Sunday, December 31, 2017

মালয়েশিয়ার হাসপাতালে পড়ে থাকা এই বাংলাদেশি কে?



মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে ১০ মাস ধরে পড়ে আছেন এক বাংলাদেশি। তার মো. আলতাফ হোসেন এবং বাড়ি বাংলাদেশের কুমিল্লায়। এতটুকুই তার পরিচয়।

এর বাইরে তিনি কোনো পরিচয় দিতে পারেননি। 

পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটিকে ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন লোক রাস্তা থেকে ক্লাং শহরের তোয়াংকো আম্পোয়ান হাসপাতালে রেখে যান। সেখানেই ৭সি ওয়ার্ডের ৩৯ নম্বর বিছানায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

অভিভাবকদের খোঁজ না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ৪ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করে।

দূতাবাসের কল্যাণ সহকারী মো. মুকসেদ আলী গত মঙ্গলবার ছুটে যান হাসপাতালে। সেখানে তিনি আলতাফ হোসেনের খোঁজখবর নেন।

হাইকমিশনের এ কর্মকর্তাকে দেখে কেঁদে ওঠেন আলতাফ। তাঁর কাছে কোনো কাগজপত্র নেই বলে জানান তিনি।

দূতাবাসের শ্রম শাখার দ্বিতীয় সচিব মো. ফরিদ আহমদ জানান, আলতাফ হোসেন আসলে বাংলাদেশি নাগরিক কি না, যাচাই করা হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত হলে তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো যাবে।

দূতাবাসের +৬০১২৪৩১৩১৫০ নম্বরে আলতাফের আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনকে ফোন দিতে বলা হয়েছে।

রাজনীতির মাঠে সুপারস্টার রজনীকান্ত

বছরের শেষ ভাগে এসে নতুন ঘোষণা দিয়ে আলোচনা তৈরি করেছেন ভারতীয় সুপারস্টার রজনীকান্ত। বহুদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল রাজনীতির মাঠে নামছেন এই তারকা। ৩১ ডিসেম্বর তার সিদ্ধান্ত খোলাখুলি জানাবেন বলে আভাস দিয়েছিলেন।

এবার স্পষ্টভাবেই নিজের বক্তব্য জানালেন। চেন্নাইয়ের রাঘবেন্দ্র মণ্ডপে রোববার ভক্তদের সঙ্গে আলাপচারিতায় রাজনীতিতে আসার বিষয়টি স্পষ্ট করলেন। পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে নতুন একটি দল গড়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এই সুপারস্টার রাজনীতিতে আসছেন বলে অনেক দিন ধরেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। কয়েক দিন আগে এক অনুষ্ঠানে রজনীকান্ত বলেছিলেন, রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পর্ক নতুন কিছু নয়।

তিনি আরো বলেছিলেন, ১৯৯৬ সাল থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে যাচ্ছি। তবে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল। আগামী ৩১ ডিসেম্বর আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব।

এরপর রোববার সকাল থেকেই রাঘবেন্দ্র মণ্ডপে ছিল উপচেপড়া ভিড়। রজনীকান্তকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তার বক্তব্য শুরু হওয়ার পরই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে জনতা।

রজনীকান্ত বলেন, দেশের গণতন্ত্র বিপর্যস্ত। রাজনীতিকরা গণতন্ত্রের নামে সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পত্তি হরণ করছেন। এটিই সঠিক সময় পরিবর্তনের।


জয়ললিতার মৃত্যুর পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে যখন সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেই সময় রজনীকান্তের রাজনীতিতে আসার ঘোষণা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামে থার্টি ফার্স্টে সূর্যাস্তের আগেই ছাড়তে হবে সমুদ্র সৈকত

চট্টগ্রামে খ্রিস্টিয় বর্ষের শেষ দিনের উদযাপন সামনে রেখে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ওই দিন সূর্যাস্তের আগেই দর্শনার্থীদের পতেঙ্গা ও পারকি সমুদ্র সৈকত এলাকা ছাড়তে বলেছে পুলিশ। এছাড়া অতিরিক্ত ফোর্সের সঙ্গে এবার নগরজুড়ে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিমও মাঠে নামাচ্ছে নগর পুলিশ।

এদিকে, বন্দরনগরীর পতেঙ্গা ও পারকি সমুদ্রসৈকত, নেভাল, সিআরবি, কর্ণফুলী সেতু এলাকায় থার্টি ফার্স্টে সূর্যাস্তের পর কাউকে অবস্থান করতে দেবে না পুলিশ।  যারা ইংরেজি বর্ষবিদায়ের জন্য উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রে জড়ো হবেন, তাদের সূর্যাস্তের আগেই ঘরে ফিরতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত পুলিশের।

রোববার (৩১ জানুয়ারি) ইংরেজি বছর ২০১৭ বিদায় নেবে। সোমবার বিশ্ববাসী স্বাগত জানাবে ২০১৮ সালকে।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (বিশেষ শাখা) মোখলেছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ঘরোয়া আয়োজন ছাড়া উন্মুক্ত স্থানে সূর্যাস্তের পর আমরা কাউকে অ্যালাউ করব না। যা কিছু সূর্যাস্তের আগেই করতে হবে।ইউনিফর্ম এবং সাদা পোশাকে প্রায় ১ হাজার পুলিশ বিভিন্ন স্পটে মোতায়েন থাকবে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে থাকবে। হোটেল-রেস্টুরেন্টেও থাকবে। এছাড়া আমরা এবার মোবাইল কোর্টও করব। পুলিশের পাশাপাশি প্রায় ৩০০ র‌্যাব সদস্য নগরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে।

বর্ষবিদায়ের শেষ সূর্যাস্ত উপভোগ করতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের তীরে ভিড় করেন বিনোদনপ্রেমীরা। প্রতিবছরের মতো এবারও পুলিশ বিনোদনপ্রেমীদের নিরাপত্তায় এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

চবির প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু কাল


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) বিভিন্ন অনুষদভুক্ত বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের অধীনে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ক্লাস একযোগে শুরু হবে আগামীকাল ১ জানুয়ারী।

রবিবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. কামরুল হুদা জানান, চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস একযোগে আগামীকাল শুরু হবে। সকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে সকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের সিলেবাস, ক্লাস রুটিন, অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় নৌবিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৬


অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে একটি নৌবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হয়েছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে ডুবুরিরা তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। খবর বিবিসির।

নর্থ সাউথ ওয়েলস পুলিশ জানিয়েছে, কোয়ান শহরতলীর হকেসবারি নদীতে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

তবে এ ঘটনায় বিমানের যাত্রী বা হতাহতের পরিচয় সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি। 

স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নৈসর্গিক দৃশ্য দেখিয়ে বেড়ায় এমন একটি কোম্পানি ওই বিমানের মালিক প্রতিষ্ঠান।

তবে কী কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটি জানাতে পারেনি তদন্তকারীরা।

ভারপ্রাপ্ত সুপারইন্টেন্ডেন্ট মাইকেল গরম্যান বলেছেন, দুর্ঘটনাস্থলে ‘উদ্ধার অভিযান অব্যাহত’ রয়েছে।

পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পুলিশের ডুবুরিরা ঘটনাস্থলে আছে। সেখান থেকে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে পাইলট ও চার ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। সেখানে ১১ বছরের একটি ছেলেও ছিল।

এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্রিটিশ কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বিমানটি তার থেকে পাঁচশ মিটার দূরে থাকাবস্থায় বিধ্বস্ত হয়েছে।

তবে বিমানটির উদ্ধারকাজ আজকের মধ্যে শেষ হবে হবে কিনা সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি।

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট ফোনসেট বাজারে আসছে

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মোবাইল ফোনসেট জ্যাংকো টিনি টি-১ বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে জ্যাংকো নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই সেট আঙুলের চেয়েও ছোট হবে। 

প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম মোবাইল ফোন। মোবাইল সেটটির ওজন হবে মাত্র ১৩ গ্রাম। ফোনটি আকারে মাত্র ৪৬.৭/২১/১২ মিলিমিটার।

ফোনটি থেকে কল ও টেক্সট মেসেজ করা যাবে। ফোনে রয়েছে ০.৪৯ ইঞ্চি ও এলইডি ডিসপ্লে। একটিই ন্যানো সিম ব্যবহার করা যাবে এই ফোনে। সেভ করা যাবে ৩০০ ফোন নম্বর। কল লিস্টে সেভ থাকবে ৫০টি নম্বর। সেভ রাখা যাবে ৫০টি এসএমএস।

ফোনটিতে রয়েছে মিডিয়াটেক প্রসেসর। সঙ্গে ৩২ এমবি র‌্যাম ও ৩২ এমবি ইন্টারনাল স্টোরেজ। ২০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার ব্যাটারিতে মিলবে ৩ দিনের স্ট্যান্ডবাই ও ৩ ঘণ্টার টকটাইম। ইউএসবির মাধ্যমে কম্পিউটারের সঙ্গেও সংযুক্ত করা যাবে এই ফোন। ব্রাউজ করা যাবে ইন্টারনেটও। আগামী বছর মে থেকে মিলবে এই ফোন। ফোনটির দাম পড়বে ৩০ ইউরো (প্রায় ৩ হাজার টাকা)।

বেলজিয়ামে বন্ধ হলো ১৭১ বছরের টেলিগ্রাম


ফেসবুক, টুইটার, মেইলের যুগে বেলজিয়ামে টেলিগ্রামে মাত্র ২০ শব্দের একটি ডাক পাঠাতে দুই হাজারেরও বেশি টাকা খরচ হয়। তাই ১৭১ বছর ধরে চালু থাকা টেলিগ্রাম সেবা বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির সবচেয়ে বড় টেলিযোগাযোগ কোম্পানি দ্য প্রক্সিমাস গ্রুপ।

গত শতাব্দীতে টেলিগ্রাম চালু রাখা দেশগুলোর মধ্যে বেলজিয়াম অন্যতম। বেলজিয়ামে ১৮৪৬ সালে ইলেক্ট্রনিক টেলিগ্রাফ সেবা চালু করা হয়, যাতে মর্স কোড ব্যবহার করা হতো। একটা সময় যোগাযোগের সবচেয়ে দ্রুততম মাধ্যম ছিল এটি।

আশির দশকে দেশটিতে প্রতি বছর দেড় মিলিয়নের বেশি টেলিগ্রাম আদান-প্রদান করা হতো। নব্বইয়ের দশকে এটি নেমে আসে অর্ধ মিলিয়নে। ২০১০ সালে দেশটিতে ৫০ হাজার টেলিগ্রাম আদান-প্রদান হয়, যার সংখ্যা ২০১৭ সালে দাঁড়ায় আট হাজারে।

বেলজিয়ামের মাত্র ১০টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এই সেবা এতদিন সচল রেখেছে। দেশটির গোমস্তারা সেবাটি নিয়ে থাকে, যাদের ডাক আদান-প্রদান করতে আইনি বৈধতার প্রয়োজন।

১৮৩০ সালে যুক্তরাজ্যে টেলিগ্রামের আবিষ্কার হয় কিন্তু ১৯৮২ সালেই সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৬ সালে এই সেবা বন্ধ করে দেয়। টেলিগ্রামের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে পরিচিত ভারত ২০১৩ সালে সেবাটি বন্ধ করে দেয়।

কীভাবে শুরু ইংরেজি নববর্ষ?


ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আবারো চলে এলো আরো একটি নতুন বছর। কয়েকঘণ্টা পরই সারাবিশ্ব বিদায় জানাবে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দকে। আজ রাত ১২টা এক মিনিটে গোটা বিশ্ব বরণ করে নেবে নতুন বছর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দকে।

কিন্তু কীভাবে এলো ইংরেজি নববর্ষ। আর কি-ই বা এর ইতিহাস। সেটিই পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস

আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপনের ধারণাটি আসে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। তখন মেসোপটেমিয় সভ্যতার (বর্তমান ইরাক) লোকেরা নতুন বছর উদযাপন শুরু করে। তারা তাদের নিজস্ব গণনা বছরের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করতো।

তবে রোমে নতুন বছর পালনের প্রচলন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ সালে। পরে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন। যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত।

রোমে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের অন্তর্গত বছরের প্রথম দিনটি জানুস দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। জানুস হলেন প্রবেশপথ বা সূচনার দেবতা। তার নাম অনুসারেই বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি নামকরণ করা হয়।

এতো গেলো যিশুর জন্মের আগের কথা। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তার জন্মের বছর গণনা করে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি এই ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার করেন। যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়।

নতুন বছর পালন

আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ ইয়ার পালন শুরু হয় ১৯ শতক থেকে। নতুন বছরের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর হচ্ছে নিউ ইয়ার ইভ। এদিন নতুন বছরের আগমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ।

ইংরেজি নতুন বছরকে ঘিরে বাংলাদেশেও উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আজ মধ্যরাতে থেকেই রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ব্যাপকভাবে নিউ ইয়ার উদযাপিত হবে। তবে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে ছুটি থাকলেও আগামীকাল সরকারি বন্ধ নেই বাংলাদেশে।

এদিকে ইংরেজি নতুন বর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন ইসরায়েল, দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। কারণ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী অ-ইহুদি উৎস হতে উৎপন্ন এই রীতি পালনের বিরোধিতা করে থাকে। আবার কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া ও আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।

