Showing posts with label প্রথম আলো. Show all posts
Showing posts with label প্রথম আলো. Show all posts

Tuesday, May 12, 2020

উফ্, অসহ্য by সুলতানা আলগিন

মডেল: পূজা রায়
কৈশোরে পড়তেই ঐশীর (ছদ্মনাম) কাছে মনে হলো তার মা যেন বদলে গেছেন। আগে তো ফ্ল্যাট বাড়ির সব ছেলেমেয়ের সঙ্গে নিশ্চিন্তে খেলত সে। ইদানীং মা বলছেন, অমুকের সঙ্গে খেলো না। আবার পোশাক-আশাকের বেলায়ও মতের অমিল। ঐশীর যে পোশাক পছন্দ, মা বলছেন, ‘ওটা পরে তোমার মতো মেয়েরা বাইরে যায়?’ ঐশী ভাবে, ‘আমার কি কোনো ইচ্ছারই মূল্য নেই। আমি কি বড় হচ্ছি না! আমার কি স্বাধীনতা নেই! সবটাতেই মায়ের বাড়াবাড়ি। উফ্, অসহ্য!’
মায়ের সঙ্গে বড় হতে থাকা কিশোর মেয়ের এই মতের অমিল, এ তো প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিশোরী মেয়ে আর মায়ের এই সম্পর্ক প্যারাডক্স বা আপাতবিরোধী হলেও বাস্তবতা হলো মেয়ে তার মাকে ‘আদর্শ নারী’ হিসেবে ভাবে। অনুসরণও করে। অথচ কখনো সে তার মায়ের মতো হতে চায় না।
কিশোর বয়সে মেয়ে ভাবে, মা তার কথা শুনতে ও বুঝতে চান না। মা সব সময় তাঁর নিজের ছোটবেলার সঙ্গে তুলনা দেন। তাঁর মতো করেই চিন্তা করেন। মাকে সে বোঝাতে পারে না, ‘তোমার যুগ আর এই যুগ এক নয়।’ সব সময় বাঁকা কথা বলেন। সে তো কখনোই, তার মা যা চান, সে রকম হতে পারবে না। মায়ের সঙ্গে তাই কথা বলতেও যেন ইচ্ছা করে না তার।
অন্যদিকে, মা ভাবেন, এই তো মাত্র কয়েক বছর আগে তিনিও কিশোরী ছিলেন। কী আর এমন সময় বদলেছে। তাঁর মা সে সময়ে যেমন তাঁকে শাসনে রেখেছিলেন, তাঁরও উচিত মেয়েকে সেভাবে দেখেশুনে বড় করে তোলা। নইলে নির্ঘাত মেয়ে তাঁর বখে যাবে।
এই দুই রকম ভাবনাতেই বাড়ে দূরত্ব। টিনএজ মেয়ে দুচোখে দেখতে পারে না মাকে। আর ভালোবাসায় ব্যাকুল মায়ের তো দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
টিনএজ মনস্তত্ব
কিশোরী মেয়ের টিনএজ বলতে আমরা ১৩ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বুঝি। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সেই মেয়েরা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের (পিউবার্টি) মধ্য দিয়ে যায়। প্রকৃতিগতভাবেই মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে শেখে। ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত, বিপদ-আপদ আন্দাজ করতে শেখে। যাদের ম্যাচুরিটি বেশি, তারা নিজেরাই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনটা কেমন হয়?
টিনএজ মেয়েরা উদ্দাম, উচ্ছল, চঞ্চল, মুডি, অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হয়। মনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মায়েরাও এই বয়স পেরিয়ে এসেছেন। তাঁরা জানেন কত বিধিনিষেধ পাড়ি দিয়ে তাঁরা এই পর্যায়ে এসেছেন। টিনএজ মেয়েরা সমাজের এই বিধিনিষেধ ভাঙতে চায়, এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু প্রথম প্রথম বাদ সাধেন মা। তাঁর অভিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধির আলোকে দেখতে চান মেয়ের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সময় বদলে গিয়েছে। প্রজন্ম ব্যবধান বা জেনারেশন গ্যাপ এখানে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। আধুনিক পৃথিবীতে মেয়েদের জগৎ ও জীবনবোধ পাল্টাচ্ছে খুব দ্রুতগতিতে। যে কাজ কয়েক বছর আগেও মেয়েদের জন্য সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না, সে কাজে নতুন দিনের মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ফ্যাশন, সাজগোজ, পোশাক-আশাক, চালচলন, কথা বলাতেও লেগেছে নতুন দিনের হাওয়া। মা তো কোনো দিন ভাবতেই পারেননি রোড শোতে স্কুলের পক্ষে সামাজিক সচেতনতার কাজে অংশ নেওয়ার কথা। কিন্তু কিশোরী দিব্যি স্কুলবন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফ্লাশমবের স্ট্রিট ড্যান্সে অংশ নিতে উদ্গ্রীব। এ ক্ষেত্রে মায়ের মত ভিন্ন হলে দূরত্ব তো বাড়বেই। তাই যত রাগ-ক্ষোভ ঘৃণা ঝরে পড়ে মায়ের ওপর। মাও হতবিহ্বল। কীভাবে এই মেয়েকে বোঝাবেন? আর মেয়ের বাবাও তো এক পায়ে খাড়া। স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুরুষেরা বিভিন্ন বিষয়ে রক্ষণশীল হলেও মেয়ের ব্যাপারে বেশ উদার। বাবার আশকারা আর মায়ের নানা ছুঁতমার্গে মেয়ে হয়ে ওঠে মায়ের প্রতি বৈরী।
এই বয়সটায় মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়। সেকেন্ডারি সেক্সুয়াল পরিবর্তনগুলো শরীরে দেখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে হতে থাকে মানসিক পরিবর্তন। এই সময় মেয়েরা বেশ আতঙ্কে থাকে। কখন কোথায় কীভাবে প্যাড চেঞ্জ করবে অথবা কাপড়ে দাগ পড়ে যায় কি না—উৎকণ্ঠায় থাকে মা-মেয়ে দুজনেই। মায়ের উৎকণ্ঠা থাকে ভালোবাসাময়, তবে মেয়ের মধ্যে তখন নতুন পরিপূর্ণ নারী ক্রমেই বেড়ে উঠছে। সে সবকিছু একান্ত নিজের মতো করে মোকাবিলা করতে চায়। এসব সমবয়সী বান্ধবীদের সঙ্গে শেয়ার করতে যতটা তারা আগ্রহী, মায়ের সঙ্গে ততটা নয়। অনেক সময় কাছাকাছি বয়সের খালা, ফুপু, কাজিনদের সঙ্গে সে শেয়ার করে। কিন্তু পরম শুভাকাঙ্ক্ষী মাকে চলে এড়িয়ে। ব্রেস্ট আড়াল করা নিয়ে চলে মা-মেয়ের যুদ্ধ। ওড়না পরা, ঝালর দেওয়া জামা পরা, অন্তর্বাস পরা—সবটাতেই মা-মেয়ের মধ্যে একটু সংকোচ-লজ্জা-জড়তা কাজ করে। পা ঢেকে রাখার জন্য লেগিংস, পাজামা, সালোয়ার—সবই এ সময় পরানোর মহড়া চলে। অনেকে মেনে নেয় আবার কেউ নেয় না। ছেলেদের প্রতি টিনএজ মেয়েদের আগ্রহ ক্রমে বাড়তে থাকে। মায়েরা হয়ে পড়েন শঙ্কিত। কার সঙ্গে প্রেম হলো, কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের অথবা ইভ টিজিংয়ের শিকার হলো কি না, এসব দুশ্চিন্তা মায়ের মনে অজান্তেই বাসা বাঁধে।
বর্তমানের হাওয়া
মেয়েদের বর্তমানে ছোটবেলা থেকেই বেশ চটপটে দেখা যায়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ইত্যাদির কারণে আগের কথিত লাজলজ্জা, জড়তা, রক্ষণশীলতার আদিখ্যেতা কিশোরীরা সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারছে। মায়েরাও পাশাপাশি সহজ হয়ে উঠছেন।
কোনো কোনো মা হয়তো মেয়ের আধুনিক জীবনবোধের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না। একটি মেয়ের কথা বলি। সিনেমা, নাটকে অভিনয় করবে। তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু সে চায় উগ্রভাবে চলাফেরা করতে। মা-বাবা কারও শাসনই সে মানছে না। মেয়ের এই আবদার, উগ্র চালচলনে মা আগে থেকেই বারণ করছেন। তিনি স্বামীকে জানিয়েছেন অথচ বাবা মেয়েকে কখনো অবিশ্বাস করেননি।
আরেকটি মেয়ে দেখতে সুশ্রী, পড়াশোনায় ভালো। সমস্যা হলো তার অনেক ছেলেবন্ধু আছে। রাত করে বাসায় ফেরে। মা অকারণ তাদের নিয়ে সন্দেহ করলে সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। একসঙ্গে অনেক ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলে।
সব দায় মায়ের?
মায়েরা মেয়েদের মনোজগৎ, চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনগুলো দ্রুত আঁচ করতে পারেন। বাবা বাসার বাইরে বেশি সময় দেন। যতক্ষণ বাসায় থাকেন, মেয়েরা থাকে বাবার চোখের মণি হিসেবে। অথচ মেয়ে পড়াশোনায় খারাপ ফলাফল করলে, কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সব দোষ মায়েরই। কেন সে দেখে রাখল না মেয়েকে?
মায়ের সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক সন্তানের। নাড়ি কাটার পর সে আলাদা সত্তা হয়ে বাঁচে। কিন্তু লালনপালন, পড়াশোনা—সবকিছুতেই মায়ের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধা। এই বন্ধন ছিন্ন করতে না পারলে যেন নিজেকে স্বাধীন ভাবা যাচ্ছে না। মনের মতো কিছু করা যাচ্ছে না। কিন্তু মা হলেন এমন একটা নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে শত বৈরিতা সত্ত্বেও মা আবার বুকে টেনে নেবেন।
যা করণীয়
মা-মেয়ের সম্পর্ক দূরত্ব তৈরির মধ্য দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতা বন্ধুসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক। মাকেও ধৈর্যসহকারে বুঝতে হবে সন্তানকে। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মেয়ের সমকাল বিচার করলে চলবে না।
মেয়েকে অকারণ সন্দেহ করা যাবে না। অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা কখনোই সুফল বয়ে আনে না।
সামাজিক কুসংস্কার, গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, পশ্চাৎপদ চিন্তা কখনোই প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়। মেয়ের জন্য পৃথিবী যেন মুক্ত আলোয় ভরা ভুবন হয়ে ওঠে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
মেয়েরও আছে কর্তব্য। মা তার পরম বন্ধু ও হিতাকাঙ্ক্ষীও বটে। বেড়ে ওঠার বয়সটাতে যেসব সমস্যা মেয়েকে মোকাবিলা করতে হয়, সেসব জড়তা ছাড়াই মায়ের সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। এটা নিশ্চিত, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মা সুপরামর্শ দেবেন।
মায়ের সঙ্গে খোলাখুলি সহজ সম্পর্ক থাকলে তা মেয়ের জন্য আশীর্বাদ। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ভালো-মন্দ আছে। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো মেয়ের জন্যই খারাপ মা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Tuesday, January 15, 2019

৯৫ হাজার বন্দীর জন্য মাত্র ৮ জন চিকিৎসক by রোজিনা ইসলাম

  • • ৬৮ কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১২৯টি
  • • কারাগারে ৩৬ হাজার ৬১৪ জনের থাকার ব্যবস্থা
  • • কিন্তু আসামির সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার
  • • চিকিৎসক চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বারবার চিঠি
  • • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না
দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৯৫ হাজার বন্দীর জন্য এখন চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র আটজন। বন্দী ও চিকিৎসকের এই অনুপাতই বলে দিচ্ছে, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার কী অবস্থা। ছোটখোটো শারীরিক সমস্যার জন্যও বন্দীদের কারা হাসপাতালের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে বন্দী থাকা মানসিক রোগী ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। এমন বন্দীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। তাঁদের নিয়মিত কাউন্সেলিং (পরামর্শ) ও বিশেষায়িত চিকিৎসা দরকার। কিন্তু সে ব্যবস্থা কারাগারগুলোতে নেই।
কারা হাসপাতালগুলোর জন্য চিকিৎসক চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গত এক বছরে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেও বারবার জানানো হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চিঠি–চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৬৮টি কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১২৯টি। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, বরিশাল ও গাজীপুর জেলা কারা হাসপাতালে একজন করে চিকিৎসক রয়েছেন। দেশের কারাগারগুলোতে ৩৬ হাজার ৬১৪ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু আসামির সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক সুভাষ কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই হাজার কারাবন্দীর জন্যে একজন চিকিৎসকও নেই। আমরা ধার করে সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক নিয়ে আসি। সত্যিকারের যাঁরা রোগী, তাঁদের কোনো চিকিৎসাই দিতে পারছি না।’ কারা হাসপাতালগুলোর জন্য চিকিৎসক চেয়ে গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শতাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৩টি। সেখানে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ৩২টি পদই শূন্য।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দিতে গত ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কড়া ভাষায় চিঠি লেখা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সেখানে বলা হয়, ২০ জন চিকিৎসককে বিভিন্ন কারা হাসপাতালে যোগদান করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তাঁরা কাজে পর্যন্ত যোগ দেননি। যাঁরা যোগ দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে বলা হয়। বারবার চিঠি দেওয়ার পরও চিকিৎসক পদায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কারা হাসপাতালে যেতে অনাগ্রহ রয়েছে বেশির ভাগ চিকিৎসকের। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে তাঁরা যেতে রাজি হন না। তিনি বলেন, ‘দেখি, এবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী করে?’
কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মাহবুবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে ১১ হাজার বন্দীর জন্য ২ জন চিকিৎসক। বন্দীদের কোনো চিকিৎসাই আসলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন অন্তত দুই শ বন্দী বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে কারা হাসপাতালে আসেন।
হাসপাতালের চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, এক্সরে করার মতো কক্ষ নেই। হাসপাতালের কোনো সুবিধাই এত বড় কারাগারে আসলে নেই।
কারা হাসপাতালে চিকিৎসক–সংকটের সুযোগ নিয়ে খুনের আসামিসহ সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা বাইরের হাসপাতালে অবস্থান করার সুযোগ নেন বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, কারা হাসপাতালে চিকিৎসার সুব্যবস্থা থাকলে নানা অজুহাত দেখিয়ে ভিআইপি বন্দীদের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা যেত। দুর্নীতিও কমে আসত।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক উপ-কারা মহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় এক লাখ কারাবন্দীর জন্য মাত্র আটজন চিকিৎসক থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক। বন্দী হিসেবে কারাগারে থাকলেও তাঁদের মানবাধিকারের বিষয়টি সবার ভাবা দরকার। তিনি বলেন, তাঁর সময়ে অবস্থা একই রকম ছিল। এখন সময় এসেছে অবস্থা পরিবর্তনের।

