Showing posts with label প্রতারণা. Show all posts
Showing posts with label প্রতারণা. Show all posts

Thursday, August 13, 2026

সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা থেকে রেহাই পেতে যে আইন জানা প্রয়োজন by তাকবির জাহান

বাংলাদেশে যত ধরনের বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তার বড় অংশই জমি বা সম্পত্তিকে ঘিরে। কারণ স্পষ্ট যে সম্পত্তি মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, আর এই সম্পদের সঙ্গে যুক্ত আইন সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অসচেতন। অথচ সম্পত্তি–সংক্রান্ত লেনদেনে আমাদের সবচেয়ে শক্ত সুরক্ষাবলয় হলো সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২। এই আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকলে দীর্ঘদিনের ঝামেলা, প্রতারণা, আদালতের ঘোরপ্যাঁচ ইত্যাদি বেশির ভাগই এড়ানো যায়।

প্রথমত, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে। ধারা ৫৫ অনুযায়ী, একজন বিক্রেতা সম্পত্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করতে পারবেন না। মালিকানা ত্রুটি, মামলাজট, দখল সমস্যা, পাওনাদারির বিষয় সম্পর্কে ক্রেতাকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। অন্যদিকে ক্রেতারও আইন অনুযায়ী দলিল যাচাই, রেকর্ড পরীক্ষা এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দায় রয়েছে। এই মৌলিক নীতিগুলো না জানার কারণেই বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হন।

অনেকেই মনে করেন, জমি কেনা মানেই শুধু চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করা। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। এই আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে—বিক্রয়, বন্ধক (মর্টগেজ), লিজ, বিনিময়, দান (গিফট) এবং নালিশযোগ্য দাবি (অ্যাকশনেবল ক্লেইম)। এগুলোর প্রতিটির আলাদা ধারা ও শর্ত আছে। উদাহরণস্বরূপ, ধারা ৫৮-১০৪ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বন্ধকের নিয়ম দেওয়া আছে। এগুলোর নিয়ম না বুঝে কোনো চুক্তিতে সই করলে পরে দেখা যায় চুক্তি বাতিল, ক্ষতি বা দীর্ঘ মামলা ছাড়া আর কিছুই নেই।

দানপত্রের ক্ষেত্রেও ভুল ধারণা প্রচুর। অনেকে মনে করেন, মৌখিক দান করলেই যথেষ্ট, যা সম্পূর্ণ ভুল। ধারা ১২২-১২৯ স্পষ্টভাবে বলে, দান অবশ্যই লিখিত, রেজিস্ট্রি করা, স্বেচ্ছায় প্রদান এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এসব শর্ত না মানলে দানপত্র আদালতে টিকবে না।

সম্পত্তি–সংক্রান্ত প্রতারণা আমাদের দেশে ক্রমে বাড়ছে। নকল দলিল, একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি বা রেকর্ডে জালিয়াতির মতো অপরাধগুলো সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আইন জানলে অনেক প্রতারণা আগেই চিনে ফেলা যায়। জমি কেনার আগে খতিয়ান, পর্চা, রেকর্ড, দখল—সব যাচাই করেই ক্রয় করা উচিত। এতে প্রতারণার সুযোগ অনেক কমে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জমি নিয়ে প্রতারণা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৪২০ অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি হাতিয়ে নিলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। নকল বা জাল দলিল তৈরি করলে দণ্ডবিধির ধারা ৪৬৭ ও ৪৬৮ অনুযায়ী কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। আবার কারও সম্পত্তি গোপনে বিক্রি করলে বিক্রেতা ধারা ৪০৬ ও ৪০৯ অনুযায়ী অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অর্থাৎ সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়।

এ ছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুসারে স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়। রেজিস্ট্রি ছাড়া কোনো দলিল আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই রেজিস্ট্রি না করে অগ্রিম টাকা নেওয়া বা মৌখিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে জমি বিক্রি করেন, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে জমি বা সম্পত্তি–সংক্রান্ত মামলাই সবচেয়ে বেশি। এর বড় কারণ হলো অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। আইন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান থাকলে, সঠিক কাগজপত্র যাচাই করলে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বিরোধ ও মামলা বহুলাংশে কমে যাবে।

সম্পত্তি মানে শুধু জমি বা বাড়ি নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের উত্তরাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্থিতি। তাই সম্পত্তি নিয়ে সচেতন থাকা মানে নিজের স্বপ্নকে সুরক্ষিত করা। আর এই সুরক্ষার প্রথম শর্ত হলো আইন জানা। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন জানলে শুধু নিজে প্রতারিত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না; বরং অন্যের প্রতারণা চিহ্নিত করা, ভুল চুক্তি এড়ানো এবং ঝুঁকির জায়গা চেনা সহজ হয়।

অতএব, আমাদের সবার উচিত এই আইনের কমপক্ষে মূল ধারাগুলোর ধারণা রাখা। এতে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি এড়ানো যায় না; বরং সমাজে জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের হার কমে আসে। সচেতনতা বাড়লে প্রতারণা কমবে, আইনি জট কমবে আর মানুষের আস্থা বাড়বে।

যদি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে চান, তবে আইনের জ্ঞানই আপনার সবচেয়ে শক্ত ঢাল।

* তাকবির জাহান, শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চিঠি

Friday, June 12, 2026

যৌন পার্টি ও ব্ল্যাকমেইল: ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্রেফতার

বীমা পলিসির রেকর্ড জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক চক্র ব্যবহার করে একটি মার্কিন ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউপোর্ট বিচ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অর্থলগ্নকারী ব্যবসায়ী মহেন্দর মাখিজানিকে (৪৪)। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা আইআরএস (ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস)-এর অভিযানে একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ৩০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আদালতের নথি অনুযায়ী, গ্রিনকার্ডধারী এই ভারতীয় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে শুধু ব্যাংক জালিয়াতিই নয়, বরং অবৈধ যৌন আসর (সেক্স পার্টি) ও মাদক পার্টি আয়োজন করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ভাড়াটে সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কয়েকটি অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁ জোরপূর্বক দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

যেভাবে চলত জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইল: ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি বিলাল এসায়লি জানান, মহেন্দর মাখিজানি ‘ক্যান্টর গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি মার্কিন ব্যাংকের কাছ থেকে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার নাম করে প্রায় ১০ কোটি ডলার অগ্রিম নেন তিনি। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে মহেন্দর ঋণের বিপরীতে জামানত রাখা সম্পত্তির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, মহেন্দর অত্যন্ত গোপনে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য দামি মাদক ও যৌনকর্মীদের নিয়ে বিশেষ প্রাইভেট পার্টির আয়োজন করতেন। পরবর্তীতে ওইসব পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের গোপন কর্মকাণ্ডের কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করতেন তিনি, যাতে ব্যাংক তার জালিয়াতি ধরতে পেরেও কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেয়। আদালতের হলফনামায় দেখা গেছে, কোনো কর্মচারী বা সহযোগী তার এই জালিয়াতির বিরোধিতা করলে মহেন্দর মাখিজানি তাদের চরমভাবে হেনস্তা করতেন।

এমনকি অধস্তন কর্মচারীদের ‘খুন’ করার এবং তাদের ‘পরিবার ও সন্তানদের রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার’ হুমকিও দিতেন তিনি। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে মহেন্দর মাখিজানি ভয়ভীতি ও সহিংসতার আশ্রয় নিতেন বলে মার্কিন গণমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক লগুনা বিচের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোনারকারের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জালিয়াতির কারণে গত মাসে এক সালিশি আদালত মহেন্দরকে ১৩০ কোটি ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্রেফতার

Thursday, June 11, 2026

হালালা সেন্টার: যৌনতার ফাঁদ নাকি ধর্মীয় সমাজের ল্যাবরেটরি টেস্ট by মনযূরুল হক

ভার্চ্যুয়াল জগৎ মাঝেমধ্যে আমাদের চেনা সমাজের ওপর এমন এক ল্যাবরেটরি টেস্ট চালায়, যার ফলাফল দেখে শিউরে উঠতে হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ঘটে যাওয়া ‘হালালা সেন্টার’ নামক একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা আমাদের তেমন এক নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

একটি ভুয়া আইডি থেকে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের পুনরায় আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার ‘সুবিধার্থে’ ‘হিল্লা’ বিয়ে করার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। পরবর্তী পোস্টে জানা যায়, এ ‘প্রস্তাবে’ সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজার পুরুষ ই-মেইলে নিজেদের সিভি পাঠিয়েছেন। বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে কারও অভিযোগের ভিত্তিতে ‘পুলিশ ডেকেছে’—এমন ক্ষোভ থেকে ‘গোপন রাখার শর্তে’ পাঠানো সিভিগুলোর মধ্য থেকে ৮০টি ই–মেইলের স্ক্রিনশট ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়া হয়।

এ তালিকায় যেমন আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী; তেমনই আছেন হাফেজ, আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসাশিক্ষক, মাদ্রাসা পরিচালক। দুঃখের কথা হলো, প্রকাশিত ছবিগুলোর বড় অংশ ধর্মীয় লেবাসের মানুষ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আইডি পরিচালনাকারী স্বীকার করেন, ‘পুরো প্রতিষ্ঠানটি ছিল কাল্পনিক, তবে ফাঁস হওয়া সিভির একটিও ভুয়া ছিল না।’

যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাঁদের অনেকে দাবি করছেন যে তাঁদের জিমেইল হ্যাকড হয়েছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ‘মজার ছলে’ দুষ্টামি করতে গিয়ে তাঁরা এই ফাঁদে পড়েছেন। এটি সত্যি হলে, তা আরও ভয়াবহ বিপদের কথা বলে। সাইবার অপরাধের এই যুগে যে কারও ছবি বা জীবনবৃত্তান্ত ব্যবহার করে তাঁকে এভাবে ব্ল্যাকমেল বা সামাজিক ফাঁদে ফেলা সম্ভব। তবে যাঁরা জেনেশুনে, সজ্ঞানে এমন ‘কুৎসিত’ উদ্দেশ্যে নিজেদের তথ্য পাঠিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক লজ্জাকে বলা যায় তাঁদের নিজেদের কর্মের ফল।

কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের আড়ালে যে সত্য ঢাকা পড়ে যায়, তা হলো একজন নারীকে সাময়িকভাবে বিয়ে করে ‘উপভোগের পর মর্জিমতো ছেড়ে দেওয়া বৈধ অধিকার’ রয়েছে—এমন একটি কদর্য সুযোগ লুফে নিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিশেষ করে ধর্মীয় ভাবধারার মানুষের ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে এখানে। সুস্থ সামাজিক কাঠামোর জন্য এটি বড় ধরনের সংকেত। বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধনকে যারা চুক্তির পণ্যে পরিণত করতে উদ্‌গ্রীব, তারা আমাদের চারপাশের চেনা মানুষই।

এ ঘটনাকে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে দেখলে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতার তত্ত্বটি মনে পড়ে। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজে যখন দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন একধরনের নিয়মহীনতা বা শূন্যতা তৈরি হয়। সেখানে তখন মানুষ যেকোনো উপায়ে নিজের আদিম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার সুযোগ খোঁজে। তা ছাড়া এখানে নারীকে অবলীলায় প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার ‘উপায়’ হিসেবেও মানুষকে ব্যবহার করার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, মানুষকে কখনো অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের ‘উপায়’ বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; প্রত্যেক মানুষ নিজেই একেকটি লক্ষ্য।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে কেন এমন একটি গরল দেখা গেল? যে সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটছে, ধর্মীয় আলোচনা হচ্ছে, সেই সমাজের আলেম, হাফেজ বা ইমামদের একটা অংশ কীভাবে এমন একটি জঘন্য ফাঁদে পা দিতে পারে?

উত্তরে অনেকে বলবেন, এর প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষার আত্মিক দিকটিকে বাদ দিয়ে কেবল ‘আইনি চতুরতা’র মানসিকতা। কেউ আরও গভীরে দর্শন দেবেন, ধর্ম যখন মানুষের ভেতরের নৈতিকতাকে পরিশুদ্ধ না করে শুধু বাহ্যিক লেবাস আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্ম হয়। ধর্ম তখন হয় কিছু অন্তঃসারশূন্য বিধিনিষেধের যোগফল। ফলে একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ও বহন করতে পারে আবার ‘উপভোগ করে ছেড়ে দেওয়ার’ লোভে সিভিও পাঠাতে পারে। এটি ধর্মের ত্রুটি নয়; বরং ধর্মকে আপন স্বার্থে ব্যবহার করার বিকৃত মনস্তত্ত্ব।

আমার কাছে কারণটি অন্য রকম। আমাদের এই চেনা ধর্মীয় সমাজের অবয়ব বা আয়তন দিন দিন বাড়ছে, তারা সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িতও হচ্ছে, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মীয় সুশাসন পরিচালনার কোনো একক ‘অথরিটি’ বা অভিভাবকত্ব তৈরি হয়নি অথবা বলতে হয় অভিভাবকত্বের ছড়াছড়ি। দেশের ধর্মীয় শ্রেণিই ধর্মের যুক্তিকে কেন্দ্র করে এত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এ অঞ্চলে আত্মশুদ্ধি শেখার অন্যতম বড় একটি মিশনারি সংগঠন হলো তাবলিগ, অথচ আজ তাদের মধ্যেও তীব্র বিভাজন। রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থীদের বিভাজিত দলের সংখ্যা অনেকের মতে শতাধিক। শিক্ষাধারায়ও ঢুকে পড়েছে হাজারো বিভক্তি; দেশে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজারো ‘প্রাইভেট’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এত বিপুল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একেকটি গ্রুপ এখন অন্ধের মতো যে যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে আর একশ্রেণি নিজেদের অন্যায় স্বার্থে তা লুফেও নিচ্ছে।

আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হলো ধর্মীয় সমাজের একাংশের তীব্র আর্থিক দৈন্য। বিশেষ করে লাখো মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ শিক্ষিত বেকারশ্রেণিও দিশাহারা। এই বিপুল কর্মহীন পুরুষের একটি বড় অংশ ধর্মের মোড়কে তৈরি হওয়া নানা ফন্দিফিকিরে পা দিচ্ছেন। কারণ, ইদানীং আমরা প্রায়ই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠা চটকদার ‘ব্যবসায়িক প্রকল্প’ বা উদ্যোগের উদ্বোধন দেখতে পাচ্ছি।

