Tuesday, December 3, 2024
কিওদো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকার: যুদ্ধ জয়ের আশা ছেড়ে দেওয়ার কথা জানালেন জেলেনস্কি by মনজুরুল হক
আজ সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় দুপুরের পর জেলেনস্কির সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়। সাক্ষাৎকার নিতে ইউক্রেনের রাজধানীতে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছিলেন বার্তা সংস্থা কিওদোর সাংবাদিক গেনইচিরো কোদামা। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করার পর আলোচনার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ভূখণ্ড ফিরে পেতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন তিনি।
পূর্বাঞ্চলে রুশ বাহিনীর দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য পর্যাপ্ত ছিল না। ইউক্রেন এখন ন্যাটোর সামরিক জোটে যোগ দিয়ে সেই চেষ্টা করে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীর সেই শক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের পথ আমাদের অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে।’
সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হওয়ার ঠিক পরপর অনেকেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সরাসরি স্বীকারোক্তিতে কিছুটা অবাক হয়েছেন। এ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে, কেন তিনি জাপানের বার্তা সংস্থাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদানের জন্য বেছে নিলেন? কেনই–বা কিওদো নিউজ জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার নিতে কিয়েভে নিজেদের সাংবাদিক দল পাঠাল।
ইউক্রেনের হঠাৎ করে এ অবস্থান বদল সম্পর্কে বলা যায়, সম্প্রতি বিশ্বরাজনীতির কিছু রদবদল ও যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে দেখা দেওয়া হতাশা জেলেনস্কিকে অবশ্যই প্রভাবিত করে থাকবে। এক মাস পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তিনি ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি টানতে নিজের ইচ্ছার কথা শুরু থেকেই বলে আসছেন। ফলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এখন জো বাইডেনের শেষ মুহূর্তে দিয়ে যাওয়া ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আসা সত্ত্বেও বুঝতে পারছেন তাঁর দেশের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অনেকটা আত্মঘাতী আকার নিতে পারে।
সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য জেলেনস্কি এমন একটি মাধ্যমের সন্ধান করছিলেন, যেটি পশ্চিমা আগ্রাসী সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় অবস্থান থেকে তাঁর কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইবে। বলা যায়, কিওদো নিউজ জেলেনস্কির সামনে সেই সুযোগ খুলে দিয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি যুদ্ধ নিয়ে ইউক্রেনে চালানো বেশ কয়েকটি জনমত জরিপের ফলাফলও রয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর প্রকাশিত গ্যালোপের জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের জনমত এখন ক্রমেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে হেলে পড়ছে। নাগরিক জীবনে মৃত্যু আরও বেশি প্রকট আকার নিয়ে উপস্থিত হতে থাকায় যুদ্ধ ছাড়াও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজেই হয়তো শঙ্কা বোধ করছেন।
গ্যালোপের জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ইউক্রেনের ৫২ শতাংশ নাগরিক এখন যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের সমাপ্তি দেখতে চান; এমনকি রাশিয়ার দখল করে নেওয়া ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হলেও। অন্যদিকে মাত্র ৩৮ শতাংশ নাগরিক ভূখণ্ড ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। ২০২২ সালে চালানো জরিপে এই হার ছিল ৭৩ শতাংশ।
অন্য যে প্রশ্ন জাপানের কিছু কিছু সূত্র থেকে তুলে ধরা হচ্ছে, তা হলো, কিওদো নিউজ কেন এ সময়ে জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে এগিয়ে গিয়েছে। জাপানের বেলায় প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অনেকটাই সহজ। উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাশিয়ার পক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা নিয়ে জাপান অনেকটাই উদ্বিগ্ন। ঘরের পাশের শত্রুদেশ সেখানে কতটা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে এবং যুদ্ধের মোড় তা ঘুরিয়ে দিচ্ছে কি না, জাপান সেটা পরিষ্কারভাবে জানতে চায়।
পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম উত্তর কোরিয়ার সেনাদলের ব্যাপকভাবে হতাহত হওয়ার খবর প্রচার করে গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক কী হচ্ছে, নিজের কৌশলগত অবস্থানের কারণেই জাপানের তা জানা দরকার।
কিওদোর প্রচারিত সাক্ষাৎকারের বর্ণনায় বড় এক অংশজুড়ে আছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি। কিওদোর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জেলেনস্কি যেমন শুরুতেই বলেছেন, রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ করার জন্য উত্তর কোরিয়ার যে সৈন্যদের পাঠানো হয়েছে, তাদের মধ্যে হতাহতের হার অনেক বেশি।
উত্তর কোরিয়ার ঠিক কতজন সৈন্যকে যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারেননি জেলেনস্কি। তবে তিনি বলেছেন, সেখানে ১২ হাজারের মতো উত্তর কোরীয় সেনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে কতজন যুদ্ধে নিহত কিংবা আহত হয়েছে, সেই সংখ্যা তিনি প্রকাশ করেননি। ফলে ধরে নেওয়া যায় উত্তর কোরিয়ার সেনাদের যুদ্ধে জড়িত হওয়া নিয়ে খুব বেশি অবগত নয় ইউক্রেন।
তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া থেকে আরও বেশি সৈন্য নিয়ে আসার জন্য তাদের সঙ্গে রুশ বাহিনী ভালো আচরণ করছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী যুদ্ধে জড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ সম্পর্কে ভালো প্রশিক্ষণ হয়তো লাভ করতে পারবে। তবে তারা আগামীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তা হলো ড্রোন, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধে ব্যবহারের অন্যান্য অস্ত্র সম্পর্কে এরা আরও বেশি অবগত হয়ে উঠলে কেবল এশিয়া নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।
![]() |
| ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Friday, September 20, 2019
কাশ্মীর নিয়ে কেন ভারত-পাকিস্তানের এত আকর্ষণ? by মনযূরুল হক

হিন্দু ধর্ম কি মানুষের মুক্তি চায় না, বৌদ্ধধর্মও কি চায় না- যেভাবে ইসলাম চায়? এই প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। কেননা, মানুষের মুক্তির প্রশ্নে মুক্তি ও ধর্মকে কাশ্মীরে মুখোমুখী করে দাঁড় করানো হয়েছে এই অজুহাতে যে, এটা রাষ্ট্রের সমাধান, এখানে ধর্মের নাক-গলানো যাবে না।
অর্থাৎ ধর্মের সমাধান রাষ্ট্র মানুক চাই না-মানুক, রাষ্ট্রের সমাধান ধার্মিকমাত্রই মানতে বাধ্য, তা রাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট ধর্মানুসারীদের পক্ষপাতী হয়েও করে, তাহলেও।
-----এক.-----
রাষ্ট্রের সমাধানটা আসলে কী? ভারত রাষ্ট্র কাশ্মীরকে ভালোবাসে না। সমাধান তো ঘৃণা দিয়ে হয় না। রাষ্ট্র নিজে তো ঘৃণা করেই (রাজনীতিকরাই এখন রাষ্ট্র), ভারতের জনসাধারণের কমসংখ্যক আছেন যারা কাশ্মীরের প্রতি হৃদ্যতা রাখেন। যুগের পর যুগ বেশুমার হত্যা ও নিপীড়ন কাশ্মীরের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, তাতে সন্দেহ কি।
ইন্ডিয়া এই ঘৃণ্য-কাশ্মীরকে ধরে রেখেছে কেনো? কারণ পাকিস্তান তার জাতশত্রু, সে পাকিস্তানের কাছে হারতে চায় না। কাশ্মীরকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে সে পাকিস্তানকে পোড়ায়। কাশ্মীর হাতছাড়া হওয়া মানে পাকিস্তানের কাছে হেরে যাওয়া। এই হারের লজ্জায়, জাতীয়তাবাদের গায়রাতের জিঘাংসা সে কাশ্মীরের উপর মেটায়।
কারণ কাশ্মীরিরা পাকিস্তানের প্রতি হৃদ্যতা পোষণা করে, আর ইন্ডিয়াকে ঘৃণা করে বলে- কাওয়ার্ড। তাতে ইন্ডিয়া ভীষণ বিব্রত ও ক্ষিপ্ত হয়। তারপরও যদি কাশ্মীরের প্রতি ভারতের সামান্য আকর্ষণ থেকে থাকে, তা হলো স্বর্গসম সেখানকার ভূমি- জনসমষ্টি নয়।
হতে পারে জনসমষ্টির বিচারে সারা ভারতে একমাত্র সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম বলে।
পাকিস্তান কি কাশ্মীরকে ভালোবাসে? প্রজারা হয়তো বাসে, রাজারা? প্রজারা যে বাসে, তা কি এই কারণে নয় যে, তারা মুসলিম? হিন্দু-বৌদ্ধদেরও কি তারা একইরকমভাবে পাশে চায়, যেভাবে ভূখণ্ডসহ মুসলিমদের চায়? বাকি রাজনীতিকদের ভালোবাসার বেশিরভাগই তো মেকি। তাদেরও আসল চাওয়া ভূস্বর্গ- মানুষ নয়।
তাদের স্বত্ব হলো, তারা জানে, কাশ্মীরের জনগণ পাকিস্তানের সমর্থন প্রবলভাবে কামনা করে। রাষ্ট্র চোরাপথে সেনা কিংবা বিদ্রোহী পাঠায়। কেননা, ভারতকে হারাতে সে-ও উদগ্রীব; এই সুযোগ সে অযথা হারাতে চায় না। কাশ্মীরিদের নিখাঁদ মুক্তির জন্য ততটা দায় তার নেই।
যদি থেকেই থাকে, তাহলে কাশ্মীর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা চাইলে পাকিস্তান কি তা মেনে নেবে? অর্থাৎ আজাদ কাশ্মীর, যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং পুরো কাশ্মীর প্রদেশের ৩৭ ভাগ, তা কি তারা ছেড়ে দেবে?
কাশ্মীর স্বাধীন হলে অবশ্যই ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণাধীন আজাদ কাশ্মীর, গিলগিট ও বাল্টিস্তান এবং চীনের দখলে থাকা আকসাই-চিন ও ট্রান্স-কারাকোরাম মিলেই দেশ গঠন হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভূমিকা তখন কী হবে?
-----দুই.-----
কাশ্মীরকে আজকাল দক্ষিণ এশিয়ার ফিলিস্তিন বলা হচ্ছে। উভয় অঞ্চল পরাধীন হয় একই বছরে-১৯৪৭ এবং হোতাও এক-ব্রিটিশ। তাই দীর্ঘমেয়াদি নিগ্রহ, নিপীড়নের ধরন, প্রতিবাদিদের স্টাইল এবং উভয় অঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণ ও উভয় দখলদার দেশের সুপ্রাচীন বন্ধুত্বের দিকে নজর রাখলে যদিও কাশ্মীরকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে তুলনা করা যায়-কিন্তু ফিলিস্তিন যা পেরেছে তা কাশ্মীরিরা পারবে কি না জানা নেই।
ফিলিস্তিন এখন জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র। অকুপাইড হয়েও তারা বেশ কয়েকটি সিটি গড়েছে, বিচারালয় হয়েছে, ভালো সংবাদমাধ্যম আছে, সরকারি-বেসরকারি শিল্প-কারখানা, আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয়, পৃথিবীর বহুদেশে নিজস্ব কূটনৈতিক মিশন এবং পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীও আছে তাদের। সাহিত্য ও কালচারে আরবি ভাষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা।
ফিলিস্তিনি নারী রাশিদা তালেব মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য, তাদের ফিল্মমেকাররা হলিউড কাঁপিয়ে অস্কার আয়োজনেও বিচারকপদ অলঙ্কৃত করছেন। তাদের ছাত্ররা ইউরোপ-আমেরিকায় ছাত্র ইউনিয়ন গড়ে গড়ে সংঘবদ্ধ। ওআইসির মতো শক্তিশালী সংস্থার সৃষ্টিই হয়েছে বলতে গেলে তাদের উদ্ধারের জন্য, আবার ইরান ও হিজবুল্লাহ হলো তাদের প্রধান শত্রু ইসরাইলের চরম শত্রু।
এছাড়া আরব হওয়ায় তাদের প্রতি আরবদের সহমর্মিতা আছে, রাজারা না-হোক ধনী আরবরা তাদের জন্য উদারহস্তে ব্যয় করছে। বাইতুল মোকাদ্দাস রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়বহন করে জর্ডান, এমনকি রাইজিং পিরিয়ডে ইয়াসির আরাফাত তার হাজার হাজার সদস্যের মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ে জর্ডান ও লেবাননে বসবাস করেছেন।
সর্বোপরি তাদের আছে শাশ্বত ইসলামিক ইমোশন-মসজিদে আকসার মর্যাদা রক্ষা। ফলে তারা হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষকে মার্জিনে নিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসরাইলি জায়নবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।
কাশ্মীর কতটুকু পেরেছে? একটা অমোঘ সত্য হলো- পাকিস্তানের হাতে কাশ্মীর নগদে চলে যাবে, তা ভারত ও তার রাষ্ট্রশক্তি কখনও মানবে না এবং জাতিসংঘও তাতে সায় দেবে বলে মনে হয় না।
ব্রিটিশরা দ্বিজাতিতত্ত্বের সুযোগ নিয়ে উপমহাদেশে এমন এক হিংসা ছড়িয়ে দিয়েছে যে, গান্ধীর অহিংসানীতি তার জীবদ্দশাতেই ভেসে গেছে। উপমহাদেশের কোনও দেশ নিজেরা শক্ত হয়ে দাঁড়াতে না পারলেও কোমরের অবশিষ্ট শক্তি প্রতিবেশির শত্রুতায় ক্ষয় করতে রাজি।
আবার যেই ব্রিটিশ-ইংরেজরা তাদের মেরুদণ্ড ভেঙেছে সোজা হয়ে দাঁড়াতে তাদেরই সহায়তা ভিক্ষা করে। তো এই হাস্যকর রাজনৈতিক চর্চার কারণে কাশ্মীরিদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ কৌশল হলো, পূর্ণ স্বাধীনতার আওয়াজ তোলা- করদরাজ্য হয়ে থাকা নয়।
কথা হলো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই বসে এবং তিব্বত কিংবা বাংলাদেশের মতো জেনোসাইডের শিকার হয়, তাহলে কি কাশ্মীর টিকতে পারবে?
