Showing posts with label প্রতিবেদন. Show all posts
Showing posts with label প্রতিবেদন. Show all posts

Monday, November 17, 2025

ভারত কেবল মুসলিমদের ‘বিদেশি’ বলে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে by আরশাদ আহমেদ ও মহিবুল হক

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নাগরিকদের বেশির ভাগই সে দেশের নাগরিক। যাঁদের পাঠানো হচ্ছে তাঁরা মুসলিম এবং বাংলাভাষী। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভুক্তভোগীদের অবস্থা নিয়ে ২৪ জুন আল–জাজিরার অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরশাদ আহমেদমহিবুল হক প্রতিবেদনটি করেছেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ৬৭ বছর বয়সী সাইকেল মেকানিক আলী গত ৩১ মে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এর আগে তিনি চারটি ভয়ংকর দিন কাটিয়েছিলেন বাংলাদেশে। জন্মের পর থেকে তিনি জীবনভর এই প্রতিবেশী দেশটির নাম কেবল ‘গালি হিসেবে’ শুনেছেন বলে দাবি করেন।

আলীর এই এক সপ্তাহের দুর্ভোগ শুরু হয় ২৩ মে। ওই দিন রাজ্যের মোরিগাঁও জেলার কুইয়াদল নামের ছোট একটি গ্রামে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে আসাম পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্য সরকার ঘোষিত ‘বিদেশি নাগরিকদের’ ধরপাকড় শুরু করে। আসামে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে কেবল ‘বিদেশি নাগরিক’ বলা হয়ে থাকে।

আসাম হচ্ছে চা উৎপাদনকারী এলাকা। এ অঞ্চলে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মানুষের আগমন ঘটেছে এবং তাঁরা সেখানে বসবাস করছেন। এর পর থেকে স্থানীয় আদিবাসীদের (যাঁরা মূলত অসমিয়া ভাষায় কথা বলেন) সঙ্গে জাতিগত উত্তেজনা তৈরি করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৬ সালে প্রথমবার আসামের ক্ষমতায় এলে এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। রাজ্যের ৩ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মুসলিম, যা ভারতের যেকোনো রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ হার।

আলী হচ্ছেন সেই ৩০০-এর বেশি মুসলিমের একজন, যাঁদের মে মাস থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) হয়েছে। এমন তথ্য দিয়েছেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের ঠেলে পাঠানো আরও জোরদার করা হবে। আমাদের রাজ্যকে বাঁচাতে আরও সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে।’

নীল আকাশের নিচে নরক

২৩ মে পুলিশ আলীকে আটক করে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের গোয়ালপাড়া জেলার মাতিয়ায় নিয়ে যায়। ওই এলাকায় আসামের কথিত ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের জন্য রাজ্যের সবচেয়ে বড় বন্দিশিবির নির্মাণ করা হয়েছে।

তিন দিন পর ২৭ মে ভোরবেলায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আলী, পাঁচ নারীসহ ১৩ জনকে একটি ভ্যানে করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়।

আলী বলেন, ‘বিএসএফ আমাদের জোর করে ওপারে ঠেলে দিতে চাইছিল। কিন্তু বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) এবং স্থানীয় বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ জানায়, তারা আমাদের নেবে না। কারণ, আমরা ভারতীয়।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি খোলা মাঠে আলীসহ অন্যদের পরবর্তী ১২ ঘণ্টা হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁদের জন্য ছিল না কোনো খাবার, আশ্রয় কিংবা সুরক্ষা।

আলীকে জলাভূমিতে বসে থাকতে এবং তাঁর চোখেমুখে গভীর আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা নীল আকাশের নিচে নরক দেখেছি আর অনুভব করেছি, কেমন করে জীবন আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিল।’

আলী বলেন, তাঁরা যখন ভারতের দিকেই ফিরে যেতে চান, তখন বিএসএফ তাঁদের ভয় দেখিয়ে বলে, ফিরে গেলে গুলি করা হবে।

আলী বলেন, ‘আমরা কান্নাকাটি করে অনুরোধ করেছিলাম যেন আমাদের না ঠেলে দেওয়া হয়। তখন ভারতের নিরাপত্তা সদস্যরা রাবার বুলেট ছোড়েন। ওই স্থান আমাদের জন্য কোনো “নো ম্যানস ল্যান্ড” ছিল না। বরং সেটি ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে আমাদের কোনো দেশই ছিল না।’

৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগমকে একইভাবে আসামের গোলাঘাট জেলা থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলছেন, এ ঘটনার স্মৃতি তাঁকে এখনো তাড়া করে।

রহিমা বলেন, ‘আমি যখন দৌড়ে বাংলাদেশের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন বিজিবি আমাকে মারধর করে। আমার কোনো পালানোর পথ ছিল না। বিএসএফ হুমকি দেয়, যদি আমরা না যাই ওপারে, তাহলে তারা আমাদের গুলি করে মারবে।’

বাংলাদেশের সীমান্ত শহর রৌমারীর সাংবাদিক জিতেন চন্দ্র দাস। তিনি এ ঘটনা নিয়ে একটি বাংলা দৈনিকে প্রতিবেদন করেছিলেন। এই সাংবাদিক আল–জাজিরাকে বলেন, বিএসএফ ওই আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়েছে। বিএসএফ তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে ‘আকাশে চার রাউন্ড গুলি’ ছুড়েছে।

তবে ২৭ মে বিএসএফ এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে’ কাজ করেছে।

বাংলাদেশি গ্রামবাসী ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের পর বিজিবি আলীকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে তিনি জঙ্গল পেরিয়ে ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরেন।

৩১ মে আসামভিত্তিক দ্য সেন্টিনেল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজিবির কাছ থেকে বিএসএফ ৬৫ জন সন্দেহভাজন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত নেয়।

বাংলাদেশে ঠেলে পাঠনো হয়েছিল, ভারতের এমন মুসলিম নাগরিকেরা আল–জাজিরাকে বলেন, বিজিবি তাঁদের আন্তর্জাতিক সীমান্তে রেখে যায়। সেখান থেকে অন্তত ১০০ জন নিজেরাই বাড়ি ফিরে যান। এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেকেই জানান, সীমান্তে ‘সাদাপোশাকে থাকা লোকজন’ তাঁদের গ্রহণ করেন এবং পরে হাইওয়েতে ফেলে রেখে চলে যান।

মুসলিমদের বিতাড়নের ঢেউ

গত ২২ এপ্রিল ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে গুলি করে ২৬ জনকে হত্যা করে সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তোলে ভারত। ওই ঘটনার পরই ভারতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর পর থেকেই তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বিতাড়নের প্রচার-প্রচারণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি অধ্যাপক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, পেহেলগাম হামলার পর ভারতের কেন্দ্রীয় ও আসাম রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি দুর্বল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেওয়ার অজুহাত খুঁজে পায়। যেমন রোহিঙ্গা সম্প্রদায় কিংবা বাংলাভাষী ভারতের মুসলিম নাগরিক।

অপূর্বানন্দ বলেন, ‘বিজেপি সরকারের অধীন ভারতে মুসলিম পরিচয় মানেই সন্ত্রাসবাদের প্রতীক। এই সরকার বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করে।’

আসামের বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, চলমান কথিত বিদেশি নাগরিক ধরার অভিযানে কেবল মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। কংগ্রেস পার্টির নেতা দেবব্রত শইকিয়া আল–জাজিরাকে বলেন, তারা কেবল মুসলিমদেরই মাতিয়া বন্দিশিবির থেকে ঠেলে পাঠিয়েছে।

অবশ্য বিজেপির মুখপাত্র মনোজ বৌরাহ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযান ধর্মভিত্তিক নয়। তিনি দাবি করেন, অবৈধ হিন্দুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়নি। কারণ, তাঁরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।

আসামের পরিস্থিতি

আসামে বহু দশক ধরে জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা চলে আসছে। এই উত্তেজনার মূল শিকড় রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।

১৯ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আসামের পার্বত্য এলাকাগুলোয় চা–বাগান তৈরি করে। এতে কাজ করতে বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আসামে আসেন। তাঁদের অনেকে বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চল থেকে এসেছেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ভারত ও পাকিস্তান—দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়। পাকিস্তানের একটি অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ছিল উর্দু।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভাষা নিয়ে গণ–আন্দোলনের পর ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২ হাজার ৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার (১৬০ মাইল) আসামের সঙ্গে।

অন্যদিকে আসামের কর্তৃপক্ষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে (বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার আগের দিন) একটি সীমারেখা হিসেবে নির্ধারণ করে। বাংলাভাষী বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব দাবি করতে হলে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে হয়, তাঁরা ওই তারিখের আগে আসামে এসেছিলেন।

এ ধরনের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে আসাম রাজ্যে স্থাপিত বিশেষ ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ বা বিদেশি ট্রাইব্যুনাল। এসব ট্রাইব্যুনাল একটি বিশেষ আদালতের মতো কাজ করে এবং সরকারি নথিপত্রে ছোটখাটো বানান ভুল বা অমিল দেখিয়ে মানুষকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে।

২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, এসব ট্রাইব্যুনাল ছিল ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং তারা ‘ইচ্ছামতো কাজ করে’।

ওই বছরেই আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। অবৈধ বাসিন্দাদের শনাক্ত করতে সরকার বহু বছর ধরে এই এনআরসি প্রস্তুত করছিল।

এই তালিকায় প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাদ দেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ মুসলিম। এনআরসি প্রকাশের পর জোরপূর্বক ভারত থেকে বহিষ্কার করতে শত শত মুসলিমকে বন্দিশিবিরে ধরে নেওয়া হয়।

আলীর নাম এনআরসিতে ছিল। তবে ২০১৩ সালে মোরিগাঁওয়ের একটি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করেন। কারণ, কিছু কাগজপত্রে তাঁর বাবার নাম ছিল ‘সামত আলী’। আবার কিছু কাগজপত্রে ‘চামত আলী’ এবং ‘চাহমত আলী’ হিসেবে তাঁর বাবার নাম লেখা হয়েছে।

নাগরিকত্ব বাতিলের পর আলী দুই বছর বন্দিশিবিরে কাটান। ২০১৪ সালে আসাম হাইকোর্টও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখেন।

আলী বলেন, তিনি এতটাই দরিদ্র যে সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য তাঁর নেই।

‘তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল’

বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন অনেক মুসলিমের নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন।

হয়রানির শিকার এসব মুসলিমের দাবি, এ পরিস্থিতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের ধরপাকড় বেআইনি। তারা অবৈধ বিদেশি ধরার নামে ইচ্ছামতো হয়রানি করছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা স্বীকার করেছেন, ‘যাদের মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, এমন কিছু মানুষকে কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ থেকে ফেরত আনা হয়েছে।’

তাঁদের একজন হলেন সোনা বানু। তিনি রাজ্যের বরপেটা জেলার বুড়িখামার গ্রামের বাসিন্দা। তাঁকে ২৭ মে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো হয়।

৫৯ বছর বয়সী সোনা বানু আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, যে দেশে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার মা–বাবা ও দাদু-দাদির জন্ম, সেই দেশ আমাকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠাবে। তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল। অথচ বাংলাদেশকে আমি জীবনে কেবল ১০ মিটার দূর থেকে দেখেছি, নো ম্যানস ল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে।’

মোরিগাঁও জেলার মিকিরভেটা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া যেন আমার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো ছিল।’

আসামের মুসলিম খায়রুল

খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রাসঙ্গিক দলিল-দস্তাবেজ থাকার পরও ২০১৬ সালে তাঁকে ‘বিদেশি’ নাগরিক ঘোষণা করা হয়। তাঁর পরিবার ব্রিটিশ আমলের জমির দলিল আদালতে জমা দিয়েছিল, যেখানে তাঁর দাদার নামে ভূমি রেকর্ড ছিল। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন।

খায়রুল বলেন, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে কাটানো সময় আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আমাদের শরণার্থীর চেয়েও খারাপ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। আমাদের কষ্ট পুরো পৃথিবীর চোখে দৃশ্যমান ছিল। আমরা যেন ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের জন্যই বিদেশি ছিলাম।’

কিন্তু ৫০ বছর বয়সী নিজাম আহমেদ সরকারি নথি অনুযায়ী, কোনোভাবেই বিদেশি ছিলেন না। গোলাঘাট জেলার জামুগুড়ি চা–বাগান এলাকায় ট্রাকচালক হিসেবে কর্মরত নিজামের নাম এনআরসিতে রয়েছে। তবু তাঁকে নো ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে দেওয়া হয়।

নিজামের ছেলে জাহিদ বলেন, একটি ভাইরাল ভিডিও থেকে তিনি তাঁর বাবার আটক হওয়ার খবর জানতে পারেন। ওই ভিডিওতে তাঁর বাবাকে বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে দেখা যায়।

জাহিদ বলেন, ‘[আমরা] ভারতীয়। আমার দাদা সেকেন্ড আসাম পুলিশ ব্যাটালিয়নে ছিলেন।’

আল–জাজিরা এ তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, নিজামের বাবা সেলিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৬০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের সদস্য ছিলেন।

জাহিদ বলেন, ‘আমার দাদা যদি এখন বেঁচে থাকতেন, এটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলেকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হলো।’

‘ফিরে এলে গুলি করব’

সম্প্রতি ভারতের বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যেও কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিতাড়নের অভিযান ছড়িয়ে পড়েছে।

গুজরাট রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে। এসব ব্যক্তি ‘অবৈধভাবে এখানে বসবাস’ করছেন। তাঁরা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে পুলিশ দাবি করছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে পুলিশ কর্মকর্তা অজিত রাজিয়ানের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছে।

ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রেও গত মাসে সাতজন মুসলিমকে বিদেশি দাবি করে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে ১৫ জুন তাঁদের সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম। এ দলটি বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়া জোটের শরিক।

সমীরুল আল–জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও অন্যান্য রাজ্য কর্তৃপক্ষ মহারাষ্ট্র পুলিশকে জানিয়েছিল, এসব ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা সরকারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

১৬ জুন কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহারাষ্ট্র পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই তাঁদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা ওই সাত মুসলিমের মধ্যে তিনজন বলেন, তাঁরা যখন মহারাষ্ট্র পুলিশের হেফাজতে ছিলেন, তখন পরিবার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ কাগজপত্র জমা দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা মিরানুল শেখ ও নিজামউদ্দিন শেখকে আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে নো ম্যানস ল্যান্ডে দেখা গেছে।

৩২ বছর বয়সী মিরানুল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলছিলাম, আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি। কিন্তু বিএসএফ আমাদের মারধর করেছে। তারা গালাগাল করে বলেছিল, “ফিরে এলে গুলি করব।”’

আল–জাজিরা ১৯ জুন বিএসএফের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য জানাতে ই–মেইল করলেও এই প্রতিবেদন করা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আসামের ‘মিয়া’ মুসলিমরা

এই ব্যাপক অভিযান চলাকালে আসামের পুলিশ ২৫ মে গোলাঘাট জেলার নোয়াজান গ্রাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিম আবদুল হানিফকে তাঁর বাড়ি থেকে আটক করে। কিন্তু তাঁকে আটকের কোনো কারণ জানানো হয়নি।

আল–জাজিরাকে হানিফের বড় ভাই দীন ইসলাম বলেন, পুলিশ বলেছিল, দুই দিনের মধ্যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

পূর্ব আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য পুলিশি অভিযান নতুন কিছু নয়। রাজ্যের চা-বাগান অঞ্চলে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে দেখা যায়। তবে পুলিশ যে এটি একটি ‘রুটিন যাচাই-বাছাই অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছে, সেটিই হানিফকে খুঁজে বের করতে পরিবারকে মরিয়া করে তোলে।

দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা তার খোঁজে এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরছি; কিন্তু পুলিশ কিছু বলছে না।’

দীন ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, হানিফকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল গোলাঘাটের পুলিশ সুপার রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে। সেখানে হানিফসহ আরও কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছিল। পরে তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হানিফের পরিবার দৃঢ়তার সঙ্গে বলছে, তিনি বিদেশি নন। দীন ইসলাম বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে কোনো ট্রাইব্যুনালে মামলা নেই। শুধু আমরা “মিয়া” বলে সন্দেহ থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

আসামে মিয়া একটি অপমানসূচক শব্দ, যা আদিবাসী অসমিয়ারা বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বোঝাতে ব্যবহার করে।

আল–জাজিরা হানিফের অবস্থান জানতে চাইলে পুলিশ সুপার রাজেন সিং বলেন, এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না।

হানিফের সঙ্গে রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে ছিলেন একজন স্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেন, তাঁদের দলটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। হানিফকে সম্ভবত বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।

নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্থানীয় ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁকেও বাংলাদেশ সীমান্তে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, মানুষ রাতারাতি গায়েব হয়ে যাচ্ছে। হানিফ হয়তো অনেকের মতো বাংলাদেশে হারিয়ে গেছেন।

আল–জাজিরা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে, গত মাসে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী যাঁদের জোর করে নো ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে পাঠিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থান এখনো অজানা।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানের জন্য আসামে অন্তত চারটি পরিবার হাইকোর্টে আবেদন করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুটি পরিবার ‘দেশি’ মুসলিম সম্প্রদায়ের, যাদের রাজ্য সরকার নিজস্ব আদিবাসী মুসলিম হিসেবে গণ্য করে।