দেখা যায়, কাল্পনিক হালালা সেন্টারে যাঁরা সিভি পাঠিয়েছেন, তাঁদের অনেকে ই-মেইলে সরাসরি আর্থিক বিষয়টি সামনে এনেছেন। কেউ অবলীলায় লিখেছেন, তিনি তালাকপ্রাপ্ত নারীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, তবে তিনি নিজে গরিব; তাই তাঁর ‘আর্থিক সুবিধার’ বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়! আবার কেউ কেউ প্রবাসী বা বড় ব্যবসায়ী, তাঁরা এই পাতানো বিয়ের বিনিময়ে প্রয়োজনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে রাজি।

তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ঢাল বানিয়ে ‘হালালা সেন্টার’ খোলা, ‘দ্বীনে ফেরা’ মডেল কর্তৃক ম্যারেজ মিডিয়ার মতো অদ্ভুত উদ্যোগ নেওয়া কিংবা ‘মাসনা কলোনি’ নামক বহুবিবাহের আবাসিক ভবনের ঘোষণা দেওয়া—এসবই হলো সমাজে কোনো একক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার এবং যথেচ্ছ ব্যাখ্যার সংকট।

অথচ ইসলামে স্ত্রীর সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছেদের পর ‘হালালা’ পন্থা অবলম্বন করে তাঁকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অবৈধ। সাজানো বিয়ের মাধ্যমে কোনো নারী তাঁর স্বামীর জন্য আইনি বা ধর্মীয়ভাবে ‘হালাল’ হন না; বরং প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাতানো বিয়ের চুক্তি যে করে, হাদিসে তাকে বলা হয়েছে ‘ধার করা ষাঁড়’।

এই হিল্লা সম্পাদনকারী ব্যক্তি এবং যার জন্য এই পাতানো বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে (অর্থাৎ প্রথম স্বামী)—উভয়ে চরমভাবে অভিশপ্ত। মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক’ (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)। আর ‘যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়—উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত’ (সুনানে তিরমিজি: ১১১৯)। এক হাদিসে তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না?’ সাহাবিগণ বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল।’ তিনি বললেন, ‘সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৩৬)

শুদ্ধ জীবনব্যবস্থার মূল কথা হলো, বিয়ে কোনো চুক্তিবদ্ধ ব্যবসা নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনেও এ ধরনের জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপের মুখে দেওয়া ‘হিল্লা বিয়ে’র কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। দেশের উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে সামাজিক সালিসের নামে নারীদের হিল্লা বিয়েতে বাধ্য করাকে অবৈধ, নারী নির্যাতন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

ডিজিটাল দুনিয়ার এই কথিত হালালা সেন্টারের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে নৈতিক শিক্ষার অভাব থাকলে প্রযুক্তির আলো মানুষকে আলোকিত করার পরিবর্তে আরও বেশি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ধর্মীয় সমাজের এই যে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নানামুখী ব্যাখ্যা—এর নানা সমাধান অনেকে খুঁজেছেন বা খুঁজছেন। অনেকে মনে করেন, ধর্মীয় সুশাসনের (রিলিজিয়াস গভর্নেন্স) ব্যবস্থা করা। মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার মতো অনেক মুসলিম দেশে একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকে, যার মাধ্যমে কোনো স্বীকৃত সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দেশের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনালয়, ধর্মীয় শিক্ষা এবং ফতোয়া বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করে। ধর্মের নামে যে কেউ যেন যথেচ্ছ ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকে এবং সমাজে একটি সুশৃঙ্খল ধর্মীয় পরিবেশ বজায় থাকে।

এখন আমাদের সমাজে যে ধরনের ধর্মীয় মতাদর্শিক বিভাজন, তাতে এমন প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করতে পারেন রাষ্ট্র এখানে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তা ছাড়া রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থাও এমন সুসংহত হয়ে উঠতে পারেনি, যা ধর্মীয় সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খলা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে শুরুতে ধর্মীয় সমাজগুলোর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানকেই এগিয়ে আসতে হবে হালালা সেন্টারের মতো উদ্ভূত সংকট ঠেকাতে।

ইন্টারনেট বা ই-মেইলের মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষ যখন এমন এক কুপ্রথার অংশ হতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে, শিক্ষার আলো আমাদের মনকে স্পর্শ করতে পারছে না, ধর্মের নীতিকথাও প্রাণে লাগছে না। এ ধরনের অপব্যাখ্যা ও লালসার বাজার বন্ধ করতে হলে আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সমাজের নেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার মূলে হাত দিতে হবে।

* মনযূরুল হক, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
- ই–মেইল: manzurul.haque267@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন
ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন

Wednesday, April 1, 2026

পুরুষের প্রতারণার ভয়ঙ্কর জাল

সম্পর্কে প্রতারণা অনেক সময় বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরে তা ততটাই জটিল। শুধু আবেগঘটিত বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এতে জড়িয়ে থাকে মানসিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ ও হিসাবি মিথ্যাচার। সম্প্রতি প্রাইভেট ডিটেকটিভ তানিয়া পুরী এক ‘বিয়ের আগে অনুসন্ধানমূলক’ কেসের ঘটনা তুলে ধরেছেন। তা প্রকাশ করেছে এক পুরুষের প্রতারণার ভয়ংকর জাল। তানিয়া পুরী ‘মোমেন্ট অব সাইলেন্স’ পডকাস্টে বলেন, সম্প্রতি আমরা একটি প্রি-ম্যারিটাল কেস পেয়েছিলাম। ছেলেটি ছিল নিখুঁত- ভালো পড়াশোনা, ভালো আয়। কিন্তু মেয়েটি বলেছিল, কিছু একটা গড়বড় মনে হচ্ছে। প্রতিদিন, বিশেষ করে নবরাত্রির সময়, সে সন্ধ্যা ৭-৮টার মধ্যে কোথায় যেন উধাও হয়ে যেত। সে বলত, ‘না না, একটা অনুষ্ঠান আছে।’ আমরা তদন্ত করে দেখি, সে তার সাবেক প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করছিল।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই ব্যক্তি একই সময়ে তিন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল। তার একজন ছিলেন সাবেক প্রেমিকা। অন্যজনের সঙ্গে সে লিভ টুগেদার করতো এবং  তৃতীয়জনের সঙ্গে সে বিয়ে নিয়ে কথা বলছিল। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, ছেলেটি টাকার জন্যও মানসিকভাবে প্রতারণা করত। তানিয়া জানান, সে সাবেক প্রেমিকার কাছ থেকে টাকা নিতো এই বলে যে. তার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তারপর সেই টাকা দিয়ে লিভ টুগেদারে থাকা মেয়েটিকে উপহার দিত।

মনোবিজ্ঞানী রাশী গুরনানি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, যখন কেউ জানতে পারে তার সঙ্গী একই সঙ্গে একাধিক সম্পর্কে যুক্ত, তখন তা তীব্র মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে। লজ্জা, রাগ, বিভ্রান্তি ও গভীর শোক অনুভূত হয়। এতে দেখা দেয় ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। অর্থাৎ যা বিশ্বাস করতাম তার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ। তিনি বলেন, এই ধরনের অভিজ্ঞতায় আত্মবিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত লাগে। ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলোতেও ভীতি ও অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। সুস্থ হওয়ার পথ শুরু হয় নিজেকে দোষ না দেয়া ও সত্য স্বীকার করা দিয়ে। ধীরে ধীরে নিরাপদ ও স্বচ্ছ সম্পর্কের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন, থেরাপির সাহায্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের চর্চা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রতারণামূলক আচরণ অনেক সময় নার্সিসিস্টিক (আত্মমুগ্ধ) বা অ্যান্টিসোশ্যাল প্রবৃত্তি থেকে আসে। যেখানে সহমর্মিতা অনুপস্থিত, আর সম্পর্ককে দেখা হয় লেনদেনের মতো এক ব্যবসা হিসেবে। রাশী গুরনানি বলেন, সব ক্ষেত্রে এটা নার্সিসিজম নয়। কখনো কখনো অপূর্ণ মানসিক নিরাপত্তা, শৈশবের অনিরাপত্তা বা আত্মঅপূর্ণতার জটিলতা থেকেও মানুষ একাধিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা স্বীকৃতি খোঁজে। এটি মানসিক অপরিপক্বতা ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভাবের লক্ষণ। মনোবিজ্ঞানী গুরনানির মতে, প্রাথমিক সতর্কসংকেতগুলো হলো- কথায় অসঙ্গতি। প্রশ্ন করলে প্রতিরক্ষামূলক আচরণ। বারবার ‘অপ্রাপ্য’ থাকা। অতিরিক্ত আকর্ষণীয় আচরণ বা ‘লাভ বম্বিং’। সূক্ষ্ম মানসিক প্রভাব। যেখানে আপনার অনুভূতিকেই আপনাকে সন্দেহ করানো হয়। তিনি পরামর্শ দেন, নিজের অন্তদৃৃষ্টির অস্বস্তিকে বিশ্বাস করুন। আবেগগত স্বাধীনতা বজায় রাখুন। বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিবর্তে আচরণের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করুন। বিশ্বস্ত বন্ধু বা থেরাপিস্টের সঙ্গে আলোচনা করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- শুরুতেই স্পষ্ট সীমারেখা টানুন, যাতে প্রতারণা গভীর হওয়ার আগেই নিজেকে রক্ষা করা যায়।

https://mzamin.com/uploads/news/main/187224_Abul-12.webp

Tuesday, February 3, 2026

মোমো’র লোভে ৮৫ লাখ রুপির গয়না উধাও

উত্তরপ্রদেশে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রের মোমো’র প্রতি ভালোবাসা ভয়াবহ ও চমকে দেয়ার মতো পরিণতি ডেকে এনেছে। তার প্রিয় খাবার ‘মোমো’। এর প্রতি আকর্ষণ থেকেই তার পরিবারের প্রায় ৮৫ লাখ রুপির গয়না হারিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, প্রথমে তার খাদ্যাভ্যাসকে সাধারণ বিষয় বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সেটাই পরে রূপ নেয় প্রতারণার ঘটনায়। স্থানীয় একটি মোমো’র দোকান চালানো তিন ব্যক্তি নাকি ফ্রি মোমো দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধীরে ধীরে শিশুটিকে ফাঁদে ফেলে। এরপর তারা তাকে বাড়ি থেকে গয়না এনে দেয়ার জন্য রাজি করায়।

বিনিময়ে মিলবে বিনা মূল্যে মোমো। ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, বারাণসীর এক মন্দিরের পুরোহিত বিমলেশ মিশ্র জানান, তার ছেলে মোমো খেতে ভীষণ পছন্দ করে। সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়েছে তিন দোকানদার। বিমলেশ মিশ্রের অভিযোগ, দোকানদাররা তার ছেলেকে বলে যে, সে যদি বাড়ি থেকে গয়না এনে দেয়, তাহলে তাকে বিনা পয়সায় মোমো খেতে দেবে। ধীরে ধীরে শিশুটি নিজের ঘর থেকে গয়না নিয়ে ওই তিন ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে তখনই, যখন বিমলেশের বোন বাড়িতে এসে নিজের গয়না খোঁজেন।

আলমারি খুলে পরিবারটি দেখে সব গয়না উধাও। পরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, ফ্রি মোমো খাওয়ার জন্য সে সব গয়না মোমো বিক্রেতাদের দিয়ে দিয়েছে। এরপর বিমলেশ মিশ্র থানায় লিখিত অভিযোগ করেন এবং তিন অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করেন। তিনি জানান, হারিয়ে যাওয়া গয়নাগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮৫ লাখ রুপি। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201613_Abul-6.webp

Saturday, June 14, 2025

ভাইয়ের ‘প্রতারণায়’ নিঃস্ব প্রবাসফেরত তমিজ

দীর্ঘ ৩৪ বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন। ১৯৯০ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে প্রবাসে কাটানো জীবনের বড় একটি সময় (২৫ বছর) তিনি কুয়েতের কারাগারে কাটিয়েছেন। সব কিছু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরুর আশায় ছিলেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে দেখেন স্ত্রী, সন্তান, পৈতৃক ভিটেমাটি, জমিজমা, কোনো কিছুই আর তার নেই। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, তমিজ উদ্দিনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আপন ছোট ভাই আলাউদ্দিন দখল করে নিয়েছেন পৈতৃক সব সম্পত্তি। আর স্ত্রী-সন্তানরাও অন্যত্র চলে গিয়েছেন। শেষ বয়সে সব হারিয়ে এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সর্বশেষ এক বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানেন না সম্পত্তি আদৌ ফিরে পাবেন কি না? এ জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তমিজ উদ্দিন বলেন, এক ভারতীয় নাগরিক হত্যার ঘটনায় কুয়েত পুলিশ আমাকে জেলে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। পরে তারা আমাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। আমি ভেঙে পড়িনি, আপিল করেছি। পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। খালাসের জন্য কয়েক দফা আবেদন করি, অবশেষে ২৫ বছর সাজা ভোগ করার পর মুক্তি পাই।

তিনি বলেন, ভেবেছিলাম দেশে ফিরে অন্তত একটা ছায়া পাব। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করব। কিন্তু এসে দেখি, নিজের ভিটেতেই আমি অনাহূত। স্ত্রী-সন্তান মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমায়। আমার আপন ভাই সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি সরকারের কাছে প্রতিকার দাবি করছি।

তমিজ উদ্দিনের ভাই জহির উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও আলাউদ্দিন কোনো প্রকার মীমাংসায় রাজি হননি। উল্টো প্রবাসী তমিজ উদ্দিনকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে। এর আগে তমিজ উদ্দিনকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দিয়েছিল। পরে আদালত তাকে মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমি কারও সম্পত্তি দখল করিনি। পৈতৃক সম্পত্তি যতটুকু পেয়েছি, ততটুকই ভোগদখল করছি। তার (তমিজ উদ্দিন) সম্পত্তি কোথায় আছে, কার দখলে আছে জানি না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বাহাদুর কালবেলাকে বলেন, এমন অনেক প্রবাসী আছেন, যারা বছরের পর বছর কষ্ট করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠালেও দেশে ফিরে ভিটেমাটি খুঁজে পান না। সরকারের কাছে আবেদন, প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ান। নইলে একের পর এক তমিজ উদ্দিনরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে দাগনভুঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স ম আজহারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা
ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা

Thursday, May 29, 2025

‘আবর্জনা থেকে হবে সোনা', জনতাকে বোকা বানালেন মন্ত্রী

এমন একটি মেশিন যা আবর্জনাকে সোনায় পরিণত করে। এটা কোনও গল্পকথা নয়। সেই মেশিন বসানো হবে মিরাটে। উত্তর প্রদেশের পশুপালন মন্ত্রী ধর্মপাল সিং -এর কথা শুনে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে রাজ্যে। যোগীর মন্ত্রীর এমন মন্তব্যে বিতর্ক চরম আকার নিয়েছে। বিরোধী শিবিরের কটাক্ষ, জনতাকে বোকা বোঝানোর সব সীমা পার করেছেন যোগীর মন্ত্রিসভার ওই মন্ত্রী।

ধর্মপাল সিংয়ের এহেন মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সাংবাদিক নরেন্দ্র প্রতাপের শেয়ার করা সেই  ভিডিওতে মন্ত্রী ধর্মপাল সিংকে বলতে শোনা যাচ্ছে, নর্দমা পরিষ্কার করার সময় ময়লা তুলে তা সেখানেই ফেলে রাখা হয়। ওই ময়লা পরে আবার নর্দমায় চলে যায়। এই বর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা থাকা উচিত। আমাদের কাছে এমন একটি পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে এইসব বর্জ্যকে সোনায় পরিণত করা যাবে। সোনা বানানোর সেই মেশিন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও সেই কাজে ছোট্ট একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তা ঠিক হয়ে গেলেই মিরাটে বসানো হবে মেশিনটি। যখন মেশিন তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে, তখন মিরাটে, আবর্জনা থেকে সোনা তৈরি হবে।'

যদি এটি সত্য হয়, তাহলে জেনেভার বিজ্ঞানীরা তাদের ব্যাগ গুছিয়ে মিরাটে যেতে চাইবেন বর্জ্য ব্যবহার করে কীভাবে সোনা তৈরি করা যায় তার একটি লাইভ ডেমো দেখার জন্য। এই মাসের শুরুতে, ইউরোপীয় নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজেশন - যা CERN নামে বেশি পরিচিত রিপোর্ট করেছিল যে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে "উচ্চ-শক্তির সীসা নিউক্লিয়াসের মধ্যে সংঘর্ষে তীব্র তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয় যা প্রোটনকে ছিটকে দিতে পারে এবং সীসাকে ক্ষণস্থায়ী পরিমাণে সোনার নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত করতে পারে।

তবে, সেটা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত ছিল। যোগীর মন্ত্রীর বক্তব্য বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, ‘মন্ত্রী মশাইয়ের কাছে অনুরোধ তিনি প্রথমে কনৌজে গরুর দুধ বিক্রির ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে চাষিদের আয়বৃদ্ধির ব্যবস্থা করুন। তারপর না হয় আবর্জনা থেকে সোনা তৈরি করবেন।’

পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপির নেতারা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন কে কতবড় মিথ্যা বলতে পারেন।’

এর আগে ২০১৯ সালে একটি সভায় বঙ্গের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, “ভারতীয় গরুর বৈশিষ্ট্য, তার দুধের মধ্যে সোনার ভাগ থাকে। তার জন্য দুধের রঙ একটু হলদেটে হয়।”

সূত্র : দ্য হিন্দু

mzamin

Wednesday, May 14, 2025

‘ডক্টর লইয়া’ আবারও তেলেসমাতি! by মো. সিরাজুল ইসলাম

‘এইসব “ডক্টর” লইয়া আমরা কী করিব’ শিরোনামে ২০২৪ সালের ২৮ জুন প্রথম আলোয় একটি লেখা লিখেছিলাম তৎকালীন কুখ্যাত তিন ব্যক্তিত্বের—সেনাপ্রধান আজিজ, পুলিশপ্রধান বেনজীর আর ছাগল-কাণ্ডের মতিউর—তথাকথিত ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি নিয়ে।

সে লেখার একটি অংশ ‘দোর্দণ্ড প্রতাপ, ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় পদক ও অর্থবিত্তের বিপুল সম্ভারের পরও যেন তাঁদের বুকে একটা শূন্যতা রয়ে যায়। আর তা হচ্ছে একটা ডক্টরেট ডিগ্রি! নামের আগে ড. যোগ।

এত প্রাপ্তিযোগের পর এ খায়েশটি তাহলে কেন অপূর্ণ থাকবে? এটাও খেতে হবে। লুৎফর রহমান রিটনের সেই বিখ্যাত “খিদে” কবিতার মতো।’ সংগত কারণেই তাঁরা সবাই সাবেক স্বৈরাচারী শাসকের খুব কাছের লোক ছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পেল তাঁদের আরেক ঘনিষ্ঠজন তুরিন আফরোজের পিএইচডি তথা ডক্টরেট ডিগ্রি জালিয়াতি। পিএইচডি শেষই করেননি, তবু নামের আগে ড. লিখতেন বা নিজেকে ড. পরিচয় দিতেন।

এ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ খুঁজে পাওয়ার মতো। তুরিন আফরোজ তাঁর মাকে স্বীকার করেন না। আর সেই মামলায় আইনজীবী সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় তিনি মায়ের নাম কী লিখেছেন, তা খুঁজতে গিয়ে জানা গেল যে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি ভুয়া, অর্জনই করেননি।

দিনক্ষণসহ তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজর ই-মেইল করে জানান, তাঁর অধীন পিএইচডি শুরু করলেও তিনি শেষ করেননি, বাংলাদেশে ফিরে গেছেন।

তুরিনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ এখনো আসেনি বিধায় ধরে নিতে পারি, এটাই সত্য। তা ছাড়া সুপারভাইজারের ভুল হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও নিশ্চিত করেছে, এ নামে কাউকে তারা পিএইচডি দেয়নি।

মজার কথা হচ্ছে, স্বৈরাচারের দোসরদের এই পিএইচডি-প্রীতির আগে, স্বয়ং স্বৈরাচার, অর্থাৎ তাদের নেত্রী কি কম গিয়েছিলেন?

হাসিনার প্রথম মেয়াদকাল, অর্থাৎ ১৯৯৬-২০০১ সালে তিনি এক ডজনের মতো ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট’ ডিগ্রি নিয়েছিলেন তথা কিনেছিলেন।

তখন কূটনীতিপাড়ায় একটি কৌতুক প্রচারিত ছিল, বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর তখনকার অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে একটা ছিল হাসিনার জন্য সেই দেশ থেকে একটি  ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট’ ডিগ্রির ব্যবস্থা করা।

আর তা করতে পারলে সেই রাষ্ট্রদূতের উন্নতি শনৈঃশনৈঃ! ভারত থেকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ডিগ্রি নিয়েছিলেন তিনি।

একনায়ক কিংবা স্বৈরাচারদের এই পিএইচডি-প্রীতি কিন্তু নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে মুক্তি পায় বিশ্বখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিক্টেটর’।

নায়ক অ্যাডমিরাল আলাদিন ওয়াদিয়া রাজ্যের তথাকথিত অবিসংবাদিত নেতা, কিন্তু আসলে একজন ‘ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক’। ছবির ভাষ্যমতে, রাজ্যজুড়ে তাঁর এতটাই কর্তৃত্ব যে একাধারে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, রাজ্যের প্রধান চিকিৎসক এবং সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়। তিনি তাঁর রাজ্যে নিজেই একটি মিথ্যা অলিম্পিকের আয়োজন করে নিজেই ১৪টি সোনা জেতেন।

ছবিতে দেখা যায়, আগে দৌড় শুরু করাসহ প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়দের গুলি করে আহত করার মধ্য দিয়ে একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনি সোনা জেতা নিশ্চিত করছেন। সব রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান তাঁর নামে—মূর্তি সর্বত্র।

এমনকি দেশের ভাষা পরিবর্তন করে প্রায় অধিকাংশ শব্দের আগে-পরে তিনি ‘আলাদিন’ যোগের নির্দেশ দেন। যেমন আপনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলতে চান বা ‘না’ বলতে চান, এ দুই ক্ষেত্রেই আপনাকে ‘আলাদিন’ বলতে হবে, তবে মুখের ভাব দুই ক্ষেত্রে দুই রকম হবে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি রাজ্যের সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও বটে, যিনি ১১৮টি পিএইচডি ডিগ্রি ও ৩০টি পোস্টডক্টরাল সম্পন্ন করেছেন। রাজ্যের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে তাঁকে ডিগ্রি দিয়ে থাকে।

সে তুলনায় হাসিনার পিএইচডির সংখ্যা কিছুটা কমই ছিল। তবে ২০০৮-২০২৪ মেয়াদে তাঁর নজর পিএইচডি নয়, বরং এর চেয়েও বড় কিছুতে পড়েছিল, আর তা হচ্ছে ‘নোবেল প্রাইজ’।

ওয়াদিয়া রাজ্যের আলাদিনও যে চেষ্টা করেননি, শেখ হাসিনাকে সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে শোনা যায়। ‘লবিস্ট’ থেকে আরম্ভ করে চামচা সাংবাদিক—সবাই এই অসিলায় তাঁর কাছ থেকে টাকা বাগিয়েছেন।

২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার দিন তিনি নাকি সারা দিন ফোনের কাছে বসে ছিলেন এই আশায় যে নোবেল প্রাপ্তির খবর দেওয়ার জন্য আসা ফোনকলটা না আবার মিস করেন।

তাঁর বদলে ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিতে তিনি ব্যাপকভাবে আহত ও রাগান্বিত হয়েছিলেন, যে গোস্‌সা দিন দিন বাড়তেই থাকে। তবে ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’-এর মতো তাঁকে এ চেষ্টা দ্বিতীয়বারও করতে দেখা যায়।

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করে আবারও বুক বাঁধতে দেখা যায় একটি ‘নোবেল’-এর আশায়। সেই লক্ষ্যে ভাসানচরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বানিয়েছেন সুদৃশ্য স্থাপনা। কিন্তু আবারও বিফল! কারণ, নকল কিংবা ভুয়া ‘নোবেল’-এর প্রচলন এখনো শুরু হয়নি।

ফলে, ২০০৮-২০২৪ মেয়াদে নেত্রীর ‘নোবেল’-চেষ্টার বিপরীতে ছোট মাপে পিএইচডি ডিগ্রি প্রাপ্তির চেষ্টাটি তাঁর চামচা বা ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়—আজিজ, বেনজীর, তুরিন কিংবা মতিউর।

তবে স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে প্রায় সব সরকারের আমলেই আমাদের মতো দুর্নীতিপীড়িত দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের অপরিসীম লোভ-লালসার অংশ হিসেবে পিএইচডি-প্রীতি বরাবরই ছিল।

‘গাছেরটা খাওয়া আর তলারটাও কুড়নো’-র মতো শেষ জীবনে এসে তাঁদের আধ্যাত্মিকতা তথা জ্ঞানচর্চার ব্যাপক আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। শুধু তা-ই নয়, শেষ জীবনে নামীদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক হওয়ার জন্যও তাঁরা উঠেপড়ে লাগেন।

তাঁদের ডিগ্রি দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, ঠিক ওয়াদিয়া রাজ্যের মতো। নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আগের সরকারটি আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এর পরের পিএইচডি ডিগ্রিটি পেত পুলিশের বিখ্যাত সেই ‘হারুন’। ডিগ্রিটি দিতেন অধ্যাপক ‘মিজান’ কিংবা ‘ছলিমুল্লাহ’ (কল্পিত নাম)।

আফসোসের বিষয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের একজন জাঁদরেল সচিব নামের আগে ড. লেখেন, কিন্তু সবাই জানে যে তাঁর ডিগ্রিটি ভুয়া।

অথচ তাঁর হার্ভার্ড থেকে একটি মাস্টার্স ডিগ্রি আছে এবং এটাই তাঁর বিদ্যার দৌড় প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ভুয়া পিএইচডিটি লিখে নিজেকে আরও ছোট করলেন।

এ ধরনের ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি নিয়ে আমার এক বন্ধু তাঁর একটি অভিজ্ঞতার গল্প করলেন এরূপ: ‘বনানীতে একবার “ইউনিভার্সিটি অব হনলুলু (ইউএসএ)” লেখা একটি বিলবোর্ড দেখলাম। কৌতূহলবশত আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম যে তারা খুব কম খরচে মাস্টার্স ও পিএইচডি অফার করছে! আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এটি জাল! এক বছর পর এটি অদৃশ্য হয়ে গেল!