Wednesday, March 21, 2018

কৃষিপণ্য রপ্তানি সংকোচন

পৃথিবীর সব দেশে সাধারণভাবে এ রকম একটা প্রত্যাশা কাজ করে যে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, সম্ভাবনাময় খাতগুলো দিন দিন সম্প্রসারিত হবে। আমাদের কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় অন্যান্য দ্রব্যপণ্যের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানিও একটা সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ দেশ থেকে আলুসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এসব পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার পরিবর্তে কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই উদ্বেগ যথার্থ এবং উদ্বেগ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিবেদন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পেশ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯৮৩ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে যায় অর্ধেকের বেশি: সে বছর মাত্র ৪০ হাজার ২২৯ টন আলু রপ্তানি হয়। শাকসবজির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা: ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৮৭৮ টন শাকসবজি রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু পরের বছর তা কমে গিয়ে হয় ২৫ হাজার ৪৭০ টন। রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা বছর বছর বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। কিন্তু এর কারণ কী? কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনই বলছে, কৃষিপণ্য ও শাকসবজি রপ্তানির পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে যাওয়ার কারণ এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের নন-কমপ্লায়েন্স, অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান রক্ষাসহ আমদানিকারকদের বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডগুলো অনুসরণ করছেন না। যেমন ২০১৪ সালে রাশিয়ায় রপ্তানি করা আলুতে ব্রাউন রুট ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়। তারপর রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অথচ আমাদের আলু রপ্তানির জন্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাজারসম্ভাবনা বিরাট। কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানির ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ কিন্তু সাম্প্রতিক বিষয় নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত শাকসবজির ১১৫টি চালান বাতিল হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিবছরই চালান বাতিলের হিসাব ওই প্রতিবেদনে আছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাতিল করেছে শাকসবজির ৯০৮টি চালান। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদেশে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের হারানো বাজার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা উচিত, এই যে বছরের পর বছর ধরে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত কৃষিপণ্যের চালান বাতিলের ঘটনা ঘটে আসছে, এর প্রতিকারের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকেরা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান তথা আমদানিকারক দেশগুলো নির্ধারিত কমপ্লায়েন্স শর্তগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, সেদিকে দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন কৃষিসঙ্গ নিরোধ বিভাগের। তাদের কি এদিকে কোনো দৃষ্টি আছে? এ বিষয়ে কারও কোনো দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বোধ আছে কি? পণ্যের গুণগত মানসংক্রান্ত নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানির চালান বাতিল হওয়া শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, দেশের ভাবমূর্তিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সেই প্রভাব কাটানো কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাজার সংকোচনের এই উদ্বেগজনক ধারা এখনই বন্ধ করার জোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হারানো বাজার দ্রুত পুনরুদ্ধারের পর তা আরও সম্প্রসারণের পদক্ষেপও নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের ঘাড়ে ‘কোন্দলের’ বোঝা by মিজানুর রহমান খান

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) হাতে মানিকগঞ্জে ধরা পড়া ১০ জনের একটি সশস্ত্র অপহরণ চক্র সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সামাজিক অবক্ষয় গভীরতর হওয়ার ইঙ্গিতবহ। আওয়ামী লীগ সমাজের অংশ, তাই সেখানেও বড় সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জঙ্গি দমলেও সমাজে চরমপন্থা ক্রমে বাড়ছে। দলীয় কোন্দলের পেছনে আসলে কোনো মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব নেই কিন্তু তথাকথিত কোন্দলে গত এক দশকে দুই শর বেশি আওয়ামী লীগার বা তার সমর্থক খুন হয়েছেন। এর বিচার বিরল, তবে ফেনীর আদালত সম্প্রতি ৩৯ জনকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছেন। নিহত ব্যক্তি উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলীয় সভাপতি ছিলেন। তাঁকে গুলি করে, পেট্রল ঢেলে গাড়িসুদ্ধ জীবন্ত হত্যা করল দলীয় সহযোদ্ধারাই। টাঙ্গাইলেও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হত্যার আসামি সাংসদ আমানুর রহমান। এর বাইরে কোথাও দুষ্কৃতকারীরা দলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখাচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর প্রতি পাঁচ বছর পর ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কারণে কোনো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দুর্বৃত্তায়নের ধারা স্থায়ী রূপ নেয়নি। মাঝখানে ছেদ পড়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন টানা দুই মেয়াদের শেষ দিকে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের রাশ টেনে ধরা যে কঠিন হয়ে পড়েছে, মানিকগঞ্জের ঘটনাই তার প্রমাণ। একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীকে রাতারাতি ও বেআইনিভাবে দলের উপজেলা সহসভাপতি করা কি প্রমাণ করে যে দলটি ভেতর থেকে ধসে পড়ছে? এই লোকটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘ভোট কিনে’ স্কুল কমিটির টানা দুই মেয়াদে সভাপতি হন। এমন ঘটনা বিরল নয়। আগে সরকারি দল এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির মতো দুর্নীতি ও মাঝেমধ্যে ছোটখাটো সংঘাতে লিপ্ত হতো। সেই চিত্র ভয়ানকভাবে পাল্টেছে। নামে-বেনামে দলটির একটি অংশ নরহত্যার মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িয়েছে। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করতে তারা কুণ্ঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চতুর্থ রিপোর্ট বলেছে, দুই মাসে (গত নভেম্বর-ডিসেম্বর) ২৪ ঘটনায় ২৬৭ ব্যক্তি আহত হন, যার মূলে দলীয় কোন্দল। রিপোর্টে দলের নাম নেই; কিন্তু তা উল্লেখ করার দরকার হয় না। মারামারির ঘটনায় দল ব্যবস্থা নেয় না-এমন অভিযোগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর উক্তি ছিল, ‘ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। তারা সেটা করে।
দলের লোক মারামারি করেছে, এটা পত্র পত্রিকা বলে। কিন্তু নিজেরা খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব?’ দুই বছর আগে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজবাহউদ্দিন সিরাজ বলেছিলেন, ‘আমাদের দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কোন্দল নাই।’ তাঁরা উভয়ে ভ্রান্ত, কিন্তু তাঁদের সাফাই বক্তব্যের সমর্থকেরা যে দলে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতীয়মান হবেন, তাতে আর সন্দেহ কী? ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে নিহত ১১৬ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকই ছিলেন ৭১ জন। ফেনীর ওই নৃশংস খুনের নেপথ্যের দুটি বড় কারণ, একজন ইউনিয়ন পরিষদে দলের চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে পরেননি, আরেকজন ডায়াবেটিক সমিতির নির্বাচন করতে পারেননি। প্রশ্ন হলো দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেই কি আধিপত্য বিস্তারের যে সর্বনাশা মোহ দলে যাদের পেয়ে বসেছে, তারা ভড়কে যাবে, নাকি দলকে রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায়ও মনোযোগ দিতে হবে? আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘মারামারি বা অপরাধ করে রাজনৈতিক দলে কারও পদ গেছে, এর নজির কম। পদ যায় রাজনৈতিক কারণে।’ অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পত্রিকান্তরে বলেছিলেন, ‘দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে তাঁদের দলীয় ফোরামে আলোচনা হয় না বললেই চলে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেটা প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা দেখে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সাত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের ঢাকায় অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাঁদের প্রভাব না থাকায় কোন্দল কমছে না।’ লক্ষণীয় রূঢ় সত্য বোঝার মতো বিবেকবান ব্যক্তি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগে আছেন, কিন্তু তাঁদের শর্ত অভিন্ন, নাম প্রকাশ করা যাবে না। আশা করব, এই বিবেকবানেরা বিবেচনায় নেবেন যে প্রধান বিরোধী দল খুব বেশি দুর্বল হলে তা ক্ষমতাসীন দলের বৈধ স্বার্থ রক্ষা করে কি না। ফলপ্রসূ ‘একদলীয়’ ব্যবস্থার শক্তি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রায়ণ ও শৃঙ্খলা রক্ষা, বহুদলীয় ব্যবস্থা থেকে যা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। নীতিহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির রাশ না টানলে দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছেন। এর মধ্যে যাঁরা মামুলি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন আর খুনখারাবি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করেছেন, তাঁরা একাকার হয়েছেন। মানিকগঞ্জে আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশে নিম্নবিত্ত অবস্থান থেকে উঠে আসা পিতা-পুত্র যেভাবে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং বিদ্যাপীঠের সম্পদ লুটের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা সম্ভবত সমাজে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানিকগঞ্জের সেলিম মোল্লার কথিত দলীয় ‘টর্চার সেল’ (জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থে গড়া ডুপ্লেক্স) ইতিমধ্যে দেশের বহু স্থানে একটি অশুভ প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। তাঁরা হয়তো দেখছেন, একই সঙ্গে বহু বাহিনী গুম বা ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ জন্য নাটকীয়ভাবে তুলে নেয়। বেসরকারি বাহিনী দায়টা তখন বিভ্রান্তিকরভাবে অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারে। আইনের শাসন যত দুর্বল হবে, ততই প্রাইভেট বাহিনী বাড়বে। রাশ না টানলে দলের ছত্রচ্ছায়ায়, নামে-বেনামে পদ্ধতিগত প্রাইভেট বাহিনীর বিস্তার ঘটতে পারে। এলিট ফোর্স নয়, দলীয় শুদ্ধি অভিযানই এদের রুখতে পারে। এ জন্য দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের জীবনযাপন ও ব্যয়ের অসংগতি যাচাইয়ে একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। বড় উন্নয়নে বড় দুর্নীতি হওয়ার ধারণা আমরা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ, এটা স্বীকৃত ও পরীক্ষিত যে দুর্নীতির গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসানো সমাজে উন্নয়ন টেকসই বা সুষম হয় না। দুর্নীতি দলে কোন্দল ও খুনখারাবি বাড়াচ্ছে। গত বছর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলে’ একটা বন্দুকযুদ্ধ হলো, তাতে সমকাল-এর সাংবাদিক প্রাণ দিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি সাংবাদিকের স্ত্রীকে একটি চাকরি দিয়েছেন। এর একদিকে স্থানীয় সেই সাংসদ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) হাসিবুর রহমান, ১৯৯৬ সালে বিএনপি ত্যাগ করে নৌকায় চেপে উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে ৪২০ ধারায় অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য তাঁর গত নির্বাচনী হলফনামায় ছিল না। তাঁর অনুসারী দলের পৌর কমিটির সভাপতির সঙ্গে বর্তমান মেয়রের গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের বন্দুক লড়াই থেকে ওই খুন। সেই হত্যা মামলায় মেয়র দলের পদ থেকে বরখাস্ত ও কারাবন্দী অথচ অন্যজন পৌর কমিটির সভাপতি পদে বহাল। টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধা খুনের আসামি আওয়ামী সাংসদ বন্দী, কিন্তু তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হননি। দল বলেছে, আদালতে ফয়সালার পর সিদ্ধান্ত। তাহলে শাহজাদপুরের আওয়ামী মেয়র কী দোষ করেছেন? ফেনীতে খুনের পরপরই কমিটি হয়, তাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাদ পড়েন, দল এখনো কাউকে বহিষ্কার করেনি। দলের কমিটিতে অন্তত খুন ও গুমের মতো ঘটনায় অভিযুক্ত এবং দণ্ডিত ব্যক্তিদের থাকতে হলে কী নিয়ম, কী নৈতিকতা, তার একটা ফয়সালা দরকার। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার বার্তা না দিতে পারলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা নীরবে অশ্রুপাত করবেন। ‘চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়ার ক্ষমতা কেবল আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ খুনখারাবি প্রতিরোধে দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের উদ্যোগ জরুরি।
মিজানুর রহমান খান : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail. com

পুতিন কেন এত জনপ্রিয়?

