমড়া গাছের নিচে, কিংবা বাতাবি লেবু গাছের নিচে। কিংবা এমন হতে পারে এখন এই সব গাছেদের কোনো নাম আমার জানা নেই বলে মনগড়া একটা নাম দিয়ে আপনাদের সাথে বলে চলেছি। দেখুন নাম দেয়া হয় সনাক্ত করার সুবিধায়। যেমন এখন আমায় ওরা একটা নাম দিয়েছে। এই নাম ধরেই তারা আমাকে নিয়ে কত কি করছে! কী বিদঘুটে নাম সে আমি উচ্চারণ করতে পারি না। যদি নাম দিত পারিজাত, দোয়েল কিংবা বুলবুলি। তো আমি খুশি হতাম, পরিচয় নতুন হলেও তার একটা সুঘ্রাণ কোনো ভাবে আমার নাকে এসে লাগত। এমনকি আমি নিজের সাকিন পরিচয়ও দিয়ে দিতে পারতাম ওদের। কিন্তু ওরা আমার কাছে কোনো পরিচয় জানতে চায় না। নিদেনপক্ষে নামটা জানতে চাইতে পারত! আচ্ছা ঠিক আছে, ওরা ধরেই নিয়েছে এর সাথে কথা বলে লাভ নেই, কিংবা কথা বলার বস্তুই তো সে নয়!
তো এটা ভোর! মানে আমার কাছে জীবনদায়িনী এক মাহেন্দ্রক্ষণ। এই ক্ষণে এক অর্থে নিশ্চয় তাই-ই। আমি জেগে উঠেছি বৈকি! গাছের নিচের বাতাসটায় কেমন যেন ঘ্রাণ! না, আমার পরিচয় নেই এর সাথে। এর ধারে কাছে কোনো ঘ্রাণের সাথেও আমার পরিচয় নেই। ঝাঁঝালো আর তিতকুটে কিছুর ঘ্রাণ এমন হলে হতে পারে। বাল্যে নানাপদের গাছের সাথে আমার সর্ম্পক ছিল গভীর। গভীর মানে ততটা যতটা অন্যের সাথে নেই গাছেদের। এমনকি ধানের বীজতলা থেকে খড় পর্যন্ত আমার বন্ধন! বিচুলি হয়ে যবে গরুর জাবনায় যায়, তখন আমি নিরুপায়! লতা-পাতা, বীরুত-বৃক্ষ সব কিছুর নাম আমার মুখস্ত। আমার বিশ্বাস ছিল আমি খুব গাছপ্রেমিক, মানে প্রেমিকা। আমার কাছ থেকে কখনো কেউ আমায় আলাদা করতে পারবে না যেমন তেমন গাছেদের কাছ থেকেও না। কখনো না। একটা পাতার কাঁপনও আমাকে নাড়িয়ে দিত, যেন ব্যথার দান; ঝিরঝির করে স্নায়ুগুলোকে কয়েকশ কোটিবার আলোড়ন দিয়ে মিইয়ে দেয় যেন! কিন্তু এখন কি দেখছি, এই যে গাছটার নিচে আমি, সে কি গাছ তা জানি না, জানার কথা নয়! কেন নয়! আমি তো সব গাছই চিনতাম। প্রায় সব। দু’একটা ছাড়া। কেননা আমি সারা জীবন শুধু গাছের পিছনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। পিছন মানে সামনে পিছন যে কোনো দিকে! নাম না জানতে পারি, কিন্তু তাকে চিনি। সে কখন ফুল দিবে কখন লাল টুকটুকা হবে, ফলগুলো খেতে দলে দলে পাখি এসে কলরব করবে, সব জানতাম। এমন কি বহু ফল আমি মুখে দিয়ে চুষে চুষে দেখেছি, কোনোটা টক, কোনোটা নোনতা কোনোটা আবার তিতকুটে। কড়ই গাছের ফল খেয়ে দেখেছি মিষ্টি মিষ্টি একটা স্বাদ। জারুল, সেই বেগুনি ফুলের গোল্লা গোল্লা ফল খেয়ে দেখেছি, ভিতরে কেমন ভাঁজ ভাঁজ, টকো স্বাদ, মন্দ নয়!
তাহলে এখন কী বলবেন, এই আপনার কি আর কোনো কাজকাম ছিল না! কি সব গাছের গোটা খেয়ে বেড়িয়েছেন! ছিল তো, করেছিও। কিন্তু সে সবে বড্ড ফাঁকি ছিল। কেননা, কেউ যেমন আমায় বুঝত না, আমারও এক ধরনের না বোঝার আয়েশ ছিল। তবে, যেটুকু বুঝেছি সেটুকুতে ফাঁকফাঁকি ছিল না। আমার হাজারটা পশ্চাৎপদতার মধ্যে যে জিনিসটা বড় হয়ে দেখা দিল শেষ পর্যন্ত, সেটা আর কিছু না, টাকা। স্রেফ টাকার অভাবে আমার শেষ জীবনটা যখন দুর্বিসহ হয়ে উঠল যে এক ঝড়ের রাতে, টর্নেডোকে সহায় করে বেরিয়ে পড়লাম, আমি দেখাতে চাইলাম, এটা আমার দোষ নয়, সব দোষ ঐ ঝড়ের, সেই আমায় উড়িয়ে নিয়ে গেল। যখন আমি উড়ছি, একটা হা হা হাওয়ার চাদর আমায় নিয়ে চলেছে, চলেছে অসীম আকাশ পানে। আমি একবার শুধু নিচের দিকে তাকিয়েছি। একটা নিস্তরঙ্গ সমুদ্র, যার পানির রঙ প্রুশিয়ান ব্লু। আমি বোধ হয় একবার নিজের ছায়া দেখতে পেলাম সেই নীলে। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না তখন। রান্নাঘরের ভাতের হাড়িটা ঘরে তোলা হয়েছে কিনা, গোয়ালের দরোজাটা খুলে দড়ি খুলে দেয়া হয়েছে কিনা গরুগুলোর, কিচ্ছু মনে থাকল না। কিন্তু আকাশ সমান ভালো লাগায় ভরে গেল ভূবন। কোনো প্রাত্যহিকতার আবিল তাতে মাখাতে চাইলাম না। কিছু পাতা আমার গায়ে ঝড়ে পড়ল, কিছু শীলাখণ্ড হুড়মুড় করে গায়ে পড়ল। আর একটা বৃহৎ কিছুর সঙ্গে সজোরে বাড়ি খেলাম। সেটা  কি পাহাড় নাকি সে রকম বৃহত বৃক্ষ নাকি কোনো গ্রহের সাথে বাড়ি খেলাম জানি না। আমি সেখানে গিয়ে থামলাম, দমলাম এবং আমি বুঝলাম এবার আমার ভবলীলা সাঙ্গ হলো। ক্রমে ক্রমে এখন জেনে গেছি যার উপর পড়েছি তা এখন পাললিক শিলা, লক্ষকোটি বছর তার আশ্রয়ে কাটিয়ে দিলাম নানা বর্ণের আকাশ দেখে দেখে। কত রঙের আকাশ! এমন কি গাঢ় তীব্র বেগুনি! কিংবা ঘন কাঁচা হলুদ! রঙ পাল্টালো, ঘ্রাণ পাল্টালো, আলোও পাল্টালো। শুধু পাল্টালো না আমার এক টুকরো হৃদয়ের জমিন। পাললিক মায়ের বুক।
আবিষ্কারে মেতে যারা উঠল, প্রথমেই তারা ধরে নিল এই মহান জীবাস্মটা কোনো শক্তিমান মানুষের, কারণ এমন মহান কাজে শক্তিহীন এই পর্যন্ত আসতেই পারে না। আর কোটি বছর আগে যে পুরুষ নারী বিভাজন, সেখানে নারী অন্তঃপুরবাসিনী, জীবাশ্মের মত মহান কাজে নারীকে ভাবা যায়ই না!