কাশ্মীরের কবিরা তাদের কাব্য কতদূর পৌঁছাতে পেরেছেন? তাদের বুদ্ধিজীবি, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিকরা কতটা মগজ রাখেন? তাদের ইন্ডাস্ট্রি কতটা স্বনির্ভর? তাদের আন্তর্জাতিক মিশন কতটা শক্তিধর?
ফিলিস্তিনের চেয়ে বরং বাংলাদেশে তাদের জন্য যুতসই আদর্শ হতে পারে। স্বাধীনতার পথে বাংলাদেশ যেমন ভারতের একনিষ্ঠ সমর্থন পেয়েছে, পেয়েছে দুই কোটি শরণার্থীর আশ্রয়, যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র এবং সর্বোপরি সারা বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে লড়েছে ভারত, কাশ্মীর কি ততটা পাকিস্তান থেকে পাবে? মনে হয় না।
বাংলাদেশ যেমন ভারতের প্ররোচনায় পাকিস্তান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, প্রতিশোধের স্পৃহায় ভারত থেকে খানিকটা সেই শোধ তেলার চেষ্টা করতে পারে পাকিস্তান, এ-ই যা।
আবার পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বন্ধু চীন কি তার অংশ ছেড়ে দিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতায় সহযোগী হবে? কাশ্মীর উত্তপ্ত হলে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব যতটা আগুন ছড়ায়, চীনের অংশের কথা তার সিকিভাগও কিন্তু আলোচনায় আসে না।
তারপরও যদি পাকিস্তান সত্যিই বন্ধুর মতো তাদের সহায়তা করে, তাহলেও আন্দাজ করা উচিত পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক সামর্থ্যই-বা কতটুকু।
এ অঞ্চলে, বলতে গেলে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান বড় একা। বাংলাদেশ তাকে জন্মশত্রু জ্ঞান করে- সাপোর্ট করে ভারতকে। শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ সবাই ইন্ডিয়াকে নমঃ নমঃ করে- কতকটা নিজেদের ঘটে বুদ্ধি না-থাকায় কতকটা হিন্দু ও বৌদ্ধদের বিরাট একটি অংশের আশ্রয় ভারতে হওয়ায়।
একে তো এই দেশগুলো পাকিস্তানের সরাসরি প্রতিবেশি নয়, আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠও নয়। তার প্রতিবেশি এক হলো চীন, আর হলো আরব-সাগরকূলের সৌদি আরব। আফগানকে না-গুণলেও চলে। দীর্ঘদিনের বন্ধু চীনকে তো ট্রান্স-কারাকোরাম ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পরের বছর নিজেই ছেড়ে দিয়েছে পাকিস্তান। আর সৌদি আরব একে তো ভূরাজনীতিতে অপটু, উপরন্তু উপমহাদেশে রাজনৈতিক প্রভাবশূন্যও বটে।
একটা তিক্ত সত্য মনে রাখা দরকার- ভারত আজ ৭০ বছর পরে যা করেছে, পাকিস্তান বহু আগেই তা করে রেখেছে। অর্থাৎ ভারত ৩৫ (ক) ও আর্টিকেল ৩৭০-এর বলে অন্তত এতদিন তাদের বিধানসভা দিয়েছিল, নিজস্ব সংবিধানের সুযোগ দিয়েছিল, বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা দিয়েছিল; আজ না হয় তা কেড়ে নিয়ে বিরাট অন্যায় করেছে। কিন্তু পাকিস্তান তার নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরিদের কী দিয়েছে?
আজাদ কাশ্মীরে যারা আছে, তাদের তো নেতাও নেই, ক্ষমতাও নেই, স্কুলও নেই, হাসপাতালও নেই। এমনকি তারা পাকিস্তানিও নয়। স্রেফ লেজকাটা হনুমান- কাশ্মীরি। স্বাধীনতাকামীদের নিরাপদ ঘাঁটি বানিয়ে রাখার অজুহাতে এলাকাটাকে পাকিস্তান ঘুটঘুটে অন্ধকার বানিয়ে রেখেছে। সীমান্তে উত্তেজনা হলেই জনসাধারণ নিদারুণ উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে পালাতে থাকে।
কাশ্মীরিরা নিজেদের ইন্ডিয়ান ভাবে না ঠিক- বিশ্ব মিডিয়াও তাদের বিভক্ত ভূখণ্ডকে পরিচয় করিয়ে দেয় ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মীর’ ও ‘পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর’ বলে- কিন্তু তারা তো নিজেদের পাকিস্তানিও ভাবে না। তাহলে পাকিস্তান নিজের ভাবে কেনো তাদের? মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে?
সেটা হলে জিজ্ঞাসা রাখি, ‘৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করেছে পাকিস্তান, সেই চরিত্র বদলে কি ইদানিং সত্যিকার শুদ্ধ মুসলিম হয়ে গেছে সে?
-----তিন.----
তো কাশ্মীরের সঙ্গে থাকছে কে? কথিত ‘মুসলিম উম্মাহ’ চেতনা। তাহলে বলি, বিশ্বে নতুন করে আরও একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের আবির্ভাব এই ক্রিশ্চিয়ান ডমিনেটিং ওয়ার্ল্ড সহজে মেনে নেবে না- তাতে সর্বধর্মবাদি সেক্যুলারিকরণের মূলমন্ত্রকে সে-দেশের সকাল-সাঁঝের তসবি বানিয়ে নিলেও।
এর মানে বিশ্ব-রাজনীতিতে অন্য কোনও ধর্ম তা দিতে পারছে না, তা নয়।
ভারতের সিদ্ধান্তে হিন্দুত্ববাদিরা খুশি হচ্ছে, যদিও কাশ্মীরে রয়েছে বিরাট সংখ্যক স্বাধীনতাকামী হিন্দুর আবাস। তবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে মুসলিমরা। আবার মুসলিমরা ‘গাজওয়ায়ে হিন্দের’ বুলিতে চঞ্চল, তবে তারা জম্মুর মতো জায়গায়ও সংখ্যালঘু।
তথাপি ধর্মীয় সদস্য সংখ্যার হিসাব কাশ্মীরের মুক্তিকে কোনও দিক থেকে সুফল দিতে পারছে না। আবার কাশ্মীরের মতো ধর্মপরায়ণ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিজেদের ধর্মকে ভুলে কেবল সেক্যুলার রাজনীতি দিয়ে সমাধানে আসতে পারবে, তা-ও সম্ভব নয়।
কেননা, তখন সর্বশেষ ভরসার ‘মুসলিম উম্মাহ’ চেতনাও যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ছেড়ে যাবে- তা না বললেও চলে।
সুতরাং কাশ্মীরের মুক্তি দূরঅস্ত! আল্লাহ তাদের সহায় হোন।
Friday, August 9, 2019
সৃজনশীলতায় হিরোশিমা-নাগাসাকির অনুপ্রেরণা by মনজুরুল হক

তবে ৭৪ বছর আগে আমাদের এই পৃথিবী আণবিক যুগে প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের নতুন এক খেলায় মত্ত হলেও পাশাপাশি আবার সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ সেদিন থেকেই বলা যায় দাঁড়িয়ে গেছে শক্তির এই দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। ফলে হিরোশিমা–নাগাসাকি একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে আমাদের স্বপ্নের শহর, যে শহরের সেদিনের ধ্বংসলীলা আজও আমাদের সাহস জুগিয়ে চলেছে প্রতিবাদী হওয়ার, আমাদের উদ্বুদ্ধ করছে মানবসভ্যতার সম্ভাব্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে। তাই ১৯৪৫ সালের সেই দিন থেকেই জাপানের এই দুই শহর আর জাপানের একার থাকেনি, বরং রূপান্তরিত হয়েছে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রাণের শহরে। অকারণেই হয়তো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতিচর্চায় নিবেদিত লোকজন এতটা আকৃষ্ট হয়েছেন এই দুই শহরের প্রতি, যে আকর্ষণে কোনো রকম ঘাটতি কখনো দেখা যায়নি। শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সেসব প্রতিবাদী মানুষের দলে জাপানিদের সংশ্লিষ্টতা স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
ফিরিয়ে দাও আমার পিতাকে ফিরিয়ে দাও আমার মাতাকে
ফিরিয়ে দাও বৃদ্ধদের
ফিরিয়ে দাও শিশুদের
ফিরিয়ে দাও আমাকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে
ফিরিয়ে দাও মানবতা
যত দিন আছে মানবিক এক বিশ্ব
ফিরিয়ে দাও আমাদের সেই শান্তি চিরায়ত শান্তি
হিরোশিমার তরতাজা স্মৃতিকে সামনে রেখে কবিতাটি লিখেছিলেন আণবিক বোমা হামলার সরাসরি অভিজ্ঞতা হওয়া জাপানি কবি সানকিচি তোগে। ১৯৫৩ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হিরোশিমার এক হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কবি, যাঁর কবিতা ১৯৪৫ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর নাটকীয় এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তোগেকে ধরা হয় সেই সাহিত্যিকদের একজন, হিরোশিমার অভিজ্ঞতা যাঁরা নিজেদের রচনায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে গেছেন। সেই একই ধারার আরেক প্রতিনিধি হলেন হারা তামিকি, যাঁর ‘গ্রীষ্মের ফুল’ নামের ছোটগল্প হচ্ছে অসাধারণ এক সৃষ্টি। হারা তামিকি একই সঙ্গে ছিলেন কবি আর ছোটগল্পের লেখক এবং বোমা হামলার সময় হিরোশিমা অবস্থান করায় তেজস্ক্রিয়তার বিষের ছোবল থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তিনি তখন থেকেই অনুভব করতে শুরু করেন। আতঙ্ক অল্প দিনের মধ্যে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল আত্মহননের পথে।
হিরোশিমার মর্মান্তিকতা শিল্প-সাহিত্যের জগতে প্রচণ্ড যে আলোড়ন নিয়ে এসেছিল, তার প্রভাব লক্ষ করা যায় বিংশ শতাব্দী অতিক্রম করে একুশ শতকের এই সময় পর্যন্ত। আর সেই আলোড়ন যে কেবল জাপানে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়; সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে হিরোশিমা নতুন এক চেতনায় জাগ্রত করে তোলে, যার প্রভাব দেখা যায় এদের নিজ নিজ সৃজনশীল কর্মে।
জাপানের বাইরে হিরোশিমার স্মৃতির সবচেয়ে সাড়া–জাগানো সৃষ্টি সম্ভবত হচ্ছে ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্গারেট ডুরাসের অমর উপন্যাস ‘হিরোশিমা মন অমর’, যে উপন্যাসকে অনেক বেশি অর্থবহ করে ছায়াছবির পর্দায় নিয়ে এসেছেন ফ্রান্সের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আলাঁ রেনে তাঁর একই নামে তৈরি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। জাপানের ছায়াছবির জগতেও বারবার ঘুরেফিরে এসেছে হিরোশিমা আর নাগাসাকি, কখনো তিক্ত বেদনায় দর্শকদের ভাসিয়ে দিয়ে, কখনো আবার শান্তির অন্বেষণে জড়িত হওয়ার ব্রত দর্শকদের মনের পর্দায় গেঁথে দিয়ে। শোহেই ইমামুরা যেমন মাসুজি ইবুসির অমর উপন্যাস ‘কালো বৃষ্টি’ অবলম্বনে তৈরি করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ছবিগুলোর একটি। একইভাবে আকিরা কুরোসাওয়াও পিছিয়ে থাকেননি আণবিক বোমার দুঃস্বপ্নকে ছায়াছবির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা থেকে। তাঁর ‘র্যাপসডি ইন আগস্ট’–এ আমরা দেখি যুদ্ধের অনেক পরেও বোমা হামলার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হওয়া প্রজন্মের পরবর্তী জীবনের বাস্তবতাকে সহজে মেনে নেওয়ার অপারগতার এক মানবিক প্রতিফলন।
পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিচার ছবির বাইরে অ্যানিমেশন বা কার্টুন ছবির নির্মাতারাও তাঁদের নিজস্ব অবস্থান থেকে আলোকপাত করেছেন হিরোশিমা-নাগাসাকির মর্মান্তিকতার ওপর। ‘হাদাশি-নো-গেন’ বা ‘নগ্নপদের গেন’ নামে কার্টুন আকারে প্রকাশিত কেইজি নাকাজাওয়ার রচনা পরে কার্টুন ছবিতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের শুনিয়ে গেছে হিরোশিমার এক বালকের দুর্দশার কথা, বোমা হামলা যার জীবনে নিয়ে এসেছিল করুণ পরিণতি। সেই কার্টুন ছবিটি তৈরি করেছেন পরিচালক মোরি মাসাকি। দর্শকদের চোখ ভিজিয়ে দেওয়া আরেকটি কার্টুন ছবি হচ্ছে ‘হোতারু নো হাকা’ বা ‘জোনাকির কবর’। হিরোশিমা-নাগাসাকি সেখানে সরাসরি উপস্থিত না হলেও খুব বেশি দূরে থাকেনি। যুদ্ধ এক পরিবারের দুই কিশোর সদস্যের জীবনকে কীভাবে ওলট-পালট কররে দিয়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, তার খুবই মর্মস্পর্শী বর্ণনা সেই গল্পে দিয়েছেন প্রয়াত লেখক নোসাকা আকিইয়ুকি এবং তাঁর সেই কাহিনিকে অ্যানিমেশন ছবিতে নিয়ে আসেন পরিচালক তয়া সাতো। বছর দুয়েক আগে মুক্তি পাওয়া আরেকটি মর্মস্পর্শী কার্টুন ছবি হচ্ছে ‘পৃথিবীর এই কোনায়’, ফুমিও কোনোর লেখা যে কার্টুনকাহিনি নিয়ে অ্যানিমেশন ছবি তৈরি করেছেন পরিচালক সানাও কাতাবুচি। সেই কার্টুন ছবিতে সদ্য বিবাহিত তরুণী সুজু উরানোর কথা বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় হিরোশিমার পাশের শহর কুরেতে সংসার গড়তে এসে যুদ্ধ আর বোমা হামলায় ছারখার হয়ে যায় যার ছোট্ট স্বপ্ন।
জাপানের ওপর আণবিক বোমা হামলা নিয়ে সাহিত্যিকদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় যাঁকে থাকতে দেখা গেছে, তিনি হলেন কেনজাবুরো ওয়ে। তাঁর ‘হিরোশিমা নোটস’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বোমা হামলায় সাধারণ নাগরিকদের যে দুর্দশা ভোগ করে হয়েছে, সেই দিক। নিজে হিরোশিমা ভ্রমণে গিয়ে বোমা হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দুর্দশা লিপিবদ্ধ করার মধ্যেই নিজের কর্মকাণ্ড তিনি সীমিত রাখেননি; একই সঙ্গে একই আণবিক বোমা হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত গল্পের সংকলন তিনি প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আণবিক বোমা সাহিত্য নামে পরিচয় লাভ করা সাহিত্যের সেদিকে সেই সংকলন ছিল প্রথম একটি উল্লেখযোগ্য সহযোজন। ইংরেজিতে ‘ক্রেজি আইরিস অ্যান্ড আদার স্টোরিস’ নামে অনূদিত সেই সংকলন ভুক্তভোগীরা কীভাবে বোমা হামলাকে দেখেছেন, ছোটগল্পের মধ্য দিয়ে তার বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল।
সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পাশাপাশি শিল্পীরাও জড়িত হয়েছেন হিরোশিমা-নাগাসাকির মর্মান্তিকতা রং-তুলিতে তুলে ধরে বিশ্ববাসীর বিবেককে জাগ্রত করে তোলার প্রয়াসে। সেই দলে শুরুতেই নাম নিতে হয় মুরাকি দম্পতির। তারো ওকামোতোর ‘আগামীকালের কিংবদন্তি’ নামের ছবিটি শিল্পী এঁকেছিলেন পারমাণবিক বিশ্বের ভয়াবহতা তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। দীর্ঘ এই প্যানেল ছবিতে একসময় হারিয়ে গেলে পরে মেক্সিকোতে সেটা খুঁজে পাওয়া যায় এবং টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার পরে সেটা কিনে এনে টোকিওর শিবুইয়া স্টেশন মানুষের দেখার জন্য সেটি রেখেছে।
৭৪ বছর আগের আণবিক বোমা হামলা তাই একদিক থেকে জাপানের জন্য ভয়ংকর দুর্দশা এনে দিলেও অন্যদিকে শান্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে করে তুলেছে অনেক বেশি সচেতন, যে সচেতনতার প্রকাশ দেখা যায় জাপানের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সৃজনশীল লোকজনের নানা রকম কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার মধ্যে। ফলে, সেই মর্মান্তিকতার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও এখন একেবারে কম নয় এবং এটাই ধ্বংসের স্মৃতির মধ্যেও আশার বার্তা আমাদের শোনায়।
