Tuesday, September 24, 2013

উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বাড়ানো জরুরি by মোঃ মুজিবুর রহমান

শিক্ষার উন্নয়ন হলেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব- এটা কোনো নতুন ধারণা নয়। উন্নত দেশগুলো এ ধারণার গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে নিয়মিত। তারা দেশের অন্য অনেক খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ উদ্দেশ্যে তারা শিক্ষাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাবমুক্ত রাখতে পারছে। শিক্ষার গুণগত মানের ব্যাপারে উন্নত দেশগুলো কখনোই কোনো শৈথিল্য প্রদর্শন করে না। এ কারণেই উন্নত দেশগুলো আরও উন্নত হয়েছে। অনেক দেশ শিক্ষা খাতের মানোন্নয়নের জন্য যেমন রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ বেশি করে, ঠিক তেমনি তারা এ খাত থেকে জাতীয়ভাবে আয়ও করে অনেক বেশি। শিক্ষায় বিনিয়োগ করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে অনেক দেশ। এরকম একটি দেশ হল নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডে শিক্ষাকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ওই দেশটি গুণগত শিক্ষা রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। সে দেশের রফতানি তালিকার সেরা পাঁচের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা। নিউজিল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আকৃষ্ট হয়ে জাপান, চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে সে দেশে যায়। এমনকি কানাডা ও ইউরোপের অনেক দেশ থেকেও ছেলেমেয়েরা নিউজিল্যান্ডে পড়তে যায়।
নিউজিল্যান্ডসহ উন্নত দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন স্টুডেন্টস অ্যাডভাইজররা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ায় শুধু বিদেশী ছাত্রছাত্রী সংগ্রহের জন্য। একবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ কলেজ অব এডুকেশনের এক অনুষ্ঠানে আমার পাশে বসেছিলেন ওই কলেজের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাডভাইজার লিজা ওয়াইজউড। অনেকদিন পর তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানালেন, তাদের কলেজ থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি সময়ে বিদেশী শিক্ষার্থী সংগ্রহের জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাডভাইজার হিসেবে তাকে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়। এরই অংশ হিসেবে তিনি কানাডা গিয়েছিলেন। পরে হয়তো তাকে আবার অন্য কোনো দেশে যেতে হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিই এভাবে নিজের দেশের শিক্ষার গুণগত মান অন্য দেশের কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে বিদেশী শিক্ষার্থী সংগ্রহে বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ায়। এটা তাদের প্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোরও একটা উপায়। এটা তারা করতে পারছে কঠোরভাবে শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখার মাধ্যমে। এ ব্যাপারে তাদের সরকার যথেষ্ট শক্ত ভূমিকা পালন করে।
বিদেশী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে দেশের সেরা দৈনিকগুলোতে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এ ধরনের বিজ্ঞাপনের হার বেড়ে যায়। এইচএসসি পাস আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা প্রচার করা হয় এসব বিজ্ঞাপনে। এমনকি তাদের শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। কয়েকদিন আগে দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকায় এমন এক বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, যার ডিগ্রি নাকি বিশ্বে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ১২ নম্বরে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগের অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতিবছর দেশ ছেড়ে চলে যায়। যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে যায়, তাদের খুব সামান্য অংশই দেশে ফেরত আসে। অধিকাংশই বিদেশে পড়ে থাকে নিরাপদ ও উন্নত জীবনের টানে। এ প্রবণতাকে মেধাবীদের দেশত্যাগ বলা যেতে পারে।
এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হতে পারে, আমাদের দেশের শিক্ষার অবস্থা কী? আমরা কেন আমাদের শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারছি না? কেন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশী শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে আসতে আগ্রহ অনুভব করে না? আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে? তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একটি আশার খবরও রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরো বিজনেস অ্যাসেম্বলির এক জরিপে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এ খবরটা আমাদের অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে সন্দেহ নেই। আমরা রুয়েটকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু এককালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাতি অর্জনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নিতে পারছে না? আমরা কি পারি না আমাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে অন্তত দেশীয় র‌্যাংকিংয়ের ব্যবস্থা করতে?
দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশে অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও আজ এগুলোর অধিকাংশই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পড়ে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দেয়ার সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজ করছে নানামুখী অস্থিরতা। আমাদের আক্ষেপ, বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে শিক্ষকদের আমরণ অনশন ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার খবরও পত্রপত্রিকায় দেখতে হচ্ছে। এটা কি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি নয়? অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে সহকর্মীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে ভিসিকে অফিস করতে দেখা গেছে কয়েক সপ্তাহ আগে। ভেতরে ভেতরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও অস্থিরতা বিরাজ করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের বিবদমান গ্র“পের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং তাদের মধ্যে সশস্ত্র মহড়া সংঘটিত হতে দেখা যায় প্রায়ই। এসব পরিস্থিতি একদিকে শিক্ষার মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন সৃষ্টি করে চলেছে, অন্যদিকে এসব কর্মকাণ্ড সবার জন্য চরম উদ্বেগের ব্যাপারও বটে। আমাদের না বলে উপায় নেই, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক বিরাট অংশ বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত। তাদের অনেককেই কখনও প্রোভিসিবিরোধী আন্দোলনে, কখনও অন্য কোনো ইস্যুতে প্রায়ই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদে পড়ালেখার পরিবেশ থাকে না। মাঝে মাঝে ছাত্রদের বিভিন্ন আন্দোলনের কারণেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখায় বিঘœ ঘটে।
উচ্চশিক্ষা মানেই গবেষণানির্ভর পড়ালেখা। কিন্তু দেশের কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করার যথেষ্ট সুযোগ নেই। ফলে উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক মান বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসংকট। হতাশার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর দিকে তেমন একটা মনোযোগ দিতে পারছে না। তারা সরকারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আয় বাড়াতে বিকল্প পথের অনুসন্ধানও খুব একটা করে না। আবার রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও শিক্ষায় গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে দেখা যায় না। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেককেই আফসোস করতে শোনা যায় প্রায়ই। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় না। এভাবে কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে কখনও?
শিক্ষার মান উন্নয়ন বলতে আমাদের চোখের সামনে কেবল ভেসে ওঠে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের বিপুল হারের কথা। অস্বীকার করার উপায় নেই, এ দুটি পরীক্ষা দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় এগুলোর দিকে সবার নজর থাকে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ দুটি পরীক্ষাতেই পাসের হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাস্যোজ্জ্বল ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হতে দেখে পুলকিত হই। কিন্তু আমরা কি ভাবছি, শিক্ষার্থীরা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফল করলেও তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ নির্বিঘœ করা যাচ্ছে না কেন? আজ যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে বের হচ্ছে, তাদের একটা অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য একসময় বিদেশে পাড়ি জমাবে সন্দেহ নেই। আর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পড়ে থাকবে দেশে। যারা থাকবে দেশে তাদের অনেকের উচ্চশিক্ষার জীবনে নেমে আসবে দুঃসহ সেশনজট। এছাড়া বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তো রয়েছেই। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তির পথ কী?
মোঃ মুজিবুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ

২৫ অক্টোবরের পর দেশে কী হবে? by বিভুরঞ্জন সরকার

২৫ অক্টোবরের পর দেশের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে যখন মানুষের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা চলছে তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ২৬ অক্টোবর থেকে দেশ চলবে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে। খালেদা জিয়ার নির্দেশে দেশ চললেই যেন রাজনীতিতে আর কোনো সংকট-সমস্যা থাকবে না, মানুষের জীবনেও আর কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, মিলন সাহেব এই ভবিষ্যদ্বাণী করলেন কিসের ভিত্তিতে? খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন বলেই কি মিলন সাহেবের মনে হয়েছে যে, ২৬ অক্টোবর থেকে দেশ তার নেত্রীর নির্দেশেই চলবে? খালেদা জিয়ার কথায় তার সমর্থকরা যতটা আস্থা-ভরসা রাখতে পারেন, সাধারণ মানুষ কি তা পারেন? বর্তমান সরকার নির্বাচিত