সেই টুকরো জমিন, পাললিক যখন ব্যবচ্ছেদ করতে লাগল, দেখল পরতে পরতে খোলা যায় তাকে। সেটা হৃদপিণ্ড নাকি মস্তিষ্ক! নিশ্চয়ই মস্তিষ্ক, আমি এই কথা জেনেছিলাম, হৃদয় বলে কিছু নেই, মস্তিষ্কই সব। সেই সব চালায়।
আজ পর্যন্ত কোনো ফসিলে তারা জীবন্ত অবশিষ্ট কিছু পায়নি সেখানে এই মস্তিষ্ক জুড়ে রয়েছে আমসত্ত্ব, কি জারুলের ফল, হা হা হা, এই উপমা ছাড়া আর কি উপমা, পেঁয়াজের খোসা! মানে পরতের পর পরত।
টেম্পোরাল লোব উন্মোচন হল, ওরা অবাক বিস্ময়ে আমার মাথার হাড়ের ভিতর তাকিয়ে আছে। অবিশ্বাস্য, অসম্ভব এই জাতীয় কিছু প্রতিক্রিয়া দিয়ে দিয়ে ওরা হয়রান হয়ে গেল, পরস্পরকে আলিঙ্গন করতে ভুলে গেল, কিংবা কি জানি ওদের পৃথিবীতে বোধ হয় আলিঙ্গন টালিঙ্গন নেই! আমি দেখছি মানুষ আসলে মানতেই চায় না তার সীমাবদ্ধতা। এই মানতে না চাওয়াই তার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। পাললিক শীলায় লেপটে থাকা আমার মাথার কি একটা অংশ হাতে নিয়ে তারা পাগল হয়ে আছে। আমি বলতে চাইছি হে আমার কোটি প্রজন্মের উত্তরসূরী, কেন এত অবাক হচ্ছ। তোমাদের এই গ্রহে কি কোনো অজানা নেই! সব জেনে বসে আছ! ওরা আমার কথা শুনতে পায়, কিন্তু বুঝতে পারে সামান্যই। আমার টেম্পোরাল লোব খুঁজে পেয়েছ, মানে কি আমার সব জেনে বসে আছ! আমার ব্যক্তিগত বলে কিছু রাখনি! তবে কি এই সভ্যতা সে রকম, যেখানে নারী বা পুরুষ নেই, সবাই দুই জননের অধিকারী! কারো কোনো দৈহিক বাহাদুরি নেই, শক্তি দেখানোর ব্যাপার নেই!
কিন্তু তোমরা আমার সব যে জেনে গেলে, কি হবে আমার! আমি আসলে ইচ্ছে করেই সংসার থেকে পালিয়েছিলাম, সেটা জেনে এত হাসছ কেন! কত পরাধীন ছিলাম সংসারের সদস্যদের কাছে, সমাজের কাছে। বলেকয়ে পালানোর কোনো পথ ছিল না। আর পালিয়ে তো কোথাও যাবার জায়গা ছিল না। মেয়েদের নিজের বলে কিছু থাকতে নেই, সে যুগ যে! তো একটা উছিলা খুঁজছিলাম, বিধাতা দিলেন। আমার বিধাতা শব্দটা তারা বুঝতে সময় নিচ্ছিল, আলোচনা করছিল। আমি আকাশের কথা বললাম সেখানে কেউ একজন নিয়ন্ত্রণ করছেন। এবার তারা বুঝল। এভাবে অবশ্য অনেক কিছুই বোঝাতে হয়েছে। বেশিরভাগ কথা তো ওখানে ধরা ছিল, আমারগুলো। ও পাশের কথাগুলো আমার নিউরণে ততটা পরিষ্কার গাথা নেই।—খাবার নিয়ে কী হয়েছিল? কিংবা আরো আরো প্রশ্ন, আমি শুনতে পাই কিন্তু দেখতে পাই সামান্য। শুনছি যে বলছি, আসলে সেটা আমার আন্দাজ, যে আমি খাবার নিয়ে একটা প্রশ্ন পাব ওদের কাছ থেকে। নয় কেন! এটা তো জানা কথা। খাওয়ার খোটা, পরার খোটা, উপার্জন করতে না পারার খোটা, বাবা-মায়ের প্রচুর টাকা পয়সা না থাকার খোটা, সবই তো শুনতে হয়েছে। কিন্তু সত্য, আমি কিচ্ছু হজম করিনি। না হজম হওয়ার যে কী উপকারিতা, এই তো প্রথম পেলুম! কে আর আমার মত কোটি কোটি বছর পর এমন এক ভীন মানুষের মুখোমুখি হয়ে সওয়াল-জবাব করেছে, নির্ভয়ে!
একটা প্রশ্নই হয়ত করে, কী খাওয়া হতো। আমি বলি ভাত, আমরা ভেতো বাঙালি। আমার কথা ওরা বুঝতে পারে, বুঝে অয় অয় বলে। মানে ঠিক আছে বা ঠিক বুঝতে পেরেছি। আমি যা শুনতে পাই তার কিছুই বুঝতে পারি না। কিন্তু কোনো কারণে ওদের বিস্ময়ের কারণগুলোর একটু সুরাহা করতে মন চাইল। আমি কোন কালের তারা কোন কালের এ এক বিশাল ধাঁধাঁ। আমি কোনো কারণ ছাড়াই বলতে চাইলাম, আমার কিছু আগে রবীন্দ্রনাথ, লালন ছিলেন, আমার শেখ মুজিবের যুগ। শুনে ওরা আবার আ আ আ করতে লাগল, মানে ওরা এই নামগুলো জানে। আমি বললাম আমরা ভাত খেতাম, তাই ভাতের খোটা দিত। আমরা কাপড় পরতাম তাই কাপড়ের খোটা দিত। আমাদের বেঁচে থাকতে টাকার দরকার হত, তাই টাকার খোটা দিত। আমরা এসবে খুব কষ্ট পেতাম, হৃদয় থেকে অভিশাপ আসত, কিন্তু ওদের কিছুই হত না। আমাদের অভিশাপে ওরা আরো শক্তিশালী হত। ওরা জোর করে আমাদের সন্তান ধারনে বাধ্য করত, সন্তান থাকলে শক্ত হয় বাঁধন যে। সন্তানহীনের কোনো মূল্য নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের সব কথা শুনতে হত।
ওরা মনে হয় এতক্ষণে সবই বুঝে ফেলেছে। আর আ আ আ করে যাচ্ছে।
ওরা আমায় জাদুঘরে নিয়ে যাবে, সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো জ্যান্ত টেম্পোরাল লোব রাখতে পারেনি। আমিই প্রথম। আমি বলি আপনারা এই আবিষ্কারের জন্য কি নোবেল প্রাইজ পাবেন? শুনে ওরা খিক খিক করে হাসে, হাসিতে একধরনের কৃত্রিমতা ছেয়ে থাকে। আমার মনে হয় ওরা নোবেলের নাম জানলেও জানতে পারে কিন্তু সে বড় হাস্যকর একটা বস্তু বলে জানে।
আমায় যখন মাটির নিচের কোনো একটা ল্যাবে নিয়ে যাচ্ছে তখন মনে হল একটা কথা বলা জরুরি, মানে বলে রাখা ভালো। বললাম আমি কিন্তু নারী, আমার স্মৃতিশক্তি তাই পুরুষদের তুলনায় অনেক তীক্ষ্ণ।
তারা এবার একটা জোরে হাসি দিল, সেই খিক খিক নয়, কিছুটা সুন্দর। বলে, তাই তো তোমার সবকিছু অটুট, ঘ্রাণ, শ্রবণ, কথাবলা, দেখা, দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি, সব। আর তুমি সত্যি পৃথিবীর সুন্দরতম মানুষ।
আহ্ টেম্পোরাল লোব সজাগ ছিল ভাগ্যিস, তাইতো এই অনুমোদন পেলুম!

