Friday, October 18, 2019

অতীত ঢাকতে পুরস্কার চালু করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল?

কেউ কিভাবে, কী কাজের মাধ্যমে বিখ্যাত হলো সেটার ওপর নির্ভর করে তার জন্য খ্যাতি ভালো না হয়ে বিড়ম্বনারও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ নোবেল পুরস্কারের স্রষ্টা আলফ্রেড নোবেলের গল্প তুলে ধরা যায়। বর্তমানে শান্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও অর্থনীতির জন্য নোবেল পুরস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের, শ্রেষ্ঠত্বের এক মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নোবেলকে জীবদ্দশায় গণমাধ্যম তাকে ‘মৃত্যুদূত’ নাম দিয়েছিল।
নোবেল ১৯ শতকের সফলতম রসায়নবিদদের একজন ছিলেন। সুইডিশ এই নাগরিকের বিস্ফোরক সফলতাই পরবর্তী জীবনে তার জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে বেশিকিছু বলেননি তিনি। কিন্তু অতীতে তার নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কাজের ইতিহাস ঘাটলে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
নোবেল সফলতার শিখরে পৌঁছেন ‘ডাইনামাইট’ আবিষ্কার করে। তার এই আবিষ্কার তাকে এনে দিয়েছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি আর সফলতা। কিন্তু ডাইনামাইট আবিষ্কার নিয়ে বেশ আক্ষেপ ছিল নোবেলের। তিনি চাননি মানুষ তাকে এই ধ্বংসকারী বস্তু আবিষ্কারের জন্য মনে রাখুক।
নোবেল মারা যান ১৮৯৬ সালে। মৃত্যুর আগে নোবেল পুরস্কারের জন্য একটি বিশাল অঙ্কের তহবিল রেখে যান তিনি। তার রেখে যাওয়া তহবিল দিয়ে ১৯০১ সাল থেকে শুরু হয় নোবেল পুরস্কার প্রদান। পুরো বিশ্ব থেকে যাচাই-বাছাই করে বিশেষ কয়েকটি বিভাগে এই পুরস্কার দেয়া হয়। নোবেল তার উইল-এ লিখে গিয়েছিলেন, বিশ্বের মধ্যে ওই বিভাগগুলোয় সমসাময়িক কালে শ্রেষ্ঠ কাজ, শান্তির প্রচারণায় মুখ্য ভূমিকা রাখা ও সামরিক বাহিনীর নিশ্চিহ্নকরণ বা হ্রাসকরণের কৃতিত্ব হিসেবে এই পুরস্কার দেয়া হবে। ধ্বংসলীলাকে পূর্ণতা দিতে পারা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন কথা কিছুটা বেমানান শোনায়।
আঠারো শতকের ষাটের দশকে শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন নোবেল। ওই পরীক্ষার অংশ হিসেবে নাইট্রোগ্লিসারিন ও ব্ল্যাক পাওডার এর এক করে ডাইনামাইট আবিষ্কার করেন এই বিজ্ঞানী। অবশ্য পরীক্ষার শুরুতেই সফলতা পাননি তিনি। ১৮৬৪ সালে এই পরীক্ষায় একবার এক নাইট্রোগ্লিসারিন কারখানা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তার এক ভাইও মারা যান। কিন্তু নোবেল অনুধাবন করতে পারছিলেন যে, তিনি এমন কিছু আবিষ্কারের কাছাকাছি আছেন যা পুরো বিশ্বকে পাল্টে দেবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পরও তিনি কাজ থামাননি। ১৮৬৭ সালে নোবেল আবিষ্কার করেন যে, নাইট্রোগ্লিসারিনের সঙ্গে ‘ডিয়াটোমাইট’ মেশালে নাইট্রোগ্লিসারিন নিরাপত্তার মাত্রা বেড়ে যায় ও তা আরো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তিনি নিজের এই আবিষ্কারের নাম দিলেন ‘ডাইনামাইট’। গ্রিক শব্দ ডাইনামিস (শক্তি) থেকে ডাইনামাইট শব্দটির উৎপত্তি। আবিষ্কারের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এর তীব্র চাহিদা দেখা দেয়।
ডাইনামাইটের বাণিজ্য করে বিপুল অর্থ আয় করেন নোবেল। বিশ্বজুড়ে খাল কাটায়, রাস্তা নির্মাণে, সুরঙ্গ তৈরি সহ নানাভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে ডাইনামাইট। নোবেল ডাইনামাইটের একাধিক কারখানা নির্মাণ করেন। প্রতিনিয়ত ডাইনামাইট আরো শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যান। ১৮৭৫ সালে তৈরি করেন ডাইনামাইটের চেয়েও শক্তিশালী বিস্ফোরক- বিস্ফোরক জেলাটিন। এই ব্যবসায় অকল্পনীয় লাভ করেন তিনি।
ডাইনামাইট ছাড়া অন্যান্য বস্তু নিয়েও কাজ করেছিলেন নোবেল। যেমন, আর্টিফিসিয়াল সিল্ক ও লেদার। লিখেছিলেন উপন্যাসও। যদিও সেগুলোর কোনটিই প্রকাশ পায়নি। ডাইনামাইটই ছিল নোবেলের সবচেয়ে বড় ব্যবসা। এই ব্যবসার সূত্র ধরেই একসময় প্রবেশ করেছিলেন যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরির কাজে। কিন্তু নোবেল ফাউন্ডেশন অনুযায়ী, নিজেকে শান্তিবাদী দাবি করতেন নোবেল। উনবিংশ শতকের অস্ট্রীয় শান্তিকর্মী, ঔপন্যাসিক বার্থা ভন সুটনারের লেখা অনুসারে, নোবেলের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৮৭৬ সালে। সেসময় নোবেল তাকে বলেছিলেন, তিনি এমন একটি বিস্ফোরক আবিষ্কার করতে চান, যেটি সব যুদ্ধ শেষ করে দেবে। ১৮৯১ সালের মধ্যে নোবেলের ৯০টি বিস্ফোরক ও যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কারখানা ছিল নোবেলের। সেসময় কারখানাগুলোর সমর্থনে শান্তিকর্মীদের তিনি বলেছিলেন, যেদিন দুটি সামরিক পক্ষ একে অপরকে সেকেন্ডের মধ্যে নিঃশেষ করে দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে, সেদিন সব সভ্য রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই আতঙ্কে ভীত হয়ে তাদের সব সামরিক বাহিনী বিলুপ্ত করে দেবে।
কিন্তু নোবেল ভুল হিসেব করেছিলেন। যুদ্ধ চলতেই থাকলো। কোনো জাতি ভীত হয়ে পিছু হটেনি। বিলুপ্ত হয়নি সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে বিখ্যাত নোবেলজয়ীদের কেউ কেউ বলেছেন, নোবেল তার জীবনের সেরা কাজ নিয়ে অনুশোচনায় ভুগতেন। আর সে আক্ষেপ ঢাকতেই নোবেল পুরষ্কার চালু করেছিলেন তিনি। এদের মধ্যে ১৯২১ সালে পদার্থে নোবেল পাওয়া আলবার্ট আইনস্টাইনও রয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে ফেলা আনবিক বোমাগুলো তৈরিতে তার গবেষণার ভূমিকা ছিল।  
১৯৪৫ সালে দেয়া এক ভাষণে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন, নোবেল তার সময়কালের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরক আবিষ্কার করেছিলেন। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কার্যকরী একটি উপায় বের করেছিলেন। নিজের এই অর্জনের প্রায়শ্চিত্ত করতে ও নিজেকের বিবেককে স্বস্তি দিতে তিনি শান্তির প্রচারণায় পুরষ্কার চালু করেছিলেন।

সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে অন্য এক সম্রাট: একমাত্র বাংলাদেশি পাইজা চেয়ারম্যান by মিজানুর রহমান

বাংলাদেশি ক্যাসিনো সম্রাটদের দেখা পাচ্ছেন না সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস বা এমবিএস-এ নিয়মিত যাতায়াতকারী জুয়াড়িরা। গল্প-আড্ডায় তাদের স্মৃতি আওড়াচ্ছেন তারা। কত কথা, কত কাহিনীর জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশি গেমলাররা। ঢাকার সম্রাট সিঙ্গাপুরেও ছিলেন নাম্বার ওয়ান। যে ক’জন জুয়াড়ি জিতে কিংবা হেরে পাইজা চেয়ারম্যান কার্ড অর্জন করেছেন সম্রাট তার অন্যতম। তার সর্বশেষ খেলা ছিল এমবিএস-এর পাইজা রুমে। যার অবস্থান ক্যাসিনোর তৃতীয় তলার এক্সক্লুসিভ জোনে। ওই এলাকায় সাধারণ জুয়াড়িদের পা ফেলা বারণ।
তবে একজন পাইজা মেম্বার নারী বা পুরুষ দু’জন সহযোগীকে স্পন্সর করতে পারেন।
ওই অঙ্গনে চীনা বংশোদ্ভূত এক পাইজা প্লাটিনাম মেম্বারের সহযোগী হিসেবে যাতায়াতকারী সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলের এক বাসিন্দা মানবজমিনকে বলেন, যেকোনো ক্যাসিনোর জন্য পাইজা মেম্বার হীরার টুকরার মতো, মূল্যবান। মিলিয়ন ডলার খেলে ধাপে ধাপে এটি অর্জন করতে হয়। পাইজা মেম্বারদের আবার অনেকগুলো স্তর আছে। পয়েন্ট রেট সুযোগ-সুবিধায় ফারাক অনেক। এটি অর্জনে একেক দেশে একেক নিয়ম। দুনিয়াসেরা লাসভেগাস বা মিশিগানের এমজিএম ক্যাসিনো কিংবা চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মেকাও সর্বত্রই সমাদৃত পাইজা মেম্বাররা। তবে তাদের সুবিধাদি ভিন্ন। দেশভেদে তারতম্য হয়।
ক্যাসিনো-জুয়াড়ি ইসমাঈল হোসেন সম্রাট সত্যিই এক বিস্ময়। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যিনি পাইজা প্রিমিয়াম, পাইজা প্লাটিনাম এই দুই ধাপ উতরিয়েছেন। এরপর অর্জন করেছেন পাইজা চেয়ারম্যানের খেতাব। সিঙ্গাপুরে পৌঁছেই টের পাই, সম্রাটকে চেনেন না এমন প্রবাসী বাংলাদেশি কম। জুয়া যেহেতু বৈধ, তাই এ নিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে বেগ পেতে হলো না। সম্রাটের নাইট লাইফের নানান চাঞ্চল্যকর কাহিনী সিঙ্গাপুরের বসবাসরত বাংলাদেশি জুয়াড়িদের মুখে মুখে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মুকুটহীন সম্রাট। পাইজা চেয়ারম্যান হিসেবে তার আগমন হতো বাদশাহী স্টাইলে। আগেই চুঙ্গি এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ থাকতো মেরিনা বে সুপরিচিত ব্ল্যাক লিমুজিন হাই সুপার কার। সম্রাট নামতেন সম্রাটের মতোই। ইমিগ্রেশনের বাইরে থাকতো প্রটোকল। ক্যাসিনো কাম লাক্সারি হোটেল মেরিনা বে সেন্ডস-এর একজন ম্যানেজার ফুলেল শুভেচ্ছায় তাকে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন এবং এস্কট করে নিয়ে যেতেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠরাও ওই এস্কট বা প্রটোকলের বেষ্টনীতে ঢুকতে পারতেন না। সিঙ্গাপুরের আইনে বরাবরই বড় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার অপশন এবং প্রমোশন রয়েছে।
কত ডলার নিয়ে ঢুকছেন? এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশনে জেরবার হন অনেকে। বিশেষ করে বাঙালিরা। কিন্তু ‘সম্রাট বাঙালি’ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, অন্য রকম উচ্চতায়। বলাবলি আছে জুয়াড়ি হিসেবে সম্রাটের ট্র্যাক রেকর্ডে ক্রম উন্নতির দ্বিতীয় ধাপেই ঢাকায় সরজমিন লোক পাঠিয়ে আমেরিকান কোম্পানি মেরিন বে সেন্ডস ক্যাসিনো তার অর্থকড়ি এবং পারিবারিক বন্ধনের তথ্য নিয়েছে। ইতিবাচক রিপোর্টই এসেছিল। ক্যাসিনো গেমলারদের ‘গোম্বল রেসপনসিবিলিটি’র অংশ হিসেবে প্রত্যেক বড় জুয়াড়ির পারিবারিক বন্ধনের তথ্য সংগ্রহে সিঙ্গাপুরের আইনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এবং ক্যাসিনো প্রশাসনের লোকজনের ব্রিফ তাই বলছে। ক্যাসিনোর কঠোর নীতি-বিধান মানলে সম্রাটের সংসারে এমন হাল হতো না- ছবি দেখে এমনটাই বললেন চীনা বংশোদ্ভূত এক জুয়াড়ি। তার মতে, সম্রাটের বিপদ কাটেনি। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর স্টেটম্যান্ট আমলে নিলে অন্তত এক বছরের জন্য সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে নিষিদ্ধ হবেন তিনি। শুধু তাই নয়, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল কাউন্সিল অব প্রবলেম গাম্বলিং (এনসিপিজি)-এর কাউন্সেলিংয়ের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। এমনটাই বলছেন ক্যাসিনো আইন বিশারদরা।
বিমানবন্দরে সম্রাট যে প্রটোকল পেতেন এটা পাইজা প্লাটিনাম থেকে শুরু করে ডায়মন্ড এবং সর্বোচ্চ চেয়ারম্যান পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল জুয়াড়িরা পেয়ে থাকেন। তাদের ৩টি বিশেষ প্রাপ্যতার প্রধান প্রাপ্য এটি। সম্রাট তা পেতেন। এটা বড় কিছু নয়। একজন পাইজা চেয়ারম্যানের জন্য এটা ডাল-ভাতই বলা যায়। তবে বাড়তি বিষয় ছিল তার জন্য আগে থেকেই মেরিনা বে সেন্ডস-এর লাক্সারি স্যুট বুকিং। মেম্বার বা চেয়ারম্যানশিপ কার্ডের সঙ্গে হোটেল স্যুটের বিলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কয়েক হাজার ডলার। খেলায় জয়ী হলে পয়েন্ট দিয়ে বিল পরিশোধের সুযোগ থাকে। অন্যথায় ক্রেডিট কার্ড বা নগদে পরিশোধ করতে হয়। স্যুট বরাবরই এনজয় করতেন সম্রাট। তিনি বাইরে থেকেছেন এমন আলামত পাওয়া যায়নি। ওই স্যুটে সম্রাটের মতো বড় জুয়াড়িদের সুযোগ-সুবিধা অনেক। হোটেল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা মতে, এটাই ভিআইপি গেস্টরা বেশি এনজয় করেন। স্যুটে থাকা গেস্টদের বড় সুবিধা হচ্ছে আরলি চেক ইন অ্যান্ড লেট চেক আউট। সম্রাটের খেলার এক চাইনিজ পার্টনার বলছিলেন- সম্রাট আসতেন দেরিতে। ওই রুমে এসে নাস্তা করতেন। পাইজা রুমের সান্ধ্যকালীন স্পেশাল এক্সক্লুসিভ অফার স্পাগু ডিশ তার পছন্দের ছিল।
‘ক্যাসিনো সম্রাট’ ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নেশা ও ‘পেশা’ ছিল জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। আলোচিত এই সম্রাট টাকার বস্তা নিয়ে জুয়া খেলতে সিঙ্গাপুরে যেতেন- ঢাকায় এমনটা বলাবলি আছে তার আত্মগোপন এবং আটকের পর থেকেই। মাসে অন্তত ১০ দিন তিনি সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন- এমন কথাও চালু আছে ঢাকায়। কিন্তু না, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকার-প্রফেশনাল থেকে শুরু করে সাধারণ বাংলাদেশি ওয়ার্কার, যারা দিন দুনিয়ার খবর রাখেন তারা এ বক্তব্যের সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাদের মতে, সম্রাট তো নয়ই, খুচরা জুয়াড়িদেরও ঢাকা থেকে টাকা বা ডলার এনে সিঙ্গাপুরে খেলতে হয় না। এখানে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার নিয়ে বসে আছেন দেশি-বিদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। তারা শুধু আশীর্বাদ আর নিরাপদ লেনদেনের নিশ্চয়তার কাঙ্গাল। অন্য কিছু নয়।
উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে সেন্ডস ক্যাসিনোতে পূর্ব-পশ্চিম, কাছের-দূরের বিভিন্ন দেশ থেকে জুয়াড়িরা আসেন। তাদের কাণ্ডকারখানা সরজমিন দেখেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের সঙ্গে তার কেটেছে দুটি নির্ঘুম রাত। বাংলাদেশি জোয়ান-বুড়ো নানা বয়সী অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। পেশাগত প্রয়োজনে ওই ক্যাসিনোর প্রাথমিক (প্রিমিয়াম) সদস্যপদ পূরণ করা এবং তার সুবাদে সহযোগী হিসেবে এক গোল্ডকার্ডধারীর সঙ্গে দ্বিতীয়তলার এক্সক্লুসিভ রুমে খেলা দেখা, কমপ্লিমেন্টারি খাওয়া, আড্ডায় পরিচিত অনেকের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জুয়াড়ি কেবল সম্রাট বা তার নিয়মিত সঙ্গী যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, বাবুল আর নাম জানা এই ক’জন নয়। সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে পা পড়েছে এমন হাই ক্লাস বাংলাদেশির সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তালিকা অনেক দীর্ঘ। শখের বশে হলেও অনেকে এখানে খেলেছেন, খেলছেন। জুনিয়র সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের নিয়মিত দেখা মিলে সেখানে। নারী জুয়াড়ি এবং মিডিয়া মুঘলরাও যান, তবে অনিয়মিত।