বিভিন্ন দেশে নতুন বছরের প্রথম দিনটি পাবলিক হলিডে। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা এক মিনিট থেকেই শুরু হয় নতুন বছর উদযাপনের উন্মাদনা। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে আতশবাজির আলোকছটা। বিশ্বব্যাপী নিউ ইয়ার ডে সর্বজনীন একটি উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

নতুন বছরে পাঠকদের আরটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। আগামী বছর আপনাদের আনন্দ ও সুখ-সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা।

ফরহাদ মজহার দম্পতিকে তলব

মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও হয়রানির অভিযোগে ফরহাদ মজহার ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা আকতারের বিরুদ্ধে করা পুলিশের মামলা আমলে নিয়েছেন আদালত। আগামী ৩০ জানুয়ারি এই দম্পতিকে আদালতে হাজির হতে সমন জারির আদেশ দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার ঢাকার মহানগর হাকিম সুব্রত ঘোষ পুলিশের মামলাটি আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন।
আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আলম মিয়া প্রথম আলোকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও হয়রানির অভিযোগে ফরহাদ মজহার ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা আকতারের বিরুদ্ধে করা মামলা করে পুলিশ । সে সময় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিরও আবেদন করা হয়। এর আগে ৭ ডিসেম্বর ফরহাদ মজহার অপহরণ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে পুলিশ। একই সঙ্গে ফরহাদ মজহার ও ফরিদা আকতারের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চাওয়া হয়। আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে পুলিশকে মামলা করার অনুমতি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পরিদর্শক মাহবুবুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় পুলিশ বলেছে, গত ৩ জুলাই ফরহাদ মজহার অপহৃত হয়েছেন বলে অভিযোগ এনে ফরিদা আকতার আদাবর থানায় মামলা করেন। ডিবি পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে বলে, ফরিদার অভিযোগ সত্য নয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের দুদিন পর ৯ ডিসেম্বর ফরহাদ মজহার তাঁর হক গার্ডেনের বাসায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। তিনি দাবি করেন, অপহরণকারীরা তাঁকে খুলনা-যশোর সীমান্তের দিক দিয়ে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। গত ৩ জুলাই ভোর পাঁচটার দিকে শ্যামলীর হক গার্ডেনের বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই তাঁকে অপহরণ করা হয়।

অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যাত্রাগান

আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে এবং অশ্লীলতার কারণে হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য যাত্রাগান। এতে ওই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চলছে দুর্দিন। দুর্দিন ঘোচাতে নীলফামারীতে ছয় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যাত্রাগান। জেলা যাত্রা ফেডারেশনের আয়োজনে জেলা সদরের খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের বোর্ডের বাজারে ছয় দিনের ওই যাত্রাগান গত শুক্রবার রাতে শেষ হয়েছে। অশ্লীলতা পরিহার করে যাত্রায় নাচ, গান, নাটক সবই ছিল। জেলা যাত্রা ফেডারেশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. মোকছেদ আলী বলেন, ‘যাত্রা মানে অশ্লীলতা নয়, যাত্রাগানে বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বিষয় আছে। অশ্লীলতার কারণে অনেক মানুষ যাত্রা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অশ্লীলতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে প্রশাসন যাত্রাগানের অনুমতি দিতে চায় না। আজ এ শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যাত্রাপালা শুরু করেছি। স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় আমরা সফলভাবে ছয় দিনের যাত্রা অনুষ্ঠান শেষ করতে পেরেছি। প্রতিদিন এখানে পাঁচ সহস্রাধিক সব বয়সের নারী-পুরুষ দর্শকশ্রোতাকে আমরা বিনা টিকিটে এই বিনোদন দিতে পেরেছি।’ আট বছর ধরে যাত্রাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত সীমা বেগম (২৫) বলেন, ‘অশ্লীলতা আমাদের ভালো লাগে না।
এখানে গত ছয় দিনে যে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে কোনো অশ্লীলতা ছিল না। তারপরও এখানে দর্শকশ্রোতা অনেক বেশি ছিল। অশ্লীলতা ছাড়াও যাত্রা হতে পারে, তার এটাই বড় উদাহরণ।’ সেখানে যাত্রাপালাটি হচ্ছিল স্বপ্না অপেরার। স্বপ্না অপেরার স্বত্বাধিকারী মানিক চন্দ্র রায় বলেন, ‘বছরে ছয় মাস যাত্রা হয়। কিন্তু যাত্রাগানে অশ্লীলতা এমন পর্যায়ে গেছে যে যাত্রাগানের কথা শুনলে প্রশাসন অনুমতি দিতে চায় না। এ কারণে দিনে পর দিন শিল্পীদের বসিয়ে রেখে খাওয়াতে হয়। ফলে প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকা লোকসান গুনতে হয়। জেলা যাত্রা ফেডারেশন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা চাই, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য যাত্রা আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাক।’ খোকশাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান প্রধান বলেন, ‘আমরা দল–মতনির্বিশেষে একটি কমিটি করি। ওই কমিটির ১০০ জন সদস্য ৫০০ টাকা করে এককালীন প্রদান করেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিনা টিকিটে যাত্রা দেখার ব্যবস্থা করি। এর বাইরে কিছু চেয়ার রাখা হয়। কোনো দর্শক চেয়ারে বসে যাত্রা দেখতে চাইলে তাঁর খুশিমতো যা দেয়, তা–ই নেওয়া হয়। চেয়ারের ভাড়া এবং আমাদের এককালীন জমা করা টাকা দিয়ে আমরা শিল্পীদের খরচসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাই।’ এই যাত্রা আয়োজনে প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন হয়েছিল কি না, তা জানতে চাইলে বদিউজ্জামান বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে অবগত করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় ব্যক্তিরা ভূমিকা পালন করায় পুলিশ প্রশাসনের প্রয়োজন হয়নি। কোনো বিশৃঙ্খলাও ঘটেনি।’

একা এভারেস্টে ওঠা নিষেধ

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টসহ কোনো পর্বতেই কেউ একা উঠতে পারবেন না। একই সঙ্গে দুই হাত না থাকা বা অন্ধ পর্বতারোহীরাও পর্বতে উঠতে পারবেন না। দুর্ঘটনা কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে নেপাল নতুন এক আইনে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আজ শনিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। দেশটির পর্যটন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, পর্বতারোহণ নিরাপদ করতে এবং মৃত্যুর ঘটনা কমাতে আইন সংশোধন করা হয়েছে। চলতি বছর এভারেস্টে উঠতে গিয়ে রেকর্ড সংখ্যক পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মৌসুমে মারা গেছেন ছয়জন পর্বতারোহী। এর মধ্যে রয়েছেন ৮৫ বছরের মিন বাহাদুর শেরচান নামের এক ব্যক্তি। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড করতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর তালিকায় রয়েছেন বিশ্বে সুপরিচিত সুইজারল্যান্ডের পর্বতারোহী উয়েলি স্টেক, যিনি ‘সুইস মেশিন’ নামে পরিচিত। হিমালয়ের পাশের একটি পর্বতে এককভাবে উঠতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি। নেপালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি পর্বতারোহীকে অবশ্যই একজন গাইড নিতে হবে। কর্তৃপক্ষের আশা, নতুন এই আইন আরও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। তবে দুই হাত না থাকা এবং অন্ধ পর্বতারোহীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ।

এবার ইউনেসকো ত্যাগ ইসরায়েলের

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে ইসরায়েল। ইউনেসকো ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাত করছে, এমন অভিযোগ তুলে ওই সংস্থা থেকে গত অক্টোবরে নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর দুই মাসের মাথায় সরে গেল খোদ ইসরায়েল। প্যারিসভিত্তিক ইউনেসকো ২০১১ সালে ফিলিস্তিনকে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তারা এমন কিছু প্রস্তাব নিয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ক্ষুব্ধ হয়েছে। ইউনেসকোর মহাপরিচালক অঁদ্রে আজুলে বলেন, শুক্রবার ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে আর ইউনেসকোর সদস্য থাকছে না তারা। এ এদিকে গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে শনিবার ২০ বছরের এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছে। নিহত জামান মুসলিহ গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-বুরিজ শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা।
অটল গুয়াতেমালা
বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মধ্যে গুয়াতেমালার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্দ্রা জোভেল বলেছেন, ইসরায়েলে তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জিমি মোরালেসের পরিকল্পনার কোনো পরিবর্তন করা হবে না।

একঘরে কাতার

উপসাগরীয় অঞ্চলে গত জুন মাসে হঠাৎ করেই সংকট দেখা দেয়। সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বসে। এই সংকট কাটাতে ১৩টি শর্ত দেয় অবরোধকারী দেশগুলো। কিন্তু কাতার সরকারের এক কথা, সার্বভৌমত্ব হরণকারী কোনো শর্তই তারা মানবে না। দুটি কারণে অবরোধকারী রাষ্ট্রগুলো ক্ষিপ্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর একটি ইসলামি সংগঠনগুলোকে সহায়তার অভিযোগ। কাতার সরকার স্বীকার করেছে, তারা মুসলিম ব্রাদারহুডকে সহযোগিতা করেছিল। তবে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বা আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক। ওই দুই অভিযোগে গত ৫ জুন সৌদি আরব ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। একই সঙ্গে এই তিন দেশের সরকার তাদের ভূখণ্ড থেকে কাতারের নাগরিকদের চলে যেতে ১৪ দিনের সময় বেঁধে দেয়। নিজেদের নাগরিকদের জন্যও কাতার ভ্রমণ বা সে দেশে বসবাস নিষিদ্ধ করে। এরপর কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মিসর, ইয়েমেন, মালদ্বীপ ও লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সরকার। এ ছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর কাতারের এয়ারলাইনকে নিষিদ্ধ করে। ওই বয়কটের পরপরই কাতারের আমদানি-রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অবরোধের প্রথম চার সপ্তাহে কাতার স্টকমার্কেটে দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের লোকসান হয়। আকাশপথের পাশাপাশি সাগরপথেও যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দিক পরিবর্তন করতে হয় দেশটিকে। ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য দেশটিতে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এ কাজে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য খুঁজতে হয় নতুন উৎস। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে অবরোধকারী দেশগুলো গত ১৩টি শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সন্ত্রাসী সংগঠন বা সংগঠনগুলোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অর্থায়ন বন্ধ করার শর্ত অন্যতম। এ ছাড়া আল-জাজিরাসহ কাতারের অর্থায়নে পরিচালিত অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ করা, তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার শর্তও দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি অবরোধ আরোপের পরপরই বলেছিলেন, তাঁর দেশ কিছুতেই সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করবে না। তবে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে তাঁরা আগ্রহী। এরপর ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। অবরোধ এখনো চলছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে কাতারের সঙ্গে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। তবে কাতার চলছে নিজের পথেই। চলতি মাসে দেশটিতে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিতে আরও একদল তুর্কি সেনাসদস্য যোগ দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, ৩৫টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছে কাতার।

