Wednesday, June 24, 2026
সমাবেশে সেনাসদস্যকে হত্যার ঘটনায় বেলুচিস্তানের অধিকারকর্মীর যাবজ্জীবন, রায় নিয়ে সমালোচনা
বেলুচিস্তান ইউনিটি কমিটির (বিওয়াইসি) নেত্রী মাহরাং বেলুচকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের দায়ে তাঁর সহকর্মী সমাজকর্মী সিবগাতুল্লাহর সঙ্গে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
প্রসিকিউটররা (সরকারি আইনজীবী) এই দুজনের বিরুদ্ধে জনতাকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। সমাবেশ থেকে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য শাব্বির আহমেদের ওপর মারাত্মক হামলা চালানো হয়েছিল।
আইনজীবী দলসহ এই বিচারপ্রক্রিয়া বর্জন করা ওই দুই অধিকারকর্মী তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বেলুচের বিরুদ্ধে উপকূলীয় শহর গোয়াদরের ওই সমাবেশে ‘অত্যন্ত উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন। যার ফলে ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ লাঠিসোঁটা ও পাথর নিয়ে তাঁর এক দলের এক সদস্যের গাড়িতে হামলা চালায়।
নিরাপত্তা বাহিনীর ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, শাব্বির আহমেদ বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালত বলেছেন, বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহ ‘বেলুচ ইউনিটি কমিটির অবৈধ সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন এবং ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারি কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডে তাঁদের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল।’
আদালত দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারদের ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি (৭১৯ ডলার) জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহ বিভিন্ন অভিযোগে দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি) এই রায় অবিলম্বে পর্যালোচনা করার দাবি জানিয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে চরমপন্থার মতোই বিবেচনা করার নীতি বজায় রেখেছে। এতে প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে।
বেলুচের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বেলুচ এবং ওই অধিকার কর্মীদের আইনি দল জানিয়েছে, তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং তাঁরা এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মাহরাং বেলুচের বোন ও আইনজীবীরা বলেন, একটি গোপন ও অজ্ঞাত আদালত এই রায় দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সঠিকভাবে জেরা করার সুযোগ পাননি।
সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও এই বিচারপ্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি এই বিচারকে ‘বিচারের নামে প্রহসন’ এবং ‘সম্পূর্ণ গোপনে’ পরিচালিত বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য পাকিস্তান সরকারকে দোষারোপ করেন।
বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, প্রসিকিউটরদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে। এই মামলাটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
মাহরাং বেলুচ ২০২৪ সালে বিবিসির ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। তিনি ২০০৯ সালে তাঁর বাবাকে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আন্দোলন শুরু করেন। এর দুই বছর পর তাঁর বাবার মরদেহ পাওয়া যায়। তাঁর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল।
২০২৩ সালের শেষের দিকে মাহরাং নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের বিচারের দাবিতে শত শত নারীকে নিয়ে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ১ হাজার মাইল (১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার) দীর্ঘ পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন।
মাহরাংয়ের সংগঠন বিওয়াইসি বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে। কয়েক দশক ধরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এই প্রদেশে আন্দোলন–সংগ্রাম চলছে।
বিওয়াইসি অবশ্য পাকিস্তান সরকারের আনা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, বেলুচ বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। -বিবিসি
![]() |
| পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের নারী মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বেলুচ। ছবি: তাঁর এক্স হ্যান্ডল থেকে নেওয়া |
Tuesday, March 3, 2026
বেলুচিস্তান যে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে by ওসামা বিন জাভাইদ
সম্প্রতি টানা ৪০ ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। সংগঠনটি কয়েক দশক ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিসাবে, এসব হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক। ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। আর ১৪৫ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা। শুধু শনিবারই মারা গেছে শতাধিক মানুষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ছিল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্যতম বড় ও দুঃসাহসী হামলা। বিদ্রোহীদের দাবি, এই হামলায় তারা ৮৪ জন নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করেছে।
প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় এখনো বহু বছরের সংঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। পুলিশ একাডেমি, আদালত ভবন ও বাজার এলাকাজুড়ে সহিংসতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। এখানেও সরকারের বার্তা একই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। এক ডজনের বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। সাধারণ মানুষ পড়েছে গোলাগুলির মাঝখানে। শক্তি প্রদর্শনের যে চেষ্টা চলছে, তা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই বাস্তব শক্তির চেয়ে বেশি দেখানোর প্রয়াস।
বেলুচিস্তানে হামলার জবাবে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এখন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ফিতনা আল হিন্দুস্তান। যার অর্থ ভারতের উপদ্রব। এ বিষয়ে অবশ্য এখনো নয়াদিল্লি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
‘বিদেশি হাত’তত্ত্ব এখন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বয়ানের মূল স্তম্ভ। প্রায় প্রতিটি হামলাকেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে বেলুচদের স্থানীয় ও বাস্তব ক্ষোভের বিষয়গুলো আড়ালে চলে যায়। তার জায়গা নেয় সহজ ও দায় এড়ানোর একটি গল্প। অতীতেও সরকার দাবি করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প নস্যাৎ করতে চায়।
এই বয়ানের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার বদলে দেশের অখণ্ডতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
২০১৬ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবকে পাকিস্তান এই ‘বিদেশি হাত’তত্ত্বের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখায়। কুলভূষণকে মৃত্যুদণ্ড দেয় একটি পাকিস্তানি আদালত। পাকিস্তান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যেখানে যাদবকে বেলুচিস্তানে হামলা সংগঠনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন।
কোয়েটার চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক বঞ্চনা আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের গল্প শোনা যায়। মানুষের প্রশ্ন, বিপুল খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের দারিদ্র্য থেকেই যাচ্ছে?