Sunday, August 15, 2021

গল্প- সুইটনেস by টনি মরিসন

অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর।
চলে গেলেন নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক টনি মরিসন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ৫আগস্ট ২০১৯ সোমবার রাতে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। টনি মরিসনের জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে 'বিলাভেড', 'সং অব সলোমন', সুলা, 'দ্য ব্লুয়েস্ট আই'। ১৯৯৩ সালে সাহিত্যের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
>>>>>>
দোষ আমার নয়। তাহলে আমাকে দোষ দিতে পারো না তোমরা। এতে আমার হাত ছিল না। কী করে এমনটি হলো আমি জানিও না। আমার দু পায়ের সংযোগস্থল থেকে অন্যরা ওকে টেনে বের করে। তার এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি বুঝতে পারি কোথাও একটা গোলমাল হয়ে গেছে। সত্যিই গোলমাল হয়ে গেছে। ওর গায়ের রং এতটাই কালো, আমি দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সিটিয়ে যাই। মাঝরাতের মতো কালো। সুদানের মানুষের মতো কালো। আমার ত্বক মোটামুটি ফর্সা; মাথার চুলের রংও ভালো; আমরা এরকম রংকে বলি উজ্জ্বল হলুদ। লুলা অ্যানের বাবার রংও এ রকমই। আমার পরিবারের লোকেরা যে যেখানে আছে তাদের কারো গায়ের রং ওর গায়ের রংয়ের ধারে কাছে নয়। ওর গায়ের রংয়ের সবচেয়ে কাছের তুলনা চলে আলকাতরার সাথে। তবে ওর চুলের রং গায়ের সঙ্গে খাপ খায় না। হালকা কোঁকড়ানো হলেও বেশ সোজা। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাংটা প্রজাতির লোকদের চুলের মতো। তোমাদের মনে হতে পারে আমাদের সুদূর কোনো পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য ওর মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু কার কাছ থেকে ওর আবির্ভাব হয়েছে কার কাছে? আমার নানিকে তোমরা দেখেছ নিশ্চয়ই। তাকে শ্বেতাঙ্গ বলেই তো মনে করা হতো; তার বিয়েও হয়েছিল শ্বেতাঙ্গের সাথে। তার সন্তানদের সম্পর্কে একটা কথাও তিনি বলেননি কাউকে। আমার মায়ের কিংবা খালাদের কাছ থেকে কোনো চিঠি পেলে না খুলে, না পড়েই ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। শেষে তারা আর কোনো খবর পেলেন না। তাকে তার মতো থাকতে দিলেন। তখনকার দিনে প্রায় সব বর্ণসংকর এবং সংকরদের সংকর সন্তানদের প্রায় সবাই এরকমই করতেন, বিশেষ করে তাদের চুল মনের মতো হয়ে থাকলে। কল্পনা করতে পারো কতজন শ্বেতাঙ্গের শরীরের অভ্যন্তরে কৃষ্ণাঙ্গের রক্ত বয়ে চলেছে? অনুমান করে দ্যাখো। আমি শুনেছি এরকম শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা শতকরা বিশজন। আমার নিজের মা লুলা মে নিজেকে শ্বেতাঙ্গের বংশধর বলে চালিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ থাকতেই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর জন্য অবশ্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। নিজেদের বিয়ের সময় বাবা আর মা গিয়েছিলেন আদালত ভবনে। সেখানে দুটো বাইবেল রাখা ছিল। একটার ওপরে হাত রেখে কৃষ্ণাঙ্গরা শপথ নিতেন। আরেকটা রাখা ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য। তাদেরকে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য রাখা বাইবেলে হাত রাখতে দেয়া হয়েছিল। বাইবেল বলে কথা! বাইবেল নিয়ে কি প্রতারণা করা যায়? এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতির বাড়িতে হাউসকিপার হিসেবে কাজ করতেন আমার মা। আমার মায়ের হাতের রান্নাই তারা প্রতিবেলা খেতেন। গোসলের সময় বাথটাবে বসে আমার মাকে পিঠ কচলে দিতে বলতেন তারা। তাকে আরো কত গোপন কাজকর্ম করতে বলতেন খোদা মালুম। কিন্তু কখনোই তাদের বাইবেল ছুঁতে দিতেন না। 
তোমরা কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারো গায়ের রং নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা খারাপ কাজ; ত্বক যত হালকা ততই ভালো। সামাজিক ক্লাবে, পাড়া প্রতিবেশে, গির্জায়, মহিলা সমিতিতে এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুলে পর্যন্ত এরকম বিভাজন দেখা যায়। না হলে সামান্য একটু মর্যাদাই বা রাখা যায় কী করে? ওষুধের দোকানে গিয়ে অন্যের থুথু থেকে বাঁচার আর অন্য কী উপায় থাকতে পারে? বাসস্টপে কোণঠাসা হয়ে ছিটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে, শ্বেতাঙ্গদের জন্য পুরো ফুটপাতটা ছেড়ে দিয়ে নালার ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে, মুদির দোকানে শ্বেতাঙ্গ ক্রেতাদের জন্য বিনামূল্যের একটা কাগজের ব্যাগের জন্য যখন আমাদের পাঁচ সেন্ট ধরা হয় তখন আর কী-ই বা করার থাকে? নামের সঙ্গে আরো কত কিছু জুড়ে দেয়ার কথা তো বাদ দিলেও আরো অনেক, অনেক কিছু শুনেছি। গায়ের রং একটু উজ্জ্বল হওয়াতে বিভাগীয় বিপণীতে হ্যাট কেনার আগে মাথায় দিয়ে পরোখ করে দেখতে কিংবা লেডিস রুম ব্যবহার করতে আমার মাকে বাধা পেতে হয়নি। আর আমার বাবা জুতা পায়ে লাগে কিনা দেখার জন্য দোকানের সামনের অংশে জুতা পরতেন, পেছনের রুমে নয়। তাদের দুজনের কেউই “শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য” লেখা ফাউন্টেন থেকে পানি খেতে পারতেন না, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মারা গেলেও না।
বলতে খারাপ লাগলেও বলতেই হচ্ছে, শুরু থেকেই মেটারনিটি ওয়ার্ডে লুলা অ্যান শিশুটি আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেই যাচ্ছিল। জন্মের সময় ওর ত্বক অন্যান্য বাচ্চাদের মতোই ফ্যাকাশে ছিল। এমনকি আফ্রিকার বাচ্চাদেরও এরকমই থাকে। কিন্তু দ্রুতই ওর ত্বকের রং বদলে যেতে থাকে। আমার চোখের সামনে ওর ত্বক নীলাভ কালো হয়ে যাওয়া দেখলাম; মনে হলো আমি পাগল হয়ে যাব। আমি জানি, মিনিট খানেকের জন্য আমি মাথা খারাপই হয়ে গিয়েছিলাম। ওর মুখের ওপরে এক সেকেন্ডের জন্য একটা কম্বল চেপে ধরেছিলাম। কিন্তু এর বেশি আর কিছু করতে পারিনি। মনে প্রাণে যতই চাই না কেন এই ত্বক নিয়ে ওর জন্মানো ঠিক হয়নি, তবু আমার পক্ষে আর নিষ্ঠুর হওয়া সম্ভব হয়নি। আমার এমনও মনে হয়েছিল, ওকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে দিব। কিন্তু যে মায়েরা গির্জার সিঁড়ির ওপরে গোপনে বাচ্চা রেখে চলে যায় তাদের মতো হতে সাহস পাইনি। সম্প্রতি জার্মানির এরকম এক দম্পতির কথা শুনেছি। তাদের দুজনেরই ত্বক তুষারের মতো সাদা। তাদের কালো ত্বকের একটা বাচ্চা হয়েছে। কেউ কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। মনে হয় যমজ বাচ্চার কথা শুনেছিলাম: একটা সাদা ত্বকের, আরেকটার ত্বক কালো। তবে ঠিক জানতে পারিনি, খবরটা সত্যি কিনা। তবে আমার ক্ষেত্রে জানি, লুলা অ্যানকে পরিচর্যা করা মানে কোনো নিগ্রো শিশুকে পরিচর্যা করা; নিগ্রো শিশুকে আমার বুকের দুধ খাওয়ানো। বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওকে বোতলে দুধ খাওয়ানো শুরু করি।  