যে তিনটি বিষয় সামনে প্রভাব ফেলবে

রাজনীতির বিবেচনায় আপাতদৃষ্টে ২০১৭ সাল যে শান্তিপূর্ণ ছিল, এ কথা সহজেই বলা যায়। রাজপথে উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদের অনুপস্থিতি, ঘটনাবলির ওপরে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত নাটকীয় পরিস্থিতির উদ্ভব না হওয়ায় বছরটিকে আমরা আওয়ামী লীগের জন্য অনুকূল বছর বলেই বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বছরটি ঘটনাবহুল ছিল না; কিংবা এ-ও নয় যে বছরটির তাৎপর্য কম। বরং ২০১৭ সাল রাষ্ট্র হিসেবে, একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য একটা তাৎপর্যবহ বছর বলেই চিহ্নিত হওয়া দরকার। রাজনীতিতে দৃশ্যমান অস্থিরতা ছিল না, কিন্তু অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা যে অনুপস্থিত ছিল তা নয়। সেই অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা ক্ষমতাসীনদের আচরণেও প্রকাশ পেয়েছে, যেমন উপস্থিত থেকেছে সাধারণ মানুষের আলোচনায়। একটি বড় সময় ধরে সেই আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছেন দেশের উচ্চ আদালত এবং প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অনিশ্চয়তার এক উৎস হচ্ছে ভিন্নমত প্রকাশের এবং তা সহ্য করার জায়গা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়া; বিপরীতে ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার। গুমের ঘটনা, যা একটি হলেই উদ্বেগের তা কেবল বহাল থেকেছে তা নয়, ২০১৭ সালে তা হয়ে উঠেছে প্রাত্যহিক ঘটনা এবং তার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি দুই-ই যেকোনো নাগরিকের জন্য হয়ে উঠেছে আতঙ্কের ও আশঙ্কার। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রশ্নে মানবিকতা প্রকাশে সরকারের যতটা সাফল্য, কূটনীতিতে তার ব্যর্থতা এখন পর্যন্ত সম্ভবত ততটুকুই। এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রভাববলয় বিস্তারের ও ক্ষমতা বিন্যাসের পরিবর্তনের মুখে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত দেশগুলোকে পাশে না পাওয়ার ঘটনা কেবল একটি সংকটের বিষয় নয়, ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সুযোগ ও সম্ভাবনাকে যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যর্থতাও কি না, সেটাও ভাবা দরকার।
এই তিন বিষয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আগামী বছরকে ছাড়িয়ে আরও অনেক সময় ধরে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, শাসনের কাঠামোর ওপরে প্রভাব রাখবে।
বিচার ও নির্বাহী বিভাগের লড়াই
২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন জমা দেওয়ার খবরে এ কথা অনুমানের কোনো কারণ ছিল না যে তার এক পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটবে ১১ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে পাস করা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল ওই বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদনের মধ্য দিয়ে। এ বছরের ৩ জুলাই সরকারের আপিল আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায় এবং ১ আগস্ট তার সম্পূর্ণ ভাষ্য প্রকাশের পর ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সংসদ সদস্যদের মন্তব্য, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের বৈঠক, প্রধান বিচারপতির ছুটি বিষয়ে বিভ্রান্তি, এস কে সিনহার দেশত্যাগ, অন্যান্য বিচারপতির বিবৃতি, এস কে সিনহার বিরুদ্ধে কথিত ১১টি অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ—এই ছিল ধারাক্রম। এগুলো যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, সেগুলোর উত্তরের জন্য ২০১৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের হাতে বিকল্প নেই। তবে এগুলোর উত্তর যে আদৌ পাওয়া যাবে এমন কোনো গ্যরান্টিও নেই। কিন্তু ১ আগস্ট থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটনাবলিতে এটা তো স্পষ্ট যে আদালতের সর্বসম্মত একটি রায়ের কারণে আক্রমণের লক্ষ্যবস্ত হয়েছেন এককভাবে প্রধান বিচারপতিই; এসব আলোচনা ও প্রকাশভঙ্গি কি কার্যত হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল তারই ইঙ্গিত দেয়নি? তদুপরি রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী যে ‘রায়ের সঙ্গে দ্বিমত সত্ত্বেও রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল’ থাকার কথা বলেছিলেন, তাঁর সহকর্মীরা সেই বক্তব্যকে গ্রহণ করেননি বলেই তাঁদের আচরণে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এগুলো ঘটনামাত্র। প্রধান বিচারপতির ‘অপসারণের’ পেছনে শুধু ‘দুর্নীতির অভিযোগ’ কাজ করেছে, বিষয়টি কোনোভাবেই এমন নয়। সেটা বোঝা যায় ১১ ডিসেম্বর সরকারের ঘোষিত নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধিবিষয়ক গেজেটের দিকে তাকালেই। এই নতুন বিধি অনুযায়ী ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকল। ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা ২০১৭’ নামে অভিহিত এই গেজেট প্রকাশের বিলম্বের কারণ হিসেবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের  একটি বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘এক ব্যক্তির এটিকে রাজনীতিকীকরণের  চেষ্টার কারণে বিলম্বিত হয়েছিল। তিনি সরে যাওয়ায় তাঁদের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের ঐকমত্যে রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে এই গেজেট করতে পেরেছি।’ কিন্তু সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্রপতির হাতে এই ক্ষমতা থাকা নিয়ে কেবল এস কে সিনহাই আপত্তি জানাননি, ২০০৮ সালের পরে আরও পাঁচজন প্রধান বিচারপতি একই কথা বলে এসেছেন। বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের টানাপোড়েন থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তো অবশ্যই যেকোনো প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। ক্ষমতার ভারসাম্য বা চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের জন্যই তার দরকার। কিন্তু ২০১৭ সালে বাংলাদেশে সেই টানাপোড়েনের যেভাবে আপাত সুরাহা হলো, তা রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভারসাম্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর হলো তা আমাদের বুঝতে হয়তো খানিকটা সময় লাগবে, কিন্তু তা অস্বীকার করার উপায় থাকবে না। ২০১৮ সালে আদালতের সামনে নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধিবিষয়ক আদেশ, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের রিভিউ শুনানি এবং ৭০ অনুচ্ছেদবিষয়ক হাইকোর্টে চলমান রিট আবেদন তার মাত্রা বুঝতে সাহায্য করবে।
গুম, নিখোঁজ ও নীরবতা
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুমের ঘটনার ব্যাপ্তি ও প্রকৃতিতে এটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে ২০১৭ সালে। বছরের প্রথম ১০ মাসে ৫০ জন গুম হয়ে যাওয়া বা আগস্ট থেকে নভেম্বরে ১৪ জনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে এই পরিবর্তন ঘটেনি। এই সময়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যাঁদের গুম হওয়ার ঘটনা তাঁদের পরিবারের বাইরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভয়ের সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গবেষক ও তরুণ শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান, সাংবাদিক উৎপল দাস, সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামানের নিখোঁজ  বা গুম হওয়ার ঘটনাগুলো আসলে যা করতে সক্ষম হয়েছে তা হচ্ছে যেকোনো ধরনের মতপ্রকাশের পথ যে অগ্রহণযোগ্য এবং যে কেউ যে এখন গুমের শিকার হতে পারেন। যদিও গত কয়েক বছরে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর জন্য সরকারি বাহিনীগুলোকে দায়ী করে এসেছে, সরকার সব সময়ই তা অস্বীকার করেছে। সরকারের এই অস্বীকৃতি গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না। কেননা, তাঁদের অনেককেই পরে ‘আটক’ দেখানো হয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে যে সরকারের পক্ষ থেকে এমন কথা বলা হয়, যাতে এসব গুমের ঘটনা একধরনের বৈধতাই লাভ করে। গত কয়েক বছরে গুম হয়ে যাওয়া যেসব মানুষ সৌভাগ্যবশত ফিরে এসেছেন (সাম্প্রতিক সময়ে মোবাশ্বার ও উৎপল), এ বিষয়ে তাঁদের নীরবতা বিস্ময়কর বলে মনে হয়, কিন্তু দুর্বোধ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মানুষের কাছ থেকে কোনো রকম তথ্য উদ্ধারের চেষ্টার অভাব প্রমাণ করে যে এ বিষয়ে তাদের উৎসাহের ঘাটতি আছে, ফলে ছাড়া পাওয়া মানুষ যে এখনো সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করেন, সেটাই স্বাভাবিক।
মানবিক সাফল্য, কূটনৈতিক ব্যর্থতা?
মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত ‘জাতিগত নিধনের’ শিকার হয়ে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশমুখী হলে আগস্টের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতিহীনতাই কেবল দৃশ্যমান হয়নি, এ বিষয়ে বিভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতিও প্রকাশিত হয় যখন বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে যৌথ নিরাপত্তার প্রস্তাব হাজির করে। কিন্তু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পটভূমিকায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাব এই ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করেই এই সাত লাখ শরণার্থীকে ফেরানোর পথে অগ্রসর হবে। বাংলাদেশের এই মানবিক অবস্থান এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা লাভ করে। কিন্তু এই সংকটকালে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত ভারত, চীন ও রাশিয়া যখন তাঁদের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় বাংলাদেশের বদলে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ায়, তখন বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ বলেই মনে হয়েছে। শুধু তাই নয়, জাপানের সমর্থন লাভে সফল না হওয়াও বিস্ময়কর। দুর্ভাগ্যজনক এই যে এসব দেশ বাংলাদেশের পাশে আছে বলার মাধ্যমে সরকার একধরনের বিভ্রান্তিই তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সমাধানের পথে অগ্রসর হয়ে একধরনের সমঝোতায় উপনীত হয়েছে, যার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নেই, বরং তা মিয়ানমারের ইচ্ছেনির্ভর। এই সংকটে বাংলাদেশের পক্ষে ভূরাজনৈতিক এবং ভূকৌশলগত বিবেচনায় যেসব সুবিধা গ্রহণের সুযোগ ছিল, তা নিতে না পারার বিষয়টিই পরিষ্কার হয়েছে।
নির্বাচনের রাজনীতি
দেশের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার একটি উপাদান হচ্ছে ২০১৮ সালের শেষে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের প্রকৃতি। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির চাওয়ার ব্যাপারে সরকার যে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়, সেটাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় স্পষ্ট। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন আদায় না করতে পারলে এবং ইতিমধ্যে বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান দুটি দুর্নীতি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। বিএনপির প্রধান তিন মাস দেশের বাইরে অবস্থানের পর দেশে ফিরলে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে সেটা লক্ষণীয়, নভেম্বর মাসে ঢাকায় দলের সমাবেশে সেটা দেখা গেছে; যদিও তা সাংঠনিকভাবে দলটির শক্তি সঞ্চয়ের বা দলের আগামী দিনের দিকনির্দেশনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় না। অন্যদিকে দেশের রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের, বিশেষত হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সখ্য, তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া থেকে বোঝা যায় আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি না এলেও যেন তারা তৃণমূলে উপস্থিত একটি রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের মাঠে উপস্থিত রাখতে পারে তা নিশ্চিত করতে। দেশের রাজনীতি যে এখন নির্বাচনমুখী হয়ে পড়েছে, সেটা নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ, বিভিন্ন দল ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আলোচনার কারণেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ও ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য নির্বাচন কমিশনের সামনে অনেক কাজই বাকি; ঢাকা উত্তরের মেয়রসহ আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনের সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ উল্লেখযোগ্য। তবে সবার অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক, সেটির দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলের, একার্থে প্রধানমন্ত্রীর।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

যে বিষয়গুলো ২০১৮ সালে নজর কাড়বে

ভবিষ্যৎ জানার আগ্রহ মানুষের চিরন্তন। তাই সেই বিষয়টি মাথায় রেখে আগামী বছরের আলোচিত বিষয়গুলো আরটিভি অনলাইন পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো।

চলুন তাহলে জেনে নেই কে বা কি হয়ে উঠতে পারে আগামী বছরের বড় ঘটনা?

চাঁদের উল্টো পিঠে চীন

২০১৮ সালের শেষ নাগাদ চাঁদের উল্টো পিঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে চীন। যদি তাই হয়, তাহলে চীন হবে চাঁদের অন্ধকার অংশে অবতরণকারী প্রথম দেশ। চীনের প্রোব চ্যাংই ফোর নামের যানটি চাঁদের উল্টো পিঠের ভূতাত্ত্বিক গঠন জরিপ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে ২০১৩ সালে চাঁদে অবতরণ করে চীন।

বৈদ্যুতিক গাড়ি

২০১৮ সাল বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বৈপ্লবিক বছর হতে পারে। মোটর শিল্পের বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছর বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা হবে ৪ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। চীনে এই গাড়ির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ।

হান্না-র উত্থান

নয় বছর বয়স থেকেই পরিবেশ বিষয়ক ব্লগ লিখে আলোচনায় হান্না অ্যালপারে। বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী হান্না অ্যান্টি বুলিং আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত। তাই হান্নাও আলোচনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বলিউড মাতাতে পারেন প্রভাস

২০১৮ সালটাও হতে পারে তেলেগু সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক প্রভাসের। এর আগে বাহুবলী, বাহুবলী-২ দিয়ে বক্স অফিস মাতিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে তার অভিনীত ‘সাহো’ নামের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। ইউভি ক্রিয়েশন ও ধর্মা প্রোডাকশনের ব্যানারে এই সিনেমায় তার বিপীরতে দেখা যাবে শ্রদ্ধা কাপুর, নিল নীতিন মুকেশ ও অরুণ বিজয়কে। সিনেমাটি একইসঙ্গে হিন্দি, তেলেগু ও তামিল ভাষায় মুক্তি দেয়া হবে।

কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী

জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কসের জন্ম হয়েছিল ১৮১৮ সালের ৫ মে। তাই ২০১৮ সালে পালিত হবে তার ২০০তম জন্মবার্ষিকী। আশা করা হচ্ছে- তার চিন্তা এবং উত্তরাধিকার নিয়ে এ বছর বহুমাত্রিক বিতর্ক হবে।

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে চীনকে পেছনে ফেলে এক নম্বরে চলে আসতে পারে ভারত। তাদের জিডিপি বাড়বে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে। অন্যদিকে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপ

২০১৮ সালে বিশ্ব মাতবে ফুটবলে। কেননা এ বছরই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত রাশিয়ায় বসবে ফিফা বিশ্বকাপের ২১তম আসর। ২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো ইউরোপের মাটিতে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ।

পোলিও মুক্ত বিশ্ব

পোলিওমুক্ত বিশ্ব এখন আর কল্পনা নয়। এটিকেই এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতিকর রোগ বলে মনে করা হতো। কিন্তু পোলিও এখন বিলুপ্তের পথে। পোলিও নির্মূলের বৈশ্বিক সংস্থা বলছে, ২০১৭ সালে মাত্র ১৭ জনের পোলিও হয়েছিল। যেখানে ২০ বছর আগে প্রতি বছরে পোলিও রোগীর সংখ্যা ছিল সাড়ে ৩ লাখ।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন

২০১৮ সাল বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দান আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ এ বছরই দেশটিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনসহ বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় ২০১৮ সালের জাতীয় দলটির অংশগ্রহণ নেয়া না নেয়া নিয়ে আলোচনায় থাকবে রাজনীতির ময়দান।

দুদকের মুখোমুখি এবি ব্যাংকের সাবেক এমডি


অর্থ পাচারের অভিযোগে এবি (আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক) ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক পরিচালক (এমডি) ও হেড অব ফিনান্সকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রোববার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে কমিশনের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।

সকাল ৯টার দিকে দুদক কার্যালয়ে আসেন এবি ব্যাংকের (আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ চৌধুরী ও হেড অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

এর আগে গেল বৃহস্পতিবার সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফজলার রহমানকে  জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ ঘটনায় আগামী ২ জানুয়ারি ব্যাংকটির পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারা হলেন- হেড অব কর্পোরেট মাহফুজ উল ইসলাম, হেড অব অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) মোহাম্মদ লোকমান, ওবিইউর কর্মকর্তা মো. আরিফ নেয়াজ, ব্যাংক কোম্পানি সেক্রেটারি মহাদেব সরকার সুমন এবং প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা এমএন আজিম।

দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন এবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন। অনুসন্ধানে তাকে সহায়তা করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। আর্থিক বিষয়ে তথ্য চেয়ে সম্প্রতি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি দেয় দুদক।

এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা সিঙ্গাপুরে একটি অফশোর প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে দেশ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন।


হরতালবিহীন ‘শান্ত’ রাজনীতি

আগের বছরের মতো এ বছরটিও রাজনীতির ময়দান ছিল অনেকটাই শান্ত। বছরের শেষভাগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় এবং প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে কিছুটা উত্তাপ। ২০১৮ সালে ভোটের বছরে প্রবেশের আগে এ বছরটি ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে আলোচনায় কেটেছে। এ বছর বিএনপি কোনো হরতাল ডাকেনি। দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এক দিন পূর্ণদিবস হরতাল দেয় জামায়াতে ইসলামী। তবে এতে বিএনপি সমর্থন দেয়নি। আর এই হরতালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিকই ছিল। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েকটি বাম দল আধা বেলা করে দুবার হরতাল ডাকে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে অর্ধবেলা হরতালে বিএনপি সমর্থন দেয়। আর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকা আধা বেলা হরতালেও বিএনপি সমর্থন দেয়। বাম দলগুলোর হরতালে পুলিশ কিছুটা চড়াও হয়।
খালেদা জিয়ার মামলা
বছরের শেষ দিকে এসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় রূপ নেয়। এই মামলার মূল আসামি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর বড় ছেলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিচার এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন বছরের শুরুতেই রায় হয়ে যেতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী যুক্তিতর্কে অংশ নিয়ে খালেদা-তারেকসহ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছেন। আর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তিতর্কে এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে খালাস চেয়েছেন। এই মামলাকে ঘিরে এখন রাজনীতিতে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, খালেদা জিয়া জেলে যাচ্ছেন কি না। মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হলে এবং তিনি কারাগারে গেলে বিএনপির প্রতিক্রিয়া কী হবে? সাজা হলে খালেদা জিয়া কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন? তারেক রহমান কি দেশে ফিরে এসে মামলা মোকাবিলা করবেন? অনেকেই মনে করছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর নতুন বছরে স্পষ্ট হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা খালেদা জিয়ার মামলা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাঁদের সামনে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিসহ নানা রাজনৈতিক বিষয়ও রয়েছে। ফলে তাঁরা কোনটার জন্য মাঠে নামবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৪টি মামলা চলমান আছে। তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার কার্যক্রম সবচেয়ে এগিয়ে। বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা আছে শতাধিক।
নতুন জোট ও দলের আত্মপ্রকাশ
এ বছর বেশ কিছু নতুন রাজনৈতিক জোট ও দল গঠন হয়েছে। গত ৭ মে দুটি দল ও দুটি রাজনৈতিক জোটের সমন্বয়ে সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) নামের একটি ‘বৃহত্তর জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এই জোটে দুটি নিবন্ধিত দলসহ মোট ৫৮টি দল রয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটা এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট। জোটের চেয়ারম্যান এরশাদ। জোটের বেশির ভাগ দলের নামের আগে-পরে ‘ইসলামী’ বা ‘ইসলাম’ শব্দ যুক্ত আছে। এটাকে ইসলামি মূল্যবোধের জোটও আখ্যা দেন এরশাদ। তবে জোট গঠনের পর এর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ৪ ডিসেম্বর রাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর নাম দেওয়া হয় ‘যুক্তফ্রন্ট’। জোটের দলগুলো হলো বিকল্পধারা, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ঐক্য। এই জোটে আরও নতুন রাজনৈতিক দল যুক্ত হবে—এমন ঘোষণাও দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত নতুন কারও যোগ দেওয়া বা জোটের কর্মসূচি শোনা যায়নি। গত ২০ সেপ্টেম্বর নামসর্বস্ব হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান আদিবাসী পার্টিসহ কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) নামে একটি দল গঠন করা হয়। এর দুই দিন পর বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) নামে আরেকটি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ারও ঘোষণা দেয় তারা। এই দল দুটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদনও করেছে।
হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সখ্য
স্তিমিত হেফাজতে ইসলামে আবার নড়াচড়া দেখা দেয় এ বছর। পাঠ্যপুস্তকে ২৯টি বিষয় পরিবর্তনে লিখিত প্রস্তাব দেয় তারা এবং তাদের দাবির সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তনও আনা হয়। ১১ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে হেফাজতে ইসলামের আমিরসহ শীর্ষ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। কওমি শিক্ষায় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করেই দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তরের সমমান প্রদান করা হয়। ওই বৈঠকেই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপন করা গ্রিক থেমেসিসের ভাস্কর্য অপসারণেরও দাবি তোলে হেফাজত। প্রধানমন্ত্রীও এতে সায় দেন। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভাস্কর্যটিকে ‘গ্রিক দেবির মূর্তি’ আখ্যায়িত করে তা অপসারণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি দেয় হেফাজতে ইসলাম। ভাস্কর্য না সরালে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়ার হুমকি দেয় তারা। এই দাবিতে সরকারের অনুগত আওয়ামী ওলামা লীগসহ অন্য ইসলামি দলও যোগ দেয়। ২৫ মে রাতে ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হয়।
সরকারের বেশির ভাগ মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা হেফাজতে ইসলাম-সম্পর্কিত সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। তবে ভেতরে ভেতরে কেউ কেউ এর সমালোচনাও করেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচির পালে হাওয়া
বছরের প্রায় পুরোটা জুড়েই ঘরোয়া কর্মসূচি পালনে সীমাবদ্ধ থাকে বিরোধীরা। বছরের শেষের দিকে এসে ঘরের বাইরে কর্মসূচি পালনের সুযোগ পায়। শুরুটা হয় ১৮ অক্টোবর। ওই দিন খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে পথে পথে নেতা-কর্মীরা তাঁকে স্বাগত জানান। এতে বিপুল মানুষের জমায়েত হয়। এরপর ২৮ অক্টোবর খালেদা জিয়া সড়কপথে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে কক্সবাজার সফরে বের হন। পথে পথে তাঁর সফর ঘিরে বিপুল জমায়েত করে বিএনপি। ফেনী ও চট্টগ্রামে খালেদার গাড়িবহরে হামলা হয়। তবে আসা-যাওয়া মিলিয়ে তিন দিনের এই সফর বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। দীর্ঘদিন পর ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি পায় বিএনপি। ওই সমাবেশে বিপুল জমায়েতও করে দলটি। সর্বশেষ ২৪ ডিসেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে অংশ নেন খালেদা জিয়া। সরকারি দল আওয়ামী লীগ সারা বছরই কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করেছে। তবে অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ায় তা উদ্‌যাপনে গুরুত্ব দেয় দলটি। সরকার ও বিএনপি জোটের বাইরে থাকা বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও হেফাজতের দাবি মেনে নেওয়ার বিরোধিতা করে হরতালসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।
অভ্যন্তরীণ সহিংসতা
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জর্জরিত আওয়ামী লীগ। এ বছরটাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রাণহানির যে ঘটনা ঘটেছে, এর পুরোভাগেই দেখা গেছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগী সংগঠনের, সহযোগী সংগঠনগুলোর মারামারি লেগেই ছিল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুসারে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৩২১টি। এসব ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪৯ জনের। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪১৫ জন। এর মধ্যে ১৮৯টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধে। এসব ঘটনায় ৩৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন ২ হাজার ৭৫৬ জন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রাণহানি ধরলে গত ১১ মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৪০ জনের প্রাণ গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘাতে প্রাণ গেছে ২৮ জনের। আর ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মারা যান ৩ জন।
রাজনীতিকদের প্রয়াণ
এ বছর বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের প্রয়াণ ঘটেছে। সর্বশেষ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক ১৬ ডিসেম্বর সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর আসন থেকে তিনি পাঁচবারের সাংসদ ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এই রাজনীতিক ২০১৪ সালে মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। গত ১৪ ডিসেম্বর দিবাগত ভোররাতে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি ১৬ বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শোকের ছায়া নামে আসে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ২৪ অক্টোবর নিজ বাসায় মারা যান। আমলা থেকে রাজনীতিতে আসা এই বর্ষীয়ান নেতা দীর্ঘদিন রোগে ভুগছিলেন। ১৯৯০ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে অবসরে যান। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লার হোমনা আসন থেকে টানা পাঁচবার সাংসদ হন। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান ও আওয়ামী লীগের নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা যান। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই নেতা। স্বাধীনতার পর সাতবার সাংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালেও তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। ২০১১ সালে তিনি রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করেন।

ভুগিয়েছে চাল-পেঁয়াজ, অসন্তোষ বিদ্যুতে


২০১৭ এর বিদায় ঘণ্টা বাজতে আর মাত্র কয়েকঘণ্টা। এরপরই ইংরেজি ক্যালেন্ডারে শুরু হবে নতুন একটি বছর। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় ২০১৭ সালটি সাধারণ মানুষের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। কারণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারাটি বছর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ছিল অস্বাভাবিক রকমের চড়া।

সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে অতি প্রয়োজনীয় চাল ও পেঁয়াজ। এছাড়া শাক-সবজি ও কাঁচা মরিচের দাম কখনো কখনো রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতও অসন্তোষ ছড়িয়েছে।

চালে  ‘কাবু’ সাধারণ মানুষ

চালের বাজারে প্রথম অস্থিরতা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। এ সময় মাঝারি মানের চাল ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকার কাছাকাছি চলে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ভারত, মিয়ানমারসহ প্রভৃতি দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে চাল আমদানি ও খোলা বাজারে চাল বিক্রি শুরু করে। তবে সরকারের নিজস্ব ভাণ্ডারে যথেষ্ট পরিমাণে চাল মজুদ না থাকায় এর সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়া সরকারের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।

বছর শেষের এই সময়ে এসেও চালের ঊর্ধ্বমুখী দর বহাল রয়েছে। ২০১৭ সালের শেষ সপ্তাহে খুচরা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৫০ টাকা, মাঝারি চাল ৪৮-৬২ টাকা এবং চিকন চাল ৭০-৮৬ টাকায়।

চালের যে দর বেড়েছে তা সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথায়ও স্পষ্ট। তিনি বলেন, চালের দাম যে পরিমাণ বেড়েছে, তা অসহনীয়। সম্প্রতি বেড়ে যাওয়ার পরিমাণটা অস্বাভাবিক। মোটা চালের কেজি ৫০ টাকার ওপরে উঠে যাওয়ায় কিছু লোকের খুব অসুবিধা হয়েছে। দামটা আসলে অনেক বেড়েছে।

এখনো কাঁদাচ্ছে পেঁয়াজ

দাম-দরের উঠানামায় বছরের আরেকটি আলোচিত পণ্যের নাম হল পেঁয়াজ। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ছিল ২২ থেকে ৩০ টাকার মধ্যেই। কিন্তু মার্চের শুরুতে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বাড়া শুরু করে। এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দামকেই দায়ী করেন। ২২-৩০ টাকা দামের পেঁয়াজ তখন ৪০ এর ঘরে পৌঁছে যায়।

এপ্রিল-মে মাসে পেঁয়াজের দর আবার কিছুটা কমে আসলেও এর পরের মাস থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করে। পরে দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই দর বাড়তে বাড়তে অক্টোবর-নভেম্বরে এসে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। চলতি মাসের শুরুর দিকে বাজারে পেঁয়াজের দর ওঠে ১৩০ টাকা পর্যন্ত।

শাক-সবজিতেও সেঞ্চুরি

পুরোটা বছর সাধারণ মানুষের অন্যতম ভোগান্তির নাম শাক-সবজি। প্রতিকেজি ঢেঁড়শ, বেগুন, বরবটি, কাকরোল, শিম কিংবা পটলের দামও তিন অঙ্কের ঘর ছাড়িয়েছিল।

চোখ রাঙালো গ্যাসের দাম

বিশ্ব বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার পর দেশে মূল্য সমন্বয়ের দাবি পূরণ হয়নি। উল্টো বছরের শুরুতেই গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণায় ভোক্তা মহলে তৈরি হয় উদ্বেগ।

বাড়তি টাকায় বিদ্যুত

২০১০ সালের ১ মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ বছরে খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে ৭ বার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। প্রায় দুই বছর পর গত নভেম্বরের শেষদিকে আবারো দাম বাড়ায় সরকার। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নয় বছরে এ নিয়ে আটবার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুত পেতে এখন ইউনিট প্রতি ৩৫ পয়সা বেশি গুণতে হচ্ছে।