এনআরসি: 'বাবার মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিক সরকার, আমরা নেব না' by অমিতাভ ভট্টশালী

দুলাল পাল ও তার জামির দলিল
'বিদেশি' হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আটক-শিবিরে বন্দী আসামের এক প্রবীণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিবার বলছে, তারা মৃতদেহ নিতে চান না।
"বাবাকে যখন বিদেশি বলেই ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে বাংলাদেশেই পাঠিয়ে দিক দেহ, আমরা নেব না," বলছিলেন দু'বছর আটক থেকে মারা যাওয়া দুলাল পালের ছেলে আশিস।
প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে মৃত ব্যক্তিকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল বিদেশি বলে ঘোষণা করার পরেই তাকে আটক করে তেজপুর জেলের ভেতরে যে আটক-শিবির রয়েছে, সেখানে রাখা হয়েছিল।
শোনিতপুরের ডেপুটি কমিশনার মানবেন্দ্র প্রতাপ সিং বিবিসিকে জানিয়েছেন, "মাস-খানেক আগে মি. পাল আটক-শিবিরে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার মানসিক ব্যাধি ছিলই, এর সঙ্গে যোগ হয় ডায়াবেটিসও। গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে তার চিকিৎসা চলছিল। সেখানেই তিনি গত রবিবার মারা যান।"
শোনিতপুর জেলার আলিসিঙ্গা-রবারতলার বাসিন্দা দুলাল পাল যে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন, সেটা জানিয়েছে তার পরিবারও।
সেই অবস্থাতেই তাকে আটক করে রাখা হয়েছিল ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে।
"১৯৬৫ সালে জমি কেনার দলিল রয়েছে আমদের। সেটাই তো প্রমাণ যে আমার বাবা ৭১-এর আগে এসেছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেটা মানল না। বাবা বা আমাদের ভাইদের কারও নামই এনআরসিতে ওঠে নি," বলছিলেন আশিস পাল।
মি. পালের মা ঘরেই মাটির জিনিসপত্র তৈরি করেন, আর তিনি নিজে গ্যারেজে কাজ করেন।
জমি আর মায়ের সামান্য সোনার গয়না বিক্রি করে বাবাকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করার জন্য মামলা লড়তে হয়েছে তাদের। কোনদিনই তিন-বেলা ভরপেট খেতে পারেন না তারা।
"কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে আমাদের। এত কিছু করেও বাবাকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে পারি নি।"
জীবিত অবস্থায় যখন তাকে বিদেশি বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে আমরা কেন দেহ নেব? আগে লিখিতভাবে প্রশাসন জানাক যে আমার বাবা ভারতীয় ছিলেন, তবেই দেহ নেব," ক্ষোভ আশিস পালের।
এ নিয়ে প্রশাসন পড়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে।
ডেপুটি কমিশনার মি. সিং বলছিলেন, "তাকে বিদেশি বলে ঘোষণা করেছিল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। যে কোনও কারণেই হোক তিনি একবারও ভোট দেন নি। সে জন্যই তার নাম প্রথমে 'ডি-ভোটার' করা হয়েছিল, তারপরে ট্রাইব্যুনালেও তিনি প্রমাণ দিতে পারেন নি যে তিনি বিদেশি নন। সেক্ষেত্রে আমাদের তো করার কিছু নেই। আমরা তো ট্রাইব্যুনালের আদেশ বদলাতে পারি না।"
গত তিন দিন ধরে প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আশিস পাল আর তার পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আইনি সহায়তা, মরদেহ গুয়াহাটি থেকে শোনিতপুরে নিয়ে আসার ব্যবস্থাসহ নানা সাহায্য করতেও তারা প্রস্তুত বলে জানাচ্ছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
একই সঙ্গে কীভাবে আটক অবস্থাতেই মৃত্যু হল দুলাল পালের, তা তদন্ত করে দেখার নির্দেশ জারি করেছেন শোনিতপুরের ডেপুটি কমিশনার মানবেন্দ্র প্রতাপ সিং।
এখনও দুলাল পালের মৃতদেহ গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজের মর্গেই রাখা রয়েছে। আর ওদিকে তার বাড়িতে পরিবার পরিজন হিন্দু শাস্ত্র মতে অশৌচও পালন করতে পারছেন না দেহ সৎকার না হওয়ায়।
তার ছেলে বলছিলেন, "বাবাকে দাহ করা হয় নি, তাই আমরা শুধু ফলটল খেয়ে আছি।"
প্রয়াত দুলাল পালের পরিবারের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা

রাজনীতিতে আবারও ভারত বিরোধিতা, বিএনপি সবচেয়ে সরব by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ভারত বিরোধিতা প্রকাশ্যে জোরালোভাবে দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর বিরোধীদল বিএনপি সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছে।
দলটির নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো বাদ দিয়ে একতরফা কিছু সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিএনপি তার প্রতিবাদ করছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সাথে সিদ্ধান্ত বা চুক্তিগুলো নিয়ে বারবার ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও কেন ভারত বিরোধিতা, এই প্রশ্নে দলগুলোর পাশাপাশি বিশ্লেষকরাও বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরছেন।

বিএনপির ভারত বিরোধী অবস্থান প্রকাশ্যে

দলটি দু'দিন আগে ঢাকায় যে সমাবেশ করেছে, এর মূল বিষয়ই ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতিবাদ করা।
সমাবেশে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেই ছিল ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কড়া সমালোচনা।
সাত আট বছর পর বিএনপি আবার প্রকাশ্যে ভারত বিরোধী অবস্থান নিয়ে এই সমাবেশ করে।
২০১২ সালের অক্টোবরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সে সময় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেছিলেন। এরপর থেকে জেলে যাওয়া পর্যন্ত বিএনপি নেত্রী ভারতের বিরোধিতা বা সমালোচনা করে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি।
এমনকি চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর নিয়ে বিএনপি আগে রক্ষণশীল অবস্থানে থাকলেও গত বছর যখন এই বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয়, তখন দলটি সতর্ক বক্তব্য তুলে ধরেছিল বিবৃতির মাধ্যমে।
কিন্তু এখন আবার ভারত বিরোধী অবস্থান নিয়ে মাঠে নামার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরে ভারতের স্বার্থে একতরফা সব চুক্তি হয়েছে, সেকারণে তারা প্রতিবাদ করছেন।
"একতরফাভাবেতো বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধুত্ব হচ্ছে টু ওয়ে ট্রাফিক। দেয়া নেয়ার ক্ষেত্রেতো একটা সমতা থাকতে হবে, একটা ন্যায্যতা থাকতে হবে। সেখানে আমরা দেখছি একটা বড় ধরণের অভাব বা ঘাটতি থাকছে।"
"তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কিছু করা হলো না। কিন্তু হঠাৎ করে ফেনী নদী থেকে পানি দিয়ে দেয়া হলো। এখানেই মানুষের মাঝে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।"
বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী আরও বলেছেন, "বাংলাদেশের জনগণ মনে করে, দুই দেশের জনগণের মাঝে বন্ধুত্ব নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলকে তারা আস্থায় নিয়ে তাদেরকে দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিষয়গুলো করিয়ে নেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের যে প্রতিক্রিয়া, সেই প্রতিক্রিয়াই আমরা তুলে ধরছি।"

বিএনপির ভারত বিরোধী অবস্থান পরিচিত ছিল, এখন তাহলে তাদের অবস্থান কেন আলোচনায় আসছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে তিস্তা নদীর পানি বন্টন ইস্যুসহ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়গুলোতে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।
এর বিরোধিতা করে ইসলামপন্থী কয়েকটি দল মাঠে নামে।
এরমধ্যে ভারত ইস্যুতে দীর্ঘসময় সতর্ক থাকা বিএনপি আবার মাঠে নামায় তাদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
কারণ দলটির পক্ষ থেকে গত কয়েক বছর ভারতের সাথে একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি চেষ্টা অনেকসময় দৃশ্যমান হয়েছে।
বিএনপি সিনিয়র কয়েকজন নেতা গত বছর ভারত সফরেও গিয়েছিলেন।
দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, তাদের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টায় ভারতে সেভাবে সাড়া দেয়নি, সেকারণে দলটির এমন চেষ্টার সাথে জড়িত অংশটি কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ফলে বিএনপিতে ভারত বিরোধিতার বিষয়টি আবার মাথা চাড়া দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে আবার বলছেন, ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও এটি বিএনপির একটি কৌশল হতে পারে।

আওয়ামী লীগ কেন বারবার ব্যাখ্যা দিচ্ছে?

আওয়ামী লীগ বা সরকারও ভারতের সাথে চুক্তিগুলো নিয়ে যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলছেন, "বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ইস্যু পাচ্ছে না। সেকারণে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। এটা তাদের সস্তা রাজনীতি।"
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বিএনপি জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সেজন্য সরকার সঠিক তথ্য তুলে ধরছে।
তবে দলটির অন্য একাধিক নেতার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, আওয়ামী লীগ এবং সরকার ভারতের সাথে ভাল সম্পর্ক বহাল রাখছে। একইসাথে মানুষের মাঝে আবার ভারত বিরোধী মনোভাব জোরালো হচ্ছে কিনা, সেটাও তারা নজরে রাখছে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য:

বড় প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি বিএনপিও বিবেচনায় নিয়েছিল। সেকারণে লম্বা সময় বাংলাদেশে রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতা সেভাবে ছিল না।
কিন্তু বিএনপির সেই কৌশলে ফল তারা পাচ্ছে না। সেকারণে এখন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়গুলোর সুযোগ নিয়ে বিএনপি মাঠে নেমেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুকসানা কিবরিয়া বলেছেন, বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলোতে ভারতের উদাসীনতার কারণে ভারত বিরোধিতা পুরোনো পরিবেশ ফিরে আসছে।
"আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে ভারত সফর করলেন, তারপর রাজনৈতিক একটা ইস্যু তৈরি হয়ে গেছে। একটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বিষয়গুলোতে সমাধান আসেনি। এখন এটা রাজনীতি। এগুলো এখন যে যেভাবে পারবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।"
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার ভারত সফর। ছবিতে আরো দেখা যাচ্ছে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদকে (ফাইল চিত্র)

সম্রাটের মুখে কুশীলবদের নাম by রুদ্র মিজান

ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অপরাধ জগতে সহযোগী কুশীলবদের নাম ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের মুখে। আড়ালে থাকা গডফাদারদের প্রশ্রয়ে অল্পদিনেই টাকার পাহাড় গড়েছেন সম্রাট। ওই টাকার ভাগ পেতেন আড়ালে থাকা কুশীলবরা। সেই কুশীলব, টাকা ও অস্ত্রের সন্ধান করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রিমান্ডে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে সম্রাটকে। প্রথম দিনই গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন যুবলীগ নেতা সম্রাট। সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রমনা থানায় দায়েরকৃত মামলা দুটি থানা পুলিশ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে র‌্যাবে।
গতকাল ডিবির হেফাজতে থাকা সম্রাট ও আরমানকে র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ক্যাসিনো কারবারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করে র‌্যাব। র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (এএসপি) মিজানুর রহমান মানবজমিনকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় থেকে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও এনামুল হক আরমানকে র‌্যাবে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা দুটি তদন্ত করবে র‌্যাব। বুধবার রাতে র‌্যাবকে মামলা দুটি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। সূত্রমতে, শুরু থেকেই সম্রাট ও আরমানের রিমান্ডের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। রিমান্ডের প্রথম দিনই ডিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি টিম সম্রাট ও আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। শিগগিরই তাদের জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেলে মুুখোমুখি (জেআইসি) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রস্তুতি ছিলো ডিবি পুলিশের। এরমধ্যেই  মামলা হস্তান্তর করা হয়েছে র‌্যাবে। তবে ডিবি পুলিশ ও র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন সম্রাট। সূত্রে জানা গেছে, সম্রাট আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শীর্ষ স্থানীয় একডজনেরও বেশি নেতার নাম প্রকাশ করেছেন। যারা নিয়মিত তার কাছ থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন। সম্রাটের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন এরকম কয়েক পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট বলেছেন, ক্যাসিনোর টাকার ভাগতো অনেকেই পেয়েছেন।
এ জন্য শুধু আমাকে দায়ী করা হচ্ছে কেন? কাকরাইল, ফকিরাপুল, কমলাপুর, মতিঝিল এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে গেলেই চাঁদা দিতো হতো সম্রাটকে। চাঁদার জন্য হুমকি-ধমকি দিতো তার লোকজন। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি মার্কেট থেকে আসতো কোটি কোটি টাকা। সিটি করপোরেশনের মার্কেটগুলোতে অবৈধভাবে দোকান তৈরি করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করতো সম্রাটের অনুসারীরা। গোয়েন্দা তথ্যানুসারে গুলিস্তানের বঙ্গবাজারের সিটি প্লাজা, জাকের মার্কেট, নগর প্লাজা, মহানগর কমপ্লেক্স, আদর্শ মার্কেট, সুন্দরবন স্কয়ারসহ বিভিন্ন মার্কেট থেকে এসব টাকা আসতো সম্রাটের কাছে। সিটি প্লাজা, জাকের মার্কেট ও নগরপ্লাজায় সহস্রাধিক অবৈধ দোকান তৈরি করে প্রতি দোকান থেকে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছে এই চক্র। টাকা না পেলে দোকানে তালা দিয়ে দিতো চক্রের সদস্যরা। এমনকি সিটি করপোরেশন থেকে বৈধ কাগজ করে দেয়ার নামে দ্বিতীয় দফা গত ফেব্রুয়ারতিে আরও ১০ থেকে ১৫ লাখ করে টাকা নেয়। সবই হতো সম্রাটের প্রশ্রয়ে। সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পরপর এসব মার্কেট চক্রের হোতা দেলোয়ার হোসেন দিলুসহ অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। এসব মার্কেট থেকে কত টাকা আসতো, এই চক্রে কারা জড়িত? কোন কোন ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজি করেছেন? এসব বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে সম্রাটকে। জানা গেছে, বিভিন্ন অবৈধ খাত থেকে উপার্জিত টাকার ভাগ যারা নিতেন তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শীর্ষ কয়েক নেতার নাম প্রকাশ করেছেন সম্রাট।
ইতিমধ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এডভোকেট মোল্লা আবু কাওছার,  যুবলীগ নেতা নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। সম্রাটের কাছ থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন এমন তালিকায় রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতাও রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন, উপাজির্ত অর্থ দিয়ে দলের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করতেন তিনি। এমনকি দলের কর্মীদের সহযোগিতা করতেন। নিজের ব্যক্তিগত কাজে তেমন টাকা ব্যয় করেননি বলে জানান তিনি। ঘনঘন বিদেশে গিয়ে মূলত জুয়া খেলতেন।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে তার বাড়ি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে কোথায় কোন ব্যাংকে তার টাকা রয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বারবার জানতে চাইলেও কৌশলে তা এড়িয়ে যান সম্রাট। কখনও কখনও রহস্যময় নিরবতা পালন করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থবোধ করছেন বলে জানান। এসময় সচেতনতার সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
উল্লেখ্য, মাদক ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুই মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১৫ই অক্টোবর ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। একইভাবে সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের প্রথম দিনই গ্রেপ্তার করা হয় সম্রাটের সহযোগী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। তারপর থেকেই আতঙ্কে ছিলেন সম্রাট। গ্রেপ্তার এড়াতে কর্মি বেষ্টিত অবস্থায় কয়েক দিন নিজের কাকরাইলের অফিসে থাকলেও পরে আত্মগোপনে চলে যান। গত ৬ই অক্টোবর কুমিল্লা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