হয়ে শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকেই খালেদা জিয়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা বলে আসছেন। শুধু তাই নয়, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া ওই সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করে আসছেন। ২০১২ সালের ১২ মার্চ ঢাকার এক জনসভা থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে সরকারকে ৯০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সরকার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি মানেনি। এরপর ১১ জুন আরেক সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া কোনো তারিখ উল্লেখ না করে ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন সরকারকে। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা চলে গেলেও সরকার দাবি মানেনি, খালেদা জিয়াও আন্দোলন করে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে পারেননি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৪ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে বলেছিলেন, ওই সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে সরকার পালানোর পথ পাবে না। সরকার খালেদা জিয়ার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে দাবিও মানেনি, পালানোর পথও খোঁজেনি। তাই এখন খালেদা জিয়া ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত যে সময় বেঁধে দিয়েছেন তার মধ্যে সরকার দাবি না মানলে আন্দোলন করে সরকারকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে কি-না, সে ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সংশয় রয়েছে। আন্দোলন করে দাবি আদায়ের কোনো রেকর্ড বিএনপির নেই। তবে আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে ব্যাপক সন্ত্রাস-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন অনেকেই। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামী। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত দলীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবির সারাদেশে বেপরোয়া হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। ২৫ অক্টোবরের পর নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত-শিবির এমনকি হেফাজতে ইসলাম যুক্ত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে কিনা সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া রংপুরের জনসভায় বলেছেন, ‘ভোট চাইতে নয়, ভোট রুখতে এসেছি’। তার কথার জবাব দিয়ে সিলেটের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন রেখেছেন, ‘তিনি ভোট চান না, নির্বাচন চান না। তাহলে কী চান? অরাজকতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি?’ প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, যে কোনো মূল্যে যথাসময়ে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি নেত্রীর সাধ্য নেই এই নির্বাচন বানচাল করার।
দুই নেত্রীর অনড় অবস্থানের পরিণতি কী সেটা কেউ বলতে পারে না। তবে এতে যে দেশের রাজনীতি ও মানুষের কোনো মঙ্গল হবে না সেটা বলা যায় জোর দিয়েই। জেদাজেদির রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের কল্যাণের কিছু থাকে না। অথচ জনগণের কল্যাণ করাই ছিল একসময় রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের একমাত্র লক্ষ্য। মানুষের ভালো করার জন্য, সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভোগ লাঘব করাই ছিল রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের প্রধান উদ্দেশ্য। মানুষের জন্য রাজনীতি করে বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় উৎসর্গ করে মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন- এমন রাজনীতিবিদ আমাদের দেশে সংখ্যায় দু-চারজন নন, অসংখ্য ছিলেন। রাজনীতি করতে গিয়ে শুধু জীবনের মূল্যবান সময় নয়, সহায়-সম্পদও হারিয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন এমন রাজনীতিবিদও আমাদের দেশে কম ছিলেন না। নীতিবোধ, আদর্শবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা- এসব ছিল রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন দিন বদলেছে, সময় বদলেছে। রাজনীতি এখন সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থেই বেশি পরিচালিত হচ্ছে। রাজনীতি এখন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কম বিনিয়োগে বেশি মুনাফা অর্জনের অন্যতম পথ হল এখন রাজনীতি। আগে রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে দল চালাতেন, কিন্তু রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণটা রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের যেমন চাঁদা দেন, তেমনি নিজেরা সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে, নেতা হয়ে, এমপি হয়ে, মন্ত্রী হয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নয়, ব্যবসায়ী এবং স্বার্থবাদী মহলের স্বার্থেই মূলত চালিত হচ্ছে রাজনীতি।