রাশিয়ার সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০১২ সালের নির্বাচনের চেয়ে এবার বেশি ভোটে জয়ী হন পুতিন। শেষবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন পেয়েছিলেন ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে যে বেড়েছে, তা আমরা বলতেই পারি। কিন্তু রাশিয়ায় পুতিনের কেন একচেটিয়া জনপ্রিয়তা? রুশ গণমাধ্যম স্পুতনিক রেডিও এ বিষয়ে কথা বলেছে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর রাশিয়ান অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক অনুরাধা চেনোইয়ের সঙ্গে। স্পুতনিক নিউজ ডট কমে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ দেওয়া হলো।
স্পুতনিক : মূলধারার গণমাধ্যমে থেকে আমরা অনেক অভিযোগ শুনতে পাচ্ছি যে নির্বাচন স্বচ্ছ ছিল না। আপনি কি তাই মনে করেন?
চেনোই : নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ছিল, আমি তা মনে করছি না। এ বিষয়ে মন্তব্য করার আগে রাশিয়ায় যেভাবে রাজনীতির চর্চা গড়ে উঠেছে, তা জানতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া স্বাধীন হলেও সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বলই রয়ে গেছে। যেখানে গণতন্ত্রচর্চা হয়, সাধারণত সেখানে অনেক শক্তিশালী বহু দলগত পদ্ধতি থাকে, কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখতে পাইনি। প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তাঁর দল অন্যদের ওপর একচেটিয়া প্রভাব রেখেছে। তবে ভালো হতো যদি রাশিয়ায় আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল থাকত, কিন্তু এর জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। গণতন্ত্র বিকশিত হতে সময় দরকার। তাই আমি মনে করি না যে এ কারণে রাশিয়াকে বা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কেউ দোষ দিতে পারে।
স্পুতনিক : রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের সঙ্গে কেন বৈশিষ্ট্যগত এত ফারাক রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
চেনোই : অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সত্যিই বণ্টন করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া উচিত এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একধরনের আস্থা থাকা উচিত। সবকিছু নিয়ে দোষ দেওয়ার মনোভাব থাকা ঠিক নয়। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করা উচিত। তরুণদের পথ দেখানো উচিত এবং সৃজনশীলতা রক্ষা করে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক বৃদ্ধি করা উচিত। আমি মনে করি, এ দেশে একটা রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্যই রয়েছে। তবে ক্যাডার, সংগঠন, শক্তি ও অর্থের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কাঠামোগতভাবে এখনো সংগঠিত হয়নি। বর্তমানে রাশিয়াসহ সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই অনেক দেশের মানুষই সে দেশে একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেতা চাইছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবেই মনে করি, রাশিয়া ভাগ্যবান এই অর্থে, সে দেশের মানুষের প্রেসিডেন্ট পুতিনের মতো একজন চৌকস নেতা রয়েছে। পুতিন রাশিয়াকে স্থিতিশীল করেছেন, তিনি রাশিয়াকে রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কারণেই তিনি রাশিয়ায় এতটা জনপ্রিয়। আমি তাঁকে একজন জনপ্রিয় নেতা বলে মনে করি। আমি মনে করি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে পুতিন তাঁর কথা রাখতে পেরেছেন। যদিও এ নিয়ে রুশ সমাজে ভিন্নমত রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং সিরিয়া ও ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে পুতিনের অবস্থান সম্পর্কে তিনি নিজেই বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন; যা ছিল ন্যায্য এবং রুশ নাগরিকেরা অবশ্যই তাঁকে সমর্থন করেছেন।
রুশ থেকে অনুবাদ : জামিল খান

নির্বাচনে গাদ্দাফির অর্থ, সারকোজি পুলিশের হেফাজতে

ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিবিসি ও দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, অবৈধ নির্বাচনী তহবিল নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্তে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিজ হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় অবৈধ তহবিল ব্যবহার করা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সারকোজির জয়ের পেছনে মুয়াম্মার গাদ্দাফির অর্থের একটি তহবিল ভূমিকা রেখেছে, এ অভিযোগে ২০১৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয় ফ্রান্সে। অভিযোগ আছে, ২০০৭ সালে নিজের নির্বাচন পরিচালনার জন্য মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে পাঁচ কোটি পাউন্ড সহায়তা পেয়েছিলেন সারকোজি।
গত পাঁচ বছর ধরে তদন্ত চলছে। সে বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্যারিসের ন্যান্টের পুলিশ স্টেশনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সারকোজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রী ব্রাইস হর্টফিয়াক্সকেও ওই তহবিল নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা সারকোজি কোনো অবৈধ নির্বাচনী তহবিল গ্রহণের অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছেন। তিনি লিবিয়ার কাছ থেকে অবৈধ অর্থ পাওয়ার অভিযোগকে অদ্ভুত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। গত জানুয়ারিতে একজন সন্দেহভাজন ফরাসি ব্যবসায়ীকে যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার করা হয় এবং লন্ডনের এক আদালতে হাজির করার পর জামিনে বেরিয়ে যান তিনি। তাঁর মাধ্যমেই গাদ্দাফির ওই অর্থ সারকোজির নির্বাচনী শিবিরে পৌঁছায় বলে ধারণা করেন তদন্তকারীরা। নিকোলা সারকোজি ২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে হেরে যান সারকোজি।

ক্ষমতার মোহময় মসনদ

রাশিয়ায় এই তো হয়ে গেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ভাবগতিকে বোঝা গিয়েছিল, ভ্লাদিমির পুতিনই বহাল থাকবেন। বাস্তবে হয়েছেও তাই। পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন পুতিন। একই সঙ্গে একটি রেকর্ডও পুরেছেন পকেটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি হলেন তিনি। এই রুশ নেতা ছাড়াও বিশ্বে আরও অনেক রাষ্ট্রপ্রধান আছেন, যাঁরা অনেক দিন ধরেই ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন বা ছিলেন। এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে এই আয়োজন:
চার দশকের বেশি সময় ক্ষমতায়
এ তালিকায় সবার ওপরে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ৪৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। ২০০৮ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তখন তাঁর বয়স আশির ঘরে। ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর মারা যান কাস্ত্রে। তাইওয়ানের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিয়াং কাই-শেক ক্ষমতায় ছিলেন ৪৭ বছর। ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত এই দ্বীপের ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং ৪৬ বছর দেশ চালিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন উত্তর কোরিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ওই দেশে এখনো ‘শাশ্বত নেতা’ হিসেবে সম্মান জানানো হয় কিম ইল সুংকে। আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট শাসক এনভার হোজা আমৃত্যু ক্ষমতায় ছিলেন। বছরে হিসাবে ৪০ বছর। ১৯৮৫ সালে মারা যান তিনি। লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি প্রায় ৪২ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। ২০১১ সালে বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান গাদ্দাফি। গ্যাবন পরিচিত তেলের খনির জন্য। ৪১ বছর দেশটি শাসন করেন ওমর বংগো অনদিম্বা। ২০০৯ সালে মারা যান ওমর।
এখনো যাঁরা ক্ষমতায়
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হলেন তিওদোরো ওবিয়াং এনগেমা। গিনির প্রেসিডেন্ট তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর ৩৮ বছর চলছে। ১৯৭৯ সালে নিজের চাচাকে অপসারণ করে ক্ষমতায় এসেছিলেন এনগেমা। এখনো চলছে তাঁর শাসন। ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া ৩৫ বছর ধরে শাসন করছেন দেশ। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ডেনিস সাসৌর চলছে ৩৪ বছর। তবে এর মধ্যে পাঁচ বছরের বিরতি ছিল তাঁর। ওই সময়টাতে ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তিনি। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন টানা ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইওয়ারি মুসাভেনি দেশ শাসন করছেন ৩২ বছর হলো। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনি ২৯ বছর ধরে দেশটির শাসনসংক্রান্ত সব নির্দেশ দিয়ে আসছেন। সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের শাসনামলের ২৮ বছর চলছে। চাদের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দেবি ২৭ বছর ধরে শাসনকাজ চালাচ্ছেন। কাজাখস্তানের নুরসুলতান নজরবায়েভ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন ২৮ বছর ধরে। তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এমামোলি রাখমনের চলছে ২৫ বছর। অন্যদিকে, ইসাইয়াস আফওয়ারকি ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন ২৪ বছর।

Tuesday, March 20, 2018

ভুল সবই ভুল, যা জানি তা ভুল by শাহদীন মালিক

ভুলটা বোঝা গেল প্রথম আলোয় র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের সাক্ষাৎকারটা পড়ে (প্রথম আলো, ১৮ মার্চ)। ভুলটা আমাদের শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদের নয়। বিশিষ্ট ব্যক্তি, ভিআইপিদের নাম উচ্চারণ করা বা লেখার আগে, অর্থাৎ নামের আগে বিশেষণ ব্যবহার করা এখন অলিখিত নিয়ম। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে খবর আছে। নেতা-নেত্রীর নামের আগে যত বেশি বিশেষণ ব্যবহার করা যায়, ততই মঙ্গল। বিশেষণ ব্যবহারকারী ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব মঙ্গলের আশায় বিশেষণগুলো দীর্ঘায়িত করেন। দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। তখন লন্ডনে থাকতাম। কী যেন একটা রাজনৈতিক ব্যাপারে-ব্যাপারটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, আর সেটা এই কলমের জন্য মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়-একটা পত্রিকায় ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা এক সাংসদের (এমপি) চিঠি ছাপা হয়েছিল। জন মেজর তখন প্রধানমন্ত্রী। এমপি সাহেব চিঠিটা শুরু করেছিলেন ‘ডিয়ার জন’ সম্বোধনে। এই অধমের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। অতিমাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করছে শুধু ‘ডিয়ার জন’ বলে! দল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কেন যে বহিষ্কৃত হলেন না, তা আজও বুঝিনি। কার নামের আগে কয়টা বিশেষণ লাগাতে হয়, তার যথাযথ তালিম নেওয়ার জন্য তাঁর কিছুদিন বাংলাদেশে অবস্থান করা জরুরি। তিন ভিনদেশে ছাত্র ছিলাম। বহু শিক্ষকের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে। অভদ্র হয়ে গিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে। তখন থেকে অধ্যাপকদের নাম ধরেই ডাকার বা সম্বোধন করার বদভ্যাস গড়ে ওঠে। কাউকে কোনো দিন ‘ছার’ (স্যার) বলিনি। শব্দটা এখনো সহজে মুখ দিয়ে বেরোতে চায় না। সতর্ক থাকা ভালো, পাছে না ‘মাইন্ড’ করে ফেলেন। তাই শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ। ভারতের সংবিধানে পইপই করে ‘টাইটেল’ ব্যবহার নিষেধ করে দিয়েছে। ব্যতিক্রম দুটো, যার সাদামাটা অর্থ হলো শিক্ষক আর সেনা কর্মকর্তারা টাইটেল ব্যবহার করতে পারবেন। অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল চলে গা! যাহোক, আপাতত শ্রদ্ধেয়ই থাক।
২. শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদের সাক্ষাৎকার পড়ে উপলব্ধি হলো যে এক যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে ভুল করে চলেছি। সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ছিল ‘ “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” একটা ভুল শব্দ’। তাই তো, এত দিন ধরে ভুল শব্দ ব্যবহার করে বিরাট ভুল করে চলেছি। লিখছি আর ভাবছি, একজন সম্পাদক বছর দুয়েক আগে অকপটে একটা কথা স্বীকার করেছিলেন। তিনি বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গোয়েন্দাদের সরবরাহ করা খবর যাচাই-বাছাই না করে ছাপার কথা স্বীকার করে তাকে ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর এক শ পুরো না হলেও এক শর কাছাকাছি মামলা খেয়েছিলেন! অকপটে ভুল স্বীকার করার জন্য তো মামলা হওয়ার কথা নয়। সেটাই ভরসা। অবশ্য আরও ভরসা এটুকু যে বছরের পর বছর ধরে এই ভুল অগণিত ব্যক্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি গণমাধ্যমও করে আসছে। আমাদের চরম সৌভাগ্য যে শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ আমাদের সবার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন; এ দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় না। থ্যাংক ইউ! অবশ্য তিনি প্রশ্নও রেখেছেন-বিচার-অন্তর্ভুক্ত হত্যাকাণ্ড কোনটি।
৩. ভুল বুঝে অনেক ভুল বা খারাপ কাজ করা হয়ে যেতে পারে। আগের বাক্যটা স্বীকারোক্তি নয়, মূল্যায়ন। ভিন্ন মূল্যায়নের জন্য মামলা খাওয়া (!) উচিত নয়। যাহোক, যা বলছিলাম, বছর আড়াই আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের বড় হলরুমে তিরিশের বেশি পরিবার সমবেত হয়েছিল। কারও ছেলে, কারও বাবা, স্বামী, ভাই নিখোঁজ। আমরা তাদের আহাজারি শুনেছিলাম প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে। তাদের প্রায় সবাইকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই অফিস, ওই অফিসে ধরনা দিয়েছে। ছেলে হারানো বৃদ্ধ মা, বাবা হারানো বালকের কথা শুনতে শুনতে আমাদের অনেকের চোখের জল বাধ মানছিল না। পরদিন প্রায় সব পত্রিকাতেই স্বজনহারাদের আহাজারির বৃত্তান্ত ছাপা হয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি-সবই ভুল। তাঁরা হয় আর্থিক-ব্যবসায়িক কারণে সটকে পড়েছেন; পারিবারিক বা বৈধ-অবৈধ প্রেমজনিত কারণে গা-ঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব করেছেন। কেউই গুম হননি। মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। সাক্ষাৎকারে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে-বিচার বিভাগ কি আর স্বাধীন! ধারণা করছি, নারায়ণগঞ্জের সাত ব্যক্তি প্রথমে নিজেদের মেরেছেন। মরার পর নিজের পেট কেটেছেন। তারপর দড়ি দিয়ে পায়ে-পেটে পাথর আর ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। আর শেষে আমজনতা, মিডিয়া আর আইনজীবীদের চাপে পরাধীন বিচারক র‍্যাবের কর্মকর্তা আর তাঁদের সঙ্গী ব্যক্তিদের অকারণে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির আদেশ দিয়েছেন। কারণ, র‍্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম কিছুই করে না। সবই আমাদের ভুল ধারণা।
৪. শুধু ভুলটাই শোধরাতে পারছি, তা নয়। নতুন তথ্যও জেনেছি সাক্ষাৎকার থেকে। প্রথম আলো প্রশ্ন রেখেছিল-‘এভাবে সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করে বিশ্বের কোথাও এ রকম বাহিনী আছে কি?’ জবাবে অতি শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘না, এ ধরনের বাহিনী অনন্য।’ দুনিয়ায় কেউ বুঝল না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাসদস্যদের সম্পৃক্ত রাখলে সুফল মেলে। বুঝল শুধু আমাদের সরকার আর র‍্যাব। আর র‍্যাব সৃষ্টির জন্য বর্তমানে ডান্ডাবেড়ি লাগানো যে ব্যক্তির ছবি প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় মাঝেমধ্যে মিডিয়ায় দেখা যায়, অর্থাৎ লুৎফুজ্জামান বাবরের নাম উল্লেখ না করলে নিঃসন্দেহে ইতিহাস বিকৃতির অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যারা র‍্যাবকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে, র‍্যাবের সঙ্গে এনগেজমেন্টে যাওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তারা তো মরতেই পারে এবং মরছেও। এটাই স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য ছিল এটাই। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সঠিক রাখার জন্য ‘লাইসেন্স টু কিল’ প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় ভুলটা এ জায়গায়। ইনিয়ে-বিনিয়ে এক দশক ধরে যে কথা বলে চলেছি এবং বলতেই থাকব তা হলো-সফল রাষ্ট্র। দুর্বল রাষ্ট্র আর ব্যর্থ রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য মূলত একটা ব্যাপারে। দুর্বল রাষ্ট্র নিজেকে সফল রাষ্ট্রে পরিণত করতে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বেশি বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর বহিঃপ্রকাশ প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাজেট বাড়ে, প্রযুক্তি-অস্ত্রশস্ত্র বাড়ে আর সেই সঙ্গে কমে জবাবদিহি। আস্তে আস্তে ধরো, মারো থেকে ক্রমান্বয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি, জমি দখল ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের বিস্তৃতি ঘটে। সেই সঙ্গে প্রতিবাদীদের সংখ্যা কমতে থাকে। দ্বিতীয় বহিঃপ্রকাশ ঘটে ব্যাংক-বিমা, কনস্ট্রাকশন মেরামত, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ইত্যাদি। ফল হিসেবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর হতে থাকে। আর যার জবাবদিহি নেই, তাকে জবাবদিহি করার চেষ্টা করা অর্থহীন। এটা গণমাধ্যমের ভুল। প্রথম আলো এই ভুলটি করেছে।
ড. শাহদীন মালিক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক

তাঁরা না কংগ্রেস না বিজেপি

দেশের পরিস্থিতি বুঝে এবং আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও বৈঠক করেছেন। বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে নতুন ফ্রন্ট গড়তে চান দুই মুখ্যমন্ত্রী। গতকাল সোমবার পশ্চিমবঙ্গের সচিবালয় নবান্নে দুই মুখ্যমন্ত্রী বৈঠক করেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে আলাদা ফ্রন্ট গড়ার কথা জানান কে চন্দ্রশেখর রাও। ২০১৪ সালের ২ জুন ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে গড়ে ওঠে নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানা। এতে অন্ধ্র প্রদেশ আলাদা আর তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হিসেবে থেকে যায়। দুই রাজ্যেরই অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদির সরকার তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। রাজ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে না। রাজ্য সরকারের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বে অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি বা টিডিপির নেতা ও অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জোট ছেড়েছেন। আবার তেলেঙ্গানার তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি বা টিআরএসের নেতা ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে থেকে কাউকে সরকার গঠন করার জন্য আহ্বান জানান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মোদিকে সরিয়ে জনগণের সরকার গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই দাবি নিয়ে এখন তিনি পুরো দেশে সোচ্চার। সভা-সমাবেশে মমতার অভিযোগ, দেশের অসাম্প্রদায়িকতার চরিত্রে কালি লেপন করছে বিজেপি। সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দিচ্ছে। নোট বাতিল ও জিএসটি চালু করে দেশের অর্থনীতির ওপর আঘাত করছে। বাড়িয়ে দিয়েছে বেকার সমস্যা আর দ্রব্যমূল্য। তাই বিজেপি সরকারের আর দরকার নেই। আলোচনা শেষে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও নবান্নে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক পরিবর্তন জরুরি। বিজেপি ও কংগ্রেসবিরোধী ফ্রন্টের প্রয়োজন। তাই তিনি মমতার সঙ্গে বিজেপি ও কংগ্রেসবিরোধী ফ্রন্ট গড়তে চান। প্রতিটি রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে এই ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করতে চান তাঁরা। বক্তব্য দেওয়ার সময় চন্দ্রশেখর রাওয়ের পাশে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতাও বলেছেন, রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে অনেক দলের সুসম্পর্ক রয়েছে। সেসব দলের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা নতুন একটি রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করতে চান। মমতা বলেন, ‘আমরা ফেডারেল ফ্রন্ট চাই। রাজ্যগুলো মজবুত হলে দেশও মজবুত হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। তাড়াহুড়ো নেই যে আজই করতে হবে। রাজনীতিতে সময় লাগে। তাই তো পরিস্থিতি এমনও হয়ে যায়, যখন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ আসে। এর থেকে ভালো আর কী হয়?’ বিজেপিবিরোধী এই দুই মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠককে ‘গুরুত্বহীন চমক’ বলছেন দলের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এই বৈঠককে উড়িয়ে দিয়ে তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘কেন্দ্রে স্থিতিশীল সরকার রয়েছে বলে এবার আঞ্চলিক দলগুলো বাজার গরম করতে চাইছে।’

চড়ুই, বিড়াল, বস্তি ও ফায়ার সার্ভিস by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ফায়ার সার্ভিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা, এর কর্মীরা অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজ করেন। পানির ভেতরে দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানেও তাঁরা উদ্ধার তৎপরতা চালান। কিন্তু এর বাইরেও যে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত, তা মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে আসে। গত দুই মাসে সে রকম কিছু খবর থেকে বোঝা যায় তাঁদের কর্মপরিধি কতটা বহুমাত্রিক। গত মঙ্গলবার রাজশাহী নগরের আলুপট্টি মোড়ে রাস্তার বিদ্যুতের তারে একটি ঘুড়ি আটকে যায়। ঘুড়ির সুতায় ঝুলছিল একটি চড়ুই পাখি। সহৃদয় একজন ফায়ার সার্ভিসে ফোন করলে তারা দ্রুত এসে চড়ুই পাখিটি উদ্ধার করে। ‘সঙ্গে সঙ্গে আকাশে উড়াল দেয় ছোট্ট পাখিটি।’ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা জানান, পাখির একটি পায়ে সুতা আটকে ছিল। তাঁদের দুটি ইউনিট পাখিটি মুক্ত করার অভিযানে নেমেছিল। তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস এখন দ্য লাইভ সেভিং ফোর্স। প্রতিটি প্রাণ রক্ষা আমাদের কর্তব্যের ভেতরেই পড়ে।’ এর কয়েক দিন আগে কুমিল্লায় একটি বিড়াল কীভাবে যেন এক উঁচু গাছের মগডালে গিয়ে আর নামতে পারছিল না। দুই দিন ওভাবে থাকার পর লোকজন ফায়ার সার্ভিসকে জানালে তারা এসে বিড়ালটিকে উদ্ধার করে। তারা উদ্ধার না করলে অনাহারে দুর্বল হয়ে অত উঁচু থেকে পড়ে হতভাগ্য বিড়ালটি হয়তো মারাই যেত। তার কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক মাধ্যমের একটি খবর ছিল তাজ্জব হওয়ার মতো শুধু নয়, বড়ই বেদনার। ঘটনাটির অকুস্থল লন্ডনের একটি হাসপাতাল হলেও তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রতিবেদনে তেমনটিই বলা হয়েছে। এক লোকের লিঙ্গে একটি আংটি ঢুকে গিয়েছিল। সাত-আটজন বিশিষ্ট সার্জন এবং পুরুষ ও নারী নার্স ওই আংটি খুলতে যখন গলদঘর্ম, তখন ডাক পড়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আট ঘণ্টা পর আংটিটি বের করা সম্ভব হয়। কীভাবে আংটিটি ওই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিশেষ দেহযন্ত্রে ঢুকল এবং আটকে গেল, সে ব্যাপারে বিপন্ন ব্যক্তিটি কিছু জানাননি। যাহোক, লিঙ্গ থেকে আংটি উদ্ধারে চিকিৎসকেরা নন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। খবরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুটি: পুরুষের বিশেষ অঙ্গে আংটি গিয়ে আটকে যাওয়া এবং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক তা উদ্ধার। ফায়ার সার্ভিসের মূল কাজ অবশ্য চড়ুই পাখি, বিড়াল বা কারও দেহযন্ত্রে আটকে যাওয়া আংটি উদ্ধার নয়। ওগুলো কখনো-সখনো করতে হয়। প্রধান কাজ আগুন নেভানো এবং কোথাও কোনো ভবনে বা পানিতে অথবা অন্য কোথাও মানুষ বা গবাদিপশু আটকা পড়লে তাদের উদ্ধার করা।
যেমন বাংলাদেশে পোশাকশিল্প কারখানায় আগুন লাগলে বা রানা প্লাজার মতো কোনো ভবন হাজার হাজার কর্মী নিয়ে ধসে পড়লে তাঁদের উদ্ধারকাজ চালানো। আমরা দেখেছি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জীবন বাজি রেখে রানা প্লাজা বা তাজরীনে উদ্ধারকাজ চালাতে। প্রশাসনের অবহেলার কারণে অন্ধ কূপে পড়ে যাওয়া জিহাদের মৃতদেহ উদ্ধার। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশের বনভূমিতে যেমন দাবানল হয়, তার আগুন নেভাতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের; বাংলাদেশের বনভূমিতে দাবানলের প্রকোপ না থাকলেও বস্তিতে দাবানল খুব ঘন ঘনই ঘটে। ১২ মার্চ বাংলাদেশে দুটি বড় দুর্ঘটনার খবর ছিল। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয় কাঠমান্ডুতে। প্রাণহানি ঘটে ৫১ যাত্রীর। ঢাকার মিরপুর মোল্লাহপুরী বস্তিতে আগুনে পুড়ে ছাই হয় পাঁচ হাজারের মতো ঘর। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে ২৫ হাজার মানুষ। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার মর্মান্তিক ঘটনায় বস্তি ভস্মের ঘটনাটি আড়াল পড়ে যায়। পৃথিবীর বহু আধুনিক শহরের বাসিন্দার সংখ্যাও ২৫ হাজার নয়। আমাদের বস্তিগুলোতে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা সবাই শ্রমজীবী ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কেউ পোশাকশ্রমিক, কেউ কারখানার শ্রমিক, কেউ যানবাহনের চালক ও শ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউবা ছোট দোকানদার-ব্যবসায়ী। এই রিপাবলিকে তাঁদের প্রয়োজন রয়েছে। এখন বস্তিবাসী কারও ঘরে রয়েছে একটি পুরোনো টেলিভিশন সেট বা ফ্রিজ। সব হারিয়ে আজ ২৫ হাজার মানুষ নিঃস্ব। এক সপ্তাহেও তাঁরা সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ বিশেষ পাননি, পুনর্বাসনের ব্যবস্থার তো প্রশ্নই আসে না। এক বাসিন্দা নার্গিস আক্তার বলেছেন, ‘সরকার নাই, এনজিও নাই। থালা নাই, বাটি নাই। পলিথিনে ভাত আইন্যা পলিথিনে কইরাই খাইতে হয়। এক কাপড়ে জানডা হাতে নিয়া বাইর হইছিলাম। সেই কাপড়েই আছি।’ (প্রথম আলো, ১৮ মার্চ, ঘটনার পাঁচ দিন পরে।) সাধারণত আমাদের দেশে বস্তিতে আগুন লাগে মধ্যরাতে, যখন ছেলেমেয়ে নিয়ে মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। আকস্মিক কারণে হোক, রহস্যজনক কারণে হোক বা বোধগম্য কারণে হোক, আগুনে যখন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে শত শত ঝুপড়িঘর, তখন ফায়ার সার্ভিস ছাড়া আর গতি নাই। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাজ আগুন নেভানো এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা; লুটপাটকারীদের তাড়ানো নয়। বাংলার মাটিতে বস্তিতে বা বাজারে আগুন লাগলে আগুনে পুড়ে যত জিনিস ছাই হয়, লুটপাটে খোয়া যায় তার চেয়ে বহু গুণ বেশি। মোল্লাহপুরীতেও তাই ঘটেছে। বস্তিতে আগুন লাগলে শুধু ফায়ার সার্ভিসের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন না। আগের দিনে তাঁদের দায়িত্বই দেখা যেত সবচেয়ে বেশি। বড় বড় অগ্নিকাণ্ডে প্রশাসনের লোক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সমাজসেবী-সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এখন দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখার লোকের সংখ্যা বেড়েছে, সাহায্যের হাত বাড়ানো মানুষ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ বস্তিগুলোর ‘খালা’দের ব্যবহার করছেন সমাজের কেউকেটারা, যাঁরা পাজেরো চালান। তাঁরা বস্তিতে ‘বাবা’র (ইয়াবার সংক্ষিপ্ত ও কথ্য রূপ) ছোটখাটো আড়ত গড়ে তুলেছেন। পোড়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসা তাঁদের ‘নৈতিক’ কর্তব্য। ফায়ার ব্রিগেড আগুন নেভায় বস্তির, কিন্তু বস্তিবাসীর বুকের ভেতরের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে সারা জীবন। মানুষের বুকের আগুন নেভানোর মতো অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আজও উদ্ভাবন করেননি কোনো বিজ্ঞানী।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