সামসুল আলীর ছেলে বক্কার আলী বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, আমরা আদিবাসী মুসলিম; তাই নিরাপদ। কিন্তু এখন দেখছি, এখানে কোনো মুসলিমই নিরাপদ নন।’

বক্কার বলেন, তাঁর বাবাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। এখন তিনি সে দেশের পুলিশের হেফাজতে আছেন।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জেল সুপার আমিরুল ইসলাম ১৬ জুন আল–জাজিরাকে জানান, আরেকজন ভারতীয় নাগরিক দইজান বিবি বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মুখপাত্র ফয়সাল মাহমুদ আল–জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, বিএসএফ যে পদ্ধতিতে মানুষকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হচ্ছে না।

ভারতীয় বাহিনী মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে—এমন অভিযোগ নিয়ে আল–জাজিরা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা (২৪ জুন) পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

‘মুসলিমদের বেছে বেছে ঠেলে পাঠানো হয়েছে’

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং কিংস কলেজ লন্ডনের যৌথ ডক্টরাল ফেলো এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশ্লেষক অংশুমান চৌধুরী বলেছেন, আসাম সরকার যে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের ঠেলে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) দাবি করছে, তা আসলে ‘জোরপূর্বক বহিষ্কার’।

আল–জাজিরাকে অংশুমান চৌধুরী বলেন, ‘পুশ ব্যাক’ অর্থ হচ্ছে—যে অভিবাসীরা আপনার সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের ঠেলে ফেরত পাঠানো। কিন্তু সরকার যা করছে, তা হলো মানুষকে ধরে তুলে নেওয়া এবং তাদের আরেকটি দেশে ছুড়ে ফেলা।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিকে তিনি ন্যায্য বলেই মনে করছেন। কারণ, তিনি ১৯৫০ সালের একটি আইনের কথা উল্লেখ করছেন, যা জেলা কমিশনারদের নির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা দেয়।

কিন্তু আসাম হাইকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ওলিউল্লাহ লস্কর বলছেন, এই আইন কেবল তাঁদের জন্য, যাঁরা অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন বা যাঁরা ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাচ্ছেন।

ওলিউল্লাহ লস্কর আল–জাজিরাকে বলেন, যাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছেন এবং যাঁদের হাতে রাজ্য সরকার-প্রদত্ত নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আইন নয়।

সরকারি প্রতিশোধের আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন আইনজীবী বলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে ‘ঘোষিত বিদেশি’ বন্দিদের বিষয়ে শুনানির সময় আসাম সরকার নিজেই বলেছে, যাঁদের বাংলাদেশের ঠিকানা জানা নেই, তাঁদের বহিষ্কার করা সম্ভব নয়।

সরকার এক হলফনামায় বলেছে, বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দেশের নাগরিকত্ব যাচাই ও ভ্রমণ অনুমতির (ট্রাভেল পারমিট) ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই বন্দিদের বহিষ্কার করা যাবে না।

অমুসলিম, বিশেষ করে হিন্দুদের যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসামে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে না পাঠাতে গত বছর আসাম সরকার পুলিশকে নির্দেশ দেয়। এ তারিখটি ছিল ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা।

২০১৯ সালের এ আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ওই নির্ধারিত তারিখের আগে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার অমুসলিমদের কেউ ভারতে প্রবেশ করলে তাঁদের জন্য সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সহজতর করা হয়েছে। এই আইনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কারণ, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ একে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।

ক্ষুব্ধ আলী বলেন, ‘আমাদের জাতীয়তা প্রমাণ করতে ২০-৩০টা কাগজ দেখাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুরা শুধু বললেই হয়, তারা হিন্দু, তাহলেই তারা নাগরিকত্ব পেয়ে যায়।’

বিএসএফ সীমান্তে ধরে নিয়ে যাওয়া ৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগম গোলাঘাটে নিজের বাড়ির বাইরে বসে আল–জাজিরাকে বলেন, যে দেশকে তিনি নিজের দেশ মনে করেন এবং যেখানে তাঁর জন্ম, এখন তিনি সেই দেশের কাছে নিজেকে প্রতারিত মনে করেন।

রহিমা বলেন, ‘এই দেশ আমার, কিন্তু আমি এ দেশের নই।’

৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে
৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ছবি: বন বিভাগের সৌজন্যে

Friday, April 18, 2025

হঠাৎ করেই কি একটি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যায়? by মো. কামরুল ইসলাম

এয়ারলাইন্স বন্ধ হওয়ার মিছিল যত দীর্ঘ হবে বাংলাদেশের এভিয়েশন তত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় বিমান সংস্থা ছাড়া বেসরকারি বিমান সংস্থার মধ্যে গত ২৮ বছরে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে হয়ে গেছে-যা খুবই দুঃখজনক। এর মধ্যে দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে চষে বেড়ানো জিএমজি এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে চালুকৃত তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা, নভো এয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা। স্রোতের বিপরীতে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ইউএস-বাংলা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত।  নব প্রতিষ্ঠিত এয়ার অ্যাস্ট্রা প্রায় দুই বছরের অধিক সময় পার করলেও সঠিক গন্তব্যে এখনো যেতে পারেনি। আরেকটি এয়ারলাইন্স নভো এয়ার নানা গুঞ্জনের ডালপালা ছড়ালেও সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন সময় আমার বিভিন্ন বক্তব্যে, বিভিন্ন লেখনীতে বলার চেষ্টা করেছি- বাংলাদেশের এভিয়েশনে দশ বছরের সময়কালটা যেকোনো এয়ারলাইন্সের জন্য অশনি সংকেত না শুভ সংকেত ! যেসব এয়ারলাইন্স দশ বছরের মাইলস্টোনটা ঠিক মতো অতিক্রম করতে পারেনি তাদের জন্যই বাংলাদেশে আকাশ পরিবহনের ব্যবসাটা হয়ে আসছে অশনি সংকেত হয়ে।

সাধারণ জনগণ হয়তো একদিন ঘুম ভেঙ্গে খবরের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে দেখবে একটি খবর, যা শিরোনাম হয়ে ভেসে আসবে কিংবা টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলের জন্য ব্রেকিং নিউজ কিংবা দিনব্যাপী স্ক্রলে চলমান থাকবে দেশের আরেকটি এয়ারলাইন্সের অপারেশন বন্ধ। খারাপ লাগবে, মন খারাপ হবে। কিন্তু চরম বাস্তবতা হচ্ছে একটি এয়ারলাইন্সের এই ধরনের শিরোনাম হওয়ার পূর্বে অতিক্রান্ত প্রায় দুই বছরের সময়কালটা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর ইতিহাস প্রায় একই রকম। নানা রকম সংকেত পাওয়ার পরও ব্যবসায় সিরিয়াস হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।

একজন এভিয়েশন জনসংযোগবিধ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ এভিয়েশনের উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি, যার উপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছি। আকাশ পরিবহন ব্যবসায় একটি নতুন এয়ারলাইন্সের আগমনের জন্য প্রায় দু’বছরের ক্ষণ গণনা করতে হয় প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে। ঠিক বিপরীত চিত্রও দেখতে পাওয়া যায়, একটি প্রতিষ্ঠিত এয়ারলাইন্সও বন্ধ হওয়ার মিছিলে শরিক হতে দু’বছরের কার্যক্রম ফলো করলেও প্রায় সবার একই রকম চিত্র দেখা যায়।

বিগত দিনের বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর কিছু নির্দিষ্ট চরিত্র দেখতে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রেগুলেটরি অথরিটির কাছে দেনা হিসেবে বিভিন্ন চার্জ প্রদান না করার অভ্যাস। কারণ বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্স থেকে এখন পর্যন্ত বাকী টাকা উদ্ধারের নজির দেখা না পাওয়া। বন্ধ হওয়ার পূর্বে খরচ কমানোকে উপলক্ষ ধরে কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাটাই যেন নিয়মিত ঘটনা।

এয়ারলাইন্সগুলো থেকে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনা না দেয়ার প্রবণতা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রদেয় সুবিধাদি বন্ধ করা।

এয়ারলাইন্সগুলোর এয়ারক্রাফটগুলো নির্দিষ্ট সময়ে হেভী চেক বিশেষ করে সি-চেক, ডি চেকের মতো চেকগুলো নিয়মিত না করা। গ্রাউন্ডেড এয়ারক্রাফটকে সচল না রাখার প্রবণতাও দেখা যায়। এয়ারক্রাফটের মতো রুট চয়েসেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে দেখা যায় এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে। যাত্রী স্বল্পতার অজুহাত তুলে প্রতিনিয়ত সিডিউল ফ্লাইট বাতিল করতে দেখা যায়। ব্র্যান্ড ইমেজ রক্ষায় যাত্রী ও এজেন্সিদের ম্যানেজ করার জন্য ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ করার পূর্বে বিভিন্ন ধরনের প্রতিজ্ঞা করা। যাতে এয়ারলাইন্সগুলোকে পুনরায় ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা সহজতর হয় কিন্তু বাস্তবে বিগত দিনে বন্ধ হওয়া একটি এয়ারলাইন্সেরও পুনর্জন্ম ঘটতে দেখিনি।

বন্ধের অপেক্ষায় থাকা এয়ারলাইন্সগুলো যেমন কর্মচারি ছাঁটাই করতে থাকে তেমনি নিজস্ব সেলস অফিসগুলো বন্ধ করার জন্য তৎপর থাকে। প্যাসেঞ্জার গ্রোথের সাথে সাথে বিজনেস গ্রোথ যখন কমতে থাকে তখন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে দূরে সরতে থাকে। যা একটা সময় একটি স্বপ্নের পতন ঘটে। একটি স্বপ্নসারথির সমাধি হিসেবে একটি অপারেশনাল এয়ারলাইন্সের যবনিকাপাত ঘটে।
লেখক: মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ,ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

mzamin

Sunday, April 13, 2025

আল-জাজিরার রিপোর্ট: নন্দনগরের হাসানের কাহিনী

নন্দনগর, উত্তরাখণ্ড।  প্রতিদিন সকাল ৮টায় আহমেদ হাসান নন্দকিনী নদীর তীরে তার ড্রাই ক্লিনিং দোকানের বাদামি শাটারটি টেনে দেন। নদীটি উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের প্রত্যন্ত হিমালয়ের পাদদেশের শহর নন্দনগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। আহমেদ তার দোকানের গোলাপী দেয়ালে প্লাস্টিকের কভারে সুন্দরভাবে ড্রাই-ক্লিন করা কাপড় ঝুলিয়ে রাখেন। তারপর ৪৯ বছর বয়সী আহমেদ গ্রাহকদের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুপুরের খাবারের সময় তার কাছে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসতেন। তাদের শেরওয়ানি, স্যুট, কোট, প্যান্ট এবং শীতকালীন পোশাক রেখে যেতেন। কেউ কেউ রাজনীতি এবং রসিকতা নিয়ে আলোচনা করার সময় হাসি-দুঃখ ভাগাভাগি করে আহমেদের সঙ্গে এক কাপ চা পান করতেন। বেশির ভাগ গ্রাহক ছিলেন হিন্দু, কয়েকজন মুসলিম।

প্রজন্মের পর  প্রজন্ম ধরে ১৫টি মুসলিম পরিবার নন্দনগরকে নিজেদের বাড়ি বলে মনে করতেন। হাসানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এখানেই। তার পরিবার হিন্দুদের উৎসবের সময় আমন্ত্রণ পেতো। আবার তারাও ঈদে প্রতিবেশীদের আতিথেয়তা করতেন। হিন্দুদের শেষকৃত্যের জন্য কাঠ সংগ্রহ করেতেন আহমেদ। হিন্দু বন্ধুদের মৃতদেহ নিজে কাঁধে তুলেছেন। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক মেয়ের যৌন হয়রানির অভিযোগের পর মুসলিমবিরোধী সহিংসতায় সবকিছু বদলে যায়। এর মূলে ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন। যা হাসান কোভিড-১৯ এর পর থেকে লক্ষ্য করেন। ঘৃণাপূর্ণ স্ল্লোগান এবং মিছিলের ফলে মুসলমানদের উপর শারীরিক আক্রমণ শুরু হয়। তাদের দোকানপাট ধ্বংস করা হয়। জীবনের ভয়ে শহরের মুসলিম সম্প্রদায় রাতের আড়ালে পালিয়ে যায়। কেবল হাসান ফিরে এসেছিলেন তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই ছেলেকে নিয়ে। দৃঢ়ভাবে বলেন, তিনি যে জায়গাটিকে নিজের বাড়ি বলে জানেন, সেখানেই কাজ করতে পারবেন। কিন্তু পরিবারটি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরা তাদের সঙ্গে কথা বলে না। হাসান আর  প্রতিদিন সন্ধ্যায় আগের মতো নদীর ধারে হাঁটতে যান না। তার সন্তানদের এবং স্ত্রীকে কারও সঙ্গে দেখা করতে দেন না। আরও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে চিন্তিত তিনি। হাসান বলেন, আমি শুধু আমার দোকানে যাই এবং বাড়ি ফিরে আসি। এটাই এখন আমাদের জীবন। এই শহরে সারা জীবন কাটানোর পর আমার মনে হচ্ছে আমি একটা ভূত। আমি সম্পূর্ণ অদৃশ্য। কেউ আমার সঙ্গে কথাও বলছে না।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে গাড়িতে নন্দনগর ১০ ঘণ্টার পথ। ভারত-চীন সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই শহরটি নন্দাকিনী নদীর উপ-নদীগুলোর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ২০০০। নন্দাকিনী নদী গঙ্গা নদীর ছয়টি উপ-নদীর মধ্যে একটি এবং হিন্দুদের কাছে এটি পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ১৯৭৫ সালে হাসানের দাদা পার্শ্ববর্তী উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বিজনৌর জেলার নাজিবাবাদ শহর থেকে এখানে চলে আসেন। তাদের পরিবার এ শহরে বসতি স্থাপন করে। এক বছর পর হাসানের জন্ম হয়। তিনি স্মরণ করেন ২০২১ সাল পর্যন্ত জীবন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। করোনাভাইরাস মহামারির সময় হিন্দু উগ্র-ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কারণে ভারতজুড়ে মুসলমানদের অপমান করা হয়। অভিযোগ করা হয় যে, মুসলিমরা ধর্মীয় রীতিনীতি এবং বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। উগ্র-ডানপন্থিরা এটিকে ‘করোনা জিহাদ’ বলে অভিহিত করে। হঠাৎ হাসানের মনে হয় তার হিন্দু বন্ধুরা দূরে সরে যাচ্ছেন। হাসান বলেন, কোভিড-১৯ এর আগে ঈদের সময় আমাদের বাড়িতে অনেক লোক আসতো। আর দীপাবলিতে বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক আমন্ত্রণ পেতাম। কিন্তু কোভিডের পর এটা বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ।

এক সপ্তাহ আগে ২২শে আগস্ট সেলুন খোলার সময় মোহাম্মদ আরিফ নামে এক মুসলিম  খৌরকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন এক হিন্দু ছাত্রী। এর ফলে আরিফ শিগগিরই শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। ১লা সেপ্টেম্বর শহরের দোকানদার সমিতি ছাত্রীর উপর কথিত হয়রানির নিন্দা জানাতে এবং পুলিশি ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। শহরের অন্য মুসলিমদের সঙ্গে  প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন হাসানও। তিনি বলেন, আমরা গিয়েছিলাম কারণ, অন্যথায় হিন্দুরা অভিযোগ করবে যে মুসলমানদের সংঘটিত অপরাধকে সমর্থন করি আমরা। তবে, লোকজন অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিমবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করে, সহিংসতার হুমকি দেয়। আমরা যখন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে হাঁটছিলাম, তখন মুসলিমবিরোধী স্লোগান উঠছিল। নন্দ নগরের পুলিশ স্টেশনে সমাবেশটি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের একটি দল ৩০ বছর বয়সী এক মুসলিম ব্যক্তি হারুণ আনসারীকে ধরে মারধর শুরু করে। হাসান বলেন, তাকে মারধরের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে অভিযোগ করেন যে, শহরের মুসলিমরা অভিযুক্ত আরিফকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

ঘটনার পর নাজিবাবাদে চলে যান আনসারী। সেখান থেকে এক ফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমার মাথায় একাধিক আঘাত লেগেছে। আমার শুধু মনে আছে জনতা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। এরপর আর কিছুই আমার চোখে পড়েনি। আনসারীকে মারধর করার পর, হাসান সহ অন্য মুসলিমরা সমাবেশ থেকে পালিয়ে যান এবং নিজেদের ঘরে আটকে রাখেন। শত শত লোকের একটি দল এসে তাদের বাড়িগুলোতে পাথর ছুড়তে শুরু করে।
হাসান বলেন, মুসলিম পরিবারগুলো সাহায্যের জন্য পুলিশকে ফোন করতে থাকে। কিন্তু কেউ আসেনি। তিনি তার হিন্দু বন্ধুদেরও ফোন করেন। কিন্তু তারা হাসানের ফোনও ধরছিল না।