মানবাধিকারের নতুন কী সংজ্ঞা দিচ্ছেন অমিত শাহ? by শুভজ্যোতি ঘোষ

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ
পশ্চিমী দুনিয়া মানবাধিকারের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে তা ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না - ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই মন্তব্য করার পর দেশের শীর্ষ মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলো তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জঙ্গী বা মাওবাদী বিদ্রোহীদের হাতে দেশে যে সব সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছেন - একটা 'ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গী' নিয়ে তাদের মানবাধিকারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তবে ভারতের মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, ভারতের সংবিধান বা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা যতক্ষণ বজায় আছে, ততক্ষণ এভাবে মানবাধিকারের সংজ্ঞা পাল্টে দেওয়ার চেষ্টাটাই সম্পূর্ণ অনৈতিক।
সম্প্রতি ভারতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিষ্ঠা দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতের পটভূমিতে মানবাধিকারের যে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।
তিনি সেখানে বলেন, "হেফাজতে মৃত্যু বা পুলিশি নির্যাতন নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা যত হইচই করেন, আসলে তার চেয়েও বেশি করা উচিত নকশাল বা জঙ্গীদের হাতে নিহত সাধারণ মানুষদের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে।"
তিনি আরও বলেন, "আন্তর্জাতিক বিশ্ব মানবাধিকারের যে মাপকাঠি স্থির করেছে তা ভারতের জন্য উপযুক্ত হতে পারে না।"
"আমাদের দেশের সমস্যাগুলো কী, সেটা আগে বুঝে নিয়ে সেইভাবে ভারতে মানবাধিকারকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে, নতুন মাত্রা দিয়ে দেখতে হবে।"
দেশের সব মানুষের মাথার ওপর ছাদ দেওয়া, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাস পৌঁছে দেওয়া, মেয়েদের শৌচাগারের ব্যবস্থা করা - এই সব মানবাধিকার নিশ্চিত করাই ভারতের অগ্রাধিকার, জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এই মৌলিক অধিকারগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছেন না ভারতের অগ্রণী অ্যাক্টিভিস্টরাও - কিন্তু তারা সেই সঙ্গেই বলছেন তার মানে এই নয় যে রাষ্ট্র হিসেবে ভারত অন্য মানবাধিকারগুলো রক্ষার দায় এড়িয়ে যাবে।
ভারতের সুপরিচিত মানবাধিকার আইনজীবী নন্দিতা হাকসার যেমন বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "অমিত শাহ যা-ই বলুন ভারত কিন্তু এখনও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। তিনি কি সেখান থেকেও সরে আসতে চান?"
"সংবিধানের পার্ট থ্রি-তে বা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মানবাধিকার যেভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে সেটাও কি তিনি মানতে চান না?"
"ভারত বা চীন মাঝে মাঝেই এই ধরনের যুক্তি দিয়ে থাকে বটে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ভারতের একটা আন্তর্জাতিক কমিটমেন্ট আছে বা সংবিধান না-বদলানো হচ্ছে ততক্ষণ এই সব কথার অর্থ কী?"
"কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করার সময় এরাই বলেছিলেন কাশ্মীরিরা না কি মানবাধিকার মানেন না। কিন্তু এখন তো এরাই দেশের সংবিধান মানছেন না।"
দিনকয়েক আগে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর এক নারী জওয়ানের দেওয়া একটি ভাষণও ভাইরাল হয়েছে - যেখানে তিনি বলেছিলেন পুলওয়ামাতে জঙ্গী হামলায় নিহত সেনাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কে কবে ভেবেছে?
অমিত শাহ নিজেও বারবার কাশ্মীরে বা মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় নিহতদের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটা নতুন ব্যাখ্যা পেশ করতে চেয়েছেন।
তবে মানবাধিকার কর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট অমিত ভট্টাচার্যর মতে তার এই যুক্তিতে একটা গোড়ায় গলদ আছে।
অধ্যাপক ভট্টাচার্যর কথায়, "ভিক্টিম কাকে বলব? তার আগে ভাবুন, অস্ত্র কাদের হাতে থাকে? স্টেট বা রাষ্ট্রের হাতে থাকে। সমস্ত অত্যাধুনিক অস্ত্র স্টেটের হাতে থাকে, এবং তাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কেউ নেই।"
"আর এই সব অস্ত্রই রাষ্ট্র ব্যবহার করে থাকে এই স্টেট সিস্টেমটার অস্তিত্ত্ব টিঁকিয়ে রাখতে। যারা এই সিস্টেম মানবে না তাদের বিরুদ্ধেই নির্বিচারে এই সব অস্ত্রর প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।"
"এমন কী মেরে ফেলাও কোনও ব্যাপার নয় - রাষ্ট্রের হাতে ফেক বা সাজানো এনকাউন্টার তো প্রতিনিয়ত হচ্ছে।"
"কিন্তু একটা সময় মানুষও যখন পাল্টা রুখে দাঁড়ায়, আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেয় তখনই এই প্রশ্নগুলো ওঠে।"
"দুজন সশস্ত্র যোদ্ধার মধ্যে লড়াইটা তবু বুঝলাম, কিন্তু যখন একজন নিরস্ত্র মানুষকে কাস্টডিতে নিয়ে টর্চার করে মেরে ফেলা হচ্ছে কিংবা নিরস্ত্র গ্রামবাসী-আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে তখন সিভিল লিবার্টি অ্যাক্টিভিস্টরা কীভাবে নীরব থাকবেন?", প্রশ্ন তুলছেন তিনি।
কিন্তু ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখন এটাও উপলব্ধি করছে - দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মানবাধিকারের গোটা বিষয়টাকেই সরকার এখন যে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করতে চাইছে, তাদের এখন লড়তে হবে সেই ন্যারেটিভের সঙ্গেও।

গ্রামীণফোন ও রবিতে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার by সায়েদুল ইসলাম

বাংলাদেশের প্রধান দুইটি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণ ফোন এবং রবি-আজিয়াটায় প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে গ্রামীণফোনের কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসির পাওনা দাবি ১২৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায়ের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার বাংলাদেশের টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বিটিআরসি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাব পাঠায় ।
বৃহস্পতিবার ওই প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ''প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপারে বিটিআরসি একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। আজ আমরা সেই প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছি। এখন বিটিআরসি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।''
এদিকে, বড় দুইটি বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করা হলে, সেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেবে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, ''এতে নেতিবাচক বার্তা দেয়ার কী আছে? সরকার জনগণের পাওয়া টাকা আদায়ের জন্য ব্যবস্থা নেবে না?
এখানে তো জোর করে কিছু করা হচ্ছে না। জনগণের প্রাপ্য টাকা আদায়ের জন্য সরকারকে তো পদক্ষেপ নিতেই হবে।''
বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলছেন, "এখন আমরা প্রশাসক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত লোকজন দেখতে শুরু করবো। এরপর সেখানে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে।"
তবে কতদিনের মধ্যে এটি করা হবে, তা এখনি বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
বিটিআরসি দাবি করে আসছে, গ্রামীনফোন এবং রবি, এই দু'টি কোম্পানির কাছে ২০ বছরে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। অডিট করে তারা এটি জানতে পেরেছে।
এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে পাওনা ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।
কিন্তু মোবাইল কোম্পানি দুটো বলছে, টাকার অংক নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
এর মধ্যে সরকারের একজন মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় আংশিক টাকা দিয়ে আপাতত একটি সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা হলেও, তাতে মোবাইল ফোন কোম্পানি দুইটি রাজি হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশে ১৬ কোটির বেশি মোবাইল ফোন গ্রাহক রয়েছে। তার তিন-চতুর্থাংশ রয়েছে এই দুটি কোম্পানির।
প্রশাসক নিয়োগ করলে কী হবে?
কোন কোম্পানি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে কোম্পানি আইন অনুসারে সরকারে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে।
সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে এই প্রশাসকরা তখন কোম্পানি পরিচালনা করবেন।
গ্রামীণ ফোন এবং রবি, প্রতিটা কোম্পানির ক্ষেত্রে চারজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। তাদের একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকবেন। বাকি তিনজনের একজন আইন, আরেকজন প্রকৌশল, অপরজন অর্থ এবং বাজারজাত করণ বিশেষজ্ঞ থাকছেন।
বিটিআরসি আশা করছে, প্রশাসকরা দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের পাওয়া নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান হবে।
গত ২রা এপ্রিল গ্রামীণফোনকে একটি নোটিশের মাধ্যমে বিটিআরসিকে ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৪ হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রদান করার নির্দেশ দেয় বিটিআরসি।
বিটিআরসির নিয়োগ করা একটি অডিট ফার্ম ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে এই বকেয়া তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদন দেয়।
এই পাওনার মধ্যে ৪০৮৬ কোটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পাওনা - যেটাও জুড়ে দেয়া হয়েছে।
তবে এই অর্থ নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেছে গ্রামীণ ফোন এবং রবি আজিয়াটা লিমিটেড।
গ্রামীণফোন একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, যেসব কারণ দেখিয়ে বিটিআরসি এই অর্থ দাবি করছে তা অযৌক্তিক।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৬ কোটির বেশি মোবাইল গ্রাহক রয়েছে

ফরিদপুরে দুই ভাইয়ের ত্রাসের রাজত্ব by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

এক রাজ্যে দুই রাজা। গোটা রাজত্বেই চলছে তাদের খবরদারি। কুশাসন আর নির্যাতন। ভয়ে-আতঙ্কে নীরব সবাই। এ দুই রাজা হলেন- আপন দুই ভাই। এখন রাজ্য শাসন করলেও এক সময় তারা বাস-ট্রাকের হেলপারের কাজ করেছেন। ছিলেন অন্যের দোকানের কর্মচারি। কোন মতে জীবন চলতো তাদের।
আর এখন তাদের আলিশান জীবন। চলেন দামি গাড়িতে। তাদের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস নেই কারও। বলতে গেলে পুরো জেলা শহর তাদের নিয়ন্ত্রণে। নানা অপকর্ম জোর জবরদস্তি করে নিজেদের কব্জায় নিয়েছেন অন্যের বাড়ি, দোকান, জমি। তাদের ইশারা ছাড়া ফরিদপুর শহরে কিছুই নড়ে না। সাধারণ জীবন থেকে রাজনীতির ছোঁয়ায় ক্ষমতাধর হয়ে উঠা এই দুই ভাই হলেন ফরিদপুর শহর যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। অর্থ আর সম্পদের লোভে এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়ান এ দুই ভাই। পরে ক্ষমতা বদলের পর তারাও রূপ বদলান। রাজনীতিকে ব্যবহার করে ত্রাস হয়ে ওঠেন ফরিদপুরের। তাদের দাপটে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এখন কোনঠাসা। কেউ কেউ অপমানে, অভিমানে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। আর যারা আছেন তারা দুই ভাগে বিভক্ত। এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অনেক। এসব অভিযোগ জমা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। এছাড়া একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে।

বরকত ও রুবেলের বাবা আবদুস সালাম মন্ডল ছিলেন বিএডিসির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। অভাবের সংসারের কারণে পড়ালেখা বেশিদূর করতে পারেননি তারা। এরশাদের জমানায় ফরিদপুর শহরের রাজবাড়ী মোড়ে পরিবহনে চাঁদা উঠাতেন দুই ভাই। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পরিচয় হয় স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে। এরপর থেকে ওই নেতার ঘনিষ্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই সময় কোমরপুর এলাকার জাকির নামের এক যুবকের দুই হাত কেটে প্রথম আলোচনায় আসেন দুই ভাই। পরে ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এডভোকেট মহিউদ্দিন খোকনকে হত্যার অভিযোগ উঠে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে। আসামি করা হয় ১ ও ৩ নম্বর। এরপর গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দেন তারা। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিহত খোকনের বাড়িতে যান সমবেদনা জানাতে। অভিযোগ রয়েছে অদৃশ্য ইশারায় পার পেয়ে যান এই দুই ভাই। হত্যা মামলার রায়েও খালাস পান তারা। ফের প্রকাশ্যে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

