Thursday, January 15, 2026

বিশ্বের কোথায় সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান অভিবাসন?

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ৩ জানুয়ারি অপহরণের ঘটনার পর দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিবেশী দেশগুলো। কলম্বিয়া ও পেরুসহ যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক ভেনেজুয়েলান বসবাস করছেন, তারা নতুন করে শরণার্থীর ঢল নামার সতর্কতা দিয়েছে।

আল জাজিরার এক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভেনেজুয়েলানের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৯ লাখ। প্রায় এক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।

কোন কোন দেশে সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলার নাগরিক?
ভেনেজুয়েলা থেকে অভিবাসনের সূচনা হয় ১৯৯৯ সালে বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর। সে সময় মূলত পেশাজীবীদের একটি ছোট অংশ দেশ ছাড়ে। শাভেজ দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেলখাতের আয় ব্যবহার করে সরকারি ব্যয় বাড়ান এবং কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে তুলে আনেন।
২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় এসে উচ্চ ঋণ ও বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির ভার বহন করেন। ২০১৪ সালে তেলের দাম ধসে পড়লে অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ে। গভীর মন্দা ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলেই লক্ষাধিক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, যাদের বড় অংশ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানায়, জুন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান শরণার্থী ও অভিবাসী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭ লাখ বা ৮৫ শতাংশ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে। সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান আশ্রয় নিয়েছে কলম্বিয়ায়- যার সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ।

কী ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা?
মানবিক সংকটের কারণে ইউএনএইচসিআর ভেনেজুয়েলানদের একটি বিশেষ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে তারা স্বাগতিক দেশগুলোতে আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়সহ মৌলিক সুবিধা পেতে পারেন।

কলম্বিয়ায় ‘টেম্পোরারি প্রোটেকশন স্ট্যাটিউট’-এর আওতায় ভেনেজুয়েলানদের ১০ বছরের আবাসিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলানদের জন্য দেয়া টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ছয় লাখের বেশি ভেনেজুয়েলানের বসবাস ও কাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে শত শত ভেনেজুয়েলানকে বহিষ্কার করা হয়, যাদের কয়েকজনকে এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সেখানে অনেকেই নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, দেশত্যাগী ভেনেজুয়েলানদের প্রায় অর্ধেক অনানুষ্ঠানিক ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত। ৪২ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ২৩ শতাংশ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট এখনও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২০২৬ সালের পাসপোর্ট সূচকে এটি ৪২তম অবস্থানে রয়েছে। এই পাসপোর্টধারীরা ১২৪টি দেশে ভিসামুক্ত, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসার সুবিধা পান।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভিসা অব্যাহতি চুক্তি রয়েছে। যার ফলে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়। পাশাপাশি আঞ্চলিক চলাচল চুক্তির কারণে দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে ভেনেজুয়েলানরা প্রবেশ ও কাজ করার সুযোগ পান।
(আল জাজিরা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

চীনকে লাতিন আমেরিকা থেকে দূরে থাকতে বলল যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে অনেক লক্ষ্য অর্জন করেছে। এমন একটি লক্ষ্য হলো চীনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—আমেরিকা থেকে দূরে থাকো।

দুই দশক ধরে লাতিন আমেরিকায় ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে চীন। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় কৌশলগত অবস্থান তৈরি করাও ছিল বেইজিংয়ের বড় লক্ষ্য। ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ, আর্জেন্টিনায় স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং স্টেশন, পেরুতে বন্দর—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরক্তি

লাতিন আমেরিকায় চীনের অগ্রগতি শুধু বর্তমান নয়, অতীতের একাধিক মার্কিন প্রশাসনের জন্যও বিরক্তির কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পেছনে চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণ ও জ্বালানি তেলের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীনের গড়ে ওঠা সম্পর্কের ‘ইতি টানতে’ এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় থাকা ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল এত দিন পর্যন্ত মূলত চীনে যাচ্ছিল। এখন তা যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হবে।

‘আমরা আপনাদের এখানে চাই না’

গত শুক্রবার তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তির কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমরা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু এ অঞ্চলে “প্রতিবেশী” হিসেবে তাদের চাই না।’