সন্ধ্যার দিকে ওইসব লোক চলে যায়। ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম পরিবারগুলো ঘরের মধ্যেই অবরুদ্ধ ছিল। সেই রাতে ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেল, হাসান চুপচাপ তার বাড়ির সামনের দোকানে ফিরে যান। দেখতে পান তার দোকানের শাটার ভাঙা এবং মচকে গেছে। ড্রাই-ক্লিন করা কাপড় রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একটি শক্ত কাঠের টেবিলের ড্রয়ারে তিনি ৪০০,০০০ রুপির সঞ্চয়  
তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তা ভেঙে গেছে- টাকা চুরি হয়ে গেছে। তিনি সন্তানদের বিয়ের জন্য সেই টাকা জমা করেছিলেন। তার দোকান, দ্য হাসান ড্রাইক্লিনার্সের নাম বোর্ডের টুকরোগুলো নন্দাকিনী নদীর তীরে ধ্বংসাবশেষের মতো ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। হাসান বলেন, আমি সেই দিনটি কখনই ভুলবো না।

২রা সেপ্টেম্বর হিন্দু উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো আরও বড় একটি বিক্ষোভের আয়োজন করে। তারা অন্য শহরের লোকদেরও নন্দনগরে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানায়। হারুণ বলেন, সেখানে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়। আর পুলিশ ছিল মাত্র ৬০-৭০ জন। আমাদের অভিযোগ সত্ত্বেও, অতিরিক্ত কোনো পুলিশ ডাকা হয়নি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত হিন্দু উগ্র ডানপন্থি নেতা দর্শন ভারতীও সেদিন নন্দনগর পরিদর্শন করেন। হাসান বলেন, তার বক্তৃতার পর জনতা তাণ্ডব চালিয়ে আমাদের সম্পত্তি ভাঙচুর করে। তারা একটি অস্থায়ী মসজিদ ধ্বংস করে এবং একজন মুসলিম বাসিন্দার গাড়ি নদীতে ফেলে দেয়। নন্দনগরে তার সফর এবং পরবর্তী সহিংসতা সম্পর্কে আল-জাজিরার  প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি ভারতী।

হাসান বলেন, জনতা যখন পাথর ছুড়ছিল, তখন শহরের মুসলিম পরিবারগুলো আমার বাড়ির উপরের তলায় লুকিয়েছিল। সেই দিনটির কথা মনে পড়লে এখনও আমার কাঁপুনি ধরে। তার বাড়িতে লোহার গ্রিল এবং একটি গেট রয়েছে। এটি একটি বহুতল ভবন, যা মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য আশ্রয় নেওয়াকে আরও নিরাপদ করে তুলেছিল।

যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত আরিফকে ১লা সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার পর সেদিনই উত্তর প্রদেশ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আরিফকে এক সপ্তাহের জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয় এবং তারপর জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। তবে, পুলিশ মুসলিম পরিবারগুলোকে জানিয়ে দেয় যে, তারা আর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবে না। অন্ধকারে অফিসাররা তাদেরকে পুলিশের গাড়িতে করে কাছের একটি শহরে নামিয়ে দেন।  বেশির ভাগ মুসলিম পরিবারের জন্য, এটি ছিল নন্দনগরে জীবনের শেষ সময়। কিন্তু হাসানের জন্য নয়। তিনি বলেন, এটা আমার বাড়ি। আমার জন্ম, লালন-পালন, আমার জীবনের সবকিছু, আমার পরিচয় সহ সব কিছু উত্তরাখণ্ডে। আমার পুরো পরিবার উত্তরাখণ্ডে থাকে। আমি এখন কোথায় যাব?

হাসান ও তার পরিবার ২৬৬ কিলোমিটার (১৬৫ মাইল) দূরে অবস্থিত রাজ্যের রাজধানী দেরাদুনে চলে যান। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর হাসান এবং নন্দনগরের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আইয়ুম ২৬শে সেপ্টেম্বর উত্তরাখণ্ড হাইকোর্টে সুরক্ষার আবেদন করেন। হাইকোর্ট চামোলি জেলার সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (এসএসপি)কে নির্দেশ দিয়েছেন, নন্দনগরে আইনশৃঙ্খলা কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এবং কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে।
হাসান বলেন, হাইকোর্ট আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার পর ভেবেছিলাম আমি এখন নন্দনগরে যেতে পারি। কিন্তু ভয়ে অন্য কোনো মুসলিম পরিবার আমার সঙ্গে যেতে  প্রস্তুত ছিল না। হাসানের ভাই নন্দনগরে একটি সেলুন চালাতেন। হাসান বলেন, কিন্তু তার বাড়িওয়ালা তাকে হুমকি দিয়েছিলেন যে- যদি তিনি তার দোকান খালি না করেন, তাহলে তিনি তার জিনিসপত্র ফেলে দেবেন। চামোলির একটি বৃহত্তর শহর গোপেশ্বরে বসবাসকারী অন্য আত্মীয়রা তার পরিবারকে কোনো সহায়তা দেননি। হাসান বলেন, অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে- আমাকে ফিরে যেতে হবে। কারণ আমার বাড়ি এবং দোকানসহ সবকিছুই নন্দনগরে।

হাসান আরও বলেন, তার স্ত্রী তার চেয়েও বেশি সাহসী। সে  প্রথমে আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে নন্দনগরে যায়। আমি পরে শহরে এসেছি। ভয় থাকা সত্ত্বেও, সে আমাকে বলেছিল যে- আমরা যদি ফিরে না যাই, তাহলে আমরা আমাদের জীবিকা হারাবো।
নিশ্চিতভাবেই পরিবারটি এখনও একটি দ্বিধার মুখোমুখি। হাসান তাদের মেয়ের স্কুল শেষ করার পর তার পরিবারকে দেরাদুনে স্থানান্তরিত করার কথা ভাবছেন। তবে তার স্ত্রী বিশ্বাস করেন, তারা যদি অন্য কোথাও চলে যান, তাহলে তাদের বাড়ি ও দোকান স্থানীয়রা দখল করবে। অবশেষে হাসান ১৬ই অক্টোবর নন্দনগরে পৌঁছান। দেখতে পান, হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি তার দোকানের সামনে একটি ড্রাই-ক্লিনিং দোকান খুলেছেন। হাসান বলেন, তিনি নিজের দোকান মেরামত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো হিন্দু কর্মী সাহায্য করতে রাজি হননি। এতটাই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে যে, কোনো কর্মী আমাদের দোকান মেরামত করতেও প্রস্তুত নয়। শ্রমিকরা আমাকে বলেছে, হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো তাদেরকে মুসলমানদের সাহায্য না করার নির্দেশ দিয়েছে।
হাসান নিজেই মেরামত করে অবশেষে তার দোকানটি খুলতে সক্ষম হন। কিন্তু কোনো গ্রাহক আসেনি। তিনি তার আগের নিয়মিত ক্লায়েন্টদের ফোন করেন। কিন্তু তারা তার দোকানে আসতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, যে কেউ আসতো তাকে  হুমকি দেয়া হতো। উল্টো দিকের ড্রাই-ক্লিনারের কাছে যেতে বলা হতো।

হাসানের পরিবারও নতুন নন্দনগরে সংগ্রাম করেছে, যেখানে তাদের ধর্ম তাদের আলাদা করে তুলেছে। তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে স্কুলে ‘তার ধর্মের কারণে’ ধমক খেয়েছে। তার এক সহপাঠী তাকে বলেছে, তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা উচিত। কারণ সে একজন মুসলিম।

হাসান এবং শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মুসলিমদের জন্য ন্যায়বিচার এখনও অধরা। ১লা সেপ্টেম্বরের হামলার পর উত্তরাখণ্ড পুলিশ নন্দনগর থানার প্রধান সঞ্জয় সিং নেগির পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। তিনি তার অভিযোগে লিখেছেন, আমি দেখলাম ২৫০-৩০০ জন লোক জোরে জোরে ‘একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়’কে গালিগালাজ করছে। আমি যখন তাদের থামানোর চেষ্টা করলাম, তারা আমাকে একপাশে ঠেলে দিলো। তারপর আমি আমার সিনিয়রদের ডেকে অতিরিক্ত পুলিশ চাই। তিনি এরপর লিখেছেন, ‘জনতা মুসলিমদের দোকান ভাঙচুর শুরু করে এবং একটি মসজিদও ভাঙচুর করে। উত্তেজিত জনতা একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছিল। এর ফলে এই পরিবারের মহিলা এবং শিশুরা ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করে।’ নেগি লিখেছেন- জনতা লাঠি, বেলচা এবং লোহার রড বহন করছিল। তবুও, উত্তরাখণ্ড পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। আল- জাজিরা চামোলি জেলার পুলিশ সুপার সর্বেশ পানওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি।

এখানে মুসলিমদের দোকানপাট লুটপাট করা হয় অথবা পুড়িয়ে দেয়া হয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থনৈতিক বয়কট শুরু করা হয়। প্রায়শই মুসলমানরা শারীরিক সহিংসতারও সম্মুখীন হন। অতিসম্প্রতি, ধামির সরকার একটি অভিন্ন দেওয়ানিবিধি-এর নিয়মাবলী অবহিত করেছে- যা রাজ্যে মুসলিম এবং অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্ম-ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন অনুসরণ করা থেকে বিরত রাখে। আদালত বেশ কয়েকবার হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু কিছু কর্মী মনে করেন যে, তাদের আরও কিছু করা দরকার। হাসানকে হাইকোর্টে একটি আবেদন করতে সাহায্য করেছেন দেরাদুনের একজন কর্মী খুরশিদ আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের দেশের আদালত বুঝতে পারে না যে, মুসলিমরা বর্তমানে কতটা নিপীড়নের মুখোমুখি। নিপীড়ন সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে- শারীরিক, মানসিক, আর্থিক।
তবুও হাসান আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন।

সেপ্টেম্বরের সহিংসতার পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পরে ১৯শে ফেব্রুয়ারি মুসলিম বিরোধী বিক্ষোভের নেতৃত্বদানকারী একজন হিন্দু ব্যক্তি হাসানের দোকানে আসেন। তার স্ত্রী সেই সময় তাদের দোকান পরিচালনা করছিলেন। হিন্দু ব্যক্তিটি একটি কোট এবং ট্রাউজার এনেছিলেন এবং জিজ্ঞাসা করেন যে- এগুলো কি দ্রুত ড্রাই-ক্লিন করা যেতে পারে কিনা। হাসানের স্ত্রী তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি আমাকে বোন ডেকেছিলেন। আর আপনি চান মুসলিমরা চলে যাক?
লোকটি উত্তর দিলো- যা হয়েছে ভুলে যাও। তোমার কাজ খুব ভালো। তাই আমি তোমার কাছে এসেছি।
হাসান সেই ঘটনাটি মনে করে হেসে বলে, আমি এই দিনটি দেখেছি। কারণ আমি পালিয়ে যাইনি এবং লড়াই করেছি। তিনি বলেন, ভাঙা বন্ধুত্বের যন্ত্রণা এখনও কষ্ট দেয়।

mzamin

Tuesday, February 18, 2025

রাজনৈতিক ঐক্যের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্যের নজির খুব বেশি নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রতি একধরনের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ঐক্যের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন সৈয়দা লাসনা কবীর, এস কে তৌফিক হকমোহাম্মাদ ঈসা ইবন বেলাল

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐক্যের ইতিহাস বরাবরই দুর্লভ। ঐক্যের অভাবে দেশ বিভিন্ন সময়ে গভীর সংকটে আবর্তিত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর সমাধানে একমত হতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ’৭১-এর স্বাধীনতা কিংবা ’৯০–এর গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, জনগণের প্রতি প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে রাজনৈতিক দলগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাত্র একবারই বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্য প্রচেষ্টার নজির পাওয়া যায়, যা ঘটেছিল ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়। সে সময় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল যে স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। তবে সেই ঐক্যের বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে এবং গণতন্ত্র কতটা সুসংহত হয়েছে, তা আজও বিতর্কের বিষয়।

তিন জোটের রূপরেখার ব্যর্থ পরিণতি

১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো যে রূপরেখা তৈরি করেছিল, তা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে তার বিপরীত চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট এবং বামপন্থীদের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচদলীয় জোট একত্র হয়ে আন্দোলনে সক্রিয় হয়। জামায়াতে ইসলামীও পৃথকভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

এদিন তিনটি জোট পৃথক সমাবেশ থেকে একই সময়ে একটি রূপরেখা ঘোষণা করে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে একটি সার্বভৌম সংসদ গঠন করা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

আন্দোলনের ফলে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে নির্মূল করার রাজনীতিতে লিপ্ত হয়।

রূপরেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা ও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ওঠে, যার ফলে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে আসে। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সংসদীয় শাসনব্যবস্থা কার্যকর করা এবং সংসদকে শক্তিশালী করা ছিল রূপরেখার অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয় এবং বিরোধী দল সংসদ বর্জন করতে শুরু করে। এর ফলে সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদ কার্যত ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটি মঞ্চে পরিণত হয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং মৌলিক অধিকারবিরোধী আইন বাতিল করা। কিন্তু ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও তারা এ দাবির বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই এমন কিছু আইন প্রণয়ন করেছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন দমনমূলক আইনের মাধ্যমে জনগণের বাক্‌স্বাধীনতা হরণ করা হয় এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী রূপ আরও সুস্পষ্ট হয়।

ছাত্রদের ১০ দফার প্রতি অবহেলা

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এই ছাত্র আন্দোলনই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে গতি দেয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।

ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন ক্রমে স্বৈরাচার পতনের পথে এগিয়ে যায় এবং ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাদের সংস্কারের দফায় সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা—এ রকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। কিন্তু পরে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের এ দাবিগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করেনি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থে তা উপেক্ষা করেছে।

ছাত্রদের ১০ দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক হবে। তারা চেয়েছিল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ভাষা প্রধান মাধ্যম হবে, তবে পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষাও চালু রাখা যেতে পারে। কিন্তু এ দাবির বাস্তবায়ন হয়নি; বরং শিক্ষাব্যবস্থা আরও বৈষম্যমূলক হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ জনগণের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং শহীদ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও মর্যাদা প্রদান করা। কিন্তু এ দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলমান থেকেছে। ক্ষমতাসীন দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায়, বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গুম, খুনের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ছাত্ররা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিও তুলেছিল। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলো এ দাবির প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থেকেছে। দুর্নীতি আরও গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং সরকারি সংস্থাগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এমনকি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ই স্বৈরাচার এরশাদ ও তাঁর দল জাতীয় পার্টিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং কাছে টানার চেষ্টা করেছে, যা ছাত্রদের নৈতিক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ছাত্রদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই স্বাধীনতা কখনোই অর্জিত হয়নি; বরং বিগত আওয়ামী শাসনামলে তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যেসব সংবাদপত্র ও সাংবাদিক সরকারের সমর্থনমূলক সংবাদ প্রচার করেনি, তাদের হয়রানি, জেল ও আইনের অপব্যবহার করে দমন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন সব সময় সমতা ও বৈষম্যহীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০—প্রতিটি গণ–আন্দোলনে ছাত্ররা বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারের রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের এসব সংস্কার প্রস্তাবকে বরারবই উপেক্ষা করে গেছে। এর ফলে সময়ে–সময়ে ছাত্রদের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হয়েছে।

তবে এবার সবাই আশা করছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাব্য ধাপগুলো

যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্যের নজির খুব বেশি নেই, তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রতি একধরনের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। সক্রিয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই বুঝতে পারছে যে যদি তারা ঐক্যবদ্ধ না থাকে এবং দেশ পুনর্গঠনে একসঙ্গে কাজ না করে, তাহলে দেশ আবারও স্বৈরাচারের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য চারটি ধাপে কাজ করা যেতে পারে।

প্রথম ধাপে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেসব সংস্কার সরকার কেবল সরকারি পরিপত্রের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যদিকে সংস্কারের যেসব প্রস্তাবের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি থাকবে, সেগুলো সংস্কার প্রস্তাব থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি সম্মিলিত রূপরেখা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এই রূপরেখায় সব সক্রিয় রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরসহ সম্মতিপত্র সংযুক্ত থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে দলীয় মতবিরোধ এড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। জাতীয় নির্বাচনের পর দলীয় সরকার পার্লামেন্টে বিল পাসের মাধ্যমে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে।

তৃতীয় ধাপে যেসব সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলো পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি অথবা যেসব বিষয়ে আংশিক ঐকমত্য ও আংশিক মতভেদ রয়েছে, সেগুলোকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরও গবেষণা, বিচার-বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সংস্কারের চতুর্থ ধাপ হতে পারে গণভোট। সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ বাকি সংস্কার কমিশনগুলোও বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করেছে, যার বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অনিবার্য। যেহেতু জাতীয় সংসদ বর্তমানে কার্যকর নয়, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে একটি গণভোটের আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে জনগণের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধন অনুমোদন করা সম্ভব হবে। এটা সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সংবিধান সংশোধনের অভাবে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধাপ্রাপ্ত হবে না।

এই চার ধাপে সংস্কারপ্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঐক্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় পুনর্গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে।

আশঙ্কা ও সম্ভাবনা

এত কিছুর পরও এবারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছু আশঙ্কা থেকেই যায়। কেননা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যে সংস্কার প্রস্তাব নিজেরাই নির্ধারণ করেছিল, পরবর্তী সময়ে তারা সেই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। একইভাবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত বিভিন্ন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক দলগুলো স্মরণে রাখবে কি না বা বাস্তবায়ন করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি শুধু ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ ও ভবিষ্যৎ স্বার্থ রক্ষার চিন্তা থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যায়, তাহলে সংস্কারের বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ, এই সংস্কারগুলোর বেশির ভাগই রাষ্ট্রের পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে প্রস্তাবিত হয়েছে, যেন ভবিষ্যতে কেউ আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে।

তবে আশার দিকও রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে সংস্কারের প্রতি দলটির সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংস্কারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু একটি চূড়ান্ত প্রশ্ন থেকে যায়—নির্বাচনের পর এই দলগুলো আদৌ এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করবে কি না?