ক্ষমতার পালা বদলে তারা ভিড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। সান্নিধ্যে আসেন ফরিদপুর আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার। এরপরই ভাগ্য খুলে যায় দুই ভাইয়ের। জড়িয়ে পড়েন টেন্ডারবাজিতে। দুই ভাইয়ের টেন্ডারবাজির কারণেই এলজিইডি অফিস ঝিলটুলী থেকে তাদের নিজবাড়ি বদরপুরে স্থানান্তর করার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ওই সময় জেলা যুবদল নেতা আফজাল হোসেন খান পলাশ মামলাও করেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পলাশকে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। একসময় ফরিদপুরের টেন্ডারবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন দুই ভাই। এলজিইডির সব টেন্ডারে নির্ধারিত ভাগ দিতে হয় তাদের। ওদিকে টেন্ডারবাজির পাশাপাশি মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করেন আলাদা সিন্ডিকেট। তাদের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন ভাগিনা সিদ্দিক ও জুয়েলকে। একধিকবার সিদ্দিক ও জুয়েল অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, আমার ছয়টি ঠিকাধারী লাইসেন্স বাতিল করেছি। নিজের দল ক্ষমতায় থাকতে কাউকে একটা চাঁদা দিয়ে আমি ঠিকাদারী করবো না। বিরোদীদল যখন ছিলো তখনই তো আমি কাউকে চাঁদা দেইনি। আর এখন দিবো? এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ফরিদপুরে শহরে সংখ্যালগু সম্প্রদায়ের বাড়ি দখল ও নির্যাতনের। শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের দক্ষিণ পাশে অরুণ গুহ নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের মাধ্যমে বিশাল বাড়ি দখল করে নেন তারা। পরে বাড়ির পাশে প্রধান কালী মন্দিরটিও ভেঙ্গে তাদের জায়গাটি দখল করে নেন। বাড়ি দখলের প্রতিবাদে ২০১৬ সালে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মানবন্ধন প্রতিবাদ করার কারণে সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক আলোক সেনকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তিনি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সরেজমিন গিয়ে বাড়ি দখল করার সত্যতা পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, বাড়িটি প্রথম একেবারে দখল করে নেয় বরকতের লোকজন। পরে যখন লেখালেখি হয়েছে, নামমাত্র মূল্য দিয়ে বাড়িটি তারা কিনেছে। এই বাড়ি হারানোর কষ্টে অরুণ গুহ বেশী দিন বাঁচেননি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফরিদপুর রাজবাড়ির চার রাস্তা মোড় সংলগ্ন বাইপাস রোডের পাশে এক কিলোমিটারজুড়ে নতুন একটি মার্কেট তৈরী করছেন বরকত। নাম মন্ডল মার্কেট। অভিযোগ রয়েছে এসব জমি তিনি অনেকের কাছ থেকে নামমাত্র টাকা দিয়ে কিনেছেন। কেউ জমি বিক্রি না করতে চাইলে, জমিটিতে মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়। তারপর  জোর করে নামমাত্র মূল্য দিয়ে জমিটি তার নামে করে ফেলেন। মার্কেটটিতে স্বর্নলতা কনফেকশনারীতে কথা হয় একজনের সাথে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, বরকত সাব যা চায়, তাই হয়। গত এক বছরের মধ্যে তিনি এই মার্কেটি করেছেন। সব দোকান নতুন। শহরে প্রবেশ করতেই কথা হয় আলাউদ্দিন নামে এক রিকশা চালকের সঙ্গে। বরকত আর রুবেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, মাস খানেক আগে ব্যাটারী চালিত রিকশা বন্ধ করে দিয়েছে শহরে। শুনেছি বরকত আর রুবেল নাকি নতুন গাড়ি নামাবে। আমাদের পেটে এভাবে লাথি মেরেছে তারা। এদিকে দুই ভাইয়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে কথা বলার সময় তাদের নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরাও ভয়ে কথা বলতে চাননি। যারা কথা বলেন তারাও নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন।

বরকতের সম্পদের যতটুকু খোঁজ পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে- ঝিলটুলী এলাকায় ১০তলা বাড়িসহ ১০ শতাংশ জমি, ধুলদিতে পাথর ভাঙ্গা কারখানাসহ ১৫ একর জমি, চন্ডিপুরে ১০ একর জমি, সিবরামপুরে ৩ একর জমি, চন্ডিপুরে পাম্পসহ ২ একর জমি, গঙ্গাবর্দিতে ২ একর জমি, বোয়ালমারীতে ১৫ শতাশ জমি, নর্থ চ্যানেলে ৩৩ একর জমি, বদরপুরে ১ একর ৫০ শতাংশ জমি। অভিযোগ উঠেছে, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ওয়ারলেছ পাড়ার মিজান চৌধুরী ও জামানের ১ একর ৪ শতাংশ জমি লিখে দিতে বাধ্য করেন বরকত। এছাড়া রুবেলের রয়েছে ঝিলটুলী টেলিগ্রাম অফিসের সামনে ৪৫ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের মোড়ে ৫.৫ শতাংশ, মুন্সীবাজারে ৩ একর, বাইপাসে ১৫ একর, ব্রাহ্মণকান্দায় ১০ একর, পাট গবেষণা কেন্দ্রের পাশে ৬ একর, চন্ডিপুরে ইট ভাটাসহ মাচ্চরে ১১ একর, মাচ্চর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে ৬ একর, চন্ডিপুর বাবু বাড়ির পাশে ২ একর, নর্থ চ্যানেলে ১০০ একর, ধুলদিতে ১৫ একর, রাজবাড়ি রাস্তার মোড়ে ১ একর ৫০ শতাংশসহ মোট ১৮২ একর জমি। স্থানীয়রা জানান, দুই ভাইয়ের নেশা জমি করার। যেখানে যেভাবে পারেন অন্যের জমি নিজেদের কব্জায় নেন। ফরিদপুরের সবচেয়ে বিলাশবহুল গাড়ী সাউথ লাইন পরিবহনের মালিক এই বরকত , রু‌বেল । যার গাড়ীর সংখ্যা প্রায় ৬০টি। যেগু‌লো ঢাকা-আরিচা -খুলনা, ঢাকা- বরিশাল রুটে চ‌লে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা, দিনাজপুর, গাজীপুর, সাতক্ষীরায় রয়েছে তাদের জমি, ফ্ল্যাট বাড়ি। চা বাগান, মাছের ঘের, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও মহাখালী ডিওএইচএস, সেগুনবাগিচায় রয়েছে একাধিক অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট। বিএমডব্লিউ, হ্যারিয়ার, লেক্সাসসহ মোট ৫টি অত্যাধুনিক গাড়ি ব্যবহার করেন তারা। সাউথ লাইনে পরিবহনে রয়েছে ৬০টি বাস। রয়েছে অসংখ্য ট্রাক-ভেকু। এছাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আবাসিক হোটেল, চরে রয়েছে কলা ও মাল্টার বাগান, একাধিক পেট্রোল পাম্প, ইটভাটা, রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে ব্যক্তিগত ২টি অফিস, বাইপাসে অসংখ্য দোকান। ফরিদপুর নিউ মার্কেটে রয়েছে ৪৪টি দোকান। যার সর্বনিম্ন মূল্য ১১ কোটি টাকা। সুইডেন, দুবাই ও মালয়েশিয়ার তাদের সম্পত্তি রয়েছে বলেও অভিযোগ এসেছে। সম্প্রতি বরকতকে ফরিদপুর শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি করা হয়। বড় বাস মালিক গ্রপের সাবেক সভাপতি মুকুলকে কৌশলে সরিয়ে সেখানকার পদটি ভাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মুকুলের সাথে কথা বল্লে তিনি বলেন, এখন আর ওখানে পরিবেশ নেই। তাই আমি আর এখন ফরিদপুর যাইনা। আমি ঢাকায় থাকি। এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।

অভিযোগ রয়েছে, আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার ৫নং আসামি, সাবেক জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ক্যাপ্টেন নুর মো. বাবুল, ফরিদুপর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ, সদর উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যাম ভোলা মাস্টারসহ অনেকেই এই দুই ভাইয়ের হয়রানির শিকার হয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ বলেন, ফরিদপুর বণিক সমিতির সভাপতি ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে সরানোর জন্য দোকানদাররে ওপর নানান অত্যাচার করতো ।পরে আমি নিজেই সরে গেছি। অথচ এখানে আমি এক যুগের বেশি ছিলাম। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে আমার মতো নিরীহ মানুষের ওপর নেমে আসবে নির্যাতন। তার চেয়ে ভালো চুপ থাকি। শহর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, দুই চ্যাংরা আমাদেরকে শাসাতে আসে। তাদের ক্ষমতার জোর কোথায় সবাই জানে। ভয়ে কেউ কিছু বলে না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই ভাইয়ের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুদক। দুদক ইতিমধ্যে তাদের সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। ফরিদপুর দুদক অফিসের কর্মকর্তা দুদকের অভিযোগ রহস্যজনক কারণে আড়াল করে রাখেন। ওই কর্মকর্তা রুবেল-বরকতের আমন্ত্রিত অতিথি হওয়ার ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর ওই কর্মকর্তাকে ফরিদপুর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এদিকে জানা গেছে, দুদক ঢাকা থেকে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। দুদকের সেই অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, গত চার পাঁচ বছরে এলজিইডির অধিকাংশ কার্যাদেশ হয়েছে সাজ্জাদ হোসেন বরকতের এসবি কনস্ট্রাকশন এবং ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের রাফেয়া কনস্ট্রাকশন এর নামে। এদিকে ফরিদপুর চর এলাকায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কমপক্ষে পাচঁশ একর খাস জমি দখলে নেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় নিজেদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছেন বরকত ও তার ভাই রুবেল। এর মধ্যে এইচএসবিসি ব্যাংকে ৪৫ কোটি টাকা, ওরি ব্যাংকে ২৬ কোটি, স্ট্যান্ডাট চার্টাড ব্যাংকে ১৬ কোটি, কর্মাশিয়াল ব্যাংক অব সিলনে ২২ কোটি টাকা, হাবিব ব্যাংকে ৩০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া দেশীয় কয়েকটি ব্যাংকে আড়াইশ কোটি টাকা জমা থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও নিউজিল্যান্ড ও দুবাইয়ে তাদের সেকেন্ড হোম আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য বিপুল ঘোষ বলেন, দলে অনুপ্রবেশকারীদের জন্য এখন আমরা আর আওয়ামী লীগ করতে পারছি না। দলের দুঃসময়ে আওয়ামী লীগ করেছি, এখন অবসরে আছি। আওয়ামী লীগের আবার দুঃসময় হলে আমি এবং জেলার যারা দলের জন্য নিবেদিত তারা আবার সক্রিয় হয়ে কাজ করবো। প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন তার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। টেন্ডারবাজি ও নানা অপকর্ম করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট যারা করেছে এদের আইনের মাধ্যমে কঠোর বিচার হওয়া দরকার।

শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে বলেন, রাজনীতি করছি একটি পক্ষ হিংসাপরায়ন হয়ে এসব বলছে। বাড়ি দখলের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি কার বাড়ি কখন দখল করলাম, কোন বাড়ি দখল করলাম। পরে এই প্রতিবেদক নির্দিষ্ট বাড়িটির কথা বলার পরে তিনি বলেন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। অন্যান্য জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সেই জমানা কিন্তু এখন আর নেই। চাইলেও কারো জমি দখল করা সম্ভব নয়। আর টেন্ডারের কথা বলছেন? আপনি একটি টেন্ডার ড্রপ করে দেখেন কেউ পার্স্টেন্টিজ চায় কিনা। চর দখল নিয়ে তিনি বলেন, আমি চরে স্বল্পদামে কিছু জায়গা কিনেছি। চরে খুব অল্পদামে জমি পাওয়া যায়, তাই কিনেছি। এটা নিয়ে যদি বলে দখল করেছি, তাহলে তো হবে না। এত অল্প টাকার জমি তো দখলের প্রয়োজন পরে না। তিনি বলেন, আমি যদি রাজনীতি না করে মসজিদের ইমামতি করতাম তাহলে এই অভিযোগগুলো আসতো না। এখন রাজনীতি করছি দুদক থেকে সব জায়গায় আমাকে নিয়ে অভিযোগ। আমাদের মূল ব্যবসা হচ্ছে ঠিকাদারী ব্যবসা। তারপর আমাদের পরিবহন ব্যবসা আছে, জমি ক্রয়বিক্রয়ের ব্যবসা আছে। আপনি যা বলছেন আমার এতো টাকা পয়সা নেই। যা আছে বৈধ। তার দলের লোকজন কেনো তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ করে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দেখেন আমি দলের জন্য কাজ করছি, পরিশ্রম করছি। তাই ভালো জায়গায় আছি। এটাকে অনেকে সহ্য করতে পারে না। হিন্দুদের বাড়ি দখল নিয়ে তিনি বলেন এটা ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, আমরা কখনোই বিএনপির রাজনীতির সাথে ছিলাম না। তার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। এদিকে ইমতিয়াজ হাসান রুবেল বলেন, বদনাম হবে বলেই আমি এলাকার বাইরে গিয়ে ঠিকাদারির কাজ করছি। আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন।

রক্তাক্ত ক্যাম্পাস: সনি থেকে আবরার by মরিয়ম চম্পা

বুয়েট ক্যাম্পাসে সাবিকুন নাহার সনি স্মৃতিফলক ফিরিয়ে নেয় প্রায় দেড় যুগ আগে। বুয়েটে সে সময় ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ হারান মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি। সনির রক্তমাখা দেহ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। ২০০২ সালের ৮ই জুন টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে  গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সনি। কেমিকৌশল বিভাগের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনির মৃত্যুতে সেদিনও জ্বলে উঠেছিল গোটা দেশ। শোকে, বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। এরপর ২০১৩ সালে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে বুয়েট। আর সম্প্রতি গভীর রাতে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্যে দিয়ে নতুন করে যুক্ত হলো এক কালো অধ্যায়।
২০০২ সালে সনি হত্যার বিচারের দাবিতে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।
দেশের সচেতন মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন জানান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিবাদ ও আন্দোলনের একপর্যায়ে গঠিত হয় ‘সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্য’। ৬৩ দিন বন্ধ থেকে বুয়েট খোলার পরে শুরু হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। একদিকে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। অন্যদিকে আন্দোলনে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে আন্দোলন না করার জন্য শিক্ষকদের হুমকি, কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনের বিরোধিতা ছিল প্রকাশ্যে। এতকিছুর পরও সনির হত্যাকারীদের শাস্তি আজও হয়নি। হাইকোর্টে দন্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।  সে সময় টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বুয়েট ছাত্রদল সভাপতি মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের টগর গ্রুপ। দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের সামনে সাবেকুন নাহার সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। নিম্ন আদালতে মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০০৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত এসএম মাসুম বিল্লাহ ও মাসুমকে খালাস দেন হাইকোর্ট। পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ প্রাপ্ত মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত পালিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। পলাতক রয়েছেন নুরুল ইসলাম সাগর ওরফে শুটার নুরু। জেলে রয়েছেন টগর।
২০১৩ সালে এক সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বুয়েটের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকে। দ্বীপ বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দ্বীপের ওপর হামলার ঘটনায় চকবাজার থানায় তার ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেজবাহকে আটক করে। গ্রেপ্তারের পর থেকে  মেজবাহ কারাগারে আছেন।
সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর গভীর রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের ভেতরে তাকে হত্যা করা হয়। কক্ষটিতে ছাত্রলীগের নেতারা থাকতেন। বুয়েটের শেরেবাংলা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী একদল নেতাকর্মী তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। হল শাখা ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, আবরারকে জেরা ও পেটানোর সময় ওই কক্ষে অমিত সাহা, মুজতাবা রাফিদ, ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরও কয়েক শিক্ষার্থী ছিলেন। একই কক্ষে এসে দ্বিতীয় দফায় আবরারকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ অনেকে। ইতোমধ্যে আবরার হত্যার অভিযোগে পুলিশ ১৬ জনকে আটক করেছে।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সত্যিকার অর্থে যারা বুয়েটের মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তারা তো অনেক মেধাবী। মেডিকেল ইঞ্চিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়াটা একটি কঠিন ব্যাপার। ভাল ছাত্র না হলে পারে না। সেখানে ভিসি বা অন্যান্য শিক্ষক যারা আছেন তাদের অজান্তে এই ধরনের ঘটনা ঘটে এটা তো দুঃখজনক। আমার মনে হয় আবরার হত্যাকান্ডের বিষয়টি প্রশাসন খুব শক্ত হাতে গ্রহণ করেছেন। যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিচার হবে। সেটা আমরা প্রত্যাশা করছি। এসকল হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে বিচার না হওয়াটাই দুঃখজনক। আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলাম যে, নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে হবে। বিচার একবার শুরু হলে কোনো অবস্থায় মূলতবি করা যাবে না। এবং সাক্ষী হাজির করা যার দায়িত্ব তাকে অবস্যই সঠিক সময়ে হাজির করতে হবে। না হলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এবং তারাতারি বিচার কাজ শেষ করা হবে। মনে হচ্ছে, তদন্তকারী সংস্থা অতি দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দিবেন। এবং বিচার কার্য শুরু হবে।
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার যে আধিপত্য, সরকারের যে ভূমিকা সেখান থেকেই সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার সবসময়ই ভয় পায়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণ শিক্ষার্থীদের যে শক্তি সেটার যে কোনো ধরনের বিকাশকে তারা সবসময় রুদ্ধ করতে চেষ্টা করে। শিক্ষকদের স্বাধীন মত যেন না থাকে সেটার বিষয়েও তাদের একটি উদ্বেগ থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যে কোনো ক্ষমতাশীল ছাত্র সংগঠনের অনুমোদিত হয়ে থাকে। তার মানে সরকারের ভূমিকাটা হচ্ছে এখানে কেন্দ্রীয়। এক্ষেত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠন এবং দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের সঙ্গে একটি জোট তৈরি হয়। যেখানে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে পরে। সমস্ত স্বাধীন তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হয়। সেটার কারনে আমরা দেখি আবরার হত্যাকান্ডের আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের নির্যাতন নীপিড়নের অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেহেতু সরকার এবং ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এগুলো হয়। তাদের নীরব সম্মতিতে এই ঘটনাগুলো ঘটে। অপরাধিরা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পায় সে কারনে এই হত্যাকান্ডের বিচার হয় না।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, এটা যেহেতু একটি ক্রিমিনাল কেইস কাজেই সেখানে তো রাজনৈতিক কোনো কিছু কাজ করার কথা না। এক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো দলই মনে হয় না বাধার সৃষ্টি করবে। একটি মামলা ট্রায়ালে উঠলে বিচারিক প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে আবরার হত্যাকান্ডের ঘটনাটি আসলেই দুঃখজনক। এখানে পুলিশ কিংবা তদন্ত কার্যের গাফিলতি হওয়ার কথা না। বা এখানে রাজনৈতিকভাবে কেউ ইন্টারফেয়ার করবে এটা আমার মনে হয় না।