Wednesday, July 10, 2019
নিউইয়র্কে প্রতারণার জাল, ঠকছে মানুষ by মনজুরুল হক

রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার মাধ্যমে দ্রুত বেশি অর্থ উপার্জনের উপায় বাতলে দিতে একটি রিয়েল স্টেট কোম্পানি গত ২৯ জুন নিউইয়র্ক নগরের লাগার্ডিয়া হোটেলে ফ্রি ক্লাসের আয়োজন করে। এই ক্লাসে যোগ দিতে কোম্পানিটি সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে। বিজ্ঞাপনটি দেখে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ওই হোটেলে ক্লাসে অংশ নিতে যান। দুই ঘণ্টার ক্লাসে কীভাবে বাড়ি কিনতে হয়, কীভাবে বিক্রি করতে হয়, কীভাবে লোন পাওয়া যায়, অকশান বা নিলামে বাড়ি কেনার নিয়ম এবং বাড়ি মেরামতের মালামাল কেনাসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে একটি ভিড়িও বার্তা প্রদর্শন করেন। তাদের কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা
করলে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় দ্রুত সফল ও লাভবান হওয়া যাবে—ভিড়িও বার্তায় সেই বিষয়টি কৌশলে ফুটিয়ে তোলা হয়।
দুই ঘণ্টা ক্লাসের কথা বললেও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানটি এক ঘণ্টায় ক্লাস শেষ করেন। ভিডিও বার্তার শেষ অংশে ছিল দ্রুত ব্যবসা প্রসার করতে হলে অথবা স্বল্প দামে বাড়ি ক্রয় বা লোন পাওয়ার কৌশল ও নিয়মকানুন জানতে হলে তাদের মাধ্যমে তিন দিনের ক্লাস করতে হবে। এই ক্লাসের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে ৫০১ ডলার দিতে হবে।
জানা গেছে, প্রবাসী বাংলাদেশিসহ নিউইয়র্কের অন্যান্য কমিউনিটির প্রায় ক্লাসে শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন, তাদের বেশির ভাগই তিন দিনের ক্লাসের জন্য ৫০১ ডলার দিয়ে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করেন। বাকিরা যখন ফরম পূরণ না করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আয়োজক কমিটির লোকজন তাদের পথ রোধ করেন। কেন রেজিস্ট্রেশন করতে অনাগ্রহী জানতে চান তারা। ক্লাসে অংশ নেওয়া এসব ব্যক্তি চিন্তা–ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানালে তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে অনেকেই তাদের আচরণের প্রতিবাদ করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
জ্যামাইকা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী সোহেল বলেন, ঘণ্টায় ৩৫ ডলারে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাঁকে একটি প্রতিষ্ঠানের অফিসে নিয়ে যায় একটি চক্র। সোহেল সেখানে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা ইন্টারভিউ নেবেন বলে তাঁকে একটি রুমে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে বলা হয়, চাকরিতে তাঁকে কাজটি করতে, তাতে তার দক্ষতা কম আছে বলে জানান কর্মকর্তারা। করণীয় হিসেবে তাঁকে একটি ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ করার কথা বলেন তাঁরা। ট্রেনিং বাবদ তাকে এক হাজার ডলার দিতে হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির লোকজন বলেন। পরে সোহেল এক হাজার ডলার দিয়ে ট্রেনিং করলেও চাকরি পাননি।
২ জুলাই আলমগীর হোসেন নামে এক বাংলাদেশি জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রিটে একজন স্প্যানিশ অভিবাসীর কাছ থেকে নতুন আইফোন–১০ ম্যাকস অল্প দাম তথা ৪০০ ডলার দিয়ে কেনেন। বাসায় গিয়ে আইফোনটি চালু করার দুই ঘণ্টা পর তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অনেক চেষ্টা করেও আইফোনটি চালু করা সম্ভব হয়।
প্রতারণা প্রসঙ্গে কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট মাকসুদ চৌধুরী জানান, দেশ থেকে অনেক সহজ–সরল মানুষ আমেরিকায় এসেছেন। তারা অনেক কষ্ট করে অর্থ আয় করছেন। তাদের উচিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে হওয়া, যাতে করে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যর কোটায় থাকে।
Sunday, June 16, 2019
জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে জাপান by মনজুরুল হক
![]() |
| কোবের নোয়েভিয়া স্টেডিয়াম |
এর আগে অবশ্য লন্ডন ও ওয়াশিংটনে স্বল্প বিরতিতে একই ধরনের আরও দুটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ২০০৯ সালের পিটসবার্গ শীর্ষ বৈঠকে বছরে একবার নিয়মিত বৈঠকের ধারা বজায় রাখার বিষয়ে নেতৃবৃন্দ সম্মত হয়েছিলেন। বলিষ্ঠ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহযোগিতার করে যাওয়ার যে অঙ্গীকার সেই বৈঠকে করা হয়, তা অর্জনের একটি উপায় হিসেবে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অপরিহার্য বলে ধরে নেওয়া নেতৃবৃন্দের সেদিনের সেই সম্মতির ফলাফল হচ্ছে জি ২০ জোট।
এরপর থেকে প্রতিবছর জোটের নেতারা শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়ে মূলত অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত বিনিময় করে গেলেও জলবায়ুর পরিবর্তন ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা থেকে শুরু করে অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যাসহ বিশ্বের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করা জটিল সব বৈশ্বিক সমস্যাবলীও পরবর্তীতে আলোচ্য-সূচিতে জায়গা করে নেয়। ফলে জি ২০ শীর্ষ সম্মেলন এখন হচ্ছে বিশ্ব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ ঠিক করে নিতে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে মতামত বিনিময়ের একটি ফোরাম। তবে বিভক্ত পৃথিবীতে এর কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত আছে।
জি ২০র অন্তর্ভুক্ত ১৯টি দেশ বছরে একবার পর্যায়ক্রমিকভাবে শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করে থাকে। জাপান এবার প্রথমবারের মতো জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ হতে যাচ্ছে এবং ওসাকায় নির্ধারিত মূল সম্মেলন সফল করে তোলার নানারকম প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দের আলোচনায় মিলিত হওয়ার বাইরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের আরও ৮টি বৈঠকও জাপানের অন্য আটটি শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং বাণিজ্য ও ডিজিটাল অর্থনীতিসংক্রান্ত মন্ত্রীদের বৈঠক ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের নেতৃস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশ নেওয়া টি ২০ নামের অন্য একটি বৈঠকও কিছুদিন আগে টোকিওতে শেষ হয়। মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকগুলোর মধ্যে সর্বশেষ বৈঠকটি হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের, নভেম্বর মাসের শেষদিকে নাগোইয়া শহরে যেটা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে অক্টোবর মাসের শেষ দিকে জোটের পর্যটন মন্ত্রীরা হোক্কাইদোর কুচান শহরে বৈঠকে মিলিত হবেন।
জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনকে অর্থবহ ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্যান্য কিছু দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনকেও সম্মেলনে অংশ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রিত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে কারা অন্তর্ভুক্ত থাকবে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব স্বাগতিক রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলেও আঞ্চলিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রের বিভিন্ন জোটের নেতৃত্বে থাকা রাষ্ট্রসমূহ এই ক্ষেত্রে সাধারণত অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। এবারের শীর্ষ সম্মেলনে জোটভুক্ত ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে আরও ৮টি দেশ এবং ৯টি বহুজাতিক সংস্থাকে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে জি ২০ ওসাকা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীর মোট সংখ্যা হচ্ছে ৩৭ টি।
যে ১৯টি দেশ জি ২০র মূল সদস্য সেগুলো হচ্ছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত ৮টি দেশ হচ্ছে নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, স্পেন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিসর, চিলি ও সেনেগাল।
![]() |
| পাহাড় থেকে দেখা আমানো-হাশিদাতের অপরূপ সৌন্দর্য। |
জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনের বাইরে এ বছর জাপানের আয়োজন করতে যাওয়া আরও একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্ট হচ্ছে বিশ্ব কাপ রাগবি। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে জাপানের যে ১২টি শহরে বিশ্ব কাপ রাগবির আয়োজন বসছে, সেই দলে কোবে শহর অন্তর্ভুক্ত আছে। কোবের নোয়েভিয়া স্টেডিয়াম মূলত ফুটবলের জন্য নির্ধারিত থাকলেও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বিশ্ব কাপ রাগবির চারটি খেলা সেই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। রাগবি বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং প্রেস টুরে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের সেই স্টেডিয়াম দেখার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি কোবের বিশ্ব জুড়ে পরিচিত খাদ্য কোবে বিফ পরিবেশন করা এক মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যবস্থাও এদের জন্য রাখা হয়েছিল।
![]() |
| সাগর থেকে বৃষ্টি-ভেজা দিনে দেখা ইনের ফুনাইয়া |
কোবের পালা সাঙ্গ করে প্রেস টুরে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা গিয়েছিলেন কিওতোর উত্তরের তিনটি শহর মিয়াজু, আমানো-হাশিদাতে এবং ইনেতে। তিন শহরের মধ্যে আমানো হাশিদাতে এর অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য জাপানের সবচেয়ে সুন্দর তিনটি স্থানের একটি হিসেবে পরিচিত। এর মূল আকর্ষণ হচ্ছে সমুদ্র উপকূল থেকে ৬.৩ কিলোমিটার দূরে মিয়াজু উপসাগরের অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চলে যাওয়া সরু এক ভূখণ্ড, যার পুরোটা জুড়ে আছে ৮ হাজারের বেশি পাইন গাছ।
জাপানের কিংবদন্তিতে উল্লেখ আছে যে সূর্য দেবী আমাতেরাসু ওমিকামি পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য স্বর্গ থেকে যে মই বেয়ে নেমে এসেছিলেন, সেই মই একসময় পড়ে যায় এবং সেটাই তৈরি করে দেয় সরু সেই ভূখণ্ড। পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা সেই দৃশ্য আসলেই হচ্ছে খুবই মনোরম। স্থানীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ আসা করছে জি ২০ শীর্ষ সম্মেলন এবং বিশ্ব কাপ রাগবি উপলক্ষে জাপানে আসা বিদেশিদের অনেকেই সেই সুযোগ গ্রহণ করে ঘুরে যাবেন কিওতোর কিছুটা আড়ালে থেকে যাওয়া তাঁদের সেই অঞ্চল।
![]() |
| ফুনাইয়ার আরেকটি দৃশ্য। |
Friday, February 26, 2016
ন্যুব্জ সংবাদমাধ্যম ও দুর্বল গণতন্ত্র by মনজুরুল হক
প্রশ্ন উঠতে পারে, জনসংযোগের মতো সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু বিভাগ নিজে থেকেই সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হওয়ায় সংবাদমাধ্যমকে কেন আগ বাড়িয়ে তা করতে হবে? জনসংযোগের কাজ যেহেতু হচ্ছে ব্যর্থতাকে আড়াল করে রেখে সাফল্যের ঢোল পেটানো, ফলে সে রকম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সরকারের ব্যর্থতার দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারা নাগরিকদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয়। আর এখানেই এসে যায় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি এবং একই সঙ্গে যা ফুটিয়ে তোলে সাংবাদিকতার সঙ্গে জনসংযোগের যোজন দূরত্বের পরিষ্কার ছবি।
ফলে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সে রকম গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দেয়। জাপানের এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাহ্যিক বেশ কিছু মিল সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দুই দেশেই ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় দলের স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ সংবাদমাধ্যমজুড়ে বিস্তৃত। তবে গুণগত পার্থক্য এ রকম, জাপানের সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ সেই উদ্বেগ সম্পর্কে দেশবাসীকে জোর গলায় সতর্ক করে দেওয়ায় নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে না যে এদের গলা টিপে ধরো, কিংবা মামলার মারপ্যাঁচে কুপোকাত করে দিয়ে নাভিশ্বাস তুলে দাও এর মালিক বা সম্পাদকদের। সরকার বরং সমালোচনার পরোক্ষ জবাব দিয়ে চলেছে সরকার–সমর্থক সংবাদমাধ্যমে নানা রকম বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে, যা-ও কিনা কোনো অবস্থাতেই অতিক্রম করছে না শালীনতার গণ্ডি।