ব্যবসায়ী সজলের ফিরে আসা

যেকোনো বিবেচনাতেই হোক, শহীদপুত্র ব্যবসায়ী সজল চৌধুরীর ফিরে আসা একটি স্বস্তির বিষয়। তাঁর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে যাঁরাই ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা ধন্যবাদার্হ্য। এ ধরনের অপহরণের পর কেউ কেউ ফিরে আসেন, কেউ কেউ ফেরেন না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে যে সাধারণ মিলটি রয়েছে তা হচ্ছে এই অপহরণকারী চক্র সম্পর্কে আমরা আর কিছুই জানতে পারি না। এই চক্রকে চিহ্নিত করা যে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তা তারা বিবেচনায় নেয় বলে মনে হয় না। ব্যবসায়ী সজল চৌধুরী অপহরণের ব্যাপারে ফিরে এসে নির্যাতনের যে বিবরণ দিয়েছেন, তাকে প্রাথমিকভাবে তদন্তযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সে ক্ষেত্রে শুরুতেই এটা খতিয়ে দেখা দরকার যে নগরীতে ব্যবসায়িক বা পারিবারিক কোনো বিরোধের পরিণতিতে এভাবে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অপহরণ অভিযান এত সফলভাবে পরিচালনা করা কী করে সম্ভব হলো? এটা দুর্ভাগ্যজনক যে সে বিষয়ে আমাদের এলিট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তরফে কোনো ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। সজল চৌধুরীর বক্তব্যে র‍্যাবের প্রসঙ্গ এসেছে, সেই সূত্রে র‍্যাবের গণমাধ্যম মুখপাত্রকে আমরা কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেখলাম। জনগণের কাছে সত্য প্রকাশের কোনো তাগিদ আমরা দেখলাম না। কারণ, র‍্যাব বা ডিবি বলে কোনো কথা নয়, সজল চৌধুরীকে যেভাবে অপহরণ করে ফেরত দেওয়া হয়েছে, তাতে সমাজে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা অজানা ভীতি ও আশঙ্কার বিস্তার ঘটতে পারে। ‘ডিবি’ পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়া বা দরজার চাবির রিংয়ে দৃশ্যত র‍্যাব-১–এর লোগো ব্যবহার করার মতো বিষয়গুলো ছদ্মবেশী ভাড়াটে গোষ্ঠীগুলোর পরিকল্পিত কৌশলের অংশ হতেই পারে। কিন্তু যখন যেটা ঘটেছে বা প্রতীয়মান হয়েছে, সেসবের অবিকল বিবরণ দেওয়া ভুক্তভোগীর মৌলিক অধিকার এবং সেসবই সরকারি তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু এসবের সত্যতা সম্পর্কে তদন্তের আগে কোনো মন্তব্য করা পেশাদারত্বের পূর্বশর্তগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যারাই সজল চৌধুরীকে তুলে নিক, এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্রের কোনো ইঙ্গিত এখনো মেলেনি।
যেটা আপাতত পরিষ্কার সেটা হলো সজল চৌধুরী যেকোনোভাবেই হোক, ব্যক্তিগত স্বার্থের টানাপোড়েনের কারণে প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। আরও আশঙ্কা হলো এ ধরনের প্রতিহিংসা মেটানোর জন্য নগরীতে বেসরকারি বাহিনী ভাড়া করা যায় এবং যারা এমনই সাফল্যের সঙ্গে অপারেশন পরিচালনা করতে পারে, যার সঙ্গে কোনো চৌকস বাহিনীর দক্ষতার সঙ্গে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিষয়টিকে এখন যেভাবে বাহ্যত মূল্যায়ন করা হচ্ছে বা সন্দেহ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার মিল নাও থাকতে পারে। ফলে এই ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য রহস্যভেদ ও কারা এই কাজটি করেছে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার বিষয়টি খুবই জরুরি। অপহরণের শিকার সজল চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের তরফে যেহেতু র‍্যাব ও ডিবির নাম উচ্চারিত হয়েছে, তাই অপহরণকারী চক্রকে ধরে তাদের প্রমাণ করা উচিত যে প্রকৃত অপকর্ম কারা করেছে। তা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে এ ধরনের অপহরণকারীদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তা করতে না পারলে সেটা বাহিনীগুলোর ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। সজল চৌধুরীকে অপহরণকারীদের মতো বিপজ্জনক, চৌকস ও প্রশিক্ষিত গোষ্ঠী যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তবে যে কেউ এদের শিকারে পরিণত হতে পারে। আমরা এই ঘটনার বিভাগীয় ও বিচারিক তদন্ত দাবি করছি।

বড় নদীতে ছোট নৌযান

বড় নদীতে স্পিডবোট ও ছোট ট্রলার চলাচলের নিয়ম নেই। কিন্তু দেশের বড় বড় নদীতে নিয়ম লঙ্ঘন করে বেপরোয়া গতিতে চলছে এসব নৌযান। এতে করে যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এসব দেখার যেন কেউ নেই। ১৫ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়া নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে প্রচুরসংখ্যক স্পিডবোট, ট্রলার ও লঞ্চ চলাচল করছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী, বড় নদীতে ২০ মিটারের নিচের লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু এ নিষেধ মানা হচ্ছে না। অবাধে চলছে এ ধরনের নৌযান। একটি স্পিডবোটে আটজনের বেশি যাত্রী ওঠানোর নিয়ম না থাকলেও এর চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। ট্রলারগুলোও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। আবহাওয়া খারাপ হলে বা নদী হঠাৎ উত্তাল হয়ে পড়লে এসব নৌযানের দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে স্পিডবোট উল্টে একজন চিকিৎসক ও তাঁর পরিবারের চারজন মারা যান। এর আগেও কয়েকটি দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণহানি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
নদীপথের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের। কিন্তু তারা যে তাদের দায়িত্ব পালন করছে না, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কোথাও কোনো নজরদারি নেই। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর ও পুরো বরিশাল বিভাগে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মাত্র একজন পরিদর্শক রয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএর একজনও নেই। ফলে নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে চলা এসব নৌযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবলও নেই। বোঝাই যাচ্ছে দ্রুত লোকবল সংকটের সমাধান করা না গেলে কোনোভাবেই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, দৈর্ঘ্যে ২০ মিটারের নিচে এমন প্রায় ১০ হাজার লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোট দেশের নদীগুলোতে চলাচল করছে। এগুলোর প্রায় অর্ধেক চলাচল করছে বরিশাল, ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার নদীতে। আর ১৬ অশ্বশক্তির নিচের নৌযানের নিবন্ধন লাগে না বলে এগুলোর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এসব ছোট ছোট নৌযান বড় নদীতে চলাচল তো করছেই। এর পাশাপাশি এগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়ে চালনা ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বড় নদীতে এসব নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীগুলোতে নজরদারি বাড়াতে লোক নিয়োগ করতে হবে। নিয়ম লঙ্ঘনকারী নৌযানগুলোর মালিকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

মিয়ানমারে গণতন্ত্র কত দূর এগোল? by মং জার্নি

অধ্যাপক অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে চমৎকারভাবে ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ‘উন্নয়ন’ শব্দটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেন যখন অধ্যাপনা করতেন, তখন তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন মিয়ানমারের বর্তমান কার্যত সরকারপ্রধান অং সান সু চি। অমর্ত্য সেনের সেই ছাত্রীটি নিশ্চয়ই ‘উন্নয়ন’-এর মানে বোঝেন। এ কারণে তিনি তাঁর রাখাইনবিষয়ক উপদেষ্টামণ্ডলী এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের গণহত্যাকে ‘উন্নয়নের ঘাটতি’ হিসেবে তুলে ধরতে পরামর্শ দিয়ে রেখেছেন। তাঁরাও সমানে এই কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু সু চি শিবিরের এই প্যাঁচানো কথার সত্যতায় গলদ রয়ে গেছে। সেটা হলো: (অর্থনৈতিক) উন্নয়নের অনুপস্থিতির কারণে কখনো গণহত্যা হয় না, মানবতাবিরোধী অপরাধও হয় না। সাধারণত সুশিক্ষিত ও সচ্ছল গোষ্ঠী ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে গণহত্যা চালায়। হিটলারের ঘনিষ্ঠ সহচরদের প্রায় সবাই হার্ভার্ড ও হামবুর্গ থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষিত নাৎসি ছিলেন এবং ওয়াল স্ট্রিটের আইকন হিসেবে পরিচিত ধনকুবেরদের সঙ্গে তাঁরা খানাপিনা করতেন। অশিক্ষিত এবং না খাওয়া লোকজন খিদের জ্বালায় কিংবা অস্তিত্বসংকট থেকে বড়জোর রাস্তাঘাটে ছিঁচকে অপরাধ করে বেড়ায়। কিন্তু গণহত্যার অর্থ ব্যাপক। পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী রাষ্ট্র যখন সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য শুদ্ধি অভিযানের মতো নৃশংস অভিযান চালিয়ে মানুষ মারতে থাকে, তখন সেটিকে গণহত্যা বলা যেতে পারে। কেউ যদি সু চির মিত্রদেশ যুক্তরাজ্যের কিংবা সু চির উপদেষ্টা দলের মধ্য থেকে আসা নীতিবিষয়ক ঘোষণাগুলোর দিকে লক্ষ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন সু চির এই সরকার পুরো মাত্রায় কর্তৃত্ববাদী। গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও এ সরকারে নেই। তাঁরা আত্মপ্রতারণার মতো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বলছেন, উন্নয়নই হচ্ছে রাখাইন সমস্যার একমাত্র সমাধান। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনারা রাখাইনে ‘নিরাপত্তাজনিত উচ্ছেদ অভিযান’ শুরু করার পর রোহিঙ্গাদের যে অবস্থা হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে সু চির ক্ষমতার অন্যতম অংশীজন সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাই কয়েক দিন আগে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে লড়াই হয়েছিল, সেই লড়াইয়ের ‘অমীমাংসিত বিষয়’ হচ্ছে এখনকার সহিংসতা। ক্ষমতার জন্য লালায়িত এসব বার্মিজ আমলা স্বীকারই করেন না মিয়ানমারে গণহত্যা কিংবা জাতিগত নিধন চলছে। ব্রিটিশ সরকারও তাদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকা অক্সফোর্ড পড়ুয়া সু চির পক্ষে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনে চালানো গণহত্যার দায় থেকে সু চিকে বাঁচানোর জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা সব ধরনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারপরও শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি। নোবেলজয়ী পরিচয় ছাপিয়ে ক্রমেই তিনি ‘গণহত্যার সহযোগী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছেন। তবে ব্রিটেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড সম্প্রতি সু চিকে ‘মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের অধিনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বার্মা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছাতে আমি মনে করি এই অবস্থাতেও দেশটির গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রাকে যুক্তরাজ্যের সমর্থন জানাতে হবে এবং দেশটির স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা ও বৈচিত্র্যকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে হবে।’ এফসিওর (ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস) অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় কর্মকর্তা (মার্ক ফিল্ড), ‘দীর্ঘমেয়াদি সমাধান’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চান? রোহিঙ্গাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার সরকার যে অভিযান শুরু করেছিল, তার ধারাবাহিকতাকেই কি আমরা ‘দীর্ঘমেয়াদি সমাধান’ হিসেবে ধরে নেব? সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি শুনানি হয়েছে। সেখানে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের উন্নয়নে আর্থিক সহায়তাদানকারী ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসির প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনা হয়। সেখানে ওই প্রকল্পের দুজন কর্মকর্তা স্বীকার করতে বাধ্য হন, তাঁদের এই প্রকল্প মিয়ানমারের কয়েক শ এমপির মধ্যে একজন এমপিও সৃষ্টি করতে পারেনি, যিনি রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রাতিষ্ঠানিক নীতি হিসেবে ‘নো মুসলিম অফিসার’ নীতি মেনে চলে। সু চিও সেই নীতি অনুসরণ করে ইতিমধ্যে তাঁর দল এনএলডিকে মুসলিম প্রতিনিধিমুক্ত করে ফেলেছেন। মিয়ানমারে আধুনিক আইনসভা চালুর পর এবারই প্রথমবারের মতো মুসলিমবিহীন পার্লামেন্ট চলছে এবং এটির নিয়ন্ত্রণে আছে শান্তির দূত সু চির দল এনএলডি। পরিহাসের বিষয় সাবেক জেনারেল থেইন সেইনের আমলে মিয়ানমারের সুশীল সমাজ যতটা প্রকাশ্য হতে পারত, এখন সু চির আমলে তারা সেটুকুও পারে না। তবু যুক্তরাজ্যের মতো দেশের কর্মকর্তারা অবিরাম বলছেন, সু চিই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। এ কারণে তাঁরা তাঁর পাশে থাকবেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত।
মং জার্নি: মিয়ানমারের নির্বাসিত মানবাধিকারকর্মী