চট্টগ্রামে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে  পোশাক কারখানা। এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তৈরি পোশাক শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝাউতলায় বিজিএমইএ ভবনের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বলে জানান, বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম। সভায় পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার দশ কারণও খুঁজে বের করেন তারা। এম এ সালাম বলেন, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ হলো- এলায়েন্স ও অ্যাকর্ড এর ফর্মুলা অনুযায়ী সংস্কার করতে না পারা, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে অক্ষমতা, পণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়া, বিদেশি বায়ারদের চট্টগ্রাম বিমুখতা, কিছু বায়ার ও বায়িং হাউসের প্রতারণা, চট্টগ্রামে অবকাঠামোগত সমস্যা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, বড় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকা ও অসম প্রতিযোগিতা। এসব সমস্যা সমাধান করতে না পারলে অচিরেই পোশাক কারখানার ৩০ লাখ শ্রমিক হুমকির মুখে পড়বে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক তানভীর বলেন, একটা সময় বৈদেশিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে বিপুল ক্রয়াদেশ (অর্ডার) পাঠাতো। কিন্তু এখন তা অনেক কমে গেছে।
তারা (ক্রেতারা) এখন ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও শ্রীলংকাকে ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। এটা আমাদের জন্য হুমকি। আমরা নির্দিষ্ট কিছু প্রোডাক্টই পর্যায়ক্রমে উৎপাদন করে আসছি। আরো প্রোডাক্ট বাড়াতে হবে। আমরা ৬৪টি প্রোডাক্ট উৎপাদান করছি। অন্যদিকে, চায়না প্রায় এক হাজারেরও বেশি প্রোডাক্ট উৎপাদন করছে। তাদের পণ্যের যোগান যেমন বেশি বায়ারদের ক্রয়াদেশও ওখানে বেশি। তাই আমাদের এই শিল্পকে বাঁচাতে ভেতর ও বাহিরের সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপাতি আবু তৈয়ব বলেন, পোশাক শিল্প কারখানার মালিকরা এখন যে সমস্যাগুলোর মধ্যে পড়ছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে লিড টাইম। বন্দরে কন্টেইনার আটকে থাকছে, সময় মত পণ্য পৌঁছানো যায় না। এতে অর্ডার হারাচ্ছি আমরা। তাছাড়া পণ্য উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি করতে অটো মেশিন ব্যবহার করতে হবে।
তিনি জানান, বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের আরোপিত শর্ত পূরণ করতে না পেরে গত চার বছরে চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক তৈরী পোশাক কারখানা, যেগুলোর অধিকাংশই যথাসময়ে অন্যত্র কারখানা স্থানান্তর করতে পারেনি। বন্ধ কারখানার মালিকদের কেউ কেউ মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন করে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশই অর্থাভাবে নতুন করে কারখানা স্থাপন করতে পারছে না।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিএমইএর ৬৮৬ সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখন চালু আছে মাত্র ৩৫১টি। এর মধ্যে সরাসরি পোশাক রপ্তানির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০০টি। ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে কয়েকটি কারখানার ১২৪ জন পোশাককর্মী নিহত হওয়ার ঘটনার পর কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কাজ শুরু করে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। এরপর থেকে চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রামে সর্বশেষ গত সপ্তাহে বন্ধ হয়ে যায় এঞ্জেলা ফ্যাশন লিমিটেড। নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আসকারাবাদ এলাকার এ পোশাক কারখানাটিতে শ্রমিক ছিল ২২৫ জন। এই কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এম জিয়াউল করিম বলেন, যে ভবনে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কারখানাটি বন্ধ করা হয়েছে। সংস্কার শেষে পুনরায় কারখানা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়েক বছর আগে বন্ধ হওয়া একই ভবনে অবস্থিত পোশাক কারখানা সাদাফ ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি এস এম জাহিদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ইতালি ও সুইডেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল আমাদের কারখানায় উৎপাদিত পোশাকের ক্রেতা। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শক দল কারখানা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যায়িত করে সেখান থেকে সরানোর শর্ত দিলে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া এবং আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই।
তিনি বলেন, বন্ধ হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৭ বার ভূমিকমপ হয়েছে। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকমপও ছিল। কিন্তু ভবনটির কিছু হয়নি। অথচ তারা বলেছে, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, একসময় আমি কোটি কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছি, আজ আমি কপর্দকশূন্য। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানা অন্যত্র স্থানান্তরে যে আর্থিক সক্ষমতা দরকার-তা আমাদের নেই। মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে বন্ধ কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে প্রত্যেক প্লটের জন্য এক বছরের মধ্যে এক কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, যেটা সবার সামর্থ্যে নেই। ব্যবসায়ীরা জানান, নগরীর কালুরঘাটে গড়ে ওঠা দেশ গার্মেন্ট দিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরের দুই দশক ভালো অবস্থানেই ছিল চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্প। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে চট্টগ্রামে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে এ খাতটি।
বিজিএমইএর পরিচালক ও ও এম এস ওয়্যারিং অ্যাাপারেলস লিমিটেডের এমডি আ ন ম সাইফুদ্দিন বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর ২০১৩ সাল থেকে এদেশের তৈরী পোশাক খাতে বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ও এনএপি (ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান) নীতিমালার আলোকে কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
তিনি বলেন, ভবন নিরাপত্তা ও অগ্নি নিরাপত্তার শর্তপূরণ করতে অক্ষম হওয়ায় সারা দেশেই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্ট কারখানা। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের দেড় শতাধিকসহ সারা দেশে প্রায় ৯০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও এ খাতের শ্রমিকরা বেকার বসে নেই মন্তব্য করে সাইফুদ্দিন বলেন, এমনিতে আমাদের শ্রমিকের সংকট ছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের বেশিরভাগ অন্য কারখানায় কাজ নিয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে বেশ কিছু গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব কারখানায় অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কেন এই দ্বন্দ্ব?

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে যারা শান্তিতে একটু শপিং করতে চান, তাদের জন্য মুজি বা ইউনিকলোর যেকোনো শাখাই হবে দারুণ পছন্দ। সাধারণত, এই দুই প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে সবসময়ই। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে কোনো ক্রেতা সমাগম একদমই কমে গেছে। কারণ হলো, জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর বিশেষ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। এরপর থেকেই জাপানি পণ্য বয়কট করছেন ক্ষুব্ধ কোরিয়ানরা। পোশাক থেকে শুরু করে গৃহস্থালি জিনিসপত্র কিনছেন ঘরোয়া প্রতিষ্ঠান থেকে। অপরদিকে জাপানে ‘অবিশ্বস্ত’ কোরিয়ানদের নিয়ে পুরনো ধ্যানধারণা ফের জেগে উঠতে শুরু করেছে। প্রতিবেশী কোরিয়া এখনও পুরনো ইতিহাস পেছনে রাখতে পারছে না, এই অনুযোগ এখন জাপানের কূটনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষদেরও।
অথচ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া- উভয়ই বেশ উদার গণতন্ত্রী রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র। কিন্তু দুই দেশ কিছুতেই একসঙ্গে কাজ করতে পারছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। ম্যাগাজিনটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বিবাদ শুরু হয়েছে গত বছরের অক্টোবর থেকে। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট একটি রায় প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেসব জাপানি প্রতিষ্ঠান কোরিয়ানদের বলপূর্বক শ্রমে বাধ্য করেছিল, তারা এখন ভুক্তভোগী বিবাদীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। জাপানের বক্তব্য হলো, এ ধরণের সকল দায়দাবি ১৯৬৫ সালে করা চুক্তির মাধ্যমে ফয়সালা হয়ে গেছে। কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর জাপান দাবি করেছে, কোরিয়া সরকারকে এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিচার ব্যবস্থায় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ফলে দায়ী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয় দক্ষিণ কোরিয়ার কৌঁসুলিরা। এর পরপরই জাপান জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি রাসায়নিক রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় মেমোরি চিপ নির্মাণে, যা কিনা দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এর প্রতিক্রিয়ায় পরের মাসেই দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বিরোধ আরও উস্কে ওঠে।
তবে এই বিরোধ শুধু একটি রায়কে কেন্দ্র করেই নয়। গত কয়েক দশক ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইস্যুতে বার বার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কে। জাপান ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়াকে উপনিবেশ করে রেখেছিল। ওই সময় কোরিয়ায় জাপানি সৈন্যরা যে নৃশংসতা সংঘটিত করেছিল, তার দায় জাপান কখনই স্বীকার করেনি বা ক্ষমা চায়নি।
এ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ানদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আবার এ-ও সত্য যে, দেশটির বিভিন্ন সময়ের সরকারই রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতীয়তাবাদী অনুভূতি উস্কে দিতে এই ইস্যু ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তবে সব ইস্যুর মধ্যে উপনৈবেশিক আমলে জাপানি কোম্পানিতে বলপূর্বক শ্রমদানে বাধ্য হওয়া কোরিয়ান বা জাপানি সৈন্যদের জন্য নির্মিত পতিতালয়ে যেসব কোরিয়ান নারীকে যৌনদাসী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ইস্যু সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ।
বিভিন্ন কারণে দুই দেশ মোটামুটি মিত্র হলেও এসব ইস্যু শুধু বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতে এতদিন প্রভাব ফেলেনি। এর একটি কারণ হলো সবসময়ই দুই দেশের অভিন্ন মিত্র যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিরসনে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার অভিন্ন হুমকিও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশকে এক রেখেছে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মাথা ঘামাতে অতটা ইচ্ছুক নয়। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকিকে অত বড় সমস্যা মনে করেন না। ট্রাম্প বরং কোরিয়া ও জাপানে অবস্থানরত মার্কিন সৈন্যদের ব্যয় নিয়ে বেশি চিন্তিত। ফলে দৃশ্যত তিনি জাপান ও কোরিয়ার মধ্যকার বিরোধে হস্তক্ষেপ করতে অতটা আগ্রহী নন।
উপরন্তু, জাপান ও কোরিয়া- দুই দেশেই জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা এখন তুঙ্গে। দুই দেশের নেতাই জাতীয়তাবাদী ঘরানার। ফলে কেউই কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। তাই দুই দেশের বর্তমানকে সমস্যার মুখে ফেলছে পুরনো অতীত।

গল্প- আলো by শাহরিনা রহমান এ্যালানা

------১.----
পায়ের শব্দ পেয়ে দ্রুত বুকশেলফ থেকে সরে গিয়ে ঘর থেকে বেরোতেই অংশুর সাথে ধাক্কা খেলাম। গত সাতদিনে এটা নতুন কিছু নয়। তবু অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। অংশুর এক চোখ অন্ধ। দুর্ঘটনায় বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে বহুদিন আগে। অন্য চোখটায় মাত্র ৫% দেখতে পায়। অন্ধ একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাবা-মার সাথে গত এক মাস ধরে আমার কোনো কথা হয় না। আমাকে জেনেশুনে ‘অন্ধকূপে’ফেলে দেবার অভিমানটা কাটাতে পারিনি বিয়ে হয়ে যাবার পরেও।

‘স্যরি,দেখতে পাইনি’

কথাটা শুনে থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।

‘আমি তো জানি,তুমি দেখতে পাও না। এতে বারবার স্যরি বলার কি আছে? কিছু হলেই স্যরি, স্যরি!’

অংশু শব্দ করে হাসল। অস্বীকার করি না,অংশুর হাসিটা সুন্দর। প্রাণখোলা, সরল একটা হাসি।

‘আসলে, তুমি যেমন এখনও ধাক্কা খাওয়ায় ঠিক অভ্যস্ত হতে পারোনি, আমিও নতুন একটা মানুষকে ধাক্কা দিয়ে অভ্যস্ত হতে পারছি না। সমস্যা নেই। আস্তে আস্তে দুইজনই অভ্যস্ত হয়ে যাব।’

মা’র কথা ছিল, আমাকেই বা কে বিয়ে করবে? চোখের কাছে বিশাল একটা ক্ষত আমার। বাস দুর্ঘটনায় কোণাকুনিভাবে ওখানে ছিঁড়ে গেছিল আমার। সে ক্ষতটা ঠিকমত সারেনি কোনোদিন। দাগটা রয়েই গেছিল। অংশু সে হিসেবে ভালো পাত্র। ছোট একটা বইয়ের দোকান চালায়। আমি একটা স্কুলে পড়াই। আমাদের দিন চলে “যাবার কথা”।

মাত্র সাতদিন। আমি জানি না,সাত মাসও,মা’র ভাষায়,‘চলে যাবে’কি না। তনয়কে আমি ভালোবাসতাম। আমাদের বিয়ে করার কথা ছিল গ্রাজুয়েশানের পর। বাস দুর্ঘটনার পরেও তনয় বহুদিন ছিল আমার সাথে। তারপর যখন ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন নিলাম,তনয় জানালো,তার বাসায় মানবে না।

-তোমার কি এই ক্ষত নিয়ে কোনো আপত্তি আছে?
-না,কিন্তু আমার বাসায় যদি তোমাকে পছন্দ না করে?