তাই এ আশঙ্কা দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের দাবি ও সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, তাহলে তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থ নয়; বরং দেশপ্রেম, জনসেবা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থা নির্মূল করাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য। 

# সৈয়দা লাসনা কবীর অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

# এস কে তৌফিক হক প্রফেসর ও ডিরেক্টর, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

# মোহাম্মাদ ঈসা ইবন বেলাল গবেষণা সহযোগী, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনৈতিক ঐক্যের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

Sunday, February 16, 2025

কেন বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট by ফাহিমা আক্তার সুমি ও আফজাল হোসেন

ছিনতাই, জমি দখল, অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। দিন দিন বেড়েই চলছে এদের দৌরাত্ম্য। অপরাধ ঘটলেই উঠে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে অস্ত্রশস্ত্র হাতে মহড়া দিচ্ছে অলিতে-গলিতে। বিভিন্ন চটকদার নামে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। এদের বেপরোয়া আচরণে পাড়া-মহল্লার মানুষ আতঙ্কে থাকে। সুযোগ পেলে উত্ত্যক্ত করছে নারীদের। এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও।

পুলিশ বলছে, শুধু রাজধানীতেই নয় দেশের প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বেড়েছে। মাদক, অর্থ লোভ, আইনের তোয়াক্কা না করা, হিরোইজম, বেকারত্ব ও অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতাসহ বেশ কয়েকটি কারণে তারা দিন দিন বেপরোয়া ও বিপথগামী হয়ে উঠছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর। দেশে বর্তমানে দুইশ’র বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। সদস্য রয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা যেন কমছে না। ১০-১৭ বছর বয়সীরা বেশি থাকলেও এসকল গ্যাং গ্রুপে রয়েছে ১৮ বছরের বেশি বয়সীরাও। সম্প্রতি কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তাদের চুলের স্টাইল, পোশাক ও চালচলনে রয়েছে ভিন্নতা। দিনে-রাতে ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এমনকি এ ঘটনায় মৃত্যুও হচ্ছে অনেকের। আবার কিশোর অপরাধীরা অস্ত্র হাতে অপরাধ কার্যক্রমের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে একে অপরকে। এমন অনেক ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন ঘটছে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ। গত ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্দেহভাজন এসকল অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বোর্ডঘাট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ সদস্যরা। এতে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের তিন এসআই ও এক এএসআইসহ চার পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। ওই এলাকার কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপ’ জড়িত বলে জানা গেছে। সূত্রমতে কয়েকদিন আগে একাধিক হত্যা মামলার আসামি ও বোর্ড ঘাট এলাকার কিশোর গ্যাং গ্রুপ পাটালি গ্রুপের মূলহোতা ফালানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই সময় পাটালি গ্রুপ ও বোর্ড ঘাটের মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের হাত থেকে তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় ব্যর্থ হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশের অভিযানের সময় তাদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে পাটালি গ্রুপের ল্যাংড়া হাসান, ফরহাদ ও চিকু শাকিল। বাকি ৩০-৪০ জন সদস্য নিয়ে তারা এ হামলা চালায়।

আদাবর বালুর মাঠ এলাকায় মোবাইল ছিনতাইয়ের সময় বাধা দিলে ছিনতাইকারীরা মো. সুমন শেখ (২৬) নামের এক যুবকের বাম হাতের কব্জিসহ হাতে থাকা মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সুমন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন।

পহেলা ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে জিলানী নামে এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তার তলপেটে গুলি লাগে। পুলিশ জানায়, হাতিরঝিল উলন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। জিলানীর পরিবার জানায়, জিলানী একজন রিকশাচালক। উলন এলাকায় তাদের বাসা। গোলাগুলির সময় সে বাসার সামনে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তলপেটে গুলি লাগে তার।

বৃহস্পতিবার মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনীর অভিযান চালিয়ে উদ্যান এলাকা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ১৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই ‘গোল্ডেন গ্যাং গ্রুপের সদস্য’। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে দুটি সামুরাই, দুটি ছুরি, একটি দেশি ধারালো অস্ত্র, বাংলা মদ, আটটি পুলিশ বন্দুকের কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। তারা এ সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে।

পহেলা ফেব্রুয়ারি বিশেষ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ৮ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আদাবর থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে অবৈধ মাদক ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। মোহাম্মদপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কোন্দল চলছিল কিশোর গ্যাং ডাইল্লা গ্রুপ ও এলেক্স গ্রুপের মধ্যে। গত বছরের ২০শে সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান মানবজমিনকে বলেন, আমরা এই পর্যন্ত এক মাসে শতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি। কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকটি গ্রুপের তথ্য পেয়েছি এর মধ্যে নতুন একটি গ্রুপের নাম ‘ইমন গ্রুপ’। এ ছাড়া ‘কব্জি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’ এবং ‘জনি গ্রুপ’ এর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। মোহাম্মদপুরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে ‘পাটালি গ্রুপের’ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। মোহাম্মদপুরে অভিযান চালালে তারা আদাবরে বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রবেশ করে, নিয়মিত অভিযান চালালে তারা তুরাগ নদ সংলগ্ন হাঁটার এরিয়ায় আত্মগোপনে চলে যায়। এ ছাড়াও তারা সাভার আশুলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থান করে।

গত দুই মাসে আদাবর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই শতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে আদাবর থানার ওসি এস এম জাকারিয়া মানবজমিনকে বলেন, এদের মধ্যে ১৭-২০ বছর বয়সী সদস্য বেশি। বৃহস্পতিবার সুমন শেখ নামে এক যুবকের কব্জি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় আমরা ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। কিশোর গ্যাংয়ের ‘কব্জি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’ এবং ‘জনি গ্রুপ’ ছাড়া আরেকটি গ্রুপ ‘ডিবি সুমন’ গ্রুপের তথ্য পেয়েছি আমরা। এই গ্রুপের মূলহোতা সুমনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি তাকে ইতিমধ্যে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৪-১৬ বছর বয়সী কিশোররাও চুরি, ছিনতাই এবং মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। ১৭-২০ বছর বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বড় ভাইদের মদত পায় ১৪-১৬ বছর বয়সী সদস্যরা নিজেরা নিজেরাই ৪ থেকে ৫ জনের গ্রুপ খোলে। এদেরকে গ্রেপ্তার করার পর জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবার একই অপরাধ কার্যক্রমে জড়িত হয়। এজন্য আমরা আদালতকে বলি তাদের যেন খুব দ্রুত জামিন না দেয়।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, শুধু জানুয়ারি মাসেই ৪২৮ জন কিশোর ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। বৃহসপতিবারেও ১৬ জনের মতো কিশোর ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডেমরা থানার ওসি মাহমুদুর রহমান বলেন, জানুয়ারি মাসে আমরা যতজন আসামি গ্রেপ্তার করেছি তার মধ্যে তিনজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল। এ সকল কিশোররা মূলত ছিনতাই এবং মারামারিতে বেশি জড়িত থাকে। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে যে সকল অভিযোগ এসেছিলো তা থেকে তদন্ত সাপেক্ষে ২২টি অভিযোগ মামলা হিসেবে রুজু হয়েছে। অপরাধ দমনে আমরা বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার জন্য এলাকায় এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে উঠান বৈঠক করছি।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমরা অপরাধ দমনে প্রতিনিয়ত কাজ করছি। বুধবার আমরা দু’জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। ছিনতাইকারীদের মধ্যে কিছু কিশোর রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার কর্মকর্তা হযরত আলী বলেন, এই থানায় আগে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ছিল, তাদেরকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতারা প্রশ্রয় দিতো সরকার পতনের পর তারা পালিয়ে গেছে।

সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম কিশোর গ্যাংয়ের নতুন তালিকা করে অভিযান চালাতে সারা দেশে পুলিশের সব ইউনিট প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তর গত পাঁচ মাসে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদের নিয়ন্ত্রণের পথ খোঁজা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারদের এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, দেশের বাস্তবতায় কোনো একটি রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখনকার অপরাধের পরিস্থিতি একরকম থাকে। অরাজনৈতিক কোনো সরকার থাকে তখনকার অপরাধ পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেও একটা ভিন্নতা রয়েছে। বর্তমান সময়ে অপরাধ প্রবণতা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, সহিংসতা, সংঘাত, খুন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ এই ধরনের অপরাধগুলো অনেক কমে আসার কথা, এটাই আমরা প্রত্যাশা করেছি কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত। একটি রাজনৈতিক দলের সরকারের পতনের পর নতুন যে অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছেন তাদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পরিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক হয়নি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) জাহাঙ্গীর কবির মানবজমিনকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র, ছুরি-চাপাতি ব্যবহার করে। মোহাম্মদপুরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি আমরা। বিভিন্ন অপরাধ দমনসহ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

mzamin

Sunday, February 2, 2025

তোষামোদ নয়, উন্নয়নে প্রয়োজন দেশপ্রেম by প্রণব মজুমদার

দেশ থেকে টাকা পাচার ১৬ বছর ধরে নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের ‘দেশপ্রেমিকগণ’ টাকা পাচার করতে শুরু করেন। বৈশ্বিক আর্থিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হয়। পাচার হওয়া গন্তব্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড।

আমাদের অনেক প্রভু! দেশে কিংবা বিদেশে। আপাতত বিদেশি প্রভুদের নিয়েই বলি। বিদেশি প্রভুরা আমাদের পরামর্শ দেন। উপদেশ দেন। খবরদারি তো আছেই! তাদের উপদেশ দেয়ার সংস্কৃতি দেশ জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। দীর্ঘ সাড়ে চার যুগের অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার বদৌলতে প্রভুদের প্রকৃতি বুঝতে পেরেছি। ঋণের শর্ত হিসেবে কোন খাতে ভর্তুকি কমাবো বা প্রত্যাহার করে নেবো, শুল্কনীতি কী হবে, সেবাপণ্যে কোথায় বৃদ্ধি করবো এসব শর্ত আমাদের সরকারগুলোকে মানতে হয়। বিদেশি প্রভুরা আমাদের দেন কম; নিয়ে যান বেশি। সাম্রাজ্যবাদী স্ব্বরূপও তেমন। সহকর্মী প্রয়াত প্রবীণ প্রতিবেদক প্রফুল্ল কুমার ভক্ত দৈনিক সংবাদে লিখলেন- ‘বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংকের ভাবী!’ নব্বইয়ের দশকে এমন প্রতিবেদন মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে রসালো এবং হাস্যকর মনে হয়েছিল! পরে দেশের সচেতন মানুষ মন্তব্যটিকে সত্য বলেই ভেবেছে।

আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধের পথে কেন যেন হাঁটতে পারে না! সফরকৃত যুক্তরাষ্ট্রের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের চেয়ার অ্যালেক্স সোরোস ও প্রেসিডেন্ট বিনাইফার নওরোজির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ক’দিন আগে বৈঠক করেন বর্তমান সরকারপ্রধান। অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে তার সরকার বিপর্যস্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অর্থনীতি পেয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে তথ্য তুলে ধরেন। তা ফিরিয়ে আনার জন্য ‘সম্পদ শনাক্তকরণ’ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশকে সহায়তা করার অনুরোধ জানান।

দেশ থেকে টাকা পাচার ১৬ বছর ধরে নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের ‘দেশপ্রেমিকগণ’ টাকা পাচার করতে শুরু করেন। বৈশ্বিক আর্থিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হয়। পাচার হওয়া গন্তব্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, অষ্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্থিক খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির (জিএফআই) পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার বা ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
শুধু ব্যক্তি উদ্যোগেই নয়, অর্থপাচার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে দেশের একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি বেসরকারি ব্যাংকও। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, গেল প্রায় দেড় যুগে দেশীয় ১৯টি ব্যাংকে আত্মসাৎ করা মাত্র ২৪টি ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমেই প্রায় একশ হাজার কোটিরও বেশি টাকা পাচার হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আর্থিক খাতে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। সে ধারাবাহিকতায় বিগত ১৬ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিরুপণের উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে অর্থপাচার বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। টাকা পাচারের বিষয়টিকে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর ‘টিউমার’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের বড় অংশ এই ক্ষতিকর টিউমার চুষে নেয়। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি মনে করে, প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৪ শতাংশের পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয় থেকে যত অর্থ এসেছে, এর এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ অর্থ এক বছরে পাচার হয়। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে যত অর্থ আসে, এর দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। এতে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ার শঙ্কার কথা বলা হয়। ৩৯৭ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে ২২টি ক্ষেত্রে আলোকপাত করা হয়। শ্বেতপত্রে বলা হয়, টাকা পাচারের জন্য দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের ক্রীড়নক, আমলাদের মধ্যে একধরনের অনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে। ঘুষ-দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ, মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে বাণিজ্য ব্যাংক থেকে চুরি করা টাকা, খেলাপিঋণের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেখানো, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, কর ফাঁকি এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হয়।

অর্থপাচার নিয়ে গবেষণা করে, এমন কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ধৃতি দিয়ে শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পদ আছে, যার মূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে মনোনীত হয়েছেন। ২০২৩ সালে ইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ কোটি ডলার পাচার হয়।
সরকারি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে, তাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এই অর্থ সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইত্যাদি খাতে ব্যয় হয়েছে। এ থেকে ঘুষ হিসেবেই দিতে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ঘুষ নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগীরা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘুষের টাকার মধ্যে ৭৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা গেছে আমলাদের কাছে। রাজনৈতিক নেতা ও তাদের সহযোগীদের কাছে গেছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর ঠিকাদারেরা দেশে ও বিদেশে এ অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে। তাদের বড় অংশ থাকেন বিদেশে।

প্রধান উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন যে বিপর্যস্ত অর্থনীতি আমাদের। বলতেই হয়, ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাজুক অবস্থা। পুঁজিবাজার পতনবৃত্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। রফতানির চাকা ঘুরছে না। বিনিয়োগ আশাব্যঞ্জক নয়। শুধু প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছাড়া দেশ অর্থনীতির সকল সূচকই নিম্ন্নমুখী। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে যা পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে। এতে প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর।
দুর্নীতিতে বিশ্বে আমরা শীর্ষস্থানে ১৬ বছর ধরে নয়। আগেও আমরা এ জন্য বিশ্বদরবারে বেশ সমালোচিত ছিলাম। ৫৩ বছরে এ পর্যন্ত দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে তার হিসাব বের করা জরুরি। দেশের ব্যাংক লুট করে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে দেশপ্রেমিকেদের জমাকৃত সে অর্থ বের করে নিয়ে আসা যায় না কি?

দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই। নিজ স্বার্থরক্ষায় কাজ করি। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও। হালুয়া-রুটির ভাগাভগি। আখের গোছানো আমাদের ধর্ম।
অর্থনীতিতে অমিত সম্ভাবনার সুজলা সুফলা সোনার বাংলাকে বঞ্চিত করে বিদেশকে আমরা ভালোবেসেছি। সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় বাড়ির মোহ দেশকে উন্নতির পথে নেয়নি মোটেও।  প্রভু দাতাদের তোষামোদ করছি; বিদেশি ঋণে নিজেদের দায় ভারী করছি। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণের নামে বিশৃঙ্খলিত করেছি। বিনিয়োগের নামে অনাবাসী বাংলাদেশি এবং প্রভুদের নানা ধরনের সহায়তাদানের নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কবি ও অর্থকাগজ সম্পাদক
reporterpranab@gmail.com

mzamin

Wednesday, January 29, 2025

বিশ্লেষণ: বায়ুদূষণের ভয়াবহতা বনাম আমাদের অপারগতা by খলিলউল্লাহ্

বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং এ বিষয়ে আমাদের অপারগতা নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্

বায়ুমানের স্কোর ৩০০ পার হলে সেটাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ ধরা হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারি সকালে ঢাকার স্কোর ৪৯৩ পর্যন্ত উঠেছিল। হরহামেশাই এখন ঢাকায় বায়ুর মানের স্কোর ৩০০ পার হচ্ছে। সারা বিশ্বের মধ্যে বায়ুদূষণে আমরা ঘুরেফিরেই শীর্ষে উঠে আসছি। বিগত ৯ বছরের ডিসেম্বর মাসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ডিসেম্বর ছিল ঢাকায় সবচেয়ে দূষিত মাস। তা ছাড়া ২০১৬-২৪ সময়ের মধ্যে গত বছর ছিল সবচেয়ে দূষিত বছর।

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলছে, কতটা ভয়ানক হুমকির মুখে আমরা রয়েছি। এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আবহাওয়ার ধরনের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের রোগের সঙ্গে ক্যানসারজনিত মৃত্যু ১৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

অন্যদিকে স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বব্যাপী শুধু ২০২১ সালেই ৮০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ করোনার মতো অতিমারিতেও বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪৯৯। একটা দেশের এত বিপুল মানুষের মৃত্যু যদি হয় বায়ুদূষণের কারণে, তাহলে এটাকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে আশু পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না?

সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, বায়ুদূষণে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। পৃথিবীতে কেবল ২০২১ সালেই বায়ুদূষণে ৫ বছরের কম বয়সী ৭ লাখ শিশু মারা গেছে। মানবশিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হলো মায়ের গর্ভ। কিন্তু শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে, যার প্রভাব সারা জীবন এসব শিশুকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে।

তা ছাড়া সাধারণত শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি দূষণের শিকার হয়। কারণ, তাদের শরীর, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক যখন গঠিত হতে থাকে, তখন তাদের বড়দের চেয়ে বেশি বায়ু গ্রহণ করতে হয়। ফলে বায়ু যদি দূষিত হয়, তাহলে দূষিত উপাদানও তারা বেশি গ্রহণ করে; অর্থাৎ আমরা শুরুতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামর্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অবস্থা এতটাই নাজুক যে এ কারণে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ৯ বছর। অথচ তামাকদ্রব্যের কারণে আয়ু কমেছে এর চেয়েও কম, ১ দশমিক ৬ বছর। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান পিএম ২ দশমিক ৫ আয়তনে মানুষের চুলের চেয়ে ৩০ গুণ ছোট। তাই সহজেই এগুলো মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর এটাই ভয়াবহতার অন্যতম কারণ।

বায়ুদূষণ কি নতুন

এটা ঠিক যে বায়ুদূষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীন মিসর, পেরু ও গ্রেট ব্রিটেনে মানবদেহের মমি থেকে দূষণে কালো হয়ে যাওয়া টিস্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের শিকার হয়েছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তৎকালীন রোমের বিচারক অ্যারিস্টো এক রায়ে চিজের দোকানের ধোঁয়া ভবনের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন।

মধ্যযুগে বায়ুদূষণের মূল উৎস ছিল ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে শিল্পবিপ্লবের পর দূষণের নতুন যুগে প্রবেশ করে পৃথিবী, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ কার্ল পোলানি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন: দ্য পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অরিজিনস অব আওয়ার টাইম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট বাজার অর্থনীতি কীভাবে আমাদের সমাজ ও পরিবেশ—দুটিরই অস্বাভাবিক ধ্বংস করেছে। এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের জীবনসহ অমূল্য সব বনজঙ্গল, উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদি প্রাকৃতিক পরিবেশের সবকিছুকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়। মুনাফার লক্ষ্যে চলে এসবের যথেচ্ছ ব্যবহার। আর এটিই হলো আমাদের সময়ের সামাজিক ও পরিবেশগত দুর্যোগের মূল কারণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে, সন্দেহ নেই। আর তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো ধারণা এসেছে। ভুটানের মতো দেশ তো প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকেই বের হয়ে এসেছে।

তা ছাড়া জিডিপির ধারণার বাইরে মানব উন্নয়ন সূচক ব্যবহারের পক্ষেও মতো জোরালো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামগ্রিক কল্যাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে পরিবেশগত মূল্যায়ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়সারাভাবে করা হয়। জিডিপির বিকল্প ভাবনাগুলো নিয়েও জোরালো কোনো আলাপ নেই।

দূষণের উৎস বন্ধে অগ্রগতি নেই

ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী শহরের আশপাশের ইটভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানালেও বহু ইটাভাটা অনুমোদনবিহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ সরকার চাইলে সরকারি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে। দেশে নির্মাণকাজের বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্প। নির্মাণকাজে বায়ুদূষণের সরকারি হিস্যাও তাই বেশি। পরিবেশবান্ধব ইট যদি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার শুরু হতো, তাহলে বেসরকারিভাবেও এর প্রচলন বাড়ত।

২০১৫ সালে গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। ইটভাটায় মাটির উপরিভাগ কেটে পোড়ানো হচ্ছে। মাটির পুষ্টি উপাদানের কারণেই ফসল উৎপাদন হয়। আর পুষ্টি থাকে এই উপরিভাগেই, যা গঠনে হাজার বছর সময়ও লাগতে পারে। অথচ কি অবলীলায় নিমেষেই আমরা মাটির উপরিভাগ নষ্ট করছি ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে! জাতিসংঘের হিসাবমতে, বর্তমান হারে মাটির উপরিভাগ ধ্বংস হতে থাকলে আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর পর তা শেষ হয়ে যাবে; অর্থাৎ আমরা আর ফসল ফলাতে পারব না।

অথচ বালু-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ব্লক ইটের বিস্তার ঘটাতে পারলে কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বায়ুদূষণও কমবে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী থেকে বালু তুলে এসব ইট বানালে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও উত্তোলিত বালু ব্যবহার করা যাবে। এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে পারলে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজার ব্যবহার করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে। অবৈধ বালু উত্তোলনে বর্তমানে নদীর প্রতিবেশ নষ্ট হয়ে জলজ প্রাণীরা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নদীভাঙনের শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ হচ্ছে বাস্তুহারা।

অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। শহর এলাকার বায়ুদূষণ রোধে মেক্সিকো আর চীনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে যানবাহনের লাইসেন্সের নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর এগুলোকে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়ে বায়ুদূষণ কমানো হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

প্রতিদিন চলতে-ফিরতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে পড়ে আছে নির্মাণকাজের ইট-বালু-সুরকির স্তূপ। সেগুলো গড়িয়ে পড়ছে রাস্তার ওপর। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও স্তূপ করে রাখা মাটিও বায়ুদূষণের বড় উৎস। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি সরকারি সংস্থাগুলো যদি সমন্বয় করে কাজ করত, তাহলে শহরের রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ যেমন কমত, তেমনি এসব উৎস থেকে দূষণ কমানোও সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ক্ষেত্রে কাউকেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতে দেখা যায় না। আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করে বায়ুমানের উন্নতির পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। বায়ুদূষণ রোধে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস গত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এদিকে বায়ুদূষণজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের মতো সংস্থা, যারা বায়ুদূষণের উৎসগুলো ঠেকানোর দায়িত্বে রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় বলেছে যে তাদের যথেষ্ট জনবল নেই। এত বড় একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান যদি জনবলের ঘাটতির কারণে আটকে থাকে, তাহলে জনবল কেন বাড়ানো হচ্ছে না? প্রয়োজনে বছরের যে মাসগুলোয় বায়ুদূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, সে সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়েও এর সমাধান করা যায়।

আইন-আদালতের দুর্বলতা

পরিবেশ রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ অন্য যেসব আইন ও বিধিমালা রয়েছে, সেগুলো আবার জাতীয় স্বার্থে ‘বরখেলাপ’ করা যায়। যেমন পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট বা রাস্তা বানাতে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনে দেওয়া হয়নি। ফলে গোড়াতেই একটা গলদ রয়ে গেছে। তা ছাড়া যা-ও আইন আছে, তা প্রয়োগের ঘাটতি তো রয়েছেই। জাতিসংঘের পরিবেশ–সংক্রান্ত সংস্থা ইউএনইপির হিসাব (২০১৯) অনুযায়ী, পরিবেশ বিষয়ে অনেক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই যেসব দেশে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা সদরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে পরিবেশ আদালত নেই। তা ছাড়া এই আইনের সীমাবদ্ধতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি এই আইনে মামলা করতে পারেন না, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে করতে হয়। আবার এসব আদালতে পরিবেশ–সংক্রান্ত মামলার চেয়ে অন্যান্য মামলাই বেশি।

২০২১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকার পরিবেশ আদালতে মোট মামলার মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায়। চট্টগ্রামে এই হার কিছুটা বেশি, ১৩ শতাংশ। এর ব্যাখ্যায় দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলে থাকেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তাই পরিবেশ আদালতে মামলা কম যায়।

২০২১ সালের ১৩ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত—দুটিতেই অপরাধীদের কারাদণ্ডের চেয়ে অর্থদণ্ড বেশি দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর সেই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ বছরে নিষ্পন্ন হওয়া ২০০ মামলার মধ্যে ১৪৭টি মামলায় পরিবেশ আদালত অর্থদণ্ড দিয়েছেন। আর পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৪৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাত্র ১৬৬ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আপিল করে ছাড়াও পেয়ে যান। বাংলাদেশ আইন কমিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৯৮ শতাংশ মামলার রায় আপিল আদালতে বাতিল হয়ে যায়।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির সৃষ্টি না হলে পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড থামবে না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রশ্ন রেখেছিলেন, শহরের কতজন ছিঁচকে চোর ধর্ম বা নৈতিকতার ভয়ে চুরি থেকে বিরত থাকে আর কতজন রাষ্ট্রের ডান্ডাবাড়ি খাওয়ার ভয়ে বিরত থাকে?

আমাদের মতো দেশের আরেকটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দেশে আইন-বিচার-রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি অপরাধের বিরুদ্ধে একধরনের সামাজিক প্রতিরোধও আছে। সাধারণ মানুষই সম্মিলিতভাবে অনেক অপরাধ ঠেকিয়ে দেন। মানুষের ভূমিকার কারণে অপরাধীদের বিরত থাকার অনেক নজিরও আছে। কিন্তু পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা কম থাকায় এ-সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সামাজিক এমন প্রতিরোধ জোরালোভাবে কাজ করে না। পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।

-খলিলউল্লাহ্ প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

বায়ুদূষণ
বায়ুদূষণ। অলংকরণ: আরাফাত করিম

Saturday, January 11, 2025

এক দিন কাজ না পেলে চুলায় ভাত বসে না তাঁদের by পল্লব চক্রবর্তী

আজ শুক্রবার সকাল আটটা। শীতের সকালে ঘন কুয়াশা। পূর্ব আকাশে সূর্য হালকা উঁকি দিচ্ছে। কাজের সন্ধানে জড়ো হচ্ছেন মানুষ। কাজ পেলে এসব মানুষের উনুন জ্বলবে, জুটবে ভাত। না পেলে পরিবার নিয়ে উপোস থাকতে হবে তাঁদের। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্রমিকের সংখ্যাও। কিন্তু শ্রমিক নিতে আসা মালিকের দেখা মেলা ভার। মাঝেমধ্যে কেউ এলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সব শ্রমিক।

আজ এ দৃশ্যের দেখা মেলে নেত্রকোনা শহরের তেরিবাজার এলাকায় প্রধান ডাকঘরের সামনে। শত বছর ধরে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এখানে বসে দিনমজুরদের হাট। এখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ পাশের ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের অনেক উপজেলা থেকে তিন শতাধিক শ্রমিক আসেন সারা দিনের জন্য শ্রম বিক্রি করতে। হাট থেকে মালিকেরা দরদাম মিটিয়ে তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে নিয়ে যান। আবার কেউ কাজ না পেয়ে বিষণ্ন মনে খালি হাতে ফিরে যান বাড়িতে।

সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের দুগিয়া গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব আবদুল আজিজ এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে। সকাল নয়টা পর্যন্ত তিনি কোনো কাজ না পেয়ে বিষণ্ন মনে বসে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁর বয়স যখন ২০ বছর ছিল তখন থেকেই এ স্থানে এসে শ্রম বিক্রি করেন। ৪০ বছর ধরে তিনি নিয়মিত শ্রম বিক্রি করছেন। এখন প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় কাজ করেন। কিন্তু যে টাকা পান তাতে সংসার চলে না। সবকিছুর দাম বেশি হওয়ায় এই টাকা চাল-ডাল ও সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যায়। সপ্তাহে পাতে মাছ মেলানো ভার। অবশ্য বছর ত্রিশেক আগেও ৫০ থেকে ৮০ টাকা রোজ উপার্জন করলে তা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যেত বলে জানান তিনি।

আজিজের পাশে থাকা উপজেলার চল্লিশা থেকে শ্রম বিক্রি করতে এসেছেন মো. সাইফুল ইসলাম (৩৭)। আর্থিক অনটনের মধ্যেই তিনি স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। ২০১৪ সালে নেত্রকোনা আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজ থেকে যখন বিএ পরীক্ষা দেন তখন তাঁর বাবা শামছুদ্দিন মারা যান। এর পর থেকে তিনি সংসারের হাল ধরেন। তিনি গাজীপুরে স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেন। কিন্তু করোনাকালে চাকরি হারিয়ে বাড়িতে এসে বেকার হন। বিভিন্ন স্থানে ‍ঘুরে কাজের সুযোগ না পেয়ে চার বছর ধরে তিনি নেত্রকোনা তেরিবাজার মোড়ে শ্রম বিক্রি করেন। এই রোজগার দিয়ে চলে তাঁর ছয় সদস্যের সংসার। ঘরে অসুস্থ মা হেলেনা আক্তারের (৬৬) ওষুধ, দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া ছোট বোন ঋতুর লেখাপড়ার খরচ, তাঁর ছয় ও তিন বছরের দুই ছেলে এবং স্ত্রীর ভরণপোষণ মেটাতে গিয়ে এখন নাভিশ্বাস অবস্থায় আছেন বলে জানান তিনি।

সাইফুল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাই, লেখাপড়া করে কোনো চাকরি পাইলাম না। অনেক জায়গায় ঘুরেছি। অভাবের সংসার, ঘরে ছয়জন মানুষ। তাই মানসম্মান নিয়া বইসা না থাইক্কা কামলার বাজারে আইয়া শ্রম বিক্রি করি। এতে কাজ বুঝে কোনো দিন ৪৫০ টাকা, কোনো দিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পাই। এ দিয়াই কোনোরকমে সংসার চলাই। এক দিন কাম না পাইলে চুলাতে ভাত বসে না। না খেয়ে থাকতে হয়। তাই এক দিনের কামলা যাওয়ার জন্য কত যে মানুষের ব্যাকুলতা, এখানে কেউ না দাঁড়াইলে উপলব্ধি করতে পারত না।’

উলুয়াটি গ্রামের শ্রমিক মো. শামছু মিয়া (৫৯) জানান, তিনি ৪২ বছর ধরে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। দুই ছেলে, এক মেয়েসহ পরিবারে তাঁর সদস্যসংখ্যা সাতজন। এক দিন কাজ না পেলে সংসার চলে না। প্রতিদিন তেরিবাজারে এসে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হন তিনি। আগে কাজের জন্য এত হাহাকার ছিল না। হাটে শ্রমিকের সংখ্যাও কম ছিল, তাই তুলনামূলক দামও বেশি ছিল। করোনার পর থেকে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।

পূর্বধলার শ্যামগঞ্জের শ্রমিক জিল্লুর রহমান (৫৫) জানান, ৩৫ বছর ধরে কামলা দিচ্ছেন। আগে নিজের কিছু জমি ছিল, অভাবের কারণে সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। কামলা দিয়ে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে স্কুল–মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাচ্ছেন। ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন তিনি। যেদিন যে কাজ পান, সে কাজই করেন। এক দিন কাজ না পেলে ভাত জোটে না তাঁর ঘরে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বয়সের কারণে কাম করতে কষ্ট হয়। মানুষও আমারে কামে নিতে চায় না বয়স দেইক্খা।’

বর্তমান বাজারদরে প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে জীবন কেমন চলছে, জিল্লুরের সঙ্গে যখন কথা চলছিল তখন পাশ থেকে মালনি এলাকার বরকত মিয়া, পুকুরিয়ার বিল্লাল শেখ, মাহমুদপুরের তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বলছিলেন, ‘এক দিন কাম না পাইলে উপবাস থাকতে হয়।’

সাতপাই রেলক্রসিং এলাকার শ্রমিক রহিম উদ্দিনকে দুর্ভাগ্যবশত আজ কেউ নেয়নি। তাই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, আমরার শ্রমের মজুরি কিন্তু বাড়ছে না। বরং কাজ কমছে, কামলা বাড়ছে। সপ্তাহে তিন-চার দিন কাম পাই। তা দিয়াই খুব কষ্টে দিন কাটাই। ১১০ টেহার পাঙাশ মাছ অহন ২০০ টেহায় কিনতে হয়। আগে দুপুরে হোটেলে ৪০ টেহা দিয়া ভাত খাওন যাইত। অহন ডিম দিয়া খাইলেও ৬০ টেহা লাগে।’

এক দিন কাজ না পেলে তাঁদের অনেকের কপালেই খাবার জোটে না। আজ শুক্রবার সকালে নেত্রকোনা শহরের তেরিবাজার মোড় এলাকায়
এক দিন কাজ না পেলে তাঁদের অনেকের কপালেই খাবার জোটে না। আজ শুক্রবার সকালে নেত্রকোনা শহরের তেরিবাজার মোড় এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, January 5, 2025

আয়নাঘরে মাইকেল চাকমা: ৫ বছরে নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা by রাশিম মোল্লা