রাজনীতির এই যে প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্য তার প্রতিফলন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজনীতিতেও দেখা যায়। গণস্বার্থ সংরক্ষণে এই দুই দল কতটুকু আন্তরিক এবং সোচ্চার সে বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী দল। এ বছর ২৩ জুন এই দলের বয়স ৬৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই দল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো খ্যাতিমান রাজনীতিবিদরা এই দলের গোড়াপত্তন করেছিলেন দেশের একেবারে সাধারণ মানুষের স্বার্থের অনুকূলে রাজনীতিকে পরিচালিত করার লক্ষ্যে। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক গণস্বার্থবিরোধী স্বেচ্ছাচারী-স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এই দল। এই দলের নেতৃত্বেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় নিশ্চিত করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে একাত্তরের নয় মাসের অসম যুদ্ধে বাঙালি জাতির বিজয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তির উৎস সাধারণ মানুষ। কৃষক-শ্রমিক-মুটে-মজুর-জেলে-তাঁতি-কামার-কুমার-মাঝি- নিু আয়ের মানুষই আওয়ামী লীগের প্রাণ। ফলে গণস্বার্থেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরিচালিত হবে- এটাই স্বাভাবিক।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির জন্ম সেনাছাউনিতে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তার শাসনের গায়ে বেসামরিক লেবাস পরানোর জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে জন্ম দিয়েছিলেন বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির। রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে ‘ডিফিকাল্ট’ করার ঘোষণা দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। জিয়ার দলে শুরুতেই যোগ দিয়েছিলেন দলছুট, সুবিধাবাদী, উচ্ছিষ্টভোগী, সুযোগসন্ধানী এক দল মানুষ, যাদের কাছে গণস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থই ছিল মুখ্য। বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতি কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়। রাজনীতির নামে, জনগণের কল্যাণের নামে বিশেষ বিশেষ শ্রেণী ও গোষ্ঠীর স্বার্থে সব নীতিনিয়ম চালু হতে থাকে। রাজনীতির ধারায় নষ্ট স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে, যা এখন ব্যাপ্তি লাভ করেছে। রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় এখন আর আলোচনায় নেই। বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগও তার অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এমনই দুর্ভাগ্য যে, দেশের মানুষ আর বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগকে আলাদাভাবে চিনতে পারে না। দুই দলকে অনেকেই এখন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বলে উল্লেখ করে থাকেন। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আওয়ামী লীগকে দেশের জন্য ‘আপদ’ এবং বিএনপিকে ‘বিপদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে কেউ হয়তো একমত পোষণ করতে না পারেন কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগকে আগে কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষের দল বলে মনে করা হতো। এখন আওয়ামী লীগের গায়েও ভদ্রলোকের হাওয়া। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে পালাক্রমে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করে আসছে, কখনও এককভাবে, কখনও জোটবদ্ধভাবে। বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা শাসক দলে পরিণত হয়। আবার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা হয় শাসক দল। আর শাসক দল মানেই জনবিচ্ছিন্নতা, গণস্বার্থপরিপন্থী কাজে বেশি উৎসাহ। তবে বিরোধী দলে থাকলেও এই দুই দল জনগণকে নিয়ে খুব ভাবনা-চিন্তা করে বলে মনে হয় না। নেতানেত্রীদের বক্তৃতায় অবশ্য ‘জনগণ’, ‘সাধারণ মানুষ’- এসব শব্দ উচ্চারিত হয় প্রায়ই, কিন্তু তা ওই বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ। উদাহরণ হিসেবে বিএনপির কথাই ধরা যাক। এই দলটি গত মেয়াদে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। অবশ্যই এককভাবে নয়। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছিল। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল। তারা গণতন্ত্রেরও পরিপন্থী, যদিও প্রকাশ্যে তারা গণতন্ত্রী সেজেই রাজনীতি করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করছে। জামায়াতের মতো একটি গণবিরোধী, ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটগতভাবে অগ্রসর হয়ে বিএনপি গণস্বার্থে কাজ করবে, এটা আশা করা যেতে পারে, তবে সে আশা পূরণ হওয়ার নয়। বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনে দেশের মানুষ যে ভালো ছিল না, তাদের কোনো স্বার্থ রক্ষায় যে সরকার এগিয়ে আসেনি সেটা কারও অজানা নয়। বরং কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার চাইতে গিয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিয়েছে। ফসলের মাঠে পানি সেচের জন্য বিদ্যুৎ চাইতে গিয়েও বিদ্যুতের বদলে পেয়েছে গুলি বর্তমানে বিএনপি বিরোধী দলে, এখন তারা শাসক দল নয়। বিরোধী দলে থেকেও কি এই দল গণস্বার্থ সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা রাখছে বা কাজ করছে? বিরোধী দল হরতালসহ যেসব কর্মসূচি পালন করে তার মধ্যে গণস্বার্থ সংরক্ষণের কোনো উপাদান খুঁজে পাওয়া যায় কি? বরং হরতালসহ সন্ত্রাসী কর্মসূচির মাধ্যমে গণস্বার্থ উপেক্ষিত হয়ে থাকে চরমভাবে। হরতাল মানেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মৃত্যু, গণদুর্ভোগ। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে শান্তি-সুখ-স্বস্তি-আনন্দ কেড়ে নেয়ার জন্য সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতিকে দায়ী না করে উপায় নেই। প্রশ্ন হল, সংঘাতের রাজনীতি কিংবা হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতি কি কেবল বিএনপিই করছে? আওয়ামী লীগ কি ধোয়া তুলসীপাতা? হিংসা থাকলে, প্রতিহিংসা থাকবেই। হিংসা দূর না করে প্রতিহিংসা দূর করার চেষ্টাও ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যখন হিংসা-প্রতিহিংসার পথ ছেড়ে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার পথে এগোতে থাকবে তখনই কেবল সম্ভব হবে নতুন রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু রাজনীতিকে নতুন ধারায় এগিয়ে নেয়ার আগ্রহ প্রধান দুটি দলের আছে বলে মনে হয় না। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক সেটাও প্রচলিত ক্ষমতা ও স্বার্থের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

রাজনীতি মানে সেবাধর্ম, ব্যবসা নয় by অরবিন্দ রায়

রাজনীতির খেলা ব্যবসায়ীরা খেলতে গেলে তাদের অবস্থা হবে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’র মতো। শ্যামের বাঁশি শুনে দেয়াল টপকাতে না পারলে শ্যাম মনঃক্ষুণœ হবেন। আবার বাইরে পা রাখলে কুলের মুখে চুনকালি পড়বে। অর্থাৎ একই সঙ্গে শ্যাম ও কুল রক্ষা করে চলা সম্ভব নয়। এ নিয়ম যেমন রাধার বেলায় প্রযোজ্য, অন্যের বেলাতেও তাই। কাজেই একজন ব্যবসায়ী রাজনীতির খাতায় নাম লেখালে তাকে হয় নিজ ব্যবসা, নয়তো দেশসেবা- এ দুয়ের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। একই সময়ে দেশের কাজ ও ব্যবসার কাজ দেখভাল করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না। রাধা যেমন কুল বিনাশ করেই শ্যামের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, সে রকম কোনো ব্যবসায়ী দেশ ও সমাজসেবা করতে চাইলে নিজ ব্যবসার লালবাতি জ্বালিয়েই তা করতে হবে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব ব্যবসায়ী নিজের আসন পোক্ত করেছেন, তারা ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতি করলেও তাদের কারও ব্যবসাই লাটে ওঠার খবর অদ্যাবধি শোনা যায়নি। বরং হয়েছে ঠিক তার উল্টোটা। অর্থাৎ এ ধরনের ব্যবসায়ীর অধিকাংশই ব্যবসা ও রাজনীতিকে একই ঠোঙায় বাজারজাত করে নিজ অবস্থাকে সুদৃঢ় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাহলে কি ধরে নেয়া যায় না যে, এ শ্রেণীর ব্যবসায়ী কাম-রাজনীতিকরা দেশ ও সমাজসেবার নাম ভাঙিয়ে যা করছেন তা কেবলই নিজস্ব ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়? অথচ শুরুতে তারা দেশ ও সমাজসেবার দৃঢ় মনোবৃত্তি নিয়েই রাজনীতির মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু কাল পরিক্রমায় তাদের সেই সুমনোবৃত্তি কখন যে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রূপ নিয়েছে তা হয়তো নিজেরাও বুঝে উঠতে পারেননি। আর এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে জনগণকে। কারণ, এ ধরনের দেশসেবকের ভেকধারীদের হাতে দেশ সেবার ভার চলে যাচ্ছে বলেই দেশ ও সমাজ আজ গভীর থেকে গভীরতর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতির মাঠ চষানো ব্যবসায়ীরা নিজেদের হয়তো দেশ ও সমাজসেবক হিসেবে দাবি তুলতে পারেন। তাদের এ দাবিকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়াও যায় না। তবে দেশসেবা যদি ঈদের আগে জাকাত হিসেবে এলাকার গরিব-দুস্থদের মধ্যে কম দামি শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ, পাপের ভার লাঘবে নিজ এলাকায় উপাসনালয় নির্মাণে অর্থ প্রদান; কিংবা এলাকার কোনো বেকার যুবককে নিজ প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরাও যে সমাজসেবা করছেন, এ দাবি তুলতেই পারেন। চাকরি প্রদানের বেলায় অবশ্য চাকরিদাতার পিএস, এপিএস, ড্রাইভার বা ড্রাইভারের শ্যালকরা যে চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেনি- এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। আবার শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণের মধ্যেও কিছু একটা ‘কিন্তু’ না থেকে যায় না। কারণ এ ধরনের বিতরণ কর্মের জন্য প্রথমেই যে জিনিসের প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে টাকা। দ্বিতীয়টি মন। টাকা ও মনের ব্যাট-বল সংযোগের ফলেই দান-খয়রাতের উৎপত্তি। তবে দান গ্রহণকারীরা কি জানেন, তিনি যার দান গ্রহণ করছেন, সেই ব্যক্তিটি ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ টাকা লুট ও সরকারি সম্পদ হরিলুট করেছেন? জানেন বলে মনে হয় না। যদি জানতেন, তাহলে বস্ত্রের অভাবে গাছের ছাল পরা লাগলেও কোট-টাই পরা ভদ্র ডাকাতদের দেয়া এসব খয়রাতি বস্ত্র গ্রহণ করতেন না। আর এসব খয়রাত নিতে গিয়ে এ পর্যন্ত যত