আমার স্বামী লুই ট্রেনে যাত্রীদের ঘুমানোর জায়গার পরিচারক। কাজ থেকে ফিরে এসে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি সত্যি পাগল হয়ে গেছি আর শিশু মেয়েটার দিকে তাকানোর ভাব দেখে মনে হলো লুই ভাবছে ও এসেছে বৃহস্পতি গ্রহ থেকে। যা তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর মতো মানুষ নয় লুই। লুই যখন ‘ধুস্ শালার! এটা কী নরকের কীট রে!’ বলল, তখনই আমি বুঝে গেলাম আমাদের মধ্যে ঝামেলার শুরু হলো বলে। সত্যি সত্যি সেরকমই হতে লাগল। তার আর আমার মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলতে লাগল। আমাদের দাম্পত্য জীবন খান খান হয়ে গেল। আমরা এক সঙ্গে তিনটে বছর খুব ভালোই ছিলাম। কিন্তু শিশুটার জন্মের পর থেকে লুই আমাকে দোষ দিতে লাগল। লুলা অ্যানের সাথে তার আচরণ দেখে মনে হলো সে ওকে চেনেই না। আরও বেশি খারাপ হতে লাগল ওর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি— ও যেন লুইয়ের শত্রু। লুই ওকে কোনো দিন ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখল না। 
আমি অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে মজা লুটিনি— সে কথাটা আর লুইকে বোঝানোর চেষ্টা করিনি। কারণ চেষ্টা করে লাভ হতো না। সে জোর মনে নিশ্চিত থাকত, আমি মিথ্যে বলছি। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের যুক্তিতর্ক চলল বেশ। শেষে আমি লুইকে বললাম, লুলা অ্যানের ত্বকের রং এসেছে তার পরিবারের কোনো পূর্বপুরুষের কাছ থেকে। আমার পরিবারের কারো কাছ থেকে আসেনি। এরপর জটিলতা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমার কথা শুনে আর কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে লুই বের হয়ে যায়। সুতরাং মাথা গোঁজার জন্য আমাকে আরো সস্তা একটা জায়গার খোঁজ করতে হয়। থাকার ঠাঁই খোঁজার ব্যাপারে আমি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। বাড়ির মালিকদের কাছে আবেদন করার সময় আমি লুলা অ্যানকে সাথে নিইনি। ওর  দেখাশোনার  জন্য এক কিশোরী কাজিনের কাছে  রেখে যেতাম। পরেও অবশ্য ওকে নিয়ে খুব বেশি বাইরে বের হইনি। কারণ দু-একবার যখনই বের হয়েছি, ওর হাত গাড়ির দিকে উৎসুক লোকজন এগিয়ে এসেছে, উকি দিয়ে আদরের কোনো কথা বলবে ভেবেছে। কিন্তু সাথে সাথে চমকে গিয়ে কয়েক কদম পিছিয়েছে। তাদের মুখে অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠতে দেখেছি। সেটা আমার জন্য দুঃখের ছিল। যদি আমার গায়ের রং কালো হতো আর ওর গায়ের রং সাদা হতো তাহলে আমাকে বেবিসিটার মনে করাটা স্বাভাবিক ছিল। গায়ের রং কালো হলে, এমনকি ত্বকের ওপরে হলুদ রংটা খানিক বেশি থাকলেও শহরের ভদ্রপাড়ায় বাসা ভাড়া পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। নব্বইয়ের দশকে, লুলা অ্যানের জন্মের সময় আইন জারি হয়েছিল— বাসা ভাড়া দেয়ার সময় বৈষম্য দেখানো যাবে না। কিন্তু খুব কম বাড়িঅলাই সে আইনের পরোয়া করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ভাড়াটিয়াকে বাসা ভাড়া না দেয়ার নানা অজুহাত বের করেছে তারা। তবে মি. লেইফের বাড়ি ভাড়া পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যের অধিকারী মনে করলাম। তবে বিজ্ঞাপনে যা উল্লেখ্য করেছিলেন ভাড়া তার চেয়ে সাত ডলার বেশি নিলেন আমার কাছ থেকে। আর টাকা দেয়া এক মিনিট দেরি হলে আর কথা ছিল না; তার বাহ্যজ্ঞান লোপ পাওয়ার অবস্থা।     
আমাকে ‘মাদার’ কিংবা ‘মামা’ বলার বদলে ‘সুইটনেস’ ডাকতে শিখিয়ে দিলাম লুলা অ্যানকে। সেটাই নিরাপদ মনে হলো আমার। ওর গায়ের রং আর মোটা ঠোটে আমাকে মামা ডাকলে লোকজন গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাছাড়া ওর চোখের রংটাও আরেক বিদঘুটে বিষয়— কাকের মতো কালো, কিন্তু তার ওপরে আবার নীলের ছোঁয়া। দেখলে কেউ ডাইনি মনে করতে পারে।
সুতরাং আমাদেরকে অনেক দিন কাটাতে হয়েছে শুধু আমাদের দুজনের পরষ্পরের সান্নিধ্যে। আর পরিত্যক্ত স্ত্রী হওয়া কী যে কঠিন অভিজ্ঞতা তা আর মুখে বলা যায় না। আমার মনে হয় আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাওয়ার জন্য লুই অনুতপ্তবোধ করেছে। কারণ কয়েক মাস পরে আমার ঠিকানা খুঁজে বের করে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করে সে। আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কখনও টাকা চাইনি, কিংবা টাকার জন্য আদালতের দারস্থও হইনি। তার পাঠানো মাসে পঞ্চাশ ডলার এবং আমার হাসপাতালের রাত্রিকালীন চাকরি থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে আমার আর লুলা অ্যানের মোটামুটি চলে যেতে থাকে; আমরা ওয়েলফেয়ারের দান থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হই। ওয়েলফেয়ারের সুবিধা নেয়া যে রকম লজ্জার তাতে আমার মনে হয় ‘ওয়েলফেয়ার’ কথাটার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াই ভালো: আমার মায়ের বালিকা বয়সে এটার নাম ছিল ‘রিলিফ’। যা-ই হোক, এ রিলিফ অনেকটা হাপিয়ে যাওয়ার পরে বিশ্রামের নিঃশ্বাসের মতো। এটা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। ওয়েলফেয়ারের ইতর কেরানিগুলোর স্বভাব চরিত্র মুখ থেকে ফেলে দেয়া থুথুর মতো। হাসপাতলে চাকরিটা পাওয়ার পর আমি যা উপার্জন করতে শুরু করলাম ওরা কোনো দিন সে পরিমাণও আয় করতে পারেনি। আমার মনে হয় ওদের দেয়া চেকের মধ্যেও হীনতার উপস্থিতি ছিল। সে কারণেই ওরা আমাদেরকে ভিক্ষুকের মতো দেখত। বিশেষ করে যখন ওরা লুলা অ্যানের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকাত ওদের চাহনি দেখে মনে হতো আমি যেন প্রতারণা করছি। হাসপাতালের কাজটা পাওয়ার পর অবস্থার অনেক উন্নতি হলেও আমাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। আমি লুলা অ্যানকে খুব সতর্কতার সাথে মানুষ করেছি। আমাকে কঠোর হতে হয়েছে, খুব কঠোর। ওকে ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছি, অন্যদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কারো সাথে বিবাদে না জড়ানোর জন্য কীভাবে মাথা নিচু করে থাকতে হবে। লুলা অ্যান ওর নাম কত বার বদল করল না করল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। কিন্তু ওর গায়ের রঙের বোঝা ওকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তবে এটা আমার কোনো দোষ থেকে হয়নি; আমি দোষী নই, মোটেও না।
ওহ, হ্যাঁ, লুলা অ্যান খুব ছোট থাকা অবস্থায় ওর সাথে যে রকম আচরণ করেছি আমি তার জন্য খুব অনুতাপ হয় আমার। কিন্তু তোমাদের বুঝতে হবে: ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল তো আমারই। জগৎ সংসার কেমন তা তো ওর জানা ছিল না। ওরকম ত্বকের কারণে কেতাদুরস্ত হওয়া, কিংবা সঠিক পথে থেকেও অন্যের অন্যায় আচরণের বিপক্ষে কঠিন হওয়ার চেষ্টা করার তো কোনো মানে হয় না। সঠিক কথাটি মুখের ওপর বলতে গেলেই কিশোর অপরাধের নাম করে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেবে। এ জগতে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গকে সবার শেষে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু চাকরি থেকে ছাঁটাই করার সময় তাকেই প্রথমে ছাঁটাই করা হয়। জন্মের পর ওতো এসবের কিছু জানত না। জানত না ওর কালো ত্বক শ্বেতাঙ্গদের কী রকম ভয় পাইয়ে দিতে পারে, কিংবা ওকে নিয়ে তারা কীভাবে হাসাহাসি করবে, তামাশা করবে। একবার একটা মেয়েকে দেখেছিলাম; লুলা অ্যানের মতো এতটা কালো নয়। বয়স দশ বছরের ওপরে হবে না মোটেই। একদল শ্বেতাঙ্গ ছেলে পায়ে পা লাগিয়ে ওকে বার বার ফেলে দিচ্ছে। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই দলের আরেক ছেলে ওর পিঠের ওপরে লাথি দিয়ে আবার ফেলে দিচ্ছে। মজা দেখে হাসতে হাসতে ছেলেগুলোর পেটে খিল ধরে যাওয়ার উপক্রম। অনেক কষ্টে মেয়েটা উঠে চলে গেল; তবু ওদের হাসি আর যেন থামে না। নিজেদের নিয়ে ওদের গর্বের শেষ নেই মনে হলো। আমি বাসের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম তাদের উল্লাস; নইলে আমি মেয়েটাকে সহায়তা করতে পারতাম, তাকে শ্বেতাবর্জনার স্তুপ থেকে উদ্ধার করতাম। এবার বুঝতে পারছ, লুলা অ্যানকে আমি না শেখালে ও সব সময় রাস্তা পার হওয়া এবং শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত না। ওকে এতসব শেখানোর ফলাফল পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত ওর জন্য আমি গর্বিত। 