মাইকেল চাকমা। ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ঢাকা থেকে গুম হন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আয়নাঘরে কাটে। এ সময় তার সঙ্গে ঘটে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা। ৭-৯ বর্গফুটের একটি রুমে তাকে আটকে রাখা হয়। খাবার পানি হিসেবে টয়লেটের কলের পানি ব্যবহার করতে হতো। ঠিকমতো ঘুমাতে দিতো না। যখন ঘুমাতে চেষ্টা করতেন তখন ফ্যান বন্ধ করে দেয়া হতো। গরমের সময় যে ফ্যান চালু করলে বেশি গরম লাগে সে ধরনের ফ্যান চালু করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো হতো। পচা-বাসি খাবার অনুপযোগী খাবার দেয়া হতো। বাধ্য হয়ে সেগুলোই খেতে হতো তার। আয়নাঘরে গত পাঁচ বছর এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। গত ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের দু’দিন পর আয়নাঘরের বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান মাইকেল চাকমা। গত ১৮ই ডিসেম্বর পলাতক হাসিনার বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মাইকেল চাকমার অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। মাইকেল চাকমার তথ্য মতে, ২০১৯ সালে ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে সিভিল ড্রেস পরিহিত ৫/৭ জনের একটি দল তাকে তুলে নেয়। দীর্ঘ ৫ বছর ৩ মাস ২৭ দিন গুম থাকার পর মুক্তি পান তিনি।

যেভাবে গুম হন মাইকেল চাকমা: ২০১৯ সালের ৯ই এপ্রিল ইউপিডিএফ’র মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে বাসে ধানমণ্ডির কলাবাগানে নামেন। এরপর সেখান থেকে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে নামেন। মেইন রোড পার হয়ে ফোনে উক্ত ব্যবসায়ীর নির্দেশনা মতো যেতে থাকি। হঠাৎ একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসা এক ভদ্রলোক তার নাম ধরে ডাকে। এমন সময় ৫-৭ জন  লোক তাকে জাপটে ধরে। তাকে ধরার সঙ্গে সঙ্গে লম্বা এক লোক (সাদা শার্ট পরিহিত) তাড়াতাড়ি গাড়ি পাঠান, তাড়াতাড়ি গাড়ি পাঠান বলে অন্য একজনকে ফোনে নির্দেশ দিতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা মাইক্রোবাস চলে আসে। মুহূর্তেই তাকে গাড়িতে তুলে হাতকড়া পরায় এবং কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে।

৭-৯ বর্গফুটের রুমে অবর্ণনীয় অত্যাচার করতো:
বিভিন্ন রাস্তায় চক্কর দিয়ে সন্ধ্যায় তাকে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি থানা হবে। পরে বুঝতে পারেন এটি থানা না। একদম নীরব নিস্তব্ধ। ৭-৯ বর্গফুটের একটি রুমে তাকে আটকে রাখা হয়। রুমের ভেতরে হাতকড়া ও চেখের বাঁধন খুলে দেয়। রুমের ভেতরে ছোট্ট একটি  টয়লেট ছিল। টয়লেটের কাছে একটি পানির কল ছিল। ওই কল ব্যবহার করেই সবকিছু করতে হতো।  সেখানে পাশাপাশি তিনটা রুম ছিল। শেষের  কোণার রুমে একজন লোক ছিল। ওই লোককে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে উল্টো দিকে ঘুরে বসে থাকতে বলা হয়। রাত ৯টার দিকে একজন লোক এসে আবার কালো কাপড় দিয়ে তার চোখ বেঁধে দেয়। তার উপর একটা কালো কাপড়ের লম্বা টুপিও পরিয়ে দেয়। তার উপর আরেকটা কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে দেয়। এরপর কাছাকাছি অন্য একটি রুমে নিয়ে একটা চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। তার ডান পাশে এবং সামনে ৩-৪ জন লোক বসা ছিল। সেখানে তাকে বিশৃঙ্খলভাবে একেকজন একেকটা প্রশ্ন করতে থাকে। ইউপিডিএফ সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্ন করার পর আবার তাকে রুমে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন ১০ই এপ্রিল সকালে নাস্তা খাওয়ার পর আবারো চোখ বেঁধে, লম্বা কালো টুপি পরিয়ে পাশের একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের খাবার খেয়ে ১৫-২০ মিনিট পর রাতের আজান হয়। এরইমধ্যে হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে তাকে ঘুম থেকে তুলে আবারো হাতকড়া লাগিয়ে চোখ বেঁধে কালো টুপি পরিয়ে দেয়। হঠাৎ বাইরে একটি গাড়ির শব্দ শুনতে পাই। আমাকে ওই গাড়িতে তোলার পর খুলে দেয়া হয় মাথার কালো টুপি। তবে কিছুক্ষণ পর তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা টুপি পরিয়ে চোখ বেঁধে দেয়। এরপর কিছুক্ষণ পর আমাকে অন্য একটা গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় গাড়িতে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়। গানের উচ্চ শব্দে বাইরের কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না। ভাঙাচোরা, উঁচু-নিচু ও আকা-বাঁকা পথ দিয়ে এক ঘণ্টার মতো সময় চলার পর গাড়িটি থামে। চারদিক নীরব, নিস্তব্ধ। আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যায়। আমি উত্তেজিত হয়ে তাদের সঙ্গে আমাকে এখানে আনার কারণ জানতে চাই। এ সময় তারা আমার সঙ্গে কথা না বললেও শারীরিক নির্যাতন করে। একজন একটি শক্ত লাঠি দিয়ে আমার পেটে গুঁতো দেয়। আরেকজন কথা বলতে গেলে মুখের ভেতর ৫-৬ ইঞ্চি বাঁশের মতো লম্বা কিছু ঢুকিয়ে দিতো। একপর্যায়ে তারা চলে যায় এবং আমাকে রুমে নিয়ে যায়। অনেক পুরোনো ভবন, টিনশেডের ছাউনি। ওই রুমে আমার জন্য ৩/৭ ফিটের একটি চকি রাখা ছিল। শরীর অনেক ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়ি। তিনদিন পর পাশের অন্য একটি বন্দিশালায় নেয়া হয়। ভবনটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। রুমের দেয়ালগুলো অসমান, ছোট ছোট বিশৃঙ্খল ঢেউয়ের মতো। এই ভবনে দশটির মতো রুম ছিল। একটা রুমে একজনকেই রাখা হতো। পাশের রুমে অন্য বন্দির শব্দ শোনা যেতো। এই ভবনের ১১৩ ও ১১৬ নম্বর রুমে আমাকে এক বছরের অধিক সময় রাখা হয়। আমার চুল-দাড়ি বড় হয়ে যায়। আয়নাঘরে (গোপন বন্দিশালায়) প্রথম দিকে খাবার কিছুটা ভালো থাকলেও পরবর্তীতে খাবারের মান খুব খারাপ হয়। বাসি-পচা খাবারও দিতো। মাসের পর মাস খাবার অনুপযোগী তরকারি দেয়া হয়েছে। সে সময় তরকারি ছাড়া শুধু ভাত খেয়ে দিন পার করেছি। ঠিকমতো ঘুমাতে দিতো না। যখন ঘুমাতে চেষ্টা করতাম, তখন ফ্যান বন্ধ করে দিতো। গরমের সময় যে ফ্যান চালু করলে বেশি গরম লাগে সে ধরনের ফ্যান চালু করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতো। লোহার দরজায় বাড়ি দিয়ে ঘুম ভেঙে দিতো। এভাবে কয়েকটা বছর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে ভীষণ অত্যাচার চালিয়েছে। শুধু তাই নয় ডিউটিম্যানদের দিয়ে খারাপ ব্যবহার করানো হতো। প্রতিকার চাইলে আরও বেশি অত্যাচার করতো। ওই সময়ের দিনগুলো ভয়ঙ্কর রকমের অসহনীয় ছিল। ওখানে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক শ্রেয় মনে করতাম। প্রায়ই মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকতাম। শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি।

গত ৬ই আগস্ট মধ্য রাতের পর আনুমানিক ৩টার দিকে আমাকে ঘুম থেকে তোলা হয়। হাতকড়া ও চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি থামে। আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জোরে জোরে হাটিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি শুয়ে পড়তে বলে। আধা ঘণ্টার আগে ওঠার চেষ্টা করলে গুলি করার হুমকি দেয়। আধাঘণ্টা শুয়ে থাকার পর বসার চেষ্টা করি। ভয় ছিল এই বুঝি এক্ষুনি গুলি করে মারবে। কিন্তু গুলি করছে না। সাহস করে চোখের বাঁধন খুলি। পাঁচ বছর তিন মাস পর এই প্রথম বাইরের আলো দেখা, পৃথিবী দেখা। চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখি। কিন্তু কাউকে দেখতে পাই না। সামনে শুধু সেগুন গাছের বন। এভাবেই মুক্ত হন তিনি।  

mzamin

Tuesday, December 31, 2024

কমলাপুর স্টেশন: মানুষ বেচা কেনার হাট by শাহীন কাওসার ও ফাহিমা আক্তার সুমি

কমলাপুর রেলস্টেশন। রেলপথের পুরো দেশের কেন্দ্রস্থল। ট্রেনের হুইসেল আর লাখো যাত্রীর পদভারে রাতদিন একাকার হয়ে যায় এখানে। দিনে কতো মানুষ আসে, কতো মানুষ যায় এই স্টেশন হয়ে। এই যাত্রীদের ঘিরে জীবন-জীবিকার সংস্থান হয় অনেক মানুষের। তাদের কারও কারও আবার ঘরবাড়ি মানে এই স্টেশন। এদের কেউ ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করে আবার কেউ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িত। এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা মানুষ বিক্রির মতো জঘন্য কাজ করে এই স্টেশনে বসেই। অবুঝ শিশু, কিশোরী এমনকি নারীদেরও বিক্রি করে দেয় এই চক্র। সরজমিন কয়েক দিন কমলাপুর স্টেশনে অবস্থান করে মানবজমিন মানুুষ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত এই চক্রের বিষয়ে বিস্তর তথ্য পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে অসহায় অবস্থায় কমলাপুর এসে অনেকে আশ্রয় নেয়। এই অসহায় মানুষদেরই টার্গেট করে গড়ে উঠেছে এই চক্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিশু চুরির সঙ্গেও যোগসাজশ আছে তাদের। এই চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চুরি করে আনা শিশু তুলে দেয় কোনো পরিবারের হাতে। আবার এই শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তির কাজে ব্যবহারেরও অভিযোগ আছে। এ ছাড়া কিশোরী বা নারীদেরও নানা পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয় তারা। এই কিশোরী বা নারীরাও নানাভাবে পরবর্তীতে পাচার বা সহিংসতার শিকার হন।

কমলাপুরে মানুষ কেনাবেচার এই চক্রটিতে ১০ থেকে ১২ জন। সোমবার কমলাপুর রেলস্টেশনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় চক্রটির মূলহোতা রুবেলের সঙ্গে। এক ব্যক্তিকে ক্রেতা সাজিয়ে তার কাছে একটি শিশুর চাহিদার কথা জানানো হয়। শুরুতে সে এড়িয়ে যেতে চাইলেও তার এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনে। একপর্যায়ে চাহিদামতো শিশু এনে দিতে পারবে বলে জানায়, দাবি করে  মোটা অঙ্কের অর্থ। শুধু শিশু নয় কিশোরী ও তরুণীদেরও বিক্রি করে দেয়ার তথ্য দেয়। তরুণীদের গর্ভে অবৈধভাবে ধারণ করা সন্তান বিক্রিরও প্রস্তাব দেয়। একটি পাঁচ মাসের ছেলে সন্তান বিক্রির জন্য দরদামও হাঁকায়।

শিশু-কিশোরীদের পাচারের কথা জানিয়ে রুবেল বলে, ছোট-বড় যে বয়সী শিশু দরকার সেটি দিতে পারবো। শিশু সংগ্রহের কৌশলের বিষয়ে সে বলে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নির্ধারিত লোক শিশু চুরি করে নিয়ে আসে। এই শিশুদের পরে বিক্রি করে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এই চক্রের সদস্যদের ধরা পড়ার তথ্যও জানায় এই যুবক।  

চক্রের ৬ সদস্য শিশু চুরির কাজ করে জানিয়ে রুবেল বলে, এখান থেকে খরচ দিয়ে আমি তিনটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিবো। তারা যাবে ময়মনসিংহ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া এবং জয়দেবপুর এবং অন্য কয়েকটি জেলায় যাবে বাকিরা। মোট আমাদের ছয়টি মেয়ে যাবে, তারা সঙ্গে করে দুইটা বাচ্চা নিয়ে আসবে। তারা নিয়ে এসে আমাকে খবর পাঠাবে আমরা আবার সেখান থেকে নিয়ে আসবো।

ক্রেতা সেজে একজন শিশুর চাহিদা জানালে রুবেল টাকা দাবি করে বলে, রাতে তার চক্রের ৬ সদস্যকে ঢাকার বাইরে পাঠানোর জন্য গাড়ি ভাড়ার খরচ বাবদ দুই হাজার টাকা দিতে হবে।
ঘণ্টাখানেক পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল করে শিশুটিকে হাতে পাওয়ার পর ১ লাখ টাকা দাবি করে রুবেল। সে বলে, কমলাপুরে এসে বাচ্চাটিকে নিতে হবে।
অন্য একজন একটি কিশোরীর চাহিদা জানালে রুবেল বলে, মারিয়া নামের একটি মেয়ে আছে। তার জন্য আমাকে ২০ হাজার টাকা দিলে হবে। মেয়েটিকে কোনো টাকা দেয়া লাগবে না। তাকে একেবারে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।

রুবেল কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে একটি পানির পাম্পে কাজ করার কথা দাবি করেন।
এসময় তিনি নিজের বাড়ি নোয়াখালী দাবি করেন। ওদিকে স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চক্রের কিছু কাজের আলামতও মিলে। শুধু শিশু না, ভবঘুরে ছিন্নমূল কিশোরী, তরুণীদেরও নানা কাজে ব্যবহার করে রুবেলসহ একাধিক চক্র। তাদের ভয় ও লোভ দেখিয়ে নানা অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এমন একজন কিশোরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, রুবেল ভাই আমাকে যেতে বলেছে। আর বলেছে আমি যেন গিয়ে ঠিকমতো কথা শুনি, যদি কথা না শুনি তাহলে কমলাপুরে দেখলে খারাপ হবে। এরচেয়ে আর বেশি কিছু বলেনি। কিশোরীটি বলে, আমার সৎমা ধরে আমাকে মারতো। নিজের মা আরেক জনকে বিয়ে করেছে। কিছু চাইলে ঠিকমতো দিতে চাইতো না। স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারতাম না। বই-খাতা কিনতে চাইলে কিনে দিতো না। এরপর অল্প বয়সে বাড়ি থেকে ট্রেনে করে চলে আসি কমলাপুরে। এখানে এসে থাকা শুরু করি। নিজের বলতে এখানে কেউ নেই। যখন আমার ৭ থেকে ৮ বছর বয়স তখন আসি। আমার বাড়ি রংপুর। সাত বছর ধরে থাকি। বাড়ি থেকেও কখনো কেউ খোঁজ নেয়নি। কিশোরীটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা ও সুঁচের চিহ্ন দেখা যায়। এসব কী জানতে চাইলে সে বলে এখানে থাকা প্রায় সবাই মাদক গ্রহণ করে, নেশা করে।

আরেক কিশোরী বলে, একেবারে ছোটবেলায় চলে আসি। রাজশাহী আমাদের গ্রামের বাড়ি। এই জগতটা আর ভালো লাগে না। অনেক ঘটনা ঘটে এই কমলাপুরে। নতুন বা পুরাতন যেই আসুক মানুষের মোবাইল ছিনতাই হয়। যাত্রীদের ব্যাগ ছিনতাই হয়। অনেকে অনেকভাবে খারাপ কথা বলে। ব্লেড দিয়ে হাত-পা কাটি। শরীরে ড্রাগ নেই, এতে নেশা হয় সব ভুলে থাকি। কখনো কখনো কষ্টে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাই। এখানে আসার পর মানুষ আর ভালো থাকতে দেয়নি। এই কিশোরীও রুবেলের কথামতো কাজ করে বলে জানায়।

২৩ বছরের আরেক তরুণ বলেন, আমার জন্মই কমলাপুর। বাবা-মা গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসে। এখন তাদের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ তেমন নেই।
আমার কোনো বাড়িঘর নেই এই কমলাপুরই সব। আমি বাইরে কোথাও ভিক্ষা করতে গেলেও কমলাপুরের কথা আমার চোখে ভাসে। এই রেলস্টেশন আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। আমার অনেক কষ্ট আছে সেজন্য আমি এলাকায় যাই না। আমি আমার মা-বাবা ছাড়া কাউকে চিনি না। করোনার সময় মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে আর হয়নি। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়লে এক জায়গায় বসে কান্নাকাটি করে নিজের দুঃখ নিজের কাছে বলি। এই কমলাপুরই আমার ভালোবাসা। এখানে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়াও বিভিন্ন কাজ করি, তাতে প্রায় ৭-৮ শত টাকা আয় হয়।