আমি হেসে তার হাতে ছোট্ট একটা স্পর্শ দিয়ে সেদিন রবীন্দ্র সরোবর থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে বাসায় এসেছিলাম। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল প্রায় দশ বছর। সম্পর্ক শেষ হতে লাগল দশ মিনিট।

অংশুর অবশ্য এই ক্ষত নিয়ে অভিযোগ ছিল না। প্রথম দেখার দিন,কিংবা বিয়ে থেকে এই সাতদিন- কখনই না। দুটো বিষয় হতে পারে,এক,সে কোনোদিন এই ক্ষতটা ভালো করে খেয়াল করেনি; দুই,তার নিজের ঘাটতিটুকু সে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে এ নিয়ে অভিযোগ না করে।

-------২.------
-দেখো কিন্তু। এখানে একটু নিচু।
-ঠিক আছে।
-সাবধানে। হাত ধরো আমার।

বসন্তোৎসবে এসেছি আমরা। আমাকে কলাপাতা সবুজ একটা শাড়ি উপহার দিয়েছে অংশু। সে কিনেছে সান্ধ্য নীল একটা পাঞ্জাবি। চারুকলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হাত ধরে। আমার হাত ভর্তি বেলি ফুলের মালা জড়ানো। আমরা হাত ধরেই হাঁটি সবসময়। ওর সুবিধা হয়। অবশ্য একা একাও সে ভালোই চলাফেরা করতে পারে। তবে এদিক সেদিক ধাক্কা খায় কিংবা উঁচু নিচু বুঝতে না পেরে হোঁচট খায়- এই যা!

তনয়ের অবশ্য সেসব ছিল না। তার সাথে আমার দেখাই হত বছরে একবার কি দু’বার। হাত ধরাধরি তো দূরের কথা।

-আচ্ছা,তনয়কে খুব বেশি ভালোবাসতে তুমি? আমার চেয়ে বেশি?

-অতীত অতীতই, অংশু। তনয় একটা নিভে যাওয়া প্রদীপ। একটা ছিঁড়ে ফেলা পৃষ্ঠা। সেটা টেনে তো লাভ নেই। আর মাত্র সাতদিন হল আমাদের..

-কিন্তু এই যে, তনয়ের কথা বলতেই তোমার চোখে পানি চিকচিক করছে। তনয় যে অতীত, তোমার চোখ তো তা বলে না।

আমি বিস্ময়ে অংশুর দিকে ফিরে তাকাই। তার তো এতটা দেখতে পাবার কথা নয়।

-হয়তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমার দৃষ্টিশক্তি মাত্র পাঁচ ভাগ। কিন্তু,বলতে পারো অন্তরা, ভালোবাসা দেখতে কতটুকু দৃষ্টিশক্তি লাগে? তোমার তো শুধু চোখ ভিজে আসেনি। কণ্ঠটাও সিক্ত হয়ে গেছে। এদিকে,রাস্তাটা একটু রুক্ষ হলেই তুমি শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরো। এই যে,সেদিন লুকিয়ে বুকশেলফ থেকে আমার পুরনো ডায়েরী পড়লে। ডায়েরীটা জায়গামতো রাখতে ভুলে গিয়েছিলে। ওতে লেখা ছিল,আমি রূপার ঝুমকো আর কাজল টানা চোখ ভালোবাসি। তোমার রূপার ঝুমকো নেই দেখে পাশের বাসার মেয়েটার থেকে ধার করে আনলে। গাঢ় করে কাজল দিলে। ভালোবাসো বলে?

আমি স্তব্ধ হয়ে রই।

-অংশু নামের অর্থ জানো, অন্তরা?

আমি বিড়বিড় করে বলি, “আলো!”

ভালো রাঁধেন অভিজিৎ, খেটেছেন জেল, পরিবারের সবাই অর্থনীতিবিদ

অভিনব সব তথ্য বেরিয়ে আসছে এবার অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার পরিবার সম্পর্কে। যেমন অভিজিৎ ছাত্রজীবনে তিহার জেলে ১০ দিন জেল খেটেছিলেন। তার পরিবার অর্থনীতিবিদে ঠাঁসা। তার পিতা-মাতা- সবাই অর্থনীতিবিদ। তার এমন কীর্তিতে গর্বিত পরিবারের সবাই। ছেলে অভিজিতের লেখা বই ‘পুওর ইকোনমিক্স’-এর একটি কপি সাংবাদিকদের দেখিয়ে মা নির্মলা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমার পরিবারের সবাই অর্থনীতিবিদ। ওর বাবা, আমি- আমরা সবাই, এক একজন অর্থনীতিবিদ। তবে এক একজন কাজ করি ভিন্ন ভিন্ন ফিল্ডে।’ আর অভিজিৎকে নোবেলজয়ী, কিন্তু খুব সাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন তার ছোট ভাই অনিরুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার যৌথভাবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এতে এস্থার পাফলো এবং মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে এ পুরস্কার জেতেন অভিজিৎ। এর পর থেকেই তার সম্পর্কে মজাদার সব তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। ভারতের মিডিয়ায় বলা হয়েছে, তিনি ভালো রান্না করতে পারেন। শাস্ত্রীয় সংগীতেও আছে তার দক্ষতা।  এ ছাড়া ছাত্রজীবনে ১০ দিন তিহার জেলে কাটাতে হয়েছিল তাকে। এই তথ্য অভিজিৎই ২০১৬ সালে জানিয়েছিলেন এক মিডিয়াকে।
১৯৮৩ সাল ছিল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজিতের শেষ বছর। ঐ বছর ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্টকে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে উপাচার্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘেরাও করেন অভিজিৎরা। সেই কারণেই তাদের  গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় তিহার জেলে। ১৯৮৩ সালের ঘটনাটির সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে ২০১৬ সালের উত্তাল জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছবির।
অভিজিৎ বিনায়ক সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন, ‘আমাদের রীতিমতো পেটানো হয়েছিল। তারপর তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।  দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছিল আমাদের নামে। এমনকি খুনের চেষ্টার ধারাতেও মামলা দেয়া হয়। ঈশ্বরের কৃপায় পরে সেই ধারা তুলে নেয় পুলিশ। কিন্তু ১০টা দিন তিহার জেলেই রাত্রিবাস করতে হয়েছিল।’
২০১৬ সালের জেএনইউতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তাই নিয়েই ছিল অভিজিতের ওই কলাম। নিজের  লেখায় অতীত তুলে এনে এই ধরনের ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রের গা-জোয়ারি’ বলেও উল্লেখ করেন অভিজিৎ বিনায়ক। তার মতে, ১৯৮৩ বা ২০১৬ দু’বারই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সুরক্ষিত পরিসর আর নিরাপদ থাকেনি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে।
ওদিকে গতকাল বুধবার আনন্দবাজার পত্রিকা অভিজিতের ছোট ভাই অনিরুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছে একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, ভালো ছাত্ররা নাকি সারা দিন বই মুখে নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু যিনি নোবেল জয় করেন তিনিও কি তাই করেন? অন্যদের প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে চাননি। তবে নিজের দাদাকে কখনও সারা দিন বই মুখে নিয়ে বসে থাকতে দেখেননি নোবেলজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহোদর অনিরুদ্ধ। উল্টো তিনি জানালেন, আড্ডায় নাকি ভীষণ উৎসাহ অভিজিৎ বাবুর। রান্নাবান্নায়ও তুখোড়।
সোমবার দিল্লি থেকে বিমানে ওঠার আগেই অনিরুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায় জানতে পেরেছিলেন, দাদার নোবেল জয়ের খবর। মাঝ আকাশে ওড়ার সময়ে মনের মধ্যে চেপে রেখেছিলেন উচ্ছ্বাস। সন্ধ্যায় বিমান কলকাতার মাটি ছুঁতেই দাদা অভিজিৎকে ফোনে ধরে ছোট ভাই বলেছিলেন, ‘ফাটিয়ে দিয়েছো...!’
অভিজিৎ বাবুর  চেয়ে বয়সে সাড়ে চার বছরের ছোট অনিরুদ্ধ পেশায় ব্র্যান্ড ও স্ট্র্যাটেজির পরামর্শদাতা। কাজের প্রয়োজনে  সোমবার দিল্লি থেকে কলকাতায় এসেছেন। ‘ফাটিয়ে দিয়েছো’- ভাইয়ের এহেন শুভেচ্ছাবার্তা শুনে হেসেছিলেন একুশ বছর পরে ফের বাংলায় নোবেল এনে দেয়া অভিজিৎ বিনায়ক।
আসলে তাদের দাদা-ভাইয়ের সম্পর্কের বাইরে নিবিড় বন্ধুত্ব রয়েছে বলেই জানান অনিরুদ্ধ। নোবেলজয়ী দাদাকে কখনো সারাদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকতে  দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। বললেন, ‘দাদা পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। তবে সারাদিন পড়াশোনা করতো তা একেবারেই নয়। বরং দাদার প্রচুর বন্ধু ছিল। আড্ডা, গানবাজনা, সবই চলতো।’
মঙ্গলবার এক বন্ধুর মাধ্যমে দাদা ও বৌদির  নোবেল পাওয়ার খবর পেয়েছেন অনিরুদ্ধ। মাত্র ৫৮ বছর বয়সেই দাদা যে নোবেল  পেতে পারেন, তা অবশ্য ভাবেননি অনিরুদ্ধ। তবে মা নির্মলা দেবী এবং তার বিশ্বাস ছিল, বছর পাঁচেক পরে হয়তো নোবেল পাবেন অভিজিৎ বাবু। কলকাতায় সময় না হলেও দিল্লিতে দাদা-ভাইয়ের মাঝেমধ্যে দেখা হয়।
আর প্রতি বছর নিয়ম করে গরমের ছুটিতে মা নির্মলা দেবীকে নিয়ে দুই ভাই দিন দশেকের জন্য পাড়ি দেন দেশ কিংবা বিদেশের কোনো গন্তব্যে। হোটেলের আলাদা ঘরে নয়। বরং মাকে নিয়ে বাড়ি ভাড়া করেই থাকেন দুই ভাই। অনিরুদ্ধ জানান, বাইরে গেলে  হেঁসেলের দায়িত্ব সামলান তার নোবেলজয়ী দাদাই। দেশি থেকে বিদেশি বিভিন্ন পদ অনায়াসেই রেঁধে ফেলেন অভিজিৎ। অনিরুদ্ধ বলেন, ‘দিল্লিতে আমাদের বাড়িতে একদিন  কেক তৈরি নিয়ে কথা হচ্ছিল। আলোচনা হচ্ছিল মিষ্টি ছাড়া কেক ভালো হয় না। আচমকাই রান্নাঘরে কী কী আছে জেনে নিয়ে দাদা সটান গিয়ে সুস্বাদু অথচ মিষ্টি ছাড়া একটি কেক বানিয়ে ফেললেন।’
নতুন বছরে তারা সকলে মিলে পাড়ি দেবেন থাইল্যান্ডের ফুকেত। কলকাতার কাজ মিটিয়ে দু’দিনের মধ্যে দিল্লি ফিরে যাবেন অনিরুদ্ধ। শনিবার সেখানেই দেখা হবে দাদা-ভাইয়ের। প্রতিবারের মতো এবারও দাদা বিশেষ কোনো উপহার আনবেন ভাইয়ের জন্য। তবে বিশ্বজয়ী দাদার জন্য তিনি কী উপহার কিনবেন- তা অবশ্য এখনো ঠিক করেননি অনিরুদ্ধ। হেসে বললেন, ‘কিছু একটা কিনে নেব। আমার দাদা নোবেলজয়ী, তবে খুবই সাধারণ।’