আন্তক্যাডার বৈষম্য কীভাবে দূর হবে by আলী ইমাম মজুমদার

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) ২৭টি ক্যাডার রয়েছে। আছে বেশ কিছু সাব-ক্যাডারও। অভিযোগ রয়েছে এসব ক্যাডার, সাব-ক্যাডারের কোনো কোনোটি অন্যদের থেকে সুযোগ-সুবিধা কম পায়। পদোন্নতিতে রয়েছে বৈষম্য, এমন কথাও বলা হয়। এসব কথার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় যে একই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সবাই চাকরিতে এসেছেন। সুতরাং এখানে বৈষম্য কাম্য হতে পারে না। কথাগুলো ফেলে দেওয়া যাবে না। তবে বাস্তবতা যাচাই করে দেখারও প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন আছে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। এটা সত্যি, একই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সবাই চাকরিতে আসেন। এর মধ্যে প্রশাসন, পররাষ্ট্র, পুলিশসহ সাধারণ ক্যাডারে আসেন সাধারণত প্রতি ব্যাচে ৬ থেকে ৭ শ। তাঁরা সুদীর্ঘ একটি তালিকা থেকে মেধা, প্রাধিকার কোটা ও পছন্দের ক্রম অনুসারে স্থান পান এসব পদে। যাঁদের স্থান হয় না, তাঁদের জন্য হালে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কিছু পদের ব্যবস্থা হয়েছে। আর বিশেষায়িত ক্যাডারেও নিজ নিজ ক্ষেত্রে একই ভিত্তিতে নিয়োগ পান। তাহলে দেখা যায়, একই পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে এলেও প্রত্যেকের মেধাক্রম অভিন্ন নয়। আর অধিকতর মেধাবীরা তাঁদের পছন্দ অনুসারে আকর্ষণীয় চাকরিগুলো পাবেন, এটাও স্বাভাবিক। এখানে প্রাধিকার কোটারও প্রভাব রয়েছে। এর যৌক্তিকতার প্রশ্ন নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে ও হচ্ছে। আজকের নিবন্ধের প্রতিপাদ্য এটা নয়। উল্লেখ্য, চাকরির সুযোগ-সুবিধা সাধারণত নির্ধারণ করা হয় তার কর্মপরিধি অনুসারে। এটা অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন হবে না, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তেমনি পদোন্নতির সুবিধাদিও সে রকমই হওয়ার কথা।
আর চাকরিতে সবাই এসেছেন নিজেদের মেধাক্রম, প্রাধিকার কোটা আর পছন্দের ভিত্তিতে। প্রতিটি চাকরির সুযোগ-সুবিধা অভিন্ন নয়। যেমন পররাষ্ট্র ক্যাডারে যাঁরা নিয়োগ পান, তাঁরা বিদেশে পদায়নকালে বিদেশ ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, চিকিৎসার সব সুযোগ, সন্তানদের পড়াশোনার ভাতা ইত্যাদি পেয়ে থাকেন। সরকারি ব্যয়ে নিতে পারেন একজন গৃহপরিচারক। রাষ্ট্রদূতেরা সরকারি খরচে একজন বাবুর্চি ও একজন মালি নিয়োগ দিতে পারেন। এগুলো সবই যৌক্তিক। তেমনি মাঠ প্রশাসনে কর্মরত থাকাকালে একজন ডিসি বা এসপি সহায়ক কর্মচারীর সুবিধা পান তাঁদের বাসভবনে। আছে ভালো গাড়ির সুবিধাও। তাঁদের জুনিয়র সহকর্মীরাও কর্মপরিধি বিবেচনায় ক্ষেত্রবিশেষে গাড়ির সুবিধা পেয়ে থাকেন। নানা ধরনের সুযোগ রয়েছে প্রকৌশল ও বন ক্যাডারেও। যাঁরা এ ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক বলে মনে করেন, তাঁদের জন্য এসব চাকরির দ্বার রুদ্ধ ছিল না। তবে বিভিন্ন স্তরে বেতনকাঠামো তো অভিন্ন। সেটা কলেজশিক্ষক, কৃষিবিদ, কূটনীতিক, পুলিশ থেকে প্রশাসনের সদস্য—সবার জন্য প্রযোজ্য। গাড়ির ব্যাপার নিয়েই কথাটা বেশি আসে। অথচ গাড়ি পদমর্যাদার প্রতীক নয়। থানায় কোনো বিসিএস কর্মকর্তা নেই। সেখানে বেশ আগে থেকেই দেওয়া ছিল একটি গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রয়োজনে সেখানে সত্যিকার অর্থে একাধিক গাড়ির প্রয়োজন। পদোন্নতির সুযোগ নিয়ে কথা বলা চলে। এটা স্মরণে রাখা দরকার প্রতি ক্যাডার, সাব-ক্যাডারে গঠনকাঠামো এক রকম নয়। এ ক্ষেত্রে একই সময়ে চাকরিতে প্রবেশ করে বিভিন্ন ক্যাডারে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পদোন্নতি হতে পারে। ১৯৭৭ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা যখন উপসচিব, তখন পররাষ্ট্র ক্যাডারের সদস্যরা মহাপরিচালক/রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। তেমনি হিসাব ও নিরীক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা পদোন্নতি পেয়েছেন যুগ্ম সচিব পদে। কর ও শুল্ক ক্যাডারের সদস্যরা হয়ে গেছেন কমিশনার। এখনো প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইউএনও, এডিসি থাকাকালেই তাঁদের ব্যাচমেটরা পররাষ্ট্র ক্যাডারে পরিচালক, পুলিশে এসপি ইত্যাদি পদে চলে যান। এমনটা হবেই। এটা জেনে ও মেনেই সবাই চাকরিতে এসেছেন। বিসিএসের সবচেয়ে বড় দুটো ক্যাডার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশ পদে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি করতে না পারলে ঢিমেতালে চলতে থাকে জীবন। ব্যাচমেটরা সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক হয়ে যান। তাঁরা হাবুডুবু খেতে থাকেন সিভিল সার্জন হতেও। এটাকে কি আমরা বৈষম্য বলতে পারি? মোটেই না। চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণা অতিমূল্যবান। সেটা মূল্যায়ন করেই ওপরের দিকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখানে জ্যেষ্ঠতা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ নিয়ে কারও ক্ষোভ থাকলেও কিছুই করার নেই। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কয়েকটি সাব-ক্যাডার রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সাব-ক্যাডার সাধারণ শিক্ষা। এখানে কমবেশি ৮০টি বিষয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পদগুলো বিশেষায়িত বলে ইতিহাসের অধ্যাপক পদ খালি হলে পদার্থবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপককে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং একই ব্যাচে চাকরি পাওয়া শিক্ষকেরা ওপরের স্তরে একই সময়ে পদোন্নতি না-ও পেতে পারেন। ক্ষেত্রবিশেষে অপেক্ষাকাল হতে পারে দীর্ঘতর। একটি দিকে আঙুল তুলে অনেকেই দেখান। সেটা সচিবালয়ে নির্ধারিত পদসংখ্যার বিপরীতে হাল আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা। এটা সত্যি কথা যে এখানে গত কয়েক বছর শূন্যপদ ব্যতিরেকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে শৃঙ্খলা বিপন্ন হচ্ছে। তদুপরি এ পদগুলোর সিংহভাগেই আছেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তাঁদের নির্ধারিত সংখ্যার অনেক কম পদ দেওয়া হয়েছে, এমনটা বলা হয়। তা হয়ে থাকলে খুবই অসংগত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা বেশ কিছু থাকার কথা। অবশ্য কিছু কিছু ক্যাডারের নিজস্ব লাইন পদে পদোন্নতির ভালো সুযোগ থাকায় তাঁরা উপসচিব স্তরে আসতে চান না। এর মধ্যে পুলিশ, শুল্ক, কর ইত্যাদি ক্যাডারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা চলে। তবে অন্য ক্যাডারগুলোর নির্ধারিত সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব না থাকার ক্ষোভ যৌক্তিক। অন্যদিকে এভাবে পদোন্নতি দিয়ে সচিবালয় প্রশাসনকে ভারসাম্যহীন করা হয়েছে। ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া শুধু একটি বিভাগের চিত্র উল্লেখ করলে দেখা যাবে, সে বিভাগে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন যথাক্রমে ১১, ৬, ৩৩ এবং ১০ জন কর্মকর্তা। শীর্ষস্থানে একজন থাকলেও এ পিরামিডটির আকৃতি অনুমান করলে এর ভারসাম্যহীনতা বুঝতে প্রশাসন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়ে না। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা, সুবিধাদি পাচ্ছেন। অনেকেই কাজ করেন এক বা একাধিক ধাপ নিচে। তাহলে ধরে নিতে হবে এ পদোন্নতির সঙ্গে জনস্বার্থের সংশ্লিষ্টতা নেই। যা-ই হোক, এখন অন্তত রাশ টেনে ধরুন। এর কারণ বিভিন্ন। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে পারলে তা আন্তক্যাডার বৈষম্য কমাতেও সহায়ক হবে। আর তা ন্যায়সংগতভাবে করতে হলে উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির সুপারিশ করার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি)। হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও এ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-প্রক্রিয়ার ওপর মোটামুটি আস্থা রয়েছে অনেকের। অযাচিত বিলম্বসহ অনেক অভিযোগ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি গ্রহণযোগ্যতা হারায়নি। পদোন্নতির সুপারিশ করা হবে চাকরিজীবনের ইতিবৃত্ত এবং অভিজ্ঞতার পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে। আর অবশ্যই শূন্য পদের বিপরীতে এবং মেধার ক্রমানুসারে। এমনটাই প্রস্তাবিত ব্যবস্থা ছিল এ সরকারের গত আমলে তৈরি সিভিল সার্ভিস আইনের খসড়ায়। সে খসড়াটি অজ্ঞাত কারণে বাদ পড়ল। এতে দলীয়করণের অভিযোগটিও তেমন আসবে না। সরকার কাউকে চাকরির ভিত্তিস্তরে নিয়োগ দেওয়ার সময়ে কোনো স্তর পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়নি। সুতরাং একটি নির্ধারিত মেয়াদান্তেই বিশেষ বিশেষ ব্যাচ চাকরিতে কত বছর হলো, সে যুক্তিতে পদোন্নতি দাবি করছে। সফলও হচ্ছে। এমনটা না করলে আন্তক্যাডার বৈষম্যের যে অভিযোগ আসছে, তার যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে যেত।
আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