ট্রাম্প বলেন, ‘চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে পারে, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।’

অভিযানের প্রতীকী তাৎপর্য

৩ জানুয়ারি ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। অভিযানের শুরুর দিকে লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রায় সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়। এসবের অধিকাংশ চীন ও রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের মধ্য দিয়ে চীনের সামরিক প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব—দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক ক্রেইগ সিংলেটন বলেন, ‘চীনের বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ার ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যকার ফাঁক—এই অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

কূটনৈতিক প্রতিবাদ, কিন্তু সীমাবদ্ধতা

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘একতরফা ও বেআইনি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস। দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, অঞ্চলটির দেশগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে—চীন কূটনৈতিক আশ্বাস দিতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের রক্ষা করতে পারে না। সেই সক্ষমতা চীনের নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ভেনেজুয়েলার ঘটনায় চীনের সীমিত প্রতিক্রিয়া অঞ্চলটির অন্য দেশগুলোকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি চাপের মুখে পড়লে বেইজিং কতটা পাশে দাঁড়াতে পারবে, সে প্রশ্ন নিয়ে এখন অঞ্চলজুড়ে আলোচনা হচ্ছে।

বৃহত্তর কৌশলের ইঙ্গিত

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা অভিযান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সীমানা’ নতুন করে নির্ধারণের প্রচেষ্টা। তবে একই সঙ্গে এ আশঙ্কাও রয়েছে—অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় জড়িয়ে যায়, তাহলে সেখানে চীন আবারও সুযোগ নিতে পারে।

কূটনীতিক ও গবেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘প্রভাব বলয়’ভিত্তিক চিন্তাকে আরও জোরালো করতে পারে। এতে ওয়াশিংটন যেমন লাতিন আমেরিকায় কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চাইবে, তেমনি বেইজিংও এশিয়ায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার যুক্তি খুঁজতে চেষ্টা করবে।

আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে প্রথমবারের তোলা হচ্ছে
আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে প্রথমবারের তোলা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

পূর্ণাঙ্গ রায়: হাসিনা–মাকসুদ কথোপকথনের ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন by ডেভিড বার্গম্যান

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগে শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথম আলোয় আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম।

সেই নিবন্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের মধ্যে হওয়া একটি আড়ি পাতা কথোপকথন নিয়ে আলোচনা করা হয়।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আদালতে যে রায়ের অংশবিশেষ পড়ে শোনানো হয়, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ট্রাইব্যুনাল ওই কথোপকথনকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মনে করেছেন, ওই দিনই শেখ হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে এই অডিও রেকর্ডিংটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই অভিযোগেই তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগটি ১৪ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।

এই সময়পর্বে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে এই কথোপকথনই একমাত্র সরাসরি প্রমাণ।

আগের লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ১৪ জুলাইয়ের ওই কথোপকথন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তবে লেখার শেষে আমি এটাও বলেছিলাম—‘পরিপূর্ণ রায় পাওয়ার পর বোঝা সম্ভব হবে সেখানে ১৪ জুলাইয়ের ফোনালাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যে ভাষ্য এখন পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত আইনি যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না।’

এখন চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়েছে, ফলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যে মোট দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই একটি অডিও কথোপকথনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

এমনকি যদি প্রথম অভিযোগটি বাতিলও হয়ে যায়, তাহলেও দুটি অভিযোগে থাকে যাতে তিনি যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

এই দুই অভিযোগের প্রমানের জন্য হাসিনা ও মাকসুদ কামালের মধ্যকার ফোনালাপের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।

তবু এই অডিও রেকর্ডিংটি ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ব্যাবহার করেছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিচারকেরা তাঁদের সামনে পেশ করা প্রমাণগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা ও মানসিকতা কতটা রাখেন, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

একই সঙ্গে প্রমাণ যদি শেখ হাসিনার (বা অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতার) পক্ষে যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারকেরা কি আদৌ তাঁদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত আছেন কি না, সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