এখনই প্রয়োজন সঠিক নীতি

টার্কি খামার, একটি সম্ভাবনাময় খামার; সঠিক নীতিমালায় একে ধরে রাখতে পারলে পরিণত হতে পারে একটি শিল্পে। পোলট্রির অন্তর্গত হলেও বিশ্বব্যাপী টার্কিকে আলাদাভাবে গণ্য করা হয়। টার্কি আকারে বড়, খাওয়ার উপযোগী একটি টার্কির ওজন প্রায় ৬-৭ কেজি এবং বাচ্চা উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পালিত টার্কির ওজন প্রায় ১০-১১ কেজি হয়ে থাকে। ব্রয়লার মাংসের চেয়ে একটু শক্ত এবং সুস্বাদু মাংস হিসেবে ভোক্তার খাদ্যাভ্যাসে যুক্ত হচ্ছে টার্কির মাংস। বৃদ্ধি পাচ্ছে ভোক্তার গ্রহণমাত্রা। বর্তমানে দামি খাবার হিসেবে অভিজাত ভোক্তা টার্কির মাংস গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছে। অল্প কয়েকটি টার্কির বাচ্চা দিয়ে এবং স্বল্প জায়গা নিয়ে এদের পালন করা যায় বলে অনেকেই এই খামারে উৎসাহী হচ্ছে এবং বাড়ছে খামারির সংখ্যা। এ যেন নব্বইয়ের দশকের পোলট্রিশিল্প, মাত্র রূপ নিচ্ছিল সম্ভাবনাময় শিল্পের। সঠিক দিকনির্দেশনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল বলেই আজও পোলট্রিশিল্প চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, যদিও বিনিয়োগের আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ, খামারি ধুঁকছেন বছরের পর বছর। আজকের টার্কি পালনকে শুধু একটি খামার নয়, বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে এখনই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে টার্কির ভবিষ্যৎও হবে পোলট্রিশিল্পের মতো, হয়তোবা তার চেয়ে খারাপ। কারণ, এ দেশের ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস পুষ্টিনির্ভর নয়, বরং স্বাদনির্ভর। টার্কি মাংসের স্বাদ সাধারণ ভোক্তার কাছে একেবারেই নতুন। ভোক্তার খাদ্যতালিকায় টার্কির মাংস সংযোজনের জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ না করে শুধু খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি করলে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেড়ে যাবে, খামারি উৎপাদন খরচের কমে উৎপাদিত টার্কির মাংস বাজারে অথবা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রয় করতে বাধ্য হবেন, ফলাফল পথে বসে যাবেন খামারি, যেমনটা হয়েছে আজকের পোলট্রিশিল্পের। ইতিমধ্যেই এমন অবস্থার অবতারণা হয়েছে। খামারি তঁার উৎপাদিত টার্কি মাংসের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, শুরু হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য! ঢাকায় প্রতি কেজি মাংস ৫০০ টাকা হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর মূল্য প্রতি কেজি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অর্থাৎ খামারির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে একশ্রেণির তথাকথিত বাজারজাতকারী। বাংলাদেশের খামারিদের বড় একটি সমস্যা হচ্ছে তাঁরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না নিয়ে অন্য সফল খামারিদের অনুসরণ করেন এবং তাঁদের পরামর্শে খামার পরিচালনা করে থাকেন। ফলে বেশির ভাগ সময় খামারি লাভজনক খামার পরিচালনায় ব্যর্থ হন।
এই সুযোগে কিছু কিছু স্থানে গড়ে উঠছে তথাকথিত ‘টার্কি পালন প্রশিক্ষণকেন্দ্র’, যাদের অনেকের আইনগত অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকে আবার বই লিখেছেন টার্কি পালনের ওপর, শুধু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, কোনো কারিগরি জ্ঞান না থাকলেও! লেখককে প্রশ্ন করলে তিনি দিতে পারেন না বইয়ে লেখা নানা রোগ, রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে দেওয়া নিজের ওষুধের নাম, এ দেশে প্রাপ্যতা ইত্যাদি, যা খামারির জন্য জরুরি। ভুল তথ্যে ভরা বই খামারিকে ঠেলে দিচ্ছে সর্বনাশের মহাসাগরে! ঘরে ঘরে পালন করা হচ্ছে টার্কি, এতে সৃষ্টি হতে পারে বিপজ্জনক পাখি থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়া রোগের ঝুঁকি। প্রতিটি উপজেলায় উপস্থিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ান, এভিয়ান ভেটেরিনারিয়ান এবং পোলট্রি বিশেষজ্ঞ; তাহলে কেন প্রয়োজন এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান? টার্কিকে একটি শিল্প হিসেবে দেখতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে, অবশ্যই বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। টার্কির জন্য এখনই প্রয়োজন একটি নীতিমালা, যাতে থাকবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। খামার স্থাপন করার আগেই সেগুলোকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে নথিভুক্ত করতে হবে এবং পূর্বানুমতি নিতে হবে, যাতে একটি সঠিক তথ্যভান্ডার পাওয়া যায় অধিদপ্তর থেকে এবং ভবিষ্যতে হুমকির মুখে না পড়ে এই শিল্প। খামার স্থাপিত হওয়ার পরে তা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করলে সৃষ্টি হয় জটিলতা। অনেক টার্কি খামারির কারিগরি জ্ঞানের অভাব আছে নিঃসন্দেহে, যেমন প্রচলিত পদ্ধতিতে খাদ্য হিসেবে শুধু শাকসবজি গুরুত্ব পাচ্ছে, অথচ বিশ্বব্যাপী নিবিড় পদ্ধতিতে টার্কি পালনে দানাদার সুষম খাদ্য ব্যবহার করা হয়, যাতে শুধু সঠিক মাংস উৎপাদন নয় বরং টার্কির ফার্টিলিটি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়, ফলে বাচ্চা উৎপাদন অব্যাহত থাকে। আশির দশকে পোলট্রিশিল্প শুরু হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পূর্ণাঙ্গ পোলট্রি নীতিমালা পেতে এই শিল্পকে পার করতে হয়েছিল প্রায় এক দশক! টার্কির নীতিমালায় যেন এ অবস্থা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে অসহায় খামারি লাভের আশায় দৌড়ে বেড়াচ্ছেন, আর কিছু মানুষ তঁাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে টু-পাইস কামাচ্ছে। বড় বেশি ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগে এখনই সময় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পদক্ষেপ নেওয়ার। খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, বাজারজাতকরণে সঠিক পথ দেখানোর উদ্দেশ্যে শুধু টার্কির জন্য একটি সমন্বিত কার্যক্রম নেওয়া সময়ের দাবি।
মো. মোরশেদ আলম: কৃষিবিদ ও সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যাগ্রিকালচার সোসাইটি।
president.baas@gmail.com

জাহাজজটের যন্ত্রণার বছর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ কোম্পানি মায়ের্সক লাইনের সহযোগী সংস্থা এমসিসি ট্রান্সপোর্ট এ বছর চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জাহাজের জট নিয়ে ২৬ বার গ্রাহকদের নোটিশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি নোটিশের মূল ভাষ্য ছিল, জটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হয় তা বলা কঠিন। ১৯ ডিসেম্বর ২৬তম নোটিশেও ছিল এই ভাষ্য। এ তো গেল কনটেইনার জাহাজের এ বছরের চিত্র। সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের জট ছিল আরও ভয়াবহ। সাধারণ পণ্যবাহী ছোট আকারের জাহাজ বন্দরের জেটিতে এবং বড় জাহাজ থেকে বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করা হয়। কয়েকটি অগ্রাধিকার পণ্যবাহী জাহাজ ছাড়া এ ধরনের জাহাজ জেটিতে ভেড়ানোর জন্য কমবেশি ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর লাইটার জাহাজ না পেয়ে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে ১৫ থেকে ১৮ দিনের পরিবর্তে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লেগেছে। বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কনটেইনার জাহাজের দীর্ঘমেয়াদি জট বিশ্বের কোথাও নেই। এই জটের মূল কারণ গত ১০ বছরে বন্দরের মূল অবকাঠামোয় একটিও জেটি যোগ না হওয়া।
অথচ এ সময়ে পণ্য পরিবহন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ফলে যন্ত্রপাতি বা অন্য অবকাঠামো যতই থাকুক, জাহাজ থেকে কনটেইনার বা পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য জেটি না থাকায় জটও দূর হচ্ছে না। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বহু আগে থেকেই সরব ছিলেন। দেশের প্রতিটি শিল্প খাতের প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে এ বছর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে বন্দর-সুবিধার অভাবের কথাও। বন্দরের এ অবস্থা এক দিনে হয়নি। তিন-চার বছর আগে থেকে শুধু বাজেট ও রোজার আগে পণ্য পরিবহনের চাপে জাহাজের জট থাকত। ২০১৬ সালে এসে প্রথমবারের মতো এপ্রিল-মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময়জুড়ে ছিল জাহাজজট। এ বছর প্রথম দিন শুরু হয়েছে জট দিয়ে। শেষও তা-ই। বছরজুড়ে গড়ে প্রতিদিন জেটিতে ভেড়ানোর জন্য প্রায় ১২টি জাহাজ বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকত। এই অপেক্ষার সময় ছিল সর্বনিম্ন ১ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত। শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন যে বাড়বে, সেটি এ পর্যন্ত বন্দরের প্রণয়ন করা সব সমীক্ষায় বলা হয়েছিল। এ জন্য দরকার ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিসহ অবকাঠামো বাড়ানো ও নতুন বন্দর গড়ে তোলা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দরের নীতিনির্ধারকেরা নতুন বন্দর হিসেবে পায়রা সমুদ্রবন্দরকে বেছে নিয়েছিলেন। ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০১৮ সালে পায়রায় জেটি নির্মাণ হবে। কিন্তু নতুন জায়গায় প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে এ দেশে যে এত দ্রুত অবকাঠামো তৈরি সম্ভব নয়, সেটি বুঝতে পারেননি নীতিনির্ধারকেরা। ফলাফল, পায়রা চালু হয়নি, চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে জট। আমদানি ও রপ্তানিতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বন্দরসেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরসেবায় কোনো ঘাটতি হলে দেশের সাধারণ মানুষকেও তার মূল্য দিতে হয়। এখনো বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ৮৯ শতাংশ জাহাজে পরিবহন হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বন্দর দিয়ে ব্যবসার খরচ বাড়লে তা সাধারণ মানুষকেই পরিশোধ করতে হয়। কারণ ব্যবসায়ীরা পণ্যমূল্যের সঙ্গে এই খরচ যোগ করে ক্রেতাদের কাছ থেকেই আদায় করেন।

বছরের চমক রোবট সোফিয়া

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এ বছর নানা ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনা মানুষকে নাড়া দিয়েছে। কিছু ঘটনা নিয়ে চলেছে বিতর্ক। কিছু ঘটনা নিয়ে আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। সব মিলে ২০১৭ সালটি দেশের মানুষের সামনে প্রযুক্তির ক্ষেত্রের কিছু উন্নতি দেখাতে পেরেছে। চলুন, এ বছরে ঘটে যাওয়া কিছু আলোচিত ঘটনা ফিরে দেখি: মাতিয়ে গেল সোফিয়া
এ বছরে দেশে প্রযুক্তিতে বড় ঘটনা ছিল সোফিয়ার বাংলাদেশে আসা। ডিসেম্বরে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথন ছাড়াও টেক টক উইথ সোফিয়া অনুষ্ঠানে দর্শনার্থীদের সামনে হাজির হয় সোফিয়া। দর্শনার্থীদের মাতিয়ে তোলে বিশ্বের প্রথম কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়া এই রোবটমানবী। সোফিয়ার ঢাকা আগমনকে ঘিরে আগে থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সোফিয়াকে চালু করা হয়। বিশ্বের প্রথম এই হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করে হংকংয়ের হ্যানসন রোবোটিকস। ব্রিটিশ অভিনেত্রী অড্রে হেফবর্নের অনুকরণে তৈরি করা হয় সোফিয়াকে। সামনে থাকা ব্যক্তির বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম সোফিয়া তার কথার ধরনের সঙ্গে মিল রেখে চেহারায় অভিব্যক্তিও প্রকাশ করতে সক্ষম। ২০১৭ সালে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র হিসেবে কোনো দেশের নাগরিকত্ব পায় সোফিয়া। সৌদি আরব তাকে এ নাগরিকত্ব দেয়।
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৮ কোটি
চলতি বছরের নভেম্বর মাস শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আট কোটি পার হয়েছে। এর মধ্যে ৭ কোটি ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের শেষে দেশে কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ ৮ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার হয়েছে। এর মধ্যে আইএসপিদের সংযোগসংখ্যা ৫৩ লাখ ৪২ হাজার। ওয়াইম্যাক্সের সংযোগ ৮৮ হাজার। নভেম্বর মাসের হিসাবে দেশে সক্রিয় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটি ৩১ লাখ ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার, রবি আজিয়াটার ৪ কোটি ১৩ লাখ ৯৭ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার, টেলিটকের ৪৪ লাখ ১৯ হাজার গ্রাহক দাঁড়িয়েছে।
রাইড শেয়ারিং সেবার জনপ্রিয়তা
দেশে এ বছর রাইড শেয়ারিং সেবার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এ বছর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি পরিবহনসেবার অ্যাপস। যেই অ্যাপগুলো থেকে অনেকেই সুবিধা পাচ্ছেন যানজট থেকে বিরত থাকার। এগুলো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক পরিবহনসেবা। মাইক্রোবাস, কার থেকে মোটরসাইকেল-সেবা দিচ্ছে এসব কোম্পানি। প্রাথমিকভাবে রাজধানী ঢাকার পর চট্টগ্রামেও এ সেবা চালু করেছে কেউ কেউ। এর মধ্যে আছে পাঠাও, উবার, ইজিয়ার, চলো, স্যাম, মুভ।
গুগল-মাইক্রোসফটে বাংলাপ্রীতি
এ বছর গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলা ভাষাকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। অনলাইনে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলায় গুগল অ্যাডসেন্স চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া নলেজ গ্রাফ, স্পিচ-টু-টেক্সটে বাংলা যুক্ত হয়েছে। এ বছর গুগলের হোমপেজে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট চারটি ডুডল প্রকাশ করা হয়। নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, হ‌ুমায়ূন আহমেদ ও বেগম রোকেয়ার জন্মদিনে বিশেষ ডুডল প্রদর্শন করে গুগল।
জরুরি নম্বর চালু
ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পুলিশি সেবা পেতে জাতীয় হেল্প ডেস্ক হিসেবে ‘৯৯৯’ নম্বরটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর আবদুল গণি সড়কে পুলিশের কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জরুরি নম্বরটির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। টোল ফ্রি হিসেবে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে নাগরিকেরা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সসেবা নিতে পারবেন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস ঘোষণা
এ বছর ১২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো পালিত হয় জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস। প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর ‘জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব নভেম্বর মাসে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
অ্যাপিকটা আয়োজন
দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় তথ্যপ্রযুক্তির অস্কারখ্যাত চার দিনের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ‘অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ডস ঢাকা-২০১৭’। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তত্ত্বাবধানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) যৌথভাবে ৭ থেকে ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ১০ মিনিটস স্কুল ই-লার্নিং বিভাগে বিজয়ী হয়।
জুম নিয়ে হইচই
দেশে পেপ্যাল আসছে বলে আলোচনা ছিল। কিন্তু বহুল আকাঙ্ক্ষিত পেপ্যালের পূর্ণাঙ্গ সেবার বদলে জুমসেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় বাংলাদেশে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে দাবি করা হয়, এ সেবা চালুর ফলে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এখন থেকে ফ্রিল্যান্সারসহ অনলাইনে কাজ করা তরুণ প্রজন্ম কম সময়ে সহজে বৈধ উপায়ে বিদেশ থেকে অর্থ আনতে পারবে। পেপ্যাল জুমসেবা চালুর ফলে অনলাইন লেনদেন অনেক সহজ হবে। দুর্নীতি ও হুন্ডির মতো অবৈধ পন্থায় অর্থ লেনদেন বন্ধ হবে।
হাইটেক পার্ক
২০১৭ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের মধ্যে অন্যতম ১২ হাইটেক পার্কের ঘোষণা। এই পার্কগুলো দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি খাতটি থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। নতুন করে ১২ জেলায় ১২ হাইটেক পার্ক স্থাপনের অনুমোদন পাওয়ায় দেশে সর্বমোট তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এমন হাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮। এ বছর যশোরে খুলে দেওয়া হয় ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’, যা ঢাকার বাইরে পূর্ণাঙ্গ হাইটেক পার্ক।
মহাকাশে যাত্রা শুরু
এ বছর মহাকাশে প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইট পাঠিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ৪ জুন মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’। মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স আর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সিআরএস-১১ অভিযানে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটে করে ন্যানো স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তর ডেটা সেন্টার
তথ্য সংরক্ষণ ও ডিজিটাল সেবা সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ডেটা সেন্টার। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে সাত একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই ফোর টায়ার ডেটা সেন্টারটি। এর মাধ্যমে দেশের সব অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, যানবাহন, টেলিকমিউনিকেশন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে শুরু করে সবকিছুই প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বিশালাকার এই ডেটা সেন্টারে থাকছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৬০৪টি র‌্যাক। এতে আরও থাকছে ৯ এমভিএ লোডের রিডান্ডেন্ট লাইনসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সংযোগের ব্যবস্থা।

