Sunday, July 1, 2018

৩ সন্তান নিয়ে জীবনযুদ্ধে সাইফুলের স্ত্রী by রুদ্র মিজান

জন্মের পর বাবার মুখ দেখা হয়নি। অবাক দৃষ্টিতে দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে ২১ মাসের ছেলে শিশু হাসান। ছবির দিকে চেয়ে ‘আব্বু. আব্বু’ বলে ডাকে। ছবির মানুষটির কোনো সাড়া-শব্দ নেই। পুত্রের ডাকে সাড়া দেয়ার ক্ষমতা নেই ছবির এই মানুষটির। এই দৃশ্য দেখে আড়ালে চোখের জল ফেলেন সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া।
শিশুটি জন্মের তিন মাস আগেই তার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হয়েছেন। আলোচিত হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার ঘটনায় মারা যান তিনি। সাইফুল ছিলেন হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের পাচক।
সাইফুলের তিন সন্তান। তার মৃত্যুর তিন মাস পরে জন্ম হয় একমাত্র ছেলে হাসানের। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া জানান, বড় মেয়ে সামিয়া পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে ইমলি। সাইফুল বাড়ির বাইরে থাকলে প্রতিদিন অন্তত একবার ইমলির সঙ্গে কথা বলতেন। স্ত্রীর সঙ্গে কথা না হলেও মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে ভুল হতো না তার। হলি আর্টিজানে কাজ নেয়ার পর ব্যস্ততার মধ্যেও ফোনে কথা বলতেন। শিশু সন্তানের সঙ্গে নানা গল্প করতেন। ফোনের রিংটোন বেজে উঠলে এখনো দৌড়ে কাছে যায় ইমলি। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। হয়তো তখনই মনে পড়ে যায় তার বাবা সাইফুল আর নেই। কখনো কখনো অভিমান করে। কারও সঙ্গে কথা বলে না ছোট্ট মেয়েটি। মায়ের কাছে জানতে চায়, সবার আব্বু ছুটিতে বাড়ি আসে, আমার আব্বু আসে না কেন? আর কখনো আসবে না।
সোনিয়া বলেন, সন্তানদের কথা শুনে চুপ করে থাকি। জবাব দিতে পারি না। কান্না পেলে সন্তানদের চোখের আড়ালে গিয়ে কাঁদি। একইভাবে সাইফুলের স্মৃতিচারণ করে কান্নাকাটি করেন তার মা সমেরা বেগম।
সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সাইফুল। সোনিয়া বলেন, সাইফুল মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করছেন। তার মৃত্যুর পর এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতি মাসে সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়ার বিকাশ নম্বরে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দিচ্ছেন তারা। সোনিয়ার রয়েছে একটি সেলাই মেশিন। সেলাই মেশিনে কাজ করে অর্থ উপার্জন করেন তিনি। এভাবেই চলছে নিহত সাইফুলের সংসার।
দুই বছর আগে ১লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীদের সঙ্গে লাশ মেলায় সাইফুল জঙ্গি কিনা এমন প্রশ্ন দেখা দেয়। হলি আর্টিজানে হামলাকারী হিসেবে পাঁচজনের লাশের ছবি সাংবাদিকদের পাঠায় পুলিশ। তার আগেই জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের বরাতে পাঁচ হামলাকারীর ছবি আসে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের মাধ্যমে। পুলিশের পাঠানো ছবিগুলোর মধ্যে চারটির সঙ্গে আইএসের দেয়া চারজনের ছবির মিল পাওয়া গেলেও মিলছিল না পাঁচকের পোশাক পরা একজনের চেহারায়। পরে সাদা অ্যাপ্রণ পরা ওই ব্যক্তিকে হলি আর্টিজানে পাচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার বলে শনাক্ত করেন তার স্বজনরা। পাচক বা শেফ হিসেবে সাইফুল ১০ বছর ছিলেন জার্মানিতে। সেখান থেকে ফিরে কাজ নেন হলি আর্টিজানে। টেলিভিশনে হলি আর্টিজানে হামলার খবর দেখে বারবার সাইফুলের ফোনে কল দিচ্ছিলেন স্বজনরা। এর মধ্যেই নিহতদের ছবি প্রকাশ করে টেলিভিশন। শুরু হয় আহাজারি। ঢাকায় এসে সাইফুলের লাশ শনাক্ত করেন। এমনকি লাশ শনাক্তের জন্য সাইফুলের মা সমেরা বেগমকে ডিএনএ টেস্টের জন্য ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাইফুল জঙ্গি কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহত সাইফুল ইসলাম চৌকিদার শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের ছেলে।

সেই ভবন এখন যেমন by মারুফ কিবরিয়া

জঙ্গি হামলার এক বছর পর গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডস্থ আর্টিজান বেকারির সেই ভবনটি বুঝে পান মালিক সাদাত মেহেদী। বেকারির ভবনটি বাস উপযোগী করে তুললেও বেশিরভাগ সময় তালা থাকে সেখানে। বাইরের কেউ আসা-যাওয়াও তেমন করেন না। বাড়ির প্রধান ফটকও নিরাপত্তারক্ষী কঠোর পাহারা দিয়ে রাখেন। হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে আজও গত বছরের মতো চার ঘণ্টার জন্য খোলা থাকবে স্থাপনাটি। এ সময়ে হামলায় নিহতদের পরিবার ও স্বজন এবং সর্বসাধরণ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন।
হামলার পর প্রায় এক বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বাড়িটি। এরপর মালিক সাদাত মেহেদীকে হস্তান্তর করা হয়। গত বছর থেকে বাড়িটিতে পরিবার নিয়ে বসববাসের জন্য উপযুক্ত করেন তিনি। তবে খুব একটা থাকেন না তারা। স্ত্রী সন্তান নিয়ে বনানীর একটি ফ্ল্যাটে বাস করেন মেহেদী সাদাত। সরজমিনে দেখা যায়, হলি আর্টিজানের ওই বাড়িটি নিরাপত্তা কর্মীরা পাহার দিয়ে রেখেছেন। কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। লেকের পূর্ব পাশ দিয়ে লেক পাড়ে হাঁটার ব্যবস্থা থাকলেও হামলার পর থেকে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, জঙ্গি হামলার পর বাড়ির দেয়ালের বাইরের অংশে সাদা রঙ করা হলেও দরজা-জানালায় নতুন করে আর রঙ করা হয়নি। আর যেসব স্থানে ভাঙা হয়েছিল বা নষ্ট হয়েছিল সেগুলো মেরামত করা হয়েছে।
এছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। নিরাপত্তাকর্মী মো. হোসেন বলেন, এটা এখন নিজে থাকার জন্য মালিক ঠিকঠাক করেছেন। তিনি পরিবার নিয়ে প্রায়ই আসা যাওয়া করেন। বাইরে থেকে তালা ঝোলানো প্রসঙ্গে এই নিরাপত্তাকর্মী বলেন. ভেতরে কুকুর আছে। খোলা রাখলেই বেরিয়ে আসে আর ঝামেলা হয়। তখন মেইন গেট সামলানো আর কুকুর সামলানো দুইটা নিয়ে বেকায়দায় পড়ি।
এজন্যই তালা ঝোলানো থাকে। বাড়িটিতে কে কে থাকেন এমন প্রশ্নের উত্তরে হোসেন বলেন, মালিক তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকেন। জানা গেছে, সাদাতের স্ত্রী সামিরা উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ির মালিক। ১৯৭৯ সালে ‘আবাসিক ভবন কাম ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য’ ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল বাড়িটি। ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার মেয়ে সামিরা ও সারা আহম্মদ। সামিরার স্বামী সাদাত মেহেদী তার বন্ধু নাসিমুল আলম পরাগসহ কয়েকজন মিলে ২০১৪ সালের জুনে গড়ে তোলেন হলি আর্টিজান বেকারি। জঙ্গি হামলার ছয় মাস পর গত বছরের ১০ই জানুয়ারি থেকে গুলশান এভিনিউর ?