Showing posts with label হাসান আজিজুল হক. Show all posts
Showing posts with label হাসান আজিজুল হক. Show all posts

Friday, February 18, 2022

গল্প- সাক্ষাৎকার by হাসান আজিজুল হক

লোকটা গত শতাব্দীর কায়দামাফিক সূর্যাস্ত দেখছিল। তার চোখে ফুটে উঠেছিল তন্ময় কল্পনা : বাঁদিকে চওড়া নদী, সেখানে সূর্যের প্রতিবিম্ব ডুবে যাচ্ছে, খানিকটা স্রোত সিঁদুরের মতো হিঙুল, স্রোত পেরিয়ে বালির চড়া, ধূসর হতে হতে আস্তে মিলিয়ে যায়; লোকটার ডানদিকে বিরাট মাঠ, মাঠ উঁচু-নিচু, মধ্যে মধ্যে টিলা আছে। এতক্ষণ লাল রং মাখানো ছিল, এখন মিলিয়ে যাচ্ছে।
সূর্যাস্তের আগে এবং পরে অনেক কিছু দেখার থাক। সূর্যাস্তের পরে খানিকক্ষণের মধ্যে সব কিছু আঁধারে ডুবে গেলেও। তখন পাকা রাস্তার উপরে গরাদ আর ইস্পাতের পাত দিয়ে ঘেরা কামরা পিঠে বয়ে নিয়ে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালে তার টের পাবার কথা নয়। রাস্তার উপরে বুটজুতোর আওয়াজ সে খেয়াল করেনি। বুটজুতোগুলি চষা জমির উপরে নেমে ধপধপ শব্দ তোলে তাও তার খেয়ালে আসে না। কিন্তু যখন সে মোলায়েম মৃদু গলার কথা শুনতে পায় তার কানের কাছেই ‘আসুন’ তখন আর তার সচেতন না হয়ে উপায় থাকে না। সে পিছনে ঘাড় ফেরাতেই আবার মৃদু গলায় আহ্বান শুনতে পায়, আসুন। সঙ্গে সঙ্গে সে ফিরে আসে। তীরের অগ্রভাগের মতো সূক্ষ্ম তীক্ষ্ণ বর্তমানের মুহূর্ত তাকে আগাগোড়া গেঁথে ফেলে।
যারা ডাকে তাদের সংখ্যা দুই কিন্তু তাদের ভালো দেখা যায় না। লোকটা শুধু টের পায়, তার ঘাড়ের নিচে থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর পর্যন্ত একটা হিম স্রোত নেমে গেল। একজন এগিয়ে এসে তার কনুইয়ের কাছে ধরলো। বরফের মতো ঠাণ্ডা স্পর্শ। লোকটা উল্টোদিকে ঝুঁকে পড়ে। বুটজুতোঅলারা তার ঘাড়ের কাছে খিমচে ধরে তাকে টেনে তোলে। তখন লোকটা তাদের অনুসরণ করে মাতালের মতো টলতে টলতে পাকা রাস্তায় এসে ওঠে। এতোক্ষণে সে হুমদো গাড়িটাকে দেখতে পায়। সেখান থেকে একজন আরো মোলায়েম গলায় বলে, এই যে এদিকে। বেশ কষ্ট করে গাড়িটার পিছন দিক দিয়ে সে খাঁচায় ঢুকলো। সিঁড়ি নেই, থাকলে ভালো হতো। ভিতরে ঢুকতেই ঘাড়ে ধাক্কা দিলো কেউ। লোকটা বোধ হয় হাঁ করে ছিল ধাক্কার চোটে ঠোঁটের উপর দাঁত পড়ে গিয়ে একটু কেটে গেল। রক্তের নোনতা স্বাদটা ভালো না লাগায় সে লোহার গরাদের ওপর জিব ছোঁয়ালো। কেমন ধোঁয়াটে আলুনি স্বাদ। তার জিব গুটিয়ে গলার কাছে চলে যায়।
এর মধ্যে গাড়ি সূর্যাস্তের নদী আর মাঠ পিছনে ফেলে হু হু করে ছুটতে থাকে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, তবু লোকটার কপালে ঘাম জমে। হাওয়ায় শুকিয়ে গেলেও আবার লোমকূপের গোড়ায় জমে। সে তার ঠাণ্ডা সাপের মতো কিলবিলে আঙুল দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আবার বিন বিন করে কপালের উপর ঘাম জমে যায়।
একটা বড়ো ফটকের কাছে গাড়ি দাঁড়াতে সে গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। এখানে সেখানে বিদ্যুতের আলোই জ্বলছে বটে কিন্তু ফটকের ওধারে বিরাট উঠোনটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেই ঝন্‌ঝন্‌ করে ফটক খুলে গেলে গাড়িটা গর্জন করে ভিতরে ঢোকে, অন্ধকার উঠোন পার হয় টালমাটাল করতে করতে। শেষে দাঁড়িয়ে যায়।
গাড়ির পিছনের দরজা খুলে গেলে আবার ধাক্কার চোটেই লাফ দিয়ে লোকটা নেমে পড়ে। চওড়া চওড়া অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠলে তবে বিরাট বারান্দা। সেখানে একটা লাল বাল্ব জ্বলছে। হুশ করে সামনের দরজা খুলে যায়। বিরাট একটা ঘর, লাল মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে। কেউ নেই। ঘর পেরিয়ে ওপাশের দেয়ালের দিকে যেতেই বাঁদিকে আবার দরজা খোলার শব্দ। আর একটা ঘর। কেউ নেই। টেবিল-চেয়ার নেই। চুন আর বার্নিশের গন্ধ। ঠাণ্ডা কিন্তু আটকানো বাতাসের গুমোটও আছে। হাওয়া উঠেছে, পিছনে একটা খোলা দরজা ক্যাঁচ শব্দ করে বন্ধ হয়েও ককাতে থাকে ক্যাঁ-এ্যা, কিঁচ।
আবার ঘর। ফাঁকা—মাত্র একটি টেবিল। কোনো আলো নেই। দুমদাম করে সবকটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। লোকটা আঁধারের মধ্যে ডুবে গিয়ে চুপ করে একা দাঁড়িয়ে থাকে। এখন সমস্ত শরীরে ঘাম। অন্ধকারের ভিতর থেকে পথ দেখানোর মতো গলায় আওয়াজ আসে, এই যে এদিকে আসুন।
কিন্তু কোন্‌দিকে যাবে লোকটা ঠিক করতে পারে না। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে এলোমেলো এগোতে গিয়ে গুবড়ে পোকার মতো শুকনো শক্ত দেয়ালে ধাক্কা খায়। একই গলায় যেন শূন্য থেকে আহ্বান আসে, আসুন, এই যে! গলা অনেক দূরে চলে যায়, হাল্‌কা মৃদু শিস দেবার মতো ডাকে, কই আসুন।
লোকটা দেয়াল ধরে হাতড়াতে হাতড়াতে খানিকটা যেতেই একটা বন্ধ দরজা পেয়ে যায়। মনে হলো হাত লাগার আগেই দরজাটা খুলে গেল। কোনো লাভ নেই। একই রকমের অন্ধকার। ঘরে ঢুকে দেয়াল ধরে এগোতে থাকে। এখন কেউ আর ডাকছে না। কান পেতেও সে আর কোনো শব্দ শুনতে পেল না। দেয়াল ধরে লম্বালম্বি পেরিয়ে গেল সে। তারপর আড়াআড়ি দেয়ালটার মাঝামাঝি আসতেই ফের একটা দরজা। কিন্তু দরজাটা এবারে সে টানাটানি করেও খুলতে পারে না। খানিকটা করে খোলে আবার ঢক্‌ করে বন্ধ হয়ে যায। প্রাণপণ শক্তিতে লোকটা দুহাতে দরজার একটা কড়া ধরে টানে। তখন আচমকা হুশ করে দরজাটা খুলে যেতেই তীব্র শাদা আলোর বন্যায় লোকটা একেবারে অন্ধ হয়ে যায়। আলোর ধাক্কায় হাঁটু ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে সে মেঝের ওপর বসে পড়ে দুহাতে চোখ দুটি চেপে ধরে। অনেকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে চোখ থেকে হাত সরিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় একটা বড়ো ন্যাংটো কালো প্লেন টেবিলের পিছনে তিনজন লোক বসে আছে। তাকে দাঁড়াতে দেখে তিনজন সমস্বরে টেনে টেনে বলে, আসুন, আসুন।
চারদিক থেকে টানা টানা কাঁপা কাঁপা প্রতিধ্বনি ওঠে, সুন সুন—হৌ হৌ।
লোকটা একটু ভালো করে চেয়ে দেখে ঘরে আছে চুনকাম করা শাদা দেয়াল—৪; বড়ো টেবিল—৩; টেবিলের পিছনে তিন চেয়ারে মানুষ—৩; টেবিলের সামনে ফাঁকা হাতলহীন কালো চেয়ার—১।
মাঝখানের লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সে রোগা লিকলিকে, শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চামড়ার উপর দিয়ে হাতের গিঁটটা ফুটে উঠেছে। বোঝা যায় সে খুবই সঙ্গমদক্ষ। তার চোখ একটুও নড়ছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলটাকে ঘুরে এগিয়ে এসে লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ধন্যবাদ, এসেছেন বলে আপনার কাছে আমরা বড়োই কৃতজ্ঞ—একটু হেঁট হয়ে সে বলে, দয়া করে আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন।
প্রতিধ্বনি ওঠে, উনন্‌ন্‌ হৌ হৌ।
এই কথা বলে সে লোকটার হাত ধরে তাকে ফাঁকা হাতল-ছাড়া চেয়ারটার উপর বসিয়ে দেয়। কাঠিখোঁচার উপর জামা-কাপড় চাপিয়ে কাক-তাড়ুয়া বানালে যেমন দেখতে হয়, তাকে ঠিক তেমনি দেখাচ্ছিল। লোকটা সবসময় তার গা থেকে মেয়েমানুষের মাংসের গন্ধ পেতে লাগল। সূর্যাস্ত প্রেমিকটিকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে টেবিল ঘুরে সে তার নিজের চেয়ারে ফিরে গেল। অন্য দুজন চুপচাপ বসে আছে। চেয়ারে বসে টেবিলের উপর শুকনো কনুই দুটো রেখে সে চিন্তিতভাবে মোটা চাপা গলায় বললো, তারপর, কেমন আছেন রহমান সাহেব?
অন্য দুজন মৃদুকণ্ঠে সায় দিলো, হ্যাঁ, তারপর কেমন আছেন রহমান সাহেব?
লোকটা অবাক-হওয়া গলায় খানিকট ঠেকে ঠেকে উত্তর দিলো, আমার নাম তো রহমান নয়। দেয়াল-টেয়াল চারিদিক থেকে পরিষ্কার শোনা গেল, নাম তো রহমান নয়। অয় অয় অয়।
মেয়েমানুষের গন্ধঅলা সঙ্গমদক্ষের মুখে মৃদু হাসি ফুটলো আর শিকারী বেড়ালের মতো তার গোঁফ একটু নড়ে উঠলো, রহমান নয় নাকি? তাহলে নামটা কি শুনতে পাই?
লোকটা তিনবার ঢোক গিলে বললো, আমার নাম হুমায়ুন কাদির।
তাই নাকি? তা রহমান সাহেব, কবে থেকে হুমায়ুন কাদির নামটা চলছে?
আমার নাম তো বরাবরই হুমায়ুন কাদির।
বরাবরই হুমায়ুন কাদির? বা বা বা—আপনার নাম বরাবরই হুমায়ুন কাদির! শাবাশ, বেড়ে বলেছেন রহমান সাহেব, থুড়ি হুমায়ুন কাদির সাহেব। বেড়ে বলেছেন।
বেড়ে বলেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
সামনের লোকটা তখন ভয়ানক গম্ভীরভাবে বললো, ইয়ে, রহমান সাহেব, ওসব কথা থাক। আমাদের একটা খবর দিতে হবে। আপনাদের এক-একটা নাম কতদিন চলে? আর মোট কটি করে নাম আপনাদের এক-একজনের আছে? আর মোট কজন আপনারা আছেন? আমাদের মাত্র একটি নাম—আমার নাম গোলাম কবির, এর নাম গোলাম রব্বানী, এর নাম গোলাম নবী।
এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে লোকটা চুপ করে।
বাঁদিকের লোকটি, সে বড়ো চমৎকার দেখতে, তাকে সঙ্গমপ্রিয় বলা যায়, বললো, গোলাম রব্বানী আমার নাম।
ডানদিকের টেকো মোটা লোকটা, পুরনো ময়লা টাকার গন্ধ বেরুচ্ছে তার গা থেকে, বললো, আমার নাম গোলাম নবী।
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর গোলাম কবির খুব ধীরে ধীরে, গোপনে গালাগালি দেবার মতো করে দাঁতের ফাঁকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ঠিক আছে রহমান সাহেব, বাজে কথায় সময় নষ্ট করার দরকার কি? আপনি শুধু বলুন শেষ কবে আপনার নামটা বদলিয়েছেন? হুমায়ুন কাদির নামটা কবে নিলেন? আপনাকে সময় দেওয়া যাচ্ছে। বলে ডান হাতটা সে উঁচু করে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজনও ডান হাত তোলে।
লোকটা, হুমায়ুন কাদির, একটু কেঁপে কেঁপে উঠে বলে, আমি জানি না।
জানেন না, না? আচ্ছা মনে করে দেখুন তো দুমাস আগে মঙ্গলবার দিন সন্ধে সাতটা ঊনত্রিশ মিনিটে চার নম্বর মোড়ের দোকান থেকে পান খেয়েছিলেন। পান মুখে সিগারেট ধরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটা সাইকেল আপনার গায়ের উপরে পড়ে, সাইকেলঅলা আপনাকে বলে, এখানে কি? অবিশ্যি তা আপনার শুনতে পাবার কথা নয়। আপনার নামটা কি সেদিনই রাখা হয়নি? বেশ করে ভেবে দেখুন, মনে পড়ে কি না?
হুমায়ুন কাদির চুপ করে বসে থাকে।
বুঝতে পারছি আপনি কিছুই স্বীকার করতে চান না। তাতে কিছু এসে যায় না অবিশ্যি। কারণ আমরা সবই জানি কাজেই আর কিছু জানার নেই। কারণ আমরা কিছুই জানি না অতএব আর কিছুই জানার নেই। ঠিক আছে, বলুন আজ সন্ধেয় কোথায় গিয়েছিলেন? গোলাম কবির একটু গলা তুলে বলে, কোথায়?
বাকি দুজন বলে, কোথায়?
আয়, আয়, আয়, আয়—শব্দ উঠলো।
সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম।
কোথায় গিয়েছিলেন বললেন? সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম? হ্যাঁ, দেখবার মতোই জিনিস বটে। চমৎকার ধাপ্পা। আমাদের বন্ধু সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলেন—বলে গোলাম কবির গোঁফের তলায় মৃদু মৃদু হাসতে শুরু করে।
হুমায়ুন কাদির বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখে মৃদু হাসিটা তার অল্পে অল্পে উঁচুতে উঠছে, হাসির মধ্যে বহু কষ্টে একবার বলে, সূর্যাস্ত, বাঃ সুন্দর কথা, সূর্যাস্ত—বলতে বলতে হো হো করে হাসতে শুরু করে সে, দমকে দমকে হাসি উঠে আসতে থাকে তার নাভি থেকে—হাঃ হাঃ হাঃ বলে কিনা সূর্যাস্ত, হাঃ হাঃ হাঃ বলে কিনা সূর্যাস্ত। চারদিক থেকে প্রকাণ্ড প্রতিধ্বনি হুড়মুড় করে ছুটে আসে, আস্ত আস্ত আস্ত—হাসির দমকে ছাদ ফেটে যাবার দশা। গোলাম কবির একটানা হেসে যায়, খানিকক্ষণের মধ্যে তার দুচোখে পানি জমে যায় টলটলে হয়ে, মুখ টকটকে লাল হয়ে যায়। কপাল ছেড়ে চোখ দুটো ঠিকরে বাইরে চলে আসার উপক্রম হয়। একনাগাড়ে বলতে থাকে, সূর্যাস্ত বললেন তাই না? তা কেমন দেখতে জিনিসটা? কি রং, কি মাপ—কত ফিট বাই কত ফিট, ওপরটা কেমন, ভেতরটা কেমন—মানে অভ্যন্তর ভাগ? আপনার বউয়ের ইয়ের মতো নাকি? এইখানে সূর্যাস্ত দেখাতে এসেছেন? বলেই হাসি একেবারে বন্ধ করে দিয়ে ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গোলাম কবির বললো, আসলে কথাটা বলুন, কতজন ছিলেন?
আর তো কেউ ছিলো না।
পাঁচজন তো ছিলোই। আপনাকে ভালো কথায় বলছি। পাঁচজন নিশ্চয়ই ছিলো। কোথায় বসেছিলেন আপনারা? আর কার কার আসার কথা ছিলো? তাদের নাম-ধাম বলুন। আমাদের কাছে নিশ্চিত খবর আছে, দুদিন আগে বেলা দুটোর সময় আপনারা বলেছিলেন, ভেবে দেখতে হবে। কি ভেবে দেখতে চেয়েছিলেন আপনি? অতো ভাবাভাবির কি আছে? তারও আগে একদিন সন্ধেবেলায় একজন যখন আপনাকে জিগগেস করে, এ বিষয়ে আপনার মত কি? সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে আপনি কিনা তাকে বললেন, চিন্তা করে দেখতে হবে। একবার ভেবে দেখবেন, একবার ভাবনাচিন্তা করে দেখবেন—ওসব বেয়াদবি আপনাকে কে করতে বলেছে? জানেন না সব ভাবনাচিন্তা আপনার অনেক আগেই করা হয়ে গেছে? কি? জানেন না নাকি? চুপ করে রইলেন যে!
হুমায়ুন কাদির অসহায়ভাবে বললো, আমি একটুও ভাবনাচিন্তা করতে চাই না। আপনাআপনি এসে যায়। গোলাম কবির ভেংচি কেটে বললো, আপনাআপনি এসে যায়। আচ্ছা গেল। এরও আগে একদিন শনিবার বিকেলবেলায় আপনি কান উঁচু করে—আপনি জানতেন না আপনার পাছাও উঁচু হয়ে গিয়েছিল—বলে একটু চোখ মেরে গোলাম কবির কথাটা শেষ করলো, আপনি কান উঁচু করে বলেছিলেন, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
গোলাম রব্বানী, গোলাম নবী একসঙ্গে একটা একটা করে বলে, আপনি কান উঁচু করে বলেছিলেন, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
প্রতিধ্বনি শোনা গেল, ছি—ছি—ছি—।
গোলাম কবির একটু দেরি করে বলে, একথা কেন বলছিলেন?
হুমায়ুন কাদির খুবই বিব্রত, এলোমেলো; হাবার মতো বলে, আমরা শিক্ষিত লোক।
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে গোলাম কবির বলে, হ্যাঁ, শিক্ষিত লোকের কান গাধার মতো লম্বা হয়ে গেছে। যাকগে, যাকগে—এইভাবে দেখা যাচ্ছে আপনি বলেছেন, গন্ধ পাওয়া যায় কিংবা গরম লাগছে বা বিস্বাদ মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এসব কথা আপনি একবার নয়, বার বার বলেছেন। খেতে বসে বলেছেন, দিনকাল খারাপ। বলে বাঁ হাত মাটিতে ঠুকেছেন, তাতে আপনার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে আঘাত লাগে, একটা বিড়েল আহত হয়। অথচ আপনি ভালো করেই জানেন—বলে গোলাম কবির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, একবার বাঁদিকে ফিরে চোখ সামান্য কাঁপায়, তারপর ডানদিকে ফিরে একইভাবে চোখ কাঁপায়, তাতে গোলাম রব্বানী ও গোলাম নবী অনিচ্ছার সঙ্গে ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়ায়। তারা স্থির হয়ে দাঁড়ালে গোলাম কবির তাদের দিকে একটু ঘাড় ঝুঁকিয়ে শুরু করে, অথচ আপনি ভালো করেই জানেন যে বচনে বা রটনায় বা ইঙ্গিতে বা ব্যবহারে—
বাকি দুজন মাটির দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে আবৃত্তি করে যায়, বচনে বা রটনায়, ইঙ্গিতে বা ব্যবহারে—
এই হলো এক নম্বর।
এই হলো এক নম্বর।
নিদ্রায় বা স্বপনে বা জাগরণে—গোলাম কবির আবার শুরু করে।
নিদ্রায় বা স্বপনে বা জাগরণে—অন্য দুজন প্যানপেনে গলায় বলে।
এই হলো দুনম্বর।
এই হলো দুনম্বর।
খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, রাজদ্বারে, শ্মশানে, গোরস্তানে, আহারে, বিহারে বা নারী সহবাসে—অন্য দুজন একইভাবে বলে যায়, খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, রাজদ্বারে, শ্মশানে, গোরস্তানে, আহারে, বিহারে বা নারী সহবাসে—
ইত্যাদি—
ইত্যাদি—
এবম্প্রকার, উল্টোসিধে কোনো প্রকার
এবম্প্রকার, উল্টোসিধে কোনো প্রকার
নিষেধ।
নিষেধ।
এই হলো তিন নম্বর।
এই হলো তিন নম্বর।
গোলাম কবির দুহাত দুদিকে বাড়িয়ে ইশারা করলে গোলাম রব্বানী এবং গোলাম নবী অসন্তুষ্ট মুখে বসে পড়ে।
গোলাম কবির কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। আস্তে আস্তে সে তার রোগা বুকটা চিতিয়ে দেয়, হাতা-গোটানো বাঁদুরে হাত দিয়ে জামার কলার ঠিকঠাক করে, দুবার কাশে, দুবার গলা ঝাড়ে—একবার নাক ঝাড়ে, তিনটে বল্টু খুলে যাবার ঘটাং ঘটাং শব্দ হয়—ঘ্‌র্‌রর করে বুকের মধ্যে একটা চাকা চালু হবার আওয়াজ আসে। তারপর অতি দ্রুত সে তার গলার ভিতর থেকে বাজ ফেলতে থাকে। ঘনঘন বাজ পড়ার আওয়াজে আর বিকট প্রতিধ্বনিতে হুমায়ুন কাদিরের কানে তালা লেগে যায়। কোনো রকমে সে শুনতে পায়, আমরা নিজেরা নিজেরা একতা আইন-শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে বসে বা মাটিতে শুয়ে যদি তা কোনদিন দেখিয়ে দিতে পারি একসঙ্গে একসঙ্গে যে যেখানে আছে ঠিকঠাক পরিকল্পনা
বেশ। তাহলে এই আপনার শেষ কথা? তাহলে এই হচ্ছে আপনার সর্বশেষ মারাত্মক জঘন্য—
অন্য দুজন একটু নড়েচড়ে বললো, আপনার সর্বশেষ মারাত্মক জঘন্য—
গোলাম কবির ভয়াবহ চিৎকার করে উঠলো। তার রগের দুপাশে শিরা উঁচু হয়ে উঠে চোখে রক্ত দেখা দিলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে পাঁজর চেপে ধরে বিরাট একটা দম নিয়ে সে ফেটে পড়লো, বলুন।
চারটে শাদা দেয়াল একসঙ্গে দুলতে থাকে। আলো কমে আসে। আবছা আলোর মধ্যে হুমায়ুন কাদির দেখতে পায় তিনজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো শাদা দাঁত বের করে বোমার মতো ফেটে পড়লো, বলুন। তিনজনে একসঙ্গে তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগে কিশকিশ করতে করতে বললো, এই শেষ তাহলে।
বলেই গোলাম কবির লাফ দিয়ে টেবিল ছেড়ে মেঝেয় দাঁড়িয়ে বললো, তাহলে শুরু করা যাক। বাঁশ দুটো কোথায়!
গোলাম নবী মুহূর্তে উধাও হয়ে গিয়ে একজোড়া হাত চারেক লম্বা বাঁশ নিয়ে ফিরে আসে। তখন গোলাম কবির হুমায়ুন কাদিরের কাছে এসে বললো, জামাটা খুলুন।
সে জামা খোলে।
গেঞ্জিটাও খুলুন।
গেঞ্জি খোলা হলে সে বলে, জুতো-মোজা খুলে ফেলুন। হ্যাঁ, এইবার মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসুন।
হুমায়ুন কাদির হাঁটু গেড়ে বসলো।
খুবই সহানুভূতির সঙ্গে তার হাত দুটো উপরের দিকে তুলতে তুলতে গোলাম কবির বলে, হাত দুটো এই রকম করে তুলুন।
সে হাঁটু গেড়ে খালি গায়ে হাত তুলে বসলে গোলাম কবির বলে, রব্বানী তোমার সেই দামেস্কের ছুরিটা কই?
বিরাট শাদা একটা ছুরি বের করে গোলাম রব্বানী বললো, এই যে।
গোলাম কবির নির্দেশ দেয়, এদিকে এগিয়ে এসো, এর ঠিক পিঠের কাছে দাঁড়াও। মাত্র একবার চান্স পাবে। হ্যাঁ ঠিক আছে। এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকো। এসো গোলাম নবী। বাঁশ দুটো গলার দুদিকে ঘাড়ের উপর একটা, গলার দিকে একটা লাগাও। এই আমি এদিকটা ধরছি—ওদিকটা তুমি। মাত্র একবার চাপ দেবে, মনে আছে? আচ্ছা রহমান সাহেব, দুমিনিট ইচ্ছে হলে কিছু ভেবে নিন।

[অনেককাল আগে একবার সবুজ ঘাসের মধ্যে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়াছিলাম। উহার এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত দেখা গিয়াছিল, উহা হালকা নীল ছিলো। পরে উহা চুম্বনের দাগের মতো মিলাইয়া যায়। ইহার পর মানুষের জগতে ফিরিয়া আসি—তাহাতে নোনা টক গন্ধ আছে এবং আক্রোশ ও ঘৃণা রহিয়াছে এবং ভালোবাসা ও মমতা রহিয়াছে। মানুষের জীবনে কোথায় অন্ধকার তাহার সন্ধান করিতে গিয়ে আমি ঘন নীল একটি ট্যাবলেটের সন্ধান পাই—মানুষ যে সামাজিক, সে নিজের ইতিহাস জানিতে চাহিয়াছে, তাহাতে সর্বদাই অন্ধকার নর্তনকুর্দন করিতেছে। তবু আমি মানুষেরই কাছে প্রার্থনা জানাইব—কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে—যদিও ঐ দাগ দেখা যায় না। অসংখ্যবার সঙ্গম করিয়াও যেমন আমি নারীতে ঐ দাগ কখনো দেখি নাই। কোথাও কিছু পাই নাই বলিয়াই বাধ্য হইয়া আমি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাইব। ইতিমধ্যে সব কিছু চমৎকার ঘটিয়াছে। অবশ্য অনেক কিছু্ই বাকিও রহিয়া গেল কারণ কিছুই শেষ হইবার নহে।]

Friday, February 26, 2021

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য : শওকত আলী by হাসান আজিজুল হক

খুব ছোট্ট বৃত্তে ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার একটা সূচনা আমরা সাধারণত উল্লেখ করে থাকি। কেন করি, জানি না। আধুনিকতার সংজ্ঞা কী, তাও জানি না। আর রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীকালের সাহিত্যকে আধুনিক সময়ের লেখা বলে আমরা চিহ্নিত করেছি। তিরিশের দশকের কবিদের কথা বলেছি। এদিক থেকে বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য কবে থেকে? আমরা আবার খতিয়ে বিচার করি – দশক ধরে। সেই সূত্রে, পঞ্চাশের দশকের লেখকদের লেখা আর পড়ি না। মানিক-তারাশঙ্কররা তো আরো আগের। সাহিত্য বিচার দশকওয়ারি হওয়া একেবারেই উচিত না। তাতে আত্মম্ভরী বেড়ে যায় যে, আগের দশকের লেখকরা ডুবে গেছে, এই মুহূর্তের লেখাই জীবমত্ম। আমাদের গ্রাম্য একটি প্রবাদ আছে, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সতীনাথ ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র, বিশেষ করে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বিভূতি-মানিক-তারাশঙ্কর, এখনো কি আমরা এঁদেরকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি? তাহলে পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশক, সত্তরের দশক, আশির দশক, নববইয়ের দশক, শূন্যের দশক, দ্বিতীয় দশক এভাবে ভাগ করা হচ্ছে কেন? আমাদের তরুণরা এসব ভাগাভাগি নিয়ে বেশি মাতামাতি করছে। আমি এটা একদমই মেনে নিতে পারি না। এছাড়া সাহিত্যের এই দশকওয়ারি বিচার করাটা একদিক থেকে আমাদের সাহিত্যিকদের নিজেরই অপমান করা হয়। যখন বলা হয় ষাটের দশকের লেখা, তখন প্রচ্ছন্নভাবে হলেও বলা হয়, লেখাটি অনেক পুরনো লেখা। এটা বললে পৃথিবীর বহু সাহিত্যকে বাতিল করে দিতে হয়। ষাটের দশকের লেখা যদি বাতিলযোগ্য হয়, তাহলে সেটা তখন-ই বাতিলযোগ্য ছিল, আর এখনো বাতিলযোগ্য। আর যদি তারা টিকে থাকে, চিরকালই টিকে থাকবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আগে ঠিক করে নেওয়া উচিত। এটা কোন পদ্ধতিতে সাহিত্যের দিকে তাকানো? এটা উচিত নয়। সাহিত্য টেকসই হয়। অনেকে মনে করেন যে, সাহিত্য অজনপ্রিয় হলেই টেকসই হবে। কথাটা ঠিক নয়। জনপ্রিয় হয়েও সাহিত্য টেকসই হয়। শরৎচন্দ্র টেকসই হয়েছেন। শরৎচন্দ্রের নাম উচ্চারিত হলেই আমরা বলে দিতে পারি এই মাপের লেখক। আজ থেকে শত বছর পরে কী হবে তা আমি জানি না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই মাপেরই লেখক। ঠিক তেমনিভাবে শওকত আলীকে বলা হয় পঞ্চাশের দশকের একদম শেষভাগের লেখক। এবং পরের যে-দশক আমাদের সাহিত্যে আধুনিকতার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে ভাবা হচ্ছে, তার কিছু কিছু স্ফুলিঙ্গ শওকত আলী তাঁর নিজের মধ্যে বহন করেছেন। পিঙ্গল আকাশ এমনি একটি লেখা। আমি এই রকম বিচারের সম্পূর্ণ বিরোধী, যা টেকার তা টিকবেই। এই মুহূর্তে যিনি লিখছেন, তিনি যদি একটি মুহূর্তকে চিহ্নিত করতে পারেন, আলাদা করে ফেলতে পারেন, সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা তারকার মতো চিহ্নিত করতে পারেন, তাহলে ওই তারা আর নিভবে না। সেজন্যে অনেকে মনে করেন, শওকত আলী যখন পঁচাত্তর পেরিয়েছেন, আশি ধরেছেন, লেখালেখি একদম ছেড়েই দিয়েছেন, এখন আর তিনি সেভাবে আলোচনায় আসছেন না। অথবা আসার খুব প্রয়োজন আছে বলেও যেন মনে হচ্ছে না।  তাহলে আমরা কি বাতিলযোগ্য, আমাদের যাদের বয়স হয়েছে, স্মৃতিশক্তি তেমন নেই, হাঁটার সামর্থ্য নেই, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি? দেবেশ রায় একবার বলেছেন, ‘খেলতে যখন নেমেছি, যতো খুশি ফউল করো, মাঠ কিন্তু ছাড়ছি না।’ কার ভাগ্যে কী আছে বলা যায়? রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়স পর্যমত্ম তীক্ষন-ধীর ছিলেন। যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন, বরং আরো তীক্ষনতর হয়েছিলেন। তা না হলে, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’, কিংবা ‘রূপ-নারানের কূলে’ কিংবা ‘শেষ প্রশ্ন’ মৃত্যুর এক সপ্তাহ-দুই সপ্তাহ আগের লেখাগুলো লেখা সম্ভব হতো না। তাঁর লেখা এতটুকু স্মান হয়নি, পুরনো হয়নি, ক্ষয়ে যায়নি। মাত্র ষাট-বাষট্টি বছর বয়সে হেমিংওয়ে নিজেই মনে করলেন, আমার লেখা একরকম শেষ। আমার কোনো ক্ষমতাই নেই। নিজের মাথায় নিজেই গুলি করলেন। না লেখার ক্ষমতা, না নারী ভোগের ক্ষমতা, কোনোটিই যখন নেই, তখন আর শারীরিকভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ। আবার বহু বৃদ্ধ লেখক সমানে লিখে চলেছেন। শওকত আলী সম্পর্কে আমার মনে হয়, এই সময়ের পাঠক ও লেখকের চোখে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। যদিও তাঁর প্রদোষে প্রাকৃতজন নিয়ে বহু বিদগ্ধজন লিখেছেন, তারপরও আরো কিছু সমৃদ্ধ লেখা লিখেছেন। অসাধারণ কিছু লিখে ফেলার পরে কেউ কেউ বাকি জীবনই টেনে নিয়ে চলতে পারেন, কেউ ছাপিয়ে যান, কেউ পিছিয়ে পড়েন, কেউ মধ্যপথে হাঁপাতে থাকেন। শওকত আলী বাষট্টি সালের দিকে তাঁর প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে একটির পর একটি অসাধারণ গল্প ও উপন্যাস লিখে গেছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর গল্পগুলো সত্যিই সুখপাঠ্য। প্রামত্মবর্গীয় জীবন, জোতদার, মহাজন, আদিবাসীদের নিয়ে লেখা কি কোনোদিন লয় পাবে? বাংলা সাহিত্য থেকে হারিয়ে যাবে? আমি অমত্মত বিশ্বাস করি না। অসাধারণ অনেক গল্প একমাত্র তাঁর কলম থেকেই বেরিয়েছে। স্থানীয় যে ঝাঁঝালো গন্ধ, স্থানীয় গন্ধ সবসময় মিষ্টিমধুর হয়, কোনো গাছে অত্যমত্ম ঝাঁঝালো, কোনো গাছকে নিংড়ালে যে-গন্ধ পাওয়া যায় সেটা অন্য রকমের। সেই গন্ধ নিয়ে ওই এলাকার মানুষের যে-গল্প তা অসাধারণ। তিনি যখন অভিনব একেকটি গল্প লিখে চলছেন, তখন আমার মনে হয়েছিল, আচ্ছা, এমন গল্প সমরেশ বসু কি লিখেছেন, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী কি লিখেছেন, কিংবা আমাদের জগদীশ গুপ্তের গল্পের কথাও ভেবেছি। খুঁজে দেখিছি। কিন্তু না, শওকত আলী সকলের চেয়ে আলাদা। উনি ওনার মতো করে গল্প লিখেছেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় উত্তরাঙ্গ নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু শওকত আলী শওকত আলী-ই। তিনি তাঁর মতো করেই লিখছেন। শওকত আলীর এই সমসত্ম খুবই জীবমত্ম গল্প। এই গল্পগুলো আমি মনে করি, এই ভূখণ্ডেরবাংলা ভাষার মানুষদের চিরদিনের পাঠ্য অবশ্যই। আর অনুবাদের ভাগ্য খারাপ। বাংলার অনুবাদ ইংরেজিতে কেন দাঁড়ায় না, আমি বুঝতে পারি না। দুই ভাষাতে কী যেন একটু তুমুল কলহ আছে! ইংরেজিকে কিছুতেই উপনিবেশ স্থাপন করতে দেবে না। বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ তেমন ভালো হলো না। পৃথিবীতে আমরা রাতকানা হয়েই কাটালাম। আমাদের আর কিছুই হলো না। আমাদের সকলের ভাগ্যে যা আছে, শওকত আলীর ভাগ্যেও তাই ঘটছে।

প্রদোষে প্রাকৃতজন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে অনেকটা কেন্দ্র ছিল গৌড় এবং পু-্রবর্ধন ওই এলাকার পাল রাজা, সেন রাজাদের শাসনামলের কাহিনি। খুব প্রশংসিত হয়েছে উপন্যাসটি। যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন। যদিও আমি মনে করি, উপন্যাসটিতে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার ব্যাপার আছে। মানুষ ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়ায় না। একটু বাঁয়ে কাত, একটু ডানে কাত, একটু সামনে ঝুঁকে পড়া। বাঙালি নারী তখন কী গহনা পরতেন, কী পোশাক পরতেন, দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল, এটা কিন্তু রোমান্সও বটে। অসিত্মত্বে ফেরা মানেই রোমান্স। পেছনের রহস্য মাখানো। যার মায়াটি একটি কুহকী, যে কুহকী মায়া আমি কোনোদিন অনুভব করব না। আমার নিজের জীবনেই এমনটা ঘটেছে। ১৭ বছর যে কুহকী মায়াতে আমি পড়েছিলাম রাঢ়ের মাটিতে, কী যে প্রেম আমার সেই মাটির সঙ্গে, এখনো সেই মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

কাজেই, শওকত আলী প্রদোষে প্রাকৃতজনে যে ফিরে গিয়েছিলেন, তখন খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। খুব সূক্ষ্মভাবে তাঁর একটা ঝুঁকে পড়ার জায়গায় আছে। এই জায়গাটাতেই আমার আপত্তি। আমি মনে করি, যে-কোনো সাহিত্যিকের জন্য ঝুঁকে পড়াটা এজন্যে অন্যায্য, ঝুঁকে পড়লেই তো ওই জায়গাটাতে আমি আর বিচার করছি না। মেনে নিচ্ছি। এতক্ষণ আমি ঝকঝকে চোখে দেখছিলাম, তখন আমার দৃষ্টির চশমাটা পালটে নিয়েছি। তারপরেই আবার শওকত আলী ফিরে গেছেন অন্য উপন্যাস লেখার দিকে। যে-উপন্যাসগুলো অনেকটা তারাশঙ্করীয়। যেমন দলিল, ওয়ারিশ ইত্যাদি। তারাশঙ্করের এলাকা আমি চিনি, শওকত আলীর মধ্যে কাছাকাছি একটা জিনিস চলে আসে। উপন্যাসের ভালো মন্দ বিচার করা কঠিন। উপন্যাস কতটা ভালো হয়েছে, আমি এখানে বিচার করতে পারব না। আর করলেও মুহূর্তের মধ্যে আর একজন আমার বিপরীত কথা বলতে পারবেন। শওকত আলী কিছু উপন্যাস লিখেছেন যেগুলো বেশ সুখপাঠ্য, উঁচু শিল্পমানের। আমার কাছে তাঁর লেখার মূল্য অপরিসীম।

Sunday, February 2, 2020

দ্বিজেন শর্মা : চিরতরুণ অমেয় মানুষ by হাসান আজিজুল হক

https://www.rokomari.com/book/author/1742/%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE
দ্বিজেন শর্মার জীবন ও কর্ম নিয়ে বিসত্মারিত বর্ণনা বা বিবরণ হাজির করার জন্য আমি উপযুক্ত মানুষ নই। তেমন উপযুক্ত দু-একজন মানুষ যে আছেন তা আমি জানি। হয়তো তাঁদেরই কেউ এই অতি গুরম্নত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করবেন নিকট ভবিষ্যতে। আমি তাঁর সঙ্গ পেয়েছি নিতামত্ম স্বল্পকালের জন্য; কিন্তু তাতেই তিনি আমার ঘনিষ্ঠতম দু-চারজন মানুষের মধ্যে একজন হয়ে গেছেন। এটা কিন্তু সম্পূর্ণ আমার দিক থেকে – হতে পারে তাঁর দিক থেকে নয়। তবে ভালোই জানি যে হৃদয় নামক অবস্ত্তক মহাবস্ত্তটির পরিসরের কোথাও কোনো সীমানা টানা নেই। আর সেজন্যেই তাঁর ধারণক্ষমতারও সীমা নেই। হৃদয়ের বেলায় পূর্ণ আর শূন্য একসঙ্গেই চলে। হাতে কিছু রাখার দরকার হয় না। দ্বিজেন শর্মার কথা মনে এলে এ রকমই মনে হয়।

একটু আগেই বলেছি, যে কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করার সংকল্প নিয়ে প্রথম যৌবনেই তিনি বাংলাদেশের উন্মুক্ত প্রকৃতির কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তারপর থেকে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ কখনই পরিত্যাগ করেননি আর দিগমেত্মরই দিকে এগুলে যেমন তা ক্রমাগত পিছিয়ে যেতেই থাকে আর শেষ পর্যমত্ম অধরাই থেকে যায়, তাঁকে জিগ্গেস করতে ইচ্ছে হয়, মীনচক্ষু কি ভেদ করতে পেরেছিলেন? প্রায় শতবর্ষব্যাপী অনুসন্ধানের ফলে যে ঐশ্বর্য লাভ করেছিলেন, তাতে কি তৃপ্ত হতে পেরেছিলেন? বেশিরভাগ পিপাসার অমত্ম মেলে, কেবল জ্ঞানপিপাসারই অমত্ম মেলে না। কিন্তু আমরা কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে, যা পেয়েছি তাতেই আমাদের প্রত্যাশার ঘট পূর্ণ হয়েছে। আপনার হাতের প্রজ্বলমত্ম মশালটি নিয়ে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাবে আপনার পরের প্রজন্মের তরম্নণরা।

ওই মশাল হাতে নেওয়ার সাধ্য আমার নেই। আমি অতি অল্পকালের জন্য মানুষটির ঘনিষ্ঠসঙ্গ লাভ করেছিলাম মাত্র। এইটুকুই  আমার সম্বল – যেটুকু লিখছি তার সবটাই ওই জমা পুঁজিটুকু ঘিরে। এই লেখা কাজেই হয়ে যাবে ওই সামান্য সঞ্চয়নির্ভর। স্মৃতি মন্থনের মতোই।

প্রথম পরিচয় কবে? সেই স্মৃতিকথা দিয়েই তাহলে শুরম্ন করি।

বাসার দোতলার চৌকাঠটি পার হতেই আপনার কণ্ঠ। পরিচয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো, কতদিনের সুহৃদের সঙ্গে কথা বলছি। একবারও, একটুও আড়ষ্টতা আসেনি। মনে হয়নি, এইমাত্র আপনি, আপনার পরিবারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। এমনি করেই কাছে টেনে নিয়েছিলেন আপনি। যেমন অনেককেই নেন, তেমনি আমাকেও। মানুষ নয়, আপনি বুকে টেনে নেন সমগ্র বিশ্বকে। আপনার মধ্যে গভীর মায়া। গাছপালা, নদী, পুকুর, পাখি, সবুজ বনানী সবই আপনাকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে। বোটানির অধ্যাপক ছিলেন, পরে সেটাই আপনার এক রকম নেশা হয়ে উঠেছিল।

তখন আপনি কাজ করছিলেন বাংলাদেশে বৃক্ষ, লতা, গুল্ম কত রকম আছে, কোথায় আছে, সেসব নিয়ে। গিয়েছিলেন একবার খুলনাতে। সকালবেলা উঠে আমরা দুজনে চলে যেতাম রূপসা নদীর ওপারে, বিলের ধারে। কাদা, জল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আপনি নেমে পড়তেন। ‘কারা’ না কী সব সংগ্রহ করতেন সেটা আমি জানি না। এসব সংগ্রহ করতে করতে কত কথা! প্রকৃতি, আগেকার বাংলাদেশ।

বাগেরহাটে যাবার পথে হঠাৎ মাঠের মাঝখানে খুব নির্জন জায়গায় বিশাল একটা দিঘি দেখা গেল। তার বাঁধানো ঘাটটা তখনও অটুট। হঠাৎ এখানে এই নির্জন জায়গায় কারা তৈরি করে দিয়েছিল এই বাঁধাঘাট, কারা এখানে এসেছিল – কত কথা! আমিও বলতাম, আপনিও বলতেন। আপনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগত। আপনার সেই উচ্চকণ্ঠে হাসি এবং কথা।

একবার রিকশায় চড়ে নদীর দিকে যাচ্ছি। আমি যখন ভাড়া দিতে যাচ্ছি – তখন আপনার সেই একই কণ্ঠ : ডোন্ট ট্রাই টু স্পেন্ড মানি। কী জানি, ধমক দিয়ে অত ভালোবাসার সঙ্গে আমাকে কেউ কখনও ওভাবে কোনো কথা বলেছে কি না।

একবার আমরা ডেমরা চলে গেলাম। সেখানে একটা নৌকো নেওয়া হলো। তখন যন্ত্রচালিত ছোট ছোট নৌকো পাওয়া যেত। তেমন একটা নৌকোয় উঠে আমরা শীতলক্ষ্যা উজিয়ে প্রায় ছয় মাইল দূরে এক জায়গায় নামলাম। জায়গাটার নাম মুগদাপাড়া। খুব পুরনো, পরিত্যক্ত, নির্জন, খাঁখাঁ করা রাজপুরী। আপনি বললেন, আমরা বেরিয়েছি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। সেই যে দুই খ– তাঁর উপন্যাস। পরবর্তীকালে আপনি বলেছিলেন, কেবলই প্রকৃতির বর্ণনা, এখন ক্লামিত্ম লাগে গো। তখন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে আমরা দুজনেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। মনপুরায় নামলাম। রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ নির্জন কক্ষগুলোতে ঘুরে বেড়ালাম। দরদালানে গেলাম। অতীতের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। কালকে আমরা নিরবধি বলি, সেটাই ঠিক। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – আমরাই বসে বসে ভাগ করি, হিসেব করি। কিন্তু এটা তো আমাদের করা, সময় তো অফুরান। সে তো টানা বয়ে চলেছে, বয়ে যাওয়াটাই তো সময়। আমরা আছি তাই সময়ও আছে। আমরা মনে রাখি, তাই ভুলে যাই।

সেই মুগদাপাড়া, অতীতের গন্ধমাখা, ভেঙেপড়া রাজবাড়ি! তা থেকে আমার অনেক গল্পের পরিবেশ আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি এরকমই এক বাড়ির ভেতরে স্থাপন করেছিলাম এ-দেশের আটকেপড়া এক হিন্দু পরিবার। নাম দিয়েছিলাম ‘খাঁচা’। ‘খাঁচা’ এখন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপামত্মরিত হয়েছে। কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় নাকি ওই বাড়ির জামাই ছিলেন।

আপনার সঙ্গে যখন গিয়েছিলাম মনে করলে দেখি – প্রথমে একটা দিঘি, অজস্র বড় বড় গাছ। তারপরে ভাঙা ঘরগুলো, সাপখোপে ভরা। প্রাণভরে আমরা ঘুরে বেড়ালাম নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। মনে হলো না যে, ওখানে কোনো জনবসতি আছে। পেটে কিছু পড়লও না, সঙ্গে বিস্কুটমতো কিছু ছিল। তারপরে ডেমরায় ফিরে এলাম। আপনি বললেন, হাসান, এখনও তো অনেকটা সময় আছে। বাড়ি যাবে? আমি বললাম, আমার তো তেমন ইচ্ছে নেই। যদি মনে করেন তো যাব। আর যদি বলেন অন্য কোথাও যাওয়া যাক তাহলে তাই হবে। আপনি বললেন, তো চলো কমলাপুর স্টেশনে। এ যে এক অদ্ভুত সময় নষ্ট করা বা সময়কে সত্যিকার ব্যবহার করা! তারপর আমরা চলে গেলাম পুবাইলে, নাগরীতে। আপনি যে কলেজে পড়াতেন, নটর ডেম কলেজ, সেখানের নিম্ন শ্রেণির সবার সঙ্গে আপনার ছিল গলায় গলায় ভাব। তাঁরা অনেকে খ্রিষ্টান হয়েছিলেন।

আমরা পুবাইল স্টেশনে নামলাম। একটু এগিয়ে এসে একটি ঘাট থেকে নৌকায় চড়লাম। এক-দুই ঘণ্টা পরে আমরা আর একটি ঘাটে পৌঁছলাম। সেখান থেকে হেঁটে নাগরী। তারা শুয়োরও পোষে। শুয়োরগুলো সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবুও আপনার কোনো বিকার ছিল না, আমারও ছিল না। সেখানে অন্ন গ্রহণ করতে আপনার বাধেনি, আমারও বাধেনি। তারা আমাদের কী খেতে দিয়েছে আপনিও জিজ্ঞাসা করেননি, আমিও জিজ্ঞাসা করিনি।

আপনারা নাকি একাত্তর সালে ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাই কিছু পুরনো পরিচিত মানুষ আপনার ছিল। তেমন দু-চারটে বাড়িতে গেলেন। তাদের সঙ্গে গল্প করলেন, কুশল জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সেখান থেকে আমরা গেলাম বিশাল একটি গির্জায়। সারাদিন কাটালাম। মনে হয়, সন্ধ্যার দিকে চলে এলাম। এ অবিস্মরণীয়, ভুলতে পারব না কখনও। আর এরকম করতে করতে মানুষ হিসেবে আমি বদলাচ্ছি, গ্রহণেচ্ছু মানুষে পরিণত হচ্ছি। আমার অতীত, আমার বাল্যকাল সেও তো এরকমই বিশাল গ্রামবাংলার সঙ্গে মিশে রয়েছে। অখ- বাংলা আমরা আর অর্জন করতে পারিনি।

নাগরীতে গিয়ে অনুভব করেছি, মানুষ মানুষের কতটা কাছে আসতে পারে। আপনি শিখিয়েছেন, কী করে অতিক্রম করতে হয় সমসত্ম প্রাচীর এবং দেয়াল। শিখেছি, দ্বিজেনদা, আপনার কাছ থেকে শিখেছি। কিছুটা তো শিখেছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এখন মনে হয়, এমন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় তো ঘটেছিল। এখন আর কাছে যেতে পারি না, কাছে আসতে পারি না। প্রকৃতির নিয়ম কাজ করছে নির্মমভাবে। আপনার ওপরে কাজ করছে, আমার ওপরেও কাজ করছে। জীবন যথেষ্ট দীর্ঘ নয়, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। তারাশঙ্করের সেই উক্তি মনে পড়ে, জীবন এত ছোট কেনে? নববই-তিরানববই বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। শেষের দিকে একটা ইজি চেয়ার চওড়া বারান্দায় পেতে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে উনি চুপ করে বসে থাকতেন। আমরা দৈনন্দিন জীবনযাপন করছি, ছুটছি, বাবা খুব কম কথা বলতেন। মেজাজি মানুষ ছিলেন। একদিন কানে এলো, তিনি আপন মনেই বলছেন, কত ছোট এই জীবন! তখন আমরা তো যৌবনের উত্তাপে মাতোয়ারা। কথার কোনো অর্থই আমরা বুঝিনি। কথা আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝি বলি বটে, কিন্তু সত্যি সত্যি বুঝি না। একে বোঝা বলে না। তারাশঙ্করও এভাবে বলেছিল – হায়, জীবন এত ছোট কেনে?

আলো ক্রমে কমিতেছে। কমলকুমার মজুমদার লিখেছেন না – আলো ক্রমে কমিয়া আসিতেছে। আমাদেরও তাই। আমাদেরও এখন অপরাহ্ণ, গড়িয়ে পড়েছে সূর্য। আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি। তবু এখনও আপনি আছেন। তখনও এখনও মনে হয় তুমি আছ, আমি আছি। স্বর্গ খেলনা তো এ ধরণীতে গড়া উচিত নয়, সুখে-দুঃখে, প্রহারে জর্জরিত হতে হতে জীবন কাটাতে হয়। তবু মনে হয়, এর চাইতে আর বেশি চাইবার কী আছে? এর পেছনটা অন্ধকার, সামনেও অন্ধকার। এইটুকুই হাতে আছে, এই আলো-অন্ধকারে ভরা জীবন। কথার শেষ হবে না দ্বিজেনদা।

সেই সময়ে আপনি আমার কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কেন জানি না, সেই চিঠিটা আমার পুরনো একটা ডায়েরির ভেতরে খামখোলা অবস্থায় রয়েছে। তারিখও দেওয়া আছে, দেখলেই মনে পড়বে। এই চিঠিতে আপনি ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ পড়ে ভালোলাগার কথা জানিয়েছেন। তবে সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কথা বলেছিলেন, কারো কারো লেখা পড়া যায় না। কোথাও বলেছিলেন, হাসান, সাহিত্যের নামে এরা জোচ্চুরি করে। সেই চিঠির শেষে লেখা আছে – চিরদিনের দ্বিজেনদা।

আমি স্মৃতি নিয়ে বসলে তার অমত্ম থাকবে না। একটা জায়গায় থামতেই হবে। এবং সেটা যে কোনো জায়গায়। তখন আপনি প্রায় ৮৬-তে পা দিয়েছেন। শরীর দুর্বল, বেরোন না, টেলিফোন রিসিভ করে কথা বললে হাঁপিয়ে ওঠেন। মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। এই যে ঢাকায় এলে আপনার বাসায় যেতাম না, এটা তো কল্পনা করতে পারতাম না। তখন কেবল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনিও কিসের আকর্ষণে যেতেন। আর আমি রাত ১১টা কি ১২টার সময় গুণের সঙ্গে বের হয়ে সমসত্ম রাসত্মা কেবল হেঁটে বেড়াতাম। হাঁটা ছাড়া আমাদের আর কাজ ছিল না। তখন ফিরে গেলে বৌদি বলতেন, খাওয়া তো হয়নি। তখন নির্মলেন্দু বলতেন, না, এখানে আমার আর আসা হবে না। আসলে আপনার সঙ্গে আমার হাঁটা হবেই হবে। আর না খেয়ে ওখানে গেলে বৌদি ভাববে – এখান থেকে খেতে এসেছে। শুনে বৌদি তো হেসেই কুটি কুটি। এত হাসি। তিনি আবার দর্শন পড়ান। এত হাসেন কীভাবে? দর্শনের গাম্ভীর্যভরা কান্ট-হেগেল নিশ্চয়ই পড়াতেন। এমনি আরো কত স্মৃতি। কখনও কখনও জ্যোতিপ্রকাশ থাকত। আমাদের তো আড্ডাই হয়ে যেত। আমি ঢাকায় গেলে আর কোথাও যেতাম না। কিন্তু আপনার ওখানে যেতে লজ্জা করতাম না, সংকোচ করতাম না।

আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমাকে যদি নিয়ে যায় তাহলে রাজশাহী ভার্সিটির প্রাকৃতিক পস্ন্যানটা আমি তৈরি করে দিতে পারি। আমি ওদের বলেছিলাম, কারো কোনো আগ্রহ দেখিনি। আপনাকে কত কী ব্যবহার করল দেশ, আমি জানি না। একটা সময় চলে গেলেন রাশিয়া। ভালোই হয়েছিল ব্যক্তিগত জীবনে। সেখানে গিয়ে প্রচুর কাজ করলেন, অনুবাদ করলেন। হার্টের ওপর লেখা একটা বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন, এখনো মনে আছে। আরো বই আমাকে দিয়েছিলেন, মৌমাছি পালনের ওপরে। দিয়েছিলেন লেপার্ড, ইতালিয়ান এক লেখকের উপন্যাস। এলোমেলো কত কথা মনে পড়ছে দ্বিজেনদা।