কারসাজি না হলে দাম বাড়বে না

দেশে চলতি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারদরও পড়তির দিকে। ফলে আগামী পবিত্র রমজান মাসে বাড়তি চাহিদা তৈরি হলেও মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। অবশ্য অতীতের অভিজ্ঞতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নানা কারসাজি করে রোজায় কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এবার যাতে তা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) গত সপ্তাহে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও দেশের বাজারদরের পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে দেখা যায়, দেশের চাহিদার তুলনায় এসব পণ্যের আমদানি স্বাভাবিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিকারকেরাও বলছেন, গত রোজার চেয়ে এ বছর পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কম। তবে তাঁদের চিন্তা ডলারের দাম, ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ও চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যজট নিয়ে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমদানি অনেক বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সরবরাহে টান পড়েছে। এতে টাকার বিপরীতে মার্কিন এই মুদ্রার দাম বেড়েছে। তা ছাড়া তারল্যসংকট তৈরি হওয়ায় ঋণ ও আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। আমদানি-রপ্তানির চাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগছে। বন্দরে জটের কারণে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি সময়মতো পণ্য হাতে পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, যা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বড় আমদানিকারক বলেন, ব্যাংকে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। আবার ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২-১৩ শতাংশ করা হয়েছে। বন্দরে জটের কারণে পণ্য খালাসে বিলম্ব হয়। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে নজর দেওয়া। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। সূত্র জানায়, সেখানে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, ট্যারিফ কমিশন রয়টার্স, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ টনের মতো দেশে উৎপাদিত হয়। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশে চিনি আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত বছরের একই সময়ের আমদানি তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, এ বছর চিনি আমদানির পরিমাণ ১৭ শতাংশ বেশি। ট্যারিফ কমিশন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত চিনির দাম ৪ শতাংশ ও এক বছরে ২৫ শতাংশ কমেছে। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে এখন ১৫ লাখ টন পরিশোধিত ভোজ্যতেলের চাহিদা আছে। দেশে সরষেসহ প্রায় ২ লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২ লাখ ৭১ হাজার টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ টন সয়াবিন তেল। বাকিটা পাম তেল। ফলে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট চাহিদার সিংহভাগ ভোজ্যতেল আট মাসেই আমদানি হয়েছে।
অবশ্য গত বছরের তুলনায় এ বছর আমদানি কিছুটা কম। গত বছর আলোচ্য সময়ে ১৩ লাখ ৮১ হাজার টন ভোজ্যতেল দেশে এসেছিল বলে দেখা যায় এনবিআরের হিসাবে। রোজায় বাজারের পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (বিপণন) আসিফ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে মূল্যে প্রভাব পড়ে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দর পড়তি। গত এক বছরে অপরিশোধিত পাম তেলের দাম ১৪ শতাংশ কমেছে। এক মাসে কমেছে ৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে সয়াবিন তেলের বাজারে তেমন হেরফের হয়নি। এক মাসে পণ্যটির দর সামান্য কিছুটা কমেছে। ট্যারিফ কমিশন বলছে, আমদানি অব্যাহত থাকলে রমজান মাসে ভোজ্যতেলের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দাম কমেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাবে, ১২ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৫১ টাকা ২২ পয়সা, যা এক মাস আগের তুলনায় ২ শতাংশের মতো কম। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে আস্ত ছোলার চাহিদা ১ লাখ টন। এর মধ্যে রোজাকেন্দ্রিক বাজারে ৮০ হাজার টনের মতো বিক্রি হয়। মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজারদর এক বছর ধরে নিম্ন পর্যায়ে আছে। ফলে বাজারে ডালের দাম আগের বছরের তুলনায় কম। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, গত আট মাসে ১ লাখ ৪ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে। ডালের বাজার নিয়ে চট্টগ্রামের বড় আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছর ছোলা ও মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজার কেজিতে ১০-১৫ টাকা কম। আশা করা যায়, দেশের মানুষ আগের চেয়ে কম দামে মসুর ডাল ও ছোলা কিনতে পারবে। পেঁয়াজের বাজারদরও পড়তি। এক মাসে পণ্যটির দাম কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। এদিকে দেশে নতুন মৌসুমে সংরক্ষণ করে রাখার মতো হালি পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে ভরা মৌসুমে পণ্যটির দাম স্থিতিশীল থাকার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে খেজুরের চাহিদা ২০ হাজার টন। এর মধ্যে ১৮ হাজার টনই লাগে রোজায়। চলতি অর্থবছরের আট মাসে দেশে ২০ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রোজা এলে ব্যবসায়ীরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চান। দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, রোজার আগে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে চিনির সরবরাহে প্রভাব পড়ে। এতে দাম বেড়ে যায়। এবারও ত্রুটির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সরকারকে বাজারে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব যাতে সঠিক হয়, তা নিশ্চিত  করতে হবে।

পাঁচ ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি

রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সুপারশপে কেনাকাটা করেছেন, এমন ৪৯ গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করেছে একটি চক্র। চক্রটি এসব গ্রাহকের তথ্য নিয়ে নতুন কার্ড তৈরি করে ২০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা বেসরকারি খাতের ব্র্যাক, দি সিটি, ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহক। ডেবিট ও ক্রেডিট-এ দুই ধরনের কার্ডই নকল করা হয়। ১০ মার্চ নকল কার্ড দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম ও পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) থেকে অর্থ তুলে নেওয়া হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হয় ব্যাংকগুলো। গ্রাহকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ ঘটনায় ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেছে সিটি ব্যাংক। অন্য ব্যাংকগুলো ঘটনার বিস্তারিত জানতে তদন্ত শুরু করেছে। মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) গোলাম রব্বানী বলেন, কার্ড জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলনের ঘটনায় সিটি ব্যাংক একটি মামলা দায়ের করেছে। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ক্যামেরার মাধ্যমে এটিএম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কার্ড জালিয়াতি হয়। সে সময় ইস্টার্ন, দি সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রায় ১ হাজার ২০০ কার্ড বাতিল করে। জানতে চাইলে দি সিটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, বনানীর স্বপ্নের একটি আউটলেট থেকে এসব কার্ড ক্লোন হয়েছে। এরপর বিভিন্ন এটিএম থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। আমরা মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেছি। এসিআই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান দেশের বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, স্বপ্নের আউটলেট থেকে কার্ডের তথ্য চুরি হয়েছে, এর কোনো প্রমাণ ব্যাংকগুলো এখনো দিতে পারেনি।
ব্যাংক সূত্রগুলো জানায়, ইসরাত জাহান, সাজিয়া চৌধুরী, অপরূপা চৌধুরী গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বনানীর ১১ নম্বর সড়ক ও কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ‘স্বপ্ন’ থেকে কেনাকাটা করেছিলেন। এরপর ১০ মার্চ তিন দফায় এবি ব্যাংকের কালশী এলাকার এটিএম বুথ থেকে ইসরাত জাহানের কার্ডের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন হয়। টাকা উত্তোলনের খুদে বার্তা পাঠানোর পর তিনি বিষয়টি সিটি ব্যাংককে অবহিত করেন। একইভাবে অন্য ৪৯ গ্রাহকের কার্ডের মাধ্যমেও টাকা উত্তোলন করা হলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপরই ব্যাংক পাঁচটি এটিএম সেবা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখে। একইভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ৯ গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করে সাড়ে ৬ লাখ টাকা তুলে নেয় চক্রটি। গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হয় ব্যাংকটি। এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাক ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জারা জাবীন মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ নিয়ে আমরা স্বপ্নের সঙ্গে কাজ করছি। আর গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।’ ইস্টার্ন ব্যাংকের ১১ গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা তুলে নেয় চক্রটি। ইস্টার্ন ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জিয়াউল করিম বলেন, সব ব্যাংকের কার্ডে ইএমভি প্রযুক্তি থাকলে কার্ড জালিয়াতি করেও এভাবে অর্থ তুলে নেওয়া সম্ভব হতো না। ব্যাংক এশিয়ার ৪ গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করে ১ লাখ ৫ হাজার তুলে নিয়েছে চক্রটি। এ ঘটনার তদন্ত করতে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে ব্যাংকটি। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন পেলেই বিস্তারিত জানা যাবে। সিটি ব্যাংকের ২২ গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করে ৬ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে চক্রটি। এর মধ্যে ১৬ জন ক্রেডিট কার্ড ও ৬ জন এটিএম কার্ডের গ্রাহক। কার্ড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে সব কার্ড চিপ ও পিনযুক্ত করতে হবে। সব ব্যাংক এ প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করলে কার্ড জালিয়াতি কমে আসবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ লাখ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক রয়েছে। আর ডেবিট কার্ড রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ। দেশের ৫৭ ব্যাংকের মধ্যে ৩৯টি ব্যাংক কার্ড সেবা দিচ্ছে।

ডিএসইর মালিকানা বিক্রি: চীনের প্রস্তাবও অনিশ্চয়তায়

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বলেছে, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য চীনের কনসোর্টিয়াম বা জোটের প্রস্তাবটি অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। তারা প্রস্তাবটি বিশ্লেষণ করে নানা অসংগতি খুঁজে পেয়েছে। ডিএসইও এখন তা মেনে নিয়েছে। যদিও গত মাসে অনুমোদনের জন্য চীনের প্রস্তাবটি বিএসইসিতে পাঠিয়েছিল ডিএসই। ফলে বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ডিএসইতে ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাব জমা দেয় ভারতের জোটও। ডিএসই বিক্রি করতে চেয়েছে ২৫ শতাংশ শেয়ার, আর ভারতের জোট কিনতে চেয়েছে ২৫ দশমিক ১০ শতাংশ। ভারতের প্রস্তাব ডিএসই বিবেচনায় না নেওয়ায় বিএসইসি এ নিয়ে এখন মাথা ঘামাচ্ছে না। তবে সংস্থাটি চীনের প্রস্তাব অনুমোদন দিতেও দ্বিধায়। বিএসইসির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চীনেরটি অনুমোদন করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক চর্চা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়ার পর শর্ত প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। অথচ তেমনটাই করা হয়েছে। একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাব ডিএসই কীভাবে পাঠাল, তা নিয়ে বিস্মিত বিএসইসি।
সংস্থাটির সূত্রে জানা গেছে, চীনা জোটের প্রস্তাব তৈরিতে ডিএসই ভেতর থেকে সহযোগিতা করেছে এবং ডিএসই পর্ষদের সদস্যরা কয়েক দফা চীন ঘুরেও এসেছেন। চীনের জোটটির নাম ‘কনসোর্টিয়াম অব সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ’। আর ভারতের নাম ‘কনসোর্টিয়াম অব ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই) অব ইন্ডিয়া, ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ এবং নাসডাক টেকনোলজি’। ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারীর প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার জন্য বিএসইসি গত ২২ ফেব্রুয়ারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার কমিশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি। তবে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘কমিটির প্রতিবেদন মাত্র পাওয়া গেল। চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে জাতীয় স্বার্থে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।’ তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিএসই বা চীনা জোটের প্রস্তাবে সমস্যা থাকতে পারে। বিএসইসির উচিত হবে ডিএসইকে ডেকে সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া। কোনো কারণে এটি বাতিল হলে ভাবমূর্তির সংকটে পড়তে পারে ডিএসই।’ ডিএসইর এমডি কে এম মাজেদুর রহমান বলেন, ‘চীনা জোটকে পেতে বিএসইসির অনুমোদন চেয়েছি। সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটাই চূড়ান্ত।’
চীনা জোটের অনেক শর্ত
চীনা জোটের প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে ১৫টি শর্ত রয়েছে। অন্যতম শর্ত হচ্ছে চুক্তি হবে যুক্তরাজ্যের আইনে এবং বিবাদের সমাধানও করতে হবে যুক্তরাজ্যের আদালতে। জোটটি ২৫ শতাংশ শেয়ারের দাম ধরেছে ৯৯২ কোটি টাকা, প্রতি শেয়ারের দাম ২২ টাকা। এ ছাড়া কারিগরি সহায়তা বাবদ ৩০০ কোটি টাকাও দিতে পারে। ডিএসইর পর্ষদে পদ চায় তারা একটি। নতুন শেয়ার ছাড়া, পরিচালকের সংখ্যা পরিবর্তন, ২৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা অবস্থায় নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারী নেওয়া, ডিএসইর সংঘ স্মারক ও সংঘবিধি পরিবর্তন, মেধাস্বত্ব অর্জন এবং ডিএসইর প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) বিষয়ে যেকোনো বিষয়, অর্থাৎ শেয়ারের মূল্য, অবলেখক নিয়োগ ও প্রসপেক্টাস অনুমোদনের কাজ চীনা জোটের সম্মতি ছাড়া করা যাবে না-এসব শর্তের কথাও রয়েছে প্রস্তাবে।
ব্যাখ্যা চাওয়ায় শর্ত প্রত্যাহার
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনা জোটের শর্তগুলো ত্রুটিপূর্ণ ও অসংগতিপূর্ণ। এমনকি শর্তগুলো উল্লেখ করা হয় সংযুক্তিতে, মূল প্রস্তাবে নয়। ডিএসই এগুলো নিয়ে চীনা জোটের সঙ্গে দর-কষাকষি করেনি। বিএসইসি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শর্তগুলোর বিষয়ে ডিএসইর কাছে ব্যাখ্যা চায়। ৪ মার্চ ডিএসই জানায়, দুটি ছাড়া সব শর্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে চীনা জোট। চুক্তি হবে বাংলাদেশি আইনে, তবে বিবাদের সমাধান হবে যুক্তরাজ্যের আদালতেই। একক বা যৌথভাবে ঋণ, চুক্তি ও বিনিয়োগের টাকার পরিমাণ ১০ কোটির বদলে হবে ১০০ কোটি টাকা। ব্যাখ্যা চাওয়ার পরে কেন শর্ত প্রত্যাহার, জানতে চাইলে ডিএসই পর্ষদের শেয়ারধারী পরিচালক শাকিল রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব যে আমাদের মাথায় আসবে, তা নয়। আর আমরা জানি যে বিএসইসি যাচাই-বাছাই করেই অনুমোদন দেবে।’ পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক বাকী খলীলী মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে ডিএসই খুবই কাঁচা কাজ করেছে। বলেন, ‘দুঃখজনক যে এটা নিয়ে শেয়ারবাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত খেলা হয়েছে।’
পাঠানো হয়নি ভারতের প্রস্তাব
ভারতের জোট পাঁচ বছরের জন্য ডিএসইতে বিনিয়োগ করার প্রস্তাব পাঠায়। প্রতি শেয়ারের দর ১৫ টাকা, টাকার অঙ্কে ৬৭৬ কোটি টাকা। তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (সেবি) এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে তারা অনুমোদন নেয়নি। ডিএসইর পর্ষদে জোটটির দাবি দুটি পরিচালকের পদ। আর ২২ শতাংশ শেয়ার থাকবে এনএসইর কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে এবং ৩ দশমিক ১০ শতাংশ শেয়ার জোটের সহযোগী ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশের নামে। নাসডাকের নামে শেয়ার থাকবে না। ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ‘ভারতের জোটের প্রস্তাবটি কারিগরি বিবেচনাতেই বাদ পড়েছে।’ উল্লেখ্য, স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক করা-সংক্রান্ত ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী ডিএসইর মোট শেয়ার ২৫০ সদস্যের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা আছে। এসব শেয়ারের মধ্যে ৪০ শতাংশ ডিএসইর সদস্যদের জন্য রাখা আছে। বাকি ৬০ শতাংশ শেয়ার আলাদা করা আছে সদস্যদের বাইরে দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির জন্য। তার মধ্য থেকে ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নেয় ডিএসই।