তোমাদের জানা দরকার, মা হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না। তবে ভালো করতে গিয়ে আমার একমাত্র মেয়েকে দুঃখ দেয়ার মতো কোনো কাজ করে ফেলতেও পাির। কারণ ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল আমার। অবশ্যই। দরকার ছিল শুধু আমার ত্বকের সুবিধার কারণে। প্রথমত শুধু ওর পরিচয়ের জন্য সাধারণভাবে ওকে ভালোবাসতে পারিনি আমি, ওর কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়কে এড়িয়ে সেটা সম্ভব ছিল না। তবে এখন আমি পারি। সত্যিই পারি। আমার মনে হয় সেটা ও বুঝতে পারে। আমার তো সে রকমই মনে হয়। 
গত দুবার ওর সাথে দেখা হওয়ার সময় ওকে আমার কাছে নজরে পড়ার মতোই মনে হয়েছে। বেশ সাহসী, আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবার ও যখন আমাকে দেখতে এসেছে আমি ভুলেই গেছি আগে ও কতটা কালো ছিল। কারণ নিজের সৌন্দর্যকে ও ফুটিয়ে তুলেছে সুন্দর সাদা পোশাকে।
ওর কাছ থেকে একটা শিক্ষা আমি পেয়েছি, সেটা আগেই পাওয়া উচিত ছিল: বাচ্চাদের সাথে বড়রা যে আচরণ করে থাকে তার গুরুত্ব অনেক। বড় হতে হতে ওরা কখনোই ভোলে না সে সব। ওর সক্ষমতা আসার সাথে সাথে লুলা অ্যান আমাকে সেই অসহনীয় অ্যাপার্টমেন্টে রেখে চলে যায়। আমার থেকে যতটা সম্ভব দূরে চলে যায় ও। নিজেকে ভালো পোশাকে সজ্জিত করে, ক্যালিফোর্নিয়াতে ব্যস্ততার বড় চাকরি শুরু করে। তারপর ফোন করে না, কিংবা আর দেখা করতে আসে না। মাঝে মধ্যেই টাকা পয়সা, এটা ওটা পাঠায়। কিন্তু কত দিন যে ওকে দেখি না! শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারি না।
নগরীর বাইরে আরো সব বড় বড় ব্যয়বহুল নার্সিং হোম আছে; তবে আমি থাকি উইনস্টন হাউস নামের একটাতে। আমার এটাই ভালো লাগে। আয়তনে ছোট, খরচ কম, বাড়ির মতো পরিবেশ। চব্বিশ ঘণ্টা নার্সদের সেবাযত্ন। সপ্তাহে দুদিন ডাক্তার আসেন। আমার বয়স এখন তেষট্টি। এরকম জায়গায় আসার পক্ষে বেশ অল্প বয়স। কিন্তু হাড়ের একটা রোগের আক্রমণে আমি কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম। সেবাযত্ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। শারীরিক দুর্বলতা কিংবা ব্যথার চেয়ে একঘেয়েমি আরো বেশি খারাপ। তবে এখানকার নার্সরা খুব ভালো। আমি যখন বললাম আমি নানি হতে যাচ্ছি একজন নার্স আমার কপোলে চুমু দিয়ে দিল। মেয়েটার হাসি আর প্রশংসা অতি সম্মানের মুকুটের মতো মনে হলো। লুলা অ্যানের পাঠানো নীল কাগজের চিরকুটটা আমি মেয়েটাকে দেখালাম। চিরকুটের নিচের অংশে লুলা অ্যান স্বাক্ষর করেছে, ‘ব্রাইড’ বলে। ওই শব্দটাতে আমি মনোযোগ দিইনি। ওর কথাগুলো আমার কাছে কিছুটা ইন্দ্রিয় বিলাসী মনে হলো বলে। “এস, অনুমান করতে পারো এই খবরটা দিতে কত আনন্দিত হয়েছি আমি? খুব শিঘ্রই আমার বাচ্চা হতে যাচ্ছে। আমার খুব শিহরণ লাগছে। আশা করি তোমারও।” আমার শিহরণ শিশুটাকে নিয়ে, ওর বাবাকে নিয়ে নয়। কারণ লুলা অ্যান শিশুর বাবা সম্পর্কে কিছুই লেখেনি। আমার জানতে ইচ্ছে করে সেও ওর মতোই কালো নাকি! যদি তা-ই হয় তাহলে আমাকে যতটা চিন্তায় পড়তে হয়েছিল লুলা অ্যানের তত চিন্তার কিছু নেই। আমার অল্প বয়সের সে অভিজ্ঞতা থেকে এখন দিন খানিকটা বদলে গেছে। নীলচে কালো রঙের মানুষদের এখন টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতে, বিজ্ঞাপনে— সবখানেই দেখা যায়। এমনকি সিনেমাতেও তারা অভিনয় করছে।
খামের ওপরে ওর নিজের ঠিকানা নেই। সুতরাং বুঝতে পারি, আমি এখনও খারাপ মা-ই রয়ে গেছি। আমার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত শাস্তি পেতে হবে আমাকে। কেননা প্রয়োজনের দিকে নজর দিয়ে, বাস্তবতার দিকে খেয়াল করেই আমি ওকে মানুষ করেছি। আমি জানি ও আমাকে ঘৃণা করে। আমাদের সম্পর্ক কত নিচে নেমে গেছে: ও আমাকে টাকা পাঠায়। বলতেই হচ্ছে, এজন্যও আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। নইলে অতিরিক্ত খরচের জন্য ভিক্ষে করতে হতো। অন্য কয়েকজনকে সেটা-ই করতে দেখেছি। একাকী খেলার জন্য তাসের সেট চাইলেই আমি পেতে পারি; তার জন্য লাউঞ্জের পুরনো রংচটা সেট নিয়ে খেলতে হবে না আমাকে। মুখে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ক্রিমও আমি কিনতে পারি। কিন্তু নিজেকে অতটা বোকা বানানোর পক্ষে নই আমি। আমি জানি, যেটুকু বিবেকবোধ ওর অবশিষ্ট আছে তার চেয়েও নিচের একটা কাজ হলো শুধু টাকা পাঠিয়ে দূরে চুপ করে থাকা।
আমার কথা যদি বিরক্তিকর মনে হয়, অকৃতজ্ঞের মতো শোনায় তাহলে এর আংশিক কারণ হলো আমার অনুশোচনা— যে সকল ছোটখাটো কাজকর্ম আমি করিনি, কিংবা ভুল করে করেছি সেগুলোর জন্য অনুশোচনা। প্রথম যখন ওর রজঃস্রাব হয়েছিল তখনকার কথা মনে আছে; ওর প্রতি আমার প্রতিক্রিয়াও মনে আছে। কিংবা হাঁটতে গিয়ে হোঁচট লাগলে, কোনো কিছু ফেলে দিলে চিৎকার করে উঠেছি। আরো একটা সত্যি কথা হলো, ওর জন্মের সময় ওর ত্বকের কথা ভেবে আমি হতাশবোধ করেছি, বিরক্তবোধ করেছি। খুব দ্রুত আমাকে সেসব স্মৃতি দূরে ঠেলে দিতে হবে। সে স্মৃতি জিইয়ে রেখে লাভ নেই। আমি জানি, ওরকম পরিস্থিতিতে ওর জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো সেটাই করেছি আমি। আমার স্বামী যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়, লুলা অ্যান আমার কাছে একটা বোঝা ছিল তখন। একটা বড় বোঝা। কিন্তু আমি সে বোঝা ভালো করেই বহন করেছি।
আমি ওর প্রতি কঠোর ছিলাম ঠিকই, তোমরা জোর গলায় বলতেই পারো। ওর বয়স বারো পেরিয়ে তেরোর দিকে যাওয়ার সময় আমাকে আরো কঠোর হতে হয়েছে। মুখে মুখে কথা বলত, আমার রান্না খেতে দিলে খেতে চাইত না, আমি চুল বেধে দিলে স্কুলে গিয়ে খুলে ফেলত। আমি চাইতাম না অন্যদের চোখে ওকে খারাপ দেখা যাক। লোকে কী কী নামে ডেকে ওকে ক্ষেপাতে পারে সে সব সম্পর্কেও ওকে সতর্ক করে দিতাম। আমার কোনো কোনো সতর্কতা হয়তো ওর মনে বেশি দাগ কেটেছে। দ্যাখো, কেমন বদলে গেছে। ক্যারিয়ার নিয়ে কত সফল, সচ্ছল! ওকে কি আর ছোট করে দেখার সুযোগ আছে? 
এখন ওর পেটে বাচ্চা। চমৎকার অর্জন লুলা অ্যান। যদি মনে করে থাকো মাতৃত্ব মানে মধুর স্বরে কথা বলা, মাতৃত্ব মানে প্রাপ্ত কোনো মূল্যবান দ্রব্য, কিংবা ডায়াপার ইত্যাদি, তাহলে তোমার মানসিক ঝাঁকি খাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বড় ধরণের ঝাঁকি। কল্পনা করে দ্যাখো তোমার বেনামি ছেলেবন্ধু, কিংবা স্বামীর কথা! আই লাভ ইউ মাই বেবি!
আমার কথা শোনো। মা হলে কেমন লাগে এখন বুঝতে যাচ্ছ— জগৎ সংসার কেমন, কেমন করে চলে এ জগৎ, মা হওয়ার পরে জগৎটা কেমন করে বদলে যায়— সব দেখতে পাবে।
সব সৌভাগ্য তোমার জন্য! ঈশ্বর তোমার সন্তানের মঙ্গল করুন।