জাপানের সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দৈনিক সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি প্রভাবশালী গণ্য করা হয়। জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক সংবাদপত্রগুলো মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। বর্তমান সরকারের দক্ষিণপন্থী অবস্থানের সমর্থনে আছে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত দৈনিক ইওমিউরি শিম্বুন-এর পাশাপাশি কট্টর জাতীয়বাদী চেতনায় অনুপ্রাণিত দৈনিক সাঙ্কেই শিম্বুন। অন্যদিকে, সরকারবিরোধী শিবিরে নেতৃত্বের অবস্থানে আছে প্রচার সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে অবস্থানকারী দৈনিক আসাহি ও মায়নিচি শিম্বুন। সরকারের অনুসৃত কতিপয় নীতি নিয়ে দুই শিবিরের কলমযুদ্ধ বলা যায় হাড্ডাহাড্ডি পর্যায়ের। একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্য দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তা নিয়ে ফলাও প্রচারেও পিছিয়ে নেই এরা।
ঠিক তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল আসাহির বিরুদ্ধে যৌনদাসী-সংক্রান্ত বানোয়াট প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগ ইওমিউরির উত্থাপন করা নিয়ে। জাপান সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইওমিউরি যৌনদাসীদের অস্তিত্ব অনেকটাই অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে আসাহি নানা রকম ঐতিহাসিক দলিলপত্রের ভিত্তিতে সেই সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা অনেক দিন থেকে করে আসছে। সেই প্রক্রিয়ার একটি বিচ্যুতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ সেই প্রতিবেদন, যেটিকে পুঁজি করে কোমর বেঁধে নেমেছিল ইওমিউরি। আসাহি অবশ্য ভুল স্বীকার করে নিলেও উল্লেখ করেছিল যে একটিমাত্র প্রতিবেদনের মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে পুরো বিষয়টির অর্থহীনতা প্রমাণিত হয় না। একপর্যায়ে ইওমিউরির সঙ্গে গলা মিলিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কঠোর ভাষায় আসাহির সমালোচনা করলে জাপানের জনগণ এবং সার্বিকভাবে সংবাদমাধ্যম সেটাকে সহজভাবে নিতে পারেনি এবং বিতর্কের বাইরে থাকার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে তারা পৌঁছে দিয়েছিল। সেই একবারের কঠোর সমালোচনার পর প্রধানমন্ত্রীও বুঝে গিয়েছিলেন, সংবাদমাধ্যমের মধ্যে চলা বিতর্কে সরকারের আগ বাড়িয়ে নাক গলাতে নেই এবং এর পর থেকে সে রকম কঠোর কোনো মন্তব্য তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়নি। আসাহিকেও ভুল স্বীকার করে নেওয়ার জন্য জড়িয়ে পড়তে হয়নি একের পর এক মামলার ফাঁদে।
এবার আমরা একটু পেছন ফিরে অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আরও যে একটি বিষয়ে বাংলাদেশের অল্প কিছুদিন আগের পরিস্থিতির সঙ্গে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মিল কিছুটা হলেও খুঁজে পাব, সেটা হলো স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে সংবাদমাধ্যমের আচরণ। একালের আসাহি আর ইওমিউরি একে অন্যের বিপরীতে অবস্থান নিলেও জাপানের সেই যুদ্ধের দিনগুলোয় এরা ছিল দেশের সামরিক আগ্রাসনের কট্টর সমর্থক। যুদ্ধের পর অবশ্য সবাই আগের সেই অবস্থানের জন্য দলবদ্ধভাবে ক্ষমা চেয়ে উল্লেখ করেছিল যে কঠোর সেন্সরশিপের আওতায় এর বাইরে কোনো কিছু করার পথ তাদের সামনে বন্ধ ছিল।
সামরিক শাসন বা স্বৈরতন্ত্র ক্ষমতাসীন হয়েই প্রথম যে কাজটি করে তা হলো সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। পাঠক হয়তো ভুলে যাননি সেই পাপিষ্ঠ কণ্ঠ: ‘আমি মেজর ডালিম বলছি।’ বঙ্গবন্ধুকে খুন করে খুনির দল প্রথমেই ছুটে গিয়েছিল বেতার কেন্দ্রে এবং বেতারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর গলা টিপে ধরেছিল সব কটি সংবাদপত্রের। ফলে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতাসীন নতুন সরকারকে স্বাগত না জানানোর কোনো উপায় সেদিন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ছিল না।
২০০৭ সালে বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বেলায়ও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা গেছে। সেদিন এমন কোনো সংবাদপত্র ছিল কি, যেটা কিনা সরকারের সমালোচনা করে সেই সরকারকে অবৈধ আখ্যায়িত করেছিল? যদি না থাকে, তবে কেন মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে সম্মিলিত এই বিষোদ্গার। সবাই যে কাজ করেছে, সেই একই কাজ তাঁকেও করতে হয়েছে এবং এর পক্ষে কোনো রকম সাফাই না গেয়ে তিনি বরং নিজের সেই অক্ষমতার জন্য অনুতপ্ত হওয়ার প্রকাশকেই তুলে ধরেছেন। এটাকে তো মনে হয় সৎ সাংবাদিকতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা উচিত, মামলার প্যাঁচে তাঁকে ঘায়েল করে দেওয়ার মতো বেইমানি হিসেবে নয়।
মাহ্ফুজ আনামের সমালোচনায় যাঁরা মুখর, তাঁরা অবশ্য বলে থাকেন যে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নেতৃত্বশূন্য করে তোলায় চালানো প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে জঘন্য অন্যায় কাজ তিনি করে ফেলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন আপনারা কোথায় ছিলেন? ঘটনা ঘটে যাওয়ার প্রায় আট বছর পর অতীতের একটি ভুলের জন্য দোষ স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ অবশ্যই এ রকম নয় যে তাঁর সব রকম পদক্ষেপই তখন ছিল কলঙ্কিত।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
Tuesday, February 2, 2016
ড্রোন কাহিনি ও এক বালিকার আর্তি by মনজুরুল হক
![]() |
| ড্রোন হামলায় স্বজন হারানো পাকিস্তানের নাবিলা এখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ |
ভিডিও গেমস যাঁরা খেলছেন, তাঁরা স্কুলগামী বালক কিংবা ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকা নেশাগ্রস্ত যুবক নন, বরং পেশাদার সৈনিক। সেই কাজের জন্য তাঁরা যে নিয়মিতভাবে বেতন পাচ্ছেন তা-ই কেবল নয়, সেই সঙ্গে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার পর জুটছে পদস্থ সেনা কর্মকর্তার পদবিও। আর কাজটা তাঁদের জন্য অনেক সহজ এ কারণে যে তাঁদের মধ্যে অনেককেই ভিডিও গেমসের নেশায় মোহাচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় সৈনিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যার মানসিক যন্ত্রণা থেকেও এঁরা মুক্ত। কেননা, ভিডিও মনিটরেই তা কেবল তাঁদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। ড্রোন হামলায় এ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি হচ্ছে আফগানিস্তানের সীমান্ত বরাবর অবস্থিত পাকিস্তানের উপজাতীয় এলাকা উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও আশপাশের কয়েকটি অঞ্চল। তালেবান আর আল-কায়েদার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে সেই সব এলাকা অনেক দিন থেকেই পরিচিত। তবে জঙ্গি আস্তানা হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণেই হয়তো সন্ত্রাসবাদী হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যও আবার হতে হচ্ছে পশ্চাদ্বর্তী সেই সব অঞ্চলকে, কেননা মানুষকে ভয় দেখিয়ে আধিপত্য বজায় রাখা হচ্ছে জঙ্গিদের একটি প্রধান কৌশল।
তাই দ্বিমুখী সেই ভীতিকর অবস্থার মধ্যে বসবাস করতে হওয়ায় দুই দিক থেকে আসা আঘাতেই চরম দুর্দশার মধ্যে পড়তে হচ্ছে সেখানকার লোকজনকে। অন্যদিকে তাঁদের সেই বঞ্চনা আর দুর্দশাকে পুঁজি করে প্রচারযুদ্ধে একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্য চালিয়ে যাওয়া প্রচেষ্টায়ও অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন সেই এলাকারই কিছু মানুষ। এই দ্বিতীয় দলের মধ্যে থেকে মালালা ইউসুফজাই নামের বালিকাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়েই কেবল বসে নেই প্রচারযুদ্ধের পশ্চিমের কান্ডারিরা, সেই বালিকাকে এখন বিশ্বের আনাচকানাচে পাঠিয়ে কতটা নির্মম সন্ত্রাসী জঙ্গিরা, তা প্রমাণের চেষ্টাও তারা সমানে করে চলেছে। সে রকম ঢাকঢোল পেটানো প্রচারের কল্যাণে তালেবান আর আল-কায়েদার অন্যায় আচরণের শিকার হওয়া ও সেই সঙ্গে নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক সাহসী বালিকা হিসেবে মালালার পরিচয় আমরা জেনে নিচ্ছি এবং বালিকার সাহসের কাহিনি পাঠ করে আবেগে আমরা হচ্ছি আপ্লুত।
তবে মালালার সেই বীরত্বের কাহিনি গল্পের পুরোটা নয়। সম্পূর্ণ সেই গল্পে আরও রয়েছেন বিশ্বজুড়ে নাম-পরিচয়হীন অনেক মানুষ, নেভাডার মরুভূমি থেকে উড়ে আসা হন্তারক দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রাণপণে এদিক-সেদিক ছুটে যাওয়ার পরও নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছেন যাঁদের অনেকে। পাল্লায় ভারী সেই অবহেলিত দলটিতে মালালার ঠিক বিপরীতে আছে প্রায় একই বয়সের অন্য এক বালিকা, নাম যার নাবিলা রেহমান।
গত বছরের নভেম্বর মাসে বাবার হাত ধরে নাবিলা এসেছিল জাপানে তার জীবনে ঘটে যাওয়া এমন কিছু মর্মান্তিক ঘটনার কথা জাপানবাসীকে জানাতে, মালালাকে নিয়ে মত্ত থাকার ডামাডোলে যার কিছুই আমরা সেভাবে শুনতে পাইনি। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে নাবিলার বয়স যখন ছিল ১২ বছর, পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে সেই দিনটি সে বাড়িতেই কাটিয়েছিল, ঈদের আসন্ন প্রস্তুতি হিসেবে স্কুল বন্ধ থাকায় পরিবারের কাজে সাহায্য করছিল সে এবং কল্পনায়ও ভাবেনি বাড়ির আশপাশের নিরাপত্তা ভেদ করে আকাশ থেকে ছুটে আসা হন্তারক আঘাত হানবে তাদের সেই পুরো পরিবারের ওপর। সেটা ছিল ২০০২ সাল থেকে শুরু হওয়া এলাকার ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালিয়ে যাওয়া অগণিত ড্রোন হামলার একটি, যে হামলায় নাবিলার বৃদ্ধা পিতামহী তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারান এবং নাবিলা ও তার এক বোনসহ আরও কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হন।
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে চালানো সেই ড্রোন হামলার পরপর পলায়নপর পাঁচ জঙ্গির ঘটনাস্থলে ঘায়েল হওয়ার কথা মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্ববাসীকে জানিয়ে অভিযানের সাফল্যের উল্লেখ করেছিল। তবে ঘটনা হচ্ছে, সেদিনের সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন পাঁচজন নয়, মাত্র একজন, আর তিনি হলেন নাবিলার মাতামহী। অন্য যে কয়েকজন এতে আহত হন, সেই দলে নাবিলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবাই তাঁরা সেদিন জড়ো হয়েছিলেন শসাখেতের ফলন তুলে আনতে, বন্দুক হাতে সন্ত্রাসী কোনো অভিযান চালাতে নয়। সে রকম এক নিষ্কলঙ্ক মুহূর্তেই তাঁদের ওপর আঘাত হানে প্রাণঘাতী ড্রোন।
জাপানের সমাবেশে নাবিলা সেদিন শুনিয়ে গেছে তার কৈশোরের স্বপ্নভঙ্গের কথা, আর সেই সঙ্গে আরও বলে গেছে নতুন যে স্বপ্ন সে এখন দেখছে, সে কথাও। নাবিলার নিজের বয়ানে তার সেই বক্তব্য ছিল এ রকম: ‘আমি খুশি যে (মালালা) ইউসুফজাই অত্যন্ত সম্মানিত একটি পুরস্কার পেয়েছে। এটা নিশ্চয় সুখবর, তবে আমি চাই যুদ্ধ যেন বন্ধ হয়। আমি আরও চাই সমাজ যেন শিক্ষিত হয়। আর এটাই হচ্ছে আমার চাওয়ার একমাত্র লক্ষ্য।’
সন্দেহ নেই, বালিকার চাওয়ার ব্যাপ্তি খুবই সীমিত। তবে আকাশজুড়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে যারা এখন বিশ্বের মোড়ল হিসেবে ছড়ি ঘোরানোর পাঁয়তারায় ব্যস্ত, সীমিত সেই চাহিদার দিকে কর্ণপাতের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা বা কোনো রকম সময় তাদের একেবারেই নেই। ড্রোন হামলায় হতাহত সবার দেহে সন্ত্রাসী-জঙ্গি ছাপ মেরে দিয়ে কালক্ষেপণ না করে প্রচার করা তাদের সব বার্তা, সেই পরিষ্কার ইঙ্গিত আমাদের দিচ্ছে।
ধাতু আর কলকবজায় তৈরি রোবট যুদ্ধে ব্যবহার করা কতটা যুক্তিসংগত, রোবটের আবিষ্কারকেরা কিন্তু শুরু থেকেই নৈতিক সেই প্রশ্ন তুলে আসছেন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মূল লক্ষ্য মানবকল্যাণ হয়ে থাকলে রোবটের ব্যবহার কল্যাণকর কাজেই সীমিত থাকা উচিত। তবে সভ্যতার ইতিহাস আমাদের বলে দেয় যে যুদ্ধবাজরা মানবকল্যাণকে সব সময় নিজেদের সংকীর্ণ লক্ষ্যে কাজে লাগাতে তৎপর। ড্রোন নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা খেলাও হচ্ছে সেই ধারাবাহিকতারই একটি দিক, যা কিনা সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলছে বিপর্যস্ত। ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানও এক অর্থে হচ্ছে রোবট, মানুষের জীবন সহজ করে দেওয়ার জন্য নানা রকম কাজে যেটা ব্যবহার করা সম্ভব। তবে সমরবলে বলীয়ানরা অন্য যে স্বপ্ন এর মধ্য দিয়ে দেখতে শুরু করেছে তা হলো, পৃথিবীর বড় অংশকে নিজেদের বশংবদ করে রাখার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করতে জুতসইভাবে সেটাকে কাজে লাগানো। ঠিক সে রকম স্বপ্নই দেখেছিল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির লেখক জুলে ভার্নের একটি উপন্যাসের খলনায়ক, পরিণতি হিসেবে নিজের পতন যে শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে। নেভাডার মরুভূমির স্বপ্নচারীদেরও সেই একই পরিণতি এখন প্রত্যাশা করছে বিশ্বের বিবেকবান জনতা।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
Wednesday, October 28, 2015
চীন-জাপানের স্মৃতির লড়াই by মনজুরুল হক