‘কয়েক বছর পর আমি একটি বিখ্যাত এনজিওর এক নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে দেখা করি এবং তিনি যখন তাঁর ভিজিটিং কার্ডটি আমাকে দেন, তখন আমি দেখতে পাই যে তাঁর নামের আগে ডক্টর লেখা এবং সেই পিএইচডি ডিগ্রি করেছেন হনলুলু বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসএ) থেকে।’

উল্লেখ্য, হনলুলু নামে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আছে ‘হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়, হনলুলু, ইউএসএ’। শুধু অনলাইনে দৃশ্যমান, বাস্তবে অস্তিত্বহীন—এ ধরনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন নেট দুনিয়ায়। শুধু পিএইচডি ডিগ্রি নয়, নেট দুনিয়ায় নকল জার্নাল, যা ‘প্রিডেটরি জার্নাল’ হিসেবে পরিচিত, এর সংখ্যা আসল জার্নালের চেয়ে বেশি।

আছে ভুয়া পাবলিশার, যেখানে আপনি যেকোনো লেখাই বই আকারে প্রকাশ করতে পারেন ইত্যাদি।      

এসব ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। তাঁরা মূলত সেই ব্রিটিশরাজের আমল থেকেই রাজা। জনগণকে ভাবেন প্রজা, যদিও জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাঁদের বেতন হয়।

ফলে আলাদিনের মতো ‘খায়েশ’-এর তাঁদের কমতি নেই। একটি সরকারি মিটিংয়ে একবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে চার মাসব্যাপী পরিচালিত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন মূল্যায়ন করতে গিয়ে বারবার তাঁর পিএইচডি গবেষণার জের টানতে দেখলাম।

পরে শুনেছি, তিনিও ছয় মাসে পিএইচডিধারী সেই সরকারি কর্মকর্তাদেরই একজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের পিএইচডি নেওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, এখানে সবাই জানেন কোনটি ভুয়া আর কোনটি আসল বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে তাঁদের ক্ষেত্রে যা হয়—নিম্নমানের ডিগ্রি কিংবা নকল করা অভিসন্দর্ভ। ৯৮ শতাংশ নকল করা এক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ধরা পরেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এ ধরনের নিম্নমানের ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

ঢাকায় অবস্থিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিই। স্মরণাতীতকালের ইতিহাসে সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে নিয়োগ পেয়েছিলেন ভারত থেকে ডিগ্রি নেওয়া তিনজন।

বুয়েটের ইতিহাসে সম্ভবত হাতে গোনা দু-একজন ভারত থেকে ডিগ্রি নেওয়া বা বাংলাদেশি পিএইচডিধারী পাবেন। ৯৯ শতাংশই বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী।

অথচ হাসিনা আমলে সেখানে প্রথমবারের মতো উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন ভারত থেকে নেওয়া একজন পিএইচডিধারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দুজন ভারত থেকে নেওয়া ডিগ্রিধারী প্রায় পনেরো বছর ধরে উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন।

একজন মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আরেকজন আলীগড়ের পিএইচডি। অথচ অক্সফোর্ড-কেমব্রিজসহ বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিধারীদের ছড়াছড়ি সেখানে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বহুদিন ছিলেন বাংলাদেশি পিএইচডিধারী বিখ্যাত এক টক শোবিদ, যিনি কিনা যুবলীগের প্রধান হওয়ার খায়েশও প্রকাশ করেছিলেন।

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডির মান নিয়ে বরাবরই ব্যাপক বিতর্ক আছে। আবার শুনেছি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

ভয় হয়, এর অপব্যবহার আরও বাড়বে কি না! প্রথম সারির দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যোগ্যতা আছে বলে মনে হয় না।

ভুয়া পিএইচডি নিয়ে এই তেলেসমাতি যুগ যুগ ধরে চলমান। আর সে জন্যই, বিখ্যাত সে গল্প—ঘোড়া আর গাধার পিএইচডি লোকের মুখে মুখে। ক্ষমতাধরদের এই ভুয়া পিএইচডি-প্রীতিকে নেহাতই একটি নিষ্পাপ ‘খায়েশ’ হিসেবে হেসে উড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

এটি উচ্চশিক্ষাকে প্রহসনে পরিণত করে, প্রকৃত পিএইচডিধারীরা বিব্রত হন এবং গবেষণার পরিবেশ নষ্ট হয়। সরকার চাইলে খুব সহজেই এই হাস্যকর প্রবণতা বন্ধ করতে পারে।

ইউজিসি বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে পিএইচডি গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের আগে কাউকে নামের সঙ্গে পিএইচডি টাইটেল যোগ করা যাবে না মর্মে একটি পরিপত্র জারি করলেই কিন্তু হয়ে যায়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি ডিগ্রির মান নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ভালো মানের জার্নালে প্রকাশনা ছাড়া কাউকেই পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া উচিত নয়।

* ড. মো. সিরাজুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা
ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। প্রতীকী ছবি: এআই/প্রথম আলো

Monday, April 28, 2025

মডেল তনয়ার হানিট্র্যাপ

সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সংস্কৃতি অঙ্গনেও আছে বিচরণ। থাকেন চট্টগ্রামে। একটি মিউজিক ভিডিও’র সূত্র ধরে পরিচয় হয় ঢাকার ২৮ বছর বয়সী মডেল তনয়া হোসেন ওরফে নাজমুন নাহার সুখী ও তার বোন ৩২ বছর বয়সী তানিশা রহমান ওরফে কামরুন নাহার আঁখির সঙ্গে। পরিচয়ের পর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেন দুই বোন। প্রায়ই তাদের মধ্যে কথাবার্তা হতো। সরকারি কর্মকর্তাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান তনয়া ও তানিশা। ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের জানাশোনা হলেও তানিশা তার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন তাই চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার চান। শর্ত ছিল কিছুদিনের ভেতরে ফেরত দিবেন। পরে তিনি তানিশাকে ৫ লাখ টাকা ধার দেন। অল্প সময়ের ভেতরে টাকা ফেরতের কথা থাকলেও কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। তানিশা টাকা ফেরত দেননি। কিন্তু ওই কর্মকর্তা একাধিকবার তানিশার কাছে টাকা ফেরত চান। একপর্যায়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি তানিশা টাকা নেয়ার জন্য ওই কর্মকর্তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না টাকা ফেরত নিতে আসলে তার জীবনে কতোটুকু ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। চলতি মাসে টাকা নিতে ঢাকা আসেন তিনি। তাকে নেয়া হয় একটি বাসায়। সেখানে যাওয়ার পর শুরু হয় কর্মকর্তার ওপর অমানবিক নির্যাতন। দুই বোন ও তাদের হানিট্রাপের সহযোগীরা মারধর, নির্যাতন করে আহত করেন। ধারণ করা হয় নগ্ন ভিডিও। সেই ভিডিও’র হুমকি দিয়ে হানিট্র্যাপ চক্রটি ৬০ লাখ টাকা আদায় করে। নগ্ন ভিডিও ধারণ করার পর ওই কর্মকর্তাকে ছেড়ে দেয় চক্রটি।

চট্টগ্রাম ফিরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে পরিচিতদের সহযোগিতায় ভাটারা থানায় গিয়ে সব খুলে বলেন। ভাটারা থানা বিষয়টি আমলে নিয়ে অভিযান চালিয়ে তনয়া-তানিশাসহ তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। শুনানিতে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাইবে পুলিশ। শনিবার রাতে ভাটারা এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে আদায়কৃত চাঁদার ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- নাজমুন নাহার সুখী ওরফে তনয়া (২৮),  কামরুন নাহার আঁখি (৩২) ওরফে তানিশা,  রুমানা ইসলাম স্মৃতি (৫০) ও মো. সাফাত ইসলাম লিংকন (২৫)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৯শে এপ্রিল ওই কর্মকর্তা ঢাকা এসে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তানিশা তাকে সন্ধ্যায় বসুন্ধরা এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে দাঁড়াতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন তনয়া তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। পরে তাকে নিয়ে তনয়া এভার কেয়ার হাসপাতালের গেট থেকে ছোলমাইদ উত্তরপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তাররকৃত চারজনসহ আরেকজন অজ্ঞাতনামা ভুক্তভোগীকে বন্দি করে ফেলে। সেখানে সাফাত ইসলাম বালিশ দিয়ে তার মুখ চেপে শ্বাসরোধের চেষ্টা করে এবং অন্যরা তার হাত-পা বেঁধে মারধর করে। ভুক্তভোগীর চিৎকার যাতে বাইরে না যায়  সেজন্য উচ্চ শব্দে টিভিতে গান বাজায় তারা। সেই আওয়াজের মধ্যেই হকিস্টিক হাতে দুই যুবক তাকে পেটাতে থাকে। তাকে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়, মুখে বালিশচাপা দিয়ে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়। ওই কর্মকর্তা তখন প্রাণে বাঁচার জন্য নানা আকুতি করেন। তাকে আর কখনো টাকা ফেরত দিতে হবে না বলেও জানান। তার বিনিময়ে যেন তাকে মারধর করা না হয়। কিন্তু তাদের মন গলেনি, বরং অত্যাচারের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। পরে তার কাছে ১ কোটি টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু এত টাকা দিতে অপারগতার কথা জানান। তখন আবার মারধর করে কর্মকর্তার বোনের কাছে ফোন দিতে বলে। প্রাণ বাঁচাতে তখন বোনকে তিনি ফোন করে বলেন, আমি বিপদে আছি। আমার এক কোটি টাকা দরকার। পরে আবার বোনকে ফোন দিয়ে বলেন, যা স্বর্ণ আছে বিক্রি করে বা ধার করে হলেও টাকা পাঠাও। পরে তার বোন ও বন্ধু মিলে মোট ৫২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। তনয়ার নাম্বারে ফোন করে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। ওই নাম্বারটি ছিল পুরুষের নামে। টাকা দুই কিস্তিতে ২৬ লাখ করে মোট ৫২ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এরপর এসএ পরিবহনের গুলশান-২ শাখা থেকে ফোন পেয়ে তনয়া ও সঙ্গী সেই টাকা সংগ্রহ করেন। সব মিলিয়ে তারা তার কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা আদায় করে। টাকা পাওয়ার পর তনয়া, তানিশা ও তাদের সহযোগীরা ওই কর্মকর্তার সমস্ত পোশাক খুলে উলঙ্গ অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। তারা তাকে হুমকি দিয়ে বলে, এসব ঘটনা কাউকে বললে বা থানা পুলিশ করলে নগ্ন ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে মানহানি করে ক্যারিয়ার শেষ করে দিবে।  ওই রাত ১১টার দিকে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে তার মোবাইল ও ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং একটি গেঞ্জি পরিয়ে গাড়ি থেকে বাড্ডার অন্ধকার এলাকায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। প্রথম রিকশাচালক ভয় পেয়ে চলে গেলেও, দ্বিতীয় একজন তাকে উদ্ধার করে হোটেলে পৌঁছে দেন। পরদিন তিনি চট্টগ্রামে ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর চট্টগ্রামেরই একজন সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক নেতার সহায়তায় ২৪শে এপ্রিল ঢাকার ভাটারা থানায় গিয়ে সব খুলে বলেন। এ ঘটনায় ২৬শে এপ্রিল ভাটারা থানায় মামলা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তনয়া মডেল হিসেবে বিভিন্ন মিউজিক ভিডিও ও ইউটিউবভিত্তিক নাটকে কাজ করেন। আর তানিশারও একই জগতে বিচরণ আছে। তার স্বামী দুবাইয়ে থাকেন এবং তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও তিনি প্রচার করেন। থাকেন অভিজাত বসুন্ধরা এলাকার আই ব্লকে। তাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদরের বড়ালিয়ায়। তারা মূলত একটি হানিট্র্যাপ চক্রের সদস্য। তাদের নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তিদের টার্গেট করে তারা হানিট্র্যাপে ফেলে টাকা আদায় করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রুবেল মিয়া মানবজমিনকে বলেন, মিউজিক ভিডিও’র সূত্র ধরে ওই কর্মকর্তার তাদের সঙ্গে পরিচয় হলেও এক সময় পারিবারিকভাবে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। তনয়ার পাশাপাশি তানিশার সঙ্গে সখ্যতা ছিল। একপর্যায়ে একটি সমস্যার কথা বলে তানিশা ৫ লাখ টাকা ধার নেয়। টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলে একটি বাসায় নিয়ে তারা দুই বোন ও আরও তিনজনসহ শারীরিক মানসিকভাবে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে। তারা তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করে। মূলত এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা মামলা নিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করি। ঘটনার সত্যতাও পাই। তিনি বলেন, এই মডেলরা হানিট্র্যাপের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। আমরা ওই কর্মকর্তার কিছু টাকা উদ্ধার করেছি। এখন রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবো।

mzamin

Thursday, April 17, 2025

৯ মাস সংসার করার পর তরুণী জানতে পারেন বিয়ে হয়নি by ওমর ফারুক সুমন

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে সংসার করেছেন ৯ মাস। করেছেন হানিমুন, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণসহ সব ধরনের আড্ডা ও সাংসারিক কাজকর্ম। দীর্ঘ ৯ মাস সংসার করার পর ঘটে লঙ্কাকাণ্ড। মূলত স্বামী ছিল না সেই যুবক। নাটক তৈরি করা নকল স্বামী আর স্ত্রী দুইজনের মধ্যে বিরোধ লাগার কারণেই আসল ঘটনার প্রকাশ ঘটে। সংশ্লিষ্ট ফুলপুর সদর কাজী অফিসে বিয়ের নকল তুলতে যান তরুণী। কাজী নকল দিতে গিয়ে টালবাহানা আর কালক্ষেপণ করলে স্থানীয় হালুয়াঘাট দৈনিক মানবজমিন প্রতিনিধির দ্বারস্থ হন। পরে মানবজমিন প্রতিনিধি কাজী অফিসে গিয়ে নকল দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্টার জানান, মূলত এটি বিয়ে হয়নি। কাজী পরিচয়ধারী কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় ফুলপুর সদর এলাকায় একটি অফিস কক্ষে কাজী অফিস সাজিয়ে বিয়ের নাটক তৈরি করেছিলেন স্বামী সেজে আসা সেই যুবক। কনে হালুয়াঘাট উপজেলার ধনভাঙ্গা গ্রামের আকলিমা খাতুন ও নকল স্বামী একই উপজেলার কুমারগাতি গ্রামের আয়নাল হক। আয়নাল হকের প্রতারণার জালেই মূলত পা দিয়েছিলেন আকলিমা।