নিরীহ আদম পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, সেসব প্রাণের মূল্য কি দিতে পারবেন কথিত দানকারীরা? তারপরও দান নিয়ে ফেরার সময় অনেককেই বলতে শোনা যায়- কেবল টাকা থাকলেই হয় না রে! মন লাগে! বেচারার মন আছে! বিশাল দিল-দরিয়া মানুষ! কিন্তু দিল দরিয়ার সনদ প্রদানকারীরা জানেন কি, যারা লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদ আহরণ করেন, তারা কখনোই দিল খোলসাভাবে দান করতে পারেন না। প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে তারা এসব দান-খয়রাত করেন কেন? মানুষের মনের কথা জানার মেশিন থাকলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা যেত। তবে ধারণা করা অমূলক হবে না যে, এসব দান-খয়রাতধর্মী কর্মকাণ্ডকে অনেকেই আÍরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তিই তার অপকর্মের বিষয়ে শতভাগ ওয়াকিবহাল। ভবিষ্যতে কোনো আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে কোমরে রশি উঠলে যেন এ খয়রাত গ্রহণকারীরা তার মুক্তির দাবিতে থানা ঘেরাও কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে পারে, এটাই এসব দান-খয়রাতের আসল কারণ বলে মনে হয়। তাছাড়া সবার উপরে মানুষ সত্য বলে যেমন একটি কথা আছে, রাজনীতির মাঠে সবার উপরে যে জিনিসটি সত্য সেটি হচ্ছে ভোটের হিসাব। ভোটের মৌসুমে নমিনেশন কিনতে যে পরিমাণ টাকা লাগবে, তার কিছু আগাম খরচ করে যদি কিছু জনসমর্থন কিনে রাখা যায় তাহলে নমিনেশন প্রাপ্তির জন্য শোডাউনে কাজে লাগবে বলে মনে হয়। এসব আত্মকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে কখনও কি দেশ ও সমাজসেবা বলা যায়? শিকারের উদ্দেশ্যে খাবার ছিটিয়ে মাছ ডেকে আনাকে যেমন দাওয়াত বলে না, স্বার্থকেন্দ্রিক এসব অনুদান ছিটানোকেও দেশসেবা বলে না। তারপরও তাদের যদি দেশ সেবকের মর্যাদা দেয়া হয় তাহলে তেলাপোকাকেও পাখির মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এসব মর্যাদাহীন দেশ সেবকরাই আজ রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। দুর্ভাগ্য এ কারণেই বলা হচ্ছে, এ ধরনের ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি বানিয়ে দেশ রক্ষার সুযোগ দেয়া আর শেয়ালের হাতে মুরগি বর্গা দেয়ার মধ্যে খুব একটা তফাৎ আছে বলে মনে হয় না।
রাজনীতিতে প্রবেশকারী ব্যবসায়ীদের দুটি শ্রেণী আছে। কেউ ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছেন, আবার কেউ রাজনীতিতে আসন পোক্ত হওয়ার পর ব্যবসায় নেমেছেন। তবে উভয় শ্রেণীর উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। উদ্দেশ্যটি হচ্ছে রাতারাতি বিত্তবৈভবের মালিক হওয়া। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইলে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লাগে। তার জন্য চাই লিফট। এ লিফটিই হচ্ছে রাজনীতি নামের স্টিকার। যেহেতু এ দুই শ্রেণীর প্রত্যেকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আখের গোছানো। কাজেই ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিক বা রাজনীতিক কাম ব্যবসায়ী উভয় শ্রেণীই যে দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ দুই শ্রেণীর কাছ থেকে দেশসেবা আশা করা আর জন্মান্ধের কাছ থেকে চাঁদনি রাতের বিবরণ শোনার মধ্যে খুব একটা তফাৎ আছে বলে মনে হয় না। আতংকের বিষয় এটাই যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন রাজনৈতিক প্রভাব নামের ছোঁয়াচে রোগ শিং চাড়া দিয়ে উঠেছে। চায়না শপে উন্মত্ত ষাঁড় যেমন সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়, শিং চাড়া দিয়ে ওঠা এ রোগটিও আজ সমাজ ও রাষ্ট্রের সব শৃংখলাকে তিল তিল করে ধ্বংস করছে। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সংঘবদ্ধ হায়েনা পর্যায়ে চলে গেছে। সেই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড এখন মস্ত বাণিজ্যিক ধারায় রূপ নিয়েছে। যার প্রধান বিক্রয়যোগ্য পণ্যের নাম তদবির। ইদানীং তদবিরের পনের আনাই তদবিরের হিল্লায় গেছে বলে মনে হয়। এখন অনেকেই রাজনৈতিক অফিসকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো তদবির সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করেন। এখানে হাতলঅলা চেয়ারে বসা না বসা নিয়ে, বসতে বলা না বলা নিয়ে, সালাম দেয়া না দেয়া নিয়ে, সর্বোপরি চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়েও বচসার সৃষ্টি হয়। এ বচসাই একসময় ভয়ংকর গ্র“প পলিটিক্সে মোড় নিয়ে পুরো বিষয়টি লাশ পতনে গিয়ে ঠেকে। এসব উদ্ভট অনাচার সংগঠনের অগ্রগামী ভূমিকা পালনকারী হিসেবে একজন ব্যবসায়ীর রাজনীতির খাতায় ও একজন রাজনীতিকের ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লেখানোকে দায়ী করা হলে মনে হয় না তারা এ দায় এড়িয়ে যেতে পারবেন। কেননা রাজনীতিকে পুঁজিহীন রমরমা ব্যবসার ধারায় নিয়ে আসার পেছনে ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিকের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়।