সে রকম ভাবনা থেকেই জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান সংগঠন ইউনেসকো ১৯৯২ সালে বিশ্বের স্মৃতি নামের একটি স্মৃতি সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, যার লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের দালিলিক নানা রকম ঐতিহ্য একক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংরক্ষণ করে সারা বিশ্বের জন্য সেগুলোর প্রাপ্তি সহজ করে দেওয়া। প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ও এর কাঠামো ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ১৯৯৭ সাল থেকে ইউনেসকো নথিবদ্ধ হওয়া সংরক্ষিত স্মৃতির তালিকা প্রকাশ করতে শুরু করে। সেই তালিকা এরপর থেকে প্রতিবছর দীর্ঘায়িত হয়ে এখন বিশাল এক ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের নানা রকম যেসব উপাদান এখন এতে যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে খ্রিষ্টপূর্ব ১৭ শতকের প্রামাণিক দলিলপত্র থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্সের কমিউনিস্ট ইশতেহারের মূল কপি এবং চিলিতে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার দলিলপত্র অন্তর্ভুক্ত আছে। ফলে বিস্তৃতি আর বিষয়বস্তু উভয় দিক থেকে বিশ্বের স্মৃতি ক্রমেই হয়ে উঠছে অতীতের পৃথিবীকে জানতে পারার নির্ভরযোগ্য এক সূত্র।
বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে পাওয়া সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পরীক্ষা করে দেখার পর বিশ্ব স্মৃতি প্রকল্পের একটি উপদেষ্টা পরিষদ বছরে একবার নতুন সংযোজনার তালিকা ঘোষণা করে থাকে। এ বছর উপদেষ্টা কমিটির তিন দিনের দ্বাদশ বৈঠকটি বসেছিল আবুধাবিতে চলতি মাসের ৪ তারিখ থেকে। প্রায় ৫০টি নতুন নথিপত্র এবারের বৈঠকে উপদেষ্টা কমিটি অনুমোদন করেছে, সেগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে জমা দেওয়া বান্দুংয়ে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশিয়া বৈঠকের সংরক্ষিত দলিল এবং সার্বিয়ার পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দেশটির বিরুদ্ধে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধ ঘোষণা করে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই পাঠানো টেলিগ্রাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সব রকম অনুমোদন যে সব সময় সব কটি দেশকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না, সেই প্রমাণও অবশ্য এবারের অনুমোদন অনেক বেশি স্পষ্ট করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
চীনের পক্ষ থেকে যে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনাবলির দালিলিক প্রমাণপত্র বিশ্বের স্মৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ বছর জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে, ১৯৩৭ সালের নানজিং গণহত্যা এবং জাপানের সামরিক বাহিনী ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের প্রথমার্ধে চীনের বিস্তৃত এলাকা দখল করে নেওয়ার পর সৈনিকদের যৌনসেবা দেওয়ার জন্য যৌনদাসী নামে পরিচিত জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া চীনা রমণীদের বিষয়টি। চীনের এ দুটি মনোনয়ন নিয়েই জাপান অবশ্য শুরু থেকেই প্রবল আপত্তি জানাতে থাকে।
জাপানের অবস্থান হচ্ছে এ রকম যে যৌনদাসীর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধকালীন প্রচলিত থাকা নিয়মের বাইরের কিছু নয় এবং বিশ্বের অনেক দেশই অতীতে তা করেছে। ফলে শুধু জাপানকে দায়ী করা হলে তা পক্ষপাতমূলক হতে বাধ্য। এ ছাড়া জাপান আরও মনে করে যে চীন কিংবা অন্যান্য দেশের সেই সব রমণীকে জোর করে ধরে এনে যৌনদাসী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়নি, বরং অর্থ উপার্জনের জন্য স্বেচ্ছায় তাঁরা সেই পথে পা বাড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে, নানজিং গণহত্যা নিয়ে জাপান সরকার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইউনেসকোকে জানিয়েছিল যে বেসামরিক কিছু চীনা নাগরিক সেই ঘটনায় নিহত হলেও নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কোনো অবস্থাতেই চীনের দাবি করা তিন লাখের কাছাকাছি নয়। সন্দেহ নেই, অতীতের সেই কলঙ্ককে জাপান কলঙ্ক বলে মেনে নিতে রাজি নয়, বরং অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই জাপানের বর্তমান নেতৃত্ব সেটাকে দেখে থাকে। ফলে কলঙ্কের দায়মুক্ত হতে চীনের সুপারিশ করা বিশ্বের সেই স্মৃতি মনোনয়নের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধে জাপান সরকার অবতীর্ণ হয়।
গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে জাপানের সরকারি পর্যায়ের সম্পর্কের ক্রমাবনতি এখন দেশ দুটিকে অনেকটা যেন উত্তপ্ত বাগ্যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে, যার সর্বশেষ উন্মুক্ত প্রকাশ আমরা দেখছি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। স্মৃতি তাই কারও জন্য ইতিহাসের আবশ্যকীয় উপাদান বিবেচিত হলেও কারও কাছে তা যে বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দেয়, জাপানের এই সাম্প্রতিক আচরণ সেই প্রমাণ আবারও আমাদের সামনে তুলে ধরছে। নানজিং গণহত্যা কিংবা যৌনদাসী—কোনোটাকেই জাপানের ক্ষমতাসীন মহল ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। জাপানের এ রকম জোরালো আপত্তির মুখে ইউনেসকোর উপদেষ্টা কমিটি শেষ পর্যন্ত চীনের দুটি সুপারিশ থেকে একটিকে গ্রহণ করে নিয়ে অন্য আবেদনটি নাকচ করে দিয়েছে। বিশ্বের স্মৃতিতে সর্বশেষ অন্তর্ভুক্ত চীনের সেই সুপারিশটি হচ্ছে নানজিংয়ের গণহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত দলিলপত্র।
তবে জাপান কিন্তু এতেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আবুধাবি বৈঠকের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচারিত এক বিবৃতিতে উষ্মা প্রকাশ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইউনেসকোর বিরুদ্ধে আনা হয়। জাপানে জাতীয়তাবাদী চেতনার নবজাগরণ–প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশের বর্তমান প্রশাসন মনে হয় অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব মেনে নিতে রাজি নয়। জার্মানির দৃষ্টান্ত জাপানের সামনে থেকে গেলেও সেই একই পথে পা বাড়াতে দেশের নেতৃত্ব নারাজ। ফলে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরাকেই টোকিওর নীতিনির্ধারকেরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তবে সে রকম অনমনীয় অবস্থান যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধিতে সহায়ক নয়, জাপানের নেতৃত্ব মনে হয় সেটা বিবেচনায় নিচ্ছে না।
নানজিং গণহত্যায় ঠিক কতজন নিহত হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তাই বলে ঘটনার গুরুত্বকে অস্বীকার করা হলে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি এবং নিপীড়নের শিকার হওয়া একটি জাতির প্রতি অসম্মানই এর মধ্য দিয়ে করা হয়। জার্মানি যেমন নাৎসি অপরাধের জন্য নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেই বসে থাকেনি, বরং আইন করে যেকোনো রকম নাৎসি তৎপরতা দেশজুড়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, জাপানের বেলায় সে রকম কিছুই কিন্তু দেখা যায় না। ফলে যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের অপরাধের বিষয়টিও যেন হয়ে ওঠে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। আর সে রকম পরিবেশ নতুন করে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে জুগিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় ইন্ধন।
ইউনেসকোর বিশ্বের স্মৃতি প্রকল্পে বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের নানা রকম উপাদান ইতিমধ্যে সংযুক্ত হলেও বাংলাদেশ কিন্তু এখন পর্যন্ত তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। এ বছরও কোনো রকম সুপারিশ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা হয়নি। এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি শোষণ ও গণহত্যার বিষয়েও কোনো দলিলপত্র বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিবেচনার জন্য দাখিল করেনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা না অজ্ঞতা, তা এই নগণ্য কলাম লেখকের বোধগম্য নয়।
তবে আমাদের সেই মহান ঐতিহ্য আর সাম্প্রতিক ইতিহাসের পাশাপাশি অতীতের আরও অনেক কিছু বিশ্বের স্মৃতিতে কীভাবে যুক্ত করে নেওয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরুর প্রক্রিয়ায় মনে হয় আর বিলম্ব করা উচিত নয়।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
Monday, October 5, 2015
জাপানি নাগরিক হত্যা অশনিসংকেত by মনজুরুল হক
ফলে আমাদের সরকার বা আমরা বাংলাদেশিরা যত জোরের সঙ্গেই বাংলাদেশের ইসলামি চরম পন্থার প্রভাব–বলয় থেকে বের হয়ে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার দাবি করি না কেন, এক সপ্তাহের মধ্যে দুজন বিদেশি নাগরিকের হত্যাকাণ্ড কিন্তু বিশ্ববাসীর দুয়ারে ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। বার্তাটি হচ্ছে, উগ্র মৌলবাদের থাবা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি, সেই কালো হাত আমাদের পেছনে বেশ জোরালোভাবেই ধাবমান। এ কারণেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এখন উচিত হবে হত্যার পেছনে যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে আসলেই এদের কোনো যোগসাজশ রয়েছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে আরও অনেক বেশি তৎপর হওয়া। তা তারা করতে না পারলে একটি বিপজ্জনক রাষ্ট্রের যে তকমা আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশকে তা অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে।
জাপানি নাগরিক হত্যার ঘটনাটিকে আমাদের সরকারি মহল ও সংবাদমাধ্যম নানা দিক থেকে তুলে ধরে এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম নিহত জাপানিকে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করায় সরকারি ও বেসরকারি মহলের কেউ কেউ বলছেন, সঠিক অর্থে জাপানি হত্যার ঘটনা হিসেবে সেটাকে দেখা যায় না। তবে হত্যার পেছনে যারা জড়িত তারা মনে হয় না সে রকম কোনো হিসাব থেকে ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
এটা এখনই বলা কঠিন যে আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী নিশ্চিতভাবেই এসব হত্যার পেছনে জড়িত। তবে এ রকম হত্যাকাণ্ড চালিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা বা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে কোনো ধরনের ফায়দা লুটে নেওয়ার চেষ্টায় যে হত্যাকাণ্ড চালানো হতে পারে, সে রকম ধারণা নাকচ করে দেওয়া কঠিন। দুই হত্যার ধরন এবং এর থেকে লাভবান হওয়ার হিসাবনিকাশের দিকে আলোকপাত, মনে হয় সেই যুক্তিকেই আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।
দুটি হত্যার বেলায়ই হত্যাকারীদের আর্থিক দিক থেকে লাভবান হতে পারার কোনো রকম প্রমাণ মেলে না। নিহত দুই বিদেশিও বিত্তবান ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কেউ নন, যাঁদের খুন করার মধ্য দিয়ে বিশাল কোনো সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব। হত্যাকারীরা সম্ভবত যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকবে তা হলো প্রচার। বিশেষ করে এ ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে বিপজ্জনক এক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঘটনা দুটি আংশিকভাবে হলেও সেই সাফল্য এনে দিয়েছে। সেদিক থেকে জাপানি নাগরিক হত্যার ঘটনার প্রভাব মনে হয় অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠবে, যদি না প্রমাণ করা যায় যে সেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা। নিহত ব্যক্তি আসল জাপানি, নাকি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী জাপানি, সেই বিতর্ক এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা আমরা জানি, তিনি ছিলেন জাপানি পাসপোর্টধারী এবং অন্য যেকোনো জাপানি পাসপোর্টধারীর মতোই জাপান সরকার তাঁকে দেশের নাগরিক হিসেবেই দেখছে, বিদেশি হিসেবে নয়।
এখন দেখা যাক ঘটনার কী প্রতিক্রিয়া জাপানের দিক থেকে দেখা দিতে পারে। মার্কিন সরকার জাপানি নাগরিক হত্যার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখালেও জাপান কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ঝটপট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। তবে এর অর্থ এ রকম নয় যে বিষয়টি নিয়ে কোনো রকম উচ্চবাচ্য জাপান করছে না এবং আগামী দিনগুলোতেও করবে না। জাপান অবশ্যই চাইবে বাংলাদেশ সরকার যেন হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় তাদের উপস্থিত করে। তবে তারও আগে জাপানি নাগরিকদের সামনে দেখা দেওয়া সম্ভাব্য হুমকি সামাল দিতে হলে কী করা দরকার তা নিয়ে জাপান ভাবছে এবং সে ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ তারা ইতিমধ্যে নিয়েছে। যেমন জাপানি নাগরিক নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর জাপান সরকার বাংলাদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা জাপানি নাগরিক ও সেই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত জাপানিদের জন্য সতর্কতার মাত্রা আরও কিছুটা কঠোর করে নেয়। কী রকম সতর্কতা তাদের বজায় রাখতে হবে, সেই পরামর্শও জাপানি নাগরিকদের দেওয়া হচ্ছে।