ফ্ল্যাগ গার্লের টার্গেট by কাজল ঘোষ

পাখির মতো উড়তে চাইতেন শিশু বয়সেই। সেই পাখির মতোই উড়ছেন তিনি। এভাবে উড়তে উড়তে তিনি খ্যাতি পেয়ে যান ফ্ল্যাগ গার্ল হিসেবে। অনন্য ইতিহাস তার খাতায়। আর এ ইতিহাস গড়তে তাকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অনেক। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন একাধিকবার। সৃষ্টিকর্তা সহায় তার। পাহাড়, পর্বত, বন, জঙ্গলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এভাবে তিনি ১৩৫ দেশে উড়িয়েছেন লাল সবুজের পতাকা।
নিজের অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর ইচ্ছা শক্তি মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার জীবন্ত সাক্ষী লক্ষ্মীপুরের মেয়ে নাজমুন নাহার। ছোটবেলায় মা-বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন সোহাগী। সেদিনের সেই কিশোরী সোহাগীই আজকের বিশ্বজয়ী নাজমুন নাহার। প্রমাণ করেছেন, মনীষীর বাণী ট্রাভেল ইজ অনলি থিং ইউ বাই দ্যাট ম্যাকস রিচার কিংবা গ্রেট থিংস নেভার কাম ফ্রম কমফোর্ট জোন। শুরুটা হয়েছিল ভারতের ভুপালের পাঁচমারি দিয়ে। সময়টা ২০০০ সাল। সে বছর ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার  প্রোগ্রামে বিশ্বের ৮০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন তিনি। আর থামেন নি। ঊনিশ বছরে তিনি শেষ করেছেন ১৩৫টি দেশ ভ্রমণ। সর্বত্র উড়িয়েছেন লাল সবুজের পতাকা। একের পর এক দেশ ভ্রমণ তালিকার কলেবর বাড়িয়েছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কেমন তার এই অভিজ্ঞতার ঝুলি? যাচ্ছিলেন আফ্রিকার দেশ গিনি। এলাকাটি কোনাক্রি। জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল। গভীর রাত। পুরনো জীর্ণ একটি গাড়িতে ৯ জন যাত্রী। গাড়ি চলছে গহিন জঙ্গলের মধ্যদিয়ে। যাত্রীদের মধ্যে একমাত্র পর্যটক নাজমুন। হঠাৎ গভীর জঙ্গলে গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কোনো লোকালয় নেই। চারধার থেকে মাঝেমধ্যেই বন্যপশুর আওয়াজ ভেসে আসছিল। কি করবেন? গাড়ি থেকে নেমে অচেনা আগন্তুকদের সঙ্গে তিনিও হাঁটা শুরু করেন। চারধারে কোনো মানববসতি নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটি খোলা ঘরে আশ্রয় নেন। সকালে আদিবাসী নারীর চিৎকারে ঘুম ভাঙে। ভাষাগত সমস্যায় আটকে যান। অনেক কষ্টে বোঝাতে পারেন তিনি বিপদে পড়েছেন, খাবার দরকার, পানি দরকার। খাবার বলতে কাঁচা বাদাম আর তৃষ্ণা মেটালেন গাছ থেকে রসালো ফল খেয়ে। নেই ফোন। নেই বিদ্যুৎ। এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে নিজেকে উদ্ধার করেন ২৬ ঘণ্টা পর। 
মরুঝড়ে মৃত্যুর পথ থেকেও ফিরে এসেছেন প্রাণ নিয়ে। মৌরিতানিয়ার সাহারা মরুভূমিতে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ঝড়ের কবলে ধারালো বালির আঘাতে রক্তাক্ত হন। একইভাবে আফ্রিকার সেনেগালের রোজ লেকে যাওয়ার পথে প্রত্যন্ত গ্রামে পথ হারিয়ে ফেলেন। গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে তিন ঘণ্টা নিরুদ্দেশ যাত্রার পর লোকালয় খুঁজে পান। একইভাবে মধ্যরাতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে আটকা পড়েছেন, বিষাক্ত পোকা মাকড়ের কামড় খেয়েছেন আফ্রিকার জংলি পথে, তিন মাস আফ্রিকাতে আলু খেয়ে বেঁচেছিলেন, কখনো না খেয়ে কখনো খেয়ে পরখ করেছেন বিচিত্র জীবন, সভ্যতার নানান রূপ।
শততম দেশটি ছিল পূর্ব আফ্রিকার জিম্বাবুয়ে। পহেলা জানুয়ারি ২০১৮ থেকে শুরু হয় নতুন প্রান্তিক। এবার আরো একশ’টি দেশ জয়ের টার্গেট নিয়ে নেমেছেন নাজমুন নাহার। সবশেষ গত আট মাসে তিনি ৩৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ১২৫তম দেশ ছিল নাইজেরিয়ার লাগোস। ১৩০তম দেশ কানাডা। চলতি বছরের ২৪শে সেপ্টেম্বর তিনি ১৩৫তম দেশ হিসেবে ভ্রমণ করেন কোস্টারিকা। আর বেশির ভাগ সময়ই ভ্রমণ করেছেন সড়কপথে। সঙ্গী বলতে নিজের সাহস। এরইমধ্যে সড়কপথে পূূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও যুগোশ্লাভিয়ার প্রতিটি দেশ, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ভ্রমণ করেছেন। এখানেই থামতে চান না তিনি। তার টার্গেট ২০০ দেশ।
নাজমুন নাহার বলেন, ছোটবেলায় বাড়ির পাশের মাঠে পাখি ধরতে চাইলেই পাখি উড়ে যেতো আকাশে। তখন আমার মনে হতো আমিও যদি এভাবে উড়তে পারতাম। ছোট থেকেই আমি মানচিত্র দেখলে তাকিয়ে থাকতাম। কোন দেশের সঙ্গে কোন দেশ লেগে আছে তা দেখতাম। কোথাকার মুদ্রার নাম কি? রাজধানী  কোন্‌টা? এগুলো দেখে দেখে ভেতরে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতো যে একদিন আমি বিশ্বভ্রমণে যাবো। এভাবে আমার স্বপ্নই ছিল বিশ্ব ভ্রমণ করা। ছোটবেলায় স্বপ্নের মধ্যেও পাখিদের মতো উড়তাম। সেই ইচ্ছাই আজকে আমাকে এখানে নিয়ে আসছে।
লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো- ২০০টি দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে পৌঁছে দিয়ে এক অনন্য রেকর্ড গড়ার। তিনি বলেন, পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরতে চাই। নাজমুন ভ্রমণের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন দাদা ও বাবার কাছ থেকে। নাজমুন বলেন, সাহস পেয়েছি বাবার কাছ  থেকেই। পরীক্ষায় খারাপ করলেও মাথা মুছে দিয়ে বলতেন পরের বার ভালো করবে, মন খারাপ করো না। প্রতিটি মুহূর্তে তার যত্ন, তার খেয়াল, তার উৎসাহ ছিল অনেক বেশি। তিনি অনেক গল্প শুনাতেন, সাফল্যময় মানুষের গল্প, বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের গল্প। এ ছাড়াও আমার দাদা  মৌলভী আহাম্মদ উল্লাহ ভ্রমণপিয়াসু মানুষ ছিলেন।
লক্ষ্মীপুর সদরের গঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমিন ও তাহেরা আমিনের আট সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নাজমুন। তিনি  লেখাপড়া করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য যান সুইডেনে। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ায় মানবাধিকার বিষয়েও কোর্স করেছেন তিনি। তার পেশা গবেষণা। এ  থেকে যা আয় হয় সবই ব্যয় করেন ভ্রমণে।
নাজমুন তার অভিযানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ২০১৮তে পান ‘তারুণ্যের আইকন’ উপাধি, অনন্যা সম্মাননা ২০১৯। একই বছরের পহেলা জুন জাম্বিয়া সরকারের কাছ থেকে পান ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি। পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। নিউ ইয়র্কের ‘মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড’, গেম চেঞ্জার অ্যাওয়ার্ড-২০১৯, অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল সম্মাননা-২০১৯, জনটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯,  তিন বাংলা সম্মাননা-২০১৯, রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ তার ঝুলিতে।

তুয়ারেগ পুরুষ: যাদের মুখ ঢাকাই থাকে by জাভেদ হুসেন

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমির বুকে আপনি হাঁটছেন। মানচিত্রে দেখাচ্ছে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা। চারদিকে আদিমকালের দৃশ্যপট। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু বালুর ঢেউ। মাঝে মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিলুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো চকচকে পাথরের দেয়াল। হঠাৎ সন্ধ্যার ঝোঁকে আপনার সামনে এসে দাঁড়াল কয়েকজন লোক। তারা সামনে এসে আপনার কুশল জানতে না চাইলে অবাক হবেন না। হঠাৎ করেই তারা যেন হাওয়ার মধ্যে থেকে এসে হাজির। আচমকাই তাদের আপনি দেখতে পাবেন। সারা গায়ে কাপড় জড়ানো। তরবারি কোমরে আর বাঁ হাতে তীক্ষ্ণ বর্শা। ডান হাতে রুপার বাঁটওয়ালা বাঁকা ছুরি। তাদের চেনার উপায় নেই। কারণ, এই পুরো দৃশ্যের মধ্যে আপনি দেখতে পাচ্ছেন কেবল এক জোড়া শান্ত সতর্ক চোখ। পুরো মুখ দেখা যাচ্ছে না। চাইলেও আপনি তা দেখতে পাবেন না।

যাদের দেখছেন তাদের সবার মুখ ঢাকা। তুয়ারেগ পুরুষ কখনো পুরো মুখ দেখায় না। তুয়ারেগ নারী নয়, পুরুষেরা পুরো মুখ ঢেকে রাখে। শুধু চোখ আর কখনো নাকের ডগা কাপড়ের বাইরে থাকে। কৈশোর পার হয়ে, কোন গোত্রে বা ২৫ বছর বয়সের পর থেকে তুয়ারেগ পুরুষ নিজের মুখ ঢেকে রাখে। রীতিমতো অনুষ্ঠান করে কৈশোর পার হওয়া তরুণকে তার কাকা-জেঠারা পূর্ণ বয়স্ক ঘোষণা দিয়ে মাথা আর মুখ ঢাকার চাদর পরিয়ে দেন।

এমনকি পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সামনেও মুখের ওপর থেকে কাপড় সরানোর নিয়ম নেই। সেই কাপড় নীল রঙে ছাপানো। প্রাচীন আর মধ্যযুগের পরিব্রাজকেরা তাদের বলতেন নীল মানুষ। সাদা মেঘের মতো উড়ে চড়ে তারা ঘুরে বেড়ায় মরুভূমির বুকে। নিজেদের তারা যোদ্ধা ভাবতেই ভালোবাসে। তাদের ইতিহাসও সেই কথা বলে।

মুখ তারা ঢেকে রাখে শত্রুদের কাছে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে। একাদশ শতাব্দীতে স্বর্ণ, লবণ, হাতির দাঁত আর দাস ব্যবসার পথ বদলানোর পর টিম্বকটু শহর জমজমাট হয়ে উঠল। সেই শহর ছিল তুয়ারেগদের চৌহদ্দির ভেতর। এরপর ৪০০ বছর তারা ব্যবসা করল, যুদ্ধ করে এলাকা দখল করল, বণিক দলের কাছ থেকে কর আদায়, তারা রাজি না হলে ডাকাতি—এভাবে জমজমাট কাটল। এ রকম জীবনযাত্রা থেকেই তুয়ারেগ পুরুষদের মধ্যে নিজের মুখ ঢেকে রাখার প্রথা চালু হয় বলে মনে করা হয়। এমনিতেও মরুভূমিতে জীবন কাটানো জনগোষ্ঠী চলাফেরার সময় বালু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে মুখ ঢেকে রাখে। কিন্তু তুয়ারেগ পুরুষদের মধ্যে মুখ ঢেকে রাখা এক কঠিন প্রথা।

তুয়ারেগ মানুষদের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথাগত ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েও তারা নিজেদের আদি কিছু প্রথা জীবনের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে। শিশুর জন্মের পর তার মাথার দুই পাশে মাটিতে দুটো ছুরি গেঁথে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে তার সুরক্ষা আর আত্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে। তুয়ারেগ ভাষা ওপর নিচ, বাঁ থেকে ডান বা ডান থেকে বাঁ—সবদিক থেকে লেখা যায়। লাইন, বিন্দু এবং বৃত্ত দিয়ে তৈরি এই ভাষার বর্ণ সেই ব্যাবিলন বা ফিনিশীয়দের প্রাচীন লিপির সাক্ষাৎ আত্মীয় বলে মনে হয়।

তুয়ারেগ নারীরা প্রতিবেশী যেকোনো জাতির নারীদের চেয়ে স্বাধীন। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে তাদের কোনো বাধা নেই। বিয়ে করার ক্ষেত্রে নারীদের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। উদার মেজাজ, স্বাধীনচেতা, কিন্তু খুব মেজাজি হিসেবে তুয়ারেগ নারীরা বেশ পরিচিত। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীরা একা মরুভূমিতে চলে যেতে পছন্দ করেন। সমাজে তাদের কদর খুব। অনুষ্ঠানে নারীরা বাদ্যযন্ত্র বাজান। স্বামীরা পশু চরান। ঘর-গৃহস্থালিতে কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত নারীদের হাতেই থাকে।

গভীরভাবে স্বাধীনচেতা এই মানুষগুলো তাদের অঞ্চলে সহজে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেয়নি। সাহসী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত তুয়ারেগরা আফ্রিকার অন্য জাতি, আরব বা ফরাসি, কাউকেই ছেড়ে কথা বলেনি। আজও তাদের কারও অধীন বলা যাবে না।

ফরাসিরা টিম্বুকটুতে তুয়ারেগদের হারিয়ে দিয়ে মালি দখল করল। আফ্রিকার সেই অঞ্চল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৃত্রিম রাষ্ট্রে ভাগ হলো। উপনিবেশকাল শেষ হওয়ার পর তুয়ারেগরা বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। অস্থির আফ্রিকার বিভিন্ন শাসক, সামরিক জান্তা—এরা কেউ তাদের সহজে মেনে নেয়নি।

পশ্চিম আফ্রিকার মানুষদের মধ্যে ফরাসিরা তুয়ারেগদের সব শেষে দমন করতে পেরেছে। তাদের জমি নাইজার, মালি, আলজেরিয়া আর লিবিয়া নামের রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। তাদের অবস্থা হলো কুর্দিদের মতো। রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষুদ্র সংখ্যার জনগোষ্ঠীকে কার্যত উপেক্ষা করে। হাজার বছর তুয়ারেগ মানুষেরা গবাদিপশু নিয়ে বিচরণ করেছে। মরুভূমিতে এন্টিলোপ শিকার করেছে। সেই ভূমি এখন আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে ভাগ হয়েছে। ইচ্ছে হলেই সেখানে যাওয়া যায় না। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে বৃষ্টির পরিমাণ কমছে। তুয়ারেগদের জীবন হচ্ছে উট আর ছাগল। খাদ্য, পানীয়, আশ্রয় আর নগদ অর্থ—সবকিছুর একমাত্র উৎস এই পশু। পশু নেই, তুয়ারেগ নেই। ১৯৭০–এর দশকে কয়েক বছর ধরে চলা খরায় প্রায় ১০ লাখ তুয়ারেগের মধ্যে সোয়া লাখ নিহত হলো। এখন তাদের সংখ্যা সাকল্যে ২৫ লাখ।

তাদের চারণভূমিতে এখন ইউরেনিয়ামের খনি। মরুভূমিও চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানির কাছে। সেখানে নতুন খনিজের অনুসন্ধান চলছে। সরকারের কাছে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না পেয়ে নাইজারের তুয়ারেগরা বিদ্রোহ করল। এর মধ্যে মাদক ব্যবসায়ী আর আল–কায়েদার কিছু অংশ তুয়ারেগ–অধ্যুষিত অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়ল। নাইজার সরকার দোষ দিল তুয়ারেগদের। তুয়ারেগরা নিজের ওপর কোনো অন্যায় সহজে কোনো দিন মেনে নেয়নি। তাদের প্রবাদ আছে, ‘যে হাত কেটে আলাদা করা যায় না, তাতে চুমু খাওয়াই ভালো’। এই প্রবাদে বোধ হয় সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে। কয়েক দফায় নাইজার সরকারের সঙ্গে তুয়ারেগদের সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। ফরাসিদের মধ্যস্থতায় সালিস হয়েছে। পরিস্থিতি এখনো শান্ত হয়নি।

পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। লবণের ব্যবসা আর চারণভূমি খুঁজে সেখানে পশু চরানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। খনিজ ব্যবসার হাতে পড়ে শিকার লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মরুভূমির জীবন শেষ হয়ে আসছে। এখন হয়তো মুখের আবরণ সরাতেই হবে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে মুখ ঢাকা তুয়ারেগ বর। নাইজার, ২০১৪। ছবি: উইকি মিডিয়া কমনস
বিভিন্ন ওয়েবসাইট অবলম্বনে লেখা।

ভেজালের ভিড়ে নির্ভেজাল উধাও! by কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