সির হাতে লাগামহীন ক্ষমতা

চীন আবারও আমাদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করেছে। বহু মানুষ আশা করেছিল, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান সি চিন পিং অক্টোবরে অনুষ্ঠিত দলটির ১৯তম জাতীয় কংগ্রেসে কঠোরতম পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন—কংগ্রেস তো নেতা নির্বাচনের জন্যই হয়। সি চিন পিংকে আরও পাঁচ বছরের জন্য নেতা নির্বাচন করা হয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি যদি উত্তরসূরি নির্বাচিত করতে না চান তাহলে তাঁকে ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। কিন্তু তা করেননি আর বিরোধীরাও কিছু করতে পারেননি। কারণটা খুব পরিষ্কার: সি এর জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি যে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন, মাও-উত্তর চীনে সেটা সম্ভব হবে না।
একই সঙ্গে, তিনি ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাও নিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করেছেন এবং দ্রুত নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। এ বছরের শুরুর দিকে চীনের নিরাপত্তাকর্মীরা যখন দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য চীনা বংশোদ্ভূত হংকংভিত্তিক ধনকুবের জিয়াও জিয়ানহুয়াকে অপহরণ করে আনল, তখনই বোঝা গেল, সি চিন পিংয়ের ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণের পথে আর কোনো বাধা রইল না। এ ছাড়া কংগ্রেসের আগে নিজের ক্ষমতা আরও সংহত করার জন্য সি চিন পিং পলিটব্যুরোর সদস্য ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি এক নেতাকে জুলাই মাসে হঠাৎ করেই দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেন। এরপর কংগ্রেস যখন শেষমেশ হলো তখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের দুই মিত্রকে পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করেন, যেটা দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ সংস্থা। আর দলকে উত্তরসূরি মনোনয়নে বাধা দিয়ে তিনি ২০২২ সালে তৃতীয় দফা নেতা হওয়ারও পথ খোলা রাখলেন। যেকোনো প্রথাগত বিবেচনায় সি চিন পিং ২০১৭ সালে  আরও শক্তিশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তিনি চীনের জন্য নিজের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। এই লড়াইয়ের প্রথম দফায় সি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন। তিনি এককভাবে চীনা আমলাতন্ত্রকে দিয়ে উচ্চাভিলাষী ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বাস্তবায়ন করিয়ে নিচ্ছেন। এই প্রকল্পে চীনা অর্থ, উপকরণ ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ব্যবহার কর এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের অনেক দেশকে চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। কিন্তু সির ক্ষমতা এতটা বাড়ার পরও এই অর্থনৈতিক স্বপ্ন বাস্তবায়নে সি চিন পিংয়ের সফলতা এখনো নিশ্চিত নয়। খুব বেশি হলে বলা যায়, আদর্শিক অনুশাসন ও নিপীড়নমূলক শাসনের কারণে ব্যাপারটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রচার-প্রচারণায় চিন পিংয়ের স্বপ্ন নিয়ে অনেক বড় কথা বলা হলেও দলের সদস্যসহ অনেক চীনা নাগরিক এটা বিশ্বাস করে কি না বলা কঠিন যে তাঁদের দেশের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীভূত ও ভয়ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী জমানার মধ্যে নিহিত আছে। বস্তুত, চিন পিংয়ের লক্ষ্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন বা সেটা ইদানীং আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক অক্রিয় প্রতিরোধ আছে। আর সি চিন পিংয়ের কঠিনতম প্রতিদ্বন্দ্বীরা শুধু দেশটির ক্ষুদ্র বিরোধীপক্ষের মানুষ নন, যে দলীয় কর্তারা তাঁর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের জ্বালা সহ্য করেছেন, তাঁরাও এই দলে আছেন। এঁরা যে শুধু বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ হারাচ্ছেন তা নয়, একই সঙ্গে ক্ষান্তিহীন রাজনৈতিক তদন্তের মুখে পড়েছেন। এখন সি চিন পিং যদি দলের মধ্যম ও নিচের সারির কর্মকর্তাদের সমর্থন না পান, তাহলে তাঁর চীন পুনর্নির্মাণের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসবে। সর্বোপরি তিনি যতই শক্তিশালী হোন না কেন, এই চীনা প্রবাদের বাস্তবতা তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না: ‘পর্বত অনেক উঁচু, আর সম্রাট অনেক দূরে’। আর যথেষ্ট বস্তুগত পুরস্কারের সম্ভাবনা না থাকলে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তারা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশের মানুষের সেই যুক্তির দ্বারস্থ হতে পারেন: ‘আমরা কাজ করার ভান করি, আর তাঁরা আমাদের মজুরি/বেতন দেওয়ার ভান করেন’।
শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী আমলাতন্ত্রের বাইরেও সি চিন পিং কমিউনিস্ট পার্টির তথাকথিত যুবলীগের মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন, যারা আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাত সদস্যবিশিষ্ট পলিটব্যুরোর নতুন স্থায়ী কমিটিতে হু জিনতাওয়ের দুজন অনুগ্রহভাজন আছেন। ফলে এই যুবলীগ ও সির গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা ঠিক, সি চিন পিং যুবলীগের এই প্রতিরোধ সামাল দিতে পারবেন, এমন সম্ভাবনা আছে। সর্বোপরি, তিনি ইতিমধ্যে আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের সঙ্গে সম্পর্কিত গোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। আগে এরাই কমিউনিস্ট পার্টিতে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী গোষ্ঠী ছিল। তবে সি যুবলীগকে বাগে আনতে পারলেও একটি ভঙ্গুর ও চেতনাহীন জমানা তাঁকে চালিয়ে নিতে হবে। সি চিন পিংকে আবার ব্যাপক নীতিগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁকে ক্রমবর্ধমান ঋণ ও অতি সক্ষমতার সমস্যা সামলাতে হবে, অন্যদিকে ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী নীতির সঙ্গেও লড়াই করতে হবে। এতে প্রবৃদ্ধির চাকা আরও শ্লথ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র নীতিতে সি চিন পিংকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক সামলাতে হবে, যার কারণ হলো, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকি ও দক্ষিণ চীন সাগরে তার আগ্রাসী আচরণ। এখন মানুষ ভাবছে, আগামী পাঁচ বছর পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, সি চিন পিং ২০২২ সালেও সহকর্মীদের নিপীড়ন করতে পারবেন। এটা সত্য হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষণস্থায়ী, বিশেষ করে সেই নেতাদের জন্য এটা প্রযোজ্য যাদের অর্থনৈতিক রেকর্ড অত দৃঢ় নয়। এখন সি চিন পিং ও তাঁর সমর্থকদের উদ্‌যাপন করার অনেক কারণ আছে। কিন্তু আগামী পাঁচ বছর শুধু গ্লাস গ্লাস পান করলেই তাঁদের চলবে না।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
মিনঝিন পি: যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেয়ারমন্ট ম্যাককেনা কলেজের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক।

তাইওয়ানের পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের ছবি!

দুই লাখ পাসপোর্টে নিজ দেশের স্থাপনার ছবির পরিবর্তে অন্য দেশের স্থাপনার ছবি ছাপিয়ে বিপাকে পড়েছে তাইওয়ান। এ ঘটনায় রোষানলে পড়ে পদত্যাগ করেছেন এক কর্মকর্তাও। শুধু তা–ই নয়, ‘ভুলবশত’ ছবি ছাপানো ওই সব পাসপোর্টের জন্য জরিমানা গুনতে হচ্ছে ছাপানোর দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি সামনে আসে গত মঙ্গলবার। দুই লাখ পাসপোর্টে তাইওয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছবির পরিবর্তে ওয়াশিংটনের ডালাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছবি ছাপানো হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ফোকাস তাইওয়ান। এরপরই সামনে আসে বিষয়টি। ১৯৬২ সালে নির্মিত ডালাস বিমানবন্দরের ডিজাইনে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৯ সালে তাইওয়ান বিমানবন্দরটি নির্মাণ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তাতেই বিপত্তি বেধেছে।
ফোকাস তাইওয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরই মধ্যে ২৮৫ জনকে পাসপোর্ট ফেরত দিতে বলা হয়েছে। আর পাসপোর্টের প্রিন্টের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা হিসেবে সঠিক ছবি দিয়ে ফের দুই লাখ পাসপোর্ট ছাপাতে বলা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির খরচ পড়বে ২৭ লাখ ডলার। এ ঘটনায় পদত্যাগ করেছেন তাইওয়ান ব্যুরো অব কনস্যুলার অ্যাফেয়ার্সের প্রধান অ্যাগ্নেস চেন। এক বিবৃতিতে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের কাছে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইছি। এবং এ ঘটনার পুরো প্রশাসনিক দায়িত্বভার নিচ্ছি।’ পাসপোর্টের ডিজাইনের দায়িত্বে থাকা কানাডায় নিযুক্ত তাইওয়ানের শীর্ষ কর্মকর্তা কুং চুং-চেনকে তলব করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করছে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এক বছরেও শুরু হয়নি বিচারকাজ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের (গাইবান্ধা-১) সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যার এক বছর আজ ৩১ ডিসেম্বর রোববার। এত দিনেও এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি চন্দন সরকারকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শুরু হয়নি মামলাটির বিচার কার্যক্রম। তবে গত শুক্রবার সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হত্যা মামলায় আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাতজন কারাগারে আছেন। আসামি চন্দন সরকারকে সম্প্রতি ভারতে আটক করা হয়েছে। তাঁকে দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে সাংসদের পরিবার-পরিজন, দলীয় নেতা-কর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটছে না। এ আসনে এক বছরের ব্যবধানে দুই সাংসদের মৃত্যু, সাবেক এক সাংসদের কারাভোগ ও আরেক সাবেক সাংসদ পলাতক থাকায় এ আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। জানতে চাইলে সাংসদ মনজুরুল ইসলামের স্ত্রী খুরশিদ জাহান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেন স্বামীর হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি। ওদের (আসামি) এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে কেউ এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে না পারে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এখনো পরিবার ও আমার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। রাস্তায় বের হলে, কোথাও গেলে ভয় লাগে। নিরাপত্তা সমস্যাও বোধ করছি।’ ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সাংসদ মনজুরুল ইসলাম নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁর ছোট বোন ফাহমিদা বুলবুল অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। শুরুতে জামায়াত-শিবিরের ওপর এর দায় চাপানো হয়। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। পরে ছিনতাইকারীদের ফেলে যাওয়া একটি ম্যাগজিনের সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করার কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ কাদের খানকে।
তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গ্রামের বাড়ি থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর সহযোগীদের। তাঁরা হলেন কাদের খানের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শাহিন মিয়া, মেহেদী হাসান, রানা মিয়া, গাড়িচালক আবদুল হান্নান, তাঁর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) জোহা মিয়া ও সুবল চন্দ্র। বর্তমানে চন্দন সরকার ছাড়া সব আসামি কারাগারে রয়েছেন। তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় কাদের খানের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে পুলিশ। বর্তমানে অস্ত্র মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। কিন্তু হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) শফিকুল ইসলাম শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মামলার এক আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি। আগামী ৮ জানুয়ারি মামলাটি গাইবান্ধা মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত থেকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর হবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চাইলে ওই আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া অবস্থায়ও মামলার বিচার শুরু করা যেত। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণে এখনো বিচার শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বশূন্য উপজেলা কমিটি: সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন সাংসদ মনজুরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাংসদ গোলাম মোস্তফা। তাঁরা মারা যাওয়ার পর এখনো এ দুইপদে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণে উপজেলা কমিটি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। এখানে দলটির অঙ্গ সংগঠনগুলোরও একই অবস্থা। এ ছাড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পৌর মেয়র আবদুল্যাহ-আল-মামুন বলেন, দলে নেতৃত্ব না থাকায় বর্তমানে দলের গতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। লোকমুখে আলোচনা হচ্ছে, এখানে যেই আওয়ামী লীগের সাংসদ হন, সেই মারা যান। এ নিয়ে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাধারণ মানুষ উৎকণ্ঠিত।
নীরব সাংসদের বাড়ি
সাংসদের সাহাবাজ গ্রামের বাড়িতে এখন সুনসান নীরবতা। আগের মতো দলীয় নেতা-কর্মীদের আড্ডা নেই। নেই সমর্থকদের সমাগম। গত শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সাংসদের দোতলা বাড়িতে তেমন লোকজন নেই। নিচের অতিথিকক্ষ (যে কক্ষে সাংসদকে গুলি করা হয়) বন্ধ। উঠোনে সাংসদের কবর। এর পাশে গাবগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক। পুরো বাড়ি যেন খা-খা করছে। সাংসদ মনজুরুল স্মরণে আজ রোববার দিনব্যাপী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কালোব্যাজ ধারণ, মসজিদে দোয়া, গ্রামের বাড়িতে মিলাদ মাহফিল ও শোকসভা। পরিবারের লোকজন, দলীয় নেতা-কর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ এ আয়োজন করেছে। এতে কেন্দ্রীয়, জেলা ও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিত থাকার কথা।
এলাকায় আতঙ্ক
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী বলেন, সাংসদ মনজুরুল ইসলাম নিহতের কারণে আসনটি শূন্য হওয়ায় গত বছরের ২২ মার্চ এখানে উপনির্বাচন হয়। এতে আওয়ামী লীগের টিকিটে সাংসদ হন গোলাম মোস্তফা। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ১৯ ডিসেম্বর মারা যান। এর আগে ২২ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে আরেক সাবেক সাংসদ জামায়াত নেতা আবদুল আজিজসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। তাঁদের মধ্যে আবদুল আজিজসহ পাঁচজন পলাতক। এসব কারণে এলাকায় এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে থার্টি ফাস্ট নাইটে (৩১ ডিসেম্বর) সারা দেশের মানুষ আনন্দ করবে, কিন্তু সেদিন আমরা সাংসদের শোক দিবস পালন করব। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা নানা ষড়যন্ত্র করতে পারে। এসব কারণে সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।’ এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার (এসপি) মাশরুকুর রহমান খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, আতঙ্কের কারণ নেই। সুন্দরগঞ্জে পুলিশের বাড়তি তদারকি রয়েছে।

নতুন মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নতুন মুখ্য সচিব করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানকে। এ ছাড়া তিন মন্ত্রণালয়ে নতুন ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। আজ রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ–সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন নজিবুর রহমান।
চুক্তিতে থাকা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে। মুখ্য সচিবের পদটি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমপর্যায়ের। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত তথ্যসচিব করা হয়েছে একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদকে। আর ভারপ্রাপ্ত খাদ্যসচিব করা হয়েছে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহাবুদ্দিন আহমেদকে। এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল্লাহ আল মোহসীনকে একই মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব করা হয়েছে।

আমরণ অনশনে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা

টানা পাঁচ দিন অবস্থান কর্মসূচি শেষে আজ রোববার থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছেন নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই কর্মসূচি চলছে। দেশের সরকারস্বীকৃত সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন এসব শিক্ষক। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ডাকে এ কর্মসূচি চলছে। গত শুক্রবার ফেডারেশনের নেতারা বৈঠক করে আজ থেকে অনশন কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেন। ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, কিছুক্ষণ আগে থেকে তাঁরা আমরণ অনশন শুরু করেছেন। গোলাম মাহমুদুন্নবী গতকাল জানান, তাঁদের একটাই দাবি, সেটা হলো সরকারস্বীকৃত ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করতে হবে। ফেডারেশনের সভাপতি বলেন, ২০১১ সাল থেকে সরকার শুধু আশ্বাসই দিচ্ছে। তাই এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রাণ গেলেও তাঁরা অনশন থেকে সরবেন না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা চান তাঁরা। গতকাল পঞ্চম দিনেও অবস্থান কর্মসূচিতে কয়েক শ শিক্ষক-কর্মচারী অংশ নেন। আজ অনশনে যোগ দিতে বিভিন্ন স্থান থেকে এক হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী ঢাকায় আসছেন। অবস্থানরত শিক্ষকনেতারা বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও একই নিয়মনীতিতে পরিচালিত হয়। একই শিক্ষাক্রম, পাঠ্যক্রম ও প্রশ্নপদ্ধতি অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীরাও বোর্ড থেকে একই মানের সনদ অর্জন করে।
অথচ বেতন পান না তাঁরা। যদিও দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে ২১ লাখ চাকরিজীবীর বেতন বেড়েছে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অংশ দেওয়া হয়, সেগুলোকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলা হয়। আর যেগুলো এমপিওভুক্ত নয়, সেগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। এগুলোকে সংক্ষেপে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলা হয়। বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী ৪ লাখের বেশি। এর বাইরে স্বীকৃতি পেলেও নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান আছে ৫ হাজার ২৪২ টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ থেকে ৮০ হাজার। সর্বশেষ ২০১০ সালে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। গতকাল সচিবালয়ে জেএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে প্রশ্ন রাখেন সাংবাদিকেরা। জবাবে মন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চেষ্টা করছেন জানিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলন থেকে সরে আসার অনুরোধ জানান। তবে এ বিষয়টির সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় জড়িত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই কমিটি যে নীতিমালা করে দেবে সে অনুযায়ী কাজ হবে বলে জানান তিনি। এদিকে নয়টি শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ মোর্চা-শিক্ষক কর্মচারী সংগ্রাম কমিটি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণসহ ১১ দফা দাবিতে শিগগিরই ধর্মঘটে যাচ্ছে। আজ জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কমিটি আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবে।

পরিবহন খাতে প্রযুক্তি, কিছুটা স্বস্তি

প্রযুক্তির উত্থানের দিক দিয়ে এ বছরকে বলা যায় অ্যাপভিত্তিক পরিবহনের বছর। একের পর এক অ্যাপের ঘোষণা আসছেই। শুরুটা ২০১৫ সালে দেশীয় উদ্যোক্তারা করলেও তেমন সাড়া মেলেনি। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা উবার এসেই বেশ হইচই ফেলে দেয়। এরপর থেকে এই ধরনের পরিবহনসেবা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের উবার চালুর পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে এর চলাচল অবৈধও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অল্প দিনেই জনপ্রিয়তার কারণে সরকারও নড়েচড়ে বসে। ‘রাইড শেয়ারিং’ নীতিমালার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর দেশীয় উদ্যোক্তারাও একে একে ঝাঁপিয়ে পড়েন অ্যাপভিত্তিক পরিবহন ব্যবসায়। সরকারও আছে সেই তালিকায়। বাস বাদে যাঁরা কিছুটা স্বস্তিতে চলতে চান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা ট্যাক্সিই ছিল তাঁদের ভরসা। পরিবহনসেবায় প্রযুক্তি এসে নগরবাসীকে বেশ কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, এমনকি সরকারি পরিবহন বিআরটিসির বাসও এখন অ্যাপের মাধ্যমে সেবা চালু করেছে। ২০১৭ সালে অনেকগুলো অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা চালুর খবর এসেছে। চলো, শেয়ার আ মোটরসাইকেল (স্যাম), পাঠাও, আমার বাইক, আমার রাইড, ইজিয়ার, লেটস গো, মুভ, ডাকো, কত দূরসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা চালু হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্য আছে পিংক স্যাম, লিলি এবং পাঠাওয়েরও নারী বাইকার। হাতের স্মার্টফোন থেকেই নগরবাসী দেখে নিতে পারছেন তাঁর গন্তব্যের কোনো বাহন আশপাশে আছে কি না। ঘরের দোর থেকে নিয়ে যাবে। যাঁরা দ্রুত চলতে চান, তাঁদের জন্য অ্যাপের মোটরবাইকসেবা যেন আশীর্বাদস্বরূপ। সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো ভাড়া নিয়ে বচসা নেই। ‘মামা, ২০ টাকা বাড়ায়া দিয়েন’ ধরনের আবদারও নেই। গন্তব্যে পৌঁছে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা দাম পরিশোধ করলেই হলো। আর অনেক অ্যাপভিত্তিক পরিবহন প্রায়ই নানা রকম অফার দেয়।
যাত্রীরা বলছেন, নিয়মিত চলাচলকারীদের ভাড়াও কম অনেক সময় আসে। হাতের মুঠোয় পরিবহন পছন্দের এত সুযোগ থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাহিদা স্বভাবতই কমেছে। গত নভেম্বর মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা শ্রমিক ঐক্য পরিষদ আট দফা দাবির ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদনহীন উবার, পাঠাওসহ যেকোনো অবৈধ অ্যাপসনির্ভর যান চলাচল বন্ধ করা।’ তারা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। এরপরেই সমালোচনার মুখে পড়ে। অটোরিকশা নিয়ে মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যাত্রীরাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে থাকেন। বেশি ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে না চাওয়া এবং মিটারে না চলা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তাদের ধর্মঘটকে স্বাগত জানিয়ে উল্টো অটোরিকশা বয়কট করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও চলে। পরিস্থিতি বুঝে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের সংগঠনটি নিজেদের দাবির সুর পাল্টে দেয়। তারা অ্যাপসে চলা যান বন্ধের দাবি থেকে সরে নীতিমালার কথা বলে। এমনকি নিজেরাই অ্যাপসেবায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা বলে। একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে জানিয়ে জানুয়ারিতেই এই সেবা চালুর ঘোষণা দেয়। ট্যাক্সির অবস্থাও একই। তারাও অ্যাপে আসতে চায়; তবে বিআরটিএ রাজি নয়। পরিবহন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিজ নীতি অনুযায়ী চলে। নিজেরাই বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়া নির্ধারণ করে। যাত্রীরা চাইছেন, এসব প্রতিষ্ঠান যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারির আওতায় আসুক, যাতে অটোরিকশার মতো এই খাতেও স্বেচ্ছাচারিতা ঢুকে না পড়ে। সরকারের ‘রাইড শেয়ারিং নীতিমালা’র খসড়া হয়ে গেছে। খসড়াটি মন্ত্রিসভায় আছে অনুমোদনের অপেক্ষায়।

নির্বাচনী প্রস্তুতির বছর

সমালোচিত রকিবউদ্দীন কমিশনের উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) কারা আসছে—এই আলোচনায় সরগরম ছিল বছরের প্রথম ৩৭ দিন। দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আর অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে ১৬ জুলাই নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে নতুন কমিশন। এরপর থেকে আলোচনায় ছিল ইসির সংলাপ। নির্বাচন সামনে রেখে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দল, নারীনেত্রী ও নির্বাচন পরিচালনায় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ করে ইসি। সংলাপে প্রধান হয়ে ওঠে আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গ। সংলাপে ২৫টি দল সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পক্ষে মত দেয়। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১১টি দল বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানায়।
১৯টি দল নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এ ছাড়া নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা না-করা, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ও প্রাধান্য পায় সংলাপে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মূল প্রস্তাবগুলো পরস্পরবিরোধী। বিশেষ করে সেনা মোতায়েন, নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদ বহাল রাখা না-রাখা নিয়ে আওয়ামী লীগ ইসিতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব না দিলেও এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাদের অবস্থান বিএনপির বিপরীত। অবশ্য ইসি বলেছে, সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকার গঠনের মতো সাংবিধানিক বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। রাজনৈতিক সমঝোতাও তাদের কাজ নয়। বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন বা সেনাবাহিনীকে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ইসির নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত এই সংলাপ রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব একটা স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। বিএনপির সঙ্গে সংলাপে সিইসি কে এম নুরুল হুদা দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলে অভিহিত করেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন ইসি নির্বাচনী আইনবিধি সংস্কারেও হাত দেয়। তারা সংসদীয় আসনের সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নতুন আইন করার উদ্যোগ নিয়ে কিছুটা পিছিয়ে আসে। এখনো সে আইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়নি। বিদ্যমান আইনেই সীমানা নির্ধারণের কাজ হচ্ছে। ফলে সীমানায় খুব একটা পরিবর্তন আসছে না। এই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অধীনে প্রথম নির্বাচন ছিল কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সে নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে দখল, প্রকাশ্যে সিল দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন ছিল মোটামুটি সুষ্ঠু। সর্বশেষ রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য।