তবে জাপান সরকার বিদেশভ্রমণের বেলায় চার মাত্রার যে সতর্কতামূলক সুপারিশ নাগরিকদের জন্য করে থাকে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের কোনো রকম হেরফের এখনো পর্যন্ত হয়নি। সতর্কতা বজায় রাখা দরকার, সে রকম রাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো হচ্ছে এক নম্বরে, হলুদ রং দিয়ে মানচিত্রে যেটাকে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেশটির বেলায় নেই, তবে সেখানে অবস্থানকালে সতর্কভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ নাগরিকদের দেওয়া হচ্ছে। গতকাল রোববার প্রচারিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশিকায় সেই সতর্কতার মাত্রাকেই আরও কিছুটা উন্নত করে নিয়ে কী করা দরকার এবং কোন বিষয়গুলোর দিকে তাদের আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে, সেসব পরামর্শ নতুন করে নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ নিশ্চয় এ রকম নয় যে বাংলাদেশের বেলায় সতর্কতার হলুদ রং আরও একটু গাঢ় হয়ে উঠবে না। এর অনেকটাই নির্ভর করবে ঘটনার পেছনে থেকে যাওয়া সব রকম রহস্য উন্মোচনে কতটা সফল আমরা হই তার ওপর।
সতর্কতার উচ্চ মাত্রা অবশ্য ব্যবসায়িক দিক থেকে নেতিবাচক কিছু প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ফেলবে। জাপানের যেসব ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করে দেখার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তারা হয়তো এখন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করবে। ফলে জাপানিদের বাংলাদেশে ভ্রমণের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব হয়তো এখন লক্ষ করা যাবে। জাপানের সেইশিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা গবেষক অধ্যাপক মাসাহাকি ওহাশি মনে করেন যে জাপানি নাগরিক হত্যার ঘটনা বাংলাদেশ সম্পর্কে কতটা নেতিবাচক প্রভাব জাপানিদের ওপর ফেলবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে কোন বার্তা বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়া যাবে তার ওপর। ‘আমি মনে করি না জাপানের ব্যবসায়ী, গবেষক ও বাংলাদেশ নিয়ে উৎসাহী অন্য জাপানিরা এখনই দেশটিকে খুবই বিপজ্জনক বলে ধরে নেবেন। যদি এমন প্রমাণিত হয় যে সেটা ছিল বিচ্ছিন্ন একটি হত্যার ঘটনা, সেই ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘায়িত হবে না। তবে যদি এমন দেখা যায় যে ঘটনাটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ধারাবাহিকতা, তাহলে কিন্তু জাপান সরকার সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়ে দেবে এবং জাপানিরাও বাংলাদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে যেতে চাইবেন’ বলেছেন অধ্যাপক ওহাশি।
ফলে সন্দেহ নেই যে জাপানি হত্যার ঘটনা অশনিসংকেত হিসেবে আমাদের সামনে এখন ঝুলে আছে। ভবিষ্যতে কোন পদক্ষেপ আমাদের সরকার গ্রহণ করে এবং বিদেশিদের আশ্বস্ত করার বস্তুনিষ্ঠ কোন উদ্যোগ সরকার ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়, সেসব কিছুর ওপর অনেকটা নির্ভর করবে অশনি সেই সংকেত কাটিয়ে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে কি না।
টোকিও, অক্টোবর ৪, ২০১৫
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
Tuesday, July 14, 2015
ইউরোপের রঙ্গমঞ্চে ঋণ-নাটক by মনজুরুল হক
আমরা যারা ব্যাংকিং খাতের জটিল নানা রকম হিসাবপত্র নিয়ে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নই, তাদের কাছে গ্রিসের দাবিকে সহজেই অযৌক্তিক মনে হতে পারে। ঋণ যখন গ্রিস নিয়েছে, তখন সেই ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও দেশটির। গ্রিসও কিন্তু ঠিক সে কথাই বলছে। গ্রিসের সরকার বলছে না যে ঋণ এথেন্স পরিশোধ করবে না। তবে গ্রিসের দাবি হলো, ঋণের পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা দরকার এবং এ রকম একটি ঋণ পরিশোধব্যবস্থা ঠিক করে নেওয়া উচিত, যেটা কিনা ঋণ পরিশোধের নামে নাগরিক জীবনকে আরও বেশি অসহনীয় করে তুলবে না।
গ্রিসের কাছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জমা হওয়া ঋণের মোট পরিমাণ হচ্ছে ২৪ হাজার কোটি ইউরো। ২০০৮ সালে গ্রিস প্রথমবারের মতো আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর সংকট উত্তরণে দুই দফায় গ্রিসকে দেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণ জমা হয়ে এমন এক ঋণের ফাঁদ এখন গ্রিসের জন্য সেটা তৈরি করে দিয়েছে, যা থেকে বের হয়ে আসার কোনো পথ দেশটির সামনে খোলা রাখা হয়নি। আগের দুই দফার ঋণ অবশ্যই শর্তহীন ছিল না। ঋণ পাওয়ার জন্য দেশটিকে যেসব শর্ত হজম করে নিতে হয়, তার মধ্যে ঋণদাতাদের অত্যন্ত পছন্দনীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় সংকোচন এবং বৃদ্ধদের পেনশন ভাতা হ্রাস অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঋণদাতারা এসব শর্ত ঋণ গ্রহণকারী দেশের উপকারের কথা বিবেচনা করে নয়, বরং নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করেই আরোপ করে থাকে। যুক্তি এখানে হচ্ছে এ রকম যে সরকারের খরচ কমিয়ে আনা হলে বাড়তি যে আয় সরকারের হাতে আসবে, সেটা দিয়ে ঋণের কিস্তি সরকার পরিশোধ করতে পারবে।
অন্যদিকে আবার বিশাল অঙ্কের নতুন যে ঋণ শর্ত মেনে নেওয়া সাপেক্ষে দেওয়া হয়, তারও সিংহভাগ চলে যায় ঋণদাতাদের ব্যাংকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ বাবদ। অর্থাৎ, নতুন ঋণের বড় অংশ ঋণ গ্রহণকারী দেশ চোখে দেখারও সুযোগ পায় না, দাতাদের কাছ থেকেই সেই অর্থ বরং চলে যায় দাতাদের দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে। আগের দুই কিস্তির ঋণের ৭০ শতাংশেরও বেশি এভাবেই চলে গিয়েছিল দাতা দেশগুলোর ব্যাংকে।
সরকারের ব্যয় হ্রাসের অন্য যে প্রেসক্রিপশন দাতারা দিয়ে থাকে তা হলো, সরকারের আকার ছোট করে নেওয়া। যার অর্থ অন্য কথায় সরকারি চাকরির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা। ফলে আমরা যা দেখতে পাই তা হলো, ঋণদাতাদের আরোপিত শর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যারা হচ্ছে, তারা হলো ঋণ গ্রহণকারী দেশের প্রান্তিক জনগণ—পেনশন ভাতা কমে যাওয়া বৃদ্ধ, চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসায় বেকারত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়া তরুণ সমাজ এবং সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা থেকে বঞ্চিত সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষজন।
এসব হিসাব সামনে রেখেই জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থী নেতা অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের রাজনৈতিক দল সিরিজা জনগণের সমর্থন পেলে ঋণের শর্তাবলি পুনর্নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে দিয়েছিল। ফলে দাতারা আবারও নতুন ঋণ প্রদানের বিনিময়ে আগের একই রকমের সব শর্ত গ্রিসের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইলে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনগণের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন ঋণ প্রশ্নে জনতার রায় শোনার জন্য। ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ বলেছেন দাতাদের শর্ত মেনে নিতে তারা রাজি নন।
গ্রিস যে হচ্ছে আকণ্ঠ ঋণে জর্জরিত একটি দেশ, সেই প্রশ্নে কোনো রকম সন্দেহ একেবারেই নেই। গত দুই দশকে বছরের পর বছর ধরে ঋণের পর ঋণ গ্রিস নিয়ে গেছে এবং সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশটি যে সংকটময় পথের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, ঋণদাতাদের চোখে সেটা পড়েনি, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে তারপরও গ্রিসকে ঋণ দিতে কোনো রকম কুণ্ঠাবোধ তারা করেনি। কেন করেনি, সেই প্রশ্নও এক গোলকধাঁধার মধ্যে আমাদের ফেলে দেয়। তবে পুঁজির থলের ভেতরের খেলার দিকে নজর দিলে প্রশ্নের উত্তরও আমরা হয়তো সহজেই পেয়ে যেতে পারি।
ইউরো মুদ্রার দেশগুলোর মুদ্রা-সংকটসংক্রান্ত বিষয়াবলি সাধারণভাবে ট্রয়কা নামে পরিচিত যে তিনটি খুবই প্রভাবশালী সংগঠন দেখাশোনা করে থাকে, তারা হচ্ছে ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। কোনো একটি দেশে ঋণ কিংবা মুদ্রাসংকট দেখা দিলে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই সংকট উত্তরণের পথের সন্ধানও এরাই দেখিয়ে দেয়। প্রয়োজনে বিশাল অঙ্কের নতুন ঋণও এদের কাছ থেকে কিংবা এদের অনুমোদন সাপেক্ষে অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকে আসে। গ্রিসের সংকট যেহেতু হঠাৎ করে দেখা দেওয়া সমস্যা নয়, ফলে গ্রিসকে সংকট থেকে বের হয়ে আসার পথের দিশাও আগে থেকে এরা দেখিয়ে আসছে। তবে কথা হচ্ছে, সংকট উত্তরণে এদের সহায়তার হাত যতটা না হচ্ছে, সংকটকবলিত দেশটিকে সাহায্য করার জন্য, তার চেয়ে বেশি সেটা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে। গ্রিসকে দেওয়া আগের ঋণের হিসাব-নিকাশ সেই সত্যতার প্রমাণ সহজেই আমাদের কাছে রাখতে সক্ষম।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর গ্রিসের জন্য দুই দফায় মোট ২৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়। তবে নিঃশর্ত ঋণ তা কোনো অবস্থাতেই ছিল না। বরং শর্তের শৃঙ্খল ছিল খুবই কঠোর। ফলে বিশাল সেই পরিমাণের আর্থিক সহায়তার সিংহভাগ চলে গিয়েছিল পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংকের জমায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের আকারে। আর এটাই হচ্ছে ঋণে জর্জরিত কোনো একটি দেশকে আবারও ঋণ দেওয়ার পেছনের খেলা। ঋণের মধ্যে দিয়ে দেশটিকে সহজেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেওয়া সম্ভব বলে ঋণের অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি সেখানে থাকে কম।
গ্রিসের আগের উদ্ধার ঋণের বেলায় কিস্তি পরিশোধ ও অন্য শর্তাবলির জন্য অর্থ খরচ করার পর মোট থোকের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ সরকারের ভান্ডারে এসে জমা হয়, যেটা দিয়ে গ্রিসকে তখন আবার অসাধ্য সাধন করতে বলা হয়েছিল। সরকারের আর্থিক ভিত পোক্ত করে নিয়ে ভবিষ্যতে সংকট এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের নামে যেসব শর্ত গ্রিসের ওপর তখন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পেনশন ভাতা হ্রাস ও সরকারের নির্ধারিত সর্বনিম্ন বেতন কমানো। আগের সেই উদ্ধার পরিকল্পনার নেট ফলাফল হিসেবে গ্রিস যা পেয়েছে তা হলো, অর্থনীতি ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়ে আসা এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬০ শতাংশে বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে আগের সেসব শর্ত গ্রিসের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী আবারও নতুন আলোচনায় বসার আহ্বান ঋণদাতাদের প্রতি জানিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, আলোচনার পথ সুগম করে দিতে অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস পদত্যাগ করেছেন। দাবার পরবর্তী চাল তাই এখন দাতাদের দেওয়ার কথা।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷
Sunday, June 28, 2015
‘সুলতান’ এরদোয়ানের হোঁচট খাওয়া by মনজুরুল হক
২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে টানা ১১ বছর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তুরস্কে এতটা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নেতাই ভোটের মাধ্যমে জনগণের আস্থা লাভ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। তুর্কি ভাষার আদ্যাক্ষরের সংক্ষিপ্ত নামকরণ একেপি নামে পরিচিত তুরস্কের ইসলামপন্থী ন্যায় ও গণতান্ত্রিক দলের নেতা সেটা পেরেছেন নিজেকে অনেকটা জনগণের কাছের মানুষ হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে।
তাঁর এই অগ্রযাত্রা কণ্টকমুক্ত পথে হেঁটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়নি। কামাল আতাতুর্কের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা সমুন্নত রাখা তুর্কি সামরিক বাহিনীর বিরোধিতা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই জনতার সারিতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এরদোয়ান ও তাঁর অনুসারীরা।
ফলে জনতার আস্থাও তাঁরা সহজেই লাভ করতে পেরেছিলেন, যার ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত তুরস্কে ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনে সক্ষম হয় একেপি এবং এরদোয়ান হয়ে ওঠেন জনতার পছন্দের নেতা। তবে তাঁর পতনের সূচনাও মনে হয় সেখান থেকেই।
ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের বাহন হিসেবে ব্যবহার করা দল একেপি শুরু থেকেই হয়ে পড়েছিল একক নেতার ওপর নির্ভরশীল একটি দলে। এরদোয়ানের প্রভাব দলে এতটাই বিস্তৃত যে তাঁর নির্দেশের বাইরে কিছুই সেখানে হয় না। এ-ও যেন হচ্ছে আমাদের সেই সংস্কৃতি—অর্থাৎ, গণতন্ত্র সরকারের গঠনের বেলায় মেনে চলব, দলের ভেতরে নয়। সে রকম অবস্থায় এরদোয়ান নিজেও চাননি দলের ভেতরে কিংবা বাইরে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ দাঁড়িয়ে যাক। ফলে ক্রমাগতই তিনি হয়ে উঠছিলেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরের একজন একনায়ক।
কেবল নিজের মন্ত্রিসভা গঠনেই পছন্দের মানুষ তিনি বেছে নেননি, এমনকি দেশের সাংবিধানিক প্রধান প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করা মানুষটিও যেন হন তাঁরই একজন কলের পুতুল, সেটাও তিনি নিশ্চিত করে নিতে চেয়েছিলেন। সেই পথ ধরেই অবশ্য তুর্কি জনগণ প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছিলেন জনতার কাতারের একজন নেতার ক্ষমতার মোহে ক্রমেই একনায়ক হয়ে ওঠার স্পষ্ট কিছু ছবি। নিজের দলের ঘনিষ্ঠজন আবদুল্লাহ গুলের প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হয়ে প্রভাববলয় বাড়িয়ে নেওয়া পছন্দ হয়নি প্রধানমন্ত্রীর। ফলে একসময় তিনি ঠিক করে ফেলেন যে নিজেই তিনি বসবেন সেই পদে।