৪৬ বিলিয়ন ডলারের চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের প্রতিশ্রুতি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আশীর্বাদ বলে মনে হয় না। বিশেষ করে গওয়াদার বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে তাদের সন্দেহ প্রবল। অনেকের ধারণা, এই প্রকল্পের সুফল পাবে বেইজিং ও ইসলামাবাদ। বেলুচের জেলে কিংবা রাখালদের ভাগ্যে তেমন কিছু জুটবে না।
বেলুচ বিদ্রোহীরা প্রায়ই খনিতে হামলা চালায়। অন্য প্রদেশ থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের হত্যা করে। বেলুচিস্তানের অনেক জায়গায় পরিস্থিতি ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো। কোনো নিয়ম নেই। প্রকৃত অর্থে কারও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও নেই।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতি। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর একজন বলছিলেন, সেনাবাহিনী একজন যোদ্ধাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু একটি ক্ষোভকে হত্যা করতে পারে না। রাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী মনে করে। অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের নিজেদের সন্তান ও ভাই হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ১৮ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এই বিভাজনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সেই মানুষদেরই গ্রাস করছে, যাদের নিরাপত্তার জন্যই ছিল বিদ্রোহ।
বেলুচিস্তান বৈপরীত্যে ভরা এক ভূমি। এখানে রয়েছে গওয়াদারের মতো ঝকঝকে বন্দর। আবার আছে এমন দুর্গম উপত্যকা, যেখানে সংঘাত শুরু হলে প্রথমেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ছিদ্রপথের সীমান্ত বিদ্রোহীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। পাকিস্তানের কাছে এই প্রদেশ তাই এক স্থায়ী উদ্বেগের উৎস।
এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ছড়িয়ে আছে ভূমি ও স্মৃতিতে। ২০১৩ সালে হাজারা টাউনে হামলার পর এক বাসিন্দা বলেছিলেন, আহত ব্যক্তিরা এখানে–ওখানে পড়ে ছিল। কার কী পরিচয়, তা বোঝা যাচ্ছিল না। ২০১৬ সালে কোয়েটা পুলিশ একাডেমিতে হামলার পর এক ক্যাডেটের প্রশ্ন ছিল, ‘কেন আমাদের অস্ত্র ছাড়া ভেতরে থাকতে বলা হয়েছিল?’