এ ঘটনার বিষয়ে প্রতারণার স্বীকার আকলিমা খাতুন বলেন, দীর্ঘ ৯ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর জানতে পারেন, স্বামী ছিল না সেই যুবক। মূলত নকল কাজীর মাধ্যমে নকল কাবিননামা তৈরি করে গড়ে তুলেছিলেন এমন অনৈতিক সম্পর্ক। তরুণীর অভিযোগ, অর্থ হাতিয়ে নিতে আর অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতেই গেল বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ফুলপুর উপজেলা সদরে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ের নাটক সাজান। আকলিমা বলেন, স্বামী সেজে আয়নাল হক ইতিমধ্যে হাতিয়ে নেন দুই লক্ষাধিক টাকা। নতুন করে আরও ১০ লাখ টাকার দাবি করলে আয়নালের ওপর সন্দেহ সৃষ্টি হয় তরুণীর। একপর্যায়ে কাজী অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন বিয়েই হয়নি তার। নকল কাজী সাজিয়ে বিয়ের নামে নাটক তৈরি করেন আয়নাল। অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যেই এমন পন্থা বেছে নেন প্রতারক আয়নাল। আয়নালের বাড়িতে খোঁজ নিলে আয়নালের দাদা আব্দুস সামাদ বলেন, তার পূর্বের আরেকটি স্ত্রী সন্তান রয়েছে। নতুন করে কাউকে বিয়ে করেননি জানান পরিবারের লোকজন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত আয়নাল মুঠোফোনে জানতে পেরে কাজীর মাধ্যমে বিয়ে করার কথা অস্বীকার করেন। তবে হুজুরের মাধ্যমে বিয়ে করা হয় বলে জানান অভিযুক্ত আয়নাল। 

mzamin

Saturday, March 29, 2025

সাইবার প্রতারণায় সব হারিয়ে আত্মহত্যা দম্পতির

সাইবার প্রতারণার শিকার হয়ে ৫০ লাখ রুপি হারিয়েছেন কর্নাটকের এক প্রবীণ দম্পতি। নিঃসন্তান ওই দম্পতি শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। এতে বলা হয়, ডিওগজেরোন সান্তান নাজারেথ (৮২) ও তার স্ত্রী ফ্লাভিয়ানার (৭৯) বসবাস ছিল খানাপুরের বেডি গ্রামে। তাদের কোনো সন্তান নেই। তারা আত্মহত্যার আগে দুই পৃষ্ঠার একটি হ্যান্ডনোট রেখে গেছেন। তাতেই বর্ণনা করেছেন আত্মহত্যার কারণ। এ জন্য অন্য কাউকে দায়ী না করতে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, কারো দয়ার ওপর তারা বেঁচে থাকতে চাননি। বৃহস্পতিবার প্রতিবেশীরা তাদেরকে না দেখে, ঘরে যান ডাকতে। গিয়ে দেখেন ফ্লাভিয়ানা মৃত পড়ে আছেন বিছানায়। অন্যদিকে তাদের বাসার নিচে পানির ট্যাংকে উদ্ধার করা হয় সান্তান নাজারেথের মৃতদেহ। তিনি সরকারি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নিজের গলায় চুরি চালিয়েছেন তিনি। কব্জিতে পাওয়া গেছে ক্ষত। ধারণা করা হচ্ছে তার স্ত্রী ফ্লাভিয়ানা বিষাক্ত কিছু ব্যবহার করেছেন। তবে এ নিয়ে তদন্ত চলছে। পরে বিস্তারিত জানা যাবে। ডেথনোটে সান্তান নাজারেথ দু’জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন সুমিত বিরা এবং অনিল যাদব।

তিনি লিখেছেন, এর মধ্যে বিরা হলেন নয়া দিল্লির একটি টেলিকম ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা। তিনি সান্তান নাজারেথকে জানান যে, তার নামে প্রতারণার মাধ্যমে একটি সিম কার্ড তোলা হয়েছে। সেটা ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রান করা হচ্ছে। অবৈধ বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে ওই ফোনকলে যাদবকে ধরিয়ে দেন বিরা। বলা হয়, যাদব হলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের একজন কর্মকর্তা। সান্তান নাজারেথের সহায় সম্পত্তির বিস্তারিত জানতে চান। বলেন,সিম কার্ডের কারণে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই ফাঁদে পা দিয়ে তাদেরকে ৫০ লাখ রুপি তুলে দেন সান্তান নাজারেথ। কিন্তু তারা আরও অর্থ দাবি করতে থাকে।

নাজারেথ সুইসাইড নোটে আরও লিখেছেন, তিনি এ জন্য সোয়া সাত লাখ রুপি গোল্ড লোন নিয়েছেন। এর সুদ দেয়ার কথা ৪ঠা জুন। এই অর্থ দিতে গেলে স্বর্ণ বিক্রি করতে হবে। এছাড়া তিনি বন্ধুদের কাছ থেকেও অর্থ ধার করেছেন। স্বর্ণ, কানের রিং বিক্রি করে লোন পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। সান্তান নাজারেথ লিখেছেন- এখন আমার বয়স ৮২ বছর। আমার স্ত্রীর ৭৯। আমাদেরকে দেখাশোনা করার মতো কেউই নেই। তাই কারো অনুগ্রহের ওপর আমরা বেঁচে থাকতে চাই না। এ জন্যই আমাদের জীবন শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একই সঙ্গে তিনি লিখেছেন, তাদের দেহ যেন একটি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা তা নিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন।

ওদিকে তার বাড়ি থেকে তার ফোন, ছুরি, আত্মহত্যার নোট আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ। বেলাগাভির এসপি ভীমাশঙ্কর গুলেড বলেন, প্রাথমিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা একটি আত্মহত্যার মামলা করেছি। তারা যে দু’জনের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। বাকি তদন্ত চলছে।

mzamin

Wednesday, March 19, 2025

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন: মুরগির রক্ত গায়ে মেখে প্রতারণা by সাজ্জাদ হোসেন

সম্রাট আকবর সবুজ। পেশায় ভ্যানচালক। ঢাকা থেকে বিভিন্ন স্থানে সবজি পরিবহনের কাজ করতেন তিনি। কয়েক বছর আগে বগুড়ায় এক গাড়িচালকের সঙ্গে বিতণ্ডার একপর্যায়ে তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন ওই গাড়িচালক। তখন নেয়া চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে জুলাই ফাউন্ডেশনে আহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে  এসে জানতে পারেন জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের ছবি কিংবা ভিডিও দেখাতে হবে। পরে সবুজ এবং তার বন্ধু মোহাম্মদ নূর আলম মিলে মুরগির রক্ত মাথায় এবং গায়ে মেখে রাস্তায় শুয়ে ভিডিও তৈরি করেন এবং ছবি তোলেন। এ সব ছবি জুলাই ফাউন্ডেশনে জমা দিয়ে ইতিমধ্যে অর্থ সহায়তা তুলে নিয়েছেন। শুধু ফাউন্ডেশনই নয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকেও আর্থিক সহায়তা বাগিয়েছেন এই ছবি দেখিয়ে। সম্প্রতি ফাউন্ডেশনের তদন্তে তার এই প্রতারণা ধরা পড়ে।

শুধু সুবজই নন, এমন অনেকে প্রতারণা করে জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের জন্য বরাদ্দকৃত অনুদান তুলে নিচ্ছেন। ফাউন্ডেশনের তদন্তে তাদের অনেকে ধরাও পড়ছেন। এ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিকেরও বেশি প্রতারণার ঘটনা ধরা পড়েছে। ধরা পড়াদের কেউ কেউ বরাদ্দকৃত টাকা ফেরত দিয়েছেন। মামলার পর জেলে গেছেন ৩ জন।  

গতকাল মঙ্গলবার জুলাই ফাউন্ডেশনের সেলে সম্রাট আকবর সবুজকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, মুরগির রক্ত  মেখে তিনি ছবি তুলেছেন। মাথায় যে আঘাত পেয়েছেন তা ব্যক্তিগত ঝগড়ার সময় প্রাপ্ত আঘাত। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন এমনটা দাবি করায় এবং প্রতারণার কথা স্বীকার করায় তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
সবুজকে ডেকে আনায় জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে আন্দোলনে আহত কয়েকজন জড়ো হয়েছিলেন। সবুজের প্রতারণার ঘটনায় ক্ষুব্ধ এসব আহত ব্যক্তি তাকে মারধর করতে উদ্যত হন এই প্রতিবেদকের সামনেই। তারা দাবি করেন, এসব প্রতারণার কারণে আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মর্যাদা হানি হচ্ছে। এসব প্রতারকের কঠোর শাস্তি দেয়ারও দাবি করেন তারা।

আন্দোলনে আহত সোহান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (পিজি) চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবুজের প্রতারণার খবর পেয়ে তিনি হাজির হন ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে। ক্ষুব্ধ সোহান বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে আমরা প্রকৃত আহতরাই সহায়তা পাইনি। কিন্তু এই প্রতারক টাকা নিয়ে গেছে। আমরা এদের কঠোর শাস্তি চাই।

গতকাল বেলা দুইটায় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের গিয়ে দেখা যায়, কেউ ব্যস্ত শহীদ পরিবার ও আহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদানে। কেউ বা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি করতে। সেখানে আহত ও তাদের স্বজনদের ভিড়। কেউবা এসেছেন অনুদানের অর্থ কবে পাবেন তা জানতে। শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের অর্থ সহায়তা, কর্মসংস্থান, সম্মানী ভাতা, আজীবন চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণসহ নানা বিষয় জানতে। তাদের বক্তব্য ও সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হতে কথা বলতে দেখা যায় ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধকে। প্রধান ভেরিফিকেশন অফিসার মো. হারুন ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন তাকে সহযোগিতা করছিলেন।

মঙ্গলবারই যাত্রাবাড়ী এলাকার আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক ফাউন্ডেশনে অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী গত ১৪ই আগস্ট সাইফ আরাফাত শরীফ এবং মো. সাইদুল ইসলাম ইয়াছিন নামে দুই তরুণ গণধর্ষণের অভিযোগে মব হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাদের পিটিয়ে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ফেলে যায় কিছু লোক। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এই দুইজনকে জুলাই আন্দোলনে শহীদ বলে এক প্রতারকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ’ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)’ এ নাম অর্ন্তভুক্ত করা হয়। এমনকি জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে আন্দোলনে শহীদদের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তাও বাগিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও ঘটনার সময় নিহত দুইজনের পরিবার দাবি করেছিল তারা জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল।

জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ও জুলাই ফাউন্ডেশনের ছাত্র প্রতিনিধি মো. রাকিব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ১৪ই আগস্টের গণপিটুনিতে তারা মারা যান। সে জুলাই আন্দোলনের শহীদ নয়। এটা ওই সময় বিভিন্ন পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ’ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)’ এএই ঘটনাায় মারা যাওয়া লোক কীভাবে ভেরিফাইড হয়। মূলত এমআইএস-এ ভুয়া নাম ভেরিফাইডের যে দালাল আমরা তাকে খুঁজে বের করবো। এছাড়াও নিহত সাইফ আরাফাত শরীফের মা’কে আমরা টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ফোন দিলে তিনি মামলা দিয়ে আমাদের ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে কথা বললে ছেলে হত্যা মামলায় নাম দিয়ে দেয়ার হুমকিও দেন তিনি।

এসব প্রতারণার ব্যাপারে জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রধান ভেরিফিকেশন অফিসার মো. হারুন মানবজমিনকে বলেন, আমরা প্রতিদিনই  নানা কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয় খুঁজে বের করছি। জুলাই ফাউন্ডেশনের বরাদ্দকৃত অর্থ যেন প্রকৃত আহত এবং নিহত পরিবারই পেয়ে থাকে আমরা সেটা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। যারা ইতিমধ্যে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা বাগিয়ে নিয়েছে তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে আমরা অবশ্যই টাকা উদ্ধার করবো।

এদিকে প্রতারণার অভিযোগে জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহেল মিয়ার করা রমনা থানার মামলায়, জুনায়েদ  এবং আবুল কালাম নামে দুই ব্যক্তির জামিন হয়েছে। জুলাই ফাউন্ডেশনের লিগ্যাল অফিসার এডভোকেট পায়েল মানবজমিনকে বলেন, মঙ্গলবার জুনায়েদ নামের এক প্রতারক তার হাতিয়ে নেয়া টাকার মধ্যে ২০ হাজার টাকা দিয়ে বাকি টাকা পরবর্তী শুনানিতে দেয়া শর্তে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। আবুল কালাম নামের আরেক ব্যক্তি পরবর্তী শুনানিতে টাকা ফেরত দেয়ার শর্তে জামিন পেয়েছেন।

mzamin


Sunday, March 16, 2025

প্রতারণার নয়া ফাঁদ by শুভ্র দেব ও পিয়াস সরকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। ডিবি থেকে রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবার ও পাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্ত হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি। নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির এলামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটারসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মূহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা অশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলায় দেয়। সজীব জানায় বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আর টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটো গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেবার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রীম ঈদের শুভেচ্ছ, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল বন্ধ করে রাখে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী  থানায় মামলা বা জিডি করছেন না। যদি থানায় অভিযোগ আসে তবে আমরা অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। তবে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছি। মানুষকে সচেতন হতে হবে। না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। প্রয়োজনে অবশ্যই পুলিশের সাহায্য নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। একেক সময় একেক ধরনের ফাঁদ পাতে তারা। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। মানুষকে সচেতনতার জন্য বলছি।

mzamin

Tuesday, March 4, 2025

এ কেমন বাটপারি! by সাজ্জাদ হোসেন

জুলাই অভ্যুত্থানে চরম বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন বিপ্লবী ছাত্র-জনতা। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর বুলেটের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলে জীবন দিয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। আহত হয়েছেন ২২ হাজারের বেশি মানুষ। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে জুলাই শহীদ ফাউন্ডেশন। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই ফাউন্ডেশন থেকে শহীদ পরিবারকে অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে একইসঙ্গে আহতদের চিকিৎসা খরচ ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে। মানবিক এই কাজের প্রতিষ্ঠান থেকেও প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এ পর্যন্ত অনেকে এভাবে তর্থ হাতিয়ে নিয়েছে যাদের অন্তত ৫০ জন ভুয়া তথ্য দিয়ে ফাউন্ডেশন থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার তথ্য মিলেছে। যাদের শনাক্ত করে ইতিমধ্যে অর্থ ফেরত চাওয়া হয়েছে। প্রতারণার অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যাদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বাড়িতে মারামারি করে আহত হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মারামারিতে আহত হয়েও ফাউন্ডেশন থেকে সাহায্য নেয়ার পর বিষয়টি ধরা পড়েছে ফাউন্ডেশনের যাচাইয়ে।