তবে পদের সঙ্গে সাংবিধানিক যেসব দায়বদ্ধতা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে করে দিচ্ছে অনেকটাই সীমিত, সেটাও তাঁর আবার পছন্দ নয়। ফলে তিনি চেয়েছিলেন সংবিধান রদবদল করে নিয়ে এমন একটি প্রেসিডেন্টের পদ তৈরি করে নিতে, নামে যেটা নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হলেও কার্যত যেটা হবে সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্র। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সামনে রেখে পরোক্ষ একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা তুরস্কে তিনি গড়ে নিতে চেয়েছিলেন, যা কিনা ক্ষমতা থেকে তাঁকে অপসারণের প্রক্রিয়াকেও করে তুলবে খুবই কঠিন। আর সে রকম এক হিসাব থেকেই ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিজের বশংবদ এক দলীয় নেতাকে বসিয়ে নিজে হয়ে ওঠেন প্রেসিডেন্ট।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ তখন থেকেই পরোক্ষে তাঁকে ‘সুলতান’ আখ্যায়িত করতে শুরু করে। নিজের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তুর্কি নেতা। এমনকি নিজের ধর্মীয় মতাদর্শের মিত্র ফাতুল্লাহ গুলেনের সঙ্গেও একসময় দেখা দেয় তাঁর বিরোধ এবং নির্বাসিত সেই নেতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি হয়ে ওঠেন খড়্গহস্ত। এতটা মাত্রাতিরিক্ত আত্মপ্রত্যয় যে পরোক্ষে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিল স্খলনের পথে, তা তিনি বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেননি কিংবা চাননি। সে রকম বিধ্বংসী আত্মপ্রত্যয়ের আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় শতাধিক কক্ষের নতুন প্রেসিডেন্ট ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়ায়। এরদোয়ান দাবি করে বসেন আগের ভবনটি তেলাপোকায় এতটাই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে যে মনুষ্যবাসের উপযোগী সেটা এখন আর নেই। নিজেকে তিনি হয়তো আতাতুর্কের প্রেতাত্মা থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন বলেই আতাতুর্কের সময় থেকে রাষ্ট্রপ্রধানদের বসবাসের সেই প্রাসাদ তাঁর মনঃপূত হয়নি।
অনেকেই অবশ্য প্রশ্ন করছেন, এরদোয়ান কেন আগে থেকে সংবিধান সংশোধন করে না নিয়ে নিজে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপ করার জন্য ২০১৫ সালের নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? দুটি ভিন্ন হিসাব সেই পথে অগ্রসর হতে তুর্কি নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রথমটি হলো এমন কারও ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারছিলেন না, যিনি কিনা সংবিধান সংশোধিত হয়ে যাওয়ার পর প্রচুর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা প্রেসিডেন্টের পদটি স্বেচ্ছায় তাঁর জন্য ছেড়ে দেবেন। কে জানে ক্ষমতার মোহে আটকা পড়ে গিয়ে নিজেরই সে রকম কোনো অধস্তন হয়তো পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো একই পরিণতির দিকে তাঁকেও ঠেলে দিতে পারে। একনায়কের মনমানসিকতার এ হচ্ছে মস্ত এক দায়। কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা তাঁদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয় না। আর তাই কোনো রকম ঝুঁকি এরদোয়ান নিশ্চিতভাবেই নিতে চাননি।
আর দ্বিতীয় অঙ্কটি হচ্ছে তাঁর হিসাবের ভুল, একনায়কসুলভ গণতান্ত্রিক নেতারা যে ভুল প্রায় সব সময় করে থাকেন। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতাসীন থেকে বিরোধীদের সব রকমভাবে কোণঠাসা করে দেওয়ার পর তিনি অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন যে সংবিধান বদলের জন্য প্রয়োজন হওয়া দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা তাঁর জন্য কোনো ব্যাপারই নয়। আর এসব ভুলের সমন্বিত ফলাফল হচ্ছে তাঁর এই হোঁচট খাওয়া।
একেপি এখনো তুরস্কে হচ্ছে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তবে সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলের না থাকায় শেষ পর্যন্ত হয়তো দ্বিতীয় কোনো শরিককে নিয়ে আবারও দল ক্ষমতাসীন হবে। আর সংবিধান পরিবর্তন সম্ভব না হওয়ায় এরদোয়ান হয়ে উঠবেন ঠুঁটো জগন্নাথ প্রেসিডেন্ট, নতুন প্রধানমন্ত্রী যঁার ওপর কোনো অবস্থাতেই আর সেভাবে নির্ভরশীল হবেন না। ফলে মাত্র কিছুদিন আগের পরাক্রমশালী নেতা এর মধ্য দিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়লেও তুরস্কের গণতন্ত্রের জন্য সেটা অবশ্যই নতুন সুবাতাস।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷
Tuesday, June 23, 2015
সু চির জন্মদিন ও লাঞ্ছিত নায়েক রাজ্জাক by মনজুরুল হক
![]() |
| অং সান সু চি, আবদুর রাজ্জাক |
সত্তরতম জন্মদিনে অং সান সু চির ঘটা করে বিশাল আকারের কেক কাটার ছবি পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটে দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। জন্মদিনে এই কেক কাটার ছবি দেখলে আমরা বাংলাদেশিরা অবশ্য কিছুটা ভড়কে যাই। কেননা, আমাদের জীবনের বাস্তবতা এ রকম বার্তা আমাদের দেয় যে জন্মদিনের সেই রকম বিশাল আকারের কেকের নিচে অসত্যের অনেক ধুলা চাপা দেওয়া থাকে। তবে সু চির বেলায় সেটা হয়নি বলেই ধারণা করি। তারপরও ভিন্ন একটি কারণে সংশয়মুক্ত হওয়া হয়তো আমাদের অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা জানি, সু চি যখন জন্মদিনে টেবিলজুড়ে কেক কাটছেন, তাঁরই দেশের অসহায় কিছু মানুষ তখন ক্ষুধার জ্বালা আর প্রাণের ভয়ে দেশান্তরিত। আর অসহায় সেই মানুষগুলো যে তাঁরই দেশের মানুষ, সেই সত্য অস্বীকার করবেন কীভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী? শুধু সেটুকুই নয়। ইন্টারনেট আর পত্রপত্রিকায় যেদিন সু চির জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখার সুযোগ আমাদের হয়, সেই একই দিনে আরেকজন অসহায় মানুষের ছবিও আমরা দেখি, সু চির দেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় (মিয়ানমার নয়) দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকার অপরাধে দেশটি তাঁর সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করছে। জন্মদিনের কেক কাটার উৎসবে আমাদের সেই নায়েকের অসহায় পরিণতির কথা সু চির আদৌ মনে হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্যও তিনি করেননি। যদিও আমরা জানি, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে অন্তত এ বিষয়ে কিছু একটা বলা তাঁর উচিত ছিল। তবে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর থাকার কারণেই তিনি এ বিষয়ে কিছু বলা থেকে বিরত আছেন? দেশটির সামরিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যদি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কোনো ফারক না থাকে, তাহলে আমাদের উদ্বিগ্ন হতে হয় বৈকি।
কোন পরিস্থিতিতে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছেন এবং আরেক সীমান্তরক্ষী, নায়েক আবদুর রাজ্জাক বন্দী হয়েছেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলেছে, তাদের টহল নৌকা বাংলাদেশ জলসীমায়ই ছিল। মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের (বিজিপি) দাবি, তারা তাদের জলসীমা থেকেই রাজ্জাককে আটক করেছে। সেটি যদি সত্যও হয়, বিজিবির সদস্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই দেশের মধ্যে বিভক্তি রেখা টেনে দেওয়া নাফ নদীতে চোরাই পণ্যের লেনদেনের বিষয়টি সবার জানা। মনে পড়ে, ছাত্রজীবনে একবার শিক্ষাভ্রমণে সেই নাফ নদীর তীরে যাওয়ার সুযোগ যখন হয়েছিল, সেই সময়ও যে নদী দিয়ে চোরাই পণ্যের আদান-প্রদান হতো, তা আমাদের চোখ এড়ায়নি। এখন অবশ্য ইয়াবার মতো ক্ষতিকর মাদক আর অবৈধ অস্ত্র সেই পথে নিয়মিত আসছে বলে অভিযোগ আছে। ফলে সে রকম এক সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত টহল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সে রকম টহল দায়িত্ব পালন করছিলেন আমাদের নায়েক রাজ্জাক, মিয়ানমারের প্রতিপক্ষ যখন হঠাৎ তাঁর দলের একজনকে আহত করে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে বলা যায় এ রকম নতুন এক খেলার শুরু, আন্তর্জাতিক কূটনীতির খুবই লজ্জাজনক এক লঙ্ঘনই যেটা কেবল নয়, বরং প্রচলিত সব রকম আইন তথা জেনেভা কনভেনশনেরও পরিপন্থী।
আমরা চাই আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আপনি যেন দ্রুত পৌঁছে যেতে পারেন। কেননা, সেই সত্য আমাদের জানা আছে যে আপনার দেশের মানুষের জন্য সেটা হয়তো হবে একধরনের মুক্তি এবং আগামীর অভিজ্ঞতা হয়তো আপনাকে দেখিয়ে দেবে আজকের এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার পথ নায়েক রাজ্জাকের যে ছবি মিয়ানমার প্রচার করেছে, সেখানে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো সংজ্ঞাতেই প্রতিবেশী দেশের বন্দী এক সীমান্তরক্ষীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বসিয়ে রেখে ছবি তুলে নিয়ে তা বিশ্বজুড়ে প্রচার করার নিয়ম নেই। তবে দেশটির নৈতিক মানদণ্ড এখন এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার-বুদ্ধিও দেশের নীতিনির্ধারকেরা হারাতে বসেছেন।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কাছে কোনো রকম প্রত্যাশা থাকা আমাদের উচিত নয়। কেননা, আমরা জানি সেই জান্তা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের সব রকম অধিকারই কেবল খর্ব করেনি, সেই সঙ্গে দমন–পীড়নের পর জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোটের ফলাফল বানচাল করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। সে কারণেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা বিরোধী দলের নেত্রী অং সান সু চির প্রতি আশা নিয়ে আমরা তাকিয়ে ছিলাম। কেননা, নীরব অথচ বলিষ্ঠ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জান্তার কুশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আদর্শ প্রতীক। আমরা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেছি, মনে মনে চেয়েছি তিনি যেন তাঁর সেই অসম যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেন এবং হয়েছেনও। ফলে তাঁকে নিয়ে আমাদের মধ্যে গভীর প্রত্যাশাও জেগেছিল। সেই প্রত্যাশা হলো, ন্যায় বোধের দ্যুতিময় স্ফুলিঙ্গে উদ্ভাসিত অং সান সুচি অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
জন্মদিন পালন করলেন তিনি খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে। আর এটা ঠিক তখন তিনি পালন করলেন, নিজের দেশের একটি জাতিগোষ্ঠী যখন নির্যাতনের স্টিমরোলারের চাপে পিষ্ট হয়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশের এক নাগরিককে যখন স্রেফ নিজ দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার অপরাধে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করে রাখা হচ্ছে। আর এসব নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন আমাদের প্রত্যাশার সেই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।
না, জন্মদিনে আপনার জন্য অশুভ কোনো কামনা আমাদের নেই। আমরা চাই আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আপনি যেন দ্রুত পৌঁছে যেতে পারেন। কেননা, সেই সত্য আমাদের জানা আছে যে আপনার দেশের মানুষের জন্য সেটা হয়তো হবে একধরনের মুক্তি এবং আগামীর অভিজ্ঞতা হয়তো আপনাকে দেখিয়ে দেবে আজকের এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার পথ। ফলে আপনার দিকে বাড়িয়ে রেখেছি আমাদের ভালোবাসার হাত।
টোকিও, ২০ জুন ২০১৫
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷
Thursday, June 11, 2015
সাগরে ভাসা মানুষের দুঃখের গাথা by মনজুরুল হক
অসহায় এসব মানুষের কথা বলতে গেলে তাই অজান্তেই আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কিছু অমানুষের কথাও এসে যায়, লোভ আর মোহ যাদের নিয়ে গেছে এমন এক অন্ধকার কুঠুরিতে, যাবতীয় মানবিক গুণ যেখানে তারা বন্ধক রেখেছে নগদপ্রাপ্তির কাছে। আর এ দুই দলের মাঝে আছে আরও একশ্রেণির মানুষ, বাহ্যিক পরিচয়ে যাদের অবস্থান আমাদের মতো নগণ্য শ্বাসজীবীদের অনেক ওপরে, তবে কাছে থেকে চোখ বুলিয়ে নিলে দেখা যাবে যার সবটাই হচ্ছে খোলস। আর সেই অমানুষ আর অর্ধেক মানুষদের অন্যের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় মত্ত হওয়ার মুখে নিজেদের মানব পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়ে অথই সমুদ্রে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হচ্ছে প্রতারিত কিছু মানুষকে। সে রকম এক ট্র্যাজিক নাটকের আমরা হলাম অসহায় কিছু দর্শক।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি আমার যে খুব অনুরাগ আছে, তা নয়। এর পেছনে প্রত্যক্ষ যে কারণ, তার মূলে আছে তিক্ত এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। বেশ কয়েক বছর আগে টোকিওতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা একটি সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালকের দায়িত্ব আমি পালন করেছিলাম। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে এসেছিলেন তরুণ কয়েকজন রোহিঙ্গা, জাপানে শরণার্থী মর্যাদা লাভের আবেদন যাঁরা করেছিলেন এবং তাঁদের সেই আবেদনের নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায় তাঁরা ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের শেষে এঁদের নেতার কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে কি না। তরুণ সেই রোহিঙ্গা নেতার তাৎক্ষণিক জবাব ছিল ইতিবাচক এবং আমাকে তিনি বলেছিলেন যে বছর পাঁচেক সেখানে তিনি কাটিয়েছেন। সেই সূত্রে তাঁর কাছে আমি আরও জানতে চেয়েছিলাম, বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সুযোগ তাঁর আদৌ হয়েছিল কি না। এবারের উত্তর কেবল নেতিবাচকই ছিল না, বরং আমাকে তিনি আরও বলেছিলেন যে বাংলা ভাষা তিনি শেখেননি, তবে শরণার্থী শিবিরের মুসলমান ভাইদের সহায়তায় আরবি আর উর্দু ভাষা তিনি সেখানে রপ্ত করার সুযোগ পান।
দেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে যে বেশ বড় রকমের ছক-কষা খেলা অনেক দিন থেকে চলছে, তাতে মনে হয় অনেকেই একমত হবেন। তবে এর অর্থ এটা নয় যে ন্যায্য অধিকার থেকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করার জঘন্য যে খেলায় মিয়ানমারের প্রশাসন আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশ মত্ত রয়েছে, তার প্রতিবাদ আমরা করব না এবং ‘তোমার ঝামেলা আমার নয়’ বলে চোখ বন্ধ করে থাকব।
রোহিঙ্গাদের দাবার ঘুঁটি হয়ে ওঠায় লাভবান হচ্ছে নিশ্চয় একশ্রেণির মানুষ এবং এদের চিহ্নিত করা এখন মনে হয় বাংলাদেশের স্বার্থেই অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। নগদ অর্থের লেনদেন যেখানে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, মধুলোভী মৌমাছির ভিড় সেখানে স্বাভাবিক। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন তাদের দেখিয়ে এদের কাছ থেকে সহজেই জীবনের শেষ সম্বল হাতিয়ে নেওয়ার এক প্রাণঘাতী খেলায় যারা নিয়োজিত, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত প্রভাবশালী মানুষজনও জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরাখবরে সেই সত্যতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রায় রোহিঙ্গাদের এরা তুলে দিচ্ছে।
আর অসহায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে স্বপ্নচারী বাংলাদেশি তরুণেরা তো আছেই, বিদেশে ‘উন্নত জীবনের স্বপ্নে’ এরা এতটাই প্রভাবিত যে জমি বিক্রি কিংবা ধারের অর্থে হলেও ডিঙি নৌকায় উপকূল পার হয়ে অদূরে অপেক্ষমাণ মাছ ধরার ট্রলারে উঠে যাওয়ার আগে অনিশ্চিত জীবনের চিন্তা এদের মাথায় একবারের জন্যও খেলে যায় না। অন্যদিকে ৮০০ রোহিঙ্গার ভিড়ে শ খানেক বাংলাদেশি স্বপ্নচারী তরুণ ট্রলারে জায়গা করে নেওয়ায় মিয়ানমার সরকারের পক্ষে এ রকম আন্তর্জাতিক প্রচারে লিপ্ত হওয়া সহজ হয়ে উঠছে যে সমুদ্রে ভাসমান অসহায় সেসব মানুষ দেশত্যাগী শরণার্থী মোটেও নয়, বরং তারা হচ্ছে অর্থনৈতিক অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশি। আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি অনেকটাই ভূলুণ্ঠিত করে দিচ্ছে। এর বাইরে ভিন্ন একটি দিক থেকেও আমাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের সরকার জোর গলায় বলে আসছে যে মধ্য আয়ের দেশ হয়ে ওঠা আমাদের জন্য এখন সময়ের ব্যাপার। কিছুদিন আগে দেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। সে রকম একটি দেশ থেকে এত বেশি তরুণের উন্নত জীবনের সন্ধানে যেকোনো উপায়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার তো কথা নয়। তবে এরপরও তা হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে, সেদিকে মনে হয় সরকার আর নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া দরকার। মাথাপিছু আয় একটি দেশের সার্বিক অবস্থার ঝাপসা কিছু ছবিই কেবল আমাদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম। ঝাপসা সেই ছবি স্পষ্ট করে তুলতে হলে মাথাপিছু আয়ের বণ্টনের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রাপ্তির সবটাই যদি শহুরে বিত্তবান শ্রেণির হাতে যায়, তাহলে মাথাপিছু আয়ের স্ফীতি কোনো কাজে আসবে না এবং দুর্গম পল্লি অঞ্চল আর শহরের ভাসমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তরুণ প্রজন্মের সামনে অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না।
এই দরিদ্র মানুষগুলোর প্রতারিত হয়ে বিদেশ যাওয়ার পেছনে যে আর্থসামাজিক সমস্যা আছে, সেগুলো দূর করতে জনমত গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আর তাই দাতাদেরও এদিকে বেশি দৃষ্টিপাত করা দরকার। তবে দাতারা মনে হয় মিয়ানমারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির বয়ানে মুগ্ধ। সু চি বলে চলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক কি না, সেই প্রমাণ তাদের দিতে হবে। ভোটের হিসাব যে মানবিকবোধকেও বিসর্জন দিতে পারে, সেটাই প্রমাণ করলেন প্রতিবেশী দেশের এই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷
Tuesday, March 17, 2015
আরেক আগুনবোমার কথা by মনজুরুল হক
আগুনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক মনে হয় আগুনকে মানুষ বশে আনতে পারার পর থেকেই। আগুন যে জীবনের উৎস, সেই বাস্তবতা থেকে একসময় সূচনা হয়েছিল অগ্নি উপাসনার। পৃথিবীর বেশ কিছু অঞ্চলের মানুষ এখনো জীবনের উৎস আগুনকে দেবতা হিসেবে গণ্য করে থাকে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আগুন একদিকে যেমন মানুষের জন্য খুলে দিয়েছে প্রগতির পথ ধরে যাত্রা শুরু করার দুয়ার, অন্যদিকে সেই একই আগুন মানুষকে দীক্ষা দিয়েছে বর্বরতার। আগুনের শক্তি উপলব্ধি করে অন্যকে কাবু করতে পারার হাতিয়ার হিসেবে যুগ যুগ ধরে মানুষ আগুনকে ব্যবহার করেছে যুদ্ধের জুতসই অস্ত্র হিসেবে। চেঙ্গিস খান আর হালাকু খানেরা যুদ্ধজয়ের পর যে উন্মাদনায় মত্ত হতেন, তা হলো দাউ দাউ অগ্নিশিখায় জ্বালিয়ে দেওয়া বর্ধিষ্ণু সব জনপদ। সেই উন্মাদনার হাত থেকে রক্ষা পেত না কোনো কিছুই।
ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে আগুনের সে রকম বর্বর ব্যবহারে সব সময় সবচেয়ে বেশি যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা হলো সাধারণ মানুষ, আগুনের ব্যবহারের মতোই শাসক আর শোষকের ব্যবহারের বস্তুতে বরাবর যারা পরিণত হয়ে থাকে। প্রগতির চাকা এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলেও আজও থেমে নেই আগুন নিয়ে মানুষের তাণ্ডবে মত্ত হওয়ার খেলা। সে রকমই এক ভয়াবহ খেলায় আজ থেকে ৭০ বছর আগে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছিল এক লাখের বেশি সাধারণ মানুষ। সংখ্যাগত হিসাবের দিক থেকে বর্বরতার মাত্রা চেঙ্গিস-হালাকুকে ছাড়িয়ে গেলেও রাজনীতির হিসাব-নিকাশের মস্ত এক প্যাঁচে সেই নিহত ব্যক্তিদের কথা এখন আর সেভাবে কেউ স্মরণ করেন না।
১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ মধ্যরাতের ঠিক অল্প পরে এগিয়ে আসা বিমানবহরের শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল জাপানের রাজধানী টোকিওর শিতামাচি বা কেন্দ্রস্থলের সুমিদা ওয়ার্ডের অধিবাসীদের। গর্জন তুলে এগিয়ে আসা বি-২৯ বোমারু বিমানের বহর শিতামাচির ঠিক ওপরে এসে পৌঁছে যাওয়ার পর সেসব বিমানের পেটের আচ্ছাদন খুলে গিয়ে সেখান থেকে সমানে বের হয়ে আসে পেট্রোলিয়াম জেলিতে পরিপূর্ণ বোমা আকারের আধার। সেসব আধার নদী আর খালগুলোকে পরিণত করে দেয় জ্বলন্ত অগ্নিগোলকে। আর মানবদেহের স্পর্শে আধারে সংরক্ষিত পেট্রোলিয়াম জেলি এলে দেহের ত্বক আর মাংস ভস্মে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত জ্বলতে থাকে আগুন। ফলে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা মানুষ প্রাণভয়ে দৌড়ে ছুটে চলছিল এমন এক নিরাপদ আশ্রয়ে, যেখানে লুকিয়ে থেকে জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে এদের অনেকেই সে রকম সৌভাগ্যের আশ্রয়ের দেখা পায়নি। কেননা, মাথার ওপর তাদের সমানে গুঞ্জন করে উড়ছিল অগুনতি সব আগুনবোমা ফেলতে থাকা বিমান।
সেদিন যারা রাতের আঁধারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারার মতো পথজুড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল, তাদের একজন হলেন ৯১ বছর বয়সী মিচিকো কিওকা। ১০ মার্চ টোকিওর সুমিদা ওয়ার্ডে বোমা হামলার ৭০তম বার্ষিকীতে আয়োজিত স্মারক অনুষ্ঠানে মর্মান্তিক সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী অল্প কয়েকজন প্রাণে বেঁচে যাওয়া টোকিওবাসীর মধ্যে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। স্মারক অনুষ্ঠানের শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ‘ওপরে তাকালে চোখে পড়ছিল আকাশজুড়ে ফড়িংয়ের মতো দলবদ্ধ হয়ে উড়ে চলা অসংখ্য বিমান, আর চোখ নিচে নামালেই দেখা যাচ্ছিল পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া সব মানবদেহ।’ বোমা হামলায় অনেকটা দৈবক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁর বাবা আর বোন।
১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় প্রশান্ত মহাসাগরের সাইপান দ্বীপ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ৩৩৪টি বি-২৯ সুপারফোর্ট্রেস বোমারু বিমান। যাত্রা শুরুর আগে সব কটি বিমানের কাঠামোগত রদবদল করে নিয়ে সেগুলোকে আরও বেশি বোমা বহনের উপযোগী করে নেওয়া হয়। জাপানের বিমানবাহিনী যুদ্ধের সেই শেষ বছরে এসে একেবারে কুপোকাত হয়ে পড়ায় খুব বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি যে হামলাকারী বিমানবহরকে পড়তে হবে না, মার্কিন সমরনায়কেরা তা অনুধাবন করতে পারায় খুব নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে বোমা ফেলার নির্দেশ বিমানের ক্রুদের দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি বিমানে বাড়তি জায়গা করে নিয়ে বোমার মজুত রাখা হয়েছিল সাত টনের মতো। ১০ মার্চ রাত ১২টা বেজে ১৫ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছে মাত্র ৫০০ মিটার উচ্চতায় নেমে আসে বিমানবহর এবং এর ঠিক পর পর শুরু হয় নির্বিচারে বোমাবর্ষণ। তিন ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে চলা সেই বিমান হামলায় টোকিওর সুমিদা ওয়ার্ড ও আশপাশের এলাকাজুড়ে ফেলা হয় দুই হাজার টনেরও বেশি পেট্রলবোমা। দাউ দাউ আগুনে পুড়তে থাকে মানুষের বাড়িঘর, দোকানপাট, অফিস ভবন আর কলকারখানা।
কেমন ছিল সেই ভয়াবহ বিমান হামলা? কাছে থেকে হামলা প্রত্যক্ষ করে মানুষের সেই দুর্দশা নিজের চোখে দেখার বিরল সুযোগ যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের একজন হলেন ফরাসি সাংবাদিক রবার্ট জুলিয়ান। যুদ্ধের প্রায় পুরো সময় ধরে জাপানে তিনি সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার পর আই স টোকিও বার্নিং নামে একটি বই তিনি লিখেছেন, যেখানে আমরা টোকিওর সেই ভয়াবহ বিমান হামলার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা খুঁজে পাই। সেই বর্ণনার অংশবিশেষ তাঁর বয়ানেই শুনে নেওয়া যাক:
‘আগুনে সেলাই করা মালায় আকাশ ছেয়ে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তারা কাজে নেমে পড়ে। অন্ধকারে চারদিক থেকে আকাশ বরাবর উঠছিল আগুনের ফুলকি, যেন ক্রিসমাস ট্রির আগুনের সাজসজ্জাকে কেউ আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে এবং পরমুহূর্তেই সেগুলো আবার মাটিতে নেমে এসে ছড়িয়ে দিচ্ছে আগুনের হলকা। হামলা শুরু হওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে বাতাসে উড়ে গিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের তৈরি বাড়িঘরের ঘনবসতিপূর্ণ শহর এলাকায়।
‘নদী আর জলাশয়গুলো সব আগুন-তাড়িত মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। শুধু মাথা পানির ওপর ভাসিয়ে রেখে নারকীয় সেই যজ্ঞ বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় তারা ছিল। পরে অবশ্য এদের মধ্যে হাজার হাজার জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পানিতে ডুবে নয়, বরং আগুনের তাপ আর ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ বাতাস থেকে শ্বাসকষ্টে তারা মারা গিয়েছিল। অন্যান্য জায়গায় আবার খালের পানি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে ভাগ্যহত সেসব আশ্রয় গ্রহণকারী সেখানে জীবন্ত সেদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।’
টোকিওর সেই বোমা হামলার বর্ণনা হিরোশিমা-নাগাসাকির মতোই মর্মান্তিক শোনালেও যুদ্ধের পর সেই স্মৃতি যেন অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো ১০ মার্চের টোকিও বিমান হামলার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সরকারি অর্থে নির্মাণ করা হয়নি কোনো জাদুঘর। এমনকি নিহত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুতির কাজেও গাফিলতি লক্ষ করা গেছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জাদুঘর তৈরির একটি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের দ্বন্দ্বে সেটা আটকা পড়ে যায়।
এ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হওয়ায় সরকারও যেন সে রকম এক ‘পরীক্ষিত’ মিত্রের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকে। শুধু তা-ই নয়, ১৯৬৪ সালে জাপান সরকার টোকিও বিমান হামলা মিশনের নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর জেনারেল কার্টিস লেমেইকে যুদ্ধের পর জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করেছিল।
ইতিহাস তাই বড়ই জটিল এমন একটি বিষয়, ক্ষেত্রবিশেষে খুবই করুণ পরিণতি যা কিনা নিয়ে আসে। ১৯৪৫ সালের ১০ মার্চ টোকিওর নির্বিচার বোমা হামলার শিকার হওয়ার বেদনাদায়ক ঘটনা সে রকম এক সত্যকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে নাকি?
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...