এক মণ বেগুনে এক কেজি চাল

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় বেগুনের দামে ধস নেমেছে। এক মণ বেগুন বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাত্র এক কেজি চাল পাওয়া যাচ্ছে। আজ শনিবার উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা হাটে গিয়ে চাষি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন আগেও বেগুনের দাম ভালো ছিল।
কিন্তু মৌসুমের শেষভাগে এসে দাম একেবারে পড়ে গেছে। আজ এখানকার পাইকারি বাজারে প্রতি মণ বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে দুজন চাষি বলেন, এক মণ মানে ৪০ সের নয়, ৫ থেকে ৭ সের পর্যন্ত বেশি দিতে হয়। ফলে দাম আরও কম পড়ে। অথচ এখন এক কেজি চাল কিনতে দরকার কমপক্ষে ৫০ টাকা। একটু ভালো চালের দাম আরও বেশি বলে তাঁরা জানান। ধানগড়া এলাকার দুজন চাষি বলেন, বেগুনের দাম পাইকারি বাজারে এত কম কিন্তু খুচরা বাজারে এর প্রভাব নেই। এখনো খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৬ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁরা জানান। উপজেলার বেতুয়া গ্রামের কৃষক আজাহার আলী বলেন, ‘আমরা যখন ফসল উৎপাদন করে বাজারে নিয়ে আসি, তখন দাম কমে যায়। আবার সেই ফসল কিনতে গেলে দাম বেড়ে যায়। কৃষক সব সময়ই বঞ্চিত হন।’ রায়গঞ্জের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, যাঁরা প্রথম দিকে বেগুন আবাদ করে বাজারে এনেছিলেন, তাঁরা প্রতি কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা করে পেয়েছেন। এখন মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় দাম খুব কমে গেছে।

রপ্তানিতে নতুন আশা পাটখড়ির ছাই

নানা উদ্যোগের পর অবশেষে পাটখড়ির ছাই বা ‘জুট স্টিক চারকোল’ রপ্তানির জট খুলেছে। এখন প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পাটখড়ির ছাই রপ্তানি হচ্ছে। ফলে বিদেশ থেকে আসছে মূল্যবান রপ্তানি আয়। জট কেটে যাওয়ার পর এ খাতে নতুন বিনিয়োগে কারখানা গড়ে তুলছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিমাসে গড়ে ৬০ হাজার ডলার মূল্যের পাটখড়ির ছাই রপ্তানি হয়।
তবে জট খোলার পর নভেম্বর থেকে পাল্টে যায় এই চিত্র। ওই মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় হয় ৬ লাখ ১৬ হাজার ডলার, যা জানুয়ারিতে দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ লাখ ডলার। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এই উদীয়মান খাতে রপ্তানি আয় হয় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার ডলার, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২০ লাখ ৮৪ হাজার ডলার। রপ্তানি আয় কিছুটা কমলেও জট খোলায় আশার আলো দেখছেন রপ্তানিকারকেরা। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির আহ্বায়ক মির্জা জিল্লুর রহমান গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে জাহাজ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর দুই মাস আগে পাটখড়ির ছাই রপ্তানিতে জটিলতা কেটেছে। খুব শিগগির এই খাতে রপ্তানি আয় বাড়বে। জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তা ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের শুরুতে কনটেইনারে পাটখড়ির ছাই পরিবহনের সময় বেসরকারি ডিপো ও বিদেশের বন্দরে এসব কনটেইনারে চারটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পাটকাঠি পুড়িয়ে তৈরি হওয়া ছাই ঠান্ডা হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে কনটেইনারে বোঝাই করায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এরপরই বড় দুর্ঘটনার শঙ্কায় অধিকাংশ জাহাজ কোম্পানি পাটখড়ির ছাই পরিবহনে আগ্রহ হারায়। এতে পণ্যটির রপ্তানি হোঁচট খায়। এ অবস্থায় গত বছরের ২৮ মে এ খাতের রপ্তানিকারকেরা বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মির্জা আজমের কাছে চিঠি দিয়ে জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানায়। এর পরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় জাহাজ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয় রপ্তানিকারকদের। এসব বৈঠকের পর নানা শর্ত সাপেক্ষে এই রপ্তানি পণ্য পরিবহনে সম্মত হয় বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো। তারা ঝুঁকি কমাতে চারটি সনদ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়। এর একটি হলো ‘সেলফ হিটিং’ সনদ, যা দেওয়া হয় পণ্যটি নির্ধারিত তাপমাত্রায় নিজে নিজে জ্বলে কি না, তা পরীক্ষা করে। এরপরেই রয়েছে চারকোলে থাকা কার্বনসহ নানা উপাদানের তথ্যসম্পর্কিত সনদ। এ ছাড়া পাটখড়ির ছাই উৎপাদনের পর কত দিন ধরে ঠান্ডা করা হয়েছে তার সনদ। উৎপাদনের পর অন্তত ১৬ দিন ধরে ঠান্ডা করতে হয় ছাই। কনটেইনারে বোঝাই করার সময় পণ্য পরীক্ষা করে ‘ভেরিং’ সনদ নিতে হয়। আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই চারটি সনদ জমা দেওয়ার পরই পাটখড়ির ছাইবাহী কনটেইনার জাহাজে তুলতে সম্মত হয় জাহাজ পরিচালনাকারীরা।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কোনো জাহাজে কনটেইনার পরিবহনের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি এবং হাজার কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকির কারণেই পাটখড়ির ছাইবাহী কনটেইনার পরিবহনে ঝুঁকি নেয়নি বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন বিদেশি জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো নির্দেশনা প্রণয়ন করায় এই পণ্য পরিবহনে আর শঙ্কা নেই। রপ্তানিকারকেরা জানান, ফরিদপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা চারকোল কারখানার বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই করা হয়। তিন থেকে চার দিন পোড়ানোর পর চুল্লির ঢাকনা খুলে ছাই সংগ্রহ করে ঠান্ডা করতে হয়। এসব ছাইয়ের মধ্যে গড়ে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন উপাদান থাকে। টনপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০ ডলারে রপ্তানি হচ্ছে এই পণ্য। পাটখড়ির ছাইয়ে থাকা কার্বন পাউডার দিয়ে প্রসাধনসামগ্রী, ব্যাটারি, কার্বন পেপার, পানির ফিল্টারের উপাদান, দাঁত পরিষ্কার করার ওষুধ ও ফটোকপি মেশিনের কালি তৈরি করা হয়। পাটখড়ির ছাইয়ের ৯৮ শতাংশ যায় চীনে। চীনে এই পণ্যের চাহিদার কারণে সেখানকার উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে কারখানা গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির হিসাবে, এই খাতে এখন ৩০টি কারখানা রয়েছে। তবে কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে ২৭টি কারখানা পাটকাঠির ছাই রপ্তানি করছে। অন্যরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রপ্তানি করছে। এই খাতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। রপ্তানি জট খোলার পর এখন নতুন বিনিয়োগও হচ্ছে। ১২ মার্চ রাজবাড়ীতে নতুন একটি কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ফরিদপুরে গত বছর যাত্রা শুরু করা চায়না বাংলা এগ্রো প্রোডাক্টসের প্রতিষ্ঠাতা সালাউদ্দিন মিয়া প্রথম আলোকে জানান, রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিনিয়োগ নিয়ে ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। রপ্তানি শুরু হওয়ার পর এখন আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। দেশ থেকে ২০০৯-১০ সালে এই পণ্য রপ্তানি শুরু হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে রপ্তানি দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৭৫২ ডলারে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ লাখ ৮২ হাজার ডলারে।

ওমানে গিয়ে ব্যাংকারের জালিয়াতি

আইএফআইসি ব্যাংকের মালিকানাধীন ওমানের প্রবাসী আয় প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান ওমান এক্সচেঞ্জের একটি শাখায় ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬১৫ ওমানি রিয়াল জালিয়াতি হয়েছে। এ অর্থ প্রায় ১০ কোটি টাকার সমান। প্রতিষ্ঠানটির একটি শাখার ব্যবস্থাপক প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা জমা না দিয়ে হাতিয়ে নেন। এ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে ওমানের উত্তরাঞ্চলের উপকূলবর্তী শহর সুহারে ওমান এক্সচেঞ্জের শাখায়। দায়ী শাখাটির ব্যবস্থাপক আমির হোসেন। বিশ্বখ্যাত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জালিয়াতির ঘটনাটি প্রথম ধরা পড়ে। এরপর ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমির হোসেনকে আটক করে ওমানের পুলিশ। একই ঘটনায় ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে আটক হন সুহার শাখার গ্রাহক ও ভারতীয় নাগরিক মুলিনকুটেল নারায়ণ পাচুর্জ। গত বছর ওমানের আদালত দোষী সাব্যস্ত করে তাঁদের কারাদণ্ড দেন। ওমান এক্সচেঞ্জ ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করে। এতে আইএফআইসি ব্যাংকের মালিকানা ২৫ শতাংশ। বাকিটা ওমানের কয়েকজন বিনিয়োগকারীর। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ২ লাখ ২৭ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে আইএফআইসি ব্যাংক। এ বিনিয়োগে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মুনাফা আসে ২২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা প্রায় ১৯ কোটি টাকার সমান। জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে। এ সময় ওমানের এক্সচেঞ্জের সুহার শাখায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা অর্থ জমা করলেও তা ব্যাংকের হিসাবে জমা দেখাননি শাখার ব্যবস্থাপক আমির হোসেন। তবে বাংলাদেশি সুবিধাভোগীরা ঠিকই অর্থ পেয়েছেন। ওই দুই মাসের জমা হওয়া অর্থের পাশাপাশি ভল্টে থাকা আগের অর্থও সরিয়ে ফেলেন শাখা ব্যবস্থাপক।
ওই সময়ে শাখার গ্রাহক নারায়ণ পাচুর্জ কোনো টাকা জমা না দিলেও তাঁর নামে ভারতে অর্থ স্থানান্তর হয়। এভাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেন শাখা ব্যবস্থাপক আমির ও নারায়ণ। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে আসার পর ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর নিকটস্থ পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে ওমান এক্সচেঞ্জ। এক সপ্তাহের মধ্যে দুজনকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশটির আদালতের রায় ঘোষণা হয়। রায়ে আমির হোসেনকে দেড় বছর ও নারায়ণকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি পুরো টাকা ফেরত দিলে ৫০০ ওমান রিয়াল জরিমানা দেওয়া সাপেক্ষে মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত তাঁরা টাকা ফেরত দেননি, ফলে মুক্তিও মেলেনি। সূত্র জানায়, আমির হোসেন ১৯৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর আইএফআইসি ব্যাংকে শিক্ষানবিশ ব্যবস্থাপনা কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালের ২৬ জুন তাঁকে প্রেষণে ওমানে পাঠানো হয়। আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ওমান এক্সচেঞ্জে রিয়েল টাইম সফটওয়্যার না থাকায় টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন আমির হোসেন। এ ঘটনার পর ওমান এক্সচেঞ্জে ‘ক্যাশ ম্যাক্স’ নামে বিশেষ সফটওয়্যার স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ ঘটনার পর ওমান এক্সচেঞ্জে মূলধন জোগানের কাজ শুরু করেছে উদ্যোক্তারা। এর মধ্যে লোকসানি টাকার ৭৫ শতাংশ দেবে কুয়েতের উদ্যোক্তারা এবং ২৫ শতাংশ দেবে আইএফআইসি ব্যাংক। এ জন্য ২ লাখ ৩৫ হাজার ডলার (প্রায় ২ কোটি টাকা) ওমানে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে আইএফআইসি ব্যাংক। জানতে চাইলে আইএফআইসি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, দেশটি থেকে প্রবাসী আয়ের বড় অংশই আসে ওমান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। একটা ঘটনায় ক্ষতি হয়ে গেছে, তবে এক্সচেঞ্জ হাউসটি কার্যক্রম চালু রাখতে নতুন করে মূলধন পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পেলেই মূলধন পাঠানো হবে।