স্টেশনে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায়ই অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসে। শুধু তাই নয় ছোট ছোট শিশুরাও আসে। আবার বিভিন্ন ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে পড়ে মেয়েরা এখানে আসে। পরে মেয়েটাকে ফেলে রেখে চলে যায়। এসব মেয়েরা আর ফিরে যায় না পরিবারের কাছে। অনেক ছেলে-মেয়ে আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করে আসে। কেউ সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে আসে। এখানে অনেকে অভাবের কারণে নিজের বাচ্চা বিক্রি করে দিতে শুনেছি। যাদের বাচ্চার প্রয়োজন হয় তারা মোবাইল নাম্বার দিয়ে যায়।
বারবার নাম জানতে চাইলেও নিজের নামটি বলতে চাননি এ তরুণ। তিনি বলেন, এখানে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই। আমার মতো যারা থাকে তাদের কেউ ভালো, কেউ খারাপ। তবে কমলাপুর সবারই ঠিকানা।

mzamin

Monday, December 30, 2024

প্যারিসের ‘উন্মুক্ত জেলে বন্দী’ দেশহীন ফরিদুলের গল্প by মুহম্মদ মুহসীন

তাঁর সঙ্গে আমার দেখা প্যারিসের লা-কুন্নভের একটি বাড়িতে। সে বাড়িতে একটি মেস আছে। সেখানে কয়েকজন বাঙালি থাকেন। তাঁদের রান্নাবান্নার কাজ করেন তিনি।

তাঁর নাম ফরিদুল আলম। ডাক নাম ফরিদ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চেহারায় স্থায়ী বিষন্নতার ছাপ।

ফরিদের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি যে ‘আত্মজীবনী’ শোনালেন, তা ‘রীতিমতো নভেল’। কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নয়, বরং পরিবারের সদস্যরা যাতে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্য মরিয়া হয়ে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ তাঁর ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যে কোনো কাহিনি–লোভাতুর চিত্রনির্মাতাকেও হয়তো ‘তারপর? তারপর?’ বলতে বাধ্য করবে।

লা কুন্নভের ওই বাড়িতে ফরিদ নিজের হাতে রান্না করে খাইয়ে তাঁর গল্পটা যখন বলছিলেন, তখন আধুনিক সভ্যতার অভিবাসন ব্যবস্থা, পরিযায়ী শ্রমিকদের কষ্ট আর আমাদের অভিবাসন ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেন তিরের মতো আমাদের বুকে বিঁধছিল।

ফরিদের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে। বাবার নাম আমিরুল আলম। মায়ের নাম আয়শা খাতুন। গরিব বাবার সংসারে জন্ম। তাই লেখাপড়ার সাধ তাঁর পূরণ হয়নি।

দুবাই দিয়ে শুরু

২০০৩ সালে আয়ের আশায় ফরিদ পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আরব আমিরাতের আলোঝলমল শহর দুবাইয়ে।

সেখানে পৌঁছে দেখেন বাঙালি শরীরে গতর খেটে এখানে পয়সা খুব একটা আসে না। কোনো দিন কাজ জোটে, কোনো দিন জোটে না।

কোনো মাসে বাংলাদেশি টাকায় ১০ হাজার, আর কোনো মাসে হয়তো ২০ হাজার আয় করা যায়।

এ দিয়ে নিজের খরচ শেষে দেশে পাঠানোর মতো তেমন কিছু আর হাতে থাকে না।

অথচ দেশ ছাড়ার আগে কতই না স্বপ্ন ছিল! বাবা-মাকে টাকা পাঠাবেন, সঞ্চয় করবেন আর সেই সঞ্চয় দিয়ে দেশে ফিরে বিয়ে-থা করে সুখের সংসার গড়বেন।

কয়েক বছর পার করে ফরিদের স্থির বিশ্বাস হয়, দুবাই শহরে গতর খেটে এই স্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবের কাছেও আসবে না।

ইউরোপের স্বপ্ন

ফরিদের মনে হলো, স্বপ্ন পূরণ হবে যদি পা রাখা যায় ইউরোপের মাটিতে।

কিন্তু ফরিদ কীভাবে ইউরোপ যাবেন? কীভাবে এ স্বপ্ন তাঁর পূরণ হবে? এই স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে অল্প দিনেই ফরিদ দেখলেন, তাঁর মতো বহু ফরিদের স্বপ্ন পুঁজি করে দুনিয়াজোড়া এক রমরমা অবৈধ আদম পাচারের ব্যবসা চালু আছে।

ব্যবসাটা অবৈধ হলেও তাকে অবৈধ বলতে মন সায় দেয় না। কারণ দেশে দেশে এর সঙ্গে জড়িত আছেন হাজার হাজার পুলিশ, শত শত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এবং বড় বড় গডফাদার।

কেতাবি আইনে এ ব্যবসা যতই অবৈধ হোক, আইনি লোকজনের সায় সম্বল করেই এ ব্যবসা চলছে এবং সত্যিকারেই এই উপায়ে এশিয়া আফ্রিকার শত শত মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে স্বপ্নের ভূমি ইউরোপের মাটিতে।

সুতরাং ‘যা করে খোদায়’ বলে ফরিদও এই পথে পা বাড়ানোর ইরাদা করলেন। অনেক ভাবাভাবি আর সাধ্যমতো তত্ত্বতালাশের পরে ধরলেন দেশেরই এক দালালকে। দালালের নাম নূর ইসলাম, তাঁর বাড়ি নোয়াখালী।

দালালের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হলো পাঁচ লাখ টাকায়। ঠিক হলো, দালাল তাঁকে গ্রিস পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন। এজন্য ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হবে।

এরপর দেড় লাখ টাকা দিতে হবে ইরানে পৌঁছানোর পরে। আর তুরস্কে যাওয়ার পর অবশিষ্ট তিন লাখ পরিশোধ করতে হবে।

সেই টাকা পেলে দালালের লোকজন ফরিদকে ইউরোপে পৌঁছে দেবেন।

দুবাই থেকে ওমান দিয়ে ইরান হয়ে দুঃস্বপ্নযাত্রার শুরু

‘কন্ট্রাক্ট’ অনুযায়ী ফরিদ শুরু করলেন তাঁর স্বপ্নযাত্রা। সময়টা ২০১০ সালের শেষ দিকে। আদম ব্যবসার লোকজন দুবাই থেকে ফরিদ এবং ফরিদের মতো কয়েকজনকে একসঙ্গে তুলে দিল একটি ট্যাক্সিতে।

ট্যাক্সি পৌঁছাল ওমানের সমুদ্র-তীরবর্তী পাহাড়ি এক এলাকায়। সে এলাকার নাম ফরিদ বলতে পারেননি। যাত্রীদের কোনো ধরনের পাসপোর্ট-ভিসা না থাকলেও তাঁদের নিয়ে ট্যাক্সিটি আরব আমিরাতের সীমান্ত পার হয়ে ওমান পৌঁছাল।

কোনো সমস্যা হলো না। কারণ, দালালদের সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের প্রয়োজনীয় রফা করা ছিল।

ওমানের সমুদ্র-তীরবর্তী এই জায়গা থেকে ফরিদের মতো আরও জনা তিরিশেক যুবককে একত্রে তুলে দেওয়া হলো একটি বোটে।

বোট পৌঁছাল ইরানের বন্দর আব্বাসে, যাকে ফরিদ যাকে বলেছেন ‘বান্দ্রাবাস’। বন্দর আব্বাসে মাসুম নামের আরেক বাঙালি দালাল তাঁদের রিসিভ করলেন এবং কোনো ভোগান্তি ছাড়াই পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন অবস্থায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো ইরানের অভ্যন্তরে; কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বোঝাপড়া আগেই সম্পন্ন ছিল।

ইরানে পৌঁছানোর পর দালালদের দেওয়া ইরানি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরও দেড় লাখ টাকা ফরিদের ভাই সম্পর্কীয় একজন দুবাই থেকে জমা দেন।

ইরান থেকে তুরস্কে

ইরানে সাত দিনের মতো তাঁদের রাখা হয় বেশ আদরযত্নে। এক সপ্তাহ পর তাঁদের ইরান থেকে প্রথমে ট্যাক্সিতে ও পরে বাসে নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্কে।

ইরানের বন্দর আব্বাস ত্যাগ করার পরে কোন কোন শহর হয়ে কোন পথে তাঁদের তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়, তা ফরিদ বলতে পারেন না।

ইরান-তুরস্ক সীমান্তের বা চেকপোস্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া ছিল বলে এই সীমান্ত অতিক্রম করতেও ফরিদ বা তাঁদের বহরের অন্যদের কোনো বেগ পেতে হয়নি।

এমনকি ইরানে তাঁদের সহযোগিতা দিয়েছেন যে দালালেরা, তাঁদের একজন তুরস্ক পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তুরস্কের অভ্যন্তরে।

তুরস্কের সীমান্ত পার হওয়ার পর প্রথমে ট্যাক্সিতে ও পরে বাসে করে তাঁরা ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে পুলিশ বাস থেকে তাঁদের নামিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

তাঁরা আবার ফিরে আসেন তুরস্কের সীমান্তে। দালাল আবার তাঁদের আশ্রয় দেন এবং কিছুদিন পরে আবার ইস্তাম্বুল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এবারও পুলিশের হাতে তাঁরা ধরা পড়েন।

এভাবে ইস্তাম্বুল যাওয়ার পথে ছয়বার তাঁরা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ছয়বার পুলিশ তাঁদের ফেরত পাঠিয়ে দেয় এবং ছয়বারই পুনরায় দালালের লোকজন তাঁদের ইস্তাম্বুল পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ছয়বারের পর সপ্তমবারে তাঁরা পুলিশের হাতে ধরা না পড়ে ইস্তাম্বুল পর্যন্ত পৌঁছাতে সমর্থ হন। ইস্তাম্বুলে এক বাঙালি তাঁদের রিসিভ করেন।

ইস্তাম্বুলে অবশ্য থাকা-খাওয়ায় সেই ইরানি কদর আর জোটে না। এক রুমে গাদাগাদি করে অনেককে রাখা হয় এবং বাইরে বেরোতে দেওয়া হয় না।

এক মাসের বেশি সময় এখানে তাঁদের এভাবে পড়ে থাকতে হয়। এখানে থাকতেই চুক্তির বাকি টাকা দালাল তথা পাচারকারীদের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হয়।

তুরস্ক থেকে গ্রিস

গ্রিসে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘আদম সংখ্যা’ পূরণ হওয়া, লরি ড্রাইভারের সঙ্গে চুক্তি করা, সীমান্ত ও বিভিন্ন চেকপোস্টের কর্মচারীদের সঙ্গে বোঝাপড়া ও তাঁদের গ্রিন সিগন্যাল ইত্যাদির সমন্বয় ঘটাতে অনেক সময় লেগে যায়।

এক মাসের বেশি সময় এখানে থাকার পর ফরিদসহ আরও অনেক ব্যক্তিকে একটি বদ্ধ লরির মতো গাড়িতে তোলা হয় গ্রিসে পৌঁছানোর জন্য।

এই গাড়ির ধারণক্ষমতা বড়জোর ২৫-৩০ জন। কিন্তু এই গাড়িতে শ খানেকের মতো লোক ওঠানো হয়। ফরিদের ভাষ্যমতে, সে এক বিভীষিকাময় যাত্রা। গাড়িতে শ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মরে যাওয়ারই কথা।

তারপরও আল্লাহর রহমতে কেউ মারা যাননি। ফরিদুল আলম মনে করেন, এই বদ্ধ গাড়িগুলোকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেওয়া হয়েছিল; কারণ সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিতদের সঙ্গে এই পাচার চক্রের সমঝোতা ছিল।

সীমান্ত অতিক্রমের পর যেখানে তাঁদের নামানো হয়, সেখান থেকে গ্রিসের সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষীরা তাঁদের ধরে নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়।

পরে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার লোকজন তাঁদের নিয়ে শরণার্থীশিবিরে স্থান দেন।

এথেন্সে শরনার্থী জীবন, পুলিশ ধরে আর ছাড়ে

এই শরণার্থীশিবিরে দিন দশেক থাকার পর তাঁদের ‘স্টে পেপার’ নামে একটি ডকুমেন্ট দেওয়া হয়। এই স্টে পেপার হাতে নিয়ে তাঁরা একটি বাসে চড়ে এথেন্সের উদ্দেশে রওনা হন।

ইস্তাম্বুল থেকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় পাচারকারীরা তাঁদের হাতে জনপ্রতি ৬০ ইউরো দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকায় বাসের টিকিট কিনে তাঁদের এই এথেন্স-যাত্রা শুরু হয়।

এথেন্সে এসে ফরিদুল স্টে পেপার নিয়ে কোর্টে যান অ্যাসাইলাম চেয়ে আবেদনের জন্য।

উল্লেখ করার মতো বিষয়, গ্রিসে থাকার সময় সব অ্যাসাইলামের আবেদনে ফরিদ নিজেকে রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়েছিলেন, কারণ পাচার চক্রের দালালেরা পরামর্শ দিয়েছিল, এই পরিচয়ে অ্যাসাইলাম সহজ হতে পারে।

আদালত ফরিদের অ্যাসাইলাম আবেদন গ্রহণ না করে স্টে পেপারে ছবি লাগিয়ে একটি সিল দিয়ে দেন। এই পেপার তাঁকে এক মাস থাকার বৈধতা দেয়। কিন্তু এই পেপার নিয়ে তিনি কিছু একটা রোজগারের কাজ শুরু করেন।

কাগজের বৈধতা শেষ হওয়ার পর একসময় পুলিশ ফরিদকে ধরে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে কিছু লোক এথেন্সে পরিচিত হওয়ায় তাঁদের সহযোগিতায় এক উকিল ধরা হয়।

উকিল থানায় গিয়ে আইনি কিছু পদক্ষেপ নেন এবং সে সুবাদে আবার এক মাসের স্টে পেপার দিয়ে দু-তিন দিন পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়।

ছাড়া পেয়ে এবার ফরিদ নিজেই অ্যাসাইলাম উকিলের দ্বারস্থ হন। আবার অ্যাসাইলামের আবেদন করা হয়। অ্যাসাইলাম না মিললেও এবার তিনি একটি লাল কার্ড পান।
এ কার্ডের পারিভাষিক নাম ফরিদ বলতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, এই লাল কার্ড নিয়ে এথেন্সে অনেকে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন।

এই লাল কার্ড থাকলে মাঝেমধ্যে পুলিশি হয়রানি সহ্য করতে হলেও একেবারে ডিপোর্টেড হতে হয় না।

এথেন্সে লাল কার্ড পাওয়ার পর উকিলের সুবাদে অ্যাসাইলামের জন্য ফরিদুল চার-পাঁচবার ইন্টারভিউ দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর কখনোই প্রসন্ন হয়নি।

অ্যাসাইলামের কাগজ তাঁর কখনো জোটেনি। তাই সময়ে-অসময়ে থানায় চলে যাওয়া, হকারির জিনিসপত্র পুলিশের হাতিয়ে নেওয়া, ইত্যাকার ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়েই স্বল্প আয়ে চলতে থাকে তাঁর এথেন্সের দিনগুলো।

একধরনের অবৈধ নিবাসের মধ্য দিয়ে হকারি বা কায়িক শ্রম দিয়ে যা যৎসামান্য রোজগার করতে পারেন, তা দিয়ে নিজের পেট চালিয়ে আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

ফলে দেশে বাবা-মা-ভাইবোনের জন্য কিছু পাঠানোও সম্ভব হয় না।

জীবন বাজি রেখে ইউরোপে পৌঁছে যে স্বপ্নপূরণের আশা ফরিদ এত দিন বুকের মধ্যে লালন করছিলেন, তা ধীরে ধীরে তাঁর বুকের মধ্যেই মিলিয়ে যেতে থাকে।

এথেন্স থেকে মেসিডোনিয়া–সার্বিয়া–হাঙ্গেরি

এভাবে চার-চারটি বছর চলে যায়। এর মধ্যে ২০১৪ সালের শেষ দিকে মানবতার এক মহাবিপর্যয় ফরিদুল আলমের মরতে বসা স্বপ্নের গোড়ায় বেঁচে ওঠার জন্য যেন আচমকা এক ঘটি পানি ঢেলে দিল।

সিরিয়ার ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের কারণে জীবন বাঁচাতে মানুষের স্রোত তখন ধেয়ে আসে ইউরোপের দিকে।

জার্মানিসহ অনেকগুলো পূর্ব ইউরোপের দেশ তাদের সীমান্ত খুলে দেয় এই শরণার্থীদের জীবন বাঁচাতে।

ফরিদ ভাবলেন, হয়তো আল্লাহ তাঁর আপাত-অবোধ্য জটিল কর্মপ্রক্রিয়ার ধারায় এত দিনে তাঁর স্বপ্নের প্রতি মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তিনি আবার পথে নামলেন। এই জনতার সঙ্গে মিশে তিনি এবার ঢুকতে চেষ্টা করলেন পশ্চিম ইউরোপের দেশ জার্মানি, সুইজারল্যান্ড বা ফ্রান্সে।

২০১৪ সালের শেষ দিকে তিনি তাঁর প্রায় নিভে যাওয়া স্বপ্ন বাঁচিয়ে তোলার আশায় এত দিনের আয়রোজগার থেকে সঞ্চিত টাকা পয়সাটুকু ট্যাঁকে গুঁজে এথেন্স থেকে যাত্রা শুরু করলেন।