শেখ মুজিব হত্যার পর জেনারেল জিয়া যে মন্তব্য করেছিলেন

আপডেট- ১৫ অগাস্ট ২০১৭: অন্যান্য দিনের মতোই রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৪ই অগাস্ট রাত ৮টা নাগাদ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ফেরেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত ১২টার মধ্যেই সে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যায়।
তখন সে বাড়ির নীচ তলায় একটি কক্ষে কর্মরত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মুহিতুল ইসলাম। রাত তিনটা নাগাদ ঘুমাতে যান মি: ইসলাম।
এর কিছুক্ষণ পরেই সে বাড়িতে টেলিফোনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি মি: ইসলামকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। কারণ রাষ্ট্রপতি তার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন।
মুহিতুল ইসলাম ২০১৬ সালে মারা যান। ১৯৯৬ সালে মি: ইসলাম শেখ মুজিব হত্যা মামলার বাদী হয়েছিলেন।
এর আগে ২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে মি: ইসলাম বলেন, " বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, সেরনিয়াবাত সাহেবের বাসায় আক্রমণ করছে। ঐ অবস্থায় আমি পুলিশকে টেলিফোনের চেষ্টা করছিলাম। তারপরে বঙ্গবন্ধু উপর থেকে নিচে নেমে এলেন। গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা। তখন উনি আমাকে বললেন যে আমার কাছে দে।
"আমার কাছ থেকে তিনি রিসিভারটা নিলেন। নিয়ে বললেন যে , হ্যালো আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি। উনি একথা বলার সাথে সাথেই বৃষ্টির মতো গুলি আসা শুরু হলো। উনি গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বললেন যে পুলিশ সেন্ট্রি,আর্মি সেন্ট্রি - এতো গুলি চলছে তোমরা কী করো? আমিও ওনার পিছু এসে দাঁড়ালাম। উনি একথা বলেই উপরে উঠে চলে গেলেন।"
এ গোলাগুলির সময় রাষ্ট্রপতিসহ তাঁর বাড়ির কেউ ঘটনা সম্পর্কে আঁচ করতে পারেন নি।
শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালকে যখন বাড়ির নিচ তলায় গুলি করে হত্যা করা হয় তখন ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল, বলছিলেন মুহিতুল ইসলাম।
ধানমন্ডির সে বাড়িতে সশস্ত্র হত্যাকারীরা প্রথমে হত্যা করে শেখ কামালকে। গোলাগুলির আওয়াজ শোনার পর ঘটনা সম্পর্কে জানতে বাড়ির নিচ তলায় নেমে আসেন শেখ কামাল।
"পাঁচ-ছয়জন আর্মি, কেউ কালো পোশাকধারী কেউ খাকি পোশাকধারী - ওনার সামনে এসে বললো হ্যান্ডস আপ। কামাল ভাই বলছে, আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। তখনই সাথে-সাথে ব্রাশ ফায়ার।"
গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হয়ে মুখ থুবড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শেখ কামাল।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে যখন আক্রমণ হয় তখন কোন ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই হত্যাকারীরা পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।
মুহিতুল ইসলাম বলছিলেন, একজন রাষ্ট্রপতির বাড়িতে যে ধরণের নিরাপত্তা থাকা দরকার সেটি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে ছিল না। তাছাড়া রাষ্ট্রপতির বাড়িতে আক্রমণের পরেও কোন তরফ থেকে কোন ধরনের সহায়তা আসেনি।
শেখ কামালকে হত্যার পর হত্যাকারীরা বেপরোয়া গুলি চালিয়ে বাড়ির উপরের দিকে যাচ্ছিল। উপরে উঠেই শুরু হয় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। চারিদিকে তখন শুধু গুলির শব্দ।
" উপরে তো তাণ্ডবলীলা চলছে। চারিদিকে একটা বীভৎস অবস্থা। ঠিক সে মুহূর্তে উপর থেকে চিৎকার শুরু করলো যে পাইছি পাইছি। এরপরে বঙ্গবন্ধুর একটা কণ্ঠ শুনলাম। তিনি বললেন, তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস? এরপরে ব্রাশ ফায়ার। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ আমরা আর শুনতে পাইনি," সে রাতের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করলেন মুহিতুল ইসলাম ।
মি: ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী ধানমন্ডির সে বাড়িটিতে সর্বশেষ হত্যা করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে। তখন তার বয়স মাত্র দশ বছর। এ হত্যাকাণ্ডটি হয়েছিল মুহিতুল ইসলামের সামনে।
"রাসেল দৌড়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে। আমাকে বললো, ভাইয়া আমাকে মারবে না তো? ওর সে কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ফেটে পানি এসেছিল। এক ঘাতক এসে আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে ভীষণ মারলো। আমাকে মারতে দেখে রাসেল আমাকে ছেড়ে দিল। ও (শেখ রাসেল) কান্নাকাটি করছিল যে 'আমি মায়ের কাছে যাব, আমি মায়ের কাছে যাব'। এক ঘাতক এসে ওকে বললো, 'চল তোর মায়ের কাছে দিয়ে আসি'। বিশ্বাস করতে পারিনি যে ঘাতকরা এতো নির্মমভাবে ছোট্ট সে শিশুটাকেও হত্যা করবে। রাসেলকে ভিতরে নিয়ে গেল এবং তারপর ব্রাশ ফায়ার।"
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সব সদস্যকে হত্যার পর ঘাতকরা একে অপরকে বলছিল, "অল আর ফিনিশড (সবাই শেষ)"।
সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সাথে জড়িত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা। সে সময় ঢাকা সেনানিবাসে লেফট্যানেন্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মি: চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা যান।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত একজন সেনা কর্মকর্তা মেজর রশিদের নেতৃত্বে একদল সেনা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে।
আমিন আহমেদ চৌধুরী তখনো জানতেন না যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। মেজর রশিদের নেতৃত্বে সৈন্যরা আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং তৎকালীন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে যায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। জেনারেল জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান।
জেনালের জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানতে পারেন যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।
"জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, 'শাফায়াত কী হয়েছে?' শাফায়াত বললেন, 'অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।' তখন জেনারেল জিয়া বললেন, সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।"
সেনানিবাসের দুটি ব্যাটালিয়ন এ অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকলেও পুরো সেনাবাহিনী সেটার পক্ষে ছিল না বলে উল্লেখ করেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। ঢাকা সেনানিবাসে যখন এ অভ্যুত্থানের খবর ছড়িয়েছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনার খবর কেন আগে জানা সম্ভব হয়নি এবং কেন সেনাবাহিনীর অন্য কোন ইউনিট এগিয়ে আসেনি সেটি আজও এক বিরাট প্রশ্ন।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আক্রমণের সময় শেখ মুজিবুর রহমান তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিনকে ফোন করে তার বাড়িতে আক্রমণের কথা জানিয়েছিলেন।
কর্নেল জামিল তখন সাথে সাথে রওনা হয়েছিলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে।
কিন্তু সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছলে তার গাড়ি রোধ করে অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত সৈন্যরা।
সে বাধা উপেক্ষা করে কর্নেল জামিল সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সকাল ১০টার দিকে আমিন আহমেদ চৌধুরী গিয়েছিলেন সে বাড়িতে।
ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ হত্যাকাণ্ড হলেও তখন সেখানে মৃতদেহ দেখেছেন মি: চৌধুরী।
সামরিক পোশাক পর অবস্থায় মি: চৌধুরী সেখানে গেলেও তাকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না সৈন্যরা।
মি: চৌধুরীর বর্ণনা ছিল এ রকম, " আর্টিলারি রেজিমেন্টের কিছু ট্রুপস ছিল সেখানে। মেজর হুদা ছিলেন। আমি যে যেহেতু হুদাকে চিনতাম, তাকে বলার পর সে আমাকে ঢুকতে দেয়। আমি দোতলার সিঁড়িতে উঠতেই বঙ্গবন্ধুর লাশটা দেখি। তার চশমা ও পাইপটাও পড়ে ছিল। দূর থেকে ভেতরে দেখলাম বেগম মুজিব পড়ে আছেন। যে লোকটার অঙ্গুলি হেলনে পঁচাত্তর মিলিয়ন লোক উঠছে বসছে, সে লোকটাকে তার সৃষ্ট আর্মি মেরে ফেললো। এটা কী করে সম্ভব? পাকিস্তানিদের কাছে মারা যায় নাই, মারা গেল শেষ পর্যন্ত বাঙালীর কাছে।"
সে অভ্যুত্থানের পর অনেকে তাকিয়ে ছিলেন তৎকালীন রক্ষীবাহিনীর প্রতিক্রিয়ার দিকে।
সেনাবাহিনীর সাথে রক্ষীবাহিনীর কোন সংঘাত তৈরি হয় কী না সেটি নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধরণের কিছু ঘটেনি।
রক্ষীবাহিনীর দিকে থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় অনেকে অবাক হয়েছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর উল্টো রক্ষীবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল বলে জানান আমিন আহমেদ চৌধুরী।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে আমিন আহমেদ চৌধুরী দুপুর নাগাদ পৌঁছেন সাভারে অবস্থিত রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তরে।
মি: চৌধুরীর দায়িত্ব ছিল রক্ষীবাহিনী যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না হয় সে বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া।
" আমি সেখানে গিয়ে বলি যে সেনাবাহিনীর কিছু লোক এটার (হত্যাকাণ্ড) সাথে জড়িত থাকলেও পুরো সেনাবাহিনী এর সাথে জড়িত নয়। সে হিসেবে সেনা প্রধানের বানী নিয়ে আমি এখানে আসছি," বলছিলেন মি: চৌধুরী।
হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন আওয়ামীলীগের একজন সিনিয়র নেতা এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
সামগ্রিকভাবে ১৫ আগস্ট সারাদিন সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
অভ্যুত্থানের খবর জানাজানি হবার পরে সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যেই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।
তিনি জানান, ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। কী করতে হবে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
মি: চৌধুরীর বর্ণনায়, "যখন সকাল হয়ে গেছে তখন দেখা যাচ্ছে কোন পলিটিকাল ডিরেকশন আসতেছে না। বঙ্গবন্ধু মারা গেছে, এখন আমরা কী করবো? কার পেছনে দাঁড়াবো? তারা তো খন্দকার মোশতাককে বসিয়ে দিয়েছে। এখন আমরা তাকে ডিসলজ (ক্ষমতাচ্যুত) করবো? এর বিরুদ্ধে গেলে পুরোপুরি যুদ্ধ করতে হবে। কারণ ওরা ট্যাংক বের করে অলরেডি বঙ্গভবনে বসে গেছে, ফার্মগেটের সামনে বসে গেছে, জাহাঙ্গীর গেটের ভেতরে অলরেডি মুভ করছে। পরিস্থিতি অ্যাসেস করতে হচ্ছে। আমরা কি পারবো? আমাকে তো জানতে হবে আমার কাছে কত সৈন্য আছে এবং কত অ্যামুনিশন আছে। এতে গিয়া গোলমাল হয়ে গেল। কনফিউশনটা খুব বেশি ছিল।"
খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত ঘাতক জুনিয়র সেনা কর্মকর্তারা।
সে থেকে পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশের ইতিহাস সেনাবাহিনীর ভেতরে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের ইতিহাস।

Friday, August 13, 2021

ইসলামভীতির শিকার ইলহান ওমর-রাশিদা তালিব, ‘জীবন ঝুঁকিতে’