তবে যে যত কথাই বলুক, একজন ব্যবসায়ী কখনও নিজ ব্যবসার উন্নতি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। এ নিয়ে কোনো তর্কেরও অবকাশ নেই। কাজেই ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতির ময়দান দাপিয়ে বেড়াবেন, তখন রাজনীতির ময়দান মুখোশধারী দেশপ্রেমিকে ভরে উঠবে। আর তাদের দিয়ে দেশের উন্নয়ন ঠিক সেদিনই হবে, যেদিন মানুষের হাতের তালুতে পশম গজানো শুরু হবে। জানি না হাতের তালুতে পশম গজাবে কবে। তবে তার আগেই নীতিনির্ধারকদের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন একজন ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হতে না পারেন। আবার যারা জনপ্রতিনিধি থেকে ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লিখিয়েছেন, তাদেরও ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। অর্থাৎ দেশ ও দশের ভাগ্যকে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’র মতো দ্বিধাগ্রস্তদের হাতে তুলে দেয়া ঠিক হবে না। আইনি জটিলতায় যদি তা সম্ভব হয়ে না ওঠে, তাহলে তাদের বর্জনের ভার আমজনতাকেই নিতে হবে।
অরবিন্দ রায় : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পরিচালক

আগামী নির্বাচন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ by বদরুদ্দীন উমর

আগামী নির্বাচন সম্পর্কিত অনেক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কোনো সুরাহা এখনও পর্যন্ত না হলেও নির্বাচনী দলগুলোর প্রত্যেকটি নিজের নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও তাদের শাস্তি নিয়ে হরতালের নামে রাস্তায় নেমে খুনখারাবি, অগ্নিসংযোগ, জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইত্যাদিতে বেশি ব্যস্ত থাকলেও অন্যরা আগামী নির্বাচন সামনে রেখেই কাজ করছে। এদের মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগকেই সব থেকে বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে থেকে নিয়ে তার দলের লোকরা সরকারে থাকার সময় সরকারি খরচেই নিজেদের দলীয় নির্বাচনী প্রচারণা বেশ নির্বিঘেœ চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী আমেরিকা থেকে তার পুত্রকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য আমদানি করে দেশে এনেছেন। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি এমন এক খেলো ব্যাপারে পরিণত হয়েছে যাতে প্রধানমন্ত্রীর এ কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর পিতার বংশধররা কেউই দেশপ্রেমিক হিসেবে দেশে থাকেন না! প্রধানমন্ত্রীও এমনভাবে দেশে থাকেন যাতে মনে হয় তিনি তার পরিবারের রাজনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার জন্যই দায়ে পড়ে এখনও পর্যন্ত দেশে পড়ে আছেন। তার পুত্র, কন্যা, বোন ও তাদের ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝে বাংলাদেশে ভ্রমণে আসেন এবং একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে, বিশেষত সরকারি রাজনৈতিক দলের লোক হিসেবে দেশের লোককে অনেক উপদেশ ও পরামর্শ খয়রাত করেন। এদেশ থেকে যা নেয়ার সেটা তারা ইংল্যান্ড-আমেরিকায় জমা করে নিজেদের ঘর গোছাতে ব্যস্ত থাকেন। অনেক দেশেই পারিবারিক শাসন কায়েম থাকলেও এভাবে জনবিচ্ছিন্ন ও দেশ বিচ্ছিন্ন কোনো পরিবারের শাসন দুনিয়াতে আর দেখা যায় না। অন্য যেসব দেশে কোনো না কোনো ধরনের পারিবারিক শাসন আছে তারা দেশেই থাকে, দেশেই বসবাস করে তারা সরাসরি দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রয়োজন হয় না। দিনরাত, প্রয়োজনে-নিষ্প্রয়োজনে মুখে দেশপ্রেম ও স্বাদেশিকতার খৈ ফোটালেও দেশে থাকার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করে না। স্থূলভাবে কথাটি বলতে গেলে বলতে হয়, দেশপ্রেমের নামে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন থেকে নিয়ে হাজার রকম সুযোগ-সুবিধা আদায় করাই তাদের আসল কাজ। দেশে আসা-যাওয়া এবং দেশের রাজনীতিতে ঢিলেঢালা অংশগ্রহণ এ উদ্দেশ্যেই তারা করে থাকে।
নির্বাচনের মাঠে প্রকৃত অবস্থা যাই হোক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় তার দলের বিজয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হয়েই তার বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার কথা হল, গত পাঁচ বছরে তারা দেশের সব ক্ষেত্রে এত উন্নতি সাধন করেছেন, তার দিকে তাকিয়ে দেশের লোক তাদের ভোট না দিয়ে পারে না। বিরোধী দলের নেত্রীর উদ্দেশেও শেখ হাসিনা প্রায়ই বলছেন, তিনিও যে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বা দেখেন না তা নয়। কাজেই সবকিছু জেনেশুনেই তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে ভোটের বাক্স ভারি করার চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রীকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, এসব দেখার কোনো অসুবিধা হলে তার উচিত নিজের চোখের চিকিৎসা করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ জোরের সঙ্গেই বলছেন, দেশের লোক তাদের সুকীর্তির দিকে তাকিয়ে বিএনপিকে কিছুতেই ভোট দিতে পারে না। অবাক হওয়ার ব্যাপার, তিনি একথা বলছেন সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির বিরাট জয় এবং নিজেদের শোচনীয় পরাজয়ের পর! শুধু এ কথাই নয়, প্রধানমন্ত্রী, তার পুত্র, আজ্ঞাবাহী মন্ত্রীরা এমন আরও সব কথা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারে বলছেন, যা শুনে সভাস্থলে উপস্থিত শ্রোতারা বেশ মজা পাচ্ছেন!!