নয়ন শিকদার নামের এক ব্যক্তি শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট কমে যাওয়ার কারণে এক সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনেও তাই লেখা ছিল। কিন্তু শরীরের বিভিন্নস্থানে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে, ফটোশপের মাধমে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন এমন ছবি তৈরি করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জুলাই ফাউন্ডেশনে আহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তের আবেদন করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ‘ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)’-এ প্রায় ২ মাস আগেই তার সকল তথ্য ভেরিফাইড হয়। নয়নের প্রতারণায় বিভ্রান্ত হয়ে সিভিল সার্জন অফিসও প্রকৃত আহত হিসেবে এমআইএস-এ তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। কিন্তু জুলাই ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন সেলের তৎপরতায় ধরা পড়ে এই প্রতারক।
রাশেদুল ইসলাম নামের আরেক জন ৭ই আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকার জাতীয় অর্থপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু) হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু গত ৪ঠা আগস্ট পাবনায় আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি আহত হয়েছেন এমন তথ্য দিয়ে ইতিমধ্যে আহতদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা তুলে নেন। সম্প্রতি আহতদের জন্য বরাদ্দকৃত দ্বিতীয় ধাপের টাকা পাওয়ার জন্য পুনরায় আবেদন করেন। জুলাই ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন সেলের সন্দেহ হলে, তাকে ফাউন্ডেশনের অফিসে ডাকা হয়। তার মেডিকেল রিপোর্টে ‘আরটিএ’, অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এমন লেখা থাকার ব্যাখ্যা চায় ফাউন্ডেশন।
জবাবে প্রথমে আন্দোলনে গিয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়েছেন এমন কথা বলেন তিনি, পরে ৭ই আগস্টে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিজয় মিছিলে গিয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন রাশেদুল। জুলাই ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তার দাবি মিথ্যা বলে জানতে পারে। একপর্যায়ে রাশেদুল ও তার বোন স্বীকার করেন যে, কোনো আন্দোলনে তিনি আহত হননি। পরে এক মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দেবেন এই মর্মে ২রা মার্চ ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন সেলের কাছে মুচলেকা দিয়ে মামলা হতে আপাতত রেহাই পান তিনি।
রুনা আক্তার নামের একজন নারী ফাউন্ডেশনে এসেছিলেন আন্দোলনে আহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য। পারিবারিক ঝগড়ায় ঠোঁট ফেটে গিয়ে আহত হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। এর চিকিৎসা সনদ নিয়ে তিনি আন্দোলনে আহত হয়েছেন দাবি করে সহায়তা দাবি করেন। ফাউন্ডেশন যাচাই করে সত্যতা না পেয়ে তাকে কোনো সহায়তা দেয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ‘ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)’-এর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আহতদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা তুলে নেন বেলাল হোসেন নামের এক অটোরিকশাচালক। পুঙ্গ পাসপাতালে ভর্তি এই ব্যক্তির একটা পা কেটেও ফেলতে হয়েছে। কিন্তু ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন সেলের কাছে তথ্য আসে বেলাল আন্দোলনে আহত ব্যক্তি নন। পরে ভেরিফিকেশন টিম তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের পরে জানতে পারে ৩০শে ডিসেম্বর তার অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময় ছিনতাইকারীর গুলি ও ছুরিকাঘাতে আহত হয় বেলাল।

যেহেতু তিনি একটি পা হারিয়েছেন এবং আর্থিকভাবেও তেমন সচ্ছল নন তাই মানবিক কারণে বেলালের নামে আর প্রতারণার মামলা দেয়নি ফাউন্ডেশন। তবে টাকা ফেরত দেয়ার মুচলেকা দিতে হয়েছে তাকে।

জুনায়েদ নামের আরেক প্রতারক দেশের বিভিন্নস্থানে আহতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমআইএস-এ নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য যোগাযোগ করতো। আহতদের নানা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলতো, ইতিমধ্যে জুলাই ফাউন্ডেশনের বরাদ্দকৃত টাকা দেয়া শেষ। আপনারা এখনো যেহেতু এমআইএস-এ নাম অন্তর্ভুক্তি করেননি তাই আপনারা আর টাকা পাবেন না। আমার কাছে লোক আছে, আমি আপনার নাম এমআইএস-এ যোগ করে দিবো বিনিময়ে ফাউন্ডেশন থেকে যত টাকা পাবেন তার অর্ধেক টাকা আমাকে দিতে হবে। এতে সফলও হয়েছে সে। পঙ্গু হাসপাতালের এক আহতের বাবার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেয় সে। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জুনায়েদকে ডেকে আনা হয় ফাউন্ডেশনের অফিসে। জুনাযেদ তার অপরাধ স্বীকার করলে ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দেয়া মামলায় জেলহাজতে পাঠানো হয়।

জুলাই ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন সেলের সমন্বয়ক সাইদুর রহমান শাহীদ মানবজমিনকে বলেন, আমরা জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত আহতদের সেবা দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আহতদের নাম তালিকাভুক্তির জন্য আমরা মূলত মেডিকেল সার্টিফিকেটগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করি। এ ছাড়াও আহত ব্যক্তি কখন আন্দোলনে গিয়েছিল, কীভাবে আহত হয়েছিল, তার দেয়া তথ্য নানাভাবে যাচাই করি। এ ছাড়াও স্থানীয় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য নিয়ে তারপর আহতদের নাম তালিকাভুক্ত করি। কিন্তু পঙ্গু হাসপাতালে একসঙ্গে অনেক লোক ভর্তি থাকায় কিছু ভুয়া লোক আহত সেজে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এসব ভুয়া আহতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
জুলাই ফাউন্ডেশনের লিগ্যাল অফিসার এডভোকেট পায়েল ভুয়া আহতদের ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে কিছু ভুয়া আহতদের নাম শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা ভুয়া আহতদের চিহ্নিত করে মামলা দেয়া, মুচলেকা নেয়া এবং টাকা ফেরত চেয়ে শোকজ নোটিশ দেয়াসহ মোট ৩ রকমের ব্যবস্থা নিচ্ছি।

প্রতারণার মাধ্যমে আহত সেজে টাকা নেয়ার গুরুতর অভিযোগে জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে রাজধানীর রমনা থানায় দেয়া ২টি মামলায় ৩ জন জেলহাজতে আছে। প্রায় ৫০ জনের অধিক প্রতারক আমাদের কাছে মুচলেকা দিয়েছে এবং টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। যদি সময়মতো টাকা না দেয় তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।
এ ছাড়াও যেসব আহত কিংবা নিহতদের পরিবারের সদস্য এককভাবে বরাদ্দকৃত টাকা উঠিয়ে নিয়েছে, অন্য অংশীদারদের বঞ্চিত করেছে তাদের নোটিশের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। যদি কাজ না হয় পরবর্তীতে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।

জুলাই ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তিনটি উইংয়ে কাজ করছে। কেউ যদি ভুল তথ্য দিয়ে ফাউন্ডেশন থেকে টাকা নিয়ে যায় অথবা নেয়ার চেষ্টা করে, আমরা তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিবো।

mzamin

Sunday, March 2, 2025

আমেরিকা পাঠানোর কথা বলে নেপালে জিম্মি: ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ

কুমিল্লায় আমেরিকা নেয়ার কথা বলে নেপাল নিয়ে জিম্মি করে তারেক আজিজি নামে এক যুবকের পরিবারের কাছ থেকে ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে আশেক এলাহী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী তারেক আজিজ কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈশাতুয়া ইউনিয়নের খানাতুয়া গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে। অভিযুক্ত আশেক একই উপজেলার তাহেরপুর গ্রামের মৃত ইছহাক মিয়ার ছেলে। তিনি কুমিল্লা পশ্চিম অঞ্চলের ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ সংলগ্ন একটি রেস্টুরেন্টের হলরুমে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তারেক বলেন, বিগত ২০২৩ সালের ১১ই নভেম্বর দুপুরে আশেক তার বাবাকে জানান, তার ছেলেকে কম কষ্টে সহজ রুটে আমেরিকা নেয়া হবে। বিনিময়ে ৪৫ লাখ টাকা দিতে হবে। আশেক আরও জানান, বৈধ পথে ঙহ অৎৎরাধষ ভিসায় নেপাল গিয়ে সেখান থেকে ইঋঝ এর মাধ্যমে ভিসা নিয়ে ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো বর্ডার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। আশেক একজন রাজনীতিবিদ হওয়ায় তারেকের বাবা ছেলের
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে রাজি হয়। পরে আশেক এবং তারেক ও তার পরিবারকে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার টুরিজম এইড লিমিটেড নামে একটি এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে চুক্তি হয় ৪৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রথমে ২ লাখ টাকাসহ পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে জমা নেন। বাকি ৪৩ লাখ টাকা তারেক মেক্সিকো অবস্থান করছেন এমন সত্যতা নিশ্চিত করলে মধ্যস্থতাকারী লাকসাম উপজেলার আঙ্গারিয়া এলাকার বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেজাউল করিম রতনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারেককে নেপালের কাঠমুণ্ডুর একটি গোডাউনে নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেয় আশেকের ভাড়া করা লোকজন। পরে তারেকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস রেকর্ড পাঠাতে বাধ্য করে ‘তারেক মেক্সিকো অবস্থান করছে বলে’ বলতে। তারেক বাধ্য হয়ে তার বাবাকে ভয়েস পাঠান। রেকর্ড পেয়ে তার বাবা চুক্তির বাকি ৪৩ লাখ টাকার মধ্যে ৪০ লাখ টাকা রেজাউলের অ্যাকাউন্টে এবং ৩ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করেন।

টাকা পাওয়ার পর, চক্রটি তারেকের চোখ-মুখ বেঁধে গাড়িতে করে কাঠমুণ্ডুর একটি রাস্তায় ফেলে চলে যায়। পরে ঘটনার কথা তারেক তার বাবাকে ফোন করে বিস্তারিত জানান।

পরে নেপাল পুলিশের সহযোগিতায় আউট পাসের মাধ্যমে ওই বছরের ২৩শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরত আসেন তারেক। পরে স্থানীয় গণ্যমান্যদের সহায়তায় কয়েক দফায় সালিশ বৈঠক বসে। সালিশে আশেক ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্ষতিপূরণসহ ৪৬ টাকা পরিশোধ করবেন বলে স্ট্যাম্প করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তারেক অভিযোগ করে বলেন, স্ট্যাম্প দেয়ার পরেও আশেক ১ টাকাও পরিশোধ না করে উল্টো হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের ৯ই মে ঢাকার মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে চারজনকে আসামি করে মামলা করেন তারেক। কিন্তু মামলার পর পরোয়ানা জারি হলেও অদ্যাবধি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মশিউর রহমান বলেন, এ মামলার দেড় মাসের মধ্যে আমি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছি। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

mzamin

Monday, November 25, 2024

ভারতে ‘যৌন ব্যবসায়’ বাধ্য করা হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণীদের

দেহব্যবসা করাতে বাংলাদেশি ২৩ তরুণীকে নেওয়া হয়েছে ভারতে। দেশ থেকে তাদের নেওয়া হয় চাকরির কথা বলে। মাসে ৬০ হাজার রুপি বেতন দেওয়া হবে, এমন প্রলোভনে ভারতে নেওয়া হয় ওই তরুণীদের। কিন্তু সেখানে নিয়ে আটকে রাখা হয় তাদের। পরানো হয় যৌন আবেদনময়ী সব পোশাক। এরপর ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে তা পাঠিয়ে দেওয়া হয় খদ্দেরের কাছে।

হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো ছবি থেকে পছন্দের তরুণীকে বাছাই করেন খদ্দেররা। এরপর কথামতো বাংলাদেশি ওই তরুণীদের পাঠানো হয় আবাসিক কোনো হোটেল বা রিসোর্টে, বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে।

দিনের পর দিন এভাবেই জোর করে বাংলাদেশি ২৩ তরুণীকে দিয়ে দেহব্যবসা করিয়ে আসছে একটি চক্র। সম্প্রতি ভারতের ওড়িশার রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে চক্রটির সন্ধান পেয়েছে সেদেশের পুলিশ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ওড়িশাটিভি রোববার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে- এই তরুণীরা বড় ধরনের মানবপাচারের শিকার। তাদের দৈনিক ২ হাজার রুপি বেতনের কাজের লোভ দেখিয়ে ভুবনেশ্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের দিয়ে যৌন ব্যবসা করানো হচ্ছে।

এই যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকা দালালরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খদ্দেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যখন কোনো খদ্দের আগ্রহ প্রকাশ করেন তখন তাদের বাংলাদেশি তরুণীদের ছবি পাঠানো হয়। সেখান থেকে যে কোনো একজনকে বেছে নেয় তারা। এরপর আগেই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। সর্বশেষে ওই খদ্দেরকে হোটেলের ঠিকানা দেওয়া হয় যেখানে নির্দিষ্ট তরুণী অপেক্ষা করেন।

ওড়িশাটিভি জানিয়েছে, কোটাক থেকে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে উদ্ধারের পর পুরো বিষয়টি সামনে আসে। ওই কিশোরীকে লিংক রোডের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তদন্ত শুরু হয়—কীভাবে বাংলাদেশি তরুণীদের ওড়িশায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া এক যৌনকর্মী জানান, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি এখানে আটকা পড়ে গেছেন। উদ্ধারকৃত ওই যৌনকর্মী জানান, পুরো বিষয়টি পরিচালনা করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

প্রতারণার শিকার এই তরুণীদের কয়েক বছর ধরে আটকে রেখেছে চক্রটি। যারা এরসঙ্গে জড়িত তাদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় যেসব দালাল এই যৌনব্যবসায় জড়িত, তাদের খুঁজে বের করতে অভিযান শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ।

ভুবনেশ্বরের উপপুলিশ কমিশনার পিনাক মিশ্রা ওড়িশাটিভিকে বলেন, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, যারা এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত, শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছবি : সংগৃহীত

Monday, October 14, 2024

পাঁচ মিলিয়ন ডলারের লোভ দেখিয়ে প্রতারণা

যুক্তরাষ্ট্রে মারা যাওয়া কথিত ব্যক্তির বীমার পাঁচ মিলিয়ন ডলারের লোভ দেখিয়ে অভিনব উপায়ে প্রতারণার মাধ্যমে ১৭ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে আজিজ মোল্লা নামে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি’র নিউমার্কেট থানা পুলিশ। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গতকাল সকালে রাজধানীর খিলগাঁও থানা পুলিশের সহায়তায় বনশ্রীর মডেল এজেন্সি নামের একটি অফিস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ৯টি ব্যাংকের ৯টি চেক বই, ৩টি এটিএম কার্ড, দু’টি ভিসা কার্ড ও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল জব্দ করা হয়। ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, গত ২৯শে সেপ্টেম্বর দুপুরে ‘Anna Harrison’ নামের ফেসবুক আইডির সঙ্গে বাদী নুরুজ্জামানের যোগাযোগ হয়। সেই ব্যক্তি বাদীকে একটি হোয়াটস অ্যাপ নম্বর দিয়ে কথা বলতে বলেন। হোয়াটহ অ্যাপে তিনি বাদীকে জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ বেলটন নামে এক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত থাকা অবস্থায় মারা যান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এলাইনস ব্যাংকে বেলটনের পাঁচ মিলিয়ন ডলার জমা রয়েছে। তিনি বাদীকে মৃত ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দেয়ার জন্য বলে এবং এলাইনস ব্যাংক ম্যানেজারের আরেকটি হোয়াটস অ্যাপ নম্বর দেয়।