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদের মুসলিম মার্কিন সদস্য ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিবের বিরুদ্ধে আক্রমণের মাধ্যমে ইসলামভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি)। এর মধ্য দিয়ে তারা এসব মুসলিম কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধে হামলায় উৎসাহ দিয়ে ঝুঁকিকে দ্বিগুন করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ইলহান ওমরের একজন সহযোগী বলেছেন, এমন আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ইলহান ওমরের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে এআইপিএসি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলপন্থি এডভোকেসি গ্রুপ হলো এআইপিএসি। তারা দ্বিপক্ষীয় (বাইপার্টিসান) হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেসব সদস্য সমালোচনা করেন, তাদের বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছে। এটা করা হচ্ছে বিশেষ করে যারা ডেমোক্রেট, তাদের বিরুদ্ধে।
ইলহান ওমরের যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক জেরেমি স্লেভিন বুধবার এআইপিএসি-এর কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা একটি পোস্ট স্পন্সর করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের মধ্যে, ইসরাইল এবং হামাস, গণতন্ত্র এবং সন্ত্রাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পারছেন না।
জেরেমি স্লেভিন বলেছেন, কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর যেসব ঘৃণাপ্রসূত ম্যাসেজ পেয়েছেন ঠিক সেই রকমই ভাষা ব্যবহার করেছে এআইপিএসি। স্লেভিন লিখেছেন, কোনো ভুল করবেন না। ইসলামভীতি থেকে বার বার বিজ্ঞাপন প্রচার করার মাধ্যমে প্রতিনিধি ইলহান ওমরের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে এআইপিএসি। এটা বলা উচিত নয়, কিন্তু মুসলিম-আমেরিকানদের ভিত্তিহীনভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা হলো ইসলামভীতির একটি টেক্সটবুক উদাহরণ। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার বিষয়ক এই নারীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে নিয়মিতভাবে এটা করা হচ্ছে।
জেরেমি স্লেভিনের এই পোস্টের পর ওয়াশিংটনভিত্তিক নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে এআইপিএসির এমন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানো হয়েছে। ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে এমন প্রচারণাকে তারা ইসলামভীতি, অসততা এবং বিপজ্জনক বিজ্ঞাপন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কেয়ার-এর উপ নির্বাহী পরিচালক এডওয়ার্ড আহমেদ মিশেল বলেছেন, এআইপিএসির এমন ইসলামভীতির ভাষা ফেসবুকের ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রতিনিধি ইলহান ওমর ও অন্য মুসলিম আমেরিকান নেতাদের বিরুদ্ধে সহিংস হুমকি উস্কে দেবে। খুব সহজভাবে বলা যায়, এআইপিএসির এই একগুঁয়েমিতে ইলহান ওমরের জীবন ঝুঁকিতে। এসব ঘৃণাপ্রসূত বিজ্ঞাপন অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা উচিত ফেসবুক কর্তৃপক্ষের। পক্ষান্তরে ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে এভাবে ইসলামভীতি, ঘৃণা উসকে দেয়ার জন্য এআইপিএসির বিরুদ্ধে নিন্দা জানানো উচিত কংগ্রেসনাল নেতাদের।
কিন্তু এই ক্ষোভ এআইপিএসির গতিবিধি পাল্টাতে পারেনি। উল্টো ইসরাইলপন্থি এই গ্রুপটি তাদের বার্তায় মিনেসোটার ডেমোক্রেট প্রতিনিধি ইলহান ওমরকে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত বলে বার্তা প্রচার করেছে আবারও। জেরেমি স্লেভিনের প্রতিক্রিয়ার জবাবে এআইপিএসি একটি টুইট করেছে। তাতে তারা বলেছে, আপনি আমাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আক্রমণ করে কথা বলছেন। আপনার এই আক্রমণ আমাদেরকে ইলহান ওমরের বিষয়ে বিচ্যুত করতে পারবে না। প্রতিনিধি ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলকে তালেবান এবং হামাসের মতো একই পর্যায়ে ফেলেছেন। এটা ক্ষোভের। গণতান্ত্রিক মিত্র এবং সন্ত্রাসীদের মধ্যে কোনো নৈতিক সমতা করা চলে না। এসব সন্ত্রাসী গণতান্ত্রিক মিত্রদের টার্গেট করে।
এখানে উল্লেখ্য, ইসরাইলপন্থি এই গ্রুপটি জুনের একটি বিতর্কের দিকে ইঙ্গিত করেছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনকে প্রশ্ন করেছিলেন ইলহান ওমর। আফগানিস্তান এবং ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন- এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি কংগ্রেশনাল শুনানিতে ব্লিনকেনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন- এই দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে যদি আভ্যন্তরীণ আদালত বিচার করতে না পারে, ন্যায়বিচার করতে না এবং আমরা যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরোধিতা করি, তাহলে দমিয়ে রাখার জন্য অপরাধের শিকার যেসব মানুষ তারা ন্যায়বিচারের জন্য কোথায় যাবে বলে আমরা মনে করি?
ইলহান ওমর পরে এর একটি ভিডিও পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর সঙ্গে যুক্ত করে দেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটদের পক্ষ থেকে কিভাবে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে, তা। ইলহান ওমর লিখেছেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার সবার জন্য জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের জন্য সমতা বজায় রাখতেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র, হামাস, ইসরাইল, আফগানিস্তান এবং তালেবানদের দ্বারা অচিন্তনীয় নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছি আমরা।
তবে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সুনির্দিষ্ট কিছু মামলার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে তালেবান ও হামাসের সঙ্গে যুক্ত করেননি। এরপরই প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেট নেতারা তার এই ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ইস্যু থেকে সরে আসেনি এআইপিএসি। তারা শুধু ইলহান ওমরকে আক্রমণ করেই ক্ষান্ত দেয়নি। তারা একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ও ফিলিস্তিনে মানবাধিকার বিষয়ক প্রথম সারির সমর্থক রাশিদা তালিবের বিরুদ্ধেও আক্রমণ করেছে। বুধবার তার বিরুদ্ধেও নেমেছে এআইপিএসি।
জেরেমি স্লেভিনের পোস্টের জবাবে মিশিগানের এই কংগ্রেসওমেন লিখেছেন, এসব নিয়ে আমি খুবই মর্মপীড়ায়। তিনি লিখেছেন, ইসরাইল ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘৃণার উস্কানি। বিদ্বেষপূর্ণ, বিপজ্জনক মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে। এতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে না।
ওদিকে টুইটার একাউন্টের শীর্ষে রাশিদা তালিবের বিরুদ্ধে পোস্ট ‘পিন’ বা স্থির করেছে এআইপিএসি। এ অবস্থায় আমেরিকান-আরব এন্টি-ডিসক্রিমিনেশন কমিটির (এডিসি) আইনি পরিচালক আবেদ আয়ুব এআইপিএসির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেছেন, বার বার ইসলামভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে এআইপিএসি। ফিলিস্তিনি অধিকারের সমর্থকদের বিরুদ্ধে এন্টি-আরব আক্রমণ চালাচ্ছে তারা। বার বার তারা এটাই দেখিয়েছে যে, আসলেই তারা ধর্মান্ধ ও বর্ণবাদী।


মন্ত্রী কথন- মুহূর্তে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

করোনা-ভাইরাসের বিস্তার রোধে গত এপ্রিল মাস থেকে দফায় দফায় বিধিনিষেধ জারি করেছে সরকার। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে কখনো সাধারণ ছুটি, কখনো চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আবার জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ করে শিল্প-কারখানা খোলা রাখা হয়েছে। আবার সমালোচনার মুখে গণপরিবহন চালু হয়েছে। সর্বশেষ ১১ই আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছু খুলে দিলেও অর্ধেক গণপরিবহন চলার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়। গতকাল আবার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ১৯শে আগস্ট থেকে সকল গণপরিবহন চালানোর অনুমতি দেয়া হয়। বারবার সিদ্ধান্ত বদলের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিধিনিষেধ জারির পর প্রথম কয়েকদিন কঠোর অবস্থানে থাকে প্রশাসন। পরে আবার সবকিছু ঢিলেঢালাভাবে চলতে থাকে। ফলে লকডাউনের যে মূল উদ্দেশ্য তা অর্জন হচ্ছে না। ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের যে খসড়া পরিকল্পনা ছিল তাও সরবরাহের ঘাটতি থাকার কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকার দফায় দফায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে করোনা মোকাবিলার মূল অস্ত্রই হচ্ছে ভ্যাকসিন। পাশাপাশি জনগণকে মাস্ক পরানো নিশ্চিত করা। কিন্তু এই দুই ইস্যুতেই সরকার পরিকল্পনা মাফিক এগোতে পারছে না। শুরুর দিকে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে আনা অক্সফোর্ডের টিকা নিয়ে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম জোরেশোরে এগোলেও পরবর্তীতে সরবরাহের ঘাটতির কারণে তা থমকে যায়। জুন মাসে বিকল্প উৎস থেকে টিকা এনে আবার গণটিকা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় সে কার্যক্রমও সীমিত করতে হয়। অপরদিকে মাস্ক পরানোর জন্য যে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা খুব একটা কাজে আসছে না। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ব্যাপারে আইন বা অধ্যাদেশ জারি করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল সরকারের নীতি-নির্ধারকরা।