অন্যভাবে বললে, বিষয়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, এই ট্রাইব্যুনাল সত্যিই কি একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছেন, নাকি এটি মূলত রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও জনমতের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি “সিলমোহর মারা” প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে; ঠিক যেমনটি ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আগের ট্রাইব্যুনালগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যেত।

মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথন: অভিযোগসমূহ

মাকসুদ ও শেখ হাসিনার মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি তিনটি অভিযোগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি অভিযোগে বিষয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

কথোপকথনের একটি অংশ উদ্ধৃত করার পর প্রথম অভিযোগে (রায়ের ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায়) বলা হয়—‘এভাবে শেখ হাসিনা ওই কথোপকথনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন যে তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

এরপর ওই অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি আলাদা কাউন্ট বা অপরাধ উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে দুটি অপরাধ পুরোপুরি এই কথোপকথনের এমন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।

একটি অপরাধ হলো—‘আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া’; অন্যটি হলো-‘তাঁর নির্দেশ অনুসারেই আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে’।

দ্বিতীয় অভিযোগেও আড়ি পাতা ওই কথোপকথনের একই অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে লক্ষণীয় হলো, কথোপকথনটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-‘এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল) এবং একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে এ ধরনের আন্দোলনের সময় যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনভাবেই তাঁদের হত্যা করার নির্দেশও দিয়েছেন।’

আর তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-এই কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘উল্লেখ করেছেন, তিনি আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল)।’

এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তৃতীয় অভিযোগে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি।

ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত

তাহলে এই কথোপকথন নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত কী ছিল?
৪৫০ পৃষ্ঠার রায়ের পুরো নথিতে ট্রাইব্যুনাল এই রেকর্ডিংটির অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে আলাদা কোনো বিশ্লেষণ দেননি। বরং দুটি জায়গায় ট্রাইব্যুনাল সরাসরি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন।

রায়ের ৩৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেভাবে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হচ্ছে, সেভাবেই তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাস্তবে এটি দ্বিতীয় অভিযোগে ব্যবহৃত ভাষারই প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি। আর রায়ের ৪৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় ওই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে—‘এটি একেবারেই স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের ‘আসল’ অর্থ

কিন্তু এই রেকর্ডিংগুলো কি সত্যিই এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে?
ট্রাইব্যুনাল মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের দুটি আলাদা অংশ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

কিন্তু রায়ে এই কথোপকথন নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ না থাকায়, কোন অংশটিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন, সেটি স্পষ্ট নয়।

দুটি অংশ মিলিয়েই ট্রাইব্যুনাল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কি না, তা-ও এখানে পরিষ্কার নয়।

এ কারণে এখন আমরা কথোপকথনের প্রতিটি অংশ আলাদা করে পর্যালোচনা করব।
কথোপকথনের প্রথম অংশে শেখ হাসিনার জবানিতে বলা হয়েছে, ‘রাজাকার তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি।’

তবে শেষের অংশের বাক্যটি-‘আমি বলে দিছি’-বিভিন্ন অর্থ বহন করে এবং একাধিকভাবে এর অনুবাদ করা সম্ভব। এটি হতে পারে-‘আমি তাদেরকে বলেছি’; ‘আমি আগেই বলেছি’ বা ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি।’

এই বাক্যটি ব্যবহার করে হাসিনা ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে; এটি চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টও হয়ে ওঠে। অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময় এবং ট্রাইব্যুনালের নিজেদের সিদ্ধান্তে (যেমন ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে) এই বাক্যটি ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।

আবার রায়ে কথোপকথনের পূর্ণ অনূদিত ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপিতে সেই একই বাক্যটিকে ‘আমি তোমাকে বলেছি’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রায় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কেন এক প্রসঙ্গে এক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্য প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থে নেওয়া হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের সরাসরি প্রসঙ্গ, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি ভালোভাবে দেখতেন বা বিবেচনা করতেন, তাহলে তাঁর পক্ষে এটি যৌক্তিকভাবে বা যুক্তিসংগতভাবে বলা কঠিন হতো যে ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ বাক্যটি দিয়ে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ দিয়েছেন।