তিনি বলেন, ‘Anna Harrison’ তার বানানো ম্যাসেজ সেই ব্যাংক ম্যানেজারকে দিতে বলে। তারপর বাদীকে তিনি তার কথিত আইন উপদেষ্টার নম্বর দিলে বাদী তার সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। কথিত আইন উপদেষ্টা বীমার টাকা পাওয়ার জন্য বাদীকে ৭৬ হাজার ডলার প্রেরণ করতে বলে। পরবর্তী সময়ে ‘Anna Harrison’ ৭৬ হাজার ডলার পরিশোধের একটি পেমেন্ট স্লিপ বাদীকে প্রদান করে। কথিত ব্যাংক ম্যানেজার বীমার ৫ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য একটি শিপিং কোম্পানির কাছে দু’টি লাগেজ প্রদান করেছে বলে বাদীকে জানায় এবং প্রমাণস্বরূপ একটি ভিডিও দেখায়। ব্যাংক ম্যানেজার বীমা খরচ এবং ডেলিভারি খরচ বাবদ ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা প্রদান করার কথা বললে বাদী তার কথামতো ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের উত্তরা শাখার একটি অ্যাকাউন্টে তা প্রদান করে।

ডিসি বলেন, এরপর গত ৩রা অক্টোবর সকাল ৮টায় একটি নম্বর থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে ঢাকা বিমানবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দেয় এবং বাদীর দু’টি লাগেজ কাস্টমসে আটকে আছে বলে জানায়। লাগেজ দু’টি ছাড়াতে ৪ লাখ ৭ হাজার টাকা দেয়ার কথা বললে বাদী তাদের কথামতো ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে তা দেন। এরপর বাদী কথিত কাস্টমস কর্মকর্তার কথামতো আয়কর ও ট্যাক্স বাবদ আরও ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইসলামী ব্যাংকের আরেকটি অ্যাকাউন্টে দেন। এসব টাকা প্রদান করার পরও তাদের পক্ষে বাদীর কাছে আরও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এভাবে বারবার টাকা চাওয়ায় বাদীর সন্দেহ হলে তিনি বিমানবন্দর কাস্টমসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কাজ। তিনি বলেন, এভাবে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটি বাদীর কাছ থেকে সবমিলিয়ে ১৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনায় বাদী নুরুজ্জামানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে শনিবার নিউমার্কেট থানায় প্রতারণার মামলা করা হয়। ওই মামলায় আজিজ মোল্লাকে খিলগাঁও থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আজিজ মোল্লা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

mzamin


Sunday, October 13, 2024

বিধ্বস্ত বীমা খাতে গ্রাহকদের হাহাকার by এমএম মাসুদ

রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন আবদুল হাকিম। উদ্দেশ্য একটি নামকরা বীমা কোম্পানির হেড অফিসে গিয়ে বীমার টাকা উদ্ধার করা। তার সহ এলাকার আরও কয়েকজনের অর্ধডজন পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু টাকা তুলতে পারছেন না। এ টাকার পেছনে ঘুরছেন প্রায় দুই বছর ধরে। হাকিম জানান, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর  যখন তারা টাকা তুলে নিতে চান, তখন স্থানীয় বীমা কোম্পানির অফিস থেকে চাপ দেয়া হয় টাকাটা একই কোম্পানিতে ডিপিএস করে রাখতে। কিন্তু আমরা ডিপিএস করতে রাজি হইনি। আমরা টাকা তুলতে চেয়েছি। হেড অফিসে জানালে তখন বলা হয় যে, টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো বলে আগামী মাসে আসেন, কখনো বলে চেক হয় নাই। কখনো বলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাই। একেকবার একেক কথা। শুধু হয়রানি।

শুধু আবদুল হাকিম নয়, তার মতো অনেকেই বীমা করতে আগ্রহী হন না। ঢাকার একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জাইমা ইসলাম জানান, তার কাছে মাঝে মধ্যে এজেন্ট বা প্রতিনিধিরা আসেন বীমা করাতে। কিন্তু তার এতে আস্থা নেই। তার মতে, দেশের বীমা সিস্টেমটাই একটা ফটকা মনে হয়। টাকা কাকে দিচ্ছি। আসলেই এ টাকা ফেরত পাবো কি-না এটি আমি জানি না। তাই ব্যাংকে ডিপিএস করি কিন্তু বীমা করিনি।

আরেকজন স্কুল শিক্ষক কাকন বেগম বলেন, তার স্বামী কয়েক বছর আগে বীমা করেছিলেন। কিন্তু পরে জমা দেয়া টাকাটাই আর ফেরত পাননি। ফলে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, অঙ্গহানিসহ এ ধরনের ঘটনায় বীমা না করায় আর্থিক সুবিধার বাইরেই থাকছেন অধিকাংশ মানুষ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবীমার প্রসার না ঘটায় চিকিৎসাখাতেও মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বীমা খাতে প্রকৃত এজেন্ট তৈরি না হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকরা এজেন্টদের দ্বারা প্রতারণার শিকার হওয়ায় বীমা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা বিরাজ করছে। ফলে এ শিল্পের বিকাশে বাধা হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে বীমা কার্যক্রম শুরু হলেও এখন বিভিন্ন ধরনের বীমার আওতায় আছে দুই কোটিরও কম মানুষ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের চরম অনাস্থার কারণে এ বিষয়ে মানুষের আগ্রহ কম।

সাধারণ মানুষ কী ভাবে: মানুষ মনে করে, আমরা ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম অব্যাহতভাবে দিয়েছি। কিন্তু যখনই আমার প্রয়োজনটা দেখা দিচ্ছে অর্থাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে, তখন আমরা কোম্পানির কাছে যাচ্ছি। কিন্তু টাকা পাচ্ছি না। এখান থেকে ওখানে ঘুরাচ্ছে। তাহলে যে ঝুঁকি মেটানোর জন্য ইন্স্যুরেন্স করলাম, আমার তো সে উদ্দেশ্য পূরণ হলো না। বীমা কোম্পানির এজেন্ট বা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সন্তোষজনক সেবা পাচ্ছি না। ফলে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বীমা খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে আস্থা পাচ্ছে না সাধারণ গ্রাহক। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাজার। এ খাত থেকে টাকা পয়সা তছরুপ করে নিয়ে পালিয়েছেন অনেকে। দীর্ঘদিন ঘুরেও বীমার টাকা তুলতে পারেননি তারা। ফলে বীমা পলিসি নেয়ার ক্ষেত্রেও অনীহা কাজ করছে। এ খাতের প্রতি আস্থা বাড়াতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন জরুরি বলে মত দেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিশ্লেষকদের মন্তব্য: আইডিআরএ’র সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, এটা ঠিক যে, দেশের সার্বিক অর্থনীতি যে গতিতে এগোচ্ছে, বীমা খাত সেভাবে এগোতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বীমাবান্ধব নয়। সরকারি বাধ্যবাধকতা অর্থাৎ আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলে কেউ বীমা করে না। এ ছাড়া, অনেক প্রতিষ্ঠান বীমা দাবি পরিশোধ না করায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

দাবি নিষ্পত্তির হার:
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৬৫.১৯ শতাংশ। এক বছর আগে যা ছিল ৬১.১৬ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আইডিআরএ’র তথ্যে দেখা গেছে, লাইফ ও নন-লাইফ উভয় বীমার ক্ষেত্রেই নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে ২০২৩ সালে ৭২ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া নন-লাইফ বীমার ক্ষেত্রে আগের বছরের ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ৪১ শতাংশ।

আইডিআরএ’র ২০ সালের প্রতিবেদন বলছে, বীমা কোম্পানিগুলোতে এখনো অনেক বীমা দাবি মেয়াদ শেষে নিষ্পত্তি হচ্ছে না, অর্থাৎ গ্রাহক টাকা বুঝে পাচ্ছেন না। জীবন বীমার ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির হার ৬৭ শতাংশ। আর সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ।

৯০ ভাগ মানুষ বীমার বাইরে:
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে ৮২টি বীমা প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে লাইফ ৩৬টি আর নন-লাইফ ৪৬টি। বর্তমানে ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে বীমার আওতায় আছে মাত্র ১ কোটি ৭১ লাখ মানুষ, যা শতাংশের হিসাবে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ এখনো বীমা সেবার বাইরে রয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে মোট বীমার পরিমাণ ছিল এক কোটি ১৪ লাখ ২ হাজার ৮৬৯টি, যা ২০২৩ সালে কিছুটা কমে হয়েছে ৯৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯৯টি। এ সময়ে লাইফে কমলেও নন-লাইফে বীমার পরিমাণ বেড়েছে।

গবেষাণা সংস্থাগুলোর তথ্য:
সিপিডি’র এক তথ্যে বলা হয়, বীমা খাত থেকে টাকা পয়সা নিয়ে অনেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ঘুরেও বীমার টাকা তোলা যাচ্ছে না। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বর্তমানে তীব্র আস্থা সংকটে পড়েছে খাতটি। এ খাতের প্রতি আস্থা বাড়াতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন জরুরি।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বীমা খাতের বিস্তার না হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আস্থাহীনতার কথা। আর এই আস্থাহীনতার মূল কারণ পাওনা দাবি নিষ্পত্তিতে জটিলতা।
সূত্রমতে, দেশের বীমা খাত শুরু থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বীমা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১১ সালে অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সেই হিসাবে আইডিআর-এর বয়সও ১৩ বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও বীমা খাত যেন সেই এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখনো জিডিপি’র তুলনায় বীমা খাতের অবদান মাত্র আধা শতাংশ।

mzamin

Saturday, October 12, 2024

গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের দিয়ে দেহব্যবসা, পেছনে ছাত্রলীগ নেতা?

প্রবাসী ও ধনী ছেলেদের টার্গেট করে খুলনায় ভয়ংকর প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জাল বিছিয়েছে একটি চক্র। চক্রটি গ্রাম থেকে শহরে আসা মেয়েদের টার্গেট করে প্রথমে অল্প ভাড়ায় ফ্ল্যাটে আশ্রয় দেয়। তারপর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে সবার মাঝে পরিচিত করে। সর্বশেষ কৌশলে বাধ্য করে দেহ ব্যবসায়। একই সঙ্গে ওই মেয়েদের দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেও চলে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ।

এসব ছাড়াও চক্রটির বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, মাদক ব্যবসা, এমনকি নারী পাচারের ভয়ংকর অপরাধেরও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী এক প্রবাসীর করা অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে কালবেলা। অনুসন্ধানেই বের হয়ে আসে খুলনার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের টার্গেট করে দেহ ব্যবসা এবং মাদকের ভয়ংকর সিন্ডিকেটের তথ্য।

কাতার প্রবাসী বিলাল (২৬)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক হয় খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়া নুসরাত জাহান অর্নার সঙ্গে। নুসরাত ও তার মায়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো বিলালের। বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ২১ লাখ টাকা নিয়েছে মা ও মেয়ে। প্রেমের ২ বছরের মাথায় ক্যানসার আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা করাতে দেশে ফেরেন বিলাল। কিন্তু ফেরার মাত্র একদিন পরই আসল চেহারা দেখায় নুসরাত। তার সিন্ডিকেট দিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায় বিলালের ওপর। দেওয়া হয় মামলা।

বিলাল বুঝতে পারেন প্রেমের নামে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ২৬ দিন পর কারামুক্ত হন তিনি। এরপর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পাল্টা মামলা করেছেন বিলাল। মামলায় এসআই সুকান্ত, নুসরাত জাহান অর্নাসহ চক্রের ৫ সদস্যকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই কর্মকর্তা ইকবাল।

বিলাল অভিযোগ করে বলেন, সাড়ে পাঁচ বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে এসে ক্যানসারে আক্রান্ত পিতার চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নুসরাত আর তার সিন্ডিকেট যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। এসআই সুকান্ত নামে এক পুলিশের মাধ্যমে আমাকে ‘ক্যাসল সালামে’ ডেকে নেওয়া হয়। তারপর আমার মোবাইল কেড়ে নিয়ে আমাকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়। ওসির রুমে অন্তত ৭/৮ জন আমাকে নির্মম নির্যাতন করে। ইলেকট্রিক শক দেয়। আমাকে মারধরের ভিডিও আমার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু বড় ভাই মাত্র দেড় লাখ টাকা দিতে পারেন। তবে টাকা কম দেওয়ায় আমাকে না ছেড়ে উল্টো আমার মোবাইলে কিছু অশ্লীল ভিডিও পাঠিয়ে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা দেয়। রিমান্ডে নিয়ে আবারও নির্যাতন করে। রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর ২৬ দিনের মাথায় আমি জামিনে মুক্তি পাই।

শুধু বিলাল না, কালবেলার হাতে আসে এই চক্রটির হাতে প্রতারিত ও নির্যাতনের শিকার এমন আরও অন্তত ৬ ভুক্তভোগীর তথ্য। এদের মধ্যে ইরাক প্রবাসী, দুজন ছাত্র ও দুজন ব্যবসায়ী রয়েছেন।

এমনই এক ব্যক্তি ইরাক প্রবাসী শাকিল (ছদ্মনাম)। কালবেলাকে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে ইরাকে থাকাকালে আমার সম্পর্ক হয় তাসমি নামে এক মেয়ের সঙ্গে। প্রেমের অভিনয় করে পড়াশোনা ও ভরণপোষণ বাবদ আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা নেয়। এক পর্যায়ে তাসমি ও তার চক্র সম্পর্কে জেনে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিই আমি। কিন্তু দেশে আসার পর আমার ওপর তারা নির্যাতন চালায়। আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের দেহ ব্যবসার অংশে নেতৃত্ব দেন সোনাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাহিম হাসান আকাশ। অনিক নামে একজনের গাড়িতে সাতক্ষীরা থেকে নিয়মিত ফেনসিডিল ও গাঁজার চালান আনতেন বলে অভিযোগ আছে। নগরীর মজিদ স্মরণী রোডের ধাবা রেস্টুরেন্টে চলে এসব ফেনসিডিল ও গাঁজার অবৈধ বেচাকেনা।