র‌্যাংগস আর্কেডের দ্বিতীয় তলায় স্বল্প পরিসরে হলি আর্টিজান বেকারিটি নতুন করে চালু হয়। সুপারশপ গোর্মেট বাজারের এক পাশে ৫০০ বর্গফুটের নতুন জায়গায় শুধু বেকারি পণ্য করছে হলি আর্টিজান। সেখানে একসঙ্গে ২০ জন অতিথি বসতে পারছেন। এদিকে গুলশানে আগের হলি আর্টিজানের ভবনটির পাশে আরেকটি অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, তারা এখনো ভয়ের মাঝে থাকেন। সেই ভয়াল মুহূর্তের কথা মনে পড়লে শিউরে ওঠে শরীর। শফিক নামের এক পুরনো নিরাপত্তাকর্মী বলেন. ওইদিন এখানেই ছিলাম। সারারাত যে কী ভয়ের মধ্যে ছিলাম! এখন মনে পড়লে শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে।
এদিকে জঙ্গি হামলার দুই বছর উপলক্ষে সেখানে নিহতদের স্মরণে চার ঘণ্টার জন্য খোলা রাখা হবে হলি আর্টিজানের সেই ভবনটি। রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নিহতদের স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, বিভিন্ন দূতাবাস, ব্যক্তি, সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাদাত মেহেদী। গত বছরও প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে কয়েক ঘণ্টা খোলা রাখা হয়েছিল স্থাপনাটি।

রবিউলরা বেঁচে থাকে সাধারণের মাঝে

হলি আর্টিজানের হামলার ঠিক সাতদিন আগে রবিউলের সঙ্গে শেষ দেখা হয় স্ত্রী উম্মে সালমার। শেষ কথা হয় আগের দিন ৩০শে জুন সকাল ৯টায়। সে সময় প্রেগন্যান্সির লাস্ট ডেট হওয়ায় শরীরের কী অবস্থা জানতে চান গুলশান হামলায় নিহত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম। তার অনুপস্থিতি সর্বক্ষণই টের পাচ্ছে তার পরিবার। সালমা বলেন, শেষবারের কথায় ও জানতে চেয়েছিলো ঈদ কোথায় করবো। কালামপুরে বাবার বাড়ি, না মানিকগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি।
তখন আমি ওকে বললাম তুমি কি বলো। শুনে সে হাসছিল। এমনিতে ফোনে ও আমার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতো না।
কিন্তু ওইদিন ও ফোনটা রিসিভ করে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল। তখন আমার মনে হলো ও কিছু বলতে চায়। আমি বললাম তুমি কি কিছু বলবা। তখন ও তেমন কিছুই বললো না। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আমার শরীর ভালো না থাকায় শুয়ে ছিলাম। রাতে আম্মা আব্বাকে বললো ওর শরীরটা মনে হয় ভালো না। ওকে আবার ডাকতে যেওনা। তখন রাত সাড়ে ৯টার দিকে আব্বার ফোনে একটা ফোন আসে। পরপর কয়েকটা ফোন আসলে আব্বা ফোন নিয়ে বাসার বাইরে চলে যান। কথা শেষে বাসায় এসে কম সাউন্ড দিয়ে টিভি অন করেন। এর ঠিক ১৫ মিনিট পর আর একটি ফোন আসলে আব্বা আম্মাকে বলে আমি ঢাকায় যাচ্ছি তুমি বাসার গেট বন্ধ করে দাও। আব্বার কথা শুনে আমি উঠে টেলিভিশনের সামনে যাই। স্ক্রলে লেখা ওঠে গুলশানে হলি আর্টিজানে গোলাগুলিতে দুই পুলিশ সদস্য আহত।
তখন আমার হঠাৎ কেমন জানি লাগলো। এরপর ওর অফিসিয়াল একটা ফোন নাম্বারে আমি ফোন দেই। এক পুলিশ সদস্য ফোনটা রিসিভ করে জানতে চাইলে আমার পরিচয় দেই। তখন সে বলে ভাবি আমরা ইউনাইটেড হাসপাতালে আছি। রবিউল কেমন আছে জানতে চাইলে সে বলে জানি না ভাবি। আল্লাহ আল্লাহ করেন। তখনই আমার সন্দেহ হলো কিছু একটা হয়েছে। এরপর বুঝলাম যে রবিউলের সিরিয়াস অবস্থা। আমার ডাক্তার বড় ভাই ঠিক ঘণ্টাখানেক পরে আম্মাকে ফোন দিয়ে জানালো যে, সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে কামরুন্নাহার রায়নার জন্মের মাসখানেক আগেই রবিউল আমাদের ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু আমার মেয়ে রায়নার অভিব্যক্তি দেখলে মনে হয় সে বাবাকে কত না জানি দেখেছে। ৬ মাস বয়সে রায়না প্রথম বাবা বলে ডাকে। এরপর বাবার ছবিকেই সব সময় আব্বু আব্বু বলে ডাকে। সে ভাবে ওই ছবিই তার বাবা। ছবিতে হাত দিয়ে ইশারা করে, আদর করে, চুমু খায়।
বড় ছেলে সাজিদের বর্তমান বয়স ৭ বছর। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সাজিদ সবসময় বাবাকে মিস করে। ওর সকল আবদার, অভাব, অভিযোগ সবকিছু বাবার কাছেই করতো। মা হিসেবে আমি ওকে প্রায় সময়ই শাসন করতাম। বকা দিতাম। তাই সে বাবার প্রতি আহলাদি ছিল। রবিউল ছেলেকে কখনোই কিছু বলতো না। ছেলে যা বলতো বাবা হিসেবে যখন যে অবস্থায় থাকতো তখন সেটা ম্যানেজ করে দিতো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমা বলেন, আমার ছেলেটা একদম বাবার ক্যারেক্টার পেয়েছে। শত কষ্ট পেলেও মুখ ফুটে বলতে পারে না। যখন ও খুব কষ্ট পায় তখন বাবার মতোই চোখ দুটো লাল হয়ে যায়। আর নীরবে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। ও ইদানীং বাবাকে খুব মিস করে যখন ওর স্কুলের অন্য বন্ধুদের বাবা স্কুলে যায়। তখন ও বড় করে নিশ্বাস ফেলে। এলাকায় মেলার সময় আমি ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেও বাবার অভাব বোধটা ওর মাঝে থেকেই যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা। আগে ওর আব্বু রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত না বাসায় আসতো ততোক্ষণ জেগে থাকতো। বাসায় আসলে বাবার সঙ্গে দুষ্টুমি করে এরপর ঘুমাতো। এখনো রাতের বেলায় আড্ডা দেয়ার সময় সাজিদ বলে., আম্মু এখন যদি আব্বু থাকতো তাহলে কতই না মজা হতো। আমরা চারজন মিলে অনেক দুষ্টুমি ও মজা করতাম। গত শুক্রবার রাতে ও হঠাৎ আমাকে বলে, আম্মু আব্বু যে আমাকে একটা ফোন দিয়েছিল সেই ফোনটা কোথায়। আমি বললাম কেন? তুমি ফোন দিয়ে কি করবে। সাজিদ জানায়, সে আব্বুকে ফোন করে কথা বলবে।
পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটি চলে যাওয়ার পর সরকার ও পুলিশ বাহিনী থেকে সহানুভূতি পেয়ে কৃতজ্ঞ স্ত্রী উম্মে সালমা। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিন অফিসার হিসেবে শিক্ষা শাখায় চাকরি হওয়াতে অনেক ব্যস্ত সময় পার করছি। এই চাকরিটাই এখন আমার ফ্যামিলি হয়ে গেছে। কাজের সুবাদে নতুন নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া তাদের ভর্তি করার মাঝে এক ধরনের সুখ খুঁজে পাই। সালমা বলেন, ওর শূন্যতা কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়। ‘যার হারায়, একমাত্র সেই বোঝে’। ওর স্মৃতিগুলো আমি দিন, মাস বা বছর হিসেবে নয় ঘণ্টা হিসেবে হিসাব করি। ওর সঙ্গে আমার স্মৃতি ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং এক জনমে কেন হাজার জনমেও শেষ হবে না। ওর স্মৃতিকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই। আজ (১লা জুলাই) রবিউলের স্মরণে মানিকগঞ্জের একটি স্কুলে অনুষ্ঠান রয়েছে। রবিউলের জন্মস্থান মানিকগঞ্জের কাটিগ্রাম বাজার সংলগ্ন একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে রবিউলের নামে। রাস্তার উদ্বোধন, র‌্যালি, শোকসভা, মিলাদ অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) এস.এম মোস্তাক আহমেদ খান বলেন, ওয়াকিটকিতে পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ রবিউল করিম। আমরা বেশ কয়েকজন জিম্মিকে উদ্ধার করতে পেরেছিলাম। নতুন আর একজন জিম্মিকে উদ্ধার করে আমরা যখন আবার আগের জায়গায় ফিরে আসি, তখনই সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন রবিউল ও সালাহ্‌?উদ্দিন। রবিউল তার গ্রামে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি স্কুল খুলেছিলেন। নিজ বেতনের টাকা দিয়েই তিনি চালাতেন তার সেই স্কুল। চাকরির মাত্র দুই বছরের মাথায় এ রকম একটি স্কুল পরিচালনা মানবসেবায় সত্যি তার ত্যাগ আর উদারতার এক অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ!

অস্ট্রেলিয়ায় যৌন নির্যাতিত শিশুরা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের শিকারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে অস্টেলিয়া। এর আওতায় প্রায় ৬০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বৈধতা পাচ্ছেন। এ বিষয়ে রোববার থেকে সেখানে একটি স্কিম চালু হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ন্যাশনাল রিড্রেস স্কিম। এ স্কিমে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ৩০০ কোটি ডলার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
এতে আরো বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে এ অর্থ দিয়ে নির্যাতিতদের বেদনা কিছুটা হলেও লাঘব করা যাবে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কয়েক দশক ধরে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আছে। এ নিয়ে রয়েল কমিশন আর্থিক এই ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছে। কমিশন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল, দাতব্য সংস্থা, স্পোর্টস ক্লাব ও সামরিক বাহিনীতে যৌন নির্যাতন ও নির্যাতিতদের দুর্ভোগের বিষয়ে ৫ বছর ধরে অনুসন্ধান করে। তারপর তারা সুপারিশ পেশ করে। তার প্রায় সবটাই মেনে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। এ বিষয়ে সেদেশের সমাজসেবা বিষয়ক মন্ত্রী ড্যান তেহান এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিভিন্ন ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠান, যেখানে তাদের সুরক্ষিত থাকার কথা, সেখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদেরকে সমর্থন দিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ। এ স্কিমের সঙ্গে যোগ দিয়েছে অনেক রাজ্য সরকার ও ধর্মীয় গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাথলিক চার্চও। যৌন নির্যাতনের শিকার প্রতিজন ক্ষতিপূরণ হিসেবে সর্বোচ্চ এক লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার করে পাবেন। গড়ে এই ক্ষতিপূরণ দাঁড়াবে ৬৭ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এমন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ডগ গোলটার। তিনি মেলবোর্নে শিশুদের একটি হোমে অনেক বছর ধরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারপর ১৭ বছর বয়সে একই পরিস্থিতির শিকার হন সিডনির একটি জেলে। তিনি অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রচার মাধ্যম এবিসি’কে বলেছেন, ওই নির্যাতন তার সারাজীবনের ওপর একটি কালো ছায়া ফেলেছে। তিনি বলেন, যেসব মানুষকে আপনি খুব ভালবাসেন, তাদের বিষয়ে কোনো ভীতি নেই, বিষয়টি এমন যে, তাদের কাছেও আপনি এই নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন না। কারণ, তারা আপনার বেদনা বুঝতে চায় না। কিছু আইনজীবী বলেছেন, এই স্কিমটি নির্যাতিতদের জন্য শেষ ভরসা। নির্যাতিতরা যদি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে মামলা করতেন তাহলে তাদের আরো বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী। যেমন ডগ গোলটার এখন ভীষণ অসুস্থ। তার জন্য এতটা সময় ক্ষেপণ করা দুরূহ ব্যাপার। তিনি এবিসি’কে বলেছেন, আমার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। সরকারি আইনই আমার জন্য উত্তম উপায় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমার হাতে তো অনেক সময় নেই। আমার আয়ুষ্কাল এখন খুবই সীমিত। সেক্ষেত্রে এভাবে আইনী লড়াইয়ে যেতে হলে অনেক সময় প্রয়োজন হতো। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেছেন, ক্ষতি কিছুটা পূরণ করার জন্যই তাদের এই স্কিমের লক্ষ্য। আসলে আমাদেরকে তো সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

ফুটবল ভক্ত ছিলেন ফারাজ স্মৃতিকাতর পরিবার by মরিয়ম চম্পা

মা-ভাইয়ের সঙ্গে ফারাজ। ছবিটি এখন কেবলই স্মৃতি
ফুটবলের ভক্ত ছিলেন গুলশানের হলি আর্টিজান হামলায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেন। চলতি বছরেই আমেরিকার বিখ্যাত এমোরি ইউনিভার্সিটির বিজনেস কোর্স থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার কথা ছিল তার। ফারাজের বড় ভাই যারেফ হোসেন বলেন, আমার মা সিমিন হোসেনের কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে এ বছর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কাজে জয়েন করতেন আমাদের ‘ছটু’ (ফারাজ)। আম্মু একদমই ভালো নেই। ফারাজ চলে যাওয়ার পর আম্মু ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে তিনি ফারাজকে স্মরণ করেন।
তবে এতো কষ্টের মধ্যেও আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে এমোরি স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বছর তাদের গ্রাজুয়েশন কোর্সে নিজেদের গ্র্যাজুয়েট স্কলার হিসেবে ফারাজকে যুক্ত করেছে। প্রয়াত শিক্ষার্থীকে ভোলেনি যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানে। গ্র্যাজুয়েশনের সময় যে একটা বুকলেট তারা রিলিজ করে সেটাতেও তারা ফারাজের নাম যুক্ত করেছে। এছাড়া বিখ্যাত গস ভোটেড বিজনেস স্কুল এই বছর প্রথমবারের মতো একটি অ্যাওয়ার্ড ইনস্টিটিউট ঘোষণা করেছে। যার নাম দিয়েছে তারা “ফারাজ হোসেন কোর ভ্যালিউজ অ্যাওয়ার্ড”। ফারাজ যে সেক্রিফাইজ করেছে, হিউম্যানিটি দেখিয়েছে, তার স্মৃতি স্মরণ করতেই এই অ্যাওয়ার্ড। আর প্রথমবারের মতো পুরস্কারটি পেয়েছেন ভারতের গুরবানি সিং নামের এক শিক্ষার্থী। যিনি গস-এর টপ লিডিং ও এমোরি ইউনোভার্সিটির স্টুডেন্ট বডির প্রেসিডেন্ট।
ছোট ভাই ফারাজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যারেফ আরো বলেন, আমাদের দুই ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় নেই যেটা আম্মু জানতেন না। ফারাজ, আমি আর মা সিমিন ছিলাম ভালো বন্ধু। তার পরেও ওর সঙ্গে একটি স্মৃতিময় বিষয় আজ শেয়ার করতে চাই। ফারাজ বরাবরই ইংল্যান্ডের নাম করা ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলো। বছর কয়েক আগে ফারাজ, যারেফ ও তাদের মা সিমিন হোসেন একত্রে বিখ্যাত ওল্ড ট্রাফোর্ড স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যান। স্টেডিয়ামে খেলা দেখা শেষে ট্রেন স্টেশনে এসেই ফারাজ কান্না শুরু করে। কেন কান্না করছে জানতে চাইলে ফারাজ জানায়, এটা তার এতো প্রিয় একটি ক্লাব যে ওটা ছেড়ে চলে যেতে ওর খুব খারাপ লাগছে। ফারাজ ও যারেফ একই রুমে বেড শেয়ার করে থাকতেন। একদিন গভীর রাতে দুই ভাই একত্রে এফএ কাপ ফাইনাল খেলা দেখছিলেন। যেটা খুব বড় খেলা ছিল। ওই ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রথমে ১ গোলে হারতে যাচ্ছিল।
তখন ফারাজ খুব চিৎকার করে বলছিল ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’। পরবর্তীতে খেলাটা ড্র হয় এবং শেষ মুহূর্তে ম্যানচেস্টার ২-১ গোলে জিতে যায়। সে তখন উত্তেজিত হয়ে আবারো চিৎকার করে বলে, ভাইয়া আমি বলেছিলাম না, ইম্পসিবল বলে কিছু নেই’। ফারাজ সবসময় ইংল্যান্ডকে সাপোর্ট করতো। ফারাজের প্রিয় দল ইংল্যান্ড এ বছর ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবলে সেকেন্ড রাউন্ডে আছে। চলতি বছর মাস দুয়েক আগে যারেফ ও তার মা সিমিন ফারাজের স্মৃতি স্মরণ করতে ওল্ড ট্রাফোর্ড স্টেডিয়ামে গিয়েছিল খেলা দেখতে। ওখানে তারা খেলা দেখার একপর্যায়ে দেখতে পায় স্টেডিয়ামের একটা জায়গায় ঠিক ফারাজের বলা কথাটি লেখা রয়েছে, অসাধ্য বলে কোনো কিছুই নাই’। কোনো বিষয়ে হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না সে। ঠিক একই ভাবে তার এই চরিত্রের পরিচয় দিয়েছিল হলি আর্টিজান হামলার সময়। যখন তার বন্ধুদের রেখে ফারাজকে বেরিয়ে যেতে বলেছিল আততায়ীরা। তখন সে বলেছিল নো, যখন আমার বন্ধুকে ছাড়া হবে ঠিক তখনই আমি যাবো। ঘটনার দিন রাতে ফারাজের মা বড় ছেলে যারেফকে বলেছিল, আমি নিশ্চিত যে ফারাজ কিছুতেই বের হবে না। সত্যি সেই ডায়হার্ড ফারাজ বন্ধুদের ছাড়া বের হয়নি।
চলতি বছর মার্চে ফারাজকে প্রথম রাইচাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইতালির বেনভেন্তোর রুম্মো হাইস্কুল। স্কুল প্রাঙ্গণের গার্ডেন অব রাইচাসে (ন্যায়নিষ্ঠদের জন্য স্মৃতি উদ্যান) ফারাজের নামে একটি গাছ লাগানো হয়েছে। ইউরোপিয়ান ডে অব দ্য রাইচাস উপলক্ষে ৬ মার্চ এ গাছ লাগানো হয়। ২০১৬ সালে মার্চে মুম্বইয়ের বিমানবন্দরের কাছে পাঁচতারা জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলের প্রধান হলের মঞ্চে ফারাজের মায়ের হাতে ছেলের সম্মাননা তুলে দিয়েছেন আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও সিস্টার প্র্যাকসি।
এই প্রথম বিদেশি কোনো ‘নায়ক’কে মরণোত্তর সম্মান জানালো হারমনি ফাউন্ডেশন। সৃষ্টি হলো সংগঠনের এক নতুন অধ্যায়ের। অমানবিক প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবতার প্রমাণ রেখে গেছেন ফারাজ। ফারাজ মরে গেছেন, কিন্তু তিনি সারা পৃথিবীর যুবকদের মাঝে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বেঁচে থাকবেন।’ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বেসরকারি সংস্থা ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস (ডিসিআই) ইন্টারন্যাশনাল আয়োজন করে ‘কনসার্ট ফর চিলড্রেন’-এর। এখানেই ২০১৭ সালের মানবতাবাদী পুরস্কার দেয়া হয় ফারাজ আইয়াজ হোসেনকে।