কিন্তু বিষয়টি সময় সাপেক্ষ হওয়ায় তা সহসাই হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণের লাগাম টানতে দফায় দফায় বিধিনিষেধ দিতে হচ্ছে সরকারকে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হলে আবার বিধিনিষেধ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিককের সঙ্গে মতবিনিময়ে বলেছেন, প্রয়োজনে আবার বিধিনিষেধ জারি করা হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে সরকারের পরবর্তী কৌশল কী হবে এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুটি কৌশলই আমরা অবলম্বন করবো। একটা হলো বিধিনিষেধ বা লকডাউন দেয়া। আরেকটি হচ্ছে ছেড়ে দেয়া, কিন্তু সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। পরিস্থিতি খারাপ হলে আবারো লকডাউন দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশে বাড়লেই, যেমন অস্ট্রেলিয়াতে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে, কারফিউ দেয়া হয়েছে, সেখানে লকডাউন দেয়া হয়েছে। আমেরিকাতে দেয়া হয়েছে। দেয়া হচ্ছে কেন? কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম।

এক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিভিন্নভাবে তাদের অপরিহার্যতা। এটা খোলা প্রয়োজন, কারণ হচ্ছে ব্যবসা করে, কাজ করে, তাদের দিকে তাকিয়ে কিন্তু এ বিষয়গুলো শিথিল করা প্রয়োজন। যদিও পরিস্থিতি কিন্তু এখনো সন্তোষজনক নয়। করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ঈদের পর ২৩শে জুলাই থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের বিধিনিষেধ ১১ই আগস্ট থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তুলে নেয়া হয়েছে। সেদিন থেকেই সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও দোকানপাট খোলা। ১৯শে আগস্ট থেকে পুরোদমে চলবে গণপরিবহন, খুলছে পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে আসন সংখ্যার অর্ধেক ব্যবহার করে পর্যটন, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদনকেন্দ্র খোলার শর্ত দিয়েছে সরকার। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ১৯শে আগস্ট পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সড়ক, রেল ও নৌপথে সব প্রকার গণপরিবহন চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া, পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদনকেন্দ্র আসন সংখ্যার ৫০ ভাগ ব্যাবহার করে চালু করতে পারবে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সব ক্ষেত্রে মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রণীত স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অবহেলা করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব বহন করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, গত ১লা জুলাই দেশে লকডাউন জারি করা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে কোরবানির ঈদের সময় ৯ দিন তা শিথিল করা হয়েছিল। ঈদের ছুটির পর ২৩শে জুলাই থেকে আবার লকডাউন শুরু হলেও এরমধ্যে দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হয়েছে। এরপর ১লা আগস্ট সব রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা খোলার অনুমতি মেলে। ১১ই আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ধরনের অফিস-আদালত খোলার অনুমতি দেয়া হয়।

বাসে-ট্রেনে গাদাগাদি করে এলে আবার সংক্রমণ বাড়বে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
করোনা থেকে সুরক্ষায় প্রত্যেককে আরও বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, আমরা মৃত্যুর হার কমাতে চাই। শুধু সরকার পারবে না, সবাইকে প্রয়োজন। নিজেদের সুরক্ষা নিজেদের করতে হবে। বাসে ট্রেনে গাদাগাদি করে আসলে চলবে না। তাহলে আবার সংক্রমণ বাড়বে। গতকাল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের গ্র্যান্ড বলরুমে ‘ডেঙ্গু ও করোনা মহামারিতে চ্যালেঞ্জ’- শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন (বিএসএম) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) যৌথভাবে কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন- বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মো. বিল্লাল আলম। সঞ্চালনা করেন- মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুদীপ রঞ্জন দেব।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে ভ্যাকসিনের ব্যাপক চাহিদার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানালে তিনি দ্রুতই চীনের সিনোফার্মের ৬ কোটি টিকা কেনার ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সেই ৬ কোটি টিকা ক্রয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সময়মতো টাকা ছাড় দিয়ে অনুমোদন দিয়েছে। এখন ধাপে ধাপে ক্রয়কৃত সিনোফার্মের ৬ কোটি টিকা দেশে আসতে থাকবে। অন্যান্য মাধ্যমেও আমাদের আশানুরূপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, দেশে চলমান টিকা কার্যক্রমের গতি চলমানই থাকবে। তিনি আরও বলেন, এক সপ্তাহে ৫৪ লাখ এবং পরের মাসে আবার ৫০ লাখ টিকা সবমিলিয়ে এই মাসে ১ কোটি টিকা আসবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিবি, পক্স আগে মানুষের ছিল না। প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে অসুখগুলো আসে, এখনো আসছে। আমরা জানি যে, করোনা কোনো একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে এসেছে। স্মল পক্স প্রতিরোধ করা গেছে। কোনো এক সময় করোনাও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। আমরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ভ্যাকসিন পাচ্ছি। কোভ্যাক্স থেকে আমরা ভ্যাকসিন পাচ্ছি, নিজেরাও কিনছি। ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে ২৬ থেকে ২৭ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োজন হবে। একসঙ্গে এত ভ্যাকসিন আমরা পাবো না, রাখতেও পারবো না। আমরা চেষ্টা করছি, যখন যেটা পাওয়া যায় আনার জন্য। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্র ভ্যাকসিন তৈরি করেছে এবং স্টক করেছে। জনসংখ্যার চারগুণ-পাঁচগুণ বেশি ভ্যাকসিন তারা স্টক করেছে। অনেক দেশ আছে যেখানে ভ্যাকসিন পৌঁছেনি।
তিনি বলেন, আমরা একেবারে সবাইকে ভ্যাকসিন দিতে পারবো না। ধৈর্য্য ধরতে হবে। আস্তে আস্তে সবাইকে আমরা ভ্যাকসিন দিচ্ছি। পৌনে দুই কোটি মানুষকে টিকা দেয়া হয়েছে। কোটি কেটি লোক রেজিস্ট্রেশন করেছে। আমাদের যারা বিরোধী আছেন, ভ্যাকসিন যখন কম থাকে তখন বলে ভ্যাকসিন কোথায়? যখন বেশি লোক আসে, লোক বেশি কেন এলো? না এলেও অসুবিধা, এলেও তাদের কাছে অসুবিধা। তাদের আমি অন্য কোনো কাজে দেখিনি। করোনার সময় মানুষের পাশে তাদের কখনো দেখিনি। মাঝে-মধ্যে টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি। শুধু সমালোচনায় দেখেছি। সমালোচনা করা সহজ খুব।

তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডেঙ্গু রোগী বাড়বে। হাসপাতালে জায়গা সংকুলনার করতে পারছি না। এখন প্রায় সবই খুলে দেয়া হয়েছে। জীবন-জীবিকা পাশাপাশি চলবে। জীবন বেশি গুরুত্ব। জীবনকে রক্ষা করে আমাদের জীবিকা অর্জন করতে হবে। আমরা মৃত্যুর হার কমাতে চাই। শুধু সরকার পারবে না, সবাইকে প্রয়োজন। নিজেদের সুরক্ষা নিজেদের করতে হবে। সংক্রমণ অনেক বেড়েছিল, এখন কমে এসেছে। ৩২ শতাংশে উঠেছিল, এখন তা ২৩ শতাংশ। এই কমার হার ধরে রাখতে চাই। যারা বাসে- ট্রেনে চলেন, গাদাগাদি করে এলে চলবে না। তাহলে সংক্রমণ আবার বাড়বে বলেন- স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব আলী নূর বলেন, হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে লাভ হবে না যদি সংক্রমণের মূল উৎস চিহ্নিত না করে কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম অনুষ্ঠানে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে মশার প্রাদুর্ভাব বাড়বে। কোভিড নিয়ে বলতে চাই, আমি অনেক পরে এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হয়েছি। আমরা রাতারাতি হাসপাতাল বাড়িয়ে ফেলতে পারি না, চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়িয়ে ফেলতে পারি না। এখন সবকিছু খুলে দেয়া হয়েছে, আমাদের খেয়াল করতে হবে আমরা যেন এই রোগ বাড়িয়ে না চলি। হাসপাতালে আর বেড বাড়ানো সম্ভব হবে না। নন-কোভিড রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের সংযত হতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, আমরা করোনা নিয়ে ক্লান্ত সবাই। এর মধ্যে নতুন করে এলো ডেঙ্গু। করোনায় বড়রা আক্রান্ত বেশি হয়। উল্টো ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে। আমরা খুব একটা ভালো সময়ে নেই। প্রতিদিনই সংক্রমণ হচ্ছে। মৃত্যু ২০০ এর উপরে। আমরা নানা পন্থা অবলম্বন করেছিলাম, তার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি সেটা খুব একটা মানা হচ্ছে না। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বেশি। চিকিৎসার চেয়ে মশা নিধন বেশি জরুরি। ডেঙ্গু চিকিৎসায় আলাদা হাসপাতাল দরকার নেই। আমি মনে করি, ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল করলে চিকিৎসায় সময় নষ্ট হবে। পরিষদের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ বলেন, সিটি করপোরেশন বাড়ি আঙিনাভিত্তিক অভিযান চালাচ্ছে। অফিস-আদালতকে আরও গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

এর আগে ডেঙ্গু ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন-এর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির করোনার চিকিৎসার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, বিএসএমএমইউ’র ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।