সঙ্গে আরও দু-তিনজন বাঙালির সঙ্গে বাসে রওনা হয়ে ফরিদ প্রথমে এলেন মেসিডোনিয়ায়।

সেখান থেকে আরেক বাসে সার্বিয়া এবং তারপর আরেক বাসে সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরি।

হাঙ্গেরিতে ঢোকার সময় ফরিদ এথেন্সে পাওয়া তাঁর লাল কার্ডটি ফেলে দেন।

হাঙ্গেরিতে তাঁরা যে বাসে পৌঁছেছিলেন, সে বাস ভর্তি ছিল আফগানি, পাকিস্তানি আর বাঙালি শরণার্থীতে।

হাঙ্গেরিতে পুরো শরণার্থীর এই বাসটি নিয়ে যাওয়া হয় একটি রিফিউজি ক্যাম্পে।

ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের দুই সপ্তাহ ওই ক্যাম্পে অবস্থানের জন্য একটি ডকুমেন্ট দেয়। কিন্তু ফরিদ এই ক্যাম্পে ১৫ দিন না থেকে অস্ট্রিয়ায় ঢোকার নিয়তে ক্যাম্প ত্যাগ করেন।

টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে ঘুম, গন্তব্য জার্মানি, গেলেন চেক রিপাবলিক

জার্মানি যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে তিনি অস্ট্রিয়ায় এক দিন থাকেন। সেখান থেকে টিকিট কেটে তিনি জার্মানির উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন।

এত দিনের খাওয়া-না-খাওয়া আর টেনশনের ভ্রমণে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহটি ট্রেনে উঠে সিটে বসার কিছু সময়েই ঘোর ঘুমের রাজ্যে চলে যায়।

সে ঘুম ফরিদকে স্বপ্নের পরিবর্তে উপহার দেয় কঠিন দুঃস্বপ্ন। তাঁর গভীর ঘুমের মধ্যে কোথায় কী হয় তিনি বলতে পারেন না। তাঁর ঘুম ভাঙে পুলিশের ডাকে।

পুলিশ তাঁকে ট্রেন থেকে এক স্টেশনে নামিয়ে দেয়। ট্রেন থেকে নেমে তিনি ধীরে ধীরে বুঝে উঠতে পারেন, তিনি যে দেশে নেমেছেন, সেটি তাঁর স্বপ্নের দেশ জার্মানি নয়, বরং সেটি অন্য দেশ; চেক রিপাবলিক।

চেক রিপাবলিকে পুলিশ ফরিদকে থানায় নিয়ে যায়। থানা হেফাজতে তাঁকে আট-দশ দিন চেক রিপাবলিকে রাখা হয়।

এরপর হেফাজতে নেওয়া অনেকগুলো মানুষের মধ্যে কাউকে অস্ট্রিয়ার পাঠিয়ে দেওয়া হয় আর কাউকে হাঙ্গেরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ফরিদের ক্ষেত্রে ঘটে একটি ভিন্ন রকম ঘটনা।

থানা হেফাজতে পুলিশ ফরিদের ব্যাগে-পকেটে টাকাপয়সা ও কাগজপত্র যা পায়, তা নিয়ে নেয়। তাঁর আশা ছিল, ইউরোপের পুলিশ বাঙালিদের মতো হবে না।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সবই আবার তাঁকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু এই পুলিশ তাঁর কিছুই আর ফেরত দেয় না। তবে অন্যদের মতো তাঁকে অস্ট্রিয়ায় বা হাঙ্গেরিতে ফেরতও পাঠায় না।

বরং তাদের গাড়িতে করে নিয়ে দূরে একটি ছোট ট্রেন স্টেশনের কাছে নামিয়ে দেয় আর ইশারায় দেখিয়ে দেয় কোন দিকে গেলে অস্ট্রিয়ায় ফেরত যাওয়া যাবে, আর কোন দিকে গেলে জার্মানির উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া যাবে।

খালি পেট আর খালি পকেটে ফের জার্মানির পথে, ফের ট্রেনে ঘুমিয়ে পুলিশের হাতে

আবারও ফরিদ জার্মানিমুখী ট্রেনে ওঠার ইরাদা করলেন। কিন্তু কীভাবে উঠবেন? তাঁর হাতে তো কোনো টাকা নেই ট্রেনের টিকিট কাটার।

কী আর করা? বিনা টিকিটেই উঠে পড়বেন, যা করে খোদায়। ঠিকই তা-ই করলেন। পুলিশের দেখানো দিকের ওপর ভর করে একটি ট্রেনে উঠলেন। ট্রেনটিতে লোকজন খুব কম।

তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এক আরব লোকের সঙ্গে এই ট্রেনে তাঁর দেখা হলো। দুবাইয়ে শেখা কিছু আরবি শব্দের ওপর ভর করে এই লোকটিকে তাঁর অবস্থার কথা কিছুটা বোঝাতে পারলেন।

আরব লোকটি তাঁকে একটি বড় স্টেশনে নামিয়ে দিলেন এবং বললেন এই স্টেশন থেকে ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাকার ইউরোপের যেকোনো দেশে যাওয়ার ট্রেন পাওয়া যাবে।

ফরিদ এই স্টেশনটির নাম অবশ্য বলতে পারেননি।

এই স্টেশনে যখন ফরিদ নামলেন, তখন তাঁর পেটে অনেক ক্ষুধা। কিন্তু খাবার পাবেন কোথায়? তাঁর পকেটে তো কোনো খাবার নেই। কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না।

তীব্র ক্ষুধায় কারও কাছে কিছু চাইতে পারছেন না। কারণ তাঁর এখানকার কোনো ভাষাই জানা নেই।

এভাবে কাটছে অসহায় সময়। এমন সময় তাঁর মনে হলো, আল্লাহ অনেক দয়ালু হয়ে একটি লোক তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরেকজন আরব। ফরিদ তাঁর ক্ষুধা ও অসহায়ত্বের কথা ইশারা ইঙ্গিতে এই লোকটিকে বললেন।

আরব লোকটি দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে একখানি ১০০ ইউরোর নোট দিলেন এবং বলে দিলেন জার্মানিগামী ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে থামবে।

তাঁর নির্দেশনামতো ফরিদ এবার জার্মানিগামী ট্রেনেই উঠলেন। এবারও বিনা টিকিটে। পকেটে সম্বল তো মাত্র ১০০ ইউরো। টিকিট কিনে সেটা শেষ করলে তারপর কী হবে?

ট্রেনে ওঠার পর ক্লান্ত ও শ্রান্ত শরীরে আবারও একই রকম ঘুম। যখন ঘুম ভাঙে তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন পুলিশের হাতে।

পুলিশ তাঁকে এবার আরেকটি স্টেশনে নামিয়ে দেয়। ফরিদের বক্তব্যমতে এটি ছিল জার্মানির ‘মুনশিয়ান বর্ডার’। গুগল ম্যাপে এ রকম বর্ডারের নাম খুঁজে পাওয়া গেল না।

ফরিদ অক্ষর চেনেন না, তাই বানানও বলতে পারেন না। তবে চেক রিপাবলিকের কাছে ভাল্ডমুশেন নামে একটি শহর গুগল ম্যাপে দেখা যায়।

ফরিদের বলা ‘মুনশিয়ান বর্ডার’ এই শহরটিও হতে পারে। স্টেশনে নামান পর পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।

সেখানে ফরিদের জন্য একটি অ্যাসাইলাম ফাইল খোলা হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে তাঁর দাখিলকৃত একটি আবেদন নথিতে তোলা হয়।

এক আফগানি ভদ্রলোককে তাঁর দোভাষী নিযুক্ত করা হয়।

শরনার্থী শিবিরে

এই ফাইলের সাপোর্টে ফরিদকে একটি উদ্বাস্তু শিবিরে তোলা হয়। ক্যাম্পের শহরটির নাম ফরিদ  বলছেন রেজবিন। কিন্তু যথারীতি এই নামের কোনো শহরও গুগলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জার্মানিতে।

হয়তো ফরিদ ভাই মানুষের মুখে শোনা নাম সঠিক উচ্চারণে রপ্ত করতে পারেননি, আর তাই-ই হয়তো মূল নামটি আমরা সঠিক বানানে লিখতে না পারায় গুগলও আমাদের সাহায্য করছে না।

এ ক্যাম্পে থাকাকালে তাঁর অ্যাসাইলামের আবেদন বিবেচনায় ফরিদের জন্য একজন আফগান দোভাষীও নিযুক্ত হয়। কিন্তু আবেদন নামঞ্জুরই থেকে যায়।

এরপর বাসে করে তাঁকে ও ক্যাম্পের আরও অনেককে আরও বড় উদ্বাস্তু শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফরিদ শহরটির নাম বলেছেন—কেমরুজ। এই নামে কোনো শহরও আমি গুগলে পাচ্ছি না।

তাঁর বর্ণনামতে শহরটি মোটামুটি বড় এবং সেখানকার উদ্বাস্তু শিবিরটিও বেশ বড়।

এখানেই তিনি প্রথম দেখলেন, উদ্বাস্তু শিবিরেও শরণার্থীদের জন্য সুন্দর ওয়াশরুমসহ সুন্দর খাট ও ভালো খাবার থাকতে পারে।

অবশ্য এই উন্নত শিবিরেও তাঁর এক সপ্তাহের বেশি থাকা হয় না। এক সপ্তাহ পরে তাঁকেসহ অনেককে এক বাসে করে নিয়ে আসা হলো পশ্চিম জার্মানির একসময়ের রাজধানী বন শহরে।

ইউরোপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশা শেষ, পরিচয়হীন জীবন

বছরের পর বছর নিজের ও পরিবারের সুখের দিনের স্বপ্ন বয়ে এমন বুকভাঙা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ফরিদ শেষ পর্যন্ত নিজেকে সব আশা ও স্বপ্ন থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলেন।

জীবনের অসহনীয় বেদনা ও বঞ্চনার ঘটনাপুঞ্জ তাঁর সব স্বপ্ন ও আশা ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে সমাহিত করে দিল যেন।

তিনি বুঝতে পারলেন, দুনিয়ায় সব মানুষের জন্য আল্লাহ স্বপ্ন রাখেননি। এবার তাই সব স্বপ্ন ও আশা তিনি ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে শুধু মসজিদমুখো হলেন।

ক্যাম্প থেকে আর পালানোর কোনো চেষ্টায় তিনি নামলেন না। এখন ক্যাম্প থেকে পাওয়া মাসিক ৩৫০ ইউরো দিয়ে নিজের পেট চালান আর মসজিদে গিয়ে আল্লাহকে ডাকেন। আর আল্লাহর কাছে মাফ চান বান্দা হয়ে এমন সুখের দিনের স্বপ্ন দেখার গোস্তাখির জন্য।

২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এভাবে জীবন কাটিয়ে তাঁর মনে হলো ইসলামি জীবন যাপনের বন শহরের চেয়ে প্যারিস হয়তো আরেকটু ভালো হবে।

অনেকে বলল, প্যারিসে অ্যাসাইলামের দরখাস্ত করলে আবেদন মঞ্জুরের সম্ভাবনাও নাকি বেশি।

শেষ ঠাঁই প্যারিসে, পাসপোর্ট নেই, পরিচয় নেই

২০১৮ সালে ফরিদ চলে এলেন প্যারিসে। এখানেও আবার অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন দাখিল করেন। কিন্তু যথারীতি তাঁর আবেদন এখানেও নামঞ্জুর হয়। তবে মঞ্জুর-নামঞ্জুরের এই প্রক্রিয়ায় তাঁর ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রায় তিন বছর চলে যায়।

এ নিয়ে অবশ্য ফরিদের তেমন কোনো আফসোস নেই। তিনি আর অ্যাসাইলাম চানও না। নিজের একটি প্রতিষ্ঠিত জীবনও আর তিনি চান না; মা-বাবা-ভাই-বোনের সামান্য কিছু সুখের জন্য দুটি ডলার বা ইউরোর আয়ও তিনি আর চান না; এমনকি বিয়ে-শাদির মাধ্যমে একটি নারীর সান্নিধ্যে পুরুষের জেগে ওঠার অতি ন্যায্য সুখটুকুও তিনি আর চান না।

আজ ফরিদুল শুধু একটু কাগজ চান, যার বলে তিনি বলতে পারবেন, তাঁরও একটি দেশ আছে, একটি জন্মভূমি আছে এবং সেখানে ফেরার তাঁর অধিকার আছে।

ফরিদ এখন লা কুন্নভের একটু মেসে রান্নাবান্নার কাজ করেন। পাশে আনওয়ার–এ–তৈয়বা নামের একটি মসজিদ আছেন। সেখানে বেশিরভাগ সময় কাটান। আর প্রতি শুক্রবার মসজিদের সামনের ফুটপাতে অল্প কিছু টুপি–তসবিহ নিয়ে বিক্রি করতে বসেন।

তবে ফরিদের জাগতিক জীবনে প্রতিষ্ঠার সব আশা শেষ হয়ে গেলেও নিজের দেশে মরার আশা শেষ হয়নি।

জীবনের শেষবেলায় সেই আশাটুকু নিয়ে ফরিদ  গিয়েছিলেন প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসে। তিনি সেখানে প্রার্থনা করলেন, একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট; যেটি থাকলে তিনি বলতে পারেন তাঁর একটি দেশ আছে এবং সেখানে যাওয়ার তাঁর অধিকার আছে।

দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাঁর আবেদন রাখল, তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট রাখল। তারপর অনেক দিন ঘুরিয়ে তাঁকে বলল, তাঁর পুরোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা না দিতে পারলে তাঁরা তাঁকে কোনো নতুন পাসপোর্ট দিতে পারবে না।

কিন্তু ফরিদ কোথায় পাবেন তাঁর সেই পুরোনো পাসপোর্ট। সেটি তো তাঁকে ফেলে দিতে হয়েছে দুবাই থেকে তাঁর যাত্রা শুরুর সঙ্গেই। ওটি হাতে রেখে তো অ্যাসাইলামের আবেদনই করা যায় না।

বাংলাদেশের মানুষ-বাবা-মা-দাদা-দাদি চৌদ্দ পুরুষ যাঁর বাংলাদেশি, সে আজ একটি কাগজের অভাবে বাংলাদেশি বলে নিজেকে দাবি করতে পারছে না।

হয়তো সমস্যাটি কাগজ না থাকার মধ্যে নয়। হয়তো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থিতার দ্বারা দেশের ওপর যে কালিমা লেপন হয়েছে, সেই কারণেই দেশ হয়তো তাঁকে অস্বীকারের পথে এগোচ্ছে।

কিন্তু দেশের এ-সংক্রান্ত কর্তাদের কি একবার ভেবে দেখা উচিত না যে, ফরিদুল আলমরা দেশের বিরুদ্ধে বলতে বা দেশের রাজনৈতিক অপচর্চা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানাতে এমন পদে পদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার পথে পা বাড়ান না?

ফরিদের শেষ ইচ্ছা

প্রতি পদে জীবনকে বাজি রেখে এবং দেশের সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা বলে বলে প্রাণান্তকরভাবে তাঁদের একটিই আকাঙ্ক্ষা, আর তা হলো ইউরোপের মাটি থেকে দুটো ডলার বা ইউরো উপার্জন করে দেশের আপনজনের কাছে পাঠানো আর সেই আপনজন তথা দেশবাসীর সামগ্রিক সুখের সূচকটি একটু এগিয়ে নেওয়া।

সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে অসমসাহস নিয়ে কেউ ওঠে ভূমধ্যসাগরের অবৈধ বোটে আর অহরহ সেই বোট ডুবে যায় আর তাঁদের মৃতদেহ হয়ে যায় ভূমধ্যসাগরের মাছ ও হাঙরের খাবার।

কেউ অর্থহীন-বস্ত্রহীন অবস্থায় ওঠে গ্রিসের উপকূলে। আর সেখানে বস্ত্রহীন তাঁদের শরীর কঠিন শীতে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। অনেকটা তাঁদেরই একজন ফরিদুল আলম।

বাংলাদেশে আবাল্যলালিত প্রিয় মুখগুলো থেকে এভাবে চিরতরে হারিয়ে না যেতে তাঁর করুণ আকুতি নিজ দেশের একটি পাসপোর্টের জন্য।

আমাদের প্যারিস দূতাবাস এবং আমাদের পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কি ফরিদুলের কষ্টের ভাগ নেবেন?  

কেউ কি একটু ভেবে দেখবেন নিজ দেশের একটু সুখের জন্য জীবন বিপন্নকারী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্যর্থ ও পরাজিত এই মানুষটিকে তাঁর নিজ দেশের আপন মানুষের কাছে এসে মরতে চাওয়ার সুযোগ করে দিতে কীভাবে একটি পাসপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়?

এমন মানুষ নিশ্চয়ই আছেন। সেই মানুষটির জন্য ফ্রান্সের একটি মোবাইল নম্বর (+ ৩৩৭৫৩৭১৮৩২৮) রাখলাম যা দিয়ে ফরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

ড. মুহম্মদ মুহসীন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক

ভাগ্যান্বেষণে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ 
ফরিদুল আলমের ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যেন ‘রীতিমতো নভেল’।
ভাগ্যান্বেষণে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ ফরিদুল আলমের ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যেন ‘রীতিমতো নভেল’। ছবি: জাকের হোসেন