এই কথাগুলো দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও ভেঙে পড়া সামাজিক চুক্তির সাক্ষ্য দেয়। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে জনসমর্থনের দাবি অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষার মতো শোনায়।
বেলুচিস্তানের এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মতে, স্থানীয় প্রশাসনের সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করতে চাননি। বেলুচিস্তান প্রদেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী। ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবা অনেকের কাছে পৌঁছায় না। আর নিরাপত্তা তো অনেকের কাছেই বিলাসিতা।
সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান পাকিস্তানের কঠোর শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়েছে। আকাশে ড্রোন আর মাটিতে টহলের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি উচ্ছেদ করা হয়েছে।
প্রতিটি বড় হামলার পর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আবার নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার নানা অঙ্গীকার করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই অঙ্গীকারের গতি থেমে যায়। নিরাপত্তা অভিযান চললেও সহিংসতা পুরোপুরি থামে না। অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, কিন্তু বিদ্রোহীদের প্রচারণা থেকে নতুন সদস্য আসার গতি তাতে খুব একটা কমে না।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতি। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই বাইরের চাপ সামলানো। একই সঙ্গে ভেতরের ক্ষতগুলো সারানো, যা এই প্রদেশকে এতটা অস্থির করে রেখেছে। শেষ ৪৮ ঘণ্টা আবারও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আগের মতোই ইসলামাবাদের ক্ষমতাকেন্দ্র ও গণমাধ্যম বেলুচিস্তানকে ভুলে যাবে। দূর থেকে বিশ্লেষণ চলবে। কিন্তু এই নীরবতা কি স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি পরবর্তী ঝড়ের আগের বিরতি হবে, তা নির্ভর করবে পরের অধ্যায় কে লিখছে, তার ওপর।
বেলুচিস্তানের প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও কার্যকর আঞ্চলিক কূটনীতি। তবেই হয়তো এই প্রদেশ চিরস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
* ওসামা বিন জাভাইদ, কাতারের দোহাভিত্তিক সাংবাদিক এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ। কোয়েটা, বেলুচিস্তান, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি |
Sunday, February 1, 2026
বেলুচিস্তানে ‘সন্ত্রাসী’ হামলা ও অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৫
এদিকে সন্ত্রাসী হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৫ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ হামলা ও অভিযান সম্পর্কে পাওয়া প্রাথমিক খবরে মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৬৮ উল্লেখ করা হয়েছিল।
আজ রোববার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে হালনাগাদ তথ্য জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গতকাল বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’–এর সদস্যরা কোয়েটা, মাসতুং, নুশকি, ডালবানদিন, খারান, পাঞ্জগুর, তাম্প, গোয়াদর ও পাসনি এলাকায় একযোগে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা নারী, শিশু ও শ্রমিকসহ ১৮ জন নিরীহ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে।
আইএসপিআর বলেছে, ‘হামলার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। অভিযানে ৩ আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীসহ ৯২ সন্ত্রাসী নিহত হন। লড়াইয়ে ১৫ সেনাসদস্য বীরত্বের সঙ্গে প্রাণ দেন। এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসীদের মূলহোতা ও সহায়তাকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।’
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এবং বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ হামলার নকশা ভারত থেকে করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা কোথায় বসে এসব করছেন, তার অকাট্য প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। আমরা বিশ্ববাসীর কাছে তাঁদের মুখোশ খুলে দেব।’
মুখ্যমন্ত্রী বুগতি বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি পুরো বেলুচ পরিবারও রয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক কমানো সম্ভব হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঞ্জাব থেকে বেলুচিস্তানে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডেরা গাজী খান শহরের পুলিশ উপকমিশনার উসমান খালিদ বলেন, ফোর্ট মুনরো হাইওয়ে ও তৌনসা-মুসা খেল সড়ক দিয়ে যানচলাচল বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে। তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার ওই হামলাকে সন্ত্রাসীদের একটি ‘মরিয়া পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আইএসপিআর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, গত এক বছরে পাকিস্তানে ৫ হাজার ৩৯৭টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে আফগান ও ভারতীয় মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে। শুধু গত বছরেই পাকিস্তানজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযানে ২ হাজার ৫৯৭ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন।
![]() |
| পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে হামলাস্থল পরিদর্শন করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, কোয়েটা। ছবি: এএফপি |
Sunday, September 27, 2009
বেলুচিস্তান কি আরেক বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে -পাকিস্তান by কুলদীপ নায়ার
পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। বেলুচিস্তানও একই পথ অনুসরণ করতে পারে, যদি পাকিস্তান সেখানে তার সামরিক অভিযান বিষয়ে সতর্ক না হয়। মুক্ত হাওয়ায় বাঁচার জন্যে একটুখানি জায়গা দাবি করায় নিজ দেশের মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে তা জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষত সহজে ঘোচানো যাবে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল।
বছরখানেক আগে সার্কভুক্ত এক দেশে একটি সম্মেলনে বেলুচ ন্যাশনাল মুভমেন্টের এক প্রতিনিধির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যদি বেলুচিস্তানের সীমান্ত থাকত, তাহলে প্রদেশটি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইতিমধ্যে ভারতে যোগ দিত। নয়াদিল্লির প্রতি ইসলামাবাদের সন্দেহের দৃষ্টি এ সব কারণে। বেলুচদের ওপর নিষ্ঠুরতার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমন ঘটনার কথা আমি শুনেছিলাম। আমি জেনেছিলাম, ঢাকায় সমাজের মাথাগুলোকে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি বেলুচদের কাছে ক্ষমা চেয়ে এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠিক কাজটি করেছিলেন বলে আমি মনে করি। বেলুচ লিবারেশন আর্মি, বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট—তিনটি সশস্ত্র সংগঠনই যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু আসিফ আলী জারদারি সেনা প্রত্যাহার, নিখোঁজদের উদ্ধার তত্পরতা, রাজবন্দীদের মুক্তি ও বেলুচিস্তানে সেনানিবাস স্থাপন বন্ধ করার মতো বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলেন। জারদারি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বোঝাতে সমর্থ হননি যে সেনা প্রত্যাহার করা দরকার। নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে শক্তি প্রদর্শন নয়, দরকার সহমর্মিতা।
অবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে আবারও খারাপ হয়েছে। বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার অনেক ভবনে উড়ছে স্বাধীনতার পতাকা। স্কুলে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাওয়া হচ্ছে না। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নবাব আকবর বাগতির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পণ্ড করতে গেলে সম্প্রতি সেখানে সংঘর্ষ বাধে। এটা খুবই স্পষ্ট যে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সেনা অভিযানের মাধ্যমে বাগতিকে হত্যা করেন। কিন্তু জারদারির শাসনকালে খুনিদের শাস্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি বাগতি ‘হত্যা’র দায়ে মোশাররফের বিরুদ্ধে একটা মামলা পর্যন্ত করতে পারেননি। মোশাররফের বিরুদ্ধে তাদের যে ক্ষোভ ছিল, তা এখন গিয়ে পড়ছে পিপিপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর। ক্ষোভ প্রশমনে পিপিপি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
যদি বেলুচদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বেলুচিস্তানকে এখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব। সাড়ে তিন দশকেরও বেশি আগের কথা। আকবর বাগতি তখন বেলুচিস্তানের গভর্নর। তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি বারবার আমাকে বলেছিলেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোকে অবশ্যই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এটাই ছিল সত্যিকারের দাবি। আমরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কথা বলেছিলাম এবং আন্দাজ করতে পেরেছিলাম, বাগতির চাওয়া ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া সবকিছু ইসলামাবাদ থেকে কোয়েটার হাতে ন্যস্ত করতে হবে। পরের দিন আমি ভুট্টোকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি জানান, আমাদের পাঁচ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনার টেপ তিনি ইতিমধ্যে হাতে পেয়ে গেছেন। এমনই ছিল ভুট্টোর কাজের ধরন। ফলস্বরূপ তিনি বাগতিকে গভর্নর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং দেশ শাসনের জন্য একনায়কতান্ত্রিক পথ বেছে নেন।
ইসলামাবাদ সরকার বেলুচদের নির্মমভাবে দমন করতে লাগল। নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেলুচ ন্যাশনাল মুভমেন্টের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বেলুচসহ আরও তিনজন জনপ্রিয় নেতাকে হত্যা করল। বিদ্রোহী নেতা-কর্মীদের প্রতি দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকল। এসবই পুরনো পদ্ধতি, যার জন্য পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। তবে এটা সত্য যে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা সেখানে নেই। তবে প্রয়াত আকবর বাগতির নাতি ২৮ বছরের উদ্যমী তরুণ ব্রামদাগ বাগতি তাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের মধ্যমণিতে পরিণত হতে যাচ্ছেন। জারদারি যদি বিষয়গুলো নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাহলে হয়তো বা বেলুচিস্তানের সমস্যার সমাধানে সফল হতেন। সেনাবাহিনীর চোখ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি যা দেখছেন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের পরিণতিই উঁকি দিচ্ছে।
পাকিস্তানের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দেশটিতে প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু পাকিস্তানের ট্র্যাজেডি হচ্ছে, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে পাঞ্জাব সব সময়ই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থেকেছে। এটা বলা খুবই কঠিন, কীভাবে ভবিষ্যতে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে ভারতের ঘাড়ে দোষ চাপানো হবে, অথবা যুদ্ধ প্রতিরোধে বেলুচিস্তানে বিপুল থেকে বিপুলতর সেনা মোতায়েন করা হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফিরোজ জামান চৌধুরী
* কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...