রেস্টুরেন্টের সাবেক এক কর্মচারী কালবেলাকে বলেন, এলাকার কাউন্সিলর রাজুল ইসলাম রাজুর ডান হাত হিসেবে পরিচিত হওয়ায় রেস্টুরেন্টটি মূলত ফাহিমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। যা ইচ্ছা তাই করত। এখানেই মাদক সেবনসহ সব ধরনের অপকর্ম করত সে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিশেষ করে যারা গরিব এবং সুন্দরী তাদের টার্গেট করেন ফাহিমের কথিত স্ত্রী নুসরাত তাসমি। তাসমির বিরুদ্ধে ইরাক প্রবাসী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ধনীর ছেলেদের টার্গেট করে কৌশলে ফাঁসিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক প্রমাণ মিলেছে।

গ্রুপের অপর সদস্য নুসরাত জাহান অর্না। কাতার প্রবাসী ব্যবসায়ী, কলেজ শিক্ষার্থী, মোটরসাইকেল শোরুম মালিক এবং এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অর্নার এসব কাজে তার মূল হাতিয়ার মা সালমা বেগম। এ ছাড়া সুমাইয়া সুলতানা রিমা নামে গ্রুপের অপর সদস্যের নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, ভয়ংকর এই চক্রের গড মাদার হিসেবে রয়েছে ফাতেমা আফরোজ। খুলনা অনলাইন শপিং নামে এক ফেসবুক পেজের এডমিন তিনি। মিল শ্রমিক বাবার দরিদ্র সংসারের মেয়ে ফাতেমা আফরোজ এখন একাধিক ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিক। খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, শেখ সোহেলের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কাজী ফয়েজ এবং একজন সাংবাদিক নেতার বন্ধু হিসেবে পরিচিত এই ফাতেমা আফরোজ।

দীর্ঘদিন ব্ল্যাকমেইল হওয়া এক নারী শিক্ষার্থী কালবেলাকে বলেন, আমার মতো গ্রাম থেকে আসা অনেকেই এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছে। নর্দান এবং নর্থওয়েস্টার্ন এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এবং বর্তমান কিছু শিক্ষার্থী সোনাডাঙ্গা দ্বিতীয় ফেজ আবাসিক এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এসব অবৈধ কার্যক্রম চালায়। আমি এদের বিচার চেয়ে কোথাও বিচার পাইনি। পরে আত্মহত্যা করার জন্য আমি ছাদ থেকে লাফ দিই। কিন্তু প্রাণে বেঁচে যাই। সেখান থেকে আমি খুলনার বাইরে। এখনো খুলনায় যেতে পারছি না।

অভিযোগের বিষয়ে ফাহিম হাসান আকাশ বলেন, কাতার প্রবাসী যে ছে‌লে সব জায়গায় অভিযোগ ক‌রে‌ছে তার সা‌থে অর্ণা না‌মে এক মে‌য়ের সম্পর্ক ছি‌ল। অর্ণা আমা‌দের ছোট বোন। অর্ণার সাথে কোনো ছেলেকে কথা বলতে দেখলে বা জানলে ওই কাতার প্রবাসী তাকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিত। এভাবে অর্ণার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। আমরা শুনেছি যে, ওই ছেলে কাতার থেকে ফিরেছে এবং পুলিশ তাকে এসব অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। তখন আমিসহ অন্তত ৫০-৬০ জন সদর থানায় তা‌কে দেখ‌তে যাই। কিন্তু আর কোনোদিন তার সাথে আমার দেখা বা কথা হয়‌নি।

তিনি বলেন, আমার স্ত্রী তাস‌মি ওই ছে‌লেটার কাছ থে‌কে কোনো টাকা নেয়নি। আমার স্ত্রী বরং ওকে বি‌ভিন্ন সময়ে টাকা পা‌ঠি‌য়ে‌ছে যার তথ‌্য আমার কা‌ছে আছে।

অভিযোগের বিষয়ে চক্রের অন‌্যতম সদস‌্য নুসরাত তাস‌মি কাল‌বেলা‌কে ব‌লেন, সাইমুম না‌মে আমার কোনো স্বামী নেই। দুই বছর আগে আমা‌দের একটা সম্পর্ক ছি‌ল। এখন তার লাইফ নি‌য়ে সে ভা‌লো আছে, আমার লাইফ নি‌য়ে আমি ভা‌লো আছি। আমাদের বিষয় সে‌টেল্ড হ‌য়ে গে‌ছে, এই বিষয় নি‌য়ে আমি আর কোনো কথা বল‌তে চাই না। অপরদিকে ফা‌তেমা আফ‌রো‌জের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একা‌ধিকবার কল দি‌লেও কলটি রিসিভ হয়নি। পরে অভিযোগের বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তার কোনো রিপ্লাই পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মো. মনিরুজ্জামান মিঠু কালবেলাকে বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। অপরাধের সঙ্গে পুলিশ সদস্য বা যেই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রতীকী ছবি

Saturday, October 5, 2024

চিকিৎসার নামে প্রতারণা, কোটিপতি কবীর by নূর ইসলাম

মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন প্রকার যৌন সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসার নামে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে প্রতারণা করে মিলিটারি কবীর এখন কোটিপতি। মানুষ ঠকানোর অর্থে তিনি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের খিতিবদিয়া গ্রামে গড়ে তুলেছেন রাজপ্রাসাদ। জমি ক্রয় করে গড়ে তুলেছেন একটি ছয়তলা ও একটি চারতলা বিশিষ্ট আলিশান বাড়ি। ছাতিয়ানতলার মল্লিকপাড়ায় রয়েছে তার আরও একটি চারতলা বাড়ি। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় কিনেছেন প্রায় শতাধিক বিঘা ধানি  জমি।

স্থানীয়রা জানান, ‘গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ দুঃশাসনের সময় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বাড়ি হওয়ায় মিলিটারি কবীরের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। প্রতারিতরা সকলেই মুখবুজে তার প্রতারণা সহ্য করেছেন।’ গোপালগঞ্জের দাপট দেখিয়ে প্রতারক মিলিটারি কবীর এখন জিরো থেকে হিরো। বিগত দিনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেয়া হলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিলিটারি কবির ওরফে খন্দকার কবীর হোসেনের পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার নারিকেলবাড়িয়ায়। তার পিতার নাম ওসমান আলী খন্দকার ও মাতার নাম রিজিয়া খাতুন। তিনি সেনাবাহিনীর নন কমিশনে চাকরি করতেন। চাকরি জীবনের শেষ দিকে তিনি পোস্টিং নিয়ে যশোর সেনানীবাসে কর্মরত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি অবসরে যান। সে সময় সেনানীবাসের বাসা ছেড়ে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে পাশেই ছাতিয়ানতলা গ্রামে অধ্যাপক মশিউল আজমের বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস শুরু করেন। কবীর ভাড়া বাড়ির ছাদে গড়ে তোলেন একটি সুন্দর ছাদবাগান। ১ বছর পর তিনি ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় মাসুদ পারভেজের ভাড়াবাড়িতে চলে যান। সেখানে তিনি ননী ফল নার্সারি করেন। এরপর থেকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ননী ফল নার্সারিকে পুঁজি করে শুরু হয় খন্দকার কবীরের মানুষ ঠকানোর ব্যবসা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ননী ফল নার্সারির আড়ালে চিকিৎসার নামে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন খন্দকার কবীর হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে যৌন ও ক্যান্সার চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা শুরু করেন। যা নিয়ে সে সময় স্থানীয় একাধিক পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলে ২০২২ সালের ১৭ই মে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতারক কবীরের ডেরায় অভিযান চালায়। এ সময় আপাদমস্তক প্রতারক কবীরের মুখোশ উন্মোচিত হয়। তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৌম্য চৌধুরী ও সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ক্যান্সার ও যৌন চিকিৎসায় প্রতারণা ও অবৈধভাবে ভুয়া ওষুধ তৈরির দায়ে খন্দকার কবীর হোসেনকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও  এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। নামের পরে মিলিটারি শব্দ যোগ করায় কবীরকে বিশেষভাবে সতর্কও করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতারক কবীর জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ব্যবসা জোরদার করেন। একাধিক ফেসবুক পেজ খুলে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে (চিকিৎসা ও ওষুধ পাঠানোর নামে) মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় কবীর চক্র। ৯০ বছরের বৃদ্ধকে যৌন রোগের ওষুধ খাওয়ায়ে ১৭ বছরের যুবক বানানোর ঘোষণা দিয়েও তিনি প্রতারণা করেন। এসব অভিযোগে ২০২২ সালের ১৭ই অক্টোবর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ খন্দকার কবীর হোসেনের ডেরায় অভিযান চালায়। এ সময় কবীর হোসেন পালিয়ে রক্ষা পেলেও তার চার সহযোগীকে আটক করে পুলিশ। পরে এসআই মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বাদী হয়ে কবীর ও তার ৪ সহযোগীর নামে মামলা করেন। কিছু দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর তিনি ফের প্রতারণার ব্যবসা শুরু করেন। এদিকে ২০২৩ সালের ১৪ই জানুয়ারি রাতে খন্দকার কবীর ফের আটক হন। কুষ্টিয়া সদর থানা পুলিশ একটি প্রতারণা মামলায় নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করে। পুলিশ জানায়, কুষ্টিয়ার সরকারি একটি দপ্তরে অফিস সহকারী পদে কর্মরত তানজিল নামে এক ব্যক্তি খন্দকার কবীর হোসেনের ফাঁদে পড়ে ১ লাখ টাকা ব্যয়ে চিকিৎসা নিয়ে প্রতারিত হন। ২০২৩ সালের ১লা জানুয়ারি তানজিল হোসেন কুষ্টিয়া সদর থানায় খন্দকার কবীর হোসেনের নামে মামলা করে। যার নম্বর -২৩/২৩।

স্থানীয়রা জানান, এতকিছুর পরও থেমে নেই কবীরের প্রতারণা। ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসা প্রতারণা দেশে ও বিদেশে  ছড়িয়ে দিয়েছেন। ব্যবসা জমজমাট করতে খোলা হয়েছে একাধিক ফেসবুক পেজ। যোগাযোগের জন্য পেজে দেয়া হয়েছে একাধিক মোবাইল নম্বর। প্রতারণায় কৌশল অবলম্বন করে প্রতারক কবীর কুরিয়ারে ওষুধ দেয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। পরে অনেকের ওষুধ পাঠানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, বিগত দিনে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগর থানার চরকাদিয়া গ্রামের মোহাম্মদ শাহজাহানের ছেলে সোহেল (৩৫)। কুরিয়ার সার্ভিসে ওষুধ পাঠানোর নামে কবীর তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন সাড়ে ৯ হাজার টাকা। এ ঘটনায় প্রতারিত সোহেল লক্ষ্মীপুর থানায় একটি জিডি করেছিলেন। সূত্রটি আরও জানায়, খন্দকার কবীর সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ইউটিউবারদের ম্যানেজ করে চিকিৎসা প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। এসব প্রচারণা বিশ্বাস করে অর্থ খোয়াচ্ছেন বহু মানুষ। তার মূল টার্গেট হচ্ছে যৌন দুর্বল মানুষ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষ। তার খপ্পরে অনেকে সর্বস্বান্ত হলেও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন কবীর।

এলাকাবাসীর তথ্য মতে, প্রতারণা করে মহাটাউট কবীর এখন কোটিপতি। যশোরে ৩টি আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এরমধ্যে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় চারতলা বাড়ি, খিতিবদিয়া গ্রামে দু’টির একটি ছয়তলা ও অপরটি চারতলা। যার একটি খিতিবদিয়া পুকুর মোড় ও অপরটি কলাবাগান রোডে অবস্থিত। জমি কিনে তিনি এসব আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়াও ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়া, খিতিবদিয়া, শানতলাসহ বিভিন্নস্থানে নামে-বেনামে প্রায় শতাধিক বিঘা জমি কিনেছেন। বরিশাল ও গোপালগঞ্জে কবীরের আরও দু’টি আলিশান বাড়ি আছে বলে জানান ছাতিয়ানতলা গ্রামের জাকির হোসেন। ছাতিয়ানতলা গ্রামের মিঠু চাকলাদার জানান, ২০২২ সালে তার শাশুড়ির ক্যান্সার নিরাময়ে ১০০ ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে ওষুধ দেন খন্দকার কবীর। চিকিৎসা বাবদ নেয়া হয় ৭০ হাজার টাকা। বলা হয় এই ওষুধ খেলে কেমোথেরাপি ছাড়াই ক্যান্সার ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু ওষুধ খাওয়ানোর কিছু দিন পর তার শাশুড়ি মারা যান। মিঠু চাকলাদার আরও জানান, তার মতো অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়া টাকায় খন্দকার কবীর কোটিপতি বনে গেছেন। কবীরের প্রতারণা থেকে রেহাই পাননি প্রতিবেশী আব্দুর রাজ্জাক। তার মায়ের ক্যান্সার চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। যদিও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অনেকেই জানান, খন্দকার কবীরের বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ার কারণে তিনি দাপট দেখিয়ে চলাফেরা করতেন। এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্রকেও তিনি ম্যানেজ করেছিলেন। ফলে প্রতারিত অনেক মানুষ তার ডেরায় গিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। প্রতিবাদ করলেই নানাভাবে হয়রানি করা হতো। গোপালগঞ্জের প্রভাবে বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে খন্দকার কবীর অনেকটা ফ্রি-স্টাইলে প্রতারণা করেছেন। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে হয়েছেন অধিক ধন সম্পদের মালিক। তার অবৈধ সম্পদের খোঁজ নেয়ার জন্য দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খন্দকার কবীর ক্ষিপ্ত হয়ে জানান, চুরি-ডাকাতি করে এই ধন সম্পদের মালিক হয়েছি। কি করবেন আপনি? লিখে আমার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবেন না। যান যা পারেন লেখেন। আমি সাংবাদিকদের ভয় পাই না। সাংবাদিকদের মতো তো আর আমি  চাঁদাবাজি করছি না। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগে খন্দকার কবীরের ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে চিকিৎসা প্রতারণার বিষয়টি জানতাম না। এ ধরনের প্রতারণা অবশ্যই দুঃখজনক। তার প্রতারণা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চিকিৎসার নামে মানুষকে ঠকিয়ে প্রতারণা করার সুযোগ দেয়া হবে না। জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম জানান, যৌন ও ক্যান্সার চিকিৎসার নামে খন্দকার কবীরের প্রতারণার ফাঁদের বিষয়টি তিনি জানতেন না। তিনি এই জেলায় নবাগত। এই বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেয়ার পরই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতারণা করে কোটিপতি বনে যাওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

mzamin