প্রেরণাই পথ দেখায়

‘ভাইয়া, ডিপ লার্নিং কীভাবে শিখব?’
‘মেশিন লার্নিং শিখতে চাই | কেমন করে শুরু করব?’
প্রশ্নগুলো শুনলে খুব অসহায় লাগে | কারণ, আমি জানি যে প্রশ্নকারীর জানতে চাওয়ার ইচ্ছা অকৃত্রিম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব প্রশ্নের খুব ভালো উত্তর আমার কাছে নেই| আমাকে সব সময় পথ দেখিয়েছে ‘অনুপ্রেরণা’। যখনই নতুন কিছু শিখতে চেয়েছি, প্রেরণাই সাহায্য করেছে; প্রযুক্তি নয় | আজ লিখছি ওই প্রেরণাগুলো নিয়ে। ১৯৯৯ সাল। স্নাতক করার জন্য মাত্র যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। জানতে পারলাম যে আমার মা অন্তঃসত্ত্বা। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর কেউ যখন মা হন, তখন সন্তানটির ‘ডাউন সিনড্রোম’ (একধরনের শারীরিক বা মানসিক উপসর্গ)-এর আশঙ্কা থাকে। খবর পেয়েছিলাম ক্যালকুলাস পরীক্ষার দুই দিন আগে। এখনো মনে আছে, অঙ্ক বাদ দিয়ে সারা রাত ডাউন সিনড্রোম নিয়ে পড়াশোনা করেছিলাম। আমার তাৎক্ষণিক চিন্তা ছিল যে ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ দিয়ে মেডিকেল সায়েন্স পড়ব। ডাউন সিনড্রোম নিয়ে গবেষণা করব। কিন্তু একটু ঘেঁটে বুঝতে পারলাম যে কম্পিউটার বিজ্ঞানের মাধ্যমেও হয়তো ডাউন সিনড্রোম নিয়ে কাজ করা সম্ভব। কী করে? সেটা পরিষ্কার ছিল না। তাই ক্লাসে তত্ত্ব শেখার পাশাপাশি সব সময়ই এই তত্ত্বের সৃজনশীল প্রয়োগ নিয়ে চিন্তা করতাম | অচিরেই সুযোগ মিলল | একবার যুক্তরাষ্ট্রে ডাউন সিনড্রোমের এক স্কুলে গিয়েছি সৌজন্য সাক্ষাৎকারের জন্য। দেখলাম ওদের স্পিচ থেরাপি (শিশুদের কথা বলতে সাহায্য করার জন্য একধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা) অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকভাবে কাজ করছে না। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আছে। শিশুদের জন্য পদ্ধতিটা মোটেও আনন্দদায়ক নয়। তা ছাড়া থেরাপির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে থেরাপিস্টের ব্যক্তিত্বের ওপর। বাসায় ফিরেই ড্রয়িং বোর্ড নিয়ে বসে পড়লাম।
ভাবতে শুরু করলাম, থেরাপিস্টকে সাহায্য করার জন্য কীভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়। কম্পিউটার সরাসরি শিক্ষার্থীদের কথা বিশ্লেষণ করবে, আর খেলার ছলে তাদের অনুপ্রেরণা দেবে—এমন কি হতে পারে? বুঝে গেলাম, এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাকে ‘স্পিচ প্রসেসিং’ আর ‘মেশিন লার্নিং’ দুটোই শিখতে হবে। অসংখ্য বই ঘাঁটলাম, রিসার্চ পেপার পড়লাম, বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপকদের সঙ্গে কথা বলে কাজে হাত দিলাম। ওই সময়ে নিজের গরজে শেখা বিদ্যা এখনো কাজে দিচ্ছে। ২০০৭ সাল। হঠাৎ খবর পেলাম, আমার মায়ের ক্যানসার। একেবারে শেষ পর্যায়ে। তখন পিএইচডি মাত্র শুরু করেছি। পিএইচডি বাদ দিয়ে ছুটে এলাম বাংলাদেশে। আমার মা একই সঙ্গে খুব আত্মবিশ্বাসী এবং আশাবাদী মানুষ। আমরা তাঁকে আশাহত করলাম না। একসঙ্গে গেলাম সিঙ্গাপুরে, উন্নত চিকিৎসা এবং হয়তো অলৌকিক কিছুর আশায়। সিঙ্গাপুরে বাঘা বাঘা ডাক্তার আছেন। আমার মায়ের দায়িত্ব নিলেন ডক্টর টো হং চং। শুনেছি কিছুদিন আগে তিনিই বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের চিকিৎসা করে তাঁকে সুস্থ করেছেন। আমাদের আশা আরও বাড়ল। ডাক্তার আমার মায়ের রিপোর্ট দেখে সূক্ষ্মভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ক্যানসার অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে। কেমোথেরাপির চেয়ে জীবনের মান বজায় রাখাটাই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়টা তখন আমাদের জন্য ভীষণ আবেগপ্রবণ। আমরা হার মানব না। ডাক্তারের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলো আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। চলল একের পর এক কেমোথেরাপি, সঙ্গে ভয়ংকর সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল পারকিনসনের মতো কাঁপুনি। ওষুধ খেলে কমে। একদিন সময়মতো ওষুধ খাওয়া হয়নি বলে হঠাৎ করে মায়ের হাত কাঁপা শুরু করল। আমার মনে আছে, শক্ত করে আমি মায়ের দুই হাত ধরে রেখেছিলাম। হয়তো ভেবেছিলাম, হাত ধরে রাখলে আমি মাকেও ধরে রাখতে পারব। কয়েক বছর পর। আমি তখন ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের সহকারী অধ্যাপক। একদিন হঠাৎ কথা হলো আমাদের মেডিকেল সেন্টারের এক প্রখ্যাত ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে।
তিনি বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এখন ৪০ শতাংশ লোকের ক্যানসার হচ্ছে এবং তাঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি লোক মারা যাচ্ছে। ক্যানসারের একটা বড় সমস্যা হলো রোগী ও ডাক্তারের যোগাযোগের বিভেদ। কোন চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি রোগীর। ডাক্তারের দায়িত্ব হলো রোগ নির্ণয়ের তথ্যগুলো রোগীকে এমনভাবে জানানো যেন রোগী আশা না হারান আর সঠিক চিকিৎসাটা বেছে নেন। যেমন ধরুন, কখনো কখনো ক্যানসার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে সেই পর্যায়ে কেমোথেরাপির উপকারের চেয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাল্লা ভারী হতে পারে...।’ তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই বললাম, ‘আমি কি তোমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি? ’ ডাক্তার খুবই উৎসাহী হলেন, ‘হ্যাঁ, পারো | আমরা প্রায় ৩৬০ জন চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্যানসার রোগী এবং তাঁদের ডাক্তারের কথোপকথন রেকর্ড করেছি | আমরা কম্পিউটার বিজ্ঞানী নই | তুমি আমাদের ওদের কথাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করতে পারো | যেমন ধরো, ডাক্তাররা কীভাবে কথা বললে রোগীরা সহজে বুঝতে পারবেন, চিকিৎসার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন...।’ এই কাজের জন্য ‘ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং’-এর ওপর দক্ষতা দরকার| ওটা আমার নেই | তাতে কী, শিখতে কতক্ষণ? কথা বললাম আমার এক ছাত্রের সঙ্গে | ও সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্পে কাজ করতে রাজি হলো | কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আমার বাবা মারা গেছেন ক্যানসারে। এই সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ |’ কয়েক দিন পর কথা হচ্ছিল এক প্রখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে | পারকিনসন রোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন তিনি। আমার জিজ্ঞাসা, ‘আচ্ছা, একজন পারকিনসন রোগীর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না অবনতি হচ্ছে, সেটা কী করে বোঝো? ’ সঙ্গে সঙ্গে বড় একটা বই টেবিলের ওপর ছুড়ে দিলেন তিনি | বললেন, ‘এটাই হচ্ছে পারকিনসনের বাইবেল | সবকিছু হয় কাগজ-কলমে। যেমন ধরো রোগীকে বলা হয়, ‘এই হাতের ব্যায়ামটা করে দেখান’। ওটা দেখে ডাক্তাররা ১ থেকে ৫ এর মধ্যে একটা নম্বর দেন | একেক ডাক্তার নম্বর দেন একেকভাবে।
সত্যি বলতে, এই নম্বরে ভুল হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে।’ আমি বললাম, ‘কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে এটাকে স্বয়ংক্রিয় করলে কেমন হয়? যেমন ধরুন, রোগী তার বাসায় বসে সেলফোন অথবা কম্পিউটার ব্যবহার করে ব্যায়ামগুলো করবে, সেটা বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার অ্যালগরিদম নম্বর দেবে। নম্বরটা দেখতে পাবেন নিউরোলজিস্ট।  সর্বশেষ সিদ্ধান্ত তাঁরই। কেমন হবে ব্যাপারটা? ’ তিনি ইংরেজিতে যা বললেন, তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘এক্কেবারে তেলেসমাতি! ’ তাঁর চেম্বার থেকে ফিরছি। সঙ্গে আমার ছাত্র রাফায়েত। আমি কিছু বলার আগেই রাফায়েত বলল, স্যার, আমি এই প্রকল্পে কাজ করতে চাই। আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, ‘তোমার কাঁধে তো এখন অনেক কাজের ভার | তুমি নতুন করে একটা প্রজেক্টে কেন যুক্ত হবে?’ রাফায়েত বলল, ‘স্যার, আমার মায়ের পারকিনসন আছে। এটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ বহু বছর আগে আমার মায়ের কম্পিত হাতটি ধরে যেই উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম, সেই উষ্ণতা আবার অনুভব করলাম। সময়ের তালে সময়ের প্রযুক্তি আসবে, তাতে তাল মিলিয়ে চলাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করা, মনের ভেতরের বার্তাটা জানতে পারা। সেটা পারলে বাকি সবকিছু আয়ত্তের মধ্যে চলে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছে, আমার ছাত্রদের ক্ষেত্রেও হচ্ছে | আশা করি তোমাদের ক্ষেত্রেও হবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চুক্তি অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রত্যাবাসনের প্রথম তালিকা, প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মাঠপর্যায়ে চুক্তির খসড়া তৈরি—এসব অগ্রগতির কথা পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয়-সন্দেহ কিছুতেই কাটছে না এবং এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আমরা দেখছি, একদিকে যখন এই প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি চলছে, তখনো মিয়ানমার থেকে শরণার্থীরা বাংলাদেশে আসছে। এই পরিস্থিতিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কতটুকু? ‍চুক্তি অনুযায়ী যে শরণার্থীরা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চাইবে, তাদেরই ফেরত পাঠাতে পারবে বাংলাদেশ। কিন্তু যে মাত্রার বর্বরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তারা তখনই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চাইবে যখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও গ্যারান্টি থাকবে। চুক্তিতে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর রোহিঙ্গা নীতিতে যে কোনো পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ দেশটি রাখতে পারেনি। বিশ্ব সম্প্রদায় যাকে গণহত্যা বলছে, মিয়ানমার সরকার তাকে সাধারণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বলেও স্বীকার করছে না, গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার তো দূরের কথা। এক লাখ শরণার্থীর প্রথম প্রত্যাবাসন তালিকা বা শরণার্থীরা কোন দিক দিয়ে মিয়ানমারে ঢুকবে, চুক্তি বাস্তবায়নের এসব খুঁটিনাটি দিকের অগ্রগতি নিয়ে তাই চূড়ান্ত বিচারে খুব আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের জন্য বিপদ হচ্ছে শরণার্থীরা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে না চাইলে তাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর সুযোগ নেই। মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়ে সেই ভীতি তৈরি করেছে এবং তা এখনো অব্যাহত আছে বলেই এখনো শরণার্থীরা বাংলাদেশে আসছে।
শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে চায় বলেই বাংলাদেশ চুক্তি করেছে। এবং এটা ঠিক যে কোনো সমস্যা দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিটিয়ে ফেলতে পারলে সবচেয়ে ভালো। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এই চুক্তি রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার চেয়ে মিয়ানমারের স্বার্থের পক্ষেই যাচ্ছে। কৌশল হিসেবে এই চুক্তিটি মিয়ানমারের জন্য লাভজনক হয়েছে। দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ যে হারে বাড়ছিল, তখন এই চুক্তি তা অনেকটাই শিথিল করে দিয়েছে। চুক্তিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের কোনো সময়সীমা না থাকায় নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা মিয়ানমারের জন্য সহজ হবে। এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংস্থার মাধ্যমেই তা করতে হবে। আমরা মনে করি, প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়ের বিষয়টি সরকারকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। শরণার্থীদের নিজেদের দেশে ফেরানো না গেলে তৃতীয় কোনো দেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আনতে হবে। শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় এই চাপ নেওয়ার ক্ষমতাও বাংলাদেশের নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বাস্তবতা বুঝতে হবে এবং বাংলাদেশকেও উদ্যোগী হয়ে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।