প্রথমত, কথোপকথনের মধ্যে আসা ‘নির্দেশ’ শব্দটি মূলত রাজাকারদের ফাঁসির উদাহরণ প্রসঙ্গে এসেছে।

এখানে হাসিনা যা বলছিলেন, সেটি ছিল অতীতের ঘটনা-যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতার কথা তিনি উল্লেখ করছিলেন, তাঁদের আটক, গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ, এটি কোনো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি যাতে মনে হয়, হাসিনা আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার, বিচার করার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন কিংবা সরকারের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, যদি ধরেও নেওয়া হয়, ট্রাইব্যুনাল বিশ্বাস করেছিলেন যে, হাসিনা রূপকভাবে কথাটি বলছিলেন এবং তাঁর ‘রাজাকারদের ফাঁসি’ উল্লেখ করা মানে ছিল ছাত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া (যেমনটা বিচারকেরা মনে করছেন)।

তারপরও এমন ব্যাখ্যার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, কথোপকথনের বাস্তব অর্থ বা তার প্রভাব দেখার মতো এমন কোনো তথ্য বা নথি নেই, যা বলে হাসিনা আসলেই আন্দোলনকারীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।

যদি সত্যিই এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তা কার কাছে পৌঁছেছিল? রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ১৪ জুলাইয়ের কথোপকথনের আগে বা ঠিক এই কথোপকথনের পরই কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবে অন্তত পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) তা জানানো হতো; কিন্তু আইজিপির স্বীকারোক্তি বা ট্রাইব্যুনালের সামনে তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তৃতীয়ত, ১৪ জুলাই হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছেন-এই ধারণা রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা প্রমাণের সঙ্গে মিলছে না এবং তা হয়তো কিছুটা বিরোধপূর্ণও। কারণ, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের প্রমান গ্রহন করেছেন যে, ১৮ জুলাই হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৮ জুলাইয়ের এই আদেশের প্রমাণ একটি স্পষ্ট আড়ি পাতা কথোপকথন এবং আইজিপির সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। তাহলে কি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের দাবি অনুযায়ী হাসিনা একই আদেশ দুবার দিয়েছেন?

চতুর্থত, পরের দিনগুলোয় যা ঘটেছে, তা দেখায়, ১৪ জুলাই ‘হত্যার আদেশ’ দেওয়া হয়েছিল-এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

কারণ যদি ১৪ জুলাই আসলেই এমন আদেশ দেওয়া হতো, তাহলে তার পরের দিন ১৫ জুলাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো না কোনো হত্যার ঘটনা প্রত্যাশিত হতো। কিন্তু ১৫ জুলাই কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৬ জুলাই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

এর মধ্যে একটি ঘটেছে রংপুরে, দুটি ঘটেছে ঢাকায় এবং তিনটি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত হত্যার নীতি নয়, বরং বিক্ষিপ্ত গুলির ঘটনা হিসেবে বোঝানো অনেক বেশি যৌক্তিক।

দ্বিতীয় অংশ

তবে সম্ভবত ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের দ্বিতীয় অংশটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে।

দ্বিতীয় অংশটি হলো: ‘সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে...আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পর অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেয়ার নেবে...কারণ ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামল, কতগুলি মেরে ফেলায় দিল না?’
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এই কথাগুলোকে অনুবাদ করেছেন এভাবে: (“They all have to be ousted. I already ordered to arrest them after waiting this day to take appropriate action as same as that that of England where protesting students were killed. ”) ‘তাদের সবাইকে অপসারণ করতে হবে। আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি ইতিমধ্যেই তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি এবং ইংল্যান্ডে যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’

এই অনুবাদের মাধ্যমে এমন একটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে তিনি শুধু শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশই দেননি, বরং ইংল্যান্ডে যা ঘটেছিল, (যেখানে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল বলে বলা হয়ে থাকে), সেই রকম ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন।

এ কথাগুলোর অর্থ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে অনুবাদ করেছে তাতে ভাষার পরিপূর্ণ চিত্র আসেনি। আর এই বক্তব্য থেকে প্রমান মেলে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন-এমন ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এভাবেই দেখেছেন কথোপকথনের এই অংশকে।

এই বাক্যের একটি অংশ অবশ্যই স্পষ্ট। হাসিনা যখন বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি’, তখন তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশের কথাই বলছেন। এবং বাস্তবে সেটিই কয়েকদিনের মধ্যে ঘটেছিল। তিনি এ কথা বলছিলেন সরাসরি সেই ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখেন।

তবে এই বাক্যে হাসিনা যা কিছুই বলেছেন, তার মধ্যে “...আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে” কথগুলো আছে।
যেখানে ‘যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে’ বলতে হত্যার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; কিন্তু তারপরও এটি মোটেও পরিষ্কার করে না, তিনি ১৪ জুলাই বা ঠিক তার পরপরই এ ধরনের নির্দিষ্ট ‘হত্যার আদেশ’ দিয়েছিলেন।

এর পাশাপাশি কথোপকথনের প্রথম অংশের প্রসঙ্গে ওপরে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এ ধরনের কোনো আদেশ আদৌ দেওয়া হয়েছিল, এমন দাবি না কথোপকথনের পটভূমি সমর্থন করে, না এটি রাষ্ট্রপক্ষের নিজস্ব প্রমাণ।

কথোপকথনের এই অংশে হাসিনা যা বলছেন, সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে হত্যা করার আদেশ হিসেবে না দেখে বরং তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত হবে। অর্থাৎ, তিনি তখন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন-সে বিষয়ে ভাবছিলেন এবং সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিলেন।

এই চিন্তাভাবনার ধারাই শেষ পর্যন্ত ১৮ জুলাইয়ের একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে গিয়ে শেষ হয়-যেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমোদন দেন।
এই ১৮ জুলাইয়ের আদেশটি নিয়ে পর্যাপ্ত ও শক্ত প্রমাণ রয়েছে (আড়ি পাতা কথোপকথন, সাক্ষ্য ইত্যাদি)।

উপসংহার

রায়ে হাসিনা-মাকসুদ কথোপকথন নিয়ে কোনো বিশদ আলোচনা নেই। ফলে ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল কিংবা উল্লিখিত বিষয়গুলো তাঁরা আদৌ বিবেচনা করেছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই।

সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যকে পুরোপুরি ও প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করেছেন।

যেহেতু কথোপকথনটি প্রথম অভিযোগের জন্য মূল ও কেন্দ্রীয় প্রমাণ এবং যেহেতু এর ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল যে অর্থে নিয়েছে তার থেকে ভিন্ন ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিচারকদের সিদ্ধান্তের যুক্তি ব্যাখ্যা না করাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক।
- ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david. bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত।
- মতামত লেখকের নিজস্ব।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-12%2F84co3idi%2FICT.jpg?rect=148%2C0%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করলো উত্তর কোরিয়া

নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির ওয়ার্কাস পার্টির ৮০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানে ওই ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করা হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির নেতা কিম জং উন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা ১১ অক্টোবর ২০২৫, শনিবার। এতে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে অত্যাধুনিক কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে দূর পাল্লার ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন পরিচালনার মতো যানবাহন অন্যতম। তবে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় হোয়াসং-২০ আইসিবিএমকে। যা সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক কৌশলগত অস্ত্র ব্যবস্থা।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর ইঞ্জিন কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি। এটি এর পূর্বে তৈরি রকেট ইঞ্জিনগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, হোয়াসং-২০ একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করার জন্য ডিজাইন করা। শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেদ করার জন্য কিম তার সামরিক বাহিনীকে এমন সক্ষমতা বিকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। কিম এক বক্তৃতায় কোরিয়াকে সমাজতান্ত্রিক শক্তির বিশ্বস্ত সদস্য বলে অভিহিত করেন। বলেন, আজ আমরা একটি মহান জাতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি। যাদের সামনে কোনো বাধা নেই। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও ভ্লাদিমির পুিতনের ঘনিষ্ট মিত্র দিমিত্রি পেসকভ।

mzamin