প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ভোটারদের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা প্রথম বিপ্লব সফল করেছেন। এখন সময় এসেছে দ্বিতীয় বিপ্লব সম্পন্ন করার। এই ‘মহৎ’ কাজ সম্পন্ন করার জন্য আর একটি আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া অন্য উপায় নেই। আওয়ামী লীগই পারে বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করতে! ওই দ্বিতীয় বিপ্লবের মর্মার্থ বোঝা জনগণের পক্ষে মুশকিল। প্রায় অসম্ভব। কারণ আওয়ামী লীগের প্রথম বিপ্লবটি কী সেটা তারা জানেন না। তারা শুধু জানেন, আওয়ামী লীগ তাদের বিগত পাঁচ বছরের শাসন আমলে দেশে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জীবনে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এটাই হল আজকের বাস্তবতা। এই বাস্তবতার কারণে বিগত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ধরাশায়ী হয়েছে। এই বাস্তবতার দিক থেকে চোখ সম্পূর্ণ অন্যদিকে সরিয়ে রেখে এক কাল্পনিক ও ইচ্ছাপূরণের ভাবনার মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে প্রধানমন্ত্রী, তার সফরকারী পুত্র এবং আজ্ঞাবাহী মন্ত্রী ও দলীয় নেতা-নেত্রীরা নিজেদের নির্বাচনী জনসভাগুলোতে যেসব কথা বলছেন তার থেকে বোঝা যায় এ সরকার এবং এই দলটির ও এদের জোটের জনবিচ্ছিন্নতা। এই জনবিচ্ছিন্ন লোকদের বক্তৃতা শুনে যে শ্রোতারা বেশ মজা পাচ্ছেন এটা আগেই বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারি অর্থ ব্যয় করে যে সভাগুলোর আয়োজন করছে সেগুলোতে মানুষ আসছে মেলা দেখতে আসার মতো করে। এগুলোতে লোকের সমাগম সত্ত্বেও মনে করার কারণ নেই যে, এসব লোক নিজেদের ভোট আওয়ামী লীগের বাক্সে ফেলবে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ভোট দাও ভোট দাও বলে মানুষের কাছে অশ্লীল কায়দায় ভোট চাইছেন এবং কারা তাদের ভোট দেবেন তাদের হাত তুলতে বলছেন, এর একটা প্রতিক্রিয়া মানুষের মধ্যে হচ্ছে। এটা এমন এক ধরনের ছ্যাবলামি যা কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মানায় না। কিন্তু যে দেশে ছ্যাবলামি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃতির অঙ্গে পরিণত হয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নেই।
তবে আওয়ামী লীগের এ অবস্থা দেখে মনে করার কারণ নেই যে, আগামী নির্বাচন যেভাবে এবং যখনই অনুষ্ঠিত হোক, তাতে বিরোধী দল ক্ষমতায় এসে পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাবে। এমন আশার কোনো শর্ত বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে নেই। মনে রাখা দরকার, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও এর আগে দু’বার ক্ষমতায় এসেছে। তাদের ক্ষমতার ব্যবহারের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। ক্ষমতার ব্যবহারের স্টাইলের পার্থক্য ছাড়া। তাছাড়া বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর মতো এমন একটি রাজনৈতিক দলকে নিজের গাঁটছড়ায় শক্তভাবে বেঁধে রেখেছে, যে দলটি দ্রুতগতিতে ক্রিমিনালাইজড হয়ে ইতিমধ্যে ভয়াবহ চরিত্র পরিগ্রহ করেছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত এবং বিএনপি বিরাট বিজয় অর্জন করবে। কিন্তু বিএনপির এ বিজয়কে জনগণের বিজয় মনে করা ভুল হবে। জনগণ আওয়ামী লীগকে তার গত পাঁচ বছরের কৃতকর্মের জন্য, তাদের চুরি, ঘুষ, দুর্নীতি, লুটতরাজ, ঔদ্ধত্য, নির্যাতন ইত্যাদির জন্য শাস্তি দেয়ার আকাক্সক্ষার মধ্যেই আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়ের কারণ নিহিত থাকবে।
বাংলাদেশে সবকিছু মিলিয়ে এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের জন্য সৃষ্টি করেছে এক অনিবার্য শর্ত এবং উর্বর ক্ষেত্র। এ কারণে বাংলাদেশ এখন সর্বপ্রকার দেশী-বিদেশী চক্রান্তের লীলাভূমি। দেশের এ অবস্থায় ‘দেশ কোন পথে?’- এ প্রশ্ন খুব বাস্তবসম্মত হলেও এর কোনো সঠিক জবাব দেয়া এখন কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল