Sunday, August 3, 2025

হারেৎজের প্রতিবেদন: গাজায় ক্ষুধা অস্বীকার হলোকাস্ট অস্বীকারের মতো ঘৃণ্য by গিডিয়ন লেভি

ইহুদি হলোকাস্ট অস্বীকারের মতো ঘৃণ্য ঘটনা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। যারা এটি অস্বীকার করে, তারা বলে এটি আদৌ ঘটেনি, আর যদি ঘটেও থাকে, মৃতের সংখ্যা খুবই সামান্য ছিল, কিংবা গ্যাস চেম্বার বলে কিছু ছিল না। তারা পরিমাপ ও তথাকথিত ডাটার মাধ্যমে এসব দাবি তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, হলোকাস্ট ছিল একটি ষড়যন্ত্র- ক্ষতিপূরণ আদায় ও সহানুভূতি অর্জনের হাতিয়ার। এমন অস্বীকারকে অনেক দেশেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং অস্বীকারকারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, সাধারণভাবে, একে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবেই দেখে। বৃটিশ ইতিহাসবিদ ডেভিড আর্ভিং অস্ট্রিয়ায় এই কারণে কারাবরণ করেছেন এবং সমাজচ্যুত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের ঘটনাকে ঘিরেও যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের প্রতি ইসরাইলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে- তাদেরকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে দাগানো হয়েছে। যখন শিল্পী রজার ওয়াটার্স বলেন যে, ধর্ষণের কোনো প্রমাণ নেই এবং শিশুদের চুল্লিতে পোড়ানোর গল্প ইসরাইলের তৈরি মিথ্যা- তখন তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করা হয়। আরও অনেকে যারা ইসরাইলি বর্ণনার অতিরঞ্জন তুলে ধরেন, তারাও একইভাবে আক্রান্ত হন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অস্বীকারের একটি ঘৃণ্য স্রোত বইছে ইসরাইলেই, এবং এটি এখন দেশটির অনেক স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় সব গণমাধ্যমই এতে অংশ নিচ্ছে।

আমরা প্রথমে চেষ্টা করেছি উপেক্ষা করতে, লুকাতে, মুখ ফিরিয়ে নিতে, হামাসকে দোষারোপ করতে, বলতে চেয়েছি যুদ্ধের সময় এমন হয়, এমনকি দাবি করেছি গাজায় কোনো নির্দোষ মানুষ নেই। কিন্তু একসময় ইসরাইলের অপরাধ এতটা সীমা অতিক্রম করল, যে তা আর অস্বীকার করা সম্ভব হলো না। যখন ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাণঘাতী অনাহার শুরু হলো, তখন একমাত্র অবশিষ্ট পথ ছিল অস্বীকার করা এবং এই অস্বীকার ঠিক ততটাই ঘৃণ্য, যতটা হলোকাস্ট অস্বীকার। এখন ইসরাইলে যে অস্বীকার চলছে, তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে গণহত্যার উদ্দেশ্য অস্বীকার এবং গাজার জনসংখ্যাকে জোরপূর্বক অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা অস্বীকার। এই অস্বীকার সেখানে স্বাভাবিক, রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কেউ এই অনাহার ঘটানোর জন্য অভিযুক্ত বা শাস্তি পাবে না। এটি এখন মূলধারার ভাবনায় পরিণত হয়েছে। গাজার অনাহারকে বলা হচ্ছে ‘ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র’। যদি ক্ষুধা থেকেই থাকে- তাহলে দায় হামাসের।

এটাই হয় যখন সব অজুহাত, কল্পকাহিনি ও প্রচারণা শেষ হয়ে যায়। তখন মানুষ এমন বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বলে- ‘ক্ষুধা নেই’- যখন চিত্রগুলো চোখের সামনে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কী অধিকার তাদের এই কথা বলার? ইসরাইলি অস্বীকারের রয়েছে অন্তত ৫০টি রূপ। প্রত্যেকটিই সমানভাবে ঘৃণ্য- কেউ চোখ সরিয়ে রাখে, কেউ চোখ ঘুরিয়ে নেয়, কেউ নিজেকেই মিথ্যা বলে। সবগুলোর লক্ষ্য এক- দায় এড়িয়ে যাওয়া, নিজেদের ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং নিজেদের প্রশংসা গাওয়া। এই দলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়- ইসরাইলের চার গবেষক মিলে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন- ‘তলোয়ার যুদ্ধের তথাকথিত গণহত্যা’। এই প্রবন্ধের অসারতা তুলে ধরেছেন হলোকাস্ট ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ব্ল্যাটম্যান এবং হারেৎজের সাংবাদিক নির হাসোন। আরও রয়েছেন, দৈনিক ইসরাইল হায়োম বিলি করা এক নারী, যিনি আমাকে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন- ‘ক্ষুধার ছবিগুলো ইয়েমেনের, বা এআই দিয়ে তৈরি।’ এছাড়া টেলিভিশনের একজন পণ্ডিত সাংবাদিক মরিয়া আসরাফ- যিনি অপমানজনক রকমের ঊর্ধ্বতন ভঙ্গিতে সাংবাদিক ইমানুয়েল এলবাজ-ফেল্পসকে চুপ করিয়ে দেন। এমনকি প্রায় সব টিভি নিউজ সম্পাদকই গাজায় কী ঘটছে, তা গোপন করছেন।

এই অস্বীকার ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস- প্রথম নাকবা (১৯৪৮) থেকেই, যে নাকি আদৌ ঘটেনি, এসব কেবলই ইসরাইল-বিদ্বেষীদের কল্পনা। এই অস্বীকার অব্যাহত ছিল দখল ও বর্ণবাদী শাসনের সব বছরজুড়ে। বিশ্বে এমন কোনো সমাজ নেই, যারা নিজেদের এতখানি অস্বীকারের মধ্যে রেখে দেয়। এর পেছনে ইসরাইলের তথাকথিত ‘স্বাধীন গণমাধ্যম’-এর বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলো যা দেখিয়েছে, তা নৈতিক অধঃপতনের নতুন রেকর্ড। ‘গাজায় অনাহার নেই’-এই দাবির পেছনে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে- ‘সীমান্তে তো ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে’, ‘ক্ষুধায় মারা যাওয়া শিশুদের মা-বাবা মোটা’, ‘হামাসের একটি ভিডিও আছে যেখানে তারা গুহায় কলা খাচ্ছে’- যদিও ছবিটি ছয় মাস আগের এবং এটি ছড়াচ্ছে আইডিএফ মুখপাত্র, যিনি দেশের সবচেয়ে বড় মিথ্যা প্রচারক। এই অস্বীকার কেবল দায় এড়ানোর চেয়ে বেশি ঘৃণ্য- এটি ভিকটিমদের প্রতি অবমাননা। যে মা তার ক্ষুধার্ত, মৃতপ্রায় শিশুকে কোলে নিয়ে কাঁদছে- তাকে বলা হচ্ছে, ‘এটি ইচ্ছাকৃত অনাহার নয়’- এটি তার যন্ত্রণাকে বিদ্রুপ করারই নামান্তর।

আমি বহু বছর ধরে বিশ্বাস করতাম- যদি সব প্রমাণ ইসরাইলিদের সামনে হাজিরও করা হয়, তারা তাও অস্বীকার করবে। এখন সেই প্রমাণ এখানে- ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি বিশ্বের সংবাদপত্র ও টিভি স্ক্রিনে ছেয়ে গেছে- তবুও ইসরাইলিরা তা অস্বীকার করছে। কী আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা বলছে- ‘এসব ছবি ভুয়া, ক্ষুধায় কেউ মরেনি, কলা আছে, দিনে ৮০টা ট্রাক ঢুকছে।’ এটিই করতেন ফরাসি অধ্যাপক রবার্ট ফোরিসন। তিনি বলতেন, গ্যাস চেম্বারের পরিমাপ অনুযায়ী হলোকাস্ট ঘটেনি। গাজা আজ সেই একই নিষ্ঠুর অস্বীকারের শিকার- নিখাদ মানবিকতা ও ন্যায়ের বিপরীত এক ভয়ঙ্কর রূপ।

(অনলাইন হারেৎজ থেকে অনুবাদ) 

mzamin

সিডনি হারবার ব্রিজে ফিলিস্তিনপন্থীদের বিক্ষোভ, শামিল হলেন অ্যাসাঞ্জও

ফিলিস্তিনের সমর্থনে আজ রোববার অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার ব্রিজের ওপর হাজারো মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছে। মিছিলে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জও অংশ নেন।

গত বছর যুক্তরাজ্যের একটি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান অ্যাসাঞ্জ। আজ বিক্ষোভের ছবিতে অ্যাসাঞ্জের পাশে তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিউ সাউথ ওয়েলসের সাবেক নেতা বব কারও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

গাজায় অপুষ্টি ও খাদ্যসংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সমালোচনা জোরালো হচ্ছে। এমন অবস্থায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা বলেছে, তারা ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবছে। কেউ কেউ অবশ্য শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকার গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে থাকলেও তারা এখনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। গত মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়া আরও এক ডজনের বেশি দেশের সঙ্গে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে তারা।

আজ বিক্ষোভকারীরা প্রচণ্ড বাতাস ও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সিডনি হারবার ব্রিজে মিছিল করে। তারা স্লোগান দিতে থাকে ‘এখনই যুদ্ধবিরতি চাই’ এবং ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’।

নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ বলেছে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সিডনি শহরজুড়ে তারা কয়েক শ অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে।

নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে বামপন্থী গ্রিনস পার্টির সিনেটর মেহরিন ফারুকি সিডনির ল্যাং পার্কে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, এই মিছিল ‘ইতিহাস সৃষ্টি করবে’। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।

মেহরিন ফারুকি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজাবাসীর ওপর ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে।

এ ছাড়া তিনি নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস মিন্সের সমালোচনা করেন। কারণ, মিন্স বলেছিলেন, এই বিক্ষোভ-মিছিল করাটা ঠিক হবে না।

আজ মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে ছিল ব্যানার। ওই সব ব্যানারে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর নিহত হওয়া হাজারো ফিলিস্তিনি শিশুর নাম লেখা ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের হামলার জবাবে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টির আইনপ্রণেতা এড হুসিকও মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য  দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের নেতৃত্বাধীন সরকারকে আহ্বান জানান।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ মিছিলে অংশ নিলেও তিনি জনতার সামনে কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলেননি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। রক্তপাত বন্ধ করতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।

ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে দেশটিতে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২১৯ জন নিহত হয়। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। ওই সময় হামাস ২৫১ জনকে জিম্মি করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হিসাব অনুসারে, এখনো ৪৯ জন গাজায় আটক আছে। এর মধ্যে ২৭ জন মারা গেছে বলে দাবি তাদের।

প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সিডনি হারবার ব্রিজ ১৯৩২ সালে চালু হয়। এর দুটি বাঁকানো অংশ সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। এটিকে এখন সিডনি আর অস্ট্রেলিয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিউ সাউথ ওয়েলসের সাবেক নেতা বব কারের সঙ্গে কথা বলছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ৩ আগস্ট ২০২৫
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিউ সাউথ ওয়েলসের সাবেক নেতা বব কারের সঙ্গে কথা বলছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ৩ আগস্ট ২০২৫ ছবি: এএফপি

ভাইরাল হওয়া ছবিটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ-বিতর্ক, পেছনের সত্যটা কী

গাজার ১৮ মাস বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশুর ছবি। শিশুটির কঙ্কালসার দেহে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে হাড়গোড়, পাঁজর ও মেরুদণ্ড। ইন্টারনেটে গত সপ্তাহে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ছবিটি।

বিবিসি, সিএনএন ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছবিটি ছাপা হয় এবং তা বিশ্বব্যাপী তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

তবে ছবিটি ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ইসরায়েল ও এর সমর্থকেরা দাবি করেছে, শিশুটির আগে থেকেই ‘স্বাস্থ্যগত জটিলতা’ ছিল।

এ দাবির ভিত্তিতেই ইসরায়েল ও এর সমর্থকেরা গাজায় শিশুদের অভুক্ত থাকার খবরকে ‘মিথ্যে প্রচার’ বলার চেষ্টা করছেন।

মিডল ইস্ট আই শিশুটির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে, একটি অস্থায়ী তাঁবুতে। সেখানে তার মা হিদায়া বলছিলেন, কীভাবে তাঁর সন্তান মোহাম্মদ আল-মুতাওয়াক আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে, সেই কাহিনি।

‘গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় আমি ছিলাম সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা’—ওই সময়ের একটি বিয়ের হলের ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়ে বলছিলেন হিদায়া। এ হল এখন তাঁদের বাসস্থান হিসেবে (অস্থায়ী তাঁবু) ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘মোহাম্মদের (আল-মুতাওয়াক) জন্ম ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে, যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর পর্যায়ে ও (ফিলিস্তিনিদের) ক্ষুধায় মারার প্রথম দফার ইসরায়েলি অভিযানের দ্বিতীয় মাসে।

‘জন্মের সময় ওর শরীরে কিছুটা অক্সিজেনের ঘাটতি হয়, যা সামান্য পেশি দুর্বলতার কারণ হয়েছিল’, যোগ করেন হিদায়া।

তবে সেই প্রাথমিক সমস্যাগুলোর পরও আল–মুতাওয়াকের চিকিৎসা চলছিল এবং তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছিল।

‘চিকিৎসকেরাও ওর উন্নতি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন’, বলেন হিদায়া।

তবে আল–মুতাওয়াক যখন মাত্র দুই মাস বয়সী, তখন হিদায়া নিজেই অপুষ্টিতে ভুগতে শুরু করেন। ফলে সে আর বুকের দুধ খেত না এবং তখনই শুরু হয় দুধ আর বেবি ফর্মুলার জন্য সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।

‘প্রথম দফার ক্ষুধা অভিযানের সময় ও এর আগের কয়েকটি মাস আমরা হাসপাতালে গিয়ে কিছু দুধ সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম’, বলেন হিদায়া।

‘তখন ওর বাবা বেঁচে ছিলেন। তিনিই আমাদের দুধ এনে দিতেন; যত দিন না তিনি এক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।’

ওই সময় পর্যন্ত শিশুটির স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে উন্নতির দিকেই ছিল। সে বয়স অনুযায়ী বেশ কিছু মাইলফলকে পৌঁছাচ্ছিল। ‘ও তখন ‘‘আম্মা’’, ‘‘আব্বা’’ বলতে শুরু করেছিল’, বলেন হিদায়া।

২০২৫ সালের শুরুতে আল–মুতাওয়াক হামাগুড়ি দিতে ও দাঁড়াতে শিখে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরই জাবালিয়া (গাজার শরণার্থী শিবির) থেকে আবার তাঁদের উৎখাত করা হয়।

এর পর থেকেই আল–মুতাওয়াকের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি শুরু হয়। ওজন নেমে আসে ৯ কেজি থেকে ৬ কেজির নিচে। পেশিশক্তি ও চলাফেরার যেসব অগ্রগতি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ উল্টোপথে চলতে থাকে।

‘যখন ওর শরীর আর মুখে এ পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করলাম, আমি ওকে কয়েকটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলেন, “এখন খাবারই ওর একমাত্র চিকিৎসা। ওর দরকার যথাযথ পুষ্টি।”’, বলেন হিদায়া।

‘এমন একটি শিশুর প্রয়োজন দুধ, ডিম, পনির, সবজি ও ফলমূল। কিন্তু ও জন্ম থেকেই কোনো দিন ফল মুখে দেয়নি। জন্মই নিয়েছে এক অভুক্ত থাকা ও বঞ্চনার বাস্তবতায়।’

‘চরম মাত্রার তীব্র অপুষ্টি’

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটি এখন ‘সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন (এসএএম)’ বা চরম মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এটি অপুষ্টির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ওর জন্য জরুরি ও ধারাবাহিকভাবে সুষম খাবার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা না যায়, তবে জীবন ভীষণ রকমের ঝুঁকিতে থাকবে।

হিদায়া বলছিলেন, ইতিমধ্যে শিশুটির শরীরে নানা ভয়ানক পরিবর্তন তিনি খেয়াল করছেন।

গত জুলাই মাসের শুরুতে আল–মুতাওয়াককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই ধরা পড়ে, সে মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভুগছে।

‘একসময় তো ভাবছিলাম, ও বুঝি মারা গেছে। আমি ওর বুকে মাথা রেখে শুনতাম, কোনো শব্দ পাই কি না। ও একেবারেই নড়ত না। সঙ্গে ছিল প্রবল ডায়রিয়া’, বলেন হিদায়া।

‘আমি বিশ্বাস করি, যেসব অস্বাস্থ্যকর খাবার আমরা খাচ্ছি, সেগুলোর কারণেই ওর এমন হয়েছিল। সেগুলোই আমরা পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প হিসেবে নিচ্ছিলাম।

হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা শিশুটির পানিশূন্যতা শনাক্ত করেন এবং কিছু ওষুধ দেন; যা সামান্য উন্নতি ঘটায়। তবু চিকিৎসকেরা সাফ জানিয়ে দেন, যথাযথ খাবার ছাড়া ওর স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব নয়।

অথচ সেই দুর্বল অবস্থাতেও আল–মুতাওয়াককে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়; যাতে আরও শিশুর জন্য জায়গা হয়।

আল–মুতাওয়াকের মতোই গাজার হাসপাতালে শত শত শিশু অসুস্থ ও অনাহারে কাতরাচ্ছে। তাদের সবার একই রোগ—চরম অপুষ্টি।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে মে মাস পর্যন্ত গাজায় প্রতিদিন গড়ে ১১২টি শিশু চরম অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্থাটি জানিয়েছে, গত জুনে ৬ হাজার ৫০০ শিশু চরম অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। শুধু জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহেই এতে আক্রান্ত হয়েছে আরও ৫ হাজার শিশু।

ইউনিসেফ আরও জানায়, গাজা উপত্যকার পুরো জনসংখ্যাই এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পাঁচ বছরের নিচের সব শিশু, যাদের সংখ্যা ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি, অকস্মাৎ চরম অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

‘আল–মুতাওয়াক হাঁটতে শিখেছিল, কিন্তু এখন সে বসতেও পারে না। ও মাথা ধরে রাখতে পারে না, পা নাড়ায় না বললেই চলে। এখন হাত পর্যন্ত নড়াতে পারছে না’, মিডল ইস্ট আইকে বলেন হিদায়া।

‘যদি আমি ওকে আগেই হামাগুড়ি দিতে আর দাঁড়াতে না দেখতাম, তবে হয়তো ভাবতাম, ওর বর্তমান অবস্থা স্বাস্থ্যগত অন্য সমস্যার কারণে। কিন্তু না, ওর স্বাস্থ্য সামান্য খারাপ ছিল আর উন্নতিই হচ্ছিল। শুধু খাবার আর দুধ জোগাড় করতে না পারার পরই ওর এমন পতন শুরু হয়।’

আজ রাতের বেলা আল–মুতাওয়াক যখন দুধ চেয়ে কাঁদছিল, হিদায়া ওকে সান্ত্বনা দেন পানি দিয়ে।

‘অনেক দিন আমরা না খেয়েই ঘুমাতে যাই। কখনো কখনো টানা চার দিন কিছু না খেয়েই থাকতে হয়।

‘বেবি ফুড, দুধ কিংবা পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট কিছুই পাওয়া যায় না। যদি বাজারে কোথাও পাওয়া যায়ও, তা এতটাই দুষ্প্রাপ্য যে দাম কল্পনাতীত।

‘আমার স্বামী নিহত হওয়ার পর আমি দুই সন্তানের একমাত্র অভিভাবক। এত দামে খাবার কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

‘আমার ছেলে এখন আক্ষরিক অর্থেই কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু নয়। আপনি ওর শরীরের ওপর দিয়েই পাঁজর আর মেরুদণ্ড দেখে ফেলতে পারবেন—এ সবই শুধু খাদ্যের অভাবে।’

খাবার জোগাড়ের পাশাপাশি হিদায়া এখন আরেকটা সংগ্রামের মধ্যে আছেন—ছেলের জন্য ডায়াপার পাওয়া। কারণ, ইসরায়েল স্বাস্থ্যসামগ্রী পর্যন্ত গাজায় ঢুকতে দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তিনি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন প্লাস্টিকের ব্যাগ।

‘আমি ওকে দুইটা পলিথিনে মুড়ে রাখি। ভাবুন, গরমের মধ্যে, তা–ও তাঁবুর মতো জায়গায়, শিশুর ত্বকে সেই নাইলনের ঘষা আর গরমের যন্ত্রণাটা কেমন হয়’, বলেন হিদায়া।

‘আমি জানি না, ও কোন দুনিয়ায় জন্মেছে। এমনকি সেই ন্যূনতমটুকুও দিতে পারি না, যেটা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মানুষ স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।

‘দখলদার শক্তি আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে—ক্ষুধার মাধ্যমে। ওরা আমাদের শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।’ # তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

মোহাম্মদ আল-মুতাওয়াক জন্ম নিয়েছিল পেশির দুর্বলতা নিয়ে, তবে গাজায় খাদ্য ও জরুরি সামগ্রীর প্রবেশে ইসরায়েলের অবরোধ শুরুর আগপর্যন্ত তার স্বাস্থ্য উন্নতির দিকেই ছিল
মোহাম্মদ আল-মুতাওয়াক জন্ম নিয়েছিল পেশির দুর্বলতা নিয়ে, তবে গাজায় খাদ্য ও জরুরি সামগ্রীর প্রবেশে ইসরায়েলের অবরোধ শুরুর আগপর্যন্ত তার স্বাস্থ্য উন্নতির দিকেই ছিল। ছবি: মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া