সর্বত্র ভেজাল আর ভেজাল। খাদ্য থেকে শুরু করে পরনের কাপড় কোথায় নেই ভেজাল? মানসম্মত,স্বাস্থ্যসম্মত কোন কিছু বেছে নেওয়াই কঠিন। মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভেজালের সমারোহ! অথচ মোড়ক দেখলে মনে হবে একেবারে খাঁটি, তরতাজা। কিন্তু খেতে যান, ব্যবহার করেন দেখবেন দু’ নম্বরী। নেই স্বাদ, নেই পিওরটি। ভেজালের ভিড়ে যেন নির্ভেজাল উধাও! বিক্রেতার ব্যবহার আর দোকানের আহামরি ডিজাইন দেখে একটি পণ্য কিনলেন, মনে হবে খাঁটি জিনিসই হবে; কিন্তু বাড়িতে এনে ব্যবহার করার সময় দেখলেন পঁচা আর ব্যবহার অনুপযোগী। এভাবে প্রতিটি পণ্যের পরতে পরতে ভেজালে সয়লাব।
‘ভেজাল’ বিষয়টি প্রধানতম খাবারের সাথে সম্পৃক্ত হলেও এখন সবখানে এটি বিস্তার ঘটিয়েছে। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভেজাল পরীক্ষা করা হয়। খাবার বা পণ্যের মান সঠিক আছে কিনা যাচাই করা হয়। করা হয় জেল, জরিমানা; কিন্তু ক’দিন পরেই এই তৎপরতা শিথিল হয়ে আসে। আবার আগের পরিস্থিতিতে ফিরে আসে।
খাবার দোকান আর পণ্যের যা অবস্থা মাঝে মাঝে খবরের শিরোনাম হয়। মনে হয় ওরা মানুষ মারার ফাঁদ পেতেছে। নয়তো খাবার আর পণ্যে ভেজাল মেশাবে কেন? বহু নামিদামী কোম্পানিকেও মোটা অংকের জরিমানা করতে দেখা গেছে। এরপরও শোধরানোর কোন চেষ্টা করেনা ওরা। অন্য কোন উপায় না থাকায় সাধারণ মানুষকে তা গ্রহণ করতে হচ্ছে। দূর-দূরান্তের মানুষ যারা নানা কাজে বের হন তাদের কোন উপায়ই থাকে না, বাধ্য হয়েই ভেজালের সাথে যুক্ত হতে হচ্ছে।
আইন করে করে আর কতটুকুই বা সম্ভব প্রতিরোধ করা যদি না মানুষের মাঝে বিবেকের তাড়নার অভাব থাকে? সততা আর বিবেকবোধের বড় আকাল পড়েছে। প্রতিনিয়ত মানুষ নানাভাবে ঠকছে। ভেজালের সাথে যুক্ত হতে হচ্ছে। এজন্য আইনের সংস্কার ও শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মাঝে বিবেকবোধ আর সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে।
মানসম্মত কোন কিছু পেতে হলে আমাকে, আপনাকে গলদঘর্ম হতে হবে। যাচাই করা না হলে নিজেই ঠকবো। এজন্য খাঁটি জিনিসটা পাওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা ও সতর্ক-সচেতন থাকতে হবে বৈকি!
ভেজাল এখন কেবল খাবার আর পণ্যে নয়, ভেজাল জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও। মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা অনেক সময় এ সম্পর্কে জানতে পারি। মানসম্মত ও নির্ভেজাল উপাদান না থাকায় বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয় সময়ে সময়ে। অথচ ওষুধ তৈরি হয় মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য।
ভেজালমুক্ত খাদ্য, পণ্য সরবরাহ করে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা একজন বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আমাদেরকে সব ধরণের ভেজালের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীর মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।
অবশ্য অনেক সৎ ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা মানুষের আস্থা অর্জন করে চলেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই আমাদের আশার আলো। সরকারের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি মানুষ যদি সৎ ও বিবেকসম্পন্ন হয় তাহলে ভেজাল থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
>>>লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

ইদি সাহেব by হাসান নিয়াজি

আব্দুল সাত্তার ইদি
জীবনের বেশির ভাগ সময় আব্দুল সাত্তার ইদিকে পাকিস্তানী উদ্দীপনার অপরিমেয় উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একজন একাকি দরবেশ যিনি পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে আশার বীজ বপন করেছেন, যারা সাধারণত স্বার্থপর নেতাদের দেখে অভ্যস্ত। প্রতিটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে উৎরানোর জন্য তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ মানুষের জ্বলন্ত উদাহরণ এবং আমরা মাঝে মাঝেই ভান করেছি যে ইদির মতো মানুষরাই আমাদের সমাজে বেশি।
কিন্তু ইদি ছিলেন প্রায় সব বিবেচনাতেই ব্যতিক্রম। বিশ্ব এ যাবতকালে যত মানবিক চরিত্র দেখেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম। তিন বছর আগে তিনি যখন মারা যান, তখন পাকিস্তান সত্যিকারের অর্থে গরিব হয়ে যায়।
ইদির নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ডের গল্প শোনাটা সহজ, কিন্তু বাস্তব বলে বিশ্বাস করাটা কঠিন। তার গল্পগুলোকে বিশ্বাস করার জন্য দ্বিতীয়বার পড়তে হবে আপনাকে। হ্যাঁ, এ রকম মানুষ সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন।
১৯৯২ সালে তার নাতি তার একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দুঃখজনকভাবে মারা যায়। এ রকম চরম ব্যক্তিগত শোকের সময়ে ইদি সাহেব যদি অন্যদের কথা অন্তত একবারের জন্য ভুলে যেতেন, তাহলে সেটাই হতো স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা হতে পারে বলে যদি ভেবে থাকেন আপনি, তাহলে ইদি সাহেবের মানসিকতাকে এখনও বুঝতে পারেননি। বরং নাতির দাফনের দিন, ঘোটকিতে ছিলেন ইদি। সেখানে ট্রেন দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া মানুষদের জন্য ত্রাণের কাজ করছিলেন তিনি। তার জামা কাপড় তখন ছিল রক্তে লাল। দেশের আত্মার জন্য যখন কাজ করছেন আপনি, তখন কোন ছুটি নেয়ার সুযোগ নেই তার।
এটা বাস্তব, কোন গল্পকাহিনী নয়।
ইদির দাতব্য প্রতিষ্ঠানের বাইরে খালি দোলনা দেখা যাবে। এক হিসেবে এই সব দোলনাতে এ পর্যন্ত ২৫,০০০ পরিত্যক্ত শিশুর যত্ন নেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ঘর খুঁজে দিয়েছেন ইদি সাহেব।
বাস্তবতা, কল্পকাহিনী নয়।
তার সততার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেয়েছেন তিনি। এরপরও যারা তাকে জানেন, তারা দেখেছেন মাত্র দুই জোড়া কাপড় ছিল তার, করাচির একটা অংশে ৮ ফুট বাই ৮ ফুট আকারের একটা ছোট ঘরে থাকতেন তিনি। করাচির ওই এলাকাটা পাকিস্তানীরা পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতো সব সময়।
সত্যি, কল্পনা নয়।
ইদির দুনিয়া, ইদির হৃদয় যেই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছে, সেটা বাস্তব হতে পারতো যদি দেশের নেতারা ইদির পথে চলতেন। কিন্তু তার বদলে পাকিস্তান বহু বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে মৌলিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে, মানবিক কল্যাণের পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে।
এই পথে গিয়ে ইদির উদাহরণকে অবজ্ঞা করেছে এই জাতি। এমনকি ইদির জীবনে এই শিক্ষাও রয়েছে যে, পাকিস্তানের নেতাদের প্রতিটি দিন থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। উদাহরনস্বরূপ, সকল জীবন যে সমানভাবে মূল্যবান, এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যে জাতি তাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে পড়ে আছে, সেখানে ইদি সাহেব কখনও দেখেননি যে আপনার ধর্ম কোনটি। তার অ্যাম্বুলেন্স, তার দাতব্য কাজগুলো কোন ধর্মীয় কাজ ছিল না, বরং মানুষের যন্ত্রণা দেখে কাতর একজন মানুষের হৃদয়ের কাজ ছিল সেগুলো। মুর্খরা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করতো তার অ্যাম্বুলেন্সে কেন হিন্দু ও খ্রিস্টানের লাশ বহন করা হচ্ছে, তখন তিনি যে জবাব দিতেন, সেগুলো স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়ানো উচিত: “কারণ আমার অ্যাম্বুলেন্স আপনার চেয়েও বেশি মুসলিম”। পশ্চিমারা তাকে পাকিস্তানের মাদার তেরেসা আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু তেরেসার কীর্তি যেখানে তার মৃত্যুর পর বিতর্কিত হয়ে পড়ে, সেখানে ইদির কীর্তি অমর হিসেবেই রয়ে গেছে, এবং এমনকি আরও প্রাণবন্তু হয়ে উঠেছে। কারণ ইদির প্রতি কোন ধর্মীয় গোষ্টীর সমর্থন ছিল না। ইদির শুধু তিনি নিজেই ছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, সেটাই ছিল যথেষ্ট।
ধর্মীয় অধিকারের সামান্য চাপে যেখানে আমাদের নেতারা কাবু হয়ে গেছেন, সেখানে এ ধরনের চাপকে সারা জীবন দূরে ঠেলে এসেছেন ইদি।
ইদির যে দিকটি ছিল সবচেয়ে অসাধারণ, সেটা হলো সৃষ্টিকর্তার সমস্ত সৃষ্টির জন্য তার ভালবাসা ছিল। সমাজের দুর্দশাগ্রস্তদের জন্যই শুধু আশ্রয় গড়েননি ইদি, বরং পশুদের জন্যও করেছেন। করাচিতে পশুদের জন্য যে ইদি হোম রয়েছে, সেটা দেখলে বোঝা যায় ইদির সমবেদনা মানুষকে ছাড়িয়ে গেছে। জীবনের মূল্যকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে দেশ হিসেবে এই মানুষটির কাছাকাছিও কি আমরা যেতে পেরেছি?
পাকিস্তানের জন্য ইদি যা কিছু করেছেন, তাতে পাকিস্তানের উচিত ছিল তার কাজকে সহজ করার চেষ্টা করা। কিন্তু সেটা করা হয়নি। ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর, দশজন মানুষ ইদি সাহেবের অফিসে ঢুকে, তাকে জিম্মি করে ও সেখানে লুটপাট করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায় পাকিস্তানে কেউ যদি ভালো কিছু করতে চায়, তাহলে তাকে কত ধরনের বাধা পেরুতে হয়। এই সব বিষয়ে রাষ্ট্র উদাসীন। তারা বুঝতে পারছে না যে, এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের অবহেলার কারণে এমন সব বাধা তৈরি হচ্ছে, যেখানে ইদির মতো মানুষ আর তৈরি হবে না।
ইদি সাহেবের বিকল্প হওয়াটা কারো পক্ষে আর সম্ভব নয়, কিন্তু তার মিশনের অনুকরণ করাটা সম্ভব। আমাদের দেশকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে আগামীকালের শিশুরা জাতির মহান নায়কদের একজন হিসেবে ইদি সাহেবকে জানতে ও শিখতে পারে। পিতামাতারা দেশের ভবিষ্যতের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, যেমনটা ইদির মা দিয়েছিলেন। ইদির মা ইদিকে প্রতিদিন দুটো পয়সা দিতেন। একটা তার নিজের জন্য আর আরেকটা অভাবী কারো জন্য। এই সামান্য কাজের মাধ্যমে, এই মহান নারী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদীকে গড়ে তুলেছিলেন। এমন কোন কারণ নেই যে পাকিস্তান তার মতো আরও মানুষ তৈরি করতে পারবে না। ইদির সৌন্দর্য ছিল এটাই যে ইদি সাধারণ মানুষ হয়েও অসাধারণ কাজ করেছেন। একটা মানুষের হৃদয় সঠিক জায়গায় থাকলে, তিনি কত মিলিয়ন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারেন, তার একটা উদাহরণ হলেন ইদি সাহেব।

নতুন মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস আসলে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?

নতুন ধরণের মাদক আইস।
বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসেবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ এবং সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী আছে ঢাকা বিভাগে।
যদিও বেসরকারি হিসেবে, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি বলে দাবি করে বিভিন্ন সংস্থা।
মাদকসেবীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একমত যে দেশটিতে এ মুহূর্তে যে মাদকটি ব্যবহারের শীর্ষে আছে তা হল - ইয়াবা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেবে, ২০০৮ সালে যে পরিমাণ ইয়াবা ব্যবহার হতো ২০১৬ সালে এর ব্যবহার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছিল।
এর বাইরে হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল বহুকাল ধরেই এদেশে অনেক মাদকসেবী ব্যবহার করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নতুন যে মাদকের নাম শোনা যাচ্ছে তা হলো- ক্রিস্টাল মেথ বা আইস।

ক্রিস্টাল মেথ বা আইস আসলে কী?

ঢাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশীদ আলম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচ ভাগ আর ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের পুরোটাই এমফিটামিন।
"তাই এটি ইয়াবার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতিকর মাদক। ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে মানবদেহে।"
মাদকাসক্তি বিষয়ক গবেষক ও ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমদাদুল হক বলছেন, ইয়াবা বা হেরোইন হল ওপিয়ামের বাইপ্রডাক্ট।
"এগুলো থেকেই প্রসেস করে এখন নতুন নতুন মাদক তৈরি হচ্ছে। আইসও এমন একটি নতুন মাদক।"
তিনি বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের বাইরে থেকেও কিছু লোক এর বিস্তারে কাজ করছে। আফ্রিকান অঞ্চলে এর নেটওয়ার্ক আছে।

বাংলাদেশে কিভাবে পাওয়া গেলো?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচ ভাগ আর ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের পুরোটাই এমফিটামিন
গত ২৭শে জুন ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ক্রিস্টাল মেথ বা মেথামফেটামাইন সহ নাইজেরীয় একজন নাগরিককে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।
তার কাছে এ ধরণের ৫২২ গ্রাম মাদক পাওয়া যায়।
পুলিশের ভাষ্য, নিষিদ্ধ ডার্ক নেটের সদস্য হয়ে তিনি মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন এবং আফ্রিকা থেকে এনে তিনি এদেশে বিক্রির চেষ্টা করতেন।
যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশীদ আলম বলছেন, ক্রিস্টাল মেথের কথা প্রথমে তারা জানতে পারেন গত ফেব্রুয়ারিতে।
"২৬শে ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে তিনজনকে মাদকসহ আটকের পর আমরা তার কাছে ৮ গ্রাম আইস পাই। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান ও আটককৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় একটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়।"
মিস্টার আলম বলেন, পরে জড়িতরা বিষয়টি স্বীকার করে ও এর মূল হোতা এখন জেলে।
"আমরা সে সময় তাদের ধরতে না পারলে এটি এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারতো।"

শরীরে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে?

গবেষক এমদাদুল হক বলছেন, এটা ইয়াবার মতোই সহজে বহনযোগ্য, তবে ইয়াবার চেয়ে বেশিগুণ ক্ষতিকর শরীরের জন্য।
আর খুরশীদ আলম বলছেন, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস সেবন করলে কারও স্ট্রোক হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। মানসিক অবসাদ বা বিষণ্ণতার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আরও অন্যান্য ঝুঁকি তো আছেই।
তবে আইস সেবন করে পরে চিকিৎসা নিয়েছেন এমন ব্যক্তির খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে শুধুমাত্র আইস সেবনে বাংলাদেশে কারও শরীরে ঠিক কোন ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে তা এখনো পরিষ্কার না।
তবে মিস্টার আলম ও এমদাদুল হক দুজনেই বলছেন যে, যেহেতু ইয়াবার মূল উপাদান দিয়েই পূর্ণাঙ্গ আইস তৈরি হয়, সে কারণে ইয়াবায় যেসব লক্ষণ বা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় সেগুলোই অনেক বেশি আকারে দেখা দেয় আইস সেবনের কারণে।
তারা বলেন, মূলত মানসিক ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রভাব ফেলে। কেউ আসক্ত হলে এটি ছাড়া তিনি আর ঘুমাতে পারেন না।

এই মাদক কেউ সেবন করছে এটা কিভাবে বোঝা যাবে?

খুরশীদ আলম বলছেন, একটু লক্ষ্য করলেই আইস সেবনকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
"যেমন ধরুন দ্রুত উত্তেজিত হওয়া। এটি ইয়াবার চেয়ে ৫০/১০০গুন বেশি উত্তেজনা তৈরি করে।"
তিনি জানান, মাদক বিষয়ে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা এর লক্ষ্মণগুলো সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন সহজেই।

নতুন মাদক আসার কারণ কী?

খুরশীদ আলম বলছেন, এটি তরুণদের মধ্যে ছড়াতে পারলে বেশি অর্থ আয় করা সম্ভব হবে - এ কারণেই হয়তো মাদক ব্যবসায়ীরা এটি বাজারে আনার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, যাদের ধরা হয়েছে তারা স্বীকার করেছে যে প্রতি গ্রাম আইস তারা পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করতো।
ক্রিস্টাল মেথ বা আইস সেবন করলে কারও স্ট্রোক হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। মানসিক অবসাদ বা বিষণ্ণতার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে